সীরাতে সরওয়ারে আলম – ৫ম খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

দশম অধ্যায়

নবুওতের ৬ষ্ঠ বছরের পর থেকে দশম বছরের পর পর্যন্ত

আবিসিনিয়ায় হিজরতের পর মক্কায় নবীর (স) অনেক কম লোকই রয়ে যান যাঁদের সাথে কতিপয় মহিলাও ছিলেন। ইসলামের দুশমনগণ একে তো হিজরতের কারণে এক চরম বিব্রতকর অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল উপরন্তু তাদের অতিরিক্ত ক্ষোভের কারণ ছিল এই যে, আবিসিনিয়ায় তারা অতি নিরাপদ আশ্রয় লাভ করেছিল এবং মুশরিকদের প্রতিনিধি দল ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে এসেছিল। এ অবস্থায় তারা নবীর (স) উপর আঘাত হানতেও ইতঃস্তত করেনি। (গ্রন্হকার কর্তৃক সংযোজন।)

নবী (স) এর উপর কুরাইশদের নির্যাতন

বোখারীতে হযরত ওরওয়া বিন যুবাইয়ের এক বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আল আসকে (রা) জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি নবী (স) এর উপর মুশরিকদের সবচেয়ে নির্মম আচরণ কি দেখেছেন?

জবাবে তিনি বলেন, একদিন নবী (স) কাবার প্রাংগণে (মতান্তরে হিজরে কাবায়) নামায পড়ছিলেন। এমন সময়ে হঠাৎ ওকবা বিন আবি মুয়াইত সম্মুখে অগ্রসর হয়ে তাঁর গলায় কাপড় জড়িয়ে পাক দিতে থাকে যাতে তাঁকে শ্বাসরুদ্ধ করে মেরে ফেলা যায়। ঠিক সে সময়ে হযরত আবু বকর (রা) তথায় পৌঁছে যান। তিনি তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন। হযরত আবদুল্লাহ (রা) বলেন, হযরত আবু বকর (রা) যখন তার সাথে ধস্তাধস্তি করছিলেন তখন তাঁর মুখ দিয়ে এ কথা বেরুচ্ছিল-

********************************************

তুমি কি তাকে শুধু এ অপরাধে মেরে ফেলতে চাও যে তিনি বলেন, আমার রব আল্লাহ? ইবনে জারীর তাঁর ইতিহাসে এ ঘটনা আবু সালামা বিন আবদুর রহমানের বরাত দিয়ে বিবৃত করেছেন। কিন্তু নাসায়ী এবং ইবনে আবি হাতেম হযরত আবদুল্লাহর পরিবর্তে তাঁর পিতা আমর বিন আস থেকে কিছু শাব্দিক পরিবর্তনসহ এ ঘটনা উদ্ধৃত করেছেন এবং তাতে ওকবা বিন আবি মুয়াইতের পরিবর্তে একথা বলেছেন যে, কুরাইশের লোকেরা এ কান্ড করেছে। আর হযরত আবু বকর (রা) কাঁদতে কাঁদতে হুযুরকে (স) রক্ষা করতে এবং এ শব্দগুলো উচ্চারণ করতে থাকেন। (তাফহীম, ৪র্থ খন্ড- সূরা মুমেনর ভূমিকা।)

ইমাম বোখারী এ ঘটনা তাঁর কিতাবে কয়েক স্থানে উদ্ধৃত করেছেন। কোন স্থানে হযরত আমর বিন আস (রা) থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, কোথাও হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আস থেকে। [সঠিক এটাই মনে হয় যে, আসল বর্ণনা হযরত আমর বিন আসের (রা) এবং আবদুল্লাহ বিন আমর (রা) ৬৪ হিজরীতে এন্তেকাল করেন এবং তখন তাঁর বয়স ছিল বায়াত্তর বচর। এদিক দিয়ে দেখতে গেলে তিনি এ ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী ছিলেননা। কারণ তাঁর জন্ম হিজরতের সাত বছর পূর্বে অর্থাৎ নবুওতের ষষ্ঠ বর্ষে হয়- (গ্রন্হকার)।] এক স্থানে হযরত আমর বিন আসের বর্ণনা এমন আছে, আমি কখনো কুরাইশকে নবীকে (স) হত্যা করার ইচ্ছা পোষণ করতে দেখিনি একবার ব্যতীত। তারা কাবা ঘরের  ছায়ায় বসেছিল এবং নবী (স) মাকাকে ইব্রাহীমে নামায পড়ছিলেন। এমন সময় তারা একে অপরকে নবীর (স) বিরুদ্ধে উত্তেজিত করলো। শেষে ওকবা বিন মুয়াইত উঠলো এবং তার চাদর নবী (স) এর গলায় পেচায়ে টানতে লাগলো। অবশেসে হযুর (স) হাঁচু গেড়ে পড়ে গেলেন। ফলে লোকদের মধে শোরগোল শুরু হলো। এমন সময় হযরত আবু বকর (রা) দৌড়ে সেখানে এলেন এবং পেছন থেকে তাঁর দুটি বাহু ধরে উঠালেন এবং বলতে লাগলেন, তোমরা কি এক ব্যক্তিকে শুধু এ অপরাধের জন্য মেরে ফেলছ যে তিনি বলেন, আমার রব আল্লাহ?

তারপর লোক তাঁর নিকট থেকে চলে গেল। নামায শেষ করে যখন নবী (স) কুরাইশদের ওসব লোকের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন বললেন, কসম সেই সত্তার যার মুষ্টিতে আমার জীবন, আমি তোমাদের প্রতি জবাইসহ প্রেরিত হয়েছি। উত্তরে আবু জাহল বলে, হে মুহাম্মদ (স) তুমিতো কখনো নির্বোধ ছিলেনা (আবু ইয়ালা ইবনে হিব্বান, তাবারানী ও বায়হাকী- এ ঘটনা আমর বিন আস (রা) এর বর্ণনা থেকে উদ্ধৃত করেছেন)।

সহীহ বোখারীর আর একটি বর্ণনায় আছে যে, মুশরিকরা হুযুরের (স) দাড়ি ও মাথার চুল ছিঁড়ে ফেলে। হযরত আবু বকর (রা) তাঁর সাহায্যের জন্য এগিয়ে যান এবং কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকেন, তোমরা কিএক ব্যক্তিকে শুধু এ অপরাধে মেরে ফেলতে চাও, যিনি বলেন, আমার রব আল্লাহ?

নবী (স) বললেন, আবু বকর (রা) তাকে ছেড়ে দাও। সেই সত্তার কসম! যাঁর হাতে আমার জীবন, আমি তাদের প্রতি জবাইসহ প্রেরিত হয়েছি। একথা শুনার পর ভিড় করা লোক কেটে পড়ে।

ইবনে হিশাম, জারীর তাবারী ও বায়হাকী ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে এ ঘটনা এভাবে উদ্ধৃত করেছেন যে, ওরওয়া বিন যুবাইর হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আসকে জিজ্ঞেস করেন, কুরাইশ নবী (স) এর প্রতি যে শক্রতা প্রকাশ করতো, তার মধ্যে সবচেয়ে নির্মম ঘটনা আপনি কি দেখেছেন? তিনি বলেন, আমি একবার কুরাইশের বৈঠকে গিয়েছিলাম এবং তাদের সর্দারগণ হিজরে সমবেত হয়েছিল। তারা রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে বলে, এ ব্যক্তির ব্যাপারে আমরা যতোটা সবর করেছি এমনটি করতে আর কাউকে দেখেনি। এ আমাদের বুদ্ধিমত্তাকে নির্বুদ্ধিতা বলে গণ্য করে। আমাদের বাপদাদার নিন্দা করে, আমাদের দ্বীনেরও দোষক্রটি ধরে এবং আমাদের দলে ভাঙন সৃষ্টি করেছে। আসলে আমরা অনেক ধৈর্য ধারণ করেছি। এরপরও সে এ সব কথা বলে। এমন সময় নবী (স) কে দেখো গেল। তিনি সামনে অগ্রসর হয়ে হিজরে আসওয়াদে চুমো দিলেন। তারপর কাবায় তাওয়াফ করতে গিয়ে তাদের নিকট দিয়ে গেলেন। তারা তখন তাঁর প্রতি এক বিদ্রুপবান নিক্ষেপ করলো। আমি তাঁর মুখমন্ডলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলাম। দ্বিতীয় বার যখন তিনি তাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন পুনরায় তারা তাঁকে উপহাস করলো। এর বিরূপ প্রতিক্রিয়াও তাঁর মধ্যে দেখলাম। তৃতীয়বার যখন তারা একই আচরণ করলো তখন তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, হে কুরাইশের লোকেরা শুনে রাখ, কসম সেই সত্তার যাঁর হাতে আমার জীবন রয়েছে, আমি তোমাদের নিকটে জবাইসহ এসেছি।

আবদুল্লাহ বিন আমর (রা) বলেন, নবীর (স) এ কথায় তারা সকলে হতভম্ব হয়ে পড়লো। এমন মনে হচ্ছিল যে, তাদের মাথার উপরে যেন পাখী বসে আছে অর্থাৎ তারা যেন বজ্রাহত। তাপর তাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশী বাড়িয়ে কথা বলছিল, সে নবীকে (স) শান্ত করার জন্য ভদ্রভাবে কথা বলে। সে বলে, হে আবুল কাসেম। ভালোভাবে চল। খোদার কসম, তুমিতো কখনো নির্বোধ ছিলেনা। হুযুর (স) সেখান থেকে ফিরে গেলন।

পরদিন তারা আবার হিজরে সমবেত হয় এবং আমিও তাদের সাথে ছিলাম। তারা নিজেদের মধ্যে বলল, তোমাদের স্মরণ আছে কি যে, এ লোকটি তোমাদের ব্যাপারে কতটা বাড়াবাড়ি করছে? এমন কি সে কথাও গতকাল পরিষ্কার বলে দিয়েছে। এরপরও তোমরা তাকে ছেড়ে দিয়েছ। এমন সময়ে হুযুরকে (স) সম্মুখ দিক থেকে আসতে দেখা গেল। তাঁর আসার সাথে সাথে সকলে তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাকে ঘিরে ধরে বলতে থাকে, তুমিই তো এই এই কথা বলে থাক? তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমি সে ব্যক্তি যে এই এই কথা বলে। এমন সময় দেখলাম তাদের মধ্যে একজন হুযুরের (স) চাদর গলার কাছ থেকে ধরে ফেলে এবং মুষ্টির মধ্যে চেপে ধরে। তারপর আবু বকর (রা) তাঁর সাহায্যের জন্য উঠে পড়েন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকেন, তোমরা কি এক ব্যক্তিকে শুধু এ অপরাধে মেরে ফেলতে চাও যিনি বলেন- আমার রব আল্লাহ?

তারপর লোকেরা তাঁকে ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। এ হচ্ছে বড্ডো কঠিন ও নির্মম আচরণ যা আমি রাসূলূল্লাহর (স) সাথে কুরাইশকে করতে দেখেছি (মুসনাদে আহমদেও এ কাহিনী এভাবে বর্ণিত আছে।)

হযরত হামযার (রা) ইসলাম গ্রহণ

সে সময়েই একদিন এমন এক ঘটনা ঘটে যা হযরত হামযাকে (রা) ইসলামের গন্ডির মধ্যে টেনে আনে। তাঁর ইসলাম গ্রহণের তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। ইবনে হাজার ইসাবাতে নবুওতের দ্বিতীয় বৎসর লিখেছেন। ইবনে আবদুল বারর প্রথমে উক্ত দ্বিতীয় বর্ষ লেখার পর পুনরায় লেখেন যে, তিনি নবুওতের ষষ্ঠ বর্ষে হুযুরের (স) দারুল আরকামে প্রবেশ করার পর মুসলমান হন। কিন্তু ইবনে সা’দ, ইবনুল জুযী এবং আলউতাবী নিশ্চয়তার সাথে নবুওতের ষষ্ঠ বছর বলেছেন, ইবনুল কাইয়েমও যাদুল মায়াদে হাবশার দ্বিতীয় হিজরতের পর উল্লেখ করেছেন, আর এ কথাই ইবনে কাসীরের তারিখুল কামেলে আছে। উপরন্তু যে ঘটনা হযরত হামযার (রা) ইসলাম গ্রহণের কারণ ছিল তা স্বয়ং এ কথা প্রকাশ করে যে, তা নবুওতের দ্বিতীয় বছর হতে পারেনা। বরঞ্চ কুরাইশ এবং নবীর (স মধ্যে সংঘাত চরমে পৌঁছার পরই তা সংঘটিত হওয়া সম্ভব ছিল, দ্বিতীয় বর্ষে আবু জাহলের কি সাধ্য ছিল যে নবীকে গালি দেয়তো দূরের কথা, তাঁর চোখে চোখ রেখে কথা বলে।

ঘটনা এই যে, একদিন নবী (স) (ইবনে ইসহাকের বর্ণনা মতে) সাফা পাহাড়ের নিকট দিয়ে মতান্তরে হাজুনের নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। এমন সময় আবু জাহল তাঁকে খুব গালি গালাজ করে। তাঁর এবং তাঁর প্রচারিত দ্বীন সম্পর্কেও কটু কথা প্রয়োগ করে। কিন্তু তিনি তার কোন কথারই জবাব দেননা। আর খবরটি ইবনে ইসহাকের বর্ণনা মতে আবদুল্লাহ বিন জুদআমের (বনী তাইয়েমর একজন প্রধান) আযাদ করা দাসী, অন্যান্যের মতে হযরত হামযার (রা) ভগ্নি হযরত সাফিয়া (রা) এবং ইবনে আবি হাতেমের বর্ণনা মতে দুজন মহিলা হযরত হামযাকে (রা) পৌঁছিয়ে দেন। তিনি কুরাইশের একজন শক্তিশালী, সাহসী ও আত্মমর্যদাশীল বীর পুরুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন হুযুরের (স) চাচা এবং দুধ ভাই। তাঁর মা বিবি আমেনার চাচাতো ভগ্নি ছিলেন। বয়সে হুযুরের দু’চার বছর বড়ো ছিলেন। হুযুরকে (স) তিনি খুবই ভালোবাসতেন। শিকারের বড়ো সখ ছিল। তীর ধনুক নিয়ে ফিরছিলেন এমন সময় এ ঘটনা শুনতে পেলেন। ক্রোধে অধীর হয়ে  হেরেমে পৌঁছেন যেখানে আবু জাহল বসেছিল। পৌঁছার সাথে সাথেএমন জোরে ধনুক দিয়ে মাথায় আঘাত করেন যে, মাথা ফেটে যায়। বলেন, তুমি তাঁকে গালি দাও? আমিএ তাঁর দ্বীনে রয়েছি এবং তাই বলি যা তিনি বলেন। তোমার সাহস থাকে তো একবার আমাকে গালি দিয়ে দেখ।

এতে নবী মাখযুমের কিছু লোক আবু জাহলের সমর্থনে দাঁড়িয়ে গেল। কিন্তু আবু জাহল বলল, আবু উমারাকে যেতে দাও। আমি সত্যিই তার ভাতিজাকে খারাপ গালি দিয়েছিলাম। তাবারানী ও এবনে হাতেম বলেন, হযরত হামযা (রা) বলেন, আমার দ্বীনও মুহাম্মদের (স) দ্বীন, তোমরা পারতো আমাকে তার থেকে নিবৃত্ত রাখো।

মাগাযী গ্রন্হ প্রণেতা ইউনুস বিন বুকাইর ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে অতিরিক্ত বিশদ বিবরণ এ দিয়েছেন যে, হযরত হামযা (রা) আত্মমর্যাদার আবেগে অভিভূত হয়ে এ কাজটি করলেন বটে। কিন্তু বাড়ি যাওয়ার পর তাঁর মন তাকে এরূপ ভর্ৎসনা করলোঃ তুমি কুরাইশের সর্দার, দ্বীন পরিত্যাগকারী এ ব্যক্তির অনুসারী হয়ে গেলে এবং বাপদাদার দ্বীন পরিত্যাগ করলে? যা করেছ তারপর তার থেকে মৃত্যুই তোমার জন্য শ্রেয়ঃ

তারপর তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, হে খোদা! এ যদি সঠিক পথ হয় তাহলে এর সত্যতা আমার মনে প্রবিষ্ট করে দাও। নতুবা তার থেকে বেরুবার কোন পথ আমার জন্য করে দাও। শয়তানী আসঅসায় সমস্ত রাত্রি তাঁর চরম উদ্বিগ্নতা ও অশান্তিরতে কাটলো। সকাল বেলা হুযুরের (স) কাছে গিয়ে বললেন, ভাইপো! আমি এমন এক ব্যাপারে জড়িয়ে পড়েছি যার থেকে বেরিয়ে আসার কোন উপায় দেখছিনা। আামার মতো লোকের এমন এক বিষয়ের উপর কায়েম থাকা যা সঠিক অথবা বেঠিক হওয়া সম্পর্কে আমার জানা নেই, এ অত্যন্ত মারাত্মক।

হুযুর (স) তাঁর কথা শুনার পর তাকে উপদেশ দেন,খোদার ভয় দেখান এবং ঈমান আনার জন্য সুসংবাদ দেন। অবশেষে আল্লাহ তাঁর দিলে ঈমান পয়দা করে দেন এবং হযরত হামযা (রা) বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি সত্যবাদী। এ ঘটনা বায়হাকী ও ইউনুস বিন বুকাইরের বরাত দিয়ে উদ্ধৃত করেছেন।

হযরত ওমরের (রা) ইসলাম গ্রহণ

তারপর কুরাইশের প্রতি দ্বিতীয় এবং বিরাট মারাত্মক আঘাত এ ছিল যে, তারা একদিন জানতে পারে যে, ওমর বিন খাত্তাবও নবীর (স) প্রতি ঈমান এনেছেন। কুরাইশের ইসলাম বিরোধিতার স্তম্ভগুলোর মধ্যে তিনি একটি স্তম্ভ ছিলেন। ঈমান আনয়ন কারীদের উপর জুলুম নির্যাতনে তাঁর অগ্রণী ভূমিকা ছিল। কুরাইশের নিকটে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ মর্যাদা ছিল। আরবের কুলপুঞ্জী বিদ্যার প্রখ্যাত পন্ডিত তিনি ছিলেন। কুরাইশের পক্ষ থেকে দূতরূপেও তাঁকে পাঠানো হতো। উপজাতিদের মধ্যে ঝগড়া বিসংবাদে তাঁকে সালিসী মানা হতো এবং তাঁর ফয়সালা মেনে নেয়া হতো তিনি ছিলেন শক্তিশালী ও সাহসী বীর। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বাকপটু ও সুবক্তা এবং শ্রোতাদেরকে করতে পারেতন মন্ত্রমুগ্ধ। কুরাইশ এ ধারণাই করতে পারেনি যে, তাঁর মতো লোক একদিন ইসলামের পতাকাবাহী রূপে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। কিন্তু ক্রমশঃ অগ্রগমনশীল এক কর্মধারা তাঁর মধ্যে ক্রিয়াশীল ছিল যা অবশেষে তাঁকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করে।(গ্রন্হকার কর্তৃক সংযোজন।)

তাঁর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া

তাঁর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া মুসনাদে আহমদে ও তাবারানীতে তাঁর বর্ণনা থেকেই উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ইসলাম গ্রহণের পূর্বে একদিন রাসূলূল্লাহকে (স) বিব্রত করার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বেরুলাম। কিন্তু আমার পূর্বেই তিনি হেরেমে প্রবেশ করেছিলেন। আমি যখন পৌঁছি তখন তিনি নামাযে সূরা আল হাক্কা পড়ছিলেন। আমি তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে গেলাম এবং শুনতে লাগলাম। কুরআনের বাকমর্যাদায় আমি বিস্ময়বোধ করছিলাম এবং আমার মধ্যে হঠাৎ এ ধারণা হলো যে এ ব্যক্তি নিশ্চয়ই একজন যাদুকর যেমন কুরাইশ বলে থাকে। তৎক্ষণাৎ হুযুরের (স) মুখ থেকে একথাগুলো বেরুলো-

*************************************************************

-এ এক সম্মনিত রাসূলের কথা, কোন কবির কথা নয়। তোমরা অতি অল্প ঈমানই আন (আয়াতঃ ৪০-৪১)

আমি মনে মনে বললাম, এ ব্যক্তি কবি না হলে, গণকতো বটে। তক্ষুণি তাঁর মুখ থেকে এ কথা বেরুলো-

***********************************

-আর না এ কোন গণকের কথা। তোমরা কম চিন্তাভাবনা কর।

*******************************************

-এ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।

এ শুনার পর আমর মনের গভীরে ইসলাম প্রবেশ করলো। (গ্রন্হকার কর্তৃক পরিবর্ধন।)

তাঁর মনে হিজরতে হাবশার প্রতিক্রিয়া

তাঁর দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়া ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে ইবনে হিশাম সীরাতে, তাবারী, তাঁর ইতিহাসে, ইবনে আসীল উসদুল গাবায়- হযরত লায়লা বিন্তে আবি হাসমার বর্ণনা থেকে উদ্ধৃত করেছেন। ইনি ছিলেন হযরত ওমরের (রা) নিকট আত্মীয়া এবং তাঁর স্বামী হযরত আমের বিন রাবিয়াতুল আনযীর সাথে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। তিনি বলেন, আমি হিজরতের জন্য মালপত্র বাঁধছিলাম এবং আমার স্বামী কোন কাজে বাইরে গিয়েছিলেন। এমন সময়ে ওমর (রা) এলেন এবং তখনো তিনি শির্কের মধ্যে লিপ্ত ছিলেন। আমরা তাঁর হাতে অনেক নির্যাতন ভোগ করেছি। কিন্তু সে সময়ে তিনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার কর্মব্যস্ততা দেখছিলেন। তারপর বললেন, আবদুল্লাহর মা, তাহলে কি চলেই যাচ্ছ?

বললাম, হ্যাঁ, তোমরা যখন আমাদের বড়ো জ্বালাতন করলে, আমাদের উপর জুলুম করলে তখন আমরা খোদার যমীনে কোথাও বেরিয়ে পড়বো যেখানে খোদা আমাদেরকে এ বিপদ থেকে বাঁচার কোন পথ বের করে দেবেন। এতে ওমর (রা) বললেন, আল্লাহ তোমাদের সাথে থাকুন। তাঁকে সে সময়ে এমন অশ্রু গদগদ দেখেছিলাম যা পূর্বে কখনো দেখিনি। আমাদের দেশ ত্যাগ করা  দখে তিনি অতি ক্ষুণ্ন মনে চলে যান।

তারপর আমের যখন আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে ফিরে এলেন তখন আমি বললাম, আবদুল্লাহর আব্বা! হায়রে তুমি যদি এ সময়ে ওমরকে এবং আমাদের অবস্থার জন্য তার বেদনা কাতর চেহারা দেখতে। এই একটু পূর্বেই সে এখান থেকে চলে গেল। আমের বললেন, তুমি কি তার মুসলমান হওয়ার আশা কর? বললাম- হ্যাঁ। তিনি বললেন, যাকে তুমি এখন দেখেছ, সে ততোক্ষণ পর্যন্ত মুসলমান হবেনা যতোক্ষণ না খাত্তাবের গাধা মুসলমান হয়।

তাঁর ইসলাম গ্রহণের কাহিনী

এ মানসিক দ্বন্দ্ব অবশেষে একদিন রাসূলুল্লাহকে (স) হত্যা করার জন্য তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে যাতে এ দ্বন্দের সমাপ্তি ঘটে যার মধ্যে তিনি নিমজ্জিত আছেন। ইবনে ইসহাক বলেন, তিনি এ উদ্দেশ্যে মুক্ত তরবারী হাতে বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু পথের মধ্যে নুয়াইম বিন আবদুল্লাহ আল্লাখ্যামের সাথে দেখা হয়ে গেল। তিনি হযরত ওমরের (রা) গোত্রেরই অন্যতম সম্ভান্ত ব্যক্তি ছিলেন যিনি গোপনে মুসলমান হয়েছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করেন, কোথায় যাচ্ছ? বলেন, আমি এ সাবীকে (ধর্ম ত্যাগীকে) হত্যা করতে চাই যিনি কুরাইশের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি করেছেন। আমাদের সবাইকে আহমকে গণ্য করেন, আমাদের দ্বীনের ক্রটি বের করেছেন এবং আমাদের মা’বুদদের গালমন্দ করেন। নুয়াইম বলেন, খোদার কসম! হে ওমর, তোমার মন তোমাকে প্রতারণার জালে আবদ্ধ করেছে। তুমি কি মনে কর যে, মুহাম্মদের (স) হত্যার পর বনী আবদে মনাফ তোমাদেরকে জীবিত রাখবে? তুমি প্রথমে তোমার আপন ঘরের লোকদের খবর তো নিয়ে দেখ। হযরত ওমর (রা) বলেন, আমার কোন আপন ঘরের লোকদের কথা বলছ? নুয়াইম বলেন, তোমার ভগ্নিপতি ও চাচাতো ভাই সাঈদ বিন যায়দ এবং ভগ্নি ফাতেমা। তারা উভয়ে মুসলমান হয়েছে। তারা মুহাম্মদের (স) আনুগত্য গ্রহণ করেছে। হযরত ওমর (রা) উল্টা দিকে ফিরে সোজা তাঁর ভগ্নির বাড়ি পৌঁছের। সেখানে খাব্বাব বিন আল আরাত উপস্থিত ছিলেন এবং তার হাতে একটি সহীফা ছিল যাতে সূরা ‘তা-হা’ লেখা ছিল। তিনি হযরত ফাতেমাকে তা শিক্ষা দিতেন। ওমরের (রা) আগমন টের পেয়ে খাব্বার ঘরের এক কোণে লুকিয়ে থাকেন। হযরত ফাতেমা সে সহীফা উরুর তলায় দাবিয়ে রাখেন। কিন্তু হযরত ওমর দরজা থেকেই হযরত খাব্বাবের কেরাত শুনতে পান। তিনি ভেতরে প্রবেশ করে বলেন, এ গুন গুন করে তোমরা কি বলছিলে যা আমি শুনতে পেলাম। সাঈদ বলেন, তুমি কিছুই শুননি। তিনি বলেন, না আমি শুনেছি। খোদার কসম, আমি জানতে পেরেছি তোমরা উভয়ে মুহাম্মদের (স) দ্বীনের আনুগত্য কবুল করেছ। তারপর তিনি ভগ্নিপতিকে মারতে থাকেন। হযরত ফাতেমা স্বামীকে বাঁচাবার জন্য অগ্রসর হলে তাঁকেও এমনভাবে মারা হয় যে, মাথা ফেটে যায়। তখন মিয়া-বিবি উভয়ে বলেন, হ্যাঁ, আমরা মুসলমান হয়েছি এবং আল্লাহর রাসূলের উপর ঈমান এনেছি। তুমি এখন যা খুশী কর। হযরত ওমর (রা) যখন ভগ্নির রক্ত ঝরতে দেখেন তখন তাঁর এ আচরণের জন্য লজ্জিত হন এবং আপন অজ্ঞতা থেকে ফিরে আসেন। তিনি ভগ্নিকে বলেন, সে সহীফা আমাকে দেখাও যা একটু আগে তোমরা পড়ছিলে। দেখি সে জিনিস কি যা মুহাম্মদ (স) এনেছে। হযরত ওমর (রা) শিক্ষিত লোক ছিলেন। এ জন্য তিনি তা পড়তে চাইছিলেন। তাঁর ভগ্নি বলে, আমার ভয় হচ্ছে, কি জানি তুমি তা নষ্ট করে না ফেল। তিনি বলেন, সে ভয় করোনা। তিনি তাঁর মা’বুদের কসম করে বলেন যে, তা পড়ে ফেরৎ দেবেন। এখন তাঁর ভগ্নির মনে কিছুটা আশার সঞ্চার হলো যে, তিনি মুসলমান হয়ে যাবেন। তিনি বললেন, ভাই, তুমি শির্কের কারণে নাপাক আর এ সহীফাকে শুধুমাত্র পাক লোকই স্পর্শ করতে পারে। এতে হযরত ওমর (রা) উঠে গোসল করে এলেন। তখন ফাতেমা সহীফা তাঁর হাতে দিলেন। তিনি সূরা ‘তা-হা’র প্রাথমিক অংশ পড়ে বললেন, কত সুন্দর ও উচ্চমানের কালাম! হযরত খাব্বাব (রা) তাঁর এ কথা শুনা মাত্র বের হয়ে এলেন এবং বললেন, হে ওমরঙ আশা করি আল্লাহ তোমাকে নবীর দোয়ার উপযোগী বানাবার জন্য বেছে নিয়েছেন। আমি গতকালই নবীকে (স) এ দোয়া করতো শুনেছি, হে খোদা! আবুল হাকাম বিন হিশাম (আবু জাহল) অথবা ওমর বিন খাত্তাবের দ্বারা ইসলামের সাহায্য কর। অতএব হে ওমর! আল্লাহর দিকে এসো, আল্লাহর দিকে এসো।

হযরত ওমর (রা) বলেন, আমাকে মুহাম্মদের (স) নিকেট নিয়ে চল। যাতে আমি মুসলমান হয়ে যাই। হযরত খাব্বাব (রা) বললেন, তিনি সাফার নিকেট একটি বাড়িতে (দারে আরকাম) তাঁর সংগীসাথীসহ রয়েছেন। হযরত ওমর (রা) তরবারী কোমরে বেঁধে হুযুর (রা) এবং তাঁর সাহাবীদের বাসস্থানে পৌঁছেন এবং দরজায় আঘাত করেন। হুযুরের একজন সাথী দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলেন যে ওমর (রা) তরবারীসহ দাঁড়িয়ে। তিনি ভয়ে ফিরে গিয়ে হুযুরকে (স) এ সংবাদ দেন। হযরত হামযা (রা) বলেন, তাকে আসতে দও। যদি নেক নিয়তে এসে থাকে তো আমরাও নেক আচরণ করব। নতুবা তার তরবারী দিয়েই তাকে খতম করব। হুযুর (স) বলেন, তাকে আসতে দাও। নির্দেশ অনুযায়ী হযরত ওমরকে (রা) ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হলো। তিনি আসা মাত্র হুযুর (স) সামনে অগ্রসর হয়ে তাঁর চাদর মুষ্টির মধ্যে চেপে ধরে সজোরে টানলেন এবং বললেন, ইবনে খাত্তাব! কি মনে করে এখানে এলে? খোদার কসম, আমি মনে করি তুমি ফিরে আসবেনা যতোক্ষণ না আল্লাহ তোমার উপর কঠিন বিপদ নাযিল না করেন। হযরত ওমর (রা) বলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর এবং রাসূলের আনীত শিক্ষঅর উপর ঈমান আনার জন্য হাযির হয়েছি। এ কথায় হুযুর (স) উচ্চস্বরে ‘আল্লাহু আকবার’ বলেন যার ফলে বাড়ি শুদ্ধ লোক জেনে ফেলেন যে, ওমর মুসলমান হয়েছেন। এতে মুসলমানদের বিরাট সাহস বেড়ে যায় যে, হযরত হামযার (রা) পরে হযরত ওমরও (রা) মুসলমান হয়েছেন। এখন এ দুজন মুসলমানদের জন্য শক্তি স্তম্ভ হয়ে পড়েন। ইবনে ইসহাক বলেন, হযরত ওমরের (রা) ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে এ মদীনাবাসী রাবীগণের বর্ণনা। হাফেজ আবু ইয়া’লা তা হযরত আনাস বিন মালেক (রা) থেকে বর্ণনা করেন এবং বাযযার স্বয়ং ওমর (রা) থেকে।

হযরত ওমরের (রা) বর্ণনা

বাযযার, তাবারানী, বায়হাকী, ইবনে আসাকের, আবু নুয়াইম, দারকুতনী প্রমুখ সীরাত লেখকগণ হযরত ইবনে আব্বাস (রা), আনাস বিন মালেক (রা), আসলাম প্রমুখ থেকে এবং স্বয়ং ওমরের (রা) নিজস্ব বর্ণনাও এ সম্পর্কে উদ্ধৃত করেছেন, যা বিশদ বিবরণে কিছু মতপার্থক্যসহ ইবনে ইসহাকের উপরোক্ত বর্ণনার সাথে অনেকটা মিলে যায়। অবশ্যি আবু নুয়াইম ও ইবনে আসাকের হযরত ওমরের (রা) বিবৃতির যে বর্ণনা হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে উদ্ধৃত করেছেন, তাতে অতিরিক্ত বলা হয়েছে যে, হযরত ওমর (রা) বলেন, আমি আরজ করলাম- হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত নই, মরি আর বাঁচি? নবী (স) বলেন, খোদার কসম, মর আর বাঁচ তোমরা হকের উপর রয়েছ। বললাম, তাহলে গোপন করার কি প্রয়োজন? আমরা যখন হকের উপর এবং তারা বাতিলের উপর, তাহলে আমরা নিজেদের দ্বীন লুকিয়ে রাখব কেন?

হুযুর (স) বললেন, হে ওমর! আমরা সংখ্যায় খুব কম। আর তুমি দেখছ যে, আমরা কোন অবস্থার মধ্য দিয়ে চলছি।

“আমি বললাম, সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে হকের সাথে নবী করে পাঠিয়েছেন, আমি এমন মজলিস ছাড়বনা যেখানে পূর্বে কুফরের সাথে বসতাম এবং এমন ইসলামের সাথে বসবনা”।

“তারপর আমরা দুই ভাগ হয়ে বেরুলাম। একটিতে আমি এবং দ্বিতীয়টিতে হামযা (রা)। অবশেষেআমরা মসজিদে হারামে প্রবেশ করলাম, কুরাইশ যখন আমাদেরকে দেখলো তখন তারা এমন মর্মাহত হলো যে, পূর্বে তা কখনো হয়নি। এ ঘটনা ইবনে মাজা, হাকেম ও ইবনে সাদ বিভিন্নভঅবে উদ্ধৃত করেছেন। ইবনে হিশাম হযরত ওমরের (রা) এ বিবৃতি উদ্ধৃত করেছেন যাতে ওমর (রা) বলেন, যেদিন আমি ইসলাম গ্রহন করি সে রাতেই আমার মনে পড়লো যে, যে ব্যক্তি নবীর (স) সবচেয়ে বড়ো দুশমন তাকে আমার ইসলাম গ্রহণের খবর দেয়া উচিত। সুতরাং আমি সোজা আবু জাহলের বাড়ি গিয়ে দরজায় আঘাত করলাম। সে বের হয়ে আমাকে দেখে বলল, খোশ আমদেদ! আমার ভাইপো, কি মনে করে এলে?

বললাম- এ খবর দিতে এলাম যে আমি মুসলমান হয়েছি। সে বলল- তোমার ও তোমার এ খবরের পরিণাম খারাপ হোক। তারপর সে দরজা বন্ধ করে দেয়।

ইবনে ওমরের (রা) বর্ণনা

ইবনে ইসহাক নাফের বরাত দিয়ে হযরত আবদুল্লাহ বিন ওমরের (রা) বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন যে, ইসলাম গ্রহণের পর হযরত ওমর (রা) জিজ্ঞেস করেন, কুরাইশের মধ্যে কে সবচেয়ে বেশী সংবাদ ছড়াতে পারে? বলা হলো- জামিল বিন মা’মার বিন হাবিব আল জুমাহী। হযরত ওমর (রা) তার সন্ধানে বেরুলেন এবং আমিও তাঁর পেছনে চললাম। সে সময়ে আমার বয়স এমন ছিল যে, যা কিছু দেখতাম তা বুঝতে পারতাম। [ইবনে সা’দ হযরত আবদুল্লাহ বিন ওমরের (রা) বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন- তাতে তিনি বলেন, আমি তখন ছ’বছরের ছিলাম। হাফেজ ইবনে হাজার ফতহুল বারীতে বলেছেন- তাঁর বয়স তখন ছিল পাঁচ বছর (গ্রন্হকার)।] হযরত ওমর (রা) গিয়ে তাকে বললেন, আমি মুসলমান হয়েছি এবং দ্বীনে মুহাম্মদ গ্রহণ করেছি। সে কোন কথা বললোনা। সে তার চাদর মাটিতে ছেঁচড়িয়ে বেরিয়ে পড়লো। হযরত ওমর তাঁর পেছনে এবং তার পেছনে আমি চললাম। মসজিদে হারামের দরজায় পৌঁছে সে চিৎকার করে বলতে লাগলো, কুরাইশের লোকেরা! কুরাইশ সর্দারগণ তখন কাবার ধারে বৈঠকে ছিল। তারা তার আওয়াজ শুনে সেদিকে মনোযোগ দিল। সে বলল, শুনো, ওমর দ্বীন থেকে ফিরে গেছে। হযরত ওমর (রা) পেছন থেকে উচ্চস্বরে বলে, মিথ্যা কথা বলছে। আমি মুসলমান হয়েছি এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (স) তাঁর বান্দা ও রাসূল।

তারপর লোক তাঁকে মারতে শুরু করে এবং তিনিও তাদেরকে মারতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত বেলা দুপুর হয়ে যায়। হযরত ওমর (রা) ক্লান্ত হয়ে বসে পড়েন। লোক চার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল এবং তিনি বলছিলেন, তোমাদের যা ইচ্ছা কর। এমন সময় কুরাইশের জনৈক মুরুব্বী ব্যক্তি সম্মুখে অগ্রসর হয়ে সমবেত লোকদের জিজ্ঞেস করলেন, কি ব্যাপার কি?

তারা বলল, ওমর দ্বীন থেকে ফিরে গেছে। তিনি বললেন, তাতে কি হয়েছে? একজন যা কিছু চাচ্ছিল তাই করেছে। এখন তোমরা কি চাও? তোমরা কি চাও যে বনী আদী এভাবে তার লোককে তোমাদের হাতে ছেড়ে দেবে? সরে যাও তার কাছ থেকে। তখন তারা সরে পড়লো। পরে আমি আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করি, তিনি কে ছিলেন?

তিনি বললেন, পুত্র, তিনি ছিলেন আস বিন ওয়ায়েল সাহমী- অর্থাৎ আমর বিন আল আস-এর পিতা । তাবারানী ও বাযযার ইবনে ওমরের (রা) এ বর্ণনা সংক্ষেপে উদ্ধৃত করেছেন।

বোখারীতে হযরত আবদুল্লাহ বিন ওমরের (রা) এরূপ বর্ণনা আছে যে, যখন হযরত ওমর (রা) আপন গৃহে ভীত সন্ত্রস্থ অবস্থায় বসে ছিলেন তখন আস বিন ওয়ায়েল (জাহেলিয়াতের যুগে আমাদের মিত্র পক্ষীয় ছিলেন) তাঁর কাছে এলেন এবং বললেন, এমন বিষণ্ন বদনে বসে আছ কেন? তিনি বলেন, তোমার কওম আমাকে হত্যা করতে চায়। কারণ আমি মুসলমান হয়েছি। তিনি বলেন, কেউ তোমার গায়ে হাত দিতে পারবেনা, আমার পক্ষ থেকে যখন তোমাকে নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে। তারপর আস যখন বাইরে বেরুলেন তখন দেখলেন উপত্যকায় মানুষের ভিড়ে জমজমাট। তিনি বললেন, তোমরা কি চাও? জবাবে তারা বললেন, আমরা ইবনে খাত্তাবের খবর নিতে চাই যে, দ্বীন থেকে বিমুখ হয়েছে। তিনি বললেন, ওমরের গায়ে কেউ হাত দিতে পারবেনা। তখন তারা সব ফিরে চলে গেল।

ওমরের (রা) ইসলাম গ্রহণের তারিখ

হযরত ওমরের (রা) ইসলাম গ্রহণের ঘটনা নবুওতের ষষ্ঠ বর্ষে সংঘটিত হয়। যেমন ইমাম নওয়াদী ‘তাহযীবুল আসমা ওয়াল্লোগাতে’ এবং মোল্লা আলী কারী ‘আরবাইনে নাওয়াদীর’ ব্যাখ্যায় লিখেছেন। কেউ কেউ বলেন, তিনি হযরত হামযার (রা) মুসলমান হওয়ার তিন দিন পর ঈমান আনেন। কেউ কেউ বলেন, তিন মাস পর। কিন্তু আবু নুয়াইম ইসফাহানী হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের (রা) এ বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন যে, তিনি বলেন, আমি স্বয়ং হযরত ওমরকে (রা) তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। জবাবে তিনি বলেন, আমি হযরত হামযার (রা) মুসলমান হওয়ার তিন দিন পর বেরিয়েছিলাম। ইবনে সা’দ হযরত ওমরের (রা) ভৃত্য আসলামের বরাত দিয়ে বলেন যে, এ ছিল নবুওতের ষষ্ঠ বর্ষের যিলহজ্ব মাসের ঘটনা। কিন্তু সম্ভবতঃ এ তার বেশ আগের ঘটনা। মসহায়লী বলেন, সে সময়ে রাসূলূল্লাহর (স) সাথে চল্লিশের কিছু বেশী লোক ছিলেন।ওয়াহেদী এর উপর অতিরিক্ত দশজন নারীর কথা বলেছেন। কিন্তু হাফেজ ইবনে হাজার ‘মুনাকেবে ওমরে’ ইবনে আবি খায়সামার বরাত দিয়ে হযরত ওমরের (রা) এ উক্তি উদ্ধৃত করেন যে, রাসূলূল্লাহর সাথে ৩৯ জন লোক ছিলেন, আমাকে দিয়ে ৪০ জন হয়। সম্ভবতঃ সে সময়ে হযরত ওমর (রা) এতো সংখ্যক লোকের কথাই জানতেন। কারণ বহু মুসলমান তাঁদের ঈমান গোপন রেখেছিলেন।

‘শিয়াবে আবি তালেবে’ অবরুদ্ধ অবস্থায়

এ সময়ে ইসলাম ও নবীর (স) উপর কুরাইশের ক্রোধ দিন দিন বেড়েই চলছিল। তারা দখেছিল যে তাদের সকল চেষ্টা সত্ত্বেও মক্কা শহরেও ভেতরে ভেতরে ইসলাম প্রসার লাভ করছিল। বাইরের গোত্রের লোকও একের পর এক মুসলমান হচ্ছিল। তারপর এ ব্যাপারটি শুধু আরব দেশেই সীমিত ছিলনা। বরঞ্চ আবিসিনিয়া পর্যন্ত তার মূল বিস্তার লাভ করে। নাজ্জাশী প্রকাশ্যে মুসলমানদের সমর্থক হয়ে পড়েন। সেখান থেকে ইসলাম গ্রহণ করারজন্য নবীর (স) নিকটে প্রতিনিধি দল আসতে থাকে। উপরন্তু তাদের ক্রোধাগ্নিতে এ জিনিস ঘৃত নিক্ষেপ করছিল যে, হযরত হামযা (রা) ও হযরত ওমরের (রা) মতো বীর ও প্রভাবশালী সর্দারগণের মুসলমানদের দলে শামিল হওয়ার ফলে ওসব মুসলমানদের হিম্মৎ সাহস বেড়ে যায়- যাঁরা হিজরতে হাবশার পর মক্কায় রয়ে গিয়েছিলেন। ইবনে আবি শায়বা ও তাবারানী হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদের (রা) এ উক্তি উদ্ধৃত করেন- খোদার কসম, আমরা বায়তুল্লাহর পার্শ্বে নামায পড়তে পারতাম না যতোক্ষণ না হযরত ওমর (রা) মুসলমান হয়েছেন। বোখারীতে সেই ইবনে মাসউদের (রা) এ উক্তি উদ্ধৃত আছে-

***************************************

-ওমরের (রা) মুসলমান হওয়ার পর থেকে আমরা বরাবর শক্তিশালীই ছিলাম।

এ কারণসমূহ একত্রে মিলে অবশেষে কুরাইশের জাহেলিয়াতকে এতোটা উত্তেজিত করে দেয় যে, তারা সর্বসম্মতিক্রমে একটি দলিল রচনা করে যাতে আল্লাহর কসম করে এ শপথ গ্রহণ করে যে, যতোক্ষণ পর্যন্ত তাদের সাথে মেলামেশা, বিয়ে-শাদী, কথাবার্তা, বেচাকেনা প্রভৃতির কোন সম্পর্ক থাকবেনা। কুরাইশের সকল পরিবারের কর্মকর্তা এ দলিলের সত্যায়ন করে এবং তা কাবা ঘরে লটকিয়ে দেয়। ইবনে সা’দ ও ইবনে আবদুল বারর বলেন এ নবুওতের সপ্তম বছর পয়লা মহররমের ঘটনা।

মুসা বিন ওকবা ইমাম যুহরীর বরাত দিয়ে তাঁর মাগাযীতে [ইবনে আবদুল বারর সীরাতে এ র্বনা মূরা বিন ওকবা ছাড়াও মুহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আবুল আসওয়াদ এবং ইয়াকুব বিন হামিদ বিন কাসেবের বরাত দিয়ে উদ্ধৃত করেন (গ্রন্হকার)।] লেখেন যে, আবু তালেব যখন জানতে পারলেন যে, কুরাইশের লোকেরা নবী মুহাম্মদের (স) জীবন নাশের জন্যে বন্ধপরিকর তখন বনী হাশেম ও বনী মুত্তালেবকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, মুহাম্মদকে (স) সাথে নিয়ে সকলে শিয়াবে আবি তালেবে [শিয়াব অর্থ ঘাঁটি। শিয়াবে আবিতালের আবু কুরাইশ পাহাড়ের ঘাটিগুলোয় অন্যতম যেখানে আবু তালেব বাস করতেন। এখন তার নাম শিয়াবে আলী। তাকে সুকুল লায়ও বলা হয়- গ্রন্হকার।] সমবেত হোক এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর হেফাজত করুক। এ প্রস্তাব উভয় পরিবার মেনে নেয় এবং তাদের কাফের ও মুসলমান সকলে শিয়াবে আবি তালেবে একত্র হয়। এরপর কুরাইশের অন্যান্য পরিবার পরস্পরে উপরে বর্ণিত চুক্তি করে। [ইবনে আবদুল বারর মূসা বিন ওকবার বরাত দিয়ে ইমাম যুহরীর এ আজীব বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন- যে শিয়াবে আবি তালেবে অবরোধের পর হুযুর (স) মক্কায় মজলুম মুসলমানদেরকে আবিসিনিয়ায় হিজ্বরত করার নির্দেশ দেন। একথা সর্বসাধারণের পরিজ্ঞাত বর্ণনার পরিপন্হী-গ্রন্হকার।]

পক্ষান্তরে ইবনে সা’দ ওয়াকেদী থেকে এবং ইবনে হিশাম ইবনে ইসহাক থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন যে, প্রথমে কুরাইশের লোকেরা বনী হাশেম ও বনী মুত্তালিবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার শপথনামা রচনা করে এবং তারপর এ দুই পরিবার আবু তালেবের কথায় শিয়াবে আবি তালেবে অবরুদ্ধ হয়ে বসে পড়ে। একথা ইবনে আবদুল বাররও সীরাতে উল্লেখ করেছেন। আবু লাহাব এ সময় তার পরিবার থেকে পৃথক থাকে এবং অবরোধকারীদের দলে যোগদান করে। বনী আবদে মনাফ-এর অবশিষ্ট দুটি পরিবার- বনী আবদে শামস ও বনী নওফলও দাদীর দিক দিয়ে আত্মীয়দের পরিত্যাগ করে অবরোধকারী দুশমনদের সাথে যোগদান করে।

ইবনে হিশাম ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে অবরোধ দু’তিন বছর স্থায়ী ছিল বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু ইবনে সা’দ ও মূসা বিন ওকবা নিশ্চয়তার সাথে এর মুদ্দৎকাল তিন বছর বলেছেন। এ সমগ্র কালব্যাপী কুরাইশের অবরোধ অত্যন্ত কঠোরতার সাথে বিদ্যমান থাকে। তাঁদেরকে এমনভাবে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল যে, পানাহারের দ্রব্যাদি তাঁদের নিকটে পৌঁছার সকল পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। মূসা বিন ওকবা বলেন, বাইরে কোন ব্যবসায়ী মক্কায় আগমন করলে কুরাইশের লোকেরা তাড়াতাড়ি তাদের সমুদয় পণ্যদ্রব্য খরিদ করে নিত যাতে অবরুদ্ধ ব্যক্তিগণ কিছু খরিদ করতে না পারেন। আবু লাহাব ব্যবসায়ীদেরকে বলতো, তাদের নিকটে এমন চড়া মূল্য চাও যেন তারা কিনতে না পারে, তারপর আমি সেসব তোমাদের নিকট থেকে খরিদ করে নেব এবং তোমাদের কোন লোকসান হতে দেবনা। ইবনে সা’দ এবং বায়হাকী বলেন, অবরুদ্ধদের অবস্থা এমন হয়েছিল যে, ক্ষুধা-তৃষ্ণায় শিশুদের কান্না শিয়াবে আবি তালেবের বাইরে শুনা যেত। এরা শুধু হজ্বের সময় বের হতেন এবং দ্বিতীয় হ্জ্ব পর্যন্ত নিজেদের মহল্লায় আবদ্ধ থাকতেন।

এ সময়ে শুধু হযরত খাদিজার (রা) ভাইপো হাকিম বিন  জুযাম এবং নাদলা বিন হাশেম বিন আবদে মানাফের ভাইপো হিশাম বিন আমর আল আমেরী গোপনে আত্মীয়তার হক আদায় করতে থাকেন। ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে ইবনে হিশাম বলেন, একবার আজু জাহল হাকিম বিন জুযামকে তাঁর ফুফুর নিকটে খাদ্যদ্রব্য নিয়ে যাবার সময় ধরে ফেলে এবং বলে বনী হাশেমের জন্যে খাদ্য নিয়ে যাচ্ছ? আচ্ছা ঠিক আছে। আমি তোমাকে ছাড়বনা যতোক্ষণ না সারা মক্কায় তোমাকে লাঞ্ছিত –অপমানিত করে দিয়েছি। এমন সময় আবুল বাখতারী বিন হিশাম (বনী আসাদ বিন আবদুল ওয্যা বিন কুসাই এর লোক এবং হযরত খাদিজার (রা) নিকট আত্মীয়) সেখানে পৌঁছলেন এবং জিজ্ঞেস করেন, ব্যাপার কি? আবু জাহল বলে, এ  বনী হাশিমের জন্যে খাদ্যদ্রব্য নিয়ে যাচ্ছে। তিনি বললেন, ছেড়ে দাও একে। এ তার ফুফুর খাদ্যদ্রব্য তার কাছে নিয়ে যাচ্ছে। তুমি কি তার নিজের জিনিস তার কাছে যেতে দেবেনা? একতা আবু জাহল মেনে নেয়না। ফলে উভয়ের মধ্যে ঝগড়া ও মারামারি শুরু হয়। এক পর্যায়ে আবুল বাখতারী উটের চোয়ালের হাড় দিয়ে আবু জাহলের মাথায় আঘাত করলে মাথা ফেটে যায়। হযরত হামযা (রা) এ ঘটনা লক্ষ্য করছিলেন। এতে উভয় মুশরিক কাফের লজ্জিত হয়ে পরস্পরিক বিবাদ বন্ধ করে দেয়- যাতে বনী হিশাম আনন্দিত না হয়। হিশাম বিন আমর আল আমেরী সম্পর্কে ইবনে ইসহাকের বর্ণনা ইবনে হিশাম উদ্ধৃত করে বলেন যে, তিনিও চুপে চুপে বনী হাশিম ও বনী আল মুত্তালিবের সাথে আত্মীয় সুলভ সদাচরণ করতে থাকেন। তা করার পন্হা এ ছিল যে, উটের পিঠে রাতের বেলায় পণ্যদ্রব্য বোঝাই করে শিয়াবে আবি তালেবের ভেতরে হাঁকিয়ে দেয়া হতো। অবরুদ্ধ লোকজন উটকে ধরে পণ্যদ্রব্য নামিয়ে নিয়ে তাকে বাইরে বের করে দিত। কুরাইশের লোকজন তাঁকেও ধমক দিত। কিন্তু আবু সুফিয়ান বলেন, তাকে ছেড়ে দাও। সেতো আত্মীয়ের প্রতি দয়া প্রদর্শনের কাজ করছে।

চন্দ্র দ্বিখন্ডিত হওয়ার ঘটনা

এ অবরোধ কঠোরতার সাথে চলছিল। কিন্তু ‘সাধারণ দাওয়াত’ অধ্যায়ে যেমন আমরা বলেছি, (এ খন্ডের শুরুতে), এতদসত্তেও রাসূলুল্লাহ (স) একদিনও তবলিগের কাজ থেকে বিরত থাকেননি এবং কারো এ সাধ্যও ছিলনা যে, তাঁকে এ কাজ থেকে নিবৃত্ত করে। অবরোধ মাত্র দু’বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর চন্দ্র দ্বিখন্ডিত হওয়ার বিরাট ঘটনা সংঘটিত হয়। মক্কায় কাফেরগণ তা স্বচক্ষে দেখতে পায়। মুহাদ্দেস ও তাফসীরকারগণ একমত যে, এ হিজরতের পাঁচ বছর পূর্বের ঘটনা। এ ঘটনা মিনার ঘটে। কুরআনে তার উল্লেখ এভাবে করা হয়েছে-

************************************************

কিয়ামতের সময় আসন্ন এবং চাঁদ ফেটে গেছে। (কিন্তু তাদের অবস্থা এই যে) তারা কোন নিদর্শনই দেখুক না কেন, মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে এতো প্রচলিত যাদু। (কামারঃ ১-২)

কতিপয় যুক্তিবাদী চাঁদের ন্যায় গ্রহের খন্ডিত হওয়াকে অসম্ভব মনে করেন এবং ******************* এর অর্থ এরূপ করেন যে, ‘চাঁদ দ্বিখন্ডিত হবে’। যদি অনুবাদ ‘ফেটে গেছে’ এর পরিবর্তে ‘ফেটে যাবে’ করা হয় তাহলে দুটি আয়াতের মর্ম অযৌক্তিক হয়ে যায়। প্রথম আয়াতে ‘চাঁদের দ্বিখন্ডিত’ হওয়াকে কিয়ামতের সময় আসন্ন হওয়ার লক্ষণ বলা হয়েছে। যদি তাকে ভবিষ্যতে সংঘটিত হবে বেল ধরা হয়, তাহলে চাঁদের ফেটে যাওওয়াকে কিয়ামত আসন্ন হওয়ার লক্ষণ কিভাবে গণ্য করা যায়? আর এ অর্থ গ্রহণ করলে পরবর্তী আয়াত তো একেবারে অর্থহীন হয়ে পড়ে যাতে এ কথা বলা হয়েছে যে, এ সব এমন হঠকারী যে, কোন নিদর্শনই তারা দেখুক না কেন, তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং তাকে যাদুর অদ্ভুত প্রকাশ বলে গণ্য করে। এর পূর্বাপর বক্তব্য ***************** এর এ অর্থ নিশ্চিত করে বলে দেয় যে, সে সময়ে চাঁদ প্রকৃতপক্ষে দ্বিখন্ডিত হয়েছিল। হাদীসের নির্ভরযোগ্য বর্ণনাসমূহ এ অর্থেরই সত্যতা স্বীকার করে। (গ্রন্হকার কর্তৃক সংযোজন।)

চন্দ্র দ্বিখন্ডিত হওয়ার বর্ণনাগুলো উদ্ধৃত করেছেন- বোখারী, তিরমিযি, আহমদ, আবু আওয়ামা, আবু দাউদ, তিয়ালিসী, আবদুর রাজ্জাক, ইবনে জারীর বায়হাকী, তাবারানী, ইবনে মারদুইয়া এবং আবু নুয়াইম। তাঁরা অধিক সনদসহ হযরত আবদুল্লাহ বিন ওমর (রা), হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা), হযরত হুযায়ফা বিন আল ইয়ামান (রা), হযরত আনাস বিন মালেক (রা) এবং হযরত জুবাইর বিন মুতয়েম (রা) থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন বুযুর্গ- হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা), হযরত হুযায়ফা (রা) এবং জুবাইর বিন মুতয়েম (রা) ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে বলেছেন যে, তাঁরা ছিলেন উক্ত ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী।

সকল বর্ণনা একত্র করলে যে বিস্তারিত বিবরণ জানা যায় তা এই যে, এ ছিল হিজরতের প্রায় পাঁচ বছর পূর্বের ঘটনা। এ ছিল চান্দ্র মাসের ১৪ই রাত। চাঁদ সবে মাত্র উদিত হয়েছে- এমন সময় হঠাৎ তা দ্বিখন্ডিত হয়ে একখন্ড সম্মুখের পাহাড়ের একদিকে এবং অপরখন্ড অপরদিকে দেখা গেল। এ অবস্থা এক মুহূর্তেই ছিল এবং তাপর দুটি খন্ড একত্র হয়ে যায়। নবী (স) তখন মিনায় অবস্থান করছিলেন। তিনি লোকদের বললেন, দেখ এবং সাক্ষী থাকো। কাফেরগণ বলল, মুহাম্মদ (স) তো আমাদের উপর যাদু করতে পারেন কিন্তু সকলের উপর করতে পারেননা। বাইরের লোকদের আসতে দাও। তাদের জিজ্ঞেস করা হবে যে, তারাও এ ঘটনা লক্ষ্য করেছে কিনা। বাইর থেকে যখন কিছু সংখ্যক লোক এলো তখন তারা সাক্ষ্য দিল যে, তারাও এ দৃশ্য দেখেছে।

হযরত আনাস (রা) থেকে কিছু রেওয়ায়েত এমন পাওয়া যায় যার থেকে এ ভূল ধারণা সৃষ্টি হয়েছে যে, চাঁদ দ্বিখন্ডিত হওয়ার ঘটনা একবার নয়, দু’বার হয়েছে। প্রথম কথা এই যে, সাহাবাগণের মধ্যে কেউ একতা বলেননি। দ্বিতীয়তঃ স্বয়ং হযরত আনাসের (রা) কোন কোন বর্ণনায় ************ (দু’বার) শব্দগুলো এবং “দুখন্ড” শব্দগুলো পাওয়া যায়। তৃতীয়তঃ কুরআন শুধু একবার দ্বিখন্ডিত হওয়ার কথা বলেছে। এর ভিত্তিতে সঠিক কথা এই যে, এ ঘটনা শুধুমাত্র একবারই সংঘটিত হয়েছে। তারপর যে কাহিনীতে প্রচলিত কথা এই যে, এ ঘটনা শুধুমাত্র একবারই সংঘটিত হয়েছে। তাপর যে কাহিনীটি প্রচলিত আছে যে, নবীর (স) অঙ্গুলির ইশারায় চাঁদ দু’টুকরা হয়ে যায় এবং এক টুকরা তাঁর জামার ভেতর ঢুকে এক আস্তিন দিয়ে বেরিয়ে যায়, তা একেবারে ভিত্তিহীন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই যে, এ ঘটনার প্রকৃত স্বরূপ কি। এটা কি কোন মোজেযা ছিল যা মক্কায় কাফেরদের মুকাবেলায় রাসূলুল্লহ (স) তাঁর রেসালাতের প্রমাণ স্বরূপ দেখিয়েছিলেন? অথবা এ একটি দুর্ঘটনা ছিল যা আল্লাহর কুদরতে চাঁদের মধ্যে সংঘটিত হয় এবং তিনি লোকের দৃষ্টি এ উদ্দেশ্যে এদিকে আকৃষ্ট করেন যে, এ কিয়ামতের সম্ভাব্যতা এবং তার নিকটবর্তী হওয়ার একটি লক্ষণ? ওলামায়ে কেরামের একটি বড়ো দল একে হুযুরের (স) মোজেযার মধ্যে শামিল করেন। তাঁদের ধারণা এই যে, কাফেরদের দাবী পূরণের জন্যে এ মোজেযা দেখানো হয়। কিন্তু এ ধারণার উদ্ভব হয়, এমন কতিপয় বর্ণনা থেকে যা হযরত আনাস (রা) থেকে উদ্ধৃত। তিনি ব্যতীত অন্য কোন সাহাবী এ কথা বলেননি। ফতহুল বারীতে ইবনে হাজার বলেন, এ কাহিনী যতোভাবে উদ্ধৃত হয়েছে তার মধ্যে হযরত আনাসের (রা) হাদীস ব্যতীত এ বিষয় আমার চোখে পড়েনি যে, চাঁদ দ্বিখন্ডিত হওয়ার ঘটনা মুশরিকদের দাবীর ভিত্তিতে ঘটেছিল। আবু নুয়াইম ইসফাহানী ‘দালায়েলুন নবুওতে’ হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে এ বিষয়ে একটি বর্ণণা উদ্ধৃত করেছেন। কিন্তু তার সনদ দুর্বল। নির্ভরযোগ্য সনদে হাদীসগ্রন্হে যতো রেওয়ায়েত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে উদ্ধৃত হয়েছে, তার কোনটিতেই এ কথার উল্লেখ নেই। উপরন্তু হযরত আনাস (রা) এবং হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) উভয়ে এ ঘটনার সমসাময়িক ছিলেননা। পক্ষান্তরে যে সকল সাহাবী সে সময়ে বিদ্যমান ছিলেন- যেমন হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা), হযরত হুযায়ফা (রা), হযরত জুবাইর বিন মুতয়েম (রা), হযরত আলী (রা), হযরত আবদুল্লাহ বিন ওমর (রা)- তাঁদের মধ্যে কেউ এ কথা বলেননি যে, মক্কায় মুমরিকগণ হুযুরের (স) সত্যতার প্রমাণ স্বরূপ কোন নিদর্শণ দাবী করেছিল এবং তার ফলে চাঁদ দ্বিখন্ডিত হওয়ার এ মোজেযা তাদেরকে দেখানো হয়েছিল। সবচেয়ে বড়ো কথা এই যে, কুরআন পাকও স্বয়ং এ ঘটনাকে রেসালাতে মুহাম্মদীর নয়, বরঞ্চ কিয়ামত আসন্ন হওয়ার লক্ষণ হিসাবে পেশ করেছে। অবশ্যি এ এদিক দিয়ে হুযুরের (স) স্যতার সুস্পষ্ট প্রমাণ অবশ্যই ছিল যে তিনি কিয়ামত আগমণের যে খবর লোকদের দিয়েছিলেন, এ ঘটনা তারই সত্যতা প্রমাণ করে।

বিরুদ্ধবাদীগণ এ ব্যাপারে দু’ধরনের আপত্তি উত্থাপন করেন। প্রথমত তাঁদের দৃষ্টিতে এরূপ হওয়া কিছুতেই সম্ভব নয় যে, চাঁদের মতো একটি বিশাল গ্রহ দ্বিখন্ডিত হয়ে একটি খন্ড আর একটি থেকে পৃথক হয়ে পড়বে এবং একটি খন্ড অপরটি থেকে শত শত মাইল দূরে যাওয়ার পর পুনরায় একত্রে যুক্ত হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, তাঁরা বলেন যে, যদি এমনটি হতো, তাহলে এ ঘটনা সারা দুনিয়ায় প্রসিদ্ধ হয়ে পড়তো, ইতিহাসে তার উল্লেখ থাকতো এবং জ্যোতিঃশাস্ত্রে তার উল্লেখ থাকতো। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে উভয় প্রতিবাদই গুরুত্বহীন। এটা মোটেও সম্ভব কিনা এ বিতর্ক হয়তো অতীতকালে চলতে পারতো। কিন্তু আধুনিক যুগে গ্রহাদির গঠন সম্পর্কে মানুষ যে জ্ঞানলাভ করেছে তার ভিত্তিতে এটা একেবারে সম্ভব যে, একটি গ্রহ তার অভ্যন্তরে অগ্নুদগমের কারণে ফেটে যেতে পারে এবং এ ভয়ানক অগ্নুদগমে তার দুটি খন্ড বহু দূরে চলে গিয়ে স্বীয় কেন্দ্রের চম্বুক শক্তির কারণে একটি অপরটির সাথে পুনঃযুক্ত হতে পারে। এখন রইলো দ্বিতীয় অভিযোগ। তা এ জন্যে গুরুত্বহীন যে, এ ঘটনা মুহূর্তেল জন্যে সংঘটিত ছিলনা। কোন বিস্ফোরণ ধ্বনিও হয়নি যে মানুষের মনোযোগ সেদিকে আকৃষ্ট হবে। পূর্বে থেকে কোন সংবাদও পরিবেশন করা হয়নি যে মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবে। আর গোটা বিশ্বে তা দেখাও সম্বব ছিলনা। বরঞ্চ শুধু আরব এবং তার পূর্বদিকের দেশগুলোই তখন  চাঁদ উদিত হয়েছিল।সেকালে ইতিহাস রচনার প্রতি মানুসের ততোটা অনুরাগ ও ইতিহাস শিল্প এতোটা উন্নতও হয়নি যে, প্রাচ্যের দেশগুলোতে যারা এ দেখেছে তারা তা লিখে রাখতো এবং কোন ঐতিহাসিকের নিকটে এ সাক্ষ্যসমূহ একত্র করে তা কোন ইতিহাস গ্রন্হে উদ্ধৃত করা হতো। তথাপি মালাবারের ইতিহাসে এ কথার উল্লেখ আছে যে, সে রাত্রে সেখানকার এক রাজা এ দৃশ্য অবলোকন করেন। এখন রইলো জ্যোতিঃশাস্ত্র ও পুঞ্জিকা গ্রন্হ। চাঁদের গতি, কক্ষ পথে তার আবর্তন এবং তার উদয় অস্তকালের মধ্যে কোন পার্থক্য নির্ণীত হলে শুধুমাত্র তখনই তা জ্যাতিঃশাস্ত্রে বা পুঞ্জিকায় উল্লেখ থাকার কথা। এ ধরনের অনিয়ম দেখা দেয়নি, সেজন্যে প্রাচীনকালের জ্যোতির্বিদগণের দৃষ্টি এদিকে আকৃষ্ট হয়নি। এ সময়ে দূরবীক্ষণ যন্ত্রেরও এতোটা উন্নতি হয়নি যে উর্ধ্বাকাশে কোন ঘটনা ঘটলে সংগে সংগেই তা রেকর্ড করে সংরক্ষিত করা হতো। (তাফহীম, ৫ম খন্ড- আল কামার-টীকা ১।)

কিভাবে অবরোধের অবসান হলো

মক্কার কাফেরদের ধর্মান্ধ ও হঠকারী সর্দারগণ যদিও সাময়িক রাগের বশবর্তী হয়ে শহরের অন্যান্য পরিবারগুলো থেকে দুটি বৃহৎ পরিবারকে অবরুদ্ধ করে রাখে, কিন্তু মক্কায় এমন কোন পরিবার ছিলনা যাদের আত্মীয়তা বনী হাশেম এবং বনী আল মুত্তালিবের সাথে ছিলনা। এ জন্যে প্রথম থেকেই অনেকের কাছে আপন ভাই বেরাদরের অবরোধ অসহনীয় ছিল। এ অবরোধ যতোই দীর্ঘায়িত হতে থাকে, ততোই এর বিরুদ্ধে তাদের মন তিক্ততর হতে থাকে। কারণ বনী হাশেম ও বনী আল মুত্তালিব অনাহারের শিকার হয়ে পড়ে। তাদের শিশুদের কান্না ও বিলাপের আওয়াজ পার্শ্ববর্তী মহল্লাগুলোতে শুনা যেতো। অন্যান্য পরিবারে তাদের আত্মীয়-স্বজন যারা পাশেই অবস্থান করতো, এ সব আর্তনাদ হাহাকার শুনে অস্থির হয়ে পড়তো। মূসা বিন ওকবা বলেন, তৃতীয় বছরের শেষে বনী আবদে মানাফ, বনী কুসাই এবং যাদের বিয়ে-শাদী বনী হাশেমে হয়েছিল একে অপরকে তিরস্কার করতে থাকে এবং পরিস্কার বলতে থাকে এ আত্মীয়তা বন্ধ করার অপরাধ যা আমরা করেছি। এ আচরণ দ্বরা আমরা পারিবারিক অধিকার ক্ষুণ্ন করেছি।

তাবারী ও ইবনে হিশাম ইসহাকের এবং বালাযুরী ওয়াকেদীর বরাত দিয়ে বলেন, অবশেষে হিশাম বিন আমর আল আমেরী এ কাজের দায়িত্ব নিয়ে বলেন যে, এ অবরোধের অবসান করেই তিনি ছাড়বেন। সর্বপ্রথম তিনি বনী মখযুমের প্রধান যুবাইর বিন আবি উমাইয়ার সাথে সাক্ষাৎ করেন যিনি ছিলেন হযরত উম্মে সালমার (রা) ভাই এবং হুযুরের (স) ফুফু আতেকা বিন্তে আবদুল মুত্তালিবের পুত্র। তিনি বলেন, হে যুবাইর! তুমি কি এতে আনন্দ উপভোগ কর যে, তুমি নিশ্চিন্তে খাওয়া দাওয়া করবে, বিয়ে-শাদী করবে আর তোমার নানার দিকের লোকেরা অনাহারে মারা যাবে? তাদের সাথে লেনদেন ও বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হবে? খোদার কসম করে বলছি, এ অবস্থা যদি আবু জাহলের হতো এবং তুমি যদি তার নানার পক্ষের লোকদের সাথে সে ব্যবহার করতে বলতে যা সে তোমার নানার পক্ষের লোকদের সাথে করতে তোমাকে বলেছে, তাহলে সে তো কখনোই করতনা। যুবাইর বলেন, হিশাম! আমি একা কি করতে পারি? আরও কেউ যদি আমাদের সহযোগিতা করতো তাহলে অবরোধের দলিল ছিন্ন না করে ছাড়তাম না। হিশাম বলেন, একজন তো আমি রয়েছি। যুবাইর বলেন, আর একজন তালাশ কর।

তারপর হিশাম বনী নওফল বিন আবদে মানাফের সর্দার মুতয়েম বিন আদীর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। বললেন, হে মুতয়েম! তুমি কি এতে খুশী যে, বনী আবদে মানাফের দুটি পরিবার ধ্বংস হয়ে যাবে আর তুমি তামাশা দেখতে থাকবে? তাদের ব্যাপারে তুমি যদি কুরাইশের সহযোগিতা কর এবং তাদেরকে শেষ করার জন্যে এভাবে কুরাইশকে ছেড়ে দাও, তাহলে শীঘ্রই এমন একদিন আসবে যেদিন এ অবস্থা তোমারও হবে। তিনি বললেন, আমি একা কি করতে পারি? আর কাউকে সাথে নাও। হিশাম বলেন, একজন তো আমি, দ্বিতীয় জন যুবাইর বিন আবি উমাইয়া। মুতয়েম বললেন, একজন তালাশ কর।

তারপর হিশাম বনী আসাদ বিন আবদুল ওয্যার সর্দার আবুল বাখতারী আস বিন হাশিমের সাথে সাক্ষাৎ করেন তাঁর কাছেও সে কথাই বলেন যা মুতয়েম বলেছিলেন। তিনি বলেন, আর কি কেউ আছে, যে আমাদের সাথে থাকবে? হিশাম বলেন, আমি, যুবাইর বিন আবি উমাইয়অ এবং মুতয়েম বিন আদী। তিনি বললেন, ব্যস, আর একজন দেখ। অতএব হিশাম যাময়া বিন আল আসওয়াদ বিন মুত্তালিবের সাথে আলাপ করেন। তিনি বনী আসাদ বিন আবদুল ওয্যার সর্দারদের অন্যতম ছিলেন, তাঁকেও এ কাজে সম্মত করা হলো।

অতঃপর এ পাঁচজন (হিশাম, যুবাইর, মুতয়েম, আবুল বাখাতারী, যাময়া) মক্কার উচ্চভূমি হাজুনে একত্রে মিলিত হন এবং স্থির করেন কিভাবে অবরোধের দলিল নষ্ট করার চেষ্টা করা যায়।  যুবাইর বলেন, আমি কথা শুরু করব এবং আপনারা আমাকে সমর্থন করবেন। দ্বিতীয় দিন সকালে তাঁরা কুরাইশের বৈঠকের দিকে যান এবং যুবাইর কাবায় সাতবার তাওয়াফ করে মক্কার লোকদের সম্বোধন করে বলেন, হে মক্কাবাসী! আমরা খেয়েপরে থাকব বনী হিশাম ধ্বংস হয়ে যাবে? না তাদের থেকে কিনা যায় আর না তাদের কাছে কিছু বিক্রি করা যায়। খোদার কসম, আমি কিছুতেই বসবনা, যতোক্ষণ না অবরোধের দলিল ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।

আবু জাহল উঠে বলে, তুমি মিথ্যা বলেছে, তা কখনো ছিঁড়ে ফেলা হবেনা। যাময়া বলেন, খোদার কসম, তুমি সবচেয়ে মিথ্যাবাদী। যখন এ দলিল লেখা হয় তখনো আমরা রাজী ছিলামনা। আবুল বাখতারী তাঁর কথায় সমর্থন দিয়ে বলেন, যাময়া ঠিক বলেছে। ঐ দলিলে যা কিছু লেখা হয়েছে তাতে আমরা কিছুতেই রাজী ছিলামনা। আর আমরা স্বীকারও করিনা। মুতয়েম বিন আদী বলেন, তোমরা উভয়ে সত্য কথা বলেছ। আর মিথ্যা সে, অন্য কথা বলছে। আমরা আল্লাহর সামনে এ দলির এবং তার মধ্যে যা লেখা আছে তার দায়-দায়িত্ব থেকে মুক্ত ঘোষণা করছি। হিশাম বিন আমরও তা সমর্থন করেন। আবু জাহল বলে, এ এক ষড়যন্ত্র যা রাতে কোন স্থানে বসে করা হয়েছে।

আল্লাহর কুদরতের এক বিস্ময়কর বহিঃপ্রকাশ

ইবনে সা’দ, ইবনে হিশাম ও বালাযুরী বলেন, রাসূলুল্লাহকে (স) আল্লাহর পক্ষ থেকে জানানো  হলো যে, সম্পর্ক ছিন্নের দলিলে অত্যাচার নিপীড়নের, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নের, যে সব কথা লেখা হয়েছিল তা সব উইপোকা খেয়ে ফেলেছ এবং শুধুমাত্র আল্লাহর নাম বাকী রয়ে গেছে।

ইবনে ইসহাক, মূসা বিন ওকবা, এবং ওরয়ার বর্ণনা তার বিপরীত এই যে, আল্লাহর নাম যে স্থানে ছিল তা উইপোকা খেয়ে ফেলেছে এবং জুলুম নিপীড়ণ প্রভৃতি কথাগুলো ঠিকই আছে। কিন্তু এ কথা গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয় না। সত্য কথা তাই যা ইবনে সা’দ, বালাযুরী ও ইবনে হিশাম বলেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম-এর উল্লেখ, তাঁর চাচা আবু তালেবের নিকটে করেন। তিনি জিজ্ঞেস করেন, তোমার রব কি তোমাকে এর সংবাদ দিয়েছেন? হুযুর (স) বলেন, জী হাঁ। আবু তালেব তাঁর ভাইদের নিকটে এর উল্লেক করেন, তাঁরা বলেন, আপনার ধারণা কি? আবু তালেব বলেন, আল্লাহর কসম। মুহাম্মদ (স) আমাদের আছে কখনো মিথ্যা কথা বলেনি।

অতঃপর আবু তালেব বলেন, এখন কি করা উচিত? নবী (স) বলেন, আমার অভিমত এই যে, আপনারা অতি সুন্দর পোষাক পরিধান করে কুরাইশের দিকে যান এবং এ কথা তাদেরকে বলেন। অতএব সকলে বেরিয়ে পড়েন এবং হিজরে যান যেখানে কুরাইশের গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ একত্রে মিলিত হন। এদেরকে যেতে দেখে সকলের নজর এদের দিকে পড়ে এবং তারা ভাবতে থাকেন যে, শেষ পর্যন্ত এরা কি বলতে চান।

যদিও ইতিহাসবেত্তাগণ এর কোন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেননি, কিন্তু পূর্বের বর্ণনা এবং এ বর্ণনা একত্রে মিলিয়ে দেখলে পরিস্কার মনে হয় যে, আবু তালেব এবং তার সাথীগণ ঠিক সে সময়ে হারামে পৌঁছেন যখন যুবাইর ও তার সাথীদের আবু জাহলের সাথে বাকবিতন্ডা চলছিল এবং কুরাইশ সর্দারগণ এ বিতর্ক নিয়ে চিন্তাভাবনা করছিলেন। আবু তালেব সেখানে পৌঁছার পরই সকলকে সম্বোধন করে বলেন, আমরা একটি বিষয় নিয়ে এসেছি- এর সে জবাবরই দিবে যা তোমাদের নিকটে সঠিক।

কুরাইশ সর্দারগণ বলেন, খোশ আমদেদ, আহলান ও সাহলান। আমাদের নিকটে সে জিনিস আছে যা আপনাদেরকে সন্তুষ্ট করবে। তো বলুন, আপনি কি চান? আবু তালেব বলেন, আমার ভাইপো আমাকে এ খবর দিয়েছে, আর খোদার কসম সে কোনদিন মিথ্যা বলেনি- এখন তোমরা সে চুক্তিপত্র চেয়ে পাঠাও এবং দেখ, আমার ভাইপোর কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে আমাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে বিরত থাক এবং তাতে যা লেখা আছে তা মিটিয়ে ফেল। আর যদি তার কথা মিথ্যা হয়, তাহলে আমি তাকে তোমাদের হাতে তুলে দেব। তারপর তোমাদের এখতিয়ার তাকে মেরেও ফেলতে পার, অথবা জীবিতও রাখতে পার। তারা বলেন, আপনিতো সুবিচারের কথাই বলেছেন।

তারপর সে চুক্তিপত্র এনে তা খুলে দেখা গেল যে,  সে কথাই সত্য হলো- যা আল্লাহ তাঁর রাসূলকে বলেছিলেন। এর ফলে কুরাইশ কাফেরদের সকল ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হলো এবং তাদের মাথা হেঁট হয়ে গেল। আবু তালেব বললেন, এখন তোমাদের কাছে এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, এ জুলুম নিপীড়ন ও সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্যে তোমরাই দায়ী। এখন কোন অপরাধে আমরা অবরুদ্ধ হয়ে থাকবো? তারপর আবু তালেব তাঁর সংগী-সাথীদের নিয়ে কাবা ঘরের পর্দার পেছনে গিয়ে বায়তুল্লাহর দেওয়ালের সাথে দেহ জড়িত করে এ দোয়া করলেনঃ হে খোদা! যারা আমাদের উপর জুলুম করেছে, আমাদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করেছে এবং নিজেদের জন্যে সে সব হালাল করে নিয়েছে যা আমাদের ব্যাপারে তুমি তাদের জন্যে হারাম করেছ- তাদের মুকাবেলায় তুমি আমাদের সাহায্য কর। এ কথা বলে তিনি তাঁর সংগী-সাথীদের নিয়ে আপন শিয়াবের দিকে রওয়ানা হয়ে গেলেন। তাঁরা চলে যেতেই কুরাইশের অনেকেই ওসব জুলুম-নিপীড়নের জন্যে ভর্ৎসনা করেন যা বনী হাশেমের প্রতি করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে মুতয়েম বিন আদী, আদী বিন কায়েস, যাময়া বিন আসওয়াদ, আবুল বাখতারী বিন হাশেম এবং যুবাইর বিন আবি উমাইয়া উল্লেখযোগ্য ছিলেন। অতঃপর এসব লোক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে শিয়াবে আবি তালেবে যান এবং বনী হাশেম এবং বনী আল মুত্তালিবকে বলেন, এখন আপনারা নিজ নিজ বাড়িতে গিয়ে বসবাস করুন।

ইবনে সা’দ, বালাযুরী, ইবনে আবদুল বারর প্রমুখ বলেন যে, এ অবরোধের অবসান ঘটে নবুওতের ১০ম বর্ষে।

হযরত খাদিজা (রা) ও জনাব আবু তালেবের ইন্তেকাল

অবরোধ অবসানের পর হুযুর (স) যে আনন্দ ও শান্তি লাভ করেছিলেন, পর পর সংঘটিত দুটি শোকাবহ ঘটনায় তা বিষাদে পরিণত হয়। তাঁর প্রধান সমর্থক ও সাহায্যকারী চাচা আবু তালেব এবং তাঁর অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও বিপদে সান্ত্বনা দায়িনী বিবি হযতর খাদিজার (রা) এন্তেকালে তিনি অত্যন্ত শোকাহত হয়ে পড়েন। এ দুটি শোকাবহ ঘটনা নবুওতের দশম বর্ষে সংঘটিত হয়, যে বছর অবরোধেরও অবসান হয়।

কোন কোন ইতিহাস লেখক বলেছেন যে, হযরহ খাদিজা (রা) আবু তালেবের পূর্বে ইন্তেকাল করেন। ওয়াকেদী বলেন ৩৫ দিন পূর্বে। কিন্তু বহুল প্রচলিত ও নির্ভরযোগ্য কথা এই যে, আবু তালেবের মৃত্যু আগে হয় এবং তার অল্পদিন পর হযরত খাদিজা (রা) ইন্তেকাল করেন। বায়হাকী এবং ইবনে হিশাম মুহাম্মদ বিন ইসহাকের এ সংক্ষিপ্ত বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন যে, এ উভয়ের মৃত্যু হিজরতের তিন বছর পূর্বে একই বছরে হয়।

ইবনে আবদুল বার বলেন, আবু তালেবের ওফাত শিয়াব থেকে বেরুবার ছয় মাস পরে হয়। তার তিনদিন পর হযরত খাদিজার (রা) ইন্তেকাল হয়। ইবনে সা’স বলেন নবুওতের দশম বছর শাওয়ালে আব তালেবের ওফাত হয়। সে সময়ে তাঁর বয়স ছিল ৮০ বছর। তার এক মাস পাঁচ দিন পর হযরত খাদিজার (রা) ওফাত হয়। এ সময়ে তাঁর বয়স ছিল ৬৫ বছর। ইবনে আসীর নুয়তের দশম বছর- সওয়াল অথবা যিলকাদ মাস আবু তালেবের ওফাতের সময় বলেছেন, বিভিন্ন বক্তব্যের মধ্যে এ বক্তব্যকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে যে, আবু তালেব এবং হযরত খাদিজার (রা) এন্তেকালের ব্যবধান মাত্র ৩৫ দিনের। হাফেজ আবু ফারাজ ইবনুল জুযী উভয়ের মৃত্যুর ব্যবধান ৫ দিন এবং কুতায়বা ৩ দিন বলেছেন। মুয়াহেবুল্লাদুন্নিয়াতে কাসতাল্লানী বলেন, সত্য কথা এই যে, হযরত খাদিজার ইন্তেকাল রমযানে হয় (নবুওতের ১০শ বছর)। বালাযুরী হাকীম বিন হিযামের বরাত দিয়ে ওফাতের তারিখ- ১০ই রমযান (নবুওতের ১০শ বর্ষ) বলে উল্লেখ করেছেন।

মুসলমানদের প্রতি কাফেরদের নির্যাতন

এ বছরটিকে নবী (স) দুঃখের বছর বলে আখ্যায়িত করতেন। এ দুটো দুর্ঘটনার পর হুযুরের (স) উপর শোক ও দুঃখের পাহাড় ভেঙে পড়ে। অপরদিকে হঠাৎ হুযুরের (স) কোন অভিভাবক না থাকার কারণে হঠাৎ কুরাইশের লোকেরা খুবই সাহসী হয়ে পড়ে। আবু তালেবের জীবদ্দশায় তারা নবীর উপরে যে নির্যাতন নিষ্পেষণ করতে পারতোনা তা এখন শুরু করে। বায়হাকী ওরওয়া বিন যুবাইরের বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন, নবী (স) বলেছেন, আবু তালেবের মৃত্যু পর্যন্ত কুরাইশ কাপুরুষ ছিল। হাকেম ওরওয়া বিন যুবাইরের এ বর্ণনাই হযরত আয়েশার (রা) বরাত দিয়ে এ ভাষায়ই উদ্ধৃত করেছেন যে, তিনি নবীকে (স) এ কথা বলতে শুনেছেন।

ইবনে ইসহাক কুরাইশের ক্রমবর্ধমান সাহসিকতার একটি দৃষ্টান্ত ওরওয়া বিন যুবাইরের বরাত দিয়ে উদ্ধৃত করেছেন যে, একদিন কুরাইশের এক ব্যক্তি বাজারের মধ্যে হুযুরের (স) মাথার উপর মাটি নিক্ষেপ করে, তিনি সে অবস্থায় বাড়ি যান। তাঁর এক কন্যা মাথা ধুয়ে দিচ্ছিলেন এবং কাঁদছিলেন। হুযুর (স) তাঁকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্যে বলছিলেন, মা, কেঁদোনা, আল্লাহ তোমার পিতার সহায়ক।

ইমাম বোখারী কিতাবুত্তাহারাত, কিতাবুল জিযয়া, কিতাবুল জিহাদ ও কিতাবুল মাগাযীতে বিভিন্ন স্থানে এ বর্ণনা হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে, হুযুর (স) একদিন কাবার নিকটে নামায পড়ছিলেন। কুরাইশের লোকেরা আপন আপন বৈঠকে বসে ছিল। এদের মধ্যে একজন (মুসলিমের বর্ণনায় এ ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, সে ছিল আবু জাহল) বলল, তোমাদের কে এমন আছে যে গিয়ে অমুকের বাড়ি থেকে জবাই করা উটের নাড়ি-ভূঁড়ি-রক্তের-ঝুড়ি উঠিয়ে এনে সিজদারত অবস্থায় তার পিঠে রেখে দেবে? এ কথায় তাদের সবচেয়ে দুর্বৃত্ত ও দূশ্চরিত্র ব্যক্তি ওকবা বিন আবি মুয়াইত উঠে পড়ে এবং ওসব ময়লা আবর্জন এন সিজদার অবস্থায় হুযুরের (স) পিঠে অথবা দু’কাঁধের মাঝখানে রেখে দেয়। তার ভারে হুযুর (স) সিজদায় পড়ে রইলেন। মাথা উঠাতে পারলেননা। কুরাইশের লোকেরা এ দৃশ্য দেখে হেসে গড়াগড়ি করতে থাকে এবং একে অপরের উপর পড়তে থাকে। ইতোমধ্যে কেউ গিয়ে হুযুরের (স) বাড়িয়ে এ খবর পৌঁছিয়ে দেয়, হযরত ফাতেমা (রা) তা শুনে দৌড়ে এলেন এবং এসব ময়লা আবর্জনা টেনে টেনে ফেলে দিলেন। তারপর কুরাইশের লোকদের সম্বোধন করে খুব ভর্ৎসনা করেন এবং যারা এ কাজ করেছে তাদের প্রতি বদদোয়া দেন (হাফেজ বাযযার অতিরিক্ত এ কথা বলেন যে, কুরাইশ কাফেরদের কেউই হযরত ফাতেমাকে (রা) কোন কথাই বললনা)। নামায শেষ করে হুযুর (স) বলেন খোদা! কুরাইশের ব্যাপারে তুমি ফায়সালা কর। কেউ বলেন, এ কথা তিনি দু’বার বলেন, কেউ বলেন, তিন বার। বোখারীর বর্ণনায় আছে যে, হুযুরের (স) এ বদদোয়া কুরাইশ অত্যন্ত অপ্রীতিকর মনে করে। মুসলিমে বলা হয়েছে যে, হুযুরের (স) কথায় তাদের হাসি বন্ধ হয়ে যায় এবং বদদোয়ায় ভীত শংকিত হয়ে পড়ে। হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ বলেন, তারপর হুযুর (স) নাম নিয়ে নিয়ে আবু জাহল, ওতবা বিন রাবিয়া, শায়বা বিন রাবিয়া, অলীদ বিন ওতবা বিন রাবিয়া, উমাইয়া বিন খালাফ, ওকবা বিন আবি  মুয়াইত এবং উমারা বিন অলীদকে বদদোয়া দেন। এ হাদীসটি বোখারী ও মুসলিম ছাড়াও ইমাম আহমদ, নাসায়ী, বাযযার, তাবারানী, আবু দাউদ তায়ালেসী প্রমুখও উদ্ধৃত করেছেন। তায়ালেসীয় বর্ণনায় হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদের (রা) এ উক্তিও উদ্ধৃত করা হয়েছে যে, ঐদিন ব্যতীত হুযুরকে (স) তাদের বদদোয়া দিতে আর শুনা যায়নি।

যদিও এ হাদীস বর্ণনাকারী মুহাদ্দেসগণ এ কথা বলেননি যে, এ ঘটনাটি কোন সময়ের কিন্তু এতে এমন তথ্য পাওয়া যায়-যা সে সময়ের কথা প্রায় নির্দিষ্ট করে বলে দেয়। তা এই যে, হুযুরের (স) সিজদারত অবস্থায় যখন তাঁর উপর উটনীর নাড়ি-ভূড়ি চাপিয়ে দেয়া হয় এবং এ খবর যখন হযরত ফাতেমাকে (রা) পৌঁছানো হয় তখন তিনি দৌড়ে এসে পিতার মাথার উপর থেকে নাড়ি-ভূঁড়ি টেনে টেনে সরিয়ে ফেলেন। তাঁর সম্পর্কে ইবনে আবদুল বারর ইস্তিয়াবে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি যখন পয়দা হন তখন হুযুরের (স) বয়স ছিল এক চল্লিশ বছর। যুরকানী শরহে মুয়াহেবে এটাকে সঠিক বলেছেন। একন একথা ঠিক যে, এ ঘটনার সময় হযরত ফাতেমার বয়স নয় বছরতো হওয়াই উটিত। কারণ তার কম বয়সের মেয়ের জন্যে এটা বড়ো কঠিন কাজ ছিল যে, উটনীর নাড়ি-ভূঁড়ি টেনে নামাতে পারতেন। এজন্যে আমাদের ধারণা কাফেরগণ এ বেহুদা কাজ সে সময়ে করে যখন হযরত খাদিজা (রা) এবং আবু তালেব এন্তেকাল করেছিলেন।

আবু তালেবের অসিয়ত

আল্লামা কাসতাল্লানী মুয়াহেবু ল্লাদুন্নিয়াতে এবং আল্লামা যুরকানী তার ব্যাখ্যায় হিশাম বিন মুহাম্মদ বিন আসসায়েব কালবীর বরাত দিয়ে বলেন যে, আবু তালেবের অন্তিম সময়ে কুরাইশ সর্দারগণ তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসেন। তিনি তাদের সামনে কুরাইশের গুণাবলী ও মহত্ব বর্ণনা করার পর তাঁদেরকে বলেন, “দেখ এই খানায়ে কাবার সম্মান অক্ষণ্ন রাখবে। এতেই রবের সন্তুষ্টি। আত্মীয়-স্বজনের হক আদায় করবে। একে অপরের উপর বাড়াবাড়ি ও হক নষ্ট করবেনা। দাওয়াত দানকারীর দাওয়াত কবুল করবে। সাহায্য প্রার্থীর অভাব পূরণ করবে। সততা ও আমানতদারী অবলম্বন করবে। এ প্রসংগে তিনি বলেন, মুহাম্মদ (স) সম্পর্কে অসিয়ত করছি যে, তার সাথে সদাচরণ করবে। কারণ সে কুরাইশের মধ্যে আমীন (নির্ভরযোগ্য) এবং সমগ্র আরবে অবি সত্যবাদী। সে ঐ সব গুণাবলীর অধিকারী যা আমি তোমাদের কাছে বললাম। সে এমন জিনিস এনেছে যা মন চায়, লোকে দুশমনীর ভয়ে মুখে তা অস্বীকার করে। কিন্তু খোদার কসম! আমি যেন স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছি যে, আরবের অভাবগ্রন্হ, চারপাশের দুর্বল মানুষ সামনে অগ্রসর হয়ে তার দাওয়াত কবুল করবে, তার কালেমার সত্যতা ঘোষণা করবে। তারা তার কাজ বাড়িয়ে দেবে এবং সে তাদেরকে নিয়ে বিপদ সংকুল ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কুরাইশ সর্দারগণ লেজ গুটিয়ে বসে থাকবে।

ইবনে সা’দ বলেন, মৃত্যুর সময় আবু তালেব সন্তানদেরকে এই বলে অসিয়ত করেন, যতোক্ষণ তোমরা মুহাম্মদের (স) কথা শুনতে থাকবে এবং হুকুম মেনে চলতে থাকবে, তোমরা সর্বদা ভালো থাকবে। অতএব তার আনুগত্য কর এবং তাকে সাহায্য কর, তাহলে সঠিক পথে থাকবে।

নবী (স) বলেন, চাচাজান, আপনি এদেরকে তো নসিহত করলেন কিন্তু নিজেকে তার বাইরে রাখছেন কেন?

জবাবে তিনি বলেন, কিন্তু আমি পছন্দ করিনা যে, মৃত্যুর সময় ঘাবড়ে গিয়ে পথচ্যুত বলে পরিগণিত হই। আর কুরাইশ এ অভিমত ব্যক্ত করুক যে, সুস্থাবস্থায় আবু তালেব যা প্রত্যাখ্যান করেছিল, মৃত্যুর সময় ঘাবড়ে গিয়ে তা অবলম্বন করলো।

ইবনে সা’দ ইমাম মুহাম্মদ বিন সিরীনের বরাত দিয়ে বলেন, আবু তালেব যখন ইন্তেকাল করেছিলেন তখন তিনি নবীকে (স) ডেকে বলেন, আমি মারা গেলে তুমি তোমার নানার পরিবার বনী নাজ্জারের নিকটে মদীনায় চলে যাবে। কারণ তারা আপন বাড়ির লোকদের হেফাজতের ব্যাপারে বড়ো কঠোর।

এসব অসিয়ত থেকে জানতে পারা যায় যে, আবু তালেব কেমন বিজ্ঞ ও দূরদর্শী লোক ছিলেন যে, মদীনা সম্পর্কে হিজরতের তিন বছর পূর্বে তিনি যে অভিমত পেশ করেন তা অবশেষে সত্যে পরিণত হয়। অথচ সে সময় এ কথা কেউ চিন্তা করতে পারেনি যে, মদীনাই ইসলাম ও নবী মুহাম্মদের (স) জন্যে জীবন বিলিয়ে দেয়া একটি জনপদ হবে। তারপর সেখান থেকে হুযুর (স) এমন এক শক্তি লাভ করবেন যা সমগ্র আরবকে বশীভূত করবে। এভাবে কুরাইশ সর্দারদের নিকটে সে সময়ে তিনি যা কিছু বলেছিলেন তা কয়েক বছর পরই অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হয়। অন্যান্য লোক হুযুরের (স) সহযোগিতা করে লাভবান হলেন এবং এ কুরাইশ সর্দারগণকে পেছনের সারিতে নিক্ষেপ করা হলো। ইবনে আবদুল বারর ইস্তিয়অবে হযরত ওমরের (রা) শাসন কালের একটি ঘটনা বিবৃত করে বলেন, একদিন কুরাইশ সর্দারগণ (যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সুহাইল বিন আমর ও আবু সুফিয়ান) আমীরুল মুমেনীনের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে অনুমতির প্রতীক্ষায় বাইরে বসেছিলেন। এমন সময় হযবর বেলাল (রা), হযরত সুহাইব (রা) এবং অন্যান আহলে বদরকে ভেতের ডাকা হলো। আবু সুফিয়ান অভিযোগের সুরে তাঁর সাথীদের বললেন, সময় কি এসেছে যে, আমাদের লোক বাইরে বসে থাকবে আর গোলামদেরকে ভেতরে ডাকা হবে? এতে সুহাইল বিন আমর বলেন, আপনারা এ অভিযোগ তো নিজেদের কাছেই করুন। যখন ইসলামের দাওয়াত দেয়া হয়, তখন তারা সামনে অগ্রসর হলো আর আপনারা পেছনে পড়ে রইলেন।

আবু লাহাব হুযুরের (স) সমর্থনের জন্য অগ্রসর হয়ে পেছনে ফিরে যায়

ইবনে সা’দ বলেন, মক্কায় হুযুর (স) এর উপর নির্যাতন যখন চরমে পৌঁছে তখন একদিন আবু লাহাব তাঁর নিকটে এসে বলেন, হে মুহাম্মদ! তুমি যা করতে চাও করতে থাক। আবু তালেবের জীবদ্দশায় তুমি যে কাজ করতে তা করতে থাক। লাত ও ওয্যার কসম! আমি বেঁচে থাকতে তোমার গায়ে কেউ হাত দিতে পারবেনা।

তারপর হুযুর (স) বাড়ি থেকে বের হলেন এবং ইবনে আলগায়তালা [এ ব্যক্তির আসল নাম ছিল হারেস বিন কায়েস আদীউস সাহমী। কায়েস বিন আদীর বিবি বনী মুররার গায়তালা নামে এক গণিকা ছিল। তার সকল সন্তানকে গায়াতেলা বলা হতো-গ্রন্হকার।] প্রকাশ্য বাজারে তাঁকে গালিগালাজ করলো। তখন আবু লাহাব বাড়ি থেকে বের হয়ে এসে ইবনুল গায়তালাকে ভর্ৎসনা করলো। সে চিৎকার করে পালিয়ে যেতে যেতে বলেছিল, হে কুরাইশের লোকেরা, শুনে রাখ, আবু ওতবাও পৈত্রিক দ্বীন থেকে সরে পড়েছে। এ হট্টগোল শুনার পর লোক আবু লাহাবের নিকটে এলো এবং  ব্যাপার কি জিজ্ঞেস করলো। সে বলল, আমি আবদুল মুত্তালেবের দ্বীন পরিত্যাগ করিনি। কিন্তু এখন আমি আমার ভাইপোর সহযোগিতা করব। কারণ এখন তার আর কোন পৃষ্ঠপোষক নেই, কুরাইশ সর্দারগণ বলেন, তুমি আত্মীয়তার হক আদায় করতে প্রস্তুত হয়ে ভালো কাজ করেছ। তারপর কিছুদিন যাবত নবী (স) নিরাপদে রইলেন এবং লোক- আবু লাহাবের দিকে তাকিয়ে নবীকে (স) উত্যক্ত করা ছেড়ে দিল। অবশেষে একদিন আবু জাহল ও ওতবা বিন আবি মুয়াইত পরস্পর পরামর্শ করে আবু লাহাবের নিকটে এসে বলল, আপন ভাইপোকে একটু জিজ্ঞেস করে দেখ- তা দাদা এবং তোমার বাপ আবদুল মুত্তালিব কোথায় যাবে। আবু লাহাব নবীকে (স) একথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, যেখানে তাঁর কওম যাবে, তিনিও সেখানে যাবেন। আবু লাহাব তাঁর বন্ধুদেরকে হুযুরের (স) এ জবাব শুনিয়ে দেয়। তারা বলে, আরে মিয়া, কিছু বুঝতে পারলে? এর অর্থ তোমার পিতাও জাহান্নামে যাবে।

আবু লাহাব এসে নবীকে (স) জিজ্ঞেস করে, হে মুহাম্মদ! আবদুল মুত্তালিব কি জাহান্নামে যাবে? তিনি বলেন, হ্যাঁ। এবং যে ব্যক্তিই সে দ্বীনের উপরে মৃত্যুবরণ করবে, যার উপর আবদুল মুত্তালিব করেছে, সে জাহান্নামে যাবে। একথা শুনামাত্র আবু লাহাব রেগে গেল এবং তড়াক করে বলল, খোদার কসম। আমি সব সময়ে তোমার দুশমন থাকবো। তুমি মনে কর- আবদুল মুত্তালিব জাহান্নামী?

এভাবে কিছুদিনের জন্য যে খোদার দুশমন হকের সমর্থক হয়েছিল, সে তার মৌল অবস্থানের দিকে ফিরে গেল।

হযরত সাওদার (রা) সাথে বিবাহ

হযরত খাদিজার (রা) ওফাতের পর হুযুরের (স) এ বিব্রতকর সমস্যা এ দেখা দিল যে, বাড়িতে শুধু অল্প বয়স্কা কন্যা- হযরত উম্মে কুলসুম (রা) ও হযরত ফাতেমা (রা) রয়ে যান। তাঁদের দেখাশুনা করার কেউ ছিলনা। এখন সেই বিপজ্জনক সম রেসালাতের দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে বাড়ির বাইরে চলে গেলে তাঁর কন্যাদ্বয় অসহায় অবস্থায় রয়ে যান। এ জন্যে তিনি হযরত খাদিজার (রা) ওফাতের কয়েকদিন পর হযরত সাওদা বিন্তে যাময়াকে বিয়ে করেন। [ইবনে সা’দ ওয়াকেদীর বরাত দিয়ে বলেন, এ বিবাহ হয়েছিল নবুওতের ১০ম বর্ষে রমযান মাসে। কাসতাল্লানী- মুয়াহেবু ল্লাদুন্নিয়অতে বলেন, হযরত খাদিজার (রা) ওফাত রমযান মাসে হয় এবং হযরত সাওদার (রা) সাথে বিয়ে হয় সাওয়াল মাসে।– গ্রন্হকার।] তিনি ছিলেন একজন বেশী বয়সের মহিলা এবং মেয়েদের দেখা শুনার জন্যে ছিলেন খুবই উপযুক্ত। তিনি বনী আমের বিন লুয়াই গোত্রের ছিলেন। তাঁর পূর্বে স্বামী- সাকরান বিন আমর তাঁর চাচাতো ভাই এবং সুহাইল বিন আমরের ভাই ছিলেন। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই ছিলেন- প্রথম দিকের মুসলমান এবং আবিসিনিয়ার দ্বিতীয় হিজরতে শামিল হন। মূসা বিন ওকবা এবং আবু মা’শার বলেন, আবিসিনিয়াতেই হযরত সাকরান (রা) ইন্তেকাল করেন। কিন্তু মুহাম্মদ বিন ইসহাক ও ওয়াকেদী বলেন, তিনি আবিসিনিয়া থেকে মক্কায় ফিরে আসেন এবং এখানেই মৃত্যুবরণ করেন।[তাবারী ও ইবনে কাসীর তাঁদের ইতিহাসে লিখেছেন যে, তিনি মক্কা থেকে আবার আবিসিনিয়া চলে যান এবং খৃষ্টান হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু বালাযুরী ইবনে ইসহাক ও ওয়াকেদীর বক্তব্যকে সত্য বলে স্বীকার করেছেন। স্বয়ং আসীর তাঁর রচিত ‘উসদুল গাবা’তে ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, তিনি মৃত্যুর সময় পর্যন্ত মুসলমান ছিলেন। হাফেজ ইবনে হাজার ‘আলাইসাবা’তে তাঁর নামের সাথে ‘রাদিআল্লাহু আনহু’ লিখেছেন।– গ্রন্হকার।] ইবনে সা’দ ওয়াকেদীর যে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন- তাতে উল্লেখ আছে যে- হুযুর (স) যখন তাঁকে বিয়ের পয়গাম দেন তখন তিনি জবাবে বলেন, আমার ব্যাপারে যে কোন ফায়সালা করার এখতিয়ার আপনার আছে। হুযুর (স) এ খবর পাঠান, নিজের পক্ষ থেকে কাউকে নিযুক্ত করে দাও, যে আমার সাথে তোমার বিয়ে করিয়ে দেবে। তিনি সুহাইল বিন আমরের ভাই এবং প্রথম দিকের মুসলমান হযরত হাতেব বিন আমরকে এ উদ্দেশ্যে নিযুক্ত করেন এবং তিনি হুযুরের (স) সাথে তার বিয়ে করিয়ে দেন।

অধিকাংশ বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, হযরত খাদিজার (রা) পর প্রথম মহিলা ইনিই ছিলেন, যিনি নবীর স্বামীত্ব গ্রহণ করেন এবং তাঁর এ বিয়ে হয়েছিল- হযরত আয়েমার (রা) সাথে বিয়ের পূর্বে। ইবনে আবদুল বারর কাতাদা, আবু ওবায়দাও ইমাম যুহরীর বরাত দিয়ে একথাই বলেছেন। ইবনে সা’দও এরই ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ইবনে ইসহাক হযরত আলী বিন হুসাইন (রা০ এর বরাত দিয়ে বলেন, প্রথম মহিলা হযরত খাদিজার (রা) পর যার সাথে হুযুরে বিয়ে হয়, তিনি ছিলেন সাওদা বিন্তে যাময়া (রা)।

হযরত আয়েশার (রা) সাথে বিবাহ

কিন্তু এর বিপরীত এক বিস্তারিত বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন- ইমাম আহমদ, তাবারানী, ইবনে জারীর তাবারী ও বায়হাকী। তাতে এ কথার উল্লেখ আছে যে, যখন হযরত খাদিজার (রা) ইন্তেকাল হয়, তখন ওসমান বিন মাউনের বিবি খাওলা বিন্তে হাকীম আসসুলামিয়্যাহ হুযুরের খেদমতে হাযির হন এবং আরজ করেন, ইয়া রাসূলুল্লা! আপনি বি বিয়ে করবেন? তিনি বললেন, কাকে বিয়ে করব? খাওলা বলেন, আপনি কুমারী চাইলে তাও পাবেন এবং বিধবা চাইলে তাও পাবেন। হুযুর (স) জিজ্ঞেস করেন, কুমারী কে? তিনি বলেন, সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে যে ব্যক্তি আপনার প্রিয়তম- তার কন্যা, অর্থাৎ আয়েশা বিন্তে আবি বকর (রা)। তারপর হুযুর (স) বলেন, বিধবা কে? তিনি বলেন, সাওদা বিন্তে যাময়া যিনি আপনার উপর ঈমান এনেছেন এবং আনুগত্যও করেছেন। হুযুর (স) বললেন, উভয় স্থানে গিয়ে কথা বল।

প্রথমে তিনি হযরত আবু বকরের (রা) কাছে গেলেন এবং তাঁর বিবি উম্মে রুমানকে বললেন, কত কল্যাণ ও বরকত আল্লাহ তোমাদের দান করেছেন।

তিনি বললেন- তা কি?

খাওলা বললেন- রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে আয়েশার (রা) জন্যে পয়গাম দিয়ে পাঠিয়েছেন। উম্মে রুমান বলেন, আবু বকরকে আসতে দাও। হযরত আবু বকর (রা) এলে উম্মে রুমান তাঁকে বললেন, আল্লাহ কেমন কল্যাণ ও বরকত আপনাকে দান করেছেন। তিনি বললেন- তা কি? উম্মে রুমান বললেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমার নিকটে আয়েশার (রা) পয়গাম পাঠিয়েছেন। তিনি বললেন, ও কি তাঁর জন্যে জায়েয হবে? সেতো তাঁর ভাতিজি?

খাওলা হুযুরের (স) কাছে গিয়ে একথা তাঁকে বললেন। তিনি বললেন, তুমি তাকে বল-সেতো আমার দ্বীনী ভাই। তার কন্যঅ আমার জন্য জায়েয। খাওলা এ জবাব হযরত আবু বকরকে (রা) শুনিয়ে দেন। তিনি বললেন, একটু অপেক্ষা কর। এই বলে তিনি চলে গেলেন।

উম্মে রুমান খাওলাকে বললেন, মুতয়েম বিন আদী তার পুত্রের  জন্যে আয়েশাকে চেয়েছিল। খোদার কসম!  আবু বরক কারো কাছে কোন ওয়াদা করে তা কোনদিন ভংগ করেনি। এদিকে আবু বকর (রা) মুতয়েমের নিকটে গেলেন। তাঁর কাছে তাঁর বিবি বসেছিলেন যাঁর ছেলের জন্যে মুতয়েম পয়গাম দিয়েছিলেন। তিনি বললেন, আবু বকর, আমাদের আাশংকা হচ্ছে যে আমরা আমাদের ছেলের বিয়ে তোমাদের পরিবারে দিলে তাকে তোমরা তার দ্বীন থেকে ফিরিয়ে দেবে। হযরত আবু বকর (রা) মুতয়েমকে বললেন, তোমার বিবি যা কিছু বলছে, তোমার কথাও তো তাই? তিনি বললেন, ওতো এ কথাই বলছে। এ জবাব শুনার পর আবু বকর (রা) তাঁর ওখান থেকে বেরিয়ে এলেন এবং আল্লাহ তাঁকে সে সংকট থেকে উদ্ধার করেন মুতয়েমের কাছে ওয়াদা করে যে সংকটে তিনি পড়েছিলেন। তারপর তিনি খাওলাকে বললেন, রাসূলুল্লাহকে (স) আমার এখানে ডেকে আন। তিনি হুযুরকে (স) ডেকে আনলে হযরত আবু বকর (রা) তাঁর সাথে হযরত আয়েশার (রা) বিয়ে করিয়ে দেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ছ’বছর।

তারপর খাওলা সেখান থেকে বেরিয়ে হযরত সাওদা বিন্তে যাময়ার ওখানে যান এবং বলেন, আল্লাহ তোমাকে কেমন কল্যাণ ও বরকত দান করেছেন। তিনি বললেন, তা কি? খাওলা বললেন, রাসূলুল্লাহ (স) বিয়ের পয়গাম দিয়ে আমাকে তোমার নিকটে পাঠিয়েছেন। তিনি বললেন, আমার পিতাকে এ কথা বল। তিনি খুব বৃদ্ধ ছিলেন। খাওলা তাঁর কাছে গিয়ে জাহেলিয়াতের পন্হায় সালাম করে প্রথমে নিজের পরিচয় দেন। তারপর বললেন, আমাকে মুহাম্মদ (স) সাওদার জন্যে পয়গাম দিয়ে পাঠিয়েছেন। তিনি বললেন, জোড়াতো বেশ সুন্দর! কিন্তু তোমার বান্ধবী কি বলে? খাওলা বলেন, সেওতো এ সম্পর্কে পছন্দ করে। তিনি সাওদাকে ডেকে তাঁর ইচ্ছা কি জিজ্ঞেস করেন। তিনি যখন তাঁর সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন, তখন তিনি হুযুরকে (স) তাঁর বাড়ি ডেকে এনে তাঁর সাথে শুনলেন যে, তাঁর ভগ্নির বিয়ে হুযুরের (স) সাথে হয়েছে তখন মাথায় মাটি ঢালতে থাকেন। তারপর যখন স্বয়ং এ ব্যক্তি মুসলমান হয়ে যান তখন বলতেন, সে সময়ে আমি নির্বোধ ছিলাম যে আপন ভগ্নির বিয়ে হুযুরের (স) সাথে হওয়ার জন্যে মাথায় মাটি ঢালতাম।

হযতর আয়েশার (রা) বিয়ের তারিখ

এ বর্ণনায় শুধু এ কথাই সুস্পষ্ট হয়নি যে, হযরত আয়েশার (রা) বিয়ে হযরত সাওদার (রা) পূর্বে হয়েছিল, বরঞ্চ এ কথাও সুস্পষ্ট হলো যে, নবুওতের দশম বছরে যখন শাওয়াল মাসে হুযুরের (স) সাথে হযরত আয়েশার (রা) বিয়ে হয়, তখন তাঁর বয়স ছিল ছ’বছর। এখানে এ প্রশ্ন করা যেতে পারে যে, যদি নবুওতের ১০ম বছরের শাওয়াল মাসে তাঁর বয়স ছ’বছর থেকে থাকে তাহলে হিজরতের সময় তাঁর বয়স নয় বছর হওয়া উচিত এবং নির্ভরযোগ্য বর্ণনা মতে যখন দ্বিতীয় হিজরীর শাওয়ালে যখন তাঁর রোখসিত হয় তখন তার বয়স ১১ বছর হওয়া উচিত।  এ প্রশ্নের জবাব কতিপয় আলেম এ দিয়েছেন যে, হযরত আয়েশার রোখসতি হিজরতের সাত মাস পরে হয়। হাফেজ ইবনে হাজার এটাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কিন্তু ইমাম নোয়াদী ‘তাহযিবুল আসমা ওয়াল্লোগাত’-তে এবং হাফেজ ইবনে কাসীর ‘আলবেদায়া’তে এবং আল্লামা কাসতাল্লানী ‘মুযাহেবুল লাদুন্নিয়া’তে নিশ্চয়তা সহকারে বলেছেন যে, রোখসতি দ্বিতীয় হিজরীতে হয়, হাফেজ বদরুদ্দীন আইনী ওমদাতুল কারীতে লিখেছেন যে, নবী (স) বদর যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর দ্বিতীয় হিজরীর শাওয়াল মাসে হযরত আয়েশার রোখসতি হয়।

ইমাম নববী এবং আল্লামা আইনী উভয়েই এ বক্তব্যকে অর্থহীন বলেছেন যে এ রোখসতি হিজরতের সাত মাস পর হয়েছিল। এরপর অবশ্যই দ্বিতীয় প্রশ্ন এ সৃষ্টি হয় যে, যদি রোখসতি দ্বিতীয় হিজরীতে হয়ে থাকে তাহলে বিয়ের তারিখ কি ছিল- যখন বিয়ের সময় তাঁর বয়স ছিল ছ’বছর এবং কণে হিসাবে স্বামী গৃহে যাওয়ার সময় বয়স ছিল ন’বছর। এর সামঞ্জস্য কিভাবে হতে পারে। এর জবাব বোখারীর সে বর্ণনা থেকে পাওয়া যায় যা ওরওয়া বিন যুবাইর থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। এতে হযরত ওরওয়া (রা) বলেন যে, হিজরতের তিন বচর পূর্বে হযরত খাদিজার (রা) ওফাত হয়। দু’বছর অথবা তার কিছু সময় পর নবী (স) হযরত আয়েশাকে (রা) বিয়ে করেন, যখন তাঁর বয়স ছ’বছর ছিল। তারপর ন’বছর বয়সে তার রোখসতি (স্বামীগৃহে গমন) হয়। এতে হিসাব ঠিকমত হয় যে, হযরত আয়েশার (রা) বিয়ে ছ’বছর বয়সে হিজরতের প্রায় এক বছর পূর্বে হয় এবং স্বামীগৃহে গমন হয়- দ্বিতীয় হিজরীতে। হযরত ওরওয়ার (রা) এ বর্ণনা যদিও মুরসাল কিন্তু হাফেজ ইবনে হাজার বলেন যে, ওরওয়া (রা) যেহেতু হযরত আয়েশরা (রা নিকট থেকে শুনেই [প্রকাশ থাকে যে, হযরত ওরওয়া বিন যুবাইর (লা) হযরত আয়েশঅর (রা) ভাগ্নে ছিলেন। এ জন্যে আপন কালা সম্পর্কে যে কথা তিনি বলেন, তা তাঁর কাছে শুনেই বলেন- বর্ণনায় তাঁর বরাত তিনি দেন বা না দেন তাতে কিছু যায় আসেনা-গ্রন্হকার।] এ কথা বলেছেন সে জন্যে একে মুত্তাসাল পর্যায়েরই মনে করা উচিত।

আয়েশার (রা) বিয়ের বিরূপ সমালোচনা

যেহেতু এখানে হযরত আয়েশার (রা) বিবাহের উল্লেখ করা হয়েছে সে জন্যে সামনে অগ্রসর হওয়ার পূর্বে এটা সংগত মনে করা হচ্ছে যে, এখানে সেসব সমালোচনার জবাব দেয়া হোক যা তাঁর বিয়ে করা এবং আঠারো বছর বয়কে তাকে বিধবা অবস্থায় ছেড়ে যাওয়া এবং কুরআনের দৃষ্টিতে অন্য কোথাও তার দ্বিতীয় বিবাহও হতে পারতো না। এ কি (মায়াযাল্লাহ) জুলুম-অবিচার নয়? আর এমন অধিক বয়স ব্যক্তির এমন অল্প বয়সের মেয়েকে বিয়ে করা কি (মায়াযাল্লাহ) প্রবৃত্তি পূজার সংজ্ঞায় পড়েনা? ন’বছর বয়স কি এমন, যে বয়সের একটি মেয়ের উপর দাম্পত্য জীবনের গুরুভার চাপিয়ে দেয়া যায়?

প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের অভিযোগ শুধু সেই অবস্থায় করা যেতে পারে- যখন নবী (স) এবং হযরত আয়েশার (রা) বিবাহ একজন সাধারণ পুরুষ এবং একজন সাধারণ মেয়ের বিবাহ মনে করা হয়, অথচ হুযুর (স) আল্লাহর রাসূল ছিলেন এবং মানব জীবনে এক সার্বিক বিপ্লব সৃষ্টি করা এবং সমাজকে সে বিপ্লবের জন্যে তৈরী করা তাঁর দায়িত্ব ছিল। আর হযরত আয়েশা (রা) একজন অসাধারণ গুণসম্পন্ন মেয়ে ছিলেন- যাঁকে তাঁর বিরাট মানসিক যোগ্যতার ভিত্তিতে সমাজ গঠনে হুযুরের (স) মিলে এতো বিরাট কাজ করতে হয়েছিল যা সকল বনী পত্নীসহ কোন মহিলাই করেননি। বরঞ্চ কোনরূপ অতিরঞ্জিত না করেই একথা বলা যেতে পারে যে, দুনিয়ার কোন নেতার পত্নীই স্বীয় স্বামীর দায়িত্ব কর্তব্য সম্পন্ন করার ব্যাপারে সার্বিক সাহায্য সহযোগিতা করেননি, যেমনভাবে হযরত আয়েশা (রা) হুযুরের (স) করেছেন। তাঁর শৈশব কালেই তাঁর এসব যোগ্যতার জ্ঞান আল্লাহ ব্যতীত আর আরো ছিলনা। এ কারণেই আপন রাসূলের সাহচর্যের জন্যে আল্লাহ স্বয়ং তাঁকে বেছে নিয়েছিলেন। বোখারীতে “আয়েশার (রা) বিবাহ” অধ্যায়ে এ কথা আছে যে, হুযুর (স) হযরত আয়েশাকে (রা) বলেন, তোমাকে দু’বার আমাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে এবং বলা হয়েছে- এ তোমার বিবি। তিরমিযি- আবওয়াবুল মানাকেবে আছে- জিব্রিল রাসূলুল্লাহর (স) নিকটে হযরত আয়েশার (রা) ছবি রেশমের কাপড়ে জড়িযে এনে বলেন, ইনি হচ্ছেন দুনিয়ায ও আখেরাতে আপনার বিবি। অতএব এ জীবনসংগিনী নির্বাচন হুযুরের (স) ছিলনা, ছিল আল্লাহ তায়ালার। আর আল্লাহরই একথা জানা ছিল যে, ছ’বছরের এ অল্প বয়স্কা মেয়েটিকে তাঁর রাসূলে পাকের শিক্ষাদীক্ষায় ভূষিত করে ইসলামী সমাজ গঠনে কত বিরাট খেদমত আঞ্জাম দেয়ার প্রয়োজন আছে।

যারা এ ব্যাপারে হুযুরের (স) উপরে প্রবৃত্তি পূজার অভিযোগ করে তারা নিজেদের বিবেককে জিজ্ঞেস করে বলুক- এমন ব্যক্তি কখনো কি প্রবৃত্তি পূজারী হতে পারেন যিনি পঁচিশ বছর বয়স থেকে পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত একই বিবিতে পরিতৃপ্ত থাকেন যিনি বয়সে তাঁর থেকে পনেরো বছরের বড়ো ছিলেন? যিনি প্রথম বিবির ওফাতের পর একজন অতি বয়স্কা বিধবাকে বিয়ে করে তাঁকে নিয়েই চার-পাঁচ বছর পরিতৃপ্ত থাকেন? তিনি যদি প্রবৃত্তির লালসা চরিতার্থ করার জন্যে বিয়ে করতে চাইতেন, তাহলে সমাজে তাঁর এতোটা বিরাট জনপ্রিয়তা ছিল যে, তিনি যতো্ই এবং যেমনই সুন্দরী কুমারী বালিকা বিয়ে করতে চাইতেন, পিতামাত নিজেদের জন্যে গৌরব মনে করেই তাদেরকে তাঁর সামনে পেশ করতে প্রস্তুত হতো। এ ছাড়াও একজন কুমারী বালিকা ছাড়া আর যত মহিলাকেই তিনি বিয়ে করেন তাঁরা সকলেই ছিলেন বিগত যৌবনা বিধবা এবং একজন স্বামী কর্তৃক পরিত্যক্ত। প্রকৃতপক্ষে শুধু এ ধরনের সমালোচকগণের মনের মধ্যে শুধুমাত্র যৌন লালসা চরিতার্থ করার চিত্রটাই থাকে। তাদের হীন মানসিকতা এতো উর্ধ্বে উঠতে পারেনা যে, সে মহামানবের দাম্পত্য জীবনের উদ্দেশ্য বুঝতে পারবে যিনি একটি অতি মহান কাজের উপযোগিতার প্রতি লক্ষ্য রেখে কতিপয় মহিলাকে তাঁর জীবনসংগিনী করে নিয়েছিলেন।

এখন রইলো জুলুমের অভিযোগ। এ ব্যাপারেও সমালোচকগণ ব্যস এই একটি সাদাসিদে ঘটনাকে সামনে রাখেন যে, একজন বয়স্ক ব্যক্তি একজন ন’বছর বয়স্কা মেয়েকে বিয়ে করে আঠার বচর বয়সের সময় বিধবা করে রেখে যান যখন তার দ্বিতীয় বিয়ের কোন সম্ভাবনা ছিলনা এবং তার সমগ্র যৌবনকাল বিধবা অবস্থায় কাটাতে হয়। তারা এ সাধারণ উঠে এসব লোক কখনো এ কথা উপলব্ধি করার চেষ্টা করেনা এবং করতে চাননা যে, যে মহান কাজের মংগলকারিতা মানব জাতির নিকটে কোন সীমিত সময়কালের জন্যে নয়, বরঞ্চ সর্বকালের জন্য এবং কোন অঞ্চেলর জন্যে নয় বরঞ্চ গোটা বিশ্বের জন্যে পৌঁছে যেতে পারে, সে কাজে লক্ষ লক্ষ মানুষের জান মাল ব্যয়িত হওয়া কোন লোকসানের বিষয় নয় অথচ একজন মহিলার যৌবন এতে ব্যয়িত হওয়াকে কুরবানীর পরিবর্তে জুলুম নামে অভিহিত করা হচ্ছে। আর সে যৌবন যদি কুরবানী করা হয়ে থাকে তাহলে এ অর্থে যে তাকে দাম্পত্য জীবনের আনন্দ উপভোগ থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে। এছাড়া আর কোন ক্ষতি চিহ্নিত করতে তাঁরা পারেননা যা উন্নতমানের মহিলাকে ভোগ করতে হয়েছে। কিন্তু অপরদিকে লক্ষ করুন যে, পারিবারিক জীবনের সকল ঝামেলা ঝঞ্চাটও কর্মব্যস্ততা থেকে মুক্ত হয়ে নিজের অবশিষ্ট গোটা জীবন নারী পুরুষের মধ্যে ইসলাম ও তার হুকুম শাসন ও আইন কানুন, নৈতিকতা ও শিষ্টাচার শিক্ষাদানের কাজে কাটিয়ে দিয়ে সে মহান সত্তা কত বিরাট খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। যে ব্যক্তিই হাদীস শাস্ত্র অধ্যায়ন করেছেন তিনি জানেন যে, হযরত আয়েশা (রা) এর মাধ্যমে যতোটা দ্বীনী ইলম মুসলমানদের নিকটে পৌঁছেছে এবং ইসলামী ফেকাহর জ্ঞান তারা লাভ করেছে, তার তুলনায়- নবী পাকের (স) যুগের নারীতো দূরের কথা পুরুষও অতি নগণ্য সংখ্যক আছন যাঁদের এলমী খেদমত পেশ করা যেতে পারে। যদি হুযুরের (স) সাথে হযরত আয়েশার (রা) বিয়ে না হতো এবং তাঁর থেকে শিক্ষাদীক্ষার সুযোগ তিনি যদি না পেতেন, তাহলে অনুমান করা যায় যে, ইসলামী জ্ঞানের বিরাট অংশ থেকে মুসলিম উম্মাহ বঞ্চিত থাকতো। হযরত আয়েশা (রা) থেকে ২২১০ টি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তিনি শুধু হাদীস বর্ণনাকারিণীই ছিলেননা, বরঞ্চ ফেকাহবিদ, মুফাসসির, মুজতাহিদ ও মুফতী ছিলেন। মুসলমান মহিলাদের মধ্যে তাঁকে সর্বসম্মতিক্রমে সর্বাপেক্ষা অধিক ফেকাহবিদ গণ্য করা হতো। প্রথম সারির সাহাবীগণ তাঁর থেকে মাসলা-মাসায়েল জেনে নিতেন। এমনকি হযরত ওমর (রা) এবং হযরত ওসমানও (রা) বিভিন্ন শরয়ী মাসলা সম্পর্কে তাঁর স্মরণাপন্ন হতেন। মদীনা তাইয়েবার ওসব মুষ্টিমেয় আলেমদের মধ্যে শামিল ছিলেন যাঁদের প্রতি জনগণের পরিপূর্ণ আস্থা ছিল। এ অগণিত সামষ্টিক কল্যাণের তুলনায় সে সামান্য ব্যক্তিগত ক্ষতি যা বিধবা হওয়অর পর হযরত আয়েশা (রা) ভোগ করেছিলেন, তা বলতে গেলে কিছুই নয়। আর বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, এ সম্পর্কে এ অভিযোগ উত্থাপন করেন- যেসব ঈসায়ী মনীষী যাঁদের দৃষ্টিতে কোন সামষ্টিক কল্যাণ ব্যতীতই নিছক উদ্দেশ্যহীন চির কৌমায্যের জীবন যাপন করা সংসারত্যাগীদের জন্যে শুধু প্রশংসনীয়ই নয় বরঞ্চ ধর্মীয় খেদমতকারীদের জন্যে অপরিহর্যাও।

তারপর নয় বছর বয়সে হযরত আয়েশার (রা) স্বামীর সাথে মিলিত হওয়ার সমালোচনা যাঁরা করেন, তাঁরা জানেননা যে, ইসলাম প্রাকৃতিক দ্বীন এবং প্রাকৃতিক দিক দিয়ে একজন বালিকার দৈহিক গঠন ও বর্ধন যদি এতোটা ভালো হয় যে, এ বয়সেই সে সাবালিকা হয়েছে বলে মনে করা হবে, তাহলে তার স্বামীর সাথে মিলিত হওয়া একেবারে জায়েয ও সংগত। শুধু একটি প্রকৃতি বিরুদ্ধ ও নৈতিকতা বিরুদ্ধ- আইনই বিয়ের জন্যে বালক ও বালিকার জন্যে একটি বিশেষ বয়স নির্দিষ্ট করে দিতে পারে। কারণ এ বিধিনিষেধ শুধু জায়েয দাম্পত্য সম্পর্কের উপরই আরোপিত হয়, বিবাহ ব্যতীত নারী পুরুষের যৌন সম্পর্ক স্থাপনের উপর, আরোপিত হয়না। আর ব্যাপার শুধু এতোটুকু নয় যে, বিয়ের বয়সের পূর্বে ব্যভিচার কার্যের উপর এসব আইন প্রণেতাদের কোন আপত্তি নেই, বরঞ্চ কার্যত তাদের সমাজে ন-দশ বছরের বালক-বালিকা যৌন কার্যে লিপ্ত হয় এবং তার ফলে কোন বালিকা যদি কুমারী মাতা হয়ে পড়ে তাহলে তাদের সকল সহানুভূতি তার জন্যেই হয়ে থাকে। সে সময় না কোন আপত্তি সে বালিকার উপর করা হয় যে, বিয়ের পূর্বে মা হয়েছে, আর না সে বালকের উপর করা হয়, যে বিয়ের বয়সের পূর্বে একটি বালিকাকে মা বানিয়েছে। এমন নিকৃষ্ট নৈতিক মূল্যবোধ পোষণকারীগণ কোন মুখে ইসলামের এ আইনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে, যে আইনে বলা হয়েছে যে, যে বালক-বালিকা সাবালক হবে, তাদের বিয়ে জায়েয- এবং এর জন্যে কোন নির্দিষ্ট বয়সের শর্ত আরোপ করা যাবেনা। বিয়ের  জন্যে আইনতঃ একটা বয়স নির্ধারণ করার অর্থইতো এই যে, এ বয়সে পৌঁছার পূর্বে হালাল বিয়ে কিছুতেই হতে পারবেনা, হারাম কাজ অর্থাৎ ব্যভিচার যতোই হোকনা কেন।

তায়েফ সফর

এ প্রাসংগিক ও ঘটনা ক্রমে জরুরী আলোচনার পর আমরা ঘটনাবলীর ধারাবাহিকতার দিকে ফিরে যাচ্ছি। আপন পারিবারিক ব্যাপারসমূহ থেকে মুক্ত হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (স) ইবনে সা’দ ও বালাযুরীর বর্ণনা মতে নবুওতের দশম বছরের শেষে শাওয়াল মাসে তায়েফমুকী হন যা মক্কার পঞ্চাশ মাইল পূর্বে অবস্থিত। এ সফরের উদ্দেশ্যে এ ছিল যে, তিনি কুরাইশের জুলুম নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন। তাদের তীব্র বিরোধিতা ও প্রতিবন্ধকতা লক্ষ্য করার পর এ আশা ছিলনা যে, এ লোকেরা দাওয়াতে হক কবুল করা তো দূরের কথা তা চলতে দেয়ার কোন অবকাশও তাঁকে দেবেন। এ জন্যে তিনি চাচ্ছিলেন যে, তিনি তায়েফবাসীকে ইসলামের দাওয়াত দেবেন এবং সেখানকার শক্তিশালী গোত্র বনী সাকীফকে অন্ততঃ এ ব্যাপারে রাজী করাবেন যে, তারা সেখানে তাঁকে আশ্রয় দেবে এবং ইসলামী দাওয়াতের কাজে সাহায্য সহযোগিতা করবে। ইবনে সা’দ জুবাইর বিন মুতয়েম বিন আদীর বরাত দিয়ে বলেন, এ সফরে হুযুরের (স) সাথে গিয়েছিলেন হযরত যায়েদ বিন হারেসা (রা)। এ কথাই বলেছেন ইবনে কুতায়বা ও বালাযুরী। কিন্তু মূসা বিন ওকবা ও ইবনে ইসহাক বলেন যে, তিনি একাই গিয়েছিলেন। এ সফর তিনি পায়ে হেঁটে করেছিলেন। কোন পরিবহন সংগ্রহ করতে পারেননি। ইবনে সা’দ বলেন যে, সেখানে তিনি দশ দিন অবস্থান করেন। কিন্তু হাফেজ সাখাবী বলেন যে, বিশ দিন পর্যন্ত তিনি তায়েফবাসীদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতে থাকেন। আবদে ইয়ালীলের সাথে সাক্ষাতের পর দশ দিন অবস্থান করেন।

হুযুরের (স) উপর তায়েফবাসীদের বিরাট জুলুম

ইবনে ইসহাক, ওয়াকেদী প্রমুখ বলেন যে, সে সময়ে তায়েফের সর্দারী ছিল আমর বিন ওমাইর বিন আওফের তিনপুত্র- আবদে ইয়ালীল, মাসউদ ও হাবিবের হাতে যাদের মধ্যে একজনের বাড়িতে কুরাইশের একজন স্ত্রীলোক- সুফিয়া বিন্তে মা’মর জুমাহী ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) তার সাথে দেখা করেন। তাকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেন এবং তাকে বলেন, আমি আপনাদের কাছে এ জন্যে এসেছি যে, আপনারা ইসলামের কাজে আমাকে সাহায্য করুন এবং আমার কওমের যারা বিরোধিতা করছে তাদের মুকাবিলায় আপনারা আমাকে সমর্থন করুন। এতে তাদের মধ্যে একজন বলল, আল্লাহ যদি তোমাকে রাসূল বানিয়ে থাকেন তাহলে আমি কাবার পর্দা ছিঁড়ে ফেলেন। দ্বিতীয় জন বলে, তোমাকে ছাড়া রাসূল বানাবার জন্যে আল্লাহ আর কাউকে পেলেননা? তৃতীয় জন বলে, আমি কিছুতেই তোমার সাথে কথা বলবনা। কারণ যদি তুমি সত্যিই আল্লাহর রাসূল হও, তাহলে আমি তোমার জবাব দেব, তার থেকে তুমি অনেক মহান। আর যদি তুমি আল্লাহর নাম নিয়ে মিথ্যা বলছ, তাহলে তুমি এমন যোগ্য নও যে, তোমার সাথে কথা বলা যায়। এ কথা শুনার পর হুযুর (স) উঠে পড়লেন। তাদের থেকে মংগলের আর কোন আমা রইলোনা। বিদায়ের পূর্বে তিনি তাদেরকে বললেন, তোমরা আমার সাথে যে আচরণ করেছ তো করেছই। কিন্তু অন্ততঃপক্ষে তোমরা এটা কর যে, আমার কথা গোপন রাখ।

এ কথা তিনি এ জন্যে বললেন যে, তিনি আশংকা করেছিলেন যদি এ সংবাদ কুরাইধের নিকট পৌঁছে যার তো তারা আরও সাহস পেয়ে যাবে। কিন্তু তারা তা করলনা এবং তাদের লুচ্চা-গুন্ডা ও গোলামদেরকে তাঁর বিরুদ্ধে উসকিয়ে দিল। তারা তাঁকে একটি বাগান পর্যন্ত নিয়ে ছেড়ে দিল, যে বাগানের মালিক ছিল ওতবা বিন রাবিয়া ও শায়বা বিন রাবিয়া।

ওয়াকেদী থেকে ইবনে সা’দের বর্ণনায় এ কথা আছে যে, হুযুরের (স) সাকীফের দলপতি ও সম্ভান্ত ব্যক্তিদের প্রত্যেকের কাছে যান। কিন্তু কউ তাঁর কথায় কর্ণপাত করেনা। বরঞ্চ তাদের এ আশংকা হয়েছিল যে, তিনি যুবকদের না বিগড়ায়ে দেন। এ জেন্য  তারা বলল, হে মুহাম্মদ (স) তুমি আমাদের শহর থেকে বেরিয়ে যাও। আর পৃথিবীতে তোমার কোন বন্ধু থাকলে তার সাথে গিয়ে মিলিত হও। অতঃপর তারা তাদের ভবঘুরে ও গোলামদেরকে তাঁর বিরুদ্ধে উসকিয়ে দেয়। তারা তাঁকে গালি দিতে থাকে এবং চিৎকার করে লোকদের একত্র করে। মূসা বিন ওকবা বলেন, তারা তাক করে টাকনু এবং পায়ের গোড়ালিতে পাথর মারতে থাকে। পথের দু;পাশে তারা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায় এবং হুযুর (স) যখন পা তুলে চলতে থাকেন, তারা প্রস্তর বর্ষণ করতে থাকে।

অবশেষে তাঁর জুতা রক্তে পরিপূর্ণ হয়। সুলায়মান আত্তায়মী বলেন, আঘাতের কষ্টে যখন তিনি বসে পড়তেন, তারা তাঁকে ধরে দাঁড় করিয়ে দিন যাতে তাঁর উপর পুনরায় পাথর মারা যায়। তিনি বাধ্য হয়ে যখন চলা শুরু করতেন, তারা পাথর মারতো এবং ঠাট্টা বিদ্রুপ করতে থাকতো। ইবনে সা’দ ওয়াকেদীর বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন- এ অবস্থায় হযরত যায়েদ বিন হারেসা (রা) তাঁকে প্রস্তরাঘাত থেকে রক্ষা করার জন্যে স্বয়ং প্রস্তর বর্ষন নিজের উপর গ্রহণ করতেন। অবশেষে তার মাথা ফেটে যায়।

নবীর (স) মর্মস্পর্শী দোয়া

অবশেষে হুযুর (স) যখন তায়েফ থেকে বেরিয়ে পড়লেন এবং যে সব দুষ্ট লোক তাঁর পশ্চাদ্ধাবন করছিল তারা ফিরে চলে গেল, তখন তিনি ক্ষত-বিক্ষত হয়ে ওতবা ও শায়বার বাগানের প্রাচীর সংলগ্ন একটি আঙুর লতার ছায়ায় বসে পড়েন। এ ঘটনায় তিনি মর্মাহত হয়ে পড়েন এবং স্বীয় রবের দিকে মুখ ফিরিয়ে দোয়া করেন যার মর্মস্পশী কথাগুলো তাবারানী কিতাবুদ্দোয়া ও ম’জামে কবীরে, ইবনে হিশাম ও মুহাম্মদ বিন ইসহাকের বরাত দিয়ে সীরাতে, তাবারী তাঁর ইতিহাসে, ইবনুল কাইয়েম যাদুল মায়াদে এবং হাফেজ ইবনে কাসীর আল বেদায়াতে উদ্ধৃত করেছেন। তা নিম্নরূপঃ

“হে খোদা! আমি তোমারই দরবারে নিজের অসহায়ত্বের এবং লোকের দৃষ্টিতে আমার মর্যাদাহীনতার অভিযোগ করছি, কার উপর তুমি আমাকে সপর্দ করছো? এমন কোন অপরিচিতের উপর যে আমার সাথে কঠোর আচরণ করবে? অথবা কোন দুশমেনর উপরে যাকে তুমি আমার উপর জয়লাভ করার শক্তি দিয়েছ? যদি তুমি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে না থাক তো আমি কোন বিপদের পরোয়া করিনা। কিন্তু তোমার পক্ষ থেকে যদি নিরাপত্তা লাভ আমি করি তাহলে তা আমার জন্যে হবে অধিক আনন্দদায়ক। আমি আশ্রয় চাই তোমার সত্তার সে নূর থেকে যা অন্ধকারে আলো দান করে এবং দুনিয়া ও আখেরাতের বিষয়গুলো সুবিন্যস্ত করে। তোমার গজব আমার উপর নাযিল হোক এবং তোমার শাস্তিযোগ্য হয়ে পড়ি এর থেকে তুমি আমাকে রক্ষা কর। আমি যেন তোমার মর্জির উপর রাজী হই এবং তুমি আমার উপর রাজী হয়ে যাও। তুমি ছাড়া আর কোন শক্তি নেই”।

নবীর (স) ‘রাহমাতুল্লিল আলামীন’ হওয়ার বর্ণনা

বোখারী ‘বাদউল খালাক’, ‘যিকরুল মালায়েকা’তে, মুসলিম মাগাযীতে এবং নাসায়ী ‘বউস’-এ হযরত আয়েশার (রা) হাদীস উদ্ধৃত করে বলেন যে, তিনি হুযুরকে (স) জিজ্ঞেস করেন, ওহোদের যুদ্ধের চেয়েও কি কোন কঠিন অবস্থার সম্মুখীন আপনি হয়েছিলেন? জবাবে তিনি তায়েফের ঘটনার উল্লেখ করেন এবং বলেন, আমি মর্মাহত অবস্থায় যেদিকেই তাকাতাম সেদিকেই ধাবিত হতাম (অর্থাৎ পেরেশান ছিলাম যে কোন দিকে যাই)। এ অবস্থা থেকে আমি কখনো রেহাই পাইনি এমন সময় হঠাৎ দেখি যে, আমি ‘কারনোস সায়ালেব’ [এ স্থানটিকে ‘কারনোল মানায়েল’ও বলে। এ হচ্ছে নজদ বাসীর মীকাত যেখান থেকে কাবার যিয়ারতের জন্যে তাদেরকে ইহরাম বাঁধতে হয়। মক্কা থেকে উঠের পিঠে একদিন এক রাতের পথ- গ্রন্হকার।] নাম স্থানে রয়েছি। উপরে তাকিয়ে দেখি একটি মেঘ আমার উপর ছায়া দান করে আছে। দেখি তার মধ্যে হযরত জিব্রিল (আ) রয়েছেন। তিনি আমাকে ডেকে বললেন, আপনার কওম আনাকে যা কিছু বলেছে এবং আপনার দাওয়াতের যে জবাব দিয়েছে আল্লাহ তা শুনেছেন। তিনি পাহড়সমূহের এ ফেরেশতা পাঠিয়েছেন। আপনি যা ইচ্ছা সে হুকুম তাকে করুন। অতঃপর পাহাড়ের ফেরেশতা আমাকে সালাম করে বলেন, হে মুহাম্মদ! আপনার কওমের বক্তব্য এবং আপনার দাওয়াতের জবাব আল্লাহ শুনেছেন। আমি পাহাড়ের ফেরেশতা। আপনার রব আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন- যাতে আপনি আমাকে হুকুম করেন। এ শব্দগুলো মুসলিমের বর্ণনায় আছে।

তাবারানীতে আছে, যে হুকুম আপনি চান করুন। বোখারীর শব্দগুলো হচ্ছেঃ তারপর তিনি বললেন, হে মুহাম্মদ (স)! আপনি যা কিছু চান তা বলার এখতিয়অর আছে। যদি আপনি চান তাহলে আমি তাদের উপর (কুরাইশের উপর) মক্কার দু’দিরে পাহাড়গুলো (আবু কুবাইস ও কুয়ায় কেয়াম) একত্র করে তাদের উপর চাপিয়ে দেব।[কুরাইশদেরকে পাহা দিয়ে ঢেকে দেয়অর জন্য ফেরেশতা এ জন্যে হুযুরের (স অনুমতি চাইলেন যে, হুযুর (স) যে মুসিবতের সম্মখীন হলেন, তা তাদেরই জুলুম ও আক্রোশের কারণেই হয়েছেন। তারা যদি তাঁর উপর সীমাতিরিক্ত নির্যাতন না করতো তাহলে তাঁর তায়েফ যাওয়অর প্রয়েঅজনইবা কেন হতো? গ্রন্হকার।] নবী (স) তার জবাবে বলেন, না, না। আমি আশা করি যে, আল্লাহ তাদের বংশ থেকে এমন লোক পয়দা করবেন যারা আল্লাহ এক ও লাশারীকের দাসত্ব আনুগত্য করবে।

আদ্দাস নাসারানীর ইসলাম গ্রহণ

ইবনে হিশাম ইবনে ইসহাকের বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন, নবী (স) যখন ক্ষতবিক্ষত হয়ে ওতবা বিন রাবিয়া এবং শায়বা বিন রাবিয়অর বাগানের প্রাচীর সংলগ্ন আঙুর লতার ছায়ায় বসেছিলেন, তখন কুরাইশের এ দুই সর্দার তাঁকে এ অবস্থায় দেখতে পেল এবং তাদের শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হলো। এ কথারও উল্লেখ আছে যে, বনী জুমাহের যে স্ত্রীলোকটি তায়েফের জনৈক সর্দারের বাড়িতে ছিল, সেও হুযুরের (স) সাথে দেখা করলো। তিনি তাকে বললেন, তোমার শ্বশুর পরিবারের লোকেরা আমার সাথে এ কিরূপ আচরণ করলো? ওতবা ও শায়বা তাদের এক ঈসায়ী গোলামকে ডেকে পাঠালো এবং বলল, বড়ো একটা পাত্রে এক গোঠা আঙুর রাখ এবং তাকে দিয়ে খেতে বল। সে যখন পাত্রটি তাঁর কাছে রাখলো তখন তিনি বিসমিল্লাহ বলে (এক বর্ণনা মতে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম বলে) তাতে হাত রাখলেন। আদ্দাস বলল, খোদার কসম, এ দেশে তো এ কালেমা বলার কেউ নেই। হুযুর (স) জিজ্ঞেস করেন, তুমি কোথাকার অধিবাসী এবং তোমার দ্বীন কি? সে বলল, আমি ঈসায়ী এবং নিনাওয়ার অধিবাসী। তিনি বললেন, মর্দে সালেহ ইউনুস বিন মাত্তার বস্তির লোক নাকি? সে বলল, আপনি তাঁকে কিভাবে জানেন? [সুহায়লী আত্তায়মীর বরাত দিয়ে বলেছৈন যে, হুযুরের (স) মুবারক মুখ থেকে হযরত ইউনুসের (আ) উল্লেখ শুনার পর আদ্দাম বলেন, খোদার কসম, আমি যখন নিনাওয়া ছেড়ে আসি, তখন লোকেরাও জানতোনা যে মাত্তা কি! তাহলে তিনি তাঁকে কি করে জানলেন- যেহেতু তিনি উম্মী ছিলেন এবং উম্মী কওমে পয়দা হন। গ্রন্হকার।] হুযুর (স) বললেন, তিনি আমার ভাই। তিনিও নবী ছিলেন এবং আমিও নবী।

একথা শুনার পরই আদ্দাস তাঁর প্রতি ঝুঁকে পড়লো এবং তাঁর মাথা ও হাত-পায়ে চুমো দিতে লাগলেন।

সুলায়মান আত্তায়মী তাঁর সীরাত গ্রন্হে এ কথা বলেন যে, আদ্দাস বলে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি আল্লাহর বান্দাহ ও তাঁর রাসূল।

রাবিয়ার পুত্রদ্বয় যখন ও দৃশ্য দেখলো তখন একজন অপরজনকে বলল, দেখ তোমাদের গোলামকেও এ লোক বিগড়ে দিয়েছে। আদ্দাস ফিরে এলে তারা তাকে বলল, তোমার কি হলো যে, তার মাথা ও হাত-পায়ে চুমো দিতে লাগলে? সে বলল, প্রভু আামার! পৃথিবীতে তাঁর চেয়ে ভালো লোক আর কেউ নেই। তিনি আমাকে এমন এক বিষয়ের সংবাদ দিয়েছেন যা নবী ব্যতীত আর কেউ জানেনা। তারা বলল, আদ্দাস! তোমার দ্বীন থেকে ফিরে যেয়োনা। তার দ্বীন থেকে তোমার দ্বীন উত্তম। (গ্রন্হকার কর্তৃক সংযোজন।)

জ্বিনদের কুরআন শ্রবণ

তায়েফ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর নবী (স) নাখলা নামক স্থানে কিছুদিন অবস্থান করেন। মক্কায় কি করে ফিরে যাবেন এ দুশ্চিন্তায় তিনি পেরেশান ছিলেন। তায়েফে যা কিছু ঘটেছে তা তারা জানতে পেরেছে। তারপর তো পূর্ব থেকে কাফেরদের সাহস আর বেড়ে যাবে। এ সময়ে একদিন তিনি যখন নামাযে কুরআন তেলাওত করছিলেন, জ্বিনদের একটি দল সেদিক দিয়ে যাচ্ছিল। তারা কুরআন শ্রবণ করে এবং ঈমান আনে। তারা ফিরে গিয়ে নিজেদের কওমের মধ্যে ইসলামের তবলিগ শুরু করে। আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে এ সুসংবাদ দেন যে, মানুষ যদিও তাঁর দাওয়াত থেকে পলায়ন করছে কিন্তু জ্বিন সে দাওয়াতের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে এবং স্বজাতির মধ্যে তা ছড়াচ্ছে।[এ ছিল সূরা আহকাফের ২৯ থেকে ৩২ আয়াত যাতে আল্লাহ তায়ালা নবীকে (স) এ সংবাদ দেন যে জ্বিনগণ তাঁর মুখে কুরআন শুনে তার কি প্রভাব গ্রহণ করেছে-গ্রন্হকার।] (তাফহীম, ৪র্থ খন্ড- আল আহকাফ- ভূমিকা।)

হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা), হযরত যুবাইর (রা), হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা), হযরত হাসান বসরী, সাঈদ বিন জুবাইর, যির বিন হুবাইশ, মুজাহিদ, একরামা এবং অন্যান্য মনীষীগণ জ্বিনদের আগমনের বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁরা সকলে একমত যে, জ্বিনদের উপস্থিতির এ ঘটনা নাখলার অভ্যন্তরে ঘটেছিল। ইবনে ইসহাক, আবু নয়াইম ইসপাহানী এবং ওয়াকেদী বলেন, এ সে সময়ের ঘটনা যখন নবী (স) তায়েফ থেকে নিরাশ হয়ে মক্কার দিকে ফিরে যাচ্ছিলেন। পথে তিনি নাখলায় অবস্থান করেন। সেখানে এমা অথবা ফজর অথবা তাহাজ্জুদে তিনি কুরআন তেলাওত করছিলেন। এমন সময় জ্বিনদের একটি দল সেদিক দিয়ে অতিক্রম করছিল। তারা তাঁর কেরাত শুনার জন্যে থেকে গেল। এর সাথে সকল বর্ণনার এ বিষয়ে ঐক্যমত্য হয় যে, এ সময়ে জ্বিনগণ হুযুরের (স) সামনে আসেনি। আর না তিনি তাদের আগমন অনুভব করেন। বরঞ্চ পরে আল্লাহ তায়ালা ওহীর মাধ্যমে তাঁকে তাদের আগমন ও কুরআন শ্রবণ সম্পর্কে অবহিত করেন।

যেখানে এ ঘটনা ঘটে সে স্থানটি ছিল ‘আযযাইমা’ অথবা ‘আস সাইলুল কবীর’। কারণ ও দুটি স্থান নাখলা উপত্যকায় অবস্থিত। উভয় স্থানেই পানি ও সবুজ শ্যামল তৃণলতা ছিল। তায়েফ থেকে আগমনকারীদের যদি ও উপত্যকার কোথাও শিবির স্থাপন করতে হতো তাহলে এ দুয়ের যে কোন একটি স্থানে তারা অবস্থান কতে পারতো। (তাফহীম, ৪র্থ খন্ড- আল আহকাফ- টীকা ৩৩।)

এ সময়ে জ্বিনগণ হুযুরের (স) মুখ থেকে কুরআনের যে সূরা শ্রবণ করে তা ছিল সূরা রহমান। আল বাযযার, ইবনে জারীর, ইবনুল আবদুল্লাহ বিন ওমর (রা) এ বর্ণনা উদ্ধৃত হরে বলেন, একবার নবী (স) স্বয়ং সূরা রহমান তেলাওয়াত করেন অথবা তাঁর সামনে ও সূরা পড়া হলো, তারপর তিনি লোকদের জিজ্ঞেস করলেন, কি কারণ যে, আমি তোমাদের নিকট থেকে তেমন সুন্দর জবাব পাচ্ছি না যেমনটি জ্বিনগণ তাদের রবকে দিয়েছিল? লোকেরা বলল, সে জবাব কি ছিল? তিনি বলেন, আমি যখন আল্লাহ তায়ালার ইরশাদ

****************************************************** পড়লাম, তখন জ্বিনগণ তার জবাবে বলল-

**********************************************

(আমরা আমাদের রবের কোন নিয়ামত অস্বকার করি না)। একই রূপ বর্ণনা তিরমিযি, হাকেম এবং হাফেজ আবু বকর বাযযার হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা) থেকে উদ্ধৃত করেন। তাঁদের বর্ণনায় এ কথা আছে যে, যখন লোক সূরা রহমান শুনে নীরব থাকে তকন হুযুর (স) বলেন, আমি এ সূরা সে রাতে জ্বিনদেরকে শুনিয়ে ছিলাম- যে রাতে তারা কুরআন শুনার জন্যে একত্র হয়ছিল। তারা এর জবাব তোমাদের থেকে সুন্দর করে দিচ্ছিল। যখন আমি এ ইরশাদ পর্যন্ত পৌঁছলাম, “হে জ্বিন ও মানব জাতি! তোমরা তোমাদের রবের কোন কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে?”- তখন তারা তার জবাবে বলতো-

*****************************************

-হে আমাদের পরওয়ারদেগার। আমরা তোমার কোন নিয়ামতই অস্বীকার করছিনা। অতএব প্রশংসা তোমারই জন্যে।

যদিও অন্যান্য বর্ণনায় এ কথা বলা হয়েছে যে, সে সময় নবী (স) জানতেননা যে জ্বিন তাঁর মুখে কুরআন শুনছিল, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা (সূরা আহকাফ- আয়াত ২৯-৩২) তাঁকে এ খবর দেন যে, তারা তাঁর কেরাত শুনছিল। কিন্তু এ কথা অনুমান করা অসংগত হবেনা যে, যেভাবে আল্লাহ তায়ালা হুযুরকে (স) জ্বিনের কুরআন শ্রবণ সম্পর্কে অবহিত করেন, তেমনি আল্লাহ তায়ালাই তাঁকে এ বিয়ষও জানিয়ে দেন যে, সূরা রহমান শুনার সময় তার কি জবাব দিচ্ছিল।

প্রত্যাবর্তনের পর মক্কায় হুযুরের (স) প্রবেশ কিভাবে হয়

ইবনে সা’দ ওয়াকেদীর বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন যে, নাখলা থেকে যখন তিনি মক্কা যাওয়ার ইচ্ছা করেন তখন হযরত যায়েদ বিন হারেসা (রা) বলেন, আপনি সেখানে কিভাবে প্রবেশ করবেন যেহেতু আপনাকে বের করে দিয়েছে? হুযুর (স) বললেন, হে যায়দ! যে অবস্থা তুমি দেখছো তার থেকে বাঁচার কোন পথ আল্লাহ বের করে দিবেন। তিন তাঁর দ্বীনের সমর্থক ও সাহায্যকারী এবং তাঁল নবীকে তিনি বিজয়দানকারী। পরবর্তী কথাগুলো ওয়াকেদী সংক্ষিপ্ত করেন। কিন্তু ইবনে ইসহাক তা বিস্তারিত বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, হেরা পৌঁছার পর তিনি আবদুল্লাহ বিন আল উরায়কেতকে [এ ব্যক্তি মুশরিক ছিল,কিন্তু নবী (স) এবং আবু বকর (রা) তাকে নির্ভরযোগ্য মনে করতেন। এ জন্যে মদীনায় হিজরতের চরম আশংকাজনক অবস্থায় পথ দেখাবার জ ন্যে হুযুর (স) তাকে সাথে নেন। সে সম্পূর্ণ বিশ্বস্ততার সাথে এ খেদমত আঞ্জাম দেয়। অথচ সে কুরাইশকে এ খবর দিয়ে মোটা পুরস্কার লাভ করতে পারতো-গ্রন্হকার।] আখনাসবিন শুরায়েকের নিকেট পাঠান যেন সে তাঁকে তার আশ্রয়ে গ্রহণ করে। সে বলে, আমি তো বন্ধুত্বের চুক্তিতে আবদ্ধ।[এ ব্যক্তি প্রকৃত পক্ষে বনী সাকিক গোত্রের ছিল। কিনউত মক্কায় বনী যোহরার (হুযুরের (স) নানার দিকের আত্মীয়) ষাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তার যোগ্যতার কারণে বনী যোহরার মধ্যে সে সর্দঅর হওয়ার মর্যাদা লাভ করে-গ্রন্হকার।] চুক্তি সূত্রে আবদ্ধ ব্যক্তিকে কুরাইশের আসল গোত্রসমূহের মুকাবিলায় আশ্রয় দিতে পারেনা। অতঃপর হুযুর (স) ইবনে উরায়কেতকে সুহাইল বিন আরের নিকট পাঠান, সে বলে, বনী আমের বিন লুসাই বনী কাবের মুকাবিলায় আশ্রয় দিতে পারেনা। তারপর হুযুর (স) তাকে মুতয়েম বিন আদী-এর নিকটে পাঠান যে, বনী আবদে মানাফের শাখা বনী নাওফরে গোত্রভুক্ত ছিল উরয়াকেত গিয়ে তাকে বলল, মুহাম্মদ (স) বলেন যে, তুমি কি তাঁকে আশ্রয় দিতে প্রস্তুত আছ, যাতে তিনি তাঁর রবের পয়গাম পৌঁছাতে পারেন? সে জবাবে বলে, ঠিক আছে তাঁকে মক্কায় আসতে বল। অতএব হুযুর (স) শহরে গিয়ে রাত বাড়িতেই কাটালেন। সকালে মুতয়েম ও তার ছ’সাত পুত্র অস্ত্রসজ্জিত হয়ে হুযুরকে (স) সংগে করে হারামে নিয়ে যায় এবং বলে, আপনি তাওয়াফ করুন। তাওয়াফের সময় তারা সকলে তাঁর নিরাপত্তার জন্যে দাঁড়িয়ে থাকে। আবু সুফিয়ান (তাবারানীর মতে আবু জাহল) জিজ্ঞেস করে, তোমরা কি আশ্রয় দাতা, না তার আনুগত্যকারী? মুতয়েম বলে, না, শুধু আশ্রয়দানকারী। সে বলে, তোমাদের আশ্রয় ভংগ করা যায়না। তোমরা যাকে আশ্রয় দিয়েছ আমরাও তাকে আশ্রয় দিয়েছি।(গ্রন্হকার কর্তৃক সংযোজন।)

মুতয়েম বিন আদীর এ অনুকম্পা ছিল যার ভিত্তিতে বদর যুদ্ধের কয়েদীদের সম্পর্কে নবী (স) বলেন,

*******************************************

অর্থাৎ যদি মুতয়েম বিন আদী জীবিত থাকতো এবং আমার সাথে এসব ঘৃণ্য লোক সম্পর্কে কথা বলতো, তাহলে তার খাতিরে আমি এদেরকে ছেড়ে দিতাম। (তাফহীম-৫ম খন্ড-সূরা মুহাম্মদ- ভূমিকা।)

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.