হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ – ১ম খন্ড

প্রথম খণ্ড

প্রথম পরিচ্ছেদ

এ খণ্ডে শরীয়তের বিধি-নিষেধের রহস্যাবলী তথা কল্যাণকর তত্ত্বগুলো উদঘাটিত হবে। সেগুলো সাতটি পর্যায়ে ও সত্তরটি পরিচ্ছেদে বর্ণিত হবে। প্রথম অধ্যায়ে শরীয়ত অনুসরণ ও তার প্রতিদান সম্পর্কে আলোচিত হবে। তার প্রথম পরিচ্ছেদে থাকবে আদি সৃষ্টি, সৃষ্টি থেকে সৃষ্টি ও কার্যকারণ রীতির সৃষ্টি সম্পর্কিত পর্যালোচনা।

জানা প্রয়োজন, আল্লাহ তা’আলা গোটা সৃষ্ট জগত সৃষ্টির ব্যাপারে পর্যায়ক্রমে তিনটি পন্থা অবলম্বন করেছেন। প্রথমে তিনি অনস্তিত্ব থেকে বস্তুর অস্তিত্ব দান করেছেন। মানে, কোন উপাদান ছাড়াই শূন্যতা থেকে বস্তুতে পূর্ণতা দান করেছেন। সৃষ্টির আদি সম্পর্কে মহানবীর (সঃ) কাছে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করায় তিনি জবাব দিলেন, আদিতে স্রষ্টাই ছিলেন, অন্য কিছু ছিল না।

দ্বিতীয় পর্যায়ে এসে তিনি এক সৃষ্টি থেকে অন্য সৃষ্টির পত্তন করলেন। যেমন আদমকে মাটি ও জীনকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন। দলীল-প্রমাণ ও যুক্তি-বুদ্ধির মিলিত সিদ্ধান্ত হল এই, গোটা সৃষ্টি জগতকে আল্লাহ পাক কয়েকটি শ্রেণী ও জাতিতে সবিন্যস্ত করে রূপ দিয়েছেন। তারপর সেই জাতি ও শ্রেণীর বৈশিষ্ট্য সুনির্দিষ্ট করেছেন। যেমন, মানুষের বৈশিষ্ট্য হল বাকবিন্যাস, মসৃণ চর্ম, সরল আকৃতি ও যুক্তি-বুদ্ধি। পক্ষান্তরে অশ্বের বৈশিষ্ট্য হল হ্রেষারব, লোমশ চর্ম, বংকিম আকৃতি ও যুক্তি-বুদ্ধিহীনতা। তেমনি বিষের বৈশিষ্ট্য হল নিধন শক্তি, আদার বৈশিষ্ট্য ঝাঁঝ ও শুষ্কতা এবং কর্পূরের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কোমলতা ও শীতলতা। এ ধরনের বৈশিষ্ট্য দেখা যায় খনিজ দ্রব্য, গাছ-পালা, জীবজন্তু এবং অন্যান্য শ্রেণী ও জাতির সৃষ্টিতেও।

আল্লাহর বিধানের বিশেষত্ব এটাই, কোন বস্তু তার নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা গুণ থেকে পৃথক হতে পারে না। একই মানুষের প্রত্যেকেই যেভাবে নিজ বৈশিষ্ট্য স্বতন্ত্র হয়ে আছে। ঠিক এ অবস্থাই প্রতিটি বস্তুর গুণাগুণ ও প্রভাবের। বিশেষ-অবিশেষ সব কিছুর ভেতরেই সাধারণতঃ তার পরিচয় মিলে। কোথাও বিশেষ ভাবে তা প্রতিভাত হয়ে থাকে। বস্তু, উদ্ভিদ, জীবজন্তু ও মানুষ সবার ভেতরেই সাধারণ কিছু গুণাগুণ ও প্রভাবাদি রয়েছে। তেমনি বিশেষ গুণাগুণ ও প্রভাবাদিও বিশেষ ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়। সাধারণের দৃষ্টিতে এ বিশেষ বৈশিষ্ট্য ধরা দেয়না। সব কিছুকে তারা সাধারণ বৈশিষ্ট্য একাকার দেখতে পায়। গভীর জ্ঞানই শুধু সেই সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য উপলব্ধি করে সঠিক প্রভাবাদির সাথে তার সম্পর্ক স্থাপনে সমর্থ। মহানবী (সঃ) অনেক বস্তুর বিশেষ বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করে তার সঠিক প্রভাব নির্ধারণ করে গেছেন। যেমন তিনি বলেছেন, ‘তালবীবা (খাদ্য বিশেষ) রোগীর জন্য আনন্দ ও শক্তিবর্ধক। কালিজিরা মৃত্যুব্যাধি ছাড়া সব রোগেরই প্রতিষেধক। উটের দুধ ও প্রস্রাব দুটোই হজমের দাওয়াই। শিরাম (বিশেষ বীজ) ঝাঁঝ বিশিষ্ট’।

তৃতীয় পর্যায়ে পাই কার্যকারণ রীতির সৃষ্টি। এ রীতিতে প্রতিটি তাঁর প্রবর্তিত প্রাকৃতিক নিয়মে দেখা দেয় এবং যে সৃষ্টি থেকে তিনি যে উদ্দেশ্য সাধন করতে চান তা সে গুণ নিয়েই দেখা দেয়। যেমন মেঘ থেকে তিনি বারিপাত ঘটান। তা থেকে মাটি সজীব করে ফসল ফলান। সে ফসল দ্বারা জীবজন্তু ও মানুষ প্রতিপালন করেন। আবার দেখি, ইবরাহীম (আঃ) আগুনে নিক্ষিপ্ত হলে তাঁকে বাঁচাবার জন্য তিনি আগুনকে প্রয়োজনীয় শীতলতা দান করলেন। তেমনি আইউবের (আঃ) দেহে রাগ জীবাণু পূর্ণ করে অবশেষে তা নির্মূল করার জন্য একটি প্রস্রবণ সৃষ্টি করলেন।

এভাবে দেখি, আল্লাহ পাক দুনিয়াবাসীর দিকে একবার দৃষ্টি দিলেন। তাদের পাপাচার দেখে ক্ষুব্ধ হলেন। তারপর ওহীর মারফৎ এক নবী মনোনীত করে তাঁকে দায়িত্ব দিলেন আল্লাহর শাস্তি ও পুরস্কারের ব্যাপারে তাদের সচেতন করার। অবশেষে তাঁকে নির্দেশ দিলেন শক্তি প্রয়োগের (জেহাদের) মাধ্যমে তাদের পাপের আধাঁরপুরী থেকে উদ্ধার করে পূণ্যলোকে উদ্ভাসিত করতে।

কার্য-কারণ রীতিতে সৃষ্টির ভেতরেই যে সৃজনী শক্তি দিয়ে দেয়া হয় তা যখন পরস্পর সন্নিহিত হয়ে সংঘাতে লিপ্ত হয়, তখন আল্লাহর ইচ্ছায় তা থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়াজাত জিনিস আত্ম প্রকাশ করে। তার ভেতরে কিছু হয় মৌলিক ও কিছু থাকে কৃত্রিম। কৃত্রিমগুলোর ভেতর থাকে কোন প্রাণীর প্রক্রিয়া কিংবা ইচ্ছা অথবা এ দুয়ের ব্যতিক্রমে অন্য কিছু। তাই এ সব প্রতিক্রিয়াজাত জিনিস ও তার ধরনের ভেতরে কার্যকারণ রীতির ব্যতিক্রম বা বিপরীত কিছু দেখা দেয়াটা অন্যায় নয়।

এটা তো সাধারণ রীতি যে, কোন কিছুর অস্তিত্ব লাভের কারণ ও উদ্দেশ্য নিয়ে দি গবেষণা করা হয় তা হলে নিঃসন্দেহে তা ভার ও কল্যাণকর প্রতীয়মান হবে। দেখুন, লোহা কাটবে এটাই তার উদ্দেশ্য, তাই তা ভাল। তবে যে মানুষটিকে কাটকে সে মানুষটির জীবন খতম হয়ে যাবে, এ দৃষ্টিতে লোহার কাটবার শক্তিটা নিন্দনীয় হতে পারে। হ্যাঁ, প্রতিক্রিয়া ও প্রকৃতিতে আরও দু’ধরনের মন্দ কেথা দিতে পারে। এক, যে কল্যাণের উদ্দেশ্যে তার সৃষ্টি তাতে শূন্যতা দেখা দেয়া। দুই, কোন কল্যাণকর প্রভাবের আদৌ অনুপস্থিতি। যখন এ ধরনের মন্দ দেখা দেবার কারণ তৈরী হয়, তখন আল্লাহর অপার করুণা, পরিপূর্ণ ক্ষমতা, সর্বব্যাপী জ্ঞানের দাবী সেই সৃজনী শক্তিগুরোর ও বস্তুনীচয়ের ওপর কবজ, বাসাত, ইহালা ও ইলহামের মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করেন এবং সেগুলোকে উদ্দেশ্য অনুসারে পরিচালিত করান।

‘কবজ’ অর্থ হরণ। তার উদাহরণ এই, হাদীসে আছে, দাজ্জাল ঈমানদার ব্যক্তিটিকে দ্বিতীয়বার হত্যার প্রয়াস পাবে। কিন্তু আল্লাহ তার হত্যা করার শক্তি হরণ করবেন। যদিও হত্যার সব হাতিয়ার ও উপকরণ তার বহাল থাকবে।

বাসাত অর্থ অস্বাভাবিক। তার উদাহরণ এই, হযরত আইউবের (আঃ) আরোগ্য লাভের জন্য ফেরেশতারা চঞ্চুর ঘায়ে প্রস্রবণ তৈরী করলেন। অথচ কার্যকারণের স্বাভাবিক রীতিতে তা হয় না। তেমনি কোন কোন প্রেমিক বান্দা দ্বারা আল্লাহ জেহাদের ময়দানে এমন কাজ করান যা তার মত লোকের কিংবা তার মত কয়েকজনের পক্ষে আদৌ স্বাভাবিক নয়।

ইহালা অর্থ অসম্ভব বা অলৌকিক। যেমন, হযরত ইবরাহীম (আঃ) আগুনে নিক্ষিপ্ত হলে আগুন ঠাণ্ডা হয়ে তাঁকে শান্তিতে বাঁচিয়ে রাখল।

ইলহাম অর্থ দিব্যজ্ঞান বা অবতীর্ণ জ্ঞান। হযরত খিজির (আঃ) ও মূসার (আঃ) ভ্রমণ বৃত্তান্তটি তার উদাহরণ। নৌকাগুলো ভেংগে দেয়া, ছেলেটি হত্যা করা ও দেয়াল সংস্কার করে দেয়ার কাজ খিজির (আঃ) দিব্যজ্ঞানের নির্দেশে করেছেন। নবীদের ওপর গ্রন্থ ও বিধি-বিধান অবতীর্ণ হওয়াও ইলহামের অন্তর্ভুক্ত। ব্যক্তি বিশেষেরও প্রয়োজনীয় মুহুর্ত তা হাসিল হতে পারে। কখনও প্রয়োজনীয় ব্যক্তি সম্পর্কে অন্যের ইলহাম অর্জিত হতে পারে।

কুরআন পাকে কার্যকারণ রীতির এত সব শ্রেণী ও ধরনের বর্ণনা রয়েছে যা অতিক্রম করা কখনও কারও পক্ষে সম্ভব হবে না।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

আলম-ই-মিছাল

(স্বরূপ জগত)

জানা প্রয়োজন, অনেক হাদীসই প্রমাণ করেছে, এ রূপ জগতের পশ্চাতে এক স্বরূপ জগত রয়েছে। সেখানে মানুষের দোষ-গুণ ইত্যাদি নিজরূপে অস্তিত্ব ধারণ করে। বস্তু জগতে যতকিছু দেখা দেয় আগে তা সেই কর্ম জগতে রূপ পায়। এখানে যা পাই তা ঠিক ওখানের মতই। সাধারণের চোখে অনেক বস্তুর অস্তিত্ব ধরা দেয়না। সেগুলো সেখানে শরীরী হয়ে বিচরণ করে। মহানবী (সঃ) বলেন, ‘আল্লাহ যখন মায়া-মমতা সৃষ্টি করলেন, তখন সে দাঁড়িয়ে বলতে লাগল, যে ব্যক্ত আত্মীয়তা বিচ্ছেদের ব্যাপারে তোমাকে ভয় করবে এবং তোমার আশ্রয় চাইবে, সে আমার কাছে ঠাঁই পাবে’। তিনি আরও বলেন, ‘সূরা বাকারা ও সূরা আলে ইমরান কেয়ামতের দিন দু’খণ্ড মেঘ বা দুটো ছাতা কিংবা দু’ঝাঁক পাখীর মত ছায়া হয়ে আসবে এবং তারা তাদের পাঠকদের পক্ষ হয়ে কথা বলবে’। তিনি এও বলেন, ‘কেয়ামতের দিন সব কৃতকর্ম হাজির হবে। প্রথমে আসবে নামায। তারপর সদকা, তারপর রোজা ইত্যাদি’। অন্যত্র তিনি বলেন, হাশরের মাঠে পাপ ও পুণ্য দেহ ধারণ করে দাঁড়িয়ে যাবে। পুণ্যবানকে সুসংবাদ শুনাবে পুণ্য এবং পাপ পাপীকে বলবে, পালাও, পালাও। কিন্তু পাপী তখন পালাবার পথ পাবেনা’। আর এক স্থানে তিনি বলেন, ‘কেয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা দুনিয়ার অন্যান্য দিনগুলো যথাযথভাবে উপস্থিত করবেন। কিন্তু জুম’আর দিনটিকে অত্যন্ত শান-শওকতের সাথে হাজির করবেন’। অন্যত্র তিনি বরেন, ‘কেয়ামতের দিন পৃথিবীকে আল্লাহ নীল রংয়ের দাঁত একং কুৎসিত ও প্রশস্ত মুখবিশিষ্ট এক অতি বৃদ্ধারূপে দাঁড় করাবেন’।

