হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ – ২য় খন্ড

পবিত্রতার অধ্যায়

কিতাবুল তাহারাত

পবিত্রতা সংক্রান্ত আলোচনা

জেনে রাখুন যে, পবিত্রতা তিন প্রকারঃ

(১) অপবিত্রতা হতে পবিত্রতা। (আরবী*****************************)

(২) দেহের সাথে সম্পর্কিত বস্তু, কাপড়ের সাথে অথবা স্থানের সাথে সম্পর্কিত অপবিত্রতা হতে পবিত্রতা।

(আরবী*****************************************************************************)

(৩) দেহ হতে উৎপন্ন অপবিত্রতা হতে পবিত্রতা, যেমন দেহের নিম্নাঙ্গে উৎপন্ন পশম, নখ ও ময়লা আবর্জনা ইত্যাদি।

অপবিত্রতা হতে পবিত্রতা সৎ কাজের ভিত্তির মধ্যে অন্যতম রুচি সম্পন্ন ব্যক্তিদের রুচির উপর ভিত্তিশীল যাদের মধ্যে মালাকুতী নূর প্রসার লাভ করেছে। ফরে তারা যাকে হদছ –অপবিত্রতা বলা হয় তাকে নিজেদের জন্য অপছন্দনীয় মনে করেছেন এবং যাকে তাহারাত তথা পবিত্রতা বলা হয় তাকে তাদের জন্য আনন্দদায়ক ও প্রশান্তিময় মনে করেছেন।

পবিত্রতার ধরনের সীমা, আকৃতি এবং তা ওয়াজিব –অত্যাবশ্যকীয় বস্তু নিচয়ের নির্ধারণঃ ঐ সব বিষয়ের উপর নির্ভরশীল যা পূর্ববর্তী মিল্লাতের মাঝে প্রসিদ্ধ ছিল। যেমন –ইহুদী, নাছারা ও অগ্নি উপাসক ও মিল্লাতে ইসমাঈলের অবশিষ্টাংশ। তারা হদছ তথা অপবিত্রতাকে দু’ভাগে ভাগ করত এবং পবিত্রতাকেও দুভাগে ভাগ করত। যেমনটি আমি পূর্বে উল্লেখ করেছি। আরবদের মাঝে জানাবতের (সহবাসের পর দেহ শুদ্ধির জন্য গোসল) গোসল আমভাবে প্রচলিত ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লাম হদছের তথা অপবিত্রতার দু’প্রকারের ন্যায় পবিত্রতারও দু’প্রকার ঘোষণা করলেন। হদছে আকবরের বিপরীতে তাহারাতে কোবরাকে (বড় অপবিত্রতা অল্প সংখ্যক সংঘটিত হয়ে থাকে। তালবিছের দিকে থেকে অধিক হয়। কঠিন কাজে আত্মাকে সতর্ক করার জন্য এরূপ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা  দেয়। অপরদিকে হদছে ছোগরাকে তাহারাতে ছোগরার (ছোট পবিত্রতাকে ছোট অপবিত্রতার) বিপরীতে ঘোষণা করলেন। এর কারণ হলো এ জাতীয় হদছে ছোগরা অধিক পরিমাণে সংঘটিত হয়ে থাকে। আর তালবিছের দিক হতে অল্পসংখ্যক হয়ে থাকে। এ সম্পর্খে বেশি একটা সতর্ক করার প্রয়োজন দেখা দেয় না। যে সব বস্তুতে অপবিত্রতার তথা হদছ-এর অর্থ পাওয়া যায় সেগুলো অসংখ্য। সুরুচি সম্পন্ন ব্যক্তিরা তা জানে, বুঝে কিন্তু যে বিষয়ে সকল মানুষকে অবগত করানো প্রয়োজন, যা অনুভক করার সাথে সম্পৃক্ত তার চিহ্ন আত্মার মাঝে প্রকাশ পায়, যা প্রকাশ্যভাবে ধরা পড়ে তা এর মাঝে পরিগণিত।

পেটের ভেতরে যা গুড়গুড় করে তা যতক্ষণ পায়খানা প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে বের না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে হদছ তথা অপবিত্রতা বলা যাবে না। এক্ষেত্রে প্রথমটির কোনো আকৃতি ও আয়ত নির্ধারিত নেই। আর যখন তা পাওয়া যাবে তখন অযু করা রোধ করা যাবে না। আর দ্বিতীয় জিনিসটি স্পর্শের মাধ্যমে জানা যায় অনুভূতির দ্বারা অনুভব করা যায়। মানুষ স্বয়ং তা অনুভব করতে পারে, তা প্রকাশ্য নাজাছাতের সাথে সম্পৃক্ত।

আত্মার ব্যস্ততার অবস্থায়ও অযু করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। আর তা হয় সে হদছ প্রকাশ হওয়ার কারণে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বাণীঃ

(আরবী**************************************************************************************)

এর মধ্যে হদছের কোনো না কোনো অর্থ বিদ্যমান অর্থাৎ তার দ্বারাও গুনাহ হয়।

ঐ সব বস্তু যার মধ্যে তাহারাত তথা পবিত্রতার অর্থ (আনন্দ ও মনের প্রশান্তি বিদ্যমান) সেগুলো অসংখ্য। যেমন সুগন্ধি লাগানো, অথবা পবিত্রতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার ন্যায় যিকিরসমূহ। যেমন কোনো ব্যক্তি পাঠ করলঃ

(আরবী********************************************************************)

“হে আল্লাহ! আমাকে সাদা কাপড়কে যেভাবে অপবিত্রতা হতে পবিত্র করেছেন সেরূপ পবিত্রতা দান করুন”। এবং পরিস্কার পরিচ্ছন্ন স্থানেঅবতরণ করা। এবং এ জাতীয় কিছু হওয়া। কিন্তু এক্ষেত্রে লোকদেরকে যে সম্পর্কে অবগত করানো যায় তা সীমিত। এবং সব সময় তা করা সহজ হয় তা এবং যা পরিচ্ছন্ন এবং সকল মজহাবে যা গ্রহণীয় ও চালু রয়েছে তা।

অযুর মূল ভিত্তি হলো দেহের বিভিন্ন পার্শ্ব-অংশ ধৌত করা। শরীয়তদাতা মুখমণ্ডলকে, চেহারাকে পুরো মুখমণ্ডলের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। উভয় হাতকে কনুইসহ সম্পৃক্ত করেছেন। কারণ এর কম হলে তার সীমা অনুভূত হয় না। উভয় পা-কে তার টাখনু তথা ছোট গিটসহ সম্পৃক্ত করেছেন। তা এজন্যে যে, এ ছাড়া অযুর অঙ্গ পূর্ণতা প্রাপ্ত হয় না। মাথা মাসেহ করা নির্ধারিত করেন তা এজন্য যে, তা ধৌত করার মাঝে পেরেশানি বিদ্যমান।

গোসলের মূল হলো সমগ্র শরীর, পূর্ণ দেহ ধৌত করা।

অযু ওয়াজিবকারী বস্তুসমূহের মূল হলো যা পায়খানা ও প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে বের হয়। আর সে সব অন্যান্য বস্তু যাকে পায়খানা ও প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে বের হওয়া বস্তুর হুকুম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

গোসল ওয়াজিবকারী বস্তুগুলো হলো স্ত্রী সঙ্গম সহবাস ও হায়েজ তথা মাসিক ঋতুস্রাব। এ দুটো বিষয় গোসল অত্যাবশ্যকীয়কারী হিসেবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পূর্বে থেকেই আরবদের মাঝে প্রচলিত ছিল।

বাকি থাকল পবিত্রতার অপর দু’প্রকার। সেগুলো (আরবী***********) এরতেকাফাতের অন্তর্ভুক্ত। আর এতদুভয় ধরনের পবিত্রতা মানব প্রকৃতির দাবি অর্থাৎ মূল দাবি। কোনো সম্প্রদায় বা কোনো জাতি তা হতে মুক্ত নয়। প্রকৃত আরবদের নিকট যে দু ধরনের পবিত্রতা বিদ্যমান ছিল শরীয়ত প্রণেতা ঐ দুটির উপর ভিত্তি করেছেন।

এক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করেছেন। যেমনিভাবে (আরবী*******) এর ক্ষেত্রে অপরাপর যেসব বিষয়কে সম্পৃক্ত করেছেন তার ক্ষেত্রে করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদব তথা শিষ্টাচারের ক্ষেত্রে এবং সন্দেহপূর্ণ বিষয়ের নির্ধারণের ক্ষেত্রে এবং অস্পষ্ট, গুপ্ত ও অজ্ঞাত বিষয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করেননি।

অযুর ফজিলত

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

(আরবী********************************************************************)

“পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক”।

আমি বলছি যে, এখানে ঈমান দ্বারা অন্তরের সে অবস্থা বুঝানো উদ্দেশ্য যা পবিত্রতা ও নম্রতার নূরের সমন্বয়ে গঠিত। আর এহসান শব্দটি এক্ষেত্রে ঈমান শব্দ হতে অধিক প্রযোজ্য। আর তাতে কোনো সন্দেহ নেই যে, পবিত্রতা ঐ ঈমানের অর্ধেক।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী*****************************************************************************)

“যে ব্যক্তি উত্তমভাবে অযু সমাপন করল, অযুর ফলে তার দেহ হতে পাপরাশি ঝরে পড়ে যায়, পরিশেষে তার নখের নিচের পাপও ঝরে পড়ে যায়”।

আমি বলছি যে, সে পবিত্রতা যা অন্তরের ভিত্তিতে প্রভাব বিস্তার করে সে পবিত্রতা নফসকে পুত-পবিত্র করে দেয়, নির্মল করে দেয়, তা ফিরিশতাদের সাথে মিলিয়ে দেয় এবং অনেক নাপাক অবস্থাকে বিস্মৃত করে দেয়। অতএব এ বাতেনী পবিত্রতার খাছিয়তকে অযুর খাছিয়ত করে দেয়া হয়েছে যা সে বাতেনী পবিত্রতার চিত্র ও তার প্রতিচ্ছবি ও ঠিকানা।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী**********************************************************************)

আমার উম্মতকে কেয়ামতের দিন “গোররাল মোহাজজালীন” বলে ডাকা হবে (সাদা চিহ্ন বিশিষ্ট) তাদের অযুর চিহ্নের কারণে। অতএব তোমাদের মধ্যে যে তার সে বিষয়ে সাদা চিহ্ন দীর্ঘ করতে ইচ্ছুক হয় সে যেন তার করে।

এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অপর বাণীঃ

(আরবী****************************************************************************)

“অযুর পানি মোমেন ব্যক্তির যতটুকু পৌঁছবে ততটুকু গয়নার ন্যায় হবে।

আমি বলছি যে, যখন পাঁচটি অঙ্গের গুপ্ত পবিত্রতার মুখপত্র তথা চিহ্ন, চিত্র এগুলোকে ধৌত করা। তখন এগুলো প্রকাশ ঘটবে গয়নার চিত্রের ন্যায়। তা হবে মুখমণ্ডলের ও হাত পায়ের উজ্জ্বল চমকের দ্বারা। যেমনিভাবে দুর্বলতা হিসেবে এবং বাহাদুরী বাঘের ন্যায় প্রকাশ পায়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী**************************************************************************************)

“মোমেন ব্যক্তি ব্যতীত অপর কেউ অযুর হেফাযত করে না”।

আমি বলছি যে, অযু সংরক্ষণ করে রাখা কঠিন আমল হওয়ার কারণে শুধুমাত্র ধৈর্যশীল ব্যক্তি ব্যতীত অপর কারো পক্ষে তা সংরক্ষণ করা অসম্ভব এবং ঐ ব্যক্তিই তা সংরক্ষন করতে পারে, যে অযুর বিশাল উপকারিতা সম্পর্কে জ্ঞাত। এ কারণে অযুকে ঈমানের চিহ্ন হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে।

অযুর পদ্ধতি

অযুর যে পদ্ধতি হযরত উসমান, হযরত আলী, হযরত আবদুল্লাহ বিন জায়েদ (রা) এবং তাঁদের ব্যতীত অপরাপর সাহাবায়ে কেরাম (রা) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে মোতাওয়াতের পদ্ধতিতে বর্ণনা করেছেন। যার উপর উম্মতের ঐকমত্য স্থাপিত রয়েছে তা হচ্ছেঃ পাত্রে হাত প্রবিষ্ট করার পূর্বে উভয় হাত পানি দিয়ে ধৌত করে নেবে। কুলি করবে, নাক ঝেড়ে নাকে পানি দেবে, তারপর নিজের মুখমণ্ডল ধুয়ে নেবে। অতঃপর উভয় হস্ত কনুই পর্যন্ত ধুবে। তারপর মাথা মাসেহ করবে ও উভয় পা টাখনু পর্যন্ত ধৌত করবে।

ঐ লোকদের বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়, যারা প্রবৃত্তির দাস হওয়ার কারণে পা ধৌত করাকে অস্বীকৃতি জানিয়েছে আয়াতের প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করার কারণে আমার নিকট যারা বদরের যুদ্ধ ও উহুদের যুদ্ধকে অস্বীকার করে তাদের এবং মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কারণ এ বিষয়টি মধ্যাহ্নের সূর্যের কিরণের ন্যায় পরিস্কার।

তবে হ্যাঁ, যারা বলেছে যে, সাবধানতা রয়েছে ধোয়া এবং মাসেহ করার মধ্যে। অথবা ফরজের সর্বনিম্ন পর্যায় হলো মাসেহ করা। যদিও ধোয়ার পর্যায়টি ঐ পর্যায়ে পড়ে যেজন্য কঠোরভাবে তিরস্কার করা হয়েছে। সুতরাং ওলামাদের এ ক্ষেত্রে বিষয়টি মুলতবী রাখবে যতক্ষণ না বিষয়টির রহস্য উদঘাটিত না হয়।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে কোনো বিশুদ্ধ বর্ণনায় আমি এরূপ দেখতে পাইনি যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাকে পানি দেয়া, কুলি করা ও তরতীবের খেলাপ করে অযু করেছেন। উক্ত তিনটি বিষয়ে বিশেষভাবে তাকিদ করা হয়েছে।

ঐ দুটি পরিপূর্ণভাবে দু ধরনের পবিত্রতা। যা ফিতরাতী বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। তাদেরকে অযুর সাথে মিলানো হয়েছে যাতে সে জন্য নির্ধারিত সময়ের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয় ঐ দুটোর জন্যে। আর তা এজন্য যে, উভয়কে ভাঁজ করা যায়। তাদের পৃথক করা হতে একত্রিত করার বর্ণনা অধিক সহীহ ও বিশুদ্ধ।

অযুর আদব কতগুলো জিনিসের সাথে সম্পৃক্ত

তন্মধ্যে আছেঃ সে সব প্যাচানো অংশগুলোয় অর্থাৎ দেহের তাঁজগুলোর প্রতি লক্ষ দেয়া যেগুলোতে মনোনিবেশ করে তথা খেয়াল করে পানি না পৌঁছানো হলে সেগুলোতে পানি প্রবেশ করে না। যেমন কুলি করা, নাকে পানি দেয়া, উভয় পায়ের ও উভয় অঙ্গুলি খিলাল করা এবং দাড়ি খিলাল করা ও আঙ্গুলে পরিহিত আংটির নিচে পানি পৌঁছানো।

তন্মধ্যে রয়েছেঃ পবিত্রতা পূর্ণ করা। যেমন প্রত্যেক অঙ্গকে তিনবার তিনবার করে ধৌত করা। ইসরাগে অযু বা পরিপূর্ণভাবে অযু করা। ইসরাগ, চেহারার ও হাত পায়ের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে থাকে। এমনিভাবে অধিক পরিচ্ছন্নতা ভালোভাবে রগড়িয়ে ধৌত করা। মাথার সাথে উভয় কান মাসেহ করা। অযু থাকা সত্ত্বেও পুনরায় অযু করা।

তন্মধ্যে রয়েছেঃ বিশেষ কাজে মুসলমানদের সহজাত নিয়মগুলোর প্রতি গুরুত্ব দেয়া। যেমন ডান হাত থেকে অর্থাৎ ডান দিকে থেকে অযু শুরু করা। এতে সন্দেহ নেই যে, ডান দিক উত্তম ও শক্তিশালী। সুতরাং ডান দিক হতে অযু শুরু করাই হলো যুক্তিযুক্ত। কোনো কর্ম উভয় হাতের দ্বারা করা হলে ডান হাত দ্বারা শুরু করাই উত্তম। ডানকে ভালো এবং উত্তম কাজের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়। এর বিরপীতকে নয়। যে কাজ এক হাতে করা হয় তাতেও ডান হাত ব্যবহার করাই উত্তম।

তন্মধ্যে আছেঃ মুখে সরাসরি নিয়ত করা এবং অন্তরের সাথে যিকির করা মুখে উচ্চারণের মাধ্যমে।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ (আরবী*************************************)

“যে আল্লাহর নাম স্মরণ করল না তার অযু হবে না”।

আমি বলছি যে, এ হাদীসটির সত্যতার ব্যাপারে হাদীসের খেদমতকারী মুহাদ্দিসগণ ঐকমত্য পোষণ করেননি। এটা এমন একটা অবস্থায় উপনীত করেছে যার কারণে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হতে দ্বীন গ্রহণ করার ক্ষেত্রে দুটি পদ্ধতির উদ্ভব করেছে। মুসলমানেরা বরাবরই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অযুর পদ্ধতি প্রচার করতে থাকেন এবং তা মানুষকে শিক্ষা দিতে থাকেন। তারা অযুর সময় বিসমিল্লাহ পাঠের বিষয়টি উল্লেখই করতেন না। পরিশেষে মোহাদ্দেসীনদের যুগ আসল। অযুর সময় বিসমিল্লাহ বলা কি রোকনদ্দ না শর্ত এ ব্যাপারে তা পরিস্কার হওয়া প্রয়োজন ছিল সর্ব প্রথমে। উভয় পদ্ধতিকে দ্বিমত বাদ দিয়ে এভঅবে আমল করা যেত যে, এর অর্থ হলো অন্তরে আল্লাহর নাম স্মরণ করা। কোনো ইবাদতই নিয়ত ব্যতীত কবুল হয় না। তখন হাদীসের শব্দ (আরবী*******) “অযু হবে না” অর্থ তার প্রকাশ্য অর্থের দৃষ্টিতে গ্রহণ করা হবে।

তবে হ্যাঁ,বিসমিল্লাহ পাঠ অযুর আদব। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইরশাদ অনুযায়ী যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজই আল্লাহর নাম ব্যতীত আরম্ভ করা হবে সে কাজেই বরকতহীন হবে। আর কেয়াসের দৃষ্টিতেও অনেক স্থানেই তা গুরুত্বপূর্ণ।

এ হাদীসের অর্থ এরূপও হতে পারে যে, “অযু পূর্ণ হবে না”। এ ধরনের ব্যাখ্যায় আমি সন্তুষ্ট নই। এটা এমন এক ধরনের ব্যাখ্যা যা শব্দের অর্থ সংরক্ষণের বিপরীত দিকের প্রতি প্রত্যাবর্তিত হয়।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী-

(আরবী******************************************************************************)

“কারণ সে জানে না তার হাত রাতে কোথায় অবস্থান করেছিল”।

আমি বলছি, তাঁর অর্থ হচ্ছে, দীর্ঘ সময় পর্যন্ত হাতে ধৌত করা হতে বেখবর থাকার কারণে হতে পারে তাতে ময়লা আবর্জনা লেগে যেতে পারে, বা কোনো ধরনের নাপাকীও লেগে যেতে পারে। এমতাবস্থায় হাত না ধুয়ে পানির পাত্রেহাত দিলে তা নাপাক ও ময়লা হতে পারে। এরূপ করা সুরুচি ও ভদ্রতার খেলাপ। এমনিভাবে পানীয়ের মধ্যে ফুঁ দেয়াও নিষিদ্ধ, কারণ তাতে পানিতে মুখের লালা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এটাও রুচি এবং ভদ্রতার খেলাপ।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী*****************************************************************************)

“শয়তান তার নাকের ছিত্রের মধ্যে রাত্রি যাপন করেছে”।

আমি বলছি এর অর্থ হলো, নাকের ছিদ্রের মধ্যে শ্লেষ্মা ও সর্দি ইত্যাদি জমা হয়ে থাকার কারণে সেগুলো  পরিস্কার পরিচ্ছন্ন না করলে কোনো কিছু বুঝার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটা শয়তানের প্রভাব বিস্তারের কাজে বড় ধরনের সহযোগিতা হতে পারে। যার কারণে যিকির-আযকারের মধ্যে শয়তানের প্রভাব প্রতিফলিত হতে পারে।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী***************************************************************************)

“তোমাদের কেউ অযু সমাপনের পর যদি পাঠ করে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল”।

অপর বর্ণনায় রয়েছে যে, তোমাদের কেউ অযু সমাপনের পর যদি পাঠ করেঃ

(আরবী***************************************************************)

“হে আল্লাহঙ আমাকে তাওবাকারীদের মধ্যে পরিগণিত করুন ও আমাকে পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের মধ্যে শামিল করে নিন”। তা হলে তার জন্য বেহেশতের ৮টি দরজাই উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। সে যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।

আমি বলছি যে, আল্লাহ তায়ালার দিকে মনোনিবেশ না করলে অযুর আত্মা পরিপূর্ণতা লাভে ধন্য হয় না। এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পরিপূর্ণ পবিত্রতা লাভের জন্য চেষ্টা না করলেও অযুর আত্মা পরিপূর্ণতা লাভ করবে না। সুতরাং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অযুতে এসবাগের হুকুম দিয়েছেন দ্বিতীয় বিষয়টি লাভ করার জন্য এবং প্রথম বিষয়টি লাভ করার জন্য এ দোয়াকে তালকীন দিয়েছেন। যাতে আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণভাবে বান্দার মনোযোগ হয়। আর জান্নাতে প্রবেশ করাকে এ দোয়ার ফলশ্রুতি হিসেবে ধরেছেন যা আত্মার পবিত্রতার মধ্যে ধর্তব্য।

যে ব্যক্তি পা পরিপূর্ণভাবে ধৌত করেনি সে ব্যক্তি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী****************************************************************)

“ঐ পায়ের টাখনুর জন্য জাহান্নাম”।

আমি বলি ঐ শাস্তি ঘোষণার মধ্যে রহস্য হচ্ছে –যখন আল্লাহ তায়ালা অযুতে দেহের তিনটি অঙ্গ ধৌত করা ফরজ করেছেন তখন ঐগুলোকে পরিপূর্ণভাবে ধৌত করা কর্তব্য। এ ক্ষেত্রে যখন কিছু অংশ ধৌত করা হলো আর কিছু অংশ অবশিষ্ট থেকে গেল, তাহলে এ অংশ ধৌত করা ঠিক ও পরিপূর্ণ হলো না। যখন অযুই পরিপূর্ণ হলো না তখন নামায কি ভাবে পরিশুদ্ধ হবে। এজন্য ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে। এখানে শরীয়তের বিধানের প্রতি অবহেলা করার পথ বন্ধ করাও উদ্দেশ্য।

পায়ের গোড়ালিকে দোজখের জন্য নির্ধারিত করার কারণ হলো তাতে নাপাকি থেকে গিয়েছিল। নাপাকি জমে থাকা ও তা পরিস্কার না করা দোজখের কারণ হয়েছে। পক্ষান্তরে পবিত্রতা অর্জন দোযখ হতে মুক্তির পথ এবং গুনাহের কাফফারা হওয়ার উপযোগী। অতএব যখন অযুর ক্ষেত্রে গোড়ালি পরিপূর্ণ রূপে পরিচ্ছন্ন করা হলো না এক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম বিরোধিতা করা হলো। ফলে এ অঙ্গ শাস্তির যোগ্য হয়ে গেল। তারপর সে কারণে ব্যক্তি শাস্তি পাওয়ার যোগ্য হলো। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

অযু ওয়াজেবকারী বস্তুসমূহের বর্ণনা

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী***********************************************************************)

“কোন ব্যক্তির অযু নষ্ট হয়ে গেলে, অপবিত্র হলে যতক্ষণ পর্যন্ত অযু না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার নামায কবুল হবে না”।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী************************************************************************)

“পবিত্রতা (অযু) ব্যতীত কোনো নামায কবুল করা হয় না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী*************************************************************************************)

“নামাযের চাবি হলো পবিত্রতা (অযু)”।

আমি বলি এসবগুলো হচ্ছে যে পবিত্র হওয়া নামাযের জন্য শর্ত এবং পবিত্রতা পরিপূর্ণভাবে একটি ইবাদত। এবং তাকে নামাযের সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া হয়েছে। উভয়ের উপকারিতা পরস্পরের উপর নির্ভরশীল হওয়ার কারণে। এক্ষেত্রে এখানে আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি জড়িত। আর তা হচ্ছে নামাযের জন্য নির্দেশ প্রদান।

আমাদের শরীয়তে অযু ওয়াজিবকারী বস্তু তিন ধরনেরঃ প্রথমটি, ঐসব বস্তু যে বিষয়ে সকল সাহাবায়ে কেরাম ঐকমত্য পোষণ করেছেন –এক্ষেত্রে বর্ণনা ও আমল সবই একই ধরনের হয়েছে। আর সেগুলো হচ্ছে প্রস্রাব, পায়খানা, হাওয়া নির্গত হওয়া, মজি নির্গত হওয়া, গভীর নিদ্রা এবং অন্যান্য যেসব বস্তু এগুলোর অর্থে ব্যবহৃত হয় সেগুলো।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী**********************************************************************)

“নিতম্বের গ্রন্থি হলো দু’চোখ”।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী******************************************************************)

“কারণ সে যখন কাত হয়ে শোয় তখন তার জোড়াসমূহ ঢিলা হয়ে যায়”।

আমি বলি এর অর্থ হচ্ছে –গভীর নিদ্রা হচ্ছে মানুষের জোড়া ঢিলে হওয়ার ও হদছ হওয়ার কারণ। আমি দেখতে পাচ্ছি যে, তার সাথে অন্য কারণও বিদ্যমান রয়েছে। আর তা হলো গভীর নিদ্রা মানুষের দেহকে দুর্বল করে দেয় আর নিদ্রার মাঝে হদছ হয়ে যায়। মজি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী-

(আরবী*************************************************************************)

“সে তার লিঙ্গ ধুয়ে নেবে ও অযু করে নেবে”।

আমি বলি যে, যে মজি হাসি-ঠাট্টার মাধ্যমে নির্গত হয় এতে শাহওয়াতের প্রয়োজনীয়তা পূর্ণ হয় সহবাস ছাড়া। তখন তার দাবি হলো বড় ধরনের পবিত্রতা না করে ছোট ধরনের পবিত্রতা অর্জন করবে। সন্দেহের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী*********************************************************************************)

ততক্ষণ পর্যন্ত মসজিদ হতে বের হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না কোনো শব্দ (হাওয়া বের হওয়ার শব্দ শুনতে পাবে) বা গন্ধ পাবে”।

আমি বলি এর অর্থ হচ্ছে তার হদছ হওয়ার ইয়াকিন তথা দৃঢ় প্রত্যয় হতে হবে। যখন দু’পথের মধ্য দিয়ে কিছু বের হওয়াকে (পায়খানার রাস্তা ও প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে কিছু বের হওয়াকে) অযু ভঙ্গের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে তখন। ঐ দু পথ দিয়ে কিছু বের হলে, কি হলো না সে সম্পর্কে দৃঢ় প্রত্যয় হতে হবে অর্থাৎ ইয়াকিন হতে হবে। সন্দেহের কারণে তা হবে না। এখানে হাদীসের উদ্দেশ্য হচ্ছে কঠোরতা বর্জন করা। সন্দেহের কারণে তা হবে না। এখানে হাদীসের উদ্দেশ্য হচ্ছে কঠোরতা বর্জন করা। সন্দেহ পরবশ হয়ে অযু ভঙ্গ হয়েছে ভেবে অযু করার জন্য কড়াকড়ি আরোপ করা বর্জন করা। এরূপ করা হলে সন্দেহ পরায়ণ ব্যক্তি কত কিছুই না করে বসবে।

দ্বিতীয়টি হলোঃ যে বিষয়ে মুতাকাদ্দেমীন, ফকীহ, সাহাবা ও তাবেয়ীনদের মদ্যে মতভেদ হয়েছে এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে পরস্পর বিরোধী রেওয়ায়েত বিদ্যমান রয়েছে। যেমন লিঙ্গ স্পর্শ করা। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী অনুযায়ী। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

(আরবী********************************************************************)

“যে ব্যক্তি তার লিঙ্গ স্পর্শ করবে তাকে অযু করতে হবে”।

ইবনে উমর, সালেম ও ওরওয়াহ এবং আরো অনেকে এ হাদীস বর্ণনা করেছেন। তা অগ্রাহ্য ও খণ্ডন করেছে হযরত আলী, ইবনে মাসউদ এবং কুফার ফকীহগণ। তাদের দলিল ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী-

(আরবী***********************************************************************)

“লিঙ্গ তো তার দেহের অংশ বৈ নয়”। এতদুভয়ের কোনোটিই মানছুখ হওয়ার বিষয়ে কোনো প্রশান্তিময় প্রমাণ নেই।

এবং যেমন “নারীকে স্পর্শ করা”। এর বর্ণনাকারী হলেন ইবনে উমর, ইবনে মাসউদ ও ফকীহ ইবরাহীম নখয়ী। মহান আল্লাহ তায়ালার বাণী হচ্ছেঃ

(আরবী**************************************************************************)

“অথবা তোমরা নারীদের স্পর্শ করবে” এর পক্ষে কোনো হাদীস সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপন করে না। বরং হযরত আয়েশা (রা)-এর হাদীস তার বিপরীত প্রমাণ উপস্থাপন করে। এ হাদীসের বিষয়ে চিন্তা করার বিষয় রয়েছে কারণ এ হাদীসটি মোনকাতে হাদীস।

আমার দৃষ্টিতে এ জাতীয় বিষয়গুলো দুটি হাদীসের মধ্যে কোনো একটিকে প্রাধান্য দেয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর তা বৈপরীত্য না থাকার কারণে কোনো হাদীসের উপর আমল করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

হযরত উমর ও হযরত ইবনে মাসউদ জানাবতের জন্য (শুক্র ক্ষরণ ও অপবিত্রতার) তাইয়াম্মুম করা  বৈধ মনে করতেন না। সুতরাং তাদের দৃষ্টি নারীকে স্পর্শ করার বিষয়েই আয়াতের বিধান নির্ধারিত হয়ে গেল। অথচ ইমরান, আম্মার ও আমর ইবনুল আস হতে জানাবতের জন্য তাইয়াম্মুম করার কথা বর্ণিত রয়েছে এবং এ বিষয়ে উম্মতের ইজমা তথা ঐকমত্যও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইবনে উমর এ ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বনের পক্ষপাতি। ইবরাহীম নখয়ী ইবনে মাসউদকে অনুসরণ করতেন। ইবনে মাসউদ যে দলিল গ্রহণ করেছিলেন তা পরিশেষে হযরত ইমাম আবু হানীফা (রা)-এর নিকট স্পষ্ট হলো। তিনি ইবরাহীম নখয়ীর কঠোর অনুসারী হওয়ার পরও তার মত ত্যাগ করলেন।

মূল কথা হলোঃ সাহাবা ও তাবেয়ীনদের পরে এ মাসয়ালার (লিঙ্গ স্পর্শ করা ও নারীকে স্পর্শ করার মাসয়ালায়) ফকীহদের মধ্যে তিনভাগ হয়ে গেল। প্রকাশ্যে তা গ্রহণকারী, সম্পূর্ণভাবে তা ত্যাগকারী ও সাক্ষ্য-প্রমাণের দ্বারা উভয়ের মধ্যে পার্থক্যকারী।

প্রবহমান রক্ত ক্ষরণের কারণে অযু করতে হবে এ মত হলো ইবরাহীম নখয়ীর এবং অধিক পরিমাণে বমি হলেও অযু করতে হবে এমতও ইবরাহীম নখয়ীর। আর নামাযে অট্টহাসির কারণেও  অযু করতে হবে এমত হযরত হাসান (রা) এর। অন্যেরা মত দেননি। উক্ত তিনটি মাসয়ালার বিষয়ে একটি হাদীস রয়েছে যে হাদীসটি বিশুদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণ ঐকমত্য হননি।

এ মাসয়ালার বিশুদ্ধতম মত হলো যিনি এহতিয়াত তথা সাবধানতা অবলম্বনের প্রতি আমল করেছেন তিনি স্বীয় দ্বীনের ও নিজের পরিচ্ছন্নতার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। আর যে এরূপ করেনি তার জন্য শরীয়তে নিরেট কোনো পথ উন্মুক্ত নেই।

এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই যে, নারীকে স্পর্শ দ্বারা যৌন উত্তেজনা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় এবং যৌন মিলন ছাড়াই নিম্নতম যৌন প্রয়োজনীয়তা পূর্ণ হয়। আর লিঙ্গ স্পর্শ করা একটি নিন্দনীয় কাজ। এ কারণে ইস্তিঞ্জায় ডান হাতে লিঙ্গ ধরা নিষেধ করা হয়েছে। অতএব যখন লিঙ্গ ধরা হলো তখন তা শয়তানী কাজ নিঃসন্দেহে। অর্থাৎ

(আরবী********************************************************************)

“যখন হাত দ্বারা লিঙ্গ ধরল তখন এটা অবশ্যই শয়তানের কাজ। আর প্রবহমান রক্ত তথা প্রবাহিত হওয়া এবং অধিক পরিমাণে বমি করা উভয়টাই দেহকে মলিনকারী ও অপরিচ্ছন্নকারী। আর নামাযে অট্টহাসি দেয়া বিশাল ভুল। কখনো কখনো সে জন্য কাফফারা দেয়া লাগতে পারে। এতে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, শরীয়তদাতা এজন্য অযু করার বিধান দিয়েছেন এবং এটা বিস্ময়ের বিষয় নয় যে, শরীয়ত এ ব্যাপারে কোনো বিধান দিল না ওয়াজিব রূপে অথবা তা মোস্তাহাব রূপেও হুকুম দিতে পারে।

তৃতীয়টি হলোঃ হাদীসের শব্দ দ্বারা বুঝা যায় যে, এটা অযু ভঙ্গের কারণ কিন্তু এগুলো অযু ভঙ্গের কারণ না হওয়ার ব্যাপারে সাহাবী, তাবেয়ী ও ফকীহদের মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। যেমন আগুনে পাকানো বস্তু ভক্ষণ করলে অযু করতে হবে। কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খোলাফায়ে রাশেদীন, হযরত ইবনে আব্বাস এবং হযরত আবু তালহা এবং অপরাপর সাহাবা হতে আগুনে পাক করা জিনিস ভক্ষণের কারণে অযু করা প্রমাণিত রয়েছে। জাবের (রা) বলেছেন যে, এ বিধান মানসুখ হয়ে গেছে।

আগুনে পাকানো বস্তু খাওয়ার কারণে অযু করার কারণ হচ্ছে প্রথশত পাকানো খাদ্য পরিপূর্ণ কল্যাণদাতা। ফিরিশতারা এরূপ করে না। আর তা ফিরিশতাদের সাথে সামঞ্জস্য না হওয়ার কারণ হবে। দ্বিতীয়ত, আগুনে পাকানো বস্তু জাহান্নামের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ কারণে লৌহ গরম করে দাগ দেয়া যেতে পারে। সুতরাং মানুষের জন্য এটা উচিত নয় যে, সে তার অন্তরকে এ নিয়ে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে।

বাকি থাকল উটের গোশত সম্পর্কিত বিষয়। এ বিষয়টি আরো জটিল। সাহাবী ও তাবেয়ী ফকীহদের কেউ উটের গোশত খেলে অযু করতে হবে একথা বলেন নি। আর এ হাদীসটি মানসুখ –রহিত এ কথারও কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই। সুতরাং হাদীস তাখরিজকারী মোহাদ্দিছ ও মোজতাহেদদের কেউ এর পক্ষে মতামত প্রকাশ করেননি। শুধুমাত্র আহমদ ও ইসহাক এ ব্যাপারে মতামত ব্যক্ত করেছেন।

আমার নিকট লোকেরা সাবধানতা অবলম্বন করবে এবং অযু করে নেবে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

যিনি উটের গোশত খাওয়াকে অযু ভঙ্গের কারণ বলেছেন এবং বলেছেন যে, উটের গোশত খেলে অযু করতে হবে তার রহস্য হচ্ছে –উটের গোশত খাওয়া তাওরাত কিতাবে হারাম ছিল। বনী ইসরাঈলের সকল নবীরা উটের গোশত হারাম হওয়ার ব্যাপারে ঐকমত্য ছিলেন। যখন আল্লাহ তায়ালা তা আমাদের জন্য হালাল করলেন তখন দুদিক থেকে তা খাওয়ার পর অযু করা ওয়াজিব করলেনঃ

প্রথম হলোঃ উটের গোশত খাওয়ার পর অযু করা হলো আল্লাহ তায়ালা উটের গোশত আমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য হারাম থাকার পর আমাদের জন্য তা হালাল ঘোষণা করেছেন তার শুকরিয়া স্বরূপ।

দ্বিতীয় হলোঃ উটের গোশত খাওয়ার পর কারো মনে কোনো ধরনের সন্দেহের চিকিৎসা স্বরূপ অযু করতে হবে। কারণ উটের গোশত বনী ইসরাঈলের সকল নবীদের প্রতি হারাম ছিল। হারাম থাকার পর তা বৈধ ও হালাল ঘোষণা করার পর তার জন্য অযু করা উচিত। আর এরূপ করা অন্তরের প্রশান্তির কারণও। আমার মতে উটের গোশত খেয়ে অযু করা ইসলামের প্রথম দিকে ছিল পরে তা মানসুখ বা রহিত হয়ে গেছে।

মোজার উপর মাসেহ করা

অযুর ভিত্তি হলো ঐ সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধৌত করা যে সব অঙ্গ সাধারণত খোলা থাকে ও যাতে ময়লা-কাদা দ্রুত প্রসার লাভ করে। যখন ঐ সব অঙ্গের উপর মোজা পরিধান করা হয় তখন ময়লা মোজায় লেগে যায় এবং গুপ্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে লুকিয়ে যায়। আরবদের মাঝে সেণ্ডেল ও জুতা পরিধানের ক্ষেত্রে খুফফাইন (চামড়ার মোজা) পরিধান করার অভ্যাস প্রচলন ছিল। প্রত্যেক অযুর সময় মোজা খুলে পা ধৌত করা কষ্টকর ও বিরক্তিকর। এ কারণে খুফফাইন (চামড়ার মোজা) পরিধান কালে কিছু সময়ের জন্য বিষয়টি সহজ করার জন্য পা ধৌত করা সহজতর করে শরীয়ত পা ধোয়ার হুকুম রহিত করে দিয়েছে এবং মোজার উপর মাসেহ করার অনুমতি দিয়েছে।

শরীয়ত যখন কোনো বিদানের ক্ষেত্রে সহজ করার উদ্দেশ্যে ছাড় দেয় তখন এমন কোনো পন্থা অবলম্বন করে না যাতে নফস বেলেগাম অর্থাৎ বন্ধনহীন হয়ে যায় এবং ঐ বিধানকে ভুলে যায়। এখানে মোজার উপর মাসেহ করার জন্য তিনটি শর্তারোপ করেছে।

প্রথম শর্ত হলোঃ মাসেহ করার জন্য  সময় নির্ধারণ করা। মুকীমের জন্য একদিন একরাত। আর মুসাফিরের জণ্য তিন দিন তিন রাত্র। কারণ এ সময় অর্থাৎ একদিন একরাত কোনো বিষয় দেখাশুনা করার জন্য একটি উত্তম সময়। যদি কেউ তা কোনো ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে ইচ্ছা করে। এমনিভাবে তিন দিন তিন রাতও। সুতরাং মুকীম ও মুসাফিরের ক্ষেত্রে এ সময় নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে মূলত তাদের অবস্থার প্রতি দৃষ্টি রেখে।

দ্বিতীয় শর্ত হলোঃ মোজা পবিত্রাবস্থায় পরিধান করতে হবে। এটা এজন্য যে, যেন বান্দার স্মরণ থাকে যে, তার পদযুগল পবিত্রতার উপরই রয়েছে। গুপ্তাঙ্গের উর কেয়াছ করে যেন গুপ্তাঙ্গসমূহে ময়লা কাদা স্বল্প পরিমাণে পৌঁছে থাকে। এ ধরনের কেয়াছ এ সকল ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয় যার সম্পর্কে আত্মাকে সতর্ক করা হয়ে থাকে।

তৃতীয় শর্ত হলোঃ মোজার উপরের অংশে মাসেহ করতে হবে। ধৌত করার পরিবর্তে। যাতেতা পদযুগল ধোয়ার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয়। এবং ধোয়ার চিহ্ন অবশিষ্ট থাকে।

হযরত আলী (রা) বলেছেনঃ

(আরবী***********************************************************************************)

“যদি দ্বীন আকল ও কেয়াছের ভিত্তিতে হতো তা হলে মোজার নিচে মাসেহ করা যুক্তিযুক্ত ছিল উপরে মাসেহ করা হতে”।

আমি বলি যে, মোজার উপর মাসেহ করা যেহেতু ধোয়ার নমুনা অবশিষ্ট রাখার উদ্দেশ্যে। এছাড়া তাতে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। আর মোজার নিচের অংশ জমিনে চলাকালে তা অপরিচ্ছন্ন ও কাদা যুক্ত হয়ে যাবে। অতএব মোজার উপরের অংশে মাসেহ করাই যুক্তিযুক্ত। হযরত আলী (রা) শরীয়তের বিধান সম্পর্কে সাধারণ জনগণ হতে অধিক জ্ঞানী ছিলেন। যেমনটি তাঁর কথা ও ভাষণ হতে প্রমাণিত হয়। তিনি এক্ষেত্রে মানুষ যেন তাদের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে স্বীয় দ্বীনের ক্ষতি সাধন না করে সে উদ্দেশ্যে এরূপ মত ব্যক্ত করেছেন।

গোসলের পদ্ধতি

বুখারী ও মুসলিম শরীফের বর্ণনায় হযরত আয়েশা (রা) ও হযরত মায়মুনা (রা) হতেযে হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং যে বিষয়ে সমগ্র উম্মত ঐকমত্য রয়েছে তা হলো পানির পাত্রে হাত প্রবেশ করানোর পূর্বে গোসলকারী স্বীয় উভয় হাতকে ধুয়ে নেবে। অতঃপর দেহ ও লিঙ্গের যে স্থানে নাপাকী থাকবে তা ধুয়ে নেবে। তারপর নামাযের অযুর ন্যায় অযু করবে। তারপর চুলের গোড়ায় অঙ্গুলি দ্বারা ঘষে পানি পৌঁছাবে। তারপর সমগ্র দেহের উপর পানি ঢালবে। গোসলের এ পুরো পদ্ধতিতেই সমগ্র উম্মতের ঐকমত্য রয়েছে। শুধুমাত্র একটি বিষয়ে দ্বিমত বা মতভেদ রয়েছে আর তা হচ্ছে –গোসলের সময় অযু করার ক্ষেত্রে পা কখন ধোবে। অযুর সাথে না কি গোসল সমাপন করার পর? কারো কারো মতে যদি এমন জায়গায় গোসল করে যে স্থানে পানি জমে থাকে তাহলে পা পরে ধুবে। আর যদি পানি সাথে সাথে সরে যায় তাহলে অযুর সময়ই পা ধুয়ে নেবে।

গোসল করার পূর্বে হাত ধোয়ার কারণঃ ঐ সব কারণ যা অযুর অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে। তা হচ্ছে দীর্ঘ সময় হাত না ধোয়ার কারণে হাতে ময়লা কাদা লেগে যেতে পারে। আর জানাবাতের পর তো হাত অপবিত্র হওয়া স্বাভাবিকই, তাই তা ধোয় অত্যাবশ্যকীয়। তখণ হাত না ধুয়ে তা পানির পাত্রে প্রবেশ করালে পানি নাপাক ও অপবিত্র হয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থেকেই যায়। আর তা সভ্যতা, ভদ্রতা ও সুরুচির বিপরীত।

গোসল শুরুর পূর্বে লজ্জাস্থান ধৌত করার কারণঃ যদি গোসল করার পূর্বে লজ্জাস্থান ধৌত করানা হয় এবং দেহে পানি প্রবাহিত করে দেয়া হয় তাহলে নাপাকী সারা শরীরে লেগে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং তা পরিস্কার করা কষ্টকর ও অধিক পরিমাণে পানির প্রয়োজন পড়বে। এজন্য গোসলের পূর্বেই লজ্জাস্থান ধুয়ে নিতে হবে।

এছাড়াও জানাবতের গোসল তো নাজাছাতে হুকমিয়াকে দূর করার উদ্দেশ্যে করা হয়। যদি নাপাক দেহে জানাবতের গোসল করা হয় তাহলে গোসলের উদ্দেশ্যে দুই নাজাছাত দূর করা হবে। তখন হদছের গোসলের জন্য তা নির্দিষ্ট হবে না। এজন্য নাজাছাতে হাকিকীকে পৃথকভাবে ধুয়ে নেয়া কর্তব্য, যাতে গোসল নাজাছাতে হুকমিয়ার জন্য নির্দিষ্ট হয়ে যায়।

গোসলের শুরুতে অযু করাঃ গোসল হচ্ছে বড় পবিত্রতা। তার দাবি হচ্ছে তা ছোট পবিত্রতার (অযুর) উপর আরো কিছু অধিক প্রভাবশীল হোক যাতে নফস পবিত্রতা সম্পর্কে আরো ভালোভাবে অবগত থাকে।

অপরদিকে গোসলের বেলায় দেহের ভাঁজ করা অঙ্গগুলোর প্রতি খেয়াল রাখা অত্যন্ত জরুরী। আর অযু হচ্ছে দেহের সে ভাঁজ করা অঙ্গগুলোর প্রতি খেয়াল দেয়া বিষয়গুলোর অন্তর্ভুক্ত। কারণ যদি অযু করা ব্যতীত দেহের উপরি অংশ বা মাথা হতে দেহের উপর পানি প্রবাহিত করে দেয়া হয় তাহলে দেহের ভাঁজকৃত বা কোকড়ানো অংশগুলোতে পানি নাও পৌঁছতে পারে। যতক্ষণ পর্যন্ত না এদিকে বিশেষ নজর দেয়া হয়, ঐ অংশগুলো শুকনো থেকে যেতে পারে। এজন্য উত্তম হলো গোসলের পূর্বে অযু করে নেয়া যাতে দেহের সমস্ত অংশ ধুয়ে যায়।

পদযুগল পরে ধোয়ার রহস্যঃ যাতে করে খামাখা-অনর্থক বিনা প্রয়োজনে বারবার পা ধুতে না হয় এজন্য। হে আল্লাহ! যদি কেউ অযুর হেফাজতের উদ্দেশ্যে তা করে তাহলে তা দোষের নয়।

সমগ্র বদনকে তিনবার ধৌত করে সমগ্র দেহকে ভালোভাবে ধৌত করা, দেহের ভাঁজকৃত অংশগুলোর প্রতি বিশেষভাবে নজর দেয়া ও ভালোভাবে সেগুলোতে পানি পৌঁছানো এবং পর্দার আড়ালে অবস্থান করে গোসল করার প্রতি গুরুত্ব দেয়াকে মোস্তাহাব ঘোষণা করে শরীয়ত প্রণেতা গোসলকে পূর্ণতা দিয়েছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী**********************************************************************************)

“আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত লজ্জাশীল ও পর্দানশীল”। এ হাদীসের ব্যাখ্যা তার এ বাণীঃ

(আরবী*******************************************)

“আল্লাহ লজ্জাশীলতা ও পর্দা করাকে পছন্দ করেন”। লোক চক্ষু হতে পর্দা করা ওয়াজিব। লোকদের এমনভাবে হওয়া উচিত যেন যদি কখনো হঠাৎ করে কেউ উপস্থিত হয়ে যায় তাহলেও যেন তার সতর দেখতে না পায়। এরূপ করা মোস্তাহাব।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী****************************************************************************)

মিশকে ভেজানো কাপড়ের টুকরা নিয়ে তদ্বারা পবিত্রতা অর্জন কর। অর্থাৎ তা দ্বারা রক্তের চিহ্ন দূর করে নাও।

আমি বলি যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কয়েক অর্থে হায়েজা-ঋতুবতী নারীকে মেশকে ভেজানো কাপড়ের টুকরা ব্যবহার করে রক্তের দাগ মুছেনিয়ে পবিত্র হতে হুকুম করেছেন।

তন্মধ্যে (১) এর দ্বারা অধিক পরিমাণে পবিত্রতা অর্জন করা উদ্দেশ্য। কারণ খুশবু পবিত্রতার কাজ করে থাকে অর্থাৎ অন্তরে আনন্দের সঞ্চার করে। কষ্টকর হওয়ার কারণে সকল গোসলের সময় সুগন্ধি ব্যবহারের বিধান দেয়া হয়নি।

(২) মেশক মিশ্রিত নেকড়া ব্যবহার করার দ্বারা হায়েজের –ঋতুস্রাবের কারণে যে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয় তা দূর করা উদ্দেশ্য।

(৩) হায়েঝ তথা ঋতু শেষ হওয়া ও পবিত্রতা আরম্ভ হওয়ার শুরুর সময়টি হচ্ছে সন্তান কামনা করার সময়। এ সময়ে স্বামী-স্ত্রী একের প্রতি অপরের আকর্ষণ বৃদ্ধি পায়। এবং রেহেমেও সন্তান ধারণের ক্ষমতা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। তখন সুগন্ধি তাকে আরো অধিক শক্তি সঞ্চয়ে সহায়তা করে।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ছা হতে পাঁচ মুদ পর্যন্ত পানি (এক ছায় প্রায় এক কেজি আর এক মুদ হলো ৭৮৭ গ্রাম) গোসলের ক্ষেত্রে এবং এক মুদ পানি অযুর ক্ষেত্রে ব্যবহার করতেন। মধ্যমদের দেহের জন্য এ পরিমাণ পানির ব্যবহার যথেষ্ট।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

(আরবী*************************************************************************)

“প্রত্যেক পশমের নিচে অপবিত্রতা বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং প্রত্যেকটি পশমকে ধৌত কর ও চামড়াকে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন কর।

এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী*********************************************************************************)

“যে ব্যক্তি একটি পশম পরিমাণ অপবিত্রতা গোসলের সময় ত্যাগ করল –যা ধৌত করেনি তাহলে সে অপবিত্রতার জন্য তাকে এমন এমন কঠোর শাস্তি দেয়া হবে”।

আমি বলি যে, এর রহস্য হলো যেমনটি আমরা অযু সংক্রান্ত ব্যাপারে ও অযু পরিপূর্ণভাবে হওয়ার বিষয়ে বলেছি, অর্থাৎ যখন দেহের সমগ্র অংশ একটি পশমসহ ভালোভাবে ধৌত করা হবে তখনি পরিপূর্ণভাবে গোসল হবে। ব্যক্তির জানাবাত অবস্থায় তথা অপবিত্র অবস্থায় থাকা এবং অপবিত্রতা বিদূরীত না করা ও এ ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করা ব্যক্তিকে জাহান্নামের শাস্তিযোগ্য করে দেয়। যদি অপবিত্র থেকে যায় তাহলে ঐ অংশের মধ্যে আল্লাহর হুকুম অমান্য করা হলো। এ কাণে দেহের ঐ অংশ শাস্তিযোগ্য হবে। এ কারণে সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দুঃখিত ও অসন্তুষ্ট হবে যে অংশের মধ্যে পবিত্রতার কমতি হয়েছে।

গোসল ওয়াজিবকারী বস্তুসমূহ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

(আরবী*******************************************************************************)

“যখন কোনো ব্যক্তি নারী উদগম হবে তখন তার বীর্য স্খলন না হলেও তাতে গোসল ওয়াজিব হবে”।

আমি বলি যে, বর্ণনার ক্ষেত্রে হাদীসের বিভিন্নতা রয়েছে। (আরবী*********) তথা সহবাস শুরু করার পর যদি লিঙ্গ থেমে যায় অথবা এমন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কারণ ঘটে যার কারণে স্বামী তার স্ত্রী হতে পৃথক হয়ে যায়, এমতাবস্থায় বীর্য স্খলন না ঘটে তাহলে এটিকে পরিপূর্ণ মিলনের হুকুমে ধরা হবে কিনা? আর পরিপূর্ণ মিলন বলতে ঐ মিলনকে বুঝানো হয়, যে মিলনে প্রয়োজনীয়তা পরিপূর্ণতা প্রাপ্ত হয় এবং যে মিলনে বীর্য স্খলন ঘটে। যে বর্ণনাটি সত্য ও যে বিষয়ে সকর ওলামায়ে কেরামের ঐকমত্য রয়েছে তা হচ্ছে –যে ব্যক্তিই স্ত্রী উদগম হবে তাতেই তাদের উভয়ের উপর গোসল ওয়াজিব হবে, চাই তাতে বীর্য স্খলন হোক বা না হোক।

উক্ত হাদীস এবং অপর হাদীসঃ (আরবী*********************************) “পানি হতে পবিত্রতা পানি দ্বারাই হয়ে থাকে”। এর মধ্যে সাম্যতা বিধানের ক্ষেত্রে মতভেদের সৃষ্টি হয়েছে। এক্ষেত্রে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন য, (আরবী**********************)

এ হাদীস স্বপ্ন দোষের এহতেলামের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর এতে যা রয়েছে তাই অর্থাৎ এ হাদীসের শানে অরুদ পূর্বে উল্লেখিত হাদীসের খেলাপ। হযরত উবাই ইবনে কাব বলেছেন যে, বীর্য স্খলনের দ্বারা গোসল ওয়াজিব হওয়া ইসলামের প্রাথমিক অবস্থার বিষয়টি সহজ করার জন্য ছিল, পরে তা মানসুখ তথা রহিত হয়ে গেছে।

হযরত উসমান, হযরত আলী, হযরত তালহা, হযরত জুবায়ের এবং উবাই বিন কাআব ও আবু আইউব (রা)-এর সকলের থেকে বর্ণিত রয়েছে যে, যেই তার স্ত্রী উদগম হবে এবং তার বীর্য স্খলন হবে না তাকে নামাযের অযুর ন্যায় অযু করে নিতে হবে। এবং সে তার লিঙ্গ ধুয়ে নেবে। এ বর্ণনাটি মারফু পদ্ধতিতে বর্ণিত রয়েছে।

আমার দৃষ্টিতে এ হাদীসকে (আরবী*********************) তথা  এমন যৌন মিলন ধরা হবে যাতে কোনো আড়াল ব্যতীত লিঙ্গকে লিঙ্গের সাথে লাগানো হবে এবং পুং লিঙ্গকে স্ত্রী লিঙ্গের মধ্যে প্রবেশ করানো হবে না। শুধুমাত্র তখনি গোসল ওয়াজিব হবে যখন বীর্য স্খলন হবে। তা না হলে গোসল ওয়াজিব হবে না। এ জাতীয় মিলনকেও কখনো কখনো যৌন মিলন হিসেবে ধরা হয়ে থাকে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, যে তার বস্ত্র ভিজা দেখতে পায়, আর্দ্রতা অনুভব করে এবং স্বপ্নের কথা স্মরণ নেই। স্বপ্নদোষের কথা স্মরণে পড়ে না তার বিধান কি? তিনি বললেন –“তাকে গোসল করতে হবে”। তাকে ঐ ব্যক্তি সম্পর্কেও জিজ্ঞেস করা হলো, যে স্বপ্নে দেখেছে যে তার স্বপ্নদোষ হয়েছে কিন্তু সে আর্দ্রতা অনুভব করে না বা আর্দ্রতা দেখতে পায় না তার বিধান কি? তিনি বললেন, “তাকে গোসল করতে হবে না”।

আমি বলছি যে, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোসল ওয়াজিব হওয়াকে আর্দ্রতার সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। স্বপ্ন দেখার, স্বপ্নদোষ হওয়ার সাথে সম্পৃক্ত করেন নি। কারণ স্বপ্ন দেখা কখনো কখনো শুধুমাত্র অন্তরের খেয়ালই হয়ে থাকে। তার কোনো তাছির পরিলক্ষিত হয় না। আবার কখনো স্বপ্নের মাধ্যমে শাহাওয়াত তথা কামভাব পূর্ণ হয়ে যায় অর্থাৎ বীর্য স্খলন হয়ে যায়। তখন অবশ্যই আর্দ্রতা বিদ্যমান থাকবে। তখন আর্দ্রতার উপরই হুকুম দেয়া হবে।

আর আর্দ্রতা এমন এক অবস্থা যা অনুভক করা যায়। কারণ বান্দা তো কখনো কখনো স্বপ্নের কথা ভুলে যায়। এজন্য গোসল ওয়াজিব হওয়ার হুকুম আর্দ্রতার সাথে সম্পৃক্ত, স্বপ্ন দেখার সাথে নয়। পবিত্রতা ও হায়েজ –ঋতুকালের ও পবিত্রতার দীর্ঘায়িত হওয়া বা স্বল্পমেয়াদী হওয়া নারীর মেজাজ তথা স্বভাব, খাদ্য ও এ জাতীয় অপরাপর বস্তুর বিভিন্নতার কারণে বিভিন্ন হয়ে থাকে। এতদুভয়ের জন্য এমন একটা নির্ধারিত সময় নির্ধারিত করা যা সকল নারীর ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য হবে তা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে নারীদের অভ্যাসের বিষয়টিকে ধর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করাই বিশুদ্ধ ও সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য। স্বয়ং রমণী যে রক্তকে হায়েজের তথা ঋতুস্রাবের রক্ত মনে করবেন তাই হায়েজ। আর যে রক্তকে ইস্তিহাজার রক্ত মনে করবে তাই ইস্তিহাজার রক্ত। সাহাবা ও তাবেয়ীনদের এ ব্যাপারে মতবিরোধের কারণও এ যে, তাঁরা রমণীদের অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছেন, গড়ে কোনো বিষয় নির্ধারিত করেননি।

হামনা (রা) ইস্তিহাজা সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লমা-এর নিকট মাসয়ালা জানতে চাইলে, তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে রুই এবং লেগাম বাঁধার হুকুম দিলেন। এবং তাকে দুটি বিষয়ে বললেন।

আমি বলি যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দেখলেন যে, ইস্তিহাজার রক্ত কোনো সুস্থ নারীর দেহের রক্ত নয় বরং তা অসুস্থ নারীর রক্ত। ইস্তিহাজার কারণে দীর্ঘ লম্বা সময় পর্যন্ত নামায ত্যাগকরার কারণে নামাযের প্রতি অনীহা প্রদর্শিত হয়। এ কারণে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইস্তিহাজার সময় পৃথক ও নির্বাচিত করে নেয়ার হুকুম দিয়েছেন, যাতে সে হায়েজের তথা মাসিক ঋতুস্রাবের দিনগুলোতে নামায বাদ দিতে এবং ইস্তিহাজার দিনগুলোতে নামায আদায় করতে পারে। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হামনাকে দুটি বিষয় বলে দিলেন –(১) তিনি বললেন যে, ইস্তিহাজা কোনো রগের রক্ত। অর্থাৎ এটি একটি পেঁচানো অসুস্থতা। আর এ রক্ত নাকছির তথা নাক হতে ক্ষরণের ন্যায় রক্ত। হায়েজের বা ঋতুস্রাবের রক্ত নয়। যদি নারী সুস্থ অবস্থায় প্রতি মাসের ঋতুস্রাবের জন্য একটা নির্ধারিত সময় থাকে তাহলে এ ক্ষেত্রেও ঐ নিয়মই মেনে চলবে। নিজের ইদ্দত অনুযায়ী নিজেকে ঋতুবতী মনে করবে। যখন সে সময় অতিবাহিত হয়ে যাবে তখন নিজেকে পবিত্র মনে করবে এবং নিয়মানুযায়ী নামায আদায় করতে আরম্ভ করে দেবে। এভঅবে সে নিজের হায়েজকে ইস্তহাজা হতে পৃথক করে নেবে। তখন তাকে হায়েজ ও ইস্তিহাজার মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করে নিতে হবে। তখন রক্তের রং দেখে তা ঠিক করতে পারবে। যেমন কালো রঙের রক্তকে ঋতুস্রাবের রক্ত ধরে নেবে। এ ছাড়া তার পূর্বেকার নিয়মিত নিয়মকে ইস্তিহাজা ধরে নেবে।

(২) ইস্তিহাজা যেহেতু বিকৃত ঋতুস্রাব এজন্য ইস্তিহাজা বিশিষ্ট নারীকে নৈদিক পাঁচবারগোসল করতে হবে। অর্থাৎ প্রত্যেক নামাযের জন্য গোসল করতে হবে। যদি তা কষ্টকর মনে করে তাহলে তিনবার গোসল করতে হবে। যেহেতু এটা হায়েজ নয় বরং বিকৃত হায়েজ; সেহেতু নামায মাফ হবে না। সে এমতাবস্থায় নামাযও পড়বে এবং রোজাও রাখবে।

রুই ব্যবহার ও লেগাম বাঁধার মধ্যে হিকমতঃ (১) রক্ত অবস্থানরত রক্তেরসাথে মিশে যাবে এবং সে স্থান হতে অন্যত্র প্রসারিত হতে পারবে না। অর্থাৎ রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাবে। (২) যাতে রক্ত নারী দেহ এবং পরিধেয় কাপড়ে লাগতে না পারে। জমহুর ফকীহগণ প্রথম অবস্থার উপর মতামত ব্যক্ত করেছেন।

অপবিত্র ও অযুহীন ব্যক্তির জন্য কি করা বৈধ আর কি করা অবৈধ

আল্লাহর নিদর্শনাবলির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ওয়াজিব। আল্লাহর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে নামায, কাবা ও পবিত্র কুরআন। এগুলোর প্রতি সবচেয়ে বড় সম্মান প্রদর্শন হলো পরিপূর্ণ পবিত্রতা অর্জন ব্যতীত মানুষ তার নিকটবর্তী হবে না। অর্থাৎ প্রথমে এমন কোনো আমল করবে যাতে অন্তরে আল্লাহর নিদর্শনাবলির সম্মান ও বিশালতা সৃষ্টি হয়। এ জন্য উক্ত তিনিট আল্লাহর নিদর্শনের নিটকবর্তী হওয়ার জন্য পবিত্রতা, পরিপূর্ণ পবিত্রতা অর্জন অতীব জরুরী।

পবিত্র কুরআন পাঠের জন্য অযু করা শর্ত করা হয়নি। কারণ সর্ব সময়ে কুরআন পাঠের জন্য পবিত্রতার শর্তারোপ করলে পবিত্র কুরআন হেফজ করা ও তা শিক্ষা করার ব্যাঘাত ঘটবে। সুতরাং সর্বদা কুরআন পাঠের দরজা উন্মুক্ত রাখা। সেজন্য উৎসাহ, তারগীব দেয়া এবং যে ব্যক্তি কুরআন হেফজ করতে চায় তার জন্য সহজ করা অতীব প্রয়োজন। হদছে আকবর তথা বড় ধরনের অপবিত্রতার ক্ষেত্রে পবিত্রতার প্রতি তাকিদ দেয়া  হয়েছে। সুতরাং অযু ব্যতীত নিজে কুরআন পাঠ করা জায়েজ নেই। আর অপবিত্র ও হায়েজ তথা ঋতুবতী নারীর জন্য মসজিদে প্রবেশ করা নিষিদ্ধ। তা এজন্য যে, মসজিদ তৈরিই করা হয়েছে নামায ও যিকিরের উদ্দেশ্যে। আর মসজিদ আল্লাহর নিদর্শনাবলির অন্তর্ভুক্ত এবং পবিত্র কাবা শরীফের নমুনা। নবীর সাহচর্য লাভের জন্য পবিত্রতা অর্জনকে শর্ত করা হয়নি। তা এজন্য যে, প্রত্যেক ব্যক্তির প্রত্যেক বস্তুর সম্মান তার অবস্থান প্রেক্ষিতে হয়ে থাকে। নবী তো একজন মানুষই ছিলেন। অন্যান্য মানুষের যেমন হদছ, জানাবত হয় তাঁরও হয়তো হয়। সুতরাং তাঁর সাহচর্যের জন্য পবিত্রতা অর্জন শর্ত করা বিপরীত বস্তু বা বিষয় হয়ে যায়।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

(আরবী************************************************************************************)

“ঐ ঘরে ফিরিশতা প্রবেশ করে না, যে ঘরে ছবি থাকে, কুকুর থাকে ও যে ঘরে অপবিত্র ব্যক্তি থাকে”। আমি বলি যে, এর অর্থ হলো –ফিরিশতারা এ বিষয়গুলোকে অপছন্দ করেন ও এগুলো এড়িয়ে চলেন। ফেরেশতারা যা পছন্দ করে এগুলো তার বিপরীত। ফিরিশতারা পবিত্রতা পছন্দ করে এবং মূর্তি পূজা করে অপছন্দ।

রাত্রে যার অপবিত্রতাবস্থা হয় তার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

(আরবী*******************************************************************************)

“অযু কর, তোমার লিঙ্গ ধুয়ে নাও, অতঃপর নিদ্রা যাও”।

আমি বলি যে, যখন অপবিত্রতা –জানাবত ফিরিশতাদের অবস্থার বিপরীত তাহলে মুমিনদের কর্তব্য হলো তারা শর্তহীন হবে না নিজেদের প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রে। অর্থাৎ শয়নে ও ভক্ষণে জানাবাতের তথা অপবিত্রতার সাথে যখন বড় ধরনের পবিত্রতা অর্জনে অক্ষম হবে তখন ছোট অপবিত্রতাও ত্যাগ করবে না। কারণ উভয় পবিত্রতার বিষয়টি একই। যদিও শরীয়তদাতা দুটাকে দু’ধরনের অপবিত্রতার জন্য ভাগ করে দিয়েছেন।

তাইয়াম্মুমের বর্ণনা

মহান আল্লাহর বিধানে তার বান্দারা যে কাজ করতে অক্ষম তা সহজতর করার একটি সুন্নাত তথা নিয়ম চালু রয়েছে। সে সব সহজ করার পদ্ধতিগুলোর মাঝে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য দাবি হচ্ছে যে সব কাজ কষ্টসাধ্য সে সব তার বান্দার প্রশান্তির সৃষ্টি হয়। আর তা পরিপূর্ণভাবে রহিত করার কারণে কোনো ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া না হয়। যা তিনি তাদের উপর অত্যাবশ্যকীয় করে দিয়েছিলেন। পবিত্রতা বর্জনে তারা অভ্যস্ত হয়ে না পড়ে। সুতরাং তাই ঘুমের মাধ্যমে অসুস্থতা ও সফররত অবস্থায় অযু ও গোসলের বিধানকে রহিত করে দিয়েছেন।

যখন বিষয়টি এমন হলো তখন আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে হুকুম হলো তাইয়াম্মুমকে অযু ও গোসলের স্থানে স্থলাভিষিক্ত করার। এতে করে অস্তিত্বলাভ করল এক সামঞ্জস্যপূর্ণ বিধান এ মর্মে যে, তাইয়াম্মুমও এক ধরনের পবিত্রতাই। আর এ বিধান ঐসব গুরুত্বপূর্ণ বিধানগুলোর অন্যতম বিধানে পরিণত হলো যেসব বিধানে উম্মতে, মিল্লাতে মুহাম্মদী অন্যান্য মিল্লাত হতে শ্রেষ্ঠতম। আর এক্ষেত্রে আমাদের প্রিয় নবীর বাণী হলোঃ

(আরবী****************************************************************************)

“আমরা যখন পবিত্রতা অর্জনের জন পানি পাব না তখণ জমিনের মাটি আমাদের জন্য পবিত্র করে দেয়া হয়েছে”।

আমি বলি যে, মাটি দ্বারা তা ইয়াম্মুম করার বিধান দেয়ার কারণ হলোঃ

(১) মাটি সহজ প্রাপ্য। সাগর ব্যতীত সকল স্থানেই তা পাওয়া যায়। সুতরাং এর দ্বারা সমস্যার সমাধান করা অধিকতর সহজ। (২) অনেক ক্ষেত্রেই মাটি পবিত্রতার মাধ্যম; যেমন চামড়ার মোজা ও তরবারিতে নাপাক  লেগে গেলে তা না ধুয়ে মাটি দ্বারা রগড়িয়ে দিলে নাপাক পবিত্র হয়ে যায়। (৩) মাটিতে হাত মেরে তা মুখমণ্ডলে ফিরিয়ে দেয়ার মাধ্যমে নাপাক পাক হয়ে যায়।

এটাও মুখমণ্ডলকে মাটির সাথে মেলানোর ন্যায়ই। আর তা ক্ষমা প্রার্থনার জন্য দরখাস্তের মতোই। অর্থাৎ পানি না পাওয়া আমাদের দুর্বলতার প্রকাশ। এজন্য তাইয়াম্মুমের মাধ্যমে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

শরীয়ত অযুর জন্য তাইয়াম্মুম ও গোসলের জন্য তাইয়াম্মুমের মধ্যে কোনো ধরনের পার্থক্য করেনি। উভয় তাইয়াম্মুম একই ধরনের। আল্লাহ তায়ালা প্রচলিত তাইয়াম্মুমের মধ্যে এ বিশেষ গুণ ও বৈশিষ্ট্য নিহিত রেখেছেন যে, সে উভয় হদছের –অপবিত্রতাকে পবিত্র করতে সক্ষম। সুতরাং তাইয়াম্মুম তার স্বীয় বৈশিষ্ট্যে গুণান্বিত। এ ক্ষেত্রে পৃথক পৃথক তাইয়াম্মুমের প্রয়োজন নেই। আর এ বিধান সে সব ক্ষেত্রে মেনে নেয়া উচিত যেসব ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধানের রহস্য সাধারণ দৃষ্টিতে বুঝে আসে না। লোকদের অন্তর এতেই প্রশান্তি লাভ করে।

গোসলের তাইয়াম্মুমের জন্য মাটিতে লুটোপুটি খাওয়া এক ধরনের পেরেশানি। তাতে দোষ সম্পূর্ণভাবে বিদূরিত হয় না।এক দুর্বলতার এলাজ হলে দ্বিতীয় দুর্বলতা এসে পড়ে। এজন্য গোসলের তাইয়াম্মুমও অযুর তাইয়াম্মুমের মতোই।

ভীষণ ঠাণ্ডাও রোগের ন্যায়ই। যদি ভীষণ ঠাণ্ডা পড়ে আর তখন ঠাণ্ডা পানি দ্বারা গোসল করলে রোগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকে তাহলে তাইয়াম্মুম করা জায়েজ। আমর ইবনুল আসের হাদীস তার প্রমাণ। সফর কোনো শর্ত নয় বরং তা পানি পাওয়া না পাওয়ার একটি কারণ। যা সহজে বুঝে আসে।

তাইয়াম্মুমের ক্ষেত্রে পা মাসেহ করার হুকুম এজন্য দেয়া হয়নি। কারণ পা হলো ময়লা কাদা লেগে থাকার জায়গা। ঐ বস্তুরই হুকুম দেয়া হয় যার দ্বারা আত্মা প্রশান্তি লাভ করে।

তাইয়াম্মুমের পদ্ধতিঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে দ্বীন গ্রহণ করার ব্যাপারে দ্বিমত পূর্ণ মাসায়েলগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম একটি।

তাবেয়ীদের মধ্যকার অধিকাংশ ফকীহগণ মোহাদ্দেসীনদের অনুসৃত পদ্ধতিই গ্রহণ ও অনুসরণ করেছেন যে, তাইয়াম্মুম হলো দুবার জমিনে হাত মারা। একবার মুখমণ্ডল মাসেহ করার জন্য, দ্বিতীয়বার কনুইসহ উভয় হাত মাসেহ করার জন্য।

এ সম্পর্কে হাদীসসমূহের মধ্যে বিশুদ্ধতম হাদীস গুলো হযরত আম্মার (রা) বর্ণিত হাদীস।

(আরবী*****************************************************************)

“তোমার তাইয়াম্মুমের জন্য যথেষ্ট হলো, তোমার উভয় হাত দ্বারা জমিনে মারা তারপর তাতে ফু দিয়ে তা দ্বারা প্রথমে তোমার মুখমণ্ডল ও পরে তোমার হাত মুছে নেয়া”।

ইবনে উমরে বর্ণনায় আছে যে,

(আরবী************************************************************************************)

“তাইয়াম্মুম হলো দুবার জমিনে হাত মারা। একবার মুখমণ্ডলের জন্য আরেকবার উভয় হাত কনুই সহ মাসেহ করার জন্য”।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আমল ও সাহাবাদের আমল উভয় পদ্ধতিতেই বর্ণিত হয়েছে।

উভয় বর্ণনার মধ্যে সামঞ্জস্য প্রদানঃ উভয় হাদীসের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের দিকে হাদীসের শব্দই পথ নির্দেশ করে (আরবী************************) “তোমার জন্য যথেষ্ট” এর দ্বারা বুঝা যায় যে, তাইয়াম্মুমের নিম্নতম সীমা হলো এতটুকু। আর দ্বিতীয়টি হলো তাইয়াম্মুমের সুন্নাত পদ্ধতি। সাহাবা ও তাবেয়ীদের তাইয়াম্মুমের বিষয়ে মতপার্থক্যের বিষয় হলো কেউ সর্বনিম্ন সীমার আমল করে আর কেউ সুন্নাত পদ্ধতির উপর আমল করে থাকে।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আমলের ব্যাখ্যা এরূপ হতে পারে যে, তিনি আম্মারকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, তাইয়াম্মুমের মধ্যে জমিনে হাত মারার কারণে যা হাতে লেগেছে তাই যথেষ্ট। এখানে জমিনে শুয়ে যাওয়া উদ্দেশ্য নয়। আর তিনি এ ক্ষেত্রে তাইয়াম্মুমকারী কতটুকু অংশ মাসেহ করবে তা বলে দেয়াও উদ্দেশ্য নয়। আর না কতবার জমিনে হাত মারাবে তা বলাই উদ্দেশ্য। অর (আরবী***********) শব্দ দ্বারা যে সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে তা দ্বারা তাই বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ তাইয়াম্মুমের মধ্যে অযুর ও গোসলের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য নেই।

এ জাতীয় মাসয়ালার ক্ষেত্রে যতটুকুতে জিম্মাদারী পূর্ণ হয় অতটুকু গ্রহণ করাই মানুষের কর্তব্য।

হযরত উমর ও ইবনে মাসউদ-এর মতে জানাবতের ক্ষেত্রে তাইয়াম্মুম জায়েম নেই। তারা উভয় আয়াতকে লমছ অর্থাৎ ছোয়া তথা স্পর্শ করার ক্ষেত্রে গ্রহণ করেন। তারা বলেন যে, নারীকে স্পর্শ করা অযু ভঙ্গের কারণ। কিন্তু ইমরান ও আম্মারের হাদীস এর বিপরীত বুঝায়।

আমি কোনো বিশুদ্ধ হাদীসে এরূপ দেখতে পাইনি যে, প্রত্যেক ফরজ নামাযের জন্য তাইয়াম্মুম করতে হবে। অথবা ভেগে যাওয়া ক্রীতদাসের জন্য বা এ জাতীয়দের জন্য তাইয়াম্মুম জায়েজ নেই। এ সবই ইস্তমাতী মাসায়ালা।

জখম ওয়ালা ব্যক্তি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী***********************************************************************************)

“তার জন্য যথেষ্ট ছিল তাইয়াম্মুম করা এবং স্বীয় জখমের উপর কোনো কাপড় বেঁধে নিয়ে তার উপর মাসেহ করা এবং অবশিষ্ট অঙ্গ ধুয়ে নেওয়া”।

আমি বলি যে, যেমনিভাবে তাইয়াম্মুম সমগ্র দেহের গোসলের স্থলাভিষিক্ত তেমনিভাবে দেহের একটি অংশের গোসলেরও স্থলাভিষিক্ত। অর্থাৎ তাইয়াম্মুম যেমনিভাবে সমগ্র দেহের অপবিত্রতা দূর করে তেমনিভাবে দেহের এক অংশের অপবিত্রতাও দূর করে থাকে।

তাইয়াম্মুমের মাঝে আল্লাহ তায়ালা পূর্ণ দেহ ও আংশিক দেহ উভয়ের পবিত্রকরণের বৈশিষ্ট্য রেখেছেন। জখমের উপর অথবা পট্টির উপর মাসেহ করার হুকুম পূর্বে উল্লেখিত মোজার উপর মাসেহ অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে। আর তা হলো এখানে মাসেহ এজন্য যেন এ স্থানটি ধোয়ার কথা স্মরণে থাকে। আর এ মাসেহ গোসলের নমুনা।

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বাণীঃ

(আরবী*****************************************************************************)

“পবিত্র মাটিই মুসলমানের পবিত্রতার মাধ্যম। যদি দশ বছর দীর্ঘ সময় পর্যন্তও পানি না পাওয়া যায়”।

আমি বলি এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সীমালঙ্ঘন করার পথ রুদ্ধ করা। এসব ক্ষেত্রে সীমা লঙ্ঘনকারীরা সীমালঙ্ঘন করে থাকে। শরীয়ত যেসব ক্ষেত্রে রোখছত দিয়েছে সে সব ক্ষেত্রে তারা আল্লাহর হুকুমের বিপরীত কাজ করে।

প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণ করার আদব

পায়খানা প্রস্রাবের আদব

এটি কতগুলো বিষয়ের সাথে জড়িতঃ

(১) কেবলার প্রতি সম্মান প্রদর্শন। আর তা হচ্ছে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী************************************************************************)

“যখন তোমরা প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূর্ণ করতে যাবে তখন কেবলার দিকে মুখও করো না। আর কেবলার দিকে পিঠও দিও না”।

এতে অপর একটি হিকমত নিহিত রয়েছে। তা হচ্ছে ইবাদতের সময় অন্তরকে আল্লাহর দিকে একাগ্র রাখা জরুরি। আর অন্তরকে আল্লাহর দিকে একাগ্র রাখা একটি গোপনীয় বিষয়। এজন্য অত্যাবশ্যকীয় হচ্ছে এমন একটি বস্তুকে নিশানা হিসেবে ঠিক করে নেয়া যা অন্তরের একাগ্রতার স্থলাভিষিক্ত হতে পারে। পূর্বেকার শরীয়তগুলোতে ঐ সব ইবাদতখানায় পৌঁছাকে আন্তরিক একাগ্রতায় মাকাম করা হয়েছিল। যা আল্লাহর বন্দেগীর জন্য তৈরি করা হতো আর যা আল্লাহর নিদর্শনাবলির মধ্যে গণ্য হতো। আর আমাদের শরীয়তে কেবলার দিকে মুখ করা এবং তাকবীর বলাতে তাওয়াজজুহে কলবীর –তথা অন্তরের একাগ্রতার স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে। কেবলামুখী হওয়া যখন আল্লাহর প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও অন্তরের একাগ্র হওয়া এবং আল্লাহর যিকিরে অন্তর মগ্ন হওয়ার স্থলাভিষিক্ত। আর তা এমন পর্যায়ের যে, কেবলার দিকে মুখ করার মাধ্যমে আল্লাহর স্মরণ হয়। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ থেকে এ কথা ইস্তিমান করলেন যে, কেবলামুখী হওয়াকে সম্মানের সাথে খাছ করা জরুরি। আর সে খাছ করার ছুরত হলো পাকৃতিক প্রয়োজন পূর্ণ করার সময় কেবলার দিকে মুখ করা বা পেছন দেয়ার অনুমতি দেয়া যাবে না। অর্থাৎ যে অবস্থা নামাযের অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত তা করার অমুনতি দেয়া যাবে না।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাবার দিকে মুখ করে ও পিঠ দিয়ে প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূর্ণ করা বর্ণিত আছে। এক্ষেত্রে জঙ্গলে কেবলামুখী হওয়া ও পিঠ দেয়া নিষিদ্ধ এবং দালানের ভেতরে তা মোবাহ বলা হয়েছে। এবং নিষিদ্ধকে মাকরূহ হিসেবে ধরা হয়েছে। আর এটা অধিক পরিস্কার।

তন্মধ্যে রয়েছেঃ পবিত্রতা প্রমাণ করা। তিনটি পাথর খণ্ডের কমে ইস্তিঞ্জা করতে নিষেধ করা হয়েছে। অর্থাৎ তিনবার পরিস্কার করতে হবে। কারণ সাধারণত তিনবারের কমে পবিত্রতা অর্জিত হয় না। তিন খণ্ড পাথর দ্বারা, ঢিলা দ্বারা পরিস্কার করার পর পানি ব্যবহার করা মোস্তাহাব।

তন্মধ্য রয়েছেঃ সেই বস্তু হতে বেঁচে থাকা যা মানুষকে কষ্ট দেয়। যেমন যে সব স্থানে মানুষ ছায়া পায় –গাছের নিচে, মানুষের চলার পথে, মানুষ যে স্থানে বসে কথাবার্তা বলে এবং চলমান নয় স্থায়ী পানিতে ইস্তিনজা করা। হাঁড় দ্বারা ইস্তিনজা করা হতেও বিরত থাকতে হবে। কারণ তা জ্বিনের খাদ্য। এমনি সে সব বস্তু হতে বেঁচে থাকতে হবে যা দ্বারা উপকার লাভ হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী হচ্ছে (আরবী*************) “তোমরা দুটি ফুৎকার দাতা বস্তু হতে বেঁচে থাক। অথবা এমন বস্তু হতে বেঁচে থাকা যা স্বয়ং নিজেকে কষ্ট দেয় যেমন গর্তের মধ্যে প্রস্রাব করা। কারণ গর্ত কখনো সাপের আশ্রয়স্থল হতে পারে, প্রস্রাবের কারণে সাপ বের হয়ে কামড় দিতে পারে, ধ্বংশন করতে পারে।

তন্মধ্যে রয়েছেঃ পর্দার প্রতি গুরুত্বারোপ করা। এতদূর চলে যাবে যাতে কোনো শব্দ শুনা না যায়। কোনো ধরনের গন্ধ অনুভূত না হয় আর না তার সতর পরিদৃষ্ট হয়, দেখা যায়। ভূমির কাছাকাছি হওয়ার পূর্বে কাপড় উঠাবে না। সে খেজুর বৃক্ষের আড়াল হওয়ার ন্যায় পর্দা করবে যা তার নিম্নাংশকে আড়াল করে নেবে। এমন অবস্থা পাওয়া না গেলে মাটির টিবিকে পেছনে করে বসবে। কারণ মানুষের ইস্তিঞ্জায় বসার স্থান নিয়ে শয়তান খেলা করে থাকে। কেননা শয়তানকে এসব নিন্দনীয় ও খারাপ কাজ করার জন্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে।

তন্মধ্যে রয়েছেঃ দেহ ও পোশাকে-পরিধেয় কাপড়ে যেন নাপাকি লেগে না যায়। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী হলোঃ

(আরবী****************************************************************************)

তোমাদের মধ্যে কেউ পেশাব করার ইচ্ছা করলে তার উচিত হলো সে জন্য কোনো নরম স্থান নির্বাচন করে নেয়।

তন্মধ্যে রয়েছেঃ ওয়াসওয়াসা –সন্দেহ দূর করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

(আরবী************************************************************************)

“তোমাদের কেউ যেন তার গোসলখানায় পেশাব না করে। কারণ এর থেকেই অধিকাংশ ওয়াসওয়াসার ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ (আরবী*****************)

“দাঁড়িয়ে পেশাব করো না”। আমার মতে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেশাব দাঁড়িয়ে করতে বারণ করেছেন। কারণ দাঁড়িয়ে পেশাব করলে দেহ এবং পরিধেয় কাপড়ে পেশাবের ফোঁটা-ছিটা পড়তে পারে। দাঁড়িয়ে পেশাব করা ভদ্রতা ও সম্মানের হানিকর ও উত্তম অভ্যাসের পরিপন্থী। এতে সতর উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বিদ্যমান থাকে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী***********************************************************************************)

“প্রস্রাব পায়খানার জায়গা নোংরা স্থান। তোমাদের কেউ প্রস্রাব ও পায়খানায় গমন করতে গেলে বলবেঃ

(আরবী*************************************************************************************)

আমি অপবিত্র নারী ও পুরুষ জ্বিন হতে আল্লাহর আশ্রয় কামনা করছি। আবার প্রস্রাবখানা ও পায়খানা হতে বের হওয়ার সময় বলবে (আরবী************) হে আল্লাহ! আমি তোমার ক্ষমা কামনা করি।

আমি বলি যে, পেশাবখানা ও পায়খানায় যাওয়ার সময় এ দোয়া পাঠ করা মোস্তাহাব। (আরবী****************) “হে আল্লাহ! আমি অপবিত্র নারী ও পুরুষ জ্বিন হতে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি”। কারণ বাইতুল খালাতে শয়তান একত্রিত হয়ে থাকে। তা এজন্য যে, তারা নাপাকী পছন্দ করে। আর বাইতুলখালা হতে বের হওয়ার সময় বলবে (আরবী****************) “আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন”। কারণ এ সময়টি হলো আল্লাহর স্মরণ, যিকির ত্যাগ করে শয়তানের সাথে একত্রিত হওয়ার মুহুর্ত।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী************************************************************************)

“তাদের একজন প্রস্রাব হতে পবিত্রতার্জন করত না। (আল হাদীস)

এ সম্পর্কে আবি বলছি যে, প্রস্রাব হতে পবিত্রতার্জন করা ওয়াজেব। একান্তভাবে কর্তব্য। প্রস্রাব হতে পবিত্রতা (আরবী******************) অর্জন বলতে বুঝায় প্রস্রাব করার পর দাঁড়িয়ে থাকবে তা হাঁটবে ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণে মনে হবে যে, প্রস্রাবনালীতে আর কোনো প্রস্রাব অবশিষ্ট নেই।

এর মাঝে একথা বিদ্যমান রয়েছে যে, অপবিত্র থাকা এবং সে কাজ করা যা পরস্পরের সাথে দ্বন্ধের সৃষ্টি করে –এগুলো কবর আযাবের কারণ হয়।

অবশিষ্ট রইল খেজুরের ডালা ভেঙ্গে উভয় কবরে স্থাপন করার বিষয়। এতে যে রহস্য নিহিত রয়েছে তাহলো শাফায়াত করা। যখন তাদের কুফুরীর কারণে পরিপূর্ণ শাফায়াত অসম্ভব ছিল তখন তাদের কবরের আযাব লাঘবের জন্য শাফায়াত করা হলো খেজুর ডালা ভেঙ্গে তাদের কবরে স্থাপনের মাধ্যমে।

ফিতরাস ও তৎসংশ্লিষ্ট আলোচনা

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ

(আরবী********************************************************************************)

দশটি বস্তু ফিতরতী প্রকৃতিগত –(১) মোছ কেটে ফেলা, (২) দাড়িকে ছেড়ে দেয়া, (৩) মেছওয়াক করা (৪) নাকে পানি দেয়া (৫) নখ কাটা (৬) বাহ্যিক মালিন্য দূরে ফেলা (৭) বগলের পশম কেটে ফেলা (৮) নিম্নাঙ্গের পশম কেটে ফেলা (৯) ইস্তিনজা করা। বর্ণনাকারী বলেছেন যে, আমি দশ নম্বরটি ভুলে গেছি, হতে পারে সেটি গরগরা কুলি করা।

আমি বলছি যে, এ সুন্নাতগুলো হযরত ইবরাহীম (আ)-এর যুগ থেকেই চালু রয়েছে এবং হানাফী সঠিক পথের অনুসরী সকল উম্মতের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে এবং তাদের অন্তরে ও তাদের খালেছ আকিদার অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। এর উপর তাদের জীবন মরণ নির্ভরশীল যুগযুগ ধরে। এ কারণে এ সুন্নাতগুলোকে ‘ফিতরাত’ প্রকৃতি বলা হয়। আর এগুলেলা শায়ায়ের তথা মিল্লাতে ইবরাহিমীর অভ্যাস, রীতিনীতি ও চাল-চলন। প্রত্যেক মিল্লাতের জন্যই এমন সব চিহ্ন ও রীতিনীতি জরুরী যা দ্বারা তাকে চেনা যায়। যার জন্য তাদেরকে পাকড়াও করা যায়। যাতে সে মিল্লাতের আনুগত্য ও নাফরমানি একটা অনুভবমূলক বস্তু হয়ে যায়। শায়ায়ের তথা অভ্যাস, চিহ্ন ও রীতিনীতি ঐ সব বস্তুকেই করা হয় যা অধিক পরিমাণে মিল্লাতের মধ্যে পাওয়ায়, যা বার বার করা হয়। এবং যা পরিস্কার ও স্বচ্ছ থাকে। এর মধ্য অনেক অসংখ্য উপকারিতা নিহিত রয়েছে। যাকে লোকদের চিন্তাধারা সম্পূর্ণ রূপে গ্রহণ করে নেয়।

এগুলো সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ও মূল্যবান কথা হলোঃ মানবদেহে এমন কিছু পশম চুল, কেশ, লোম উৎপন্ন হয় যা হদছ তথা নাজাচাতে হুকুমীর কাজ করে। এগুলোর মধ্যে মোচ, বগলের পশম ও দেহের নিম্নাঙ্গের পশম। এমনিভাবে মাথার চুল এবং দাড়ি ইত্যাদির বিক্ষিপ্ত হওয়াও তবিয়তের জন্য খারাপ। এজন্য এগুলোকে কাটা এবং এগুলোকে সুন্দর ও পরিপাটি করার নির্দেশ রয়েছে। দেহে বিভিন্ন চর্মরোগের ও খোশ পাঁচড়ার আক্রান্ত হওয়া সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনায় ডাক্তারগণ বলেছেন যে, এ কারণে মন চিন্তিত হয়ে পড়ে এবং কর্ম ক্ষশতা হ্রাস প্রাপ্ত হয়। এ রোগগুলো এমন যে, যার চিহ্ন দেহে দেখা যায় এবং হদছের, নাজাছাতের কাজ করে। এগুলোকে দূর করা পবিত্রতার অঙ্গ।

দাড়ি ছোট এবং বড়ের মধ্যে পার্থক্যকারী। দাড়ি পুরুষের সৌন্দর্য। দাড়ি পুরুষ্যত্বের পরিপূর্ণতা দাতা। এজন্য দাড়ি বৃদ্ধি করা, লম্বা করা জরুরি। দাড়ি মুণ্ডানো অগ্নি উপাসকদের রীতি ছিল। এতে আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি সাধিত হয়। দাড়ি মুণ্ডানোর দ্বারা সর্দার, বড়লোক এবং সাধারণের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। সবাই একই শ্রেণীর বলে পরিগণিত হয়।

যে ব্যক্তির মোচ বড় হয় তার মোচের সাথে খাদ্য ও পানীয় লেগে যায়। তাতে ময়লা কাড়া জমা হয়। এটা অর্থাৎ মোচ লম্বা করা অগ্নি উপাসকদের মজুসীদের রীতি। সুতরাং মোচ কেটে ফেলা জরুরী। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইরশাদ হচ্ছেঃ

(আরবী*****************************************************************************)

“তোমরা মুশরিকদের বিপরীত কর। মোচ কেটে ফেল এবং দাড়ি লম্বা কর”।

কুলি করা, নাক পরিস্কার করা এবং মেছওয়াক করার মাধ্যমে সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও মালিন্য ও দুর্গন্ধ দূর হয়।

খতনা করার সময় যে চামড়া কেটে ফেলা হয় তা একটি বাড়তি চামড়া ও অপ্রয়োজনীয় চামড়া। তাতে ময়লা কাড়া জমাট বাঁধে। তা থাকা অবস্থায় উত্তম রূপে পরিস্কার পরিচ্ছন্নও হওয়া যায় না। এর কারণে পেশাবের কিছু অংশ ভেতরে থেকে যায়। খাতনা না করলে পুরুষ এবং নারীর যৌন মিলনের আনন্দও কমে যায়। মানব দেহকে অসুন্দর দেখায় এজন্য খাতনা করে তা কেটে ফেলা জরুরী হয়ে পড়ে।

তাওরাত শরীফে আছেঃ

(আরবী*********************************************************)

খাতনা করা হযরত ইবরাহীম (আ) এবং তাঁর সন্তানদের বংশধরদের জন্য আল্লাহর খাছ –বিশেষ নিদর্শন। অর্থাৎ যেভাবে রাজারা তাদের বিশেষ প্রাণীর উপর চিহ্ন –নিশান লাগান যাতে সেগুলো অপরগুলো হতে পৃথক ও বিশেষিত হয়। আবার ঐ সব ক্রীতদাসদের চিহ্নিত করেন যারা সর্বদা তাদের নিকটে অবস্থান করে। যাদের বিক্রয় করার বা আযাদ –মুক্ত করার ইচ্ছা থাকে না। এমনিভাবে খতনা করা ইবরাহীম (আ)-এর বংশধরদের চিহ্ন –নিশানা রূপে নির্ধারণ করা হয়েছে।

অন্যান্য শায়ায়েরের মধ্যে, রীতিনীতি ও চিহ্নের মধ্যে পরিবর্তন সাধন করা যেতে পারে। ধোঁকা দেয়া যেতে পারে। আর খতনা এমন এক চিহ্ন যার মধ্যে অতি কষ্টে পরিবর্তন করা সম্ভব। এত ধোঁকা দেয়ার সুযোগ নেই।

পানি ব্যবহার করার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো পানি দ্বারা ইস্তিনজা করা।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী******************************************************************************)

“চারটি বিষয় নবীদের সুন্নাত, যথা –লজ্জা কোনো কোনো বর্ণনায় লজ্জার স্থলে খাতনা করানোর কথা বর্ণিত হয়েছে। খুশবু লাগানো, মেছওয়াক করা ও বিবাহ করা”।

আমি বলি যে, আমার মনে হয় এসব বিষয়গুলোও তাহারাত তথা পবিত্রতার অন্তর্ভুক্ত।

হায়া-লজ্জাশীলতাঃ হায়া হলো লজ্জাহীনতা, বাজে ও অশ্লীল আবরণ এবং খারাপ কাজ ত্যাগ করা। এ কাজগুলো নফসকে –ব্যক্তি সত্তাকে কলুষিত ও পংকিল করে। সুগন্ধি লাগানো একটি আনন্দদায়ক কাজ। এতে নফছের মধ্যে আনন্দ ও অন্তরে প্রশস্ততা সৃষ্টি হয়। এটাই তাহারাতের তথা পবিত্রতার মূল হাকীকত। আর তা পবিত্রতার প্রতি বিশেষভাবে আগ্রহান্বিত করে তোলে।

বিবাহ নারীদের প্রতি আগ্রহ থেকে আভ্যন্তরীণ অবস্থাকে পবিত্র করে তোলে। এবং নারীদের সাথে মিলনের দিকে আগ্রহ সৃষ্টিকারী যেসব কথা দেমাগে ঘুরপাক খায় তা হতে দেমাগকে পবিত্র রাখে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী********************************************************************************)

“যদি আমার উম্মতের জন্য বিষয়টি কষ্টকর না হতো তাহলে আমি তাদেরকে প্রত্যেক নামাযের সময় (অযু করার সময়) মেছওয়াক করার নির্দেশ প্রদান করতাম”।

আমি বলছি যে, এর উদ্দেশ্য হলো যদি মেছওয়াক করার ক্ষেত্রে সংকীর্ণতার ভয় না হতো তাহলে নামাযের অযুর ন্যায় মেছওয়াক করাকেও শর্ত করে দেয়া হতো। এ বিষয়ে অনেকগুলো হাদীস বর্ণিত আছে। এর থেকে একথা পরিস্কারভাবে প্রমাণিত হয় যে, শরীয়তের বিধানের ক্ষেত্রে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইজতেহাদের অধিকার রয়েছে। আর এসব আহকামে শরীয়া –শরীয়তের বিধানাবলি উদ্দেশ্যের কামাসেদের সাথে সম্পৃক্ত। দ্বীনের ক্ষেত্রে হজতর করা, সংকীর্ণতা দূর করা শরীয়তের মূলনীতির মধ্যে পরিগণিত।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মেছওয়াক করার পদ্ধতি সম্পর্কে বর্ণনাকারীর উক্তিঃ

(আরবী***********************************************************************)

মেছওয়াক করার সময় তিনি যেন কাশি দিচ্ছিলেন, যেন বমি করছিলেন। আমি বলছি যে, মেছওয়াক করার সশয় যেন হলকের শেষাংশ পর্যন্ত মেছওয়াক পৌঁছায়। যাতে গলা এবং সিনার কফ ও শ্লেষ্মা বেরিয়ে যায়। মুখের গভীরে মেছওয়াকের মাধ্যমে মুখের ভেতরে ও জিহ্বায় যে ফাঙ্গাস জাতীয় রোগ হয় তা বিদূরিত হয় এবং তাতে গলার স্বর পরিস্কার হয় এবং মুখের মধ্যে সুগন্ধ হয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী********************************************************************************)

“প্রত্যেক মুসলমানদের কর্তব্য হলো, সে প্রত্যেক সাত দিনের মাঝে একদিন গোসল করবে। ঐ গোসলে সে নিজের মাথা ও সমগ্র দেহ ভালোভাবে ধুয়ে নেবে”।

আমি বলি যে, প্রতি সাত দিনে একদিন, প্রতি সপ্তাহে একবার গোসল করা একিট দায়েমী সুন্নাত। দেহকে কাদামুক্ত করার ও নফসকে পবিত্র করার উদ্দেশ্যে এ সুন্নাত জারি করা হয়েছে। জুমার দিনের সাথে এ গোসল করাকে সম্পৃক্ত করার কারণ হলো, গোসল এবং জুমার নামায একে অপরকে পরিপূর্ণতা দান করে। এতে করে জুমার নামাযের প্রতি তাজিম তথা সম্মান প্রদর্শন হয়ে থাকে।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারটি কারণে গোসল করতেন

(আরবী******************************************************************************)

(১) জানাবতের কারণে (২) জুমার দিন (৩) সিংগা লাগানোর পর ও (৪) মৃত ব্যক্তিকে গোসল করানোর পর।

আমি বলছি যে, সিঙ্গা লাগানোর পর গোসল করার কারণ হচ্ছে –(১) সিংগার কারণে দেহে রক্ত প্রবাহিত হয় এবং প্রতিটি ফোঁটা পৃথক পৃথকভাবে ধৌত করা কষ্টকর হয়। (২) সিংগার দ্বারা দেহের বিভিন্ন অংশ হতে রক্ত শোষণ করে নিয়ে আসা হয়। কাজ সমাপ্ত হলে সে স্থানের রক্ত বন্ধ হয় কিন্তু রক্তের প্রবাহ বন্ধ হয় না তাই গোসল করার দ্বারা সমগ্র শরীর হতে রক্তের চাপ প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়।

মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেয়ার মাধ্যমে –(১) গোসলদাতার সমগ্র দেহে ফোঁটা-ছিটে ফোঁটা পড়ে যায়। যা নাপাক করে দেয় গোসলদাতার দেহকে। দেহের কোনো অংশে তা পড়েছে তা বের করা কষ্টসাধ্য হওয়ার গোসলের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জিত হয়। (২) আমি একদা এক মৃত্যুমুখ যাত্রীর নিকট বসেছিলাম। দেখতে পেলাম যে, রূহ কবজকারী ফিরিশতারা উপস্থিত লোকদের মধ্যে ভীষণ ভয় ভীতির সৃষ্টি করে। আমি অনুভব করলাম য, তাদের এ অবস্থা পরিবর্তন হয়ে তাদের অন্তরে স্বস্তির ভাব আসা প্রয়োজন। তাই মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেয়ার পর গোসলতাদার গোসল করে নেয়া কর্তব্য। যাতে তার সকল ভয় ভীতি দূর হয়ে স্বস্তির অবস্থা ফেরত আসে।

যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করবে তাকে পানি ও বরই পাতার পানি দ্বারা গোসল করতে হবে। এরূপ নির্দেশ দিয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপর ব্যক্তিকে বলেছেন –(আরবী****************)

“তুমি কুফুরীর সময়ের চুল মুণ্ডিয়ে ফেল”।

আমি বলি যে, এর মধ্যে নিহিত রহস্য হচ্ছে, নতুন ইসলাম গ্রহণকারীর সামনে এ বিষয়টি পরিস্কারভাবে প্রতিভাত হবে যে, সে কুফুরী হতে বেরিয়ে এসেছে এবং ইসলামে প্রবেশ করেছে। বাকি আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

পানির বিধান

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

(আরবী**********************************************************************)

“তোমাদের কেউ কখনো স্থির পানিতে –যে পানি প্রবহমান নয় এমন পানিতে পশাব করে পুনরায় সে পানি গোসল করবে না”।

আমি বলি যে, এতে স্থির পানিতে পেশাব করা এবং তাতে গোসল করতে বারণ করা হয়েছে। যেমন হাদীসে এসেছে দু-ব্যক্তি এমনবাবে পায়খানায় গমন করবে না যে, তাদের উভয়ের সতর উন্মুক্ত এবং তারা উভয়ে পায়খানা করা অবস্থায় কথাবার্তা বলছে। এতে আল্লাহ তায়ালা রাগান্বিত হন। এ বর্ণনা হতে শুধুমাত্র পানিতে প্রস্রাব করা হতে বারণ করা হয়েছে। অপর বর্ণনায় শুধুমাত্র গোসল করা হতে বারণ করা হয়েছে।

এরূপ বলার পেছনে রহস্যঃ উভয় বিষয়টিই দুটি অবস্থা হতে মুক্ত নয়। (১) এতে তখন পানির অবস্থা পরিবর্তন হয়ে যাবে। অথবা পরিবর্তনের দিকে ধাবিত হবে। লোকেরা এরূপ করতে দেখতে পাবে এবং প্রত্যেকে এরূপ করতে থাকবে। এখানে উদ্দেশ্য পানিতে নাপাক হওয়া হতে রক্ষা করা। (২) এরূপ করা লানতের কারণ হবে। হে আল্লাহঙ আমাদেরকে এরূপ করা হতে রক্ষা করুন। তবে পানি যদি অধিক পরিমাণের হয় এবং প্রবহমান হয় তাহলে তাতে গোসল করা জায়েজ এবং পেশাব করার বিষয়টি সর্বাবস্থায় এড়িয়ে যাওয়া কর্তব্য।

‘মায়ে মোস্তামেলা’ তথা ব্যবহৃত পানি। কেউ তা পবিত্রতা অর্জনের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে না। তা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। এজন্য নব করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা দ্বিতীয় বার পবিত্রতার্জনের জন্য ব্যবহার করার অনুমতি দেননি। তা পূর্বাবস্থায়ই রেখে দিয়েছেন। এ ব্যাপারে পরিস্কারভাবে কোনো নির্দেশও প্রদান করেন নি। নিঃসন্দেহে এ পানি পবিত্র।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী**********************************************************************)

পানি দু’মটকা পরিমাণ হলে তা নাপাক হয় না”।

আমি বলি যে, এর অর্থ হলোঃ তা মৌলিকভাবে অপবিত্র হয় না। তা সম্পর্কে শরীয়তই বিধান দিয়ে থাকে। প্রচলিত রীতিনীতি ও জনশ্রুত বিধান ব্যতীতই। তবে যদি পানির গুণগুলোর কোনো গুণ পরিবর্তিত হয়ে যায়, নাপাকীর কারণে অথবা নাপাকীর পরিমাণ ও সংখ্যা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় তাহলে তার বিধান পূর্বে উল্লেখিত বিধানের অর্ন্তভুক্ত হবে না।

মু’মটকা পানিতে অল্প পানি অধিক পানির মধ্যে পার্থক্যকারী নির্বাচনের কারণ এমন একটি জরুরি বিষয় যার কোনো প্রতিকার নেই। এটা কোনো জোর জবরদস্তির বিষয়ও নয় বা কোনো আন্দাজ অনুমানের বিষয়ও নয়। এটা এমন একটা বিষয় যা ধরে নেয়া ব্যতীত কোনো উপায় নেই। এ ছাড়া শরীয়তের অন্যান্য বিধানগুলোর ক্ষেত্রেও এমনিভাবে বিশেষ কারণ রয়েছে যা মেনে নেয়া ব্যতীত উপায় নেই।

তার ব্যাখ্যা হলোঃ পানির জন্য দুটি স্থান। (১) উৎস, উৎপত্তিস্থল, প্রস্রবণ (২) পাত্র। উৎপত্তিস্থল হলো কূপ ও ঝর্ণা এবং প্রবহমান নালাসমূহ তার মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। আর পাত্র হলো চামড়ার মশক, মটকা, পানির পাত যাতে হাত মুখ ধোয়া হয়, টব, চামড়ার তৈরি পানির পাত্র ইত্যাদি। (১) কূপ নাপাক হলে অর্থাৎ কূপের পানি নাপাক হলে লোকদের ক্ষতি হয় এবং তার পানি বের করে ফেলাতে অনেক কষ্ট হয়। (২) পাত্রের অবস্থা এমন যে তা প্রতিনিয়ত পূর্ণ করা যায় তার পানি নাপাক হলে তা পরিবর্তন করাতে কোনো কষ্ট হয় না। (২) কূপের ও ঝর্ণার কোনো ঢাকনা থাকে না। তাকে ঘোড়া, গাধা ও চতুষ্পদ জন্তুর গোবর এবং হিংস্র প্রাণির মুখ দেয়া হতে রক্ষা করা সম্ভব নয়। অথচ পাত্রকে ঢেকে রাখার এবং হেফাযত করাতে কোনো পেরেশানী নেই। তবে সর্বদা ঘরে আগমনকারী লোক ও জন্তুর বিষয়টি পৃথক। (৩) কূপে ও ঝর্ণার অনেক পানি থাকে। অনেক নাপাকি পড়লেও তা পরিলক্ষিত হয় না। পাত্রের পানি স্বল্প হয়। এজন্য তাতে নাপাকি পড়লেই তা পরিলক্ষিত হয়। পাত্রের বিষয়টি কূপ ও ঝর্ণার বিপরীত। সুতরাং ঝর্ণার ও কূপের পানির বিধান এবং পাত্রের পানির বিধান পৃথক পৃথক হওয়াই অত্যাবশ্যকীয়। আর কূপ ও ঝর্ণাধারার ক্ষেত্রে সেসব সুযোগ দিতে হবে যা পাত্রের ক্ষেত্রে দেয়া সম্ভব নয়।

সুতরাং পাত্র ও কূপ এবং ঝর্ণাধারার ক্ষেত্রে স্বল্প ও অধিক পানির পরিমাণ নির্ধারণের দু’মটকা পানিকে পার্থক্যকারী নির্ণয় করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। কারণ কূপ ও ঝর্ণার পানি সাধারণত দু’মটকার অধিক ব্যতীত কম হয় না। দু’মটকার কম যে কূপে বা ঝর্ণায় পানি হয় তাকে হাউজ বা গর্ত বলা হয় না। বরং তাকে ছোট গুহা বলা হয়।

যদি কোথাও কোনো সমতল ভূমিতে দু’মটকা পানি হয় তার পরিমাণ দৈর্ঘ্য ও প্রস্তে সাত হাত গুণ পাঁচ হাত হয়ে থাকে।

এটা হচ্ছে হাউজের সর্বনিম্ন সীমানা। পানির পাত্রের মধ্যে বড় পাত্র হলো মটকা। এর চেয়ে বড় পাত্রের ব্যবহার আরবদের মধ্যে পাওয়া যায় না। আর সকল মটকা এক মানের হয় না, কোনো মটকা বড়, কোনো মটকা ছোট দেড় মটকার পরিমাণ, কোনোটি মটকার তিনের একাংশ, আবার কোনোটি অর্ধেক ও কোনোটি চারভাগের একভাগ হয়ে থাকে। কোনো বড় মটকা ছোট দু’মটকার সমান হয় না। সুতরাং দু’মটকা পানির পরিমাণ এমন একটা পরিমাণ যে পরিমাণ পর্যন্ত পাত্রের পরিমাণ পৌছায় না। আর যার থেকে কম পানি কোনো কূপে বা ঝর্ণায় থাকে না। এ কারণে দু’মটকা পানিকে অল্প পানি ও অধিক পানির পরিমাণ ধরা হয়েছে।

যারা পানির পরিমাণকে দু’মটকায় ধরেন না তাদেরও সে জন্য একটা পরিমাণ অব্যশই মেনে নিতে হবে। যেমন মালেকীদের অবস্থা। যারা জঙ্গলে অবস্থিত কূপের ক্ষেত্রে উটের বিষ্ঠা পতিত হলেও তাকে পাক বলে থাকেন। সুতরাং এদিক সেদিক হাত না মেরে দু’মটকার হাদীস মেনে নেয়াই উত্তম। উক্ত আলোচনার ভিত্তিতে শরীয়তের বিধানগুলো ভালোভাবে বুঝতে হবে। শরীয়ত যেসব সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে তা জরুরি ভিত্তিতে দিয়েছে যা মেনে নেয়া ব্যতীত কোনো গত্যন্তর নেই। আর বুদ্ধিমত্তার দিক থেকেও তা মেনে নেয়া ব্যতীত অপর কোনো পথ নেই।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী************************************************************************)

“পানি পবিত্রতাকারী, তাকে কিছু অপবিত্র করতে পারে না”।

এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী**********************************************************************************)

“পানি নাপাক হয় না”।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী**************************************************)

“নিশ্চয়ই মুমিন নাপাক হয় না”।

এমনিভাবে অন্যান্য বর্ণনায় যা এসেছে যে,

(আরবী**********************************************************)

“বদন নাপাক হয় না এবং জমিন নাপাক হয় না”।

আমি বলি যে, উক্ত সকল হাদীসে একটা বিশেষ নাজাছাতকে নফী করা উদ্দেশ্য যা সময় ও অবস্থার দ্বারা বুঝা যায়। অতএব তাঁর বাণী (আরবী**********************) “পানি নাপাক হয় না” তার অর্থ হলো –কূপ ও ঝর্ণায় নাপাক পড়লে তা নাপাক হয় না যদি তা তুলে ফেলে দেয়া হয় এবং নাজাছাতের দ্বারা পানির গুণ পরিবর্তন না হয়। আর নাপাকি অত্যধিক না হয়। বদন ধৌত করা হয় তাতে তা পাক পবিত্র হয়ে যায়। জমিনে বৃষ্টি বর্ষিত হয়, সূর্যের আলোক পতিত হয় এবং পা দিয়ে তা পাড়ানো হয় এতে তা পবিত্র হয়ে যায়।

বুদায়া কূপ সম্পর্কে ভেবে দেখুন তো। এটা কি মেনে নেয়া যায় যে, সে কূপে এসব নাপাকি পড়ে থাকত। এবং লোকেরা তা হতে পানি ব্যবহার করত।

এটা এরূপ কখনো নয়। বরং অবস্থা ছিল এমন যে, এসব নাপাকি অনিচ্ছায় সে কূপে পতিত হতো। কেউ তা তাতে নিক্ষেপ করত না। যেমন আমরা আমাদের বর্তমান সময়ে কূপের ব্যাপারে লক্ষ্য করি। তারপর সে সব নাপাকী বের করে দয়া হতো এবং সে কূপের পানি ব্যবহার করা হতো। মানুষের অভ্যাস হলো এ জাতীয় নাপাকি হতে বেঁচে থাকা। তা হলে কিভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ কূপের পানি চাইতেন? অনিচ্ছায় সে কূপে নাপাকি পতিত হতো আর তা বের করে ফেলে দেয়া হতো। ইসলামের আবির্ভাবের পর লোকেরা সে কূপের পানির শরয়ী হুকুম জানতে চাইল যে, ঐ পবিত্রতাই কি যথেষ্ট যা মানুষ বুঝে থাকে –নাকি শরীয়তের পক্ষ হতে এ ব্যাপারে নতুন কোনো বিধান রয়েছে? সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ

(আরবী***************************************************************)

“পাবি পবিত্রতাকারী, তাকে কিছু অপবিত্র করে না”। অর্থাৎ লোকদের নিকট যে পবিত্রতা রয়েছে তাই যথেষ্ট –এর অধিক আর কিছু প্রয়োজন নেই।

এটা কোনো তাবিল নয়, গায়ের জোরে কোনো ব্যাখ্যা নয় –আর না এটা হাদীসের বাহ্যিক দিককে অন্যদিকে ফিরিয়ে দেয়া। বরং এটা আরবদের পরিমাণপূর্ণ ও সামঞ্জসপূর্ণ কথা। সুতরাং আল্লাহ তায়ালার বাণীঃ

(আরবী****************************************************************)

“আপনি বলে দিন, আমার নিকট যা অহি করা হয়েছে তাতে কারো জন্য কোনো কিছু হারাম দেখতে পাচ্ছি না”। এর উদ্দেশ্য হলো সে সব বস্তুর মধ্যে যাতে তোমরা দ্বিমত পোষন কর। যখন কোনো ডাক্তারকে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হয় তখন তিনি বলেন যে, এ বস্তুর ব্যবহার ঠিক নয়। এর দ্বারা জানা যায় যে, স্বাস্থ্য সঠিক রাখার দিক থেকে এটার ব্যবহার ঠিক নয়। আবার যখন কোনো ফিকাহ শাস্ত্রবিদ তথা ফকীহর নিকট কোনো বিষয় জানতে চাওয়া হয়, তখন জবাবে যদি তিনি বলেন –তা জায়েজ নয়। তা হতে বুঝা যায় যে, মরীয়তের বিধানমতে তা জায়েজ নয়। এমনিভাবে আল্লাহ তায়ালার বাণীঃ

(আরবী*************************************) তোমাদের জন্য তোমাদের মা’দের হারাম করা হয়েছে। অর্থাৎ তাদেরকে বিবাহ করা হারাম করা হয়েছে। এমনিভাবে আল্লাহর বাণী- (আরবী*******************) তোমাদের জন্য মৃত প্রাণী হারাম করা হয়েছে। অর্থাৎ তা ভক্ষণ করা তথা খাওয়াকে হারাম করা হয়েছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী (আরবী*********************************) ওলী ব্যতীত কোনো নেহাক-বিবাহ বৈধ নয়। এখঅনে ঐ বিবাহ শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয় বুঝনো হয়েছে। উজুদে খারেজীর নফি করা হয়নি। এ জাতীয় অনেক বিষয় রয়েছে। এগুলো তাবিলের ভিত্তিতে নয়।

‘মায়ে মোকাইয়েদ’ এমন পানি যা পানি বললে পানি হিসেবে মনে উদিত হয় না। যেমন গোলাপের পানি, এ ‘মায়ে মোকাইয়েদ’ দ্বারা অযু ও গোসল করা এমন একটি বিষয় যা মিল্লাতের শিক্ষা সহজভাবেই তা সমাধান করে দিতে সক্ষম। তার দ্বারা নাজাছাতে হাকিকী দূর করা যায়। শুধু তাই নয় বরং তাই অধিকতর গ্রহণযোগ্য।

কাওম তথা হানাফী মজহাবের ইমামগণ কূপে কোনো প্রাণীর মারা যাওয়ার মাসয়ালা এবং দশগজ দশ গজ দৈর্ঘ্যপ্রস্থ হাউজের মাসয়ালা ও মায়ে জারী তথা প্রবাহিত পানির এ তিন মাসয়ালার প্রশস্ত হৃদয়ের পরিচয় দিয়েছে। অথচ এ তিনটি বিষয়ে কোনো বিশুদ্ধ হাদীস বিদ্যমান নেই। অথচ সাহাবী ও তাবেয়ীদের পক্ষ হতে যে সব আছার বর্ণিত রয়েছে যেমন হাবশী সম্পর্কে ইবনে জুবাইয়ের আছার। ইঁদুর সম্পর্কে হযরত আলীর (রা) আছার এবং বিড়াল জাতীয় প্রাণীর ব্যাপারে নখয়ী ও শাবীর আছার। এসব আছারের বিশুদ্ধ হওয়া সংক্রান্ত বিষয়ে হাদীস শাস্ত্র বিশারদদের কোনো ধরনের সাক্ষ্য নেই। আর এগুলো এমন বর্ণনাও নয় যার প্রতি প্রথম যুগের লোকদের ঐকমত্য রয়েছে। যদি এসব আছারের সত্যতা তথা এগুলোকে সত্য বলে গ্রহণ করাও হয়, তাহলেও তা হবে মনের প্রশান্তি ও পানির পবিত্রতার জন্য, তা শরীয়তের পক্ষ হতে ওয়াজের হিসেবে নয়। এ সন্দেহ অপনোদন না করে তা প্রমাণ করা খুবই দুষ্কর ও কষ্টসাধ্য।

মোটকথা, এ মাসয়ালার এমন কোনো গ্রহণযোগ্য বিষয় নেই শরীয়তের দৃষ্টিতে যার উপর আমল করা ওয়াজিব। আর দু’মটকা পানি সংক্রান্ত হাদীস এক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে একটি দৃঢ় বিষয়। আর এটা অসম্ভব যে, আল্লাহ তায়ালা এ মাসয়ালায় এমন কিছু শরীয়ত সম্মত করবেন যার গুরুত্ব অত্যধিক হবে সকলের ঐকমত্যের উপর। যা অধিক প্রয়োগ হবে এবং যা সকলে মেনে নেবে। এতদসত্ত্বেও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে সরাসরি কোনো হাদীস বলবেন না আর তা সাহাবা ও তাবেয়ীদের মধ্যে প্রচারিত ও প্রসারিত হবে না। আর কোনো এক ব্যক্তির বর্ণনাও এ বিষয়ে থাকবে না এটা কি করে সম্ভব। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

নাজাছাত পবিত্র করা

নাজাছাতঃ নাজাছাত হলো ঐ সব অপবিত্র ও অপরিস্কার বস্তু যা রুচি সম্পন্ন ব্যক্তিরা ঘৃণা করে। মানুষ যা পরিহার করে চলে। যদি তা দেহে বা কাপড়ে লেগে যায় তা ধৌত করে নেয়। যেমন –পায়খানা, পেশাব ও রক্ত।

নাজাছাত পবিত্র করাঃ তা গ্রহণ করা হয়েছে রুচি সম্পন্ন লোকদের থেকে এবং তাদের মাঝে যা প্রচলিত রয়েছে তা হতেই তা গৃহীত হয়েছে। লেদ তথা ঘোড়া, গাধা ইত্যাদির মল নাপাক ইবনে মাসউদ বর্ণিত হাদীসের ভিত্তিতে। যেসব জন্তুর গোশত খাওয়া হয় তাদের পেশাব। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, যেসব প্রাণীর গোশত খাওয়া হয় তাদের পেশাব নাপাক। এতে সুস্থ রুচি সম্পন্নদের ঘৃণা হয়। শুধুমাত্র চিকিৎসার ক্ষেত্রে তা পান করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এসবের পাক হওয়া এবং তার নাপাকী হালকা ধরনের হওয়ার ফয়সালা শুধুমাত্র সংকীর্ণতা দূর করার জন্য বলা হয়ে থাকে। শরীয়তদাতা নাজাছাতের সাথে শরাবকে তথা মদকে মিলিয়েছেন। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন –(আরবী*********) “অপবিত্রতা, মালিন্য শয়তানী কাজ”। তা এজন্য যে, শরীয়তদাতা তাকে হারাম ঘোষণা করেছেন এবং শক্তভাবে হারাম ঘোষণা করেছেন। তখন হেকমতে খোদাওয়ান্দী তথা আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা হলো যে, এটাকে –শরাবকে, মদকে পায়খানা ও পেশাবের পর্যায়ের করে দেবেন। যাতে শরাবের তথা মদের মন্দতা ও পাপ মানুষের সামনে অপবিত্রতা উপমা হয়ে থাকে এবং তা অধিক নাপাক হওয়ার কারণে মানবাত্মা তা হতে দূরে অবস্থান করবে।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী*******************************************************************************)

“তোমাদের কারো পাত্রে কুকুর পান করলে তাকে সাতবার ধুয়ে নেবে। অপর এক বর্ণনায় রয়েছে, “তোমাদের কারো পাত্রে কুকুর মুখ দিলে তাকে সাতবার ধুয়ে নেবে এবং তার প্রথমবার মাটি দিয়ে রগড়িয়ে ধুয়ে নেবে”।

আমি বলি যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুরের ঝুটাকে নাপাকীর তথা অপবিত্রতার সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন এবং তাকে প্রচণ্ড ধরনের নাপাকী রূপে পরিগণিত করেছেন। কারণ কুকুর এক অভিশপ্ত জন্তু। ফিরিশতারা তা হতে দূরে থাকে। কোনো প্রয়োজন ব্যতীত কুকুর পালন করা ও তার সাথে মেলামেশা করা প্রতিদিন এক কিরাত করে সওয়াব কমিয়ে দেয়।

এসবের রহস্যঃ কুকুরের ফিতরাত –প্রকৃতি হলো শয়তানের ফিতরাতের ন্যায়। তার প্রকৃতি হলো –খেলাধুলা, রাগ, নাপাকীতে নিমজ্জিত থাকা, লোকদের কষ্ট দেয়া এবং সে শয়তান থেকে এলহাম গ্রহণ করে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন, এ প্রাণীটি এতটা নিকৃষ্ট হওয়ার পরও লোকেরা তা পালনে আনন্দ অনুভব করে অর্থাৎ লোকেরা কুকুর হতে দূরে থাকতে অলসতা প্রদর্শন করে থাকে। অপরদিকে ক্ষেতি-জিয়াতের হেফাজতের জন্য চৌকিদারীর জন্য তথা পাহারার জন্য এবং শিকার করার জন্য কুকুর পালনের প্রয়োজন থাকার কারণে কুকুর পালন হতে নিষেধ করাও ছিল কঠিন। সুতরাং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কৌশল অবলম্বন করলেন যে, কুকুর কারো পাত্রে মুখ দিলে তা সাতবার ধুতে হবে এবং একবার মাটি দিয়ে রগড়িয়ে ধুতে হবে। এ ব্যাপারে কঠোর নির্দেশ দিলেন। এবং এমন শর্তারোপ করলেন, যাতে কষ্ট রয়েছে। যাতে এসব কারণ মিলে কুকুর পালন হতে বিরত রাখা যায়।

কোনো কোনো আহলে ইলেম (ইমাম মালেক (র) মত প্রকাশ করেছেন যে, সাতবার ধৌত করা কোনো শরীয়তের বিধান নয়। বরং তা এক ধরনের তাকিদ করা হয়েছে। তাদের কেউ আবার প্রকাশ্য হাদীসকে গ্রহণ করেছেন। এক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উত্তম।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী*****************************************************************)

“তার পেশাবের উপর এক বড় ঢোল পানি প্রবাহিত করে দাও”।

আমি বলি যে, জমিনের উপরে পেশাব; জমিনের উপরে পেশাব করা হলে তাতে অধিক পরিমাণে পানি প্রবাহিত করে দিলে তা পাক পবিত্র হয়ে যায়। এ হুকুম লোকদের সে মতামত হতে গৃহীত হয়েছে যে, জমিনে অধিক বৃষ্টি হলে তা পাক পবিত্র হয়ে যায়। আর অধিক পরিমাণে পানি প্রবাহিত করলে দুর্গন্ধও দূর হয়ে যায়। আর আধিক পরিমাণে পানি প্রবাহিত করার কারণে পেশাব নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী*********************************************************************************)

যদি কোনো নারীর কাপড়ে মাসিক ঋতুস্রাবের রক্ত লেগে যায় তাহলে সে তাকে মাটিতে মেলে নেবে, তারপর ধৌত করবে পানি দিয়ে। অতঃপর তাতে নামায আদায় করবে।

আমি বলি যে, মূল নাজাছাত ও তার চিহ্ন বিদূরীত হলেই তা পাক-পবিত্র হয়ে যায়। এজন্য কোনো নির্ধারিত নিয়ম নেই। যে সব পদ্ধতির কথা বর্ণিত হয়েছে তার সবটাই নাজাছাত দূরীকরণের জন্য ও তার চিহ্ন দূরীকরণের জন্য। তা শর্ত নয় বরং সতর্কতা মাত্র।

মণি বা শুক্র নাপাক। উপরে আমরা নাজাছাত সম্পর্কে যে আলোচনা উপস্থাপন করেছি তার ভিত্তিতে। শুষ্ক মণি ঘর্ষণ করে তুলে ফেললে কাপড় পাক-পবিত্র হয়ে যায়। যদি তা দেখা যায়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী**************************************************************)

মেয়ের পেশাব লাগলে কাপড় ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। ছেলের পেশাব কাপড়ে লাগলে তাতে পানি ছিঠিয়ে নিলে হবে। অথবা হালকাভাবে ধুয়ে নিলে চলবে।

আমি বলি যে, এটা এমন একটা বিষয় যা জাহেলী যুগে সর্ব সম্মতভাবে সিদ্ধান্তকৃত ছিল। আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পূর্বাবস্থাই ঠিক রেখেছেন। ছেলে এবং মেয়ের পেশাবের মধ্যে পার্থক্য করার বেশ কিছু কারণ রয়েছে।

তন্মধ্যেঃ (১) ছেলে কাপড়ে পেশাব করলে তা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে এবং তা দূর করা কষ্টসাধ্য হয় এজন্য শরীয়ত এক্ষেত্রে সহজ করেছেন। পক্ষান্তরে মেয়ের পেশাব কাপড়ে এক জায়গায় লাগে তাই তা পরিস্কার করা সহজতর।

তন্মধ্যেঃ (২) মেয়ের পেশাব ছেলের পেশাব অপেক্ষা অধিক গাঢ় ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে থাকে।

তন্মধ্যেঃ (৩) ছেলেকে লোকেরা সব সময় লোকে তুলে রাখে তার প্রতি অধিক আগ্রহ থাকে, মেয়েদের কোলে রাখা হতে বিরত থাকে ও অল্প পরিমাণে আগ্রহী হয়। এজন্য প্রথমটিতে একটু সহজ ও দ্বিতীয়টিতে তা করা হয়নি।

উক্ত হাদীস মদীনাবাসী ও ইবরাহীম নখয়ী গ্রহণ করেছেন। ইমাম মুহাম্মদ এ ব্যাপারে একটু ঢিল দিয়েছেন। মানুষের মাঝে যা প্রসিদ্ধ রয়েছে তাতে কোনো ধরনের ধোঁকায় পড়বেন না।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী********************************************************************)

কাঁচা চামড়াকে যখন দাবাগত করা হয় –রং দেয়া হয় তখন তা পাক পবিত্র হয়ে যায়”।

আমি বলি যে, দাবাগত করা –রং করা চামড়ার ব্যবহার লোকদের নিকট আম রেওয়াজ রয়েছে। এর রহস্য হচ্ছেঃ দাবাগত করলে –রং করলে তাতে চামড়ার পচা ও দুর্গন্ধ দূর হয়ে যায়।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী*************************************************************************************)

“তোমাদের কেউ যখন তার জুতার ময়লাকে রগড়িয়ে নেয় তখন মাটি তাকে পরিস্কার ও পবিত্র করে দেয়”।

আমি বলি যে, জুতা এবং খোফ –মোজা উভয়টাই দৃশ্যমান নাজাছাত হতে পাক হয় তা রগড়িয়ে নিলে মাটিতে। কারণ এগুলো শক্ত বস্তু যাতে নাপাকি প্রসারিত হয় না। অতএব নাপাকি গলিত হোক কি শুষ্ক –মাটিতে রগড়িয়ে নিলেই তা পাক পবিত্র হয়ে যাবে।

বিড়াল সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী******************************************************************************)

আমি বলি যে, একদলের মতামত অনুযায়ী বিড়াল যদিও নাপাকীতে মুখ দিয়ে থাকে এবং ইঁদুর শিকার করে, এ ক্ষেত্রে তার ঝুটা-এঁটো পাক পবিত্র হওয়ার বিধান দেয়া কর্তব্য –অত্যাবশ্যকীয়। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে শর্ত উঠিয়ে নেয়া শরীয়তের একটি অন্যতম বিধান। অন্য দলের মতে (যারা বিড়ালের ঝুটাকে মাকরূহ বলে) প্রত্যেক প্রাণীর প্রতি দয়া হওয়া প্রয়োজন। এর প্রতি আকৃষ্ট করণের জন্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিড়ালকে ঝাঞ্ঝাকারী ও ঝাঞ্ঝাকারিণীর সাথে তুলনা করেছেন। আল্লাহই সর্বজ্ঞ

নামায সম্পর্কীয় আলোচনা

জেনে নিন: নামায সমগ্র ইবাদতের মধ্যে বিশাল মাহাত্ম্যপূর্ণ এবং দলিল প্রমাণের দিক থেকে অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ইবাদত। মানুষের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ইবাদাত। দেহের জন্য সবচেয়ে উপকারি ইবাদত। এ জন্য শরীয়তাদাত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ফজিলত, তার সময়, শর্তাবলি ও আরকান ও তার আদব নির্ধারণের ক্ষেত্রে এবং তার রোখছত এবং নফল নামায আদায়ের ক্ষেত্রে এমন গুরুত্বারোপ করেছেন যা অন্যান্য ইবাদতের ক্ষেত্রে করেন নি। এবং নামাযকে দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ শেয়ার তথা অভ্যাস ও চিহ্ন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। নামায ইহুদী, নাছারা মজুস ও মিল্লাতে ইসমাঈলের সকল অনুসারীদের জন্য একটি স্বীকৃত ও সম্পূর্ণভাবে প্রমাণিত যথার্থ ইবাদত ছিল। এ কারণ শরীয়তদাতা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে এবং তার সাথে সম্পৃক্ত অন্যান্য ক্ষেত্রে ঐ সকল বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি রেখেছেন যা লোকদের মধ্যে ঐকমত্য ছিল অথবা অধিকাংশ লোক তাতে একমত ছিল।

তাদের মধ্যে পার্থক্য ও পরিবর্তন যা ছিল তা হলো যেমন ইছদিরা জুতা এবং মোজা পরিহিত অবস্থায় নামায আদায় জায়েজজ মনে করত না। এসব ক্ষেত্রে এটা অত্যন্ত জরুরী ছিল যে, তাদের এ নিয়মকে সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করা হবে, যাতে মুসলমানদের গৃহীত পদ্ধতি তাদের পদ্ধতি হতে সর্বোত্তম হবে। এমনিভাবে মুজুছিরা তাদের দ্বীনের মাঝে পরিবর্তন সাধন করেছিল এবং তারা সূর্যের পূজা উপাসনা করতে আরম্ভ করেছিল। এ জন্য মিল্লাতে ইসলামীকে তাদের মিল্লাতের উপর ও সর্বদিক থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রমাণ করা  অত্যন্ত জরুরি ছিল। সুতরাং তাদের ইবাদতের সময় মুসলমানদের নামায আদায় করতেও নিষেধ করা হয়েছে।

যেহেতু নামাযের আহকাম অনেক এবং যেসব মূলনীতির উপর নামাযের ভীত প্রতিষ্ঠিত সেগুলোও অধিক সংখ্যক, এজন্য এখানে কিতাবুস সালাতের-নামাযের অধ্যায়ের প্রথমে সেসব মূলনীতি আলোচনা করা হয়নি। যেমন কিতাবুত তাহারাত –পবিত্রতার অধ্যায়ে তার মূলনীতিসমূহ আলোচিত হয়েছে। বরং এক্ষেত্রে প্রত্যেক অধ্যায়ের তার মূলনীতিগুলো সে অধ্যায়ের শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী*********************************************************************)

“তোমাদের সন্তানদের বয়স যখন সাত বছর হয় তখন তাদের নামাযের নির্দেশ দাও। যখন তাদের বয়স দশ বছর হয় তখন নামায ত্যাগ করলে তাদের প্রহার কর। এবং শয়ন কক্ষে তাদেরকে পৃথক করে দাও”।

আমি বলি, সন্তানের বালেগ হওয়ার দু’প্রকারের হয়ে থাকে।

(ক) দৈহিকভাবে সুস্থতা ও রোগ-শোক হতে মুক্ত থাকা বালেগ হওয়া। সন্তানের মাঝে দৈহিক সুস্থতা হলো তার জ্ঞানের-আকলের উন্মেষ ঘটা। আর তার জ্ঞান শূন্য থাকা স্বাস্থ্যগত অসুস্থতা। সাত বছর বয়স জ্ঞানের উন্মেষ ঘটার বয়স। এ বয়সে সন্তানদের মধ্যে প্রকাশ্য পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। আর দশ বছর জ্ঞানের পূর্ণতার বয়স। সন্তান যদি সঠিক মেজাজের হয় তাহলে দশ বছর বয়সে জ্ঞানী হয়। নিজের উপকার ও ক্ষতি, কল্যাণ ও অকল্যাণ বুঝতে পারে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও এ জাতীয় কাজে পারঙ্গম হয়।

(খ) জেহাদ ও হুদুদ গ্রহণের দিক থেকে বালেগ তথা পূর্ণ বয়স্ক হওয়া। এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণের দিক থেকে বালেগ হওয়া। যে বয়সে সে পূর্ণ পুরুষে পরিণত হয় এবং পুরুষদের ন্যায় কষ্ট সহিষ্ণু হয়ে যায়। এবং রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় সকল ক্ষেত্র তার অংশগ্রহণ গ্রহণযোগ্য হয়। যেমন ভোট দেওয়া ও দায়িত্ব গ্রহণ করার যোগ্যতা অর্জন করে। তাকে সরল সঠিক পথে ছেরাতাল মোস্তকীমে চলার জন্য বাধ্য করা যায়। বয়সের পরিপূর্ণতার এ পর্যায়ে জ্ঞানের পরিপূর্ণতা ও দৈহিক সৌষ্ঠব পরিপক্কতা প্রাপ্ত হয়। আর এ অবস্থা সাধারণত পনেরো বছর বয়সকালে হয়ে থাকে। আর যদি সন্তানের বয়স জানা না যায় তাহলে স্বপ্নদোষ ও নিম্নাঙ্গের পশম উঠার দ্বারা তা নির্ণয় করা যায়। কারণ এগুলো বালেগ হওয়ার চিহ্নের অন্তর্ভুক্ত।

নামাযের দুটি দিক রয়েছেঃ (ক) নামায আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম –জরিয়া এবং জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়া হতে বাঁচার –রক্ষা পাওয়ার ইবাদত। এ কারণে যৌবনের উন্মেষ কালেই অর্থাৎ বালেগ হওয়ার সূচনা লগ্নেই নামাযের হুকুম দেয়া হয়েছে।

(খ) নামায ইসলামের শেয়ার তথা অভ্যাস, রীতিনীতি ও চালচলনের এমন এক শেয়ার –চিহ্ন তথা রীতিনীতি যাতে সংকীর্ণতা ও অসতর্কতা বা কমতি হলে লোকদের পাকড়াও করা যায়। সে কামনা করুক বা না করুক সে বিষয়ে তাকে বাধ্য করা যায়। এদিক থেকে নামাযের বিষয়টি অন্যান্য ইবাদাতের মতোই।

দশ বছর বয়স যখন উভয় পর্যায়ের বয়সের মধ্যবর্তী অবস্থা এবং এ অবস্থা উভয় বয়সের মিলনস্থল ও মধ্য অবস্থা; এ জন্য তার জন্য উভয় বয়সের মধ্যে অংশ রাখা হয়েছে।

বিছানা পৃথক করাঃ বিছানা পৃথক করণের কারণ হলো এ বয়স হচ্ছে যৌবন কাল আগমনের পূর্বাভাসের বয়স। অচিরেই মোজামেয়াতের ইচ্ছা প্রকাশ পাবে। এ কারণে সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার পূর্বেই সমস্যার পথ বন্ধ করে দেয়া অত্যন্ত জরুরি।

নামাযের ফজিলত

আল্লাহ তা’আলার বাণীঃ

(আরবী***************************************************)

“নিশ্চয়ই নেক-পুণ্য কাজ পাপ দূরীভূত করে দেয়”।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী সে ব্যক্তির উদ্দেশ্যে যে পাপ করার পর জামাতে নামায আদায় করেছে-

(আরবী**********************************************************************)

“অতঃপর নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক তোমার পাপ ক্ষমা করে দিয়েছেন”।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী*********************************************************)

“বল, যদি তোমাদের কারো দরজায় নদী প্রবহমান থাকে, যাতে সে ব্যক্তি দৈনিক পাঁচবার গোসল করে, তাহলে কি তার দেহে কোনো ময়লা অবশিষ্ট থাকবে? সাহাবায়ে কেরাম জবাব দিলেন –তার দেহে ময়লার কিছুই থাকবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এটা পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের উপমা। আল্লাহ তা’আলা নামাযের মাধ্যমে গুনাহ ক্ষমা করে দেন”।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী***************************************************)

“পাঁচ ওয়াক্ত নামায এবং এক জুমা অপর জুমা পর্যন্ত এবং এক রমজান অপর রমজান পর্যন্ত সংঘটিত সকল গুনাহকে নির্মূল করে দেয়। যদি কবিরা গুনাহ হতে বিরত থাকা হয়”।

উপরোক্ত হাদীস ও পবিত্র কুরআনের আয়াত সম্পর্কে আমি বলি যে, নামায পবিত্রতা অর্জন এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের সর্বোত্তম মাধ্যম। নামায আত্মাকে পবিত্রকারী ও ফিরিশতাদের জগতে পৌঁছে দেয়। নফস তথা আত্মার বৈশিষ্ট্য হলো যখন সে কোনো একটি গুণে পরিপূর্ণভাবে গুণান্বিত হয় তার সে গুণ তার মধ্যে প্রভাব বিস্তার করে নেয় তখন সে তার বিপরীত গুণ হতে দূরে অবস্থান করে পরিপূর্ণরূপে। তার বিপরীত গুণ হতে এমনভাবে দূরত্ব অবলম্বন করে যেন সেটি স্মরণে রাখার ন্যায় কোনো বিষয়ই ছিল না। (যেমনঃ যখন নফস –তথা অন্তর ন্যায়পরায়ণতা ও দানশীলতার গুণে গুণান্বিত ও অভ্যস্ত হয়ে যায় তখন তার মধ্যে যুলুম ও কৃপণতার নিশানা পর্যন্ত বিদ্যমান থাকে না। এমনিভাবে তার বিপরীত।) যখন কোনো ব্যক্তি সঠিক পদ্ধতিতে নামায আদায় করবে উত্তমরূপে অযু করবে, সময়মত নামায আদায় করবে, রুকু সিজদা সঠিকভাবে করবে, শুখুর প্রতি গুরত্ব দেবে, নামাযের সকল তাসবীহসমূহ পরিপূর্ণরূপে গুরুত্ব সহকারে আদায় করবে। নামাযি যখন নামাযের রূহ ও হাকীকত লাভ করার প্রচেষ্টা চালাবে, তখন সে রহমতের সাগরে ডুব দেবে এবং আল্লাহ তা’আলা তার গুনাহসমূহ নির্মূল করে দেবেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ

(আরবী**********************************************************************)

“আল্লাহর অনুগত বান্দা ও কাফেরের মধ্যে তফাত হলো নামায ত্যাগ করা”।

আমি বলি যে, নামায ইসলামের বিশাল শ্রেষ্ঠ ও উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন নিদর্শন অভ্যাস ও চিহ্ন এবং মুসলমানের এমন বৈশিষ্ট্য ও চিহ্ন যে, যদি তা না থাকে তাহলে মূলত ইসলামই রইল না। নামায ও ইসলামের উভয় মাঝে মজবুত সম্পর্কের কারণে। নামাযই সঠিকভাবে প্রমাণ করে আল্লাহর সামনে আল্লাহর জন্য মাথা ঝুকানোকে। যার নামাযের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই মূলত তার ইসলামের সাথে সম্পর্ক নামকাওয়াস্তে। তার ইসলাম ধর্তব্যই নয়।

নামাযের সময়

নামাযের উপকারিতা যখন আল্লাহর দর্শন লাভ ও তার একান্ত নৈকট্য পাওয়া অর্থাৎ আল্লাহর নৈকট্য লাভের সর্বোচ্চ আসনে উপনীত হওয়া এবং পরিপূর্ণভাবে ফিরিশতাদের সারিতে গুণে-গুণান্বিত হওয়া। তা ততক্ষণ পর্যন্ত লাভ করা যাবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না পুরো জীবন নামাযের জন্য নিবেদিত না হবে, ব্যক্তি সর্বদা নামাযের সাথে সম্পৃক্ত হবে, এত অধিক পরিমাণে নামায আদায় করবে যাতে তার সমস্ত গুনাহের বোঝা তার থেকে দূরীভূত হবে ও সে গুনাহের বোঝা হতে মুক্তি লাভ করবে। কিন্তু এক্ষেত্রে মানুষকে এমন তো কোনো বিধান দেয়া যায় না যার কারণে মানুষের দুনিয়াবী অপর সব জরুরী কাজ থেমে যাবে, স্পষ্ট হয়ে যাবে এবং বস্তুগত সকল প্রয়োজন হতে মুক্ত হয়ে যেতে হবে। এজন্য হেকমতে খোদাওয়ান্দী তথা মহান আল্লাহর হিকমতের দাবি হলো লোকদেরকে খণ্ডকালীন সময়ে নামাযের প্রতি দৃষ্টি দেয়া এবং তাকে সংরক্ষণ তথা হেফাযত করার হুকুম করা হবে। যাতে নামাযের সময়ের পূর্বে নামাযের জন্য অপেক্ষা করা, নামাযের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করার ও তাছাড়া অন্য যে সময়টুকু বেঁচে যাবে তাও নামাযের নূরের কারণে নামাযের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। এক নামায হতে অন্য নামাযের মাঝে সময়ের যে অংশটুকু গাফলতের মাঝে পড়বে যেহেতু সে সময়েও তার ধ্যান ও খেয়াল আল্লাহর স্মরণের প্রতিই নিবদ্ধ থাকবে এবং তার অন্তর আল্লাহর আনুগত্যে নিবেদিত থাকবে সেহেতু তাও নামাযের সাথে মিলিয়ে দেয়া হবে। এতে করে মুসলমানের অবস্থা ঐ ঘোড়ার ন্যায় হয়ে যাবে যেটি একটি খুঁটির সাথে বাঁধা। ঘোড়াটি দু-একবার লাফালাফি করে দু-এক কদম এদিক-সেদিক ঘোরে, তারপর পুনরায় নিজের খুঁটির নিকট ফিরে আসে। এমনিভাবে মুমিনের অন্তর নামাযের সাথে বাঁধা থাকে। কিছু সময় ব্যস্ততার পর পুনরায় এসে নামাযে দাঁড়িয়ে যায়। তার অন্তরে ভুলের ও গাফলতে অন্ধকার প্রবেশ করতে পারে না। যখন সার্বক্ষণিক নামাযে নিয়োজিত থাকা সম্ভব নয় তখন এরূপভাবে নামাযে নিয়োজিত থাকা সম্ভব।

উপরোক্ত মাছলেহাতের কারণে যখন নামায খণ্ডকালীন সময়ে আদায় করার প্রয়োজন দেখা দিল তখন নামাযের সময় নির্ধারণ করার প্রয়োজন দেখা দিল। তখন দেখা দেল চারটি সময় –যে সময়গুলোতে আল্লাহর রহমত অধিক পরিমাণে বর্ষিত হয় সেগুলোই এজন্য উপযুক্ত সময়। যে সময়গুলোতে আল্লাহর ফিরিশতারা অবতীর্ণ হয়, সে সময়গুলোতে বান্দার আমল আল্লাহর সম্মুখে পেশ করা হয়, বান্দার দোয়াগুলো কবুল করা হয়, ঐ সময়গুলো সকল নবীর নিকট একটি যথার্থ সময় মহান আল্লাহর নিকট হতে জ্ঞান লাভের জন্য। এসময়গুলো দু’দিক থেকে দিবা ও রাতের একত্রিত হওয়ার সময় এবং উভয়ের অর্ধেক হওয়ার সময়। (অর্থাৎ ফজরের সময়, সূর্যাস্তের সময়, আছরের সময় ও অর্ধরাতের সময়।) কিন্তু অর্ধরাতে মানুষকে নামাযের জন্য কষ্ট দেয়া একটি পেরেশানির কারণ। যা সকলেই ভালোভাবে বুঝতে সক্ষম। এ কারণে নামাযের জন্য তিনটি সময় নির্বাচিত করা হয় মূলত। সকাল বেলা, সন্ধ্যাবেলা এবং রাত্রে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলার ইরশাদ হচ্ছেঃ

(আরবী*****************************************************************************)

“নামায কায়েম কর সূর্য ঢলে পড়ার পর হতে রাত অন্ধকার হওয়া পর্যন্ত এবং সকাল বেলার নামাযও আদায় কর। নিশ্চয়ই সকাল বেলার নামায (ফিরিশতাদের) উপস্থিতির সময়”।

এখানে আল্লাহ তা’আলা (আরবী***************) “রাত অন্ধকার হওয়া” পর্যন্ত বলার কারণ হচ্ছে সন্ধ্যাবেলার নামাযের সময় রাত অন্ধকার হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ। এবং ঐ নামাযগুলো পরপর আসে। এ কারণে প্রয়োজনের ক্ষেত্রে জোহর ও আছর একত্রে আদায় করা এবং মাগরীব ও এশা আদায় করার প্রমাণ।

দু’নামাযের মাঝে সময়ের দূরত্ব অধিক বা অত্যধিক হওয়া ঠিক নয়। এতে নামাযের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখার অর্থ অনর্থক হয়ে যাবে। পূর্ববর্তী নামাযের দ্বারা বান্দার অন্তরে আল্লাহর যে স্মরণ সৃষ্টি হয়েছিল বান্দা তা ভুলে যাবে। আবার দু’নামাযের মাঝে সময়ের ব্যবধান অত্যধিক কম-স্বল্প হওয়াও উচিত নয়। এতে করে বান্দা তার জীবিকা অন্বেষণের সুযোগ পাবে না। নামযের সময়গুলোও এমন গ্রহণযোগ্য সময়ে হতে হবে যা প্রকাশ্য এবং গ্রহণযোগ্য। যা সব ধরনের লোকের বুঝের মধ্যে হবে –প্রত্যেকে যা বুঝতে পারবে এমন হবে। ঐ গ্রহণযোগ্য সময়গুলোও আরব অনারব সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য ও বোধগম্য সময় হতে হবে। এ ক্ষেত্রে শর্ত হলো সেগুলোও অনির্ধারিত ও দীর্ঘ হতে পারবে না। সুতরাং দু’নামাযের মধ্যে সময়ের গ্রহণযোগ্য দূরত্ব হবে দিনের চারের একাংশ অর্থাৎ তিনঘন্টা। কারণ রাত্র ও দিনকে বার বার ঘন্টায় ভাগ করার বিষয়ে সকল দেশের মানুষের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। কৃষক, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি এবং অপরাপর পেশার লোক সাধারণতঃ সকাল হতে দ্বিপ্রহর পর্যন্ত সময়ে তাদের কর্মে ব্যস্ততায় কাটায়। কারণ এ সময়টা হলো তাদের জীবিকা অন্বেষণের সময়। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেনঃ

(আরবী**********************************************************)

“আমি দিনকে করেছি জীবিকা অন্বেষণের জন্য”।

তিনি আরো ইরশাদ করেছেনঃ

(আরবী*************************************)

“যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ অন্বেষণ  করতে পার”। আবার, অনেক কাজ এমন রয়েছে যেগুলো সমাধা করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন পড়ে। ঐ সময়ে নামাযের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ এবং নামায আদায় করা সকলের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে সকাল বেলার সময় দীর্ঘ করা হয়েছে এবং তখন কোনো নামায ফরজ করা হয়নি। এ সময়ের সদ্ব্যবহারের জন্য বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছেন।

এক্ষেত্রে সন্ধ্যার নামাযকে দুটি সময়ে ভাগ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল –যাদের উভয়ের মাঝে দিনের চার ভাগের এক ভাগ সময়ের ব্যবধান হবে। আর তাহলো জোহর ও আছর এবং রাতের অংশের নামাযকেও দুটি সময়ে ভাগ করার প্রয়োজন হলো তা হলো মাগরীব ও এশা যাদের মাঝেও সে সমপরিমাণ সময়ের ব্যবধান থাকবে।

যখন এমন কোনো প্রয়োজন দেখা দেয় যা হতে উত্তীর্ণ হওয়ার কোনো উপায় থাকে না সে অবস্থায় ব্যতীত জোহর ও আছর এবং মাগরীব ও এশার মধ্যে একত্রিত করা উচিত নয় তা না হলে নামাযের সময় নির্ধারণের মধ্যে যে মাছলেহাত নিহিত ছিল তা বাতিল হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে এটিও অপর মূলনীতি।

মধ্যপন্থী দেশ ও সমমনা যেসব সাধারণ লোকদেরকে শরীয়তের বিধান প্রণয়নকালে সামনে রাখা হয়েথে তারা খুব সকালে ঘুম থেকে জাগ্রত হয় এবং রাত্র পর্যন্ত কায়-কারবারে ব্যস্ত থাকে এবং যে সময়গুলোতে নামায আদায় করার প্রতি অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, সে সময়গুলোতে নামায আদায় করে তা হলোঃ

যখন দিল ও দেমাগ তথা মন মানসিকতা জীবিকা অন্বেষণের চিন্তা মুক্ত থাকে –জীবন-জীবিকা অন্বেষণের ব্যস্ততা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ ভূলিয়ে দেয়। যখন –মন মানসিকতা জীবন জীবিকার চিন্তা মুক্ত থাকে তখন নামায আদায় করলে আল্লাহর স্মরণ অন্তরে জায়গা করে নেয় এবং অন্তরের উপর বিশাল প্রভাব বিস্তার করে। সুতরাং সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠতেই নামায ফরয করা হয়েছে। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেনঃ

(আরবী************************************************************************************)

“আর সকাল বেলায় তেলাওয়াত। আর সকাল বেলার তেলাওয়াতে ফিরিশতারা উপস্থিত হয়ে থাকে”।

শয়তানের পূর্বে যাতে সারা দিনে যেসব গুনাহ সংঘটিত হয়েছে আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে তার কাফফারা হয়ে যায়। এবং অন্তরের দুশ্চিন্তা বিদূরীত হয়ে যায়। এ সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

(আরবী*******************************************************************************)

“যে ব্যক্তি এশার নামায জামাতের সাথে আদায় করল –তা প্রথম অর্ধরাত্র নফল আদায়ের সমতুল্য। আর যে ব্যক্তি এশা ও ফজর উভয় নামায জামাতের সাথে আদায় করল –তা পুরো রাত নফল আদায়ের সমতুল্য।

কায়-কারবারে ব্যস্ত থাকার সময় –যেমন মধ্যদিনের সময় এ সময়ে নামায আদায় করা দুনিয়ার মাঝে ডুবে যাওয়াকে দূর করে দেয় এবং দুনিয়ার বিষের প্রতিষেধক হয়। সাধারণ লোকদেরকে এ বিষয়ে বাধ্য করা যাবে না –বাধ্য করা বৈধ হবে না। কারণ তারা তখন দু’অবস্থার মধ্যে পড়ে যাবে। সে হয়ত এটা ত্যাগ করবে, না হয় ওটা ত্যাগ করবে। এটাও দু’নামাযের মধ্যে একত্রিতকরণের একটা মূলনীতি। কারণ এরূপ করলে সে হয়ত নামায ত্যাগ করবে বা সে দুনিয়াদারী ত্যাগ করবে। নামায ত্যাগ করলে দ্বীনের ক্ষতি হবে আর দুনিয়া ত্যাগ, কাজ ত্যাগ করলে তার দুনিয়ার ক্ষতি হবে।

নামাযের সময় নির্ধারনের ক্ষেত্রে এদিকেও দৃষ্টি দেয়া হয়েছে তা যেন পূর্বেকার নবীদের নামাযের সময়ের হয়। কারণ তা আত্মাকে ইবাদতের প্রতি আকৃষ্ট করে এবং লোকদেরকে ইবাদতের ক্ষেত্রে প্রতিযোগী করে তোলে এবং নেককার লোকদের স্মরণ রাখার কারণ হয়। এ সম্পর্কে হযরত জিবরাঈল (আ)-এর বাণী হলোঃ

(আরবী*********************************************************************************)

“এটি হচ্ছে আপনার পূর্বেকার নবীদের জন্য নির্ধারিত সময়”।

এশার নামায সম্পর্কে মোয়াজ (রাঃ)-এর হাদীসে এসেছে যে, (আরবী********************) “তোমাদের পূর্বে কোনো উম্মত এ নামায আদায় করেনি”। কারণ এ হাদীসে সাহাবীদের এক বিরাট সংখ্যক বর্ণনা করেছেন। তাদের কেউ কেউ বলেছেনঃ

(আরবী******************************) “নিঃসন্দেহে অনেক লোক নামায আদায় করেছে এবং শুয়ে গেছে”। তাদের কেউ কেউ বলেছেন-

(আরবী*************************************************************************************)

“মদীনায় ব্যতীত অন্য কোথাও এ নামায আদায় করা হয়নি”। ইত্যাদি ইত্যাদি। এর থেকে একথা পরিস্কার যে, হযরত মোয়াজের এ বর্ণনাটি (আরবী*******************) এটি অর্থ ভিত্তিক বর্ণনা। দু’নামাযের মধ্যে একত্রিকরণের এটাও অপর একটা প্রমাণ।

মোটকথাঃ নামাযের সময় নির্ধারণের মধ্যে অনেক হিকমত লুকিয়ে রয়েছে। নামাযের সময় নির্ধারণের মধ্যে অনেক গুরুত্ব থাকার কারণে স্বয়ং হযরত জিবরাঈল (আ) উপস্থিত থেকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নামাযের সময় শিক্ষা দিয়েছেন। এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে নামায আদায় করেছেন।

আমার উপরে যা উল্লেখ করেছি তা হতে দু’ওয়াক্ত নামায প্রয়োজনের ক্ষেত্রে একত্রিত সময় যৌক্তিকতা প্রমাণিত হলো। এবং অন্যান্যরা যা উল্লেখ করেছেন –যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও অন্যান্য নবীদের উপর তাহাজ্জুদ ও চাশতের নামায ওয়াজিব ছিল এবং উম্মতের জন্য মোস্তাহাব। এবং সময়মত নামায আদায়ের প্রতি এতটা তাকিদ কেন দেয়া হয়েছে? এসব বিষয় সবিস্তারে জানা গেল। আল্লাহ তা’আলা সর্বজ্ঞ।

নামাযের সময়ের প্রতি এতটা গুরুত্ব থাকার পরও প্রত্যেকে নামায একই সময়ে পড়তে বাধ্য করা হয়নি। কেউ আগে পড়বে না, আবার কেউ পিছে পড়বে না। এটা এজন্য যে নামাযের সময় দীর্ঘ ও প্রশস্ত।

শরীয়তের বিধান আম তথা সর্বসাধারণের জন্য অত্যাবশ্যকীয় হওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরী হলো নামাযের জন্য এমন একটা  পরিচ্ছন্ন ও গ্রহণযোগ্য সময় নির্বাচন করা হবে যা সমগ্র আরববাসী সমভাবে অবগত থাকবে যে নামাযের সমেয়র আগমন ঘটেছে এবং নামাযের সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। সময় হলেই সে নামায আদায়ের চিন্তা করবে এবং সময় শেষ হওয়ার পূর্বে জিম্মাদারী হতে মুক্ত হবে। সুতরাং নামাযের প্রথম সময় ও শেষ সময় নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছে।

সময়ের মধ্যে প্রতিযোগিতার কারণে নামাযের জন্য চারটি সময় তথা ওয়াক্ত নির্ধারিত হয়েছেঃ

১. পছন্দনীয় সময়ঃ এটা এমন একটা সময় যখন সাচ্ছন্দে নামায আদায় করা যায়। এ ব্যাপারে বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য দুখানা হাদীস রয়েছে। (১) হাদীসে জিবরাঈল, হযরত জিবরাঈল (আ) আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে দু’দিন নামায আদায় করেছেন। আর (২) হযরত বুরাইদার (রা) হাদীস। তাতে রয়েছে যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযের ওয়াক্ত সম্পর্কে প্রশ্নকারীর দু’দিন প্রথম সময়ে ও দু’দিন শেষ সময়ে নামায আদায় করে তার জবাব দিয়েছেন। এ দুটির মধ্যে যেটি অধিক স্বচ্ছ বর্ণণা সেটিকে গ্রহণ করা হবে যেটিতে অস্বচ্ছতা রয়েছে তা হতে। দুটি হাদীসের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে যেটি স্বচ্ছ তা গ্রহণ করা হবে যেটিতে স্বচ্ছতা নেই তা গ্রহণ করা হবে না। আর যদি উভয়টি স্বচ্ছ হয় তাহলে বুরাইদার (রাঃ) হাদীস গ্রহণ করা হবে। কারণ তাতে যে ঘটনার উল্লেখ রয়েছে তা মদীনা শরীফের ঘটনা আর জিরাঈলের ইমামতির ঘটনা মক্কার ঘটনা। এক্ষেত্রে শেষটিকে গ্রহণ করা হবে। এ মতবিরোধের ব্যাখ্যা হলোঃ মাগরীবের নামাযের শেষ সময় হলো শফক (পশ্চিম আকাশের লালিমা) বিদূরীত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। হযরত জিবরাঈল (আ) দ্বিতীয় দিন মাগরীবের নামায খুব অল্প সময় বিলম্ব করে থাকবেন হয়ত মাগরীবের নামাযের সময় স্বল্প হওয়ার কারণে। এ কারণে বর্ণনাকারী এভাবে বর্ণনা করেছেন যে উভয় দিন জিবরাঈল (আ) একই সময়ে মাগরিবের নামায আদায় করেছেন। অথবা নিজের ইজতেহাদী ভুলের কারণে অথবা খুব সামান্য বিলম্ব করার কারণে। বাকি আল্লাহই ভালো জানেন।

অনেক বর্ণনা হতে এটা জানা যায় এবং ফোকাহাগণও এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন যে, আছরের নামাযের সময় হল সূর্যের রং পরিবর্তন হওয়া পর্যন্ত। ছায়া আছলীর দ্বিগুণ হওয়ার বর্ণনা হতে পারে পছন্দনীয় সময়ের শেষ সময়ের বর্ণনা বা আছরের নামায আদায়ের মোস্তাহাব সময়ের বর্ণনা। অথবা আমরা বলতে পারি যে, শরীয়ত প্রথমে এ বিষয়টির প্রতি লক্ষ করেছেণ যে, আছরকে জোহর হতে পৃথক করার উদ্দেশ্য হলো দু’নামাযের মধ্যে নূন্যতম পক্ষে দিনের চার ভাগের এক ভাগের (তিন ঘন্টার) ব্যবধান হওয়া চাই তাই ছায়ায়ে আছলীর দ্বিগুণ হওয়া পর্যন্ত তার সময় নির্ধারিত করে দিয়েছে।

অতঃপর লোকদের প্রয়োজনীয়তা ও সুস্থ্যতার বিষয়টি সামনে এল, তাই আছরের নামাযের শেষ সীমা দীর্ঘায়িত করে দেয়া হলো।

এ সীমা নির্ধারিত করার মধ্যে চিন্তার বিষয় নিহিত রয়েছে। মূল ছায়া ঠিক রাখা এবং অবস্থান গ্রহণ করার উপায়। সাধারণ জনগণকে এমন বিষয়ের হুকুম দেয়া উচিত নয় যা তাদের পক্ষে বুঝা সহজ নয়। অতএব আল্লাহ তা’আলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অন্তরে এ বিষয়ের উদ্রেক করেছিলেন যাতে সূর্যের রং পরিবর্তন হওয়া পর্যন্ত আছরের নামাযের সময় বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহই ভালো জানেন।

২. মোস্তাহাব সময়ঃ মোস্তাহাব সময় হলো সে সময় যখন নামায আদায় করা মোস্তাহাব। আর সেসময় হলো প্রত্যেক নামাযের প্রথম ওয়াক্ত।

ক. এশার নামায ব্যতীতঃ এশার নামাযের ক্ষেত্রে মূলত বিলম্বে নামায আদায় করাই হলো মোস্তাহাব। তার কারণ হলো আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, সেটা প্রকৃতিগত কারণে। এ সম্পর্কে আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইরশাদ হচ্ছেঃ

(আরবী***********************************************************************)

“আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর মনে না করলে আমি তাদেরকে এশার নামায বিলম্বে আদায় করতে বলতাম”।

মানুষের আভ্যন্তরীণ অবস্থা পরিস্কার করার জন্য এশার নামায বিলম্বে আদায় করা খুবই উপকারি। মানুষকে এশায় বিলম্ব করা মাধ্যমে যেসব বিষয় ব্যস্ত হওয়া হতে বাঁচানো হয় যেগুলো তাদেরকে আল্লাহর স্মরণকে ভুলিয়ে রাখে এবং এশার পর গল্প গুজবে সময় ব্যয়ে ব্যস্ত করে রাখে। কিন্তু এশার নামায বিলম্ব করা কখনো কখনো জামাতে লোক স্বল্পতার ও লোকদের জামাত হতে দূরে থাকার কারণও হতে পারে। এক্ষেত্রে এসে বিষয়টি উল্টা হয়ে যায়। এ কারণে যখন লোক অধিক পরিমাণে একত্রিত হতো তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাড়াতাড়ি নামায  আদায় করে নিতেন আবার যখন লোকদের উপস্থিতি কম হতো তখন বিলম্ব করতেন।

খ. এখানে ব্যতিক্রম হলো গ্রীষ্মকালীন জোহরের নামাযঃ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইরশাদ হলোঃ

(আরবী*****************************************************************************)

যখন গরম বেড়ে যায় তখন জোহরের নামাযকে ঠাণ্ডা করে আদায় করো, কারণ গরমের কঠোরতা জাহান্নামের প্রভাব ফেলে থাকে।

আমি বলি যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো জান্নাত ও জাহান্নামের উৎস হচ্ছে তাই যা এ দুনিয়ায় প্রচলিত; চাই সেটি অবস্থার অনুকূল হোক কি প্রতিকূল হোক। আর এটাই বুঝানো হয়েছে যা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামর ইরশাদ করেছেনঃ

(আরবী********************************************************************************)

“তোমরা ফজরের নামায আলোকিত অবস্থায় আদায় কর। অর্থাৎ মসজিদে নববীতে যেভাবে আমল চলে আসছে সেরূপভাবে কর তার বিপরীত করো না। তা সওয়াবের দিক হতে অনেক বড় (অর্থাৎ ফজরের নামায চারদিক আলোকিত অবস্থায় আদায় করলে অধিক সওয়াব হবে কারণ তাতে জামাত বড় হবে, জামাত যত বড় হবে সওয়াব তত অধিক হবে)।

আমি বলি এ সম্বোধন সে সব লোকদের উদ্দেশ্য করা হয়েছে যারা ফজরের নামায বিলম্বে চারদিকে আলোকিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলে জামাতে লোকজন কম হওয়ার ভয় করে তাদের জন্যে অথবা ঐ মসজিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যেখানে দুর্বল লোকেরা ও ছোট ছোট শিশুরা জামাতে একত্রিত হয় আর সেখানে তাদের কষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বিলম্ব করে চারদিকে আলোকিত হলে ফজরের নামায আদায় করলে –যেমন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ

(আরবী***************************************************************************************)

“তোমাদের কেউ যদি নামায লোকদের পড়ায় তাহলে সহজ ও হালকাভাবে নামায আদায় করবে”।

পূর্ণ হাদীসটি এরূপঃ

(আরবী************************************************************************************)

তোমাদের কেউ মানুষের ইমামতি করলে নামায হালকা করবে, কারণ তাদের মধ্যে দুর্বল, অসুস্থ ও বৃদ্ধ লোক রয়েছে, সংক্ষিপ্ত করবে। যখন নিজে একা একা পড়বে তখন যত ইচ্ছা দীর্ঘ করবে। অথবা তার অর্থ হচ্ছে এমন যে, নামায এমনভাবে দীর্ঘ করবে যাতে তার শেষাংশ চারদিকে আলোকিত হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ হয়। তা হযরত আবু বারজার হাদীস অনুযায়ী-

(আরবী*********************************************************************************)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকালের নামায হতে তখন ফিরতেন যখন মানুষ তার সাথীকে দেখলে চিতনে পারত এবং তিনি ফজরের নামাযে, ষাট থেকে একশত আয়াত পাঠ করতেন। সুতরাং (আরবী********) আলোকিত হওয়া ও (আরবী************) অন্ধকারে নামায আদায় করার মধ্যে কোনো বিরোধ থাকল না।

(আরবী*********************************************************************************)

গ. জরুরি সময়ঃ জরুরি সময় চলতে বুঝায় কোনো ওজর ব্যতীত সে সময় পর্যন্ত নামায বিলম্ব করা জায়েয নয়। এ সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী হলো-

(আরবী************************************************************************************)

যে ব্যক্তি ফজরের নামাযের এক রাকাত পেল সে ফজরের নামায পেল। যে ব্যক্তি আছরের সূর্যাস্তের পূর্বে এক রাকাত পেল সে পুরো আছরের নামায পেল। এটা হলো মোনাফেকের নামায যে সূর্যের রং হলুদ হওয়া পর্যন্ত নামায বিলম্ব করে থাকে। এটি জোহর আছর একত্রিত করার ব্যাপারে এবং মাগরীব ও এশার একত্রিত করার ব্যাপারে ইবনে আব্বাসের হাদীস। ওজর হলোঃ যেমন সফর, অসুস্থতা ও বৃষ্টি। এশার সময় জরুরি সময় হলো- (আরবী***********************************) ফজর অর্থাৎ সোবহে সাদেক উদিত হওয়া পর্যন্ত। আল্লাহই অধিক অবগত।

ঘ. কাযার সময়ঃ যখন ভুলে গেলে স্মরণ হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস-

(আরবী**********************************************************)

“যে ব্যক্তি নামায ভুলে যাবে অথবা ঘুমিয়ে পড়বে, যখন তা স্মরণ হবে তখনি তা আদায় করে নেবে”।

আমি বলি এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত ও মোদ্দা কথা হলো যাতে নামায বাদ দেয়ার ব্যাপারে নফছ অভ্যস্ত হয়ে না পড়ে। এবং কাজা নামায আদায় করার দ্বারা যে ঐ বস্তু পেয়ে যাবে যা তার হাত ছাড়া হয়ে গিয়েছিল।

ওলামাগণ জেনে বুঝে নামায ত্যাগ করা অর্থাৎ (আরবী**************) কেও (আরবী************) অর্থাৎ বাদ পড়ে যাওয়া-এর মধ্যে ধরেছেন। এ দৃষ্টিতে যে তা কাফফারা আদায় করার ক্ষেত্রে অধিক গ্রহণযোগ্য।

(১) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু জরকে তাকিদ দিয়েছেন যে, যদি তোমাদের এমন নেতা নিযুক্ত হয় যখন তারা নামায কাজা করে পড়বে বা বিলম্বে পড়বে তখন-

(আরবী*********************************************************************************)

তুমি ওয়াক্ত মতো নামায আদায় করে নেবে পার যদিতাদের সাথেও তা পাও তাহলেও তা পড়ে নেবে আর তা হবে তোমার জন্য নফল।

আমি বলি –রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযের বিষয় দুটি দিকের প্রতি লক্ষ রাখতেন, এক হলো নামায আল্লাহ ও বান্দার মাঝে উসিলা; দুই হলো নামায দ্বীনের এমন একটা রীতিনীতি ও চিহ্ন যা বাদ দিলে তাকে শাস্তির যোগ্য মনে করা হয়। দ্বীনের তাতে ক্ষতি হয়।

(২) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী-

(আরবী***********************************************************************************)

“আমার উম্মত ততক্ষণ পর্যন্ত কল্যাণের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না তারকারাজি উদিত হওয়া পর্যন্ত মাগরীব বিলম্বিত করবে”।

আমি বলি এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, শরীয়তের সীমারেখার ব্যাপারে উম্মত ভ্রুক্ষেপ না করলে, অলসতা প্রদর্শন করলে –সে উম্মত নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এবং তা উম্মতের ধ্বংসের কারণ।

(৩) আল্লাহ তা’আলা বলেছেন-

(আরবী******************************************************************************)

“তোমরা নামাযকে হেফাযত করো, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নামাযকে গুরুত্ব সহকারে হেফাযত কর”। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আছরের নামায। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী-

(আরবী*********************************************************)

যে ব্যক্তি দু’শীতল সময়ের নামায আদায় করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী-

(আরবী*************************************************************************************)

“যে আছরের নামায বাদ দিল তার আমল বাতিল হয়ে গেল”। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী-

(আরবী*************************************************************************)

“মুনাফিকদের জন্য ফজর ও এশা হতে ভারী কোনো নামায নেই। এ দু নামাযে কি সওয়াব রয়েছে তা যদি তারা জানত তাহলে তারা টানা-হিছড়া করেও তাতে উপস্থিত হতো। হামাগুড়ি দিয়ে হলেও।

আমি বলি, তরগীব ও তরহীব –উৎসাহ ও উদ্দীপনা এবং প্রেরণা দানের উদ্দেশ্যে এ তিন নামাযের প্রতি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুরুত্ব প্রদান করেছেন। কারণ এগুলো হচ্ছে অলসতা ও গুরুত্ব না দেয়ার স্থান ও সময়।

ফজর ও এশা ঘুমানোর সময়ের মধ্যে পড়ে। সে সময় গরম লেপ ত্যাগ করে, মজাদার ঘুম ছেড়ে মুত্তাকী মুমিন ব্যতীত অপর কেউ নামাযে হাজির হতে পারে না। আর আছরের সময় হলো তাদের বাজারের মোক্ষম সময়, ক্রয়-বিক্রয়ের গুরুত্বপূর্ণ সম। কৃষিকাজের লোকেরা এসময় চরম ব্যস্ত অবস্থায় সময় অতিবাহিত করে। (৪) রাসূলুল্লাস সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী-

(আরবী***************************************************************************)

“তোমাদের মাগরীবের নামাযের নামেত কোনো বেদুঈন তোমাদের উপর বিজয়ী হতে পারবে না। অপর এক হাদীসে রয়েছে –তোমাদের এশার নামাযের নামের কারণে কোনো বেদুঈন তোমাদের উপর বিজয়ী হতে পারবে না।

আমি বিল পবিত্র কুরআন ওহাদীসে যে সমস্ত নাম এসেছে তাতে পরিবর্তন করা ও অন্য নাম দেয়া। যার ফরে নতুন নামের কারণে পুরাতন নাম বাদ পড়ে যায় এরূপ করা মাকরূহ। কারণ এতে করে মানুষের জন্য তাদের দ্বীন বুঝা কঠিন হয়ে যাবে, এতে করে তাদের দ্বীন মোশতাবেহ –সন্দেহ পরায়ণ ও তাদের কুরআন ও হাদীস অস্পষ্ট ও অজ্ঞেয় হয়ে যাবে।

আযান

সাহাবায়ে কেরাম যখন জানতে পারলেন যে, জামাতে নামায আদায় করা কাঙ্ক্ষিত ও তাকিদকৃত। কোনো ধরনের আহবান ও ঘোষণা ব্যতীত একই সময়ে একই স্থানে সকলের একত্রিত হওয়াও অসম্ভব। তখন তাঁরা পরস্পর এ বিষয়ে আলোচনা, পরামর্শ কররেন। কেউ বললেন –উঁচু স্থানে আগুন জ্বালানো হোক যা দেখে লোকেরা এক স্থানে একত্রিত হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা অগ্নি পূজকদের সাথে সাদৃশ্য হওয়ার কারণে গ্রঞণ করলেন না। কেউ বললেন –সিঙ্গা ফুকানোর জন্য। ইহুদিদের সাথে সাদৃশ্য হওয়ার কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা গ্রহণ করলেন না। কেউ পরামর্শ দিলেন ঘন্টা বাজানোর জন্য। খ্রিষ্টানদের সাথে সাদৃশ্য হওয়ার কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা গ্রহণ করলেন না। তখন কোনো সমাধান ব্যতীতই সকলে ঘরে ফিরে গেল। অতঃপর আবদল্লাহ বিন জায়েদকে স্বপ্ন যোগে আযান ও একামত দেখানো হলো। তিনি তা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট প্রকাশ করলেন। তিনি তা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট প্রকাশ করলেন। তা শুনে তিনি বললেন, অতিসত্য স্বপ্ন।

এ ঘটনা হতে প্রমাণিত হয় যে, শরীয়তের বিধান কল্যাণের উদ্দেশ্যেই প্রণীত হয়। শরীয়তের বিধানের ক্ষেত্রে নবীর ইজতিহাদেরও কিছু ভূমিকা রয়েছে। দ্বীনের হুকুমগুলো সহজতর করা শরীয়তের একটি স্থায়ী নীতির অন্তর্ভুক্ত। শরীয়তের স্থায়ী রীতিনীতির ক্ষেত্রে দীর্ঘ দিন হতে পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত লোকদের বিপরীত নীতি গ্রহণ করা কাম্য। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়াও অপর কোনো ব্যক্তিও স্বপ্ন যোগে আল্লাহর উদ্দেশ্য জানতে, অবগত হতে পারে। কিন্তু লোকেরা তার মোকাল্লেফ তথা অনুসারী হতে পারবে না। যতক্ষণ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক তা স্বীকৃত হবে না ততক্ষণ পর্যন্ত তা সন্দেহ মুক্ত হবে না।

আযাত প্রচলনের মাঝে আল্লাহ তা’আলার হিকমত হলো আযান শুধুমাত্র আহবান এবং ঘোষণাই থাকবে না; বরং তা দ্বীনের একটি স্থায়ী চিহ্ন ও রীতিনীতি হয়ে থাকবে। তা এভাবে যে, যখন প্রত্যেকের সম্মুখে আযান দেয়া হবে তখন তাতে দ্বীনের শান ও মান বৃদ্ধি পাবে। আর লোকদের তা মেনে নেয়া তাদের পক্ষ হতে আল্লাহর দ্বীনের আনুগত্যের প্রমাণ হবে। এজন্য আযান আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে আরম্ভ করা হয়। অতঃপর ইসলামের বুনিয়াদী আকীদা তাওহীদ ও রেসালাতের ঘোষণা দেয়া হয়। তারপর ইসলামের বুনিয়াদী ইবাদত নামাযের দিকে লোকদের আহবান করা হয়। তার সাথে সাথে নামাযের ফায়েদাও বর্ণনা করা হয়। যাতে আযানের উদ্দেশ্য পরিস্কারভাবে সকলের সামনে প্রতিভাত হয়ে যায়।

About শিবির অনলাইন লাইব্রেরী