ইসলামী অর্থনীতি নির্বাচিত প্রবন্ধ

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং

. বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা

সমগ্র বিশ্বে আজ ব্যতিক্রমধর্মী একটি ইসলামী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান বা ইনস্টিটিউশন সম্পর্কে জানবার ও বুঝবার জন্যে বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যেই ধনী-গরীব ও মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে নানা দেশে এই ইনস্টিটিউশনটি ক্রমাগত তার বিজয় পতাকা উড়িয়ে চলেছৈ। সুদনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোর আর্থ-সামাজিক কাঠামোয় প্রচণ্ড এক বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে এই প্রতিষ্ঠান। বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই জনগণ অবাক বিস্ময়ে (খানিকটা সংশয় জড়িতও) তাকিয়ে দেখছে বহুল আলোচিত প্রতিষ্ঠানটি তাদের একেবারে দোরগড়ায় হাজির। প্রতিষ্ঠানটির নাম ইসলামী ব্যাংক।

অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান কায়েম করা এবং এক্ষেত্রে বিরাজমান হারাম পদ্ধতি থেকে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে মুক্ত করাই ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মুখ্য উদ্দেশ্য। ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে মুসলিম সমাজের দীর্ঘদিনের আকাংখা ইসলামী প্রক্রিয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা সমস্যার সমাধান হবে। জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সাধিত হবে। আজকের সমাজ যেসব অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যায় ভুগছে সেসব সমস্যার সমাধানে ইসলামী অর্থনীতির কৃতিত্ব ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আবারো প্রমাণিত হবে। বস্তুতঃ সমাজের অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণ এবং সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতিই হচ্ছে ইসলামী অর্থনীতির লক্ষ্য।

মিশরেই সর্বপ্রথম ১৯৬৩ সালে পুরোপুরি আল্লাহর নির্দেশ ও বিধি-বিধান অনুসারে পরিচালিত হবে এমন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্যে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এবছরেই মিশরের মিটঘামার নামক স্থানে ইসলামী সেভিংস ব্যাংক নামে আধুনিক কালের সর্বপ্রথম ইসলামী ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠিত হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাংকটি বিপুল সাফল্য অর্জন করে। কিন্তু ব্যাংকটি সে দেশের সুদনির্ভর ব্যাংকগুলোর চক্ষুশুল হওয়ায় ইসলামের দুশমন ও নিজেকে ফেরাউনের বংশধর বলে দাবীদার প্রেসিডেন্ট জামাল আব্দুল নাসেরের সরকার এটি বন্ধ করে দেয়। সাফল্যই ছিল ব্যাংকটির বড় শত্রু।

প্রায় এক দশক পর দ্বিতীয় প্রচেষ্টা হিসাবে সে দেশে ১৯৭১ সালে সউদী আরবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক এবং ঐ একই বছরে সংযুক্ত আরব আমীরাতে দুবাই ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৭ সালে সুদানে ফয়সাল ইসলামী ব্যাংক, কুয়েতে কুয়েত ফাইন্যান্স হাউজ, মিশরে ফয়সল ইসলামী ব্যাংক এবং ১৯৭৮ সালে জর্দানে জর্দান ইসলামী ব্যাংক ফর ফাইন্যান্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর হতে প্রায় প্রতি বছর বিশ্বের কোন-না-কোন দেশে ইসলামী ব্যাংক ও ফাইন্যান্সিং প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হচ্ছে। ইতিমধ্যেই এই সংখ্যা প্রায় তিন শতে পৌঁচেছে।

উল্লেখ্য, সুদভিত্তিক ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করতে সময় লেগেছে কয়েক শতাব্দী। কিন্তু আন্দের বিষয়, পদ্ধতি হিসাবে ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক রূপ লাভে সমর্থ হয়েছে। শুধু তেলসমৃদ্ধ আরব দেশগুলোতেই নয়, কৃষিপ্রধান ও দরিদ্র দেশেও ইসলামী ব্যাংক ও বিনিয়োগ সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ও হচ্ছে। তেলসমৃদ্ধ মুসলিম দেশসমূহে যে কয়টি ইসলামী ব্যাংক স্থাপিত হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশী ব্যাংক স্থাপিত হয়েছে অন্যান্য দেশে। উদাহরণস্বরূপ সুদান মিশর পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার নাম করা যেতে পারে। এ থেকেই প্রমানিত হয় যে ব্যবসা ও বিনিয়োগ কার্যক্রমের ইসলামী মডেল বিশ্বজনীনতা তথা ব্যাপক ও স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক রূপ লাভে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশের জনসমষ্টির ৮৬% ইসলামের অনুসারী। ইসলামে সুদ নিষিদ্ধ একথা সকলেরই জানা। তাই সুদভিত্তিক ব্যাংক ব্যবস্থার সাথে দেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর কখনও আত্মিক সংযোগ ঘটেনি। অথচ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশ গ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারলে জাতীয় উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন মহল থেকে তাই ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার দাবী উঠেছে স্বাধীনতা লাভের পর হতেই। এ জন্যে এযাবৎ গৃহীত পদক্ষেপসমূহ নীচে উল্লেখ করা গেল।

প্রথমেই সরকারের ভূমিকার কথা বলতে হয়। ইসলামী সম্মেলন সংস্থা ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেশ হিসেবে বাংলাদেশ িইসলামী অর্থনীতি ও ব্যাংক ব্যবস্থা প্রবর্তন করার জন্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ ব্যাপারে সরকার যেসব উদ্যোগে অংশগ্রহণ ও সম্মতি প্রদান করেছেন তা িএই প্রতিশ্রুতি রক্ষারই প্রচেষ্টা। এসবের মধ্যে রয়েছে:

ক) আগষ্ট, ১৯৯৪ সালে জেদ্দায় অনুষ্ঠিত মুসলিম দেশসমূহের অর্থমন্ত্রীদের সম্মেলনে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সনদে স্বাক্ষরকারী ২২টি সদস্য দেশের অন্যতম বাংলাদেশ। এই সদন স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সরকার নীতিগতভাবেই দেশের অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং তৎপরতাকে ইসলামী শরীয়াহর আলোকে পুনর্গঠিত করতে সম্মত হয়েছে।

খ) ১৯৭৮ সালের এপ্রিলে ডাকারে অনুষ্ঠিত ইসলামী পররাষ্ট্র মন্ত্রী সম্মেলনে বাংলাদেশ অংশ গ্রহণ করে। এই সম্মেলনে ইসলামী ব্যাংকের সংজ্ঞা গৃহীত হয় এবং পর্যায়ক্রমে মুসলিম দেশসমূহে ইসলামী অর্থনীতি ও ব্যাংক ব্যবস্থা চালু করার জন্যে প্রস্তাব গৃহীত হয়।

গ) ১৯৭৯ সালের নভেম্বর সংযুক্ত আরব আমীরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এ দেশে দুবাই ইসলামী ব্যাংকের মতো ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি লেখেন। এরপর ডিসেম্বর, ১৯৭৯ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ বিভাগ এদেশে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে মতামত চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দেয়।

ঘ) মে, ১৯৮০ সালে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত ইসলামী পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে বাংলাদেশের তদানীন্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রছেসর মুহাম্মদ শামস-উল-হক সকল ইসলামী দেশে শাখাসহ একটি আন্তর্জাতিক ইসলামী ব্যাংক চালুর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তাব করেন।

ঙ) এই প্রেক্ষিতে নভেম্বর, ১৯৮০ বাংলাদেশ ব্যাংক মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের ইসলামী ব্যাংকের কার্যপদ্ধতি পর্যালোচনা করার উদ্যোগ নেয় এবং সে আলোকে জানুয়অরী, ১৯৮১ বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে সরকারের কাছে রিপোর্ট প্রদান করে।

চ) ১৯৮১ সালে ঐতিহাসিক মক্কা সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানর প্রস্তাব অনুসারে মুসলিম দেশসমূহে তাদের নিজস্ব ধ্যান-ধারণার আলোকে ব্যাংক ব্যবস্থার প্রচলনের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের সুপারিশ অনুমোদিত হয়্ এজন্যে বেসরকারী খাতে যৌথ উদ্যোগে ব্যাংক ও ফাইন্যান্সিং প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং এর মাধ্যমে ইসলামী দেশসমূহে বিনিয়োগকে ফলপ্রসূ করে তোলার প্রস্তাব গৃহীত হয়।

ছ) ১৯৮১ সালের মার্চে খার্তুমে অনুষ্ঠিত ইসলামী সম্মেলন সংস্থার সদস্য দেশসমূহের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও মুদ্রা নিয়ন্ত্রণসংস্থা প্রধানদের সম্মেলনে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে একটি সর্বসম্মত কাঠামো উদ্ভাবনের প্রস্তাব গৃহীত হয়।

ঝ) বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিংএর বাস্তব কার্যপদ্ধতি উদ্ভাবনের উদ্দেশ্যে নিয়মিত অনুশীলন ও সমীক্ষার জন্যে ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ওয়ার্কিং গ্রুপ ফর ইসলামী ব্যাংকিং ইন বাংলাদেশ। পরবর্তীকালে নভেম্বর, ১‘৯৮১তে এটি বাংলাদেশ ইসলামিক ব্যাংকার্স এ্যাসোসিয়েশন (BIBA) নামে পুনর্গঠিত হয়। এর মূল শ্লোগান ছিল ‘BIBA to fight against RIBA’। এর মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্সের উপর বেশ কয়েকটি প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালিত হয়।

ঞ) বেসরকারী পর্যায়ে এদেশে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে গণসচেতনতা ও প্রাথমিক প্রস্তুতির কাজ শুরু হয় ১৯৭৯ সালের শুরু থেকে। এ বছরের জুলাই মাসে ইসলামিক ইকোনমিকস রিসার্চ ব্যুরোর উদ্যোগে দুদিনব্যাপী এই সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দেশী-বিদেশী গবেষক-অধ্যাপক ও চিন্তাবিদগণ অংশগ্রহণ করেন।

ঢাকার মুসলিম বিজিনেসমেন্‌স সোসাইটির সদস্যগণও সেমিনারের সুপারিশমালার ব্যাপারে বিশেষ উৎসাহ দেখান। দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর সোসাইটির সদস্যগণ এদেশে বেসরকারী খাতে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং এ উদ্দেশ্যে চূড়ান্ত চেষ্টা চালানোর জন্যে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে তারা ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ নামে একটি কোম্পানীও গঠন করেন।

ট) ১৯৮১ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর উদ্যোগ ইসলামী ব্যাংকিং-এর উপর দুদিন ব্যাপী এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। ঐ একই বছর এপ্রিল মাসে বায়তুশ শরফ ইসলামী গবেষণা ট্রাষ্টের উদ্যোগে চট্টগ্রামেও ইসলামী ব্যাংকের উপর এক সফল সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি সেমিনারেই সর্বস্তরের জনগণ বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে অংশ গ্রহণ করে।

ঠ) ১৯৮১ সালের ২৬ অক্টোবর-২৪ নভেম্বর সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজ ইসলামী ব্যাংকের উপর এক মাস মেয়াদী আন্তঃব্যাংক আবাসিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। পরবর্তী সময়ে ইসলামিক ইকোনমিকস রিসার্চ ব্যুরো ও বাংলাদেশ ইসলামিক ব্যাংকার্স এসোসিয়েশন বিভিন্ন মেয়াদের প্রশিক্ষণ কোর্সের আয়োজন করেছে। বিআইবিএম-ও ১৯৮২ সালের ১৮-৩০ জানুয়ারী ইসলামী ব্যাংকিং এর উপর আবাসিক প্রশিক্ষণ কোর্সের আয়োজন করে। এসব প্রশিক্ষণ কোর্সে দেশের সিনিয়র ব্যাংকারসহ বিভিন্ন কর্মকর্তাগণ অংশগ্রহণ করেন।

ড) ইতোমধ্যে ইসলামী ব্যাংক স্থাপনের জন্যে সরকারের কাছে অনুমতি চেয়ে আবেদন পেশ করা হয়। ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। ১৯৮২ সালের নভেম্বর মাসে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের একটি সমীক্ষা মিশন বাংলাদেশ সফর করে এবং এদেশে বেসরকারী খাতে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা যাচাই করে। এই মিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক প্রস্তাবিত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ এর পরিশোধিত মূলধনে অংশগ্রহণ করে অন্যতম উদ্যোক্তা-শেয়ারহোল্ডার হিসাবে ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শেষ পর্যন্ত সকল বাধা-বিপত্তি ও প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে আল্লাহ্‌র অসীম অনুগ্রহে বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি লাভ করে বেসরকারী খাতে দেশে প্রথম ইসলামী ব্যাংক- ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ। ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৩ সালের ৩০শে মার্চ।

ঢ) এদেশে ইসলামী পদ্ধতির ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রথম পর্যায়ে যারা নানাভাবে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন প্রসঙ্গতঃ তাদের কথাও উল্লেখের দাবী রাখে। তাঁদের অকুণ্ঠ ত্যাগ স্বকিার ও নিরলস প্রয়াস ছাড়া দেশের প্রথম ইসলামী ব্যাংকটির অগ্রযাত্রা দুরূহ ছিল। এঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজের সাবেক প্রিন্সিপ্যাল জনাব এম. আযীযুল হক। নতুন এই ব্যাংকের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় কান্ডারীর ভূমিকা গ্রহণ করতে তিনি স্বেচ্ছায় ঐ পদ ছেড়ে চলে আসেন। ব্যাংকের শরীয়াহ্‌ কাউন্সিলের প্রথম সদস্য-সচিব হিসাবে দারুল ইফতার চেয়ারম্যান বাইয়েদ মুহাম্মদ আলী বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। এছাড়া ব্যাংকের প্রথম চেয়ারম্যান বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আলহাজ্জ্ব আবদুর রাজ্জাক লস্কর, চট্টগ্রামের বায়তুশ শরপ ফাউণ্ডেশনের চেয়ারম্যান আলহাজ্জ্ব মাওলানা জব্বার শাহ্‌, বগুড়ার প্রখ্যাত শিল্পপতি আলহাজ্জ্ব মফিজুর রহমান এবং বাংলাদেশে সৌদী আরবের তদানীন্তন মাননীয় রাষ্ট্রদূত ফুয়াদ আবদুল হামদি আল-খতীব প্রমুখের নাম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে হয়।

বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে এদেশের জনগণের দীর্ঘদিনের আকাংখা বাস্তবায়িত হয়েছে। এ নতুন পদ্ধতি চালু হওয়ার ফলে প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্থা ও এদেশের কোটি কোটি তৌহিদী জনতার আকাঙ্খিত ব্যাংক ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য নিরূপণের বাস্তব সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে। আশার কথা, এদেশের প্রথম এই ইসলামী ব্যাংকটি ইতিমধ্যেই আশাতীত সাফল্য অর্জন করছে। পরবর্তী আলোচনা হতে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।

বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেই ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ ক্ষান্ত হয় নি। দেশের আপামর জনগণের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের উদ্দেশ্য, কর্মকৌশল, উপার্জন পদ্ধতি, বিনিয়োগের প্রকৃতি প্রভৃতি বিষয়ে প্রচার ও প্রসারের জন্যে ব্যাংকটি ক্রমাগত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এজন্যে নিজ উদ্যোগে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের সেমিনার ও সম্মেলনের আয়োজন করেছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ১১-১২ মার্চ, ১৯৮৫ সালে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক মানের সেমিনার। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, এই সেমিনারের পরেই ১৯৮৭ সালের মে মাসে সউদী আরবের দাল্লাহ আল-বারাকা গ্রুপের সহযোগিতায় ঢাকাতে আল-বারাকা ব্যাংক বাংলাদেশ (বর্তমানে ওরিয়েন্টাল ব্যাংক) প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল দেশের দ্বিতীয় ইসলামী ব্যাংক।

দেশের ইসলামপ্রিয় জনগণের চাহিদা পূরণের জন্যে একটি বা দুটি ইসলামী ব্যাংক কোনক্রমেই যথেষ্ট বিবেচিত হতে পারে না। তাছাড়া ইতিমধ্যেই ইসলামিক ইকোনমিকস রিসার্চ ব্যূরোর সেমিনার-সিম্পোজিয়াম এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ আয়োজিত দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরে সেমিনার ও ইফতার মাহফিলের আলোচনা ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থার প্রতি জনমানসে ব্যাপক সাড়া জাগাতে সমর্থ হয়। এই প্রেক্ষিতেই ১৮ জুন, ১৯৯৫ প্রতিষ্ঠিত হয় আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড এবং ছয় মাসের কম সময়ের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের চতুর্থ ইসলামী ব্যাংক- সোস্যাল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক লিমিডেট (২২ নভেম্বর, ১৯৯৫)।

এছাড়া ফয়সল ইসলামী ব্যাংক অব বাহরাইনের শাখা প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকায় ১১ আগষ্ট, ১৯৯৭। প্রাইম ব্যাংক ১৮ ডিসেম্বর, ১৯৯৫ ঢাকাতে তার প্রথম ইসলামী ব্যাংকিং শাখা প্রতিষ্ঠা করে। এর ঠিক দুবছর পরে (১৭.১২.৯৯) সিলেটে অনুরূপ আরেকটি শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়েছ। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শাহজালাল েইসলামী ব্যাংক। উপরন্তু দেশের প্রথম ইসলামী বিনিয়োগ কোম্পানী –ইসলামিক ফাইন্যান্স এ্যাণ্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড কাজ শুরু করেছে ২০০০ সাল হতে।

. ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড

. প্রতিষ্ঠা

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম সুদমুক্ত ব্যাংক তথা ইসলামী শরীয়াহ অনুসারে ব্যাংক হিসাবে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড (আইবিবিএল) তার অগ্রযাত্রা শুরু করে ৩০শে মার্চ, ১৯৮৩ সালে। জেদ্দাস্থ ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি ইসলামী ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা এবং দেশী উদ্যোক্তাদের মূলধন নিয়ে ব্যাংকটির কার্যক্রম শুরু হয়। তখন এর অনুমোদিত মূলধনের পরিমাণ ছিল ৫০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ছিল ৬.৭৫ কোটি টাকা যা ক্রমশঃ বৃদ্ধি পেয়ে ২০০৩ সালের শেষ নাগাদ দাঁড়িয়েছে ১৯২.০০ কোটি টাকায়।

. পরিচালনা ব্যবস্থাপনা

ব্যাংকটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্যে চব্বিশ সদস্য বিশিষ্ট একটি বোর্ড অব ডাইরেক্টরস রয়েছে। এর মধ্যে দেশী উদ্যোক্তা ও শেয়ার হোল্ডারদের প্রতিনিধি রয়েছেন ষোলজন এবং বিদেশী উদ্যোক্তাদের মধ্যে থেকে আটজন। ব্যাংকটি ইসলামী শরীয়াহর আলোকে পরিচালনার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠার বছরই দশ সদস্য বিশিষ্ট একটি শরীয়অহ কাউন্সিল গঠিত হয়। এদের মধ্যে রয়েছেন দেশের সাতজন প্রখ্যাত ফকীহ/আলিম এবং একজন করে প্রথিতযশা ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ ও আইনজীবি। বর্তমানে এই সংখ্যা তেরো জনে উন্নীত করা হয়েছে। দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যক্রম পরিচালনার জন্যে বোর্ড অব ডাইরেক্টরসের স্থানীয় সদস্যদের মধ্যে থেকে আটজনের সমন্বয়ে গটিত একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি ও শরীয়াহ কাউন্সিলের সদস্য-সচিব ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে নির্বাহের জন্যে নির্বাহী প্রেসিডেন্টকে সহযোগিতা করে থাকেন।

আইবিবিএল যেসব পদ্ধতিতে আমানত গ্রহণ করে থাকে সেগুলো হলো:

১. আল-ওয়াদিয়াহ চলতি আমানত

২. মুদারাবা সঞ্চয়ী আমানত

৩. মুদারাবা মেয়াদী আমানত

৪. মুদারাবা স্বল্পমেয়াদী আমানত

৫. মুদারাবা হজ্জ সঞ্চয় আমানত

৬. মুদারাবা বিশেষ সঞ্চয়ী (পেনশন) আমানত

এছাড়াও অতি সম্প্রতি চালু হয়েছে:

১. মুদারাবা মোহর সঞ্চয় আমানত

২. মুদারাবা বৈদেশিক মুদ্রা আমানত

৩. মুদারাবা মাসিক মুনাফা আমানত

৪. মুদারাবা ওয়াকফ ক্যাশ সঞ্চয় আমানত

আইবিবিএল তার মূলধন ও আমানত বিনিয়োগের সময়ে যে সমস্ত বিষয়ের প্রতি সতর্ক ‍দৃষ্টি দেয় তা বাস্তবিকই প্রশংসনীয়। এসবের মধ্যে রয়েছে:

ক) শরীয়াহ অনুমোদন;

খ) সামাজিক কাম্যতা;

গ) দ্রুত তারল্য;

ঘ) অধিক সংখ্যক গ্রাহক;

ঙ) নিরাপত্তার নিশ্চয়তা; এবং

চ) মুনাফার সম্ভাব্যতা

. কর্মপদ্ধতি

আইবিবিএল যে প্রক্রিয়া বা পদ্ধতিতে তার তহবিল বিনিয়োগ করে থাকে সেসবের উল্লেখ করা জরুরী। প্রসঙ্গতঃ মনে রাখা বাঞ্ছনীয় যে সূদী ব্যাংকগুলো যেমন নানা ধরনের সেবামূলক কাজের মাধ্যমে তার মোট আয়ের ৩০%-৩৫% উপার্জন করে থাকে (ইসলামের দৃষ্টিতে যা সম্পূরণতঃ হালাল বা বৈধ) ইসলামী পদ্ধতির ব্যাংকও সেই সমুদয় সেবামূলক কাজ করে অনুরপ পরিমাণ অর্থ আয় করতে সমর্থ। বাকী ৬৫%-৭০% আয়ের উদ্দেশ্য ইতিপূর্বে আলোচিত ইসলামী ব্যাংকের উপার্জন কৌশলের মধ্যে নীচের কর্মপদ্ধতিসমূহ অনুসৃত হয়ে থাকে। এগুলো হচ্ছে:

ক) মুরাবাহা

খ) মুশারাকা

গ) বায়-ই-মুয়াজ্জাল

ঘ) হায়ার পারচেজ আন্ডার শিরকাতুল মিলক

ঙ) ক্রয় ও নেগেশিয়েশন

চ) করযে হাসানা

আইবিবিএল এদেশের জনসাধারণের ইচ্ছা ও চাহিদার প্রতি নজর রেখে এবং প্রকৃত সামাজিক কল্যাণের কথা বিবেচনা করে নতুন কতকগুলো বিনিয়োগ কার্য়ক্রম গ্রহণ করেছে। এতগুলো কর্মসূচী বাংলাদেশে অন্য কোনও ব্যাংক আজ অবধি একসংগে গ্রহণ করেনি। ব্যাংকের গৃহীত প্রকল্পসমূহ ইতিমধ্যেই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এসবের মধ্যে রয়েছে:

১. গৃহসামগ্রী বিনিয়োগ

২. গৃহনির্মাণ বিনিয়োগ

৩. পরিবহন বিনিয়োগ

৪. মোটরকার বিনিয়োগ

৫. ডাক্তার বিনিয়োগ

৬. ক্ষুদ্র ব্যবসায় বিনিয়োগ

৭. কৃষি-সরঞ্জাম বিনিয়োগ

৮. পল্লী উন্নয়ন

৯. মিরপুর রেশম বয়ন বিনিয়োগ

১০. ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প বিনিয়োগ

এসব বিনিয়েঅগ কার্যক্রম ছাড়াও আইবিবিএল সার্ভিস চার্জের (ফি ও কমিশন) বিনিয়োগ যেসব সেবামূলক কাজ করে হালালভাবেই উপার্জন করে থাকে সেগুলো হলো:

১. স্পষ্ট রেটে বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয়;

২. ঋণপত্র খোলা;

৩. নিশ্চয়তাপত্র প্রদান;

৪. বাণিজ্যিক দলিলপত্র জামানাতের বিপরীতে স্বল্প মেয়াদী অর্থ সরবরাহ;

৫. ড্রাফট, চেক, প্রমিসারী নোট, বিল অব লেডিং ইত্যাদি সংগ্রহ ও অর্থ প্রদান;

৬. শেয়ার বিনিয়োগ সার্টিফিকেট, বন্ড প্রভৃতি ক্রয়-বিক্রয়;

৭. নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্যে কৃষি, রিয়েন্স এষ্টেট ও সেবামূলক প্রকল্পে সহায়তা প্রদান;

৮. এজেন্ট নিয়োগ ও এজেন্ট হিসেবে কাজ করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানো;

৯. সম্ভাব্য ঘাটতি পূরণের জন্যে সলিডারিটি ও সিকিউরিটি তহবিল গঠন; এবং

১০. প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইপত্র (Feasibility study) তৈরী এবং ফাইন্যান্সিয়াল, টেকনিক্যাল, অর্থনৈতিক, বিপণন ও ব্যবস্থাপা সম্পর্কিত পরামর্শ প্রদান।

. সাফল্য

আইবিবিএল তার মূলধন ও আমানতকারীদের অর্থ ইসলামী পদ্ধতিতে বিনিয়োগ করে বিগত কুড়ি বছরে কতটুকু সাফল্য অর্জন করেছে তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বিশেষতঃ প্রচলিত সুদনির্ভর ব্যাংকিং পদ্ধতির বিপরীতে ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ কর্মকৌশল সম্পূর্ণ ভিন্ন হওয়ায় এই বিবেচনা আরও গুরুত্ববহ হয়ে দাঁড়ায়। নীচে পর্যায়ক্রমে শাখাবৃদ্ধি ও আমানত সংগ্রহ, বিনিয়োগ, আয় ও মুনাফা, পদ্ধতি ও খাতওয়ারী বিনিয়োগ, শাখাপিছু আয়, ব্যয় ও মুনাফা অর্জন, বৈদেশিক বাণিজ্যে অংশ গ্রহণ ও গৃহীত প্রকল্পসমূহের সাফল্য সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের র‌্যাংকিং প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ইংল্যান্ডের Reed Information Services-এর ১৯৯৫ সালের জানুয়ারী মাসের র‌্যাংকিং অনুসারে পৃথিবীর প্রথম শ্রেণীর চার হাজার ব্যাংকের মধ্যে আইবিবিএল-এর স্থান ছিল ২৩১৪ তম। [The Banker’s Almanac January 1995, vol. 1-4, (Reed Info9rmating Services 1995, Winder Court, East Grinstead House, West sussex, England.] উপরন্তু, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত CAMEL rating (অর্থাৎ, C=Capital বা মূলধন, A=Asset বা সম্পদ, M=Management বা ব্যবস্থাপনা, E-Efficiencey বা দক্ষতা, L=Liquidity বা তারল্য) অনুসারেও এই ব্যাংকের মান A+। এই সম্মান শুধু ব্যাংকটির জন্যেই নয় দেশের জন্যেও গৌরবের। উপরন্তু সম্প্রতি লন্ডন হতে প্রকাশিত বিশ্বখ্যাত অর্থনৈতিক ম্যাগাজিন The Global Finace তাদের প্রকাশিত সমীক্ষায় ১৯৯৯ ও ২০০০ সালের জন্যে আইবিবিএলকেই উপর্যপুরি বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ বা বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

(i) শাখা বৃদ্ধি আমানত সংগ্রহ

সারণী-১ হতে দেখা যাবে প্রতিষ্ঠার বছরে ব্যাংকটি মাত্র তিনটি শাখা স্থাপনে সমর্থ হয়েছিল। ক্রমে শাখার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ছয় বছরের ব্যবধানে ১৯৮৯ সালে ৪০ এবং পরবর্তী ছয় বছরের ব্যবধানে ১৯৯৫ সালে ৯০টিতে উন্নীত হয়েছে। এই সংখ্যা ২০০৩ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ১৪১এ পৌঁছেছে। একটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ব্যাংকের পক্ষে ভিন্ন অর্থনৈতিক ও আইন কাঠামোর মধ্যে এভাবে শাখা বিস্তারে সফলতা লাভ নিঃসন্দেহে গৌরবময় ও তাৎপর্যবহ।

এই সরণী হতেই দেখা যাবে আইবিবিএলের আমানতের পরিমাণ ১৯৮৩ সালে ছিল ১৪.৪০ কোটি টাকা। এই পরিমাণ ২০০৩ সালের শেষ নাগাদ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৬৯৯৪.১৭ কোটি টাকায়। অনুরূপভাবে শাখাপিছু আমানতের পরিমাণ ১৯৮৩-তে ছিল ৪.৮০ কোটি আকা। ১৯৮৬ সালে এই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১২.২০ কোটি টাকায় (প্রায় ৩ গুণ বৃদ্ধি)। এরপর তা কমতে থাকে এবং ১৯৮৯ সালে ৮.৬৪ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ১৯৯০ সাল হতে ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি হতে থাকে এবং ২০০৩ সালে শাখাপিছু আমানত ৪৯.৬০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। তুলনামূলক বিচারে আমানত সংগ্রহের পরিমাণ ও হার অবশ্যই সন্তোষজনক।

(ii) বিনিয়োগ

আইবিবিএলের ১৯৮৩ সালে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল মাত্র ৫.৬০ কোটি টাকা। এক দশকের মাথায় এই পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৯২-এ দাঁড়িয়েছে ৫১৬.৪০ কোটি টাকা। (সারণী-১ দ্রষ্টব্য)। এক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ৯২ গুণেরও বেশী। শাখাপিছু গড় বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৯৮৩-তে ১.৮৭ কোটি টাকা। এই হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৮৭ সালে সর্বোচ্চ ৮.৮৭ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। কিন্তু এরপর ১৯৮৮ সালে এই পরিমাণ হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ৭.৮৯ কোটি টাকায় এবঙ ১৯৮৯ সালে ৫.৮৯ কোটি টাকায়। এই অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করে ২০০৩ সাল হতে এবং ২০০৩ সালে শাখাপিছু বিনিয়োগের পরিমাণ ৪১.৮৭ কোটি টাকায় পৌঁছায়। (সারণী-১ দ্রষ্টব্য)।

সারণী-১

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লি.-এর আমানত ও বিনিয়োগ চিত্র: ১৯৮৩-২০০৩ (কোটি টাকায়)

বছর শাখার সংখ্যা আমানতের পরিমাণ শাখাপিছু আমানত বিনিয়োগের পরিমাণ শাখাপিছু বিনিয়োগ মোট আয় শাখাপিছু আয় মোট আয় শাখাপিছু ব্যয়
১০
১৯৮৩ ১৪.৪ ৪.৮০ ৫.৬ ১.৮৭ ০,৩৪ ০.১১ ০.৫৯ ০.১৯
১৯৮৪ ৬৩.৬ ৯.০৮ ৪৫.৮ ৬.৫৪ ৪.৫০ ০.৬৪ ৩.৭২ ০.৫৩
১৯৮৫ ১৩ ১৫৬.৪ ১২.০৩ ৯৪.৮ ৭.২৩ ১০.০২ ০.৭৭ ৯.১৩ ০.৭০
১৯৮৬ ১৮ ২২৩,০ ১২.৩৮ ১৪১.২ ৭.৮৪ ১৩.৬৭ ০.৭৫ ১৩.৬৬ ০.৭৫
১৯৮৭ ২১ ২৪২.০ ১১.৫২ ১৮০.৯ ৮.৬১ ১৮.০৭ ০.৮৬ ১৭.৩৪ ০.৮২
১৯৮৮ ২৭ ২৩৮ ১০.৪৬ ২১৩.২ ৭.৮৯ ২৩.২৯ ০.৮৬ ২০.২২ ০.৭৪
১৯৮৯ ৪০ ৩৪৫.৬ ৮.৮৪ ২৩৫.৮ ৫.৮৯ ২৮.৫৮ ০.৭১ ২৬.৩২ ০.৬৫
১৯৯০ ৪৯ ৪৪৬.৬ ৯.১০ ৩২৫.৩ ৬.৬৪ ৪৫.২২ ০.৯২ ৩১.১৭ ০.৬৩
১৯৯১ ৬১ ৫৬৭.২ ৯.৩০ ৪২৮.৩ ৭.০২ ৫৪.১৮ ০.৮৮ ৪৩.৬০ ০.৭১
১৯৯২ ৭১ ৬৭০.৪ ৯.৪৪ ৫১৬.৪ ৭.২৭ ৫২.৭০ ০.৭৪ ৫২.৭০ ০.৭৪
১৯৯৩ ৭৬ ৮২৬.১ ১০.৮৬ ৫৫৪.২ ৭.৮০ ৬২.২৮ ০.৮২ ৫৪.২৮ ০.৭১
১৯৯৪ ৮৩ ১০২২.৬ ১২.৩২ ৮০৭.৬ ৯.৭৩ ৮২.৬৫ ০.৯৯ ৬০.৩৯ ০.৭২
১৯৯৫ ৯০ ১২৬৬.৯ ১৪.০৭ ১১৫১.২ ১২.৭৯ ১০৯.৭৬ ১.২২ ৭৮.৬২ ০.৮৭
১৯৯৬ ৯৫ ১৪৩২.৯ ১০.০৮ ১৩৫৩.৯ ১৪.২৫ ১২৩.২৩ ১.২৯ ৯৪.৮৩ ০.৯৯
১৯৯৭ ১০০ ১৬৮৭.৪ ১৬.৮৭ ১৩০৯.৫ ১৩.০৯ ১৩৬.৮৭ ১.৩৬ ১১৯.৮০ ১.১৯
১৯৯৮ ১০৫ ২০০২.২ ১৯.০৭ ১৩৪৫.৫ ১২.৮১ ১৬২.৯৩ ১.৫৫ ১৪৮.০৯ ১.৪১
১৯৯৯ ১১০ ২৫১৯.০ ২২.৯০ ১৮২৮.৩ ১৬.৬২ ১৯৬.৬২ ১.৭৮ ১৭৮.৭৯ ১.৬০
২০০০ ১১৬ ৩২১১.৩ ২৭.৬৮ ২৭৪৭.১ ২৩.৬৮ ৩২০.৭৮ ২.৭৬ ২৮৭.৭৬ ২.৪৮
২০০১ ১২১ ৪১৫৪.৭ ৩৪.৩৪ ৩৫২৭.২ ২৯.১৫ ৪২৫.১৫ ৩.৫২ ৩৬৮.৩৪ ৩.০৪
২০০২ ১২৮ ৫৪৪৬.১ ৪৩.৩৩ ৪৬৩১.৫ ৩৬.১৮ ৫২৩.৪০ ৪.৪০ ৪২৪.০০ ৩.৩১
২০০৩ ১৪১ ৬৯৯৪.২ ৪৯.৬০ ৫৯০৪.২ ৪১.৮৭ ৬৮৭.১৩ ৪.৮৫ ৬০৩.৯৩ ৪.২৮

উৎস : ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ-এর বার্ষিক প্রতিবেদনসমুহ

(iii) আয় মুনাফা

আয়ের বিবেচনার আইবিবিএলের এ যাবৎ মোট ফলাফল সন্তোষজনকই বলা যায়। শুরুর বছরে ব্যাংকটির মোট আয় ছিল ০.৩৪ কোটি টাকা যা ক্রামাগত বৃদ্ধি পেয়ে ২০০৩ সালে ৬৮৭.১৩ কোটি টাকায় পৌঁছায়। পক্ষান্তরে একই সময়ে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৬০৩.৯২ কোটি টাকা। (সারণী-২ দ্রষ্টব্য)। শুরুর বছরে মোট আয়ের তুলনায় মোট ব্যয়ের বৃদ্ধি ছিল ১৭৩%। পরবর্তী বছরে ঐ হার কমে ৮৩%-এ দাঁড়ায়।

কোন ব্যাংকের সার্বিক সাফল্য বা কৃতকার্যতা বিচারের ক্ষেত্রে মুনাফা অর্জনে সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে আইবিবিএলকে অনেক চড়াই উৎরাই পার হতে হয়েছে। সারণী-২ হতে তার প্রমাণ পাওয়া যাবে।

সারণী-২ হতে দেখা যাচ্ছে শুরুর বছরটিতে ব্যাংক লোকসান দিয়েছে টাকা ২৫.০ লক্ষ। অবশ্য তার পরের বছর হতেই ব্যাংক মুনাফার মুখ দেখেছে এবং পরবর্তী বছরে তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু ১৯৮৬ সালে এই মুনাফা হ্রাস পেয়ে মাত্র ১.০ লক্ষ টাকায় নেমে এসেছে। পরবর্তী বছরে তা আবার টাকা ৭৩.০ লক্ষে উন্নীত হয়েছে। মুনাফার অংক কোটি টাকা অতিক্রম করেছে ১৯৮৮ সালে। এই বছর আয়কর ও রিজার্ভপূর্ব মুনাফার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩.০৭ কোটি টাকা। পরবর্তী বছরেই আবার মুনাফা হ্রাস পেয়েছে। ১৯৯২ সালে ব্যাংক কোন মুনাফাই অর্জন করেনি। কিন্তু আশ্চর্য হতে হয় যে পরবর্তী বছরেই অর্থাৎ ১৯৯৩ সালে ব্যাংকের অর্জিত মুনাফার পরিমাণ ছিল ৮.০কোটি টাকা। ২০০২ সালে ব্যাংক রেকর্ড পরিমাণ ‍মুনাফা করেছে- আয়কর ও রিজার্ভ- পূর্ব মুনাফার পরিমাণ ছিল ৯৯.৪০ কোটি টাকা। বারবার এই মুনাফা হ্রাসের কারণ হিসাবে কু-বিনিয়োগ অবলোপন, মুশারাকা খাতে লোকসান ও মেয়াদ উত্তীর্ণ বিনিয়োগ ও তার বিপরীতে মুনাফা না পাওয়া প্রভৃতি সমস্যাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সারণী

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লি. –এর মুনাফা: ১৯৮৩২০০৩ (কোটি টাকায়)

বছর মুনাফা/লোকসান বছর মুনাফা/লোকসান
১৯৮৩ (০.২৫) ১৯৯৪ ২২.২৬
১৯৮৪ ০.৭৮ ১৯৯৫ ৩১.১৪
১৯৮৫ ০.৮৯ ১৯৯৬ ২৮.৩৫
১৯৮৬ ০.০১ ১৯৯৭ ১৭.০৭
১৯৮৭ ০.৭৩ ১৯৯৮ ১৪.৮৪
১৯৮৮ ৩.০৭ ১৯৯৯ ১৭.৮৩
১৯৯০ ১৪.০৫ ২০০০ ৩৩.০২
১৯৯১ ১০.৫৮ ২০০১ ৫৭.৬১
১৯৯২ ০.০০ ২০০৩ ৮০.২০
১৯৯৩ ৮.০০    

উৎস: ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃএর বার্ষিক প্রতিবেদনসমূহ

সারণী

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃএর খাতওয়ারী পদ্ধতিভিত্তিক বিনিয়োগ : ১৯৯৬২০০৩

বিনিয়োগ/বছর ১৯৯৬ ১৯৯৭ ১৯৯৮ ১৯৯৯ ২০০০ ২০০১ ২০০২ ২০০৩
খাত পরিমাণ % পরিমাণ % পরিমাণ % পরিমাণ % পরিমাণ % পরিমাণ % পরিমাণ % পরিমাণ %
বাণিজ্য ৬১৩.২৩ ৪৫.৩৬ ৪৮৫.৭২ ৩৭.১৫ ৪০৬.৩৯ ৩০.২৫ ১১৪০.২০ ৫৫.৩৯ ১১৬৬.২৮ ৪২.৬১ ১১৫২.৬১ ৩২.৭১ ১৭৫৩.৪০ ৩৭.৮৯ ২০৪৬.৪০ ৩৭.৮৯
শিল্প ৪৫৮.৮১ ৩৩.৪২ ৫৭০.৭০ ৪৩.৬৫ ৫৪১.৭৩ ৪০.৩২ ৪১৫.৩৪ ২০.১৮ ৯৮৪.৯৮ ৩৫.৯০ ১৫৭২.২০ ৪৪.৬১ ১৯৬৯.২৬ ৪২.৫৫ ২৪৪৮.০২ ৪১.৪৯
কৃষি ৭.৭১ ০.৫৭ ৫.৫৭ ০.৪৩ ১০.৪১ ০.৭৮ ১৩.৪০ ০.৪৯ ২৩৪.৪৮ ৬.৬৫ ২৩৫.০৫ ৬.৬৫ ২৩৫.০৫ ৫.০৮ ২২৩.৫২ ৩.৭৯
রিয়াল এস্টেট ৪৮.২৬ ৩.৫৭ ২৬.৩০ ২.০১ ৫৫.৭৮ ৪.১৫ ১৩৮.৬২ ৬.৭৪ ২৫০.৬২ ৮.৭৭ ২৫৭.৬০ ৭.৩১ ৩৫৮.১৭ ৭.৭৪ ৫২০.৪১ ৮.৮২
পরিবহন ৬৭.০৫ ৪.৯৬ ৪৬.৯৮ ৩.৫৯ ৫৪.৫৩ ৪.০৬ ৮৫.২৭ ৪.১৪ ১১২.০৯ ৪.০৮ ১৩৯.৭০ ৩.৯৬ ১৮৫.১০ ৪.৩০ ২৪৭.৫১ ৪.১৯
অন্যান্য ১৬৩.৭৭ ১২.১২ ১৭২.২৬ ১৩.১৭ ২৭৪.৬৫ ২০.৪৪ ২৬৫.৭২ ১২.৯১ ২২৬.৩৫ ৮.২৫ ১৬৭.১৭ ৪.৭৫ ১২৭.০০ ২.৭৪ ৪১৪.৪৯ ৭.০২
মোট ১০৫১.৮৩ ১০০.০০ ১৩০৭.৫৩ ১০০.০০ ১৩৪৩.৪৫ ১০০.০০ ২০৫৮.৪৬ ১০০.০০ ২৭৪৩.৭৩ ১০০.০০ ৩৫২৩.৭৭ ১০০.০০ ৪৬২৮.০৬ ১০০.০০ ৫৯০০.৭৫ ১০০.০০

পদ্ধতি
মুরাহাবা ৬৭৯.৭৫ ৫০.২৮ ৫৫৫.৯১ ৪২.৫১ ৫৩৯.৭৭ ৪০.১৮ ৮৩২.১০ ৪০.৪২ ১২০০.৩৯ ৪০.৭৫ ১৭১১.২৫ ৪৮.৫৬ ১৩৫২.২৯ ৫০.৮৩ ৩১১৩.৮৮ ৫২.৭৭
মুদারাবা ৫.২০ ০.২৫ ৪.২০ ০.১৯ ৪.২০ ০.১৫ ৫.২০ ৫.১১ ১০.২০ ০.১৭
মুশারাকা ৪২.৯৭ ৩.১৮ ৩৪.২১ ২.৬২ ২৮.৯৮ ২.১৬ ৪৮.৯২ ২.৩৮ ৪২.৮৯ ১.৫৬ ৩৪.৬২ ০.৯৮ ৩.৭০ ০.০৮ ১.২১ ০.০২
বায়-ই-মুয়াজ্জাল ১৪৭.৯৪ ১৮.৩৪ ২৬০.২০ ১৯.৯০ ২৮২.৫৯ ২১.০০ ৪০৬.১৭ ১৯.৭৩ ৪৪৭.৮৩ ১৬.০২ ৪৭৫.৩৫ ১০.৭০ ৪৯৬.৫৭ ১০.৭০ ৫৫১.২১ ৯.৩৪
হায়ার পারচেজ ২২৫.১৭ ১৬.৬৬ ২৬৮.১৩ ২০.৫১ ২৯০.৮৬ ২১.৬৫ ৫৩৮.৮০ ২৬.১৮ ৮৪৮.৬৮ ৩০.৯৭ ১০৬৬.৪০ ৩০.২৭ ১৪১৩.১৪ ৩০.৫৩ ১৮৩৬.৫১ ৩০.৬২
পারচেজ ও নেগোশিয়েশন ৯৭.৬৫ ৭.২২ ১২৬.১৮ ৯.৬৫ ১৩৮.৯০ ১০.৩৪ ১৬২.৩৯ ৭.৮৯ ১৩৩.৭০ ৪.৮৭ ১৩৮.৬১ ৩.৯৩ ১৮৬.৫২ ৪.০০ ঙ১৮০.১০ ৩.০৫
অন্যান্য ১৮.৩৫ ৪.৩২ ৬২.৯০ ৪.৮১ ৬২.৩৫ ৪.৬৪ ৭৩.০৭ ৩.৪০ ৬৯.২২ ২.৫৩ ৯২.৩১ ২.৬২ ১৭০.৬২ ৩.৬৯ ২৩৭.৫৯ ৪.০৩
মোট ৬৭৯.৭৫ ১০০.০০ ১৩০৭.৫০ ১০০.০০ ১০৪০.৪৫ ১০০.০০ ২০৫৮.৪৬ ১০০.০০ ২৭৪৩.৭৩ ১০০.০০ ৩৫২৩.৭৭ ১০০.০০ ৫৯২৮.০৬ ১০০.০০ ৫৯০০.৭৫ ১০০.০০

উৎস: ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ-এর বার্ষিক প্রতিবেদনসমূহ।

(iv) পদ্ধতিভিত্তিক বিনিয়োগ

আইবিবিএল যে সমস্ত পদ্ধতিতে অর্থ বিনিয়োগ করেছে তার মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়েছে মুরাবাহা। বিগত পাঁচ বছর ধরে মোট বিনিয়োগের অর্ধেকেরও বেশী এই পদ্ধতিতেই করা হয়েছে। (সারণী-৩ দ্রষ্টব্য)। এর পরই দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেরছে হায়ার পারচেজ বা ইজারা বিল-বায়ই পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে বিনিয়োগের পরিমাণ ক্রমশঃ বৃদ্ধি পেয়ে গত চার বছরে ৩০% এর ঊর্দ্ধে রয়েছে। তৃতীয স্থানে রয়েছে রায়-ই মুয়াজ্জাল পদ্ধতি। লক্ষণীয়, মুশারাকা পদ্ধতিতে বিনিয়োগের পরিমাণ খুবই নগণ্য, ২০০৩ সালে মাত্র ০.০২%। অথচ পদ্ধতি হিসাবে গুরুত্ব আরও বেশী হওয়া উচিৎ ছিল। মুদারাবার অবস্থাও তাই। ১৯৯৯ হতে শুরু করে ২০০৩ পর্যন্ত কোন বছরেই এর পরিমাণ ০.২৫% এর উর্দ্ধে ওঠেনি। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, বিশ্বের অন্যত্র ইসলামী ব্যাংকসমূহ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যান্য যেসব পদ্ধতি অনুসরণ করেছে আইবিবিএল এখনও সেসব পদ্ধতি অনুসরণ করার জন্যে পদক্ষেপ নিতে পারেনি। উদাহরণস্বরূপ মুদারাবা, বায়-ই-সালাম, ইজারা ইত্যাদির উল্লেখ করা যেতে পারে।

(v) খাতভিত্তিক বিনিয়োগ

সারণী-৩ এ প্রদত্ত আইবিবিএল-এর খাতওয়ারী বিনিয়োগ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে বিগত পাঁচ বছর ধরে শিল্পে বিনিয়োগ হয়েছে আমানতের সিংহভাগ-গড়ে ৪০%। পক্ষান্তরে বাণিজ্যে বিনিয়োগ হয়েছে মোট বিনিয়োগের এক-তৃতীয়াংশ। সেই তুলনায় কৃষি খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় সর্বনিম্নে, গড়ে ৪%। এই অবস্থা মোটেই কাংখিত হতে পারে না। দেশের জাতীয় আয়ের বৃহৎ অংশ এখনও আসে কৃষিখাত হতেই। মোট কর্মসংস্থানের বৃহৎ অংশ কৃষি খাতেই। অথচ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিকল্পনায় সেই খাতটি তেমন গুরুত্ব পায়নি।

(vi) বৈদেশিক বাণিজ্য

বৈদেশিক বাণিজ্যে অংশ গ্রহণ করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করে তুলতে সহায়তা করে থাকে। একই সঙ্গে নিজেদের উপার্জন বৃদ্ধিরও সুযোগ করে নেয়। আইবিবিএল এক্ষেত্রেও স্বীয় যোগ্যতা সাফল্যের সাক্ষর রেখেছে। সারণী-৪ হতে বিগত আঠারো বছরের বৈদেশিক বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে ব্যাংকের সাফল্যের একটি চিত্র পাওয়া যাবে। চিত্রটি নিঃসন্দেহে উজ্জ্বল। আমদানী ও রফতানী খাতে ব্যাংকের অংশ গ্রহণের পরিমাণ ক্রমাগত বেড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রেমিট্যান্সও ১৯৯০ এর পর হতে বৃদ্ধি পেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে। সারণীটি হতে আরও দেখা যায় যে, ১৯৯১ সালে মোট বৈদেশিক বাণিজ্য ও রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে ব্যাংককে অগ্রগ্রতি পূর্ববর্তী বছরের তুলনা। +৫২.৬৭% বেশী। অনুরূপভাবে ১৯৯৪ সালেও পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় অগ্রগতির পরিমাণ ছিল +৫০.৪২%। রফতানীর ক্ষেত্রে ব্যাংক ১০০০ কোটি টাকার মাত্রা অতিক্রম করেছে ১৯৯৫ সালে। এরপর প্রবৃদ্ধির হার ১৯৯৬ সালে হ্রাস পায়। অবশ্য পরবর্তী বছরেই ব্যাংক তা কাটিয়ে উঠতে সমর্থ হয়।

সারণী

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃএর বৈদেশিক বাণিজ্যে অগ্রগতি: ১৯৮৬২০০৩ (কোটি টাকায়)

বছর আমদানী রফতানী রেমিট্যান্স মোট বৃদ্ধির হার (%)
১৯৮৬ ১৮০.০৬ ৬২.২৪ ১১৭.২৭ ৩৫৯.৫৭
১৯৮৭ ১৫৭.৮৫ ৯৭.১১ ১৪২.৪৬ ৩৯৭.৪২ +১০.৫৩
১৯৮৮ ২০১.৫৩ ১৩৪.৯৭ ১১২.৫৪ ৪৪৯.০৪ )১২.৯৯
১৯৮৯ ৩৩৯.৪৯ ১৫৪.৩৮ ৯০.১৬ ৫৮৪.০৩ +৩০.০৬
১৯৯০ ৩৯১.৭৭ ২৫৮.৮৩ ১৩৩.৯৯ ৭৮৪.৯৯ +৩৪.৪১
১৯৯১ ৬২০.৪২ ৩৯৬.৬৬ ১৮১.৪১ ১১৯৮.৪৮ +৫২.৬৭
১৯৯২ ৮৭৭.৮৫ ৪৯৪.৮৮ ২০২.৮৬ ১৫৭৫.৫৯ +৩১.৪৭
১৯৯৩ ৮৬১.২৭ ৫৮৪.১৬ ২৪০.২৫ ১৬৮৫.৫৯ +৬.৯৯
১৯৯৪ ১৪৬২.৩৪ ৭৭৯.০৪ ২৯৪.০৪ ২৫৩৫.৮৬ +৫০.৪২
১৯৯৫ ২১২১.৮৩ ১১০১.৫৭ ২৪৪.৭২ ৩৪৬৮.১২ +৩৬.৭৭
১৯৯৬ ১৭৮৭.৪৮ ১১৭৬.৬৪ ৩৩২.৮৩ ৩২৯৬.৯৫ -.৯৪
১৯৯৭ ১৭৩৭.০০ ১৪৪৬.৯৪ ৪৮০.৬০ ৩৬৬৪.৫৪ +১১.১৫
১৯৯৮ ২০২৩.৮৩ ১৪৮৯.৪৩ ৬৩৬.০৬ ৪১৪৯.৩২ +১৩.২২
১৯৯৯ ২০৩৯.৬০ ১৪৭৯.৮০ ৮৪১.৫০ ৪৩৬০.৯০ +৫.০৯
২০০০ ২৫৩২১.৭০ ১৬৮৮.৯০ ৭৬৪.৪০ ৪৯৮৬.০০ +১৪.৩৩
২০০১ ২৫৯০.৭০ ১৬০৮.২০ ৯৮৭.৯০ ৫১৮৬.৮০ +৪.০২
২০০২ ৩৩৭৮.৮০ ১৬৬৭.৩০ ১৪৬৭.০০ ৬৫১৩.১০ +২৫.৫৮
২০০৩ ৪৬২৩.৭০ ২১৭৩.৮০ ১৬৬৬.৮০ ৮৪৬৪.৩০ +২৯.৯৫

উৎস : ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ-এর বার্ষিক প্রতিবেদনসমূহ।

(vii) প্রকল্প সাফল্য

পূর্বেই বলা হয়েছে, আইবিবিএল স্বল্প পুঁজির লোকদের সহায়তা করার উদ্দেশ্যে নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণ করছে। এসব প্রকল্প গ্রহণের ফলে একদিকে যেমন ব্যাংকের বিভিন্ন ধরনের মুদারাবা আমানতের অর্থ ব্যবহার করে মুনাফা অর্জনের সুযোগ হয়েছে, অন্যদিকে দেশে বিদ্যমান ব্যাপক বেকারত্ব দূর করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পথ উন্মুক্ত হয়েছে। ডাক্তার বিনিয়োগ প্রকল্প, ক্ষুদ্র ব্রবসায় বিনিয়োগ প্রকল্প, ক্ষুদ্র পরিবহন প্রকল্প, ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প বিনিয়োগ প্রকল্প এসবের প্রকৃষ্ট পরিচায়ক। কৃষি সরঞ্জাম বিনিয়োগ প্রকল্প ও গৃহসামগ্রী বিনিয়োগ প্রকল্প ইতিমধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

(viii) পল্লী উন্নয়ন স্কীম

পল্লী জনগোষ্ঠীর দারিদ্র বিমোচন, গ্রামীন বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, উদ্যোগী ব্যক্তিদের আত্মকর্মসংস্থান ও গরীব কৃষকদের ভাগ্য উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামীন অর্থনীনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে আইবিবিএল ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৬ হতে পল্লী উন্নয়ন স্কীম চালু করেছে। িএই প্রকল্পের আওতায় ফসল উৎপাদন, মৎস্য চাষ, কৃষি ও সেচ যন্ত্রপাতি, রিকসা ভ্যানসহ বিভিন্ন গ্রামীন পরিবহন, হস্তচালিত অগভীর নলকূপ, উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও পশুপালনসহ বিভিন্ন আয়বর্ধনমূলক খাতে সহজ শর্তে বিনিয়োগ সুবিধা দিচ্ছে। প্রাথমিকভাবে দেশের ১৮টি জেলায় ব্যাংকের ২০টি শাখার প্রতিটি দশ কিলোমিটার পরিসীমার মধ্যে এক বা একাধিক গ্রামকে আদর্শ গ্রামে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়ে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল। বর্তমানে এই পরিসীমা ষোল কিলোমিটারে উন্নীত করা হয়েছে। গ্রাম বাছাইয়ের সময় সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিম্ন আয়ের লোকের সংখ্যাধিক্য ও কৃষি/অকৃষিখাতের বিদ্যমানতাকে বিবেচনা করা হয়। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানতঃ বায়ই মুয়াজ্জাল ও হায়ার পারচেজ আন্ডার শিরকাতুল মিলক পদ্ধতিই বেশী ব্যবহৃত হচ্ছে।

ডিসেম্বর, ২০০৩ পর্যন্ত দেশের ৫০টি জেলার ১২৬টি থানার ৩,৭০০টি গ্রামে কর্মসূচীটি বিস্তৃত লাভ করেছে। ক্রমান্বয়ে দেশের সকল এলাকাতেই স্কীমটি পরিব্যাপ্তি লাভ করবে বলে ব্যাংকের পরিকল্পনা রয়েছে। এই স্কীমের আওতায় ডিসেম্বর, ২০০৩ পর্যন্ত ৫,৫১৪টি কেন্দ্রে ২৬,০৯৩টি গ্রুপ তৈরী হয়েছে যার মোট সদস্য সংখ্যা ১ লক্ষ ৩০ হাজারেরও বেশি। দেশের পল্লী এলাকায় কর্মরত অন্যান্য এনজিওর মতো আইবিবিএলও মহিলাদের আর্থিক স্বচ্ছলতা অর্জনের মাধ্যমে পারিবারিক ক্ষমতায়নের উপর গুরুত্ব প্রদান করেছে। তাই সদস্যদের মধ্যে মহিলারাই ৯৪%। এ পর্যন্ত পুঞ্জীভূত বিনিয়োগকৃত অর্থের পরিমাণ ২৯২.৩৬ কোটি টাকার বেশী। গৃহীত অর্থ পরিশোধের হারও খুবই সন্তোষজনক। অপরদিকে খেলাপী ঋণের পরিমাণ খুব নগণ্য-মাত্র ২%। অপরদিকে গ্রুপের সদস্যদের ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯.৮২ কোটি টাকা। অন্যান্য এনজিওর সাথে আইবিবিএল এর গ্রহীত স্তীমের দুটি বড় পার্থক্য রয়েছে: (i) সদস্য/সদস্যাদের ইসলামী জীবনাদর্শ আচরণের জন্যে তাগিদ দেয় এবং এজন্যে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও দেয় এবং (ii) মঞ্জুরীকৃত অর্থের পুরোটাই সামগ্রী আকারে গ্রহীতা হতে পেয়ে থাকে, তা থেকে নানা তহবিলের নামে অংশবিশেষ আগেই কেটে রাখা হয় না।

(ix) সামাজিক কল্যাণ

প্রতিষ্ঠার পরপরই আইবিবিএল তার প্রদেয় যাকাতের অর্থ এবং যেসব আয় সন্দেহজনক সেসবের সমন্বয়ে ‘সাদাকাহ তহবিল’ নামে একটি দাতব্য তহবিল গঠন করে। এই তহবিল হতে আর্ত-মানবতার সেবা এবং বঞ্চিত ও অভাবগ্রস্ত মানুষের কল্যাণের লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। ক্রমান্বয়ে এর কার্যক্রমের পরিধির বিস্তৃতি ঘটলে ১৯৯১ সালের মে মাসে একে একটি ফাউণ্ডেশনে রূপান্তরিত করে ‘ইসলামী ব্যাংক ফাউণ্ডেশনের’ সৃষ্টি হয়। সেই থেকে এটি স্বতন্ত্র হিসাব ও ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়ে আসছে। এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো আর্তমানবতার সেবা, গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষা সম্প্রসারণ, আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণ, শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি ক্রীড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ, ইসলামী মতাদর্শের প্রচার, প্রসার ও গবেষণামূলক কর্মকাণ্ডের উৎসাহ দান এবং মানব সম্পদ উন্নয়ন।

ফাউন্ডেশনের আয়ের উৎস নিম্নরূপ:

১. আইবিবিএল এর নিজস্ব যাকাত;

২. ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত যাকাত;

৩. ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত অনুদান;

৪. শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ সুদমুক্ত নয় এমন আয়; এবং

৫. ফাউন্শেনের নিজস্ব প্রকল্প থেকে আয়।

ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম বহুমুখী। সেগুলোকে কয়েকটি বড় গ্রুপে ভাগ করা যায়। যেমন:-

(ক) আয়বর্ধনমূলক কার্যক্রম: এর মধ্যে রয়েছে ভিখারীর হাতকে কর্মীর হাতিয়ারে পরিনত করার উদ্দেশ্যে, রিক্সা, সেলাই মেশিন, হাঁস-মুরগী বিতরণ, গাভী পালন, আত্মকর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠায় আর্থিক সহযোগিতা প্রদান।

(খ) শিক্ষামূলক কার্যক্রম: অশিক্ষার অভিশাপ থেকে আমাদের জনগোষ্ঠীকে বিশেষতঃ দরিদ্র জনসাধারণকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে ফাউন্ডেশান তার সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে আদর্শ ফোরকারনিয়া মক্তব পরিচালনা, দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যে শিক্ষা বৃত্তি প্রদান, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহায়তা দান, ক্ষেত্রবিশেষে ছাত্র-ছাত্রীদের এককালীন সাহায্য দান কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

(গ) স্বাস্থ্য ও ‍চিকিৎসা কার্যক্রম: বাংলাদেশের অধিকাংশ লোকই স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে ফাউন্ডেশন দাতব্য চিকিৎসালয়ে সহায়তাদান কর্মসূচী। চিকিৎসার জন্যে এককালীন আর্থিক সাহায্য প্রদান, নলকূপ স্থাপন এবং স্যানেটারী পায়খানা নির্মাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচী চালিয়ে যাচ্ছে।

(ঘ) মানবিক সাহায্য দান কার্যক্রম: দুঃস্থ ব্যক্তি যারা খাদ্য বস্ত্র বাসস্থানের মতো অপরিহার্য মৌলিক চাহিদা পূরণের অসমর্থ তাদের তাৎক্ষণিক সম্ভাব্য সাহায্য করার উদ্দেশ্যে এই কর্মসূচী পরিচালিত হচ্ছে। ঋণগ্রস্তদের ঋণপরিশোধ, কন্যাদায়গ্রস্তদের এককালীন সহায়তা প্রদান এবং ইয়াতীমখানা নির্মাণ ও পরিচালনাও এই কর্মসূচীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।

(ঙ) ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম: বন্যা, ঘুর্ণিঝড়, খরা, জলোচ্ছ্বাস প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ফাউন্ডেশন তার সামর্থ অনুায়ী ত্রাণকাজ পরিচালনা করে থাকে। নদী ভাঙ্গন ও অগ্নিকাণ্ডসহ অন্যান্য দুর্যোগেও ফাউন্ডেশন ত্রাণ তৎপরতা গ্রহণ করে। অধিকন্তু ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্যে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলসহ বিভিন্ন সংস্থাকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আর্থিক অনুদান প্রদান করে থাকে ফাউন্ডেশন।

(চ) দাওয়াহ কার্যক্রম: এই কর্মসূচীর আওতায় দেশের বুদ্ধিজীবী মহলসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের বিশিষ্ট ব্যক্তিাদের মধ্যে গবেষণাধর্মী ইসলামী পত্র-পত্রিকা ও বই বিতরণ করা হয়। মাদরাসা ও মসজিদ নির্মাণ ও সংস্কারের সহায়তাদান, জাতীয় পুনর্গঠন কাজে নিয়োজিত বিভিন্ন সংস্থার অনুদান প্রদান এবং অডিও-ভিজ্যুয়াল পদ্ধতিতে দাওয়াহ কার্যক্রমের সম্প্রসারণে সাহায্য করাও এই কর্মসূচীর আওতাভুক্ত।

(ছ) বিশেষ প্রকল্প: ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে কয়েকটি বিশেষ প্রকল্পও পরিচালিত হচ্ছে। যথা:

১. ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ: মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত রোগীদের স্বল্প ব্যয়ে চিকিৎসা সুবিধা প্রদানের উদ্দেশ্যে ঢাকাতে ১৯৯৩ সালের এপ্রিল মাসে ৬০ শয্যাবিশিষ্ট এই হাসপাতা চালু করা হয়। পরবর্তীতে ঢাকাতে আরও একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। এখানে দিবা-রাত্রি জরুরী সেবা প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে। আধুনিক চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়ের সুযোগ্র ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে। এছাড়া রাজশাহীতে ১৯৯৬ সালে এবং খুলনায় ১৯৯৯ সালে এবং ২০০১ সালে বরিশালে একই মানের আরও তিনটি ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সাতক্ষীরা, মানিকগঞ্জ ও রংপুরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কম্যুনিটি হাসপাতাল। পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরসমূহে এই সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই পাশাপাশি চিকিৎসা শিক্ষা সম্প্রসারণের জন্যে রাজশাহীতে একটি পূর্ণাংগ মেডিক্যাল কলেজও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ব্যাংক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগেই এবং ২০০৩-২০০৪ শিক্ষাবর্ষে পাঠদান কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।

২. ইসলামী ব্যাংক টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট: বেকার সমস্যা সমাধান ও দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ঢাকায় দুটি বগুড়া চট্টগ্রাম ও সিলেটে একটি করে বৃত্তিমূলক কারিগরী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছে ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন। বাংলাদেশ সরকারের কারিগরী শিক্ষাবোর্ডের অনুমদোনক্রমে এগুলো পরিচালিত হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এখানে কম্পিউটার ট্রেনিং, সেক্রেটারিয়াল সায়েন্স, ইলেকট্রোনিক্স, ইন্ডাষ্ট্রিয়াল স্যুয়িং মেশিন অপরেশেন, িএয়ারকণ্ডিশনিং ও রেফ্রিজারেশান, মোটর ড্রাইভিং, রেডিও ও টেলিভিশন রিপেয়ারিং, পেইন্টিং প্রভৃতি ট্রেড কোর্সে প্রশিক্ষণ দেওযা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে এই ইনস্টিটিউটকে মানব সম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্রে পরিণত করার কর্মসূচী রয়েছে।

৩. মনোরম: মহিলাদের আত্মনির্ভরশীল করার জন্যে তাদের ঘরে তৈরি এমব্রয়ডারী করা ও নানা ডিজাইনের পোশাক-পরিচ্ছদ ও নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী বাজারজাতকরণের উদ্দেশ্যে এই প্রকল্প গৃহীত হয়েছে। এর আওতায় ইতিমধ্যে ঢাকায় একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিপণী কেন্দ্র চালু হয়েছে।

৪. বিবিধ: এছাড়া ইসলামী আদর্শে চরিত্র গঠনের উদ্দেশ্যে ১৯৯৯ সালে ঢাকায় ‘ইসলামী ব্যাংক মডেল স্কুল ও কলেজ’ নামে একটি ইংরেজী মাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছে। একই মানের একটি বাংলা মাধ্যম প্রতিষ্ঠান ২০০০ সালের মধ্যে স্থাপনেরও উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে। এছাড়া বিকলাঙ্গদের জন্যে ঢাকার কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক ফিজিওথেরাপী ও বিকলাঙ্গ পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছে এবং জাতীয় ঐতিহ্য এবং ইসলামী মূল্যবোধে উজ্জীবিত উন্নয়নকর্মীদের জন্যে ‘সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট ডায়ালগ’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। অধিকন্তু (১) ঢাকা ও রাজশাহীতে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র (২) কুরআন শরীফ শুদ্ধ পাঠ প্রশিক্ষণের জন্যে ‘তালীমুল কুরআন প্রজেক্ট’, (৩) ঢাকার মীরপুরে দুঃস্থ মহিলা পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং (৪) মামলার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্তদের আইনের সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে ‘লিগ্যাল এইড প্রজেক্ট’-িএর মতো কর্মসূচীও ব্যাংক ফাউন্ডেশনের অর্থানুকূল্যে পরিচালিত হয়ে আসছে।

ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন ১৯৯২ সালে উপরোক্ত খাতসমূহে তার তহবিল হতে ব্যয় করেছে ১.০২ কোটি টাকা, ১৯৯৩ সালে ১.৯৪ কোটি টাকা, ১৯৯৪ সালে ২.৩৯ কোটি টাকা, ১৯৯৫ সালে ২.৫০ কোটি টাকা, ১৯৯৬ সালে ২.৬৮ টাকা, ১৯৯৭ সালে ৪.২৯ কোটি টাকা এবং ১৯৯৮ সালে ৫.৭৯ কোটি টাকা, ২০০ সালে ২৯.৬০ কোটি টাকা, ২০০১ সালে ১০.০৫ কোটি টাকা, ২০০২ সালে ৭.৯২ টাকা এবং ২০০৩ সালে এর পরিমাণ ছিল ১০.৬৩ কোটি টাকা। এসব উদ্যোগ গ্রহণের ফলে গ্রাম পর্যায়ে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও বিনামূল্যে চিকিৎসালাভের পাশাপাশি আয়বর্ধনমূলক কর্মকাণ্ড সমাজের দরিদ্র ও মন্দভাগ্য লোকদের জীবনে স্বস্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ সৃষ্টিতে সমর্থ হয়েছে। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ করা যেতে পারে দেশের সুদভিত্তিক বানিজ্যিক ব্যাংকসমূহ আজও এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসতে পারেনি।

(x) তথ্য সেবার আধুনিকায়ন

আইবিবিএল তথ্য ও সেবার সর্বোচ্চ মান বজায় ও উন্নয়নকল্পে অব্যাহত প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। এই উদ্দেশ্যে পৃথক ইনফরমেশন টেকনোলজি বিভাগ স্থাপন করেছে। সকল শাখাকে কম্পিউটার সজ্জিত করে Local Area Network (LAN) এর আওতায় আনা হয়েছে। এছাড় প্রবর্তিত হয়েছে Integrated Masseging System (IMS)। বালাদেশ E-cash, ATM Network এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্যও আইবিবিএল। ব্যাংক তার নিজস্ব ওয়েবসাইট তৈরী করেছে এবং ১৯৯৯ সাল থেকে সুইফটেরও (Society for Worldwide Inter-Bank Financial Telecommunication) সদস্য রয়েছে। কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সময়মতেহা উপস্থিতি নিশ্চিত করতে প্রধান অফিসে স্থাপিত হয়েছে Automated Time Attendance System (ATAS)। ব্যাংকের নানা ধরনের হিসাব ও প্রকল্প সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও তদারকির জন্যে নিজস্ব সফটওয়্যার তৈরীর প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে।

(xi) ইসলামী ব্যাংক ট্রেনিং এ্যান্ড রিসার্চ একাডেমী

আইবিবিএল একদল সুদক্ষ ও সুযোগ্য কর্মী বাহিনী গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে কার্যক্রম শুরুর বছরেই প্রতিষ্ঠা করেছে ইসলামী ব্যাংক ট্রেনিং এ্যান্ড রিসার্চ একাডেমী (IBTRA)। বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্স সম্বন্ধে বিস্তারিত জানার ও হাতে কলমে প্রশিক্ষণ প্রদানের কোন প্রতিষ্ঠান ছিলনা। উপরন্তু প্রচলিত সুদী ব্যাংক হতে আগ্রহী ও দক্ষ ও সিনিয়র অফিসারদরে রিক্রুট করতে হয় সঙ্গত কারণেই। একই সঙ্গে রিক্রুটকৃত অফিসার ও কর্মীদের ইসলামী জীবনাদর্শ সম্পর্কে সম্যক ধারণা প্রদানের পাশাপাশি ইসলামী অর্থনীতি, ফাইন্যান্স ও ব্যাংকিং এবং বাণিজ্যনীতি ও কর্মকৌশল বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান একাডেমীর মুখ্য লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভিন্নধর্মী এই ব্যাংকের জন্যে যোগ্য ও দক্ষ জনশক্তি গঠনের উদ্দেশ্যে নিয়মিত ট্রেনিং কর্মসূচী, ওয়ার্কশপ, এক্সিকিউটিভ ডেভেলপমেন্ট কোর্স পরিচালনা ছাড়াও ঢাকাস্থ বিভিন্ন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগ, মার্কেটিং এবং ব্যবস্থাপনা বিভাগের মাস্টার্স শেষ বর্ষের ছাত্র-ছাত্রীদের ইন্টার্নশীপ পোগ্রামও একাডেমী পরিচালনা করে আসছে। সেই সাথে একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরী তৈরী ও গবেষণার প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদানের জন্যেও সযত্ন প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে। একাডেমীটির নিজস্ব গবেষণা-প্রকাশনাও রয়েছে।

(xii) জনসংযোগ উদ্বুদ্ধকরণ

বাংলাদেশের ইসলামপ্রিয় জনগণের কাছে আইবিবিএল-এর গৃহীত কর্মসূচী পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি সুদের কুফল ও মারাত্মক পরিণতি সম্বন্ধে তাদের অবহিত করার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠার পর হতেই ব্যাংকটির ব্যাপক জনসংযোগ ও উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচী গ্রহণ করে চলেছে। এই সব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে বই-পুস্তিকা প্রকাশ, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের আয়োজন, ইফতার মাহফিল, সুধী সমাবেশ ও জার্নাল প্রকাশ।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ-এর প্রথম প্রকাশিত বই ইসলামী ব্যাংক কি ও কেন? দেশব্যাপী ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল। এ পর্যন্ত বইটির দুইটি সংস্করণ (১৯৮৩ ও ১৯৮৪) প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া জনগণকে যাকাত প্রদানে উদ্বুদ্ধ করার জন্যে প্রকাশিত হয়েছে যাকাত কি ও কেন? পুস্তিকা (১৯৯২, ৬ষ্ঠ সং ২০০২)। ব্যাংক তার কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক ও সাফল্যের বিবরণ জানাবার জন্যে প্রকাশ করেছে অগ্রগতির দুই বছর (১৯৮৫), ইসলামী ব্যাংকিং: সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত (১৯৮৬), ইসলামী ব্যাংকের পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প (১৯৯৭), অগ্রগতির আট বছর (১৯৯১), ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন: জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম (১৯৯২), এবং হাজীদের সুবিধার্থে জিয়ারতের বায়তুল্লা (১৯৮৪, ৭ম সং ১৯৯৯), ইসলামী ব্যাংকিং: একটি উন্নততর ব্যাংক ব্যবস্থা (১৯৯৬), আদর্শ জীবন গড়ার প্রথম পাঠ (১৯৯৮) এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড পরিচিত (২০০১) এবং ইসলামী ব্যাংকিং: মাসায়েল ও ফতওয়া ১৯৮৩-২০০১ (২য় সং ২০০৩)। ইংরেজীতে প্রকাশ করেছে Garments (n.d), Investment and Trade Opportunities in Bangladesh (1998), Islamic Band: on Road to Progress (1992), A Decade of Progress (1994), An Era of Progress (1995), Islami Bank Foundation : Welfare Programmes (1992, 1994, 1999), Rural Development Scheme (1992), Islami Bank : 16 Years of Progress (1999), Islami Bank : 18 Years of Progress (2001) প্রভৃতি তথ্য ও চিত্রসমৃদ্ধ পুস্তিকা। এছাড়া ব্যাংকের গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের বিবরণ ও কর্মপদ্ধতি সম্বন্ধে জনসাধারণকে ওয়াকিফহাল করার জন্যে প্রকাশকরে চলেছে সুদৃশ্য ও তথ্যসমৃদ্ধ চাররঙা পরিচি৬তপত্র। উপরন্তু ইসলামী ব্যাংকিং শীর্ষক একটি তথ্য সমৃদ্ধ ও গবেষণাধর্মী জার্নাল, Islami Bank Newsletter এবং ইসলামী ব্যাংক পরিক্রমা নামে একটি ঘরোয়া ত্রৈমাসিক প্রত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগ হতে।

আইবিবিএল বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সেমিনারেরও আয়োজন করেছে। এর মধ্যে ‘ইসলামী ব্যাংক ও বীমা’ (১৯৮৯), ‘ইসলামী কমন মার্কেট’ (১৯৯৩) এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক ও ইসলামিক ইকোনমিকস্‌ রিসার্চ ব্যুরোর সাথে যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত Financial Mabagement in an Islamic Perspective, 2004 খুবই সফ ও ‍গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়েছে। এছাড়া ইসলামিক ইকোনমিকস রিসার্চ ব্যুরোর সহযোগিতায় রাজধানী ছাড়াও দেশের বিভাগীয় ও প্রধান জেলা শহরে কুড়িটিরও বেশী আঞ্চলিক সেমিনারের আয়োজন করেছে ১৯৯৩-১৯৯৫ সালে। জনাকীর্ণ এই সব সেমিনার দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অর্থনীতিবিদ ওলামাযে কেরাম ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থা তথা ইসলামী অর্থনীতির শ্রেষ্ঠত্ব ও সামাজিক কল্যাণমুখী দিকগুলো বিশদভাবে উপস্থাপন করেন। এই ধারা অব্যাহত রয়েছে।

প্রতি বছর বিশেষ গ্রাহক সমাবেশের আয়োজন ছাড়াও পবিত্র মাহে রমজানে আইবিবিএল এর সকল শাখায় আয়োজিত ইফতার মাহফিলে বক্তৃতা ও আলোচনার মাধ্যমে জনসাধারণের কাছে ইসলামী অর্থনীতি ও ফাইন্যান্স ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্ব ও কল্যাণকর দিকগুলো তুলে ধরার ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে জনমনে যে বিপুল উদ্দীপনার সৃষ্টি হয় তারই ফলে ব্যাংকের শাখা বিস্তারের জন্যে গণদাবী উঠে। এজন্যেই ১৯৮৮ সালের ২৭টি শাখা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে পনের বছরের মধ্যে ২০০৩ সালে ১৪১-এ পৌঁচেছে। েইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের এই জনসংযোগ ও উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচীর ফলেই দেশে অন্যান্য ইসলামী ব্যাঙক প্রতিষ্ঠা বহুলাংশে সহজ হয়ে যায়। খুব অল্প দিনের ব্যবধানে দু-দুটি ইসলামী ব্যাংকের আত্মপ্রকাশ এবং একটি পুরোপুরি সুদী ব্যাংকের রাতারাতি ইসলামী ব্যাংকে রূপান্তর (এক্সিম ব্যাংক) এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

. আলআরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড

প্রতিষ্ঠা

আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লিমিডেট (এআইবিএল) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮ই জুন, ১৯৯৫। তবে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় ২৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৫। প্রতিষ্ঠার পর পরই ব্যাংকটি দেশের জনগণের মধ্যে সাড়া জাগাতে সমর্থ হয়েছে। এর অনুমোদিত মূলধনের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা। ব্যাংকটি যাত্রা শুরেু করে ১০ কোটি ১২ লক্ষ টাকার পরিশোধিত মূলধন নিয়ে। ২০০৩ সালে এই পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ৫০ কোটি ৬০ লাখ টাকার পৌঁচেছে।

পরিচালনা ব্যবস্থাপনা

ব্যাংকের বোর্ড অব ডাইরেক্টরসের বর্তহমান সদস্য সংখ্যা ২৬। এরা সকলেই বাংলাদেশী। ইসলামী শরীয়াহ পালনের নিশ্চয়তা বিধানের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠার সময় হতেই সাত সদস্য বিশিষ্ট একটি শরীয়াহ কাউন্সিলও গটিত হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন দেশের পাঁচজন প্রখ্যাত ফকীহ/আলিম এবং এজজন করে ব্যাংকার ও আনজ্ঞ।

কার্যপদ্ধতি

আইবিবিএল যেসব পদ্ধতিতে আমানত গ্রহণ ও বিনিয়োগ করে থাকে এই ব্যাংকটিও সেসব পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকে। এছাড়াও মাসিক মুনাফা প্রদানভিত্তিক পাঁচ বছর মেয়াদী মুদারাবা আমানত, এককালীন হজ্জ্ব আমানত, মাসিক জমাভিত্তিক মেয়াদী সঞ্চয় আমানত ও বিবাহ সঞ্চয় আমানত নামে আরও কয়েক ধরনের আমানত গ্রহণ করে থাকে।

এআইবিএল তার মূলধন ও আমানতের মাধ্যমে সংগৃহীত তহবিল বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে তার পূর্বসূরী আইবিবিএল অনুসৃত ইসলামী শরীয়াহভিত্তিক পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করে থাকে। উপরন্তু আয়বর্ধন কর্মকাণ্ডসহ অর্থনীতির সকল দিককে আওতায় আনার উদ্দেশ্যে নতুন নতুন স্কমি গ্রহণ করে চলেছে। সীমিত আয়ের লোক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয়বর্ধনমূলক কর্মকাণ্ডে অগ্রগতির উদ্দেশ্যে ব্যাংক নীচের প্রকল্পসমূহ চালু করেছে:

১) কাংখিত সামগ্রী বিনিয়োগ

২) ক্ষুদ্র ব্যবসায় বিনিয়োগ

৩) পরিবহন বিনিয়োগ

৪) বিশেষ পল্লী বিনিয়োগ

এসব বিনিয়োগ কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ব্যাংকটি এদেশের মাদরাসা শিক্ষতিদের, মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের, দ্বীনদার এবঙ আলেমদের জন্যে বিশেষ বিনিয়োগ প্রকল্প গ্রহণ করেছে। প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় এরা অবহেলিত ও অনাদৃত। এদেশে কর্মরত এনজিও গোষ্ঠী এবং অন্যান্য সাহায্যকারী সংস্থাগুলো মাদরাসাশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর প্রতি কোন দিন নজর দেয়নি। এর প্রতিবিধানের উদ্দেশ্যে এআইবিএল মাদরাসা শিক্ষিত লোকদের জন্যে সুবিধাজনক শর্তে বিশেষ বিনিয়োগ কর্মসূচী গ্রহণ করেছে।

সাফল্য

এআইবিএলের কার্যকাল আট ব ছরের কিছু বেশী। এত স্বল্প সময় কোন ব্যাংকেরই কার্যক্রম মূল্যায়নের জন্যে যথেষ্ট নয়। তাই এখানে শুধু মাত্র তার কর্মকাণ্ডের সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হ লো।

. শাখা বৃদ্ধি আমানত সংগ্রহ

সারণী-৫ হতে দেখা যাবে প্রতিষ্ঠার বছরেই ব্যাংক পাঁচটি শাখা খুলতে সমর্থ হয়েছিল। পরবর্তী বছরে সেই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির হার ১০০%। তার পরবর্তী বছরেও অর্থাৎ ১৯৯৭ সালের প্রবৃদ্ধির হার একই ছিল- শাখার সংখ্যা ১০ হতে ২০-এ উন্নীত হয়েছে। এই সংখ্যা ১৯৯৮ সালে ৩০-এ পৌঁচেছে। প্রতিকূল পরিবেশে ভিন্নধর্মী আদর্শের একটা ব্যাংকের এই দ্রুতগতি শাখা বিস্তার নিঃসন্দেহে তার শক্তিমত্তা ও সাফল্যের পরিচায়ক। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য প্রতিষ্ঠার প্রথম চার বছরে আইবিবিএল-এর শাখার সংখ্যা ছিল মাত্র ১৮। অবশ্য দীর্ঘ পনের বছর ধরে আইবিবিএলের ব্যাপক জনসংযোগ, সাফল্য ও প্রেরণাই যে এআইবিবিএল-এর এই সম্প্রসারণের ভিত রচনা করে রেখেছিল তা স্বীকার করতেই হবে। ১৯৯৫ সালে ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ ছিল ২০.১৪ কোটি টাকা। ২০০৩ সালে এই পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ৮৬৪.৩২ কোটি টাকায় পৌঁচেছে।

সারণী

আল আরাফা ইসলামী ব্যাংক লি.-এর আমানত বিনিয়োগের চিত্র: ১৯৯৫২০০৩ (কোটি টাকায়)

বছর শাখার সংখ্যা আমানতের পরিমাণ শাখাপিছু আমানত বিনিয়োগের পরিমাণ শাখাপিছু বিনিয়োগ মোট আয় শাখাপিছু আয় মোট ব্যয় শাখাপিছু ব্যয়
১০
১৯৯৫ ২০.১৪ ৪.০২ ১.২৪ ০.২৪ ০.১৩ ০.০২ ০.৩৩ ০.০৬
১৯৯৬ ১০ ১০৩.৫৬ ১০.৩৫ ৭৭.৯২ ৭.৭৯ ৫.০৯ ০.৫০ ৪.৬২ ০.৪৬
১৯৯৭ ২০ ২২৫.৬৬ ১১.২৮ ১৭৪.৫৫ ৮.৭৩ ১৯.৬২ ০.৯৮ ১২.৮৯ ০.৬৪
১৯৯৮ ৩০ ৪৫৩.৪৭ ১৫.১২ ২২৫.৯৮ ৭.৫৩ ৩২.২৯ ১.০৭ ২৪.০৯ ০.৮০
১৯৯৯ ৩৫ ৬৪১.৫৮ ১৮.৩৩ ৩৩০.৬৪ ৯.৪৭ ৫৩.৪৭ ১.৫৩ ৪৬.৪৩ ১.৩৩
২০০০ ৩৭ ৭৩০.৯১ ১৯.৬৯ ৫০৭.৯২ ১২.৬৯ ৮০.০৩ ২.০০ ৬৭.৮৮ ১.৬৯
২০০১ ৪০ ৭৮৭.৯১ ১৯.৬৯ ৫০৭.৯২ ১২.৬৯ ৮০.০৩ ২.০০ ৬৭.৮৮ ১.৬৯
২০০২ ৪০ ৭১৬.৩০ ১৭.৯০ ৬৪০.৩৬ ১৬.০০ ৮৩.৫৪ ২.০৮ ৬৭.১৪ ১.৬৭
২০০৩ ৪০ ৮৬৪.৩২ ২১.৬০ ৭৫৭.১৫ ১৮.৯২ ৯৮.৭৭ ২.৪৬ ৬৮.১৩ ১.৭০

উৎস : আল্‌-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লিঃ বার্ষিক প্রতিবেদনসমূহ।

. বিনিয়োগ

শুরুর বচরে ছয় মাসেরও কম সময়ে এআইবিএল ১.২৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে সমর্থ হয়েছিল। পরবর্তী বছরে এই পরিমাণ লাফিয়ে বৃদ্ধি পেয়ে ৭৭.৯২ কোটি টাকায় পৌঁছায়। ১৯৯৭ সালে এই পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭৪.৫৫ কোটি টাকায়। (বৃদ্ধির হার ছিল +১২৪%) এবং ১৯৯৮-এ ২২৫.৯৮ কোটি টাকায়। এক্ষেত্রে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় বৃদ্ধির হার ছিল +২৯.৪৬%। ২০০৩ সালে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৭৫৭.১৫ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে শাখাপিছু গড় বিনিয়োগ ছিল ১৮.৯২ কোটি টাকা। (সারণী-৫ দ্রষ্টব্য)।

. বৈদেশিক বাণিজ্য

বৈদেশিক বাণিজ্যে অর্থায়নের ক্ষেত্রে এআইবিএলের অগ্রগতি প্রশংসনীয়। তবে আমদানী বাণিজ্যে অর্থায়নের চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে রপ্তানী বাণিজ্যে অর্থায়ন। ১৯৯৬ সালে ব্যাংকটির আমদানী বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১০৩.০২ কোটি টাকা, ১৯৯৭ সালে ৩২২.২৪ কোটি টাকা এবং ১৯৯৮ সালে ৫২৭.৯৫ কোটি টাকা (বৃদ্ধির হার যথাক্রমে +২১২.৭৯% ও +৬৩.৮৩%)। সেই তুলনায় রপ্তানী বাণিজ্যের পরিমাণ এই একই বছরগুলোয় ছিল যথাক্রমে ৮.৩৬ কোটি টাকা, ৫৯.২১ কোটি টাকা এবং ১১০.৩০ কোটি টাকা (বৃদ্ধির হার যথাক্রমে +৬০৮% ও +৮৬.২৮%) ২০০৩ সালে ব্যাংকটির আমদানী বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৭৬৯.৮২ কোটি টাকা এবং রপ্তানী বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৩০৭.৫৫ কোটি টাকা।

. আয় মুনাফা

ব্যাংকটির আয় বৃদ্ধি পেয়েছে অবিশ্বাস্য দ্রুত হারে। ১৯৯৬ সালে যেখানে ব্যাংকটির আয় ছিল মাত্র ৫.০৯ কোটি টাকা, ১৯৯৭ সালেই তা বেড়ে ১৯.৬২ কোটি টাকায় পৌঁছায়। এক্ষেত্রে শাখাপিছু আয় ছিল ১৯৯৬ সালে ৫০ লক্ষ টাকা। এই আয়ই ২০০৩ সালে ২ কোটি ৪৬ লক্ষ টাকায় পৌঁছায়। লক্ষ্যণীয়, প্রথম দিকে শাখা পিছু ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় সমান দ্রুত তালে। ১৯৯৬ সালে শাখাপিছু ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৪৬ লক্ষ টাকা। এই অংকই ২০০৩ এ এসে দাঁড়িয়েছে শাখাপিছু ১.৭০ কোটি টাকা (সারণী-৫ দ্রষ্টব্য)।

ব্যাংকটির ১৯৯৫ সালে ৬ মাসের কার্যকালে ২০ লক্ষ টাকা লোকসান দিলেও পরবর্তী বছর হতেই মুনাফা অর্জনে সক্ষম হয়। এর পরিমাণ অবশ্য স্বল্প ছিল, মাত্র ৪৭ লক্ষ টাকা। ১৯৯৭ সালে এই পরিমাণ দাঁড়ায় ৬.৭৩ কোটি টাকা এবং ২০০৩ সালে করপূর্ব মুনাফার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০.৬৩ কোটি টাকা। ২০০১ ও ২০০২ সালে এর পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৩.৯৪ কোটি টাকা ও ১৬.৩৯ কোটি টাকা।

. প্রশিক্ষণ প্রেরণা

জনশক্তির দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যে প্রশিক্ষণ ও প্রেরণা অপরিহার্য। যেকোন বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ জনশক্তি তার প্রাণমক্তি রূপে কাজ করে। এই উদ্দেশ্যে ব্যাংকটি নিজস্ব ট্রেনিং একাডেমীতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। উপরন্তু ১৯৯৮ সাল হতে শুদ্ধভাবে কুরআন শরীফ পাঠের উদ্দেশ্যে কুরআন শিক্ষা অধিবেশন শুরু করেছে। এসব প্রশিক্ষণ ও প্রেষণামূলক কার্যক্রমের ফলে কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের আচার-আচরণের পরিবর্তন এসেছে এবং নৈতিক মূল্যবোধের পুনরুজ্জীবন ঘটেছে বলে দাবী করেছেন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ (বার্ষিক প্রতিবেদন ১৯৯৮, পৃ. ২২)।

প্রসঙ্গতঃ জনশক্তি নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকের ঘোষিত নীতির উল্লেখের দাবী রাখে। এই ব্যাংকে অফিসার হতে শুরু করে সকল পর্যায়ে লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে মাদ্রাসা শিক্ষিতদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ব্যাংকের চেয়ারম্যান এক অনুষ্ঠানে বলেছেন- “মাদরাসা শিক্ষিতদের দ্বারা ব্যাংক চালনাকে আমরা একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি” (দৈনিক সংগ্রাম, ১৮ অক্টোবর ১৯৯৯)। নিঃসন্দেহে এদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এ এক নতুন মাত্রা।

. অন্যান্য কার্যক্রম

সমাজসেবামূলক কার্যক্রমে অংশ গ্রহণের জন্যে এআইবিএল একটি ব্যাংক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছে। যাকাত এবং যে সন্দেহজনক আয় ব্যাংক মুনাফায় গ্রহণ করতে পারে না সেই অর্থ দিয়ে এটি পরিচালিত হয়। এর আওতায় ১৯৯৯ সালে ঢাকায় একটি সমৃদ্ধ আধুনিক লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ১৯৯৯ সালেই ‘আল-আরাফাহ ইংলিশ মিডিয়াম মাদরাসা’ স্থাপন করে আধুনিক শিক্ষার সাথে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বয় সাধনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। উপরন্তু ইসলামী জ্ঞান শিক্ষা ও ইসলামী মূল্যবোধ তৈরীর প্রতি জোর দেওয়া কর্মসূচীর আওতায় ১০৮৪ কপি তরজমানুল কুরআন বিনামূল্যে দেশের প্রতিটি উপজেলায় বিতরণ করেছে।

. সোস্যাল ইনভেষ্টমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড

প্রতিষ্ঠা

বাংলাদেশে ইসলামী পদ্থরি চতুর্থ ব্যাং হলো সোস্যাল ইনভেষ্টমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (এসআইবিএল)। এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় ২২ নভেম্বর, ১৯৯৫। ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধনের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ২৬.০০ কোটি টাকা। ব্যাংকটির ৩৮ জন উদ্যোক্তার মধ্যে ৭ জন বিদেশী রয়েছে।

পরিচালনা ব্যবস্থাপনা

এর বোর্ড অব ডিরেক্টরসের সদস্য সংখ্যা ২৭। এদের মধ্যে ৩জন বিদেশী। অন্যান্য ইসলামী ব্যাংকের মতো এই ব্যাংকেরও একটা শরীয়াহ বোর্ড রয়েছে। এগারো সদস্যবিশিষ্ট এই শরীয়াহবোর্ডে রয়েছেন ছয়জন ফকীহ/আলিম, একজন ব্যাংকার, একজন আইনজ্ঞ ও দুজন অর্থনীতিবিদ।

কার্যপদ্ধতি

আইবিবিএল যেসব পদ্ধতিতে আমানত গ্রহণ ও বিনিয়োগ করে থাকে এই ব্যাংকও সেসব পদ্ধতি অনুসরণ করার পাশাপাশি দু-একটি অপ্রচলিত নতুন পদ্ধতিও উদ্ভাবন করেছে। সেসবের মধ্যে ক্যাশ ওয়াক্‌ফ ফান্ড উল্লেখযোগ্য।

অন্যান্য ব্যাংক হতে এসআইবিএল নিজেকে ভিন্নধর্মী বলে দাবী করে। এজন্যে এর কর্মপদ্ধতি ও কর্মপরিধিও অধিকতর বিস্তৃত হওয়ার কথা। তবে সময়ই বলে দেবে এর প্রস্তাবিত কর্মপদ্ধতি কতখানি সফলতা অর্জনে সক্ষম হবে। ব্যাংকটি ত্রিখাত মডেলের ভিত্তিতে কাজ করে যাচ্ছে। এগুলো হলো: (ক) আনুষ্ঠানিক (Fromal) (খ) অনানুষ্ঠানিক (Non-Fromal) এবং (গ) স্বেচ্ছামূলক (Voluntary)।

আনুষ্ঠানিক খাত: এ খাতের আওতায় অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের অনুরূপ সকল সাধারণ সেবা প্রদান করা হয়। এ খাতে সৃষ্ট ‘সামাজিক উদ্বৃত্ত’ দুঃস্থ মানুষের কল্যাণের জন্যে ব্যয়িত হবে। ফলে খাতটির ‘মানবিকীকরণ’ ঘটবে বলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ প্রত্যাশা করেন।

অনানুষ্ঠানিক খাত: এ খাতে ব্যাংক কর্পোরেট বহির্ভূত কার্যক্রমে অর্থায়ন করবে। তবে এক্ষেত্রে যেসব বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকতে হবে সেগুলো হলো: )১) সহজেই প্রবেশে সক্ষম, (২) স্থানীয় সম্পদের উপর নির্ভরশীল কর্মকাণ্ড, (৩) ক্ষুদ্রায়তন কর্মপরিধি, (৪) শ্রমনিবিড় উৎপাদন কৌশল, (৫) অনানুষ্ঠানিক স্কুলের বাইরে অর্জিত দক্ষতা এবং (৬) অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতামূলক বাজার। বিশেষ করে শহর ও গ্রামীন এলাকার দরিদ্র পরিবারসমূহের ক্ষমতায়নের উদ্দেশ্যে গৃহীত কর্মসূচীর ফলে এখাতের প্রকৃতই ‘সামাজিকীকরণ’ ঘটবে বলে প্রত্যাশা করেন। প্রতিষ্টাতা চেয়ারম্যান।

স্বেচ্ছামূলক খাত: এ খাতের আওতায় রয়েছে ওয়াকপ ও মসজিদসমূহের সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন, উত্তরাধিকার সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন দাতব্য ট্রাষ্ট ও সংস্থা ও অলাভজনক ফাউন্ডেশনসমূহের ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন, অমুসলিমদের কল্যাণের জন্যে তহবিল গঠন প্রভৃতি কার্যক্রম। এসব উদ্যোগ গ্রহণের মাধমে ব্যাংক গোটা খাতটির ‘আর্থিকীকরণ’ করতে চায়।

উল্লেখ্য, আনুষ্ঠানিক খাতকে মানবিকীকরণের উদ্দেশ্যে প্রতিবেশী এ্যাউন্স স্কীম ও যৌতুকমুক্ত নববিবাহিত সম্পত্তিকে বিশেষ সুবিধাজনক হারে স্থায়ী ভোগ্যপণ্য ক্রয়ে অর্থায়ন, অনানুষ্ঠানিক খাতের সামাজিকীকরণের উদ্দেশ্যে আইএলও-র সহযোগিতায় টোকাইদের মধ্যে থেকে এগিয়ে আসা কিশোরদরে জন্যে ‘পরিবেশ বন্ধুসুলভ ব্যবসায় কর্মসূচী’ গ্রহণ এবং স্বেচ্ছামূলক খাতে আর্থিকীকরণ তথা সমাজে কল্যাণমুখী কর্মধারা জোরদার করার উদ্দেশ্যে ক্যাশ ওয়াক্‌ফ সার্টিফিকেট (যা ব্যবহারের ৩২টি খাত রয়েছে) প্রবর্তন সন্দেহাতীতভাবে ব্যাংকটির ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ। সত্যিকার ইসলামী জীবন ব্যবস্থা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে দেশের অন্যান্য ইসলামী ব্যাংকও এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে এগিয়ে আসতে পারে

ক্যাশ ওয়াকফের অর্থ হলো সমাজের বিত্তশালী তথা সচ্ছল জনগোষ্ঠী তাদের সঞ্চয়ের একটা অংশ দিয়ে এই নামেই একটা সার্টিফিকেট কিনবে যার আয় ওয়াকপ সম্পত্তির আয়ের মতোই ধর্মীয়, শিক্ষামূলক ও সামাজিক সেবামূলক নানা ধরনের মহৎ কাচে ব্যবহৃত হবে। এ উদ্যোগ গ্রহণের পিচনে ব্যাংকের উদ্দেশ্য হলো সামাজিক সঞ্চয় আহরণ করে তা মুলধনে রূপান্তরের মাধ্যমে তা থেকে অর্জিত আয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কল্যাণ সাধনে ব্যয় করতে বিত্তশালীদের উদ্বুদ্ধ ও সহযোগিতা করা। এজন্যেই ব্যাংকের প্রধান শ্লোগান হলো- ‘দরদী সমাজ গঠনে সমবেত অংশ গ্রহণৎ’।

সাফল্য

এসআইবিএলের কার্যকাল আট বছর পূর্ণ হয়েছে। এত স্বল্প সময়ের কার্যক্রমের ভিত্তিতে এর বিশদ মূল্যায়ন অর্থাৎ সাফল্য ও ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরা সম্ভব নয়। তাই শুধা মাত্র কর্মকাণ্ডের সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো।

. শাকা বৃদ্ধি আমানত সংগ্রহ: সারণী-৬ হতে দেখা যাবে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটির শাখা পাঁচটিতেই সীমিত রয়েছে। অবশ্য ১৯৯৮ সালে ব্যাংক নতুন পাঁচটি শাখা খুলতে সমর্থ হয়েছে। ফলে শাখা সংখ্যা ১০ এ উন্নীত হয়েছে। ২০০৩ সালে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২৪-এ। ১৯৯৬ সালের ৪১.৭৮ কোটি৬ টাকার আমানত ১৯৯৭ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ৬৪.৫৫ কোটি টাকায় পৌঁচেছে (বৃদ্ধির হার +৬৪.৪৯%)। পরবর্তী বছরে বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল আরও সন্তোষজনক, ২০২.৯০ কোটি টাকা (বৃদ্ধির হার +২১৪.৩২%)। এর পর ক্রামাগত আমানত বেড়েছে এবং ২০০৩ সালে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১,৯৭০.৯৩ কোটি টাকা।

. বিনিয়োগ: এসআইবিএল ১৯৯৬ সালে ২০.৬৩ কোটি টাকা বিনিয়োগে সমর্থ হয়। পরবর্তী বছরে এক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ছিল +৭৮.৫২%। বিনিয়োগের পরিমাণ ১৯৯৮ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১১৭.১৪ কোটি টাকায়। ২০০৩ সালে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রথমবারের মতো এক হাজার কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করে। এ বছর শাখাপিছু বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৪১.৯১ কোটি টাকা (সারণী-৬ দ্রষ্টব্য)।

সারণী

সোস্যাল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক লিঃএর আমানত বিনিয়োগের চিত্র: ১৯৯৫২০০৩ (কোটি টাকায়)

বছর শাখার সংখ্যা আমানতের পরিমাণ শাখাপিছু আমানত বিনিয়োগের পরিমাণ শাখাপিছু বিনিয়োগ মোট আয় শাখাপিছু আয় মোট ব্যয় শাখাপিছু ব্যয়
১০
১৯৯৫ ১২.৪২ ১২.৪২ ০.০২ ০.০২ ০.দ১৭ ০.১৭ ০.৬২ ০.৬২
১৯৯৬ ৪১,৭৮ ৮.৩৫ ২০.৬৩ ৪.১২ ১.৯২ ০.৩৮ ৩.৮২ ০.৭৬
১৯৯৭ ৬৪.৫৫ ১২.৯১ ৩৬.৮৩ ৭.৩৬ ৫.১৩ ১.০২ ৫.৬৮ ১.১৩
১৯৯৮ ১০ ২০২.৯০ ২০.২৯ ১১৭.১৪ ১১.৭১ ১৭.৩৯ ১.৭৩ ১৩.৪৭ ১.৩৪
১৯৯৯ ১২ ৩৮২.৬৬ ৩১.৮৮ ২১৬.৪৬ ১৮.০৪ ১৩.২২ ১.১০ ৫.৮২ ০.৪৮
২০০০ ১৪ ৪৮৬.৩২ ৩৪.৭৩ ২৫২.২২ ২৫.১৫ ১৮.২৪ ১.৩০ ৭.৬৭ ০.৫৪
২০০১ ১৫ ১০৫৬.৯৭ ৭০.৪৬ ৫৪৯.৯২ ৩৬.৬৬ ৩৯.৮৭ ২.৬৫ ৯.৬৭ ০.৬৪
২০০২ ১৯ ১৫১৪.১৩ ৭৯.৬৯ ৭৫০.৪০ ৩৯.৪৯ ৫৪.১৯ ২.৮৫ ১২.৯১ ০.৬৭
২০০৩ ২৪ ১৯৭০.৯৩ ৮২.১২ ১০০৫.৯১ ৪১.৯১ ৬৯.৪৮ ২.৮৯ ১৯.৪৩ ০.৮১

উৎস: সোস্যাল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক লিঃ এর বার্ষিক প্রতিবেদনসমূহ।

. বৈদেশিক বাণিজ্য: বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্যাংকটির সাফল্য দেশে ইসলামী পদ্ধতির অন্যান্য ব্যাংকের মতোই। এই ব্যাংকও আমদানী বাণিজ্যের চেয়ে রপ্তানী বাণিজ্যে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ১৯৯৭ সালে ব্যাংকের আমদানী বাণিজ্যে অর্থায়নের পরিমান ছিল ৫৩.৪৪ কোটি টাকা, ১৯৯৮ সালে ১৩৬.৪৩ কোটি টাকা এবং ১৯৯৯ সালে ১৭১.৮৬ কোটি টাকা সেই তুলনায় রপ্তানী বাণিজ্যে অর্থায়নের পরিমান ঐ একই বছরগুলোতে যথাক্রমে ৩.৮৬ কোটি, ৪.২৯ কোটি টাকা এবং ১৩.৯৮ কোটি টাকা। ২০০২ ও ২০০৩ সালে এই পরিমাণ ছিল আমদানীর ক্ষেত্রে যথাক্রমে ১১১২.১৮ কোটি ও ১৪৯০.৫৯ কোটি টাকা এবং রপ্তানী বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ২২৮.৭৬ কোটি টাকা ও ৪০৩.৫৯ কোটি টাকা।

. আয় মুনাফা: ব্যাংকটির আয়ের সাথে ব্যয় যেন পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৯৬ সালে ব্যাংকের আয় যেখানে ছিল ১.৯২ কোটি টাকা সেখানে ব্যয় ৩.৮২ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রায় দ্বিগুণ। পরবর্তী বছরেও ব্যয়ের পরিমাণ আয়ের মাত্রাকে অতিক্রম করে গেছে। ব্যাংকটি প্রথম মুনাফার মুখ দেখে ১৯৯৮ সালে। এ বছরে করপূর্ব মুনাফার পরিমাণ ছিল ৩.৯২ কোটি টাকা। কিন্তু পূর্ববর্তী বছরসমূহের লোকসান পূরণ, কর প্রদান, স্ট্যাটুটরী সঞ্চিতি ইত্যাদির জন্যে বরাদ্দ রাখার ফলে শেয়ার হোল্ডারদের কোন ডিভিডেন্ড দেওয়া সম্ভব হয়নি। ২০০৩ সালে ব্যাংকের আয় দাঁড়ায় ৬৯.৪৮ কোটি টাকা এবং ব্যয় দাঁড়ায় ১৯.৪৩ কোটি টাকা। এ বছরে করপূর্ব মুনাফার পরিমাণ ছিল ৫০.০৫ কোটি টাকা।

. প্রশিক্ষণ: অন্যান্য ইসলামী ব্যাংকের মতো এসআইবিএলও তার জনশক্তির মান উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যে প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে। শাখার সংখ্যা কম হেতু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা কম হওয়ায় ব্যাংকের কোন অফিসেই প্রশিক্ষণ কর্মসূচী পরিচালিত হচ্ছে।

. বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিংএর সমস্যা

ইসলামী পদ্ধতির ব্যাংকগুলার প্রয়াস সম্পর্কে দেশবাসী যতখানি আগ্রহান্বিত ও উদগ্রীব ছিল বাস্তবে তা পূরণ হয়নি। অবশ্য আইবিবিএল ইতিমধ্যেই দেশের সেরা ব্যাংক হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। তারপরেও বলতেই হবে ইসলামী পদ্ধতির ব্যাংকিং এদেশে পদে পদে হোঁচট খাচ্ছে, নানা রকম বাধা-বিপত্তির সম্মুখণ হচ্ছে। এজন্যে যে সব কারণ দায়ী তার কিছু ব্যাংকের নিজস্বব সীমাবদ্ধতা, কিছু দেশে বিদ্যমান আইন কাঠামেসা, প্রশান ব্যবস্থা এবং জনগণের মানসিকতার সাথে সংশ্লিষ্ট। নীচে এগুলো সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

প্রথম, প্রতিষ্ঠার পর থেকে ব্যাংকগুলো সীমিত কতকগুলো ক্ষেত্রেই শুধু বিনিয়োগ করে যাচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে ঝুঁকি খুবই কম কিন্তু মুনাফা প্রাপ্তি নিশ্চিত। ফলে অর্থনীতির অন্যান্য খাত অবহেলিত ও উপেক্ষিত রয়ে যাচ্ছে। উপরন্তু বিনিয়োগের অন্যান্য যেসব ইসলামী পদ্ধতি রয়েছে, বিশেষতঃ ইসলামী অর্থনীতির প্রাণশক্তি মুদারাবা ও মুশারাকার কোন চর্চাই হচ্ছে না।

দ্বিতীয়, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিগণের অসততা ও মুনাফা গোপন করার প্রবণতার কারণে ব্যাংক সঠিক হিসাব পায় না। ফলে বাৎসরিক ঘোষিত মুনাফার হারও স্বভাবতঃই কম হয়। অপরদিকে যারা সৎ-অসৎ উপায় নির্বিশেষে মুনাফা অর্জনকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দেয় তারাওইসরামী শরীয়অহর কড়াকড়ি অনুশাসনের আওতায় আসতে চায় না।

তৃতীয়, বিনিয়োগের জন্যে অর্থ গ্রহণের পর ঐ অর্থ পরিশোধে গ্রহীতাগণ নির্দিষ্ট সময়সীমা মেনে চলতে অনেক সময়ই ব্যর্থ হয়। এক্ষেত্রে সুদী ব্যাংকসমূহ চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ আদায় করে ঐ ক্ষতি পুষিয়ে নেয়। কিন্তু শরীয়াহর নিষেধের কারণে েইসলামী ব্যাংকগুলো এই পদক্ষেপ নিতে পারে না। এজন্যে জরিমানা আদায় করলেও তাতে শরীয়াহর অনুমোদন না থাকায় ব্যাংক তা নিজস্ব আয় হিসাবে দেখাতে পারে না। ফলে ঐ অর্থ চলে যায় সাদাকাহ তহবিলে।

চতুর্থ, ইসলামী ব্যাংকগুলো নিয়মিত যাকাত আদায় করে থাকে। এর পরিমাণ কোটি কোটি টাকা। এই অর্থ জনকল্যাণেই ব্যয়িত হচ্ছে। কিন্তু সুদী ব্যাংকসমূহকে যাকাত দিতে হয় না। তারা বরং িএর চেয়ে অনেক কম পরিমাণ অর্থ মাঝে-মধ্যে সরকারের বিভিন্ন ত্রাণমূলক কর্মকাণ্ডে দান করে যেমন সুনাম অর্জন করে তেমনি ঐ অর্থ খরচ হিসাবে দেখিয়ে আয়কর মওকুফের সুবিধা পায়। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকগুলো যাকাত প্রদান করলেও এজন্যে কর মওকুফের কোন সুবিধা পায় না। অথচ তাদের এই সুবিধা পাওয়া উচিত ছিল যুক্তিসংগতভাবেই।

পঞ্চম, বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিংএর জন্যে এখনও উপযুক্ত ও পৃথক আইন কাঠামো তৈরী হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকিং এ্যাক্ট ১৯৯১ ও কোম্পানী আইন ১৯৯৪ ‍অনুযায়ী এদেশের ব্যাংক সমগ্র ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে। এদেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বয়স তিন দশক পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু তার জন্যে আজও ইসলামী শরীয়াহ আইন তৈরী হয়নি। ফলে প্রতি পদে তাকে বাধাগ্রস্ত হতে হচ্ছে।

ষষ্ঠ, ইসলামী ব্যাংকের জন্যে এখনও দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনশক্তির অবাব প্রকট। প্রাথমিক পর্যায়ে আইবিবিএলকে অন্যান্য সুদী ব্যাংক হতে দক্ষ জনশক্তি সংগ্রহ করে কাজ শুরু করতে হয়েছিল। তাদেরকে অবশ্য ইসলামী ব্যাংকিং-এর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও ইসলামী ব্যাংকগুলো শাখা সম্প্রসারণের জন্যে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও উদ্বুদ্ধ জনশক্তির অভাব প্রধান অন্তরায় বলে স্বীকৃত।

সপ্তম, ইসলামী ব্যাংকগুলো এখনও পুরোপুর ইসলামী পদ্ধতিতে তাদের হিসাব পরিচালানা করতে পারছে না। শরীয়াহ্‌ কাউন্সিল বার বার দৃষ্টি আকর্ষণ করা সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত বহু ক্ষেত্রে এ্যাক্রুয়াল পদ্ধতিতেই হিসাব রাকা হচ্ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়-দায়িত্বও কম নয়। কিন্তু তারাও এ ব্যাপারে যথোচিত-দিক নির্দেশনা প্রদান করছে না।

অষ্টম, এদেশে সমাজ জীবনএখন এক সর্বব্যাপী ও সর্বগ্রাসী অবক্ষয়ের শিকার। ইসলামী পদ্ধতির ব্যাংক পরিচালনা এ অবস্থায় নিঃসন্দেহে দুরূহ কাজ। বিশ্বাস সততা আমানতদারী ওয়াদা রক্ষা ও সময়ানুবর্তিতা নিঃসন্দেহে যেকোন ব্যবসায় ও কার্যক্রমের প্রাণশক্তি। আমাদের সমাজে এখন এসবের নিদারুণ অভাব। উপরন্তু দাপটের সাথে বিদ্যমান দুর্নীতিপরায়ণ প্রশাসন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, চাঁদাবাজী, দীর্ঘসূত্রীতা, স্বজনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক জিঘাংসা। এর অবসান না হলে সটিক মানে ইসলামী ব্যাংকিং পরিচালনা এক দুরূহ কাজ।

নবম, ইসলামী ব্যাংকিং-এর অন্যতম উদ্দেশ্য দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন যাপনের মান উন্নয়ন। এদেশের জনগোষ্ঠীর বিপুল অংশ পল্লীবাসী, কৃষিজীবি এবং একই সঙ্গে দরিদ্রও। পরিণাম ফল যাই হোক না কেন কৃষি ব্যাংকসমূহ সুদী ব্যাংকগুলো কৃষিঋণের ব্যবস্থা করে কৃষকদের সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছে। অথচ দরিদ্র কৃষকদের বিনিয়োগ সুবিধা প্রদানের জন্য ইসলামী ব্যাংকগুলো এখনও কার্যকর কোন বিনিয়োগ পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে পারেনি। ফলে গ্রামীন জনগণ তথা দেশের কৃষককুলের জীবনের যেমনগুণগত পরিবর্তনের সুযোগ হচ্ছে না তেমনি তাদের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিং এর প্রসার ঘটেনি।

দশম, ইসলামী ব্যাংকগুলো এখনও পর্যন্ত দেশের পল্লী এলাকায় কোন শাখা প্রতিষ্ঠা করেনি। বেসরকারী সুদী ব্যাংকগুলোর মত এরাও মূলতঃ শহর এলাকাতেই শাখা সম্প্রসারণ সীমাবদ্ধ রেখেছে। এ অবস্থা আদৌ কাঙ্খিত হতে পারে না। ইসলামী ব্যাংকিং অবশ্যই গণমুখী হতে হবে। এক্ষেত্রে দুটো বাধা রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। প্রথম, ব্যাংকের জনশক্তি গ্রামে থাকতে অনিচ্ছুক। কারণ গ্রামাঞ্চলে শহুরে জীবনে অভ্যস্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব। দ্বিতীয়, শহরের তুলনায় পল্লীতে কম আয়ের সম্ভাবনা। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকসমূহে কর্মরতদের মনে রাখা উচিৎ তারা এখানে শুধু চাকুরীইা করছে নরা, তাদের কার্যক্রম ইবাদাতের শামিল। ইসলামী ব্যাংকগুলোর জনশক্তির কাছ থেকে এদেশের ইসলামপ্রিয় জনগণ কিছুটা আরাম-আয়েশের কুরবানী আশা করতে পারে বৈ কি। একই সাথে শুধু মুনাফা অর্জনই একটা কল্যাণমুখী ব্যাংকং-এর মুখ্য কাম্য হতে পারে না। মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কল্যাণ ও গণমানুষের সাথে সম্পৃক্ততাকেও ইসলামী ব্যাংকগুলোর সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিৎ।

একাদশ, একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ইসলামী ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানসমূহের সম্প্রসারণের প্রবল বিরোধিতা করছে এদেশের সরকারই। এজন্যেই ইসলামী ব্যাংকগুলো যতগুলো নতুন শাখা স্থাপনের অনুমতির জন্যে বাংলাদেশে ব্যাংকের কাছে আবেদন জানায় বহু দেন-দরবারের পর তার এক-তৃতীয়াংশ বা অর্ধেকের কম অনুমোদন পায়। ফলে ইচ্ছা ও সামর্থ থাকা সত্ত্বেও ইসলামী ব্যাংকগুলো তাদের শাখা সম্প্রসারণ করতে পারছে না। এর কয়েকটি তাৎপর্য রয়েছে। এদেশের সুদী ব্যাংকগুলো সাফল্য ও গ্রহণযোগ্যতার বিচারে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে। ফলশ্রুতিতে জনমনে ইসলামী ব্যাংকিং তথা ইসলামী অর্থনীতি যে আসলেই প্রগতিশীল ও কল্যাণময় অর্থনীতি বাস্তবায়নে সক্ষম তাই-ই সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এদেশে মুখে ইসলাম পছন্দ অথচ বাস্তবে প্রচণ্ড ইসলামী জীবনাদর্শবিরোধী সরকারগুলো কখনই ইসলামের কল্যাণের দিক বাস্তবায়নে স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসেনি।

উপসংহার

সংক্ষিপ্ত এই আলোচনা বাংলাদেশে ২০০০ সালের পূর্বে প্রতিষ্টিত ইসলামী ব্যাংকগুলোর কর্মপদ্ধতি ও সাফল্য সম্পর্কে একটা চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। এত অল্প সময় সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী একটি ব্যাংকিং পদ্ধতির কার্যক্রম মূল্যায়নের জন্যে আদৌ যথেষ্ট নয়। তাকে আরও অনেক পথ অতিক্রম করতে হবে, পার হতে হবে অনেক চড়াই-উৎরাই। তবু একথা বলা বাঞ্ছনীয় যে, অর্থনীতিরন মাত্র একটি বা দুটি খাতকে ক্রমাগত প্রাধানী দিয়ে গেলে বা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সম্পদশালী অংশকেই বরাবর সুযোগ দিতে থাকলে দীর্ঘকালীন সামষ্টিক উন্নতি ও কল্যাণধর্মী অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন আদৌ সম্ভব নয়। এজন্যে চাই যুগপৎ সমাজের সকল শ্রেণীর বিশেষ করে গ্রামীন দরিদ্র শ্রেণীর ভাগ্য উন্নয়নের কর্মসূচী গ্রহণের পাশাপাশি অর্থনীতির সকল খাতেই বিচরণ করার যোগ্যতা অর্জন। এজন্যে ইসলামী পদ্ধতির ব্যাংকগুলোকে আরও গণমুখী, ব্যাপকভিত্তিক ও শেকড় সন্ধানী হতে হবে। তার বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে হতে হবে বহুধা বিস্তৃত, সহযোগিতাধর্মী ও দরিদ্রদের জন্যে প্রকৃতই উপযোগী অর্থাৎ, আয়বর্ধন কর্মসংস্থানমূলক। তাহলেই নিশ্চিত হবে এদেশের জনগণের প্রকৃত আর্থঞ-সামাজিক শ্রীবৃদ্ধি ও কল্যাণ।

About শাহ মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান