সীরাতে সরওয়ারে আলম – ৫ম খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

চলমান পেজের সূচীপত্র

নবম অধ্যায়

আবিসিনিয়ায় হিজরত

দ্বীন ইসলামে হিজরতের গুরুত্ব

কুরআনে জিহাদের পর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখযোগ্য জিনিস হচ্ছে হিজরত। ইসলামে হিজরতের এতো গুরুত্ব কেন? তার কারণ এই যে, একজন মুসলমানের  জন্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু থাকলে তা না তার আপন জন্মভূমি, না তার জাতি, আন না তার রুটি অথবা পেট। বরঞ্চ তার জন্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে, যে সব মূলনীতির উপর সে ঈমান এনেছে তদনুযায়ী জীবন যাপন করে সে যেন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে পারে। যদি সে সে মূলনীতি অনুযায়ী জীবন যাপন করতে না পারে, তাহলে তার জন্যে স্বাধীনতা কেন স্বয়ং তার জীবনই অর্থহীন হয়ে পড়বে। যে সব মূলনীতির উপর ঈমান নির্ভরশীল এবং যেসব সম্পর্কে তার দৃঢ়বিশ্বাস যে তা হক (অতি সত্য) যা খোদা ও রাসূল প্রদত্ত, সে সব বিসর্জন দেয়অর পরিবর্তে সে বরঞ্চ খোদার পথে তার জীবন বিসর্জন দেয়াকেই শ্রেয়ঃ মনে করবে।

রাসূলের যে সব অনুসারী আরব থেকে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন, তাঁরা এ জন্যে করেছিলেন যে, আরব, কুরায়শী ও মক্কী হওয়ার জন্যে আপন দেশে, গোত্রে ও শহরে সকল প্রকার স্বাধীনতা তাঁদের ছিল। কিন্তু যে স্বাধীনতা থেকে তাঁরা বঞ্চিত ছিলেন, তাহলো মুসলমান হওয়ার স্বাধীনতা। এ জন্যে তাঁরা জন্মভূমি পরিত্যাগ করে অন্য এক দেশে চলে গেলেন যেখানে রাসূলুল্লাহ (স) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন, তো কেন করেছিলেন? তিনি মক্কার অধিবাসী ছিলেন। মক্কায় তিনি সে সব অধিকার লাভ করেন যা মক্কায় যে কোন নাগরিক লাভ করতো। তাঁর সংগী সাথীরাও সে সকল অধিকার লাভ করেছিলেন যা কোন কুরাইশী হওয়ার দিক দিয়ে লাভ করতো। কিন্তু যে কারণে তিনি ও তাঁর সংগী সাথীগণ ঘরদোর ছাড়লেন, আত্মীয় স্বজন ছাড়লেন, বিষয় সম্পদ ছাড়লেন এবং শুধু গায়ে পরিহিত কাপড়সহ বেরিয়ে পড়লেন, তা এ ছিল যে, মুসলমান হওয়ার দিক দিয়ে তাঁদের কোন স্বাধীনতা ছিলনা। এ স্বাধীনতার জন্যেই তাঁরা জন্মভূমি পরিত্যাগ করেন এবং শুধু গায়ে পরিহিত কাপড়সহ বেরিয়ে পড়লেন, তা এ ছিল যে, মুসলমান হওয়ার দিক দিয়ে তাঁদের কোন স্বাধীনতা ছিলনা। এ স্বাধীনতার জন্যেই তাঁরা জন্মভূমি পরিত্যাগ করেন এবং অন্য শহরে গিয়ে বসতি স্থাপন করেন। (প্রচারপত্র- আযাদী (গ্রন্হকার) পৃঃ ১১-১২।)

কুরআনে মুসলমানদেরকে হিজরতের জন্য তৈরী করা হয়

মক্কায় মুসলমানদের উপর অত্যাচার নির্যাতন যখন চরমে পৌঁছলো, তখন কুরআনে তাঁদেরকে হিজরতের জন্য তৈরী করার কাজ শুরু হলো। এরশাদ হলোঃ

*********************************************

-হে আমার বান্দাহগণ, যারা ঈমান এনেছ! আমার পৃথিবী প্রশস্ত। অতএব তোমরা আমারই বন্দেগী কর- (হুকুম শাসন মেনে চল)। প্রত্যেককে মৃত্যুর স্বাধ  গ্রহণ করতে হবে। তারপর তোমাদের সবাইকেই আমার দিকে ফিরে আনা হবে। যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, তাদেরকে আমি বেহেশতের সুউচ্চ অট্টালিকাগুলোতে স্থান দেব যার তলদেশে স্রোতস্বিনী প্রবাহমান থাকবে। সেখানে তারা থাকবে চিরকাল। আমলকারীদের কি উৎকৃষ্ঠ প্রতিদান। এ সব তাদের জন্যে যারা সবর করেছে এবং আপন রবের উপর ভরসা। করে। এমন বহু প্রাণী আছে যারা তাদের রিযিকসহ চলা ফেরা করেনা। আল্লাহই তাদেরকে রিযিক দেন এবং তোমাদেরকেও। আর তিনি সব কিছু শুনেন এবং জানেন। (আনকাবূত- ৫৬-৬০)

প্রথম আয়াতে হিজরতের প্রতি ইংগিত করা হয়েছে। উদ্দেশ্য এই যে, যদি মক্কায় খোদার বন্দেগী করা কষ্টকর হয় থাকে তাহলে দেশ ছেড়ে চলে যাও- খোদার যমীন সংকীর্ণ নয়। যেখানেই তোমরা খোদার বান্দাহ হয়ে থাকতে পারেব, সেখানে চলে যাও। তোমাদের কওম ও জন্মভূমির বন্দেগী নয়, খোদার বন্দেগী করতে হবে। এতে এ শিক্ষা দেয়া হয়েছে যে, প্রকৃত জিনিস কওম, জন্মভূমি বা দেশ নয়, বরঞ্চ আল্লাহর বন্দেগী। যদি কখনো কওম, জন্মভূমি ও দেশের ভালোবাসার দাবী আল্লাহর বন্দেগীর দাবীর সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে সে সময়টাই হয় মুমেনের ঈমানের পরীক্ষা। যে সাচ্চা মুমেন, সে আল্লাহর বন্দেগীই করবে এবং কওম, জন্মভূমি ও দেশ প্রত্যাখ্যান করবে। যে ঈমানের মিথ্যা দাবীদার, সে ঈমান পরিহার করে আপন জাতি ও দেশের সাথে আঁকড়ে থাকবে। এতে বিশদভাবে মুসলমানদেরকে বলা হয়েছে যে, একজন খাঁটি খোদা পুরস্ত ব্যক্তি জাতি ও দেশ প্রেমিকও হতে পারে কিন্তু কওম ও দেশ পূজারী হতে পারেনা। তার নিকটে খোদার বন্দেগী সকল বস্তু থেকে অধিক প্রিয় যার জন্যে সে দুনিয়ার প্রতিটি বস্তু কুরবান করে দেবে কিন্তু দুনিয়র কোন বস্তুর জন্যে খোদার বন্দেগী বিসর্জন দেবেনা।

দ্বিতীয় আয়াতে বলা হয়েছে, তোমরা আপন জীবনের চিন্তা করোনা। এতো যে কোন সময়ে শেষ হবে। চিরকাল থাকার জন্যে কেউতো দুনিয়ায় আসেনি। অতএব তোমাদের জন্যে চিন্তার বিষয় এ নয় যে, এ দুনিয়ায় জীবন কিভাবে বাঁচানো যায়। বরঞ্চ প্রকৃত চিন্তার বিয়ষ এই যে, ঈমান কিভাবে বাঁচানো যায় এবং খোদা পুরস্তির দাবী কিভাবে জীবন বাঁচাবার জন্যে ঈমান হারিয়ে ফেলে আস, তো তার পরিণাম একরূপ হবে। অতএব চিন্তা যা কিছু দরকার তা এ জন্যে কর যে, আমার কাছে যখন ফিরে আসবে তখন কি নিয়ে আসবে। জীবনের উপর কুরবান করা ঈমান নিয়ে, না ঈমানের উপর কুরবান করা জীবন নিয়ে?

তৃতীয় ও চতুর্থ আয়াতে বলা হয়েছে, মনে কর যদি তোমরা- ঈমান ও সৎ কাজের রাস্তায় চলে দুনিয়অর সকল নিয়ামত থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছ এবং দুনিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যর্থ হয়ে গেছ, তাহলে বিশ্বাস কর তার ক্ষতি পূরণ অবশ্যই হবে। নিছক ক্ষতি পূরণই নয়- বরঞ্চ সর্বোৎকৃষ্ট প্রতিদান লাভ করবে। যারা বিভিন্ন রকমের দুঃখ কষ্ট, বিপদ মুসিবত ও ক্ষতির মুকাবেলায় ঈমানের উপর সুদৃঢ় রয়েছে, যারা ঈমান আনার সকল প্রকার ঝুঁকি কাঁধে নিয়েছে, তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি, যারা ঈমান পরিহার করার সুযোগ সুবিধা ও পার্থিব কল্যাণ স্বচক্ষে দেখেছে কিন্তু তার প্রতি সামান্যতম অনুরাগ প্রদর্শন করেনি, যারা কাফের ও ফাসেকদেরকে চোখের সামনে আঙুল ফুলে কলাগাছ হতে দেখেছে এবং তাদের উপর, ব্যবসা বাণিজ্য ও গোত্রের উপর না করে, করে আপন রবের উপর; যারা পার্থিব উপায় উপাদানের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করে নিছক আপন রবের উপর ভরসা করে, ঈমানের খাতিরে প্রত্যেক বিপদ সহ্য করতে এবং প্রতিটি শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে তৈরী থেকেছে এবং সময়ের ডাকে ঘরদোর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে, এমন মুমেন ও সৎ কর্মশীল বান্দাহদের প্রতিদান তাদের রবের নিকটে কখনো বিনষ্ট হবেনা। তিনি এ দুনিয়াতেও তাদের পৃষ্ঠপোসকতা ও সাহায্য করবেন এবং আখেরাতেও তাদের আমলের উৎকৃষ্ট প্রতিদান দেবেন।

শেষে এ প্রেরণা দান করা হয় যে, হিজরত কালে জীবনের চিন্তার ন্যায় জীবিকার চিন্তায়ও তোমাদের বিব্রত হওয়া উচিত নয়। এই যে অসংখ্য পশু-পাখী ও জলজ প্রাণী আকাশে বাতাসে, জলে স্থলে বিচরণ করছে তাদের মধ্যে কে আপন জীবিকাসহ চলাফেরা করছে? একমাত্র আল্লাহই তো তাদেরকে লালন পালন করছেন। যেখানেই তারা যাক না কেন, আল্লাহর ফয কোন না কোন ভাবে তারা জীবিকা লাভ করছে। অতএব আহলে ঈমান এ চিন্তাভাবনা করে যেন হিম্মৎ হারিয়ে না ফেলে যে, যদি ঈমানের খাতিরে ঘরদোর ছেড়ে অন্যত্র চলে যায় তাহলে খেতে পাবে কোথা থেকে। আল্লাহ যেখান থেকে তাঁর অগণিত সৃষ্টিকে রিযিক দিচ্ছেন, তাদেরকেও দেবেন।

দাওয়াতে হকের পথে এ পর্যায়ে এমনও এসে যায়- যখন একজন হক দুরস্ত লোকের জন্যে এ ছাড়া কোন উপায় থাকেনা যে, উপায় উপকরণের জগতের সকল সহায় সম্বল থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিছক আল্লাহর ভরসায় জীবনের ঝুঁকি নেবে। এমন অবস্থায় ওসব লোক কিছুই করতে পারেনা। যারা হিসাব কয়ে ভবিষ্যতের সম্ভাবনায় যাঁচাই পর্যালোচনা করে এবং কোন পদক্ষেপ করার পূর্বে জীবনের নিরাপত্তার এবং জীবিকার নিশ্চয়তা তালাশ করে। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের অবস্থার পরিবর্তন হয় তাদের ক্ষতির দ্বারা যারা মাথায় কাফন বেঁধে দাঁড়িয়ে যায় এবং সকল বিপদ মুসিবত বরণ করার জন্যে বেধড়ক তৈরী হয়ে যায়। তাদেরই কুরবানী অবশেষে সে শুভ মুহুর্ত এনে দেয় যখন আল্লাহর কালেমা বুলন্দ হয় এবং তার মুকাবলিায় সকল বাতিল কালেমা হীন ও অবনমিত হয়।(তাফহীমুল কুরআন- ৩য় খন্ড- আনকাবুত- টীকা ৯৪-৯৯।)

অন্যত্র বলা হয়েছেঃ

*****************************************
(হে নবী) বল, হে আমার বান্দাহগণ যারা ঈমান এনেছ, আপন রবকে ভয় কর। যারা এ দুনিয়ায় সৎকর্মশীতার আচরণ করেছে, তাদের জন্যে কল্যাণ। এবং খোদার যমীন প্রশস্ত। ধৈর্যশীলদের তো তাদের প্রতিদান অগণিত দেয়া হবে। (যুমারঃ ১০)

এখানেও আহলে ঈমানদারদের হেদায়ত দেয়া হচ্ছে যে, যদি আল্লাহর বন্দেগীর জন্যে কোন এক স্থান সংকীর্ণ হয়ে থাকে, তাঁর যমীনতো প্রশস্ত। নিজের দ্বীন বাঁচাবার জন্যে অন্য কোন দিকে বেরিয়ে পড়। সেই সাথে তাদেরকে এ সুসংবাদও দেয়া হয়েছে যে, তাদের জন্যে দুনিয়অতেও কল্যাণ আখেরাতেও কল্যাণ। তাদের দুনিয়াও সুবিন্যস্ত হবে এবং আখেরাতেও। কারণ তারা দ্বীনকে দুনিয়া ও তার ভোগ বিলাসের উপর প্রাধান্য দিয়েছে। নিছক দ্বীনের খাতিরে গৃহ থেকে গৃহহীন, দেশ থেকে দেশহীন হয়ে অন্য শহর বা অঞ্চলে হিজরত করেছে। একটি শহর, অঞ্চল বা দেশ যখন আল্লাহর বন্দেগীর জন্যে সংকীর্ণ হয়ে পড়লো তখন তারা অন্যত্র চলে গেল। অতএব এমন লোকদের জন্যে অগণিত প্রতিদান যারা খোদাপরস্তি ও নেকীর পথে চলার জন্যে হরেক রকম বিপদ মুসিবত ও দুঃখ কষ্ঠ বরদাশত করেছে এবং হক পথ থেকে সরে পড়েনি। এ অগণিত প্রতিদানের ওয়াদা শুধু হিজরতকারীদের জন্যেই করা হয়নি, বরঞ্চ তাদের জন্যেও যারা জুলুম নির্যাতনের ভূখন্ডে অনড় থেকে প্রত্যেক বিপদের মুকাবেলা করতে থাকে। (তাফহীমুল কুরআন ৪র্থ খন্ড- যুমার ভূমিকা, টীকা ৩০-৩২।)

হিজরতের সময় হেদায়াত

কুরআন মজিদে মক্কার মজলূম মুসলমানদেরকে শুধু হিজরতের প্রেরণাই দান করা হয়নি, বরঞ্চ দু’ধরনের হেদায়াত দেয়া হয়েছে। যেহেতু মুসলমানগণ হিজরত করে একটি ঈসায়ী দেশে যাচ্ছিলেন, সে জন্যে এ পরিস্থিতিতে সূরা মরিয়ম নাযিল করা হয়, যার প্রথম দু’রূকুতে হযরত ইয়াহইয়া এবং হযরত ঈসা আলয়হিস সালামের কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। তার অর্থ এই যে, যদিও মুসলমানরা এক মজলুম আাশ্রয় প্রাথী হিসাবে সেখানে যাচ্ছে, তথাপি এ অবস্থায় আল্লাহ তায়ালঅ তাদেরকে তাদের দ্বীনের ব্যাপারে সামান্যতম নমনিয়তা প্রদর্শনের শিক্ষা দেননি, বরঞ্চ যাবার সময় পাথেয় স্বরূপ এ সূরা তাঁদের সাথে দিয়ে দেন যাতে তাঁরা ঈসায়দের দেশে ঈসা (আ) এর সঠিক পরিচয় ও মর্যাদা পেশ করতে পারেন এবং তাঁর ‘খোদার পুত্র হওয়ার’ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে অস্বীকার করতে পারেন- তার পরিণাম যাই হোক না কেন।

দ্বিতীয় হেদায়াত এ করা হলোঃ

****************************************************

-আর আহলে কিতাবদের সাথে উত্তম পদ্ধতিতে ছাড় বিতর্ক করোনা, যারা জালেম তাদের কথা আলাদা। এবং তাদেরকে বল, আমরা ঈমান এনেছি ওসবের উপরে যা আমাদের উপর নাযিল করা হয়েছে এবং ওসবের উপরেও যা তোমাদের উপর নাযিল করা হয়েছে। আমাদের খোদা এবং তোমাদের খোদা এক এবং আমরা তাঁরই অনুগত। (আনকাবুতঃ ৪৬)

অর্থাৎ আহলে কিতাবদের (ঈসায়ী) সম্মুখীন যখন হবে তখন তাদের মধ্যে যারা জালেম তাদের সাথে বিতর্ক এড়িয়ে যারা সমঝদার তাদের সাথে নেহায়েত যুক্তিসংগত উপায়ে ভদ্র ও শালীন ভাষায় এবং হৃদয়গ্রাহী ভংগিমায় আলোচনা কর। তাদেরকে বল, আমরা এমন গোঁড়া দল নই যে, আমাদের নিকটে প্রেরিত কিতাব আমরা মানি এবং তোমাদের নিকট প্রেরিত কিতাব মানিনা। আমরাও হকপুরস্ত অর্থাৎ হক মেনে চলি। খোদার পক্ষ থেকে যা কিছু আমাদের কাছে  এসেছে তা যেমন হক বলে মানি, ঠিক তোমাদের নিকট যে এসেছে তার উপরও ঈমান রাখি, আমাদের ও তোমাদের খোদা পৃথক পৃথক নয়। বরঞ্চ একই খোদা যাকে আমরাও মানি তোমরাও মান। আমরা সেই একই খোদার বন্দেগী ও আনুগত্য কারার পন্হা অবলম্বন করেছি।(তাফহীম, ৬ষ্ঠ খন্ড- সূরা আল হাক্কার ভূমিকা।)

আবিসিনিয়ার প্রথম হিজরত

পরিস্থিতি যখন ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে, দিল, তখন নবুওতের পঞ্চম বর্ষে রজব মাসে হুযুর (স) তাঁর সংগীসাথীদের বললেন,

*************************************************

-ভালো হয় যদি তোমরা বেরিয়ে হাবশে অর্থাৎ আবিসিনিয়ায় চলে যাও। সেখানে এমন এক বাদশাহ আছেন, যেখানে কারো উপর জুলুম করা হয়না। তা হলো কল্যাণের দেশ। যতোক্ষণ আল্লাহ তায়ালা তোমাদের এ বিপদ দূর করার কোন ব্যবস্থা না করছেন তোমরা সেখানে অবস্থান করতে থাক।

এ নিদের্শ অনুযায়ী আবিসিনিয়ায় প্রথম হিজরত অনুষ্ঠিত হয় এবং এত এগারোজন পুরুষ এবং চারজন নারী অংশ গ্রহণ করেন। কুরাইশের লোকেরা সমূদ্রতীর পর্যন্ত তাদের পশ্চদ্ধাবন করে। কিন্তু সৌভাগ্যের বিষয় শুয়ায়বাহ সমূদ্র বন্দরে- যথা সময়ে তাঁরা আবিসিনিয়াগামী নৌকা পেয়ে যান এবং তারা ধরা পড়া থেকে বেঁচে যান।

প্রথম হিজরতে অংশ গ্রহণকারী

ইবনে হিশাম ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে বলেন, এ হিজরতে মুহাজেরীনের তালিকা নিম্নরূপঃ

১.   বনী উমাইয়া থেকে হযরত ওসমান বিন আফফান (রা)।

২.   তাঁর বিবি হযরত রুকাইয়া (রা) বিন্তে রাসূলুল্লাহ (স)।

(ইবনে আবদুল বারর বলেন, তাঁদের সাথে উম্মে আয়মানও ছিলেন।)

৩.   বনী আবেদ শামস বিন আবদে মানাফ থেকে হযরত আবু হুযায়ফা বিন উৎবা বিন রাবিয়া (রা)।

৪.   তাঁর বিবি হযরত সাহল বিনতে সুহাইল বিন আমর।

৫.   বনী আসাদ বিন আবদুল ওয্যা বিন কুসাই থেকে হযরত যুবাইর বিন আওয়াম (রা)।

(তিনি ছিলেন হযরত খাদিজার (রা) ভাতিজা এবং হুযুর (স) এর ফুফাতো ভাই।)

৬.   বনী আবদুদ্দার বিন কুসাই থেকে হযরত মুসয়াব বিন উমাইর (রা)।

৭.   বনী সুহরা বিন কিলাব থেকে হযরত আবদুর রহমান বিন  আওফ (রা)।

৮.   বনী মাখযুম থেকে হযরত আবু সালাম বিন আবদুল আসাদ (রা)

৯.   তাঁর বিবি উম্মে সালমা (রা) (আবু জাহলের আপন চাচাতো ভগ্নি)

১০.  বনী জুমাহ থেকে ওসমান বিন মাযউন (রা)- (উম্মুল মুমেনীন হযরত হাফসার (রা) মামু)

১১.  হুলাফায়ে বনী আদী থেকে হযরত আমের বিন রাবিয়া আল আনযী (রা)।

১২.   তাঁর বিবি লায়লা বিন্তে আবি হাসমা (রা)।

১৩. বনী আমের বিন লুয়াই থেকে আবু সাবরাহ (রা) বিন আবি রুহম।

১৪.  বনী আল হারেস বিন ফিহর থেকে সুহাইল বিন বায়দা (রা)।

ইবনে সাদ ওয়াকেদীর বরাত দিয়ে আরও দুটি নাম যোগ করেন- হাতেব বিন আমর বিন আবদে শামস এবং আবদুল্লাহ বিন মাসদউ (রা) (বনী যোহরার চুক্তি বদ্ধ মিত্র)। ইবনে ইসহাক বলেন পরবর্তীকালে হযরত জা’ফর বিন আবি তালেবও তাঁদের মধ্যে শামিল হন। কিন্তু মূসা বিন ওকবা মাগাযীতে বলেন যে, তিনি প্রথম হিজরতে নয়, দ্বিতীয় হিজরতে শামিল হন। ইবনে ইসহাক বলেন, হযরত আবদুল্লাহ বিনি মাসউদ (রা) প্রথম হিজরতে নয়, দ্বিতীয় হিজরতে ছিলেন। উপরস্তু যুরকানী কতিপয় সীরাত রচয়িতার বরাত দিয়ে বলেন যে, আবু সাবরার (রা) সাথে তাঁর বিবি উম্মে কুলসূমও ছিলেন যিনি সুহাইল বিন আমরের দ্বিতীয়া কন্যা ছিলেন। সকলের আগে বেরিয়ে পড়েছিলেন হযরত ওসমান (রা)। (বায়হাকী)

আবিসিনিয়ায় মুহাজিরদের সাথে আচরণ

ইবনে জারীর তাবারী বলেন, হাবশা (আবিসিনিয়া) কুরাইশদের প্রাচীন বাণিজ্যস্থল ছিল। সেখানে তারা প্রভূত পরিমাণে জীবিকা অর্জন করতো এবং ব্যবসায় খুব লাভবান হতো। এ কারণে মুহাজিরগণকে সেখানে কোন কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়নি। মুহাজিরদের নিজস্ব বক্তব্য ছিল এই যে, আমরা সেখানে খুব ভালো ভাবে ছিলাম। আপন দ্বীনের ব্যাপারে পরিপূর্ণ নিরাপত্তা ছিল। আল্লাহর এবাদত করতাম। কোন প্রকার কষ্ট আমাদের দেয়া হতোনা। এমন কোন কথাও আমাদের শুনতে হয়নি যা আমাদের জন্যে অপ্রীতিকর ছিল।

তাঁদের পেছনে কুরাইশ প্রতিনিধি দলের গমন

কুরাইশগণ যখন দেখলো যে, এসব লোক আবিসিনিয়ায় গিয়ে নিরাপদে অবস্থান করছে তখন তারা আমর বিন আল আস এবং আবদুল্লাহ বিন আবি রাবিয়াকে বহু মূল্যবান উপঢৌকনসহ নাজ্জাশীর [আবিসিনিয়ার রাজার উপাধি ছিল- নাজ্জাশী- NEGUS] নিকটে পাঠালো যেন তাদেরকে মক্কায় ফিরে আনা হয়। বোখারীতে এ শাহের নাম বলা হয়েছে আসহামা (*************)। কিন্তু নাজ্জাশী তাদের কথায় কোন কর্ণপাত করেননা এবং তাদেরকে ব্যর্থতাসহকারে মক্কায় ফেরৎ পাঠিয়ে দেন। এ প্রতিনিধি দল সম্পর্কে বর্ণনায় মত পার্থক্য দেখা যায়। কোন কোন বর্ণনা মতে এ দু’জন প্রতিনিধির সাথে ওমারা বিন অলীদ বিন মগীরাকে পাঠানো হয়। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, আমর বিন আসকে প্রথম ও দ্বিতীয় উভয় হিজরতের সময় নাজ্জাশীর নিকটে পাঠানো হয়। কিন্তু প্রথম প্রতিনিধি দলের সাথে ওমারা ছিল এবং দ্বিতীয়টিতে আবদুল্লাহ কিন্তু ইবনে ইসহাক উভয় প্রতিনিধি দলের মধ্যে আবদুল্লাহর নাম উল্লেখ করেন। (গ্রন্হকার কর্তৃক পরিবর্ধন।)

মুহাজিরদের প্রত্যাবর্তন ও তার কারণ

এ বছরে রমযান মাসে এমন এক ঘটনা ঘটে যার সংবাদ আবিসিনিয়ায় এভাবে পৌঁছে যে, মক্কায় কাফেরগণ মুসলমান হয়েছে।

ঘটনাটি ছিল এরূপঃ

একদিন হেরমে পাকে যখন কুরাইশের লোকেরা একত্রে সমবেত ছিল, তখন হঠাৎ রাসূলুল্লাহ (স) বক্তৃতা করতে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং আল্লাহ তায়ালা তাঁর মুখ দিয়ে সূরা নজম জারী করে দিলেন। আল্লাহর কালামের প্রভাব এতোটা তীব্র ও শক্তিশালী ছিল যে, নবী (স) যখন শুনাতে থাকেন- তখন বিরোধিদের হট্টগোল কারর চেতনাই বিলুপ্ত হয়ে যায়। আবৃত্তি শেষে যখন তিনি সিজদা করেন তখন সমবেত সব লোকই সিজদা করে। বোখারী, মুসলিম, আবু দাউদ এবং নাসায়ীতে হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদের (রা) বর্ণনা মতে এ ছিল কুরআন মজিদের প্রথম সূরা- যা নবী (স) কুরাইশদের সাধারণ সমাবেশে শুনিয়েছেন। ইবনে মারদুইয়া বর্ণনা মতে হেরেমে সমাবেশে কাফের-মুমেন উভয়ই ছিল। অবশেষে নবী (স) যখন সিজদার আয়াত পাঠ করে সিজদা করেন, সাথে সাথে উপস্থিত সকলেই সিজদা করে। মুশরিকদের প্রভাবশালী সর্দঅরগণ যারা বিরোধীতায় অগ্রণী ভূমিকা রাখতো তারাও সিজদা না করে পারেনি। কাফেরদের মধ্যে শুধু একজন উমাইয়অ বিন খালাফকে দেখা গেল যে, সে এক মুষ্টি মাটি মুখমন্ডলে মেখে বলল- ব্যস এই যথেষ্ট।

এ ঘটনার দ্বিতীয় চাক্ষষ সাক্ষী ছিলেন হযরত মুত্তালিব বিন আবি ওয়াদায়া যিনি তখনো মুসলমান হননি। নাসায়ী এবং মুসনাদে আহমদে তাঁর নিজস্ব বর্ণনা এভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছেঃ

যখন হুযুর (স) সূরা নজম পড়ে সিজদা করলেন এবং উপস্থিত সকলেই সিজদায় পড়ে গেল, তো আমি সিজদা করলামনা। তার ক্ষতিপূরণ এখন আমি এভাবে করি যে, ঐ সূরা তেলাওতের সিজদা না করে ছাড়িনা।

ইবনে সা’দ ওয়াকেদীর সনদ উদ্ধৃত করে বলেন, অলীদ বিন মুগীরাও এক মুষ্টি মাটি মুখে লাগায়। কারণ বাধ্যক্যের কারণে সে সিজদা করতে পারেনি। আবু উহায়হা সাঈদ বিন আলআসও মুখে মাটি লাগায় বার্ধক্যের কারণে।

এভাবে এ ঘটনাটি জনশ্রুতিতে পরিণত হয়ে আবিসিনিয়ায় এরূপে পৌঁছে যে, কুরাইশ মুশরিকরা সব মুসলমান হয়ে গেছে। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা ছিল ভিন্ন। কুরআনের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে সিজদাকারীগণ তো সে সময়ে সিজদা করে ফেলে কিন্তু পরবর্তীকালে তারা এমনভাবে বিব্রত হয়ে পড়ে যে, তাদের দ্বারা এ কোন দুর্বলতা প্রদর্শন করা হলো। লোকেরা তাদেরকে এই বলে ভর্ৎসনা করতে লাগলো যে, অপরকে তো সে কালাম শুনতে নিষেধ করা হয় কিস্তু নিজেরা কান পেতে শুনেইনি, বরঞ্চ মুহাম্মদ (স) এর সাথে সিজদাও করলো। অতঃপর তারা একটা বানোয়াট কাহিনী রচনা করে- তাদের নিরস্ত করে। তারা বলে, আরে আমরা তো

**********************************************

-এর পরে মুহাম্মদের (স) মুখ দিয়ে এ কথাগুলো শুনলাম-

*************************************************

-(এ সব উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন দেবী এবং তাদের শাফায়ত অবশ্যই আশা করা যায়)।

এ জন্য আমরা মনে করলাম যে, মুহাম্মদ (স) আমাদের পথে এসে গেছেন। অথচ কোন পাগলও কি কখনো এ চিন্তা করতে পারে যে, সূরা নজমের পূর্বাপর বক্তব্যের মধ্যে এ কথাগুলোর কোন স্থান হতে পারে? আর তারা দাবী করতো যে, তারা আপ ন কানে হুযুরর (স) মুখে সে কথা শুনেছে।(তাফহীম ৫ম খন্ড- সারসংক্ষেপ ও ভূমিকা- নাজম।)

গারানিক কাহিনীর রহস্য

দুঃখের বিষয় স্বয়ং আমাদের তাফসীরকার ও মুহাদ্দেসীনের মধ্যে কিছু এ ধরনের বর্ণনা মশহুর হয়ে পড়ে যায় ফল এ দাঁড়ায় যে, হুযুর (স) এর মুখ থেকে কাফেরগণ যে কথা শুনার দাবী করে, তা প্রকৃত  পক্ষে হুযুর (স) এর মুখ থেকেই বেরয়। আর এ অভিলাষ থেকে বেরয় যে, কোন প্রকারে তাঁর এবং কাফেরদের মধ্যে যে ঘৃণা বিদ্বেষ রয়েছে তা দূর হয়ে যাক। আর শয়তান তাঁর এ অভিলাষের সুযোগে এ কথাগুলো তাঁর মুখ থেকে বের করে দেয়।

কাহিনীটি এভাবে বলা হয় যে, নবী (স) এর মনে আকাংখা পয়দা হয় যে, হায়রে যদি কুরআনে এমন কথা নাযিল হয়ে যায় যাতে ইসলামের বিরুদ্ধে কুরাইশ কাফেরদের ঘৃণা দূর হয়ে যায় এবং তারা কিছুটা নিকটে এসে যায়। অন্ততঃ পক্ষে তাদের দ্বীনের বিরুদ্ধে এমন কঠোর সমালোচনা না হয় যা তাদেরকে উত্তেজিত করে দেয়। এ অভিলাষ তাঁর মনের মধ্যেই ছিল এমন সময়ে একদিন কুরাইশদের এক বিরাট সমাবেশ বসা অবস্থায় তাঁর উপর সূরা নজম নাযিল হয় এবং তিনি তা পড়তে থাকেন। তিনি যখন-

******************************************************

পর্যন্ত পৌঁছেন তখন হঠাৎ তাঁর মুখ থেকে এ কথাগুলো বেরয়ঃ

****************************************************

তারপর সূরায় পরবর্তী আয়াতগুলো তিনি পড়তে থাকেন। তারপর সূরা শেষ করে যখন তিনি সিজদা করেন, তখন মুশরিক ও মুসলমান সকলেই সিজদায় পড়ে যায়। কুরাইশ কাফেরগণ বলে, এখন আমাদের এবং মুহাম্মদের (স) মধ্যে কি মতপার্থক্য রইলো? আমরা তো এ কথাই বলতাম যে, খালেক ও রাযেক তো আল্লাহই বটে, অবশ্যি আমাদের এসব মাবুদ তাঁর দরবারে আমাদের জন্য শাফায়াতকারী। সন্ধ্যায় জিব্রিল (আ) এসে বলেন, এ আপনি কি করলেন? এ দু’টি বাক্য তো আমি নিয়ে আসিনি। এতে তিনি (নবী (স) খুব দুঃখিত হন। ফলে আল্লাহ তায়ালা- এ আয়াত নাযিল করেন যা সূরা বনী ইসরাইলের ৮ম রুকুতে আছে-[পশ্চিমা জগতের একজন প্রাচ্যবিদ সততাহীন মনগড়া উক্তি করেছেন যে সে সব শয়তানী আয়াত মনসূখ করে সেস্থানে সূরা নজমের ২১ নং ও ২২ নং আয়াত নাযিল করা হয়েছে। অথচ এ একেবারে যুক্তি প্রমাণহীন কথা যার কোন সনদের উল্লেখ তিনি করেননি এবং কোন নির্ভযোগ্য তথ্য পেশ করতেও তিনি অক্ষম- গ্রন্হকার।]

*****************************************

-অর্থাৎ (হে নবী) এ সব লোক এ চেষ্টার কোন ক্রটি করেনি যে, তোমাকে ফেৎনার মধ্যে নিক্ষেপ করে সেই অহী থেকে তোমাকে সরিয়ে দেবে যা আমি তোমার প্রতি পাঠিয়েছি যাতে তুমি আমার নাম করে নিজের পক্ষ থেকে কোন কথা রচনা কর…..। তারপর আমার মুকাবিলায় কোন সাহায্যদাতা পাবেনা।

এ বিষয়টি সর্বদা নবীর মন দুঃখ ভরাক্রান্ত করে রাখতো। অবশেষে সূরা হজ্বের ৫২ নং আয়াত নাযিল হয়, যাতে হুযুরকে (স) এ ভাবে সান্ত্বনা দেয়া হয়- তোমার পূর্ববর্তী নবীগণের বেলায়ও এরূপ ঘটেছে যে, কোন নবী কোন অভিলাষ পোষণ করেছেন আর শয়তান তাতে হস্তক্ষেপ করেছে। এভাবে শয়তান যা কিছুই হস্তক্ষেপ করে আল্লাহ তা মিটিয়ে দেন এবং নিজের আয়াত সেখানে সুদৃঢ় করে দেন।

এদিকে কুরআন শুনার পর কুরাইশের লোকজন নবীর সাথে সিজদা করেছে- এ খবরটি এমন রঙে রঞ্চিত করে আবিসিনিয়ায় পৌঁছানো হলো যে, নবী (স) এবং মক্কায় কাফেরদের মধ্যে সন্ধি হয়ে গেছে। ফলে বহু মুহাজির মক্কায় ফিরে আসেন। কিন্তু এখানে আসার পর তাঁরা জানতে পারেন যে, সন্ধির খবরটি মিথ্যা। ইসলাম ও কুফরের সংঘাত সংঘর্ষ আগের মতোই আছে।

এ কাহিনী ইবনে জারীর এবং অনেক তাফসীরকার তাঁদের তাফসীরে, ইবনে সাদ তাবাকাতে; আলওয়াহেদী আসবাবুন্নুযুলে, মূসা বিন ওকবা মাগাযীতে, ইবনে ইসহাক সীরাতে, ইবনে আবি হাতেম, ইবনুল মুনযের, বায্যার, ইবনে মারদুইয়া এবং তাবারানী তাঁদের হাদীসসমূহে উদ্ধৃত করেছেন। যেসব সনদের ভিক্তিতে এ উদ্ধৃত হয়েছে তা মুহাম্মদ বিন কায়েস, মুহাম্মদ বিন কাব কুরাযী, ওরওয়া বিন যুবাইর, আবু সালেহ, আবুল আলীয়া, সাঈদ বিন জুবাইর, দাহহাক, আবু বকর বিন আবদুর রহমান বিন হারেস, কাতাদা, মুজাইদ, সুদ্দী, ইবনে শিহাব যুহরী, সর্বশেষ ইবনে আব্বাস (রা)। (ইবনে আব্বাস (রা) ব্যতীত এদের মধ্যে কেউ সাহাবী ছিলেননা)। কাহিনী বিস্তারিত বিবরণে ছোটোখাটো মতপার্থখ্য ছাড়াও দুটি অতি বড়ো মতপার্থক্য রয়েছে। এক- দেবদেবীর প্রশংসায় যেসব কথা নবীর প্রতি আরোপ করা হয়েছে- তার প্রতিটি বর্ণনা অন্য বর্ণনা থেকে ভিন্ন। দ্বিতীয় বিরাট মতপার্থক্য এই যে, কোন বর্ণনা মতে- এ কথাগুলো অহী নাযিল হওয়অ অবস্থায় নবীর উপর শয়তান ইলকা করেছে বা মনের উপর চাপিয়ে দিয়েছে এবং তিনি মনে করলেন যে, এ কথাগুলো জিব্রিল (আ) এনেছেন। কোন বর্ণনায় আছে যে, এ শব্দগুলো তাঁর অভিলায়েল প্রতিক্রিয়া স্বরূপ ভূলক্রমে তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। কারো বর্ণনায় আছে যে, কথাগুলো তিনি ইচ্ছাকৃত ভাবেই বলেছেন- তবে অস্বীকার করার অর্থে প্রশ্নোবোধক বাক্যে বলেছেন। কারো বর্ণনায় আছে যে, শয়তান নবীর আওয়াজে তার আওয়াজ মিলিয়ে এ শব্দগুলো বলেছৈ এবং মনে করা হয়েছে যে, এগুলো তিনি (নবী) বলেছেন। আবার কারো বর্ণনা মতে, মুশরিকদের মধ্যে কেউ এ শব্দগুলো বলেছে।

ইবনে কাসীর, বায়হাকী, কাজী এয়ায, ইবনে খুযায়মা, কাজী আবু বকর ইবনুল আরবী, ইমাম রাযী, কুরতুবী, বদরুদ্দীন আয়নী, শাওকানী, আলুসী প্রমুখ মনীষী এ কাহিনীকে একেবারে মিথ্যা বলেছেন। ইবনে কাসীর বলেন, যতো সনদে এ কথার বর্ণনা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে সব মুরসাল এবং মুনকাতা। কোন সঠিক মুত্তাসিল সনদে আমি এ কাহিনী পাইনি। বায়হাকী বলেন, উদ্ধৃতির দিক দিয়ে এ কাহিনী প্রমাণিত নয়। এ সম্পর্কে ইবনে খুযায়মাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এ যিন্দীকদের মনগড়া কাহিনী, এর দুর্বলতা এর থেকে প্রমাণ হয় যে, সিহাহ সিত্তার প্রণেতাগণের মধ্যে কেউ এ কথা তাঁদের গ্রন্হে উদ্ধৃত করেননি। আর না এ কোন সহীহ মুত্তাসিল নির্দোষ সনদসহ নির্ভরযোগ্য রাবীগণ দ্বারা বর্ণিত হয়েছে। ইমাম রাযী, কাজী আবু বকর এবং ইমাম আলূযী বিস্তারিত আলোচনার পর শক্তিশালী যুক্তিসহ একে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অপর দিকে হাফেজ ইবনে হাজর এর মতো উন্নতমানের মুহাদ্দেস এবং আবু বরক যাসসাসের মতো প্রখ্যাত ফেকাহবিদ, যামাখশারী, ইবনে  জারীর এতে সঠিক মনে করেন, আর একে সূরা হজ্বের ৫২ নং আয়াতের তাফসীর গণ্য করেন। ইবনে হাজারের যুক্তি নিম্নরূপঃ

সাঈদ বিন জুবাইরের পদ্ধতি ব্যতীত আর যেসব পদ্ধতিতে এ বর্ণনা পাওয়া যায়- তা হয় দুর্বল নতুবা মুনকাতা। কিন্তু পদ্ধতির আধিক্য এ কথা প্রমাণ করে যে, এর একটা মূল অবশ্যই আছে।

উপরন্ত এ এক পদ্ধতি সহীহ সনদে মুত্তাসিল রূপে উদ্ধৃত হয়েছে যা বাযযার বের করেছেন (অর্থাৎ ইউসুফ বিন হাম্মাদ আন উমাইয়া বিন খালেদ আশ শু’বা বিন আবি বিশর আন সাঈদ বিন জুবাইর আন আবি আব্বাস)। আর দু’ পদ্ধতিতে এ যদিও মুরসাল কিন্তু রাবীগণ সহীহাইনের শর্ত মুতাবিক। এ দুটি বর্ণনা তাবারী উদ্ধৃত করেছেন। একটি ইউনুস বিন ইয়াযিদ আন ইবনে শিহাবের পদ্ধতিতে অন্যটি মু’তাসের বিন সুলায়মান ও হাম্মাদ বিন সালামা আন দাউদ বিন আবি হিন্দ আন আবিল আলীয়ার পদ্ধতিতে। সমমনাদের কথা বলতে গেলে, তাঁরা তো একে সঠিক বলে মেনে নিয়েছেন। বিরোধিগণও সাধারণতঃ এ ব্যাপারে যাঁচাই বাছাই ও সমালোচনার হক আদায় করেননি। একদল একে এ জন্য রদ করে যে, তার সনদ তাঁদের নিকটে সহীহ নয়। এর অর্থ এই যে, সনদ শক্তিশালী হলে এ হযরতগণ কাহিনীকে সত্য বলে মেনে নিতেন। অন্য দল একে এ জন্য প্রত্যাখ্যান করে যে, এর থেকে তো সমগ্র দ্বীনই সন্দেহ যুক্ত হয়ে পড়বে এবং দ্বীনের প্রতিটি বিষয়ের প্রতি সন্দেহ সংশয় সৃষ্টি হবে, এটা মনে করে যে কি জানি আর কোথায় কোথায় শয়তানী কুপ্ররোচনা অথবা কুপ্রবৃত্তির হস্তক্ষেপ হয়ে পড়েছে। অথচ এ ধরনের যুক্তি তাদেরকে সন্তুষ্ট করতে পারে যারা ঈমান আনার সংকল্পে অটল। কিন্তু অন্যান্য লোক যারা প্রথম থেকেই সন্দেহ পোষণ করতো অথবা যারা এখন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত করতে চায় যে, ঈমান আনবে কি আনবেনা, তাদের মনে তো এ প্রেরণা সৃষ্টি হবেনা যে, যেসব বিষয়ের দ্বারা দ্বীন সন্দেহ যুক্ত বলে গণ্য হয়, সেসব প্রত্যাখ্যান করা। তারা তো বলবে, যখন অন্ততঃপক্ষে একজন প্রখ্যাত সাহাবী এবং বহু সংখ্যক তাবেয়ীন, তাবয়ে তাবেয়ীন এবং বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য হাদীস বর্ণনাকারীর বর্ণনায় একটি ঘটনা প্রমাণিত হচ্ছে, তখন তা এ কারণে কেন প্রত্যাখ্যান করা হবে যে, তার দ্বারা আপনাদের দ্বীন সন্দিগ্ধ হয়ে পড়েছে? এর স্থলে আপনাদের দ্বীন কেন সন্দেহযুক্ত মনে করা হবেনা যখন এ ঘটনা তাকে সন্দেহযুক্ত করছে?

এখন দেখার বিষয় এই যে, সমালোচনা বা যাঁচাই বাছাইয়ের সে সঠিক পদ্ধতি কি হতে পারে যার দ্বারা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখলে এ অগ্রহণযোগ্য বলে গণ্য হয়- তার সনদ যতোই শক্তিশালী হোকনা কেন।

প্রথম জিনিস স্বয়ং তার আভ্যন্তরীন সাক্ষ্য যা তাকে মিথ্যা প্রমাণ করে। কাহিনীতে বলা হয়েছে যে, এ ঘটনা তখন সংঘটিত হয় যখন আবিসিনিয়ার প্রথম হিজরত সমাপ্ত হয়েছে এবং এ ঘটনার খবর পেয়ে মুহাজিরদের একটি দল মক্কায় ফিরে এসেছে। এখন তারিখের পার্থক্য লক্ষ্য করুনঃ

-নির্ভনযোগ্য বর্ণনা মতে আবিসিনিয়ার হিজরত সংঘটিত হয় নবুওতের পঞ্চম বর্ষে রজব মাসে। মুহাজিরদের একটি দল সন্ধির ভূল খবর শুনে তিন মাস পর (অর্থাৎ সে বছরেই সম্ভবতঃ শাওয়াল মাসে) মক্কায় ফিরে আসে। এর থেকে জানা গেল যে,  এ ঘটনা নবুওতের পঞ্চম বর্ষে সংঘটিত হয়।

-সূরা বনী ইসরাইলের একটি আয়াত সম্পর্কে বলা হয় যে এ নবী (স) এর এ কাজের জন্য অসন্তোষ প্রকাশ করে নাযিল করা হয় এবং তা মে’রাজের পর। আর নির্ভরযোগ্য বর্ণনা মতে মে’রাজ সংঘটিত নবুওতের একাদশ অথবা দ্বাদশ বৎসরে। তার অর্থ এই যে, এ ঘটনার পাঁচ বছর পর আল্লাহ তায়ালা তার অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

-তারপর সূরা হজ্বের ৫২ নং আয়াতের পূর্বাপর বক্তব্য এ কথাই বলে যে, তা প্রথম হিজরী সনে নাযিল হয়। অর্থাৎ নবীর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করার দু’আড়াই বছর পর ঘোষণা করা হলো যে, এ সংমিশ্রণ যেহেতু শয়তানের পক্ষ থেকে করা হয়েছিল সেহেতু তা মনসুখ বা রহিত করা হলো।

কোন বিবেক সম্পন্ন ব্যক্তি কি একথা বিশ্বাস করতে পারে যে, সংমিশ্রণের কাজ হলো আজ, অসন্তোষ প্রকাশ করা হলো ছ’বছর পর এবং সংমিশ্রণ রহিত করার ঘোষণা হলো নয় বছর পর?

অতঃপর এ কাহিনীতে বলা হয়েছে যে, এ সংমিশ্রণ হয় সূরা নজমে এবং এভাবে যে প্রথম থেকেই নবী (স) আসল সূরার শব্দগুলো পড়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ ******************************  পর্যন্ত পৌঁছার পর তাঁর নিজের দ্বারা অথবা শয়তানী প্ররোচনায় এ বাক্যটি যোগ করা হয়। তারপর সূরা নজমের পরবর্তী আয়াতগুলো তিনি পড়তে থাকেন। এ সম্পর্কে বলা হচ্ছে যে, মক্কার কাফেরগণ তা শুনে খুব আনন্দিত হয় এবং বলে এখন আমাদের এবং মুহাম্মদের (স) মতপার্থক্য শেষ হয়ে গেল। কিন্তু সূরা নজমের বচনের ধারাবাহিকতায় এ সংযুক্ত বাক্যটি শামিল করে দেখুন।

-“অতঃপর তুমি কি চিন্তা করে দেখেছ এ লাত ও ওয্যা এবং তৃতীয় আর এক দেবী মানাত সম্পর্কে? এ সব উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন দেবী। এদের শাফায়াত অবশ্যই আশা করা যায়। তোমাদের জন্য কি হবে পুত্র এবং তাঁর (আল্লাহর) জন্য কন্যা? এতো বড়ো অবিচারপূর্ণ বন্টন। প্রকৃত পক্ষে এ সব কিছুই না, শুধুমাত্র কয়েকটি নাম যা তোমরা ও তোমাদের বাপদাদা রেখে দিয়েছ, তাদের (সত্য হওয়ার) কোন সনদ আল্লাহ নাযিল করেননি। মানুষ শুধু আন্দাজ অনুমান ও মনগড়া ধারণার অনুসরণ করছে। অথচ তাদের রবের পক্ষ থেকে সঠিক পথ নির্দেশনা এসে গেছে।

দেখুন, উপরের বক্তব্যের মধ্যে নিম্নরেখাংকিত বাক্য দুটি কিরূপ সুস্পষ্ট স্ববিরোধিতা সৃষ্টি করছে। এক নিঃস্বাসে বলা হচ্ছে যে, সত্যি সত্যি তোমাদের দেবীগণ বড়ো উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন এবং তাদের শাফায়াত অবশ্যই আশা করা যায়। পরবর্তী নিঃশ্বাসে তাদের উপর আঘাত করে বলা হচ্ছে ওরে নির্বোধেরা! তোমরা খোদার জন্য কন্যার প্রস্তাব কিভাবে করে রেখেছ? এ কেমন অবৈধ পন্হা যে, তোমরা তো লাভ করবে এবং পুত্র সন্তান আর খোদার ভাগে পড়বে কন্যা? এসব তোমাদের মনগড়া কথা, খোদার পক্ষ থেকে যার কোন সনদ নেই। কিছুক্ষণের জন্য এ প্রশ্ন ছেড়ে দিন যে, এ অর্থহীন কথা কোন জ্ঞানী ব্যক্তির মুখ থেকে বেরুতে পারে কিনা। একথা মেনে নিন যে, শয়তান কর্তৃত্ব লাভ করে এ শব্দগুলো মুখ থেকে বের করিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু কুরাইশের যে গোটা সমাবেশ তা শুনছিল তা কি পাগল ছিল যে, পরবর্তী বাক্যগুলো তো ঐ প্রশংসাসূচক কথাগুলোর সুস্পষ্ট খন্ডন শুনার পরও এ কথাই মনে করতে থাকে যে, তাদের দেবীদের প্রকৃতপক্ষে প্রশংসাই করা হয়েছে/ সূরা নজমের শেষ পর্যন্ত  গোটা প্রসংগটাই এই প্রশংসা সূচক বাক্যের একেবারে বিপরীত। কিভাবে বিশ্বাস করা যায় যে, কুরাইশের লোকেরা তা শেষ পর্যন্ত শুনার পরও আনন্দে চীৎকার করে বলে- চল আজ আমাদের ও মুহাম্মদের (স) মধ্যকার মতপার্থক্য শেষ হয়ে গেল?

এ তো হলো কাহিনীটির আভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য যা তাকে বানোয়অট ও অর্থহীন হওয়ার কথাই বলছে। তার পর দ্বিতীয় জিনিস যা দেখার তাহলো এই যে, এতে তিটি আয়াতের যে শানে নুযুল বর্ণনা করা হচ্ছে, কুরআনের ক্রমাগত ধারাবাহিকতা তা গ্রহণ করছে কিনা। কাহিনীতে বলা হচ্ছে যে, সংমিশ্রণ সূরায়ে নজমে হয়েছে যা নবুওতের পঞ্চম বৎসরে নাযিল হয়। এ সংমিশ্রণের জন্য সূরা বনী ইসরাইলে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। তারপর তার খন্ডন ও ব্যাখ্যা প্রদর্শন করা হয়, সূরা হজ্বের আয়াতে। এখন অবশ্যম্ভাবী রূপে দুটি অবস্থার যে কোন একটিই ঘটে থাকবে। হয় অসন্তোষ প্রকাশকারী ও খন্ডনকারী আয়াতগুলোও ঐ সময়ে নাযিল হয় যখন সংমিশ্রণের ঘটনা ঘটে। অথবা তারপর অসন্তোষ প্রকাশকারী আয়াত সূরা বনী ইসরাইলের সাথে এবং খন্ডনকারী আয়াত সূরা হজ্বের সাথে নাযিল হয়।

প্রথম অবস্থা হলে এ কেমন আজব কথা যে, এ দুটি আয়াতই সূরা নাজমেই শামিল করা হয়নি, বরঞ্চ অসন্তোষ প্রকাশকারী আয়াতকে ছ’বছর পর্যন্ত এমনিতেই ফেলে রাখা হলো এবং সূরা বনী ইসরাইল যখন নাযিল হলো তখন তা তার মধ্যে এক স্থানে বসিয়ে দেয়া হলো। তারপর সংমিশ্রণ খন্ডনকারী আয়াত দু’ আড়াই বছর ফেলে রাখা হলো এবং সূরা হজ্ব নাযিল হওয়া পর্যন্ত কোথাও তা সন্নিবেশিত করা হলোনা। কুরআনের অনুক্রমিক ধারাবাহিকতা কি এভাবে হয়েছে যে, এক সময়ের নাযিলকৃত আয়াতগুলো পৃথক পৃথক ও বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে থাকতো এবং কয়েক বছর পর কোনটিকে কোন সূরার সাথে এবং কোনটিকে অন্য কোন সূরার সাথে গেঁথে দেয়া হতো?

কিন্তু যদি দ্বিতীয় অবস্থা হয় যে, অসন্তোষ প্রকাশকারী আয়াত ঘটনার ছ’বছর পর এবং খন্ডনকারী আয়াত আট নয় বছর নাযিল হয়েছে, তাহলে যে অপ্রাসংগিকতার (irrelevence) উল্লেখ আমরা ইতিপূর্বে করেছি তাছাড়া এ প্রশ্ন জাগে যে, সূরা বনী ইসরাইল ও সূরা হজ্বে তা নাযিল হওয়ার অবকাশ কোথায়?

এখানে পৌঁছার পর সমালোচনা ও যাচাই বাছাইয়েল সঠিক পদ্ধতি আমাদের সামনে এসে যায়। অর্থাৎ এই যে, কোন আয়াতের যে তাফসীর বর্ণনা করা হয়- তা দেখতে হবে যে কুরআনের পূর্বাপর প্রসংগ তা গ্রহণ করে কিনা। সূরা বনী ইসরাইলের অষ্টম রুকু পড়ে দেখুন এব্ং তার আগের এবং পরের বক্তব্যের উপরও চোখ বুলিয়ে নিন। এ বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় এ কথার কি সুযোগ আছে যে, ছ’বছর পূর্বের একটি ঘটনা প্রসংগে নবীকে তিরস্কার করা হচ্ছে। (অবশ্যি এটাও দেখার বিষয় যে, ***************************** আয়াতে নবীকে (স) তিরস্কার করা হয়েছে কিনা এবং আয়াতের শব্দগুলো কাফেরদের সৃষ্ট ফেৎনায় নবীর লিপ্ত হওয়ার প্রতিবাদ করছে, না তার সত্যতা স্বীকার করছে? এ ভাবে সূরা হজ্ব পড়ে দেখুন- ৫২ নং আয়াতের পূর্ববর্তী বক্তব্য পড়ুন এবং পরবর্তী বক্তব্যও। কোন যুক্তিসংগত কারণ আপনি খুঁজে পাচ্ছেন যে, এ পূর্বাপর প্রসংগের মধ্যে হঠাৎ একথা কি করে এসে গেল যে- “হে নবী! নয় বছর পূর্বে কুরআনের মধ্যে সংমিশ্রণ করার যে কাজ তোমার দ্বারা হয়েছিল, তার জন্য চিন্তা করোনা। পূর্ববর্তী নবীগনের দ্বারাও শয়তান এ কাজ করিয়েছে এবং নবীগণ যখন এ কাজ করেছেন তখন আল্লাহ তা মনসূখ করে স্বীয় আয়াতেকে পুনরায় পাকাপোক্ত করে দেন।“

আমরা ইতিপূর্বে বার বার একথা বলেছি এবং পুনরায় তার পুনরাবৃত্তি করছি যে, কোন রেওয়ায়েত (বর্ণনা) সনদের দিক দিয়ে সূর্য অপেক্ষা ও উজ্জ্বল হোক না কেন, এমন অবস্থায় গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা যদি দেখা যায় যে তার মূল বচন (মতন) তার ভুল হওয়ার সুস্পষ্ট সাক্ষ্য দিচ্ছে এবং কুরআনের শব্দগুলো তার পূর্বাপর উক্তি ক্রমবিন্যাস প্রভৃতি প্রতিটি বস্তু তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করছে। এ যুক্তিসমূহ তো একজন সন্দেহ পোষণকারী এবং নিরপেক্ষ গবেষকের মনেও দৃঢ় প্রত্যয় সৃষ্টি করবে যে, এ কাহিনী একেবারে মিথ্যা। এখন রইলো একজন মুমেনের ব্যাপার। তো সে কিছুতেই মেনে নিতে পারেনা যখন সে প্রকাশ্যতঃ দেখতে পাচ্ছে যে, এ বর্ণনা কুরআনের একটি নয় বরঞ্চ বহু আয়াতের সাথে সংঘর্ষিক। একজন মুসলমানের জন্য একথা মেনে নেয়া অতি সহজ যে, এ বর্ণনার (রেওয়াতের) প্রণেতাগণকে বিভ্রান্তির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। পক্ষান্তরে সে কিছুতেই একথা বিশ্বাস করতে পারেনা যে, রাসূলূল্লাহ (স) কখনো তাঁর মনের ইচ্ছামত কুরআনের মধ্যে একটি শব্দও সংযোজন করতে পারেন। অথবা হুযুর (স) এর মনে কখনো মুহুর্তের জন্য এ ধারণা সৃষ্টি হতে পারে যে, তৌহীদের সাথে শির্কের কিছু সংমিশ্রণ করে কাফেরদেরকে খুশী করবেন। অথবা তিনি আল্লাহ তায়অলার ফরমানগুলো সম্পর্কে এমন অভিলাষ পোষণ করতে পারতেন যে, আল্লাহ তায়ালা এমন কোন কথা বলে না ফেলেন যাতে কাফেরগণ নারাজ হয়ে যায়। অথবা এমন ধারণা যে, তার উপর অরক্ষিত ও সন্দেহযুক্ত পন্হায় অহী আসতো যাতে জিব্রিল (আ এর সাথে শয়তানও তাঁর উপর কোন শব্দ অন্তর্নিবিষ্ট করে দেয় এবং তিনি এ ভুল ধারণা করেন যে, এও জিব্রিল (আ) এনেছেন। এ সবের প্রতিটি কথাই কুরআনের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যাসমূহের পরিপন্হী। উপরন্তু তা ঐসব প্রমাণিত আকীদারও পরিপন্হী যা আমরা কুরআন এবং মুহাম্মদ (স) সম্পর্কে পোষণ করে থাকি। এমন এক রেওয়ায়েত পুরস্তি (অন্ধভাবে মেনে নেয়ার প্রবণতা) যা নিছক সনদের ইত্তেসাল, রাবীগণের বিশ্বস্ততা এবং বর্ণনা পদ্ধতির আধিক্য দেখে কোন মুসলমানকে খোদার কিতাব ও তাঁর রাসূল সম্পর্কে এমন কঠিন কথাও মেনে নিতে প্রস্তুত করে তার থেকে খোদার পানাহ বা আশ্রয় চাই।

রবীগণের এত বিরাট সংখ্যাকে এ কাহিনী বর্ণনায় লিপ্ত দেখে মনে যে সন্দেহের উদ্রেক হয়- তা দূর করাও সমীচীন মনে করছি। কেউ প্রশ্ন করতে পারে যে, এ কাহিনীর যদি কোন ভিত্তিই না থাকে, তাহলে নবী (স) এবং কুরআনের উপর এতো বড়ো মিথ্যঅচার হাদীসের এমন সব নির্ভরযোগ্য রাবীদের মাধ্যমে প্রকাশ লাভ করলো কিভাবে? তার জবাব এই যে, তার কারণগুলো স্বয়ং হাদীসের ভান্ডার থেকেই পাওয়া যায়। বোখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী এবং মুসনাদে আহমদে প্রকৃত ঘটনা এভাবে বর্ণনা করা হয়েছেঃ

নবী (স) সূরা নজম তেলাওয়াত করেন এবং শেষে যখন তিনি সিজদা করেন, তখন উপস্থিত সকলে, মুসলিম ও মুশরিক, সিজদায় পড়ে যায়। ঘটনা শুধু এতোটুকু। আর এ কোন বিস্ময়কর ব্যাপার ছিলনা। প্রথমত কু্রআনের শক্তিশালী বক্তব্য হৃদয়গ্রাহী বর্ণনা ভংগী, এবং তারপর নবী (স) এর মুখে তা অহীর মর্যাদাসহ আবৃত্তি করা। তা  শুনার পর যদি গোটা সমাবেশ আবেগ- আপ্লুত হয়ে পড়ে সকলে নবী (স) এর সাথে সিজদারত হয়ে যায় তো এতে আশ্চর্যের কিছু ছিল না। এটাই তো সেই বস্তু যার জন্য কুরাইশের লোকেরা বলতো যে, এ লোকটি একজন যাদুকর। অবশ্যি একথা জানা যায় ,পরে কুরাইশের লোকেরা তাদের এ সামাজিক প্রতিক্রিয়ার জন্য লজ্জিত হয়ে পড়ে এবং তাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি অথবা কতিপয় লোক তাদের এ কাজের কারণ এটা নির্ণয় করে, মুহাম্মদের (স) মুখে আমরাতো আমারেদ আপন কানে আমাদের মা’বুদের প্রশংশায় কিছু কথা শুনতে পেয়েছিলাম যার জন্য আমরা তাঁর সাথে সিজদা করি।[ইয়াকুত মু’জামুল বুলদানে ‘ওয্যা’ শব্দের শিরোনামে একথা লিখেছেন যে, কুরাইশের লোকেরা কাবার তাওয়াফ করতে করতে বলতো-

*******************************************

এর থেকে এ অনুমান করা যায় যে, হুযুরের (স) মুখে লাত ও ওয্যার উল্লেখ শুনার পর কেউ তাঁর আওয়াজের সাথে আওয়াজ মিলিয়ে এ কথাগুলো বলে থাকবে এবং দূর থেকে যারা শুনেছে তাদের মধ্যে এর থেকে ভুল ধারণা হয়ে থাকবে- গ্রন্হকার।]

অন্যদিকে এ ঘটনা মুহাজিরদের নিকটে এভাবে পৌঁছে যে, নবী (স) এবং কুরাইশদের মধ্যে সন্ধি হয়ে গেছে। কারণ দর্শকেরা নবী (স) ও মুশরিকদেরকে একত্রে সিজদা করতে দেখে। এ গুজব এমন উত্তাপ সৃষ্টি করে যে, সকল মুহাজির অথবা তাদের অধিকাংশ মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন। এক মতকের মধ্যে এ তিনটি কথা অর্থাৎ কুরাইশদের সিজদা, সিজদার এ কারণ এবং মুহাজিরদের প্রত্যাবর্তন একত্রে মিলিত হয়ে এ কাহিনীর রূপ পরিগ্রহ করে এবং কতিপয় নির্ভরযোগ্য লোক এ বর্ণনায় লিপ্ত হয়ে পড়েন। মানুষ তো মানুষই বটে। বিরাট নেক ব্যক্তিত্ব ও বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন ব্যক্তিও অনেক সময় ভুল করে ফেলেন। তাঁদের ভুল সাধারণ মানুষের ভুল থেকে অধিকতর ক্ষতিকর হয়ে থাকে। শ্রদ্ধায় সীমালংঘনকারীগণ এসব বুযুর্গের সঠিক কথার সাথে ভুল কথাকেও চক্ষু বদ্ধ করে মেনে নেয়। আর বিদ্বেষ পরায়ণ লোক বেছে বেছে তাঁদের ভুলগুলো একত্র করে এবং সেগুলোকে এ কথার যুক্তি প্রমাণ হিসাবে পেশ করে যে, তাঁদের মাধ্যমে যে সব আমাদের নিকটে পৌঁছেছে তা সবই প্রত্যাখ্যানযোগ্য। (তাফহীম ৩য় খন্ড- হজ্ব- টীকা ৯৯।)

প্রত্যাবর্তনকারী মুহাজিরগণের অবস্থা

মক্কাবাসীদের মুসলমান হওয়ার কথা শুনে নবুওতের ৫ম বৎসর শওয়াল মাসে মুহাজিরগণ আবিসিনিয়া থেকে মক্কায় প্রত্যাবর্তণ করেন। ইবনে সা’দ বলেন, সকল মুহাজির মক্কায় ফিরে আসেন। কিন্তু ইবনে ইসহাক বলেন, কিছু সংখ্যক আসেন আর কিছু সংখ্যক আসেননি। বালাযুরী আবিসিনিয়ায় প্রথম হিজরতকারীদের সকলের প্রত্যাবর্তনের কথাই শুধু বলেননি, বরঞ্চ তাঁদের সকলের তালিকা পেশ করে বলেন, কে কার আশ্রয়ে মক্কা প্রবেশ করেন। তাঁরা মক্কার নিকটে পৌঁছার পর বনী কিনানার এক ব্যক্তির সাথে তাঁদের দেখা হয়। তার নিকটে তাঁরা কুরাইশদের অবস্থা জানতে চান। সে বলে, মুহাম্মদ (স) তাদের মাবুদদের প্রশংসাসূচক উল্লেখ করেন। ফলে তারা সব মুহাম্মদের (স) পক্ষ হয়ে যায়। অতঃপর তাঁরা (মুহাজিরগণ) পূর্বের ন্যায় তাদের মাবুদদের নিন্দা করতে থাকলে তারাও তাঁদের সাথে কঠোর আচরণ করে।

এ অবস্থায় মুহাজিরগণ পরস্পর এ বিষয়ে পরামর্শ করে বলেন, আমরা কি পুনরায় আবিসিনিয়ায় চলে যাব, না এসেই যখন পড়েছি তো মক্কায় প্রবেশ করিনা কেন। তারপর দেখা যাবে কি করা যায়। অতএব তাঁদের প্রত্যেকে কারো না কারো আশ্রয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন। ব্যতিক্রম শুধু ইবনে মাসউদ (রা) যিনি কারো আশ্রয় ব্যতিরেকেই মক্কায় প্রবেশ করেন এবং কিছু সময় অবস্তান করে আবিসিনিয়া চলে যান। ইবনে মাসউদ (রা) সম্পর্কে এ কথা বলেন- ইবনে সাদ, বালাযুরী এবং অন্যান্যগণ। কিন্তু ইবনুল কাইয়েম, যাদুল মায়াদে বলেছেন যে, তিনি মক্কাতেই রয়ে যান। অপরদিকে ইবনে ইসহাকের বক্তব্য আমরা পূর্বেই উদ্ধৃত করেছি যে, তিনি মোটেই হিজরত করেননি।

বালাযুরী বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন যে, প্রত্যাবর্তনকারী মুহাজিরদের মক্কা প্রবেশ করতে গিয়ে কে কার আশ্রয় গ্রহণ করেন।

১.   হযরত ওসমানকে (রা) আশ্রয় দেন আবু ওহায়না সাঈদ বিন আল আস।

২.   হযরত আবু হুযায়ফা (রা) বিন ওতবা বিন রাবিয়াকে আশ্রয় দেন- উমাইয়া বিন খালাফ।

৩.   হযরত যুবাইর (রা) বিন আল আওয়াম- আশ্রয়দাতা- যামায়া বিন আল আসওয়াদ।

৪.   হযরত মুসয়াব (রা) বিন ওমাইর- আশ্রয়দাতা- নদর বিন আল হারেস বিন কালাদাহ (অথবা আবু আযীয বিন ওমাইর)।

৫.   হযরত আবদুর রহমান (রা) বিন আওফ- আশ্রয়দাতা- আসওয়াদ বিন আবদে ইয়াগুস।

৬.   হযরত আমের বিন রাবিয়া- আশ্রয়দাতা- আস বিন ওয়াইল সাহমী।

৭.   হযরত আবু সাবরা (রা) বিন আবি রুহম- আশ্রয়দাতা- উখনাস বিন শুরাইক।

৮.   হযরত হাতেব (রা) বিন আমর- আশ্রয়দাতা- হুয়ায়তিব বিন আবদুল ওয্যা।

৯.   হযরত সুহাইল (রা) বিন বায়দা- আশ্রয়দাতা- তাঁর গোত্রের কোন ব্যক্তি। (অন্য বর্ণনা মতে তিনি মক্কায় আত্মগোপন করে থাকেন। অতপর আবিসিনিয়া চলে যান)।

বালাযুরী- ওয়াকেদীর- বরাত দিয়ে এবং ইবনে হিশাম কিছু মতপার্থক্যসহ ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে বলেন যে, হযরত ওসমান (রা) বিন মযউন- অলীদ বিন মগীরার আশ্রয় গ্রহণ করেন। কিন্তু যখন তিনি দেখলেন যে, অন্যান্য মুসলমানদের উপর চরম নির্যাতন চলছে এবং অলীদের আশ্রয়ে বড়ো শান্তিতে আছেন ও চলাফেরা করছেন, তখন তিনি লজ্জাবোধ করেন এবং মনে মনে ভাবতে থাকেন যে, যখন আমার সংগীসাথী আহলে দ্বীন বিপদে আছেন আর আমি একজন মুশরিকের আশ্রয়ে রয়েছি- এ আমার মনের বিরাট দুর্বলতা। অতএব তিনি অলীদকে বললেন, আপনি আমাকে আপনার আশ্রয় থেকে মুক্ত করে দিন। অলীদ বলেন, বৎস তুমি কি আমার আশ্রয়ে মংগল ছাড়া অন্য কিছু দেখেছ? কেউ কি তোমার সাথে কোন কদাচরণ করেছে? হযরত ওসমান (রা) জবাবে কোন অভিযোগক না করে বলেন, আমি আল্লাহর আশ্রয় চাই। তিনি ব্যতীত অন্যের আশ্রয়ে থাকা পছন্দ করিনা। অলীদ বলেন, তাহলে হেরেমে গিয়ে আশ্রয় থেকে মুক্ত হওয়ার ঘোষণা কর- যেমন আমি আশ্রয়দানের ঘোষণা করেছিলাম। হযরত ওসমান (রা) সন্তুষ্টচিত্তে তৈরী হয়ে যান। তিনি এবং অলীদ একত্রে হেরেমে যান। অলীদ বলেন, এ ওসমান আমার আশ্রয় ফিরে দিতে এসেছে। হযরত ওসমান (রা) বলেন, ঠিক কথা। আমি অলীদের আশ্রয়কে একন সম্ভান্ত ও বিশ্বস্ত লোকের আশ্রয় হিসাবে পেয়েছি। কিন্তু আমি এখন আল্লাহ ছাড়া কারো আশ্রয়ে থাকতে চাইনা। এজন্য তাঁর আশ্রয় আমি ফিরে দিয়েছি। সে সময়ে আরবের প্রখ্যাত কবি লাবীদ বিন রাবিয়া মক্কায় এসেছিলেন। তিনি তাঁর কবিতা শুনাতে গিয়ে এ ছত্রটিও বলেন-

*******************************************

“সাবধান থেকো। আল্লাহ ছাড়া সব কিছুই মিথ্যা”।

হযরত ওসমান (রা) বিন মযউন চিৎকার করে বলেন, আপনি ঠিক বলেছেন।

তারপর তিনি যখন দ্বিতীয় ছত্রটি পড়েন-

***************************************

“এবং প্রত্যেক নিয়ামত অবশ্যই ধ্বংসশীল”।

হযরত ওসমান (রা) বলেন, এ মিথ্যা কথা। বেহেশতের নিয়ামত ধ্বংস হবার নয়।

লাবীদ এতে রেগে যান এবং কুরাইশদের লক্ষ্য করে বলেন- আপনাদের সাথে বসা কোনদিন অপমানজনক ছিলনা এবং বদতমিজি ও বেয়াদবি আপনাদের জন্য শোভনীয় ছিলনা। এতে বনী মগীরার এক ব্যক্তি উঠে হযরত ওসমানের মুখে সজোরে থাপ্পড় মারে যার ফলে তার চোখ নীল বর্ণ ধারণ করে। অলীদ উপহাস করে বলেন, বৎস এতে তোমার কি লাভ হলো? জবাবে ওসমান বলেন, আমার দ্বিতীয় চোখটিও সে আঘাতের প্রত্যাশী যা তার সাথী পেয়েছে। অলীদ বলেন, তুমি এমন লোকের জিম্মায় ছিলে যে তোমার হেফাজতকারী। হযরত ওসমান (রা) বলেন, খোদার কসম! এখন আমি আল।লাহর আশ্রয় ব্যতীত অন্য কারো আশ্রয় গ্রহণ করবনা। এ আলোচনার সময় আবদুল্লাহ বিন আবি উমাইয়া বিন মগীরা সেই ব্যক্তির নাকে আঘাত করে ক্ষতবিক্ষত করে দেয় যে হযরত ওসমানকে থাপ্পড় মেরেছিল।

ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে ইবনে হিশাম বলেন, হযরত আবু সালামা তাঁর মামু আবু তালেবের আশ্রয় গ্রহণ করেন। কারণ তিনি আবু তালেবের ভগ্নি বাররা বিন্তে আবদুল মুত্তালিবৈর পুত্র ছিলেন। বনী মাখযুম আবু তালেবকে বলে, আপন ভাতিজাকে তো আপনি নিজের আশ্রয়ে রেখেছেন, কিন্তু আমাদের লোকের সাথে আপনার কি সম্পর্ক যে তাকে আপনি আশ্রয় দিয়ে রেখেছেন? তিনি বলেন, মুহাম্মদ (স) আমার ভাতিজা, আর আবু সালামা আমার ভাগ্নে। ভাতিজাকে যদি আশ্রয় দিতে পারি তো ভাগ্নেকে কেন পারবনা? বনী মাখযুম কিছু ঝগড়া করতে যাচ্ছিল এমন সময় আবু লাহাব দাঁড়িয়ে বলল, হে আহলে কুরাইশ! তুমি আমাদের মুরুব্বীর সাথে অনেক কিছু করলে এবং তাঁর উপর চাপ সৃষ্টি করে চলেছ যাতে তিনি নিজের কওমের মধ্যে যাকে আশ্রয় দেন তাকে তাঁর আশ্রয় থেকে বের করে নেবে। খোদার কসম! হয় তুমি তাঁকে বিরক্ত করা থেকে বিরত হও, নতুবা আমিও তাঁর সাথে দাঁড়িয়ে যাব।

বনী মাখযুম আবু লাহাবের একথা শুনে ঘাবড়ে যায় এবং বলে, হে আবু ওতবা, আমরা আপনাকে নারাজ করতে চাইনা।

তাবারী বলেন, প্রত্যাবর্তনকারীদের মধ্যে হযরত ওসমান  (রা) বিন আফফান ও তাঁর স্ত্রী হযরত রুকাইয়া (রা) বিন্তে রাসূলুল্লাহ (স), হযরত আবু হুযায়ফা (রা) ও তাঁর স্ত্রী সাহলা বিন্তে সুহাইল বিন আমর মক্কায় রয়ে যান এবং মদীনায় হিজরত করা পর্যন্ত মক্কায় অবস্থান করেন। কিন্তু এ বর্ণনায় সন্দেহ রয়েছে। কারণ ইবনে ইসহাক আবিসিনিয়ায় দ্বিতীয় হিজরতকারীদের মধ্যে তাঁর নাম উল্লেখ করেছেন এবং তাঁর নাম তেত্রিশজন পুরুষ ও আটজন মহিলার সে দলটির মধ্যে শামিল করেছেন- যা হুযুরের (স) মদীনায় হিজরত করার পূর্বে আবিসিনিয়া থেকে মক্কা আসে। যাদের মধ্যে দু’জন মৃত্যুবরণ করেন, সাতজন বন্দী হয় এবং চব্বিশ জন বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

আবিসিনিয়ায় দ্বিতীয় বার হিজরত

মক্কার মুসলমানদের উপর নির্যাতন- নিষ্পেষণ, যখন চরমে পৌঁছলো এবং নবী (স) দেখলেন যে, আবিসিনিয়া মুসলমানদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় স্থান প্রমাণিত হলো, তখন তিনি পুনরায় নির্দেশ দেন যে, মজলুম লোক আবিসিনিয়ায় চলে যাক। অতএব নবুওতের ষষ্ঠ বৎসর (৬১৫ খৃঃ) দ্বিতীয় হিজরত অনুষ্ঠিত হয়। যদিও কুরাইশ হিজরতে বাধা দেয়ার আপ্রাণ চেষ্ঠা করে, হিজরতকারীদের নানানভাবে ত্যক্ত বিরক্ত করে, তথাপি এবার আশিরও অধিক পুরুস এবং আঠার উনিশ জন মহিলা নিরাপদে আবিসিনিয়ায় পৌঁছে যান। ইবনে সা’দ পুরুষের সংখ্যা ৮৩ বলেছেন এবং মহিলাদের ১১ জন কুরায়শী এবং ৭ জন অকুরাইশীর উল্লেখ করেছেন। ৮৩ জন পুরুষের মধ্যে আম্মার বিন ইয়াসেরের (রা) নামও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ইবনে ইসহাক তাঁর শরীক হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেন। ওয়াকেদী, ইবনে ওকবা প্রমুখ ঐতিহাসিকগণ দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বলেছেন যে, তিনি তাদের মধ্যে শামিল ছিলেননা। পক্ষান্তরে ইবনে আবদুল বরার দৃঢ়তার সাথে বলেন যে, তিনি তাঁদের মধ্যে ছিলেন। এভাবে এসব মুহাজিরদের মধ্যে হযরত আবু মূসা আশয়ারীর (রা) নামও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সত্য কথা এই যে, তিনি মক্কা থেকে হিজরত করেননি। বরঞ্চ তিনি প্রথমে এসে মুসলমান হয়ে ইয়ামেনে ফিরে যান এবং সেখানে ইসলাম প্রচারের কাজ করতে থাকেন। তারপর আপন কওমের কিছু সখ্যক লোকসহ (যাদের সংখ্যা ৫২/৫৩ জন বলা হয়েছে) একটি নৌকা যোগে ইয়ামেন থেকে রওয়ানা হন। কিন্তু বাতাস তাঁদের নৌকাকে আবিসনিয়ার তীরে পৌঁছিয়ে দেয়। এভাবে তাঁরা মুহাজিরদের সাথে মিলিত হন। বোখারী ও মুসলিমে আবু মুসার (রা) নিজস্ব বর্ণনা এরূপই আছে। তিনি বলেন- আমরা যখন রাসূলুল্লাহর (স) নবুওতের ঘোষণা শুনলাম এবং যখন আমরা ইয়েমেনে ছিলাম, তখন আমরা একটি নৌকা যোগে যাত্র করলাম। কিন্তু আমাদের নৌকা আমাদেরকে আবিসিনিয়ায় পৌঁছিয়ে দিল। সেখানে আমরা হযরত জাফর বিন আবি তালেবের সাথে মিলিত হলাম। অতঃপর খায়বার বিজয়ের সময় তাঁর সাথে খায়বার পৌঁছি। ইবনে সা’দ হযরত আবু মূসার এরূপ বক্তব্য উদ্ধৃত করেন, আমরা ইয়েমেন থেকে আপন কওমের পঞ্চাশেরও বেশী লোকসহ বেরিয়ে পড়ি এবং আমাদের নৌকা আমাদেরকে নাজ্জাশীর (আবিসিনিয়ার বাদশাহ) এলাকায় পৌঁছিয়ে দেয়। প্রথম থেকেই সেখানে হযরত জাফর (রা) বিন আবু তালেব অবস্থান করছিলেন।

মুহাজিরদের তালিকা

মুহাজিরগণের এ তালিকা দৃষ্টে এ হিজরতের গুরত্ব অনুমাণ করা যায় যা ইবনে হিশাম- ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে সন্নিবেশিত করেছেন।

বনী হাশেম থেকে

১. হযরত জাফর বিন আবি তালেব (রা)।

২. তাঁর স্ত্রী আসমা বিন্তে ওমাইস খাশয়ামিয়া।

বনী উমাইয়া থেকে

৩. হযরত ওসমান বিন আফফান (রা)।

৪. তাঁর বিবি হযরত রুকাইয়া (রা) বিন্তে রাসূলুল্লাহ (স)।

৫. আমর বিন সাঈদ বিন আল আস (রা)।

৬. তাঁর বিবি ফাতেমা বিন্তে সাফওয়ান।

৭. তাঁর ভাই খালেদ বিন সাঈদ বিন আল আস (রা)।

৮. তাঁর বিবি উমাইনা খালাফ।

বনী উমাইয়ার সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ কওম থেকে

৯. হযরত আবদুল্লাহ বিন জাহশ (রা)। (বনী গানম বিন দুদান থেকে এবং উম্মুল মুমেনীন হযরত যয়নবের (রা) ভাই)

১০. তাঁর ভাই ওবায়দুল্লাহ বিন জাহশ (রা)।

১১. তাঁর বিবি উম্মে হাবিবা।

১২. কায়েস বিন আবদুল্লাহ।

১৩. তাঁর বিবি বারাকা বিন্তে ইয়াসার।

১৪. মুয়াইকিব বিন আবি ফাতেমা।

বনী আবদ শামস বিন আবদে মানাফ থেকে

১৫. আবু হুযায়ফা (রা) বিন ওতবা বিন রাবিয়া।

১৬. ওতবা বিন গাযওয়ান (রা)।

১৭. যুবাইর (রা) বিন আল আওয়াম বিন খুয়ায়লেদ।

১৮. আসওদা (রা) বিন নাওফাল বিন খুয়ায়লেদ,

(যুবাইর ও আসওয়াদ হযরত খাদিজার (রা) ভাতিজা ছিলেন)।

১৯. ইয়াযিদ (রা) বিন উমাইয়া বিন হারেস বিন আসাদ।

ব্নী আবদ বিন কুসাই থেকে

২১. তুলাইব (রা) ব্নি উমাইর বিন ওহাব (ইনি হুযুরের (স) ফুফাতো ভাই)।

বনী আবদুদ্বার বিন কুসাই থেকে

২২. মুসআব (রা) বিন ওমাইর বিন হাশেম।

২৩. সুয়ায়বেত (রা) বিন সাদ।

২৪. জাহম (রা) বিন কায়েস।

২৫. তাঁর বিবি উম্মে হারমালা (রা) বিন্তে আবদুল আসওয়াদ।

২৬. তাঁর পুত্র আমর (রা) বিন জাহম।

২৭. তাঁর অন্য পুত্র খুযায়মা (রা) বিন জাহম।

২৮, আবুর রুম (রা) বিন ওমাইর বিন হাশেম।

২৯. কিরাম (রা) বিন নাদার বিন হারেস বিন কালাদা।

৩০. আবদুর রহমান বিন আওফ (রা)।

৩১. আমের বিন আবি ওক্কাস (রা)।

(সা’দ বিন আবি ওক্কাসের ভাই)

৩২. মুত্তালিব বিন আযহার (রা)।

৩৩. তাঁর বিবি রামলা বিন্তে আওফ।

বনী যুহরার সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ

৩৪. আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা)।

৩৫. তাঁর ভাই ওতবা মাসউদ (রা)।

৩৬. মিকদাদ বিন আমর (রা)।

বনী তাইম থেকে

৩৭. হারেস বিন খালে (রা)।

৩৮. তাঁর বিবি রায়তা (রা) বিন্তে আল হারেস বিন হাবালা।

৩৯. আমর বিন ওসমান (রা)।

বনী মাখযুম থেকে

৪০. আবু সালামা বিন আবদুল আসাদ (রা)।

৪১. তাঁর বিবি ওসমান (রা)।

৪২. শাম্মাস বিন ওসমান (রা)।

৪৩. হাববার বিন সুফিয়ান (রা)।

৪৪. তাঁর ভাই আবদুল্লাহ বিন সুফিয়ান (রা)।

৪৫. হিশাম বিন আবি হুযায়ফা বিন মগীরা (রা)।

৪৬. সালামা বিন হিশাম বিন মুগীরা (রা)।

৪৭. আয়য়শা বিন আবি রাবিয়া (রা)।

বনী মাখযুমের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ।

৪৮. মুয়াত্তিব বিন আওফ (রা)।

বনী জুমাহ থেকে

৪৯. ওসমান বিন মাযউন (রা)।

৫০. তাঁর পুত্র সায়েব বিন ওসমান (রা)।

৫১. কুদামা বিন মাযউন (ওসমানের ভাই) (রা)।

৫২. দ্বিতীয় ভাই আবদুল্লাহ বিন মাযউন (রা)।

৫৩. হাতেব বিন আল হারেস (রা)।

৫৪. তাঁর বিবি ফাতেমা বিন্তে মুজাল্লেলে আমেরিয়া।

৫৫. তাঁর পুত্র মুহাম্মদ বিন হাতেব (রা)।

৫৬. তাঁর দ্বিতীয় পুত্র হারেস বিন হাতেব (রা)।

৫৭. তাঁর ভাই খাত্তাব বিন হারেস (রা)।

৫৮. তাঁর বিবি ফুকায়হা বিন্তে ইয়াসার।

৫৯. সুফিয়ান বিন মা’মার (রা)।

৬০. তাঁর পুত্র জাবের বিন সুফিয়ান (রা)।

৬১. তাঁর দ্বিতীয় পুত্র জুনাদা বিন সুফিয়ান (রা)।

৬২. তাঁর বিবি হাসানা (রা)- জাবের ও জুনাদার মা।

৬৩. হাসানার দ্বিতীয় স্বামীর পক্ষের পুত্র শুর জাবিল হাসানা (রা)।

৬৪. ওসমান বিন রাবিয়া বিন উহবান (রা)।

বনী সাহম থেকে

৬৫. খুনাইস বিন হুযাফা (রা), (হযরত ওমরের (রা) জামাই)।

৬৬. আবদুল্লাহ বিন হারেস (রা)।

৬৭. হিশাম বিন আস বিন ওয়ায়েল (রা)।

৬৮. কায়েস বিন হুযাফা (রা)।

৬৯. আবু কায়েস বিন হারেস (রা)।

৭০. আবদুল্লাহ বিন হুসাফা (রা)।

৭১. হারেস বিন হারেস বিন কায়স (রা)।

৭২. মুয়াম্মার বিন হারেস বিন কায়েস (রা)।

৭৩. বিশান বিন হারেস বন কায়েস (রা)।

৭৪. তাঁর বৈমাত্রিক ভাই সাঈদ বিন আমর (রা)।

৭৫. সাঈদ বিন হারেস বিন কায়েস (রা)।

৭৬. সায়েব বিন হারেস বিন কায়েস (রা)।

৭৭. ওমাইর বিন রিয়াব (রা)।

বনী সাহমের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ

৭৮. মাহমিয়া বিন আল জাযয়া (রা)।

৭৯. মুয়াম্মার বিন আবদুল্লাহ বিন নাদলা (রা)।

৮০. ওরওয়া (রা) বিন আবদুল ওয্যা।

৮১. আদী বিন নাদলা (রা)।

৮২. তাঁর পুত্র নু’মান বিন আদী (রা)।

৮৩. আমের বিন রাবিয়া আল আনযী (রা)।

৮৪. তাঁর বিবি লায়লা বিন্তে আবি হাসমা (রা)।

বনী আমের বিন লুই থেকে

৮৫. আবু সাবরা বিন আবি রুহম (রা)।

৮৬. তাঁর বিবি উম্মে কুলসুম বিন্তে সুহাইল বিন আমর।

৮৭. আবদুল্লাহ বিন মাখরামা (রা)।

৮৮. আবদুল্লাহ বিন সুহাইল বিন আমর (রা)।

৮৯. সলীত বিন আমর (রা)।

৯০. তাঁর ভাই সাকরাম বিন আমর (রা)।

৯১. তাঁর বিবি সাওদা বিন্তে যামায়া (রা)।

(পরে তাঁর উম্মুল মুমেনীন হওয়ার সৌভাগ্য হয়)।

৯২. মালেক বিন যামায়া (রা) (হযরত সাওদার ভাই)।

৯৩. তাঁর বিবি আমরা বিন্তে আসসা’দী (রা)।

৯৪. হাতেব বিন আমর (রা)।

বনী আমরের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ

৯৫. সা’দ বিন খাওলা (রা)।

বনী হারেস বিন ফিহর থেকে

৯৬. আবু ওবায়াদা বিন আল জাররাহ (রা)।

৯৭. সুহাইল বিন বায়দা (রা)।

৯৮. আমর বিন আবি সারহ (রা)।

৯৯. ইয়াদ বিন যুহাইর (রা)।

১০০. আমর বিন আল হারেস বিন যুহাইর (রা)।

১০১. ওসমন বিন আবেদ গানাম বিন যুহাইর (রা)।

১০২. সা’দ বিন আবদে কায়স (রা)।

১০৩. হারেস বিন আবদে কায়েস (রা)।(গ্রন্হকার কর্তৃক পরিবর্ধন।)

মক্কায় এ হিজরতের প্রতিক্রিয়া

এ হিজরতের ফলে মক্কা ঘরে ঘরে বিলাপ ও আর্তনাদ শুরু হয়। কারণ কুরাইমের বড়ো ও ছোট পরিবারের এমন কেউ ছিলনা যার প্রাণপ্রিয় সন্তান এ হিজরতকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলনা। কারো পুত্র গিয়েছেতো কারো জামাতা। কারো কন্যা গিয়েছে তো কারো ভাই অথবা ভগ্নি। আবু জাহলের ভাই সালামা বিন হিশাম (রা্), তাঁর চাচাতো ভাই হিশাম বিন আবি হুযায়ফা (রা) ও আয়্যাশ বিন আবি রাবিয়া (রা), তার চাচাতো ভগ্নি হযরত উম্মে সালমা (রা), আবু সুফিয়ানের কন্যা উম্মে হাবিবা (রা), ওতবা বিন রাবিয়ার পুত্র এবং কলিজা ভক্ষণকারী হিন্দের সহোদর ভাই আবু হুযায়ফা (রা), সুহাইল বিন আমরের পুত্র, কন্যাগণ এবং জামাতা। এভাবে অন্যান্য কুরাইশ সর্দার ও প্রখ্যাত ইসলাম দুশমনদের আপন সন্তানাদি দ্বীনের খাতিরে বাড়িঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। এ জন্য এমন কোন গৃহ ছিলনা যা এ ঘটনায় বেদনাহত হয়নি। কতিপয় লোক পূর্ব থেকে অধিকতর ইসলমা দুশমন হয়ে পড়ে। আবার কিছু লোকের মনে এর এমন প্রভাব পড়ে যে, তারা মুসলমান হয়ে যায়। (তাফহীম- ৩য় খন্ড- ভূমিকা সূরা মরিয়ম।)

হযরত আবু বকরের (রা) হিজরতের ইচ্ছা

এরপর আর এক আঘাত কুরাইশগণ পেল যখন হযরত আবু বকরের (রা) মতো একজন সম্মানিত ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর (স) নিকট থেকে অনুমতি নিয়ে মক্কা থেকে বেরিয়ে পড়েন যাতে অন্যান্য মুহাজিরদের সাথে মিলিত হতে পারেন। বোখারীতে, হযরত আয়েশার (রা) বর্ণনা মতে, যখন তিনি বারকুল গেমাদ [এর উচ্চারণে পার্থক্য রয়েছে। আমরা যে উচ্চারণ লিখেছি তা ফতহুল বারী থেকে নেয়া হয়েছে। মু’জামুল বুলদানে ‘বেরকুল গেমাদ’ ************** লেখা হয়েছে। এক উচ্চারণ বেরকল গুমাদ ***************  করা হয়েছে- গ্রন্হকার।] নামক স্থানে পৌঁছেন (মক্কা থেকে ইয়ামেনের দিকে পাঁচ দিনের পথে)। তখন কারা গোত্রের সর্দার ইবনুদ দুগুন্নার সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। ইবনে ইসহাক যুহরী, তারপর ওরওয়া, তারপর হযরত আয়েশার (রা) সনদে বর্ণনা করেন যে, আবু বকর (রা) মক্কা থেকে এক অথবা দু’দিনের পথ অতিক্রম করার পর ইবনুদ দুগুন্নার সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। তিনি সেকালে আহাবিশের দলপতি ছিলেন। তিনি বললেন, আবু বকর! কোথায় চলেছ? জবাবে তিনি বলেন, আমার কওম আমাকে বের করে দিয়েছে। বড় কষ্ট দিয়েছে এবং জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। তিনি বলেন, কেন বল দেখি? আবু বকরের মতো লোকতো বের হতে পারেনা, তাকে কেউ বের করে দিতেও পারেনা। খোদার কসম, তুমিতো সমাজের ভূষণ। অকর্মন্নকে উপার্জন করে দাও, আত্মীয়ের সাথ সদাচার কর, অক্ষম ব্যক্তিদের বোঝা বহন কর, মেহমানদারী কর, ভালো কাজে সাহায্য কর, ফিরে চল আমি তোমাকে আমার আশ্রয়ে নেব। আপন শহের আপন রবের এবাদত কর। তারপর তিনি হযরত আবু বকরকে (রা) সাথে নিয়ে মক্কায় আসেন এবং কুরাইশদের সম্ভান্ত দলপতিদের কাছে গিয়ে বলেন, আবু বকরের মতো বেরিয়ে যেতে পারেনা, তাকে বের করে দেয়াও যেতে পারেনা। যার মধ্যে এমন এমন গুণাবলী আছে তাকে তোমরা বের করে দিতে পার? ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় আছে যে, তিনি মক্কায় ঘোষণা করেন, আমি কুহাফার পুত্রকে আশ্রয় দিয়েছি- এখন তার কেউ সদাচরণ ব্যতীত আর কিছু যেন না করে। কুরাইশ তাঁর এ আশ্রয় নাকচ করেনি। কিন্তু এ শর্ত আরোপ করলো যে, আবু বকর (রা) তাঁর আপন ঘরে যেভাবে ইচ্ছা তাঁর আপন রবের এবদত করুক এবং যা ইচ্ছা তাই পড়ুক। কিন্তু উচ্চস্বরে পড়ে আমাদেরকে যেন কষ্ট না দেয় অথবা ঘরের বাইরে  পড়া শুরু না করে। কারণ এতে আমরা আশংকা করি যে, আামাদের মহিলা ও ছেলেমেয়ে ফেৎনায় পতিত হবে। তারপর আবু বকর (রা) তাঁর বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে একটি মসজিদ তৈরী করে তাঁর মধ্যে নামায পড়া এবং কুরআন তেলাওতের কাজ শুরু করলেন। তাঁর তেলাওতের মধ্যে আবেগের এমন তীব্রতা ও উত্তাপ এবং এমন আকর্ষণ ছিল যে, মুশরিকদের মহিলা বালক যুবক নির্বিশেষে কুরআন শুনার জন্য প্রচন্ড ভিড় করতো। কুরআন পড়তে পড়তে আবু বকর (রা) কান্না শুরু করতেন এবং শ্রোতাগণও অভিভুত হয়ে পড়তো। এতে মুশরিক দলপতিগণ বিচলিত হয়ে পড়লেন। তাঁরা ইবনুদ দুগুন্নাকে ডেকে পাঠালেন এবং বল্লেন, আমরা তোমার খাতিরে তাঁকে আশ্রয় দিয়েছিলাম যাতে তিনি তার বাড়িতে আপন রবের এবাদত করতে পারেন। কিন্তু তাঁর বাড়ির চত্বঃসীমার মধ্যে এক মসজিদ তৈরী করে প্রকাশ্যে নামায ও কুরআন পড়তে শুরু করেছেন। আমাদের আশংকা হয় যে, এতে আমাদের মহিলা ও ছেলেমেয়েরা পথভ্রষ্ট হবে। তাকে একাজ থেকে বিরত রাখ। হয় চুপচাপ তিনি আপন বাড়িতে আপন রবের এবাদত বন্দেগী করবেন। নতুবা তিনি ফেরৎ দিয়ে দিন। আমরা কিন্তু তোমার জিম্মা বিনষ্ট করতে চাইনা।

অতঃপর ইবনুদ দুগুন্না গিয়ে হযরত আবু বকরকে (রা) এ কথা বলেন। তিনি বলেন, আমি চাইনা যে, আরবে এ কথা ছড়িয়ে পড়ুক যে আমি এক ব্যক্তিকে আশ্রয় দিয়েছিলাম এবং আমার এ আশ্রয় ভংগ করা হয়েছে। জবাবে হযরত আবু বকর (রা) বলেন, আচ্ছা তাহলে আমি আপনার আশ্রয় আপনাকে ফেরৎ দিচ্ছি এবং আল্লাহর জিম্মার উপর সন্তুষ্ট আছি। ইবনুদ দুগুন্না উঠে কুরাইশের লোকদের নিকটে গিয়ে বললেন, আবু বকর (রা) আমার জিম্মা ফেরৎ দিয়েছেন। এখন তোমরা রইলে এবং তোমাদের লোক। (পরিবর্ধন।)

মুহাজিরগণকে ফেরৎ আনার জন্য নাজ্জাশীর নিকটে মুশরিকদের প্রতিনিধি

হিজরতের পর কুরাইশ দলপতিগণ একত্রে বসে সিদ্ধান্ত করেন যে, আবদুল্লাহ বিন আবি রাবিয়া। [অনেকে আবদুল্লাহ বিন রাবিয়া লিখেছেন। কিন্তু ইবনে হিশাম লিখেছেন- বিন আবি রাবিয়া। ইনি হযরত আইয়াশ বিন আবি রাবিয়ার (রা) সহোদর ভাই ছিলেন- গ্রন্হকার।] (আবু হালের বৈমাত্রিক ভাই) এবং আমর বিন আসকে বহু মূল্যবান উপঢৌকনসহ আবিসিনিয়া পাঠানো হোক এবং তাঁরা যেন কোন না কোন প্রকারে নাজ্জাশীকে (আবিসিনিয়ার বাদশাহ) রাজী করেন যাতে তিনি মুহাজিরদেরকে মক্কায় ফেরৎ পাঠান।

হযরত উম্মে সালমার (রা) বর্ণনা

উম্মুল মুমেনীন হযরত উম্মে সালমা (রা) মুহাজেরদের মধ্যে একজন, এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন যা ইবনে ইসহাক ও ইমাম আহমদ উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেন যে, এ দু’জন ঝানু রাজনীতিক দূত আমাদের সন্ধানে আবিসিনিয়ায় পৌঁছান এবং নাজ্জাশীর সভাসদ বৃন্দকে প্রচুর উপঢৌকন প্রদান করেন। মুহাজিরগণকে দেশে ফেরৎ পাঠাবার জন্য তাঁরা নাজ্জাশীর উপর সকলে মিলে ভয়ানক চাপ সৃষ্টি করবেন বলে রাজী হয়ে যান। তারপর তাঁরা নজ্জাশীর সাথে সাক্ষাৎ করে মূল্যবান উপঢৌকন প্রদান করে বলেন, আমাদের শহরের কতিপয় নির্বোধ ছেলে ছোকরা পালিয়ে আপনার এখানে এসেছে এবং কওমের সম্ভান্ত ব্যক্তিগত আমাদেরকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন, তাদেরকে ফেরৎ পাঠাবার আবেদন জানাতে। এসব ছেলে ছোকরা আমাদের দ্বীন থেকেও বেরিয়ে গেছে। তারা আপনার দ্বীনও গ্রহণ করেনি। বরঞ্চ তারা এক অদ্ভূত দ্বীন বের করেছে।

তার কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই রাজ পরিষদগণ চারদিক থেকে বলে উঠলেন, এমন লোকদেরকে অবশ্যই ফেরৎ পাঠানো উচিত। তাদের কওমের লোকই ভালো ভাবে জানে তাদের দোষ-ক্রটি কি। তাদেরকে রাখা ঠিক হবেনা।

নাজ্জাশী রেগে গিয়ে বললেন, এভাবে তো আমি তাদেরকে এদের হাতে ছেড়ে দিতে পারিনা। যারা অন্য দেশ ত্যাগ করে আমার দেশের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এখানে আশ্রয় নিতে এসেছে তাদের সাথে আমি বিশ্বাস ভংগের কাজ করতে পারিনা। প্রথমে তাদেরকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করব যে, তাদের সম্পর্কে এরা যা কিছু বলছে- তার সত্যতা কতটুকু। অতএব নাজ্জাশী রাসূলূল্লাহর (রা) সাহাবীগণকে তাঁর দরবারে ডেকে পাঠালেন।

নাজ্জাশীর পয়গাম শুনার পর সকল মুহাজির একত্রে পরামর্শ করলেন যে, বাদশাহের সামনে কি বলা যায়। অবশেষে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত করা হয় যে, নবী (স) যে শিক্ষা দিয়েছেন অবিকল তাই বলা হবে- তা নাজ্জাশী আমাদেরকে এখানে থাকতে দেন বা বের করে দেন।

দরবারে পৌঁছার সাথে সাথে নাজ্জাশী প্রশ্ন করেনঃ

এ তোমরা কি করলে যে, নিজেদের দ্বীনও পরিত্যাগ করলে এবং আমার দ্বীনও গ্রহণ করলেনা? আর না দুনিয়ার কোন একটি দ্বীন গ্রহণ করলে? তোমাদের এ নতুন দ্বীনটাইবা কি?

জবাবে মুহাজিরগণের পক্ষ থেকে হযরত জা’ফর বিন আবি তালিব উপস্থিত মত এক ভাষণ দান করেন- যাতে আরব জাহেলিয়াতের ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক দোষগুলো বর্ণনা করেন। তারপর নবী (স) এর আগমণের উল্লেখ করে বলেন, তিনি কি শিক্ষা দেন। তারপর সেসব জুলুম নির্যাতনের উল্লেখ করেন, যা নবীর আনুগত্যকারীগণের উপর করা হয়। তিনি তাঁর ভাষণ এ কথার উপর শেষ করেন, অন্য কোন দেশে যাওয়ার পরিবর্তে আমরা আপনার দেশে এ জন্য এসেছি যে, এখানে আমাদের উপর কোন জুলুম করা হবেনা।[হজরত জাফরের (রা) হুবহু ভাষণ যা ইবনে ইসহাক হযরত উম্মে সালমার (রা) বর্ণনা থেকে উদ্ধৃত করেছেন তা নিম্নরূপঃ

বাদশাহ নামদার। আমরা জাহেলিয়াতে নিমজ্জিত কওম ছিলাম। প্রতিমা পূজা করতাম, মৃত জীব ভক্ষণ করতাম। অশ্লীল কাজে অভ্যস্থ ছিলাম, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করতাম, প্রতিবেশির সাথে এবং ওয়াদা পালনে খারাপ আচরণ করতাম। সবল দুর্বলকে মের ফেলতো। আমরা এমন অবস্থায় ছিলাম যখন আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং আমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল পাঠালেন। তাঁর বংশ পরিচয়, আমানতদারী সততা, নিষ্কুলষ চরিত্র আমাদের জানা ছিল। তিনি আমাদেরকে আল্লাহর দিকে আহবান জানান, যাতে আমরা তৌহীদে বিশ্বাসী হই এবং তাঁরই এবাদত করি। আর যেসব পাথরের মূর্তিকে আমরা ও আমাদের বাপ দাদা পূজা করতাম তা যেন পরিত্যাগ করি। তিনি আমাদেরকে সত্য কথা বলা, আমানতদারী, আত্মীয়ের প্রতি সদাচরণ, প্রতিবেশীর প্রতি সাহায্য সহানুভূতি, ওয়াদা পালনের এবং হারাম কাজ ও হত্যাকান্ড থেকে বিরত থাকার আদেশ করেন। আমাদেরকে সকল প্রকার অশ্লীলতা, মিথ্যা কথা, এতিমের মাল ভক্ষণ, সতী সাধ্বী মহিলামের প্রতি মিথ্যঅ দোষারূপ করা থেকে বিরত রাখেন। একমাত্র এক আল্লাহর এবাদত করার এবং কোন কিছু তাঁর সাথে শরীক না করার নির্দেশ তিনি আমাদেরকে দেন। নামায পড়া, রোযা রাখা এবং যাকাত দেয়ার হেদায়াতও তিনি করেন। (উম্মে সালমা (রা) বলেন, এভাবে হযরত জাফর (রা) ইসলামের অন্যান্য হুকুম আহকামও বাদশাহকে শুনিয়ে দেন)। অতএব আমরা তাঁর সত্যতা স্বীকার করে নিই এবং তাঁর উপর ঈমান আনি। আল্লাহর পক্ষ থেকে তিনি যা কিছু নিয়ে আসেন, তা আমরা মেনে চলি। আমরা শুধু আল্লাহর এবাদত করি এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করিনা। তিনি যা আমাদের জন্যে হারাম করেন তা আমরা হারাম করে নেই, আর যা কিছু তিনি আমাদের জন্যে হালাল করেন তা আমরা হালাল করে নিই। এতে আমাদের কওম আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা আমাদেরকে শাস্তি দিতে থাকে এবং দ্বীনের ব্যাপারে আমাদের উপর এমন জুলুম করে যেন আমরা আল্লাহর এবাদতের পরিবর্তে মূর্তি পূজা করি। আর আমরা সেসব নিকৃষ্ট বস্তু হালাল করে নিই যা পূর্বে হালাল করে নিয়েছিলাম। অবশেষে যখন তারা অত্যাচার উৎপীড়নে আমাদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে এবং আমাদের দ্বীনের পথে প্রতিবন্ধক হয় তখন আমরা আপনার দেশের উদ্দে্যে বেরিয়ে পড়ি। অন্য দেশের তুলনায় আপনার দেশ পছন্দ করি এবং আশ্রয় প্রাথী হই, এ আশায় যে আমাদের উপর কো জুলুম হবেনা- গ্রন্হকার)]

আমাকে সে কালাম শুনাও যা তোমরা বলছ খোদার পক্ষ থেকে তোমাদের নবীর উপর অবতীর্ণ হয়েছে।

জবাবে হযরত জা’ফর (রা) সূরায়ে মরিয়মের সে প্রাথমিক অংশ পাঠ করে শুনিয়ে দেন যা ছিল হযরত ইয়াহইয়া (আ) এবং হযরত ঈসা (আ) সম্পর্কিত। নাজ্জাশী তা শুনতে থাকেন এবং অশ্রু বিসর্জন করতে থাকেন। এমনকি তাঁর দাড়ি অশ্রু সিক্ত হয়ে যায়। তাঁর পাদরীও কেঁদে ফেলেন এবং মুসাহেববৃন্দও কাঁদেন। হযরত জাফরের (রা) তেলাওত শেষ করার পর নাজ্জাশী বলেন, অবশ্য এ কালাম এবং ঈসা (আ) যা এনেছিলেন উভয়ই একই উৎস থেকে উৎসারিত। খোদার কসম! আমি তোমাদেরকে তাদের হাতে তুলে দেবনা। কুরাইশ দূতদেরকে বলেন, তোমরা ফিরে যাও। এদেরকে তোমাদের হাতে কখনোই তুলে দেবনা- তা কখনো হতে পারেনা।

হযরত উম্মে সালমা (রা) বলেন, আবদুল্লাহ বিন আবি রাবিয়ার আমাদের প্রতি কিছুটা দুর্বলতা ছিল, সে চাচ্ছিল যে আমরা রক্ষা পাই। কিন্তু আমর বিন আস বলল, খোদার কসম, কাল আমি এমন কথা বলব- যা তাদের মূল উৎপাটন করবে। আমি নাজ্জাশীকে বলবো এরা ঈসা বিন মরিয়মকে (আ) নিছক বান্দাহ গণ্য করে। আবদুল্লাহ বলে, এমনটি করোনা। এরা আমাদের বিরোধী হলেও আমাদের ভইতো বটে। তাদের কিছু হকও তো আমাদের উপর আছে। আমর বিন আস তার কথায় কর্ণপাত করেনা এবং পরদিন নাজ্জাশীকে বলে, তাদেরকে ডেকে এ কথাও জিজ্ঞেস করুন যে, ঈসা বিন মরিয়ম সম্পর্কে তাদের আকীদা কি। তাঁর সম্পর্কে এরা বড়ো কঠিন কথা বলে। নাজ্জাশী পুনরায় মুহাজিরদেরক ডেকে পাঠান। আমর বিন আসের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে তাঁরা ওয়াকেফহাল হয়েছিলেন। তাঁরা একত্র হয়ে পরামর্শ করেন যে, যদি নাজ্জাশী ঈসা (আ( সম্পর্কে কোন প্রশ্ন করেন তো কি জবাব দেয়া যাবে। পরিস্থিতি বড়ই নাজুক। আর সকলে বড়ো উদিগ্ন হয়ে পড়েন। কিন্তু রাসূলের সাহাবীগণ সিদ্ধঅন্ত করেন, যা কিছু হবার তা  হোক। আমরা তো সেই কথাই বলব যা আল্লাহ বলেছেন এবং তার রাসূল শিক্ষা দিয়েছেন। অবশেষে তাঁরা যখন বাদশাহের দরবারে গেলেন তখন নাজ্জাশী আমর বিন আসের প্রশ্ন তাঁদের সামনে রাখলেন। জাফর বিন আবি তালেব উঠে দ্বিধাহীন চিত্তে বললেন-

****************************************

-তিনি আল্লাহর বান্দাহ, তাঁর রাসূল, তাঁর পক্ষ থেকে একটি রূহ ও একটি কালেমা যা আল্লাহ কুমারী মরিয়মের উ পর ইলকা করেন।

নাজ্জাশী তা শুনার পর একটা ঘাস মাটি থেকে তুলে নিয়ে বলেন, খোদার কসম! তুমি যা কিছু বললে, ঈসা (আ) তার থেকে বেশী কিছু ছিলেননা। একথায় পাদরীগণ সাপের মতো ফোঁস করে উঠলেন। কিন্তু নাজ্জাশী বলেন, কসম খোদার, কথা এই তোমরা যতোই ফোঁস কর না কেন। তারপর তিনি আমাদেরকে বললেন, যাও তোমরা আমার দেশে নিরাপদে থাক। তোমাদেরকে কেউ মন্দ বললে সে শাস্তি পাবে। যদি কেউ আমাকে স্বর্ণের পাহাড় উপঢৌকন দেয়, তার বিনিয়মে তোমাদের কষ্ট দেয়া আমি পছন্দ করবনা। তারপর তিনি আদেশ করেন- এ দু’জন দূতকে তাদের হাদিয়া ফেরৎ দাও- তার কোন প্রয়োজন আমার নেই। আল্লাহ যখন আমার রাজ্য আমাকে ফেরৎ দিয়েছিলেন, তখন তিনি আমার কাছ থেকে কোন ঘুষ নেননি যে আমি আল্লাহর ব্যাপারে ঘুষ নেব। (তাফহীম- ৩য় খন্ড- সূরা মরিয়মের ভূমিকা।)

হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদের বর্ণনা

এ ঘটনার আর একজন চাক্ষুষ সাক্ষী হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা)। তিনি সে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। মুসনাদে আহমদ ও তাবারানীতে তাঁর বর্ণনা এভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছেঃ

নাজ্জাশী যখন মুহাজিরগণকে তাঁর দরবারে ডেকে পাঠালেন এবং জাফর বিন আবি তালেবের (রা) মুখে নবী (স) এর শিক্ষার কথা শুনলেন তখন বললেন, খোদান কসম! আমরা ঈসা (আ) সম্পর্কে যা বলি, এরা তার চেয়ে বেশী বলেনা। মারহাবা তোমাদের জন্য এবং সে সত্তার জন্য যাঁর কাছ থেকে তোমরা এসেছ। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি তিনি আল্লাহর রাসূল আর তিনিই সেই ব্যক্তি যাঁর উল্লেখ আমরা ইনজিলে পাই। আর তিনি সেই রাসূল যাঁর সুসংবাদ ঈসা ইবনে মারিয়ম (আ) দিয়েছেন।(তাফহীম ৫ম খন্ড- সূরা সাফ- টীকা ৮)

আবদুল্লাহ বিন মাসউদের (রা) বর্ণনায় এ কথারও উল্লেখ আছে যে, কুরাইশদের দূতদ্বয় নাজ্জাশীর দরবারে হাযির হয়ে প্রথমে তাকে সিজদা করে এবং তাঁর ডানে ও বামে তারা বসে পড়ে। তারা বলে, আমাদের জ্ঞাতিদের মধ্য থেকে কিছু লোক আপনার এখানে এসেছে এবং তারা আমাদের ও আমাদের দ্বীন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তার ফলে সকলের পক্ষ থেকে কথা বলব। সকলে তাঁর পেছনে চলেন। দরবারে প্রবেশ করে হযরত জাফর (রা) সালাম করেন। পরিষদগণ বলে, সিজদা কেন করলেননা?

জাফর (রা) বললেন, আমরা খোদা ব্যতীত কাউকে সিজদা করিনা। তারপর নবী (স) ও তাঁর শিক্ষার উল্লেখ করেন ও তারপর হযরত ঈসা বিন মরিয়ম সম্পর্কে মুসলমানদের আকীদার উল্লেক করেন। এ বর্ণনায় নাজ্জাশীর এ বক্তব্যও উদ্ধৃত করা হয় যে, তিনি নবী (স) এর সত্যতা স্বীকার করার পর বলেন, খোদার কসম! যদি আমি বাদশাহীর দায়িত্বে ফেঁসে না থাকতাম, তাহলে তাঁর খেদমতে হাযর হতাম, তাঁর জুতো তুলে নিতাম এবং তাকে অজু করাতাম।

হযরত আবু মুসা আশয়ারীর বর্ণনা

হাফেজ আবু নুয়াইম এবং বায়হাকী প্রায় একই রকমের বর্ণনা হযরত আবু মুসা আশয়ারী থেকে উদ্ধৃত করেছেন। এতে অতিরিক্ত এ কথা আছে যে, মুহাজিরগণের রাজদরবারে পৌঁছার পূর্বে কুরাইশ প্রতিনিধি নাজ্জাশীকে উত্তেজিত করার জন্য বলে, দেখবেন এরা আপনাকে সিজদা করবেনা। আমরা দরবারে পৌঁছলে দরবারীগণ বলে, বাদশাহকে সিজদা কর। জাফর (রা) বলেন, আমরা আল্লাহ ছাড়া কাউকে সিজদা করিনা। আমরা সামনে অগ্রসর হয়ে যখন নাজ্জাশীর সামনে পৌঁছলাম তখন তিনি বললেন, কোন জিনিস আমাকে সিজদা করা থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখলো। তিনি সে জবাবই দেন, আমরা আল্লাহ ছাড়া কাউকে সিজদা করিনা। তার পরের ঘটনা তাই যা ইবনে মাসউদ (রা) বলেছেন। শেষে নাজ্জাশী আমাদেরকে বলেন, যতোদিন ইচ্ছা তোমরা আমার ভূখন্ডে থাক। তিনি আমাদের খোরাক পোষাকের ব্যবস্থা করারও নির্দেশ দেন।

স্বয়ং হযরত জা’ফরের (রা) বর্ণনা

 হাফেজ ইবনে আসাকের ও তাবারানী হযরত জাফরের (রা) বর্ণনা তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ বিন জাফরের বরাত দিয়ে উদ্ধৃত করেছেন। এ বর্ণনায় অতিরিক্তি এ কথা আছে যে, কুরাইশ প্রতিনিধিদের অভিযোগের জবাবে যখন আমরা আমাদের ও তাঁদের দ্বীনী মতপার্থক্যের বিশ্লেষণ করি, তখন নাজ্জাশী কুরাইশ প্রতিনিধিদেরকে জিজ্ঞেস করেন, এরা কি তোমাদের গোলাম? তারা বলে- না। তিনি বলেন, তোমাদের নিকটে এদের কোন ঋণ আছে? তারা না বলে। তিনি বলেন, তাহলে এদেরকে ছেড়ে দাও। অতঃপর হযরত জাফরও (রা) সে কথাই বলেন, যা অন্যান্যগণ বলেছেন যে, আমর বিন আস নাজ্জাশীর সম্মুখে হযরত ঈসা বিন মরিয়ম (আ) সম্পর্কে আমাদের আকীদার বিষয়টি তুলে ধরে। নাজ্জাশী তার সত্যতা স্বীকার করেন এবং আমাদেরকে বলেন, এখানে কেউ তোমাদেরকে কষ্ট দিচ্ছে নাতো? আমরা বললাম, হ্যাঁ দিচ্ছে। তারপর তিনি ঘোষণা করেন যে কেউ কষ্ট দিলে তার চার দিরহাম জরিমানা করা হবে। তারপর নাজ্জাশী আমাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, এটা কি যথেষ্ট। আমরা বলি, না। তখন তিনি জরিমানা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেন।(পরিবর্ধন।)

মুহাজিরদের সত্যবাদী ভূমিকা

এভাবে মুহাজেরীনে হাবশা শুধু একথাই প্রমাণ করেননি যে, যে হকের উপর তাঁরা ঈমান এনেছেন তার খাতিরে তাঁরা ঘরদো, আত্মীয় স্বজন, ব্যবসা বাণিজ্য, সহায় সম্পদ ও মাতৃভূমি সকল কিছুই ছেড়ে নির্বাসন দন্ড ভোগ করতে তৈরী হয়ে যান। বরঞ্চ এটাও প্রমাণ করেন যে, এ নির্বাসন কালেও অসহায় অবস্থায় হকের ব্যাপারে কোন দুর্বলতা প্রদর্শনেও তৈরী ছিলেননা। তাঁদের এ ঈমানী শক্তি ছিল এমন বিস্ময়কর যে, শাহী দরবারের মতো এক নাজুক পরিবেশেও হযরত ঈসা (আ) সম্পর্কে তাঁদের আকীদাহ সুস্পষ্টরূপে প্রকাশ করেন যখন নাজ্জাশীর সকল পরিষদ ঘুষ গ্রহণ করে তাঁদেরকে দুশমনের হাতে তুলে দিতে উদ্যত ছিল। সে সময়ে এ আশংকা ছিল যে, খৃস্ট ধর্মের বুনিয়াদী আকীদা সম্পর্কে ইসলামের দ্বিধাহীন মন্তব্য শুনার পর নাজ্জাশীও ক্ষীপ্ত হতে পারতেন এবং মজলুম মুসলমানদেরকে কুরাইশ কসাইদের হাতে তুলে দিতে পারতেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তাঁরা সত্য কথা পেশ করতে সামান্য পরিমাণে ইতঃস্ততও করেননি। এ বিষয়টিই দুনিয়াকে দেখিয়ে দেয় যে, ইসলামী দাওয়াত কোন ধরনের মজবুত চরিত্রের দিবেদিত প্রাণ লোক পৌঁছিয়ে দেয়।(১৪)

আবিসিনিয়া থেকে ঈসায়ী প্রতিনিধিদের আগমন

মুহাজিরগণের চরিত্র ও তাঁদের দাওয়াতের প্রভাব কিরূপ আবিসিনিয়াবাসীর উপর বিস্তার লাভ করেছিল তার অনুমান এ ঘটনা থেকে করা যায় যে, সেকান থেকে বিশ জনের একটি প্রতিনিধি দল মক্কায় আগমন করে নবী (স) এর সাথে মিলিত হয়।

এ ঘটনা ইবনে হিশাম, বায়হাকী প্রমুখ মুহাম্মদ বিন ইসহাকের বরাত দিয়ে এভাবে বর্ণনা করেছেন যে, হিজরতে হাবশার পর যখন নবী (স) এর আগমন ও দাওয়াতের প্রচার প্রসার আবিসিনিয়ায় শুরু হয়, তখন সেখান থেকে প্রায় বিশ জনের একটি প্রতিনিধি দল মসজিদে হারামে নবী (স) এর সাথে মিলিত হয় (এক বর্ণনায় আছে মিলিত হয় এবং কিছু প্রশ্ন করে)। কুরাইশের বহু লোকও এ ঘটনা দেখার জন্য চারদিকে দাঁড়িয়ে যায়। প্রতিনিধি দল কিছু প্রশ্ন করলে নবী (স) তার জবাব দেন। তারপর তিনি তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং কুরআনের আয়াত তাদের সামনে পাঠ করেন। কুরআন শ্রবণে তাদের চোখ থেকে অশ্রু নির্গত হয়। এ যে আল্লাহর কালাম এর সত্যতা তাঁরা স্বীকার করেন এবং নবীর উপর ঈমান আনেন। বৈঠক শেষে আবু জাহল এবং তার কতিপয় সংগী সাথী পথে তাঁদের সাথে মিলিত হয়ে এভাবে তিরস্কার করে, তোমাদের জীবন ব্যর্থ হোক। তোমাদের স্বধর্মীগণ তোমাদেরকে এজন্য পাঠিয়েছিলেন যে, তোমরা এ ব্যক্তির অবস্থা যাচাই করে ঠিক ঠিক খবর দেবে। কিন্তু তোমরা তাঁর কাছে বসতে না বসতেই নিজেদের দ্বীন পরিত্যাগ করে তাঁর উপর ঈমান আনলে। তোমাদের চেয়ে নির্বোধ লোকতো আমরা কখনো দেখিনি। জবাবে তাঁরা বলেন, ভাই তোমাদেরকে সালাম। তোমাদের সাথে আমরা জাহেল সুলভ তর্কবিতর্ক করতে পারিনা। আমাদেরকে আমাদের পথে চলতে দাও আর তোমরা তোমাদের পথে চলতে থাক। আমরা জেনে বুঝে নিজেদেরকে মংগল থেকে বঞ্চিত রাখতে পারিনা। এ ঘটনার উল্লেখ সূরায়ে কাসাসে করা হয়েছেঃ

***********************************************************

-যাদেরকে আমরা এর আগে কিতাব দিয়েছিলাম তারা এ কুরআনের উপর ঈমান আনে এবং যখন তা তাদেরকে শুনানো হয় তখন বলে, আমরা এর উপর ঈমান আনলাম। এ প্রকৃতপক্ষে সত্য আমাদের রবের পক্ষ থেকে। এর পূর্বেও আমরা এ দ্বীনে ইসলামের উপর ছিলাম। (কাসাসঃ ৫২-৫৩)

****************************************************

-যারা যখন বেহুদা কথা শুনে তখন তার থেকে কেটে পড়ে এবং বলে আমাদের কর্ম আমাদের জন্য এবং তোমাদের কর্ম তোমাদের জন্য। তোমাদের সালাম আমরা জাহেলসুলভ পন্হা অবলম্বন করতে পারিনা। (কাসাসঃ৫৫) (তাফহীম ৩য় খন্ড- কাসাস- টীকা ৭২।)

আবিসিনিয়া থেকে প্রত্যাবর্তনকারী মুহাজিরদের প্রথম তালিকা

উল্লেখ্য যে, মুহাজেরীনের একটি দল হযরত জা’ফরের (রা) সাথে আবিসিনিয়াতেই রয়ে যান এবং খায়বারের যুদ্ধের সময় ফিরে আসেন। নিম্নলিখিত মুহাজিরগণ ইবনে ইসহাকের বর্ণনা মতে বিভিন্ন সময়ে নবীর মদীনা হিজরতের পূর্বে ফিরে আসেন।

১. হযরত ওসমান (রা) ও তাঁর বিবি হযরত রুবাইয়া বিন্তে রাসূল (স)।

২. হযরত আবু হুযায়ফা বিন ওতবা বিন রাবিয়া (রা) এবং তাঁর বিবি সাহলা বিন্তে সুহাইল বিন আমর।

৩. হযরত আবদুল্লাহ বিন জাহশ (রা)

৪. হযরত ওতবা বিন গাযওয়ান (রা)

৫. হযরত যুবাইর বিন আল আওয়াম (রা)

৬. হযরত মুসআব বিন ওমাইর (রা)

৭. হযরত সুয়াইবেত বিন সা’দ বিন হামালা (রা)

৮. হযরত তুলাইব বিন ওমাইর (রা)

৯. হযরত আবদুর রহমান বিন আওফ (রা)

১০. হযরত মিকদাদ বিন আমর (রা)

১১. হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা)

১২. হযরত আবু সালামা (রা) ও তাঁর বিবি হযরত উম্মে সালামা

১৩. হযরত শাম্মাস বিন ওসমান (রা)

১৪. হযরত সালামা বিন হিশাম (রা)

১৫. হযরত আইয়াশ বিন আবি রাবিয়া (রা)

১৬. হযরত মুয়াত্তেব বিন আওফ (রা)

১৭. হযরত ওসমান বিন মাযউন (রা), তাঁর পুত্র হযরত সায়েব (রা এবং দু’ভাই হযরত কুদামা (রা) ও আবদুল্লাহ (রা)

১৮. হযরত খুনাইস বিন হুযাফা (রা)

১৯. হযরত হিশাম বিন আস বিন ওয়ায়েল (রা)

২০. হযরত আমের বিন রাবিয়া (রা) ও তাঁর বিবি লায়লা বিন্তে আবি হাসমা।

২১. হযরত আবদুল্লাহ বিন মাখযামা (রা)

২২. হযরত আবদুল্লাহ বিন সুহাইল বিন আমর (রা)। তাকে মক্কায় বন্দী করার পর তার পিতা এতো নির্মমভাবে মারপিট করে যে, প্রকাশ্যতঃ কাফের হয়ে যান কিন্তু অন্তরে অন্তরে মুসলমান। বদরের যুদ্ধে কাফেরদের সংগে গিয়ে ঠিক যু্ধের সময় মুসলমানদের সাথে মিলিত হন।

২৩. হযরত আবু সাবরা বিন আবি রুহাম (রা) ও তাঁর বিবি উম্মে কুলসূম বিন্তে সুহাইল বিন আমর।

২৪. হযরত সাকরান বিন আমর (রা), ইবনে ইসহাক ও ওয়াকেদী বলেন, তিনি মক্কায় এসে ইন্তেকাল করেন। মূসা বিন ওকবা ও আবু মা’শার বলেন, আবিসিনিয়ায় তাঁর এন্তেকাল হয়।

২৫. হযরত সাওদা বিন্তে যামায়া (রা)

২৬. হযরত সা’দ বিন খাওলা (রা)

২৭. হযরত আবু ওবায়দাহ বিন আল জাররাহ (রা)

২৮. হযরত আমর বিন হারেস (রা)

২৯. হযরত সুহাইল বিন বায়দা (রা)

৩০. হযরত আমর বিন আবি সারাহ (রা)।(পরিবর্ধন।)

সূরা রূমের ভবিষ্যদ্বাণী

আবিসিনিয়ায় হিজরত করা কালেই এমন এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে যা অবশেষে রাসূলুল্লাহ (স) ও কুরআনের সত্যতার এক অনস্বীকার্য প্রমাণ রূপে গন্য হয়। কুরআন যে প্রকৃত পক্ষে আল্লাহ তায়ালার পাক কালাম যা অহীর মাধ্যমে নবীর (স) উপর নাযিল হয়েছে এর বিরুদ্ধে কোন যক্তি পেশ করা সম্ভব ছিলনা। এ সূরায়ে রুমের প্রাথমিক কয়েকটি আয়াত ছিল যাতে বলা হয়ঃ

রোমীয়গণ নিকটবর্তী ভূখন্ডে পরাজিত হয়েছে এবং তাদের এ পরাজয়ের পর কয়েক বছরের মধ্যেই বিজয়ী হয়ে যাবে। পূর্বে ও পরে এখতিয়ার একমাত্র আল্লাহরই। আর সে এমন একদিন হবে যখন মুসলমানগ আনন্দে করবে (আয়াত ২ থেকে ৪)। এর সংক্ষিপ্ত ঘটনা আমরা বর্ণনা করছি।

নবী (স) এর নবুওতের আট বছর পূর্বের ঘটনা এই যে, রোমের বাদশাহ মরিসের (MARICE)  বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। ফলে ফোকাস (PHOCAS) নামে এক ব্যক্তি সিংহাসনে আরোহণ করে। প্রথমে সে সম্রাট মরিসের চোখের সামনে তাঁর পাঁচজন পুত্রকে হত্যা করে এবং পরে সম্রাটকেও হত্যা করে। অতঃপর পিতা পুত্রের ছিন্ন মস্তকসমূহ কসতুনতানিয়ার উন্মুক্ত স্থানে লটকিয়ে রাখে। তার কিছু দিন পর তাঁর স্ত্রী ও তিন কন্যাকেও হত্যা করে। এতে ইরান সম্রাট খসরু পারভেজ রোম সাম্রাজ্য আক্রমণ করার এক নৈতিক বাহনা পেয়ে যায়। কারণ সম্রাট মরিস তাঁর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর সাহায্যেই পারভেজ ইরানের সিংহাসন লাভ করেন। তাঁকে তিনি পিতা মনে করতেন। এর ভিত্তিতে তিনি ঘোষণা করেন, আমি বলপ্রয়োগে ক্ষমতাসীন ফোকাসের সেই অত্যাচারের বদলা নিতে চাই যা সে আামর রূপক পিতা ও তাঁর সন্তানের উপর করেছে। ৬০৩ খৃষ্টাব্দে তিনি রোমীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং কয়েক বছরের মধ্যে তিনি ফোকাসের সেনাবাহিনীকে একটির পর একটিকে পরাজিত করে একদিকে এশিয়া মাইনরের বর্তমান উরাফা পর্যন্ত এবং অপরদিকে শ্যাম দেশের হালাব ও আন্তাকিয়া পর্যন্ত বিজয়ীর দেশে পৌঁছে যান। রোমীয় সাম্রাজের উচ্চ পদস্থ ব্যক্তিগণ যখন দেখলেন যে ফোকাস দেশ রক্ষা করতে পারবেননা, তখন তাঁরা আফ্রিকার শাসকরে সাহায্য প্রার্থনা করেন। তিনি তাঁর পুত্র হেরাক্লিয়াসকে একটি শক্তিশালী সেনা রেজিমেন্টসহ কনস্টান্টিনপল পাঠিয়ে দেন। তিনি তথায় পৌঁছা মাত্র ফোকাসকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং তার স্থলে হেরাক্লিয়াসকে কায়সার তথা রোমীয় সম্রাট বানানো হয়। তিনি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ফোকাসের সাথে সেই আচরণ করা হয় যা সে মরিসের সাথে করেছিল। এ হলো ৬১০ খৃষ্টাব্দের ঘটনা এবং এ বছরেই নবী মুহাম্মদকে (স) নবুওতের মর্যাদায় ভূষিত করা হয়।

খসরু পারভেজ যে নৈতিক বাহানায় যুদ্ধ ঘোষণা করেন, ফোকাসের ক্ষমতাচ্যুতি ও হত্যার পর তা শেষ হয়ে যায়। যদি সত্যিকার অর্থে বলপূর্বক ক্ষমতা দখলকারী ফোকাসের কৃত জুলুম নিষ্পেষণের বদলা নেয়াই উদ্দেশ্য হতো, তাহলে তাকে হত্যা করার পর নতুন সম্রাটের সাথে সন্ধি করাই উচিত ছিল। কিন্তু খসরু তারপরেও যুদ্ধ চালিয়ে যান। এ যুদ্ধকে তিনি অগ্নিপূজক ও খৃষ্টীয়দের মধ্যে ধর্মীয় যুদ্ধের রঙে রঞ্জিত করেন। ইসায়ীদের যে ফের্কাগুলোকে রোমীয় সাম্রাজ্যের সরকারী গির্জা ধর্মেদ্রাহী বলে বছরের পর বছর ধরে অত্যাচার নিপীড়নের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত করছিল তারা অগ্নিপূজক আক্রমণকারীদের সহযোগী হয়ে যায়। ইহুদী সম্প্রদায়ও তাদের সাথে মিলিত হয়। খসরু পারভেজের সেনাবাহিনীতে ২০৬ হাজার ইহুদী ভর্তি হয়। হেরাক্লিয়াস এ প্লাবনের মুকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়। সিংহাসনে আরোহণের সাথে সাথে প্রথম যে সংবাদ তাঁর কাছে পৌঁছে তা এই তে ইন্তাকিয়ার উপর ইরানীদের দখল, তারপর ৬১৩ খৃষ্টাব্দে তাঁরা দামেশক দখল করেন। অতঃপর ৬১৪ খৃষ্টাব্দে বায়তুল মাকদেস দখল করে খৃষ্টীয় জগতের উপর চরম বিপর্যয় সৃষ্টি করেন। এ শহরে নব্বই হাজার ঈসায়ীকে হত্যা করা হয়, তাদের সবচেয়ে সম্মানিত গির্জা ‘কানিসাতুল কিয়ামা’ ধ্বংস করা হয়। আসল ‘ক্রস’ যে সম্পর্কে ঈসায়ীদের ধর্মীয় বিশ্বাস যে তার উপরেই মসিহ জীবন দেন, ইরানীগণ তা ছিনিয়ে নিয়ে ইরানীদের রাজধানী মাদায়েনে পৌঁছিয়ে দেন, পাদরী জাকারিয়াকেও তারা ধরে নিয়ে যায় এবং শহরে বড়ো বড়ো গির্জা ধ্বংস করা হয়। এ বিজয়ে খসরু যে পরিমাণে উম্মত্ত হন, তার অনুমান সে পত্র থেকে করা যায় যা তিনি বায়তুল মাকদেস থেকে হেরাক্লিয়াসকে লিখেছিলেন। তাতে বলা হয়-

‘সকল খোদার বড়ো, বিশ্বজগতের মালিক খসরুর পক্ষ থেকে ইতর ও অবিবেচক বান্দা হেরাক্লিয়াসের নামে’।

তুমি বল যে, তোমার নিজের রবের উপর ভরসা আছে, তাহলে কেন তোমার খোদা জেরুজালেমকে আমার হাত থেকে রক্ষা করতে পারলোনা?

এ বিজয়ের পর- এক বছরের মধ্যে ইরানী সেনাবাহিনী জর্দান, ফিলিস্তিন ও সিনাই উপত্যকায় সমগ্র অঞ্চল দখল করে মিসরে পৌঁছে যায়। এ ছিল ঠিক সে সময়েল ঘটনা যখন মক্কায় তারচেয়ে অনেক গুণে বেশী ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ তথা দ্বন্দ্ব সংঘর্ষ চলছিল। এখানে তাওহীদের পতাকাবাহী সাইয়েদুনা মুহাম্মদের (স) নেতৃত্বে এবং শির্কেল অনুসারী কুরাইশ সর্দারদের নির্দেশে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ইয়ে লিপ্ত ছিল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, ৬১৫ খৃষ্টাব্দে নবুওতের পঞ্চম বর্ষে মুসলমানদের বিরাট সংখ্যক লোক নিজেদের ঘরদোর ছেড়ে আবিসিনিয়ার ঈসায়ী রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হন। আবিসিনিয়া তখন রোমের সাথে বন্ধত্বসূত্রে আবদ্ধ ছিল। রোম সাম্রাজ্যের উপর ইরানের বিজয়ের কথা প্রত্যেকের মুখে শুনা যেতো। মক্কার মুশরিকগণ এতে আনন্দ উল্লাস করেতা। তারা মুসলমানদেরকে বলতো, দেখ, ইরানের অগ্নিপূজক মুশরিকগণ জয়লাভ করছে আর তৌহীদ রেসালতে বিশ্বাসী ঈসায়ীগণ শুধু পরাজয় বরণ করছে। এভাবে আমরা আরব পৌত্তলিক তোমাদেরকে ও তোমাদের দ্বীনকে নির্মূল করে দেব।

এ অবস্থায় কুরআনের এ সূরা নাযিল হয় এবং এ ভবিষ্যদ্বাণী করা হয় যে, নিকটস্থ ভূখন্ডে রোমীয়গণ পরাজিত হয়ে গেল। কিন্তু এ পরাজয়ের পর কয়েক বছরের মধ্যে তারা বিজয়ী হবে এবং সে এমন দিন হবে যেদিন আল্লাহ প্রদত্ত বিজয়ে মুসলমানগণ আনন্দিত হবে।

এতে একটির পরিবর্তে দুটি ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে। এক- রোমীয়গণ বিজয়ী হবে। দুই- মুসলমানগণও সে সময়ে বিজয় লাভ করবে। প্রকাশ্যতঃ দূর-দূরান্ত পর্যন্ত এর কোন আলামত নজরে পড়তোনা যে এ দুটির েোন একটি ভবিষ্যদ্বাণী কয়েক বছরের মধ্যে কার্যে পরিণত হবে। একদিকে ছিল মুষ্টিমেয় মুসলমান যাদেরকে অত্যাচার নির্যাতনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত করা হচ্ছিল। আর এ ভবিষ্যদ্বাণীর পর আট বৎসর যাবত তাদের বিজয়ের কোন সম্ভাবনা দেখা যেতোনা। অপর দিকে রোমের পরাজয় দিন দিন বেড়েই চলছিল। ৬১৯ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত সমগ্র মিসর ইরানের অধীনে চলে যায়। ইরানী সৈন্যগণ তারাবুলিসের নিকট উপনীত হয়ে নিজের পতাকা উত্তোলন করে। এশিয়া মাইনরে ইরানী সৈন্য রোমীয়দেরকে মারতে মারতে বসফোরাসের তটভূমিতে পৌঁছে যায়। ৬১৭ খৃষ্টাব্দে তারা কনস্টান্টিনপলের সম্মুখে খালেকদুন (CHALCEDON) হস্তগত করে। কায়সার খসরুরর নিকটে তাঁর প্রতিনিধি পাঠিয়ে যে কোন মূল্যে সন্ধির প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি জবাবে বরেণ, আমি কায়সারকে নিরাপত্তা দান করবনা যতোক্ষণ না সে শৃংখলাবদ্ধ হয়ে আমার সামনে হাযির হয় এবং ক্রসের খোদাকে পরিত্যাগ করে অগ্নি খোদার এবাদত কবুল না করেছে। অবশেষে কায়সার এতাটা পরাজয়মনা হয়ে পড়েন যে, তিনি কনস্টন্টিনপল পরিত্যাগ করে কার্থেজে স্থানান্তরিত হওয়ার ইচ্ছা করেন। ঐতিহাসিক গিবন বলেন, কুরআনের এ ভবিষ্যদ্বাণীর পরও সাত আট বছর অবস্থা ছিল যে, কেউ ধারণাই করতে পারতোনা যে রোম সাম্রাজ্য ইরানের উপর বিজয়ী হবে। বরঞ্চ বিজয়তো দূরের কথা সে সময়ে কেউতো এ আশাও পোষণ করতোনা যে এ সাম্রাজ্য জীবিত রয়ে যাবে (Gibbon on Decline and Fall of the Roman Empire- Vol. II P. 788, Modern Library- New York)।

কুরআনের এ আয়াতগুলো যখন নাযিল হয়, তখন মক্কায় কাফেরগণ খুব ঠাট্টা বিদ্রুপ করতে থাকে এবং উবাই বিন খালাফ হযরত আবু বকরের (রা) সাথে এ বাজি রাখলো- যদি তিন বছরের মধ্যে রোমীয়গণ বিজয়ী হয় তাহলে আমি দশটি উট দেব, নতুবা দশ উট তোমাকে দিতে হবে। নবী (স) যখন একথা জানতে পারলেন, তখন বললেন, কুরআনে- ********************** শব্দগুলো বলা হয়েছে। আরবী ভাষায় এ অর্থ দশেরকম ধরা হয়। এ জন্য দশ বছরের মধ্যে শর্ত কর এবং উটের সংখ্যা বাড়িয়ে একশ কর। অতএব হযরত আবু বকর (রা) ওবাইয়ের সাথে পুনরায় কথা বলে নতুন করে এ শর্ত করা হয় যে, উভয় পক্ষের মধ্যে যার কথা ভূল প্রমাণিত হবে তাকে একশত উট দিতে হবে।

এদিকে ৬২২ খৃষ্টাব্দে নবী (স) হিজরত করে মদীনা গমন করেন এবং অন্যদিকে হেরাক্লিয়াস চুপে চুপে কনস্টান্টিনপল থেকে কৃষ্ণ সাগরের পথে তারাবেযুনের দিকে রওয়ানা হন যেখানে তিনি পশ্চাৎ দিক থেকে ইরানের উপর আক্রমণ চালাবার প্রস্তুতি নেন। এ পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতির জন্য কায়সার গির্জাগুলোর কাছে আর্থিক সাহায্য চান এবং আর্চবিশপ সার্জিয়াস (SERGIUS) খৃষ্টধর্মকে অগ্নি পূজকদের ধর্ম থেকে রক্ষা করার জন্য গির্জাগুলোতে নজরানা হিসাবে সঞ্চিত বিপুল অর্থ সূদে কর্জ দেন। হেরাক্লিয়াস তাঁর আক্রমণ আরমেনিয়া থেকে শুরু করেন এবং পরের বছর (৬২৪ খৃঃ) তিনি আজারবাইজানে প্রবেশ করে যরদশতের জন্মস্থান উর’মিয়া ধ্বংস করেন এবং ইরানীদের সর্ববৃহৎ অগ্নি মন্দির ধূলিসাৎ করেন। খোদার কুদরতের বিস্ময়কর বহিঃপ্রকাশ দেখুন, এ ছিল সেই বছর যে বছরে বদর প্রান্তরে মুসলমান প্রথমবার মুশরিদের মুকাবেলার সিদ্ধান্তকরে বিজয় লাভ করেন। এভাবে সে দুটি ভবিষ্যদ্বাণী যা কুরআনে করা হয়েছিল দশ বছর অতিক্রান্ত হওার পূর্বেই একই সাথে কার্যে পরিণত হয়।

অতঃপর রোমীয় সেনাবাহিনী ইরানীদেরকে ক্রমাগতভাবে পরাভূত করতে থাকে। নিনওয়ার সিদ্ধান্তকর যুদ্ধে (৬২৭ খৃঃ) তাঁরা ইরান সাম্রাজ্যের মেরুদন্ড চূর্ণ করে দেন। তারপর ইরান সম্রাটের বাসস্থান দস্তগার্দ ধ্বংস করা হয় এবং রোমীয় সৈন্য সম্মুখে অগ্রসর হয়ে তইসাফুনের সম্মুখ ভাগে উপনীত হয় যা সেকালে ইরানের রাজধানী ছিল। ৬২৮ খৃষ্টাব্দে স্বয়ং খসরু পারভেজের বিরুদ্ধে আপন গৃহেই বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। তাঁকে বন্দী করা হয়। তাঁর চোখের সামনে তাঁর আঠারজন পুত্রকে হত্যা করা হয়। তাঁর এক পুত্র শেরবায়া সিংহাসনে আোহণ করে। এ বছরেই হুদায়বিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরিত হয় যাকে কুরআনে বিরাট বিজয় বলে আখ্যায়িত করা হয়। আর এ বছরেই ইরান সম্রাট রোমের সকল দখলকৃত অঞ্চল থেকে তাঁর অধিকার প্রত্যাহার করে রোমের সাথে সন্ধি করেন। ৬২৯ খৃষ্টাব্দে কায়সার মহান ক্রসকে তার স্থানে রাখার জন্য স্বয়ং বায়তুল মাকদেস যান এবং ঐ বছরেই নবী (স) ‘ওমরাতুল কাযা’ আদায় করার জন্য হিজরতের পর প্রথমবার মক্কা প্রবেশ করেন।

এর পরে কারো মনে এ সন্দেহের অবকাশ রইলোনা যে- কুরআনের ভবিষ্যদ্বাণী একেবারে সত্য ছিল। বহু মুশরিক এর উপর ঈমান আনে। উবাই বিন খালাফের ওয়ারিশগণকে হার মেনে নিয়ে শর্তের উট আবু বকরকে (রা) দিতে হয়। তিনি তা নিয়ে নবীর (স) খেদমতে হাযির হন। তিনি হুকুম দেন যে, তা সদকা করে দেয়া হোক। কারণ এ শর্ত তখন করা হয়েছিল যখন শরিয়তে জুয়া হারাম করা হয়নি। এ সময়ে হারাম হওয়ার নির্দেশ আসে। এ জন্য যুদ্ধকারী কাফেরদের নিকট থেকে শের্তের মাল গ্রহণের অনুমতি দেয়া হয় এবং তা স্বয়ং ব্যবহার না করে সদকা করতে বলা হয়। (তাফহীম ৩য় খন্ড- সূরা রূমের ভূমিকা।)

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.