হাদীস শরীফ – ২য় খন্ড

অযূ

অযূর কল্যাণ

*********************************************************

হযরত আবু হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, হযরত নবী করীম (সা) বলিয়াছেনঃ মুযসলমান  বা (মুমিন) বান্দা যখন ওযু করে এবং তাহাতে সে তাহার মুখমন্ডল ধৌত করে, তখন তাহার মুখমন্ডল হইতে সর্বপ্রকারের গুনাহ-খাতা বাহির হইয়া যায়। ইহা সে তাহার দুই চক্ষু দ্বারা দেখিতে পায়। উহা বাহির হইয়া যায় অযুর পানির সঙ্গে অথবা (বলিয়া ছন) পানির শেষ বিন্দুর সঙ্গে কিংবা এই রকম কিছু বলিয়াছেন। আর যখন তাহার হস্তদ্বয় ধৌত করে, তখন তাহার হস্তদ্বয় হইতে এমন সকল গুনাহ-খাতা যাহা তাহার দুইখানি হাত কর্তৃক ানুষ্ঠিত হইয়াছে-পানির সঙ্গে অথবা (বলিয়াছেন) পানির সর্বশেষ বিন্দুর সঙ্গে ঝরিয়া পড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই ব্যক্তি সমস্ত গুনাহ হইতে মুক্ত  ও পরিচ্ছন্ন হইয়া যায়।

– তিরমিযি

ব্যাখ্যাঃ আলোচ্য হাদীসটিতে অযুর কল্যাণ সুন্দর  ও সাম্যকভাবে বর্ণিত হইয়াছে। ‘অযু’ অর্থ পবিত্র পানি দ্বারা যথা নিয়মে নির্দিষ্ট অঙ্গ-প্রতঙ্গ ধৌত করা-নিজেবক আল্লাহর ইবাদত করার উপযুক্ত করিয়া লইবার উদ্দেশ্যে পবিত্র করার নিয়্যতে। আল্লাহর ইবাদত করার উদ্দেশ্যে অযু করিয়া নিজেকে পবিত্র করা অত্যান্ত মহান ও বিপুল সওয়াবের কাজ। ইহার ফলে অনেক গুনাহ-খাতা স্বতঃই মাফ হইয়া যায়। এই মাফ হইয়া যাওয়ার ব্যাপারটি বুঝাইবার জন্য নবী করীম (সা) রূপক ভাষা ব্যবহার করিয়া গুনাহের ‘বাহির হইয়া যাওয়ার’ কথা বলিয়াছেন। গুনাহ তো কোন দেহ-সত্তা-সম্পন্ন জিনিস নয়, কাজেই উহা ‘বাহির হওয়ার’ কথাটি রূপক অর্থে মনে করিতে হইবে। আল্লামা ইবনুল আরাবী বলিয়াছেনঃ ‘গুনাহ বাহির হইয়া যায়, অর্থঃ উহা মাফ হইয়া যায়। সঠিকভাবে অযু করিলে পূর্ব কৃত গুনাহ দূর হইয়া যায়। উহা অবশিষ্ট থাকে না। ইমমি সয়ূতী বলিয়াছেন, গুনাহ বাহির হইয়া যাওয়ার এই কথাটি যথার্থ বলিয়াছেন। কেননা গুনাহ নিজে কোন দেহ-সম্পন্ন সত্তা না হইলেও বান্দা যখন গুনাহ করে তখন তাহার অন্তরে কালো চিহ্ন মুদ্রিত হইয়া পড়ে। অতঃপর অযু করিলে যে পবিত্রতা অর্জিত হয়, তাহা এই কালো চিহ্ন সম্পূর্ণ মুছিয়া ও নিশ্চিন্ন করিয়া ফেলে।

বান্দা গুনাহ করিলে ান্তরের উপর যে কালো চিহ্ন মুদ্রিত হয়, তাহা স্বয়ং নবী করীম (সা)-এরই একটি হাদীস হইতে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হইয়াছে। হযরত আবু হুরায়রা হইতে বর্ণিত অপর একটি হাদীসে রাসূলে করীম (সা) বলিয়াছেনঃ

**************************************************

বান্দা যখন গুনাহ করে, তখন তাহার অন্তরের উপর একটি চিহ্ন মুদ্রিত হয়। অতঃপর সে যদি তওবা করে, গুনাহের কাজ হইতে বিরত থাকে এবং আল্লাহর নিকট মাগফিরাত চাহে, তাহা হইলে তাহার দিল বা অন্তর পরিচ্ছন্ন  ও নির্মল হইয়া যায়। কিন্তু সে পুনারায় যদি গুনাহ করে, তাহা হইলে সেই চিহ্নটি প্রবল হয় এবং দিলের উপর চড়িয়া বসে। আর ইহা সেই ময়লা চিহ্ন যাহার কথা আল্লাহ তা’আলা নিজেই কুরআন মজীদের আয়াতে বলিয়াছেনঃ ‘নয়’ কখখনও নয়, বরং তাহাদের দিলের উপর তাহাদের নিজেদের (পাপ) কাজের দরুন ময়লা চিহ্ন লাগিয়া গিয়াছে।

-সূরা  আত-তাতফীফ এর ১৪ আয়াত

নবী করীম (সা)-এর অপর একটি বাণী হইতেও ইহার সমর্থন পাওয়া যায়। বলিয়াছেনঃ

*************************************************

(আল্লাহর ঘরের প্রাচীরে গাথা) কালো-পাথর মূলত জান্নাতের শ্বেত শুভ্র মহামূল্য প্রস্তরখন্ড। উহা বরপের অপেক্ষাও অনেক বেশী শ্বেত-শুভ্র ছিল, মুশরিকদের গুনাহ-খাতাই উহাকে কালোবর্ণ বানাইয়া দিয়েছে।

ইমাম সয়ূতী বলিয়াছেন, পাথরও যখন গুনাহগারের গুন্হ দ্বারা কালোবর্ণ হইয়া যাইতে পারে, তখন স্বয়ং গুনাহগারের দেহ বা হৃদয়পটে সে কালো চিহ্ন পড়া তো খুবই সম্ভব ব্যাপার। তাহা হইলে মূল হাদীসে যে ‘গুনাহ বাহির হইয়া যায়’ বলা হইয়াছে, তাহার ার্থ হইবেঃ

গুনাহের চিহ্ন ও প্রভাব তাহার শরীর ও মন হইতে মুছিয়া যাইবে।

হাদীসের শেষাংশে বলা হইয়াছেঃ অযুকারী অযু করা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত গুনাহ হইতেও পবিত্র হইয়া যায়। সে নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা যেসব গুনাহের কাজ করিয়াছে তাহা সব সগীরা গুনাহ-মাফ হইয়া যায়। শেষ পর্যন্ত অযূকারী গুনাহ খাতা হইতে পবিত্র পরিচ্ছন্ন হইয়া আল্লাহর ইবাদত-নামাযের জন্য প্রস্তুত হইতে পারে। ***********************************

বিনা অযুতে কুরআন পাঠ

************************************************************

আবূস সালাম হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়া জন, নবী করীম (সা) কে দেখিয়াছেন এমন একজন লোক অর্থাৎ জনৈক সাহাবী -আমাকে  বলিয়াছেন যে, নব করীম (সা) প্রস্রাব করিলেন, অতঃপর তিনি ‘অযু’ করার পূর্বে কুরআন মাজীদের কিছু অংশ পাঠ করিলেন।

-মুসনাদে আহমদ

ব্যাখ্যাঃ বিনা ‘অযূ’তে কুরআন মজীদ মুখস্ত পড়া যায় কিনা এবং বিনা ‘অযু’তে কুরআন মজীদ স্পর্শ করা জায়েয কিনা মুসলমান জনগণের পক্ষে এই দুইটি বিষয়ে ইসলামী শরীয়তের বিধান জারিয়া লওয়া একান্তই জরুরী। মুসলমানদের জীবনের আদর্শ বিধান হইল কুরআন মজীদ। দিন রাত উহা পাঠ করা, স্মরণ করা, উহা হইতে  ইসলামের বিধান জানিয়া লওয়া এবং সে জন্য উহা ধরা-স্পর্ম করা একান্তই অপরিহার্য। তাই উপরিউক্ত প্রশ্নদ্বয় এবং তাহার জওয়াব মুসলিম জীবনে অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ।

এই পর্যায়ে কুরআন মজীদের আয়াত

*********************************************

কুরআন মজীদ সর্বোত্তম পবিত্র ব্যক্তিরা ছাড়া অন্য কেহ স্পর্শ করে না।

কথাটি যদি একটি সংবাদ হয়, তাহা হইলে প্রথমত মনে করিতে হইবে যে, ইহা লওহে মাহফুযে সুরক্ষিত কুরআন মজদি সম্পর্কেই বলা হইয়াছে এবং কেবল ফেরেশতাগণ ছাড়া অন্য কেহই স্পর্শ করে না বা করিতে পারে না বলিয়া এই আয়াত দ্বারা জানাইয়া দেওয়া হইয়াছে। দ্বিতীয়ত দুনিয়ার বর্তমান কুরআন মজীদ স্পর্শ করা সম্পর্কে যদি ইহা একটি সংবাদ হয় তাহা হইলে বলিতে হইবে যে, পূর্ণ মাত্রায় পবিত্রতা অর্জন করার পরই কুরআন মজীদ স্পর্শ করা বাঞ্ছনীয়। এই পর্যায়ে আব্দুর রহমান ইবনে জায়দ বর্ণিত একটি হাদীস উল্লেখ্য। তিনি বলিয়াছেনঃ একদা আমরা বলিলাম, আপনি অযু করিয়া লইলে আমরা আপনাকে কুরআন মাজীদের একটি বিষয় জিজ্ঞাসা করিতাম। তখন তিনি বলিলেনঃ

****************************************************

তোমরা আমাকে জিজ্ঞাসা করিতে পার। আমি কুরআন স্পর্শ করিব না। কেননা উহা কেবলমাত্র পূর্ণাঙ্গ পবিত্রতা সম্পন্ন লোক ছাড়া অন্য কেহ স্পর্শ করে না। অতঃপর তিনি উক্ত আয়াতাংশ পাঠ করিলেনঃ উহা সর্বোত্তম পবিত্র লোক ছাড়া অন্য কেহ স্পর্শ করে না।

-মুসান্নাফ ইবনে আবু শায়বা, হাকেম

ইমাম শাফেয়ীও উক্ত আয়াতের ভিত্তিতে বিনা অযুতে কুরআন স্পর্শ করিতে নিষেধ করিয়াছেন। ****************** এই পর্যায়ে আর একটি দলীল হইল হযরত আমর আবনে হাজামের প্রতি নবী করমি (সা)-এর লিখিত পত্র। তাহাতে অন্যান্য নির্দেশাবলীর সঙ্গে এই কথাটিও লিখিত ছিলঃ

**********************************************

উত্তম পবিত্রতা অর্জন করা ছাড়া তোমরা কুরআন স্পর্শ করিও না।

হযরত  ইবনে উমর (রা) বলিয়াছেন, পবিত্রতা সম্পন্ন ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেহ কুরআন স্পর্শ করে না।

কুরআনের আয়াত ও হাদীসের এই সব বর্ণনা হইতে স্পষ্ট বুঝিতে পারা যায়, অপবিত্রাবস্থায় কুরআন স্পর্শ করা নিষেধ। অপবিত্রাবস্থায় কুরআন পড়া জায়েয কিনা, সেই প্রশ্ন থাকিয়া যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণিত একটি বিবরণে বলা হইয়াছে ************************** ‘নাপাক শরীরে কুরআন পাঠ করা, মুখে মুখে পড়া জায়েয’। ইমাম আবূ হানীফা (রা) হইতেও এই কথাই বর্ণিত হইয়াছে।

*******************************************************

হযরত আলী কাররামাল্লাহু অজহাহু হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, নবী করীম (সা) মল-মূত্র ত্যাগ করিয়া বাহির হইয়া আসিতেন। অতঃপর তিনি কুরআন পাঠ করিতেন এবং আমাদের সঙ্গে বসিয়া গোশত খাইতেন। ইহাতে তিনি সংকোচ বোধ করিতেন না। তিনি (হযরত আলী) প্রায়ই বলিতেনঃ নাপাক শরীর ছাড়া অন্য কোন কারণে তিনি কুরআন পড়া হইতে বিরত থাকিতেন না।

-বুখারী, মুসলিম, আবূ দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী

***************************************************

হযরত ইবনে উমর (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি নবী করমি (সা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি বলিয়াছেনঃ নাপাক শরীরে ও হায়েজ অবস্থায় কুরআনের কোন জিনিস (আয়াত বা সূরা) পড়িবে না।

-আবূ দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ

ব্যাখ্যাঃ এই দুইটি হাদীস হইতে প্রমাণিত হয় যে, নাপাক শরীরে কুরআন মজীদ স্পর্শ করা তো দূরের কথা, মুখস্তও কিছু পড়া যাইবে না। শেষোক্ত হাদীস হইতে আরো জানা গেল যে, হায়েয াবস্থা সম্পর্কেও ইসলামের এই নির্দেশ। ইমাম শাওকানী লিখিয়াছেনঃ

*********************************************

উপরের হাদীস দুইটি হইতে প্রমাণিত হয় যে, নাপাক শরীরে ও হায়েয াবস্থায় কুরআন শরীফ পড়া হারাম। *************************

তিরমিযী শরীফে হযরত আলী (রা) হইতে বর্ণিত হাদীসে বলা হইয়াছেঃ

*******************************************

নবী করীম (সা) যতক্ষণ পর্যন্ত স্ত্রী-সংগমের দরুন অপবিত্র না হইতেন, তিনি সর্বাবস্থায় আমাদিগকে কুরআন পড়াইতেন।

‘কুরআন পড়াইতেন’ অর্থ কুরআন শিক্ষা দিতেন’। ‘সর্বাবস্থায়’ অর্থঃ

****************** তিনি বা-অযূ হইতেন, কি বিনা অযূ।

মুসলিম শরীফে হযরত আয়েশা (রা) বর্ণিত হাদীসটি হইলঃ

***************************************

নবী করীম (সা) সকল সময়ই আল্লাহর যিকর করিতেন।

‘সকল সময়’ বলিতে ‘জানাবত-স্ত্রী সহবাসজনিত অপবিত্র অবস্থায়ও বুঝায়। আর ‘আল্লাহর যিকর’ বলিতে বুঝায় কুরআন পাঠও। ফলে হযরত আলী বর্ণিত হাদীস ও হযরত আয়েশা বর্ণিত এই হাদসের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়। তবে বলা যায়, হযরত আয়েশা বর্ণিত হাদীস ব্যাপক, হযরত আলী বর্ণিত হাদীস দ্বারা উহা সংকুচিত হইয়াছে। বদরুদ্দীন আইনীর মতে হাদীসদ্বযের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। কেননা হযরত আয়েশার কথার অর্থ কুরআন ছাড়া অন্যান্য যিকর অর্থাৎ কুরআন পড়া কেবল জানাবতের অবস্থায় জায়েয নয়, অন্য সময়-অর্থাৎ অযু ছাড়াও জায়েযঃ ইমাম তিনমিযী পূর্বোদ্ধৃত হাদীস উল্লেখ করার পর লিখিয়াছেনঃ

**************************************************

বিনা অযুতে কুরআন (মুখস্ত) পড়িতে পারে। কুরআন ধরিয়া উহা দেখিয়া দেখিয়া ‘তাহেজরুন’-বা অযু হওয়া ছাড়া পড়িবে না।

সুফিয়ান সওরী, ইমাম শাফেয়ী, আমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক রাহআই, ইমাম আবূ হানীফা ও ইমাম মালিক (রা) এই মত প্রকাশ করিয়াছেন।

অযূ জান্নাতের কুঞ্চিকা

*********************************************************

হযরত উমর (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, নবী করীম (সা) ইরশাদ করিয়াছেন, তোমাদের যে কেহ অযূ করিবে সে যদি (পূর্ণ নিয়ম নীতি অনুযায়ী খুব ভালো করিয়া) পূর্ণ অযূ করে এবং অযূর পর সে যদি (শাহাদতের কালেমা আরবীতে) পাঠ করেঃ আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ছাড়া কেহই ইলাহ নাই এবং মুহাম্মাদ (সা) তাঁহার বান্দা ও রাসূল, তাহা হইলে তাহার জন্য জান্নাতের আটটি দুয়ার অবশ্যই খুলিয়া যা ইবে, অতঃপর সে যে দুয়ার দিয়াই ইচ্ছা হইবে, উহাতে প্রবেশ করিতে পারিবে।

-মুসলিম।

ব্যাখ্যাঃ হাদীসের সারকথা হইল, যদি কোন লোক পুরামাত্রার ও পুরাপুরিভাবে অযু করে এবং সেই অযুর পর হাদীসে উল্লেখিত দোয়া পাঠ করে, তাহা হইলে আটটি জান্নাতের সব কয়টি দুয়ারের চাবি তাহার করায়ত্ত হইবে। সে ইহার যে কোন একটি দুয়ার দিয়া জান্নাতে প্রবেশ করিতে পারিবে।

অযু করিবার পর উপরিউক্ত দোয়া পাঠ করা এই হাদীস অনুযায়ী মুস্তাহাব। হাদীসে অযুর পরে পাঠ করিবার জন্য কয়েক প্রকারের দোয়া উদ্ধৃত হইয়াছে। এখানে কয়েকটি দোয়ার উল্লেখ করা যাইতেছেঃ

*********************************************************

আমি স্বাক্ষ্য দিতেছি যে, এক আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নাই এবং মুহাম্মাদ (সা) তাঁহার বান্দা ও রাসূল।-মুসলিম

***********************************************

হে আল্লাহ ! আমাকে তওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের একজন বানাইয়া দাও।- তিরমিযী

****************************************************

হে আল্লাহ ! তুমি সর্বদিক দিয়া পবিত্র। তোমার হামদ ও প্রশংসা সহকারে সাক্ষ্য দিতেছি যে, একমাত্র তুমি ছাড়া আর কেহ ইলাহ নাই। তোমার কেহ শরীক নাই।  আমি তোমার নিকট ক্ষমা চাহিতেছি এবং তোমারই নিকট আমি তওবা করিতেছি।

-নাসায়ী

ইমাম নববী লিখিয়াছেন, এই তিনটি দোয়া পরপর মিলাইয়া পাঠ করা আবশ্যক এবং ওয়াজিব গোসলকারীর পক্ষেও এই দোয়া পাঠ করা উচিৎ।

বস্তুত অযূর দ্বারা বাহ্যত সংশ্লিষ্ট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা ও পবিত্রতা অর্জনই মূল লক্ষ্য। এই কারণে মুমিন বান্দ অযু করার পর অনুভব করে যে, আমি সংশ্লিষ্ট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধৌত করার কাজ করিয়া অযু সংক্রান্ত শরীয়তের হুকুম তো পালন করিয়াছি, ইহার দ্বারা বাহ্যিক পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা লাভ করিয়াছি। কিন্তু আসল মলিনতা ও অপবিত্রতা হইল ইমানের দূর্বলতা, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার অভাব  এবং আমলের খারাবী। এই অনুভূতি সহকারে যদি সে কালেমায়ে শাহাদত পাঠ করিয়া ঈমানকে নূতন ও তাজা করিয়া লয়, আল্লাহর খালিস বন্দেগী ও রাসূ ল কারীমের পুরাপুরি আনুগত্যের  নূতন প্রতিম্রুতি প্রদান করে, তাহা হইলে আল্লাহ তা’আলার তরফ হইতে তাহার ক্ষমার ফয়সালাও হইয়া যায় এবং বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়ে মনের অযুও একসাথে সম্পাদিত হয়। কাজেই অযু করার পর এই দোয়া পাঠ করা একান্ত বাঞ্ছনীয়।

অযুর পাকালীন ফল

****************************************************************

হযরত আবু হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, নবী করীম (সা) ইরশাদ করিয়াছেন, কিয়ামতের দিন আমার উম্মতকে যখন ডাকা হইবে, তখন অযুর প্রভাবে তাহাদের মুখমন্ডল এবং হাত ও পা উজ্জ্বল ও আলোকোদ্ভাসিত হইবে। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক সেই আলো ও ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধি করিতে পারে ও উহাকে পূর্ণাঙ্গ করিয়া লইতে পারে, তাহার তাহা অবশ্যই করিয়া লওয়া উচিৎ।

-বুখারী, মুসলিম

ব্যাখ্যাঃ অযুর বাহ্যিক ও বৈষয়িক ফল এই যে, উহার সাহায্যে মুখমন্ডল ও হাত-পা ধৌত করার কাজ রীতিমত সম্পন্ন হয়। আর উহার আত্মিক ও আধ্যাত্মিক ফল এই যে, উহার দরুন অন্তরে পবিত্রতা নিঃশংক অনুভূতি এবং এক প্রকারের পরম পুলক ও আনন্দফুর্তির নির্মল ভাবধারার উদ্রেক হয়। ইহা সবই এই দুনিয়ার অর্জনীয়। কিন্তু অযুর এই বাহ্যিক ফলও কেবল দুনিয়াই সীমাবদ্ধ নয়। পরকালেও ইহার পরম ও মহামূল্য ফল পাওয়া যাইবে। আর তাহা এই যে, দুনিয়ায় যাহারা অযু কলা কালে সংশ্লিষ্ট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঠিক ঠিক ভাবে ও পুরাপুরি মাত্রায় ধৌত করিবে, কিয়ামতের দিন তাহাদের মুখমন্ডল এবং হাত ও পা এবং অযুতে ধুইবার জন্য নির্দিষ্ট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ উজ্জ্বল ও আলোকমন্ডিত হইবে। আর হাশরের ময়দানে  ইহাই হইবে তাহাদের অন্যান্যদের হইতে পার্থক্যসূচক বিশিষ্টতার চিহ্ন। অতএব যাহাদের অযু যতখানি পূর্ণাঙ্গ ও পূর্ণ পরিণত হইবে, তাহাদের ঔজ্জ্বল্য ততই  ব্যাপক ও উদ্ভাসিত হইবে।  এই কারণে হাদীসের শেষ ভাগে রাসূলে করীম (সা) ইরশাদ করিয়াছেন, যাহার পক্ষেই তাহার এই ঔজ্জ্বল্যকে বৃদ্ধি ও ব্যাপক করিয়া লওয়া সম্ভব, সে যেন অবশ্যই তাহা করে, তাহা করিবার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা চালাইয়া যায়। আর তাহার উপায় হইল, অযু করার সময় মনোযোগ ও চিন্তা যত্ন সহকারে প্রত্যেকটা কাজ করিবে, নিয়ম-নীতির প্রতি পুরাপুরি লক্ষ্য রাখিবে এবং কোথাও কোন অসম্পূর্ণতা বা ত্রুটিবিচ্যুতি থঅকিয়া না যাইতে পারে, সেদিকে সচেতন সতর্কতা রাখিয়া অযু করিবে।

অযু গুনাহ মায়াফী ও মর্যাদা বৃদ্ধির উৎস

**************************************************

হযরত আবু হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, নবী করীম (সা) বলিয়াছেনঃ আমি কি তোমাদিগকে সেই সব আমলের কথা বলিব না, সে সবের বরকতে আল্লাহ তা’আলা গুনাহসমূহকে মাফ করিয়া দেন  ও মর্যাদা বাড়াইয়া দেন? উপস্থিত সাহাবা বলিলেন, ‘ইয়া রাসূল ! আমাদিগকে াবশ্যই সেই সব আমলের কথা বলিবেন। তখন নবী করীম (সা) ইরশাদ করিলেনঃ কষ্ট ও অসহ্যতা সত্ত্বেও পূর্ণমাত্রায় ও ভালোভাবে অযু করা, মসজিদসমূহের দিকে খুব বেশী পা বাড়ানো  এবং  এক নামাযের পর পরবর্তী নামাযের অপেক্সায থাকা। বস্তুত ইহাই আসণ ‘রিবাত’, ইহাই প্রকৃত ‘রিবাত’।

– মুসলিম

ব্যাখ্যাঃ মূল বক্তব্যের উপর গুরুত্ব আরোপ এবং শ্রোতাদের মনে সেইদিকে অধিকতর আকৃষ্ট, আগ্রহান্বিত ও ঔৎসুক্যপূর্ণ করিয়া তুলিবার জন্য নবী করীম (সা) সপ্রায়ই ‘আমি কি তোমাদিগকে এইরূপ গুরুত্বপূর্ণ কাজের কথা বলিব না’ বলিয়া কথার সূচনা করিতেন। বস্তুত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের বিশেষ বিশেষ কথা বলিবার ইহা একটি বিশেষ স্টাইল। ইহাতে শ্রোতাবৃন্দের মন স্বভাবতই বক্তা ও তাহার বক্তব্যের দিকে আকৃষ্ট ও উদগ্রীব হইয়া ওঠে। অতঃপর যাহা কিছু বলা হয় তাহা শ্রোতাদের মনে দৃঢ়মূল হইয়া বসে। আলোচ্য হাদীসের শুরুতে নবী করীম (সা) সেই পদ্ধতিই অবলম্বন করিয়াছেন।

উপরিউক্ত হাদীসটিতে নবী করীম (সা) অযুর ফযীলত ও কল্যাণ বর্ণনা প্রসঙ্গে পরপর তিনটি আমলের ফলে কি হইবে তাহা স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন এবং তাহা যথাযথভাবে করিবার জন্য উৎসহ দান করিয়া বলিয়াছেন, এই সব আমলের ফলে গুনাহ মাফ হইয়া যায়। মানুষের পরকালীন মর্যাদা অধিক বৃদ্ধি পায়। আমল তিনটির মধ্যে প্রথম হইল, কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও পুরামাত্রায় অযু করা এবং সেই ব্যাপারে খুব তাড়াহুড়া করিয়া কাজ সমাধা না করা। কেননা তাহা সুন্নাতের পরিপন্তী। বিশেষ করিয়া কঠিন শীতের সময় অযু করা বড়ই কষ্টকর হইয়া থাকে। এ্ট সময় প্রত্যেকটি অঙ্গ (তিন তিনবার করিয়া) ধৌত করা সহজ কাজ নয়। অথবা নিকটে অল্প পরিমাণ পানি রহিয়াছে। যাহার দ্বারা পুরামাত্রায় ও সুন্নাত মুতাবিত অযু করা যায় না। ভালোভাবে অযু করিতে হইলে কিছুদূর যাইয়া পানি লইতে হয়।  এই দুইটি অবস্থার ক্ষেত্রেই  বর্তমান কথাটি প্রযোজ্য এবং এইরূপ অবস্থাও যদি কেহ ভালোভাবে ও পূর্ণমাত্রায় অযু করে, তবে উহা এমন একটি উন্নত মানের কাজ, যাহার ফলে বান্দার গুনাহ খাতা মাফ করিয়া দেওয়া হইবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরকালীন মর্যাদা খুবই উন্নত করিয়া দেওয়া হইবে।

দ্বিতীয় আমল হইল, মসজিদসমূহের দিকে খুব বেশী পা বাড়ানো। অন্য কথায় মসজিদের সাথে আন্নরিক সম্পর্ক স্থাপন। নামায পড়ার জন্য বারবার মসজিদে যাওয়া, মসজিদ দূরে অবস্থিত হইলেও তথায় গিয়া নামায পড়া অথবা প্রত্যেক নামাযে মসজিদের জামা’আতে শামিল হওয়ার জন্য যাতায়াত করা। যাহার বসবাস মসজিদ হইতে যত বেশী দূরে, সে এই মসজিদের নামায পড়ার জন্য বারবার যাওয়ার ফলে তাহার বেশী বেশী পদক্ষেপ মসজিদের দিকে হইবে।

আর তৃতীয় আমল-রাসূলে করীম (সা) এর ইরশাদ অনুযায়ী- এক নামাযের পর পরবর্তী নামাযের জন্য অপেক্ষায় থাকা এবং দিলকে সেই দিকেই নিয়োজিত রাখা। বস্তুত যে লোকের মনোভাব এইরূপ হইবে, নামায দ্বারা যে লোক মনের শান্তি, সুখ ও চরিতার্থতা লাভ করে, সে নবী করীম (সা) এর বাণী ****************** আমার চোখের শান্তি ও শীতলতা হইল নামায এর ভাবধারার কিছু কিছু অংশ লাভ করিবে।

হাদীসের শেষ ভাবে ‘ইহাই আসল রিবাত’ ‘ইহাই প্রকৃত রিবাত’ বলা হইয়াছে। ‘রিবাত’ ******** শব্দের প্রচলিত অর্থ ‘ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্তে অবস্থান করা ও পাহারা দেওয়া’। শত্রুর আক্রমণ হইতে দেশকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে যে সব মুজাহিদকে সীমান্তে নিযুক্ত করা হয়, তথায় তাহাদের অবস্থান করাকেই ‘রিবাত’ বলা হয়। বলা বাহুল্য, ইহা অত্যন্ত বড় গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক কষ্টসাধ্য কাজ। এখানে প্রতি মুহূর্তই জীবনের শংকা-বিপদ ঘনীভূত। আলোচ্য হাদীসে নবী করীম (সা) উপরিউক্ত তিনটি কাজকে ‘রিবাত’ বলিাছেন সম্ভবত এই অর্থে যে, এ তিনটি কাজই সুষ্ঠুরূপে সম্পন্ন করা হইলে শয়তানের আক্রমণ হইতে বান্দার পক্ষ্যে সুরক্ষিত থাকা অনেকটা নিশ্চিত হয়। আর শয়তানের আক্রমণ হইতে স্বীয় ঈমানকে রক্ষা করা আদর্শবাদের দৃষ্টিতে রাজ্য-সীমান্ত রক্ষা অপেক্ষাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ, সন্দেহ নাই। আর সত্যকথা এই যে, যাহারা এইসব আমলের সাহায্যে ঈমানী সীমান্তকে রক্ষা করিতে সক্ষম হয়,  ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্তের সঠিক  ও সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ তাহাদের দ্বারাই সম্ভবপর।

নামাযের জন্য অযু অপরিহার্য

***********************************************

হযরত আবু হুরায়রা হইতে বর্ণিত, তিনি বলিয়াছেন, নবী করীম (সা)  ইরশাদ করিয়াছেনঃ যে লোকের অযু নাই সে অযু করিয়া না লইলে (ও বিনা অযুতে নামায পড়িলে) তাহার নামায কবুল হইবে না।

বুখারী, মুসলিম

*******************************************

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) বলিয়াছেনঃ নবী করীম (সা) ইরশাদ করিয়াছেনঃ পবিত্রতা ব্যতীত বিশেষ  আইন ও বিধান পর্যায়ের। যেমন ইস্তিনজার হুকুম, দেহ ও কাপড় পবিত্র রাখার হুকুম, পানি পাক ব নাপাক হওয়া পর্যায়ের বিস্তারিত বিধান। আর কতকগুলি হইল নামাযের শর্ত পর্যায়ের। অর্থাৎ ইহা না করিলে নামায হইবে না। নামায পড়িতে হইলে উহার পূর্বে তাহা অবশ্যই করিয়া লইতে হইবে-ইত্যাদি ধরনের কথা। অযু এই পর্যায়ের বিধান। নামাযের জন্য অযু সম্পর্কে কুরআন মজীদে স্পষ্ট ভাষায় বলা হইয়াছেঃ

*************************************************

তোমরা যখন নামায পড়িবার জন্য দাঁড়াইবে, তখন উহার পূর্বে তাহা তোমাদের মুখমন্ডল এবং কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত কর। তোমাদের মাথা মসেহ কর। আর তোমাদের পা গিরা পর্যন্ত ধুইয়া ফেল।

এই আয়াতে বলা হইয়াছে, নামায হইল আল্লাহর প্রতি দরবারে হাযির হওয়া এবং তাঁহার সহিত কথা বলা, তাঁহার নিকট প্রার্থণা কলার একটি বিশেষ পদ্ধতি। এই কারণে এই নামায অযু সহকারেই পড়া যাইতে পারে অযু ছাড়া নয়। এই অযু নামায শুরু করার পূর্বে জায়নামাযে দাঁড়াইবারও আগে করিয়া লইতে হইবে। আল্লাহর পবিত্র দরবারে হাযির হওয়ার জন্য ইহা এক অপরিহার্য নিয়ম। এই নিয়মের ব্যতিক্রম কোনক্রমেই হইতে পারে না।

******************************************************

হযরত আলী (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, নবী করমি (সা) ইরশাদ করিয়াছেনঃ নামাযে কুঞ্জিকা হইল পবিত্র-অযু, উহার তাহরীম হইল তাকবীর এবং উহার তাহলীল হইল সালাম।

-আবূ দাউদ, তিরমিযী, দারেনী, ইবনে মাজাহ

হাদীসটি হযরত আলী (রা) ছাড়াও হযরত আবূ সাঈদ খুদরী হইতে বর্ণিত হইয়াছে।

ব্যাখ্যাঃ ‘তাহরীম’ অর্থ ‘আল্লাহু আকবর’ বলিয়া হাত বাঁধিয়া নামায শুরু করা। এই ভাবেই নামাযে প্রবেশ করিতে হয়। অতঃপর নামায শেষ হওয়া পর্যন্ত কথাবলা, চলাফেরা, নড়া-চড়া কিংবা এমন আচরণ করা যাহার কারণে তাহাকে নামাযে নিযুক্ত মনে করা যায় না-সম্পূর্ণ হারাম হইয়া যায়। এই জন্যই ইহাকে ‘তাকবীরে তাহরীমা’ বলা হয়।

আর ‘নামাযের তাহলীল হইল সালাম’-ইহার অর্থ ডান ও বাম দিকে মুখ ফিরাইয়া ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ বলিয়া নামায শেষ করিতে হয। ইহা করা হইলে সব কাজই করা হালাল এবং জায়েয হইয়া যায়, যাহা এতক্ষণ শুধু নামাযের কারণেই হারাম হইয়াছিল। এই জন্য ইহাকে নামাযের তাহলীল বলা হইয়াছে।

পবিত্রতাকে নামাযের চাবি বলার তাৎপর্য কি? কোন তালাবদ্ধ ঘরে যেমন চাবি দিয়া তালা না  খালা পর্যন্ত কাহারো কক্ষে প্রবেশ করা  সম্ভব না ঠিক তেমনিভাবে অযু ব্যতিরেকে নামাযে শামিল হওয়া কারো পক্ষে জায়েয ও বৈধ হয় না।

এই কয়টি হাদীসের বাহ্যিক শব্দে ও বর্ণনাভঙ্গীতে কিছুটা পার্থক্য থাকিলেও মূল প্রতিপাদ্য একই। আর তাহা হইল অযু ছাড়া নামায কখনই জায়েয ও গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না। অযু হইল নামাযের জন্য অপরিহার্য শর্ত। অতএব নামাযে দাঁড়াইবার আগে অযু করিয়া লইতে হইবে।

নামায যেহেতু আল্লাহর পবিত্র দরবারে হাজিরা দেওয়ার অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ এক পন্থা ও পদ্ধতি, তাই প্রত্যেক ওয়াক্তে নামাযের জন্য সমস্ত শরীর ধৌত এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও উত্তম পোশাক পরিধান করার নির্দেশ হওয়াই বাঞ্ছনীয় এবং স্বাভাবিক। কিন্তু আল্লাহ তা’আলা সম্ভবত দয়া-পরবশ হইয়াই সেরূপ আদেশ করেন নাই। শুধু এতটুকু আদেশ দিয়াই ছাড়িয়া দিয়াছেন যে, নামাযের জন্য পোষাক পাক ও পবিত্র হইতে হইবে এবং সাধারণত সমস্ত দেহ নয়, বিশেষ কয়টি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ধৌত করিলেই চলিবে। লক্ষ্য করা যাইতে পারে, অযুতে যেসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দুইতে হয, তাহাতে মোটামুটি বাহ্যিক অঙ্গ প্রায় সবই ধোয়া হইয়া যায়। আর  এই কয়টি অঙ্গ দেহের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক গুরুত্বপূর্ণও বটে। এই কারণেই এই কয়টি প্রত্যঙ্গ সমগ্র দেহের স্থলাভিষিক্ত  রূপে গণ্য হইল। এতদ্ব্যতীত মুখমন্ডল, হাত পা ও মাথা-পোষাক পরিধানের পর এই অঙ্গগুলিই বাহিরে উন্মুক্ত হইয়া থাকে। এই কারণে অযুতে কেবল এইগুলিই ধুইবার ও মসেহ করিবার নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। ইহাতে সমস্ত শরীরের পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়ার একটা স্পষ্ট অনুভূতি গড়িয়া উঠে। আর এই অনুভূতিই পবিত্রতার  প্রাণ।

অযু করার পূর্বে বিসমিল্লাহ বলা

**********************************************************

হযরত আবু হুরায়রা (রা) হযরত ইবনে মাসউদ (রা) এবং হযরত ইবনে উমর (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, নবী করীম (সা) বলিয়াছেনঃ যে লোক অযু করিল ও শুরুতে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করিল-বিসমিল্লাহ বলিল, সে এই অযু দ্বারা তাহার সমস্ত শরীরকে পাক করিয়া লইল। আর যে লোক অযু করিল কিন্তু মুরুতে বিসমিল্লাহ বলিল না, সে তাহার অযুর জন্য নির্দিষ্ট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছাড়া আর কিছুই পবিত্র করিতে পারিল না।

-দারেকুতনী

ব্যাখ্যাঃ অযুতে ফরয মাত্র চারটি, এই চারিটির কথা কুরআন মজীদের পূর্বোদ্ধৃত আয়াতে বলা হইয়াছে। তাহা হইলঃ পূর্ণ মুখমন্ডল ধৌত করা, কনুই পর্যন্ত উভয় হাত ধৌত করা, মাথা মাসেহ করা এবং দুই পা গিরা পর্যন্ত ধোয়া। এই চারিটি কাজের বাহিরে নবী করীম (সা) নিজ হইতে অযুর মধ্যে আরো কিছু কাজের ব্যবস্থা দিয়াছেন এবং তাহা করিবার জন্য উৎসাহ দান করিয়াছেন। এই কাজগুলি হইল অযুর সুন্নাত ও অন্যান্য  আদব-কায়দা। এই সবের সমন্বয়েই অযু পরিপূর্ণতা লাভ করিতে পারে। এই পর্যায়ে উল্লেখ হইল, যেমন মুখমন্ডল ও হাত পা  একবারের বদলে তিনবার করিয়া ধোয়া, দুইবার সময় মাজা-ঘষা করা, দাঁড়ি ও হাত পাযের অংগুলির মধ্যে খিলাল করা, সর্বত্র পানি পৌছাইবার দিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখা, কুলি করা ও নাকে পানি দিয়া উহার ময়লা দুর করা, কর্ণদ্বয়ের ভিতর ও বাহির উভয় দিক মসেহ করা, অযু করিতে শুরু করার সময় বিসমিল্লাহ বলা, অযু শেষে নির্দিষ্ট দোয়া পড়া-এই সব কিছুই হইল অযুযর সুন্নাত অর্থাৎ আল্লাহর নির্দেশের বাহিরে উহার সহিত সঙ্গতি রাখিয়া এবং উহার পূর্ণত্ব বিধানের উদ্দেশ্যে নবী করীমের দেওয়া ব্যবস্থা। এই প্রসঙ্গেই আলোচ্য হাদীস। ইহাতে বিসমিল্লাহ বলা সম্পর্কে রাসূলের ইরশাদ উদ্ধৃত হইয়াছে।

এই হাদীস হইতে জানা গেল যে, মূলত কেবলমাত্র অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধৌত করার নামই অযু নয়। অযুর আসল উদ্দেশ্যও তাহা নয়। আসলে অযু হইল এক ব্যক্তির সমগ্র ব্যক্তিসত্তার পরিপূর্ণ পবিত্রকরণ প্রক্রিয়া। আর তাহার নিয়ম হইল বিসমিল্লাহ কলিয়া অযু করা। ‘বিসমিল্লাহ’ বলা শুধু একটো শব্দ বা বাক্যের উচ্চরণই নয়, ইহাতে অন্তরের গভরি ভাবধারার প্রকাশ ঘটে। ইহা বলিয়া সে প্রকাশ করে যে, কেবল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধৌত করাই তাহার লক্ষ্য নয়। তাহার লক্ষ্য সমগ্র সত্তার পবিত্রতা বিধান। সে বিসমিল্লাহ বলিয়া প্রকারান্তরে ঘোষণা করে যে, সে আল্লাহর সন্তোষ লাভই তাহার চরম লক্ষ্য এবং সে আল্লাহর শিখানো পদ্ধতিতেই কাজ করিতেছে। সেই সঙ্গে সে একথারও প্রকাশ করে যে, মুসলমানের প্রত্যেকটি কাজ আল্লাহর নাম লইয়াই করা উচিত এবং আল্লাহর সন্তোষ লাভের উদ্দেশ্যে তাঁহার দেওয়া নিয়মেই করা বাঞ্ছনীয়।

বস্তুত এই ভাবে করা অযুই পূর্ণাঙ্গ অযূ। ইসলামে এই অযুই কাম্য। এইরূপ অযূ করিলেই একজন মুসলমান মন ও দেহের দিক দিয়া পরিপূর্ণ পবিত্রতা ও মুচিতা লাভ পূর্বক আল্লাহর সম্মুখে দাঁড়াইবার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে।

তবে বিসমিল্লাহ না বলিলে অযু একেবারে হইবেই না এমন নয়। অযু হইবে, তবে পূর্ণাঙ্গ নয়, অসম্পূর্ণ।

এই পর্যায়ে আর একটি হাদীস উদ্ধৃত হইতেছেঃ

*********************************************************

হযরত আবু হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন, নবী করীম (সা) ইরশাদ করিয়াছেনঃ অযু করিবার শুরুতে যে লোক বিসমিল্লাহ বলে নাই তাহার অযুই মুদ্ধ হয নাই।

-মুসনাদে আহমদ, আবূ-দাউদ, ইবনে মাজাহ

ইহা একটি হাদীসের অংশ। ইহার পূর্ণ ভাষণ এইঃ

**************************************************

যে লোক অযু করে নাই, তাহার নামায হইবে না, আর যে লোক অযু করিবার সময় বিসমিল্লাহ বলে নাই, তাহার অযুই হয নাই। [এই হাদীসটি ইয়াকুব ইবনে মালামাত হইতে-তাঁহার পিতা হইতে-হযরত আবু হুরায়রা হইতে বর্ণিত। ইমাম বুখারী বলিযাছেন, ইযাকুব ইবনে মালামাত তাঁহার পিতার নিকট হইতে ইহা শুনিয়াছেন কিংবা তাঁহার পিতা হযরত আবু হুরায়রা (রা) এর নিকট শুনিয়াছিলেন-এমন কথা জানা যায় নাই। অবশ্য দারে কুতনী ও বায়াহাকী অন্য সূত্র হইতে হাদীসটি বর্ণনা করিয়াছেন, কিন্তু এই সব সূত্রই দূর্বল। অবশ্য তাবরানী হযরত আবু হুরায়রা হইতেই অপর ভাষায় একটি হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন। তাহা হইল, নব করীম (সা) ইরশাদ করিয়াছেনঃ

************************************************

তুমি যখন অযু করিবে, তখন বিসমিল্লাহ-আলহামদুলিল্লাহ বল। কেননা তোমার রক্ষাকারীরা তোমার জন্য নেক আমল লিখিতেই থাকিবে, যতক্ষণ না তোমার অযু ভঙ্গ হইয়া যাইবে।

কিন্তু এই হাদীসের সনদও দূর্বল।]

 

অযুর পর রুমাল ব্যবহার

***********************************************

হযরত মু’আয  ইবনে জাবাল হইতে বর্ণিত, তিনি বলিয়াছেঃ আমি রাসূলে করীম (সা)-কে দেখিয়াছি, তিনি যখন অযু করিতেন, তখন তাঁহার কাপড়ের এক অংশ দ্বারা তাঁহার মুখমন্ডল মুছিয়া ফেলিতেন।

-তিরমিযী

ব্যাখ্যাঃ এই হাদীস হইতে জানা যায় যে, নব করমি (সা) অযু করিবার পর নিজের পরিধানের কাপড়ের কোন এক অংশ দ্বারা হাত ও মুখমন্ডলের পানি মুছিয়া ফেলিতেন। ইমাম তিরেমিযী উদ্ধৃত ও হযরত আয়েশা (রা) হইতে বর্ণিত অপর এক হাদীসে বলা হইয়াছেঃ অযুর পরে অযুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহ মুছিয়া ফেলিবার জন্য একখানি স্বতন্ত্র কাপড় রাসূলে করীম (সা)-এর জন্য বিশেষ ভাবে নির্দিষ্ট ছিল। অযুর পর তিনি উহার দ্বারা সিক্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মুছিয়া ফেলিবার উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। এই পর্যায়ে বর্ণিত সব কয়টি হাদীস সামনে রাখিয়া বলা যায়, শরীরের সমস্ত জামা-কাপড় সিক্ত হইতে দেওয়া কোন শরীয়তসম্মত অপরিহার্য কাজ নয়।

‘আল-মুনিয়া’ নামক ফিকাহর কিতাবে বলা হইয়াছেঃ

***********************************

অযুর পর রুমাল বা তোয়ালে ব্যবহার করা অতীব পছন্দনীয় কাজ।

ফতওয়ার কিতাব ‘কাযীখান’-এ ইহাকে ‘মুবাহ’ বলা হইয়াছে।

এক অযুতে একাধিক নামায পড়া

***********************************

আমর ইবনে আমের হইতে বর্ণিত, তিনি বলিযাছেনঃ আমি হযরত আনাস (রা) কে বলিতে মুনিয়াছি যে, নবী করীম (সা) প্রত্যেক নামাযের সময় অযু করিতেন। আমর বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনারা (সাহাবীরা) কি করিতেন? তখন হযরত আনাস বলিলেন, আমরা তো একই অযু দিয়া পর পর কয়েক ওয়াক্তের নামায পড়িতাম, যতক্ষণ না অযু ভাঙ্গিয়া যাইত।

-মুসনাদে আহমদ

ব্যাখ্যাঃ নবী করীম (সা) প্রত্যেক নামাযের সময় অযু করিতেন-ইহার অর্থ একবার অযু করিবার পর পরবর্তী নামাযের সময় তিনি নূতন করিয়া আবার অযু করিতেন এবং এই নূতন অযু দিয়াই পরবর্তী ওয়াক্তের নামায আদায় করিতেন।

হযরত ইবনে উমর বর্ণিত অপর এক হাদীসে এই কথারই সমার্থন পাওয়া যায়। উহাতে বলা হইয়াছেঃ

******************************************

নবী করীম (সা) এর অযু থাকিতেন কিংবা বিনা অযুতে-উভয় অবস্থায়ই তিনি প্রত্যেক নামাযের সময় নূতন করিয়া অযু করিবার জন্য নির্দেশিত হইয়াছিলেন।

ইমাম তাহাভী এই সম্পর্কে লিখিয়াছেনঃ

*************************************

সম্ভবত প্রত্যেক নামাযের জন্য নূতন অযু করার বিশেষভাবে তাহার জন্য ওয়াজিব ছিল। পরে মক্কা বিজয় দিবসে তাহা প্রত্যাহার করা হয়।

মুসলিম শরীফে উদ্ধৃত হইয়াছেঃ

**********************************

নবী করীম (সা) মক্কা বিজয় দিনে এক অযু দিয়া কয়েক ওয়াক্তের নামায পড়িয়াছেন।

ইহার আর একটি ব্যাখ্যা এইড হইতে পারে যে, সম্ভবত নবী করীম (সা) নিজে ভালো মনে করিয়া ই প্রত্যেক নামাযের সময় নূতন করিয়া অযু করার নিয়ম করিয়া লইয়াছিলেন। কিন্তু পরে যখন তিনি বুঝিতে পারিলেন যে, এইরূপ করিতে থাকিলে সাধারণ মুসলমানের জন্য ইহাকে ওয়াজিব করিয়া দেওয়া হইতে পারে, তখন তিনি নিজেই ইহা ত্যাগ করিলেন  এবং এক অযু দ্বারা কয়েক ওয়াক্তের নামায  আদায় করিতে থাকিলেন। কিন্তু মুসনদে আহমদ বর্ণিত উপরে উদ্ধৃত হাদীসে ‘তিনি আদিষ্ট হইয়াছিলেন’ কথা দ্বারা  এই শেষোক্ত ব্যাখ্যা আসার প্রনাণিত হইয়া যায়।

*******************************************

সুলায়মান ইবনে বুরাইদা তাঁহার পিতার নিকট হইতে শুনিয়াছেন যে, নবী করীম (সা) মক্কা বিজয়-দিনে একই অযু দ্বারা কয়েক ওয়াক্তের নামায পড়িয়াছেন। ইহা দেখিয়া হযরত উমর (না) নবী করীম (সা) কে লক্ষ করিয়া বলিলেনঃ  ইয়া রাসূল, আপনি আজ এমন একটি কাজ করিয়াছেন যাহা ইতিপূর্বে কখনো করিতেন না। উত্তরে তিনি বলিলেনঃ ইহা আমি ইচ্ছা  করিয়াই বরিয়াছি।

-মুসনাদে আহমদ, মুদলিম

‘ইতিপূর্বে কখনো করিতেন না’ অর্থ  এইরূপ করার অভ্যাস ছিল না। ‘সাধারণত এক অযু দ্বারা একাধিক নামায পড়া আপনার রীতি ছিল না। বরং প্রত্যেক ওয়াক্তে নূতন করিয়া অযু করাই আপনার চিরকালের অভ্যাস।

হযরত উমরের এই কথাটির অর্থ এ নয় যে, নবী করীম (সা) ইতিপূর্বে কখনোই এবং কোন দিনই একই অযু দিয়া একাধিক ওয়াক্তের নামায পড়েন নাই। যেমন বুখারী শরীফে হযরত সুয়াইদ ইবনে নু’মান (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছেঃ আমরা খায়বার যুদ্ধের বৎসরে নবী করীমের সাথে  বাহির হইলাম। আমরা যখন ‘সাহবা’ [ইহা খায়বারের নিকটবর্তী একটি স্থান] নামক স্থানে পৌছিলাম, তখন নবী করীম (সা) আমাদের লইয়া আসরের নামায পড়িলেন। নামাযের পর তিনি সকলের সঙ্গে পানাহার করিলেন; অতঃপর তিনি শুধু কুলি করিয়া মাগরিবের নামাযে দাঁড়াইয়া গেলেন। নূতন করিয়া অযু করিলেন না।

এই হাদীস হইতে প্রথমত প্রমাণিত হয় যে, প্রত্যেক ওয়াক্তের নামাযের জন্য নূতন করিয়া অযু করার জন্য নবী করীম (সা) আদিষ্ট ছিলেন না। কেননা তিনি আদিষ্ট হইয়া থাকিলে তাহার ব্যতিক্রম করা তাঁহার পক্ষে কিছুতেই সম্ভবপর হইত না। বরং সত্র কথা  এই যে, ইহা ছিল তাঁহার নিজের একটা সাধারণ নিয়ম। নূতন অযুসহ প্রত্যেক ওয়াক্তের নামায পড়ার প্রয়োজন দেখা দিলেও যে তিনি তাহা করিতেন না, তাহাও নয়। বুখারী উদ্ধৃদ উপরিউক্ত হাদীসটি তাহার অকাট্য প্রমাণ। মুল্লা আলী আল-কারী লিখিয়াছেনঃ

**************************************

প্রত্যেক ওযাক্তের নামাযের জন্য নূতন করিয়া অযু করা যে রাসূল কারীমের জন্য বিশেষ কোন বিধান নয়, এই হাদীস তাহারই প্রমাণ।

তিনি আরো লিখিয়াছেনঃ

**************************************

এক অযু দ্বারা একাধিক নামায পড়া যাহার পক্ষে সম্ভব সে নিৎসন্দেহে পড়িতে পারিবে। তাহার নামায মাকরূহ হইবে না, এই হাদীসই উহার প্রমাণ। ************************

প্রত্যেক প্রস্রাব-পায়খানার পর অযু

*******************************************

হযরত  আয়েশা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, নবী করীম (সা) একবার প্রস্রাব করিলেন। তখন হযরত উমর তাঁহার পিছনে পানির পাত্র লইযা দাঁড়াইলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেনঃ হে উমর, উহা কি? উমর বলিলেন, ইহাতে পানি আছে, আপনি প্রস্রাবের পর অযু করিবেন বলিয়াই ইহা লইয়া আসিয়াছি। তখন নবী করীম (সা) বলিলেনঃ আমি যখনই প্রস্রাব করিব তখনই অযু করিতে হইবে-আমাকে এমন কোন আদেশ দেওয়া হয় নাই। যদি আমি তাহা করি, তবে উহা একটা বাধ্যতামূলক ও স্থায়ীভাবে অনুসরণীয় নিয়মে পরিণত হইবে।

ব্যাখ্যাঃ এই হাদীসটি হইতে জানা গেল যে, পায়খানা-প্রস্রাব করিবার পর অযু করিতেই হইবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নাই। অবশ্য  ইহা করা মুস্তাহাব-খুবই পছন্দনীয় কাজ সন্দেহ নাই। পায়খানা করিবার পর অযু করিবার ব্যাপারটিও এইরূপ। অযু করিলে ভালই। আর নিয়মিত অযু না করিলেও অন্তত হাতমুখ ধুইয়া ফেলাও যথেষ্ট।

অযুর বিধান

***************************************

হযরত উসমান  ইবনে আফফান (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছেঃ তিনি (একদিন পানিভরা) পাত্র আনিতে বলিলেন। অতঃপর তিনি তাঁহার দুই কব্জার উপর তিনবার পানি ঢালিলেন ও কব্জাদ্বয় ধৌত করিলেন। ইহার পর পাত্রের মধ্যে তাঁহার ডান হাত ঢুকাইয়া পানি উঠাইলেন ও কুলি করিলেন এবং নাকের ছিদ্রদ্বয় পানি দ্বারা ধৌত করিলেন। তাঁহার পর তাঁহার মুখমন্ডল ও দুই কনুই পর্যন্ত দুইখানি হাত তিনবার দুইলেন। পরে মাথা মসেহ করিলেন ও পা দুইখানা গিরা পর্যন্ত তিনবার ধুইলেন। অতঃপর তিনি বলিলেনঃ আমি রাসূলে করীম (সা) কে ঠিক এইরূপে অযু করিতে দেখিয়াছি যেমন আমি (এইমাত্র) করিলাম। তাহার পর তিনি [নবী করীম (সা)] বলিয়াছেনঃ যে ব্যক্তি  আমার মত অযু করিবে ও উহার পর দুই রাকাত নামায পড়িবে এমনভাবে যে, নামাযের রাকাআতদ্বয়ের মাঝে তাহার মনে কোন খারাপ চিন্তা  আসিবে না, আল্লাহ আ’আলা তাহার পূর্বের গুনাহ মাফ করিয়া দিবেন।

-বুখারী, মুসলিম

ব্যাখ্যাঃ হাদীসটি হইতে অযুর বিস্তারিত নিয়ম ও পদ্ধতি জানা যায়। ইহার মূল বর্ণনাকারী হইতেছেন হযরত উসমানের মুক্তিপ্রাপ্ত গোলাম হুমরান। তিনি প্রথমত হযরত উসমানের অযুর বর্ণনা দিয়াছেন। সেই সঙ্গে হযরত উসমান (রা) অযু করিবার পর যাহা কিছু বলিয়াছেন, তাহাও বর্ণনা করিয়াছেন। হযরত উসমান অযু সম্পন্ন করিয়া বলিয়াছেনঃ ঠিক এইভাবেই রাসূলে করীম (সা) কে অযু করিতে দেখিয়াছি। এবং রাসূলে করীম (সা) অযু করিয়া যে কথা বলিয়াছেন, তাহাও তিনি বর্ণনা করিয়াছেন। ফলে একই হাদীস হইতে রাসূলে করীম (সা), সাহাবী ও তাবেয়ীদের অযু করিবার নিয়ম ও পদ্ধতি একসঙ্গে জানা গেল। এই দিক দিয়া হাদীসটির গুরুত্ব অপরিসীম।

এই হাদীস হইতে অযুর যে বিস্তারিত নিয়ম জানা যায় তাহা এই যে, প্রথমত হস্তদ্বয় কবজা পর্যন্ত তিনবার ধুইতে হইবে। ইহা সর্বসম্মতভাবে সুন্নাত। ইহার পর তিনবার কুলি করার নিয়ম এই যে, মুখে পানি লইয়া চারিদিকে ঘুরাইবে যেন মুখের কোন অংশে পানি পৌছাইতে বাকী না থাকে এবং যেন কন্ঠনালী পর্যন্ত পানি পৌছায় (রাজা রাখা অবস্থায়  ইহা করা মাকরূহ)। তাহার পর নূতন পানি লইয়া নাকের মধ্যে দিবে ও নাকের ছিদ্রদ্বয়ের ভিতরভাগ ভাল করিয়া দুইয়া ঝাড়িয়া ফেলিবে। ইহার পর মুখমন্ডল তিনবার নূতন পানি দ্বারা ধুইবে। ইহাতে কপালের উপর চুলের গোড়া হইতে থুতনির নীচ ও কর্ণদ্বয়ের গোড়াভাগ পর্যন্ত সবই ভালভাবে ভিজিয়া যাওয়া আবশ্যক। তাহার পর কনুইর উপর পর্যন্ত হস্তদ্বয় তিনবার করিয়া ধুইবে। তাহার পর মাথা মসেহ করিবে। মাথা মসেহ করার নিয়ম হইতেছে, ভিজা হাত দুখানি মাথার উপর লাগাইয়া ঘুরাইয়া নিবে। আর শেষ কাজ এই যে, পা’দুখানি গিরা পর্যন্ত তিনবার ভাল করিয়া ধুইবে।

সকল মুসলিমই এই সম্পর্কে একমত যে, অযুতে নির্দিষ্ট প্রত্যেকটি অঙ্গ একবার করিয়া ধৌত করা ওয়াজিব। আর তিনবার করিয়া ধোয়া সুন্নাত। ইহাই অযুর পূর্ণাঙ্গ রূপ।

মাথা মসেহ করা সম্পর্কে সামান্য মতভেদ রহিয়াছে। ইমাম শাফেয়ীর মতে তিনবার মসেহ করা মুস্তাহাব। কিন্তু ইমাম আবূ হানীফা, ইমাম মালিক, আহমদ ও অন্যান্য ইমামগণের মতে একবার মসেহ করা সুন্নাত এবং ইহার অধিক করা উচিৎ নয়।

-নববী, শরহে মুসলিম, পৃঃ ১২০

About মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম