ইসলামী অর্থনীতি নির্বাচিত প্রবন্ধ

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমস্যা ইসলামী সমাধান

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমস্যা

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমস্যা ক্রমাগত ভয়াবহ রূপ ধারণ কর চলেছে। এ দেশের ৮৬% লোকই মুসলমান। ইসলামী জীবন দর্শনে তারা বিশ্বাসী। কিন্তু ইসলামী জীবন দর্শনে বিশ্ববাসীদের জীবনে যে শান্তি, কল্যাণ, উন্নয়ন ও নিরাপত্তা থাকার কথা তাদের জীবনে আজ তা অনুপস্থিত। এ রকম তো হওয়ার কথা ছিল না। এই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমস্যার প্রকৃত কারণ উৎঘাটনের চেষ্টা এবং ইসলামী অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য ও মূলনীতির আলোকে ঐসব সমস্যার সমাধান কতখানি সম্ভব সেই জিজ্ঞাসার উত্তর খোঁজা হয়েছে বর্তমান আলোচনায়। সমস্যা যত ব্যাপক ও গভীর হবে তার সমাধান ততই জোরালো ও ত্বরিৎ ফলপ্রসূ হতে হবে। এবং তা হতে হবে ইসলামী জীবন দর্শন তথা ইসলামী অর্থনীতির মূলনীতির আলোকেই। এ দেশর জনসাধারণ দীর্ঘদিন ভ্রান্তির কবলে নিপতিত। পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের দাওয়ােই এ দেশে প্রয়োগ করা হয়েছে রাষ্ট্রীয়ভাবেই, কিন্তু উন্নতি ও কল্যাণ তো আসেই নি বরং অকল্যাণের সাথে সাথে সাধারণ মানুষের জীবন-যাপনের মানের হয়েছে অধোগতি।

বাংলাদেশের অর্থনীতির সমস্যা হিসাবে প্রধানতঃ এবং প্রায়শঃ যেসব বিষয়কে চিহ্নিত করা হয় তার অধিকাংশই প্রকৃতপক্ষে মূল সমস্যা নয়। পুঁজির ঘাটতি, শ্রমিকের অদক্ষতা, প্রাকৃতিক দুর্বিপাক, নিরক্ষর জনগণ, প্রাচীন কৃষি পদ্ধতি অনুসরণ, কম সঞ্চয়, দুর্বল ভৌত অবকাঠামো ইত্যাদিকে এদেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সমস্যা বলে চিহ্নিত করা হয়। অথচ প্রকৃত সমস্যার সাথে এক করে বিচার করা হয়। যেসব সমস্যার সমাধান করলে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিকাশ গতিশীল হতে পারে, বেকারত্ব হ্রাস পেয়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেতে পারে, উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে পরনির্ভরশীলতা হ্রাস পেতে জরুরী অথচ সমাজের গভীরে প্রোথিত সমস্যার মূলোৎপাটন আজ একান্ত প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির মৌলিক সমস্যা প্রধানতঃ পাঁচটি। যথা:-

ক. ধন বন্টনে বৈষম্য;

খ. পর্যাপ্ত উৎপাদন না হওয়া;

গ. অপব্যয়, দুর্নীতি ও কালো টাকার প্রসার;

ঘ. বৈদেশিক বাণিজ্যে ঘাটতি; এবং

ঙ. ব্যাপক বেকারত্ব।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় যে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্যে যারা নানা পথ নির্দেশের প্রস্তাবনা পেশ করেন, নানা প্রেসক্রিপশান দিয়ে থাকেন বিভিন্ন চটকদার মোড়কে তারা না আমাদের জীবন দর্শনে বিশ্বাসী ও আস্থাশীল, না তারা আমাদের যথার্থ হিতৈষী। আমাদের সমস্যা সমাধানে আজ আমাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে; আমাদের প্রয়োজন পূরণে আমাদেরকে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে। এ কাজে এ দেশে তৌহীদবাদী অকুতোভয় নওজোয়ানরাই সেরা সেনানীর, শ্রেষ্ঠ উদ্যোক্তার ভূমিকা রাখতে পারে।

উপরে উল্লেখিত অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান কিভাবে ইসলামী উপায়ে হতে পারে, অর্থাৎ ইসলামী অর্থনীতিতে এর কি সমাধান রয়েছে সে বিষয়ে এখানে আলোকপাত করা হলো। মনে রাখা দরকার, যে যুগে রাসূলে করীম (স) ইসলামের অমিয় বাণী নিয়ে এসেছিলেন এবং যে জাতির আমূল পরিবর্তন করেছিলেন আজকের পৃথিবী বহু ক্ষেত্রেই অনুরূপ পংকিলতা ও দুর্যোগের শিকার। অথচ রাসূলের (স) রেখে যাওয়া কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের হাতের কাছেই বর্তমান। আমাদের আত্মবিস্মৃতি ও পরমুখাপেক্ষিতাই যে বর্তমানে গোটা জাতিকে হীন দশায় উপনীত করেছে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

ইসলামী সমাধান

. ধনবন্টনে বৈষম্য দূরীকরণ

ধনবন্টনে বৈষম্যের পথ ধরই সমাজে হতাশা, বঞ্চনা ও শ্রেণী বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। বেকারত্ব ও অসহায়ত্ব বৃদ্ধি পায়। শোষণ-নিপীড়নের জগদ্দল পাথর চেপে বসে। অসহায় ও বঞ্চিতদের মৌলিক মানবিক প্রয়োজন রয়ে যায় অপূর্ণ। তাই ধন বন্টনে বৈষম্য দূরীকরণ অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে ‘আমর বিল মারুফ’ ও ‘নেহী আনিল মুনকার’ ইসলামের এই উভয় নির্দেশই যুগপৎ পালনীয়।

১. ধন বন্টনে সাম্য স্থাপনের ক্ষেত্রে ইসলামী মীরাস বা উত্তরাধিকারীদের মধ্যে মৃতের স্থাবর-অস্থাপর সম্পদে বাঁটোয়ারা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়। ইসলামপূর্ব যুগে পৃথিবীতে সম্পদ বন্টনের কোন বৈজ্ঞানিক পন্থা বিদ্যমান ছিল না। ইসলামই সর্বপ্রথম মৃতের সম্পদ তার আত্মীয়-স্বজন পরিবার-পরিজনদের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে যেমন তাদের তাৎক্ষণিক অসহায় অবস্থা দূর করতে সমর্থ হয়েছে, তেমনি ব্যক্তি বিশেষের হাতে সকল সম্পদ কুক্ষিগত হওয়ার বিপদও দূর করেছে। উপরন্তু সম্পত্তিতে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করে তাদেরকেও নিজের পায়ে দাঁড়াবার সুযোগ করে দিয়েছে।

আমাদের দেশের দেওয়ানী আইনে মুসলমানদের এই অধিকার স্বীকৃত আছে। ফারায়েজ অনুসারে মৃতের সম্পত্তি বাঁটোয়ারার বিধান আইনতঃ স্বীকৃত হলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ সন্তোষজনক নয়। বরং বেআইনী বা জবরদস্তিমূলক স্থাপর-অস্থাবর সম্পত্তি দখল করা বর্তমানে একটা স্বীকৃত রেওয়াজ বা দস্তুরে পরিণত হয়েছে। আত্মীয়-স্বজনের জমি, ইয়াতীম ও নাবালকদের সম্পত্তি এমনকি প্রতিবেশীর জমি বাগান দালান ছাড়াও শত্রু সম্পত্তি, সরকারী সম্পত্তি (খাস জমি) বাড়িঘর প্রতিষ্ঠান জবর দখল করে, কিংবা জাল বা ভূয়া দলিল করে েএক শ্রেণীর মানুষ রাতারাতি বিত্তশালী হওয়ার সুযোগ নিচ্ছে। আইন এদের কাছে বড়ই অসহায়। ছলে-বলে কৌশলে ন্যায্য প্রাপ্য সম্পত্তি হতে বঞ্চিত করা হচ্ছে ইয়াতীমদের, বিধবা ভ্রাতৃবধুদের, ভাগ্নে-ভাগ্নিদের, ভাইবো-ভাইঝিদের, বোনদের, খালা-ফুফুদের। ফলে মুষ্টিমেয় লোকের হাতে সম্পত্তি পুঞ্জীভূত হয়ে চলেছে। এই অবস্থার কারণেই একদিকে যেমন ধনবৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে অন্যদিকে নির্যাতন নিপীড়ন বঞ্চনা ও হতাশা বেড়েই চলেছে। তাই আজ প্রয়োজন দেশে বিদ্যমান দেওয়ানী আইনের মীরাসী অংশের পূর্ণ ও দ্রুত বাস্তবায়ন।

২. যে কোন সমাজে আয় ও সম্পদ বন্টনে বৈষম্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে সুদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে দেশে যে সমাজে যে অর্থনীতিতে একবার সুদের অণুপ্রবেশ ঘটেছে সে অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে গেছে, সে সমাজ ধ্বংস হয়ে গেছে। ধনী-গরীবের পার্থক্য হয়েছে বিপুল আর নির্যাতিত বঞ্চিত মানুষের আহাজারিতে ভরে গেছে আকাশ বাতাস জনপদ। সুদের বিদ্যমানতার ফলে অর্থনীতিতে যেসব প্রত্যক্ষ কুফল লক্ষ্য করা গেছে সেগুলো সম্পর্কে ইতোপূর্বেই অন্যত্র বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। (সুদ: অর্থনৈতিক কুফল ও উচ্ছেদের উপায় প্রবন্ধ দ্রষ্টব্য)

সুদের ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক কুফলের কারণেই সুদ উচ্ছেদের জন্যে রাসূলে কারীম (স) মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর হতেই সুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করে গেছেন। তাঁরই চেষ্টায় প্রথমে মদীনা হতে ও পরবর্তীকালে সমগ্র ইসলামী বিশ্ব হতে সুদ নির্মূল হয়ে যায়। দুর্ভাগ্যের বিষয়, িইসলামী হুকুমাতের পতন দশা শুরু হওয়অর পর যখন খৃষ্টান শাসকগোষ্ঠী তথা পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যলিপ্সু শক্তি একের পর এক মুসলিম দেশে তাদের আধিপত্য বিস্তার শুরু করে তখন তাদেরই উদ্যোগে ও তাদেরই তৈরী আইনের আওতায় অর্থনীতিতে সুদভিত্তিক লেনদেন পুনরায় শুরু হয়ে যায়। বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম নয়। মুসলিম শাসন আমলে এ দেশেমুসলমানদের মধ্যে সুদ চালু ছিল না। কিন্তু ইংরেজ শাসনকালে তাদেরই সহযোগিতা ও তৎপরতায় এ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সুদের অনুপ্রবেশ ঘটে। এ থেকে মুক্তির জন্যে তিনটি পথ খোলা রয়েছে।

