সীরাতে সরওয়ারে আলম – ৫ম খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

দ্বাদশ অধ্যায়

মক্কী যুগের শেষ তিন বছর

এর আগে আমরা হুযুরের (স) তায়েফ সফরের উল্লেখ করেছি- যা নবুওতের ১০ম বর্ষে সংঘটিত হয়। সে অভিজ্ঞতার আলোকে নবী (স) বুঝতে পেরেছিলেন কুরইশের পক্ষ থেকে এমন কোন মংগল আশা করা যায়না, ঠিক তেমনি বনী সাকীফ থেকেও এ আশা করা যায় না। তারা তাঁর দাওয়াত কবুল করা তো দূরের কথা তা বরদাশত করতেও প্রস্তুত নয়। বরঞ্চ তায়েফে তাঁর উপর যে  জুলুম নির্যাতন করা হয়েছে. দশ বছরের দীর্ঘ সংঘাত- সংঘর্ষে তা মক্কায় একদিনও করা হয়নি। এভাবে মক্কা ও তায়েফবাসীদের থেকে নিরাশ হয়ে তিনি আরবের অন্যান্য গোত্রদের প্রতি দৃষ্টি দেন- যারা ওকাজ, মাজান্না ও যুল-মাজাযের মেলাগুলোতে এবং হজ্বের সময় মিনায় একত্র হতো। যদিও ইতিপূর্বে সাধারণ দাওয়াতের জন্যে তিনি এসব সমাবোশে প্রত্যেক গোত্রের শিবিরে যেতেন। কিন্তু সে সময়ে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল শুধু দাওয়াত ইলাল্লাহ পেশ করা। কিন্তু এখন তিনি এ দাওয়াত পেশ করার সাথে সাথে এ কথাও বলা শুরু করেনঃ ‘তোমরা আমাকে তোমাদের সাহায্য- সহযোগিতায় নিয়ে নাও এবং আমার সহযোগিতা কর, যেন আমি আমার রবের বাণী লোকের কাছে পৌঁছাতে পারি।

এসব স্থানে আবু জাহল, আবু লাহাব এবং কুরাইশের অন্যান্য শয়তানরা হুযুরের (স) পেছনে লেগে থাকত এবং গোত্রগুলোকে হুশিয়ার করে দিত যেন তারা তাঁর কথা না শুনে। নতুবা তারা পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে। অনেক সময় এসব দুষ্ট লোক নবীল (স) প্রতি পাথর নিক্ষেপও করতো। কেউ বা মাটি নিক্ষেপ করতো। কিন্তু এতদসত্ত্বেও হুযুর (স) তাঁর কাজ করেই যেতেন। তাছাড়া মক্কার বাইর থেকে কোন প্রভাবশালী লোক, ওমরা, জিয়ারত অথবা ব্যবসার উদ্দেশ্যে যখন আসতো, তাঁর সাথেও তিনি সাক্ষাৎ করতেন এবং তার কাছে দ্বীনের দাওয়াত পেশ করতেন। সেই সাথে এ কথাও বলতেন, তোমরা এ তবলিগে হকের কাজে আমাকে সাহায্য কর এবং তোমাদের এলাকায় আমাকে নিয়ে চল।

সেসব গোত্র যাদের সাথে তিনি মিলিত হন

হুযুর (স) তাঁর দাওয়াত পৌঁছাবার জন্যে অধিকাংশ গোত্রের কাছে যান যাদের তালিকা দৃষ্টে জানা যায় যে, আরবের পূর্ব প্রান্ত থেকে পশ্চিম এবং দক্ষিণ প্রান্ত থেকে উত্তর প্রান্ত পর্যন্ত কোন প্রভাবশালী ও শক্তিশালী গোত্র এমন ছিল না যার সাথে তিনি যোগাযোগ স্থাপন করেননি। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য গোত্র নিম্নরূপঃ

১.   কেন্দাহ- দক্ষিণ আরবের এক বিরাট গোত্র। হাদারা- মাওত থেকে ইয়ামেন পর্যন্ত তার এলাকা বিস্তৃতি ছিল।

২.   কালব- কোযায়ার একটি শাখা। যাদের এলাকা বিস্তৃত ছিল- উত্তর আরবের ‘দুমাতুল জান্দাল’ থেকে তবুক পর্যন্ত।

৩.   বনী বকর বিন ওয়ায়েল- এ আরবের বড়ো সংগ্রামপ্রবণ গোত্রগুলোর অন্তর্ভুক্ত ছিল।

রাসূলের যুগে আরব গোত্রসমূহের অঞ্চল

মধ্য আরব থেকে পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত তার শাখা ছড়িয়ে ছিল। ৩৩০ খৃষ্টাব্দে এ গোত্রটি সর্বপ্রথম ইরান সাম্রাজ্যের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। অতঃপর নবীর যুগে পুনরায় ইরানের সাথে যুদ্ধ বাধে যাতে ইরান পরাজয় বরণ করে। ইতিহাসে এ যুদ্ধ ‘জংগে যি-কার’ নামে অভিহিত।

৪. বনী আল বাক্কা-বনী আমের বিন সা’সায়ার একটি শাখা। মক্কা ও ইরাক সীমান্ত পথে এদের অবস্থান ছিল।

৫.  সা’লাবা বিন ওকাবা- বনী সা’লাবা বিন ওকাবার একটি শাখা।

৬.  বনী শায়বান বিন সা’লাবা- বনী সা’লাবা বিন উকাবার একটি শাখা।

৭. বনী আল হারেস বিন কা’ব- বনী তামীমের একটি শাখা।

৮.  বনী হানীফা- এ ছিল বনী বকর বিন ওয়ায়েলের একটি শাকা যা ইয়ামামায় বাস করতো। মুসায়লামা কাযযাব এ গোত্রভুক্ত ছিল। হযরত আবু বকর (রা) সময়ে ইরতিদাদে যে ফেৎনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল তাতে এ গোত্রই মুসলমানদের সাথে ভয়ানক যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। আরবের প্রখ্যাত যুদ্ধপ্রবণ গোত্রগুলোর মধ্যে এ একটি ছিল।

৯. বনু সুলায়েম- কায়সে আইলান গোত্রগুলোর মধ্যে এ এক বৃহৎ গোত্র ছিল। তাদের বাসস্থান ছিল খায়বারের নিকটস্থ- নজদের উচ্চতর অঞ্চল। ‘ওয়াদিউল কুরা এবং ‘তায়মা’ পর্যন্ত এরা ছড়িয়ে ছিল।

১০. বনীআমের বিন সা’সায়া-এ ‘হাওয়াযেন’- এর একটি শাখা। হাওয়াযেন কায়সে আইলানের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরা নজদে বসবাস করতো। অতঃপর তায়েফের এক অংশেও তারা পৌঁছে যায়। গ্রীষ্মে তায়েফে এবং শীতে নজদে কাটাতো।

১১. বনী আবাস- এ আইলানের একটি শাখা বনী গাতফানের এক বিরাট অধস্তন গোত্র ছিল। নজদে বসবাস করতো এবং যুদ্ধপ্রবণ ছিল। জাহেলিয়াতের যুগে অন্যান্য গোত্রের সাথে তাদের যুদ্ধ চলতো দীর্ঘকাল যাবত। সে সবের মধ্যে ওয়াহেস ও গাবরার যুদ্ধ ছিল ইতিহাসে বিখ্যাত।

১২.  বনী ওযরা- এ বনী আদুল্লাহ বিন গাতফানের একটি শাখা ছিল।

১৩. গাসসান- এ দক্ষিণ আরবের একটি বড়ো কওম যা উত্তর আরবে গিয়ে বসবাস করে। এদের মধ্যে বিভিন্ন গোত্র ছিল- যাদের মধ্যে ঈসায়ী ও মুশরিক ছিল। রোমীয় সাম্রাজ্যের অধীন গাসসানীদের একটি রাষ্ট্রও ছিল।

১৪. ফাযারা- এ গাতফান অধঃস্তন গোত্রগুলোর এক বিরাট গোত্র ছিল। এরা নজদ ও ওয়াদিউল কুরাতে বসবাস করতো।

১৫. বনী আবদুল্লাহ- এ কালবের অধঃস্তন গোত্রগুলোর একটি ছিল।

১৬. বনী মহারিব বিন খাসামা- এ আদনানী গোত্রগুলোর একটি ছিল।

 বহু গোত্রের মধ্যে মাত্র কয়েকটির উল্লেখ এখানে করা হলো যাদের সাথে হুযুর (স) সাক্ষাৎ করে দাওয়াত পেশ করেন। এ সংক্ষিপ্ত তালিকা এ জন্যে পেশ করা হলো যে, আপন দাওয়াতের এ পর্যায়ে হুযুর (স) বেছে বেছে এমন সব গোত্রের কাছে যান যারা স্বীয় সংখ্যা, স্বীয় মর্যাদা, স্বীয় সাধারণ শক্তি এবং অন্যান্য গোত্রের সাথে নিজেদের সম্পর্কের ভিত্তিতে এমন মর্যাদা-সম্পন্ন ছিল যে, তাদের মধ্যে কোন একটি গোত্র যদি তাঁর কথা মেনে নিত এবং ইসলামী দাওয়াতের জন্যে বদ্ধপরিকর হতো, তাহলে আশা করা যেতো যে, তদ্দরুণ দ্বীন বড়ো শক্তি সঞ্চার করতে পারতো।

গোত্রগুলোর সাথে সাক্ষাতের বিবরণ

আরব গোত্রগুলোর সাথে সাক্ষাতকালে রাসূলুল্লাহকে (স) বিভিন্ন ধরনের লোকের সম্মুখীন হতে হয়। মূসা বিন ওকবা মাগাযীতে বলেন, অধিকাংশ গোত্রের জবাব এ ছিলঃ লোকের কওম তাকে বেশী ভালো জানতো। এমন এক ব্যক্তি কি আমাদের জন্যে মংগলদার হতে পারে যে তার আপন কওমের মধ্যে ফাসাদ ও বিরোধ বিসংবাদ সৃষ্টি করেছে এবং তার কওম তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে? আবার কোন কোন গোত্র তাঁর দাওয়াত শুধু প্রত্যাখ্যানই করেনি, তাঁর সাথে অসদাচরণও করেছে। ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে- ইবনে জারীর, ইবনে হিশাম ও ইবনে কাসীর বলেন যে, হুযুর (স) কিন্দার শিবিরে গিয়ে তাদের সহযোগিতা চান। কিন্তু তারা সে কথা মেনে নিতে অস্বীকার করে। বনী আবদুল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করে বলেন, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের পিতাকে সুন্দর নাম দিয়েছেন। তোমরা আমার সহযোগি হও। কিন্তু তারাও অস্বীকার করেন। বনী হানিফার সাথে সাক্ষাৎ করলে তাদের জবাব অন্যান্য সকল গোত্র থেকে অধিকতর খারাপ ছিল। এছাড়াও কিছু গোত্র এমনও ছিল যাদের সাথে হুযুরের (স) সাক্ষাতের বড়ো চমৎকার অবস্থা হাদীস ও ইতিহাসবেত্তাগণ উদ্ধৃত করেছেন।

বনী হামদানের এক ব্যক্তির দ্বিধা প্রকাশ

ইমাম আহমদ, হাকেম এবং অন্যান্য মুহাদ্দসীন হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহর বরাত দিয়ে বর্ণনা করেন যে, হুযুর (স) এ কথা বলতে বলতে যাচ্ছিলেন, “কেউ আছে কি যে আমাকে সাথে করে তার কওমের কাছে নিয়ে যাবে?”

এমন সময়ে হামদান গোত্রের একজন তাঁর কাছে এলো এবং তাঁর কথা মেনে নিল। তারপর তার আশংকা হলো কি জানি তার কওম তার এ কথা মানে কিনা। অতএব সে পুনরায় ফিরে এসেস বলল, আমি গিয়ে আমার কওমের সাথে কথা বলব। তারপর আগামী বছর হজ্বের সময় আপনার সাথে দেখা করব।

বনী বকর বিন ওয়ায়েলের সাথে সাক্ষাৎ

হাফেজ আবু নুয়াইম এবং এহিয়া বিন আলউমাবী বরাত দিয়ে বলেন, হুযুর (স) বনী বকর বিন ওয়ায়েলের সাথে মিলিত হন এবং কথা প্রসংগে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমাদের সামরিক শক্তি কেমন?”

তারা বলে, আমরা ইরানের সাথে যুদ্ধ করার শক্তি রাখিনা এবং তার মুকাবেলায় কারো নিরাপতত্তার ব্যবস্থাও করতে পারিনা।

হুযুর (স) বলেন, এমন এক সময় আসবে যখন তোমরা তাদের জনপড়ে উপনীত হবে, তাদের নারীদেরকে বিয়ে করবে এবং তাদের ছেলেদেরকে গোলাম বানাবে। একথা বলে তিনি সেখান থেকে ফিরে আসেন এবং আবু লাহাব সেখানে পৌঁছে। সে তাদেরকে বলে, এ ব্যক্তি আমাদের নিকটে বড়ো মর্যাদা সম্পন্ন ছিল, কিন্তু তার মতিভ্রম হয়েছে।

তারা জবাবে বলে, সে যখন ইরানীদের উল্লেখ করে তখন আমরা এটাই মনে করেছিলাম।

এর  থেকে অনুমান করা যায় যে, সে সময়ে কোন আরব এ ধারণাই করতে পারতোনা যে, ইরানের মতো এমন বিরাট সাম্রাজ্যের উপর আরববাসী বিজয়ী হবে। তাদের দৃষ্টিতে এমন কথা একজন পাগলই বলতে পারতো। কিন্তু কথাবার্তার পর পনেরো-সোল বছর অতিবাহিত হতে না হতেই তারা স্বচক্ষে সে বস্তুই দেখতে পেলো যার উল্লেখ তারা পাগলামি মনে করতো।

বনী আমের বিন সা’সায়ার সাথে সাক্ষাৎ

ইবনে ইসহাক ইমাম যুহরীর বরাত দিয়ে বলেন যে, হুযুর (স) বনী আমের বিন সা’সায়ার শিবিরে গমন করেন এবং তাদের সামনে তাঁর কথা রাখেন। তাদের মাধ্যে একজন বুহায়রা বিন ফেরাস বলে, খোদার কসম, কুরাইশের এ যুবককে যদি আমি আমার সাথে নিয়ে নেই তো তার মাধ্যমে গোটা আরব বশীভূত করে ফেলব। তারপর সে হুযুরকে (স) বলে, যদি আমার আপনার সাথে সহযোগিতিা করি এবং আল্লাহ আপনাকে বিরোধিদের উপর বিজয়ী করেন, তাহলে আপনার পরে কি শাসন ক্ষমতা আমাদের হাতে আসবে? হুযুর (স) বলেন, এ ব্যাপার তো আল্লাহর হাতে। তিন যাকে চান তাকে শাসন ক্ষমতা দান করেন। তখন সে বলে, তাহলে আমরা কি আপনার খাতিরে আমাদের গলদেশ আরবদের লক্ষ্য বানাবার জন্যে পেশ করব এবং আল্লাহ যখন আপনকেক বিজয় দান করবেন তখন শাসন ক্ষমতা আমাদের পরিবর্তে অন্যরা লাভ করবে? যান, আপনার আমাদের কোন প্রয়োজন নাই।

হজ্বের শেসে যখন এসব লোক বাড়ি ফিরে যায়, তখন তারা তাদের হজ্বের অবস্থা এমন এক শ্রদ্ধেয় বৃদ্ধলোককে জানালো যিনি বার্ধক্যের জন্যে হজ্ব ও অন্যান্য মেলায় যোগদান করতে পারতেননা। তারা তাঁর নিকটে এ কথাও বলল, আমাদের নিকটে কুরাইশের মধ্য থেকে বনী আদুল মুত্তালিবের এক যুবক এসেছিল, যে এ দাবী করতো যে, সে একজন নবী এবং আমাদেরকে বলছিল- “তোমরা আমার সহযোগিতা কর এবং আমাকে তোমাদের এলাকায় নিয়ে চল”। কিন্তু তার সাথে আমাদের এ কথা হয়েছিল এবং শেষে তাকে এ জবাব দিয়ে বিদায় করে দিই। এ কথা শুনার পর যে বৃদ্ধ আপন মস্তক চেপে ধরে বলেন, বনী আমের! এর কি কোন প্রতিকার হতে পারে? এ হাত ছাড়া সুযোগ কি আর ফিরে আসতে পারে? সেই খোদার কসম, যার মুষ্টির মধ্যে আমার প্রাণ, কোন ইসমাঈলী এমন কথা মিথ্যার আবরণে কখনো বলতে পারেনা। তিনি অবশ্যই নবী। তোমাদের বিবেক তখন কোথায় ছিল?

বনী শায়বান বিন সা’লাবার সাথে সাক্ষাৎ

আবু নুয়াইম, হাকেম ও বায়হাকী হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে হযরত আলীর (রা) এ বর্ণনা উদ্ধৃত করেন যে, তিনি (হযরত আলী (রা)) বলেন, আমি একবার রাসূলুল্লাহ (স) ও আবু বকর (রা) সাথে মিনায় গোত্রগুলোর সাথে দেখা-সাক্ষাতের কাজ করছিলাম। ঘোরাফেরা করতে করতে আমরা একটি বিরাট মর্যাদাসম্পন্ন সমাবেশে পৌঁছলাম। তার নেতৃবৃন্দ বিরাট ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। হযরত আবু বকর (রা) জিজ্ঞেস করলেন, আপনাদের পরিচয়? তাঁরা জবাবে বলেন, আমরা বনী শায়বান বিন সা’লাবার লোক। হযরত আবু বকর (রা) হুযুরকে (স) বলেন, আমার মা-বাপ আপনার জন্যে কুরবান হোক, এঁদের থেকে সম্মানিত লোক আর কোথাও পাওয়া যাবে না। এ বৈঠকে মাফরুক বিন আমার, হানী বিন কাবিসা, মুসান্না বনি হারেসা ও নো’মান বিন শারিক উপস্থিত ছিলেন। মাফরুক হযরত আবু বকরের (রা) নিকটেই বসেছিলেন।

তিনি বলেন, সম্ভবতঃ আপনারা কুরাইশের লোক? হযরত আবু বকর (রা) বলেন, সম্ভবত আপনারা শুনেছেন যে, এখানে আল্লাহর রাসূল প্রেরিত হয়েছেন। তিনিই এ ব্যক্তি। মাফরুক বলেন, হ্যাঁ, এ কথা আমাদের কাছে পৌঁছেছে। অতঃপর তিনি হুযুরের (স) দিকে মনোনিবেশ করলেন। হুযুর (স) বলেন, আমি আপনাদেরকে দাওয়াত দিচ্ছি যে, আপনারা এ সাক্ষ্য দেন আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং সাক্ষ্য দেন যে আমি আল্লাহর রাসূল। আর এই যে, আপনারা আপনারেদ ওখানে আমাকে আশ্রয় দিন এবং আমার মদদ করুন যাতে সে দায়িত্ব আমি পালন করতে পারি যা আল্লাহ আমার উপর অর্পণ করেছেন। কারণ কুরাইশ আল্লাহর কাজ রুখবার জন্যে জোটবদ্ধ হয়েছে। আল্লাহর রাসূলকে অস্বীকার করেছে এবং হকের পরিবর্তে বাতিল নিয়ে মগ্ন রয়েছে। অথচ আল্লাহ মানুষের মুখাপেক্ষী নন এবং আপন সত্তার সপ্রশংসিত।

মাফরুক বলেন, হে কুরাইশ ভাই! আপনি আর কোন জিনিসের দাওয়াত দেন? হুযুর (স) সূরা আনয়ামের ১৫১-১৫৩ আয়াত- তেলাওয়াত করেন-

********************************************

(১৫১) হে মুহাম্মদ (স), এ লোকদের বল যে, এসো আমি তোমাদের শুনাবো তোমাদের রব তোমাদের উপর কি কি হারাম করেছেন। তা এই যে, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবেনা। পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে। নিজেদের সন্তান দারিদ্রের ভয়ে হত্যা করবেনা। আমি তোমাদেরও রিযিক দিই, তাদেরও দেব। নির্লজ্জতার ধারে-কাছেও যেয়োনা, তা প্রকাশ্যই হোক কি গোপন। কোন মানুষ যাকে আল্লাহ সম্মানিত করেছেন হত্যার করোনা, অবশ্যি ন্যায় সংগত হলে অন্য কথা। এ সব কথা যা পালনের জন্যে তিনি তোমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। সম্ভবতঃ তোমরা বুঝে শুনে কাজ করবে।

(১৫২) আরও এই যে তোমরা এতিমের মালের নিকটেও যাবেনা। অবশ্যি এমন নিয়ম ও পন্হায় যা সবচেয়ে ভালো, যতোদিন পর্যন্ত না সে সাবালক হয়েছে। আর ওজনে পুরোপুরি ইনসাফ কর। আমরা প্রত্যেক ব্যক্তির উপর দায়িত্বের বোঝা ততোখানি দিই যতোখানি বহন করার শক্তি তার আছে। কথা বললে ইনসাফের কথা বলবে নিজের আত্মীয়ের ব্যাপার হোক না কেন। খোদার ওয়াদা পূরণ কর। এসব বিষয়ের হেদায়েত আল্লাহ তোমাদের দিয়েছেন হয়তো তোমরা নসিহত কবুল করবে।

মাফরুক বলেন, হে কুরাইশ ভাই, আপনি আর কোন জিনিসের দাওয়াত দেন? খোদার কসম, এ দুনিয়াবাসীর কালাম নয়। তাদের কালাম হলে আমরা চিনতে পারতাম। তখন হুযুর (স) সূরা নাহলের ৯০ আয়াত তেলাওয়াত করেন-

********************************************

-আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন- ইনসাফ, অনুগ্রহ করার ও আত্মীয়-স্বজনকে দেয়ার জন্যে। আর নিষেধ করছেন- নির্লজ্জতা, পাপাচার ও জুলুম-নিপীড়ন করতে। তিনি তোমাদের নসিহত করছেন- যেন তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পার।

মাফরুক বলেন, খোদার কসম, হে কুরাইশ ভাই, আপনি সর্বোৎকৃষ্ট নৈতিক গুণাবলী ও ভালো কাজে দাওয়াত দিয়েছেন। বড়ো বিবেকহীন সে কওম যে আপনাকে অস্বীকার করেছে এবং আপনার বিরুদ্ধে জোটবন্ধ হয়েছে। তারপর হানী বিন কাবিসার দিকে ইংগিত করে মাফরুক বলেন, ইনি আমাদের মুরব্বী ও ধর্মীয় নেতা।

হানী বলেন, হে কুরাইশী ভাই, আপনার কথা আমি মুনেছি। তা সত্য বলে স্বীকার করছি। কিন্তু আমাদের একই বৈঠকে নিজেদের দ্বীন পরিত্যাগ করে আপনার আনুগত্য করা বড়ো তাড়াহুড়া করা হবে। পেছনে আমাদের এক কওম আছে। তাদের পরামর্শ ও অভিমত ছাড়া কোন সিদ্ধান্ত করে তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া ঠিক হবেনা। আমরা ফিরে যাচ্ছি এবং আপনিও যান। আমরা এর পরিণাম সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করব এবং আপনিও দেখুন ব্যাপার কতদূর পর্যন্ত গড়াচ্ছে।

একথা বলে হানী মুসান্না বিন হারেসের সাথে হুযুরের (স) পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন, ইনি আমাদের শায়খ ও জংগী সর্দার (সেনাপতি)।

মুসান্না বলেন, হে কুরাইশী ভাই, আমি আপনার কথা শুনেছি ও তা পছন্দ করেছি। কিন্তু আমার জবাব তাই যা হানী দিয়েছেন। একই বৈঠকে আমাদের দ্বীন পরিত্যা করে আপনার আনুগত্য স্বীকার করা ঠিক হবেনা। আমরা এমন স্থানে থাকি যেখানে আমাদের দুটি প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়, একটি ইয়ামাম  এবং দ্বিতীয়টি সামাওয়া।[ইরাকের সে অংশ যা আরব উপদ্বীপের সাথে সংলগ্ন- গ্রন্হকার।]

রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, এ দুটি কি?

মুসান্না- এক তো পাহাড় ও আরব ভূখন্ড, দ্বিতীয়- ইরানের এলাকা এবং কিসরার নদ-নদী। কিসরা আমাদের কাছ থেকে শপথ নিয়েছে যে- না আমরা স্বয়ং প্রচলিত নিয়ম বিরোধী কোন নতুন কাজ করব আর না এমন কাজ যে করতে চায় তাকে আমাদের এখানে কোন স্থান দেব। আপনি যে জিনিসের দিকে আমাদের আহ্বান জানাচ্ছেন- তা সম্ভবতঃ বাদশাহগণ সহ্য করবেননা। আরব ভূখন্ডের ব্যাপারে কথা এই যে, এতে আমাদের দোষক্রটি ক্ষমার যোগ্য হতে পারে। যদি আপনি চান যে আরবের মুকাবেলায় আমরা আপনার সহযোগিতা করি, তো তা আমরা করতে পারি। কিন্তু পারস্যের মুকাবেলা করা আমাদের সাধ্যের অতীত।

রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আপনারা সত্য কথা বলে থাকলে মন্দ কিছু করেননি। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আল্লাহর দ্বীনকে নিয়ে যে দাঁড়িয়ে যায় সে কোন ব্যতিক্রম কিছু করেনা, সকল দিক দিয়ে তার সহযোগিতা করে। আপনারা একটু সবর করুন, তাহলে আল্লাহ পারস্যবাসীদের দেশ ও ধনসম্পদ আপনাদেরকে দান করবেন এবং তাদের কন্যাদেরকে আপনাদের অধীন করে দেবেন। আপনারা কি আল্লাহর তসবিহ ও তাকদীস করবেন?

নো’মান বিন শারীক বলেন, হে কুরায়শী ভাই, আপনার এ কথা আমরা মেনে নিলাম। তারপর হুযুর (স)-

********************************************

পড়তে পড়তে উঠে পড়েন এবং হযর আবু বকরের (রা) হাত ধরে বিদায় হন।

বনী আব্বাসের সাথে সাক্ষাৎ

ওয়াকেদী আবদুল্লাহ বিন ওয়াবেসাতুল আবসী থেকে তাঁর দাদার এ বয়ান উদ্ধৃত করেন, আমাদের গোত্র বনী আবস মসজিদে খায়ফের নিকটে জামরাতুল উলার সন্নিকটে অবস্থান করছিল। রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের থাকার জায়গায় তশরিফ আনেন। যায়েদ বিন হারেসা (রা) তাঁর সাথে ছিলেন। তিনি আমাদেরকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেন এবং আমরা তা কবুল করি। ইতিপূর্বেও প্রত্যেক হজ্বের সময় তিনি আমাদের শিবিরে আসতেন এবং তাঁর দাওয়াত আমরা কখনো কবুর করিনি। এবার যখন তিনি আমাদের নিকট এলেন তখন মায়সারা বিন মাসরুক আল আবসী আমাদের সাথে ছিলেন। তিনি বলেন, খোদার কসম! যদি আমরা তাঁর সত্যতা স্বীকার করি এবং তাঁকে নিয়ে গিয়ে আমাদের এলাকার কেন্দ্রীয়, স্থানে রাখি তাহলে এ হবে একটা ন্যায়সংগত অভিমত। কারণ খোদার কসম, তিনি অবশ্যই বিজয়ী হবেন এবং পুরোপুরি বিজয়ী হবেন। কিন্তু কওমের লোকেরা বলল, রাখ ভাই, আমাদেরকে এমন কাজে ঠেলে দিওনা যার বোঝা বহন করার সাধ্য আমাদের নেই।

মায়সারা সম্পর্কে হুযুর (স) কিছু আশা পোষণ করে তাঁকে ডেকে নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলে, আপনার কালাম কত সুন্দর ও সুস্পষ্ট। কিন্তু আমার কওম আমার বিরোধিতা করছে। যদি তারাই সমর্থন না করে তো অন্যান্যরা তো দূরে পালাবে।

দীর্ঘকাল পর বিদায় হজ্বের সময় মায়সারা হুযুরের (স) সাথে সাক্ষাৎ করলে তিনি তাঁকে চিনতে পারেন। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! যখন প্রথম বার আপনি আমাদের শিবিরে আসেন তখন থেকে হরহামেশা আপনার আনুগত্যের অভিলাষী ছিলাম। কিন্তু যা হবার তা হয়েছে। এখন আমি এতো বিলম্বে মুসলমান হচ্ছি।

এভাবে আরবের সকল গোত্র সে নিয়ামত থেকে বঞ্চিত রয়ে যায়, যা পায়ে হেঁটে তার কাছে যান এবং তা লাভ করেন। আমরা কিছুটা পেছনে ফিরে গিয়ে বলব যে, এ ভাগ্যবান বস্তির লোক কি কারণে মুহাম্মদ আরবীর (স) দাওয়াত কবুল করার জন্যে মানসিক দিক দিয়ে তৈরী ছিলেন।

