ইসলামের যাকাত বিধান – ১ম খন্ড

ইসলামের যাকাত বিধান
প্রথম খণ্ড
আল্লাহর বিধান
(আারবী**********)
লোকদের ধন-মাল থেকে যাকাত গ্রহণ কর, তার দ্বারা তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ কর এবং তাদের জন্যে কল্যাণের দেয়া কর। নিসন্দেহে তোমার এই দোয়া তাদের জন্য পরম সান্ত্বনার কারণ। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
গ্রন্থকারের কথা
সমস্ত তারীফ ও প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য। দরূদ ও সালাম রাসূলে করীম (স)-এর জন্য; তাঁর বংশ-পরিবার, সঙ্গী-সাথী ও তাঁর নিকট থেকে প্রাপ্ত হিদায়াতের অনুসরণকারীদের প্রতি-
দ্বীন-ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্তম্ভ হচ্ছে যাকাত। তাওহীদী ঈমান ও নামায কায়েমের সঙ্গে সঙ্গে এই যাকাত রীতিমত আদায় করেই এক ব্যক্তি মুসলিম সমাজের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে। অধিকারী হতে পারে মুসলিম জনগণের ভাই হওয়ার, পারে পারস্পরিক সম্পর্ক গভীর ও ঘনিষ্ঠ করে নিতে। যেমন কুরআন মজীদে বলা হয়েছে:
(আরবী*************)
যদি এই লোকেরা তওবা করে, নামায কায়েম করে এবং যাকাত দেয় তবে তারা তোমাদের দ্বীনী ভাই হবে।
যাকাত সাধারণত ইবাদতের পর্যায়ে গণ্য। কুরআন মজীদে নামাযের সঙ্গেই আছে যাকাতের উল্লেখ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যাকাত ইসলামের সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিধানের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ কারণে তা খুব গুরুত্ব সহাকারেই উপস্থাপিত হয়, রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে এবং এই পর্যায়ে লিখিত গ্রন্থাবলীতে।
ইসলামের বিশেষজ্ঞগণ এই কারণে যাকাতের আইন ও বিধি-ব্যবস্থা এবং তত্ত্ব ও তথ্যের উপর পরিপূর্ণ বিশেষত্ব ও বৈশিষ্ট্যে সহকারে গুরুত্ব আরোপ করেছেন- এই প্রসঙ্গে গবেষণা চালিয়েছেন।
কুরআনের তাফসীর লেখকগণের ভূমিকা
কুরআন মজীদের যেসব আয়াতে যাকাতের উল্লেখ রয়েছে, তাফসীর লেখকগণ সেই সব আয়াতকে ভিত্তি করে যথেষ্ট চিন্তা-গবেষনা ও বিস্তারিত আলোচনা পর্যালোচনা চালিয়েছেন। এই পর্যায়ে সূরা আল-বাকারার ২৬৭ ও তৎপরবর্তী আয়াত, সূরা আল-আনআমের ১৪১ আয়াত, সূরা আত-তওবা’র ৩৪, ৬০ ও ১০৩ আয়াত এবং আরও কয়েকটি সূরার কতিপয় আয়াত উল্লেখ্য।
তাফসীরকারগণ উপরিউক্ত আয়াতসমূহের পর্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এ প্রসঙ্গে যে মহামূল্য ও বৃহদাকার গ্রন্থাবলী রচিত হয়েছে তন্মধ্যে নিম্নলিখিত গ্রন্থাবলীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ:
-আবূ বকর আর-রাযী আল-জাস্সাস : আল আহকামুল কুরআন
-আবূ বকর ইবনুল আরাব: আল-আহাকামুল কুরআন
-আবূ আবদুল্লাহ আল-কুরতুবী: আল-জামে’লি-আহকামিল কুরআন
মুহাদ্দিস ও হাদীসের ব্যাখ্যাকারদের ভূমিকা
এ পর্যায়ে হাদীসসমূহের আলোচনা ও ব্যাখ্যাদানে মুহাদ্দিস ও হাদীসের ব্যাখ্যাকারগণ বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। ফিকাহ্ গ্রন্থের পদ্ধতিতে হাদীসের যে সব গ্রন্থ প্রণীত হয়েছে তার প্রত্যেকটিতে যাকাত সম্বন্ধে একটা বিশেষ অধ্যায় সংযোজিত করেছেন। এক্ষেত্রে ইমাম মালিক প্রণীত মুয়াত্তা, বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ, জামে তিরমিযী, সুনানে নাসায়ী, আবূ দাউদ ও ইবনে মাজা প্রভৃতি গ্রন্থের নাম উল্লেখ্য। সেই বিশেষ অধ্যায়ে রাসূলে করীম (স) থেকে বর্ণিত তাঁর কথা ও কাজের বিবরণ সুবিন্যস্ত করা হয়েছে। একমাত্র বুখারী শরীফেই যে ‘কিতাবুস যাকাত’ উদ্ধৃত আছে তাতেই ১৭২টি সহীহ্ মারফূ [মারফূ বলা হয় সেই হাদীসকে, যা রাসূলের কথা সম্বলিত এবং কোন সাহাবী কর্তৃক বর্ণিত] হাদীস সংকলিত রয়েছে। মুসলিম শরীফেও তাঁর থেকে সতেরিটি হাদীস ছাড়া অবশিষ্ট সকল হাদীসই উদ্ধৃত হয়েছে। মুসলিম শরীফেও তাঁর থেকে সতেরটি হাদীস ছাড়া অবশিষ্ট সকল হাদীসই উদ্ধৃত হয়েছে। উপরন্তু সাহাবা ও তাবেয়ীনের বিশটি উক্তিও তাতে উল্লেখ করা হয়েছে।[ফহ্হুল বারী-বুখারী শরীফের শরাহ্। তাতে কিতাবুয যাকাত উপসংহারে দ্রষ্টব্য।]
ফিকাহবিদদের কাজ
ফিকাহ্র কিতাবসমূহে যাকাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে ইসলামের দ্বিতীয ইবাদত হিসেবে। এই কারণে কুরআন ও সুন্নাহ্র অনুসরণে নামাযের পরপরই তার উল্লেখ রয়েছে ইবাদাতসমূহের আলোচনা ব্যপদেশে।
ইসলামের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ফিকাহ্র আলিমগণের কাজ
তাঁরা ইসলামের অর্থনৈতিক ও সামষ্টিক ব্যবস্থার অংশ হিসাবেই যাকাতকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এ কারণে সে বিষয়ে আলোচনায় আমরা দেখতে পাই ইমাম আবূ ইউসুফের ‘কিতাবুল খারাজ’-এ, ইয়াহ্ ইয়া ইবনে আদাম লিখিত ‘কিতাবুল খারাজ’-এ, আবূ উবাইদ লিখিত ‘কিতাবুল আমওয়াল’-এ, মাওদী শাফেয়ী ও আবূ-ইয়ালী আল-হাম্বলী রচিত ‘আল-আহ্কামুস সুলতানীয়া’ নামক গ্রন্থদ্বয়ে এবং ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা লিখিত ‘আস-সিয়াতুশ-শরীয়াহ’ গ্রন্থে।
এক্ষণেযাকাত পর্যায়ে আলোচনাকারী যে মৌল বস্তুর মুখাপেক্ষী হয়, তা অত্যন্ত ভারী ও দুরূহ। তার উৎস বিপুল এবং প্রচুর। তাহলে নতুন করে যাকাত সম্পর্কে এই আলোচনার অবতারণার প্রয়োজন কি? অন্য কথায়, ইসলামী গ্রন্থকার কি এই ধরনের এক নবতর বিরাট আলোচনার মুখাপেক্ষী, যাতে যাকাতের নিয়ম-বিধান, তার লক্ষ্য এবং ব্যক্তি-সমষ্টির জীবনে তার প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া বর্ণনা করা হবে? বর্ণনা করা হবে সমসাময়িক অর্থনৈতিক ও সামাজিক-সামষ্টিক ব্যবস্থাপনায় তার স্থান সম্পর্কে? এ প্রশ্নের জবাব আমরা নিশ্চিন্তেই ইতিবাচকভাবে দিতে সক্ষম। বরং বলতে পারি, এ ধরনের আলোচনার প্রয়োজন অত্যন্ত তীব্র। তার কয়েকটি কারণ এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে:
১. এ কথায় কোন সন্দেহ নেই যে, ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই স্তম্ভ সম্পর্কে আলোচনাকারী ও লেখকগণের একটা বড় দায়িত্ব রয়েছে। প্রয়োজন রয়েছে এই বিষয়টির পৌনপুনিক আলোচনা, প্রয়োজন হচ্ছে বিভিন্ন উৎস বিস্তিীর্ণ হয়ে থাকা তার হুকুম-আহকাম, তার তত্ত্ব ও তথ্য একত্র করার এবং তাকে সমসাময়িক যুগের পদ্ধতি ও যুক্তিসঙ্গত কলেবরে নতুন করে উপস্থানের। অতীত-কালে বিশেষজ্ঞগণ এ পর্যায়ে যে চিন্তা ও গ্রন্থাবলী উপস্থাপন করেছেন, এ যুগের জন্য তাকে যথেষ্ট মনে করা যায় না কোনক্রমেই। কেননা তাঁরা যে গ্রন্থাবলী প্রণয়ন করেছেন, তা তাঁদের যুগোপযোগী সেকালের ভঙ্গী ও স্টাইল অনুযায়ী করেছেন। কিন্তু যেহেতু প্রত্যেকযুগেরই একটা নিজস্ব ভাষা ও ভঙ্গী রয়েছে, প্রত্যেক যুগের স্টাইল স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী। স্বয়ং আল্লাহ্ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন:
(আরবী************)
আমরা যে রাসূলই প্রেরণ করেছি, তাকে তার সময়কার লোকদের ভাষা ও ভঙ্গী (এবং কথা বলার যোগ্যতা) সহকারে প্রেরণ করেছি, যেন সে লোকদের সামনে স্পষ্ট বক্তব্য রাখতে সক্ষম হয়।
ইসলামী অর্থব্যবস্থায় দুটি প্রধান বিষয় অধ্যয়ন, পর্যালোচনা ও সর্বদিক দিয়ে স্পষ্ট করে তোলা একান্তই আবশ্যক। বিষয় দুটি পরস্পর বিরোধী। একটি ইতিবাচক আর অপরটি নেতিবাচক। একটি ইসলামের ফরযসমূহের মধ্যে গণ এবং সত্য কথা হচ্ছে, তা ইসলামেরপাঁচটি মৌল স্তম্ভের অন্যতম। আর দ্বিতীয়টি ইসলামে শুধু নিষিদ্ধই নয়, ধ্বংসকারী সাতটি কাজের অন্যতম। প্রথমটি যাকাত আর দ্বিতীয়টি সূদ। প্রথমটির ফরয হওয়ার কথা কিংবা দ্বিতীয়টির হারাম হওয়ার কথা অস্বীকার ও অমান্যকারী ব্যক্তি সর্বসম্মতভাবে কাফির- ইসলাম ত্যাগকারীরূপে অভিহিত।
আর বাস্তবিকপক্ষে দ্বিতীয় বিষয়টি- অর্থাৎ সুদ-মুসলিম মানীষীদের কাছে প্রথমটির তুলনায় বেশী গুরুত্ব লাভ করেছে।
মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী, মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ্ দারাজ, ঈসা আবদুহু, মুহাম্মাদ আবূ জুহরা, মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ আল-আরাবী, মাহমুদ আবুস-সউদ, মুহাম্মাদ বাকর আস্-সদর ও মুহাম্মাদ আজীজ প্রমুশ মনীষী এ পর্যায়ে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। [এই মনীষীদের লিখিত বইয়ের নাম এখানে যথাক্রমে এই: ‘সুদ’, ‘আল্লাহ সূদ হারাম করেছেন কেন’ সুদ হারামকরণ একটা অর্থনৈকি সংগঠন’, বিশেষ মালিকানা ও ইসলামে তাঁর সীমা, ইসলামী অর্থনীতির প্রধান রূপরেখা, আমাদরে অর্থ ‘ব্যবস্থা’, ‘সুদমুক্ত ব্যাংক সাফল্যেল চাবিকাঠি’ প্রভৃতি।] তাঁরা খালেস ইসলামী দৃষ্টিকোণ কিংবা সম্পদ ও জীবন সম্পর্কে পাশ্চাত্য পুঁজিবাদ প্রভাবিত দৃষ্টিকোণে অনেক কিছুই লিখেছেন।
কিন্তু জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্রমবিবর্তনের দৃষ্টিতে বিষয়টি অধিক ও গভীর ও ব্যাপক পর্যালোচনার প্রয়োজনও এখনও অব্যাহত। যারাই বেশী গবেষণা ও চেষ্টা-সাধনা করতে ইচ্ছুক, তাদের জন্যে এ ক্ষেত্রটি চিরকাল বিস্তীর্ণ হয়ে থাকবে। তবে সেই অধ্যয়ন অবশ্যই তুলনামূলক হতে হবে। সেই সঙ্গে উল্লেখ করতে হবে ইসলামেরমৌল উৎসমূহের। সর্বাবস্থায়ইবিষয়টি অধিক যত্ন ও গুরুত্বের দাবি রাখে।
কিন্তু ‘যাকাতৎ আলোচ্য বিষয় হিসেবে আলোচনাকারী ও বিশেষজ্ঞদের নিকট যথাযথ গুরুত্ব লাভ থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছে। এর ধরনের একটি বিষয় যে পরিচর্যা পাওয়ার অধিকারী, তা আদৌ করা হয়নি। অথচ ইসলামের ফরযসমূহের মধ্যে তার একটা বিশেষ স্থান রয়েছে, বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে অর্থনৈতিক, রাজস্ব ও সামষ্টিক ব্যবস্থায়।
২. এখানে এমন কতগুলো সমস্যা আছে, যে বিষয়ে প্রাচীনকালীন ফিকাহ্দিদের মধ্যে পারস্পরিক মতভেদ রয়েছে। প্রক্যেক মতের সমর্থকবৃন্দ তাঁদের মত উল্লেখ করার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দলিল-প্রমাণেরও উল্লেখ করেছেন। ফতোয়া দানকারিগণ পরস্পর বিরোধী সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। প্রত্যেকেই নিজের মত ও তার ইমামের (অগ্রবরতী মত প্রদানকারী) সমর্থন জানিয়েছেন। আর সাধারণ ফতোয়া প্রার্থীগণ ফতোয়া প্রদানকারী বিশেষজ্ঞদের এই পারস্পরিক বৈপরীত্যের সম্মুখে দিশেহারা হয়ে অবস্থান করছে। এ কারণে এসব পারস্পর বিরোধী উক্তি, তাদের প্রত্যেকের উপস্থাপিত প্রমাণ ও যুক্তির পুনর্বিবেচনা হওয়া এবং আল্লাহ্র অবতীর্ণ কিতাব ও মানদণ্ডের উপর ইনসাফের দৃষিএত তার যাঁচাই-পরখ হওয়া একান্তই আবশ্যকীয় ছিল। একান্তই জরুরী ছিল পরস্পর বিপরীত এসব মতের মধ্যে একটি মতকে এমনভাবে অগ্রাধিকার দান করা, যেন পরবর্তীকালে আলোচনাকারীরা একটা নির্ভুল সিদ্ধান্তে উপনতি হতে সমর্থ হন।
এই কারণে শিক্ষাগুরু মরহুম শায়খ মাহমুদ শালতুত তাঁর রচিত ‘আল-ইসলাম আকীদাতুন ওয়া-শরীয়াতুন’-ইসলাম: একটি বিশ্বাস ও বিধান’ শীর্ষক মূল্যবান গ্রন্থে সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছেন। বলেছেন: যাকাত একটি সাধারণ দ্বীনী স্তম্ভ।
তিনি লিখেছেন:
যদিও আমি বিশ্বাস করি, নীতিগত মতপার্থক্য জীবন্ত চিন্তাশক্তির নিদর্শন এবং এ মত-পার্থক্যের যে ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠে তার উদারতা থাকা সত্ত্বেও যখনি এই কর্তব্যের বাস্তবায়নে ইমামগণের মতবিরোধের ক্ষেত্র লক্ষ্য করি, আমাদের দিল কুণ্ঠিত হয়ে উঠে, যদিও ফিকাহ্র কিতাব ও নিয়ম-বিধানে যথেষ্ট প্রশস্ততা দেখতে পাওয়া যায়।
এই ফরয কাজটির উল্লেখ প্রায়শই নামায সংক্রান্ত নির্দেশের পাশাপাশি হয়েছে। কাজেই তাতে মুসলমানদের ভূমিকা কিংবা তাদের সকলের ক্ষেত্রে এই ফরয কাজটির ভূমিকা ঠিক নামাদের মতই হওয়া বাঞ্ছনীয়। অন্য কথায়, নামায মুসলিম জনগণের কাজে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, এ কাজটিও ঠিক ততটা গুরত্বপূর্ণ হওয়া উচিত। তার মর্যাদা এমন সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট হওয়া বাঞ্ছনীয়, যাতে কোন অষ্পষ্টতা থাকবে না, থাকবে না কোন বিরোধ-পার্থক্যের একবিন্দু অবকাশ। ঠিক মেযন দিন-রাতের মধ্যে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয।
এ ফরয কাজটির মৌল ও পরিমাণ বিশেষজ্ঞদের মতবিরোধের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। পরিমাণের ক্ষেত্রে তাঁদের মতবিরোধ এমন একটা প্রকাশ ঘটিয়েছে, যা মুসলমানদের দ্বীনী কর্তব্য পালনে বিশেষ পার্থক্যের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর অন্ধ অনুসরণে মতবিরোধ এবং তার পথের বিভিন্নতা ও বিপুলতাই তার মূলে নিহিত কারণ।
কারো কারো মতে শিশু-বালক ও পাগলের মাল-সম্পদে যাকাত ধার্য হয়, কারো কারো মতে তা হয় না। এমনিভাবে কেউ কেউ মনে করেন, জমি থেকে মানুষ যা-ই উৎপাদন করে তাতেই যাকাত ধার্য হয়। অপরদের মতে এক বিশেষ ধরনের ফসল বা ফল ছাড়া অন্য কিছুতে যাকাত ধার্য হয় না। কারো মতে ঋণ থাকলেও যাকাত দিতে হবে, অপর লোকেরা এর সঙ্গে একমত হতে পারেন নি। ব্যবসায়ী পণ্যে যাকাত ধার্য হওয়ার কথা অনেকে বলেছেন, অনেকে আবার ভিন্নমত পোষণ করেন। মহিলাদের ব্যবহার্য অলংকারেও যাকাত ধার্য হয় কিন্তু অনেকে তা মেনে নিতে পারেননি। অনেক বিশেষজ্ঞ যাকাত ফরও হওয়ার জন্য একটা নিম্নতম পরিমাণ মাল নিসাব নির্দিষ্ট করেন এবং তা কারো মালিকানায় এলেই যাকাত দিতে হবে বলে মত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু নিম্নতম পরিমাণের শত অনেকই মানছেন না। এক কথায় যাকাত ফরয হওয়া না-হওয়ার দ্রব্যসামগ্রী পর্যায়ে বিভিন্ন মত উপস্থাপিত হয়েছে। অনুরূপভাবেযাকাত ব্যয়ক্ষেত্র সম্পর্কেও যথেষ্ট মতপার্থক্য থাকার কথা অস্বীকার করা যায় না।
শায়খ শালতুত এ কথার উল্লেখ করার পর খুবই দ্রুততা সহকারে এ ব্যাপারে পুনর্বিবেচনার জন্য আকুল আহবান জানিয়েছেন। কেননা তিনি মনে করেন, ইমামগণের নিকট বিরোধীয় বিষয়সমূহ এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, এই মতবিরোধ মূল ফরযটির উপরই কঠিন আঘাত হানতে পারে এবং তার বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। এ ক্ষেত্রে পুনর্বিবেচনা হতে হবে সেই মূল লক্ষ্যের ভিত্তিতে, যে কারণে কুরআন মজদি এই কাজটিকে ফরয করেছে, একে একটি দ্বীনী কর্তব্য বলে ঘোষণা করেছে, যেন তার ও তার সমগ্র দিকের সাথে সমস্ত মুসলমানের সম্পর্ক সমমানের হতে পারে।
(আরবী***************)
৩. এ ক্ষেত্রে আরও কতগুলো ব্যাপারে সম্পূর্ণ নতুনভাবে এই যুগে দেখা দিয়েছে। প্রাচীনকালীন ফিকাহ্বিদগণ এ সম্পর্কে কিছুমাত্র অবহিত ছিলেন না। শেষেরদিকের ফিকাহ্বিদগণও সেসব বিষয়ে সম্পূর্ণ অনবহিতই রয়ে গেছেন। এই ব্যাপারগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ একান্ত আবশ্যক, যেন মানুষ মানসিক অশান্তি ও অস্থিরতা থেকে নিষ্কৃতি লাভ করতে পারে এবং সাধারণ মুসলমানদের মুখে উচ্চারিত উদ্বেগ সৃষ্টিকারী প্রশ্নাবলীর স্পষ্ট জবাব দানে সক্ষম হয়। একালে জন্তু-জানোয়ার, নগদ অর্থ, কৃষি ফসল ও ফল-ফলাদি ছাড়াও বহু সম্পদ নতুনভাবে দেখা দিয়েছে, বহু আকাশচুম্বী দালান-কোঠা নির্মিত হয়েছে ভাড়ায় লাগানো ও মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে। বড় বড় শিল্প-কারখানা নির্মিত হয়েছে ভাড়ায় লাগানো ও মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে। বড় বড় শিল্প-কারখানা নির্মিত হয়েছে বিভিন্ন প্রকারের অস্ত্রশস্ত্র, যন্ত্রপাতি ও সাজ-সরঞ্জামও পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের মূলধন-স্থাবর ও অস্থাবর রয়েছে যা মালিকদের হাতে আবর্তিত হয় ও উৎপাদন হতেথাকে, ভাড়া দেয়া হয়, যেমন নৌকা, গাড়ি, উড়োজাহাজ, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও প্রেস ইত্যাদি। বিপুল সংখ্যক শিল্প-ব্যবসায়ী কোম্পানী কায়েম ও চালু হয়ে আছে। স্বাধীন পেশাধারী লোকও বিপুল পরিমাণ অর্থোপার্জন করে থাকে, যেমন চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, উকীল প্রভৃতি। এর মধ্যে বিপুল সংখ্যক উচ্চ মর্যাদা, মজুরী ও বিনিময় সম্পন্ন মাসিক বেতনধারী লোকও রয়েছে। এ পর্যায়ে প্রশ্ন হচ্ছে, এসব প্রতিষ্ঠান-সংখ্যা ও ক্রমবর্ধমান মূলধন কি যাকাত ফরযের আওতায় পড়ে অথবা প্রাথমিক যুগে যেসব জিনিসের উপর যাকাত চালু ছিল, এখনও তা তারই মধ্যে সীমিত হয়ে থাকবে? এ সবের উপরও যাকাত যদি ফরয ধরা হয়, তাহলে তার পরিমাণ কি হবে কখন তা ফরয হবে এবং সেজন্য ফিকাহসম্মত ভিত্তি কি হতে পারে?
কতগুলোর ক্ষেত্রে নিসাব (যাকাত ফরয হওয়ার নিম্নতর পরিমাণ) এবং শরীয়তসম্মত পরিমাণ নির্ধারিত রয়েছে। যাকাত ফরয হওয়ার জন্যে নিসাব নির্ধারণকারী অকট্য দলিল রয়েছে। কৃষি ফসল ও ফল-ফলাদির যাকাত ফরয হওয়ার জন্য পাঁচ ‘অসাক্ক’, রোযা-ভঙ্গের যাকাত একশ’ এবং নগদ টাকায় যাকাত ফরয হওয়ার জন্য দুইশ’ দিরহাম অথবা বিশ ‘দীনার’ নির্ধারিত আছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, বর্তমান সময়ে আমরা এই প্রাচীনকালীন নিসাপের পরিমাণ ও কালের মুদ্রায় কিভাবে নির্ধারিত করতে পারি? এ কালের প্রচলিত পরিমাণে তার রূপান্তর কিভাবে সম্ভব? তা‘ছাড়া এ প্রশ্নও প্রবল যে, এগুলো কি অপরিবর্তনশীল, না তাতে কোনরূপ পরিবর্তন-হ্রাস-বৃদ্ধি করার অবকাশ আছে? কেননা অর্থনৈতিক ও সামাজিক আধার (Receptacles) পরিবর্তিত এবং নগদ অর্থের ক্রয়মূল্য উঠানামা করছে।
বিশেষ করে প্রাথমিক ইসলামী যুগের- যখন এগুলো নির্ধারিত হয়েছিল—তুলনায় অনেকটা ভিন্ন ধরনের রূপ পরিগ্রহ করেছে আমাদের একালে এবং এখানকার সমাজে।
উপরন্তু আধুনিক কালের কর ধার্যকরণের (Taxation) ব্যাপারটিও বিশেষভাবে বিবেচ্য। তা কখনও প্রকারভিত্তিতে হয়, কখনও অ-প্রকারভিত্তিতে; আবার কখনও আপেক্ষিকভাবে ও ঊর্ধ্বমুখী ভাবধারায়। এগুলো সাম্প্রতিককালেল রাষ্ট্র-সরকার কর্তৃক ধার্য হয়ে থাকে। আর রাষ্ট্রের সাধারণ প্রয়োজন পূরণে তৎলব্ধ অর্থ ব্যয় করা হয়। অনেক সামষ্টিক লক্ষ্য বাস্তবায়নেও তা বিনিয়োগ করা হয়। প্রশ্ন হল, যাকাতেরসাথে এই সব ধার্যকৃত করের (Taxation) সম্পর্ক কি? উৎস, ব্যয়ের ক্ষেত্র ও লক্ষ্য ইত্যাদিতে এ দুয়ের মাঝে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের প্রকৃত কারণ কি? ধার্যকৃত কর কি কখনও যাকাতের পাশাপাশি কর ধার্যকরণ কি শরীয়াত অনুযায়ী জায়েয?
এগুলো বড় বড় ও জটিলতার প্রশ্ন। এ যুগ এইসব প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব পাওয়ার জন্যে উদগ্রীব। আমাদের পক্ষে এ পর্যায়ে কোন-না-কোন অভিমত ব্যক্ত করা একান্তই অপরিহার্য, যদিও প্রাচীন কালের ফিকাহ্বিদগণযেসব বিষয়ে কোন মত দিয়ে যান নি, সেসব বিষয়ে এ কালের আলিমগণের পক্ষে কোন মত স্থির করা খুবই দুরূহ ব্যাপার। আর তার কারণ হল, ইসলামের প্রাথমিক যুগের পর যে ‘ইজতিহাদ’ কার্যকর ছিল এ কালে তার দ্বার চিরতরে রুদ্ধ হয়ে গেছে বলে লোকদের বদ্ধমূল ধারণা রয়ে গেছে। অথচ এই কথাটি যে সুস্পষ্ট-রূপে ভুল ও বিভ্রান্তিকর, তাতে কোনই সন্দেহ নেই। বস্তুত স্বয়ং রাসূলে করীম (স) যে দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, তা রুদ্ধ করার অধিকার কারোরই থাকতে পারে না।
তবে বিশেষজ্ঞগণ যেমনবলেছেন, ইজতিহাদ কয়েক প্রকার ও কয়েকটি ক্ষেত্রে সমন্বিত। কোন কোন আলিম বিশেষ বিশেষ ব্যাপারে ও ক্ষেত্রে ইজতিহাদে পারদর্শী হতেপারেন, অন্যান্য বিষয়ে হয়ত তা করতে তাঁরা সক্ষম নন। বস্তুত এ ব্যাপারটি যেমন অসম্ভব নয়, তেমনি নয় কঠিন ও দুরূহ। তবে তা সম্ভব সেইসব আলিমদের জন্যে, যাঁরা তা করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করবে এবং ইসলামী শরীয়াত আরবী ভাষা অধ্যয়নে দ্বীনের মূল উৎস্য আহরণ ও আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে অনুসন্ধানে (Explore) এবং পারস্পরিক মূল্যায়ন ও উদ্ভাবনে অনুসিদ্ধান্ত গ্রহণে (Inference) ব্রতী ও যোগ্যতা-প্রতিভাসম্পন্ন হবেন।
আমি বিশ্বাস করি, উপরিউক্ত বিষয়াবলীতে কোন সুস্পষ্ট ও অকাট্য অভিমত বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যে সামষ্টিক ইজতিহাদ একান্তই অপরিহার্য। তা করতে হবে মুসলিম আলিম সমষ্টিকে সমবেতভাবে। তসে সেই সঙ্গে এই বিশ্বাসও আমার রয়েছে যে, বিভিন্ন বিষয়ে ব্যক্তি পর্যায়ে আলোচনা-পর্যালোচনা ও ইজতিহাদী চিন্তা-ভাবনা নির্ভুল সামষ্টিক ইজতিহাদের পথ শুধু উন্মুক্তই করে না, আলোকজ্জ্বলও করে তোলে। তাতে পূর্বপ্রস্তুতি শূন্যতা বা অপরিপক্কতার কোন প্রশ্রয় থাকবে না।
সামষ্টিক ইজতিহাদে সারা দেশের মুসলিম আলিমদের মধ্যকার শক্তিশালী বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের অভিমত অভিব্যক্তিও প্রতিফলিত হতে পারে। তার সম্মুখে সব সময়েই বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধক প্রচণ্ড হয়ে দাঁড়াবে। তার বড় বড়গুলো রাজনৈতিক ত্রুটি-বিচ্যুতি ও প্রশাসকদের স্বেচ্ছাচারিতায় মারাত্মক পরিণতি লাভ করবে।
৪. এ পর্যায়ে বিপুল সংখ্যক মুসলিমের বড় বেশী ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে—এটা দুঃখের সাথেই বলতে হচ্ছে। তাদের মধ্যে যাঁরা সংস্কৃতিসম্পন্ন বলে গণ্য, তাঁরাও সেই ভুল ধারণা থেকে মুক্ত নন। তাঁরা মনে করেন যাকাত কতিপয় পয়সার সামগ্রী মাত্র কিংবা শস্য দানার একটি ওজন বিশেষ। তা দিয়ে দানশীল ধনী ব্যক্তিরা দরিদ্র-নিঃস্বদের উপর মর্যাদাবান হয়ে উঠেন। তার দ্বারা কয়েক দিনের ক্সুধা নিবৃত্ত হয় মাত্র—পরিমাণেতা কম হোক, কি বেশী।তারপরই সেই দরিদ্র, নিঃস্ব ব্যক্তি আবার সেই দানশীল ধনী ব্যক্তির দ্বারস্থ হয়—ভিক্ষার হাত প্রসারিত করেতার দান গ্রহণের উদ্দেশ্যে। সে তার পবিত্র হাত দিয়ে সেই দান গ্রহণ করে এবং তার ধন-জনে শ্রীবৃদ্ধির জন্যে কল্যাণের দোয়া করে মহান আল্লাহর দরবারে।
কিন্তু ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ বিধানের সাথে এই অবস্থার কোন সম্পর্ক নেই। তবু স্বীকার করতে হবে যে, পরবর্তীকালসমুহে মুসলিম সমাজে এটা একটা রেওয়াযে পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি প্রচারমান দুটি সাপ্তাহিক পত্রিকা পড়ার সুযোগ আমাদের হয়েছে। তার একটিতে জনৈক লেখক [লেখক কমিউনিস্ট বলে পরিচিত। নাম: আহমদ বাহাউদ্দিন, আর পত্রিকার নাম আখবারুল ইয়াউম ২৯৬১ সন।] এই ধারণা উপস্থাপিত করেছেন যে, যাকাত আমাদের এ কালেরসমাজের পক্ষে শোভন নয়। কেননা এ কালে সমাজের অর্থনৈতিক ও সামষ্টিক সংগঠন-সংস্থা দানের উপর নির্ভরশীল নয়। এ কালের সমাজ কাজ ও উৎপাদনের উপর প্রতিষ্ঠিত। তাঁরামনে করেন, ইসলামী ব্যবস্থায় যাকাত হচ্ছে ভিক্ষুকদের জন্যে বিশেষ দান অথবা অলস-নিষ্কর্মা লোকদের জন্যে জীবিকা।
অপর একজনলেখক এখানি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাতে ইসলামী সুচিবার ব্যবস্থাকে ‘দানের সাম্যবাদ’ বলে অভিহিত করা হয়েছে [কিতাবখানির নাম: আরবী******) (আমরা এখান থেকে শুরু করছি(। খালেদ মুহাম্মাদ খালেদ এই বইখানির রচয়িতা।] এ সব কিছু থেকে স্পষ্টরূপে প্রমাণিত হচ্ছে যে, এ লোকগুলো হয় গভীর মূর্খতায় নিমজ্জিত নতুবা তারা অসদুদ্দেশ্যপরায়ণ।
এই প্রেক্ষিতেই আমাদের বক্তব্য হল, প্রস্তাবিত আলোচনা যে একান্ত অপরিহার্য, তা সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত হচ্ছে। যার পক্ষেই এ বিসয়ে আলোচনা করা সম্ভব, তার এ দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকা কিছুতেই উচিত নয়। আমি বিশ্বাসকরি, জ্ঞানবান লোকদের উপর তা ‘ফরযে কিফঅয়া’ [যা সাধারণভাবে সকলেরই উপর ফরয কিন্তু তাদের কতিপয় আদায় করলেই সকলেল আদায় হয়ে যায়] কেননা কেউই এ কর্তব্য পালন না করলে সকলেই গুনাহ্গার হবে।
ইসলামে সম্পদ ও অর্থব্যবস্থা পর্যায়ে জনৈক আলোচনাকারী বিস্ময় [তিনি মাহমুদ আবুস-সউদ ‘আল-মুসলিমুন’ নামক পত্রিকায় লিখিত প্রবন্ধ।] প্রকাশ করেছেন এই অবস্থা দেখে যে, আধুনিক কালের ইসলামী গ্রন্থ প্রণয়ন সংস্থাসমূহ যাকাত পর্যায়ে একখানি উত্তম গ্রন্থ প্রণয়ন ও প্রকাশ না করে পারলো কি করে? অথচ তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দ্বীন-ইসলামে তার স্থান অনস্বীকার্য। মিসরের ওয়াক্ফ্ মন্ত্রণালয়ের ইসলামী বিষয়ক উচ্চতর সংস্থা এই প্রয়োজনের কথা বলিষ্ঠভাবে প্রকাশ করেছে। বিগত নয় বছর কাল ধরে কতকগুলো ইসলামী বিষয়ে প্রতিযোগিতার আহ্বান করা হয়ে এসেছে। সারা মুসলিম জাহানের লেখক-চিন্তাবিদদের তাতে রচনা পেশ করার জন্যে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে সেই রচনার আকার যেন বড় আকারের ৩৫০ পৃষ্ঠার কম না হয়। ‘ইসলামেরযাকাত’ ছিল এই পর্যায়েরএকটি বড় উল্লেখযোগ্য বিষয়।
১৯৬৩ সনেরমার্চ মাসে কায়রো শহরে যে ইসলামী আলোচনা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার ঘোষণায় উপরিউক্ত কাজের প্রয়োজনের উপর অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। প্রায় চল্লিশটি দেশের ইসলাম বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি তাতে অংশ করেছিলেন। এই সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ছিল:
যাকাত, ইসলামের অর্থোৎপাদনের উপায়, ফল গ্রহণের পন্থা এবং ব্যক্তি ও সমষ্টির সাথে এগুলোর সম্পর্ক—এই হল আজকের আলোচ্য বিষয়। কেননা এগুলো ইসলামী শরীয়াতের দুটি বিভাগের মিলনক্ষেত্র। আর সেই বিভাগ দুটি হচ্ছে: ইবাদত, সামাজিক-সামষ্টিক আচরণবিধি। এই কারণে সম্মেলনতার পরবর্তী অধিবেশনসমূহে আলোচনা ও চিন্তা-গবেষণার জন্য এই বিষয়গুলো নির্দিষ্ট করেছে।
এ আলোচনার [টীকা: (আরবী*********)] গুরুত্বপূর্ণদিক ছিল নিম্নোক্ত উদ্দেশ্যাবলী পরিপূরণের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ:
ক. সংশ্লিষ্ট বিষয়েল উপাদানসমূহ—যা মৌল উৎেসে বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে রয়েছে—একত্র করা। হাদীস, তাফসীর, বিভিন্ন মাযহাবের ফিকাহ্র গ্রন্থাদি, শরীয়াত ও অর্থ সংক্রান্ত কিতাবাদি প্রভৃতিই হল এ পর্যায়ের মৌল উৎস। ইসলামী সংস্কৃতির এগুলোই হল প্রধান উৎস। এগুলো সংগ্রহ করার পর সেগুলোকে নতুন করে উপস্থাপন করা এমনভাবে যেন তা থেকে ইসলামের বিধান স্পষ্টভাবে পাওয়া যেতে পারে।
খ. সংশ্লিষ্ট বিসয়ে যে বহু বিভিন্ন মত রয়েছে তা মন্থন করা, যেন তন্মধ্যে অগ্রাধিকার পাওয়ারযোগ্য মত সহজেই জানতে পারা যায়। তা হবে শরীয়াতের অকাট্য দলিলভিত্তিক এবং বর্তমান সময়ের ও প্রয়োজনের দৃষ্টিতে মুসলিম জনগণের পক্ষে কল্যাণকর, তা ব্যক্তির সীমিত শক্তিসামর্থ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
গ. সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যেসব নতুন প্রশ্ন, সমস্যা ও ঘটনা দেখা দিয়েছে, যার সাথে প্রাচীনকালীন আলিমগণ আদৌ পরিচিত ছিলেন না—সেই সব বিষয়ে অভিমত ব্যক্ত করা। কেননা এ সব এমন গুরুত্বপূর্ণ যে, সমকালীন ইসলামী চিন্তাবিদ ও লেখকগণ সে সম্পর্কে অনভিজ্ঞ ও নিঃসম্পর্ক হয়ে থাকতে পারেন না।
ঘ. ‘ইসলামী কর’ হিসেবে যাকাতের মর্মকথা স্পষ্ট করে তোলা। সেই সঙ্গে তার ও আধুনিককালে আরোপিত করের মধ্যে তুলনা করা। এ দুয়ের মাঝে যে সাদৃশ্য বা বৈপরীত্য রয়েছে, তা ব্যক্ত করা।
ঙ. মুসলিম সমাজ জীবনে যাকাতের লক্ষ্য ও ফলশ্রুতি বর্ণনা করা। মুসলিম সমাজের দারিদ্র্য, নিঃস্বতা, ভিক্ষাবৃত্তি, আকস্মিক বিপদ-আপদ ও ঘটনা-দুর্ঘটনা প্রভৃতি সমস্যার সমাধান করা, সেই সঙ্গে একালে প্রকাশিত বিভিন্ন সামষ্টিক ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাসমূহ কার্যকর করা।
চ. ‘যাকাত’কে কেন্দ্র করে যে সব ভুল চিনাতা-ধারণা পুঞ্জীভূত হয়ে উঠেছে তার পরিশুদ্ধিকরণ। বুল বুঝ্-সমঝ ও তাকে ভুল ভাবে প্রয়োগই হল এর কারণ অথবা ইসলামের দুশমনদের উত্থাপিত সন্দেহগুলোর দরুনই তা হয়েছে।
বস্তুত এ সব কাজ সম্মুখে রেখেই উপরিউক্ত আলোচনা-সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিলও কাজ করেছে। আমি মনে করি, তাতে যথেষ্ট সাফল্যও অর্জিত হয়েছে। [(আরবী*********)]
আলোচনার পদ্ধতি ও ধরণ
সম্মুখবর্তী আলোচনায় যে পদ্ধতিটি অনুসৃত হয়েছে ও যে দৃষ্টিকোণ অবলম্বিত হয়েছে তা এখানে স্পষ্ট করে বলার চেষ্টা করা হচ্ছে:
১. মৌল-উৎস নির্ধারণ তত্ত্ব সগ্রহ
এ পর্যায়ে আমার প্রথম কাজ ছিল কাঙ্ক্ষিত তথ্য ও তত্ত্ব সংগ্রহ করা। অন্য কথায় প্রস্তাবিত আলোচনার জন্যে যে সব দলিল-প্রমাণ এবং উক্তি জরুরী তা প্রাচীন ও আধুনিক উৎসমূহ থেকে সংগ্রহ করে সম্মুখে রাখা। এই দলিল-প্রমাণ ও উক্তি যেমন শরীয়াহ থেকে সংগৃহীত, তেমনি মনীষীদের লিখিত গ্রন্থাদি থেকেও। এ পর্যায়ে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কুরআন ও সুন্নাহ্র অকাট্য দলিলসমূহ (Wordings)। কেননা যাকাতের মর্মকথা, তার নিয়ম ও আইন-বিধান এবং তার লক্ষ্য, ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ তা-ই হচ্ছে প্রথম ভিত্তি।
বস্তুত এই আলোচনায় তত্ত্ব ও তথ্যের উৎস বিপুল ও অফুরন্ত। বিভিন্ন সময়ে লিখিত তাফসীর গ্রন্থসমূহ এ পর্যায়ে বড় অবলম্বন। এই তাফসীল দুই ধরনের।একধরনেরতাফসীল আয়াতের সাথে সংশ্লিষ্ট হাদীসসমূহ উদ্ধৃত হয়েছে। অপর এক প্রকারের তাফসীর লেখকের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা-গবেষণার ফসল উপস্থাপিত হয়েছে। বিশেষ করে কুরআন মজীদের আইন-বিধান পর্যায়ের আয়াতসমূহের তাফসীর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।
হাদীসের গ্রন্থসমূহ: হাদীসের মূল বর্ণনা, তার ব্যাখ্যাসমূহ, বিভিন্ন বর্ণনা, তাতে প্রযুক্ত বুদ্ধিমত্তা, হাদীসের সমালোচনা-পর্যালোচনা—সহীহ বা অ-সহীহ নির্ধারণ। যেসব হাদীস গ্রন্থে ফিকাহ্র দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে তা (আরবী*********) ও এই দুখানি হাদীস সংগ্রহ এবং ব্যাখ্যা পুস্তক।
বিভিন্ন মাযহাবের ফিকাহ্র কিতাব এবং তুলনামূলক মাযহাবী ফিকাহ্র কিতাব। বিশেষ করে ফিকাহ্র যেসব গ্রন্থে বিশেষ মাযহাবের দলিলাদী উদ্ধৃত হয়েছে, বিরোধী মতের দলিলাদি রদ করা হয়েছে, আইন-প্রণয়নের মৌলনীতি ও ফিকাহ্ শাস্ত্রের কায়দা-কানুন সংক্রান্ত কিতাবাদিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ইসলামী অর্থশাস্ত্র ও প্রতিষ্ঠানাদি সংক্রান্ত গ্রন্থাবলী: এ পর্যায়ে ইমাম আবূ উবাইদ আর-কাসেম ইবনে সালাম ইসলামী সামাজিক বিধান আলোচিত হয়েছে, তেমনি ইসলামের রাজনৈতিক ও অর্থনৈাতিক ব্যবস্থা পর্যালোচিত হয়েছে।
এ ছাড়া সাহায্যকারীগ্রন্থাদিতো রয়েছে বিপুল সংখ্যক অভিধান, ইতিহাস, জীবনচরিত, বিশ্বকোষ ও গ্রন্থাদির তালিকাপ্রভৃতি বিশেষ কাজ দিয়েছে।
এসব প্রাচীন ও এ কালের লিখিত গ্রন্থাদি থেকে আমিযা-ই উদ্ধৃত করেছি, মূল আলোচনা ব্যপদেশে তার উল্লেখ করেছি। অথবা সেই পৃষ্ঠার টীকায় তার নাম, পৃষ্ঠা ও গ্রন্থকারের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এমন সব গ্রন্থাদিরও সাহায্য গ্রহণ করেছি যা লেখক সমাজের কাছে সাধারণভাবে পরিচিত নয়। এক স্থানে যে গ্রন্থের নামের উল্লেখ করা হয়েছে, পরবর্তী স্থানে সেই কিতাবের আসল নাম অথবা তা বোঝা যায় এমন ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। অনৈক সময় ছোট অথচ প্রখাত উক্তিও উদ্ধৃত করা হয়েছে কিন্তু তার উৎসের উল্লেখের প্রয়োজন মনে হয় নি। আর তা অত্যন্ত বিরল এবং মূলসিদ্ধান্ত তার উপর নির্ভরশীলও নয়। আমাদের পূর্বকালীন লেখকদের কাছ থেকে জানতে পেরেছি যে, যার উক্তিরই উল্লেখ করা হোক তার সঙ্গে আসল উক্তিকারীর নামের উল্লেখ করাই বাঞ্ছনীয়। তাঁরা বলেছেন:
(আরবী*********)
যার কথাই উদ্ধৃত করা হোক তা তার নামে উল্লেখ করাতেই বরকত রয়েছে।
এখানে আমি উল্লেখ করতে চাই, এই আলোচনার একটা মহামূল্য অবদান হল ধন-সম্পদ ও অর্থনীতি সংক্রান্ত অধ্যয়নের বদ্ধ দুয়ার আমার সম্মুখে উদ্ঘাটিত হয়ে গেছে। আমি এই বিষয়ে ‘বিশেষজ্ঞ’ হওয়ার ইচ্ছায় নিভৃত একাকীত্বে মগ্ন হয়েছিলাম। ফলে এ পথে আমি ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা-অন্তর্দৃষ্টি অর্জনে সক্ষম হয়েছি। তার নিদর্শনাদি আমার কাছে প্রতিভাত হয়ে উঠেছে। তার প্রাথমিক তথ্যাবলী এবং সমর্থখ তথ্যাদিও আমার চোখের সম্মুখে উজ্জ্বল-উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। এগুলো আমি স্বতন্ত্র একখানি গ্রন্থে সন্নিবেশিত করেছি। সেই গ্রন্থের নাম (আরবী*********) (দারিদ্র সমস্যা ও তার ইসলামী সমাধান)।
২. আলোচনার বন্টন ও তার বিভিন্ন বিন্যাস
বিষয়বস্তুর প্রকৃতি, তার বিভিন্ন অংশের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সমস্যাদির পূর্ণাঙ্গতা বিধানের দৃষ্টিতে এগুলোকে বিস্তীর্ণ প্রেক্ষিতে গ্রহণ করা হয়েছে। কেননা এর এক অংশ অপর অংশের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। আমি আমারসীমিত সাধ্যানুযায়ী এইমহান ইসলামী বিষয়টিকে একটি আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তি সংগ্রহ করে দিতে চেষ্টানুবর্তী হয়েছি। এইকারণে প্রতিটি আলোচনাই অপেক্ষাকৃতভাবে দীর্ঘায়িত হয়েছে। এই গোটা আলোচনা নয়টি অধ্যায় ও একটি উপসংহারে বিভক্ত। অধ্যায়সমূহের বিন্যাস যুক্তসঙ্গতভাবেই করা হয়েছে। প্রথমে যাকাত ফরয হওয়া সম্পর্কিত আলোচনা, পরে যাকাত কার উপর ফরয হয়, সেইআলোচনা—অতঃপর কিসে কিসে ও কতটা পরিমাণ ফরয তার বর্ণনা; এই যাকাত কার জন্যে ব্যয় করা হবে, কার জন্যে তা গ্রহণ করা হারাম, তার বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপিত করা হয়েছে। এরপর বলা হয়েছে যাকাত আদায় করার পন্থা এবং তার লক্ষ্য ও ফলাফল। ফিতরের যাকাত পর্যায়ের আলোচনা এরপর এসেছে। যাকাত দেয়ার পর ব্যক্তির ধনমালের উপর অপরাপর যেসব অধিকার ধার্য হয় এবং যাকাত ও আধুনিক কালে ধার্য করা। কর বা খাজনা ইত্যাদির মধ্যকার সম্পর্ক, সাদৃশ্য ও বৈপরীত্য পর্যায়ের আলোচনাও পেশ করা হয়েছে।
প্রথম অধ্যায়: এ পর্যায়ে যাকাত ওয়াজিব হওয়া সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আমরা দেখিয়েছি, সব ধর্ম ব্যবস্থায়ই গরীব ও দুর্বল-অক্ষমদের প্রতি লক্ষ্য আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু ইসলাম মক্কী স্তর থেকেই এ ব্যাপারে খুব বেশী গুরুত্ব সহকারে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে। আর মদীনা শরীফে সুনির্দিষ্টভাবে যাকাতের বিধান কার্যকর হয় এবং তার সাহায্যে সমাজের দরিদ্রদের অভাব পূরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ইসলামের এই ব্যবস্থা যেমন অভিনব, তেমনি বিরল। এর পূর্বে কোন ধর্ম বা রাষ্ট্র বিধান এরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে নি।
দ্বিতীয অধ্যায়: যাকাত কার ওপর ওয়াজিব, তা এই পর্যায়ে আলোচিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বালক ও পাগলের ধন-সম্পদে যাকাত ধার্য হওয়ার ব্যাপারটি বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। অমুসলিমের কাছ থেকে যাকাত আদায় করা যায় কিনা, এ প্রশ্ন সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে।
তৃতীয় অধ্যায়: যাকাতের পাত্র ও পরিমাণ অর্থাৎ পশু সম্পদ, নগদ অর্থ, ব্যবসায় পণ্য, কৃষি ফসল, খনিজ সম্পদ, সামুদ্রিক সম্পদ, মধু ইত্যাদি প্রাণিজ সম্পদ প্রভৃতি থেকে যাকাত ফরযহওয়ার পরিমাণ আলোচিত হয়েছে এই অধ্যায়ে। শস্যোৎপাদনের প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানা, ব্যবসায়ী, ব্যবসায়ী মূলধন গড়ে তোলা, অনুরূপভাবে শ্রেণীভিত্তিক মজুরী ও স্বাধীন জীবিকা গ্রহণের উপযোগী লোক সংগ্রহ ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা সেই সঙ্গে রয়েছে।
চতুর্থ অধ্যায়: কুরআন মজীদে যাকাত ব্যয়ের যে আটটি ক্ষেত্রের উল্লেখ রয়েছে, তার বিস্তারিত বিশ্লেষণ ও পর্যায়ে দেয়া হয়েছে। কোন্ ক্ষেত্রে কত ব্যয় করা হবে, প্রত্যেক ক্ষেত্রে সমান পরিমাণ ব্যয় করা হবে কিনা? কাদের জন্য কত যাকাত ব্যয় করা যাবে না, এ সব বিষয়ের আলোচনা।
পঞ্চম অধ্যায়: যাকাত আদায় করার পন্থা, যাকাতের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক, যাকাত আদায়ে ত্বরিত পন্থা বিলম্বিতকরণ, তা এক স্থান থেকে অন্যত্র স্থানান্তরিতকরন, যাকাতের দূল্য দান ও এতদ্সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় আলোচনা করা হয়েছে।
ষষ্ঠ অধ্যায়: যাকাতের লক্ষ্য ও ফলাফল, দাতা, গ্রহণকারী ও গোটা সমাজের প্রেক্ষিতে যাকাতের লক্ষ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সমাজের বড় বড় সমস্যার—যেমন বেকারত্ব, ভিক্ষাবৃত্তি, আকস্মিক ঘটনা-দুর্ঘটনা, ঝগড়া—বিবাদ, নিঃস্বর্তা—সর্বপরি দরিদ্র্য সমস্যার সমাধানে যাকাতের ভূমিকা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
সপ্তম অধ্যায়: ফিতরের যাকাত (ফিত্রার সাদকা) ও তার আইন-বিধান আলোচিত হয়েছে।
অষ্টম অধ্যায়: যাকাত আদায় করার পরও ব্যক্তির ধন-মালে অন্যান্য যেসব অধিকার ধার্য হয়—এর পক্ষের মত ও বিপক্ষের মত এবং উভয় পক্ভের দলীল—প্রমাণ পর্যায়ে আলোচনা সন্নিবেশিত হয়েছে। উক্ত দুই পক্ষের মতবিরোধের মূল স্থান বা কারণ নির্ধারণ এবং একটি মতের অগ্রাধিকার দান সম্পর্কেও আলোচনা হয়েছে।
নবম অধ্যায়: যাকাত ও কর সম্পর্কে আলোচনা। যাকাত তার প্রকৃতি ও ভিত্তির দিক দিয়ে এক বিশেষত্ব সম্পন্ন ও বিশিষ্ট কর হওয়ার আলোচনা। তার মৌলনতি (Principle) নিরাপত্তামূলক অবদান ও লক্ষ্য, তার মৌলনীতি ও বিধি-বিধান, আধুনিক ‘কর’ সংক্রান্ত চিন্তার পরিণতিকেও ছাড়িয়ে গেছে। নিয়ম-বিধান, লক্ষ্য ও নিরাপত্তা বিধানে আধুনিক কর ব্যবস্থা যা করতে অক্ষম রয়ে গেছে, যাকাত তা করতে সক্ষম হয়েছে। এ পর্যায়ে যাকাত গ্রহণের ব্যবস্থা কার্যকর করার পর বিভিন্ন খাতে ‘কর’ গ্রহণকে শরীয়াত জায়েয মনে করে কিনা, আর যাকাত দিয়ে দিলে বিভিন্ন প্রকারকর দেয়ার দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া যায় কিনা—এ আলোচনার নবম অধ্যায়ে সে সম্পর্কে বিস্তারিত কথা বলা হয়েছে।
উপসংহার: এ পর্যায়ে যাকাত ব্যবস্থার মর্মকথা সংক্ষিপ্তভাবে বলা হয়েছে। এতে যাকাত সম্পর্কে বিভিন্ন মুসলিম ও অমুসলিম লেখকদরে সাক্ষ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। সেই সাথে সুবিচার, সাম্য ও সমাজবধ্য লোকদের নিরাপত্তার ব্যবস্থায় যাকাতের ভূমিকা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এই সব আলোচনা মিলিয়ে ‘যাকাত’ বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত সমস্ত বিষয়কে একত্র ও সম্পূর্ণ করা হয়েছে। যাকাতের মৌল নিয়ম-নীতি, বিধি-বিধান এবং লক্ষ্য ও ফলাফল বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে।
আলোচনার এ হচ্ছে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল:
৩. তুলনামূলক আলোচনা
তার দুটি রূপ রয়েছে:
প্রথম. ইসলামের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন মতের পারস্পরিক তুলনা করা। তন্মধ্যে সর্বোত্তম ও দলিল-প্রমাণের দিক দিয়ে সর্বাধিক শক্তিশালী মত সুস্পষ্ট ও পরিচ্ছন্ন করে তোলা।
দ্বিতীয়. ইসলামী শরীয়াত ও অন্যান্য শরীয়াতের মধ্যে পারস্পরিক তুলনা। এই অন্যান্য শরীয়াতের মধ্যে যেমন কতিপয় আসমানী ধর্ম রয়েছে, তেমনি রয়েছে মানুষের গড়া কতিপয় বিধান ও ব্যবস্থা। তার কতিপয় প্রাচীণ এবং কয়েকটি নতুন—এ কালের রচিত। এর ফলে আল্লাহ তা’আলার সর্বশেষ শরীয়াতের বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্ব অপরাপর বাতিলকৃত আসমানী শরীয়াতের অপেক্ষা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মানব-রচিত মতবাদের অক্ষমতা ও সম্পূর্ণতাও প্রকট হয়ে উঠেছে।
ইসলামের ভিতরকার মাযহাবসমূহের মধ্যে তুলনা করতে গিয়ে আমি কেবল চারটি প্রখ্যাত মাযহাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকিনি। কেননা তা ইসলামী ফিকাহ্র অন্য সমস্ত বড় বড় মাযহাব ও মতের প্রতি অবিচার করা হত। এই আলোচনায় সাহাবী, তাবেয়ীন ও তৎপর্বী ফিকাহ্বিদদের মাযহাবের উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা সেই মাযহাব ও মতকে উপেক্ষা করা ও তা থেকে ফায়দা গ্রহণ না করা, না শরীয়াতের দৃষ্টিতে জায়েজ হতে পারে, না বিবেক-বুদ্ধির দৃষ্টিতে। সাহাবিগণের মর্যাদা ও ইলমী বিশেষত্ব সম্পর্কে কোন মতদ্বৈধতার অবকাশ নেই। তাঁদের বাদ দিলে সায়ীদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, উমর ইবনে আবদুল আজীজ, জুহরী, নখয়ী, হাসান, আতা, শাবী, মাইমুন ইবনেমিহরান প্রমুখ প্রধান তাবেয়ীনের মাযহাব আমাদরে সামনেআসে। আ তাদের পরবর্তীদের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে আমরা দেখতে পাই—ইমাম সওরী, আওযায়ী, আবূ উবাইদ, তাবারী ও দাউদ জাহেরী প্রমুখ ফিকাহ্বিদকে। এ মনীষীদের মত ও উক্তি ইসলামী জ্ঞানসমুদ্রে মহামূল্য সম্পদ। তা বাদ দিলে যেমন জ্ঞানের ক্ষেত্রে মহা ভুল করা হবে, তেমনি দ্বীন-ইসলামেরও বড় ক্ষতি সাধিতহবে।
আমি ‘শিয়া’ মাযহাবকেও বাদ দিইনি। সেখানে ‘যায়দীন’ ও ‘ইমামীয়া’ ফিকাহ্ বর্তমান রয়েছে। আমার জানামতে আমাদের ও এঁদের মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য নেই, পার্থক্য শুধু খুঁটিনাটি ব্যাপারে এবং তা সামান্য। শেষের দিকের দুজন মনীষীর নীতি আমি অধ্যয়ন করেছি। তাঁরা হলেন, ‘সুবুলুসসালাম’-এর (আরবী*****) লেখক ইমাম সান্য়ানী এবং ‘নায়লুল আওতার’-এর )আরবী****) গ্রন্থকার শওকারী। দুজনই অতি বড় মুহাদ্দিস। তাঁরা নিজ নিজ গ্রন্থে ‘যায়দীয়া’ ও ‘ইমামীয়া’ মাযহাবের উল্লেখ করেছেন। আল-হাদী, আল-কাসেম, আল-বাক্কের, আন-নাসের প্রমুখ এই শোষোক্ত মাযহাবদ্বয়ের ইমাম। আহলে সুন্নাতের আলিমএঁদের মতকে খুববেশী উল্লেখ ও ব্যবহার করছেন এবং তাতে তাঁরা কোন দেখতে পান নি।
ইসলামী ফিকাহ্-বহির্ভূত মতসমূহের তুলনামূলক আলোচনায় আমরাযাকাত ও প্রাচীন ধর্মসমূহ প্রবর্তিত দানসমূহের মধ্যে তুলনা করেছি। আধুনিককালে যে সম্পদে কর ধার্য হয়, তার ও যাকাতের মধ্যকার পার্থক্যও স্পষ্ট করে তোলা হয়েছে। এ কালের বড় অবদান যেসামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, তার সাথে যাকাতের তুলনামূলক আলোচনাও আমরা উপস্থাপিত করেছি।
৪. ব্যাখ্যা ও কারণ প্রদর্শন
প্রতিটি ব্যাপারে শুধু শরীয়াতের বিধান বা হুকুম উল্লেখ করেই আমি ক্ষান্ত হইনি—তাকেই যথেষ্ট মনেকরিনি। তার পশ্চাতে যে যৌক্তিকতা ও বুদ্ধিমত্তা নিহিত, তারও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দিতে চেষ্টা করেছি। শরীয়াতে যা ওয়াজিব বা মুস্তাহাব ঘোষিত হয়েছে কিংবা যা নিষিদ্ধ হয়েছে বা অনুমতিপ্রাপ্ত হয়েছে, তার মূলে নিশ্চয়ই একটা তত্ত্বগত দিক রয়েছে। সেইদিকের উন্মোচন না হলে তার সৌন্দর্য অনুধাবন সম্ভব হয় না। শরীয়াতের বিধানদাতার নিজের অনুসৃত এই পন্থাকে আমরা অনুসরণ করেছি। বিধি-বিধানের মূলগত কারন, তার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য, ব্যক্তি বা সমষ্টিগতভাবে মানুষের জন্যে তার কল্যাণ প্রকাশ করতে চেষ্টা করা হয়েছে। কেবল শরীয়াত পালনের দায়িত্ব ও নির্মম কর্তব্যের কথা বলে দিয়েই ক্ষান্ত হতে চেষ্টা করিনি। ঈমানের তাকীদে শরীয়াতের সর্বপ্রকার আদেশ-নিষেদ অবশ্যই পালন করতে হবে—তার যৌক্তিকতা কেউ বুঝুক আর না-ই বুঝুক, এই নীতিকে সর্বপ্রযত্নে পরিহার করা হয়েছে।
শরীয়াতের অন্তর্নিহিত যুক্তি ও সৌন্দর্য বর্ণনা ও ব্যাখ্যা করা সর্বাবস্থায়ই যখন অতীব বাঞ্ছনীয় ও মঙ্গলময় কাজ, তখন এ কালে তার অপরিহার্যতা তো শতগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশ্চাত্য বিপর্যয়কারী চিন্তাধারা, বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী চিন্তা-প্রবাহ এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য থেকে আগত সাংস্কৃতিক প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে তার আরও বেশী প্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দিয়েছে। কাজেই একদিক থেকে শুধু বিধান ঘোষণা ও অপর দিক থেকে ‘শুনলাম ও মানলাম’ বলে মাথা নত করে দেয়া বর্তমান যুগে কোনক্রমেই যথেষ্ট হতে পারে না।
৫. যাচাই ও অগ্রাধিকার দান
আলোচনাকারীকে অবশ্যই সমগ্র উৎসকে মন্থন করতে হবে। বিষয় সম্পর্কিত সমস্ত উক্তি, দলীল-প্রমাণ উল্লেখ এবং সে সবের মধ্যে তুলনা ও যাচাই করা আবশ্যক।কেননা সেযদি বিশেষ একটি কথায় বন্দী হয়ে পড়ে বা বিশেষ একটি মাযহাবের অন্ধ অনুসারী হয়ে থাকে, তাহলে তার সমস্ত চেষ্টা-সাধনা-গবেষণা এই মাযহাবের সমর্থন ও শক্তি বর্ধন এবং তার বিপরীত মাযহাবের প্রতিবাদেই সীমাবদ্ধ হয়ে থেকে যাবে। প্রকৃত কল্যাণে উপনীত হওয়া তার পক্ষে সম্ভবপর হবে না।
এই কারণে আমি আমার গর্দান বিশেষ একটি মাযহাব ও তার অন্ধ অণুসরণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে নিয়েছি। তবে এই ব্যাপারটি অতীব নতুন বলা চলে। প্রাচীনকালের লোকেরা এর সাথে পরিচিত ছিলেন না। আর বস্তুতই যদি কেউকোন বিশেষ ফিকাহ্বিদকে প্রতিটি বিষয়ে ও ক্ষেত্রে তার দলীল দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও অনুসরণকরে, তাহলে সে তাঁকে ‘শরীয়াত-দাতা’ রূপে মেনে নিল। অথচ শরীয়াতদাতা আল্লাহ এবং রাসূল ছাড়া আর কেউই নন। পরন্তু অন্ধ অনুসরণে বিবেক-বুদ্ধি ও চিন্তা শক্তিকে সম্পূর্ণরূপে বাতিল ও নিষ্ক্রিয় করে দিতে হয়। কিন্তু তা কোনক্রমেই উচিত হতে পারে না। ইমামইবনুল জাওজী বলেছেন: আল্লাহ তা’আলা মানুষকে চিন্তা-বিবেচনা ও ভাল-মন্দ বিচারের যোগ্যতাদিয়ে সৃষ্টি করেছেন (উদ্দেশ্যহচ্ছে, এগুলোকে সে পুরোপুরি কাজে লাগাবে)। কাজেই যে লোককে আলোকবর্তিকা দেয়া হয়েছে আর কেউ হতে পারে না। অন্য মনীষীদের উক্তি হচ্ছে, অন্ধভাবে অনুসরণ করে চলে সে, যে বরম বিদ্বেষী অথবা নিতান্তই বুদ্ধিহীন।
এই প্রেক্ষিতে বলতে চাই, আমি বিভিন্ন মনীষীর উক্তি ও দলীল-প্রমাণসমূহ একজন অন্ধ অনুসরণকারীর মনোভাব নিয়ে পাঠ করিনি পাঠ করেছি অনুসন্ধনকারী, সত্যানুসন্ধিৎসু ও যাচাই-পরখকারীর দৃষ্টিতে। বস্তুত, সত্যের আবিষ্কারকামী পরোয়া করে না কোথায় সে সত্য পাওয়া গেল, কার সঙ্গে চলে তা পাওয়া গেল। সে তা পেতে পারে আগের কালের লোকদের কাছে, পেতে পারে পরে আসালোকদের কাছে। অনেক সময় প্রকৃত সত্য পাওয়া যায় স্বাধীন মত প্রকাশকারীদের কাছে, আধুনিক কালের অথবা হাদীসবিদদের কাছে। কখনও জাহেরী ফিকাহ্বিদদের কাছে, চারটি প্রখ্যাত মাযহাবেও তা পাওয়া যেতে পারে। অপরাপর ইমামগণের কাছেও সত্যের সন্ধান পাওয়া যায় না, এমন কথাও নয়।
বিদ্বেষপরায়ণ, সংশয়বাদী ও প্রতিটি প্রাচীন মতে অবিচল হয়ে থাকা লোকদের পথে আমি চলিনি। যারা মনে করে, চারজন প্রখ্যাত ইমামের পরে আর কোন ‘ইমাম’ আসেনি, আমি তাদের সাথেও একমত নই। প্রথম যুগের ইজতিহাদের দ্বার চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার কথাও আমি সমর্থন করি না; পরবর্তীকালে তাক্লীদকারী ফিকাহ্বিদ ছাড়া আর কারোর কাছে ইল্মনেই, যারা তাদের বিপরীত মত গ্রহণ করেতারা তাদের সাথে শত্রুতা করে—এরূপ গোঁড়ামী মনোভাবকে আমি কল্যাণকর মনে করতে পারিনি।
এতদ্সত্ত্বেও আমি সেসব আত্মাভিমানী লোকদের দলভুক্ত নাই, যারা ইজতিহাদের যোগ্যতা ছাড়াই এক-একজন বড় মুজতাহিদ হওয়ার দাবিতে মুখর। সেসব নতুনত্ব বাদীদেরও আমি সমর্থন করি না, যারা নুতন দ্বীন, নতুন ভাষা-পরিভাষা এবং নতুন চন্দ্র-সূর্য সৃষ্টির অহমিকায় দিশেহারা।
জ্ঞান-চর্চা ও সত্যানুসন্ধানে আমি সম্পূর্ণ মধ্যমও ভারসম্যপূর্ণ নীতি অবলম্বনকরে চলেছি। যে কোন কল্যাণময় নতুনকে আমি স্বাগত জানাই। যে কোন নির্ভুল পুরাতনকে গহণ করতে আমি সতত উদগ্রীব। প্রাচীন গ্রন্থাদির হরিং বর্ণ মুদ্রণ বিভ্রাট আমাকেতা পাঠ করতে বাধাগ্রস্ত করেনি। বরং আমি তার গভীরে তলিয়ে সত্য উদ্ধারে সচেষ্ট হয়েছি। এক কথায়, পুরাতন ও নতুন উভয় ধরনের জ্ঞান-ভান্ডার থেকেই আমি তত্ত্ব ও তথ্য-সুধা আহরণ করেছি। তাতে কোন কুণ্ঠা বা সংশয় আমার গতিকে শ্লথ করতে পারেনি। উভয় ক্ষেত্রেই আমার ভূমিকা হচ্ছে মূল আলোচ্য বিষয় সম্পর্কিত জ্ঞান তথ্য বাছাই-ছাঁটাইকারীর মত। ভাল ও গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে, অকাতরে ও অকপটে তা তুলে নিয়েছি। যা অপ্রয়োজনীয় আবর্জনাবৎ, তা পরিহার করে সম্মুখে চলে গেছি। সংগৃহীত সম্পদ যাচাই ও তুলনা করে দেখেছি। ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করছি। যার কথার যৌক্তিকতা আমার কাছে প্রকট ও অকাট্য প্রমাণিত হয়েছে, তা গ্রহণ করতে কুণ্ঠিত হইনি। কোনরূপ বিদ্বেষার্ত মনোভাব আমার মনে ছিল না—কোন মুনির কথার প্রতি, কোন ইমামের মাযহাবের প্রতি। একটি বিষয়ে আমি যদি ইমাম আবূ হানীফার মত গ্রহণ করে থাকি, তাহলে অপর ক্ষেত্রে গ্রহণ করেছি ইমাম মালিকের মত। তৃতীয় ক্ষেত্রে ইমাম শাফেয়ী, সুফিয়ান, আহমদ, আওযায়ী, আবূ উবাইদ বাতাঁদের পূর্ব কিংবা পরবর্তী কোন ইমামের মত। কেননা তাঁরা প্রত্যেকেই কোন সাহাবী কিংবাকোন তাবেয়ী’র সহীহ্ মতকে গ্রহণ করেছেন বলে আমার ঐকান্তিক বিশ্বাস।
আমার এ নীতিকে মিথ্যা দ্বারা সজ্জিতকরণ (Embishment) বা জাল দলীল উদ্ভাবন (Fabrcate) অথবা ‘সহজিয়া’ নীতি বলে অভিহিত করা (ও তাই এর নিন্দা করা) চলে না। কেননা আসলে এ নীতির সারবত্তা হচ্ছে, ‘দলীল-প্রমাণের অনুসরণ, যেখানেই তা পাওয়া যাক। কোন লেখক-চিন্তাবিদেরই কেবলমাত্র কুরআন ও সুন্নাহ্ ব্যতিরেকে অপর কোন মতের সাথে নিজেকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলা উচিত নয়। হযরত ইবনে আব্বাস, আতা ও মালিক প্রমুখ থেকে বর্ণিত:
(আরবী***********)
যে কারোরই কথা যেমন গ্রহণ করা চলে তেমনি তা প্রত্যাখ্যান করাও চলে। তবে রাসূলে করীম (স)-এর কথা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।
অবশ্য এ ক্ষেত্রে আমাকে কোন কোন বিষয়ে কোন পরিত্যক্ত ও অপ্রখ্যাত উক্তি বা মত গ্রহণ করতে হয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে বহুসংখ্যকের মতকেও অগ্রাহ্য করতে হয়েছে। কেননা বেশী লোক বললেই যে একটা কথা অকাট্য সত্য হয়ে যাচে—এ কোন কথা নয়। তেমনি কম লোকে বললে কথাটি মিথ্যা বলে মনে করতে হবে, তার পেছনেও কোন যুক্তি নেই। দুনিয়ায় এমন ফিকাহ্বদি রয়েছেন, যাঁদের কথার সমর্থনে অকাট্য যুক্তি থাকলেও তাতে তিনি এককই রয়ে গেছেন। অল্পসংখ্যক লোকের মতের ক্ষেত্রে সর্বত্র এরূপই অবস্থা দেখা গিয়েছে। কিন্তু আমি তার পরোয়া করিনি।
পরোয়া করব কেন? আমি অনেক বড় বড় ইমামকে দেখেছি, তাঁরা নিজ নিজ মতের উপর একক ও অনন্য হয়েই অবিচল হয়ে রয়েছেন; যদিও অধিকাংশ লোক তাঁর বিপরীত মত প্রকাশ করেছেন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর কথাই ধরুন, তিনি বলেন: একটি ব্যাপার যা আল্লাহর কিতাবে নেই, রাসূলে করীম (স)-এর ফয়সালাতেও পাওয়া যায় না। অথচ তোমরা দেখবে, সব লোকই তা গ্রহণ করেছে। তাহলে মৃতের শুধু কন্য থাকলে তার বোনও মীরাস পায়। [(আরবী*********)] সমস্ত মানুষ এ মতকে নিজের বিরুদ্ধে দলীলরূপে মনে করেনি।
ইমাম মালিক (র) ফতোয়া দিয়েছেন যে, ফল-পাকুড় বিক্রির ক্ষেত্রেও শুফ্ফা (Pre-emption) কার্যকর হবে। পরে তিনি বলেছেন: ‘এ এমন একটা ব্যাপার যা আমি কখনও শুনিনি কিংবা অপর কেউ এ মত দিয়েছেন—এমন খবরও আমার কাছে পেটৗঁছায়নি।’ [ঐ, পৃষ্ঠা ৫৪২] প্রত্যেক ইমামেরই এমন বহু ব্যাপার ছিল, যে সম্পর্কে তাঁরা একান্ত নিজস্ব মত পোষণ করে গেছেন। অপর কেউই তাঁদের সমর্থন করেনি। তাতে তাঁরা কোন দোষই মনে করেন নি।
ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের এরূপ একক ও অন্যদের অসমর্থিত বহু মতকে একত্রিত করে একখানি বিশেষ গ্রন্থও রচিত হয়েছে।
গ্রহণ, অগ্রাধিকার ও সত্য নির্ধারণে অবলম্বিত নিয়ম নীতি
বক্ষমাণ আলোচনা বহু মৌলনীতি সমষ্টির উপর প্রতিষ্ঠিত। দৃষ্টিতে যা স্পষ্ট প্রতিভাতক হয়ে উঠেছে তা অবলম্বন বা গ্রহন, বিভিন্ন মতদ্বেধতা সম্পন্ন নিয়ম-বিধানের একটিকে অগ্রাধিকার দান এবং ইজতিহাদী কার্যক্রমের সাহায্যে সম্পূর্ণ নতুন বা প্রায় নতুন কোন মত উদ্ভাবনের একটা শরীয়াতী নিয়ম রয়েছে। এসব নিযম-নীতিকে আমরা মোটামুটিভাবে উল্লেখ করছি:
১. দলীলকে সাধারণ অর্থে গ্রহণ—যতক্ষণ বিশেষ অর্থে গ্রহণের কোন দলীল পাওয়া না যায়
বস্তুত দ্বীন-ইসলামের বহু দলীলই সাধারণ অর্থবোধক শব্দ সহকারে এসেছে, যেন তার তাৎপর্যের ব্যাপকতায় বহু একক ও খুঁটিনাটি ব্যাপারও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। দ্বীন-ইসলাম যে শাশ্বত ও চিরন্তন এবং তা সর্বকালে সকল স্থানেই সমানভাবেই প্রযোজ্য, এটা তার একটা অকাট্য প্রমাণ।
এ কারণে আমি মনে করি, কুরআন মজীদের আয়াতে এবং রাসূলে করীম (স) –এর হাদীসে সাধারণ অর্থবোধক যে শব্দ, এত সাধারণভাবে প্রযোজ্য যেসব বিধান এসেছে, সেসব সেভাবেই গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। সাধারণ তাৎপর্যের প্রেক্ষিতেই তার প্রয়োগ হওয়া উচিত। তবে কোন বিশেষ নির্ভুল অকাট্য দলীল যদি তা থেকে বিশেষ অল্থ ও তাৎপর্য গ্রহণে বাধ্য করে, তা হলে তখন আমরা সে সাধারণ অর্থ ও তাৎপর্য পরিহার করে বিশেষ অর্থ ও তাৎপর্যই গ্রহণ করব।
সহীহ সুন্নাতের সুন্দর জাহেরী তাৎপর্য এবং সাধারণ তাৎপর্যকে উপস্থাপক আয়াতসমূহ যারা প্রত্যাখ্যান করেন, আমিতাদের সাথে একমত নাই। যাঁরা হাদীসের সাহায্যে কুরআনের সাধারণ তাৎপর্যকে বিশেষ তাৎপর্য়য পরিণত করেন, তাঁদের নীতিকেও আমি সমর্থন করতে পার না। যদিও তাঁর সনদে নমনবীয়তা আছে অথবা কোন সহীহ্ হাদীস দ্বারাও বিশেষ অর্থ গ্রহণের দিকে নিয়ে যেতে চাই না—যদিও তাঁর ইঙ্গিতে দুর্বলতা বা স্পষ্টতা বিদ্যমান।
ইমাম আবূ হানীফঅ (র) একটি হাদীস গ্রহণ করতে রাযী হন নি। হাদীসটি হল এই:
(আরবী**********)
পাঁচ ওয়াসেক্ (একটা বিশেষ পরিমাণ) খেজুরের কম পরিমাণে যাকাত নেই।
তিনি মনে করেন কুরআনের আয়াত:
(আরবী**********)
যমীন থেকে যা-িই আমরা উৎপাদন করে দিয়েছি (তারই ‘ওশর’ দিতে হবে)
এবং (আরবী************) আকাশের বর্ষণে যে ভূমিই সিক্ত হয়, তার ফসলের ‘ওশর’ (দশ ভাগের এক ভাগ) ধার্য হবে।
সাধারণ বিধান উপস্থাপক ও হাদীসের ভিত্তিতে প্রথমোক্ত হাদীসটি প্রত্যাখ্যান করেনছেন এবং সকল পরিমাণের ফসলের উপরই যাকাত ফয বলে মত দিয়েছেন। কিন্তু আমি এখানে ইমাম আবূ হানীফা (র)-এর মত গ্রহণ করতে পারিনি। কেননা উক্ত হাদীসটি সহীহ্ এবং বুখারী ও মুসলিম শরীফে উদ্ধৃত। আর এ কথা বলে তার ব্যাখ্যা দেন যে, ব্যবসায়ের জন্যে খেজুর নির্দিষ্ট হলে তখন হাদীসটি প্রযোজ্য হবে, তা যেমন দুর্বল ব্যাখ্যা, তেমনি অ-অগ্রাধিকারদানযোগ্য, বরং ভুল। এ কারণে ইমাম আবূ হানীফা (র)-র মত গ্রহণ না করে এ পর্যায়ে ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ এবং অধিকাংশ ফিকাহ্বিদের মত গ্রহণ করেছি। ফলে জ মি যে ফসলই দেয় তাতে যাকাত ধার্যকরণে আমি নিসাব (নিম্ন পরিমাণ) নির্ধারণ করার প্রয়োজন মনে করেছি—যেমন অন্যান্য স ধরনের ধন-মালের ক্ষেত্রে নিসাব ধার্য হয়ে থাকে। আর ধনশালী ব্যক্তিদের উপর যাকাত ফরয করার মূলে যে যৌক্তিকতা আমার এ মত তার সাথে সাযুজ্যপূর্ণ।
তবে ইমাম আবূ হানীফা (র) উপরিউক্ত আয়াত ও হাদীসের যে সাধারণ তাৎপর্য গ্রহণ করেছেন, তাতে আমি তাঁর মত সমপূর্ণ সমর্থন করছি এবং তাৎপর্যের এ সাধারণতাকে (আরবী*********) ‘শাক-সব্জিতে যাকাত হয় না’ এ হাদীসের তাৎপর্য দ্বারা বিশেষ অর্থে গ্রহণ করি না কেননা হাদীসটি খুবই দুর্বল। তবে তার একটা ব্যাখ্যা দেয়া যেতে পারে এই অর্থে যে, তাতে যাকাত হয় না যা সংগ্রহকারীরা গ্রহণ করতে পারে। কেননা তা তো খুব শীঘ্রই বিনষ্ট হয়ে যাওয়া জিনিস (Perishable goods)। বায়তুলমালে তা টিকে থাকতে পারে না। অতএব জন্তু ও ফসল ইত্যাদির ন্যায় তা গ্রহণ করার বিধান শরীয়াতে দেয়া হয়নি। এগুলোর ওয়াজিব হওয়াটা পূর্বোক্ত সাধারণ অর্থবোধক শব্দ দ্বারা প্রত্যাহৃত হয়ে যায়নি।
কুরআন ও সুন্নাহতে যে সাধারণ তাৎপর্যসম্পন্ন বিধান ও ব্যবস্থা রয়েছে, তা ঠিক অনুরূপ মর্যাদা সহকারেই মেনে নেয়া উচিত, যতক্ষণ না বিশেষ অর্থ গ্রহণে বাধ্যকারী কোন সহীহ্ দলীল পাওয়া যাবে। এ প্রেক্ষিতে যে সব আয়াত ও হাদীস সাধারণভাবে সর্বপ্রকারের ধন-মালে যাকাত ফরয ঘোষণা করেছে, আমরা সেগুলোকে সেই সাধারণ অর্থেই গ্রহণ করেছি। যেমন আল্লাহর নির্দেশ:
(আরবী*********) ধনী লোকদের ধন-মাল থেকে যাকাত গ্রহণ কর।
(আরবী*********) তাদের ধন-মালে সুনির্দিষ্ট হক রয়েছে।
নবী করীম (স)-এর কথা: (আরবী*********)
তোমরা তোমাদরে ধন-মালের যাকাত আদায় করে দাও।
এসব সাধারণ তাৎপর্যমূলক আয়াত ও হাদীসের ভিত্তিতে বিভিন্ন ধন-মালের মধ্যে পার্থক্য বা তারতম্য করা যায় না। এ সাধারণ তাৎপর্য থেকে বাইরে রাখব শুধু তা-ই, যে সম্পর্কে অকাট্য ও সহীহ্ দলীল পাওয়া যাবে।
২. সুদৃঢ় ইজমার প্রতি সমর্থন প্রদর্শন
যেহেতু শরীয়াতের কোন বিশেষ হুকুমের ব্যাপারে গোটা মুসলিম উম্মতের আলিমগণের, বিশেষ করে, প্রাথমিক যুগে—ঐকমত্য হওয়া স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, তিনি যে বিষয়ে ঐকমত্য পৌঁছেছেন সে বিষয়ে শরীয়াতের সহীহ্ দলীল বা সার্বিক কল্যাণবোধ অথবা অনুভবযোগ্য কোন ব্যাপারের ভিত্তিতে করেছেন। তাই তাঁদের এ ঐকমত্যের প্রতি মর্যাদা প্রদর্শন একান্তই বাঞ্ছনীয়। তার ফলে ঐকমত্যের ক্ষেত্রসমূহ শরীয়াতে সুরক্ষিত থাকতে পারে, তা ভারসাম্য মৌলনীতি হতে পারে এবং চৈন্তিক অস্থিরতা ও উচ্ছৃংখলতা বন্ধ হতে পারে।
যেমন রৌপ্যের যাকাতের অনুপাতে স্বর্ণের যাকাত ফরয হওয়ার ব্যাপারে তাঁদের সম্পূর্ণ ঐকমত্য সাধিত হয়েছে দশ ভাগের এক-চতুর্থাংশ। আর যেমন তাদের ইজমা হয়েছে যে, এক ‘মিসকাল’ হ চ্ছে এক দিরহাম ও এক দিরহামের সাত ভাগের তিন ভাগ পরিমাণ। এভাবে আরও অনেক দৃষ্টান্ত দেয়া যেতে পারে।
শিরোনামে আমি ‘সুদৃঢ় ইজমা’ ব্যবহার করছি। তার কারণ এই যে, কোন কোন ফিকাহ্বিদ এমন সব বিষয়ে ইজমা হয়েছে বলে দাবি করেছেন, যে বিষয়ে অন্যদের কাছে মতদ্বৈধতা রয়েছে। এ মতদ্বৈধতারও কারণ রয়েছে। প্রাথমিক যুগসমহের মুজতাহিদ আলিমগণ বিভিন্ন দেশে ও অঞ্চলে বিচ্ছিন্ন ও পরস্পর সম্পর্কহীন অবস্থায় ছিলেন। তাঁদের সংখ্যাও ছিল অনেক। প্রতিটি ইজতিহাদী বিষয়ে তাঁদের অভিমত জানতে পারা ও একত্র করা খুবই দুরীহ ব্যাপার ছিল। ইমাম আহমদ এ পর্যায়ে বলেছেন:
(আরবী*********)
যে দাবি করে যে, কোন বিষয়ে ইজমা (ঐকমত্য) হয়েছে, সে মিথ্যাবাদী, কেননা হয়ত সে জানে না যে, লোকেরা ভিন্ন মত প্রকাশ করেছে অথবা সে খবর তার পর্যন্ত পৌঁছায়নি। অতএব বলা দরকার যে, লোকেরা হয়ত ভিন্নমত প্রকাশ করেছে, তার সংবাদ আমার পর্যন্ত আসেনি।
এ পর্যায়ে এমন এক দৃষ্টান্তই দেয়া যেতে পারে, যাতে ইজমা সংঘটিত হওয়ার দাবি করা হয়েছে বটে অথবা সেই বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করার সংবাদ সে জানে না বলে জানিয়েছে। তা সত্ত্বেও তাতে ভিন্নমত প্রমাণিত হয়েছে।
ইমাম শাফেয়ী গরুর যাকাত পর্যায়ে বলেছেন: প্রতি ত্রিশটি গরুর যাকাত বাবদ একটা এক বছরের বাচুর (***) দিতে হবে। আর চল্লিশটিতে দিতে হবে একটি (*******) আর এতে ভিন্নমত আছে বলে আমি জানি না।
… অথচ এ কথা প্রমাণিত যে, হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ, সায়ীদ ইবনুল মুসায়্যিব, কাতাদাহ এবং ইবনে যুবাইরের মদীনায় নিয়োজিত কর্মকর্তাগণ এ বিসয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন। [আরবী********]
ইবনুল মুনযির ধন-মালের যাকাত অমুসলিমকে দেয়া যাবে না—এই মতে ইজমা হয়েছে বলে দাবি করেছেন। অথচ জুহরী, ইবনে সিরীন ও কিরামা এ থেকে ভিন্নমত প্রকাশ করে বলেছেন যে, হ্যাঁ, অমুসলিমদের জন্যে তা থেকে ব্যয় করা জায়েয। আর যেমন বর্ণিত হয়েছে, হযরত উমরের বাহ্যিক মত এটাই। [যাকাত ব্যয়ের ক্ষেত্র-এই অধ্যায়ে অমুসলিমদের যাকাত দানের আলোচনা দ্রষ্টব্য।]
ইবনে কুদামাহ্ তাঁর ‘আল-মুগনী (আরবী****) গ্রন্থে লিখেছেন: বনু হাশিম বংশের লেকাদের ফরয যাকাত গ্রহণ করা যায়েয নেই—এ বিষয়ে কোন মতদ্বৈতা আছে বলে আমরা জানি না। আর টীকায়, হাফেয ইবনে হাজারলিখিত ‘ফতহুল বারী’ গ্রন্থ থেকেও তার এরূপ মতের কথা উদ্ধৃত করেছেন। ইমাম তাবারী উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম আবূ হানীফা (র) তা জায়েয বলে মত প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ মত প্রকাশ করেছেন যে, তারা যদি রাসূল (স)-এর নিকটাত্মীয় হওয়ার দরুন প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে তাদের জন্য ফরয যাকাত গ্রহণ করা জায়েয। ইমাম তাহাভীও এরূপ উদ্ধৃত করেছেন। মালিকী মাযহাবের কেউ কেউ আবহরী থেকেও এ মতের উল্লেখ করেছেন। আর তা-ই কোন কোন শাফেয়ীর মত্ ইমাম আবূ ইউসুফ থেকে বর্ণিত হয়েছে: বনূ হাশিমের লোকেরা পরস্পরের কাছ থেকে যাকাত গ্রহণ করতে পারে। মালিকী মাযহাবের এ ব্যাপারে চারটি মতের উল্লেখ করা হয়েছে। এক—জায়েয, দুই—জায়েয নয়, তিন—নফল দান গ্রহণ কায়েয, ফরয দান নয়; এবং চার—এর বিপরীত (অর্থা নফল দান গ্রহণ জায়েয নয়, ফরয যাকাত গ্রহণ জায়েয)। [(****) ৩য় খণ্ড, ২২৭ পৃষ্ঠা; যাকাত ব্যয়ের ক্ষেত্র-এ পর্যায়ে নবম পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।]
বস্তুত এই যে ইজমা—কোন বিষয়ে ঐকমত্যের দাবি, দলীলের ভিত্তিতে আমরা তার বিরোধিতা করতে পারি, করলে কোন দোষ হবে না। কেননা প্রকৃতপক্ষে এটা ইজমা নয়।
তবে যে ইজমা সুদৃঢ়—যাতে কোন বিপরীত মত আদৌ জানা যায় নি—তার সম্ভাবনা, বাস্তবতা ও অকাট্যতা নিয়ে যত বিতর্কেররই সৃষ্টি হোক না-কেন, সেই পর্যায়ের কোন শরীয়াতী হুকুমের বিরোধিতা আমি করছি না, যেমন এর পূর্বে আমি বলছি।
কিন্তু আমি বিরোধিতা করছি এ মতে ইজমা হওয়ার, যাতে উসুলে ফিকাহ্র আলিমগণের এই মত প্রকাশ করা হয়েছে যে, কোন সময়ের আলিমগণ কোন বিষয়ে দুটি মতে মতদ্বৈধতা করলে তাঁদের পরবর্তী লোকদের তৃতীয় কোন মত নতুন করে বলা জায়েয নয়। কেননা মুসলিম উম্মত যদি দুটি মতের মধ্যে মতদ্বৈধতা সীমাবদ্ধা করে রাখে, তাহলে বুঝতে হবে, তাৎপর্যের দিক দিয়ে উম্মত তৃতীয় মত নতুন করে সৃষ্টি করতে নিষেধ করে দিয়েছে। আ-মদী (প্রখ্যাত উসূলে ফিকাহ্বিদ) মনে করেন, তৃতীয় মতটি যদি পূর্ববর্তী দুই মতের সাথে সাযুজ্যপূর্ণহয়, তাহলে সেরূপ মত দেয়া জায়েয নয়। অন্যথায় যদি এক হিসেবে দুটি মতের একটির সাথে সাযুজ্যপূর্ণ হয়, আর অপর দিক দিয়ে তার সাথে সাংঘর্ষিক হয় তবে তা জায়েয হবে, কেননা তাতে ইজমা ভঙ্গ করা হয় না। [আল-অ-মদী লিখিত (****) ১ম খণ্ড, ১৩৭-১৩৮ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।]
এর দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যায়, ইমাম আবূ হানীফা (র) বলেছেন: (আরবী********) ‘ফসলে ওশর দেয়ার দায়িত্ব জমির মালিকের আর অধিক সংখ্যক ফিকাহ্বিদ (*****) বলেছেন: যে লোক জমি ভাড়া নিয়ে চাষ করবে, তাকে দিতে হবে ওশর। এখানে এ দুটি মতের মধ্যে ঐকম্যত ভিত্তিক মত হল: ওশর ওয়াজিব-অবশ্যই দেয়। অতঃপর আমরা যখন বলব, ওশরজমির ফসলথেকে ভাড়ায় চাষকারীর দেয়া ওয়াজিব—জমির মালিককে মূল্য বা ভাড়া বাবদ দেয়া মূল্য বাদ দেয়ার পর; এবং বলব, মালিক ভাড়াকারীর কাছ থেকে যে মূল্য আদায় করেছে তা থেকে যাকাত দিতে হবে, তখন আমরা—অ-মদী যেমন বলেছেন—ইজমা ভঙগ্কারী হব না।
তবে আলিমগণের মধ্যে কেউ কেউ বলেছেন, কোন বিষয়ে দুটি মতের দ্বৈধতা এ কথার অকাট্য প্রমাণ যে, তাতে ইজতিহাদ করার বিপুল অবকাশ বিদ্যমান। তৃতীয় মতটি তো ইজতিহাদেরই ফলশ্রুতি এবং তা জায়েয। অনেক বিষয়েই কোন কোন তাবেয়ী তৃতীয় মত নতুন করে প্রকাশ করেছেন, যা সাহাবীদের কেউ বলেন নি। যেমন ইবনে সিরীন ও মসরূক্ব প্রমখথেকে বর্ণিত হয়েছে। [আল-আ-মদী লিখিত (****) ১ম খণ্ড, ১৩৭-১৩৮ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।] বস্তুত বিষয়টি যতক্ষণ ইজতিহাদ পর্যায়ভুক্ত থাকবে, ততক্ষণ তা-ই ঘটতে থাকবে। কেননা তাতে দৃষ্টির প্রসারতা ও ইজতিহাদ করার সুযোগ থেকেই যায়।
৩. সহীহ কিয়াস (Analogy) কার্যকরণ
‘কিয়াস’ বলা হয় একটি ক্ষেত্রে তারই মত অপর একটি ক্ষেত্রে দেয়া শরীয়াতী মত (****) প্রয়াগ করাকে। তা এমন একটি কারণের (***) দরুন হয়, যা উভয় ক্ষেত্রে সমানভাবে বর্তমান। এ ব্যাপারটিকে মহান আল্লাহ্ তা’আলা বিবেক-বুদ্ধি ও প্রকৃতির মধ্যে গচ্ছিত রেখেছেন। ইবনুল কাইয়্যেম যেমন বলেছেন, এটা হচ্ছে সেই ‘মীযান’ (মানদণ্ড) যা আল্লাহ তায়ালা কুরআন মজীদের সঙ্গে করে নাযিল করেছেন, তার সহকারী ও সহযাত্রী বানিয়েছেন। এখানে এ পর্যায়ে দুটো আয়াতের উল্লেখ করা যায়:
(আরবী*********)
আল্লাহ্ তিনিই, যিনি পরম সত্যতা সহকারে কিতাব ও আল-মীযান—নির্ভুল মানদণ্ড নাযিল করেছেন।
(আরবী*********)
এব আমরা নিঃসন্দেহে আমাদেররাসূলগণকে পাঠিয়েছি অকাট্য-স্পষ্ট দলীল সহকারে এবং আমরাতাদের সঙ্গে নাযিল করেছি আল-কিতাব ও আল-মীযান, যেন মানুষের সুবিচার সহকারে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
এই আল-মীযান (*****) অর্থ সুবিচার, ন্যায়পরতা এবং সুবিচার-ন্যায়পরতা কি এবং কি নয়, তার প্রমাণকারী যন্ত্র। নির্ভুল কিয়াসই হচ্ছে কুরআন প্রবর্তিত এই ‘আল-মীযান’। প্রথমত আল্লাহ্ এর যে নামকরণ করেছেন তা প্রশংসাসূচক নাম।তা সর্বাবস্থায় সকলের জন্যে কর্তব্য—প্রত্যেকের সাধ্যানুযায়ী। ‘কিয়াস’-এর নামকরণ এভাবে হয়নি। তা দুভাবে বিভক্ত; ‘হক’ হতে পারে, হতে পারে ‘বাতিল’ও। তা যেমন প্রশংসেোগ্য হয়, তেমনি রিতষ্কারযোগ্য। হয় সহীহ্—নির্ভুল ও খারাপ—বিপর্যয়কারীও। তবে সহীহ্ ‘কিয়াস’ হচ্ছে সেই আল-মীযান, যা আল্লাহ তা’আলা তাঁর কিতাবের সঙ্গী করে নাযিল করেছেন। [(আরবী*********)]
শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া লিখেছেন: ‘কিয়াস’ একটা মোটামুটি অর্থজ্ঞাপক শব্দ। সহীহ্ কিয়াস ও অ-সহীহ্ কিয়াস উভয়ই এর অন্তর্ভুক্ত। তবেসহীহ্ কিয়াসই শরীয়াত সমর্থিত। আর তা হচ্ছে দুই সমান বিষয়ের একত্রীকরণ, দুটো পরস্পর পার্থক্যপূর্ণ জিনিসের মধ্যে পার্থক্যকরণ। প্রথমটি প্রত্যাহারের কিয়াস। আর দ্বিতীয়টি বিপরীতের কিয়াস। আর তা-ই সে সুবিচার, যা করার জন্যে আল্লাহ্ তা’আলা রাসূলে করীম(স)-কে পাঠিয়েছেন।
সহীহ কিয়াস হচ্ছে, যেমন মুল বিষ যে, কারণ (****) বর্তমান থাকার দরুনশরীয়াতের একটা হুকুম হয়েছে, সে কারণটি অপর যে বিষয়ে পাওয়া যাবে তাতেও শরীয়াতের সে হুকুমই গ্রহণীয় হবে। কেননা অনুরূপ হুকুম দ্বিতীয় ক্ষেত্রে গ্রহণ করার প্রতিবন্ধক কিছুই নেই। শরীয়াত এরূপ কিয়াসের বিরুদ্ধে কখনিই কিছু নিয়ে আসেনি। পার্থক্যকারী বাতিলকরণের কিয়াসও এমনিইহয়ে থাকে তা হচ্ছে এই যে, দুটো অবস্থার মধ্যে পার্থক্য হবে না, যা দ্তিীয অবস্থার উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। শরীয়াত এরূপ কিয়াসের বিরুদ্ধে নয়। [আরবী***********]
আসল বক্তব্য হল, ‘কিয়াস’ যখন মূল ও তার সদৃশ দ্বিতীয় জিনিসের মধ্যে সমন্বয়কারী ‘কারণ’-কে স্পষ্ট করে তোলে এবং দুটোর মাঝে প্রকাশমান বা প্রচ্ছন্ন কোন পার্থক্যকারী না থাকে, গণনার যোগ্য কোন প্রতিবাদীও পাওয়া না যায় তখন তাকে একটি শরীয়াতসম্মত দলীল হিসেবে গ্রহণ করা ও মেনে নেয়া ওয়াজিব। তাতে কোন দোষ হওয়ার কারণ নেই।
কেউ আপত্তি তুলতে পারেন এই বলে যে, যাকাত একটি বিশেষ ইবাদতের কাজ। আর ইবাদাতের কাজে কোন ‘কিয়াস’ চলে না। তা হলে আমরা বলব: হ্যাঁ, একথা সত্য যে, খালেস ইবাদতের কাজে কিয়াসের কোন অবকাশ থাকতে পারে না। কেননা ইবাদত ফরয হওয়ার ‘ইল্লাত’ (কারণ) বিস্তারিতভাবে জানা সম্ভব নয়। ইবাদতের কাজে তো কোন কারণের প্রতি দৃষ্পিাত না করে শুধু আল্লাহর কুম পালন করাই লক্ষ্য হতে হবে। অতএব নামায, রোযা, হজ্জ প্রভৃতি নিছক ইবাদত পর্যায়ের কাজসমূহে কোনরূপ কিয়াস করা ঠিক হবে না। তাহলেই লোকদের জন্যে দ্বীনের নামে এমন কাজের বিধান করা বন্ধ হবে, যার অনুমতি আল্লাহ তা’আলা দেননি। না তেমন কাজ করতে বাধ্য করা যাবে, না কোন কাজ করার দায়িত্ব থেকে কাউকে মুক্ত করা যাবে।
কিন্তু যাকাতের অবস্থা ভিন্নতর। তার আরও একটা দিক রয়েছে। তা নিছক ইবাদত নয়। তা সুপরিজ্ঞাত হক্ও। একটা সুনির্দিষ্ট ও দার্যকৃত করও। তা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সামষ্টিক ও ধন-সম্পদ সংক্রান্ত ব্যবস্থার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশও। তা একদিকে ইবাদতের তাৎপর্য ও ভাবধারা সমন্বিত। শরীয়াতে তাঁর বিধিবদ্ধ হওয়া ও তৎসংক্রান্ত হুকুম-আহকাম নাযিল হওয়ার মূল কারণ (***) প্রখ্যাত ও সর্বজনবিতি। তাহলে সেই ‘ইল্লাত’ বা ‘কারণ’ অনুযায়ী আর যা যা তার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ রয়েছে, শরীয়াতের অকাট্য দলীলেল ভিত্তিতে সেই বিষয়েও অনুরূপ বিধান হওয়ার কথা আমরা ‘কিয়াস’ করব না কেন?
নবী করীম(স) স্বয়ং কোন কোন দানা জীবন ও ফল-ফসর মেন যব, খেজুর, কিসমিস, মনাক্কা ইত্যাদি থেকে ফিতরায় যাকাত গ্রহণ করেছেন। ইমাম শাফেয়ী, আহ্মদ ও তাঁদের ইত্যাদি থেকে ফিতরার যাকাত গ্রহণ করেছেন। ইমাম শাফেয়ী, আহ্মদ ও তাঁদের সঙ্গীগণ সাধারণত বা বেশীর ভাগ খাদ্য হিসেবে গৃহীত জিনিসের উপর ‘কিয়াস’ করেছেন। তাঁরা এসব গৃহীত জিনিসকে মূলত ইবাদতের লক্ষ্যস্বরূপ ধরে নেন নি। কেননা তাহলে এর উপর কিয়াস করা চলতো না। কৃষি-ফসল ও ফল-পাকড়েরর ক্ষেত্রেও অনুরূপভাবে বেশীর ভাগ ফিকাহ্বিদ অন্যান্য এমনসব দানা বা বীজ সম্পর্কে কিয়াস করেছেন, যে সম্পর্কে দলীল পাওয়া গেছে এবং তাঁরা কেবল হাদীসে উল্লিখিত গম, যব, খেজুর ও কিসমিসের মধ্যে যাকাতকে সীমাবদ্ধ করে রাখেননি। হযরত উমর (রা)-ও যাকাত পর্যায়ে কিয়াস প্রয়োগ করেছেন বলে বর্ণিত হয়েছে। অনুরূপভাবে তিনি যখন জানতে পারলেন যে, এক-একটি ঘোড়ার মূল্য একশতটি উষ্ট্রের সমান হয়, তখন ঘোড়ার যাকাত গ্রহণের জন্যে তিনি নির্দেশ দিলেন। তিনি বললেন, আমরা চল্লিশটি ছাগল থেকে যাকাত আদায় করি; কিন্তু ঘোড়া থেকে কিছুই নিচ্ছি না, (এটা হওয়া উচিত নয়)। ইমাম আবূ হানীফঅ (র) সুপরিজ্ঞাত শর্তের ভিত্তিতে এই মতকেই মেনে নিয়েছেন। [এ সম্পর্কিত বিস্তারিত আলোচনা এই গ্রন্থে যথস্থানে করা হবে।]
এই আলেঅকে আমরা কৃষিজমির উপর ‘কিয়াস’ করেছি বসবাসের জন্যে ভাড়া দেয়া দালান-কোঠা, ঘর-বাড়ি, ইত্যাদি। যেসব দানের জিনিসথেকেহযরত ইবনে মাসউদ, মুয়াবিয়া ও উমর ইবনে আবদুল আযীয প্রমুখ যাকাত গ্রহণ করতেন তা ব্যয় করা কালে—যদিও তা সাধারণভাবে যাকাত ফরয হওয়া জিনিসের অন্তর্ভুক্ত তার উপর আমরা কিয়াস করছি মাসিক বেতন (****) ও মজুরীকে।
মধুর উপর ওশর ধার্য হওয়ার কথা হাদীসে (***)-ই উদ্ধৃত হয়েছে। আমরা তার উপর কিয়াস করছি মিল্কও দুগ্ধ ইত্যাদি পশুজ-উৎপন্ন দ্রব্যাদি।
কিয়াসের গুরুত্ব প্রমাণ করার প্রসংগে ইমাম শাফেয়ী তাঁর (****) গ্রন্থে স্বর্ণের যাকাত পর্যায়ে যা লিখেছেন, এখানে তার উল্লেখ যথেষ্ট হবে বলে মনে করছি। তিনি বলেছেন:
নবী করীম (স) ‘আল-অরাক্ক, (নগদ রৌপ্য)-এ যাকাত ফরয করেছেন। তাঁর পরে মুসলিম সমাজ স্বর্ণে যাকাত গ্রহণ করেছে। হয় এমন হাদীসের (****) ভিত্তিতে, যা আমাদের কাছে পৌঁছেনি অথবা এই কিয়াস করে যে, স্বর্ণ ও মুদ্রা লোকদের এমন নগদ সম্দ, যা তারা পুঁজি করে এবং ইসলামের পূর্বে ও পরে তারা যে ক্রয়-বিক্রয় করত তাতে মূল্য হিসেবে তা তারাও চালু করেছে। [(আরবী*********)]
অতএব নগদ স্বর্ণ মুদ্রার যাকতা গ্রহণ—এই মুদ্রাই হল বিশ্বের বড় বড় জাতির নগদ মুদ্রার বিশ্বমান—খুব সহজ ব্যাপর নয়। তা সত্ত্বেও রাসূলে করীম (স)-এর পর মুসলমানগণ এই যাকাত গ্রহণ করেছেন এবং তা করেছেন কিয়াস-এর সাহায্যে। এটাই অধিকতর সম্ভব। এ পর্যায়ে কোন হাদীস থেকে থাকলেও তা ইমাম শাফেয়ীর কাছে পৌঁছায়নি—যদিও তিনি খুব তালাশ করেছেন অনুরূপ কিছু ভিত্তি পাওয়ার জন্যে চেষ্টা করেছেন। অনুরূফভাবে ইমাম মালিক, ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমের কাছেও এই পর্যায়ে কিছুই পৌঁছায়নি। কাজেই বলতে হয়যে, এ পর্যায়ে কোন হাদীসের অস্তিত্ব একটা বহু দূরবর্তী সম্ভাবনা। এই কারণে ইমাম মালিক কোন হাদীসের অপেক্ষা না করে ‘আমল’ বা কাজের উপর ভিত্তি করেছেন এবং বলেছেন:
(আরবী*********)
আমাদের মতে যে সুন্নাতে কোন মতদ্বৈধতা নেই, তা হচ্ছে সরাসরিভাবে বিশটি দীনারে (স্বর্ণমুদ্রা) যাকাত ফরয যেমন দুইশ’ দিরহামে (রৌপ্য মুদ্রায়) যাকাত ফরয হয়ে থাকে।
৪. লক্ষ্য ও কল্যাণের গুরত্ব স্বীকার
ইসলামের সুবিজ্ঞ ও গভীর জ্ঞানসম্পন্ন মনীষিগণ স্পষ্ট ভাষায় বলেছৈন যে, শরীয়াতের হুকুম-আহকাম ও আইন-বিধান কার্যকর করা হয়েছে আল্লাহর বান্দাদের ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণের দৃষ্টিতে। সে সব কল্যাণ জরুরীমূলক হোক, প্রতিবন্ধকতামূলক অথবা সৌন্দর্যসূচক, তাতে কোন পার্থক্য নেই।
এ কথার দলীল—যেমন ইমাম শাতেবী লিখেছেন—তা হচ্ছে শরীয়াতের বিধান অনুসন্ধান ও তার সামষ্টিটক ও অংশসম্পর্কিত দলীলাদির উপর দৃষ্টিপাত। তা কোন বিশেষ একটি দলীলের মধ্যে সীমিত নয়, কোন একটা বিশেষ ঘটনা কেন্দ্রিকও নয়। বরং গোটা শরীয়াত সম্পূর্ণরূপে তার উপর আবর্তিত। [আরবী**********]
ইমাম শাতেবী একটা গুরুত্বপূর্ণ নিয়মের উল্লেখ করেছেন: ‘শরীয়াত পালনে বাধ্যবাধতার প্রেক্ষিতে ইবাদতের আসল কথা হল দাসত্ব স্বীকার—তার তাৎপর্যের প্রতি ভ্রূক্ষেপ মাত্র না করে। আর আদত-অভ্যাস-মুয়ামিলাত-এর মূল কথা হল তাৎপর্যের প্রতি লক্ষ্য আরোপ। [(আরবী*********)] এ কথা প্রমাণের জন্যে তিনি এতসব স্পষ্ট অকাট্য দলীলের উল্লেখ করেছেন, যা এখানে উদ্ধৃত করার অবকাশ নেই।
এখানে আমি আবার বলছি, পূর্বোক্ত কথার উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করছি: যাকাত যদিও ইবাদতের পর্যায়ে নামাযের সঙ্গে সঙ্গে উল্লিখিত হয়েছে কিন্তু তা সত্ত্বেও তা প্রকৃতপক্ষে একটা ইবাদাত মাত্র নয়। আসলে তা ‘আদত’ বা মুয়ামিলাতের অতীব নিকটবর্তী কাজ। কেননা তা মুসলিম জনগণের ধন-মাল সংক্রান্ত ব্যাপার; বড়জোর তা রাষ্ট্র ও ধন-মালিকের মধ্যকার ব্যাপার অথবা রাষ্ট্রের অবর্তমানে বা নিষ্ক্রিয়তার সময়ে ধন-মালের মালিক ও দরিদ্র ব্যক্তির মধ্যকার সম্পর্কের দিক। আর তার প্রমাণ এই যে, ইসলামের অর্থ-বিজ্ঞান ও প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত গ্রন্থাদিতে যাকাত এ পর্যায়ে উল্লিখিত ও আলোচিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গের গ্রন্থাদির মধ্যে কিতাবুল খারাজ, কিতাবুল আমওয়াল, আহকামুস্ সুলতানয়া ও আস্সিয়া সাতুশ-শরঈয়া উল্লেখ্য।আসলে যাকাত ইসলামের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার একটা বিশেষ অংশ।
আমরা যদি ইসলামী ফিকাহ্কে আধুনিক পদ্ধতিতে পুনর্বিন্যাস করতে ইচ্ছা করি, তাহলে যাকাতকে আমরা অবশ্যই অর্থনৈতিক ও সামষ্টিক বিধানের অন্তর্ভুক্ত করব। নিছক ইবাদতের মধ্যে গণ্য করেই ক্ষান্ত হয়ে যাব না। আইন প্রণয়ণকালেও তাই করতে হবে। কেননা তা যে অর্থনৈতিক ও সামষ্টিক বিধি প্রণয়নের অন্তর্ভুক্ত তাতে কোন সন্দেহ নেই।
এরূপ করা হলে যাকাত ইবাদতের পরিমণ্ডল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে যাবে না। ইমাম শাতেবী ঘোষণা করেছেন: আদতের মধ্যে যদি বন্দেগীর ভাবধারা পাওয়া যায়, তাহলে তা অবশ্যই মানতে হবে এবং দলীলের সাথে স্থিতি গ্রহণ করতে হবে। যেমন বিবাহে মোহরানা দাবি করা, খাদ্য হিসেবে গৃহীত জন্তুর দেহের বিশেষ স্থানে যবেহ করা, মীরাস বন্টনে নির্দিষ্ট অংশসমূহ এবং তালাকের সংখ্যায় মাসের সংখ্যা গণনা প্রভৃতি।
যাকাতের পরিমাণ ও নিসাবকে আমি এ পর্যায়েই গণ্য করছি। কেননা তা শরীয়াতদাতা কর্তৃক সুনির্দিষ্ট। তাই তার সীমা নির্ধারণ করেছেন এবং চূড়া্ত করে দিয়েছেন। বিগত কাল ও যুগসমহে বিশ্বের মুসলিমগণ সেই ব্যাপারে সম্পূর্ণ ঐকমত্য রক্ষা করে এসেছেন। কাজেই এ ক্ষেত্রে ঠিক দলীলের উপর স্থিতি ও ঐকমত্য হওয়া কর্তব্য। এ কাারণে যেসব লোক যাকাতের পরিমাণ ও নিসাবকে কাল ও অবস্থার অনুপাতে পরিবর্তন ও হ্রাস-বৃদ্ধির যাঁতাকলে ফেলতে চাইছেন, আমি তাঁদের বিরোধিতা করছি। কেননা তা করা হলে শরীয়াতভিত্তিক যাকাতের মর্যাদই বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং তাকেও একটা রাষ্ট্রীয় ট্যাক্স পর্যায়ে নামিয়ে দেবে। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন রাষ্ট সরকার যেমন বিভিন্ন ধরনে ও পরিমাণের ট্যাক্স ধার্য করে থাকে, যাকাতও ঠিক সেই রকমের একটা অতীব নগণ্য জিনিসে পরিণত হবে।
সারকথা: ইসলামী শরীয়াতের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে জনগণের কল্যাণ সাধন এবং ক্ষতি ও বিপর্যয়ের পথ বা কারণসমূহ প্রতিরোধ। ইমামমালিক ও তাঁর সঙ্গী-সাথীদের অনুসৃত নীতি এই মৌল নীতির সমর্থন পাওয়া যায়। কেননা তাঁরা ‘জনকল্যাণ’ (Public good or welfare) (আরবী*********)-কে শরীয়াতের একটি দলীলরূপে গণ্য করেছেন। তাই ‘যরায়ে’ (ক্ষতির কারণ) বন্ধ করার নীতি অনুযায়ী যেমন আমল করা দরকার, [বরং আল-কারাফী বলেছেন: অন্যের ‘মাসালিহে মুরসালার’ ব্যাখ্যা তাদের নিজেদের দৃষ্টিকোণ দিয়ে করেছেন। কিন্তু তার শাখা-প্রশাখা বর্ণনাকালে শুধু ‘মুসলিহা’ বলেন। [ তেমনি এই ‘জনকল্যাণ’ অনুযায়ীও আমল হওয়া আবশ্যক। তবেহাম্বলী মাযহাবের বহু সংখ্যক ফিকাহ্বিদ এ বিতর্ক দূরীভূত করে দিয়েছেন। ইাম ইবনে তাইমিয়্যা ও তাঁর ছাত্র ইবনুল কাইয়্যেম নিজ নিজ গ্রন্থে এই দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থন যুগিয়েছেন। এ পর্যায়ে তাঁরা দু’জনই বহু দলীল ও সহীহ শরীয়াতী হিসাব-নিকাশ উপস্থাপিত করেছেন।
এই ভিত্তিতে ইবনুল কাইয়্যেম একটা অধ্যায় দাঁড় করিয়েছেন। কাল-স্থান, অবস্তা, মনোভাব ও ব্যবহারের পার্থক্যের দৃষ্টিতে ফতোয়া পরিবর্তন ও পার্থক্য দেয়া স্বাভাবিকভাবেই প্রয়োজন হয়ে পড়ে বলে তিনি দাবি করেছেন। ভূমিকায় তিনি লিখেছেন: ‘এ-এক বিরাট কল্যাণদায়ী পরিচ্ছেদ।’
এ সম্পর্কে অজ্ঞতার দরুন শরীয়াতের ব্যাপারে বড় ভুল সংঘটিত হয়েছে। এর কারণে বহু দুঃখ-কষ্ট ও অসুবিধার উদ্ভব হয়েছে। অথচ শরীয়াত উচ্চমানের কল্যাণ দৃষ্টিসমপ্পন্ন হওয়ার দরুন িএই ধরনের অবস্থার সুযোগ দেয় না। কেননা শরীয়াতের ভিত্তি সংস্থাপিত হয়েছে জনগণের ইহকালীন ও পরকালীণ কল্যাণ চিন্তার উপর। এটা সম্যক সুবিচার, আল্লাহ্র অপরিসীম রহমত, সামষ্টিক কল্যাণ, অতীব যুক্তি ও বুদ্ধিমত্তাসঞ্জাত। অতএব যে বিষয়ই সুবিচারে সীমা পেরিয়ে জুলুমের পর্যায়ে পড়বে, রহমতের পরিবর্তে অশান্তির কারণ হবে, অকল্যাণের পরিবর্তে বিপর্যয় ডেকে আনবে, যুক্তি ও বুদ্ধিমত্তার পরিবর্তে অর্থহীনতা ও আবর্জনার প্রশ্রয় দেবে, তা শরীয়াত হতে পারে না—তার যে ব্যাখ্যাই দেয়া হোক-না-কেন। শরীয়াত হচ্ছে বান্দাগণের মধ্যে আল্লাহর সুবিচার। তাঁর সৃষ্টিকুলের প্রতি অনুকম্পা, পৃথিবীর উপর মহাশান্তির ছায়া বিস্তার। তাঁর সৃষ্টিকুলেল প্রতি অনুকম্পা, পৃথিবীর উপর মহাশান্তির ছায়া বিস্তার। তাঁর যৌক্তিকতা ও কর্মকৌশলের নিদর্শন, মহানবী (স)-এর সভ্যতার অকাট্য প্রমাণ। তা নূর বিশেষ, দৃষ্টিমানরা তার আলোকেই দেখতে পারে, হেদায়াতপ্রাপ্ত লোকেরা তাঁরই হেদায়াত পেয়ে ধন্য হয়। [(আরবী*********)]
বস্তুত এ অতীব লোভনীয় ও আগ্রহসম্পন্ন কালাম। জনগণের মধ্যে তার ব্যাপক প্রচার সাধন আমাদের কর্তব্য। আমাদের এই যুগেও এর বিপরীত কিছু বলার থাকতে পারে না। বস্তুত ইবনুল কাইয়্যেম যখন বলেণ যে, কাল ও অবস্থার পরিবর্তনে ফতোয়াও বদলে যায়, তখন তিনি খুব ঠিক কথাই বলেন, অতব সত্য কথা বলেন।
কেননা তখন মূলত শরীয়াতের বিধান কিছুমাত্র পরিবর্তিত হয় না, পরিবর্তিত হয় শুধু তার প্রয়োগ। আইন বদলে যায় না, আইনেসর বুঝ-সমঝ বদলে যায়। শরীয়াত তো আল্লাহ্র ওহী, তা শাশ্বত। কিন্তু ফতোয়া, বুঝ-সমঝ ও বিচার মানুষের কর্ম।
রাসূলে করীমের যুগে কুরআনের আয়াত অনুযায়ী ‘আল-মুয়াল্লাফাতুল কুলূব’ [Whose hearts have learn (recently) reconciled to (truthe)]-কে যাকাত দেয়া হত। উত্তরকালে খলীফা হযরতত উমর ফরূক (রা) তাদের যাকাত দিতে অস্বীকার করলেন। বললেন:
(আরবী*********)
নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা দ্বীন ইসলামকে শক্তিশালী করে দিয়েছেন এবং ওদের প্রতি মুখাপেক্ষিতা শেষ করেছেন।
একথা বলে ও এ কাজ করে তিনি মূলত শরীয়াতের কোন হুকুমকে পরিবর্তিত করে দেন নি, কুরআনী অকাট্য দলীলকে বাতিল ঘোষণা করেন নি—যদিও এরূপ ভিত্তিহীন কথা অনেকেই মনে করে নিয়েছে। তিনি রাসূলে করীমের সময়কাল ও অবস্থার পরিবর্তন হয়ে যাওয়ার দরুন ফতোয়া—(শরীয়াতী হুকুমের প্রয়োগ) পরিবর্তন করে দিয়েছেন মাত্র। ফলে উয়াইনা ইবনে হাসান ও আক্রা ইবনে হাবেসের ন্যায় লোকদের উপর তাদের মন ফিরিয়ে রাখার জন্যে ইসলামের যে নির্ভরশীলতা ছিল ও তারাও কিছু পাওয়ার জন্যে আকাঙ্ক্ষিত ছিল, তার আর কোন অবকাশই থাকল না। কেননা রাসূলে করীম (স) তাদের দিল আকৃষ্ট করার জন্যে কোন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে যান নি, -সাদা চেকে স্বাক্ষর করে যান নি। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রপ্রধানের পূর্ণ অধিকার ও স্বাধীনতা রয়েছে, তিনি যখন তার মন আকৃষ্ট করে রাখার প্রয়োজন মনে করবেন, তাই করতে পারবেন, আর যখন দেখবেন যে, কোন ব্যক্তি বা লোক সমষিট্টর মত খুশী করার আদৌ প্রয়োজন নেই অথবা অবস্থার পরিবর্তনের কারণে তার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে অথবা ধন ব্যয়েল অন্য ক্ষেত্রসমূহ তুলনামূলকভাবে অধিকতর প্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দিয়েছে, তখন তদনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণের তার অধিকার রয়েছে। তাতে চিরদিনের জন্যে এ খাতিট বাতিল করেও দেয়া হবে না। সেকালের ও একালের কোন হানাফী আলিম তাই মনে করেছেন। কেননা আল্লাহ কিতাবের কোন হুকুম বাতিল ও নিষ্ক্রিয়করণের কোন অধিকার হ যরত উমরতো দূরের কথা, গোটা মুসলিম উম্মতেরও থাকতে পারে না। তবে তিনি সেকালে মুসলিম জনগণের ক্যাণ এতেই নিহিত বলে মনে করেচিলেন যে, মন রক্ষার জন্যে যাকাতের অর্থ প্রতি লোভীদের নিরাশ করে দেবেন। পরবর্তীকালে কারোর মন রক্ষারজন্যে যাকাতের অর্থের প্রতি লোভীদের নিরাশ করে দেবেন। পরবর্তীকালে কারোর মন রক্ষার জন্যে অথবা সাধারণ কল্যাণের দৃষ্টিটতে কিছু দেয়ার প্রয়োজন দেখা দিলে তা করার পর এর দরুন বন্ধ হয়ে যায় নি। [(আরবী*********) দ্রষ্টব্য।]
সাধারণ জনকল্যাণের দৃষ্টিতে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ ও বিপর্যয়কারী পথ বন্ধ করা যে শরীয়াত বিরোধী নয়, হযরত উমরের এই কাজ তার অকাট্য দৃষ্টান্ত। অনুরূপভাবে কাল ও স্থানের পরিবর্তনের দরুন ফতোয়া পরিবর্তিত হওয়ারও তা অতীব উত্তম ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
অবস্থার পরিবর্তনে ফতোয়া পরিবর্তিত হওয়া পর্যায়ে হযরত উমরের দ্বিতীয় অবদান হচ্ছে ঘোড়ার উপর যাকাত ধার্যকরণ। সিরিয়ার কতিপয় লোক এসে তাঁর কাছে ঘোড়ার যাকাত জমা দেবার ইচ্ছা প্রকাশ করে। কিন্তু তা গ্রহণে তাঁর মনে দ্বিধার সঞ্চার হল। কেননা নবী করীম (স)-ও এ কাজ করেন নি, তাঁর পূর্ববর্তী খলীফা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-ও এ কাজের কোন দৃষ্টান্ত রেখে যান নি। পরবর্তীকালে ইয়ালা ইবনে উমাইয়া ও তাঁর ভাই যখন দেখলেন একটি ঘোড়ার মূল্য একশটি উষ্ট্রের সমান হয়েছে, তখন কিয়াসকে দলীলরূপে গ্রহণ করে তিনি ঘোড়ার উপর যাকাত ধার্য করে দিলেন। এ কাজটি আসলে পরম লক্ষ্য ও কল্যাণ ও শরীয়াতের ভিত্তি যে সুবিচার, তার দাবি পূরণ পর্যায়ের।
স্থান ও কালের পরিবর্তনের দরুন ফতোয়ার পরিবর্তন হয়ে যাওয়া এখানে উল্লেখ্য আর একটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে রাসূলে করীম (স) যখন হযরত মুয়ায (রা)-কে ইয়েমেনে পাঠিয়ে দিলেন, তখন নির্দেশ দিয়ে দিলেন যে, তিনি যেন সেখানকার ধনী ব্যক্তিদের কাছ থেকে যাকাত আদায় করে সেখানকার দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করেন। এ পর্যায়ের নির্দেশে বলা হয়েছিল: শস্য থেকেশস্য গ্রহণ কর, ছাগল থেকে ছাগী, উষ্ট্র থেকে উষ্ট্র। এই নির্দেশ জনগণের প্রতি একটা সুবিধা দানের ব্যাপারই মনে করা হয়েছিল। লোকদের কাছে এভাবে দাবি করা হবে; কিন্তু তাঁদের জন্যে যদি সেই জিনিসের মূল্য দিয়ে দেয়া সহজ হয় তবে তাকে অবশ্যই স্বাগতম জানানো হবে। কেননা জনগনের পক্ষে সহজতর পন্থা তা-ই। তাদের পিছনে অবস্থানকারী রাজধানী মদীনাবাসীদের জন্যেও তাতেই ফায়দা নিহিত। কেননা কোন জিনিস উদ্বৃত্ত হয়ে গেলে তা তো সেখানেই পাঠিয়ে দেয়া হবে। হযরত মুয়ায ইয়েমেনে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তাতে তিনি বলেছিলেণ:
(আরবী*********)
তোমরা আমাকে খামীস কিংবা তোমাদের তৈরী পোশাক দাও। আমি তা তোমাদের কাছ থেকে শস্য বা যবের পরিবর্তে গ্রহণ করব। কেননা তা-ই তোমাদরে জন্য সহজ আর মদীনায় অবস্থাকারী মুজাহিদদের পক্ষেও সুবিধাজনক। [এ গ্রন্থে ‘যাকাত আদায়ের পন্থা’ শীর্ষক পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।]
হযরত মুয়ায (রা) হালাল-হারাম সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। হাদীসে এরূপই বলা হয়েছে এবং তিনিই দেখলেন যে, যাকাতের বিধানদাতা তার দ্বারা জনগণের সর্বাধিক কল্যাণ সাধনই করতে চেয়েছেন। এ উদ্দেশ্যেই যাকাতের ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে। তিনি ফসলের যাকাত বাবদ ফসলের পরিবর্তে ইয়েমেনী বস্ত্র গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিলেন। যদিও তা বাহ্যত হাদীসের বিরুদ্ধ মত। কিন্তু হযরত মুয়ায তো আর হাদীসের বিরোধিতা করতে পারেন না। তিনিই কুরআন ও সুন্নাতের পর ইজতিহাদকে আইনের তৃতীয় উৎস রূপে ঘোষণা করিয়েছিলেন। তিনি এখানে হাদীসের মূল লক্ষ্য অনুধাবন করে তাকে কার্যকর করেছেন, তার মৌল বক্তব্যকে লংঘন করেন নি। এ কারণে ফিকাহ্র মৌল নীতিবিদগণ মুজাহিত হওয়ার অন্যতম শর্ত করেছেন, তাকে আইন-বিধানের মর্মকতা ও শরীয়াতের আসল লক্ষ্য সম্পর্কে সঠিকভাবেআলিম হতে হবে। সেই সাথে তাকে যুগের জনগণের প্রকৃত কল্যাণ সম্পর্কেও অবহিত হতে হবে। আর একথা খুবই সত্য। কেননা যে লোক বহু ও বিপুল বিদ্যা অর্জন করল, ইজতিহাদের উপায়-উপকরণসমূহও আয়ত্বাধীন করেনিল কিন্তু সে কোন নিভৃত কোণে কিংবা গির্জা-খানকার মধ্যে নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করে বলে সমাজ-সমষ্টির কল্যাণ বা অকল্যাণ সম্পর্কে কোন ধারণাই অর্জন করতে পারেনি, জনমনে ঝগড়া-বিবাদের কি সব কারণ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তাও বুঝতে পারেনি—বাস্তব ও বৈষয়িক জীবন যাপন করেনি, সে মুজতাহিদ হতে পারে না, ইসলামী শরীয়াতের কোন ব্যাপারে সে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে সম্পূর্ণ অক্ষম থেকে যাবে।
আমরা এখানে শরীয়াতের যে সাধারণ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং সার্বিক কল্যাণের কথা বলছি, এর পক্ষে বেশ কয়েকজন সাহাবী মত প্রকাশ করেছেন। যেমন অনেকে বলেছেন, স্ত্রীলোকদের ব্যবহার্য অলংকারে যাকাত নেই। কেননা যাকাত প্রবর্তনে শরীয়াতের লক্ষ্য তাঁরা বুঝেছেন, ক্রমবৃদ্ধিশীল ধন-মার থেকে যাকাত গ্রহণ অথবা বর্ধন প্রবণতাসম্পন্ন ধন-মালের যাকাত গ্রহণ-রাসূলে করীম(স) তাই করেছেন। যেন অতিরিক্ত ও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত সম্পদ থেকেই সাদারণভাবে যাকাত গ্রহণ করা হয় এবং মূল সম্পদ যেন মালিকের কর্তৃত্বে অবশিষ্ট থেকে যায়। এ দৃষ্টিতে আল্লাহ নারীদের জন্যে যে অলংকার ব্যবহার জায়েয করে দিয়েছেন, তা তো বৃদ্ধিশীল নয়—বৃদ্ধির প্রবণতা সম্পন্নও নয় বরং তা ক্ষয়িষ্ণু, তা সৌন্দর্য ও শোভা বৃদ্ধিকারী পোশাক বা ঘরের সরঞ্জাম পর্যায়ের জিনিস।
শরীয়াতের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে নিরপেক্ষ সুবিচার ও ন্যায়পরায়ণতার উপর। এ দিকে লক্ষ্য রেখে আমরা তাবেয়ী ইমাম আতা ইবনে বিরাহ্র মতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। তাঁর মত হল ফসল উৎপাদনে যে ব্যয় হয়েছে তা বাদ দেয়ার পর অবশিষ্ট ফসল থেকে যাকাত গ্রহণ। জমি ভাড়ায় নিয়ে যারা ফসল উৎপাদন করে, তাদেরও উৎপাদন ব্যয় বাদ দেয়ার পরই যাকাতের হিসাব লাগাতে হবে। জমির ভাড়াটাও বাদ পড়বে। ভাড়ার জমির মালিকশুধু দখলের কারণে যে ভাড়া পায় তার উপরও যাকাত ধার্য হবে। তা থেকে ‘ওশর’ কিংবা ‘অর্ধেক ওশর’ আদায় করা হবে। কেননা সে নিজে চাষাবাদ করলে যা উৎপাদন হত, এ ভাড়াটা তারই বিকল্প।
আলোচনার পদ্ধতি
বক্ষমাণ আলোচনায় আমি যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছি, তাকে সহজ ও কঠিন—উভয় পরিব্যাপ্ত বলা যায়। বৈজ্ঞানিক বিষয়াদির আলোচনায় সাধারণত যে কঠিন ও দুর্বোধ্যতা আরোপ করা হয়, আমি তা পরিহার করে চলেছি। প্রাচীন গ্রন্থাদি থেকে খুব স্পষ্ট অর্থজ্ঞাপক বক্তব্যের উদ্ধৃতিও দিয়েছি। মূল তাৎপর্য সংরক্ষণ সহকারে অল্প অল্প কথা উদ্ধৃত করা হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে।
সফল ও সঠিক পদ্ধতি তা-ই হতে পারে যাতে কঠিন কঠিন সূক্ষ্ম বিষয়াদি স্পষ্ট করে বলা হয়। আমি তাই করতে চেষ্টা পেয়েছি। সম্ভবত আমি তাতে সাফল্য লাভ করেছি কিংবা সাফল্যের নিকটবর্তী হয়েছি।
পরবর্তী কথা হচ্ছে, আমি দীর্ঘ ছয় বছরাধিক কাল ধরে এই আলোচনাকে একটা বৈজ্ঞানিক মর্যাদা দানের জন্যে চেষ্টা করেছি। এরপর এর পথে নানা প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। আল্লাহ্ যা করেন, তাতেই মংগল নিহিত। আমি এই পাণ্ডুলিপি সম্মুখে রেখে নাড়াচাড়া করতে থাকি। কোথাও কথা বাড়াতে থাকি, পুনর্বিন্যাসকরতে থাকি, পরিচ্ছন্ন ও পরিমার্জিত করতে থাকি। সর্বশেষ মহান আল্লাহ্র ইচ্ছায় বর্তমান আকার ও অবস্থায় তা প্রকাশিত হচ্ছে। সুস্থ দৃষ্টিবান চিন্তাবিদ ও লেখকগণ আশা করি এর প্রতি গুরুত্ব দেবেন এবং নিরপেক্ষ নিষ্ঠাবান সমালোচকগণের পর্যবেক্ষণ থেকে আশা করি বঞ্চিত হব না।
সে-যাই হোক, আমি আমার সর্বাত্মক চেষ্টা এ কাজে নিয়োজিত করেছি। এই সুদৃঢ় ফরয কাজের (যাকাতরে) মর্মকথা ব্যাখ্যা করার যে সাধ্যযোগ্যতা আমার ছিল, তা এ কাজে লাগাতে বিন্দুমাত্র কুন্ঠিত হইনি। ইসলামী বিধানের অবদান এই যাকাত ব্যবস্থা। তার সাথে সংশ্লিষ্ট আইন-বিধানের নিরপেক্ষতা, তাতে নিহিত তত্ত্বের গভীরতা এবঙ তার বিরাট লক্ষ্য ও প্রভাব সমুদ্ঘাটিত ও সমুদ্ভাসিত করে তোলার উদ্দেশ্যেই এই দীর্ঘ আলোচনা। মুসিলমগণ এর আলোকে ইসলাম সম্পর্কিত ধারণা সঠিকভাবে গড়ে নেবেন, দীর্ঘ দিনের অনুপস্থিতি ও অপরিচিতির পর এই ব্যবস্থার পুনঃ প্রবর্তন করবেন এবং তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক-সামষ্টিক ব্যবস্থার এক অবিচ্ছিন্ন অংশ হিসেবে যাকাত আবার গ্রহণ ও কার্যকর করবেন, আমি এটারই আশা পোষণ করছি। কেননা তার ফলেই আল্লাগর সন্তোষ লাভ সম্ভব। শুধু তাই নয়, মুসলিম জনগণের বৈষয়িক ও অর্থনৈতিক সমস্যাবলীর বহুলাংশের সমাধান এর মাধ্যমেই হওয়া সম্ভব বলে মনে করি। এ কালের যুবক সমাজে পাশ্চাত্য চিন্তাধারা যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে, তা থেকে তাদের রক্ষা করার এটাই অন্যতম পন্থা বলে আমার বিশ্বাস।
এখন এই অর্ধয়ন যদি তার লক্ষ্যে সাফল্যমন্ডিত হয়, তাহলে আমি সেজন্যে আল্লাহর হামদ করব। আল্লাহ্র শোকার আদায় করাই আমার এই চেষ্টা-প্রচেষ্টর চরম লক্ষ্য। তিনিই এই চেষ্টর শুভ ভল দানে সক্ষম, তিনিই পারেন আমার এই কাজে বরকত দিতে—যদিও তা আমার লক্ষ্য পর্যন্ত পৌঁছতে অসমর্থ রয়েছে।
আমার জন্যে সান্ত্বনার বিষয় হল, আমি আমার সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করেছি, তাতে কোন ত্রুটি বা অবসাদের প্রশ্রয় দেইনি। আর যে লোক প্রাণপণ চেষ্টা করে তার ‘মজুরি’ এবং যে নিয়ত করে, তার সওয়াব বন্ধ হয়ে যায় না। প্রত্যেক চেষ্টাকারীরই একটা প্রাপ্য রয়েছে। আর প্রত্যেকেই তা-ই পায়, যা পাওয়অর জন্য সে ইচ্ছা করেছে—এটাই ইসলামের নিয়ম।
(আরবী*********)
ইউসুফল আল-কারযাভী,
দোহা, কাতার
জুমাদিুল আউয়াল ১৩৮৯ হিজরী
জানুয়ারী ১৯৬৯
প্রাথমিক কথা
যাকাত ও সাদকার অর্থ
‘যাকাত’ শব্দের বিশ্লেষণ
আভিধানিক অর্থ: বলা হয়: (***) যে জিনিস ক্রমশ বৃদ্ধি পায় ও পরিমাণে বেশী হয়’। (*****) অমুক ব্যক্তি যাকাত দিয়েছে অর্থ—সুস্থ ও সুসংবদ্ধ হয়েছে। অতএব ‘যাকাত’ হচ্ছে ‘বরকত’—পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়া, প্রবৃদ্ধি লাভ করা, পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা-শুদ্ধতা-সুসংবদ্ধতা। [***১]
‘লিসানুল আরব’ গ্রন্থে বলা হয়েছে: ‘যাকাত’ শব্দের মূল আভিধানিক অর্থ: (******) পবিত্রতা, ক্রমবৃদ্ধি, আধিক্য ও প্রশসা।’ এ সব কয়টি অর্থই কুরআন ও হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে।
ওয়াহেদী প্রমুখ বলেছেন: বাহ্যত (****) এ মূলের আসল অর্থ হচ্ছে আধিক্য ও প্রবৃদ্ধি। আরবীতে বলা হয়:
(আরবী*********)
কৃষিফসল বৃদ্ধি পেয়েছে-পেয়েছে যেমন করেবৃদ্ধি পেয়ে থাকে। আর যে জিনিসই বৃদ্ধি পায়, তাই ‘যাকাত’ হয়।
আর কৃষিফসল ক্রমবৃদ্ধি পাওয়া কেবল তখনই সম্ভব, যখন তা আবর্জনামুক্ত হয়। তাই ‘যাকাত’ শব্দটিতে পবিত্রতা-পরিচ্ছন্নতার ভাবধারা বিদ্যমান।
ব্যক্তির গুণ বর্ণনায় ‘যাকাত’ শব্দ ব্যবহৃত হলে তা হবে সুস্থতা-সুসংবদ্ধতা অর্থে। তখন ব্যক্তির মধ্যে কল্যাণের আধিক্য হওয়া বোঝাবে। যেমন বলা হয়: (****) অর্থাৎ পবিত্র জাতির মধ্যে চরম মাত্রার কল্যাণসম্পন্ন ব্যক্তি। আর (আরবী*********) বলা হবে যখন বিচারক সাক্ষ্য প্রমাণের অধিকতর কল্যাণ বর্ণনা করবে।
শরীয়াতের দৃষ্টিতে ‘যাকাত ব্যবহৃত হয় ধন-মালে আল্লাহ কর্তৃক সুনির্দিষ্ট ও ফরযকৃত অংশ বোঝাবার জন্যেয়। যেমন পাওয়অর যোগ্য-অধিকারী লোকরেদ নির্দিষ্ট অংশের ধন-মাল দেওয়াকেও ‘যাকাত’ বলা হয়।
ধন-মাল থেকে এই নির্দিষ্ট অংশ বের করাকে ‘যাকাত’ বলা হয় এজন্যে যে, যে মাল থেকে তার বের করা হলো তদ্দরুন তা বৃদ্ধিপ্রা্ত হয়। প্রকৃতপক্ষেই তার মাত্রা ও পরিমাণ বেড়ে যায়। তা বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পায়। ইমাম নববী ওয়াহেদী থেকে এ কথা বর্ণনা করেছেন। [আল্লামা যামাখশারী তাঁর ‘আল-ফায়েক’ গ্রন্থের ১ম খণ্ডের ৫৩৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেন: ‘যাকাত’ সাদকা’র মতই একটা কাজ বিশেষ। এ একটা সমন্বিত অর্থজ্ঞাপক শব্দ। তার একটা অর্থ: যাকাত বাবদ দেয়া ধনমালের একটা অংশ। আর দ্বিতীয় হল পরিচ্ছন্নতাকরণের কাজ। কুরআনের আয়াত (আরবী*********)-এর অর্থ মূর্খতাবশত প্রথমটি মনে করার দুরুন ভুল তাৎপর্য গ্রহণ করা হয়েছে। আসলে এর অর্থ- যারা তাযকীয়া—পরিচ্ছন্ন িপবিত্রতার কাজ করেছে।]
ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা বলেছেন: সাদকায় দানকারীর মন ও আত্মা পবিতও হয়, তার ধন-মাল বৃদ্ধি পায়, পরিচ্ছন্ন হয় এবং প্রকৃতপক্ষে পরিমাণে বেশী হয়। [(আরবী*********)]
ক্রমবৃদ্ধি ও পবিত্রতা কেবল ধন-মালের মধ্যেই সাধিত হয় না। যাকাত দানকারীর মন-মানসিকতা ও ধ্যান-ধারণা পর্যন্ত তা সংক্রমিত হয়। সম্ভবত এ দিকে লক্ষ্য রেখেই আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন:
(আরবী*********)
তুমি তাদের ধন-মাল থেকে সাদকা (যাকাত) গ্রহণ কর, তুমি তার দ্বারা তাদের পবিত্র করবে ও পরিচ্ছন্ন (প্রবৃদ্ধিমান) করবে।
আজহারী লিখেছেন—তা দরিদ্র্যকেও প্রবৃদ্ধি দান কর। দরিদ্রের জন্য বস্তুগত ও মনস্তাত্তিবক প্রবৃদ্ধি ব্যক্ত করে—এ শব্দটি এই অর্থের দিকে সুন্দর এক দৃষ্টিপাত বা ইংগিত করে। সেই সাথে ধনমালী ব্যক্তির মন ও সম্পদ প্রবৃদ্ধি সাধন করে—এ কথাও বোঝায়।
ইমাম নব্বী ‘আল-হাভী’ গ্রন্থ প্রণেতার উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন: তোমরা জানবে, ‘যাকাত’ আরবী শব্দ ইসলামী শরীয়াত নাযিল হওয়ার পূর্বেও এই শব্দটি সর্বজন পরিচিত ছিল। জাহিলিয়াতের যুগের কাব্য ও কতিপয় তা ব্যবহৃত হয়েছে, এই ব্যবহারকে অনেক সময় দৃষ্টান্ত হিসেবে উদ্ধৃত করা হয়।
দাঊদ যাহিরী লিখেছেন: অভিধানে এই নামের কোন ভিত্তি নেই। শরীয়াতের বিধান দ্বারাই তা প্রচলিত।
‘আল-হাভী’ প্রণেতা বলেছেন, এ কথাটি যদিও বিপর্যয়কারী, তবে যাকাতের বিধানে তার মধ্যকার মতদ্বৈধতা কিছুমাত্র প্রভাবশালী নয়। [(আরবী*********)]
এসব কথা জেনে নেয়ার পর প্রখ্যাত ইয়াহুদী প্রাচ্যবিদ—শাখ্ত-এর কথায় যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যায় না। অনুবাদকৃত ইসলামী বিশ্বকোষে ‘যাকাত’ শব্দ সম্পর্কে লিখিত হয়েছে:
নবী করীম (স) ‘যাকাত’ শব্দটি তার আভিধানিক অর্থের তুলনায় অনেক বেশী প্রশস্ত তাৎপর্যে ব্যবহার করছেন। তিনি আসলে শব্দটির ইয়াহুদী ব্যবহার গ্রহণ করেছেন। (ইয়াহুদী ব্যবহারে এরমীয় শব্দ—যাকাত (***) মক্তা শরীফে (****) বা (****) রূপে ব্যবহৃত হয়েছে। (***) মূল থেকে বিভিন্ন রূপ গটিত হয়, (***) অর্থ (***) পবিত্র হয়েছে। যাকাতরে সাথে সম্পৃক্ত-আরবদের আভিধানিক অনুভূতির দিক দিয়ে, এসব বিভিন্নভাবে গড়া শব্দ কুরআনে ব্যবহৃত হয়ে সেই অর্থ দেয় না যা মূলত আরবী নয়। যা ইয়াহুদী ভাষা থেকে গৃহীত। তার অর্থ: ‘তাকয়া’। [(আরবী*********)]
শাখ্ত ও অন্য প্রাচ্যবিদগণ (Orientalists) ইসলামের চিন্তাধারা, তার পরিভাষিক শব্দ, বিধি-বিধান, তাৎপর্য ইত্যাদিকে ইয়াহুদী বা খৃস্টানদের উৎসের সাথে সম্পর্কিত দেখাবার জন্য একটা চরম পাগলামিমূলক অহমিকায় নিমজ্জিত। তারা যেগুলোকে প্রাচ্য বা পাশ্চাত্য কোন-না কোন উৎস থেকে আসা বলে প্রমাণ করতে সব সময় সচেষ্ট থাকেন। আসলে এ ক্ষেত্রে তারা একটা অমূলক ধারণা দ্বারা চালিত। নিজেদের ইচ্ছেমতই তারা যা তা বলতেও কুণ্ঠিত নন। এ কথার জবাবে আমরা দুটি বিষয়ের অবতারণা যথেষ্ট বলে মনে করছি:
প্রথমত, কুরআন মজীদ ‘যাকাত’ শব্দটি মুসলিম সমাজে পরিচিত অর্থেই ব্যবহার করেছে সেই মক্কী জীবনের প্রাথমিক সময় থেকেই। এ পর্যায়ে আল-আরাফ-এর ১৫৬ আয়াত, সূরা মরিয়মের ৩১ ও ৫৫ আয়াত, সূরা আল-আম্বিয়ার ৭২ আয়াত, সূরা আল-মুমিনুনের ৪ আয়াত, সূরা আন-নামলের ৩ আয়াত, সূরা আর-রুম-এর ৩৯ আয়াত, সূরা লুকমানের ৩ আয়াত, সূরা ফুস্সিলাত-এর ৭ আয়াত দ্রষ্টব্য।
আর নিশ্চিতরূপে বলা যায়, নবী করীম (স) ইব্রীয় ভাষা জানতেন না। আরবী ছাড়া অন্য কোন ভাষা জানতে পারা তাঁর পক্ষে আদৌ সম্ভভপরও ছিল না। ইয়াহুদীদের সাথে তার দেখা-সাক্ষাৎ ও মেলামেশা সম্ভব হয়েছিল মদীনা শরীফে হিজরতের পরে, তার পূর্বে নয়। তাহলে তিনি কুরআনের এসব মক্কী সূরার আয়াতে ব্যবহৃত ‘যাকাত’ শব্দ ইয়াহুদ বা ইয়াহুদী ভাষা থেকে কি করে গ্রহণ করতে পারেন? সুতরাং শাখ্ত-এর ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
দ্বিতীযত, দুই ভাষায় সমন্বিত অর্থের কোন শব্দ পাওয়া গেলে তা যথাযথ উদ্ধৃত করার চিন্তা করা গবেষণা পদ্ধতি ও আলিমদের পরিণাম-চিন্তা-উদাসীন বিরোধী চরিত্রের ব্যাপারে। একই অর্থের শব্দ হলে দুই ভাষার এক ভাষায় অপর ভাষা থেকে গ্রহণ করা কোন জরুরী ব্যাপার নয়।
তৃতীয়ত, দুই ভাষার মধ্যে একটিকে নকলকারী এবং অপরটিকে তা থেকে নকল করা হয়েছে মনে করা একটা যুক্তি বা প্রমাণহীন জবরদস্তি ব্যাপার। যা অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য নয়, তাকেই অগ্রাধিকার দান করা। এ পদ্ধতিকে যারা অভ্যাস হিসেবে গ্রহণ করে, তাদের জ্ঞানের আমানতের খিয়ানত হয়ে যায় এবং আলিম চরিত্রের পরিপন্থী কাজ হয়, তাতে সন্দেহ নেই।
সাদকার অর্থ
কুরআন ও সুন্নাতের ভাষায় শরীয়াতসম্মত ও ‘যাকাত’ ‘সাদকা’ নামে অভিহিত। মা-ওয়ার্দী লিখেছেন: সাদকা যাকাত, যাকাত সাদকা। নাম পার্থক্যপূর্ণ হলৌ সে জিনিসের নামকরণ করা হয়েছে, তা এক ও অভিন্ন। [(আরবী*********) একাদশ অধ্যায়]
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন: (আরবী*********)
তাদের ধন-মাল থেকে সাদকা গ্রহণ কর, তুমি তার দ্বারা তাদের পবিত্র করবে ও পরিচ্ছন্ন নির্মল করবে।
বলেছেন: (আরবী*********)
এদের মধ্যে এমনলোক রয়েছে যারা সাদকাতের ব্যাপারে তোমাকে দোষী করে, তা থেকে তাদের দেয়া হলে তারা সন্তুষ্ট হয়। আরর দেয়া না হলে তখন তারা অসন্তুষ্ট।
(আরবী*********)
সাদকাত (যাকাত) ফকীর ও মিসকীনের জন্য…..। [মরহুম মূসা‘শাখ্ত ইউসুফ সম্পর্কে বিশ্বকোষ (****)-এর টীকায় লিখেছেন: ‘কুরআন’ সর্ব প্রথম যাকাতকে ‘সাদকা’ নামে ভূষিত করেছে। পরে ‘যাকাত’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু কুরআনের মক্কী সূরা-সমূহ সম্মুখে রেখে চিন্তা করলে বোঝা যায় কুর আন সর্বপ্রথম ‘যাকাত’ শব্দটিকে ব্যবহর করেছে। ‘সাদকা’ বা ‘সাদাকাত’ শব্দের ব্যবহার কেবলমাত্র মাদানীয় সমাজেই হয়েছে।’
হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে: (আরবী*********)
পাঁচ অসক্ ফসলের ‘সাদকা’ নেই। তিন বছর থেকে দশ বছর বয়সের উষ্ট্রের পাঁচটির কমে সাদকা নেই। আর পাঁচ আওয়অকের (***) কমে সাদকা নেই।
হযরত মুয়ায (রা)-কে ইয়েমেনে প্রেরণ সংক্রান্ত হাদীসে বলা হয়েছে:
(আরবী*********)
তাদের জানিয়ে দাও যে, তাদের ধন-মালে আল্লাহ্ তা’আলা সাদকা ফরয করে দিয়েছেন, যা তাদের ধনী লোকদের কাছ থেকে গ্রহণ করা হবে।
এ সব ঘোষণা ও অকাট্য বিধান ‘যাকাত’ সম্পর্কেই উদ্ধৃত হয়েছে, যদিও শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে ‘সাদকা’। যাকাত আদায়ে নিযুক্ত কর্মচারীকে ‘মুসাদ্দিক’ –‘সাদকা আদায়কারী নামে অভিহিত করা হয়েছে। কেননা সে সাদকা একত্র করে এবং বন্টন প্রার্থ ও ভিখারীদের দেয়া হয়।
কিন্তু প্রচলিত ব্যবহার যেন আমাদেরকে প্রতারিত না করে এবং কুরআন নাযিল হওয়া কালে আরবদের ভাষায় ব্যবহৃত শব্দের মূল তত্ত্ব থেকে যেন আমরা বঞ্চিত হয়ে না থাকি, সেদিকে আমাদেরকে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে। আর ‘সাদকা’ শব্দটি সিদ্ক-সত্যতা থেকে গৃহীত।
কাযী আবূ বকর ইবনুল আরাবী ‘যাকাত’-কে ‘সাদকা’ নামে অভিহিত করা সম্পর্কে একটা দৃঢ় কথা বলেছেন। তাঁর কথা হল, এ শব্দটি মুখের কথা ও দিলের বিশ্বাসের অনুরূপ কাজ বোঝানোর জন্যে ‘সিদ্কা’ থেকে গৃহীত হয়েছে।
(****) এ তিনটি অক্ষর দ্বারা গঠিত শব্দ (****) একটি জিনিস দ্বারা অপর একটি জিনিস প্রমাণ করা ও তাকে শক্তিশালী করার দিকে ইংগিত করা বোঝায় (****) ‘নারীর মোহরানা’ বলতে বোঝায়, শরীয়াত অনুযায়ী বিয়ের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়তার হালাল হওয়াএবং তার সত্যতা প্রমাণ করা।
শব্দটির রূপান্তর ঘটলে অর্থেও পার্থক্য ঘটবে। যেমন বলা হয়: (আরবী*********) ‘সেসত্য কথা বলেছে, কথার সত্যতা প্রমানিত করেছে, যেমন করে তা প্রমাণ করতে হয়।’
আর- (আরবী*********)
আমি অর্থ দান করেছি। যেমন করে তা দান করতে হয়।
(আরবী*********) স্ত্রীটিকে আমি মোহরানা দিয়েছি, যেমন করে তা দিতে হয়।
শব্দের রূপান্তর বলতে প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশেষ অর্থর প্রতি ইংগিত করা বোঝায়। এ সিদ্ক বা সত্যতার সদৃশ শব্দ হচ্ছে ‘সাদকা’। দ্বীনের সবচাইতে বেশী প্রত্যয়পূর্ণ। আর এ নিকটবর্তী ঘর পরকালে যাওয়ার সিঁড়ি। মন্দ কিংবা ভালোর দিকে যাওয়ার দ্বার-যার জন্রে সে কাজ করেছে। সে অগ্রে যা পাঠিয়েছে, তা-ই তথায় পাবে। এ ব্যাপারে সে সন্দেহ করলে বা সেজন্যে কাজ করায় আলস্র করলে, তার উপর পৃথিবীর জীবনকে অধিক গুরুত্ব দিলে সে তার ধন-মালে কার্পণ্য করবে, তার কামনা-বাসনা পূরণে প্রস্তুতি নিলে পরিণামের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করবে না।[(আরবী*********)]
আমি বলব, এ কারণেই আল্লাহ্ তা’আলা (***) দেয়ার ও (***) সত্য বলে মানা—এ দুইয়ের সমন্বয় করেছেন, যেমন সমন্বয় করেছেন কার্পণ্য ও মিথ্যা মনে করার মধ্যে নিম্নের আয়াতে:
(আরবী*********)
অতেএব যে দিল ও ভয় করল এবং জান্নাতকে সত্য বলে মেনে নিল, আমরা অবশ্যইতার জন্যে জান্নাত সহজলভ্য করে দেব। আর যে লোক কার্পণ্য করল—বেপরোয়া নীতি অনুসরণ করল এবং জান্নাতকে মিথ্যা মনে করল, তার জন্যে কষ্টের জাহান্নাম অবশ্যই সহজপ্রাপ্য করে দেব।
কাজেই ‘সাদকা’ ঈমানে সত্যতার প্রমাণ এবং বিচার দিনের সত্যতা যথার্থতার স্বীকৃতি। এ জন্যেই নবী করীম(স) বলেছেন:
(আরবী*********)
সাদকা অকাট্য দলীল।
কুরআন মজীদে যাকাত
কুরআন মজীদে ‘যাকাত’ শব্দটি বারবার উল্লিখিত হয়েছে একটি সর্বজন-পরিচিত শব্দ (****) হিসেবে[মাত্র দুটি আয়াতে ‘অপরিচিত’ (***) হিসেবেব্যবহৃত হয়েছে ভিন্ন অর্থে। একটি সূরা কাহাফে, অপরটি সূরা মারিয়ামে।] ত্রিশটি আয়াতে। তন্মধ্যে সাতাশটি আয়াতে নামযের সঙ্গে একত্র করে। একটি আয়াতে নামাযের প্রেক্ষিতে উল্লিখিত হয়েছে। আয়াতটি হচ্ছে:
(আরবী*********)
আর যারা ‘যাকাত’ দানেসক্রিয়। এরই পূর্বে রয়েছে:
(আরবী*********) যারা তাদের নামাযে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় নিমগ্ন।
অবশিষ্ট যে ত্রিশটি আয়াতে ‘যাকাত’ শব্দটি উদ্ধৃত হয়েছে, তন্মধে্যে আটটি হচ্ছে মক্কী সূরার আয়াত। আর সবকয়টিই মাদানী সূরায় রয়েছে। [(আরবী*********) এ ‘যাকাত’ শব্দ দ্রষ্টব্য—মুহাম্মাদ ফুয়াদ আব্দুলবাকী লিখিত]
কোন কোন গ্রন্থকার উল্লেখ করেছেন যে, কুরআনের ৮২টি আয়অতে ‘যাকাত’ শব্দটির নামাযের সাথে উদ্ধৃত হয়েছে। কিন্তু এটা খুব বাড়াবাড়ি মনে হয়। উপরে উল্লিখিত গণনা তার প্রতিবাদ করে। তারা যদি বলে যে, ‘যাকাত’ বলতে সে সবই বোঝায়, যাতে ‘ব্যয়’ করা সম্পর্কে বলা হয়েছে—যেমন (***) ও (***) মিসকীনের খাবার প্রভৃতি, তাহলে বলব এ সংখ্যাটি সুসংবদ্ধ নয়। বাহ্যত মনে হয়, ৩২ সংখ্যাকেভুল বশত ৮২ লিখাহয়েছে।
আর ‘সাদকা’ (***) এবং ‘সাদকাত’ (***) শব্দটি কুরআনে ১২টি বার এসেছে। এ সবই মাদানী সূরায়।
প্রথম অধ্যায়
যাকাত ওয়াজিব: ইসলামে তার স্থান
প্রাচীন সভ্যতায় দরিদ্র শ্রেণীর অবস্থা
দরিদ্রদের প্রতি কল্যাণকরণে আসমানী ধর্মসমূহের উদারতা
মক্কী পর্যায়ে পর্যন্ত দরিদ্রদের প্রতি ইসলামের সহানুভূতিমূলক অবদান
মক্কী জীবন পর্যন্ত শুধু যাকাতের উৎসাহ দান
সুনির্দিষ্ট পমিাণে যাকাত ফরয ঘোষণা- মাদানী যুগে
ইসলামে যাকাতের গুরুত্ব
যে তার দিকে অস্বীকা র কারে তার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত
ইসলামের যাকাত ও অন্যান ধর্মের কল্যাণকর কাজের মধ্যে পার্থক্য
যাকাত সম্পর্কে শাখ্ত-এর বিভিন্ন ধারণার সমালোচনা
শুরু কথা
দ্বীন-ইসলামে ‘যাকাত’ ফরয হওয়া এবং তার গুরুত্ব ও স্থান সম্পর্কে আলোচনা করার পূর্বেইসলাম-পূর্ব সমাজে দুর্বল ও দরিদ্র শ্রেণী লোকদের কি অবস্থা ছিল তার বিশ্লেষণ দেয়া সমীচীন মনে হচ্ছে। প্রাচীন কালের ধর্মবিধান তাদের প্রয়োজন পূরণ ও সমস্যার সমাধানে কতটা অবদান রেখেছে, সেই বর্ণনাও এ প্রসঙ্গে উপস্থাপন আবশ্যক। এই অধয়নে জানা যাবেযে, এহেন গুরুত্বপূর্ণ দিকটির সংশোধনে ইসলাম অন্যান সর্ব প্রকার ধর্ম ও মতকে অতিক্রম করে গেছে। শুধু তাই নয়, ইসলাম এর মৌলিক সমাধান দিতে সক্ষম হয়েছে। ইসলাম সুবিচারের ভিত্তি স্থাপনের সাথে সাথে সামাজিক-সামষ্টিক নিরাপত্তা দানেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ইসলামের এই অবদান দৃঢ় ভিত্তিক, তার স্তম্ভসমূহ অত্যন্ত মজবুত। কুরআন মজীদ এর অবতারণা করেছে এবং রাসূলের হাদীসবা সুন্নাত তার রূপায়ণ করেছে।
প্রাচীন সভ্যতার দরিদ্র সমাজ
মানুষ অতীব প্রাচীনকাল থেকেই দারিদ্র্য ও অধিকার বঞ্চনার সাথে মুকাবিলা করে এসেছে। দূর অতীতকালের ইতিহাসে দরিদ্র ও বঞ্চিত মানবতার উল্লেখ বিদ্যমান। সত্য কথা হচ্ছে, মানব সভ্যতা কোন এক যুগেও এমন সব লোক থেকে শূন্য ছিল না, যারা মানবতাকে আহ্বান জানাতে সতত কর্তব্যরত ছিল। মানবতাকে দারিদ্র্য ও বঞ্চনার বেড়াজাল থেকে মুক্ত করার এবং তাদের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করার চেষ্টা-প্রচেষ্টা আজকের দিনে কোন নতুন কথা নয়।
তবে দরিদ্র জনগণ খুবই মর্মান্তিক অবস্থার সম্মুখীন হয়ে রয়েছে চিরকাল। মানবতার ললাটদেশে তা ছিল একটা কলংক টিকা। এ যুগের মনীষী-বিজ্ঞানী ও সমাজতাত্ত্বিকগণ সমাজকে যে উপদেশদিয়েছেন, সমাজ তা কখনই গ্রাহ্য করেনি।
এখানে একজন খ্যাতনামা গ্রন্থকারের উল্লেখ করা যায়। [তিনি উস্তাদ আল্লামা মুহাম্মাদ ফরীদ ওজদী (আরবী**********) দ্রষ্টব্য। তিনি সেই প্রাচীনকাল থেকেই এ কালো ইতিহাসকে আমাদের সম্মুখে তুলে ধরেছেন। সব-পাওয়া ধনী ও সর্বহারা দরিদ্রের মধ্যকার এই ইতিহাস খুবই মর্মস্পর্শী। তিনি লিখেছেন:
‘প্রাচীনকালের জাতিসমূহের ইতিহাস গ্রন্থকার যেখানেই দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন, দেখতে পেয়েছেন, মানুষ মাত্র দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত। এ দুয়ের মাঝে তৃতীয় শ্রেণীর কোন অস্তিত্ব দেখতে পাওয়া যায়নি।শ্রেণী দুটি হচ্ছে: ধনী ও দরিদ্র। এর পশ্চাতে লক্ষ্য যোগ্র ব্যাপার ছিল, ধনী শ্রেণীর স্ফীতি সীমা ছাড়িয়ে গেছে আর দরিদ্র শ্রেণী ক্ষীন হতে হতে মাটির সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। তেলহীন প্রদীপেরন্যায় নিভু নিভু জীবন প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছে মাত্র। এরূপ দুর্বলতার ভিত্তির উপর সমাজ-প্রাসাদের ভিত্তি সংস্থাপিত। ধনী সুখী শ্রেণী কোন্ দিকথেকে যে তাদের মাথার উপর ছাদ ধ্বসে পড়বে, তা ভাবতেও সক্ষম নয়। প্রাচীন মিসরছিল পৃথিবীর বুকে আল্লাহ্র জান্নাত। তথায় যে ফসল ও খাদ্যদ্রব্য উৎপন্ন হত তা সেখান কার অধিবাসীদের কয়েকগুণ বেশী লোকের জন্য যথেষ্ট হত। কিন্তু সেখানকার দরিদ্র শ্রেণী খাবার থেকে বঞ্চিত ছিল। কেননা ধনী শ্রেণীর লোকেরা তাদের জন্যে নিতান্ত উচ্ছিষ্ট বা তলানী ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট রাখতো না। আর তা খেয়ে তাদের জীবন ধারণ ছিল অসম্ভব।
দ্বাদশ পরিবারের রাজত্বের আমলে যখন মারাত্মক ধরনের দুর্ভিক্ষ দেখা দিল তখন দরিদ্ররা ধনীদের কাছে নিজেদের বিক্রয় করে দিতে বাধ্য হল। আর তারা তখনসুযোগ পেয়ে দরিদ্রদের চরমভাবে গ্রাসকরে ফেলল এবং অমানুষিক আযাব ও নির্যাতন-নিষ্পেষণে তাদের জর্জরিত করে দিল।
ব্যাবিলনেও দরিদ্রদের অবস্থা মিসরের মতই ছিল। তাদের উন্নতি ও অগ্রগতির কোন ফল দরিদ্রদের ভাগ্যে জুটত না, যদিও প্রবৃদ্ধি ও উৎসর্গতায় তারা ফিরাউনের দেশের তুলনায় কিছুমাত্র পশ্চাদপদ ছিল না। সেখানকার ঝরণাসমূহ পারস্য পর্যন্ত প্রবাহিত হত। প্রাচীন গ্রীক সমাজের অবস্থা এ থেকে ভিন্নতর ছিল না বরং কোন কোন রাজত্বকালের এমন ঘটনা ইতিহাসে উদ্ধৃত হয়েছে, যা অন্তরে কম্পন এবং দেহে লোমহর্ষণ সৃষ্টি করে। দরিদ্র শ্রেণীর লোকদেরতারা অত্যন্ত হীন কাজে নিয়োজিত করত এবং সামান্য কারণে ছাগল যবেহ করার ন্যায় তাদের যবেহ করত।
স্পার্টর শাসন আমলে দরিদ্র শ্রেণীর লোকদের সম্পূর্ণ অনুর্বর ও অ-আবাদযোগ্য জমিতে চাষাবাদের কাজে নিযুক্ত করা হয়েছিল। সেখানে তারা প্রাণপণ পরিশ্রম করেও খাদ্যোৎপাদনে অক্ষম থেকে যায় এবং তারা না খেয়ে থাকতে ও মরতে বাধ্য হয়।
আবিসিনিয়ায় ধনী শ্রেণীর লোকেরা দরিদ্রের উপর এমন শাসন ও প্রশাসন চালাত যে, তারা তাদের ঠিক ক্রীতদাসের মত হাটে-বাজারে বিক্রয় করে দিত যদি তাদের উপর ধার্যকৃত কর ও র্যালেট দিতে অক্ষম হয়ে পড়ত।
রোম ছিল আইন-বিধানেরন কেন্দ্রভূমি। বড় বড় আইনবিদ ও আইনের মূলনীতি-বিদদের অধিবাস ও অবস্থান ছিল এখানে। ধনী শ্রেণীর লোকেরাই জনগণের উপর নিরংকুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছিল। সাধারণ মানুষ থেকে তারা অত্যন্ত ভিন্নতর ও বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ছিল, আর তাদের অন্তরালে সাধারণ মানুষ ছিল সবদিক দিয়ে পরিত্যক্ত, অবহেলিত ও পদদলিত। তাদের তারা কিছুই দিত না। তারা যখন খুব বেশী দুর্বলহয়ে পড়ত, তখন তারা শহর-নগর ত্যাগ করে চলে যেতে বাধ্য হত।
এ দিক দিয়ে রোমান সাম্রাজ্যের অবস্থা বর্ণনা প্রসঙ্গে ‘মিলিশিয়া’ লিখেছেন:
দরিদ্ররা প্রতিদিন দরিদ্রতর হয়ে যেত, ধনীরা ক্রমশ অধিকতর ধনশালী হয়ে যেত। তারা বলত, দেশেরসব লোক ধ্বংস হোক, না খেয়ে মরুক। তাহলে তারা আর যুদ্ধের ময়দানে যেতে পারবে না। [(আরবী**********)]
রোমান সম্রাজ্যের পতনেরপর তার সমাধির উপর যখন ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহ গড়ে উঠল, তখন দরিদ্র শ্রেণীর অবস্থা আরও মারাত্মক ও মর্মান্তিক হয়ে পড়ল। তখন তারা তাদের অঞ্চলে তাদের জমি-ক্ষেতসহ ঠিক গরু-ছাগলের মত ক্রয়-বিক্রয় হত।
প্রাচীন সুদীর্ঘকালের দরিদ্র সমাজের এটা হল ইতিহাস। ধনী লোকদের ভূমিকা এ সমস্ত কালে এক ও অভিন্ন ছিল। এক্ষণে প্রশ্ন জাগে যে, এরূপ অবস্থায় দরিদ্রদের মুক্তি এবং তাদের দুঃখ-দুর্দশা বিলোপের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধর্মের কি ভূমিকা ছিল?
দরিদ্রের ব্যাপারে বিভিন্ন ধর্মের ভূমিকা
সত্য কথা এই যে, দুনিয়ার সব ধর্মই—মনগড়া ধর্ম ব্যবস্থাসমূহ ও কোন আসমানী কিতাবেরসাথে যে-সবধর্মেরকোন সম্পর্ক নেই—মানব সমাজের এ দিকটির প্রতি যথাসাধ্য দৃষ্টি পাত করেছে। কেননা এ ছাড়া সমাজে ভ্রাতৃত্ব ও পবিত্র জীবনের ভাবধারা প্রবাহমান হতে পারে না।
চার হাজার বছর পূর্বেদুটি খালের মাঝে অবস্থিত দেশগুলোতেও আমরা তাই দেখতে পাই। সর্বপ্রথম শরীয়াতের বিধান ও আইন হাম্বুরাবীর মাধ্যমে পাওয়া যায়। তিনি প্রথম সম্বর্ধনা পর্যায়ে বলেছিলেন:
আল্লাহ্গণ তাকে পাঠিয়েছেন দুর্বল লোকদের উপর নিগ্রহ-নির্যাতন চালানো থেকে শক্তিশালীদের বিরত রাখার উদ্দেশ্যে, জনগণকে হিদায়াতের পথ দেখাতে এবং সুযোগ-সুবিধাকে সাধারণের জন্যে নিরাপত্তাপূর্ণকরে দেয়ার লক্ষ্যে।
কয়েক হাজার বছর পূর্বে প্রাচীন মিসরের জনগণ এ দিক দিয়ে সচেতন ছিল যে, তারা যখন বলত: আমি ক্ষুধার্তকে খাবার দিয়েছি, বস্ত্রহীনকে পোশাক দিয়েছি, যারা নদী পার হতে পারছিল না, তাদের আমার নৌকায় পার করে দিয়েছি, আমি ইয়াতীমের পিতা হয়েছ, বিধবার স্বামী হয়েছি এবং প্রচষ্ট বাতাসের ঝাপটায় ছিন্ন-ভিন্ন লোকদের সংরক্ষণকারী হয়েছি—তখন তারা ঠিক ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করেছিল। [(আরবী**********)]
আসমানী ধর্মসমূহের অবদান
তবে আসমানী ধর্মসমূহের দরিদ্র ও দুর্বল লোকদের কল্যাণের জন্যে যে দাওয়াত ছিল, তা ছিল অধিকতর বলিষ্ঠ ও গভীর প্রভাবশালী। অন্যান্য মানবীয় দর্শনের তুলনায় সে সবেরঅবদান ছিল অসামান্য। মানব রচিত ধর্মমত ও বা বৈষয়িক ধর্মবিশ্বাস অনুরূপ অবদান রাখতে সম্পূর্ণ অক্ষম ছিল। কুরআন ‘যাকাত’ নামে যে জিনিসকে অভিহিত করেছে, কোন নবী-রাসূলের দাওয়াত এ মানবিক দিকের প্রতি গুরুত্ব আরোপ না করে পারে নি।
এ পর্যায়ে যখন আমরা কুরআন মজীদের প্রতি দৃষ্টিনিবদ্ধ করি, -এ কুরআনই হচ্ছে বিশ্বমানবতার জন্যে সর্বশেষ ও অবশিষ্ট নির্ভরযোগ্য ও সহীহতম দলীল—তখন আমরা দেখতে পাই, হযরত ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুব (আ) সম্পর্কে বলা হয়েছে:
(আরবী**********)
আমরাতাদের ইমাম (নেতা) বানিয়েছি, তারা আমার বিধান অনুযায়ী চলে এবং আমরা তাদের প্রতি ভালো-ভালো কাজ, নামায কায়েমকরা ও যাকাত দেয়ার জন্যে ওহী পাঠিয়েছি। আর তারা বস্তুতই আমাদের ইবাদাতকারী ছিল।
হযরত ইসমাঈল (আ) সম্পর্কে বলা হয়েছে:
(আরবী**********)
কিতাবে ইসমাইলের কথা স্মরণ কর। সে ওয়াদা সত্যপ্রমাণকারী ছিল। ছিল রাসূল, নবী। সে তার জনগণকে নামায পড়ার ও যাকাত দেয়ার জন্যে নির্দেশদিত। আর সে তার আল্লাহ্র কাছে পছন্দ, সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত ছিল।
বনূ ইসরাঈলীদের সাথে চুক্তির বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:
(আরবী**********)
আর স্মরণ কর, আমরা যখন বনূ ইসরাইলের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিলাম এই বলে যে, তোমরা আল্লাহ চাড়া আর কারোর বন্দেগী করবে না, পিতামার সাথে আন্তরিকভাবে….ভালো ব্যবহার করবে…. নামায কায়েমকর ও যাকাত দাও….
অপর এক সূরায় উদ্ধৃত হয়েছে:
(আরবী**********)
আল্লাহ তা’আলা বনূ ইসমাইলের কাছ থেকে চুক্তি গ্রহণ করেছেন। আমরা তাদের মধ্য থেকে বারজন দল-প্রধান প্রেরণ করলাম। আর আল্লাহ্ বলেন, আমি তোমাদের সাথেই রয়েছি যদি তোমরা নামাযকায়েম কর, যাকাত দাও এবং আমার নবী-রাসূলগণের প্রতি ঈমান আন, তাদের সাহায্য-সহযোগিতা কর, আর আল্লাহকে ‘করযে হাসানা’ দাও, তাহলে আমিতোমাদের থেকে তোমাদের সব খারাপ ও দোষ দূর করে দেব এবং তোমাদের সেই জান্নাতে দাখিল করে দেব, যার নিম্নদেশথেকে ঝর্ণাধারা সতত প্রবাহমান। আর যে কুফল করবে এরপর, সে তো সঠিক সরল পথ হারিয়ে ফেলল।
হযরত ঈসা (আ) দোলনায় থাকাকালে বলেছিলেন: স(আরবী**********)
এবং আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন নামায ও যাকাত সম্পর্কে যদ্দিন আমি জীবিত থাকব।
সাধারণ আহ্লি কিতাব সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন:
(আরবী**********)
তাদের শুধু এই নির্দেশই দেয়া হয়েছে যে, তারা একমাত্র আল্লাহ্রই ইবাদত করবে, তারই জন্যে আনুগত্যকে খালেস করে একমুখী হবে। আর তারা নামায কায়েম করবে ও যাকাত দেবে। আর িএ-ই হচ্ছে স্থির-সঠিক সুদৃঢ় দ্বীন।
আমরা যখন তাওরাত ও ইনজীল—পুরাতন নিয়ম ও নতুন নিয়ম—দেখি—যা আমাদের সামনেই রয়েছে—তখন তাতে দুর্বল ও দরিদ্র লোকদের প্রতি সহৃদয়তা ও সহানুভূতিপূর্ণ আচরণ গ্রহণের বহু আদেশ ও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আদিপুস্তকে বলা হয়েছে:
যে দরিদ্রের ক্রন্দনে কর্ণরোধ করে সে আপনিই ডাকিবে কিন্তু উত্তর পাইবে না। গুপ্তধন শান্ত করে ক্রোধ আর বক্ষ স্থলে দত্ত উপঢৌকন শান্ত করে প্রচণ্ড ক্রোধ। (হিতোপদেশ: ২১:১৩, ১৪)
সুনয়ন ব্যক্তি আশীর্বাদযুক্ত হইবে; কারণ সে দীনহীন লোককে আপন খাদ্যের অংশ দেয়। (পুর্বোক্ত: ২২:৯)
যে দরিদ্রকে দান করে সে পরমুখাপেক্ষী হয় না। আর যে তার চক্ষুদ্বয় আড়াল করে, তার উপর অশেষ অভিসম্পাত। (পূর্বোক্ত: ২৭)
অন্যত্র বলা হয়েছে:”
তোমার ভাইদের মধ্যে কেউ দরিদ্র হলে, তোমার দরজায় কোন দরিদ্র এলে—তোমার দেশে যা, তোমার আল্লাহ্ সদাপ্রভু তোমাকে দিয়েছেন তার প্রতি তোমার মন কঠিন করিও না। তোমার দরিদ্র ভাই থেকে তোমার হাত গুটিয়ে নিও না। বরং তার জন্য উন্মুক্ত কর তোমার হস্ত। তাকে ঋণ দাও, যতটা তার প্রয়োজন সেই পরিমাণ দাও তাকে। দেওয়ার সময় তোমার মন যেন খারাপ হয়ে না যায়। কেননা এ কাজের দরুন তোমার আল্লাহ সদাপ্রভু তোমাকে বরকত দেবেন। তোমার সব কাজে এবং সেইসব ক্ষেত্রে, যেদিকে তোমাকে হাত প্রসারিত করবে। কেননা পৃথিবীতে দরিদ্রদের কখনও হারাবে না। এ জন্যে আমি তোমাদের উপদেশদিয়ে বলছি: তোমার দরিদ্র ভাইয়ের জন্যে তোমার হস্ত উন্মুক্ত কর তোমার নিজ দেশে। (দ্বিতীয় বিবরণ: ১৫:৭, ৮)
বলা হয়েছে:
তুমি তোমার বীজ হইতে উৎপন্ন যাবতীয় শস্যের বীজ বৎসের যাহা ক্ষেতে উৎপন্ন হয়, তাহার দশমাংশ পৃথক করিবে। (পূর্বোক্ত: ২২)
তৃতীয় বৎসরের শেষে তুমি সেই বৎসরে উৎপন্ন আপন শস্যাদিব যাবতীয় দশমাংশ বাহির করিয়া আনিয়া আপন নগর-দ্বারের ভিতরে সঞ্চয় করিয়া রাখিবে।
তাহাতে তোমার সাথে যাহার কোন অংশ কি অধিকার নাই, সেই লেবীয় এবং বিদেশী, পিতৃহীন ও বিধবা, তোমার নগর-দ্বারের মধ্যবর্তী এই সকল লোক আসিয়া ভোজন করিয়া তৃপ্ত হইবে; এরূপে যেন তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু তোমার হস্তকৃত সমস্ত কর্মে তোমাকে আশীর্বাদ করেন।
বলা হয়েছে:
তোমরা যা কিছু সব বিক্রয় কর এবং সাদকা দাও। (১৩:৩৩)
যাহার দু’খানা কাপড় সেযেন যার নাই তাহাকে দেয়। যাহার খাদ্য আছে সেও যেন তাহাই করে। (১৪:১০)
বরং ভিতরে যাহা আছে, তাহা দান কর, আর দেখ, তোমাদের পক্ষে সকলই শুচি। (লূক: ১১:৪১)
তুমিযখন মধ্যাহ্নভোজ কিংবা রাত্রিভোজ প্রস্তুত কর, তখন তোমার বন্ধুগণকে বা তোমার ভ্রাতাদিগকে বা তোমার জ্ঞাতিদিগকে কিংবা ধনী প্রতিবেশীগণকে ডাকিও না; কি জানি তাহারাও তোমাকে পাল্টা নিমন্ত্রণ করিবে, আর তুমি প্রতিদিন পাইবে। কিন্তু তুমি যখন ভোজ প্রস্তুত করিবে তখন দরিদ্র, লুলা, খঞ্জ ও অন্ধদিগকে নিমন্ত্রণ করিও, তাহাতে ধন্য হইবে, কেননা তোমার প্রতিদান করিতে তাহাদের কিছুই নাই, তাই ধার্মিকগণের পুনরুত্থান সময়ে তুমি প্রতিদান পাইবে। (লুক-১৪:১২:১৪)
পরে তিনি চক্ষু তুলিয়া দেখিলেন, ধনবানেনা ভান্ডারে আপন-আপন দান রাখিতেছে। আর তিনি দেখিলেন, একটি দীন হীনা বিধবাসেই স্থানে দুটি সিকি পয়সারাখিতেছে; তখন তিনি কহিলেন, আমি তোমাদিগকে সত্য বলিতেছি এই দরিদ্র বিধবা সকলের অপেক্ষা অধিক রাখিল, কেননা ইহারা সকলে আপন আপন অতিরিক্ত ধন হইতে কিছু কিছু দানের মধ্যে রাখিল কিন্তু এ নিজ অনটন সত্ত্বেও ইহার যাহা কিছু ছিল, সমুদয় জীবনোপায় রাখিল।
যে তোমার কাছে যাচ্ঞা করে তাহাকে দাও, এবং যে তোমার কাছে ধার চায় তাহা হইতে বিমুখ হইও না।
সাবধান, লোককে দেখাইবার জন্য তাহাদের সাক্ষাতে তোমাদের ধর্ম করিও না, করিলে তোমাদের স্বর্গস্থ পিতার কাছে তোমাদের পুরষ্কার নাই।
অতএব তুমি যখন দান কর, তখন তোমার সম্মুখে তুরি বাজাইও না, যেমন কপটরা লোকের কাছে গৌরব পাইবার জন্য সমাজ-গৃহে ও পথে করিয়া থাকে। আমি তোমাদিগকে সত্য বলিতেছি, তাহারা আপনাদের পুরস্কার পাইয়াছে।
কিন্তু তুমিযখন দান কর তখন তোমাদের দক্ষিন হস্ত কি করিতেছে তাহা তোমার বাম হস্তকে জানিতে দিও না। এইরূপে তোমার দান যেন গোপনে হয়, তাহাতে তোমার পিতা, যিনি গোপনে দেখেন, তিনি তোমাকে ফল দিবেন। (মথি, ৬:৪-১)
আর যে কেহ এই ক্ষুদ্রগণের মধ্যে কোন একজনকে শিষ্য বলিয়া কেবল এক বাটি শীতল জল পান করিতে দেয়, আমি তোমাদিগকে সত্য বলিতেছি, যে কোন মতে আপন পুরস্কার বঞ্চিত হইবে না। (মথি, ১০:৪২)
পর্যালোচনা:
দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত লোকদের ব্যাপারে প্রাচীন ধর্মসমূহ যে ভূমিকা গ্রহণ করেছে, তার কিছুটা উজ্জ্বল নমুনা উপরে উদ্ধৃত হল। কুরআনে পূর্বেকার আসমানী কিতাবসমূহের এটাই ছিল দাওয়াত।
কিন্তু এখানে কতিপয় বিষয় স্পষ্ট প্রয়োজন বলে মনে করছি:
১. এ সব উদ্ধৃতি থেকে এ কথা স্পষ্ট জানা গেল যে, প্রাচীন ধর্মগ্রন্থসমূহ দরিদ্রদের প্রতি দয়া-অনুগ্রহ প্রদর্শনের জন্যে যথেষ্ট উৎসাহ দিয়েছে। স্বার্থপরতা ও কার্পণ্যের প্রণিতি সম্পর্কে ভয় দেখানো হয়েছে এবং ব্যক্তিগত ও ইচ্ছামূলকভাবে দান সাদকা করার জন্যে স্পষ্ট বলিষ্ঠ আহবান পেশ করেছে।
২. তবে এগুলো এই কাজকে কর্তব্য ও বাধ্যতামূলক করার দিক দিয়ে উচ্চতর মানে উন্নীত হতে পারে নি। এসব কাজ না করলেও দ্বীনের কোন মৌলিক কাজ ত্যাগ করা হয়েছে বলে এসব কথা দ্বারা অনুভূতি জেগে উঠে না এবং তদ্দরুন ইহকাল ও পরকালে আল্লাহ্ তা’আলা কঠিন আযাবে নিক্ষেপ করবেন, সে কথাও তা থেকে জানা যায় না।
৩. এই কাজকে ব্যক্তির খুশী—ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তাদের মনকে এদিকে উৎসাহিত করতে চাওয়া হয়েছে। কিন্তু তাদের উপর এই কাজ করানোর জন্যে রাষ্ট্রকে কোন কর্তৃত্ব দেয়া হয়নি। না সংগ্রহ ও আদায় করার জন্যে, না তা বন্টন করার জন্যে।
৪. সাদকা ও দান করার কাজ কর্তব্র হওয়ার জন্যে ধন-মালের কোন পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়নি। তার জন্যে কোন শর্তও আরোপ করা হয়নি। কত পরিমাণ দিতে হবে, তাও অনির্ধারিতই রয়ে গেছে। এর ফলে রাষ্ট্র তা আদায় করে নেয়ার কোন দায়িত্ব বুঝতে পারে না। কেননা যার পরিমাণ নির্ধারিত নয়, সীমা অনির্দিষ্ট, তা আদায় করা রাষ্ট্রের পক্ষে অসম্ভব।
৫. দরিদ্রদের প্রতি যে অনুগ্রহ প্রদর্শন করার উপদেশ দেয়া হয়েছে, দারিদ্র্য সমস্যার সমাধান তার লক্ষ্য নয়। দারিদ্র্য মূলোৎপাটিত করাকে লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। দরিদ্র্যকে মালিকদের মুখী করে দেয়ারও কোন ইচ্ছা নেই বরং তার উদ্দেশ্য হচ্ছে, শুধু তাদের দুরবস্থার মাত্রা হ্রাস করা এবং তাদের ফরিয়াদের ধ্বনিকে ক্ষীণ করা মাত্র।
এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে চাই দরিদ্র ও দুর্বল লোকেরা সক্ষম ধনী শ্রেণী লোকদের দয়া ও অনুগ্রহের অধীন বেঁচে থাকত। যখন তাদের মধ্যে আল্লাহ প্রেম, পরকালের ভয় জাগত কিংবা জনগণের কাছ থেকে প্রশংসা ও খ্যাতি লাভের ইচ্ছা জাগত, ঠিক তখনই তারা কিছু দান করত—পরিমাণ তার যত সামান্যই হোক-না-কেন, দুর্বল ও দরিদ্র্য জর্জরিত লোকেরা ঠিক তখনই ধনীদের কাছ থেকে কিছু একটা পেতে পারত। তখন এই ধনীরা বড় দাতা ও বদান্যতাসম্পন্ন লোক বলে প্রশংসিত হয়। কিন্তু তারা যখন ধন-প্রেম ও স্বার্থপরতায় অন্ধ হয়ে যেত, তখন দরিদ্রদের ছটফট করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া চাড়া কোন পরিণতি হত না। দরিদ্র্যর থাবা তাদের ছিন্নভিন্ন করে ফেলত। তা থেকে আত্মরক্ষা করার মত কোন অবলম্বনই তাদের ছিল না। অধিকারের দাবি তোলার সামর্থ্যও ছিল না তাদের। কেনা তাদের কোন অধিকার স্বীকৃতি ও সপরিজ্ঞাত ছিল না। এই অনুগ্রহদানের ব্যাপারটি সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তিদের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছিল।
দারিদ্র বিমোচনে ইসলামের অবদান
দারিদ্র বিমোচনে ইসলামের অবদান
দারিদ্র বিমোচনে ইসলামের ভূমিকা এবং দরিদ্র-অভাবগ্রস্ত ও দুর্বল-অক্ষম লোকদের প্রতি কর্তব্য পালনে ইসলামের যে নীতি ও অবদান; কোন আসমানী ধর্ম বা মানব রচিত বিধানই তার সমতুল্য হতে পারে না। শুধু লালন ও শিক্ষণ প্রশিক্ষণের দিকদিয়েই হোক কিংবা আইন প্রণয়ন ও সংগঠন গড়ে তোলার দিক দিয়েই হোক আর বাস্তবায়ন ও কার্যকরণের দিক দিয়েই হোক—কোন একটি দিক দিয়েও ইসলামের সাথে অন্য কিছুরই তুলনা হতে পারে না।
মক্কী যুগ থেকে কুরআনের ভূমিকা
দারিদ্র্য সমস্যার সমাধানে ইসলামযে অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করেছে, গরীব জনগণ সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করেছে, ইসলামের শুভ সূ্র্যোদয়কালীন মক্কা শরীফস্থ অবস্থাই তার বড় প্রমাণ। তখন মুসলমান ছিল আংগুল গণনা করা কয়েকজন ব্যক্তি মাত্র। দ্বীণ-ইসলাম কবুল করার কারণে তারা ছিল কঠিনভাবে বিপদগ্রস্ত। দ্বীনের দাওয়াত দানে তারা ছিল প্রচণ্ড বাধার সম্মুখীন। তাদের হাতে রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক শক্তি বলতে কিছুই ছিল না। তখনও এই মানবিক সামষ্টিক—গরী মিসকীনদের ব্যাপারটি খুব বেশী গুরুত্ব পেয়েছে। কুরআন মজীদ তার জন্যে বিশেষ ও স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। কুরআন মজীদ এ পর্যায়ে কখনও মিসকীনকে খাদ্য দান ও সেজন্যে অন্যদের উৎসাহিতকরণের গুরুত্ব দিয়েছে, কখনও আল্লাহর দেয়া রিযিক থেকে ব্যয় ও বন্টনের কথা বলে উৎসাহিত করেছে; কখনও বলেছৈ, এ হচ্ছে প্রার্থ, বঞ্চিত মিসকীন ও নিঃসম্বল পথিকের অধিকার আদায়, কোথাও স্পষ্ট ভাষায় ‘যাকাত’ দেয়ার তাকীদ করেছে। বিভিন্ন নাম ও বিভিন্ন শিরোনামেতার উল্লেখ করা হয়েছে।
কুরআন মজীদ থেকে এ পর্যায়ে কতিপয়ের আয়াত এখানে উদ্ধৃত করা হলে আমাদের পূর্বোক্ত কথার প্রমাণ পাওয়া যাবে।
মিসকীনকে খাবার দেয়া ঈমানের অংগ
সূরা ‘আল-মুদ্দাসসির’ প্রাথমিক পর্যায়ে অবতীর্ণ সূরাসমহের অন্যতম। তাতে কিয়ামতের দিনের চিত্র অংকিত হয়েছে। দক্ষিণ বহুপন্থী মু’মিনগণ অপরাধী কাফির ও অমান্যকারীদের সম্পর্কে পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদ করেছে; এদের জন্যে তো জাহান্নাম নির্ধারিত করা হয়েছে। তাদের উপর কি ধরনের আযাব এসেছে, কি কি কারণে সে আযাবেতারা নিক্ষিপ্ত হয়েছে, তা-ই হচ্ছে তাদের জিজ্ঞাস্য। দেখানো হয়েছে যে, তাদের আযাবের মূল কারণ হচ্ছে মিসকীনদের অধিকারের প্রতি উপেক্ষা প্রদরশন, ক্ষুধা-তৃষ্ণা ও বস্ত্রহীনতার আগুনে তাদের দগ্ধ হওয়ার জন্যে ছেড়ে দেয়াও তাদের এই মর্মান্তিক অবস্থা বিদূরণে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা। বলা হয়েছে:
(আরবী***********)
প্রতিটি প্রাণী স্বীয় উপার্জনের বিনিময়ে রেহেনবন্দী—দক্ষিণ বাহুওয়ালা লোকদের ব্যতীত। তারা তো জান্নাতে অবস্থান করবে। সেখানে তারা অপরাধী লোকদের কাছে জিজ্ঞাসা করবে: কোন্ জিনিসটি তোমাদের জাহান্নামে নিয়ে গিয়েছে, তারা বলবে: আমরা নামায পড়া লোকদের মধ্যে শামিল ছিলাম না, মিসকীণদের খাবার খাওয়াতাম না। আর প্রকৃত সত্যের বিরুদ্ধে কথা রচনাকারীদের সাথে মিলিত হয়ে আমরাও অনুরূপ কথাবার্তা রচনার কাজে মশগুল হয়েছিলাম। সেই সাথে প্রতিফল দেয়ার দিনটিকেও আমরা অসত্য মনে করতাম।
মিসকীনদের পোশাক দান, আশ্রয় দান এবং তাদের প্রয়োজন ও অভাব-অনটন বিদূরণ প্রভৃতিও এই ‘খাদ্যদান’ (***) কথাটির অন্তর্ভুক্ত।
সূরা ‘আল-কলম’-এর ভাষণে আল্লাহ্ তা’আলা সেই বাগান মালিকদের কিস্সা বর্ণনা করেছেন, যারা রাত্রিকালেই ফল আহরণের ওয়াদা পরস্পরে করেছে, যেন ফল পাড়ার সময় দরিদ্ররা যে স্বভাবতই ভিড় জমায় ও তা থেকে অংশ পেতে চায়, তার সুযোগটা না আসে বরং তারা যেন বঞ্চিতই থেকে যায়। কিন্তু আল্লাহ্র আযাব খুব শিগগিরই তাদের গ্রাস করে ফেলল।
(আরবী*************)
রাতের বেলা তারা নিদ্রামগ্ন ছিল। এই সময় তোমার আল্লাহ্র কাছ থেকে একটি বিপদ সেই বাগানের উপর অপতিত হল এবং তার অবস্থা যেন কর্তিত ফসলের মত হয়ে গেল।
সকালবেলা তারা পরস্পরকে ডাকল যে, ফল পাড়তে হলে খুব সকাল-সকালই ক্ষেতের দিকে রওয়ানা হয়ে চল। অতঃপর তারা রওয়ানা হয়ে গেল। তারা পরস্পর চুপে চুপে (কথা) বলতে বলতে চলছিল যে, আজ যেন কোন ভিখারী তোমাদের কাছেও ঘেঁষতে না পারে; তারা কাউকে কিছু না দেয়ার সিদ্ধান্ত করে ফলে ভোরে ভোরে তাড়াহুড়া করে সেখানে এমনভাবে উপস্থিত হল যেন তারা ফল পাড়তে খুব সক্ষম। কিন্তু বাগানটি যখন তারা দেখল, তারা বলতে লাগল, আমরা নিশ্চয় পথ ভুলে গেছি। না, বরং আমরা বঞ্চিত রয়ে গেছি। তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি উত্তম ছিল, সে বলল, আমি কি তোমাদের বলিনি যে, তোমরা তসবীহ্ করো না কেন?… তারা উচ্চঃস্বরে বলে উঠল: মহান পবিত্র আমাদের রব্! আমরা সত্যই বড় গুনাহ্গার ছিলাম। পরে তারা পরস্পরকে তিরস্কার করতে লাগল। শেষ পর্যন্ত তারা বলল: আমাদের অবস্থার জন্যে বড়ই দুঃখ! আমরা নিশ্চয়ই সীমালংঘনকারী হয়ে গিয়েছিলাম। কুব অসম্ভব নয় যে, আমাদের রব্ আমাদের এ থেকেও উত্তম বাগান দান করবেন। আমরা আমাদের ইলাহ্র দিকেই ফিরে যাচ্ছি।…. এমনি হয়ে থাকে আযাব। আর পরকালের আযাব তো আরও অনেক বড়। যদি তারা তা জানতো।
মিসকীনের অধিকার আদায়ের জন্যে উৎসাহ দান
কুরআন মজীদের মক্কায় অবতীর্ণ সূরা ও আয়াত মিসকীনদের প্রতি দয়া প্রদর্শন, তাদের খাবার দানের ও তাদের দুঃখ দূরীকরণের জন্যে উৎসাহ দান, তাদের প্রতি অবহেলা ও নির্মমতা প্রদর্শনে ভয় দেখানো প্রভৃতি কাজটুকু করেই ক্ষান্ত হয়নি, তা অতিক্রম করে সম্মুখের দিকে অনেক দূর অগ্রসর হয়ে গেছে। ইসলাম প্রত্যেক মুমিনের উপর মিসকীনের অধিকার ধার্য করে দিয়েছে তাদের খাবার দেয়ার ও তাদের দুঃখ মোচনের উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসার জন্যে। অন্যদের উৎসাহিত করাও তাদেরই দায়িত্ব বলে ঘোষণা করা হয়েছে। আর এ কাজ না করাকে আল্লাহ্র প্রতি কুফরী সমতুল্য এবং আল্লাহ্র ক্রোধ-অসন্তোষ ও পরকালীন আযাব উদ্রেককারী বলে জানিয়ে দেয়া হয়েছে?।
সূরা ‘আল-হাক্কাহ্’ –এ বামপন্থীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে:
(আরবী**********)
আর যার আমলনামা তার বাম হস্তে দেয়া হবে, সে বলবে, হায় আমার আমলনামা আমাকে যদি না-ই দেয়া হত আর আমার হিসেব কি তা যদি আমি না-ই জানতাম। হায়, আমার দুনিয়ায় ঘটিত মৃত্যুই যদি চূড়ান্ত হত। আজ আমার ধন-মাল আমার কোন কাজে এলো না। আমার সব ক্ষমতা-আধিপত্য-প্রভুত্ব নিঃশেষ হয়ে গেছে।
পরে রাব্বুল আলামীন তার উপর সুবিচারপূর্ণ ফয়সালা জারি করেছেন, সে যে আযাব পাওয়ার যোগ্য, সেই আযাবই তাকে দেয়া হল। বলা হয়েছে:
(আরবী**********)
ধর লোকটিকে, তার গলায় ফাঁস লাগিয়ে দাও, তারপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ কর। আর তারপর তাকে সত্তর হতে দীর্ঘ শিকলে বেঁধে ফেল।
এভাবে প্রকাশ্যে ঘোষণার মাধ্যমে আযাব, অপমান ও লাঞ্ছনা দেয়ার কারণ কি? তার কারণ দুটো। একটি, সে মহান আল্লাহ্র প্রতি ঈমান রাখতো না। আর দ্বিতীয়, মিসকীনদের খাবার দেয়ার জন্যে লোকদের উৎসাহিত করতো না।
এসব আয়াতে কঠিন আযাবের ভয় দেখানো হয়েছে। এ ভয় দিলকে কাঁপিয়ে দেয়। এগুলো ঠিক তেমনি, যেমন হযরত আবুদ-দারদা (রা) তাঁর স্ত্রীকে বলেছিলেন:
হে উম্দে দারদা! আল্লাহ্র একটা শিকল রয়েছে, যা সব সময়—যে সময় জাহান্নাম সৃষ্টি হয়েছে, সেইসময় থেকেই জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হচ্ছে। তা সেই দিন পর্যন্ত উত্তপ্ত করতে থাকা হবে, যেদিন তা লোকদের গলায় পরানো হবে। আল্লাহ্র প্রতি ঈমান আনার কারণে তার অর্ধেক থেকে তো তিনি আমাদের নাজাত দিয়েছেন। (এক্ষুণে বাকী অর্ধেক থেকে মুক্তির জন্যে) হে উম্মে দারদা! মিসকীনকে খাবার দেয়ার জন্যে উৎসাহিত করতে থাক। [আরবী******}
কুরআনের পূর্বেক দুনিয়ায় এমন কোন ধর্মগ্রন্থ দেখা যায়নি, যা মিসকীনদের খাবার দেয়ার উৎসাহিত করার কাজ না করাকে জাহান্নামে যাওয়ার ও কঠিন আযাব ভোগ করার কারণস্বরূপ উল্লেখ করেছে।
সূরা ‘আল-ফজর’ –এ আল্লাহ তা’আলা জাহিলিয়াতের লোকদের সম্বোধন করেছেন যারা ধারণা করত যে, তাদের ধর্ম তাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে এবং তারা তাদের পিতা ইবরাহীমের ধর্মের উপর কায়েম রয়েছে। আল্লাহ্ তাদের ধিক্কার দিয়ে ভর্ৎসনা করে বলেছেন:
(আরবী*********)
তোমাদের ধারণা সত্য নয়। তোমরা বরং (অপরাধ করছ এই যে, ) তোমরা ইয়াতীমকে সম্মান কর না এবং মিসকীনদের খাবার দেয়ার জন্যে পরস্পরকে উৎসাহিত কর না।
বস্তুত এই ছোট্ট আয়াতে সমাজের গরীব-মিসকীনদের মৌলিক অধিকার আদায়ের নিরাপত্তা দানের ব্যবস্থা হয়েছে।
শায়খ মুহাম্মাদ আব্দুহু এ প্রসংগে লিখেছেন, আয়াত মিসকীনকে খাবার দিতে বলার পরিবর্তে খাবার দেয়ার জন্যে উৎসাহ দানের কথা বলা হয়েছে। প্রথমটি বলার হলে বলা হত (*****) ‘তোমরা মিসকীনকে খাবার দাও না।’-এভাবে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে কথা স্পষ্ট হত। কিন্তু তা বলা হয়নি। কেননা সমাজের ব্যক্তিরা পরস্পরের জন্যে দায়িত্বশীল। প্রত্যেকেরই উচিত অপর প্রত্যেক লোককে ন্যায় কাজের আদেশ দান এবং অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে বিরত রাখা। সেই সাথে যে কাজের আদেশ সে অন্যকে করবে, সে নিজে তা অবশ্যই পালন করবে। অনুরূপভাবেযে কাজ করতে অন্যদের নিষেধ করবে, সে নিজেও তা থেকে বিরত থাকবে—এটাই স্বাভাবিক।
সূরা আল-মাউন এ ইয়াতীমকে গলাধাক্কা দেয়া ও মিসকীনকে খাবার দেবার জন্যে উৎসাহ দান না করাকে বিচার দিনের প্রতি অবিশ্বাস ও কুফরী করার অনিবার্য ফলশ্রুতি বলা হয়েছে। [আরবী********]
আল্লাহ তা’আলা বলেছেন:
(আরবী**********)
তুমিকি সেই লোকটিকে দেখেছ, যে লোক বিচারের দিনকে অসত্য মনে করে?
এই জিজ্ঞাসা প্রতিটি সমঝদার ব্যক্তির প্রতি। অর্থাৎ পরকাল ও বিচারের দিনকে অসত্য মনে করে কে, তা কি তুমি বুঝতে পেরেছ? যদি না-ই বুঝে থাক, না-ই চিনেথাক, তাহলে জেনে নাও, সে হচ্ছে সেই ব্যক্তি যে ইয়াতীমকে গলাধাক্কা দেয় এবং মিসকীনকে খাবার দেয়ার জন্যে লোকদের উৎসাহিত করে না।
মিসকীনকে খাবার দেয়ার জন্যে উৎসাহ দান বলতে বোঝায় এই কাজের ব্যবস্থাপনার জন্যে লোকদের আহ্বান জানানো। কেননা যে লোক মিসকীনকে খাবার দেয়ার জন্যে লোকদের উৎসাহিত কর না, সে স্বভাবতই নিজে মিসকীনকে খাবার দেয় না। কাজেই আল্লাহর কথা:
(আরবী*********) মিসকীনকে খাবার দেবার জন্যে উৎসাহিত করে না-
সেই ব্যক্তিকে বোঝায়, যে খাদ্যাভাবী ও উপার্জনে অক্ষম দরিদ্র ব্যক্তিকে নিজের ধন-মাল থেকে একবিন্দু পরিমাণও দান করে না। এখানে ইংগিতপূর্ণ কথা বলার প্রকারন্তরে একথাই বোঝানো হয়েছে যে, তোমার কাছে মিসকীনের প্রয়োজন প্রকাশিত ও উপস্থাপিত হলে আর তোমার কাছে দেবার মত কিছু না থাকলে তখন অন্যদেরকে তা দিতে বলা ও উৎসাহিত করা তোমার কর্তব্য। এখানে পরকালে বিশ্বাসী লোকদের দরিদ্রের ফরিয়াতে তাদের দান করার জন্যে উৎসাহিত করা হয়েছে, তা অন্যদের কাছ থেকে সম্পদ সংগ্রহ করে হলেও অবশ্যই করতে হবে। আর এ হচ্ছে খয়রাতী কাজে সংগঠন ও সংস্থা গড়ে তোলার একটা পন্থা। কুরআনের উপরিউক্ত আয়াতটিই হল তার মৌল ভিত্তি। যেমন সূরা আল-ফঅজ্র-এ বলা হয়েছে।
(আরবী*********)
না, কখনই নয়, আসলে তোমরা ইয়াতীমকে সম্মান দেখাও না এবং মিসকীনকে খাবার দেয়ার জন্যে পরস্পরকে উৎসাহিত কর না।
বস্তুত এ একটা অতীব উত্তম পন্থা। এর মাধ্যমে দরিদ্রদের সাহায্য করা যায়, মিসকীণদের প্রয়োজন পূরণের জন্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এ ভাবেই সম্ভব। [আরবী********]
পরকালে অবিশ্বাসী লোকদের পরিচয় দান প্রসঙ্গে পরে বলা হয়েছে:
(আরবী**********)
দুঃখ সেই নামাযীদের জন্যে, যারা নামাযের ব্যাপারে অবসাদ ও উপেক্ষা প্রদর্শন করে। তারা ওরাই, যারা লোকদের দেখানোমূলক কাজ করে এবং নিত্য সাধারণ প্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে পরস্পরকে সাহায্য করতেও কুন্ঠিত হয়।
আল্লামা ইবনে কাসীর এ আয়াতের তাফসীরে লিখেছেন:
অর্থাৎ তারা তাদের আল্লাহর ইবাদত উত্তমভাবে সম্পন্ন করতে পারেনি যেমন, তেমনি আল্লাহর সৃষ্টিকুলের প্রতিও কোন কল্যাণমূলক অবদান রাখতে সক্ষম হয়নি। এমনকি সামান্য-নগণ্য যেসব জিনিস দিয়ে পরস্পরকে সাহায্য করা যায়, যা দ্বারা লোকদের বেশ উপকারও হয় এবং মূল জিনিসটিও যথাযথ অক্ষুণ্ণ থাকে; বিনস্ট বিলুপ্ত হয় না ও তা আসল মালিকের কাছে ফিরে আসে। এ সব লোক যে যাকাত ও অন্যান্য রকমারি উপকারী জিনিস দিতেও রাযী নয়, তা তো আরও সত্য কথা। [আরবী******] এই ধরনের লোকদের নামাযও তাদের কোন কাজে আসবে না এবং পরকাল-বিশ্বাসী লোকদের মধ্যে তাদের মধ্যে গণ্যও করা হবে না।
ভিখারী, বঞ্চিত. মিসকীন ও নিঃস্ব পথিকদের অধিকার
সূরা আয্-যারিয়াত-এ আল্লাহ তা’আলা সে সব মুত্তাকী লোকের উল্লেখ করেছেন, যারা তাঁর কাছে জান্নাত ও অফুরন্ত নিয়ামত পাওয়ার অধিকারী হবে। এই লোকদের সবচেয়ে উজ্জ্বল পরিচিত হচ্ছে:
(আরবী***********)
তাদের ধন-মালে ভিখারী প্রার্থী ও বঞ্চিতদের সুস্পষ্ট ও সুপরিজ্ঞাত অধিকার রয়েছে।
‘ভিখারী’ বা প্রার্থী বলতে বোঝানো হয়েছে সে লোক, যে এসে দয়াস্বরূপ কিছু পেতে চায়; যদিও তার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। আর ‘বঞ্চিত’ বলে সেই লোককে বোঝানো হয়েছে, যার ধন-মাল কিছুই নেই, উপার্জন নেই, জীবিকা নির্বাহের কোন রোজগারও নেই।
এ কথার দরুন উপরিউক্ত মুত্তাকী লোকের অনুধাবন করতে পারলে যে, তাদের কাছে যে ধন-মাল রয়েছে, তারা তার নিরংকুশ মালিক নয়। তার কারণে তারা অন্যদের থেকে কোন স্বতন্ত্র মর্যাদা বা অধিকারেরও দাবিদার হতে পারে না। তাতে নিশ্চিতরূপে অভাবগ্রস্ত অন্য লোকদের অধিকার রয়েছে। তা তাদের পক্ষ থেকে তোমাদের ‘হেবা’ করেও দিয়ে দেয়া হয়নি। আর এর কারণে তোমরা তাদের থেকে কোন বিশিষ্টতাও পেয়ে যাওনি। এ মূলতই তাদের হক-পাওনা। আর ‘পাওনা’ গ্রহণের কারণে তাদের অমর্যাদাও কিছু হতে পারে না। তোমরা তা দিয়ে দিলেও তাদের উপর তোমাদের অনুগ্রহ বর্ষিত হয়েছে বলে দাবি করতে বা কোনরূপ অহমিকতাও বোধ করতে পার না।
সূরা ‘আল-মা’আরিজ’-এ এই পরিচিতিটিরই পুনরুল্লেখ হয়েছে। তবে তাতে একটা অতিরিক্ত শব্দ বসানো হয়েছে। সেই মু’মিনদের পরিচিত প্রসঙ্গে কথাটি বলা হয়েছে, যারা তাদের ঈমান ও নৈতিকতার শক্তিতে মানবীয় দুর্বলতাকে জয় করেছে। [আরবী****] মানবীয় দুর্বলতার উল্লেখ করে কুরআন মজীদে বলা হয়েছে:
(আরবী*********)
মানুষ খুবইসংকীর্ণমনা (ছোট আত্মার) সৃষ্ট হয়েছে। তার উপর যখন বিপদ আসে তখন ঘাবড়িয়ে যায়এবং যখন স্বাচ্ছন্দ্য আসে তখন সে কার্পণ্য করতে শুরু করে। কিন্তু সেই সব লোক (এই জন্মগত দুর্বলতা থেকে মুক্ত), যারা নিজেদের নামায রীতিমত ও স্থায়ীভাবে আদায় করে, যাদের ধন-মালে প্রার্থনাকারী ও বঞ্চিতদের একটা নির্দিষ্ট অধিকার রয়েছে।
এ আয়াতে ধনীদের ধন-মালে একটা সুপরিজ্ঞাত (Known) অধিকারের কথা স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলেছেন, এ ‘সুপরিজ্ঞাত অধিকার’ হচ্ছে ‘যাকাত’। কেননা ধনীদের ধন-মালে পরিমিত ও সুপরিজ্ঞাত হক তো এটাই।তাঁরা এ-ও জানে; উল্লেখও করেছেন যে, এ সূরাটি মক্কা শরীফে অবতীর্ণ। এতে কোনই সন্দেহ নেই। আর এ কথাও সকলেরই জানা যে, যাকাত কার্যত মদীনাতেই ফরয ঘোষিত হয়, তাহলে বলতে হবে: উক্ত আয়াতে যে ‘সুপরিজ্ঞাত হক’-এর কথা বলা হয়েছে, তা ভাগ করে দেয়া অংশ ছাড়া আর কিছুই নয়। তা ভাগ করে দিয়ে দেয়ার কাজটিকে তারা নিজেরাই নিজেদের উপর ফরয করে নিয়েছিল এবং তারা প্রার্থী ও বঞ্চিতদের জন্যে নির্দিষ্টিও করে দিয়েছিল। [আরবী**********]
তাহলে এ ‘হক’ ও সুপরিচিত ‘যাকাত’—এ দুইয়ের মাঝে পার্থক্য হচ্ছে এই যে, উক্ত ‘হক’ তারা নিজেরাই পরিমিত ও নির্ধারিত করে নিয়েছিল নিজেদের জন্যে বাধ্যতামূলক হিসেবে। আর ‘যাকাত’ সুনির্দিষ্ট হয়েছে—পরিমাণ নির্ধারিত হয়েছে স্বয়ং শরীয়াতের বিধানদাতা কর্তৃক।
সূরা ‘আল-ইসরা’ ও ‘সূরা আর্-রূম’ –এ আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন:
(আরবী**********)
এবং নিকটাত্মীয়দের তাদের হক, আর মিসকীন, নিঃস্ব পথিককে এবং বেহুদা ব্যয় করো না।
(আরবী*********)
অতএব দাও নিকটাত্মীয়কে হক এবং মিসকীন ও নিঃস্ব পথিককে।
তা অতীব উত্তম সেই লোকদের জন্যে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চায়। এ সব কথা দ্বারা কুরআন মজীদ মক্কীযুগের প্রথম দিনগুলো থেকেই মুসলমানের প্রাণে এ ভাবধারা দৃঢ়মূল করে বসাতে চেয়েছে যে, নিকটাত্মীয় ও অভাবগ্রস্ত সাধারণ লোকদের এক নিশ্চিত অধিকার রয়েছে তার ধন-মালে এবং সেই হক আদায় করা তার একান্তই কর্তব্য। এটা নিছক ইচ্ছামূলক নফল দানমাত্র নয়। তাই ইচ্ছা হলে দেবে নতুবা দেবে না—এটা নয় আদপেই বরং এটা অবশ্য দেয়।
শস্য কর্তনকালীন অধিকার
সূরা আল-আন’আমের আয়াতে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন:
(আরবী**********)
সেই মহান আল্লাহ্ই নানা ধরনের বাগ-বাগিচা, আঙুর বাগান, খেজুর বাগান সৃষ্টি করেছেন, খেত-খামার বানিয়েছেন, যা থেকে নানা প্রকারের খাদ্য-উৎপন্ন হয়, জয়, জয়তুন ও আনারের বৃক্ষ সৃষ্টি করেছেন, যার ফলসমূহ দেখতে সদৃশ কিন্তু স্বাদে ভিন্ন।….খাও তার ফসল, যখন তা হবে এবং আল্লাহ্র হক দিয়ে দাও যখন তার ফসল তুলবে। আর সীমালংঘন করো না, আল্লাহ্ সীমালংঘনকারীদের পছন্দ করেন না।
এ আয়াতটি দ্বারা আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাদের সাবধান করে দিয়েছেন। বলেছেন, জমি যে ফল বা ফসল ফলায়, তাতে অনিবার্যভাবে দেয় হক রয়েছে এবং তা সেদিনই আদায় করে দিতে হবে যেদিন তা পাড়া বা কাটা হবে।
হযরত সায়ীদ ইবনে যুবায়েল (রা) থেকে বর্ণিত—তিনি বলেছেন:
এই নির্দেশ ছিল যাকাতের বিধান নাযিল হওয়ার পূর্বে। প্রত্যেক ব্যক্তিই তখন তার ক্ষেতের ফসল ধেকে দান করত, পশুরা বিচরণ করত। ইয়াতীম মিসকীন ও কামাই-রোযগারে অক্ষম লোকেরা তা থেকে হিসসা লাভ করত।
এ অধিকার ছিল শর্তহীন এবং ওশর বা অর্ধেক ওশর অনির্ধারিত। ক্ষেত্রও বাগান-মালিকের ঈমানের উপর এই কাজটি ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। কেননা তাদের চতুর্দিকে অভাবগ্রস্ত লোক কিলবিল করত। পরবর্তীকালে রাসূলে করীম (স) িএই হক-এর পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেন এবং তা মদীনা শরীফে সংঘটিত হয়। যেমন আল্লাহ্র তরফ থেকে ওশর বা অর্ধেক ওশর দেয়া ফরয করে দেয়া হয়েছে পাঁচ অসাক্ পরিমাণ শস্য ও ফল-পাকড় থেকে। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলেছেন, মক্কায় যে ব্যবস্থা ছিল, এই পরিমাণ নির্ধারণ তা নাকচ করে দিয়েছে। কিন্তু শেষের দিকের ফিকাহ্বিদদের মতে এই পারিভাসিক নাকচকরণ (****) এখানে প্রযোজ্য নয়। এ পর্যায়ে আমরা বিশদ আলোচনা করব ‘ফসল ও ফলের যাকাত’ পর্যায়ে।
মক্কায় ‘যাকাত’ দান
মক্কা শরীফে অবতীর্ণ কুরআনের আয়াতসমূহের প্রায় সর্বত্রই এই ধরণ ও পদ্ধতি অনুসৃত হয়েছে। সকল অবস্থায়ই দরিদ্রদের দুঃখ মোচনের আহবান জানানো হয়েছে। ধন-মাল থেকেতাদের অংশদিয়ে দেয়ার জন্যে তাকীদ করা হয়েছে। তার উদ্দেশ্য হল মু’মিনদের সমাজে দরিদ্ররা যেন কষ্ট না পায়।
শেষ পর্যায়ে এই পদ্ধতি ও স্টাইল পরিবর্তিত হয়েছে এবং ‘যাকাত দান’ কথাটি বলা হয়েছে। যারা তাদেয় তাদের প্রশংসা করা হয়েছে আর যারা দেয় না তাদের তিরস্কার করা হয়েছে। কুরআনের মক্কী সূরাসমূহের আয়াত সমষ্টি থেকে তা স্পষ্ট হয়ে উঠে।
সূরা ‘আর-রুম’-এ আল্লাহ তা’আলা নিকটাত্মীয়, মিসকীন ও নিঃস্ব পথিকেরহক্ আদায় করে দেয়ার আদেশ করেছেন। তাতে সুদ, যা বাহ্যত ধনের পরিমাণ বৃদ্ধি করে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে হ্রাসকরে এবং যাকাত বাহ্যত ধনের পরিমাণহ্রাস করে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বৃদ্ধি করে—এ দুইয়ের মাঝে তুলনা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন:
(আরবী********)
অতএব তোমরা দাও নিকটাত্মীয়কে তার হক এবং মিসকীন ও নিঃস্ব পথিককে। তা অতীব উত্তম তাদের জন্য, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে ইচ্ছুক। আর তারাই সফলকাম। আর তোমরা যে সুদ দাও—লোকদের ধন-মালের পরিমাণ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে, তা আল্লাহর কাছে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় না। আর তোমরা যে যাকাত দাও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে, তারাই আসলে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত ধনের মালিক হয় (যারা যাকাত দেয়)।
আর সূরা ‘আন-নামল-এ আল্লাহ্ মু’মিনদের পরিচিতি স্বরূপ বলেছেঠন, যাদের জন্যে তাঁর কিতাবকে হিদায়েত ও সুসংবাদবাহক বানিয়ে নাযিল করেছন। তাতে বলা হয়েছে:
(আরবী********)
এসব কুরআনেরই আয়াত, সুস্পষ্ট বর্ণনাকারী কিতাব, হিদায়াতের ও সুসংবাদের গ্রন্থ মু’মিনদের জ ন্যে, যারা নামায কায়েমকরে ও যাকাত দেয় আর তারা প্রকৃত পক্ষে পরকালের প্রতি দৃঢ় প্রত্যয়শীল।
যাকাত দানের কথাটি নামায কায়েম করার কথার পর যেভাবে বলা হয়েছে, তাতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, ধন-মালের যাকাততের কথাই বলা হয়েছে। কেননা এটা কুরআনের রীতি।
সূরা ‘লূকমান’-এর শুরুতে বলা হয়েছে:
(আরবী*******)
হিদায়াতের বিধান ও রহমত ঐকান্তিক নিবেদিত (বান্দা)-দের জন্যে যারা নামায কায়েম করে, যাকাত দেয়…
পূর্ববর্তী আয়াত প্রসংগে যা বলা হয়েছে, এ পর্যায়েও তা-ই বলা যায়। সূরা ‘আল-মু’মিনুন’ এ ফিরদাউস জান্নাতের অধিকারী মু’মিনের পরিচিত বর্ণনা প্রসংগে বলা হয়েছে:
(আরবী********)
আর যারা যাকাত দান করে…
সূরা ‘আল-আ’রাফ-এ মূসা নবী ও তাঁর জনগণের কিসসা বর্ণনা প্রসংগে বলা হয়েছে:
(আরবী**********)
আর আমার রহমত সব কিছুতে পরিব্যাপ্ত। আমি তা লিখব তাদের জন্যে, যারা মুত্তাকী, যারা যাকাত দেয়, আর যারা আমাদের আয়াতসমূহের প্রতি ঈমান রাখে, যারা উম্মী নবী-রাসূল (স)-কে অনুসরণ করে চলে।
সূরা ‘ফুস্সিলাত’-এ মুশরিকদের জন্যে অভিশাপ বর্ষণ করেছেন এবং তাদের প্রধান ও বিশেষ পরিচিতির উল্লেখ করেছেন। সে পরিচিতি হচ্ছে, তারা যাকাত দেয় না িএবং পরকালে অবিশ্বাস করে। আয়াতটি হচ্ছে:
(আরবী**********)
দুঃখ মুশরিকদের জন্যে, যারা যাকাত দেয় না এবং তারা পরকালে অবিশ্বাস করে। স্পষ্ট কথা, নিষ্ঠাবান মু’মিনরা যাকাত দেয়, তারাই পরকালের প্রতি দৃঢ় প্রত্যয়শীল। আর ওরা যাকাত দেয় না। পরকালে অবিশ্বাসী। মু’মিন ও কাফিরের মধ্যে এটাই বড় পার্থক্য।
কোন কোন তাফসীরকার বলেছেন, এখানে ‘যাকাত’ বলে মনের যাকাত—পরিচ্ছন্নতা, নির্মলতা ও পবিত্রতা বুঝিয়েছেন। কেননা শিরক হচ্ছে সবচেয়ে বড় ময়লা-আবর্জনা। যেমন এ আয়াতে বলা হয়েছে:
(আরবী**********) সত্যিই কল্যাণ লাভ করছে, যে (আত্মাকে) পবিত্র করেছে।
(আরবী**********)
নিশ্চয় সাফল্য লাভ করেছে, যে পবিত্রতা অবলম্বন করেছে।
এ ধরনের তাফসীর করে আসলে ধন-সম্পদের যাকাত ব্যাপারে ‘পলায়নী নীতি’ গ্রহণ করা হয়েছে, যা মদীনায় বিধিবদ্ধ হয়েছে বলেই সকলেই জানেন। তাই ইবনে জারীর তাবারী এরূপ তাফসীল প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি উপরিউক্ত আয়াতদ্বয়ের তাফসীর ও তাৎপর্যে বলেছেন: “তারা তাদের ধন-মাল থেকে তার যাকাত বের করে ব্যয় করে না। তার বড় দলীল হল, ‘যাকাত’ শব্দটি বিশেষভাবে ‘ধন-মালের যাকাত’ অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে, অন্য অর্থে নয়।
কুরআনে প্রায় সর্বত্রই যাকাত প্রসঙ্গে (****) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, তার অর্থ, (****) দেয়া বা দান করা। ধন-মালের যাকাত দেয়া প্রসঙ্গে এই শব্দের ব্যবহার সটিক ও উত্তমভাবেই হয়েছে।
মক্কী সূরাসমূহে ‘যাকাত’ প্রসঙ্গে ‘আদেশ’ নাযিল হয়নি। তাহলে তা পালন করা ফরয হয়ে যেত। বরং সংবাদ দানের ভঙ্গীতে বলা হয়েছে, মু’মিন, মুত্তাকী ও মুহসিনলোকদের একটা মৌলিক গুণ হিসেবে উদ্ধৃত হয়েছে। [সূরা আল-মুয্যাম্মিলের শেষআয়াতে যা বলা হয়েছে তা মক্কী বলে বলা হয়েছে, কিন্তু কেউ কেউ মাদানী বলে উল্লেখ করেছেন।এতে যে মতভেদ রয়েছে—তা স্পষ্ট।] এবং কাফিরদের পরিচিতিস্বরূপ উল্লেখ করা হয়েছে তার তরককারী বলে।
বস্তুত কল্যাণ প্রাপ্ত মু’মিনদের মৌলিক গুণাবলীর মধ্যে গণ্য হচ্ছে যাকাত দান। তানা-দেয়া মুশরিকদের অবিচ্ছিন্ন গুণপনা। কথার এ ধরণই প্রমাণ করে যে, তাদেয়া ফরয। কেননা মু’মিনদের গুণপনায় ভূষিত ও সুশোভিত হওয়া এবং মুশরিকদের বিশেষসমূহ থেকে মুক্ত ও রিক্ত হওয়া ঈমানদার ব্যক্তিমাত্রেরই কর্তব্য। তাতে কোনরূপ মতদ্বৈধতা নেই। আর সেই সবের উপর স্পষ্ট আদেশ হচ্ছে:
(আরবী**********)
এবং দাও তার হক্ তা কাটার দিনেই।
মক্কী যুগের যাকাত নিঃশর্ত
প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলামী আইন রচনারইতিহাসে সর্বজনজ্ঞাত কথা হচ্ছে, যাকাত মদীনায় ফরয হয়েছে। তাহলে উপরিউক্ত কথা ও কুরআনের মক্কী সূরার আয়াত বা সূরাসমূহে যাকাতের উল্লেখ কি করে সাযুজ্যপূর্ণ হতে পারে?
এ প্রশ্নের জবাব হচ্ছে, মক্কী সূরাসমূহে যে যাকাতের উল্লেখ হয়েছে, তা হুবহু সেই ‘যকাত’-এ নয় যা পরে মদীনায় বিধিবদ্ধ হয়েছে এবং তার পমিাণ ও নিসাব নির্ধারিত হয়েছে। তা সংগ্রহ ও আদায় করার জন্যে কর্মচারী নিযুক্ত হয়েছে। তার সংগঠন করার জন্যে রাষ্ট্র সরকার দায়িত্বশীল হয়েছে।
মক্কায় যাকাত নিঃশর্ত, নিসাব ও পরিমাণ অনির্ধারিত। আর তা আদায় করা ব্যক্তিদের ঈমানও তাদের মু’মিন ভাইদের ভ্রাতৃত্বের কর্তব্যবোধের উপর ছিল ন্যস্ত। তখন ধন-মালথেকে কিছু একটা পরিমাণ দিয়ে দেয়াই যথেষ্ট ছিল।যদিও অভাবআরও অধিক ব্যয় করার দাবি করছিল।
মক্সী সূরাসমূহে উদ্ধৃত ‘তার হক’ ও ‘প্রার্থী ও বঞ্চিতেরদ হক’ ‘সুপরিজ্ঞাত হক্’ প্রভৃতি কথার একটা ভিন্নতর ব্যাখ্যা দিয়েছেন কোন আলোচনাকারী।তাঁরা বলেছেন এটা সম্ভব যে, মক্কী পর্যায়েই নবী করীম (স) হয়ত যাকাতের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে যারা তাদিতে সক্ষম তাদের জন্যে তা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছিলেন। [‘সীরাতুর-রাসূল’ কুরআন থেকে গৃহীত আকৃতি’ মুহাম্মাদ ইজ্জাত দরোজা লিখিত-২য় খন্ড, ৩৪১ পৃষ্ঠা।]
কিন্তু এ কথাটি প্রমাণিত হয়নি বরং তার বিপরীত কথাই উদ্ধৃতহয়েছে। বস্তুত তখনকার সময় এ নির্ধারণ ছিল সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়। কেননা তখন তো লোকেরা নিজেরাই দিয়ে দিচ্ছিলেন এবং যা ছিল তাঁদের হাতে আসত, তা প্রায় সবই দ্বীনের পথে ব্যয় করে দিচ্ছিলেন অকাতরে।আর রাসূল (স) কর্তৃক পরিমাণ নির্ধারণ ছাড়া গরীবদের হক্ সুপরিজ্ঞাত হতে পারেনা, এটাও কোন জরুরী কথা নয়। হয়ত প্রত্যেক ধনী ব্যক্তি নিজেই স্বীয় ধন-মালে গরীবদের হকের পরিমাণ নির্ধারণ করতেন। কোন তাফসীরকার এ কথার উল্লেখও করেছেন। অথবা তখনকার অবস্থা ও প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে একটা পরিমাণ প্রচলিত ও সর্ব জনবিদিত ছিল এবং সেই অনুযায়ীই তাঁরা ব্যয় করতেন।
হাফেয ইবন কাসীর সূরা ‘আল-মু’মিন’ –এর আয়াত:
(আরবী**********)-এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে লিখেছেন: অধিকাংশ তাফসীরবিদ মনে করেন, এখানে ‘যাকাত’ বলতে ধন-মালের যাকাতই বুঝিয়েছেন, যদিও এ আয়াতটি মক্কায় অবতীর্ণ এবং যদিও যাকাত ফরয হয়েছে, তা নিসাব ও পরিমাণভিত্তিক। নতুবা আসল কথা হচ্ছে মৌলিকভাবেযাকাত মক্কা শরীফেই ফরয হয়। [(আরবী**********)] আল্লাহ্ তা’আলা সূরা ‘আল-আন’আম’-এ বলেছেন: (আরবী**********) ‘এবং দাও তাঁর হক তা কাটার দিনই।’ এ সূরাটি মক্কাশরীফেই নাযিল হয়েছে। আমাদের পূর্বোদ্ধৃতবহু আয়াত থেকেই এর সমর্থন পাওয়া যায়।
মদীনা-পর্যায়ে যাকাত
মুসুলিমগণ মক্কা শরীফে একক ব্যক্তি হিসেবে দ্বীনী দাওয়াতী কাজে ব্যস্ত ছিলেন। মদীনায়পৌঁছার পরই তাঁরা প্রকৃতপক্ষে সামাজিক ও সামষ্টিক জীবন যাপন করতে শুরু করেন। সেখানে তাঁদের ছিল ভৌগলিক ভূখণ্ড (Territory) প্রশাসন-সংস্থা ও সার্বভৌমত্ব। তাই এখানে ইসলামী প্রশাসনিক আইন-বিধান এমন এমন একটা নতুন রূপ পেয়েছে, যা এ উত্তরণের সাথে পুরোপুরিভাবে সাযুজ্যপূর্ণ। এখানে সব কিছু সুনির্দিষ্ট, বিশেষভাবে চিহ্নিত। যদিও পূর্বে মক্কী পর্যায়ে তা-ই ছিল সাধারণ ও শর্তহীন। মক্কায় যা ছিল শুধু উপদেশ, দৃষ্টি আকর্ষণ ও নিতান্তই উৎসাহদান পর্যায়ে, মদীনায় তা-ই হয়েছে শক্তি ও সার্বভৌমত্ব বলে জারী ও কার্যকর। এখানেও মানুষেরঈমান ও মনের প্রতি আবেদন পরিত্যক্ত হয়নি। যাকাতের ব্যাপারে এ মাদানী রীতি অত্যন্ত প্রকট। এখানে শরীয়াত প্রদাতা কত পরিমাণ ধন-মালে যাকাত ফরয, ফরয হওয়ার শর্ত ও পরিমাণ এবং তার ব্যয়ের ক্ষেত্র ইত্যাদি সব কিছুই সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। যাকাত আদায় ও বন্টনের একটা পূর্ণাংগ সংস্থা গড়ে উঠেছিল এখানে।
কুরআনের মাদানী আয়াতে যাকাতের তাকীদ ও বিধি-বিধান
মদীনা শরীফে অবতীর্ণ কুরআনযাকাত ফরয হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে স্পষ্ট আদেশের ভঙ্গীতে এবং তা দেয়ার জন্যে স্পষ্ট ভাষায় আদেশ উদ্ধৃত হয়েছে। মদীনায় অবতীর্ণ সূরা ‘আল-বাকারা’য় আমরা পড়ি:
(আরবী**********)
আর তোমরা কায়েম কর নামায এবং দাও যাকাত।
ক্ষেত্র এখানে প্রশস্ত। কিন্তু উদ্ধৃত যাকাত সংক্রান্ত আদেশের গুরুত্বের কারণেই আমি আর একটি আয়াতের উল্লেখ করছি। তা হচ্ছে সূরা ‘আত্-তাওবা’র আয়াত। এই সূরা সর্বশেষ নাযিল হয়েছে।
‘যাকাত’ প্রসঙ্গে সূরা তাওবা’র দৃষ্টান্ত
ক. এই সূরা’র শুরুতে চুক্তি ভঙ্গকারী মুশরিকদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ ঘোষণা করার নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ তা’আলা। তিনি তাদের জন্যে চার মাসের অবকাশও নির্দিষ্টকরেন, যেন এই সময়ের মধ্যে তারা দুনিয়া পরিভ্রমণ করতেও নিজেদের জন্যে একটা পন্থা চূড়ান্তভাবে গ্রহণ করতে পারে। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন:
(আরবী**********)
হারাম মাসসমূহ অতিক্রান্ত হয়ে গেলে তোমরা মুশরিকদের হত্যা কর যেখানেই তাদের পাও। তাদের পাকড়াও কর, পরিবেষ্টিত কর, এবংতাদের জন্যে প্রতিটি ঘাটিতে অপেক্ষায় বস। অতঃপর তারা যদি তওবা করে এবং নামায কায়েম করে ও যাকাত দেয় তাহলে তখন তাদের পথ উন্মুক্ত করে দাও। জানবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা ক্ষমাশীল ও দয়াবান।
এআয়াত অনুযায়ী মুশরিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করা থেকে বিরত থাকা ও তাদের পথ উন্মুক্ত করে দেয়ার জন্যে শর্ত তিনটি:
প্রথম. শিরক থেকে তওবা। আর তার প্রমাণহবে, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্’র সাক্ষ্য দান।
দ্বিতীয়, মুসলিমদের জন্যে ফরয করা নামায কায়েম করা—তা ঈমানের প্রকাশ ক্ষেত্র, ইসলামের সর্বাপেক্ষা বড় স্তম্ভ, প্রতি দিন-রাতে পাঁচবার কাম্য। মুসলিম ও কাফিরের মধ্যে তা-ই হচ্ছে প্রধান পার্থক্যকারী এবং মুসলিমদের পারস্পরিক, আত্মিক, সামষ্টিক ও দ্বীনী যোগাযোগের প্রধান সূত্র। এবং
তৃতীয়: ধনীদের ধন-মালে অভাবগ্রস্ত ও সাধারণ জনগণের কল্যাণের জন্যে ফরয-করা যাকাত রীতিমত আদায় করা। তা মুসলিম সমষ্টির পরস্পরের সঙ্গে অর্থনৈতিক, সামষ্টিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক সূত্র।
খ. এই সূরাটিতে ছয়টি আয়াতের পরই আল্লাহ্ তা’আলা অন্যান্য মুশরিক জাতির প্রসঙ্গে ইরশাদ করেছেন:
(আরবী**********)
অতঃপর তারা যদি তওবা করেও নামায কায়েম করে এবং যাকাত দেয়, তাহলে তারা তোমাদের দ্বীনী ভাই। জানে, এমন লোকদের জন্যে আমরা আয়াতসমূহকে আলাদা-আলাদা করে বর্ণনা করছি।
তাহলে কাফিরদের জন্য মুসলিমসমাজে প্রবেশ করার ও তাদের সাথে এমন দ্বীনী ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কোন পথই উন্মুক্ত নেই—যে ভ্রাতৃত্ব প্রত্যেক ব্যক্তিকে সমষ্টির একজন বানিয়ে দেয়, যেখানে ব্যক্তির জন্যে তা-ই হয় যা সমষ্টির জন্যে; ব্যক্তির দায়িত্ব তা-ই হয় যা সমষ্টির দায়িত্ব এবং পরস্পরকে অবিচ্ছিন্ন বন্ধরে বেঁধে দেয়, এই রকমের ভ্রাতৃত্বের কোন পথ দেখা যায় না।তবে তার একটি মাত্র পথই রয়েছে। আর তা হচ্ছে শিরক থেকে তওবা করা এবং তার আনুষঙ্গিক প্রথমকাজ হচ্ছে, মুসলিমদেরকে আল্লাহর আনুগত বানায় যে নামায, সেই নামায কায়েমকরা। এই নামাযের মাধ্যমেই তারা পরস্পরের সাথে পরিচিত, নিকটবর্তী ও ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে। আর দ্বিতীয় কাজ হচ্ছে যাকাত দেয়া। যার মাধ্যমে তারা পরস্পরের দুঃখ মোচন করতে পারে, অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা কার্যকর করতে পারে।
সাহাবীদের সময় থেকেই বিশেষজ্ঞগণ একটি ব্যাপারে আমাদের সতর্ক করে দিয়েছেন, এখানে তা উল্লেখ্য। তা হচ্ছে এই যে, নামাযের পাশাপাশিই যাকাতের উল্লেখ কুরআন মজীদের একটা রীতি। এ দুটিকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন করে খুব কমই উল্লেখ করা হয়েছে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেছেন:
(আরবী**********)
তোমাদেরকে একসঙ্গে আদেশ করা হয়েছে নামায কায়েম করার ও যাকাত দেয়ার জন্যে। তাই কেউ যাকাত না দিলেতার নামাযও হবে না।
ইবনে যায়েদ বলেছেন: (আরবী**********)
নামাযওযাকাত এক সাথে ফরয করাহয়েছে, এ দুটির মাঝে কোনরূপ পার্থক্য করা হয়নি।
অতঃপর তিনি পড়লেন: (আরবী**********)
বললেন: যাকাত চাড়া শুধু নামাযগ্রহণ করতে অস্বীকার করা হয়েছে।তিনি আরও বলেছেন: আল্লাহ তা’আলা আবূবকর (রা)-কে রহমত করুন। তিনি ছিলেন খ্যাতিমান ফিকাহ্বিদ। কেননা তিনিই সর্বপ্রথম বলেছিলেন: আল্লাহ যে দুটি জিনিসকে একত্র করেছেন, আমি সে দুটিকে কখনই বিচ্ছিন্ন করব না।
গ. এসূরাতেই আল্লাহ তা’আলা যেসব মসজিদ প্রতিষ্ঠাকারীদের উল্লেখ করেছেন, যাঁদের কাছ থেকেতিনি তা কবূল করবেন। বলেছেন:
(আরবী**********)
সন্দেহ নেই, আল্লাহ্র মসজিদসমূহ প্রতিষ্ঠা ও আবাদ করে সেইলোক, যে ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি, পরকালের প্রতি এবং নামায কায়েম করেছে ও যাকাত দিয়েছে, আর আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করেনি। খুবই সম্ভব এ লোকেরাই হিদায়েতপ্রাপ্ত হবে।
অর্থাৎ কাফির—মুশরিকরা যদি মসজিদও প্রতিষ্ঠা করে, তবুতা গ্রহণ করা হবে না—যতক্ষণতারা ঈমান না আনবে, নামায কায়েম করবে ও যাকাত না দেবে।
ঘ. এসূরাতেই কঠিন আযাবের ভয় প্রদর্শন করা হয়েছে যেসব স্বর্ণ-রৌপ্য সঞ্চয়কারীদের প্রতি, যারা তা থেকে আল্লাহ্র হক আদায় করে না।
ইরশাদ হয়েছে:
(আরবী**********)
আর যারাই স্বর্ণ ও রৌপ্য সঞ্চয় করে আটকে রাখে, তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদের পীড়াদায়ক আযাবের সুসংবাদ দাও। যেদিন তাদের উপর তা উত্তপ্ত করেতাদের মুখাবয়বে ও পার্শ্বে-পিঠে দাগ দেয়া হবে, বলা হবে যে, এই সেইঅপরাধের শাস্তিযা তোমরা (স্বর্ণরৌপ্য) সঞ্চয় করে নিজেদের জন্যে সংগ্রহ করেছ। অতএব তোমরা তার স্বাদ আস্বাদন কর যা তোমরা নিজেরাই সঞ্চয় করেছিলে।
বিশেষজ্ঞগণ বলেছেন: এ পর্যায়ে এত বড় শাসনবাণী উচ্চারিত হওয়ার কারণ হল, অর্থ-সম্পদের লোভ ও কার্পণ্য মানব-প্রকৃতি নিহিত স্বভাব। তাই তারা যদি এ ব্যাপারে ভয় করে এবং তা থেকেবিরত থাকতে পারে, তা হলে তারা আল্লাহর আনুগত্যমূলক সব কাজে বিনীয় ও নিবেদিত হবে বলে আশা করা যায়। [(আরবী**********)]
ঙ. যাকাত বাবদ লব্ধ সম্পদ কোথায় ও কোন্ কোন্ খাতে ব্যয় করা হবে, ত-ও এই সূরাতেই বলে দেয়া হয়েছে। সাদ্কা সম্পর্কেও বলা হয়েছে। এ কথা মূলত বলা হয়েছিল লোভী ও লালসান্ধ সেসব লোকের প্রতিবাদস্বরূপ, যারা কোনরূপ অধিকার ব্যতীতই যাকাতের সম্পদ পেতে চেয়েছিল। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন:
(আরবী**********)
এদের মধ্যে এমন লোক রয়েছে যারা তোমাকে সাদ্কার ব্যাপারে দোষী করে। তা থেকে তাদর দেয়া হলে তারা খুশী হয়, আর দেয়া না হলে তারা তখন অসন্তুষ্ট হয়ে পড়ে। তারা যদি সন্তুষ্ট হতো তা পেয়ে, যা আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল তাদের দিয়েছেন এবং বলত যে, আল্লাহই আমাদের জন্যে যথেষ্ট, আল্লাহ্ তাঁর অনুগ্রহ থেকে আমাদের দেবেন অবশ্যই এবং তাঁর রাসূলও (তা হলে নিশ্চয়ই ভাল হত)। …. আমরা তো আল্লাহ্র দিকেই আগ্রহী।
এর সাথে সাথেই বলা হয়েছে:
(আরবী**********)
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এই যে, সাদ্কা-যাকাত কেবলমাত্র দরিদ্র, মিসকীন, যে (যাকাত সংগ্রহ ও বন্টন) কাজে নিযুক্ত কর্মচারী, যাদের দিল আকৃষ্ট করা প্রয়োজন, যারা বন্দী, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে এবং নিঃস্ব পথিকের জন্যে। এ আল্লাহ্র নিকট থেকে ফরযরূপে নির্ধারিত। আর আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ ও সুবিজ্ঞানী।
এই চূড়ান্ত কথা ঘোষণাকারী আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা লোভীদের লোভ বন্ধ করার ব্যবস্থা করে দিলেন। তাদের লেলিহান জিহ্বা কর্তন করলেন। যাকাত বন্টনের কাজটিকে লোভীদের লোভ-লালসার অধীন রাখলেন না। কোন প্রশাসকের ইচ্ছাধীনও করে দিলেন না। তার বন্টন আটটি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ও সুনির্দিষ্ট করে দিলেন। আর এই বন্টন খাত যে অতীব ইনসাফপূর্ণ, তাতে কোন সন্দেহই থাকতে পারেনা।
বস্তুত ঈমানদার লোকদের কাছে আল্লাহ্র চাইতে উত্তম ফয়সালাকারী আর কে হতে পারে? (আল-মায়েদা: ৫০)
আয়াতটি স্পষ্ট বলে দিচ্ছে যে, যাকাত আদায়, সংগ্রহ ও বন্টনের কাজ ‘সে কাজে নিয়োজিত কর্মচারীদের’ মধ্যে সমাধা করতে হবে। সেইসাথে বলা হয়েছে যে, যাকাত সংক্রান্ত কাজের দায়িত্ব ব্যক্তিদের উপর নয়, সরকারের উপর ন্যস্ত (পরে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হবে)।
চ. মুসলিম সমাজের মৌল কাঠামো গড়ে তোলার পদ্ধতি ও বিধি-বিধানের কথাও এ সূরাতেই বলে দেয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে:
(আরবী**********)
আর মু’মিন স্ত্রী-পুরুষ পরস্পর পরস্পরের বন্ধু, অভিবাবক। তারা ভাল ও ন্যায় কাজের আদেশ করে, খারাপ ও পাপ কাজ থেকে বিরত রাখে, নামায কায়েম করে, যাকাত দেয়, আর আল্লাহ্ ও রাসূলের আনুগত্য ও অনুসরণ করে। এসব লোককে আল্লাহ্ অবশ্যই রহমত দান করবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ মহাপরাক্রমশালী, সুবিজ্ঞানী।
মু’মিন সমাজ ও মুনাফিক সমাজের মধ্যে পার্থক্যকারী অন্যতম স্তম্ভ হচ্ছে যাকাত। উক্ত আয়াতের পূর্ববর্তী আয়াতে বলা হয়েছে:
(আরবী**********)
মুনাফিক পুরুষ ও স্ত্রীগণপরস্পরের (পৃষ্ঠপোষক)। তারা পাক ও অন্যায় কাজের আদেশ করে, ভাল ও পুণ্যের কাজ করতে নিষেধ করে। আর তাদের হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রাখে। তারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, আল্লাহও তাদের ভুলে গেছেন। আসলে মুনাফিকরাই সীমালংঘনকারী।
মুনাফিকদের ‘হাত মুষ্টিবদ্ধ’ করার অর্থ ও লোভ ও লালসান্ধ হওয়া। ফলে তারা আল্লাহর কাছেও বিস্মৃত হয়েছে। আল্লাহ তাদের ত্যাগ করেছেন কিন্তু মু’মিনগণহাত উন্মুক্ত ও প্রশস্ত প্রসারিত করে রাখে। তারা আল্লাহ্র প্রতি ঈমানের কারণে ব্যাপকভাবে দান-খয়রাত ও আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করে। ফলে তারা আল্লাহ্র রহমত পাওয়ার যোগ্য অধিকারী হয়।
ছ. আলোচ্য সূরা তওবায়ই আল্লাহ তা’আলা তাঁর রাসূল এবংতাঁর পরে যারাই মুসলিম উম্মতের পরিচালক হবে তাদের সম্বোধন করে নির্দেশ দিয়েছেন:
(আরবী**********)
তাদের ধন-মাল থেকে ‘সাদকা’ (যাকাত) গ্রহণ কর, পবিত্র কর, তাদের পরিচ্ছন্ন পরিশুদ্ধ কর তাদেরতাদিয়ে। আর তাদের জন্যে পূর্ণরহমতের দোয়া কর। কেননা তোমার দোয়া তাদের জন্যে শান্তির বাহক। আর আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
তাফসীরকারগণ আয়াতটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন: (***) শব্দের পূর্বে (***) বসানো হয়েছে বলেধন-মালের একটা অংশ গ্রহণের নির্দেশ বোঝায়। কেননা ফরয যাকাত বাবদ সম্পূর্ণ ধন-মাল দিতে হয় না, তার থেকে একটা নির্দিষ্ট অংশই শুধু দিয়ে দিতে হয়। আর (****) (তাদের মালসমূহ থেক) বলা হয়েছে; (****) (তাদের মাল থেকে) বলা হয়নি। বহুবচনের এই শব্দ বিভিন্ন প্রকার ও ধরনের মাল সম্পদ শামিল করছে বলে সেই সব কিছু থেকেই নির্দিষ্ট অংশ আদায় করতে হবে। আর (তাদের) বলে সমস্ত মুসলিম উম্মত বোঝানো হয়েছে। সর্বসাধারণ তাফসীরকারদের এটাই মত।
এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, সমস্ত মুসলিমের সর্বপ্রকারের ধন-মাল থেকেই যাকাত গ্রহণ করতে হবে। কেননা দ্বীনের হুকুম-আহ্কাম পালনে তারা সকলেই সমানভাবে বাধ্য। [(আরবী*********)]
আয়াতটি এ কথাও বলেছে যে, যাকাত আদায় করতে রাষ্ট্র প্রধান অথবা তাঁর স্থলাভিষিক্ত প্রতিনিধি। হাদীস থেকেও এ কথাই প্রমাণিত। খুলাফায়ে রাশেদুন বাস্তবভাবেযে আমল করেছেন, তা-ও এ কথার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ‘যাকাত আদায়’ শীর্ষক আলোচনায় আমরা এ পর্যায়ে বিস্তারিত কথা বলব।
হযরত আবূ বকর সিদ্দিক (রা)-এর খিলাফত আমলে যাকাত দিতে অস্বীকারকারী বিদ্রোহীরা এ আয়াতকে ভিত্তি করেই বলেছিল:
আয়াতে সম্বোধন করা হয়েছে রাসূলেকরীম (স)-কে। কাজেই কেবল তিনি যাকাত আদায়ের অধিকারী। তিনি ছাড়া আর কেউহই আদায় করতে পারেন না। (আর তিনি তো ইহকাল ত্যাগ করে চলে গেছেন, অতএব আর যাকাত নেয়া যাবে না, দিতেও হবে না)।
বিশেষজ্ঞগণ এ ধারণাটির তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। বলেছেন, তাদের এই সন্দেহ নিতান্তই ভিত্তিহীন। একটু পরেই আমরা এ পর্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করছি।
কেউ কেউ বলতে চেয়েছেন, উপরিউক্ত আয়াতে যে ‘সাদাকাত’-এর কথা বলা হয়েছে, তাতে ‘যাকাত’ বোঝায় না। তবুকযুদ্ধে যারা যোগদান করেনি, যারা নেক আমলের সঙ্গে বদ আমল সংমিশ্রিত করেছে, আয়াতটি তাদের প্রসঙ্গে নাযিল হয়েছে। তাদের কাছ থেকে যে ‘সাদ্কা’ গ্রহণ করা হয়েছে, তা-ই তাদের উক্ত গুনাহের কাফ্ফারা হয়েছে। তাহলে তা ‘নফল দান’ বিশেষ এবং তা বিশেষভাবে তাদের জন্যে প্রযোজ্য। পূর্বকথা থেকেও তা-ই মনে হয় অথচ সাধারণ অর্থবোধক শব্দে কারণের কোন বিশেষত্ব গণ্য হতে পারে না। যাকাত যে ফরয সেখানেও তাদের বিশেষত্ব কিছু নেই। আর তাদের যুদ্ধ থেকে অনুপস্থিত থাকাটাও তার কারণ হতে পারে না। কেননা যাকাত হচ্ছে ইসলামের অধিকার। অপরাধের ‘প্রায়শ্চিত্ত’ বা কাফ্ফারাস্বরূপও তা ফরয করা হয়নি। [(আরবী*********)] ইমাম তাবারীও একথাই সমর্থন করেছেন। বহু সংখ্যক ব্যাখ্যাকারের এ অভিমত বলেও তিনি জানিয়েছেন।
কিন্তু বিপুল সংখ্যক তাফসীরকার বলেছেন, উপরিউক্ত আয়াতের শব্দ (****) এর অর্থ ‘যাকাত’। প্রাচীন ও পরবর্তী সর্বকালের দ্বীন-অভিজ্ঞগণ এ আয়াতের ভিত্তিতেই যাকাতের যাবতীয় আইন-বিধান সংকলন করেছেন।তা থেকে প্রমাণিত হয় যে, পূর্বকথা ‘সাদ্কা’ শব্দের অর্থ হিসেবেযাকাত মনে করণে কিছুমাত্র প্রতিবন্ধক নয়। আর পরবর্তী আয়াতকে পূর্ববর্তী আয়াতের সঙ্গে যুক্ত করে তাফসীর করতে হলে তার জন্যে অকাট্য দলীলের প্রয়োজন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকেও এ কথা বর্ণিত। কুশাইরীর উদ্ধৃতি অনুযায়ী ইকরামাও এ মতই প্রকাশ করেছেন।
তবে পূর্ব ও পরবর্তী আয়াতের মধ্যে সংযুক্তি সূত্র হিসেবে ইমাম ফকরুদ্দীন রাযী অপর একটি যুক্তিসঙ্গত দিকের উল্লেখ করেছেন।তা হচ্ছে এই যে, যাকাত তাদের উপর ফরয ছিল। তারা যখন যুদ্ধে অনুপস্থিত থাকার গুনাহ থেকেতওবা করল, উত্তমভাবে ইসলাম মেনে চলতে শুরু করল এবং যাকাতও দিতে লাগল, তখন আল্লাহ তাঁর রাসূল (স)-কে তা গ্রহণ করার নির্দেশদিলেন অথচ কোন মুনাফিকের কাছ থেকে যাকাত গ্রহণ করা যায় না। [ইমাম রাযী ও কাসেমী লিখিত তাফসীর।]
‘বিশেষ কারণ’ শব্দের সাধারণ অর্থ জ্ঞাপনের বিরোধী নয়। বিশেষজ্ঞদের কাছে এটাই গ্রহেোগ্য মত।
উপরিউক্ত আয়াতের ‘সাদকাত’ শব্দের অর্থ এই যে, তার বড় ও স্পষ্ট দলীল হচ্ছে, হযরত আবূ বকর (রা)-এর খিলাফত আমলে যাকাত দিতে অস্বীকারকারীরা তো এই আয়াতটিকেই দলীল হিসেবে পেশ করেছিল। দাবি করেছিল যে, এই নির্দেশ বিশেষভাবে রাসূলের প্রতি, অতএব তার পরে এর কোন অবকাশনেই (একটু পূর্বেই আমরা এ কথার উল্লেখ করেছি, পরেও করা হবে)। অথচ তখন কোন সাহাবীই এ কথার প্রতিবাদ করেন নি। যদিও আয়াতটি সম্পর্কে এবং কোন্ কথা বোঝবার জন্যে এ আয়াতটি নাযিল হয়েছিল সেসম্পর্কে তাঁরাই ছিলেন সর্বাপেক্ষা অধিক ওয়াকিফহাল। এ আয়াতটি ‘ফরয সাদকা-যাকাত ছাড়া অপর কোন বিষয়ে নাযিল হয়েছে এমন কথা কেউই বলেন নি। পরবর্তী কোন আলিম-বিশেষজ্ঞও এই মত প্রকাশ করেন নি। সকলেই একবাক্যে এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, উক্ত আয়াতে রাসূল (স)-কে সম্বোধন করা হয়েছে যেমন তেমনি তাঁর পরে যারাই মুসলিম উম্মতের কর্ণধার হবে তাদের সকলকেই এই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। [(আরবী*********)]
‘সাদাকাত’ অর্থ যে যাকাত তার কতগুলো লক্ষণও রয়েছে। বনূ হাশিম গোত্রের কতিপয় যুবক রাসূলে করীম (স)-এর কাছে যাকাত সংস্থার কর্মচারী হওয়ার দাবি জানায়। তাদের এই দাবির জবাবেনবী করীম (স) বলেছিলেন:
(আরবী*********)
এই যাকাত (তা সংগ্রহের কর্মচারী হওয়া) মুহাম্মাদের বংশের লোকদের জন্যে হালাল নয়। কেননা তা জনগণের ময়লা।
এই প্রতীকী ও ইঙ্গিতপূর্ণ কথাটি আল্লাহ্র কথার সাথে সাযুজ্যপূর্ণ: ‘তুমি তাদের পবিত্র করবে, নির্মল ও পরিচ্ছন্ন করবে।’
ইমাম মুসলিম হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবূ আওফা (রা) থেকে বর্ণিত হাদীস উদ্ধৃত করেছেন। তাতে বলা হয়েছে:
(আরবী*********)
যখন কোন লোক-সমষ্টির ‘সাদকা (যাকাত) নিয়ে আসা হত তখননবী করীম(স) তাঁদের জন্যে রহমতের দোয়া করতেন। আমার পিতা তাঁর ‘সাদকা’ নিয়ে তার কাছে উপস্থিত হলে তিনি বললেন: ‘হে আল্লাহ! পূর্ণ রহমত নাযিল কর আবূ আওফার বংশেরলোকদের প্রতি।’
রাসূলে করীম (স) লোকদের ‘সাদকা’ গ্রহণের আদেশপালন করতে গিয়ে আল্লাহ পরবর্তী আদেশ ‘সাদকা’ দাতাদের জন্যে রহমতের দোয়া করার আদেশও পালন করেছেন, তা উক্ত হাদীসের বর্ণনা থেকে স্পষ্ট জানা যায়। এ থেকে সব আলিমই এই মত দিয়েছেন যে, মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান বা তাঁর স্থলাভিষিক্তের কর্তব্য হল ‘যাকাত’ দানের জন্যে দোয়া করা।
সূরা তওবায় যাকাত পর্যায়ে যত কথাই এসেছে, তন্মধ্যে এটা অধিক গুরুত্বপূর্ণ কথা। আর তা মাদানী সূরাসমূহে যাকাত ফরয হওয়ার এবং তার বিধি-বিধানের গুরুত্ব বোঝাবার ব্যাপারে প্রযুক্ত সাধারণ ভঙ্গীর প্রতীক।
কুরআনের দৃষ্টিাতে যাকাত না দিয়ে কোন লোকই কল্যাণ পেতে পারে না, সত্যবাদী নেক্কার ও মুত্তাকী লোকদের মধ্যে গণ্যও হতে পারে না। তা হতে হলে অবশ্যই রতিমত যাকাত দিতে হবে।
পরকালের প্রতি বিশ্বাসী মুনাফিকদের থেকেও কেউ ভিন্নতর পরিচিতি লাভ করতে পারে না নিয়মিত যাকাত না দিলে। মুঠিবন্ধকারী িএবং লোকদের জন্যে ব্যয় করতে অস্বীকারকারী মুনাফিকদের থেকেও ভিন্নতর পরিচয়ে ভূষিত হওয়া কারো পক্ষে সম্ভব হয় না।
যাকাত না দিলে লোকেরারহমত পাওয়ার যোগ্য অধিকারীও হতে পারে না। কেননা আল্লাহ্ নিজেই যাকাত দিতে অস্বীকারকারীদের জন্যে রহমত লিপিবদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। বলেছেন:
(আরবী*********)
আমার রহমত সব কিছু পরিব্যাপ্ত করে নিয়েছে। তা আমি লিখে দেব সেই লোকরেদ জন্যে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, যাকাত দেয় এবং তারাই আমাদের আয়াতসমূহের প্রতি ঈমান রাখে, ‘যাকাত’ না দিলে আল্লাহ্র বন্ধুত্ব, রাসূলের এবং মু’মিনদের পৃষ্ঠপোষত্বও লাভ করা যেতে পারে না।
কেননা আল্লাহ নিজেই বলেছেন:
(আরবী*********)
তোমাদের একমাত্র বন্ধু-পৃষ্ঠপোষক হচ্ছেন আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল আর ঈমানদার লোকেরা, যারা নামায কায়েম করে, যাকাত দেয়, তারাই অনুগত। আর আল্লাহ্ তাঁর রাসূল ও ঈমানদার লোকদের যারাই অভিভাবক বানাবে, (তারাই আল্লাহর দলভুক্ত) আর শেষ পর্যন্ত আল্লাহ্র দলই বিজয়ী হবে।
কুরআনের ঘোষণা, যারাই আল্লাহর যাহায্য করবে, আল্লাহ তাদেরই সাহায্য করবেন। কিন্তু এই সাহায্য সেই লোক কখনই পাবে না, যে যাকাত দেবে না। ইরশাদ হয়েছে:
(আরবী*********)
যে লোক আল্লাহকে সাহায্য করবে, আল্লাহ্ অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন। সন্দেহ নেই, আল্লাহ সর্বশক্তিসম্পন্ন, সর্বজয়ী। তারা সেইলোক, যাদের আমরা যদি পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করি, তাহলে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে, ভাল কাজের আদেশকরবে ও মন্দ কাজ থেকে লোকদের বিরত রাখবে। আর সর্বকাজের পরিণতি আল্লাহর জন্যই।
কুরআনের মোটামুটি বলা কথার ব্যাখ্যা দেয়া সুন্নাত
কুরআন ইসলামের সংবিধান, তার মৌল উৎস। কাজেই তাতে শুধু মৌলিক নিয়ম-কানুন (Fundamental Principles)-ই দেয়া হয়েছে, সাধারণ (Common) নিয়ম-বিধিরই উল্লেখ রয়েছে তাতে। বিস্তারিত ও খুঁটিনাটি বিষয়ের উল্লেখ বড় একটা নেই। তাও আছে শুধু সেই বিষয়ে, যেখানে খুঁটিনাটি বলেনাদিলে মতদ্বৈধ্যতার কারণে আল্লাহ্র বিধান অ-পালিত থেকে যাওয়ার ও বিভ্রান্তি হওয়ার আশংকা বিদ্যমান।
সুন্নাতই হচ্ছে কুরআনের বাক-ব্যাখ্যা, বাস্তব রূপ। কুরআনে যা মোটামুটি, সুন্নাতে তার বিস্তারিত রূপ প্রস্ফূটিত। কুরআনে যা অস্পষ্ট, সুন্নাতে তা স্পষ্ট। কুরআনে যা অনির্দিষ্ট, নিঃশর্ত, সুন্নাতে তা সুনির্দিষ্ট। রাসূলে করীম (স)-এর কথা, কাজ ও সমর্থনের সাহায্যে এই কাজ সম্ভব হয়েছে এজন্য যে, তিনি মহান আল্লাহ্র কাছ থেকেই এ ক্ষমতা, যোগ্যতা ও জ্ঞান লাভ করেছেন। আল্লাহ্ নিজেই বলে দিয়েছেন:
(আরবী*********)
আমরা তোমার কাছে কুরআন নাযিল করেছি এই উদ্দেশ্যে যে, যা কিছু জনগণের জন্যে নাযিল হয়েছে, তুমি তা তাদের কাছে স্পষ্ট করেবর্ণনা করবে।
কুরআনে ‘যাকাত’ ফরয ঘোষিত হয়েছে। সুন্নাত তারই তাকীদ করেছে বলিষ্ঠ কণ্ঠে এবং তা মক্কী জীবন থেকেই।
হযরত জাফর ইবনে তালিব (রা) হাবশায় হিজরতকারী মুসলমানদের নামে হাবশা-সম্রাট নাজ্জাশীকে সম্বোধন করে কথা বলেছেন, তাঁকে নবী করীম (স) সম্পর্কে বর্ণনা দিয়েছেন, তিনি তাদের কি কি শিক্ষা দিয়েছেন, তাঁকে নবী করীম (স) সম্পর্কেও বর্ণনা দিয়েছেন, তিনিতাদের কি কি শিক্ষা দিয়েছেন, সেই পর্যায়ে বলতে গিয়ে বলেছেন:
(আরবী*********)
তিনি আমাদের আদেশকরেন নামায পড়তে, যাকাত দিতে ও রোযা রাখতে।
এখানে শুধুই নামা-রোযা-যাকাতের কথা বলা হয়েছে। তার কোন নির্দিষ্ট রূপ তখনও গড়ে উঠেনি। পাঁচ ওয়াক্ত নামাযও তখন পর্যন্ত ফরয হয়নি, রমযানের রোযাও নির্দিষ্ট হয়নি। আর নিসাব ও পরিমাণসহ যাকাত তখনও চালু হয়নি। [(আরবী*********)] এ সবের বিস্তারিত, স্পষ্ট ও সুনির্ধারিত বিধান তো পরে মদীনা শরীফে নাযিল ও কার্যকর হয়েছে।
‘ফরয যাকাত’ পর্যায়ে কথা বলার প্রশস্ত স্থান ও পরিবেশ গড়ে উঠেছিল মদীনা শরীফে। তাই এখানে তার নিসাব, পরিমাণ ও শর্তসমূহ সবিস্তারে বর্ণিত ও বিবৃত হয়। তা আদায় করার উৎসাহদান ও দিতে অস্বীকারকারীদের ভয় প্রদর্শন ও এখানেই সম্ভব ছিল।

About শিবির অনলাইন লাইব্রেরী