রাহে আমল – ২য় খণ্ড

জীব জানোয়ারের অধিকার অধ্যায়

জানোয়ারের প্রতি সদয় ব্যবহারঃ

(আরবী****)

শব্দের অর্থঃ (আরবী) মাররা- যাচ্ছিলেন। (আরবী) বিবাযীরিন – উটের কাছ দিয়ে। (আরবী) কাদ লাহিকা- অবশ্যই লেগে গিয়েছিল। (আরবী**)যাহরুহু বিবাতনিহি- তার পেটের সাথে পিঠ। (আরবী) ইত্তাকূল্লাহা- আল্লাহকে ভয় করো। (আরবী**) আলবাহায়িমি- চতুস্পদ জন্তু। (আরবী***) আলমু জামাতি –বাকহীন। (আরবী**)ফারাকাবূহা- এর ওপর আরোহন করো।

২২৬।সাহল ইবনে হাঞ্জালা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহিওয়াসাল্লাম এমন একটি রুগ্ন উটের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন যার ঠি পেটের সাথে লেগে গিয়েছিল। এ দৃশ্যদেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম বললেন, এ সকল বাকহীন পশুর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। সুস্থ অবস্থায় এদের উপর আরোহন করবে এবং সুস্থ অবস্থায়ই তাদেরকে ত্যাগ করবে। – আবুদ দাউদ

ব্যাখ্যাঃ অর্থাৎ জানোয়ারকে অভুক্ত রেখে কষ্ট দিলে আল্লাহ নারায হন। যখন তাদের দ্বারা কাজ নেয়া হয় তখন তাদেরকে উত্তমরুপে খাবার দেবে। এদের শক্তির বাইরে কোন কাজ করানো অন্যায়। এতে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন।

পশুর জন্য আরামের ব্যবস্থাঃ

(আরবী******)

শব্দের অর্থঃ (আরবী***) হায়িতান- বাগান। (আরবী) আলজামালু- উট। (আরবী**) জারজারা- গোংগানীর আওয়াজ দিলো। (আরবী) যারাফাত আইনাহু – তার দু চোখ বেয়ে অশ্রু বইতে লাগল। (আরবী**) ফাআতাহু- তিনি নিকটে এলেন। (আরবী) সারাহাহু- তার পিঠের কুঁজ। (আরবী) যাফারাহু – তার পিছনের হাড়। (আরবী) ফাসাকানা- অতঃপর সে শান্ত হয়। (আরবী) রাব্বু- মালিক। (আরবী) ফাতান- যুবক। (আরবী) আফালা তাত্তাকী- তুমি কি ভয় করো না। (আরবী) আলবাহীমাতু- চতুস্পদ জন্তু। (আরবী) মাল্লাকাল্লাহু- আল্লাহ মালিক করে দিয়েছেন। (আরবী) ইয়াশকু ইলাইয়্যা- আমার কাছে সে অভিযোগ করছে। (আরবী) তুজীউহু- তুমি তাকে উপোষ রাখছো।(আরবী) তুদয়িবুহু- তার কাছ থেকে কাজ নিচ্ছো।

২২৭।আবদুল্লাহ ইবন জাফর হতে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক আনসার ব্যক্তির বাগানে প্রবেশ করে তথায় একটি উট বাঁধা অবস্থায় দেখতে পেলেন উটটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখামাত্র গোংগানীর আওয়াজ দিলো এবং তার দুচোখ বেয়ে অশ্রু বইতে লাগলো। আল্লাহর নবী উটটির নিকটে গেলেন এবং এর পিঠ ও কোমরে হাত বুলিয়ে দিলে উটটি শান্ত হয়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, কে েএই উটটির মালিক? এটা কার উট? একজন যুবক আনসার এগিয়ে এসে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! উটটি আমার। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি এই নির্বাক জানোয়াটির ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো না যা আল্লাহ তোমার মালিকানাধীন করে দিয়েছেন? এ উটটি তার বিগলিত অশ্রু ও বেদনা বিধুর আওয়াজ দ্বারা আমার নিকট অভিযোগ করছে যে, তুমি তাকে অভুক্ত রাখছো এবংএর দ্বারা একটানা কাজ নিচ্ছো।– রিয়াযুস সালেহীন

ভ্রমনকালে পশুর হকঃ

(আরবী***)

শব্দের অর্থঃ (আরবী) সাফারতুম- তোমরা সফর করো। (আরবী) ফীল খাসাবি- শস্য শ্যামল এলাকায়। (আরবী) ফীসসানাতি- খরা পীড়িত এলাকা। (আরবী) ফাআসরাউ- দ্রুত চালিয়ে নিয়ে যাবে।

২২৮।রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা যখন উর্বর ও শস্য-শ্যমলএলাকা ভ্রমন করবে তখন তুমি ভূমি হতে উটকে তার হক প্রদান করবে। আর খরা পীড়িত এলাকা ভ্রমণকালে তাকে দ্রুত চালিয়ে নিয়ে যাবে।– মুসলিম

ব্যাখ্যাঃ অর্থাৎ ফসলের মৌসুমে ভূমি রসালো থাকার কারণে মাটিতে নানা প্রকারের ঘাস ও তৃণলতা জন্মায়। এ সময়ে সফর করলে মাঝে মধ্যে জানোয়ারকে ছেড়ে দিয়ে ঘাস লাতাপাতা খাবার সুযোগ দিতে হবে। আর দুর্ভিক্ষ ও খরার মৌসুমে মাটি রসহীন হয়ে যায় কোন ঘাস লতা উৎপন্ন হয় না। তাই এ সময়ের সফরে উটকে দ্রুত চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। যেনো শীঘ্র গন্তব্যস্থলে পৌছে যায় এবং পথিমধ্যে ক্ষুধা তৃঞ্চায় তার কষ্ট না হয়।

যবাই করার পদ্ধতিঃ

(আরবী****)

শব্দের অর্থঃ (আরবী) কাতাবা- নির্দেশ দিয়েছেন। (আরবী) আল ইহসানা- উত্তমভাবে। (আরবী) ইযা কাতালতুম- যখন তোমরা হত্যা করবে। (আরবী) ফাআহসিনূ- তখন উত্তম পন্থায় করবে। (আরবী) ইউহাদ্দি- ধার তীক্ষ্ন করবে।(আরবী) ওয়ালইউরিহ- আর শান্তি দেবে। (আরবী) যাবীহাতাহু- যবেহের পশুকে।

২২৯। শাদ্দাদ ইবনে আউস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত।রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি কাজ উত্তম ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব, তোমরা যখন হত্যা করবে তখন উত্তম পন্থায় হত্যা করবে। আর যখন যবাই করবে তখন ভালো পন্থায় যবাই করবে। অবশ্যই তোমাদের ছুরি ধার তীক্ষন করবে এবং যবাইকৃত পশুকে আরাম দেবে। এমনভাবে যবাই করো না যাতে যবাইকৃত পশু দীর্ঘ সময় ধরে ছটফট করতে থাকে। বরং ধারালো অস্ত্র দ্বারা এমনভাবে যবাই করবে যাতে দ্রুত প্রাণবায়ু বেরিয়ে যায়।–মুসলিম

যবাই করার নিয়মঃ

(আরবী***)

শব্দের অর্থঃ (আরবী) ইয়ানহা- তিনি বারণ করেছেন।(আরবী)আই ইউসাবিরা- হাতপা বাঁধা অবস্থায়। (আরবী) লিলকাতলি- হত্যার জন্য।

২৩০।আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কোন চুতস্পদ জন্তু কিংবা অন্য কোন প্রাণীকে(পাখী অথবা মানুষ) বেঁধে দন্ডায়মান অবস্থায় তীর মেরে হত্যা করতে বারণ করতে শুনেছি।–বুখারী, মুসলিম

জীব জন্তুর চেহারায় আঘাত করা নিষেধঃ

(আরবী)

শব্দের অর্থঃ (আরবী) নাহা – তিনি নিষেধ করেছেন।(আরবী) আনিযযারবি- মারতে। (আরবী) ফীল ওয়াজহি – মুখমন্ডলে, চেহারায়।(আরবী) আনিল ওয়াসমি- দাগ দিতে।

২৩১।জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে।রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীব জন্তুর চেহারায় আঘাত করতে ও দাগ দিতে নিষেধ করেছেন।–মুসলিম

অকারণে প্রাণী হ্ত্যা করাঃ

(আরবী****)

শব্দের অর্থঃ (আরবী) উসফুরান – চড়ুই পাখি। (আরবী) ফামা ফাওকাহা- তার চেয়ে ক্ষুদ্র।(আরবী) বিগাইরি হাককিহা- অধিকার ছাড়া।(আরবী) ওয়া মা হাককুহা- তার অধিকার কি?(আরবী) আই ইয়াযবাহাহা – তাকে যবেহ করা। (আরবী) ফাইয়াকুলাহা- তারপর তাকে খাবে। (আরবী) রাসাহা- তার মাথা। (আরবী) ফাইয়ারমী বিহা- তারপর তাকে ফেলে দিবে।

২৩২।আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেছেন, যে ব্যক্তি চড়ুই অথবা তার চেয়ে ক্ষুদ্র কোন পাখী অনর্থক হত্যা করবে। আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকে এ হত্যার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। জিজ্ঞাস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল!পাখীর হক কি? উত্তরে তিনি বললেন, পাখি যখন যবাই করবে তখন তাকে খেয়ে ফেলবে।আর তার মাথা কাটার পর ফেলে দেবে না।– মিশকাত

ব্যাখ্যাঃ এ হাদীস দ্বারা জানা গেলো, গোশত খাবার উদ্দেশ্যে জীব জন্তু শিকার করা জায়েয। আমোদ প্রমোদের উদ্দেশ্যে শিকার করা ইসলামে নিষিদ্ধ।আমোদ –প্রমোদের উদ্দেশ্যে শিকার করার অর্থ হলো, শুধু সখ করে শিকার করা। না খেয়ে ফেলে দেয়া।

পশু পাখির কষ্টের প্রতি খেয়াল রাখাঃ

(আরবী***)

শব্দের অর্থঃ (আরবী) কুন্না- আমরা ছিলাম। (আরবী) ফানতালাকা – তারপর তিনি চলে গেলেন। (আরবী) লিহাজাতিহি- তাঁর প্রয়োজনে। (আরবী) ফারাআইনা- আমরা দেখলাম। (আরবী) হুমরাতান – একটি পাখি, শালিক। (আরবী) ফারখানি- দুটি বাচ্চা।(আরবী) ফাজাআলাত তুফরিশু- ডানা মেলে বাচ্চাদের উপর ঝাপটা মারতে লাগলো। (আরবী) ফাজ্জাআ- কষ্ট দিচ্চো। (আরবী) রদ্দু- ফিরে দাও। (আরবী) কারইয়াতা নামলিন- পিপড়ার ঘর। (আরবী) কাদ হাররাকনাহা- আমরা তা পুড়ে দিয়েছিলাম। (আরবী) লা ইয়ামবাগী- উচিত নয়। (আরবী) আই ইউআয়যিবা- শাস্তি দেয়া। (আরবী) রাব্বুন্নারি- আগুনের সৃষ্টিকর্তা।

২৩৩।আবদুর রহমান রাদিয়াল্লাহু আনহু স্বীয় পিতা আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ননা করেছেন। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে এক সফরে ছিলাম। তিনি বিশেষ প্রয়োজনে বেরিয়ে পড়লেন। ইতমধ্যে আমরা একটি পাখি দেখলাম। যার সংগে দুটি বাচ্চা ছিলো। আমরা বাচ্চা দুটি ধরে ফেললাম। এতে পাখিটি তার ডানা বিস্তার করে বাচ্চাদের উপর ঝাপটা মারতে লাগলো। ইত্যবসরে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরে এলেন এবং পাখিটির অস্থিরতা দেখতে পেয়ে বললেন, পাখিটাকে তার বাচ্চার কারণে কে কষ্ট দিচ্ছো? তার বাচ্চা তাকে ফিরিয়ে দাও? এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি পিপড়ার ঘর দেখলেন যা আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ঘরগুলো কে পুড়িয়েছে? আমরা বললাম, আমরা জ্বালিয়ে দিয়েছি।তিনি বললেন, আগুন দ্বারা শাস্তি দেবার অধিকার একমাত্র আগুনের মালিক আল্লাহ ছাড়া আর কারোর নেই।– আবু দাউদ

পশুর মধ্যে লড়াই বাধানো নিষিদ্ধঃ

(আরবী*****)

শব্দের অর্থঃ (আরবী) আতহাহরীশু- লড়াই বাঁধানো। (আরবী) বাইনাল বাহায়িমি- পশুদের মধ্যে।

২৩৪।রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পশুদের মধ্যে লড়াই বাধানো ও লড়াই খেলানো নিষেধ করেছেন।– তিরমিযি

জীব জন্তুকে পানি পান করানোঃ

(আরবী*****)

শব্দের অর্থঃ (আরবী) ইয়ামশী- পথ চলছে। (আরবী) বিতারীকিন – রাস্তায়।(আরবী) ইশতাদ্দা আলাইহিল আতাশু- সে ভীষণ পিপাসার্ত হলো। (আরবী) ফাওয়াজাদা- তারপর সে পেলো। (আরবী) বিরান – কুপ। (আরবী) ইয়ালহাসু- হাপাচ্ছে। (আরবী) ইয়াকুল- খাচ্ছে।(আরবী) আসসারা – ভিজা মাটি। (আরবী) লাকাদ বালাগা- নিশ্চয়ই পৌছেছে। (আরবী) আল আতাশু- পিপাশা। (আরবী)ফামালা – সে পূর্ণ করলো।(আরবী) খুফফাহু- তার মোজা। (আরবী) ফাসাকা- পান করালো। (আরবী) ফাশাকারাল্লাহা- আল্লাহর শোকর করলো। (আরবী) ফীল বাহায়িমি – পশু পাখির ব্যাপারে।(আরবী) আজরান – সওয়াব। (আরবী) যাতি কাবাদিন রাতবাতিন- প্রানী।

২৩৫।রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এক ব্যক্তি পথ চলতে গিয়ে ভীষণভাবে তৃঞ্চার্ত হয়ে পড়ে। সে এদিক সেদিক অনুসন্ধানের পর একটি কূপ দেখতে পেয়ে তার মধ্যে নেমে পানি পান করলো।(তথায় বালতি এবং রশির ব্যবস্থা ছিল না)অতঃপর কূপ হতে বের হয়ে এসে সে দেখতে পেলো একটি কুকুর পিপাসায় কাতর হয়ে জিহবা বের করে ভিজা মাটি চাটছে। সে মনে মনে ভাবলো নিশ্চয়ই কুকুরটি তারই ন্যায় অত্যন্ত পিপাসার্ত। সে তৎক্ষনাৎ কূপে নামলো এবং স্বীয় চামড়ার মোজা পানি দ্বারা পূর্ণ করে মুখে ধারণ করে উঠে আসলো এবং কুকুরটিকে পান করালো। আল্লাহ তার এ কাজটি অত্যন্ত পছন্দ করলেন এবং সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিলেন। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস কররেন। হে আল্লাহর রাসূল। পশুদের প্রতি দয়া প্রদর্শণে আমাদের জন্য ছাওয়াব আছে কি? তিনি বললেন, হাঁ। যে কোন প্রাণীর প্রতি সদয় ব্যবহার করলে ছাওয়াব লাভ করা যায়।– বুখারী, মুসলিম।

About আল্লামা জলীল আহসান নদভী