সীরাতে সরওয়ারে আলম – ৫ম খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

৬. মুসলমানদের উপর জুলুম নির্যাতন

বিরোধিতা ও প্রতিবন্ধকতার অন্যান্য কলাকৌশল অবলম্বনের সাথে সাথে কুরাইশ কাফেরগণ চরম নিষ্ঠুর আচরণ এই করছিল যে, যার সম্পর্কেই তারা জানতে পারতো যে, সে মুসলমান হয়েছে, অথবা যে ব্যক্তিই কোনভাবে তার ইসলমা গ্রহণের কথা প্রকাশ করেছে, তার উপর তারা চরম নির্যাতন নিষ্পেষণ শুরু করেছে। ইসলাম থেকে ফিরে আসার জন্য তার প্রতি চাপ সৃষ্টি করার কোন চেষ্টাও করাও বাকী রাখেনি। প্রথম প্রথম তারা এ পন্হা অবলম্বন করে যে, ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে যারা কিছুটা মানসম্মান পারিবারিক মর্যাদা ও সমর্থন লাভ করতো, তাদেরকে এই বলে তিরস্কার করা হতো, “তুমি তোমার বাপদাদার দ্বীন পরিত্যাগ করেছ। অথচ তারা তোমার চেয়ে বেশী ভালো-মন্দের জ্ঞান রাখতেন। এখন যদি তুমি ফিরে না আস তাহলে আমরা তোমাকে অপদস্ত ও অপমানিত করব, তোমাকে আহমক গণ্য করব এবং তোমার মানসম্মান ধুলোয় ধুসরিত করে দিব”।

যারা ব্যবসা বাণিজ্য করতো তাদেরকে এই বলে হুমকি দেয়া হতো, “ইসলাম পরিত্যাপগ কর, নতুবা তোমাদের ব্যবসা বাণিজ্য ধ্বংস করে দেয়া হবে এবং তোমাদের পেশা অচল করে দেয়া হবে। তারপর তোমাদেরকে অনাহারে মৃত্যুবরণ করতে হবে”।

তারপর যারা ছিল সহায় সম্বলহীন ও দুর্বল, তাদেরকে নির্মম নির্যাতন ভোগ করতে হতো। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে উপনীত হয় যে, সম্ভ্রান্ত লোকদেরকেও বন্দী করে দৈহিক শাস্তি দেয়া হতো।

পরিবারের অধীন লোকদের উপর জুলুম নির্যাতন

ইবনে ইসহাক ও তাবারী হযর ওরওয়া বিন যুবাইয়ের (রা) বরাত দিয়ে বলেন, কুরাইশ সর্দারগণ পরস্পর মিলিত হয়ে এ সিদ্ধান্ত করে যে, তাদের পুত্র, ভাই এবং গোত্রের যারাই রাসূলুল্লাহ (স) এর আনুগত্য মেনে নিয়েছে, তাদের উপর নির্যাতন চালিয়ে বলপূর্বক ইসলাম থেকে ফেরাবার চেষ্টা করতে হবে, ফলে নবীর (স) অনুসারীগণ বিরাট অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হন।

হযরত আবু বকরের (রা) মতো সম্মানিত ব্যক্তিকে নওফল বিন খুয়ায়লিদ বিন আল আদাবিয়্যা, যাকে কুরাইশের সিংহ পুরুষ বলা হতো, হযরত তালহার (রা) সাথে একত্রে বেধে ফেলে। তাঁদের পরিবার বনু তায়েম তাদেরকে বাঁচাবার কোন চেষ্টা করেনি। এর জন্য হুযুর (স) দোয়া করেন- হে খোদা, ইবনে আল আদাবিয়্যার অনিষ্ট থেকে আমাদের রক্ষা করার জন্য তুমিই দায়িত্ব গ্রহণ কর (বায়হাকী ইবনে সা’দ)। হযরত যুবাইর বিন আল আওয়ামকে (রা) তাঁর চাচা একটি চাটায়ে পেঁচিয়ে লটকিয়ে দিত। তারপর নীচ দিক থেকে ধোঁয়া দিয়ে সে বলতে থাকতো, ইসলামম থেকে ফিরে এসো। জবাবে তিনি বলতে থাকেন, আমি কখনো কুফর করবনা (ইবনে সা’দ, তাবারানী)। হযরত ওসমানকে (রা) তাঁর চাচা হাকাম (মারওয়ানের পিতা) বেঁধে ফেলে বলে, তুমি বাপদাদার দ্বীন পরিত্যাগ করে মুহাম্মদের (স) দ্বীন কবুল করেছ? আমি তোমাকে কিছুতেই ছাড়বনা যতোক্ষণ না তুমি সে দ্বীন ছেড়ে দিয়েছ। তিনি জবাবে বলতেন আমার যা কিছুই হোকনা কেন, এ দ্বীল কিছুতেই ছাড়বনা- (ইবনে সা’দ)। হযরত মুসয়াব বিন ওমায়রকে (রা) তাঁর চাচাতো ভাই ওসমান বিন তালহা কাবার চাবি রক্ষক) ভয়ানক নির্যাতন করে। তাঁর পরিবারবর্গ তাঁকে বন্দী করে রাখে। তিনি কোনভাবে পালিয়ে যান এবং আবিসিনিয়ার হিজরতকারী প্রথম দলের সাথে মিলিত হয়ে হিজরত করেন (ইবনে সা’দ)। হযরত সা’দ বিন আবি ওককাস (রা) এবং তাঁর ভাই আমেরকে (রা) তাঁদের মা তাঁদেরকে নানানভাবে নির্যাতন করেও দ্বীন ইসলাম থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি (ইবনে সা’দ) মুসনাদে আহমদ, মুসলিম, তিরমিযি, আবু দাউদ এবং নাসায়ীতে বলা হয়েছে যে, হযরত সা’দ বিন ওককাসের মা হামনা বিন্তে সুফিয়ান বিন উমায়্যা (আবু সুফিয়ানের ভাতিজি) তাঁদেরকে বলে, যতোক্ষণ না তোমরা মুহাম্মদের (স) দ্বীন পরিত্যাগ করবে, আমি পানাহারও করবনা, ছায়াতে গিয়েও বসবনা। মায়ের হক আদায় করাতো আল্লাহর হুকুম। আমার কথা না মানলে আল্লাহরও নাফরমানি করা হবে। এতে হযরত সা’দ খুব পেরেশান হয়ে নবীর দরবারে গিয়ে সব কথা পেশ করলেন। জবাবে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এ আয়াত নাযিল হলো-

****************************************************

এবং আমরা মানুষকে তার মা বাপের সাথে সদাচারণের নির্দেশ দিয়েছি। কিন্তু যদি তারা তোমার উপর এমন পীড়াপীড়ি করতে থাকে যে, তুমি আমার সাথে এমন কাউকে শরীক করবে যাকে তুমি জাননা, তাহলে তাদের কথা মানবেনা। (আনকাবুতঃ ৮)

হযরত খালেদ বিন সাঈদের (রা) বর্ণনা

হযরত খালেদ (রা) বিন সাঈদ বিন আল আস যখন জানতে পারলেন যে, তাঁর মুসলমান হওয়ার কথা তাঁর পিতা আবু উহায়হা জানতে পেরেছে, তখন তিনি ভয়ে আত্মগোপন করলেন। তারপর তাঁর পিতা তাঁকে খুঁঝে বের করার পর বকাঝকা করে এমনভাবে মারতে থাকলো যে, যে কাষ্ঠখন্ড দিয়ে মারা হচ্ছিল তা ভেঙে গেল। তারপর সে বলল, তুই মুহাম্মদের (স) আনুগত্য মেনে নিয়েছিস, অথচ তুই দেখছিল যে, সে আপন কওমের বিরোধিতা করছে, পৈত্রিক দ্বীনের দোষক্রটি বের করছে এবং পূর্ব পুরুষদেরকে পথভ্রষ্ট বলছে, যাঁরা এ দ্বীনের অনুসরণ করতে থাকেন।

হযরত খালেদ (রা) বলেন, খোদার কসম তিনি সত্যবাদী এবং আমি তাঁর অনুগামী।

আবু উহায়হা পুনরায় তাঁকে মারপিট করে বকুনি দেয় এবং বলে, লায়েক, তুই যেখানে ইচ্ছা চলে যা, আমার বাড়িতে তোর আহার বন্ধ। তিনি বলেন, আপনি আমার রিযিক বন্ধ করে দিলে আল্লাহ আমাকে রিযিক দেবেন। তারপর তিনি হুযুরের (স) নিকটে অবস্থান করতে থাকেন। একদিন মক্কায় পার্শ্ববর্তী এক নির্জন স্থানে তিনি নামায পড়ছিলেন। একথা তাঁর পিতা উহায়হা জানতে পারে। সে ডেকে তাঁকে বলল, মুহাম্মদের (স) দ্বীন ছেড়ে দাও। জবাবে তিনি বলেন, আমরণ এ দ্বীন তিনি পরিত্যাগ করবেননা। উহায়হা রাগান্বিতহয়ে একখন্ড কাঠ দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করতে থাকে এবং শেষে কাষ্ঠখন্ড ভেঙে যায়। তারপর তাঁকে তিনদিন অভুক্ত অবস্থায় বন্ধী করে রাখা হয়। মক্কায় প্রাণান্তকর গরমে তিনি এ শাস্তি ভোগ করতে থাকেন। তারপর এক সুযোগে তিনি পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তারপর মক্কার চারপাশে ঘুরাফেরা করতে থাকেন। অবশেষে মক্কা থেকে আবিসিনিয়ায় হিজ্বরতকারী প্রথম দলভুক্ত হয়ে হিজ্বরত করেন। ইবনে সা’দ এবং বায়হাকীও সংক্ষেপে এ ঘটনা উল্লেখ করেন।

হযরত আবু বকরের (রা) উপর অমানুষিক জুলুম

একদিন নবী করিম (স) এবং হযরত আবু বকর (রা) ‘দারে আরকাম’ থেকে বেরিয়ে মসজিদে হারামে যান। সেখানে হঠাৎ আবু বকর (রা) দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুরু করেন। তিনি লোকদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে আহবান জানান। এভাবে ঘোষণা দিয়ে মসজিদে হারামে ইসলামী দাওয়াত দেয়ার এ ছিল প্রথম ঘটনা। মুশরিকগণ এ বক্তৃতা শুনার সাথে সাথে তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাঁকে মাটিতে ফেলে পদদলিত করে। ওতবা বিন রাবিয়অ তাঁর মুখে জুতা দিয়ে এমন আঘাতের উপর আঘাত করে যে, সমগ মুখমন্ডল ফুলে ওঠে এবং রক্তে নাক ডুবে যায়। এ অবস্থা দেখার পর তাঁর গোত্রীয় লোকজন (বনু তায়েম) সামনে অগ্রসর হয়ে তাঁকে উদ্ধার করে তাঁর বাড়ি পৌঁছিয়ে দেয়। তাদের এ বিষয়ে কণা মাত্র সন্দেহ ছিলনা যে, তিনি এখন মারা যাবেন। এ জন্যে পুনরায় তারা মসজিদে গেল এবং বলল, খোদার কসম, যদি আবু বকর (রা) মারা যান, তাহলে আমরা ওতবাকে জীবিত ছেড়ে দেবনা। সন্ধ্যা পর্যন্ত হযরত আবু বকর (রা) সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে রইলেন। জ্ঞান লাভের পর তাঁর প্রথম প্রশ্ন ছিল, রাসূলূল্লাহ (স) এর অবস্থা কি? এ কথায় বনু তায়েম তাঁকে গালিগালাজ করলো, ভর্ৎসনা করলো। তারপর তারা চলে গেল। যাবার আগে হযরত আবু  বকরের (রা) মা উম্মুল খায়রকে তারা বলে গেল যেন তাকে পানাহার করানো হয়। মাতা ও পুত্র ব্যতীত আর যখন কেউ ছিলনা, তখন হযরত আবু বকর (রা) পুণনায় সেই প্রশ্নই করলেন তিনি বললেন, উম্মে জামিলকে (হযরত ওমরের (রা)ভগ্নি [তাবারানী বিশদভাবে বলেন যে, হযরত ওমরের (রা) ভগ্নি ফাতেমা বিন্তে খাত্তাবের কুনিয়অত ছিল উম্মে জামিল। আবদুর রাজ্জাক আল মুসান্নাফে ইমাম যুহারীর বরাত দিয়ে বলে, হযরত ওমর (রা) তাঁর ভগ্নি উম্মে জামিলের বাড়িতে কুরআন শুনে ঈমান জানেন। অন্য বর্ণনায় এ মহিলার নাম ফাতেমা বিন্ত খাত্তাব বলা হয়েছে। এর থেকে প্রমাণিত হয়ে যে, হযরত ওমরের সেই ভগ্নির নাম ছিল ফাতেমা। আর তাঁর কুনিয়াত ছিল উম্মে জামিল।] ফাতেমা বিন্তে খাত্তাব) গিয়ে জিজ্ঞেস কর। তখন তিনি মুসলমান হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ইসলামগ্রহণ গোপন রেখেছিলেন। হযরত আবু বকরের মা যখন তাঁকে বললেন, আবু বকর (রা) মুহাম্মদ (স) বিন আবদুল্লাহর অবস্থা জানতে চাইছে, তখন তিনি বললেন, আমিতো মুহাম্মদ (স) বিন আবুদুল্লাহকেও চিনিনা, আবু বকরকেও চিনিনা। তবে যদি আপনি চান তো আমি আবু বকরের নিকটে যাব। তিনি বললেন, আচ্ছা চল।

তিনি এসে দেখলেন, হযরত আবু বকর (রা) খুব আশংকাজনক অবস্থায় পড়ে আছেন। দেখা মাত্র তিনি আর্তনাদ করে বললেন, খোদার কসম, যারা আপনার সাথে এ আপরণ করেছে, তারা কাফের ও ফাসেক। আশা করি আল্লাহ তাদের প্রতিশোধ নেবেন।

আবু বকর বললেন, রাসূলুল্লাহ (স) এর অবস্থা কি? তিনি চুপে চুপে বললেন, আপনার মা শুনছেন। আবু বকর (রা) বললেন, তাঁর জন্যে ভয়ের কোন কারণ নেই। তখন উম্মে জামিল বললেন, হুযুর (স) বিলকুল সুস্থ্য আছেন। আবু বকর (রা) বললেন, কোথায় আছেন? তিনি বললেন, দারে আরকামে আছেন। হযরত আবু বকর (রা) বলেন, খোদার কসম, হুযুর (স) এর নিকটে না যাওয়া পর্যন্ত আমি পানাহার করবনা। উম্মে জামিল বলেন, একটু সবর করুন। অতঃপর যখন শহরের অবস্থা শান্ত হলো, তখন তিনি এবং উম্মুল খায়ের উভয়ে মিলে তাঁকে ধরাধরি করে দারে আরকামে নিয়ে গেলেন। তাঁর অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ (স) স্নেহবিহ্বল হয়ে পড়েন। তিনি তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে তাঁর অবস্থা দেখলেন।

হযরত আবু বকর (রা) বললেন, আমার মা বাপ আপনার জন্য কুরবান হোক, আমার বিশেষ কষ্ট হয়নি। তবে ঐ পাপচারী আমার মুখে তার জুতার আঘাত করে যে কষ্ট দিয়েছে, তাছাড়া আর কোন কষ্ট নেই। এ আমার মা তার পুত্রসহ এখানে হাযির। আপনি পরম শুভানুধ্যায়ী। তাঁকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দনি এবং দোয়া করুন যেন, আল্লাহ তাঁকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করেন। তারপর হুযুর (স) তাঁর জন্য দোয়া করেন, তাঁকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেন এবং তিনি মুসলমান হয়ে যান। এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন হাফেজ ইবনে কাসীর আল বেদায়অ ওয়ান্নেহায়াতে, হাফেজ আবুল হাসান খায়সান বিন সুলায়মান আল আতবা, বুলসীর কেতাব ‘ফাযায়েলুস সাহাবা’ থেকে বিশদভাবে উদ্ধৃত করেছেন। আর হাফেজ ইবনে হাজার এসাবাতে উম্মুল খায়েরের অবস্থা সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন।(পরিবর্ধন।)

হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদকে নির্মমভাবে প্রহার করা হয়

ইবনে ইসহাক হযরত ওরওয়াহ বিন যুবাইর থেকে এ ঘটনা উদ্ধৃত করে বলেন যে, একদিন সাহাবায়ে কেরাম (রা) পরস্পর বলাবলি করছিলেন যে, কুরাইশগণ আমাদের মধ্যে কাউকেও প্রকাশ্যে উচ্চ শব্দে কুরআন পড়তে শুনেনি। আমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে, একবার তাদেরকে এ কালামপাক শুনিয়ে দেবে?

হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) বলেন, এ কাজ আমি করব। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আমাদের ভয় হয় তারা তোমার ওপর বাড়াবাড়ি করবে। আমাদের মতে এমন এক ব্যক্তির কোন অন্যায় হস্তক্ষেপ করে তাহলে তার পরিবারের লোকজন তার সমর্থনে এগিয়ে আসবে।

হযরত আবদুল্লাহ বলেন, এ কাজ আমাকে করতে দাও। খোদা আমার রক্ষ।

তারপর তিনি একটু বেলা হওয়ার পর হেরেমে পৌঁছেন যখন কুরাইশ সর্দারগণ তাদের নিজ নিজ স্থানে বৈঠকে বসা ছিল হযরত আবদুল্লাহ মকামে ইব্রাহীমে পৌঁছে উচ্চস্বরে সুরায়ে আর- রাহমান তেলাওয়াত শুরু করেন। কুরাইশের লোকেরা প্রথমে বুঝবার চেষ্টা করে যে আবদুল্লাহ কি পড়ছেন। কিন্তু যখন বুঝতে পারলো যে,  এ সেই কালাম যা মুহাম্মদ (স) খোদার কালাম হিসাবে পেশ করেন। তখন তারা তাঁর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুখে বড়-থাপ্পড় মারতে থাকে। কিন্তু আবদুল্লাহ কোন পরোয়অ না করে অটল থাকেন। যতোই তারা মারতে থাকে ততোই তিনি পড়তে থাকেন। যতোক্ষণ তাঁর সাধ্য ছিল কুরআন শুনাতে থাকেন। অবশেষে যখন তিনি তাঁর ক্ষত-বিক্ষত মুখ নিয়ে ফিরে আসেন, তখন তাঁর সাথীরা বলল, আমরা তো এ ভয় করেছিলাম। তিনি বললেন, আজকের দিনের চেয়ে আর কোনদিন এ খোদার দুশমনেরা আমামর জন্য দুর্বল ছিলনা। যদি বল তো আগামীকাল আবার তাদেরকে কুরআন শুনিয়ে দিই। সকলে বলেন, ব্যস যথেষ্ট হয়েছে। যা তারা শুনতে চাচ্চিল না, তা তুমি শুনিয়ে দিয়েছ (ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, ৩৩৬ পৃষ্ঠা)। (তাফহীম ৫ম খন্ড- সূরা রহমানের ভূমিকা।)

অসহায় দাস-দাসীদের উপর জুলুম নির্যাতন

সবচেয়ে বেদনাদায়ক নির্যাতন নিষ্পেষণ ওসব দাসদাসীদের প্রতি করা হয়, যারা ইসলাম গ্রহণ করে এবং মক্কায় যাদের কোন পৃষ্ঠপোষক ছিলনা। তাদের কতিপয় দৃষ্টান্ত নিন্মরূপঃ

হযরত বেলাল

তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত বেলাল বিন রাবাহ। তিনি বনী জুমাহর জনৈক ব্যক্তির গোলাম ছিলেন এবং গোলামীর অবস্থায় তার ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হাবশী বলে পরিচিত ছিলেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ হয়ে পড়লে উমাইয়া বিন খালাফ জুমাহী তাঁকে নানানভাবে নির্যাতন করে। ইবনে হিশাম ও বালাযুরী বলেন, সে দুপুরের প্রচন্ড রোদের মধ্যে তাঁকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে মক্কার উত্তপ্ত বালুকারাশির উপর শায়িত করে বুকের উপর ভারী পাথর চাপা দিয়ে রাখতো। তারপর বলতো, খোদার কসম, তুমি এ অবস্থায় পড়ে থাকবে যতোক্ষণ না মুহাম্মদকে (স) অস্বীকার করে লাত ও ওয্যার এবাদত করেছ। কিন্তু তিনি (বেলাল( জবাবে শুধুমাত্র ‘আহাদ’ ‘আহাদ’ ই বলতে থাকেন।

বালাযুরী হযরত আমর বিন আল আসের বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন, “আমি বেলালকে (রা) এমন উত্তপ্ত মাটির উপর পড়ে থাকতে দেখেছি যার উপর গোশত রেখে দিলে তা পাক করা হয়ে যেতো। কিন্তু এ অবস্থাতেও তিনি স্পষ্ট করে বলতেন, আমি লাত ও ওয্যাকে অস্বীকার করি।

হযরত হাসসান বিন সাবেত তাঁর চোখে দেখা অবস্থা বর্ণনা করে বলেন, আমি (হাসসান বিন সাবেত) হজ্ব অথবা ওমরার জন্য মক্কায় গিয়ে দেখতে পেলাম, বেলালকে একটি দড়ি দিয়ে বাঁধা হয়েছে এবং ছেলে ছোকরার দল তাঁকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে চলেছে। কিন্তু তিনি এ কথা বলতে থাকেন, আমি লাত, ওয্যা, হুবাল, ইসাফ, নায়েলা এবং বুয়ানা-সকলকে অস্বীকার করছি। স্বয়ং হযরত বেলালের (রা) বর্ণনা বালাযুরী এভাবে উদ্ধৃত করেছেন, আমাকে একদিন ও একরাত পিপাসার্ত রাখা হয়, তারপর উত্তপ্ত বালুকারাশির উপর নিক্ষেপ করা হয়।

ইবনে সা’দ বলেন, গলায় রশি বেঁধে তাঁকে বালকদের হাতে ছেড়ে দেয়া হতো। তারা তাঁকে মক্কায় উপত্যকাগুলোতে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে বেড়াতো। তারপর উত্তপ্ত বালুর উপর উপুড় করে শুইয়ে দিয়ে পাথর চাপা দিত। কিন্তু তিনি শুধু ‘আহাদ’ ‘আহাদ’ বলতেন। হযরত আবু বকরের (রা) বাড়ি বনী জুমাহের মহল্লাতেই ছিল। তিনি এ জুলুম অত্যাচার দেখে অধীর হয়ে পড়েন। তিনি স্বাস্থ্যবান একজন হাবশী গোলামের বিনিময়ে হযরত বেলালকে খরিদ করে আযাদ করে দেন।

হযরত আম্মার বিন ইয়াসির (রা)

ইবনে সা’দ বলেন, ইয়াসির ছিলেন ইয়েমেনের অধিবাসী। সেখান থেকে মক্কা আসেনে এবং আবু হুযায়ফা বিন মুগিরা মাখযুমমীর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেন। আবু হুযায়ফা তাঁর দাসী সুমাইয়ার সাথে তাঁর বিয়ে করিয়ে দেন। ইসলাম আগমনের পর ইয়াসির, সুমাইয়া, আম্মার ও তাঁর ভাই আবদুল্লাহ সবাই মুসলমান হয়ে যান। এর ফলে গোটা পরিবারকে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়। বালাযরী উম্মেহানী থেকে এবং তাবারানী হযরত ওসমান (রা) থেকে এ বর্ণনা উদ্ধৃত করেন যে, একবার রাসূলুল্লাহ (স) সে স্থান দিয়ে যাচ্ছিলেন যেখানে তাঁদেরকে শাস্তি দেয়া হচ্ছিল। তিনি বড়ো দুঃখ পেলেন এবং বললেন,

*********************************************

  • হে আলে ইয়াসির, সবর কর। তোমাদের জন্য রয়েছে জান্নাতের ওয়াদা।

ইমাম আহমদ ও ইবনে সা’দ হযরত ওসমানের (রা) বরাত দিয়ে বলেন, একবার তিনি হুযুর (স) এর  সাথে ঐ স্থান দিয়ে যাচ্চিলেন যেখানে এ পরিবারকে শাস্তি দেয়া হচ্ছিল। হুযুর (স) বললেন, সবর কর। হে খোদা! আলে ইয়াসিরকে মাগফেরাত দান কর। আর তুমিতো তাদের মাগফেরাত করেই দিয়েছ।

ইবনে সা’দ মুহাম্মদ বিন কা’য়অব কুরাযীর বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন, এক ব্যক্তি হযরত আম্মারকে তাঁর জামা খোলা অবস্থায় দেখলো যে, সারা পিঠে শুধু আগুনে পুড়ে যাওয়ার দাগ। জিজ্ঞেস করলো, এসব কি? তিনি বললেন, এ সব সেই শাস্তির চিহ্ন যা মক্কার উত্তপ্ত যমীনের উপর আমাকে দেয়া হয়েছিল।

আমর বিন মাইমুন এর বরাত দিয়ে ইবনে সা’দ বলেন, মুশরিকদের পক্ষ থেকে হযরত আম্মারকে জ্বলন্ত অংগারের দাগ দেয়া হয় এবং হুযুর (স) বলেন, হে আগুন, তুমি আম্মারের প্রতি সেরূপ শীতল হয়ে যাও, যেমন হযরত ইব্রাহীমের (আ) প্রতি হয়েছিলে। তাঁর পিতা ইয়াসির অমানুষিক শাস্তি সহ্য করতে না পেরে মৃত্যুবরণ করেন। তারপর আবু জাহল তাঁর মা সুমাইয়াকে হত্যা করে। তাঁর ভাই আবদুল্লাহকে নিহত করা হয়। শুধু হযরত আম্মার রয়ে যান। তাঁকে পানিতে ডুবিয়ে দেয়া হতো। তাঁর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল এবং তিনি নবীকে অস্বীকার ও তাদের দেবদেবীর প্রশংসা করে জীবন রক্ষা করেন। তারপর ক্রন্দনরত অবস্থায় নবীর দরবারে হাযির হয়ে সকল কথা বললেন। তিনি বললেন, তোমার মনের অবস্থা কি ছিল? তিনি বলেন, একেবারে ঈমানের উপর নিশ্চিত আছি। নবী (স) বললেন, ভবিষ্যতে এমন অবস্থার শিকার হলে, এসব কথাই বলবে। বায়হাকী, ইবনে সা’দ, ইবনে জারীর, বালাযুরী, আওফী প্রমুখ মনীষীগণ এ ঘটনা বিবৃত করে বিভিন্ন তাফসীরকারগণের এ উক্তি উদ্ধৃত করেন যে, সূরা নহলের ১০৪ আয়াত এ ব্যাপারেই নাযিল হয় যাতে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি ঈমান আনার পর কুফর করলো, কিন্তু এ কাজে তাকে বাধ্য করা হয়েছিল অথচ মন তাঁর ঈমানের উপর নিশ্চিন্ত ছিল, তাহলে তাকে মাফ করা হবে। কিন্তু যে সন্তুষ্ট চিত্তে কুফর অবলম্বন করবে তার উপর খোদার গজব এবং তার জন্যে কঠিন শাস্তি রয়েছে।

হযরত খাব্বাব বিন আল আরাত

তিনি ছিলেন মূলতঃ ইরাকী। রাবিয়া গোত্রের একটি দল তাঁকে ধরে গোলাম বানায় এবং মক্কায় এনে বনী খুযায়ার একটি পরিবার ‘আলে-সাবা’- এর নিকট বিক্রি করে দেয় এবং তারা ছিল বনী যুহরার সাথে বন্ধুস্তপূর্ণ চুক্তিতে আবদ্ধ। তিনি ছিলেন একজন কারিগর শিল্পী। তিনি কর্মকারের পেশা অবলম্বন করতেন এবং তরবারী নির্মাণ করতেন। মুসলমান হওয়ার অপরাধে প্রথমে তাকে আর্থিক দিক দিয়ে পথে বসানো হলো। মুসনাদে আহমদ, বুখারী ও মুসলিমে স্বয়ং তাঁর বর্ণনা উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি বলেন, আস বিন ওয়ায়েল সাহমীর নিকট থেকে আমার কিছু পাওনা ছিল। তা আদায় করার জন্য তার কাছে গেলে সে বলতো, তোমাকে কিছুই দেবনা যদি তুমি মুহাম্মদকে (স) অস্বীকার কর। তাকে এ জবাব দিতাম, আমি কখনোই তাঁকে অস্বীকার করবনা, যদি তুমি মরে আবার জীবিত হও-তবুও না। ইবনে সা’দ বলেন, এর জবাবে আস বলতো, ঠিক আছে, আমি মরার পর যখন পুনরায় আমার মাল ও আওলাদের নিকট ফিরে আসব, তখন তোমার ঋণ শোধ করব।

ইবনে হিশাম ঘটনাটি এভাবে বয়ান করেছেন যে, আস তাঁর কাছে অনেক তলোয়ার বানিয়ে নেয় এবং ঋণ বাড়তে থাকে। তিনি যখন কর্জ পরিশোধের জন্য তাকীদ করেন তখন সে বলে, তোমার এ সাহেব মুহাম্মদ (স) যার দ্বীন তুমি গ্রহণ করেছ, বলেন যে, জান্নাতে বহু সোনা-চাঁদি, কাপড় ও খেদমতগার আছে।

খাব্বাব বলেন, হ্যাঁ। সত্য কথা। সে বলে, তাহলে আমাকে কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ দাও। সেখানে আমি কর্জ পরিশোধ করব। কারণ সেখানে তুমি ও তোমার সাহেব মুহাম্মদ (স) আমার চেয়ে বেশী প্রিয়পাত্র হবেনা।

এভাবে আর্থিক দিক দিয়ে পংগু করেও যখন জালেমদের তৃপ্তি হলোনা, তখন তারা তাঁকে কঠিন শাস্তি দেয়া শুরু করলো। ইবনে সা’দ ও বালাযুরী শা’বীর বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন- একবার হযরত উমরের (রা) খেলাফতকালে তিনি (খাব্বাব) তার পিঠ খুলে দেখালেন যা একেবারে স্বেতকুষ্ঠ ব্যাধির মতো দেখচ্ছিল। তিনি বললেন, মুশরিকরা আগুন জ্বালিয়ে তার উপর দিয়ে আমাকে ছিঁচড়ে নিয়ে যেতো, একজন আমার বুকের উপর দাঁড়াতো। তারপর আমার চর্বি গলে দিয়ে আগুন নিভে যেতো। (পরিবর্ধন।)

হুযুরের (স) নিকটে হযরত খাব্বাবের ফরিয়অদ এবং তাঁর জবাব

এ ধরনের নির্যাতন চলাকালেই সে ঘটনা যা ইমাম আহমদ বিন হাম্বল, বুখারী, আবু দাউদ এবং নাসায়ী স্বয়ং হযরত খাব্বাব থেকে উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেন, যে সময়ে মুশরিকদের অত্যাচার নির্যাতনে আমরা অতীষ্ট হয়ে পড়েছিলাম, সে সময়ে একদিন আমি দেখি যে, নবী (স) কাবার দেয়ালের ছায়ায় বসে আছেন। আমি নিকটে গিয়ে আরজ করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! জুলুমতো এখন চরমে পৌঁছেছে। আপনি কি আমাদের জন্যে দোয়অ করছেননা?

একথা শুনার পর নবী (স) এর মুখমন্ডল লালবর্ণ ধারণ করে এবং তিনি বলেন, তোমাদের পূর্বে যে সকল আহলে ঈমান অতীত হয়েছেন, তাঁদের উপর এর চেয়ে অধিক নির্যাতন করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কাউকে গর্ত খনন করে তাতে বসানো হতো এবং করাত দিয়ে মাথা থেকে দ্বিখন্ডিত করা হতো। কারো জোড়ায় জোড়ায় লোহার চিরুণী বিদ্ধ করে দেয়অ হতো, যাতে ঈমান পরিহার করে। তথাপি তাঁরা দ্বীন থেকে ফিরে যেতেননা। বিশ্বাস কর, আল্লাহ এ কাজ সমাধা করেই ছাড়বেন। অবশেষে এমন একদিন আসবে যখন এক ব্যক্তি সানআ থেকে হাদারামাওত পর্যন্ত দ্বিধাহীনচিত্তে সফর করবে এবং আল্লাহ ব্যতীত আর কারো ভয় তার থাকবেনা। কিন্তু তোমরা তাড়াহুড়া করছ।(তাফহীম ৩য় খন্ড- সূরা মরিয়মের ভূমিকা- সূরা আনকাবুত- টীকা ১।)

হযরত আবু বকর (রা) কর্তৃক মজলুম গোলামদের খরিদ করে আযাদ করা

এ অত্যাচার নির্যাতনের সময়ে হযরত আবু বকর (রা) প্রভৃত অর্থ ব্যয় করে বহু সংখ্যক মজলুম গোলাম ও বাঁদী খরিদ করে, আযাদ করে দেন। ইবনে হিশাম এমন সাত জনের নাম করেছেন। কিন্তু বায়হাকী, ইবনে ইসহাক, ইবনে আবদুল বারর এবং ইবনে হাজার প্রমুখ ব্যক্তিগণ যে নাম গণনা করেছে, তাতে মোট সংখ্যা হয় নয়।

 ১. হযরত বেলাল (পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে)।

২. তাঁর মাতা- হামামা। ইবনে আবদুল বারর বলেন, তাঁকেও রাহ খোদায় শাস্তি দেয়া হতো।

৩. আমের বিন ফুহায়রা। ইবনে সা’দ, তাবারী ও বালাযুরী বলেন, ইনি হযরত আয়েশার (রা) আপন ভাই তুফাইল বিন আল হারেসের গোলাম ছিলেন এবং সে সব মজলুমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন যাঁদেরকে শাস্তি দেয়া হতো।

৪. আবু ফুকায়হা তাঁর সম্পর্কে ইবনে ইসহাক বলেন, উমাইয়অ বিন খালাফ তাঁকে কঠোর শাস্তি দিত। তাবাকাতে ইবনে সা’দ এবং উসদুল গাবাতে আছে যে, বনী আবদুদ্দারের কিছু লোক যাদের গোলামী তিনি করতেন, দুপুরের প্রচন্ড গরমে তাঁকে শুইয়ে রাখতো। পিঠের উপরে ভারী পাথরও রেখে দেয়া হতো। অবশেষে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন।

৫. লুবায়না অথবা লুবায়বা। বালাযুরী তাঁর নাম উল্লেখ করেছেন এবং ইবনে হিশাম নাম উল্লেখ না করে বনী মুয়াম্মাল-এর (বনী আদীর একটি শাখা) দাসী বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, হযরত ওমর (রা) তাঁর কুফরী অবস্থায় তাঁকে খুব মারতেন এবং মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে বলতেন, আমি শুধু ক্লান্ত হওয়অর জন্যে তোমাকে ছেড়ে দিলাম। তিনি জবাবে বলতেন, আল্লাহ তোমার সাথে এরূপ আচরণ করুন।

৬. ও ৭. নাহদিয়্যা ও তাঁর কন্যা। উভয়ে বনী আবদুদ্দারের জনৈক মহিলার দাসী ছিলেন। তাঁদের কর্তাও তাঁদের উপর জুলুম করত।

৮. যিন্নিরা (ইন্তিয়াবে তাঁর নাম বলা হয়েছে যাম্বারা)। ইবনে আসীরের একটি বর্ণনায় জানা যায় যে, তিনি বনী আদীর দাসী ছিলেন এবং ওমর বিন খাত্তাব (রা) তাঁকে শাস্তি দিতেন। দ্বিতীয় এক বর্ণনায় জানা জায় যে, তিনি বনী মাখযুমের দাসী ছিলেন এবং আবু জাহল তাঁকে শাস্তি দিত। অবশেষে তাঁর দৃষ্টি শক্তি রহিত হয়ে যায়। আবু জাহল বলে, লাত এবং ওয্যা তোমাকে অন্ধ বানিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, লাত ও ওয্যা জানেই না যে কে তার পূজা করছে। এ ফয়সালাতো আসমান থেকে হয় এবং আমার রবের এ ক্ষমতা আছে যে তিনি আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিতে পারেন। সত্যি সত্যিই পরদিন যখন তিনি ঘুম থেকে উঠলেন তখন দেখা গেল আল্লাহ তায়ালা তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। বালাযুরী এ বর্ণনাই লিপিবদ্ধ করেছেন।

ইবনে হিশাম পক্ষান্তরে বলেছেন যে, হযরত আবু বকর (রা) যখন তাঁকে খরিদ করে বলতৈ থাকে যে, লাত ও ওয্যা তাকে অন্ধ করে দিয়েছে। তিনি বললেন, বায়তুল্লাহ কসম, এরা মিথ্যা বলছে। ওয্যা না কারো কোন উপকার করতে পারে, না ক্ষতি করতে পারে। তারপর আল্লাহ তায়ালা তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন।

৯. উম্মে উবাইস। কেউ উনায়েস এবং কেউ উমায়েস বলেছেন। বালাযুরী বলেন, ইনি বনী যোহরার দাসী ছিলেন। আসওয়া বিন আবদে ইয়াগুখ তাঁর উপর অত্যাচার করতো। (পরিবর্ধন।)

হযরত আবু বকরের (রা) পিতার আপত্তি ও তাঁর জবাব

ইবনে ইসহাক, ইবনে জারীর এবং ইবনে আসাকের হযরত আমের বিন আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রা) এর বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন যে, হযরত আবু বকরকে (রা) এভাবে হতভাগ্য দাসদাসীদের মুক্ত করতেগিয়ে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে দেখে তাঁর পিতা আবু কুহাফা (তখনও তিনি মুশরিক ছিলেন) তাঁকে বলেন, বৎস, আমি দেখছি তুমি দুর্বল লোকদেরকে আযাদ করে দিচ্ছ। তুমি যদি শক্তিশালী যুবকদের আযাদীর জন্য এ অর্থ ব্যয় করতে, তাহলে তারা তোমার শক্তিশালী দক্ষিণ হস্ত হতো। হযরত আবু বকর (রা) জবাবে বলেন, আব্বাজান, আমি তো সেই প্রতিদান চাই, যা রয়েছে আল্লাহর নিকটে।

এ ঘটনাটি সূরায়ে ‘লায়ল’ এর সে আয়াতগুলো সুন্দর স্বাক্ষর বহন করে, যাতে বলা হয়েছে, আর জাহান্নামের সে আগুন থেকে দূরে রাখা হতে সেই অত্যন্ত খোদাভীরু লোককে, যে পবিত্রতা অর্জনের জন্য তার ধনসম্পদ  ব্যয় করে। তার উপর কারো কোন অনুগ্রহ নেই যার বদলা তাকে দিতে হবে। সে তো নিছক তার মহান খোদার সন্তোষলাভের জন্য এ কাজ করে (আয়াত ১৭-২০)।

অর্থাৎ তিনি তাঁর ধনসম্পদ যাদের জন্য ব্যয় করেন, তাঁর উপর তাদের কোন অনুগ্রহ পূর্ব থেকেও ছিল না এবং না ভবিষ্যতে তাদের নিকট থেকে অতিরিক্ত সুযোগ সুবিধা লাভের জন্য তাদেরকে কোন হাদিয়া তোহফা দিচ্ছেন। বরঞ্চ তিনি তাঁর মহান খোদার সন্তুষ্টি হাসিলের জন্য এমন সব লোকের সাহায্য করছেন যাদের তাঁর উপরে পূর্বে কোন অনুগ্রহ ছিল না, আর না ভবিষ্যতে তাদের অনুগ্রহের কোন আশা তিনি করেন।(পরিবর্ধন।)

অত্যাচার উৎপীড়নের পরিণাম

কুরাইশগণ মুসলমানদের উপর অত্যাচার উৎপীড়ন চালিয়ে প্রকাশ্যতঃ এ সুবিধা লাভ করতে চাচ্ছিল যে, মুসলমানদের উপর বিভীষিকা সৃষ্টি করে ইসলামের প্রচার ও প্রসার বন্ধ করে দেবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার যে পরিণাম হলো তা ছিল তাদের চিন্তার অতীত। প্রথমতঃ এর থেকে একথা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, ইসলাম যে চরিত্র ও যুক্তি প্রমাণ নিয়ে এসেছে, তার কোন জবাব মানবতা বিরোধী কূটকৌশল ব্যতীত কুফরের কাছে ছিলনা। দ্বিতীয়তঃ এ নিষ্ঠুরতা দেখার পর প্রত্যেক সৎ প্রকৃতির লোক কুফর ও তার পতাকাবাহীদেরকে ঘৃণার চোখে দেখতে লাগলো এবং যে সবর ও অবিচলতার সাথে মুসলমাগণ এ অন্যায় জুলুম বরদাশত করে তার ফলে সকল নিরপেক্ষ মনে তাদের জন্য সহানুভূতির সৃষ্টি হয় এবং সেই সাথে সম্মান শ্রদ্ধাও। বরঞ্চ প্রকৃত পক্ষে তা ইসলামের মর্যাদা এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করে যে, মক্কার সমাজ থেকেই এমন পাকাপোক্ত, দৃঢ়সংকল্প এবং ঈমানী শক্তিতে শক্তিমান লোক পাওয়া যায়, যাঁরা কোন পার্থিব স্বার্থের জন্যে নয়, শুধু সত্যের জন্যে বিরাট বিরাট বিপদ মুসিবত সহ্য করেন। তারপর কাফেরদের এসব অপকৌশল ইসলামের প্রচার-প্রসার রুখতে পারেনি। এসব অত্যাচার সত্ত্বেও এমন সব আল্লাহর বান্দা আন্দোলনের জন্যে বেরিয়ে আসেন, যাঁরা কাফেরদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং অনেকে মনে মনে ঈমান নিয়ে আসেন কিন্তু প্রকাশ করেননি। এ কারণে ইসলামের দুশমনগণ সঠিক ধারণা করতে পারেনি যে, তাদের মধ্যে এ দ্বীন সমর্থনকারী কত লোক আত্মগোপন করে আছে। তাদের এ গোপন সমর্থন কুফরের দূর্গে ফাটর ধরাতে পারে।

এসব জুলুম অত্যাচারে ইসলামের সবচেয়ে যে বড়ো উপকার হয়েছে তা হো এই যে, এ অগ্নিপরীক্ষার ভেতর দিয়ে যাঁরা নবী করিমের (স) সাথে এসেছেন তাঁরা মানব জাতির সর্বোক্তম মানুষ। এ অবস্থায় কোন দুর্বল চরিত্রের লোক এদিকে আসার সাহসই করেত পারেনা। (পরিবর্ধন)

অহী বন্ধের কাল

আল।লাহ তায়ালার হিকমতপূর্ণ কাজ এমন এক বিচিত্র ধরনের যে, বিবেক তা উপলব্ধি করতে পারেনা। এমন এক সময় যখন কুফর ও ইসলামের পারস্পরিক সংঘাত-সংঘর্ষ এমন চরমে পৌঁছেছিল এবং নবী (স) এবং মুসলমানদের জীবনে প্রতিটি মুহূর্ত দুঃসহ হয়ে পড়েছিল, তখন স্বভাবতঃই আশা করা হচ্ছিল যে, নবীর (স) এর উপরে অহী নাযিল হওয়া অব্যাহত থাকবে। এর দ্বারা প্রতিদিনের সংঘটিত নিত্য নতুন পরিস্থিতিতে পথ নির্দেশনা দেয়া হতো। নবী (স) ও তাঁর সংগী সাথীদেরকে সান্ত্বনা ও উৎসাহ দান করা হতো এবং কাফেরদেরকে তাদের জুলুম অত্যাচারের জন্যে শাসিয়ে দেয়অ হতো। কিন্তু এ সময়ে আল্লাহ তায়অলার পক্ষ থেকে অহী নাযিল হওয়া বন্ধ হয়ে গেল। এ জন্যে নবীও (স) ভয়ানকভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং কাফেরদেরও ঠাট্টা বিদ্রুপ করার সুযোগ হলো।

এ অহী নাযিল বন্ধ হওয়অর সময়টা কখন ছিল তা জানা নেই। কিন্তু এ ব্যাপারে যে সমস্ত বর্ণনা হাদিসে পাওয়া যায়, তার থেকে এবং স্বয়ং ঐ দুটি সূরার বিষয়বস্তু থেকে যা এ অহী বন্ধের সমাপ্তির পর নাযিল হয়, এর থেকে সুস্পষ্ট রূপে জানা যায় যে, এ ঘটনা (অহী নাযিল বন্ধ হওয়া) সাধারণ দাওয়াত শুরু হওয়া এবং ইসলাম ও কুফরের দ্বন্দ্ব তীব্র হওয়ার পর সংঘটিত হয়। বিভিন্ন বর্ণনায় এ অহী বন্ধের মুদ্দৎ বিভিন্ন প্রকার বলা হয়েছে। ইবনে জুরাইজ বার দিন, কালবী পনেরো দিন, ইবনে আব্বাস (রা) পঁচিশ দিন, সুদ্দী ও মুকাতিল চল্লিশ দিন এর মুদ্দৎ বর্ণনা করেছেন। যাই হোক, এ সময়কাল এতো দীর্ঘ ছিল যে, নবী  (স) এর জন্যে বড়োই দুঃখ ভারাক্রান্ত ছিলেন। বিরোধীরাও তাঁকে বিদ্রুপ করতে থাকে। কারণ তাঁল উপরে কোন নতুন সূরা নাযিল হলে তা তিনি লোকদেরকে প শুনাতেন। এ জন্যে যখন বেশ কিছু কাল যাবত তিনি নতুন অহী লোকদেরকে শুনাতে পারলেননা, তখন বিরোধীরা মনে করলো সে উৎস বন্ধ হয়ে গেছে যেখান থেকে এ কালামপাক আসতো। জুন্দুব বিন আবদুল্লাহিল বাজালী বলেন যে, যখন জিব্রিল (আ) এর আগমন বন্ধ হয়ে গেল, তখন মুশরিকগণ বলা শুরু করলো যে, মুহাম্মদকে (স) তাঁর রব পরিত্যাগ করেছেন (ইবনে জারীর, তাবারী, তাবারানী, আবদ বিন হামীদ, সাইদ বিন মনুসর, ইবনে মারদুইয়া)।

অন্যান্য বর্ণনায় আছে, আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিল- হুযুরের (স) চাচী এবৃং অতিনিকট প্রতিবেশিনী, নবীকে (স) বলে, মনে হচ্ছে তোমার শয়তান তোমাকে পরিত্যাগ করেছে।

আওফী ও ইবনে জারীর ইবনে আব্বাসের (রা) বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন, কয়েকদিন যাবত জিব্রিলের আগমন বন্ধ হওয়াতে নবী (স) পেরেশান হয়ে পড়েন এবং মুশরিকগন বলতে থাকে, তাঁর রব তাঁর উপর অসন্তুষ্ঠ হয়েছেন এবং তাঁকে পরিত্যাগ করেছেন। কাতাদাহ এবং দাহহাকের মুরসাল রেওয়ায়েতে প্রায় একই রকম কথা বলা হয়েছে। এ অবস্থায় হুযুর (স) এর দুঃখ বেদনার অবস্থাও বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে। আর এমনটি হবেই না কেন যখন প্রিয় সত্তার পক্ষ থেকে উদাসীনতা, কুফর ও ঈমানের মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘর্ষ শুরু হয়ে যাওয়ার পর সেই শক্তির উৎস থেকে বঞ্চনা- যা এমন প্রাণান্তকর সংঘাতের প্রবল স্রোতের মধ্যে তাঁর একমাত্র সহায় ছিল, উপরন্তু দুশমনের হাসিঠাট্টা এসব কিছু একত্র হয়ে নবী (স) এর জন্যে ভয়ানক পেরেশানীর কারণ হয়ে পড়েছিল যার জন্যে তিনি মনে করছিলেন কি জানি কোন ভুলক্রটি হয়ে যায়নিতো যার জন্যে আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন এবং হক ও বাতিলের লড়াইয়ে একাকী ছেড়ে দিয়েছেন।

সূরা ‘দোহা’ নাযিল হওয়া

এ অবস্থায় সূরা ‘দোহা’ নাযিল হয় যাতে বলা হয়ঃ

*****************************************************

  • উজ্জ্বল দিনের কসম এবং রাতের যখন তা প্রশান্তিসহ ছেয়ে পড়ে, হে নবী। তোমার রব তোমাকে কখনো পরিত্যঅগ করেননি। আর না তিনি নারাজ হয়েছেন।

অর্থাৎ যেভাবে দিন উজ্জ্বল হওয়া এবং অন্ধকার ও প্রশান্তিসহ রাতের ছেয়ে যাওয়া এর ভিত্তিতে হয়না যে, আল্লাহ তায়ালা দিনের বেলা মানুষের প্রতি সন্তুষ্ট এবং রাতে তাদের প্রতি অসন্তষ্ট হন। বরঞ্চ এ উভয় অবস্থা এক বিরাট হিকমত ও উপযোগিতার ভিত্তিতে হয়ে থাকে। এর কোন সম্পর্ক এ বিষয়ের সাথে নেই যে, যখন আল্লাহ তোমার প্রতি খুমী থাকবেন তখন অহী পাঠাবেন, আর যখন অহী পাঠাবেননা তখন তার অর্থ এই হবে যে, তিনি তোমার উপর অসন্তুষ্ট এবং তার জন্যে তোমাকে পরিত্যঅগ করেছেন। দিনের আলো যদি ক্রমাগতভাবে মানুষে উপর  পতিত হতে থাকে তাহলে তা মানুষকে শ্রান্ত ক্লান্ত করে দেবে। এ জন্যে যৌক্তিকতার দাবী এই যে, দিনের পর রাত আসুক যাতে মানুষ প্রশান্তি লাভ করতে পারে। এভাবে অহীর আলো যদি তোমার উপর অবিরাম পড়তে থাকে তাহলে তোমার শিরা উপশিরা তা বরদাশত করতে পারবেনা। এজন্যে মাঝ মধ্যে অহী বন্ধ রাখার সময়কালও এ যুক্তিসংগত কারণে আল্লাহ তায়ালা নির্ধারণ করে রেখেছেন, যাতে করে অহী নাযিলের যে গুরুভার তোমার উপর পড়ে তার প্রতিক্রিয়া তিরোহিত হয় এবং তুমি প্রশান্তি লাভ কর।[অহী নাযিলের গুরুভার নবীর (স) কতটা কঠিন ও কষ্টদায়ক হতো তা ওসব বর্ণনা থেকে অনুমান করা যায়- যা এ সম্পর্কে হাদীসসমূহে পাওয়া যায়। হযরত যায়েদ বিন সাবেত (রা) বলেন, একবার রাসূলূল্লাহ (স) এর উপর অহী এমন অবস্থায় নাযিল হয়- যখন তিনি আমার হাঁটুর উপর তাঁর হাঁটু রেখে বসেছিলেন। তখন আমার হাঁটুর উপর এমন কঠিন চাপ পড়লো যে মনে হলো যে, হাঁটু চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে।

হযরত আয়েশা (রা) বলেন, তীব্র শীতের মাধ্যে নবীর উপর অহী নাযিল হতে দেখেছি। তখন তাঁর কপাল দিয়ে টপ টপ করে ঘাম পড়তো- (বোখারী, মুসলিম, মুয়াত্ত ইমাম মালেক, তিরমিযি, নাসায়ী)। হযরত আয়েশা (রা) আরও বলেন, যখন তাঁর উপর এমন অবস্থায় অহী নাযিল হতো যে তিনি উটনীর উপর বসে আছেন, তখন উটনী তার বুক যমীনের উপর ঠেস দিয়ে রাখতো এবং ততোক্ষণ পর্যন্ত নড়াচড়া করতোনা যতোক্ষণ না অহী নাযিল হওয়া শেষ হতো (মুসনাদে আহমদ, হাকেম, ইবনে জারীর)। (তাফহীম ৬ষ্ঠ খন্ড- মুজাম্মেল টীকা)]

তারপর বলা হয়েছে-

*****************************************************

  • এর নিশ্চিত রূপে তোমার জন্যে পরবর্তী যুগ প্রথম যুগ থেকে শ্রেয়।

এ সুসংবাদ নবী (স) কে এমন সময়ে আল্লাহ তায়ালা দিয়েছেন- যখন মুষ্টিমেয় লোক তাঁর সাথে ছিলেন। ইসলামের প্রদীপ মক্কাতেই মিট মিট করে জ্বলছিল। তা নিভানোর জন্যে চারদিকে তুফান উঠছিল। সমগ্র  জাতি বিরোধিতাৰয় বদ্ধপরিকর ছিল এবং প্রকাশ্যতঃ মুসলমানদের সাফল্যের কোন লক্ষণ দূর-দূরান্ত পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিলনা। সে সময়ে আল্লাহ তায়ালা নবী (স) কে বলেন, প্রাথমিক যুগের দুঃখ কষ্ট ও মুসিবতে উদ্বিগ্ন হবেননা। প্রতিটি পরবর্তী যুগ পূর্ববর্তীযূগ থেকে উৎকৃষ্ঠ প্রমাণিত হবে। আপনার শক্তি, সম্মান, প্রতিপত্তি, ও পদমর্যাদা বাড়তে থাকবে এবং আপনার প্রভাবও বেড়ে চলবে। আর এ ওয়াদা দুনিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরঞ্চ আখেরাতও আপনার জন্যে দুনিয়া থেকে উৎকৃষ্টতর হবে।

তারপর বলা হয়-

***********************************************

  • আর শীঘ্রই তোমার রব তোমাকে এতোটা দেবেন যে তুমি খুশী হয়ে যাবে। (আয়াত নং ৫)

অর্থাৎ যদিও দিতে কিছু বিলম্ব হবে, কিন্তু সে সময় দূরে নয় যখন তোমার উপর তোমার রবের দান এমনভাবে বর্ষিত হবে যে তুমি খুশী হয়ে যাবে। এ ওয়াদা নবী পাকের (স) জীবদ্দশাতেই এমনভাবে পূরণ করা হয় যে, গোটা আরব দেশ- দক্ষিণের সমুদ্র তটভূমি থেকে শুরু করে উত্তরে রোম সাম্রাজ্যের শাম এবং পারস্য সাম্রাজ্যের ইরাক সীমান্ত পর্যন্ত এবং পূর্বে পারস্য উপসাগর থেকে পশ্চিমে লোহিত সাগর পর্যন্ত সমগ্র এলাকা তাঁর পদানত হয়ে পড়ে। আরবের ইতিহাসে প্রথম বার এ ভূখন্ড এক আইন শৃংখলার অধীন হয়ে পড়ে। যে শক্তিই তার সাথে টক্কর দিতে এসেছে সেই চূর্ণ বিচূর্ণ হয়েছে। সমগ্র ভূখন্ডে কালেমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লঅহ গুঞ্জরিত হয়। এখানকার মুশরিক ও আহলে কিতাব তাদের মিথ্যা কালেমা বুলন্দ রাখার জন্যে সর্বশক্তি নিয়োগ করেও ব্যর্থ হয়। আনুগত্যে তাদের মস্তকই শুধূ অবনত হয়নি মনো বশীভূত হয়েছে। বিশ্বাস ও আমল- আখলাকে এক বিরাট বিপ্লব সাধিত হয়। গোটা মানব জাতির ইতিহাসে এর কোন দৃষ্টান্ত মেলেনা যে,  জাহেলিয়াতে নিমজ্জিত একটি জাতি মাত্র তেইশ বছরে এতাটা পরিবর্তিত হয়েছে। তারপর নবী পাকের (স) প্রতিষ্ঠিত আন্দোলন  এতোটা শক্তিশালী হয় যে, এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের বিরাট অংশে তা বিস্তার লাভ করে এবং দুনিয়ার নিভৃত গ্রামগঞ্জ ও পথে প্রান্তরে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। এ কিছুতো আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূলকে দুনিয়ায় দিয়েছেন। আখেরাতে যা কিছু দেবেন তার মহত্বের ধারণাও করা যেতে পারেনা।

সূরা ‘আলাম নাশরাহ- অবতরণ

এর অল্পকাল পরে ইসলামী আন্দোলনের সূচনায় যেসব অসুবিধার সৃষ্টি করেছিল এবং যার জন্যে নবী (স) অত্যন্ত বিব্রত বোধ করেছিলেন। তখন তাঁকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য ‘আলাম নাশরাহ’ সূরা নাযিল হয়। এর সংশ্লিষ্ট অংশগুলো এখানে ব্যাখ্যাসহ উদ্ধৃত করা হচ্ছে।

***********************************************

  • হে নবী‍! আমি কি তোমার বক্ষ তোমার জন্য উন্মুক্ত করে দিইনি? (আয়াত নং ১)

এ প্রশ্নের মাধ্যমে বক্তব্যের সূচনা এবং পরবর্তী বিষয়বস্তু স্বয়ং একথা সুস্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) সে সময়ে ঐ সব অসুবিধার সম্মুখীন হয়ে ভয়ানক বিব্রত হয়ে পড়েছিলেন যা প্রকাশ্যে ইসলামী দাওয়াতের কাজ শুরু করার পর প্রাথমিক যুগে তিনি যেসব বাধাবিপত্তি ও অসুবিধার সম্মুখীন হচ্চিলেন। এ অবস্থায় আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সম্বোধন করে সান্তনা দিতে গিয়ে বলেন, হে নবী! আমি কি তোমাকে এই এই অনুগ্রহ দান করিনি? তাহলে এ প্রাথমিক পর্যায়ের এ সব অসুবিধার জন্য বিব্রত হচ্ছ কেন?

বক্ষ উন্মুক্ত করা শব্দ কুরআন  মাজিদে যেসব ব্যাপারে ব্যবহার করা হয়েছে তার প্রতি লক্ষ্য করলে জানতে পারা যায় যে,  এর দুটি অর্থ রয়েছে।

১. সূরা আনয়ামের ১২৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে-

****************************************

  • অতএব যে ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা হেদায়াত দান করবেন, তার বক্ষ ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন । সূরায়ে যুমারের ২২ নং আয়াতে বলা হয়েছে-

*****************************************

  • তাহলে যার বক্ষ আল্লাহ ইসলামের জন্য খুলে দিয়েছেন, সেতো তার রবের পক্ষ থেকে এক আলোকের উপর চলছে।

এ দুটি স্থানে ‘বক্ষ উন্মুক্ত করণ’-এর অর্থ হরেক রকমের উদ্বেগ ও দ্বিধা দ্বন্দ্ব মুক্ত হয়ে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যে ইসলামের পথই সত্য সেই আকীদাহ বিশ্বাস চারিত্রিক মূলনীতি, সভ্যতা সংস্কৃতি সেই নির্দেশাবলী ও হেদায়াত বিলকুল সত্য ও সঠিক যা ইসলাম মানুষকে দিয়েছে।

২. সূরা শুয়ারা- ১২ এবং ১৩ নং আয়াতে উল্লেখ আছে যে, হযরত মুসাকে (আ) যখন আল্লাহ তায়অলা নুবওতের পদমর্যাদায় ভূষিক করে ফেরাউন ও তার বিরাট রাষ্টশক্তির মুকাবিলা করার নির্দেশ দেন, তখন তিনি আরজ করলেন-

*************************************

-হে আমার রব! আমার ভয় হচ্ছে যে তারা আমাকে মিথ্যা মনে করে প্রত্যাখ্যান করবে। (ভয়ে ও নৈরাশ্যে) আমার বক্ষ সংকীর্ণ হয়ে আসছে।

সূরা তাহা ২২-২৫ নং আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে- সে সময় হযরত মূসা (আ) আল্লাহর নিকটে দোয়া করেন-

*********************************

  • আমার রব। আমার বক্ষ আমার জন্য উন্মুক্ত করে দাও এবং আমার কাজ আমার জন্য সহজ করে দাও।

এখানে বক্ষের সংকীর্ণতার অর্থ এই যে, নবুওতের মতো কঠিন কাজের গুরুভার বহন করার এবং একাকী এক বিরাট কুফরী শক্তির সাথে টক্কর দেয়ার সাহস না হওয়া। পক্ষান্তরে বক্ষ উন্মোচন এর অর্থ মানুষের সাহস ও উৎসাহ উদ্যম বেড়ে যাওয়া। কোন প্রাণান্তকর অভিযান পরিচালনার জন্য এবং ভয়ানক কঠিন কাজ করার ব্যাপারে বিমুখ না হওয়া। যার ফলে নবুওতের বিরাট দায়িত্ব পালনে সাহসের সঞ্চার হয়।

চিন্তা করলে অনুভব করা যায় যে, এ আয়াতে (আলাম নাশরাহ) রাসূলুল্লাহ (স) এবং বক্ষ উন্মুক্ত করার মধ্যে উপরের দুটি অর্থই নিহিত রয়েছে। প্রথম অর্থ গ্রহণ করলে তার মর্ম এ হবে যে, নবুওত পূর্ব কালে রাসূলূল্লাহ (স) আরবের মুশরিক, নাসারা, ইহুদী, অগ্নিপূজক- সকলের ধর্মকে ভ্রান্ত মনে করতেন। উপরন্তু সেই আল্লাহমুখীতার প্রতিও সন্তুষ্ট ছিলেননা যা আরবের কতিপয় তাওহীদপন্হীদের মধ্যে পাওয়া যেতো। কারণ এ ছিল একটা দ্ব্যর্থবোধক আকীদাহ-বিশ্বাস! যার মধ্যে সঠিক পথের কোন বিবরণ পাওয়া যেতোনা (তাফহীমুল কুরআনে- সূরা হা মীম সাজদার ৫ নং টীকা দ্রষ্টব্য)। কিন্তু যেহেতু সঠিক পথের সন্ধান তাঁরও (নবীর) জানা ছিলনা, সে জন্য তিনি কঠিন দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিলেন। নবুওত দান করে আল্লাহ তায়ালা তাঁর দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দূর করেন এবং সত্য সঠিক পথ তাঁর কাছে সুস্পষ্ট করে তুলে ধরেন, যার ফলে তিনি নিশ্চিত ও নিশ্চিত হন।

দ্বিতীয় অর্থ ধরা হলে তার মর্ম এ হবে যে, নবুওত দান করার পর আল্লাহ তায়ালা তাঁকে উৎসাহ উদ্যম, সাহস, দৃঢ় সংকল্প এবং মনের সে প্রশস্ততা দান করেন যা এ পদের গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজন ছিল। তিনি যে ব্যাপক ও বিশাল জ্ঞানের অধিকারী হন যা কোন মানুষ তা ধারণ করতে পারেনা। তিনি সে হিকমত বিজ্ঞতা লাভ করেন- যা চরম অবনতি দূর করতঃ তা সুবিন্যস্ত ও সুনিয়ন্ত্রিত করার যোগ্যতা রাখতো। তিনি এমন যোগ্যতা লাভ করেন যে, জাহেলিয়াতে নিমজ্জিত ও অজ্ঞতার দিক দিয়ে অসভ্য ও বর্বর সমাজে উপায় উপকরণহীন অবস্থায় এবং প্রকাশ্যতঃ কোন পৃষ্ঠপোষক শক্তির ঝড়-ঝঞ্চার মুকাবিলা করতে হতভম্ব হয়ে যাননি। এ পথে যেসব দুঃখ কষ্ট ও মুসিবতের সম্মুখীন হন তা সহনশীলতার সাথে বরদাশত করেন। কোন শক্তিই তাঁকে তাঁর আপন অবস্থান থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। অতএব আল্লাহ তায়ালার ইরশাদের অর্থ এই যে, হে নবী! শরহে সদরের (বক্ষ উন্মোচনের) অফুরন্ত সম্পদ যখন আল্লাহ তায়ালা তোমাকে দান করেছেন- তখন তুমি ওসব অসুবিধার জন্য মনঃক্ষুণ্ন হচ্ছ কেন যেসব কাজের সূচনা কালের এ পর্যায়ে দেখা দিচ্ছে। [১. কোন কোন তফসীরকার শরহে সদরকে বক্ষবিদীর্ণ অর্থে গ্রহণ করেছেন এবং এ আয়াতকে বক্ষবিদীর্ণ হওয়ার সে মুজেযার প্রমাণ হিসাবে গণ্য করেছেন যা হাদীসের বর্ণনাগুলোতে পাওয়া যায়। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার এই যে, এ মুজেযার প্রমাণ হাদীসের বর্ণনার উপর নির্ভর করে। কুরআন থেকে তা প্রমাণের চেষ্টা করা ঠিক নয়। আরবী ভাষার দিক দিয়ে ‘শরহে সদর’কে কিছুতেই বক্ষবিদীর্ণ অর্থে গ্রহণ করা যায়না। আল্লামা আলুসী রুহুল মায়ানীতে বলেন,

***************************************

গবেষকদের নিকটে এ আয়াতে ‘শরহ’কে বিদীর্ণ অর্থে গ্রহণ করা একটি দুর্বল কথা।]

***********************************

  • এবং তোমারই জন্য তোমার উল্লেখ ধ্বনী বুলন্দ করে দিয়েছি।

এ কথা সে সময়ে বলা হয়েছিল, যখন কুরাইশের সকল ইসলাম দুশমন নবী (স) এর অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছিল। বিশেষ করে হজ্বের সময়ে অলীদ বিন মুগীরার প্রস্তাবিত স্কীম অনুযায়ী হাজীদের এক একটি শিবিরে গিয়ে নবী সম্পর্কে এমন সব কথা প্রচার করা হতো যার ফলে মানুষ তাঁর প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করে তাঁর থেকে দূরে পলায়ন করতো। তাহলে এ অবস্থায় নবীর স্মরণ সমুন্নত করার সুসংবাদ কি করে হতে পারে?

সর্ব প্রথমে তাঁর স্মরণ সমুন্নত করার কাজ আল্লাহ স্বয়ং দুশমনদের দ্বারাই নিয়েছেন। মক্কার কাফেরগণ তাঁক লাঞ্চিত করার জন্য যেসব পন্হা অবলম্বন করে তার কারণেই তাঁর নাম আরবের সর্বত্র গ্রামেগঞ্জে পৌঁছে যায় এবং মক্কার নিভৃত কোণ থেকে বের হয়ে স্বয়ং শক্রগণই তাঁকে দেশের সকল গোত্রের নিকটে পরিচিত করে দেয়। আর এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল যে মানুষ জানতে চায় সে ব্যক্তিটি কে। কি বলে? কেমন লোক সে? তার যাদু দ্বারা প্রভাবিত লোকগুলো কেমন? তাদের উপর তার যাদুর কি প্রভাব পড়েছে? মক্কার কাফেরদের এ প্রচার প্রপাগান্ডা যতোই বাড়তে থাকে, লোকের মধ্যে এ অনুসন্ধিৎসাও ততোই বাড়তে থাকে। অতঃপর এ অনুসন্ধিতার ফলে লোক যখন তাঁর (নবীর) চরিত্র ও আচার-আচরণ জানতে পারলো, যখন লোকে কুরআন শুনলো, আর জানতে পারলো, সে শিক্ষা কি যা তিনি পরিবেশন করছেন এবং যখন দর্শকেরা এটা দেখলো যে, যাকে যাদু বলা হচ্ছে তার দ্বারা যারা প্রভাবিত তাদের জীবন আরবের সাধারণ মানুষ অপেক্ষা কত উচ্চ ও পবিত্র হয়ে পড়েছে, তখন সেই কুখ্যাতি সুখ্যাতিতে পরিবর্তিত হতে থাকলো। অবশেষে মদীনায় হিজরতের সময় আসা পর্যন্ত অবস্থা এই হয়ে পড়ে যে, দূর ও নিকটের আরব গোত্রদের মধ্যে এমন কোন গোত্র ছিলনা যার কোন না কোন ব্যক্তি বা পরিবার ইসলাম গ্রহণ করেনি এবং যাদের মধ্যে কিছু লোক নবী (স) ও তাঁর দাওয়াতের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েনি। এ হচ্ছে হুযুর (স) এর স্মরণ সমুন্নত করণের প্রথম পর্যায় যা এ সূরা নাযিলের সময় অতিবাহিত হচ্ছিল এবং সকলে তার প্রতিক্রিয়অ লক্ষ্য করছিল।

এর কয়েক বছর পর তার দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় যা সে সময়ে কেউ দেখতে পারতনা আর না তার ধারণা করতে পারতো। শুধু আল্লাহ তায়ালাই তার জ্ঞান রাখতেন এবং তিনিই তার সুসংবাদ নবীকে দেন। হিজরতের পর, মুনাফিক, ইহুদী এবং আরবের সকল প্রভাবশালী মুশরিক একদিকে নবীর বদনাম রটাবার ব্যাপারে সক্রিয় ছিল এবং অপরদিকে মদীনার ইসলামী রাষ্ট্র খোদা পুরস্তি, খোদাভীতি, পূতপবিত্র নৈতিকতা, সুখী ও সুন্দর সামাজিকতা, সুবিচার, সাম্য, ধনীদের বদান্যতা, গরীবদের দেখাশুনা, চুক্তি ও অংগীকার সংরক্ষণ এবং কার্যকলাপে সততা প্রভৃতির যে বাস্তব নমুনা পেশ করছিল, তা মানুষের মন জয় করছিল। দুশমন যুদ্ধের মাধ্যমে এ উদীয়মান প্রভাব প্রতিহত করার চেষ্টা করে। কিন্তু নবীর নেতৃত্বে ঈমানদারগণের যে দল তৈরী হয়েছিল, তা স্বীয় আইন শৃংখলা, বীরত্ব, মৃত্যুভয় না থাকা, যুদ্ধাবস্থায়ও নৈতিক সীমারেখা  মেনে চলা প্রভৃতি গুণাবলীর দরুন নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব এমনভাবে প্রমাণ করেন যে, গোটা আরব দেশ তাঁদের সে শ্রেষ্ঠত্ব, মেনে নেয়। দশ বছরের মধ্যে নবী (স) এর স্মরণ বুলন্দ এমনভাবে হয় যে, যে দেশে তাঁকে বদনাম করার জন্য বিরোধিগণ সর্বশক্তি প্রয়োগ করে, সে দেশেরই প্রতিটি আনাচে-কানাচে *************************************  – এর ধ্বনি গুঞ্জরিত হয়। অতঃপর খেলাফতে রাশেদার যুগে তাঁর পবিত্র নাম সারা দুনিয়ায় সমুন্নত হতে থাকে। এ ধারাবাহিকতা আজ পর্যন্ত বেড়েই চলেছে এবং ইনশাআল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত বেড়েই চলবে। দুনিয়ার এমন কোন স্থান নেই যেখানে মুসলমানদের কোন বস্তি আছে এবং সেখানে দৈনিক পাঁচ বার আযানে উচ্চস্বরে মুহাম্মদ (স) এর রেসালাতের ঘোষণা করা হয়না। নামাযে তাঁর প্রতি দরূদ পড়া হয়না, জুমার খুৎবার তাঁর নাম স্মরণ করা হয়না এবং বছরের বারো মাসের মধ্যে কোন দিন ও দিনের ২৪ ঘন্টার মধ্যে কোন সময় এমন নেই যখন দুনিয়ার কোথাও না কোথাও তাঁর নাম নেয়া হয়না। অতএব আয়াতের মর্ম এই যে, হে নবী। এ সময়ের কঠিন বিপদ মুসিবতে তুমি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছ কেন? তোমার স্মরণ সমুন্নত করার তো এমন ব্যবস্থা আমি করেছি যা কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। হাদীসে হযরত আবু সাঈদ খুদরীর বর্ণনায় আছে যে, নবী (স) বলেন, জিব্রিল আমার নিকটে আস এবং আমাকে বলে, আমার রব এবং তোমার রব জিজ্ঞেস করে কিভাবে আমি তোমার স্মরণ সমুন্নত করেছি? আমি বললাম, আল্লাহই ভালো জানেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালার এরশাদ হচ্ছে যে, যখন আমার ইরাদ বা স্মরণ করা হয়, তখন আমার সাথে তোমারও ইয়াদ করা হয়- (ইবনে জারীর, ইবনে আবি হাতেম, আবু ইয়া’লা, ইবনুল মুনযের, ইবনে হাব্বান, ইবনে মারদুইয়া, আবু নাঈম)।

****************************************

অতএব সত্য কথা এই যে, সংকীর্ণতার সাথে প্রশস্ততাও আছে। নিঃসন্দেহে সংকীর্ণতার সাথে প্রশ্বস্ততা আছে।

একথা দু’বার আবৃত্তি করা হয়েছে এ যাতে করে নবী (স) কে ভালোভাবে সান্ত্বনা দেয়া যায় যে, যে কঠিন অবস্থায় তিনি কালাতিপাত করছেন তা বেশী দিন স্থায়ী থাকার নয়। বরঞ্চ তারপর সত্ত্বরই ভালো অবস্থা এসে যাচ্চে। দৃশ্যতঃ এ কথা স্ববিরোধী মনে হচ্ছে যে, সংকীর্ণতার সাথে প্রশস্ততা হবে। কারন এ দুটি অবস্থা একই সময়ে একত্র হতে পারেনা। কিন্তু সংকীর্ণতার পর প্রশ্বস্ততা একথা বলার পরিবর্তে সংকীর্ণতার সাথে প্রশ্বস্ততা শব্দগুলো এ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে যে, প্রশস্ততার সময় এতোটা নিকটবর্তী যে, যেন তা প্রথমটির সাথে মিলিত হয়েই আসছে।(তাফহীম ৬ষ্ঠ খন্ড- আলাম নাশরাহ- টীকা- ১,৩,৪।)

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.