প্রথমতঃ সুদভিত্তিক বাণিজ্যিক লেনদেন বন্ধ করে দিতে হলে এমন অর্থব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার যা সম্পূর্ণ শরীয়াহসম্মত। বর্তমান যুগে বাণিজ্যিক লেনদেন যেহেতু সুদনির্ভর সেহেতু এর বিপরীতে ইসরামী ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠান স্থাপনের উপর অধিকতর জোর দিতে হবে। ইতমধ্যেই এ দেশে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ব্যাংকসমূহ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে প্রতিযোগিতামূলকভাবে সাফল্যের সাথে কাজ করে চলেছে। এই সাফল্যকে আরও বিস্তৃত ও সুদুরপ্রসারী করতে হলে আরও বেশী সংখ্যক ইসরামী ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা চাই। এর ফলে সুদের যুলুম হতে মানুষ অনকখানি নিষ্কৃতি পাবে।

দ্বিতীয়তঃ সুদের অপকার সম্বন্ধে জনমত গঠন ও জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এ দেশে স্বাক্ষরতার হার বাড়লেও শিক্ষিতের হার বাড়েনি। তাই ইসলামী জীবনের মূল কর্মপদ্ধতি ও নীতির যৌক্তিক সম্পর্ক সম্বন্ধে অধিকাংশ লোক অজ্ঞ। ফলে তারা সুদের ভয়াবহ আর্থিক, সামাজিক ও ধর্মীয় পরিণাম সম্বন্ধে আদৌ ওয়াকিফহাল নয়। এদরে কাছে সুদের মারাত্মক কুফলগুলো তুলে ধরতে হবে। এ কাজ করতে হবে পোষ্টার, লিফলেট, আলোচনা, ওয়াজ-মাহফিল, সেমিনার ও ব্যক্তিগত আলাপচারিতার মাধ্যমে। পরিণামে গণদাবী সৃষ্টি হলে সুদের উচ্ছেদ শুধু সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।

তৃতীয়তঃ সমাজে যারা সুদের লেনদেন করে, ব্রবসা করে এবং সুদের টাকা খাটায় তাদের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হতে হবে। তাদের প্রতিহত করতে হবে সামাজিকভাবেই। কেননা যথাযথ সামাজিক প্রতিরোধের মুখে কোন অশুভ শক্তিই টিকতে পারে না। এ দেশে পঞ্চাশ বছর পূর্বেও সুদখোরদের বাড়িতে কোন দাওয়াত গ্রহণ করতেন না আলিম-উলামারা। তাদের বিয়ে-শাদীতে শরিক হতেন না। বরং সুদখোরদের এতই অখ্যতি ছিল যে, গরুর গায়ে পোকা হলে সাতজন সুদখোরের নাম কাগজে লিখে গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হতো। অথচ আজ সুদী ব্যাংকের বার্ষিক প্রীতিভোজে দাওয়াত না পেলে অনৈকে নিজেদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে গণ্য করেন। আজ সময় এসেছে সুদখোরদরে বয়কট করার, তাদের ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি না বানাবার এবং জরিমানার বদলে বাধ্যতামূলকবাবে সুদ না আদায়ের দাবী তোলার। সরকারী প্রাপ্য, যেমন জমির খাজনা বকেয়া হলে সরকার তার জন্যে সুদ আদায় করেন দণ্ড বা শাস্তি হিসাবে। এর প্রতিবিধান হওয়া দরকার। খাজনা যদি বাকি পড়েই তাহলে জমির মুসলমান মালিক সে জন্যে জরিমানা দিতে বাধ্য থাকবেন, সুদ দেবেন কেন? এসব বিষয়ে নিশ্চয়ই জনগণকে বলা যায়, বোঝানো যায়। এ দায়িত্ব তরুণদের। তারাই আগামী দিনে দেশের কর্ণধার। সুতরাং, তাদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। সেই সাথে অবশ্যই সহযোগিতা করবেন দেশের আলিম-উলামা ও মাশায়েখগণ।

৩. যাকাত আদায় ও তার যথোচিত ব্যবহার আয় ও সম্পদের সুবিচারপূর্ণ বন্টনের একটি বলিষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। যাকাতের মাধ্যমে সম্পদের একটি সুনির্দিষ্ট অংশ এমন কয়েকটি নির্দিষ্ট খাতের লোকদের মধ্যে বন্টিত ও ব্যবহার হয় যারা প্রকৃতই বিত্তহীন শ্রেণীভুক্ত। এদের মধ্যে রয়েছে গরীব অভাবগ্রস্ত ঋণগ্রস্ত মুসাফির নওমুসলিম ও আল্লাহর পথে জিহাদকারী। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ব্যতিক্রমী কয়েকটি উদাহরণ বাদে অধিকাংশ মুসলিম দেশেই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বাধ্যতামূলকভাবে যাকাত আদায় ও তা বিলি-বন্টনের ব্যবস্থা নেই। আমাদের দেশে তো যাকাত আদায় ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা মর্জির উপর নির্ভরশীল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উশরের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। উশর আদায়ের মাধ্যমে কৃষিক্ষেত্রে ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য যেমন হ্রাস পায় তেমনি কৃষি পণ্যের সুষ্ঠু সামাজিক বন্টনও নিশ্চিত হয়। বর্তমানে প্রচলিত খাজনা পদ্ধতির চেয়ে এই পদ্ধতি এ জন্যেই উত্তম যে, নিসাব পরিমাণ ফসল না হলে উশর আদায় করতে হয় না। আজকের খাজনা ব্যবস্থায় বড় চাষীদের বিপুল বিত্তের মালিক হওয়ার অবাধ সুযোগ বিদ্যমান। কারণ তাদের প্রদত্ত খাজনা ও উৎপন্নের মধ্যে রয়েছে দুস্তর ব্যবধান। পক্ষান্তরে উশর ব্যবস্থায় প্রান্তিক চাষী, ক্ষুদ্র চাষী, এমনকি বর্গচাষীরা রেহাই পায় সঙ্গতঃ কারণেই। এর ফলে ধনবন্টনে বৈষম্য হ্রাস পেতে বাধ্য।

এদেশে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে যাকাত ও উশর আদায এবং তার সুষ্ঠু বিলিবন্টন করা খুবই সম্ভব। এ জন্যে চাই আইনী সহায়তা ও যথাযথ উদ্রোগ। পরিকল্পিত উপায়ে যাকাত ও উশর আদায় করে তা যাকাতের হকদারদের ত্রাণ ও পুর্নবাসন, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানমূলক কাজে ব্যবহার করে সমাজের হতদরিদ্র লোকদের অবস্থার পরিবর্তন করা সম্ভব। এ উদ্দেশ্যে ইতিমধ্যে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ও ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পরিকল্পিতভাবে কাজ করে চলেছে। তাদের পরিসর ক্ষুদ্র, কিন্তু সুফল পাওয়া যাচ্ছে ঠিকই।

৪. ধনবন্টনে বৈষম্যের অপর গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে ব্যবসায়িক অসাধুতা। ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ব্যক্তিরা নানা অসৎ উপায়ে জনজীবনে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং নিজেরা বিপুল বিত্তের মালিক হয়ে যায়। এসব অসৎ কাজের মধ্যে রয়েছে মজুতদারী মুনাফাখোরী কালোবাজারী ওজনে কারচুপি পণ্যে ভেজাল দেওয়া নকল করা ইত্যাদি। একথা সর্বজন স্বীকৃত যে, চোরাকারবারী যেমন দেশের অর্থনৈতিক ধ্বংস ডেকে আনে, কালোবাজারীও তেমনই সামাজিক অবক্ষয়ের গতি ত্বরান্বিত করে। এ দুইয়ের যোগফল যে কোন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাকে ভয়ানক নাজুক করে তুলতে পারে। উপরন্তু এসব ব্যবসায়িক অসাধুতার সুযোগ নিয়ে কিছুসংখ্রক লোক রাতারাতি আঙুল ফুলে কলা গাছ হয়ে যায়। অন্যদিকে সাধারণ জনগণ এদের অন্যায় ও অনৈতিক কাজের শিকার হয়ে ক্রমাগত দরিদ্র হয়ে পড়ে। বলাবাহুল্য, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সব ধরনের ব্যবসায়িক অসাধুতা এখন সদাপটে বিদ্যমান।

গভীর পরিতাপ ও হতাশার কথা, এসব রুখবার জন্যে দেশে ঔপনিবেশিক আমলে প্রবর্তিত যে আইন এখনও বিদ্যমান রয়েছে তাও বাস্তবায়ন করার জন্যে যেন কেউ নেই। পচা দ্রব্য, ভেজাল সামগ্রী বাজার হতে বিতাড়নের জন্যে রয়েছে মার্কেট ইন্সপেক্টর। তাকে কখনও বাজারে দেখা যায় একথা হলফ করে কেউ বলতে পারবে না। অনুরূপভাবে দেশে চোরাচালান রোধের জন্যে ফায়ারিং স্কোয়াডে চোরাচালানীর মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয়েছে তিন দশক আগে। আজ অবধি সেই আইনের প্রয়োগ এ দেশে কেউ দেখেনি, যেন এদেশে চোরাচালান হয় না। ওজনে কারচুপি করলে আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে। তারও প্রয়োগ যেন কোন অদৃশ্য ইঙ্গিতে থেমে রয়েছে। এসব ব্যবসায়িক অসাধুতার পথেই সৃষ্ট হয় মুনাফার পাহাড় যা পরিণামে জন্ম দেয় অর্থনৈতিক নৈরাজ্যের। এর প্রতিবিধানের উদ্দেশ্যে একদিকে যেমন দেশে বিদ্যমান আইনের সুষ্ঠু ও ত্বরিৎ প্রয়োগের জন্যে জোর দাবী তুলতে হবে, গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে তেমনি অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধেও গড়ে তুলতে হবে সামাজিক সচেতনতা, ক্ষেত্রবিশেষে সামাজিক প্রতিরোধ। সামাজিক প্রতিরোধের মাধ্যমেই কেবল কালোবাজারী, চোরাচালানী ও মজুতদারী উচ্ছেদ সম্ভব। একই সঙ্গে আইনের নিরপেক্ষ ও কঠোর প্রয়োগ জরুরী। নেহী আনিল মুনকারে বাস্তবায়ন এখন রাষ্ট্রীয়ভাবে আবশ্যক। রাষ্ট্র পরাঙমুখ হলে দেশের সচেতন যুব সমাজকেই এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে ভয়াবহ দুর্যোগ ও নিদারুণ নির্যাতনের শিকার হবে আপামর জনসাধারণ। বর্তমান সময়ই তার স্বাক্ষী।

৬. ঘুষ ও অন্যান্য অবৈধ উপায়ে আয় সামাজিক শ্রেণী বৈষম্য সৃষ্টির অন্যতম কারণ। ঘুষের রন্ধ্রপথে দুর্নীতির যে অনুপ্রবেশ ঘটে তা গোটা প্রশাসন, বিচার ও আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থাকেই ঘুণে ধরা কাঠের মত ধ্বংস করে ফেলে। উপরন্তু সমাজে ধনবৈষম্যকে করে তোলে আরও প্রকট। ঘুষের কারণেই সরকারী চাকুরীর বয়স তিন বছর না পুরতেই রাজধানীতে জমি হয়, বাড়ি হয়, স্ত্রীর শরীরে ওঠে দামী গহণা। ঘুষের কারণেই কোন কোন অফিসের নিম্নমান সহকারীর টিনের ঘরও কয়েক বছরের মধ্যে রূপান্তরিত হয় তিনতলা পাকা বাড়িতে। অথচ সৎভাবে উপার্জন করে বহু উঁচু পদের অফিসাররাও শেষ জীবনে ভাড়া বাড়িতে কাটান। ঘুষের যত রকম রূপ সম্ভব এ দেশে তার সব কটিই প্রচলিত রয়েছে। অফিসার ইন্সপেক্টর হতে শুরু করে উঁচু পদের আমলা এমনকি মন্ত্রীরা পর্যন্ত ঘুষ খায় বলে অভিযোগ প্রকাশিত হয় জাতীয় দৈনিকগুলোতে। এর প্রতিবিধানের জন্যে বহু দেশে সরকারী আমলা ও মন্ত্রীদের সহায়-সম্পত্তির হিসাব দেওয়ার বিধি রয়েছে। সেই বিবরণ খবরের কাগজগুলোতেও প্রকাশিত হয়। এ দেশেও এক সময় এ নিয়ম চালু ছিল। আজ আর নেই বলে সবাই উঠেছে লাপরোয়া। ফলে দুর্গতি ও ভোগান্তির চূড়ান্ত হচ্ছে সাধারণ জনগণের।

এই ব্যবস্থা নিরসনের জন্যে চাই আল্লাহর আইন, চাই সৎ লোকের শাসন। একদিকে যেমন খোদাভীরু ও যোগ্য লোক প্রশাসন, আইন, বিচার ও অন্যান্য বিভাগের দায়িত্ব গ্রহণ করবে এবং নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করবে অন্যদিকে তারা ফয়সালা করবে আল্লাহর আইন অনুসারেই। আমাদের দেশে এখনও দেওয়ানী ও ফৌজদারী আইন যা বলবৎ রয়েছে যোগ্য ও সৎ লোক দ্বারা তার যথাযথ প্রয়োগ হলে সমাজের বহু বেইনসাফী দূল হতো, প্রতিষ্ঠিত হতো আদল ও ইহসান। তবে মানুষের সার্বিক কল্যাণের জন্যে সকল ক্ষেত্রেই চাই আল্লাহর আইন। কারণ মানুষের তৈরী আইনে ভ্রান্তি ও দুর্বলতা থাকেই। আল্লাহর আইনই ভ্রান্তিমুক্ত ও কল্যাণধর্মী। এদেশের অর্থনীতিতে বৈষম্য দূল করে মানুষের সত্যিকার কল্যাণ ও আর্থিক নিরাপত্তা বিধানের জন্যে যেসব আইন বলবৎ আছে অন্ততঃ সেগুলোর প্রয়োগ যেন যথাযথভাবে হয় তার চেষ্টা চালাতে হবে। একইসঙ্গে সৎ নেতৃত্ব তৈরী করে তাদের মাধ্যমে আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

. পর্যাপ্ত উৎপাদন বৃদ্ধির প্রচেষ্টা

বাংলাদেশে কৃষি ও শিল্প উভয় খাতেই উৎপাদনের হার ও পরিমাণ বিশ্বমানের অনেক নীচে। ফলে উদ্বৃত্ত পণ্য রপ্তানী করে দেশের জন্যে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন দূরে থাক, খাদ্য সামগ্রীসহ বহু নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানী করতে হচ্ছে। স্বাধনিতার পর হতে আজও বাংলাদেশ কৃষিপণ্য উৎপাদনের স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারেনি। অথচ কৃষি বিশেষজ্ঞ যারাই এ দেশে এসেছেন সরকারের পরামর্শদাতা হিসেবে তাঁদের সকলেরই অভিমত বাংলাদেশের খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ না হওয়ার যৌক্তিক কোন কারণ নেই। মূলতঃ যে প্রধান কারণটির জন্রে আজও এ দেশে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়নি সেটিহচ্ছে কৃষি জমির যথাযথ ব্যবহার না হওয়া। এ ক্ষেত্রে মূল অন্তরায় হচ্ছে বিদ্যমান ত্রুটিপূর্ণ ভূমিস্বত্ব ব্যবস্থা।

এদেশে বিদ্যমান বর্গাপ্রথা জমির উন্নয়ন ও এক ফসলী জমিকে তিন ফসলী জমিতে রূপান্তরের ক্ষে্রেত মস্ত বড় বাধা। যারা বেশি জমির মালিক তারা জমির যত্ন নেয় না, বর্গাদাররা স্বেচ্ছায় যা করে তাতেই সন্তুষ্ট থাকে। পক্ষান্তরে অধিকাংশ বর্গাচাষী দরিদ্র হওয়ার কারণে জমির উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহের উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণে অপারগ। এ ক্ষেত্রে তাদের আশু প্রয়োজন পূরণে সহায়তা করার জন্যে এগিয়ে আসে গ্রাম্য মহাজন যাদের সুদের হার আকাশচুম্বী। গবেষণায় দেখা গেছে, সরকারী যেসব প্রতিষ্ঠান কম হারে সুদে কৃষকদের উপকরণ সংগ্রহের জন্যে ঋণের যোগানদার হওয়ার দাবী করে তারা প্রকৃত দরকারের সময়ে ঋণ যোগাতে ব্যর্থ। সে সময়ে গ্রাম্য মহাজনই দ্রুত সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসে। ফলে উৎপাদন যেটুকু হয় ফসল ওঠার পরে সুদের দায়ে তার প্রায় সবটুকু মহাজনের গোলায় ওঠে। বাকীটুকু প্রায় জমির মালিক। পরিণামে বর্গাচাষীর ঋণের বোঝা আরও স্ফীত হয়। যথাসময়ে সার সেচ উন্নত বীজ ও কীটনাশক সংগ্রহ অনেক চাষীর নাগালের বাইরে। ফলে কৃষি উৎপাদনে এ দেশ পশ্চাৎপদ রয়েই গেছে।

এ অবস্থা হতে পরিত্রাণ পেতে হলে বর্গাচাষ ব্যবস্থাকে আরও যৌক্তিক করতে হবে এবং সরকারকে অবশ্যই করযে হাসানা দেওয়ার জন্যে পদক্ষেপ নিতে হবে। যদি পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ করে দেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে কৃষকদের ন্যূনতম পক্ষে ঐ পরিমাণ অর্থ প্রারম্ভিকভাবে করযে হাসানা দেওয়া খুবই সম্ভব। এর চেয়ে বেশী পরিমাণ অর্থ-সর্বোচ্চ বিশ হাজার টাকা দেওয়াও সম্ভব হতে পারে ন্যূনতম সার্ভিস চার্জের বিনিময়ে। ফলে ঋণ নিয়ে কৃষি কাজ করতে বাধ্য হয় তারা শুধু উপকৃতই হবে না, মধ্যস্বত্ব ভোগীদের উপদ্রব হতেও তারা রেহাই পাবে। উপরন্তু বর্গার যে অংশভাগ পদ্ধতি মরয়েছে তারও পরিবর্তন হওয়া দরকার। প্রকত চাষীর অনুকূলে এই অনুপাত নির্ধারিত হলে চাষীরা উৎসাহিত হবে উৎপাদন বৃদ্ধিতে। এ দুটো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হলে জনমত সৃষ্টি ও সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে। এজন্যে ব্যাপক যোগাযোগ করতে হবে চাষীদের সাথে, জনগণের সাথে। করযে হাসানা প্রদান ও বর্গার অনুপাত চাষীদের অনুকূলে বাস্তবায়ন করতে হলে জমির মালিক, চাষী ও সংশ্লিষ্ট সকলকে এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

শিল্প উৎপাদন ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ নিদারুণভাবে পশ্চাৎপদ। এ জন্যে নানা কারণ দায়ী। আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি, পর্যাপ্ত পুঁজির অভাব ও বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি লাগসই প্রযুক্তি (Appropriate technology) উদ্ভাবন ও ব্যবহারের প্রতি আমাদের সীমাহীন অনীহার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। অথচ টেকসই উন্নয়নের (Sustainable development) জন্যে লাগসই প্রযুক্তি অপরিহার্য। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, ইসলামী শ্রমনীতি মূল দাবীগুলি এ দেশে উপেক্ষিত। উপরন্তু সম্পূর্ণ অন্যায় ও অবৈধভাবে বিপুল সংখ্যক শিশু ও কিশোর শ্রম ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতারিত ও নিগৃহীত হচ্ছে নারী শ্রমিকেরা।

এর প্রতিবিধানের জন্যে শিল্প ক্ষেত্রে শ্রমিক নিয়েঅগের সময়ে ইসলামী শ্রমনীতির মূলনীতিগুলি যেমন অবশ্য পালনীয় তেমনি শ্রমিকদেরও মালিকের হক আদায় করা অবশ্য কর্তব্য। ইসলামী অর্থনীতিতে শ্রমিকের যে মর্যাদা ও অধিকার স্বীকৃত হয়েছে এবং শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে যে প্রীতির সম্পর্ক সৃষ্টির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাতে শ্রমিক-মালিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত সৃষ্টির কোন অবকাশ নেই। দুই পক্ষের সম্মিলিত চেষ্টা ও আন্তরিকতাপূর্ণ সহযোগিতার ফলে শিল্পের ক্রমাগত উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধি হওয়াই স্বাভাবিক।

এদেশে শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে মালিকরা যেমন শুরু থেকেই শ্রমিক শোষণের কথা ভাবে শ্রমিকরাও তেমনি ন্যায্য-অন্যায্য দাবী নিয়ে ঘেরাও-ধর্মঘট, কর্মবিরতি, হরতাল-পিকেটিং-লকআপ ইত্যাদির আশ্রয় নিয়ে মিল-কারখানা অচল করে দেয়। এ ছাড়া রয়েছে কাজে ফঅঁকি দেয়া, অন্যায়বাবে ওভারটাইমের দাবী, বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিত থাকা, মানসম্মত উৎপাদনের চেষ্টা না করা ইত্যাদি। ফলে কল-কারখানা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, লোকসানের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ায় তেমনি মিল বন্ধ বা লে-অফ ঘোষিত হলে শ্রমজীবি মানুষেরও দুর্গতির সীমা থাকে না।

শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ব্যয় হ্রাসের পাশাপাশি নতুন নতুন শিল্প স্থাপনা ছাড়া দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন দুরাশা মাত্র। এশিয়ার দূরপ্রাচ্যের নতুন অর্থনৈতিক শক্তি-মালয়েডিশয়া ইন্দোনেশিয়া কোরিয়া তাইওয়ান থাইল্যান্ড সিংগাপুর ও হংকং-এই সেভেন টাইগারস মূলতঃ শিল্প উৎপাদনে সোপান বেয়েই সমৃদ্ধির শিকরে আরোহণ করেছে। সেসব দেশে শ্রমিক-মালিক দ্বন্দ্ব, কারখানায় অপ্রীতিকর ঘটনা, শ্রমিকদের স্বার্থহানিকর কাজ ঘটে কদাচিৎ। ইসলামের অনুসারী বাংলাদেশের এই বিপুল সংখ্যক লোকেরও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সম্ভব যদি শিল্প-কারখানা স্থাপনে এবং পরিচালনায় শ্রমিক-মালিক উভয়পক্ষই দরদী ও দেশপ্রেমিক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসে।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, এ দেশে অসংখ্য মাঝারি ও বড় আকারের শিল্প স্থাপিত হওয়ার পরেও তা আর চলেনি বা চালানো হয়নি ইচ্ছাকৃতভাবেই। ব্যাংক হতে যে ঋণ নিয়ে এসব শিল্প স্থাপন করা হয়েছে সে ঋণ আদৌ শোধ করা হয়নি, হবেও না। এই ঋণ আদায়ের জন্যে এযাবৎ সকল সরকারই উপযুক্ত ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র মতে সেপ্টেম্বর ২০০৪ পর্যন্ত খেলাপী ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা। (দৈনিক প্রথম আলো, ২১ ডিসেম্বর ২০০৪)। এই ঋণ আর আদায় হওয়ার নয়।

এই বিপুল ঋণ দেওয়া হয়েছিল জনগণের সঞ্চিত আমানত এবং জনগণেরই নামে বিদেশ হতে গৃহীত মূল্যবান বৈদেশিক ঋণ থেকে। অনাদায়ী এই বিপুল ঋণের পুরো দায়ভার এখন চেপে বসেছে হতভাগ্য জনগণেরই উপর। গ্রামের বিশ হাজার কৃষক যদি গড়ে পাঁচ হাজার টাকা ঋণ নেয় তা হলে যে অর্থের প্রয়োজন হবে একজন বড় শিল্পপতি একাই তার চেয়ে অনেক বেশী ঋণ নিয়ে থাকে। অথচ ঐ শিল্পপতি সমুদয় ঋণই অনাদায়ী রেখে অনায়াসে সমাজে বসবাস করতে পারে, করছেও। অপরদিকে ঐ বিশ হাজার কৃষকের অর্ধেকেরও বেশী লোক যথা সময়ে ঋণ পরিশোধ করে থাকে, বাকীদের অর্ধেক বিলম্বে হলেও শোধ করে।

আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠিত শিল্প-কারখানা ধ্বংস হওয়া বা সে সবের অগ্রগতি ও উন্নতি সাধন না হওয়ার পশ্চাতে যেসব কারণ প্রধানতঃ দায়ী সেসবের মধ্যে রয়েছে:

ক. শিল্প মালিকদের অতিলোভ ও অবিমৃষ্যকারিতা;

খ. চোরাচালানের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারা;

গ. সরকারের ভ্রান্ত শিল্পনীতি;

ঘ. শ্রমিকদের অযৌক্তিক ও অন্যায় দাবী; এবং

ঙ. সরকারী আমলাদের শিল্পস্বার্থবিরোধী অপতৎপরতা।

কৃষি ও শিল্পভিত্তিক উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু আমাদের দেশে পাশ্চাত্যে অনুসৃত ও ব্যবহৃত পন্থা ও কৌশল হুবহু প্রয়োগের কোন সুযোগ নেই। কারণ এদেশের জনগণের আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বোধ ও আচরণ ঐসব দেশের বিপরীত। এজন্যেই এদেশের সুদী ব্যাংকগুলি দীর্ঘকাল যাবৎ পাশ্চাত্যে অনুসৃত কর্মকৌশল অনুসরণ করার পরেও উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তেমন ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়নি। এজন্যে দায়ী প্রধান কারণগুলো হলো:-

১. প্রয়োজনীয় জামানত দেবার সামর্থ্য না থাকায় বিত্তহীন সৎ ও যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা এসব ব্যাংক হতে কোন আর্থিক সহায়তা পায় না;

২. সামাজিকভাবে কাম্য কিন্তু কম লাভজনক প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে এসব ব্যাংক আদৌ আগ্রহী নয়;

৩. ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বহুসংখ্যক বিনিয়োগের পরিবর্তে বৃহৎ আকারে স্বল্পসংখ্যক বিনিয়োগে অধিক আগ্রহ;

৪. উদ্যোক্তার/ঋণগ্রহীতার প্রকল্পের সাফল্য/ব্যর্থতা নিয়ে ব্যাংকগুলি যথার্থ কোন উদ্বেগ থাকে না; এবং

৪. প্রকল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তার উপযুক্ততা বা আর্থিখ সাফল্য বিচার অপেক্ষা রাজনৈতিক সুপারিশ ও দুর্নীতিপরায়ণ আমলাদের চাপই প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

এরই রন্ধ্র পথে হাজার হাজার কোটি টাকা, যা দরিদ্র জনসাধারণের প্রদত্ত কর ও বিদেশ হতে কঠিন শর্তে গৃহীত ঋণ, হাত বদল হয়ে চলে যায় শিল্পপতি তথা অসাধু ব্যক্তিদের হাতে। এই ঋণ আর কখনও আদায় হবে না। বরং জাতির ঘাড়ে এর বোঝা চেপে বসবে জগদ্দল পাথরের মতো।

শতকরা ৮৬% জন মুসলিম অধিবাসীর দেশ বাংলাদেশে এসব সমস্যা সমাধান ইসলামের আলোকে হওয়াই সমীচীন। বাংলাদেশকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে বিশ্বসভায়। সে জন্যে নিজস্ব তাহজীব-তমুদ্দুনের উপর নির্ভর করেই, আমাদের মানসিক ও সামাজিক পটভূমিকে সামনে রেখেই কর্মকৌশল উদ্ভাবন করতে হবে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করে যেমন দেশকে স্বয়ম্ভর হতে হবে তেমনি শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি করে এবং নতুন নতুন শিল্প কারখানা স্থাপন করে কর্মসংস্থাতন বাড়াতে হবে, আমদানীও হ্রাস করতে হবে। রপ্তানীমুখী শিল্প গড়ে তুললেও আমদানীর লাগাম টেনে ধরতে না পারলে বৈদেশিক ঋণ ও বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতা বাড়তেই থাকবে। এর প্রতিবিধানের জন্যে চাই সৎ ও যোগ্য লোকের উদ্যোগ। অসৎ লোকেরহাতে দেশের শিল্পোদ্যোগ নস্যাৎ হতে বাধ্য। কার্যতঃ হচ্ছেও তাই।

. অপব্যয়, দুর্নীতি কালো টাকার প্রসার রোধ

“দুর্নীতিমূলক আচরণ আধুনিককরণের আদর্শ অর্জনের যেকোন প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে খুবই অনিষ্টকর। দুর্নীতি উন্নয়নের পথে বিরাট বাধা।” –বলেছেন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী সুইডিস অর্থনীতিবিদ গুনার মিরডাল তাঁর সুবিখ্যাত বিই Asina Dramma-তে। কথাগুলো তিনি বলেছেন এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তাঁর তথ্যানুসন্ধানী গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতা থেকে। অনুরূপভাবে অপচয় ও অপব্যয়ও উন্নয়নের পথে, স্বনির্ভরতা অর্জন ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার পথে সমান অন্তরায়। অপচয়ে রন্ধ্র পথে মিউনিসিপ্যালিটির বিপুল অর্থ ব্যয়ে সরবরাহ করা লাখ লাখ গ্যালন পানি নর্দমা দিয়ে চলে যায়। একইভাবে বাংলাদেশে দৈনিক অফিস-আদালত ও বিভিন্ন স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে পরিমাণ কাগজ নষ্ট হয় তার পরিমাণ কয়েক টন। সারা বছরেরর হিসেবে ধরলে হাজার টনেরও বেশি হবে। এ তথ্য পরিবেশিত হয়েছে বাংলাদেশ টেলিভিশনেরই এক অনুষ্ঠানে।

গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো আমরা অপব্যয় নামক আর একটি বড় ধরনের সামাজিক ও আর্থিক ক্ষতির শিকার। আল্লাহ নিজেই আল-কুরআনে বলেছৈন- “নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই” (সূরা বনি ইসরাইল: ২৭ আয়াত)। বাস্তবিকই বেহুদা ব্রয়বা অপব্যয় এবং বিলাস-ব্যসনও সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টির অন্যতম কারণ। তাই সৎভাবে অর্জিত অর্থও বেহুদা ব্যয় করা নিষিদ্ধ। অথচ আমাদের দেশে িএকযোগে অপচয়, অপব্যয় ও দুর্নীতির প্রতিযোগিতা চলেছে। সরকারী কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি হতে সাধারণ কর্মচারীটি পর্যন্ত আজ অপচয়কারী, অপব্যয় উন্মুখ এবং দুর্নীতির কবলে নিপতিত।

পুতুলের বিয়ে ও শবেবরাতের আতশবাজিতে আজ হাজার হাজার টাকার শুধু আতশ বাজী পোড়ানো হয় যা দিয়ে কয়েকটি পরিবারের সারা মাসের খরচ নির্বাহ হতে পারে। ধনী পরিবারের শখের একটা কুকুরের পেছনে যা খরচ হয় তাতে একটা মধ্যবিত্ত পরিবারেরসারা মাস চলে যেতে পারে নির্বিঘ্নে। বেহুদা খরচ সম্পর্কে মহান খুলাফায়ে রাশিদূন (রা) এতদূর সতর্ক ছিলেন যে, মিশরের গভর্ণর তাঁর সরকারী বাসভবনের প্রাচীর তৈরী করলে তাকে পদচ্যুত করা হয়। সেই প্রাচীরও ধূলিসাৎ করা হয় খলীফার নির্দেশে। খলীফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) সরকারী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিতেন লেখার জন্যে কলমের নিব সরু করে নিতে এবং কাগজের মার্জিনেও লিখতে। উদ্দেশ্য ছিল সরকারী সম্পদ ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়া। অথচ আজ প্রবাদ বাক্যের মতো চালু হয়ে গেছে- “সরকারকা মাল দরিয়ামে ঢাল”। অর্থাৎ, সরকারের জিনিস হলে নদীতে ফেলে দাও। এর অন্তর্নিহিত অর্থ হচ্ছে সরকারী অপচয় করলে, অপব্যয় করলে কৈফিয়ৎ দেবার প্রয়োজন নেই, কৈফিয়ৎ চাইবারও কেউ নেই।

দুর্নীতির কবলে পড়ে দেশের শিল্প আজ ধ্বংসের মুখোমুখি। সার কেলেঙ্কারীর ফলে সার রফতানীকারী দেশের নিরীহ কৃষক পুলিশের গুলিতে লাশ হয়ে ফিরে গেছে নিজের বাড়ীতে। সীমাহীন দুর্নীতি ও অপরিমেয় লোভ এজন্যে দায়ী। এ দেশে সরকারী বিধান রয়েছে চট্টগ্রামের প্রগতি ইন্ড্রাস্ট্রিজের কাছ থেকে কিনতে হবে বাস, ট্রাক ও জীপ। কিন্তু সেই বিধানকে থোড়াই কেয়ার করে সরকারী আমলা ও ধনী ব্যবসায়ীরা। তাদের জন্যে বিদেশ হতে আসে পাজেরো জীপ। কিভাবে এটা সম্ভব? সরকারী দপ্তরে জেলা পর্যায়ের কর্তকর্তাদের অনেকেরই ছেলে-মেয়েরা পড়ছে বিদেশে। কোন যাদুর কাঠি হাতে পেয়েছে তারা? এ রকম হাজারটা প্রশ্ন তোলা যাবে যার প্রতিটি উত্তর আঙ্গুলি নির্দেশ করে দুর্নীতির দিকেই। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল -এর প্রকাশিত তথ্য ও রিপোর্ট অনুসারে বাংলাদেশ পৃথিবীর মধ্যে ২০০০ হতে ২০০২ সালে উপর্যুপরি তিনবার এককভাবে ও ২০০৩ সালে নাইজেরিয়ার সাথে যুগ্মভাবে দুর্নীতিতে শীর্ষস্থান অধিকার করেছে। এরচেয়ে গভীর পরিতাপ ও চরম লজ্জাকর আর কি হতে পারে?

দুর্নীতির আরেক ভয়াবহ ও বিপর্যয়কারী রূপ হলো কালো টাকা। উন্নত বিশ্বের চেয়ে উন্নয়নশীল বিশ্বেই এর বিস্তার ও বিধ্বংসী রূপের বহিঃপ্রকাশ অনেক বেশী। বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ হাজার হাজার কোটি কালো টাকার ভারে ন্যুব্জপৃষ্ঠ। বাংলাদেশে কালো টাকার পরিমাণ কত? এক হিসাবে এই পরিমাণ ১৯৮৮-৮৯ অর্থ বছরে ছিল অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সমান (দ্রষ্টব্য: অর্থকথা, বর্ষ ৬, সংখ্যা ৬, ১৯৯৬)। কালো টাকার দাপটে প্রশাসন দুর্বল হয়ে পড়ে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধ্বস নামে। গরীব জনগণ আরও গরীব হয়, শক্তিধর হয়ে উঠে কালো টাকার মালিকেরা। কালো টাকা জনসাধারণের জীবনাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি করে, সমাজে সৃষ্টি করে অনভিপ্রেত বৈষম্য। যেসব উপায়ে এক শ্রেণরি লোকের হাতে বিপুল কালো টাকা সঞ্চিত হচ্ছে সেগুলি হলো:

১. সরকারী তহবিল তছরূপ ও পরিত্যক্ত সম্পত্তি জবরদখল;

২. চোরাচালান;

৩. মাদক দ্রব্যের ব্যবসা;

৪. মজুতদারী, কালোবাজারী ও পণ্যে ভেজাল প্রদান;

৫. বৈদেশিক মুদ্রার আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসিংক;

৬. কর ফাঁকি দেওয়া;

৭. পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির সুবাদে আয়;

৮. টেন্ডার জালিয়াতি ও নিম্নমানের নির্মাণ কাজ;

৯. ব্যাংক ঋণের লুটপাট;

১০. বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে কমিশন আদায়;

১১. ঘুষ ও চাঁদাবাজী; এবং

১২. পারমিট-লাইসেন্স হস্তান্তর।

এই দুর্নীতি অপচয় অপব্যয় ও কালো টাকা প্রতিরোধের উপায় এদেশের আইনে আছে বলে দৃশ্যমান হয় না। কারণ যে সরিষায় ভূত ঝাড়াবে সেই সরিষাতেই রয়েছে ভূতের আছর। জবাবদিহিতার অভাব পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটিয়েছে। সুতরাং, দেশের শ্রীবৃদ্ধি চাইলে, জনগণের দুঃখ-দুর্দশা ও ভোগান্তি দূর করতে চাইলে, সর্বেপরি ধনবন্টন ও জীবন যাপনে প্রকট বৈষম্য দূর ক রতে চাইলে সমাজ দেহ হতে এই চার কালব্যধি দূর করতে হবে চিরতরে। এরা একযোগে এতই শক্তিশালী যে সরকার পর্যন্ত উৎখাতে সমর্থ। মরণ ব্যাধি এইডসের হাত হতে বাঁচার যেমন একটাই উপায়- শরীয়াহসম্মত জীবন যাপন, তেমনি এই চার দুষ্টগ্রহ হতে রক্ষা পাওয়ার উপায় ইসলামী অনুশাসনের অনুপুঙ্খ বাস্তবায়ন। সে কাজ করতে পারে নতুন প্রজন্মের তরুণরা। সাহস-শৌর্য, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার দ্বারা তারাই সব ধরনের সামাজিক অনাচার, দুর্নীতি ও কালো টাকার প্রতিরোধ করতে সক্ষম। সঙ্গে সঙ্গে জনমত গড়ে তোলা ও অন্যায়ের প্রতিরোধ করার জন্যে দুর্বার আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণের পবিত্র দায়িত্বও তাদের। একমাত্র নির্লোভ ও সাহসী যুব শক্তিই অর্থনীতরি এই দূরারোগ্য ক্ষত নির্মূল করে তাকে তেজীয়ান ও গতিশীল করে তুলতে সমর্থ।

. বৈদেশিক বাণিজ্যে ঘাটতি দূরীকরণ

স্বাধীনতা লাভের সময়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে যে ঘাটতি ছিল এখন তা কয়েক হাজার গুণ ছড়িয়ে গেছে। সেই ঘাটতি পূরণ ও রোধের স্বার্তমক চেষ্টা করে সকল সরকার ক্রমাগত বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান নিয়েই চলেছে। ফলে বিদেশে আমাদের মর্যাদা ও গুরুত্ব যেমন হ্রাস পেয়েছে তেমনি হ্রাস পেয়েছে টাকার মূল্যমান ও ক্রয়ক্ষমতা।

ব্যাপক চোরাচালান, ব্যবসয়িক অসাধুতা, আমলাদের দুর্নীতি সর্বোপরি মুক্তবাজার অর্থনীতির কারণে বৈদেশিক বাণিজ্যে ঘাটতি এত প্রকট। এই অবস্থার নিরসনকল্পে অপ্রয়োজনীয় সামগ্রী আমদানী রোধের পাশাপাশি চোরাচালান বন্ধ করা দরকার কঠোভাবে। চোরাচালানীরা সমাজের শত্রু। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে এদেশে সরকারী মহলের দুয়ার তাদের জন্যে উন্মুক্ত। মাঝে মাঝে যা দু-চারজন ধরা পড়ে তারা চুনেপুঁটি। রাঘব বোয়ালের থেকে যায় পানির গভীরেই। তাদর নাগাল পাওয়া ভার। এদেশে চোরাচালানীরা সেনাবাহিনীর পদস্থ অফিসারকে হত্যা করেও পার পেয়ে যায়। সেই সঙ্গে রয়েছে ভেতরথেকেই দশের শিল্প-কারখানা ধ্বংস করে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্র। মুক্তবাজার অর্থনীতির অসময়োচিত ও ভ্রান্ত পদক্ষেপের জন্যে ঘাটতি আরও বৃদ্ধি পাবে। বৈদেশিক বাণিজ্যের এই বিপুল ঘাটতি রোধ করতে হলে বাণিজ্যনীতির পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। ব্যবসায়িক অসাধুতা দূর করতে হবে এবং আমলাদের দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশের উপর নির্ভরশীলতা হ্রাসের জন্যে কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি করে স্বনির্ভরতা অর্জনের প্রয়াসও অব্যাহত রাখা অপরিহার্য। আমদানীবিকল্প শিল্প স্থাপন করে তাকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে হলেও সংরক্ষণ বা নিরাপত্তা দিতে হবে। পাশাপাশি বিদেশে আমাদের পণ্যসামগ্রী বাজার খুঁজতে হবে সত্যিকার আন্তরিকতা দিয়ে, খাঁটি দেশপ্রেম দিয়ে বর্তমানে যার নিতান্তই অভাব।

. বেকারত্বের অভিশাপ হতে মুক্তি

বাংলাদেশে আজ লক্ষ লক্ষ লোক বেকার। বেকারত্বের অভিশাপে গোটা অর্থনীতি বিপর্যস্ত। বেকারত্বের কারণে নানা সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। এর সমাধান রয়েছে ইসলামী পদ্ধতির মধ্যেই। সুদভিত্তিক অর্থনীতিতে পুঁজির যোগান পেতে হলে উদ্যোক্তাকে হতে হবে বিত্তশালী। প্রার্থির পুঁজির সমপরিমাণ স্থাবর-অস্থাপর সম্পত্তি জামানত হিসেবে দেখাতে না পারলে পুঁজি মেলে না। এই কারণেই সুদী ব্যবস্থায় কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্যে বিনিয়োগ পুঁজির সংকট তীব্র। অনেক সময়ে পুঁজির পর্যাপ্ত যোগান থাকলেও উপযুক্ত গ্রাহক থাকে না। এই ব্যবস্থায় যার যথেষ্ট জামানত দেবার সামর্থ আছে সেই শুধু পুঁজি প াবে এবং তার কারবার ফুলে-ফেঁপে বড় হয়ে উঠবে।

এই পুঁজি সংকটের সমাধান রয়েছে ইসলামেই। মুদারিবাত বা অংশীদরিত্বের ভিত্তিতে ব্যবসা ও উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা ইসলাসী অর্থনীতরি অনন্য অবদান। এই ব্যবস্থায় সাহিব আল-মাল (পুঁজির যোগানদার) ও মুদারিবের (উদ্যোক্তা) মধ্যে চুক্তির ভিত্তিতে কারবার বা উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। অর্জিত মুনাফা পূর্বস্বীকৃত অংশ বা হার অনুসারে উভয়েল মধ্যে ভাগ হয়। সমাজে কিছু লোক রয়েছে যাদের নিকট প্রচুর অর্থ আছে। কিন্তু তা কাজে লাগাবার মতো শক্তি বা ব্যবসায়িক বুদ্ধি তাদের অনেক সময়ই থাকে না। কখনো বা শরীয়াহর কারণেই তাদের এ সুযোগ নেই। অনুরূপভাবে সমাজে এমন বহু লোক রয়েছে যাদের প্রয়োজনীয় শ্রমশক্তি ও ব্যবসায়িক বুদ্ধির অভাব নেই, অভাব শুধু প্রয়োজনীয় অর্থের। যদি এই দুই ধরনের লোকের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা যায় তাহলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থাগমের নতুন নতুন পথ উন্মুক্ত হবে। এরফলে শুধু যে এই দুই শ্রেণীর লোকই উপকৃত হবে তা নয়, সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথও প্রশস্ত হবে।

মুদারাবার পথ ধরেই আত্মকর্মসংস্থানমূলক কর্মসূচীর প্রসার ঘটতে পারে। বাংলাদেশে যে তীব্র বেকারত্ব রয়েছে তার সমাধান আত্মকর্মসংস্থানমূলক কর্মসূচী গ্রহণে যুবকদের উদ্বুদ্ধ করার মধ্যেই। এজন্যে তাদের প্রশিক্ষণ দেবার পাশপাশি মূলধনেরও যোগান নিশ্চিত করা জরুরী। মূলধন যোগানের জন্যে মুদারিবাত খুবই উত্তম ও কার্যকর পদ্ধতি সন্দেহ নেই। করযে হাসানার কথাও এই সাথে বিবেচ্য। পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে লগ্নী কারবারে বা ঋণভিত্তিক ব্যবসায়ে যত শোষণ ও যুলুমের অবকাশ রয়েছে তা দূর করার মানসেই মুদারিবাত ও করযে হাসানার প্রবর্তন ইসলামী অর্থনীতির এক বৈপ্লবিক ও কার্যকর বলিষ্ঠ হাতিয়ার। বাংলাদেশে এ দুয়ের প্রবর্তন বিদ্যমান সংকট নিরসনের সর্বোত্তম উপায়।

ব্যক্তিগত প্রয়োজচন ছাড়াও ব্যবসায়িক বিনিয়োগ ও কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্যে সমাজের বিত্তশালী লোকদের নিকট হতে করযে হাসানা নেওয়ার প্রথা চালু হয় রাসূলে করীম (স) মদীনায় হিজরতের পর হতে। এজন্যে সমাজে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরী হয়েছিল। বায়তুলমাল হতেও করযে হাসানা নেবার ব্যবস্থা ছিল। এক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে কোন পার্থক্য বা পক্ষপাতিত্ব করা হতো না। বাংলাদেশে করযে হাসানার প্রচলন নেই। কারণ মানুষের মধ্যে আমানতদারী ও নির্ভরযোগ্যতা হ্রাস পেয়েছে মারাত্মকভাবে। উপরন্তু দেশে বিদ্যমান আইনও মুদারিবাত ও করযে হাসানা কার্যকর করার অনুকূল নয়। তাই প্রয়াস চালাতে হবে যুগপৎ আইন সংশোধনের এবং মুদারিবাত ও করযে হাসানা পদ্ধতি চালু করার। সৎ, নিষ্ঠাবান ও যোগ্যতাসম্পন্ন লোক তৈরীর মধ্যেই এর উত্তর নিহিত রয়েছে। আশা করা যায়, আজকের ইসরামী কাফেলার অন্তর্ভুক্ত নতুন প্রজন্ম মুদারিব ও করযে হাসানা গ্রহণকারী হিসেবে তাদের যোগ্যতা, সততা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়ে যেমন নিজেদের বেকারত্ব দূর করতে সক্ষম হবে তেমনি সক্ষম হবে অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে।

. ইসলামী শরীয়াহ আইনের বাস্তবায়ন

এদেশে বিদ্যমান আইন ব্যবস্থায় ইসলামী জীবনাদর্শের সাথে সম্পৃক্ত যেসব আইন-কানুন রয়েছে সেসব যদি যথাযথ এবং দ্রুত প্রয়োগ করা যায় তাহলে ইসলামী অর্থনীতি বাস্তবায়নের কাজ অনেকখানি সহজ হবে। উপরন্তু বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই বেশ কিছু অর্থনৈতিক সমস্যার সুরাহা করাও সম্ভব হবে। অন্ততঃপক্ষে ফারায়েজ, মরিাসী আইন, শ্রমনীতি প্রভৃতি যেসব ক্ষেত্রে ইসরামের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ আইন রয়েছে সেগুলো প্রয়োগের নিশ্চয়তা বিধান করলে মনস্তাত্তিবকভাবেই মানুষ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে আরও বেশী তৎপর হবে ইসলামের অন্যান্য সুবিচারপূর্ণ আইনের সুযোগ গ্রহণের জন্যে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা বিদ্যমান নিপীড়ন শোষণ ও বঞ্চনা দূর করতে অনেকখানি সহায়তা কতে পারে। এ দেশের জনগণ প্রকৃতিগতভাবেই ধর্মপরায়ণ। সুতরাং, তাদেরকে নিয়েই এগুনো সম্ভব। উপযুক্ত নেতৃত্ব তারা যে আপোষহীন সংগ্রামে জীবনবাজি রেখে অংশ নিতে পারে তার নজীর ভুরি ভুরি। ইতিহাসের সেই দৃষ্টান্ত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। তাহলে অর্থনৈতিক সমস্যার ইসলামী সমাধান, যা প্রকৃতই কল্যাণধর্মী ও সুবিচারপূর্ণ, অনেকখানি সহজ হয়ে যাবে।

. মৌলিক মানবিক প্রয়োজন পূরণের নিশ্চয়তা

মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পাঁচটি—খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা। অনেক দেরীতে হলেও জাতিসংঘ এবং তার অঙ্গসংস্থাসমূহ একথার স্বীকৃতি দিয়েছে। এই পাঁচটি প্রয়োজন পূরণে এদেশের সরকার উপযুক্ত আন্তরিকতার পরিচয় দেয়নি। সেই সুযোগে ঈমানবিধ্বংসী এনজিওগুলো ছড়িয়ে পড়েছে দেশের গভীরে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সেবার আড়ালে লুকানো তাদের দন্ত-নখর শেষ অবধি বেরিয়ে পড়েছে। এর মুকাবিলায় আমাদের আন্তরিকতার সাথে তৎপর হওয়া প্রয়োজন। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই তা হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিভাবে এই পাঁচটি মৌলিক প্রয়োজন পূরণের সুব্যবস্থা করে জনসাধারণের জীবন যাপনের মান উন্নত করা সম্ভব সে বিষয়ে ইসলামের আলোকেই গভীর অভিনিবেশ সহকারে ভাবতে হবে এবং যথোচিত পদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের খাদ্য ঘাটতি পূরণের জন্যে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি অপরিহার্য। সেজন্যে বিদ্যমান কৃষিনীতি ঢেলে সাজাতে হবে। ইসলামের ভূমিস্বত্ব, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও ভূমি রাজস্বের বৈজ্ঞানিক যৌক্তিকতা সম্বন্ধে জনসাধারণকে বুঝাতে হবে। বিপুল জমির মালিক ও ভূমিহীন কৃষক এই দুই প্রান্তের মধ্যে যে বিরাট ব্যবধান ও অসামঞ্জস্য রয়েছে তার অপনোদনও জরুরী। সেক্ষেত্রে ইসলামী বিধি-বিধান অনুসরণই উচিত উপায়।

বাংলাদেশে সুলভে বস্ত্রের অভাবও প্রকট। স্বাধীনতা লাভের পর এই সমস্যা তীব্র রূপ ধারণ করেছিল। অবস্থার এতদূর অবনতি হয়েছিল যে মৃতের দাফনের জন্যে কাপড়ের বদলে কলাপাতা ব্যবহার করতে হয়েছিল। সেই ভয়াবহ সংকট এখন নেই। কিন্তু বস্ত্র এখনো দরিদ্র জনগণের ক্রয় ক্ষমতার নাগালের বাইরে। দেশের কাপড়ের কলগুলো সমস্যা প্রধানতঃ দুটি—বিদেশী কাপড় চোরাচালানের অসম প্রতিযোগিতা এবং দেশে তূলা ও সূতার তীব্র সংকট। এই সংগে দুর্নীতি ও মাথাভারী প্রশাসনের কথাও উল্লেখ করতে হয়। তাঁতীরা নানা সংকটের সম্মুখীন। অথচ তারা গ্রামাঞ্চলে কাপড়েরর সিংহভাগে যোগানদার। তাদের রং, সূতা ও পুঁজির অভাব তীব্র। ভূয়া সমবায়ের মাধ্যমে সূতা বিতরণের ফলে প্রকৃত তাঁতীদের হাতে সূতা পৌঁছেনা; চড়া দামে তাদের সূতা কিনতে হয় কালোবাজার হতে। যখনই সরকার বদল হয় তখনই নতুন একদল লোক তাঁতীদের প্রতিনিধি সেজে তাদের সর্বনাশ করে, নিজেরা বিপুল বিত্তের মালিক হয়ে উঠে। সর্বগ্রাসী দুর্নীতির বিষে এই খাতটি জর্জরিত।

শীত মৌসুমে সাধারণ লোকদের অবস্থা হয় আরও করুণ। শত সহস্র বনি আদম ছেঁড়া চট আর খবরের কাগজ গায়ে জড়িয়ে ফুটপাত, সরকারী বে-সরকারী ভবন ও দোকানের বারান্দায় রাত কাটায়। আমাদেরই কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানী করা বিদেশী পুরাতন শীতবস্ত্র গাঁটকে গাঁট রাতের আঁধারে সীমান্ত পার হয়। কারা একাজ করে জনগণ তা জান। কিন্তু বিচ্ছিন্ন জনতার প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল। চোরাচালান রোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও যথাযথ তৎপর নয়। বস্ত্রখাতে এই নাজুক অবস্থা দূল করার জন্যে গোটা উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাবার পাশাপাশি প্রকৃত তাঁতীদের করযে হাসানা প্রদান, উপযুক্ত সমবায় সমিতি গঠন, কঠোরভাবে চোরাচালান দমন এবং অসম প্রতিযোগিতার পথ রুদ্ধ করা জরুরী।

দেশের বিপুল সংখ্যক জনগণের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। এজন্যে জনগণের দরিদ্র্য যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী সরকারের ভ্রান্তনীতি। শহরাঞ্চলে বিত্তশালীরা বাড়ী তৈরীর জন্যে বিপুল অঙ্কের ঋণ পায় হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো হতে। পূর্বতন ঋণ শোধ না করেও রেহাই পেয়ে যাচ্ছে বহুলোক। তাদের বাড়ী নিলমে বিক্রী হচ্ছে সত্যি, কিন্তু এর মধ্যে রয়ে গেছে শুভংকরের ফঅঁকি। ছয়-সাত লাখ টাকা ঋণ নিয়ে বাড়ী তৈরীর জন্যে তারা প্রকৃতপক্ষে ব্যয় করেছে দুই-তিন লাখ টাকা। উৎকোচ দিয়ে মুখ বন্ধ করেছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। এরপর ইচ্ছাকৃতভাবেই তারা ঋণের কিস্তি শোধ করেনি। অথচ ভাড়াটের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করছে ঠিকই। অবশেষে এক সময়ে ঋণের টাকা আদায়ের জন্যে ঐ বাড়ী নীলামে চড়ায় এইচবিএফসি। বিক্রী হয় ঐ দুই-তিন লাখ টাকাতেই। অর্থাৎ, এক্ষেত্রেও ব্যাংকের ঋণ তাৎক্ষণিক শোধ হলো না। কিন্তু মূল ঋণ গ্রহীতা বিনা পুঁজিতেই চার-পাঁচ লাখ টাকার মালিক হয়ে সটকে পড়ার সুযোগ পেলো। তাকে গ্রেফতার করে বা তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রী কর টাকা আদায়ের কোন সুযোগ নেই বিদ্যমান আইনে।

গ্রামাঞ্চলের অবস্থা ভিন্নতর। সেখানে সরকারী সাহায্যের বা ঋণের কোন সুযোগ নেই। ফলে সাধারণ মানুষ যেভাবে জীবন যাপনে বাধ্য হয় তা সভ্যতার চরম অবমাননা। মানুষের এই তৃতীয় মৌলিক প্রয়োজন পূরণের জন্যে সরকার এগিয়ে না এলেও এনজিওদের কেউ কেউ এগিয়ে এসেছ । বিশেষতঃ গ্রামীন ব্যাংক ও ব্রাক এ ব্যাপারে জোরদার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ফল কি দাঁড়িয়েছে? যাদের সহযোগিতার ফলে নিজেদের মাথা গোঁজার ঠাঁই হচ্ছে স্বভাবতঃই তাদের প্রতি মানসিক দুর্বলতা সৃষ্টি হচ্ছে দরিদ্র লোকদের। পরিণামে এনজিওদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে গ্রামীণ সমাজ জীবনে। এর প্রতিকারের জন্যেই সমবায় সমিতি প্রত্ঠিা, ইসলামী এনজিও গঠন যাকাতের অর্থের পরিকল্পিত ব্যবহার এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে গৃহনির্মাণ ঋণদানের জন্যে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

জনসাধারণের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্যে পুষ্টিশিক্ষা, প্রতিষেধকের ব্যবস্থা েএবং চিকিৎসার পর্যাপ্ত সুযোগ থাকা প্রয়োজন। দুঃখের বিষয়, গ্রামাঞ্চলে এসবের সুযোগ নিশ্চিত করতে সরকার এগিয়ে আসেনি। বরং সুযোগ বুঝে এগিয়ে এসেছে এনজিওরা। তারা গ্রামে গ্রামে মহিলাদের সন্তান পালন, পুষ্টি শিক্ষা, প্রতিষেধক গ্রহণ, স্বাস্থ্যবিধি, পরিবার কল্যাণ ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষা দিচ্ছে। সেই সঙ্গে খোদাদ্রোহিতার, ইসলামবিরোধিতারও বীজ বুনে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে শহরাঞ্চলেও সরকার চরম ব্যর্থতা লক্ষণীয়। হাসপাতালগুলেতে চিকিৎসা সুবিধা নেই বলেই জীবন বাঁচাতে মানুষ ট্যাকের কড়ি গোণে। তারই সুযোগ নেয় ডাক্তার নামের ব্যবসায়ী মানুষগুলো। রাস্তার মোড়ে মোড়ে গড়ে ওঠে ক্লিনিক নামের চিকিৎসা-ব্যবসা কেন্দ্রও। এসব ক্লিনিক অথবা সাইনবোর্ডসর্বস্ব হাসপাতাল যথাযথ মানসম্পন্ন কিনা তা আদৌ যাচাই করা হয় না। উপযুক্ত টীম দিয়ে নিয়মিত পরিদর্শন করা তো হয়ই না, ধার্যকৃত ফি-এর ক্ষেত্রেও রয়েছে নিদারুণ তারতম্য। সরকার একটু উদ্যোগ নিলেই স্বাস্থ্য সেবার মান বাড়াতে পারে। এদেশের জাতীয় ঔষধনীতিই তার প্রমাণ। এই নীতির ফলে প্রমাণিত হয়েছে অনেক কম দামেই প্রয়োজনীয় ঔষধ পর্যাপ্ত পরিমাণেই সরবরাহ করা সম্ভব।

এদেশের সরকার দুই দশক আগে ঘোষণা করেছিল থানা হেল্‌থ কমপ্লেক্সে িএকজন ডেন্টিস্টসহ পাঁচজন ডাক্তার থাকবে। এক সময়ে সত্যি সত্যি তা ছিলও। আজ আর নেই। পাঁচজনের এক বা দুইজন পালা করে কমপ্লেক্স পাহারা দেয়, বাকীরা সবাই জেলা সদরে প্রাকটিস করে। ফলে চিকিৎসা সুবিধা হতে বঞ্চিত হচ্ছে গ্রামাঞ্চলের সাধারণ লোকেরা। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আকস্মিক সফরে অনুপস্থিত ডাক্তারের সাময়িক বরখাস্তের আদেশও অবস্থার কোন উন্নতি হয় না। সরকার ঢালাওভাবে যাক্তারদের বিদেশে পাড়ি দেবার অনুমতি দিয়ে চিকিৎসা সংকটে আরও তীব্র করে তুলেছে। যেকোন উন্নত দেশের তুলনায় এদেশের জনসংখ্যার অনুপাতে ডাক্তারের সংখ্যা খুবই কম। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, একজন ডাক্তার তৈরীতে জনসাধারণের ব্যয় হয় তিন লক্ষ টাকারও বেশী, অথচ সেই ডাক্তারের সেবা লাভ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। এই অবস্থা নিরসন হওয়া দরকার। আর্ত-মানবতার সেবায় আমাদের ডাক্তারদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে; পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্য সুবিধা, পুষ্টিশিক্ষা ও প্রতিষেধকের ব্যবস্থাও করতে হবে।

জীবনের অন্যতম মৌলিক প্রয়োজন শিক্ষার ক্ষেত্রেও আমরা দারুণ পশ্চাৎপদ। জ্ঞান অর্জন ইসরামে ফরয করা হয়েছে। অথচ এদেশের অর্ধেক লোক এখনও সত্যিকার অর্থেই নিরক্ষর। এক্ষেত্রে সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক করা হয়েছে, কিন্তু বাধ্যতামূলক করা হয়নি। গ্রামে-গঞ্চে স্কুলের সংখ্যা এখনও চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। যেসব স্কুল রয়েছে সেসবেও দেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর ঈমান-আকীদার চর্চা ও শিক্ষার সুযোগ মানসম্মত নয়। এ দেশেই খ্রষ্টান মিশনারীদের দ্বারা পরিচালিত স্কুলগুলোতে ছেলেমেয়েরা খৃষ্টধর্ম সম্বন্ধে যতটা জানে এবং আচরণ করতে বাধ্য হয় সরকার পরিচালিত স্কুলগুলোতে মুসলমান ছেলে-মেয়েরা ইসলাম সম্বন্ধে অনুরূপ মানের জ্ঞান অর্জন করে না। এক্ষেত্রে দ্বীনি প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং মসজিদভিত্তিক মক্তবগুলো যে খেদমত করে যাচ্ছে তার গুরুত্ব অপরিসীম।

এদেশের সরকারগুলো নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্যে বিভিন্ন কৌশল ও পদ্ধতি প্রয়োগ করে ব্যর্থ হয়েছে। গণশিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা, নৈশ পাঠশালা, শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ, শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য (শিবিখা) ইত্যাদি কার্যক্রমে সুফল না পেয়ে শেষ অবধি মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছেন। এতে আশাতীত সুফল পাওয়া যাচ্ছে বলে সম্প্রতি পরিচালিত এক জরীপ থেকে জানা গেছে। আসলেই দেশের দুই লক্ষাধিক মসজিদে যদি গড়ে ‍বিশজন ছেলেমেয়েও দ্বীনি তালিম-তরবিয়াতের পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষা লাভ করে তাহলে প্রতি পাঁচ বছরে দুই কোটিরও বেশী ছেলেমেয়ে নিরক্ষরতার অভিশাপ হতে মুক্ত হবে। শিক্ষা যেহেতু সকল উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের চালিকা শক্তি সেহেতু িএর প্রতি অধিক যত্নবান ও মনোযোগী হতে হবে। কয়েকটি এনজিও এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটি পুরোটাই নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এর প্রতিবিধান করতে হলে ঈমানী চেতনায় উদ্বুদ্ধ সচেতন দেশবাসীকেই স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড’ –শুধু এই অপ্তবাক্য আওড়ালে জাতির উন্নতি হবে না। এর বাস্তব প্রতিফলন ঘটানো প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গনে বিরাজমান দুর্নীতি ও সন্ত্রাসেরও উৎপাটন অপরিহার্য। দুর্নীতি ও সন্ত্রাস অপরিহার্য়। দুর্নীতি ও সন্ত্রাস অব্যাহত থাকলে শিক্ষাঙ্গন ধ্বংস হয়ে যাবে। শিক্ষার মান নেমে যাবে নীচে, ইতিমধ্যে গেছেও শিক্ষাঙ্গন অস্ত্রের ঝনঝনানি মুক্ত করতে হলে েএবং শিক্ষার মান উন্নত করতে হলে জাতির ভবিষ্যৎ ছাত্র সমাজকেও নৈতিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত হতে হবে। সন্ত্রাস দিয়ে মানুষের মন জয় করা যায় না, বরং ধৈর্য ও ত্যাগের মাধ্যমেই জনতার হৃদয়ে স্থায়ী আসন লাভ করা যায়। ইতহিাসের শিক্ষাই তাই।

. জনসমর্থন সৃষ্টির জন্যে প্রচারণা

শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মন-মানসিকতা ইসলামমুখী করে তোলার ক্ষেত্রে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, সম্মেলন ইত্যাদির ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এদেশে ইসলামী অর্থনীতির প্রচার ও প্রতিষ্ঠর জন্যে ইসরামিক ইকনমিকস রিসার্চ ব্যুরোর অবদান অবিস্মরণীয়। ১৯৭৮ সালে ইসলামী অর্থনীতির উপর প্রথম আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজনের মধ্যে দিয়ে এদেশের গণমানসে আলোড়ন ও সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির যে ধারা শুরু হয়েছিল তা আজও অব্যাহত রয়েছে। আজও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড ও কতিপয় প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে ইসলামী অর্থনীতি ও ব্যাংক বিষয়ে বহু সেমিনার ও সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে ও হচ্ছে। ঐসব অনুষ্ঠানে যে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে তা অভাবিত। এ থেকেই প্রতীয়মান হয় শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইসলামী জীবনাদর্শের প্রতি যে সুপ্ত আকাংখা রয়েছে তার উপযুক্ত পরিপোষণ করতে পারলে এবং পরিবেশ সৃষ্টিতে সমর্থ হলে এদেশে ইসলামী অর্থনীতি বাস্তবায়ন করা খুবই সম্ভব।

