ইসলামের যাকাত বিধান – ১ম খন্ড

পর্যালোচনা
উপরে দুটি মাযহাবের অভিমত ও দলীল উল্লেখ করার পর আমার বক্তব্য হচ্ছে, ঘোড়ার যাকাত না লওয়া সম্পর্কে রাসূলে করীমের কোন সুস্পষ্ট উক্তি পাওয়া যায় না, যেমন স্পষ্ট ভাষায় তা ফরয বলে ঘোষণাও করেন নি। ‘মুসলমানের ক্রীতদাস ও ঘোড়ার যাকাত নেই’ হযরত আবূ হুরায়রা বর্ণিত এ হাদীসটি শুধু এতটুকু বলে যে, মুসলমানদের যেসব ঘোড়া জিহাদ ও সাধারণ চলাচলে ব্যবহৃত হয় তার যাকাত দিতে হবে না। যায়দ ইবনে সাবিত ও ইবনে আব্বাস (রা) থেকেও তা-ই বর্ণিত হয়েছে। উক্ত হাদীসের ‘ক্রীতদাস’ বলতে বোঝায় ব্যক্তির খেদমতে নিয়োজিত দাস, তার চলাচল ও জিহাদের ব্যবহৃত ঘোড়া। আর জাহেরী ফিকাহ্বিদ ব্যতীত আর সকলেই এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ একমত যে, ব্যবসায়ের জন্যে যেসব ঘোড়া ও দাস সংগ্রহ করা হবে, তার যাকাত অবশ্যই দিতে হবে।
হযরত আবূ হুরায়রাও কুরআন-হাদীসের বাহ্যিক ও প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণেই আগ্রহী ছিলেন। তিনি যায়দ ও ইবনে আব্বাস (রা)-এর ন্যায় ফিকাহ্ বিদ্যায় পারদর্শী রূপে খ্যাতি লাভ করেন নি।
হযরত আলী বর্ণিত হাদীস ‘আমি তোমাদের ঘোড়া ও দাসের যাকাত মাফ করে দিয়েছি’- কথাটি তাঁর নিজের, রাসূলের নয়। ইামম দারেকুত্নীর মতে এ হাদীসটিও মৌলিকভাবে তার উপর যাকাত ফরয হওয়ারই ইঙ্গিত বহন করে- যদিও তা মাফঠ করার কথা বলা হচ্ছে। সে মাফ করার অনেক কারণ থাকতে পারে। সে যুগে তো ঘোড়া বেশীর ভাগ জিহাদ ও পাহারাদারীর কাজেই প্রয়োজন হত। তা-ই ছিল সেকালের প্রধান প্রস্তুতি সামগ্রী। আর তখনকার আরবে সম্পদ এতটা বিস্তীর্ণও ছিল না।
সে যা-ই হোক, ঘোড়ার যাকাত দেয়া পর্যায়ে কোন সুস্পষ্ট কথার প্রমাণ করে না যে, তাতে যাকাত কখনই ধার্য করেছেন। স্বর্ণ সম্পর্কে তাঁর এ রকম কোন সুস্পষ্ট উক্তি নেই। কেননা সেকালের প্রধান নগদ মুদ্রা রৌপ্য নির্মিত ছিল। তা্ িসে বিষয়ে যাকাত ফরয হওয়ার কথা প্রমাণিত হওয়ায় রৌপ্যর উপরও তা ধার্য করা হসহ হয়েছে। কেননা এ দুয়ের কল্যাণ ও লক্ষ্য অভিন্ন।
উপরে উদ্ধৃত ইয়ালী ও হযরত উমর সংক্রান্ক কিস্সা যাকাত পর্যায়ে খুব বেশী গুরুত্বের দাবি রাখে। তাতে দেখা যায়, হযরত উমর এ ব্যাপারে কিয়াসের আশ্রয় নিয়েছেন। আর তা প্রমাণ করে যে, ইজতিহাদ করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। নবী করীম (স) যে যে মালের যাকাত নিয়েছেন, তা এই কথা প্রমাণ করে যে, অনুরূপ মাল-সম্পদের যাকাত গ্রহণে মূলত নিষেধ কিছুই নেই। আর যে মূল-সম্পদই বর্ধনশীল তা থেকেযাকাত গ্রহণ করাই আবশ্যক। তার পরিমাণ নির্ধারিত না থাকলে সেজন্যে ইজতিহাদ করতে হবে।
জমহুর ফিকাহ্বিদগণ বলেছেন যে, তা হযরত উমরের ইজতিহাদ বৈ কিছু নয়। অতএব তা অকাট্য দলীল হতে পারে না- এ কথার উপর যে, তিনি তাদেরকে তার জন্যে আদেশ করেছিলেন তখন, যখন তারা ইচ্ছা করেই ঘোড়ার যাকাত দিতে চেয়েছিল। অপর একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, সিরিয়াবাসী কিছু লোক এসে বলেছিল, ‘আমরা কিছু ঘোড়া ও দাস পেয়ে গেছি। তাতে যাকাত ধার্য হওয়া আমরা প৪ছন্দ করি।’ তখন হযরত উমর (রা) জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমার পূর্ববর্তী দুইজন (রাসূলে করীম ও হযরত আবূ বকর) যে নীতি গ্রহণ করেছিলেন, আমি সেই অনুযায়ী কাজ করব।’ তিনি অন্যান্য সাহাবীদের সাথে পরামর্শও করলেন। হযরত আলী বললেন, ‘তাই ভাল। কোন কোন জিযিয়া যদি প্রচলিত না থেকে থাকে, তবে আপনার পরে তাদের কাছ থেকে তা গ্রহণ করা হতে থাকবে।’
আমি মনে করি, সিরিয়ার লোকদের সাথে উক্ত ঘটনা ইয়েমেনের লোকদের সাথে সংঘটিত ঘটনার পূর্বের ব্যাপার। হযরত উমর বুঝতে পেরেছিলেন যে, ঘোড়ার খুব বেশী মূল্য হয়ে থাকে, তাই তা যাকাতমুক্ত হতে পারে না। সেই কারণে উক্তরূপ উক্তি করেছিলেন যা বর্ণিত ঘটনার শেষে বলা হয়েছে। অতএব যুক্তিসঙ্গত কথা হচ্ছে, উক্ত ঘটনার পর এই ঘটনা।
প্রথমত, তিনি দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন এ জন্যে যে, যে কাজ রাসূলে করীম ও হযরত আবু বকর করেন নি, তা তিনি কিভাবে করবেন? তাই তিনি সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করেছিলেন। হযরত আলী সেই দিকে ইঙ্গিত করেই তাঁর মত প্রকাশ করেছিলেন। এতে কড়া সতর্কতা অবলম্বনের নীতি নিহিত রয়েছে।
কিন্তু এ শেষোক্ত ঘটনায় তিনি কারোর কাছেই পরামর্শ চান নি। তিনি যা দেখেছেন, তারই ভিত্তিতে নিজে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং ইয়েমেনে নিযুক্ত গভর্ণরকে প্রতিটি ঘোড়া বাবদ এক দীনার গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
আমি মনে করি, প্রতিটি ঘোড়া বাবদ এক দীনার গ্রহণ করা কোন বাধ্যতামূলক কাজ নয়। কেননা দীনারের ক্রয়ক্ষমতা বিভিন্ন সময়ে ও বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন হয়ে থাকে। তাই কোন দেশে একটি ঘোড়া বাবদ পাওয়া এক দীনার অনেক মুল্যবান, আবার অন্য দেশে খুব সামান্য।
আমাদের এ যুগে ইমাম নখরী ও আবূ হানীফার মত অনুযায়ী ঘোড়ার মূল্য ধরে তার দশ ভাগের এক ভাগের চারভাগের এক ভাগ যাকাত বাবদ গ্রহণ করাই সমীচীন। শরীয়াত নগদ সম্পদ ও পণ্যদ্র্রব্যের যাকাতে এ হারই চালু করেছে। গবাদিপশুর যাকাত এ রকমই প্রায়। কেননা সেক্ষেত্রে প্রতিটি চল্লিশটি উষ্ট্রে একটি তৃতীয় বর্ষে উপনীতা উষ্ট্রী শাবক, প্রতি পঞ্চাশটিতে একটি করে চতুর্থ বছরে উপনীতা উষ্ট্রী, প্রতি ত্রিশটি গরুতে একটি করে এক বছর বয়সের বাছুর, আর প্রতি চল্লিশটিাতে একটি দুই বছর বয়স্ক বাছুর ধার্য হয়েছে। কোন গবাদিপশুর পালে বিভিন্ন বয়সের ছোট ও বড় জন্তু থাকে। তাই দশ ভাগের এক ভাগের এক চতুর্থাংশই শ্রেয়। তবে ছাগলের যাকাতের প্রতি একশটিতে একটি ছাগী ধার্য হয়েছে এজন্যে যে, তাতে ছোট ও বড় জন্তু থাকে। তাই দশ বাগের এক ভাগের এক-চতুর্থাংশই শ্রেয়। তবে ছাগলের যাকাত প্রতি একশটিতে একটি ছাগী ধার্য করা হয়েছে এজন্যে যে, তাতে ছোট বয়সের ছাগল বেশী থাকাই স্বাভাবিক। সেগুলোও তো গণনা করা হবে; কিন্তু তার যাকাত নেয়া হবে না।
পূর্বে যেমন বলেছি, এ পর্যায়ে আমার মত হচ্ছে, নবী করীশ (স) গরুর হিসাব সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেন নি মুসলিম উম্মতকে কিছুটা সুবিধা দান ও রাষ্ট্রপ্রধানের বিবেচনা খাটানোর সুযোগ করে দেয়ার উদ্দেশ্যে। আর তিনি এ পর্যায়ের কথা বলেছিলেন মুসলমানদের নেতা হিসেবে। তা ক রার অধিকাও ছিল। তিনি আদেশও করবেন, নিষেধও করবেন। বাধ্য করবেন, আবার নিষ্কৃতিও দেবেন। গোটা জাতির সামষ্টিক কল্যাণের দৃষ্টিতে তাঁর সমগ্র কাজ আঞ্জাম পাবে। অনেক সময় ঘোড়ার যাকাত না লওয়াটাই সামষ্টিক কল্যাণের দৃষ্টিতে প্রয়োজনীয় ছিল।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, রাসূলে করীম(স) নবী হিসেবে যা বলেছেন এবং যা বলেছেন মুসলিম জাতির রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে, এ দুইয়ের মধ্যে পার্থক্যকরা যাবে কি ভাবে?
সেপার্থক্য করা যাবে অবস্থার লক্ষণের দৃষ্টিতে। হাদীসের বিষয়বস্তু রাষ্ট্রনীতি বা অর্থনীতি, সামরিক কিংবা প্রতিষ্ঠানগত কল্যাণ সম্পর্কিত হবে, যা থেকে বোঝা যাবে যে, রাসূলে করীম (স) সেই কথা রাষ্ট্রনেতা হিসেবে বলেছেন অথবা এমন দলীল হবে যা তার বিরোধী হবে কেবল স্থান, কাল ও অবস্থার বিরোধিতার কারণে; যা প্রমাণকরবে যে, তাতে সাময়িক ও আংশিক অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়েছে, তাতে চিরস্থায়ীভাবে আইন প্রণয়ন লক্ষ্য নয়।
আর দৃষ্টান্ত হিসেবে ইমাম কিরাফীর গ্রন্থ ‘আল-আহকাম’-এর উদ্ধৃত একটি হাদীস এখানে উল্লেখ করা যায়। হাদীসটি হচ্ছে:
(আরবী********)
যে লোক কোন লোককে জিহাদে হত্যা করল, নিহত ব্যক্তির সঙ্গের জিনিসপত্রের সে-ই পাবে।
ইমাম মালিক বলেছেন, রাসূলের এ কথা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বলা কথা। কাজেই যুদ্ধের পূর্বের রাষ্ট্রনেতার অনুমতি ছাড়া কোন মুজাহিদ যেন তার হাতে নিহত ব্যক্তির সঙ্গের জিনিসপত্র নিজের জন্যে খাস মনে করে নিয়ে নেবে না। রাসূলে করীম (স) থেকে তাই ঘটেছে। যে সব বিষয় ইমাম মালিকের এই মত গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছে, আল্লামা কাওয়াফীর মতে তা হচ্ছে:
১. গনীমত বন্টন সংক্রান্ত আয়াত ও এ হাদগীসের সাথে তার বৈসাদৃশ্য,
২. মুজাহিদদের নিয়ত নষ্ট করা- যখন তা শুরুতেই ঘটবে।
৩. উক্ত হাদীসে যেমন বলা হয়েছে, তা অবস্থার লক্ষণের ইঙ্গিত। যুদ্ধে উৎসাহ দানের জন্যেই তা বলা হয়েছিল।
শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী লিখেছেন:
জানা উচিত, রাসূলে করীম(স) থেকে যা বর্ণিত এবং যা হাদীসের গ্রন্থাবলীতে সঙ্কলিত, তা দুভাগে বিভক্ত। একটি ভাগের সেসব কথা, যা রিসালাতের দায়িত্ব পালন স্বরূপ তিনি বলেছেন। আল্লাহর আদেশ- যা রাসূল তোমাদের দেন তোমরা তা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তিনি তোমাদের নিষেধ করেন তোমরা তা থেকে বিরত থাক’ –এই পর্যায়ের কথা। এ ছাড়া পরকাল ও বিশ্বলোকের বিস্ময়কর জগত সম্পর্কিত তথ্যাবলীও এ পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।’
দ্বিতীয় যা রিসালাতের দায়িত্ব পালন পর্যায়ে নয়। রাসূলের উক্তি- ‘আমি একজন মানুষ মাত্র। আমি যখন তোমাদের দ্বীন সম্পর্কিত কোন বিষয়ে কিছু বলি, তখন তোমরা তা অবশ্যই গ্রহণকরবে। আর আমার নিজের অভিমত হিসেবে, যদি কিছু বলি, তা হলে মনে রাখবে আমি একজন মানুষ।’ চিকিৎসা সংক্রান্ত কথাবার্তা এ পর্যায়ে গণ্য।তা রাসূলের অর্জিত অভিজ্ঞতা সঞ্জাত। রাসূলে করীম(স) অভ্যাস-বশত যা করেছেন- ইবাদত হিসেবে নয়- তা-ও এ পর্যায়ে গণ্য হবে। ঘটনাবশত যা করেছেন, ঠিক ইচ্ছা করে করেন নি, তাও তাঁর মানুষ হিসেবে করা কাজ। তিনি তৎকালীন সাধারণ জনকল্যাণের অংশহিসেবে যা কিছু বলেছৈন, গোটা জাতির সকলের জন্যে তা বাধ্যতামূলক নয়, তাও এ পর্যায়ে গণ্য করতে হবে। সৈন্যবাহিনী সজ্জায়ন ও আচার-আচরণ নির্ধারণ…. এ ব্যাপারের দৃষ্টান্ত। এ পর্যায়ে বহু আদেশ-নির্দেশও উদ্ধৃত হয়েছে।
(আরবী********)
যে মুজাহিদ কোন কাফিরকে যুদ্ধে হত্যা করর, তার সঙ্গের যাবতীয় জিনিস তারই হবে।
(আরবী********)
যে লোক প্রতিত জমি চাষেপযোগী বানালো তা তারই মালিকানাভুক্ত হবে।
মালিকী মায্হাবের লোকেরা এ পর্যায়ে বলেছেন যে, হত্যাকারী কোন নিহত ব্যক্তির সঙ্গের জিনিসপত্র পাবে না, যদি যুদ্ধের পূর্বে নবী করীম(স)-এর ন্যায় রাষ্ট্রপ্রধান উক্তরূপ ঘোষণা প্রদান না করেন। হানাফীরাও বলেছৈন, রাষ্ট্রপ্রধানের অনুমতি ব্যতিরেকে কোন পতিত জমি চাষোপযোগী করতে চেষ্টা করা কারোর পক্ষেই জায়েয হবে না।
আমার মতে, ঘোড়ার যাকাত মাফ করে দেযা সংক্রান্ত রাসূলের ঘোষণা যদি সহীহ্ প্রমাণিত হয়ও, তবু তা এ পর্যায়েরই ঘোষণা হবে। তিনি তখন এরূপ করাকেই জনগণের জন্যে কল্যাণকর মনে করেছিলেন। তাতে লোকেরা ঘোড়া পালন করার উৎসাহ পাবে, এ-ই ছিল তাঁর ধারণা। রাসূলের উক্তি ‘আমি মাফ করে দিলাম’ এই কথাই প্রমাণ করে। কেননা যা অবশ্য পালনীয়, তাতেই ক্ষমা করা বা মাফ করে দেয়ার সুযোগ থাকে। এ থেকে বোঝা যায়, ব্যাপারটি তাঁর বিবেচনার উপর নির্ভরশীল ছিল। তাই পরবর্তী সমস্ত কালের রাষ্ট্রপ্রধানদের বিবেচনার উপর তা নির্ভর করবে। তারা যাকাত ধার্য করলে তা দিতে হবে, নতুবা নয়।
বস্তুত ঘোড়া যখন বিভিন্ন দেশে বংশবৃদ্ধি ও অর্থোপার্জনের সূত্র হিসেবে পালিত হয় এবং উষ্ট্রের তুলনায় অধিক বেশী মূল্যবান সম্পদরূপে গণ্য হয়, তখন তার যাকাত গ্রহণ করাই যুক্তিযুক্ত। তাতে সব ধনীদের প্রতিই সমতা রক্ষা করা হবে। অন্যথায় কোন কোন ধনী লোকদের কাছ থেকে তাদের ধন-মালের যাকাত গ্রহণ ও কোন কোন ধনীর কাছ থেকে যাকাত না গ্রহণ করার অবিচার অনুষ্ঠিত হবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
হযরত উমর (রা) যে ঘোড়ার যাকাত ধার্য করেছিলেন, তাঁর এই কাজের এটাই হচ্ছে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা।
নবম আলোচনা
ঘোড়া ছাড়া অন্যন্য গবাদিপশু
এ পর্যায়ে আর একটি আলোচনা এখানে করে নিলে গবাদিপশু যাকাত সংক্রান্ত আলোচনা সমাপ্ত হতে পারে।
এ আলোচনা একটি প্রশ্নের জবাব। প্রশ্নটি হচ্ছে, লোকেরা যদি কোন অভিনব ধরনের পশু উদ্ভাবন করে, তার প্রবৃদ্ধির কার্যকর ব্যবস্থা নেয় এবং তা থেকে উপার্জনের পথ উন্মুক্ত হয়, তা হলে তার উপর যাকাত ধার্য করা হবে কিনা?
একালের ইসলামী অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ আবু জুহ্রা, আবদুল ওহাবা খাল্লাফ ও আবদুর রহমান হাসান যাকাত সংক্রান্ত আলোচনায় এ পর্যায়ে কথা বলেছেন। তাঁরা হযরত উমর থেকে প্রমাণিত হাদীসের ভিত্তিতে এই মত গঠন করেছেন যে, যাকাতের ব্রাপারে ‘কিয়াস’ প্রয়োগ করা একালের বিশেষজ্ঞদের পক্ষেও জায়েয। এ পর্যায়ের দলীলসমহ নিশ্চয়ই ‘কারণ’ সমন্বিত এবং সে ‘কারণ’ সংক্রমণশীলও বটে।
প্রবৃদ্ধির কারণ বর্তমান থাকার দরুন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব ঘোড়ার যাকাত গ্রহণ করেছেন। ইমাম আবূ হানীফা এ ‘কিয়াস’ কে যথার্থ মনে করে তার অনুসরণ করেছেন। যাঁরা এ ‘কিয়াস’ মেনে নেননি, ঘোড়ার উপর যাকাত দার্য করার পক্ষেও মত দেননি। তাঁরা যা সিদ্ধানত নেয়ার নিয়েছেন। কেননা তাঁরা যাকাত ফরয হওয়ার কারণ হিসেবে কেবলমাত্র প্রবৃদ্ধির গণ্য করেন নি, বরং তার সাথে খাদ্য হিসেবে বৈধতা ও তার বংশবৃদ্ধির কল্যাণকেও গণ্য করেছেন। ‘আল-মুগ্নী গ্রন্থ প্রণেতা িএ জন্যেই বলেছেন যে, ঘোড়াকে ছাগলের মত মনে করা ঠিক নয়। কেননা ছাগলের প্রবৃদ্ধি, বংশ কল্যাণ, দুগ্ধ ও গোশ্ত ভক্ষণ এবং কুরবানী করা জায়েয হওয়া ইত্যাদিও রয়েছে, যা অন্যত্র নেই।
তাঁরা বলেছেন, খলীফা উমর যখন প্রবৃদ্ধিকে ‘কারণ’ রূপে গণ্য করলেন এবং আবূ হানীফা তা অনুসরণ করলেন, তখন এ পদ্ধতিতে আমরা বলতে পারি, প্রবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে যে জন্তুই পালন করা হবে এবং খোলা মাঠে ঘাস খাওয়ানো হবে, তার নিসাব সংখ্যা বিশ মিশকাল স্বর্ণ (84c gramms)-এর পরিমাণ হলেইতাতে দশ ভাগের এক-চতুর্থাংশ যাকাত ধার্য হবে।
স্বর্ণকে নিসাবের মান ধরা হয়েছে এজন্যে যে, উমর ফারুক (রা) ঘোড়ার যাকাত নির্ধারণে মূল্যের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। আর এ কালে স্বর্ণের মানেই মূল্য নির্ধারিত হয়ে থাকে সর্বত্র।
এ কথার সমর্থন রয়েছে। রাসূলে করীম(স) গাধার যাকাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়ে স্পষ্ট ভাষায় ‘না’ বলেন নি। বরং বলেছেন: ‘এ পর্যায়ে আমার কাছে আল্লাহ তা’আলা কিছুই নাযিল করেন নি।’ শুধু এ ব্যাপক অর্থবোধক আয়াতটিই বলা যায়, যাতে বলা হয়েছে ‘যে লোক এক বিন্দু পরিমাণ ভাল কাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে। আর যে লোক বিন্দু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে, সেও তা দেখতে পাবে।
দশ ভাগের এক ভাগের এক-চতুর্থাংশ নির্ধারণের দৃষ্টান্ত হচ্ছে রাসূলের উক্তি: ‘প্রতি চল্লিশটি মুক্ত উষ্ট্রের একটি করে তৃতীয বর্ষে উপনীতা উষ্ট্রী শাবক।’
একশত বিশটির ঊর্ধ্ব সংখ্যক উটের যাকাত পর্যায়ে যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তাতেও এই বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়েছে। তখনও প্রতি চল্লিশটি উষ্ট্রে একটি করে তৃতীয় বর্ষে উপনীতা উষ্ট্রী শাবক, আর প্রতি চল্লিশটি গরুতে একটি তৃতীয় বর্ষে উপনীতা ও প্রতি ত্রিশটিতে একটি করে এক বছরের বাছুর দিতে হবে।
আমি বলব, প্রবৃদ্ধি সাধন, প্রতিপত্তি অর্জন ও অর্থোৎপার্জনের উদ্দেশ্যে পালিত সমস্ত উন্মুক্ত চরায় পালিত পশুর যাকাত ফরয বলা একটি সহীহ ইজতিহাদ বটে। তা এমন ‘কিয়াস’ ভিত্তিক, যাকাতের ক্ষেত্র নির্ধারণের যার কার্যকারিতার প্রতি আমরা সকলেই বিশ্বাসী। যেন আমরা বিভিন্ন প্রবৃদ্ধিশীল সম্পদের উপর যাকাত ধার্যকরণে কোন তারতম্যের নীতি অনুসরণ না করি, এ জন্যে এই ব্যবস্থা। অতএব খচ্চর ও বন্য ছাগলও এর মধ্যে গণ্য হবে। এর মূল্য ধরে দশ ভাগের এক ভাগের এক চতুর্থাংশ যাকাত আদায় করতে হবে।
অনেক মনীষীই সব জন্তুর যাকাতের নিসাব ধরেছেন নগদ সম্পদের হিসেবে- বিশ মিশকাল (84c gramms) স্বর্ণ। যখন পশু সম্পদের মূল্য এই পরিমাণ হবে, তখনই তাতে যাকাত ফরয হবে। কিন্তু আমি এ মতের বিপরীত মত পোষণ করি। অবশ্য স্বর্ণ মানে নিসাব নির্ধারণে আমার কিছুই বক্তব্য নেই। কিন্তু পশুর যাকাতের নিসাব নগদ সম্পদের যাকাতের নিসাবের সমান মনে করায় আমার ভীষণ আপত্তি। এরূপ নিসাব নির্ধারণে বলা হয়েছে ৫টি উট ও ৪০টি ছাগল দুইশত দিরহামের সমান। অথচ আমরা দেখেছি, ইবনুল হুম্মাম ও ইবনে নাজীম দুটি ছাগীর মূল্য ২০ দিরহাম ধরেছেন। তাহলে ৪০টি ছাগী ৪০০দিরহামের সমান হয় অর্থাৎ নগদ সম্পদের দিগুণ।
এক্ষণে নগদ সম্পদের নিসাবকে যদি এক্ষেত্রে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণই করতে হয়, তাহলে পশুর নিসাবের হিসাবনগদ সম্পদের নিসাবের দ্বিগুণহতে হবে। কেননানগদ সম্পদ মানুষকে পশু ইত্যাদির মালিকানার তুলনায় অধিক শক্তিশালী বানিয়ে দেয়। এ কারণে শরীয়াতের বিধানদাতা নগদ সম্পদের হিসাব খুব কম পরিমাণকে বানিয়েছেন, যতটা কম মুক্ত পশুর নিসাব ধরেন নি।
আমরা এখানে বর্ধনশীল পশুর যাকাতের নিসাব দুটো ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে পারি:
১. তার সংখ্যা পাঁচটির কম হবে না। কেননা আমরা লক্ষ্য করছি, শরীয়াতের পাঁচ অসাকের কমেও কোন যাকাত নেই। নগদ রৌপ্য সম্পদের পাঁচ আউন্সের (Ounce) কমেও কোন যাকাত দিতে হবে না। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, শরীয়াতের দৃষ্টিতে যাকাত ফরয হওয়ার জন্যে পাঁচ হচ্ছে কম-সে কম সে কম সংখ্যা।
২. তার মূল্য পাঁচটি উষ্ট্র অথবা চল্লিশটি ছাগলের মূল্যের কম হবে না- দেশের সাধারণবাজার মূল্যের দৃষ্টিতে মূল্য নির্ধারণে নগদ সম্পদের মূল্যেল তুলনায় পাঁচটি উষ্ট্র বা চল্লিশটি ছাগলের মূল্যকে ভিত্তিরূপে গণ্য করা দুটো কারণে উত্তম:
ক- নগদ সম্পদের মূল্য ক্রয়শক্তির নিত্য পরিবর্তনশীলতার দরুন স্থিতিশীলহয় না। কেননা অর্থনৈতিক অবস্থাও সব সময় পরিবর্তিত হতে থাকে। যেমন বিশ মিশকাল একটি জন্তু বা তার অর্ধেকেও সমান হয় না।
খ- এক ধরনের পশুর মূল্য অন্য ধরনের পশুর মূল্যের দৃষ্টিতে নির্ধারণকরা বিধিসম্মত। অপর জাতীয সম্পদের দৃষ্টিতে কিয়াস অপেক্ষা এটা অনেক উত্তম।
দশম আলোচনা
প্রাথমিক কথা
পশু সম্পদের যাকাত পর্যায়ে আমাদের আলোচনা অনেক দীর্ঘ হয়ে গেছে। অনেকে হয়তো মনে করতে পারেন যে, এ বিষয়ে এতটা দীর্ঘ আলোচনার কোন প্রয়োজন ছিল না। বিশেষ করে এ জন্যে যে, রাসূলে করীম (স) ও খিলাফতের আমলে যেমন পশুসম্পদকে অর্থনীতির স্তম্ভ বা ভিত্তি মনে করা হত, বর্তমানে তা মনে করা হয় না।
কিন্তু দুটো কারণে আমরা এ আলোচনা দীর্ঘ করেছি:
প্রথম, শরীয়াতের বিধানেই পশুর যাকাত সংক্রান্ত আলোচনা দীর্ঘ করা হয়েছে তাতে বহু আইন-বিধানেরও উল্লেখ করা হয়েছে, যা অন্যান্য ব্যাপারে করা হয়নি।
দ্বিতীয়, এই দীর্ঘ আলোচনা আমাদের সম্মুখে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ মৌলনীতি উপস্থাপিত করেছে। তার ভিত্তিতে আমরা যাকাতের তত্ত্ব ও প্রকৃতি উদ্ঘাটিত করতে সমর্থ হতে পারি। তার নিয়ম-বিধানসমূহও জানতে পারা সম্ভব হচ্ছে। এ পর্যায়ে কতগুলো বিষয়ের উল্লেখ করা যাচ্ছে:
১. যাকাত একটি ইবাদতের কাজ হলেও তা একটি সরকারী ব্যবস্থাপনা বিশেষ। ইসলামী রাষ্ট্রই তা বাস্তবায়িত করার অধিকারী। যাকাত আদায়কারী প্রেরণ ও মালিকের কাছ থেকে সম্পদের যাকাত গ্রহণ করানো তার অন্যতম দায়িত্ব।
২. যাকাত ফরয করা হয়েছে এক হিসেবে গরীব লোকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে, অপর হিসেবে সম্পদ-মালিকদের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রেখে। এই কারণে স্বল্প পরিমাণ সম্পদকে যাকাত থেকে নিষ্কৃতি দেয়া হয়েছে এবং শরীয়াতের নির্দেশ হচ্ছে মধ্যম মানের মাল গ্রহণ ও ত্রুটিপূর্ণ মাল গ্রহণ করতে অস্বীকার করা।
৩. পশু পালনে যে কত কষ্ট ও ব্যয় হয়, যাকাত অব্যাহতি কিংবা হালকা-করণের ব্যাপারটি তার উপর নির্ভরশীল। এ কারণে জমহুর ফিকাহ্বিদগণ সারা বছর ধরে ঘাস খাওয়াতে হয়- এমন পশুকুলের যাকাত নাকচ করে দিয়েছেন। কেননা অধিক কষ্ট স্বীকারের কারণে তার প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হয়।
৪. বর্ধনশীল মাল প্রবৃদ্ধির দিক থেকে ব্যক্তিগত ব্যবহার ও ভোগের দিকে ফিরিয়ে দিলে তার উপর যাকাত ধার্য হবে না। গরু ও উষ্ট্র সাধারণত, কৃষি, পানি উত্তোলন ও বার বহন ইত্যাদির কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে, বংশ বৃদ্ধি ও দুগ্ধ আহরণে নয়। তাই এর উপর যাকাত হবে না।
৫. একাধিক লোকের শরীকানা কারবারকে শরীয়াতে তাৎপর্যগতভাবে এক ‘অখণ্ড ব্যক্তিত্ব’ মনে করা হয়েছে, তার শরীক ব্যক্তিদের স্বতন্ত্র সত্তার দিকে লক্ষ্য দেয়া হয়নি। আর এভাবেই তার উপর যাকাত ধার্য করার নীতি গৃহীত হয়েছে। যৌথ পশু খামার পর্যায়ে জ মহুর ফিকাহ্বিদদের এই মত। আর শাফেয়ী মতের লোকদের এটাই অভিমত সমস্ত প্রকারের মালের যৌথ মালিকানায়।
৬. ফরয থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যে যেসব কৌশল অবলম্বিত হয়- যেমন হারাম জিনিসকে মুবাহ্ মনে করা- শরীয়াত তা বাতিল ঘোষণা করেছে। এ কারণে নবী করীম(স) যাকাত দেয়ার ভয়েমাল একত্রিত বা বিচ্ছিন্নকরণ করতে নিষেধ করেছেন।
৭. যাকাতের মাসয়ালা-মাসায়েলে ‘কিয়াস’ প্রয়োগ করার সুযোগ রয়েছে। কেনা এতদ্সংক্রান্ত সমস্ত হুকুম-আহ্কাম কারণভিত্তিক। আর ‘কারণ’ সংক্রমণ প্রকৃতি সম্পন্ন এ কারণে হযরত উমর ফারূক(রা) ঘোড়ার যাকাত আদায় করেছেন। এ প্রেক্ষিতেই আমরা মুক্তভাবে পালিত জন্তুগুলোর যাকাত গ্রহণের কথা বলেছি। যদিও নবী করীম (স) ও খিলাফত আমলে তা করা হয়নি। যাকাত ফরয হওয়ার ‘কারণ’ এখানে বিদ্যমান বলেই আমরা এ মত গ্রহণ করছি।
৮. নবী করীম (স) যেসব বিধান প্রবর্তন করেছেন, তা তিনি করেছেন মুসলিম উম্মতের ইমাম ও রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে। একথা অনুধাবন ও উপলব্ধি করা আবশ্যক। এ কারণে তাঁর প্রদত্ত বিধানাবলীর মধ্যে পার্থক্যকরণেরও প্রয়োজন। এ দৃষ্টিতে নবী করীম (স)-এর লিখিত ও তাঁর খলীফাগণের লেখনের মধ্রকার কোন কোন হালকা ধরনের পার্থক্রের ব্যাক্যা আমরা দিয়েছি।
৯. যাকাতে পশু সম্পদের যাকাত নগদ সম্পদের দ্বিগুণ। এ কারণে দুদিট ছাগীর মূল্য পরিমাণ ধরা হয়েছে বিশ দিরহাম। তাহলে চল্লিশটি ছাগীর মূল্য পরিমাণ হয় ৪০০ দিরহাম। অথচ দিরহামের নিসাব হয় সর্বসম্মতিক্রমে ২০০ দিরহামে।
১০. যাকাত পশু সম্পদেও একটা আপেক্ষিত কর মাত্র, তা বিপরীত দিক দিয়ে ঊর্ধ্বমুখী হয় না, যেমন কেউ কেউ মনে করেন। ছাগলের যাকাতরে এ হার খুবই হালকা ধরা হয়েছে এক বিশেষ যৌক্তিকতার কারণে; যার ব্যাখ্যা পূর্বে দেয়া হয়েছে।
১১. পশুসম্পদের যাকাতের নিসাব পরিমাণ প্রায় দশ ভাগের এক-চতুর্থাংশ, তাই উষ্ট্র ও গরুতেও সুস্পষ্ট। ছাগলের যাকতা কম গ্রহণের ব্যাপারে আমাদের দেয়া ব্যাখ্যার আলোকে তাই বোঝায়। এভাবে পশুর যাকাত কম গ্রহণের ব্যাপারে আমাদের দেয়া ব্যখ্যার আলোকে তাই বোঝায়। এভাবে পমুর যাকাত এবং পণ্যদ্রব্য ও নগদ সম্পদের যাকাতের পরিমাণ সমান হয়। এভাবে যে, এ সব থেকে যা গ্রহণ করা হবে তা শতকরা ২.৫ অংশ। মূলদনের যাকাত তাই।
এ সব তথ্যই পশু সম্পদের যাকাত সংক্রান্ত এ অধ্যায়ের আলোচনা থেকে পাওয়া গেছে। পরবর্তী অধ্যায়সমূহে তা আমাদের অনেক উপকার দেবে ইনশাআল্লাহ্।
তৃতীয় অধ্যায়
স্বর্ণ ও রৌপ্যের যাকাত
স্বর্ণ ও রৌপ্য দুটি উত্তম খনিজ সম্পদ। আল্লাহ তা’আলা এ দুটির মধ্যে অনেক কল্যাণ রেখেছেন, যা অপরাপর খনিজ সম্পদে লক্ষ্য করা যায় না। এ দুটি সম্পদের অপ্রতুলতা ও উত্তমতার কারণে প্রাচীনকাল থেকেই বহু জাতি এ দুটি ধাতুর দ্বারা নগদ সম্পদ বা মুদ্রা বানিয়েছে ও দ্রব্যমূল্যের মান হিসাবে গ্রহণ করেছে।
এ কারণে ইসলামী শরীয়াত এ দুটির প্রতি বিশেষ দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে। এ দুটি স্বতঃই বর্ধনশীল সম্পদরূপে গণ্য হয়ে এসেছে। তাই শরীয়াত তার উপর যাকাত ফরয করেছে, তা নগদ সম্পদ হয়ে থাকুক, কিংবা খনিজ দ্রব্য হয়েই থাকুক। তা দিয়ে পাত্র, উপঢৌকন, প্রতিমূর্তি কিংবা পুরুষের ব্যবহার্য অলংকার বানানো হলেও তাতে যাকাত ধার্য হবে।
তবে মহিলাদের অলংকাররূপে ব্যবহৃত হলে সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্ত হবে। সে বিষয়ে ফিকাহ্বিদদের বিভিন্ন মত রয়েছে।
স্বর্ণ ও রৌপ্যের যাকাত সম্পর্কে আমরা দুটি পর্যালোচনা পেশ করছি।
প্রথম আলোচনা: নগদ সম্পদের যাকাতও এ পর্যায়ে গণ্র শর্তাবলী। দ্বিতীয় আলোচনা: অলংকারাদি, উপঢৌকনাদির যাকাত এবং এ বিষয়ের মতভেদ ইত্যাদি।
প্রথম আলোচনা
নগদ সম্পদের যাকাত
নগদ সম্পদের ভূমিকা ও পর্যায়সমূহ
প্রাথমিক কালের মানুষ নগদ সম্পদ বলতে কিছুই জানতো না। তখনকা মানুষ পণ্যদ্রব্য অনুমানের ভিত্তিতে পারস্পরিক বিনিময় করে নিত। প্রত্যেক উৎপাদনকারী স্বীয় প্রয়োজনাতিরিক্ত পণ্য অপরকে দিয়ে তার কাছ থেকে স্বীয় প্রয়োজনীয় পণ্য গ্রহণ করত।
তবে আনুমানিকভাবে পণ্য বিনিময়ের এই কাজটি সীমাবদ্ধ সমাজেই সম্ভবপর হচ্ছিল। তাতে কার্য সম্পাদনে খুবই বিলম্ব হত এবংসময় ও শ্রমের অপচয় অনিবার্য হয়ে দাঁড়াত। তাতে বহু শর্ত কড়া বাধ্যবাধকতহাও আরোপিত হত, তার পরই কার্য সম্পাদিত হয়েছে বলে মনে করা যেত। তাছাড়া তাতে দ্রব্যমূল্যের চরম অনিশ্চয়তা ও বিভিন্নতাও দেখা দিত। আর তার কালণ ছিল শুধু এই যে, পারস্পরিক পণ্য বিনিময়ের কোন সুপরিচিত মানদন্ড ছিল না। উত্তরকালে আল্লাহ্র দেয়া জ্ঞানের আলোকে মানুষ পণ্য বিনিময়ের নগদ অর্থ ব্যবহার করতে শিখল। আর তাই হল পারস্পরিক পণ্য বিনিময়ের মাধ্যম ও সর্বজনস্বীকৃত মান। তার ভিত্তিতেই দ্রব্যের মূল্য নির্ধারণ করা হত, মুনাফার হিসাব করা হত, শ্রমের মূল্য ধরা হত- এতে করে জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বিনিময় কার্য খুবই সহজতর হয়ে উঠল।
এই সমপদ ব্যবহার শুরু হওয়ার পর তা বহু স্তর পার হয়ে এসেছে। শেষ পর্যন্ত এই উত্তম খনিজ সম্পদের পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ পর্যায়ে স্বর্ণ ও রৌপ্য বিশেষ পদার্থ হিসেবে গৃহীত হয়েছে। বস্তুত এ দুটি পদার্থে আল্লাহ্ তা’আলা বহু বৈশিষ্ট্য, বিশেষত্ব ও প্রকৃতিগতভাবে বহু গুরুত্ব রেখেছেন, যা অন্য কোন পদার্থে পাওয়া যায় না।
রাসূলে করীমের যুগে প্রচলিত নগদ অর্থ
যে সময় নবী করীম (স) প্রেরিত হলেন, তখনকার সমাজ এ দুটি নগদ মুদ্রার মাধ্যমে নিজেদের মধ্যকার ক্রয়-বিক্রয় সমাধা করত। স্বরণ দিয়ে নির্মিত হত ‘দীনার’, আর পৌপ্য দিয়ে ‘দিরহাম’। প্রতিবেশী অনেকগুলো রাষ্ট্র থেকেও তাদরে কাছে এ দুই মুদ্রাই চলে আসত। বাইজেন্টাইন রোমান সম্রাজ্যে প্রধানত ‘দীনার’ প্রচলিত ছিল। আর পারস্যে ছিল রৌপ্য নির্মিত ‘দিরহাম’। কিন্তু দিরহাম বিভিন্ন ওজনের হত- ছোটও হত, বড়ও হত, কম ওজনের হত, হত ভারী ওজনেরও। এ কারণে জাহিলিয়াতের যুগে মক্কারলোকেরা তাকে গণনার ভিত্তিতে ব্যবহার করত না, করত ওজনের ভিত্তিতে। তা টুকরা হয়ে থাকতো, তার উপর কোন ছাপ মুদ্রিত হত না।
আর তাদের মধ্যে কতগুলো ওজন স্বীকৃতভাবে প্রচলিত ছিল। আর একটা ছিল ‘তরল’-১২ ‘আউকিয়া’ (আউন্স) বেং এক ‘আউকিয়া’য় চল্লিশ দিরহাম। আর ‘নশ্’ হচ্ছে বিশ দিরহামের সমান অর্থাৎ এক আউকিয়া’য় অর্ধেক। আর পাঁচ দিরহাম হচ্ছে এক ‘নওয়াত’।
নবী করীম (স) মক্কাবাসীদের এসব ব্যবস্থাপনা পুরোপুরভাবে বহাল রেখেছিলেন, এতে কোনরূপ পরিবর্তন আনেন নি। বলেছিলেন, ‘মক্কাবাসীদের পাল্লাই সটিক পাল্লা’ এবং ধন-মালের যাকাত ‘দিরহাম’ ও ‘দীনারের হিসাবে চালু করলেন। এই কারণে স্বর্ণ ও রৌপ্যকে শরীয়াতসম্মত নগদ সম্পদরূপে গণ্য করা হল এবং তিনি তার উপর বহুবিধ আইন-কানুন কার্যকর করে দিলেন। তার অনেকগুলো ব্যবসায়ী ও সামাজিক ধরনের আইন- যেমন সুদ ও ব্যয় সংক্রান্ত বিধি-বিধান। আর কতগুলো ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট, যেমন মোহরানা। অনেকগুলো দণ্ডবিধিও রয়েছে। যেমন কত পরিমাণ মাল চুতে হাত কাটা নির্দেশ কার্যকর হবে। অর্থনৈতিক বিধি-বিধানও অনেক রয়েছে, বিশেষ করে যাকাত সংক্রান্ত আিইন।
নগদ সম্পদে যাকাত ফরয হওয়ার দলীল
নগদ সম্পদে যাকাত ফরয হওয়ার কথা কুরআন-হাদীস ও ইজ্মা দ্বারা প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত।
কুরআনের আয়াত: (আরবী*********)
যারাই স্বর্ণ ও রৌপ্য একীভূত ও পুঁজি করে রাখবে, তা আল্লাহ্র পথে খরচ করবে না, তাদের তীব্র উৎপীড়ক আযাবের সুসংবাদ দাও- যে দিন সেগুলোকে জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে, পরে তার দ্বারা তাদের কপোল-পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশ দাগ দেয়া হবে। বলা হবে, এ তা-ই, যা তোমরা তোমাদের নিজেদের জন্যে পুঁজি করে রেখেছিলে। অতএব এক্ষণে তোমরা স্বাদ আস্বাদন কর সেই জিনিসের, যা তোমরা পুঁজি করে রেখেছিলে।
এই আয়াতদ্বয়ে কঠিন আযাবের ভয় দেখানো হয়েছে শুধু এজন্যে যে, স্বর্ণ ও রৌপ্যে মোটামুটিভাবে আল্লাহর হক রয়েছে। তা খরচ করবে না বলে ইঙ্গিতে নগদ সম্পদের কথাই বলা হয়েছে। কেননা তাই ব্যয় করা সম্ভব, প্রচলিত ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমেই। এ পর্যায়ে সে দুটি ব্যয় করবে না বলে বল াহয়েছে: তা ব্যয় করবে না। তার অর্থ এ দাঁড়ায় যে, এ দুটি ধাতব পদার্থ দিয়ে নগদ সম্পদ যাই বানানো হবে, তাই ব্যয় করতে হবে।
আয়াতটিতে দুটি কাজের জন্যে আযাবের ভয় দেখানো হয়েছে: একটি তা পুঁজি করে রাখা, এবং দ্বিতীয় তা আল্লাহর পথে খরচ না করা। অতএব যে লোক যাকাত দেয় না, সে-ই তা আল্লাহ্র পথে ব্যয় করে না।
সুন্নাতের দলীল হচ্ছে, হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-র বর্ণনা; নবী করীম (স) বলেছেন:
(আরবী*********)
যে স্বর্ণ রৌপ্যের মালিকই তার হক (যাকাত) আদায় করবে না, কিয়ামতের দিন জাহান্নামের এক পাশ তার জন্যে প্রস্তুত করা হবে, পরে তা জাহান্নামে উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দিয়ে তার পার্শ্ব, কপাল ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেয়া হবে। তা যখনই শীতল হয়ে যাবে, পুনরায় তা উত্তপ্ত করা হবে। এসব করা হবে সেই দিন যার পরিধি পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান হবে। সেদিন শেষ পর্যন্ত লোকদের মধ্যে চূড়ান্ত ফয়সালা করে দেয়া হবে। অতঃপর তারা তাদের পথ- হয় জান্নাতের দিকে দেখবে, নতুবা দেখবে জাহাননামের দিকে। এসব আযাব ভীতি স্বর্ণ রৌপ্যের যাকাত না দেয়ার জন্যে ঘোষিত হয়েছে।
উপরিউক্ত হাদীসে যে ‘হক’ বলা হয়েছে, অপর এক বর্ণনায় তার তাৎপর্য বলা হয়েছে ‘যাকাত’। যেমন একটি বর্ণনার স্পষ্ট ভাষা হল:
(আরবী*********)
যে লোকই তার পুঁজিকৃত নগদ সম্পদের যাকাত আদায় করবে না তা-ই জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে…
পূর্বে উদ্ধৃত হযরত আনাস বর্ণিত হাদীসে রাসূলের ফরয করা যাকাত সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ্ই রাসূলকে তা করতে বলেছেন। পরে, হযরত আবূ বকর (রা) যখন তাঁকে বাহ্রাইনে পাঠিয়ে দিলেন, তখন তাঁকে যা লিখে দিয়েছিলেন, তাতে এ-ও রয়েছে: ‘নগদ সম্পদের যাকাতের হিসাব হচ্ছে প্রতি দুইশ’ দিরহামের দশ ভাগের এক ভাগের এক-চতুর্থাংশ, যদি সম্পদের পরিমাণ একশ’ নব্বই হয়, তবে তার উপর যাকাত ধার্য হবে না। তবে মালিক দিতে চাইলে…
আর ইজমার দলীল হচ্ছে, ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায়েই নগদ সম্পদের উপর যাকাত ফরয হওয়ার ব্যাপারে সমগ্র মুসলিম উম্মত সম্পূর্ণ একমত রয়েছে। এক্ষেত্রে আদৌ কোন মতভেদ কখনই দেখা দেয়নি।
নগদ সম্পদে ধার্য হওয়া যৌক্তিকতা
নগদ সম্পদের প্রকৃতি হচ্ছে চলাচল ও আবর্তিত হওয়া। ফলে যারাই এর সাথে সম্পর্কিত হয়, তারাই তা থেকে ফায়দা পেতে পারে। তা যদি পুঁজি করে আটকে রাখা হয়, তাহলে সর্বস্তরে এক চরম অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়, বেকারত্ব ব্যাপক হয়ে উঠে, হাট-বাজার অচল হয়ে দাঁড়ায়। আর সাধারণভাবেই অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও মন্দাভাব দেখা দেয়।
এ কারণে যে নগদ মূলধনই যাকাত পরিমাণ হবে, এক বছর অতীত হওয়ার পরই তার যাকাত দেয়া ফরয হবে। মালিক তা কোন টউৎপাদনের কাজে নিয়োজিত করুক, তাতে কোন পার্থক্য হবে না। নগদ সম্পদকে আটকে রাখার প্রবণতার উপর এটা একটা চাবুক আঘাত বিশেষ। অর্থনীতিবিদগণ পুঁজিকরণ ব্যাধির প্রতিষেধক বা চিকিৎসা স্বরূপ এ ব্যবস্থার কার্যকরতা স্বীকার করেছেন। এমন কি তাদের কেউ কেউ নগদ সম্পদে পুঁজি-অযোগ্য বানানোর জন্যে তার উৎপাদন তারিখ লিখে দেয়ারও প্রস্তাব করেছেন, যেন নির্দিষ্ট মেয়াদ অতিবাহিত হওয়ার পর তা অচল হয়ে যায়। তখন তা পুঁজি করা অসম্ভব বা অর্থহীন হয়ে দাঁড়াবে।
পাশ্চাত্য অর্থনীতিবিদরা একটা নতুন চিন্তা বাস্তবায়িত করার চেষ্টায় আত্মনিয়োগ করেছেন। তাহল, প্রতিটি নগদ মুদ্রার উপর মাসিক চিহ্ন অংকিত করে দেয়া, যেন যে-ই তা পাবে সে-ই যেন সেই মাস শেষ হওয়ার পূর্বেই তার হাত থেকে অন্য লোকের হাতে পৌঁছিয়ে দেয়। ফলে বিনিময় তৎপরতা অব্যাহত থাকবে, আবর্তনের গতি প্রশস্ততর হবে এবং সাধারণবাবেই অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠবে।
এই যে পন্থা ও উপায়ের প্রস্তাব করা হয়েছে- যা কার্যতই চালুও হয়েছে- বাস্তবায়িত করা বড়ই দুষ্কর ও কঠিন। কিন্তু তা সত্ত্বেও- যে অবস্তায়ই হোক, তা নগদ সম্পদের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিকোণেরই সমর্থন করে। তা অধিক ব্যাপকভাবে পুঁজিকরণ প্রতিরুদ্ধ করে। আর তা হচ্ছে প্রতি একশ’তে ২.৫ ভাগ বার্ষিক হিসাবেতার উপর দেয় ফরয করে দেয়া। এ কারণে মালিক তার অবশিষ্টকেও কালের অগ্রগতির সাথে নিঃশেষ খেয়ে ফেলবে।
এ কারণেই ইয়াতীমের মাল-সম্পদ নিয়ে ব্যবসা করার জন্যে হাদীসে উৎসাহ দেয়া হয়েছে, যেন যাকাত দিতে দিতে তা নিঃশেষ হয়ে না যায়।
ইয়াতীমের মূলধন নিয়ে ব্যবাস করার জন্যে বিশেষভাবে উৎসাহ দেয়া হয়েছে এ উদ্দেশ্যে, যেন কোন লোক নিজের মূলধনরেক বেকার ফেলে না রাখে, তাহলে তা স্বতঃ প্রবৃদ্ধি লাভ করতে থাকবে। অন্তর্নিহিত এ ক্ষয় প্রতিরোধ ব্যবস্থার ঐকান্তিক দাবিই হচ্ছে তাই। ইয়াতীমেরমাল তো মুতাওয়াল্লীর হাতে থাকে। সে ইচ্ছা করেই সে মাল বেকার ফেলে রাখতে পারে, অবসাদগ্রস্ততা তার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ কারণেই নবী করীমের নির্দেশ হচ্ছে, এ মালের প্রবৃদ্ধি চাওয়া, যেন তা বিন্যাস ও নিঃশেষ হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায়।
নগদ সম্পদের যাকাত পরিমাণ
নগদ সম্পদের উপর যাকাত ধার্য হওয়ার ব্যাপারে সমস্ত মুসলমান যেমন একমত, তেমনি তার ফরয পরিমাণও কোন দ্বিমত নেই। আল-মুগনী গ্রন্থে লিখিত হয়েছে, স্বর্ণ ও রৌপ্যের যাকাত পরিমাণ হচ্ছে দশভাগের এক-চতুর্থাংশ, এতে কোন মতভেদ নেই, নবী করীমের উক্তি (****) ‘নগদ সম্পদে দশ ভাগের এক ভাগের এক-চতুর্থাংশ যাকাত’ এ কথা অকাট্যভাবে প্রমাণ করছে।
এ পরিমাণ খুবই কম। দশ ভাগের এক ভাগ কিংবা বিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত ধার্য করা হয়নি, যেমন ফসলের যাকাতে তা ধরা হয়েছে। তার কারণ, জমির অনুপাতে ফসল ও ফলাদি হচ্ছে মূলদনের মুনাফার মত। এ কারণে তাতে মুনাফার উপর কর ধরা হয়েছে- তাতে যে শ্রম ও ব্যয় হয় এর প্রতি লক্ষ্য রেখে। কিন্তু নগদ মূলধনের যাকাত সেরূপ নয়। সেখানে তো আসল মূলধনের সমস্তটার উপরই যাকাত ধার্য হয়েছে। তা প্রবৃদ্ধি লাভ করুক আর না-ই করুক, মুনাফা অর্জনে সক্ষম হোক, আর না-ই হোক।
এ কালে এ পরিমাণ বৃদ্ধি করা যায় কি
এ কালে কিছু সংখ্যক চিন্তাবিদ ইসলামী বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জন না করেই বলতে শুরু করেছেন যে, যাকাতের প্রচলিত পরিমাণ এ কালের সমাজের প্রয়োজন পূরণে মোটেই সক্ষম বা যথেষ্ট নয়। কেননা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অনেক বিবর্তন ও অগ্রগতি সাধিত হয়েছে ফলে এ বিষয়ে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন তীব্র হয়ে দেখা দিয়েছে। সরকার যেন প্রয়োজন ও ক্ষেত্রের দৃষ্টিতে তার পরিমাণ বাড়াতে পারে, তার সুযোগ থাকা আবশ্যক।
কিন্তু এ মত কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়; বরং প্রত্যাহারযোগ্য সর্বতোভাবে। আর প্রমাণসমূহ এখানে উদ্ধৃত করা যাচ্ছে।
১. এ মত শরীয়অতের সুস্পষ্ট অকাট্য দলীলের পরিপন্থী, যে দলীল রাসূলে করীম (স) ও তারপর খূলাফায়ে রাশেদূনের সুন্নাত থেকে প্রমাণিত; অথচ রাসূলে করীম (স) এ সুন্নাত আঁকড়ে ধরা ও পূর্ণমাত্রায় অনুসরণকরার জন্যে সুস্পস্ট ভাষায় নির্দেশ দিয়েছেন এবং তার বিরোধিতা করার মারাত্মক পরিণতি সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ্ তা’আলা আমাদর হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন।
ইরশাদ করেছেন: (আরবী*******)
সেসব লোক যেন সতর্ক হয়ে যায়, যারা তাঁর নির্দেশের বিরোধিতা করে। কেননা ভয় রয়েছে তাদের উপর একটি কঠিন বিপদ আসার অথবা এক তীব্র যন্ত্রণাদায়ক আযাব আসার।
২. এ মত গোটা মুসলিম উম্মতের ইজ্মা’র সম্পূর্ণ পরিপন্থী, বিগত চৌদ্দশ বছরের মুসলিম জাতির ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত ও আমলের সম্পূর্ণ খেলাফ। এ সময়ের মধ্যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থার অনেক পরিবর্তন ও বিবর্তন সাধিত হয়েছে, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অবস্থাও ক খনও অপরিবর্তিত থাকেনি। খলীফা ও প্রশাসকবৃন্দ অনেক সময় কঠিন প্রয়োজনে বায়তুলমাল শূন্য করে দিতে বাধা হয়েছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও আলিমগণ কখনই যাকাতের হার বৃদ্ধি করার পক্ষেকোন মত প্রকাশ করেন নি।
৩. এ ইজমা যে অবিসংবাদিত, তার প্রমাণ হচ্ছে, মানুষের ধন-মালের উপর যাকাত ছাড়াও জনগণের হক আছে কিনা তা নিয়ে আলিমগণের মধ্যে মতবিরোধ হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যাকাতের পরিমাণ বৃদ্ধি করা যদি সম্ভবই হত তা হলে এ ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়ার কোন কারণ থাকে না। এ মতবিরোধই প্রমাণ করে যে, যাকাতের পরিমাণ উভয় পক্ষের লোকদের মতে অসম্পূর্ণ অপরিবর্তনীয়। মতবিরোধ ছিল ব্যাপারে যে, প্রয়োজনকালে যাকাত ছাড়াও আর কোন হক ধনশালী লোকদের ধন-মালে আছে কিনা এবং তা নেয়া যাবে কিনা?
৪. ফিকাহ্বিদদের মধ্যে ‘কিয়াস’ প্রয়োগ সর্বাধিক ব্যাপকতা ও প্রশস্ততা দেখিয়েছেন হানাফী মতের ফকীহগণ। কিন্তু তাঁরাও মনে করেন, যাকাতরে হার নির্ধারণে ‘কিয়াস’-এর কোন স্থান নেই। কেননা এ নির্ধারণের নিরঙ্কুশ অধিকার হচ্ছে শরীয়াতদাতার। তিনি তা চূড়ান্তভাবেই করে গেছেন। এমতাবস্থায় শরীয়াতের অকাট দলীল ও ইজমার দ্বারা প্রমাণিত কিয়াস দ্বারা কেমন করে পরিবর্তন করা যাবে?
৫. যাকাত হচ্ছে দ্বীনি ফরয, সবকিছুর ঊর্ধ্বে তার স্থান। আর এ হচ্ছে স্থিতিশীল ও অপরিবর্তনীয় ফরয। কেনা তা ইসলামের অন্যতম রুক্ন। মহান ইজমার ভিত্তিতে তা প্রতিষ্ঠিত। এ হার বৃদ্ধি করা হলে তা পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামষ্টিক অবস্থার আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে- স্থিতিশীলতা সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট হবে। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষিতে তার হার বিভিন্ন হতে বাধ্য হবে। এক-এক সরকার এক-এক রকমের হার ইচ্ছামত নির্ধারণ করবে। কেউ শতকরা বিশ ভাগ, কেউ ত্রিশ ভাগ নির্ধারণ করবে। কেউ তা ক্রমবর্ধনশীল হারের কম বলে মনে করবে। তা হলে শরীয়াতদাতা এই হার নির্ধারিত করে বিভিন্ন দেশ ও অবস্থার মধ্রে জীবন যাপনকারী মুসলিম উম্মতকে শরীয়াতের ফরয ও রুকন পালনে যে ঐক্যবদ্ধ ও অভিন্ন করতে চেয়েছিলেন, তা কোথায় থাকবে- তার অবস্থা কি দাঁড়াবে?
৬. তাছাড়া যে হার একবার বৃদ্ধি করা হবে, তা একবার হ্রাসও তো করা হতে পারে। আর যে নির্দিষ্ট হার একবার হ্রাস করা হবে, তা কখনো সম্পূর্ণ বাতিলও করা হবে না, এমন নিশ্চয়তা কে দিতে পারে? কেননা কখনও যদি ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজ প্রাচুর্যে ভরপুর হয়ে যায়, সরকার নানা অর্থনৈতিক উপকরণে বিপুলভাবে ধনশালী হয়ে পড়ে, তখন তো বাহ্যিক দৃষ্টিতে যাকাতের কোন প্রয়োজনই লক্ষ্য করা যাবে না। এরূপ অবস্থায় যাকাত একটা ইবাদত হিসেবে তার সমস্ত মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলবে, ইসলামের শাশ্বত বিধান পদদলিত ও উপেক্ষিত হবে। তা রাষ্ট্র কর্তাদের হাতের খেলনায় পরিণত হবে এবং তারা নিজেদের ইচ্ছামত কখনও হ্রাস আর কখনো বৃদ্ধি করতে থাকবে।
৭. যাকাতের হ্রাস-বৃদ্ধির দ্বার একবার উন্মুক্ত করা হলে ইসলামী শরীয়াতের পবিত্রতা বিনষ্ট হওয়া অবধারিত। তখন তা আর শুধু যাকাতের হার পর্যন্তই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে না, ইসলামের গোটা বিধান ও ব্রবস্থাকেও চরমভাবে আঘাত হানতে দ্বিধা করবে না। তবে আজকের সমাজের প্রয়োজন পূরণ ও রাষ্ট্রীয় অভাব দূরীকরণের জন্যে ‘কর’ ধার্য করায় তো কোন বাধা নেই। তখন তা যাকাতের বাইরের ব্যবস্থা হবে, প্রয়োজনও অপূরণীয় থাকবে না।
নগদ সম্পদের নিসাব
বুখারী-মুসলিমে উদ্ধৃত হাদীসে বলা হয়েছে: (আরবী*******)
মুদ্রিত মুদ্রার পাঁচ আওকিয়ার (Ounce) কমে কোন যাকাত নেই।
কুরআন মজীদে আসহাবে কাহ্ফের কিস্সায় বলা হয়েছে: (আরবী*******)
তোমরা তোমাদের মধ্য থেকে কোন একজনকে এ মুদ্রাসহ শহরের দিকে পাঠিয়ে দাও।
(*****) অর্থ নগদ মুদ্রা। যে রৌপ্য মুদ্রার চাপ পড়েনি তা নগদ মুদ্রা নয়, তাকে (****) ও বলা হয় না। ‘কামুস’ ও ‘লিসানুল আরব’ প্রভৃতি অভিধান গ্রন্থে তা-ই লিখা হয়েছে। প্রাচীন আরব কাব্য ও রাসূলের হাদীসথেকেও এ অর্থ সমর্থিত। আবূ উবাইদও এ মতই প্রকাশ করেছেন। বলেছেন: আউকিয়া বলতে চল্লিশ দিরহাম বোঝায়। তাই পাঁচ আউকিয়া অর্থ দুইশ দিরহাম।’
জানা যায়, নবী করীমের সময়ে নগদ রৌপ্য মুদ্রা ব্যাকপখাবে ব্যবহৃত ছিল। এ কারণে হাদীসে তার বিপুল উল্লেখ বিদ্যমান, আর তারই ভিত্তিতে ফরয যাকাতের নিসাবও নির্ধারিত হয়েছে। দিরহামের নিসাব যেমন স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, তাতে কত দিতে হবে, তাও পরিষ্কার ভাষায় বলে দেয়া হয়েছে। আর জানা গেছে যে, রৌপ্যের নিসাব হচ্ছে দুইশ দিরহাম। এ ব্যাপারে কারোরই কোন দ্বিমত নেই।
আর নগদ স্বর্ণ মুদ্রা-দীনার এর নিসাব নির্ধারণে সে রকম শক্তিশালী কোন হাদীস উদ্ধৃত হয়নি, যতটা রৌপ্যমুদ্রার ক্ষেত্রে হয়েছে। এ কারণে রৌপ্যের ন্যায় স্বর্ণ মুদ্রার নিসাবে ঐকমত্য অর্জিত হয়নি যদিও বিপুল সংখ্যক ফিকাহ্বিদ বলেছৈন যে, তার নিসাব হচ্ছে বিশ দীনার।
হাসান বসরীর মত হচ্ছে দীনারের নিসাব চল্লিশ দীনার। এটা অনেকের মত বলে বর্ণিতও হয়েছে। স্বর্ণের নিসাব স্বর্ণিই গ্রহণীয়। অবশ্য আউস ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি স্বর্ণের নিসাব নির্ধারণে রৌপ্যের নিসাবকে ভিত্তিরূপে গ্রহণ করেছেন। তাই যে পরিমাণ স্বর্ণের মূল্য দুইশ দিরহাম তাতেই যাকাত ফরয হবে। আতা, জুহরী, সুলায়মান ইবনে হারব, আইয়ুব ও সখতিয়ানীও এ মত পোষণ করতেন।
জমহুর ফিকাহ্বিদদের মতের সমর্থন নিম্নলিখিত বিষয় থেকে পাওয়া যায়:
১. বহু মরফূ হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে বটে, সেসবের সনদ সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকেনি; কিন্তু তার কতক অপর কতককে শক্তিশালী করে তোলে।
ক. ইবনে মাজা ও দারেকুতনী হযরত উমর ও আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত হাদীস উদ্ধৃত করেছেন। তাঁর ভাষা হল:
(আরবী*******)
নবী করীম (স) প্রতি বিশ দীনারের যাকাত বাবদ অর্ধ দীনার গ্রহণ করতেন।
খ. দারেকুত্নী আমর ইবনে শুয়াইব- তাঁর পিতা তাঁর দাদা থেকে হাদীসউদ্ধৃত করেছেন, রাসূলে করীম (স) বলেছৈন:
(আরবী*******)
বিশ বিশকাল (Ounce) স্বর্ণের কমে এবং দুইশ দিরহামের কম পরিমাণে কোন যাকাত নেই।
গ. আবূ উবাইদ আবদুর রহমান আনসারী তাবেয়ীথেকে হাদীস উদ্ধৃত করেছেন:
রাসূলের ও হযরত উমরের যাকাত সংক্রান্ত চিঠিতে লিখিত আছে:
স্বর্ণ বিশ দীনার না হওয়া পর্যন্ত তা থেকে কিছুই গ্রহণ করা হবে না। বিশ দীনার হলে তা থেকে অর্ধ দীনার গ্রহণ করা হবে।
ঘ. আবূ দাউদ আলী ইবনে আবূ তালিব থেকে হাদীস উদ্ধৃত করেছেন:
(আরবী*******)
তোমার যখন দুইশ দিরহামহবে ও তার উপর একটি বছর অতিবাহিত হবে, তখন তা থেকে পাঁচ দিরহামদিতে হবে। আর স্বর্ণের বিশ দীনার না হওয়া পর্যন্ত তোমাকে কিছুই দিতে হবে না। যখন বিশ দীনার হবে ও তার উপর একটি বছর অতিবাহিত হবে, তখন তা থেকে অর্ধ দীনার দিতে হবে।
হাদীসের হাফিযগণ এই হাদীসটি ‘সহীহ’ বলে অভিহিত করেছে। দারে-কুত্নী বলেছেন, আসলে হযরত আলীর উক্তি।
১. যাকাতের পরিমাণে যখন কোন কিয়াস চলে না, এই কথায় বিশ্বাসী হানাফিগণ তখন- হযরত আলী থেকে বর্ণিত সহীহ্ হাদীসকে- যাতে বলা হয়েছে যে, স্বর্ণের নিসাব হচ্ছে বিশ দীনার- রাসূলের উক্তি বলেই মনে করতে হবে।
২. এই ঐতিহাসিক সত্যও উক্ত কথার সমর্থন করে যে, সেকালে এক দীনার দশ দিরহাম দিয়ে ভাঙানো যেত।
সাহাবী ও তাঁদের পরবর্তীকালে লোকদের আমলও ঐ সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে। ফলে এর উপর ইজমা হয়েছে মনে করতে হবে।
৪. হযরত আনাস (রা) বলেছৈন, হযরত উমর আমাকে যাকাত আদায় করার দায়িত্বশীল বানিয়েছিলেন। তিনি আমাকে প্রতি বিশ দীনারে অর্ধ দীনার আদায় করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তার বেশী চার দীনার হলে সেজন্যে অর্ধ দিরহাম নিতে বলেচিলেন।
৫. হযরত আলী থেকে বর্ণিত, ‘বিশ দীনারের কমে কোন যাকাত নেই। আর বিশ দীনারে অর্ধ দীনার, চল্লিশ দীনারে এক দীনার- এই হাদীসটিকে অনেকেই রাসূলে করীমের উক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
৬. ইবরাহীম নখ্য়ী বলেছেন, ‘ইবনে মাসউদের স্ত্রীর বিশ বিশকাল ওজন স্বর্ণের একটা হার ছিল। তিনি তাঁকে তার যাকাত স্বরূপ পাঁচ দিরহাম দিতে বলেছিলেন’।
৭. শা’বী, ইবনে সিরীন, ইবরাহীম, হাসান হিকাম ইবনে উতায়বা ও উমর ইবনে আবদুল আযীয প্রমুখ তাবেয়ী ইমামের মত হচ্ছে, ‘বিশ দীনারে অর্ধ দীনার যাকাত।’
৮. আবূ উবাইদ ও ইবনে হাজম বর্ননা করেছেন, উমর ইবনে আবদুল আযীয লিখেছেন: ‘যে মুসলিমই তোমার কাছে আসবেতার প্রতি নজর দাও। তার বাহ্যিকধন-মালথেকেযাকাত আদায় কর, যা ব্যবসা ইত্যাদিতে আবর্তিত হয়। প্রতি চল্লিশ দীনারে এক দীনর আর তার কম হলে সেই নিসাব অনুাযায়ী বিশ দীনার পর্যন্ত পৌঁছলে যাকাত হবে। এক তৃতীয়াংশ দীনার ও তার থেকে কমহলে তা ছেড়ে দাও।’
এই পরিমাণটাই শেষ পর্যন্ত স্থির হয়ে গেছে। লোকেরা এই অনুযায়ীই আমল করেছে উমর ইবনে আবদুল আযীয পর্যন্ত। এ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোন মতবিরোধই দেখা দেয়নি। ফলে এ ব্যাপারে মুসলিম উম্মতের কার্যত ইজমা অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে মনে করতে হবে।
ইমাম মালিক গোটা উম্মতের- বিশেষ করে মদীনাবাসীর এই আমলকে চূড়ান্ত ফয়ালা বলে ধরে নিয়েছেন। তাই তিনি তাঁর ‘আল-মুয়াত্তা গ্রন্থে লিখেছেন: ‘আমার মতে মতপার্থক্যমুক্ত সুন্নাত হচ্ছে, বিশ দীনার স্বর্ণমুদ্রার যাকাত ফরয হবে, যেমন দুশ’ দিরহামে যাকাত ফরয হয়।
ইমাম শাফেয়ী ‘কিতাবুল উম্ম’-এ বলেছেন: ‘স্বর্ণের পরিমাণ বিশ (মিশকাল) পর্যন্ত না পৌঁছলে তাতে কোন যাকাত তাতে কোন যাকাত নেই। বিশ মিশকাল হলে তাতে যাকাত ফরয হবে- এই কথায় কোন মতবিরোধ আছে বলে আমার জানা নেই।’
আবূ উবাইদ তাঁর ‘কিতাবুল আমওয়াল’ গ্রন্থে হাদীস উল্লেখ করেছেন: ‘স্বর্ণের নিসাব ২০ মিশকাল।’ পরে বলেছেন, এই ব্যাপার মুসলমানদের মধ্যে কোন মতবিরোধ নেই। কোন লোকযদি বছরের শুরুতে যাকাত ফরয হওয়া পরিমাণ দুশ’ দিরহাম কিংবা বিশ দীনার মালের মালিক হয় অথবা পাঁচটি উষ্ট্র বা ত্রিশটি গরু কিংবা চল্লিশটি ছাগলের বা এর কোন একটি প্রকারের মালিক হয় ও তার বছরের শেষ পর্যন্ত থাকে, তাহলে তার উপর বিশেষজ্ঞদের কথানুযায়ী অবশ্যই যাকাত ফরয হবে।
অনেক সংখ্যক ইমাম বলেছেন, হাদীসটর সনদে যা-ই থাক, গোটা মুসলিম উম্মত তা কবুল করে নিয়েছে। যেমন মেনে নিয়েছে হাদীস: ‘উত্তরাধিকারীর জন্যে কোন ওসীয়াত হয় না।’ এ পর্যায়ে ইমাম শাফেয়ী, ইবনে আবদুল বার, ইবনুল হুম্মাম, ইবনে হাজার, ইবনুল কাইয়্যেম প্রমুখ ইমাম ও হাফিয উল্লেখ্য। এই কারণে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ইমাম তিরমিযী একটি হাদীস উদ্ধৃত করে তাকে যয়ীফ ও অপরিচিত অ্যিভহিত করার পরও লিখেছেন: ‘আলিমগণের আমল কিন্তু এই হাদীস অনুযায়ী’। ইবনে আবদুল বার বলেন, হাদীসটি আমার মতে সহীহ্। কেননা আলিমগণ সেটি কবুল করে নিয়েছেন।
কথাটি সাধারণভাবে গ্রহণীয় নয়। আমরা লক্ষ্য করছি, একটি হাদীস যদি সনদের দিক দিয়ে যয়ীফও হয়, আর শেষের দিকের লোকদের নয়; বরং সাহাবী ও পূর্বকালের লোকদের আমল তদনুযায়ী হয়ে থাকে, আর কোন গ্রহণীয় ও শরীয়অত-সম্মত বাধা তার বিরুদ্ধে না থাকে, তাহলে তা অবশ্যই গ্রহণকরতে হবে। বিশ দীনারে যাকাত ফরয হওয়া পর্যায়ে ইতিপূর্বে আমরা যে হাদীসসমূহ উদ্ধৃত করেছি, সে বিষয়েও এই একই কথা। কেননা তাতে এ সব দিকেই বর্তমান রয়েছে।
এ সব হাদীসের সনদসমূহ গ্রহণীয় প্রায় এবং পূর্বকালের লোকদের আমলও সে অনুযায়ীই রয়েছে। তার বিরোধী কিছুই পাওয়া যায়নি; বরং অনুকূল কথাই পাওয়া গেছে। আর তার নিসাব হচ্ছে, বিশদীনার বা দুইশ’ দিরহামের সমান।
সংশয় ও তার অপনোদন
হাসান বসরী চল্লিশ দীনার নিসাবের পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন। এর দলীল হিসেবে আমর ইবনে হাজমকে লিখিত রাসূলের চিঠির কথা বলেছেন। অনেকে তাতে রৌপ্যের নিসাব উল্লেখ করার পর বলা হয়েছে: প্রতি চল্লিশ দীনারে এক দীনার।
আমার মতে হাদীসটিকে সহীহ্ মেনে নিলেও বলা যায়, চল্লিশেরকম দীনারে যাকাত ধার্যহবে না এমনকোন কথা হাদীসে নেই। কেননা তা ফরয পরিমাণের অকাট্য দলীল; কিন্তু তাতে নিসাব বর্ণনা করা হয়নি। অতএব এই হাদীসের কথা: ‘চল্লিশ দীনারে এক দীনার’ –আমাদের প্রতি একশ’তে আড়াই অথবা প্রতি হাজারে পাঁচশ-এর মতই কথা। তাতে হার বলা হয়েছে মাত্র; কিন্তু নিসাব কত তা জানা যাবে রৌপ্যের নিসাব থেকে। সে দৃষ্টিতে বলা যায়, দুশ’ দিরহাম হলে তা বিশ দীনারে পরিবর্তিত করা যাবে।
জমহুর ফিকাহ্বিদদের মতে এভাবেই আপত্তি থেকে রক্ষা পেতে পারে।
শরীয়অতসম্মত ‘দিরহাম’ ও দীনারের পরিমাণ
আমরা জানতে পেরেছি, রৌপ্যের নিসাব দুইশ’ দিরহাম এবং স্বর্ণের নিসাব বিশ দীনার। এক্ষণে দিরহাম ও দীনারের ও এ দুটির পরিমাণের নিগূঢ় তত্ত্ব জানাটা বাকি রয়ে গেছে। তাহলেই আমরা জানতে পারব, এ যুগে তার সমান নিসাব পরিমাণটা কি দাঁড়ায়।
পূর্ববর্তী ও শেষের দিকের বহু মনীষী এ আলোচনার অবতারণা করেছেন। আবূ উবাইদের ‘কিতাবুল আমওয়াল’, বালাযুযরীর ‘ফতহুল বুলদান’, খাত্তাবীর ‘মায়ালিমুস সূনান’, মা-ওয়ার্দীর ‘আল-আহকামুস্ সুলতানীয়া’, ইমাম নববীর ‘আ-মাজমু’, মুকরেযীর ‘আল-নাহদুল-কাদীমাতহুল ইসলামিয়া’ এবং ইবনে খালদূনের ‘আল-মুকাদ্দামাহ’ প্রবৃতি গ্রন্থে এ পর্যায়ে যথেষ্ট আলোচনা সন্নিবেশিত হয়েছে।
এ সকল মনীষীর কথা থেকে যে সারমর্ম জানা যায়, তা ইবনে খালদুনের ভাষায় নেই:
জেনে রাখো, ইজমা সংগঠিত হয়েছে ইসলামের শুরু সাহাবী ও তাবেয়ীনেরযুগ থেকেই।তা হচ্ছে শর’ঈ দিরহাম তাই, যা সাত মিশকাল স্বর্ণ দ্বারা দশ ওজন করা হয় এবং আউকিয়া ওজন করা হয় চল্লিশ দিরহাম দ্বারা, এ হিসেবে তা দীনারের দশ ভাগের সাত ভাগ। আর খালেস স্বর্ণে মিশকালের ওজন হচ্ছে, মধ্যমআকারের যবের ৭২ দানা। অতএব দিরহাম- যা দশ ভাগের সাত-ভাগ পঞ্চাশ ও পাঁ দানা। এসব ওজনই ইজমা দ্বারা প্রমাণিত।
তবে দীনারে- তার মিশকালে- জাহেলিয়াত ও ইসলামের যুগে কোন পরিবর্তন হয়নি বলেই সকলের জানা। আর ্ও সর্বসম্মত কথা যে, আরবী ইসলামী যুগের নগদ সম্পদ এ ওজন হিসেবে সর্ববাদীসম্মত- এর উপর ইজমা হয়েছে। উমাইয়া খলীফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের শাসন আমলে তা সর্বত্র সাধারণভাবে বিস্তার লাভ করে। সে সময় দিরহামগুলো ছিল আট দন্ক (দিরহামের এক-ষষ্ঠাংশ)-এর বড় ও চার দন্ক-এর ছোট, এ দুজনের মধ্যবর্তী ওজনের। পরে দুটিকে সমান মাত্রায় দিরহাম বানিয়ে দিল। তাদের প্রত্যেকটির ওজন দাঁড়াল পূর্ণাঙ্গ ছয় দন্ক। এভাবে মিশকালের হিসাব করা হল। এক্ষণে তা চিরকালেল হয়ে গেল, তার জন্যে কোন সীমাবদ্ধ সময় নির্দিষ্ট থাকল না। এখন প্রতি দশ দিরহাম- যা ছয় দন্ক ওজনের হয়- তা সাত মিশকাল এবং তা অপরিবর্তিতই থেকে গেছে।
অতঃপর আলিম ও ইতিহাসবিদ্গণ প্রমাণিত করেছে যে, আবদুল মালিকের শাসনামলে দিরহাম ও দীনারের যে রূপ ও ধরনের উপর ইজমা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, উত্তরকালে তা আসল রূপে অপরিবর্তিত থাকেনি। বরং ওজন ও মানের দিক দিয়ে তাতে বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। দেশে দেশে পার্থক্য হয়ে গেছে। এক যুগ থেকে অন্য যুগে পৌঁছে তা পরিবর্তিত হয়েছে এবং লোকেরা মানসিকভাবে সেদুটির প্রচলিত ওজনকেই শরীয়াতসম্মত মনে করে রেখেছে। ফলে প্রত্যেক দেশের লোকেরা তাদের নগদ সম্পদ থেকে শরীয়াতের হক্ বের করেছে সেই প্রচলিত ওজনের হিসেবে। তাহলে িএক্ষণে শরীয়াতে ব্যবহৃত দিরহাম-দীনারের ওজন জানবার কি উপায় হতে পারে?…. এ প্রেক্ষিতে যে, তাতে কারসাজি ও ওজনের পরিবর্তন ঘটে গেছে?
নবী করীম(স) তাঁর উম্মতকে এক মহাকল্যাণময় তত্ত্বের সন্ধান দিয়ে গেছেন। শেষের দিকের সংস্কৃতিসম্পন্ন রাষ্ট্রসমূহ তার গুরত্ব স্বীকার করেছে এবং তার ব্রাপকতা বিধানের জন্যে কার্যকর ভূমিকাও পালন করেছে। আর তা হচ্ছে, গোটা জাতির ‘কায়ল’ (Measure) ও ওজন (wight)-কে অভিন্ন ও একীভূত রাখতে হবে। কেবলতাতেই সমস্ত লোকের পারস্পরিক লেন-দেন ও কেনা-বেচা ইনসাফপূর্ণ রাখতে হবে। কেবল তাতেই সমস্ত লোকের পারস্পরিকলেন-দেন ও কেনা-বেচা ইনসাফপূর্ণ হতে পারে এবং তাদের মধ্যে এ নিয়ে কোন বাকবিতণ্ডা বা ঝগড়া বিবাদের সৃষ্টি হওয়ারও কোন অবকাশ থাকবে না। বস্তুত রাসূলে করীম (স)-এর হাদীসে ঠিক সে কথাই ঘোষিত হয়েছে:
(আরবী***********)
ওজন চলবে মক্কাসাবীদের অনুযায়ী ওজন এবং পরিমাপ চলবে মদীনাবাসীদের পরিমাপ অনুযায়ী।
এরূপ ঘোষণার কারণ হচ্ছে, মক্কাবাসীরা ছিল ব্যবসায়ী। তারা মিশকাল, দিরহাম ও ‘আউকিয়া’ প্রভৃতি ওজনে পারস্পরিক ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন করত। আর এ ব্যাপারে তারা ছিল খুব সুর্দঢ় ও সূক্ষ্মদর্শী। পক্ষান্তরে মদীনাবাসীরা ছিল কৃষিজীবি, ফসল ও ফল ফলানোই ছিল তাদের পেশা। তারা অসাক্, ছা’, মদ্ প্রভৃতি মাপে কার্য সম্পাদন করত। আর তাতে তারা ছিল খুবই সতর্ক ও দক্ষ। রাসূলে করীম(স) এ কারণে লোকদের যে ব্যাপারে যারা অধিক পারদর্শী সে ব্যাপারে তাদের অনুসরণ করতে বলেছেন।
ইসলামের সেই সমসাময়িক যুগে অন্যান্য দেশগুলোও এ মহান নগরদ্বয়ে প্রচলিত ‘ওজন’ ও ‘কায়ল’-কে অনুসরণ করে চলেছে। কেননা রাসূলে করীম(স) নিজেই তাকে বহাল ও চালূ রেখেছেন। ফলে প্রতিটি ইসলামী দেশে একই ওজন ও পরিমাণের দিরহাম গৃহীত হয়েছিল। মিশকাল, আউকিয়া, রতন প্রভৃতি ওজন এবং ছা’, মদ্ প্রভৃতি কায়ল সর্বত্র প্রচলিত হয়ে গেল। কোথাও এর ব্যতিক্রম থাকল না। আর শরীয়াতী অধিকারসমূহের ওজন পরিমাপেও তাই অনুসরণ করা হল। তাতে কোনরূপ মন্থরতা কোথাও থাকল না।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, পরবর্তীকালে মুসলিমসমাজে রাসূলে করীম (স)-এর এই পথ-নির্দেশের গুরুত্ব বুঝতে সক্ষম হয়নি। তাকে প্রয়োজনীয় ও যথাযথ গুরুত্বও তারা দিতে ব্যর্থ হল। প্রয়োজন ছিল মক্কাবাসীদের মানদণ্ডের সুদৃঢ় ও সূক্ষ্ম ব্যবস্থার সংরক্ষণ। বিশেষ করে মক্কাবাসীদের ‘কায়ল’- মিশকাল ও দিরহামের ওজন এবং মদীনাবাসীদের ছা’ ও মদ-এর মান। তা হলে আজকের দিনে যাকাত বিধানের শরীয়াতের পরিমাণ নির্ধারণ খুবই সহজ হয়ে দাঁড়াত।
ইসলামী রাষ্ট্রসমূহের কর্তব্য ছিল এসব মান (Standard)-কে পারস্পরিক মুয়ামিলা, লেন-দেন ও ক্রয়-বিক্রয় বিনিময়ে মৌল মান হিসেবে অনুসরণ করা। ব্যক্তিদের পরস্পরেও যেমন রাষ্ট্রসমূহের পরস্পরেও তেমনি। তা হলে তার ভিত্তিতে শরীয়াতের বিধানাবলী সহজে পালন করা সম্ভব হত।
কিন্তু বাস্তবে সর্বত্র এর বিপরীত ঘটেছে। ‘দিরহাম’, ‘আউকিয়া’ ‘রতল’ ইত্যাদি সব ওজন ও ‘কায়ল’ চরমভাবে বিভিন্ন ও রিবর্তিত হয়ে গেছে। একটি দেশের সাথে অন্য দেশের কোন মিল নেই। এক্ষেত্রে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে এবং এ মতবিরোধ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে।
অতঃপর আমরা পড়তে, শুনতে ও দেখতে পেলাম, বাগদাদী ‘রতল’ মাদানী ‘রতল’ মিসরীয় ‘রতল’ (রতল-Pound)। পড়তে লাগলাম, ‘দিরহাম’ কি ১২ ‘কিরাত’ (Inch), না ১৫ কিরাত, না ১৬ কিরাত’ অথবা তার কম বেশী। আর তাতে যবের বা গমের কত দানা? ….. ‘মিশকাল’ (84c. gramms) কি? তা কি মূল দীনার না অন্য কিছু, তাতে কত কীরাত বা কত দানা হবে?… ইত্যাদি ইত্যাদি ধরনের অর্থহীন কথাবার্তা।
এগুলো এমন সব প্রশ্ন, যে বিষয়ে ফিকাহ্ডবিদগণ দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। আর চরম মতভেদেরও অবতারণা করেছেন এক্ষেত্রে। কেননা বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন প্রয়োজন রয়েছে, বিভিন্ন সময়ে তা বিভিন্ন রূপও ধারণ করেছে।ফলে কোন কোন হানাফী ফিকাহ্বিদ বলতে শুরু করলেন: (আরবী***********)
প্রত্যেক দেশে সেই দেশে প্রচলিত ওজন হিসাবে ফতোয়া দিতে হবে। [ইবনে আবেদীন]
ইবনে হুবাইব আল-আন্দালুসীও তাঁদের সুরে সুর মিলিয়ে বলেছেন:
(আরবী***********) প্রত্যেকদেশের লোকেরা সে দেশে প্রচলিত দিরহামের হিসাবে পারস্পরিক লেন-দেন করবে।
তাঁরা এ-ও বলেছেন যে, এ কথা তাঁর একার। কেননা যাকাতের নিসাব দুশ’ দিরহাম হওয়ার বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কেউ মত প্রকাশ করেন নি। এই দু’শ’ দিরহাম একশ’ চল্লিশ মিশকাল সমান। এমন কি, এই কথায় তাঁরা ঐকমত্যে পৌঁছেছেন যে, দিরহাম হবে ৭/১০ মিশকাল (প্রতি সাত মিশকাল দশ দিরহাম)।
এক্ষণে শরীয়াত কথিত দিরহাম ও দীনার সম্পর্কে আলোচনা করা আবশ্যক। কেননা শরীয়াতে এ দুটির ভিত্তিতে যাকাতের নিসাব নির্ধারিত হয়েছে।
মনে হচ্ছে, এ দুটির একটির পরিমাণ জানতে পারলে অপরটির পরিমাণও জানা যাবে। কেননা দিরহাম ও দীনারের পারস্পরিক সম্পর্ক সর্বজন পরিচিত। এ দুটির হার ৭:১০। আর দিরহাম ৭/১০ মিশকাল।
তবে আমাদের সম্মুখে যে সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইউনিট বা এককের উল্লেখ করা হয়েছে, যা দিরহাম ও দীনারের ভগ্নাংশরূপে গণ্য হয়েছে, তা আয়ত্ত করা খুবই দুঃসাধ্য। কেননা তা আদৌ সুসংবদ্ধ নয়। যুগ, স্থান ও প্রকারভেদে তা বিভিন্ন হয়ে থাকে। আর তা যব গম ও সর্ষপ বীজ। আমিনিজে কায়রো শহরে বিভিন্ন আকৃতি ও রূপে তার পরীক্ষা করে দেখেছি এবং তা বিভিন্ন রকম ও পরিমাণে দেখতে পেয়েছি। নিম্নে তার বিবরণ দেয়া হল।
(ক) তাঁরা বলেছেন, শরীয়াতের হিসাব মতে িএক দিরহাম ছয় দন্ক (একদিরহামের ছয় ভাগের এক ভাগ হল এক দন্ক) এবং দুই ও দুই-তৃতীয়াংশ সর্ষপ দানায় এক দন্ক। তা হলে এক দিরহাম হবে ১৬ সর্ষপ দানায়। কিন্তু সর্ষপ দানার ওজন জানব কি করে? ডঃ আবদুর রহমান ফহমী তাঁর (*******) নামক গ্রন্থে বহু অনুসন্ধান ও গবেষণা চালিয়ে লিখেছেন, মধ্যম ওজনের সর্ষপ দানায় ১৯৪ গ্রাম হয়। তাহলে এক দিরহামে ১৬*১৯৪=৩, ১০৪ গ্রাম।
তার অর্থ শরীয়াতে কথিত দিরহাম প্রায় প্রচলিত দিরহামের সমান। তবে তা ১৬০.০ গ্রাম। কিন্তু এ সিদ্ধান্তে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় যে, দিরহামের পরিমাণ ছয় দন্ক ও ১৬ কীরাত নির্ধারিত সর্ববাদীসম্মত নয়। যেমন সর্ববাদীসম্মত নয় ‘কীরাত’-এর পরিমাণ।
ইবনে আবেদীন হানাফী ফিকাহ্বিদেদের পক্ষে শরীয়াতে কথিত দিরহামের পরিমাণ নির্ধারণে এবং এর ও প্রচলিত দিরহামের পরিমাণ নির্ধারণে অনেক কথাই বলেছেন। তাতে তাঁদের ব্যাপক মতবিরোধ লক্ষ্য করা যায়। কেউ বলেছেন, প্রচলিত দিরহাম বড়, কেউ বলেছেন ছোট। আরও বলেছেন, পরিভাষায় পার্থক্যের দরুন কীরাত ও দিরহামের পরিমাণ নির্ধারণে অসংখ্য রকমের কথা উদ্ধৃত হয়েছে।
(খ) কোন কোন আলোচনাকারী ভিন্ন পথে উপরিউক্তি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। আল-মুকারেযী উল্লেখ করেছেন, দিরহাম ও দীনারের ওজন নির্ধারণকারী প্রাচীন গ্রীক সর্ষপ দানার সাহায্যে দিরহাম দীনারের ওজন ঠিক করেছে। কেননা তার আয়াতন (Size) খুবেই ক্ষুদ্র ও সূক্ষ্ম এবং স্থান-কালের পার্থক্যের দরুন তাতে পার্থক্য দেখা দেয় না। তাঁরা বলেছেন এক দিরহামে ৪, ২০০ সর্ষপ দানা। আর এক দীনারে ৬.০০০ দানা। বিগত শতকে যাহ্বী শাফেয়ী একখানি কিতাব লিখে জানালেন, তাঁর সময়ে যে দিরহাম প্রচলিত ছিল, তা শরীয়অতে কথিত দিরহাম। তিনি সর্ষপ দানার সাহায্যে তার পরীক্ষা করে দেখেছেন। বলেছেন, এ থেকেই ‘রতল’ হয়।মিসরে ১৪৪ দিরহামে এক ‘রতল’, আর বাগদাদী প্রচলনে ১২৮ ৪/৭ দিরহাম।
তার অর্থ, সেই দিরহাম আমাদের এ সময়ই প্রচলিত। কেননা এখনকার মিসরীয় রতল ১৪৪ দিরহাম, আর দিরহাম ৩১২ গ্রামের (gramms) সমান। তাই তার ওজনও পূর্বে চলা ওজনের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে ১৬০.০ গ্রাম। আর তা খুব সামান্যই।
কিন্তু কথা হল, দিরহামের ওজন নির্ধারণের সর্ষপ দানার উপর ভিত্তি করে যথেষ্ট নয়। কেননা এ দানাগুলোও অবস্থা, কাল ও পরিবেশের পার্থক্যের দরুন বিভিন্ন ওজনের হয়ে থাকে। শেষ পর্যন্ত পরস্পরে এমন একটা পার্থক্য হয়ে যায় যা অবশ্যই গণণার মত। আমি নিজে ‘খারুব’ দানা পরীক্ষা করে এ ধারণা লাভ করেছি।
মুক্রেযীর কথায় বিবেচনার বিষয় হল, যে দিরহামের ওজন ৪২০০ সর্ষপ দানার সমান ধরা হয়েছে, তা হচ্ছে ‘রতলে’র দিরহাম। তাহলে নগদ দিরহামও কি তাই?
মনে হচ্ছে, নগদ দিরহাম ও মিশকাল ছাড়াও অন্যান্য রকমের দিরহাম ও মিশকাল প্রচলিত ছিল। আল-মুকরেযী খাত্তবী থেকে উদ্ধৃত করেছেন; যে দিরহামের ওজনস ৭-১০; তা ছাড়াও পরিমাপ করার দিরহাম ভিন্নতর ছিল এবং ইসলামী দুনিয়ায় তা ব্যবহৃত হত। যেমন আলী মুবারক বলেছেন যে, দিরহামের ওজন ৩.১২ গ্রাম। তাই বহুল ব্যবহৃত ছিল।
অবশ্য দিরহাম ও মিশকালের পরিমাণ নির্ধারণে বিভিন্ন লোকের মত পার্থক্যের দরুন বহু বিভিন্নতা দেধা দিয়েছে।
রাজা কাইতাবাইর দিরহামে কমবেশী হওয়াটা অসম্ভব নয়। পূর্বে উল্লেখ করেছি এবং ঐতিহাসিকগণও প্রমাণ করেছেন, নগদ টাকা শরীয়াতের ওজনমত ঠিক থাকেনি। তাহলে কাইতাবাইর দিরহাম অপরিবর্তিত শরীয়াতী দিরহাম ছিল- একথা আমাদের কে বলে দিতে পারে?
(গ) শরীয়াতী দিরহাম ও দীনারের পরিমাণ জানার জন্যে আমাদের সম্মুখে আর একটি পন্থা আছে।তা হচ্ছে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের পন্থা অর্থাৎ আরবও পাশ্চাত্য দেশের ঘরসমূহে সংরক্ষিত নগদ মুদ্রা ওজন- বিশেষ করে দীনার ও মিশকালের ওজন যাচাই-পরীক্ষা করে দেখা। কেননা এ কথা স্বীকৃত যে, জাহিলিয়াত ও ইসলামের যুগে তার ওজনে কোন পরিবর্তন ঘটেনি। আর তারা যখন দিরহাম বানাতো, তার দশ ভাগের এক ভাগ ছয় মিশকাল ওজনের হত। ফলে ‘মিশকাল’ এমন একটা মৌল যার উপর নির্ভর করা চলে। তাই মিশকালের ওজনটা জানতে পারলে স্বর্ণ-রৌপ্যের নগদ মুদ্রার নিসাবটাও আমরা সহজে জানতে পারব।
কোন কোন ইউরোপীয় গ্রন্থকাও এ পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। মিসরীয় গ্রন্থকার আলী পাশা মুবারক তাদের অনুসরণ করেছেন। তিনি লন্ডন, প্যারিস, মাদ্রিদ ও বার্লিনের সংরক্ষিত ইসলামী নগদ মুদ্রাসমূহ সন্ধান করে জানতে পেরেছেনযে, খলীফা আবদুল মালিকের সময়ে প্রচলিত দীনার ৪.২৫ গ্রাম ওজনের হত। ইসলামী বিশ্বোকোষেও তাই বলা হয়েছে।তা-ই আসল বাইজান্টাইন দীনারের ওজন। তাহলে দিরহাম হবে (৭ ×৪.২৫)/১০ =২.৯৭৫। সমকালীন বহু আরব প্রত্নতত্ত্ব আলোচনাকারীও এটাকেই সমর্থন দিয়েছেন। প্রাচ্যবিদ জস্বাওরও এই কথা ইসলামী বিশ্বকোষে উল্লেখ করেছেন। তাতে ‘দিরহাম’ শীর্ষক আলোচনায় বলা হয়েছে:
আইন সঙ্গত দিরহামের পরিমাণ নির্ধারণে ঐতিহাসিকগণ খুব বেশী মতবিরোধের মধ্যে পড়ে গেছেন। তবে এ ব্যাপারে তাঁরা একমত যে, দিরহামের ওজন মিশকালের তুলনায় ৭:১০- আর মিশকাল কয়েকটি অর্থ দেয়। তাই এ সমভার (Counterballance) করা সহীহ্ হতে পারে কেবল তখনই, যদি মিশকাল আইনসঙ্গত (Legal) দীনারের সমান হয় অর্থাৎ মক্কী মিশকাল- যার ওজন ৪.২৫ গ্রাম। এর সারকথা এই দাঁড়ায় যে, দিরহামের ওজনের নিকটবর্তী সম্ভাব্য ওজন হল ২.৯৭ গ্রাম। এ ওজনটা অবশিষ্ট অক্ষয়িষ্ণু মুদ্রার সঙ্গে মিলে যায়। যেমনমিলে যায় খলীফা মুক্তাদিরের আমল (২৯৫-৩২০হিঃ) নির্মিত মুদ্রার ওজন।
সম্ভবত সর্বপ্রথম হযরত ওমর (রা)-ই দিরহামের আইনসঙ্গত ওজন ২৯৭ গ্রাম নির্দিষ্ট করেছন। খলীফা আবদুল মালিক-নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, দিরহাম ও ওজনেরই হতে হবে, অন্যথা নয়। আর তাই হবে সঠিক রৌপ্য মুদ্রা।
‘দীনার’ পর্যায়ে বলা হয়েছে:
খলীফা আবদুল মালিক ৭৭ হিজরী সনে মুদ্রার উপর যে সংশোধনী জারী করেছেন, তা প্রচলিত সর্ণমুদ্রা (Currency) মানকে স্পর্শ করেনি। এটা সম্ভব যে, আমরা সহসাই এ প্রচলিত মুদ্রার সুদৃঢ় ওজনের ব্যাপারে স্থিতি গ্রহণ করব, সংশোধনীয় প্রভাবিত দীনারের পূর্ববর্তী মুদ্রা নির্মাণে যে চরম মাত্রায় সূক্ষ্মতা অবলম্বিত হয়েছে, তা থেকে বাঁচার জন্যে। তাহলে আমরা দেখব, দীনার ৪.২৫ গ্রাম (৬৬ দানা) সম্বলিত। এ ওজনটা বাইজান্টানী সোলডায়িস প্রচলিত ওজনের সাথে পুরোপুরিভাবে সামঞ্জস্যশীল। পরে লিখেছেন, শরীয়াত সব সময়এ এ সর্মে দলীল পেশ করছে যে, প্রচলিত দীনারের ওজন ৪.২৫ গ্রাম (৬৬ দানা) হবে।
সম্ভবত শরীয়াতী দিরহাম ও দীনারের পরিমাণ নির্ধারণের জন্যে এটাই অধিক উত্তম ও আদর্শ পন্থা। এতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম। এটা বিজ্ঞানসম্মত পন্থার খুব নিকটবর্তীও। কেননা তা ঐতিহাসিক নগদ মুদ্রার বাস্তব অনুসন্ধানের উপর ভিত্তিশীল। এর সত্যতা ও যথার্থতায় কোনরূপ দ্বিধা-দ্বন্দের আশংকা নেই। এটা পূর্ববর্তী পন্থাসমূহে থেকে খানিকটা ভিন্নতর পরিণতিতেই পৌঁছায়। দিরহাম ও দীনার সাম্যই কম। সম্ভবত এই পন্থা যাকাতের ক্ষেত্রে অধিক সতর্কতাপূর্ণও। আর আল্লাহ্ তা’আলা যে গরীব-মিসকীনের কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে যাকাত ফরয করেছেন, সে দৃষ্টিতেও এটা অধিক সুবিচারপূর্ণ হবে।
এক্ষণে রৌপ্যের নিসাব দাঁড়াল আধুনিক ওজন অনুযায়ী ২.৯৭৫*২০০=৫৯৫ গ্রাম। আর স্বর্ণের নিসাব হবে ৪.২৫*২০=৮০ গ্রাম।
অতএব যে লোক খালেস বা খাঁটি স্বর্ণের নগদ বা ছাঁচ-৫৯৫ গ্রাম পরিমাণের মালিক হবে, তাকে যাকাত দিতে হবে প্রতি একশ’তে ২.৫। কেননা রৌপ্যের নিসাবকেইা প্রচলিত নিয়মে ভিত্তি করা হয়েছে।
আমরা জেনেছি, মিসরীয় রিয়াল ১৪গ্রাম ওজনের সমান বিনিময় হার বিশিষ্ট। আর তাতে রৌপ্যের হার ৭২০.০, তাতে খাঁটি রৌপ্যের হার ৮০.১০ গ্রাম। অতএব এ দৃষ্টিতে মিসরীয় রিয়ালে নগদ রৌপ্যের নিসাব হবে ৫০.১০.০৮/৫৯৫ রিয়াল অর্থাৎ ১১৮০.৪ করশ।
হানাফী মাযহাবের আলিমগণ নগদ মুদ্রায় ধাতু খাদমুক্ত হওয়ার শর্ত করেন না। তাঁরা খাঁটি ন্যায় প্রচলিত হলে খাদমুক্ত মুদ্রাও গ্রহণ করতে প্রস্তুত। তাহলেরিয়ালের নিসাব ৪২.৫=১৪/৫৯৫ রিয়াল হবে অর্থাৎ ৮৫০ করশ।
কিন্তু প্রথম মতটি ফিকাহ্বিদদের। আর তাই দলীলসমূহের বাহ্যিক অর্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কেননা রৌপ্যের নিসাব নির্ধারিত হয়েছে দু’শ’ দিরহাম।
এ থেকেই আমরা জানতে পারি যে, রৌপ্যের নিসাব ২২/ ২/৭ মিসরীয় রিয়াল।অথবা হানাফী মাযহাব অনুযায়ী ২৭ রিয়াল। এরূপ বলা এখনকার প্রচলিত মুদ্রার রৌপ্য ওজনের নিকটবর্তী ও তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কাজেই এ বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করা আবশ্যক এবং এখনকার ওজন ৫৯৫ গ্রাম-এ ফিরে যাওয়া প্রয়োজন।
স্বর্ণের নিসাব নির্ধারণ করাযাবে এভাবে যে, তার ওজন হবে ৮৫ গ্রাম। কেননা বর্তমান সময়ে অভ্যন্তরীণ লেনদেনে স্বর্ণমুদ্রা প্রায় অব্যবহৃত হয়ে আছে। কাজেই যে-লোক স্বর্ণের দলা বা ছাঁচের মালিক হবে অথবা ৮৫ গ্রাম সমান নগদ টাকার অধিকারী হবে তাতে শতকরা ২.৫ যাকাত বাবদ দিতে হবে।
সমকালীন চিন্তাবিদদের একটা বড় ভুল
যাকাত সম্পর্কে লেখাপড়া করেছেন, সমকালীন এমন চিন্তাবিদগণ একটা বড় ভুলের মধ্যে ডুবে আছেন। বিশেষ করে তাঁরা যখন নগদ সম্পদের নিসাব নির্ধারণ পর্যায়ে কথা বলেন, সাধারণত তখনই এই ভুলটা হয়।
দৃষ্টান্তস্বরূপ (*****) নামক ফিকাহ্ গ্রন্থটির উল্লেখ করা যায়। গ্রন্থখানি মিসরের ওয়াক্ফ বিভাগীয় মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনায় চারও মাযহাবের আলিমগণের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি কর্তৃক রচিত হয়েছে।
তাতে বলা হয়েছে, স্বর্ণের যাকাত নিসাব মিসরীয়মুদ্রায় ১১ মিসরীয় ‘জনীহ্’, তার অর্ধেক, এক-চতুর্থাংশ ও এক-অষ্টমাংশ (১১৮৭.৫ করশ)। আর রৌপ্যের নিসাব ৫২৯ ২ /৩ করশ সমান।
প্রায় সব কিতাব ও পত্র-পত্রিকায় এ পরিমাণটাই ব্যাপক প্রচার লাভ করেছে। যারা ফতোয়া দেন, তাঁদের মুখেও এ কথা উচ্চারিত।
এখানে দুটি দিকের ভুল লক্ষ্য করা যায়:
প্রথম, প্রাচীন ওজন অনুযায়ী মিসরীয় স্বর্ণ ১১ ৭/৮ জনীহ্ নিসাব নির্ধারণ, যার ওজনস হয় ৮.৫ গ্রাম তা ১১৮৭.৫ এর সমান হয় না। জনীহ্ নিসাবে নিসাবে নির্ধারণ করা হলে তা যথার্থ হতে পারে। তা হবে কাগজী মুদ্রার ভিত্তিতে। কিন্তু স্বর্ণ নির্মিত ‘জনীহ্’ কাগজী মুদ্রার হিসাবে ৮০ জনীহ্ থেকে বেশী হয়ে থাকে। তার কারণ হচ্ছে, স্বর্ণ নির্মিত জনীহ্র প্রকৃত মুল্য ও নামের মূল্যের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। এক্ষণে (১৯৬৯ সনে) কাগজী মুদ্রায় ৭জনীহ্ পরিমাণ হবে প্রায়।
দ্বিতীয, এই কথার অর্থ হচ্ছে, নগদ সম্পদের যাকাত নিসাব- এখানে দুটি এবং এ দুটির মধ্যে বড় পার্থক্য বিদ্যমান। ইসলামী শরীয়াতের আদালত কি এ বিরাট ব্যবধানকে কবুল করে নিতে প্রস্তুত, যাতে দুটি নিসাবের একটি অপরটির তেরোবারেরও অধিক গুণ বেশী হয়ে যায়? এই কঠিন পার্থক্যের সম্মুখে আমরামুসলিমজনগণকে ছেড়ে দেব দিশাহারা অবস্থায়, তা কি কোন অবস্থায়ই সমর্থনযোগ্য হবে? যে লোকই পাঁচ ‘জনীহ্’র মালিক, তাকেউ আমরা বলবযে, তুমি রৌপ্যের নিসাব অনুযায়ী ধনী ব্যক্তি, আর যে পঞ্চাশ জনীহ্র অধিকারী হয়েছে, তাকেবলব, স্বর্ণের নিসাবের দৃষ্টিতে তুমি একজন দরিদ্র ব্যক্তি, বিবেক-বুদ্ধি বা শরীয়াতের দৃষ্টিতে তা কি কোনরূপ যুক্তিসংগত কথা হবে? .. না, তা অবৈধ এবং অসংগত, তাতে কোন সন্দেহ থাকতে পারে না। যে সব হাদীস নগদ সম্পদে দু’শ দিরহাম রৌপ্যে এবং বিশ দীনার স্বর্ণে যাকাতের নিসাব নির্ধারণ করেছে, তার মানে তো এ নয় যে, তার দ্বারা দুটির পরস্পর বিরোধী নিসাব নির্ধারণকরাহবে? আসলে এ একটা অভিন্ন নিসাব, যে লোকই তার মালিক হবে, তাকে ‘ধনী’ করা হবে এবং তার উপর যাকাত ফরয হবে। মূলত এ নিসাব দুটি বিকল্প প্রান্তিক মানে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। আর তা হচ্ছে, হয় দু’শ’ দিরহাম, না হয় বিশ দীনার। আসলে এটা এক ও অভিন্ন দর বা মান বিশেষ। কেননা বিপুল সংখ্যক অকাট্য দলীল প্রমাণ করেছে যে, রাসূলে করীম(স) ও খুলাফায়ে রাশেদুনের যুগে এক দীনার দশ দিরহামে ভাঙানো যেত। আর তাই যাকাতে প্রচলিত হয়েছে, চুরির ‘হদ্দ’ জিযিয়া ও দিয়ত প্রভৃতিতেতেও এ দরই স্বীকৃত ও চালু হয়ে গেছে।
এ প্রেক্ষিতে নগদ সম্পদের যাকাতের নিসাব এক ও অভিন্ন নির্দিষ্ট করা কর্তব্য হয়ে পড়ে। স্বর্ণ ও রৌপ্যের একই মান, একই মূল্য হবেতার মুদ্রা ছাপা যত বিভিন্ন হোক –না কেন।
এ যুগে নিসাব নির্ধারণ কিসে হবে
সন্দেহ নেই, এ কালে নগদ স্বর্ণ মুদ্রার জন্যে একটা নিসাব নির্ধারণ করা এবং রৌপ্যের জন্যে আর একটা নির্ধারণ সম্ভব নয়। এ কালে তো কাগজী নোটই জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বিনিময়-মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে ও ব্যাপকভাবে চলছৈ। কোন ধাতব মুদ্রা-বিশেষ করে স্বর্ণ দেখতে পাওয়ারও কোন সম্ভাবনা আছে বলে মনে করাযায় না। কাজেই ফকীহ্গণ এ পর্যায়ে যত আলোচনা ও বিতর্কের অবতারণা করেছেন, এ কালে তার কোন প্রয়োজন বা অবকাশ আছে বলে মনে করার কোন কারণ নেই। এক্ষণে দুটি নগদ মুদ্রার একটি অপরটির সাথে মিলিয়ে দেয়া হবে, কি হবে না? কেননা মিলিয়ে দেয়া একটা জরুরী ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। িএ বিতর্কে এক্ষণে সম্পূর্ণ অবান্তর।
তবে জরুরীভাবে আলোচনা করতে হবে এ বিষয়ে যে, আমরা দুটির কোন নগদ সম্পদটিকে ভিত্তি করে নিসাব নির্ধারণ করব? যাকাত ফরয হওয়ার নিম্নতম সম্পদ পরিমাণ কি হবে? কেননা শরীয়াত প্রতিটির জন্যে অপরটির বিপরীত নিসাব নির্ধারণ করেছে। এক্ষণে আমরা কি তা রৌপ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করব?
এ কালের আলিমগণের মধ্যে বিপুল সংখ্যকের ধারণা তাই এবং তা দুটি কারণে:
প্রথম- রৌপ্যের নিসাব সর্ববাদীসম্মত। সহীহ্ মশহুর হাদীস ও সুন্নাত দ্বারা প্রমাণিত।
দ্বিতীয়- রৌপ্যের ভিত্তিতে নিসাব নির্দারণ করা হলে দরিদ্র লোকদের ফায়দা বেশী হবে। কেননা এ হিসাবে অধিকাংশ মুসলিম জনগণে উপর যাকাত ফরয হবে। এ কারণে মিসরে বিশ ও তার উপরে কয়েকটি রিয়াল ধরে নিসাব নির্ধারণ করা হয়েছে। আর সউদী রাষ্ট্রে প্রায় পঞ্চাশ রিয়ালকে নিসাব ধরা হয়েছে। আরব আমীরাতেও তাই। আর পকিস্তান ও হিন্দুস্থানে পঞ্চাশ বা ষাট টাকাতে নিম্নতম নিসাব ধরা হয়েছে।
অপরাপর আলিমদের মত হচ্ছে, স্বর্ণের ভিত্তিতে নিসাব নির্ধারণ করতে হবে। কেননা নবী করীম (স) এর পরে রৌপ্যের মূল পরিবর্তিত হয়ে গেছে। [ঐতিহাসিকগণ বলেছৈন, প্রাথমিক যুগে এক দীনার দিরহামের সমান হয়েছিল। উমাইয়া শাসনের দ্বিতীয়ার্ধে বারো দিরহামের সমান এবং আব্বাসী যুগে ১৫ দিরহাম সমান হয়েছিল।] যেমন কালের পরিবর্তনে অন্যান্য সমস্ত জিনিসেরই মূল্যে পরিবর্তন ঘটেছে। তবে স্বর্ণের মূল্য মোটামুটিভাবে একটা নির্দিষ্ট দূরবর্তী সীমায় এসে ঠেকেছে। কালের পার্থক্যের দরুন স্বর্ণ মুদ্রা মূল্যে তেমন একটা পার্থক্য ঘটেনি। কেননা তা সর্বকালের নির্ধারণ একক। আল্লামা আবূ জুহরা, খাল্লাফ ও হাসান প্রমুখ। একালের মনীষীগণ যাকাত সংক্রান্ত আলোচনায় এ মত ব্যক্ত করেছেন।
আমার মনে হয়, এ মতটি সর্বতোভাবে সুষ্ঠু ও বলিষ্ঠ। যাকাতের মালসমূহের উল্লিখিত নিসাবসসমূহের মধ্যে –যেমন পাঁচটি উষ্ট্র ও চল্লিশটি ছাগল, অথবা পাঁচ ওসাক্ কিশমিশ বা খেজুর- তুলনামূলক আলোচনা করা হলে আমরা দেখতে পাব যে, একালের উপযোগীহবে স্বর্ণের নিসাব, রৌপ্যের নিসাব নয়্
পাঁচটি উষ্ট্র বা চল্লিশটি মূল্য প্রায় চারশ দীনার বা জনীহ্র সমান হয়; কিংবা কিছুটা বেশী। তাহলে যে লোক চারটি উষ্ট্রের কিংবা ঊনত্রিশটি ছাগলের মালিক, সে শরীয়াতের দৃস্টিতে দরিদ্র ব্যক্তি গণ্য হবে কি করে? অথচ যে ব্যক্তি এমন পরিমাণ নগদ সম্পদের মালিক যা দিয়ে সে একটি ছাগীও খরিদ করতে পারে না, তার উপর যাকাত ফরয হবে কি করে? যে লোক এই সামান্য পরিমাণ মালেরমালিক সেকি ধনী বিবেচিত হতে পারে?
আল্লামা ওলীউল্লাহ দেহ্লভী তাঁর হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা’ গ্রন্থে লিখেছেন: ‘রৌপ্যের নিসাব পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ ‘আউকিয়া’। কেননা এ পরিমাণটা একটি পরিবারের এক বছর কালের ব্যয়েল জন্যে যথেষ্ট, যখন দ্রব্যমূল্যসমগ্র দেশে সমমানের হবে। তার ভারসাম্যপুর্ণ দেশসমূহে সস্তাকাল ও ঊর্ধ্বমূল্যের কালের নিয়ম অধ্যয়ন করলে তুমিতাইদেখতে পাবে।
বর্তমানে আমরা ইসলামীদেশগুলোতে কি দেখতে পাচ্ছি? মিসরীয়, সউদী, কাতারী রিয়াল বা পাক-ভারতীয় রুপিয়ার পঞ্চাশ বা অনুরূপ পরিমাণ একটি পরিবারের প্রয়োজন পূরণের জন্যে একটি পূর্ণ বছরের, একটি মাসের, এমনকি একটি সপ্তাহের জন্যেও যথেস্ট হয় বলে মনে করতে পরি কি?
যে সব দেশে জীবন-যাত্রার মান অনেক উঁচু হয়ে গেছে- বিশেষ করে পেট্রোলের দেশে- এ পরিমাণ নগদ অর্থ একটি মধ্যম পরিবারের পক্ষে একটি দিনের জন্যেও যথেষ্ট হয় না। তাহলে যে তার মালিক হল, তাকে শরীয়াতের দৃষ্টিতে ধনী ব্যক্তি মনে করা যায় কিভাবে? সেতো বড় অসম্ভব ব্যাপার।
অতএব এ কালে স্বর্ণভিত্তিক নিসাব নির্ধারণ করাই আমাদের জন্যে বাঞ্ছনীয়, যদিও রৌপ্য ভিত্তিক নিসাব ফকীর-মিসকীনদের জন্যে অধিকতর কল্যাণকর। কিন্তু ধন-মালের মালিকদের জন্যে তা খুবই অবিচারপূর্ণ হবে। কেননা এ ধন-মালের মালিকরা কোন বড় মূলধনের মালিক নয়। তারা জাতির সাধারণ জন-মানুষও বটে।
নগদ সম্পদে কোন স্থির মান নির্ধারণ কি সম্ভব
ইতিহাস ও অর্থনীতি পাঠকদের ভালভাবেই জানা আছে যে, নগদ অর্থেরমূল্য অস্থিতিশীল। তা নিত্য পরিবর্তিত হচ্ছে। উঠছে ও নামছে, একসময়থেকে অন্য সময়ে বিরাট পার্থক্য হয়ে যাচ্ছে। নগদ সম্পদে প্রকৃত মূল্য তো প্রতিফলিত হয় তার ক্রয়শক্তির মাধ্যমে। [আবূ দাউদ বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (স)-এর যুগে দিয়ত বাবদ দেয় ছিল ৮০ দীনার বা ৮.০০০ দিরহাম আর হযরত উমরের যুগে- তিনি বললেন, উষ্ট্রের মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে গেছে। অতএব স্বর্ণের মালিকদের প্রতি ১০০০ দীনার ধার্য কর এবং কাগজী মুদ্রার উপর ১২০০ দিরহাম। ] বিশেষ করে আমাদের এ যুগে কাগজী নোটের ব্যাপক প্রচলন ঘটেছে। মানুষতো আর নগদ সম্পদ খায় না, পরেও না। বরং তা দিয়ে প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয় করে মাত্র।
আমরা দেখতে পাচ্ছি, রৌপ্য মুদ্রার মূল্য এমনভাবে নীচে পড়ে গেছে যে, এর শরীয়াতের নিসাব কোন উল্লেখ্য জিনিসের সমান হয় না অন্যান্য স্বর্ণভিত্তিক শরীয়াতী নিসাবের, কিংবা গবাদিপশু ভিত্তিক নিসাবের।
কিন্তু স্বর্ণমূল্য যদি নিম্নগামী হয় এবং বিশ দীনার হয়ে দাঁড়ায় অন্য কথায়, ৮৫ গামবা অন্যান্য নিসাবের কাছাকাছি না হয়- তাহলে সমস্যার সমাধান হবে কিভাবে?
ইসলাম শরীয়াতসম্মত যে ধন-মালকে যাকাত ফরয হওয়ার ভিত্তিরূপে গ্রহণ করেছে, তার জন্যে কোন স্থায়ী মান নির্ধারণ করা কি সম্ভব?…..যেন কেবলমাত্র যে ধন-মালের উপর যাকাত ফরয হয়।
যে কোন যুগে নগদ মুদ্রার মূল্য যখনই উচ্চ উর্ধ্বগামী হবে এবং তার ক্রয়শক্তি এক অযোক্তিক সীমা পর্যন্ত বর্ধিত হবে, তখনই এ প্রশ্ন তীব্র হয়ে দেখা দেবে।
অন্যান্য নিসাব পরিমাণ নির্ধারণ
এখানেই আমরা নগদ সম্পদের নিসাব অন্যান্য দলীল প্রমাণিত নিসাবের দৃষ্টিতে নির্ধারণের যৌক্তিকতা দেখতে পাই- যা নগদ মুদ্রার মূল্য পরবর্তনের দরুনপরিবর্তিত হবে না, কেননা তার একটা নিজস্ব ও স্থায়ী মূল্যমান থাকবে, তার নগদ মূল্য অন্যান্য শহরে ও সময়ে যতই ভিন্নতর হোক-নাকেন। পাঁচটি উষ্ট্রের বা চল্লিশটি ছাগলের অথবা পাঁচ অসাক আটা বা গমের ম্যূ নিয়ে কেউ বিতর্ক করে না, তা খুব বেশী পরিবর্তিতও হয় না। কেননা তা মানুষের জন্যে খুব বেশী প্রয়োজনীয়।
শব্য ও ফল-ফসলে নিসাব অনুযায়ী নির্ধারণ কি সম্ভব
কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি, (পাঁচ অসাক) শস্যমূল্য অনেক সময় গবাদিপশুর নিসাব মূল্যের তুলনায় অনেক কময় হয়ে পড়ে। সম্ভবত শরীয়াতদাতা বিশেষ কয়েকটি কারণে এই নিসাব পরিমাণ কম রাখার ব্যবস্থা করেছেন।
কারণসমূহ এই:
১. ফসল উৎেপাদনে আল্লাহ্র নিয়ামত দান অন্য যে –কোন জিনিসের তুলনায় অধিকতর প্রকাশমান এবং অপরাপর ধন-ঐশ্বের্যের তুলনায় এক্ষেত্রে মানুষের শ্রম ও কষ্ট অপেক্ষাকৃতভাবে অনেক কম। যেমন আল্লাহ নিজেই বলেছেন:
(আরবী*********)
যেন তারা ভোগ করে তার ফল ও ফসল এবং তাদের হাত যা কিছু উৎপাদন করেছে। তারা কি সেজন্যে শোকর করবে না?
২. জমি যা উৎপাদন করে তা থেকে মানুষ মুখাপেক্ষীহীন থাকতে পারে না, যদিও গবাদিপশু না হলেও মানুষের চলতে পারে। এ কারণে জমির উৎপাদনে নিসাব পরিমাণ খুবই কম রাখার প্রয়োজন মনে করেছেন শরীয়াতদাতা। কেননা আল্লাহ তা’আলা জমিথেকে যা কিছু ইৎপাদন করেন- বিশেষ করে খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত ফসল- তার জন্যে লোকদের ঠেকা খুব বেশী।
৩. যেসব দানা ও ফলে যাকাত ফরয হয়, তা জমিরই ফল ও ফসল। তা মূলদনের মুনাফার মত। কিন্তু উষ্ট্র, গরু ও ছাগলের ব্যাপারে ভিন্নমত। তারমূল ও প্রবৃদ্ধি উভয়ের উপরেই যাকাত ফরয হয়ে থাকে। অন্য কথায় মূলধন ও মুনাফা উভয় থেকেই যাকাত দিতে হয়। এ কারণে শরীয়াতে দানা ও ফলে কম পরিমাণের নিসাব ধার্য করা হচ্ছে, কেননাতা সবটাই তো প্রবৃদ্ধি ও নবতর রিযিক। তার ফরয পরিমাণও বাড়িয়ে ধরা হয়েছে। আর তা হচ্ছে, দশ ভাগের এক ভাগ ও বিশভাগের একভাগ।
গবাদিপশুর নিসাবের দৃষ্টিতে নিসাব নির্ধারণ কি সম্ভব
এসব কারণে ও ফসল ফলাদির নিসাব অনুযায়ী নিসাব নির্ধারণ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়াই কর্তব্য বিবেচিত হচ্ছে। ফলে উষ্ট্র, গরু ও ছাগল প্রভৃতি গবাদিপশুর নিসাব মান অনুযায়ী নিসাব নির্ধারণ ব্যতীত আর কোন উপায় থাকে না।
গরুর নিসাব বিভিন্ন ধরা হয়েছে। পাঁচটি থেকে ত্রিশ-পঞ্চাশটি পর্যন্ত। এসব পার্থক্যের কারণে তাকে একটা মান বা ভিত্তিরূপে গ্রহণ করে অন্যকিছুর নিসাব নির্ধারণ সম্ভব নয়।
থেকে যায় উষ্ট্র ও ছাগলের নিসাব। এ দুটি শরীয়াতের অকাট্য দলীল ও ইজমা উভয় দ্বারাই প্রমাণিত। উষ্ট্রের নিসাব পাঁচটি, আর ছাগলের নিসাব চল্লিশটি।
তাহলে আমরা কেবল বলতে পারি যে, নগদ সম্পদের নিসাব তাই, যা পাঁচটি উষ্ট্রের অথবা চল্লিশটি ছাগলের মূল্যের সমান?
এই প্রশ্নের জবাব ইতিবাচক। তবে তা নির্ভর করে এ সব নিসাবের শরীয়াত কথিত নগদ সম্পদের নিসাব-নবী যুগের ২০০ দিরহাম-এর সমান হওয়ার উপর। তাই পাঁচটি উষ্ট্র বা চল্লিশটি ছাগলের সে যুগে যখন দু’শ’ দিরহামের সমান হবে, তখন তার আলোকে আমরানগদ সম্পদের নিসাব-পরিমাণটা বের করতে পারি, সে নিসাব হচ্ছে সেই পরিমাণ নগদ অর্থ, যা পাঁচটি উষ্ট্রের বা চল্লিশটি ছাগলের মূল্যের সমান হবে।
শামসুল আইম্মা আস-সরখ্শী তাঁর ‘আল-মব্সূত’ গ্রন্থে যা লিখেছেন, তাতে আমাদের উপরিউক্ত কথার সমর্থন পাওয়া যায়। যেমন পশু সম্পদের যাকাতে আমরা উল্লেখ করেছি- পরিমাণ গ্রহণে মূল্যের হিসাব গণ্য করতে হবে। কেননা দ্বিতীয় বর্ষে উপনীতা একটি উষ্ট্রী শাবকের- এই হচ্ছে যাকাত ফরয হওয়ার নিম্নতম বয়স- যার মূল্য প্রায় চল্লিশ দিরহাম হয়, আর একটা ছাগীর মূল্য পাঁচ দিরহাম। অতএব পাঁচটি উষ্ট্রে যাকাত ফরয হওয়া দু’শ রৌপ্য দিরহামের উপর যাকাত ফরয হওয়া সমান।
আল-মবসূত-এর কথার নগদ সম্পদের নিসাব উষ্ট্র বা ছাগলের নিসাবের দৃস্টিতে নির্ধারণের সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে।
কিন্তু আমরা সেখানেই বলেছি, ইবনুল হুম্মাম ও ইবনে নজীব এ দুজন প্রখ্যাত ফিকাহ্বিদ মব্সূতের উক্ত কথার সমালোচনা করেছেন। কেননা বুখারী শরীফ উদ্ধৃত হয়েছে:
কারুর উপর বিশেষ বয়সের উষ্ট্র যাকাত বাবদ ফরয হলে আর তার কাছে তা পাওয়া না গেলে তখন ছাগীর বদলে দশ দিরহাম পেশ করবে- ছাগী বর্তমান না থাকলে।
এই কথা ‘সারখশী’ উদ্ধৃত কথার সুস্পষ্ট বিরোধী।
বুখারী শরীফে হযরত আনাস বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, ‘যার মালিকানায় উষ্ট্রের যাকাত হবে দুই বছরের ছাগী বাচ্চা, আর তার কাছে থাকে চতুর্থ বর্ষে উনীতা উষ্ট্রী বাচ্চা তবে তার কাছ থেকে তাই গ্রহণ করা হবে। আর সেই সঙ্গে নিতে হবে দুটি ছাগী- যদি তার পক্ষে তা সহজ হয়, অথবা বিশ দিরহাম। আর যার উপর চতুর্থ বর্ষে উপনীতা উষ্ট্রী বাচ্চা যাকাত ধার্য হবে তার কাছে যদি তা না থাকে; বরং তার কাছে থাকে দুই বছরের ছাগীর বাচ্চা, তাহলে তার কাছ থেকে তা গ্রহণ করা হবে। আর যাকাত আদায়কারী তাকে বিশ দিরহাম কিংবা দুটি ছাগী দিয়ে দেবে…
এই সহীহ হাদীসটির আলোকে আমাদরে সম্মুখে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, চল্লিশটি ছাগী- যা ছাগলের নিসাব- নবী করীম (স)-এর যুগে চারশত দিরহামের সমানহত (১০*৪০)। তার অর্থ নগদ সম্পদের নিসাবের (২০০ দিরহাম) দ্বিগুণ।
সম্ভবত নগদ সম্পদের নিসাব গবাদিপশুর যাকাতের নিসাবের তুলনায় কম রাখা শরীয়াতদাতার লক্ষ্য। কেননা নগদ সম্পদের মালিকত্ব ব্যক্তিকে তার বহু ও বিপুল অর্থনৈতিক প্রয়োজন পরিপূরণে সমর্থ বানিয়ে দেয়। সে অতি দ্রুত এবং সহজেই সব প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয় করতে সক্ষম হয় কিন্তু উষ্ট্রের ও অন্যান্য পশু সম্পদের মালিকের পক্ষেতা সম্ভব হয় না। তাই যার কাছে এটা রয়েছে, তার প্রয়োজন হয় খাদ্য, পোশাক বা ঔষদ ক্রয়ের। কিন্তু সে নগদ টাকার বিনিময়ে উষ্ট্রী বিক্রয় করা ছাড়া তা ক্রয় করতে পারে না। অথচ এ বিক্রিতটাও সব সময় সহজ হয় না, সম্ভবপর হয় না। আর যথার্থ মূল্যও সব সময় পাওয়া যাওয়ার কথা নয়। কিন্তু নগদ সম্পদের মালিকের এ অবস্থার সম্মুখীন হতে হয় না। কেননা এ নগদ সম্পদই তো বিনিময়ের প্রত্যক্ষ মাধ্যম। প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয়ের সার্থক হাতিয়ার বিশেষ। নিসাব পরিমাণ নগদ সম্পদের মালিকানা যেমন প্রাচুর্য নিয়ে আসে, পুঁজি করে রাখার সুযোগও তাতে কম থাকে না। বিশেষ করে একটি বছর অতিক্রান্ত হওয়ার যে শর্ত করা হয়, তা তাতে সহজেই কার্যকর হতে পারে। জমহুর ফিকাহ্বিদ্দের মত তাই।
হানাফী ফিকাহ্বিদদের শর্ত হচ্ছে, নগদ সম্পদের পরিমাণ মালিকের মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত হতে হবে। যেন যাকাত দিয়ে দেয়ার পর তার মৌল প্রয়োজন পরিপূরণে সে পরমুখাপেক্ষী হয়ে না পড়ে।
এ প্রেক্ষিতে উষ্ট্র বা ছাগল- এ গবাদিপশুর যাকাতের নিসাবের অর্থের নগদ সম্পদের যাকাতের নিসাব নির্ধারণে নিশ্চয়ই এ অস্বাভাবিক বা বিস্ময়ের কিছুই নেই।
নগদ সম্পদের নিসাব গ্রহণযোগ্য মান
এই আলোচনা ভিত্তিতে নগদ সম্পদের নিসাবের জন্যে একটা স্থায়ী মান নির্ধারণ করা আমাদের পক্ষে খুবই সম্ভব। নগদ অর্থের ক্রয় ক্ষমতা যদি কখনও খুব সাংঘতিকভাবে পরিবর্তিত হয়ে যায়, তাহলে তখন তার আশ্রয় গ্রহণ সম্ভব হবে। সে অবস্থায় ধন-মালের মালিকের উপর অবিচার করা হয়, নয় দরিদ্র যাকাত প্রাপকদের উপর উক্ত মানটি পাঁচটি উষ্ট্রের বা চল্লিশটি ছাগলের মূল্যের অর্ধেকের সমান হবে, গড় শহর মূল্যের বিচারে।
গড় শঞর মূল্যের কথা বলা হল এজন্যে যে, অনেক দেশ অস্বাভাবিকভাবে পশু সম্পদের অভাব দেখা দেয় ও তার মূল্য চরমভাবে বৃদ্ধি পেয়ে যায়। আবার অনেক দেশে তার সংখ্যা বিপুল হয়ে দাঁড়ায় এবং খুব সস্তায় ক্রয় বিক্রয় হতে থাকে। এমতাবস্থায় মধ্যম বা গড়টাই সুবিচারপূর্ণ হবে। তখন এই পরিমাণ নির্ধারণের দায়িত্ব ওয়াকিফহাল ও সমঝদার সুধীদের উপর অর্পিত হবে।
নগদ কাগজী মুদ্রা ও তার বিচিত্রতা
কাগজী নোট বিশেষ ধরনের কাগজের টুকরা দিয়ে তৈরী হয় এবং বিশেষ চিত্র-দৃশ্য কারুকার্য সহকারে মুদ্রিত হয়। তাতে সুষ্ঠু ক্রমিক নম্বরও দেয়া হয়। তা সাধারণত আইনসম্মতভাবে একটা দাতব পরিমাণের বিকল্প ও প্রতিভূ হয়ে থাকে। তা সরকার বা সরকারের পক্ষ থেকে ভারপ্রাপ্ত কোন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রকাশ করা হয়। জনগণ তারই বিনিময়ে নিজেদের মধ্যে যাবতীয় লেন-দেনের কার্য সমাধা করে থাকে।
এই ধরনের নগদ মুদ্রা উপস্থাপন বর্তমান কালে একটা সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় সব রাষ্ট্রই এই ধরনে নোট প্রকাশ করার ব্যবস্থা করে। বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে লেন-দেনের সুবিধা ও ব্যাপকতার কারণে তা করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কেনা কেবল মাত্র ধাতব মুদ্রাই যথেষ্ট হতে পারে না এই প্রয়োজন পূরণের জন্যে। অর্থনৈতিক গতিধারা অব্যাহত রাখার জন্যে এছাড়া কোন গতি নেই।
নগদী কাগজী নোট ধাতব মুদ্রার সমান মর্যাদাও গণ্য হয়ে থাকে। কেননা এই দুটিই সমভাবে বিনিময় মাধ্যম হওয়ারেোগ্র।তা সত্ত্বেও কাগজী নোট মূল ও আসল মুদ্রা দেয়ার একটা প্রতিশ্রুতি মাত্র। তা ঋণ পরিশোধের কাজে ধাতব মুদ্রার ন্যায় কাজ দিতে সক্ষম। মানুষের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয় করা তার ভিত্তিতে খুব সহজও বটে।
নগদী কাগজী মুদ্রা তিন প্রকারের হয়ে থাকে: স্থিরীকৃত (Fixed), দলীলপত্র স্বরূপ (Documentary) এবং বাধ্যতামূলক (obligatory)।
১. স্থিরীকৃত যে সব চেক্ বা স্বর্ণ বা রৌপ্যের একটা পরিমাণের প্রতিভূ হয়। একটা নির্দিষ্ট বিনিময় ক্ষেত্রে আমানতকৃকত নগদরূপে কিংবা পিণ্ডরূপে (Ingot) যার খনিজ ধাতুব মূল্য চাওয়া মাত্র ভাঙ্গানো যোগ্য চেকের মূল্যের বিকল্প হবে। বলা যাবে যে, এই সব খনিজ ধাতুর নগদ মুদ্রা এই কাগজী চেকরূপে প্রকাশমান, যেন তা বহন করা ও স্থানান্তরিত করা সহজসাধ্য হয় এবং ক্ষয়ক্ষতি বা অবক্ষয়ের সম্মুখীন না হয়।
২. নগদ দলীল-পত্র রূপ। তা এমন চেক্ যা তার উপর সংকিত অংকের প্রতিশ্রুতি বহন করে যে, তার বাহক চাওয়া মাত্রই সেই নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পেয়ে যাবে। সরকারের অনুমতিক্রমে ব্যাংকসমূহ যেসব ব্যাংক নোট প্রকাশ করে সে সব নগদ ভাঙানোযোগ্য কাগজী নোট এই পর্যায়ের। তার জন্যে খনিজ ধাতুর অবশিষ্ট (Balance) মজুদ থাকে, যা ব্যাংক সংরক্ষণ করে এবং সে এর লাভ করতে চায় যা দেশীয় আইন উভয়ের মধ্যে নির্দিষ্ট করে দেয়। এর ফলে এই নগদ মুদ্রাটা নিরাপত্তাপূর্ণ ও দায়িত্ব গৃহীত (Secured) হয়। সব বিনিময় ক্ষেত্র, জনগণ এবং সাধারণ অর্থনীতি তাতে বিপুলভাবে উপকৃত হয়।
৩. বাধ্যতামূলক কাগজী নগদ, যাতে স্বর্ণ বা রৌপ্য ভাঙানোযোগ্য হয় না। তা দু’প্রকারের:
(ক) সকারী কাগজী নগদ।সরকার তা বিভিন্ন অনিয়মিত সময়ে প্রকাশ করে থাকে এবং তাকে প্রধান ও শীর্ষস্থানীয় নগদরূপে গুরুত্ব দেয়। কিন্তু তা আসল খনিজ ধাতুর সাথে বিনিময় হয় না। কোন ধাতব অবমিষ্টও তার মুকাবিলায় থাকে না।
(খ) ভাঙানোযোগ্য কাগজী নগদ (ব্যাংক নোট)। কর্তৃত্বপ্রাপ্ত ব্যাংক তা আইনের ভিত্তিতে প্রকাশ করে ও আসল ধাতুতে ভাঙাতে বাধ্য থাকে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর দুনিয়ার বড় বড় রাষ্ট্র ও বাধ্যতামূলক ভাঙানোযোগ্য নগদের ব্যবস্থা অনুসরণ করে চলেছে। স্থানীয়ভাবে সর্বপ্রকার বিনিময় প্রয়োজনের ভিত্তিতে সুসম্পন্ন হচ্ছে। আর বৈদেশিখ বিনিময়ের জন্যে অথবা উৎপাদনের বিনিময়ের জন্য প্রচুর বিশুদ্ধ ধাতু সংরক্ষণ করা হয়।
এ সব বাধ্যতামূলক নগদের মূল্য নির্ধারিত হয় বিধিদাতার ইচ্ছানুযায়ী। তার নিজের থেকে নয়। কেননা তা কোন পণ্যমূল্য বহন করে না। তার ভিত্তিতে বিনিময় অবলুপ্ত করে দেয়া হলেতার মূল্য হারিয়ে ফেলেকিন্তু যে নগদ মুদ্রা খনিজ সম্পদের বিনিময়ে ভাঙানো যায়, তাতে তার আইনগত মূল্য ও পণ্যমূল্যেল মধ্যে সমন্বয় সাধন করা হয়।
নগদ কাগজী সম্পদের যাকাত সংক্রান্ত শরীয়াতী হুকুম জানার আগে তার প্রকৃত ভূমিকা সম্পর্কে- ভূমিকা স্বরূপ এ সব কথা জানা জরুরী ছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, ধাতব নগদের বিরোধী কোন হুকুম কি তার জন্যে রয়েছে? থাকলে তা কি?
কাগজী নগদের যাকাত
কাগজী নগদ মুদ্রার প্রচলন সম্পূর্ণ এ যুগের ব্যাপার। এর পূর্বে এর প্রচলন কখনই ছিল না। ফলে আগের কালের আলিমগণ এ পর্যায়ে কোন অীভমত ব্যক্ত করে গেছেন, আমরা তা আশা করতে পারি না। এক্ষেত্রে যা কিছু রয়েছে, তা হচ্ছে এই যে, এ কালেল বহু মনীষী প্রাচীনকালের লোকদের মতামতের উপর ভিত্তি করে নিজেদের ফতোয়া রচনা চাতুরী করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ এসব নগদ, মুদ্রার উপর নিতান্ত আক্ষরিক বাহ্যিকভাবে দৃষ্টিপাত করেছেন। ফলে তাঁরা একে নগদ সম্পদই মনে করতে পারেন নি। কেননা তাঁদের মতে শরীয়াতী নগদ সম্পদ হ চ্ছে রৌপ্য ও স্বর্ণ। অতএব (তাঁদের মতে) কাগজী নোটের উপর যাকাত ধার্য হয় না।
মিসরের মালিকী মাযহাবপন্থী শায়খ আলীশ তাঁর সময়ে এ বিষয়ে ফতোয়া দিয়েছেন। তাঁর কাছে বাদশাহ্র সিলযুক্ত কাগজের বিষয়ে- যা দিরহাম- দীনারের মত পারস্পরিক বিনিময়ে ব্যবহৃত হচ্ছে- ফতোয়া চাওয়া হয়েছিল। তিনি একবাক্যে ফতোয়া দিয়েছিলেন যে, তাতে যাকাত ফরয নয়।
কোন শাফেয়ী আলিমও তাতে যাকাত নেই বলে ফতোয়া দিয়েছেন। তবেতার মূল্য বাবদ রৌপ্য বা স্বর্ণ হাতে পেলেও একটি বছর অতীত হলে তখন তার উপর যাকাত ধার্য হবে। তা এ জন্যে যে, কাগজী লেনদেনের শরীয়াতের বিচারে জায়েয নয়। কেননা তাতে কোন অর্পণ ও গ্রহণের শব্দ লিখিত নেই।
‘আল-ফিক্হ আলাল-মাযহাবিল আরবায়া’ গ্রন্থে লিখিত হয়েছে:
১. শাফেয়ী মাযহাবের আলিমগণ বলেছৈন: নগদী কাগজ (বা কাগজ নগদ)-এর ভিত্তিতে পারস্পরিক লেন-দেন ও মুয়ামিলা করা তার মূল্য দেয়ার জন্যে ব্রাংকের উপর দায়িত্ব অর্পণ পর্যায়ের কাজ। তাই ব্রাংকের উপর ঋণ হিসেবে তার মূল্যেল মালিক হওয়া যাবে। ব্যাংক তা দিতে সদা প্রস্তুত। আর কোন ঋণগ্রস্ত (Debtor) ব্যক্তি এই পরিচিতির হলে তখনকার অবস্থার দৃষ্টিতে তার উপর যাকাত ফরয হবে। আর হাওয়ালায় গ্রহণের শব্দদ্বয় না থাকলেও যা থাকাই স্বাভাবিক- তা বাতিল হবে না।
তবে কোন শাফেয়ী আলিম বলেছৈন, অর্পণ ও গ্রহণ বলতে বোঝায় সেই সব কথা বা কাজ, যার দ্বারা উভয়ের রাযী থাকার কথা জানা যাবে। আর এই উভয়ের রাযী থাকার প্রয়োজন সুস্পষ্ট।
২. হানাফী ফিকাহ্বিদগণ বলেছেন: ধন-সম্পর্কিত কাগজ বা ব্যাংক নোট শক্তিশালী ঋণপত্রের মধ্যে গণ্য। তবে তা তৎক্ষণিকভাবে রৌপ্যের বিনিময়ে ভাঙানো যায়। অতএব তাতে যাকাত ফরয হবে।
৩. মালিকী ফিকাহ্বিদগণ বলেছৈন: ব্যাংকের নোট যদিও ঋণের সনদ বিশেষ, কিন্তু তা তাৎক্ষণিকভাবে রৌপ্যে ভাঙানো যায়। আর পারস্পরিক লেন-দেনে তা স্বর্ণের মূল্যাভিষিক্তি গণ্য হবে। অতএবতার উপর যাকাত ফরয হবে তার শর্তাবলীসহ।
হাম্বলী মাযহাবের লোকেরা বলেছেন: কাগজী নগদে যাকাত ফরয নয়; যতক্ষণ তা স্বর্ন বা রৌপ্যে ভাঙানো নাযাবে এবং তাতে যাকাতের শর্তাবলী পাওয়া না যাবে।
বিভিন্ন মাযহাবের এসব মতামতের ভিত্তি হচ্ছে, তা প্রমাণকারী ব্যাংকোর উপর ঋণ প্রমাণকারী এসব সনদরূপে গণ্য এবং তাৎক্ষণিকভাবে রৌপ্য দ্বারা তার মূল্য ভাঙানো যেতে পারে। অতএব তার উপর তখনই যাকাত ফরয হবে- তিন মাযহাবের মত তা-ই। আর হাম্বলী মতে তা কার্যত ভাঙানো হলেই যাকাত ফরয হবে। আর আমরা জানি, আইন ব্যাংক নোটকে স্বর্ণ বা রৌপ্যে ভাঙানোর বাধ্যবাধকতা থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছে। এ থেকেই বের হয়ে আসে সেই ভিত্তি, যার দরুন এসব কাগজী নোটের উপর যাকাত ফরয হওয়া প্রমাণিত হয়।
এ সব কাগজী নোট জনগণের পারস্পরিক মুয়ামিলা সম্পন্ন করার ভিত্তি। জনগণ কখনই রৌপ্য বা স্বর্ণমুদ্রা চোখে দেখতে পারে না। সম্পদ ও পারস্পরিক লেন-দেন বিনিময়ের ভিত্তিতেই হচ্ছে এ কাগজী মুদ্রা।
এবং কাগজী নোট শরীয়াতসম্মত কৃতৃত্বের আস্থাক্রমে ও পারস্পরিক মুয়ামিলারই ভিত্তিতে সম্পন্ন হয় বলে তা-ই দ্রব্যের মূল্য ও মূলধন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রয় ও বিক্রয় তার দ্বারা সাধিত হয়। মজুরী, মাসিক বেতন ও ক্ষতিপূরণ ইত্যাদিও তাতে দেয়া হয়। তার যতটা পরিমাণেই কেউ মালিক হলে ধনীরূপে গণ্য হতে পারে। প্রয়োজন পূরণে স্বর্ণ ও রৌপ্যের শক্তিলাভ তার হাতে আসে। সে সহজেই বিনিময় কার্য সম্পন্ন করতে পারে। উপার্জনও করতে পারে, মুনাফাও লাভ করতে পারে। এ দিক দিয়ে তা ক্রমবৃদ্ধিশীল সম্পদ বটে, অন্তত তার দ্বারা প্রবৃদ্ধি সাধিত হতে পারে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাই তা স্বর্ণ ও রৌপ্যের মর্যাদাসম্পন্ন।
এটাই সত্য যে, স্বর্ণ ও রৌপ্যের অর্থগত মর্যাদা তার নিজস্ব। কেননা তা পকৃত ধাতব ও খনিজ দ্রব্য। তা নগদ মুদ্রা হিসেবে কখনো অকেজো হয়ে গেলেও তার ধাতুগত মূল্য তো কোন দিনেই হারিয়ে যাবে না। কিন্তু শরীয়াতের যে মৌল ভাবধারা ও তৎসংক্রান্ত যেসব অকাট্য দলীল তাতে বোঝা যায় যে, স্বর্ণ ও রৌপ্যের উপর যাকাত ফরয হয় শুধু সে দুটোর অর্থনৈতিক সরবত্তার কারণে। কেননা সব মালেই তো আর যাকাত ফরয হয় না। হয় কেবল সেই ধন-মালে যা প্রবৃদ্ধি প্রবণ। আর স্বর্ণ ও রৌপ্যকে প্রবৃদ্ধি-প্রবণরূপে শরীয়াতে গণ্য করা হয়েছে এ দৃষ্টিতে যে, সে দুটো দ্রব্যের মূল্য বিশেষ। তাহলে বলা যায়, এ দুটোর অর্থনৈতিক গুরুত্বের সাথে সাথে সেদুটোর মূল্যত্বও বিবেচিত হয়েছে। এ কারণে বহু সংখ্যক কিতাবে স্বর্ণ রৌপ্যের যাকাত পর্যায়ের আলোচনার শিরোনাম দেয়া হয়েছে; ‘মূল্যসমূহের যাকাত’ কিংবা ‘দুই নগদ সম্পদের যাকাত।’
এই কারণে এ কথা বলা সম্ভব নয় যে, কোন কোন মাযহাবের লোকেরা এ সব কাগজী নোটের যাকাত দেয়ার প্রয়োজন মনে করেন না। আর সেজন্যে হাম্বলী বা মালিকী কিংবা শাফেয়ী মাযহাবের নাম করা হবে। আসলে এ ব্যাপারটি সম্পূর্ণ অভিনব। মুজতাহিদ ইমামগণের যুগে কোন দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে না। ফলে কিয়াস করার মত কোন ভিত্তিই সেখানে নেই।
এই কারণে বলতে হবে যে, এ ব্যাপারে আমাদরেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও নতুনভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। করতে হবে এ যুগের অবস্থা, পরিবেশ পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে।
শায়খমুহাম্মাদ হাসনাইন মখলুফ তার পুস্তিকা (আরবী******) –এ যা লিখেছেন; যাকাতের পরিমাণ নির্ধারণে তা এখানে উল্লেখ করতে চাই। কাগজী সম্পদের যাকাত দেয়া এই চিন্তা করে যে, তা ঋণের যাকাত- যা প্রাচীন ফিকাহ্বিদগণ জানতেন- তিনি তার সমর্থন করেছেন এবং এ কাগজী নোটকে ঋণেল বস্তুরূপে গণ্য করেছেন; বলেছেন, তার উপর যাকাত ফরয হয় শুধু তাদের মতে, যারা বলেন যে, সেই ঋণের যাকাত তার হাতে দিয়ে দেয়াকেশর্ত করা যায় না যদি তা কোন স্বীকারকারীর প্রতি নির্দেশমূলক হয়। এ কথা সুস্পষ্ট যে, ঋণের যাকাতের ভিত্তিতে এই কাগজী নোটের যাকাত দেয়া- তাতে গরীবদের উপর অবিচল হলেও- এসব কাগজে মুদ্রিত মূল্যের হিসেবে একটি ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির যিম্মায় থাকা প্রকৃত ঋণের মতই এবং এসব কাগজী নোট প্রকৃত ঋণের মতই মনে করতে হবে।
তা সত্ত্বেও এসব কাগজী নোটের ও তাতে যে মূল্য মুদ্রিত আছে এবং প্রকৃত ঋণ- এ দুয়ের মাঝে বড় পার্থক্য রয়েছে। কেননা ঋণের টাকা যতক্ষণ পর্যন্ত কোন উপকার ও লাভ করতে পারে না। কেননা তা উপস্থিতনগদ ও প্রবৃদ্ধিশীল সম্পদ নয়। কিন্তু এ সব কাগজী নোটের মূল্য সেরূপ নয়, তা তো ক্রমবর্ধনশীল, তা ব্যবহার করা চলে। যেমন উপস্থিত সম্পদ দ্বারা উপকৃত হওয়া সম্ভব হয়ে থাকে। তাহলে কেমন করে বলা যেতে পারে যে, এই নোটগুলো ঋণের বস্তু বা সনদের মত? ঋণের সনদ তো তা-ই, যা ঋণীকে দায়ী করার জন্যেও ক্ষয়ের ভয়ে গ্রহণ করা হয়ে থাকে। ঋণীর যিম্মায় ঋণ বৃদ্ধিসাধনের উদ্দেশ্যে নয়। তা দিয়ে কায়-কারবার করার উদ্দেশ্যেও নয়। এ কথাই বলা যেতে পারে কি ভাবে যে, তার বিকল্প স্বর্ণ বা রৌপ্য হাতে না লওয়া পর্যন্ত তার উপর যাকাত ধার্যহবে না? অথচ ঋণের টাকায় যাকাত না হওয়া তো এজন্যে যে, তা প্রবৃদ্ধিশীল নয় এবং ঋণী ব্যক্তির ভাণ্ডারে তা যথাযথভাবে সংরক্ষিতও নেই।
ফিকাহ্বিদগণ ঋণের যাকাত না দেয়ার কথা বলেছেন যতক্ষণ তা ঋণীর হাতে থাকবে, তা মালিকের হাতে ফিরে না আসবে, তা তো এই কারণে। শাফেয়ী মাযহাবে সচ্ছল অবস্থার লোকের চলতি ঋণকে যাকাতের ক্ষেত্র থেকেবাদ দেয়া হয়েছে। কেননা সে তো গচ্ছিত ধনের ন্যায় হাতে আসারপূর্বেই যাকাত দিতে থাকে। এ কথা মনে করে যে, তা তার হাতেই রয়েছে এবং ক্রমবৃদ্ধির উপযুক্ত ও প্রস্তুত। যদিও তা প্রবৃদ্ধি ধরে নেয়া হয়- যেমন কাগজী নোটের বিকল্প রয়েছে- তা হলেতাতে হাতে আসার পূর্বপর্যন্ত যাকাত মওকুফ হওয়ার কোন কারণ থাকে না, কোন আলিমও তার পক্ষেম মত দিতে পারেন না।
সত্যি কথা হচ্ছে, এ এক ভিন্ন ধরনের ঋণ, সম্পূর্ণ নতুন। প্রকৃত ঋণের সাথে তা খাপ খায় না। ফকীহ্দের পরিচিত শর্তাবলীও তাতে চলে না। ঋণের যাকাতে যে মতবিরোধ রয়েছে, তা-ও এ ক্ষেত্রে নিতান্তই অবাস্তব। বরং যাকাত ফররয হওয়াটা সর্ববাদীসম্মত হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
শেষ পর্যন্ত বলেছেন, যদি মনে করা হয় যে, ব্যাংকে নগদ সম্পদ কিছুই নেইএবং শুধু এসব কাগজী নোট দেখতে পাওয়া গেল তার বিকল্প থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে, তার উপর লিখিত প্রতিশ্রুতির বাধ্যবাধকতার প্রতি নজর না দিয়েতা সরকার প্রকাশ করেছেন শুধু এতটুকু গণ্য করে এবং তার প্রচলিত মূল্যের কারণটা গণ্য করে তবুও তার যাকাত দেয়া ফরয হবে। কেননা তার শুধু মূল্যত্বের কারণেই স্বর্ণ-রৌপ্য দুইনগদ সম্পদের যাকাত ফরয হয়েই থাকে- তা সৃষ্টিগতভাবে না হলেও। যেমন পূর্বে পয়সা, চাকমড়া ও কাগজের উপর যাকাত ফরয হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ থেকে জানা গেল, অর্থ সংক্রান্ত কাগজী নোটের উপরও যাকাত হবে চারটি কারণে:
প্রথম, অর্থের হিসেবে- ব্যাংকের যিম্মায়যে দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে সেই হিসেবে। আর তা পূর্ণ মাত্রায় উপস্থিত, হস্তগত।যদিও সব দিক দিয়েতা ফিকাহ্বিদদের কাছে পরিচিত ঋণ নয়্
দ্বিতীয়, তার যাকাত হবে ব্যাংকের ভাণ্ডারে রক্ষিত মাল হিসেবে। আর এ দুটি দিক দিয়ে তাতে যাকাত ফরয সর্ববাদীসম্মতরূপে।
তৃতীয়, তার যাকাত হবে ব্যাংকের যিম্মায় অর্পিত ঋণ হিসেবে। অতএব নির্দেশ হিসেবে উপস্থিত ঋণের যাকাত মনে করে যাকাত দিতে হবে।
চতুর্থ, তার যাকাত হবে তার প্রচলিত মূল্য হিসেবে, যা পারস্পরিক মুয়ামিলা তার ভিত্তি চলাকালে স্বীকৃত হয়, আর মূল্য হিসেবে তা গ্রহণকরণ জনগণের ঐকমত্যের কারণে। অতএব তাতে যাকাত হওয়াটা কিয়াসের ভিত্তিতে প্রমাণিত, যেমন পয়সা ও তামার যাকাত হয়।
আমি বলব, এই শোষোক্ত বিবেচনায় বাধ্যতামূলক কাগজী নগদের ক্ষেত্রে যা এক্ষণে সর্বোত্তম বিনিময় ও মুয়ামিলা-মাধ্যম এবং যার মুকাবিলায় ব্যাংকে ধাতব অবশিষ্ট সংরক্ষণের শর্ত করা হয়নি; ব্যাংক তা রৌপ্যও স্বর্ণে ভাঙাতে বাধ্য হয় না- ফিরে যাওয়া কর্তব্য।
এ সব কাগজী নোট গ্রহণ করে প্রথম ব্যবহারকালে যাকাত ফরয হওয়া সম্পর্কে ভিন্ন মত রয়েছে। কেননা জনগণের তার প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস অর্জিত হয় না, যা প্রত্যেকটি নতুনের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। এক্ষণে যদিও অবস্থার সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে।
এ সব কাগজী নোট নগদ টাকা হিসেবে প্রত্যেক রাস্ট্রেই প্রচলিত হয়ে পড়েছে, যেমন ধাতব নগদ অর্থ প্রচলিত হয়েছে। সমাজ দুটোকে একই দৃষ্টিতে দেখে থাকে।
তা মোহরানা হিসেবে দেয়া যেতে পারে। কোন প্রকার আপত্তি ছাড়াই তার ভিত্তিতে বিয়ে শুদ্ধ ও সংঘটিত হবে।
মূল্য হিসেবেও তা দেয়া চলবে। কোনরূপ চুক্তি ব্যতিরেকেই তা দিয়ে পণ্য গ্রহণ করা যাবে।
শ্রমের মজুরী হিসেবেও তা দেয়া যাবে। কর্মের পারিশ্রমিক হিসেবে তা গ্রহণ করা যাবে।
‘ভুলবশত হত্যাকাণ্ডের’ রক্তমূল্য হিসেবেও তা দেয়া যাবে। প্রায় ইচ্ছামূলক হত্যার রক্তমূল্যও তা-ই। তার ফলে হত্যাকারী নিষ্কৃতি পেতে পারবে। নিহতের অভিভাবক তা পেয়ে রাযীও হবে। তা চুরি করলে চুরির শাস্তি ভোগ করতে হবে। কোনরূপ সন্দেহ ছাড়াই।
তা সঞ্চয় করা যাবে, তার মালিক হওয়াও সংগত হবে। যে পরিমাণ সম্পদ থাকলে কেউ ধনী গণ্য হতে পারে, তা এ সম্পদের মালিকানায়ও কার্যকর হবে তা কারোর কাছে বেশী পরিমাণ জমাহলে সে তার নিজের কাছেও এবং সমাজের কাছেও মালদার ব্যক্তিরূপে গণ্য হবে।
এসব কথার তাৎপর্য হল, এ কাগজী নোটের শরীয়াতসম্মত নগদ হওয়ার ভূমিকা রয়েছে। তার গুরুত্ব স্বীকৃব্য। সমাজ সমষ্টিরও এ দৃষ্টি রয়েছে তার উপর। তা হলে এসব নগদ মুদ্রার ফায়দা গ্রহণ ও তার বহুমুখী ভূমিকা পালন থেকে গরীব-মিসকীন ও অন্যান্য সমস্ত পাওনাদারদের বঞ্চিত রাখা যাবে কি করে? সমস্ত মানুষ কি নির্বিশেষেতা পাওয়ার জন্যে চেষ্টা করছে না? তার মালিক কি তাকে এমন নিয়ামত মনে করে না, যার শোকার করা ফরয হয়? ফকীর-মিসকীনরা কি তার প্রতি করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে না? তা পাওয়ার জন্যে কি তাদের মনের ইচ্ছা বা লোভ জেগে উঠে না? তার সামান্য কিছুও তাদের দিলে তারা কি খুশীতে নেচে উঠবে না?… হ্যাঁ নিশ্চয়ই তা হয়।
এ আলোচনার উপসংহারে এসে আমি কতিপয় অর্থনীতিবিদের সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করতে চাই। বলা যায়, এ নগদ কাগজী নাট সমূহ সম্পূর্ণ ব্যবহৃত হয় মূল্যের ধারণায়, বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে, সঞ্চয়ের সম্পদরূপে, তাহলে কোন্ জিনিসটি একে নগদের ভূমিকা পালনের উপযুক্ত করে দিল? যে জিনিস দিয়েতা তৈরী এবং তার বিনিময়ের মাধ্যমহওয়ার অবস্থা থেকেই দৃষ্টি ফিরিয়েই একথার জবাব ঠিক করতে হবে। কাজেই যতক্ষণ তাতে এমন বস্তুত্ব থাকবে যার দরুন তা সমাজের উৎপাদনকারীরা গ্রহণ করবে তারা যা বিক্রয়করেতার বিকল্প হিসেবে। অতএব এ বস্তুতই হচ্ছে নগদ সম্পদ।
নগদ সম্পদে যাকাত ফরয হওয়ার শর্ত
শরীয়াত নগদ সম্পদের সকল পরিমাণের উপর যাকাত ফরয করেনি। তা কম হোক, কি বেশী। সব সময়ও তা ফরয নয়- সে সময় দীর্ঘ হোক কি সংক্ষিপ্ত। সকল মালিকের উপরও- তার পরিবেশ-পরিস্থিতি ও প্রয়োজনের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে- ফরয করা হয়নি। বরঞ্চ নগদ সম্পদে যাকাত ফরয হওয়ার কতগুলো সুনির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে। সে শর্তসমূহের গুরুত্ব ঠিকতা-ই, যা যাকাত ফরয হওয়া সব ধনমালেই রয়েছে।
১. নিসাব পরিমাণ হওয়া
তার জন্যে প্রথমশর্ত হচ্ছে, এ নগদ সম্পদ নিসাব পরিমাণ হতে হবে। আর নিসাবতো শরীয়াতে ধনীর জন্যে ধনের নিম্নতম পরিমাণের মালিকানা।তার কম হলে তা সামান্য মাল গণ্য হবে। তার উপর যাকাত ফরয হবে না। তার মালিকও এ মালিকানার দরুন ধনী গণ্য হবে না।
ইতিপূর্বেকার আলোচনা থেকে প্রচলিত মুদ্রার নগদ সম্পদের নিসাবের পরিমাণটা ভালভাবেই জানা গেছে। আমরা দেখিয়েছি নগদ সম্পদের নিসাব যে পরিমাণ যা ৮৫ গ্রাম স্বর্ণের মূল্যের সমান। আর তা-ই দীনারের সমান, যার সমর্থনে হাদীসের উদ্ধৃতি হয়েছে এবং ব্যাপারটি চূড়ান্তভাবে মীমাংসিত হয়ে গেছে।
নিবাস পরিমাণের একক মালিক হওয়া কি শর্ত?
অনেক কয়েকজন লোকের শরীকানাভুক্ত মাল সমষ্টিগতভাবে যদি নিসাব পরিমাণ হয়, কিন্তু শরীকদের প্রত্যেকের আলাদা-আলাদা মালিকানার সমষ্টি নিসাব পরিমাণ না হয়, তাহলে সেই শরীকানা সম্পদের সামষ্টিক পমিাণের উপর যাকাত ফরয ও ধার্য হবে কি?
এ বিষয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। আবূ হানীফা ও মালিক)(র) মত দিয়েছেন যে, শরীকদ্বয়ের কারোর উপরই যাকাত ফরয হবে না, যতক্ষণ না তাদের প্রত্যেকের উপর আলাদা-আলাদাভাবে যাকাত ফরয হচ্ছে।
ইমাম শাফেয়ীর মত হল সম্মিলিত সামষ্টিক সম্পদ এক ব্যক্তির মালিকানা সম্পদের মতই। নিসাব হলে তাতে যাকাত ধরা হবে।
এই মতবিরোধের কারণও রয়েছে। ইবনে রুশ্দ উল্লেখ করেছেন, খোদ নবী করীম(স)-এর কথায়ও অস্পষ্টতা রয়েছে। তাঁর বাণী হল: ‘পাঁচ আউকিয়ার কম পরিমাণে যাকাত নেই।’ হতে পারে তিনি এ পরিমাণটার কথা বলেছেন একক মালিকানা সম্পদের ক্ষেত্রে। হতে পারে, এ হুকুমটি তিনি একক মালিকানা ও একাধিক মালিকানা উভয় ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্যরূপে বলেছেন। তবে এ নিসাব নির্দিষ্ট করার মূলেযেহেতু দয়া প্রদর্শনই মৌল ভাবধারা, তাই এ শর্তটি একক মালিকানার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়াই বাঞ্ছনীয়। আর সেটাই অধিক যুক্তিসংগত।
ইমাম শাফেয়ীর মতটি গবাদিপশুর ক্ষেত্রে সংমিশ্রণের মধ্যেই এ শরীকী মালিকানাকে মনে করেছেন। কিন্তু সংমিশ্রণের প্রভাব ক্রিয়া সর্ববাদীসম্মত নয়?
তবে জম্হুর ফিকাহ্বিদদের মত হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে আপেক্ষিক ব্যী্ত-স্বতন্ত্র কিংবা তাপর্যগত শরীকানা গণনার যোগ্য নয়। কেননা এই শরীকানার অংগ-সমূহ- সদস্যগণ গরীবদের অংশের সমষ্টির ভাগীদার। আর যাকাত ধনী লোকদের কাছ থেকে এজন্যেই নেয়া হয়, যেন তা গরীবদের মধ্যে বন্টন করা যায়। কাজেই এক্ষণে ঐসব লোক তো সেই পর্যায়ের, যাদের মধ্যে যাকাত বন্টন করা হবে, সেই লোকদের মধ্যে গণ্য নয় যাদের কাছ থেকে যাকাত গ্রহণ করা হবে। বেশ কয়েকজন লোকের নিসাব পরিমাণ সম্পদের অংশীদারিত্বে একত্রিত হওয়াটায় তাদের মধ্যকার গরীবরা তো আর ধনী হয়ে যাবে না।
তবেসংগতি সাধনে ইমাম শাফেয়ীর মতটির ভূমিকা কার্যকর। এ কালেল রাষ্ট্রসমূহের প্রতি দৃষ্টি দিলেতা-ই মনে হয়। এটা সম্ভব যে, ঋণগ্রস্তরা যাকাতের একটা নির্দিষ্ট হার কোম্পানীর জন্যে ছেড়ে দেবে, যেন তা গরীব অংশীদারদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। তাতে একই সঙ্গে দুটি নেক কাজের সমন্বয় হবে।
২. একটি বছরকাল অতিবাহিত হওয়া
নগদ সম্পদের নিসাব পরিমাণ হওয়ার পর এ পর্যায়ের দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে তার মালিকানার একটি বছর অতিবাহিত হতে হবে। এ কথাটি সর্ববাদীসম্মত অব্যাবহৃত সম্পদের ক্ষেত্রে। অর্থাৎনগদ সম্পদের যাকাত বছর মাত্র একবারই ফরয হবে।তাই যে-মালেরই যাকাত একবার দেয়া হল, তার উপর একটি পূর্ণ বছর অতিবাতি হওয়ার পূর্বে তার যাকাত পুনরায় দিতে হবে না।
হানাফী ফিকাহ্বিদদের মতে বছরের শুরু ও শেষ উভয় কালেই পূর্ণ মাত্রায় নিসাব বর্তমান থাকা যাকাত ফরয হওয়ার জন্য শর্ত। বছরের শুরুতে ধার্য হবে আর বছরের শেষে দিয়ে দেয়া ফরয হবে। মাঝখানে কম হয়ে গেছে কোন ক্ষতি হবে না- যাকাত থেকে নিসাব পাওয়া যাবে না, তবে বছরের মাঝখানে সম্পূর্ণ সম্পদ ধ্বংস বা বিনষ্ট হয়ে গেলেসে বছর গণনা পরিত্যক্ত হবে। পরে নতুনভাবে সম্পদের মালিকানা শুরু হলে তখন থেকে আবার বছর গণণা শুরু হবে।
তিনজন ইমাম সারাটি বছরকালধরে নিসাব-মাত্রা পূর্ণ অপরিবর্তিত থাকার কথা বলেছেন।তাঁদের দলীল হচ্ছে এই হাদীস:
(আরবী******)
একটি পূর্ণ বছর অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত কোন মালের যাকাত ফরয হবে না।
এ হাদীসের দাবি হচ্ছে সারাটি বছর সমানভাবে নিসাব পরিমাণ বর্তমান ও অক্ষুন্ন থাকা। এ দাবিও রয়েছে যে, বছরের শুরু ও শেষেযা গণ্যহবে মাঝখানেও তা গণ্য হতে হবে। আর তা হচ্ছে মালিকত্ব এবং মুসিলম হওয়া।
আর যে সম্পদ নগদ সম্পদ ব্যবহৃত হচ্ছে- যেমন বেতন, মজুরী, ক্ষতিপূরণ, কাফ্ফারা, স্বাধীন পেশাধারী- চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী প্রভৃতিকে দেয় অথবা ফলপ্রসূ বাসোপযোগী দালান-কোঠা, শিল্পকারখানা, হোটেল-রেস্তোঁরা প্রভৃতি স্থায়ী কাজে এবং গাড়ি ও উড়োজাহাজ প্রভৃতি অস্থায়ী কাজে মূলধন বিনিয়োগ- এই সব ক্ষেত্রেই জমহুর ফিকাহ্বিদদের মত হচ্ছে সারাটি বছর নিসাবমান অক্ষুণ্ণ থাকা। ইমাম আবূ হানীফা বলেছেন: কাজে বিনিয়োগকৃত সম্পদ নগদ সম্পদের সাথে যোগ করে বছরান্তে হিসাব করে সমস্তটাই যাকাত দিতে হবে উক্ত মালের বছর হিসেবে। তবে বিনিয়োজিত মাল যাকাত দেয়া মালের বিকল্প হলে অন্য কথা।
কোন কোন সাহাবী থেকে এর বিপরীত মত পাওয়া গেছে। তাঁরা বিনিয়োগকৃত মালের যাকাত দেয়ার কথা বলেছেন যখনই তা হাতে ফিরে আসবে। তখন বছর অতিবাহিত হওয়ার শর্তে নয়।
পরে এ পর্যায়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব।
৩. ঋণমুক্তি
যে নিসাব পরিমাণ নগদ সম্পদের উপর যাকাত ফরয হবে, সে জন্যে শর্ত হচ্ছে যে, তাকে অবশ্যই ঋণমুক্ত হতে হবে। যেন ঋণ গোটা নিসাব পরিমাণকে গ্রাস বা হ্রাস করতে না পারে। এ পর্যায়ে এ অধ্যায়ে এ প্রথম পরিচ্ছেদে আমরা আলোচনা করে এসেছি। এর পক্ষের দলীলাদিও তথায় উল্লেখ করেছি।
হানাফীদের মতে যে ঋণ যাকাত ফরয হওয়ার প্রতিবন্ধক, তা হচ্ছে সেই ঋণকে যার জন্যে নানাবিধ দাবি প্রবল হয়ে আছে, তা আল্লাহ্র দিকে হোক- যেমন, যাকাত, খারাজ কিংবা জনগণের দিক থেকে- যেমন সাধারণ দায়-দেনার ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। এতে কোন পার্থক্য হবে না। তবে মানত, কাফ্ফারা, হজ্জ ইত্যাদির ঋণের কথা এখানে প্রযোজ্য নয়। কেননা এগুলোর জন্যে জনগণের দিক থেকে কোন দাবির চাপ নেই।
দীর্ঘ মেয়াদী ঋণের ব্যাপারে মতবিরোধ রয়েছে। তা যাকাতের প্রতিবন্ধক হবে কি না, তাতে আলিমগণ একমত নন।
ইমাম নববীর কথানুযায়ী শাফেয়ীর মত হচ্ছে, আমরা যখন বলি যে, ঋণ যাকাতের প্রতিবন্ধক, তখন এ কথাই বুঝি যে, সে ঋণ আল্লাহ্র হোক বা মানুষের, তাতে কোন পার্থক্য হবে না।
৪. মৌল প্রয়োজনের বাড়তি হওয়া
হানাফী ফিকাহ্বিদদের মধ্যকার বিশেষজ্ঞগণ এ পর্যায়ে শর্ত আরোপ করেছেন যে, নগদ সম্পদের নিসাব হতে হবে মালিকের মৌল প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদের। ‘মৌল প্রয়োজন’ কি, তার ব্যাখ্রায় ইমাম মালিকের মত আমরা পূর্বেই উদ্ধৃত করেছি। তা হচ্ছে, যা মানুষকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে, তা-ই মৌল প্রয়োজন। যেমন দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় ব্যয়, বসবাসের বাড়ি-ঘর, যুদ্ধের অস্ত্রাদি, শীত গ্রীস্মের প্রয়োজনীয় পোশাক এবং ঋণ। ঋণও মৌল প্রয়োজনের মধ্যে শামিল এ জন্যে যে, তা দিতে সে বাধ্য। হাতে রক্ষিত নিসাব পরিমাণ সম্পদ থেকে হলেও। অন্যথায় সে ঋণদাতার মামলা ও তজ্জনিত কারাবরণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারবে না। আর কারাবরণ তো ধ্বংসেরই শামিল। পেশার কাজের যন্ত্রপাতি ও ঘরের সরঞ্জামাদি এবং যানবাহন ও পড়ার বইও এর মধ্যে গণ্য। কেননা তাঁদের মতে মূর্খতা ধ্বংস বিশেষ। কারো কাছে যদি এ পরিমাণ পয়সা থাকে, যা এসব প্রয়োজন পূরণে ব্যয় হয়ে যাবে, তাহলে তার কিছুই নেই মনে করতে হবে। যেমন পিপাসা নিবৃত্তির জন্যে প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি থাকলেতা নেই মনে করেই ওযুর পরিবর্তে তায়াম্মুম করা তার জন্যে জায়েয।
তাই যে মুসলমান যাকাতের নিসাব পরিমাণ নগদ সম্পদের মালিক হবে; কিনতউ তার পরিবারবর্গের শীত বা গ্রীস্মের প্রয়োজনীয় কাপড় ক্রয়ে তা ব্যয়ের প্রয়োজন হয়ে পড়বে অথবা প্রয়োজনীয় গ্রন্থাদি খরিদে ব্যয় হয়ে যাবে। কিংবা ঋণ শোধে- যার দুশ্চিনতায় সে দিন রাত অস্থির- তা ব্যয় হয়ে যাবে অথবা অন্যান্য জরুরী প্রয়োজনে লেগে যাবে, তাহলে তার উপর যাকাত ফরয হবে না।
এতটুকু পরিমাণ মূলধনের মালিক কখনও এমন ধনী বলে গণ্য হবে না, যাতে তার উপর যাকাত ফরয হতে পারে। কেননা হাদীস অনুযায়ী যাকাত তো কেবল ধনীদের কাছথেকেই গ্রহণ করা হবে। সে তো উপরিউক্ত ধরনের বহুবিধ প্রয়েঅজন পূরণে নিতান্তই নাজেহাল। এগুলো তার জীবনের মৌল প্রয়োজন। আর রাসূলে করীম (স) বলেছেন: ‘যাকাত হবে শুধু প্রকাশমান ধনের উপর।’ যেমন বলেছৈন: ‘তুমি শুরু কর তোমার পরিবারবর্গ থেকে।’
দ্বিতীয় আলোচনা
অলংকারাদি, তৈজসপত্র ও স্বর্ণ-রৌপ্য নির্মিত উপঢৌকনাদির যাকাত
স্বর্ণ-রৌপ্যর যাকাত পর্যায়ে শেষ আলোচনা ব্যবহার্য পাত্রাদি ও সৌন্দর্য জাঁকজমক বিধানের উপঢৌকনাদি, মানুষ বা জীব ইত্যাদির প্রতিমূর্তি অথবা নারী-পুরুষের অলংকারাদিতে ব্যবহৃত স্বর্ণ-রৌপ্যের যাকাত সম্পর্কিত তথ্যাদি উপস্থাপন জরুরী। প্রশ্ন হচ্ছে, এসবে ব্যবহৃত স্বর্ণ-রৌপ্যের যাকাত ফরয হবে কি? না তার কোন-কোনটিতে ফলয হবে, আর কোন-কোনটিতে হবে না।
স্বর্ণ-রৌপ্য পাত্রাদি ও উপঢৌকনাদির যাকাত
যে সব জিনিস ব্যবহার হারাম, তা স্বর্ণ-রৌপ্য দ্বারা নির্মাণ করা হলে তাতে যাকাত ফরয হবে। এব্যাপারে আলিমগণের মধ্যে কোন মতবিরোধ নেই।
যেসব পাত্র ব্যবহার হাদীসে হারাম ঘোষিত হয়েছে এবং সে জন্যে কঠিন আযাবের ভয় দেখানো হয়েছে, যা জাঁকজমক ও বিলাসিতার প্রতীক, তারউপর যাকাত ফরয হবে। কেননা তা এক্ষণে সঞ্চিত নগদ সম্পদ ও অপ্রয়োজনে আটকে রাখা ঐশ্বর্য মনে করতে হবে। তন্মধ্যে যে সব পাত্র নিত্যকার পানাহারে ব্যবহৃত হবে, আর যা শুধু চাকচিক্য ও সৌন্দর্যের জন্যে ব্যবহৃত হবে, তা সবই সমান হবে। কেননা এ উভয়টাই নিন্দিত বিলাসিতার মধ্যে গণ্য। ‘আল-মুগনী’ গ্রন্থে লিখিত হয়েছে, যা ব্যবহার করা হারাম, ব্যবহার্য দ্রব্যের আকারে তা গ্রহণ করাও হারাম। তাতে নারী ও পুরুষ অভিন্ন। কেননা হারাম হওয়ার মূল কারণটা উভয়ের মধ্যে কার্যকর। তা হচ্ছে অপচয়, বেহুদা খরচ ও বড় মানুষী, বাহাদুরী, অহংকার প্রকাশ এবং তার ফলে গরীবলোকদের মনে আঘাত হানা। অতএব উভয়ের জন্যে তা সমানভাবে হারাম হবে। তবে স্ত্রীলোকের জন্যে অলংকার ব্যবহার জায়েয করা হয়েছে তাদের বিশেষ প্রয়োজনে। স্বামীর জন্যে সাজসজ্জা করা স্ত্রীর কর্তব্যের মধ্যে গণ্য। কিন্তু তা তৈজসপত্র বা অন্যান্য পাত্রাদির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অতএব তা হারামই থেকে যাবে।
প্রতিকৃতি নির্মাণও হারাম, তা ব্রোঞ্জ বা তাম্র নির্মিত হলেও। কিন্তু তা যদি রৌপ্য বা স্বর্ণের হয়, তাহলে হারামের মাত্রা অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়ে যাবে।
ইবনে কুদামাহ বলেছৈন, এসবে যাকাত ফরয হবে এ কথা যখন প্রমাণিত হয়ে গেল এবং তাতে কোনরূপ মতভেদ থাকার কথা জানা গেল না এবং জানা গেল যে, ওজনের দৃষ্টিতে নিসাব পরিমাণ না হওয়া পর্যন্ত যাকাত হবে না, তখন তার কাছে রক্ষিত অন্যান্য জিনিস যোগ করায় নিসাব পরিমাণ হলেও অবশ্যই তাতে যাকাত ধার্য হবে।
যদিও একটি মতে ওজন নয়, নিসাব নির্ধারণের জন্যে মূল্যের নিসাব লাগাতে হবে- কোন কোন হাম্বলী মতের আলিম এ মত দিয়েছেন। কেননা শৈলিপক কারুকার্য, উন্নতমানের গঠন সৌস্ঠব, শিল্প-নৈপুণ্য ইত্যাদির কারণে তার মূল্য অত্যধিক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়ে যায়ে- ওজন, তার কম হোক। তাই মূল্যের হিসাব করাই বাঞ্ছনীয়। তাতে গরীবরা, পাওনাদাররা যাকাতের পরিমাণটা বেশীই পেয়ে যাবে। সে সঙ্গে আল্লাহ্র হারাম করা জিনিস ব্যবহারকারী বিলাসী লোকদের উপর একটা কঠোর চাপ সৃষ্টি হবে।
পুরুষের ব্যবহৃত হারাম অলংকারাদিতেও যাকাত ফরয
যে সব পাত্র ও উপঢৌকন দ্রব্যাদি স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত, পুরুষ ও নারী উভয়ই ব্যবহার করে এবং পুরুষেরা যেসব হারাম অলংকার ব্যবহা করে, এ সব কিছুতেই যাকাত ফরয হবে।
কেননা অলংকার পুরুষের জন্যে প্রয়োজনীয় নয়। তার প্রকৃতির সাথেও সংগতিসম্পন্ন নয়। এ কারণে তাদের জন্যে স্বর্ণ নির্মিত অলংকার ব্যবহার ইসলামী শরীয়াতে হারাম ঘোষিত হয়েছে। তাদের পক্ষে রৌপ্য নির্মিত অঙ্গুরীর ব্যবহার করা জায়েয বটে। কেননা সাধারণত তার ওজন নিসাব পরিমাণ হয় না।
তাই কোন পুরুষ যদি স্বর্ণ নির্মিত অলংকার- অঙ্গুরীয়, হার, চেইন ইত্যাদি- কিছু ব্যবহার করে এবং তার মূল্য নিসাব পরিমাণ হয় অথবা তার কাছে রক্ষিত অন্যান্য মালের মূল্য মিলিয়ে নিসাব পর্যন্ত পৌঁছে, তাহলে তার উপর যাকাত ফরয হবে। কেননা তা বেকার ফেলে রাখা সম্পদ। অথচ তা প্রবৃদ্ধির কাজে বা সাধারণ উপকারে ব্যবহার করা অথবা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের স্বর্ণ ভাণ্ডারে তা জমা করাও যেতে পারে। এ সম্পদ ফেলে রাখা স্বাভাবিক নয়, যুক্তিসঙ্গতও নয়। তাতে আল্লাহ্র নির্দিষ্ট কর সীমাও লংঘিত হয়। এ জন্যে তার উপর যাকাত ধার্য করে পুরুষদের এ কাজ থেকে বিরত রাখা একান্তই আবশ্যক।তাতে তাদের এ কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হবে যে, এ সম্পদ বাড়তি উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধির কাজে বিনিয়োগযোগ্য। তাতে তা বিনিময়-মাধ্যম হওয়ার ও আবর্তনশীলতার ক্ষেত্রে উপযুক্ত বূীমকা পালন করতে পারত।
পুরুষদের পক্ষে সাধারণভাবে স্বর্ণ হারাম। তবে নিতান্ত প্রয়োজন দেখা দিলে তা অবশ্য ব্যবহার করা যাবে।যেমন কারোর নাম কাটা গেলে সে তার জন্যে ব্যবহার করতে পারবে। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আরফাজাতা ইবনে মায়াদদের নাক কাটা গিয়েছিল। পরে তিনি কাগজ দিয়ে একটি নাক বানিয়ে নেন। তাতে দুর্গন্ধ হলে নবী করীম (স)-এর নির্দেশ অনুযায়ী স্বর্ণ দিয়ে একটি নাক বানিয়ে নিয়েছিলেন (আবু দাউদ)।
ইমাম আহমদ বলেছৈন, পড়ে যাওয়ার ভয়ে স্বর্ণ দ্বারা দন্তসমূহ জুড়ে দেয়া হলে তা জায়েয হবে; কেননা এটাও একটা প্রয়োজন। এতদ্ব্যতীত অন্যবাবে স্বর্ণ ব্যবহৃত হলে তার যাকাত দিতে হবে। সেক্ষেত্রে মূল্যটাই নিসাব গণনায় হিসেব করতে হবে, ওজন নয়। কেননা এগুলো সামগ্রী বিশেষ। তার মূল্য ৮৫ গ্রাম স্বর্ণ মূল্য পরিমাণ হলেই- তার ওজন যত কমই হোক- যাকাত দিতে হবে।
স্ত্রীলোকদের মুক্তা ও মণি নির্মিত অলংকারের যাকাত
স্বর্ণ ও রৌপ্য ছাড়া অন্যান্য মূল্যবান পাথন- যেমন মণি, মুক্তা, মুঙ্গা (ঈষৎ পীতবর্ণের প্রস্তর বিশেষ- chrysolite), পারা প্রবৃতি- নির্মিত অলংকার ব্যবহার করা হলে সেজন্যে কোন যাকাত দিতে হবে না। কেননা তা অপ্রবৃদ্ধিশীল সামগ্রী। তা অলংকার বিশেষ, নারীদের জন্যে আল্লাহ মুবাহ করা জিনিস।
তিনি নিজেই বলেছেন: (আরবী******)
তোমরা সমুদ্র থেকে অলংকার সামগ্রী বের করে আনো, যা তোমরা ব্যবহার কর।
কেবল মাত্র শিয়া মতের কতিপয় ইমাম ছাড়া আর কেউ এ ব্যাপারে ভিন্ন মত প্রকাশ করেন নি। তাঁরা বলেছৈন, মূল্যবান পাথরেনর মুল্য নিসাব পরিমাণ হলে তার যাকাত দেয়া করত্ব্য। কেননা তা খুবই মূল্যবান জিনিস এবং তা আল্লাহর বাণী- ‘ধনীদের ধন-মাল থেকে যাকাত গ্রহণ করে তাদের পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন কর’ –এই সাধারণ নির্দেশের অর্তর্ভুক্ত।
আয়াতে ব্যবহৃত (****) বহু বচনে বলা হয়েছে। তার অর্থ, ‘তাদের প্রত্যেকটি আলাদা আলাদা মাল-সামগ্রী থেকে যাকাত গহণ কর।’ মূল্যবান পাথরের সমন্বিত সর্বপ্রকারের অলংকারই এই সাধারণ নির্দেশের মধ্যে গণ্য।
জম্হুর ফিকাহ্বিদগণ এর জবাবে বলেছেন, আয়াতে সাধারণভাবে সর্বপ্রকারের ধন-মাল থেকেই যাকাত গ্রহণের নির্দেশ হয়েছে এ কথা সত্য; কিন্তু তা সত্ত্বেও রাসূলে করীমের কথা ও কাজের সুন্নাতে এই সাধারণত্বকে সংকুচিত করে কেবলমা্র ক্রমবৃদ্ধিশীল ও প্রবৃদ্ধি উপযোগী ধন-মালেই যাকাত ফরয করা হয়েছে। তাহলে যাকাত ফরয হওয়ার ‘ইল্লাত’ বা কারণ হল প্রকৃত প্রবৃদ্ধি প্রবণতা। মহামূল্য হওয়াটা যাকাত ফরয হওয়ার ‘কারণ’ নয়। এসব পাথর অলংকার হিসেবে ব্যক্তিগত ফায়দার জন্যে ব্যবহৃত হয়, প্রবৃদ্ধির জন্যে নয়। তা পুঁজিও করা হয় না, যুক্তিসঙ্গত সীমাও লংঘিত হয় না তাতে।
স্ত্রীলোকদের স্বর্ণ-রৌপ্যের অলংকারের যাকাত সম্পর্কে বিভিন্ন মত
স্ত্রীলোকদের স্বর্ণ-রৌপ্য নির্মিত অলংকারাদির যাকাত পর্যায়ে নবী করীম(স)-এর যাকাত সংক্রান্ত পত্রাদিতে কোন কথাই বলা হয়নি। তাতে যাকাত ফরয হওয়া বা না হওয়া পর্যায়ে কোন সুস্পষ্ট অকাট্য দলীলই উদ্ধৃত হয়নি। তবে এ সম্পর্কে যেসব হাদীস বর্ণিত উদ্ধৃত হয়েছে, তার যথার্থতা নিয়েও যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে এবং তার প্রকৃত তাৎপর্য সম্পর্কে কম মতবৈষম্য নেই।
এই মতবৈষম্যের কারণহচ্ছে, কিছু লোকের দৃষ্টি নিবন্ধ হয়েছে অলংকার নির্মাণের সামগ্রী বা বস্তুর উপর। তাঁরা বলেছৈন, এটা আসল খনিজপদার্থ, নগদ সম্পদ হওয়ার জন্যেই আল্লাহ তা’আলা তা সৃষ্টি করেছেন। তাঁর দ্বারা লোকদের পরস্পরিক বিনিময় কার্য সম্পদিত হবে এ-ও তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য। আর সেজন্যেই তার উপর সর্বসম্মতিক্রমে যাকাত ফরয হবে।
অপর লোকদের দৃষ্টি নিবন্ধ হয়েছে শিল্প কর্ম ও কারুকার্য খচিত অলংকারের উপর। তার কারণ তাতে তআর নগদ সম্পদ হওয়ার যোগ্যতা অবশিষ্ট থাকেনি। বরং তার ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণের জন্যে সংরক্ষিত দ্রব্যাদি পর্যায়ে পড়ে গেছে। এখন তা ঘরের আসবাবপত্রের মতই যার কোন যাকাত হয় না বলে ইজমা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কেননা আমরা রাসূলেকরীম(স)-এর হিদায়ত থেকে যা জানতে পেরেছি, সে দৃষ্টিতে কেবলমাত্র বর্ধনশীল বা বর্ধনউপযোগী কিংবা উৎপাদনশীল দ্রব্যাদিতে যাকাত ফরয হয়। এই কারণে তাঁরা বলেছেন যে, অলংকারাদিতে যাকাত নেই। এ সব মতবৈষম্য কিন্তু অলংকার সম্পর্কে জায়েয। কেননা ইসলামে হারাম এমন অলংকারের যাকাত ফরয হওয়া সম্পর্কে পূর্ণ ইজমা রয়েছে।
অতএব সংক্ষেপে বলা যায়-
১. কিছু লোক বলেছেন, অলংকারের যাকাত দিতে হবে, যেমন সাধারণভাবে নগদ সম্পদের যাকাত দিতে হয়। আর তা হচ্ছে প্রতি বছর দশ ভাগের এক ভাগের এক চতুর্থাংশ।
২. অন্য লোকেরা তা মনে করেন না। তাঁদের মতে তাতে যাকাত ফরয নয়। অথবা বড়জোর জীবনে একবার মাত্র যাকাত দেয়াই যথেষ্ট। তবে কতগুলো নির্দিষ্ট শর্তের ভিত্তিতে তা দেয়া ফরয বলা যেতে পারে।
অলংকারের যাকাত ফরয হওয়ার দলীল
বায়হাকী প্রমুখ হযরত আলকামা থেকে বর্ণনা করেছেন, ইবনে মাসউদ (রা)-এর স্ত্রী তাঁকে তাঁর অলংকার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, দুইশ’ দিরহাম পর্যন্ত পৌঁছলে তার যাকাত দিতে হবে। জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে আমি সে যাকাত আমার ক্রোড়ে পালিত আমার ভাইয়ের বংশধরদের দেব?’ বললেন, ‘হ্যাঁ, দিতে পারেন।’ বায়হাকী বলেছেন, হাদীসটি রাসূলের কথা হিসেবে বর্ণিত হলেও আসলেতা গ্রহণযোগ্য নয়।
শুয়াইব ইবনে ইয়াসার থেকে বর্ণিত, উমর (রা) আবূ মূসার প্রতি ফরমান লিখে পাঠালেন যে, তোমার পক্ষ থেকে মুসলিম মহিলাদের তাদের অলংকারাদির যাকাত দিতে নির্দেশ দাও।
কিন্তু আসলে এ কথাটি হযরত উমর থেকেই সপ্রমাণিত হয়নি। এ কারণে ইবনে আবূ শায়বাহাসান থেকে বর্ণনা করেছেন: ‘কোন্ খলীফা অলংকারের যাকাত দিতে হবে বলেছেন, তা আমাদরে জানা নেই।’
বায়হাকী হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন: ‘অলংকারের যাকাত দেয়া হলে তা ব্যবহার করায় কোন দোষ নেই।
কিন্তু হযরত আয়েশা (রা) থেকে এর বিপরীত কথা বর্ণিত হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে আমর থেকে বর্ণিত, তিনি তাঁর কোষাধ্যক্ষ সালেমকে লিখেচিলেন, তিনি যে তাঁর কন্যাদের অলংকারের যাকাত প্রতি বছর আদায় করে দেয়। আবূ উবাইদ তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি ছয় হাজার দীনার দিয়ে তাঁর তিনটি কন্যার অলংকার গড়ে দিয়েছিলেন এবং অতঃপর তিনি তাঁর মুক্ত গোলামের মাধ্যমে এর যাকাত প্রতি বছর আদায় করেদিতেন।
এই সব বর্ণনার সনদ আপত্তিপূর্ণ। এ কারণে আবূ উবাইদ বলেছৈন, ইবনে মাস্উদ (রা) ছাড়া অন্য কোন সাহাবী থেকেই অলংকারের যাকাত দেয়া সম্পর্কে কোন কথাই আমার দৃষ্টিতে সপ্রমাণিত নয়। যদিও ইবনে হাজম দাবি করেছেন যে, তা আমার কাছে চূড়ান্তভাবে সহীহ।
অলংকারের যাকাত দেয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, সাঈদ ইবনে যাবায়র, আতা, মুজাহিদ, আবদুল্লাহ ইবনে সাদ্দাদ, জাবির ইবনে যায়িদ, ইবনে সাবরামাতা, মায়মুন ইবনে মাহ্রান জুহ্রী ও সওরী প্রমুখ তাবেয়ী ফিকাহ্বিদগণ থেকে। ইমাম আবূ হানীফা, তাঁর সঙ্গিগণ, আওযায়ী ও নোমান ইবনে হাইরও এ মত।
এ কথার দলীল
১. অলংকারের যাকাত ফরয বলে যাঁরা মত দিয়েছেন, তাঁদের প্রথম দলীল হচ্ছে, কুরআনের সাধারণ অর্থসম্পন্ন আয়াত:
(আরবী******)
যারাই স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঁজি করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদের পীড়াদায়ক আযাবের সুসংবাদ দাও।
আয়াতে স্বর্ণ ও রৌপ্যের উল্লেখে তা দিয়ে নির্মিত অলংকারাদিও এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে, যেমন নগদ এবং স্বর্ণপিণ্ডও এর মধ্যে শামিল। অতএব তার যাকাত না দিলে তা পুঁজি করা হবে এবং কিয়ামতের দিন দাগ দেয়অর আযাব ভোগ করতে হবে।
২. রাসূলের কথার সাধারণত্বের উপর তাঁরা নির্ভর করেছেন।
কথাটি হল: (আরবী******)
নগদ সম্পদে দশ ভাগের এক ভাগের এক-চতুর্থাংশ যাকাত। আর পাঁচ আউকিয়ার কম পরিমাণে কোন যাকাত নেই।
তার অর্থ, ‘পাঁচ আউকিয়া’ পরিমাণ হলেই তার যাকাত দিতে হবে। স্বর্ণের যাকাত পর্যায়ে আরও অনেক অনেক তাৎপর্যপূর্ণ কথা উদ্ধৃত হয়েছে। যেমন:
(আরবী******) স্বর্ণেল যে মালিক তার যাকাত দেবে না…..
৩. তৃতীয় পর্যায়ের দলীলহল বিশেষভাবে অলংকারের যাকাত পর্যায়ে উদ্ধৃত হাদীসসমূহ। বহু ইমামই সে সব হাদীসকে সহীহ বলে মন্তব্য করেছেন। যেমন:
(ক) আবূ দাউদ বর্ণা করেছেন, একটি স্ত্রীলোক রাসূলে করীম (স)-এর কাছে উপস্থিত হল। তার সঙ্গে ছিল তার কন্যা। আর তার কন্যার হাতে ছিল দুটি ভারী স্বর্ণের কাঁকণ। রাসূলে করীম(স) তাকে বললেন, তোমরা কি এ জিনিসের যাকাত দিয়ে থাক? বলল না। বললেন, তুমিকি খুশি হবে যদি আল্লাহ্ কিয়ামতের দিন এ দুটির বদলে দুটি আগুনের কাঁকন পরিয়ে দেন? বর্ণনাকারী বলেছেন, অতঃপর স্ত্রীলোকটি কাঁকন দুটি খুলে নবী করীম (স)-এর দিকে ফেলে দিল এবং বলল, এ দুটি আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলের জন্যে উৎসর্গকৃত।
(খ) আবূ দাউদ, দারে কুত্নী হাকেম ও বায়হাকী বর্ণনা করেছেন হযরত আয়েশা (রা) থেকে, তিনি বলেছৈন, রাসূলে করীম(স) আমার ঘরে উপস্থিত হলেন, তিনি আমার হাতে স্বর্ণের বড় অঙ্গুরীর পরিহিত দেখতে পেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, হে আয়েশা, এটা কি? বললাম, এ অলংকার আমি বানিয়েছি আপনার জন্যে সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে হে রাসূল। বললেন, তুমি কি এর যাকাত দিয়ে থাক? বললেণ, না। কিংবা আল্লাহ যা চাহেন। বললেন, তোমার জাহান্নামের জন্য এটাই যথেষ্ট।
(গ) আবূ দাউদ প্রমুখ উম্মে সালমা থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছন, তিনি বলেছেন, আমি স্বর্ণের অলংকার ব্যবহার করতাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে রাসূল এতে কি পুঁজিকরণ হবে? তিনি বললেন, তুমি যদি যাকাত পরিমাণ হলে তার তার যাকাত দিয়ে দযাও, তাহলে পুঁজিকরণ হবে না।
মুহাদ্দিস আল-মুনযেরী বলেছেন, এ হাদীসটির সনদে বর্ণনাকারী হিসে ইতাব ইবনে বুশাইর ও আবুল হাসান আল-হুররানী রয়েছেন। ইমাম বুখারীও এ হাদীস উদ্ধৃত করেছেন, কিন্তু বেশ কয়েকজন হাদীসবিদ উক্ত বর্ননাকারীদ্বয়ের বিষয়ে আপত্তি তুলেছেন।

About শিবির অনলাইন লাইব্রেরী