হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ – ২য় খন্ড

অধ্যায়-৬৫

সংশয়পূর্ণ স্থানের যাচাই-বাছাই ও মূলনীতি থেকে বিধান বের করা

মনে রাখা দরকার, অনেক বিধা এমন রয়েছে যা শুধু মূল ব্যাপারের নামোল্লেখ করে জারি করা হয়েছে। তা জান যায় তার বিভাজন ও শ্রেণী-বিন্যাসের মাধ্যমে। অথচ তার সাম্প্রতিক অর্থজ্ঞাপক কোনো সংজ্ঞা নেই। তাতে প্রত্যেক শ্রেণীর পৃথক পৃথক বিধানের উল্লেখ নেই। যেমন একটি মৌলিক বিধান হলোঃ

(আরবী**************************************************************)

অর্থাৎ “চোর পুরুষ হোক কিংবা স্ত্রী হোক তার হাত কেটে দাও”।

এখানে চুরির দণ্ডবিধি জানানো হয়েছে। এও জানা গেল তা প্রয়োগ হয়েছে বনী উবাইদাক, তাঈমা ও মাখসুমীয়ার এক নারীর ক্ষেত্রে। তবে এটাও জানা কথা যে, চুরির কয়েকটি ধরন রয়েছে।

যেমন চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, আত্মসাৎ, পড়ে থাকা মাল নেয়া, রাহাজানি ও গায়ের জোরে যখন খুশি যার মাল নিয়ে যাওয়া ও অপচয়। প্রয়োজন ছিল হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এর প্রতিটি ধরনের পৃথক পৃথক অবস্থা জিজ্ঞেস করে বা জেনে নেয়া। তা হলে প্রত্যেকটির স্বাতন্ত্র্য সুস্পষ্টভাবে সামনে এসে যেত।

এক্ষণে এগুলো যাচাই বাছাইয়ের ক্ষেত্রে জরুরী হচ্ছে, প্রত্যেকটি ধরনের স্বরূপ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা। তা হলে জানা যাবে, চুরি থেকে এসবের পার্থক্য কতটুকু ও কি ধরনের। তখন সে সবের কোন একটি চুরি নয় তা বুঝা যাবে। চুরিবলতে সাধারণত কোন কাজকে বুঝা হয় তাও এখানে বিবেচ্য। এভাবে চুরির সুনির্দিষ্ট লক্ষণগুলো বের করে তার ভিত্তিতে কোনটি চুরি এবং কোনটি চুরি নয় তা নির্ধারণ করতে হবে। সুনির্দিষ্ট লক্ষণের ভিত্তিতেই চুরির সংজ্ঞা নির্ধারিত হবে।

যেমন ডাকাতি বা রাহাজানি ইত্যাকার নাম থেকৈই বুঝা যায় যে, এরূপ কাজের যারা শিকার হয় তারা শক্তি দ্বারা মোকাবেলা ছাড়া রেহাই পায় না। এ সব কাজ এমন জায়গায় করা হয় সেখানের লোকেরা সাহায্য পেয়ে মোকাবেলা করার সুযোগ থাকে না। তেমনি ছিনতাই এমন এক কাজ যা দেখতে না দেখতে নিমেষের মাঝে করে উধাও হয়। আত্মসাৎ থেকে বুঝা যায় শুরুতে পরিচিতি ও বিশ্বস্ততার সুযোগে এ কাজটি সম্ভব হয়েছে। পথে পাওয়া মাল কথাটি বলে দেয় উদাসীনতা ও অরক্ষণীয়তাই এ কাজের সুযোগ সৃষ্টি করে। বলপূর্বক কিছু নেয়া থেকে বুঝা যায় যে, প্রতিপক্ষ তার তুলনায় দুর্বল এবং সে জানে, এ কাজের বিচার চাওয়ার ক্ষমতাও তার নেই। যদি সে বিচারকের কাছে যায়ও তথাপি বিচারককে প্রভাবিত করে হোক কিংবা ঘুষ দিয়ে হোক সবল ব্যক্তি তার পক্ষেই রায় নিতে পারবে। অপচয় বা অপব্যয় দ্বারা সাধারণত এটাই বুঝায় যে, কেউ কোনো কিছু বেপরোয়া ব্যয় বা খরচ করে চলে। তার ব্যাপারে সবাই করুণা দেখিয়ে থাকে। যেমন পানি বা জ্বালানি খরচে বেপরোয়া হওয়া। পক্ষান্তরে চুরি বলতে কারো কোনো কিছু রাতের অন্ধকারেনা বলে নেয়াকে বুঝায়।

হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছোটখাটো চুরির ক্ষেত্রেও তিন দিরহাম জরিমানার বিধান রেখেছেন। ফলে তা পথে পাওয়া মাল থেকে পৃথক হয়ে গেল। তেমনি বললেন, আত্মসাৎকারী, লুণ্ঠনকারী ও ছিনতাইকারীর বেলায় হাত কাটার বিধান নয়। তিনি আরও বললেন গাছের ফল পেড়ে খাওয়া কিংবা পাহাড়ে পড়ে পাওয়া মালের জন্য হাত কাটা নয়। এ থেকে তিনি এ ইঙ্গিতই দিলেন যে, হাত কাটার মতো চুরির বস্তু হতে হবে সুরক্ষিত ও প্রতিবন্ধকতাপূর্ণ।

তেমনি মাত্রারিতিক্ত বিলাস জীবন ও প্রাচুর্যেরও চূড়ান্ত সংজ্ঞা নির্ধারণ সুকঠিন। তাই এর একটা মোটামুটি সংজ্ঞা নেয়া যেতে পারে। সমাজ জীবনে এর সুফল অনিয়ন্ত্রিত থাকে। কোনো বাহ্যিক নিদর্শন দ্বারা এর মাত্রা নির্ণয় করা যায় না। কে কতখানি বিলাসপ্রিয় আর কে কত পরিমাণ প্রাচুর্য পেলে পাকড়াও করা হবে এ পার্থক্য নির্ণয় যথাযথভাবে সম্ভব নয়।

এটা জানা কথা যে, অনারবরা উত্তম বাহন, সুউচ্চ বাসস্থান, সর্বোচ্চ পোশাক-আশাক ও মহামূল্যবান অলংকারাদি ব্যবহারে অভ্যস্ত। অথচ তা বিলাস সামগ্রী। তেমনি এটাও সুস্পষ্ট কথা যে, মানুষের রুচিভেদে বিলাস দ্রব্যেও পার্থক্য দেখা দেয়। এক জাতির বিলাসিতা অন্য জাতির কাছে সহজ সরল জীবন বলে বিবেচিত হয়। এক দেশের উত্তম পোশাক ও চালচলন অন্য দেশের লোকের কাছে দারিদ্র্য বলে বিবেচিত হয়। এটাও জানা কথা যে, জীবন যাপনের ধারাও কোথাও উত্তম বস্তু দিয়ে হয়, কোথাও সাধারণ বস্তু দিয়ে হয়। অবশ্য সাধারণ বস্তু দ্বারা জীবন যাপনকে কখনো বিলাসিতা বলা যায় না। তেমনি বিলাসিতার উদ্দেশ্য ছাড়াই যারা স্বভাবত ভালো বেশভূষা নিয়ে চলে ও ভালো খায় দায় কিংবা পরিবেশগত ভাবেই সে সবে যারা অভ্যস্ত তাদেরও বিলাসী বলা যাবে না। কারণ এ ক্ষেত্রে কেউই সেটাকে বিলাসিতা ভাবে না। ক

শরীয়ত সাধারণভাবে প্রাচুর্য ও বিলাসিতার কুফল সম্পর্কে সতর্ক করেছে এবং সে সব বস্তুর উল্লেখ করেছে যেগুলোকে লোক বিলাসিতার উদ্দেশ্যেই ব্যবহারের অভ্যেস গড়ে তোলে। ইরানি ও রেমানরা সেসব বিলাস সামগ্রী ব্যবহারের ক্ষেত্রে একমত। এ কারণেই সেগুলোকে হারাম করা হয়েছে। হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কোনো জীবনধারা বা কোনো দূর দেশের জীবন ধারার দিকে লক্ষ্য করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। উক্ত দলীলের ভিত্তিতেই রেশমি বস্ত্র ও সোনা-রূপার পাত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়েছে।

শরীআত দেখতে পেল, বিলাসী জীবনের মূল কথা হচ্ছে, এক শ্রেণীর লোক সব ধরনের জীবন ধঅরা থেকে বেছে বেছে উত্তম বস্তু নিয়ে নেয় এবং সাধারণ সামগ্রী উপেক্ষা করে। তারপর পূর্ণ বিলাসিতার বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, বিশেষ বিলাসী সামগ্রীর ভেতর থেকে তারা সর্বোত্তমটিই বেছে নেয় এবং অপেক্ষাকৃত স্বল্প মানের পণ্যটি অবজ্ঞা ভরে উপেক্ষা করে। অবশ্য দুর্লভ বস্তুর ক্ষেত্রে তারা এ নীতি অনুসরণ করে না। অবশ্য শরীআতের বিধানসুলভ বস্তুকে বিবেচনায় আনে না। তবে এ ক্ষেত্রে যেহেতু বিলাসীদের আকর্ষণ বিদ্যমান তাই সেটাকেও হারাম করা হয়েছে। মূলত বিলাস জীবন যেহেতু ঘৃণার্হ, তাই বিলাস সামগ্রী বলে চিহ্নিত বস্তুর অনুরূপ কিংবা আনুসঙ্গিক বস্তু হারাম হওয়া অধিকতর যুক্তিসঙ্গত। এ নীতির ভিত্তিতে টাকার বদলে অতিরিক্ত টাকা ও খাদ্যসামগ্রীর বদলে অতিরিক্ত খাদ্য সামগ্রী নেয়া হারাম করা হয়েছে। অথচ ভালো জিনিসের বেশি দাম দেয়া হারাম নয়। কারণ, সেক্ষেত্রে জিনিসে তারতম্য হয়ে গেছে। ফলে বিক্রেতার মর্জির উপর তার দাম নির্ভরশীল হয়ে গেল। জিনিসের বিনিময়ের ক্ষেত্রে একই জিনিস হওয়াই যথেষ্ট নয়, জিনিসের মানো এক হতে হবে। যেমন এক বাঁদীর বদলেই দুই বাঁদী খরিদ করা অবৈধ নয়। তেমনি এক কাপড়ের বদলে দুই কাপড় কোনো হারাম নয়। কারণ এ সবের মূল্য মানে তারতম্য থাকে। ভালোটা ভালো দামে ও মন্দটা কম দামে বিক্রি হয়। তাই সাধারণের ধারণা অনুসারে জিনিসের বদলে জিনিসের পরিমাণ এক থাকা জরুরী নয়।

আমার এ ভূমিকার পর এ অধ্যায়ের অনেক মাসআলা সমাধান এসে গেল। যেমন এক পশুর বদলে একাধিক পশু খরিদ করা কিংবা ঐ ধরনের অন্যান্য ব্যাপার এলে চিন্তা করে তার সমাধান পাওয়া যাবে।

কখনো দুটো ব্যাপারে বাহ্যত বেশ সাদৃম্য বিদ্যমান। কিন্তু তার অন্তর্নিহিত তারতম্য সাধারণের কাছে বোধগম্য নয়। যার গভীর দৃষ্টি সম্পন্ন তাদের চোখেই কেবল তা ধরা পড়ে। সেটা শুধু হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর উম্মতদের মতানুসারী আলেমগণই উপলব্ধি করতে পেরেছেন। এরূপ ক্ষেত্রে কোনো বাহিক্য নিদর্শন নির্ধারিত করে তার ভিত্তিতেই কোনটা পাপের ও কোনটা পুণ্যের তা নির্ণয় করতে হবে। তারপর তার ভিত্তিতে উভয়ের বিধি বিধান বলে দিতে হবে। যেমন বিবাহ ও ব্যভিচার।

বিবাহের তত্ত্বকথা হলো এই, এর মাধ্যমে সৃষ্টির ধারা সুশৃঙ্খলভাবে অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা করা হয়। তাই তার দাবি হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক গভীর ও স্থায়ী হবে, উভয়ের সন্তান উৎপাদনের অভিলাস থাকবে এবং উভয়ে নিজ নিজ ইজ্জত আবরুর হেফাজত করবে। এটাই সবার আকাঙ্ক্ষিত ও পসন্দনীয় কাজ।

পক্ষান্তরে ব্যভিচার বা যৌন স্বেচ্ছাচারের মূল কথা হলো এই যে, ইচ্ছাশক্তিকে বিভ্রান্তি ও যৌন স্বেচ্ছাচারের জন্য লাগামহীন করে দেয়া। ফলে তার লজ্জা শরমের বালাই থাকে না, ইজ্জত আবরুর আগল ভেঙ্গে যায় ও সৃষ্টি কৌশলের সামগ্রিক নিয়ম শৃঙ্খলা চুরমার হয়ে যায়। এ কাজটি সৃষ্টিকর্তার গজবের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই তা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হলো।

বহু ক্ষেত্রেই বিয়ে ও মুক্ত যৌনাচারে সাদৃশ্য রয়েছে। যেমন দুটোতেই যৌন চাহিদা পূরণ হয় এবং নারীর প্রতি পুরুষের যৌনাকর্ষণ সৃষ্টি হয়। এ কারণেই বাহ্যিক কোনো নিদর্শন দ্বারা এ দুটোর পার্থক্য সৃষ্টি করতে হবে। তার ভিত্তিতেই কোনটি বাঞ্চিত ও কোনটি অবাঞ্ছিত তা বলে দিতে হবে। তাই হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিয়ের জন্যে কয়েকটি নিয়ম বেঁধে দিয়ে তার বৈশিষ্ট্য স্থির করে দিলেন।

১। পুরুষ পুরুষকে নয়, বরং নারীকে বিয়ে করবে। কারণ এ পথেই বংশধারা চালু থাকবে। পরন্তু সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বিয়ে করতে হবে স্থায়িত্বের জন্যে, আমোদ ফুর্তির জন্যে নয়। তাতে পরামর্শ প্রস্তাবনা ও ঘোষণা থাকতে হবে। তাছাড়া প্রস্তাবিত নারীর সম্মাতি থাকতে হবে। এ সবই বিয়ের শর্ত।

২। স্বামী স্ত্রী উভয়ে পারস্পরিক সহায়তার জন্য উদ্ধুদ্ধ থাকবে। এটা তখনই হতে পারে যখন বিয়ে সাময়িক না হয়ে স্থায়ী ও অপরিহার্য হয়। এ কারণেই গোপন বিয়ে ও সাময়িক বিয়ে নিষিদ্ধ হয়েচে। একই কারণে সমকাকিতাকে হারাম করা হয়েছে।

অনেক সময় এক পুণ্য কাজ অন্য পুণ্য কাজের সাথে সাদৃশ্য রাখে। তখন সে দুটোর ভেতরেও পার্থক্য সৃষ্টি জরুরী হয়। যেমন কিয়াম হচ্ছে রুকু ও সিজদার মাঝে পার্থক্য সৃষ্টিকারী। কখনো আবার কোনো কাজ খুব কল্যাণ দেয় না বটে, কিন্তু করা হয়। যেমন দু’সিজদার মাঝে বসা। কখনো কোনো এক কাজের শর্ত গোপন ও কল্পনীয় ব্যাপার হয়। তখন দৈহিক কোনো কাজ বা কথা দ্বারা তা চিহ্নিত করতে হয় এবং সেটাকে রুকন বানাতে হয় যেন গোপন কাজটা নিয়মনীতির আওতায় চলে আসে। আল্লাহ পাকের জন্য খালেস নিয়তে ইবাদত করা একটা অন্তর্নিহিত ব্যাপার এবং নিয়ত করা একটা গোপন কাজ। তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে কেবলামুখী হওয়া ও তাকবীর বলাকে এবং এ দুটোকে নামাযের রুকন বা অঙ্গ করা হয়েছে।

যখন কোনো আয়াতে বিশেস পরিভাষা ব্যবহৃত হয় কিংবা তার অবস্থা থেকে বিশেস কোনো বিধান বুঝা যায়, তখন তা পালনে কোথাও সংশয় সৃষ্টি হয়। সেক্ষেত্রে পরিভাষায় ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ জরুরী হয় কিংবা সেই বিশেষ বিধানের সংজ্ঞা সম্পর্কে আরববাসীর প্রচলিত ধারণা অবহিত হতে হয়। যেমন রমযান সম্পর্কে আয়াত নাযিল হলো। অতঃপর মেঘ ঢাকা অবস্থায় তা অনুসরণের ক্ষেত্রে সংশয় দেখা দিল। সেক্ষেত্রে আরবরা সেভঅবে মাস নির্ধারণ করে অর্থাৎ শাবান মাসকে ত্রিশ দিন ধরে রমযান মাস শুরু করে, রোযাও সে হিসেবে রাখতে হবে। কারণ, আরবী মাস কখনো উনত্রিশ দিনে ও কখানো ত্রিশ দিনে হয়। তাই হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমরা উম্মী জাতি। না লিখতে জানি, না কোন মাস কত দিনে হয় তার হিসাব জানি। -আল হাদীস।

তেমনি কসরের আয়াতে সফর পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। অতঃপর তা পালনে কখনো সংশয় দেখা দিল। তাই সাহাবায়ে কেরাম ফায়সালা করলেন যে, সফর বলতে নিজ স্থান থেকে অন্য এমন কোনো স্থানে গমনকে বুঝাবে যেখানে যেতে একদিন ও একরাত পৌঁছা যায় না এবং পরবর্তী দিনও প্রয়োজন হয়। তাই তার দূরত্ব ধরা হবে চার বুর্দ বা আটচল্লিশ মাইল।

যে বিধান হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য নির্দিষ্ট ছিল এবং উম্মত তা থেকে মুক্ত রয়েছে সে ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য নীতি হলো এই যে, সে বিধানটি সার্বজনীন বিধান নয়, বরং ব্যক্তি বিশেষের উপযোগিতা নির্ভর বিধান। হযরত তাউস (রহঃ) আসরের পরে দু’রাকাত নামায পড়তেন সে ব্যাপারেও এই কথা। এ কারণেই তিনি অন্যান্যকে তা অনুসরণ করতে নিষেধ করতেন। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব কিছুর হাকিকত জানতেন। তাই তাঁর ব্যতিক্রমধর্মী আমলের ওপর সংশয় করা চলে না।

যেমন চার বিয়ের ব্যাপারটি। এর বেশি বিয়ের ক্ষেত্রে ইনসাফ বজায় রাখা সম্ভব না হবারই সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ব্যাপারে সচেতন ও সজ্ঞাত ছিলেন। তিনি জানতেন দাম্পত্য জীবনে সার্বিকভাবে যাপন করার উত্তম পন্থা কোনটি। এ জন্যে তিনি এক্ষেত্রে যা করেছেন, অপরের জন্যে তা বৈধ রাখেননি। কারণ তাদের পক্ষে অনুসরণ সম্ভব নাও হতে পারে।

অথবা সে বিধানটি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্যে নির্দিষ্ট হওয়ার ব্যাপারটি ব্যক্তিগত কারণে না হয়ে কোনো প্রচলিত রীতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা সৃষ্টির জন্যেও হতে পারে। যেমন তিনি বললেন- কোনো জিনিস ক্রয় করে বিক্রেতার ওপর কোনো শর্ত আরোপ করা যাবে না। অথচ তিনি হযরত জাবের (রাঃ) থেকে একটি উট কিনে শর্ত লাগলেন সেটাকে মদীনা পর্যন্ত চালিয়ে নেবে।

অথবা সে বিধান নিষ্পাপ নবী ছাড়া অন্যদের বিপথে নিয়ে যাবে। যেমন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোযার অবস্থায় হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে চুমু খেয়েছেন। সে ব্যাপারে তিনি বলেন –তোমাদের কে আছ যে লোক নিজের প্রকৃতির ওপর সেভাবে বিজয়ী থাকতে পার যেভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পারতেন?

অথবা রিসালাতের সাথে সে কাজটি এ জন্যে নির্দিষ্ট করা হয়েছে যে, তাঁর পবিত্র আত্মা যখন কোনো নেক কাজের ইচ্ছা পোষণ করেন তখন তা বিশেষ অনুমোদন লাভ করে। কারণ, তাঁর আত্মা সর্বদা আল্লাহ পাকের দিকে অধিক নিবিষ্ট থাকার ও ঔদাসীন্যের সকল পর্দা ছিন্ন করার জন্য সদা উদগ্রীব ছিল। যেমন কোনো এক সক্ষম ব্যক্তির খাবার চাহিদা বেশী হয়ে থাকে। একটি বর্ণনা মোতাবেক তাঁর জন্যে তাহাজ্জুদ, ইশরাক ও চাশত নামায ওয়াজিব ছিল।

অধ্যায়-৬৬

অবকাশ দান ও সহজিকরণ

আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

(আরবী**************************************************************************************)

অর্থাৎ আল্লাহ পাকের অনুগ্রহে তুমি তাদের বেলায় বিনয়ী ও নম্র হয়েছ। যদি তুমি উগ্র মেজাজ ও রূঢ় স্বভাবেরহতে, তাহলে তারা তোমার কাছ থেকে পালিয়ে যেত। তিনি আরও বলেনঃ

(আরবী***************************************************************************************)

অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা তোমাদের ব্যাপারে সহজ ও আরামদায়ক করতে চান, কঠিন ও কষ্টদায়ক করতে চান না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আবু মূসা (রাঃ) ও মাআজ ইবনে জাবাল (রাঃ)-কে ইয়ামানের শাসনকর্তা পরিচালনার জন্য পাঠান তখন বলেনঃ

(আরবী**************************************************************************************)

অর্থাৎ তুমি আরাম দিও, কষ্ট দিও না, খুশি রেখ, অখুশি করো না এবং ঐক্যবদ্ধ রেখো, বিভক্তি সৃষ্টি করো না।

তিনি অন্যত্র বলেনঃ

(আরবী**************************************************************************************)

অর্থাৎ তোমাদেরকে সহজ করার জন্য পাঠানো হয়েছে, কঠিন করার জন্যে পাঠানো হয়নি।

দ্বীনের কাজগুলোকে সহজ করার ব্যাপারটি কয়েকভাবে অর্জিত হতে পারে।

১। কোনো ইবাদতের জন্যে কোনোরূপ কষ্টদায়ক ব্যাপারকে শর্ত বা রুকন বানানো। যেমন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি যদি উম্মতের জন্যে কষ্টদায়ক না ভাবতাম তা হলে প্রত্যেক নামাযের আগে মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।

২। কিছু ইবাদতকে এরূপ আনুষ্ঠানিক রীতিতে পরিণত করে দেয়া যা সবাই সানন্দে স্বতঃস্ফুর্তভাবে করতে উদ্ধুদ্ধ হয়। যেমন, দুই ঈদের নামায ও জুমার নামায। এর প্রয়োজন সম্পর্কে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন –ইয়াহুদি সম্প্রদায় যেন জানতে পায়, দ্বীনের কাজে আনন্দ রয়েছে।

মূলত বড় বড় মজলিসে সেজেগুজে আগে গিয়ে হাজির হওয়ার প্রবণতা মানুষের স্বভাবজাত ব্যাপার।

৩। সে সব কাজকে সুন্নাত বানানো যার প্রতি মানুষের মন স্বভাবতই আকৃষ্ট হয় এবং তাদের বিবেক বুদ্ধি সম্মত হয়। তা হলে স্বতঃস্ফুর্তভাবে তা প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে পালন করবে। এ কারণেই মসজিদকে পাক-সাফ রেখে আকর্ষণীয় করা ও মুসল্লীদের খোশবু মেখে নামাযে আসা সুন্নাত করা হয়েছে। মধুর কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত ও সুরেলা কণ্ঠে আযান দেয়াকে মুস্তাহাব করা হয়েছে।

৪। ইবাদতের ক্ষেত্রে কাজ না থাকা চাই এবং যে কাজ মানুষ অপছন্দ করে তা দূর করা চাই। এ কারণেই ক্রীতদাস, গেয়ো ও জারজ ব্যক্তির ইমামতিকে মাকরূহ করা হয়েছে। স্বভাবতই মানুষ তাদের মুক্তাদি হতে অপমানবোধ করে।

৫। অধিকাংশ লোকের স্বভাব যা দাবি করে এবং যা বর্জন করায় তাদের মনে খটকা সৃষ্টি হয় তা বহাল রাখা চাই। যেমন খলীফাই ইমামতের অধিকতর হকদার, তেমনি হকদার মেহমান নেওয়াজ ব্যক্তি তার বাড়িতে ইমামতি করার। তেমনি একাধিক স্ত্রীরস্বামী নতুন বিয়ে করলে তিন অথবা সাতদিন একাধারে নতুন স্ত্রীকে দিয়ে পরবর্তী দিনগুলো স্ত্রীদের ভেতর যথায়িমে বণ্টন করবে এটাই মানুষের স্বাভাবিক দাবি।

৬। মানুষকে সব সময় দ্বীনের তালীম দিতে থাকবে, তাদের সদুপদেশ দেবে এবং ভালো কাজে উৎসাহ দেবে ও মন্দ কাজে নিরুৎসাহিত করবে। যেন তাদের অন্তর প্রেরণা প্রাপ্ত হয়। ফলে তাদের জন্যে দ্বীন পালন সহজ হবে। হুযর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা এ কাজ করতেন।

৭। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে যে কাজ করতে বলতেন তা তিনি নিজেও করতেন। কখনো তিনি সেক্ষেত্রে অন্যদের অবকাশ দিতেন তা তা করার। এর ফলে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কার্যধারার ওপর লোকের আস্থা বেড়ে যেত।

৮। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতের জন্যে আল্লাহ পাকের কাছে দোয়া করতেন যেন তিনি তাদের পূর্ণ দ্বীনদার ও সংস্কৃতিবান করেন।

৯। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মাধ্যমে আল্লাহ পাকের তরফ থেকে গভীর প্রেরণা ও আত্মিক প্রশান্তি অর্জন। তার জন্যে সবাই তাঁর কাছে এরূপ মনঃসংযোগ সহকারে বসতেন যেন মাথার ওপর পাখি বসছে বলে কেউ মাথা নাড়াচ্ছে না।

১০। যে ব্যক্তি সত্যদ্রোহী হবে তাকে শায়েস্তা করা চাই। তাকে সর্বক্ষেত্রে ব্যর্থ ও হতাশ করতে হবে। যেমন হন্তা নিহতের ওয়ারিশ হতে পারবে না এবং জোর জবরদস্তির তালাক কাজে আসবে না। এর ফলে কেউ সে সব কাজ করাকে লাভবান ভাববে না। কারণ তাদের উদ্দেশ্য হাসিল হবে না।

১১। ভারী কাজকে আস্তে আস্তে বিধানে রূপ দেবে। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, কুরআনে পয়লা জান্নাত-জাহান্নামের বর্ণনামূলক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়েছে। তারপর যখন মানুষ ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হলো, তখন হালাল হারামের বিধান অবতীর্ণ হলো। যদি শুরুতেই শরাব হারাম করা হতো, তা হলে শরাবীরা বলতঃ আমরা কখনো শরাব ছাড়তে পারব না। তেমনি শুরুতেই যদি বলা হতো, জ্বেনা ছাড়, তাহলে তারা বলতঃ আমরা কখনো জ্বেনা ছাড়তে পারব না।

১২। সহজিকরণের আরেকটি পথ হলো এই, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কোনো কাজ করবেন না যা লোকদের ভেতর দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণেই কখনো খখনো মুস্তাহাব কাজও বর্জন করা হতো। যেমন হযরত আয়েশাকে (রাঃ) লক্ষ্য করে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যদি তোমার জাতি কাফের হয়ে যাবার ভয় না থাকত তা হলে আমি হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ভিতের ওপরই কাবাঘর তৈরী করতাম।

১৩। শরীয়াত প্রণেতা বিভিন্ন পুণ্য কাজের বিধান দান করেছেন। যেমন ওযু, গোসল, নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি। এগুলো মানুষের বুদ্ধি-বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেননি। তবে তা পালনের নিয়ম-পদ্ধতি ও শর্ত-শরায়েতের ক্ষেত্রে আঁটঘাট বেঁধে কিছু করে যাননি। বরং সেগুলো মানুষের বিবেক-বুদ্ধির আনুকূল্য রেখে দিয়েছেন। তারা যেন মূল বক্তব্য ও বিধান বুঝে নিয়ে নিজেদের সাধ্যমত তা পালন করতে পারে। যেমন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সূরা ফাতিহা ছাড়া নামায হবে না। কিন্তু তিনি শব্দ উচ্চারণে বিশুদ্ধতার কথা বলেন নি। অথচ কিরাআতের বিশুদ্ধতা তার ওপর নির্ভরশীল। কোথায় তাশদীদ হবে ও সাকিন হবে তাও বলেননি। তেমনি তিনি বলেছেনঃ কেবলামুখী হয়ে নামায পড়তে হবে। কিন্তু এ কথা বলে দেননি তা আমরা কিভাবে নির্ধারণ করব। তেমিন তিনি বলেছেন, শতকরা আড়াই দিরহাম যাকাত দিতে হবে। কিন্তু এটা বলে দেননি যে, দিরহামের ওজন কতটুকু হবে?

এসব নিয়ে কেউ যদি কোনো প্রশ্ন করেছে তা তো তিনি সে জবাবই দিয়েছেন যা প্রশ্নকর্তার নিজেরও জানা রয়েছে। তার চেয়ে বেশী কিছু বলেন নি। যেমন রমযানের পয়লা দিন কখন শুরু হবে এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মেঘলা দিন হলে শাবানের ত্রিশদিন পূর্ণ হলে শুরু হবে। তেমনি জঙ্গলে অবস্থিত যে পানি জীব জানোয়ার ব্যবহার করে তা পাক কিনা জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, দুই কুল্লাহ পরিমাণ পানি হলে তা পবিত্র। কুল্লা বলতে কতটুকু পানিকে বুঝায় তা আরবদের জানা ছিল।

এরপর কথা হলো এই যে, প্রত্যেক বস্তুকে তার মূল অবস্থায় রেখে বর্ণনা করা চলে। ফলে প্রকাশ্যে কি গোপনে ও বিধিবদ্ধ না থাকা অবস্থায় একই থেকে যায়। প্রয়োজনে যেন তার সমসাময়িক প্রচলিত ব্যবস্থা চলতে থাকে। কোনো কিছু আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে দেয়া হলে তা লোকের জন্য কষ্টকর হয়। বেশি বাঁধাবাধি হলে বেশি কষ্ট হয়। অথচ শরীআত মেনে চলা সাধারণ অসাধারণ সবার জন্যেই অপরিহার্য। তাই তার বিধিবিধান সবিস্তারে বর্ণিত হলে তা মনে রাখাও কঠিন হয়। তার চেয়ে বড় কথা হলো, মানুষ বিধানের নিয়ম-নীতি নিয়ে বেশি মাথা ঘামাতে যায়, তখন তার উপকারের দিকটা ভাবভার সময় পায় না। তখন তার অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যও তার দৃষ্টিগোচর হয় না। তোমরা দেখতে পাচ্ছ যে, ক্বারী ও মুজাব্বিদরা দিনরাত শব্দের উচ্চারণ নিয়েই মন মগজ ব্যস্ত রাখে, তার মর্ম নিয়ে ভাবার সময় পায় না। তাই এটাই উত্তম পন্থা যে, বিধানের মৌলিক দিকগুলো বলে দিয়ে খুঁটিনাটি বিষয় লোকদের প্রচলিত জ্ঞান ও ধারণার ওপর ছেড়ে দেয়া।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

১৪। শরীআতদাতা মানুষকে তাদের মূল জ্ঞান-বুদ্ধি মোতাবেক আহবান জানিয়েছেন। তারা বিজ্ঞা, যুক্তিশাস্ত্র বা নীতিজ্ঞান না শিখেও খোদাদত্ত জ্ঞানবুদ্ধি দ্বারাই তাঁর আহবান যেন বুঝতে পায়। যেমন আল্লাহ তা’আলা তাঁর অবস্থান বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেনঃ

(আরবী**********************************************************)

অর্থাৎ আল্লাহ তাঁর আরশে সমাসীন রয়েছে। অতঃপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাবশী মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ আল্লাহ কোথায় আছেন? সে জবাবে আকাশের দিকে ইঙ্গিত করল। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মহিলাটি ঈমানদার।

তেমনি কেবলামুখী হওয়া কিংবা পাঁচ ওয়াক্ত নামায বা ঈদের নামাযের সময় জানার জন্য মানুষকে হিসাববিজ্ঞান কিংবা জ্যোতির্বিজ্ঞানের মুখাপেক্ষী রাখা হয়নি। বরং মুল বিধানটি বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। কেবলা তো পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝেই রয়েছে। তাই কাবার দিকে মুখ হলেই চলবে।

তেমনি বলেছেন, যেদিন তোমরা হজ্ব করে ফিরবে হজ্ব এবং ঈদুর ফিতর সেদিন হবে যেদিন রোযা শেষ করবে।

অধ্যায়-৬৭

উৎসাহ ও নিরুৎসাহ তত্ত্ব

বান্দার উপর আল্লাহ পাকের অন্যতম অনুগ্রহ ও অবদান হলো এই যে, তিনি আম্বিয়ায়ে কেরামের মাধ্যমে কোন কোন কাজে পুরস্কার আর কোন কোন কাজে শাস্তি রয়েছে তা আগাম বান্দাদের জানিয়ে দিলেন। ফলে বান্দাদের অন্তরে জান্নাত লাভের উৎসাহ ও জাহান্নামের পথে নিরুৎসাহ সৃষ্টি হলো। তারা শরীআত অনুসরণের জন্যে উদ্ধুদ্ধ হলো। মানুষ স্বভাবতই লাভের কাজে এগিয়ে যায় ও লোকসানের কাজ ছেড়ে দেয়।

তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ

(আরবী*************************************************************************)

অর্থাৎ অবশ্যই এটা ভারী কাজ, কিন্তু তাদের জন্যে ভারী নয় যারা এ ভাবনায় ভীত নয়, নিশ্চয় তারা তাদের প্রভুর সম্মুখীন হবে এবং নিঃসন্দেহে তাঁর কাছেই তাদের ফিরে যেতে হবে।

উৎসাহ-নিরুৎসাহ তথা প্রলোভন-ভীতি তত্ত্বের কয়েকটি মূলনীতি রয়েছে। তার ভিত্তিতে এর শাখা-প্রশাখাগুলো নির্ণীত হয়। ফকীহ সাহাবায়ে কেরাম তার মৌলিক রূপ সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। সবিস্তারে জানতেন না। আমার এ কথার সমর্থনে এ হাদীসটি দলীল হতে পারে-

(আরবী************************************************************************************)

অর্থাৎ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ স্ত্রী সহবাসেও তোমাদের জন্যে পুরস্কার রয়েছে। তখন সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আমাদের কেউ তার কাম চরিতার্থ করলে তাতেও সে ছাওয়াব পাবে? তিনি বলছেন, সে যদি বিপথে তা করত তাহলে তো আজাব পেত, সেটা কি তোমরা দেখছ না।

সাহাবায়ে কেরাম যে কোনো মাসআলার উপর নির্দ্বিধায় আমল করতেন, কিন্তু তার তত্ত্ব জানার প্রয়োজন বোধ করতেন না। তাই তা তাদের কাছে উহ্য থাকত। তার কারণ এই যে, মোটামুটি জানতেন যে, যেমন কর্ম তেমন ফল, এটাই তো মূলনীতি। এর ব্যাখ্য বিশ্লেষণের কি প্রয়োজন? সেক্ষেত্রে আমার বক্তব্যের সমর্থনে বলা যায়, যখন তারা হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে কোনো প্রশ্ন করেছেন তখন তিনি প্রচলিত সুস্পষ্ট একটি নীতি তুলে ধরে তার ভিত্তিতেই তাদের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন।

ফকীহদের উদ্ধৃত একটি হাদীসও আমার বক্তব্যের দলীল, যেমন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

(আরবী*****************************************************************)

অর্থাৎ যদি তোমার বাপ ঋণগ্রস্ত থেকে মারা যান তাহলে কি তুমি তা পরিশোধ করবে? সাহাবী (রাঃ) বললেন- হাঁ, তখন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে আল্লাহই বেশি হকদার।

ফকীহগণ বলেন, এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, যে কোনো বিধান কোনো একটি মূলনীতির ভিত্তিতে এসেছে।

এসব পর্যালোচনার সার কথা হলো এই, পুণ্য কাজের দ্বারা আত্মা সুশোভিত হয়। যেমন তাসবীহ, তাহলীল ও তাকবীর পাঠ। তেমনি তা থেকে নাগরিক জীবনেও শান্তি-শৃঙ্খলা দেখা দেয়। পক্ষান্তরে পাপ কাজে এর বিপরীত ফল দেখা দেয়।

এক্ষণে কথা হচ্ছে যে, যৌনতৃপ্তি মিটানো তো জৈবিক চাহিদার অনুসরণ বৈ নয়। তাই এটা যে কোনো পথে বাস্তবায়নের ভেতর সাধারণ বুদ্ধি অতিরিক্ত কোনো কল্যাণ দেখতে পায় না। এতে এমন কোনো ব্যাপার নেই যা মূলনীতি হতে পারে। সে ধরনের চিন্তা প্রয়াসও হাস্যকর। তবে সংশ্লিষ্ট হাদীসের তাৎপর্য এই যে, স্ত্রী সহবাসে স্বামী ও স্ত্রীর লজ্জাস্থান সুরক্ষিত ও পবিত্র থাকে এবং তার ফলে হারাম পথে কামনা চরিতার্থতা থেকে বাঁচা যায়।

এবারে আমি তারগীব ও তারহীবের বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করছি। প্রত্যেকটি পদ্ধতির ভিন্ন ভিন্ন রহস্যও রয়েছে।

১। আত্মশুদ্ধির ব্যাপারে কোনো আমলের কি তাছীর তা এখন বলে দেয়া হচ্ছে। যেমন সুপ্রবৃত্তি ও কুপ্রবৃত্তি এ দুটোর যে কোনো একটির জয়ী হওয়া বা পরাজিত হওয়ার বাস্তব প্রকাশকেই পুণ্য বা পাপ বলে আখ্যায়িত করা হয়।

যেমন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রতিদিন একশত বার-

(আরবী******************************************************************************)

এ দোয়াটি পাঠ করবে, তার জন্যে দশটি গোলাম আযাদ করার ছাওয়াব লেখা হবে, একশত পুণ্য লেখা হবে, একশত পাপ মাফ করা হবে এবং সেদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত সে শয়তান থেকে হেফাজত থাকবে। সেদিন তার চাইতে ভালো আমল আর কেউ পেশ করতে পারবে না। তবে হ্যাঁ, কেউ যদি এ আমল আরও বেশি করে থাকে তার কথা ভিন্ন।

আমি এ সব আমলের তত্ত্বকথা পূর্বের আলোচনায় বলে এসেছি।

২। এ আমল অনুসরণ করে শয়তান থেকে রক্ষা পাওয়ার সুফল ও সুপ্রভাব বর্ণনা করা যাক। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে বলেছেনঃ সন্ধ্যা পর্যন্ত আমলকারী শয়তান থেকে সুরক্ষিত থাকবে, অন্যত্র বলেছেনঃ বদকার লোক এ আমল অনুসরণ করতে পারবে না। তার অর্থ দাঁড়াল এই যে, এ আমল অনুসরণকারী শয়তান থেকে সুরক্ষিত নেককারে পরিণত হলো। তেমনি এ আমল রিযিক বাড়িয়ে দেয় ও সব বরকত এনে দেয়।

এ আমলের অন্যতম রহস্য এই যে, এতে আল্লাহ পাকের মাহাত্ম্য ঘোষণা করে তাঁর কাছে নিরাপত্তা চাওয়া হয়। ফলে এটা তার দোয়া কবুলের উছিলা হয়। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত এক হাদীসে কুদছীতে বলা হয়েছেঃ আল্লাহ পাক বলেন, যদি সে আমার কাছে আশ্রয় চায় তাহলে অবশ্যই আমি তাকে আশ্রয় দিব।

অপর একটি রহস্য এই যে, এ আমলকারী আল্লাহর স্মরণে মশগুল হয় ও মহামহিমান্বিত প্রভুর মহান দরবারের দিকে নিবিষ্টচিত্ত হয়। ফলে গায়েবী মদদ পেয়ে শয়তানের সকল প্রভাব থেকে সে মুক্ত হয়ে যায়।

অপর একটি রহস্য এই যে, ফেরেশতা তার জন্যে দোয়া করে। ফলে সে পুণ্য পথেই অগ্রসর হতে থাকে। কখনো সে কল্যাণের পথে চলে, কখনো আবার অকল্যাণ প্রতিরোধের পন্থা নেয়।

৩। এ আমলের প্রভাব আখেরাতে কী হবে এখন তা বলা যাক। দুটো পটভূমির মাধ্যমে সে রহস্য জানা যাবে।

পয়লা পটভূমি হলো এই যে, আখেরাতে কোনো কিছুর ছাওয়াব বা আজাবের কারণ হবার স্বীকৃতি তখনই লাভ হবে যখন তার সাথে পুরস্কার বা শাস্তি কোনো একটির সাথে সামঞ্জস্য বিদ্যমান থাকবে। অথবা সেটার সাথে সেই চার স্বভাবের সামঞ্জস্য থাকবে যার ওপর সৌভাগ্য ও আত্মশুদ্ধি অর্জন হওয়া বা না হওয়া নির্ভর করে। সেই চারটি স্বভাব হলোঃ পবিত্রতা, প্রভুর সামনে বিনয়, দান-খয়রাত, ইনসাফ প্রতিষ্ঠার প্রয়াস কিংবা সর্বোচ্চ পরিষদের অভিপ্রায় অনুসারে শরীআতের বিধান প্রবর্তনের মাধ্যমে আম্বিয়ায়ে কেরামের মিশনের সহায়তা করা। সামঞ্জস্য বলতে এটাই বুঝানো হয়েছে যে, কাজটি উক্ত প্রতিফলের যে কোনো একটির যথোপযুক্ত আশ্রয়স্থল হবে। অথবা তার স্বভাবই সে প্রতিফলটির অপরিহার্য দাবিদার হবে অথবা তার উসিলা হবে। যেমন কেউ যদি খালেস নিয়তে নির্মল চিত্তে আদায় করে তা হলে জানা গেল যে, সে আল্লাহর মহিমান্বিত দরবারের নৈকট্য লাভ করেছে এবং জৈবিক স্তর থেকে আধ্যাত্মিক স্তরে উন্নীত হয়েচে। তেমনি পরিপূর্ণ ওযু আত্মার ওপর পবিত্র প্রভাব বিস্তার করে। অনুরূপ কার্পণ্যের স্তর থেকে উন্নীত হয়ে কেউ যদি অতিরিক্ত দান-খয়রাত করে, অত্যাচারীকে ক্ষমা করে, নিজের হকের ক্ষেত্রেও ঝগড়া এড়িয়ে যায় ইত্যাকার কাজ প্রমাণ দেয় যে, লোকটার অন্তর ঔদার্য্যে পরিপূর্ণ এবং উপরোক্ত কাজগুলো তারই নিদর্শন।

তেমনি ক্ষুধার্তকে অন্ন দান, তৃষ্ণার্তকে জল দান, বন্ধুদের পারস্পরিক ঝগড়া মিটানো ইত্যাদি পৃথিবীতে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কারণ ও উসিলা হয়ে থাকে। তেমনি আরবদের সাথে মহব্বত রাখা, তাদের মতো লেবাস পোশাক পরা ও তাদের জীবনযাত্রা অনুসরণ করার কারণ হয়ে থাকে। এটাই সত্য ধর্ম অর্জনের সহজ উপায়। কারণ আল্লাহ তাআলার দ্বীন মূলত আবরদের অভ্যেসকে সামনে রেখেই নির্ধারিত হয়েছে এবং নবীর শরীআতের শান-শওকত তাদের মাধ্যমেই সমুন্নত হয়েছে।

তেমনি সূর্যাস্তের বেশ আগেই ইফতারের আয়োজন করে রাখা মূলত অন্যান্য জাতির সাথে স্বাতন্ত্র্য রাখারও তাদের বিকৃতি থেকে নিজেদের মুক্ত রাখার সহায়ক হয়েছে।

মানব সমাজের বিজ্ঞ মনীষী, প্রকৌশলী ও ডাক্তার ইত্যাদি শ্রেণীর লোক বিধি ব্যবস্থা প্রদান ও অবলম্বনের এ ধরনের সতর্কতামূলক পন্থাই অনুসরণ করেন। আরববাসীও তাদের বক্তৃতা ও লেখনীর মাধ্যমে এ নীতি অনুসরণের কথাই বলে আসছেন। আমি তার থেকে কিছু উল্লেখও করেছি।

যদি কোনো আমল কষ্টকর হয়, দুর্বোধ্য হয়, কিংবা মন মেজাজের পরিপন্থী হয়, তার ওপর সে ব্যক্তিই স্থির থাকতে পারে যার এখলাস মজবুত ও যথার্থ হয়। এ ধরনের আমল ইখলাসের স্বরূপ উদঘাটন করে। যেমন যমযমের পানি খুব তৃপ্তি মিটিয়ে পান করা কিংবা হযরত আলী (রাঃ)-এর সাথে মহব্বত রাখা। কারণ এগুলো খোদায়ী বিধানের পরীক্ষামূলক বিধান। তেমনি আনসারদের সাথে মহব্বত রাখাও ক্ষেত্র বিশেষে কঠিন আমল। কারণ সা’দী ও ইয়ামনীরা সর্বদা তাদের সাথে শত্রুতা চালিয়ে আসছিল। অবশেষে ইসলাম এসে তাদের ভেতর মহব্বত সৃষ্টি করেছে। মূলত তাদের সাথে মহব্বত রাখতে পারাটা প্রমাণ করে যে, তাদের অন্তরে ইসলামের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে। তেমনি ইসলামের সৈনিকদের নিরাপত্তার দায়িত্ববোধ নিয়ে কেউ যদি পাহাড়ের চূঢ়ায় উঠে রাত জেগে তাদের পাহারা দেয় তাহলে তা প্রমাণ করে যে, আল্লাহর বাণীকে উচ্চকিত করা ও আল্লাহর দ্বীনকে মহব্বত করার ক্ষেত্রে তার যথার্থ দৃঢ়তা রয়েছে।

দ্বিতীয় পটভূমি এই যে, যখন কোনো ব্যক্তি মারা যায় এবং তার আত্মাও কায়া যখন তার ভালো কিংবা মন্দ আমলের দিকে রুজু করে তখন তার চেহারায় তার ছাপ পড়ে এবং তাতে সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, সে সেখানে পুরস্কৃত হবে, না শাস্তি পাবে। সেই পুরস্কার বা শাস্তির ক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তি ও যুক্তিতর্কের কোনো অবকাশ নেই।

পক্ষান্তরে এ জগতের কার্যকারণ ভিন্নধর্মী। এখানে আত্মার কিছু ব্যাপার অন্য কিছুর ব্যাপারকে অপরিহার্য করে। সেই আত্মিক কার্যকারণ মোতাবেকই নিদ্রিত ব্যক্তির সামনে পরিণাম ফলটি রূপ ধারণ করে। যেমন মুয়াজ্জিন সবাইকে জানিয়ে দিল, এখানে স্ত্রীসংগম ও খানাপিনা চলবে না আর তার পরিণাম ফল এই দেখা দিল যে, সবার লজ্জাস্থান ও মুখে মোহর লেগে গেল। মেছালী জগতে কার্য-করণের এ ধরনের ফলাফলই দেখা দেয় আর সেখানকার বিধান এর উপরই প্রতিষ্ঠিত।

যেমন হযরত জিবরাঈল (আঃ) শুধুমাত্র হযরত দাহিয়াহ কলবী (রাঃ)-এর রূপ ধরে আসতেন, অন্য কোনো রূপ ধারণ করতেন না, এর কারণও বিশেষ তাৎপর্যের সাথে সংশ্লিষ্ট। তেমনি আগুন হযরত মূসা (আঃ)-এর সামনে আত্মপ্রকাশ করল বিশেষ তাৎপর্য নিয়ে। আরিফ তথা এ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি এর তাৎপর্য বুঝতে পায়। তিনি জানেন, কোন কাজের পরিণামটি কি ধরনের রূপ নিয়ে ধরা দেবে। যেমন স্বপ্নের দক্ষ ব্যাখ্যাকার বলতে পারে, স্বপ্নদ্রষ্টা যে চিত্রটি স্বপ্নে দেখেছে তার তাৎপর্য কি হবে।

মোটকথা এভাবে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে পান, যে ব্যক্তি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ইলম গোপন রাখে এবং তা কাউকে শেখায় না, তাকে আগুনের লাগাম লাগিয়ে শাস্তি দেয়া হবে। কারণ বিদ্যা গোপন করায় আত্মা বিব্রত হয় ও কষ্ট পায় এবং লাগামও কাউকে বিব্রতকর কষ্ট দান করে। তাই বিদ্যা গোপনের এটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ স্বাভাবিক শাস্তি।

তেমনি যে ব্যক্তি ধনসম্পদ লিপ্সু ও তার মন মগজ সবই ধনলিপ্সা গ্রাস করে ফেলে, তার গলায় আগুনের সাপ জড়িয়ে দেয়া হবে। তেমনি যে ব্যক্তি টাকা পয়সা ও গরু ছাগল রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে সর্বদা ব্যস্ত থাকে এবং তা আল্লাহর পথে খরচ করা থেকে বিরত থাকে তাকে মালায়ে আলায় নির্ধারিত সেই শাস্তিই প্রদান করা হবে যা উক্ত অপরাধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তেমনি যে ব্যক্তি লৌহ নির্মিত আংটি কিংবা বিষপান করে আত্মহত্যার মাধ্যমে নাফরমানি করবে তাকে তদনুরূপ শাস্তিই দেয়া হবে।

তেমনি যে ব্যক্তি দরিদ্রদের বস্ত্র দান করবে তাকে কেয়ামতের দিন জান্নাতের রেশমি বস্ত্র পরিধান করানো হবে। যে ব্যক্তি একজন মুসলমান গোলামকে আজাদ করে তাকে গোলামীর বিপদ তেকে মুক্তি দেবে তার প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সেই গোলামের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিনিময়ে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাবে।

৪। প্রলোভন ও ভীতি প্রদর্শনের আরেকটি পদ্ধতি হেলা এই, যাদের তা প্রদর্শন করা হবে তাদের ধারণায় যা ভালো বা মন্দ তা দিয়েই তাদের উৎসাহিত বা নিরুৎসাহিত করবে। হোক তা শরীআত মোতাবেক ভালো বা মন্দ কিংবা তাদের অভ্যাসগত ভালো বা মন্দ। অবশ্য এটা লক্ষ্য রাখতে হবে যে, সেটা যেন শরীআত ও অভ্যেস এ দুটোর সমন্বিত ব্যাপার হয়। মোটকথা উপমা ও উপমিতের ভেতর যে কোনো ধরনের সাযুজ্য বহাল থাকলেই হলো। যেমন ফজর নামাযের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত জিকিরকারীকে এক হজ্ব ও এক উমহরাকারীর সাথে তুলনা দেয়া হয়েছে। তেমনি হাদিয়া দিয়ে ফেরত নেয়া লোককে সেই কুকুরের সাথে তুলনা করা হয়েচে যেটা আমি বমি করে চেটে খায়।

প্রলোভন বা ভীতির কাজটি সবার কাছেই লোভনীয় বা ভীতিকর হয়। তা যে করবে তাকে যেন দোয়া বা বদদোয়া করা হয়। এসব উপমা-উদাহরণের মাধ্যমে আমল কোনটি ভালো আর কোনটি মন্দ তা নির্দ্বিধায় সবার সামনে সুস্পষ্ট হয়ে যায়। যেমন শরীআত প্রণেতা বলেনঃ

“এটা মুনাফিকের নামায। যে ব্যক্তি এরূপ করবে সে আমাদের দলভুক্ত নয়”। কিংবা এটা শয়তানের কাজ অথবা এটা ফেরেশতার কাজ। ‘যে ব্যক্তি এরূপ কাজ করে আল্লাহ তাকে রহম করুন। এ ধরনের আরও কিছু বক্তব্য রয়েছে।

উৎসাহিত ও নিরুৎসাহিত করার অপর একটি পদ্ধতি হলো এই যে, কোন কাজ আল্লাহ পছন্দ করেন ও কোনটি অপছন্দ করেন এবং কোন কাজে ফেরেশতাদের দোয়া ও কোন কাজে বদদোয়া লাভ হয় তা তুলে ধরা। যেমন শরীআত প্রণেতা বলেন, আল্লাহ পাক এই কাজ অপছন্দ করেন। তেমনি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ সারির ডানদিকের লোকদের ওপর রহমত নাযিল করেন। এর রহস্য আমি বলে এসেছি।

অধ্যায়-৬৮

পরিপূর্ণতা অর্জনে সাফল্য বা ব্যর্থতার ভিত্তিতে উম্মতের বিভিন্ন স্তর

এ অধ্যায়ের মূলনীতি সূরা ওয়াকেয়ায় আল্লাহ তাআলা বলে দিয়েছেন।

তিনি বলেনঃ

(আরবী********************************************************************************)

অর্থাৎ তোমরা তিন শ্রেণীর হবে। অতঃপর ডানদিকের সহচর। ডান দিকের সহচর কারা? আর বামদিকের সহচর, বামদিকের সহচর কারা? আর আগে বেরিয়ে যাবার দল সবার আগে রয়েছে। তারা নৈকট্য লাভকারী দল।

অন্যত্র তিনি বলেনঃ

(আরবী***************************************************************************************)

অর্থাৎ অতঃপর আমি তাদের মহাগ্রন্থের উত্তরাধিকারী বানালাম যাদের আমি বান্দাদের ভেতর পছন্দ করেছি। তাদের একদল নিজেদের ওপর অত্যাচারী, অন্য একদল মাঝামাঝি অবস্থায় এবং অপর দলটি আমার অনুমোদনক্রমে কল্যাণের সাথে আগে চলে গেছে, এটা বড়ই মর্যাদার ব্যাপার।

তোমরা জান যে, সর্বোচ্চ স্তর হলো লোকদের ভেতর মুফহামীনদের (দিব্যজ্ঞান প্রাপ্তদের)। তাদের কথা আমি আগেই বলে এসেছি। তার পরবর্তী স্তর হলো সাবেকীনদের (নৈকট্য প্রাপ্ত)। তাদের আবার দুটো শ্রেণী রয়েছে।

প্রথম শ্রেণীতে রয়েছে আসহাবে ইসতিলাহ ও উলুব। তারা পরিপূর্ণতা অর্জনের ক্ষেত্রে মুফহামিনদের মতোই যোগ্যতা রাখেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তারা মুফহামিনদের স্তরে পৌঁছতে ব্যর্থ হন। বস্তুত তাদের যোগ্যতা হচ্ছে নিদ্রিত ব্যক্তির যোগ্যতার মতোই; তা কাজে লাগা বা না লাগা নির্ভর করে জাগ্রতকারীর ওপর। যখন পয়গাম্বরদের আহবান তাদের জাগিয়েদেয় তখন তারা নিজ যোগ্যতা অনুসারে জ্ঞানার্জনে মনোনিবেশ করে। সেই জ্ঞান অন্মেষণের স্পৃহাটি তার অন্তরে নিহিত থাকে। ফলে সে ধর্মীয় মুজতাহিদের মতোই গবেষণায় রত হয় এবং সেই ইলহামের মোটামুটি অবস্থাটি অর্জন করে।

ইলহামের মোটামুটি অবস্থা বলতে এ কথাই বুঝায় যে, মহিমান্বিত দরবারের পবিত্র মজলিস তার ভেতর ব্যাপক যোগ্যতার কারণে তার দিকে আকৃষ্ট হয়। আর এ আস্থাটি সাবেকীনদের (অগ্রবর্তী দল) সব শ্রেণীর ভেতর প্রায় সমভাবে বিদ্যমান। আম্বিয়ায়ে কেরামও এ কথা বলে গেছেন।

দ্বিতীয় শ্রেণীটি হলো মাজজব ও উন্নত পর্যায়ে উন্নীতদের। খোদাদত্ত তাওফীকের বদৌলতে তারা সাধনা ও সান্নিধ্য প্রাপ্তির পথে নিমগ্ন থাকে। ফলে তাদের জৈবিক দিকগুলো পরাভূত ও নির্লিপ্ত হয়। আল্লাহ তায়ালা তাদের ইলম ও আমলে পূর্ণতা দান করেন। তাই তারা তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে দিব্যজ্ঞান লাভ করেন। ফলে তাদের থেকে অনেক বড় বড় ঘটনা প্রকাশ পায়। আধ্যাত্মবাদের শীর্ষস্থানীয় বুযুর্গদের মতোই তাদের হেদায়েত, কাশফ ও গায়েবী ইলম হাসিল হতে থাকে।

সাবেকীনদের উভয় শ্রেণী দুটো ব্যাপারে একমত। ১। তারা তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করে আল্লাহর দিকে নিবিষ্ট থাকে তাঁর নৈকট্য লাভের জন্যে।

২। তাদেরস্বভাব প্রকৃতি খুবই শক্তিশালী হয়। তাদের উদ্দিষ্ট মর্যাদার স্তর তাদের সামনে যথাযথভাবে প্রতিভাত হতে থাকে। কিন্তু তার আকার-প্রকারের দিকে তাদের নজর থাকে না। সেটা তার প্রয়োজনও ভাবে না। সেটা তাদের দেখা প্রয়োজন হয় মর্যাদার রূপ ও স্বরূপ বিশ্লেষণের জন্যে। কারণ, তার মাধ্যমেই উদ্দিষ্ট বস্তু রূপ ধারণ করে।

সাবেকীনদের ভেতর একদল থাকে নিঃসঙ্গ ও নির্জন বাসের লোক। তারা অদৃশ্য জগতের দিকে নিবিষ্টচিত্ত থাকে। আল্লাহর জিকির তাদের পার্থিব সব ঝামেলা থেকে মুক্তি দিয়েছে।

তাদের ছাড়া অপর দলটি হলো সিদ্দীকদের। তারা আল্লাহ তাআলার কঠোরতম অনুসারী। অন্য একাগ্রতা ও ইখলাসের কারণে তারা বিশিষ্ট মর্যাদার অধিকারী।

আরেকটি দল হলো শহীদদের। তারা মানুষের পথিকৃৎ হয়ে জন্ম নেন। তাদের উপর সর্বোচ্চ পরিষদের এ প্রভাব প্রতিফলিত হয় যে, তারা কাফেরদের ব্যাপারে কঠোর ও মারমুখী এবং মোমেনদের ব্যাপারে কোমল ও দয়ার্দ্র হন। পাপ ও অন্যায়ের মূলোৎপাটন ঘটিয়ে পুণ্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠাই তাদের কাজ হয়ে থাকে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুপ্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে তাঁর উম্মতের দুনিয়ার বুকে বিজয়ী জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রাম চালিয়ে থাকেন। এমনকি কিয়ামতেও তারা কাফিরদের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হবেন এবং তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবেন। তারা হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মিশনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গরূপে তাঁকে প্রেরণের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। এ কারণেই অন্যান্য দলের মোকাবেলায় তাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও অধিকতর মর্যাদা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়।

আরেকটি দল হলো সত্য জ্ঞান সমৃদ্ধ মনীষীবৃন্দের। তাঁরা উন্নত মানের জ্ঞান ও বিবেকের অধিকারী হন। তাঁরা যখন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ইলম ও হিকমতের বাণী শুনতে পেলেন তখন তাদের ভেতর অভাবনীয় যোগ্যতা সৃষ্টি হয়ে গেল। ফলে তাদের অন্তর্জগতে আল্লাহর কিতাবের অর্থ ও মর্ম সুস্পষ্ট হয়ে ধরা দিল। হযরত আলী (রাঃ) সেদিকেই ইঙ্গিত করে বললেনঃ আমাকে কিতাবুল্লাহর সেই বুঝ দান করা হয়েছে যা একজন যথার্থ মুসলমানকে প্রদান করা হয়।

অগ্রবর্তীদের একটি শ্রেণী এরূপ যে, তারা ইবাদতের কল্যাণকারীতা খোলা চোখে দেখতে পান। ইবাদতের জ্যোতিতে তাদের আত্মা রঞ্জিত হয়েছে। তাদের আত্মার মণিকোঠায় তার প্রভাব ছড়িয়ে গেছে। ফলে তারা পূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে আল্লাহ পাকের ইবাদতে মশগুল হন।

তাদের অপর শ্রেণীটি হলো জাহেদদের। তাদের অন্তরে পরকাল বিশ্বাস ও তার স্বাদ পূর্ণমাত্রায় মজবুত ভিত্তিতে ঠাঁই নিয়েছে। ফলে তারা পার্থিব স্বাদ আহলাদ ও আকর্ষণ অকিঞ্চিৎকর ভেবেছে। তাদের দৃষ্টিতে মানব সমাজ হলো গুরুত্বহীন এক উটের পাল।

অপর একটি শ্রেণী রয়েছেন যারা আম্বিয়ায়ে কিরামের খেলাফত প্রতিষ্ঠার মিশনের উত্তরাধিকারী। তারা সৃষ্টিজগতের ভেতর ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করে থাকেন। তাদের ইনসাফ গুণটিকে তারা আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের কাজের নিয়োজিত করেন।

অপর এক শ্রেণীর লোক হচ্ছেন চমৎকার স্বভাবের ও উদার চরিত্রের লোক। তারাই মহানুভব ব্যক্তির শ্রেণীভুক্ত। তারা দান-খয়রাত করেন, বিনয়ী হন ও অত্যাচারীকে ক্ষমা করেন। তারা ফেরেশতা স্বভাবের লোক বিধায় ফেরেশতাদের সাথেও সম্পৃক্ত হন। যেমন হাদীসে আছে যে, কোনো কোনো সাহাবীকে ফেরেশতারা সালাম দিতেন।

এ সব শ্রেণীর প্রতিটি শ্রেণীর ভেতরই প্রকৃতিগত বিশেষ যোগ্যতা বিদ্যমান যাকে জাগ্রত ও সক্রিয় করার জন্য আম্বিয়ায়ে কেরামের আহবান পৌঁছার প্রয়োজন থাকে। তার সাথে সংযোগ ঘটে তার সাধনাগত শ্রমলব্ধ যোগ্যতার। সে যোগ্যতা তাকে শরীআতের পূর্ণ অনুসারী করে তোলে। এ প্রকৃতিগত ও অর্জিত যোগ্যতা মিলে তাকে পূর্ণত্ব দান করে। যে সব মুফহাসীন বা দিব্য জ্ঞান সম্পন্ন লোক নবুওয়াতের দায়িত্ব পাননি, তারাও সাবেকীন বা অগ্রবর্তী দলের অন্তর্ভুক্ত হন।

অগ্রবর্তী দলের পরবর্তী শ্রেণীটি হলো আসহাবে ইয়ামীন বা ডান দিকের দল। তাদেরও কয়েকটি শ্রেণী রয়েছে।

তাদের একটি শ্রেণীতে তারা রয়েছে যাদের অন্তর ও আত্মা সাবেকীনদের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। তাদের প্রকৃতিগত যোগ্যতা লাভের সৌভাগ্য হয়নি বলেই তারা আত্মনির্ভর না হয়ে অবয়ব নির্ভর হয়ে থাখে। কিন্তু আত্মার সাথেও তারা সম্পর্ক রাখে।

এক শ্রেণীর তাজাজুবদের। তাদের আত্মিক শক্তি দুর্বল ও জৈবিক শক্তি প্রবল হওয়া সত্ত্বেও কঠোর সাধনার সৌভাগ্য ও মনোবল অর্জিত হওয়ায় তারা এ শ্রেণীভুক্ত হতে পেরেছে। তারা সেই জ্ঞান লাভ করে যা নিম্ন পরিষদে পাওয়া যায়। তাদের কারো ভেতর আবার জৈবিক শক্তির দুর্বলতাও পরিলক্ষিত হয়। তাদের ভেতর আল্লাহর জিকর তুফান সৃষ্টি করে। তাদের ইলহাম, ইরাদাত ও তাহারত পূর্ণত্ব প্রাপ্ত হয় না, বরং সবটাই অপূর্ণভাবে অর্জিত হয়।

এক শ্রেণীতে আহলে ইসতিহাল বলা হয়। তারে ভেতর নেক স্বভাবের দিকটি খুবই দুর্বল। তদুপরি যদি তার বদ স্বভাবের দিকটি প্রবল হয় এবং যদি সে কঠোর রিয়াজাত অনুসরণ করে চলে তা হলে এ শ্রেণীভুক্ত হতে পারে। পক্ষান্তরে তার জৈবিক দিকটি যদি দুর্বল হয় এবং নিয়মিত বিভিন্ন ওজিফা আদায় করে, তা হলে যদিও তার কাশফ হাসিল না হয়, তথাপি তার অন্তরের মণিকোঠায় সেসব আমলের বরকতে ফেরেশতা স্বভাবের উন্মেষ ঘটে।

এ শ্রেণীর অধিকাংশ লোকের অবস্থা এই যে, তাদের আমলের ভেতর নির্ভেজাল ইখলাসের অভাব থাকে। যেমন তারা সাদকা দেয়, অথচ তা ছাওয়াবের নিয়তে দিলেও প্রকৃতিগত কার্পণ্য থাকায় মনোকষ্ট সহকারে দেয়। তারা নামায পড়ে সমাজের প্রথার খাতিরে, আবার ছাওয়াবের আশা রাখে। ব্যভিচার বা শরাবখোরী থেকে তারা কিছুটা খোদার ভয়ে এবং কিছুটা সাহস ও সামর্থ্যের অভাবে বেঁচে থাকে। তাদের আমলগুলো তখনই কবুল হবে যখন দেখা যাবে যে, প্রকৃতিগতভাবেই তাদের অন্তর নির্ভেজাল ইখলাস অর্জনের শক্তি রাখে না এবং তারা অন্যান্য আমলেরও যথারীতি পাবন্দ রয়েছে। কারণ, নেক স্বভাবের যাত্রা শুরুর স্তর হিসেবে এটাকে গণ্য করা যায়। লজ্জা শরম কোনো কোনো ক্ষেত্রে শুধুই কল্যাণের হয়, কোথাওবা দুর্বলতারও লক্ষণ হয়। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন লজ্জা সবটাই ভালো। মানে তা দুর্বলতার কারণেই হোক কিংবা ভালো উদ্দেশ্যে হোক সর্বক্ষেত্রেই লজ্জা প্রশংসনীয়। এ বক্তব্যে আমার পূর্ব অভিমতের সত্যতা প্রমাণিত হলো।

অনেক লোক এরূপ রয়েছে যাদের ওপর কখনোবা ঊর্ধ্ব জগতের বিজলী বিচ্ছুরিত হয়, অথচ তাদের সেরূপ কোনো যোগ্যতা নেই। এমনও নয় যে, তারা সে খবরই রাখে না, যেমন তওবা ও অনুশোচনাকারী, সংগোপনে জিকির ও ক্রন্দনকারী কিংবা সে ব্যক্তি প্রকৃতিগত দুর্বলতার কারণে আদৌ ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও পাপে জড়িয়ে পড়ে অথবা অসুস্থতা বা বিপদাপদে মন মেজাসের ভারসাম্য হারিয়ে পাপ কাজ করে ফেলে, এসব ক্ষেত্রে তাদের পাপ মাফ করে দেয়া হয়। মোটকথা, আসহাবে ইয়ামীনরা সাবেকীনদের দুটো স্বভাবের একটি হারিয়ে ফেলে ও অন্যটি অনুসরণ করে।

এ শ্রেণীর একটি দলকে বলা হয় আসহাবে আরাফ। তাও আবার দু’শ্রেণীতে বিভক্ত।

১। এ দলটির লোকের মন মেজাজও ঠিক আছে, লোকও ভালো স্বভাবের কিন্তু তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াতই পৌঁছেনি। অথবা তাদের ভাষায় এমনভাবে দাওয়াত পৌঁছেনি যা তাদের বিরুদ্ধে দলীল হতে পারে। মানে, দাওয়াতটি অবশ্যই তাদের বোধগম্য ভাষায় সংশয়মুক্তভাবে পৌঁছতে হবে। তারা স্বভাবতই নিন্দনীয় ও বর্জনীয় কাজে জড়িত হয় না। তেমনি তারা আল্লাহকে স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটাই করে না। তারা পার্থিব জীবনে সৎভাবে মানুষের সাথে জীবন যাপন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। মৃত্যুর পর তাদের এক অনিশ্চিত অবস্থায় রাখা হবে। শাস্তিও হবে না ছাওয়াবও পাবে না। এ অবস্থায় থেকে যখন তাদের পাশব প্রবৃত্তি বিলুপ্ত হবে, তখন তাদের ওপর ঐশী আলোর কোনো একটি অংশের বিকিরণ ঘটবে।

২। দ্বিতীয় দলটি হচ্ছে প্রকৃতিগতভাবেই যাদের বুদ্ধি অপূর্ণ বা বিকৃত। যেমন শিশু, মাতাল, গেঁয়ো গোলাম এবং এ ধরনের এমন সব লোক যাদের ব্যাপারে সবারই ধারণা যে এরা হিসেবেই বাইরে। কারণ তাদের কোনো রীতিনীতির আওতায়ই তারা আসে না। মোটকথা, তারা নির্বোধ শ্রেণী। তাদের ভেতর মৌলিক ঈমানই যথেষ্ট। যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈকা হাবশী দাসীকে প্রশ্ন করলেন আল্লাহ কোথায় আছেন? সে আকাশেল দিকে ইঙ্গিত করল।

এ ধরনের লোকদের থেকে এতটুকুই আশা করা যায় যে, তারা মুসলিম সমাজে মিলেমিশে থেকে তাদের মতোই জীবন যাপন করে। ফলে তাদের তাওহীদী ঈমান বহাল থাকে। পক্ষান্তরে যারা খারাপ অভ্যেস গড়ে তোলে ও ভ্রান্ত কাজে লিপ্ত থাকে এবং আল্লাহ সম্পর্কে বিকৃত ধারণা পোষন করে, তারা জাহেল। তাদের নানা ধরনের শাস্তি দেয়া হবে।

এর পরবর্তী স্তর হলো মুনাফিকদের। তারা ঈমানের উদ্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার। হয়ত তাদের পথে প্রকৃতিগত পর্দা অন্তরায় হয়েছে। যেমন তারা পানাহার, নারী সম্ভোগ কিংবা হিংসা-বিদ্বেষে এরূপ ডুবে গেছে যে, বাহ্যিক ইবাদত ও ঈমান তাদের কোনোই উপকারে আসেনি। অথবা তারা সামাজিক পরিবেশ ও কুসংস্কারে এরূপ নিমজ্জিত ছিল যে, তাদের রীতিনীতি, বেরাদারী ও দেশের মাটির মায়া ছাড়তে পারেনি। অথবা তাদের বিবেক বুদ্ধির ওপর ওপর পর্দা পড়ে যাওয়ায় তারা সত্যের আলো দেখতে ব্যর্থ হয়েছে। যেমন মুতাশাব্বেহ দল। অর্থাৎ যারা খেঅদাকে কোনো সৃষ্টির অনুরূপ ভাবে। তা ছাড়া যারা ইবাদতে কিংবা মদদ কামনায় আল্লাহর সাথে সংগোপনে অন্যকেও জড়িয়ে ফেলে ভাবে যে, এটা কোনো শিরকের কাজ নয়, তারাও উক্ত শ্রেণীভুক্ত। তাদের যুক্তি হলো, জাতির ধর্মের কোথাও এ সব ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো দলীল পাওয়া যায় না। মোটকথা তাদের পূর্বতন শিরক ও কুফরীর আবরণ থেকে তারা পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি।

এদের কিছু লোক দুর্বল চিত্তের পাপাচারী এবং হায়া শরম বলতে তাদের কিছুই নেই। তাই শুধুমাত্র আল্লাহ-রাসূল প্রীতি তাদের পাপ থেকে বাঁচাতে ব্যর্থ হয়েছে। যেমন এক ব্যক্তি শরাবও পান করত, আবার আল্লাহ-রাসূলকেও ভালোবাসত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাক্ষ্য দিলেন, তার আল্লাহ-রাসূল প্রীতি কোনোই উপকারে আসেনি।

অপর একটি দল হলো ফাসেক। এ দলটি তারা যাদের কার্যকলাপ কখনো নীচ প্রবৃত্তির লোকদের চাইতে নিকৃষ্ট হয়ে থাকে। তাদের কিছু লোককের জৈবিক চাহিদা খুবই তীব্র থাকে। মোটকথা তারা জীব জানোয়ারে জীবনধারায় অনুসারী হয়ে গেছে। কিছু লোক বিকৃত মন-মেজাজ ও ধ্যান ধারণার শিকার হয়ে থাকে। তারা সেই রুগীর মতোই যারা মাটি বা পোড়া রুটি খেতে চায়। মোটকথা তারা শয়তানী কার্যকলাপের  আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে।

ফাসিকদের পরের স্তরটি হলো কাফিরদের। তারা অত্যন্ত দাম্ভিক ও নাফরমান হয়ে থাকে। তাদের জ্ঞান-বুদ্ধিও ঠিক থাকে, তাদের কাছে দাওয়াতও ঠিকমত পৌঁছে থাকে, তথাপি তারা কলেমা পড়তে অস্বীকার করে। অথবা তারা আল্লাহ তাআলার সেই অভিপ্রায়ের বিরোধিতা করল যা তিনি আম্বিয়ায়ে কেরামের মাধ্যমে শরীআত আকারে প্রসারিত করতে চেয়েছিলেন। তারা লোকদের আল্লাহর পথে চলতে বাধা দেয়। তারা পার্থিব জীবনকেই সন্তুষ্ট চিত্তে বেছে নিয়েছে। পারলৌকিক জীবনের দিকে তাদের আদৌ দৃষ্টি নেই। তাই তাদের ওপর চিরস্থায়ী অভিশাপ এবং তারা অনন্ত কাল জাহান্নামের জিন্দাখানায় আবদ্ধ থাকবে। তাদের একদল কট্টর জাহেল ও অন্যদল ঘৃণ্য মোনাফেক। মোনাফেকরা মুখে ঈমানের দাবিদার হলেও অন্তরে তাদের নির্ভেজাল কুফরী বিদ্যমান। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

অধ্যায়-৬৯

অন্যান্য দ্বীন বিলুপ্তকারী দ্বীনের প্রয়োজনীতা

ভূমণ্ডলে যত জাতি ও সম্প্রদায় আছে তাদের নিয়ে একটু চিন্তা-ভাবনা কর। দেখতে পাবে, পেছনের অধ্যায়গুলোতে আমি যা কিছু আলোচনা করেছি তার বিন্দুমাত্র তারতম্য কোথাও নেই। খোদার শপথ! কখনো কোথাও তার ব্যতিক্রম দেখতে পাবে না। সব জাতির ভেতর এ জাতি ও ধর্মের প্রবর্তকের সত্যথার প্রতি বিশ্বাস ও তাঁর মর্যাদার প্রতি আস্থা বিরাজমান। তারা তাঁকে পরিপূর্ণ ও অতুলনীয় বলেও মনে করে। কারণ তারা তাঁকে ইবাদাতে অটল দেখতে পায়, তাঁর অলৌকিকত্ব দেখতে পায়, এবং তাঁর প্রার্থনার গ্রহণযোগ্যতার তারা সাক্ষী হয়ে আছে।

মূলত প্রত্যেকটি দ্বীনেই কিছু দণ্ডবিধি, বিধিবিধান ও দণ্ড দানের ব্যবস্থা রয়েছে। সেগুলো ছাড়া জাতির ভেতর শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব নয়। অতঃপর তাতে এমন কতগুলো ব্যাপার থাকে যেগুলো উপরোক্ত ব্যাপারগুলোর সহায়ক হয় ও সেগুলো সহজপাপ্য করে। হয়তবা সেগুলোর সাথে অনেকটা সাদ্যশ্য রাখে।

প্রত্যেক জাতির একটা রীতিনীতি থাকে, থাকে স্বতন্ত্র বিধি বিধান। তারা তা পালনের জন্যে পূর্বসূরীতের অভ্যেস ও আচরণের অনুসারী হয়। সে ক্ষেত্রে তারা জাতির পরিচালক ও দ্বীনের ইমামদের চরিত্র অধ্যয়ন ও অনুকরণ করে থাকে। তারই ভিত্তিতে তারা তাদের দ্বীনের বুনিয়াদ ও বিধিবিধান মজবুতভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। অবশেষে ধর্মাবলম্বীরা নিজ নিজ ধর্মের সাহায্য করে। এমনকি তারা রক্ষার জন্যে যুদ্ধ করে। পরন্তু তার জন্যে নিজেদের জান-মাল উৎসর্গ করে। তার কারণ এই যে, তার ভেতরে এমন কিছু স্থায়ী ব্যবস্থা ও মজবুত কল্যাণধর্মীতা প্রতিষ্ঠিত হয় যার তত্ত্ব জানার ক্ষমতা সাধারণ ধর্মাবলম্বীর থাকে না।

যখন প্রত্যেক জাতির ধর্ম স্বতন্ত্র হয়ে যায় এবং তারা নিজ নিজ বিশেষ রীতিনীতি নির্ধারণ করে নেয়, তখন তা রক্ষার জন্য বাকযুদ্ধ থেকে শুরু করে সশস্ত্র যুদ্ধ পর্যন্ত করেথাকে। ফলে পর্যায়ক্রমে তাদের ভিতর অত্যাচার অবিচারবেড়ে যায়। কারণ অযোগ্য ও অপাত্রে নেতৃত্ব এসে যায়। তাছাড়া নতুন নতুন রীতিনীতি তাতে সংযোজিত হয়। ধর্মনায়করা গাফেল ও উদাসীন হয়ে যায়। ফলে অধিকাংশ ধর্মাবলম্বী ধর্মীয় কাজকর্ম ছেড়ে দেয়। অবশেষে তাদের ধর্ম বলতে যে সব নিদর্শন অবশিষ্ট থাকে তা তাদের ধর্মের আসল রূপ জানার কোনো উপায় থাকে না।

তারপর এক জাতি অপর জাতির মুণ্ডপাত করেথঅকে ও নিজ ধর্ম ছাড়া অন্য ধর্মকে ধর্ম বলেই অস্বীকার করে না। এমনিক ধর্মে ধর্মে যুদ্ধবিগ্রহ দেখা দেয়। এভাবে সত্যধর্ম বিলুপ্ত হয়ে অধর্মই ধর্ম বলে চলতে থাকে। ঠিক তেমনি মুহুর্তে এমন এক সত্যপথ প্রদর্শকের প্রয়োজন যিনি সব ধর্মের সাথে এরূপ আচরণ করবেন যা এক জালিম বাদশাহ মোকাবিলায় একজন সত্যানুসারী খলীফা করে থাকেন। কালীলা ও দিমনার হিন্দি থেকে ফার্সিতে অনুবাদকারী বিজ্ঞ লেখক বিভিন্ন ধর্মের জগাখিচুড়ি অবস্থা নিয়ে যা আলোচনা করেছেন তাতে তোমাদের জন্যে যথেষ্ট শিক্ষণীয় ব্যাপার রয়েছে। তিনি কিছু সঠিক কথা তুলে ধরতে চেয়েছেন। কিন্তু সামান্য কিছুমাত্র বলতে সক্ষম হয়েছেন। তাছাড়া ইতিহাসকাররা জাহেলী যুগের জাতি ধর্মের যে দুর্গতি সম্পর্কে যা কিছু লিখেছেন তাতেও শিক্ষণীয় ব্যাপার রয়েছে।

যে ইমাম বা মহান নায়ক সব জাতি ধর্মকে একক জাতি ধর্মে রূপান্তরিত ও ঐক্যবদ্ধ করতে চান, তার জন্যে পুরাতন রীতিনীতি ও বিধিবিধানের বাইরে নতুন কিছু বিধি-বিধানের প্রয়োজন রয়েছে।

১। জাতিগুলোকে তিনি সঠিক রীতি-নীতির দিকে ডাকবেন, তাদের আত্মশুদ্ধির ব্যবস্থা করবেন এবং তাদের অবস্থা শুধরে দেবেন। অতঃপর তিনি তাদের নিজ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্থলাভিষিক্ত করবেন। অবশেষে তিনি দুনিয়াবাসীর সাথে জিহাদ করে সেই মতাদর্শ দুনিয়াময় ছড়িয়ে দেবেন।

আল্লাহ পাক বলেনঃ

(আরবী*************************************************************************************)

অর্থাৎ তোমাদের উত্তম জাতি হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে গোটা মানবজাতির স্বার্থে। তাদের তোমরা কল্যাণের পথে প্রতিষ্ঠিত করবে ও অকল্যাণ থেকে ফিরিয়ে রাখবে।

আল্লাহ পাকের এ উত্তম উম্মত বাছাইয়ের উদ্দেশ্য হলো এই যে, একা সে নায়ক অসংখ্য জাতির বিরুদ্ধে লড়তে পারেন না। এ ধরনের নায়কের জন্যে অপরিহার্য হচ্ছে শরীআতের এমন বিধি বিধান যা আরব আজমের সব দেশের জন্যে স্বাভাবিক ও প্রকৃতিগত ধর্মের রূপ নেবে। শরীআতে সে বিধানগুলো সে সব জাতির সার্বিক বিবেক ও জীবন ধারার অনুকূল হয়ে দেখা দেবে। তাতে অবশ্য অন্যান্য জাতির তুলনায় নিজ জাতির দিকে বেশি নজর রাখা হবে। তারপর সারা দুনিয়ার লোকদের উদ্ধুদ্ধ করা হবে সে সব বিধান পালনের জন্যে। কারণ এটা হতে পারে না যে, সে কাজটি সকল জাতির দায়িত্বে ছেড়ে দেয়া হবে। সেরূপ করা হলে  এ শরীআত পুরোপুরি ব্যর্থতার মুখ দেখবে। তাই এটাও হতে পারে না যে, সেটা সব যুগের ইমামদের জন্য রেখে দেয়া হবে। এও হতে পারে না যে, প্রত্যেক জাতির জ্ঞান বুদ্ধি ও অবস্থাভেদে ভিন্ন ভিন্ন বিধান দেয়া হবে। কারণ, ব্যক্তি বিশেষের জন্যে সারা দুনিয়ার বিভিন্ন এলাকার ভিন্ন ভিন্ন ধর্মমত ও রীতিনীতি আয়ত্তে আনা অসম্ভভ ব্যাপার। এক শরীআত বর্ণনা করতে গিয়েই অধিকাংশ বর্ণনাকারী অপরাগ হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে এত শরীআত কি করে বর্ণনা করে ঠিক রাখা যায়?

অধিকাংশ ক্ষেত্রে এরূপ দেখা যায় যে, যে কোনো শরীআত ব্যাপকভাবে অনুসৃত হতে বেশ কিছুকাল লেগে যায়। এটা জানা কথা, কোনো নবীরই জীবনকাল তত দীর্ঘ হয় না। আমাদের সামনে যে শরীআত রয়েছে তা থেকে এটাই প্রমাণিত হয়। শুরুতে খুব কম সংখ্যক ইহুদী ও খ্রিষ্টান ঈমান এনেছে। তারপর আস্তে আস্তে তাদের সংখ্যা বাড়তে লাগল। অবশেষে তাদের থেকেই অধিকাংশ ঈমানদার সৃষ্টি হলো।

বস্তুত অধিকতর সহজ ও উত্তম পন্থা এটাই যে, শরীআত, দণ্ডবিধি ও জীবন বিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে সেই জাতির অভ্যেস ও স্বভাব সামনে রাখা হবে যে জাতির ভেতর নবী প্রেরিত হন। সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য জাতির জন্যেও যেন তা কঠোর ও কষ্টকর না হয় সেদিকেও নজর থাকা প্রয়োজন। তবে হ্যাঁ, পরবর্তীকালে ঈমান গ্রহণকারী জাতিগুলোর জন্যে তা আদৌ কষ্টকর হবে না তেমনটা নয়।

পূর্ববর্তীদের জন্যে এ শরীআত পালন এ কারণে সহজ হয় যে, তারা তাদের অভ্যেস ও স্বভাবের নিজেরাই সাক্ষী আর তারই আলোকে এ শরীআত এসেছে। পরবর্তীদের জন্যে তা পালন সহজ হতে পারে খোলাফায়ে রাশেদীন ও আইম্মায়ে কেরামের জীবন চরিত আলোচনা ও তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা সৃষ্টির মাধ্যমে। মূলত প্রাচীন ও নবীন সব যুগেই মানুষের স্বভাব এটাই দেখা যায়। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম-এর যুগে সভ্য এলাকা ও জাতি হিসেবে যাদের পরিচিত ছিল তারা দুটো বিশাল সাম্রাজ্যের দু’সম্রাটের অধীনে বিভক্ত ছিল।

(১) কিসরা বা পারস্য সাম্রাজ্য। ইরান, ইরাক, ইয়ামান, খোরাসান ও তার আশপাশের এলাকাগুলো এর অধীনে ছিল। এমনকি আফগানিস্তান এবং হিন্দুস্তানও তার বশ্যতা স্বীকার করে নিয়মিত কর দিত।

(২) কায়সার বা রোমক সাম্রাজ্য। সিরিয়া, ফিলিস্তিন, তুরস্ক, ইতালি ও তার সংশ্লিষ্ট এলাকা নিয়ে এ সামাজ্য গঠিত হয়। তা ছাড়া মিসর, উত্তর আফ্রিকা ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ এর বশ্যতা স্বীকার করে কর দিত।

এ দুটো বিশাল সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করা ও তাদের এলাকাগুলো জয় করে নেয়া মূলত গোটা বিশ্ব জয় করে নেয়ার শামিল ছিল। তাদের বিলাস জীবনের প্রভাব তাদের গোটা সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করেছিল। তাদের সে অভ্যেস বদলে দেয়া আর তা থেকে তাদের বিরত রাখা প্রকারান্তরে গোটা পৃথিবীর দেশগুলোকে সতর্ক করে দেয়া বৈ নয়। অবশ্য পরবর্তীকালে তাদের অবস্থা ভিন্ন রূপ নিয়েছিল। হযরত উমর (রাঃ) যখন অনারবদের বিরুদ্ধে জেহাদের ব্যাপারে হরমুযানের সাথে পরামর্শ করলেন, তখন সে সেরূপ ইঙ্গিতই দান করেছিল। তথাপি সার্বিক ধ্যান ধারণায় সুবিন্যস্ত এলাকার লোক কোনোরূপ আপোষের ওপর গুরুত্ব দেয়নি। এ কারণে যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে গেছেনঃ “তুর্কিরা যতদিন তোমাদের থেকে স্বতন্ত্র অবস্থায় থাকবে, তোমরাও তাদের থেকে আলাদা থাকবে। পক্ষান্তরে যতদিন আবিসিনিয়া তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে না নামবে, ততদিন তোমরাও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না”।

মোটকথা, আল্লাহ তাআলা চাইলেন জাতির অব্যবস্থা দূর করতে আর তার জন্যে তিনি এমন একটি দল গড়ে তুললেন যাদের কাজ হলো পুণ্যকে প্রতিষ্ঠা করা, পাপকে নির্মূল করা ও ভ্রান্ত রীতিনীতিগুলো বদলে ফেলা। এ ব্যাপারটি নির্ভর করছিল উক্ত সাম্রাজ্য দুটের পতনের ওপর। কারণ, এ দুটোর অবস্থার সাথে মোকাবেলা করলেই সার্বিক অবস্থাটির প্রতিষ্ঠা সহজ হয়ে যায়। মূলত এ দুটো সাম্রাজ্যের অভ্যেস ও রীতিনীতির প্রভাবে অন্যান্য দেশগুলো আচ্ছন্ন ছিল কিংবা তার কাছাকাছি অবস্থায় ছিল।

সে মতে আল্লাহ তাআলা এ দুটো সাম্রাজ্য ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ওহীর মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন, পারস্য সাম্রাজ্য ধ্বংস হলো, এরপর আর কোনো রোম সম্রাজ ক্ষমতাসীন হবে না। সত্য অবতীর্ণ হয়েছে আর তার প্রভাবে পৃথিবীর বুকে বাতিলের পরিসমাপ্তি ঘটবে।

তাই আল্লাহ তাআলা প্রথমে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামকে দিয়ে আরবের বুক থেকে বাতিলের অবসান ঘটালেন। অতঃপর আবরদের মাধ্যমে উক্ত দুটো সাম্রজ্যের বুক থেকে বাতিল বিলুপ্ত কররেন। পরিশেষে সেই দুটো সাম্রাজ্যের অধিবাসীদের দিয়ে অন্য সব দেশের বাতিল দূর করলেন। ওয়ালিল্লাহিল হুজ্জাতুল বালিগা।

৩। উক্ত পথপ্রদর্শক মহান নায়কের জন্যে এটাও একটি মূলনীতি যে, তিনি লোকদের ভেতর দ্বীনের তালীম ব্যাপক করার জন্যে খেলাফত পদ্ধতি চালু করবেন। তারা তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়ে তাঁর মিশন অব্যাহত রাখবেন। তারা হবেন পথ প্রদর্শক মহান নায়কের দেশের ও গোত্রের এবং যারা তাঁরই নীতি-আদর্শে লালিত ও অভ্যস্ত। চোখ স্বাভাবিকভাবে কালো হওয়া এক জিনিস আর সুরমা লাগিয়ে কালো বানানো আরেক জিনিস। আসল ও নকল হতে পারে না। মূল ঈমামের সাথে খলীফাদের দ্বীনি ও নসবী একাত্মতার ফলে তাদের দায়িত্বের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা মিল্লাত প্রতিষ্ঠাতার দায়িত্বের মর্যাদার সমপর্যায়ে পৌঁছে থাকে। তাই হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে গেলেনঃ খলীফার হবেন কুরায়েশ বংশ থেকে।

তাছাড়া খলীফাদের দ্বীনের প্রতিষ্ঠা ও প্রসারের জন্যে ওসিয়াত করা হবে। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) বলেনঃ “তোমারা এ দ্বীনের ওপর ততদিন প্রতিষ্ঠিত থাকবে যতদিন তোমাদের নেতারা সঠিক ও সরল থাকবে”।

৪। তাঁর কাজ হবে এ দ্বীনকে অন্যান্য দ্বীনের ওপর বিজয়ী করবে। ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক সবাইকে এ দ্বীনের অধীন হতে হবে। চাই তারা মর্যাদারসাথে আসুক কিংবা লাঞ্ছিত হয়ে আসুক। সে মতে মানুষ তিন শ্রেণীর হয়ে যাবে।

(ক) জাহেরে ও বাতেলে পূর্ণমাত্রায় দ্বীনের অনুসারী হবে।

(খ) বিদ্রোহ করার ক্ষমতা না থাকায় বাধ্য হয়ে বাহ্যত দ্বীনের আনুগত্য করবে।

(গ) লাঞ্ছিত কাফের অবস্থায় দ্বীনের হুকুমাতের আনুগত্য মেনে নেবে। দ্বীনের ইমাম তাদের চতুষ্পদ জীবের মতো ক্ষেত খামারের ও বোঝা বহনের কাজে লাগাবেন এবং তাদের ওপর লাঞ্ছনার জিঞ্জির আরোপ করবেন।

সকল দ্বীনের ওপর একটি মাত্র দ্বীনের প্রাধান্য লাভের কয়েকটি কারণ দেখা যায়।

১। সব ধর্মের নিদর্শনাবলীর ওপর নিজ ধর্মের নিদর্শনগুলোর শ্রেষ্ঠত্ব সুস্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়। ধর্মীয় নিদর্শনাবলি একটি প্রকাশ্য ব্যাপার যা প্রত্যেক ধর্মের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রূপে বিরাজ করে। ফলে যে ধর্মের কাজগুলো উত্তম বিবেচিত হয় তার প্রবর্তক সর্বশ্রেষ্ঠ বিবেচিত হয়। যেমন ইসলামের নিদর্শনাবলীর ভেতর রয়েছে খতনা করা, মসজিদের মর্যাদা দান, আজান প্রবর্তক, জুমআর নামায চালু করা, জামাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়া ইত্যাদি।

২। অন্যান্য ধর্বাবলম্বীর প্রতি বিধি নিষেধ আরোপ করা হয় যেন তারা তাদের ধর্মের ব্যাপারগুলো প্রকাশ্যে খোলা ময়দানে প্রচার করে না বেড়ায়।

৩। কিসাস ও দিয়াতের ব্যাপারে মুসলমান ও কাফের একই মর্যাদা না পায়। তেমনি বিয়ে-শাদি ও রাষ্ট্রীয় দায়-দায়িত্বে কাফের ও মুসলমান যেন সম অধিকার ও মর্যাদা না পায়। এ সব বিধি-নিষেধের ফলে যেন তারা ঈমান গ্রহণের জন্যে উদ্ধুদ্ধ হয়।

৪। লোকদের পুণ্য কাজ করতে ও পাপ কাজ ছাড়তে বাধ্য করা হবে। অন্তরে যার যাই থাক না কেন বাহ্যত সে বিধানগুলো মেনে চলতে বাধ্যতামূলকভাবে অভ্যস্ত করতে হবে। শরীআতের বিধি-নিষেধের ক্ষেত্রে কাউকে স্বাধীনতা দেয়া যাবে না। শরীআতর রহস্য সম্পর্কিত জ্ঞান গোপন রাখতে হবে এবং শুধুমাত্র বিজ্ঞ আলেমের ভেতর চার চর্চা সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। কারণ, জনসাধারণ না তা জানেআর না তা জানার ক্ষমতা রাখে। যতক্ষণ পর্যন্ত বিধানগুলোর কল্যাণকারিতা তুলে ধলার বিধিবদ্ধ পদ্ধতি স্থির না হবে এবং তা উপলব্ধি করার যথেষ্ট লোক তৈরি না হয় ততক্ষণ উক্ত নীতিই চালু থাকবে। কারণ, তার আগে প্রকাশ করতে গেলে জ্ঞানের গভীরতার অভাবে জনসাধারণের ভেতর প্রচুর মতানৈক্য ও বিতর্ক দেখা দেবে। যদি শরীআতের কোনো ব্যাপারে তাদের অবকাশ দেয়া হয় এবং বলা হয় যে, এ বাহ্যিক কাজটি তো আসল লক্ষ্য নয়, আসল উদ্দেশ্য হলো অন্তরের পরিবর্তন, তা হলে তাদের ভেতর জল্পনা কল্পনা বেড়ে যাবে। অথচ আল্লাহা পাকের তা আদৌ কাম্য নয়। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

৫। এটাও একটা কথা যে, শুধু তরবারীর জোরে দ্বীনকে বিজয়ী করতে গেলে মানুষের মনে খটকা থেকেই যাবে। তাতে এ সংশয় থেকে যায় যে, কোনো সুযোগ তারা কুফরের দিকে ফিরে যাবে। এ জন্যে জরুরী হলো যে, নেতা অখণ্ডনীয় মজবুত দলীল প্রমাণ দ্বারা লোকদের সামনে এ দ্বীনের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরবেন এবং জোরালো বক্তব্যের মাধ্যমে তাদের সর্বতোভাবে প্রভাবিত করবেন। সাথে সাথে অন্যান্য দ্বীন বিভিন্ন কারণে যে অনুসরণযোগ্য নয় তাও যুক্তি-প্রমাণ দ্বারা লোকদের সামনে এ দ্বীনের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরবেন এবং জোরালো বক্তব্যের মাধ্যমে তাদের সর্বতোভাবে প্রভাবিত করবেন। সাথে সাথে অন্যান্য দ্বীন বিভিন্ন কারণে যে অনুসরণযোগ্য নয় তাও যুক্তি-প্রমাণ দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে। প্রথমতঃ যেসব দ্বীনের বিধাগুলো কোনো নিষ্পাপ লোকের বর্ণনা থেকে পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয়তঃ অন্যান্য ধর্মের বিধানগুলো একটি জাতির সার্বিক জীবন ব্যবস্থা হতে পারে না। তৃতীয়তঃ অন্যান্য ধর্মীয় বিধানে যথেষ্ট বিকৃতি এসে গেচে। ফলে মূল  বিধান থেকে তা অনেক দূরে সরে গেছে।

পক্ষান্তরে লোকদের ভেতর এ কথাটির সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা চাই যে, এ দ্বীনই সঠিক, সহজপ্রাপ্য ও নির্ভেজাল দ্বীন। এর বিধি বিধান সুস্পষ্ট এবং বিবেক বুদ্ধি এর যথার্থ তা সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয়। এ দ্বীনের অস্পষ্ট বিষয়গুলোও দিবালোকের ন্যায় সমুজ্জল। এর পদ্ধতি ও রীতিনীতিগুলো মানবজাতির জন্যে সর্বাধিক কল্যাণকর। তা ছাড়া অতীতের আম্বিয়ায়ে কেরামের যে সব জীবনচরিত আজ পর্যন্ত বিদ্যমান তার সাথে এ দ্বীনের সামঞ্জস্য রয়েছে সর্বাধিক।

মোটকথা, এ সব কথা লোকদের কাছে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা চাই। তা হলই এ দ্বীনের এককত্ব সম্পর্কে কারও কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকবে না।

অধ্যায়-৭০

বিকৃতি থেকে দ্বীনের সংরক্ষণ

মানব জাতির শান্তি-শৃঙ্খলার শ্রেষ্ঠতম বিধান নিয়ে আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে যে মহান ব্যক্তিত্ব অবতীর্ণ হয়ে অতীতের সব ধর্মমত বাতিল করে দেন, তাঁর জন্যে এটা অপরিহার্য যে, তিনি তাঁর দ্বীনকে এরূপ সুদৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করবেন যাতে কোনোরূপ বিকৃতি না আসতে পারে। কারণ, তিনি বিভিন্নমুখী লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের ভিন্ন ভিন্ন জাতিকে একই সূত্রে গ্রথিত করতে চান। অনেক সময় লোকদের মনে ফেলে আসা ধর্মের কিছু কিছু ব্যাপারের প্রতি আসক্তি থেকে যায় কিংবা তাদের মনের খেয়াল খুশি অথবা স্বল্প বুদ্ধিরকারণে ছোটখাটো সাধারণ ব্যাপারকে গুরত্বপূর্ণ ভেবে বসে। ফরে তার ভেতরে তাদের দৃষ্টিতে বেশ কিছু কল্যাণ পরিলক্ষিত হয়। এ কারণে তারা দ্বীনের সুপ্রমাণিত কার্যাবলী উপেক্ষা করতে উদ্ধুদ্ধ হয় এবং যা দ্বীনের কাজ নয় তা তার অন্তর্ভুক্ত করে ফেলে। পরিণামে দ্বীনের ভেতর বিকৃতি দেখা দেয়। আমাদের অতীতের দ্বীনগুলো এভঅবেই বিকৃতির শিকার হয়েছে।

দ্বীনের বিকৃতি ও বিচ্যুতির সব রাস্তা বন্ধ করা কঠিন। কারণ, তা আগে ভাগেই নির্দিষ্ট করা সম্ভব নয়। যেহেতু তার সব রূপ আগে থেকে জানা যায় না, তাই তা বন্ধ করা যায় না। তাই এ থেকে জরুরী হচ্ছে সামগ্রিকভাবে বিকৃতি সম্পর্কে সবাইকে কঠোরভাবে সতর্ক করে দেয়া এবং যে সব মাসআলার ব্যাপারে বিকৃতির আশংকা থাকে, সেগুলোর ভালোভাবে বুঝিয়ে দেয়া। তারপর বলে দেয়া যে, এসব পথেই বনি আদমের ঔদাসিন্যের কারণে বিকৃতি প্রবেশ করে থাকে। মোটকথা বিকৃতি ঢোকার ক্ষুদ্রতম ছিদ্রও পূর্ণরূপে বন্ধ করে এরূপ কিছু ব্যবস্থা চালু করতে হবে যা অন্যান্য বাতিল ধর্মানুসারীদেরঅতিপ্রিয় অভ্যেস ও রীতিনীতির পরিপন্থী হয়। যেমন, নামাযের রীতিনীতি ও পদ্ধতি। বস্তুত তাদের অতি পরিচিত নামায বা উপাসনা পদ্ধতির সাথে এর আদৌ মিল নেই।

বিকৃতির অন্যতম কারণ হলো ধর্মনায়ক ও ধর্মানুসারীদের ঔদাসিন্যতা। তা এভাবে হয় যে, সাহাবা ও হাওয়ারীনদের পরবর্তী স্তরে এমন লোকও আসে যারা নামাযই পড়ে না। পক্ষান্তরে তারা বাসনা-কামনা চরিতার্থের জন্যে লাগাম হীনভাবে ছুটে বেড়ায়। দ্বীনের প্রচার ও প্রসারের গুরুত্ব তারা দেয় না। অর্থাৎ দ্বীন শেখা, শেখানো ও আমল করা যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার সেটাই তারা বুঝে না। তারা নেক কাজের নির্দেশ দেয়না, বদ কাজ থেকে ফিরিয়েও রাখে না। এ অবস্থায় সে সমাজে দ্বীনের পরিপন্থী রীতিনীতি চালু হয়ে যায়। এমনকি শরীআতের পরিপন্থী অভ্যেস ও মন মেজাজ সৃষ্টি হয়। এর পরবর্তী স্তরে এমন লোকও আসে যারা এর চাইতেও উদাসীন হয়। অবশেষে বেশির ভাগ দ্বীনের জ্ঞান তাদের বিলুপ্ত হয়। এমনকি তাদের দ্বারাই বেশি বিকৃতি চালু হয়। এ কারণেই হযরত নূহ (আঃ) ও হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর উম্মত বরবাদ হয়েছে। আজ দুনিয়াতে কেউইতাদের ধর্মমত সম্পর্কে কিছু জানে না। ঔদাসিন্য সৃষ্টির কয়েকটি কারণ থাকে।

এক: জাতির প্রতিষ্ঠাতা থেকে ধর্মের বিধি-বিধানগুলোর বর্ণনা অব্যাহত না রাখা এবং তা কার্যকর করার ব্যবস্থা না থাকা, তাই হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- সাবধান! কোনো এক ভোজনবিলাসী ব্যক্তি ঘোষণাকরবে, শুধু কুরআনের ওপর দৃঢ় থাক। কুরআনে যা হালাল পাবে তাই খাবে আর যা হারাম দেখবে শুধু সেটাই বাদ দেবে। অথচ আল্লাহর রাসূল যেটাকে হারাম বলেছেন সেটাও আল্লাহর হারাম বলারই নামান্তর মাত্র।

হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ পাক মানব জাতি থেকে দ্বীনের জ্ঞান ছিনিয়ে নেবেন না, দ্বীনি জ্ঞানের আলেমদের তুলে নেবেন। এমনকি অবশেষে একজন আলেমও অবশিষ্ট থাকবেন না। তখন জনগণ মূর্খদের নেতা বানাবেন। অতঃপর লোক তার কাছে মাসআলা জানতে চাইবে। অগত্যাসে বিদ্যা ছাড়াই ফতোয়া দেবে। ফলে সে যেমন গোমরাহ, লোকদেরও তেমন গোমরাহ বানাবে।

ঔদাসিন্যের আরেকটি কারণ হয়, অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থতা করা বাতার জন্যে দ্বীনের ভূল ব্যাখ্যা করা হয়। যেমন বাদশাহকে খুশি করে কার্যসিদ্ধির জন্যে আয়াতের মতলবী ব্যাখ্যা শুনানো হয়।

এ সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেনঃ

(আরবী***************************************************************************************)

অর্থাৎ নিশ্চয় যারা আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাবের বিধান গোপন করে নগণ্য পয়সার বিনিময়ে তারা তা দিয়ে যা কিছু আহার উদরস্থ করে তা আগুন ছাড়া কিছুই নয়।

ঔদাসীন্যের আরেকটি কারণ হলো, পাপাচার ব্যাপক হতে থাকে, অথচ ওলামায়ে কেরাম বাধা দেয় না।

তাই আল্লাহ বলেনঃ

(আরবী*************************************************************************************)

অর্থাৎ অনন্তর তোমাদের পূর্ববর্তী যুগসমূহের মতো কেন হবে না, যখন সে সব যুগে ফেতনা ফাসাদ দেখা দিত, তখন অন্তত নগণ্য সংখ্যক জ্ঞানীগুণী তাতে বাধা দিত। আমি তাদের নাজাত দিয়েছি। পক্ষান্তরে যারা জালিমদের ধন সম্পদের লোভে তাদের অনুসারী হয়েছে তারা ছিল পাপাচারী।

বনী ইসরাঈল যখন নাফরমানীতে নিমজ্জিত হলো, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তখন তাদের আলেমরা শুরুতে বাধা দিয়েছিল। পরে তারা তাদের মজলিসে যেত, তাদের সাথে খানাপিতায় শরিক হতো। ফলে আল্লাহ তাদের পরস্পরকে সহায়করূপে একাকার করে দিলেন এবং হযরত দাউদ (আঃ) ও ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-এর মু তাদের অভিশপ্ত করলেন। কারণ, তারা নাফরমান হয়েছিল এবং সীমা অতিক্রম করেছিল।

দ্বীনের ভেতর বিকৃতি আসার এও একটি কারণ যে, দ্বীনের বিধান সম্পর্কে অহেতুক গবেষণা করা। তা এভাবে ঘটে যে, শরীআত প্রণেতা কোনো কাজের নির্দেশ দিয়েছেন কিংবা কোনো কাজ করতে নিষেধ করেছেন উম্মতের কোনো এক ব্যক্তি তা শুনতে পেয়ে নিজের বুঝমতো এমন এক কাজ করল বা ছাড়ল যা নির্দিষ্ট কাজটির সাথে সাদৃশ্য রাখে কিংবা যে সব কারণে তার নির্দেশ বা নিষেধ এসেছে তার কিছু কারণ গবেষক লোকটির কাজেও বিদ্যমান। অথবা উক্ত গবেষণ শরীআত প্রণেতার নির্দেশটিকে নির্দিষ্ট বস্তুর বিভিন্ন শ্রেণীর কোনো একটির সংঘটন ও কার্যকরণের ভিত্তিতে স্থির করে নেয়। যখন কোনো নির্দেশ বর্ণনার পরস্পর বৈপরীত্যের কারণে তার কাছে অস্পষ্ট মনে হয়, তখন সে সেটাকে অপরিহার্য করেনেয় ও ওয়াজিব ধরে নেয়। সে লোক হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কৃত প্রতিটি কাজকে ইবাদত মনে করে। অথচ তার কিছু কাজ ছিল অভ্যেসগত। সে লোকের ধারণা, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অভ্যেসগত কাজও শরীআতের নির্দেশ-নিষেধের অন্তর্ভুক্ত। ফলে ঘোষণা করে বেড়ায় যে, আল্লাহ পাক এটা করতে নির্দেশ দিয়েছেন কিংবা ওটা করতে নিষেধ করেছেন।

তেমনি একদল এরূপ বুঝে নিয়েছে যে, সেহরী খাওয়া শরীআত বিরোধী কাজ। কারণ, সেটা নফস দমনের পরিপন্থী কাজ। তারা এও বুঝে নিয়েছে, রোযা রেখে স্ত্রীকে চুমু খাওয়া হারাম। কারণ, তা সহবাসের কারণ ও উপকরণ হয়ে থাকে। তাদের মতে চুমু ও সহবাস দুটোই যৌনক্ষুধা চরিতার্থের সম পর্যায়ের; অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বাড়াবাড়ির কুফল বলে দিয়েছেন এবং এ সবকেও তিনি ধর্মের ক্ষেত্রে বিকৃতি বলে আখ্যায়িত করেন।

কড়াকড়িও ধর্মের বিকৃতি আসার অন্যতম কারণ। তা এভাবে ঘটে যে, ইবাদতের কাজে এমন অসহনীয় কষ্টকর পন্থা অনুসরণ করা যা শরীআত প্রণেতা বলেননি। যেমন বছর ঠিকা রোযা রাখা, অহরহ নামায পড়া, দুনিয়া ত্যাগ করা, বিয়ে না করা এবং সুন্নাত ও মুস্তাহাবকে ওয়াজিবের মতো অনুসরণ করা ইত্যাদি। হযরত উসমান ইবনে মাজউন (রাঃ) যখন এরূপ কঠিন পরিশ্রমের ইবাদত শুরু করতে চাইলেন, তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিষেধ করলেন। তিনি বললেন, “দ্বীন নিয়ে যারা অহেতুক মাথা ঘামাবে, দ্বীন তাদের গ্রাস করবে”। যখন এ ধরনের কড়া ইবাদতগুজার ব্যক্তি কোনো সমাজের ওস্তাদ বা ইমাম হন, তখন লোকজন মনে করে এটাই শরীআতের নির্দেশ এবং এ পথেই শরীআতদাতার সন্তুষ্টি অর্জিত হয়। ইয়াহুদি ও নাসারা দরবেশরা এ ব্যাধিরই শিকার হয়েছিল।

দ্বীন তাহরীফের আকেরটি কারণ ইস্তেহসান। তার তত্ত্বকথা এই যে, কেউ হয়ত শরীআত প্রণেতাকে দেখতে পেল যে, তিনি শরীআত প্রদানের বেলায় পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করেছেন। ফলে শরীআতের পথ সুগম হয়েছে। আমিও শরীআতের এরূপ কলা-কৌশল ও কল্যাণধর্মীতা সম্পর্কে আলোচনা করে এসেছি। এখন সেই লোক শরীআত জারি করতে গিয়ে নিজেই আজকের পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনা করে তাতে কিছু তারতম্য ঘটিয়ে চলল। যেমন ইয়াহুদীরা দেখতে পেল, শরীআত প্রণেতা মানুষকে সংশোধনের জন্যেবিভিন্ন দণ্ডবিধি প্রদান করেছেন। এক্ষণে সে দেখতে পেল,  পাথর মেরে হত্যা করার বিধান চালাতে গেলে উম্মতের ভেতর মতানৈক্য ও ঝগড়া ফাসাদ দেখা দেয়। তাই তারা ফতোয়া দিল, মুখে কালি মেখে কয়েক ঘা কোড়া লাগালেই চলবে। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা তাদের সুস্পষ্ট তাহরীফ ও তাওরাতে প্রদত্ত আল্লাহ পাকের সুস্পষ্ট নির্দেশের পরিপন্থী এক মনগড়া বিধান।

ইবনে সিরীন (রহঃ) বলেনঃ সর্বপ্রধম কিয়াস করছে ইবলিশ। এই কিয়াসের সাহায্যেই –চাঁদ, সুরুজের পূজা হয়েছে।

হযরত আল হাসান (রহঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি এ প্রসঙ্গে এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেনঃ

(আরবী***********************************************************************************)

অর্থা আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন আগুন দিয়ে আর আদমকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দিয়ে।

অতঃপর তিনি বলেন, সর্বপ্রথম কিয়াস করেছে ইবলিস। হযরত শাবী (রহঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন- আল্লাহর কসম! তোমরা যদি কিয়াস চালাতে থাক তো হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল করে ফেলবে।

হযরত মাআজ ইবনে জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছেঃ লোকদের মাঝে কুরআন এরূপ প্রসার লাভ করবে যে, আবাল বৃদ্ধ বণিতা সবাই তা পাঠ করবে। তখন এক লোক বলবে, আমি এত কুরআন পড়লাম, অথচ লোকজন আমাকে মান্য করছে না, আল্লাহর কসম! এবারে আমি কুরআনের ওপর পুরোপুরি আমল করব। তা হলে হয়ত লোকজন আমাকে মান্য করবে। তারপর সে তাই করবে। তথাপি লোকজন তাকে মান্য করবে না। তখন সে বলবে, আমি বেশি বেশি করে কুরআন তিলাওয়াত করলাম, পুরোপুরি কুরআন আমল করলাম, তবুও লোকজন আমাকে মানছে না। এবারে আমি আমার ঘরে মসজিদ বানাব। ত হলে হয়ত সবাই আমাকে মানবে। অতঃপর সেই তাই করব। তথাপি লোকজন তার অনুগত হবে। তখন সে বলবে, আমি কুরআন তিলাওয়াত করলাম, তার ওপর আমল করলাম, এমনকি আমার বাড়িতে মসজিদ বানালাম, তথাপি লোকজন আমার অনুসারী হলো না। এবারে আমি এমন হাদীস বানিয়ে তাদের সামনে পেশ করব যা তারা আল্লাহর কুরআনে পাবে না, রাসূলের হাদীসেও পাবে না। তাহলে হয়ত লোকজন আমার অনুসারী হবে। হযরত মাআজ (রাঃ) বলেনঃ এভাবে সে মনগড়া হাদীস পেশ করবে; তার থেকে বেঁচে থাকো। কার, সে যা বর্ণনা করবে তা  সুস্পষ্ট গোমরাহী।

হযরত উমর (রাঃ) থেকে বর্নিত হয়েছে যে, ‘আলেমের পদস্খলন, মুনাফিকদের আল্লাহর কিতাবের ব্যাপারে বিতর্ক সৃষ্টি, গোমরাহ নেতা ও রাষ্ট্রনায়কদের ভুল নির্দেশনা ও ভ্রান্ত পরিচালনা ইসলামকে ধ্বংস করবে।

এ সবগুলো বর্ণনায় বক্তব্য একটি। তা হচ্ছে, কুরআন-সুন্নাহ বহির্ভূত কিয়াস সুস্পষ্ট গোমরাহী।

তেমনি ইজমার অন্ধ অনুসরণও তাহরীফের কারণ হয়ে থাকে। তার তত্ত্বকথা হলো এই, কোনো এক যুগের দ্বীনের ধারক ও বাহকদের অধিকাংশ কোনো একটি মাসআলায় একমত হয়ে গেল। সর্বসাধারণ ভাবল, অধিকাংশের ইজমা হকের ওপরই হয়। এটা আসলে ঠিক নয়। তাদের দেখা উচিত, যে মাসআলায় তারা একমত হয়েছে কুরআন-সুন্নায় তার সপক্ষে সুস্পষ্ট কোনো দলীল রয়েছে কি-না। সুতরাং এ সব ইজমা সেই ইজমা নয় যার ওপর উম্মত একমত হয়েছে এবং যার প্রমাণ কুরআন-সুন্নায় বিদ্যমান। মূলত কুরআন সুন্নাহর কোনো একটিতে যার সুস্পষ্ট সমর্থন মিলে না সেরূপ ইজমা নামায়েয।

এ ধরনের ভ্রান্ত ইজমার অনুসরণ সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেনঃ

(আরবী*********************************************************************************)

অর্থাৎ যখন লোকদের বলা হলো তোমরা আল্লাহর অবতীর্ণ বিধানের ওপর বিশ্বাস স্থাপন কর, তখন তারা বলল, আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের যার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে দেখেছি তার ওপরই বিশ্বাসী হব।

ইহুদীরা হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুওয়াত এজন্যে অস্বীকার করেছে যে, তাদের পূর্বসূরিরা তাদের অবস্থা পর্ববেক্ষন করে দেখতে পেয়েছেন, তাদের ভেতর নবী হওয়ার শর্তাবলী পাওয়া যায়নি। নাসারাবাদের নিকট নবী হওয়ার কয়েকটি শর্ত রয়েছে। অথচ সে সব শর্ত তাওরাতও ইঞ্জীলে বর্ণিত শর্তের পররিপন্থী। তাদের কাছে পূর্বসূরীদের ইজমাই বড় দলীল।

তাহরীফের আকেরটি কারণ হচ্ছে নিষ্পাপ লোক ছাড়া অন্য কারো অন্ধ আনুগত্য করা। একমাত্র নবীই নিষ্পাপ। তিনি ছাড়া আর কারো অন্ধ আনুগত্য চলে না। এর সার কথা হলো এই, উম্মতের আলেমদের কেউ একটি মাসআলা

ইজতেহাদ করে চালিয়ে দিলেন। তার অনুসারীরা ভাবল, এত বড় আলেম যা বলছেন তা নির্ভুল এমনকি তার বিরুদ্ধে কোনো বিশুদ্ধ হাদীস পেলেওতা তারা প্রত্যাখ্যনা করে। এ ধরনের তাকলীদ বা অন্ধ অনুসরণের পক্ষে উম্মতের কখনো মতৈক্য ছিল না। কারণ উম্মত তো সে সব মুজতাহিদের তাকলীদের ওপর একমত হয়েছে যাদের ইজতেহাদের দলীল কুরআন-সুন্নায় বিদ্যমান। উম্মত এ ব্যাপারেও একমত যে, মুজতাহিদের ইজতিহাদ কোথাও ঠিক হয়, কোথাও ভুল হয়। তাই এটা সর্বদা খেয়াল রাখতে হবে যে, ইজতেহাদী কোনো মাসআলার বিপক্ষে যদি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো হাদীস পাওয়া যায় তা হলে তা বর্জন করতে হবে এবং হাদীস অনুসরণ করতে হবে।

আল্লাহ পাক বলেনঃ

(আরবী**********************************************************************)

অর্থাৎ তারা তাদের আলেম ও পীরদের আল্লাহকে বাদ দিয়ে প্রভু বানিয়ে নিয়েছে।

এ আয়াত প্রসঙ্গে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মূলত তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে পীর-আলেমদের ইবাদত করত না। তবে পীর-আলেমরা যেটাকে হালাল বলত সেটাকেই তারা হালাল আর যেটাকে হারাম বলত সেটাকেই হারাম ভাবত।

তাহরীফের আরেকটি কাণ হলো এক ধর্মের সাথে অন্য ধর্মের এরূপ সংমিশ্রণ  যার ফলেএমনকি দুটোর ভেতর পার্থক্য সৃষ্টি করা যায় না। ব্যাপারটি এভাবে ঘ যে, মানুষ কোনো এক ধর্মে থাকে। স্বভাবতই সে ধর্মের বিধিবিধান ও রীতিনীতি সম্পর্কিত জ্ঞান ও ধ্যান-ধারণা মজ্জাগত হয়ে যায়। অতঃপর যখন সে নতুন ধর্মমত গ্রহণ করে তখন তার ভেতরে পুরনো ধর্মের কিছুটা আকর্ষণ থেকে যায় বিধায় গৃহীত ধর্মের ভেতর তার বৈধতা খুজে থাকে। ফলে কোনো মওজু বা দুর্বল বর্ণনাওযদি তার সপক্ষে দেখতে পায়, সেটাকেই আশ্রয় করে তার পুরনো অভ্যেসকে বৈধ ভেবে চলে,  এ সম্পর্কে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

“বনী ইসরাঈলদের কাজ শুরু ঠিক ছিল। অবশেষে তাদের ভেতর বিভিন্ন গোত্র ও কয়েদীদের সংমিশ্রণ ঘটল। অতঃপর মিশ্রিত জাতির বশধারা খেয়াল খুশিমত ধর্মের ব্যাখ্যা দিতে লাগল। ফলে তারা নিজেরাও গোমরাহ হলো ও অন্যান্যদের পধভ্রষ্ট করল”।

আমাদের দ্বীনের ভেতরও বনী ইসরাঈলদের বিদ্যা,জাহেলী যুগের ওয়ায়েজীনদের ওয়াজ, গ্রিক দর্শন ও ব্যবিলনীয় সভ্যতার প্রভাব ও তাদের সংমিশ্রণ ঘটেছে। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে তাওরাত পাঠ করা হলো, তখন তিনি এ কারণেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। হযরত উমর (রাঃ) একই কারণে হযরত দানিয়েল (আঃ)-এর কিতাব সন্ধানকারীকে প্রহার করেছিলেন।

অধ্যায়-৭১

দ্বীনে মুহাম্মদী ওয়াহুদী-নাসারার দ্বীনে পার্থক্য সৃষ্টির কারণ সমূহ

জানা দরকার যে, আল্লাহ তাআলা যখন কোনো জাতির কাছে তাঁর রাসূল পাঠান তখন সেই রাসূল তারা মাতৃভাষায় দ্বীন কায়েম করেন এবং তাতে তিনি কোনোরূপ অস্পষ্টতা বা ত্রুটি রেখে যান না। পরবর্তী স্তরে তাঁরথেকে বর্ণনার ধারা চলতে থাকে এবং তাঁর উম্মতের ভেতর তাঁর সহচর ও সহযোগিরা সেভাবেই দ্বীন উপস্থাপন করেন সেভাবে তা করা উচিত। এভাবে একটি পর্যায় পর্যন্ত দ্বীনের ধারখক ও বাহকরা দ্বীনের ব্যাপারগুলো যথাযথভাবে চালাতে থাকেন। তারপর এমন একদল অবাঞ্ছিত লোক আসে যারা দ্বীনের ভেতর বিকৃতি ও বিচ্যুতি সৃষ্টি করে। তখন আর সত্যদ্বীন নির্ভেজাল থাকে না, বরং তাতে অসত্যের সংমিশ্রণ ঘটে। তাই হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

“আল্লাহ পাক যে জাতির ভেতরে কোনো নবী পাঠান তাদের ভেতর থেকে তার একদল সহায়ক ও সহচর হয়ে থাকেন। যারা তার সুন্নতের পূর্ণ অনুসারী হন এবং তার সব বিধি বিধান অনুসরণ করেন। পরবর্তী স্তরে গিয়ে এমন কিছু  অবাঞ্ছিত লোক আসে যারা বলে এক রকম, করে অন্য রকম এবং যে কাজ তাদের বলা হয়নি তাই করে”।

বাতিল কয়েক শ্রেণীকে বিভক্তঃ

১। প্রকাশ্য শিরক ও সরাসর বিকৃতি। তারা এ কাজের জন্যে সর্বাবস্থায় পাকড়াও হবে।

২। অপ্রকাশ্য শিরক ও অদৃশ্য বিকৃতি। সেক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা তাদের তখন জবাবদিহি করবেন যখন তাদের কাছে নবী পাঠিয়ে নিজ প্রতিশ্রুতি ও প্রমাণ পূর্ণ করবেন এবং তাদের সামনে হক ও বাতিল সুস্পষ্ট করে দেবেন। ফলে যেন যারা নিস্তার পেতে চায় তারা দলীল সহকারে নিস্তার পেতে পারে এবং যারা হালাক হতে চায় তারাও দলীল সহকারে ধ্বংস হতে পারে।

আল্লাহ তাআলা যখন তাদের ভেতর নভী পাঠান, তখন তাদের যত সব বিকৃতি ও বিচ্যুতি তা ঠিকঠাক করে মূল সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন। যদি তাদের ভেতর পূর্বের কোনো শরীআত থেকে থাকে তা হলে যে সব বিধানে শিরকের সংমিশ্রণ ঘটেনি এবং ইবাদত ও সমাজ জীবনের যে সব রীতিনীতি সঠিক পাওয়া যায় সেগুলো তিনি বহাল রেখে তার গুরুত্ব সুস্পষ্ট করে দেন এবং সে সবের সঠিক পদ্ধতি নির্ধারণ করেন। পক্ষান্তরে তার ভেতর যা কিছু বিচ্যুতি ও বিকৃতি এসেছে তা বিলুপ্ত করেন এবং বলে দেন, এগুলোর দ্বীনের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই।

অতঃপর যে সব বিধান পারিপার্শ্বিকতার কারণে তখনকার জন্যে কল্যাণকর বিবেচিত হয়েছিল, কিন্তু বর্তমানে মানব প্রকৃতির পরিবর্তনের কারণে সেগুলো পরিবর্তিত হয়। কারণ, বিধানের আসল উদ্দেশ্য কল্যাণ সাধন। স্থান, কাল, পাত্রের পরিবর্তনে বিধানের কল্যাণকারিতায় পরিবর্তন সাধিত হয়। এ কারণেই বিধানের সাথে পারিপার্শ্বিকতারও উল্লেখ থাকে। কখনো কোনো অবস্থা সৃষ্টির জন্যে কিছু কিছু ব্যাপার কারণ হয়ে থাকে। পরবর্তীতে দেখা যায় অন্য কোনো কারণে সে অবস্থা দেখা দিয়েছে। যেমন, সর্দি গর্মির সংমিশ্রণে জ্বর সৃষ্টি হয়। আবার দেখা যায়, অন্য সময় অন্য কোনো কারণে জ্বর দেখা দেয়। ডাক্তার আগে কারণ নির্ণয় করে জ্বরের প্রতিষেধক প্রদান করেন। ফলে দেখা যায়, একই জ্বরের জন্যে ভিন্ন ভিন্ন বিধান প্রদত্ত হয়। তাছাড়া যে সব বিধানের ব্যাপারে সর্বোচ্চ পরিষদে মতৈক্য রয়েছে এবং লোকদের ভেতর যে কাজগুলো অভ্যেসগত ও সুদৃঢ় হয়েছে ও তাদের অন্তরের গভীরে দানা বেঁধেছে, সেগুলো আরও বাড়িয়ে দেয়া হয়।

আমাদের নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগে যত আম্বিয়ায়ে কেরাম এসেছেন, তাঁরা বিধান কিছু কিছু বাড়িয়েছেন, কিন্তু কমাননি মোটেও। তাছাড়া খুব কমই পরিবর্তন করতেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ) হযরত নূহ (আঃ)-এর দ্বীনের সাথে কুরবানী ও খাতনা সহ কয়েকিট বিষয়ের সংযোগ ঘটিয়েছেন। হযরত মূসা (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দ্বীনের সাথে কয়েকটি বিষয় সংযোগ করেছেন। যেমন উটের গোশত হারাম করা, ব্যভিচারের শাস্তি পাথর মেরে হত্যা করা ও শনিবারকে সপ্তাহের সম্মানিত দিন বলে ঘোষণা করা। তবে আমাদের নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিধান বাড়িয়েছেন, কমিয়েছেন এবং বদলিয়েছেনও। কোনো সূক্ষ্ম দৃষ্টি সম্পন্ন অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তি যখন শরীআতের বিধানের গভীরে অনুসন্ধান চালাবে তা হলে সেই বাড়ানো, কমানো ও পরিবর্তনের কয়েকটি কারণ দেখতে পাবে।

১। ইয়াহুদি ধর্ম তাদের যাজকদের হাতে ন্যস্ত ছিল। তারা পূর্বোল্লেখিত পন্থায় তাতে তাহরীফ বা বিকৃতি ঘটিয়েছে। যখন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পদার্পণ করলেন, তখন তিনি প্রত্যেকটি বিধানকে বিকৃতিমুক্ত করে যথার্থ অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যে ইয়াহুদি ধর্ম মানুষের সামনে ছিল, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দ্বীন এ কারণেই তার থেকে স্বতন্ত্র হয়ে গেল। তাই ইয়াহুদিরা বলছিল, এ নতুন দ্বীনে এটা বাড়ানো হয়েছে, ওটা কমানো হয়েছে। আর এগুলো বদল করা হয়েছে।

২। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবী হিসেবে আবির্ভাব দ্বৈত আবির্ভাবের শামিল। তিনি প্রাথমিকভাবে বনী ইসমাঈলের কাছে প্রেরিত হন।

তাই স্বয়ং আল্লাহ পাক বলেনঃ

(আরবী****************************************************************************)

অর্থাৎ তিনিই উম্মীদের কাছে তাদের মধ্য হতে রাসূল প্রেরণ করেন।

অন্যত্র তিনি বলেনঃ

(আরবী***************************************************************)

অর্থাৎ তুমি যেন সেই জাতিকে সতর্ক কর যাদের বাপদাদাকে কেউ সতর্ক করেনি বলে তারা উদাসীন রয়েছে।

এই প্রাথমিক প্রেরণের লক্ষ্য যেহেতু নবী ইসমাঈল, তাই বনী ইসমাঈলের কাছে যে বিকৃত দ্বীনে ইবরাহিমী ছিল তা সামনে রেখে তাদের অভ্যেস, ইবাদত ও জীবন পদ্ধতির পুনর্বিন্যাসের লক্ষ্য নিয়েই হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শরীআত প্রণীত হয়েছে। যারা এ পরিবেশ ও পরিভাষার সাথে পরিচিত নয় তাদের উদ্দেশ্যে তাঁর প্রাথমিক পর্যায়ের অবতরণ নয়। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ

(আরবী*******************************************************************************)

অর্থাৎ কুরআন আরবিতে নাযিল করেছি যেন তোমরা বুঝতে পাও।

অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেনঃ

(আরবী**************************************************************)

অর্থাৎ যদি আমি অনারবদের ভাষায় কুরআনকে রূপ দিতাম তাহলে তারা বলত কেন আলাদা আলাদা ভাষায় আয়াতগুলো বিশ্লেষিত হলো না। আরবতের জন্যে অনারবদের ভাষা?

অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেনঃ

(আরবী***************************************************************)

অর্থাৎ আমি এমন কোনো নবী পাঠাইনি যে তার জাতির ভাষায় গ্রন্থ পায়নি।

হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রেরণের দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো সমগ্র বিশ্ববাসী। সে বিধানগুলো হলো মানব-সংস্কৃতি ও সভ্যতা সম্পর্কিত যাবতীয় জ্ঞান ও কলা কৌশল সম্বলিত। তার কারণ হলো, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে কতিপয় জাতির ওপর অভিসম্পাত নাযিল হয় এবং তাদের সাম্রাজ্য পারস্য ও রোম ধ্বংসের ফয়সালা হয়। এর মাধ্যমে মানব সভ্যতার চতুর্থ স্তর পুনর্বিন্যাসের নির্দেশ জারি হয়। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মর্যাদা ও বিজয়কে উক্ত নির্দেশ বাস্তবায়নের কারণ নির্ধারণ করা হয়। উক্ত সম্রাটদের কোষাগারের চাবিগুলো হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে সোপর্দ করা হয়। বস্তুত তাঁর এ সাফল্যের ও শ্রেষ্ঠত্বের কারণে তাওরাতের বিধান ছাড়া অন্যান্য বিধান তাঁকে দেয়া হলো। যেমন –খেরাজ, জিযিয়া, কাফেরদের সাথে জেহাদ ও বিধান বিকৃতির কারণসমূহ থেকে মুক্ত থাকা।

৩। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চরম এক শূন্যতার যুগে পাঠানো হয়। তখন সব সত্যধর্মই বিলুপ্ত হয়েছিল। সেগুলোয় দেখা দিয়েছিল ব্যাপক বিকৃতি। মানুষের ভেতর তখন জাতি ও গোত্রগত হিংসা ও বাড়াবাড়ি ব্যাপক রূপ ধারণ করেছিল। এ কারণেই মানুষ তাদের বিকৃত দ্বীন ও জাহেলী কুসংস্কার বর্জন করতে পারছিল না। তাই জিহাদের মাধ্যমে শক্তভাবে তাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী বিরোধ বিসম্বাদের সম্মুখীন হতে হয়েছে।

অধ্যায়-৭২

আয়াতের বিলোপ সাধন ও পরিবর্তনের কারণসমূহ

মানসুখ তথা কোনো আয়াতের বিলোপ সাধন ও তার পরিবর্তে অন্য আয়াত প্রদান সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

(আরবী*****************************************************************************)

অর্থাৎ আমি যে আয়াত মানসুখ করি কিংবা ভুলিয়ে দেই, আমি তার চেয়ে ভালো কিংবা তদানুরূপ প্রদান করি।

এটা সুস্পষ্ট যে, মানসুখ দু’ধরনেরঃ

১। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংস্কৃতি ও সত্যতা কিংবা ইবাদত পদ্ধতি দৃষ্টিতে রেখে সেগুলো শরীআত মোতাবেক সংস্কার সাধন করেন। এটা হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইজতেহাদ মাত্র। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাঁকে ইজতেহাদের ওপর কায়েম রাখেন না। বরং উদ্ভুত সমস্যাটির আসল সমাধান বলে দেন। সেটাই মূলত আল্লাহ পাকের সিদ্ধান্ত। হয় এ সিদ্ধান্তটি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে প্রকাশ করা হয় কিংবা তদনুসারে কুরআনের কোনো আয়াত নাযিল করা হয়। অথবা তাঁর ইজতিহাদকে অন্যদিকে পরিবর্তন করে তার ওপর তাঁকে সুদৃঢ় করে দেন।

প্রথমটির উদাহরণ হলো হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়ার নির্দেশ দান। অতঃপর কুরআনের আয়াত নাযিল হলো এবং সে নির্দেশ বাতিল হলো।

দ্বিতীয়টির উদাহরণ হলো, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্ষুদ্র মশক ছাড়া অন্য কোনো পাত্রে নাবীজ তৈরী করতে নিষেধ করেছেন। অতঃপর সব পাত্রেই নাবীজ তৈরীর অনুমতি দেন এবং বলেন –নেশা পান করার কোনো পাত্র না হলেই হলো। তার কারণ হলো এই যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দেখলেন, নেশা একটি অদৃশ্য ব্যাপার, তখন তিনি তার জন্যে একটি প্রকাশ্য কারণ দাঁড় করালেন। মানে, এমন পাত্রে নাবীজ তৈরী করতে হবে যাতে নেশা সৃষ্টি না হতে পারে। যেমন –মাটি, কাঠ কিংবা লাউয়ের পাত্রে নাবীজ তৈরী করতে গেলে সাথে তাতে নেশা সৃষ্টি হয়। পক্ষান্তরে ক্ষুদ্র মশকে নাবীজ তৈরী করলে তিন দিন পর্যন্ত তাতে নেমা সৃষ্টি হয় না। অতঃপর হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে নির্দেশ পরিবর্তন করলেন এবং পাত্রের কারণে নেশা সৃষ্টি হওয়াকে কারণ নির্ধারণ করলেন। নেশা সৃষ্টির লক্ষণ হলো উত্তেজনা দেখা দেয়া ও মুখে ফেনা সৃষ্টি হওয়া। নেশা সৃষ্টির অন্তর্নিহিত কারণসমূহের যে কোনো একটিকে কিংবা নেশা সৃষ্টিকারী বস্তুর যে কোনো একটি গুণকে উত্তম হিসেবে নির্ধারণ করা বাইরের কোনো পশুকে উৎস হিসেবে নির্ণয় করা থেকে উত্তম।

দ্বিতীয় বিবেচ্য হিসেবে এও বলা যায় যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দেখলেন, জাতি নেশার প্রতি খুবই আসক্ত, তখন এ আশংকা ছিল যে, তাদের যদি শুধু নেশা সৃষ্টিকারী বস্তু খেতে নিষেধ করা হয় তা হলে অন্য পথে যে বস্তুতে নেশার সংযোগ ঘটে তারা সেই পথে গিয়ে বলবে যে, আমরা তো ভেবেছিলাম এতে নেশা সৃষ্টি হবে না। যেহেতু তাদেরজানা নেই, কোন কোন পাত্রে নাবীজ তৈরী করলে নেশার সংযোগ ঘটে, তাই তারা সব ধরনের পাত্রেই নাবীজ তৈরী করে সমস্যা সৃষ্টি করত। অতঃপর যখন তারা ইসলামে সুদৃঢ় হয়ে গেল, এবং যে কোনো ভাবে সৃষ্ট নেশা থেকে মুক্ত থাকার জন্য তারা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলো ও সে ধরনের পাত্র ব্যবহার তারা বর্জন করল, তখনই শুধু নেশা সৃষ্টিকারী বস্তুটি নিষিদ্ধ করা হলো।

বিবেচনার এই দিকটি থেকে এ উদাহরণটি সৃষ্টি হয়ে যায় যে, উৎসসমূহে পার্থক্যের কারণে বিধানের তারতম্য ঘটে। এ ধরনের ‘নসখ’ সম্পর্কে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

“আমার কালাম দ্বারা আল্লাহর কালাম মানসুখ হয় না, আল্লাহর কালাম আমার কালামকে মানসুখ করে এবং আল্লাহর কোনো এক কালাম তাঁর অন্য এক কালামকে মানসুখ করে।

মানসুখের দ্বিতীয় প্রকারটি হলো এই যে, কোনো এক বস্তু কোনো এক কল্যাণ বা অকল্যাণের উৎস বা কারণ হয়ে দেখা দেয়। সে কারণে এক ধরনের হুকুম জারি করা হয়। তারপর এমন এক সময় আসে যখন সেই উৎস বা কারণ অন্তর্নিহিত হয়। ফলে হুকুমের পরিবর্তন ঘটে। তার উদাহরণ হলো এই যে, তখন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করলেন এবং মুহাজির মুসলমান ও তাঁদের আত্মীয় স্বজনদরে ভেরত সম্পর্কচ্ছেদ ঘটল; তখন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাহায্য ও সহযোগিতার জন্যে মদীনার আনসারদের সাথে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক কায়েম করে দিলেন। কুরআন পাক শুরুতে সেই ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতেই মীরাছের বিধান অবতীর্ণ হলো। সঙ্গে সঙ্গে তার উপকারিতা বর্ণনা প্রসঙ্গে বললেন, ‘হে মুসলিম! তোমরা যদি এ বিধান অনুসরণ না কর তাহলে পৃথিবীতে ফেতনা-ফাসাদ বিরাজ করবে। তারপর যখন ইসলামের সুদিন আসল ও মুহাজিরদের আত্মীয় স্বজনরা এসে তাদের সাথে মিলিত হয়, তখন মীরাছের বিধান তার মূল অবস্থায় ফিরে এল।

তাছাড়া যে নবুওয়াতের পর খেলাফতের ধারা বিদ্যমান থাকে না, তখন একটি বস্তুর প্রয়োজন ও কল্যাণ দেখা দেয় না। যেমন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পূর্বেকার কিংবা তাঁর হিজরতের আগের অবস্থা। ঠিক বস্তুটিই সে নবুওয়াতের পরে যখন খেলাফতের ধারা চালু হয়, তখন কল্যাণকর বলে বিবেচিত হয়। তার উদাহরণ হলো এই, আল্লাহ তাআলা আমাদের পূর্বেকার উম্মতদের জন্যে গণীমত হালাল করেন নি, কিন্তু আমাদের জন্যে হালাল করেছেন। হাদীসে তার দুটি কারণ বর্ণিত হয়েছে।

১। আল্লাহ পাক আমাদের দৈন্য ও দুর্বলতা লক্ষ্য করে আমাদের জন্যে গণীমত হালাল করেছেন।

২। আল্লাহ পাক আমাদের নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সব নবীর ওপর এবং আমাদেরকে সব উম্মতের ওপর মর্যাদা দান করেছেন। সে কারণেই শুধু আমাদের জন্যে গণীমত হালাল করেছেন।

উপরোক্ত কারণ দুটের বিশ্লেষণে এই দাঁড়ায় যে, আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পূর্বেকার সব নবী (আঃ)-ই নিজ নিজ জাতির নিকট প্রেরিত হতেন। তাঁদের সংখ্যাও ছিল মুষ্টিমেয়। তাই তাদের মাঝে দু’এক বছরে হয়ত একবার জেহাদ করতে হতো। তার ওপর সে সব জাতি সচ্ছল ও শক্তিশালী। জেহাদের লোক কিংবা তার উপকরণের কোনো অভাব তাদের ছিল না। কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্য তাদের এক সঙ্গেই চলত। তাই তাদের গণীমতের প্রয়োজনও ছিল না। মূলত আল্লাহ পাকের ইচ্ছা তখন এটাই ছিল যে, তাদের জ্ঞানের ভেতর কোনো পার্থিব লালসার মিশ্রণ না ঘটুক। ফলে যেন তাদের কাজের তারা পূর্ণ বিনিময় লাভ করতে পারে।

পক্ষান্তরে আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু সমগ্র বিশ্বের জন্যে প্রেরিত হয়েছেন, এবং গোটা পৃথিবীর লোকও অসংখ্য, পরন্তু বহুজাতির বিচিত্রমুখী মানুষেল সাথে জিহাদের প্রয়োজনও অনেক বেশী, অথচ, মুসলমানদের সংখ্যাগত ও আর্থিক দুর্বলতা ছিল যথেষ্ট, একই সঙ্গে কৃষি ও ব্যবসা চালানোও ছিল তখন অসম্ভব, তাই তাদের গণীমাত নেয়ার অনুমতি দেয়া হলো।

আরেক কথা, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মতদের দায়িত্ব হলো সারা দুনিয়ার মানুষদের ইসলামের পথে আহবান করা। ফলে এমন সব জাতি ও গোত্র ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিল যাতের ভেতর খালেস নিয়তের লোক কমই ছিল। তাদের সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

(আরবী*******************************************************************************)

অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা ফাসেক দ্বারাও এ দ্বীনের সাহায্য করেন।

হাদীসটির তাৎপর্য এই যে, ফাসিকরা শুধু পার্থিব স্বার্থে জিহাদে অংশ নেয়, আর জিহাদের ক্ষেত্রে আল্লাহর রহমত ব্যাপক হওয়ায় সাই তার অন্তর্ভুক্ত হয়। কারণ, ইসলামের শত্রুদের প্রতি আল্লাহ পাকের অসন্তুষ্টিও অত্যধিক।

তাই হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

(আরবী**************************************************************)

অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা বিশ্ববাসীর প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন। তিনি আরব ও আজমের সকল নাফরমানের প্রতি নারাজ হলেন।

এ ব্যাপক অসন্তুষ্টির কারণেই তিনি এটা অপরিহার্য করলেন, তাদের জান মালের নিরাপত্তা সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যাক। পরন্তু তিনি এটাও অপরিহার্য করলেন যে, তাদের সম্পদের ওপর অপরের দখলদারী দিয়ে তাদের অন্তর্দাহ সৃষ্টি করা হোক। যেমন রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু জেহেলের নাকে রূপালি চিহ্ন সম্বলিত উটনী হারাম শরীফে এ জন্যে কুরবানী করতে পাঠালেন যে, কাফেরদের অন্তরে যেন তীব্র অন্তর্দাহ সৃষ্টি হয়। তেমনি তিনি তাদের খেজুরগুলো কেটে জ্বালিয়ে দিতে বললেন যেন কাফেরদের মর্মজ্বালা দেখা দেয়। এসব কারণেই কুরআন পাকে এ উম্মতের জন্যে গণীমতের সম্পদ হালাল করা হয়েছে।

নাসেব মানসুখের অপর একটি উদাহরণ হলো এই, ইসলামের শুরুতে জেহাদের অনুমতি দেয়া হয়নি। কারণ, তখন মুসলমানদের খেলাফত ছিল না, ফৌজ ও অস্ত্রের ব্যবস্থা ছিল না। অতঃপর যখন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করলেন, মুসলমানরা এসে সংঘবদ্ধ হলো ও খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হলো এবং ইসলামের শত্রুদের সাথে মোকাবেলা করার শক্তি অর্জিত হলো, তখন আল্লাহ তাআলা এ নির্দেশ দিলেনঃ

(আরবী*********************************************************************)

অর্থাৎ যারা নির্যাতিত তাদের জন্যে যুদ্ধ করার অনুমতি দেয়া গেল এবং নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা মজলুমদের সাহায্য করার সবিশেষ ক্ষমতা রাখেন।

এ ধরনের উদাহরণ সংশ্লিষ্ট নাসেখ মানসুখ সম্পর্কেই আল্লাহ পাক বলেনঃ

(আরবী***********************************************************************)

অর্থাৎ আমি যে আয়াত মানসুখ করি কিংবা বিস্মৃত করি, আমি তার চেয়ে উত্তম কিংবা তদনুরূপ আয়াতটি প্রদান করি।

আয়াতের ‘তার চেয়ে উত্তম’ কথাটি দ্বারা নবুওয়াতের সাথে খেলাফতের সংযোগ ঘটায় যেসব বিধানের পরিবর্তন ঘটেছে সেগুলো বুঝানো হয়েছে এবং তদনুরূপ কথাটি উৎস ও পটভূমি পরিবর্তনের ফলে যেসব বিধানে পরিবর্তন ঘটেছে সেগুলোকে বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।

অধ্যায়-৭৩

জাহেলী যুগের অবস্থা ও রাসূল (সাঃ)-এর সংস্কার

আপনি যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শরীআতকে বুঝতে চান তাহলে সবার আগে সেই সব অশিক্ষিত লোকদের অবস্থা অনুসন্ধান করুন যাদের ভেতর তিনি প্রেরিত হন। তারাই তাঁর শরীআতের ভিত্তি। তারপর তাদের সেই অবস্থার সংস্কার পদ্ধতি বিশ্লেষণ করুন যা চিল উক্ত শরীআতের লক্ষ্যবস্তু, সেই অবস্থার সংস্কার পদ্ধতি বিশ্লেষণ করুন যা ছিল উক্ত শরীআতের লক্ষ্যবস্তু, মানে শরীআতের প্রয়োগ ও প্রণয়ন, তার সহজীকরণ ব্যবস্থা ও জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিধানাবলী পর্যবেক্ষণ করলেই ব্যাপার সুস্পষ্ট হবে।

এটাই স্পষ্ট কথা, ইসমাঈলী দ্বীনে হানিফ অনুসরণের দাবিদারদের ভেতরই হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রেরিত হন। উদ্দেশ্য হলো, সেই দ্বীনে হানীফের বিকৃতি দূর করা ও তার আসল ঔজ্জ্বল্য ফিরিয়ে আনা।

তাই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

(আরবী*************************************************************)

অর্থাৎ এ মিল্লাত তোমাদের পিতা ইবরাহীমের। অবস্থা যখন এই, তখন অপরিহার্য হচ্ছে, এ দ্বীনের মুলনীতিগুলো সর্বজন স্বীকৃত ও তার পদ্ধতি সুনির্ধারিত হবে। তা এ জন্যে যে, যখন কোনো নবী এমন কোনো জাতির কাছে প্রেরিত হয় যাদের ভেতর সঠিক রীতিনীতি চালু থাকে, তখন তা পরিবর্তন করা অর্থহীন হয়। বরং সেগুলো চালু রাখাই জরুরী হয়ে যায়। কারণ সেগুলো তাদের মন-মগজ কবুল করে নিয়েছে। ফলে তা উত্তমভাবেই তাদের ভেতর প্রতিষ্ঠিত করা যায়।

বনী ইসমাঈলের ভেতর তাদের পিতা ইসমাঈল (আঃ)-এর রীতিনীতি ওয়ারিশী সূত্রেই চালু ছিল। এমনকি আমর ইবনে লুহার সময় পর্যন্ত সেই শরীআত যথাযথ ছিল। উক্ত ব্যক্তি এসে তার কতিপয় ভুল সিন্ধান্তের মাধ্যমে তাতে বিকৃতি সৃষ্টি করল। সে নিজে ভ্রান্ত ছিল ও জাতিকে বিভ্রান্ত করল। সে ব্যক্তিই প্রতিমা পূজা চালু করল। সে লোকই ষাঁড় ছাড়া ও বাহিরা পদ্ধতির কুসংস্কার চালু করল। ফলে তখন দ্বীন বিকৃত হলো এবং সত্য ও মিথ্যার মিশ্রণ ঘটল। অবশেষে তারা অজ্ঞতা ও শিরক কুফরীর অন্ধকারে ডুবে গেল। অতঃপর আল্লাহ তাআলা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাদের মাঝে পাঠালেন। উদ্দেশ্য হলো, তাদের বিকৃতি ও বিচ্যুতির সংশোধন ও সত্য দ্বীনকে সঠিক অবস্থায় পুনর্জীবন দান। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের শরীআতের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলেন। তাদের ভেতর ইসমাঈল (আঃ)-এর শরীআতের যা কিছু অবশিষ্ট ছিল, তা তিনি বহাল রাখলেন। পক্ষান্তরে যত সব বিকৃতি বিচ্যুতি, শিরক, কুফর, ফিতনা, ফাসাদ ইত্যাদি তাতে সৃষ্টি হয়েছিল তা সবই খতম করলেন। সেগুলো যে মিথ্যা ও বাতিল তা প্রমাণিত করে সীল মেরে দিলেন। উপাসনা ইত্যাদির ভেতর যে ত্রুটিবিচ্যুতি দেখা দিয়েছিল তার যথাযথ মর্যাদা ও রীতিনীতি শেখানো হলো। ফলে সেক্ষেত্রের কুসংস্কারও দূর হলো। অসামাজিক বিভিন্ন কুসংস্কারের বদলে ভালো রীতিনীতি চালু করা হলো। নবীশূন্য যুগগুলোয় যেসব আসল কাজ হারিয়ে গিয়েছিল সেগুলো পুনর্বহাল করা হলো। এভাবে আল্লাহর দ্বীন পূর্ণত্ব পেল এবং তা সুদৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হলো।

হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগেও জাহেলরা এ কথা মেনে চলছিল যে, মানুষের পথ প্রদর্শনের জন্যে নবী প্রেরিত হন। তারা ভালো কাজে পুরস্কার ও মন্দ কাজে শাস্তি লাভের ব্যাপারটিও মানত। তারা পুণ্যের বিভিন্ন শ্রেণীবিন্যাসেও বিশ্বাসী ছিল। তাছাড়া সমাজবদ্ধ জীবনের বিভিন্ন স্তরের কল্যাণ-অকল্যাণের বিধি নিষেধের ব্যাপার সম্পর্কেও তারা সচেতন ছিল। জাতীয় তাহজীব তামাদ্দুন নিয়েও তাদের চিন্তাভাবনা চিল। আমি যে বলে এসেছি, তাদের সুস্পষ্ট দুটো ফেরকা বিদ্যমান ছিল। ওপরের আলোচনাটুকু তার পরিপন্থী নয়। সেই ফেরকা দুটো এইঃ

১। পাপাচারী ও ভ্রান্ত বিশ্বাসী। পাপাচারীরা পাশবিক কাজ ও আচরণে লিপ্ত থাকত। দ্বীন অনুসরণে তাদের ঔদাসিন্য ও অবহেলা ছিল এবং দুর্বলতার কারণে তারা নফসের তাড়নায় পাপাচারে লিপ্ত থাকত। তারা দ্বীনের কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করলেও সেটা যে অন্যায় তা তারা মানত।

পক্ষান্তরে, ভ্রান্ত বিশ্বাসীদের বোধ-শোধই কম ছিল। তারা কোনো কিছু তলিয়ে দেখার ক্ষমতাই রাখত না। অথচ যে কোনো দ্বীনের ধারক ও বাহকের জন্যে তা অপরিহার্য। তারা না কারো অনুগামী হতো আর না কোনো দ্বীন প্রবর্তকের আগমন বার্তা তারা মেনে নিত। তারা এসব ব্যাপারে নিজ সংশয় নিয়ে ডুবে থাকত। সাথে সাথে তারা ধর্মানুসারীদের ভয় করত। সমাজ তাদের খারাপ ভাবে। তাদের ধর্মদ্রোহী ঘোষণা করে। সমাজের লোক মনে করত, তারা ধর্মাচরণ মুক্ত লোক। তাই সবাই তাদের খারাপ ভাবত ও অপছন্দ করত। সুতরাং তারা কোনো নবীর আগমন বার্তা অস্বীকার করলে তাতে ক্ষতির তেমন কিছু ছিল না।

২। জাহেল ও গাফেল শ্রেণী। তারা দ্বীনের দিকে মাথা তুলে তাকিয়েও দেখে না। তা নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথাও নেই। কুরায়েশ ও তাদের আশপাশের গোত্রগুলোর এ শ্রেণীর লোক যথেষ্ট ছিল। কারণ, দীর্ঘকাল তাদের কাছে কোনো নবী আসেননি।

তাদের সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেনঃ

(আরবী****************************************************************************)

অর্থাৎ তুমি যেন তাদের সতর্ক কর যাদের কাছে কোনো সতর্ককারী আসেনি। অবশ্য তারা এরূপ জাহেল ও উদাসীন নয় যে, সত্য দ্বীনের ডাক এলে তা তাদের বোধগম্য হবে না এবং তাদের দায়ী করা যাবে না ও তাদের অমূলক অজুহাত শুদ্ধ করা যাবে না।

জাহেলী যুগের লোকদের এ মৌলিক বিশ্বাসটি ছিল যে, আসমান জমীন ও তার ভেতর যা কিছু রয়েছে তা সবই আল্লাহ তাআলা একাকী সৃষ্টি করেছেন।

তেমনি সৃষ্টি জগতের যত বড় বড় ব্যাপার ও তার পূর্ণ ব্যবস্থাপনাও শুধু তাঁরই দ্বারা সম্পন্ন হয়। এ সবের ভেতর তাঁর কোনো শরীক নেই। তাঁর হুকুম কেউ অমান্য করতে পারবে না। তাছাড়া তাঁর ফয়সালাও কেউ বদলাতে পারে না। অবশ্য তাঁর সে ফায়সালা যদি চূড়ান্ত ফায়সালা হয়।

তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ

(আরবী*************************************************************************)

অর্থাৎ তুমি যদি তাদের জিজ্ঞেস কর আসমান ও পৃথিবী কে সৃষ্টি করেছেন?

তারা অবশ্যই বলবে –আল্লাহ।

তেমনি অন্যত্র তিনি বলেনঃ

(আরবী*******************************)

অর্থাৎ বরং তাঁকেই তো ডাকবে।

অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেনঃ

(আরবী**************************************************************)

অর্থাৎ শুধুমাত্র তাঁকে ছাড়া অন্যকেও যারা ডাকল তারা পথহারা হলো।

অবশ্য যিন্দিক বা ভ্রান্ত বিশ্বাসীরা বলত, ফেরেশতা ও আত্মাসমূহের মধ্যে থেকে কতিপয় বিশিষ্ট ফেরেশতা ও আত্মা বড় বড় ব্যাপারগুলো ছাড়া বিশ্বাসীর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে থাকে। যেমন উপাসনাকারীদের অবস্থা শুধরে দেয়া। বিশেষত তারা উপাসকদের নিজেদের সন্তান-সন্ততির ও ধন-সম্পদের যে কোনো সমস্যা দূর করে থাকে।

তারা সেসব ফেরেশতা ও আত্মাদের বাদশাহর আমর্ত্যবর্গের সাথে তুলনা দিত। সভাসদদের ভিতর যার বেশি সম্পর্ক বাদশাহর সাথে থাকে, সে প্রজাবর্গের ওপর তত বেশি দায়িত্ব লাভ করে। আল্লাহর দরবারের ব্যাপারও সেরূপ। তাদের এ ভ্রান্তির উৎস হলো শরীআতের এ বক্তব্য যে, সাধারণ কার্যাবলী বাস্তবায়নের দায়িত্ব ফেরেশতাদের ওপর অর্পণ করা হয়েছে এবং নৈকট্য প্রাপ্ত ফেরেশতাদের প্রার্থনা আল্লাহর দরবারে মঞ্জুর হয়। অথচ পার্থিব একটা ব্যাপার থেকে অপার্থিব একটি ব্যাপার কেয়াস করা চলে না। এ ভ্রান্তি থেকেই উপরোক্ত বিভ্রান্তি দেখা দিল।

জাহেলদের একটা নীতি এও ছিল যে, তারা আল্লাহ তাআলার জন্যে যে সব কাজ অশোভন ও অনুপযোগী তা থেকে তাঁকে তারা মুক্ত ও পবিত্র ভাবত। তেমনি তাঁর নামাবলির ক্ষেত্রে ইলাহদের সংযোগকে তারা অবৈধ ভাবত। কিন্তু তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাসী হবার ফল এই দাঁড়াল যে, তারা ফেরেশতাদের আল্লাহর কন্যা সন্তান ভাবত। পরন্তু তাদের ধারণা, তিনি ফেরেশতাদের মাধ্যমে সৃষ্টি জগতের খবরাখবর সংগ্রহ করেন। তারা রাজা-বাদশাহদের গুপ্তচর নিয়োগ ও তাদের মাধ্যমে খবরাখবর সংগ্রহের উপর কেয়াস করে এ ভ্রান্ত বিশ্বাসের শিকার হয়েছে।

জাহিলদের ভেতর এ ধারণাও বিরাজ করত যে, আল্লাহ তাআলা কোনো কিছু সৃষ্টি করার আগেই তার দ্বারা ঘটিতব্য সব কিছু নির্ধারণ করে থাকেন। হযরত হাসান বসরী (রহঃ) বলেন, জাহেলী যুগের লোকদের বক্তব্য ও কাব্যে তকদীর বিশ্বাসের সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলে। এ কারণেই শরীআত সে বিশ্বাসকে আরও মজবুত করে দিয়েছে।

জাহেলী যুগের লোকের এও এক বিশ্বাস ছিল যে, ঊর্ধ্বজগতে এমন এক নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে যেখান থেকে পর্যায়ক্রমে ঘটনাবলির বিকাশ ঘটতে থাকে। সেখানে ফেরেশতা ওলি-আল্লাহ ও বুযুর্গদের দোআর বিশেষ প্রভাব দেখা দেয়। অবশ্য সে প্রভাবের স্বরূপ তাদের জানা ছিল না। তাই তাদের ধারণা এটাই সৃষ্টি হলো যে, বাদশাহর সভাসদের সুপারিশের যেরূপ ফল দেখা দেয়, এ ক্ষেত্রেও তাই ঘটে থাকে।

জাহেলী যুগের লোকদের এ বিশ্বাসও ছিল যে, আল্লাহ তাআলা বান্দাদের জন্যে ভালো ও মন্দ কাজের সীমানা নির্ধারণ করে বলে দিয়েছেন, এগুলো বৈধ ও এগুলো অবৈধ। এ কারণে তিনি পুরস্কার ও শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন। ভালো কাজে ভালো ফল ও মন্দ কাজে মন্দ ফল পাওয়া যাবে। তারা এও জানত যে, আল্লাহ তাআলার নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতারা বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। আল্লাহর নির্দেশে তারা দুনিয়ার কার্যাবলী তদারকি করেন। তারা কখনো আল্লাহর নাফরমানী করেন না এবং তাদের যা নির্দেশ দেয়া হয় তা পালন করে থাকেন। খানাপিনা, পেশাব-পায়খানা, কিংবা বিয়ে-শাদীর কোনো ব্যাপারই তাদের প্রয়োজন হয় না। এমনি যে সব ফেরেশতারা কখনো কখনো বুজুর্গদের দ্বীনের সামনে আত্মপ্রকাশ করে সুসংবাদ শুনান- আল্লাহ তাআলা কখনো বা নিজ অনুগ্রহে বান্দাদের ভেতর কাউকে নবী বানিয়ে বান্দাকের কাছে পাঠান, তার কাছে ওহী পাঠান, এবং তার কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয়। নবীর আনুগত্য বান্দাদের জন্যে ফরজ করা হয়। তাঁর আনুগত্য ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। তাঁর থেকে কেউ পালিয়ে বাঁচতে পারে না। জাহেলী যুগের লোকেরা এ বিশ্বাসও ছিল যে, সর্বোচ্চ পরিষদ ও আরশবাহী ফেরেশতার অস্তিত্ব বিদ্যমান। তাদের ভেতর এ নিয়ে বেশ আলোচনাও হতো।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমাইয়া ইবনে আবু সামেতের দুটো চরণের সত্যতাকে মেনে নিয়েছেন। তা হলোঃ

(আরবী******************************************************)

অর্থাৎ মানুষ ও ষাঁড় তার ডান পায়ের নিচে অবস্থিত। শকুন তার এক পা ও বাঘ অপর পা পাহারা দিচ্ছে।

হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কবিতায় এ চরণ দুটো শুনে বললেন, সে সত্য বলেছে। তারপর উক্ত কবির এ চরণ দুটো পড়ে শুনানো হলোঃ

(আরবী**************************************************************************)

অর্থাৎ প্রতি রাতের পর সূর্যোদয় ঘটে। লাল ও গোলাপি রং ধরে ভোরের আগমন ঘটে। অবশ্য তা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে উদিত হয় না বরং শাস্তি পেয়ে ঘা খেয়ে আত্মপ্রকাশ করে।

হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- উমাইয়া সত্য বলেছে।

এ কথার ব্যাখ্যা হলো এই যে, জাহেলী যুগের লোকর এ ধারণা ছিল যে, চার ফেরেশতা আল্লাহর আরশ বহনকারী। তাদের একজনের সূরাত মানুষের। সে মানুষের জন্যে সুপারিশ করে। অপর জনের সূরাত ষাঁড়ের। সে চতুষ্পদ জীবের জন্যে সুপারিশ করে। তৃতীয়জন শকুন রূপধারী সে পাখ-পাখালীর জন্যে সুপারিশ করে। চতুর্থজন বাঘরূপ ধারী। সে হিংস্র জীবের জন্যে সুপারিশ করে। শরীআতও এর কাছাকাছি ধারণা দিয়েছে। অবশ্য তারা তাদের ওউল নাম দিয়েছেন। তার শাব্দিক অর্থ দাঁড়ায় পার্বত্য বেষ। তা এ কারণে যে, মেছালী দুনিয়ায় তাদের সেইরূপই দেখা যায়। এ সব ধারণা তাদের জাহেলী যুগেই বিদ্যমান ছিল। তবে তাদের ভ্রান্তি এটাই ছিল যে, তারা পার্থিব ব্যাপার দিয়ে অপার্থিব ব্যাপারের ধারণা গ্রহণ করত। বিদ্যাগত বস্তুর সাথে তারা কল্পনার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে ব্যাপারটিকে গুলিয়ে ফেলত।

যদি আমার উপরোক্ত আলোচনায় আপনাদের কোনো সংশয় দেখা দেয় তাহলে কুরআনে বর্ণিত ঘটনা নিয়ে চিন্তাভাবনা করে দেখেন। তাদের কাছে সত্যজ্ঞান যতটুকু অবশিষ্ট ছিল সেগুলো দিয়েই আল্লাহ তাআলা তাদের কাছে দলীল পেশ করেছেন। পরন্তু সেগুলোর ভেতর যা কিছু গোলমেলে জিনিসের সংযোগ ঘটেছিল সে সব তিনি দূর করে দিয়েছেন। বিশেষত সে সব লোক যখন কুরআন নাযিলের ব্যাপারটি অস্বীকার করছিল তখন তিনি তাদের প্রশ্ন করলেন –মূসা যে কিতাব নিয়ে এল, বল, তা কে নাযিল করেছে?

তেমনি তারা যখন প্রশ্ন তুলল, এ কেমন নবী, যে খায়-দায় আর হাট বাজারে যায়? আল্লাহ পাক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জবাবে বলতে বললেন –আমি তো কোনো নতুন নবী নই।

এ ধরনের অনেক উদাহরণ রয়েছে। তাতে জানা যায়, যদিও মুশরিকরা সরল পথ থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিল, তথাপি তাদের ভিতর যেটুকু সত্যজ্ঞান অবশিষ্ট ছিল তা দিয়েই তাদের সামনে দলীল পেশ করা হতো। তাদের মনীষীদের বক্তব্য লক্ষ্য কর। কিস ইবনে যায়েদা ও যায়েদ ইবনে আমর ইবনে নোফায়েলের বক্তব্য এবং আমর ইবনে লোহার কবিতা পর্যালোচনা কর। তাহলে দেখতে পাবে, আমি যা বলেছি তাতে তার প্রমাণ রয়েছে। তাতে গভীরভাবে দৃষ্টি দিলে দেখতে পাবে; তাদের বুযুর্গ ও মনীষীরা পরকাল ও তার সংরক্ষক ফেরেশতার ওপর বিশ্বাসী ছিল এবং তারা একত্ববাদও মানত। যায়েদ ইবনে আমর ইবনে নোফায়েল তার কবিতায় লিখেনঃ

(আরবী**************************************************************************************)

অর্থাৎ তোমার বান্দা গোনাহগার এবং তুমি প্রতিপালক প্রভু। মৃতরা ও মৃতদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত তো তোমরাই কব্জায় রয়েছে।

অন্যত্র তিনি লিখেনঃ

(আরবী***********************************************************************************))

অর্থাৎ এক প্রভু মানবে, না হাজার প্রভু? দ্বীনের কাজ যদি বিভিন্ন হাতে বিভক্ত থাকে তা হলে তা দ্বীন থাকে? আমি লাত ও ওজ্জা সব ছেড়েছি। বিচক্ষণ ও জ্ঞানী ব্যক্তিরা এটাই করে থাকে। উমাইয়া ইবনে আবি সিলভের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ‘তার কবিতা ঈমান এনেছে, কিন্তু তার অন্তর ঈমানদার হয়নি’।

এসব কিছুই তারা হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর ওয়ারিস হিসেবে পেয়েছিল। পরন্তু তার সাথে আহলে কিতাবদের সংশ্রবজাত কিছু ধ্যান-ধারণা সংযুক্ত হয়েছে। তারা একথা খুব ভালোভাবেই জানত, মানুষের পূর্ণতা আসে তার প্রতিপালকের কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণে এবং সর্বশক্তি দিয়ে আল্লাহর ইবাদতে নিবেদিত থাকায়। পবিত্রতা অর্জন, স্ত্রী সংগমে গোসল জরুরী হওয়া সর্বদা তাদের ইবাদতপূর্ণ কাজ ছিল। তেমনি খাতনা করা সহ সর্বধরনের স্বাভাবিক মানবীয় রীতিকে তারা ইবাদততুল্য ভাবত।

তাওরাতে আছে, আল্লাহ তাআলা খাতনাকে হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও তাঁর বংশধরদের জন্যে একটি নিদর্শন হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। মাজুসী, ইয়াহুদি ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও বিশেষ বিশেষ পদ্ধতিতে ওযূ করত। আরবের ধর্মবেত্তা মনীষীদের ভেতরও এক ধরনের ওযূ করত। আরবের ধর্মবেত্তা মনীষীদের ভেতরও এক ধরনের ওযূ চালু ছিল। এমনকি বিশেষ ধরনের নামায বা উপাসনা পদ্ধতি ছিল। হযরত আবুজর (রাঃ) হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে হাজির হওয়ার তিন বছর আগে থেকেই নামায পড়তেন। তেমনি কিস ইবনে যায়দা আয়াদীও নামায পড়তেন। ইয়াহুদী, মাজুসী ও আরবদের ভেতর নামাযের মতোই আনুগত্য প্রকাশের কিছু কিছু কাজ অবশিষ্ট ছিল। বিশেষত সিজদা, প্রার্থনা ও জপনা অবশিষ্ট ছিল। তাদের ভেতর যাকাত, মেহমানদারী, মুসাফের আপ্যায়ন, দীন-দরিদ্রের দান-খয়রাত, মিসকীন-ইয়াতীমদের সাহায্য সহায়তা, আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ খবর নেয়া, হকদারদের হক আদায় ইত্যাদি প্রথা চালু ছিল। সেগুলো তাদের কাছে প্রশংসনীয় কাজ ছিল এবং তা করাকে পুণ্যবান ও কামেল লোকের লক্ষণ বলে ভাবত।

হযরত খাদিজা (রাঃ) বলেছিলেন, আল্লাহর কসম! আল্লাহ তাআলা আপনাকে কখনো লাঞ্ছিত করবেন না। আপনি আত্মীয় স্বজনের খোঁজ নেন, মেহমানদারী করেন, গরিব পরিবারকে সাহায্য করেন এবং হকদারদের হক আদায় করেন।

তাদের ভেতর প্রত্যুষকাল থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোযার পদ্ধতিও চালু ছিল। কুরায়েশরা জাহেলী যুগে আশুরার রোযা রাখত ও মসজিদে ইতেকাফ করত। হযরত উমর (রাঃ) জাহেলী যুগে ইতেকাফের নামত করেছিলেন। সে মতে ইসলাম গ্রহণের পর তিনি এ ব্যাপারে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে অভিমত চেয়েছিলেন। আস ইবনে ওয়ায়েল মৃত্যুকালে ওসিয়ত করে গেছেন, আমার মৃত্যুর পর এতজন ক্রীতদাসকে যেন আজাদ করা হয়।

মোটকথা, জাহেলী যুগের লোকেরা বিবিধরূপ সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার ইবাদত করত। তাদের বায়তুল্লায় হজ্ব ও আল্লাহর নিদর্শনাবলির প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং সম্মানিক মাসগুলোকে মর্যাদা দানের ব্যাপারে তো সবারই জানা কথা। তারা দোয়া কালাম আর তাবীজ-তুমারেও অভ্যস্ত ছিল। অবশ্য তাদের এ সবের ভেতর শিরক ঢুকেছিল। তাদের ভেতর জীব-জানোয়ারের গলায় ছুরি চালিয়ে জবেহ করা ও উটের গর্দানে তীর মেরে জবেহ করার পদ্ধতিও চালু ছিল। তারা ফাঁস লাগিয়ে পশু জবাই করত না এবং পেট ফেড়ে উট জবাই করত না। তারা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর যেটুকু দ্বীন তখনো অবশিষ্ট ছিল তা পালন করত। তারা জ্যোতিষ বিদ্যা মানত না। প্রকাশ্যে প্রয়োজনীয় ব্যাপার নিয়ে তারা ব্যাপৃত থাকত এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের সুদক্ষ কায়-কারবারে তারা ধার ধারত না। ভবিষ্যৎ জানার জন্যে তারা সত্য স্বপ্ন ও নবীদের সুসংবাদের ওপর নির্ভর করত। তবে তাদের ভেতর তীর মেরে বা এ ধরনের অন্যকিছু করে কোনো কাজের শুভাশুভ নির্ণয়ের পদ্ধতি চালু ছিল। অবশ্য তারা জানত যে, এ সবের সাথে দ্বীনের কোনো সম্পর্ক নেই।

হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাদের ভেতর হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর ছবি দেখতে পেলেন এবং এও দেখলেন যে, তাদের হাতে তীর রয়েছে তখন তিনি বললেন, এরা জানে যে, তাঁরা কখনো তীর মেরে ভাগ্য নির্ণয় করতেন না।

বনী ইসমাঈল আমর ইবনে লুহার পূর্ব পর্যন্ত ইসমাঈল (আঃ)-এর দ্বীনের ওপর পুরোপুরি বহাল ছিল। আমর ইবনে লুহা হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্মের প্রায় সাতাশ বছর আগে জন্মলাভ করে। তাদের ভেতর খানাপিনা, লেবাস, পোশাক, মেহমানদারী, ওলিমা, বিয়ে, তালাক, ইদ্দত, শোক পালন, ক্রয়-বিক্রয় ও লেনদেন ইত্যাদির ব্যাপারে স্থায়ী পদ্ধতি চালু ছিল। তা কেউ লঙ্ঘন করলে নিন্দনীয় হতো।

তারা মুহারামাত তথা মা, বোন, কন্যা ও তাদের সন্তানদের বিয়ে করা হারাম ভাবত। জুলুম-অত্যাচারের জন্যে নির্ধারিত শাস্তির ব্যবস্থা ছিল। যেমন কিসাস, দিয়াত ইত্যাদি। ব্যভিচার ও চুরির জন্যেও শাস্তির ব্যবস্থা ছিল। তাদের ভেতর রোমান ও পারসিয়ান সভ্যতা ও সংস্কৃতির জ্ঞানও বিদ্যমান ছিল। কিন্তু তারা পাপাচারী হয়ে গিয়েছিল। একে অপরকে আটক করা ও লুটপাট করার মতো নিপীড়নমূলক কাজ চালু হয়েছিল। ব্যভিচার, অবৈধ বিয়ে ও সুদ ব্যাপকতা লাভ করেছিল। তারা নামায ও জিকির-আজকার বর্জন করেছিল। অতঃপর এ কাজ দুটো পুরোপুরিই ছেড়ে দিল।

অবশেষে তাদের ভেতর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রেরিত হন। তাদের অবস্থা তখন অনুরূপ ছিল। তিনি তার জাতির কাছে যা কিছু ছিল সব পর্যবেক্ষণ করলেন। দ্বীনের যেটুকু যথাযথ পেলেন তা ঠিক রাখলেন। সেগুলোর ওপর বহাল থাকার জন্যে তাদের তাগাদা দিলেন। তিনি সেগুলোর উপায়-উপকরণ, শর্ত ও অবয়ব নিয়ম-অনিয়ম, অপরিহার্যতা ও অবকাশ, ওয়াক্ত ও ক্বাযা ইত্যাদি শিখিয়ে দিয়ে তাদের ইবাদতগুলো বিধিবদ্ধ ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করলেন। তেমনি নিয়ম পদ্ধতি নির্ধারণের ফলে তা বর্জনের পাপের স্তর ও বিন্যাস করেছিলেন। দণ্ডবিধি জারি করলেন ও কাফফারা জরিমানার পদ্ধতি ও পরিমাণ বলে দিলেন। আশা ও আশংকার দিকগুলো বর্ণণা করে দ্বীন পালন করা তাদের জন্যে সহজ করে দিলেন। পাপের পথ বদ্ধ করে পুণ্যের পথ উন্মুক্ত করার জন্যে উৎসাহ ব্যঞ্জক বর্ণনা শুনিয়ে তাদের দ্বীন অনুসরণের প্রেরণা সৃষ্টি করলেন। সেগুলো তাদের কাছে তাদেরই পূর্বের জ্ঞান ও ধ্যান-ধারণার সাথে খাপ খাইয়ে এমনভাবে পেশ করলেন যা গ্রহণ করা তাদের জন্যে সহজ হয়। তারা যেহেতু দ্বীনে হানীফের দাবিদার ছিল, তাই সেই দ্বীনে হানীফের সংস্কার ও উন্নয়নের যথার্থ দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালালেন। তার ভেতরে যে সব বিকৃতি ও বিচ্যুতি ঢুকেছিলেন তিনি সেগুলো সংস্কার সাধন করলেন। এভাবে তিনি সেই মিল্লাতে হানীফকেই সকল দ্বীনের উপর বিজয়ী করার সাধনায় নিয়োজিত হলেন। তাদের ভেতর থেকে সব কুসংস্কার ও পাপাচার দূর করে তিনি তাদের শ্রেষ্ঠতম সভ্য জাতিতে পরিণত করলেন। এমনকি তাদের তিনি এক সুসংবদ্ধ রাষ্ট্রব্যবস্থা খেলাফত কায়েম করে দিলেন। তার মাধ্যমে তিনি অসত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজ সহচরদের নিয়ে জেহাদ শুরু করলেন। এভাবে অবশেষে আল্লাহ পাকের ইচ্ছাই পূর্ণ হলো। যদিও তা মেনে নেয়া কাফেরদের জন্য কষ্টকর হলো। কোনো কোনো হাদীসে আছে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমাকে সহজ ও সুস্পষ্ট দ্বীনে হানীফ দিয়ে পাঠানো হয়েছে।

(আরবী***************************************************************)

‘সামহা’ শব্দের তাৎপর্যই হচ্ছে এই যে, তাতে কষ্টকর কোনো ইবাদত নেই। মানে পাদ্রিরা সেরূপ কষ্টকর ইবাদত বানিয়ে নিয়েছে, মূল দ্বীনে তা নেই। পরন্তু তাতে প্রত্যেকটি প্রতিবন্ধকতার ক্ষেত্রে অবকাশ ও বিকল্প রয়েছে। ফলে দুর্বল, সক্ষম, ব্যবসায়ী ও অবসরপ্রাপ্ত সবাই সহজে সে দ্বীন অনুসরণ করতে পারে।

‘হানিফিয়া’ শব্দের তাৎপর্য হচ্ছে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মিল্লাত। তার কাজ হচ্ছে আল্লাহর নিদর্শনাবলী প্রতিষ্ঠিত করা ও শিরকের নমুনাগুলো নিশ্চিহ্ন করা। তেমনি তার মধ্যকার বিকৃতি, বিচ্যুতি এবং কুসংস্কার বিলুপ্ত করা।

‘বায়রা’ শব্দের তাৎপর্য হচ্ছে, সে দ্বীনের প্রকৃতি, কলা-কৌশল ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট। সামান্য চিন্তা-ভাবনা করার ক্ষমতা ও অবকাশ যার রয়েছে সে নিঃসন্দেহ তা মেনে নেবে। তবে শর্ত এই যে, তার বিবেক সুস্থ থাকতে হবে এবং তার ভেতর কোনো গোঁড়ামি ও সংকীর্ণতা থাকবে না। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

About শিবির অনলাইন লাইব্রেরী