ইসলামের যাকাত বিধান – ১ম খন্ড

পঞ্চম আলোচনা
অনুমানের ভিত্তিতে যাকাতের পরিমাণ নির্ধারণ
খেজুর ও আঙুর ফলের যাকাত ও ফরয পরিমাণ নির্ধারণে ওজন বা পাত্র দিয়ে পরিমাপ করা ছাড়া শুধু অনুমানের সাহায্য গ্রহণের একটা রীতি নবী করীম(স) চালু করেছেন।তখন এটা অনুমানমূলক ব্যাপার হবে এবং একজন অভিজ্ঞ, আমানতদার, বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি এ কাজটা করবে। তা এভাবে হবে যে, ফল যখন পাকতে শুরু করবে তখন অনুমানকারী গাছের কাঁচা খেজুর ও আঙুর দেখে পরিমাণ নির্ধারণ করবে। তখনই যাকাতের পরিমাণটা জানা যাবে। পরে পূর্ণ পরিপক্কতা লাভের পর পূর্বের অনুমান অনুযায়ী যাকাত (ওশর বা অর্ধ-ওশর) তা থেকে নিয়ে নেয়া হবে।
অনুমান করার নীতির একটা ফায়দা হল মালের মালিক ও প্রাপক গরীব মিসকীন উভয় পক্ষের কল্যাণ সাধন। যেহেতু অনুমানটা হয়ে যাওয়ার পর মালিক তার খেজুর-আঙুর নিয়ে যা করার ইচ্ছা হবে করতে পারবে। কেননা ওশর বাবদ যা ধার্য হবার তা তো পূর্বেই নির্দিষ্ট হয়ে আছে। ওদিকে যাকাত আদায়ের দায়িত্বশীল-প্রাপকদের প্রতিনিধি- তার প্রাপ্য পরিমাণটাও জেনে নিতে পেরেছে, সে তা যথাসময়ে আদায় করে নিতে পারবে।
খাত্তাবী বলেছৈন, অনুমানের ফায়দা ও তাৎপর্য হচ্ছে, গরীব-মিস্কীনরা উৎপন্ন ফসলে মালিকদের সাথে অংশীদার।মালের মালিক যদি তাদের অধিকার দিতে অস্বীকার করে, তার ভোগের সুযোগ নাদেয়, ওদিকে ফসলও পূর্ণ পরিপক্কতা বা শুষ্কতা বা শুষ্কতা পেয়ে যায়, তাহলে তাতে প্রাপকদের ক্ষতি হবে। মালিকদের হস্ত তার মধ্যে প্রসারিত হলে গরীবদের অংশ ক্ষতি সূচিত হতে পারে। কেননা সব মানুষ বিশ্বস্ততা ও নির্ভরযোগ্যতার দিক দিয়ে সমান নাও হতে পারে। এ কারণে শরীয়াত ও অনুমানের পথ অবলম্বন করেছেন। যেন মালের মালিকও তা থেকে ফায়দা পেতে পারে এবং মিসকীনদের হকটাও সুনিশ্চিত থাকে। এ অনুমানেরকাজটা করতে হবেফসল পাকা শুরু হতেই, তা খাওয়া ও ব্যবহার শুরু করার পূর্বে, যেন ওশরের পরিমাণটা নিঃসন্দেহে ও নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ ও সংরক্ষণ করা যায় এবং সেই অনুযায়ী পূর্ণ পরিপক্কতার পর তা বের করে নেয়া যায়।
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব ও সহল ইবনে আবূ হাস্মা, মারওয়ান, কাসিম ইবনে মুহাম্মাদ, হাসান, আতা, জুহরী, আমর ইবনে দীনার এবং ইমাম মালিক, শাফেয়ী, আহমদ, আবূ উবাইদ ও আবূ সওর এবং আরও বহু বিশেষজ্ঞ থেকেই এ অনুমান করার রীতি বর্ণিত হয়েছে।
কিন্তু ইমাম আবূ হানীফা তা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। কেননা তাঁর মতে অনুমান হচ্ছে গায়েবের উপর ঢিলমারা বা নিরুদ্দেশ্যে তীর নিক্ষেপ করা। আর শরীয়াতে আন্দাজ-অনুমানের ভিত্তিতে কোন সিদ্ধান্তই বাধ্যতামূলক হয় না। এ কারণে তিনি ‘কুরয়া’ (lot)-কে অগ্রাহ্য করেছেন। জমহুর ফিকাহ্বিদগণ তাঁদের মতের ভিত্তিতে স্থাপন করেছেন নিম্নোদ্ধৃত হাদীসসমূহের উপর:
১. সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব বর্ণনা করেছেন: নবী করীম (স) লোকদের বাগানে আঙুর ও অন্যান্য ফলাদির পরিমাণ অনুমান করার জন্যে দায়িত্বশীল লোক পাঠাতেন।
২. এই সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিবেরই অপর একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, নবী করীম (স) আঙুরের পরিমাণ নির্ধারণের আদেশ দিয়েছেন, যেমন খেজুরের পরিমাণ অনুমান করা হয় এবং তার কিশমিশ হওয়াকালে যাকাত গ্রহণেরও নির্দেশদিয়েছে, যেমন খেজুর পেকে শুষ্ক হওয়া কালের যাকাত গ্রহণ করা হয়।
৩. নবীকরীম(স) নিজে এ কাজ করেছেন। তিনি তাবুক যুদ্ধের বছর ওয়াদিউল-কুরাস্থ একজন মেয়েলোকের বাগানের ফলের পরিমাণ আন্দাজ করেছেন এবং সে অনুমানে দশ অসাক্ পরিমাণ ধরা হয়েছিল। পরে স্ত্রীলোকটিকে বললেন, এ বাগানে কতটা ফল থাকতে পারে তা আমি নিজে অনুমান করেছি। পরে সে নিজে অনুমান করেও ঠিক সেই পরিমাণটাই স্থির করে।
৪. আবূ দাউদ হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে, তিনি বলেন (য়াবরের অবস্থা বর্ণনা করেছিলেণ তিনি) নবী করীম(স) আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহাকে ইয়াহুদীদের কাছে পাঠাতেন। তিনি খেজুর পরিপক্ক হওয়াকালীন পরিমাণ অনুমান করতেন তা থেকে কিছু খাওয়ার পূর্বেই।
৫. সহল ইবনে আবূ হাস্মা থেকে বর্ণিত, নবী করীম (স) বলেছেন: তোমরা যদি অনুমানের ভিত্তিতে যাকাত গ্রহণ কর, তাহলে অনুমিত পরিমাণের এক-তৃতীয়াশ বাদ দিয়ে নিও। আর যদি এক-তৃতীয়াংশ বাদ দেয়া সমীচীন মনে না কর, তাহলে অন্তত এক-চতুর্থাংশ অবশ্যই বাদ দেবে।
ইমাম খাত্তাবী লিখেছেন, এই হাদীস অনুমান করা ও তদনুযায়ী কাজ করর বৈধতা প্রমাণকরে। আর তা-ই সর্বসাধারণ আলিমেরও মত। তবে শা’বী বলেছেন, অনুমান করা বিদ’আত। ইরাকী ফিকাহ্বিদগণও তা অগ্রাহ্য করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ বলেছেন, অনুমানের রীতিটা চালু হয়েছিল ফসল উৎপাদনকারীদের ভিত করার জন্যে যেন শেষে তারা বিশ্বাসঘাতকতা না করে। কিন্তু তার ভিত্তিতে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সমীচীন হতে পারে না। কেননাতা একটা ধারণা-অনুমানই মাত্র। তাতে ধোঁকার আশংকা খুব বেশী। সূদ ও জুয়া হারাম হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তা জায়েয ছিল। তারপর তা জায়েয থাকেনি।
এ কথার জবাবে ইমাম খাত্তাবী লিখেছেন, অনুমান করার কাজ প্রমাণিত সূদ, জুয়া ইত্যাদি হারাম হওয়ার পূর্বে। তারপরও নবী করীম(স) সারা জীবন ধরে এ অনুমানের কাজটি করেছেন। তাঁর অন্ধর্ধানের পরে হযরত আবূ বকর ও উমর (রা)-ও এ কাজ করেছেন। সাধারণভাবে সাহাবিগণ এ কাজকে জায়েয বলেছেন। কেউ ভিন্নমত পোষণ করতেন বলেকোন বর্ণনাই পাওয়া যায় নি।
এটাকে নিছক আন্দাজ-অনুমান বলে উড়িয়ে দেয়াও কিন্তু ঠিক নয়। বরং একেবলতে হবে, ‘পরিমাণ জানবার জন্যে ইজতিহাদ’। আন্দাজ-অনুমানও এক প্রকারের পরিমাপ, তার সাহায্যে পরিমাণজানতে চেষ্টা চালানো যাবে, যেমন পাল্লায় ওজন করেও াত্র দিয়ে মেপে তা জানা যায়।
এটা এমনই, যেমন কোন বিষয়ে শরীয়াতের স্পষ্ট দলীল পাওয়া না গেলে ইজতিহাদ করার সুযোগ রয়েছে, যদিও ইজতিহাদে ভুল হওয়ার আশংকা থাকে। খুব ঘন জঙ্গলের মধ্যের গাছের মূল্য ইজতিহাদের মাধ্যমে নির্ধারণ একটা প্রচলিত রীতি। আর বাহ্যিক দিক দিয়ে ইজতিহাদ করার দ্বার খুব প্রশস্ত, তা কোন আলিম অস্বীকার করতে পারেন না।
অনুমান করার উপযুক্ত সময়
ফলের পক্কতা শুরু হলে তখনই মোট পরিমাণ অনুমান করার সঠিক সময়। হযরত আয়েশা (রা) বলেছেন, ‘নবী করীম(স) আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহাকে পাঠাতেন, তিনি গিয়ে খেজুরের পরিমাণ অনুমান করতেন যখন তা পেকে যেত। তা ছাড়া অনুমানের লক্ষ্য হল যাকাতের পরিমাণ নির্ধারণ এবং তার পর মালিককে তাতে হস্তক্ষেপের স্বাধীনতা দেয়া। আর তার প্রয়োজন তখনই দেখা দিতে পারে, যখন ফল পাকতে শুরু করে ও তার উপর যাকাত ফরযহয়ে দাঁড়ায়।
