হাদীস শরীফ – ৩য় ও ৪র্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

কন্যা ও ভগ্নিদের লালন-পালন

****************************************

হযরত আবূ সায়ীদ খুদরী (রা) হইত বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, হযরত রাসূলে করীম (স) বলিয়াছেনঃ যে লোকের তিনটি ভগ্নি আছে; কিংবা আছে দুইটি কন্যা, অথবা দুইট বোন এবং সে তাহাদের সহিত উত্তম সম্পর্ক-সাহচর্য রক্ষা করিয়াছে ও তাহাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করিয়াছে, সে জান্নাত লাভ করিবে।

(তিরমিযী)

ব্যাখ্যাঃ হাদীসে তিনটি বোন বা দুইটি বোন অথবা দুইটি কন্যার কথা বলা হইয়াছে। কিন্তু এই সংখ্যাটাই এখানে কোন মুখ্য বা অপরিবর্তনীয় ও নিশ্চিত রূপে নির্দিষ্ট বিষয় নয়। সম্ভবত রাসূলে করীম (স)-এর এই কথাটির মূল উদ্দেশ্য হইল কন্যা সন্তান কিংবা ভগ্নিদের ভাল ভাবে রক্ষণাবেক্ষণ ও শুভ পন্হায় লালন-পালন করার গুরুত্ব বোঝানো ও এই কাজে লোকদিগকে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করা-সংখ্যা তাহাদের যাহাই হউক না কেন। তবে মেয়েদের লালন-পালন ও রক্ষণা-বেক্ষণ এমনতেই খুব জটিল ব্যাপার। তাহাতে যদি একাধিক মেয়ে বা একাধিক বোন থাকে, তবে তাহাদের লালন-পালন ও রক্ষণাবেক্ষণ অধিকতর জটিল ও দুঃসাধ্য হইয়া পড়ে। একের অধীক সংখ্যক বোন বা কন্যার কথা বলিয়া রাসূলে করীম (স) এই অধিক জটিলতার কথা বুঝাইতে চাহিয়াছেন মাত্র।

বস্তুত মেয়েদের লালন-পালন ও রক্ষণা-বেক্ষণের ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজন রহিয়াছে। তাহাদিগকে শুধু খাওয়া-পরা দিলেই তাহাদের লালন-পালন দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে আদায় হয় না। বিশেষত মেয়ে কিংবা বোন যে-ই হউক, তাহাকে বিবাহ দিতে হইবে, পিতা বা ভাইর ঘর হইতে চলিয়া গিয়া তাহাকেক ভিন্ন তর এক পরিবার ও পরিবেশে স্বামীর সহিত ঘর বাঁধিতে ও জীবন কাটাইতে হইবে। তাহার গর্ভজাত সন্তানকে কেন্দ্র করিয়া বংশের একটা নূতন ধারা সূচিত ও নূতন সমাজের সদস্য গঠিত হইয়া উঠিবে। তাহাদের প্রথমে স্ত্রী, গৃহবধু এবং পরে সন্তানের মা হইতে হইবে। কাজেই এই দৃষ্টিতেই সুসম্পন্ন করিতে হইবে তাহাদের লালন-পালন ও শিক্ষণ প্রশিক্ষণ।

শুধু শিক্ষাদান করা-ই তো নয়, সর্বোপরি তাহাদের রক্ষণাক্ষেণ অত্যন্ত দুরূহ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। মেয়েরা চোট বয়সের থাকা অবস্থায় একরকমের নাজুকতার সম্মুখীন হইতে হয়, আর বয়স বৃদ্ধির ও তাহাদের যৌবনে পদার্পন করার পর এই নাজুকতা শতগুণ বৃদ্ধি পাইয়া যায়। নবী করীম (স) আলোচ্য কথাটি বলিয়া কন্যাদের পিতা বা ভাইদের অতিশয় কঠিন দায়িত্বের কথা স্মরণ করাইয়া ও সে বিষয়ে তাহাদিগকে সদা সচেতন সতর্ক থাকার কথা বলিয়াছেন, ************ ‘তাহাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করিল’ কথাটির অর্থ ইহাই। এই দিক দিয়া হাদসটির গুরুত্ব অপরিসীম। তাহারা যদি এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করিতে পারে, তবে তাহাদের পক্ষে বেহেশতে যাওয়া সহজ হইবে। অন্যথায় অন্যান্য হাজারও নেক আমল থাকা সত্ত্বেও বেহেশতের পথে ইহাই বিরাট বাধা হইয়া দাঁড়াইতে পারে।

এই হাদীসটির অপর একটি বর্ণনার ভাষা এইরূপঃ

তোমাদের কাহারও তিনটি কন্যার কিংবা তিনটি ভগ্নি থাকিলে ও তাহাদের কল্যাণ সাধন করিলে সে জান্নাতে যাইব্

বুখারীর আদাবুল মুফরাদের উদ্ধৃত বর্ণনায় অতিরিক্ত শব্দ হইল ***** ‘তাহাদের ব্যাপারে সে ধৈর্য ধারণ করিল’। ইবন মাজাহার বর্ণনায় অতিরিক্ত শব্দগুলি হইলঃ

****************************************

তাহাদিগকে খাওয়াইল, পান করাইল ও কাপড় পোশাক পরিতে দিল।

আর তাবারানী গ্রন্হে হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর বর্ণনায় অতিরিক্ত শব্দ হইলঃ

****************************************

তাহাদের জন্য ব্যয় করিল, তাহাদিগকে বিবাহ দিল এবং তাহাদিগকে উত্তম আদব-কায়দা ও স্বভাব চরিত্র শিক্ষা দিল।

এই হাদীস হইতে স্পষ্ট বুঝা যায়, পিতার অবর্তমানে পিতার কন্যান-অর্থাৎ বোনদের লালন পালনের দায়িত্ব ভাইদের উপর অর্পিত হয়।

(********)

কন্যা সন্তানের ব্যাপারে অগ্নি পরীক্ষা

****************************************

যে লোক কন্যাদের ব্যাপারে বিপদগ্রস্থ ও পরীক্ষার সম্মুখীন হইবে এবং তাহাদের ব্যাপারে হইবে অবিচল ধৈর্যশালী, এই কন্যারা তাহার জন্য জাহান্নাম হইতে আবরণ হইয়া দাঁড়াইবে।

(তিরমিযী)

মূল হাদীসের শব্দ হইতেছে **** এই শব্দটি **** হইতে বানানো হইয়াছে। এখানে ইহার যথার্থ তাৎপর্য কি সে বিষয়ে নানা কথা উদ্ধৃত হইয়াছে। প্রশ্ন হইয়াছে, **** শব্দের মূল অর্থ বিপদগ্রস্থ হওয়া। পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার সঠিক তাৎপর্য কি? ইহা কি তাহাদের অস্তিত্বের কারণে?…. কাহারও কন্যা সন্তান হওয়াটাই কি বিপদের কারণ?….. কন্যা হওয়াই যদি পিতার পক্ষে বিপদের কারণ হয়, তাহা হইলে দুনিয়ায় মানব বংশের ধারা চলিবে কি ভাবে? উপরন্তু ইহা কি সাধারণভাবে কন্যামাত্রের ব্যাপারেই প্রযোজ্য, না বিশেষ বিশেষ কন্যার ক্ষেত্রে? কিংবা কন্যাদের কারণে পিতাকে যে সব অসুবিধার সম্মুখীন হইতে হয়, অথবা কন্যাদের যেসব আচরণ ও চরিত্র সাধারণতঃ হইয়া থাকে, এই কথাটি সেই জন্য?

ইবনে বাত্তাল এ বিষয়ে বলিয়াছেন, এই ব্যাপারটি ***** বলা হইয়াছে এই জন্য যে, জাহিলিয়াতের যুগে আরব সমাজের লোকেরা সাধারণত কন্যা সন্তানদেরকে ঘৃণা করিত, কাহারও ঘরে কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহণ করিলে তাহার মনে ক্ষোভ ও অসন্তুষ্টির উদ্রেক হইত এবং তাহাদিগকে হত্যঅ করিতে উদ্যত হইত। এ কালেও কন্যা সন্তানের জন্ম হইলে পিতা-মাতা বা নিকটাত্মীয়রা খুব উৎফুল্ল ও উল্লাসিত হইয়া উঠে, এমন কথা বলা যায় না। বরং বিভিন্ন দেশের গর্ভবতীয়রা গর্ভস্থ সন্তানের লিঙ্গ জানিতে অত্যাধুনিত যন্ত্রপাতির সাহায্যে চেষ্টা করিতেছে। তাহার ফলে গর্ভে কন্যা সন্তানের উদ্ভব হইয়াছে জানিতে পারিলে ভারতীয় হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদী ও চৈনিক বৌদ্ধ সমাজতান্ত্রিবাদী সমাজের এক শ্রেণীল মেয়েরা গর্ভপাত করিয়া উহাকে নিশ্চিহ্ন করিয়া দেয়। রাসূলে করীম (স)-এর এই শব্দ প্রয়োগ এই প্রেক্ষিতে হইয়াছে বলিয়া মনে করা যাইতে পারে। এই রূপ বলিয়া তিনি আসলে লোকদিগকে এই মানসিকতা পরিহার করিতে এবং কন্যাদের প্রতি অস্থাশীল হইবার জন্য তাহাদের জীবনের শক্র না হইয়া তাহাদের কল্যাণকামী হওয়ার আহবান জানাইয়াছেন। সেই সঙ্গে তাহাদের অযত্ন করা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা ও তাহাদের হত্যা করা হইতে বিরত রাখিতে চাহিয়াছেন।

হাফেয ইরাকী বলিয়াছেন, ***** শব্দের অর্থ এখানে হইতে পারে ***** যাচাই করা বা পরীক্ষা গ্রহণ। অর্থাৎ কাহারও ঘরে কন্যা সন্তানের জন্ম তাহার জন্য একটা বিশেষ পরীক্ষা। একজনকে পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যেই তাহাকে কন্যা সন্তান দেওয়া হয়। সে পরীক্ষা এই ব্যাপারে যে, সে কন্যা সন্তানের প্রতি বিরুপ ব্যবহার করে, যত্ন করে কি অযত্ন, তাহার সঠিক লালন-পালন করে, না তাহার প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শণ করে, তাহাকে বন্য পশু সন্তানের মত লাগাম শূণ্য করিয়া ছাড়িয়া দেয়, না গৃহপালিতের মত বাঁধিয়া-ছাঁদিয়াও রাখে ও নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করে। আর বিশেষ ভাবে কন্যা-সন্তান যে পিতার জন্য এই দিক দিয়া একটা কঠিন পরীক্ষার ব্যাপার তাহাতে একবিন্দু সন্দেহ নাই। হযরত আবূ সায়ীদ (রা) বর্ণিত আলোচ্য হাদীসে এই কারণেই ****** বলিয়া কন্যাদের ব্যাপারে ভয় করিয়া চলার কথা বলা হইয়াছে। বস্তুত যে লোক আল্লাহকে ভয় করে, সেই কন্যা সন্তানের সুষ্ঠু ও সঠিক লালন-পালন ও প্রশিক্ষণের দায়িত্ব আন্তরিক ভাবে পালন করে এবং তাহা করিয়া সে আল্লাহর নিকট হইতে অশেষ সওয়াবের অধিকারী হয়। তাই এই হাদীসটিতে বলাহ হইয়অছে, ****** ‘এই কন্যারাই তাাহর জাহান্নামে যাওয়ার পথে প্রধান অন্তারায় হইয়া দাঁড়াইবে’। পক্ষান্তরে যদি কোন পিতা কন্যা-সন্তানের প্রতি গুরুত্ব না দেয় যথার্থ লালন-পালন না করে, তাহাকে যদি সৎ শিক্ষা দিয়া চরিত্রবতী না বানায়, অসৎ সংসর্গে পড়িয়া উচ্ছৃংখল হইবার জন্য যদি তাহাকে উম্মুক্ত করিয়া ছাড়িয়া দেয়, উপযুক্ত সময়ে ভাল ছেলের সহিত তাহার বিবাহ না দেয়, তাহা হইলে এই কন্যারাই তাহার জাহান্নামে যাওয়ার বড় কারণ হইয়া দাঁড়াইবে, ইহাতে কোনই সন্দেহ নাই।

আলোচ্য হাদীসে কন্যা সন্তানদের হক ও অধিকার যে অনেক বেশী এবং তাহাদের ব্যাপারে পিতার দায়িত্ব ও কর্তব্য যে অধিক তীব্র ও গুরুত্বপূর্ণ, সে কথা বিশেষ বলিষ্ঠ ভংগীতে বলা হইয়াছে। হাদীসে বহু বচন ব্যবহৃত হইতে দেখিয়া কাহারও মনে এই ধারণা আসা উচিত নয় যে, একাধিক কন্যা হইলেই বুঝি তাহা বিপদের কারণ হয় এবং তাহাদের দ্বারা তাহার পরীক্ষা হইতেছে বলিয়া মনে করা যাইতে পারে, একটি কন্যা হইলে তুমি এই কথা প্রযোজ্য নয়। না-ইহা ঠিক নয়। কেননা কন্যা মাত্রই গুরুদায়িত্ব ও কঠিন পরীক্ষার ব্যাপার। একাধিক হইলে এই গুরুদায়িত্বের মাত্রা অনেক বৃদ্ধি পাইয়া যায় এবং পরীক্ষাও হয় অধিক তীব্র ও কঠিন। তখন তাহা হয় কঠিন অগ্নি পরীক্ষা।

কন্যাদের ব্যাপারে এইরূপ বলার একটা নৃতাত্বিক কারণও আছে। তাহা এই যে, কন্যা সন্তান পুত্র সন্তানের তুলনায় জন্মগতভাবেই দুর্বল হইয়া থাকে। কেননা একটা ছেলে সাধারণভাবে দশ বার বৎসর বয়সে যতটা কর্মক্ষম হয়, একটা মেয়ে তাহা হয় না। দৈহিক সংস্থা সংগঠনের জন্মগত পার্থক্যের কারণেই এই কথা অনস্বীকার্য।

(*****************)

সন্তানদের প্রতি স্নেহ বাৎসল্য

****************************************

হযরত আসমা বিনতে আবূ বকর (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনুজ্জুবাইরকে গর্ভে ধারণ করিয়াছিলেন মক্কা শরীফে থাকা অবস্থায়। তিনি বলিয়াছেন, আমি মক্কা হইতে যখন হিজরত করার উদ্দেশ্যে বাহির হইলাম, তখন আমি গর্ভমাসসমূহ পুর্ণ করিতেছিলাম। পরে মদীনায় আসিয়া আমি কুবা’য় অবস্থান গ্রহণ করিলাম এবং এই কুবা’য়ই আমি তাহাকে প্রসব করিলাম। পরে আমি তাহাকে লইয়া রাসূলে করীম (স)-এর নিকট উপস্থিত হইলাম এবং তাহাকে তাঁহার কোলে রাখিয়া দিলাম। তিনি একটি খেজুর আনিতে বলিলেন। তিনি খেজুরটি চিবাইয়া তাহার মুখের মধ্যে ঢুকাইয়া দিলেন। আবদুল্লাহর পেট সর্বপ্রথম যে জিনিস প্রবেশ করিল, তাহা হইল রাসূলে করীম (স)-এর মুখের পানি। অতঃপর তিনি খেজুরটিকে ‘তাহনীক’ করিলেন। ইহার পর তিনি তাহার জন্য দোয়া করিলেন। তাহার জীবনে বরকত হওয়ার জন্যও দোয়া করিলেন। আবদুল্লাহই ছিলেন প্রথম সন্তান, যে ইসলামের যুগে জন্মগ্রহণ করিয়াছে। ইহাতে সকল লোক খুব বেশী উৎফুল্ল আনন্দিত হইয়াছিল। কেননা তাহাদিগকে বলা হইয়াছিল যে, ইয়াহুদীরা তোমাদের উপর যাদু করিয়াছে, ফলে তোমাদের ঘরে আর সন্তান জন্মগ্রণ করিবে না।

(বুখারী, মুসলিম)

ব্যাখ্যাঃ সদ্য প্রসূত আবদুল্লাহ ইবনুজ্জুবাইরকে রাসূলে করীম (স) কিভাবে গ্রহণ করিলেন এবং তাহাকে লইয়া তিনিক কি কি করিলেন, উপরোদ্ধৃত হাদীসটিতে তাহারই বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। ইহা হইতে জানা যায়, নবী করীম (স) প্রথমে তাহাকে নিজের কোলে লইলেন। তাহার পর একটি খেজুর আনিতে বলিলেন। তিনি খেজুরটি প্রথমে নিজে মুখে রাখিয়া খুব করিয়া চিবাইলেন ও উহাকে নরম ও দ্রবীভূত করিলেন। ইহার পর তিনি সদ্যজাত শিশুর মুখে নিজের মুখের পানি দিয়া ভিজাইয়া দিলেন। ইহা করার পর তিনি চিবানো খেজুরটি দিয়া ‘তাহনীক’ ***** করিলেন। তাহার পর তিনি আবদুল্লাহর জন্য দোয়া করিলেন, তাহার প্রতি ‘তাবরীক’ করিলেন। তাবরীক করা অর্থ জীবনে ও জীবনের সব কাজে-কর্মে ‘বরকত’ হওয়ার জন্য বলা। আর ‘বরকত’ অর্থ শ্রীবৃদ্ধি। এই দুইটি দোয়া পর্যায়ের কাজ।  অর্থাৎ রাসূলে করীম (স) তাহার সাধারণ কল্যাণ সাধিত হওয়ার জন্য  দোয়া করার পর তাহার জীবনে-জীবনের যাবতীয় কাজে-কর্মে বিপুলভাবে শ্রী-বৃদ্ধি সাধিত হওয়ার জন্য বিশেষভাবে দোয়া করিলেন।

বস্তুত মুসলিম সমাজে সদ্যজাত শিশুর প্রতি কিরূপ আচারণ করা বাঞ্ছনীয়, তাহার মোটামুটি দিগদর্শন এই হাদীসটি হইতে লাভ করা যায়। এক কথায় এই সমস্ত কাজকে বলা হয়, ‘তাহনীক’। এই পর্যায়ের কাজের মধ্যে প্রথম কাজ হইল, সদ্যজাত শিশুকে সমাজের কোন শ্রদ্ধাভাজন সম্মানিত ব্যক্তির-পুরুষ বা মহিলার- কোলে দিতে হইবে। সে ব্যক্তি প্রথমে শিশুটির মুখে নিজের মুখের পানি দিবেন। পরে একটি খেজুর ভাল ভাবে চিবাইয়া নরম করিয়া শিশুটির মুখের তালুতে চাপিয়া বসাইয়া ও লাগাইয়া দিবেন এবং তাহার পর উহার সাধারণ সঠিক কল্যাণ এবং জীবনের সর্বকাজে সর্বক্ষেত্রে শ্রী-বৃদ্ধি হওয়ার জন্য মহান আল্লাহর নিকট দোয়া করিবেন। সদ্যপ্রসূত শিশুর সহিত এইরূপ আচরণ তাহার প্রতি প্রকৃত ও সত্য নিষ্ঠ স্নেহ-বাৎসল্যের প্রতীক। বস্তুত ইহাই ইসলামী সংস্কৃতি সমৃদ্ধ আচরণ।

বিশেষজ্ঞগণ বলিয়াছেন, সদ্য জাত শিশুর প্রতি এইরূপ আচরণ করা মুস্তাহাব- অতীব উত্তম কাজ ও আচরণ। এই কাজে সর্বত্র খেজুর ব্যবহার করিতে হইবে এমন কোন ধরাবাঁধা কথা নাই। খেজুর না পাইলে তৎপরিবর্তে অনুরূপ অন্য যে কোন জিনিস ব্যবহার করা যাইতে পারে, তবে তাহা প্রথমতঃ মিষ্ট হইতে হইবে এবং দ্বিতীয়তঃ চিবাইয়া নরম করা ও গলাইয়া দিতে হইবে- সে জিনিসটির এই রকমই হইতে হইবে। খেজুর পাওয়া না গেলে এতদ্দেশ্যে সাধারণ ভাবে প্রাপ্য উত্তম চকোলেট এই কাজে ব্যবহৃত হইতে পারে। এই জিনিসটি শিশুর মুখের তালুতে লাগাইয়া দিলে মুখের পানির সহিত উহা গলিয়া গলিয়া ধীরে ধীরে মিলিয়া মিশিয়া যাইতে থাকিবে। ফলে শিশুটি দীর্ঘক্ষণ স্বয়ংক্রিয় ভাবে মিষ্টতা পান করিতে পারিবে। এই কাজটি করিবেন এমন নেক ব্যক্তি নিকটে উপস্থিত না থাকিলে শিশুটিকে তাহার নিকটে লইয়া যাইতে হইবে এবং সদ্যজাত শিশুকে পাইয়া সংশ্লিষ্ট সকলেরই আনন্দিত ও উৎফুল্ল উল্লাসিত হইয়া উঠা বাঞ্ছনীয়। তাহাতে আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি যেমন সন্তুষ্টি প্রকাশিত হইবে, তেমনি প্রকাশ পাইবে বিশ্ব মানবতা ও মানব বংশবৃদ্ধির প্রতি শ্রদ্ধা ও আস্থা। ইহা ইসলামী ভাবধারার একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিক। রাসূলে করীম (স) নিজে সদ্য জাত শিশুর প্রতি এইরূপ আচরণ করিতেন। এই কারণে এরূপ করার সর্বসম্মতিক্রমে রাসূলে করীম (স)-এর সুন্নাত।

হযরত আনাস (রা) বলিয়াছেন, ‘হযরত আবু তালহা আনসারীর পুত্র আবদুল্লাহ যখন জন্মগ্রহণ করিলেন, তখন আমি তাঁহাকে লইয়া নবী করীম (স)-এর নিকট উপস্থিত হইলাম। তিনি খেজুর আনিতে বলিলেন এবং খেজুর নিজের মুখে পুরিয়া চিবাইতে লাগিলেন। পরে শিশুটির মুখ খুলিয়া উহার তালুতে লাগাইয়া দিলেন। শিশুটি জিহবা নাড়িয়া চাটিতে ও মিষ্টতা পান করিতে লাগিল।

(মুসলিম)

সন্তানের শিক্ষা প্রশিক্ষণের দায়িত্ব

****************************************

হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিতেন, হযরত রাসূলে করীম (স) বলিয়াছেনঃ যে সন্তানই জন্মগ্রহণ করে তাহার জন্ম হয় স্বভাবসিদ্ধ নিয়ম ও ভাবধারার ভিত্তিতে। পরে তাহার পিতা-মাতা তাহাকে ইয়াহুদী বানায়, বানায় খৃষ্টান কিংবা অগ্নিপূজক। ইহা ঠিক তেমন যেমন চতুষ্পদ জন্তু পূর্ণাঙ্গ, সুগঠিক দেহ সংস্থা সম্পন্ন বাছুর প্রসব করে। তোমরা কি উহার মধ্যে কোন অঙ্গহানী বা কর্তিত অঙ্গ দেখিতে পাও? অতঃপর আবূ হুরায়রা (রা) বলিলেন, তোমার ইচ্ছা হইলে পড়ঃ আল্লাহর সৃষ্টি ব্যবস্থা ও ভাবধারা, যাহার উপর ভিত্তি করিয়া আল্লাহ তা’আলা মানুষ জাতিকে সৃষ্টি করিয়াছেন। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোন রূপ পরিবর্তন নাই।

(মুসলিম)

ব্যাখ্যাঃ ইহা একটি অতীব প্রসিদ্ধ ও দার্শনিক তত্ত্ব সমৃদ্ধ হাদীস। হাদীসটি সাধারণভাবে সমস্ত জীব সন্তানের এবং বিশেষভাবে মানব সন্তানের জন্ম সংক্রান্ত মৌলিক নিয়ম ও ভাবধারার কথা বলা হইয়াছে এবং উহার পর দেখানো হইয়াছে, উত্তম কালে উহার দেহে বা চরিত্রে প্রবৃত্তিতে কিভাবে পরিবর্তন বা বিকৃতি আসে।

রাসূলে করীম (স)-এর প্রথম কথা হইল, মানব শিশু-সন্তান আল্লাহর স্থায়ী নিয়মে ও স্বভাবজাত ভাবধারায়ই জন্মগ্রহণ করে। ইহার পর তাহার পিতা-মাতারই কর্তব্য ও দায়িত্ব হয় তাহারা এই শিশুকে কিভাবে গড়িয়া তুলিবে। তাহারা যেভাবে গড়িতে চাহিবে, শিশু ধীরে ধীরে সেই ভাবে গড়িয়া উঠিবে। ইহাই স্বাভাবিক।

এই মূল কথাটি বুঝাইবার জন্য নবী করীম (স) একটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ করিয়াছেন। দৃষ্টান্তটি সমাজের আশ-পাশ হইতে গৃহীত ও সহজবোধ্য। কোন জটিল তত্ত্ব নয়। মানুষের চারি পাশে যে সব জন্তু-জানোয়ার থাকে, তাহাতে দেখা যায় সে জন্তু-জানোয়ার যে সব বাছুর প্রসব করে, তাহা সম্পূর্ণ নিখুঁত হইয়া জন্ম গ্রহণ করে। উহাতে কোন অঙ্গহানি দেখা যায় না, হাত-পা নাক-কানে কোন কাটা-ছেড়াও লক্ষ্য করা যায় না। দেখা যায় না কোন রূপ অসম্পূর্ণতা বা আঙ্গিক ও দৈহিক কোনরূপ ক্রটি-বিচ্যুতি। ইহাই সৃষ্টির সাধারণ নিয়ম। মানব সন্তানও ঠিক এইরূপ। জন্তু-সন্তান যেমন দৈহিক দিক দিয়া ক্রটিহীন ও খুঁতমুক্ত হইয়া জন্মগ্রহণ করে, মানব-সন্তান নৈতিকতা বা ধর্ম বিশ্বাসের দিক দিয়া অনুরূপ নিখুঁত ও ক্রটিহীত অবস্থায় জন্ম নেয়। যাহা স্বাভাবিক, যাহা স্বভাবের নিয়ম ও ভাবধারা সম্পন্ন, মানুষের স্বভাব প্রকৃতিও সেইরূপ থাকে। সমগ্র বিশ্ব-স্বভাবের মর্মকথা যে আল্লাহ বিশ্বাস ও আল্লাহর আনুগত্য, মানব সন্তানও সেই ভাবধারাসম্পন্ন থাকে উহার জন্ম মুহূর্তে। জন্তু-সাবকের দৈহিক ক্রটিহীনতার দৃষ্টান্ত দিয়া মানব-সন্তানের নৈতিক ও প্রকৃতিগত ক্রটিহীনতা বুঝাইতে চাওয়া হইয়াছে এই হাদীসটিতে। কিন্তু ইহার পর জন্তু-জানোয়ারের দেহে যেমন বিকৃতি ও ক্রটি সূচিত হয়, মানব-শিশুর ক্রমশ বড় হইতে থাকাকালে তাহার স্বভাব, চরিত্র, প্রবণতা ও হৃদয়-বৃত্তিতে বিকৃতি ও বিচ্যুতি সংঘটিত হয়। জন্তুর সন্তানের দেহে বিকৃতি আসে সমাজের লোকদের হাতে প্রচলিত নিয়ম-প্রথার প্রভাবে ও কারণে। আর তাহা এই যে, উহার কান চিড়িয়া দেওয়া হয়, নাক ছেঁদা করা হয়। হাতে পায়ে নানাভাবে কাটার চিহ্ন অংকিত করা হয়। এইরূপ করা ছিল তদানীন্তন আরব জাহিলিয়াতের জামানায় মুশরিক লোকদের দেব-দেবী পূজার একটা বিশেষ পদ্ধতি। তাহাদের উপাস্য দেবতার সন্তুষ্টি বিধানের জন্যই তাহারা এইরূপ করিত। এইরূপ করা না হইলে সে জন্তু শাবক চিরকাল অক্ষত, নিঃখুত ও ক্রটিহীন দেহ লইয়াই বাঁচিয়া থাকিতে পারে। মানব শিশু সন্তানের নৈতিকতা স্বভাব প্রকৃতি ও প্রবৃত্তি-প্রবণতার অনুরূপ বিকৃতি ও বিচ্যুতি আসে পরিবার ও সমাজ পরিবেশ, দেশ চলিত প্রথা ও রাষ্ট্রীয় আইন কানুনের কারণে। আর তাহার সূচনা হয় পিতা মাতার নিকট হইতে। কেননা পিতা-মাতার ঔরসে ও গর্ভে তাহার জন্ম। জন্ম মূহূর্ত হএত সে মায়ের বুকের অপত্য স্নেহ সুধা ও স্তন-দুগ্ধের অমৃত লাভ করে, লাভ করে পিতার অসীম আবেগ মিশ্রিত স্নেহ বাৎসল্য বরা ক্রোড়। এই কারণে শিশু সন্তান পিতা-মাতার নিকট হইতে সামাজিক ও নৈতক প্রভাবও গ্রহণ করে গভীর ভাবে। তখন পিতা-মাতা শিশু সন্তানকে যেরূপ আদর্শে ও ভাবধারায় গড়িয়া তুলিতে ইচ্ছুক হয়, সন্তান ঠিক সেই ভাবধারা লইয়াই লালিত-পালিত ও বড় হইয়া উঠে। এই প্রেক্ষিতেই বলা হইয়াছে, তাহার পিতা-মাতা তাহাকে ইয়াহুদী বানায়, খৃস্টান বানায় বা অগ্নিপূজক বানায়। পিতা-মাতা ইয়াহুদী বানায়, অথচ ইয়াহুদী হইয়া সে জন্মায় নাই, ইয়াহুদী হইয়া সত্য দ্বীন-বিদ্বেষী বা ইসলামের দুশমন হইয়া জীবন যাপন করিবে এ উদ্দেশ্যে তাহাকে সৃষ্টি করা বা তাহার জন্ম অনুষ্ঠিত হয় নাই। পিতা মাতা খৃস্টান বানায় অথচ সে শিশু বড় হইয়া ত্রীত্ববাদে বিশ্বাসী হইবে, হযরত ঈসা (আ) কে আল্লাহর নবী-রাসূল বিশ্বাস করার পরিবর্তে (নায়ুযুবিল্লাহ) আল্লাহর পুত্র বলিয়া বিশ্বাস করিবে, অথবা, এক আল্লাহর বান্দেগী করার পরিবর্তে আগুনের পূড়া ও উপাসনা করিবে কিংবা নিজ হাতে গড়া মূর্তি বা চাঁদ সূর্য পাহাড় বৃক্ষের পূড়া করিবে- এই জন্য তাহার জন্ম হয় নাই। তাহাকে তো সৃষ্টি করা হইয়াছে এক আল্লাহর বান্দেগী করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেই ইহা করিবে না- করিতে জানে না শুধু এই কারণে যে, তাহার পিতা-মাতা তাহাকে স্বভাব নিয়ম ও প্রকৃতি অনুযায়ী এক আল্লাহর বান্দাহ বানাইবার পরিবর্তে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্ম বা মতাবলম্বী বানাইয়া দিয়াছে। শিশু বড় হইয়া কি হইবে তাহা পিতা-মাতার উপর নির্ভরশীল। অতএব শিশুদের উত্তম চরিত্রগঠন ও ইসলামী আদর্শবাদী বানাইয়া তোলা পিতা-মাতার উপর অর্পিত কঠিন দায়িত্ব। এই দায়িত্ব শুরু হইতেই তাহাদিগকে পালন করিতে হইবে। অন্যথায় তাহাদিগকে আল্লাহর নিকট কিয়ামতের দিন কঠিন জওয়াবদিহির সম্মুখীন হইতে হইবে। এই হাদীসের যথার্থতা প্রমাণের উদ্দেশ্যে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) কুরআন মজীদের যে আয়াতটির উদ্ধৃতি দিয়াছেন, আলোচনায় লিখিত সমস্ত কথাই সেই প্রেক্ষিতে লেখা। ইহা হইতেও প্রমাণিত হয় যে, মূলত হাদীসটি কুরআন নিঃসৃত ও কুরআন সমর্থিত। কুরআনের এই আয়াতটিরই সাধারণ বোধ্য ভাষায় ব্যাখ্যা হইতেছে এই হাদীসটি। আয়াতটি স্বয়ং আল্লাহর বাণী; আর হাদীসটি রাসূল (স)-এর মুখে উহারই ব্যাখ্যা।

****************************************

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেনঃ হযরত রাসূলে করীম (স) বলিয়াছেনঃ যে লোক আমাদের শিশু ও ছোট বয়সের লোকদিগকে স্নে বাৎসল্য দেয় না, আমাদের মধ্যে যাহরা বেশী বয়সের তাহাদিগকে সম্মান করে না এবং ভাল কাজের আদেশ করে না ও মন্দ কাজ হইতে নিষেধ করে না, সে আমাদের মধ্যে গণ্য নয়।

(মুসনাদে আহমাদ, বুখারী, তিরমিযী, আবূ দায়ূদ)

ব্যাখ্যাঃ ছোট শিশু আর বয়স্ক বালক-বালিকাদের প্রতি দয়া ও স্নেহ-বাৎসল্য প্রদর্শন সাধারণভাবে সব মানুষেরই কর্তব্য। অনুরূপ কর্তব্য হইতেছে পরিবারের ও সমাজের বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি ও সম্মান প্রদর্শন। সাধারণ ভাবে ইহাই সমস্ত মানুষের জন্য রাসূল (স)-এর উপদেশ। এই প্রেক্ষিতে শিশু সন্তানের প্রতি গভীর স্নেহ মমতা পোষণ করা সেই শিশু সন্তানের পিতা-মাতার পক্ষে যে কতবড় দায়িত্ব ও কর্তব্য তাহা সহজেই বুঝিতে পারা যায়। পিতা মাতার শুধু জৈবিক কর্তব্যই ইহা নয়, ইহা তাহাদের নৈতিক দায়িত্বও।

শিশু বালকদের প্রতি স্নেহ আর বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান মূলত একই ভাবধারার এপিঠ ওপিঠ, শুরু অবস্থা ও পরিণত অবস্থা। আজ যে শিশু সকলের ছোট, কালই সে অনেকের তুলনায় বড় এবং ৩০-৪০ বৎসর পর তাহারাই সমাজের বড় ও বয়স্ক ব্যক্তি। যে সমাজে শিশু বালকদের প্রতি স্নেহ মমতা থাকে, সে সমাজে বয়োঃবৃদ্ধদের প্রতিও থাকে সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ। পক্ষান্তরে যে সমাজে প্রথমটি থাকে না, সে সমাজে দ্বিতীয়টিরও প্রচণ্ড অভাব ও অনুপস্থিতি অনিবার্য। যে সমাজ মানব শিশু অবাঞ্ছিত, সে সমাজে বয়োঃবৃদ্ধরা চরমভাবে উপেক্ষিত, নিদারূন দুর্দশাগ্রস্থ, নিরুপায়, অসহায় ও লাঞ্ছিত।

রাসূলে করীম (স) যে সমাজ-আদর্শ পেশ করিয়াছেন, তাহাতে মানুষের সার্বিক মর্যাদা সমধিক গুরুত্বপূর্ণ। সে মানুষ সদ্যজাত শিশু কিংবা অল্প বয়স্ক বালক অথবা বয়োঃবৃদ্ধ, উপার্জন-অক্ষম- যাহাই হউক না কেন। সে স মাজে কোন অবস্থায় মানুষ উপেক্ষিত ও অবহেলিত হইতে পারে না। মানবতার প্রতি ইহা নির্বিশেষে ও সুগভীর মমত্ব ও শ্রদ্ধাবোধেরই প্রমাণ। এই মানবতাবাদী ও মানব কল্যাণকামী ভাবধারার কারণেই ন্যায়ের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ ইসলামী সমাজের প্রত্যেকটি ব্যক্তির কর্তব্য। এই কর্তব্য ব্যক্তিগতভাবে ও এ কর্তব্য সামষ্টিভাবেও। মানুষকে ভাল বাসিতে হইবে, এই জন্যই মানুষকে ভাল কাজ করার পথ দেকাইতে হইবে। ভাল কাজের উপদেশ দিতে হইবে ও ব্যাপক প্রচার চালাইত হইবে, কল্যাণকর পথে পরিচালিত করিতে হইবে ব্যাপক বিপুল জনতাকে। কেননা ভাল কাজ করা ও কল্যাণকর পথে চলার ইহকালীন পরিণাম যেমন কল্যাণময়, তেমনি পরকালীন পরিণতিও। অনুরূপভাবে মানুষকে ভালবাসিতে হইবে বলিয়াই অন্যায়ের প্রতিবাদ করিতে হইবে, অন্যায়ের যে অন্যায়ত্ব তাহা সকলের সম্মুখে বিশ্লেষণ করিতে হইবে। লোকদের বুঝাইয়া দিতে হইবে, প্রচার করিতে হইবে যে, ইহা অন্যায়, ইহা করা উচিত নয়। সে অন্যায় হইতে লোকদিগকে বিরত থাকার জন্য উপদেশ দিতে হইবে এবং তাহা হইত বিরত রাখিতে হইবে। বস্তুত শিশুদের প্রতি স্নহ মমতা দান, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা সম্মান প্রদর্শন, ন্যায়ের প্রচার আদেশ ও প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বিশ্লেষণ, নিষেদ ও প্রতিরোধ- এই চারওটি কাজ পরস্পর সম্পৃক্ত, সম্পূরক ও একই ধারাবাহিকতার শৃংকলে আবদ্ধ। এই চারওটি কাজ সামাজিক পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। ইহা যেমন পরিবারের ক্ষুদ্র সংকীর্ণ পরিবেশের মধ্যে হইতে হইবে, তেমনি হইতে হইবে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। যে সমাজ বা রাষ্ট্র শিশু সন্তানের সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে না, সে সমাজে ও রাষ্ট্রে বয়োবৃদ্ধদের চরম দূর্গতি অবশ্যম্ভাবী। পরন্তু সে সমাজ-রাষ্ট্র ন্যায়ের প্রতিষ্ঠাতা না হইয়া হয় ন্যায়ের প্রতিরোধকারী। অন্যায়ের প্রতিরোধ করা উহার পক্ষে সম্ভব হয় না, অন্যায় ও পাপের সয়লাবে সমস্ত মানবীয় মূল্যবোধ ও মানবিকতার পয়মাল হইতে দেওয়াই হয় উহার একমাত্র পরিচয়।

তাই রাসূলে করীম (স) বলিয়াছেনঃ এই চারটি কাজ যে করে না, সে আমার মধ্যে গণ্য নয়। হাদীসের শব্দ হইল *****। ইহার সঠিক তাৎপর্য কি? হাদীসবিদদের মতে ইহার একটি অর্থ হইল; ***************** ‘সে (লোক-সমাজ ও রাষ্ট্র) আমার নীতি আদর্শ ও পন্হা বা পথ অনুসারী নয়। ‘কিন্তু ইহার অর্থ এই নয় যে, সে রাসূলের দ্বীন হইতে বহিষ্কৃত হইয়া গিয়াছে বা বাহির করিয়া দেওয়া বা দিতে হইবে। এতটা কড়া অর্থ ইহার নয়। কিন্তু এইরূপ বলার তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। ইহাতে তীব্র শাসন ও তিরষ্কার নিহিত। পিতা যেমন পুত্রের কোন কাজে অসন্তুষ্ট হইয়া বলেঃ তোর সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নাই’ কিংবা তুই যদি এই কাজ কর তাহা হইলে তুই আমার ছেলে নয়। রাসূলে করীম (স)-এর এই কথাটিও তেমনি। পিতার উক্তি কথায়ই যেমন পিতা-পুত্রের সম্পর্ক চিরতরে বিচ্ছিন্ন করিয়া দেওয়া উদ্দেশ্য হয় না- ইহাও তেমনি। কিন্তু তাহা সত্বেও এই চারটি কাজ না করিলে রাসূলে করীম (স)-এর আদর্শ লংঘিত হয় তাহাতে কোন সন্দেহ নাই।

অন্য কেহ কেহ বলিয়াছেন, ইহার অর্থ ************* ‘সে আমার উপস্থাপিত পূর্ণ দ্বীন-ইসলামরে অনুসারী নয়’। অর্থাৎ সে রাসূলের উপস্থাপিত দ্বীনের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক বা শাখাকে অমান্য করিয়াছে, যদিও মূল দ্বীন এখন পর্যন্ত অস্বীকৃত হয় নাই। ইহা সত্ত্বেও রাসুলে করীম (স) তাহাকে নিজের উম্মতের মধ্যে গণ্য করেন নাই। ইহা অতীব সাংঘাতিব কথা।

(************)

সন্তানের উত্তম প্রশিক্ষণ দান

****************************************

হযরত সায়ীদ ইবনুল আ’চ (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, হযরত রাসূলে করীম (স) বলিয়াছেনঃ পিতা সন্তানকে উত্তম স্বভাব-চরিত্রের তুলনায় অধিক উত্তম ভাল কোন দান-ই দিতে পারে না।

(মুসনাদে আহমাদ, তিরমিযী)

ব্যাখ্যাঃ রাসূলে করীম (স)- এর ইন্তেকালের সময় সায়ীদ ইবনুল আ’চ মাত্র নয় বৎসরের বালক ছিলেন। তিনি নিজের কর্ণে রাসূলে করীম (স)-এর এই কথাটি শুনিয়াছেন এমন কথা মনে করা যায় না। ফলে এই হাদীসটি সনদের দিক দিয়া ‘মুরসাল’- যে সাহাবী এই হাদীসের প্রথম ও মূল বর্ণনাকারী তাঁহার নাম এখানে উহ্য। কিন্তু এহা যে নবী করীম (স)-এর বাণী তাহাতে একবিন্দু সন্দেহ নাই। কেননা এই মর্মের ও এই প্রসঙ্গের বহু বাণী সাহাবীদের সনদে বর্ণিত ও উদ্ধৃত হইয়াছে, যাহা তাঁহারা সরাসরিভাবে রাসূলে করীম (স)-এর মুখে শুনিয়া বর্ণনা করিয়াছেন।

হাদীসটির সংক্ষিপ্ত কথনে নবী করীম (স) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বের ব্যাখ্যা দিয়াছেন। পিতা স্বাভাবিক ভাবে পুত্র-কন্যার জন্য অনেক বিত্ত সম্পত্তি রাখিয়া যাইডতে চাহে ও চেষ্টা করে। কিন্তু বিত্ত-সম্পত্তি দেওয়া পিতার বিশেষ কোন দেওয়া নয়। এই দেওয়া কোন কৃতিত্বের দাবি রাখে না। যদি সন্তানকে উত্তম চরিত্র ও ভাল আদব কায়দা শিক্ষা দিতে না পারে, তবে তুলনামূলকভাবে ইহাই তাহার সর্বোত্তম ও ভাল আদব-কায়দা সম্পন্ন সন্তানের পক্ষে কিছুমাত্র কঠিন হইবে না। চরিত্রহীন ছেলের হাতে যদি বিপুল ধন-সম্পদ রাখিয়অ যায়, তাহা হইলে সে কেবল ধন-সম্পদই বিনষ্ট করিবে না, নিজেকেও ধ্বংস করিবে। তাই চরিত্র শিক্ষাদানের গুরুত্ব ও মর্যাদা সর্বাধিক।

(****************)

সন্তানদের প্রতি পিতার অর্থনৈতিক কর্তব্য

****************************************

হযরত সায়াদ ইবনে আবূ অক্কাচ (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, রাসূলে করীম (স) আমাকে দেখিবার জন্য আসিলেন। এই সময় আমি মক্কায় অবস্থান করিতেছিলাম। তিনি যে স্থান হইতে হিজরত করিয়া গিয়াছেন, সেই স্থানে মৃত্যুবরণ করাকে অপছন্দ করিতেছিলেন। রাসূলে করীম (স) বলিলেনঃ আল্লাহ তা’আলা ইবনে আফরাকে রহমত দান করুন। আমি বলিলামঃ হে রাসূল! আমি আমার সমস্ত ধন-সম্পদ অছিয়ত করিতেছি। তিনি বলিলেন, না। আমি বলিলাম, তাহা হইলে অর্ধেক? বলিলেন, না। বলিলাম, এক তৃতীয়াংশ, বলিলেনঃ হ্যাঁ, এক তৃতীয়াংশ করিতে পার এবং ইহা অনেক। তুমি যদি তোমার উত্তরাধিকারীদিগকে সচ্চল ও ধনশালী রাখিয়া যাইতে পার তবে তাহা তাহাদিগকে  নিঃস্ব দরিদ্র ও লোকদিগকে জড়াইয়া ধরিয়া ভিক্ষাকারী বানাইয়া রাখিয়া যাওয়া অপেক্ষা অনেক উত্তম। আর তুমি যাহা কিছুই ব্যয় কর, তাহা সাদকা হইবে। এমন কি, যে খাদ্যমুঠি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে তুলিয়া দাও তাহাও। আল্লাহ ততোমাকে শীঘ্র ভাল করিয়া দিবেন। অতঃপর তোমার দ্বারা বহু লোক উপকৃত হইবে এবং অন্যান্য বহু লোক ক্ষতিগ্রস্থ হইবে। এই সময় হযতর সায়াদ ইবনে অক্কাচের একটি কন্যা ছাড়া আর কোন সন্তান ছিল না।

(বুখারী, মুসলিম, আবূ দায়ূদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)

ব্যাখ্যাঃ হাদীসটি প্রখ্যাত সাহাবী হযরত সায়াদ ইবনে আবূ অক্কাচ (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি নিজেই রাসূলে করীম (স)-এর একটি কর্থা বর্ণনা করিয়াছেন। মূল কথাটি বর্ণনা প্রসঙ্গে কথাটির পটভূমিও তিনি বলিয়াছেন। এই হাদীস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইমাম বুখারী তাঁহার একই গ্রন্হের অন্তত দশটি প্রসঙ্গে ও স্থানে এই হাদীসটি বিভিন্ন বর্ণনাকারী সূত্রে উদ্ধৃত করিয়াছেন। সিহাহ সিত্তার প্রত্যেক গ্রন্হেই ইহা উদ্ধৃত হইয়াছে।

হাদীসটির পটভূমি স্বরূপ জানা গিয়াছে, বিদায় হজ্জ উপলক্ষে নবী করীম (স) লক্ষাধিকক সাহাবী সমভিব্যহারে মক্কা শরীফ গমন করিয়াছেন। এই সময় হযরত সায়াদ ইবনে আবূ আক্কাচ (রা) কঠিন রোগে আক্রান্ত হইয়া পড়েন। এই রোগের প্রকৃত রূপ কি ছিল? তাহা অপর একটি বর্ণনা হইতে জানা গিয়াছে। রোগের রূপ বর্ণনা প্রসঙ্গে হযরত সায়াদ (রা) বলিয়াছেনঃ ***************** ‘আমি এই রোগের দরুন মৃত্যুমুখে উপনীত হইয়া গিয়াছি’। অর্থাৎ এই রোগের অতিশয্যে তিনি জীবনে বাঁচিয়া থাকার ব্যাপারে সন্দিহান এবং নিরাশ হইয়া গিয়াছিলেন। এই সময় রাসূলে করীম (স) তাঁহাকে দেখিবার জন্য তাঁহার নিকট উপস্থিত হইলেন। এইখানে মূল হাদীসে একটি বিচ্ছিন্ন বাক্য বলা হইয়াছে। তাহা হইলঃ তিনি যে স্থান হইতে হিজরত করিয়া চলিয়া গিয়াছেন সেই স্থানে মৃত্যু বরণ করিতে তিনি নিতান্ত অপছন্দ করিতেছিলেন। এই তিনি বলিয়া কাহাকে বুজানো হইয়াছে? জওয়াবে বলা যায়, ‘তিনি’ বলিতে স্বয়ং নবী করীম (স) ও হইতে পারেন, হইতে পারেন হযরত সায়াদ। কেহ কেহ বলিয়ানে, বাক্যটি যেভাবে বলা হইয়াছে তাহাতে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, এই অপছন্দকারী নবী করীম (স)। তিনি হযরত সায়াদের রোগাক্রান্ত হওয়ার কথা জানিতে পারিয়া বিশেষ উদ্বিগ্ন হইয়া পড়িয়াছিলেন, কেননা মৃত্যু অবধারিত ও সময় নির্দিষ্ট হওয়া সত্ত্বেও একবার ত্যাগ করিয়া যাওযা এই স্থানে-মক্কায়- হযরত সায়াদ কিংবা তাঁহার ন্যায় অন্য কোন মুহাজির সাহাবী মৃত্যু বরণ করুক তাহা নবী করীম (স) পছন্দনীয় হইত পারে না। কিংবা  এই স্থানটি জন্মভূমি হইলও এখন তাঁহার স্থায়ী বাসস্থান মক্কা নয়-মদীনা। মক্কা হইতে তো তিনি হিজরত করিয়া গিয়াছিলেন। হজ্জব্রত উদযাপনের উদ্দেশ্যে এখানে কিছুদিনের জন্য আসিয়াছেন মাত্র। ইহা এখন তাঁহাদের জন্য বিদেশ। এই বিদেশ বেভূঁইয়ে প্রবাসী অবস্থায় কাহারও মৃত্যু হউক, তাহা কাহারওই পছন্দনীয় হইতে পারে না। এই হইল এই বাক্যটির তাৎপর্য।

এই অপছন্দকারী হযরত সায়াদও হইতে পারেন। কেননা মুসলিম শরীফে এই হাদীসটিতে উদ্ধৃত হইয়াছে, তিনি নবী করীম (স)কে লক্ষ্য করিয়া বলিলেনঃ

****************************************

হে রাসূল যে স্থান হইতে আমি হিজরত করিয়া গিয়াছি সেখানেই আমার মৃত্যু হয় নাকি, যেমন সায়াদ ইবনে খাওলা’র মৃত্যু হইয়াছিল, আমি ইহাই ভয় করিতেছি।

অপছন্দকারী হযরত সায়াদ তাহাই এ উদ্ধৃত হইতে স্পষ্ট ভাষায় জানা গেল। রাসূলে করীম (স) হযরত সায়াদের রোগাক্রান্ত অবস্থা দেখিয়া বলিলেনঃ

****************************************

আল্লাহ ইবনে আফরাকে রহমত দান করুন।

ইবনে আফরা- আফরা’র পুত্র- বলিতে হযরত সায়াদ (রা)কেই বুঝাইয়াছেন। তাহা হইলে ‘আফরা’ কে? দায়ূদী বলিয়াছেন, ইহা অরক্ষিত শব্দ। হাফেয দিমইয়াতী বলিয়াছেন, ভূল বশতঃ এই রূপ বলা হইয়াছে। নাসায়ী গ্রন্হে ‘সায়াদ ইবনে খাওলা’ বলা হইয়াছে। কেননা তিনি মদীনা হইতে মক্কায় আসিয়অ মৃত্যু বরণ করিয়াছিলেন। আল্লামা আইনী লিখিয়াছেন, ইহা হযরত সায়াদের মায়ের নাম হইতে এবং এই হিসাবেই রাসূলে করীম (স) এই বাক্যটি বলিয়াছেন।

হযরত সায়াদ রাসূলে করীম (স) কে বলিলেনঃ ************** ‘আমি আমার সমস্ত ধন-সম্পদ দান করিয়া দিব’। বাক্যটি সংবাদমূলক। অর্থাৎ হযরত সায়াদ (রা) তাঁহার সমস্ত দান করিয়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত রাসূলে করীম (স)কে জানাইলেন। কিন্তু অপর একটি বর্ণনায় এই বাক্যটি জিজ্ঞাসা সূচক। তা হইলঃ ************* ‘হে রাসূল আমি আমার সমস্ত মাল-সম্পদ দান করিয়া দিব’? রাসূলে করীম (স) ইহার জওয়াবে বলিলেনঃ না। অর্থাৎ সমস্ত মাল-সম্পদ দান করিয়া দেওয়া তোমার উচিত নয়। অতঃপর তিনি অর্ধেক মাল-সম্পদ কিংবা দুই তৃতীয়াংশ দান করার অনুমতি চাহেন। রাসূলে করীম (স) ইহার জওয়াবেও ‘না’ বলেন। পরে তিনি জিজ্ঞাসা করেনঃ এক তৃতীয়াংশ দিতে পারি? রাসূলে করীম (স) বলিলেনঃ ********** ‘হ্যাঁ তুমি এক তৃতীয়াংশ দিতে পার। আর যাবতীয় মাল-সম্পদের এক তৃতীয়াংশে তো অনেক। অপর বর্ণনায় **** এর স্থানে ***** উদ্ধৃত হইয়াছে। অর্থাৎ এক তৃতীয়াংশ সম্পদ বেশ বড়।

এখানে প্রশ্ন উঠে, হযরত সায়াদ তাঁহার ধন-সম্পত্তি দান করিয়া দেওয়ার জন্য এতটা ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছিলেন কেন? ইহার জওয়াব তিনি নিজেই দিয়াছেন। এতদসংক্রান্ত প্রশ্নের পূর্বেই তিনি বলিয়াছেনঃ

****************************************

আমার রোগ যন্ত্রণা চরমে পৌঁছিয়া গিয়াছে। (অতঃপর বাঁচিব সে আশা খুবই কম) অথচ আমি একজন ধনশালী ব্যক্তি। কিন্তু আমার একমাত্র কন্যা ছাড়া আর কেহই উত্তরাধিকারী নাই।

এই বর্ণনাটি বুখারী গ্রন্হেই অন্য এক প্রসঙ্গে সায়াদ ইবনে ইবরাহীম বর্ণনাকারী সূত্রে উদ্ধৃত হইয়াছে। আর উপরোদ্ধৃত বর্ণনাটির শেষে বর্ণনাকারীর উক্তি হিসাবে বলা হইয়াছেঃ ****** ‘এই সময় তাঁহার একটি কন্যা ছাড়া (সন্তান  বা উত্তরাধীকারী হইবার মত) আর কেহই ছিল না’। এই কন্যার নাম ছিল আয়েশা। তিনি ও সাহাবী ছিলেন বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। এই কথার সার নির্যাস হইল, হযরত সায়াদ (রা) অসুখের যন্ত্রনায় জীবনে বাচিয়া থাকা হইতে নিরাশ হইয়া গিয়াছিলেন। তখন তাঁহার ধন-সম্পত্তি সম্পর্কে কি নীতি গ্রহণ করিবেন, তাহা লইয়া তাঁহার মনে দুশ্চিন্তার উদয় হইয়াছিল। এই বিষয়ে তিনি নবী করীম (স)কে জিজ্ঞাসা করিলেন যে, তিনি তাঁহার সম্পদ-সম্পত্তি দান করিয়া যাইবেন কিনা। নবী করীম (স) তাঁহাকে মাত্র এক তৃতীয়াংশ অসিয়ত বা দান করার অনুমতি দিলেন। ইহার অধিক দান বা অসিয়ত করিতে স্পষ্ট ভাষায় নিষেধ করিলেন। ইহার কারণ স্বরূপ তিনি বলিলেনঃ তুমি যদি তোমার উত্তরাধিকারীদিগকে সচ্চল ও ধনশালী করিয়া রাখিয়া যাইতে পার তাহা হইলে তোমার মৃত্যুর পর তাহারা জনগণের হাতে পায়ে জড়াইয়া ধরিয়া ভিক্ষাকারী নিঃস্ব ফকীর হইবে-এইরূপ অবস্থায় তাহাদিগকে রাখিয়া যাওয়া অপেক্ষা ইহা অনেক বেশী উত্তম কাজ। ইহা এক তৃতীয়াংশের অধিক অসিয়ত বা দান করিতে নিষেধ করার কারণ। এই কথাটির বিস্তারিত রূপ এইঃ তুমি এক তৃতীয়াংশের অধিকক দান বা অসিয়াত করিও না। কেননা এখন তুমি যদি মরিয়া দাও, তাহা হইলে তুমি তোমার উত্তরাধিকারীদিগকে সচ্ছল ও ধনশালী বানাইয়া রাখিয়া যাইতে পারিবে। আর তুমি যদি জীবনে বাঁচিয়া থাক, তাহা হইলে তুমি দানও করিতে থাকিবে, ব্যয়ও করিতে পারিবে এবং তাহাতে তুমি শুভ কর্মফল লাভ করিতে পারিবে জীবনে মরণে উভয় অবস্থায়। আর তুমি যদি প্রয়োজনে ব্যয় কর, তবে এই ব্যয় দান সদকার ন্যায় সওয়াব পাওয়ার মাধ্যম হইবে। এই দান যে কোন ক্ষেত্রে এবং যে কোন রকমেরই হউক না কেন। অপর দুইটি বর্ণনায় বলা হইয়াছেঃ

****************************************

কেননা তুমি যে কোন ধরনের ব্যয় বহন কর না কেন, উহার দায়িত্ব তুমি যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পাইতে ইচ্ছা কর তাহা হইলে উহার দরুন তোমাকে বিপুল সওয়াব দেওয়া হইবে।

এখানে ব্যয়কে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের ইচ্ছা বা নিয়্যতের সহিত শর্তযুক্ত করিয়া দেওয়া হইয়াছে সওয়াব লাভের ব্যাপারে অর্থাৎ ব্যয় করা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে না হয়, তাহা হইলে সওয়াব পাওয়া যাইবে না। সেই উদ্দেশ্যে হইলে তবেই সওয়াব পাওয়া সম্ভব হইবে।

হাদীসটিতে একটি কথা বিশেষ গুরুত্ব সহকারে বলা হইয়াছে। তাহা হইলঃ

****************************************

এমন কি সেই খাদ্যমুঠি যাহা তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে তুলিয়া দাও….।

অর্থাৎ ইহাও তোমার দান বিশেষ এবং ইহাতেও তোমার সওয়াব হইবে। এই বাক্যটি অপর একটি বর্ণনায় উদ্ধৃত হইয়াছে এই ভাষায়ঃ ***********এমনকি তুমি যাহা তোমার স্ত্রীর মুখে রাখ। উভয় বাক্যের মৌল তাৎপর্য একই এবং অভিন্ন।

এখানে প্রশ্ন উঠে, অসিয়ত প্রসঙ্গে পারিবারিক ব্যয়ের প্রসঙ্গে আনা হইয়াছে কেন? ইহর জওয়াব এই যে, হযরত সায়াদের জিজ্ঞাসা হইতে যখন জানা গেল যে, তিনি বেশী বেশী সওয়াব পাওয়ার জন্য খুবই আগ্রহী অথচ নবী করীম (স) এক তৃতীয়াংশের অধিক অসিয়ত করিতে নিষেধ করিয়া দিলেন। তখন তাঁহাকে সান্ত্বনা দানের উদ্দেশ্যে নবী করীম (স) একথা বলার প্রয়োজন বোধ করিলেন যে, তোমার ধন-মাল তুমি যাহাই কর না কেন উহার কিছু অংশ অসিয়ত কর ও কিংবা স্ত্রী ও সন্তানের জন্য ব্যয় করনা কেন, এমন কি কর্তব্য পর্যায়ের খরচও যদি কর, তাহা হইলেও তুমি তাহাতেই সওয়াব পাইতে পার। তবে শর্ত এই যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ উহার মূলে নিহিত উদ্দেশ্য হইতে হইবে। এই প্রসঙ্গে স্ত্রীর কথা বিশেষভাবে বলা হইল কেন, এই প্রশ্নও উঠিতে পারে। জওয়াবে বলা যাইতে পারে যে, যেহেতু স্ত্রীর ব্যয়বার বহন স্বামীর স্থায়ী কর্তব্যভুক্ত, অন্যান্য ব্যয় সেরূপ নহে আর এই স্থায়ী খরচপত্রে কোন সওয়াব হইবার নয় বলিয়া কাহারও ধারণা জাগিতে পারে, এই কারণে নবী করীম (স) প্রসঙ্গত এই কথাটি বলিয়া এ পর্যায়ের ভূল ধারণা দূর করিতে চাহিয়াছেন।

হাদীসটির শেষাংশে যে বাক্যটি উদ্ধৃত হইয়াছে তাহা হযরত সায়াদের জন্য নবী করীম (স)-এর বিশেষ দোয়া। এই দোয়া তিনি করিয়াছিলেন হযরত সায়াদের জীবন সম্পর্কে আশংকা প্রকাশ করার পরে। তিনি অসুখের তীব্রতার দরুন ভয় পাইয়া গিয়াছিলেন এবং মনে করিয়াছিলেন যে, তিনি হয়ত বাচিবেন না, এই ব্যাগ করিয়া চলিয়া যাওয়া স্থানেই বুঝি মৃত্যু বরণ করিতে হইবে। তিনি নবী করীম (স) প্রশ্ন করিয়াছিলেনঃ ************ ‘হে রাসূল! আমি কি আমার সঙ্গীদে পিছনে এখানে পড়িয়া থাকিব’? অর্থাৎ হজ্জ সংক্রান্ত সমস্ত কাজ-কর্মে সমাপ্ত হইয়া যাওয়অর পর সব মুহাজির সাহাবী তো মক্কা হইতে মদীনায় চলিয়া যাইবেন। তখন কি আমি এখানে একা পড়িয়া থাকিতে বাধ্য হইব? ইমাম কুরতুবী লিখিয়াছেনঃ হযরত সায়াদ মক্কাতে তাঁহার মৃত্যু হইয়া না যায়, এই ভয়ে ভীত হইয়া পড়িয়াছিলেন। এই কারণেই তিনি এই প্রশ্ন করিয়াছিলেন। ইহার জওয়াবে রাসূলে করীম (স) বলিলেনঃ

‘আল্লাহ তোমাকে শীঘ্র ভাল করিয়া দিবেন’। অর্থাৎ এখনই তোমার মৃত্যু হইবে না। বরং তোমার জীবন দীর্ঘ হইবে। কাযী ইয়ায বলিয়াছেন, এই হাদীসের আলোকে মনে হয়, মক্কা বিজয়ের পরও হিজরতের অর্থাৎ মক্কা ত্যাগ করার পূর্বে নির্দেশ বহাল ও কার্যকর ছিল। তবে ইহাও বলা হইয়াছে, যাহারা মক্কা বিজয়ের পূর্বে হিজরত করিয়াছিলেন এই নির্দেশ কেবল তাঁহাদের জন্যই বলবত ছিল। যাহারা উহার পর হিজরত করিয়াছেন তাহাদের জন্য নয়। আর হযরত সায়াদ (রা) মক্কা বিজয়ের পূর্বেই হিজরতকারী ছিলেন। রাসূলে করীম (স)-এর দোয়ার শেষাংশে বলা হইয়াছেঃ ‘তোমার দ্বারা বহু লোক উপকৃত হইবে এবং ক্ষতিগ্রস্থ হইবে অন্য বহু লোক।

এই দোয়াটির তাৎপর্য হইল, হযরত সায়াদ এই রোগে মরিবে না। ইহা হইতে মুক্তি লাভ করিয়া তিনি দীর্ঘদিন বাঁচিয়া থাকিবেন- ছিলেনও তাই। চল্লিশ বৎসরেরও বেশী। এই বৎসরগুলিতে তাঁহার বহু পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করে। উপরন্তু তাঁহাকে যখন ইরাক অভিযানে সেনাধক্ষ নিযুক্ত করা হয়, তখন তিনি এমন বহু লোকের সাক্ষাৎ পাইলেন যাহারা মুর্তাদ (ইসলাম ত্যাগকারী) হইয়া গিয়াছিল ও ইসলামী রাষ্ট্রের বিদ্রোহী হইয়া গিয়াছিল। হযরত সায়াদ (রা) তাহাদিগকে তওবা করিয়া পুনরায় দ্বীন-ইসলাম কবুল করার আহবান জানাইয়া ছিলেন। তাহাদের অনেকেই তাহাই করে। যাহারা তওবা করিয়া দ্বীন-ইসলাম কবুল করিতে প্রস্তুত হয় নাই, তাহাদিগকে তিনি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। তাঁহার এই কাজের ফলে বাস্তবিকই বহুলোক উপকৃত হয় এবং বহু লোক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। [হাদীসের কথাঃ ‘অতঃপর তোমার দ্বারা বহু লোক উপকৃত হইব এবং অন্যান্য বহু লোক ক্ষতিগ্রস্থ হইবে’ কথাটির একটি ব্যাখ্যা হইল, মুসলমান জনগণ তোমার নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধে বিজয়ী হইয়া বিপুল পরিমাণ গণীমতের মাল-সম্পদ লাভ করিবে, আর বহু সংখ্যক মুশরিক তোমার হাতে নিহত পর্যুদস্ত হইয়া বিরাট ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইবে। ইবনুত্তীন বলিয়াছেনঃ তাঁহার দ্বারা উপকৃত হওয়ার কথার তাৎপর্য হইল, হযরত সায়াদ (রা)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত কাদেসীয়া ইত্যদি যুদ্দে বিজয় লাভ। ইহা এক ঐতিহাসিক ব্যাপার। মূলত ইহা নবীকরীম (স)-এর একটি বিস্ময়কর মু’জিজা। তিনি ঘটনা সংঘটিত হওয়ার বহু পূর্বেই এই আগাম সংবাদ জানাইয়া দিয়াছিলেন আল্লাহর নিকট হইতে পাওয়া ইংগিতের ভিত্তিতে।] ইহার মাধ্যমেই নবী করীম (স)-এর দোয়ার বাস্তবতা প্রকট হইয়া উঠে।

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখিয়াছেন, এই হাদীসটি যে সর্বোতভাবে সহীহ সে বিষয়ে মুহাদ্দিসগণ সম্পূর্ণ একমত। ইহাতে অসীয়ত করার সে সর্বনিম্ন পরিমাণ নির্দিষ্ট করা হইয়াছে, ফিকাহবিদদের নিকট ইহাই অসিয়তের মৌল মানদণ্ড। আর তাহা হইল, মুমুর্ষ ব্যক্তির মালিকানাধীন ধন-সম্পত্তির এক তৃতীয়াংশ মাত্র। ইহা অধিকের জন্য অসিয়াত করা কাহারও পক্ষেই জায়েয নয়। বরং উহারও কম পরিমাণের জন্য অসিয়ত করাই বিশেষজ্ঞদের মতে বাঞ্ছনীয়। ইমাম সওরী বলিয়াছেন, বিশেষজ্ঞদের মত হইল অসিয়তের পরিমাণ এক তৃতীয়াংশে কম এক চতুর্থাংশ কিংবা এক পঞ্চমাংশ হওয়াই উচিত, উহার অধিক নহে। ইসলাম সম্পর্কে বিশেষজ্ঞগণ এমত হইয়া বলিয়াছেন, মুমূর্ষ ব্যক্তির যদি উত্তরাধিকারী পুত্র সন্তান কিংবা পিতা-মাতা বা ভাই-চাচা থাকে, তাহা হইলে এক তৃতীয়াংশের অধিকের জন্য অসিয়ত করা কোন প্রকারেই জায়েয নয়। আর যদি তাহা না থাকে তাহা হইলে হযরত ইবনে মাসউদের (রা) মতে সম্পূর্ণ সম্পত্তি অন্য কাহারও জন্য অসিয়ত করিয়া যাইতে পারে। হযরত আবূ মূসা, মসরুক, উবাইদা, ইসহাক, প্রমুখ ফিকাহদিগণও এইমত সমর্থন করিয়াছেন।

হযরত আবূ হুরাইয়রা (রা) হইতে বর্ণিত অপর একটি যয়ীফ হাদীস ইহার সমর্থনে উদ্ধৃত হইয়াছে। হাদীসটি হইল, নবী করীম (স) বলিয়াছেনঃ

****************************************

আল্লাহ তা’আলা তোমাদের ধন-মালের এক তৃতীয়াংশে অসিয়ত বিধিবদ্ধ করিয়া দিয়া তোমাদের আমল সমূহে প্রাচুর্য ও আধিক্য সৃষ্টি করিয়া দিয়াছেন। অতএব সন্তানদিগকে নিঃস্ব সর্বহারা করিয়া রাখিয়া না যাওয়ার জন্য আন্তরিক চেষ্টা চালানো পিতার প্রধান কর্তব্য।

এই হাদীস হইতে প্রমাণিত হয় যে, মুসলিম সমাজের কেহ রোগাক্রান্ত হইয়া পড়িলে তাহার ইয়াদাতের জন্য যাওয়া এবং রোগীর দীর্ঘজীবনের দোয়া করা ও উৎসাহ ব্যাঞ্জক কথা বলা সুন্নাত। ইহা ছাড়া জায়েয উপায়ে ধন-সম্পদ সঞ্চয় করা যে নাজায়েয নয়, তাহাও এই হাদীস হইত অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়।

সন্তানদের প্রতি সমতাপূর্ণ আচরণ গ্রহণ

****************************************

নু’মান ইবনে বশীর হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তাঁহার পিতা (বশীর) তাঁহার এক পুত্রকে একটি দাস দান করিলেন। অতঃপর তিনি নবী করীম (স)কে এই কাজের সাক্ষী বানাইবার উদ্দেশ্যে তাঁহার নিকট আসিলেন। তিনি শুনিয়া জিজ্ঞাসা বরিলেনঃ তোমার সব কয়জন সন্তানকেই কি এই রূপ (দাস) দান করিয়াছ? বশীর বলিলেন, না। তখন নবী করীম (স) বলিলেনঃ তাহা হইলে তোমার এই দাস প্রত্যাহার কর ও ফিরাইয়া লও।

(তিরমিযী, মুসলিম, বুখারী, বায়হাকী)

ব্যাখ্যাঃ হাদীসের শব্দ *** অর্থ দান করা, হেবা করা, কোন রূপ বিনিময় এবং কোন রূফ অধিকার ছাড়াই কাহাকেও কিছু দেওয়া। হযরত বশীর (রা) তাঁহার কোন সন্তানকে তাঁহার দাস দান করিয়া রাসূলে করীম (স)-এর নিকট উপস্থিত হইলেন ও বলিলেনঃ আপনি সাক্ষী থাকুন, আমি আমার এই দাসটিকে আমার এই সন্তানকে দান করিলাম। ইহার জওয়াবে রাসূলে করীম (স) যাহা বলিলেন, তাহার বুখারী মুসলিমে উদ্ধৃত ভাষা হইলঃ

****************************************

তুমি কি তোমার সমস্ত সন্তানকে এইরূপ দিয়াছ?

উত্তরে তিনি যখন বলিলেন-না, তখন নবী করীম (স) বলিলেনঃ

****************************************

তুমি আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমার সন্তানদের মধ্যে দানের ব্যাপারে পূর্ণ সমতা রক্ষা কর।

বুখারী মুসলিমের-ই অপর একটি বর্ণনায় রাসূলে করীম (স)-এর জওয়াবের ভাষা এইঃ

****************************************

আমি জুলুম ও অবিচারের সাক্ষী হইবো না।

এই একই ঘটনার বিভিন্ন ভাষায় উদ্ধৃত  বর্ণনা হইতে হাদীসটির ব্যাপকতা অধিক স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। বস্তুত সন্তাদের মধ্যে বস্তুগত সামগ্রী দানের ব্যাপারে পূর্ণ সমতা রক্ষা করা পিতা-মাতার কর্তব্য। তাহা করা না হইলে- কাহাকেও বেশী কাহাকেও কম; কিংবা কাহাকেও দান করা ও কাহাকেও বঞ্চিত করা স্পষ্টরূপে জুলুম। ইহা কোনক্রমেই ইসলাম সম্মত কাজ নহে। ইমাম তিরমিযী উপরোদ্ধৃত হাদীসটির ভিত্তিতে বলিয়াছেন, দ্বীন-বিশেষজ্ঞগণ সন্তানদের মধ্যে পূর্ণ সমতা রক্ষা করাই পছন্দ করেন। এমনকি স্নেহ-বাৎসল্য ও দান-হেবা সর্বক্ষেত্রেই মেয়ে সন্তান ও পুরুষ সন্তাদের মধ্যে কোনরূপ পক্ষপাতিত্ব বেশী কম বা অগ্রাধিকার ও বঞ্চনার আচরণ আদৌ করা যাইবে না।

পুত্র সন্তানদের পরস্পরের মধ্যে পূর্ণ ন্যায়পরতা ও ভারসাম্য রক্ষার জন্য নবী করীম (স) বিশেষভাবে তাকীদ করিয়াছেন। এই পর্যায়ের হাদীসঃ

****************************************

নুমান ইবনে বশীর (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, হযরত রাসূলে করীম (স) ইরশাদ করিয়াছেনঃ তোমরা তোমাদের পুত্র সন্তানদের পরস্পরের মধ্যে পূর্ণ সুবিচার ও নিরপেক্ষ ন্যায়পরতা প্রতিষ্ঠিত কর, তোমাদের পুত্র সন্তানদের পরস্পরের মধ্যে পুর্ণ সুবিচার ও ন্যায়পরতা প্রতিষ্ঠিত কর, তোমাদের পুত্র সন্তানদের পরস্পরের মধ্যে পুর্ণ সুবিচার ও ন্যায়পরতা প্রতিষ্ঠিত কর।

(মুসনাদে আহমাদ, ইবনে হাব্বান)

ব্যাখ্যাঃ এখানে উদ্ধৃত হাদীসটিতে শুধু পুত্র সন্তানদের পরস্পরের মধ্যে ন্যায়পরতা, পক্ষপাতহীনতা ও পূর্ণ নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নবী করীম (স) পরপর তিনবার একই কথা বলিয়া তাকীদ দিয়াছেন। একই কথা পর পর তিনবার বলার উদ্দেশ্য মূল বিষয়টির উপর অত্যাধিক গুরুত্ব আরোপ বুঝায়।

আর ইহারও পূর্বে উদ্ধৃত হাদীসটিতে **** শব্দ ব্যবহার করিয়া নবী করীম (স) শুধু পত্র সন্তানদের মধ্যেই নয় বরং পুত্র কন্যা নির্বিশেষে সকল সন্তানদের প্রতিই পুর্ণ সমতা ও নিরপেক্ষতা ভিত্তিক সুবিচার প্রতিষ্ঠিত করার নির্দেশ দিয়াছেন। কেননা দুনিয়ায় একমাত্র দ্বীন-ইসলামই সকল পর্যায়ে সকল ক্ষেত্রে ও  ব্যাপারে সকলের প্রতি ন্যায়পরতা ও সুবিচার প্রতিষ্ঠাকামী একমাত্র জীবন বিধান। কুরআন মজীদে নিঃশর্ত ভাবে হুকুম হইয়াছেঃ

****************************************

তোমরা সকলে সুবিচার ও পূর্ণ ন্যায়পরতা-নিরপেক্ষতা স্থাপন কর। কেননা তাহাই আল্লাহ ভয়ের অতীব নিকটবর্তী নীতি।

অন্তরে ঈমান ও আল্লাহর ভয় থাকিলে উহার সহিত অতীব ঘনিষ্ঠ ও সামঞ্জস্যশীল আচরণ নীতি হইল পূর্ণ নিরপেক্ষ ভারসাম্যপূর্ণ সূবিচার। এই ভারসাম্যপূর্ণ সুবিচার ও ন্যায়পরতার উপরই প্রতিষ্ঠিত হইয়া আছে গোটা বিশ্ব ব্যবস্থা। অতএব মানুষের জীবন যাত্রায়- বিশেষ করিয়া পারিবারিক জীবনেও তাহা পুরামাত্রায় প্রতিষ্ঠিত ও কার্যকর হইতে হইবে।

পারিবারিক জীবনে পিতা-মাতার সন্তান হিসাবে পুত্র ও কন্যা সর্বতোভাবে অভিন্ন। সকলেরই দেহে একই পিতা-মাতার রক্ত প্রবাহমান। কাজেই স্নেহ-বাৎসল্য, আদর-যত্ন ও কর্ম সম্পাদনে এই সমতা-অভিন্নতা ও ন্যায়পরতা ও সুবিচার অশ্যই প্রতিষ্ঠিত থাকিতেই হইবে। ইহা এক বিন্দু লংঘিত হইলে গোটা পরিবার-পরিবেশ বিপর্যস্ত হইবে, বিনষ্ট হইবে পারিবারিক জীবনে যাবতীয় শান্তি-শৃঙ্খলা ও সুখ।

অতএব এই গুরুত্বপুর্ণ দিকটির দিকে পিতা-মাতাকে সদা জাগ্রত ও অতন্দ্র প্রহরী হইয়া থাকিতে হইবে।

 

About মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম