হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ – ১ম খন্ড

পরিচ্ছেদঃ উনচল্লিশ

শিরকের প্রকার ভেদ

শিরকের তাৎপর্য হল এই, মানুষ বুযুর্গ লোকদের ব্যাপারে এ ধারণা পোষন করে যে, তাদের থেকে যেসব নিদর্শন ও কারামত প্রকাশ পায় তা তাদের সেই গুণ ক্ষমতার কারণে যা মানুষের থাকতে পারে না; বরং তা শুধু আল্লাহরই থাকে। তবে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ভেতর তখনই তা দৃষ্ট হয়, যখন আল্লাহ তাঁর ক্ষমতার কিছু অংশ তাকে অর্পণ করেন কিংবা তার সাথে আল্লাহ একাকার হয়ে যান অথবা এ ধরনের অন্য কোন বাতিল ও ভ্রান্ত ধারণা তার ব্যাপারে পোষণ করা হয়। যেমন, হাদীস শরীফে আছেঃ “মুশরিকরা হজ্জের তালবিয়া এভাবে পড়ে থাকে –“হাজির আছি হাজির আছি, তোমার কোন শরীক নেই, সেই শরীক ছাড়া যে শরকের তুমিই মালিক, আর তার মালিকানারও তুমি মালিক। মূলতঃ মুশরিরো সেই শরীকদের সামনে অশেষ বিনয় প্রকাশ করত এবং তাদের সাথে সে সব ব্যাপারই করত যা আল্লাহর সাথে বান্দারা করে থাকে।

এ ধরনের শিরকের কয়েকটি রূপ ও শ্রেণী রয়েছে। শরীয়ত সেসব রূপ ও শ্রেণী নিয়ে আলোচনা করেছে। সেসব শিরক মানুষ নিয়ত বেঁধেই করে এবং তারা স্বভাবগতভাবেই মুশরিক বলে বিবেচিত। শরীয়ত এসলাহ ও ফাসাদের কারণগুলোকেই এসলাহ ও ফাসাদের স্থলাভিষিক্ত করে থাকে।

এক্ষণে আমি সে ব্যাপারগুলোই তুলে ধরব শরীয়তে মোহাম্মদী যেগুলোকেই শিরকের স্থান বলে নির্দেশ করে সে ক্ষেত্রে পদচারণা নিষিদ্ধ করেছে। মোটকথা, মুশরিকরা যেহেতু প্রতিমা ও নক্ষত্রকে সিজদা করত তাই শরীয়ত আল্লাহ ছাড়া কাউকে সিজদা করতে নিষেধ করেছে। মূলতঃ সিজদায় কোন বস্তুকে শরীক করা মানেই হচ্ছে আল্লাহর কার্যাবলীতে তাকে শরীক করা। এদিকে আমি আগেই ইংগিত করে এসেছি। অবশ্য এ ক্ষেত্রে কোন কোন কালাম শাস্ত্রবিদ যা ধারণা করেছে, তা ঠিক নয়। তারা বলে, আল্লাহ পাকের ইবাদতের বিধানের একটি হল তাওহীদ। তাই বিভিন্ন দ্বীনে ভিন্ন ভিন্ন তাওহীদের ধারণা থাকা সম্ভব। তার জন্যে কোন নিশ্চিত দলীল জরুরী নয়। এটা কি করে হতে পারে? যদি তাই হত তাহলে আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্যে এটা অপরিহার্য করতেন না যে, সৃষ্টি ও তার পরিচালনার কার্যে কাউকে আল্লাহর সাথে শরীক করবে না। অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহই সৃষ্টিকর্তা ও পালন পরিচালনকর্তা। যেমন, আল্লাহ বলেনঃ

(আরবী*******************************************************************)

সূরা নমলঃ আয়াত ৫৯

“তুমি বলে দাও, সব প্রশংসাই আল্লাহর এবং তাঁর সেই বান্দাদের প্রতি সালাম, যাদের তিনি বেছে নিয়েছেন। আল্লাহ কতই উত্তম”। (পরবর্তী ৫ আয়াত।)

মূলতঃ সত্য কথা এটাই যে, মুশরিকরা বড় বড় কাজে আল্লাহকেই স্রষ্ট ও কর্মকর্তা ভাবত। তারা এটাও মানত যে, এ সৃষ্টি তার পরিচালন কার্যের জন্যে তিনি ইবাদত পাবার যোগ্য। তাওহীদের তাৎপর্য বর্ণনা প্রসংগে আমি সেদিকে ইংগিত দিয়েছি। তাই আল্লাহ পাক মুশরিকদর ওপর এ অভিযোগ এনেছেন যে, তার এ মূল ইবাদতেই অন্যকে শরীক করছে। আল্লাহর জন্যেই চূড়ান্ত দলীল-প্রমাণ।

মুশরিকরা নিজেদের প্রয়োজনাদি, রুগীর আরোগ্য, দরিদ্রের ধনী হওয়া ইত্যাদি ব্যাপারে গায়রুল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানাত। সেজন্যে তাদের নামে মানত করে ভেট দিত ও বিশ্বাস করত যে, এসব নামনের ভেট দিলেই তাদের প্রার্থনা পূর্ণ হবে। তারা বরকতের জন্যে গায়রুল্লাহর নাম ব্যভহার করত। তাই আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্যে অপরিহার্য করে দিয়েছেন যে, নামাযে তারা এ দোয়া পড়বে –“আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করছি এবং একমাত্র তোমারই সাহায্য কামনা করছি”। অন্যত্র তিনি বলেন –“তাই তোমরা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ডেক না”।

তফসীরকারনগণ দোয়াকে যে ইবাদত বরেছেন তাহা ঠিক নয়। কারণ, দোয়া হচ্ছে আল্লাহর মদদ চাওয়া। কারণ, আল্লাহই শিখিয়ে দিলেন, “তোমার যা চাওয়ার তা কেবল আল্লাহর কাছেই চাও যেন তিনি তোমাদের সে চাহিদা পূর্ণ করেন”।

এক দল মুশরিক তাদের নির্ধারিত শরীকদের কাউকে আল্লাহর পুত্র ও কাউকে তাঁর কন্যা বলত। তাই তাদের তা বলতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। পূর্ববর্তী পৃষ্ঠাগুলোর আলোচনায় এ ব্যাপারটি রহস্য আমি সুস্পষ্ট করে দিয়েছি। তারপর একটি ব্যাপার এই যে, তারা তাদের আহবার ও রোহবান অর্থাৎ, তারা এ বিশ্বাস রাখত যে, তারা যে বস্তুকে হালাল বলবে সেটাই হালাল এবং যে বস্তুকে হারাম বলবে সেটাই হারাম। আর এজন্য তাদের পাকড়াও করা হবে না। এ প্রসংগে আল্লাহ পাক এ আয়াত নাযিল করলেনঃ

(আরবী************************************************)

সূরা তাওবাহঃ আয়াতঃ ৩১

“তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের আহবার ও রোহবানদের প্রভু বানিয়েছেন”।

তখন আ’দী ইবনে হাতিম এ ব্যাপারে রাসূল (সঃ)-এর কাছে জানতে চাইলেন। রাসূল (সঃ) বললেনঃ এ আহবাররা তাদের জন্যে যেসব বস্তু হালাল বলে তারা সেগুলো হালাল মনে করে, আর যেগুলোকে হারাম লে দেয় সেগুলোকে তারাও হারাম বলে মেনে নেয়।

আসল কথা হল, হালাল-হারাম নির্ধারণের ব্যাপারটি পার্থিব ব্যাপার নয়। এটা আত্মিক জগতের ব্যাপার। সে জগতে এ নির্দেশ জারী হবে যে, অমুক বস্তুর ব্যাপারে জবাবদিহি করা হবে, আর অমুক বস্তুর ব্যাপারে ধরপাকড় হবে না। মূলত এ ঐশী ফরমানই পাকড়াও হওয়া না হওয়ার কারণ। আর এ ক্ষমতা তো আল্লাহ পাকের খাস ব্যাপার! রাসূল (সঃ) কোন কোন বস্তু হালাল কিংবা হারাম করেছেন বলে যে প্রমাণ পাওয়া যায়, তার তাৎপর্য হচ্ছে এই যে, তার যে কোন নির্দেশ এ কথার দলীল যে, মূলত তা আল্লাহর তরফেরই নির্দেশ। অর্থাৎ, তা হালাল বা হারাম করেছেন স্বয়ং আল্লাহ। মুজতাহেদীনরাও হালাল-হারাম নির্ধারণ করেছেন বলে যে কথা রয়েছে তার তাৎপর্য হল এই, তারা শরীয়ত প্রণেতার আয়াত থেকেই তা ইজতেহাদ করে বের করে নিয়েছেন, তারা নিজেরা কিছুই নির্ধারণ করেননি।

স্মরণ থাকা দরকার, আল্লাহ পাক যখন তাঁর রাসূলকে পাঠান, মু’জিযার মাধ্যমে তার রিসালাত প্রমাণিত হয়। তখন সেখানে কোন কোন জিনিস হারাম ছিল। আল্লাহ পাক তাঁর মুখে সেগুলোকে হালাল ঘোষণা করালেন। তখন কিচু লোকের মনে খটকা দেখা দিল ও সেগুলো হারাম স্মরণ থাকা দরকার, আল্লাহ পাক যখন তাঁর রাসূলকে পাঠান, মু’জিযার মাধ্যমে তার রিসালাত প্রমাণিত হয়। তখন সেখানে কোন কোন জিনিস হারাম ছিল। আল্লাহ পাক তাঁর মুখে সেগুলোকে হালাল ঘোষণা করালেন। তখন কিচু লোকের মনে খটকা দেখা দিল ও সেগুলো হারাম ছিল। তাদের এ বৈধ কারণকে অস্বীকার ও অবৈধ কারণের দিকে ঝোঁক থাকার দুটো কারণ হতে পারে।

এক –যদি বর্তমান দ্বীন ও শরীয়ত সত্য হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ থাকা। তাহলে তা এ নবীকে অস্বীকার করা ও তাঁর সাথে কুফরী করার পর্যায়ে চলে যায়।

দুই –যদি পূর্ববর্তী হারামকে এরূপ হারাম ভাবে যা বাতিল হবার নয়, তা হলেও তা বৈধকরণকে অস্বীকার করা হয়। এরূপ ধারণা সৃষ্টির কারণ এটাই হতে পারে, যিনি তা হারাম করে গেছেন, তিনি আল্লাহর সাথে একাকার সত্তা বিধায় আল্লাহর এক বান্দার ঘোষিত বিধানের চেয়ে তার ঘোষিত বিধানের গুরুত্ব বেশী। ফলে তা লংঘন করতে গেলে জান-মালের ক্ষতি দেখা দেবে।

নিঃসন্দেহে এরূপ ব্যক্তি মুশরিক। সে গায়রুল্লাহর ভেতরে আল্লাহকে দেখছে এ তার অসন্তোষ থেকে গযবের আশংকা করছে। এমনকি গায়রুল্লাহকে হালাল-হারাম বানাবার অধিকারী ভেবে বসেছে।

শিরকের এও এক পদ্ধতি যে, প্রতিমা ও নক্ষত্রের নৈকট্য লাভের জন্য জীব-জানোয়ার জবাই করে সেগুলোর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা। এ পদ্ধতি মুশরিকরা সে জীব-প্রতিমার জন্যে নির্ধারিত পূজার বেদীতে জবাই করত আর জবাই করার সময়ে প্রতিমার নাম নিত। এ ধরনের শিরকও নিষিদ্ধ হয়েছে।

শিরকের আরেক পদ্ধতি এরূপ ছিল যে, বাহীরা ও সায়েবা নামক উট তারা দেবতার নামে উৎসর্গ করে মুক্ত ভাবে ছেড়ে দিত। এ পদ্ধতি নিষিদ্ধ করে আল্লাহ পাক ঘোষনা করলেন, আল্লাহ কান কাটা কিংবা মুক্ত ষাঁড়কে তাঁর শরীয়তের বিধান বানাননি।

শিরকের এও এক রূপ ছিল যে, কোন কোন মহান পূর্বপুরুষের নাম খুব শ্রদ্ধার চোখে দেখা হত এবং তাদের নামে মিথ্যা শপথ নিলে জান-মালের ক্ষতি দেখা দেবে বলে বিশ্বাস করা হত। তাই তারা নিজেদের কায়-কারবারে সে সব নামে শপথ করত। আল্লাহ পাক তাও নিষিদ্ধ করেছেন। নবী করীম (সঃ) বলেনঃ যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর নামে কসম করল সে শিরক করল।

কোন কোন মুহাদ্দিস তাঁর এ বক্তব্যকে সতর্কতা ও ধমকমূলক বক্তব্য বলে এড়াতে চান। আমি তা বলি না। আমার নিকট উক্ত শপথের তাৎপর্য পূর্বোল্লেখিত আকীদার শপথ! তাই তা শিরক হবে।

শিরকের আরেকটি রূপ হল, গায়রুল্লাহর মাযার, দরগাহ বা খানকা যিয়ারত করা। এ যিয়ারতকারীরা ভাবে যে, উক্ত স্থান অত্যন্ত বরকতময়। কারণ, অমুক বুযুর্গের সাথে জড়িত। তাই সেখানে গেলে তার নৈকট্য ও অনুগ্রহ পাওয়া যাবে। এ ধরনের শিরকও নিষিদ্ধ হয়েছে। নবী করীম (সঃ) বলেন –তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন স্থান যিয়ারতের জন্যে বাহনে উঠবেনা!

শিরকের আরেক রূপ হল, নিজ সন্তানদের নাম দেবতার নামের সাথে জুড়ে রাখা। যেমন, আবদুল উযযা আব্দুস শামস ইত্যাদি। তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ

(আরবী*********************************************************************)

সূরা আ’রাফঃ ১৮৯

অর্থাৎ, তিনিই তোমাদিগকে সৃষ্টি করেছেন একটি প্রাণ থেকে, তা থেকে তার জোড়া সৃষ্টি করেছেন যেন সে তাতে তুষ্টি পায়! তারপর যখন সে তাকে ঢেকে নিল….।

হাদীসে এসেছে, হাওয়া (আঃ) তার সন্তানদের নাম আবদুল হারিস রাখেন এবং তা শয়তানের কুমন্ত্রণা মোতাবেক ছিল। তাছাড়া অসংখ্য হাদীস থেকে প্রমাণ মিলে যে, হুজুর (সঃ) তার সাহাবাদের ম্যধকার আবদুল উযযা ও আবদুস শামস নাম বদল করে আবদুল্লাহ ও আবদুর রহমান রেখেছেন।

এসবই হল শিরকের বিভিন্ন রূপ ও পদ্ধতি। তাই শরীয়ত প্রণেতা একে নিষিদ্ধ করেছেন।

পরিচ্ছেদঃ চল্লিশ

আল্লাহর গুণাবলীর ওপর ঈমান

জেনে রাখুন, পুণ্যের সকল শ্রেণীর ভেতর সর্বোচ্চ স্থান হল আল্লাহর গুণাবলীর ওপর ঈমান আনা এবং সেগুলোর সাথে আল্লার গুণান্বিত হওয়ার ওপর বিশ্বাস রাখা। কারণ, এ ব্যাপারটি আল্লাহ ও তাঁর বান্দার সম্পর্কের দুয়ার খুলে দেয়। আর এর মাধ্যমেই আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহাত্ম্য সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জনের যোগ্যতা সৃষ্টি হয়।

মনে রাখবেন, কোন জ্ঞানগত ও বস্তুগত জিনিসের সাথে তুলনীয় হওয়া থেকে আল্লাহ পাক মুক্ত ও পবিত্র। কেননা, কোন সৃষ্টি বস্তু ও জীবের যেভাবে গুণ অর্জন হয় বা তার ওপরে গুণ আরোপিত হয় অথবা তার ভেতরে গুণ প্রবিষ্ট করা হয়, এ ক্ষেত্রে তার কোনটিই প্রযোজ্য নয়। সুতরাং সাধারণ জ্ঞান-বুদ্ধি, যুক্তি-প্রমাণ ও উপমা দ্বারা তাঁর গুণাবলীর প্রকাশ বা পরিমাপ চলে না।

অথচ মানুষকে সে গুণাবলী প্রকাশও করতে হবে যেন সে যথাসম্ভব তার দায়িত্ব পূর্ণ করতে পারে। তাই আল্লাহর গুণ দ্বারা তার ফলাফল ও ব্যাপ্তি অর্থ নিতে হবে! তার আদি রূপ বলা সম্ভব নয়! যেমন, রহমত দ্বারা বুঝতে হবে, নিয়ামত প্রদান। যেখানে অন্তরের নম্রতা ও ঝোঁক অর্থ নেয়া যাবে না। সেভাবে সমগ্র সৃষ্টবস্তু আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে আছে বলতে এমন অর্থ নিতে হবে, যা সাধারণ্যে বোধগম্য। যেমন, কোন বাদশাহর কোন শহর নিয়ন্ত্রণে আনা, কারণ, আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ বুঝাবার জন্যে এর চেয়ে সুন্দর ভাষা ও পদ্ধতি মানুষের থাকতে পারে না। তাঁর ব্যঅপারে কোন উপমা উৎপ্রেক্ষা ব্যবহার করলেও তা যথাযথ অর্থে ব্যবহার করা যাবে না! আর এমন উপমা হতে হবে যার পরিচিতি অর্থের সাথে উক্ত গুণের মোটামুটি সাযুজ্য রয়েছে। যেমন দরাজ হস্ত বলতে দান-দাক্ষিণ্য বুঝায়। পরন্তু এসব উপমা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে, যেন তা থেকে শ্রোতারা তাঁর গুণের ভেতরে জৈবিক বিভিন্নতার কারণে ভিন্ন ভিন্ন হয়। তাই বলতে হবে, আল্লাহ শুনেন ও দেখেন, কিন্তু তিনি স্বাদ নেন ও ছুঁয়ে থাকেন বলা যাবে না। এটাও জরুরী যে, বিভিন্ন অর্থ ও প্রভাবযুক্ত একই শব্দের ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। যেমন, রাযযাক (রুযীদাতা) ও মুসাব্বের (চিত্রশিল্পী)। তেমনি যেসব গুণ আল্লাহ পাকের শান ও মর্যাদার পরিপন্থী ও তাঁর জন্যে অশোভন তা তাঁর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে না, ব্যবহার করা চলবে না। তাই বলতে হবে যে, আল্লাহর কোন সন্তান নেই এবং তিনিও কারো সন্তান নন!

সকল ঐশী গ্রন্থ আল্লাহর গুণাবলী প্রকাশের উপরোক্ত রীতি-নীতি ও শর্তাদির সাথে একমত। তারা এ ব্যাপারেও একমত যে, এ পথে অনুরূপ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে ও এ নিয়ে কোন তর্ক-বিতর্ক চলবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম-এর ঘোষিত উত্তম যুগপত্রের সবাই এ পন্থাই অনুসরণ করে গেছেন। তাদের পরে ইসলামানুসারীদের একটি দল কোন আয়াতের সমর্থন ও অকাট্ট প্রমাণ ছাড়াই আল্লাহর গুণাবলী, অর্থ ও তাৎপর্য নিয়ে অনুসন্ধান ও বিতর্ক জুড়ে দিল। অথচ রাসূল (সঃ) বলেছেন, সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা কর কিন্তু স্রষ্টা নিয়ে গবেষণা করো না।

আল্লাহ পাকের বাণীঃ “সব কিছুর শেষ সীমা হল তোমার পালনকর্তা এ প্রসংগে তিনি বলেন, প্রভুকে নিয়ে চিন্তা-গবেষণা চলে না।

মূলতঃ আল্লাহর গুণাবলী সৃষ্টও নয়, নশ্বরও নয়। তাই তা নিয়ে গবেষণা অনাবশ্যক। তা নিয়ে গবেষণা করতে গেলেই প্রশ্ন আসবে, তিনি এ সব গুণে কিভাবে কখন থেকে গুণান্বিত হলেন? তখনই তাঁকে সৃষ্টির ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার সাথে একাকার করা হয়। ইমাম তিরমিজীর এক হাদীসে আছে, “আল্লাহর হাত ভরপুর”। এ সম্পর্কে হাদীসের ইমামগণ বলেন- আমরা এ হাদীসের উপর সেভাবেই ঈমান রাখি যেভাবে তা বর্ণিত হয়েছে। তার কোন ব্যাখ্যা কিংবা তাতে কোন সংশয় ছাড়াই আমরা ঈমান রাখি। তেমনি সুফিয়ান সাওরী, ইমাম মালিক, ইবনে উয়াইনা ও ইবনে মুবারক বলেন –এ ধরনের কথা যেভাবে যা বর্ণিত আছে, সেভাবেই তার উপর ঈমান রাখি। এ প্রশ্ন তোলা যাবে না যে, তা হল কি ভাবে?

ইমাম তিরমিজী অপর এক স্থানে বলেন –উক্ত গুণাবলী যেভাবে বর্ণিত আছে সেভাবেই উদ্ধৃত করা হবে। এটা কোন সৃষ্টির সাথে তুলনীয় ব্যাপার নয়, তাই এরূপ বলা যাবে না যে, তাঁর শোনা আমাদের শোনার মত এবং তাঁর দেখা আমাদের দেখার মত।

হাফিজ ইবহে হাজার আসকালানী (রঃ) বলেনঃ রাসূল (সঃ) ও সাহাবায়ে কেরাম থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে এমন বর্ণনা নাই যাতে বুঝা যায় যে, অনুরূপ বর্ণনা ব্যাখ্যা করা ওয়াজিব কিংবা তা সর্বতোভাবে নিষিদ্ধ। এটাও অসম্ভব কথা যে, আল্লাহ পাক তাঁর রাসূলকে যা কিছু অবতীর্ণ হয়েছে তা মানুষের কাছে প্রচার করতে বলছেন এবং এও বলছেন যে, আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, অথচ মুতাশাবিহা বা রূপক শব্দ কিভাবে প্রচার করতে হবে, তার কোন বিধান নেই। তাই মানুষ জানতে পারে না যে, কোন ব্যাপার তাঁর সাথে সম্পৃক্ত করা যাবে আর কোনটা করা যাবে না। অথচ হুজুর (সঃ) নিজেও আল্লাহ রাসূলের বাণী প্রচারের ওপর সুস্পষ্ট জোর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যারা উপস্থিত আছে তারা অনুপস্থিতদের কাছে কথাগুলো পৌঁছে দেবে। তাই সহচররা তাঁর বাণী, কাজ, অবস্থা এমনকি সেসব ব্যাপার যা তার সামনে সংঘটিত হয়েছে তা সবই যথাযথভাবে পরবর্তী উম্মতের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। সুতরাং তা থেকে এটাও জানা গেছে যে, এটা এজমায়ে উম্মত হিসাবে চলে আসছে যে, মুতাশাবিহা বা রূপক আয়াত দ্বারা আল্লাহ যা বুঝাতে চেয়েছেন তার ওপর ঈমান রাখা চাই। কারণ, সৃষ্টির সাথে কোনরূপ তুলনা থেকে তাঁকে পবিত্র রাখা অপরিহার্য। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

(আরবী*******************************************)

সূরা শূরাঃ ১১

অর্থাৎ তাঁর তুলনা তিনি নিজেই, অন্য কিছুই নয়!

আমি বলছি, শ্রবণ, দর্শন, ক্ষমতা, হাসি, কথাবলা, সমাসীন হওয়া ইত্যাদির মধ্যে কোন তারতম্য নেই। কারণ, ভাষাবিদ মাত্রই এসব শব্দের অর্থ এরূপ নিয়ে থাকেন, যা আল্লাহ পাকের জন্য কোন ভাবেই উপযোগী নয়। হাসি তার জন্যে এ কারণে অসম্ভব ব্যাপার যে, তার জন্যে বিশেষ ধরনের মুখ প্রয়োজন। তেমনি কথার জন্যেও মুখ চাই এবং ধরা ও চলার জন্যে বিশেষ গড়নের হাত-পা চাই। শোনা ও দেখার ব্যাপারটি তদ্রূপ। তাতে কান ও চোখ প্রয়োজন। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

এসব চিন্তা ও ভাবনাকারীরা মুহাদ্দিসদের সমালোচনা করেছেন। তারা তাঁদের সম্পর্কে বলে থাকেন, তাঁরা মূলতঃ দেহবাদী ও উপমাবাদী, কিন্তু তাঁরা তা গোপন রাখে।

আমার কাছে এটা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তাদের এ সমালোচনা অর্থহীন। সব ধরনের বর্ণনা ও তাৎপর্যের আলোকে তাদের সমালোচনা ভ্রান্তিপূর্ণ। হেদায়েতের ইমাম মুহাদ্দিসদের ওপর অপবাদ দেয়ার কাজটি ভ্রান্ত কাজ। তার ব্যাখ্যায় দুটো অবস্থা রয়েছে।

১। আল্লাহ পাক এসব গুণাবলীর সাথে কিভাবে গুণান্বিত হলেন? এ গুণাবলী কি তাঁর ব্যক্তিসত্তার বাহনের অতিরিক্ত কিছু, না মৌল সত্তার অংশ? তাঁর শ্রবণ, দর্শন ও কথোপকথন ইত্যাদির তাৎপর্য কি? কারণ, সাধারণ অভিমত অনুসারে সেসব শব্দ তার ক্ষেত্রে শোভন নয়। এ ক্ষেত্রে সত্য কথা এটাই যে, হুযুর (সঃ) এ ব্যাপারে কিছু বলেননি। পরন্তু উম্মতকে তিনি এ ব্যাপারে মুখ খুলতে ও বিতর্ক তুলতে নিষেধ করেছেন। তাই হুযুর (সঃ) যা নিষেধ করেছেন সে ব্যাপারে অগ্রসর হওয়ার কারো অধিকার নেই।

 ২। শরীয়তে এমন কোন জিনিস রয়েছে যা দিয়ে আল্লাহ তা’আলার গুণ প্রকাশ করা যায় আর কোন জিনিস দ্বারা তাঁর গুণ প্রকাশ বৈধ নয়।

সত্য কথা এই যে, তাঁর গুণ ও নামসমূহ তাওফিকী বা শর্ত সাপেক্ষ। অর্থাৎ, অবশ্য আমরা সেই রীতি-নীতি বুঝি যার ওপর আল্লাহ তা’আলার গুণাবলীর বর্ণনার বুনিয়াদ রাখা হয়েছে। এ অধ্যায়ের শুরুতে আমি সেগুলো বর্ণনা করে এসেছি। অধিকাংশের ধারণা, যদি গুণ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা বৈধ রাখা হয়, তাহলে যে বৈধ করবে সে গোমরাহ হবে এবং অন্যদেরও গোমরাহ বানাবে। অবশ্য এমন কতক বিশেষণ রয়েছে যদ্দারা আল্রাহর গুণ বর্ণনা করা মূলতঃ বৈধ। কিন্তু কাফেররা সে বিশেষণগুলো অপাত্রে ব্যবহার করে তা জনসাধারণে সেভাবেই খ্যাত করে ফেলেছে। তেমনি কিছু বিশেষণ আছে, যা প্রকাশ্য অর্থে ব্যবহার করা গেলেও ব্যবহারিক অর্থে ভুল বুঝার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই তা ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে। এসব কারণেই শরীয়ত তাঁর গুণাবলী ও নামসমূহ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা অবৈধ করেছে।

মোটকথা হাসি, খুশী, উৎফুল্লতা, অসন্তোষ ও সন্তুষ্টি শব্দ আল্লাহর শানে ব্যবহার করা চলে। তবে কান্না ও ভয় ইত্যাকার শব্দ ব্যবহার করা চলে না। যদিও উভয় শ্রেণীর অনুভূতির উৎস প্রায় একই। আমাদের তাহকীক মতে প্রমাণ ও জ্ঞান দ্বারা এটা সমর্থিত হয়। এর ধারে-কাছেও বাতিলের অস্তিত্ব নেই। উক্ত চিন্তাভাবনাকারী দলের মতামত ও যুক্তিতর্কের আলোচনা অন্যত্র হওয়া বাঞ্ছনীয়। এক্ষণে সেই গুণাবলীর বিশ্লেষণ ও তাৎপর্য এমন ভাবে করা দরকার যা তাদের বক্তব্য থেকে অধিকতর উপযোগী ও কাছাকাছি।

কারণ, এসব অর্থ কোন দলীল-প্রমাণ দ্বারা নির্ধারিত নয়। তা মেনে নেয়ার জন্য কাউকে বাধ্য করা চলে না। তেমনি ভাবে অন্য ব্যাখ্যার ওপর প্রাধান্য দেয়ারও উপায় নেই। তেমনি এক ব্যাখ্যা অপর ব্য্যাখার ওপর মর্যাদা দাবী করতে পারে না। তেমনি এ ব্যাখ্যাকে আল্লাহ নির্দেশিত ব্যাখ্য বলেও দাবী করা যায় না। এটাও বলার উপায় নেই যে, এ ব্যাখ্যার ওপর উম্মতের ইজমা হয়েছে। এখন আমি বলছিঃ আমাদের সামনে তিন শ্রেণীর অস্তিত্ব রয়েছে। জীবন্ত, মৃত ও এ দুয়ের বহির্ভূত জড় পদার্থ। এ তিনের ভেতরে জীবন্তই সজ্ঞান। তাই সৃষ্টির ভেতরে তা প্রভাবশালী। এ কারণেই আল্লাহর সাথে তার সাজুয্য রয়েছে, তাই তাঁর নাম “হাই” হওয়া অপরিহার্য, তার অর্থ জীবন্ত। তেমনি যেহেতু আমাদের কাছে ইলম বা জ্ঞানই সব রহস্যের আঁধার বিলুপ্ত করে সব কিছু আমাদের সামনে উজ্জ্বল করে তুলে ধরে। আল্লাহর কাছে সব কিছুই যেহেতু উজ্জ্বল হয়ে আছে এবং শুরুতেই সামষ্টিক ভাবে ও পরে সবিস্তারে বিদ্যমান রয়েছে, তাই তাঁর নাম “আলীম” বা সর্বজ্ঞ রাখা অপরিহার্য। তেমনি দেখা-শোনার দ্বারা সব কিছুর জ্ঞান যখন পূর্ণতা লাভ করে তখন তাঁর নাম “সামিউন” ও “বাসীরুন” রাখা জরুরী। তেমনি আমরা যখন বলি, অমুক ব্যক্তি অমুক কাজ করার ইচ্ছা করেছে, তখন এ কথাই বুঝিয়ে থাকি যে, সে ব্যক্তি সে অনেক করা বা না করার ইচ্ছা পোষণকারী হতে পারে। আল্লাহ পাক যেহেতু অনেক কাজ কোন শর্ত পূরণ হলে কিংবা সৃষ্টি জগতে তার শর্ত ও উপযোগীতা দেখা দিলে করে থাকেন, ফলে যা হওয়া আগে জরুরী ছিল না তা শর্ত ও উপযোগীতা দেখা দেয়ার জরুরী হয়ে থাকে, কখনও তাঁর অনুমতি ও নির্দেশক্রমে কোন কাজে মতৈক্য সৃষ্টি হয়, যা আগে মতানৈক্যের ব্যাপারে ছিল, তাই তাঁর নাম ‘মুরীদ’ বা ইচ্ছা পোষণকারী।

তেমনি যেহেতু তিনি আদিতেই অনেক কিছুর সামষ্টিক ইচ্ছা পোষণ করে রেখেছেন যা দিনের পর দিন যথাক্রমে প্রকাশ পেয়ে চলছে, তাই প্রতিটি ঘটনাকেই স্বতন্ত্র রূপ দিয়ে বলা যায় যে, তিনি ইচ্ছা করায় এ ঘটনা ঘটছে।

তেমনি যখন আমরা বলি অমুক ব্যক্তি ক্ষমতাবান, তখন আমরা এ অর্থই বুঝিয়ে থাকি যে, সে ব্যক্তি কোন কিছু করার ক্ষমতা রাখে এবং  থাকি যে, সে ব্যক্তি কোন কিছু করার ক্ষমতা রাখে এবং কোন বাহ্যিক প্রতিকূলতা তাকে সে কাজ করা থেকে বিরত রাখতে পারে না। তারপর যদি ক্ষমতাবান তার ক্ষমতাধীন কাজের একটি করে অপরটি না করে, তা হলে বলা যায় না যে, সেটা করার সে ক্ষমতা রাখে না। এটা সুস্পষ্ট কথা যে আল্লাহ সব কিছু করার ক্ষমতা রাখেন। তবে নিজ অনুগ্রহে ও ইচ্ছানুসারে তিনি এক কাজের ওপর অন্য কাজকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। তাই এটা জরুরী হয়ে দাঁড়ায় যে তাঁর নাম হবে “কাদের”।

তেমনি আমরা যখন বলি, অমুক অমুকের সাথে কথা বলেছে তখন আমরা এটাই বুঝিয়ে থাকি যে, সে নিশ্চয়ই কোন অর্থপূর্ণ কথা বলেছে। রাহমানুর রাহীম অনেক সময় বান্দার ওপর ইলমের তুফান সৃষ্টি করেন। কখনও আবার এমন জ্ঞান অবতীর্ণ করেন যা বান্দার বোধগম্য হয়। ফলে তা বান্দার জন্য অর্থবহ করা হয়ে থাকে। এ কারণেই জরুরী হল যে, তাঁর নাম হবে “মুতাকাল্লিম” বা প্রবক্তা। তাই আল্লাহ বলেনঃ

(আরবী***************************************************************)

সূরা শূরাঃ আয়াত ৫১

অর্থাৎ, আল্লাহর সাথে (সরাসরি) কথা বলার ক্ষমতা কারো নেই, হ্যাঁ, তিনি ওহীর মাধ্যমে কিংবা পর্দার আড়াল থেকে অথবা কোন ফেরেশতার মাধ্যমে ওহী নাযিল করে যা চান বলে থাকেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বোচ্চ স্তরের মহা কুশলী।

মূলতঃ ওহী হচ্ছে কখনও বা কারো অন্তরে তন্দ্রাযোগে কোন কথা ঢেলে দেয়া। তেমনি কখনও বা আল্লাহর দিকে নিবিষ্ট মনে ধ্যানকারীর অন্তরে জাগ্রত ভাবেই প্রয়োজনীয় জ্ঞান উপস্থিত হওয়া। পর্দার পেছন থেকে শোনার তাৎপর্য এই যে, সে অদৃশ্য থেকে ক্রমাগত সুবিন্যস্ত কথা শুনতে পায় অথচ বক্তাকে দেখতে পায় না। কিংবা তিনি কোন বাণীবাহক পাঠান এবং উদ্দিষ্ট ব্যক্তির সামনে ফেরেশতা এসে সশরীরে হাজির হন। কখনও আল্লাহর দিকে ধ্যানমগ্ন অর্ধ চেতন অবস্থায় ঘন্টার আওয়াজের মত কথা মূলতঃ ওহী হচ্ছে কখনও বা কারো অন্তরে তন্দ্রাযোগে কোন কথা ঢেলে দেয়া। তেমনি কখনও বা আল্লাহর দিকে নিবিষ্ট মনে ধ্যানকারীর অন্তরে জাগ্রত ভাবেই প্রয়োজনীয় জ্ঞান উপস্থিত হওয়া। পর্দার পেছন থেকে শোনার তাৎপর্য এই যে, সে অদৃশ্য থেকে ক্রমাগত সুবিন্যস্ত কথা শুনতে পায় অথচ বক্তাকে দেখতে পায় না। কিংবা তিনি কোন বাণীবাহক পাঠান এবং উদ্দিষ্ট ব্যক্তির সামনে ফেরেশতা এসে সশরীরে হাজির হন। কখনও আল্লাহর দিকে ধ্যানমগ্ন অর্ধ চেতন অবস্থায় ঘন্টার আওয়াজের মত কথা শুনা যায়, এ যেন অর্ধচেতন অবস্থায় চোখে লাল-নীর রং দেখা।

যখন হাদিরাতুল কুদস বা পবিত্র দরবারের নির্ধারিত নেযাম মানব জগতে কায়েম করা উদ্দেশ্য হয়, তখন যে ব্যক্তি তা অনুসরণ করে সে সর্বোচ্চ পরিষদের সাথে সংযুক্ত হয়। তখন আল্লাহ তাকে আঁধার থেকে উদ্ধার করে আলোর জগতে নিয়ে আসেন এবং তাঁর প্রশস্ততার আশ্রয়ে তাকে ঠাঁই দেন। ফলে রহমতের দ্বার তার জন্যে অবারিত হয়। ফেরেশতা ও মানব কুলে ইলকা হয়ে যায় যে, তার সাথে সবাই সুসম্পর্ক রাখবে। তেমনি কেউ যদি সে বিধানের বিরোধিতা করে, তাহলে তাকে সর্বোচ্চ পরিষদ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয় এবং উক্ত পরিষদের অসন্তোষের কারণে তার ওপর দুর্যোগ নেমে আসে। অতঃপর পূর্বোল্লেখিত পদ্ধতিতে তার শাস্তি হয়ে থাকে। এ কারণেই এটা জরুরী হয়ে দাঁড়ায় যে, আল্লাহর সন্তোষ ও অসন্তোষের ভিত্তিতে পুরস্কার ও শাস্তি এসে থাকে। এসব কিছুর মূল সূত্র হল সৃষ্টিজগতের উদ্দেশ্য মোতাবেক চলা বা না চলা। তাই বলা যায়, যদি বিধানদাতার মর্জি রক্ষার মাধ্যমে সৃষ্টিজগতে পরিবেশ সৃষ্টি করে দোয়া করা হয়, তাহলে তা স্বভাবতঃই কবুল হয়।

রুইয়াত বা দেখা অর্থ হল কোন কিছু সুস্পষ্টভাবে কারো সামনে প্রকাশ পাওয়া। তাই মানুষ যখন পরকালে সেসব জিনিসের সামনে হাজির হবে যেগুলো সম্পর্কে তাদের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, তখন মেছাল দুনিয়ার মাধ্যমে তার দৃষ্টিতে তাজাল্লী সৃষ্টি হবে। তখন সবাই আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখবে এবং তখনই বাণী বাস্তবায়িত হবে। ‘শীঘ্রই তোমরা তাঁকে দেখতে পাবে যেভাবে তোমরা চৌদ্দ তারিখের পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে পাও’।

পরিচ্ছেদঃ একচল্লিশ

তাকদীরে বিশ্বাস

পুণ্যের শ্রেণীসমূহের ভেতরে তাকদীরের ওপর ঈমান রাখা বড় স্তরের পুণ্য। কারণ, এর মাধ্যমে মানুষ গোটা সৃষ্টি জগতের নিয়ন্তা একমাত্র আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে। যে ব্যক্তি তাকদীরের ফয়সালার ওপর যথাযথ ভাবে বিশ্বাস রাখে, তার দৃষ্টি সর্বতোভাবে সেদিকেই নিবদ্ধ থাকে যা কিছু আল্লাহর কাছে রয়েছে। সে গোটা দুনিয়া ও তার তাবৎ সম্পদকে সেই অমূল্য সম্পদের অন্তরায় ও পরিপন্থী মনে করে। আল্লাহর ফয়সালার সামনে বান্দার ক্ষমতাকে সে আয়নায় প্রতিফলিত প্রতিবিম্বের মতই অস্তিত্বহীন মনে করে। তাকদীরে বিশ্বাসের ফলে সে পার্থিব জীবনে আল্লাহর একক ব্যবস্থার জ্ঞান অর্জন করে থাকে। অবশ্য এ সম্পর্কিত পূর্ণ জ্ঞঅন সে পরকালেই অর্জন করবে।

রাসূল (সঃ) তাকদীরের গুরুত্ব সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন-

যে ব্যক্তি কল্যাণ-অকল্যাণের তাকদীরের ওপর বিশ্বাসী নয়, আমার সাথে তার সম্পর্ক নেই। তিনি আরও বলেন –কোন মানুষ কল্যাণ-অকল্যাণের তাকদীরে বিশ্বাস ছাড়া মোমেনই হতে পারে না। তেমনি মোমেন হতে পারেনা যতক্ষণ সে এ বিশ্বাস না রাখবে যে, যা কিছু তার ব্যাপারে ঘটার তা ঘটবেই এবং যা তার জন্যে ঘটার নয় তা কখনও ঘটবে না।

জেনে রাখুন, আল্লাহ পাকের আদি জ্ঞানে, জন্ম নেয়া বা না নেয়ার প্রতিটি ব্যক্তির সব কিছু বিধৃত রয়েছে। এটা কখনও হতে পারে না যে, এমন কোন কিছু সৃষ্টি হয়েছে যা তিনি জানেন না। এমন ঘটনা কারো মনে দেখা দিলে সেটা হবে অজ্ঞতা, সেটাকে জ্ঞান বলা যায় না। এ প্রশ্নটি হল ইলম বা জ্ঞানের সামগ্রিকতা সংশ্লিষ্ট, তাকদীর সম্পর্কিত নয়। কোন ইষলামী ফেকাহই এ ব্যাপারে মতানৈক্য পোষণ করে না।

উল্লেখিত হাদীস থেকে যে তাকদীরের গুরুত্ব জানা যায়, পূর্বসূরী নেককারগণ যে তাকদীরে বিশ্বাসী ছিলেন, এবং মুহাক্কিকবৃন্দ যে তাকদীর সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করেছেন, সে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। অবস্থা যদি তাই হয়, তাহলে কাজ-কর্মের কি প্রয়োজন? তাকদীর তো অপরিহার্য, যে কোন ঘটনা ঘটার বহু আগেই তা ঘটব বলে নির্ধারিত হয়ে আছে। তা আগে থেকেই অপরিহার্য করে রাখা হয়েছে বলেই তো ঘটছে। তা থেকে না কেউ পালাতে পারে, না কেউ ঠেকাতে পারে, এ তাকদীর পাঁচবার ঘটেছে।

এক, আদিতে আল্লাহ পাক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, সৃষ্টি জগতকে প্রয়োজন মোতাবেক এরূপ উত্তমভাবে সৃষ্টি করা হবে, যাতে সর্ববিধ প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা থাকবে এবং তার অস্তিত্ব লাভের সময় তার যাবতীয় বাড়তি সৌন্দর্য সৃষ্টির উপযোগিতাও প্রদত্ত হবে। এ জন্যে আল্লাহ তাআলা সর্ববিধ পরিকল্পনার ভেতর থেকে একটি পরিকল্পনা নির্দিষ্ট করে নিয়েছেন যেন অন্যকোন পরিকল্পনা সে ক্ষেত্রে ঠাঁই না পায়। তেমনি সেখানার ঘটনাপ্রবাহকে এমন ভাবে বিন্যস্ত করেছে নযেন তা একটি সুসংবদ্ধ একক ব্যাপার আরতাতে আধিক্যের কোন অবকাশ নেই। এভাবে সর্বজ্ঞ আল্লাহ পাকের সৃষ্টি জগতের অস্তিত্ব দানের ইচ্ছাটাই সৃষ্টি জগতের সর্ব ঘটনা প্রবাহের শেষ ঘটনাটি পর্যন্ত ঘটে যাওয়া।

দুই, আল্লাহ পাক সব কিছুর পরিমাণ আদি থেকে সুপরিজ্ঞাত। বর্ণিত আছে আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে সকল সৃষ্টির সংখ্যা ও পরিমাণ লিপিবদ্ধ করেছেন। তা এভাবে যে, তাঁর আদি অনুগ্রহ মোতাবেক সকল সৃষ্ট বস্তুকে আরশের অস্তিত্বের আওতায় সন্নিবেশিত করেছেন। সেখানে তিনি সব কিছুর নমুনা সৃষ্টি করেছেন। শরীয়তের পরিভাষায় সেটাকে বলা হয় যিকর। যেমন, যেখানে তিনি মোহাম্মদ (সঃ)-এর নমুনা চিত্রিত করে নির্ধারণ করে রেখেছেন যে, তাকে অমুক সময়ে মানব জাতির কাছে পাঠানো হবে এবং তিনি তাদের খোদায়ী বিধান অবহিত করবেন। তাছাড়া আবু লাহাব তাকে অস্বীকার করবে ও তার পাপ তাকে দুনিয়ায়ই গ্রেপ্তার করবে এবং আখেরাতে তাকে আগুন ঘিরে রাখবে ইত্যাদি, তখনই সেখানে নির্দিষ্ট হয়ে গেছে। ঠিক এভঅবেই পৃথিবীর ঘটনা প্রবাহের প্রতিটি ব্যাপার সেখানে নির্ধারিত হয়ে আছে, আর সে কারণেই তা সেভাবেই ঘটে থাকে। আমাদের যেমন ধারণা যে, দেয়ালের ওপর রাখা কাষ্ঠটি স্থির হয়ে থাকার সুযোগ না থাকায় ফসকে পড়েছে এবং ভূমির ওপর রাখলে তা ফসকাত না, এও তেমনি ব্যাপার।

তিন, আল্লাহ তাআলা আদম (আঃ)-কে মানব জাতির পিতা হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর থেকেই মানব জাতির সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন। তাই মেছালী-দুনিয়ায় তিনি তাঁর প্রতিটি বংশধরের নমুনা সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের পাপ-পুণ্য কাজের ভিত্তিতে এক দলকে আঁধার পূর্ণ ও এক দলকে আলোকময় করে সেখানে প্রকাশ করেছেন। অতঃপর তাদের সবাইকে জবাবদিহি হওয়ার উপযোগী করে দায়িত্বশীল করে বানিয়েছেন। তাদের ভেতর তাঁর ইবাদত ও মা’রিফতের যোগ্যতা দিয়ে দিয়েছেন। তার ফলেই তারা আল্লাহর সাথে ওয়াদা করে এসেছেন, তাকে প্রভু বলে মেনে চলার। তাদের জবাবদিহির কারণ এটাই। অবশ্য তারা তা ভুলে গেছে। আজকের জগতের যারাই বিদ্যমান, তারা সবাই সেই নমুনা জগতের সৃষ্ট মানুষেরই বাস্তব রূপ। সুতরাং সেখানে তাদের যার ভেতর যে বস্তু রাখা হয়েছে সেটাই তো আজ বাস্তবায়িত হয়ে চলছে।

চার –যখন মাতৃগর্ভে বাচ্চার প্রাণ ফুঁকে দেয়া হয়, সে প্রাণ তার নির্ধারিত ঘটনাপ্রবাহ নিয়েই দেহে প্রবিষ্ট হয়। যে ব্যক্তি কোন বৃক্ষের বীজ বপন করে সে ব্যক্তি বিজ্ঞ হলে বীজ, মাটি ও আবহাওয়া যাচাই করে বলে দিতে পারে যে, গাছটি কিরূপ সতেজ কিম্বা শুকনা হবে। তেমনি যে ফেরেশতা বাচ্চার দেহে প্রাণ ফুঁকে দেয় সে তার পরিস্থিতি-পরিবেশ থেকে জানতে পারে যে, এ লোকটি কি ধরনের রুযী-রোযগার করবে আর কি সব কাজ-কারবার করবে। সে এও জানতে পায়, তার ভেতর কি জৈব প্রকৃতি সবল হবে, না ফেরেশতা খাসলত জয়ী হবে। ফলে এটাও সে ফেরেশতা বুঝে নেয় যে, সে ব্যক্তি নেককার হবে, না বদকার হবে।

পাঁচ- ঘটনাবপ্রাহ ঘটার আগেই তা নির্ধারিত হয়ে আছে। মূলতঃ পবিত্র দরবারে রক্ষিত নমুনার জগতে পয়লা ঘটনাটি চিত্রিত হয়ে আছে। মূলতঃ পবিত্র দরবারে রক্ষিত নমুনার জগতে পয়লা ঘটনাটি চিত্রিত হয়। তারপর পৃথিবীতে তার ব্যবস্থাপনা চালু হয়ে যায়, এবং সে ঘটনাটি প্রকাশ পেয়ে থাকে।

আমি বারংবার এ ব্যাপারটি দেখেছি যে, একদল লোক পরস্পর লাই করছিল। তাদের ভেতর সংকীর্ণতা ও হিংসা জন্ম নিল। আমি আল্লাহ পাকের কাছে এ ব্যাপারে আবেদন জানালাম। তখন আমি দেখতে পেলাম, পবিত্র দরবার থেকে পৃথিবী পর্যন্ত একটি নূরানী রেখা দেখা দিল ও আস্তে আস্তে তা সম্প্রসারিত হয়ে চলল। তারপর যতদূর তা ছড়াল, ততদূর পর্যন্ত হিংসা সংকীর্ণতা বিলুপ্ত হল। আমার মজলিস খতম হবার আগেই তারা পরস্পর মিলে-মিশে গেল এবং হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে পূর্বেকার মিল-মহব্বতের জীবনে ফিরে গেল।

আমার কাছে এটা আল্লাহ পাকের বিস্ময়কর অপার লীলার এক নিদর্শন বৈ নয়। একবার আমার ছেলে অসুস্থ হল। আমার মন সেদিকে নিবিষ্ট ছিল। তারর জোহর নামায পড়ার অবস্থায় আমি দেখলাম, তার মৃত্যুর এসে গেছে! শেষ পর্যন্ত সে রাতেই তার মৃত্যু হল। এ থেকে এটা সুস্পষ্ট হল যে, পৃথিবীতে যা ঘটে, তা ঘটার আগে আল্লাহ তাআলা সে ঘটনা সৃষ্টি করেন। তারপর তা পৃথিবীতে এসে সেভাবেই রূপ লাভ করে যেভাবে আল্লাহ পাক তাকে রূপ দিয়েছেন। এ ভাবেই তিনি অনস্তিত্বকে অস্তিত্বে ও অস্তিত্বকে অনস্তিত্বে রূপান্তরিত করে থাকেন। আল্লাহ বলেন-

(আরবী**********************************************************************)

সূরা রা’দঃ আয়াত ৩৯

অর্থাৎ, আল্লাহ যা চান বিলুপ্ত করেন ও যা চান কায়েম করেন, তাঁর কাছে (সব কিছু লিপিবদ্ধ করা) মূল গ্রন্থ রয়েছে।

যেমন, আল্লাহ পাক কোন এক ধরনের বিপদ সৃষ্টি করেন। তারপর সেটাকে কোন বিপদযোগ্য ব্যক্তির ওপর অবতীর্ণ করার উপক্রম করেন। তখন যদি তার তরফ থেকে তওবা ও দোয়া ঊর্ধ্ব জগতে পৌঁছে যায় সে বিপদ তিনি রহিত করেন। তেমনি কখনও তিনি কারো জন্যে মৃত্যু সৃষ্টি করেন। কিন্তু এদিক থেকে তার বিশেষ কোন পুণ্য ঊর্ধ্ব জগতে পৌঁছে যায়। তখন আল্লাহ পাক সে মৃত্যু রদ করেন।

এর ভেতর রহস্য হল এই যে, উপর থেকে সৃষ্টি হয়ে যেটা আসে তা ঘটনাটি ঘটার একটি কারণ হয়ে আসে। যেমন, খানা-পিনা বেঁচে থাকার কারণ হয়। তেমনি বিষ পান বা তরবারির আঘাত মৃত্যুর কারণ হয়। বহু হাদীসে প্রমাণ মিলে যে, এমন এক জগত রয়েছে যেখানে কার্যকারণ রূপ ভাল করে। তারপর তাদের উদ্দিষ্ট বস্তু সংযুক্ত হয় এবং পৃথিবীতে তা বাস্তব হয়ে দেখা দেয়। যেমন, রহমত আরশে চলে যাওয়া, বৃষ্টির ফোঁটার মত ঘিল হওয়া, সিদরাতুল মুন্তাহার তলদেশ থেকে নীল ও ফোরাত বারিত হওয়া, ও তা পরে পৃথিবীতে প্রবাহিত হওয়া, লোহা ও চতুষ্পদ জন্তুর পৃথিবীতে অবতরণ, সমগ্র কোরআন পয়লা আসমানে নাযিল করা, হুযুর (সঃ)-এর সামনে এবং তাঁর ও মসজিদের দেয়ালের মাঝখানে জান্নাতের উত্তাপ অনুভূত হওয়ার মত অবস্থান নিয়ে দোযখের উপস্থিত হওয়া, বিপদ ও দোয়ার পারস্পরিক লড়াই, আদম সন্তান ও বুদ্ধি সৃষ্টি করা, তারপর বুদ্ধির একবার অগ্রসর হওয়া ও আরেকবার পিছিয়ে যাওয়া, সূরা বাক্বারা ও সূরা আলে ইমরানের দুই ঝাঁক পাখীর রূপ নিয়ে প্রকাশ পাওয়া, আমলের পরিমাপ হওয়া, জান্নাত তার অনভিপ্রেত জিনিসে ও দোযখন তার অভিপ্রেত জিনিসে পূর্ণ হওয়া ইত্যাকার এরূপ বহু উদাহরণ হাদীসের সাধারণ পারদর্শীর কাছেও গোপন নয়।

জেনে রাখুন, তাকদীর কখনও কার্যকারণের পৃথিবীর নিয়ম-নীতির অন্তরায় নয়। কারণ, তাকদীরের সম্পর্ক হল সেই সামগ্রিক ব্যবস্থার সাথে যা একবার করে রাখা হয়েছে। হুযুর (সঃ)-এর একটি বক্তব্যের এটাই তাৎপর্য। যখন তাঁর কাছে ঝাড়ফুঁক, ওষুধ-পত্তর ব্যবহার করা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হল যে, এসব কি আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরের পরিবর্তন ঘটাতে পারবে? তিনি জবাব দিলেন, এ ঝাড়ফুঁক ও ওষুধ-পত্তরও আল্লাহর নির্ধারিত তকদীর।

হযরত উমর ফারূক (রাঃ)-এর বক্তব্য থেকেও এ তাৎপর্য মেলে। তিনি  সরস এলাকার সতেজ ঘাসের ক্ষেতে উট চরাবার প্রশ্নে বলেছিলেন –এটা কি ঠিক নয় যে, তোমরা উট কোন সবুজ সতেজ ঘাসের মাঠে চরাও তাহলে সেটাই উটের তাকদীর?

মূলতঃ বান্দার নিজ কাজের স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু সে স্বাধীনতায় তার কিছু করার থাকে না। কারণ, উদ্দিষ্ট বস্তুর নকশা ও তার ফায়দা অন্তরে জাগরূক হওয়া ও তাতে উদ্ধুদ্ধ হয়ে তার ইচ্ছা পোষন করায় এ স্বাধীনতা জন্ম নেয়। অথচ তা কিভাবে হল সে খবর বান্দার নেই। তাহলে স্বাধীনতা কোথায়? হুযুর (সঃ) সেদিকে ইংগিত করেই বলেছেন, “অন্তর তো আল্লাহর দু’আংগুলোর ফাঁকে অবস্থান করছে। তিনি যেদিকে ইচ্ছা করেন সেদিকেই সেগুলো ফিরে থাকে”।

পরিচ্ছেদঃ বিয়াল্লিশ

ইবাদতের উপর ঈমান

স্মরণ রাখবেন, পুণ্যের শ্রেষ্ঠতম কাজ হচ্ছে এই, মানুষ পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে এ আকীদা পোষন করবে, এমন কি এ বিশ্বাসের পরিপন্থী কোন ভাবনাই আসবে না যে, ইবাদত মূলতঃ বান্দার ওপর আল্লাহর হক এবং অন্যান্য হকদাররা যেভাবে নিজ নিজ হক দাবী করে থাকে ঠিক তেমনি আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে বান্দার কাছে ইবাদত দাবী করা হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাহ হযরত মা’আজ (রাঃ)-কে বলেন- “হে মা’আজ! জান কি বান্দার ওপর আল্লাহর কি হক রয়েছে? তেমনি আল্লাহর উপরই বা বান্দার কি হক আছে? মা’আজ (রাঃ) জবাব দিলেন, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল তা ভাল জানেন। হুযুর (সঃ) তখন বললেন, “বান্দার ওপর আল্লাহর হক হচ্ছে বান্দা আল্লাহরই ইবাদত করবে আর আল্লাহর সাথে কোন প্রকার শিরক করবে না। পক্ষান্তরে আল্লাহর ওপর বান্দার হক হল, যে বান্দা তাঁর সাথে কোন শরীক করবে না, তাকে তিনি শাস্তি দেবেন না।

তার কারণ এই যে, যে ব্যক্তি অনুরূপ মজবুত আকীদা না রাখবে তার এরূপ ধারণা সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে যে, মানুষের তো কিছুই করার নেই। আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তা-ই হয় এবং সব কাজের তিনিই মালিক মোখতার। তাই তার কাছে না তিনি ইবাদতের দাবীদার, আর না তিনি সেজন্যে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। মূলতঃ এ ধরনের আকীদা পোষণকারী নাস্তিক। যদিও সে বাহ্যত ইবাদত করে থাকে, কিন্তু সে ইবাদ তার ওপর কোন প্রভাব বিস্তার করে না। তাই তার ইবাদত আদৌ আন্তরিক হবে না। এ কারণে। তার ও তার প্রতিপালকের সাথে কোন সম্পর্ক সৃষ্টি হবে না। তখন তাঁর অন্যান্য পার্থিব অভ্যাসের মত এটাও একটা অভ্যাস মাত্র হয়ে দাঁড়াবে।

এক্ষেত্রে আসল ব্যাপার এই যে, আম্বিয়ায়ে কেরাম ও তাদের ওয়ারিশদের জ্ঞান ও আত্মিক সাধনার মাধ্যমে এ সত্যটি সুপ্রমাণিত যে, বাধ্যতামূলক জগতের বিভিন্ন ক্ষেত্রের ভেতর একটা ক্ষেত্র এরূপ যেখানে ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা সক্রিয় রয়েছে। এক্ষেত্রে আসল কথা হচ্ছে এই, আম্বিয়ায়ে কেরাম ও তাঁর ওয়ারিশদের জ্ঞানে এ সত্যটি প্রতিভাত হয়েছে যে, অপরিহার্য বিধানের জগতেও এমন একটি ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে ইচ্ছা ও অভিলাষ অর্থাৎ, কোন কিছু করা বা না করার অনুমোদন রয়েছে। অথচ ঊর্ধ্ব জগতের কল্যাণকর বিধানে এরূপ ঝুলন্ত কোন ব্যাপার নেই। সেখানে হয় করা অপরিহার্য, অন্যথায় না করা অপরিহার্য হবে!

যেসব দার্শনিক বলে থাকেন যে, ইচ্ছার ভেতরেও কিছু করা বা না করার সিদ্ধান্ত নিহিত থাকে, তারা কিছু জিনিস আয়ত্ত করেছেন ও অনেক জিনিস তাদের কাছে ধরা দেয়নি। অপরিহার্যতার জগতের সেই বিশেষ ক্ষেত্রটি তাদের দৃষ্টির আড়ালে রয়ে গেছে। তাই ঐশী ও জড়জগতের বিধানে সূক্ষ্ম পার্থক্য তাদের কাছে ধরা পড়েনি। কারণ, সেই বিশেষ ক্ষেত্রের কোন পথ প্রদর্শক তাদের নেই। সে ক্ষেত্রটি শ্রেষ্ঠতম তাজাল্লী ও উচ্চতম পরিষদের মাঝখানে রয়েছে। সূর্য ও কিরণের মাঝখানে যে সম্পর্ক রয়েছে এও ঠিক তাই।

তাদের পথে অন্তরায় হচ্ছে এটাই যে, তাদের এমন কোন পথপ্রদর্শক নেই যা ‘মালা-এ-আ’লা ও তাজাল্লীয়ে আজমের মধ্যবর্তী যোগসূত্রের মত যোগাযোগের কাজ দেবে। ওয়া’লিল্লাহিল মাসালুল আলা (সর্বোচ্চ উপমা তো শুধু আল্লাহর জন্য)। বস্তুতঃ এ ক্ষেত্রে ক্রিয়া ও নিষ্ক্রিয়ার ব্যাপারটি একই ছিল।

উক্ত দার্শনিকদের জবাবে আমাদের দলীল হল এই যে, আমাদের সকলেই এ কথাটি সুস্পষ্টভাবে জানে যে, যখন কোন লোক হাত বাড়ায় ও কলম ধরে তখন সে ইচ্ছা করে ও সক্রিয় হয়। তার এ ইচ্ছা ও সক্রিয়তা বিবেচনায় তার করা বা না করার অধিকার সমানই থাকে। অথচ ওপরওয়ালার করা বা না করার ব্যাপারটি অপরিহার্য হয়ে থাকে। এ অবস্থাই সে সব ব্যাপারেবুঝে নাও যার কারণে বিভিন্ন যোগ্যতা জন্ম নেয়। বস্তুতঃ অবস্থা সৃষ্টিকারীর তরফ থেকে এমন অবস্থা সৃষ্টি করা হয় যা সৃষ্টি হওয়ার উপাদান ও যোগ্যতা বস্তুর ভেতর রয়েছে। যেমন, দোয়া করলে তা কবুল হওয়া। এ কবুল বস্তুটি সৃষ্টি হওয়ার পেছনে দোয়ার কোন না কোন ভাবে হাত রয়েছে। তুমি হয়ত বলবে যে, কোন কিছু হওয়ার ব্যাপারে যে উভয় দিকের সম্ভাবনাকে আমরা সমান ভেবে থাকি, তা তো ওপরওয়ালার অপরিহার্য সিদ্ধান্তটি না জানার কারণে। তাহলে উভয় দিকের সমান সম্ভাবনা ভাবার জ্ঞানটি সঠিক জ্ঞান হল কি করে?

আমি বলছি, এটাই তো সঠিক জ্ঞান। এ জ্ঞানই অবস্থাটির সঠিক ধারণা দেয়। অজ্ঞতা তো এটাই যে, ওপরওয়ালার ব্যাপারটিকে অপরিহার্য নয় বলে জানা। এরূপ অজ্ঞতা সব শরীয়তেই নিষিদ্ধ। সব শরীয়তেই তাকদীরের ওপর ঈমান আনতে বলাহ য়েছে। তাই এটা মানতেই হবে যে, তুমি যা পাবার তা তোমার কাছে পৌঁছবেই আর যা তোমার হারাবার তা তোমর কাছে থেকে যাবেই। এ প্রেক্ষিতে যদি বলা যায়, তাহলে তা সঠিক জ্ঞানেরই পরিচায়ক হবে। তুমি যে কোন চতুষ্পদ পুরুষ জন্তুকে ঠিক পুরুষ জন্তুর মতই কাজ করতে দেখবে; তেমনি স্ত্রী জন্তুকে স্ত্রী জন্তুর মতই কাজ করতে দেখবে। এখন যদি তুমি এ সিদ্ধান্ত নাও যে, এ কাজটি জবরদস্তির সাথে যেভাবেই করানো হচ্ছে যেভাবে পাথরকে ধাক্কা দিয়ে নড়াচড়া করানো হয়, তাহলে তুমি ভুল করবে।

তেমনি তুমি যদি বল, কোন কারণ বা অন্তর্নিহিত যোগ্যতা ছাড়াই পুরুষ জন্তু পুরোষোচিত এবং স্ত্রী জন্তু স্ত্রীসুলভ কাজ করছে তাহলে তুমি ভুল বলবে। তেমনি যদি তুমি বল, উক্ত জন্তুদের ভেতর ওপরওয়ালাদের ইচ্ছার যে ছাপ রয়েছে, তার তারই প্রতিফলন ঘটাচ্ছে, তাদের ভেতর স্বতন্ত্র কোন প্রেরণা বা উদ্দীপনা কাজ করছে না, তাহলেও তোমার ভুল বলা হবে।

মূলতঃ সত্য ও সঠিক কথা রয়েছে এ ব্যাপারে দুটোর মাঝখানে। আর তা হচ্ছে এই যে, ইচ্ছাটা মূলতঃ কোন কারণের সাথে সম্পৃক্ত। তাই তা সেটা তার কারণের প্রতিকূলে যেতে পারে না। উক্ত কারণই কাংক্ষিত কাজটিকে অপরিহার্য করে দেয়। তাই এটা অসম্ভব কথা যে, কারণ মওজুদ থাকা সত্ত্বেও কাজটি হবে না পরন্তু ইচ্ছা শক্তিটির অবস্থা তো এই যে, সে নিজের ওপর অন্য কোন শক্তি দেখতে পায় না। এখন যদি তুমি ইচ্ছা শক্তির এ অবস্থাটি মেনে নাও আর তা নিজের ভেতরেও দেখতে পাও, তাহরলে দেখবে করা না করার সম্ভাবনার সমতা তোমার কাছেও স্বীকৃত সত্য হয়ে ধরা দেবে এবং বলবে, আমার ইচ্ছার কারণে কাজটি হয়েছে।

তেমনি এরূপ বলাটা সত্যেরই প্রতিধ্বনি হবে। মোটকথা, আল্লাহ পাকের বিধি-বিধান এক্ষেত্রে আল্লাহর ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে উক্ত ইচ্ছাশক্তির কথা জানিয়ে দিয়েছেন।

মোদ্দাকথা, যে ইচ্ছা নতুন নতুন কাজ সৃষ্টি করে সেরূপ ইচ্ছার অস্তিত্ব শরীয়তে প্রমাণিত সত্য হয়ে আছে। তাই দুনিয়া ও আখেরাতে শুভাশুভ ফলাফলও সুপ্রমাণিত সত্য বই নয়।

এটাও সুপ্রমাণিত যে, নিখিল সৃষ্টির নিয়ন্তা শরীয়ত অনুসরণ করাকে অপরিহার্য করেই সৃষ্টির পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করেছেন যেন মানুষ তা অনুসরণ করে কল্যাণ পেতে পারে। ব্যাপারটি এরূপ যেন কোন প্রভু তার ভৃত্যদের খেদমতে নিয়োজিত করলেন ও তার কাছে যথাযথ খেদমত দাবী করলেন। যে ভৃত্য তার খিদমত করল তার ওপর তিনি খুশী। বস্তুতঃ ঠিক এ দৃষ্টিকোণ থেকেই আল্লাহর শরীয়ত অবতীর্ণ হয়েছে। আমি আগেই বলে এসেছি যে, আল্লাহর বিধি-বিধান তাঁর গুণাবলী ও আনুসংগিক ব্যাপারের সাথে এরূপ ওতপ্রোত সম্পৃক্ততা নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছে যা দিবালোকের মতই সুস্পষ্ট। আভ্যন্তরীণ কি বাহ্যিক কোন সত্যই এর চাইতে সুস্পষ্ট হয়ে ধরা দিতে পারে না।

আল্লাহর শরীয়ত এ সূক্ষ্ম ও রহস্যপূর্ণ বস্তুর (ইবাদত যে আল্লাহর স্বাভাবিক পাওনা) পরিচয়টি তিন ভাবে ব্যক্ত করেছেন। এ তিনটি ব্যাপারই তাঁর অনুমোদিত ও সর্বজন বিদিত সত্য।

একঃ আল্লাহ পাক নিয়ামতদাতা, কৃতজ্ঞতা অপরিহার্য, তাঁর নিয়ামতের জন্যে তাঁর ইবাদত করাই কৃতজ্ঞতা।

দুইঃ তিনি অকৃতজ্ঞকে শাস্তি দান করেন। তাই পৃথিবীতে যে তাঁর ইবাদত করবে না তাকে তিনি কঠোর শাস্তি দেবেন।

তিনঃ তিনি পরকালে তাঁর অনুগত ও অবাধ্যদের যার যার কর্মফল প্রদান করবেন।

এ থেকে তিনটি জ্ঞান অর্জিত হল।

এক, তাজকীর বে আলাল্লাহ।

দুই, তাজকীর বে আইয়ামিল্লাহ।

তিন, তাজকীর বিল মাআদ।

সমগ্র কুরআন পাক এ তিন জ্ঞানের ব্যাখ্যা হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে। এ তিনটি জ্ঞাতব্য বিষয়কে খোলামেলা ভাবে সকলের সামনে তুলে ধরার দিকেই কুরআন বেশী নজর দিয়েছে। কারণ, মানুষের সৃষ্টিই এভাবে হয়েছে যে, স্রষ্টার দিকে তার আকর্ষণ স্বভাবতঃই দেখা দেয়। এ আকর্ষণ একটি সূক্ষ্ম ব্যাপার। এটা মানুষেল প্রকৃতিতেই নিহিত রয়েছে। এ কারণেই তার সুস্থ বিবেক এ বিশ্বাস পোষন করে যে, আল্লাহর ইবাদত করাটা বান্দার কাছে আল্লাহর পাওনা। কারণ, তিনি তার নেয়ামতদাতা ও তার কৃতকর্মের ফলাফলদাতা। এখন যারা বান্দার ইচ্ছা শক্তির বা বান্দার ওপর আল্লাহর অধিকারের সত্যটি অস্বীকার করে কিংবা কৃতকর্মের ফলাফল দানের ব্যাপারটি মানেনা তারা নাস্তিক। তাদের সুস্থ বিবেক বিলুপ্ত হয়েছে। কারণ, সে তার প্রকৃতিগত আকর্ষণের অনুভূতিও হারিয়ে বসেছে। তার স্বভাবে যে বস্তুটি নিহিত রয়েছে আর সে যে বস্তুর প্রতিনিধিত্ব করছে তা উধাও হয়ে গেছে। তুমি যদি উক্ত স্বভাবগত আকর্ষণের হাকীকত জানতে চাও তাহলে স্মরণ রেখ, মানবাত্মার একটি নূরের লতিফা রয়েছে যাতে প্রকৃতিগত ভাবেই আল্লাহর প্রতি আকর্ষণ বিদ্যমান। লোহা যেভাবে চুম্বকের দিকে আকৃষ্ট থাকে এও তেমনি ব্যাপার। আত্মিক অনুভূতির মাধ্যমেই এটা জানা যায়।

তাই যে ব্যক্তি নিজ আত্মার লতিফাগুলো জানার জন্য গভীর গবেষণা ও সাধনা করবে এবং প্রতি লতিফার অবস্থা বুঝে নেবে, সে অবশ্যই সেই নূরানী লতিফার সন্ধান পাবে তখন সে তাতে আল্লাহর প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ সম্পর্কে অবগত হবে। আধ্যাত্মিক সাধকদের নিকট সে আকর্ষণই আল্লাহ-প্রেম নামে অভিহিত। অন্যান্য আত্মিক ব্যাপারের মত এ ব্যাপারটিও আত্মিক অনুভূতির মাধ্যমেই পরিজ্ঞাত হয়, দলীল-প্রমাণ দ্বারা অর্জিত হয় না। যেমন ক্ষুধার্তের ক্ষুধা ও পিপাসার্তের পিপাসা আত্মা দিয়েই বুঝা যায়। অতঃপর যখন কোন মানুষের লতিফাগুলো আঁধার পর্দায় আবৃত হয়ে যায় তখন সে আর সেই নূরানী লতিফার সন্ধান পায় না। দেহ যে ভাবে ইনজেকশন দিয়ে অবশ করে নিলে গরম কি ঠাণ্ডা সব অনুভূতি বিলুপ্ত হয়, এও তাই।

মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যুর কারণে যখন নিম্নস্তরের লতিফাগুলো যেভাবে স্তব্ধ হয়ে যায়, সেভাবে আত্মার অধিকাংশ ব্যাপারের সক্রিয়তা বিলুপ্তি হয়, কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে যদি কেউ মৃত্যুর পর্যায়ে নিজেকে নিয়ে যায়, তখন আর তার ওপর কোন অবশকারী বস্তুর প্রভাব কাজ করে না। বিভিন্ন বিস্ময়কর পন্থা অর্থাৎ আত্মিক ও দৈহিক সাধনা দ্বারা মানুষ জীবন কালেও মরণোত্তর স্থায়ী আত্মার পর্যায়ে পৌঁছতে পারে এবং সেটাকেই স্বেচ্ছামৃত বলা হয়েছে। যদি কেউ মরে গিয়েও আল্লাহর দিকে নিছক অজ্ঞতা মূর্খতার কারণে রুজু হতে না পারে, তাহলে মানবিক যোগ্যতা হাজারো থাকা সত্ত্বেও সে হতভাগা। মরণোত্তর বার্যাখী জিন্দেগীর অবস্থাগুলো তার কাছে উদঘাটিত হবে বটে, কিন্তু আত্মিক যোগ্যতার অভাবে সে তার সমাধান খুঁজে পাবে না। তাই সেখানে সে হয়রান ও হতভম্ব হবে। তারপর যদি তার জ্ঞানগত কর্মগত কোন অসংগতি থাকে তাহলে তো সে অত্যন্ত সমস্যা ও টানাপোড়েনে পড়ে যাবে। তার জৈব আত্মা আল্লাহর ও অজৈব আত্মা বিভিন্ন পরস্পর বিরোধী অবস্থার শিকার হয়ে তাকে নিম্নগামী করবে। ফলেতার ভেতরে এক ভয়ংকর অবস্থার উদ্রেক হবে। এ অবস্থাটি তার অজৈব আত্মায় প্রভাব ফেলবে। পরিণামে অধিকাংশ সময়ে তার সামনে ভয়াবহ ঘটনাবলী দেখা দেবে। কোন জণ্ডিসগ্রস্তের স্বপ্নে আগুন ও স্ফুলিংগ দেখার মতই সে তা দেখতে থাকবে। আত্মার পরিচিতির রহস্যের এটাই মৌল তাৎপর্য। সে লোকের ওপর সর্বোচ্চ পরিষদের ক্রোধ ও গজবের দৃষ্টি পড়তে থাকবে। এ কারণেই সেখানে কর্মরত ফেরেশতা ও অন্যান্য অধিকার প্রাপ্তদের অন্তরে এটাই জাগ্রত হবে যে, তাকে শাস্তি ও দুঃখ-কষ্ট দিতে হবে।

মূলতঃ মানুষের অন্তরে যে সব বাসনা-কামনা ও খটকা সৃষ্টি হয় তার মূল কারণ সম্পর্কিত সঠিক ব্যাখ্যা এটাই। মোট কথা, আল্লাহর দিকে আকৃষ্ট হওয়া ও তাঁর বিধি-বিধানকে অপরিহার্য্য করে নেয়ার মাধ্যমে মানুষ তার নিম্নস্তরের লতিফাগুলোর টানাপোড়ন থেকে মুক্ত হতে পারে। তখনই সে অপরিহার্য কাজ বর্জনের জন্যে সেগুলোকে জবাবদিহি করতে পারে। আল্লাহ তা’আলা প্রতিটি মানুষের ভেতর এরূপ যোগ্যতা ও প্রভাব দিয়ে দিয়েছেন যার সাহায্যে মানুষ স্বভাবতঃই উক্ত অবস্থা বর্জন করতে পারে। এরূপ অবস্থায় মানুষ শুধু ভাসা আমল ও রুসম-রেওয়াজ অনুসরণের মাদ্যমে হাসিল করতে পারে। আমল তো শুধু সে লতিফার অভিপ্রায় পূরণ করা ও আত্মাকে দুরস্ত রাখার জন্যে হয়ে থাকে। এ ব্যাপারটি যেহেতু অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং এ লতিফা বুঝার লোক খুবই নগণ্য ছিল, তাই জরুরী হয়েছে সে লতিফার দিকে লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ না করে সরাসরি আল্লাহর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা। মূলতঃ নূরানী লতিফার উদ্দেশ্যও তাই। সে দিকেই তা মানুষকে আকৃষ্ট করে।

এতো গেল আত্মার সে অংশের অস্তিত্ব নির্ধারণ যা মানুষকে আল্লাহর দিকে আকৃষ্ট করে। এটা আমার সে দাবীরই সার কথা যাতে বলা হয়েছে যে, মানুষকে আল্লাহর দিকে আকৃষ্ট করাই মানবাত্মার নূরানী লতিফার দায়িত্ব।

আল্লাহ যখন তাঁর শরীয়ত অবতীর্ণ করেন তখন তিনি এ রহস্যটি এমন সহজ ভাবে বুঝিয়েছেন যাতে প্রত্যেকেই নিজ সহজাত জ্ঞানেই সহজে বুঝতে পারে। আল্লাহ পাক এ সূক্ষ্ম ব্যাপারটি উপমা-উৎপ্রেক্ষার মাধ্যমে মানুষের বোধগম্য করে নাযিল করেনে। যেমন কোন কো নলোকের সামনে স্বপ্নের মাধ্যমে একটা নিছক উপলব্ধির ব্যাপার এমন এক বস্তুর রূপ ধরে আসে যা তার স্বাভাবিক অভ্যেস মোতাবেকই তার জন্য অপরিহার্য হয়। হুবহু সেরূপ যদি নাও হয়তবে তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

বস্তুতঃ বলা হয় যে, বান্দার ওপর আল্লার হক হচ্ছে ইবাদত। এর ওপরেই কোরআন মজীদের হক, রাসূলের হক, মালিকের হক, পিতা-মাতার হক ও জনগণের হক কেয়াস করা উচিত। তেমনি মানুষের নিজের ওপরও নিজের হক রয়েছে। তাও আদায় করলে তার সার্বিক হক আদায় হয়। নিজে যেন সে নিজের ওপর জুলুম না করে। হক যার পাওনা আর যার সাথে হকের লেন-দেন হবে তা যেন যেনতেন ভাবে আদায় না হয়; বরং তা ভালভাবে জেনে-শুনে সঠিক ভাবে আদায় করা চাই।

পরিচ্ছেদঃ তেতাল্লিশ

আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন

আল্লাহ পাক বলেনঃ-

(আরবী***********************************************************************************)

সূরা হাজ্জ্বঃ আয়াত ৩২

“যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে মর্যাদা দেয় সেটা তার অন্তরের আল্লাহ ভীতিরই পরিচায়ক”।

স্মরণ রাখা চাই যে, আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে সম্মান প্রদর্শন ও তার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনই শরীয়তের ভিত্তিমূল। এ কথা বলে আমি সে পদ্ধতির দিকে ইংগিত দিচ্ছি যে পদ্ধতি আল্লাহ মানুষের জন্য নির্ধারণ করেছেন। মূলতঃ তা হচ্ছে ধ্যান-ধারণার ব্যাপারগুলোকে বস্তুর মাধ্যমে রূপ দেয়া। জৈবশক্তির জন্যে সেগুলো গ্রহণ করা সহজ হয়। নিদর্শনাবলী বলতে আমি সে সব বাহ্যিক কার্যকলাপকে বুঝিয়েছি যেগুলো আল্লাহর ইবাদতের জন্যে নির্ধারণ করা হয়েছে। আর সেগুলো এমন ভাবে আল্লাহর সাথে নির্দিষ্ট হয়ে গেছে যে, সেগুলোকে মর্যাদা দেয়ার মানেই আল্লাহকে মর্যাদা দেয়া। তেমনি সেগুলোর প্রতি ঔদাসীন্যের অর্থ হচ্ছে আল্লাহর প্রতি ঔদাসীন্য প্রদর্শন। এগুলো মানুষের মনের গহনে এমন ভাবে বাসা বেঁধে নিয়েছে যে, তাদের অন্তরগুলো টুকরো করে ফেললেও সেগুলোর মর্যাদা বোধ তা থেকে বিচ্যুত হবে না। মূলতঃ আল্লাহর নিদর্শনের প্রভাব এরূপ স্বাভাবিক ও প্রকৃতিগতই হয়ে থাকে। যেমন মানুষের মন কোন এক অভ্যেস ও স্বভাবে সুদৃঢ় ও সুস্থির হয়ে যায়। ফলে সেখানে সেটা প্রচলিত ও খ্যাত হয়ে যায়। এমন কি তা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের ঊর্ধে উঠে সুস্পষ্ট সত্যরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তখন আল্লাহর রহমতও সে সব বস্তুর রূপ নিয়ে দেখা দেয়। ফলে তা সার্বজনীন জনপ্রিয়তা লাভ করে ও তার রহস্য সবার কাছে খুলে যায়। দূর ও নিটকের সকলের কাছেই তার প্রচার ও প্রসার ঘটে। তখন তাদের ওপর আল্লাহর সে নিদর্শনের মর্যাদা দান অপরিহার্য হয়ে যায়। যেমন কেউ যদি আল্লাহর নামে মিথ্যা শপথ নেয় তখন তার বিবেক সে জন্যে তাকে দংশন ও জবাবদিহি করে থাকে। তেমনি এ নিদর্শনগুলো অস্বীকার করতে গেলে বিবেকের দংশন সহ্য করতে হয়, বরং তা মেনে চলার অনুকূলেই তার জ্ঞান সায় দেয়। তার জ্ঞানের এ আনুকূল্য ও আকর্ষণ অপরিহার্য করে দেয় যে, আমাদের আনুগত্য ও অনুসরণ আল্লাহর রহমতের প্রকাশ ঘটায়। কারণ, যে কোন কার্য ব্যবস্থার ভিত্তি হতে হয় সহজ থেকে সহজতর যাতে সবার অন্তরে তা সহজে প্রবিষ্ট ও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি সর্বান্তঃকরণে মর্যাদা প্রদর্শন করা উচিত। তাতে কোনরূপ ঔদাসীন্য ও অবহেলা চলবে না।

আল্লাহ পাক নিজ বান্দাদের ওপর যা কিছু অপরিহার্য করেছেন তা তাঁর নিজের কল্যাণের জন্য নয় আদৌ। আল্লাহ তাআলা তা থেকে অনেক ঊর্ধে অবস্থান করছেন। বরং তাতে সৃষ্টি কুলেরই কল্যাণ রয়েছে। বান্দার অবস্থা তো এই যে আল্লাহর ব্যাপারে সর্বান্তঃকরণে সম্মান প্রদর্শন ছাড়া তার বন্দেগীর পূর্ণতা আসেনা।

এটা সুস্পষ্ট যে, শরীয়তের কাজের ব্যাপারে ব্যক্তির অবস্থাই শুধু লক্ষ্য করা হয় না বরং গোটা সমাজের অবস্থা সামনে রাখা হয়। একটি লোককে সামনে নিয়ে গোটা সমাজের বিধান চালু করা হয়। পরিপূর্ণ দলীল-প্রমাণ আল্লাহর জন্য রয়েছে! আল্লাহর সেরা নিদর্শন চারটিঃ

(১) কুরআন মজীদ।

(২) কাবা শরীফ।

(৩) নবী করীম (সঃ)।

(৪) নামায।

কোরআন মজিদ আল্লাহর নিদর্শন। কারণ, রাজা-বাদশাহের ফরমান প্রজা-পুঞ্জের ভেতর চালু হওয়ার পদ্ধতি প্রসিদ্ধ ছিল। সে সব ফরমানকে সম্মান প্রদর্শন রাজা-বাদশাহকে সম্মান প্রদর্শন বলে বিবেচিত হত। আম্বিয়ায়ে কেরামের সহীফা ও অন্যান্য লেখকের গ্রন্থ পাশা-পাশি চালু ছিল। আম্বিয়ায়ে কেরামের প্রচারিত দ্বীন যারা কবুল করত তারাই শুধু সহীফাকে সম্মান দেখাত ও তা তিলাওয়াত করত। আদিকাল থেকেই প্রকাশ্যত এ ধারণাই চলে আসছে যে, কোন নির্ধারিত সহীফা ভিন্ন অন্য কিছু থেকে জ্ঞান অর্জন করা ও তা অনুসরণ করা সহজ সাধ্য হয় না। তাই মানুষের ধারণা জন্মে গেছে আল্লাহর তরফ থেকে অবতীর্ণ কিতাবের সাথে তার রহমত জড়িত থাখে। তাই তার মর্যাদাকে মানুষ অপরিহার্য ভেবে থাকে।

এ মর্যাদা দানের একটি পদ্ধতি হল এই যে, যখন তা পাঠ করা হবে তখণ চুপচাপ থেকে তা শুনতে হবে। তা শোনার অন্যান্য রীতি পালন করবে। যেমন তিলাওয়াতের সিজদা ও বিভিন্ন তাসবীহর আয়াতের তাসবীহ সংগে সংগে আদায় করবে।

তাকে মর্যাদা প্রদর্শনের এও এক পদ্ধতি যে, ওযু ছাড়া কেউ কুরআন স্পর্শ করবে না। কা’বা শরীফও আল্লাহর নিদর্শন। হযতর ইবরাহীম (আঃ)-এর যুগে মানুষ সূর্য ও নক্ষত্রাদির অর্চনার জন্যে ইবাদতখানা ও হায়কাল বানাবার বাড়াবাড়িতে লিপ্ত ছিল। তারা ভাবত, নিরাকারকে ইবাদতের জন্য ইবাদতখানা বানিয়ে না নিয়ে চলতে পারে না। এ কারণেই হায়কাল বানাত। তারা মনে করত, নিরাকার প্রভু এর ভেতর ঠাঁই নেন। তাই তাকে পেতে হলে হায়কালের অর্চনা করতে হবে। একটি ইবাদত ঘর এমন হতে হবে যার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত প্রকাশ পাবে আর সে ঘরটি তাওয়াফ করে তারা আল্লাহর রহমত লাভ করবে। সর্ব সাধারণের এ ধ্যান-ধারণা দীর্ঘদিন থেকে চলে আসছিল। তাই আল্লাহ পাক কাবা ঘর তৈরী করিয়ে লোকদের ডাকলেন এবং সেটাকে মর্যাদা দানের নির্দেশ দিলেন। তারপর যুগ যুগ ধরে এ ধারণা ও জ্ঞান বদ্ধমূল হয়ে চলল যে, কা’বা ঘরকে মর্যাদা দেয়া আল্লাহকে মর্যাদা দেয়ার নামান্তর এবং তাতে ত্রুটিকরা আল্লাহর খেদমতে ত্রুটি করার শামিল। তাই কা’বা ঘরে হজ্জ করা ফরয হল।

(১) কাবা ঘরকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য এ বিধান দেয়া হল, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন পোশাকে পবিত্র হয়ে তার তাওয়াফ করতে হবে।

(২) কাবার দিকে মুখ করে নামায আদায় করতে হবে।

(৩) পায়খানা-প্রস্রাবের সময় সেদিকে মুখ কিংবা পিঠ রাখতে পারবে না।

রাসূলও আল্লাহর নিদর্শন। তাঁর পদবী এ জন্যেই রাসূল হয়েছে যে, তাঁকে রাজা-বাদশাহর বার্তাবহের সাথে তুলনা করা হয়েছে। বার্তাবহের কাজ হয় প্রজা পুঞ্জের কাছে রাজা-বাদশাহর আদেশ নিষেধ পৌঁছে দেয়া। সে বার্তাবহকে সমআমন দেখানো রাজা-বাদশাহকে সম্মান দেখানোরই নামান্তর। তাই রাসূলের প্রতি সম্মান দেখানো রাসূলের প্রেরকের প্রতি সম্মান দেখানোরই নামান্তর।

(১) পয়গাম্বরকে মর্যাদা দানের পদ্ধতি এই যে, তাঁর আনুগত্যকে অপরিহার্য ভাববে।

(২) তাঁর জন্যে দরূদ পাঠ করবে।

(৩) তাঁর সামনে জোরে কথা বলবে না।

নামায, এ কারণে আল্লাহর নিদর্শন যে, নামাযের মাধ্যমে মাবুদের সামনে বান্দার অবস্থার যথার্থ প্রতিফলন ঘটে। যে ভাবে কোন ভৃত্য বাদশাহর দরবারে দাঁড়িয়ে সবিনয়ে কোন দরখাস্ত পেশ করে এবং শুরুতে সে বাদশাহের গুণগান করে নেয়, এও ঠিক তাই। নামাযে মানুষকে ঠিক বাদশাহর সামনে ভৃত্যের আবেদন-নিবেদনের অবস্থাগুলোরই প্রকাশ ঘটাতে হয়, যেমন হাত বাঁধা, এদিক ওদিক না দেখা ইত্যাদি। রাসূল (সঃ) বলেনঃ যখন তোমাদের কেউ নামাযে দাঁড়ায়, তখন সে আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়।

পরিচ্ছেদঃ চৌচল্লিশ

ওযু ও গোসলের রহস্য

স্মরণ রেখ, মানুষ কখনও প্রকৃতিগত অন্ধকার থেকে পবিত্র মজলিসের দিকে মনোনিবেশ করে। তখন সেখানকার স্বর্গীয় দ্যুতি তার ওপরে ছেয়ে যায়। ফলে ক্ষণিকের জন্যে হলেও সে প্রকৃতিগত বিধি-বিধান থেকে মুক্ত হয়ে যায়। এমন কি পবিত্র মজলিসের ফেরেশতাদের সাথে একাকার হয়ে যায়। এমন কি আত্মিক পবিত্রতার দিক দিয়ে সে তাদেরই একজন হয়ে যায়। তারপর তাকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেয়া হয়। তখন সে প্রথম অবস্থার ব্যাপারে-স্যাপারের প্রতি আকৃষ্ট হয়। কারণ, প্রথম অবস্থার অবর্তমানে সে সেটাকে গনীমত ভেবেছিল এবং সেটাকে হারানো অবস্থা লাভের একটা উপকরণ মনে করে।

বস্তুতঃ সে উক্ত গুণের মাধ্যমে হারানো অবস্থা থেকে একটি অবস্থা লাভ করে। সেটা হচ্ছে অপবিত্রতা থেকে মুক্ত এবং পবিত্রতা অর্জনের বস্তুসমূহ ব্যবহার করার ফলে অর্জিত তৃপ্তি ও প্রসন্নতা। সে সেই অবস্থাটিকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে থাকে তখন সে ব্যক্তি শুনতে পায় যে, সত্য সংবাদদাতা ঘোষণা করলেন, এ অবস্থায় মানবিক পূর্ণত্ব অর্জনের মর্যাদা লাভ ঘটে। সে এও শুনতে পায় যে, তার স্রষ্টা প্রভু এ অবস্থাটি প্রসন্দ করেন। এ ছাড়াও এতে অসংখ্য কল্যাণ রয়েছে।

বস্তুতঃ সে আন্তরিক সাক্ষ্য দ্বারা এটাকে সত্য বলে গ্রহণ করেছে। তার প্রভু তাকে যে নির্দেশ দিয়েছেন সে তা পালন করেছে। তিনি তাকে যে আশ্বাস দিয়েছেন তা সত্য হয়েছে। তার ওপর রহমতের দুয়ার খুলে গেছে। সে ফেরেশতার রঙে রঞ্জিত হয়েছে।

এর পরের স্তর হল তাদের, যারা উক্ত স্তরের কিছু জানে না, কিন্তু নবীগণ তাদের জোর করে সে পথে নিয়েছে। তাদের এমন অবস্থায় পৌঁছতে বাধ্য করেছে যাতে অন্ততঃ পরকালে ফেরেশতাদের সাথে একাকার হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে। এরা হল সে দল যাদের জিঞ্জিরে বেঁধে জান্নাতের দিকে টেনে হেঁচড়ে নেয়া হবে।

যে অপবিত্রতা সাধারণ লোকের ধারণায় রয়েছে, যার প্রভাব প্রত্যেকের আত্মাই অনুভব করে, যার উৎস ও প্রতিকার সর্বসাধারণকে স্মরণ করিয়ে ও বুঝিয়ে দিতে হয় আর যা অহরহ ঘটে থাকে এবং যা লোকদের শিক্ষা না দিলে মারাত্মক ক্ষতি হয় এরূপ অপবিত্রতা দু ধরনের হয়ে থাকেঃ-

(১) মানুষের তিনটি পরিত্যাজ্য বস্তু যথা হাওয়া ছাড়া কিংবা পেশাব-পায়খানায় লিপ্ত হওয়া। এগুলো তার পাকস্থলির প্রক্রিয়াজাত বাড়তি জিনিস। এগুলো না জানে এমন কোন লোক নেই। যখন কারো পেটে হাওয়া জমে যায় কিংবা পেশাব-পায়খানা জমা হয়, তখন তার মন খারাপ হয়ে যাবে। তখণ সে কোন ভূখণ্ডের দিকে যায় এবং অত্যন্ত বিব্রতকর অবস্থার ভেতর কাটায়। তখন সে অস্থিরতা অনুভব করে। স্বস্তি ও তার মাঝখানে পর্দা পড়ে যায়। যখন তার পেট থেকে হাওয়া এবং পায়খানা-পেশাব বেরিয়ে যায়, তখন ওযু-গোসল করে নেয়। ফলে নিজকে পবিত্র মনে হয়। তখন সে স্বস্তি ও তৃপ্তি ফিরে পায়। তখন তার মনে হয়, হারানো বস্তু ফিরে পেয়েছে।

(২) যৌনাচারে মত্ত হওয়া। এ কাজটা মানুষকে পশু প্রকৃতির স্তরে নামিয়ে দেয়।

একটু ভেবে দেখুন, যখন চতুষ্পদ জন্তুকে পোষ মানানো হয়, সেটাকে বিশেষ রীতি-নীতি শেখানো হয়, শিকারী জন্তুকে ক্ষুধা ও অনিদ্রা দ্বারা অনুগত করা হয়, সেটাকে শিকার ধরে ঠিকঠাকমত নিয়ে আসার শিক্ষা দেয়া হয়, পাখীকে যখম মানুষের বুলি শেখানো হয়, এক কথায় যে জীবই হোক সেটাকে তার প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য ভুলিয়ে বিপরীতধর্মী যে কাজই শেখানো হোক, যখনই সে সুযোগ পাবে পাশবিক যৌনাচারে লিপ্ত হবেই। তখন সব ভুলে ক্রমাগত সে কাজেই লিপ্ত থাকতে চাইবে। কেউ যদি একটু ভেবে দেখে, তা হলেই বুঝতে পারে, এ কাজটি তার মন মানসিকতাকে অস্বস্তিকর করে দেয়। এমনকি অধিক খাওয়া ও নেশা করায়ও এত বেশী অস্বস্তি বোধ হয় না। তাই এটা প্রমাণিত সত্য যে, যৌনাচার মানুষকে অধিকতর পশু স্বভাবের অধিকারী করে। যে কেউ তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকেও এটা বুঝতে পারে। এ জন্যেই ডাক্তাররা দুনিয়া ত্যাগী সন্ন্যাসীদের প্রতিষেধক হিসেবে যৌন সম্পর্কের ব্যবস্থার কথা বলেন।

সর্ব সাধারণের বোধগম্য ও সকলের জন্যে অপরিহার্য। এ দু’ধরনের অপবিত্রতা থেকে পবিত্রতা অর্জনের উপকরণ হল পানি। তাই আবাদ এলাকায় তা প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। যেহেতু ঐগুলো অহরহ ঘটে থাকে তাই তা দূর করার ব্যবস্থাকে সহজ লভ্য করা হয়েছে। যেহেতু এ দুটো ব্যাপার প্রকৃতির ধর্ম হিসেবে বিবেচ্য তাই তা আবার দু’ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে।

এক –ছোট পবিত্রতা।

দুই –বড় পবিত্রতা।

বড় পবিত্রতার জন্য সারা শরীর পানি দিয়ে ডলে-মলে ধুয়ে সাফ করতে হবে। পানি যে পবিত্রকর ও অপবিত্রতা বিদূরক একটা সর্বজন স্বীকৃত সত্য। পানি শরীরের অবসাদ দূর করে সজীবতা ও প্রসন্নতা ফিরিয়ে আনে।

কিছুলোক শরাব পান করে নেশায় মত্ত হয়। তার প্রকৃতিতে নেশার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সে অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে কিংবা কোন মূল্যবান সম্পদ নষ্ট করে। তারপর হঠাৎ সে সচেতন হয়, সুস্থ হয়, নেশার ঘোর।

কেটে বুদ্ধি ফিরে আসে। অনেক দুর্বল লোকও নেশায় মত্ত অবস্থায় সবল হয়ে যায় আর নেশা কেটে গেলে তার নড়াচড়ারও শক্তি থাকে না। এভাবে হঠাৎ কোন ব্যাপারে উত্তেজিত হয়ে বা জিদের বশবর্তী হয়ে দুর্বলরা সবল হয় এবং উত্তেজনা ও জিদ চলে গেলে আবার দুর্বল হয়ে যায়।

মোটকথা মানুষের মানস জগতে কখনো হঠাৎ পরিবর্তন আসে এবং তা এক স্বভাব থেকে অন্য স্বভাবে পরিবর্তিত হয় এ জন্য মন চাংগা হয়ে উঠে। মানস জগতের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মনের এ চাংগা অবস্থা সৃষ্টির ব্যবস্থা করা একটা উত্তম পন্থা। এ ধরনের সচেতনতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে পূর্ণাংগ পবিত্রতা অর্জন একটা কার্যকর ব্যবস্থা। এ পবিত্রতা একমাত্র পানি দ্বারাই অর্জিত হতে পারে।

পক্ষান্তরে ছোট পবিত্রতা দূর করে পবিত্রতা অর্জনের জন্যে মুখ, হাত ও পা ধোয়াই যথেষ্ট। কারণ সকল সভ্য সমাজেই এ তিনটি খোলা অংগ ধূলা-বালি থেকে পরিস্কার রাখার জন্যে ধোয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কারণ, তা জামা-কাপড়ের বাইরেই রাখা হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামও এ তিনটি অংগ কাপড় ঢাকা করতে নিষেধ করেছেন। খোলা অংগ-প্রত্যংগে স্বভাবতঃই ময়লা লাগে বলে অহরহ তা সবাই ধুয়ে থাকে। রাজা-বাদশাহর দরবারে যেহেতু মানুষ এগুলো ধুয়ে সাফ করে নেয়। মানুষের নজরেও এ তিনটি ধরা দেয়। তাছাড়া অভিজ্ঞতাও বলে দেয় এ তিনটি অংগ ধুয়ে মাথা মুছে ফেললে দেহে স্বস্তি ও প্রশান্তি আসে। অচেতন কিংবা নিদ্রামগ্নকে সচেতন ও সজাগ করতে হলে মুখে পানি ছিটাতে হয়। ডাক্তারগণও তাই বলে।

পবিত্রতা অর্জন মানুষের অভ্যেসগত ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। মানবতার পরিপূর্ণতার এটা ভিত্তিমূল। পবিত্রতা মানুষকে ফেরেশতার সংস্পর্শে পৌঁছায় ও শয়তান থেকে দূরে রাখে। এর বদৌলতে কবর আযাব থেকেও রেহাই মেলে। রাসূল (সঃ) বলেছেন, পেশাব থেকে  সাবধান। কারণ, সাধারণতঃ পেশাবের অপবিত্রতা কবর আযাবের কারণ হয়ে থাকে। পবিত্রতার বদৌলতে মানুষ মহান মর্যাদার অধিকারী হয়। আল্লাহ বলেনঃ “পবিত্র ব্যক্তিকে আল্লাহ বন্ধুরূপে গ্রহণ করেন”। যখন পবিত্রতার প্রভাব অন্তরে মজবুত ভাবে বসে যায়, তখন ফেরেশতার নূরের দ্যুতি সেখানে অবস্থান করে। ফলে পশুত্বের তথা জৈবিকতার অন্ধকার তার থেকে দূর হয়ে যায়। পুণ্য লিপিবদ্ধ হওয়া ও পাপ বিলুপ্ত হওয়ার তাৎপর্য এটাই। রুসম-রেওয়াজ বা সামাজিক রীতিনীতির বিচারেও পবিত্রতা অত্যন্ত কল্যাণপ্রদ। রাজা-বাদশাহর দরবারে যাবার জন্যে যেভাবে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা অনুসরণ করে, যদি কেউ ঠিক তেমনি নিয়ত করে পবিত্র থাকে ও যিকর-আযকার চালু রাখে তা হলে আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ফলপ্রসূ হয়।

মানুষ যখন বুঝতে পায় যে, পবিত্রতাই তার পূর্ণতা অর্জনের ভিত্তি। তখন তার জ্ঞানই তাকে নির্দেশ দেবে আর সে জ্ঞান অনুসারেই সে তা করতে থাকবে। ফলে তার স্বভাব-প্রকৃতি জ্ঞানের অনুগামী হতে বাধ্য হবে। এটাও বড় একটা লাভ। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।

পরিচ্ছেদঃ পঁয়তাল্লিশ

নামাযের হাকীকত

স্মরণ রাখবেন, কখনও মানুষ হাযিরাতুল কুদস বা পবিত্র মজলিস পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তখন সে আল্লাহ পাকের অত্যধিক নৈকট্য লাভ করে। তাই সেখান থেকে তার ওপর পবিত্র জ্যোতি অবতীর্ণ হয়। তখন সে ইন্দ্রিয়ের ওপর বিজয়ী হয়ে এমন সব অতিন্দ্রিয় ঘটনা অবলোকন করবে যা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। তারপর আবার যেখানে ছিল সেখানে ফিরে আসে। ফলে তার ভেতর অস্থিরতা দেখা দেয় ও অস্বস্তি সৃষ্টি হয়। অবশেষে বাধ্য হয়ে সে এ নিম্ন অবস্থা মেনে নেয়। অবশ্য তার এ নিম্ন অবস্থা সাধারণের নিম্ন অবস্থা থেকে অনেক উত্তম। তখন সে আল্লা-প্রেমে মগ্ন হয়ে যায় এবং সেটাকে তার হারানো অবস্থা ফিরে পাবার উপায় হিসেবে গ্রহণ করে। এ অবস্থাটি আসলে কথা ও কাজের মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে আবেদন-নিবেদন ও কাকুতি-মিনতি করার নামান্তর মাত্র। এটাই তার জন্য নির্ধারিত কাজ।

এর পরবর্তী স্তর হল সেই ব্যক্তির যে এক সত্য সংবাদ দাতার সত্য খবর শুনে সেটাকে মনে-প্রাণে গ্রহণ করেছে এবং প্রথমোক্ত অবস্থার দিকে তার আহবানকে যথার্থ বলে মেনে নিয়ে আল্লাহর বিধি-বিধান মেনে চলেছে। ফলে তাকে যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে রহমত লাভেল তাও সে পেয়ে চলেছে। তাকে যে আশা দেয়া হয়েছে সে আশাও তার পূর্ণ হয়েছে।

তার পরের স্তরে সেই ব্যক্তি রয়েছে যাকে নামায আদায়ের জন্য আম্বিয়ায়ে কেরাম বাধ্য করেছেন অথচ সে নিজে কিছুই জানত না। যে ভাবে কোন পিতা তার ছেলেকে তার অপছন্দনীয় কোন কল্যাণকর কারিগরি শিক্ষাদানে বাধ্য করে, এও ঠিক তেমনি ব্যাপার।

কখনও মানুষ তার প্রতিপালকের কাছে বিপদ বিদূরণ ও নিয়ামত অর্জনের প্রার্থনা জানায়। সে ক্ষেত্রে তার উচিত সম্মান প্রদর্শন ও বিনয় প্রকাশের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান। দোয়ার প্রাণ হল প্রার্থনাকারীর মনোভংগী। এমন মনোভংগী থাকা চাই যা প্রার্থনা কবুলে প্রভাব বিস্তার করে। ইস্তেস্কার নামায এ কারণেই সুন্নত হয়েছে।

নামাযের মূল ব্যাপার তিনটি-

১। আল্লাহ পাকের অপর মহত্ত্ব ও অশেষ প্রতিপত্তি অনুসারে অন্তরে পরম বিনয় ও ভীতি পোষণ করা।

২। সেই বিনয় ও ভীতি বিশুদ্ধ ভাষায় মুখে প্রকাশ করা।

৩। সেই ভীতি ও বিনয় মোতাবেক অংগ-প্রত্যঙ্গ সঞ্চালন করা।

জনৈক কবি খুব চমৎকার কথা বলেছেনঃ

(আরবী**************************************************************************)

“তোমার অনুগ্রহরাজি আমার তিনটি জিনিসকে তোমার সেবায় নিয়োজিত করেছে। তা হচ্ছে আমার হাত, আমার মুখ ও আমার লুকানো অন্তর। অর্থাৎ এগুলো তোমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশে নিয়োজিত রয়েছে”।

সম্মানসূচক কাজের একটি হচ্ছে, নিজ প্রভুর সামনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করবে এবং তাঁর দিকে পূর্ণ মাত্রায় খেয়াল রাখবে। তার চাইতেও বড় প্রভুর সামনে ভৃত্যের মতই নিজকে পেশ করবে। মাথা সর্বক্ষণ আনত রাখবে। মানব তো দূরে, পশুও বুঝে যে মাথা উঁচু রাখা বিনয়ের পরিপন্থী দাম্ভিকতা পূর্ণ কাজ আর মাথা নত করাই বিনয়ের চিহ্ন। আল্লাহর বাণীও তাই বলছেঃ

(আরবী*********************************************************************************)

সূরা শু’আরাঃ আয়াত ৪

অর্থাৎ অতঃপর সে নিদর্শন দেখে তাদের ঘাড় আনত হত।

তার চাইতেও বড় কথা হল, শ্রেষ্ঠতম অংগ মুখমণ্ডল তাঁর সিজদার জন্যে ভূমিতে বিন্যস্ত করা। মানুষের দৃষ্টির মাধ্যমে সব অনুভূতিই নিবদ্ধ থাকে এ মুখমণ্ডলের দিকে।

এ তিন ধরনের সম্মানসূচক কাজ সার্বজনীন ভাবেই প্রচলিত রয়েছে। কেউ সেগুলো নামাযে আল্লাহর দরবারে এসে করে আর কেউ শাসক কিংবা কর্মকর্তার সামনে গিয়ে। সর্বোত্তম নামায সেটাই যার ভেতর এ তিনটি কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তার সাথে সাথে বিনয় ও নম্রতার সাধারণ অবস্থাটি অসাধারণ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। শুধু বিরাট ভাবে সম্মান দেখানো কিংবা সাধারণভাবে সম্মান দেখানোর হাবভাব দ্বারা এ ক্ষেত্রে উন্নতি বা অবনতি নির্ণীত হয় না।

নামাযকে বলা হয় আল্লাহর নৈকট্য লাভের সকল কাজের ভিত্তিমূল। আল্লাহ পাকের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে গবেষণা ও তাঁর স্থায়ী জিকর-আজকারকেও এ গুরুত্ব দেয়া হয়নি। কারণ, খুব উচ্চ মার্গের আত্মা ব্যতীত আল্লাহ পাকের মহান শ্রেষ্ঠত্বের সঠিক ধ্যান গবেষণা সম্ভব নয়। তাদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। সেই বিশেষ স্তরে লোক ছাড়া অন্যরা তা করতে গেলে ঈমান হারিয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। এ পথে চলতে গিয়ে অনেকেরই মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছে। যে জিকরের পেছনে অংগ প্রত্যংগের সক্রিয় অংশ গ্রহণ ও পৃষ্ঠপোষকতা থাকে না, থাকে না কোনরূপ প্রশস্ততা তা বিকৃতি ও ব্যর্থতা ডেকে আনে। অধিকাংশের ক্ষেত্রেই এ কাজ অর্থহীন হয়।

নামায মূলতঃ একটি টনিক-মিকচার। একেতো তার ভেতর আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্ব ভাবনার নিয়ত ও প্রয়াস রয়েছে। দ্বিতীয়তঃ এমন পদ্ধতিতে ও পারিপার্শ্বিকতায় সে চিন্তা-ভাবনার কাজটি হচ্ছে যা সাধারণ মানুষেরও অনুসরণ যোগ্য। এরূপ অবস্থায় তারা স্বভাবতঃই আল্লাহর ধ্যানে তন্ময় হতে পারে। নামায এ ব্যাপারে তার সহায়ক হয়ে থাকে। নামাযের ভেতরে এমন দোয়া-কালামও রয়েছে যাতে খালেস অন্তরে আল্লাহর দিকে রুজু হওয়ার কথা রয়েছে। তাতে আল্লাহরই সাহায্য চাইতে বলা হয়েছে।

নামাযের রুকু এবং সিজদাও সম্মানসূচক কাজ। সেগুলো একে অপরের পরিপূরক ও পরস্পর ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এগুলো নামাযীকে সতর্কও করে। এর কারণ সাধারণ অসাধারণ সবার জন্যই নামায কল্যাণপ্রদ ও শক্তিশালী প্রতিষেধক। যে কেউ তা থেকে যোগ্যতানুপাতে কল্যাণ নিতে পারে।

ঈমানদারদের জন্যে নামায হল মিরাজ। নামায তাদের পারলৌকিক জ্যোতির্ময় জীবনের জন্যে প্রস্তুত করে! নভী করীম (সঃ) বলনঃ তোমরা শীঘ্রই আল্লাহ পাকের দীদার লাভ করবে। তাই ফজর ও আসর নামাযে গাফেল থেকনা। নামায পড়তে থাক, কারণ তা আল্লাহর মহব্বত ও রহমত লাভের বড় উপায়।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম আরও বলেনঃ আমি তোমাদের শাফাআত করে জান্নাতে নেব। কিন্তু তোমরাও আমাকে সাহায্য কর। তোমরা বেশী বেশী নামায পড়। আল্লাহ পাক জাহান্নামীদের সম্পর্কে বলেন যে, তারা সেদিন বলবে, (আরবী*****************************) অর্থাৎ আমরা নামায পড়তাম না।

মুমিনের অন্তরে যখন নামাযের প্রীতি মজবুত হয়ে যায়, তখন আল্লাহর নূরে নিমগ্ন হয়ে থাকে। তখন পাপ দূর হয়ে যায়। কারণ, পুণ্য পাপ দূর করে। আল্লাহকে পাওয়া ও জানার জন্যে নামাযের চাইতে সহায়ক ও কল্যাণপ্রদ আর কোন বস্তু নাই। বিশেষতঃ নামাযের প্রতিটি কাজ যখন বিনয় ও আন্তরিকতা নিয়ে পবিত্র নিয়তে আদায় করা হয়, তখনই তা উপকারী হয়। যদি কেউ সামাজিক প্রথা হিসেবে নামায পড়ে তা হলেও সে সামাজিক অন্যায়-অনাচার থেকে বেঁচে যাবে।

নামায মুসলমানকে কাফের থেকে আলাদা করে দেয়। নবী করীম (সঃ) বলেনঃ কাফের ও আমাদের মাঝে পার্থক্য সৃষ্টিকারী হলো নামায। তাই যে ব্যক্তি নামায ছাড়ল সে কাফের হয়ে গেল।

সন্দেহ নেই, আত্মাকে জ্ঞানের নিয়ন্ত্রণে চলার অভ্যেস সৃষ্টি করার ব্যাপারে নামাযের কোন জুড়ি নেই।

পরিচ্ছেদ-ছিচল্লিশ

যাকাতের হাকীকত

স্মরণ রেখ, যখন কোন গরীব-মিসকীনের প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন সে কথায় কি হাবভাবে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে থাকে, তখন আল্লাহ পাকের দানের দুয়ার খুলে যায়। কখনও তিনি কোন বান্দার অন্তরে ইলহাম করে দেন যাতে সে সেই গরীবের প্রয়োজন মিটিয়ে দেয়। সে ব্যক্তি যখন তা করে তখন তিনি খুশী হন। তখন উপর থেকে, নীচ থেকে, ডান থেকে, বাম থেকে তার ওপর রহমত ও বরকত নাযিল হতে থাকে।

একদিন এক গরীব আমার কাছে তার চরম অভাবের কথা বলল। আমি তখন আমার অন্তরে ইলহামের অবতরণ অনুভব করলাম। বুঝতে পেলাম, তাকে কিছু দেয়ার জন্যে আমাকে হুকুম দেয়া হয়েছে। তার বিনিময়ে আমাকে দুনিয়া ও আখেরাতের সুসংবাদ দেয়া হল। আমি তাই সেই গরীবের প্রয়োজন মিটিয়ে দিলাম। ফলে আমি আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতির যথাযথ বাস্তবায়ন দেখতে পেয়েছি। সেই গরীবের আল্লাহর বখশিশের দরজার কড়া নাড়া আর আল্লাহর তরফ থেকে তাকে সাহায্য করার জন্যে আমার প্রতি নির্দেশ হওয়া এবং নির্দেশ পালনের পুরস্কার হাতে হাতে পাওয়া, এ সবই আমার চোখের সামনে ঘটেছে।

কখনও কিছু খরচ করা আল্লাহর রহমত লাভের কারণ হয়ে থাকে। যেমন সর্বোচ্চ পরিষদে বিশেখ কোন ধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটাবার সিদ্ধান্ত হল। তখন যারা সে ধর্মের সহায়ক হয় তাদের ওপর আল্লাহর রহমত হয়। সেদিন সে কাজে খরচ করা তবুকের যুদ্ধে খরচের মতই পুণ্য কাজ হয়। যেমন কোন সম্প্রদায় দুর্ভিক্ষের শিকার হল। অথচ আল্লাহ তাদের বাঁচাতে যেমন কোন সম্প্রদায় দুর্ভিক্ষের শিকার হল। অথচ আল্লাহ তাদের বাঁচাতে ইচ্ছুক হলেন। সেখানে যারাই খরচ করবে তারা বহু পুণ্যের অধিকারী হবে।

মোটকথা, সত্য সংবাদ দাতা একটি বাক্যে একটা নীতি ঘোষণা করলেন। তিনি বললেনঃ যে ব্যক্তি কোন গরীবকে এরূপ এরূপ খরচ করবে কিংবা এই এই অবস্থায় খরচ করবে, তার সে কাজ খুবই মকবুল কাজ হবে।

কোন এক শ্রোতা এ বাণী শুনতে পায় এবং আন্তরিক ভাবে তা সত্য জেনে কার্যকরী করে। ফলে তাতে যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা সে সত্য দেখতে পায়। অনেক সময় মানুষের মনই সাক্ষী দেয় যে, তার সম্পদের লালসা ও কার্পণ্য তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং তার মুক্তি লাভের পথে তাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

ফলে সে অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত থাকে। তার এ সমস্যার সমাধান হচ্ছে এই যে, আল্লাহর পথে খরচ করার তার যে আকর্ষণ সৃষ্টি হয়েছে তা বাস্তবায়নের জন্যে সে যেন তার প্রিয় বস্তুগুলো দান করার অভ্যেস গড়ে তোলে। শক্ত হাতে এ ভাবে প্রিয়তম বস্তু দান করার মাধ্যমেই সে উপকৃত ও কৃতকার্য হবে। অন্যথায় সে যে অবস্থায় ছিল সে অবস্থায়ই থেকে যাবে। পরিণামে পরকালে তার সে প্রিয় সম্পদ সাপ হয়ে তার গলায় জড়াবে কিংবা তা তাকে অন্যভাবে বিপদগ্রস্ত করবে। এক হাদীছে আছেঃ “সম্পদ পুঞ্জিভূত করে যে ব্যক্তি যাকাত দেয় না তার পা তপ্ত তাপে ঝলসে যাবে”।

স্বয়ং আল্লাহ বলেনঃ

(আরবী*************************************************************************)

সূরা তাওবাঃ আয়াত ৩৪

“যারা সোনা-রূপা জমা করে”।

অনেক সময় বান্দা বিপদগ্রস্ত হয় এবং নমুনা জগতে তাকে ধ্বংসের সিদ্ধান্ত হয়। বিপদে পড়ে সে বেশি পরিমাণে প্রিয় ধন-সম্পদ বিতরণ করে। তখন সে নিজে ও তার জন্যে নেককার জীবিত ও মৃতেরা কান্নাকাটি ও দোয়া করে। এভাবে সে ধন বিলিয়ে প্রাণ বাঁচিয়ে নেয়। নবী করীম (সঃ) বলেনঃ “নির্ধারিত মৃত্যুকে শুধুমাত্র দোয়া পিছিয়ে দিতে পারে। আর পুণ্যই কেবল আয়ু বাড়াতে পারে”।

কখনও প্রবৃত্তির তাড়নায় কেউ অন্যায় কাজ করে ফেলে। তারপর তার ভেতর অনুশোচনা জাগে ও তাওবা করে, তারপর আবার প্রবৃত্তির তাড়নায় অন্যায় করে, আবার অনুতপ্ত হয়ে তাওবা করে। এ ধরনের লোকদের সংশোধনের উপায় হচ্ছে নিজের উপর মোটা অংকের জরিমানা করা। তা হলে তার সামনে সর্বদা সে বিরাট আর্থিক ক্ষতি বাধা হয়ে দেখা দেবে ফলে অন্যায় থেকে বিরত থাকবে।

কখনও কেউ খান্দানী মান-মর্যাদা সংরক্ষণ ও ভদ্রতা, সামাজিকতা বজায় রাখার জন্য খুব খাওয়ায়, সালাম-কালাম চালায়, সাহায্য সহানুভূতি দেখায় বিভিন্নভাবে খরচ পত্র করে। এটাও আল্লাহর মর্জিতে হয় এবং এগুলোকে সদকা হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

যাকাত দেয়ায় আয়ু বাড়ে। যাকাত আল্লাহর রহমত টেনে আনে ও গজব দূর করে। কার্পণ্যের জন্যে সৃষ্ট পারলৌকিক আজাব থেকে যাকাত রেহাই দেয়। পার্থিব জীবনেও যাকাত দাতার শাস্তি ও নিরাপত্তার জন্য সর্বোচ্চ পরিষদে দোয়ার ব্যবস্থা হয়।

পরিচ্ছেদঃ সাতচল্লিশ

রোযার হাকীকত

স্মরণ রেখ, অনেক সময় মানুষ সত্য এলহামের মাধ্যমে এটা বুঝতে পায় যে, আভ্যন্তরীণ পাশব প্রবৃত্তি তাকে মানবিক পূর্ণতায় পৌঁছতে বাধা সৃষ্টি করছে। আর সে কারণেই ফেরেশতা খাসলাতের অনুগামী হতে পারছে না। তাই সে তার পশু স্বভাবকে খারাপ ভাবতে থাকে ও তা দমন করার জন্যে পথ খুঁজে বেড়ায়। তখন সে তা দমনের জন্যে ক্ষুৎপিপাসাকে অবলম্বন করে, স্ত্রী সাহচর্য ত্যাগ করে, মুখ, অন্তর ও অন্যান্য অংগ-প্রত্যঙ্গ নিয়ন্ত্রণে রাখে। মোটকথা, এগুলো দ্বারা সে আত্মিক ব্যাধির চিকিৎসা করে।

এর পরবর্তী স্তর হল তাদের যারা এক সত্য সংবাদ দাতার সংবাদকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে ও তা অনুসরণের মাধ্যমে আত্মিক উৎকর্ষ সৃষ্টি করে।

এর পরবর্তী স্তর হল তার যাকে কোন নবী মেহেরবানী করে সেই কাজে নিয়োজিত করে যে সম্পর্কে তার কোন ধারণা ছিল না। তার সে আত্মসংযমের কার্যাবলীর পুরস্কার সে পরকালে পাবে।

অনেক সময় মানুষ নিজেই জানতে পায়, প্রবৃত্তিকে জ্ঞানের নিয়ন্ত্রণে রাখাতেই মানুষের সাফল্য আসে কিন্তু তার প্রবৃত্তি বিদ্রোহী হয়ে যায়। কখনও জ্ঞানের নির্দেশ মানে, কখনও আবার মানে না। তখন তার জন্য অনুশীলন অত্যাবশ্যক হয়। তাই রোযার মত কোন কষ্টকর কাজে প্রবৃত্তিকে নিয়োজিত রাখতে হয়। রোযা প্রবৃত্তিকে দমন করে ও আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি পালনে বাধ্য করে। এভাবে প্রবৃত্তি দিনের পর দিন রোযা রেখে সংযমে অভ্যস্ত হয় ফলে তাকে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য সফল হয়।

কখনও বা কোন লোক পাপ করে ফেলে। তখন বেশ কিছু কাল রোযা রাখতে থাকে। এটা প্রবৃত্তির জন্যে অধিক কষ্টদায়ক হয় ফলে তার পক্ষে দ্বিতীয় বার সেই পাপ করার হিম্মত থাকে না।

কখনও কারো ভেতর নারী সম্ভোগের প্রবণতা দেখা দেয়। অথচ বিয়ে করার তার সামর্থ্য নেই। তাই ব্যভিচার থেকে বাঁচার জন্যে সে রোযা রেখে যৌন প্রবণতা স্তিমিত করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে আছাল্লাম বলেনঃ যার বিয়ে করার সামর্থ্য নেই, সে যেন রোযা রাখে। কারণ, রোযা মানুষের কামভাব স্তিমিত করে।

রোযা বড়ই পুণ্য কাজ! রোযা মানুষের ফেরেশতা স্বভাবকে জোরদার ও পশু স্বভাবকে দুর্বল করে। আত্মার পরিচ্ছন্নতা ও প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে রোযার চেয়ে ফলপ্রসূ কোন আমল নেই। তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ ‘রোযা আমারই জন্যে হয় এবং আমি নিজেই তার পুরস্কার দেব।

রোযা প্রবৃত্তিকে যত বেশী নিয়ন্ত্রিত করে পাপও তত বেশী হ্রাস পায়। ফলে তা মানুষকে ফেরেশতা স্বভাবের সাথে তুলনীয় করে তোলে। ফলে রোযাদারকে ফেরেশতারা ভালবাসে। এ ভালবাসা পশু প্রকৃতিকে দুর্বল করে দেয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহ পাকের কাছে মিশকের ঘ্রাণের চেয়েও প্রিয়।

রোযা যদি কেউ নেহাৎ আনুষ্ঠানিকভাবেও রাখে তাতেও কল্যাণ রয়েছে। যখন কোন মানুষ রোযা রাখে তখন তার কুমন্ত্রণাদাতা শয়তান শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়, তার জন্য জান্নাদের দুয়ার খুলে যায় এবং দোযখের দুয়ার বন্ধ হয়ে যায়। যখন কোন লোক প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় ও তার খারাপ প্রভাব দূর করতে চায়, তখন নমুনার জগতে তার এ প্রয়াসের একটা পবিত্র নকশা তৈরী হয়ে যায়। তখন কিছু পুণাত্মা সাধকের সে দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় ফলে অদৃশ্য জগত থেকে সে জ্ঞানগত সাহায্য পেয়ে থাকে। এভাবে পবিত্র নকশা ও পুণ্যাত্মার সংযোগে যে এক পুণ্যময় পরিমণ্ডল সৃষ্টি হয় তাতে সেই ব্যক্তি আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে। রাসূল (সঃ) যে আল্লাহ পাকের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেছেনঃ রোযা আমার এবং তার পুরস্কার আমিই দেব, এ কথার তাৎপর্যও তাই।

অনেক সময় মানুষ এটা জানতে পায় যে, জীবিকার ধাঁধায় ডুবে থাকা ও তা নিয়ে মেতে থাকা ক্ষতিকর। পক্ষান্তরে মসজিদে পড়ে থেকে এক ধ্যানে কায়মনে ইবাদত করা উত্তম ও কল্যাণকর অথচ সব সময়ের জন্যে তা সম্ভব নয় তা বলে কোন সময়ই তা না হওয়া ঠিক নয়। অন্ততঃ কিছু সময়ের জন্য হলেও তা হওয়া উচিতৎ। এ কারণেই কিছু মানুষ নিজেই কিছু সময় বের করে এতেকাফ করে থাকে।

তারপর আরেক দল সত্য সংবাদদাতার প্রদত্ত সংবাদ আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে সেই অনুসারে নির্দিষ্ট সময়ে তা করে।

তৃতীয় দলকে বিধি-বিধানের বাঁধনে-বেঁধে এতেকাফ করানো হয়। এ কথাটি আগেও বলা হয়েছে।

কখনও এমন হয় যে, একটি লোক রোযা তো রাখে, কিন্তু এতেকাফ ছাড়া মুখটাকে সংযত ও পবিত্র রাখতে পারেনা।

কখনও কেউ আবার লাইলাতুল কদর আর ফেরেশতার দেখা পেতে চায়। সেটাও এতেকাফ ছাড়া সম্ভবপর হয়না। লাইলাতুল কদর সম্পর্কে শীঘ্রই আপনারা জানতে পারবেন।

পরিচ্ছেদঃ আটচল্লিশ

হজ্জের হাকীকত

জেনে রাখুন, হজ্জের হাকীকত হল এটাও যে, নেককারদের বিরাট একটি দল আল্লাহর নিদর্শনপূর্ণ এক জায়গায় সমবেত হয়ে নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সালেহদের অবস্থা স্মরণ করবে! দ্বীনের ইমামদের বড় বড় দল হজ্জে গিয়েছেন তাদের উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর নিদর্শনগুলোকে সম্মান দেখানো, দীনহীন ভাবে আল্লাহর মহব্বত প্রকাশের মাধ্যমে আল্লাহর কাছ থেকে পাপ মার্জনা করানো ও আল্লাহর রহমত লাভ করা যখন এ মনোভাব নিয়ে অনুরূপভাবে সমবেত লোকদের অন্তরে রহমত লাভের প্রত্যয় সৃষ্টি হয়, তখনই অপরিহার্যভাবে আল্লাহর ক্ষমা ও দয়া অবতীর্ণ হয়। যেমন- রাসূল (সঃ) বলেছেনঃ আরাফার দিন শয়তান যে ভাবে অপমানিত, লাঞ্ছিত হয়ে থাকে আর কোন দিন সেরূপ হয় না।

হজ্জের মূলবস্তু সব জাতির ভেতরেই নিহিত রয়েছে। কারণ, সব জাতিই এমন একটি মিলনতীর্থ কামনা করে, যেখানে একত্রিত হয়ে স্রষ্টার পুণ্য নিদর্শনাবলী দেখে তারা কৃতার্থ হবে। প্রত্যেক জাতির ভেতর মানত ও কুরবানী করার বিশেষ একটি ধরন রয়েছে। তাদের পূর্বপুরুষ থেকেই এটা চলে আসছে। তারাও সেটা অপরিহার্যভাবে অনুসরণ করে চলেছে। কারণ এর ভেতর দিয়ে তারা স্রষ্টার নৈকট্য প্রাপ্তদের স্মরণ ও অনুসরণ করে নিজেরা নৈকট্য লাভের প্রেরণা অর্জন করছে।

হজ্জের জন্য বায়তুল্লাহ যোগ্যতম কেন্দ্র। সেখানে স্রষ্টার সুস্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে। সেটি আল্লাহ পাকের নির্দেশ ও ওহী মোতাবেক হযরত ইবরাহীম (আঃ) এক পবিত্র ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠিত করেন। অধিকাংশ জাতির ভেতর তার গুণ কীর্তন চলে আসছিল। কারণ, সেটি ব্যতীত অন্য যে কোন তীর্থধাম ছিল মানুষের মনগড়া শির্ক ও বিদআতের আস্তানা।

আত্মিক পবিত্রতার জন্যে এটাও  প্রয়োজন যে, এমন কোথাও গিয়ে আস্তানা করা চাই যে স্থানটিকে পুণ্যাত্মাগণ সম্মানের চোখে দেখে গেছেন এবং আল্লাহর জিকর ও ইবাদত দ্বারা সে স্থানটি সমুজ্জল করে গেছেন। কারণ পার্থিব ব্যাপারে নিয়োজিত ফেরেশতাদের দৃষ্টি সে স্থানটির প্রতি নিবদ্ধ থাকে। তাই যখন কোন ব্যক্তি সেখানে অবস্থান নেয়, তখন ফেরেশতাদের দৃষ্টির প্রভাবে তার চরিত্র প্রভাবিত হয়ে থাকে। আমি নিজেও বারংবার তা উপলব্ধি করেছি।

আল্লাহর নিদর্শন দেখা ও তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনও আল্লাহর জিকরের একটি পদ্ধতি। ধোঁয়া দেখলে যেভাবে তার পেছনে আগুনের অস্তিত্ব স্মরণে আসে ঠিক তেমনি আল্লাহর নিদর্শন দেখলে আল্লাহকে স্মরণ করা হয়। অবশ্য এ ক্ষেত্রে সীমা লংঘনের ব্যাপারে পূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন। আল্লাহর নিদর্শনকে আল্লাহর মর্যাদায় ভূষিত করা না হয়।

মানুষ কখনও আল্লাহর দীদার কামনা করে। তার এ কামনা হজ্জ ছাড়া অন্য কোন পথে পূর্ণ হতে পারে না। তাতে রাষ্ট্রের উন্নতি ও অগ্রগতির প্রচার-প্রসারের ব্যবস্থা হয়। তেমনি ধর্ম জগতেরও হজ্জ যেন সেই রাষ্ট্রীয় দরবার। যেখান দ্বীনদার ও নাফরমানের পার্থক্য সৃষ্টি হয়। আল্লাহর দ্বীনে কিভাবে সারা দুনিয়ার মানুষ দলে দলে যোগ দিচ্ছে তা প্রত্যক্ষ করা যায়। সারা দুনিয়ার তীর্থযাত্রীদের সাথে ভাবের আদান-প্রদানে পারস্পরিক কল্যাণ সাধিত হয়। আল্লাহর দীদারের জন্যে আন্তরিক হজ্জ যদি না করে কেউ আনুষ্ঠানিক হজ্জও করে তাতেও বহু সামাজিক কল্যাণ পাওয়া যায়। তবে দ্বীনের ক্ষেত্রে উৎকর্ষ ও উন্নয়ন সৃষ্টির ব্যাপারে হজ্জ অতুলনীয় অবদান রাখে।

হজ্জে যেহেতু দূর-দূরান্তে সফর করতে হয় তাই তা বেশ কষ্টসাধ্য কাজ। সেখানে গিয়েও হজ্জ সমাধার জন্যে যথেষ্ট কায়িক ও আর্থিক কষ্ট, ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। এ জন্যে হজ্জ মানুষের অতীতের পাপরাশি সেভাবেই ধুয়ে-মুছে যায় যেভাবে ঈমান এনে মুসলমান হবার ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।

পরিচ্ছেদঃ উনপঞ্চাশ

বিভিন্ন পুণ্যের হাকীকত ত

(১) আল্লাহর জিকর এক শ্রেণীর পুণ্য কাজ। কারণ, আল্লাহর জিকর ও তাঁর মাঝখানে কোন পর্দা থাকে না। আল্লাহর পরিচয়ে ত্রুটি-বিচ্যুতি পরিশুদ্ধির জন্যে জিকরের চেয়ে উপকারী কোন বস্তু নেই। স্বয়ং রাসূল (সঃ) বলেন, আমি কি তোমাদের সব আমলের ভেতর উত্তম আমল বলে দেব না? বিশেষতঃ যে ব্যক্তির ভেতর পশু প্রবৃত্তি প্রকৃতিগত ভাবেই দুর্বল কিংবা কষ্টকর কাজ দ্বারা তা দুর্বল করে রেখেছে তার ক্ষেত্রে জিকর বেশী কল্যাণকর। তেমনি কল্যাণপ্রদ যারা জাহেরী ইবাদতে মন স্থির রাখতে ব্যর্থ হয় তাদের জন্য।

(২) দোয়া বা প্রার্থনাও এক শ্রেণীর পুণ্য কাজ। এ কাজটি আল্লাহর দরবারে প্রশস্ত দরজা খুলে দেয়। দোয়ার মাধ্যমে বান্দার মাবুদের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও তাঁর কাছে সর্বতোভাবে মুখাপেক্ষিতা প্রকাশ পায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ দোয়া ইবাদতের মগজ। দোয়াকারী মূলতঃ আবেদন-নিবেদনের মাধ্যমে আত্মার নিজ উৎসের দিকে নিবিষ্ট হওয়া। দোয়ার গুণগত উৎকর্ষই হল প্রার্থীত বস্তু লাভের ব্যাপারে প্রাণসত্তা স্বরূপ!

(৩) কুরআন তিলাওয়াত ও ওয়াজ-নসিহত শ্রবণ। যে ব্যক্তি তা কানে শুনে মনে ঠাঁই দেয়, সে আল্লাহভীতি ও হাল-হাকীকত, আল্লাহর বিশালত্ব বোধের বিস্ময় ও আল্লাহর দান-দাক্ষিণ্যে অভিভূত ও প্রভাবিত হতে বাধ্য। বস্তুতঃ তার নিজের আত্মাকে সজীব করার ক্ষেত্রে তা খুবই ফলপ্রসূ হয়। আর আত্মাকেও ঊর্দ্ধজগতের বিশেষ রং-এর প্রভাবে রঞ্জিত করবে। এ কারণেই কাজটি পরকালে যথেষ্ট ফলদায়ক হবে। কবরেরও ফেরেশতা মৃতকে প্রশ্ন করবেঃ তুমি কোরআন বুঝেছ? ও তা তিলাওয়াত করেছ? কোরআন পাঠ মানুষের আত্মার নীচতা ও দীনতা দূর করে এবং সেটাকে পূত-পবিত্র করে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেনঃ প্রত্যেক বস্তুর রেত রয়েছে এবং অন্তরের রেত হল কোরআন তিলাওয়াত।

(৪) আত্মীয়-স্বজন পাড়া-পড়শী, এলাকাবাসী ও জাতির সেবা ও কল্যান করা ও দাস মুক্ত করা। এ কাজগুলো আল্লাহর রহমত ও শান্তিপূর্ণ জীবনের পরিবেশ সৃষ্টি করে। এ কাজের দ্বরা জীবন ধারার দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের কাজ পূর্ণতা লাভ করে। এর ফলে ফেরেশতার দোয়া পাওয়া যায়।

(৫) জিহাদ। এটা এভাবে সংঘটিত হয় যে, কোন এক পাপাচারী ও অত্যাচারী লোক সর্ব সাধারণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে চলছে যা আল্লাহ পাক তাঁর পৃথিবীর শান্তি-শৃঙ্খলার পরিপন্থী বিধায় তিনি তাকে ধ্বংস করতে চান, তখন এক পুণ্যবান ব্যক্তির অন্তরে তিনি এলহাম করে দেন যাতে সে সেই জালিমকে হত্যা করার জন্য উদ্ধুদ্ধ হয়। তখন সে নিছক আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে নিজের সব কাজ ছেড়ে দিয়ে সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে নেমে পড়ে। স্বভাবতঃই তখন সে আল্লহর রহমত ও নূর দ্বারা পরিবৃত হয়। তাই সহজেই সে সেই জালিমকে হত্যা করে মজলুম জনগণকে মুক্তি দান করে।

এর কাছাকাছি আরেকটি অবস্থা আছে। তা হল এই যে, আল্লাহ পাক কখনও কোন পাপচারী জালিম জাতিকে শায়েস্তা করতে চান। তখন কোন নবীকে জিহাদের জন্যে নির্দেশ দেন। তেমনি তাঁর উম্মতদের ভেতরেও এরূপ প্রেরণা সৃষ্টি করেন যাতে তারা একটি নেককার জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তখন তাদের ওপর আল্লাহর রহমত অবতীর্ণ হয়। ফলে তারা সকলেই জালিম সম্পদায়কে ধ্বংস করে দেয়।

কখনও এরূপ হয় যে, কোন জাতির সর্বসাধারণ এ ব্যাপারে এক মত হয়ে যায় যে, হিংস্র প্রকৃতির শাসকমণ্ডলীর হাত থেকে দেশ ও জাতিকে বাঁচাতে হবে এবং অত্যাচারী গোষ্ঠীকে শাস্তি দিতে হবে। তারপর দেশে সর্বপ্রকারের অন্যায় নির্মূল করতে হবে। তখন সেই জাতির ওপর আল্লাহর রহমত নেমে আসে এবং তাদের পুণ্য প্রয়াসে তারা সফল হয়। ফলে দেশময় স্বস্তি ও শান্তি ফিরে আসে।

(৬) মুমিনের জীবনে বিপদাপদ ও রোগ-ব্যাধিও কয়েক ভাবে পুণ্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

(ক) যখন আল্লাহর রহমত কোন লোকের কাজ শুধরে নিতে চায়, তখন পৃথিবীর কার্যকারণগুলো সক্রিয় হয়ে তাকে বিপদগ্রস্ত করে। তখন সেই পরীক্ষায় উতরে গিয়ে সে তার সব পাপ ধুয়ে-মুছে ফেলে। ফলে তার জন্যে পুরস্কার লেখা হয়। যেমন কোন প্রবাহমান শ্রোতাধারা যদি বন্ধ করে দেয়া হয় তা হলে তা উদ্বেলিত হয়ে বাঁধের ওপর ও নীচ উভয় দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়, মুমিনের জীবনে বাধা-বিপত্তিকে সেই বাঁধের সাথে তুলনা করা যায়। এ বাঁধ তার পুণ্য প্রবণতাকে উদ্বেলিত করে বহুমুখী করে দেয়।

(খ) মুমিনের ওপর যখন কঠিন বিপদ দেখা দেয় এবং অন্যের জন্যে পৃথিবী প্রশস্ত হলেও তার জন্য সংকীর্ণ হয়ে যায়, তখন তার স্বভাব-প্রকৃতিতে যে সামাজিক বন্ধনের তোয়াক্কা ছিল তা বিলুপ্ত হয় এবং সে পুরাপুরি আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল হয়ে যায়। পক্ষান্তরে কাফের তখন হারানো জীবনের সব কিছু নিয়ে বিলাপ করে আর দুনিয়াবী ব্যাপার নিয়ে কান্না-কাটা করে। ফলে সে চূড়ান্ত পাপী হয়ে যায়।

(গ) কখনও বিপদাপদ এজন্যে পুণ্যের কারণ হয় যে, প্রবৃত্তি তখনই শক্তিশাল থাকে যখন দেহে শক্তি থাকে। ফলে তাতে বাসনা, কামনাও প্রবল থাকে এবং পাপ প্রবণতা জোরদার হয়। কিন্তু রোগ-ব্যাধি এসে যখন দেহকে দুর্বল করে ফেলে তখন প্রবৃত্তিও দুর্বল হয় এবং পাপ প্রবণতা নিস্তেজ হয়। তাই আমরা যে কোন দুর্বল রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে যৌনাচার বা উত্তেজনাকর ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থাকতে দেখি। মোট কথা লোকটি একদম বদলে যায় এবং তার পেছনের জীবন সে ভুলে যায়। তখন ভাবাই যায় না যে, এ লোক আগে অন্যরূপ ছিল।

(ঘ) যখন কোন মুসলমানদের পশু প্রবৃত্তি তার ফেরেশতা স্বভাবের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়ে যায় এবং সে পাপে লিপ্ত হয়ে পড়ে তখন আল্লাহ তাকে দুনিয়াতেই শাস্তি দিয়ে পরকালের জন্য পরিচ্ছন্ন করে নেন। হাদীসে আছেঃ- পার্থিব জীবনে মুমিনের জন্যে বিপদাপদ তার কৃতকর্মের শাস্তিরূপে দেখা দেয়।

পরিচ্ছেদঃ পঞ্চাশ

পাপের বিভিন্ন স্তর

জেনে রেখ, অনেক কাজ আছে যা আনুগত্যের অংগ। তেমনি বহু পদ্ধতি আছে যদ্বারা আনুগত্য অর্জিত হয়। তদ্বারা পশু প্রবৃত্তির ফেরেশতা স্বভাবের আনুগত্য হওয়ার কথা জানা যায়। তেমনি এমন সব কাজ, স্থান ও পদ্ধতি রয়েছে যদ্বারা নাফরমানীর অবস্থা জানা যায়। সেগুলোকেই বলা হয় পাপ। এ পাপ-গুলোর স্তর রয়েছে।

(১) সেই পাপ যা মানুষের উন্নতির পথ একেবারেই রুদ্ধ করে দেয়। এ ধরনের বড় পাপ দু ধরনের হয়ে থাকে। একটি ধরন হচ্ছে, আল্লাহর সাথে সম্পর্কযুক্ত। তা হচ্ছে নিজ প্রভুর পরিচয় সম্পর্কে অজ্ঞতা কিংবা সৃষ্টির গুণ দিয়ে স্রষ্টাকে পরিমাপ করা। অর্থাৎ সৃষ্টির গুণই স্রষ্টার ব্যাপারে প্রমাণ করা কিংবা স্রষ্টার গুণ সৃষ্টির ব্যাপারে প্রয়োগ করা। দ্বিতীয় ধরন হচ্ছে উপমাগত পাপ। এ গুলোই হচ্ছে শিরক।

কারণ আত্মা তখনই পবিত্র ধারার অধিকারী হয় যখন তা নিরাকার প্রভুর নিখিল সৃষ্টির সার্বিক পরিচালকের ব্যাপার গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে সক্ষম হয়। এ বিরাট চিন্তাশক্তি যে হারিয়ে বসে স্বভাবতঃই নিজের ক্ষুদ্র গণ্ডীর ভেতরে আবদ্ধ হয়ে যায়। তার অপরিচিতি ও অস্বীকৃতির দেয়াল কখনও ভাঙ্গেনা। তাই আল্লাহর পরিচয়ের ক্ষেত্রে সূচাগ্র পরিমাণ দখলও অর্জন করতে পারে না। এটাই সব চাইতে বড় বিপদ।

(খ) মানুষ এ ধ্যান-ধারণা পোষন করে যে, আত্মার উৎস হল এ দেহ, এছাড়া অন্য কোন ঠাঁই নেই। এ পার্থিব জীবনই একমাত্র জীবন, এ ছাড়া অন্য  কোন জীবন নেই। তাই পার্থিব জীবনের উন্নয়ন ও সাফল্য ছাড়া আর কিছুই করার নেই। অন্তরে যদি এ বিশ্বাসটি জমে থাকে তা হলে তার জন্যে আত্মিক উন্নয়ন ও সাফল্য অর্জনের দিকে দৃষ্টিপাতের কোনই পথ থাকে না।

যখন মানবিক পূর্ণতা অর্জন বলতে জৈবিক উন্নয়ন ছাড়া অন্য কিছু বুঝবে, তখন জনসাধারণ সেটাই অর্জনের জন্যে চেষ্টা করবে। আর তা তখনই সম্ভব হবে যখন সব দিক দিয়েই সে বস্তুগত উন্নয়নের বিপরীত চিন্তা-ভাবনা করবে। যদি তা না হল তা হলে জৈবিক উন্নয়ন ও আত্মিক পরস্পর বিপরীত ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। ফলে মানুষ আত্মিক উন্নয়ন ছেড়ে জৈবিক উন্নয়নের দিকে ঝুঁকে পড়বে। তাই সে জন্যে একটি সতর্ক ঘন্টা ঠিক করা হল আর তা হচ্ছে কেয়ামত ও আল্লাহর সাথে মোলাকাতের ওপর ঈমান আনা।

নিম্ন আয়াতের এটাই তাৎপর্যঃ

(আরবী************************************************************************)

সূরা নাহলঃ ২২

অর্থাৎ যারা আখেরাতে বিশ্বাস করেনা তাদের অন্তর সত্য অস্বীকারকারী হয় ও অহংকারী হয়।

মোট কথা, মানুষ যখন অনুরূপ পাপের ওপর মারা যায়, আর তার জৈবিক শক্তি ধ্বংস হয়, তখন ঊর্ধ্বজগত থেকে চরম ঘৃণা এসে তাকে আচ্ছন্ন করে। তা থেকে সে আর কখনও মুক্তি পায় না।

পাপোর দ্বিতীয় স্তর এই যে, জৈবিক শক্তির দম্ভে মানুষ যে সব ফজিলতের কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সেগুলো আল্লাহ তা’আলা তার পূর্ণত্ব ও সাফল্য লাভের জন্যে  নির্ধারিত করে দিয়েছেন। যেহেতু সর্বোচ্চ পরিষদ অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পয়গাম্বর ও শরীয়তের মাধ্যমে সেগুলো প্রকাশ ও তার মর্যাদা উঁচু করার ইচ্ছা পোষণ করে। তাই তা অস্বীকারকারী মূলতঃ তাদের সাথে শত্রুতায় লিপ্ত হয়। তাই যখন সে মারা যায়, তখন সর্বোচ্চ পরিষদের সব সদস্য তাকে ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখে। তারা তাকে শাস্তি দেয়ার পক্ষপাতি হয়। তখন তার পাপ তাকে এরূপ ঘিরে ফেলে যে, তা থেকে তার আর বেরোবার পথ থাকে না। যেহেতু সে তার যথার্থ যোগ্যতা ও গুণ সম্পর্কে অনবহিত থাকে, কিংবা যদি কিছুটা অবহিতও থাকে, কিন্তু তা অপর্যাপ্ত, তাই তার এদুর্গটি থেকে আর রেহাই মেলে না। পাপের এ স্তরটি মানুষকে সকল নবীর ধর্ম থেকেই বাইরে রাখে।

পাপের তৃতীয় স্তর এই যে, মানুষ তার মুক্তির পথ বর্জন করে অভিশপ্ত পথ অনুসরণ করে। কিংবা সে এমন কাজ করে যাতে পৃথিবীতে বড় ধরনের বিপদ ও ফাসাদ সৃষ্টির আশংকা দেখা দেয়। কিংবা সে সব কাজ সচ্চরিত্রতা ও সভ্যতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এ স্তরের পাপের কয়েকটি ধরন রয়েছে। এক, সে শরীয়তের সে বিধানগুলো মেনে চলে না যদ্বারা আনুগত্য অর্জিত হয়।

দুই, আনুগত্যের কাজে তার কিছু না কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ও শৈথিল্য থেকে যায়।

শরীয়তের অনুসরণ মানুষের জন্যে পৃথক পৃথক ভাবে বিভিন্নরূপ হয়ে থাকে। যে ব্যক্তি পশু প্রবৃত্তিতে ডুবে আছে, আর ফেরেশতা স্বভাব যার নিস্তেজ হয়ে গেছে, তার জন্যে শরীয়তের বেশী বেশী বিধান প্রয়োজন। তেমনি যার ভেতর পশু প্রবৃত্তি খুবই শক্তিশালী ও মজবুত, তার জন্যে শরীয়তের কষ্টকর বিধান বেশী করে অনুসরণ করা প্রয়োজন।

পাপ কাজগুলোর ভেতর কিছু আছে হিংস্র প্রকৃতির। সেগুলো সর্বাধিক ছু আছে হিংস্র প্রকৃতির। সেগুলো সর্বাধিক অভিশপ্ত। যেমন হত্যা, ধর্ষণ, ব্যভিচার ইত্যাদি। তেমনি জনক্ষতিকর কাজ। যেমন জুয়া, সুদ প্রভৃতি। এ তিন ধরনের পাপ আত্মাকে মেরে ফেলে। কারণ তা হচ্ছে সরল সত্য পথের পরিপন্থী। আমি তা আগেই বলে এসেছি। এ পাপগুলোর কারণে সর্বোচ্চ পরিষদ থেকে এরূপ অভিশাপ বর্ষিত হয় যা মানুষকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। পাপ ও অভিশাপের সমন্বয় ঘটলে শাস্তি অপরিহার্য হয়ে যায়।

তৃতীয় স্তরটি সকল পাপের সেরা পাপ। পবিত্র মজলিসে এর হারাম হওয়া ও এর অনুসারীর ওপর অভিসম্পাদ বর্ষণ করার পাকা-পোক্তা সিদ্ধান্ত রয়েছে। সব নবী রাসূলই এগুলো ক্রমাগতভাবে বলে গেছেন। এ পাপগুলোর অধিকাংশের ব্যাপারেই সকল নবীর শরীয়তে মতৈক্য রয়েছে।

চতুর্থ স্তরের পাপ হচ্ছে সে সব শরীয়ত ও তরীকাতের নাফরমানী করা যেগুলো জামানা ও জাতির পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তন হয়ে থাকে। তার কারণ এই যে, আল্লাহ পাক যখন কোন জাতির কাছে কোন নবী পাঠান তাদের আঁধার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসার জন্য, তখন তাকে দায়িত্ব দেন তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধন করে তাদের ভেতরে ন্যায়ের অনুশাসন চালু করার। তখন তাকে এমন সব কাজ দিয়ে পাঠানো হয় যেগুলো ছাড়া সংশোধন ও অনুশাসন চলতে পারে না। এ কারণে প্রত্যেকটি বিশেষ উদ্দেশ্যের একটি স্থায়ী অথবা দীর্ঘস্থায়ী মানদণ্ড থাকে। আর সে ভিত্তিতেই তাদের জবাবদিহি হতে হয়। প্রত্যেক কাজের জন্যে সময় নির্ধারিত করার প্রয়োজনীয় রীতি থাকে। কোন কোন কাজ ভালাই কিংবা ধ্বংসের হয়ে থাকে। আর সে বিচারেই তার ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হয়।

কিছু কাজ তার অনিষ্ট বা নিষিদ্ধ হওয়ার কারণের সাথে সংযুক্ত থাকে। কিচু কাজের সে সংযুক্ততা থাকে না। তার ভেতর স্বল্প সংখ্যক কাজের ব্যাপারে প্রকাশ্য ওহী নাযিল হয়েছে। কিন্তু তার অধিকাংশই নবীদের ইজতেহাদ থেকে প্রমাণিত হয়েছে।

পাপের পঞ্চম স্তর হচ্ছে সে সব পাপ, শরীয়ত প্রণেতা যে ব্যাপারে খুলে কিছু বলেননি এবং সর্বোচ্চ মজলিসেও তার কোন নির্দেশ বা মতামত নেই। কিন্তু বান্দা যখন সাহস করে আল্লাহর দিকে পুরোপুরি মনোসংযোগ করে, তখন তার কেয়াস কিংবা উদ্ভাবনী শক্তির মাধ্যমে যে কোন কিছুর আদেশ অথবা নিষেধ সম্পর্কে জানতে পারে। যেভাবে কোন সাধারণ ব্যক্তি বিজ্ঞ ডাক্তারের বিশেষ রোগের জন্যে দেয়া প্রেসক্রিপশন থেকে অপূর্ণ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে কোন ওষুধের কি প্রভাব তা বুঝতে পায়, অথচ না সে প্রভাবের কারণ জানে আর না ডাক্তার তাকে তা বলে দিয়েছে, এও তেমনি ব্যাপার। এ ধরনের ব্যাপার উপেক্ষা করলেও মানুষ দায়মুক্ত হতে পারেনা। তার এ কেয়াসলব্ধ ও বিবেক নির্দেশিত কাজ উপেক্ষা করলে তার ও আল্লাহর মাঝে এক আবরণ সৃষ্টি হয় এবং এ জন্যে তাকে জবাবদিহি হতে হবে। এ নিষিদ্ধ কাজ বর্জন করাটাই তাকওয়ার কাজ। অবশ্য এমন লোকও রয়েছেন যারা এ ধরনের পাপ বর্জন করা ও পুণ্য অর্জন করাকে ওয়াজিব মনে করেন। আল্লাহ পাকও তাদের জন্যে তা ওয়াজিব হিসেবে বিবেচনা করেন। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ পাক বরেনঃ

(আরবী**********************************************************************)

বান্দা আমার ব্যাপারে যেরূপ ধারণা পোষন করে আমি তার ব্যাপারে সেরূপই হয়ে থাকি। কোরআন পাকে বলা হয়েছেঃ

(আরবী********************************************************************************)

সূরা হাদীসঃ আয়াত ২৭

অর্থাৎ তারা নিজেদের তরফ থেকে বৈরাগ্য গ্রহণ করেছিলেন। আমি তাদের জন্যে তা লিখেছিলাম না। কিন্তু তারা আল্লাহকে খুশী করার জন্যে তা করেছে।

রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (আরবী************************************************************)

অর্থাৎ নিজেদের ওপর কাঠিন্য চাপিওনা, তাহলে আল্লাহও তোমাদের ওপর সে কাঠিন্য বলবৎ করবেন।

রাসূল (সঃ) আরও বলেনঃ তোমাদের মনে যাতে খটকা লাগে সেটাও পাপ।

কোন মুজতাহিদের ইজতেহাদে প্রমাণিত হুকুমের নাফরমানী এ স্তরের পাপেরই সমগোত্রীয় পাপ।

পরিচ্ছেদঃ একান্ন

পাপের কুফল

স্মরণ রেখ, বড় পাপ ও ছোট পাপ নির্ধারণ দুভাবে হয়ে থাকে। এক, পুণ্য ও পাপের গূঢ় রহস্যের ভিত্তিতে।

দুই, শরীয়ত ও তরীকতের ভিত্তিতে যা বিশেষ যুগের সাথে নির্দিষ্ট হয়ে থাকে।

তত্ত্বগত কারণে নির্ধারিত কবীরা গুনাহ সেটাকেই বলা হয়, যার জন্যে কবর ও হাশরে শাস্তি অপরিহার্য এবং মানব জাতির সভ্যতা ও শৃঙ্খলা বিধ্বস্ত হয়। এমন কি মানুষের সহজাত স্বভাবেরও পরিপন্থী। পক্ষান্তরে সগীরা গুনাহ সেটাকেই বলা হয়, যা কবীরা গুনাহ নয় বটে, কিন্তু কবীরা গুনাহর পথ খুলে দেয় এবং তা থেকে কবীরা গুনাহের আশংকা সৃষ্টি হয়।

যেমন, এক ব্যক্তি আল্লাহর পথে খরচ করে, কিন্তু তার পরিবারবর্গ বুখা-ফাকা থেকে মরণাপন্ন হয়। সে লোক কার্পণ্যের হীনতা তো দূর করে বটে, কিন্তু পারিবারিক ব্যবস্থা ধ্বংস করে থাকে।

অনেক সময় এমনও হয় যে, পাপ-পুণ্যে তত্ত্বগত বিচারে বা ছোট পাপ তা শরীয়তের মানদণ্ডে বড় পাপ। তার উদাহরণ এই যে, জাহেলী যুগের কোন সম্প্রদায় কখনও কোন একটি অন্যায় কাজ পছন্দ করল, আর সেটাকে সমাাজিক রীতিতে পরিণত করল। তখন তা থেকে তাদের কারো বেরিয়ে আসা যেন তাদের অন্তর থেকে বিরত থাকতে বলল। অথচ তারা তা মেনে না নিয়ে সদম্ভে শরীয়তের বিরুদ্ধাচরণে লেগে গেল। তাদের এ দম্ভ ও জিদের কারণে শরীয়তও কঠিন হয়ে গেল। অবশেষে সে পাপ অনুসরণ করাটা মিল্লাতের সাথে দুশমনী করার পর্যায়ে চলে গেল। সুতরাং এরূপ পাপ কেবল মরদুদ ও নাফরমানের পক্ষেই সম্ভব হতে পারে। সে না আল্লাকে পরোয়া করে, না মিল্লাতের তোয়াক্কা করে। এ কারণেই এরূপ পাপকে কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

মোটকথা, শরীয়তের মানদণ্ড নির্ধারিত কবীরা গুনাহ নিয়ে আমি এ গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে আলোচনা করব। কারণ, সেটাই এ ব্যাপারে আলোচনা নির্ধারিত স্থান! এখানে সে পাপের কুফল নিয়ে আলোচনা করব, যা তত্ত্বগত কারণে পাপ বলে বিবেচিত। আমি যেভাবে পাপের স্তরগুলো সংক্ষেপে বর্ণনা করেছি কুফলও সেভাবে সংক্ষেপে বর্ণনা করব।

কবীরা গুনাহ সম্পর্কে এ মতভেদ রয়েছে যে, তা করে কেউ তওবা ছাড়া মারা গেলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন কি না? প্রত্যেক দলই নিজের সপক্ষে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে দলীল পেশ করেছেন। আমার মতে, এ মতানৈক্যের সমাধান হচ্ছে এই যে, আল্লাহ পাকের কাজ দু’ধরনের হয়ে থাকে।

এক, আল্লাহ পাক প্রতিনিয়ত নিজ মর্জী মোতাবেক যেসব কাজ স্বাভাবিক পদ্ধতিতে ঘটিয়ে থাকেন।

দুই, বিশেষ কারণে স্বাভাবিক পদ্ধতি ভংগ করে যে কাজ সম্পাদন করেণ। যে বাক্যটি নিয়ে মানুষ মতানৈক্যের শিকার হয়েছে তাও দু’ধরনের। এক, স্বাভাবিক পদ্ধতির, দুই, স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক উভয় পদ্ধতির। অথচ বিরোধ সৃষ্টির জন্যে বাক্যটির ধরন এক হওয়া চাই। তর্কশাস্ত্রবিদরা বাক্যের একই ধরন হওয়ার অপরিহার্যতা প্রসঙ্গে এ কথা বলেছেন। কখনও কোন বাক্যের দিকই উল্লেখ থাকে না। তখন সেখানে কোরআন খুলে দেখা দরকার। যেমন, বলা হল, “যে বিষ পান করে, সে মারা যায়”। এবাক্যটি স্বাভাবিক পদ্ধতিতেই যা ঘটে সেটাই ব্যক্ত করেছে। কিন্তু সেখানে এটা বলা হয় না যে, বিষ পান যে করবে সে মরেই যাবে। কারণ, অস্বাভাবিক পদ্ধতিতে সে বেঁচেও যেতে পারে।

এ কারণেই মূলতঃ আলোচ্য ব্যাপারটি বিতর্কিত ব্যাপার নয়। পৃথিবীতেও আমরা আল্লাহ পাকের স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক কাজের যথেষ্ট উদাহরণ দেখতে পাই। যেভাবে আখেরাতেও তাঁর উভয় ধরনের কাজ প্রকাশ পাবে। স্বাভাবিক নিয়ম তো এটাই যে, বড় পাপ করে তওবা ছাড়া যে লোক মারা যাবে সে দীর্ঘকাল ধরে শাস্তি পাবে। কিন্তু আল্লাহ পাক সে নিয়ম ভংগ করে তাকে ক্ষমাও করতে পারেন।

বান্দার হকের ব্যাপারটি তাই। তবে কবীরা গুনাহ করলে চিরকাল জাহান্নামে থাকবে এটা ঠিক নয়। আল্লাহ পাকের নীতিও এটা নয় যে, তিনি কবীরা গুনাহর গুনাহগারকে কাফেরের সাথে একাকার করে শাস্তি দেবেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।

পরিচ্ছেদঃ বায়ান্ন

ব্যক্তিগত পাপ

জেনে রাখুন, মানুষের আত্মিক শক্তিকে তার জৈবিক শক্তি চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে। আত্মাটি হল দেহ নামক খাঁচায় বন্দী পাখী। এ পাখীর সৌভাগ্যের পথই হচ্ছে খাঁচামুক্ত হয়ে নিরাপদে তার আসল ঠিকানায় পৌঁছে যাওয়া। তারপর সেখানে বসে মুক্তভাবে ভাল ভাল ফলমূল ও দানাপানি খেয়ে অন্যান্য মুক্ত পাখীদের সাথে আনন্দ করে উড়ে বেড়ানো।

তেমনি মানুষের চরম দুর্ভাগ্য হল এটাই যে, সে পূর্ণ মাত্রায় বস্তুবাদী হয়ে যায়। বস্তুবাদের তাৎপর্য এটাই যে, তা মানুষের আল্লাহপ্রদত্ত সহজাত স্বভাবের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আমি আগেই বলে এসেছি যে, মানুষের স্বাভাবিক আকর্ষণ তার, উৎস স্থল সৃষ্টিকর্তার দিকে। তারা স্বভাবতঃই তাঁকে অতিমাত্রায় সম্মান দেখাতে চায়। নিম্ন আয়াতেও তাই বলা হয়েছে-

(আরবী*************************************************************)

সূরা আ’রাফঃ আয়াত ১৭২

অর্থাৎ তোমার পালনকর্তা যখন বনী আদম থেকে প্রতিশ্রুতি নিলেন, আমি কি তোমাদের প্রভু নই? তারা বলল, “হ্যাঁ”।

মহানবী (সঃ) বলেনঃ প্রতিটি শিশু প্রকৃতির ধর্ম ইসলামের ওপর জন্ম নেয়। স্রষ্টার ওপর মানুষের অন্তরে এ অন্তহীন সম্ভ্রমবোধ তখনই দেখা দেয়, যখন তাদের অন্তরে এ প্রীতিটি জন্মে যে, তিনি যা যেভাবে ইচ্ছা করে থাকেন, ভাল কি মন্দ কাজের ফলাফল দেন এবং মানুষের জন্যে শরীয়ত বা আইন-কানুন নির্ধারন করেন।

পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার কোন প্রতিপালক প্রভু রয়েছেন বলে বিশ্বাস করে না, এও বিশ্বাস করে না যে, সবাইকে তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে কিংবা মনে করে স্রষ্টাতো আছেন বটে? কিন্তু পার্থিব জীবনের ব্যাপারে তিনি হস্তক্ষেপ করেন না, কিংবা যদি কিছু করেন তা ইচ্ছা করে করেন না, আপনা আপনি হয়ে থাকে এবং তা ঠেকানোর ক্ষমতা তাঁর নেই অথবা তিনি বান্দার ভাল-মন্দ কাজের ফলাফল দেবেন না কিংবা সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির মতই একজন হবেন অথবা সৃষ্টির গুণাবলীতেই তিনি গুণান্বিত কিংবা তিনি কোন নবীর মারফত কোন শরীয়ত পাঠাননি, সে ব্যক্তি নিশ্চিত নাস্তিক। সে ব্যক্তির অন্তরে না আল্লাহ পাকের কোন মর্যাদাবোধ আছে, আর না তার বুঝ-ব্যবস্থার সাথে পবিত্র মজলিসের কোন সম্পর্ক আছে। সে তো এমন এক খাঁচাবদ্ধ পাখী যে খাঁচায় সূঁচ্যাগ্র পরিমাণ ছিদ্র নেই। মৃত্যুর পর তার সামনে সব কিছুই প্রকাশ পাবে। তখন কোনভাবে তার ফেরেশতা স্বভাবতও প্রকাশ পাবে এবং তার আকর্ষণ স্বভাবতঃই স্রষ্টার দিকে হবে। কিন্তু সে আকর্ষণের পথে আল্লাহ পাকের ইলম ও পবিত্র মজলিসের সিদ্ধান্ত অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। তখন তার জৈব প্রবৃত্তি অত্যন্ত উত্তেজিত ও হিংস্র হয়ে প্রকাশ পাবে। তার সে অবস্থা দেখে আল্লাহ পাক ও সর্বোচ্চ পরিষদ অত্যন্ত  অসন্তুষ্ট হবেন। তাকে তখন ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখা হবে এবং ফেরেশতাদের ওপর ইলহাম হবে তাকে শাস্তি দেবার। ফলে সে নমুনা জগত ও বহির্জগতে শাস্তি ভোগ করবে।

মানুষের জন্যে কাফের হওয়া বড় দুর্ভাগ্যের ব্যাপার।

আল্লাহ পাক বলেনঃ

(আরবী**********************************************)

সূরা আর-রাহমানঃ আয়াত ২৯

অর্থাৎ জগতের জন্যে আল্লাহ পাক কৌশলগত কারণে বিভিন্ন যুগ ও তার রীতি-নীতি নির্ধারণ করেন। যখনই কোন যুগ শুরু হয় তখন আল্লাহ পাক সকল আকাশে তার বিধান জারী করেন। সর্বোচ্চ পরিষদকে তিনি তার তদারকির কাজে নিয়োজিত করেন। মানব জাতির জন্যেও তিনি বিশেষ শরীয়ত ও কল্যাণ ব্যবস্থান নির্ধারণ করেন।

অতঃপর আল্লাহ তা’আলা সর্বোচ্চ পরিষদকে ইলহাম করেন পৃথিবীকে সে রীতি-নীতি ছড়িয়ে দেবার ব্যাপারে একমত হতে। তাদের একমত হওয়ার কারণে মানুষের অন্তরে ইলহাম হয় তা গ্রহণের জন্যে। এটাই হচ্ছে আল্লাহর শানের তাৎপর্য। তাঁর চিন্তার শানের এটা খণ্ড প্রতিফলন মাত্র। কারণ, তাঁর মৌলিক শান কখনও নতুন ভাবে সৃষ্টি হয় না।

মোটকথা, আল্লাহ পাকের এ শানকে যে অস্বীকার করে সে কাফের। কারণ, এ শানতো আল্লাহর মৌলিক অবিনশ্বর শানেরই প্রতিফলন। তাই এ শানতো আল্লাহর মৌলিক অবিনশ্বর শানেরই প্রতিফলন। তাই এ শানের বিরোধিতাকারীর ওপর আল্লাহর অসন্তোষ প্রকাশ পায়। তার ওপর যখন সে অপরকেও সে কাজে বাধ্য করে, তখন সর্বোচ্চ পরিষদের অভিশাপ বর্ষিত হয়।

এ অভিশাপ তাকে চারদিক থেকে বেষ্টন করে এবং সকল কাজ বরবাদ হয়ে যায়। তার অন্তর কঠিন হয়ে যায়। ফলে তার জন্য কল্যাণকর কোন ভাল কথা গ্রহণ করার ক্ষমতা তার থাকে না। নিম্ন আয়াতে এ কথাই বলা হয়েছেঃ

“যারা আমার সুস্পষ্ট নিদর্শন ও হেদায়েতকে মানুষের জন্যে আমি পরিস্কারভাবে বর্ণনা করার পরেও গোপন করে তাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ ও অন্যান্য অভিশাপকারীদের অভিশাপ বর্ষিত হয়”।

আল্লাহ পাক আরও বলেনঃ

(আরবী**********************************************************************************)

সূরা বাক্বারাঃ আয়াত ৭

“আল্লাহ তাদের অন্তরে সীল মেরে দিয়েছেন এবং তাদের কর্ণকুহরেও”।

এ ধরনের লোক হল সেই খাঁচাবদ্ধ পাখী যার খাঁচার ছিদ্র আছে বটে, কিন্তু তা আবররণ দিয়ে ঢাকা।

পূর্বোক্ত নাস্তিক ও কাফেরের পরবর্তী স্তর হল তার, যে ব্যক্তি আল্লাহর একত্ব ও তাঁর মর্যাদায় আস্থাবান কবটে, কিন্তু পাপ-পুণ্যের ভিত্তিতে তাকে যেসব বিধি-নিষেধ পালন করতে বলা হয়েছিল তা সে করেনি। এ লোক হল সেই জ্ঞানীর মত যে লোক বীরত্ব ও তার উপকারিতা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান বটে, কিন্তু নে সিজে কাপুরুষ। কারণ, বীরত্বের গুণাগুণ জানা আর বীর হওয়া স্বতন্ত্র ব্যাপার। অবশ্য যে ব্যক্তি বীরত্ব সম্পর্কে কোন ধারণাই রাখে না তার চেয়ে সে ভাল। এ লোকটির অবস্থা হল সেরূপ খাঁচায় আবদ্ধ পাখীর মত যে খাঁচায় ছিদ্র আছে, আর যা দিয়ে সবুজ বাগ বাগিচা ও বহুবিধ মজাদার ফলমূল দেখা যাচ্ছে। এমন কি তা দেখে সে পাখা ঝাপটাবার কসরৎ চালাচ্ছে আর ছিদ্র পথে ঠোঁট বাড়াবার চেষ্টা পাচ্ছে। কিন্তু বেরোবার কোন পথ পাচ্ছে না। এরাই কবীরা গুনাহর পাপী।

এ দলের পরবর্তী স্তরে রয়েছে সেই লোক যে পাপ-পুণ্যের বিধি-বিধানগুলো মেনে চলল বটে, কিন্তু যেসব শর্ত পূরণ করে তা পালন করা প্রয়োজন ছিল তা সে করেনি। তার অবস্থা হল সেই পাখীর মত যেটি একটি ভাংগা খাঁচায় আবদ্ধ এবং অনেক কষ্টেসৃষ্টে সে তা থেকে রেহাই পেতে পারে বটে, কিন্তু পালক ও চামড়ার নিরাপত্তা থাকে না। তার এ দুর্গত অবস্থার জন্যে সে অন্যান্য পাখীর সাথে না একত্রে ফলমূল খেতে পারে, আর না আনন্দ করে বেড়াতে পারে। এরা পুণ্যের সাথে পাপ মিশ্রণকারী সগীরা গুনাহর পাপী। নবী করীম (সঃ) পুলসিরাতের হাদীস প্রসঙ্গে বলেনঃ একদল পুলসিরাত থেকে জাহান্নামে পড়ে যাবে। একদল আহত অবস্থায় তা পার হবে। অপর এক দল জাহান্নামের আগুনে জ্বলে মুক্তি পাবে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।

About শিবির অনলাইন লাইব্রেরী