অনুমানকারীর ভুল
অনুমানকারী যদি পরিমাণ নির্ধারণে ভুল করে- বেশী বা কম নির্ধারণ করে, -তাহলে কি হবে, এ পর্যায়ে কাসিম ইবনে মুহাম্মাদ (মদীনার সাতজন ফকীহ্র অন্যতম) থেকে বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তি এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বললেন, যা অনুমান করে ধার্য করা হয়েছে তাই দেয়াই তোমার কর্তব্য। সে তো একজন অনুমানকারী মাত্র।’ ইমাম মালিকের মতও তাই। তিনি বলেছেন, অনুমানকারী যদি পূর্ণ বিশ্বস্ততা ও সততার ভিত্তিতে অনুমান করে থাকে ও প্রকৃত পরিমাণটা জানবার জন্যেই চেষ্টা করে থাকে, তাহলে তাতে কম ধরুক, বেশী ধরুক তা কার্যকর হবে। ইমাম মালিকের মত হচ্ছে, এ একটা বাস্তব সিদ্ধান্ত, তাতে কোন দোষ নেই।’
এ কথার সমর্থনে আবূ উবাইদ বলেছৈন, আমার মতে তার কারণ হচ্ছে, এ ভুলটা যদি পারস্পরিক ক্ষতি সাধনের উদ্দেশ্যমূলক হয় এবং তাতে ভুল করেও পরিমাণটা বেশী ধরে ফেলেতাহলে তা প্রত্যাহার করে সঠিক অনুমান করতে হবে। তাতে কিন্তু অনুমানের রীতিটা কিছুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত বা ক্ষুণ্ণ হয় না। কেননা এই মারাত্মক ভুল যদি পাত্র দিয়ে পরিমাপ করায় ঘটে তাহলেও তা প্রত্যাহার করা হয়, অনুমানের বেলায়ও অনুরূপ অবস্থা হলে এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বেশী বা কম যদি ততটা হয়, যতটা সাধারণ দুটি মাপ-পাত্রের মধ্যে হতে পারে- তাহলে এটা জায়েয বলতে হবে।
ইবনে হাজম বলেছেন: অনুমানকারীর ভুলে জুলুম হয়- বেশী কিংবা কম ধরার কারণে, তাহলে প্রকৃত পরিমাণ অনুযায়ী-ই ফরয পরিমাণ ধার্য করতে হবে। যা অতিরিক্ত নেয়া হবে, তা মালিককে ফেরত দিতে হবে। আর কম ধরা হলে সেই পরিমাণটা নিয়ে নিতে হবে। কেননা আল্লাহ্ বলেছেন:
তোমরা সুবিচার ও ন্যায়পরনায়তার প্রতিষ্ঠাকারী হও।
অনুমানকারী পরিমাণ বেশী ধরলে মালিকের উপর জুলুম হয়। আর কম ধরলে যাকাত প্রাপকদের প্রতি জুলুম করাহয়; তাদের হক নষ্ট হয়। এর প্রতিটিই অন্যায় এবং গুনাহ্। যদি দাবি করা হয় যে, অনুমানকারী জুলুম করেছে কিংবা ভুল করেছে, তাহলে অকাট্য প্রমাণছাড়া সে দাবি মেনে নেয়া যাবে না-যদি অনুমানকারী সুবিচারক ও বিশেষজ্ঞ হয়। কিন্তু আবূ উবাইদ যা বলেছেন, তা অধিক সহজ, বাস্তবতার অতি কাছে এবং গ্রহণপযোগী।
খেজুর-আঙুর ছাড়া অন্যান্য ফলেও কি অনুমান করা যাবে
জমহুর ফিকাহ্বিদগণ মত দিয়েছেন যে, খেজুর আঙুর ছাড়া অন্যান্য ফলের পরিমাণ নির্ধারণে অনুমান প্রয়োগ করা যাবে না। জয়তুনে তা করা যাবে না, কেননা তার ফলগুলো কাছে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় এবং পাতা দিয়ে ঢাকা থাকে। মালিকের প্রয়োজন হয় না তা খাওয়ার। কিন্তু খেজুর ও আঙুরের ব্যাপার স্বতন্ত্র। কেননা খেজুর তার ছাড়ার মধ্যে পুঞ্জীভূত হয়ে থাকে। আর আঙুর থাকে তার ঝাড়ের মধ্যে। তাই এই উভয় ক্ষেত্রে অনুমানটা সহজভাবে সাধিত হতে পারে। ইমাম মালিকও আহমদেরও এই মত।
জুহ্রী, আওযায়ী ও লাইস বলেছেন, জয়তুনেরও পরিমাণ অনুমান করে নির্ধারণ করা যাবে। কেননাতা এমন ফল যার উপর যাকাত ফরয হয়। তাই খেজুর আঙুরেরমত তার অনুমান করা চলবে।
এ পর্যায়ে আমার বাছাই করা মত হচ্ছে, অনুমানের সম্ভাব্যতার সাথে তা করা জায়েয বা না-জায়েয- এ প্রশ্ন জড়িত। তার প্রয়োজন আছে কি নাতাও দেখতে হবে। বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ লোকদের মতকেই প্রাধান্য দিতে হবে। তারা যদি তাদের কৌশলগত উপকরণের সাহায্যে অনুমানের ভিত্তিতে পরিমাণ নির্ধারণ সহজ মনে করে এবং যাকাত প্রতিষ্ঠান তার প্রয়োজনও বোধ করে, তাহলে সব ব্যাপার লিপিবদ্ধ করে নিতে হবে। কিংবা মালিক যদি প্রয়োজন বোধ করে, তাহলে অনুমান করেই তার উপর যাকাত ধার্য করা যাবে। এ পর্যায়ের দলীল অনুযায়ীই এ কথা বলা হচ্ছে।
ষষ্ঠ আলোচনা
কৃষি ফসলও ফলের মালিকের জন্যে কি ছেড়ে দেয়া যাবে
১. পূর্বে উদ্ধৃত সহল ইবনে আবূ হাসমা বর্নিত হাদীসে বলা হয়েছে, নবী করীম(স) বলতেন, ‘তোমরা যখন অনুমানের ভিত্তিতে পরিমাণ নির্ধারিত করবে, তখন এক-তৃতীয়াংশ ছেড়ে দেবে। যদি তা না ছাড়, তাহলে এক-চতুর্থাংশ অবশ্যই ছাড়বে।ৎ
২. ইবনে আবদুল বার্ নবী করীম (স)-এর কথাটি উদ্ধৃত করেছেন? ‘অনুমান করার বেলা খুবই হালকা করে পরিমাণ ধরবে।’
৩. আবূ উবাইদ মক্হুল থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (স) যখন অনুমানকারী পাঠাতেন, বলতেন, ‘খুব হালকা (কম) করে ধরবে। কেননা তাতে লোকদের খেতে দেয়া শূন্য ছড়াও থাকতে পারে, থাকতে পারে বীজ বের করে মূলটা খেয়ে ফেলা ফল।’
৪. আওজায়ী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, হযরত উমর বলেছেন বলে আমাদের কাছে খবর পৌঁচেছে যে, অনুমানে লোকদের প্রতি হালকা করে পরিমাণ ধর। কেননা মালে অনেক শূন্যতা বা খেয়ে ফেলা অংশ থাকতে পারে।
৫. বশীর ইবনে ইয়াসার থেকে বর্ণিত হয়েছে, হযরত উমর আবূ হাসমা আনসারীকে মুসলিম জনগণের মালের পরিমাণ নির্ধারণে অনুমান করার জন্যে পাঠিয়েবলেছেন, ‘তোমরা যদি লোকদের তাদের খেজুর বাগানে দেখতে পাও যে, তারা খেজুর পেড়ে ফেলছে, তাহলেতা থেকে তারা যা খেয়ে ফেলেছে, তা বাদ দাও, অনুমানে তা গণ্য করবে না।’
৬. সহল ইবনে আবূ হাসমা থেকেবর্ণিত, মারওয়ান তাকে খেজুরের পরিমাণ নির্ধারণে অনুমান করার জন্যে পাঠিয়েছিলেন।তিনি সা’দ ইবনে আবূসা’দের খেজুর সাতশত ‘অসাক’ অনুমান করলেন।বললেন, আমিযদি তাতে চল্লিশটি আশ্রয়স্থল না দেখতে পেতাম, তাহলে আমি নিশ্চয়ই নয় শত অসাক অনুমান করতাম।কিন্তু আমি মালিকদের প্রতি লক্ষ্য রেখে যে-পরিমাণ খেয়ে ফেলেছে তা বাদ দিয়েছি।’ এ আশ্রয়স্থলগুলো ছিল ছায়াচ্ছন্ন, লোকেরা এখানে বসে ফল খেয়েছে।
প্রথম হাদীসটি বহু সংখ্যক হাদীসবিদের বিবেচনায় সহীহ হাদীস। হযরত জাবির ও মক্হূল বর্ণিত হাদীস দ্বারা তা শক্তিশালী হয়েছে। তারাসাহাবিগণের কথাও তার সমর্থনে রয়েছে। রাসূলের প্রদর্শিত নিয়ামদি সম্পর্কে তাঁরাই বেশী জানেন। তাঁর অনুসরণেও তাঁরা ছিলেন অধিকতর আগ্রহী। ইবনে হাজম বলেছেন, এটা হযরত উমর, আবূ হাসমা ও সহল- এ তিনজন সাহাবীর কাজ। অন্যান্য সাহাবীও এ বিষয়ে অবহিত ছিলেন। কেউ ভিন্ন মত পোষণকারী ছিলেন না। এসব হাদীস ও সাহাবীদের উক্তি প্রমাণকরে যে, মালের মালিকদের প্রতি নম্রতা দেখাতে হবে তাদের পরিমাণে যথাসম্ভব কম ধরতে হবে। তাদের রেয়াত দিতে হবে তাদের প্রয়োজন ও পাত্রের পরিমাণের প্রতি লক্ষ্য রেখে।
‘আল-মুগনী’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, অনুমানকারীর উচিত এক-তৃতীয়াংশবা এক-চতুর্থাংশ রেয়াত দেয়া। তাতে মালিকদের প্রতি দয়া প্রশস্ততা দেখানো হবে। কেননা তারা নিজেরা এবং তাদের আত্মীয়-স্বজন ও মেহমারা তা থেকে কিছুটা খেয়ে ফেলতে পারে। তারা তাদের প্রতিবেশীদের, তাদের ঘরের লোকদের, বন্ধু-বান্ধবও প্রার্থীদেরও খেদে দিয়ে থাকতে পারে। তা থেকে পাখীরাও অনেক খেয়ে ফেলতে পারে। পথিকেরাও যে খায়নি, তা-ও বলা যায় না। এমতাবস্থায় এসব বাদ দিলে অনুমান ধরা নাহলে মালিকদের ক্ষতি অবধাতি। ইসহাক, লাইস ও আবূ উবাইদ এ কথাই বলেছেন।বাদ দেয়ার ব্যাপারে যাকাত আদায়কারীর দায়িত্ব রয়েছে। তাকেও ইজতিহাদ করতে হবে। খাওয়ার লোক বেশী মনে হলে এক-তৃতীয়াংশ বাদ দিয়ে ধরবে, আর কম হলে এক-চতুর্থাংশ বাদ দেবে। অনুমানকারী আদৌ বাদ না দিলেও মালিকের পক্ষেতার মাল-ফল-ফলাদি থেকে- সমপরিমাণ খেয়ে ফেলা জায়েয, হিসেবে তা ধরা যাবে না, তাদেরও সে জন্যে দায়ী করা চলবে না। কেননা এটা তাদের অধিকার।
রাষ্ট্র সরকার যদি অনুমানকারী না পাঠায়, ওদিকে ফলের মালিক তাতে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয় এবং সে নিজে অনুমানকারী নিযুক্ত করে পরিমাণের অনুমানটা করিয়ে নেয়, তাহলে সেই অনুযায়ী অনুমতি পরিমাণ মেনে নেয়া জায়েয হবে। সে নিজে অনুমান করলে তাও না-জায়েয হবে না। তবে কোনদিকে বাড়াবাড়ি না হয় সে দিকে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে। যে ফল ও ফসলের পমিাণ অনুমান করা হয় না, মালিকের বিশ্বস্ততার উপরই তা ছেড়ে দেয়া হয়, ‘আল-মুগনী’ গ্রন্থকারের মতে সাধারণ রীতি অনুযায়ী পরিমাণত তা থেকে খাওয়া হলে কোন দোষ হবে না, সে জন্যে মালিককে দায়ী করাও চলবে না। ইমাম আহমদের কাছে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘কৃষি ফসলের মালিক যদি খোসামুক্ত ফসল খেয়ে ফেলে তাহলে কি হবে? জবাবেতিনি বলেছিলেন: ‘মালিক প্রয়োজনমত কিছু খেয়ে ফেললে তাতে কোন দোষ নেই।’ কারণ এরূপ খাওয়া সাধারণ প্রচলিত। ফলের মালিক যদি কিছু খেয়ে ফেলেই থাকে, তা স্বাভাবিক মনে করে নিতে হবে।
ইমাম আবূ ইউসুফ ও মুহাম্মাদ বলেছেন, ‘মালিক নিজে, তার সঙ্গী বন্ধু ও প্রতিবেশী কিছু খেয়ে ফেলে থাকলেতার রেয়াত দিতে হবে। এমন কি, সবচও যদি খেয়ে ফেলেকাঁচা অবস্থায়, তা হলে তার উপর কোন যাকাত ধার্য করা যাবে না।
ইমাম মালিক ও আবূ হানীফা ভিন্নমত পোষণ করেন। তাঁরা ফল কৃষি ফসলের মালিককে কিছুই রেয়াত দিতে রাযী নন। তাঁরা ফল পাড়া বা ফসল কাটার পূর্বে মালিকরা কিছু খেয়ে ফেললে বা লোকদের খাওয়ায়ে থাকলে তারও হিসেব করার পক্ষপাতী।
ইবনুল আরাবী বলেছেন- সওরী তাঁর সমর্থন করেছেন-এভাবে মালিকদের জন্যে কিছু বাদ দেয়া যাবে না। এ থেকে মনে হয়, ইমাম মালিক ও সুফিয়ান সওরী সহল ইবনে আবূ হাসমা’র হাদীসের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন কি, যাতে অনুমানে নম্রতা অবলম্বন ও এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ রেয়াব দিতে বলা হয়েছে। অথবা তাঁরা এ হাদীসটি পান নি।
ইবনে হাজম বলেছেন, কৃষি ফসলের মালিক নিজে বাতার পরিবারবর্গ তার খোসা বের করে কিংবা ছাতু বানিয়ে কিছু খেয়ে থাকলে যাকাতের হিসেবে তা গণ্য করা জায়েয হবে না- তার পরিমাণ কম হোক কি বেশী। আর যে সব ছড়া পরে যায়, পাখীখেয়ে ফেলে, পথিক বা অভাবী লোকেরা নিয়ে যায়, তা-ও ধরা যাবে না। কাটার সময় কিছুদান করে থাকলেতাও বাদ যাবে। তবে যা পরিচ্ছন্ন অবস্থায় পাওয়া যাবে, তাতে যাকাত অবশ্যই ধার্য হবে। পূর্বে এর দলীল উদ্ধৃত করা হয়েছে এবংতা হচ্ছে, মাপা সম্ভবকালে যে পরিমাণটা হবে, তারই উপর যাকাত ধার্য হবে। তার পূর্বে যা হাত ছাড়া হয়ে গেছে, যাকাত ফরযরূপে ধার্য হওয়ার পূর্বেই তা চলে গেছে বলে মনে করতে হবে। শাফেয়ী ও লাইসও এই কথা বলেছেন, মালিক ও আবূ হানীফা বলেছেন, এই সবই হিসেবে ধরতে হবে।
আবূ মুহাম্মাদ বলেছেন, এটা সাধ্যের অতীত কাজের দায়িত্ব চাপানো। ছড়া থেকেই এতটা পরিমাণ ঝরে পড়ে যায় যে, তা থাকলে পাঁচ অসাক পূর্ণ হত। কিন্তু এটা তো হিসেবে করা সম্ভব নয়। আর মূলতও তার কোন বাধ্যবাধকতা নেই- ‘আল্লাহ্ নিজেই কোন অসাধ্য কাজের দায়িত্ব চাপান না’। বলেছেন, খেজুরের ব্যাপারেমালিকনিজে বা তার পরিবারবর্গ যদি কাঁচা অবস্থায়ই কিছু খেয়েফেলে তা হলে তার প্রতি নম্রতা বিধান স্বরূপ তা বাদ দেয়া অনুমানকারীর কর্তব্য। তার যাকাত দিতে তাকে বাধ্য করা যাবে না। ইমাম শাফেয়ী ও লাইস ইবনে সাদ এই মত দিয়েছেন।
ইবনে হাজম, সহর ইবনে আবূ হাস্মা বর্ণিত হাদীসকে দলীল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হযরত উমর, আবূ হাস্মা ও সহল প্রমুখ সাহাবীর মতও এই কথার দলীল।
আর যাঁরা সহল বর্ণিত হাদীস অনুযায়ী আমল পরিহার করেছেন তাঁরা ভিন্ন মত পোষণ করেন এবং জবাবেতাঁরা বলেন: অনুমানের এই রীতিটা বিশেষভাবে গৃহীত হয়েছিল খাবারের ক্ষেত্রে। অতএব অন্যকোথাও তার প্রয়োগ হতে পারে না।
অপর কেউ কেউ বলেছেন, হাদীসটির অর্থ হল মালিকের জন্যে এক-তৃতীয়াংশবা এক চতুর্থাংশ ওশর বাদ দেবে, যেন তারা তাদের দরিদ্র আত্মীয় ও প্রতিবেশী লোকদের মধ্যে তা বিতরণ করতে পারে। তা হলে মালিকরা দ্বিতীযবারতার উপর জরিমানার মত দিতে বাধ্য হবে না। ইমাম শাফেয়ীও হাদীসটির এই ব্যাখ্যাই দিয়েছেন।
তার একটা পুরানো কথাও আছে। তা হল, তার পরিবারবর্গের খাওয়ার জন্যে কিছু খেজুর রেখে দেবে। আর তার পরিবারের লোকদের কমবেশী হওয়ার ভিত্তিতে এর পরিমাণেও কম বেশী হবে। অপররা জবাব দিয়েছেন এই বলে যে, কৃষি ও জমিতে যা খরচ হয়, তা বাদ দিয়ে হিসাব করতে হবে। ইবনুল আরাবী বলেছেন, সঠিক দৃষ্টিভংগী হচ্ছে, হাদীস অনুযায়ী আমল করা। আর তা হচ্ছে ব্যয়ের পরিমাণ। আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি, কাঁচা অবস্থায় যা খাওয়া হয় তার চাইতে সব সময় ব্যয়ের ভাগ বেশী থাকে।
আমি মনে করি, সহজ হাদীসও অন্যান্য দলীলাদি যা প্রমাণ করে তা গ্রহণ করাই বাঞ্ছনীয়। হযরত উমর ফারূকও এ মত অনুযায়ী আমল করেছেন। ইমাম আহমদ, ইসহাক, লাইস, শাফেয়ী (তাঁর পুরনো কথা) ও ইবনে হাজমও এ মত গ্রহণ করেছেন।
সত্যি কথা এই যে, এ হাদীসটি আমাদের যাকাত পর্যায়ে এক গুরুত্বপূর্ণ শুভ সূচনা দান করে। আর তা হচ্ছে, মালিক ও তার পরিবারবর্গের যুক্তিসংগত প্রয়োজনকে মেনে নেয়া এবং সে অনুপাতে পরিমাণ নির্ধারণী রেয়াত দান ও কম্-সেকম পরিমাণ ধার্য করা। আর যে মালেই যাকাত ধার্য হয় তাতে এ একটা সাধারণ শর্ত বিশেষ।তা হল মৌল প্রয়োজনের অতিরিক্তের উপর যাকাত ধার্য করণ।
ইসলাম সব সময়ই ব্যক্তিগত সুবিধা-অসুবিধা ও তার পরিবারবর্গের প্রয়োজনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। মানবীয় চিন্তা ও কর ধার্যকরণ রীতিতে এ চিন্তাটা এসেছে। তবে তা খুব বেশী দিনের কথা নয়। পূর্বের নীতি ছিল আসলের উপর কর ধার্যকরণ, মালিকের সুবিধা-অসুবিধা ও তার প্রয়োজন এবং ঋণের প্রতি কোনই লক্ষ্য না দেয়া।
সপ্তম আলোচনা
ঋণ ও ব্যয়ভার বাদ দিয়ে অবশিষ্টের যাকাত
ঋণ ও ব্যয়ভার বাদ দিয়ে কি যাকাত দেয়া যাবে
কৃষিফসলও ফলেরমালিকের ঋণ দুরকমের হয়ে থাকে। তার কৃষি ও চাষাবাদের কাজে ব্যয় করার কারণে ঋণ হয়ে থাকে। বীজ, সার ও শ্রমিকের মজুরী দান প্রভৃতি ব্যয় এ পর্যায়ে গণ্য। আর কতক ঋণ হয় কৃষি মালিকের নিজের ও তার পরিবারবর্গের ব্যয়ভার বহনে। এ প্রকারের ঋণের ক্ষেত্রে শরীয়াতের নির্দেশ কি?
আবূ উবাইদ জাবির ইবনে যায়দ থেকে বর্ণা করেচেন, যে ব্যক্তি ঋণ নিয়ে নিজের পরিবারবর্গ ও চাষের জমির উপর ব্যয় করে, তার সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, যা জমির উপর ব্যয় করা হয়েছে, তাই আদায় করা হবে। ইবনে উমর বলেছেন, তার পরিবার ও জমি উভয়ের উপর ব্যয়িত অর্থই যাকাত দেয়ার সম্পদ থেকে বাদ দেয়া হবে। তারপর অবশিষ্টের যাকাত দিতে হবে। ইয়াহ্ইয়া ইবনে উমরের এ মত উদ্ধৃত করেছেন যে, প্রথম সম্পূর্ণ ঋণ হিসাব করে বাদ দেয়া হবে, পরে অবশিষ্টের যাকাত দেয়া হবে। আর িইবনে আব্বাসের মত হল, যা ফসরের জন্যে ব্যয় করা হয়েছে, তা বাদ দিয়ে অবশিষ্টের যাকাত দিতে হবে।
তা হলে ইবনে আব্বাস ও ইবনে উমর উভয়ই জমি ও ফল-ফসলের জন্যে ব্রয় করা সর্বপ্রথম বাদ দেয়া, হিসেবে তা না ধরা এবং শুধু অবশিষ্টের যাকাত দেয়া সম্পর্কে সম্পূর্ণ একমত। তবে নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনে নেয়া ঋণ সম্পর্কে তাঁরা দুজন হতে পারেন নি।
মকহুল বলেছৈন, কৃষি মালিক ঋণগ্রস্ত সে ঋণ পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তার কাছ থেকে যাকাতআদায় করা যাবে না। যা অবশিষ্ট থাকবে, কেবল তারইযাকাত দিতে হবে, যদি তা যাকাত ফরযহওয়া পরিমাণের হয়। আতা ও তায়ূসথেকেও এ কথাই বর্ণিত হয়েছে।ইরাকী ফিকাহ্বিদদের অনেকেই ইবনে উমর, আতা, তায়ূস ও মকহুলথেকে বর্ণিত মত সমর্থন করেছে। সুফিয়ান সওরীও এই মতই প্রকাশ করেছেন।
আহমদ ইবনে হাম্বলের দুটি মত উদ্ধৃত হয়েছে। একটি বলা হয়েছে, যে লোক পরিবারের ব্যয়ভার বহন ও কৃষি কাজের প্রয়োজনীয় ব্যয়ভার বহনের জন্যে ঋণকরবে, তার প্রথমটির হিসাব গণ্য হবে না, গণ্য হবে দ্বিতীয়টির হিসাব। কেননা ওটাতো কৃষিসংক্রান্ত ব্যয়। আর দ্বিতীয় মতে বলা হয়েছে, এই গোটা ঋণই যাকাতরে প্রতিবন্ধক। ফলে প্রথমমতটি ইবনে আব্বাসের মতের অনুকূল। আর দ্বিতীয় মতে তিনি ইবনে উমরের সাথে একাত্ম।
‘আল-মুগনী’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, এই বর্ণনানুযায়ী সর্ব প্রকার ঋণই গণ্যও হিসাব করাহবে। তারপরে অবশিষ্ট কৃষি ফসলের উপর ওশর ধার্য হবে, যদি নিসাব পরিমাণ থাকে অন্যথায় নয়। কেননা ঋণ তো যাকাত ধার্য হওয়ার পথেই বড় বাধা। যেমন গোপন মালের যাকাতের ক্ষেত্রে। আর কৃষি কাজের ব্যয়। প্রথম বর্ণনুযায়ী দুটির মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, যা কৃষি সংক্রান্ত ব্যয় হবে তার মুকাবিলায় অর্জিত ফসল ভিন্ন কাজে ব্যয় করা হবে, যেন তা অর্জিতই হয়নি।
আবূ উবাইদের মতে ইবনে উমর ও তাঁর অনুকূল মতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন অর্জিত ফসল থেকে সম্পূর্ণ ঋণটা বাদ দেয়া ও অবশিষ্টের যাকাত দেয়ার ব্যাপারে। তবে শর্ত হচ্ছে, ঋণটা যথার্থ হতে হবে। বলেছেন, ‘ঋণ যদি যথার্থ হয় িএবং জমির মালিকেরই হয়ে থাকে তাহলে তার উপর যাকাত ধার্য হবে না। তার ঋণেল কারণেই তা প্রত্যাহৃত হবে।’ ইবনে আমর, তায়ূস, মকহুলও এ কথাই বলেছেন। আর তা সুন্নাতের অনুসরণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। কেননা নবী করীম(স) তো ধনীদের কাছ থেকে যাকাত গ্রহণের সুন্নাত কার্যকর করেছেন, যেন তা গরীবদের মধ্যে বন্টন করা যায়। যে লোকের ঋণ তাকে গ্রাসকরেছে, আদায়ের মত অর্থ যার নেই, সেনিজেই যাকাত পাওয়ার যোগ্য। তার কাছ থেকে যাকাত নেয়া যাবে কি করে? –আর একই সময় ধনী ব্যীক্ত কি করে দরিদ্র গণ্য হতে পারে? তা সত্ত্বেও সে-যাকাত পাওয়ার যোগ্র আটজনের একজন-ঋণী। তাই দুই দিক দিয়েই তার পাওনা সাব্যস্ত হয়।
খারাজ হচ্ছে জমিখণ্ডের উপর ধার্য করা ভূমিকর মাত্র। জমির ফসল থেকে তা কিছু বাদ দিয়ে হিসাব করা হবে এবং অবশিষ্টের যাকাত দিতে হবে? .. না অন্য কিছু?
ইয়াহইয়া ইবনে আদাম বর্ণনা করেছেন, সুফিয়ান সওরী খারাজী জমির মালিককে বলেছেন, ‘তোমার ঋণ ও খারাজ বাদ দাও। তারপর পাঁচ অসাক ফসল অবশিষ্ট থাকলে যাকাত দাও।’
আবূ উবাইদ বর্ণনা করেছেন, উমর ইবনে আবদুল আযীয আবদুল্লাহ ইবনে আওফ-ফিলিস্তিনে তাঁর নিয়োজিত কর্মকর্তা লিখেছিলেন: ‘যে মুসলিমের মালিকানায় জিযিয়া জমি রয়েছে, তার জিযিয়া বাদ দিয়ে অবশিষ্ট থেকে যাকাত নিতে হবে।’ (এখানে ‘জিযিয়া’ অর্থ খারাজ)। উমর, সুফিয়ান ‘খারাজ’ পরিমাণ বাদ দিয়ে যাকাত নেয়ার পক্ষপাতী। অবশিষ্ট নিসাব পরিমাণ হলেই তার উপর যাকাত হবে। উমর একজন অন্যতম ইমাম ছিলেন।
ইমার আহ্মদের মতও প্রায় এমনিই। তাঁর যুক্তি হচ্ছে, খারাজ জমি বাবদ ব্যয়। তাই ততটা পরিমাণ বাদ দিয়েই যাকাত ফরয হবে- ইবনে আব্বাস ও ইবনে উমর যেমন করে কৃষি কার্যে ব্যয় করা পরিমাণ বাদ দিয়ে অবশিষ্টের যাকাত দেয়ার কথা বলেছেন।
কৃষি শ্রমিককে জমির মালিক যে মজুরী দেয় তা এই খারাজের মতই মূল উৎপাদন থেকে বাদ পড়বে, তার পর যাকাত দেয়া হবে। কেননা জমহুর ফিকাহ্বিদ খারাজকে জমির মজুরীর পর্যায়ে গণ্য করেছেন। ইয়াহ্ইয়া ইবনে আদম বলেন, কেউযদি সাদা ওশরী জমি নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্যের বিনিময়ে কাউকে চাষ করতে দেয়, সেতাতে খাদ্যের চাষ করে, তাহলে তার দেয় খাদ্র পরিমাণ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট থেকে যাকাত দিতে হবে। যাকাত ওশর হতে পারে, হতে পারে অর্ধ-ওশর। পরে বলেছেন সে তার ঋণও বাদ দেবে, পরে যা থাকবে তা থেকে ফরয পরিমাণ যাকাত দেবে।
তবে কাজ ও ফলোৎপাদনে যদি ঋণ না হয় ও খারাজ দিতে না হয়, যেমন যদি কেউ নিজ থেকেই বীজ, সার, চাষ ইত্যাদি বাবদ যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করে, তাহলে কি করা হবে? তখনও কি এই সব ব্যয় ও দায়িত্ব পরিমাণ ফসল থেকে বাদ দিয়ে অবশিষ্টের যাকাত দিতে হবে? যেমন ঋণ ও খারাজ বাদ দিয়ে ওশর দো হয়? অথবা সমস্ত ফসলের উপরই যাকাত ধার্য হবে।
ইবনে হাজম বলেছেন, ফসল উৎপাদনকারী নিজে এ পর্যায়ে যা কিছু ব্যয় বা বিনিয়োগ করেছেতা সবইবাদ যাবে ও তারপরই অবশিষ্টের উপর যাকাত ধার্য হবে, এ কথা ঠিক নয়। তাতে সে ঋণ হোক, কি ঋণ ছাড়াই এই সব ব্যয় করে থাকুক। এবং সমস্ত ব্যয় সমস্ত ফসল ও ফলেরমূল্য দিয়ে পূর্ণ হোক, কি না-ই হোক, এ ক্ষেত্রে পূর্বকালীন মনীষীদের বিভিন্ন মত রয়েছে। ইবনে আব্বাস ও ইবনে উমরের মধ্যেও রয়েছে মতপার্থক্য। একজন বলেছেন, সম্পূর্ণটা যাকাত দিতে হবে, অপর জন বলেছেন, ব্যয়টা বাদ দিয়ে তবে যাকাত দিতে হবে।
আতার মতে যে ব্যয় ন্যায়সংগত রয়েছে তা বাদ দিয়ে অবশিষ্টের উপর যাকাত ধার্য হলে তা বাদ দেবে, নতুবা নয়। ইবনে হাজম এ কথার প্রতিবাদ করে বলেছৈন, আল্লাহ্ যে হক ধার্য করেছেন, তা কুরআন বা প্রমাণিত সুন্নাতের দলীল ব্যতিরিকে প্রত্যাহার করা জায়েয হতে পারে না। ইমাম মালিক, শাফেয়ী ও আবূ হানীফাও এ মত দিয়েছেন।
উপরিউক্ত ব্যাপারে ইবনে আব্বাস ও ইবনে উমর ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করলেও এ ব্যাপারে দুজনই একমত যে, কেউঋণ নিয়ে ফল ও ফসল এবং নিজ পরিবারের জন্যে ব্যয় করলে ফল-ফসল যা ব্যয় হয়েছে তা বাদ দেয়ার পরই অবশিষ্টের উপর যাকাত ধার্য হবে। তবে ইবনে উমরের মতে নিজের ও পরিবারবর্গের জন্যে যা ব্যয় করা হয়, তাও বাদ যাবে।
এই মতটি দুজন মহাসম্মানিত সাহাবীর- সেই ব্যক্তি সম্পর্কে, যে নিজের কৃষি ফসল ও ফলে নিজে থেকে অথবা ঋণ নিয়ে ব্যয় করেছে। ঋণ না নিয়ে নিজের মালথেকে ব্যয় করে থাকলে কি হবে, এ বিষয়ে দুজনই নীরব।এ পর্যায়ে কেবল ইবনে হাজমের উপরোদ্ধৃত মতটিই পাওয়ায যায়। আতাও এ মত দিয়েছেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছি, ‘আমার নিজের জমি আমি চাষাবাদ করি, আমার ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত? বললেন: ‘তোমার ব্যয়টা তুলে নাও তারপর যা থাকবে তা থেকে যাকাত দাও।
ইবনুল আরাবী বলেছেন, আমাদের আলিমগণের মত বিভিন্ন হয়ে গেছে, যাকাযোগ্য মাল থেকে ব্যয় বাদ দেয়া হবে ও তারপর যাকাত ধার্য হবে, অথবা মাল ও খেদমতের ব্যয় ফসল লাভ করা পর্যন্ত সব মালিকের ভাগে চলে যাবে এবং মূলধন থেকে যাকাত দেয়া হবে- এ ধরনের বিভিন্ন মত রয়েছে। সহীহ কথা হল, লব্ধ ফসল থেকেই তা বাদ দেয়া হবে ও অবশিষ্ট থেকে ওশর নেয়া হবে। দলীল হচ্ছে, নবী করীম (স) বলেছেন, এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশচেড়ে দাও। এ পরিমাণটা মোট খরচের প্রায় সমান। যা কাঁচা খাওয়া হয়েছে ও যা ব্যয় করা হয়েছে তা বাদ দিলে চারভাগের তিন ভাগ অথবা দুই-তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে। আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি।
ইবনুল আরাবীর কথার অর্থ হল, এক-তৃতীয়াংশ কিংবা এক-চতুর্থাংশ- যেমন হাদীসে বলা হয়েছে- এর ব্যয় পরিমাণ ফসল থেকেবাদ দেয়া, এ দুটি এক সাথে চলবে না। কেননা তা এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশের মধ্যেই গণ্য। তার অর্থ এই যে, এক তৃতীয়াংশের অধিক হলেও বাদ দিতে হবে আর তা করা হবে প্রত্যেকবারের ফসলে ও ফলে- তা অনুমান করা হোক, আর না-ই হোক।
ইবনুল হুম্মাম এ মতহ সমর্থন করেন নি এই বলে যে, শরীয়াত প্রদাতা নিজেই ব্যয়ভারের পার্থক্যের কারণে যাকাতের পরিমাণে পার্থক্য করার নির্দেশ করেছেন। যদি ব্যয় পরিমাণ বাদ দেয়া হয় তাহলে তাকে এককভাবে ফরয পরিমাণ। আর তা হচ্ছে, চিরদিন অবশিষ্ট্যের উপর ধার্য ওশর। কেননা কেবলমাত্র এই ব্যয়ভারের জন্যেই অর্ধ-ওশরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আসলে ফরয ধার্যই হয় অবশিষ্টে উপর-ব্যয়ভার বাদ দেয়ার পর, িএমন অবস্থায় যে, তাতে ব্যয়ভার নেই।তাহলে ফরয পরিমাণ চিরকালই ওশর হবে। কিন্তু এই পরিমাণটা শরীযাতই পার্থক্যপূর্ণ করে দিয়েছে- একবার ওশর ও একবার অর্ধ-ওশর করে – তা এই ব্যয়ভারের কারণে। এ থেকে আমরা জানলাম যে, কতক উৎপাদনের উপর ওশর ধার্য হওয়াটা শরীয়াত কর্তৃক গ্রাহ্য হয়নি। কেননা মৌলিকভাবে তা হচ্ছে খরচের সমপরিমাণ। [(আরবী ************)]
আমার কাছে মনে হয়, শরীয়াত প্রদাতা উৎপাদনে ফরয পরিমাণে পার্থক্য করেছেন জমির সেচকাজে কষ্ট চেষ্টা-প্রচেষ্টার পার্থক্যের কারণে। আর কৃষি জমির বিভিন্নতার দরুন এ কথাটি খুবই স্পষ্ট ও প্রকট হয়ে ওঠে। এ ছাড়া অন্যান্য পার্থক্য গণ্য করার পক্ষেকোন দলীল নেই। তা বাদ দেয়ার পক্ষেও নেই। কিন্তু শরীয়াতের মৌল ভাবধারার সাথে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ হচ্ছে উৎপাদন থেকে খরচের সমপরিমাণ যাকাত প্রত্যাহার করা। দুটি ব্যাপার এ কথার সমর্থনে রয়েছে:
প্রথম, শরীয়াতের দৃষ্টিতে কষ্ট ও খরচের একটা প্রভাব ও গুরুত্ব রয়েছে। এ কারণে ফরয পরিমাণ কম ধরা হয়। যেমন যন্ত্র দ্বারা পানি সেচ করা। তাতে অর্ধ-ওশর ধরা হয়েছে। আর সারা বছর যে গবাদিপশুকে কেটে এনে ঘাস খাওয়াতে হয়, তাতে যাকাত ধার্যই হয় না। কাজেই জমির উৎপাদন থেকে সে পরিমাণ প্রত্যাহার করায় তা প্রভাবশালী হবে, এতে আশ্চর্যের কিছুই নেই।
দ্বিতয়, প্রকৃত প্রবৃদ্ধি হচ্ছে বাড়তি অংশ। কিন্তু অর্জনে যদি সমপরিমাণ ব্যয় হয়ে যায়, তাহলে মাল বাড়তি হল বা বেশী উপার্জন হল তা মনে করাযায় না। এ কারণে কোন কোন ফিকাহ্বিদ বলেছেন, খরচের পরিমাণটা বিনিময়ে অর্পিতের মত, যেন সেতা ক্রয় করেছে। আর এটাই ঠিক।
এ কথার ভিত্তিতে বলা হচ্ছে যে, যে পানি সেচের ব্যয়ের জন্যে শরীয়াতে ওশর থেকে ফরয পরিমাণকে অর্ধেকে নিয়ে আসা হয়েছে, আমরা তা হিসেব করব না।
তাহলে যার জমি দশ ‘কিন্তার’ ৩.৪৪ কিলোগ্রাম তুলা উৎপাদন করেছে, যা দুইশ’ ‘জনীহ’র (মিসরীয় পাউণ্ড) সমান অথচ পানি সেচ ছাড়া জমির করসহ অন্যান্য কাজে ব্যয় হয়ে গেছে ষাট ‘জনীহ’ (যা তিন কিন্তারের সমান) সে মাত্র অবশিষ্ট সাত ‘কিন্তার’-এর যাকাত দেবে। আর যদি মেঘের পানিতেই সিক্ত হয়ে থাকে, তাহলে তাতে ওশর ধার্য হবে এবং যন্ত্রের সাহায্যে সেচ হয়ে থাকলে অর্ধ-ওশর হবে।
অষ্টম আলোচনা
ভাড়া করা জমির যাকাত
মালিক নিজেই চাষ করলে
১. জমির মালিক নিজেই নিজের জমি চাষ করবে- যদি সে কৃষিজীবী হয়ে থাকে। শরীযাতের দৃষ্টিতে এটাই উত্তম কাজ। তখন সে জমির ফসলের ওশর বা অর্ধ-ওশর যাকাত দেবে। কেননা জমি ও চাষাবাদ উভয়েরই মালিক সে।
ধার করা জমির যাকাত
২. কিন্তু জমির মালিকযদি তার জমি অপর কোন কৃষিজীবীকে ধার দেয়, সে তা চাষকরেও কোনরূপ বিনিময় না দিয়ে, ফসল পায়- তাহলে ইসলামের দৃষ্টিতে তা খুবই প্রশংসনীয় কাজ। ইসলামে এজন্যে উৎসাহও দান করা হয়েছে। এরূপ হলে জমির যাকাত দিতে হবে চাষাবাদকারীকে, কেননা সে কোনরূপ বিনিময় বা ভাড়া ছাড়াই জমি থেকে উপকৃত হয়েছে।
জমি মালিক ও শরীক
৩. কিন্তু জমি যদি সহীহ্ভাবে পারস্পরিক চুক্তিতে চাষাবাদ করা হয়। ফসলের এক-চতুর্থাংশ বা এক-তৃতীয়াংশ বা অর্ধেক দেয়ার চুক্তিতে সেখানে যেমন নিয়ম-শর্তে, তাহলে প্রত্যেক অংশীদারকেতার প্রাপ্ত অংশ থেকে যাকাত দিতে হবে- যদি তার অংশ যাকাত পরিমাণ হয়। অথবা তার যদি অন্য চাষাবাদও থাকে তার সাথে মিলিয়ে তার মোট প্রাপ্ত ফসল পরিমাণ হিসাব করে যাকাত দিতে হবে- নিসাব পরিমাণ হলে।
কিন্তু দুজনার একজনের অংশ যদি নিসাব পরিমাণ হয়- অন্য জনের তা না হয়, তাহলে যার সেই পরিমাণ হবে, তাকেইনিজের অংশথেকে যাকাত দিতে হবে, অপরজনকে কিছুই দিতে হবে না। কেননা সে নিসাব পরিমাণের কম ফসল পেয়েছে। এ জন্যে যে, শরীয়াতের দৃষ্টিতে সে ধনী ব্যক্তি নয়। আর যাকাত তো কেবল ধনীর কাছ থেকেই নিতে হবে। কিন্তু ইমাম শাফেয়ী ও আহমদ এই দুইজনকে একজন ব্যক্তি ধরে উভয়ের উপর ওশর ধার্য করার পক্ষে- যদি উভয়ের প্রাপ্ত ফসলসমষ্টি পাঁচ অসাক পরিমাণের হয়। তখন প্রত্যেকেই নিজের অংশথেকে ওশর দেবে।
মালিক যাকাত দেবে, না কেরায়াদার
৪. জমি যদি নগদ অর্থ বা কোন জ্ঞাত জিনিসের বিনিময়ে ভাড়ায় লাগানো হয়, জমহুর ফিকাহ্বিদগণ তা জায়েয বলেছেন- তা হলে ওশর বা অর্ধ-ওশর কে দেবে? জমির মালিক? কেননা জমি সে-ই পেয়েছে।– অথবা কেরায়াদার? কেননা সে-ই চাষাবাদ করে কার্যত উপকৃত হয়েছে, ফসল পেয়েছে।
ইমাম আবূ হানীফার মত
এ ক্ষেত্রে ইমাম আবূ হানীফা বলেছন, মালিকই জমির ওশর দেবে, কেননা তাঁর কাছে মৌলনীতি হচ্ছে, ওশর জমির বর্ধনশীলতার হক এবং দেয়, কৃষিকাজের হক বা দেয় নয়। আর এখানে জমির মালিক রয়েছে, জমি তারই’ আর ওশর হচ্ছে জমির খরচ, যেমন তার খারাজ। আরও এ জন্যে যে, জমি যেমন কৃষি-কাজে বর্ধনশীলহয়, তেমনি ভাড়ায় লাগানোও বর্ধনশীল হয়। তাহলে তার ভাড়াটা ফল ও ফসলের মতই মূল লক্ষ্যবস্তু। মালিকের জন্যে প্রবৃদ্ধির একটা তাৎপর্য থাকে, সেই সাথে মালিকানার নিয়অমতও সে-ইভোগ করে। কাজেই ওশর তার উপরই ধার্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। ইবরাহীম নখয়ীও এ মত দিয়েছেন।
জম্হুর ফিকাহ্বিদদের মত
জম্হুর ফিকাহ্বিদদের মত হচ্ছে, ওশর দিতে হবে কেরায়া গ্রহণকারীকে। কেননা ওশর হচ্ছে কৃষির হক, জমির হক নয়। কিন্তু এখানে জমি-মালিক কোন ফল বা ফসল পায়নি। সে কৃষি ফসলের যাকাত দেবে কি করে, সে তো ফসলের মালিক হয়নি, মালিক হয়েছে অন্য লোক?
মতপার্থক্যের কারণ
ইবনে রুশ্দ বলেছেন, ওশর জমির হক, না কৃষি কাজের হক অথবা উভয়ের, এই নিয়ে মতপার্থক্য হচ্ছে উপরিউক্ত মতবিরোধের আসল কারণ। কেননা উভয়ের সামষ্টিক হক হওয়ার কথা কেউ বলেন নি। অথচ প্রকৃতপক্ষে উভয়েরই সামষ্টিক হক।
জমির ফসলের উপর হক ধার্য হয় দুটি দিক দিয়ে। একটি দিক জমি, আর অপর দিক হচ্ছে ফসল। এক্ষণে মতবিরোধ হয়েছে এই নিয়েযে, এ দুটির কোনটি ‘হক’ নির্দিষ্ট করা উত্তম তাঁদের মধ্য ঐকমত্যের ক্ষেত্রেও রয়েছে। জমি ও কৃষি কাজ উভয়ের মালিকযদি একজন হয়, তাহলে সেই ঐকমত্য বাস্তবায়িত হতে পারে। সাধারণ ফিকাহ্বিদগণ বলেছেন, জমির ফসলই হচ্ছে যাকাত হওয়ার আসল কারণ। আর ইমাম আবূ হানীফঅ মনে করেছেন, যাকাত ফরয হওয়ার আসল কারণ হচ্ছে জমি।
অগ্রাধিকার দান
‘আল-মুগনী’ গ্রন্থ প্রণেতার দৃষ্টিতে জম্হুর ফিকাহ্বিদদের মতই অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। অর্থাৎ ওশর ফলয হবে কৃষিফসলে, এই ফসলের মালিকই তা দেবে। আর বলেছেন, ওশরকে জমির ব্যয় মনে করা ঠিক নয়। কেননাযদি তা-ই হত, তাহলে তাতেই ওশর ফরয হত তা চাষাবাদ করা না হলেও। যেমন খারাজ বা কর ধার্য থাকে ও দিতে হয় সর্বাবস্থায়েই। যিম্মীর উপরও তা ফরয- যেমন খারাজ। আর তা জমির পরিমাণ অনুযায়ী ধার্য হত, কৃষি ফসলের পরিমাণ হিসেবেহত না এবং তা ফাই-এর ব্যয় ক্ষেত্রেই ব্যয় করা হত, যাকাত ব্যয়ের ক্ষেত্রে নয়।
রাফেয়ী বলেছেন, মালিকানাভুক্ত ফসল এবং ভাড়ায় লওয়া জমির ফসলের মধ্যে ওশর ফরয হওয়ার ব্যাপারে কোন পার্থক্য নেই। কেরায়াদারের উপর ওশর ও কেরায়া- উভয়ই একত্রিত হয়ে পড়ে। যেমন কেউ যদি ব্যবসায়ের জন্যে কোন দোকান ভাড়া নেয়, তাহলে তাকে ভাড়া ও ব্যবসায়ের যাকাত উভয়ৈই বহন করতে হয়।
কিন্তু এই তুলনা সমর্থনযোগ্য নয়, কেননা ব্যবসায়ীর কাছে প্রবর্ধনশীল মূলদনের যা-ই অবশিষ্ট থাকবে, প্রতি বছর তার উপর ব্যবসায়ী যাকাত ধার্য় হবে- সারা বছরের দোকান ভাড়া, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য ব্যয় বাদ দিয়ে। বছরের বা এক মাসের ভাড়া ইত্যাদি কিছু বাকি থেকেথাকলে তা তার ঋণ হবে এবং জমা থেকে বাদ দেয়ার পরই তার যাকাত দিতে হবে। কিন্তু কৃষি ফসলের যাকাতের বছরের হিসাব নেই। যখনই ফসল কাটা হবে, তখনই যাকাত ফরযহবে। কাজেই যাকাত দেয়ার পূর্বে কৃষি ফসল থেকে ভাড়া দিয়ে দেয়া সম্ভব নয়- যেমন দোকানের ভাড়া ব্যবসায়ের আয় থেকে দিয়ে দেয়া সম্ভব হয়ে থাকে।
এ কারণে কেরায়াদার জমিতে প্রাণপণ খাটুনী খাটবে, পরে তার ভাড়া দেবে, আর তারপরও তার কাছ থেকে ওশর নেয়া হবে- এটা তার প্রতি খুবই অতিরিক্ত চাপ বলে মনে হয়। এমতাবস্থায় জমির মালিক সর্ব প্রকার দায়দায়িত্বমুক্ত থেকে জমির ভাড়াটি আদায় করে নেয়। ভাড়ার টাকা এক বছর বয়স হওয়ার পূর্বে তার কাছে কিছুই দাবি করা হয় না।
সুবিচারপূর্ণ নীতি হচ্ছে, জমি বাবদ দেয় যাকাতের উভয় পক্ষকে শরীক হতে হবে। প্রত্যেকেই যা যা অর্জন করেছে, তার উপর থেকে তা দিতে প্রত্যেককেই বাধ্য থাকতে হবে। তাহলে কেরায়াদারও যাকাত দেয়ার দায়িত্ব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হবে না- যেমন ইমাম আবূ হানীফা মনে করেন। আর মালিককে সম্পূর্ণ মুক্ত করে দিয়ে যাকাতের সমস্ত দায়-দায়িত্ব কেরায়াদারের উপর চাপানোওহবে না- যেমন জম্হুর ফিকাহ্বিদরা মনে করেছেন।
ইবনে রুশ্দ তাঁর দার্শনিক বিবেকের বলে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন, কৃষিজমির উপর ধার্যকরণটা কেবল জমির হক নয়, নয় কেবলমাত্র কৃষি ফসলের হক’ বরং এই উভয়েরই যৌথ হক।
তার অর্থ, জমি-মালিক ও কৃষি ফসলেরমালিক উভয়ই ওশর বা অর্ধ-ওশর- যাই হোক- তা দেয়ার ব্যাপারে সমান দায়িত্বশীল হবে। আমারমতে এই মতটাই অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য।
কিন্তু ফরয আদায় করার ব্যাপারে দুজন লোক কিভাবে শরীক হতে পারে এবং কিসের ও কোন্ ভিত্তি তা আদায় করবে?
আমরা মনে করি, এ মতটাই ঠিক যে, যাকাত পরিচ্ছন্ন কৃষি ফসলের উপর ধার্য হবে। ঋণ ও কর-খাজনা-খারাজ হচ্ছে ব্যয়, আর চাষকার্য ও বীজ মোট উৎপাদন থেকে সমপরিমাণ বাদ দিতে হবে। পরে অবশিষ্ট পরিমাণ যদি নিসাব পরিমাণ হয় তবে তার যাকাত দিতে হবে। জমির ভাড়া নিঃসন্দেহে কৃষিকার্য পর্যায়ের ব্যয়। তা খারাজের মতই, তা ভাড়াটের উপর ঋণরূপে গণ্য হবে। অতএব উৎপাদন থেকে সেই পরিমাণ বাদ দিতে হবে। সেই সঙ্গে অন্যান্য যাবতীয় ঋণ ও ব্যায়দিও **** পরে ওশর বা অর্ধ-ওশর দেয়ার সময়হবে। যদি তার নিসাব পমিাণ ফসল হাতে থাকে।
দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায়, জমির কেয়ারা যদি ২০ জনীহ্ হয়, আর উৎপন্ন ফসলের পরিমাণ যদি হয় আরদব। এক আরদব পাঁচ জনীহ্র সমান। (তা হলে উৎপাদন পরিমাণ হল ১০*৫=৫০ জনীহ্)। তাই কেবলমাত্র ৬ আদরবের যাকাত দিতেহবে। বাকীটা ভাড়া বাবদ কাটা যাবে।
আর যদি ভাড়া ব্যয় হয় ৩০ জনীহ্ (যা ৬ আরদবের মূল্যের সমান) তা হলে অবশিষ্ট ৪া আরদব- ৪৮ মাপ। তা যাকাত ফরয হওয়ার পরিমাপের কম বলে তার উপর যাকাত ধার্য হবে না। কিন্তু জমির মালিকর পক্ষে ফসলের ওশর বা অর্ধ-ওশর দেয়া সম্ভব নয়। কেননা সেতো ফসলের মালিক নয়। সে তো জমির ভাড়া পেয়েছে মাত্র, ফসল পায়নি।
তবে জমি যদি অর্ধেক ফসলের বিনিময়ে চাষ করতে দেয়া হয়, তাহলেসে তার প্রাপ্ত অংশ থেকে তার যাকাত দিতে পারে, যদি তা নিসাব পরিমাণ হয়।
এমতাবস্থায় সে ভাড়া বাবদ যা পাবে- তা অর্ধেক ফসল- তা থেকে ওশর বা অর্ধ-ওশর দেবে। তবে শর্ত এই যে, তা জমির ফসলের নিসাবের মূল্য পর্যন্ত হতে হবে। কেননা তা তারই বিনিময়। তার উপর ঋণ বা খারাজও রয়েছে জমির কর বাবদ দেয়, তাও তাকে প্রাপ্ত অংশথেকে দিতে হবে এবং অবশিষ্ট থেকে যাকাত দেবে যা ধার্য হয়। ঋণ ও খারাজ তো মৌল প্রয়োজনের অর্তর্বুক্ত, যেমন তার নিজের ও পরিবারবর্গের খাবার, পোশাক, বাসস্থান ও চিকিৎসা ইত্যাদি বাবদ ব্যয় মৌল প্রয়োজনের শামিল। এগুলোর উপর সে পুরোপুরি নির্ভরশীল। এ জন্যে ফিকাহ্বিদগণ মনে করেছেন, পানের জন্যে প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি থাকা অবস্থায়ও তায়াম্মুম করা জায়েয। কেননা তখন মনে করতে হবে যে, আদপেই কোন পানি নেই। এখানেও তেমনি।
এখানে যা বললাম, জমি মালিক ও ভাড়ায় চাষাবাদকারী- এ দুজনইসুবিচার ও ইনসাফের ভিত্তিতে যাকাত দেয়ায় শরীক হবে।
তাই ভাড়ায় জমি চাষকারী ঋণ, ভাড়া ও কৃষি সংক্রান্ত যাবতীয ব্যয়ের দায়িত্ব মুক্ত হয়ে প্রাপ্ত ফসল থেকে যাকাত দেবে। আর জমিরমালিক যাকাত দেবে যা আল্লাহ তাকে পাইয়ে দেবেন- ঋণ ও কর ইত্যাদি মুক্ত হয়ে- তা থেকে।
ভাড়ায় চাষকারীর অংশের ফসল থেকে ভাড়ার পরিমাণ অংশ বাদ যাবে। আর যে পরিমাণ যাকাত মাফ করা হবে, তা মালিকের ভাগে চলে যাবে এবং তা থেকে ফরয যাকাত দিয়ে দেবে। সেই পরিমাণের যাকাত কেরায়াদারের পরিবর্তে সে-ই আদায় করার অধিকার যোগ্য।
মালিক ও কেরায়াদারের এই পারস্পরিক সুবিচারপূর্ণ সহানুভূতির ভিত্তিতে ইমাম আবূ হানীফার মতের উত্তম অংশ ও জম্হুর ফিকাহ্বিদদের মতের উত্তম অংশ অনায়াসেই গ্রহণ করতে পারি এবং উভয়ের উপর সেই পরিমাণ ধার্য করতে পারি, যার সে অধিকারী মালিক। সেই সাথে একই মালের উপর দুইবার যাকাত ফরয হওয়ার বিপদ থেকে রক্ষাও পাওয়া যায়। কেননা যে পরিমাণ মালের যাকাত জমি মালিক দিয়েছে, তা কেরায়াদারের অংশ থেকে বাদ দেয়া হবে।
একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে কথাটি স্পষ্ট করে তোলা যেতে পারে। একটি লোক দশ ফেদান বা একর পরিমাণ জমির মালিক। সে তা ভাড়া দিলতাতে ধান উৎপাদন করার উদ্দেশ্যে। আর তার ভাড়া হল ২০ জনীহ। জমিতে ১০০ ‘আরদব’ ধান উৎপন্ন হল। প্রতি আদবের মূল্যহল ৪জনীহ। এক্ষণে এ মালিক ও কেরায়াদার এর যাকাত দেবে কিভাবে?
কেরায়াদার মোট উৎপাদন থেকে ভাড়া পরিমাণ ফসল- ম৫০-আরদব- (৫০*৪=২০০ জনীহ তা থেকে ১০*২০=২০০ ভাড়া) বের করে নেবে। আর সে যেহেতু এ ফসল উৎপাদনে বীজ ও সার বাবদ ব্যয় করেছে আরও ৪০ জনীহ (যা ১০ আরদব সমান)। ফলেতার জন্যে নির্ঝঞ্ঝাটভাবে অবশিষ্ট থাকবে আরদব। আর তার উপর ফরয যেহেতু অর্ধ-ওশর, তাই সে তা থেকে ২ আরদব যাকাত দেবে। আর জমির মালিক তার প্রাপ্ত জনীহ্র যাকাত দেবে। তার উপর যদি খারাজ বা করব দেয় থাকে, যা ৪০ জনীহ্র সমান, তাহলে তার কাছে অবশিষ্ট থাকবে= ১৬০ জনীহ। অতএব এক্ষণে তার দেয়হবে অর্ধ-ওশর বাবদ ৮ জনীহ।
আমি এ মতটি ১৯৬৩ সন থেকে লিখে আসছি। কিন্তু জামে আযহারের বহু আলিমই তা গ্রহণ করেন নি। শেষ পর্যন্ত শায়খ আবূ জুহরা লিখিত (****) নামক গ্রন্থের ১৫৯ পৃষ্ঠায় নিম্নলিখিত কথাগুলো পড়লাম:
এ যুগের কতিপয় আলিম যাকাত ব্যবস্থা পর্যায়ে প্রস্তাব করেছেন যে, জমি মালিক ও কেরায়াদার উভয়ের কাছ থেকেই যাকাত গ্রহণ করতে হবে। প্রত্যেকের কাছে সর্বশেষে সকল দায়মুক্ত অস্থায় যা প্রাপ্ত হবে- মালিকের কর-খাজনা ইত্যাদি বাদ দিয়ে এবং কেরায়াদারের চাষ সংক্রান্ত যাবতীয় দায়দায়িত্ব বাদ দিয়ে তারই যাকাত গ্রহণ করা হবে। আমি সর্বশেষ এ মতটি পছন্দ করছি ও অগ্রাধিকার দিচ্ছি।
অর্থাৎতিনি আমার উপরিউক্ত প্রস্তাব মেনে নিয়েছেন।
দশম আলোচনা
ওশর ও খারাজ
হানাফী ফিকাহ্বিদগণ কৃষি ফসলও ফলে ওশর বা অর্ধ-ওশর ফরয হওয়ার ব্যাপারে শর্ত আরোপ করেছেন যে, জমি ওশরী হতে হবে- খারাজী হবে না। জমি খারাজী হলেতার উপর বার্ষিক যে খারাজ ধার্য রয়েছে, তা ছাড়া আর কিছুতার উপর ধার্যহবে না। আর একালে তা হচ্ছে জমির মালিকানা কর বা খাজনা। কিন্তু এ অবস্থায় হানাফী ফকীহ্দের মতে জমির ফসলের উপর যাকাত-ওশর বা অর্ধঘ-ওশর ধার্য হবে না।
জমহুর ফিকাহ্বিদগণ এ মত মেনে নেন নি। তাঁরা সর্বপ্রকার জমির উপরই- তা ওশরী হোক, কি খারাজী-ওশর ফরয বলে মত প্রকাশ করেছেন। এ কারণে এ পর্যায়ে আলোচ্য বিষয় হল ওশরী জমি কি, আর খারাজী জমি কি? এবং এ দুই শ্রেণীর ফিকাহ্বিদদের মতপার্থক্যের প্রকৃত কারণ কি। পরে তাঁদের প্রত্যেক পক্ষের দলীল উল্লেখ করাহবে এবং কোন্ মতটি অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য তা-ও বিবেচনা করা হবে।
জমি কখন ওশরী হয়, কখন হয় খারাজী
ক. ওশরী জমি
আবূ উবাইদের আলোচনার দৃষ্টিতে নিম্নোক্ত কয়েক প্রকারের মধ্যে যে কোন প্রকারের জমি ওশরী হতে পারে:
প্রথম প্রকার: যে জমি-মালিকই ইসলাম কবুল করবে ও তারপরও সেই জমির মালিকথেকে যাবে সেই জমিই ওশরী জ মি হবে। মদনিা, তায়েফ, ইয়েমেন ও বাহ্রাইন এবং মক্কার জমি এ পর্যায়ে গণ্য হবে। যে জমি সশস্ত্র যুদ্ধের পর দখল করা হয়েছে অথচ নবীকরীম (স) জমির প্রাচীন মালিকদের অনুগ্রহ করেছেন, তিনি তাদের প্রাণের উপর হামলা করেন নি, তাদের ধন-মাণও ‘গনীমত’ বানিয়ে নেননি। শেষ পর্যন্ত যখন তাদের ধন-মাল নিষ্কৃতি পেল এবং তারাও পরে ইসলাম কবুলকরল- এ সময় তাদের সব ধন-মাল তাদের মালিকানায়ই থেকে গেল এরূপ অবস্থায় তাদের জমি ‘ওশরী’ বলে গণ্য হবে।
দ্বিতীয় প্রকার: যে জমিই বল প্রয়োগপূর্বক অর্থাৎ জমি মালিক ও মুসলমানদের মধ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর মুসলিম কর্তৃক বিজিত হবে, পরে ইসলামী রাষ্ট্র প্রধান সেই জমিকে ‘ফাই’ রূপে গণ্য না করে তাকে ‘গনীমত’ গণ্যকর তার উপর এক পঞ্চমাংশ ফসল (খুমুস) দেয়রূপে ধার্য করেছেন এবঙ বিশেষভাবে বিজয়ীদের মধ্যে তার পাঁচ ভাগের চার ভাগকে বন্টন করে দিয়েছেন- যেমন নবী করীম(স) খায়বরের জমির ক্ষেত্রে করেছেন (যুদ্ধের পূবেৃ তা সব ইয়াহুদীদের মালিকানাধীন ছিল)। এ জমি তাদেরই মালিকানা সম্পত্তিরূপে থেকে যাবেএবং তাতে ওশর ছাড়া আর কিছুই ধার্য হবে না। এমনিভাবে উপত্যকাসমূহ যখন তা বিজয়ীদের মধ্যে বন্টন করে দেয়া হবে এবং তার উপর থেকে এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহ্ যাদের নাম করেছেন তাদের দেয় প্রত্যাহার করা হবে, তাও ওশরী হবে।
