হাদীস শরীফ – ২য় খন্ড

হজ্জ

============================

হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, আমি নবী করীম (স)-কে বলিতে শুনিয়াছিঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌রই জন্য হজ্জ করিল এবং এই সময়ের মধ্যে স্ত্রী সহবাস ও কোনরূপ ফাসিকী কাজ করিল না, সে তাহার মা কর্তৃক ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিনের মতই হইয়া গেল।

ব্যাখ্যা হজ্জ ইমলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম। ‘হজ্জ’ শব্দের অর্থ ======== কোন বিষয়ের বা কাজের ইচ্ছা বা দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ’ খলীল বলিয়াছেনঃ ‘হজ্জ’ অর্থ;

==========================

কোন মহৎ বিরাট কাজের বারবার ইচ্ছা ও সঙকল্ গ্রহণ করা।

আযহারী বলিয়াছেনঃ হজ্জ অর্থ ‘কোন স্থানে একবারের পর দ্বিতীয়বার আসা।‘ এই কারণে মক্কা গমনকে ========== আল্লাহ্‌র ঘরের হজ্জ বলা হয়।

=====================

কেননা জনগণ প্রত্যেক বৎসর আল্লাহর ঘরে আসে।

ইসলামী শরীয়াতের পরিভাষায়ঃ

=============================

আল্লাহ্‌র ঘরের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে কতকগুলি বিশেষ ও নির্দিষ্ট কাজ সহকারে মহান ঘরের যিয়ারতের সংকল্প করাই হইল হজ্জ।

বদরুদ্দীন আইনী লিখিয়াছেনঃ

==========================

আল্লাহ্‌র ঘরের সম্মান ও মহানত্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে উহার যিয়ারতের সংকল্প করাই ‌’হজ্জ’। কিরমানী লিখিয়াছেনঃ

=============================

কা’বা ঘরের অনুষ্ঠানাদি পালন ও আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের উদ্দেশ্যে তথায় গমন করাই হজ্জ।

কুরআন মজীদের যে আয়াতে হজ্জ ফরয হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হইয়াছে, তাহা হইলঃ

==========================

আল্লাহ্‌রই জন্য লোকদের কর্তব্য আল্লাহ্‌র ঘরের হজ্জ করা-এই লোকের, যাহার সেই পর্যন্ত যাকাতের সামর্থ্য আছে।

এই আয়াত অনুযায়ী আল্লাহ্‌র ঘর পর্যন্ত যাতায়াত সংক্রান্ত যাবতীয় ব্যয়, সুযোগ-সুবিধা ও শক্তি সামর্থ্যের অধিকারী প্রত্যেক ব্যক্তির উপর হজ্জ করা ফরয। নবী করীম (স)-ও হজ্জ ফরয হওয়ার কথা সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করিয়াছেন। ইসলামের পৎাচটি রুকনের মধ্যে হজ্জ একটি। এই সম্পর্কিত হাদীসসমূহ ১৬ জন সাহাবী কর্তৃক অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্রে ও বলিষ্ঠ ভাষায় বর্ণিত ও হাদীসের গ্রন্থাবলীতে উদ্ধৃত হইয়াছে। সব কয়টি হাদীসে ইসলামের পঞ্চম ‘রুকন’ বলা হইয়াছে এই ভাষায়ঃ

=============================

আল্লাহ্‌র ঘরের হজ্জ-যদি তথায় যাতায়াতের সামর্থ্য তোমার থাকে।

এই ‘আল্লাহ্‌র ঘরই’ হজ্জ ফরয হওয়ার কারণ। আর আল্লাহ্‌র ঘর ‘কা’বা শরীফ’ মাত্র একটি এইজন্য হজ্জ জীবনে মাত্র একবারই ফরয। জীবনে একাধিকবার হজ্জ করা ফরয নয়। যে লোক ‘হজ্জ’ করে তাহাকে বলা হয় ======= ‘আলহাজ্জ’- ‘হাজী’। কিন্তু ইহা কোন পদবী বা উপাধি নয়।

কেহ কেহ বলিয়াছেন, হজ্জ হিজরতের পূর্বেই ফরয হইয়াছে কিন্তু ইহা সর্বজনগ্রাহ্য কথা নয়। ইমাম কুরতুবী বলিয়াছেন, হজ্জ ফরয হইয়াছে হিজরতের পঞ্চম বৎসর। অধিকাংশ লোকের মত হইল, হজ্জ ফরয হইয়াছে ষষ্ঠ হিজরী সনে। কেননা এই সনে কুরআনের আয়াতঃ ========== ‘আল্লাহ্‌রই জন্য হজ্জ ও উমরা সম্পন্ন কর। নাযিল হইয়াছে।

=========================

কিন্তু নবম হিজরী সনে হজ্জ ফরয হওয়ার কথা অধিক সত্য। আল্লামা মা-ওয়ার্দী বলিয়াছেন, অষ্ট হিজরী সনে হজ্জ ফরয হইয়াছে।

হাদীসে উদ্ধৃত শব্দ ======= (স্ত্রী সঙ্গম করে নাই) এবং ========== (ফাসিকী করে নাই) বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ‘রফস’ বলিতে স্ত্রী সহবাস বুঝায়। বলা হইয়াছেঃ

========================

পুরুষ স্ত্রীর নিকট হইতে যাহা কিছু পাইতে চায়, তাহার সবকিছুকেই ‘রফস’ বলা হয়। আল্লামা বায়যাভী লিখিয়াছেনঃ

============================

যাহা ইশারায় বলা দরকার তাহা প্রকাশ্যে বলাকেই ‘রফস’ বলে।

আর ইবনে সাইয়েদাহ্ বলিয়াছেন ======= ‘রফস’ শব্দের অর্থ স্ত্রী সঙ্গম। আর ‘ফিসক’ অর্থ ====== নাফরমানী ও গুনাহের কাজ এবং

===========================

আল্লাহ্‌র আদেশ ছাড়িয়া দেওয়া ও সত্যের পথ পরিহার করা।

কুরআন মজীদে বলা হইয়াছেঃ

==========================

হজ্জে স্ত্রী সহবাস, গুনাহের কাজ ও জগড়া-বিরাদের কোন অবকাশ নাই।

অর্থাৎ যে ব্যক্তি হজ্জ ব্যাপদেশে স্ত্রী সহবাস করে নাই এবং কোন গুনাহের কাজও করে নাই, তাহার সম্পর্কেই রাসূলে করীম (স) বলিয়াছেন যে, সে সদ্যজাত শিশুর মতই নিষ্পাপ হইল। কথাটি দৃষ্টান্তমূলক। মা এই মাত্র যে সন্তান প্রসব করিল, সে একান্তই নিষ্পাপ ও নির্মল। আর যে ব্যক্তি স্ত্রী সঙ্গম পরিহার ও সকল প্রকার গুনাহ নিমুক্ত হইয়া হজ্জ করিতে পারিল, সেও সেই সদ্যজাত শিশুর মতই নিষ্পাপ ও নির্দোষ হইল। তাহার সগীরা-কবীরা সব রকমের গুনাহ্‌ই মাফ হইয়া গেল।

=======================

একটি হজ্জ ফরয

=============================

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, হযরত নবী করীম (স) বলিয়াছেনঃ হে লোকগণ। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা’আলা তোমাদের প্রতি হজ্জ ফরয করিয়াছেন। তখন আক্‌রা ইবনে হাবিস দাঁড়াইয়া বলিলেনঃ হে রাসূল! প্রত্যেক বৎসরই কি হজ্জ করা ফরয?-নবী করীম (স) বলিলেনঃ আমি যদি ইহার জওয়াবে ‘হাঁ’ বলি, তবে তাহাই ওয়াজিব হইয়া যাইবে, আর যদি তাহা ওয়াজিব হইয়া যাইত, তবে তোমরা তদানুযায়ী আমল করিতে না। আর তোমরা তাহা করিতে পারিতেও না। হজ্জ মূলত একবারই ফরয, যদি কেহ উহার অধিক করে, তবে তাহা নফল।

-তিরমিযী, মুননাদে আহ্‌মদ, নাসাযী, দারেমী

ব্যাখ্যা হাদীসে নবী করীম (স)-এর একটি ভাষণের উল্লেখ করা হইয়াছে। আলোচ্য হাদীসে ‘হে লোকগণ’-রাসূলের এই সম্বোধনই এই কথা প্রমাণ করে। অবশ্য হযরত আবু হুরায়রা (রা) কর্তৃক বর্ণিত এই বিষয়েরই অপর একটি হাদীসে স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হইয়াছেঃ

=========================

রাসূলে করীম (স) ভাষণ দান করিলেন।

মুসনাদে আহমদ-এ উদ্ধৃত হযরত ইবনে আব্বাস বর্ণিত এই হাদীসের শুরুতেও এই কথার উল্লেখ আছে।

হযরত আলী (রা) বর্ণিত হাদীসে এই প্রসঙ্গে আরও তথ্য লাভ করা যায়। তাহা এই যে, যখন কুরআন মজীদের আয়াতঃ

==========================

আল্লাহ্‌র জন্য আল্লাহ্‌র ঘরের হজ্জ করা সেই লোকদের উপর কর্তব্য, যাহারা তথায় যাওয়া-আসার সামর্থ্য রাখে।

নাযিল হয়, তখন নবী করীম (স) এই ভাষণ প্রদান করেন। কুরআন হইতে মোটামুটিভাবে এই কথা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর ঘরের হজ্জ করা-তথায় যাওয়া-আসার শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলমানের প্রতিই ফরয। কিন্তু ইহা জীবনের কয়বার আদায় করিতে হইবে, কিংবা জীবনে মাত্র একবার হজ্জ আদায় করিলেই দায়িত্ব পালন করা যাইবে কিনা, তাহা কুরআনের আয়াত হইতে জানাযায় না। আলোচ্য হাদীস হইতে এই সম্পর্কে স্পষ্টভাবে জানা যাইতেছে যে, হজ্জ জীবনে একবার আদায় করাই ফরয। একবার ফরয আদায় করার পরও যদি কেহ হজ্জ করে তবে তাহা নফল হইবে এবং তাহাতে নফল হজ্জ পালনেরই সওয়াব পাওয়া যাইবে। বস্তুত হাদীস যে কুরআনের ব্যাখ্যাকারী, কুরআনের হুকুম বাস্তবায়নের পথ-নির্দেশ করে হাদীস, ইহা হইতে তাহা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়।

হযরত আকরাম মনে এই সম্পর্কে প্রশ্ন জাগিয়াছিল। সেই জন্যই তিনি রাসূলের কথা শোনার পরই প্রশ্নই পেশ করিয়াছিলেন। অন্য হাদীসের র্বণনা মতে নবী করীম (স) প্রশ্নটির জওয়াব সঙ্গে সঙ্গেই দেন নাই। বরং তিনি চুপ করিয়াছিলেন। রাসূলের প্রথম চুপ থাকার তাৎপর্য ইহাই বুঝিতে পারা যায় যে, তিনি এইখানে এই প্রশ্ন করাকে মোটেই পছন্দ করিতে পারেন নাই বলিয়া এই ধরনের ক্ষেত্রে চুপ থাকাই শ্রেয়। অন্য কথায় অধিক শরীয়াতী দায়িত্ব চাপিয়া বসার আশংকা রহিয়াছে। পূর্বেও কয়েকবার এইরূপ প্রশ্ন উঠিয়াছে, নবী করীম (স) তহা নিষেধ করিয়া দিয়াছেন; কিন্তু নবী করীম (স) যেহেতু দুনিয়ায় শরীয়াতের জরুরী ্জঞান বিস্তারের দায়িত্ব লইয়া আসিয়াছেন, এইজন্য তিনি বেশীক্ষণ চুপ করিয়া থাকিতে পারিলেন না। প্রশ্নকারী যখন একবার দুইবার তিনবার প্রশ্নটি উত্থাপন করিল, তখন নবী করীম (স) বলিলেন, উহার উত্তরে আমি ‘হ্যা’ বলিলে প্রত্যেক বৎসরই একজনের সারা জীবনের কর্তব্য পালন হইয়া যাইবে, সে সম্পর্কে ফয়সালা করার দায়িত্ব আল্লাহর তরফ হইতে রাসূলে করীমের উপর অর্পিত হইয়াছিল। এই জন্য তিনি জওয়াবে বলিয়াছেন যে, ‘আমি হ্যা’ বলিলেই তাহা ওয়াজিব হইয়া যাইত; কিন্তু তোমরা তাহা করিবে না; করিতে পারিবে না। তাই জীবনে একবার হজ্জ করাকেই ফরয করা হইয়াছে।

হজ্জ ও উম্‌রার গুরুত্ব

============================

হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, হযরত রাসূলে করীম (স) বলিয়াছেনঃ তোমরা হজ্জ ও উমরা পরপর সঙ্গে সঙ্গে আদায় কর। কেননা এই দুইটি কাজ দারিদ্র্য ও গুনাহ্‌-খাতা নিশ্চিহ্ন করিয়া দেয়, যেমন রেত লৌহের মরিচা ও স্বর্ণ-রৌপ্যের জঞ্জাল দূর করিয়া দেয়। আর কবুল হওয়া হজ্জের সওয়াব জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।

ব্যাখ্যা নবী করীম (স)-এর এই বাণীতে হজ্জ এবং উমরা উভয়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হইয়াছে। তিনি যাহা বলিয়াছেন, উহার শাব্দিক অর্থ হইল ‘হজ্জ ও উমরার’ মধ্যে একটিকে অপরটির পরে পরে কর। অর্থাৎ এই দুইটি অনুষ্ঠান কাছাকাছি সময়ের মধ্যে পালন কর। ইহার দুইটি অবস্থা হয় ‘হজ্জে কিরান’ করিয়া এই আদেশ পালন কর, নয় একটির পর অন্যটি আদায় কর। তায়্যিবী বলিয়াছেন, রাসূলে করীম (স)-এর এই কথাটির অর্থ হইলঃ

===========================

তোমরা যখন উমরা সমাপন করিলে তখন তোমরা হজ্জ করিও, আর যখন হজ্জ অনুষ্ঠান শেষ করিলে, তখন তোমরা অবশ্যই উমরা করিবে।

উমরা ======= শব্দের অর্থ ======= ‘সাক্ষাত বা দেখার জন্য উপস্থিত হওয়া’। আর পরীয়াতের পরিভাষায়ঃ

=====================

পরিচিত সুনির্দিষ্ট কতকগুলি অনুষ্ঠান বিশেষ প্রমাণিত নিয়ম ও পদ্ধতিতে পালন করা।- শওকানী

মুল্লা আল-কারী লিখিয়াছেনঃ শরীয়াতের পরিভাষায় ====== আল্লাহর ঘর তওয়াফ করা ও সাফা-মারওয়ায় দৌঁড়ানোর সংকল্প পরিবার নাম উমরা।

হজ্জের জন্য সময় ও দিন তারিখ নির্দিষ্ট। সেই সময় ও দিন-তারিখ ছাড়া হজ্জ হয় না। কিন্তু উমরার জন্য কোন সময় বা দিন-তারিখ নির্দিষ্ট নাই। উহা সব সময় এবং যে কোন সময়ই হইতে পারে।

কেহ কেহ হজ্জের মাসে উমরা করা মাকরূহ মনে করেন। কিন্তু ইহা সম্পূর্ণ ভুল কথা। কেননা স্বয়ং নবী করিম (স) ও হজ্জের সময় ও মাসে উমরা করিয়াছেন। ইমাম আবূ হানীফা (রা) আরাফাতে অবস্থানের দিন উমরা করা মাকরূহু মনে করিয়াছেন মাত্র।

রাসূলে করীম (স)-এর উপরিউক্ত কথার কারণ তিনি নিজেই বলিয়া দিয়াছেন। আর তাহা হইল, এই দুইটি (কাছাকাছি সময়ে সম্পাদন করা হইলে) দারিদ্র্য ও গুনাহ দূর করিয়া দেয়। দারিদ্র্য দুই প্রকারের। এক প্রকারের দারিদ্র্য বাহ্যিক অর্থে, অর্থাৎ ধন-সম্পদ না থাকা। আর দ্বিতীয় প্রকারের দারিদ্র্য প্রচ্ছন্ন। এই দারিদ্র্য মনের ও মানসিকতার। এই দারিদ্র্য দূর হওয়ার দুইটি অবস্থা। হয় অর্থ সম্পদ বা বিত্ত সম্পত্তি লাভ হইল, যাহার ফলে বাহ্যিক দারিদ্র্য দূরীভূত হইয়া গেল; কিংবা মন ও মানসিকতার দারিদ্র্য দূর হইয়া গেল। হৃদয় জ্ঞান ও চেতনায় সমৃদ্ধ হইল। আর গুনাহ-খাতা নিশ্চিহ্ন করিয়া দেওয়ার ব্যাপারটি ‘সগীরা গুনাহ’ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ।

এই কথাটি বুঝাইবার জন্য নবী করীম (স) দৃষ্টান্তের ব্যবহার করিয়াছেন। লোহা বা স্বর্ণ-রৌপ্য অব্যবহৃত অবস্থায় পড়িয়া থাকিলে উহাতে ময়লা ধরিয়া যায়। ‘রেত’ দিয়া ঘষিলেই এই আবর্জনা দূর হইয়া ঝকঝকে তকতকে হইয়া উঠে। হজ্জ ও উমরা এক সময়ে করা হইলে মানুষের দারিদ্র্য ও গুনাহের জঞ্জাল মোচন করে ঠিক এইভাবেই। বস্তুত মানুষ মূলতই লৌহ বা স্বর্ণ রৌপ্যের ন্যায় স্বভাবজাত, নির্মল নিষ্কলুষ। বাহির হইতে উহার উপর আবর্জনা জন্মে এবং সে আবর্জনার তলে পড়িয়া উহার আসল সত্তা হারাইয়া যায়। আত্মপরিচয় বিস্মৃত হইয়া পড়ে। বস্তুজগতের প্রকৃত জিনিসের উপরে জমা আবর্জনা দূর করার জন্য যেমন ব্যবস্থা রহিয়াছে তেমনি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জগতে পূঞ্জীভূত ময়লা আবর্জনা দূর করার জন্য হজ্জ ও উমরা যুক্তভাবে একটা অত্যন্ত শান্তি হাতিয়ার।

‘হজ্জে মাবরুর’ বলিতে বুঝায়, যে হজ্জ আল্লাহ্‌র নিকট গৃহীত হইয়াছে, কিংবা যে হজ্জ উদযাপন কালে এক বিন্দু গুনাহের স্পর্শও লাগে নাই, তাহাই ‘হজ্জে মাবরুর’। বিশেষজ্ঞদের ভাষায় এই শব্দটির বিভিন্ন অর্থ বা ব্যাখ্যা দেওয়া হইয়াছে বটে; কিন্তু সব কথার সার একই। আর তাহা হইল যে হজ্জ পালনে যাবতীয় নিয়ম বিধান যথাযথভাবে পালন করা হইয়াছে। ফলে প্রত্যেকটি কাজ ঠিক সেইভাবেই সম্পন্ন করা হইয়াছে যেভাবে সম্পন্ন হওয়া আল্লাহ্‌র পছন্দ এবং তাঁহার সম্মতি ও সন্তোষের কারণ, তাহাই হজ্জে মাবরুর। ইমাম নবভী বলিয়াছেনঃ

===========================

হজ্জে মাবরুর তাহাই, যাহা করা কালে কোনরূপ গুনাহ করা হয় না।

হজ্জ ইসলামের পঞ্চাম রুকন, ইহা ফরয। এই ব্যাপারে কোনই সন্দেহ বা মতবিরোধ নাই। কিন্তু আলোচ্য হাদীসে নবী করীম (স) হজ্জ ও উমরা পালনের নির্দেশ এক সঙ্গে দিয়াছেন। এই কারণে শরীয়াতে উমরার আসল মর্যাদা কি, তাহা আলোচনা করা আবশ্যক।

কুরআন মজীদে আল্লাহ্‌র নির্দেশ উদ্ধৃত হইয়াছেঃ

======================

তোমরা হজ্জ ও উমরা আল্লাহরই জন্য সম্পূর্ণরূপে পালন কর।

এই আয়াতের দৃষ্টিতে অনেকের মত হইল, উমরা হজ্জের মতই ওয়াজিব। কেননা এই আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা যেমন হ্জ্জ অনুষ্ঠান সম্পূর্ণরূপে পালন করার নির্দেশ দিয়াছেন, তেমনি নির্দেশ দিয়াছেন উমরা পালন সম্পূর্ণ করার জন্য। ইমাম শাফেয়ী এই মত পোষণ করেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) বলিতেনঃ

=======================

আল্লাহ্‌র সৃষ্টি প্রত্যেক মানুষের-আল্লাহর ঘর পর্যন্ত যাতায়াতের সামর্থ্য যাহার আছে তাহার উপর হজ্জ ও উমরা করা ওয়াজিব, ইহা হইতে কেহই মুক্ত নয়। যদি কেহ উহা আদায় করার পর অতিরিক্ত কিছু করে, তবে তাহা তাহার নফল ইবাদত এবং অত্যন্ত কল্যাণময় কাজ। -দারে কুতনী

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলিয়অছেনঃ

================== -উমরা করা ওয়াজিব।

হযরত যায়দ ইবনে সাবিত (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, রাসূলে করীম (স) বলিয়াছেনঃ

=======================

হযরত যায়দ ইবনে সাবিক (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, রাসূলে করীম (স) বলিয়াছেনঃ

========================

হজ্জ ও উমরা উভয়ই ফরয। এই দুইটি যে কাজটিই তুমি প্রথমে কর করিতে পার তাহাতে তোমার কোন ক্ষতি সাধিত হইবে না।  -দারে কুতনী

অপর একটি হাদীসে বলা হইয়াছে, হযরত আব রুজাইন আল উকাইলী (রা) নবী করীম (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া বলিলেনঃ আমার পিতা বয়োবৃদ্ধ, হজ্জ ও উমরা কিংবা বিদেশ সফর করিতে সক্ষম নহেন। তখন নবী করীম (স) বলিলেনঃ

=================== তুমি তোমার পিতার তরফ হইতে হজ্জ ও উমরা কর।

ইহা ছিল নির্দেশ। তাই ইমাম আহমদ বলেনঃ

=========================

উমরা ওয়াজিব হওয়া পর্যায়ে ইহা হইতে উত্তম ও সহীহ সনদে বর্ণিত অন্য কোন হাদীস আমি জানি না।

ইমাম মালিক বলিতেনঃ

========================

উমরাহ করা রাসূলে করীম (স) এর নীতি। উহা তরক করিবার অনুমতি কেহ দিয়াছে, এমন কথা আমার জানা নাই।

ইমাম আবু হানীফা (রা) উমরা করা হজ্জের মতই কর্তব্য বলিয়া মনে করিতেন। তবে তাঁহার মতে উমরা রাসূলে করীম (স)-এর প্রবর্তিত ‌’সুন্নত’ এবং প্রমাণিত। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহও এই মত প্রকাশ করিয়াছেন। এই পর্যায়ে উল্লেখ্য হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহর একটি বর্ণনা। একটি লোক রাসূলে করিম (স)-কে নামায, যাকাত ও হজ্জ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, ==== এই কাজ কয়টি কি অবশ্য কর্তব্য? জওয়াবে নবী করীম (স) বলিলেনঃ

======================

উহা ঠিক ওয়াজিব বা অবশ্য কর্তব্য নয়। তবে তুমি যদি উমরা আদায় কর, তাহা হইলে উহা তোমাদের জন্য খুবই কল্যাণবহ হইবে।

যাহারা উমরা করাকে ওয়াজিব মনে করেন না, ‘সুন্নাত’ মনে করেন, উপরিউক্ত বর্ণনাটি তাঁহাদের দলীল। তাঁহাদের মতে কুরআনের উপরোদ্ধৃত আয়াদ হইতে হজ্জের সঙ্গে সঙ্গে উমরা করাও ওয়াজিব প্রমাণিত হয় না। কেননা উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা’আলা ‘সম্পূর্ণ’ করার নির্দেশ দিয়াছেন, উহা শুরু করিতে বলেন নাই। আর যে অ-ফরয ইবাদতে শুরু করা হইবে, তাহা ‘ম্পূর্ণ’ করাও যে শরীয়াত অনুযায়ীই ফরয, তাহা সর্ববাদীসম্মত কথা।

হযরত ইবনে মাসউদ (রা)-এর একটি বর্ণনাঃ

===========================

হজ্জ ফরয এবং উমরা নফল।

ইমাম শাফেয়ীর মতে, হজ্জ জিহাদ পর্যায়ের কাজ এবং উমরা নফল মাত্র। – কিতাবুল উম্ম হযরত আলী (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছেঃ তিনি বলিয়াছেনঃ

=========================

প্রত্যেক মাসেই উমরা করা যাইতে পারে। অর্থাৎ হজ্জের যেমন মাস ও সময় নির্দিষ্ট, উমরার জন্য তাহা নাই।

প্রসঙ্গত উল্লেখ, নবী করীম (স) এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী হজ্জ করার নিয়্যত করা ফরয, যেমন ইহরামের নিয়্যত করা ফরয। নবী করীম (স) কি ধরনের হজ্জ করিবেন, তাহা নিয়্যত যাত্রারম্ভ করার সময়ই করিয়া লইতেন ও লোকদিগকে তাহা করিতে নির্দেশ দিতেন। ইমাম শাফেয়ী বলিয়াছেনঃ কেহ যদি ‘তালবীয়া’ পড়ে; কিন্তু হজ্জ বা উমরার নিয়্যত না করে, তাহা হইলে তাহার হজ্জও হ্ইবে না, উমরাও হইবে না। আর যদি নিয়্যত করিয়া হজ্জের অনুষ্ঠানাদি পালন করে এবং তালবীয়া না করে, তবুও তাহার হজ্জ সম্পূর্ণ হইবে। রাসূলের মূলনীতি মূলক বাণী-‘ইন্নামাল আ’মালু বিননিয়্যাত’-ও ইহার একটি দলীল।

হজ্জ ও উমরা রমযান মাসের উমরার সওয়াব

===========================

হযরত আমের ইবনে বরায়াতা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, রাসূলে করীম (স) বলিয়াছেনঃ এক উমরা হইতে আর এক উমরা পর্যন্ত এই দুইটির মধ্যবর্তীকালের সমস্ত গুণাহ ও ভুলত্রুটির জন্য উহা কাফফারা। আর হজ্জে মাবরুর-এর একমাত্র প্রতিফল হইল জান্নাত।

– মুসনাদে আহ্‌মদ

ব্যাখ্যা এহ হাদাসে হজ্জ ও উমরার সওয়াব স্পষ্ট ভাষায় ঘোষিত হইয়াছে। হাদীসের প্রথমাংশে উমরার সওয়াব ও কল্যাণ সম্পর্কে যাহা বলা হইয়াছে তাহার সারকথা হইল, ‘একটি উমরা হইতে আর একটি উমরা পর্যন্ত’ যে সময়, এই সময়ে যত গুনাহ-খাতা হইবে, তাহা সবই ক্ষমা প্রাপ্ত হইবে। অবশ্য কেবলমাত্র সগীরা গুনাহই মাফ হইয়া যাইবে, কবীরা গুনাহ নয়। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে এই অর্থের যে হাদীসটি বর্ণিত হইয়াছে তাহা এইঃ

========================

এক উমরা হইতে অপর উমরা পর্যন্ত মাঝখানে করা গুনাহ মাফ করাইয়া দেয়। (মাঝখানের সময় যত দীর্ঘই হউক না কোন এবঙ একটি এমরা করার পর যত দীর্ঘদিন বা কাল পরেই পরবর্তী উমরা করা হউক না কেন।)

হাদীসের প্রকাশ্য ভাষা হইতে বুঝা যায়, প্রথম উমরাটিই গুনাহ মাফ করায়। কেননা এই উমরা সম্পর্কেই হাদীসটিতে বলা হইয়াছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দ্বিতীয় উমরা হইতে এই পর্যন্তকার সময়ে করা সব গুনাহ-খাতা মাফ করাইয়া দেয়। কেননা গুনাহ হওয়ার আগে উহার মাফ হওয়ার কথা অপ্রাসংগিক।

হজ্জ সম্পর্কে যাহা বলা হইয়াছে, তাহার অর্থ, হজ্জকালে যদি কোন গুনাহ করা না হয় এবং উহা যদি আল্লাহ্‌র নিকট কবুল হইয়া যায়, তাহা হইলে জান্নাতই উহার একমাত্র প্রতিফল। জান্নাত ছাড়া উহার সওয়াব স্বরূপ আর কিছু দেওয়া যাইতে পারে না। (এই বিষয়ে পূর্বে বলা হইয়াছে।)

সাধারণভাবে বৎসরের যে কোন সময়ে করা উমরা সম্পর্কে এই কথা। কিন্তু রমযান মাসে করা উমরা সম্পর্কে অশেষ সওয়াবের উল্লেখ হইয়াছে। কয়েকটি হাদীস এখানে উল্লেখ করা যাইতেছেঃ

আনসার কবীরার একজন মহিলা হজ্জ করিত (অবশ্য নফল হজ্জ, ফরয নয়) না পারায় নবী করীম (স) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেনঃ

এই বৎসর আমার সহিত হজ্জে গমণ করিতে তোমাকে কোন জিনিস বাঁধা দিয়াছে?