আউস ও খাযরজের প্রাথমিক ইতিহাস

৪৫০ অথবা ৪৫১ খৃষ্টাব্দে মারেব বাঁধ বা প্রাচীর ভেঙে যাওয়ার ফলে ইয়ামেনে বিরাট বন্যা হয়। এ কারণে সাবা কওমের এক ব্যক্তি আমর বিন আমের তার পরিবারের লোকজনসহ উত্তর দিকে স্থানান্তরিত হয়। তার এক পুত্র জুফনার সন্তানগণ শাম অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। অঞ্চলটি গাসসান নামে অভিহিত হয়। দ্বিতীয় পুত্র হারেসা হেজাযের পাহাড়পুঞ্জ এবং লোহিত সাগরের তটভূমির মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় বসবাস করতে থাকে যে স্থানটিকে তাহামা বলা হয়। তার বংশধর খুযায়া নামে খ্যাত। তৃতীয় পুত্র সা’লাবার সন্তানদের মধ্যে একজন ছিল হারেসা যার দু’পুত্র একই মা-কায়লার গর্ভে জন্মগ্রহণ করে। এ দু’পুত্রের নাম ছিল আউস ও খাযরাজ। তাদের সন্তানগণ ইয়াসরেব (মদীনা) গিয়ে বসতি স্থাপন করে, যেখানে ইহুদী পূর্ব থেকেই প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছিল। দীর্ঘকাল যাবত ইহুদীরা আউস ও খাযরাজের সন্তানদেরকে মূল শহর এবং তার সবুজ-শ্যামল ভূখন্ডে প্রবেশ করতে দেয়নি। ফরে তারা চারপাশের অনুর্বর ভূমিতে বড়ো কষ্টে জীবন যাপন করতে থাকে। অবশেষে তার তাদের সমবংশীয় গাসসানীদের সাহায্য প্রার্থনা করে। তারা সৈন্য-সামন্ত নিয়ে এসে ইহুদীদেরকে শহর থেকে বহিষ্কার করে দিয়ে আউস ও খাযরাজকে স্থান করে দেয়। ইহুদীদের দুটি গোত্র- বনী কুরায়জা ও বনী নাদীর শহরের উপকন্ঠে বাস করতে বাধ্য হয় এবং একটি গোত্র বনী কায়নোকা খাযরাজ গোত্রের আশ্রয় নিয়ে শহরের এক মহল্লায় বসবাস করতে থাকে। বনী কুরায়জা ও বনী নাদীর যখন দেখলো যে তাদের প্রতিদ্বন্দী গোত্র বনী কায়নোকা খাযরাজের বন্ধু হয়ে গেছে, তখন তরা আউস গোত্রের সাথে চুক্তি করে তাদেরকে বন্ধু বানিয়ে নেয়। তারপর আউস ও খাযরাজ পৌনেঁ দু’শত বছর যাবত ইহুদীদের সাথে একই শহরে ও তার উপকন্ঠে বসবাস করতে থাকে। এ সময়কালে এ দুটি আরব গোত্র একই বংশোদ্ভুত হওয়া সত্ত্বেও এবং পারস্পরিক বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও জাহেলিয়াতের ভিত্তিতে স্বয়ং একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত থাকে। ইহুদী গোত্রগুলোও আপন আপন বন্ধু গোত্রগুলোকে একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইন্ধনও যোগাতে থাকে। কারণ তাদের (আউস ও খাযরাজ) পারস্পরিক যুদ্ধে ইহুদীরা তাদের মংগল মনে করতো ও তাদের ঐক্য তাদের মৃত্যুর পরওয়ানা স্বরূপ ছিল। এভাবে পৌনে দু’শতকের মধ্যে ছোটো-খাটো বহু যুদ্ধ ছাড়াও এগারটি রক্তাক্ত সংঘর্ষ হয় যার মধ্যে সর্বশেষ যুদ্ধ- বুয়াসের যুদ্ধ- হিজরতের মাত্র পাঁচ বছর পূর্বে (নবুওতের ৮শ বর্ষে, ৬১৯ খৃঃ) সংঘটিত হয়- যাতে উভয় গোত্রের বড়ো বড়ো সর্দারগণ নিহত হন।[ইবন সা’দের বর্ণনা অনুযায়ী বুয়াস যুদ্ধ হিজরতের ছ’বছর পূর্বে সংঘটিত হয়। বুয়অস একটি স্থান, অথবা ছোট দুর্গ অথবা শস্যক্ষেত্রের নাম যা বনী কুরাইযার সন্নিকটে মদীনা তেকে দু’মাইল দূরে অবস্থিত। যদ্দে এক পক্ষে আউস গোত্র ছিল, যার সর্দার ছিলেন হযরত উসাইদ বিন মুহদাইরের পিতা হুদাইর। বনী কুরায়যা ও বনী নাদীর- তাদের সাথে যুদ্ধে শরীক ছিল। অপর পক্ষে ছিল খাযরাজ গোত্র যার সর্দঅর ছিলেন আমর বিন নু’মান বায়াযী। ইহুদীদের বনী কায়নুকা তাদের সাথে ছিল। আউস যুদ্ধে বিজয়ী হয়। কিন্তু উভয় পক্ষ এতোটা ক্ষতিগ্রন্ত হয় যে, তাদের চিন্তাশীল ব্যক্তিগণ অনুভব করেন যে, যদি তারা এভাবে একে অপরের দুশম হয়ে থাকে তাহলে যুদ্ধ করতে করতে সব খতম হয়ে যাবে।– গ্রন্হকার।] কিন্তু এসব যুদ্ধবিগ্রহ সত্ত্বেও মদীনাবাসীদের উপর ইহুদীদের ধর্মীয় প্রভাব এমন অধিক পরিমাণে ছিল যে, যে নারীর সন্তান হয়ে হয়ে মরা যেতো, সে মানত করতো। এরপর যে সন্তান জন্মগ্রহণ করবে তাকে ইহুদ বানাবে। এ অবস্থার উল্লেখ ইবনে জারীর তাঁর তাফসীরে আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের (রা) বরাত দিয়ে করেছেন। আবু দাউদ, নাসায়ী, ইবনে আবি হাতেম এবং ইবনে হিব্বানও এ সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন- যা ইবন আব্বাস (রা) , মুজাহেস, সাঈদ বিন জুবাইর, শা’বী, হাসান বাসরী প্রমুখ থেকে বর্ণিত আছে।

এ ঐতিহাসিক পটভূমির প্রভাব

এ সংক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক অবস্থা যা বয়ান করা হলো, তার কারণে আউস এবং খাযরাজের উপর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়ে। তারা অন্যান্য সকল আরব গোত্রের বিপরীত তাদের ইসলাম কবুলের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে রেখেছিল এবং তার সুযোগ সামনে আসার সাথে সাথেই ওসব কারণে এরা এ দ্বীন এবং তার আহবায়ক সাইয়েদুনা মুহাম্মদ (স)-এর দিকে ঝুঁকে পড়লো যেমন তৃষ্ণার্ত পানির দিকে ঝুঁকে পড়ে।

এ সবের মধ্যে প্রথম প্রভাব এ ছিল যে, দীর্ঘদিন যাবত ইহুদীদের সাথে মিলামিশা ও যোগাযোগ রক্সা করে চলার ফলে তাদের কাছে অহী, কিতাব, শরিয়ত প্রভৃতি শব্দাবলী ও তার অর্থ পরিচিত হয়ে পড়েছিল। এ কারণে তাদের জন্যে এ বস্তুগুলো তেম অপরিচিত ছিলনা যেমন ছিল অন্যান্য আরববাসীর কাছে।

দ্বিতীয় প্রভাব, ইবনে ইসহাকের বরাতসহ ইবনে হিশাম ও তাবারীর বর্ণনা অনুযায়ী এ ছিল যে, প্রতিবেশী ইহুদীদের সাথে আলপচারীতে প্রায় এ কথা তারা জানতে পারতো যে, এসব লোক (ইহুদী) অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে একজন নবীর আগমন প্রতীক্ষায় ছিল- যার ভবিষ্যদ্বাণী তাদের আসমানী কিতাবগুলোতে করা হয়েছে। তারা এ দোয়া করতো-  শীগগির তিনি যদি আসেন, তাহলে অইহুদী কওমগুলোর প্রাধান্য শেষ হয়ে যাবে এবং তাদের নিজেদের উন্নতির যুগ শুরু হবে। বিশেষ করে যখন আউস ও খাযরাজের সাথে ঝগড়া বিবাদ হতো তখন তারা বলতো, অতিসত্বর এক নবীর আগমন হবে। তিনি যখন আসবেন তখন আমরা তাঁর আনুগ্য করব এবং তাঁর সাথে থেকে তোমাদেরকে এমন মার দেব যেমন আদ ও ইরাম মার খেয়েছিল। কুরআনেও তাদের এসব কথার দিকে ইংগিত করা হয়েছেঃ

************************************************

-এবং ইতিপূর্বে তারা স্বয়ং কাফেরদের মুকাবেলায় বিজয়ী হওয়ার দোয়া করতো। (বাকারাঃ ৮৯)

ইহুদীদের এ সব কথায় আউস ও খাযরাজের লোকের মধ্যে এ প্রেরণা সৃষ্টি হয়েছিল যে, সে নবী যদি আসেন তাহলে সকলের আগে তারা সম্মুখে অগ্রসর হয়ে তাঁর আনুগত্য অবলম্বন করবে যাতে ইহুদীরা তাদের অগ্রগামী হতে না পারে।

তৃতীয় প্রভাব এ ছিল যে, গৃহযুদ্ধে তারা মনমরা হয়ে পড়েছিল এবং এমন এক নেতৃত্বের অভিলাষী ছিল যে তাদের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি করতে পারে। তাদের এ অবস্থার প্রতিও ইংগিত করা হয়েছেঃ

************************************************

-তোমরা অগ্নি গহ্বরের তীরে অবস্থঅন করছিলে, আল্লাহ তার থেকে তোমাদের রক্ষা করেছেন।(আলে ইমরানঃ ১০৩)

নিজেদের এ বিপদের অবসান ঘটাবার জন্যে মদীনাবাসী এতোদূর পর্যন্ত প্রস্তুত হয়েছিল যে, খাযরাজের সর্দঅর আবদুল্লাহ বিন ওবাইকে তারা তাদের বাদশাহ বানিয়ে নেবে যাতে তাদের মতানৈক্য মিটে যায় এবং এক ব্যক্তির শাসনাধীন সব একত্র হয়ে যায়। এ অবস্থায় অবশেষে সে নিয়ামত তাদের সামনে এসে গেল প্রকৃতপক্ষে যার অভিলাষী তারা ছিল। (ইবনে হিশাম- ২য় খন্ড- পৃঃ ২৩৪)

মদীনার প্রথম ব্যক্তির হুযুরের (স) সাথে সাক্ষাৎ

ইবনে হিশাম ও তাবারী ইবনে ইসহাক থেকে আসেম বিন ওমর বিন কাতাদার এ বর্ণণা উদ্ধৃত করেছেন যে, মদীনার সর্ব প্রথম ব্যক্তি যিনি রাসূলুল্লাহর (স) সাথে মিলিত হন- তিনি ছিলেন সুয়া’এদ বিন সামেত। তিনি তাঁর যোগ্যতা, বীরত্ব, কবিত্ব ও বংশ মর্যাদার দিক দিয়ে তাঁর কওমের নিকটে ‘কামেল’ বলে খ্যাত ছিলেন। ইবনে সা’দ ব্যখ্যায় বলেন, যে ব্যক্তি তার কওমের মধ্যে সম্মানিত ও বিবেকবান, সঠিক অভিমত ব্যক্ত করতে সক্ষম, শিক্ষিত, তীর নিক্ষেপ ও সাঁতারে পটু, এমন ব্যক্তিকে জাহেলিয়াতের যুগে ‘কামেল’ বলা হতো। (তবকাত- ৩য় খন্ড- পৃঃ ৬০৩)

রাসূলুল্লাহর (স) সাথে এ ব্যক্তির আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল, তাঁরা মা লায়লা বিন্তে আমর হুযুরের (স) দাদার মা সালমা বিন্তে আমরের সহোদরা ভগ্নি ছিলেন, হজ্ব অথবা ওমরার উদ্দেশ্যে তিনি মক্কায় এলে হুযুর (স) নিয়ম অনুযায়ী তাঁর সাথে মিলিত হন। তাঁর সামনে দাওয়াত পেশ করেন। তিনি বলেন, সম্ভবতঃ আপনার নিকটেও সেই জিনিস আছে যা আমার কাছে আছে। হুযুর (স) বলেন, তা কি? তিনি বলেন- মুজাল্লায়ে লুকমান- অর্থাৎ লোকমানের পান্ডিত্য ও বিচক্ষণতা। হুযুর (স) বলেন,  তা আমাকে শুনান। তিনি তা পড়ে শুনান। হুযুর (স) বলেন, এ সুন্দর কালাম। তবে আমার নিকটে যা আছে তা এর চেয়ে উৎকৃষ্টতর। তা হলো কুরআন- যা আল্লাহ আমর উপর নাযিল করেছেন। তা হেদায়াত ও নূর। অতঃপর হুযুর (স) তাঁকে কুরআন শুনিয়ে দেন এবং ইসলামের দাওয়াত দেন। তিনি এর থেকে দূরে সরে না গিয়ে বলেন, সত্যি এ বড়ো সুন্দর কালাম। তারপর তিনি মদীনা ফিরে যান।  কিছুদিন পর খাযরাজ তাঁকে হত্যা করে। এ বুয়াস যুদ্ধের পূর্বের ঘটনা।[বালাযুরী আনসাবুল আশরফে বলেন, সুয়াএদের হত্যার কারণেই বুয়াদের যুদ্ধ হয়- গ্রন্হকার।]

মদীনার আর একটি প্রতিনিধি দলের সাথে সাক্ষাৎ

ইবনে হিশাম ও তাবারী মুহাম্মদ বিন ইসহাকের এ বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন যে- বুয়াস যুদ্ধের পূর্বে যখন আউস এবং খাযরাজের মধ্যে শক্রতার অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হওয়ার উপক্রম হয়, তখন আউসের একটি শাখা- বনী আবদুল আশহাল- এর একটি প্রতিনিধি দল আবুল হায়সের অথবা হায়সার-এর নেতৃত্বে মক্কা আগমন করে যাতে খাযরাজের মুকাবেলায় কুরাইশকে নিজেদের বন্ধু বানাতে পারে। তাদের আগমনের সংবাদ নবী (স) জানতে পেরে তাদের সাথে মিলিত হন। তিনি তাদেরকে বলেন, তোমরা যে জিনিসের জন্যে এখানে এসেছ তার থেকে উৎকৃষ্টতর জিনিস কবুল করা পছন্দ কর কি?

তাঁরা বলেন, তা কি? হুযুর (স) বলেন, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর বান্দাহদের জন্যে প্রেরিত রাসূল। তাদেরকে এ দাওয়াত দিতে এসেছি যে, তিনি ছাড়া আর কারো বন্দেগী করবেনা, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবেনা। আমার উপর একটি কেতাব নাযিল করা হয়েছে।

তারপর তিনি তাদেরকে ইসলামের কিছু শিক্ষা দেন এবং কুরআন শুনিয়ে দেন। প্রতিনিধি দলের মধ্যে এক যুবক- ইয়াস বিন মুয়াযও ছিলেন। তিনি হুযুরের (স) কথা শুনে বলেন, হে লোকেরা, এ জিনিস তার থেকে উৎকৃষ্টতর যার জন্যে তোমরা এখানে এসেছ। কিন্তু আবু হায়সের বাতহার কিছু মাটি তুলে নিয়ে তার মুখের উপর নিক্ষেপ করে বলেন, এস ব কথা থেকে আমাদের মাফ কর। আমরা অন্য এক কাজে এসেছি।

ইয়াস নীরব রইলেন এবং হুযুর (স) উঠে চলে গেলেন। এসব লোক মদীনায় ফিরে যাওয়ার পর বুয়াস যুদ্ধ শুরু হয়। তারপর বেশী দিন অতিবাহিত হওয়ার পূর্বেই ইয়াস মারা যান। তাঁর মৃত্যুর সময় যারা উপস্থিত ছিল তারা বলে যে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা তাঁর মুখ থেকে আল্লাহর তাসবিহ ও তাহলিল শুনতে পেয়েছে। এজন্যে তাদের এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ ছিলনা যে, ইয়াস সেই বৈঠক থেকে ইসলাম কবুল করেই এসেছিলেন এবং তিনি ইসলামের উপরেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

ইবনে সা’দ ওয়াকেদীর বরাত দিয়ে এ ঘটনার যে বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন, তার কিছু কথা ইবনে ইসহাকের বর্ণনা থেকে অতিরিক্ত। এর থেকে জানা যায় যে, বনী আবদুল আশহাল-এর প্রতিনিধি দল মক্কায় ওতবা বিন রাবিয়ার বাড়ি অবস্থান করছিল। সে তাদের খুব সম্মানের সাথে আতিথেয়তা করেছিল। তারা যখন তার কাছে বন্ধুত্বপূর্ণ চুক্তির প্রস্তাব দেয় তখন সে এই বলে প্রত্যাখ্যান করে যে তার এলাকা তাদের এলাকা থেকে বহু দূরে। তাদের কাছ থেকে সাহায্যের আবেদন এখানে পৌঁছতে পৌঁছতে দুশন তার কাজ সেরে ফেলবে। সে বলে, আমাদের ব্যাপারেও তাই হবে।

ওয়াকেদী এ কথাও বলেন যে ইয়াস যখন ইসলাম গ্রহণ করার প্রস্তাব দেন, তখন আবুল হায়সের তাঁর উপর মাটি নিক্ষেপ করতে করতে বলে, আমরা এসেছিলাম- আমাদের দুশমনকে মুকাবেলায় কুরাইশকে বন্ধু হিসাবে পেতে, আর তুমি চাচ্ছ- আমরা কুরাইশকে শক্র বানিয়ে ফিরে যাই।

ওয়াকেদীর বর্ণনায় অতিরিক্ত এ কথাও আছে যে, যারা ইয়াসকে মারবার সময় তাসবিহ তাহলিল পড়তে শুনেছে- তারা হচ্ছেন মুহাম্মদ বিন মাসলামা (রা), সালামা বিন সালামা বিন ওয়াকশ (রা) এবং আবু হাশিম বিন আত্তায়হান।

আনসারের প্রথম দলের ইসলাম গ্রহণ ও আকাবার প্রথম বায়আত

নবুওতের একাদশ বছরে (৬২০ খৃঃ) হজ্বের সময়ে হুযুর (স) তাঁর নিয়ম অনুযায়ী আরব গোত্রগুলোর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে মিনার দিকে রওয়ানা হন। ঘোরাফেরা করতে করতে আকাবার [আকাবা ঘাঁটিকে বলে। এখানে যে ঘাঁটির উল্লেখ আছে- তা মিনার এলাকায় মক্কার পথে অবস্থিত- গ্রন্হকার।] নিকটে খাযরাজ গোত্রের একটি দলের কাছে পৌঁছেন। ইবনে হিশাম ও তাবারী মুহাম্মদ ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে বলেন, হুযুর (স) তাদেরকে বলেন, আপনাদের পরিচয়? তাঁরা বলেন, খাযরাজের কিছু লোক। নবী (স) বলেন, আপনারা কি একটু বসবেন- যাতে আমি আপনাদের কাছে কথা বলতে পারি? তাঁরা বলেন, অবশ্যই। অতএব তাঁরা হুযুরের (স) নিকটে বসে পড়লেন। তিনি তাঁদেরকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেন, তাঁদের সামনে ইসলাম পেশ করেন। তাঁদেরকে কুরআন শুনান। তাঁরা পরস্পরে বলাবলি করলেন, ভাইসব! জেনে রাখ যে, ইনিই সেই নবী যাঁর আগমনের ভয় ইহুদীরা তোমাদের দেখাতো। এমন যেন না হয় যে তারা আমাদের থেকে আগে চলে যায়। অতঃপর একেবারে সন্তুষ্টচিত্তে তাঁরা তাঁর দাওয়াত কবুল করেন, তাঁর সত্যতা স্বীকার করেন এবং তাঁর পেশকৃত ইসলামের উপর ঈমান আনেন। তারপর তাঁরা আরজ করেন, আমরা আমাদের কওমকে এ অবস্থায়  ছেড়ে এসেছি যে, কোন কওম এমন হবেনা যাদের মধ্যে আমাদের চেয়ে অধিক পারস্পরিক শক্রতা পাওয়া যায়। সম্ভবতঃ আল্লাহ আপনার মাধ্যমে তাদেরকে একত্র করবেন। আমরা তাদের কাছে ফিরে যাচ্ছি, আপনার পক্ষ থেকে তাদেরকে দাওয়াত দিচ্ছি এবং যে দ্বীন আমরা গ্রহণ করলাম তা তাদের কাছে পেশ করছি। যদি আল্লাহ তাদেরকে আপনার জন্যে একত্র করে দেন তাহলে কেউ আপনার চেয়ে শক্তিশারী হবেনা।

কোন কোন বর্ণনায় এ কথাকে এভাবে বলা হয়েছে, বায়আতের পর হুযুর (স) তাঁদেরকে বলেন, আপনার কি আমার পৃষ্ঠপোষকতা করবেন যাতে আমি রবের পয়গাম পৌঁছাতে পারি? তাঁরা আরজ করেন, হে আল্লাহ রাসূল! এখন আমাদের ওখানে বুয়াসের যুদ্ধ হয়ে গেল। এ অবস্থায় আপনি সেখানে গেলে লোকেরা একত্রে মিলিত হওয়া মুশকিল হবে। আপাততঃ আপনি সেখানে গেলে লোকেরা একত্রে মিলিত হওয়া মুশকিল হবে। আপাততঃ আপনি আমাদেরকে আপন লোকদের কাছে ফিরে যেতে দিন। হয়তো আল্লাহ আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ভালো করে দিবেন। আর আমরা লোকদের কাছে সেই দাওয়াত দিই যার দিকে আপনি আমাদের দাওয়াত দিয়েছেন। হতে পারে যে- আল্লাহ আপনার জন্যে তাদেরকে একত্রে মিলিত করে দিবেন। তারপর আপনার চেয়ে শক্তিশালী আর কেই হবেনা। এখন আমরা সামনে বছর হজ্বে আপনার সাথে মিলিত হবো।

ইবনে ইসহাক, শা’বী এবং যুহরী বলেন যে, এরা ছয় জন ছিলেন। ইবনে সা’দ ওয়াকেদীর বক্তব্যই উদ্ধৃত করেছেন যে তাঁদের সংখ্যা ছিল ছয়। তাঁদের তালিকা নিম্নরূপঃ

বনী মালেক বিন আন্নাজ্জার থেকে-

১. আবু উসামা আসয়াদ বিন যুরায়া (জাহেলিয়াতের যুগেও ইনি তাওহীদ পন্হী ছিলেন এবং প্রতিমা পূজার বিরোধী ছিলেন।)

২. আওফ বিন আল হারেস বিন রিফায়া- মায়ের নাম আফরা।

বনী যুরাইস থেকে-

৩. রাফে বিন মালেক (জাহেলিয়াতে ‘কামেল’ বলা হতো)

৪. কুতবা বিন আমের বিন হাদীদা।

বনী হারাম বিন কাব থেকে-

৫. ওকবা বিন আমের বিন নাবী।

বনী ওবায়েদ বিন আদী থেকে-

৬. জাবের বিন আদুল্লাহ বিন রেয়াব।

ইবনে আবদুল বার বলেন, সীরাতের জ্ঞান সম্পন্ন কেউ কেউ  জাবের বিন রেয়াবের স্থলে হযরত উবাদাহ বিন সামেতের নাম লিখেছেন। মূসা বিন যুরারা এবং রাফে বিন মালেকের সাথে তাঁরা মুয়ায বিন আফরা, ইয়াযিদ বিন সা’লাবা, আবুল হায়সাম বিন আত্তাইয়েহান এবং উয়ায়েম বিন সায়েদার নাম শামিল করেছেন অতঃপর একটি দুর্বল বর্ণনা হিসাবে বলেন, বলা হয়ে থাকে যে, এদের মধ্যে উবাদা বিন সামেত এবং যকারান বিন আবদে কায়সও ছিলেন। কিন্তু বিজ্ঞজনের অধিকাংশ মুহাম্মদ বিন ইসহাকের বর্ণনাকেই গ্রহণ করেছেন এবং ফতহুলবারীতে হাফেজ ইবনে হাজার এ বর্ণনাকেই অন্যান্য বর্ণনার উপর অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

ইবনে সা’দ ওয়াকেদীর উপরে বর্ণিত বক্তব্য ছাড়াও মদীনাবাসীর ইসলাম কবুল সম্পর্কে আরও তিনটি বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেনঃ

১. সর্ব প্রথম আসয়াদ বিন যুবারা এবং যাকরান বিন আবদ কায়েস জাহেলিয়াতের রীতি অনুযায়ী গর্ব অহংকারের মুকাবেলা করার জন্যে মক্কায় ওতবা বিন রাবিয়ার নিকটে যান। কিন্তু ওতবার সাথে মিলিত হবার আগেই রাসূলুল্লাহর (স) কথা শুনে তাঁর সাথে মিলিত হন ও মুসলমান হয়ে যান। অতঃপর হযরত আসয়াদ মদীনা গিয়ে আবুল হায়সাম বিন আত্তাইয়েহান- এর কাছে ইসলামের উল্লেখ করেন এবং তাঁরাও ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর তিনি সে ছয়জনের সাথে শামিল হন যাঁরা আকাবার স্থঅনে হুযুরের (স) সাথে মিলিত হন।

২. সর্ব প্রথম রাফে বিন মালেক আযযুরাকী এবং মুয়াযা বিন আফরা  ওমরা করতে মক্কায় যান। সেখানে তাঁরা হুযুরের (স) নাম শুনতে পান। তারপর তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে মুসলমান হন।

৩. মিনায় হুযুরের (স) সাথে মদীনার ছয়জন নয় আটজনের সাক্ষাৎ হয়। এ আটজন তাঁরা যাঁদেনর নাম আমরা মূসা বিন ওকবার বরাত দিয়ে উপরে উল্লেখ করেছি।

মদীনা থেকে দ্বিতীয় প্রতিনিধি দলের উপস্থিতি ও আকাবার দ্বিতীয় বায়আত

ইবনে সা’দ ও ইবনে ইসহাক বলেন, আকাবার স্থানে ইসলাম গ্রহণকারী এ প্রথম দলটি যখন মদীনা ফিরে যান তখন তাঁরা সেখানে ইসলাম সম্পর্কে আলাপ আলোচনা শুরু করেন। ফলে আনসারদের মহল্লার মধ্যে এমন কোন মহল্লা বাকী থাকলোনা যেখানে রাসূলুল্লাহর (স) উল্লেখ  করা হলোনা। অতঃপর পরের বছর (নবুওতের দ্বাদশ বর্ষে) হজ্বের সময় মদীনার বার জন হুযুরের (স) সাথে ঐ আকারব স্থানে মিলিত হন যেখানে খাযরাজের লোকের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিল। এদের মধ্যে পাঁচজনই তাঁরা ছিলেন যাঁরা গত বছর মুসলমান হন (জাবের বিন আবদুল্রাহ বিন রেয়াব এবার আসেননি)। অবশিষ্ট সাত জনের মধ্যে ৫জন খাযরাজের এবং দু’জন আউসের ছিলেন। তাদের নাম নিম্নরূপঃ

খাযরাজের বনী আন্নাজ্জার থেকে-          ১. মুয়ায আল হারেস বিন রেফায়া।

খাযরাজের বনী যুরাইন থেকে-              ২. যাকরান বিন আবদ কায়েম। ইবনে সাদ ও ইবনে হিশাম বনে, এ দু’জন মদীনা থেকে মক্কা এসে হুযুরের (স) সাথে থাকেন এবং তাঁর সাথে হিজরত করেন।

খাযরাজের বনী আওফ বিন আল           ৩. ওবাদা বিন সামেত।

খাযরাজ থেকে-                                   ৪. ইয়াযিদ বিন সা’লাবা।

খাযরাজের বনী সালেম বিন আওফ        ৫. আব্বাস বিন ওবদা বিন নাদলা (ইবনে ইসহাক বলেন, ইনিও হুযুরের (স) সাথে থাকেন এবং তাঁর সাথে হিজরত করন।

আউসের বনী আবদুল আশহাল থেকে-   ৬. আবুল হায়সাম বিন আত্তাইয়েহান (ইনি জাহেলিয়াতের যুগেও তাওহীদ পন্হী ছিলেন এবং প্রতিমা পূজার বিরোধিতা করতেন।

আউসের বনী আমর বিন আওফের-       ৭. ওয়াইম বিন সায়েদা।

এ সমেয় হুযুর (স) এসব লোকের থেকে যে বায়আত গ্রহণ করেন তা ‘বায়আতে নেসা’ নামে অভিহিত। কারণ এ সে বায়আতের শব্দাবলীর অনেকটা অনুরূপ- যা এ ঘটনার কয়েক বছর পর সূরায়ে মুমতাহেনার- ১২ নং আয়াতে মুসলিম নারীদের নিকট থেকে বায়আত গ্রহণের নির্দেশ দেয় হয়। ইবনে ইসহাক হযরত উবাদা বিন সামেতের (রা) বর্ণনা উদ্ধৃত করেন যে, হুযুর (স) এ সব বিষয়ে বায়আত গ্রহণ করেনঃ

************************************************

আমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবনা, চুরি করবনা, ব্যভিচার করবনা, আপন সন্তানদের হত্যা করবনা, আপন হাত পায়েল আগে কেউ বুহতান বানোয়াট অভিযোগ পেশ করবেনা এবং কোন মা’রূফ কাজে রাসূলুল্লাহর (স) নাফরমানী করবনা, তাঁর হুকুম শুনবো ও মানবো, আমরা সুখে থাকি বা দুঃখে থাকি, সে হুকুম আমাদের সহনীয় হোক বা অসহনীয়, তা আমাদের উপর কাউকে অগ্রাধিকার দেয়া হোক না কেন এবং আমরা হুকুম শাসনের ব্যাপারে শাসকের সাথে ঝগড়া বিবাদ করবোনা। ( মুসতাদে আহমদে অতিরিক্ত বলা হয়েছে যে, যদিও তোমরা মনে কর যে শাসন ব্যবস্থায় তোমাদের হক আছে। বোখারীতে অতিরিক্ত  এ কথা আছে, অথবা তোমরা যদি প্রকাশ্য কুফর দেখ) এবং আমরা যেখানে যে অবস্থায় থাকি না কেন, সত্য কথা বলব, কোন ভৎর্সনাকারীর ভর্ৎসনার ভয় করবনা। অতএব তোমরা যদি এ শপথ পূরণ কর তাহলে তোমাদের জন্যে জান্নাত। আর যদি কেউ হারাম কাজের কোন একটি করে তার বিষয়টি আল্লাহর হাতে। তিনি চাইলে মাফ করবেন এবং চাইলে শাস্তি দেবেন (একটি বর্ণনায় এ কথা আছে, যদি তোমরা হারাম কাজের কোন একটা কর, তারপর ধরা পড় এবং দুনিয়াতে তোমাদের শাস্তি দেয়া হয়- তাহলে তা সে অপরাধের কাফফারা হবে, আর কিয়ামত পর্যন্ত তোমাদের সে অপরাধ যদি পর্দাবৃত থাকে, তাহলে তোমাদের বিষয়টি আল্লাহ তায়ালা ইচ্ছা করলে শাস্তি দিতে পারেন এবং ইচ্ছা করলে মাফও করতে পারেন)।

এ হাদীসের বিভিন্ন অংশ বোখারী কিতাবুল ঈমান, আবওয়াবে মুনাকেবেল আনসার, কিতাবুল হুদূদ, কিতাবুল ফিতন, কিতাবুল আহকাম, মুসলিমের- কিতাবুল হুদূদ ও কিতাবুল ইমারাত এবং মুসনাদে আহমদে- মরবিয়াতে উমরা বিন সামেত- এ পাওয়া যায়।

মুসআব বিন উমাইরকে মদীনা প্রেরণ

ইবনে জারীর ও ইবনে হিশাম মুহাম্মদ বিন ইসহাকের এ বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন যে, যখন এসব লোক মদীনায় ফিরে যাচ্ছিলেন- তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাঁদের সাথে হযরত মুসআব বিন উমাইরকেও পাঠালেন যাতে তিনি তাঁদেরকে কুরআন শিক্ষা দেন, ইসলাম শিক্ষা দান করেন এবং তাঁদের মধ্যে দ্বীনের উপলব্ধি সৃষ্টি করেন। অতএব মুসআব (রা) মদীনায় গিয়ে আসয়াদ বিন মুরারার (রা) বাড়িতে অবস্থান করতে থাকেন।

এর বিপরীতে মূসা বিন ওকবার বর্ণনায় একথা আছে যে, তাঁরা মদীনায় যাওয়ার পর মুয়ায বিন আফরা (রা) এবং রাফে বিন মালিককে (রা) এ উদ্দেশ্যে হুযুরের (স) নিকটে পাঠান হয়- যেন এমন ব্যক্তিকে মদীনা পাঠনো হয় যিনি তাঁদেরকে দ্বীন শিক্ষা দেবেন। এ আবেদনের পর তিনি হযরত মুসয়াবক (রা) পাঠিয়ে দেন। এর চেয়ে একটু ভিন্ন রেওয়ায়েত বায়হাকী ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে উদ্ধৃত করেছেন। তা এই যে, তাঁরা হুযুরর (স) নিকটে লিখলেন, “আমাদের দ্বীন শিক্ষা দেয়ার জন্যে কাউকে পাঠিয়ে দিন”। তার ফলে হযরত মুসয়াবকে পাঠানো হয়। ওয়াকেদী থেকে ইবনে সা’দও তাই বর্ণনা করেছেন।

আকাবার এ দ্বিতীয় বায়আতের পর মদীনায় প্রত্যাবর্তন করে আনসারের লোকজন হযরত মুসআব বিন উমাইরের নেতৃত্বে দ্রুতবেগে ইসলামের প্রচার শুরু করেন। ইবনে সা’দ ওয়াকেদীর বরাত দিয়ে বলেন, বনী আবদুল আশহালের আববাদ বিন বিমর বিন ওয়াকশ এবং তাদের চুক্তিবদ্ধ বন্ধুদের মধ্যে মুহাম্মদ বিন মাসলামা (রা) হযরত মুসয়অবের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর বনী আবদুল আশহালের সর্দার সা’দ বন মুয়ায ও উসাইদ বিন হুযাইর একই দিনে তাঁর হাতে মুসলমান হন। তাঁর ইসলাম গ্রহণের ফলে তাঁর গোটা গোত্র মুসলমান হয়ে যায়। এমনকি বনী আবদুল আশহালের মহল্লায় একজনও অমুসলিম রইলোনা। ইবেন হিশাম ইবনে ইসহাক থেকে এবং তাবারী হযরত সা’দ থেকে হযরত উসাইদের ইসলাম গ্রহনেল এক মজার কাহিনী বর্ণনা করেছেন।

একদিন আসয়াদ বিন যুরারা হযরত মুসয়াবকে সাথে নিয়ে আউস গোত্রের একটি শাখা বনী যফরের বাগানগুলোর একটি বাগানে যান। যাঁরা মুসলমান হয়েছিলেন তাদের অনেকেই সেকানে সমবেত হন। যখন সা’দ বিন মুয়ায এবং উসাইদ বিন হুযাইর এ কথা জানতে পারলেন তখন সা’দ উসাইদকে বলেন, তুমি এ দু’জন লোকের (আয়াদ ও মুসয়াব) কাছে যাও যারা আমাদের বস্তিতে এসে দুর্বল লোকদেরকে বোকা বানাচ্ছে। তাদের ধমক দিয়ে আমাদের এলাকায় আসতে নিষেধ করে দাও। যদি আসয়াদ বিন যুরারা না হতো তাহলে আমি স্বয়ং সেখানে যেতাম। কিন্তু জান তো সে আমার খালাতো ভাই। এ জন্যে তার সামনে আমি যেতে চাইনা। এ কথায় উসাইদ তার হাতিয়ার নিয়ে সেখানে যান। তাঁকে আসতে দেখে আসয়াদ মুসয়াবকে বলেন, এ তার কওমের সর্দার। তার ব্যাপারে ঠিক ঠিক আল্লাহর কথা পৌছাবার হক আদায় করবে। হযরত মুসআব বলেন, ইনি বসে পড়লে কথা বলব। উসাইদ তাঁ সামনে এসে রুঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে বললেন, তোমরা দু’জন এখানে কেন এসেছ? তোমরা আমাদের দুর্বল লোকদের বোকা বানাচ্ছ। যদি ভালো চাও তো এদিকে কোনদিন মুখ করবেনা।

মুসয়াব বললেন, আপনি কি বসে আমাদের কথা শুনবেন? কথা পছন্দ হলে কবুল করবেন, তা না হলে যে কাজ  আপনি পছন্দ করেননা তা করা হবেনা। উসাইদ বললেন- এতো তুমি ইনসাফের কথা বলেছ। তারপর তাঁর হাতিয়ার মাটিতে গুঁজে তাঁর কাছ বসে পড়লেন। হযরত মুসয়াব তাঁকে ইসলামের শিক্ষা বললেন এবং কুরআন পড়ে শুনালেন। হযরত আসয়াদ (রা) এবং হযরত মুসয়াব (রা) উভয়ে বলেন, খোদার কসম, উসাইদের মুখের প্রফুল্লতা এবং কথাবার্তায় নম্রতা দেখে আমরা বুঝলাম যে, ইসলাম তার হৃদয়ে প্রবেশ করেছে। সব কথা শুনার তিনি বললেন, কত ভালো ও সুন্দর কালাম। এ দ্বীনের মধ্যে যখন তোমরা প্রবেশ কর কি কর? উভয় বললেন, গোসল করে শরীর পাক করে নিন এবং নিজের কাপড়ও পাক করুন। তারপর হকের সাক্ষ্য দিন। তারপর নামায পড়ুন। তিনি তক্ষুণি উঠে পড়লেন, পাক সাফ হয়ে এলেন, কালেমা শাহাদ পাঠ করলেন এবং দু’রাকআত নামায পড়লেন। তারপর বলতে লাগলেন, আমার পেছনে আর একজন আছে। সে যদি তোমাদের আনুগত্য মেনে নেয় তাহলে তার কওমের কেউ তার বিরুদ্ধে যাবেনা। আমি গিয়ে তাকে তোমাদের কাছে পাঠাচ্ছি। এ কথা বলে উসাইদ (রা) তাঁর হাতিয়ার নিয়ে সা’দ বিন মুয়াযের দিকে চললেন, যাঁর কাছে তাঁর কওমের লোক একত্রে বসেছিল। তাঁকে আসতে দেখে সা’দ বললেন, খোদার কসম করে বলছি এ সে চেহারা নয় যা নিয়ে সে গিয়েছিল।

উসাইদ যখন এসে তাদের বৈঠকের সামনে দাঁড়ালেন তখন সা’দ জিজ্ঞেস করলেন, কি করে এলে? তিনি বললেন, আমি দু’জনের সাথে কথা বলেছি। তাদের মধ্যে তো খারাপ কিচু দেখলামনা। আমি তাদেরকে নিষেধ করাতে তারা বলল, আপনি যা চান তাই আমরা করব। তারপর উসাইদ বলেন, আমি শুনেছিলাম যে, বনী হারেসা আসয়াদ বিন যুরারাকে হত্যা করার জন্যে বের হয়েছে। কারণ তারা জানে যে, আসয়াদ তোমার খালাতো ভাই এবং তারা তোমাকে হেয় করতে চায়।

এ কথা শুনা মাত্র সা’দ ভয়ানক রাগান্বিত হন এবং অস্ত্র হাতে নিয়ে দ্রুত বেগে চলতে থাকেন যাবে বনী হারেসার আক্রমণের পূর্বে তিনি তাঁর ভাইয়ের কাছে (খালাতো ভাই) পৌঁছে যেতে পারেন। চলতে চলতে তিনি উসাইদকে বলেন, খোদার কসম, আমি মনে করি তোমাকে পাঠিয়ে কোন ফল হয়নি।

হযরত আসয়াদ বিন যুরারা (রা) দূর থেকে তাঁকে যেতে দেখে হযরত মুসয়াবকে (রা) বলেন, এ এমন এক সর্দার যে তার পেচনে তার গোটা কওম রয়েছে। সে মুসলমান হলে দু’জনও এমন থাকবেনা যে তার মধ্যে ইসলাম কবুল না করে পারবে।

সেখানে পৌঁছার পর সাদ যখন দেখলেন যে আসয়াদ এবং মুসয়াব নিশ্চিন্তে বসে আছেন, তখন তিনি বুঝতে পারলেন যে, উসাইদের আসল উদ্দেশ্য ছিল, তাকে তাঁদের কথা শুনানো। তিনি ক্রোধ ভরে তাঁদরে সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং আসয়াদ বিন যুরারাকে বললেন, আবু উসামা, আমার এবং তোমার মধ্যে যদি আত্মীয়তা না থাকতো, তাহলে এ ব্যক্তি (মুসআব) আমার হাত থেকে রক্ষা পেতোনা। তুমি কি আমাদের বাড়িতে আমাদের উপর সে জিনিস চাপিয়ে দিতে চাও যা আমরা পছন্দ করিনা?

হযরত মুসয়াব বলেন, আপনি কি বসে আমাদের কথা শুনবেননা? পছন্দ হলে কবুল করবেন, না হলে সে জিনিসকে আপনার থেকে দূরে রাখব যা আপনি পছন্দ করেননা।

সা’দ বলেন, এটা তুমি ইনসাফের কথা বলেছ। তারপর তাঁর অস্ত্র মাটিতে গেড়ে দিযে বসে পড়েন। হযরত মুসয়াব তাঁর সামনে ইসলাম পেশ করেন এবং কুরআন পড়ে শুনান। হযরত আসয়াদ এবং হযরত মুসয়াব বলেন, তাঁর কথা বলার পূর্বেই তাঁর চেহারায় প্রফুল্লতা ও নম্রতা দেখে বুঝে ফেল্লাম যে, ইসলাম তাঁকে প্রভাবিত করেছে। সাদ সকল কথা শুনার পর বলেন, এ দ্বীনে প্রবেশ করতে হলে তোমরা কি কর? তাঁরা তাঁকে সে কথাই বললেন যা উসাইদকে বলেছিলেন। তারপর তিনি পাক সাফ হয়ে এলেন এবং কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করলেন। দু’রাকাআত নামায পড়লেন এবং অস্ত্র উঠিয়ে নিয়ে স্বীয় গোত্রের মজলিস বা সম্মেলনের দিকে রওয়ানা হলেন।

হযরত সা’দ (রা) যখন তাঁর লোকদের কাছে পৌঁছলেন তারা বলে উঠলো, এতো সে চেহারা নয়, যা নিয়ে সাদ এখান থেকে গিয়েছিল। তিনি তাদের নিকেট পৌঁছে বললেন, হে বনী আবদুল আশহালের লোকেরা! তোমরা তোমাদের মধ্যে আমার ব্যাপারে কি জান? সবাই বলে, আপনি আমাদের সর্দার। আমাদের মধ্যে আপনি সবচেয়ে বেশী আত্মীয়দের উপর দয়া  অনুগ্রহ করে থাকেন। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী সঠিক মতামত দানকারী। আমাদের জন্যে সবচেয়ে বিবেক সম্পন্ন ও অভিজ্ঞ। এসব কথা শুনে সা’দ বলেন, যতোক্ষণ না তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান এনেছ, তোমাদের নারী পুরুষের সাথে আমার কথা বলা হারাম। তারপর সন্ধ্যা হওয়ার পূর্বেই বনী আবদুল আশহালের সকল নারী ও পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। শুধু এক ব্যক্তি আমর বিন সাবেত অমুসলিত রয়ে যান। তিনি ওহুদ যুদ্ধের সময় ঈমান আনেন এবং সিজদার সুযোগ আসার পূর্বেই শহী হন। হুযুর(স) বলেন, তিনি জান্নাতবাসী। উল্লেখ্য যে, বনী আবদুল আশহালের মধ্যে একজনও মুনাফেক ছিলনা। ইবনে সা’দ ওয়াকেদীর বরাত দিয়ে বলেন, মুসলমান হওয়ার পর হযরত সা’স বিন মুয়ায (রা) এবং উসাইদ বিন হুযাইর (রা) বনী আবদুল আশহালের প্রতিমা ভেঙে বেড়াতেন।

ইবনে ইসহাক বলেন, হযরত মুসয়াব মদীনায় ক্রমাগত তবলিগ করতে থাকেন। অবশেষে আনসারের একন কোন মহল্লা ছিলনা যেখানে মুসলমান নারী-পুরুষ পাওয়া যেতোনা। শুধু তিন-চারটি পরিবার এমন ছিল যারা খন্দকের যুদ্ধ পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেনি।

মদীনায় জুমা কায়েম

হযরত কাব বিন মালেক (রা) এবং ইবন সিরীন (র) বলেন, জুমার নামাযের হুকুম আসার পূর্বেই মদীনার আনসার পরস্পরে এ সিদ্ধান্ত করেন যে, তাঁরা হপ্তায় একদিন সামষ্টিক নামায পড়বেন। এ উদ্দেশ্যে তাঁরা ইহুদীদের সাবত (শনিবার) এবং ঈসায়ীদের রোববার বাদ দিয়ে জুমার দনি ধার্য করেন- (জাহেলিয়াতের যুগে তাকে ‘ইয়াওমে আরোবা’ বলা হতো)। সর্ব প্রথম জুমা হযরত আসয়াদ বিন যুরারা (রা) বায়াযা এলাকায় পড়ান যেখানে চল্লিশ জন শরীক হন (মুসনাদে আহদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান, আবদ বিন হামীদ, আবদুর রাজ্জাক, বায়হাকী, ইবনে হিশাম)।

দার কুতনী হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের (রা) বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন, মক্কায় যখন নামাযে জুমার হুকুম এলো, তখন রাসূলুল্লাহ (স) হযরত মুসআব বিন উমাইরকে (রা) মদীনায় লিখিত নির্দেশ দেন যে, বেলা গড়ে যাওয়ার পর যেন দু’রাকাআত নামায পড়িয়ে দেন। মদীনায় জুমা কায়েমের হুকুম দেয়ার কারণ এই ছিল যে, সে সময়ে মক্কায় জুমার নামায পড়া সম্ভব ছিলনা।

আকাবার শেষ বায়আত

নবুওতের ত্রয়োদশ বর্ষে (৬২২ খৃঃ জুন-জুলাই) যিলহজ্ব মাসের হজ্বের সময় আসা পর্যন্ত মদীনায় ইসলাম যথেষ্ট প্রসার লাভ করেছিল। ইমাম আমদ ও তাবারানী হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ আনসারীর (রা) এ বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন, “রাসূলুল্লাহ (স) দশ বছর যাবত ওকায ও মাজান্নার মেলাগুলোতে এবং হজ্বের সময় বিভিন্ন গোত্রের শিবিরে শিবিরে ঘোরাফেরা করতে থাকেন। এ সব স্থানে তিনি বলতেন, কে আমাকে তার ওখানে আশ্রয় দেবে এবং কে আমর মদদ করতে পারে যাতে আমি আমার রবের পয়গাম পৌঁছাতে পারি এ্বং তার বিনিময়ে সে জান্নাত লাভ করবে? কিন্তু কেউ তাঁর সহযোগিতার জন্যে প্রস্তুত হয়নি। বরঞ্চ যদি ইয়ামেন অথবা মুদারের কোন লোক মক্কা যাওয়ার জন্যে বেরুতে, তাহলে তার কওমের লোক অথবা আত্মীয় তাকে বলতো, কুরাইশের সেই যুবক থেকে একটু দূরে থাকবে, সে যেন তোমাকে ফেৎনায় ফেলে না দেয়।

“হুযুর (স) তাদের শিবিরের পাশ দিয়ে যখন যেতেন, তখন তাঁকে আঙুল দিয়ে ইশারা করা হতো। অবশেষে আল্লাহ আমাদেরকে ইয়াসরেব থেকে রাসূলুল্লাহর (স) নিকটে পাঠিয়ে দেন, আমরা তাঁকে সত্য বলে স্বীকার করে নেই। তারপর অবস্থা এমন হয়ে যায় যে, একজন বাড়ি থেকে বের হয়, ঈমান আনে, কুরআন পড়ে এবং যখন বাড়ি ফিরে যায়- তখন তার বাড়ির লোকজনও মুসলমান হয়ে যায়। এবাবে আনসারের মহল্লাগুলোতে [আসলে **** শব্দ ব্যবহার করা যা **** শব্দের বহু বচন। মদীনাবাসীর বস্তি এ ধরনের ছিল যে প্রত্যেক গোত্রের পৃথক বাড়ি ছিল যার মধ্যে থাকার ঘর, ক্ষেত, আঙুরের বাগান- সব  একত্রে হতো। এরূপ নয়টি বাড়ি সে সময়ে মদীনায় পাওয়া যেত। প্রত্যেক বাড়ি স্থায়ী ছিল এবং অন্যান্য গোত্রের বাড়ি সংলগ্ন ছিল। এর ভিত্তিতে আমরা এ বাড়ি রজন্যে মহল্লা ব্যাবহার করেছি- গ্রন্হকার।] এমন কোন মহল্লা ছিলনা যেখানে মুসলমানদের একটি দল পাওয়া যেতোনা এবং তারা প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষনা করতোনা। একদিন আমরা ব একত্রে সমবেত হলাম এবং পরস্পরে বলাবলি করতে লাগলাম যে, আর কতদিন পর্যন্ত রাসূলুল্লাহকে (স) এ অবস্থায় ফেলে রাখবো যে, তিনি মক্কার পাহাড়গুলোর স্থানে ঘুরে বেড়াবেন এবং সব স্থানে তাঁকে প্রত্যাখ্যঅন করা হবে এবং কোথাও তাঁর শাস্তি ও নিরাপত্তা নেই? তারপর আমরা সত্তর জন হজ্বে গেলাম এবং স্থির হলো যে, আকাবায় তাঁর সথে আমরা মিলিত হবো (এ হাদীসের বাকী অংশ আমরা সামনে সন্নিবেশিত করব)।

ইমাম আহমদ, তাবরানী, ইবনে জারীর তাবারী ও ইবনে হিশাম মুহাম্মদ বিন ইসহাকের বরাত দিয়ে হযরত কাব বিন মালেকের (রা) বর্ণনা নকল করেন যে, আমরা আমাদের কওমের মুশরিদের [হাকেম ও ইবনে সা’দ বলেন, সে বছর আউস ও কাযরাজের ৫০০ (পাঁচশ) লোক হজ্জের জন্যে বেরিয়ে পড়ে-গ্রন্হকার।] সাথে হজ্বের জন্যে রওয়ানা হই। আমাদের সাথে আমাদের সর্দার ও বুযুর্গ বারা বিন মা’রুরও ছিলেন। পথিমধ্যে তিনি বলেন, আমার একটা অভিমত আছে। জানিনা তোমরা তার সাথে একমত, না দ্বিমত পোষণ কর। আমরা বল্লাম, তা কি? বললেন, আমার মত এই যে, আমি কাবার দিকে পিঠ না করে বরঞ্চ মুখ করে নামায পড়ব। আমরা বললাম, আমরা তো রাসূলুল্লাহর (স) নিকট থেকে এ কথা জানতে পেরেছি যে, তিনি শামের দিকে (বায়তুল মাকদেসরে দিকে) মুখ করে নামায পড়েন। আমরা আপনার তরিকা অনুযায়ী নামায পড়বনা। কিন্তু তিনি কাবার দিকে মুখ করেই নামায পড়তে থাকেন। তাকে আমরা তিরস্কার করতে থাকি। মক্কা পৌঁছার পর তিনি আমাকে বললেন, ভাতিজা, চল রাসূলুল্লাহর (স) সাথে সাক্ষাৎ করি। তারপর তাঁকে আমার এ কাজের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করব যা আমি করি। কারণ তোমাদের বিরোধিতার কারণে আমার মনে খটকা পয়দা হয়েছে। আমরা কখনো হুযুরকে (স) দেখিনি। তাঁকে চিনতামওনা। এ জন্যে মক্কার একজন লোকের কাছে তাঁর ঠিকানা জানতে চাইলাম। সে বলল, তাঁর চাচা আব্বাসকে চেন? আমরা বললাম- হ্যাঁ। কারণ তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে আমাদের ওখানে যাতায়াত করতেন। সে বলল, হেরমে যাও- তাঁকে আব্বাসের সাথে বসে থাকতে দেখবে।

আমরা সেখানে পৌঁছে তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি আব্বাসকে (রা) জিজ্ঞেস করলেন, আপনি ও দু’জনকে চেনেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, এ বারা বিন মা’রুর এবং এ কাব বিন মালেক। আমি হুযুরের (স) একথা কখনো ভূলবোনা যে তিনি আমার নাম শুনার পর বললেন, কবি? আব্বাস (রা) বললেন, হ্যাঁ। তারপর বারা তার মসলা জিজ্ঞেস করলেন। তারপর হুযুরের (স) নির্দেশ অনুযায়ী তিনি সেই কেবলার দিকেই নামায পড়তে শুরু করলেন, যেদিকে হুযুর (ষ) পড়তেন। তারপর হুযুর (স) আমাদেরকে ‘আইয়ামে তাশরিকের’ [‘আইয়ামে তাশরিক’ সে সব দিনকে বলে যে সময়ে লোক হজ্বের পর মিনায় অবস্থান করে-গ্রন্হকার।] মাসের দিনে আকাবায় তাঁর সাথে রাতে মিলিত হওয়ার জন্যে বললেন। সেই রাতে আমরা আমাদের শিবিরে শুয়ে পড়লাম। রাতের এক তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হওয়ার পর আমরা চুপে চুপে তাঁর সাথে দেখা করার জন্যে চল্লাম। কারণ আমরা আমদের কওমর মুশরিদের কাছে এ ব্যাপারটি গোপন রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের সাথে আমাদের সর্দার ও সম্ভ্রন্ত লোকদের মধ্যে আবু জাবের আবদুল্লাহ বিন আমর বিন হারাম ছিলেন। তিনি বাপদাদার দ্বীনের উপরেই কায়েম ছিলেন। তাঁকে আমরা সাথে নিয়ে বললাম, আপনি আমাদের সর্দার ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন। আমরা চাইনা যে আপনি জাহান্নামের ইন্ধন হন। তারপর আমর তাঁর কাছে ইসলাম পেশ করলাম এবং বললাম, এখন আমরা আকাবায় হুযুরের (স) সাথে সাক্ষাতের জন্যে যাচ্ছি। তিনি তখনই ইসলাম গ্রহন করলেন এবং আমাদের সাথে আকাবায় বায়আতে শরীক হলেন। তখন আমরা মোট ৭৩ জন পুরুষ ছিলাম এবং আমাদের সাথে দু’জন মহিলাও ছিল। একজন বনী নাজ্জাসের নাসিবা অথবা নুসায়বা বিন্তে কাব উম্মে উমারা [এ মহিলা মুসায়লামা কায্যাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে স্বীয় পুত্র হযরত আবদুল্লাহর সাথে ছিলেন। যুদ্ধে স্বয়ং অংশ গ্রহণ করেন। শরীরের বারো স্থানে আঘাত পান এবং এক হাত কেটে যায়। এর পূর্বে তাঁর পুত্র হাবিবকে মুসয়লামা খন্ড বিখন্ড করে হত্যা করে । সে বলতো, তুমি কি মুহাম্মদের (স) রাসূল হওয়অর সাক্ষ্যা দাও? হাবিব (রা) বলতেন, হ্যাঁ। যখন সে বলতো, তুমি আমার রাসূল হওয়ার সাক্ষ্য দাও? তিনি বলতেন, আমি কিছু শুনতে চাইনা। এতে সে তাঁর একটি অংশ কেটে ফেলতো। এবাবে প্রত্যেক প্রশ্নের জবাবের পর একটি অংগ কেটে ফেলতো। এভাবে জালেম তাঁকে খন্ড বিখনড করে কেট হত্যঅ করে। কিন্তু তিনি এ মিথ্যা নবীকে শেষ পর্যণ্ত সত্য বলে স্বীকার করেননি। (ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পঃ ১০৮-১০৯)-গ্রন্হকার।] আর অন্য জন বনী সালেমার আসমা বিন্তে আমর উম্মে সানী।

এ বায়আত অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা হযরত জাবের (রা) সত্তর বলেছেন, মহিলার উল্লেখ করেননি। এ বক্তব্যই আহমদ ও বায়হাকী- আমরে শা’বী থেকে উদ্ধৃত করেছেন। কিন্তু হযরত কাব বিন মালেক (রা) ৭২ জন পুরষ এবং দু’জন মহিলার উল্লেখ করেছেন। তাঁদের নামও সুস্পষ্ট করে বলেছেন। ইবনে ইসহাক অতিরিক্ত এ বিশদ বিবরণ দিয়েছেন যে, ৭৩ জন পুরুষের ১১ জন আউসের এবং ৬২ জন খাযরাজের ছিলেন। তাঁদের সাথে দু’জন মহিলা ছিলেন। একজন নুসায়বা বিন্তে কাব তাঁর স্বামী যায়েদ বিন আসেম (রা) এবং দু’ পুত্র হাবিব (রা) এবং ওবায়দুল্লাহ (রা) সহ ছিলেন। দ্বিতীয়া মহিলা- আসমা বিন্তে আমর ছিলেন। বর্ণনায় এ মতপার্থক্য থাকার কারণ সম্ভবতঃ এই যে- আরবগণ অধিকাংশ সময়ে ভগ্নাংশ বাদ দিয়ে সংখ্যা বর্ণনা করেন। দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ যদি পুরুষ হয়, তাহলে তাদের উল্লেখ করাই যথেষ্ট মনে করেন। দু’ একজন মহিলা থাকলে তা উপেক্ষা করেন।

ইবনে সা’দ ওয়াকেদীর বরাত দিয়ে উয়াইম বিন সায়েদার বর্ণনা উদ্ধৃত করেন যে, যখন আমরা মক্কা পৌঁছলাম, তখন সা’দ বিন খায়সামা (রা) মায়ান বিন আদী (রা) এবং আবদুল্লাহ বিন জুবাইর (রা) আমাকে বলেন, চল আমরা রাসূলুল্লাহর (স) সাথে দেখা করে সালাম দিই। কারণ আমরা তাঁর উপর ঈমানতো এনেছি কিন্তু এখন পর্যন্ত তাঁকে দেখিনি। অতএব আমরা বেরুলাম। আমাদেরকে বলা হয়েছিল যে, তিনি আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালেবের বাড়িতে অবস্থান করছেন। আমরা সেখানে পৌঁছলাম। তাঁক সালাম করে জিজ্ঞেস করলাম, আমাদের অর্থাৎ মদীনা থেকে আগত প্রতিনিধি দলের সাথে আপনার সাক্ষাৎ কোথায় হবে? হযরত আব্বাস বলল, তোমাদের সাথে তোমাদের কওমের সেসব লোকও আছে যারা তোমাদের বিরোধী। অতএব নিজেদের ব্যাপার গোপন রাখ, হাজীগণ  চলে যাওয়া পর্যন্ত। রাসূলুল্লাহ (স) সাক্ষাতের জন্যে সে রাতের প্রস্তাব দিয়েছেন- যার সকালকে বলা হয় ‘ইয়াওমুন নাফারেল আখের’  ***************** অর্থাৎ সেই শেষ দিন যখন হাজী মিনা থেকে বিদায় হয়ে যা। আকাবার উচ্চ অংশ তিনি নির্ধারিত করেন। [ইবনে সা’দ বলেন, এ সেই স্থানে যেখানে একন মসজিদ রয়েছে। (তাবাকাতে ইবনে সা’দ বয়রুতে মুদ্রিত- ১৯৫৭ খৃঃ ১ম খন্ড- পৃঃ ২২১)। এবনে সা’দ ১৬৮ হিজরীতে পয়দা হন- ২৩০ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। এর অর্থ এই যে, দ্বিতয়ি হিজরী শতকে এ মসজিদ বিদ্যমান ছিল। এ মসজদ সে সময়েও ছিল যখন ১৯৩৬ খৃষ্টাব্দে মুহাম্মদ হুসাইন হায়কাল হেজাজ ভ্রমণ করেন। এ কথা তিনি তাঁর ‘ফী মানযিলিল অহী’ গ্রন্হের ১১১ পৃঃ মসজিদে আকাবায় উল্লেখ করেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় বর্তমানে কোথাও তার নাম-নিশানা পাওয়া যায়না- গ্রন্হকার।] হুকুম দেয়া হয়, কোন নিদ্রিতকে জাগাবেনা, আর যে আসেনি তার অপেক্ষা করবেনা।

বায়আতে আকাবা সম্পর্কে সব বর্ণনাগুলো এ ব্যাপারে একমত পোষণ করে যে, যখন এ সব লোক রাতের বলায় দু’জন চারজন করে গোপনে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছেন, তখন তাঁরা নিজের ব্যাপারে তাঁর উপর আস্থা রাখতেন- যদিও তখনো তিন প্রকাশ্যতঃ অমুসলিম ছিলেন।[ইবনে সা’দ রাসূলুল্লাহর (স) গোলাম আবু রাফে (রা) এর বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেন- আমি হযরত আব্বাসের (রা) যখন গোলাম ছিলাম- তখন ইসলাম আমাদের বাড়ি প্রবেশ করে। হযরত আব্বাস (রা) তাঁর বিবি উম্মুল ফযল ও আমি মুসলমান হয়েছিলাম। কিন্তু হযরত আব্বাস (রা) তাঁর ইসলাম গ্রহণ গোপন রেখেছিলেন। বদর যুদ্ধের পর যখন কাফেরদের বাড়িতে মাতম চলছিল, তখন আমাদের বাড়িতে আনন্দ করা হতো-গ্রন্হকার।] তিনি এ জন্যে এ নাজুক পরিস্থিতিতে এখানে এসেছিলেন যে, হুযুরের (স) মদীনা যাওয়ার পূর্বে সব দিক দিয়ে কথা যেন পাকা পোক্ত করে নেয়া যায়।

ইমাম আহমদ, বায়হাকী এবং আমের শা’বীর বর্ণনায় আছে যে, যখন সব লোক একত্র হয়ে যান, তখন হুযুর (স) বলেন, যে বলতে চায় সংক্ষেপে বলুক- কথা দীর্ঘায়িত যেন না করে। কারণ মুশরিকদের গুপ্তচর তোমাদের সন্ধানে আছে।

হযরত কাব বিন মালেক, যাঁর বর্ণনার একাংশ আমরা ইমা আহমদ, ইবনে জারীর, তাবারী ও ইবনে হিশামরে বরাত দিয়ে উপরে উদ্ধৃত করেছি, সে বর্ণনা প্রসংগে পরের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, সকলের প্রথমে হযরত আব্বাস (রা) কথা শুরু করেন। তিনি বলেন, হে খাযরাজের [সে সময়ে আউস ও খাযরাজের সমাবেশকে খাযরাজ বলা হতো-গ্রন্হকার।] লোকেরাঙ মুহাম্মদের (স) এখানে যে মর্যাদা তা তোমরা জান। যারা তাঁর সম্পর্কে আমাদের সমমনা (অর্থাৎ যারা ইসলাম গ্রহণ করেনি) তাদের মুকাবেলায় আমরা (বনী হাশেম ও বনী মুত্তাবেল) তাঁকে সমর্থণ করেছি ও নিরাপত্তা দিয়েছি। এ জন্যে তিনি আপন কওমের মধ্যে সুদৃঢ় পজিশনে ও শহরে সুরক্ষিত স্থানে আছেন। কিন্তু তিনি তোমাদের ওখানে যাওয়া ব্যতীত আর কিছুতে রাজী নন। এখন যদি তোমরা মনে কর য, তোমরা সে ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে যে শর্তে তোমরা তাঁকে ডাকছো এবং তাঁর বিরোধিদের মুকাবেলায় তাঁর হেফাজত করবে। তাহলে যে দায়িত্ব তোমরা গ্রহণ করছ- তা কর। কিন্তু যদি এখান থেকে তাঁর বের হয়ে তোমাদের সাথে মিলিত হওয়অর পর তোমরা কোন পর্যায়েও এ আশংকা পোষণ কর য, তাঁর সংশ্রব পরিত্যাগ করতে এবং তাঁকে দুশনের হাতে তুলে দিতে তোমরা বাধ্য হবে, তাহলে এটাই শ্রেয়ঃ হবে যে, এখন থেকেই তাঁকে ছেড়ে দাও। কারণ তিনি তাঁর কওমের মধ্যে সুদৃঢ় মর্যাদার অধিকারী এবং শহরেও সুরক্ষিত স্থানে বাস করেন।

“আমরা বললাম- আপনার কথা তো আমরা শুনলাম। এখন, হে আল্লাহ রাসূল? আপনি এরশাদ করুন এবং যে ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি আমাদের কাছ থেকে নিতে চান তা নিন”।

তারপর হুযুর (স) তাঁর ভাষণে কুরআন তেলাওত করেন, আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেন, ইসলামের প্রেরণা দান করেন এবং তারপর বলেন, আমি তোমাদের থেকে এ কথার উপর বায়আত নিচ্ছি যে, তোমরা ঠিক সেভাবে আমার সহযোগিতা ও হেফাজত করবে- যেমন তোমাদের জানের ও সন্তানদের হেফাজত করে থাক।

বারা বিন মা’রুর (রা) হুযুরের হাত আপন হাতের মধ্যে নিয়ে আরজ করেন, জি হ্যাঁ, সেই খোদার কসম, যিনি আপনাকে হকসহ পাঠিয়েছেন, আমরা সে সব বিষয় থেকে আপনাকে হেফাজত করব যেসব থেকে আমরা স্বয়ং আমাদের জান ও আওলাদকে হেফাজত করি। অতএব হে আল্লাহর রাসূল! (স) আমাদের থেকে বায়আত গ্রহণ করুন। আমরা যুদ্ধের পরীক্ষিত লোক। আমরা বাপদাদার নিকট থেকে এসব উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি।

আবুল হায়সাম বিন আত্তাইয়েহান [কেউ কেউ এর উচ্চারণ- ‘আত্তাইয়াহান’ আর কেউ ‘আত্তিহান’ লিখেছেন- গ্রন্হকার।] মাঝখান থেকে বলে উঠলেন, হে আল্লাহর রাসূলঙ আমাদের এবং অন্যান্য (ইহুদী) লোকদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে যা আপনি ছিন্নকারী। তারপর এমন যেন না হয় যে, যখন আল্লাক আপনাকে বিজয় দান করবেন, তখন আপনি আমাদের ছেড়ে আপন কওমের মধ্যে চলে যাবেন। হুযুর (স) মুচকি হেসে বললেন, না, না। বরঞ্চ এখন খুনের সাথে খুন এবং কবরের সাথে কবর। অর্থাৎ আমার মরণ ও জীবন তোমাদের সাথে। আমি তোমাদের এবং তোমরা আমার। যাদের সাথে তোমাদের লড়াই তাদের সাথে আমারও লড়াই। আর যার সাথে তোমাদের সন্ধি, তার সাথে আমারও সন্ধি।

হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ আনসারীর (রা) যে বর্ণনা আমরা ইতিপূর্বে মুসনাদে আহমদ ও তাবারানী থেকে উদ্ধৃত করেছি, তাতে সামনে অগ্রসর হয়ে তিনি বলেন, আকাবায় যখন আমরা সবাই একত্র হলাম, তখন আমরা আরজ করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কোন বিষয়ের উপর আপনার থেকে বায়আত করব? হুযুর (স) বলেন, এর উপর যে তোমরা ভালো-মন্দ সকল অবস্থায় হুকুম মেনে চলবে, আনুগত্য করবে। অবস্থা স্বচ্ছল হোক বা অস্বচ্ছল- সকল অবস্থায় সম্পদ ব্যয় করবে, সৎ কাজের হুকুম করবে, অসৎ কাজ করতে নিষেধ করবে। আর আল্লাহর ব্যাপারে সত্য কথা বলবে। কোন ভর্ৎসনাকারীর ভর্ৎসনার ভয় করবেনা। আর বায়আত করবে এবং কথার উপর যে, আমি যখন তোমাদের ওখানে আসব তো তোমরা প্রত্যেকে সে জিনিক থেকে আমার হেফাজত করবে যার থেকে তোমরা তোমাদের জান ও আওলাদের হেফাজত কর। তার বিনিময়ে তোমাদের জন্যে জান্নাত রয়েছে। এ কথায় আমরা উঠে তাঁর দিকে অগ্রসর হলাম এবং তাঁর হাত দলের সবচেয়ে অল্প বয়স্ক যুবক (বায়হাকীর বর্ণনায় শব্দগুলি- আমি ছাড়া সকলের ছোট) আসয়াদ বিন যুরারা (রা) তাঁর হাতের মধ্যে নিয়ে বললেন, হে ইয়াসরেববাসী, থাম। আমরা উট দৌড়ায়ে তাঁর কাছে এ ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে আসিনি যে, আমরা জানি তিনি আল্লাহর রাসূল। আজ তাঁকে এখান থেকে বরে করে নিজেদের সাথে নিয়ে যাওয়ার অর্থ সমগ্র আরবের দুশমনি খরিদ করা। এর পরিণামে তোমাদের নতুন প্রজন্মকে কতল করা হবে, তরবারী হবে তোমাদের খুন রঞ্জিত। অতএব যদি এসব বরদাশত করার শক্তি তোমাদের থাকে, তাহলে তাঁর হাত চেপে ধর। তোমাদের প্রতিদান আল্লাহর হাতে। কিন্তু তোমরা যদি  জানের ভয় কর তাহলে এখন থেকেই সে চিন্তা ত্যাগ কর। আর আর পরিস্কার ওজর পেশ কর। কারণ এ সময়ে ওজর-আপত্তি করে দেয়া আল্লাহর নিকেট বেশী গ্রহণযোগ্য হবে। এতে সবাই বলে ওঠে, আসয়াদ, আমাদের রাস্তা থেকে সরে যাও। খোদার কসম, আমরা এ বায়আত কখনো ত্যাগ করবনা, আর না আর থেকে হাত সরে নেব। তারপর সকলে বায়আত করেন। হাকেম, বায্যার ও বায়হাকীও এ বর্ণনা উদ্ধৃত করেন।

ইবনে জারীর তাবারী ইবনে হিশাম আসেম বিন ওমর বিন কাতাদার বরতা দিয়ে মুহাম্মদ বিন ইসহাকের বর্ণনা উদ্ধৃত করেন যে, বায়আতের সময় আব্বাস বিন উবাদা বিন নাদলা আনসারী বলেন, খাযরাজের জবাব এলো- হ্যাঁ জানি। আব্বাস তাঁর কথায় জোর দিয়ে বলেন, তোমরা সাদা ও কালো সকলের সাথে লড়াইয়ের বায়আত করছ। অর্থাৎ এ বায়আত করে সারা দুনিয়ার সাথে লড়াই আহবান করছ। এখন যদি তোমরা ধারণা কর যে, যখন তোমাদের ধনসম্পদ ধ্বংসের এবং তোমাদের সম্ভ্রান্ত লোকদের ধ্বংসের আশংকা করবে, তখন এ ব্যক্তিকে দুশমনের হাতে তুলে দেব, তাহলে এটাই শ্রেয়ঃ যে আজই তাঁকে পরিত্যাগ কর। কারণ খোদার কসম, এ হবে দুনিয়া ও আখোরাতের লাঞ্ছনার কারণ। আর যদি তোমরা মনে কর যে, যে প্রতিশ্রুতিসহ তোমরা এ ব্যক্তিকে তোমাদের ওখানে আহবান জানাচ্ছ, তাঁকে আপন ধনসম্পদের ও আপন বুযুর্গানের ধ্বংসের আশংকা সত্ত্বেও সব শামলে নেবে, তাহলে নিঃসন্দেহে তাঁর হস্ত ধারণ কর। খোদার কসম, এটাই হবে দুনিয়া ও আখোরাতের জন্যে মংগল। সমবেত সকলে একমত হয়ে বলল, আমরা তাঁকে নিয়ে আমাদের ধনসম্পদ ও বুযুর্গানকে বিপদে নিক্ষেপ করতে প্রস্তুত আছি। তারপর লোকেরা আরজ করলো, হে আল্লাহর রাসূল!  আমরা যদি আমাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করি- তাহলে আমাদের পুরস্কার কি?

তিনি বললেন- জান্নাত।

ইবনে সা’দ হযরত মুয়ায বিন রিফায়া বিন রাফে- এর বর্ণনা ওয়াকেদীল বরাত দিয়ে উদ্ধৃত করেন যে, আকাবার স্থানে সকলে একত্র হলেন, তখন হুযুরের (স) চাচা আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালেব- কথা এভাবে মুরু করেন, হে খাযরাজ দল! তোমরা মুহাম্মদকে (স) তোমাদের ওখানে যাওয়ার জন্যে দাওয়াত দিয়েছ। আর অবস্থা এই যে, মুহাম্মদ (স) তার পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে সবচেয়ে সুদৃঢ় মর্যাদা সম্পন্ন। আমাদের মধ্যে যারা তাঁর দ্বীন গ্রহণ করেছে এবং যারা করেনি, তারা সকলে বংশ মর্যাদার ভিত্তিতে তাঁর হেফাজত করছে। কিন্তু মুহাম্মদ (স) সকলকে ছেড়ে তোমাদের কাছেই যেতে চান। এখন বুঝেপড়ে দেখ যে, অতএব চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত কর। পরস্পর পরামর্শ কর এবং সকলে একমত হয়ে কোন সিদ্ধান্ত কর। কারণ সবচেয়ে ভালো কথা হলো সত্য কথা।

তারপর হযরত আব্বাস জিজ্ঞেস করেন- আমাকে একটু বল তো তোমরা দুশমনের সাথে কিভাবে লড়াই কর? সকলে নীরব রইলেন। আবদুল্লাহ বিন আমর বিন হারাম- যিনি বায়আতে আকাবার পূর্বক্ষনে ইসলাম গ্রহণ করেন, এ প্রশ্নের জবাব দেন। তিনি বলেন, খোদার কসম, আমরা সমরবিদ লোক। যুদ্ধ আমাদের স্বভাবে পরিণত হয়েছে। এতে আমরা অভ্যস্থ। বাপদাদা থেকে এ আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছি। আমরা প্রথমে তীরন্দাজের কাজ করি। তীর শেষ হওয়ার পর নেজাবল্লম দিয়ে লড়াই করি। তা শেষ হওয়ার পর তরবারীর যুদ্ধ শুরু করি। এ তরবারী দিয়ে শক্রুর মুকাবেলা করি। এরপর যার মৃত্যু আগে আসে সে মৃত্যু বর করে।

হযরত আব্বাস বলেন, সত্যিই তোমরা যোদ্ধার জাতি। তারপর বারা বিন মা’রুর বলেন, আমরা আপনার কথা শুনলাম। খোদার কসম! আমাদের মনে অন্য কিছু থাকলে পরিষ্কার তা বলে দিতাম। আমরা তো রাসূলুল্লাহর (স) সাথে সত্যিকার অর্থে প্রতিশ্রুতি পালন করতে এবং তাঁর জন্যে জীবন দিতে চাই।

ওয়াকেদী অন্য একটি বর্ণনায়- হযরত বারা বিন মা’রুরের এ ভাষণের এ কথাগুলো উদ্ধৃত করা হয়েছে। “আমরা প্রচুর যুদ্ধ সরঞ্জাম ও লড়াইয়ের শক্তি রাখি। আমরা যখন পাথরের মূর্তি পূজা করতাম, তখনই যখন এ অবস্থা ছিল, আর এখন তো আমাদের অবস্থা কেমন হতে পারে- যখন আল্লাহ আমাদেরকে সে সত্য দেখিয়ে দিয়েছেন- যে বিষয়ে অন্যান্য লোক অন্ধকারে আছে এবং মুহাম্মদের (স) মাধ্যমে আমাদের সাহায্য করেছেন।(গ্রন্হকার কর্তৃক সংযোজন।)

আকাবার বায়আতের গুরুত্ব

ইসলামের ইতিহাসের এ এক বৈপ্লবিক ঘটনা যা খোদা তাঁর মেহেরবারীতে সংঘটিত করেন এবং নবী মুহাম্মদ (স) এর সুযোগ গ্রহণ করেন। ইয়াসরেববাসী নবীকে (স) নিছক একজন আশ্রয় প্রার্থী হিসাবে নয়, বরঞ্চ খোদার প্রতিনিধি এবং নিজেদের নেতা ও শাসক হিসাবে তাঁদের শহরে ডাকছিলেন এবং ইসলামের অনুসারীদের নিকটে তাঁদের এ আহবান এ জন্যে ছিলনা যে তিনি এক অপরিচিত স্থানে নিছক একজন মুহাজির হিসাবে স্থান লাভ করবেন, বরঞ্চ উদ্দেশ্য ছিল এই যে, আরবের বিভিন্ন গোত্রে ও অংশে যে সব মুসলমান ছড়িয়ে ছিঁটিয়ে ছিল তারা সব ইয়াসরেবে এসে একত্র হবে এবং ইয়াসরেবী মুসলমানদের সাথে মিলিত হয়ে একটি সুশৃংখল ইসলামী সমাজ গঠন করবে। এভাবে ইয়াসরেব প্রকৃতপক্ষে নিজেকে ‘মদীনাতুল ইসলাম’ (ইসলামের শহর) হিসাবে পেশ করলো এবং নবী (স) তা গ্রহণ করে আরবে প্রথম দারুল ইসলাম কায়েম করলেন। এ উদ্যোগের অর্থ যা কিছু ছিল, তার থেকে মদীনাবাসী অনবহিত ছিলনা। এর পরিস্কার অর্থ এই যে, একটা ক্ষুদ্র শহর নিজেকে সমগ্র দেশের সামরিক, অর্থনৈতিক ও তামাদ্দুনিক বয়কটের মুকাবেলা পেশ করছিল। বস্তুতঃ বায়আতে আকাবার রাতের সে বৈঠকে ইসলামের এ প্রাথমিক সাহায্যকারীগণ (আনাসার) এ পরিণাম খুব ভালো করে জেনে বুঝে নবীর (স) হাতে তাঁদের হাত রেখেছিলেন। তাঁদের ভাষণে এ সব কিছুই প্রকাশ হয়ে পড়েছিল।(তাফহীমুল কুরআন, দ্বিতীয় খন্ড, সূরা আনফাল- এর ভূমিকা।)

আনসারদের জীবন বিলিয়ে দেয়ার প্রেরণা

বিপদের আশংকা ভালে করে জানা সত্ত্বেও মদীনার আনসার রাসূলুল্লাহর (স) হাতে যে বায়আত করেছিলেন, তার জন্যে কোন প্রকার বিচলিত হওয়া তো দূরের কথা, তার জন্যে তাঁরা গর্ববোধ করেন এবং তাঁদের মধ্যে এ পথে সকলের আগে চলার প্রেরণা এতো বিরাট ছিল যে, তাঁদের মধ্যে এ আলোচনা হতে থাকে যে, বায়আতের সময় সবার আগে নবীর (স) হাতে কার হাত রাখার সৌভাগ্য হয়েছিল। ইবনে ইসহাক বলেন, নবী নাজ্জার দাবী করতো যে, সর্ব প্রথম বায়আত করেন আসয়াদ বিন যুরারা (রা)। বনী আবদুল আশহাল দাবী করতো যে, এ সৌভাগ্য হয়েছিল- আবুল হায়সাম বিন আত্তাইয়েহানের। ইবনে আসীর উসদুল গাবাতে লিখেছেন যে, বনী সালমা বলেন, সকলের আগে বায়াতকারী ছিলেন কা’ব বিন মালেক (রা)। ইবনে সা’দ ওয়াকেদীর বরাত দিয়ে বলেন, আউস এবং খাযরাজের মধ্যে পরম্পর গর্ব অহংকার করা শুরু হলো যে, সকলের আগে বায়আতকারী আউসের ছিল না খাযরাজের। অবশেষে লোকেরা বলল, এ বিষয়টি হযরত আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিব থেকে ভালো আর কেউ জানেনা। কারণ তিনি সে সময় হুযুরের (স) সাথে ছিলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, হুযুরের (স) হাত সর্বপ্রথম দেন আসয়াদ বিন যুরারা, তারপর বরা বিন মা’রুর এবং তারপর উসাইদ বিন হুযাইর।

নকীব নিয়োগ

হযরত কা’ব বিন মালেকের (রা) যে বর্ণনা আমরা ইতোপূর্বে উদ্ধৃত করেছি, তার শেষে তিনি বয়ান করেন যে, বায়আতের পর রাসূলুল্লাহ (স) আমাদেরকে বলেন, তোমাদের মধ্য থেকে বার জন নকীব নির্বাচন করে আমাকে দাও যারা নিজ নিজ গোত্রের দায়িত্বশীল হবে। তাবাকাতে ইবনে সা’দে ইবনে ইসহাকের এরূপ বর্ণনা আছে যে, নবী (স) বলেন, তারা নিজ নিজ কওমের জমিদার হবে যেমন হযরত ঈসা (আ) বিন মরিয়ামের হাওয়ারীগণ জামিনদার ছিলেন। তাবাকাতে ইবনে সা’দে ওয়াকেদী থেকে এমন আর এক বর্ণনা আছে যে, হযরত মূসা (আ) বনী ইসরাঈল থেকে বার জন নকীব নিয়েছিলেন। হুযুরের (স) এ এরশাদ অনুযায়ী সকলে ১২ জনের প্রস্তাব করেন- ৯ জন খাযরাজ থেকে, ৩ জন আউস থেকে। ইবনে ইসহাকের বর্ণনা মতে তাঁদের তালিকা নিম্নরূপঃ

খাযরাজ থেকে-

১. আসয়াদ বিন যুরারা (রা) হুযুর (স) তাঁকে নকীবগণের নেতা বানিয়ে দেন (নকীবুন নুকাবা)।

২. সা’দ বিন আর-রাবী (রা)। জাহেলিয়াতের যুগে মদীনার শিক্ষিত লোকদের মধ্যে তিনি একজন ছিলেন।

৩. আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা)। তাঁকে ‘কামেল’ বলা হতো।

৪. রাফে বিন মালেক (রা)। জাহেলিয়াতের যুগে- ‘কামেল’ বলা হতো।

৫. বারা বিন মা’রুর (রা)। হিজরতের কিছু পূর্বে তাঁর ইন্তেকাল হয়। হুযুর (স) তাঁর কবরে জানাযা পড়েন।

৬. আবদুল্লাহ বিন আমর বিন হারাম (রা)। বায়আতে আকাবার রাতে তিনি ঈমান আনেন।

৭. উবাদা বিন সামেত (রা)।

৮. সা’দ বিন আমর (রা)। ইনিও লেখাপড়া জানতেন।

আউসের মধ্যে-

১. উসায়েদ বিন হুযাইর (রা)। তাঁকে ‘কামেল’ বলা হতো।

২. রিফায়া বিন আবদুল মুনষের (রা)। (ইবনে ইসহাক বলেন, জ্ঞানীগণ তাঁর স্থলে আবুল হায়সাম বিন আত্তাইয়েহান বলেছেন)।

তারপর হুযুর (স) বলেন, তোমরা আপন আপন থাকার জায়গায় চলে যাও।

বায়আতের সংবাদে কুরাইশের প্রথম প্রতিক্রিয়া

ইমাম আহমদ, ইবনে জারীর তাবারী ও ইবনে হিশাম- মুহাম্মদ বিন ইসহাকের বরাত দিয়ে হযরত কাব বিন মালেকের (রা) বর্ণনা উদ্ধৃত করেন এবং অনুরূপ বর্ণনা ওয়াকেদী বিভিন্ন সনদসহ উদ্ধৃত করেন, যা ইবনে সা’দ তাবাকাতে সন্নিবেশিত করেন। তা এই যে, যে রাতে আকাবায় বায়আত অনুষ্ঠিত হয়, সে রাতেই কুরাইশের কানে এ খবর পৌঁছে এবং সকাল বেলা তাদের নেতৃবৃন্দ মিনায় মদীনাবাসীদের শিবিরে পৌঁছে। তারা বলে, হে খাযরাজের লোকেরা, আমাদের নিকটে এ খবর পৌঁছেছে যে, তোমরা আমাদের এ লোকের – (মুহাম্মদ (স) সাথে মিলিত হয়েছো। তোমরা চাও তাকে আমাদের নিকট থেকে বের করে নিয়ে যেতে এবং তার কাছে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার বায়আত করেছ। খোদার কসম! আরবের মধ্যে এমন কোন কওম নেই- যাদের সাথে লড়াই করা আমাদের জন্যে তোমাদের চেয়ে বেশী অপছন্দনীয়।

এর জবাবে মদীনাবাসীদের মধ্যে যারা মুশরিক ছিল তারা উঠে হলপ করে বলে, এমন কিছু হয়নি, আমাদের এ সম্পর্কে কিছু জানা নেই।

এটা তাদের সত্য কথাই ছিল। কারণ সত্য সত্যই এ সম্পর্কে তাদের কিছু জানা ছিলনা। কিন্তু মুসলমান একে অপরের দিকে চাওয়া চাওই করছিলেন। তারপর কুরাইশের সর্দার আবদুল্লাহ বিন ওবাই- এর নিকট গেল এবং তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলো। সে বলে, এ এতো বড়ো কাজ যে, আমার কওম আমাকে ছাড়া এ কাজ করতে পারেনা। আমি জানিনা যে এমন হয়েছে।

এসব জবাবে কুরাইশ সন্তুষ্ট হতে পারেনি। তারা গোপনে অনুসন্ধান করতে থাকে। তারপর তারা নিশ্চিত হয় যে, এরূপ ঘটনা ঘটেছে। বায়আতকারীগণ মদীনায় ফিরে যাবার সময় কুরাইশ তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে। মক্কার বাইর নিকটেই ‘আযাখের’ নামক স্থানে তারা হযরত সা’ বিন ওবাদা (রা) এবং মুনষের বিন আমরকে (রা) ধরে ফেলে। মুনযের তো তাদের থেকে পালিয়ে বেরিয়ে যান। কিন্তু সা’দ বিন ওবাদা (রা) কে আটক করে তার হাত গলার সাথে বেঁধে মারতে মারতে মক্কায় নিয়ে আসে।

হযরত সা’দ (রা) বলেন, যখন মক্কায় আমার সাথে এরূপ আচরণ করা হচ্ছিল তখন একজন গৌর বর্ণের হাট্টগোট্টা যুবক আমার সামনে এলো (এ ছিল সুহাই বিন আমর)। মনে করলাম- এদের কারো মধ্যে যদি মংগল থাকে তো এর মধ্যে আছে। কিন্তু আমার নিকটে এসে সে খুব জোরে আমাকে একটা ঘুষি মারলেঅ। মনে মনে ভাবলাম এর মধ্যে কোন মংগল নেই। যখন তারা আমাকে ছিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিল তখন একজন আমাকে বলল (এ ছিল আবুল বাখাতারী হিশাম), খোদার বান্দাহ! তোমরা এবং কুরাইশের কারো সাথে কোন প্রতিশ্রুতি ও আশ্রয়ের কোন সম্পর্ক নেই তো? আমি বললাম, আমি আমার এলাকায় জুবাই’র বিন মুতয়েম ও হারেস বিন উমাইয়া বিন আবদে শামশের বাণিজ্য কাফেলাকে আশ্রয় দিয়ে থাকি। (ইবনে সা’দ জুবাইরের স্থলে তার পিতা মুতয়েম বিন আদীর নাম বলেছেন)। সে বলে, তাহলে তার দোহাই দাও এবং বল তার সাথে তোমার ক সম্পর্ক। অতএব আমি তাই বললাম। তখন সে (আবুল বাখতারী) দু’ব্যক্তির তালাশে বেরিয়ে গেল। তারপর হেরমে কাবায় তাদেরকে পেয়ে গেল। তাদেরকে বলল, খাযরাজের এক ব্যক্তিকে মক্কা ও মিনার মধ্যবর্তী মুহাসসাব উপত্যকায় মারপিট করা হচ্ছে এবং সে তোমাদের দু’জনের নাম ধরে ডাকছে। সে বলছে- তার এবং তোমাদের মধে আশ্রয়দানের সম্পর্ক আছে। তারা বলল, সে ব্যক্তি কে? সে বলল, সা’দ বিন ওবাদা। এ কথা শুনে উভয়ে বলল, খোদার কসম, সে সত্য কথা বলছে। আমাদের ব্যবসায়ীদেরকে সে আশ্র দিত এবং তাদের উপর কাউকে জুলুম করতে দিতনা। তারা এলো এবং হযরত ওবাদাকে জালেমদের হাত থেকে রক্ষা করলো।

ওয়াকেদী বলেন, হযরত সাদের নিরুদ্দেশ হওয়ার খবর যখন আনসার জানতে পারলেন, তখন তাঁরা তাঁর তালাশে মক্কার দিকে ফিরলেন। কিন্তু পথে তাঁরা সা’দকে ফিরে যেতে দেখলেন।

বায়আতের পর মদীনায় ইসলাম প্রচার

মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পর আনসার অতি দ্রুততার সাথে ইসলাম প্রচার শুরু করেন এবং দ্বীনী আবেগসহ প্রতিমা ভেঙে ফেলার কাজে লেগে যান। ইবনে সা’দ বিস্তারিত বর্ণনা দেন যে, আবু আবস বিন জাবর ও আবু বুরদা বিন নিয়ার, বনী হারেসার প্রতিমা, উমারা বিন হাযম, আসয়াদ বনি যুরারা, আওফ বিন আফরা, সালিত বিন কায়স ও আবু সিরাম বনী নাজ্জারের প্রতিমা; যিয়াদ বিন লাবিদ ও ফারওয়া বিন আমর বনী বিয়াযার প্রতিমা; সা’দ বিন উবাদার, মুনযের বিন আমর ও আবু দু’জামা, বনী সয়েদার প্রতিমা; মুযায় বিন জাবল, সা’লবা বিন গানামা ও আবদুল্লাহ বিন উনায়েস বনী সালেমার প্রতিমা চূর্ণ করছিলেন। এর থেকে আন্দাজ করা যায় যে, মুসলমান সে সময়ে মদীনার মুশরিকদের উপর এতোটা প্রভাব বিস্তার করেছিলেন যে, তারা এ প্রতিমা ধ্বংসে প্রতিবন্ধকতা করতে পারেনি।

এ সম্পর্কে একটি মজার ঘটনা ইবনে হিশাম বর্ণনা করেছেন। মদীনাবাসীদের সর্দারদের মধ্যে বনী সালেমার সর্দার আমর বিন জামুহ শির্কের উপর অবিচল ছিল। অথচ তার পুত্র মুয়ায বিন আমর মুসলমান হয়ে আকবায় বায়আত করে এসেছিলেন। সে তার বাড়িতে কাঠের একটি প্রতিমা অত্যন্ত সম্মানের সাতে রেখেছিল যার নাম ছিল মানাত। এ ধরনের প্রতিমা ঘর সাধারণতঃ মশরিকদের সর্দার তাদের বাড়িতে রাখতো। বনী সালেমা গোত্রের যুবকগণ স্বয়ং আমর বিন জামুহ- এর পুত্রসহু মুসলমান হয়ে গেলেন। বনী সামো গোত্রের যুবকগণ স্বয়ং আমর বিন জামুহ- এর পুত্রসহ মুসলমান হয়ে গেলেন। রাতের বেলা তাঁরা প্রতিমাগৃহে ঢুকে সে প্রতিমাকে উপুড় করে একটি গর্তে নিক্ষেপ করতেন যেখানে মহল্অর লোক ময়লা- আবর্জন ফেলতো। সকালে উঠে যখন আমর তার প্রতিমাকেদেখতে পেতনা তখন হৈ হল্লা করে তা খুঁজে বেড়াতো। তারপর গর্ত থেকে তুলে এনে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে সুগন্ধি লাগিয়ে তার স্থানে রেখে দিত। তারপর সে বলতো, যে তোমার সাতে এ আচরণ করেছে তাকে যদি পেতাম তো ভালোভাবে লাঞ্ছিত করতাম। এ ধরনের খেল-তামাশা কিছুদনি চলে। একদিন সে তার প্রতিমা গর্ত থেকে তুলে এনে তার ঘাড়ে একটি তরবারী ঝুলিয়ে দেয়। তারপর বলে, আমি জানিনা তোমার সাথে এ আচরণ কে করে। এখন তোমার কোন শক্তি থাকলে এ তরবারী দিয়ে নিজের হেফাজত কর।

রাতে যুবক দল প্রতিমার ঘাড় থেকে তরবারী নামিয়ে রাখে, একটি মৃত কুকর তার সাথে বেঁধ দেয় এবং তাকে নিয়ে বনী সালেমার একটি কূপে তা নিক্ষেপ করে। সকাল বেলা তালাশ করতে করতে তাকে সে কূপের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। একটি মৃত কুকুরের সাথে ময়লা-আবর্জনায় উপুড় হয়ে পড়ে আছে। তখন তার কওমের মুসলমানগণ তাকে অনেক বুঝাবার পর তার চোখ খুলে যায় এবং তারপর সে খাঁটি হেলে ইসলাম গ্রহণ করে। (গ্রন্হকার। কর্তক সংযোজন।)

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.