সীরাতে সরওয়ারে আলম – ৫ম খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

একাদশ অধ্যায়

ইসরা ও মে’রাজের মর্মকথা

নবী মুস্তফা (স) এর মক্কী যিন্দেগীর শেষ তিন বছরের ইতিহাস র্ব্ণনা করার আগে সে সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ পেশ করা যুক্তিসংগত মনে করছি। তা নবী পাকের জীবন চরিত্রের উপর এক উজ্জ্বল শিরস্ত্রাণরূপে শোভা বর্ধণ করতে দেখা যাচ্ছিল। এ এমন এক তাজ বা শিরস্ত্রাণ যা আম্বিয়া সমেত মানব ইতিহাসের অন্য কোন ব্যক্তির জীবন চরিত আলোকোজ্জ্বল করতি পারেনি। আর তা হচ্ছে ইসরা ও মে’রাজের ঘটনা। ইসরার অর্থ রাতের বেলায় নবীকে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা (বায়তুল মাকদেস) পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া। এ কথা কুরআনে সূরায়ে বনী ইসরাইলের শুরুতে বলা হয়েছে। মে’রাজের অর্থ নবী পাকের (স) বায়তুল মাকদেস থেকে সিদরাতুল মুন্তাহা পর্যন্ত পৌঁছা। এর পূর্ণ বিবরণ হাদীসগুলোতে  পাওয়া যা। কদাচিৎ একথাও বলা হয়েছে যে, ইসরা ও মে’রাজের ঘটনা পৃথক পৃথক সময়ে সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু ওলামায়ে উম্মত এবং ফকীহ, মুহাদ্দিস ও মুতাকাল্লিমীনের বিরাট সংখ্যক মনীষী  এ ব্যাপারে একমত যে, এ উভয় ঘটনা একই সময়ে সংঘটিত হয়। একই রাতে নবী মুস্তাফাকে সশরীরে অর্থাৎ দেহ আত্মাসহ জাগ্রত অবস্থায় মসজিদে হারাম থেকে বায়তুল মাকদেস পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ঐ রাতেই তিনি উর্ধ জগতের উচ্চতম স্তর অতিক্রম করে গিয়ে রাব্বুল ইয্যাতের দরবারে পৌঁছে যান। আবার ভোর হবার আগেই তিনি মক্কায় তশরিফ আনেন।

মে’রাজের তারিখ

এ ঘটনা কখন ঘটেছিল তা নিয়ে মতপার্থক্য আছে। ইবনে সাদ ওয়াকেদীর বর্ণনা নকল করে বলেন যে, নবুওতের বার বছর পর ১৭ই রমজানে অর্থাৎ হিজরতের আঠারো মাস আগে এ ঘটনা ঘটে।[এখানে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট করে তুলে ধরা প্রয়োজন বোধ করছি যে, আমরা মদীনায় হিজরতের পূর্বে নবুওত উত্তর কালের যে ইতিহাস নির্ণয় করি তা ঐ হাদীসের ভিত্তিতে যা বোখারী এবং মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। এতে তিনি বলেন, নবী (স) এর উপর যখন ওহী নাযিল হয়, তখন তাঁর বয়স ছিল চল্লিশ বছর। তারপর তিনি মক্কায় তের বছর, মদীনায় দশ বছর অতিবাহিত করেন। এ বর্ণনার ভিত্তিতে আমরা মনে করি নবুওতের তের বছর পূর্ব হওয়ার পর হিজরত হয়-গ্রন্হকার।] অন্য এক সনদে ইবনে সা’দই নবুওতের তের বছর পর ১৭ই রবিউল আওয়াল অর্থাৎ হিজরতের এক বছর পূর্বের এ ঘটনা বলে উল্লেখ করেন। বায়হাকী মুসা বিন ওকবার বরাত দিয়ে এবং তিনি ইমাম যুহরীর বরাত দিয়ে মে’রাজের এ তারিখই উল্লেখ করেছেন। ওরওয়া বিন যুবাইরের বর্ণনাও তাই। ইবনে লাহিয়া আবুল আসওয়াদের বরাত দিয়ে তা উদ্ধৃত করেছেন। এর ভিত্তিতে ইমাম নাওয়াদী এটাকেই মে’রাজের সঠিক তারিখ বলেছেন। ইবনে হাযম এর উপর ইজমার দাবী করেছেন যদিও তা সঠিক নয়। ইসমাঈল আস-সুদ্দী থেকে দুটি বক্তব্য বর্ণিত আছে। তাবারী ও বায়হাকী তাঁর যে বর্ণনা নকল করেছেন তাতে মে’রাজকে হিজরতের এক বছর পাঁচ মাস পূর্বে নবুওতের দ্বাদশ বর্ষের শাওয়াল মাসের ঘটনা বলে বর্ণনা করেছেন। হাশেমের বর্ণনা মতে এ এক বছর চার মাস পূর্বের ঘটনা এবং সে দৃষ্টিতে এ যিলকাদ মাসের ঘটনা বলে নির্নিত হয়। ইবনে আব্দুল বার এবং কুতায়বার বর্ণনা এই যে, এ হিজরতের এক বছর আট মাস পূর্বে (দ্বাদশ নবুওত বর্ষের রজব মাসে) এ ঘটনা ঘটে। ইবনে ফারেস একে হিজরতের এক বছর তিন মাস, ইবনে আল জাওযী আট মাস, আবুর রাবী বিন মালেক ছ’মাস পূর্বের ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন। এগার মাস পূর্বের একটা উক্তিও আছে। ইবনুল মুনীর সীরাতে ইবনে আবদুল বার এর ব্যাখ্যায় এটাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ইবরাহীম বিন ইসহাক আল হারবী নিশ্চয়তার সাথে বলেছেন যে এটাই হলো মে’রাজের সঠিক তারিখ। কিন্তু  ২৭শে রজব যে মে’রাজ হয় একথা প্রসিদ্ধি লাভ করে। আল্লামা যুরকানী বলেন, কোন উক্তিকে অন্য কোন উক্তির উপর প্রধান্য দেয়ার যথেষ্ট দলিল প্রমাণ পাওয়া না গেলে প্রসিদ্ধ উক্তি গ্রহণ করাই উত্তম।[]

ঐতিহাসিক পটভূমিঃ

এ ঘটনাটি ইসলামী আন্দোলনের এমন এক স্তরে সংঘটিত হয়; যখন নবী (স) এর তাওহীদের আওয়াজ বলুন্দ করার পর প্রায় বার বছর কেটে গেছে। বিরুদ্ধবাদীরা তাঁর পথ রুদ্ধ করার জন্যে সকল প্রচেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু তাদের প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও নবীর আওয়াজ আরবের প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। আরবের এমন কোন গোত্র ছিলনা যার দু’চার জন লোক তাঁর দাওয়াত দ্বারা প্রভাবিত হয়নি। স্বয়ং মক্কায় মুষ্টিমেয় নিষ্ঠাবান লোকের এমন একনি দল তৈরী হয়েছিল, যাঁরা এ দাওয়াতে হকের সাফল্যের জন্যে জীবনের যে কোন ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ছিলেন। মদীনায় আওস ও খাযরাজের শক্তিশালী গোত্রদ্বয়ের বিরাট সংখ্যট লোক নবীর সাহায্য সহযোগিতাকারী হয়ে পড়েছিলেন। এখন সে সময় নিকটবর্তী হয়ে পড়েছিল যখন নবী পাকের মক্কা থেকে মদীনায় স্থানান্তরিত হয়ে বিভিন্ন স্থানে ছাড়িয়ে পড়া মুলমানদেরকে একস্থানে একত্র করে ইসলামের আদর্শ ও নীতির ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ এসে গিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে মে’রাজ সংঘটিত হয় এবং মে’রাজ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর নবী (স) মানুষকে সে পয়গাম শুনিয়ে দেন যা সুরায়ে বনী ইসরাইলে সন্নিবেশিত আছে।

ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ

সূরায়ে বনী ইসরাইলের প্রথম আয়াতে শুধু মসজিদে হারাম (বায়তুল্লাহ) থেকে মসজিদে আকসা (বায়তুল মাকদেস) পর্যন্ত হুযুরকে (স) নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে যে আল্লাহতায়ালা তাঁর বান্দাহকে তাঁর কিছু নিদর্শন দেখাতে চেয়েছিলেন। এর চেয়ে বিস্তারিত কিছু কুরআনে বলা হয়নি। কিন্তু হাদীস ও সীরাতে গ্রন্হগুলোতে এ ঘটনার বিশদ বিবরণ বহু সংখ্যক সাহাবী থেকে বর্ণিত আছে যাঁদের সংখ্যা পঁচিশ পর্যন্ত, বরঞ্চ গবেষণা ও অনুসন্ধানের পর পঁয়তাল্লিশ পর্যন্ত পৌঁছে যা। তাঁদের মধ্যে সব চেয়ে বিস্তারিত বিবরণ বর্ণিত হয়েছে হযরত আনাস বিন মালেক (রা), হযরত আবু হুরায়রা (রা), হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা), হযরত মালেক (রা), হযরত মালেক বিন সা’সায়া (রা), হযরত আবুযর গিফারী (রা), হযরত শাদ্দাদ বিন আওস (রা), হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা), হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) এবং হযরত উম্মেহানী (রা) থেকে।

হাদীসে যে বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় তার সংক্ষিপ্ত সার এই যে, রাতে জিব্রিল (আ) নবীকে (স) জাগ্রত করে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত বোরাকে আরোহণ করিয়ে নিয়ে যান। সেখানে (বায়তুল মাকদেসে) নবী (স) আম্বিয়া আলায়হিমুস সালামের সাথে নামায আদায় করেন। তারপর জিব্রিল (আ) তাঁকে উর্ধ জগতে নিয়ে চলেন। বিভিন্ন আসমানে বিভিন্ন নবীর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। শেষে এক অতি চরম উচ্চতায় পৌঁছার পর তিনি তাঁর রবের দরবারে হাযির হন। এ হাযিরি কালে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ হেদায়াত ছাড়াও পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হিসাবে তাঁর উপর আরোপ করা হয়। তারপর তিনি বায়তুল মাকদেসে প্রত্যাবর্তন করেন। সেখান থেকে তিনি মসজিদে হারামে ফিরে আসেন। এ সম্পর্কে বহু হাদীস থেকে জানা যায় যে, তাঁকে জান্নাত এবং জাহান্নামও দেখানো হয়। উপরন্তু নির্ভরযোগ্য বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, পরদিন যখন তিনি লোকের সামনে এ ঘটনার উল্লেখ করেন, তখন মক্কার কাফেরগণ তাই নিয়ে খুব ঠাট্টা বিদ্রুপ করে এবং মুসলমানদের মধ্যে কারো কারো ঈমান নড়বড়ে হয়ে পড়ে।

হাদীসের এ অতিরিক্তি বিবরণ কুরআনের পরিপন্হী নয় বরঞ্চ কুরআনের বর্ণনার পর আরও কিছু বলা হয়েছে। একথা সুস্পষ্ট যে অতিরিক্ত বর্ণনাকে কুরআনের পরিপন্হী বলে প্রত্যাখ্যান করা যায়না।

মে’রাজ দৈহিক ছিল না আত্মিক?

মে’রাজের এ ভ্রমণ কাহিনী কেমন ছিল? একি স্বপ্নে হয়েছিল, না জাগ্রত অবস্থায়? হুযুর (স) কি স্বয়ং তশরিফ নিয়ে গিয়েছিলেন, না তিনি আপন স্থানে অবস্থান করছিলেন এবং তাঁকে আত্মিকভাবে ওসব দেখানো হয়েছিল? এ সব প্রশ্নের জবাব স্বয়ং কুরআনের শব্দগুলো থেকেই পাওয়া যায়।

*********************************** থেকে বর্ণনার সূচনা এ কথাই বলে যে, এ কোন বিরাট অস্বাভাবিক অলৌকিক ঘটনা ছিল যা আল্লাহতায়ালার অসীম শক্তি ও কুদরতে সংটিত হয়। একথা ঠিক যে, স্বপ্নে কোন ব্যক্তির এমন কিছু দেখা, অথবা কাশফের দ্বারা এমন দেখার এ গুরুত্ব হয় না যে তা বয়ান করার জন্যে এ ভূমিকার প্রয়োজন হয়। যেমন সকল ক্রটি বিচ্যুতির ও অক্ষমতার উর্ধে যে সত্তা যিনি তাঁর বান্দাকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন অথবা কাশফের মাধ্যমে এ সব কিছু দেখিয়ে দিয়েছেন। তারপর এ শব্দগুলো- “একরাত্রিতে তিনি তাঁর বান্দাহকে নিয়ে গেলেন” দৈহিক ভ্রমণকেই বুঝায়। স্বপ্নে কোন সফরকে, অথবা কাশফের মাধ্যমে কোন সফরের জন্যে ‘নিয়ে যাওয়া’ শব্দগুলো কিছুতেই উপযোগী হতে পারেনা। সুতরাং আমাদের এ কথা মেনে নেয়া ছাড়া উপায়ান্তর থাকেনা যে এ নিছক এককি আত্বিক পর্যবেক্ষণ ছিলনা বরঞ্চ একটি দৈহিক সফর এবং চাক্ষুষ পর্যবেক্ষণ ছিল যা আল্লাহ নবী (স) কে দেখিয়েছিলেন।

এখন যদি এক রাতে উড়োজাহাজ ব্যতিরেকে মক্কা থেকে বায়তুল মাকদেস যাওয়া এবং আসা আল্লাহর কুদরতে সম্ভব ছিল, তাহলে পরবর্তী অন্যান্য বিবরণ অসম্ভব বলে কেন প্রত্যাখ্যান করা হবে যা হাদীসে বর্ণি হয়েছে? সম্ভব ও অসম্ভবের বিতর্ক তখনই হতে পারে যখন কোন সৃষ্ট জীবের নিজের এখতিয়ারে কোন কাজ করার প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু যখন বলা হয় যে খোদা অমুক কাজ করেছেন তখন সম্ভাবনার প্রশ্ন সেই ব্যক্তি উত্থাপন করতে পারে খোদার শক্তিশালী হওয়ার বিশ্বাস যার নেই। আল্লাহ তায়ালা যাকে ইচ্ছা মূহুর্তের মধ্যে এমন স্থানে নিয়ে যেতে পারেন যেখানে জড় জগতের সব চেয়ে দ্রুতগামী বস্তু আলোর পৌঁছতে কোটি কোটি আলোক বর্ষের প্রয়োজন হয়। কাল ও স্থানের বাধা বন্ধন সৃষ্টির জন্যে, বিশ্ব জগতের সষ্ট্রার জন্যে নয়।

হাদীস অস্বীকারকারীদের আপত্তি-অভিযোগ

মে’রাজ ভ্রমণের যে বিস্তারিত বিবরণ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, সে সম্পর্কে হাদীস অস্বীকারকারীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন আপত্তি অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু সে সবের মধ্যে শুধু দুটি এমন যার কিছু গুরুত্ব দেয়া যায়।

এক- এই যে, এর থেকে আল্লাহ তায়ালার কোন বিশেষ স্থানে অবস্থান অনিবার্য হয়ে পড়ে। নতুবা তাঁর সামনে বান্দার উপস্থিতির জন্যে তাকে সফর করিয়ে এক নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যাওয়ার কি প্রয়োজন ছিল?

দ্বিতীয়- এই যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে দোযখ ও বেহেশত দেখানো এবং কিছু লোকের আযাবে লিপ্ত থাকার দৃশ্য কিভাবে দেখানো হলো যখন বান্দাদের বিষয়ে চুড়ান্ত ফয়সালা করাই হয়নি। এ কোন কথা যে শাস্তি অথবা পুরস্কারের ফয়সালা তো হবার কথা কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার পর, কিন্তু কিছু লোককে পূর্বাহ্নেই শাস্তি দেয়া হয়েছে?

প্রকৃতপক্ষে এ দুটি অভিযোগ ক্রটিপূর্ণ চিন্তারই পরিণাম ফল। প্রথম অভিযোগটি এ জন্যে ভ্রান্ত যে, স্রষ্টা তাঁর আপন সত্তায় নিঃসন্দেহে অসীম শক্তির মর্যাদাসম্পন্ন। কিন্তু সৃষ্টির সাথে আচরণের ব্যাপারে তিনি তাঁর নিজের দুর্বলতার জন্যে নয় বরঞ্চ সৃষ্টির দুর্বলতার কারণে সীমিত মাধ্যম অবলম্বন করেন। যেমন যখন তিনি সৃষ্টির সাথে কথা বলেন, তখন কথা বলার সেই সীমিত পন্হা অবলম্বন করেন যা একজন মানুষ শুনতে ও বুঝতে পারে। বস্তুতঃ আল্লাহর কথার নিজস্ব একটা সার্বভৌম মর্যাদা রয়েছে। এমনিভাবে যখন তিনি তাঁর বান্দাহকে তাঁর সাম্রাজের বিরাট ও মহান নিদর্শনাবলী দেখাতে চান, তখন তিনি তাকে নিয়ে যান এবং যেখানে যে বস্তু দেখাবার সেখানেই যেভাবে খোদা দেখে থাকেন। কোন কিছু পর্যবেরক্ষণ করার জন্যে খোদাকে কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হয় না, কিন্তু বান্দার প্রয়োজন হয়। স্রষ্টার সমীপে হাযির হওয়ার ব্যাপারটাও তাই। স্রষ্টা স্বয়ং কোন স্থানে অবস্থানরত নন। কিন্তু বান্দাহ তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্যে একটা স্থানের মুখাপেক্ষী যেখানে তার জন্যে আল্লাহ তায়ালার তাজাল্লী কেন্দ্রভূত করা হয়। অন্যথায় তাঁর সার্বভৌম মর্যাদার তাঁর সাথে সাক্ষাৎ সীমিত শক্তিসম্পন্ন বান্দাহর জন্যে সম্ভব নয়।

এখন রইলো দ্বিতীয় অভিযোগটি। তা এ জন্যে ভূল যে, মে’রাজের সময় নবীকে বহু কিছুর পর্যবেক্ষণ করানো হয়। তার মধ্যে কিছু বাস্তবতাকে রূপকের আকারে দেখানো হয়। যেমন কোন ফেৎনা সৃষ্টিকারী বিষয়ের এ দৃষ্টান্ত যে, একটি সামান্য ফাটল বা ছিদ্র থেকে একটা মোটাসোটা বলদ বেরিয়ে আসা এবং এবং তারপর আর তার মধ্যে ফিরে যেতে না পারা। জেনাকারীদের এ দৃষ্টান্ত যে, তার কাছে তাজা সুন্দর গোশত থাকা সত্ত্বেও তা ছেড়ে পঁচা গোশত খাচ্ছে। এভাবে অসৎ কাজের যে শাস্তি তাঁকে দেখানো হলো, তা ছিল রূপক আকারে আখেরাতের শাস্তির অগ্রিম পর্যবেক্ষণ।

প্রকৃত বিষয় যা মে’রাজ সম্পর্কে উপলদ্ধি করা উচিত তাহলো এই যে, আম্বিয়া আলায়হিমুস সালামের প্রত্যেককে আল্লাহ তায়ালা তাঁর পদমর্যাদা অনুযায়ী আসমান যমীনের শাসন ব্যবস্থার পর্যবেক্ষণ করিয়েছেন। বস্তুগত যবনিকা মাঝখান থেকে উত্তোলন করে সচক্ষে সেসব বাস্তব সত্য দেখানো হয়েছে যা না দেখেই বিশ্বাস করার দাওয়াত দেয়ার জন্যে তাঁদেরকে আদিষ্ট করা হয়েছিল, যাতে করে তাঁদের মর্যাদা একজন দার্শনিকের মর্যাদা থেকে স্বতন্ত্র হয়ে যায়। দার্শনিক যা কিছু বলে তা আন্দাজ অনুমান করে বলে। সে যদি স্বয়ং তার নিজের সম্পর্কে ওয়াকেফহাল হয়, তাহলে কখনো তার কোন অভিমতের সত্যতার সাক্ষ্য দেবেনা। কিন্তু নবীগণ যা কিছুই বলেন, তা তাঁর প্রত্যক্ষ প্রমাণ ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই বলেন। তাঁরা সৃষ্টির সামনে এ সাক্ষ্য দিতে পারেন, “আমরা এ সব জানি এবং এ সব আমাদের চোখে দেখা বাস্তবতা”।(তাফহীমুল কুরআন বনী ইসরাইল, ভূমিকা ও টীকা ১।)

মে’রাজকে স্বপ্ন বলে আখ্যায়িতকারীদের যুক্তি পর্যালোচনা

এ ঘটনাটিতে স্বপ্ন বলে আখ্যায়িত করার জন্যে দুটি যুক্তি পেশ করা হয়ে থকে। একটি এই যে, সূরা বনী ইসরাইলের ৬০ নং আয়াতে তার জন্যে রুয়া ******** শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ হযরত আয়েশার (রা) এ উক্তি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে-

*****************************************

হুযুরের (স) দেহমুবারক (আপনস্থান থেকে) সরে যায়নি, বরঞ্চ তাঁর রূহকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

এ দুটির মধ্যে প্রথমটিকে তো স্বয়ং কুরআনই নাকচ করে দিচ্ছে। সেই পূর্ণ বাক্যটি একটু দেখুন যাতে মে’রাজকে লক্ষ করে ******** শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

************************************

আর যে রুয়া আমরা তোমাকে দেখিয়েছি তাকে আমরা মানুষের জন্যে ফেৎনা বানিয়ে রেখে দিয়েছি।

এ বাক্যে যদি ***** শব্দকে স্বপ্নের অর্থে নেয়অ হয় তাহলে মানুষের জন্যে তা ফেৎনা হওয়ার কি কারণ হতে পারে? স্বপ্নে মানুষ হরেক রকমের বস্তু দেখতে পারে। যদি রাসূলুল্লাহ (স লোকের সামনে একথা বলতেন, ‘আজ রাতে স্বপ্নে দেখলাম যে, মক্কা থেকেক বায়তুল মাকদেস গিয়েছি’- তাহলে তার জন্যে কোন মুলমান ফেৎনায় পড়ে মুরতাদ হয়ে যেতোনা এবং কোন কাফেরও এ নিয়ে বিদ্রুপ করতোনা। আর কেউ একথাও জিজ্ঞেস করতোনা- তোমার ভ্রমণ যে সত্য তার প্রমাণ দাও। এটা ফেৎনা তখনই হতে পারতো যখন নবী (স) এ ঘটনা জাগ্রত অবস্থায় ঘটেছে বলে লোকের কাছে বলতেন এবং একথাও বলতেন যে, আমার এ সফর রূহানী নয়, বরঞ্চ দৈহিক।

উপরন্ত একথা দাবী করাও ঠিক নয় যে, আরবী ভাষায় ******* শব্দ শুধু স্বপ্নের জন্যেই ব্যবহৃত হয়। প্রকৃতপক্ষে আরবী অভিধানে ***** এবং ***** উভয়ই একই অর্থবোক এবং একটি অপরটির স্থানে ব্যবহৃত হয়। যেমন ********* ও ******** হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) যিনি আরবী ভাষায় দিকপাল হিসাবে গণ্য হতেন, কুরআনের এ আয়াতের এ তাফসীর করতে গিয়ে বলেন,

*********************************************

-এ ছিল চাক্ষুষ স্বপ্ন যা সে রাতে নবীকে (স) দেখানো হয়েছিল যখন তাঁকে বায়তুল মাকদেস নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সাঈদ বিন মনসুর ইবনে আব্বাসের (রা) এ উক্তির যে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন তার মধ্যে ও কথাটি অতিরিক্ত আছে- *********** ও স্বপ্নের মতো ***** (রুয়া) ছিলনা।

অন্য একটি সনদে ইবনে মনসুর ইবনে আব্বাসের (রা) এ উক্তি নকল করেছেন-

***************************************

এর দ্বারা সে পর্যবেক্ষণ বুঝানো হয়েছে যা বায়তুল মাকদেসের পথে নবীকে করানো হয়েছিল।

এখন রইলো হযতর আয়েশার (রা) উক্তি। তো এ সনদের দিক দিয়ে অত্যন্ত দুর্বল। মুহাম্মদ বিন ইসহাক তা এ ভাষায় নকল করেছেন- আবু বকর বংশের কতিপয় লোক (কোন ব্যক্তিকে) বলেছেন যে, হযরত আয়েশা (রা) এ কথা বলতেন। এরূপ অজ্ঞাত সনদ দ্বারা এ কি করে প্রমাণিত হতে পারে যে, যে কথা হযরত আয়েশার (রা) বলে উল্লেখ করা হচ্ছে, তা প্রকৃত পক্ষে তাঁর উক্তি? তারপর এ দুর্বল বর্ণনায় মুকাবিলায় বহু সহীহ সনদের মাধ্যমে হাদীসের নির্ভর যোগ্য গ্রন্হগুলোতে স্বয়ং নবী (স) এর বর্ণিত ইসরা ও মে’রাজের ভ্রমণ বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ আছে। আর এ সব উদ্ধৃত করা হয়েছে হযরত আনেস (রা), হযরত মালেক বিন সা’সায়া (রা), হযরত আবু হুরায়রা (রা), হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা), হযরত আবুযর গিফারী (রা), হযরত শাদ্দাদ বিন আওস (রা) এবং অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম থেকে। এ সব কি করে নাকচ করা যায়? আর হযরত আয়েশার (রা) এ বর্ণনার কি ব্যাখ্যা করা যেতে পারে যা বায়হাকী পুরো মুত্তাসিল সনদসহ নকল করেছেন যে, ইসরার রাত শেষে ভোরবেলায় নবী (স) লোকের কাছে রাতের ঘটনা বর্ণনা করছিলেন এবং ঈমান আনার পর নবীর নবুওতের যারা স্বীকৃতি দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে অনেকেই মুরতাদ হয়ে পড়েন। তারপর তাঁরা এ খবর নিয়ে হযরত আবু বকরের (রা) কাছে গিয়ে বলতে থাকেন আপনার বন্ধুর একটু খবর নিয়ে দেখুন। তিনি বলেছন যে, গত রাতে তাঁকে বায়তুল মাকদেস নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

আবু বকর বলেন, তিনি কি এরূপ বলেছেন নাকি? তাঁরা বললেন হ্যাঁ। আবু বকর (রা) বলেন, যদি তিনি এমন বলে থাকেন তাহলে অবশ্যই তা সত্য কথা বলেছেন। তাঁরা বললেন, আপনি কি এটা সত্য মনে করেন যে, তিনি একই রাতে বায়তুল মাকদেস গেলেন এবং ভোরের আগে ফিরেও এলেন? আবু বকর (রা) বলেন, আমি তো সকাল সন্ধা তাঁর থেকে আসমানের খবর শুনে তার সত্যতা স্বকিার করে নেই।

কোন ব্যক্তি কি এ কথা মেনে নিতে পারে যে, যে বক্তব্যটি অজ্ঞাত সনদের মাধ্যমে হযরত আয়েশার (রা) বলে বলা হচ্ছে যে, হুযুরের দেহ আপন স্থানেই ছিল এবং শুধু রূহকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সে বক্তব্য ছিল হযরত আয়েশার (রা)?(গ্রন্হকার কর্তৃক পরিবর্ধন।)

মে’রাজের প্রকৃত মর্মকথা

মে’রাজের এ ঘটনা মানব ইতিহাসের এক অন্যতম বিরাট ঘটনা যা কালের গতি পরিবর্তন করে এবং ইতিহাসের উপর স্থায়ী রেখাপাত করে। মে’রাজের প্রকৃত গুরুত্ব এটা নয় যে তা কিভাবে হলো, বরঞ্চ তার উদ্দেশ্য ও ফলাফলই প্রকৃত গুরুত্বপূর্ণ।

আসল কথা এই যে, যে ভূমন্ডলে আমরা বাস করি, তা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার বিরাট বিশাল সাম্রাজ্যের একটি অতি ক্ষুদ্র প্রদেশ বিশেষ। এ প্রদেশে খোদার পক্ষ থেকে যে নবীই পাঠানো হয়েছে তাঁর মর্যাদা কিছুটা এমন ছিল যেমন দুনিয়ার সরকারগুলো তাদের অধীন দেশগুলোতে গভর্নর অথবা ভাইসরয় প্রেরণ করে থাকে। একদিক দিয়ে উভয়ের মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়ে্ছে। দুনিয়অর সরকার বা রাষ্ট্র পরিচালকদের গভর্ণর ও ভাইসরয় শুধুমাত্র দেশের ব্যবস্থাপনার জন্যে নিযুক্ত করা হয়ে থাকে। অপর দিকে বিশ্বজগতের সম্রাটের গভর্নর ও ভাইসরয় এজন্যে নিযুক্ত হন যে তাঁরা মানুষকে সঠিক সভ্যতা, পুত চরিত্র এবং সত্য জ্ঞান ও কর্মের এমন মূলনীতি শিক্ষা দেন যা আলোক স্তম্ভের ন্যায় মানব জীবনের রাজপথে অবস্থান করে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সোজা পথ দেখাতে থাকে। এতদ সত্ত্বেও উভয়ের মধ্যে সাদৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। দুনিয়অর রাষ্ট্রগুলো গভর্নরের দায়িত্ব তাদের উপর অর্পন করে যারা হয় নির্ভরযোগ্য। যখন তারা তাদেরকে এ দায়িত্বে নিয়োজিত করে তখন তাদেরকে বলা হয় রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীন ব্যবস্থাপনা কিভাবে এবং কোন পলিসির উপর চলছে। তাদের কাছে সে সব গোপন তথ্যও প্রকাশ করে দেয়া হয় যা সাধারণ প্রজাবৃন্দের জন্যে করা হয়না। খোদার সাম্রাজের অবস্থাও অনুরূপ। সেখানেও পয়গম্বরী বা নবুওতের দায়িত্ব তাঁদের ওপরই আরোপ করা হয়েছে যাঁরা সবচেয়ে বেশী বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য। তারপর যখন তাঁদেরকে এ পদে নিয়োগ করা হয়, তখন আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং তাঁদেরকে তাঁর সকল সাম্যাজ্যের আভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ করান। তাদের কাছে সৃষ্টিজগতে সে সব গোন রহস্য ও তথ্য প্রকাশ করে দেন যা সাধারণ মানুষের জন্যে প্রকাশ করা হয়না। যেমন, হযরত ইবরাহীমকে (আ) আসমান ও যমীনের আভ্যন্তীর ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ করিয়ে দেন (সূরা আনয়াম আয়াত ৭৫)। খোদা কিভাবে মৃত্যুকে জীবন দান করেন, তাও তাঁকে দেখিয়ে দেয়া হয় (সূরা বাকারা আয়াত ২৬০)। হযরত মূসাকে (আ) তূর পর্বতে আল্লাহর তাজাল্লী দেখানো হয় (সূরা আ’রাফঃ ১৪৩)। তাঁকে এক বিশিষ্ট বান্দার সাথে তাঁকে এক বিশিষ্ট বান্দার সাথে কিছুকাল ভ্রমণ করান যাতে করে তিনি দেখতে পান এবং উপলব্ধি করেন যে, আল্লাহর ইচ্ছায় দুনিয়অর ব্যবস্থাপনা কিভাবে চলে (সূরা কাহাফঃ ৬০-৮২)। এমন কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা নবী মুহাম্মদ (স) লাভ করেন। কখনো তিনি খোদার নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতাকে উর্ধলোকে প্রকাশ্যে দেখতে পান (তাকবীরঃ ২৩)। কখনো সে ফেরেশতা তাঁর এতোটা নিকটবর্তী হয়ে যান যে, উভয়ের মধ্যে দুই ধনুক পরিমাণ, বরঞ্চ তার চেয়েও কম দূরত্ব রয়ে যায় (সূরা নজমঃ ৬-৯)। কখনো আবার সেই ফেরেশতাকে তিনি সিদরাতুল মুন্তাহা অর্থাৎ জড় জগতের সর্বশেষ সীমান্তে দেখতে পান এবং সেখানে তিনি খোদার বিরাট ও মহান নিদর্শনাবলী প্রত্যক্ষ করেন (নজমঃ ১৩-১৮)। কিন্তু মে’রাজ নিছক পরীক্ষা পর্যবেক্ষন পর্যন্তই সীমিত ছিলনা, বরঞ্চ তার চেয়ে উচ্চতর মর্যাদার এক বস্তু ছিল। তার দৃষ্টান্ত কিছুটা এ ধরনের মনে করুন যে, সর্বোচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন শাসক তাঁর নিয়োগকৃত নিম্নপদস্থ শাসককে কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে সরাসরি রাজধানীতে ডেকে নিয়ে কোন বিশেষ কাজের দায়িত্ব অর্পন করছেন। এবং তার জন্যে প্রয়োজনীয় নীতি সম্পর্কীয় নির্দেশাবলীও দিচ্ছেন। ঠিক তেমনি রাসূলূল্লাহ (স)-কেও আল্লাহর দরবারে তলব করা হয়েছিল। কারণ ইসলামী আন্দোলনের মোড় পরিবর্তন ছিল অতি আসন্ন। এ অবস্থার প্রেক্ষিতে তাঁকে বিশেষ পথ নির্দেশনা দানই ইপ্সিত ছিল।(বেতার ভাষণ ২০শে আগস্ট ১৯৪১ (সংক্ষেপিত)।)

মে’রাজের ভ্রমন বৃত্তান্ত

এখন আমরা প্রথমে ঐ সব হাদীসগুলোর সার সংক্ষেপ পেশ করব যাতে মে’রাজের অত্যাশ্চর্য ভ্রমণ বৃত্তান্ত বয়ান করা হয়েছে। তারপর বলব, মে’রাজ থেকে প্রত্যাবর্তন করে রাসূলুল্লাহ (স) দুনিয়াবাসীকে কোন পয়গাম দিয়েছিলেন।

রাসূলুল্লাহ (স) নবুওত প্রাপ্তির পর প্রায় বারো বছর অতিবাহিত হয়েছে। বয়স তাঁর বায়ান্ন বছর। হেরমে কাবায় তিনি শুয়ে ছিলেন। হঠাৎ জিব্রিল ফেরেশতা এসে তাঁকে জাগিয়ে দেন। আধা-ঘুমন্ত ও আধা-জাগ্রত অবস্থায় তাঁকে তুলে যমযমের নিকটে নিয়ে যান। তাঁর বক্ষ বিদীর্ণ করেন। তা যমযমের পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলেন। তারপর সহনশীলতা প্রজ্ঞা এবং ঈমান ও একীন দিয়ে সে বক্ষ পরিপূর্ণ করে দেন।[বুখারী, মুসলিম, মুসনাদে আহমদ, ইবনে জারীর, বায়হাকী, হাফেয ইবনে আবি হাতেম, তাবারানী ও বাযযার প্রভৃতিতে হযরত আবু হুরায়রা (রা) ও হযরত মালেক বিন সা’সায়ার বর্ণনা সমূহ। কিছু অন্যান্য বর্ণনায় বলা হয়েছে যেয, ইসরার সূচনা হয় হুযুরের চাচাতো ভগ্নি উম্মেহানী (রা) বিন্তে আবি তালিবের বাড়ি থেকে। সেখানে তিনি এশার নামায পড়ে ঘুমিয়ে ছিলেন। ইবনে জারীর আবু ইয়ালা এবং তাবারানী এ ঘটনা স্বয়ং উম্মেহানী (রা) থেকে এবং বায়হাকী হযরত আলী (রা) বিন আবি তালিব, হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) এবং হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। তাবাকাতে ইবনে সায়াদে ওয়াকেদীর এ বর্ণনা আছে যে, ইসরার সূচনা হয় শিয়াবে আবি তালিব থেকে। বুখারী ও মুসলিমে আবুযর (রা) থেকে এবং মুসনাদে আহমদে হযরত উবাই বিন কায়াব (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, বাড়ির ছাদ ফেঁড়ে জিব্রিল (আ) ঘরে প্রবেশ করেন এবং নবীকে নিয়ে যান। প্রকৃত পক্ষে এ সব বর্ণনায় কোন গরমিল নেই। উম্মেহানীর ঘর ছিল শিয়াবে আবি তালিবে। সে ঘরের ছাদ ফেঁড়ে জিব্রিল ঘরে নামেন এবং নিদ্রাবস্থায় নবীকে মসজিদে হারামে নিয়ে যান। তারপর আধা-নিদ্রা ও আধা-জাগ্রত অবস্থায় যা ঘটলো তা উপরে বলা হয়েছে।– গ্রন্হকার।]

তারপর আরোহনের জন্যে জিব্রিল (আ) একটি পশু পেশ করেন। তার রং ছিল সাদা, আকৃতি ছিল গাধা থেকে কিছুটা বড়ো এবং খচ্চর থেকে ছোটো। বিদ্যুৎ বেগে চলছিল। তার এক একটি পদক্ষেপ হচ্ছিল দৃষ্টির শেষ সীমায়। আর এ কারণেই তার নাম ছিল বুরাক। [বুরাকের ও গুণাবলী সম্পর্কে হাদীসের সকল বর্ণনা সর্বসম্মত-গ্রন্হকার।] পূর্বে নবীগণও এরূপ ভ্রমণে এধরনের বাহনই ব্যবহার করতেন। [ইবনে জারীর বায়হাকী তাঁর দালায়েলে, ইবনে আবি হাতেম, ইবনে ইসহাক, ইবনে মারদুইয়া, নাসায়ী, মাগাযী ইবনে আয়েয এবং সযহায়লী রাওযুল উনুকে লিখেছেন যে, হযরত ইবরাহীম (রা) বুরাকে চড়ে হযরত হাজেরা ও দুগ্ধপোষ্য সন্তান হযরত ইসমাইলকে (আ) নিয়ে মক্কায় গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর এ বর্ণনার উৎস বলেননি- গ্রন্হকার।] যখন নবী পাক (স) তার উপর সওয়ার হতে যাচ্ছিলেন তখন সে নড়ে উঠলো। হযরত জিব্রিল (আ) তার গায়ে মৃদু আঘাত করে বলেন, এ দেখ কি করছিলস। আজ পর্যন্ত মুহাম্মদ (স) থেকে কোন মহান ব্যক্তিত্ব তোর উপর সওয়ার হয়নি। এ কথায় লজ্জায় তার গা দিয়ে ঘাম ছুটলো।[মুসনাদে আহমদ, তিরমিযি, ইবনে হিব্বান, ইবনে জারীর, ইবনে ইসহাক, ইবনে সা’দ, -(গ্রন্হকার)।]

তারপর নবীপাক তার উপর আরোহন করেন এবং জিব্রিল তাঁর সাথে চলেন।[ইবনে জারীর, বায়হাকী, নাসায়ী, ইবনে হাশেম, ইবনে আবি হাতেম, তাবারানী, বাযযার ও ইবনে সা’দের উদ্ধৃত বর্ণনাবলীতে আছে যে জিব্রিল (আ) সব সময়ে এ সফরে নবীর সাথে ছিলেন। তাবারানীতে আবদুর রহমান বিন আবি লায়লার বর্ণনায় আছে যে, জিব্রিল (আ) হুযুরকে বুরাকের উপরে তাঁর সামনে বসিয়ে নিয়েছেন। আবু ইয়ালা এবং ইবনে হিব্বানে হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদের (রা) এ বর্ণনা উদ্ধৃত করা হয়েছে যে, জিব্রিল (আ) সামনে বনে এবং হুযুরকে (স) পেছনে বসিয়ে নেন। তিরমিযি, নাসায়ী এবং মুসনাদে আহমদে হযরত হুযায়ফার (রা) এরূপ বর্ণনা আছে যে, হুযুর (স) এবং জিব্রিল (আ) উভয়ে বুরাকের উপরে আরোহন করেন, কিন্তু এ কথা বলা হয়নি যে, কে আগে এবং কে পেছনে ছিলেন- গ্রন্হকার।] প্রথম মনযিল ছিল মদীনা, যেখানে নেমে নবী (স) নামায পড়েন। জিব্রিল (আ) বলেন, এখানে আপনি হিজরত করে আসবেন। দ্বিতীয় মনযিল ছিল সিনাই পাহাড় যেখানে আল্লাহ হযরত মূসার (আ) সাথে কথা বলেন, তৃতীয় মনযিল বায়তুল্লাহম যেখানে হযরত ঈসা (আ) ভূমিষ্ট হন। চতুর্থ মনযিল ছিল বায়তুল মাকদেস, যেখানে বুরাকের সফর শেষ হয়।[নাসায়ীতে আনাস বিন মালেকের (রা) বর্ণনা এবযং বায়হাকীতে শাদ্দাদ বিন আওসের (রা) বর্ণনা কিছু ভিন্ন ধরনের। এতে সিনাই পাহাড়ের পরিবর্তে মাদইয়ানের সেই গাছের নিকটে নামায পড়ার উল্লেখ আছে যেখানে হযরত মুসা (আ) দুজন মহিলার পশুকে পানি পান করারবার পর বসে পড়েছিলেন-গ্রন্হকার।]

বিভিন্ন পথভ্রষ্ট ও পথভ্রষ্ঠকারী শক্তি

এ সফরের এক স্থানে একজন চিৎকার করে বলে, এদিকে এসো। নবী (স) সে দিকে কোন ভ্রক্ষেপ করলেননা। জিব্রিল (আ) বললেন, এ ইহুদীবাদের দিকে আহবান জানাচ্ছে। অপর দিক থেকে আওয়াজ এলো- এদিকে এসো। নবী (স) সে দিকেও তাকালেননা। জিব্রিল (আ) বলেন, এ খৃষ্টবাদের আহবায়ক। তারপর অত্যন্ত সাজ সজ্জা ও জাঁক জমক সহ এজন রমনী দেখা গেল। সেও হুযুরকে তার দিকে আহবান জানালো। তিনি সে দিক থেকেও মুখ ফিরিয়ে নেন। জিব্রিল (আ) বলেন, এ হচ্ছে দুনিয়া। তারপর এক বৃদ্ধা সামনে পড়লো। জিব্রিল (আ) বলেন, দুনিয়ার অবশিষ্ট বয়স এ বৃদ্ধার অবশিষ্ট বয়স থেকে অনুমান করুন। তারপর আর এক ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ হলো, যে নবীকে তার দিকে আকৃষ্ট করতে চাইলো। কিন্তু তাকেও ছেড়ে তিনি সামনে অগ্রসর হলেন। জিব্রিল (আ) বলেন, এ শয়তান ছিল যে, আপনাকে পথ থেকে সরাতে চেয়েছিল।[এ ঘটনা গুলোর বিভিন্ন অংশ হাদীস ও সীরাতের বিভিন্ন গ্রন্হাবলীতে সন্নিবেশিত আছে। বায়হাকী (দালায়েল), তাবারানী (আওসাত), ইবনে জাবীর, ইবনে হাতেম, ইবনে ইসহাক, ইবনে মারদইয়া- (গ্রন্হকার)।]

বায়তুল মাকদেসে নামাজ

বায়তুল মাকদেসে পৌঁছার পর হুযুর (স) বুরাক থেকে নেমে পড়লেন। সেখানেই বুরাককে বেঁধে রাখা হলো যেখানে অন্যান্য নবীগণ তাকে বাঁধতেন। [মু’সনাদে আহমদ, মুসলিম, ইবনে জারীর, বায়হাকী, ইবনে আবি হাতেম, ইবনে ইসহাক, ইবনে সা’দ, ইবনে মারদুইয়া। কিছু অন্যান্য বর্ণনায়ও আছে যে, জিব্রিল (আ) একটি পাথর আঙুলের আঘাতে ছিদ্র করেন। সেই ছিদ্রের সাথে বুরাককে বাঁধেন (তিরমিযি, হাতেম, ইবনে আবি হাতেম।] যখন তিনি হায়কালে সুলায়মানীতে (সে সময়ে তা ধ্বংস হলেও তার স্থান বিদ্যমান ছিল এবং কায়সার জাষ্টিনাইন যেখানে একটা গীর্জা বানিয়ে রেখেছিলেন) প্রবেশ করলেন, তখন সে সকল নবীকে তিনি দেখতে পেলেন যাঁরা মানব জন্মের সূচনা কাল থেকে তখন পর্যন্ত দুনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৌঁছার সাথে সাথেই নামাজের কাতার দাঁড়িয়ে যায় এবং সকলে প্রতীক্ষা করতে থাকেন যে, কে ইমামতি করবেন। জিব্রিল (আ) তাঁর হাত ধরে সামনে নিয়ে গেলেন এবং তাঁর পেছনে সকলে নামাজ আদায় করেন।[ইবনে জারীর, বায়হাকী, তাবারানী, নাসায়ী, ইবনে আবি হাতেম, মুসনাদে আহমদ, ইবনে সা’দ।]

তারপর তাঁর সানে তিনটি পানপাত্র রাখা হয়। একটিতে পানি, দ্বিতীয়টি দুধ এবং তৃতীয়টিতে শরাব ছিল। তিনি দুধের পাত্র হাতে নিয়ে তা পান করলেন। জিব্রিল (আ) তাঁকে মুবারকবাদ দিয়ে বলেন আপনি প্রকৃতির পথ অবলম্বন করেছেন।[হযরত সুহাইব (রা) থেকে তাবারানীর, হযরত আনাস (রা) এবং আবু হুরায়রা (রা) থেকে ইবনে জারীর, এবং বিভিন্ন মনীষীদের পক্ষ থেকে ইবনে ইসহাকের বর্ণনা তাই যা আমরা উপরে উদ্দৃত করেছি। কিন্তু এ ব্যাপারে বর্ণনা সমূহের মধ্যে অনেক মতভেদ রয়েছে। ইবনে জারীর, বায়হাকী এবং ইবনে আবি হাতেম হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে যে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেনে তাতে দুটি পেয়ালার উল্লেখ আছে। একটিতে পানি এবং দ্বিতীয়টিতে শরাব ছিল। মুসনাদে আহমদ এবং মুসলিমে হযরত আনাসের (রা) বর্ণনা, বোখারীতে হযরত আবু হুরায়রার বর্ণনা এবং বায়হাকীতে হযরত সাঈদ বিন আল-মুসাইয়েবের (রা) বর্ননায় দুটি পাত্রের উল্লখ আছে। একটিতে দুধ এবং অপরটিতে শরাব ছিল। বায়হাকী, ইবনে হাতেম, বাযযার এবং তাবারানীতে হযরত শাদ্দাদ বিন আওসের বর্ণনায়ও দুটি পাত্রের কথা আছে। কিন্তু একটিতে দুধ এবং অপরটিতে মধু ছিল। পক্ষান্তরে মুসনাদে আহমদ, বোখারী এবং মসুলিম, মালেক বিন সা’সায়ার (রা) বর্ণনা হচ্ছে এই যে, সিদরাতুল মুন্তাহার নিকটে অথবা বায়তুল মামুরের নিকটে হুযুর (স) এর সামনে তিনটি পাত্র পেশ করা হয়, যার একটিতে শারাব, দ্বিতীয়টিতে দুধ এবং তৃতীয়টিতে মধু ছিল। কিন্তু সকল বর্ণনা এ ব্যাপারে একমত যে হুযুর (স) দুধের পাত্রই বেছে নেন- গ্রন্হকার।]

অতঃপর একটি সিঁড়ি তাঁর সামনে পেশ করা হলো। তাঁর সাহায্যে জিব্রিল (আ) তাঁকে আসমানের দিকে নিয়ে চললেন। আরবী ভাষায় সিঁড়িকে মে’রাজ বলে। তদনুযায়ী এ সমগ্র ঘটনাকে মে’রাজ নামে অভিহিত করা হয়। [ইবনে জারীর, বায়হাকী, ইবনে আবি হাতেম, ইবনে ইসহাক, ইবনে মারদুইয়া আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে নকল করেছেন। কিন্তু ইবনে হাতেম হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করেন যে জিব্রিল (আ) হুযুর (স) এর হাত ধরে আসমানের দিকে উঠে যান- গ্রন্হকার।]

প্রথম আসমানে

যখন তাঁরা প্রথম আসমানে উঠেন, তখন আসমানের দরজা বন্ধ ছিল।

দ্বার রক্ষক ফেরেশতা জিজ্ঞেস করেন, কে এসেছে?

হযরত জিব্রিল (আ) আপন নাম বলেন।

ফেরেশতা বলেন, আপনার সাথে কে?

জিব্রিল-মুহাম্মদ (স)।

ফেরেশতা- তাঁকে কি ডাকা হয়েছে?

জিব্রিল- জি হ্যাঁ।

তারপর দরজা খুলে যায় এবং হুযুরকে (স) সাদরে অভ্যর্থনা করা হয়। [মে’রাজ সম্পর্কে এ কথা সর্ব সম্মত যে, প্রত্যেক আসমানে প্রবেশ করার সময়ে জিব্রিলকে (আ) এভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো। আগমনকারী জিব্রিল (আ) এটা নিশ্চিত জানার পর এবং তাঁর সাথে মুহাম্মদ (স) এবং তাকে ডাকা হয়েছে এটা জানার পর দরজা খুলে দেয়া হয়েছে ও হুযুরকে অভ্যর্থনা জানানো হয়েছে-গ্রন্হকার।] এখানে নবী পাকের (স) পরিচয় ফেরেশতা এবং মানবীয় আত্মার ঐসব বিরাট ব্যক্তিত্বের সাথে হয়, যাঁরা এ স্তরে অবস্থান করছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব এমন এক বুযুর্গের ছিল যা ছিল মানব আকৃতির পূর্ণাংগ নমুনা। মুখমন্ডল ও দেহের গঠনে কোন প্রকার ক্রটি বা অপূর্ণতা ছিলনা। জিব্রিল (আ) বলেন, ইনি আদম (আ), আপনার আদি পিতা।

এ বুযুর্গের ডানে বামে বহু লোক ছিল। তিনি ডান দিকে তাকালে আনন্দিত হতেন, বাম দিকে তাকালে কাঁদতেন। জিজ্ঞেস করা হলো- ব্যাপার কি?

বলা হলো- এ সব আদমের বংশধর। আদম তাঁর নেক বংশধরদের দেখে খুশী হতেন এবং অসৎ লোকদের দেখে কাঁদতেন।[বুখারী, মুসলিম, মুসনাদে আহমদ মালেক বিন সা’সায়ার বর্ণনা, বুখারী ও মুসলিম আবুযর (রা) এর বর্ণনা, ইবনে জারির, বায়হাকী, ইবনে আবি হাতেম, ইবনে মারদুইয়া, ইবনে ইসহাক আবু সাঈদ খুদরীর (রা) বর্ণনা, ইবনে জারির, বায়হাকী, হাফেয ইবনে আবি হাতেম, তাবারানী, বাযযার আবু হুরায়রার (রা) বর্ণনা এবং আবদুল্লাহ বিন আহমদ হাম্বল যাওয়ায়েদে মুসনাদে উবাই বিন কায়াবের (রা) বর্ণনা নকল করেছেন- গ্রন্হকার।]

তারপর হুযুরকে (স) বিস্তারিত পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেয়া হয়। একস্থানে তিনি দেখলেন কিছু লোক ফসল কাটলো। যতোই কাটছে ততোই বেড়ে যাচ্ছে। জিজ্ঞেস করা হলো- এর কারা? বলা হলো- এরা খোদার পথে জিহাদকারী।

তারপর দেখা গেল কিছু লোকের মস্তক পাথর মেরে চুর্ণ বিচুর্ণ করা হচ্ছে। জিজ্ঞেস করা হলো- এরা কারা? বলা হলো এরা ঐসব লোক যাদের অনীহা অসন্তোষ নামাযের জন্যে উঠতে দিতনা।

তিনি এমন কিছু লোক দেখলেন যাদের কাপড়ের আগে-পেছনে তালি দেয়া আছে এবং তারা পশুর মতো ঘাস খাচ্ছে। জিজ্ঞেস করা হলো- এরা কারা? বলা হলো- এরা তাদের মাল থেকে যাকাত খায়রাত কিছু দিতনা।

তারপর একজন লোক দেখা গেল, যে কাঠ জমা করে তার বোঝা উঠাবার চেষ্টা করছে। যখন তা উঠাতে পারছিলনা তখন তার সাথে আরও কিছু কাঠ যোগ করছিল। জিজ্ঞেস করা হলো-এ কে? বলা হলো- এ এমন ব্যক্তি যার উপর দায়িত্বের এতো বোঝা  ছিলে যে, তা বহন করতে পারতোনা। কিন্তু তা কম করার পরিবর্তে আরও দায়িত্বের বোঝা নিজের কাঁধে চাপিয়ে নিত।

তারপর দেখা গেল কিছু লোকের জিহবা ও ওষ্ঠ কাঁচি দিয়ে কাটা হচ্ছে। জিজ্ঞেস করা হলো- এরা কারা? বলা হলো- এরা এমন সব লোক যারা ছিল দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তা এবং মুখে যা আসতো তাই বলতো এবং সমাজে ফেৎনা সৃষ্টি করতো।

তারপর একস্থানে একটা পাথর দেখা গেল, যার মধ্যে সামান্য ফাটল ছিল। তার মধ্যে থেকে একটা মোটা সোটা বলদ বেরিয়ে এলো। তারপর সে পুনরায় তার মধ্যে প্রবেশ করার চেষ্টা করছিল কিন্তু পারছিলনা। জিজ্ঞেস করা হলো- ব্যাপার কি? বলা হলো- এ হচ্ছে এমন ব্যক্তির দৃষ্টান্ত, যে দায়িত্বহীনের মতো ফেৎনা সৃষ্টিকারী উক্তি করে। তারপর- লজ্জিত হয়ে প্রতিকার করতে চায় কিন্তু পারেনা।

এক স্থানে দেখা গেল কিছু লোক তাদের নিজেদের গোশত কেটে কেটে খাচ্ছে। জিজ্ঞেস করা হলো- এরা কারা? বলা হলো- এরা পরের বিরুদ্ধে মিথ্যা দোষারোপ ও কটুক্তি করতো।

তাদের নিকটেই এমন কিছু লোক ছিল যাদের হাতের নখ ছিল তামার তৈরী। তাই দিয়ে তারা তাদের মুখমন্ডল ও বুক আঁচড়াচ্ছিল। এরা কারা জিজ্ঞেস করা হলে বলা হলো- এরা মানুষের অসাক্ষাতে তাদের কুকর্ম প্রচার করে বেড়াতো এবং তাদের সম্মানে আঘাত করতো।

কিছু লোক এমন দেখা গেল, যাদের ওষ্টদ্বয় ছিল উটের ওষ্টের মতো এবং তারা আগুন ভক্ষণ করছিল। জিজ্ঞেস করা হলো- এসব কারা। বলা হলো- এরা এতিমের সম্পদ ভক্ষণ করছিল।

কিছু লোক এমন দেখা গেল, যাদের পেট ছিল অসম্ভব রকমের বড়ো এবং তা ছিল বিষাক্ত সাপে পরিপূর্ণ। লোক তাদেরকে দলিত মথিত করে তাদের উপর দিয়ে যাতায়াত করতো কিন্তু তারা আপন স্থান থেকে নড়তে পারতোনা। এরা কারা জিজ্ঞেস করা হলে বলা হলো- এরা ছিল সুদখোর।

তারপর এমন কিচু লোক দেখা গেল, যাদের সামনে একদিকে রাখা ছিল তাজা সুন্দর গোশত, অন্যদিকে পঁচা গোশত যার থেকে দুর্গন্ধ ঠিকরে বেরুচ্ছিল। তারা ভালো গোশত ছেড়ে পঁচা গোশত খাচ্ছিল। বলা হলো, এরা ছিল এমন লোক যারা তাদের হালাল স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও অবৈধভাবে নিজেদের যৌন বাসনা চরিতার্থ করতো।

তারপর কিছু স্ত্রীলোক এমন দেখা গেল, যারা তাদের স্তনের সাহায্যে লটকে ছিল। জিজ্ঞেস করা হলে বলা হলো- এরা এমন স্ত্রীলোক ছিল যারা তাদের এমন সব সন্তানকে স্বামীর ঔরসজাত বলতো যারা তাদের ঔরসজাত ছিলনা।[এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে যে, এসব পর্যবেক্ষণ বায়তুল মাকদেস যাবার পথে হয়েছিল, না প্রথম আসমানে। উপরন্তু এ সকল পর্যবেক্ষণের উল্লেখ সব বর্ণনায় একত্রে করা হয়নি। বরঞ্চ বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের উল্লেখ বিভিন্ন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। এখানে আমরা সব বরাত এক স্থানে করে দিচ্ছি। মুসনাদে আহমদ, ইবনে মাজা, ইবনে জারীর, বায়হাকী, ইবনে হাশেম, ইবনে আবি হাতেম, তাবারানী, বাযযার- বর্ণনা আবু হুরায়রা (রা) ইবনে জারীর, ইবনে আবি হাতেম, ইবনে ইসহাক, ইবনে মারদুইয়া, বর্ণনা আবু সাঈদ খুদরীর (রা) মুসনাদে আহমদ ও আবু দাউদ- বর্ণনা আনেস বিন মালেকের (র)- গ্রন্হকার।]

এ সব পর্যবেক্ষণকালে নবী (স) এর সাক্ষাৎ এমন এক ফেরেশতার সাথে হয়- যিনি অত্যন্ত কাটাখোট্টা মেযাজে মিলিত হন। নবী (স) জিব্রিলকে (আ) জিজ্ঞেস করেন, এতক্ষণ যতো ফেরেশতার সাথে সাক্ষাৎ হলো সকলে উৎফুল্ল হয়ে ও হাসিমুখে মিলিত হলেন। কিন্তু ইনি এমন শুষ্ক মেযাজের কেন? জিব্রিল (আ) বলেন, এর হাসিখুসির কোন কারবার নেই। এ যে দোযখের দারোগা। এ কথা শুনে নবী (স) দোযখ দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেন্ তৎক্ষণাৎ তাঁর দৃষ্টিপথ থেকে পর্দা উঠিয়ে দেয়া হলো এব্ং দোযখ তার ভয়ংকর রূপ নিয়ে আবির্ভূত হলো।[সীরাতে ইবনে হিশাম- বরাত ইবনে ইসহাক ও ইবনে আবি হাতেম। বর্ণনা আনাস বিন মালেকের (রা)- গ্রন্হকার।]

পরবর্তী আসমানগুলোতে

এসব স্তর অতিক্রম করে নবী পাক (স) দ্বিতীয় আসমানে পৌঁছেন। এখানকার মনীষীদের মধ্যে দুজন যুবক ছিলেন বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। পরিচয়ে জানা গেল, তাঁরা হলেন হযরত ইয়াহইয়া (আ) এবং হযরত ইসা (আ)।

তৃতীয় আসমানে এক বুযর্গের পরিচয় দেয়া হলো যাঁর সৌন্দর্য সাধারণ মানুষের তুলনায় তারকারাজির মুকাবিলায় যেন পূর্ণিমার চাঁদ। জানা গেল, ইনি হযরত ইউসুফ (আ)।

চতুর্থ আসমানে হযরত ইদ্রিস (আ), পঞ্চম আসমানে হযরত হারুন (আ) এবং ষষ্ঠ আসমানে হযরত মূসা (আ) নবী মুহাম্মদ (স) এর সাথে মিলিত হন। সপ্তম আসমানে পৌঁছার পর তিনি এক বিরাট প্রাসাদ (বায়তুল মা’মুর) দেখতে পান যেখানে সকল যিনি স্বয়ং দেখতে অনেকটা তাঁর মতোই ছিলেন। পরিচয়ে জানা গেল তিনি হযরত ইব্রাহীম (আ)।[মুসনাদে আহমদ, বুখারীও মুসলিম- মালেক বিন সা’সায়ার বর্ণনা। মুসনাদে আহমদ, মুসলিম, ইবনে আবি হাতেম আনাস বিন মালেকের (রা) বর্ণনা। ইবনে জারীর, বায়হাকী, ইবনে আবি হাতেম, তাবারানী, বাযযার, হাকেম, ইবেন ইসহাক- আবু হুরায়রার (রা) বর্ণনা। কোন কোন বর্ণনায় নবীগণের স্থান সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করা হয়েছে। নাসায়ী এবং মুসলিমে হযরত আনাসের (রা) বর্ণনায় চতুর্থ আসমানে হযরত হারুন (আ) এবং পঞ্চম আসমানে হযরত ইদরিসের (আ) স্থান বলা হয়েছে। হযরত আবু সাঈদ খুদরীর (রা) বর্ণনা উদ্ধৃত করে ইবনে জারীর, বায়হাকী, ইবনে মারদুইয়া হযরত ইউসুফের (রা) স্থান দ্বিতীয় আসমানে এবং হযরত ইহাহইয়া (আ) ও হযরত ঈসার (আ) স্থান তৃতীয় আসমানে বলেছেন- গ্রন্হকার।]

সিদরাতুল মুন্তাহা

অতঃপর নবী পাকের (স) অতিরিক্ত উর্ধলোকে যাত্রা শুরু হয় এবং তিনি সিদরাতুল মুন্তাহা পৌঁছে যান। এ হচ্ মহান রাব্বুল ইয্যাতের দরবার এবৃ জড়জগতের মধ্যবর্তী এক বিভক্তকারী সীমান্তের মর্যাদা ধারণ করে। এখানে সকল সৃষ্টির জ্ঞান শেষ হয় যায়। এরপর যা কিছু আছে তা অদৃশ্য যার জ্ঞান না কোন নবীর আছে আর না কোন নিকবর্তী ফেরেশতার। অবশ্যি আল্লাহ তার থেকে কোন কিছুর জ্ঞান কাউকে দিতে চান তো ভিন্ন কথা। নীচে থেকে যার কিছু যায় তা এখানে নিয়ে নেয়া হয় এবং উপর থেকে যা কিছু আষে তা এখানে গ্রহণ করা হয়। এ স্থানের নিকেট নবীকে বেহেশতের পর্যবেক্ষণ করানো হয়। তিনি দেখেন যে, নেক বান্দাহদের জন্যে আল্লাহ তায়ালঅ এমন সব নিয়ামতের ব্যবস্থা করে রেখেছেন যা না কোন চোখ দেখেছে, না কোন কান শুনেছে, আর না কোন মন তার ধারণা করতেপেরেছে।[বুখারী ও মুসলিম- আবুযর (রা) এর বর্ণনা। মুসলিম, নাসায়ী, তিরমিযি ও বায়হাকী- আবদুল্লাহ বিন মাসউদের (রা) বর্ণনা। ইবনে জারীর, বায়হাকী, ইবনে আবি হাতেম, ইবনে মারদুইয়া- বর্ণনা আবু সাঈদ খুদরীর (রা)- গ্রন্হকার।]

সিদরাতুল মুন্তাহার জিব্রিল (আ) থেকে যান। তারপর নবী (স) একাকী সামনে অগ্রসর হন। অতঃপর এক উচ্চ অনুকূল সমতল স্থানে মহিমাময়ের দরবার সামনে দেখতে পান। অতঃপর কথোপকথনের মর্যাদা তাঁকে দান করা হয়। [ইবনে হাতেম, বর্ণনা আনেস বিন মালেকের (রা)। বুখারী- কিতাবুস সালাত- বর্ণনা ইবনে আব্বাস (রা) এবং আবু হাব্বা আনাসারীর। কাসতাল্লানী তাঁর মাওয়াহেবে বরাত ছাড়াই বলেচেন যে, হুযুর (স) বলেছেন, জিব্রিল যখন তাঁর স্থানে পৌঁছলেন, তখন বললেন, “এখন সামনে আপনার এবং আপনার রবের ব্যাপার। এই আমার স্থান যার আগে আমি আর যেতে পারিনা”।] যা কিছু এরশাদ করা হয় তার মধ্যে ছিলঃ

১. প্রতিদিন পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরয করা হয়।

২. সূরা বাকারায় শেষ দু’আয়াত শিক্ষা দেয়া হয়।

৩. শির্ক ব্যতীত অন্য সব গোনাহ মাফ করার ইচ্ছা প্রকাশ করা হয়।

৪. এরশাদ হয় যে, যে ব্যক্তি নেক কাজ করার ইচ্ছা করে, তার জন্যে একটি নেকী লেখা হয়। তারপর যখন সে তার উপর আমল করে তখন তার জন্যে দশটি নেকী লেখা হয়। কিন্ত যে অসৎ কাজের ইচ্ছা করে, তার বিরুদ্ধে কিছু লেখা হয়না। তারপর যখন সে তার উপর আমল করে তখন একটি গোনাহ লেখা হয়।[প্রথমতঃ পঞ্চাশ নামায ফরয হওয়ার কথা মে’রাজের ব্যাপারে সকল হাদীসের সর্বসম্মত বর্ণনা। অন্যান্য বিষয়গুলো নিম্নের হাদীস গ্রন্হগুলোতে বর্ণিত আছেঃ

মুসলিম, নাসায়ী, তিরমিযি, বায়হাকী- রেওয়ায়াত আবদুল্লাহ বিন মাসউদের (রা) মুসনাদে আহমদ ও মুসলিম- আনাস ইবনে মালেকের (রা) বর্ণনা। ইবনে জারীর বায়হাকী, ইবনে আবি হাতেম, ইবনে মারদুইয়া- বর্ণনা আবু সাঈদ খুদরীর (রা)- গ্রন্হকার।]

খোদার দরবারে হাযিরের পর প্রত্যাবর্তনের জন্যে নীচে অবতরণ কালে হযরত মূসা (আ) এর সাথে হুযুরের (স) সাক্ষাৎ হয়। তিনি বিবরণ শুনার পর বলেন, বনী ইসরাঈল সম্পর্কে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমার ধারণা আপনার উম্মত পঞ্চাশটি নামাযের পাবন্দী করতে পারবেনা, যার কম করার জন্যে আরজ করুন। তিনি ফিরে গেলে আল্লাহ জাল্লা শানূহু (মহিমান্বিত আল্লাহ) দশ নামায কম করে দেন।

হযরত মূসা (আ) পুনরায় সে কথাই বলেন। তারপর নবী মুহাম্মদ (স) বার বার উপরে যান এবং দশ দশটি করে নামায কম হতে থাকে। অবশেষে পাঁচ নামায ফরয করা হয় এবং বলা হয় এ পঞ্চাশ নামাযের সমান।[এ কথাটি সকর হাদীসে সর্বসম্মত যে, হযরত মূসার (আ) কথায় হুযুর (স) বার বার আল্লাহর দরবারে গিয়ে কম করার আরজ করেন এবং সর্বশেষে পাঁচ নামায ফরয রয়ে যায়। একে আল্লাহ পঞ্চাশের সমান গণ্য করেন। অবশ্যি অধিকাংশ বর্ণনায় পাঁচটি করে কম করার উল্লেখ আছে- কিন্তু বর্ণনায় কিছু কম করার এবং কোন কোন বর্ণনায় পাঁচটি করে কম করার উল্লেখ আছে- গ্রন্হকার। (মুষ্টিমেয় পাশ্চাত্যমনা বিশেষ করে হাদীস অস্বীকারকারী এ বর্ণনায় আপত্তি উত্থাপন করে বলেন যে, পাঁচটি নামাযই যদি খোদার ফরয করার ইচ্ছা ছিল তাহলে পঞ্চাশ থেকে কথা শুরু করে ক্রমশঃ দর কষাকষির কি অর্থ হয়? তার জন্য এই যে, আল্লাহ তায়ালা বান্দার প্রতি এ বিষয়ে সুস্পষ্ট করে দেন যে তাঁর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করার জন্যে মানুষের এতোটা এবাদতকারী হওয়া উচিত যে, যদি দৈনিক পঞ্চাশ বার নামায আদায় করে তাহলে তা এমন কিছু বেশী নয়। কিন্তু মানবীয় দুর্বলতা ও স্বভাব সামনে রেখে এ সুবিধা দান করা হয়। তারপর হুযুর (স) হযরত মূসার (আ) পরামর্শে বার বার কম করার যে আবেদন করেন এবং আবেদন মঞ্জুর করা হয় তাতে হুযুরের (স) মর্যাদা বৃদ্ধি হয়।  এ ঘটনাটি আখেরাতে হুযর (স) এবং অন্যান্য নবীগণের পক্ষ থেকে শাফায়াতের একটি প্রমাণ- গ্রন্হকা।)]

প্রত্যাবর্তন

ফেরার পথে হুযুর (স) সেই সিঁড়ি বেয়ে বায়তুল মাকদেস এসে পড়েন। এখানে পুনরায় সকল নবী হাযির ছিলেন। তিনি তাঁদেরকে নামায পড়িয়ে দেন এবং সম্ভবতঃ তা ছিল ফজর নামায। তারপর বুরাকে আরোহণ করে মক্কায় ফিরে আসেন (আল বেদায়া ওয়ান্নেহায়া-তৃতীয় খন্ড, পৃঃ ১১২-১৩)।

ভোরে সকলের আগে এ ঘটনার বিবরণ তিনি তাঁর চাচাতো ভগ্নি উম্মে হানীকে (রা) শুনিয়ে দেন। তারপর বাইরে বেরুতে চান। কিন্তু তিনি (উম্মে হানী) তাঁর চাদর টেনে ধরে বলেন, আল্লাহর ওয়স্তে এ ঘটনা কারো কাছে বলবেননা। নতুবা আপনাকে ঠাট্টা বিদ্রুপ করার আর একটা হেতু তারা পেয়ে যাবে। কিন্তু হুযুর (স) ‘আমি অবশ্যই বলবো’- এ কথা বলে বাইরে বেরিয়ে গেলেন (তাবারানী ইবনে ইসহাক, ইবনে সাদ, আবু ইয়ালা উম্মেহানীর (রা) বরাত দিয়ে এ কথা বর্ণনা করেছেন)।

হেরমে কাবায় পৌঁছার পর হুযুর (স) আবু জাহেলকে সামনে দেখতে পান। সে বলে, কোন নতুন খবর আছে কি? হুযুর (স) বলেন, হ্যাঁ আছে বৈকি। আবু জাহেল বলে, বল দেখি তা কি?

হুযুর (স) বলেন, আজ রাতে আমি বায়তুল মাকদেস গিয়েছিলাম। আবু জাহেল বলে, বায়তুল মাকদেস? রাতারাতিই ঘুরে এলে? আর সকাল বেলা এখানে হাযির?

হুযুর (স) বলেন, হ্যাঁ তাই।

আবু জাহেল বলে- তাহলে লোকজন জমা করবো? সকলের সামনে এ কথা বলবে তো?

হুযুর (স) বলেন, অবশ্যই।

আবু জাহেল চিৎকার করে করে সবাইকে জমা করলো এবং হুযুর (স) কে বলল, এখন তুমি বল।

হুযর (স) সকলের সামনে পূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করেন। লোকে ঠাট্টা বিদ্রুপ করা শুরু করল। কেউ হাত তালি দিচ্ছিল, কেউ অবাক বিস্ময়ে মাথায় হাত রাখছিল। বলছিল, দু’মাসের সফর এক রাতে? অসম্বব, একেবারে অবাস্তব। আগেতো আমাদের সন্দেহ ছিল কিন্তু এখন দৃঢ় বিশ্বাস হলো যে তুমি পাগলই বটে- (মুসনাদে আহমদ, নাসায়ী, বায়হাকী, বাযযার, তাবারানী ইবনে আব্বাসের (রা) বরাত দিয়ে বর্ণনা করেছেন। ইবনে জারীর, বায়হাকী, ইবনে আবি হাতেম- বর্ণনা আবু সাঈদ খুদরীর (রা)।

হযরত সিদ্দীকের (রা) সত্যতা স্বীকার

মুহুর্তের মধ্যে সংবাদটি গোটা মক্কায় ছড়িয়ে পড়ে। কিছু মুসলমান একথা শুনে ইসলাম থেকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে। (মুসনাদে আহমদ, বুখারী, তিরমিযি, বায়হাকী, জাবের বায়হাকী- বর্ণনা হযরত আয়েশা (রা)।

তারপর লোক এ আশায় হযরত আবু বকর (রা) নিকটে গেল যে, তিনি ছিলেন নবী মুহাম্মদ (স) এর দক্ষিণ হস্ত। তিনি যদি নবী থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহলে এ আন্দোলনেন মৃত্যু ঘটবে। হযরত আবু বকর (রা) এ ঘটনা শুনার পর বলেন, যদি মুহাম্মদ (স) এ কথা বলে থাকেন, তাহলে তা অবশ্যই সত্য হবে। এতে আশ্চর্যের কি আছে? আমি তো প্রতিদিন শুনি যে, তাঁর কাছে আসমান থেকে পয়গাম আসে। তার সত্যতাও আমি স্বীকার করি (ইবনে জারীর, বায়হাকী- বর্ণনা আবু সালমা বিন আবদুর রহমানের। ইবনে আবি হাতেম- বর্ণনা আনেস বিন মালেকের। বায়হাকী- বর্ণনা হযরত আয়েশার (রা)।

তারপর হযরত আবু বকর (রা) হেরমে কাবায় আসেন যেখানে রাসূলুল্লাহ (স) বিদ্যমান ছিলেন এবং ঠাট্টা-বিদ্রুপকারী জনতাও। তিনি হুযর (স) কে জিজ্ঞেস করেন, সত্যিই কি আপনি এ সব কথা বলেছেন?

হুযুর (স) বলেন, হ্যাঁ বলেছি।

হযরত আবু বকর (রা)- বায়তুল মাকদেস আমার দেখা আছে। আপনি সেখানকার চিত্র বয়ান করুন।

হুযুর (স) সাথে সাথে তার চিত্র বয়ান করা শুরু করলেন। এক একটি জিনিস এমনভাবে বয়ান করেন যেন বাতুল মাকদেস তাঁর সামনে রয়েছে এবং তা দেখে দেখে অবস্থা বর্ণনা করছেন। হযরত আবু বকরের (রা) এ ধরনের অবস্থা অবলম্বনে অস্বীকারকারীদের মনে চরম আঘাত লাগে।[হাফেজ ইবনে কাসীর আল বেদায়া এবং আন্নেহায়ায় বলেন যে, বায়তুল মাকদেসের বিবরণ আবু বকর (রা) মুশরিকদের সামনে এজন্য দিতে বলেন যে, তিনি যদি সঠিকভাবে তা বর্ণনা করতে পারেন তাহলে মুশরিকদের মুখ বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু আবু ইয়ালা উম্মেহানী (রা) থেকে একটি বর্ণনা নকল করেছেন যে, বায়তুল মাকদেসের বিবরণ জিজ্ঞেস করেছিল মুতয়েম বিন আদী। ইবনে জারীর এবংইবনে আবি হাতেম আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে এ বর্ণনা নকল করেছেন যে, জনতার মধ্যে এ কথা যে ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেছিল সে হুযুরকে মিথ্যা মনে করছিল। মুসরিম হযরত আবু হুরায়রার (রা) এ বর্ণনা আছে যে, লোকজন হুযুরকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল। এ প্রশ্ন করার আসল কারণ এই যে, তাদের জানা ছিল জীবনে হুযুর (স) কখনো বায়তুল মাকদেস দেখেননি। তার জন্যে এর বিবরণ দেয়া মুস্কিল ছিল বিশেষ করে তিনি রাতের বেলায় তা দেখেছিলেন। তাই আল্লাহ তায়ালা তাদের জিজ্ঞাসাবাদের সময় বায়তুল মাকদেস তাঁর দৃষ্টির সামনে তুলে ধরেন এবং তা দেখে দেখে তিনি তাঁদের এক একটি প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাদেরকে মানতে হলো যে, সেখানকার যে চিত্র তিনি বর্ণনা করেন তা একবারে সত্য। বোখারী, মুসলিম মুসনাদে আহমদ ইবনে জারীর, তিরমিযি ও বায়হাকী- বর্ণনা জাবের বিন আবদুল্লাহর (রা)। মুসলিম ও ইবনে সা’দ- বর্ণনা আবূ হুরায়রার (রা)। বায়হাকী ইবনে আবি হাতেম, বাযযার, তাবারানী- বর্ণনা ইবনে আব্বাসের (রা) – গ্রন্হকার।]

আরও সাক্ষী

সমাবেশে এমন অনেক ছিল যারা ব্যবসার উদ্দেশ্যে বায়তুল মাকদেস যাতায়াত করতো। তারা মনে মনে বলছিল যে, তিনি সঠিক চিত্রই বয়ান করেছেন। এখন এ বয়ানের সত্যতার জন্যে লোক আরও প্রমাণ দাবী করতে থাকে।

হুযুর (স) বলেন, যাবার সময় আমি অমুক কাফেলা অতিক্রম করে যাই, যাদের সাথে এই এই জিনিসপত্র ছিল। কাফেলা ওয়ালাদের উট বুরাক দেখে ভয়ে ভড়কে গেল। একটি তো অমুক উপত্যকার দিকে দৌড়ে পালিয়ে গেল। কাফেলাওয়ালাকে বলে দিলাম সে কোথায় গেল।

ফিরবার সময় ওমুক গোত্রের অমুক কাফেলার সাথে অমুক প্রান্তরে আমার সাক্ষাৎ হয়। তারা সব ঘুমিয়ে ছিল। আমি তাদের পাত্র থেকে পানি পান করিং পানি পান করার চিহ্নও রেখে যাই।

হুযুর (স) এ ধরনের আরও কিছু ঘটনা তুলে ধরেন। পরে আগত কাফেলাওয়ালাদের নিকেট তার সত্যতার স্বীকৃতি লাভ করা হয় (ইবনে আবি হাতেম আনাস বিন মালেকের (রা) বরতা দিয়ে বলেন, বায়হাকী, ইবনে আবি হাতেম, বাযযার, তাবারানী শাদ্দাদ বিন আওসের বরাত দিয়ে বলেন এবং তাবারানী আবু ইয়ালা উম্মে হানীর (রা) বর্ণনা নকল করেন)।

এভাবে প্রতিপক্ষের মুখ বন্দ হয়ে যায়। কিন্তু তারা মনে মনে ভাবতে থাকে যে, কিভাবে এটা হতে পারে। আজও অনেক লোকের মনে এ প্রশ্ন যে তা কিভাবে সম্ভব হলো।[]

হুযুরকে (স) পাঁচ ওয়াক্ত নামায শিক্ষাদান

যে রাতে মে’রাজ অনুষ্ঠিত হয় তারপর দু’দিন পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে জিব্রিল (আ) প্রত্যেক নামাযের সময় একথা বলার জন্যে আসতে থাকেন যে, যে পাঁচ নামায ফরয করা হয়েছে তা আদায়ের সময়টা কি। তিনি একটি নামায রাসূলুল্লাহ (স) কে প্রথম দিন প্রথম ওয়াক্তে পড়িয়ে দেন এবং দ্বিতীয় দিন শেষ ওয়াক্তে। নামাযে তিনি ইমামতি করেন। অতঃপর বলেন, প্রত্যেক নামাযের সময় এ দু’সময়ের মধ্যে। এ বর্ণনা ইমাম আহমদ নাসায়ী, তিরমিযি, ইবনে হিব্বান এবং হাকেম হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ থেকে নকল করেন। ইমাম বুখারী একে নামাযের সময়ের ব্যাপারে সবচেয়ে সঠিক বলে গণ্য করেন। ইমাম আহমদ, তিরমিযি, আবু দাউদ ইবনে খুযায়মা, দারকুতনী, হাকেম ও আবদুর রায্যাক এ বিষয়ে বর্ণনা কিছুটা পার্থক্য সহ হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) থেকে নকল করেছেন। আর এটাকে ইবনে আবদুল বার, কাযী আবু বকর বিন আল- আরাবী সঠিক বলে গণ্য করেছেন।

ইমাম যুহরী বলেন, হযরত ওমর বিন আবদুল আযীযের (রহ) সামনে যখন ওরওয়া বিন যুবাইর, একথা বলেন যে, রাসূলুল্লাহকে (স) হযরত জিব্রিল (আ) তাঁর ইমামতিতে নামায পড়ান, তখন তিনি অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে বলেন, ওরওয়া, একবার চিন্তা করে দেখত, তুমি কি বলছ? অর্থাৎ হুযুরের (স) ইমামতি জিব্রিল (আ) করেছিলেন?

ওরওয়া বলেন, আমি একথা বাশির বিন আবি মাসউদ থেকে শুনেছি। তিনি আবু মাসউদ আনসারী (রা) থেকে শুনেছেন বলে বলেন। তিনি (মাসউদ আনসারী) বলেছেন, আমি স্বয়ং রাসূলুল্লাহকে (স) একথা বাশির বিন আবি মাসউদ থেকে শুনেছি। তিনি আবু মাসউদ আনসারী (রা) থেকে শুনেছেন বলে বলেন। তিনি (মাসউদ আনসারী) বলেছেন, আমি স্বয়ং রাসূলুল্লাহকে (স) একথা বলতে শুনেছি, জিব্রিল নাযিল হলেন এবং তিনি আমার ইমামতি করলেন। আমি তাঁর সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়লাম (মুয়াত্তা, বুখারী, মুসলিম, আবদুর রায্যাক, তাবারানী)।[]

মে’রাজের পয়গাম

মে’রাজের সফর থেকে প্রত্যাবর্তনের পর আল্লাহর পক্ষ থেকে যে পয়গাম রাসূলুল্লাহ (স) দুনিয়াবাসীকে দেন তা কুরআন মাজিদের সপ্তদশ সূরা বনী ইসরাইলের আয়াত ২ থেকে ৩৯ পর্যন্ত অক্ষরে অক্ষরে সংরক্ষিত আছে। তা যদি দেখা যায় এবং তার ঐতিহাসিক পটভূমির প্রতি যদি দৃষ্টি দেয়া যায় তাহলে জানা যাবে যে, এ হেদায়াত হিজরতের এক বছর পূর্বে দেয়া হয়েছিল। পাঠক পরিস্কার বুঝতে পারবেন যে, ইসলামের মূলনীতির উপর একটি নতুন রাষ্ট্রের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের পূর্বেই সে হেদায়েত দেয়া হয়েছিল যার ভিত্তিতে নবী (স) ও সাহাবায়ে কেরামকে পরবর্তীতে কাজ করতে হয়েছিল।

বনী ইসরাইলের ইতিাহস থেকে শিক্ষা গ্রহণ

এ পয়গামে মে’রাজের উল্লেখ করার পর সকলের আগে বনী ইসরাইলের ইতিহাস থেকে শিক্ষাদান করা হয়। মিসরীয়দের গোলামি থেকে মুক্ত হওয়ার পর বনী ইসরাইল যখন স্বাধীন জীবন যাপন করতে থাকেক তখন খোদাওন্দ আলম তাদের পথ নির্দেশনার জন্য কিতাব দান করেন। সেই সাথে এ তাকীদ করে দেয়া হয়- আমি ছাড়া এখন নিজেদের কাজকর্মের ব্যাপারে আর কারো পথ নির্দেশনার উপর যেন ভরসা না কর।

কিন্তু বনী ইসরাইল খোদার এ নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করার পরিবর্তে তার প্রতি অস্বীকৃতি জানায় এবং তারা পৃথিবীতে সংস্কার ধর্মী হওয়ার পরিবর্তে ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারী ও বিদ্রোহী হয়ে রইলো। পরিণাম এই হলো যে, খোদা একবার তাদের বেবিলনীয়দের দ্বারা নির্মূল করেন এবং দ্বিতীয় বার রোমীয়দেরকে তাদের শাসক বানিয়ে দেন। এ শিক্ষনীয় ইতিহাসের উল্লেখ করে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদেরকে সাবধান করে দেন যে, একমাত্র কুরআনই এমন এক গ্রন্হ যা তোমাদেরকে সঠিক পথ বাতলিয়ে দেবে। এটা যদি অনুসরণ করে চল তাহলে তোমাদের জন্যে বিরাট পুরস্কাররের সুসংবাদ রয়েছে।

প্রত্যেক ব্যক্তি দায়িত্বশীল

দ্বিতীয় যে গুরুত্বপূর্ণ সত্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে তাহলো এই যে, প্রত্যেক মানুষ স্বয়ং এক স্থায়ী নৈতিক দায়িত্বের অধিকারী। তার নিজের ক্রিমায়কর্ম তার স্বপক্ষে চূড়ান্ত ফয়সালাকারী। সোজা পথে চললে তার নিজেরই মংগল। ভূল পলে চললে নিজেকে ক্ষতির সম্মুকীন হতে হবে। এ ব্যক্তিগত দায়িত্বে কেউ কারো অংশীদার নয়। একের দায়িত্বের বোঝা অপরকে বহন করতে হবেনা। অতএব একটি সৎ সমাজের প্রতিটি মানুষের আপন আপন দায়িত্বের প্রতি বিশেষ নজর রাখা উচিত। অন্য লোক যা কিছুই করুক, তার প্রথমে এ চিন্তাই করা উচিত যে, সে নিজে কি করছে।

বড়ো লোকদের অধঃপতন

তৃতীয় যে বিষয়টি সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে তাহলো এই যে, একটি সমাজকে অবশেষে যে জিনিস ধ্বংস করে তা বড়ো লোকদের, প্রভাব প্রতিপত্তিশীলদের অধঃপতন। যখন কোন জাতির ভাগ্য বিপর্যয় অপরিহার্য হয়, তখন তার স্বচ্ছল ও ক্ষমতাসীন ব্যক্তিগণ পাপাচারে লিপ্ত হয়। তারা অন্যায় অত্যাচার, অবিচার, পাপাচার ও দুষ্কর্ম করা শুরু করে। অবশেষে এ ফেৎনা গোটা জাতিকে ধ্বংসের অতল তলে নিমজ্জিত করে। অতএব যে সমাজ নিজেই নিজের দুশমন হতে না চায়, তার এ বিষয়ে চিন্তা ভাবনা থাকা উচিত, যাতে করে সে সমাজে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও আর্থিক ধন সম্পদের চাবিকাঠি যেন চরিত্রহীন লোকের হাতে না যায়।

দুনিয়ার সাথে আখোরাতের গুরুত্ব

তারপর মুসলমানদেরকে সে কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়, যার পুনরাবৃত্তি বারবার কুরআনে করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তোমাদের লক্ষ্য যদি দুনিয়া এবং তার সাফল্য ও সুখ স্বাচ্ছন্দ্য হয়, তাহলে সে সব কিছু তোমরা এখানে লাভ করতে পার। কিন্তু তার শেষ পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। স্থায়ী ও চিরন্তন সাফল্য যা এ  জীবন থেকে শুরু করে পরবর্তী জীবন পর্যন্ত কোথাও ব্যর্থতার গ্লানি বহন করেনা তা তোমরা একমাত্র সে অবস্থায় লাভ করতে পার যখন তোমরা তোমাদের চেষ্টা চরিত্রে আখেরাত ও তার জবাবদিহির অনুভূতিকে সামনে রাখ। দুনিয়া পুজারীদের স্বাচ্ছল্য প্রকাশ্যতঃ সৃজনশীল বলে মনে হয়। কিন্তু তার এ সৃজনশীলতার মধ্যে অনিষ্ট অনাচারের বীজ লুকায়িত থাকে। সে চরিত্রের সে মহত্ত্ব থেকে বঞ্চিত থাকে যা শুধুমাত্র আখেরাতে জবাবদিহির অনুভূতি থেকে সৃষ্টি হয়। এ পার্থক্য তোমরা দুনিয়াতেই উভয় প্রকারের মানুষের মধ্যে দেখতে পাও। এ পার্থক্য জীবনর পরবর্তী স্তরগুলোতে আরও অধিকতর সুস্পষ্ট হয়ে যাবে। অবশেষে একজনের জীবন একবারে ব্যর্থকাম এবং অন্য জনের জীবন পরিপূর্ণ সাফল্যমন্ডিত হবে।

ইসলামী তামাদ্দুনের বুনিয়াদী মূলনীতি

ভূমিকা স্বরূপ এ সব উপদেশ দানের পর সে সব গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি বর্ণনা করা হয়েছে যার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজ গঠিত হওয়ার কথা। এ মূলনীতি চৌদ্দটি। আমরা সেগুলো সেই ক্রমানুসারেই পেশ করছি যেভাবে তা মে’রাজের এ পয়গামে বর্ণনা করা হয়েছে।

১. এক ও লা শরীক আল্লাহ ব্যতীত আর কোন শক্তি ও সত্তার প্রভুত্ব কর্তৃত্ব স্বীকার করা যাবেনা। তিনি তোমাদের মা’বুদ এবং দাসত্ব আনুগত্য একমাত্র তাঁরই কর। আর হুকুম পালন করে চলাই তোমাদের স্বাতন্ত্র স্বকীয়তার পরিচায়ক। তিনি ব্যতীত যদি অন্য কারো প্রভুত্ব কর্তৃত্ব তোমরা মেনে নাও, তা সে অন্য কেউ হোক, বা তোমাদের প্রবৃত্তি, তাহলে অবশেষে তোমরা চরম লাঞ্ছনার শিকার হয়ে পড়বে এবং ঐ সব নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হবে যা খোদর সাহায্যেই শুধু লাভ করা যেতে পারে।[এ শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসই ছিলনা বরঞ্চ যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা নবী (স) মদীনা গিয়ে কায়েম করেছিলেন তার বুনিয়াদী মূলনীতি ছিল। তার গোটা প্রাসাদ এ দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্মাণ করা হয় যে খোদাওন্দ আলমই দেশের মালিক ও বাদশাহ এবং তাঁর শরিয়তই দেশের আইন- গ্রন্হকার।]

২. মানবীয় অধিকারে মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকারযোগ্য অধিকার মাতাপিতার। সন্তানগণকে মাতাপিতার অনুগত, খেদমতগুজার ও শিষ্টাচারী হতে হবে। সমাজের সামাজিক নীতি নৈতিকতা এমন হওয়া উচিত যাতে সন্তান সন্ততি মাতাপিতার মুখপেক্ষীহীন ও অবাধ্য না হয় বরঞ্চ তাদের প্রতি অত্যন্ত সদাচারী হয়। তারা তাদের সম্মান শ্রদ্ধা করবে এবং তাদের বার্ধক্যে সেবা-শুশ্রুষা করবে ও সকল প্রয়োজন পূলণ করবে যেমন তাদের শৈশবকালে মাতাপিতা করেছে।[এ দফার দৃষ্টিতে এটা স্থিরীকৃত হয় যে, ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার ভিত্তি পরিবারের উপর স্থাপিত হবে এবং পারিবারিক ব্যবস্থার মেরুদন্ড হলো পিতামাতার প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা। পরবর্তীকালে এ দফা অনুযায়ী মাতাপিতার সে শরিয়ত সম্মত অধিকার নির্ধারিত করা হয় যার বিস্তারিত বিবরণ আমরা হাদীস ও ফেকার গ্রন্হবলীতে দেখতে পাই। উপরন্তু ইসলামী সমাজের মানসিক ও নৈতিক প্রশিক্ষণে এবং মুসলমানদের সভ্যতার শিষ্টাচারে এমন সব চিন্তাধারণা ও আচরণ অন্তর্ভুক্ত করা হয় যা খোদা ও রাসূলের পরে মা বাপকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। এ সব বিষয় সর্বকালের জন্য এ মূলনীতি নির্ধারিত করে দেয় যে, ইসলামী রাষ্ট্র তার আইন প্রশাসনিক নির্দেশের মাধ্যমে পরিবারকে দুর্বল করার পরিবর্তে সদৃঢ় ও সংরক্ষিত করার ব্যবস্থা করবে- গ্রন্হকার।]

৩. সামাজিক জীবনে পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতা, সহানুভূতি ও সুবিচার প্রতিষ্ঠায় প্রাণশক্তি যেন বলবৎ থাকে। প্রত্যেক আত্মীয় তার আত্মীয়ের যেন সাহায্যকারী হয়। প্রত্যেকে যেন অন্যের সাহায্য লাভের অধীকারী হয়। কোন মুসাফির কোন পল্লী বা জনপদে গিয়ে পৌঁছলে সে যেন নিজেকে অতিথিপরায়ন লোদের মধ্যে দেখতে পায়। সমাজে অধিকার (হক) সম্পর্কে ধারণা যেন এতো তীব্র ও ব্যাপক হয় যাতে একটি মানুষ যাদের মধ্যে বসবাস করে তাদের অধিকার সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন থাকে। তাদের কোন খেদমত করলে মনে করবে যে, তার হক আদায় করছে, অনুগ্রহ করছেনা। খেদমত করার ব্যক্তি না থাকলে বিনীতভা অক্ষমতা প্রকাশ করবে এবং খোদার করুণা ভিখারী হবে যাতে সে অপরের কাজে লাগতে পারে।[এ দফার ভিত্তিতে- মদীনায় সমাজে ওয়াজেব সদকা এবং নফল সদকার নির্দেশ দেয়া হয়। এতিমদের অসিয়ত এবং ওয়াকফের পদ্ধতি নির্ধারিত করা হয। এতিমদের অধিকার সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। একটি বস্তিতে মুসাফিরের এ অধিকার কায়েম করা হয় যে, কম পক্ষে তিন দিন পর্যন্ত তার মেহমানদারী করতে হবে। তারপর নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে গোটা সমাজে উদারতা সহানুভূতি ও সাহায্য সহযোগিতায় এমন প্রাণশক্তি সৃষ্টি করা হয় যে, লোকের মধ্যে আইনগত অধিকার ছাড়াও নৈতিক অধিকারের এক ব্যাপক ধারণা সৃষ্টি হয়। তার ভিত্তিতে লোক স্বয়ং একে অপরের এ ধরনের অধিকার অবগত হতে লাগলো এবং তা আদায় করা শুরু করলো যা আইনের বলে না চাওয়া যেতে পারে,আর না তা আদায় করিয়ে দেয়া যেতে পারে- গ্রন্হকার।]

৪. লোকে তাদের ধন সম্পদ যেন ভুল পদ্ধতিতে অপচয় না করে। গর্ব প্রকাশের ও লোক দেকানোর জন্য বিলাসিতা ও পাপ কাজের জন্য ব্যয় করা এবং মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন ও মংগলজনক কাজের পরিবর্তে সম্পদ ভ্রান্ত পথে ব্যয় করার অর্থ খোদার নিয়ামতের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন। যারা এভাবে তাদের সম্পদ ব্যয় করে তারা প্রকৃত পক্ষে শয়তানের ভাই এবং এ ধরনের সম্পদের অপচয়কে নৈতিক প্রশিক্ষণ ও আইনানুগ বিধিনিষেধের মাধ্যমে বন্ধ করে দেয়া একটা সংস্কার ধর্মী সমাজের অপরিহার্য কর্তব্য।

৫. মানুষের মধ্যে এতোখানি ভারসাম্য থাকা উচিত যাতে তারা কার্পণ্য করে সম্পদ পুঞ্জিভূত করে না রাখে এবং বাহুল্য খরচ করে নিজের আর্থিক শক্তি বিনষ্ট না করে। সমাজের লোকদের মধ্যে ভারসাম্যের এমন এক সঠিক অনুভুতি থাকতে হবে যেন তারা একদিকে ন্যায় সংগত ব্যয় করা থেকে বিরত না থাকে এবং অপরদিকে অন্যায় পথে ব্যয় করার পাপে লিপ্ত না হয়।[মদীনার সমাজে এ উভয় দফার ব্যাখ্যা বিভিন্নভাবে করা হয়েছে। একদিকে ব্যববহুল ও বিলাসিতার বহু উপায় পদ্ধতি আইনত হারাম করে দেয়া হয়েছে এবং অন্যদিকে পরোক্ষভাবে আইনের সাহায্যে সম্পদের অন্যায় অসংগত ব্যয়ের পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। আর এক দিকে দিয়ে সরকারকে এ এখতিয়ার দেয়া হয়েছিল যে, ব্যয় বাহুল্যের লক্ষণীয় কর্মকান্ড প্রশাসনিক নির্দেশের দ্বারা বন্ধ করে দেয়া হবে। যারা তাদের ধনসম্পদ অন্যায়ভাবে ব্যয় করতে থাকবে তাদের বিষয় সম্পত্তি সাধারণভাবে সরকার নিজের ব্যবস্থাপনায় নিয়ে নেবে। এসব পদক্ষেপ ছাড়াও সমাজের মধ্যে এমন এক জনমত সৃষ্টি করা হয় যে, ব্যয় বহুলের প্রশংসা করার পরিবর্তে নিন্দা করা হয়। তারপর নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে মন মানসিকতার সংশোধনও করা হয় যাতে অন্যায় ও ন্যায়সংগত ব্যয়ের পার্থক্য উপলব্ধি করতে পারে এবং স্বয়ং এর থেকে বিরত থাকে। এমনিভাবে কৃপণতাও আইনের সাহায্যে যতোটা সম্ভব বন্ধ করা হয়। অন্যায় সংস্কারমূলক কাজ জনমতের চাপে এবং নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়।]

৬. খোদা তাঁর রিযিক বন্টনের যে ব্যবস্থাপনা কায়েম করে রেখেছেন, মানুষ যেন কৃত্রিম উপায়ে তাতে হস্তক্ষেপ না করে। তিনি তাঁর সকল বান্দাহকে রিযিকের দিক দিয়ে সমান করে রাখেননি, বরঞ্চ তাদের মধ্যে কম ও বেশীর পার্থক্য রেখেছেন। তার মধ্যে অনেক তাৎপর্য রয়েছে এবং তিনি স্বয়ং তা ভালো জানেন।

অতএব একটি সঠিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তাই যা খোদার নির্ধারিত এ পন্হার নিকটতর হবে। প্রাকৃতিক অসাম্যকে একটি কৃত্রিম সাম্যে পরিবর্তন করা অথবা অসাম্যকে প্রকৃতির সীমারেখা থেকে বর্ধিত করে বেইনসাফীর সীমা পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেয়া উভয়ই একই ধরনের ভুল।[এ দফার মধ্যে প্রকৃতির বিধানের যে মূলনীতির দিকে পথ নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তার কারণে মদীনার সংস্কারমূলক কর্মসূচীতে এ চিন্তাধারণা কোন স্থানই পায়নি যে, জীবিকা এবং জীবিকার উপায় উপকরণে বৈষম্য পার্থক্য এবং শ্রেষ্টত্ব প্রকৃতিগতভাবে কোন অবিচার এবং সুবিচার কায়েম করার জন্যে ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য মিটিয়ে দেয়া এবং একটি শ্রেণীহীন সমাজ গঠন করার চেষ্টা করা উচিত। ঠিক তার বিপরীত মদীনায় মানবীয় তামাদ্দুনকে সৎ বুনিয়াদের উপর কায়েম করার জন্যে যে কর্মপন্হা অবলম্বন করা হয়েছিল তা এই যে, আল্লাহর ফিতরাত মানুষের মধ্যে যে পার্থক্য সৃষিট করে রেখেছে তাকে অবিকল প্রাকৃতিক অবস্থায় রেখে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম দফা অনুযায়ী সমাজের স্বভাব চরিত্র, আচার, অনাচারের কারণ না হয়ে অসংখ্য নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও তামাদ্দুনিক সুযোগ সুবিদার কারণ হয়ে পড়ে। প্রকৃত পক্ষে এ জন্যই বিশ্বপ্রকৃতির স্রষ্টা তাঁর বান্দাহদের মধ্যে এ পার্থক্য রেখে দিয়েছেন- গ্রন্হকার।]

৭. সন্তান সন্ততি বেড়ে গেলে জীবন জীবিকার পথ সংকীর্ণ হয়ে যাবে এ আশংকার জন্ম নিয়ন্ত্রণ মারাত্মক ভুল। এ আশংকায় যারা ভবিষ্যৎ বংশ ধ্বংস করে তথা জন্ম নিয়ন্ত্রণ করে তারা এ ভুল ধারণায় লিপ্ত যে রিযিকের ব্যবস্থাপনা তাদের হাতে। অথচ রিযিক দাতা সেই খোদা যিনি মানুষকে এ পৃথিবীতে বসবাসের ব্যবস্থা করেছেন। পূর্ববর্তীদের রিবিকের ব্যবস্থাপনা তিনিই করেছেন এবং পরবর্তীদের রিযিকের ব্যবস্থাপনাও তিনিই করবেন। জনসংখ্যা যতোই বর্ধিত হয়, খোদা সেই অনুপাতে জীবন জজীবিকার উপায় উপকরণও প্রসারিত করে দেন। অতএব খোদা তাঁর সৃষ্টির জন্য যে ব্যবস্থাপনা করে রেখেছেন তাতে কেউ যেন অন্যায় হস্তক্ষেণ না করে এবং কোন অবস্থাতেই যেন তাদের মধ্যে বংশ হত্যার প্রবণতা সৃষ্টি হতে না পারে।[এ দফাটি সে অর্থনৈতিক বুনিয়াদ একেবারে নির্মূল করে দিচ্ছে যাকে ভিত্তি করে প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন যুগে জন্ম নিয়ন্ত্রণের আন্দোলনের মাথাচাড়া দিয়ে থাকে। প্রাচীনকালে দারিদ্রের ভয়ে শিশু হত্যা ও ভ্রুণ হত্যার জন্যে মানুষ তৈরী হতো। এখন তৃতীয় একটি পন্হা অর্থাৎ জন্ম নিয়ন্ত্রণের দিকে দুনিয়াকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু মে’রাজের পয়গামের এ দফাটি মানুষকে এ পথ নির্দেশনাই দেয় যে, আহার গ্রহণকারীর সংখ্যা হ্রাস করার ধ্বংসাত্মক প্রচেষ্টা পরিহার করে খাদ্যের উপায় উপকরণ বাড়াবার গঠনমূলক চেষ্টা চরিত্রে নিজেদের শক্তি ও যোগ্যতা নিয়েঅজিত করতে হবে-গ্রন্হকার।]

৮. ব্যভিচারের মাধ্যমে নারী- পুরুষের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। এ শুধু বন্ধ হওয়াই যথেষ্ট নয় বরঞ্চ যে সব উপায় উপকরণ মানুষকে ব্যভিচারের নিকটবর্তী করে দেয় সে সবেরও মূলোৎপাটন করা উচিত।[অবশেষে এ দফাটি ইসলামী জীবন ব্যবস্থার এক বিস্তারিত অধ্যায়ের ভিত্তি হয়ে পড়ে। এ দফা অনুযায়ী ব্যভিচার ও ব্যভিচারের অভিযোগকে ফৌজদারী অপরাধ গণ্য করা হয়েছে। অশ্লীলতার প্রচারের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছৈ। মদ্যপান গীতবাদ্য, নৃত্য এবং জীবের মুর্তি ও ছবির উপরেও বাধানিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তারপর এমন এক দাম্পত্য আইন বানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, তার ফলে বিবাহ অত্যন্ত সহজসাধ্য হয়ে পড়েছে এবং ব্যভিচারের জন্য সমাজে প্রচলিত উপায় উপকরণ নির্মূল করা হয়েছে- গ্রন্হকার।]

৯. আল্লাহ তায়ালা মানুষের জীবনকে সম্মান ও মর্যাদার যোগ্য বলে গণ্য করেছেন। কোন ব্যক্তি না আত্মহত্যা করতে পারে, আর না অপরকে হত্যা করতে পারে। খোদার নির্ধারিত এ নিষেধাজ্ঞা তখনই ভংগ করা যেতে পারে যখন খোদারই নির্ধারিত কোন অধিকার তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়। অতঃপর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর রক্তপাত ততোটুকু পরিমাণে হওয়া উচিত যতোটুকু সে অধিকার দাবী করে। হত্যার ব্যাপারে সীমালংঘনের সকল পথ বন্ধ হওয়া উচিত। যেমন, উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে অপরাধীর পরিবর্তে অন্য কাউকে হত্যা করা যার বিরুদ্ধে অধিকার প্রমাণিত হয়নি। অথবা অপরাধীকে যন্ত্রণা দিয়ে দিয়ে মেরে ফেলা অথবা হত্যা করার পর তার মৃতদেহের অসম্মান করা। অথবা এ ধরনের অন্য কোন প্রতিশোধমূলক বাড়াবাড়ি যা দুনিয়ায় প্রচলিত ছিল।[এ দফার ভিত্তিতে ইসলামী আইনে আত্মহত্যা হারাম করা হয়েছে। ইচ্ছাকৃত হত্যাকে অপরাধ গণ্য করা হয়েছে। ভুল বশতঃ হত্যার বিভিন্ন অবস্থার জন্য হত্যার খেসারত ও কাফফারার প্রস্তাব করা হয়েছে। ন্যায়সংগত হত্যা পাঁচটি অবস্থার মধ্যে সীমিত করে রাখা হয়েছে।

এক.  যদি কেউ ইচ্ছাকৃত ভাবে হত্যা করে।

দুই.  কোন দল যদি দ্বীনে হকের পথে এমন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে যে, তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ অপরিহার্য হয়ে পড়ে।

তিন.  কোন বিবাহিত পুরুষ অথবা নারী যদি ব্যভিচার করে।

চার.  কোন দল যদি ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা উচ্ছেদের চেষ্টা করে অথবা ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা পরিচালনাকারী দলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ করে।

পাঁচ. মুসলমান হওয়ার পর যদি কেউ মুরতাদ হয়ে যায়। তারপর ন্যায়সংগত হত্যার সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়অর শরীয়তের কাজীকে দেয়া হয়েছে। তার জন্যে শালীনতাপূর্ণ নিয়ম নীতিও তৈরী করে দেয়া হয়েছে-গ্রন্হকার।]

১০. এতিমদের স্বার্থের সংরক্ষণ ততোক্ষণ পর্যন্ত করতে হবে যতোক্ষণ না তারা নিজের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। তাদের সম্পদ এমন ভাবে ব্যয় করা যাবেনা যা তাদের জন্য মংগলজনক নয়।[এটাও নিছক একটি নৈতিক হেদায়াত ছিলনা। বরঞ্চ এতিমদের অধিকার সংরক্ষণের জন্যে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার আইনানুগ ও প্রশাসনিক উভয় ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে যার বিস্তারিত বিবরণ আমরা হাদীস ও ফেকাহর গ্রন্হগুলোতে দেখতে পাই। অতঃপর এ দফা থেকেই এ সুদূর প্রসারী মূলনীতি গ্রহণ করা হয়েছে যে, যে সব নাগরিক নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে সক্ষম নয় তাদের স্বার্থের সংরক্ষক স্বয়ং ইসলামী রাষ্ট্র। নবী (স) এর এরশাদ-

************************************   (যার কোন অভিভাবক নেই আমি তার অভিভাবক) সে ইংগিতই বহন করে- গ্রন্হকার।]

১১. চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি কোন ব্যক্তির সাথে অথবা কোন জাতির জন্য কোন জাতির সাথে যে কোন অবস্থাতেই ঈমানদারীর সাথে পূরণ করতে হবে। চুক্তি ভংগ করলে খোদার নিকটে জবাবদিহি করতে হবে।[এটাও ইসলামী নৈতিকতার নিছক একটি গুরুত্বপূর্ণ দফা ছিলনা। বরঞ্চ পরবর্তী কালে ইসলামী রাষ্ট্র এটাকেই তার আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক রাজনীতির ভিত্তিপ্রস্তর বলে গণ্য করে- গ্রন্হকার।]

১২. পণ্য দ্রব্যের পরিমাণ যন্ত্র ঠিক রাখতে হবে যাতে লেনদেনে ঠিকমত পরিমাপ করে দেয়া যায়।[এ দফা অনুযায়ী ইসলামী রাষ্ট্রের পুলিশ বিভাগের উপর অন্যান্য দায়িত্বের সাথে এ  দায়িত্বও আরোপিত হয় যে, তারা বাজারে ওজন ও পরিমাপ যন্ত্র দেখাশুনা করবে এবং শক্তি প্রয়োগ করে মাপে ও ওজনে কম দেয়া বন্ধ করে দেবে। অতঃপর এর থেকে এ ব্যাপক মূলনীতি গ্রহণ করা হয় যে ব্যবসা ও লেনদেনে সকল প্রকার বেঈমানী ও অধিকার হরণ তথা ধোকা প্রতারণার মূলোচ্ছেদ করা সরকারের দায়িত্ব- গ্রন্হকার।]

১৩. যে বিষয়ের সত্যতা সম্পর্কে তোমার জ্ঞান নেই সে বিষয় নিয়ে উঠে পড়ে লেগোনা। শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি এবং মনের নিয়ত, ধারণা ও ইচ্ছা বাসনার পুংখানুপুংখ্য হিসাব দিতে হবে খোদার সামনে।[এ দফার উদ্দেশ্যে এই যে, মুসলমান তার ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন কুসংস্কার আন্দাজ অনুমান ও ধারণার পরিবর্তে জ্ঞানের অনুসারী হবে নৈতিকতায়, আইনে, দেশের আইন শৃংঙ্খলায় এবং শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন ভাবে ব্যাপক হারে এ উদ্দেশ্যে বাস্তবায়িত করা হয়েছে। জ্ঞানের পরিবর্তে আন্দাজ অনুমানের ভিত্তিতে জীবনের বিভিন্ন দিকে যে অগণিত অত্যাচার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে সেগুলো থেকে ইসলামী সমাজকে রক্ষা করা হয়। নৈতিকতার দিক দিয়ে নির্দেম দেয়াহয় যে, কুধারণা পোষণ করা থেকে দূরে থাক এবং ভালোভাবে যাচাই না করে কোন ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করোনা। আইনে এ একটি স্থায়ী নীতি হিসাবে নির্ধারিত হয় যে, নিছক সন্দেহ বশতঃ কাউকে গ্রেফতার করা মারপিট করা, হাজতে বন্ধ করে রাখা একবারে অন্যায় ও অবৈধ কাজ, বিজাতীয়দেরা সাথে আচরণের বেলায়ও এ নীতি নিধারিত করে দেয়া হয় যে, তদন্ত ছাড়া কারো বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবেনা। সন্দেহ বশতঃ গুজব ছাড়ানোও যাবেনা। শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেও সে সব তথাকথিত জ্ঞান বিদ্যাকে অবাঞ্ছিত মনে করা হয়েছে, যার ভিত্তি নিছক আন্দাজ ও অলীক কল্পনা। এভাবে মুসলমানদের মধ্যে একটা সত্যনিষ্ঠ ও সত্য ভিত্তিক মানসিকতার সৃষ্টি করা হয়েছে- গ্রন্হকার।]

১৪. অত্যচারী ও অহংকারীদের ন্যায় যমীনের উপর চলোনা। না তুমি তোমার ঔদ্ধত্য অহংকার যমীনকে বিদীর্ণ করতে পারে। আর না তোমার গর্বের দ্বারা পাহাড় থেকে মাথা উঁচু করতে পার।[এটাও নিছক কোন উপদেশবানী নয়, বরঞ্চ প্রকৃত পক্ষে মুসলমানদেরকে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে যে, ক্ষমতাসীন দল হওয়ার পর যেন তার লোজন গর্ব অহংকারে লিপ্ত না হয়। এ নির্দেশের বাস্তব প্রতিফলন আমরা এই দেখতে পাই যে, এ ১৪ দফা মেনিফেস্টো বা ঘোষণা অনুযায়ী মদীনা শরীফে যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হলো তার শাসকবৃন্দ গভর্নর ও সিপাহসলারগণ মৌলিক ও লিখিতবাবে এমন কিচু বলেননি যার মধ্যে গর্ব অহংকারের লেশমাত্র পাওয়া যা। এমন কি যুদ্ধকালেও তাঁরা গর্ব অহংকার সূচক কোন কথা বলেননি। তাঁদের কতাবার্তার আচার আচরণে এবং উঠে বসায় বিনয় নম্রতাই ফুটে উঠেছে। বিজয়ীর বেশে যখন কোন শহরে প্রবেশ করেছেন, তখন গর্ব-অহংকার ও দাম্ভিকতার সাথে নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তারের চেষ্টা করেননি- গ্রন্হকার।]

এ ছিল সে সব মূলনীতি যার উপরে নবী (স) মদীনায় হিজরতের পর ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেন।[]

হুযুরকে (স) হিজরতের দোয়া শিক্ষাদান

এ সূরায়ে বনী ইসরাইলে আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে এমন এক দোয়া শিক্ষা দেন যা প্রকৃতপক্ষে হিজরতের দোয়া বলা যেতে পারে। তিরমিযি এবং হাকেম হযরত ইবনে আব্বাসের (রা) বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন যে, নিম্ন আয়াতে নবীকে (স) হিজরতের অনুমতি দেয়া হয়ঃ

**********************************

এবং (হে নবী) দোয়া করঃ পরওয়ারদেগারু তুমি যেখানেই আমাকে নিয়ে যাও, সত্যতার সাথে নিয়ে যাও এবং যেখান থেকেই আমাকে বের করে নাও সত্যতার সাথে বের করে নাও এবং তোমার পক্ষ থেকে একটা রাষ্ট্রশক্তি আমার সহায়ক বানিয়ে দাও। (বনী ইসরাইলঃ ৮০)

এ দোয়া শিক্ষা থেকে এ কথা পরিস্খার জানতে পারা যায় যে, হিজরতের সময় সন্নিকট। এ জন্য বলা হচ্ছে, তোমার দোয়া এই হওয়া উচিত যে কোন অবস্থাতেই যেন তুমি সত্যতা থেকে সরে না পড়। যেখান থেকেই বেরিয়ে পড় সত্যতার সাথে বেরিয়ে পড়বে এবং যেখানেই যাও সত্যতার সাথেই যাবে।

“এবং তোমার পক্ষ থেকে একটা রাষ্ট্রশক্তি আমার সহায়ক বানিয়ে দাও”।

অর্থাৎ হয় তুমি স্বয়ং আমাকে রাষ্ট্রশক্তি দান কর অথবা কোন রাষ্ট্রশক্তি বা সরকারকে আমার সহায়ক বানিয়ে দাও যাতে করে তার সাহায্যে আমি দুনিয়ার এ অধঃপতন অনাচারকে দূর করতে পারি, অশ্লীলতা ও পাপাচারের সয়লাব রুখতে পারি এবং তোমার সুবিচারপূর্ণ আইন কার্যকর করতে পারি। এর থেকে জানতে পারা যায় যে, ইসলাম দুনিয়ায় যে সংস্কার সংশোধন চায় তা শুধু ওয়াজ-নসিহত নয়, বরঞ্চ ইসলামের বাস্তব প্রতিফলনের জন্যে রাজনৈতিক শক্তিরও প্রয়োজন আছে। তারপর এ দোয়া যখন আল্লাহ তাঁর নবীকে স্বয়ং শিক্ষা দিয়েছেন এবং হাদীসে একথা পাওয়া যায়-

***************************************************

অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা রাষ্ট্রশক্তির দ্বরা সে সব বিষয়ের পথরুদ্ধ করে দেয়- যা কুরআন করতে পারেনা- তখন এর থেকে এ কথা প্রমাণিত হয় য, দ্বীনের প্রতিষ্টা (একামতে দ্বীন) এবং শরিয়ত ও আল্লাহর দন্ডনীয় আইনসমূহ (হদূদ) জারী করার জন্যে রাষ্ট্রশক্তি চাওয়া এবং তা লাভ করার জন্যে চেষ্টা করা শুধু জায়েযই নয় বরঞ্চ বাঞ্ছনীয়। যারা এটাকে দুনিয়াদারী বা দুনিয়াপুরস্তি বলে অভিহিত করে, তারা ভুলের মধ্যে নিমজ্জিত আছে। দুনিয়াপুরস্তি তখনই হতে পারে যখন কেউ নিজের স্বার্থের জন্য রাষ্ট্রশক্তি লাভ করতে চায়। আর খোদার দ্বীনের প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রশক্তির অভিলাসী হওয়া দুনিয়াপুরস্তি নয় বরঞ্চ খোদাপুরস্তিরই দাবী।[]

সাহায্যের জন্যে মজলুম মুসলমানদের দোয়া শিক্ষাদান

মে’রাজের সময়কালেই সূরায়ে বাকারায় শেষ কয়েকটি আয়াত রাসূলুল্লাহকে (স) দান করা হয়। ইতিপূর্বে আমরা হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা)-এর বর্ণনা উদ্ধৃত করে একতা বলেছি। এ আয়াতগুলোর সমাপ্তি নিম্নোক্ত দোয়ার মধ্য দিয়ে হয়ঃ

**********************************************

হে আমাদের রব! ভূলে আমাদের কোন ক্রটি বিচ্যুতি হয়ে থাকলে তার জন্যে পাকড়াও করোনা। হে খোদা!‍ তুমি সে বোঝা আমাদের উপর চাপিয়ে দিওয়া যা তুমি আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর চাপিয়েছিলেন। পরওয়ারদেগার! যে বোঝ বহনের  শক্তি আমাদের নেই, তা আমাদের উপর চাপিওনা! আমাদের প্রতি কোমল হও, আমাদের ক্ষমা কর, আমাদের উপর রহম কর। তুমি আমাদের প্রভু। অতএব কাফেরদের মুকাবিলায় তুমি আমাদের সাহায্য, কর। (বাকারাঃ ২৮৬)

লক্ষ্য রাখতে হযে যে এ দোয়াটি এমন এক অবস্থায় শিক্ষা দেয়া হয়েছিল যখন মক্কায় ইসলাম ও কুফরের সংঘাত সঘর্ষ চরমে পৌঁছেছিল। মুসলমানদের উপরে বিপদ কোন স্থান ছিলনা যেখানে কোন খোদার বান্দাহ দ্বীনি হকের অনুকরণ করা শুরু করেছে আর যমীনের উপর তার জন্যে শাসরুদ্ধকর অবস্থার সৃষ্টি হয়নি। এ অবস্থায় মুসলমানদেরকে শিক্ষা দেয়া হলো যে এ ভাবে আপন প্রভুর কাছে দোয়া কর। বলা বাহুল্য যে দাতা স্বয়ং যদি চাওয়ার ধরন পদ্ধতি বলে দেন, তাহলে আপনা আপনি পাওয়ার নিশ্চয়তাও পয়দা হয়। এজন্যে এ দোয়া সে সময়ে মুসলমানদের জন্যে অসাধারণ মানসিক প্রশাস্তি এনে দিয়েছিল উপরন্তু এ দোয়অর মধ্যে প্রসংগক্রমে এ শিক্ষাও দেয়া হয় যে, তারা যেন তাদের ভাবাবেগ কোন অবাঞ্চিত দিকে প্রবাহিত হতে না দেয়, বরঞ্চ এ দোয়ার ছাঁচেই ঢেলে নেয়। একদিকে সেই হৃদয় বিদারক জুলুম নির্যাতন দেখুন যা শুধু হকপরস্তি বা সত্যনিষ্ঠার জন্যে তাদের উপর করা হচ্ছিল এবং অপর দিকে এ দোয়া দেখুন যার মধ্যে দুশমনের বিরুদ্ধে তিক্ততা সৃষ্টির লেশমাত্র পাওয়া যাবেনা। একদিকে সেই দৈহিক নির্যাতন ও আর্থিক ক্ষতি দেখুন যার শিকার তারা হয়েছিলেন এবং অপর দিকে দোয়া দেখুন যার মধ্যে দুনিয়াবী কোন স্বার্থ হাসিলের সামান্যতম কোন কথাও নেই। এক দিকে সে সব হকপুরস্ত ও সত্যনিষ্ঠদের চরম দুরবস্থা দেখুন এবং অন্য দিকে সে মহান ও পুতপবিত্র ভাবাবেগ দেখুন যার দ্বারা এ দোয়া পূর্ণ। এ তুলনামূলক যাঁচাই পর্যালোচনা থেকেই সঠিক ধারণা হতে পারে যে, সে সময়ে আহলে ঈমান মুসলমানদেরকে কোন ধরনের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক তরবিয়ত দেয়া হচ্ছিল।[]

মে’রাজের আর একটা দিক

এ বর্ণনা প্রসংগে মে’রাজের আর একটা দিকও পাঠকদের সামনে তুলে ধরা সংগত হবে যার থেকে এমন সব বহু প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে যা মে’রাজের বিভিন্ন অবস্থা ও বিবরণ অধ্যায়ন করতে গিয়ে মনের মধ্যে উদয় হয়।

জিব্রিল (আ) এর সাথে হুযুর (স) এর দুনিয়ার উপর প্রথম সাক্ষাত

কুরআন পাকে সূরায়ে নজমে প্রথমেই জিব্রিল (আ) এর সাথে হুযুর (স) এর সাক্ষাতের উল্লেখ করা হয়েছে যখন তাকে (জিব্রিল) তাঁর প্রকৃত আকৃতিতে দিগ্বলয়ে দেখা গেল। তারপর তিনি নিকটবর্তী হতে হতে এতোটা নিকটে এসে গেলেন যে হুযুর (স) ও তাঁর মাঝে দুটি ধনুকের সমান অথবা তার চেয়েও কম দুরত্ব রয়ে গেল। সে সময় তিনি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অহী পৌঁছিয়ে দেন। একথা উল্লেখ করার পর এরশাদ হচ্ছে-

**********************************************

চোখ যা দেখলো, মন তাতে মিথ্যা মিলিয়ে দিলনা। এখন তোমরা কি তার সাথে সে বিষয় নিয়ে বিতর্ক করছ যা সে চোখ দিয়ে দেখছে? (নাজমঃ ১১-১২)

অর্থাৎ দিনের আলোকে পরিপূর্ণ জাগ্রত অবস্থায় উন্মুক্ত চোখে নবী মুহাম্মদ (স) যা পর্যবেক্ষণ করলেন, সে সম্পর্কে তাঁর মন এ কথা বললনা যে, এ দৃষ্টিভ্রম মাত্র। অথবা এ কোন জ্বিন বা শয়তান যা দেখা যাচ্ছে। অথবা এ কোন কাল্পনিত আকৃতি যা আমার সামনে আবির্ভুত হয়েছে। অথবা জাগ্রত অবস্থায় স্বপ্ন দেখছি। না তা নয়। বরঞ্চ তাঁর মন ঠিক তাই উপলব্ধি করছে যা তাঁর চোখ দেখছিল। তাঁর এ বিষয়ে কণামাত্র সন্দেহ ছিলনা যে প্রকৃতপক্ষে ইনি জিব্রিল (আ) এবং যে পয়গাম তিনি বয়ে এনেছেন তা খোদার পক্ষ থেকে অহী।

এ ধরনের অসাধারণ পর্যবেক্ষণের পর নবীর মনে সন্দেহ উদ্রেক না হওয়ার কারণ

এখানে এ প্রশ্ন মনে জাগে যে এ কেমন কথা যে এমন অভিনব ও অসাধারণ পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে নবী পাকের (স) মনে কোন সন্দেহের উদ্রেক হলোনা এবং তিনি দৃঢ় বিশ্বাস করলেন যে, তাঁর চোখ যা কিছু দেখেছে তা প্রকৃত পক্ষে সত্য, কোন কল্পিত নিরাকর কিছু নয় এবং জ্বিন ও শয়তানও নয়? এর কারণ কি? এ প্রশ্ন নিয়ে চিন্তাভাবনা করলে এর পাঁচটি কারণ আমরা অনুধাবন করতে পারি।

প্রথম এই যে, যে বাহ্যিক অবস্থায় এ পর্যবেক্ষণ হয়েছিল তা এ সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চয়দা দান করে। রাসূলুল্লাহ (স) এর এ পর্যবেক্ষণ রাতের আঁধারে; অথবা মুরাকাবা অবস্থায়, স্বপ্নে অথবা অর্ধজাগ্রত অবস্থায় হয়নি। বরঞ্চ সকালের উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে পড়েছিল। নবী (স) পুরোপুরি জাগ্রত ছিলেন। প্রকাশ্য ও সুস্পষ্ট শূন্যে এবং পূর্ণ দিবালোকে স্বচক্ষে তিনি এ দৃশ্য ঠিক সেভাবেই দেখছিলেন, যেভাবে কোন ব্যক্তি দুনিয়ার অন্যান্য দৃশ্য দেখে থাকে। এর মধ্যে যদি সন্দেহের কোন অবকাশ থাকে, তাহলে এই যে দিনের বেলায় আমরা সমুদ্র, পাহাড়, মানুষজন, ঘরবাড়ি এবং আর যা কিছুই দেখছি, তা সবই সন্দিগ্ধ ও দৃষ্টিভ্রম হতে পারে।

দ্বিতীয় কারণ এই যে, নবী পাকের (স) আভ্যন্তরীণ অবস্থা্ও এ সত্যতার নিশ্চয়তা দান করছিল। তিনি পরিপূর্ণ সজ্ঞানে ছিলেন। পূর্ব থেকে তাঁর মনে এমন কোন চিন্তাধারণা ছিলনা যে এমন কোন পর্যবেক্ষণ হওয়া উচিত বা হতে যাচ্ছে। এ সব চিন্তাভাবনা ও তত্বতালাশ থেকে তাঁর মন একেবারে শূণ্য ছিল। এমন অবস্থায় আকস্মিক ভাবে তাঁর সামনে এ ঘটনা ঘটে। এতে এ ধরনের সন্দেহের কোন অবকাশ ছিলনা যে, চোখ কোন বাস্তব দৃশ্য দেখছেনা, বরঞ্চ কল্পিত কোন আকৃতি তাঁর সামনে ভেসে উঠেছে।

তৃতীয় এই যে, এ অবস্থায় নবীর সামনে যে সত্তা আবির্ভূত হলেন, তিনি এতো মহান, মর্যাদাপূর্ণ, সুন্দর ও জ্যোতির্ময় যে, এমন সত্তার কোন ধরণা কোন দিনই এর আগে তিনি হৃদয়ে পোষণ করেননি। নতুবা তাঁর মনে হতো এ দৃশ্য তাঁর ধারণা ও কল্পনা প্রসূত। জ্বিন বা শয়তানও এমন মর্যাদা সম্পনন হতে পাতোনা যে তিনি তাঁকে ফেরেশতা ব্যতীত অন্য মনে করতে পারতেন।

হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) এর বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, আমি জিব্রিলকে (আ) এমন আকৃতিতে দেখলাম যে, তাঁর দু’শ বাহু ছিল (মুসনাদে আহমদ)। অন্য এক বর্ণনায় ইবনে মাসউদ (রা) আরও ব্যাখ্যা করে বলেন যে, জিব্রিল (আ) এর এক একটি বাহু এতো বিরাট ও বিশাল ছিল যে তা উর্ধাকাশ ছেয়ে আছে- এমনটি দেখা যাচ্ছিল। (মুসনাদে আহমদ)

চতুর্থ কারণ এই যে, যে শিক্ষা সে সত্তা দান করছিলেন তাও এ পর্যবেক্ষণের সত্যতার নিশ্চয়তা দানকারী ছিল। এর মাধ্যমে হঠাৎ যে জ্ঞান, সমগ্র বিশ্বপ্রকৃতির বাস্তব সত্যতা সম্পর্কিত যে জ্ঞান তিনি লাভ করলেন, তার কোন ধারণা ইতিপূর্বে তাঁর মনে ছিলনা যে তিনি এ সন্দেহ পোষণ করতে পারতেন যে এ সব তাঁরাই ধ্যান ধারণা যা রূপ লাভ করে তাঁর সামনে এসেছে। এমনি ভাবে সে জ্ঞান সম্পর্কে এ সন্দেহ পোষণের কোন অবকাশ ছিলনা যে শয়তান এ আকৃতি ধারণ করে তাঁকে ধোকা দিচ্ছে। কারণ এ কাজ তো শয়তানের হতেই পারেনা এবং কখন সে এ কাজ করেছে যে, মানুষকে শির্ক ও পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে, খাঁটি তাওহীদের শিক্ষা দিচ্ছে? আখেরাতের জিজ্ঞাসাবাদের ব্যাপারে সতর্ক করে দিচ্ছে? জাহেলিয়াত ও তার রীতি পদ্ধতির প্রতি বিরাগভাজন করে দিচ্ছে? নৈতিক মহত্ব লাভের দাওয়াত দিচ্ছে? আর এক ব্যক্তিকে বলছে যে- শুধু তুমি এটা গ্রহণ করবে তাই নয়, বরঞ্চ তার স্থানে তাওহীদ, সুবিচার এবং তাকওয়া মংগলকারিতা প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে দাঁড়িয়ে যাও?

পঞ্চম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই যে, আল্লাহ তায়ালা যখন কোন ব্যক্তিকে নবুওতের জন্যে বেছে নেন, তখন তাঁর মনকে সকল সন্দেহ সংশয় ও প্ররোচনা থেকে মুক্ত করে সেখানে দৃঢ় প্রত্যয় ও আস্থা সৃষ্টি করে দেন। এ অবস্থায় তাঁল চোখ যা কিছু দেখে এবং কান যা কিছু শুনে তার সত্যতা সম্পর্কে কণামাত্র সন্দেহ তাঁর মনে সৃষ্টি হতে পারেনা। তিনি পূর্ণ আস্থা সহকারে প্রতিটি সত্য গ্রহণ করেন, যা তাঁর রবের পক্ষ থেকে তাঁর কাছে উদঘাটিত হয়। এ কোন পর্যবেক্ষণের আকারেও হতে পারে যা তাঁকে স্বচক্ষে দেখানো যায় অথবা ইসলামী জ্ঞানের আকারেও হতে পারে যা প্রতিটি শব্দে শব্দে তাঁকে শুনানো যায়। এ সকল অবস্থাতেই পয়গাম্বরের এ বিষয়ের পূর্ণ অনুভূতি হয় যে তিনি সকল খোদা প্রদত্ত অনুভূতির ন্যায় পয়গম্বরের এ অনুভূতিও এমন এক নিশ্চিত বস্তু যার মধ্যে ভূল বুঝাবুঝির কোন অবকাশ নেই। মাছের সপ্তরণকারী মাছ হওয়অর, পাখীর পাখী হওয়ার এবং মানুষের মানুষ হওয়া অনুভূতি যেমন একেবারে খোদা প্রদত্ত এবং এতে ভূল বুঝাবুঝির যেমন কোন অবকাশ নেই, ঠিক তেমনি পয়গম্বরের নিজের পয়গম্বর হওয়ার অনুভূতিও খোদা প্রদত্ত। তাঁর মনের মধ্যে পয়গম্বর হওয়া সম্পর্কে ভূল ধারণার সৃষ্টি হয়েছে এমন খারাপ ধারণা তাঁর মনে এক মুহূর্তের জন্যেও স্থান পেতে পারেনা।

জিব্রিলের (আ) সাথে দ্বিতীয় সাক্ষাত সিদরাতুল মুন্তাহায়

****************************************************

এবং আর একবার সে সিদরাতুল মুন্তাহার কাছে তকে নেমে আসতে দেখে,সেখানে নিকটেই জান্নাতুল মাওয়া রয়েছে। সে সময় সিদরার উপরে ছেয়ে যাচ্ছিল যা কিছু ছেয়ে যাচ্ছিল। দৃষ্টি না ঝলসে যায়, আর না সীমা অতিক্রম করে। এবং সে তার রবের বড়ো নিদর্শন দেখে। (নজমঃ ১৩-১৮)

এখানে জিব্রিল (আ) এর সাথে নবী (স) এর দ্বিতীয় বার সাক্ষাতের উল্লেখ করা হয়েছে। যেখানে তিনি নবী (স)এর সামনে তাঁর আসল আকৃতিতে আবির্ভুত হন। এ সাক্ষাতের স্থান সিদরাতুল মুন্তাহা বলা হয়েছে। সেই সাথে এ কথাও বলা হয়েছে যে, তার নিকটেই রয়েছে ‘জান্নাতুল মাওয়া’।

সিদরাতুল মুন্তাহা

সিদরা আরবী ভাষায় কুলগাছকে বলা হয়। আর ‘মুন্তাহা’ অর্থ শেষ প্রান্ত। ‘সিদরাতুল মুন্তাহার’ আভিধানিক অর্থ সে কুলগাছ যা একেবারে শেষ প্রানেত্ অবস্থিত আল্লামা আলূসী তাঁর তফসীর রুহুল মায়ানীতে এর ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন-

***********************************************

এখানে এসে সকল জ্ঞানীর জ্ঞান শেষ হয়ে যায়। তারপর যা কিছু আছে তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেনা। প্রায় এরূপ ব্যাখ্যাই ইবনে জারীর তাঁর তফসীরে এবং ইবনে আসীর ‘আন্নিহায়া ফী গারীবেল হাদীসে ওয়াল আাসর”- এ করেছেন। আমাদের পক্ষে এ কথা বলা বড়ো কঠিন যে, এ জড়জগতের শেষ সীমান্তে সে কুলগাছটি কেমন এবং তার প্রকৃত ধরণ ও অবস্থাটাই বা কেমন। এ আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টিতত্ত্বের এমন এক রহস্য যা কিছুতেই আমাদের বোধগম্য নয়। যাহোক সে এমন এক বস্তু যার জন্যে মানুষের ভাষায় সিদরা বা কুলগাছ থেকে অধিকতর উপযোগী কোন শব্দ আল্লাহ তায়ালার নিকট আর কিছু হয়তো ছিলনা।

জান্নাতুল মাওয়া

জান্নাতুল মাওয়ার আভিধানিক অর্থ হলো এমন জান্নাত যা বসবাস যোগ্য। হযরত হাসান বাসরী (র) বলেন, এ হচ্ছে সেই জান্নাত যা আখেরাতে ঈমানদার ও মুত্তাকীদের জন্যে নির্দিষ্ট করা আছে এই আয়াত থেকে তিনি এ যুক্তি প্রমাণ পেশ করেন যে, সে জান্নাত আসমানে রয়েছে। কাতাদাহ বলেন, এ সেই জান্নাত যেখানে শহীদদের রূহ রাখা হয়। এ জান্নাত বুঝায়না যা আখেরাতে পাওয়া যাবে। ইবনে আব্বাসও তাই বলেন এবং অতিরিক্ত এ কথা বলেন যে, আখেরাতে যে জান্নাত ঈমানদাদের দেয়া হবে তা আসমানে নয়, বরং তার স্থান এ যমীনে।

হুযুর (স) এর সংযম ও ধৈর্য

অতঃপর নবী পাকের (স) প্রশংসায় বলা হয়েছে যে, সে তাজাল্লী দেখার পর তাঁর দৃষ্টি ঝলসেও যায়নি এবং সীমা অতিক্রমও করেনি। অর্থাৎ একদিকে তাঁর চরম সহনশীতা এমন ছিল যে, এমন অত্যুজ্জ্বল জ্যোতি প্রবাহ তাঁর দৃষ্টিশক্তি ঝলসে দেয়নি একাগ্রতা এমন ছিল যে, যে উদ্দেশ্যে তাঁকে ডাকা হয়েছে, তার প্রতিই তাঁর মন ও দৃষ্টি কেন্দ্রীভূত করে রাখেন। আর যে বিস্ময়কর দৃশ্য সেকানে বিরাজমান ছিল তা দেখার জন্যে তিনি একজন ক্রীড়া দর্শকের ন্যায় চারদিকে দৃষ্টিপাত করা শুরু করেননি। তার দৃষ্টান্ত এই যে, যেমন কোন ব্যক্তির কোন বিরাট ক্ষমতা ও প্রতিপত্তিশীল বাদশার দরবারে হাযির হওয়ার সুযোগ হচ্ছে এবং সে সেখানে এমন সব জাঁকজমক ও আড়ম্বর দেখছে যা সে কোনদিন ধারণা করতে পারেনি। এখন যদি সে নিম্ন শ্রেণীর লোক হয় তাহলে তো সেখানে পৌঁছা মাত্র কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়বে। হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে। দরবারে শিষ্টাচার সম্পর্কে অনবহিত হলে দরবারে সাজসজ্জা ও দৃশ্য উপভোগ করার জন্যে চারদিকে ঘুরে ফিরে দেখতে থাকবে। কিন্তু একজন সম্ভ্রান্ত মার্জিত শিষ্টাচার ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি সেখানে পৌঁছে না হতবাক হয়ে যায়, আর না দরবারের সাজসজ্জা ও জাঁকজমক দর্শনে মশগুল হয়ে পড়ে বরঞ্চ সে অত্যন্ত মর্যাদাসহকারে সেখানে উপস্থিত হবে এবং যে উদ্দেশ্যে তাকে শাহী দরবারে তলব করা হয়েছৈ তার প্রতি তার সমস্ত মনোযোগ নিবিষ্ট করবে। নবী পাকের (স) এ গুণ বৈশিষ্ট্যই ছিল যার প্রশংসা এ আয়াতে করা হয়েছে।

নবী (স) কি আল্লাহকে দেখেছিলেন?

শেষের আয়াতে বলা হয়েছে যে, তিনি তাঁর রবের বড়ো বড়ো নিদের্শন দেখেছেন।

এ আয়াত এ ব্যাখ্যা পেশ করে যে, রাসূলুল্লাহ (স) আল্লাহকে নয়, বরঞ্চ তাঁর বড়ো বড়ো নিদর্শনাবলী দেখেছিলেন। আর যেহেতু পূর্বাপর বক্তব্যের দৃষ্টিতে এ দ্বিতীয় সাক্ষাতও সেই সত্তার সাথে হয়েছিল, যাঁর সাথে প্রথম সাক্ষাত হয়েছিল, সে জন্যে এ কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, উর্ধ্বে শূন্যে যাঁকে তিনি প্রথমবার দেখেছিলেন যিনি নিকটে আসতে আসতে এতো নিকটে এলেন যে উভয়ের মধ্যে দুট ধনুকের অথবা াতরও কম দূরত্ব রয়ে গেল, তিনিও আল্লাহ ছিলেননা। যদি তিনি এ দু’টি ঘটনার কোন একটিতেও আল্লাহ তায়ালাকে দেখে থাকতেন, তাহলে এতো বড়ো একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হতো যে, তাহলে অবশ্যই তা ব্যাখ্যা করে বলে দেয়া হতো। হযরত মূসা (আ) সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে যে, তিনি আল্লাহকে দেখার আবেদন করেছিলেন। জবাবে স্পষ্ট বলে দেয়া হয় ****************** তুমি আমাকে দেখতে পারনা- (আ’রাফঃ ১৪৩)। এখন এ মর্যাদা হযরত মূসাকে ( আ) দেয়া হলোনা, কিন্তু নবী মুহাম্মদকে (স) যদি দেয়া হতো, তাহলে তার গুরুত্বের প্রতি লক্ষ্য করে তা সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দেয়া হতো। কিন্তু আমরা দেখি যে কুরআনের কোথাও এ কথা বলা হয়নি যে, হুযর (স) তাঁর রবকে দেখেছেন। বরঞ্চ মেরাজের ঘটনার উল্লেখ করতে গিয়ে সূরায়ে বনী ইসরাঈলে এরশাদ করা হয়েছে যে, “আমরা আমাদের বান্দাহকে এ জন্যে নিয়ে গিয়েছিলাম যে, তাকে আমাদের নিদর্শনাবলী দেখাব- (***********************************) এবং এখানে সিদরাতুল মুন্তাহায় উপস্থিতির বেলায়ও বলা হয়েছে, “সে তার রবের বড়ো বড়ো নিদর্শনাবলী দেখেছে-

(**************************************)

এ সব কারণে বাহ্যতঃ এ বিতর্কের কোন অবকাশ থাকেনা যে রাসূলুল্লাহ (স) এ উভয় অবস্থাতে আল্লাহকে দেখেছিলেন না হযরত জিব্রিলকে (আ)? কিন্তু যে কারণে এ বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে তা এই যে, এ বিষয়ে হাদীস গ্রন্হগুলোতে মতানৈক্য পাওয়া যায়। নিম্নে আমরা ক্রামানুসারে ঐ সব হাদীস সন্নিবেশিত করছি যেগুলো এ বিষয়ে বিভিন্ন সাহাবায়ে কেরাম থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে।

হযরত আয়েশার (রা) বর্ণনা

বুখারী কিতাবুত তাফসীরে হযরত মাসরুকের বর্ণনা রয়েছে। তিনি বলেন, আমি হযতর আয়েশাকে (রা) জিজ্ঞেস করলাম, আম্মাজান, মুহাম্মদ (স) কি তাঁর রবকে দেখেছিলেন?

তিনি বলেন, তোমার এ কথায় তো আমার শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে পড়লো। একথা তুমি কি করে ভুলে গেলে যে, তিনটি বিষয় এমন যে, যদি কেউ তার দাবী করে তাহলে সে মিথ্যা দাবী করছে?

হযরত আয়েশা (রা) বলেন, প্রথমটি এই যে, যদি কেউ তোমাকে এ কথা বলে যে, মুহাম্মদ (স) তাঁর রবকে দেখেছেন, তাহলে সে মিথ্যা কথা বলছে। তারপর হযরত আয়েশা (রা) এ আয়াত পাঠ করেন- ********************** কোন চোখ তাঁকে দেখতে পারেনা। তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করেন।

**********************************************

কোন মানুষের এ মর্যাদা নয় যে, আল্লাহ তার সাথে কথা বলবেন। তবে হ্যাঁ, হয় অহীর মাধ্যমে, অথবা পর্দার আড়াল থেকে, অথবা কোন ফেরেশতা পাঠিয়ে দেবেন এবং সে তার উপর আল্লাহর অনুমতিক্রমে অহী করবে যা কিছু তিনি চান।

তারপর হযরত আয়েশা (রা) বলেন, তবে রাসূলুল্লাহ (স) জিব্রিলকে (আ) দু’বার তাঁর প্রকৃত আকৃতিতে দেখেছেন।

এ হাদীসের একটি অংশ বুখারী, কিতাবুত তাওহীদ, ৪র্থ অধ্যায়ে বর্ণিত আছে। আর *************** এ মাসরুকের যে বর্ণনা ইমাম বুখারী উদ্ধৃত করেছেন তাতে তিনি বলেছেন, আমি হযরাত আয়েশার (রা) একথা শুনে জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে আল্লহ তায়ালার এ এরশাদের অর্থ কি?

************************************

জবাবে তিনি বলেন, এর থেকে জিব্রিলকে (আ) বুঝানো হয়েছে। তিনি হামেশা রাসূলুল্লাহ (স) সামনে মানুষের আকৃতিতে আসতেন। কিন্তু এ সময়ে তিনি তাঁর প্রকৃত আকৃতিতে রাসূলুল্লাহর (স) কাছে আসেন এবং তিনি সমগ্র শূন্যলোকে ছেয়ে যান।

মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, সিদরাতুল মুন্তাহা অধ্যায়ে, হযরত আয়েশার (রা) সাথে মাসরুকের এ কথোপকথন বিস্তারিতভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছে। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে এই যে, হযরত আয়েশা (রা) বলেন, যে ব্যক্তি এ দাবী করে যে, মুহাম্মদ (স) তাঁর রবকে দেখেছেন, সে আল্লাহর প্রতি ভয়ানক দোষারোপ করে।

মাসরুক বলেন, আমি ঠেস দিয়ে বসেছিলাম। এ কথা শুনার পর উঠে ভালো হয়ে বসলাম এবং আরজ করলাম, উম্মুল মুমেনীন। তাড়াহুড়া করবেননা। আল্লাহ তায়ালা কি এ কথা বলেননি?

********************************* এবং *******************************

হযরত আয়েশা তার জবাবে বলেন, এ উম্মতের মধ্যে সর্বপ্রথম আমিই রাসূলুল্লাহকে (স) এ  বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি বলেন-

-তিনি তো জিব্রিল (আ) ছিলেন। যে আকৃতিতে আল্লাহ তাকে পয়দা করেছেন, সেই আসল আকৃতিতে তাঁকে দু’বার ব্যতীত আর কখনো দেখিনি। এ দ’সময়ে আমি তাঁকে আসমান থেকে নামতে দেখেছি তাঁর বিরাট সত্তা আসমান ও যমীনের মাঝে বিরাট শূন্যলোক জুড়ে ছিল।

ইবনে মারদুইয়অ মাসরুকের এ বর্ণনাকে যে ভাষায় উদ্ধৃত করেছেন তা এইঃ

*****************************************************

হযরত আয়েশা (রা) বলেন, সবার আগেই আমিই রাসূলুল্লাহ (স) এ কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম- আপনি কি আপনার রবকে দেখেছেন?

হযুর (স) জবাবে বলেন, না, আমি জিব্রিলকে (আ) আসমান থেকে নামতে দেখেছি।

হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদের (রা) বর্ণনা

বুখারী কিতাবুত তাফসীর, মুসলিম কিতাবুল ঈমান এবং তিরমিযি আবওয়াবুত তাফসীর এ যির বিন হুবাইশ এর যে বর্ণনা আছে তাতে বলা হয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা)- ************************ এর এরূপ তাফসীর বর্ণনা করেছেনঃ

রাসূলুল্লাহ (স) জিব্রিলকে (আ) এ আকৃতিতে দেখেন যে, তাঁর ছয়শ’ বাহু ছিল মুসলিমের দ্বিতীয় একটি বর্ণনায়-

******************************************************

এরও একই রূপ তাফসীর যির বিন হুবাইশ হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) থেকে উদ্ধৃত করেছেন।

মুসনাদে আহমদে ইবনে মাসউদের (রা) এ তাফসীর যির বিন হুবাইশ ছাড়াও আবদুর রহমান বিন ইয়াযির এবং আবু ওয়াইল-এর মাধ্যমেও উদ্ধৃত হয়েছে। উপরন্তু মুসনাদে আহমদে যির বিন হুবাইশের আরও দুটি বর্ণনা নকল করা হয়েছে যাতে আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা)

************************************************

এর তাফসীর বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন-

************************************************

-অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আমি জিব্রিলকে সিদরাতুল মুন্তাহার নিকটে দেখেছি। তাঁর ছয়শ’ বাহু ছিল।

এ বিষয়ের বর্ণনা ইমাম আহমদ শাকীক বিন সালমা থেকেও নকল করেছেন। এতে তিনি বলেন, আম আবদুল্লাহ বিন মাসউদের (রা) মুখ থেকে এ কথা শুনেছি। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আমি জিব্রিল (আ) কে এ আকৃতিতে সিদরাতুল মুন্তাহায় দেখেছি।

হযরত আবু হুরায়রার (রা) বর্ণনা

আতা বিন রাবাহ হযরত আবু হুরায়রাহ (রা) থেকে- *******************************

-এর অর্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি জবাবে বলেন,  ************************************************

-হুযুর (স) জিব্রিলকে (আ) দেখেছিলেন (মুসলিম-কিতাবুল ঈমান)।

হযরত আবুযর (রা) এর বর্ণনা

ইমাম মুসলিম কিতাবুল ঈমানে হযরত আবুযর গিফারী (রা) থেকে আবদুল্লাহ বিন শাকীকের দুটি বর্ণনা নকল করেছেন। এক বর্ণনায় তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহকে (স) জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি আপনার রবকে দেখেছিলেন? হুযুর (স) জবাবে বলেন-

************************ দ্বিতীয় বর্ণনায় বলেন, আমার প্রশে।ন তিনি এ জবাব দেন-

*************************** হুযুরের (স) প্রথম এরশাদের অর্থ ইবনুল কাইয়েম তাঁর যাদুল মায়াদে এভাবে বর্ণনা করেছেন- আমার এবং রবের দর্শনের মধ্যে নূর প্রতিবন্ধক ছিল। দ্বিতীয় এরশাদের অর্থ তিনি এভাবে বর্ণনা করেন- আমি আমার রবকে দেখিনি, বরঞ্চ ব্যস একটা নূর দেখেছি।

নাসায়ী এবং ইবনে আবি হাতেম হযরত আবুযর গিফারীর (রা) বক্তব্য এ ভাষায় নকল করেছেন- রাসূলুল্লাহ (স) তাঁর রবকে মন দিয়ে দেখেছেন, চোখ দিয়ে দেখেননি।

হযরত আবু মুসা আশায়ারীর (রা) বর্ণনা

হযরত আবু মুসা আশায়ারী (রা) থেকে মুসলিম কিতাবুল ঈমানের এ বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন যে, হুযুর (স) বলেছেন *****************************  আল্লাহ তায়ালার সৃষ্ট জীবের মধ্য থেকেক কারো দৃষ্টি তিনি পর্যন্ত পৌঁছেনি।

হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের (রা) বর্ণনা

মুসলিমের বর্ণনায় আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) কে জিজ্ঞেস করা হলো- ********************* এবং ************************

এ দুটি আয়াতে অর্থ কি?

জবাবে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁর রবকে দু’বার মনের চোখ দিয়ে দেখেন। এ বর্ণনা মুসনাদে আহমদেও আছে।

ইবনে মারদুইয়া আতা বিন আবি রাবাহার বরাত দিয়ে ইবনে আব্বাসের (রা) এ বক্তব্য উদ্ধৃত করেন যে, নবী (স) আল্লাহ তায়ালাকে চোখ দিয়ে দেখেননি, মন দিয়ে দেখেছেন।

নাসায়ীতে একরেমার বর্ণনা আছে যে, ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন,

*************************************************

তোমরা কি একথায় বিস্ময় বোধ করছ যে ইব্রাহীমকে (আ) আল্লাহ তায়ালা খলীল (বন্ধু) বানিয়েছেন, মূসা (আ) এর সাথে কথা বলেছেন এবং মুহাম্মদকে (স) দর্শনের মর্যাদা দিয়েছেন?

হাকেম এ বর্ণনা নকল করেছেন এবং একে সঠিক বলেছেন।

তিরমিযিতে শা’বীর বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, ইবনে আব্বাস (রা) এক বৈঠকে বলেন, আল্লাহ তাঁর দর্শন ও কথনকে মুহাম্মদ (স) এবং মূসার (আ) মধ্যে বন্টন করে দেন। মূসার (আ) সাথে তিনি দু’বার কথা বলেন এবং মুহাম্মদ (স) তাঁকে দু’বার দেখেন।

ইবনে আব্বাসের (রা) এ বক্তব্য শুনার পর মাসরুক হযরত আয়েশার (রা) নিকটে যান এবং জিজ্ঞেস করেন, মুহাম্মদ (স) কি তাঁর রবকে দেখেছেন?

তিনি বলেন, তোমার কথায় আমার শরীর রোমাঞ্চিত হলো।

তারপর হযরত আয়েশা (রা) এবং মাসরুকের মধ্যে যে কথোপকথন হয় তা আমরা উপরে হযরত আয়েশার (রা) বর্ণনায় উল্লেখ করেছি।

তিরমিযিতেই ইবনে আব্বাসের (রা) দ্বিতীয় যে বর্ণনা নকল করা হয়েছে তাঁতে একস্থানে তিনি বলেন, হুযুর (স) আল্লাহকে দেখেছিলেন। দ্বিতীয় স্থানে বলেন, দু’বার দেখেছিলেন। তৃতীয় স্থানে বলেন, তিনি আল্লাহকে মন দিয়ে দেখেছিলেন।

মুসনাদে আহমদে ইবনে আব্বাস (রা) এর একটি বর্ণনা এ ধরনের আছে-

*************************************************

আমার মহান রব আল্লাহ তায়ালাকে আমি দেখেছি, দ্বিতীয় বর্ণনায় তিনি বলেন-

*************************************************

রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আজ রাতে আমার রব অতি সুন্দর আকৃতিতে আমার নিকটে আসেন। আমি মনে করি হুযুরের (স) একথা বলার অর্থ এই যে, স্বপ্নে তিনি আল্লাহ তায়ালাকে দেখেছিলেন।

তাবারানী এবং ইবনে মারদুইয়া ইবনে আব্বাস (রা) থেকে এ ধরনের একটা বর্ণনাও নকল করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ (স) দু’বার তাঁর রবকে দেখেছিলেন। একবার চোখ দিয়ে এবং দ্বিতীয় বার মন দিয়ে।

মুহাম্মদ বিন কাব আল কুরাযীর বর্ণনা

মুহাম্মদ বিন কাব আল কুরাযী বলেন- রাসূলুল্লাহকে (স) কতিপয় সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি আপনার রবকে দেখেছেন? হুযুর (স) জবাবে বলেন, আমি দু’বার তাঁকে মন দিয়ে দেখেছি (ইবনে হাতেম)। এ বর্ণনাকে ইবনে জারীর এ ভাষায় নকল করেছেন, আমি তাঁকে চোখ নয় মন দিয়ে দু’বার দেখেছি।

হযরত আনাসের (রা) বর্ণনা

হযরত আনাস বিন মালেক এর একটি বর্ণনা যা মে’রাজ প্রসংগে শরীক বিন আবদুল্লাহর বরাত দিয়ে ইমাম বুখারী কিতাবুত্তাওহীদে উদ্ধৃত করেছেন তা এই যে-

*************************************************

-অর্থাৎ যখন তিনি সিদরাতুল মুন্তাহায় পৌঁছলেন, তখন আল্লাহ রাব্বুল ইয্যাৎ তাঁর নিকটে এলেন এবং তাঁর উপর ঝুলে রইলেন। এমনকি তাঁর এবং আল্লাহর মাঝে দুটি ধনুকের অথবা তার কম পরিমাণ দূরত্ব রয়ে গেল। তারপর আল্লাহ তাঁর উপরে যেসব অহী করলেন তার মধ্যে পঞ্চাশ নামাযের হুকুমও ছিল।

এ বর্ণনার সনদ এবং বিষয়বস্তুর উপরে ইমাম খাত্তাবী, হাফেজ ইবন হাজার, ইবনে হাযম এবং হাফেজ আবদুল হক যে সব ওজর আপত্তি তুলেছেন সে সবের বড় আপত্তি এই যে, এ কুরআনের সুস্পষ্ট খেলাপ, কারণ কুরআন দুটি পৃথক দর্শনের উল্লেখ করছে। একটি প্রথমে সুউচ্চ দিগ্বলয়ে ঘটে এবং তারপর নিকটে আসতে আসতে এতোটা নিকটে আসে যে, নবী (স) এবং তার মধ্যে দুটি ধনুক অথবা তার কম পরিমাণ দুরত্ব রয়ে যায়। প্রথমে এ ঘটনা ঘটে। দ্বিতীয় ঘটনা ঘটে সিদরাতুল মুন্তাহার নিকটে। কিন্তু এ বর্ণনা দুটি দর্শনকে একত্রে মিলিয়ে একাকার করে দিয়েছে এ জন্যে কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে এটাকে কিছুতেই মেনে নেয়া যায়না।

এখন রইলো ঐসব বর্ণনা যা উপরে আমরা উদ্ধৃত করেছি। তবে সে সবের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা তাই যা হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) এবং হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে কারণ তাঁরা উভয়ে মতৈক্য সহকারে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) এর এ এরশাদ বয়ান করেন যে, এ উভয় অবস্থাতেই তিনি আল্লাহকে দেখেননি, বরঞ্চ হযরত জিব্রিলকে (আ) দেখেছেন। আর এ বর্ণনাগুলো কুরআনের ব্যাখ্যা ও ইংগিতের সাথে পুরোপুরি সংগতিশীল। উপরন্তু তার সমর্থন হুযর (স) এর ঐসব বক্তব্য থেকেও পাওয়া যায়  যা হযরত আবুযর গিফারী (রা) এবং হযরত আবু মুসা আশয়ারী (রা) থেকে যে সব বর্ণনা উদ্ধৃক করেছেন। এর বিপরীত হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) থেকে যে সব বর্ণনা হাদীস গ্রন্হলোতে উদ্ধৃত হয়েছে তার মধ্যে ভয়ানক গরমিল পাওয়া যায়। কারো মধ্যে তিনি উভয় দর্শনকে চাক্ষুষ বলছেন, কারো মধ্যে উভয়কে মনের দেখা বলছেন। কোন বর্ণনায় একটি চাক্ষুষ এবং অন্যটি মনের দেখা বলছেন। কোন বর্ণনায় চাক্ষুষ দেখা বর্ণনায় একটি চাক্ষুষ এবং অন্যটি মনের দেখা বলছেন। কোন বর্ণনায় চাক্ষুষ দেখা একেবারে অস্বীকার করেছেন। এসবের মধ্যে কোন একটি বর্ণনাও এমন নয় যাতে তিনি রাসূলুল্লাহ (স) নিজস্ব কোন বক্তব্য উদ্ধৃত করছেন। যেখানে তিনি স্বয়ং হুযুরের (স) কথা উদ্ধৃত করছেন সেখানে প্রথমতঃ কুরআনে বর্ণিত এ দুটি দর্শনের কোন একটিও উল্লেখ নেই। উপরন্তু তাঁর এক বর্ণনার ব্যাখ্যা অন্য বর্ণনা দ্বারা এতোটুকু জানা যায় যে, হুযুর (স) কোন সময়ে জাগ্রত অবস্থায় নয়, স্বপ্নে আল্লাহ তায়ালাকে দেখেছেন। এ কারণে এ আয়াতগুলোর তাফসীরে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) এর বর্ণনার উপর আস্থা স্থাপন করা যায়না। এরূপ মুহাম্মদ বিন কা’ব আল কুরাযীর বর্ণনা যদিও রাসূলুল্লাহর (স) একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করছে, কিন্তু তার মধ্যে এসব সাহাবায়ে কেরামের নামের কোন বিবরণ নেই যারা হুযুর (স) থেকে এ কথা শুনেছেন। উপরন্তু তার মধ্যে একটিতে বলা হয়েছে যে, হুযর (স) চাক্ষুষ দর্শন একেবারে অস্বীকার করেছেন।

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.