মহিলাটি জিজ্ঞাসার জওয়াবে যানবাহন না পাওয়ার কথা বলিল। তখন নবী করীম (স) তাহাকে বলিলেনঃ

===========================

যখন রমযান মাস আসিবে, তখন তুমি উমরা করিও। কেননা রজমান মাসের উমরা হজ্জের সমান মর্যাদাশীল হইয়া থাকে।

হযরত উম্মে মা’কাল আসিয়া রাসূলে করীম (স)-কে বলিলেনঃ আমরা উলটি দুর্বল হইয়া পড়ার কারণে আমি হজ্জে যাইতে পারি নাই। এখন আমি কি করিব? নবী করীম (স) বলিলেনঃ

======================

আগামী রমযান মাসে তুমি উমরা করিবে। কেননা রমযান মাসের উমরা হজ্জের মতই।

অপর একটি হাদীসে বলা হইয়াছে, উম্মে মা’কাল বলিলেনঃ

==========================

হে রাসূল! আমি বৃদ্ধ হইয়া গিয়াছি, রোগাক্রান্ত হইয়াছি। আমার জন্য এমন কোন আমল আছে কি, যাহা আমার হজ্জের বিকল্প হইতে পারে?

ইহার জওয়াবে রাসূলে করীম বলিলেনঃ

==========================

রমযানের উমরা তোমার হজ্জের বিকল্প হইতে পারে।

ইহা অসম্ভব নয় যে, মহিলাটি স্বীয় বার্ধক্য ও রোগাক্রান্ততার কারণে আগামী বৎসরের হজ্জ করিতে না পারায় কিংবা আগামী হজ্জের পূর্বেই মৃত্যু হইয়া যাওয়ার আশংকা বোধ করিতেছিলেন। সেই কারণে পরবর্তী হ্জ্জ আসার পূর্বে ও উপস্থিত সময়ের মধ্যে উহার বিকল্প কাজ কি হইতে পরে তাহা জানিতে চাহিয়াছিলেন। জওয়াবে নবী করীম (স) যাহা বলিয়াছেন, তাহা হয়ত এই আশংকার কথা বুঝিতে পারিয়াই বলিয়াছেন। অর্থাৎ বেচারী যদি হজ্জ না করিয়াই মারিয়া যায়, তাহা হইলে রমযান মাসে উমরাটা করিয়া যাইতে পারিলে অনেকটা দায়িত্ব পালন হইয়া যাইবে।

বস্তুত ইহা নবী করীম (স)-এর অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী দৃষ্টি ও আন্তরিক সহানুভূতিরই ফলশ্রুতি সন্দেহ নাই।

এইসব হাদীস হইতে রমযানে করা উমরার ফযীলত ও অসীম সওয়াবের কথা স্পষ্ট জানা যায়। ইহাতে হজ্জ ও উমরার মধ্যে তুলনামূলকভাবে উক্ত উদ্ধৃত হইয়াছে এবং ‘রমজানের উমরা হজ্জের মতই’ বলা হইয়াছে। এই পর্যায়ে প্রথম কথা এই হজ্জ নিশ্চয়ই ফরয হজ্জ নয়। কাহারও উপর হজ্জ ফরয হইলে, সে হজ্জের পরিবর্তে উমরা করিলে তাহা ফরয আদায় হইবে না। ইহা ‘দুইটি সাদৃশ্য সম্পন্ন জিনিসের একটির অপরটির স্থালাভিষিক্ত হওয়ার’ মত কথা মাত্র। কোন কোন দিক দিয়া, সাদৃশ্য থাকিলেই এইরূপ কথা বলা চলে। সর্ববিষয়ে সাদৃশ্য থাকার প্রয়োজন করে না। বস্তুত হজ্জ ও উমরায় প্রায় একই প্রকারের অনুষ্ঠান করিতে হয়। তবে উমরার তুলনায় হজ্জের কাজ ও ব্যস্ততা অনেক বেশী। অন্তত ইহরাম বাঁধা, আল্লাহর ঘরের তওয়াফ করা এবং সাফা ও মারওয়ার মাঝে দৌঁড়ানো-এই কয়টি কাজ একইভাবে উভয়ের ক্ষেত্রে করিতে হয়। ইহা মৌলিক সাদৃশ্য। রমযান মাসে উমরা পালন করা হইলে উহাতে হজ্জের সমান সওয়াব পাওয়া যাওয়া বিচিত্র কিছুই নয়। আল্লাহর দরবারে অভাবও নাই, সংকীর্ণতাও নাই। আর আল্লাহ্‌র রাসূল যখন বারবার ও বিভিন্ন লোককে এই কথাটি বলিয়াছেন, তখন ইহার তাৎর্য ও যথার্থতা অবশ্যই অনস্বীকার্য। বিশেষত সময়ের মর্যাদার দরুন সেই সময়ে করা ইবাদতের মর্যাদা নির্ধারণ ইসলামের একটি বিশেষ নীতি। রমযান মাসে করা উমরা কিংবা নফল ইবাদতের সওয়াব যে অনেক বেশী পাওয়া যায়, তাহা হাদীস হইতেই প্রমাণিত। এতদ্বাতীত রমযান মাসে রোযা রাখা অবস্থায় উমরার অনুষ্ঠানাদি পালন করা অনেক কষ্টসাধ্য। রমযানে করা উমরার সওয়াবের মাত্রা অধিক বৃদ্ধি পাওয়ার ইহাও একটা কারণ।

জিহাদ বনাম হজ্জ

===========================

হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, নবী করীম (স)-কে জিজ্ঞাসা করা হইলঃ ‘কোন আমল অধিক উত্তম?’ তিনি বলিলেনঃ ‘আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের প্রতি ঈমান।‘ জিজ্ঞাসা করা হইলঃ ‘অতঃপর কি?’ বলিলেনঃ ‘আল্লাহর পথে জিহাদ।‘ জিজ্ঞাসা করা হইলঃ ‘তাহার পর কোন আমলটি সর্বোত্তম?’ বলিলেনঃ ‘কবুল হওয়া হ্জ্জ।‘

ব্যাখ্যা হাদীসটিকে বলা হইয়াছে, নব করীম (স)-কে জিজ্ঞাসা করা হইল-জিজ্ঞাসাকারী ছিলেন প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু যর গিফারী (রা)। হাদীসটিতে মোট তিনটি বিষয়ে কথা বলা হইয়াছেঃ ঈমান, জিহাদ ও হজ্জ। কিন্তু ব্যবহৃত ভাষায় প্রথম ও তৃতীয়টির প্রথমে আলিফ ও লাম ব্যবহৃত হয় নাই। কেবলমাত্র ‘জিহাদ’ শব্দের উপর আলিফ ও লাম ব্যবহার করা হইয়াছে। ‘অন্য দুইটির মত ==== ‘জিহাদুন’ না বলিয়া আল-জিহাদ ==== বলা হইয়াছে। উহার কারণ হইল ঈমান ও হজ্জ জীবনে বারবার হয় না। ঈমান তো জীবনের তরে একবার চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত করিয়া লওয়ার ক্যাপার। এতকর সিদ্ধান্ত করিয়া লইলে জীবনে উহার কোন নড়চড় হইতে পারে না। আর হজ্জও সামার্থবান ব্যক্তির জীবনে একবারই মাত্র ফরয। একবার ফরয আদায় করিয়া লওয়ার পর এই ফরয চিরতরে আদায় হইয়া যায়। কিন্তু জিহাদ উহা হইতে ব্যতিক্রম। ইহার প্রয়োজন জীবনে বারবার দেখা দেয়। বারবার জিহাদে আত্মনিয়োগ করার ও ঝাঁপাইয়া পড়ার প্রয়োজন হয়। জিহাদে স্থায়ীভাবে লাগিয়া থাকিতে হয়। এতদ্ব্যতিত ঈমান ও হজ্জ সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত দায়িত্বের কাজ। আর ‘জিহাদ’ শব্দের উর আলিফ-লাম ব্যবহৃত হওয়ায় জিহাদের পূর্ণতা বুঝায়। একবার উহা করা হইলেও বারবার করার প্রয়োজন দেখা দেয়।

এই হাদীসটি প্রথমত প্রমাণ করে যে, আকীদা-বিশ্বাসও আমল পর্যায়ে গণ্য। আবার ঈমান শব্দ শারীরিক আমর বুঝাইবার জন্য অনেক সময় ব্যবহৃত হয়। কেননা এই আমল দ্বারাই তো ঈমানের সত্যতা প্রমাণিত হয় ও ঈমানকে পূর্ণ পরিণত করে এবং দ্বিতীয়ত আল্লাহ্‌র নির্দিষ্ট ও মনোনীত আমলসমূহ করিয়াই তাঁহার দরবারে উচ্চতম মর্যাদা অর্জন করা যাইতে পারে। আর তৃতীয়ত ঈমানের পর নাজাম রোযা যাকাত বাদে অতীব গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনী কাজ হইল জিহাদ। তাহার পরই হজ্জের স্থান।

এই কথা স্মরণীয় যে, নবী করীম (স) এই ধরনের বিভিন্ন প্রশ্নকারীকে বিভিন্ন উত্তর দিয়াছেন। আর এই বিভিন্নতার কারণ হইল প্রশ্নকারীর অবস্থার পার্থক্য ো তারতম্য। যাহার প্রশ্নের যে রকমের জওয়াব দেওয়া দরকার বা ভালো মনে করিয়াছেন, তিনি তাহাকে সেই ধরনেরই জওয়াব দিয়াছেন। আলোচ্য হাদীসে উদ্ধৃত জোয়াবে এই কারণেই নামায, রোযা ও যাকাতের উল্লেখ নাই। কেননা নবী করীম (স) এই প্রশ্নকারীকে এই তিনটির কথা বলার প্রয়োজন মনে করেন নাই। তাহা ছাড়া রাসূলে করীম (স) বিভিন্ন দিক দিয়া বিভিন্ন জিনিসকে ‘সর্বোত্তম’ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। কাজেই কোন বিশেষ কাজকে সর্বোত্তম বলার অর্থ এই নয় যে, উহা সব দিক ও সর্ববিষয়ের সমস্ত কাজের মধ্যে সর্বোত্তম হইবে। রাসূলে করীম (স)-এর একটি কথা হইতে ইহার প্রমাণ মেলে। তিনি ইরশাদ করিয়াছেনঃ

=========================

যে লোক হজ্জ করে নাই, (হজ্জ ফরয হইয়া থাকিলে) তাহার হজ্জ চল্লিশটি ইসলামী যুদ্ধে যোগদান অপেক্ষা উত্তম। আর যে লোক হজ্জ করিয়াছে তাহার জন্য চল্লিশবার হজ্জ করার অপেক্ষা একটা ইসলামী যুদ্ধে যোগদান করা উত্তম।

আলোচ্য হাদীসে হজ্জের পূর্বে জিহাদের উল্লেখ করা হইয়াছে। ইহাতে মনে হয় হজ্জের তুলনায় জিহাদের গুরুত্ব অধিক। অথচ হজ্জ ইসলামের পাঁচটি রুকনের মধ্যে একটি, আর জিহাদ সেরূপ নয়। এই পর্যয়েঁ বলা যায়, ইসলামের প্রাথমিক যুগে জিহাদ সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল। কেননা তখন ইসলামে শত্রুদের মুকাবিলা করা ইসলামের অন্যান্য আমল অপেক্ষাও অধিক প্রয়োজনীয় ছিল। ইমলামের শত্রুরা তখন সমগ্র ইসলামকেই উৎপাটিত করিতে বদ্ধপরিকর হইয়াছিল। তাহাদের প্রতিরোধ করা না হইলে শুধু হজ্জই নয়, নামায-রোযা করাও সম্ভবপর হইত না। দ্বিতীয়ত জিহাদ কোন এক সময় অন্যান্য ‘ফরযে ফিকায়ার’ ন্যায় ফরযে কিফায়া থাকে না, ‘ফরযে আইন’ হইয়া যায়। তখন ফরযে আইন হয় না, তখনও ইহা ‘ফরযে ফিকায়া’ থাকে। আর হজ্জ জীবনে মাত্র একবার আদায় করা ফরয-ফরযে আইন। একবার যখন হজ্জ করা হইয়া য়া, তখন উহা ফরযের স্তর হইতে নামিয়া নফল পর্যায়ে আসিয়া যায়। সে সময় জিহাদ ফরযে আইন হইয়া যায়, তখন হজ্জ জিহাদের তুলনা করা হইলে হজ্জের তুলনায় জিহাদ অধিক উত্তম হইয়া যাইবে। তৃতীয়ত ফরয হওয়ার ব্যাপারে জিহাদ হজ্জের সহিত শরীফ ও সম মর্যাদাবান। কিন্তু জিহাদের কল্যাণ গোটা মুসলিম উম্মত লাভ করে। উহাই ইসলামের অস্তিত্ব, মান-মর্যাদা ও কার্যকরতা রক্ষা করে, অব্যাহত রাখে। হজ্জ একবার করা হইলে পরে উহা নফল পর্যায়ে গণ্য হইতে থাকে, কিন্তু জিহাদ ফরযে ফিকায়া যে নফলের তুলনায় অধিক মর্যাদা সম্পন্ন তাহা বলাই বাহুল্য। ইমামুল হারামাইন বলিয়াছেনঃ আমার নিকট ফরযে কিফায়া ফরযে আইন অপেক্ষাও উত্তম। কেননা উহা মুসলিম জাতির ইসলামী জীবন যাপন পথের সব অসুবিধা ও প্রতিবন্ধকতা দূর করিয়া দেয়, ইসলামকে মুক্ত ও প্রতিষ্ঠিত করে। জিহাদ করা না হইলে গোটা মুসলিম উম্মতই আল্লাহর নিকট দায়ী ও দায়ী হইয়া যায়। আর যে কাজের এতটা গুরুত্ব, তাহা যে অন্য যেকোন আমলের তুলনায় অধিক উত্তম, তাহাতে কোনই সন্দেহ থাকিতে পারে না।

মুসনাদে আহমদ গ্রন্থে এই হাদীসটি ভিন্নতর ভাষায় উদ্ধৃত হইয়াছে। তাহা এইঃ

আল্লাহর নিকট সমস্ত আমলের মধ্যে সর্বোত্তম আমল হইল এমন ঈমান যাহাতে সন্দেহ  স্থান পায় নাই, এমন যাহাতে গনীমতের মাল বন্টনের পূর্বে চুরি করিয়া হয় নাই এবং এমন হজ্জ যাহা আদায় করার সময় কোন পাণ করা হয় নাই এবং আল্লাহর নিকট কবুল হইয়া গিয়াছে।

ব্যাখ্যাঃ এই হাদীসে ঈমানের কথা বলা হইয়াছে, তাহা সেই ঈমান যাহা গ্রহণ করিলে একজন ব্যক্তি ইসলামী মিল্লাতে প্রবেশ করিতে পারে। তাহা হইল, ঈমানের বিষয়গুলিমকে আন্তরিকভাবে সত্য ও যথার্থ বলিয়া বিশ্বাস করা এবং আল্লাহর একত্ব ও  রাসূলে করীমের রিসালতের প্রতি ঈমান আনার কথা মুখে উচ্চারণ করা- কালিমা শাহাদাত বিশ্বাস সহকারে পাট করা। ইহার প্রথম অংশ দিল ও  অন্তরের কাজ। আর দ্বিতীয়টি মুখ বা বাকশক্তির কাজ। অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যেঙ্গের সাহায্যে যেসব আমল করা হয়, তাহা ইহার অন্তর্ভুক্ত নয়। কিন্তু এইসব আমল ছাড়া যেহেতু ঈমান সম্পুর্ণ হয় না, উহার সত্যতাও বাস্তবভাবে প্রমাণিত হয় না। এই কারণে এই ঈমানও এক হিসাবে আমলের মধ্যে গণ্য।

হাদীসের ভাষা অনুযায়ী এই ঈমান সন্দেহমুক্ত হইতে হইকব। কেহ যদি কেবলমাত্র মুখে ঈমানের কথা প্রকাশ করে কিন্তু দিল অবিশ্বাসী থাকিয়া যায় এবং ঈমান অনুযায়ী কাজ না করে, তাহা হইলে তাহার এই মৌখিক ঈমানকে ঈমান নামে অভিহিত করা যায় না।

হাদীসে যে যুদ্ধের কথা বলা হইয়াছে, ইহা সেই যুদ্ধ যাহা আল্লাহর সন্তোষ লাভের উদ্দেশ্যে তাঁহার দ্বীন কায়েমের জন্য তাঁহারই বিধান ও রীতি অনুযায়ী সম্পন্ন করা হয় এবং যাহাতে ইসলাম ও মুসলমানের দুশমনকে প্রতিরোধ করা হয়। এইরূপ যুদ্ধ আত্মসাৎ মুক্ত হইতে হইবে। তাহাতে গনীমতের মাল সরকারীভাবে বন্টন করার পূর্বে চুরি করিয়া লওয়া হইবে না। যদি কেহ তাহা করে, তবে সে মুজাহিদ গণ্য হইতে পারে না এবং তাহার এই যুদ্ধকার্যের বিনিময়ে সে জিহাদের সওয়াব ও মর্যাদা আল্লাহর নিকট হইতে  পাইবে না।

‌হজ্জে মাবরুর ইমাম নববীর মতে তাহাই, যাহাতে কোন গুনাহ মিশ্রিত হয় নাই। হ্জ্জ করা কালে শরীয়াতের বিপরীত কোন কাজ করা হয় নাই। ইহার অপর অর্থ হইল ===== যাহা আল্লাহর নিকট কবুল হইয়াছে। আর কাহার হজ্জ কবুল হইয়াছে, তাহা বুঝিবার চিহ্ন হইল, হাজী হজ্জ সমাপনান্তে ভালোয় ভালোয় নিজের ঘরে ফিরিয়া আসিয়াছে এবং এই সময়ের মধ্যে কোন গুনাহ করে নাই। কেহ কেহ বলিয়াছেন যে হজ্জে রিয়া নাই তাহাই হজ্জে মাবরুর।

হযরত আবু হুরায়রা (রা) এই হাদীসটি বর্ণনা করিয়া বলিয়াছেনঃ

===========================

হজ্জে মাসরুর সেই বৎসরের সমস্ত গুনাহ খতম করিয়া দেয়।

তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ (রা) রসূলে করীম (স)-কে  বলিতে শুনিয়াছেনঃ

=============================

হজ্জ্ব জিহাদের সমান মর্যাদাসম্পন্ন। আর উমরা নফল ইবাদত।

==============

মুসলিম জাতির মা হযরত আয়েশা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিলেনঃ ইয়া রাসূল। আমরা দেখিতেছি জিহাদই উত্তম আমল। তাহা হইলে আমরা কি জিহাদ করিব না? জবাবে নবী করীম (স) বলিলেন, না। বরং উত্তম জিহাদ হইতেছে কবুল হজ্জ।

বুখারী, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ্

ব্যাখ্যা হাদীসটিতে জিহাদ ও হজ্জের মধ্যে তুলনা করা হইয়াছে। হযরত আয়েশার প্রশ্নের জওয়াবে নবী করীম (স) বলিয়াছেন যে, কবুল হওয়া হজ্জই উত্তম জিহদ। এই কথাটি বিশেষভাবে মুসলিম মহিলাদের জন্য। কেননা তাহাদের পক্ষে রক্ষপাতপূর্ণ যুদ্ধ-বিগ্রহে অংশ গ্রহণ করা স্বাভাবিক কাজ নয়। তাহাদের স্বাভাব প্রকৃতি ও শক্তি ক্ষমাতার অনুকুলও নয়। রাসূলে করীমের জওয়াবটি সংক্ষিপ্ত। পূর্ণ বাক্য এইরূপ মনে করিতে হইবেঃ

===============================

হ্যা, জিহাদ তো উত্তম আমল, তাহাতে  সন্দেহ নাই। কিন্তু তোমাদের মহিলাদের পক্ষে উত্তম জিহাদ হইল কবুল হওয়া হজ্জ।

আর বস্তুতই স্ত্রীলোকদের পক্ষে জিহাদের মত কঠিন ও বিপদসংকুল কাজে অংশ গ্রহণের তুলনায় আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য কবুল হওয়া হ্জ্জই যে উত্তম, তাহাতে সন্দেহ নাই। নাসায়ীর গ্রন্থে আলোচ্য বর্ণনাটির ভাষা এইরূপ। হযরত আয়েশা (রা) বলিলেনঃ

======================================

আমরা কি বাহির হইব না ও আপনার সহিত জিহাদে শরীক হইব না? কেননা, আমি কুরআনের দৃষ্টিতে জিহাদের তুলনায় অধিক উত্তম অন্য কোন আমল  দেখিতে পাই না? উত্তরে নবী করীম (স) বলিলেনঃ কিন্তু অধিক সুন্দর ও অধিক ভালো আমল হইল আল্লাহর ঘরের উদ্দেশ্যে বাহির হওয়া ও কবুল হওয়া হজ্জ করা।

আর ইবনে মাজাহ্ গ্রন্থে এই বর্ণনাটির ভাষা এইরূপঃ হযরত আয়েশা (রা) হইতে বর্ণিতঃ

=================================

আমি বলিলাম, হে রাসূল। মেয়েলোকদের পক্ষে জিহাদ করা কি কর্তব্য? রাসূলে করীম (স) বলিলেনঃ স্ত্রীলোকদের জিহাদ অবশ্য কর্তব্য। তবে তাহা এমন জিহাদ যাহাতে মারামারি ও হযরত উস্ম সালমা (রা) হইতে একটি বর্ণনায় বলা হইয়াছে।

=============================

প্রত্যেক দুর্বল ব্যক্তির জন্য হজ্জই হইল জিহাদ আর হযরত আবু হুরায়রা (রা) বর্ণিত হাদীসে নবী করীম (স)-এর কথাটি এই ভাষায় বলা হইয়াছেঃ

==============================

 বেশী বয়স্ক, অল্প বয়স্ক, দুর্বল ও মেয়েলোকদের জিহাদ হজ্জ ও  উমরা।

হাদীসের এইসব বর্ণনা হইতে দুইটি কথা স্পষ্ট হইয়া উঠে। একটি এই যে, স্ত্রীলোকদের পক্ষে জিহাদের ঝামেলায় না পড়িয়া হজ্জ ও উমরা করিলে যেমন হজ্জের ফরয আদায় হইবে, তেমনি জিহাদের তুলনায় অধিক সওয়াবও পাওয়া যাইবে।

দ্বিতীয়, জিহাদ অতীব উত্তম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যন্ত বেশী সওয়াবের কাজ-তাহাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু এই জিহাদ শুধুমাত্র শক্তিসম্পন্ন পুরুষদের জন্য তাহাও বেশী বয়স্ক বৃদ্ধ, অল্প বয়স্ক বালক এবং দুর্বল স্বাস্থ্যের লোকদের জন্য নয়। কেননা এই অবস্থার লোক জিহাদে শরীক হইয়া কোন কাজ করিতে পারিবে না। তাহারা বরং মুসলিম মুজাহিদের জন্য একটি দুর্বহ বোঝা হইয়া দাঁড়াইবে। এই কারণে সাধারণ অবস্থায় ভালো স্বাস্থ্যবান যুবকদেরই জিহাদে শরীক হওয়া কর্তব্য। কিন্তু তখন এই স্বাস্থ্যবান যুবকদের বাহিরে যেসব বৃদ্ধ, স্বাস্থ্যীন বালক ও নারী সমাজ থাকিবে, তাহাদের জন্য হজ্জ ও উমরার কাজে যোগদান করা অধিক উত্তম, এই কথার যৌক্তিকতা সহজেই বুঝিতে পারা যায়।

কিন্তু যে সময় একটি ইসলামী রাষ্ট্রের উপর শত্রুর আক্রমণ সংঘটিত হইবেও রাষ্ট্রের পক্ষ হইতে জরুরী অবস্থা ঘোষণার মাধ্যমে সকল নাগরিককে নিজ নিজ সাধ্য ও যোগ্যতা অনুযায়ী দেশ রক্ষার জিহাদে যোগদানের আহবান জানানো হইবে, তখন আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা নির্বিশেষে প্রত্যেককেই জিহাদে যোগদান করিতে হইবে। এই মুহুর্তে জিহাদ ফরযে কিফায়া থাকে না, ফরযে আইন হইয়া যায়। এই কারণে ইসলামের  প্রাথমিক যুগে মহিলারাও জিহাদে যোগদান করিয়াছেন এবং অনুরূপ অবস্থায় ইহা করা শুধু বিধেয় নহে  অবশ্য কর্তব্যও।

হাদসসমূহে এই আলোচনায় একটি কথা বিশেষভাবে লক্ষণীয়, তাহা হইল, প্রত্যেকটি কথায় হজ্জ ও জিহাদের মধ্যে তুলনা করা হইয়াছে। অন্য কোন আমলের সাথে তুলনা করা হয় নাই। ইহার কারণ হইল, হজ্জ পালনে ও জিহাদে নিজের নফসের সহিত সংগ্রাম করিতে হয়। উপরন্তু নিজের সর্বস্ব সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর উপর ন্যস্ত করা ও একমাত্র আল্লাহরই সন্তোষ বিধানের উদ্দেশ্যে সর্বশক্তি নিয়োগ করার গভীর ভাবধারা জিহাদ ও হজ্জ-উভয় কাজেই নিহিত রহিয়াছে। এক কথায় এই উদ্দেশ্যে হয় জিহাদ করিতে হইবে, আর জিহাদে যোগদান করা সম্ভব বা নমীচীন না হইলে হজ্জ ও উমরার কাজে সময় ও অর্থ ব্যয় করিবে এবং উহার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য ও পরম সন্তোষ লাভ করিবে। এই দৃষ্টিতে আলোচ্য আলোচনার গুরুত্ব অনুধাবনীয়।

মহিলাদের হজ্জ যাত্রা

================

হযরত আবু আমামাতা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, রাসূলে করীম (স) বলিয়াছেনঃ মেয়েলোক তিনদিনের সফরে কিংবা হজ্জ করার উদ্দেশ্যে যাত্রা করিবে না, যদি তাহার স্বামী তাহার সঙ্গী না হয়।-দারে কুতনী

ব্যাখ্যা হাদীসটির বক্তব্য দুইটি। প্রথম, স্ত্রীলোককে স্বামী ছাড়া তিনদিনের বিদেশ যাত্রা গমন করিতে নিষেধ করা হইয়াছে। স্বামী ছাড়া কোন নারী হজ্জ করিতেও যাইবে না।

এই দুইটি কথাই বিশদভাবে আলোচিতব্য।

স্ত্রীলোকদের বিদেশ যাত্রা পর্যায়ে বহু সংখ্যক হাদীস উদ্ধৃত হ্ইয়াছে। তাহার ভাষা বিভিন্ন। ফলে সেসব হাদীস হইতে এই প্রসঙ্গে অনেক কথাই জানা যায়। কোন কোন হাদীসে স্বামী নয়, মুহাররম পুরুষের  উল্লেখ রহিয়াছে। অর্থাৎ মহিলারা কোন মুহাররম পুরুষ সঙ্গে না লইয়া বিদেশ যাত্রা করিবে না। হযরত ইবনে আব্বাস বর্ণিত একটি হাদীসে বলা হইয়াছে, নবী করীম (স) ভাষণ দান প্রসঙ্গে বলিয়াছেনঃ

===========================

 কোন ভিন পুরুষ কোন ভিন মেয়েলোকদের সহিত নিভৃত একাকীত্বে হইবে না, যদি না মেয়ে লোকটির সহিত তাহার কোন মুহাররম পুরুষ উপস্থিত থাকে এবং কোন মেয়েলোক মুহাররক পুরুষ সঙ্গে না লাইয়া বিদেশ যাত্রা করিবে না।

এই কথা শুনিয়া এক ব্যক্তি দাঁড়াইয়া বলিলঃ ইয়া রাসূল, আমি তো এখানে যুদ্ধ ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত রহিয়াছে। ওদিকে আমার স্ত্রী একাকী হজ্জ করিতে বাহির হইয়াছে। এখন আমার কি কর্তব্য? নবী করীম (স) বলিলেনঃ

তুমি চলিয়া যাও এবং তোমার স্ত্রী সহিত একত্রিত হইয়া হজ্জ কর।

বস্তুত ভিন্ পুরুষ ও ভিন্ মেয়েলোকের নিভৃত একাতীত্বে কোন মুহাররম পুরুষের উপস্থিতি ছাড়া একত্রিত হওয়া সম্পূর্ণরূপে হারাম। এই মতে ইজ্‌ম্য হইয়াছে। তবে কোন মুহররম পুরুষের উপস্থিতিতে ভিন্ পুরুষ মেয়েলোকের একিত্রত হওয়া এই হাদীসের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ নয়।

 মেয়েলোক তিনদিনের বিদেশ যাত্রার  মুহাররম পুরুষ সঙ্গী না লইয়া যাত্রা করিবে না এই কথাটি নির্বিশেষে। অর্থাৎ কোন রকম বিদেশ যাত্রা-তাহা যে ধরনেই হউক না কেন-মুহাররম পুরুষ  সঙ্গী ছাড়া স্ত্রীলোকের জন্য জায়েয নয়।

উপরোদ্ধৃত হাদীসে তিনদিনের সফরের কথা বলা হইয়াছে। হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা) হইতে বর্ণিত হাদীসে বলা হইয়াছে। হাদীসটি এইঃ

==========================

নবী করীম (স) স্ত্রীলোকদিগকে দুই দিন কিংবা দুই রাত্রির দুরত্ব পথে তাহার স্বামী কিংবা কোন মুহাররম পুরুষ সঙ্গী ছাড়া সফর করিতে নিষধ করিয়াছেন।-বুখারী,মুসুলম

এই  হাদীসে দুই দিন বা দুই রাত্রির সফরের কথা বলা হইয়াছে।

আর হযরত আবু হুরায়রা (রা) বর্ণিত হাদীসে একদিন এক রাত্রির কথা বলা হইয়াছে। নবী করীম (স) বলিয়াছেনঃ

==========================

কোন মুহাররম পুরুষ সঙ্গীছাড়া কোন স্ত্রীলোকের পক্ষে একদিন এক রাত্রি পথ সফর করা হালাল নয়।

হযরত আবু সাঈদ বর্ণিত অপর একটি বর্ণনায় পুরুষ সঙ্গীদের স্পষ্ট উল্লেখ করা হইয়াছে। হাদীসটি এইঃ

================================

আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী কোন স্ত্রীলোকের পক্ষে তাহার পিতা কিংবা স্বামী কিংবা পুত্র কিংবা ভাই অথবা অন্য কোন মুহাররম পুরুষ সঙ্গী ছাড়া তিনদিন কিংবা ততোধিক সময়ের জন্য সফর যাওয়া হালাল নয়।

 এই হাদীসটিতে সাধারণভাবে শুধু মুহাররম পুরুষ, আর বিশেষভাবে পিতা, স্বামী, পুত্র ও ভাইর উল্লেখ করা হইয়াছে এবং সফরকাল পর্যায়ে বলা হইয়াছে তিনদিন কিংবা ততোধিক সময়।

এইসব হাদীস হইতে কোন মুহাররম পুরুষ সঙ্গী ছাড়া বিদেশ সফর করা স্ত্রীলোকদের জন্য সম্পূর্ন নিষিদ্ধ ঘোষিত হইয়াছে বলিয়া জানা যায়। আর সফরকাল সম্পর্কে উক্ত বিভিন্ন সময়ের মধ্যে আসলে কোন পার্থক্য নাই। ইহা বর্ণনাকারীদের নিজস্ব সময়-হিসাবের পার্থক্যের পরিণাম মাত্র।

==============================

সময় নির্ধারণ পর্যায়ে যাহা বলা হইয়াছে তাহা হইতে উহার বাহ্যিক অর্থই আসল লক্ষ্য নয়। আসল কথা হইল, যে বিদেশ যাত্রাকে সফর বলা হয়, তাহার সময় যতুটুকু হউক না কেন, কোন মুহররম পুরুষ সঙ্গ ছাড়া সফর করা কোন মুসলিম মহিলার পক্ষে হালাল নয়।

এমন কি হজ্জের  জন্য সফর করাও নয়। সুফিয়ান সওরী বলিয়াছেন, কেবল দুরের সফরের ক্ষেত্রেই মুহাররম সঙ্গীর প্রয়োজন দেখা দেয়, নিকটবর্তী স্থানে যাওয়ার জন্য নয়। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রা) বলিয়াছেনঃ

==========================

মুহাররম সঙ্গী না পাইতো স্ত্রীলোকের উপর হজ্জ করা ফরয হয় না।

ইমাম আবু হানীফা, নখরী, ইসহাক ও ইমাম শাফেয়ীও স্ত্রীলোকদের হজ্জ যাত্রার জন্য কোন মুহররম সঙ্গী থাকা জরুরী শত বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন। ইমাম মালিক মত প্রকাশ করিয়াছেন,ফরয হজ্জের সফরে যাওয়ার জন্য মুহাররম সঙ্গীর শর্ত জরুরী নয়। কিন্তু এই মত যথার্থ নয়। কেননা হাদীসে স্পষ্ট ভাষায় হজ্জের সফরের উল্লেখ করিয়া বলা হইয়াছে যে, উহা মুহাররম সঙ্গী ছাড়া হালাল নয়। কেহ কেহ বলিয়াছেন, কেবল যুবতী মেয়েলোকদের জন্য মুহাররম পুরুষ সঙ্গীর উপস্থিত শর্ত-বৃদ্ধাদের জন্য নয়। কেননা বৃদ্ধাদের প্রতি ভিন্‌ পুরুষের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় না। কিন্তু এই পর্যায়ে বর্ণিত সব কয়টি হাদীস একত্রিত করিলেও তাহা হইতে এই কথা প্রমাণিত হয় না।

হাদীসসমূহে যে মুহাররম পুরুষ সঙ্গীর শর্ত করা হইয়াছে, তাহার অর্থ চিরকালের জন্য যাহাদের পরস্পর বিবাহ হারাম সেই পুরুষ ও স্ত্রীলোক। সাময়িক কারণেও বিবাহ হারাম হয়, যেমন শালী-ভগ্নীপতি, এইরূপ মুহাররমের কথা এখানে বলা হয় নাই এবং এইরূপ মুহাররম পুরুষের সঙ্গে স্ত্রীলোকের সফর যাত্রা যায়েয নয়।

স্বরণীয় যে, কুরআনের আয়াতে সামর্থ্যবান যে কোন পুরুষ বা স্ত্রীর উপর হজ্জ করা ফরয করা হইয়াছে। আর হাদীসে মুহাররম পুরুষ সঙ্গী ছাড়া স্ত্রীলোকদের জন্য বিদেশ যাত্রা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই হাদীসের কারণে কুরআনের সাধারণ হুকুম পালন সীমাবদ্ধ হইয়া গেল। বিশেষজ্ঞদের নিকট ইহা নীতিবিরুদ্ধ নয়।

দ্বিতীয়তঃ==================বলিয়া পথের সামর্থ্যের কথা হইয়াছে, এই সামর্থ্যের শর্তের মধ্যে মুহাররম পুরুষের উপস্থিতি স্ত্রীলোকদের ক্ষেত্রে জরুরী অংশ। কাজেই কোন মহিলা যদি মুহাররম পুরুষ সঙ্গী না পাওয়ার কারণে ফরয হজ্জ আদায় করা হইতে বিরত থাকে, তবে তাহা কুরআনের ঘোষণার সহিত সাঞ্জস্যপূর্ন, উহার বিরোধিতা নয় এবং সেইজন্য গুনাহ হইবে না।

=======

হজ্জ ও পাথেয়

=============================

হযরত আলী (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, হযরত রাসূলে করীম (স) বলিয়াছেনঃ যে লোক পথের এমন সম্বল ও যানবাহনের অধিকারী হইল, যাহা তাহাকে আল্লাহর ঘর পর্যন্ত পৌছাইয়া দিতে পারে আর তাহা সত্ত্বেও হজ্জ করিল না, সে ইয়াহুদী হইয়া মরুক কি খৃষ্টান হইয়া তাহাতে কোন পার্থক্য হইবে না। এই কথাই আল্লাহ্ তাআলা তাঁহার কিতাবে বলিয়াছেনঃ আল্লাহ্‌রই জন্য (আল্লাহ্‌র) ঘরের হজ্জ করা সেই লোকদের জন্য অবশ্য কর্তব্য। যাহারা সে পর্যন্ত পৌছার পথ অতিক্রম করিতে সমর্থ হইবে।তিরমিযী,মুসনাদে আহমদ

ব্যাখ্যা হাদীসটিতে হজ্জ করার সামর্থ থাকা সত্ত্বেও হজ্জ না করাকে একটি মহা অপরাধরূপে গণ্য করা হইয়াছে। এইরূপ ব্যক্তির উপর আল্লাহর কঠিন আযাব হওয়ার সংবাদই হইতে দেওয়া হইয়াছে। এইরূপ ব্যক্তি যখন হজ্জ না করিয়া মরিয়া যায়, তখন তাহার পরিণতি মুসলমানদের ন্যায় হয় না। তাহার মৃত্যুকে ইয়াহুদী বা খৃষ্টানের মৃত্যুর সমান বলা হইয়াছে। কেননা এই দুই জাতি আহলি কিতাব, তাহাদের নিকট আল্লাহর নাযিল করা কিতাব রহিয়াছে। তাহা সত্ত্বেও তাহারা। তদানুযায়ী আমল করে না। হজ্জের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি হজ্জ না করিয়াই মরিয়া গেল, তাহার অবস্থা এই আহলি কিতাবদের মতই। কেননা সেও তাহাদের মত আল্লাহর নাযিল করা কিতাব অনুযায়ী আমল করে নাই। আল্লাহর বিধান ও স্পষ্ট নির্দেশকে সে উপেক্ষা করিযাছে, তাহার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করিয়াছেন। সে উহার প্রতি এমন আচরণ গ্রহণ করিয়াছে, যাহাতে মনে হয়, সে উহার কথা আদৌ জানে না কিংবা জানিলেও তাহা সে বিশ্বাস করে না বা মানিতে প্রস্তুত নয়।

তায়্যিবী রাসূলে করীম (স)-এর এই কথাটুকুর ব্যাখ্যা করিয়াছেন এই ভাষায়ঃ

==========================

এই ব্যক্তির এমতাবস্থায় মৃত্যু হওয়া এবং তাহার ইয়াহুদী বা খৃষ্টান অবস্থায় মৃত্যু হওয়া সম্পূর্ণরূপে এক ও অভিন্ন।

বস্তুত ইহা যে অত্যন্ত কঠোর উক্তি তাহাতে সন্দেহ নাই এবং এই কঠোর উক্তি রাসূলে করীম (স)-এর নিজস্ব মন্তব্য কিছু নয়। ইহা খোদা কুরআনে উদ্ধৃত হইয়াছে। এই পর্যায়ে রাসুলে করীম (স) কুরআনের আয়াত পাঠ করিয়া শোনাইয়াছেন এবং বুঝাইয়া দিয়াছেন যে, আল্লাহর ঘর পর্যন্ত যাতায়াতের সামর্থ্যবান প্রত্যেক ব্যক্তিরই হজ্জ্ব করা এমন কর্তব্য যে, যে লোক তাহা করিবে না, তাহার জন্য আয়াতের পরবর্তী অংশই যর্থাথ বলিয়া প্রতীয় হইবে। আর তাহা হইলঃ

===========================

যে লোক কুফরী করিল-নিশ্চয়ই আল্লাহ্ বিশ্বলোকের কাহারো মুখাপেক্ষী নহেন।

এই আয়াতাংশের বিভিন্ন ব্যাখ্যা বর্ণিত হইয়াছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলিয়াছেনঃ

====================

যে লোক কুফরী করিল-নিশ্চয়ই ফরয হওয়াকে অস্বীকার করিল ও উহাকে অবশ্য কর্তব্য মনে করিল না, (সেই লোকের প্রতি আল্লাহর কিছুমাত্র মুখাপেক্ষী নহেন।)

উপরোদ্ধৃত হাদীসটি সম্পর্কে ইমাম তিরমিযী লিখিয়াছেনঃÕ Õএই হাদীসটির সনদ সম্পর্কে আপত্তি আছে। হিলাল ইবনে আবদুল্লাহ উহার একজন বর্ণনাকারী অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি। আর হারিস অপর একজন বর্ণনাকারী যয়ীক ব্যক্তি। কিন্তু এই হাদীসটিই হযরত আলী (রা) হইতে অন্য এক সূত্রে বর্ণিত হইয়াছে। সেই সূত্রটি অধিকতর নির্ভরযোগ্য। উহার ভাষা নিম্নরূপঃ

===================================

রাসূলে করীম (স) তাঁহার ভাষণে বলিয়াছেনঃ হে জনগণ। আল্লাহ্ তা’আলা তোমাদের প্রতি হজ্জ ফরয করিয়া দিয়াছেন- যাহারা আল্লাহর ঘর পর্যন্ত যাতায়াতের সামর্থ্য রাখে। যে লোক ইহা সত্ত্বেও হজ্জ্ করিল না, সে ইয়াহুদী বা খৃস্টান কিংবা অগ্নিপূজক যাহা ইচ্ছা হইয়া মরিতে পারে। তবে যদি কেহ রোগ অসুখ কিংবা অত্যাচারী শাসকের বাধা প্রভৃতি কোন অসুবিধার সম্মুখীন হইয়া হজ্জ করা হইতে বিরত থাকে, তাহার কথা স্বতন্ত্র। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে লোক হজ্জ করিবে না, তাহার জন্য আমার শাফাআতে কোন অংশ নাই এবং আমার ÕহাওযেÕও তাহার উপস্থিতি হইবে না। (কুরতবী) এই মর্মের হাদীস হযরত উমর, হযরত আবু হুরায়রা, হযরত ইবনে আব্বাস ও হযরত আবু আমামাতা হইতেও বর্ণিত হইয়াছে।-কুরতুবী

কাতাদাহ হাসান হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) বলিয়াছেন।

==========================

আমি সংকল্পবদ্ধ হইয়াছি, বিভিন্ন শহরে ও অঞ্চলে লোক পাঠাইয়া দিব, তাহারা পরীক্ষা করিয়া দেখিবে, কোন লোক ধন-সম্পদের অধিকারী হইয়াও হজ্জ করে নাই, তাহার উপর তাহারা জিযিয়া কর ধার্য করিয়া দিবে, আল্লাহ্‌র বাণীঃ যে লোক কুফরী করিল, আল্লাহ্ নিশ্চয়ই সারা জাহানের কাহারো প্রতি মুখাপেক্ষী নহেন-এর প্রকৃত তাৎপর্য ইহাই।

জিযিয়া কর কেবলমাত্র অসুমলিম নাগরিকদের উপর প্রবর্তন করাই ইসলামের বিধান। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ্জ না করিলে তাহার উপর জিযিয়া কর ধার্য করার অর্থ তাহাকে অমুসলিমের ন্যায় গণ্য করা। ইমাম কুরতুবী লিখিয়াছেন, যে লোক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ্জ না করিয়া মরিয়া যায়, এই আয়ীদ-দুঃখপূর্ণ পরিণতির আগাম বাণী-কেবলমাত্র তাহার জন্যই প্রযুক্ত হইবে।

কিন্তু বায়হাকীর বর্ণনায় হযরত উমরের এই কথাটির শেষাংশে কুরআনের উক্ত আয়াতের উল্লেখ নাই, বরং তদস্থলে এই শব্দ দুইটি রহিয়াছে।

====================

উহারা মুসলমান নয়, উহারা মুসলমান নয়।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলিয়াছেনঃ

=====================

তোমরা ফরয হজ্জ অনতিবিলম্বে সম্পন্ন কর। কেননা পরে কি অবস্থা দেখা দিবে তাহা কেহ জানে না।

অপর একটি বর্ণনায় হযরত উমরের কথাটির ভাষা এইরূপঃ

============================

যে লোক হজ্জ করার ইচ্ছা করিল, সেই কাজে তাহার মোটেই বিলম্ব করা উচিত নয়। কেননা লোক কখনো রোগাক্রান্ত হইতে পারে, কখনো যানবাহনের অসুবিধা দেখা দিতে পারে এবং কখনো কোন বিশেষ প্রয়োজন বাধা হইয়া দাঁড়াতে পারে।

===========================

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, এক ব্যক্তি রাসূলে করীম (স)-এর সম্মুখে দাঁড়াইয়া গেল। বলিল, ইয়া রাসূল! কোন্ জিনিস হজ্জকে ফরয করিয়া দেয়া? বলিলেনঃ সম্বল ও যানবাহন। জিজ্ঞাসা করিলঃ ইয়া রাসূল! হাজীকে কি রকম বেশভূষা গ্রহণ করিতে হয়? বলিলেনঃ চুলে জুবুথবু ও সুগন্ধি পরিহারকারী। এই সময় অপর এক ব্যক্তি দাঁড়াইয়া গেল। বলিলঃ হে আল্লাহ্‌র রাসূল! হজ্জের তৎপরতা কি রকম? বলিলেনঃ উচ্চস্বরে লাব্বাইকা লাব্বাইকা, উচ্চারণ করিতে হয় ও শেষে কুরবানী করিতে হয়।

ব্যাখ্যা হাদীসটিতে রাসূলে করীম (স) এর একটি মসলিসের চিত্র অংকন করা হইয়াছে, সেখানে সাহাবায়ে কিয়াম হজ্জ সম্পর্কে রাসূলে করীম (স)-এর নিকট বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন পেশ করিতেছিলেন এবং রাসূলে করীম (স) তাহার উত্তর দান করিতেছিলেন। এই হাদীসটিতে প্রথমত হজ্জ ফরয হওয়ার প্রাথমিক নিমিত্তের উল্লেখ করা হইয়াছে। রাসূলে করীম (স) স্পষ্ট ভাষায় বলিয়াছেনঃ মক্কা শরীফে যাতায়াতের সম্বল এবং যাতায়াতের জন্য জরুরী যানবাহনের ব্যবস্থা হইলেই হজ্জ ফরয হইয়া যায়। কুরআনের আয়াতেও তাহাই বক্তব্য। অর্থাৎ

==============================

যে লোকই আল্লাহ্‌র ঘর পর্যন্ত পৌঁছিবার সামর্থ্য লাভ করিল, তাহারই হজ্জ করা ফরয হইয়া যায়।

ইহার পরবর্তী অর্থ, সম্বল ও যাতায়াতের যানবাহন যানবাহন ইত্যাদির ব্যবস্থা না হইলে হজ্জ করা ফরয হইয়া যায়।

ইহার পরবর্তী অর্থ, সম্বল ও যাতায়াতের যানবাহন ইত্যাদির ব্যবস্থা না হইলে হজ্জ ফরয হয় না। হজ্জ ফরয হওয়ার জন্য ইহা প্রথম শর্ত। আর এই শর্তে যাতায়াত ভাড়া, সফরকালীন প্রয়োজনীয় খরচ, নির্ভরশীল লোকদের এই সময়কার যাবতীয় খরচ, হজ্জ যাত্রীর নিজের স্বাস্থ্য ও শারীরিক সামর্থ্য ও বল-শক্তি এবং নিজের বাড়ী হইতে বায়তুল্লাহ পর্যন্ত যাতায়াতের যানবাহন ব্যবস্থা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইবনুয যুবায়র, আতা, ইকরামা ও মালিক বলিয়াছেনঃ

==========================

সামর্থ্য বলিতে কেবল স্বাস্থ্যগত সামর্থ্যই হজ্জের জন্য শর্ত। অন্য কিছু নয়।

কিন্তু সাধারণ দৃষ্টিতে এই কথা যুক্তিসঙ্গত মনে হয় না।

ইমাম শাফেয়ী বলিয়াছেনঃ =============শক্তি সামর্থ্য (কুরআনে যাহার শর্ত করা হইয়াছে) দুই ধরনের। একটি হইল, লোকটি নিজের শরীর ও স্বাস্থ্যের দিক দিয়া সামর্থ্যবান হইবে এবং হজ্জে যাতায়াতের আর্থিক সম্পদ থাকিতে হইবে। আর দ্বিতীয়টি হইল, নিজের দৈহিক শক্তিতে অক্ষমতা থাকিলেও সে এমন একজন শক্তি-সামর্থ্যবান লোক সংগ্রহ করিতে পারে যে, তাহার আদেশক্রমে তাহার পক্ষ হইতে হজ্জ করিতে পারে কিংবা পয়সা দিয়া কাহারো দ্বারা হজ্জ করাইতে সমর্থ এই উভয় ব্যক্তিরই যেভাবে সম্ভব হজ্জ করা কর্তব্য।

===========================

হজ্জের সর্বোত্তম পাথেয়

=====================

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে তিনি বলিয়াছেন, ইয়েমেন দেশের লোকেরা হজ্জ করিতে আসিত; কিন্তু সম্বল গ্রহণ করিত না। তাহারা বলিত, আমরা তাওয়াক্কুলকারী লোক। তাহার যখন মদীনায় (মক্কায়) উপস্থিত হইত তখন লোকদের নিকট হইতে ভিক্ষা চাহিয়া বেড়াইত। তখন আল্লাহ্‌ তা’আলা এই আয়াত নাযিল করিয়াছেন। (উহার অর্থ)ঃ তোমরা অবশ্যই  পাথেয় গ্রহণ করিবে। বস্তুত সর্বোত্তম পাথেয় হইল তাক্‌ওয়া। – বুখারী, আবু দাউদ, নাসায়ী

ব্যাখ্যা হজ্জ যাত্রার পাথেয় ও সম্বল অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। ইয়েমেন দেশের লোকেরা পাথেয় না লইয়াই হজ্জ করিতে রওয়ানা হইয়া যাইত। কিন্তু খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদি বাবদ সম্পদের প্রয়োজন হইত। খাওয়া-দাওয়া না করিয়া যেমন কেহ থাকিতে ও বাঁচিতে পারে না, তেমনি সম্পদ ছাড়াও কাহারও খাওয়া-দাওয়া জুটিতে পারে না। তাই ইয়েমেন দেশের লোকেরা হজ্জে আসিয়া লোকদের নিকট খয়রাত চাহিতে বাধ্য হইত। ইহা কিছুমাত্র প্রশংসাযোগ্য কাজ নয়।

হাদীসে বলা হইয়াছেঃ

======= তাহারা যখন মদীনায় উপস্থিত হইত।

ইহাই অধিক সংখ্যক বর্ণনার ভাষা। কিন্তু কাশ্‌মুহাইনীর বর্ণনায় ইহার পরিবর্তে বলা হইয়াছেঃ

====== তাহারা যখন মক্কায় উপস্থিত হইত।

বিশিষ্ট হাদীস ব্যাখ্যাকারগণ এই বর্ণনাটিকেই সঠিক ও যথার্থ বলিয়াছেন। কেননা হজ্জ তো মক্কা শরীফে করিত হয়। মদীনায় যাইতে হয় শুধু রওয়া পাকের যিয়ারতের জন্য, হজ্জের জন্য নয়। আবূ নয়ীমও ইহাই উদ্ধৃত করিয়াছেন।

ইয়েমনবাসীদের এই অবাঞ্ছনীয় আচরণের প্রতিবাদ করা হইলে ও পাথেয় না লইয়া হজ্জে কেন আসিয়াছে জিজ্ঞাসা করা হইলে তাহারা বলিত, আমরা তো আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলকারী। আমাদের আবার পথেয়র প্রয়োজন কি? আল্লাহই তো আমাদের যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ করিবেন। অন্য কথায় কোনরূপ পাথেয় না লইয়া আল্লাহ্‌র উপর তাওয়াক্কুল করিয়া হ্জ্জ যাত্রা ছিল তাহাদের স্বভাব। কিন্তু এই স্বভাব সমর্থনীয় নয়। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ্‌র বাণীঃ অবশ্যই পাথেয় সংগ্রহ করিয়া লইবে, কেননা সর্বোত্তম পাথেয় হইল তাকওয়া নাযিল হইয়াছে।

সম্বল ও পাথেয় লইয়া হজ্জ যাত্রা করা সম্পর্কে ইহা আল্লাহ্ তাআলার সুস্পষ্ট নির্দেশ। কেননা হজ্জ যাত্রীদের নিকট পাথেয় থাকিলে কাহারো নিকট ভিক্ষার হাত দরাজ করার প্রয়োজন দেখা দেয় না। লোকদের নিকট চাহিয়া নির্লজ্জতা ও চরম হীনমন্যতা প্রকাশ করিতে হয় না। হযরত ইবনে আব্বাসের এই বর্ণনাই কিছুটা পরিবর্তিত ভাষায় উদ্ধৃত হইয়াছেঃ

===========================

আল্লাহ তাআলা বলিলেনঃ তোমরা সকলে অবশ্যই পাথেয় সংগ্রহ করিয়া রওয়ানা হইবে। উহার পরিমাণ এমন হইতে হইবে যাহা তোমাদিগকে লোকদের নিকট ভিক্ষা চাওয়া হইতে রক্ষা করিতে পারিবে।

হযরত ইবনে উমর (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, এই লোকেরা যখন ইহরাম বাঁধিত তখন তাহাদের নিকট যথেষ্ট পাথেয় মজুত থাকিত। কিন্তু তাহারা উহা ফেলাইয়া দিত ও অন্য এক ধরনে পাথেয় লইত। তখন আল্লাহ্ তাআলা এই আয়াত নাযিল করিয়া বলিয়া দিলেন যে, তোমরা এইরূপ করিও না এবং সঙ্গে যাবতীয় প্রয়োজনীয় জিনিস লইয়া হজ্জে গমন করিবার নির্দেশ দিলেন।

ইকরামা মুজাহিদ, কাতাদাহ ও ইবেন যায়দ প্রমুখ বলিয়াছেনঃ যে সব লোক কোনরূপ পাথেয় না লইয়াই হজ্জে গমন করিত, এই নির্দেশ তাহাদের প্রতি। তাহাদের অনেকে বলেঃ

=====================

আমরা আল্লাহ্‌র হজ্জ কিভাবে করিব, তিনি তো আমাদিগকে খাওয়াইবেন না?

ফলে তাহারা অন্যান্য হজ্জ যাত্রীদের উপর বোঝা হইয়া পড়িত। এই অবস্থা সৃষ্টি করা হইতে অত্র আয়াতে নিষেধ করা হইয়াছে। এই দৃষ্টিতে কুরআনের আয়াতের শব্দ ===== অর্থঃ লোকদের নিকট ভিক্ষা চাওয়া হইতে নিজেকে রক্ষা করা।

কিন্তু ইহার আরো একটি তাৎপর্য রহিয়াছে। তাহা হইল, বৈষয়িক বিষয়ে বিধান দান প্রসঙ্গেই পরকালের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা কুরআনের স্থায়ী নিয়ম। এখানেও তাহাই করা হইয়াছে। অর্থাৎ হজ্জের সফর পার্থিব ব্যাপার। এই সময়ে পাথেয় সংগ্রহ করার নির্দেশ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরকালীন মহাযাত্রার পাথেয় সংগ্রহ করার আবশ্যকতার দিকে ইঙ্গিত করা হইয়াছে। আর সেই পাথেয় হইল তাক্‌ওয়া। সেই কারণে আয়াতের শেষাংশে বলা হইয়াছেঃ

==========

পরকালীন মহাযাত্রার জন্য সর্বোত্তম পাথেয় হইল আল্লাহকে ভয় করা ও আল্লাহর নাফরমানী না করা।

অর্থাৎ বৈষয়িক সফরের পাথেয়র ব্যবস্থা তো করিতে হইবেই এবং তাহা না লইয়া হজ্জ যাত্রা করিবে না। অনুরূপভাবে পরকালীন মহাযাত্রার জন্যও অবশ্যই পাথেয় করিয়া লইবে। আর এই ক্ষেত্রে সর্বাধিক উত্তম পাথেয় হইল তাকওয়া। হজ্জ যাত্রার পাথেয়র তুলনায় এই যাত্রার পাথেয় অধিক গুরুত্বপূর্ণ। আতা খুরাসানী বলিয়াছেনঃ ======== বলিয়া পরকালীন মহাযাত্রার পাথেয়র কথাই বুঝানো হইয়াছে। জরীর ইবনে আবদুল্লাহ নবী করীম (স)-এর বাণী বর্ণনা করিয়াছেনঃ

===================================

যে লোক এই পৃথবীতে পাথেয় সংগ্রহ করিবে, পরকালে সে উপকৃত হইবে।

এই আয়াত ও হাদীসের মূল বক্তব্য হইল, ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করিলে তাওরয়াক্কুল হইবে না। আল্লাহর উপর যদি তাওয়াক্কুলই করিবে ও সেইজন্য পাথেয় না লইয়া হজ্জে গমন করিবে, তাহা হইলে কোন লোকের সাহায্য পার্থনা করিতে পারিরবে না। পক্ষান্তরে পাথেয় সংগ্রহ না করিয়া তাওয়াক্কুল করা অর্থহীন। পাথেয় সংগ্রহ করার পরই তাওয়াক্কুল করিতে হইবে। ইসলামে এই রূপ তাওয়াক্কুলই কাম্য ও সমর্থনীয়। এইজন্য উট না বাঁধিয়া আল্লাহ্‌র উপর তাওয়াক্কুল করার প্রতিবাদ করিয়া নবী করীম (স) বলিয়াছেনঃ

============== প্রথমে উহাকে বাঁধ, তাহার পর তাওয়াক্কুল কর।

=============

হজ্জ তিন প্রকারের

=======================

হযরত আয়েশা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে নবী করীম (স) ইফবাদ হজ্জ করিয়াছেন।

-বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, মুননাদে আহমদ

ব্যাখ্যা হাদীসটিতে নবী করীম (স)-এর হজ্জ সম্পর্কে বলা হইয়াছে যে, তিনি ইফরাদ হজ্জ করিয়াছেন। এই পর্যায়ে কয়েকটি প্রশ্ন আলোচিতব্য। প্রথম, নবী করীম (স) কয়রার হজ্জ করিয়াছেন? দ্বিতীয়, তিনি যে হজ্জ করিয়াছেন তাহা কোন প্রকারের হজ্জ ছিল এবং তৃতীয় তিনি উমরা করিয়ানে কিনা?

নবী করীম (স) কয় হজ্জ করিয়াছেন-এই বিষয়ে হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ্ বর্ণিত হাদীস উল্লেখ। তিনি বলিয়াছেনঃ

==================================

নবী করীম (স) তিনবার হজ্জ করিয়াছেন। দুইবার হজ্জ করিয়াছেন হিজরতের পূর্বে এবং একবার হজ্জ করিয়াছেন হিজরতের পর। উহার সহিত উমরাও করিয়াছেন।

কাতাদাহ বলিয়াছেন, আমি হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা) কে জিজ্ঞাসা করিলামঃ ==== নবী করীম (স) কয়টি হজ্জ করিয়াছেন?

জবাবে তিনি বলিলেনঃ ======= তিনি একটি মাত্র হজ্জ করিয়াছেন।

সম্ভবত হযরত আনাস (রা) হিজরতের পরে করা হজ্জের কথাই বলিয়াছেন। কেননা নবী করীম (স) একটি হজ্জ করিয়াছেন বলিলে তাহাই বুঝায়।

নবী করীম (স) এর উমরা করা সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস ও হযরত আনাস ইবনে মালিক উভয়ই বলিয়াছেনঃ নবী করীম (স) চারটি উমরা করিয়াছেন। প্রথম হুদায়বিয়ার উমরা। নবী করীম (স) উমরার নিয়্যত করিয়া মক্কা যাত্রা করিয়াছিলেন। মক্কা হইতে নয় মাইল দূরে হুদায়বিয়া নামক স্থানে মক্কার কুয়শরা তাঁহাকে বাঁধা দান করে। ফলে উমরা না করিয়াই তনি প্রত্যাবর্তন করিতে বাধ্য হন। কিন্তু ইহাও তাঁহার করা উমরারূপে গণ্য। উহারই পরবর্তী বৎসর তিনি দ্বিতীয় উমরা করেন। তৃতীয় উমরা করেন সেই বৎসর যথন তিনি হুনাইন যুদ্ধে লব্ধ গনীমতের মাল বন্টন করিয়াছলেন। আর চতুর্থ উমরা বিদায় হজ্জের সময় সম্পন্ন করেন।

উপরে উদ্ধৃত হযরত আয়েশা (রা) বর্ণিত হাদীস অনুযায়ী নবী করীম (স) বিদায় হজ্জ করিয়াছিলেন ইফরাদ হজ্জ। অর্থাৎ কেবলমাত্র হজ্জের নিয়্যত করিয়াই ইহরাম বাঁধিয়াছিলেন।

নবী করীম (স) কি ধরনের হজ্জ করিয়াছিলেন সেই বিষয়ে বিভিন্ন বর্ণনা উদ্ধৃত হ্ইয়াছে। বহু সংখ্যক সাহাবীর বর্ণনায় উহারই উল্লেখ হইয়াছে। বহু সংখ্যক সাহাবীর র্বণনা হইল, তিনি ক্কিরান হজ্জ করিয়াছিলেন। আবার কয়েকজন সাহাবী বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি তামাত্তু হজ্জ করিয়াছিলেন। ইমাম খাত্তাবীর পর্যালোচনায় এই কথা স্পষ্ট হইয়াছে যে, নবী করীম (স) ইফরাদ হজ্জ করিয়াছেন। এই কথাই গ্রহণযোগ্য।

এই আলোচনা হইতে এই কথা স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে যে, হজ্জ তিন প্রকারেরঃ ইফরাদ, তামাত্তু ও ক্কিরান। শুধু হজ্জের নিয়্যত করিয়া ইহরাম বাঁধিলে ইফরাদ হজ্জ হয়। ইহাতে হজ্জের সমস্ত অনুষ্ঠান পালন শেষ করার পর উমরা করিতে হয়। সম্পূর্ণ নূতনভাবে নিয়্যত করিয়া ও ইহরাম বাঁধিয়া। হজ্জের মাসে প্রথমে উমরার নিয়্যত করিয়া হজ্জের নিয়্যতে ইহরাম বাঁধিলে ইহা তামাত্তু হ্জ্জ হইবে। আর ক্কিরান হজ্জ হয় এক সঙ্গে হজ্জ ও উমরার নিয়্যত করিয়া ইহরাম বাঁধিলে।

রাসূলে করীম (স) ইফরাদ হজ্জ করিয়াছিলেন, এই কথার ভিত্তিতে অনেকেই এই মত প্রকাশ করিয়াছেন যে, ইফরাদ হজ্জই অন্য দুইটি হইতে উত্তম। উমাম সওরী বলিয়াছেনঃ

=============================

তুমি ইফরাদ হজ্জ করিলে ভালোম ক্কিরান করিলেও ভালো এবং তামাত্তু করিলেও ভালো।

অর্থাৎ সওরীর মতে সব রকমের হজ্জই ভালো। ভালো হওয়ার ব্যাপারে সব সমান। ইমাম শাফেরী বলিয়াছেনঃ

=====================

আমি প্রথমে ভালো মনে করি ইফরাদ, তাহার পর তামাত্তু এবং সবশেষে ক্কিরান।

হানাফীদের দৃষ্টিতেঃ

===========================

ক্কিরান হজ্জ তামাত্তু ও ইফরাদ হজ্জ হইতে উত্তম এবং তামাত্তু, ইফরাদ হইতে উত্তম।

সাহাবী ও তাবেয়ীনের বহু লোক তামাত্তু হজ্জকে অন্যান্য দুইটির তুলনায় উত্তম মনে করিয়াছেন। কেননা নবী করীম (স) ইহা না করিতে পারার কারণে দুঃখ প্রকাশ করিয়াছেন ও ইহা করার কামনা করিয়াছেন।

ইমাম আবু ইউসুফ বলিয়াছেনঃ

==================================

কিরান ও তামাত্তু সমান মর্যাদাশীল। আর এই দুইটি ইফরাদ হইতে উত্তম।

==============================

নায়েবী হজ্জ

=========================

হযরত আবু রাযীন আল-উকাইলী হইতে বর্ণিত, তিনি নবী করীম (স) এর নিকট উপস্থিত হইয়া বলিলেনঃ হে রাসূলুল্লাহ! আমার পিতা অধিক বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি। তিনি হজ্জ করিতে পারেন না, উমরা করাও তাঁহার সাধ্য নাই এবং বাহিরে গমন ও যানবাহনে আরোহণ করিতেও তিনি সমর্থ নহেন। (এমতাবস্থায় কি করা উচিত) নবী করীম (স) বলিলেনঃ তুমি তোমার পিতার পক্ষ হইতে হজ্জ ও উমরা আদায় কর।

ব্যাখ্যা এই হাদীস হইতে স্পষ্টভাবে জানা যায়, যাহার উপর হজ্জ ফরয, সে যদি এমন বয়োবৃদ্ধ হয় যে, হজ্জ ও উমরা করিবার মত দৈহিক শক্তি-সামর্থ্য তাহার নাই কিংবা ঘরের বাহিরে কিংবা বিদেশে গিয়া চলাফিরা বা যানবাহনে আরোহণ করিবার সামর্থ্যও তাহার নাই, তাহা হইলে অন্য কেহ তাহার পক্ষ হইতে হজ্জ ও উমরা করিতে পারে। করিলে এই হাদীস অনুযায়ী তাহার পক্ষ হইত হজ্জ আদায় হইয়া যায়। [কিন্তু এখানে প্রশ্ন উঠে, কুরআনের যে আয়াতের ভিত্তিতে হজ্জ ফরয হইয়াছে, তাহাতে কি এই ধরনের বয়োবৃদ্ধ ও যাতায়াতে শারীরিক দিক দিয়া অক্ষম ব্যক্তিদের উপর হজ্জ করা ফরয করা হইয়াছে।- তাহাতেই যদি ফরয না হইল তাহা হইলে নায়েবী হজ্জের তাৎপর্য কি।] ইমাম আবু হানীফা (রা) প্রমুখ ফিকাহবিদের মত হইলঃ

যে লোক হজ্জ করে নাই, সে লোকও অন্য কাহারো নায়েব হইয়া তাহার পক্ষ হইতে হজ্জ করিতে পারে, ইহাতে সাধারণ অনুমতি দেওয়া আছে।

কিন্তু জমহুর ফিকাহবিদগণ ইহার বিপরীত মত পোষণ করেন। তাঁহারা বলেন, যে লোক নিজে হজ্জ করে নাই, সে অন্য কাহারো নায়েব হইয়া হজ্জ করিতে পারে না, করিলে তাহা সহীহ হইবে না। তাঁহাদের দলীল হইল একটি হাদীস। হাদীসটি ইবনে আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত ও সহীহ ইবনে খুযায়মা কর্তৃক উদ্ধৃত। তাহাতে বলা হইয়াছেঃ নবী করীম (স) এক ব্যক্তিকে শিবরামার পক্ষ হইতে তালবিয়া পড়িতে দেখিলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেনঃ

=============== তুমি তোমার নিজের হজ্জ আদায় করিয়াছ কি?

সেই লোকটি বলিলঃ না। তখন নবী করীম (স) নির্দেশ দিলেনঃ

===============

তুমি প্রথমে নিজের হজ্জ আদায় কর। তাহার পর শিবরামার জন্য হজ্জ কর।

================

হজ্জ ফরয হওয়ার অন্যতম শর্ত হইল শারীরিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতা। অতএব রোগী ও বয়োবৃদ্ধ, যে নিজে যানবাহনে আরোহণ করিতে পারে না, তাহার উপর হজ্জ ফরয নয়।

প্রথমে উদ্ধৃত হাদীসের শেষভাগে রাসূলের কথাঃ তোমর পিতার পক্ষ হইতে হজ্জ কর ও উমরা কর। উহার ভিত্তিতে কেহ কেহ মত প্রকাশ করিয়াছেন যে, উমরা করা ওয়াজিব। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল বলিয়াছেনঃ

=====================================

উমরা ওয়াজিব-এই কথা প্রমাণের জন্য এই হাদীসটি অপেক্ষা অধিক উত্তম ও অধিক সহীহ্ হাদীস আর একটিও আমার জানা নাই।

===============================

বুরাইদাতা হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, একটি স্ত্রীলোক রাসূলে করীম (স) -এর নিকট আসিল ও বলিলঃ আমার মা মরিয়া গিয়াছে; কিন্তু হজ্জ করিতে পারে নাই। এখন আমি কি তাহার পক্ষ হইতে হজ্জ করিব। নবী করীম (স) বলিলেনঃ হ্যাঁ তুমি হাজার পক্ষ হইতে হজ্জ কর। – তিরমিযী মুসলিম, হাকেম

ব্যাখ্যা এই হাদীস হইতে স্পষ্ট বুঝা যায়, হজ্জ না করিয়া মরিয়া গেলে তাহার পক্ষ হইতে অন্য কেহ তাহার হজ্জ করিতে পারে।

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখিয়াছেনঃ

========================

যাহার উপর হজ্জ ফরয সে যদি কোন কারণে অক্ষম ও পঙ্গু হয়, তবে তাহার পক্ষ হইতে অন্য কাহারো হজ্জ করা জায়েয, ইহার দলীয় এই হাদীসে রহিয়াছে।

ইমাম আবু হানীফা, তাঁহার সঙ্গীদ্বয় সওরী ইমাম শাফেরী, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল ও ইসহাক রাহওয়াই এই মত প্রকাশ করিয়াছেন।

ইমাম মালিক, লাইস, হাসান ইবনে সালিহ বলিয়াছেনঃ

=============================

কেহ অন্য কাহারো পক্ষ হইতে তাহার হজ্জ করিতে পারে না। তবে যে লোক হজ্জ না করিয়া মরিয়া গিয়াছে, তাহার পক্ষ হইতে অন্য কেহ তাহার হজ্জ করিতে পারে।

ইবনে আবূ শায়বার হাদীসগ্রন্থে উদ্ধৃত হ্ইয়াছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) বর্ণনা করিয়াছেনঃ

=================

কেহ কাহারো পক্ষ হইতে হজ্জ করিবে না। কেহ অন্য কাহারো পক্ষ হইতে রোযা রাখিবে না।

ইবরাহীম নখয়ী এই মত সমর্থন করিয়াছেন।

তবে ইমাম শাফেয়ী ও জমহুর ফিকাহবিদ বলিয়াছেনঃ

========================

মৃত ব্যক্তির পক্ষ হইতে অন্য কাহারো হজ্জ করা তাহা মৃত ব্যক্তির ফরয হজ্জ হউক, কি মানতী হজ্জ-সম্পূর্ণ জায়েয। সেইজন্য সে অসিয়ত করিয়া গিয়া থাকুক, কি নাই করুক।

হিদায়া ফিকাহ গ্রন্থে বলা হইয়াছে, এই ব্যাপারে মূলনীতি হইল, মানুষের জন্য এই সুযোগ আছে যে, সে তাহার আমলের সওয়াব অন্য কাহারো জন্য উৎসর্গ করিয়া দিবে-তাহা নামায, দান-সাদকা, রোযা ইত্যাদি যাহাই হউক না কেন। আহলি সুন্নাত ল জামাআতের ইহাই মত।

হজ্জ ও উমরার প্রস্তুতি

=========================

হযরত যায়দ ইবনে সাবিত (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি দেখিতে পাইলেন যে, নবী করীম (স) সেলাইযুক্ত পোশাক ছাড়িয়া দিয়া সেলাইবিহীন চাদর পরিধান করিয়া ইহরাম বাঁধিবার জন্য প্রস্তুত হইলেন এবং গোসল করিলেন।

ব্যাখ্যা এই হাদীস হইতে জানা যায়, হজ্জ বা উমরার জন্য প্রস্তুতি হিসাবে সর্বপ্রথম সেলাই করা জামা-কাপড় পরিহার করিতে হইবে এবং গোসল করিয়া ইহরাম বাঁধিতে হইবে আর রওয়ানা হওয়ার নিয়্যত করিতে হইবে।

ইহরাম বাঁধিবার পূর্বে গোসল করা মুস্তাহাব। ইহাই অধিকাংশ ফিকাহবিদের মত। ইহরামকারী পুরুষ হউক কি স্ত্রী লোক, হায়েযসম্পন্ন মহিলা হউক, কি নিফাসসম্পন্না-ইহারা সকলে ইহরামের নিয়্যতের গোসল করিবে। এই সময় গোসলের বিধান করার উদ্দেশ্য হইল পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা লাভ। কেননা মহান আল্লাহর পবিত্রতম স্থানে যাইতে হইবে। এই সময় মনের সঙ্গে সঙ্গে দেহেরও সর্বোত্তমভাবে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হওয়া একান্তই আবশ্যক। নাসের ফকীহ এই গোসলকে ওয়াজিব বলিয়াছেন। ইহা তাঁহার একারমত। অন্যান্য সকলের মতে ইহা সুন্নাতে মুয়াক্কিদা। ইহা তরক করা-গোসল না করিয়া ইহরাম বাঁধা-মাকরূহঠ ইমাম শাফেয়ী এই বিষয়ে সুষ্পষ্ট মত প্রকাশ করিয়াছেন। তবে ইবনুল মুনযির লিখিয়াছেন, শরীয়ত-অভিজ্ঞ সমস্ত লোক এই মত দিয়াছেন যে, গোসল না করিয়াও ইহরাম বাঁধা জায়েয। ইহরামের জন্য গোসল করা যে ওয়াজিব নয়, ইহা সর্বসম্মত। তবে ইমাম হাসান বসরী বলিয়াছেন, যদি কেহ ভুলবতশ সোগল না করিয়া থাকে, তবে যখন স্মরণ হইবে, তখন গোসল করিয়া লইবে।

ইহরাম বাঁধিয়া কি ধরনের পোশাক পড়িতে হইবে, এই পর্যায়ে বহু হাদীস বর্ণিত হইয়াছে। হযরত ইবনে উমর (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছেঃ

==========================

রাসুলে করীম (স) কে জিজ্ঞাসা করা হইল, ইহরামকারী কি পোশাক পড়িবে? জবাবে তিনি বলিলেনঃ ইহরামকারী সেলাই করা জামা কোর্তা পরিবে না, পাগড়ী বাঁধিবে না, মাথায় টুপি বা মাথা বন্ধ থাকে- এমন কোন চাদর ইত্যাদি পরিবে না। এমন কোন কাপড়ও পরিবে না, যাহাতে জাফরান ইত্যাদির রঙ লাগা আছে। পায়ে মোজা পড়িবে না। তবে যদি কাহারো জুতা না থাকে, তাহা হইলে মোজা পরিতে পারে। সেই মোজা কাটিয়া পায়ের গিড়ার নীচে পড়ে- এমন বানাইয়া লইতে হইবে।

ইহরামকারী কি পোশাক পরিবে এই প্রশ্নের জবাবে নবী করীম (স) কতগুলি পোশাকের নাম করিয়া বলিয়াছেন যে, এইগুলি পরিবে না। ইহার অর্থ এইগুলি ছাড়া অন্যান্য সবই পরা যাইতে পারে। এই নেতিবাচক জওয়াব খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। অরস ও জাফরান প্রভৃতি রঙ লাগানো কাপড় করিতে নবী করীম (স) নিষেধ করিয়াছেন। সেই রঙে সুগন্ধি থাকিলে তাহা ধুইয়া ও রঙ দূর করিয়া পরিতে পারা যায়।

======================================

 হযরত আয়েশা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, আমি রাসূলে করীমের ইহরামের জন্য ইহরাম বাঁধিবার পূর্বে এবং আল্লাহর ঘরের তওয়াফ করার পূর্বে ইহরাম খুলিবার সময় তাঁহাকে এমন সুগন্ধি লাগাইয়া দিতাম, যাহাতে মিশক নামক সুগন্ধি থাকিত। পরে আমি রাসূলে করীম (স)-এর সিথিতে সুগন্ধির সাদাটে রঙ তাকাইয়া দেখিতে পাইতাম। এই সময়ও তিনি ইহরাম বাঁধা অবস্থায় হইতেন।     -বুখারী, মুসলিম

ব্যাখ্যা উপরোদ্ধৃত হাদীসিটতে বুখারীর দুইটি স্বতন্ত্র বর্ণনাকে একত্রিত করিয়া দেওয়া হইয়াছে। দুইটি বর্ণনাই হযরত আয়েশা (রা) হইতে বর্ণিত। হযরত আয়েশা ইহার প্রথম অংশ বর্ণনা করিয়াছেন কাশেম এবং শেষ অংশ বর্ণনা করিয়াছেন আস্ওয়াদ। এই দুইজন তাবেয়ী বর্ণনাকারীই হযরত আয়েশার ছাত্র। এই হাদীসটি হইতে বুখারী ওমুসলিম ছাড়া নাসায়ী ও তাহাভী গ্রন্থদ্বয়েও উদ্ধৃত হইয়াছে। এই হাদীসটি হইতে স্পষ্ট জানা যায় যে, নবী করীম (স) ইহরাম বাঁধার পূর্বে সুগন্ধি ব্যবহার করিতেন। ইহরাম থাকা অবস্থায় এই সুগন্ধির সাদাটে চাকচিক্য স্পষ্ট দেখা যাইত। অতএব ইহরাম বাঁধার ইচ্ছা মুহুর্তে সুগন্ধির ব্যবহার করা মুস্থাহাব এবং ইহরাম, অবস্থায় উহার সুগন্ধি  থাকা ও জায়েয। ইমাম আবু হানীফা, আবু ইউসুফ ও যুফর এই হাদীসের ভিত্তিতে বলিয়াছেনঃ ইহরাম বাঁধার পূর্বে বৈধ যে কোন প্রকার সুগন্ধি ব্যবহার করা যাইতে পারে। ইহার পর ইহরাম অবস্থায় উহার চিহ্ন ও গন্ধ বর্তমান থাকিলেও কোন ক্ষতি বা অসুবিধা নাই। তাহাতে কোন গুনাহ হইবে না। পুরুষ ও মেয়ে সকলের জন্য এই কথা। ইমাম শাফেয়ী, আহমদ, সওরী ও আওযায়ীও এই মত প্রকাশ করিয়াছেন।

কিন্তু আতা, যুহরী সাঈদ ইবনে যুবায়র, ইবনে সীরীন ও হাসান বসরী বলিয়াছেন, ইহরাম বাঁধার পূর্বে এমন সুগন্ধি ব্যবহার করা জায়েয নয়, যাহার গন্ধ ইহরাম অবস্থাও বর্তমান থাকিবে। ইহরাম বাঁধার পর সুগন্ধি লাগানো হারাম- যতক্ষণ না আল্লাহ্‌র ঘরের তওয়াফ শেষ করিবে। মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান, তাহাভী প্রমুখ এই মত সমর্থন করিয়াছেন। এই মতের দলীল হিসাবে ইয়ালা ইবনে উমাইয়া বর্ণিত একটি হাদীস পেশ করা হইয়াছে। হাদীসটি এইঃ ইয়ালা বলেনঃ আমরা রাসূলে করীমের সামনে উপস্থিত ছিলাম। এই সময় একটি লোক উপস্থিত হইল। তাহার পরনে একটি জুব্বা ছিল এবং উহাতে খালুক নামক সুগন্ধির চিহ্ন ছিল। সেই ব্যক্তি বলিলঃ

=================================

হে রাসূল, আমি উমরা করিতে যাইতেছি। এই কাজ আমি কিভাবে করিব, তাহা আমাকে বলিয়া দিনঃ

রাসূলে করীম (স) বলিলেনঃ

=====================

তুমি তোমার পরিধানের এই জুব্বাটি খুলিয়া ফেল এবং তোমার হইতে খালুকের চিহ্ন ধুইয়া ফেল। অতঃপর তোমার উমরায় তা-ই কর, যাঁহা তোমরা হজ্জ পালনে করিয়া থাকে।

– বুখারী, মুসীলম, মুসনাদে আহমদ

এই নির্দেশ হইতে স্পষ্ট জানা যায় যে, ইহরাম অবস্থায় পোষাকে বা দেঞহ কোনরূপ সুগন্ধির চিহ্ন বর্তমান থাকা নিষিদ্ধ। কিন্তু ইহা হইতে শরীয়াতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়া ইহরামের প্রাক্কালে সুগন্ধি লাগানো জায়েয মনে করা হাদীস বিচারের নিয়মে যুক্তিযুক্ত নয়। কেননা লোকটির জুব্বায় খালুক লাগানো ছিল, শরীরে শরীরে নয়। আর খালুক যেহেতু জাফরান ধরনের রঙ, আর জাফরান ব্যবহার পুরুষের জন্য সব সময়ই নিষিদ্ধ। দ্বিতীয়ত, এই ঘটনা ঘটিয়াছিল জেয়ের রেনা নামক স্থানে, অষ্টম হিজরী সনে মক্কা বিজয়ের পর। আর হযরত আয়েশা বর্ণিত উপরিউক্ত হাদীসে সুগন্ধি লাগানোর কথা বলা হইয়াছে দশম হিজরী সনে রাসূলে করীমের বিদায় হজ্জ উপলক্ষে ইহরাম বাধার সময়। ইহা উক্ত ঘটনার অনেক পরের ব্যাপার। ইহাই রাসূলে করীম (স)-এর শেষ হজ্জ যাত্রা ও শেষ ইহরাম বাঁধা। কেননা নবী করীম (স) হিজরতের পর এই বিদায় হজ্জ ছাড়া অন্য কোন হজ্জ করেন নাই, ইহা সর্বসম্মত।

তৃতীয়ত লোকটি হয়ত ইহরাম বাঁধার পর সুগন্ধি ব্যবহার করিয়াছিল। এই কারণে উহার চিহ্ন ধুইয়া ফেলিবার নির্দেশ দেওয়া হইয়াছিল। তবে কেহ কেহ হযরত আয়েশা (রা) বর্ণিত হাদীসটির ব্যাখ্যা দিয়াছেন এই বলিয়া যে, নবী করীম (স) সুগন্ধি ব্যবহার করার পর গোসল করিয়াছেন। তাহাতে উক্ত সুগন্ধি ইহরাম বাঁধার পূর্বেই নিঃশেষ হইয়া গিয়াছিল। ইমাম তাহাভী ও কাযী ইয়ায প্রমুখ এই ব্যাখ্যার আলোকে ইহরাম বাঁধার প্রাক্কালে সুগন্ধি ব্যবহার করা মাকরুহ মনে করিয়াছেন।

======================

তালবিয়া পাঠ

======================

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেনঃ নবী করীম (স) এই ভাষায় তালবিয়া পড়িতেন। (উহার তরজমা) উপস্থিত হইয়াছি তোমার সমীপে, হে আমাদের আল্লাহ্ উপস্থিত হইয়াছি। তোমার আহ্বানে সাড়া দিতেছি, কেহই তোমার শরীক নাই। আমরা তোমার আহবানক্রমে হাজির হইয়াছি। নিঃসন্দেহে সমস্ত তারীফ-প্রশংসা ও নিয়মাত তোমারই, তোমার জন্যই। আর সব মালিকানা ও শাসন ক্ষমতা তোমাতেই নিবন্ধ। কেহই কোমার শরীফ নাই।

-তিরমিযী

ব্যাখ্যা হজ্জ্বের বা উমরার ইহরাম বাঁধিয়া কাবা শরীফের দিকে রওয়ানা হইতেই উচ্চস্বরে কতগুলি কালিয়া পাঠ করিতে হয়। ইসলামী পরিভাষায় উহাকে তালবিয়া পাঠ বলা হয়। হযরত

===============================

আবদুল্লাহ ইবনে উমরের বর্ণনা মতে নবী করীম (স) এই সময়  যে তালাবিয়া পাঠ করিতেন, তাহার ভাষায় এইঃ

এই কালিমার প্রথম বারবার ব্যবহৃত শব্দ হইতেছে ==লারাইকা। ‌লারবাইকা শব্দটি ====তালবিয়াতুন হইতে গৃহীত।

ইহার অন্য অর্থঃ

===========================

আমি উপস্থিত হইয়াছি হে আল্লাহ্‌! তোমারই সমীপে যথাযথভাবে একবারের পর আর একবার, বারবার।

==== অর্থ কোন স্থানে দণ্ডায়মান হওয়া।

ইহার অন্য অর্থঃ

===========================

হে আল্লাহ্‌! আমি তোমার আনুগত্য ও হুকুম পালনের কাজে একবারের পর আর একবার-বারবার প্রস্তুত হইতেছি, দাঁড়াইয়াছি।

অন্য এক মতে ইহার অর্থঃ

========================

হে আল্লাহ্‌! আমি তোমার আহবানে সাড়া দিয়াছি একবারের পর আর একবার, বারবার। অপর এক মতে এই কালিমার অর্থঃ

=========

আমার সমস্ত সত্তা ও সমস্ত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তোমার দিকেই নিবদ্ধ হে আল্লাহ্‌।

এইরূপ কালিমা বলার কারণ হইল, ইহরাম বাঁধিয়া যখন একজন লোক কা’বা শরীপের দিকে রওয়ানা হয়, তখন সে কার্যত আল্লাহ তাআলার আহবানে সাড়া দেয়, তাঁহার ডাকে সাড়া দিয়া আল্লাহ্‌র নিকট উপস্থিত হয়। কেননা আল্লাহ্‌ তাআলা তাহাকে তাহার ঘরের হজ্জ (বা উমরা) করার জন্য আহ্বান জানাইয়াছেন। সে এই আহবান কবুল করিয়া তাহার ঘরে উপস্থিত হইয়াছেঃ

=======================

আল্লাহ্‌র নির্দেশক্রমে হযরত ইবরাহীম (আ) জনগণকে আল্লাহর ঘরের হজ্জ করার জন্য যে আহবান জানাইয়াছিলেন, নেই আহবানেরই সাড়া দেওয়া হইতেছে তালবিরয়া পড়িয়া। তালবিয়ার ইহাই অর্থ।

বস্তুত হযরত ইবরাহীম (আ) যখন আল্লাহর ঘরের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করিয়াছিলেন, তখন তাঁহাকে এই ঘরের হজ্জ করার জন্য জনতাকে আহবান জানাইবার নির্দেশ দেওয়া হইয়াছিল। তখন তিনি বলিয়াছিলেনঃ ===========

হে আল্লাহ্‌! আমার কণ্ঠস্বর তো লোকদের পর্যন্ত পৌঁছিবে না। তখন আল্লাহ্‌ তাআলা বলিলেনঃ ===============

তুমি লোকদিগকে ডাকা তো দাও। লোকদের পর্যন্ত সে ডাক পৌঁছাইয়া দেওয়ার দায়িত্ব আমার।

তখন হযরত ইবরাহীম (আ) ঘোষণা দিলেনঃ

=====================

হে জনগণ। আল্লাহ্‌র এই মহা পবিত্র ও প্রাচীনতম ঘরের হজ্জ করা তোমাদের জন্য কর্তব্য করিয়া দেওয়া হইয়াছে।

এই আহ্বান আকাশ ও পৃথিবীর সর্বত্র প্রতিধ্বনিত ও বিস্তৃত হইয়া পড়িল। অতঃপর যুগে যুগে পৃথিবীর প্রতিটি কোণে এই আহবানের সাড়া ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হইয়াছে। এখন পর্যন্ত পৃথিবীর দূরতম কোণ হইতে মানুষ এই তালবিয়া পড়িয়া আল্লাহ্‌র ঘরের দিকে রওয়ানা হইতেছে, তাহা কি তোমরা দেখিতে পাইতেছ না? এই সময় হইতে কিয়ামত পর্যন্ত যে লোকই হজ্জ যাত্রা করিবে, সে-ই যাত্রারম্ভ হইতে হযরত ইবরাহীমের আহবানে সাড়া দিতে শুরু করিবে এই তালবিয়া পড়িয়া।

তালবিয়া শব্দগুলি কত প্রেরণাদায়ক, উদ্দীপনাপূর্ণ ও ঈমানের তেজবীর্য প্রকাশক, তাহা ইহার প্রত্যেকটি শব্দ লইয়া চিন্তা বিবেচনা করিলেই স্পষ্ট হইয়া উঠে এবং আল্লাহর ঘরের দিকে ইহরাম বাঁধিয়া রওয়ানা দেওয়ার কালে যে এই শব্দগুলি বলা যাইতে পারে- ইহা হইতে উত্তম কথা যে আর হইতে পারে না, তাহা অন্তর দিয়া বুঝিতে পারা যায়।

====================

নিশ্চয়ই সমস্ত প্রশংসা এবং সমস্ত নিয়ামত হে আল্লাহ্‌! কেবল তোমারই জন্য।

আর সব মালিকানা, কর্তৃত্ব ও প্রভুত্ব সার্বভৌমত্বও তুমি ছাড়া আর কেহরই নয়। সর্বাবস্থায় প্রশংসা কেবল আল্লাহ্‌রই হইতে পারে, আল্লাহ্‌রই প্রশংসা করা যাইতে পারে। সর্বপ্রকার প্রশংসা সর্বাবস্থায়  পাওয়ার অধিকার কেবলমাত্র তাঁহারই থাকিতে পারে। এই অধিকারের নিয়ামত দান ও বিতরণের অধিকারে হে আল্লাহ্‌ তোমার কেহই শরীক নাই। প্রভূত্ব ও সার্বভৌমত্ব সারেজাহানের উপর কেবলমাত্র তোমারই বিরাজ করিতেছে, বিরাজ করিতে থাকিবে।

বস্তুতঃ আল্লাহ্‌র ঘরের পাদদেশে উপস্থিত হওয়ার উদ্দেশ্যে দীনহীন বেশে যে লোক রওয়ানা হইয়াছে, যে লোক পিছনের সব বৈষায়িক আকর্ষণ পরিহার করিয়া সবকিছু একমাত্র আল্লাহ্‌রই জন্য উৎসর্গ করিয়া আল্লাহর সন্নিকটে সমুপস্থিত হওয়ার জন্য যাত্রা করিয়াছে, তাহার কণ্ঠে এই ধরনের শব্দটি ধ্বনিতে প্রতিধ্বনিত হইতে পারে। ইহাপেক্ষা এই সময়ের জন্য অধিক উপযুক্ত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ শব্দ ও কথা আর কিছুই হইতে পারে না।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়িতে পড়িতে রওয়ানা হইয়া যাইতেন। তিনি বলিতেনঃ

==============

রাসুলে করীম (স)-এর তালবিয়া ইহাই। এই তালবিয়া পড়িতে পড়িতেই তিনি হজ্জ যাত্রা করিতেন।

সেই সঙ্গে তিনি নিজের তরফ হইতে কয়েকটি শব্দ অতিরিক্ত পড়িতেন। তাহা এইঃ

হাযির হইয়াছি হে আল্লাহ। উপস্থিত হইয়াছি তোমার সমীপে। তোমারই ইবাদত ও বন্দেগীতে অধিক শক্তি অর্জনের জন্য, উহার সহিত সামঞ্জস্য বিধানের জন্য। হে আল্লাহ্। সমস্ত কল্যাণ কেবলমাত্র তোমারই হস্তে নিবদ্ধ। সবই তোমার অনুগ্রহের দানমাত্র। সমস্ত লক্ষ্য-মনের ঝোঁক-প্রবণতা, আগ্রহ ও উৎসাহ কেবলমাত্র তোমার দিকেই নিবদ্ধ। তোমারই হস্তে সমস্ত কল্যাণ নিহিত, আমার কামনা ও প্রার্থনা কেবলমাত্র তোমারই নিকট। অন্য কোন দিকে নয়, অন্য কাহারো কাছে নয়। এমনিভাবে সমস্ত আমল তাঁহারই জন্য উৎসর্গীকৃত।

অর্থাৎ ইবাদত-বন্দেগীর যে আমলই আমি করি, তাহা তোমারই জন্য করি, তোমারই সন্তোষ বিধানের জন্য করি। অথবা আমার যাহা কিছু আমল ইবাদত বন্দেগী তাহা সবই কেবলমাত্র তোমারই অনুগ্রহে, তোমারই দেওয়া সুযোগ সুবিধার কারণে। তুমি তওফীক না দিলে আমার দ্বারা কিছু হওয়া সম্ভবপর হইত না।

ইমাম তিরমিযী লিখিয়াছেনঃ ইহা একটি সমীহ হাদীস এবং এই পর্যায়ে হযরত ইবনে মাসউদ, হযরত জাবির, হযরত ইবনে আব্বাস, হযরত আবূ হুরায়রা ও হযরত আয়েশা (রা) হইতেও বর্ণিত হইয়াছে। এই হাদীস কয়টি যথাক্রমে ইমাম নাসায়ী, ইমমি আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ্ এবং ইমাম আহমদ ও ইমাম বুখারী নিজ নিজ গ্রন্থে উদ্ধৃত করিয়াছেন। সাহাবায়ে কিরাম এইরূপই আমল করিয়াছেন। ইমাম শাফেয়ী বলিয়াছেনঃ আল্লাহর অধিক তাজিম প্রকাশের উদ্দেশ্যে যদি কেহ রাসূলের তালবিয়ার বাক্যগুলি হইতেও অধিক ও অতিরিক্ত কিছু শব্দ বলে তবে তাহাতে কোন দোষ নাই। তবে রাসূলে করীম (স)-এর মূল তালবিয়াকে যথেষ্ট মনে করাই বাঞ্ছনীয়। এই সঙ্গে এই কথাও সত্য যে, হযরত ইবনে উমর নিজ হইতে অতিরিক্ত করিয়া বলিতেন বলিয়া যাহা বলা হইয়াছে, আমলে তাহাও তাহার স্বকপোলকল্পিত নয়; বরং তাহাও নবী করীম (স) হইতেই শুনিতে পাওয়া। তিনি নিজেই বলিয়াছেনঃ এই তালবিয়া আমি স্বয়ং নবী করীম (স) হইতেই মুখস্ত করিয়া রাখিয়াছি।

============================

 

উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়া

================================

হযরত সায়েব (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেনঃ হযরত রাসূলে করীম (স) বলিয়াছেনঃ হযরত জিবরাঈল (আ) আমার নিকট আসিলেন এবং আমাকে আদেশ করিলেন, আমি যেন আমার সঙ্গী-সাথিগণকে খুব উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়িতে আদেশ করি।

– তিরমিযী, আবূ দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ, মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হাকেম বায়হাকী

ব্যাখ্যা এখানে যে হাদীসটি উদ্ধৃত হইয়াছে উহা তিরমিযী শরীফের ভাষা। ইহা হইতে জানা যায়, তালবিয়া উচ্চসরে পড়ার জন্য নবী করীম (স) তাঁহার সাহাবিগণকে আদেশ করিয়াছেন। কেননা হযরত জিবরাঈলই তাঁহাকে এই রূপ নির্দেশ দেওয়ার জন্য হুকুম দিয়াছেন। অতএব তালবিযা উচ্চস্বরে পড়া কর্তব্য। কিন্তু কর্তব্য বলিতে কি বুঝায়? ইহাতে মতভেদ রহিয়াছে। বাহ্যত মনে হয়, ইহা ওয়াজিব। কিন্তু বেশী সংখ্যক ফিকাহবিদের মতে ইহা মুস্তাহাব। হযরত আনাস (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেনঃ

==================

নবী করীম (স) মদীনায় জুহরের নামায চার রাকআত পড়িয়া (রওয়ানা হইলেন ও) যিল্ হুলাইফা পৌঁছিয়া দুই রাকআত আসরের (কসর) নামায পড়িলেন। আর আমি তাঁহাদের সকলকে উচ্চস্বরে তালাবিয়া পড়িতে শুনিলাম। -বুখারী

এই হাদীসটির প্রথমাংশ হইতে সফরে কসর নামায পড়ার কথা জানা যায়। আর শেষাংশ হইতে মক্কাগামী কাফেলার লোকদের সকলকেই উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়িতে শোনার কথা বলা হইয়াছে। ইহাই এখানকার আলোচ্য হাদীসের ভাষাঃ

==========

হজ্জ ও উমরা উভয়ের জন্য উচ্চস্বরে তাঁহারা তালবিয়া পড়িতেছিলেন।

যায়দ ইবনে খালেক বর্ণিত হাদীসের ভাষা হইলঃ

=======================

হে মুহাম্মাদঁ আপনি আপনার সঙ্গী-সাথীগণকে উচ্চস্বরে তালবিযা পড়ার জন্য আদেশ করুন। কেননা ইহা হজ্জের অন্যতম নিদর্শন।- ইবনে মাজাহ্‌

হযরত আবু হুরাযরা বর্ণিত হাদীসের শেষ কথাটিও এইঃ উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়া হজ্জের নিদর্শন বিশেষ।

আল-মুত্তালিব ইবনে আবদুল্লাহ্‌ বলিয়াছেনঃ

=============================

রাসূলে করীম (স)-এর সাহাবিগণ এমন উচ্চস্বরে তালবিয়া করিতেছিলেন যে, তাঁহাদের কণ্ঠস্বর ক্ষীর্ণ হইয়া আসিতেছিল।

আবু যুবায়র বলিয়াছেনঃ

==========================

তিনটি ধ্বনি লইয়া আল্লাহ্ তাআলা ফেরেশতাদের সম্মুখে গৌরব প্রকাশ করেন। সেই তিনটি হইলঃ আযান, আল্লাহর পথে তকবীর ধ্বনি এবং তালবয়ার উচ্চ কণ্ঠস্বর।

======================

যে লোকই তালবিয়া পড়ে, তাহার সঙ্গে সঙ্গে ডান ও বামের সব গাছপালা ও পাথরও তালবিয়া পড়িতে থাকে। এমনকি, এখান হইতে সেখানে-পূর্বদিক হইতে পশ্চিম দিকে-চলিয়া যায় অর্থাৎ সমস্ত সৃষ্টিলোক তাহার সহিত মিলিয়া তালবিয়া পড়িতে থাকে।

– তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, হাকেম

এই হাদীস দুইটি হইতে উচ্চস্বরে তালবিযা করার বরকত ও মাহাত্ম্য জানিতে পারা যায়। যাহেরী মাযহাবপন্থীদের মতে উচ্চস্বরে তালবিয়া করা ওয়াজিব। আর অন্ততঃ একবার হইলেও উচব্চস্বরে বলা ফরয। শুরুতে উদ্ধৃত হযরত সাহেব বর্ণিত হাদীসই তাঁহাদের দলীল। কেননা ইহাতে হযরত জিবরাঈলের তরফ হইতে পাওয়া নির্দেশের উল্লেখ হইয়াছে। আর === বা নির্দেশ যে ওয়াজিব প্রমাণিত হয়, তাহা সর্বজনমান্য।

বস্তুত তালবিয়া বলা শরীয়াতসম্মত, এই বিষয়ে পূর্ণ ইজমা রহিয়াছে। তবে ইহাতে কয়েকটি মতের উল্লেখ হইয়াছে। একটি মত হইল, উহা সুন্নাত। ইমাম শাফেয়ী ও হাসান ইবনে হাই এই মত দিয়াছেন। দ্বিতীয় মত, ইহা ওয়াজিব। ইহা তরফ হইয়া গেলে সেইজন্য কাফ্‌ফরা দিতে হইবে জন্তু যবাই করিয়া। ইমাম মালিক ও তাঁহার অনুসারীরা এইমত পোষণ করেন। তাঁহাদের যুক্তি হইল, তালবিয়া হজ্জ অনুষ্ঠানেরই একটা অংশ। আর যে লোক হজ্জের, লোক অনুষ্ঠান তরফ করিবে, তাহাকে অবশ্যই জন্তু জবাই করিয়া কাফফারা দিতে হইবে, ইহা সর্ববাদীসম্মত। তৃতীয় মত হইল, তালবিয়া ইহরামের শর্তের মধ্যে গণ্য। এই তালবিয়া না করিলে ইহরামই সহীহ হইবে না। সওরী ও আবূ হানীফা (র) এই মত প্রকাশ করিয়াছেন। ইমাম আবু হানীফা বলিয়াছেনঃ

=====================

তালবিয়া আল্লাহ্‌র যিকর ও কুরবানীর জন্তু যবাই ক্ষেত্রে পাঠানো ব্যতীত একজন লোক ইহ্‌রামকারীই হইতে পারে না।

ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম- মুহাম্মাদ বলিয়াছেনঃ ইহরামের তালবিয়া নামাযের তাকবীর সমতুল্য। কেননা হযরত ইবনে আব্বাস বলিয়াছেনঃ

==========================

হজ্জের মাসসমূহে যে লোকই হজ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইবে, সে-ই তালবিয়া বলিবে।

আতা, ইকরামা ও তাউস বলিয়াছেনঃ তালবিয়া বলা ছাড়া হজ্জই হয় না। ইবনুল হুম্মাম বলিয়াছেনঃ উচ্চস্বরে তালবিয়া বলা সুন্নাত। যদি কেহ উচ্চস্বরে না বলে তাহা হইলে সে ভুল করিবে। তবে সেজন্য কিছু কাফফরা নাই। আর উচ্চস্বরে বলিতে গিয়া এমনভাবে যেন চীৎকার করা না হয়, যাহা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর হইতে পারে। ইমাম শাওকানী লিখিয়াছেন, দাউদ যাহেরীর মতে উচ্চস্বরে তালবিযা বলা ওয়াজিব। মহিলাদের জন্য উচ্চস্বরে বলা নিয়ম নয়। বরং নিম্নস্বরে বলাই বাঞ্ছনীয়। =================

আল্লাহ্‌র ঘর দেখিয়া হাত তুলিয়া দোয়া করা

============================

মুহাজির ইবনে ইকরামা হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেনঃ হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) কে জিজ্ঞাসা করা হইলঃ একজন লোক আল্লাহর ঘর দেখিতে পাইয়া তাহার হস্তদ্বয় উপরে উঠাইবে কি? তিনি উত্তরে বলিলেনঃ আমরা তো রাসূলে করীম (স)-এর সঙ্গে হজ্জ করিয়াছি, তখন কি আমরা তাহা করিতা? -তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসায়ী

ব্যাখ্যা ইহরাম বাঁধা অবস্থায় একজন লোক যখন হেরেম শরীফে উপস্থিত হয় তখন সে পথমে আল্লাহর ঘর কাবা শরীফ দেখিতে পায়। এই সময় হাত উপরে তোলা বাঞ্ছনীয় কিনা-এই প্রশ্নই হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা)-কে জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিল। জওয়াবে তিনি বলিলেনঃ আমরা তো রাসূলে করীমের সঙ্গে হজ্জ করিতে গিয়াছি। তখন কি আমরা ইহজা করিতাম? ইহা অস্বীকৃতিসূচক প্রশ্ন অর্থাৎ আমরা তাহা করিতাম না। যদি তাহা করা উচিত হইত, তাহা হইলে রাসূলে করীম (স) আমাদিগকে তাহা অবশ্যই বলিয়া দিতেন। আর তিনি ইহা বলেন নাই, আমরাও তাহা করি নাই। আবূ দাউদে এই বাক্যের ভাষা এইরূপঃ

=========== তখন তিনি তাহা করেন নাই (হাত উপরে উঠান নাই)। আর নাসায়ী শরীফে ইহার ভাষা হইলঃ

============= আমরা তখন ইহা করিতাম না।

এই দুইটি বাক্য স্পষ্ট নেতিবাচক উক্তি। তায়্যিবী বলিয়াছেনঃ ইমাম আবু হানীফা, মালিক ও শাফেয়ী এই মত প্রকাশ করিয়াছেন অর্থাৎ আল্লাহর ঘর দেখিতে পাইয়া হাত উপরে তোলা জায়েয নয়। ইমাম আহমদ ও সুফিয়ান সওরী ইহার বিপরীত মত পোষণ করিতেন।

কিন্তু তায়্যিবীর এই কথা যথার্থ নয়। কেননা ইমামগণ হইতে স্পষ্ট ভাষায় বর্ণিত হইয়াছে, আল্লাহ্‌র ঘর দেখিতে পাইয়া কিংবা যে স্থান হইতে আল্লাহর ঘর দেখিতে পাওয়া যায় সেখানে পৌঁছিয়া থামিয়া দাঁড়াইয়া দুই হাত উপরে তুলিয়া দোয়া করা সুন্নাত।

ইমাম শাফেয়ী ইবনে জুরাইজ হইতে বর্ণনা করিয়াছেনঃ

=======================

নবী করীম (স) যখন আল্লাহ্‌র ঘর দেখিতে পাইতেন, তখন দুই হাত উপরে তুলিয়া দোয়া করিতেন। বলিতেনঃ হে আল্লাহ্‌! এই ঘরের মর্যাদা মাহাত্ম্য, সম্মান ও প্রতাপ বৃদ্ধি কর এবং উহার প্রতি সম্মান, মাহাত্ম্য, বিরাটত্ব ও মর্যাদা প্রকাশস্বরূপ যে লোক উহার হজ্জ করিবে বা উমরা করিবে তাহার সম্মান, মর্যাদা, মাহাত্ম্য ও পূর্ণশীলতা বাড়াইয়া দাও। – মুসনাদে শাফেয়ী

ইমাম শাফেয়ী বলিয়াছেনঃ আল্লাহর ঘর দেখিয়া হাত উপরে তোলায় কোনই দোষ নাই। এই জন্য আমি উহা মাকরূহ মনে করি না, মুস্তাহাবও মনে করি না। ইবনে জুরাইজ বর্ণিত এই হাদীসটির সনদ সম্পর্কে হাফেজ ইবনে হাজার আল-আস্‌কালানী আপত্তি তুলিয়াছেন। বায়হাকী বলিয়াছেন, সনদের দুর্বলতার কারণে আল-আসকালানী এই হাদীসটির প্রতি আস্থা স্থাপন করিতে পারেন নাই। উপরন্তু আল্লাহর ঘর দেখামাত্র হাত তুলিবার ব্যাপারে কোন দলীলই পাওয়া যায় নাই। আর দলীল ছাড়া তো শরীয়াতের হুকুম প্রমাণিত হয় না। তবে আল্লাহর ঘর দেখামাত্র দোয়া করা সহীহ্‌ সনদে বর্ণিত হাদীস হইতে প্রমাণিত। হযরত উমর (রা) আল্লাহর ঘর দেখিয়া দোয়া করিতেন এই বলিয়াঃ

======================

হে আল্লাহ্‌! তুমিই শান্তি দাতা। শান্তি তোমার নিকট হইতে পাওয়া যায়। হে আমাদের আল্লাহ, তুমি আমাদিগকে শান্তিতে জীবিত রাখ। – হাকেম, বায়হাকী

আল্লাহর ঘরের তওয়াফ ও সাফা মারওয়ার দৌঁড়

===============================

হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেনঃ নবী করীম (স) যখন মক্কা শরীফে উপস্থিত হইলেন, তখন মসজিদে হারাম-হেরেম শরীফে প্রবেশ করিলেন। অগ্রসর হইয়া গিয়া হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করিলেন, উহাকে ধরিলেন ও চুম্বন করিলেন। পরে তিনি তাহার ডান দিকে চলিয়া গেলেন ও তিনবার রমল করিলেন ও চারিবার হাঁটিলেন। পরে তিনি মকামে ইবরাহীমে আসিলেন। পড়িলেনঃ তোমরা মকামে ইবরাহীমে মুসাল্লা গ্রহণ কর। অতঃপর দুই রাক্আত নামায পড়িলেন। তখন মকামে ইবরাহীম তাঁহার ও আল্লাহ্‌র ঘরের মাঝখানে অবস্থিত ছিল। দুই রাক্আত নামায পড়ার পর তিনি কালো পাথরের নিকট আসিলেন।

উহাকে স্পর্শ ও চুম্বন করিলেন। পরে তিনি সাফা পর্বতের দিকে বাহির হইয়া গেলেন। আমি মনে করি, এই সময় তিনি পড়িলেনঃ সাফা ও মারওয়ার পর্বতদ্বয় আল্লাহ্‌র নিদর্শনসমূহের মধ্যে গণ্য।

-তিরমিযী, মুসলিম

ব্যাখ্যা হাদীসটি হইতে আল্লাহ্‌র ঘরের তওয়াফ করার রীতি ও নিয়ম জানা যাইতেছে। স্বয়ং নবী করীম (স) কিভাবে তওয়াফ সম্পন্ন করিয়াছেন, ইহাতে তাহারই বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে। আর ইহাই মুসলিম উম্মতের জন্য আদর্শ। আল্লাহর ঘরের নিকটে উপস্থিত হইয়া সর্বপ্রথম আল্লাহ্‌র ঘরের এক কোণে প্রাচীরের সহিত পগ্রথিত হাজরে আসওয়াদ-কালো বর্ণের পাথরখানি খুব তাঞ্জিম ও আন্তরিকতা সহকারে স্পর্শ ও চুম্বন করিতে হয়। নবী করীম (স) তাহাই করিয়াছেন। ইহার পর ডান দিকে যাইয়া তওয়াফ শুধু করিতে হয়। এইভাবে মোট সাতবার প্রদক্ষিণ করিতে হয়। তন্মধ্যে তিনবার রমল করিতে হয় ও চারিবার সাধারণভাবে চলিতে হয়। রমন শব্দের অর্থঃ

========================

খুব দ্রুত চলা ও দুই কাঁধ নাড়ানো।

এই তওয়াফকে পরিভাষায় তওয়াফে কুদুম উপস্থিত হওয়া মাত্র তওয়াফ বলা হয়। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছেঃ নবী করীম (স) তওয়াফ করা কালে এই দোয়া পড়িতেনঃ

============================

হে আল্লাহ্‌! আমি তোমার নিকট আশ্রয় চাহিতেছি সন্দেহ, সংশয়, শিরক, মুনাফিকী, হিংসা, বিভেদ ও খারাপ স্বভাব চরিত্র হইতে।

এই তওয়াফ হজ্জের রুকন এবং ফরয। কুরআন মজীদে বলা হইয়াছেঃ

====================

এবং তাহারা যেন আল্লাহর মহান প্রাচীনতম ঘরের তওয়াফ করে।

তওয়াফ শেষ হইয়া যাওয়ার পর মকামে ইবরাহীমে আসিতে হয়। হাদীসে বলা হইয়াছে, নবী করীম (স) এখানে উপস্থিত হইয়া পড়িলেনঃ

======================

ইহা কুরআন মজীদে সূরা আল-বাকারার ১২৫ আয়াতের অংশ। সম্পূর্ণ আয়াতের অর্থ হইলঃ আমরা ঘরকে যখন জনগণের মিলনকেন্দ্র ও নিরাপত্তাপূর্ণ স্থান বানাইয়া দিলাম, তখন নির্দেশ দিলাম যে, তোমরা ইবরাহীমের দাঁড়াইবার স্থানকে নামাযের জায়গা রূপে গ্রহণ কর।

ইবরাহীমের দাঁড়াইবার স্থান বলিতে সেই পাথরখানা বুঝানো হইয়াছে, যাহার উপর হযরত ইবরাহীম (আ) কা’বা ঘর নির্মাণকালে দাঁড়াইয়াছিলেন। -বুখারী

হযরত আনাস (রা) বলিয়াছেনঃ

====================

আমি পাথরটিতে তাঁহার (হযরত ইবরাহীমের) আংগুলি ও গোড়ালীর চিহ্ন অংকিত দেখিযাছি। উহার তাঁহার দুই পা বসিয়া গিয়াছিল। তবে লোকদের মদনে উহার চিশ্চিহ্ন হইয়া গিয়াছে।

প্রথমে এই পাথরখানা কাবা ঘরের প্রাচীরের সংলগ্ন রক্ষিত ছিল। বর্তমান হযরত উমর কারুক (রা)-ই উহা সরাইয়া রাখেন। তওয়াফের পর উহার উপর দাঁড়াইয়া দুই রাখআত নামায পড়িতে হয়। ইহাকে====== তওয়াফের নামায বলে। রাসূলে করীম (স) -এই নামাযের প্রথম রাকয়াতে ==== ও দ্বিতীয় আকআতে === পড়িয়াছেন। ইহার পর হাজারে আস্‌ওয়াদ-এ আসিতে হয় ও উহাকে স্পর্শ ও চুম্বন করিতে হয়। উহার পর সাফা পর্বত হইতে মারওয়া পর্বত পর্যন্ত সাতবার দৌঁড়ানোর কাজ করিতে হয়। নবী করীম (স) এইখানে আসিয়া কুরআনের আয়াত পাঠ করিয়াছিলেনঃ

==============

এই হাদীসটি হযরত ইবনে উমর (রা) হইতেও বর্ণিত হইয়াছে এবং উহা বুখারী ও মুসলিম উভয় গ্রন্থে উদ্ধৃত হইয়াছে। ইমাম তিরমিযী লিখিয়াছেনঃ এই হাদীসের বর্ণনানুযায়ীই তওয়াফ করা সর্বসম্মত নিয়ম।

হযরত জাবির (রা) বর্ণিত হাদীসে বলা হইয়াছেঃ নবী করীম (স) সাফা পর্বতে উঠিয়া আসিয়া বলিলেনঃ

======================

আল্লাহ্ যেখান হইতে শুরু করিয়াছেন, আমরা সেখান হইতে শুরু করিতেছি।

অপর হাদীসে বলা হইয়াছ, সাফা-মারওয়ার সায়ী (দৌঁড়) সম্পর্কিত আয়াত নাযিল হইলে সাহাবিগণ নবী করীম (স) কে জিজ্ঞাসা করিলেনঃ

==============

আমরা দুইটি পাহাড়ের কোনটি হইতে দৌঁড় শুরু করিব হে রাসূল?

জওয়াবে নবী করীম (স) বলিলেনঃ

==================

আল্লাহ যে পাহাড়ের উল্লেখ প্রথমে করিয়াছেন, সেইটি হইতেই দৌঁড় শুরু কর।

অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা কুরআনের এই আয়াতে প্রথমে সাফা পর্বতের উল্লেখ করিয়াছেন। অতএব দুই পাহাড়ের মাঝে দৌঁড়ানোর কাজ আমরাও শুরু করিব সাফা পর্বত হইতে। কেননা কুরআনে উল্লেখের পরম্পরার বিশেষ গুরুত্ব রহিযাছে শরীয়াতের বিধান রচনায়। অনেক ক্ষেত্রে এই পরম্পরা অনুসরণ করা ওয়াজিব; অনেক ক্ষেত্রে মুস্তাহাব। আয়াতে সাফা ও মারওয়া পর্বতদ্বয়কে আল্লাহ্‌র ==== বলা হইয়াছে। === অর্থ === আল্লাহ্‌র দ্বীনের নিদর্শন। ইহার মূল ==== যে জিনিসই আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভের মাধ্যমে, উহার যাহাই নিদর্শন বা চিহ্ন হইবে-যেমন নামায, দোয়া, কুরবাণী তাহাইঃ

=====================

আল্লাহ্‌ অসংখ্য নিদর্শনের মধ্যে অন্যতম নিদর্শন বিশেষ।

আর হজ্জের নিদর্শন হইল, উহার বাহ্যিক অনুভবযোগ্য অনুষ্ঠানসমূহ। তওয়াফের স্থান, আরাফাতের ময়দান, যবাই করার জায়গা, সবই হজ্জের নিদর্শনাদির অন্তর্ভুক্ত। এখানে ==== বলিতে বুঝানো হইয়াছেঃ

==============

যে অনুষ্ঠানকে আল্লাহ তাআলা তাঁহার ইবাগত ও আনুগত্যের স্বরূপ নির্ধারিত করিয়া দিয়াছেন তাহা।

অন্য কথায় যেসব কাজ স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, ইহা কেবলমাত্র আল্লাহরই জন্য করা হইতেছে, অন্য কাহারো জন্য নয়, তাহাই আল্লাহ্‌র জন্য করা হইতেছে, অন্য কাহারো জন্য নয়, তাহাই আল্লাহর === নিদর্শন।

আর সাফা ও মারওয়া পর্বতদ্বয় ইহার অন্তর্ভুক্ত। কেননা এই দুই পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে দৌঁড়ানো হজ্জের অনুষ্ঠানসমূহের অন্যতম। জমহুর ফিকাহবিদদের মত হইল, এই দৌঁড়ানো হজ্জের রুকন। ইহা না করিলে হজ্জ সম্পূর্ণ হইতে পারে না। ইমাম আবূ হানীফা বলিয়াছেন, ইহা ওয়াজিব। ইহা না করিলে জন্তু যবাই করিয়া কাফফারা দিতে হইবে। আতা বলিয়াছেন, ইহা সুন্নত। ইহা না করিলে কিছুই করিতে হইবে না। হযরত আয়েশা (রা) বলিয়াছেনঃ

===================

রাসূলে করীম (স) এই পর্বতদ্বয়ের মাঝে দৌঁড়ানোর নিয়ম স্থায়ীভাবে চালু করিয়া নিয়াছেন। কাজেই এই তওয়াফ-দৌড়ানো তরক করিবার কাহারও অধিকার নাই।-বুখারী, মুসলিম

ইমাম তিরমিযী লিখিয়াছেন, যদি কেহ না দৌঁড়াইয়া ধীরগতিতে হাটে, তবে তাহা জায়েয হইবে। ইহাই ফিকাহবিদদের মত। ইমাম মালিক বলিযাছেন, দৌঁড়ানোর জন্য নির্দিশষ্ট স্থানে না দৌঁড়াইলে উহার কাযা করা ওয়াজিব হইবে। ===============

কালো পাথর চুম্বন

=================================

হযরত উমর (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে তিনি কালো পাথরের নিকট আসিলেন ও উহাকে চুম্বন করিলেন। অতঃপর পাথরকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেনঃ ‌আমি নিশ্চিত জানি তুমি একজন পাথর মাত্র। তুমি কোন ক্ষতিও কর না, কোন উপকারও কর না। আমি যদি নবী করীম (স)-কে তোমাকে চুম্বন করিতে না দেখিলাম, তাহা হইলে আমি কখনই তোমাকে চুম্বন করিতাম না।

-বুখারী, মুসলিম, আবূ দাউদ, তিরমিযী, নাসারী

ব্যাখ্যা হাদীসটিতে হযরত উমর ফারুক (রা)-এর একটি আমলের বর্ণনা ও তাঁহার সেই সময় বলা একটি কথা উদ্ধৃত হইয়াছে। কথাটি তিনি হাজ্জরে আস্‌ওয়াদ চুম্বন করার পর উহাকেই লক্ষ্য করিয়া বলিয়াছেন। কথাটি হইল, আমি নিজে রাসূলে করীম (স)-কে তোমাকে চুম্বন করিতে না দেখিয়া থাকিলে আমি কখনই তোমাকে চুম্বন করিতাম না। কেননা তুমি একটা পাথর ছাড়া আর কিছুই নও। আর ক্ষতি বা উপকার কোন কিছুই করিবার তোমার কোন সাধ্য নাই (কিংবা কর না)।

হাদীস ব্যাখ্যাকারকগণ হযরত উমর (রা)-এর কথাটির বিশদ ব্যাখ্যা লিখিয়াছেন। ইবনে জরীর তাবারী লিখিয়াছেনঃ হযরত উমর (রা) এই কথাটি বলিয়াছেন এই কারণে যে, তখনকার সময় বহু লোক নও মুসলিম ছিল। তাহারা মূর্তিপূজা ও শিরকী কাজকর্ম ত্যাগ করিয়াছিল তখনও খুব বেশী দিন অতিবাহিত হয় নাই। হযরত উমর (রা) আশংকাবোধ করিয়াছিলেন যে, কালো পাথর স্পর্শ ও চুম্বন করা দেখিয়া অজ্ঞ-মুর্খ লোকেরা উহাকে প্রাগ ইসলাম কালের আরবদের মূর্তিপূজার মতই মনে করিয়া বসিতে পারে। এই কারণে তিনি পাথর চুম্বনের সঙ্গে সঙ্গে জনগণকে জানাইয়া দেওয়া জরুরী মনে করিলেন যে, এই ইস্তিলাম-এই স্পর্শকরণ ও চুম্বন-আল্লাহ্‌ তাআলার প্রতি সম্মান ও মাহাত্ম্য প্রদর্শন এবং রাসূলে করীম (স)-এর আদেশ পালন ছাড়া কোন উদ্দেশ্যেই করা হইতেছে না। ইহা হজ্জের অন্যতম নিদর্শন আর আল্লাহ তাআলাই হজ্জের নিদর্শসমূহের তাজিম করার নির্দেশ দিয়াছেন।

এতদ্ব্যতীত শুধু স্পর্শ ও চুম্বন করাও জাহিলিয়াতের আরবদের মূর্তিপূজা হইতে সম্পূর্ণ ভিন্নতর কাজ। কেননা তাহাদের বিশ্বাস ছিল, এই মূর্তিগুলি তাহাদিগকে আল্লাহ্‌র নিকটবর্তী করিয়া দিবে। হযরত উমর (রা) এই বিশ্বাসকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দিলেন এই কথা বলিয়া যে, তুমি একখানা পাথর মাত্র, তুমি ক্ষতিও করতে পার না। আর যাহার ক্ষতি বা উপকার করার ক্ষমতা নাই, তাহার আরাধনা ও পূজা উপাসনা করার কোন কারণ বা যৌক্তিকতা নাই- কেহই তাহা করে না। এই ক্ষমতা কেবলমাত্র আল্লাহ্‌রই আছে। এইজন্য আরাধনা ও পূজা উপাসনা কেবল তাঁহারই করা যাইতে পারে, করা বাঞ্ছনীয় ও কর্তব্য। অন্য কাহারো বা কোন কিছুরই আরাধনা উপাসনা করা যাইতে পারে না।

মুহিব্ব তাবারী বলিয়াছেন, হযরত উমরের এই কথাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যখন দেখা গেলম কালো পাথর স্পর্শ করা হইতেছে, চুম্বনও করা হইতেছে, কিন্তু ইহার বোধগম্য বা অনুভবযোগ্য কোন কারণ পরিদৃষ্ট নয়, সাধারণ বিবেক বুদ্ধিতেও ইহা আসে না, তখন তিনি এই ব্যাপারে নিজস্ব বিবেকবুদ্ধি ও চিন্তাশক্তি পরিহার করিয়া সম্পূর্ণরূপে নবী অনুসরণের পন্থা গ্রহণ করিয়াছেন।

ইমাম খাত্তাবী লিখিয়াছেন, হযরত উমরের এই কথার তাৎপর্য হইল, সর্বক্ষেত্রে নবী করীমের পুরাপুরি অনুসরণ ওয়াজিব, যদিও কোন কোন কাজের অন্তর্নিহিত কারণ ও যেৌক্তিকতা বোধগম্য হইবে না। যে লোকই ইহা জানিতে পারিবে, তাহারই উচিত উহা অনুসরণ করা। আর কালো পাথর চুম্বন উহার প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও উহার অধিকার মাহাত্ম্যের স্বীকৃতি মাত্র। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ্‌ তাআলা কোন কোন পাথরকে অন্য পাথরের তুলনায় বেশী সম্মানিত করিয়াছেন, যেমন বিশেষ বিশেষ স্থানের মর্যাদা অধিক বিধান করিয়াছেন অন্যান্য স্থানের উপর এবং বিশেষ রাত্রের অধিক মর্যাদার কথা ঘোষণা করিয়অছেন অন্যান্য রাত্রের তুলনায়। ইহা তো জানা কথা। ইমাম নববী লিখিয়াছেন, হাজরে আসওয়াদ স্পর্শও করিতে হয়, চুম্বনও করিতে হয়। আর রুকনে ইয়ামানীকে শুধু স্পর্শ করিতে হয়, চুম্বন করিতে হয় না। যদিও হযরত ইবরাহীমের কায়েম করা খুটি হিসাবে দুইটিই সমান। আর পশ্চিম দিকের অবশিষ্ট দুইটি কোণ স্পর্শও করিতে হয় না, চুম্বনও নয়। কেননা উক্ত বৈশিষ্ট্য এই দুইটি কোণের নাই।

হাজরে আস্‌ওয়াদ স্পর্শ ও চুম্বরের যৌক্তিকতা এই দিক দিয়াও যে, নবী করীম (স) বলিয়াছেনঃ উহা জান্নাতের পাথরসমূহের অন্যতম। আর তাহাই যদি হইয়া  থাকে, তাহা হইলে উহা স্পর্শ ও চুম্বনের অর্থ জান্নাতের সহিত প্রত্যক্ষ সম্পর্খ স্থাপন। দ্বিতীয়, নবী করীম (স) বলিয়াছেনঃ

======== উহা পৃথিবীতে আল্লাহ্‌র দক্ষিণ হস্ত হযরত ইবনে আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছেঃ

============================

এই কালো পাথর পৃথিবীর বুকে আল্লাহ্‌র দক্ষিণ হস্ত। বান্দারা উহাকে স্পর্শ করিয়া কার্যত সেই হস্তের সহিতই কারমর্দন করে, যেমন একজন লোক তাহার ভাইর সহিত করমর্দন করে।

অপর একটি বর্ণনায় অতিরিক্ত বলা হইয়াছেঃ

=======================

যেলোক কালো পাথর ধরিল, সে যেন আল্লাহর হস্ত ধারণ করিল।

মুহিব্‌ব তাবারী লিখিয়াছেন, সম্রাট বা শাহানশাহ্‌র সমীো উপস্থিত হইলে তাঁহার হাত চুম্বন করা হয়, ইহাই নিয়ম। অনুরূপভাবে হাজী বা উমরাকারী সর্বপ্রথম যখন মক্কা শরীফে উপস্থিত হয়, তখন যে জিনিস আল্লাহ্‌র হস্তের স্থালাভিষিক্ত তাহা চুম্বন করাই বাঞ্ছনীয়, ইহাই সুন্নাত, রাসুলের আদর্শ। বস্তুত ইহা একটা রূপক দৃষ্টান্ত মাত্র। আর দৃষ্টান্তের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র মর্যাদা ও অধিকার বুঝানোতে কোন দোষ নাই। আর এই কারণেইঃ

================================

যেলোক কালো পাথরের সহিত করমর্দন করিল তাহার জন্য আল্লাহ্‌র নিকট একটা বিশেষ মর্যাদা রহিয়াছে, যেমন সম্রাট বা শাহানশাহ করমর্দনের মর্যাদা ও প্রতিশ্রুতি দেন।

এই হাদীস হইত জানা গেল, হাজারে আসওয়াদ চুম্বন করা সুন্নাত। ইমাম তিরমিযী এই হাদীস উদ্ধৃত করিয়া লিখিয়াছেন, মুহাদ্দিসগণ এই হাদীস অনুযায়ী আমল করেন। তাহারা কালো পাথর চুম্বন করা খুবই পছন্দ করেন। তাহাদের কেহ যদি উহা করিতে সক্ষম না হয় কিংবা সেই পর্যন্ত পৌছিতে সমর্থন না হন, তাহা হইলে নিজের হাত ইস্তিলাম করেন ও চুম্বন করেন। অত্যন্ত ভীড়ের কারণে সেই পর্যন্ত পৌছিতে না পারিলে উহা দিকে মুখকরিয়া দাঁড়াইতে হয় এবং উহার মুখামুখী দাঁড়াইয়া তাকবীর উচ্চারণ করিতে হয়। ইহা ইমাম শাফেয়ীর মত। ইমাম মালিক ভিন্ন মত প্রকাশ করিয়াছেন, কালো পাথর স্পর্শ করিবে; কিন্তু তাহা করিতে না পারিলে নিজের হাত চুম্বন করিবে না। জমহুর ফিকাহ্‌বিদগণের মত হইল, উহা ইস্তিলাম করিবে- স্পর্শ করিবে, পরে নিজের হাত চুম্বন করিবে। হযরত ইবনে উমর, আব্বাস, আবু হুরায়রা, আবূ সাঈদ খুদরী, জাবির, আতা ইবনে আবূ রিবাহ, ইবনে আবূ মুলাইকা, ইকরামা ইবনে খালিদ, সাঈদ ইবেন যুবায়র, মুজাহিদ ও আমর ইবনে দীনার প্রমুখ মনীষীরও এই মত। ইমাম আবূ হানীফা, আওয়ামী, শাফেয়ী, শাফেয়ী, আহমাদও এই মতই প্রকাশ করিয়াছেন।

হযরত জাবির সম্পর্কে বর্ণিত হইয়াছেঃ

===============================

তিনি প্রথমেই হাজার আস্‌ওয়াদের নিকট উপস্থিত হইয়া উহাকে স্পর্শ করিলেন-জড়াইয়া ধরিলেন। তখন কান্নার ভাবের তাঁহার চক্ষুদ্বয় হইতে অজস্র ধারায় অশ্রু প্রবাহিত হইতে লাগিল। অতঃপর তিনি উহাকে চুম্বন করিলেন। উহার উপর তাঁহার হাত রাখিলেন এবং দুই হাত দ্বারা তাঁহার নিজের মুখমন্ডল মর্দন করিলেন।

হযরত ইবনে আব্বাস সম্পর্কে বর্ণিত হইয়াছেঃ ==== তিনি উহাকে তিনবার চুম্বন করিলেন। (নাসায়ী) আর একটি বর্ণনায় বলা হইয়াছেঃ======== এবং উহার উপর সিজদাকরিয়াছেন। – হাকেম

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) রাসূলে কমীম (স)-এর এই কথাটি বর্ণনা করিয়াছেনঃ

=======================

এই কালো পাথরখানির একটি জিহবা ও দুইটি ওষ্ঠ রহিয়াছে। যে লোক উহার ইস্তিলাম করিবে তাহার পক্ষে উহা কিয়ামতের দিন সত্যতার সাক্ষ্য দিবে।

মূল হাদীসে হযরত উমর ফারুকের উক্তির ফলশ্রুতি হইলঃ

=============================

দ্বীন ও শরীয়াতের যেসব বিষয় ও ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য, সৌন্দর্য ও যৌক্তিকতা সহ উদ্‌ঘাটিত ও প্রকাশিত নয়, যেসব ক্ষেত্রে বিধানদাতার নিকট আত্মসমর্পণ ও র্পূণ অনুসরণ করা মহৎ শিক্ষা। ইহা ইসলামী বিধানের মূল দর্শন।

আর ইমাম খাত্তাবী লিখিয়াছেনঃ

======================================

শরীয়াতের যেসব বিষয়ের অর্থ ও তাৎপর্য সুস্পষ্টরূপে উপলব্ধ নয় তাহাতে যৌক্তিকতা ও কার্যকারণ অনুসন্ধান পরিহার ও র্পূণমাত্রায় রাসূলে করীমের অনুসরণই হযহর উমরের উক্ত কথার বড় শিক্ষা।

ইহা হইতে আরো জানা গেল, জন-নেতা যখন তাহার নিজের কোন কাজের প্রতিক্রিয়ায় সাধারণ লোকের আকীদা নষ্ট হওয়ার আশংকা বোধ করিবেন, তখন তাহার নিজের পক্ষ হইতেই বিষয়টির সব কিছু পুরাপুরি যৌক্তিকতা ও উহার যর্থাথ তাৎপর্য বর্ণনা করিয়া উহাকে সুস্পষ্ট করিয়া ও সকল সন্দেহ সংশয় দূরীভূত করিয়া দেওয়া কর্তব্য।

=======================================

মিনায় উপস্থিতি ও অবস্থান

===============================

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছে, হযরত রাসূলে করীম (স) মিনায় আমাদের লইয়া যুহরৱ, আসর, মাগরিব, এশা ও ফজর-এর নামায পড়িলেন। অতঃপর সকাল বেলায়ই আরাফাতের ময়দানের দিকে রওয়ানা হইয়া গেলেন।

– তিরমিযী, ইবনে মাজাহ

ব্যাখ্যা মিনা স্থানটি মক্কা ও মুযদালিফার মাঝখানে-মক্কা হইতে প্রায় চার মাইল দূরে অবস্থিত। নবী করীম (স) মিনায় পূর্ণ পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ার সময় পর্যন্ত অবস্থান করিলেন। ইহা যিলহজ্জ মাসের আট তারিখ। এই দিনটিকে ইয়াওমুত তারভিয়া ==== বলা হয়। পরের দিন ফজরের নামাযের পর ও সূর্যোদেয় হওয়ার পর এখান হইতে আরাফাত ময়দানের দিকে রওয়ানা হইয়া যাইতে হয়। এই দিন যে কোন সময় মিনায় উপস্থিত হওয়া চলে। তবে সুন্নাত হইল যুহরের নামায মিনায় উপস্থিত হইয়া পড়া। এখানে র্পূণ পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়িতে হয়। আর একটি রাত্র যাপন করিয়া পরের দিন সকালে সূর্যোদয় হইলে পর আরাফার দিকে যাইতে হয়। এই আট তারিখের পূর্বে মিনায় উপস্থিত না হওয়া সুন্নত। ইমাম মালিক একদিন পূর্ণ উপস্থিত হওয়া মাকরূহ বলিয়াছেন। ইমাম নব্বী বলিয়াছেনঃ আট-ই যিলহজ্জের পূর্বে মিনায় উপস্থিত হওয়া সুন্নাতের পরিপন্থী। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) সম্পর্কে বর্ণিত হইয়াছেঃ

==========================================

সমর্থ হইলে তারভিয়া দিবসে জুহরের নামায মিনায় পড়া তিনি পছন্দ করিতেন। তাহা এইজন্য যে, স্বয়ং নবী করীম (স) জুহরের নামায মিনায় পড়িয়াছেন।

আর হযরত ইবনে উমর (রা) সবচাইতে বেশী নবী করমি (স)-এর অনুসরণ করিতেন। তাঁহার সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের জন্যই তাঁহার এইরূপ নীতি ছিল।

অতএব মিনায় পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়া ও যুহর হইতে শুরু করা মুস্তাহাব। ইহাই জমহুর ফিকাহবিদদের মত। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলিয়াছেনঃ

==================

সূর্য যখন পশ্চিম দিকে ঢলিবে, তখন মিনার দিকে রওয়ানা হইয়া যাইবে।

আর মিনা হইতে আরাফায় যাওয়ার জন্য ফজরের নামাযের পর সূর্যোদ্বয়ের অপেক্ষা করা ও সূর্যোদয়ের পর রওয়ানা হওয়া মুস্তাহাব। কেননা হযরত জাবির (রা) বর্ণিত দীর্ঘ হাদীসে বলা হইয়াছেঃ

==========================

অতঃপর নব করীম (স) কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিলেন যতক্ষণ না সূর্যোদয় হইয়াছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়র (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে তিনি বলিয়াছেনঃ

============================

মিনায় জুহর হইতে পরের দিন ফজর পর্যন্ত এই মোট পাঁচ ওয়াক্ত নামায ইমামের (মুসলিম রাষ্ট্র নেতার) পড়ানো হজ্জ্বের সুন্নাতের মধ্যে গন্য। =============

মিনায় কসর নামায

==============================

হযরত হারিস ইবনে ওয়াহাব (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেনঃ আমি নবী করীম (স)-এর সঙ্গে মিনায় দুই রাক্‌আত করিয়া নামায পড়িয়াছি। অথচ আমর সংখ্যায় অনেক বেশী এবং ভয়-ভীতি হইতে সর্ম্পূণ নিরাপদে ছিলাম।

– বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী

ব্যাখ্যা মিনা মক্কা শরীফ হইতে এততটা দূর নয় যে, সেজন্য কসর পড়িতে হইবে। এবং সেখানে মুসলমানদের কোন ভয় ভীতি, বিপদ-আপদ কিংবা শত্রুর সঙ্গে মুখামুখি অবস্থা ছিল না, মুসলমানরা সংখ্যাও বেশী ছিল। তাহা সত্ত্বেও নবী করীম (স) মিনায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাযই কসর পড়িয়াছেন-চার রাক্‌আত নামাযে দুই রাক্‌আত পড়িয়াছেন।

এই হাদীসটি হযরত ইবন মাসউদ হইতেও বর্ণিত হইয়াছে এবং তাহা বুখারী ও মুসলিম শরীফে উদ্ধৃত হইয়াছ্ তিনি বলিয়াছেনঃ

===================

‌আমি নবী করীম (স)-এর সঙ্গে মিনায় চার রাক্‌আতের স্থলে দুই রাখ্‌আত (কসর) পড়িয়াছি। কিন্তু অদূরবর্তী মক্কার স্থায়ী অধিবাসীদের জন্যও কসর করা কর্তব্য কিনা, এই বিষয়ে মতভেদ রহিয়াছে। কহ কেহ বলিয়াছেনঃ

======================

মক্কার বাসিন্দারা মিনায় যাইয়া নামায কসর করিবে না। তবে মিনায় যে লোক মুসাফির হইবে, সে-ই কসর পড়িবে।

কেননা মিনায় কসর করা সফরের কারণে। ইহা হজ্জের অংশ নয়।

ইবনে জুরাইজ, সুফিয়ান সওরী, ইয়াহ্‌ইয়া ইবনে সাঈদ আল তাকান, ইমাম আবূ হানীফা, ইমাম শাফেয়ী, আহমদ ও ইসহাক এই মত পোষণ করেন। কেহ কেহ বলিয়াছেনঃ

=======================

মক্কার স্থায়ী অধিবাসীদের জন্যও মিনায় কসর নামায পড়ায় কোন দোষ নাই।

এই মত দিয়াছেন ইমাম আওযায়ী, ইমাম মালিক, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা ও আবদুর রহমান ইবনে মাহদী প্রমুখ ফিকাহবিদ। তাঁহাদের মতে মিনায় কসর নামায পড়া হজ্জের অনুষ্ঠানসমূহের মধ্যে গণ্য। ইহা সফরের জন্য নয়।

ইমাম খাত্তাবী লিখিয়াছেনঃ রাসূরের সং্গে আমি মিনায় দুই রাখ্‌আত পড়িয়াছি। সাহাবীর এই কথা মক্কার অধিবাসীদের জন্যও মিনায় কসর নামায পড়া জায়েয প্রমাণ করে না। নবী করীম (স) তথায় মুসাফির ছিলেন বিধায় কসর পড়িয়াছেন। মক্কাবাসীরা তথায় কি করিবে তাহা তাহাকে জিজ্ঞাসা করা হইলে তিনি নিশ্চয়ই কসর পড়িবার নির্দেশ দিনে না। হযরত উরম ফারুক (রা) মিনায় কসর নামায শেষ করিয়া বলিতেনঃ

==============================

হে মক্কাবাসীরা! তোমরা নামায র্পূণ করিয়া পড়। আমরা মুসাফির হওয়ার কারণে দুই রাক্‌আয়াত, পড়িয়াছি।===============================

মিনা হইতে আরাফাত যাত্রা

===================================

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, নবী করীম (স) মিনা হইতে আরাফা যাওয়ার দিনের প্রাতঃকালে ফজরের নামায পড়া সম্পন্ন করার পর রওয়ানা হইলেন। পরে রতিনি আরাফার নিকট পৌছিঁয়া নামেরাতায় অবতরণ করিলেন। উহা ইমামের সেই অবতরণ স্থান, ফারাফার ময়দানের যেখানে সব সময়ই ইমাম অবতরণ করিযা থাকে। ইহার পার জুহরের নামাযের সময় যখন হইল, নবী করীম (স) দ্বিপ্রহরকালীন প্রখর রৌদ্রতাপের মধ্যে রওয়ানা হইয়া গেলেন। এইদিন তিনি জুহর ও আসরের নামায একসঙ্গে (অর্থাৎ একই সময় পর পর) পড়িয়াছেন। অতঃপর তিনি লোকদিগকে সম্বোধন করিয়া ভাষণ দিলেন। পরে তিনি রওয়ানা হইলেন ও আরাফার ময়দানে অবস্থিতি গ্রহণ করলেন।

-আবূ দাউদ, মুসনাদে আহমদ

ব্যাখ্যা নবী করীম (স) মিনায় ফজরের নামায পড়ার পরও কিছুক্ষণ অবস্থান করিয়া ও সূর্যোদয়ের পর তথা হইতে আরাফার ময়দানের দিকে রওয়ানা হইয়া গেলেন। আরাফাতের ময়দানের নিকটবর্তী নামিরা নামক স্থানে তিনি প্রথমে অবতরণ করিলেন। নামিরা আলাপার পার্শ্ববর্তী স্থান হইলেও ইহা আরাফাতের মযদানের অন্তর্ভুক্ত নয়। এই স্থানটিতে মূল পাহাসহ পাথরগুলি পথিপার্শ্বে পড়িয়া থাকিতে দেখা যায় এবং আরাফাগামীর ডানদিকে পড়ে। এই স্থানটিই ‌নামিয়া নামে চিহ্নিত। নবী করীম (স) এবং তাঁহার পর খুলাফায়ে রাশেদুন আরাফা যাওয়ার পথে প্রথমে এই স্থানে অবতরণ করিয়াছেন।

এই স্থান হইতে নবী করীম (স) আরাফার মূল ময়দানের দিকে যাত্রা করিয়াছেন ঠিক দ্বিপ্রহরের সময়, যখন সূর্যতাপ খুব প্রখর হইয়াছিল ও জুহরের নামাযের সময় নিকটবর্তী হইয়াছিল। এই সময় তিনি জুহর ও আসরের নামায এক সঙ্গে আদায় করেন। ইহাকে ======= বলা হয়। অর্থাৎ পরবর্তী নামাযের সময় হওয়ার আগেই পূর্ববর্তী নামাযের সাথে সাথে উহা পড়িয়া লওয়া। নামায পড়ার পর তিনি সমবেত জনতাকে লক্ষ্য করিয়া ভাষণ প্রদান করেন। ভাষণ দেওয়ার স্থানটিকে ===== উরানী বলা হয়। ইমাম শাফেয়ী ও অন্যান্য সকল ফিকাহবিদের মতে এই স্থানটিও মূল আরাফাতের ময়দানে গন্য নয়। অবশ্য ইমাম মালিক ইহা হইতে ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাঁহার মতে ইহা আরঅপাতের মধ্যেরই একটি স্থান। এই স্থানে দাঁড়াইয়া নবী করীম (স) ভাষণ দিয়াছিলেন। সমবেত হজ্জ যাত্রীদের ল্কষ্য করিয়া আরাফার দিনে এই স্থানে ভাষণ দেওয়া হইমামের জন্য কর্তব্য। জমহুর আলিমদের সম্মিলিত মতে এই ভাষণ দান সুন্নত। ইমাম মালিক ও তাঁহার অনুসারীরা ইহার বিপরতি মত প্রকাশ করিয়াছেন। শাফেয়ীর মতে হজ্জের চারিটি ভাষণ দিত হয়। একটি যিলহজ্জ মাসের সাত তারিখ জুহরের নামাযের পর কাবা শরীফের পাদদেশে। দ্বিতীয় বাষণ কুরবানীর দিবসে উনারা উপত্যকায়। তৃতীয় ভাষণ কুরবানীর দিন, আর চতুর্থ ভাষণ আরাফার ময়দান হইতে বিদায়ের দিন। এই দিনটি আইয়্যামে তাশ্‌রীকের দ্বিতীয় দিন।

এই স্থান হইতে যাত্রা করিয়া নবী করীম (স) আরাফার ময়দানে অবস্থানের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থিত গ্রহণ করিলেন। ইহা জাবালে রহমত-এর পাদদেশে পাথর বিচানো স্থান। আর জাবালে রহমত-রহমতের পাহাড়টি আরাফাতের মূল যমীনের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। এই স্থানে অবস্থান মুস্তাহাব। পাহাড়ের উপরে উঠিয়া অবস্থান করার একটা প্রবণতা সাধারণ হাজীদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। এই স্থান ব্যতীত অন্যত্র অবস্থান গ্রহণ সহীহ নয় বলিয়া ধারণা করা হয়। কিন্তু ইহা ভ্রান্ত ধারণা মাত্র। সঠিক ও যথার্থ কথা হইল, আরাফাতের বিশাল ময়দানের যে কোন অংশে অবস্থান করার একটা ফযীলত রহিয়াছে। তাহা না পারিলে অপেক্ষাকৃত নিকটবর্তী যে স্থানেই সম্ভব অবস্থান করিলে ফযীলত হইতে বঞ্চিত হইবে না।

জুহর ও আসরের নামায এক সময়ে পড়ার জন্য আযান দেওয়ার ব্যাপারে দুইটি মতের উল্লেখ করা হইয়াছে। ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আবূ হানীফা, আবূ সওর ও ইবনুল মুনযির এর মত হইল, জুহরের নামাযের আযান দেওয়া হইবে, আসরের নামাযের জন্য নয়। কেননা নামাযের সময়টি হইল জুহরের। ইমাম তাহাভী দাবি করিয়াছেন, এই মতের উপর ইজমা হইয়াছে। কিন্তু ইমাম মালিক বলিয়াছেন, প্রত্যেক নামাযের জন্য আযান ও ইকামত আলাদা আলাদা ভাবেই দিতে হইবে। ইমাম আহমদ ও ইসহাক ইবনে রাহওয়াই বলিয়াছেন, এই ওয়াক্ত নামাযের প্রত্যেকটির জন্য ইকামত দিতে হইবে। কিন্তু আযান দিতে হইবে মাত্র এক ওয়াক্ত নামাযের। পূর্বোল্লেখিত মতের দলীয় হইল জাবির বর্ণিত হাদীস। তাহাতে বলা হইয়াছেঃ

================================

অতঃপর আযান দিলেন, পরে ইকামত বলিলেন ও তাহার পর জুহরের নামায পড়িলেন। পরে আবার ইকামত বলা হইল ও আসরের নামায পড়িলেন। এই দুই নামাযের মধ্যে অন্য কোন নামায পড়েন নাই।

এই বিষয়ে মুসলিম উম্মতের ইজমা অনুষ্ঠিত হইয়াছে যে, হাজী যদি ইমামের পিছনে নামায পড়ে তাহা হইলে এই দিনের জুহর ও আসরের নামায এক সময়ে পড়িয়া নিবে। যদি জামাআতের সহিত নামায পড়িবার সুযোগ না পাইল, তবে একাকীও এই দুই নামায একসঙ্গে পড়িবে- ইহা ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের মত। ইমাম আবূ হানীফা (র) বলিয়াছেন, দুই নামায একসঙ্গে পড়া যাইবে ইমামের সঙ্গে পড়িলে একাকী পড়িলে নয়। =======================

আরাফা যাওয়ার পথে তালবিয়া ও তাকবীর

=====================================

মুহাম্মদ ইবনে আবূ বকর সাকাফী হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি হযরত আনাস (রা)-এর সঙ্গে প্রাতঃকালে আরাফার দিকে যাওয়ার সময় তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেনঃ এই আরাফার দিনে আপনারা রাসূলে করীম (স)-এর সঙ্গে থাকিয়া পথ চলাকালে কি সব দোয়া-যিক্‌র করিতেন? উত্তরে হযরত আনাস বলিলেনঃ আমাদের মধ্যে কিছু লোক উচ্চস্বরে তালবিয়া করিতেন। কিন্তু কেহ উহার জন্য প্রতিবাদ বা সেইজন্য কোন আপত্তি প্রকাশ করেন নাই। তেমনি কিছু লোক তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করিতেছিলেন, সে বিষয়েও কেহ আপত্তি জানান নাই।

– বুখারী, নাসাযী, বায়হাকী, মুননাদে আহমদ, ইবনে মাজাহ

ব্যাখ্যা মিনা হইতে আরাফার ময়দানের দিকে যাওয়ার পথে তালবিয়া ও তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করা সম্পর্কে এই হাদীস। হযরত আনাস (রা) নবী করীমের সঙ্গী সাথী ও খাদিম হইয়া থাকার দরুন তাঁহার আমল সম্পর্কে বিশেষ ওয়াকিফহাল হওয়াই স্বাভাবিক। এই কারণে মুহাম্মাদ ইবনে আবূ বকর সাকাফী তাবেয়ী তাঁহাকে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন। উত্তরে হযরত আনাস (রা) বলিলেনঃ আমাদের সঙ্গী-সাথীরা উচ্চস্বরে তালাবিয়া করিতেন, উচ্চস্বরে তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করিতেন। কিন্তু কেহই সেইজন্য আপত্তি তুলেন নাই, কেহ উহার প্রতিবাদ করেন নাই- স্বয়ং নবী করীম (স)-ও।

বুখারী বর্ণিত অপর এক হাদীসের

==========================

লোকেরা উচ্চস্বরে তালবিয়া করিত, কিন্তু কেহ উহার প্রতিবাদ করে নাই।

আর মুসলিম-এর বর্ণনা হইলঃ

================================

আমাদের মধ্যে কিছু লোক তাকবীরকারী ছিল। কিন্তু লোক তালবিয়াকারী; কিন্তু আমাদের কেহই তাহার সঙ্গীর এই কাজের দোষ ধরিত না।

এই হাদীসসমূহ হইতে প্রমাণিত হয় যে, মিনা হইতে আরাফার ময়দানের দিকে যাওয়ার পথে উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়া ও আল্লাহু আকবার বলিয়া ধ্বনি উচ্চারণ করা মুস্তাবাহ। সাহাবায়ে কিযাম (রা) নবী করীম (স)-এর সঙ্গে থাকিয়া এই কাজ করিয়াছেন; কিন্তু তিনি বা কোন সাহাবী এই কাজের প্রতিবাদ করেন নাই, ইহা করিতে নিশেধ করেন নাই। ফলে ইহা নবী করীম (স) কর্তৃক সমর্থিত হইয়াছে। তবে তাকবীর ধ্বনির তুলনায় তালবিয়া বেশী পড়া হইত। জমহুর ফিকাহবিদগণ এই মত সমর্থন করিয়াছেন। আরাফা দিবসের সকাল বেলায়ই তালবিয়া পড়া শেষ করিতে হইবে যাঁহার মত প্রকাশ করিয়াছেন, আলোচ্য হাদীস উহার বিপরীত কথা প্রমাণ করিতেছে।

আরাফাতে অবস্থান

=========================

হযরত আবদুর রহমান ইবনে ইয়ামার আদ-দায়লী (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, আমি রাসূলে করীম (স)-কে আলাফায় অবস্থানরত দেখিতে পাইলাম। তখন নজদের অধিবাসী কিছুলোক তাঁহার নিকট উপস্থিত হইল। তাহারা বলিলঃ হে রাসূল। হজ্জ কি রকমে- কি নিয়মে? উত্তরে নবী করীম (স) বলিলেনঃ আরাফাই তো হজ্জ। যে লোক মুযদালিকায় যাপন করা রাত্রির ফজরের নামাযের পূর্বে এখানে আসিয়া পৌছিবে, তাঁহার হজ্জ পূর্ণ হইয়া গেল। মিনায় অবস্থানের জন্য নির্দিষ্ট তিন দিন। যে লোক দুই দিনেই অবস্থান সর্ম্পূণ করিবে, তাহাতে তাহার কোন গুনাহ হইবে না। কেহ বিলম্বিত করিলে তাহাতেও কোন দোষ নাই। পরে তিনি এক ব্যক্তিকে জন্তুযানে নিজের পিছনে বসাইয়া লইলেন। সেই লোক উক্তরূপ কথা ঘোষণা করিতে শুরু করিল।

ব্যাখ্যা নজদবাসীরা রাসূলে করীম (স)-কে জিজ্ঞাসা করিলেনঃ ===== ইহার সোজা তরজমা হইল হজ্জ কিরূপ-কিরূপে হজ্জ করিতে হয়? কিন্তু নবী করীম (স) ইহার উত্তরে বলিলেনঃ ==== ইহার তরজমাঃ আরাফা-ই-হজ্জ। ইমাম শাওকানীর ভাষায় ইহার অর্থঃ

=====================

যেলোক আলাফা ময়দানে অবস্থানের জন্য নির্দিষ্ট দিনে ময়দানে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য পাইল, তাহার হজ্জই সহীহ হজ্জ।

আর ইজ্জুদ্দীন আবদুস সালাম বলিয়াছেনঃ জওয়াবটির পূর্ণরূপ হইলঃ

==========================

আরাফার ময়দানে অবস্থানই হজ্জ পাওয়ার কাজ।

ইমাম তিরমিযী লিখিয়াছেন, বিশেষজ্ঞগণ আরাফায় অবস্থান সম্পর্কে বলিয়াছেনঃ

===========================

যে লোক আলাফার ময়দানে ফজরের পূর্বে অবস্থান করে নাই, তাহার হজ্জ হারাইয়া গিয়াছে-হয় নাই।

অতএব  কেহ যদি ফজর উদয় হওয়ার পর আরাফায় উপস্থিত হয়, তবে এই উপস্থিতি তাহার কোন কাজে লাগিবে না। তাহার হজ্জ হইবে না, হইবে উমরা। এই ব্যাপারে সমগ্র মুসলিম উম্মত সম্পূর্ণ একমত। ইমাম শাফেরী ও ইমাম আহমদের মতে তাহাকে পরবর্তী বৎসর পুনরায় হজ্জ করিতে হইবে। =====================

আরাফাত শব্দটি স্বতঃই বহুবচন। অনেকে বলেন, ইহার আর কোন বহুবচন নাই।। ইহার একবচন আরাফা ==============

আরাফা ময়দানের নামকরণ সম্পর্কে বিভিন্ন কথা বলা হ্ইয়াছে। বলা হইয়াছে, ইহার নামকরণ হইয়াছে ইহার চতুর্দিকের পরিবেশের অবস্থানুসারে। কেননা সমগ্র পরিবেশটি সুদূর বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি সমন্বিত। কেহ বলিয়াছেন, এই বিশাল প্রান্তরের নাম আরাফা রাখা হইয়াছে এই জন্য যে, এইখানে জনগণ একত্রিত হইয়া পরস্পরের সহিত পরিচিতি লাভ করে। কেননা আরাফা ======== শব্দের মূল অর্থ পরিচিতি। বলা হইয়াছে, হযরত আদম (রা) দুনিয়ায় আসিয়া ভারত অঞ্চলে অবতীর্ণ হইলেন এবং হাওয়া বিবি অবতীর্ণ হইলেন জিদ্দায়। পরে তাঁহারা র্দীঘদিনের বিচ্চেদ-বেদনা ও মিলন-কামনার পর এই আরাফার ময়দানে একত্রিত ও পরস্পরের সহিত পরিচিত হইয়াছিলেন। ফলে এই পরিচিতি লাভের দিনদিকে আরাফা দিবস এবঙ এই স্থানটিকে আরাফাত বলা হইতে লাগিল। এই মতও প্রকাশ করা হইয়াছে যে, আরাফাত শব্দটি আরাফ হইতে নির্গত। ইহার অর্থ ===== সুগন্ধি। অর্থাৎ আরাফার ময়দান সুগন্ধিমসয় সুঘ্রানে মুখরিত। মিনা ইহার ব্যতিক্রম। কেননা সেখানে ময়লা আবর্জনা ও রক্ত পূঞ্জীভূত হইয়া থাকে। এই কারণে বিস্তীর্ণ প্রান্তরের নাম হইয়াছে আরাফাত। অন্যরা বলিয়াছেন, ময়দান ও দিনটির নাম আরাফা রাখার মূল কারণ হইলঃ শব্দটি মূল অর্থ==== সরব বা ধৈর্য। কোন লোক যখন আল্লাহ্ ভীরু ও পরম ধৈর্যশীল হয়, তখন তাহাকে বলা হয় ===== ধৈর্যশীল ও আল্লাহ্‌- ভীরু ব্যক্তি। আর আরাফার প্রান্তরে উপস্থিত হইয়া হাজী অত্যন্ত নম্র, বিনয়ী ও আল্লাহর প্রতাপে ভীত-সম্ভ্রন্ত হইয়া পড়ে। আল্লাহর নিকট দোয়া ও নানা ইবাদত করার ব্যাপারে এবং এখানে অবস্থানজনিত নানা অসুবিধা সৃষ্ট কষ্ট ও দুঃখ সহ্য করার ব্যাপারে অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও পরম সহিষ্ণু হইয়া থাকে। এ কারণে এই প্রান্তরের নাম আরাফাত-অনেক অনেক কষ্ট সহ্য করার স্থান এবং এই দিনটিকে আরাফার দিবস-অনেক দুঃখ কষ্ট অকাতরে সহ্য করার দিন বলিয়া অভিহিত করা হয়। আরাফাত বহুবচনে ব্যবহৃত হয় এই কারণে যে, এই বিশাল ময়দানের প্রত্যেক অংশই আরাফা। হযরত ইবনে আব্বাস ও হযরত আলী (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, হযরত ইবরাহীম (আ)-কে এই ময়দানের কথা বলা হইয়াছিল। পরে তিনি বর্ণনানুযায়ী এই ময়দানটিকে চিনিয়া লইতে সক্ষম হন। এই কারণে এই নামকরণ হইয়াছে। দহহাক ও সুদ্দী প্রমুখ বলিয়াছেন, যেহেতু হযরত জিবরাঈল (আ) এই ময়দানে হযরত আদম (আ)-কে বলিয়াছেন।

============================

আপনি আপনার গুনাহ স্বীকার করুন এবং আপনার হজ্জ ও যাবতীয় ইবাদত-বন্দেগীর নিয়ম কানুন জানিয়া চিনিয়া লউন।

এই কারণেই এই ময়দানটির এই নামকরণ করা হইয়াছে।

===================

আরাফার ময়দান হইতে মুযদালিফা গমন

=============================

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, রাসূলে করীম (স) আরাফার ময়দান হইতে রওয়ানা হইলেন। হযরত উসামা ইবনে যায়দ (রা) তাঁহার সঙ্গে আরোহী ছিলেন। উষ্ট্রটি তাঁহাকে লইয়া একটা পাক দিয়া আসিল-গেল এবং আসিল। এই সময় রাসূলে করীম (স)-এর দুইখানি হাত ঊর্ধ্বে এমনভানে উত্তোলিত ছিল যে, হাত দুইখানি তাঁহার মস্তক অতিক্রম করিয়া যায় নাই। অতঃপর ধীর মন্থর গতিতে তিনি চলিয়া গেলেন। শেষ পর্যন্ত মুযদালিফায় আসিয়া পৌছিলেন। ইহার পর পরের দিন রওয়ানা হইলেন। এই সময় তাঁহার সঙ্গে আরোহী ছিলেন হযরত ফযল ইবনে আব্বাস। তখন তিনি সব সময় তালবিয়া করিতেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি জমরা আকাবায় প্রস্তর নিক্ষেপ করিলেন।

ব্যাখ্যা এই হাদীসটি কেবলমাত্র মুননাদে আহমদ গ্রন্থে উদ্ধৃত হ্ইয়াছে। এই শব্দ ও ভাষায় হাদীসটি অন্য কোন গ্রন্থে উদ্ধৃত হয় নাই। তবে এই হাদীসটিই অর্থাৎ এই বক্তব্যটিই মুসলিম শরীফে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত ও উদ্ধৃত হইয়াছে। উহার ভাষা নিম্নরূপঃ

=================================

রাসূলে করীম (স) আরাফার ময়দান হইতে রওয়ানা হইলেন। এই সময় হযরত উসামা হইবেন। যায়দ (রা) তাঁহার সহ-আরোহী ছিলেন। অতঃপর তিনি খুব ধীর-মন্থর ও সম্ভ্রম সম্পন্ন গতিতে চলিতে লাগিলেন। শেষ পর্যন্ত মুযদালিকায় আসিয়া পৌছিলেন।

এই হাদীসের মূল বক্তব্য তিনটি। প্রথম, আরাফাত ময়দানের অনুষ্ঠান সমাপ্ত হওয়ার পর এই ময়দান হইতে রওয়ানা হইয়া যাইতে হয়। সূর্যাস্ত সম্পূর্ণরূপে হওয়ার পর্ই রওয়ানা হইতে হইবে। যাইবার সময় পথে পথে আল্লাহ্‌র নিকট দোয়া করিতে হয়। নবী করীম (স) তাহাই করিয়াছেন। এই সময় দোয়া ও যিকর করার নির্দেশ কুরআন মজীদে দেওয়া হ্ইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছেনঃ

=========================

তোমরা যখন আরাফাতের ময়দান হইতে রওয়ানা হইয়া যাইবে, তখন মুযদালিফার নিকটে আল্লাহর যিকর করিবে।

ইমাম শাফেয়ী ও লাইস এই আয়াতের ভিত্তিতে মুযদালিকায় অবস্থান, যিকর ও তালবিয়া করাকে ফরয বলিয়াছেন। হানাফী মতে ফরয নয়। মুল হাদীসে বলা হইয়াছে, নবী করীম (স) এই সময় দুইখানি হাত উপরে তুলিয়া দোয়া করিয়াছেন। বস্তুত নবী করীম (স) ইন্তিসকা নামাযের পর এবং এইখানের দোয়ার সময় হাত তুলিয়াছেন, এমন উল্লেখ হাদীসে স্পষ্ট ভাষায় করা হইয়াছে। এতদ্বাতীত অন্য কোন সময় হাত তুলিয়া দোয়া করিয়াছেন, এমন ইল্লেখ পাওয়া যায় না। সেই সঙ্গে এই কথাও স্পষ্ট করিয়া বলিয়া দেওয়া হইয়াছে যে, মুনাজাত হাত তুলিলে সেই হাত যেন মাথার উপরে উঠিয়া না যায়- নবী করীম (স) -এর হাত তাহা যায় নাই। ময়দান হইতে রওয়ানা হইয়া খুব ধীর স্থির ও গাম্ভীয সহকারে চলিতে হইবে। চলার পথে লোকদিগকে কোন কষ্ট দেওয়া চলিবে না। তবে যদি প্রশস্ততা পাওয়া যায়,  তাহা হইলে দ্রুতগতিতে চলা সুন্নাত। কেননা মাগরিবের নামায এশার সময়ে মুযদালিফায় পৌছিয়া পড়িতে হইবে।

আরাফাতের ময়দান হইতে রওয়ানা হইয়া যে স্থানে অবস্থান করিতে হয়, উহার প্রচলিত নাম ‌মুযদালিফা। এই স্থানের নাম মুযদালিফ হওয়ার কারণ বলা হইয়াছেঃ

======================================

কেননা এই স্থানে অবস্থান করিয়া লোকেরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে। কিন্তু উপরিউক্ত হাদীসদ্বয়ে এই স্থানকে ======= বলা হইয়াছে। ইহার অর্থ একত্রিত করণ হয়,  যেহেতু এইখানে পৌছিয়া হাজীগণকে মাগরিব ও এশার নামায এক সময়ে জমা করিয়া পড়িতে হয়, এই কারণেই এই স্থানটিকে ======= বলা হইয়াছে। হাদীসে এই জমা করিয়া নামায পড়ার কথা স্পষ্ট ভাষায় বলা হইয়াছে। এই স্থানের আর এক নাম মাশাআররিল হারাম।

=======================

হযরত আলী (র) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, রাসূলে করীম (স) মুযদালিফায় উপস্থিত হইলেন। এখানে তিনি লোকদের লইয়া মাগরিবও এশার গড়িলেন ও এখানেই রাত্রি যাপন করিলেন। সকাল হইলে পর তিনি কুযাহা পাহাড়ে আসিলেন ও উহার উপরে অবস্থান গ্রহণ করিলেন। পরে বলিলেন, ইহা অবস্থানের এবং মুযদালিফা সবটাই অবস্থান স্থান। পরে তিনি রওয়ানা হইয়া গেলেন এবং মুহাসুসর-এ উপস্থিত হইলেন ও উহার উপর অবস্থান করিলেন। তিনি তাঁহার উষ্ট্রীকে চাবুক মারিলেন। উষ্ট্রী দ্রুত চলিতে লাগিল। এইভাবে তিনি উপত্যকা অতিক্রম করিয়া গেলেন। পরে উহাকে থামাইলেন এবং আব্বাস পুত্র ফযল (রা)- কে উষ্টযানের পিছনে বসাইলেন। চলিতে চলিতে পাথর নিক্ষেপ স্থানে উপস্থিত হইলেন। এখানে তিনি পাথর নিক্ষেপ করিলেন। ইহার পর তিনি কুরবানী করিবার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে আসিলেন। বলিলেনঃ ইহা কুরবানী করার স্থান এবং মিনার যে কোন স্থানেই কুরবানী করা যায়।

-মুসনাদে আহমদ

ব্যাখ্যা আরাফাতের ময়াদন হইতে রওয়ানা হইয়া যাওয়ার পর হইতে মিনাতে কুরবানী করা পর্যন্ত নবী করীম (স) যত কাজ করিয়াছেন, এই হাদীসে উহার উল্লেখ করা হউয়াছে। নবী করীম (স) যাহা করিয়াছেন তাহা হজ্জের ধরাবাঁধা নিয়ম ও পদ্ধতি বলিয়াই করিয়াছেন এবং হাজীকে এই সবই করিতে হয়।

হাদীসটিতে বলা হইয়াছে, নবী করীম (স) মুযদালিফায় উপস্থিত হইয়া মাগরিব ও এশার নামায পড়িয়াছেন। অর্থাৎ এশার নামাযের সময় হইলে প্রথমে মাগরিবের নামায পড়িয়াছেন এবং পরে এশা পড়াইয়াছেন। এই নামায পড়া সম্পর্কে হযরত আলী (রা) বর্ণিত অপর এক হাদীসে বলা হইয়াছেঃ

======================

নবী করীম (স) মুযদালিফায় উপস্থিত হইয়া দুই ওয়াক্তের (মাগরিব ও এশার) নামায একত্র করিয়া (এক সময়ে) পড়িলেন।-আবু দাউদ, তিরমিযী, মুসনাদে আহমদ হযরত উসামা ইবনে যায়দ (রা) বলিয়াছেনঃ

===========================================

রাসূলে করীম (স) মুযদালিফায় মাগরিব ও এশার নামায জমা করিয়া পড়িয়াছেন। (অপর এক বর্ণনায় এই কথাও আছেঃ) এবং এই দুই নামাযের মাঝখানে কোন নফল পড়েন নাই।

হযরত আবু আইউব আনসারী ও অন্যান্য সাহাবীদের হইতেও এই রূপ অর্থের বহু সংখ্যক হাদীস বর্ণিত হইয়াছে।

এই দুই ওয়াক্ত নামায এক সঙ্গে পড়া সম্পূর্ণ শরীয়াতসম্মত, সহীত হাদীসসমূহ দ্বারা প্রমাণিত। মুসাফির মুযদালিফায় এই দুই নামায এশার নামাযের সময় পড়া সম্পূর্ণ জায়েব। যদি মাগরিবের নামাযের সময়ে কিংবা মুসদালিফা ছাড়া অন্য স্থানে এক সঙ্গে ইহা পড়া হয়, তাহা হইলে শাফেয়ী মাযহাবে জায়েয হইবে। আতা, ওরওয়া ইবনুল যুবায়র কাসিম ইবনে মুহাম্মদ ও সাঈদ ইবনে যুবায়র প্রমুখও এই মত দিয়াছেন। ইমাম মালিক, ইমাম আহমদ ইসহাক, ইমাম আবু ইউসুফ, আবু সওর, ইবনে ইবনুল মুনযির, সুফিয়ান সওরী ও ইমাম আবূ হানীফা প্রমুখের মতে মুযদালিফা পৌঁছার আগে এবং এশার সময় হওয়ার পূর্বেই পড়িলে তাহা জায়েয হইবে না। ইমাম আহমদ ও ইমাম শাফেয়ীর মতে কেবলমাত্র প্রথম নামাযের জন্য আযান দেওয়া হইবে। আর ইকামত বলা হইবে উভয় নামাযের জন্য। ইমাম মালিকের মত উভয় নামাযের জন্য আলাদা ভাবে আযান-ইকামত বলা হইবে। হানাফী মাযহাব মতে কেবলমাত্র প্রথম নামাযের জন্য আযান-ইকামত বলা হইবে, দ্বিতীয় নামাযের জন্য নয়।

মুযদালিফায় থাকা অবস্থায় খুব বেশী দোয়া করা, লা-ইলাহা কালিমা পড়া আল্লাহু আকবর বলার ফযীলত হাদীসে বর্ণিত হইয়াছে। এই দোয়া বেশী বেশী পড়া যায়ঃ

=============================

ইহা ছাড়া খুব বেশী তালবিয়া পড়া এবং পড়া এবং যাহা ইচ্ছা নেক দোয়া করা উচিত। হযরত ফজল ইবনে আনাস (রা) বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদীসের শেষভাগে রাসূলে করীম (স) সম্পর্কে বলা হইয়াছেঃ

==============================

নবী করীম (স) জামরা আকাবায় পাথর নিক্ষেপ করার সময় পর্যন্ত তালবিয়া পড়িতেছিলেন।

ইহা হইতে বুঝা যায়, পরের দিন-কুরবানীর দিন পাথর নিক্ষেপ শুরু করা পর্যন্ত তালবিযা করা মুস্তাহাব। ইমাম আবু হানীফা, ইমাম শাফেরী ও সুফিয়ান সওরী প্রমুখ এই মতই গ্রহণ করিয়াছেন। অবশ্য হাসান বসরী বলিয়াছেন, আরাফা দিবস পর্যন্ত তালবিয়া পড়িয়া বন্ধ করিয়া দিবে।

===================

পাথর নিক্ষেপ

=============================

হযরত জাবিরর ইবনে আবদুল্লাহ (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেনঃ আমি রাসূলে করীম (স)-কে দেখিয়াছি; তিনি কুরবানীর দিনে তাঁহার জন্তু যানে আরোহী থাকা অবস্থায়ই পাথর নিক্ষেপ করিতেছেন এবং বলিতেছেনঃ তোমরা আমার নিকট হইতে তোমাদের হজ্জের নিয়ম-পদ্ধতি শিখিয়া লও। কেননা আমি জানি না, হয়ত আমার এই হজ্জের পর আর কোন হজ্জ আমি করিব না। – মুসলিম, মুসনাদে আহমদ, নাসায়ী

ব্যাখ্যা ১০ই যিলহজ্জ কুরবানীর দিন। এই দিন মুযদালিফা হইতে মিনায় উপস্থিত হইয়া চারিটি কাজ করিতে হয়। তাহার মধ্যে সর্বপ্রথম হইল জামরা আকাবায় পাথর নিক্ষেপ করা। জামরা আকাবার পাথর নিক্ষেপ ==== ফিকাহর দৃষ্টিতে ওয়াজিব। ইহা করা না হইলে একটি জন্তু কুরবানী করা কর্তব্য হইয়া যায়।

আলোচ্য হাদীসটিতে সাহাবী হযরত জাবির (রা) নবী করীম (স)-এর এই পাথর নিক্ষেপের কথা উল্লেখ করিয়াছেন। নবী করীম (স) -এর কথা হইতেই এই কথা সুস্পষ্ট হয় যে, ইহা নবী করীম (স)-এর বিদায় হজ্জ-এর সময়কার পাথর নিক্ষেপ সংক্রান্ত বিবরণ।

এই পাথর নিক্ষেপের কাজ কুরবানীর দিনে করিতে হয়, তাহা উপরিউক্ত হাদীসেই বলা হইয়াছে। কিন্তু কোন সময়? হযরত জাবির (রা) বর্ণিত অপর একটি হাদীস সময়ের উল্লেখ করা হইয়াছেঃ

==========================

কুরবানীর দিন সকাল বেলা। আর ইহার পরে সূর্য যখন পশ্চিম দিকে ঢলিয়া পড়িবে তখন। সকাল বেলা পাথর নিক্ষেপ করাই যে উত্তম, তাহাতে কোন মতভেদ নাই। তবে ফজরের পূর্বে করা সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ী বলিয়াছেনঃ অর্ধ রাতেরও পূর্বে করা যাইতে পারে। ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম আহমদ প্রমুখ বলিয়াছেন, জাম্‌রার আকরার পাথর নিক্ষেপ সুর্যোদয়ের পর ছাড়া করা যাইতে পারে না।

পাথর নিক্ষেপ কিভাবে করিতে হইবে? এই পর্যায়ে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রা) সম্পর্কে একটি হাদীসে বলা হইয়াছেঃ

===================

তিনি উপত্যকার উপর উহার মাঝখানে দাঁড়াইয়া কাবামুখী হইয়া ডানদিকে পাথর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। তিনি সাতটি পাথর টুরা নিক্ষেপ করলেন। প্রতিটি পাথর টুকরা নিক্ষেপকালে তিনি আল্লাহু আকবার বলিতেছিলেন।

পাথর নিক্ষেপকালে আল্লাহু আকবার বলার পরই এই দোয়া করাও সুন্নাতঃ

========================

যে আল্লাহ্! ইহাকে হজ্জে মাবরুর (যাহার পর সব গুনাহ মাফ হইয়া যায়) গুনাহ মাফী ও কবুল করা আমল বানাইয়া দাও।

ইহা হইতে জানা গেল প্রত্যেকটি পাথর টুকরা ভিন্ন ভিন্নভাবে নিক্ষেপ করিতে হইবে। অবশ্য আতা ও ইমাম আবূ হানীফা বলিয়াছেন, একবারেই সাতটি টুকরা নিক্ষেপ করা হইলে নামায়েয হইবে না, উহাই যথেষ্ট হইবে। ================

পাথর নিক্ষেপের পরবর্তী কাজ

======================================

হযরত আবদুল্লাহ্‌ ইবনে আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, রাসূলে করীম (স) জামরা আকবায় পাথর নিক্ষেপ করিয়াছেন। অতঃপর কুরবানী দিয়াছেন। ইহার পর মাথা মুণ্ডন করিযাছেন। ——– মুননাদে আহমদ

ব্যাখ্যা মুযদালিফায় উপস্থিত হওয়ার পর শেষকালে তিনটি কাজ করিতে হয়। একটি জামরা আকাবায় পাথর নিক্ষেপ করা, কুরবানী দেওয়া ও মাথা মুণ্ডন করানো। এই কাজ তিনটি এই পরস্পরা অনুযায়ী করা বাঞ্ছনীয়, ইহাই উত্তম। তবে যদি আগে পিছে করে, তাহাতে কোন দোষ হইবে না।

জাম্‌রা আকবার পাথর নিক্ষেপই মূলত হজ্জ সংক্রান্ত যাবতীয় অনুষ্ঠানের সর্বশেষ কাজ। ইহা হইয়া লেগেই বুঝিতে হইবে, হজ্জ সম্পূর্ণ হইয়া গিয়াছে। হযরত ইবনে আব্বাস হইতে বর্ণিত, নবী করীম (স) বলিয়াছেনঃ

====================================

পাথর নিক্ষেপ কাজ সম্পূর্ণ হইয়া গেলে অতঃপর স্ত্রীসঙ্গম ছাড়া আর সব কাজই হালাল হইয়া যাইবে।

অর্থাৎ ইহরাম বাঁধার কারণে যেসব কাজ হারাম হইয়া গিয়াছিল, অতঃপর সেই সব কাজই হালাল করা যাইবে। কেননা ইহরামই শেষ হইয়া গিয়াছে। তবে স্ত্রী সঙ্গম করা এখন বন্ধ রাখিতে হইবে।

হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করিয়াছেনঃ

==========================

রাসূলে করীম (স) বলিয়াছেন, যখন তোমরা পাথর নিক্ষেপের কাজ শেষ করিলে ও মাথা মুণ্ডন করাইলে, অতঃপর তোমাদের জন্য স্ত্রীসঙ্গম ব্যতীত সুগন্ধি ব্যবহার, সেলাই করা কাপড় পরা এবং অন্যান্য সব জিনিসই হালাল হইয়া গেল।

অর্থাৎ অতঃপর মুমিনের জন্য জায়েয এমন সব কাজ করাই জায়েয। অতঃপর আর কিছুই নিষিদ্ধ থাকিল না। তবে স্ত্রীসঙ্গম এই সময়ও হালাল হইবে না। উপরিউক্ত তিনটি কাজ সুসম্পন্ন হওয়ার পর এই দিনই চতুর্থ একটি কাজ করিতে হয়, তাহা হইল কাবা ঘরের তওয়াফ। হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর (রা) বর্ণনা করিয়াছেনঃ

==================================

রাসূলে করীম (স) কুরবানীর দিনই কাবা ঘরের তওয়াফ করিয়াছেন। অতঃপর তিনি মিনায় ফিরিয়া আসিলেন এবং এখানেই জুহরের নামায পড়িলেন।

রাসূলে করীম (স) এই যে কাবা ঘরের তওয়াফ করিলেন, ইহাকে তওয়াফে ইফাযা কিংবা তওয়াফে যিয়ারত বলা হয়।

এই তওয়াফ হজ্জের রুকন। ইহা না করিলে হজ্জে পূর্ণ হইতে পারে না। এই ব্যাপারে কোন মতভেদ নাই। এই তওয়াফের জন্য দুইটি সময়। একটি কুরবানীর দিন পাথর নিক্ষেপ করা, কুরবানী করা, মাথা মুণ্ডন করানো এবং দ্বিপ্রহর পর্যন্ত তওয়াফ করা। সন্ধ্যা পর্যন্ত বিলম্ব হইলেও দোষ নাই। আর দ্বিতীয় হইল, জায়েয সময়। ইমাম আবূ হানীফার মতে কুরবানীর পরের দিন প্রথম সূর্যোদয় কাল পর্যন্ত।

উপরিউক্ত হাদীসে বলা হইয়াছে, নবী করীম (স) মক্কা হইতে মিনায় ফিরিয়া আসিয়া এখানেই জুহরের নামায পড়িয়াছেন। কিন্তু হযরত জাবির (রা) হইতে বর্ণিত ও মুসলিম শরীফে উদ্ধৃত হাদীসে বলা হইয়াছেঃ

=================================

রাসূলে করীম (স) উষ্টে আরোহণ করেন। কাবা ঘরের তওয়াফে ইফাযা করেন এবং মক্কা শরীফেই জুহরের নামায পড়িলেন।

এই দুইটি বর্ণনায় স্পষ্ট পার্থক্য রহিয়াছে। এই পার্থক্য দূর করিয়া উভয় কথার মাঝে সমন্বয় সাধনের উদ্দেশ্যে ইমাম নববী বলিয়াছেনঃ রাসূলে করীম (স) দ্বিপ্রহরের পূর্বেই তাওয়াফ শেষ করেন। পরে মক্কাতেই আউয়াল ওয়াক্তে জুহর পড়েন। অতঃপর মিনায় প্রত্যাবর্তন করিয়া সেকানে উপস্থিত সাহাবীদের সহিত আবার জুহর পড়েন। এই বারের নামায নফল মাত্র এবং এইরূপ নফল পড়া নবী করীম (স) হইতে প্রমাণিত। ইহা শরীয়াতসম্মত। ইমাম শাওকানী লিখিয়াছেনঃ নবী করীম (স) জুহরের নামায মক্কাতে পড়িয়া মিনায় কিফরিয়া আসিয়া দেখেন যে, সেখানে উপস্থিত সাহাবিগণ জুহরের নামায পড়িতেছেন। তখন তিনিও জামাআতে শরীক হইয়া গেলেন। কেননা রাসূলে করীম (স) নিজেই এই বিধান দিয়েছেন যে, একবার নামায পড়ার পর যদি দেখিতে পায় যে, সেই নামাযের জামাআত দাঁড়াইয়া গিয়াছে, তাহা হইলে সে নফল স্বরূপ সেই জামায়াতে শামিল হইয়া নামায পড়িতে পারে। ==========================

কুরবানী

=============================

হযরত যায়দ ইবনে আরকাম (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ইয়া রাসূল। এই কুরবানী কি? নবী করিম (স) বলিলেনঃ তোমাদের পিতা হযরত ইবরাহীমের সুন্নত। বলিলাম, উহা করিলে আমরা কি পাইব? বলিলেন, প্রত্যেকটি চুলের চিনিময়ে একটি করিয়া নেকী। জিজ্ঞাসা করিলামঃ ইয়া রাসূল। পশমের ব্যাপারে কি হইবে? বলিলেন, পশমের প্রত্যেকটি চুলের বদলে একটি নেকী পাওয়া যাইবে।

-ইবনে মাজাহ, হাকেম, আবূ দাউদ, মুসনাদে আহমদ, আল-মুনযিরী

ব্যাখ্যা হাদীসটিতে কুরবানীর মৌল ইতিহাসের দিকে ইংগিত করার সঙ্গে সঙ্গে উহার সুবিপুল সওয়াবের কথা বলা হইয়াছে। বস্তুত মুসলিম সমাজে প্রতিবছর ঈদুল আযহাকালে যে পশু যবাই করা হয়, ইহার পিছনে একটি দীর্ঘ মর্মান্তিক ইতিহাস রহিয়াছে। সে ইতিহাস নবীকুল মধ্যমণি হযরত ইবরাহীম এবং তাহার প্রাণধিক পুত্র (হযরত ইসমাইল)-কে কেন্দ্র করিয়া গড়িয়া উঠিয়াছে। হযরত ইসমাঈল (অথবা হযরত ইসহাক) পিতা ইবরাহীমের অত্যন্ত প্রিয় ও প্রাণধিক সন্তান ছিলেন। আল্লাহ্ তাআলা পিতা পুত্রকে অধিকতর ও উন্নততর মর্যাদা দানের উদ্দেশ্যে তাঁহাদের উভয়কে এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করিলেন। হযরত ইবরাহীম (আ)কে নির্দেশ দিলেন তাঁহার প্রিয়তম পুত্রকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে যবাই করিতে। পিতা পুত্রকে এই কথা বলিলেন পুত্র বলিলেনঃ

=====================================

হে পিতঃ আপনি নির্দেশ পালনে ব্রতী হউন। আমাকে আল্লাহ চাহিলে ধৈর্যশীলই পাইবেন। ইহার পর হযরত ইবরাহীম (আ) উদ্যোগী হইলেন। পুত্রকে যবাই করিতে প্রস্তুত হইলেন। কুরআন মজীদে বলা হইয়াছেঃ

=================================

যখন উভয়্ আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়নে প্রস্তুত হইল এবং পিতা পুত্রকে কাত করাইয়া শোয়াইয়া দিল, তখন আমি তাহাকে ডাক দিলামঃ হে ইবরাহীম। তুমি নির্দেশ পালনে সততার প্রমাণ দিয়াছ। একান্তভাবে আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্যে নিবেদিত প্রাণ লোকদিগকে এমনিভাবেই প্রতিফল দিয়া থাকি। নিঃসন্দেহ ইহা সুস্পষ্ট পরীক্ষা বিশেষ। আর পুত্র সবাইর বিনিময়ে তাহাকে এক যবাই করা মোটা তাজা জন্তু উপহার দিলাম।

বস্তুত হযরত ইবরাহীমের প্রাণাধিক পুত্র যবাইর বিনিময়ে একটা মোটা তাজা জন্তু যবাই হওয়ার সময় হইতেই এবং এই কাজে তাঁহার আদর্শের বাস্তব অনুসরণের প্রমাণ পেশ করার উদ্দেশ্যেই প্রত্যেক বৎসর ঈদুল আযহার সময়ে পশু কুরবানী করার রেওয়াজ চালু হইয়াছে। বিশেষত সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (স) মিল্লাতে ইবরাহীম পরিচিতিতেই দ্বীন-ইসরাম প্রচার করিয়াছেন, কাজেই তাঁহার উম্মতের লোকদের পক্ষে হযরত ইবরাহীমের এই দৃষ্টান্তহীন আত্মত্যাহের অনুসরণে কুরবানী করা একান্তই জরুরী। নসবী করীম (স) আলোচ্য হাদীসে কুরবানী সংক্রান্ত প্রশ্নের জওয়াবে এই কথাই বলিয়াছেন।

হাদীসে মূল বর্ণনাকারীর প্রথম প্রশ্ন উদ্ধৃত হইয়াছেঃ

===== এই উদাহী কি? ==== বহুবচনের শব্দ। একচনের ===। আসমায়ী বলিয়াছেনঃ এই শব্দটির চারিটি রূপ হইতে পারেঃ (১)  === ও === (২) ==== ও ==== ইহার বহুবচন === (৩) ==== ইহার বহুবচন ==== আর (৪) ==== ইহার বহুবচন === এই সব কয়টি রূপের মূল অর্থ সূর্যের উপরে উঠা। যেহেতু এই জন্তু যবাই করার কাজ সকালে ঈদের নামায পড়ার পর এবং সূর্যের বেশ অনেকটা উপরে উঠার পর করা হয়, এইজন্য-এই সময়ের সম্পর্কের কারণে- ইহার নামকরণ হইয়াছে আয্হা। ইমাম  ইমাম বুখারীর মতে এই হাদীসটি সনদের বিচার সহীদ্‌ নয়; কিন্তু ইহার উদ্ধৃত কারিগণের মতে ইহার সনদ সহীহ।

কুরবানীর মর্যাদা ও মাহাত্ম্য

============================================

হযরত আয়েশা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, রাসূলে করীম (স) বলিয়াছেনঃ কুরবানীর দিন কোন ব্যক্তি রক্ত ঝরানোর তুলনায় আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় ও পছন্দনীয় অন্য কোন কাজই করিতে পারে না। যবাই করা জন্তু কিয়ামতের দিন উহার শিং, পশম ও খুর লইয়া উপস্থিত হইবে। কুরবানীর রক্ত মাটিতে পড়ার পূর্বেই আল্লাহর নিকট সন্তুষ্টির মর্যাদায় পৌছিয়া যায়। অতএব  তোমরা ইহাতে মনের সুখ ও সন্তোষ নিবন্ধ কর।

– তিরমিযী, হাকেম, ইবনে মাজাহ্

ব্যাখ্যা হাদীসটি হইতে কুরবানীর ফযীলত ও মর্যাদার কথা বলা হইয়াছে। প্রথম কথা কুরবানীর দিন আল্লাহ্‌র সন্তোষ বিধানমূলক ও আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় পছন্দনীয় কাজ হইল কুরবানী করা। জয়নুল আরব ইহার অর্থ করিয়াছেন এই ভাষায়ঃ

======================

ঈদুল আযহার দিন কুরবানীর জন্তুর রক্ত ঝরানোই অতীব উত্তম ইবাদত।

কুরবানী করা জন্তুও এই কারণে বিশেষ মর্যাদা অধিকারী হইবে। এই মর্যাদা হইল, কিয়ামতের দিন জন্তুটি পূর্ণাঙ্গ হইয়া-যেমনটি দুনিয়ায় ছিল টিক তেমনি-এবং কোনরূট অঙ্গহানি ব্যতিরেকেই হাশরের ময়াদানে উপস্থিত হইবে। যেন উহার প্রত্যেকটি অংশ কুরবানীর সওয়াবের অংশ পাইতে পারে এবং কুরবানীদাতার জন্য উহা পুলসিরাত পার হওয়ার জন্য বাহন হইতে পারে। কুরবানীর সময় জন্তুটির রক্ত মাটির উপর পড়ার আগেই আল্লাহ্‌র নিকট সন্তোষ পাইয়া যায় ও কবুল হয়। অর্থাৎ যবাই করার সংকল্প ও উদ্যোগ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এবং রক্ত ঝরানোর পূর্বেই আল্লাহ্‌র নিকট গৃহীত হয়। কুরআন মজীদে এই কুরবানী সম্পর্কে বলা হইয়াছেঃ

===================

কুরবানী করা জন্তুর গোশত ও উহার রক্ত আল্লাহ্‌র নিকট কস্মিনকালেও পৌঁছায় না। বরং শুধু তোমাদের তাক্‌ওয়া-আল্লাহ্‌কে ভয় করিয়া তাঁহার সন্তোষ বিধানের ইচ্ছা ও উদ্যোগ গ্রহণই তাঁহার নিকট পৌঁছায় ও কবুল হয়। তিনি উহারই সওয়াব দেন।

বস্তুত কুরবানীর ব্যাপারে কুরবানীদাতার ঐকান্তিক নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও কেবলমাত্র আল্লাহ্‌র সন্তোষ লাভের উদ্দেশ্যই কুরবানী দেওয়ার জন্য এবং তাহাতে অন্য কোন উদ্দেশ্য যাহাতে শামিল হইতে না পারে সেই ব্যাপারে সাবধান করার জন্যই আল্লাহ্ তাআলা এই কথাটি বলিয়াছেন। ইহারই প্রেক্ষিতে রাসূলে করীম (স)-এর এই নির্দেশ লক্ষণীয়ঃ=====

অর্থাৎ তোমরা যখন জানিতে পারিলে যে, আল্লাহ্‌ তাআলা তোমাদের আল্লাহ্‌রই উদ্দেশ্যে দেওয়া কুরবানী কবুল করিবেন, উহার জন্য তোমাদিগকে বিপুলভাবে প্রতিফল দিবেন তখন মোতাদের মনে কুরবানী করার বিশেষ উৎসাহ ও উদ্দীপনা জাগ্রত হওয়া বাঞ্ছনীয়। কুরবানী দেওয়ার পর উহা করিরতে পারার জন্য আল্লাহর শোকর আদায় করিবে এবং তোমাদের মনে এই কাজের প্রতি কোনরূপ ঘৃণা বা বিদ্বেষভাব কিংবা অনীহা সৃষ্টি হওয়া কিছুতেই উচিত হইবে না।

হযরত আয়েশা (রা) হইতে বর্ণিত অপর এক হাদীসে বলা হইয়াছে, নব করীম (স) হযরত ফাতিমা (রা) কে লক্ষ্য করিয়া বলিলেনঃ

==============================

তুমি উঠ, তোমার কুরবানীর নিকট উপস্থিত হও এবং উহা দেখ। কেননা কুরবানীর যে রক্ত প্রবাহিত হয় উহার প্রতিবন্দুর বিনিময়ে আল্লাহ্‌ তাআলা তোমার অতীত গুনাহ মাফ করিয়া প্রবাহিত হয় উহার প্রতিবন্দুর বিনিময়ে আল্লাহ্‌ তাআলা তোমার অতীত গুনাহ মাফ করিয়া দিবেন। হযরত ফাতিমা (রা) বলিলেনঃ ইয়া রাসূল। আমাদের আপনার পরিবারবর্গের লোকদের জন্য উহা কি বিশেষ ব্যবস্থা, না আমাদের জন্য ও সব মুসলমানের জন্য উহা? নবী করীম (স) বলিলেন, না, বরং আমাদের ও সর্ব সাধারণ মুসলমানের জন্যই এই ব্যবস্থা – বাযযার

কুরবানীর উদ্দেশ্যে যবাই করা জন্তুর প্রবাহিত রক্তের প্রতিটি বিন্দুই যে ঈমানদার কুরবানীদাতার গুনাহ মাফীর কারণ হইবে এবং গুনাহ মাফী যে বিশেষ কোন ব্যক্তি কিংবা বিশেষ কোন পরিবারের লোকদের জন্য নয়, বরং সর্বসাধারণ মুসলমানের জন্যই এই ব্যবস্থা, তাহা এই হাদীসটি এবং এই ধরনের বর্ণিত আরো বহু হাদীস হইতে নিঃসন্দেহে জানা যায়। এই সমস্ত হাদীস সনদের বিচারে খুবই উন্নতমানের সহীহ না হইলেও ইহা গ্রহণযোগ্যতার মানে উত্তীর্ণ-হাসান, তাহাতে সন্দেহ নাই। কাজেই ইহা অবশ্য বিশ্বাস করিতেও এই বিরাট সওয়াবের আশায় কুরবানী করিতে হইবে।

প্রত্যেকটি পরিবারের প্রতি বছর কুরবানী দেওয়া

=========================

হযরত মিখনাফ ইবনে সুলাইম (রা) বলিয়াছেন, আমরা নবী করীম (স)-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি আরাফাতের ময়দানে দণ্ডায়মান অবস্থায় বলিলেনঃ হে জনগণ। নিশ্চয়ই প্রত্যেক ঘরের পরিবারের লোকদের প্রত্যেক বৎসর একটি কুরবানী করা কর্তব্য। তিনি জিজ্ঞেসা করিলেনঃ তোমরা কি জান, আতীরা কাহাকে বলে? এই হাদীসের একজন বর্ণনাকারী ইবনে আউন বলিয়াছেন, সাহাবিগণ রাসূলে করীমের এই বিজ্ঞাসার কি জওয়াব দিয়াছেন তাহা আমি জানি না। রাসূলে করীম (স) নিজেই বলিয়াছেনঃ আতীরা বলিতে তাহাই বুঝায়, যাহাকে লোকেরা রজবিয়াহ বলিত তাহাই বুঝায়, যাহাকে লোকেরা রজবিয়াহ বলিত।

ব্যাখ্যা হাদীসটিতে রাসূলে করীম (স)-এর মোটামুটি দুইটি কথা উদ্বৃত হইয়াছে। একটি হইল, প্রত্যেক পরিবার বা ঘরবাসীদের পক্ষ হইতে একটি কুরবানী দেওয়া যথেষ্ট, সে ঘর বা পরিবারের লোকসংখ্যা যাহাই হউক না কেন। আর এই কুরবানী প্রতি বছর-বছরে একবার দিতে হইবে। এমন নয় যে, জীবনে একবার দিলেই কুরবানী দেওয়ার কর্তব্য পালন হইয়া যাইবে, আর দিতে হইবে না। হজ্জ জীবনে একবার করা হইলে হজ্জের ফরযীলত আদায় হইয়া গেল; কিন্তু কুরবানী সেরূপ নয়। ইহা প্রত্যেক বৎসরই ঈদুল আযহার সময় দিত হয়।

রাসূলে করীম (স)-এর দ্বিতীয় কথাটি হইল, তিনি আতীরা বলিতে কি বুঝায় তাহা লোকদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন। তিনি নিজেই জওয়াব দিলেন যে, আতীরা ===== বলিতে তাহাই বুঝায় লোকেরা যাহাকে রজবীয়া বলে। অর্থাৎ জাহেলিয়াতের যুগে লোকেরা রজব মাসে দেবতাদের উদ্দেশ্যে একটি ছাগী যবাই করিত। কাহারো কাহারো মতে ইহা মানতের কুরবানী হইত। একজন মানত মানিত যে, সে যদি একটা বিশেষ পরিমাণের ধন-সম্পদ লাভ করিতে পারে, তাহা হইলে সে প্রতি দশটি উষ্ট্র কিংবা ছাগলের বিনিময়ে একটি রজব মাসে যবাই করিবে।

প্রথম দিক দিয়া মুসলমানরাও তাহা করিত। কিন্তু পরে উহা বাতিল ও নাকচ করা হয়। কেননা এই যবাইটা হইত মুর্তির উদ্দেশ্যে এবং উহার রক্ত মূর্তির গায়ে মাথায় লেপিয়া দেওয়া হইত। ========= শব্দটি ====== হইতে নির্গত। ইহার অর্থ যবাই করা। আর যেহেতু রজব মাসে এই যবাই হইত, এইজন্য উহাকে সাধারণত রজবীয়া বলা হইত এবং এর নামটি সর্বজনবিদিত ছিল। নবী করীম (স) তাঁহার কথায় সেই দিকে ইঙ্গিত করিয়াছেন।

ইমাম তিরমিযী এই হাদীসটিকে সনদের দিক দিয়া ==== বলিয়াছেন। কিন্তু ইমাম খাত্তাবী ইহাকে যয়ীক বলিয়াছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও কুরবানী দেওয়া আবশ্যকতা ও এই নিয়মের যর্থাথতা অনস্বীকার্য।

কুরবানী দেওয়া কি?- ওয়াজিব না সুন্নাত? ফিকাহর দৃষ্টিতে এই বিষয়টি আলোচিতব্য।

সাধারণতভাবে সাহাবিগণ ও ফিকাহর ইমামগণ মত দিয়াছেন. কুরবানী করা সুন্নাতে মুয়াক্কিদা-অবশ্য স্বচ্ছল লোকের প্রতি। তবে এই তাহার প্রতিও ওয়াজিব নয়। হযরত আবূ বকর সিদ্দিক, হযরত উমর ফারুক, হযরত বিলাল ও হযরত আবূ মাসউদ আলবদরী (রা) প্রমুখ সাহাবী সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব, আতা, আলকামা ও আসওয়াদ  প্রমুখ তাবেয়ী এবং মালিক, শাফেয়ী, আহম্মদ ইবনে হাম্বল, আবূ ইউনুফ, ইসহাক, আবূ সত্তর, আল মুজানী দাউদ ও ইবনুল মুনযিব প্রমুখ ফিকাহবিদ এই মত সমর্থন করিয়াছেন।

ইমাম আবূ হানীফা, রবীয়া, লাইস ইবনে সাদ ও আওযায়ী বলিয়াছেন, কুরবানী করা স্বচ্ছল অব্স্থার  লোকের জন্য ওয়াজিব। মুহাম্মাদ ইবনে হাসান বলিয়াছেন, নিজ বাড়ীতে উপস্থিত ও মুসাফির নয়-এমন ব্যক্তির জন্য ওয়াজিব। ইমাম আবু হানিফা সম্পর্কে বলা হইয়াছে, বাড়ীতে উপস্থিত ব্যক্তি যাকাতের নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হইলে তাহার কুরবানী দেওয়া ওয়াজিব বলিয়া তিনি মত প্রকাশ করিয়াছেন। এই মতের সমর্থকগণ তাহাদের মতের স্বপক্ষে দলীল হিসাবে উপরোদ্ধৃত হাদীস ও এই ধরনের আরো বহু হাদীস পেশ করিয়াছেন। সেই সঙ্গে কুরআনের আয়াতঃ

===========================================

অতএব তোমার আল্লাহর জন্য তুমি নামায পড় এবং কুরবানী দাও।

এই আয়াতটিও তাঁহাদের একটি বড় দলীল। তাঁহারা বলিয়াছেন, আল্লাহ তা আলা নিজেই এই আয়াতটিতে কুরবানী করার হুকুম দিয়াছেন। আর হুকুম হইলে তো তাহা পালন করা ওয়াজিব-অবশ্য কর্তব্য হইয়া যায়।

এই পর্যায়ে আর একটি হাদীস হইলঃ

====================

হযরত আবু হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, রাসূলে করীম (স) ঘোষণা করিয়াছেনঃ যে লোক অর্থ সম্পদ ও অবস্থার দিক দিয়া সামর্থ্যবান হওয়া সত্ত্বেও কুরবানী করেন না সে যেন আমার নামায পড়ার স্থানের নিকটেও আসে না।

ব্যাখ্যাঃ যে লোক সামর্থ্যবান হওয়া সত্ত্বেও কুরবানী করে না, সে যেন আমার নামায পড়ার স্থানেও অর্থাৎ আমার এই মসজিদে না আসে ও নামাযের জামাআতে শরীক না হয়। সামর্থ্যবান ব্যক্তি কে? যাহারই যাকাত ফরয হওয়া পরিমাণ সম্পদ আছে, সে-ই সামর্থ্যবান ব্যক্তি। এইরূপ ব্যক্তি কুরবানী না দিলে নবী করীম (স) তাহাকে মসজিদের কাছেও যাইতে এবং মসজিদের জামাআতে শরীক হইতে নিষেধ করিয়াছেন। এইজন্য তিনি অত্যন্ত কড়া শব্দ ও ভঙ্গি ব্যবহার করিয়াছেন। বস্তুতই ইহা অত্যন্ত কঠোর কথা। এই কথা হইতে কুরবানী করার গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা সুষ্পষ্ট হইয়া উঠে। কুরবানী না করিলে তাহার নামাযও সহীহ্ হইবে না এমন কথা অবশ্য নয়। কিন্তু রাসূলে করীমের এই কথা হইতে বুঝা যায়, যে লোক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানী দেয় না, রাসূলে করীম (স) তাহাকে সমাজের নেক লোকদের মধ্যে গণ্য করিতে প্রস্তুত নহেন। দ্বিতীয় সে লোক তাহার নিজের আমল দ্বারাই প্রমাণ করে যে, সে মুসলিম সমাজ ও জামাআতের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং মুসলিম সমাজের রীতি-নীতি ও সংস্কুতি সভ্যতা মানিয়া চলিতে সে প্রস্তুত নয়। রাসূলে করীমের এই কঠোর বাণীর মুলীভূত কারণ ইহাই। আর যে কাজের জন্যই এইরূপ কঠোর বাণী স্বয়ং রাসূলে করীমের মুখে উচ্চারিতও ধ্বনিত হইয়াছে, তাহা অবশ্যই ওয়াজিব হইবে।

যাঁহারা কুরবানী করা ,সুন্নাতে মুয়াক্কিদা বলেন, তাঁহারা উপরোদ্ধৃত আয়াতটি প্রসঙ্গে মত প্রকাশ করিয়াছেন, যে এই আয়াত হইতে কুরবানী করা ওয়াজিব প্রমাণিত হয় না। আয়াতটির বক্তব্যও তাহা নয়। বরং এই  আযাতে নামায ও কুরবানী খালিসভাবে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোনরূপ শিরকী আকীদা ব্যতিরেকেই করিবার নির্দেশ হইয়াছে। কিন্তু কুরবানী করিতেই হইবে এমন কথা নয়। তবে উহা করিলে কেবলমাত্র আল্লাহরই উদ্দেশ্যে, একমাত্র তাঁহারই সন্তোষ বিধানের জন্য করিতে হইবে, তাহাতে সন্দেহ নাই।

কিন্তু এইরূপ যুক্তি বিশ্লেষণ খুব বলিষ্ঠ ও অকাট্য বলিয়া মনে হয় না। কেননা কুরবানী যে একনিষ্ঠভাবে কেবলমাত্র আল্লাহরই জন্য করিতে হইবে, ইহাতে তো কোন দ্বিমতের অবকাশ নাই। তবে ======= কুরবানী কর আল্লাহর এই সুষ্পষ্ট নির্দেশ হইতে  যে ওয়াজিব প্রমাণিত হয়, তাহাতে সন্দেহ নাই। এতদ্ব্যতীত স্বয়ং নবী করীম (স)-ও অনুরূপভাবে এই জন্য নির্দেশই দিয়াছেন। বলিয়াছেনঃ

========================

যে লোক ঈদের নামাজের আগেই কুরবানী দিয়া বসিয়াছে, সে  যেন নামাযের পর উহার স্থলে আর একটি কুরবানী করে।

ইহা রাসূলে করীম (স)-এর আদেশ এবং রাসূলের আদেশ হইতে ওয়াজিবই প্রমাণিত হয়।। ইহা সর্বসম্মত।

ইমাম শাফেয়ী ও অন্যান্য ফিকাহ্ববিদ তাঁহাদের মতের সমর্থনে দলীল হিসাবে নিম্মোদ্ধৃত হাদীসটিতে পেশ করিয়াছেনঃ

==============================

দশ যিলহজ্জ্ব হইলে যে লোক কুরবানী করার ইচ্ছা করিবে সে যেন কুরবানী জন্তু পশম ও চামড়া স্পর্শ না করে।

এখানে বলা হইয়াছে, যদি কেহ কুরবানী করার ইচ্ছা করে। অর্থাৎ ইহা ব্যক্তির ইচ্ছাধীন ব্যাপার, বাধ্যতামূলক বা জরুরী কিছু নয়। যদি ইহা ওয়াজিবই হইত, তাহা হইলে নবী করীম (স) কাজটিকে ব্যক্তির ইচ্ছার উপর ছাড়িয়া দিতেন না।

ব্যয়হাকী হযরত ইবনে আব্বাস (রা) হইতে হাদীস উদ্ধৃত করিয়াছেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক ও হযরত উমর ফারুক (রা) কুরবানী করিতেন না এই ভয়ে যে তাহা দেখিয়া লোকেরা ইহাকে ওয়াজিব মনে করিয়া বসিবে।

ইহা উভয় মতের সমর্থনের দলীলসমূহের সংক্ষিপ্ত উল্লেখ মাত্র। কিন্তু এতদসত্ত্বেও কুরবানীর রেওয়াজ মুসলিম সমাজের শুরু হইতেই প্রচলিত হইয়া আসিয়াছে। ইহার গুরুত্ব ক্রমেই অস্বীকার করা যায় না।

হাদীসসমুহের ব্যাখ্যায় যে সব তাফসীর ও শরাহ গ্রন্থের সাহায্য লওয়া হইয়াছে, সে সবের নাম ও সংক্ষিপ্ত পরিচয়।

১.আল-জামে লি-আহকামিল কুরআন- কুরআনের তাফসীর- তাফসীরুল কুরতুবী নামে খ্যাতঃ আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে আহমদ আল আনসারী আল-কুরতুবী।

২.রুহুল মাআনী ফী-তাফসীরিল কুরআনিল আযীম ওয়াস সাবয়িল মা আনী, আবুল ফযল শিহাবউদ্দীন আস্‌সায়্যিদ মুহম্মাদ আ-লুসী আল-বাগদাদী। মৃত্যুঃ ১২৭হিজরী।

৩.লুবাবুত্‌তাবীল ফী মাআনীয়েত তানযীল-তাফসীরুল খামেনঃ আলাউদ্দীন আলী ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম আল-বাগদাদী আল খাযেন। মৃত্যুঃ ৭২৫ হিজরী।

৪.ফত্হু্ল  বারী, শরহি সহহীহল বুখারী-ইমামুল হাফেম আহ্‌মদ ইবনে আলী ইবনে হাজার আল-আসকালীন (৭৭৩-৮৫২হিঃ)।

৫.উমৃদাতুল কারী, শরহি সহীহুল বুখারীঃ শায়খুল ইসলাম বদরুদ্দীন আবু মুহাম্মাদ মাহমুদ ইবনে আহ্‌মদ মুসা আল-আইনী (৭৬২-৮৫৫হিঃ)।

৬.তুহ্‌ফাতুল আহ্‌ওয়াযী শরহি জামে তিরমিযীঃ আবুল আলী মুহাম্মাদ আবদুর রহমান ইবনে আহমদ আল-মুবারকপুরী (১২৫৩-১২৮৩হিঃ)।

৭.নববী শরহি মুসলিমঃ মুহিউদ্দিন আবু যাকারিয়া ইয়াহ্‌ইয়া ইবনে শারফ আন-নববী (৬৩১-৬৭৬হিজরী)

৮.বজ্‌লুল মজহুদ কী হল্লে আবু দাউদ। আবু ইবরাহীম খলীল আহমদ।

৯.নাইলুল আওতার-শরহি মুনতাকাল আখবার মিন্ আহাদীসে সায়্যিদিল আখ্‌ইয়ারঃ শায়খ কাযী মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনে মুহাম্মাদ আশ-শাওকানী। মৃত্যুঃ ১২৫৫হিজরী।

১০.বুলুগুল আমানী মিন আস্‌রারিল ফত্‌হির রব্বানীঃ আহমদ আবদুর রহমান আলবান্না আস্‌সায়াতী শরহি মুসনাদে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল আশ্‌-শায়বানী।

১১.মিরকাতুল মাফাতীহ শরহি মিশৃকাতুল মাসাবীহঃ আলী ইবনে সুলতান মুহাম্মাদ আলক্বারী। মৃত্যুঃ১০১৪হিজরী।

১২.আশ্‌য়াতুল-লুমাআত, শরহি মিশ্‌কাত (ফাসী) শাহ্‌ আবদুল হক্‌ মুহাদ্দিস দিহলভী।

১৩.আল-কাওকাবুদ দুররী শরহিত্‌ তিরমিযী।

১৪.যাদুল মাআদ ফী হাদিয়ে খায়রিল ইবাবদঃ ইমাম আবু আবুদুল্লাহ ইবনুল কায়্যিম আল জাওজীয়া। মৃত্যুঃ৭৫১হিজরী।

১৫.মায়ালিমুস্‌-সুনান শহরি সুনানে আবু দাউদঃ ইমাম আবু সুলায়মান হামদ্‌ ইবনে মুহাম্মাদ আল-খাত্তাবী। মৃত্যুঃ২৭৫ হিজরী।

১৬.ফত্‌হুল মুবদী শরিহ মুখতাসারুজ্‌ যুবাইদীঃ শায়খ আবদুল্লাহ্‌ আশ্‌-শারকাভী।

১৭.আহ্‌কামুল কুরআনঃ আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আরাবী।

১৮.শরহিয্‌-যারকানী আলা মুয়াত্তা ইমাম মালিক।

১৯.মা আরিফুল হাদীস (উর্দু) মাওলানা মনজুর নুমানী।

২০.আল-ফিকহু আলাল মাযাহিবিল আরবায়া (ফিকাহ)

২১.তুহ্‌ফাতুল ফুকাহাঃ আস-সামারকন্দী (ফিকাহ্‌)

২২.আল-হিদায়া।

২৩.আল-মুগনীঃ ইবনে কুদামা।

২৪.বিদায়াতুল মুজতাহিদ-ওয়া-নিহায়াতিল যুকতাসিদঃ মুহাম্মাদ ইবনে আহমদ ইবনে রুশদ আল-কুরতুবী।

২৫.ফিকহুস সুন্নাত (উর্দু)-আসিমুল হাদ্দাদ্।

 

About মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম