রাহে আমল – ২য় খণ্ড

জিহাদ অধ্যায়

ইসলামী অন্দোলন না করার পরিণাম

(আরবী*****************)

শব্দের অর্থঃ (আরবী) ফাআরাফতু- আমি বুঝতে পারলাম। (আরবী)হাফারাহু- তাঁকে আঘাত করেছে। (আরবী) ফাতাওয়াযযাআ- অতঃপর তিনি ওযু করলেন। (আরবী) ফালা ইয়াতাকাল্লামু আহাদান- কারো সাথে কথা বললেন না। (আরবী) মুরু বিল মারুফি- ভালো কাজের আদেশ দাও। (আরবী) তাদউনী- তোমরা আমাকে ডাকো। (আরবী) লা- উজীবুকুম- আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবো না।

৪৫৩।হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক দিন রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে এলেন। তখন তাঁর মুখমন্ডল দেখে আমার মনে হলো যে, কোন জিনিস যেন তাকে আঘাত করেছে। অতঃপর তিনি ওযু করেন এরবং বের হয়ে যান। এ সময়ের মধ্যে তিনি কাউকে কিছু বললেন না। আমি হুজরার ভিতর থেকেই তাঁর নিকটবর্তী হলাম। তখন আমি শুনতে পেলাম, তিনি বলেন,হে জনসমাজ, আল্রাহ তায়ালা নিশ্চয়ই বলেছেন যে, তোমরা অবশ্য অবশ্যই ন্যায়ের আদেশ করবে এবং অন্যায় ও পাপ কাজ হতে লোকদের বিরত রাখবে, সে অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার পূর্বে যখন তোমরা আমাকে ডাকবে, কিন্তু আমি সাড়া দিবো না। তোমরা আমার কাছে চাইবে। কিন্তু আমি তোমাদেরকে দিবো না। তোমরা আমার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করবে, কিন্তু আমি তোমাদের সাহায্য করবো না। – মুসনাদে আহমদ, ইবনে মাজাহ

(আরবী******************)

শব্দের অর্থঃ (আরবী) লাতামুরুন্না- তোমরা অবশ্যই হুকুম দিবে। (আরবী) লাতনহাওনা- তোমরা অবশ্যই নিষেধ করবে। (আরবী) লাইয়াসহাতান্নাকুম- তোমাদেরকে অবশ্যই ধ্বংস করবেন।(আরবী) লাইউআম্মিরান্নাকুম- তোমাদেরকে অবশ্যই নেতা করা হবে।

৪৫৪।হযরত হুযাইফা ইবনে  ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা অবশ্যই মারুফ- এর আদেশ করবে, মুনকার থেকে নিষেধ করবে, অন্যথায় আল্লাহ যে কোন আযাবে তোমাদের সকলকেই ধ্বংস করবেন কিংবা তোমাদের উপর শাসনকর্তা নিয়ুক্ত করে দিবেন। এ সময় তোমাদের মধ্যকার নেকার লোকেরা মুক্তিলাভের জন্য আল্লাহ কাচে দোয়া ও কান্নাকাটি করবে, কিন্তু তাদের দোয়া আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না।– মুসনাদে আহমদ

জিহাদের ধারা ও প্রকৃতি

(আরবী***********)

শব্দের অর্থঃ (আরবী) জাহিদূ- তোমরা জিহাদ করো। (আরবী) লা- তুবালূ- তোমরা ভ্রমণ করো না। (আরবী) আকীমূ- তোমরা কায়িম করো।(আরবী) হুদূদুল্লাহি- আল্লাহর হুদুদ, দন্ডবিধি। (আরবী) ইউনজী- নাজাত দেবেন।

৪৫৫।হযরত উবাদা ইবনুস সামেত রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা সকলে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিকটবর্তী ও দূরের লোকদের সাথে জিহাদ করো এবং আল্লাহর ব্যাপারে তোমরা কোন উৎপীড়কের উৎপীড়নের বিন্দুমাত্র ভয় করো না। পরন্তু তোমরা দেশ বিদেশে যখন যেখানেই থাক, আল্লাহর আইন ও দন্ড বিধানকে কার্যকর করে তোল। তোমরা অবশ্যই আল্লাহর পথে জিহাদ কর, কেননা জিহাদ হচ্ছে জান্নাতের অসংখ্য দরজার মধ্যে একটি অতি বড় দরজা। এ দ্বার পথের সাহায্যেই আল্লাহ তায়ালা (জিহাদকারী লোকদেরকে) সকল প্রকার চিন্তা ভাবনা ও ভয় ভীতি হতে নাজাত দান করবেন।– মুসনাদে আহমদ, বায়হাকী

জিহাদের চূড়ান্ত লক্ষ

(আরবী*************)

শব্দের অর্থঃ (আরবী) ইউকাতিলু- লড়াই করে। (আরবী) লিযযিকরি – সুনামের জন্য। (আরবী) লিইউরিয়া মাকানাহূ- তার মার্যাদা দেখাবার জন্য।(আরবী) কালিমাতুল্লাহি- আল্লাহর বাণী)

৪৫৬।হযরত আবূ মূসা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্নিত। একজন বেদূঈন রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উপস্থিত হয়ে বললো, এক ব্যক্তি সুনাম সুখ্যাতির জন্য যুদ্ধ করে, আর এক ব্যক্তি প্রসংসা লাভের আশায় যুদ্ধ করে, আর এক ব্যক্তি যুদ্ধ করে এই জন্য যে, লোকেরা তার মান মর্যাদা দেখুক,(এদের মধ্যে কার যুদ্ধ ঠিক) উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন ঃ যে ব্যক্তি যুদ্ধ করে এ উদ্দেশ্যে যে, আল্লাহর কালেমা সর্বোচ্চ ও সর্বোন্নত হোক, তার যুদ্ধই মহান আল্লাহর (প্রদর্শিত) পথে সম্পন্ন হয়।– আবূ দাউদ

জিহাদের স্তরঃ

(আরবী***********)

শব্দের অর্থঃ (আরবী) বাআসাহুল্লাহু- আল্লাহ পাঠিয়েছেন। (আরবী) হাওয়ারিয়ূনা- সাহায্যকারীগণ। (আরবী) ইয়াকতাদূনা- তারা অনুসরণ করতো। (আরবী) মা লা ইউমারুনা- যে ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হয়নি। (আরবী) মান জাহাদাহুম- তাদের সাথে যে যুদ্ধ করে।(আরবী) হাব্বাতু খারদালিন- এক বিন্দু পরিমাণ।

৪৫৭।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমার পূর্বে যে কোন উম্মতের প্রতি যে নবীই আল্লাহ তাআলা পাঠিয়েছেন তাঁরই কিছু সহকর্মী ও যোগ্য সাথী হয়েছে। তাঁরা তাঁর প্রদর্শিতপথে চলতো, তাঁর হুকুম পালন করতো। এরপর তাদের অনুপযুক্ত উত্তরাধিকারীগণ তাদের স্থলাভিষিক্ত হলো আর তাদের অবস্থা হলে এই যে, তারা এমন কথা বার্তা বলতো, যে তারা নিজেরা করতো না। (অর্থাৎ লোকদের তো ভাল কাজ করতে বলতো, কিন্তু তারা নিজেরা করতো না) এর অপর অর্থ এই যে, যে কাজ বাস্তবিকই করনীয় তা তারা নিজেরা করতো না, কিন্তু মানুষের কাছে বলতো যে, আমরা এটা করছি।নিজেদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া গদি রক্ষার জন্য এই সুস্পষ্ট মিথ্যা কথা বলতে তারা কুণ্ঠিত হতো না আর যে কাজ করার তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়নি, তাই তারা করতো। (অর্থাৎ নিজেদের নবীর সুন্নাত এবং তাঁর আদেশ নিষেধ অনুযায়ী তারা নিজেরা তো চলতো না, কিন্তু যেসব গুনাহ ও বিদায়াতী কাজের কোন নির্দেশই তাদেরকে দেয়া হয়নি তা তারা খুব বেীশ করেই করতো।) এরুপ অবস্থায় যারা এদের বিরুদ্ধে নিজেদের দুহাতের শক্তির দাবারা জিহাদ করে সে ঈমানদার। আর যে ব্যক্তি (তা সরতে অসমর্থ হয়ে) অন্তত শুধু মুখের দ্বারা এর বিরুদ্ধে জিহাদ করে সেও মুমিন। আর যে (মুখের জিহাদ করতে অসমর্থ হয়ে ) কেবলমাত্র মন দ্বারাই এর বিরুদ্ধে জিহাদ করে (অর্থাৎ মন দ্বারা এতে ঘৃণা করে ও এর বিরুদ্ধে ক্রোধ ও অসন্তোষ পোষণ করে) সেও মুমিন। কিন্তু এতটুকুও যে না করবে, তার মধ্যে একবিন্দু পরিমাণও ঈমান বর্তমান নেই।–মুসলিম

জিহাদ ও ঈমান

(আরবী***********)

শব্দের অর্থঃ(আরবী) লাম ইয়াগযূ- যুদ্ধ করেনি। (আরবী) লাম ইউহাদ্দিস- কথা বলেনি। (আরবী) শু বাতিম মিন্নিফাকি- মুনাফিকীর এক শাখা।

৪৫৮।হযরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি মরে গেলো, অথচ সে না জিহাদ করেছে আর না তার মনে জিহাদের জন্য কোন চিন্তা, সংকল্প ও ইচ্ছার উদ্রেক হয়েছে, তবে সেই ব্যক্তি মুনাফিকের ন্যায় মরলো।–মুসলিম

জিহাদে অর্থ ব্যয়ঃ

(আরবী*********)

শব্দের অর্থঃ (আরবী) মান আনফাকা- যে খরচ করেছে।(আরবী) ফী সাবীলিল্লাহি- আল্লাহর পথে। (আরবী) কুতিবাত- লিখা হবে। (আরবী) সাবউ মিয়াতি দিফিন- সাতশত গুণ।

৪৫৯।খুরাইম ইবনে ফাতিক থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বরেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে যত কিছু খরচ করবে তার জন্য সাতশত গুন বেশি সওয়াব লিখে দেয়া হবে।–তিরমিযি

(আরবী**********)

শব্দের অর্থঃ (আরবী) যুদ্ধ সাজে সজ্জিত করবে।(আরবী) যে ব্যক্তি তার অনুপস্থিতিতে তার পরিবারের দেখাশুনা করবে।

৪৬০।হযরত যাইদ ইবনে খালিদিল জুহানী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি জিহাদকারীকে যুদ্ধসাজে সজ্জিত করবে কিংবা জিহাদকারীর অনুপস্থিতিতে তার পরিবারবর্গের রক্ষাণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে, তার জন্য টিক জিহাদকারীর অনুরুপ সওয়াব লিখিত হবে। কিন্তু সে কারণ মুল জিহাদকারীর জিহাদের সওয়াব হতে এক বিন্দুও কম করা হবে না। – মুসনাদে আহমদ

ব্যাখ্যাঃ মুসলিম শরীফে এই পর্যায়ে হাদীস হলঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তি জিহাদকারীকে প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করে দিলো, সে যেন নিজেই জিহাদ করলো। আর যে লোক জিহাদকারীর অনুপস্থিতিতে তার পরিবারবর্গের কল্যাণ সাধনের দায়িত্ব গ্রহন করলো, সেও যেন প্রত্যক্ষ জিহাদে যোগদান করলো।

(আরবী*******) যেসব লোক মুসলিম সাধারণের পক্ষে কল্যাণকর কাজে নিযুক্ত রয়েছে, কিংবা তাদের কোন সামগ্রিক দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত হয়েছে, সে সব লোকদের প্রতি কল্যাণময় আচরণ করার এবং তাদের জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ সেই সব কাজ আঞ্জাম দেয়ার প্রতি এই হাদীসে লোকদেরকে উৎসাহ দান করা হয়েছে।

অন্যকথায়, হয় তমি নিজে জিহাদে আত্ননিয়োগ কর, না হয় জিহাদে নিযুক্ত লোকদের ও তাদের পরিবারবর্গের প্রয়োজন পূরণের কাজে নিয়োজিত থাক। মুসলমানদেরর জন্য তৃতীয় কোন উপায় থাকতে পারে না।

-সমাপ্ত-

About আল্লামা জলীল আহসান নদভী