একবার তিনি বললেন, ‘হে মানবমণ্ডলী! আমি যা দেখছি তা কি তোমরা দেখতে পাচ্ছ? আমি তো তোমাদের ঘরে ঘরে বৃষ্টির মত ফেতনা-ফাসাদ বর্ষিত হতে দেখছি’। মি’রাজ সম্পর্কিত হাদীসে তিনি বলেন, ‘হঠাৎ আমার সামনে চারটি প্রস্রবণ দেখা দিল। দু’টি আত্মিক ও দুটি বাহ্যিক। আমি প্রশ্ন করলাম, হে জিব্রাঈল! এ সব কি? তিনি জবাব দিলেন, আত্মিক দুটো জান্নাতের ও বাহ্যিক দুটো হল নীল ও ফোরাতের স্রোত’। সূর্য গ্রহণের হাদীস প্রসংগে তিনি বললেন, ‘আমাকে জান্নাত ও জাহান্নামের রূপ দেখানো হয়েছে’। অন্য বর্ণনা মতে তিনি বললেন, ‘কেবলাস্থিত দেয়াল ও আমার মাঝখানে বেহেশত ও দোযখ স্বরূপে দেখানো হলো’। এ হাদীসে এ কথাও বলা হয়েছে, তিনি বেহেশতের ফলের একটি গুচ্ছ নেবার জন্য হাত বাড়ালেন। তাতে এও আছে, ‘তিনি দোযখের আগুনের তেজে উহ উহ করে পিছিয়ে এলেন এবং সে আগুনে হাজীদের জিনিসপত্রের চোরকে ও বিড়াল উপোসে মারার মহিলাকে দেখতে পেলেন। তেমনি জান্নাতে তিনি পিপাসার্ত কুকুরকে পানি পান করিয়ে বাঁচাবার গণিকাটিকে দেখতে পেলেন। এটা সুস্পষ্ট যে, মহানবী (সঃ) ও মসজিদের মেহরাবের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ জায়গায় বেহেশত-দোযখের যে পরিধি সবার জানা রয়েছে তা বাহ্যত কিছুতেই ঠাঁই পেতে পারে না। অথচ অন্যত্র তিনি বলেছেন, দেখলাম, ‘জান্নাত এত কণ্ঠকাকীর্ণ যে প্রবৃত্তির তা অসহ মনে হয়, এবং জাহান্নাম এত কুসুমাস্তীর্ণ যে, প্রবৃত্তির তা খুবই পছন্দনীয়। তারপর জিব্রাঈল বললেন, নিন, এখন দেখে নিন তাদের’।

অন্যত্র তিনি বলেন, যখন বিপদের অবতীর্ণ হয়, তখন দোয়া তার সাথে লড়াই করে এবং ঠেকিয়ে রাখে। তিনি আরও বলেন, আল্লাহ জ্ঞান সৃষ্টি করে বললেন, কাছে এস। সে কাছে এল। তারপর বললেন, চলে যাও। তখন সে চলে গেল।

একস্থানে তিনি বলেছেন, ‘এ পুস্তক দুটো আল্লাহর তরফ থেকে পাঠানো হল’। তিনি আরও বলেন, ‘মৃত্যুকে দুম্বারূপ দিয়ে বেহেশত ও দোযখের মাঝখানে জবাই করা হবে’।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি মরিয়মের কাছে এক ফেরেশতা পাঠালাম, সে এক যুবকরূপে তার সামনে দেখা দিল’। হাদীসে প্রমাণ মিলে, জিব্রাঈল যখন মহানবীর কাছে আসতেন, তিনি তাঁকে দেখতে পেতেন এবং তাঁর সাথে বলতেন। অথচ উপস্থিত অন্য সবাই দেখতে পেতেন না। এও প্রমাণিত হয়েছে, মু’মিনের কবর দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে সত্তর গজ প্রশস্ত হয়ে যায়। পক্ষান্তরে কাফেরের কবর সংকীর্ণ হতে হতে তার পাঁজরের হাড় এদিক থেকে ওদিকে নিয়ে যায়। হাদীসে এও রয়েছে, কবরে ফেরেশতা এসে মৃতের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং তার কৃতকর্ম বিশেষ এক রূপ নিয়ে দেখা দেয়। এও আছে, মরণ কালে যে ফেরেশতা প্রাণ বয়ে নিয়ে আসে তার হাতে হয় রেশমী বস্ত্র, নয় তো চট থাকে। আরও আছে, কবরে মৃত ব্যক্তিকে (কাফের) ফেরেশতারা গুর্জ ও হাতুড়ি পেটা করবে। তখন তার চীৎকার জীন ও মানুষ ছাড়া চতুর্দিকে সবাই শুনতে পাবে। অন্যত্র আছে, প্রতিটি কাফেরের ওপর কবরে নিরানব্বইটি আজদাহা লেলিয়ে দেয়া হয়। কেয়ামত পর্যন্ত সেগুরো তাকে দংশন ও ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করতে থাকে।

তিনি আরও বলেন, ‘মৃতকে যখন কবরে রাখা হয়, তখন তার মনে হয়, সূর্য ডুবছে। তাই সে বসে চোখ ডলতে ডলতে ফেরেশতাদের বলে, আমাকে ছেড়ে দাওতো নামাযটা পড়ে নিই’। হাদীসে প্রমাণ মিলে, কেয়ামতের দিন হাশরে উপনীতদের আল্লাহতা’য়ালা বিভিন্ন রূপে নিজ জ্যোতি প্রদর্শন করাবেন। এও আছে, ‘মহানবী (সঃ) যখন আল্লাহর সমীপে যাবেন, তখন তনি কুরসির ওপর উপবিষ্ট থাকবেন’। আরও আছে, ‘আল্লাহ পাক বনী-আদমের সাথে সামনা সামনি বলবেন’। মোট কথা এ ধরনের অসংখ্য হাদীস রয়েছে।

এ সব হাদীস যারা দেখবে, তাদের তিনটি অবস্থার যে কোন একটি দেখা দেবেই। হয় কেউ এর প্রকাশ্য অর্থই গ্রহণ করবে। তাকে আমার বর্ণিত স্বরূপ জগতটি মেনে নিতে হবে। আহলে হাদীসের রীতি এটাই। আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতী বলেন, আমি তো হাদীসের প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করি এবং এটাই আমার মজহাব।

কেউ হয়ত বলবে, আসলে এসবের কোন কিছুই অস্তিত্ব নেবেনা, শুধু খেয়ালী দৃষ্টিতেই তা পরিদৃষ্ট হবে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ আল্লাহর ‘সেদিনের অপেক্ষা কর যেদিন আকাশ ধোঁয়াটে মনে হবে’ এ বাণী ব্যাখ্যা প্রসংগে বলেন, তাঁর সময়ে একবার দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল এবং তখন অনশনক্লিষ্ট দেহ নিয়ে ওপরে তাকালে গোটা আকাশ ধোঁয়াটে মনে হত। ইবনে মাজেফু’ন থেকে বর্ণিত আছে, যে হাদীসেই কেয়ামতের দিন আল্লাহ পাক সেদিন বান্দার দৃষ্টি এভাবে বদলে দেবেন যাতে করে তারা সেরূপ দেখতে পাবে। তারা দেখবে যেন তিনি এসে তাদের সাথে কথা বলছেন। অথচ না তিনি মূলত নিজ অবস্থান থেকে বিন্দুমাত্র নড়ছেন, না কারো সাথে কথা বলছেন। বান্দার এ অবস্থা এজন্য ঘটানো হবে যেন তারা বুঝতে পায় আল্লাহ সব কিছুই করতে পারেন।

কেউ হয়তবা বলবে, এ সব হাদীসের অন্যরূপ তাৎপর্য রয়েছে। সে সব তাৎপর্যের জন্য এ সব রূপকের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। আমার বক্তব্য হল, এ তৃতীয় মতটি কোন সত্যানুসারীর নয়।

ইমাম গাজ্জালী (রঃ) কবর আজাব সম্পর্কে বলতে দিয়ে এ তিনটি অবস্থা সম্পর্কেই ভালভাবে পর্যালোচনা করেছেন। তিনি বলেনঃ

“এ ধরনের হাদীসের বাহ্যিক অর্থ তো ঠিক, তবে তার অন্তর্নিহিত রহস্য রয়েছে। অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্নদের কাছে তা সুস্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। যে ব্যক্তি এগুলোর রহস্য জানেনা এবং কোন কিছুর অন্তর্নিহিত তত্ত্ব যার কাছে ধরা দেয়না, তার অন্তত প্রকাশ্য অর্থগুলো অস্বীকার করা উচিত নয়। বরং সত্য বরে সেগুলো মেনে নেয়া উচিত। কারণ, এটা ঈমানের নূন্যতম দাবী”।

কেউ যদি বলে, আমি কাফেরের কবর উন্মুক্ত করে দেখেছি এবং বহুদিন ধরে তার লাশ পড়ে থাকতে দেখেছি। কিন্তু বর্ণিত অবস্থাগুলো কখনও পরিদৃষ্ট হয়নি। তাই চোখে দেখা ব্যাপারের বিপরীত কথাকে কি করে সত্য বলে মেনে নেব?

তার জবাব হল এই, এ ধরনের কথা মানতে গেলে মানুষের তিনটি অবস্থা দেখা দেয়। প্রথম অবস্থাটি সব চাইতে বিশুদ্ধ, সুস্পষ্ট ও সমর্থনযোগ্য। তা হল এই, এসব কথা মূলত সত্য। নিঃসন্দেহে অজগর সাপ মৃত কাফেরকে দংশন করে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করছে। তবে এ পার্থিব চোখে আপনি সেই অপার্থিব ব্যাপারটি দেখতে পাবেন কেন? পারলৌকিক সব ঘটনাই তো আত্মিক ও অপার্থিব। দেখুন, জিব্রাঈলের (আঃ) অবতরণ সম্পর্কে সাহাবারা (রাঃ) কিরূপ আস্থা রাখতেন। অথচ তাঁরা তাঁকে দেখতে পেতেন না। তথাপি তাঁরা বিশ্বাস করতেন যে, মহানবী (সঃ) যথার্থই জীব্রাঈলকে (আঃ) দেখতে পেতেন। এক্ষণে আপনারা যদি মহানবীর (সঃ) হাদীসগুলো অবাস্তব বলে মনে করেন তো তাঁর কাছে ফেরেশতার আগমন ও ওহী অবতীর্ণ হবার কথা কি করে বিশ্বাস করবেন?

সুতরাং প্রথমে আপনাদের ঈমানের নবায়ন ও সংস্কার প্রয়োজন। যদি আপনি এ ঈমান রাখেন যে, কিছু ব্যাপার মহানবী (সঃ) দেখতেন, কিন্তু উম্মতরা দেখার ক্ষমতা রাখেনা, তা’হলে মৃতের ব্যাপারে যা যা বলা হল তা মানতে দ্বিধা আসবে কেন? ফেরেশতা যেরূপ মানুষ ও জীব-জন্তুর মত নন, তেমনি মৃতকে দংশন করার অজগর ও বিচ্ছু পার্থিব অজগর ও বিচ্ছুর মত নয়। বরং সেই অপার্থিব অজগর অন্য কিছুর তৈরী সাপ। তাই, তা দেখতে অন্য ধরনের দৃষ্টি ও অনুভব শক্তি থাকা চাই।

দ্বিতীয় অবস্থার মানুষেরা বলেন, আপনারা নিদ্রিত ব্যক্তির স্বপ্নে সাপে কাটার কথা মনে করুন। স্বপ্নে সে দংশন জ্বালায় তীব্রতাও অনুভব করে। সে জাগ্রতের মতই দংশন জ্বালায় চীৎকার করে উঠে ও ঘর্মাক্ত হয়। কখনও সে শয়নস্থল থেকে লাফিয়ে ওঠে। এ সবই সে ব্যক্তি দেখে ও অনুভব করে। কিন্তু বাহ্যত আপনি নিদ্রিতকে চুপচাপ পড়ে থাকতে দেখছেন। না তার কাছে সাপ দেখছেন, না ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন দেহ। অথচ স্বপ্নদ্রষ্টা তো সাপ-বিচ্ছু যেমন দেখছে, তেমনি তার দংশন জ্বালাও অনুভব করছে।

আপনাদের দৃষ্টিকোণ থেকে এসব হল দৃষ্টি অগোচর ব্যাপার। তথাপি স্বপ্নের সাপের দংশন জ্বালা স্বপ্নমগ্নের জন্য যখন জাগ্রত সাপের দংশন জ্বালার মতই কষ্টদায়ক, তখন এ দু’সাপের ভেতর তারতম্য কোথায়?

তৃতীয় অবস্থাটা এই, আপনারা ভালভাবেই জানেন, সাপ স্বয়ং দুঃখ-কষ্ট নয়, দুঃখ-কষ্ট রয়েছে তার বিষে। এমনকি বিষও দুঃখ-কষ্ট নয়, দুঃখ-কষ্ট তার প্রভাবজাত জ্বালায়। এখন যদি বাস্তব বিষ ছাড়া অন্য কিছু থেকেও সেই জ্বালা অনুভূত হয়, তাও তার থেকে আদৌ কম দুঃখদায়ক শাস্তি নয়। তবে সেই শাস্তির দুঃখকে সাধারণের উপলব্ধির উপযোগী করতে হলে বাস্তব কারণের উল্লেখ সম্ভব নয়। যেমন যৌন সুখ যদি কাউকে নারীর স্পর্শ ছাড়া উপলব্ধি করাতে হয় তা হরে নর-নারীর যৌন মিলনের উল্লেখ ছাড়া বুঝানো সম্ভব হয় না। এটা কার্যকারণ বুঝবার জন্য প্রয়োজন। যেন কারণ থেকে অনিবার্য কার্যের উপলব্ধি ঘটে। কার্যত যদিও কারণ অনুপস্থিত, তথাপি তার বর্ণনার মাদ্রমে তার্য জ্ঞাত করানোই উদ্দেশ্য। লক্ষ্যবস্তু কারণ নয়, কার্য।

বলা বাহুল্য, মানুষের এ জীবনের কু-অভ্যাসগুলোই মৃত্যুকালে তাকে দুঃখ-কষ্ট দেবার জন্য মওজুদ থাকে। সেগুলোর অনুশোচনা তাকে সাপের মতই দংশন করতে থাকে। যদিও তার অন্তরে সাপ উপস্থিত থাকে না।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

মালা-ই-আলো

(সর্বোচ্চ পরিষদ)

আল্লাহর সর্বোচ্চ পরিষদের মহামান্য ফেরেশতাদের বর্ণনাই এ পরিচ্ছেদের উদ্দেশ্য। আল্লাহ পাক স্বয়ং বলছেনঃ

(আরবী*********************************************************************************)

সূরা মুমিনঃ আয়াতঃ ৭-৯

“আরশ মু’আল্লার বাহক ও তা বেষ্টনকারী পরিষদ আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনায় নিরত থাকেন এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ প্রত্যয় নিয়ে ঈমানদার বান্দাদের জন্য ক্ষমা চাইতে থাকেন। তাঁরা বলতে থাকেন, হে আমাদের প্রভু! সব কিছুই ঘিরে আছে তোমার জ্ঞান ও করুণা! (তুমি সবই জান ও সবার প্রতি তোমার সহৃদয় সৃষ্টি)। তাই যে বান্দারা তোমার দিকে মুখ ফিরিয়েছে ও তোমার দেখানো সরল পথ অনুসরণ করেছে, তাদের তুমি ক্ষমা কর। তাদের দোযখের আগুন থেকে রেহাই দাও। হে আল্লাহ! তাদের ও তাদের বাপ-মা, স্ত্রী-পুত্রদের যারা ঈমানদার তাদের সবাইকে চিরন্তর জান্নাতের বাসিন্দা কর। তাদের জান্নাত দানের তুমি ওয়াদা করেছ। তুমিই সর্বশক্তিমান ও শ্রেষ্ঠতম কুশলী। হে মা’বুদ! তাদের অকল্যাণ থেকে বাঁচাও। তুমি সেদিন যাদের অকল্যাণ থেকে বাঁচাবে, তার ওপর বড়ই দয়া দেখানো হবে। এটাই চরম সাফল্য, পরম অভীষ্ট লাভ”।

রাসূল (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা যখন আরশ থেকে কোন ফরমান জারী করেন, তখণ ভয়ে ফেরেশতাদের পাখা ও পালক ঝড়পেটা হতে থাকে। তাতে পাথরে জিঞ্জীর আছড়ানোর মত ঝনৎকার শ্রুত হয়। তারপর যখন তাদের অন্তর থেকে ভয় ও অস্থিরতা দূর হয়, তখন একে অপরকে জিজ্ঞেস করেন, আল্লাহ পাক কি নির্দেশ দিলেন? তখন কেউ বলে দেন, তিনি অমুক সত্যটি প্রকাশ করেছেন এবং তিনিই সর্বোন্নত ও শ্রেষ্ঠতম।

অন্য এক বর্ণনায় এরূপ বলা হয়েছে, আল্লাহ পাক যখন কোন নির্দেশ দেন, তখন আরশবাহী ফেরেশতারা তাঁর তাসবীহ পাঠ করতে থাকেন। তারপর তা অনুসরণ করেন আরশের পার্শ্বস্ত মজলিস সদস্যরা। এ ভাবে পর্যায়ক্রমে পার্শ্বষ্থ নিম্নতর আকাশের, এমনকি দুনিয়ার ফেরেশতা পর্যন্ত তাসবীহ পাঠের অনুসরণ করে চলে। অবশেষে আরশের নিম্ন দিকের ফেরেশতারা আরশবাহী ফেরেশতাদের প্রশ্ন করেন, প্রভু তোমাদের কি নির্দেশ দিলেন? তখন তাঁরা প্রভুর নির্দেশ বলে দেন এবং তা আবার পর্যায়ক্রমে শ্রুত হয়ে সপ্ত আকাশ পেরিয়ে দুনিয়ার ফেরেশতাদের কাছে পৌঁছে যায়।

অন্যত্র তিনি বলেন, আমি তাহাজ্জুদের জন্যে জেগে উঠে ওজু সেরে আল্লাহ যতখানি তাওফিক দিলেন নামায পড়লাম। নামাযের ভেতরেই তন্দ্রা এল এবং ঘুমিয়ে পড়লাম। যখন গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন হলাম, দেখতে পেলাম, আল্লাহ পাক অত্যন্ত পবিত্র রূপে জ্যোতির্ময় হয়েছেন। তিনি বলছেন, হে মুহাম্মদ! আমি জবাব দিলাম, হে আমার প্রতিপালক! আমি উপস্থিত রয়েছি। তিনি প্রশ্ন করলেন, সর্বোচ্চ পরিষদের ফেরেশতারা কোন সম্পর্কে আলোচনা করছে? আরজ করলাম, আমার তো জানা নেই। তিনি একে একে তিনবার একই প্রশ্ন করলেন এবং আমিও একই উত্তর দিলাম।

তারপর মহানবী (সঃ) বললেন, আমি দেখলাম, তিনি আমার কাঁধের ওপর হাত রাখলেন এবং আমি তাঁর আঙ্গুলের অগ্রভাগের শীতলতা অন্তর দিয়ে অনুভভ করলাম। তারপর সে কথাগুরো আমার কাছে সুস্পষ্ট হল। তাঁর প্রশ্নের জবাবও আমার জানা হয়ে গেল। অতঃপর আল্লাহ পাক সম্বোধন করলেন, হে মুহাম্মদ! আমি জবাব দিলাম, হে আমার প্রভু! আমি হাজির আছি। তখন তিনি প্রশ্ন করলেন, হে মুহাম্মদ, উচ্চতম পরিষদ কোন ব্যাপারে আলোচনা করছে? আরজ করলাম, জামাতের (নামাযের) জন্য পথ চলা, নামজের পর (ইবাদতের জন্য) মসজিদে বসে থাকা এবং কষ্টের ভেতরেও পুরোপুরি ওজু করা। তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, এ ছাড়া আর কি আলোচ না করছে তারা? আরজ করলাম, মর্যাদার বিভিন্ন স্তর সম্পর্কে। প্রশ্ন করলেন, সেগুলো কি? আরজ করলাম, মিসকীন খাওয়ানো, সবিনয়ে কথা বলা এবং সবার ঘুমের সময়ে ইবাদত করা (তাহাজুজদ পড়া)।

অন্য এক জায়গায় তিনি বলেন, আল্লাহ যখন কোন বান্দাকে ভালবাসেন এবং বন্ধুরূপে গ্রহণ করেন, তখন জিব্রাঈলকে ডেকে বলেন, আমি অমুককে ভালবাসি, তুমিও তাকে ভালবাস। সেমতে জিব্রাঈল তাকে ভালবাসেন। তারপর আকাশমণ্ডলীতে ঘোষণা করে দেয়া হবে, অমুক ব্যক্তি আল্লাহর বন্ধু, তাকে সবাই ভালবাস। তাই আকাশের সবাই তাকে ভালবাসবেন। এভাবে তাকে পৃথিবতেও জনপ্রিয় করা হয়। অর্থাৎ সবার অন্তরে তার ভালবাসা জন্ম নেয়। তেমনি আল্লাহ যখন কাউকে খারাপ ঘৃণা করতে থাকে। সেমতে জিব্রাঈল তাকে ঘৃণা করবেন। তারপর আকাশ-মণ্ডলীর সবাইকে জানিয়ে দেয়া হবে, অমুক ব্যক্তিকে আল্লাহ পাক ঘৃণা করেন, তোমরাও তাকে ঘৃণা কর। তা শুনে সেখানে সবাই তাকে ঘৃণা করবে। অবশেষে সেই ঘৃণা পৃথিবীতেও দেখা দেবে।

মহানবী (সঃ) অন্যত্র বলেন, কেউ যদি নামাযের পর মসজিদে বসে থাকে, তাকে ফেরেশতারা ততক্ষণ দোয়া করেন যতক্ষণ না সে তাদের র্কষ্ট দেয় এবং অপবিত্র হয়। তাঁরা এ দোয়া করেন, হে আমার প্রভু! তাকে ক্ষমা কর। হে আমার প্রভু! তাকে দয়ার দৃষ্টিতে দেখ।

তিনি আরও বলেন, প্রতি ফজরে দু’জন ফেরেশতা নেমে আসেন। একজন বলেন, হে আমার প্রভু! দাতা ও (উদার হস্তে) খরচকারীকে তুমি প্রতিদানে আরও বাড়িয়ে দাও। দ্বিতীয় ফেরেশতা বলেন, হে আমার প্রভু, বখিলকে বাড়িয়ে দিও না এবং তার সম্পদ ধ্বংস কর।

উল্লেখ্য যে, শরীয়ত থেকে এ কথা প্রমাণিত হয়েছে, আল্লাহ পাকের কিছু উত্তম বান্দা রয়েছেন। তাঁরা হলেন উচ্চ মর্যাদার আল্লাহ নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতা। যে ব্যক্তি নিজকে পুণ্যবান রূপে গড়ে তোলেন এবং নিজকে সম্পূর্ণ নির্দোষ রেখে পূত চরিত্রের অধিকারী হন, এবং মানব সমাজের সংস্কার ও কল্যাণ সাধনে ব্রতী হন, সেই ফেরেশতারা তার জন্য সর্বদা দোয়া করতে থাকেন। ফলে তার ওপর রহমত ও বরকত নাযিল হয়। এ ফেরেশতারা আল্লাহর নাফরমান ও ফেতনা সৃষ্টিকারী বান্দাদের ওপর বদ-দোয়া ও অভিসম্পাত দিতে থাকেন। তাদের এ বদ-দোয়া ও অভিসম্পাতের কারণে পরিণামে নাফরমানদের অনুতপ্ত হতে হয়। আর সে কারণেই নিম্নতর আকাশের ও পৃথিবীর বাসিন্তাদের অন্তরে তাদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। খারাপ ব্যবহার করার জন্য ইলহামেও জানানো হয়। তার ফলে পৃথিবীতেও তারা দুর্ব্যবহার পায়, নশ্বর দেহ থেকে আত্মা ও বিচ্ছিন্ন হবার পরেও পায়।

এ ফেরেশতারা আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের ভেতর দূত হিসেবে কাজ করেন। তাঁরা বনি আদমের অন্তরে ভাল কথা জাগিয়ে দেন। তাঁরা যে কোন ভাবে অন্তরের ভাল ভাবগুলো জাগ্রত রাখার ব্যবস্থা করেন। আল্লাহ পাক যেভাবে তাঁদের যেখানে চান সমবেত করে মজলিস বসান। তাঁদের এ মর্যাদা ও অবস্থার জন্য পৃথক পৃথক নামে তাঁদের ডাকেন। কখনও ‘রফীকুল আলা’ (উঁচুস্তরের বন্ধু), কখনও ‘নুদীউল আলা’ (ঊর্ধ্বতম মজলিস) ও কখনও মালা-ই-আলা (উচ্চতম পরিষদ) বলে আখ্যায়িত করেন। পুণ্যবান ও নৈকট্য লাভকারী লোকদের আত্মাও তাদের ভেতর শামিল হয়। আল্লাহ পাক বলেন,

(আরবী************************************************************************)

সূরা ফাজরঃ আয়াত ২৮-৩০)

‘হে নিশ্চিন্ত আত্মাসমূহ! সানন্দে তোমাদের প্রভুর কাছে চলে এস ও আমার বান্দাদের সাথে গিয়ে মিলিত হও এবং আমার জান্নাতে এসে বাস কর।

রাসূল (সঃ) বলেন, আমি জাফর ইবনে আবু তালিবকে ফেরেশতা রূপে জান্নাতে অন্যান্য ফেরেশতারা সাথে পাখায় ভর করে উড়তে দেখেছি।

আল্লাহর সব বিধি-বিধান ও সিদ্ধান্ত প্রথমে মালা-ই-আলায় অবতীর্ণ হয়। “দুনিয়ার যে সব কাজ তাৎপর্যময় ও কল্যাণধর্মী তা এই কদরের রাতে নির্ধারিত হয়” আল্লাহর এ বাণী সংশ্লিষ্ট ব্যাপারগুলো উচ্চতম পরিষদে নির্ধারিত হয়ে থাকে। কোন না কোন ভাবে শরা-শরীয়ত এখানেই স্থিরিকৃত হয়।

স্মরণ রাখা প্রয়োজন, উচ্চতম পরিষদে তিন শ্রেণীর সদস্য রয়েছেন। প্রথম শ্রেণীর দায়িত্বে রয়েছে আল্লাহর মংগলময় ব্যবস্থাবলী। মুসাকে (আঃ) পথ প্রদর্শনের জন্য যে নূর দ্বারা আল্লাহ আগুন সৃষ্টি করেছিলেন, তা থেকেই এ শ্রেণীর ফেরেশতাদের তৈরী করে তাতে পবিত্র আত্মাগুলোর সংযোগ ঘটানো হয়েছে।

দ্বিতীয় শ্রেণীর জন্ম হয়েছে মৌল উপাদানগুলোর সংঘাতসৃষ্ট সূক্ষ্মতম ও পরম হাল্কা এক বিশেষ তাপ ও দ্যুতি থেকে। তারপর তাকে এমন উঁচু পর্যায়ের আত্মার সংযোগ ঘটানো হয়েছে যা জীব জগতের পংকিল প্রাণ প্রবাহ থেকে স্পষ্টত স্বতন্ত্র হয়ে ধরা দেয়।

তৃতীয় শ্রেণীর সদস্য হলেন আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী মানবাত্মারা। তাঁরা জীবিতাবস্থায় পুণ্যব্রতের দ্বারা মালা-ই-আলার মর্যাদা পান। অবশেষে তাঁদের আত্মা থেকে দেহরূপ আবরণটুকু খসে পড়লে তাঁরা সেখানে গিয়ে শামিল হন। তখন থেকে তাঁরা মালা-ই-আলার সদস্যরূপে গণ্য হন।

মালা-ই-আলার আসল কাজ হল প্রতিনিয়ত নিজ প্রভুর দিকে নিবিষ্ট থাকা এবং অন্য কোন ব্যস্ততাকে সেই পথে অন্তরায় হতে না দেয়া। আল্লাহ পাক যে বলেছে ন, “মালা-ই-আলা” সতত আল্লাহর স্তুতি গেয়ে ফিরে ও তাঁর পবিত্রতা বর্ণনায় মুখর থাকে এবং তাঁর ওপর সুদৃঢ় ঈমান রাখে” তার তাৎপর্য এটাই। তা ছাড়া তাঁদের অন্তরকে আল্লাহ খোদায়ী জীবন ব্যবস্থা পছন্দের ও গ্রহণের জন্য প্রস্তুত রাখেন। তেমনি তাঁরা আল্লাহ বিরোধী অন্যায় জীবন ব্যবস্থাকে খারাপ জানেন ও ঘৃণা করেন। “তারা ঈমানদারের পাপের জন্য ক্ষমা চাইতে থাকে?” আল্লাহর এ বাণীর তাৎপর্য এটাই।

উচ্চতম পরিষদের সর্বোচ্চ মর্যাদার ফেরেশতারা সেই পূণ্যত্মার চার পাশে নূরের সমাবেশ ঘটান ও তাদের সাথে মেলামেশা করেন। তারপর এরা সবাই মিলে একাত্ম হয়ে যান এবং নাম পান ‘হাজিরাতুর কুদুস’ বা পবিত্র পার্লামেন্ট।

এ পবিত্র পার্লামেন্টে এরুপ পরামর্শ করা হয় যে, বনি আদমের পার্থিব ও অপার্থিব কার্যাবলীর ব্যবস্থাপনার জন্য এবং তাদের সমস্যাবলী দূর করার জন্য কোন এক ব্যক্তিকে পূর্ণত্ব দেয়া ও তার নির্দেশ অন্য সবার ভেতরে প্রতিপাল্য করা প্রয়োজন। সে ব্যক্তিটি হবেন সেই যুগের উত্তম ব্যক্তি। এ পরামর্শ অনুসারেই যোগ্য লোকদের অন্তরে এ ইলহাম (কথা) ঢেলে দেয়া হয় যে, সেই ব্যক্তির অনুগত হয়ে তারা এমন এক জাতিতে পরিণত হবে যারা গোটা বনি আদমের সেবায় আত্মনিয়োগের যোগ্যতা অর্জন করবে। এ পরামর্শের প্রেক্ষিতেই এমন বিদ্যার চর্চা বেড়ে যায় ও দীক্ষা চলতে থাকে যা থেকে জাতি সংশোধিত হয় এবং পথের দিশা পায়।

উক্ত ইলহাম কখনও ওহী হয়ে আসে, কখনও স্বপ্নে দেখতে পায়, কখনও গায়ব আওয়াজ শোনে, কখনও বা হাজিরাতুল কুদুসের প্রতিনিধি সেই ব্যক্তিটির (নবীর) সাথে দেখা করে সরাসরি বলে দেয়। এ কারণেই সেই ব্যক্তিত্বের সহচর ও অনুচররা তাঁকে সাহায্য করতে প্রস্তুত থাকে। ফলে তাঁর সাফল্য ও মংগলের উপকরণ ও সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাঁর দুশমন ও আল্লাহর পথে প্রতিবন্ধক সৃষ্টিকারীর ওপর অভিসম্পাত বর্ষিত হয় এবং সেটা তাদের ব্যর্থতা ও দুঃখ-দুর্দশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মোট কথা, নবুয়তের অন্যায় মূলনীতির এটা অন্যতম। এ ফেরেশতাদের এরূপ স্বতন্ত্র ও স্থায়ী সিদ্ধান্তকে বলা হয় ‘তাঈদে রূহুল কুদুস’ বা পব্রি পার্লামেন্টের সহায়তা; এটা যাঁরা লাভ করেন তাঁরা নানারূপ অলৌকিক কাজ করেন ও মানুষের অসাধ্য কার্যাবলী সাধন করে থাকেন। এটাকেই বরে মু’জিযা।

এ দ্বিবিধ মালা-ই-আলার এক স্তর নীচে কিছু সংখ্যক ব্যক্তি রয়েছেন। তারা উচ্চতম মর্যাদার অধিকারী না হলেও তাদের প্রের্রণার সূক্ষ্ম ও হাল্কা তাপে সবার ভেতর এক সরল প্রকৃতি জন্ম নেয়। এ সরল প্রকৃতির সৃষ্টিরা শুধু প্রেরণা ও নির্দেশনা লাভের অপেক্ষায় থাকে। তারই প্রভাব স্রষ্টার যোগ্যতা ও প্রভাব গ্রহণের ক্ষমতার ভেতরে যখন সমতা স্থাপিত হয়, তখন তারা নিজ অস্তিত্ব ভুলে জান-মাল বাজী রেখে প্রভাবিত কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পশু-পাখী নিজের প্রাকৃতিক প্রয়োজনে যেভাবে ছুটে যায়, তেমনি ছুটে যায় তারা ওপর ওয়ালার ইংগিতে।

সুতরাং তাঁদের কাজই হচ্ছে মানুষ ও জীবজন্তুর ভেতর প্রভাব সৃষ্টি করা। সে সবের ধ্যান-ধারনা ও ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাকে তাঁরা নিজেদের অভিপ্রায় অনুসারে পরিচালিত করেন। যদি কোন পাথর নড়ে কিংবা চঞ্চল হয়, কোন বুজুর্গ ফেরেশতা সেটাকে চঞ্চল ও গতিশীল করেন। তেমনি কোন শিকারী যখন নদীতে জাল ফেলেন, তখন একদল ফেরেশতা কোন কোন মাছের ভেতর জালে ফেঁসে যাবার ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং কোন মাছকে ভেগে যাবার ভাবনা দান করেন। সেমতে কোন ফেরেশতা রশি টেনে ধরে এবং কোন ফেরেশতা রশি ঢিল দেয়। মাছগুলোও জানে না তাদেরকে কি করছে ও কেন করছে। তাদের মনে যা ইলহাম হয় তা-ই তারা করে যায়। তেমনি দু’দল সৈন্য যখন লড়াইয়ে লিপ্ত হয়, তখন ফেরেশতারা এসে এক দলের প্রাণে সাহস ও অস্ত্র চালনার শক্তি যোগান এবং অন্য দলের প্রাণে দুর্বলতা ও হাতে শিথিলতা এনে দেন। তাদের উদ্দেশ্য থাকে যার কর্মে যে পরিণতি রয়েছে সেটাকে বাস্তবায়িত করে দেয়া। কখনও তাঁদের ওপর নির্দেশ আসে মানুষকে সুখ-শান্তি কিংবা দুঃখ-দুর্দশা পৌঁছে দেয়ার। তখন তারা সে কাজে আত্মনিয়োগ করে।

এ ফেরেশতাদের বিপরীত দিকে এমন একটি দল রয়েছে যাদের ভেতর রয়েছে খেলো প্রকৃতির রাগ ও পাপ প্রবণতা। তারা উত্তপ্ত আঁধার থেকে জন্ম নেয়। তাদের বলা হয় শয়তান। এ শয়তানরাই ফেরেশতাদের প্রয়াস ব্যর্থ করার জন্য পাল্টা প্রচেষ্টা চালিয়ে থাকে।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

আল্লাহর অনড় বিধান

(আরবী**********************************)

সূরা আহযাবঃ ৬২

“আল্লাহর প্রকৃতিতে তুমি কোন পরিবর্তন দেখতে পাবেনা”। কুরআনের এ আয়াতের ওপর এ অধ্যায়ে আলোচা করা হবে।

এ কথা সুস্পষ্ট যে, সৃষ্টি জগতে আল্লাহর কিছু কাজ তাঁর প্রবর্তিত কোন না কোন প্রাকৃতিক শক্তির ভিত্তিতে বিন্যস্ত হয়ে থাকে। উদ্ধৃতি ও যুক্তিবুদ্ধি উভয় থেকেই এর সমর্থন মিলে। মহানবী (সঃ) বলেন, আল্লাহ পাক গোটা দুনিয়ার এক মুষ্টি মাটি দিয়ে আদমকে তৈরী করেছেন। এ কারণে আদম সন্তান লাল, কালো কিংবা দুয়ের মাঝামাঝি বর্ণের এবং নম্র বা রুক্ষ ও ভাল বা মন্দ প্রকৃতির হয়ে থাকে।

একবার আবদুল্লাহ ইবদে সালাম রাসূলুল্লাহকে প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! বাচ্চা কি ভাবে মা কিংবা বাপের অনুরূপ হয়? তিনি জবাব দিলেন, বাপের বীর্য অগ্রগামী হয়, তা হলে বাপের অনুরূপ হয় এবং মায়ের বীর্য অগ্রগামী হলে মায়ের অনুরূপ হয়। তেমনি সবাই জানে, বিষ পানে কিংবা তরবারীর ঘায়ে মানুষকে মৃত্যু ঘটে। মায়ের জরায়ুতে বীর্য প্রবিষ্ট হলে সন্তান জন্ম নেয়। তরকারী ও গাছ পালা কর্ষণ ও পানি সিঞ্চনে উৎপন্ন হয়।

ঠিক এ শক্তির উপস্থিতির কারণেই মানুষকে (শরীয়তের) দায়িত্ব চাপানো হয়েছে। আদেশ ও নিষেধের মাধ্যমে তাদের পুরস্কার ও তিরস্কারের যোগ্য বিবেচনা করা হয়েছে।

আল্লাহর সৃষ্ট ও প্রাকৃতিক শক্তি কয়েক শ্রেণীতে বিভক্ত। এক, যে শক্তি জড় উপাদানের গুণাগুণ (তাপ, শুষ্কতা, আর্দ্রতা ইত্যাদি) সৃষ্টি করে। দুই, রূপান্তর ও শ্রেণীভেদের ক্ষেত্রে আল্লাহ পাক যে শক্তিকে সক্রিয় রেখেছেন। তিন, যে শক্তি জগজগতে আত্মপ্রকাশের পূর্বে ছায়া জগতে সব কিছুর বিকাশ ঘটায়। চার, পরিমার্জিত ও পুণ্য চরিত্রের মানুষের জন্য উচ্চতম পরিষদের মনে-প্রাণে দোয়া ও তাদের পরিপন্থীদের জন্য মনে-প্রানে বদ দোয়া থেকে যে শক্তির উদ্ভব হয়। পাঁচ, শরীয়ত তথা আল্লাহর বিধি-নিষেধের শক্তি। যে শক্তির প্রভাবে তার অনুসারীরা সাফল্য অর্জন করে ও উপেক্ষাকারীরা ব্যর্থথার মুখ দেখে।

ছয়, যে শক্তি সৃষ্টির কারণ হয়ে আসে। আল্লাহ পাক কোন কিছু সৃষ্টি হওয়ার নির্দেশ জারী করলে তার কারণটি আগে সৃষ্টি হয়। এ কারণটি শক্তিরূপে সৃষ্টির কাজ দেয়। আল্লাহ চান সৃষ্টিজগতটি কার্যকারণ শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাক। অন্যথায় বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টিজগত ধ্বংস করে দেবে। এ ষষ্ঠ শক্তির উদাহরণ প্রসংগে নবীর (সঃ) এ বক্তব্য নেয়া যায়, ‘আল্লাহ যদি চান অমুক ব্যক্তির অমুক স্থানে মৃত্যু হোক, তখন তার সেখানে পৌছার একটি কারণ সৃষ্টি হয়ে যায়।

এ সব কথা হাদীস ও যুক্তি দ্বারা সুপ্রমাণিত হয়ে আছে।[সব কথার সারকথা হল এই, আল্লাহ এ সব স্বনির্ধারিত প্রাকৃতিক রীতি বা শক্তির মাধ্যমে কাজ করে থাকেন। কেউ কাউকে তরবারীর আঘাত করলে তিনি মৃত্যু দান করেন। বীর্য ছাড়া সন্তান উৎপাদনের শক্তি আল্লাহর থাকা সত্ত্বেও সেটাকেই তিনি এ জগতে মানব জন্মের মাধ্যম করেছেন।]

জানা প্রয়োজন, যে সব মাধ্যম শক্তির ভিত্তিতে তিনি নিজ মর্জী ও নির্দেশ কার্যকরী করেন, কখনও সেগুলো পরস্পর বিরোধী সংঘাতে লিপ্ত হয়। তখন তিনি যে শক্তির প্রাধান্য লাভ অধিকতর মংগলদায়ক মনে করেন, সেটাকে জয়ী করেন। হাদীসে যে রয়েছে, দাঁড়ি পাল্লা আল্লাহর হাতে রয়েছে এবং যে পাল্লা ভারী করতে চান সেটাই ভারী হয় এবং আল্লাহ যে বলেছেন, স্রষ্টা সতত সৃজনশীল কাজে নিরত বা ব্যস্ত, এ দুটো বক্তব্যের তাৎপর্য এটাই।[উক্ত শক্তি বা কারণ সম্পর্কে আরেকটি মত হল এই যে, (১) জড় উপাদানের গুণাগুণ। যেমন, আগুন তাপ দেয় ও পানি শীতল করে। স্মর্তব্য যে, তাপ দেয়া বা ঠান্ডা করা আল্লাহর কাজ এবং আগুন ও পানি আল্লাহর সৃষ্ট কারণ। (২) বায়ুর শুষ্ককরণ শক্তির মত বিভিন্ন উপাদানের শ্রেণীগত বৈশিষ্ট্য (৩) কল্যাণ বা অকল্যাণ সৃষ্টিকারী উচ্চতম পরিষদের দোয়া ও বদদোয়া (৪) দুঃখ ও শান্তি সৃষ্টিকারী আল্লাহর শরীয়তের বিধি নিষেধ।]

কখনও শক্তির প্রাধান্য হয় উপকরণের শ্রেষ্ঠত্বের কারণে। কখনও তা হয় কল্যাণ-শক্তির শ্রেষ্ঠত্বের কারণে। কখনও সৃষ্টিকে ব্যবস্থাপনার ওপর প্রাধান্য দেয়া হয়। এ ছাড়াও বিভিন্ন কারনে শক্তির পারস্পরিক দ্বন্দ্বে একটির ওপর অপরটি প্রাধান্য পেয়ে থাকে।

আমরা শক্তির দ্বন্দ্বের সময়ে ভালোভাবে জানতে পাইনা, কোনটি এ ক্ষেত্রে সঠিক। তবে যেটা জয়ী হয়ে রূপলাভ করে, সেটাকে নিঃসন্দেহে সঠিক ভাবতে পারি। এর ভেতরেই কল্যাণ নিহিত। আমার এ বক্তব্যটি ভেবে-চিন্তে দেখলে এর থেকে অনেক সমস্যা ও জটিলতারই সমাধান পাওয়া যাবে।

গ্রহ-নক্ষত্রের শক্তি সম্পর্কে বলা চলে, এর গতিবিধি দ্বারা গরম-ঠাণ্ডা বা দিন-রাতের হ্রাস-বৃদ্ধি হওয়ার মত সাধারণ কাজ অবশ্যই ঘটে থাকে। তেমনি জোয়ার ভাটাও দেখা যায়। হাদীসে আছে, “যখন ভোরে তারা দেখা দেয়, সূর্য বিদায় নেয়”। অর্থাৎ এটাই রীতি। কিন্তু এ সবের প্রভাবে ধনী-গরীব হওয়া, দুঃখ-সুখ পাওয়া কিংবা দুর্ভিক্ষ-মহামারী দেখা দেয়ার কোন শরীয়ত সম্মত প্রমাণ নেই। মহানবী (সঃ) বরং এ সব নিয়ে মাথা ঘামাতেও নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, ‘জ্যোতিষী হওয়া ও যাদুকর হওয়া একই কথা’ (হারাম পেশা)। আরবের জাহেলরা যে বলত, অমুক গ্রহ বা নক্ষত্রের উদয় বা অস্তের কারণে বৃষ্টি হয়েছে, তিনি তার বিরুদ্ধে কঠোর সতর্ক বাণী উচ্চারণ করেছেন।

এ ক্ষেত্রে আমার বক্তব্য এই, মহানবীর (সঃ) শরীয়ত এ কথা কোথাও বলেনি যে, গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধির ভেতর আল্লাহ এমন কোন শক্তি রাখেননি যা প্রকৃতির বিবর্তনের লীলায় কোনই অংশ রাখে না। তবে এটাও ঠিক যে, মহানবী (সঃ) জ্যোতিষী হতে নিষেধ করেছেন। জ্যোতিষী বা গণকদার জীনদের কাছে জিজ্ঞেস করে করে অজানা খবর জানত। তাই তিনি জ্যোতিষীর কাছে যাওয়া ও তাদের কথার ওপর বিশ্বাস করাকে অত্যন্ত খঅরাপ জানতেন। জ্যোতিষীর কার্যকলাপ সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলতেন, ফেরেশতারা যখন আকাশে আল্লাহর কোন সিদ্ধান্ত আলোচনা করেন, শয়তান তখন সে খবর আড়ি পেতে শুনে নিয়ে পালায় এবং (ভক্ত) জ্যোতিষীদের তা শুনায়। জ্যোতিষী সেই একটি সত্যের সাথে একশ মিথ্যা মিলিয়ে লোকদের শুনায়।

আল্লাহ তা’আলা বলেন, হে ঈমানাদর সমাজ! যারা কুপরী কাজ করল তাদের মত হয়োনা। আর তোমাদের সেই ভাইদের মত হয়োনা যারা তোমাদের ব্যাপারে বলল, যদি তারা অভিযানে গিয়ে যুদ্ধে অংশ না নিয়ে আমাদের কাছে থাকত, তা’হলে মারা যেতনা, নিহত হতনা।

মহানবী (সঃ) বলেন, তোমাদের ভাল কাজই শুধু তোমাদের জান্নাত দেবেনা (আল্লাহ ছাড়া)। তিনি আরও বলেন, তুমিই তো একমাত্র দয়ালু বন্ধু। তুমি তো দয়ার হাত বাড়িয়েই রয়েছ।

মোটকথা জ্যোতিষ শাস্ত্র নিষিদ্ধ করার ভেতর অজস্র কল্যাণকর উদ্দেশ্য রয়েছে।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

প্রাণের রহস্য

আল্লাহ পাক বলেনঃ

(আরবী**********************************************************************************)

সূরা বনী ইস্রাঈলঃ আয়াত ৮৫

“(হে মুহাম্মদ!) জনতা তোমার কাছে প্রাণের রহস্য জানতে চাইছে? তুমি বলে দাও, প্রাণ আল্লাহর নির্দেশ বৈ কিছুই নয় বং তোমাদের খুব নগণ্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে”। (১৭: ৮৫)

ইবনে মাসউদের বর্ণনায় তিনি (আরবী**********) স্থলে (আরবী**************) পাঠ করেছেন। তার অর্থ দাঁড়ায় ‘তাদের নগণ্য জ্ঞান দেয়া হয়েছে’। এই ‘তাদের’ থেকে বুঝা যায়, প্রশ্নকারীরা ইহুদী ছিল। তা ছঅড়া এ আয়াত থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলেনা যে, মুসলমানদের কেউ প্রাণের রহস্য জানতেন না। কিছু লোকের অবশ্য সেরূপ ধারণা রয়েছে। শরীয়ত প্রবর্তক যে ব্যাপারে চুপ ছিলেন, সে ব্যাপারে কারো কিছু জানা সম্ভবই নয়, এটা ভুল কথা। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে শরীয়ত দাতা এ জন্য নীরব ভূমিকা নিয়েছেন যে, সেরূপ সূক্ষ্ম ও জটিল বিষয় দু’চারজনে বুঝলেও সর্ব সাধারণের বোধগম্য হবেনা।

আপনার জানা প্রয়োজন, প্রাণের রহস্য আপনি সর্বপ্রথম যতটুকু বুঝতে পারেন তা হল এই, প্রাণী জগতের আয়ুস্কালের ভিত্তি ও উৎসই হল প্রাণ। যতক্ষণ তা যে প্রাণীর দেহে অবস্থা করে, সেটা জীবিত থাকে এবং যখনই প্রাণ দেহ ছেড়ে চলে যায়, প্রাণীটি মারা যায়।

আরও একটু গভীরে তলিয়ে দেখতে পাবেন, দেহের ভিতর সূক্ষ্ম ও হালস্কা উষ্ণতার অস্তিত্ব মিলে। রক্ত, পিত্ত, কফ ইত্যাকার দেহের চার চীজের নিখুঁত ও নির্ভুল সংমিশ্রণে তা কলবের ভিতর জন্ম নেয়। তারপর তা অনুভূতি, গতি ও বোধ শক্তির ধারককে (দেহকে) রুজীর আহরণে বয়ে চলে এবং তাতে চিকিৎসাদিরও দখল থাকে।

অভিজ্ঞতা থেকে আরও জানা যায়, সেই উষ্ণ পিণ্ড হাল্কা ও ভারী এবং পরিচ্ছন্ন ও অপরিচ্ছন্ন হওয়া নির্ভর করছে উপরি বর্ণিত শক্তিগুলোর ওপর। উক্ত শক্তিগুলো থেকে যে প্রক্রিয়া সৃষ্টি হয়, তার প্রতিক্রিয়া সেটার ওপর প্রভাব বিস্তার করে।

এ জানা যায়, যখন সেই উষ্ণপিণ্ডের জন্ম ও রূপ লাভের সাথে সংশ্লিষ্ট কোন অংগে কোন বিপত্তি দেখা দেয়, তখন উষ্ণপিণ্ডেও গোলযোগ দেখা দেয়। এও জানা যায় উষ্ণ পিণ্ডের জন্ম লাভ জীবনের ও মিটে যাওয়া মৃত্যুর কারণ হয়। ভাসা ভাসা দৃষ্টিতে তো মনে হয় এ উষ্ণ পিণ্ডই প্রাণ। কিন্তু যদি গভীর দৃষ্টিতে লক্ষ্য করা যায়, তা’হলে বুঝা যায়, সেটা প্রাণের নিম্নতম স্তর মাত্র। ফুলের সাথে ঘ্রাণের যে সম্পর্ক কিংবা আগুনের সাথে কয়লার, শরীরের সাথে তার ততটুকু সম্পর্ক।

আরও গভীরে তলিয়ে দেখলে বুঝা যায়, এ উষ্ণপিণ্ড প্রাণ নয়, বরং মূল প্রাণের ধারক বা খোলস এবং শরীরের সাথে তার সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে বস্তু। তার প্রমাণ হল এই, আমরা বারংবার দেখছি শিশু যুবক এবং যুবক বৃদ্ধ হয়। তেমনি তার শরীরের মৌল উপাদান রক্ত, কফ, পিত্ত ইত্যাদি পরিবর্তন হয়ে চলে। তাই তার সংমিশ্রণে যে প্রাণের অস্তিত্ব দেখতে পাই তা আগের চাইতে বহুগুণ বেড়ে যায়। আবার দেখি, শিশু ছোট থেকে বড় হয়, কালো কিংবা সাদা হয়, আলেম কিংবা জাহেল হয়। এভাবে তার অবস্থার বহুবিধ বিবর্তন ঘটে, অথচ ব্যক্তিত্বটি একই থেকে যায়।

এখানে যদি কেউ (তার অবস্থা পরিবর্তন হওয়া বা না হওয়া নিয়ে) তর্ক-বিতর্ক চালায় তো আমি জবাবে বলব, এ পরিবর্তনটি আমি ধরে নিয়েছি মাত্র। নইলে এতে তো সন্দেহ নেই যে, তার অবস্থার প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হতেই থাকে। অথচ ব্যক্তিটি একই থেকে যায়। কিংবা এ ভাবে জবাব দেব যে, শিশুটির নিজ অবস্থানে বহাল থাকা তো মেনে নেব, কিন্তু তার অবস্থা নিজ অবস্থানে বহাল থাকতে পারেনা। এ থেকেই প্রমাণিত হল, শিশুটি আসল বস্তু ও তার অবস্থা নকল বস্তু।

সুতরাং এটাই সুপ্রমাণিত হল, যে বস্তুর অস্তিত্ব মানুষকে জীবিত রাখে তা উক্ত প্রাণ বা উষ্ণপিণ্ড নয়। তেমনি দেহ তো নয়ই। ব্যক্তিত্বটিও নয়, যা বাহ্যত মনে হয়। বরং প্রাণ হল সংমিশ্রণ মুক্ত একক ও স্বতন্ত্র এক জিনিস। তা হল এমন এক নূর বিন্দু বা আলোকপিণ্ড যা পরিবর্তনশীল অবস্থা কিংবা বিভিন্ন পদার্থের সংমিশ্রণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও স্বতন্ত্র। এ আসল প্রাণ সত্তাটি ছোট ও বড়র, কালো ও সাদার ও অন্যান্য বিপরীত ধর্মী বিভিন্ন অবস্থার ভেতর একই রকম থাকে। কোনরূপ বিবর্তন বা বিভক্তি স্বীকার করেনা।

অবশ্য সেই আসল প্রাণ সত্তার সম্পর্ক (বাহ্য দৃষ্টির প্রাণ সত্তা) তাপপিণ্ডের সাথেই রয়েছে। সেটার কারণেই দেহের অস্তিত্ব বিরাজমান থাকে। কারণ, দেহ তো উষ্ণপিণ্ড সৃষ্টির চার উপাদা থেকেই অস্তিত্ববান। পক্ষান্তরে মূল প্রাণ জগতের এমন একটি খিড়কী যে পথে সে যে যে উপাদানে জড় প্রাণের সৃষ্টি তা সবই সেখান থেকে পেয়ে যায়। এখন থেকে গেল বিবর্তনের বিবরণী। পার্থিব উপাদানের সেটাই স্বভাব। দেখুন, রোদ ও রোদের তাপ ধোপার ধোয়া কাপড় শুকিয়ে সাদা করে, অথচ ধোপাকে পুড়ে কালো করে। এও তেমনি ব্যাপার।

আমরা বিশুদ্ধ মন ও মননের এটাই সিদ্ধান্ত যে, দেহে যদি জড় প্রাণের উৎপাদন শক্তি না থাকে, তাহলে জড় প্রাণ সেখান থেকে বিদায় নেয়। এরই নাম মৃত্যু! জড় প্রাণ থেকে মূল প্রাণের নাম মৃত্যু নয়। তাই যখন ধ্বংসকারী ব্যাধিতে জড় প্রাণ তথা তাপপিণ্ড হাওয়া হয়ে যায়, তখনও আল্লাহর কৌশলগত কারণে মূল প্রাণ দেহের সাথে সম্পর্ক রেখে চলে। আপনি যদি কোন শিশির বায়ু ষোল আনা বের করে ফেলার জন্য আপ্রাণ প্রয়াস চালান, এমনকি বায়ু আকর্ষণ করতে গিয়ে শিশি ভেংগে ফেলারও উপক্রম করেন, তথাপি তাতে কিছু না কিছু বায়ু থেকেই যাবে। তা আবার শিশিতে ছড়িয়ে জড়িয়ে যাবে। এটুকুই তো বায়ু প্রকৃতির গূঢ়তম রহস্য বা অপরিবর্তনীয় ও অখণ্ড সত্তা। তেমনি যৌগিক প্রাণের মূলেও এক রহস্যময় অপরিবর্তনীয় ও অবিভাজ্য সত্তা রয়েছে এবং সেটাই মৌলিক প্রাণ।

মৌলিখ প্রাণের নির্ধারিত এক সীমা ও পরিমাপ রয়েছে। তার ব্যতিক্রম হতে পারে না। মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার যৌগিক প্রাণ অন্যরূপ ধারণ করে। তখন মৌলিক প্রাণের কারণে তার যৌথ অনুভূতির যতটুকু অবশিষ্ট থাকে, ছাড়া জগতের সাহায্যে তা এরূপ শক্তি অর্জন কর যে, দেখা, শোনা ও কথা বরার সব কাজই তাতে সম্ভব হয়। অর্থাৎ দেহ তখন এক অবচেতন মনের অধিকারী হয়।

নভোমণ্ডলীতে একই ধরনের শক্তি কাজ করছে। তাই যৌগিক প্রাণ ছায়াজগতের প্রভাবে আলো কিংবা আঁধারের পরিচ্ছদে ভূষিত হওয়ার ক্ষমতা লাভ করে। এ থেকে অন্তর্বর্তী জগতের (আলমে বরযখ) অদ্ভুত ঘটনাবলী সম্ভব হয়। তারপর যখন ইস্রাফীলের শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে (যেভাবে শিংগায় সুর ধ্বনি দিয়ে দেহজগতে প্রাণের সঞ্চার ঘটিয়ে সৃষ্টির ধারা অব্যাহত রাখার স্থায়ী ব্যবস্থা করা হয়েছিল) তখন মৌলিক প্রাণের (আমরুল্লাহ) প্রভাবে সেটাকে দেহরূপ ভূষণ কিংবা ছাড়া ও কায়াজগতের মাঝামাঝি ধরনের এক দেহে দান করা হবে।

তারপর থেকে শুরু হবে সত্য সংবাদ দাতার সংবাদগুলোর এককের পর এক বাস্তবায়ন। যেহেতু যৌগিক প্রাণের সংযোগ রয়েছে  মৌলিক প্রাণের সাথে, তাই এ প্রাণ ইহ ও পরকাল দুটোর প্রভাব লাভ করবে। আত্মিক জগতের সাথে সংযোগ তার ভেতর ফেরেশতাসুলভ স্বভাব জন্মাবে এবং জগ জগতের প্রভাব তার ভেতর পশুসুলভ স্বভাবের উদ্ভব ঘটাবে।

প্রাণ (রূহ) তত্ত্ব সম্পর্কে ভূমিকা আলোচনা করেই আমার ক্ষান্ত হওয়া উচিত। এ বিষয়ের এ মূল তত্ত্বটুকু মেনে নেয়ার পর এর শাখা-প্রশাখা বিন্যাস ও বিভিন্ন প্রশ্নের সমাধান প্রয়োজন। আর তা এর চাইতে কোন উন্নততর বিষয়ের আলোচনায় প্রসংগত এর সব রহস্যজাল ছিন্ন হবার আগেই হওয়া চাই।

দায়িত্ব তত্ত্ব

আল্লাহ পাক বলেনঃ

(আরবী*****************************************************************)

সূরা আহযাবঃ আয়াত ৭২-৭৩

“আমি নভঃমণ্ডলী, পৃথিবী ও পাহাড়-পর্বতের সামনে আমার আমানত পেশ করলাম। তারা সে দায়িত্ব বহন করতে অস্বীকার করল। তারা ভয় পেয়ে গেল। অথচ মানুষ সে দায়িত্ব নিল। কারণ, তারা বড়ই জালিম ও জাহিল। এটা এ কারণেই ঘটল যে, আল্লাহ মুনাফিক ও মুশরিক নর-নারীকে শাস্তি দেবেন এবং মু’মিন নর-নারীকে অনুগ্রহীত করবেন। আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও দয়ালু”।

ইমাম গাজ্জালী ও ইমাম বায়জারী (রঃ) প্রমুখ এটা সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এ আয়াতের ‘আমানত’ অর্থ হল ‘আল্লাহ দত্ত দায়িত্ব’। আকাশ ও পৃথিবীর অন্য সবাই সভয়ে এ দায়িত্ব পারিহার করেছে। মানুষ এ দায়িত্ব বুঝে নেয়ার কারণেই আল্লাহর আনুগত্যের জন্য যেমন পুরস্কার পাবে, তেমনি তাঁর নাফরমানীর জন্য শাস্তিও পাবে। অন্যান্যের কাছে এ দায়িত্ব পেশ করার উদ্দেশ্য হল তাদের যোগ্যতা যাচাই করে নেয়া। তাদের অস্বীকার থেকে প্রমাণিত হয়, এত বড় গুরুদায়িত্ব বহনের শক্তি ও সাহস তাদের নেই। মানুষ তা গ্রহণ করে নিজেদের যোগ্যতম বলে প্রমাণ দিল।

এ ক্ষেত্রে আমার বক্তব্য এই, এখানে আল্লাহ পাকের ‘মানুষ বড়ই জালিম ও জাহিল’ মন্তব্যটি মানুষের যোগ্যতার কারণ ইংগিত করেছে। জালিম তাকেই বলা হয়, ইনসাফ করার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি জুলুম করে। তেমনি জাহিল তাকেই বলা যায়, জ্ঞানার্জনের যোগ্যতা নিয়ে যে ব্যক্তি মূর্খ থাকে। বস্তুত মানুষ ছাড়া সব সৃষ্টিই হয় শুধু আলিম ও আদিল। তাদের ভেতরে অত্যাচার ও মূর্খতার কোন স্থানই নেই। যেমন, ফেরেশতা। নয় তারা শুধুই জালিম ও জাহিল। ইলম ও আদলের কোন যোগ্যতাই তাদের নেই। যেমন চতুষ্পদ জন্তু। সুতরাং উক্ত আমানত গ্রহণের যোগ্যতা কেবল তাদেরই থাকতে পারে যাদের ক্ষমতা প্রকৃতিজাত নয়, উপার্জনক্ষম। তারপর আয়াতে (আরবী************************) শব্দের ‘লাম’ পরিণতি অর্থে এসেছে। অর্থাৎ দায়িত্ব গ্রহণের পরিণতি হল সুখ ও দুঃখ।

এক্ষণে যদি আপনি সঠিক ব্যাপার বুঝতে চান, তা হলে প্রথমে ফেরশতার কথাই খেয়াল করুন। ফেরেশতাদের না আছে ক্ষুৎ-পিপাসা, না ভয়-ভাবনা। তেমনি জৈবিক লালসা, রাগ, অহংকার ইত্যাকার বলতে কিছুই নেই। তাদের রুজী রোজগার কিংবা স্বাস্থ্য রক্ষার বালাই নেই। এক কথায় জীবজগতের কোন প্রয়োজনেরই তাদের পরোয়া নেই। তারা থাকেন। তাই কোন বাঞ্ছিত বিধান প্রবর্তনের কিংবা বিরূপ বা অনুকূল মনোভাব গ্রহণের ঐশী নির্দেশ পাওয়া মাত্র সংগে তারা মনে-প্রাণে তা বাস্তবায়নের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন।

এবারের পশুদের কথা খেয়ার করুন। সেগুলোর অবস্থা শোচনীয়। কতশত মন্দ স্বভাবের পশুদের সাথে তারা আষ্টেপিষ্টে জড়িত। তারা জৈবিক আনন্দ ছাড়া কিছুই বুঝেনা। তাই বস্তুগত স্বার্থ, ভোগ-লালসা ও উত্তেজনার উত্তাল তরংগে তারা ডুবে থাকে।

অবশেষে মানুষের দিকে লক্ষ্য করুন। আল্লাহ পাক তাঁর পরিপূর্ণ কৌশল প্রয়োগ দ্বারা মানুষের ভেতর পরস্পর বিরোধী দুটো শক্তিরই সমাবেশ ঘটিয়েছেন।

এক, ফেরেশতা প্রকৃতি (বিবেক)। এ প্রকৃতি মানুষের মৌলিক প্রাণ থেকৈ প্রেরণা পায় এবং সেই প্রাণ থেকে তার মৌলিক প্রাণকে অহরহ প্রেরণা যোগায় (যৌগিক প্রাণ মানুষের গোটা দেহে ছড়িয়ে থাকে)। মৌলিক প্রাণের প্রেরণা গ্রহণই ফেরেশতা প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য এবং তার ওপরেই সে প্রেরণা প্রাধান্য বিস্তার করে।

দুই, পশু প্রকৃতি (প্রবৃত্তি অন্য সব পশুর ভেতর যে জৈব প্রবৃত্তি রয়েছে সেটাই মানুষের পশু প্রকৃতির ভিত্তি ও উৎস। যে চার উপাদানের মানুষের যৌগিক প্রাণের সৃষ্টি, এ প্রকৃতিতেও তা বর্তমান। পশু প্রকৃতি সম্পূর্ণ স্বাধীণ হয়। মৌলিক প্রাণও তার নির্দেশ মেনে নেয়।

এও স্মরণ থাকা চাই, এ দুই শক্তির ভেতর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব চলে। কখনও বিবেক প্রবৃত্তিকে ওপরে টানতে চায়। কখনও আবার প্রবৃত্তি বিবেককে টেনে নিচে নামাতে চায়। সেক্ষেত্রৈ বিবেক পরাজিত হলে প্রবৃত্তির প্রভাব প্রকাশ পায় এবং প্রবৃত্তি পরাজিত হলে বিবেকের প্রভাব প্রকাশ পায়। আল্লাহ পাক তো দুটোই প্রকাশের সযোগ দেন। উপার্জণকারী যেটাই উপার্জন করতে চায়, তিনি সাধারণত সেটা দেন। যদি কেউ পশু স্বভাবের প্রাধান্য দিতে চায়, আল্লাহ তার পথ খুলে দেন। পক্ষান্তরে কেউ যদি ফেরেশতা প্রকৃতির প্রাধান্য রাখতে চায়, আল্লাহ পাকও তাকে তার ব্যবস্থা করে দেন। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ

(আরবী****************************************************************************)

সুরা লাইলঃ ৫-১০

“আল্লাহর পথে যে ব্যক্তি দান করে ও আল্লাহকে ভয় করে এবং ন্যায় কাজকে সমর্থন করে, আমি তার জন্য পূণ্য কাজ সহজ করে দেই। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কার্পণ্য করে ও আল্লাহকে ভয় করেনা এবং সত্যপথকে মিথ্যা বলে আখ্যায়িত করে, আমি তার জন্য পাপ কাজ সহজ করে দেই”।

অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেনঃ

(আরবী**************************************************************)

“হে মুহাম্মদ! তোমর প্রভুর অবদানে আমি দলমত নির্বিশেষে ধন্য করে থাকি। এদলকেও দেই, ও দলকেও দেই। কারণ, তোমার প্রভু ইহলোকে তাঁর দান-দাক্ষিণ্য কারো জন্য বন্ধ রাখেন না”।

প্রত্যেক শক্তি বা প্রকৃতিতেই সুখ ও দুঃখ রয়েছে। নিজ প্রকৃতির অনুকূল ব্যাপারের অনুভূতিকে বলে সুখ এবং প্রতিকূল ব্যাপার সহ্য করার নাম দুঃখ। দেখুন, মানুষকে যখন অবশ (ক্লোরোফর্ম) করার মত কিছু প্রয়োগ করা হয়, তখন কোন কিছুই তাকে কষ্ট দিতে পারে না। যদি তার কোন অংগ আগুনে জ্বালানো হয় তা সে টের পাবেনা। কিন্তু যখন তার অবশ অবস্থা কেটে যায়, এবং পুনরায় অনুভূতি ফিরে আসে তখন কিরূপ কষ্ট দেখা দেয় তাও জানেন।

মানুষের অবস্থার সাথে গোলাপ ফুলের বেশ সাদৃশ্য রয়েছে চিকিৎসকরা বলেছেন, তার ভেতর তিনটি শক্তি বিদ্যমান। এক, মৃত্তিকা প্রকৃতি। ঘষে দিয়ে গায়ে লাগালে তা প্রকাশ পায়। দুই, জলীয় প্রকৃতি। চিপে পান করলে তা জানা যায়। তিন, বায়বীয় প্রকৃতি। তার পরিচয় ঘ্রাণেই মিলে।

এ সব আলোচনা থেকে জানা গেল, মানুষের যোগ্যতাই দায়িত্ব দাবী করে। সুতরাং আল্লাহ তাদের যে দায়িত্ব দিয়ে জবাবদিহির ব্যবস্থা করেছেন সেটা তাদের দাবীরই অনুকূল। তেমনি তাদের ভেতরকার ফেরেশতা প্রকৃতি (বিবেক) এ দাবীই জানায়, তার অনুকূল ও উপযোগী কাজগুলো তার জন্য ফরজ (অপরিহার্য) করা হতহোক এবং প্রতিকূল ও অনুপযোগী পশু প্রকৃতির কাজগুলো হারাম (অবৈধ) করা হোক। তা হলেই সে শাস্তি থেকে বেঁচে গিয়ে শাস্তি লাভ করতে পারবে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

সপ্তম পরিচ্ছেদ

দায়িত্ব মানুষের বিধিলিপি

এ কথা সুস্পষ্ট যে, আল্লাহর এ সৃষ্টিজগতে এমন অজস্র নিদর্শন রয়েছে যা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে বেশ বুঝা যায়, আল্লাহ পাক যে তাঁর বান্দাদের শরীয়তের বিধি-নিষেধ পালনের দায়িত্ব দিয়েছেন তার ভেতর বহু কল্যাণকর উদ্দেশ্য রয়েছে। তাঁর কাছে এর সমর্থনে সকল যুক্তি-প্রমাণও রয়েছে।

এখন একবার গাছের পাতা, ফুল ও ফলের দিকে তাকান। তা দেখে এবং স্বাদ ও গন্ধ নিয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়, তার দিকে গভীরভাবে লক্ষ্য করুন। দেখতে পাবেন, প্রত্যেক ধরনের পাতাকে আল্লাহ বিশেষ রূপ দিয়েছেন। প্রত্যেক জাতীয় ফুলকে দিয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন রঙ ও ঘ্রাণ। প্রত্যেক প্রকারের ফলকে দিয়েছে ন স্বতন্ত্র স্বাদ। এ থেকে কোনটি কোন গাছের পাতা, কিসের ফুল ও কোন ফল তা সহজেই বলা যায়। এ সবগুলোই শ্রেণীরূপের অন্তর্গত। যে সূত্র থেকে যেভাবে শ্রেনী বিন্যাস হয়ে থাকে, এগুলো সেখান থেকেই একই ভাবে বিন্যস্ত হয়।

আল্লাহর সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রত্যেক প্রকারের গাছের জন্য বিশেষ উপাদান নির্ধারিত হয়ে আছে। যেমন, খেজুর গাছের জন্য বিশেষ ধরনের মাটি তিনি নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। তারপর মোটামুটিভাবে বলে দিয়েছেন, এ উপাদান খেজুরের রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করবে। অবশেষে বিস্তারিত ফরমানে বলা হল, খেজুরের পাতা এরূপ, ফল ওরূপ ও বীচি সেরূপ হবে।

প্রত্যেক শ্রেণীর কিছু বৈশিষ্ট্য তো সামান্য বুদ্ধি যার রয়েছে সে-ই বলতে পারে। কিন্তু কিছু বৈশিষ্ট্য এরূপ সূক্ষ্ম হয় যা বিজ্ঞ ব্যক্তি ছাড়া কেউ জানতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে ইয়াকুতের এক বিশেষ প্রভাবের কথা ধরে নিন। যার হাতে ইয়াকুত থাকে, অন্তরে তার আনন্দ ও সাহস বেড়ে যায়। ইয়াকুতের এ বৈশিষ্ট্যটি সাধারণতঃ কেউ দেখে না।

কোন কোন শ্রেণীর বৈশিষ্ট্যগুলো তার গোটা সত্তার ভেতর পাওয়া যায়। তা ঘটে উপাদানের উপযুক্ততার জন্য (উপাদানের দুর্বলতার কারণে একই শ্রেণীর ফলফুলের ভেতর তারতম্য ঘটে)। তেমনি কোন শ্রেনীর কিছু সত্তায় সব বৈশিষ্ট্য থাকে, কিছু অংশে থাকে না। হালীলা ফল মুঠোয় নিলে এ সত্যটি সহজ হয়ে ধরা দেয়।

খেজুর এরূপ কেন এ কথা বলতে পারেন না। এ প্রশ্ন অবান্তর। কারণ, সেটা যেরূপ আছে তা-ই থাকবে। এর কারণ জানতে চাওয়ার পালা নেই।

তারপর আপনি যদি পশুর শ্রেনীগুলোর দিকে দৃষ্টি দেন, সেখানেও মাছের মতই প্রতিটি শ্রেণীর পার্থক্য ও স্বাতন্ত্র্য দেখতে পাবেন। সঙ্গে সঙ্গে এও দেখতে পাবেন, তাদের ভেতর এমন কতগুলো স্বতঃস্ফুর্ত ও প্রকৃতিগত ব্যাপার দেখা যায় যা থেকে সহজেই এক শ্রেনী হতে অপর শ্রেণীর পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। যেমন গৃহপালিত গরু, ছাগল ইত্যাদি ঘাস খায় ও চর্বিত চর্বন করে। অথচ ঘোড়া খচ্চর ইত্যাদি তৃণজীবি হয়েও চর্বিত চর্বন করে না। হিংস্র জন্তুর গোস্ত খেয়েই বাঁচে। পাখীরা উড়ে বেড়ায়। মাছ পানিতে সাঁতরায়। প্রত্যেক শ্রেণীর পশুর কণ্ঠস্বর ভিন্ন। সংগম ও দাম্পত্য পদ্ধতিও ভিন্ন ভিন্ন। বাচ্চা পালন ও ডিম প্রদানের রীতিও স্বতন্ত্র। এ সব সবিস্তারে বলতে গেলে গ্রন্থের কলেবর বেড়ে যাবে।

এরপর দেখি, প্রত্যেক শ্রেণীর ভেতর যতটুকু স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফুর্ত জ্ঞান রয়েছে যা তার একান্ত প্রয়োজন ও তার জন্য কল্যাণকর। এ সব হচ্ছে আল্লাহর দত্ত জ্ঞান। শ্রেণী বৈশিষ্ট্যের ছিদ্র পথে তার আগমন। ফুলের রঙ ও রূপ এবং ফলের স্বাদ ও ঘ্রাণ যেরূপ শ্রেণী বিশেষের সাথে জড়িয়েই আবির্ভূত হয়, এও তেমনি এসে থাকে।

কোন শ্রেণীতে শ্রেণীগত বৈশিষ্ট্যগুলোর সর্বত্র উপস্থিতি দেখা যায়। অথচ কোন শ্রেণীতে কিছু সংখ্যকের ভেতর পাওয়া যায় ও কিছু সংখ্যকের ভেতর পাওয়া যায় না। তার মূলে রয়েছে উপাদানের উপযোগিতা কিংবা দুর্বলতা। তবে শ্রেণী বিশেষের প্রত্যেকটি সত্তাই বৈশিষ্ট্যগুলো ধারণের যোগ্যতা রাখে। বৈশিষ্ট্যে ব্যতিক্রমের অন্যতম উদাহরণ হল মধু মক্ষিকার রাজা ও গৃহপালিত তোতাপাখী। নিজ নিজ শ্রেণী থেকে তারা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য পেয়ে থাকে।

মানুষের দিকে লক্ষ্য করলেও আপনি গাছপালা ও জীবজন্তুর মতই কতগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট্য সেখানে দেখতে পাবেন। যেমন, জন্ম নেয়া, বৃদ্ধি পাওয়া, কাশী দেয়া, হাই তোলা, পায়খানা-প্রস্রাব করা, জন্ম নিয়ে মাতৃস্তন্য পনা করা ইত্যাদি। সঙ্গে সঙ্গে এমন কতগুলো বৈশিষ্ট্যও পাবেন যেগুলো মানব জাতিকে অন্যান্য জাতীয় সৃষ্টি থেকে স্বতন্ত্র করে রেখেছে। যেমন, কথা বলা ও বুঝা, ভূমিকা বুঝেই বিষয়জ্ঞান অর্জন করা, সাধনা ও গবেষণা চালিয়ে বুদ্ধি-বিবেকের সাহায্যে গভীর তত্ত্বজ্ঞান হাসিল করা, বস্তুগত ধ্যান-ধারণার বাইরের বস্তুকে উন্নত জ্ঞানের সাহায্যে জেনে নেয়া (সভ্যতা ও দেশ, জাতি ও ব্যক্তি সংস্কার পদ্ধতি ইত্যাদি)। এ ব্যাপারগুলো যেহেতু মানুষের জাতিগত বৈশিষ্ট্য ও জন্মগত উত্তরাধিকার, তাই জংগল বা পাহাড়ের চূড়ায় বসবাসকারী মানুষের কাছেও তার পরিচয় মিলে। এও হচ্ছে আল্লাহর শ্রেণী বিন্যাসের জন্য নির্ধারিত বিশেষ উপাদানের বৈশিষ্ট্য। আসল তত্ত্ব হল এই, মানুষের সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য বা স্বভাবের দাবী হল এই, তার রিপুর ওপরে অন্তরের ও অন্তরের ওপরে বুদ্ধির প্রাধান্য থাকা চাই।

তারপর লক্ষ্য করুন, আল্লাহ পাক প্রতিটি শ্রেণী বিন্যাসে কত কলা-কৌশল ও অনুগ্রহ-প্রীতির পরিচয় দিয়েছেন। গাছ-পালায় যেহেতু গতি ও অনুভূতির উপাদান অবতৃমান, তাই তার শিকড়কে এত শক্তি দান করেছেন যে, হাওয়া, মাটি, আলো ইত্যাদি সংযোগে সৃষ্ট প্রয়োজনীয় উপাদান সে সংগ্রহ করে তার শাখা-প্রশাখা শ্রেণীগত চাহিদা মোতাবেক বর্দ্ধন করে দেয়। পক্ষান্তরে জীব-জন্তু যেহেতু অনুভূতিশীল, মর্জী মাফিক তারা চলতেও পারে, তাই তাদের মাটি থেকে প্রয়োজনীয় উপাদান চুষে খাবার শিকড় দেয়া হয় নি। বরং তাদের আল্লাহদত্ত জ্ঞান হল এই, ঘাস, পাতা ও পানি যেখানে পাবে, খুঁজে ফিরে খাবে। এ ভাবে তাদের অন্যান্য প্রয়োজন মিটাবার বুদ্ধিও দেয়া হল। যে সব শ্রেণী মাটি থেকৈ পোকার মত জন্ম নেয় না, তাদের আল্লাহ পাক সন্তান উৎপাদন, ধারণ প্রসব ও পালনের শক্তি দান করলেন। সন্তানদাত্রীর ভেতর এমন তরল পদার্থ দিলেন যা পেটের সন্তান পালনে ব্যয় হতে পারে। তারপর সেই তরল পদার্থকে দুধে পরিণত করা হল এবং বাচ্চাকে ইলহাম করা হল বুক চুখে তা পান করার জন্য। চোষার ফলে দুধ তার কণ্ঠনালী পেরিয়ে পাকস্থলীতে চলে গেল।

তেমনি মুরগীর ভেতর এমন তরল পদার্থ দেয়া হয়েছে যা থেকে ডিম তৈরি হতে পারে। ডিম দেয়া শেষ হলে দেহের তরল পদার্থ শুকিয়ে যায় এবং পেট শূণ্য হয়ে যায়। তখন তার ভেতর এমন এক উন্মাদনা দেখা দেয় যে, অন্যান্য মোরগের সাথে মেলামেশা ভুলে সে ডিমে তা দিতে বসে থাকে। এর ফলে তার পেটের শূন্যতার অনুভূতি দূর হয়।

কবুতর জুটির ভেতর অদ্ভুত ভালবাসা দান করা হয়েছে। কবুতরীর পেটের খোলসটিকে ডিমে তা দেয়ার জন্য উপযোগী করে রাখা হয়েছে। তার ভেতরকার বাড়তি তরল পদার্থকে বমি আকারে বাচ্চার ওপর অনুগ্রহে পরিণত করা হয়েছে। বমির মাধ্যমে সে দানা-পানি বাচ্চার উপযোগী করে খাওয়ার এবং কবুতরকে আকৃষ্ট করে তার পথ অনুসরণ করে বাচ্চাকে খোরাক জোগাবার জন্য। তেমনি বাচ্চার প্রকৃতিতে তরল পদার্থ দিয়ে পালক সৃষ্টির পথ করা হয়েছে। তার সাহায্যে যেন সে উড়তে পারে।

মানুষের যেহেতু গতি, অনুভূতি, জৈব তাড়না ও বুদ্ধি-বিবেকের প্রেরণা রয়েছে, এমন কি বাড়তি জ্ঞান অর্জনের ক্ষমতাও তার রয়েছে, তাই তাকে চাষাবাদ করা, বৃক্ষ রোপন, লেন-দেন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সহজাত জ্ঞান দেয়া হল। কিছু লোককে নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব সুলভ ও কিছু রোককে দাসত্ব-আনুগত্য সুলভ স্বভাব দান করা হল। এক দলকে রাজকীয় স্বভাবের ও অন্য দলকে প্রজাসুলভ স্বভাবের অধিকারী করা হল। কাউকে আল্লাহতত্ত্ব, প্রকৃতিতত্ত্ব, তর্কশাস্ত্র ও ব্যবহারিক শাস্ত্রের গভীর ও জটিল জ্ঞান দান করা হল। কাউকে আবার এমন নির্বোধ করা হয়েছে যে, জ্ঞানী ব্যক্তির অনুসরণ করা ছাড়া তার নিজের কিছু বুঝবারই ক্ষমতা নেই। শহুরে হোক কিংবা গেঁয়ো, সবার ভেতরেই স্বভাবের ও ক্ষমতার এ বৈচিত্র্য বিদ্যমান।

যা কিছু আলোচিত হল সবই মানুষের জৈবিক জীবন ও জীবসুলভ শক্তি সম্পর্কিত আলোচনা ও বিশ্লেষণ বৈ নয়। এখণ তার ফেরেশতাসুলভ শক্তির দিকে চলুন। এটাও আপনি জানেন, মানুষ অন্যান্য জীবের মত নয়: বরং তাকে সকল জীবের চাইতে উত্তম পর্যায়ের জ্ঞান দান করা হয়েছে। তার সে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার ভেতর যেটাকে সবার অনুসরণ করতে হয়, তা হচ্ছে তার জন্ম ও প্রতিপালনের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কিত জ্ঞান। তারা তখন এটাও জেনে ফেলে যে, সৃষ্টির এ বিশাল কারখানার একজন মহান পরিচালক রয়েছেন। তিনিই সবাইকে সৃষ্টি করেছেন এবং রুজী সরবরাহ করছেন। তাই তারা সবাই মিলে অন্তত হাবভাবে সেই মহান প্রতিপালক ও বিজ্ঞতম স্রষ্টার কাছে বিনয়াবনত থাকছে। এটাই হচ্ছে আল্লাহ পাকের নিম্ন আয়াতের তাৎপর্যঃ

(আরবী****************************************************************************************)

(সূরা হাজ্জঃ আয়াত ১৮)

“(হে মুহাম্মদ)! তুমি কি দেখছ না নতোমণ্ডলের বাসিন্দারা, পৃথিবীর অধিবাসী, চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র, পাহাড়, গাছপালা, চতুষ্পদ জন্তু এবং বহু সংখ্যক মানুষ আল্লাহর সমীপে বিনয়াবনত রয়েছে? তবে বহু লোক এমনও রয়েছে যাদের ভাগ্যে (নাফরমানীর কারণে) রয়েছে নির্ধারিত শাস্তি”।

লক্ষ্য করুন, গাছের প্রতিটি অংশ, শাখা, পাতা, ফুল তাদের বিজ্ঞতম স্রষ্টার সমীপে হাত পেতে রয়েছে। যদি সেগুলোর জ্ঞান থাকত, তা হলে স্রষ্টার প্রশংসায় মুখর থাকত এবং অধিক থেকে অধিকতর কৃতজ্ঞ হয়ে চলত। যদি কিছুটা বুঝ থাকত, তা হলে হাবভাবে প্রার্থনার বদলে কথা দয়ে প্রার্থনা করত।

এ থেকে এটাও জানা গেল যে, মানুষ বড়ই বিজ্ঞ ও বুদ্ধিমান। তাই তারা হাবভাবে প্রার্থনার বদলে জ্ঞানপূর্ণ প্রার্থণা জানায়। মানব শ্রেণীর এটাও একটা বৈশিষ্ট্য যে, তাদের ভেতরে কেউ না কেউ অবশ্যই সকল তত্ত্বজ্ঞানের উৎসের দিকে কায়মনে নিবিষ্ট থাকেন। সে ব্যক্তি সেই উৎ           স থেকে ওহী, দিব্যজ্ঞান কিংবা স্বপ্নের মাধ্যমে আসল জ্ঞান শিখে নেন। অন্যান্য লোক তাঁর ভেতর পথের আলো ও পুণ্যের প্রভাব দেখে আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের প্রতি অনুগত হয়ে থাকে।

প্রত্যেকটি মানুষকে অদৃশ্য জগতের কথা জানার শক্তি দেয়া হয়েছে। হোক তা সে স্বপ্নের মাধ্যমে কিংবা দিব্যজ্ঞানের সাহায্যে অথবা গায়েবী আওয়াজ শুনে বা দূরদৃষ্টি প্রয়োগ করে জানুক। তবে এতটুকু তারতম্য অবশ্যই রয়েছে যে, কিছু লোক এক্ষেত্রে পূর্ণতা লাভ করেন এবং কিছু রোক অপূর্ণ থাকে। অপূর্ণদের তাই পূর্ণতা প্রাপ্তদের শরণাপন্ন হতে হয়। এ ছাড়াও মানুষের কতগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা অন্যান্য জীবের ভেতর নেই। যেমন, বিনয়, পবিত্রতা, ন্যায়পরায়ণতা, দানশীলতা, উদারতা, প্রার্থনালব্ধ ঐশী প্রভাব ইত্যাদি। এ ভাবের আরও কিছু অবস্থা রয়েছে। যেমন কারামত।

মোট কথা যে সব বৈশিষ্ট্য মানুষকে জীবজগতে স্বাতন্ত্র্য দান করেছে তার সংখ্যা অনেক। তবে সবগুলোরই মূলে হল দুটি শক্তি। এক, জ্ঞঅন বা বোধশক্তি। এর দুটো শাখা। একটি শাখার ঝোঁক থাকে মানবিক কল্যাণ ও তার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম দিকগুলোর দিকে। অন্যটির ঝোঁক রয়েছে আল্লাহর কাছ থেকে সরাসরি সব কিছু জানার দিকে। দুই, পূর্ণাঙ্গ কর্মশক্তি। এরও দুটো শাখা রয়েছে। একটির সাহায্যে মানুষ নিজের ইচ্ছানুসারে ভাল বা মন্দ কাজ করে থাকে। পক্ষান্তরে জীব-জন্তুর ইচ্ছা-অনিচ্ছার বালাই নেই। ভাল বা মন্দ কাজের ভাবনাও তাদের স্বভাবে নেই। ভাল বা মন্দ কাজ দ্বারা তারা প্রভাবিতও হয় না। তারা তো জৈবিক প্রাণের তাগাদায় চলে ও তার থেকেই শুধু প্রভাবিত হয়। তাই পশুরা এ ক্ষেত্রে বেপরোয়া। কিন্তু মানুষ যখন কোন কাজ করে, কাজ ফুরিয়ে গেলেও তার প্রাণ বা প্রভাব থেকে যায় এবং তা তার প্রবৃত্তির খোরাক হয়। ফলে হয় তা থেকে আত্মা আলোকময় হয় অথবা আঁধারের ম্লানিমায় আচ্ছাদিত হয়।

শরীয়ত মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছা প্রয়োগ করে কাজ করার ক্ষেত্রেই শুধু জবাবদিহি করা হবে বলে শর্ত দিয়েছে। তার সাথে ডাক্তারের এ শর্তের মিল রয়েছে যে, বিষ পানের ক্ষতি ও আফিমের উপকার পেতে হলে তা গিলে পেটে পৌঁছাতে হবে। আমি বলেছি, মানুষের প্রবৃত্তি তার কাজের প্রভাব বা প্রাণশক্তি আহরণ করে এ বক্তব্যটি কোন না কোনরূপে আত্মিক সাধনা ও ইবাদতকে মানবকুলের সর্বসম্মত ভাবে ভাল বলে ঘোষণাই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কারণ, তাদের অনুসন্ধিৎসা এর আলোকময়তা সম্পর্কে জেনে ফেলেছে।

তেমনি মানুষ সর্বসম্মত ভাবেই পাপাচার ও নাফরমানীকে খারাপ বলে জানে। কারণ, তাদের অনুসন্ধিৎসা তার তমসা ও ক্ষতি দেখতে পেয়েছে। জীব জগতে মানবের স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টির দ্বিতীয় শত্কিটির দ্বিতীয় শাখা হল তার উন্নততর অবস্থা ও শ্রেষ্ঠতর মর্যাদা। এ অবস্থা ও মর্যাদা অন্যান্য জীবের নেই। যেমন, আল্লাহপ্রীতি ও আল্লাহর নির্ভরতা।

প্রকাশ থাকে যে, পরিমিত স্বভাব মানুষের জাতিগত বৈশিষ্ট্য। অবশ্য তা নিম্ন জিনিসগুলো ছাড়া পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। এক, উন্নততর ও উত্তম ব্যক্তির অর্জিত যে বিদ্যাগুলো অন্যান্য মানুষ অনুসরণ করেছে, সে সব বিদ্যা অর্জন। দুই, আল্লাহর যে বিধি-বিধানে আল্লাহর পরিচিতি এবং কল্যাণময় ব্যবস্থাদি রয়েছে, সেই শরীয়ত। তিন, যে সব নীতিমালা মানুষের ইচ্ছাকৃত কার্য-কলাপ নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনের জন্য কার্যগুলোকে ফরজ, হারাম, মুস্তাহাব, মুবাহ ও মকরুহ এ পাঁচ ভাগে বিভক্ত করেছে, সেই নীতিশাস্ত্র। চার, মানবতার ও মানবিক সভ্যতার পূর্ণ বিকাশ ঘটানোর উপায় উপকরণাদি।

আল্লাহ পাকের অনুগ্রহ ও কলাকৌশল পবিত্র অদৃশ্য জগতে থেকে ব্যক্তি বিশেষকে সব চাইতে মেধাবী ব্যক্তির উপযোগী জ্ঞান দান করে তাঁর দিকে আকৃষ্ট করে। তখন তাঁর কাছ থেকে সে ব্যক্তি উপরোক্ত জ্ঞান অর্জণ করে নেয়। তারপর অন্যান্য ব্যক্তিরা তাকে অনুসরণ করে। মধুমক্ষিকার ঝাঁক যেভাবে তাদের রাজ মক্ষিকা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, এও তেমনি ব্যাপার। যদি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজ মক্ষিকাকে সেই শক্তি না দেয়া হত, তা হলে মধুমক্ষিকার ঝাঁকের এ গৌরবজনক কীর্তিকলাপ সম্ভব হত না।

সে ভাবে কেউ যখন দেখে যে, কোন জন্তু ঘাস ছাড়া বাঁচে না, তখন সে অবশ্যই বিশ্বাস করে, তার জন্য কোন না কোন চারণ ক্ষেত্র সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে। ঠিক সেভাবেই আল্লাহ পাকের কলা-কৌশল নিয়ে যারা চিন্তা-ভাবনা করে, তারা অবশ্যই বিশ্বাস রাখে যে, আল্লাহ পাক নিশ্চয়ই এমন কতক বিদ্যা কোথাও না কোথাও দান করে রেখেছেন যার সাহায্যে মানুষ তার জ্ঞানগত অভাব অভিযোগ দূর করে পূর্ণত্ব লাভ করতে পারে।

মোটকথা এ সব বিদ্যার অন্যতম হল স্রষ্টার একত্ব ও গুণাবলী সম্পর্কিত জ্ঞান। এ বিদ্যাটি এরূপ সুস্পষ্টভাবে বিশ্লেষিত হওয়া উচিত যা প্রত্যেকেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। এরূপ জটিল ও অস্পষ্ট করে তা আলোচনা করা ঠিক নয় যা কারো পক্ষেই জানা ও বুঝা সম্ভব হয় না। তাই সে বিদ্যার বিশ্লেষণ আল্লাহ তা’আলা তাঁর পরিচিতির মাধ্যমে দিয়েছেন।

যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী*********************************) (আল্লাহ নিজ গুণাবলী নিয়ে পবিত্র রয়েছেন)। সুতরাং তিনি এমন গুণ নিয়ে রয়েছেন যা মানুষ জানে। তারা নিজেরা সেগুলো ব্যবহারও করে। যেমন, তিনি চিরঞ্জীব, তিনি দেখেন, শুনেন, ক্ষমতা রাখেন, ইচ্ছা রাখেন, কথা বলেন, রাগ হন, অসন্তুষ্ট হন, দয়া দেখান, মালিকানা রাখেন, মুখাপেক্ষী হন না ইত্যাদি। সঙ্গে সঙ্গে এটাও প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, তাঁর এ গুণাবলীর সমকক্ষতা করার ক্ষমতা কারো নেই। সুতরাং তাঁর জীবন, দেখা-শুনা, ক্ষমতা, ইচ্ছা, কথা বলা ইত্যাদি আমাদের কারো মত নয়। এ ভাবে তাঁর প্রত্যেকটি গুণই আমাদের থেকে স্বতন্ত্র ধরনের।

সেই অতুলনীয়তার ব্যাখ্যা হল এই, মরুভূমির বালু, বৃষ্টির বিন্দু কিংবা সব গাছপালার পাতা অথবা সকল জীবের শ্বাসপ্রশ্বাস গণনার মতই অসম্ভব ব্যাপার হল আল্লাহর গুণ আমাদের কারো ভেতরে পাওয়া। তিনি তো আঁধার রাতের গর্ভের পিপীলিকার চাল-চলন দেখেন এবং বদ্ধকোঠায় লেপের নিচে কে কি ফাস করে তাও শোনেন। সব গুণের ক্ষেত্রেই তাঁর এ শ্রেষ্ঠত্ব ও অতুলনীয়তা।

এ বিদ্যার বিভিন্ন শাখার ভেতর রয়েছে, উপাসনা পদ্ধতি, জীবন ধারণ পদ্ধতি, আলোচনা ও সমালোচনা পদ্ধতি, সত্য ও ন্যায়ের পথে নিম্নস্তরের লোকের সন্দেহ সংশয় নিরসন বিদ্যা, ইতিহাস ও বর্ণনা শাস্ত্র (যে বিদ্যায় আল্লাহর অনুগ্রহ, অভিলাষ, কবর, হাশর ইত্যাদির বর্ণনা এবং একই মানুষকে বংশানুক্রমে যুগে যুগে আল্লাহ যে যোগ্যতা ও বিবেক-বুদ্ধির পূর্ণত্ব দান করেছেন তার বর্ণনা থাকে) এ সব বিদ্যা অদৃশ্য জগতের অদৃশ্যতম রহস্যের জ্ঞান সমৃদ্ধ মহাজ্ঞানীরা ভেতরেই সীমিত ও সমন্বিত হয়েছিল। এ অবস্থাটিকে আশায়েরা সম্প্রদায় ‘কালামে নফসী’ বা আদি বাক্য আখ্যা দান করেছে। এটা হল জ্ঞান, ইচ্ছা ও শক্তি ভিন্ন অন্য কিছু। তারপর যখন ফেরেশতা সৃষ্টির মুহুর্ত এল, আল্লাহ পাক জানতে পেলেন, ফেরেশতা সৃষ্টি ছাড়া মানুষের কল্যাণের কাজ সুসম্পন্ন হবে না। জ্ঞানের বিভিণ্ন শাখার মতই ফেরেশততারা মানুষের ভেতর জড়িয়ে ও ছড়িয়ে থাকবে। সুতরাং ফেরেশতাদের তিনি মানুষের প্রতি রহমত হিসেবে সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ‘কুন’ (হয়ে যাও) বলা মাত্র হয়ে গেল। তখন তাদের ভেতর অদৃশ্য জগতের অদৃশ্যতম তত্ত্বজ্ঞানীর ভেতর সীমিত ও সমন্বিত জ্ঞানের কিছুটা ঝলকানী দেয়া হল। ফলে তারা আত্মিক জীব হয়ে আত্মপ্রকাশ করল। আল্লাহ পাক এদের ব্যাপারেই বললেন, ‘আরশ বাহী ও তাদের পার্শ্বচররা’ ইত্যাদি।

তারপর যখন শাস্ত্রীয়, ধর্মীয় ও জাতীয় পরিবর্তনের মুহুর্ত এল, তখন আল্লাহর কৌশলগত প্রয়োজন দেখা দিল কিছু আত্মিক জিনিসের অস্তিত্ব দানের। তখন সে সব জ্ঞান যুগের প্রয়োজন অনুসারে বিস্তারিত ও বিশ্লেষিত হয়ে প্রকাশ পেল। সে সম্পর্কেই আল্লাহ বললেনঃ

(আরবী*******************************************************************)

সূরা দুখানঃ আয়াত ৩-৪

‘আমি এ জ্ঞানভাণ্ডারকে (কুরআন) এক কল্যাণময় (শবে কদর) রাতে অবতীর্ণ করেছি। আমি সতর্ককারী (পূর্বাভাস দাতা) ছিলাম। এ রাতেই সব হিকমতপূর্ণ ব্যাপার আমার দরবার থেকে নির্দেশ (অর্ডিন্যান্স) আকারে মীমাংসিত ও বণ্টিত হয়’।

তারপর আল্লাহর কৌশলগত প্রয়োজন এক পুণ্য ও পূত চরিত্রের ব্যক্তিকে নবী হিসেবে মনোনীত করল। তাকে ওহী ধারণের যোগ্যতাও দান করল। এ জন্য উচ্চ স্তর ও উন্নত মর্যাদা নির্দিষ্ট করা হল। যখন তা পাওয়া গেল, তখনই মনোনয়ন দেয়া হল এবং উদ্দেশ্য সফলের জন্য তাকে আল্লাহ মাধ্যম বানালেন। তার ওপর নি গ্রন্থ অবতীর্ণ করলেন। তাঁকে অনুসরণ করা মানুষের জন্য ফরজ করে দিলেন। হযরত মুসাকে (আঃ) লক্ষ্য করে আল্লাহ তা’আলা এ তথ্যই ব্যক্ত করেছেনঃ “(হে মুসা!) আমি তোমাকে আমার (কাজের) জন্য মনোনীত করলাম”।

সুতরাং অদৃশ্য জগতের অদৃশ্যতম তত্ত্ব জ্ঞানীর মানুষের জন্য এ সব অমূল্য বিদ্যা নির্ধারিত করে রাখা মানুষের প্রতি তাঁর অপর অনুগ্রহের পরিচয় দেয়। তারপর মানুষের সেবার জন্য ফেরেশতা সৃষ্টি করা মানুষেরই যোগ্যতার প্রতি ইংগিত দান করে। মানুষেরই বিভিন্ন যুগের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থাই আল্লাহর বিধানকে পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত করে করে পূর্ণতা দান করেছে। ফলে মানুষের ওপর আল্লাহর (তরফের) দলীল-প্রমাণ, সুদৃঢ় ও বিজয়ী হল।

এরপর যদি কেউ প্রশ্ন করে, নামায কোত্থেকে ফরজ হল? রাসূলের আনুগত্য কি করে ওয়াজিব হল? চুরি ও ব্যভিচার কোথায় হারাম হল? জবাবে বলব, যেখান থেকে গরু ছাগরের ঘাস খাওয়া ফরজ ও মাংস খাওয়া হারাম করা হয়েছে, মানুষের ফরজ হারামও সেখান থেকে করা হয়েছে। তেমনি যেখান থেকে মক্ষিকার ঝাঁকের জন্য রাজ মক্ষিকাকে অনুসরণ করা ওয়াজিব করা হল, সেখান থেকেই মানুষের জন্য নবীকে অনুসরণ করা ওয়াজিব করা হয়েছে। হ্যাঁ, তফাত এতটুকু যে, পশু-পাখীর জন্য ফরজ হারাম হয় প্রকৃতিগত ইলহামের দ্বারা এবং মানুষ সাধনা লব্ধ ওহীর ও দিব্যজ্ঞানের মাধ্যমে ফরজ হারামের সন্ধান পায়। তারপর অন্যান্যরা পায় ওহীপ্রাপ্ত ব্যক্তির অনুসরণের মাধ্যমে।

About শিবির অনলাইন লাইব্রেরী