. গণসচেতনতা গণদাবী সৃষ্টি

ইসলামী অর্থনীতির সঠিক রূপ এবং এর কার্যকারিতা সম্বন্ধে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে ব্রাক গণসচেতনতা ও গণদাবী সৃষ্টি করা সম্ভব। এজন্যে যেমন চাই সহজবোধ্য বই, তেমনি চাক্ষুষ জানার জন্যে চাই অডিও-ভিডিও মাধ্যমের সর্বোচ্চ ব্যবহার। জনগণ গ্রহণ না করলে ভাল জিনিসেরও মূল্য নেই। ভাল জিনিসের জন্যেও চাই প্রচারণা। আমাদের দেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠী নিরক্ষর। তাদের কাছে ইসলামী অর্থনীতি তথা ইসলামী জীবনাদর্শের সুফল তুলে ধরতে অডিও-ভিডিওর মাধ্যমে খুবই উপযোগী। এই উদ্দেশ্যে বিদেশে অনেক চিত্তাকর্ষক স্বল্পদৈর্ঘ চলচিত্র তৈরী হয়েছে। বাংলায় অনুবাদ করে সেসবের ব্যবহার করা যায়। উল্লেখ্য, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইমাম সাহেবদের অনেকেই ইতিমধ্যে স্ব স্ব এলাকায় ক্ষুদ্র পরিসরে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন আনতে সমর্থ হয়েছেন। তাঁরা যদি ইসলামী অর্থনীতির বুনিয়াদী বিষয় জনগণকে বোঝাবার চেষ্টা করেন তাহলে জনমানসে পরিবর্তন সূচিত হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী না হওয়ার কারণ নেই। এদেশের অর্থনৈতিক সমস্যার ইসলাম সমাধান করতে হলে ইসলামী মানসিকতায় গড়ে ওঠা জনসমষ্টির অচেতন ও সংশয়দুর্বল মনকে সচেতন ও সংঘবদর্ধ করে ইসলামী মূল্যবোধ বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে হবে। ফলে সমস্যাসমূহ দূরীভূত হয়ে ইসলামী জীবন বিধান পালনের পথ সুগম হবে।

. পাইলট প্রজেক্ট গ্রহণ

ইসলামী অর্থনীতির সুফল জনসমক্ষে চাক্সুষভাবে তুলে ধরতে হলে চাই সফল প্রতিষ্ঠান বা কার্যক্রমের পরিচিতি। এজন্যে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু পাইলট প্রজেক্ট গ্রহণ করা খুবই যুক্তিযুক্ত। উদাহরণতঃ শুধু বাংলাদেশে নয়, সমগ্র বিশ্বেই সুদের বিরুদ্ধে কার্যকর অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রমাণ করার জন্যেই ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রয়াস শুরু হয় তিন দশক আগে। শরীয়াহ অনুমোদিত পদ্ধতিতে ব্যাংক পরিচালনা করে প্রমাণ করা গেছে যে সুদ ছাড়াও ব্যাংক চলতে পারে। শুধু পদ্ধতিতে ব্যাংক পরিচালনা করে প্রমাণ করা গেছে যে সুদ ছাড়াও ব্যাংক চলতে পারে। শুধু চলতেই পারে না, সাফল্যের বিলি-ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই যাকাতের অর্থ ব্যবহার করে যে আর্থ-সামাজিক কল্যাণ লাভ করা গেছে তার আলোকে নির্দিধায় বলা যেতে পারে যে, যাকাত ইসলামী সমাজ তথা অর্থনতিতে দারিদ্র্য ও শোষণের বিরুদ্ধে সেফটি ভালভ বা রক্ষা কবচ।

সুতরাং, পাইলট প্রজেক্টের সাফল্যের মাধ্যমে একদিকে যেমন জনগণকে বিশেষ কর্মসূচী বা পদ্ধতির সাফল্য ও কৃতকার্যতা হাতে-কলমে দেখানো যায়, অন্যদিকে সরকার বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকেও অনুরূপ কর্মসূচী গ্রহণের জন্যে চাপ দেওয়া সহজ হয়। প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রায়োগিক সাফল্যেল পাশাপাশি যুগপৎ জনগণের সোচ্চার দাবী করকারকে বাধ্য করে উপযুক্ত পরিবর্তন বা সংস্কার করতে। এভাবেই ধীরে ধীরে বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই অনেকখানি সাফল্য অর্জন সম্ভব। তবে পরিপূর্ণ সাফল্য অর্জনের জন্যে অবশ্যই সার্বিক পরিবর্তন এবং ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার বাস্তবায়ন অপরিহার্য।

উপসংহার

শুরুতে একটি বিষয়ের উল্লেখ করা হয়নি। এই আলোচনার কোথাও সরকারের কাছে কিছু যেমন প্রার্থনা করা হয়নি, ইসলামী অর্থনীতির অনুকূলে সরকার স্বেচ্ছায় কিছু করবে তেমন কল্পনাও করা হয়নি। বরং সরকারের নেতিবাচক ভূমিকাকে কি করে পরিবর্তন করা যায় সেসব পদক্ষেপেরই আলোচনা করা হয়েছে। আলোচনা করা হয়েছে ঐসব নীতি ও পদ্ধতি যেগুলো দেশের তৌহিদবাদী জনতা ও জাগ্রত ছাত্রসমাজ অনুসরণ করবে। বিদ্যমান রাজনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষিতেই শুধু এই বক্তব্য ও প্রতিপাদ্য বিষয়সমূহ সত্য। সত্যিকার ইসলামী রাষ্ট্র বাস্তবায়িত হলে এসব পদক্সেপের আদৌ কোন প্রয়োজন হবে না। তবে সেদিন যেহেতু এখনও দূ,রে তাই সেই দিনের লক্ষ্যে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে নিরন্তুর।

প্রসঙ্গতঃ আরও একটা কথা উল্লেখযোগ্য। পৃথিবীর উন্নয়নশীল দেশসমূহে আজ চিন্তা চলেছে কিভাবে সত্যিকারের জনকল্যাণমুখী উন্নয়ন কর্মকান্ড নিশ্চিত করা যায়, কিভাবে প্রত্যেকের ভাগ্যের উন্নতি বিধান করা যায়। সেজন্যেই বিশ্বব্যাংক পুরাতন ধ্যান-ধারণার পরিবর্তে নতুন চিন্তা-ভাবনার আমদানী করেছে তাদের গবেষণায়। তাদের নতুন Prescription বা পরামর্শপত্রে বলা হচ্ছে Structural Adjustment বা কাঠামোগত পুর্নবিন্যাসের কথা। এর মূল বক্তব্যই হচ্ছে ধন-বন্টনে বৈষম্য দূরীকরণ, বৈদেশিক বাণিজ্যে ঘাটতি হ্রাস, মৌলিক মানবিক প্রয়োজন পূরণ এবং দুর্নীতির উচ্ছেদ। বিলম্বে হলেও বিশ্বব্যাংক নতুন আঙ্গিকে উন্নয়নের সমস্যা বিশ্লেষণ করতে সচেষ্ট হয়েছে। কিন্তু এই কর্মকৌশলে ইসলামের নৈতিক ছাঁকনী না থাকায় এবং ইসলামের বিশ্বদর্শনের সাথে এর কোন সাযুজ্য না থাকায় মুসলিম উম্মাহর এতে কোন উপকার হবে না। তাই এই উদ্যোগে আত্মতৃপ্ত বা উল্লসিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ এর মধ্যে ইসলামী শরীয়াহর যে উদ্দেশ্য বা মাক্বাসিদ আল-শরীয়াহ তা অর্জনের কোন সুযোগ নেই। এরই বিপরীতে ইসলামের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী নতুন ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। মৌলবাদ প্রতিরোধের জিগির তুলে, সন্ত্রাসবাদের দায় ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেশে দেশে ইসলামী আন্দোলনকেই বানচাল করার অপচেষ্টা চলেছে। পুঁজিবাদের কায়েমী স্বার্থ যেন ক্ষুণ্ণ না হয় সেজন্যে ইসলামী আন্দোলন ও মূল্যবোধ ধ্বংসের উদ্দেশ্যে উদ্ভাবিত হচ্ছে নতুন নতুন কৌশল, বিস্তৃত হচ্ছে ষড়যন্ত্রের নতুন জাল।

তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশই মুসলিম প্রধান। তাদের সচেতন সত্ত্বার বিকাশ এবং পুঁজিবাদের প্রভাব বলয়ের বাইরে উন্নতি লাভ কিছুতেই সহ্য হওয়ার নয় পুঁজিবাদী বিশ্বের। তাদের প্রধান মুরুব্বী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের দোসর ইহুদী কোটিপতেোদর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যাপী প্রচার মাধ্যমগুলি সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিচ্ছে তথ্যসন্ত্রাস। বিশ্বব্যাংক, এমনকি খোদ জাতিসংঘও এতের হাতে খেলার পুতুল। তাই বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের দেওয়া প্রেসক্রিপশনের তোয়াক্কা না করে আমাদের নির্ভর করতে হবে কুরআন ও সুন্নাহর উপর। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (স) শাশ্বত বাণীই হবে আমাদের পথ নির্দেশক, আমাদের সাফল্যেল ভিত্তি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্বয়ং নির্দেশ দিয়েছেন-

“হে ঈমানদারগণ, তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামের ভিতর প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। কারণ নিশ্চিতরূপে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” (সূরা আল-বাকারাহ: ২০৮ আয়াত)

একই সঙ্গে তাঁর জলদগম্ভীর ঘোষণা হলো- “আল্লাহ ততক্ষণ কোন জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করে।” (সূরা রাদ: ১১ আয়াত)

সেজন্যেই আজ এমন মুসলমানের প্রয়োজন যারা শত অসুবিধা ও বাধা-বিপত্তির মুকাবিলাতেও হালালকে অর্জন ও ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা এবং হারামকে বর্জন ও দূর্নীতি উচ্ছেদের জন্যে সংকল্পবদ্ধ। এ দায়িত্ব সকলের, তবে বিশেষভাবে সচেতন মুসলিম যুবসমাজের। তারা যদি একবার জেগে ওঠে, তৌহিদী বিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে সত্যিকার সদিচ্ছা ও দুর্জয় মনোবল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাস্তব কর্মক্ষেত্রে তাহলে ইসলামী অর্থনীতির বৈপ্লবিক কার্যক্রমের প্রয়োগ ও প্রতিষ্ঠা আজও মোটেই অসম্ভব নয়। সেদিন আল-কুরআনের ভাষাতেই বলতে হয়-

“সত্য সমাগত, মিথ্যা বিদূরিত। নিশ্চয় মিথ্যার বিনাশ অবশ্যম্ভাবী।” (সূরা বনি ইসরাঈল: ৮১ আয়াত)

About শাহ মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান