সীরাতে সরওয়ারে আলম – ৫ম খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

৩. কুরাইশদের বালসুলভ ও হীন আচরণ

হুযুরের (স) বিরুদ্ধে কুরাইশের লোকেরা যে আচরণ করছিল তা ছিল অত্যন্ত হীন ও বালসুলভ ও তার উদ্দেশ্য ছিল, তাঁকে নিরোৎসাহ করা এবং বিব্রত করে রাখা।

হযরত যয়নবকে (রা) তালাক দেয়াবার চেষ্টা

তাদের একটি তৎপরতা এ ছিল যে, তারা হুযুরের (স) জামাতা আবুল আস বিন আররাবী’র উপর চাপ সৃষ্টি করছিল যাতে সে হুজুরের (স) বড়ো মেয়ে হযরত যয়নবকে (রা) তালাক দেয়, যেভাবে  আবু লাহাব তার পুত্রদ্বয়কে হুযুরের (স) কন্যা হযতর রুকাইয়া (রা) এবং হযরত উম্মে কুলসুমকে (রা) তালাকা দিতে বাধ্য করে। এ আবুল আস ছিলেন বনী আবদুল ওয্যা বিন আবদে শামস গোত্রের লোক। তাঁর মা হালা বিনতে খুয়াইলেদ হযরত খাদিজার (রা) ভগ্নি ছিলেন। মক্কার ধনাঢ্য ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি একজন ছিলেন। ধনসম্পদ, ব্যবসা বাণিজ্য ও আমানতদারীর দিক দিয়ে তিনি মক্কায় মুষ্টিমেয় ব্যক্তিদের অন্যতম ছিলেন। হুযুরের (স) নবীর পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে হযরত যয়নবের (রা) সাথে তাঁর বিয়ে হয়। হযরত খাদিজা (রা) তাঁকে আপন পুত্রের মতোই মনে করতেন। নবুওতের পর যদিও তিনি মুসলমান হননি এবং শির্কের মধ্যেই লিপ্ত ছিলেন, তথাপি তিনি কুরাইশদের চাপের মুখে নতি স্বীকার করেননি এবং হযরত  যয়নবকে (রা) তালাকও দেননি।[প্রকাশ থাকে যে হযরত যয়নব (রা) আপন মায়ের সাথেই মুসলমান হন। কিন্তু যেহেতু তখন পর্যন্ত মুমেন ও মুশরিকের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ হওয়ার হুকুম আসেনি। সে জন্য তিনি আবুল আসের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন।গ্রন্হকার।] বালাযুরী –আনসাবুল- আাশরাফে বলেছেলে, কুরাইশ সর্দারগণ তাঁকে (আবুল আস) বললো, তুমি যয়নবকে তালাক দাও। তারপর কুরাইশের যে নারীকেই তুমি পছন্দ কর তাকে দিয়ে তোমার বিবাহ দেব।

তিনি বলেন, তাবারী ও ইবনে হিশাম মুহাম্মদ বিন ইসহাকের বরাত দিয়ে। তাঁরা অতিরিক্ত এ কথাও বলেন যে, কুরাইশের লোকেরা আবু লাহাব পুত্র ওতবার নিকটে গিয়ে বলল, তুমি মুহাম্মদের (স) কন্যাকে তালাক দাও। কুরাইশের যে মেয়েকেই তুমি চাইবে তার সাথে তোমার বিয়ে দিয়ে দেব। সে বলল, তোমরা যদি সাঈদ বিন আস অথবা তার পুত্র আবানের মেয়েকে আমার জন্যে ঠিক করে দিতে পার তাহলে তোমাদের কথা মানব। তার ইচ্ছামত মেয়ে তার জন্য সংগ্রহ করে দেয়অর পর সে হুযুরের (স) মেয়েকে তালাক দেয়।  তাও রুখসতি বা মেয়ে বিদায়ের পূর্বে।

নবী পুত্রের মৃত্যুতে আনন্দ প্রকাশ

এর চেয়েও অধিকতর হীন মানসিকতাসূলভ আচরণ তাদের এ ছিল যে, হুযুরের (স) প্রথম পুত্র সন্তান হযরত কাসেমের (স) শৈশবকালেই ইন্তেকাল হওয়ার পর যখন তাঁর দ্বিতীয় পুত্র হযরত আবদুল্লাহও (রা) শৈশবে ইন্তেকাল করেন তখন কুরাইশের লোকেরা হুযুরের (স) শোক দুঃখে সে ধরনের সহানুভুতিও প্রকাশ করেনি, যা ছিল ভদ্রতা ও মানবিকতার সর্বনিম্ন দাবী, বরঞ্চ তার বিপরীত তারা আনন্দ উল্লাস করে এবং তাঁকে ছিন্নমুল বলা শুরু করে। অর্থাৎ তাঁর  পরে তাঁর নাম নেয়ার কেউ থাকবেনা।(পরিবর্ধন।)

ইবনে সা’দ ও ইবনে আসাকের হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের (রা) বরাত দিয়ে বলেন, নবীর (স) বড়ো পুত্র ছিলেন হযরত কাসেম (রা)। তাঁর ছোট ছিলেন হযরত যয়নব (রা)। তাঁর ছোট হযরত আবদুল্লাহ (রা)। তারপর পর পর তিন কন্যা উম্মে কুলসুম (রা) ফাতেমা (রা) ও রুকাইয়া (রা) ছিলেন। এঁদের মধ্যে প্রথমে হযরত কাসেমের (রা) ইন্তেকাল হয়, তারপর হযরত আবদুল্লাহরও (রা) ইন্তেকাল হয়। এতে আস বিন ওয়অয়েল বলে, তাঁর বংশ নিঃশেষ হয়ে গেল। তিনি এখন ছিন্নমূল, তাঁর শিকড় কেটে গেছে।

কোন কোন বর্ণনায় অতিরিক্ত একথা বলা হয়েছে যে, আস বলে মুহাম্মদ (স) আবতার (ছিন্নমুল) । তাঁর কোন পুত্র নেই যে তাঁল স্থলাভিষিক্ত হতে পারে। যখন তিনি মৃত্যুবরণ করবেন তখন তাঁর থেকে তোমরা রেহাই পাবে। আবদে হামীদ ইবনে আব্বাস (রা) এর বরাত দিয়ে বলেন, হুযুরের (স) পুত্র আবদুল্লাহর (রা) মুত্যুর পর আবু  জাহলও এ ধরনের মন্তব্য করে।

ইবনে আবি হাতেম শামির বিন আতিয়্যার বরাত দিয়ে বলেন, হুযুরের (স) এ শোক দুঃখে আনন্দ উল্লাস প্রকাশ করতে গিয়ে ওকবা বিন আবি মুয়াইতও এ ধরনের হীন মানসিকতা ব্যক্ত করে। আতা বলেন, নবী (স) এর দ্বিতীয় পুত্র ইন্তেকালের পর তাঁর আপন চাচা আবু লাহাব (যার বাড়ি হুযুরের (স) বাড়ির সংলগ্ন ছিল) দৌড়ে মুশরিকদের কাছে গিয়ে এ সুসংবাদ (?) দেয় যে আজ রাতে মুহাম্মদ (স) পুত্রহীন হড়ে পড়েছে- অর্থাৎ ছিন্নমূল হয়ে পড়েছে।

এ ছিল অতীব হৃদয় বিদারক অবস্থা যখন সূরা কাওসার নাযিল হয়। কুরাইশের লোকেরা এজন্য নবীর প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিল যে, তিনি শুধুমাত্র আল্লাহর বন্দেগী করতেন এবং তাদের শির্ককে প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এজন্য নবুওতের পূর্বে গোটা কওমের মধ্যে তাঁর যে মর্যাদা ও স্থান ছিল তা কেড়ে নেয়া হয়। তাঁকে যেন আপন জ্ঞাতি গোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। তাঁল মুষ্টিমেয় সংগী-সাথীও অসহায় ও বন্ধহীন হয়ে পড়েছিলেন এবং তাঁদের উপর মারপিটও চলছিল। উপরন্তু পর পর পুত্র হারা হওয়অর ফলে দুঃখের পাহাড় তাঁর উপরে ভেঙে পড়েছিল। এমতাবস্থায় বন্দু বান্ধব, আত্মীয় স্বজন, গোত্র ও জ্ঞাতি গোষ্ঠীর লোক এবং প্রতিবেশীদের পক্ষ থেকে সমবেদনা প্রকামের পরিবর্তে আনন্দ- উল্লাস করা হচ্ছিল। তারা সব এমন মন্তব্যও করছিল, যা এমন এক শরীফ ব্যক্তির জন্য অতীব হৃদয়বিদারক ছিল, যিনি শুধু আপনজনের জন্যই নয় বরঞ্চ অপরের জন্যও অত্যন্ত সদাচরণ করতেন।

এসবের জবাবে আল্লাহ তায়অলা সূরা কাওসারে বললেন,

*****************************************************

  • অর্থাৎ তোমরা দুশমনই আবতার বা ছিন্নমূল।

এ শুধু নিছক প্রত্যুত্তরমূলক আক্রমণ ছিলনা বরহ্ছ প্রকৃতপক্ষে কুরআনের গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণীসমূহের মধ্যে একটি ছিল, যা  অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হয়। যখন এ ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, তখন লোকে নবীকে (স) আবতার (ছিন্নমুল) মনে করছিল এবং কেউ ধারণাও করতে পারতোনা যে, কুরাইশের এ বড়ো বড়ো দলপতি কিভাবে ছিন্নমূল হয়ে পড়বে যারা শুধু মক্কা  শহরেই নয় গোটা আরব দেশে সুবিখ্যাত ছিল, সফলকাম ছিল। ধনদৌলত ও সন্তানসন্ততি লাভের সৌভাগ্যই শুধু তাদের হয়েছিল না, বরঞ্চ সমগ্র দেশে স্থানে স্থানে তাদের সহযোগী সাহায্যকারীও ছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যে একচেটিয়অ সুবিধাভোগী ও হজ্বের ব্যবস্থাপক হওয়ার কারণে সমস্ত আরব গোত্রের সাথে তাদের গভীর সম্পর্ক ছিল। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই অবস্থা একেবারে বিপরীতমুখী হয়ে গেল।

যখন পঞ্চম হিজরীতে আহযাব যুদ্ধের সময় কুরাইশগণ বহু আরব ও ইহুদী গোত্রসহ মদীনা অবরোধ করে এবং হুযুরকে (স) অবরুদ্ধ হয়ে খাল খনন করে প্রতিরোধের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল, অথচ মাত্র তিন বছর পর সে সময় এলা যখন অষ্টম হিজরীতে নবী (স) মক্কা আক্রমণ করেন, তখন কুরাইশদের কোন সাহায্যকারী ছিলনা এবং অসহায় অবস্থায় তাদেরকে অস্ত্র সংবরণ করতে হয়। তারপর এক বছরের মধ্যেই গোটা আরব দেশ নবী (স) এর করতলগত হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিভন্ন গোত্রের প্রতিনিধি দল নবীর হাতে বায়আত করছিল। দুশমন একেবারে অসহায় ও বন্ধুহীন হয়ে রইলো। তাদের নাম নিশানা এমনভাবে মুছে গেল যে তাদের বংশধর কেউ দুনিয়ার কোথাও থাকলেও তাদের মধ্যে আজ কেউ একথা জানেনা যে, সে আবু জাহল, আবু লাহাব, আস বিন ওয়ায়েল অথবা ওকবা বিন আবি মুয়াইত ইত্যাদি ইসলাম দুশমনের বংশধর। আার জানলেও কেউ একথা বলতে রাজী নয় যে তার পূর্ব পুরুষ ওসব লোক ছিল। পক্ষান্তরে রাসূলূল্লাহ (স) এর পরিবার পরিজনের উপর আজ সরা দুনিয়ায় দরূদ পাঠ করা হচ্ছে। কোটি কোটি মুসলমান তাঁর সাথে সম্পর্ক রাখার জন্য গর্ববোধ করছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ শুধুমাত্র তাঁরই নয়, বরঞ্চ আপনার পরিবার ও আপনার সংগীসাথীদের পরিবারের বংশধর হওয়াকে গৌরবের বিষয় মনে করে। কেউ সাইয়েদ, কেউ আলভী, কেউ আব্বাসী, কেউ হাশেমী, কেউ সিদ্দিকী, কেউ ফারুরী, কেউ ওসমানী, কেউ যুবায়রী এবং কেউ আনসারী। কিন্তু আবু জাহালী ও আবু লাহাবী নামের কাউকে পাওয়া যায়না । ইতিহাসে একথা প্রমাণিত যে, আবতার হুযুর (স) ছিলেননা, বরঞ্চ তাঁর দুশমনই ছিল এবং আছে। (তাফহীম ৬ষ্ঠ খন্ড- সূরা কাওসার- ভূমিকা, টীকা-৪।)

কুরআনের আওয়াজ শুনা মাত্র হৈ চৈ করা

আর একটি হীন ও জঘণ্য আচরণ যা তারা অবলম্বন করেছিল তা এই যে, যখন কুরআন পাঠ করা হতো তখন তারা হৈ চৈ করতো এবং চারদিক থেকে দৌড়ে পালাতো যাতে তারা নিজেও শুনতে না পায় এবং অপরেও শুনতে না পারে। কুরআনে বলা হয়েছে-

*****************************************************

এ সত্য অস্বীকারকারীগণ বলে, এ কুরআন কখনো শুনবেনা এবং যখন শুনানো হবে তখন হৈ চৈ শুরু করে দাও, সম্ভবত এভাবে তোমরা বিজয়ী হবে (হা-মীম-আসসাজদাহ-২৬)

এ ছিল ম্কার কাফেরদের পরিকল্পনাগুলোর একটি। এর দ্বারা নবীর (স) দাওয়াত ও তবলীগ তারা ব্যর্থ করে দিতে চাইছিল। তারা ভালোভাবে জানতো যে, কুরআনের মধ্যে কোন যাদুকরী প্রভাব ছিল এবং যিনি তা পাঠ করে শুনাতেন তিনি কোন উচ্চস্তরের লোক ছিলেন। আর এ ব্যক্তিত্বসহ তার পঠনভংগী কত হৃদয়গ্রাহী। তারা মনে করতো যে এমন উচ্চস্তরের ব্যক্তির মুখ থেকে এমন মন মাতানো ভংগিমায় এ তুলনাবিহীন কথা যে শুনবে সেই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়বে। এ জন্য তারা এ কর্মসূচী তৈরী করলো যে, এ কালাম তারা নিজেরাও শুনাবেনা এবং অপরকেও শুনতে দেবেনা। মুহাম্মদ (স) যখনই তা শুনাতে শুরু করবেন, তখন হৈ চৈ করবে, হাত তালি দেবে, চিৎকার করবে, ঘোর আপত্তি জানাবে এবং আওয়াজ এতো উচ্চ করবে যেন তাঁর আওয়াজ তলিয়ে যায়। এ কৌশল অবলম্বন করে তারা এ আশা পোষণ করতো যে, আল্লাহর নবীকে তারা পরাজিত করবে।(তাফহীম ৪র্থ খন্ড- হা-মীম-সাজদা- টীকা ৩০)

*****************************************************

অতএব ( হে নবী) ব্যাপার কি, এ অস্বীকারকারীগণ তোমার ডান ও বামদিক থেকে দলে দলে দৌড়ে তোমার দিকে আসছে?

এ তাদের কথা বলা হচ্ছে, যারা নবীর (স) দাওয়াত, তবলীগ ও কুরআন তেলাওতের আওয়াজ শুনে বিদ্রুপ করার এবং হট্টগোল করার জন্য চারদিকে দৌড়ে আসতো।(তাফহীম ৬ষ্ঠ খন্ড- মায়ারেজ- টীকা ১২৪।)

*****************************************************

নিজের নামায না উচ্চস্বরে অথবা খুব নিম্নস্বরে পড়োনা। এ উভয়ের মধ্যে মধ্যম আওয়াজে পড়।

মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে আব্বাসের এমন বর্ণনা আাছে যে, মক্কায় যখন নবী (স) আপন বাড়িতে অথবা দারুল আরকামে নামাযে উচ্চস্বরে কুরআন পড়তেন, তখন কাফেরেরা হৈ চৈ শুরু করতো এবং কখনো গালিও দিত। এর ফলে নির্দেশ হলো, না তুমি এতা উচ্চস্বরে পড় যে কাফেরেরা শুনে ভিড় করে আসে, আর না এতো নিম্বস্বরে পড় যে, তোমার সাথীগণও শুনতে না পায়।(তাফহীম ২য় খন্ড- বনী ইসরাঈল- টীকা ২৪।)

কুরআনের কদর্থ করে পথভ্রষ্ট করা

মক্কায় কাফেরদের এ কৌশলের উল্লেখ কুরআনে আছে-

*****************************************************

যারা আমাদের আয়াতের বিকৃত অর্থ পেশ করে তারা আমাদের কাছে গোপন নয়, স্বয়ং চিন্তা করে দেখ যে, সে ব্যক্তি কি উৎকৃষ্ট, যাকে আগুনে নিক্ষেপ করা হবে না সে যে নিয়ামতের দিনে নিরাপত্তাসহ হাযির হবে। যা ইচ্ছা করতে থাক। তোমরা যা কিছুই করছ আল্লাহ তা দেখছেন।

‘ইলহাদ’ এর অর্থ পথভ্রষ্ট হওয়া, সরল পথ থেকে বক্র পথে ঘুরে যাওয়া, বক্রতা অবলম্বন করা। আল্লাহর আয়াতে ‘ইলহাদ’ এর অর্থ এই যে, মানুষ সহজ সরল কথায় কিছু বক্রতা বের করার চেষ্টা করে। আয়অতে ইলাহীর সঠিক ও স্পষ্ট  মর্ম তো গ্রহণ করেনা, বরঞ্চ বিভিন্নভাবে তার কদর্থ করে নিজেও পথভ্রষ্ট হয় এবং অন্যকেও পথভ্রষ্ট করে। মক্কার কাফেরগণ কুরএনর দাওয়াত বন্ধ করার জন্য যে সব কূটকৌশল অবলম্বন করেছিল তার মধ্যে একটি এও ছিল যে, তারা কুরআনের আয়অত শুনে যেতো। তারপর কোন আয়াতকে তার পূর্বাপর সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে, কোন আয়াতের শাব্দিক কদর্থ করে, কোন শব্দ বা বাক্যের ভুল অর্থ করে বিভিন্ন ধরনের আপত্তি উত্থাপন করতো এবং মানুষকে এই বলে বিভ্রান্ত করতো যে, ‘এ নবী সাহেব’ কি কথা বলেছেন। (তাফহীম ৪র্থ খন্ড- হা-মীম- সাজদা- টীকা)

মুসলমানরদেরকে অযথা ও বেহুদা বিতর্কে লিপ্ত করা

কাফেরদের-এ আচরণের উল্লেখ কুরআনে এভাবে করা হয়েছে-

*****************************************************

আল্লাহর দাওয়াতে সাড়া দেয়ার পর যারা সাড়াদানকারীদের সাথে আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে ঝগড়া বিতর্কে লিপ্ত হয়, তাদের এ দলিল প্রমাণ উপস্থাপন তাদের রবের নিকট বাতিল বলে গণ্য।

এ সে অবস্থার প্রতি ইংগিত করছে, যা মক্কায় দৈনন্দিন ঘটতো। যখন কারো সম্পর্কে জানা গেল যে, সে মুসলমান হয়েছে, তখন সকলে কোমর বেঁধে তার পেছনে লেগে যেতো। তার জীবন অতিষ্ঠ করে তোলা হতো। না বাড়িতে, না মহল্লায় আর না জ্ঞাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সে নিশ্চিন্তে থাকতে পারতো।

যেখানে সে যেতো, এক অফুরন্ত বিতর্ক শুরু হয়ে যেতো, এ উদ্দেশ্যে তা করা হতো যেন সে কোন প্রকারে বনী মুহাম্মদের (স) সম্পর্কে ত্যাগ করে, সেই জাহেলিয়াতের দিকে ফিরে আসে যার থেকে সে বেরিয়ে পড়েছিল। (তাফহীম ৪র্থ খন্ড- শুরা- টীকা ৩১।)

মুসলমানদের বিদ্রুপ করা ও তাদেরকে হেয় করা

এ ব্যাপারে কুরআন বলেঃ

*****************************************************

অপরাধী লোকেরা ঈমানদার লোকদের বিদ্রুপ করতো এবং তাদের নিকট দিয়ে যাবার সময় চোখ টিপে টিপে তাদের দিকে ইংগিত করতো। আর যখন আপন লোকদের মধ্যে ফিরে যেতো তখন আনন্দে গদ গদ হয়ে ফিরে যেতো। তাদেরকে দেখলে বলতো, এরা সব পথভ্রষ্ট লোক। অথচ তাদেরকে তাদের ব্যাপারে পর্যবেক্ষণ করে পাঠানো হয়নি। (মুতাফফেফীনঃ ২৯-৩৩)

আনন্দে গদ গদ হয়ে ফেরার অর্থ- যখন তারা বাড়ি ফিরতো, তারা মনে করতো, আজ বেশ মজা উপভোগ করা গেল। আমরা অমুক মুসলমানকে খুব বিদ্রুপ করলাম, উচ্চস্বরে উপহাস করে আনন্দ পেলাম এবং লোকের মধ্যে তার ভালো প্রতিক্রিয়া হলো।(তাফহীম ৪র্থ খন্ড- শুরা- টীকা ৩১।)

বালাযুরী, আনসাবুল আশরাফে হযরত ওরওয়া বিন যুবাইয়ের বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন, যখন নবী (স) এর সাথে আম্মার বিন ইয়াসের (রা), খাব্বাব বিন আল আরেত (রা), সুহাইব বিন সিনান (রা), বেলাল বিন রাবাহ (রা), আবু ফুকাইহা (রা) এবং আমের বিন ফুহায়রার মতো লোককে কুরাইশরা মসজিদে হারামে বসে থাকতে দেখতো, তখন সব লোকই আল্লাহর অনুগ্রহের অধিকারী ছিল?

অজ্ঞ লোকদেরকে বিভ্রান্তির মধ্যে নিক্ষেপ করা

এ প্রসংগে কুরআন বলে-

*****************************************************

যখন তাদের কেউ জিজ্ঞেস করে, তোমাদের রব এ কোন জিনিস নাযিল করেছেন, তখন তারা বলে, আরে এতো প্রাচীনকালের জরাজীর্ণ কাহিনী (নহলঃ ২৪)।

নবী (স) এর দাওয়াত যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো, তখন মক্কার লোক যেখানেই যেতো, তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হতো, তোমাদের ওখানে যে ব্যক্তি নবী হিসাবে আবির্ভূত হয়েছেন, তাঁর শিক্ষা কি? কুরআন কোন ধরনের কিতাব? তার বিষয়বস্তু কি? ইত্যাদি ইত্যাদি।

এ ধরনের প্রশ্নের জবাব মক্কার কাফেরগণ সব সময়ে এমন ভাষায় দিত যার দরুন প্রশ্নকারীর মনে নবী (স) এবং আনীত কিতাব সম্পর্কে কোননা কোন প্রকার সন্দেহ সৃষ্টি হতো অথবা অন্ততঃপক্ষে নবী ও তাঁর নবুওত সম্পর্কে তার মনে কোন অনুরাগ যেন বাকী না থাকে। (তাফহীম ২য় খন্ড- নাহাল- টীকা ২২।)

৪. সাংস্কৃতিক কর্মসূচী

এসব নিকৃষ্ট কলাকৌশল ছাড়াও নবী (স) এর দাওয়াত প্রতিরোধের জন্য আর এক কৌশলঃ অবলম্বন করতো। এ কথাও চিন্তা করা হয়েছিল যে, মানুষকে কেচ্ছা কাহিনী, গান বাদ্য আনন্দ-সম্ভোগে মগ্ন রেখে- তাদেরকে চিন্তা চেতনার দিকে পংগু করে রাখা যাতে তারা যেন কোন গুরুতর বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দিতে না পারে যা কুরআন এবং মুহাম্মদ (স) তাদের সামনে পেশ করছিলেন।

ইবনে হিশাম সীরাতে মুহাম্মদ বিন ইসহাকের বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন যে, বনী আবদুদ্দারের নদর বিন আল হারেস বিন আলাদা কুরাইশের এক সমাবেশে বলে, তোমরা মুহাম্মদের (স) মুকাবেলা যেভাবে করছো তাতে কোন ফল হবেনা। মুহাম্মদ (স) যখন যুবক ছিলেন তখন তিনি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে অমায়িক ছিলেন, সবচেয়ে সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ছিলেন। এখন যখন তাঁর চুল শ্বেত বর্ণ ধারণ করেছে, তখন তিনি তোমাদের নিকটে এমন জিনিস এনেছেন যে তোমরা তাঁকে বলছ যাদুকর, গণক, কবি ও পাগল। খোদার কসম! তিনি যাদুকর নন। আমরা যাদুকর দেখেছি, তাদের ঝাড়ফুঁক দেখছি। খোদার কসম! তিনি গণক নন। আমরা গণকের নীরস ছন্দোবন্ধ কথা শুনেছি। সে যে আবোল-তাবোল কথা বলে তাও আমাদের জানা আছে। তাঁর কালাম এ সবের কোন ধারায় পড়েনা। খোদার কসম! তিনি পাগলও নন। পাগলের যে অবস্থা হয়ে থাকে এবং যে ধরনের অর্থহীন কথা বিড় বিড় করে বলে তা কি আমাদের জানা নেই? হে কুরাইশ সর্দারগণ! অন্য কিছু উপায় চিন্তা করে দেখ। যে জিনিসের মুকাবেলা তোমাদের করতে হবে, তা এর চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ যে তোমরা কিছু রচনা করে তাকে পরাজিত করতে চাও।

তারপর সে প্রস্তাব করে যে, অনারব দেশ থেকে রুস্তম ও ইসফেন্দয়ারের কেচ্ছা কাহিনী সংগ্রহ করে এনে ছড়ানো হোক যাতে লোক এর প্রতি অনুরক্ত হতে থাকে এবং তা তাদের কাছে কুরআন থেকে অধিক বিস্ময়কর মনে হয়। তারপর কিছুদিন এ কাজ চলতে থাকে এবং স্বয়ং নদর কেচ্ছা-কাহিনী শুনাতে থাকে।(তাফহীম ৩য় খন্ড- আম্বিয়া- টীকা ৭।‌)

এ বর্ণনাই ওয়াহেদী, কালবী এবং মুকাতেলের বরাত দিয়ে আসবাবুন নুযুলে উদ্ধৃত করেছেন। ইবনে আব্বাস (রা) অতিরিক্ত একথা বলেছেন যে, নদর এ উদ্দেশ্যে গায়িকা দাসীও খরিদ করেছিল। যখনই সে এ কথা শুনতো যে অমুক নবী (স)এর কথায় প্রভাবিত হয়ে পড়েছে, তখন তার পেছনে একজন দাসী লাগিয়ে দিত এবং তাকে বলতো, তাকে খুব ভালো করে আদর যত্ন করে খেতে দাও এবং গান শুনাতে থাক, যাতে তোমাকে নিয়ে মত্ত থেকে তার মন যেন ওদিক থেকে সরে আসে (তাফহীম ৪র্থ খন্ড- লোকমান- টীকা ৬।)

৫. মিথ্যার অভিযান ও তার প্রভাব

এসব কৌশল অবলম্বনের সাথে কুরাইশগণ নবী (স) এর সাধারণ দাওয়াত শুরু হওয়ার সাথে সাথে মিথ্যা প্রচারণার এক অভিযানও শুরু করে যাতে মানুষকে তাঁর প্রতি বীতশ্রদ্ধ করা যায়। এ অভিযানে যেহেতু স্যের কোন লেশমাত্র ছিলা, বরঞ্চ নিছক তাঁর বদনাম করা এবং তাঁর থেকে মানুষকে দূরে রাখা উদ্দেশ্য ছিল, সে জন্যে, যার মুখে যা আসতো তাই বলে বেড়াতো। কেউ বলতো, তিনি কবি, কেউ বলতো, গণক, কেউ বলতো যাদুকর। কেউ বলতো- তাঁকে যাদু করা হয়েছে। কেউ আবার পাগল বলতো। মোটকথা কোন একটি মাত্র কথা ছিলনা যা তারা তাঁর সম্পর্কে বলতো। এ সব নিন্দা চর্চা মক্কার আনাচে-কানাচেই করা হতোনা, বরঞ্চ মক্কায় যে ব্যক্তিই আসতো যিয়ারত, ব্যবসা-বাণিজ্য বা অন্য কোন উদ্দেশ্যে তাকেই এসব কথা বলা হতো। এর দ্বারা চেষ্টা করা হতো যাতে কেউ তাঁর (নবীর) কথা শুনতেই না পায়, যার দ্বারা তার প্রভাবিত হওয়ার আশংকা করা হতো।(পরিবর্ধন।)

হজ্জের সময় কুরাইশদের পরামর্শ

এভাবে কয়েক মাস অতিবাহিত হওয়ার পর হজ্বের সময় এসে গেল। মক্কার লোকেরা এ চিন্তায় পড়ে গেল যে, এ সময়ে গোটা আরব থেকে হাজীদের কাফেলা আসবে। যদি মুহাম্মদ (স) এ সব কাফেলার অবস্থানে গিয়ে গিয়ে হাজীদের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং হজ্বের সমাবেশগুলোতে স্থানে স্থানে দাঁড়িয়ে কুরআনের মতো নজীর বিহীন এ প্রভাব সৃষ্টিকারী কালাম পাঠ করে শুনাতে থাকেন, তাহলে আরবের প্রতিটি আনাচে-কানাচে তাঁর দাওয়াত পৌঁছে যাবে। তারপর না জানি কে কে এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে। ইবনে ইসহাক, হাকেম এবং বায়হাকী উৎকৃষ্ট সনদসহ এ ঘটনা বর্ণনা করেনঃ

এ উদ্দেশ্যে কুরাইশ সর্দারগণ এক সম্মেলন করলো এবং এতে সিদ্ধান্ত করা হয় যে, হাজীদের আগমনের সাথে সাথেই তাদের মধ্যে হুযুরের (স) বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করা হবে। এতে সকলে একমত হওয়ার পর অলীদ বিন মগীরা সমবেত লোকদেরকে বলল, যদি আপনারা মুহাম্মদ (স) সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের কথা লোকদেরকে বলেন, তাহলে আমাদের প্রতি আস্থা নষ্ট হয়ে যাবে। এ জন্যে কোন একটি স্থির করে নিন যা সকলে একমত হয়ে বলবো।

কেউ কেউ বলল, আমরা মুহাম্মদকে (স) গণক বলবো। অলীদ বলল-না, খোদার কসম গে গণক নয়। আমরা গণক দেখেছি। যেভাবে সে গুণ গুণ করে কথা বলে  এবং যে ধরনের বাক্য জোড়ে, তার সাথে কুরআনের কোন দূরতম সম্পর্কও নেই। কেউ বলল- তাকে পাগল বলা হোক। অলীদ বলল-সে পাগলও নয়। আমরা তো পাগলও দেখেছি। সে যেমন মাতালের মতো কথা বলে এবং উল্টা-সিধা ভাব-ভংগী করে তা কারো অজানা নেই। কে এ কথা বিশ্বাস করবে যে, মুহাম্মদ (স) যে কালাম পেশ করছেন, তা পাগলের দম্ভোক্তি অথবা পাগল অবস্থায় মানুষ এমন কথা বলে? লোকে বলল, আচ্ছা, তাহলে তাকে আমরা কবি বলব। অলীদ বলল, তিনি কবিও নন। আমরা কবিতার সকল ধরন সম্পর্কে অবগত। এ কালামে কবিতা রচনার কোন দিক দিয়েই মিল নেই। লোকে বলল, তাহলে তাকে যাদুকর বলা হোক। অলীদ বলল- তিনি যাদুকরও নন। যাদুকরদের আমরা চিনি। যাদুর জন্য তারা যে পদ্ধতি অবলম্বন করে তাও আমাদের জানা আছে। এ কথাও মুহাম্মদের (স) উপর প্রযোজ্য নয়। তোমরা এ সবের মধ্যে যে কথাই বলবে তা মানুষ অন্যায় অভিযোগই মনে করবে। খোদার কসম! এ কালামে বড়ো মিষ্টাতা রয়েছে। তার মূল গভীরে এবং শাখা-প্রশাখা ফলবান।

ইবনে জারীর তাঁর তফসীরে কথা একরামার বরাত দিয়ে অতিরিক্ত বলছেন যে, এরপর আবু জাহল অলীদকে চাপ দিয়ে বলে, মুহাম্মদ (স) সম্পর্কে যতোক্ষণ না তুমি কিছু বলেছ, তোমার কওম তোমার উপর সন্তুষ্ট হবেনা। অলীদ বলে, আচ্ছা আমাকে চিন্তা করতে দাও। তারপর চিন্তাভাবনা করে বলে, কমপক্ষে যে কথাটা বলা যায় তাহলো এই যে, তোমরা আরবের লোকদেরকে বল- এ ব্যক্তি যাদুকর। এ ব্যক্তি এমন কালাম পেশ করে যা মানুষকে তার বাপ, ভাই, বিবি-বাচ্চা ও গোটা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। অলীদের একথা সকলে মেনে নিল। তারপর এক পরিকল্পনা মুতাবেক হজ্বের সময় কুরাইশদের প্রতিনিধি দল, হাজীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তারা আগমনকারীদেরকে সতর্ক করে দিতে লাগলো যে এখানে এমন এক ব্যক্তির আবির্ভাব হয়েছে যে বড়ো যাদুকর। তার যাদু পরিবারের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি করে। তার থেকে সতর্ক থাকতে হবে।(তাফহীম ৬ষ্ঠ খন্ড- সূরা মুদ্দাসসেরের ভূমিকা।)

এ ঘটনার বিষয়ে কুরআনে পর্যালোচনা

অলীদ বিন মুগীরার এ প্রস্তবানা সম্পর্কে সূরায়ে মুদ্দাসিরের ১১-২৫ আয়াতে পর্যালোচনা করা হয়েছেঃ ছেড়ে দাও আমাকে এবং সে ব্যাক্তিকে। অথ্যাৎ তাকে আমিই দেখে নেব। তার ব্যাপারে তোমার চিন্তার কোন দরকার নেই। আমি তাকে একাকী ও নিসংগ অবস্থায় পয়াদ করেছি। অর্থাৎ সে দুনিয়ায় সাথে করে কিছু নিয়ে আসেনি। আমি তাকে বহু ধনসম্পদ দিয়েছি এবং তার সাথে হাযির থাকার জন্য বহু পুত্র সন্তানও দিয়েছি। অর্থাৎ তাকে দশ-বারো জন যুবক পুত্র সন্তান দিয়েছি- যারা সব নামকরা। বৈঠকাদিতে তার সাথে থাকতো (খালিদ বিন অলীদ (রা) এর মতো  যোগ্য পুত্রও তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন)। তার জন্য নেতৃত্ব কর্তৃত্বের পথ সুগম করে দিয়েছি। এতদসত্ত্বেও সে লালসা করতো যে আমি তাকে আরও দিই, কক্ষনোও না। আমি তো তাকে একটা চড়াইতে চড়াব। সে চিন্তা করলো এবং কিছু কথা রচনা করার চেষ্টা করলো। খোদার মার তার উপর – কেমন কথ রচনার চেষ্টা সে করেছে। হ্যাঁ, খোদার মার তার উপর কেমন কথা রচনার চেষ্টা সে করেছে। পরে লোকদের প্রতি তাকালো। পরে কপাল সংকোচিত করলো, মুখ বাঁকা করলো, পরে ফিরে গেল এবং অহংকারে পড়ে গেল। শেষে বলল, এ কুরআন তো কিছু নয়। একটি যাদু যা পূর্ব থেকে চলে আসছে। এ তো এক মানব রচিত কালাম”।

উপরে যে ঘটনার উল্লেখ আমরা করেছি তার থেকে স্পষ্ট যে, কুরআন আল্লাহর কালাম এ সম্পর্কে অলীদের মন নিশ্চিত ছিল। তারপর তার কওমের মধ্যে তার নেতৃত্ব কর্তৃত্ব ও মানসম্মান রক্ষা করার জন্য নিজের বিবেকের সাথে যেভাবে সংগ্রাম করলো এবং যে ধরনের মানসিক সংঘাতে বহুক্ষণ যাবত লিপ্ত থাকার পর সে কুরআনের বিপক্ষে যে একটি কথা রচনা করলো- তার চিত্র এ আয়াতগুলোতে অংকিত করা হয়েছে।(তাফহীম ৬ষ্ঠ খন্ড- সূরা মুদ্দাসসেরের তাফসীর।)

স্থায়ীভাবে ও ব্যাপক আকারে মিথ্যা প্রচারণা

এ মিথ্যার অভিযান  শুধু হজ্বের সময়েই চলতোনা। বরঞ্চ বছরের বারো মাসে এবং মাসের তিরিশ দিন-দিবারাত্রি এ অভিযান চালানো হতো। মক্কার জনসাধারণকেও সর্বদা নবীর (স) বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত করে তোলা হতো। বহিরাগতদেরকে সতর্ক থাকতে এবং নবীর নিকটবর্তী না হওয়ার জন্য তাকীদ করা হতো। আরবের মেলাগুলোতে, যেমন ওকাজ, মাজান্না ও যুল-মাজায- কুরাইশের প্রতিনিধিগণ ছড়িয়ে পড়তো এবং নবীর (স) বিরুদ্ধে হরেক রকমের প্ররোচনা তাদের দেয়া হতো। বিশেষ করে প্রতি বছর হজ্বের সময় তাদের প্রতিনিধি হাজীদের শিবিরে শিবিরে যেতো এবং নবীর (স) বিরুদ্ধে সব কথা ছড়িয়ে দিত যাতে লোক তাঁর কথা শুনা থেকে দূরে থাকে এবং তাঁকে নিজেদের জন্য একটি বিপদ মনে করে।

মক্কার বাইরে ইসলামের প্রচার

কুরাইশরা একথা মনে করতো যে, এভাবে তারা নবী মুহাম্মদ (স) ও কুরআন প্রতিহত করবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এভাবে তারা স্বয়ং আরবের আনাচে কানাচে তাঁর নাম পৌঁছিয়ে দেয়। বছরের পর বছর ধরে মুসলমানদের চেষ্টায় যতোটা তাঁর নাম ও দাওয়াতের প্রচার সম্ভব হয়নি, কুরাইশদের এ অভিযানের অল্প সময়ে তা সম্ভব হয়। সাধারণ মানুষ এতে খারাপ ধারণা পোষণ করলেও অনেকের মনে আপনা আপনি এ প্রশ্নের উদয় হয়। জানাতো দরকার যার বিরুদ্ধে এ ঝড় উঠেছে, সে কেমন লোক? অনেকে এরূপ চিন্তাও করতে থাকে যে, যার এতো ভয় আমাদের দেখানো হচ্ছে, তার কথাটাতো শুনা যাক। এভাবে মক্কার বাইরে অন্যান্য অঞ্চলেও ইসলাম পৌঁছার পথ খুলে যায়।

তুফাইল বিন আমর দাওসূর ইসলাম গ্রহণ

ইনি দাওস গোত্রের একজন সম্ভ্রান্ত দলপতি ছিলেন। ইবনে ইসহাক এবং ইবনে সা’দ তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা স্বয়ং তাঁর বর্ণনা মুতাবিক বিস্তারিতভাবে উদ্ধৃত করেছেন। দাওসী বলেন, আমি দাওস গোত্রের একজন কবি ছিলাম। কোন কাজে মক্কা গিয়েছিলাম। সেখানে পৌঁছার পর পরই কুরাইশের কিছু লোক ঘিরে ধরলো এবং নবীর (স) বিরুদ্ধে আমার কান ঝালাপালা করে দিল। ফলে আমি তাঁর প্রতি খুব বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়লাম। আমি স্থির করলাম যে, তাঁর থেকে আমি সরেই থাকব। দ্বিতীয় দিন আমি হেরেমে হাযির হয়ে দেখলাম তিনি নামায পড়ছেন। আমার কানে তাঁর পঠিত কিছু কথা পড়তেই অনুভব করলাম, এ তো বড়ো সুন্দর কথা। আমি মনে মনে ভাবলাম, আমি একজন কবি, যুবক মানুষ, জ্ঞান বিবেক রাখি, কচি খোকাও নই যে,  ভালোমন্দ পার্থক্য করতে পারবনা। এ লোকের সাথে সাক্ষাৎ করে জানিনা কেন, এ কি বলে। বস্তুতঃ নবী (স) যখন নামায শেষ করে ঘরে ফিরছিলেন, তখন আমি তাঁর পেছনে পেছনে চললাম। তাঁর বাড়ি পৌছার পর আমি তাঁকে বললাম, আপনার কওম আপনার সম্পর্কে আমাকে এ ধরনের কথা বলেছিল তার দরুন আপনার প্রতি আমার এমন খারাপ ধারণা হয় যে, আমি কানে তুলো দিয়েছিলাম যাতে আপনার কোন কথা ঘুনতে না পাই। কিন্তু এই মাত্র আপনার মুখ থেকে যে কয়টি কথা শুনলাম, তা আমার কাছে খুব ভালো মনে হয়েছে। আপনি একটু বিস্তারিত বলুন- আপনি কি বলতে চান। জবাবে নবী (স) আমাকে কুরআনের একটি অংশ পড়ে শুনান, এর দ্বারা আমি এতোটা প্রভাবিত হয়ে পড়লাম যে, তখনই ঈমান আনলাম। তারপর যখন বাড়ি ফিরে গেলাম, তো আমার বৃদ্ধ পিতা সামনে এলেন। বললাম,আব্বা, আমার থেকে দূরে থাকবেন। না আমি আপনার কেউ, আর না আপনি আমার কেউ। তিনি বললেন, কেন? বললাম, আমি মুসলমান হয়েছি এবং দ্বীনে মুহাম্মদীর আনুগত্য অবলম্বন করেছি। তিনি বললেন, বাপু তোমার যা দ্বীন আমারও তাই দ্বীন। বললাম, তাহলে গোসল করে পাক-পবিত্র কাপড় পরে আসুন। তারপর আমি আপনাকে সে দ্বীনের তালীম দেব- যা আমি শিক্ষা গ্রহণ করে এসেছি। তিনি তাই করলেন এবং মুসলমান হয়ে গেলেন। তারপর আমার বিবি এলো, আমি তাকেও সে কথাই বললাম যা পিতাকে বলেছিলাম। সে বলল, আমার মা-বাপ তোমার উপর কুরবান, তুমি এ কি বলছ? বললাম, আমার এবং তোমার মধ্যে ইসলাম পার্থক্য সূচিত করেছে। আমি দ্বীনে মুহাম্মদীর অনুগত হয়ে পড়েছি। সে বলল, তোমার দ্বীন আমাকে বলে দাও। বললাম, যুশশারার (দাওসী গোত্রের প্রতিমা) হেমাতে [হেমা সে চত্বর বা প্রাংসগণকে বলে যা কোন সর্দার, নেতা বা দেবতার জন্য নির্দিষ্ঠ। তার মধ্যে প্রবেশ করার অর্থ তাদের বিরাগভাজন হওয়া- গ্রন্হকার।] (চত্বরে) যাও এবং পাহাড় থেকে প্রবাহিত ঝর্ণায় গোসল কর। সে বলল, যশশারা থেকে আমার সন্তানদের কোন বিপদের আশংকা নেই তো? বললাম, না। আমি সে দায়িত্ব নিচ্ছি। সে গিয়ে গোসল করে এলো। তার কাছে আমি ইসলাম পেশ করলাম। সে মুসলমান হয়ে গেল। তারপর আমি দাওস গোত্রের মধ্যে ইসলামের তাবলিগ শুরু করলাম। কিন্তু তারা ইসলাম গ্রহণ করতে ইতস্ততঃ করছিল। আমি মক্কায় হুযুরের (স) কাছে ফিরে এসে বললাম, দাওস গাফলতির শিকার এবং আমার পথে প্রতিবন্ধকতা করছে। তিনি তাদের জন্য দোয়া করলেন। তিনি বললেন, হে খোদা! দাওসকে হেদায়েত কর। তারপর আমাকে এভাবে নসিহত করলেন- গিয়ে তাদের মধ্যে আবার তাবলিগ কর এবং তাদের সাথে নম্র আচরণ করবে। তারপর আমি দাওসের মধ্যে দাওয়াতী কাজ করতে থাকলাম এবং শেষ পর্যন্ত খয়বর অভিযানের সময় সেখান থেকে সত্তর-আশি পরিবার সহ উপস্থিত হই।

হযরত আবুযর গিফারীর (রা) ইসলাম গ্রহণ

তিনি ছিলেন বনী গিফার গোত্রের লোক। এরা রাজপথে ডাকাতির জন্য মশহুর ছিল। এক সময় স্বয়ং আবুযরও এমন দুরন্ত ডাকাত ছিলেন যে, একাকী কোন কাফেলার উপর এমনভাবে আক্রমণ করতেন যেন কোন হিংস্র জন্তুর আক্রমণ হয়েছে। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের তিন বছর পূর্বে তাঁর মনের পরিবর্তন হয়েছিল এবং কোন না কোনভাবে নামায পড়া শুরু করে দিয়েছিলেন। মুসনাদে আহমদ ও ইবনে সা’দের বর্ণনায় আছে যে, তিনি বলতেন, আমি তিন বছর পূর্বে থেকেই আল্লাহর জন্য যেদিকেই মুখ করতাম নামায পড়তাম।

তাঁর প্রকৃত নাম ছিল, জুন্দুব বিন জুনাদাহ। বোখারীতে বর্ণিত আছে যে, যখন হুযুরের (স) আবির্ভাবের কথা তাঁর কাছে পৌঁছালো,তখন তিনি তাঁর ভাই উনাইসকে (মুসনাদে আহমদের বর্ণনা মতে) মক্কা পাঠালেন, সেই ব্যক্তি সম্পর্কে খোঁড় খবর নিতে যিনি বলেন, ‘আমি নবী’। তিনি গেলেন এবং ফিরে এসে বললেন, তিনি অতি উন্নতমানের চারিত্রিক শিক্ষা দেন এবং এমন কালাম পেশ করেন যা কবিতা নয়। হযরত আবুযর (রা) বললেন, আমি যা জানতে চেয়েছিলাম তা তুমি জেনে আসতে পারনি। অতঃপর তিনি স্বয়ং মক্কায় গেলেন এবং মসজিদে হারামে হুযুরকে (স) তালাশ করতে থাকেন। কিন্তু যেহেতু তিনি নবীকে চিনতেননা এবং কাউকে জিজ্ঞেস করতেও চাইতেননা, সে জন্য তাঁকে পেলেননা। হযরত আলী (রা) তাঁকে দেখে মনে করলেন কোন অপরিচিত মুসাফির হবে। তাঁর সাথে কোন কথাবার্তাও হয়না। তৃতীয় দিন হযরত আলী (রা) তাঁকে বললেন, তুমি কি জন্য এসেছ? তিনি বললেন, যদি তুমি ওয়াদা কর যে, তুমি যদি আমাকে আমার ইপ্সিতের নিকটে পৌঁছিয়ে দাও তাহলে বলব কি জন্য এসেছি। হযরত আলী (রা) ওয়াদা করলেন, তখন তিনি তাঁর উদ্দেশ্য বর্ণনা করলেন। আলী (রা) তিনি নিশ্চিত রূপে হকের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং আল্লাহর রাসূল।আগামীকাল সকালে তুমি আমার পেছনে পেছনে আসবে। যদি আমি চলতে থাকি, তুমিও চলতে থাকবে। যেখানে আমি প্রবেশ করি তুমিও সেখানে প্রবেশ করবে। আমি যদি এমন কিছু দেখি- যা তোমার জন্য আশংকাজনক মনে করব, তাহলে এমনভাবে দাঁড়িয়ে পড়ব যেন পানি ঢালছি। তা দেখে তুমি দাঁড়িয়ে যাবে। মোটকথা এভাবে আবুযর (রা) হুযুরের (স) নিকটে পৌঁছলেন। তাঁর কথা শুনামাত্র মুসলমান হয়ে গেলেন। হুযুর (স) বললেন, তুমি তোমার কওমের কাছে ফিরে যাও এবং লোকদেরকে দ্বীন সম্পর্কে অবগত করতে থাক। শেষ পর্যন্ত তুমি আমার অবস্থা যেন জানতে পার। হযরত আবুযর (রা) বলেন, যে খোদা আপনাকে পাঠিয়েছেন, তাঁর কসম! আমি মক্কাবাসীদের কাছে সত্য প্রকাশ করে ছাড়ব। অতঃপর তিনি মসজিদে হারামে পৌছেঁ উচ্চস্বরে বললেন- “আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ”। একথা শুনামাত্র লোক তাঁর উপর ঝাপিয়ে পড়ে এমন মার দিল যে তিনি পড়ে গেলেন। এ অবস্থা দেখে হযরত আব্বাস (রা) তাঁর এং লোকদের মধ্যে মধ্যস্থ হয়ে বললেন, ওরে হতভাগার দল, তোমাদের কি জানা আছে যে ইনি বনী গিফার গোত্রের লোক। তোমাদের শামদেশে ব্যবসার উদ্দেশ্যে যাওয়ার পথে এরা অবস্থান করে? এভাবে হযরত আব্বাস (রা) তাঁকে রক্ষা করেন। দ্বিতীয় দিনেও তারা তাঁর সাথে এরূপ ব্যবহাই করে এবং হযরত আব্বাস (রা) তাঁকে ছাড়িয়ে নেন।

ইমাম আহমদ তাঁর মুসনাদে স্বয়ং আবুযরের (রা) এ বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। তিনি (আবুযর) বলেন, আমি ও আমার ভাই উনাইস এবং আমার মা বাইরে অবস্থান করছিলাম। উনাইস বলেন, আমি একটু মক্কা শহর থেকে ঘুরে আসি। তোমরা আমার জন্য অপেক্ষা কর। তারপর তিনি অনেক বিলম্বে ফিরলেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এতো বিলম্ব করলেন কোথায়? তিনি বললেন, এক ব্যক্তির সাথে আমার সাক্ষাৎ হয় যিনি বলেন যে, তিনি আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহ তাঁকে সে দ্বীনের উপরেই পাঠিয়েছেন যা তোমার দ্বীন (অর্থাৎ শির্ক প্রত্যাখ্যান এবং তৌহীদের স্বীকৃতি)।

“আমি জিজ্ঞেস করলাম, লোকে তাঁকে কি বলে? তিনি বললেন, তারা বলে যে, তিনি কবি, গণক, যাদুকর। উনাইস স্বয়ং কবি ছিলেন, তিনি বললেন, আমি গণকদের কথাও শুনেছি। কবিতা রচনা করতেও জানি। কন্তিু এ সবের সাথে তাঁর কথার কোন সম্পর্কই নেই। খোদার কসম, তিনি সত্য এবং ঐ লোকগুলোই মিথ্যাবাদী।

আমি বললাম, আমার স্থলে তুমি কি একটু দেখাশুনা করবে যাতে আমি স্বয়ং সেখানে যেতে পারি? তিনি বললেন, ঠিক আছে, তবে মক্কাবাসীদের ব্যাপারে সতর্ক থেকো। কারণ তারা তাঁর বিরোধিতার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। আমি মক্কায় পৌঁছলাম। তারপর এক ব্যক্তিকে একটু দুর্বল মনে করে জিজ্ঞেস করলাম, সে ব্যক্তি কোথায় যাকে লোকে ‘সাবী’ (দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাওয়া) বলে? তারপর সে ব্যক্তি আমার দিকে ইংগিত করা মাত্র লোক আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। তাদের হাতে যা কিছু ছিল, আমার উপর নিক্ষেপ করলো। অতঃপর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। জ্ঞান ফেরার পর হেরেমে গেলাম, যমযম পানি পান করলাম এবং আহতস্থান ধুয়ে ফেললাম। ত্রিশ দিন যাবত কাবায় পর্দার অন্তরালে লুকিয়ে থাকলাম। এ সময় যমযম পানি ব্যতীত আর কোন কিছু আমার আহার্য বস্তু ছিল না। তথাপি আমি মোটা তাজা পয়ে পড়ি।

তারপর হযরত আবুযর (রা) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (স) ও হযরত আবু বকর (রা) হেরেমে, এলেন, হিজরে আসওয়াদে চুমো দিলেন, তাওয়াফ করলেন ও নামায পড়লেন।

আমি বের হয়ে প্রথম বার ইসলামী পদ্ধতিতে তাঁকে সালাম করলাম। তিনি বললেন- ‘আলায়কাস সালাম’। জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে? বললাম, বনী গিফারের একজন। বললেন, কবে থেকে এখানে আছ? বললাম- ত্রিশ দিন ও রাত যাবত। বললেন, তোমাকে আহার করাতো কে? বললাম, যমযম ব্যতীত আমার আহারের আর কিছু ছিলনা। তার দ্বারা আমার শুধু ক্ষুধা নিবৃত্তই হয়নি, বরঞ্চ কিছুটা মোটা তাজা হয়েছি। তিনি বললেন, ওতো বরকতপূর্ণ পানি। শুধু পানিই নয়, আহারও।

হযরত আবু বকর (রা) বললেন, অনুমতি হলে রাতে ইনি আমার বাড়ি খাবেন। হুযুর (স) অনুমতি দিলেন। তারপর তিনি চলে গেলেন এবং আমি আবু বকরের (রা) ওখানে গেলাম। তিনি আমাকে তায়েফের কিশমিশ খাওয়ালেন। আমি কিছুকাল তাঁর ওখানে অবস্থান করলাম। তারপর হুযুর (স) বললেন, এমন এক ভূখন্ডের দিকে আমাকে ইংগিত করা হয়েছে, যেখানে খেজুরের বাগান আছে এবং আমার মনে হয় সে স্থান ইয়াসরেব ব্যতীত আর কোন স্থান নয়। তুমি কি আমার পয়গাম তোমার কওমের কাছে পৌঁছাবে? সম্ভবতঃ এতে তাদেরও উপকার হবে এবং তোমারও প্রতিদান মিলবে।

হযরত আবুযর (রা) বলেন, তারপর আমি আমার মা ও ভাইয়ের কাছে ফিরে গেলাম। তাঁরা বললেন, কি করে এলে? বললাম, ইসলাম নিয়ে এসেছি এবং তার সত্যতারও সাক্ষ্য দিয়েছি। উনাইস বলেন, আমিও তোমার দ্বীন থেকে দূরে থাকতে চাই না। আমি ইসলাম কবুল করলাম এবং তার সত্যতার সাক্ষ্য দিলাম। আমাদের মা বললেন, আমিও তোমাদের দু’জনের দ্বীন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে চাইনা। আমিও ইসলাম কবুল করলাম এবং সত্যতার সাক্ষ্য দিচ্ছি। তারপর আমরা আমাদের কওম গিফারে ফিরে গেলাম। তাদের মধ্যে কিছু লোক হুযুরের (স) মদীনায় হিজরত করার পূর্বেই ইসলাম গ্রহণন করে। তাদেরকে খুফাফ বিন আয়মা বিন রাহাদাতুল গিফারী নামায পড়াতেন। কারণ তিনিই কওমের সর্দার ছিলেন। হিজরতের পর অবশিষ্ট গিফারীগণও ইসলাম গ্রহণ করেন (ইমাম মুসলিমও ও কাহিনী এভাবেই বর্ণনা করেছেন। তাবারানী আওসাতে এ কাহিনীর বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন)।

ইবনে সা’দের বর্ণনায়- যদিও এ কাহিনী উপরের মতোই লিপিবদ্ধ হয়েছে, তবুও তার মধ্যে আবু যর গিফারীর (রা) নিম্নলিখিত বক্তব্যও সংযোজিত করা হয়েছে। তিনি বলেন-

‘যখন কাবায় পর্দার পেছনে লুকিয়ে ছিলাম, তখন তাওয়াফের স্থানে দু’জন মহিলা ব্যতীত আর কেউ ছিল না। আমি তাদেরকে এসাফ ও নায়েলার উল্লেখ করতে শুনলাম। তা আমার সহ্য হলোনা, তাই বললাম- এ দু’জনের মধ্যে বিয়ে দিয়ে দাও। এতে তাঁরা ভয়ানক ক্ষিপ্ত হয়ে বলতে লাগলো, আহা, আমাদের কোন লোক যদি এখানে থাকতো। ওদিকে পাহাড় থেকে রাসূলূল্লাহ (স) ও হযরত আবু বকর (রা) নেমে এদিকে আসছিলেন। এ মহিলাদ্বয়- সম্ভবতঃ তাঁদেরকে চিনতোনা।তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন,তোমরা এতো ক্ষুব্ধ কেন? তারা বলল, একজন সাহাবী কাবায় পর্দার আড়ালে লুকিয়ে আছে। হুযুর (স) বললেন, সে তোমাদের কি বলেছে? তারা বলল, সে এমন কথা বলেছে, যা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না’।

আমর বিন আবাসা সুলামীর ইসলাম গ্রহণ

তিনি ছিলেন বন সুলায়েমের লোক। তাঁর ধাণা ছিল যে তিনি চতুর্থ মুসলমান। কিন্তু তাঁর মুসলমান হওয়ার যে বর্ণনা তিনি স্বয়ং দিয়েছেন, তার থেকে জানা যায় যে সাধারণ দাওয়াত শুরু হওয়ার পর তিনিও নবী (স) এর দাওয়াতে মুসলমান হয়েছিলেন। ইবনে সা’দের একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, তিনি ওকাজের বাজারে নবী (স) এর সাথে মিলিত হন। সেখানেই তিনি মুসলমান হন। তার অর্থ এই যে, হুযুর (স) সে সময়ে দাওয়াতী কাজে বের হওয়া শুরু করেছেন। দ্বিতীয় বর্ণনা যা ইবনে সা’দ ও মুসলিম আবু উমামা বাহেলীর বরাত দিয়ে উদ্ধৃত করেছেন- তাতে আমর বিন আবাসা স্বয়ং বলেন, আমি জাহেলিয়াতের যুগে মানুষকে পথভ্রষ্ট মনে করতাম এবং প্রতিমাগুলোকে অর্থহীন মনে করতাম। তারপর শুনলাম যে, মক্কায় এক ব্যক্তি আছেন যিনি কিছু খবর দেন এবং কিছু কথাও বলেন। অতএব আমি মক্কায় গেলাম এবং দেখলাম যে হুযুর (স) আত্মগোপন করে রয়েছেন এবং তাঁর ব্যাপারে কওম দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। আমি সতর্কতার সাথে তাঁর সাথে মিলিত হই এবং জিজ্ঞেস করি, আপনি কে? বললেন, নবী। আমি বললাম- নবী কাকে বলে? তিনি বললেন- আল্লাহর রাসূল। বললাম- আল্লাহ কি আপনাকে পাঠিয়েছেন? বললেন- হ্যাঁ। বললাম- কোন শিক্ষাসহ পাঠিয়েছেন ? বললেন- একমাত্র আল্লাহকে মাবুদ মানতে হবে, তাঁর সাথে কাউকেও শরীক করা যাবে না। আত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহার করতে হবে। জিজ্ঞেস করলাম- আপনার সাথে কারা রয়েছে? বললেন, স্বাধীন ও গোলাম উভয়ে, সে সময় হযরত আবু বকর (রা) ও হযরত বেলালম (রা) উপস্থিত ছিলেন। (এর থেকে তাঁর এ ভ্রান্ত ধারণা হয় যে, তিনি চতুর্থ ব্যক্তি।)

আমি বললাম- আমি আপনার সাথে থাকব। তিনি বললেন- এ সময়ে তুমি এমন করতে পারনা। যখন তুমি শুনবে যে আমি প্রকাশ্যে কাজ শুরু করেছি, তখন তুমি এসে আমার সাথে মিলিত হবে।

“অতএব আমি আমার লোকদের কাছে ফিরে গেলাম”।

দিমাদুল আযদীর (রা) ইসলাম গ্রহণ

তিনি ছিলেন আযদে শানুয়া গোত্রের লোক। তাদের পেশা ছিল ঝাড়-ফুঁক করা। হাফেজ ইবনে আবদুল বারার, হাফেজ ইবনে হাজার এবং হাফেজ ইবনে হিব্বান বলেন, জাহেলিয়াতের যুগের তিনি হুযুরের (স) বন্ধু ছিলেন। মুসলিম, নাসায়ী, বায়হাকী এবং ইবনে সাদ’ বলেন,তিনি মক্কায় এলে মক্কাবাসী বলে যে, তিনি পাগল হয়ে গেছেন। আযদী বললেন, তোমরা আমাকে বল তিনি কোথায়? সম্ভবতঃ আমার দ্বারা আল্লাহ তাঁকে আরোগ্য দান করবেন।

অতঃপর তিনি হুযুরের (স) নিকটে এলেন এবং বললেন, আমি ঝাড়-ফুঁক করি। আমার হাতে আল্লাহ যাকে চান আরোগ্য দান করেন। আসুন, আপনার চিকিৎসা করি।

হুযুর (স) প্রথমে কালেমা শাহাদত পাঠ করেন। তারপর আল্লাহর হামদ ও কিছু কালেমা পাঠ করেন। এসব কথা দিমাদুল আযদীর খুব ভালো লাগলো। তিনি বললেন, আবার বলূন। হুযুর (স) তিনবার তার পুনরাবৃত্তি করেন। দিমাদ বলেন, আমি এমন কথা কোনদিন শুনিনি। আমি গণকদের কথা শুনেছি, কবিদের কথা শুনেছি, যাদুকরদের কথা শুনেছি। কিন্তু এমন কথা কখনো শুনিনি। এ তো সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তারপর তিনি ইসলাম কবুল করেন এবং নিজের ও নিজের কওমের পক্ষ থেকে নবীর হাতে বায়আত করেন।

হযরত আবু মুসা আশয়ারীর (রা) ইসলাম গ্রহণ

ইনি ইয়ামেন থেকে এসে মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর দেশে ফিরে গিয়ে আপন ভাই আবু বুরদা ও আবু রহম এবং প্রায় পঞ্চাশজনকে ইসলামে দীক্ষিত করেন। তারপর এসব মুসলমান একটি নৌকায় চড়ে রওয়ানা হন এবং বাতাস তাঁদেরকে আবিসিনিয়ার তীরে পৌঁছিয়ে দেয়- সেখানে তাঁরা হযরত জাফর বিন আবি তালেব এবং অন্যান্য মুহাজিরদের সাথে মিলিত হন। এ হচ্ছে ইবনে সা’দ এবং ইবনে আবদুল বাররের বর্ণনা। ইবনে হাজার বলেন, তাঁরা আবিসিনিয়ায় যাননি, বরঞ্চ যখন তাঁরা মক্কা থেকে মদীনার দিকে রওয়ানা হন, তখন তাঁদের নৌকা এসব মুহাজিরদের নৌকার সাথে মিলিত হয়- যা মদীনার দিকে যাচ্ছিল। তারপর তাঁরা এক সাথে খায়বারে হুযুরের (স) নিকটে পৌঁছেন।

মুয়ায়কীব বিন আবি ফাতেমা আদ্দাউসীর ইসলাম গ্রহণ

ইবনে সা’দ বলেন, ইনিও দাউস গোত্রের ছিলেন এবং মক্কায় মুসলমান হন। একটি বর্ণনা অনুযায়ী ইনি মুসলমান হওয়ার পর আপন দেশে ফিরে যান। অন্য একটি বর্ণনা মতে আবিসিনিয়ায় দ্বিতীয় হিজরতে ইনি শামিল ছিলেন। ইবনে হাজার ও ইবনে আবদুল বারর বলেন, তিনি ওসব লোকের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন যাঁরা মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আবিসিনিয়ায় দ্বিতীয় হিজরতে শামিল হন।

জুয়াল বিন সুরাকা (রা)

ইনি ছিলেন বনী যামরার লোক। ইবনে সা’দ ও ইবনে আবদুল বারার বলেন, ইনিও মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করেন।

আবদুল্লাহ (রা) ও আবদুর রহমান কিনানী (রা)

ইবনে সা’দের বর্ণনা মতে এ দু’ভাই বনী মিসানার এক ব্যক্তি লুহাইবের পুত্র ছিলেন। তাঁরাও মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করেন।

বুরায়দাহ বিন আল মুসাইবের ইসলাম গ্রহণ

ইবনে সা’দ ও ইবনে আবদুল বারের মতে ইনি বনী খুযায়ার একটি শাখা সম্ভূত ছিলেন, যে শাখাটি খুযায়া পরিবার বর্গ থেকে পৃথক হয়ে পড়েছিল। হিজরতের সময় যখন নবী ((স) মক্কা থেকে মদীনা যাচ্ছিলেন, তখন গামীম নামক স্থানে এ ব্যক্তি হুযুরের (স) সাথে মিলিত হন এবং তাঁর সাথে আশিটি পরিবারের লোক ইসলাম গ্রহণ করেন। এই কথাই ইবনে হাজার ইসাবায় লিখেছেন। তার অর্থ এই যে, পূর্বে থেকেই এসব লোক ইসলামের প্রতি প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলেন। নতুবা পথ চলতে চলতে হঠাৎ সাক্ষাতের ফলে এতো লোক মুসলমান হতে পারেনা।

এ হচ্ছে কয়েকটি দৃষ্টান্ত যার থেকে জানতে পারা যায় যে, যদিও কুরাইশগণ নবী (স) এর বিরুদ্ধে মিথ্যার অভিযান চালিয়ে আরবের লোকদেরকে নবীর প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলতে চেষ্টার কোন ক্রটি করেনি, তথাপি এ পন্হা অবলম্বন করে স্বয়ং নবীকে  আরবের লোকদের মধ্যে শুধু তারা সুপরিচিতই করেনি, বরঞ্চ তাঁর প্রতি বহু পবিত্র আত্মার মনোযোগও আকৃষ্ট করে দিয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চল ও গোত্রের লোক এ অভিযানের ফলে সত্যানুসন্ধানের জন্য নবীর প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং এভাবে মক্কার বাইরে অন্যান্য গোত্রের নিকটে ইসলাম পৌঁছে যায়। এ জন্যই সূরা আলাম নাশরায় বলা হয়েছে ***********************  অর্থাৎ এ মিথ্য প্রচারণায় মনমরা হচ্ছো কেন? আমরা তো তোমার দুশমনদের দ্বারাই তোমার খ্যাতি ছড়িয়ে দিয়েছি।

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.