তৃতীয় প্রকার: সব প্রাচীন পড়ো জমি, যার মালিক বা আবাদকারী কেউ নেই, রাষ্ট্রপ্রধান তা লোকদের মধ্যে খণ্ড খণ্ড করে বন্টন করে দিয়েছে। আরব উপদ্বীপের জমি যেমন, নবী করীম (স) ও খুলাফায়ে রাশেদুন তাই করেচিলেন। ইয়েমেনে, ইয়ামামা ও বসরা প্রভৃতি অঞ্চলের জমিও অনুরূপ।
চতুর্থ প্রকার: মৃত জমি, কোন মুসলিম ব্যক্তি তা পানি ঢেলে আবাদ ও সঞ্জীবিত করে ফসল ফলিয়েছে।
এই সকল প্রকারের জমি সম্পর্কে রাসূলের সুন্নাত হচ্ছে, তা ওশরী বা অর্ধ-ওশরী জমি হিসেবে গণ্য হবে। হাদীসে এ সব কথা উল্লিখিত হয়েছে। আল্লাহ্ তা’আলা এ সব জমিতে যে ফসল দেবেন, তা পাঁচ অসাক বা ততোধিক হলে তাতে ওশর ধার্য হবে এবং আল্লাহ্ যাকাত বন্টনের যে আটটি খাত নির্ধারণ করেছেন, সে অনুসারে তা বন্টন করা হবে।
খারাজী জমির বিভিন্ন প্রকার
আবূ উবাইদ বলেছেন, উপরোল্লিখিত জমিগুলো বাদে যে সব জমি রয়েছে, যা হয় জোর প্রয়েঅগ করে দখল করা ‘ফাই’ জমি- যেমন ইরাকের সওয়াদ, আহ্ওয়অজ, ফারেস, কিরমান, ইসফাহান, রায় এবং সিরিয়া, মিসর ও মাগরিব এলাকার জমি অথবা তা হবে সন্ধির মাধ্যমে পাওয়া জমি। যেমন, নাজরান, ‘আইলা আযরাহ, দাওমাতুল জন্দাল ও ফিদাক প্রভৃতি এলাকার জমি। রাসূলে করীম (স) এই সব এলাকার অধিপতিদের সাথে সন্ধি করেছিলেন অথবা তাঁর পরবর্তী রাষ্ট্রকর্তাগণ তা করেছিলেন। যেমন, উপদ্বীপ এলাকা ও আরমেনিয়ার কোন কোন এলাকা এবং খোরাসানের অধিকাংশ অঞ্চল।
জমি মোটামুটি এই ধরনেরই। সন্ধি ও শক্তি প্রয়োগে বিজিত জমি ‘ফাই’ হয়। তা সাধারণ মানুষের হয়ে যায়- মদান হিসেবে ও সন্তানাদির খাদ্য যোগানের সূত্র হিসেবে। আর রাষ্ট্র প্রধান হয়ে যায়- দান হিসেবে ও সন্তানাদির খাদ্য যোগানের সূত্র হিসেবে। আর রাষ্ট্র প্রধান যে সব জমি জনগণের ব্যাপারাদি সুসম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেন তা।
অর্থাৎ এই দুই প্রকারের জমি থেকে খারাজ হিসেবে যা গ্রহণ করা হবে, তা সাধারণ রাষ্ট্রীয় বিভাগে রক্ষিত হবে এবং তা থেকে সেনাবাহিনী ও সরকারী কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ইত্যাদি খাতে ব্যয় করা হবে। আর সামগ্রিকভাবে জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে।– উৎপাদন বৃদ্ধি অথবা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় হবে।
যে জমি শক্তি প্রয়োগ করে জয় হয়েছে, যা দখল করার জন্যে মুসলমানেরা যুদ্ধ করেছে, মালিকদের সাথে কোন প্রকার চুক্তি করেনি, মুসলমান ও তাদের মধ্যে একমাত্র অস্ত্রই ছিল চূড়ান্ত ফয়সালাকারী’ এই ধরনের জমির ব্যাপারে ইসলামের বিশেষ নীতি রয়েছে। কুরআন মজীদে এই জমি সংকান্ত নীতি বর্ণিত হয়েছে। নবী করীম (স) সেই নীতি বাস্তবায়ন শুরুকরেছেন। হযরত উমরের আমলে সে নীতি অধিক স্পষ্ট ও পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়িত হয়েছে। সে নীতির সারকথা হল, মালিকানা ব্যক্তিদের হাত থেকে নিয়ে মুসলিম উম্মতের সমষ্টির হাতে তুলে দেয়া হবে। তা যেমন এই পর্যায়ের সমস্ত জমিতে কার্যকর হবে, তেমনি হবে সব পর্যায়ে ও যুগে। তা কখনই ব্যক্তি-মালিকানাভুক্ত হবে না, তা হবে মুসলিম জনগণের কল্যাণে নিয়োজিত। তা এজন্যে যে, জমির মালিকানার একটা বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। এই পর্যায়ে উল্লেখ্য, ইসলাম-পূর্ব যুগে জমি বন্টনে চরম জুলুমকরা হয়েছে। কেবল শাসক পরিবারের লোকেরাই সে সব জমি ভাগ-বন্টন করে নিত, নিত খুব ভালো-ভালো ও উচ্চ ধরনের জমিগুলো। আর কৃষক-চাষীরা নিতান্ত দাসানুদাসেরমতই তাতে কাজ করত।
ইসলামী ফিকাহ্বিদদের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এই জমিগুলো মুসলিম জনগণের জন্যে ওয়াক্ফ হবে। তার উপর একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ খারাজ ধার্যহবে, প্রতি বছর তা যথারীতি আদায় করা হবে। জমির উৎপাদন ক্ষমতা অনুপাতে তার ভাড়া-খারাজ নির্ধারণ হবে। এই খারাজ যদ্দিন তারা নিয়মিত আদায় করতে থাকবে, তদ্দিন জমি সেই মালিকদের হাতেই থাকবে, তারা মুসলমান হোক, কি যিম্মী-অমুসলিম। মালিকরা ইসলাম কবুল করলেও এই খারাজ প্রত্যাহার করাহবেনা। অমুসলিম এলাকা থেকে স্থানান্তরিত হলেও নয় (কেননা, তা-ই এই জমির ভাড়া)। অতএব তা চিরকাল ‘খারাজী জমি’ নামে অভিহিত হবে।
হযরত উমর ফারূক (রা) তাই করেছেন তাঁর সময়ে জয় করা ইরাকও সিরিয়ার জমির ক্ষেত্রে। হযরত বিলাল (রা) ও অন্যান্য জয়লাভকারী মুজাহিদগণ সৈন্যদের মধ্যে গনীমতেরমালবন্টনের ন্যায় এই জমিও বন্টন করে দেয়ার দাবি করেছিলেন। কিন্তু তিনি তা বন্টন করে দিতে অস্বীকার করলেন িএবং তাদের কুরআনের আয়াত পাঠ করে শোনালেন:
(আরবী**********)
আল্লাহ তা’আলা গ্রামবাসীদের থেকেযা কিছু তাঁর রাসূলকে ‘ফাই’ হিসেবে দেওয়ায়ে দিয়েছেন, তা আল্লাহ্র জন্যে, তাঁর রাসূলের জন্যে এবং নিকটাত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন, ও নিঃস্বল পথিকদের জন্যে- যেমন ধন-সম্পদ কেবলমাত্র তোমাদের ধনীদেরই কুক্ষিগত হয়ে না যায়।
পরে তিনি বলেছেন: (আরবী**********)
তা হবে সেই সব দরিদ্র ও মুহাজিরদের জন্যে, যারা তাদের ঘর-বাড়ি ও ধন-মাল সম্পদ থেকে বহিষ্কৃত ও বিতাড়িত হয়েছে।
পরে পাঠ করলেন: (আরবী**********)
আর যারা তাদের পূর্বে তাদের আশ্রয় গ্রহণ করেছে ঘর ও ঈমানের, তারা ভালোবাসে সেই সব লোককে যারা হিজরত করে তাদের কাছে এসেছে।
এরপর পাঠ করলেন:
(আরবী**********)
আর যারা তাদের পরে এসেছে, তারা বলে, হে আমাদের রব! তুমি আমাদের ক্ষমা কর এবং আমাদের সেই ভাইদেরও ক্ষমাকর, যারা আমাদের পূর্বে ঈমান এনেছে।
পরপর এই চারটি আয়াত পাঠ করার পর হযরত উমর ভাষণ প্রসঙ্গে বললেন: তোমাদের পরে যারা আসবে এই ‘ফাই’ সম্পদে আল্লাহ্ তাদের শরীক বানিয়েছেন। কাজেই এখনই যদি এই সম্পদ তোমাদের মধ্যে বন্টন করে দিই তাহলে তোমাদের পরে যারা আসবে, তাদের জন্যে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। জেনে রাখ, আমিযদি বেঁচে থাকি, তাহলে সানয়ার অধিবাসী রাখালও এই ‘ফাই’ সম্পদ থেকে তার প্রাপ্য অংশ পেয়ে যাবে এবং তার মর্যাদা সুরক্ষিত থাকবে- তাকে ভিক্ষার লাঞ্ছনা ভোগ করতে হবে না।
কুরআনের আয়াত ‘ফাই’ সম্পদকে সমাজে দুর্বল-অক্ষম ও অভাবগ্রস্ত লোকদের মধ্যে বন্টন করার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেছে এই বলে:
ধন-সম্পদ যেন কেবল তোমাদের ধনীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ও কুক্ষিগত হয়ে না থাকে।
হযরত উমরের দীর্ঘকাল পরে সমাজবাদী ও সাধারণ কল্যাণকামী লোকেরা এই কথার যথার্থতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। কুরআনের আয়াত ফাই সম্পদের সুষ্ঠু ও সুবিচারপূর্ণ বন্টনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। উপস্থিত সে সব মুহাজির- যাঁরা তাঁদের ঘর-বাড়ি ও ধন-সম্পদ থেকে বঞ্চিত ও বহিষ্কৃত হয়েছেন এবং নিতান্ত অন্যায়ভাবে তাঁদের বিত্তসম্পত্তি হারাতে বাধ্য করা হয়েছে- তাদের অপরাধ তো ছিল শুধু এতটুকু যে, তাঁরা বলেছিলেন, ‘আল্লাহ্ই আমাদের রব’ এবং সে সব আনসার- যাঁরা তাঁদের মুহাজির ভাইদের জন্যে তাদের হৃদয় ও ঘরবাড়ি উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন, তাদের আশ্রয় ও সাহায্য দিয়েছিলেন, তারা নিজেরা দারিদ্রপীড়িত হয়েও; তাদের অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন তাঁদের নিজেদের উপর- এঁদের জন্যেও ‘ফাই’ সম্পদের অংশ নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল।
এ সময়ের লোকদের পরবর্তী বংশধরেরা- যারা আত্মত্যাগ করেছে তাদের জন্যেও তাতে অংশ নির্দিষ্ট রয়েছে। এ আয়াতটি এই নির্ধারণের ঘোষণা দিয়েছে:
যারা তাদের পরে এসেছে, বলছে: হে আমাদের রব। আমাদের ক্ষমা কর, ক্ষমা কর আমাদের যেসব ভাইদেরও, যারা আমাদের পূর্বে ঈমান এনেছে। আর আমাদের দিলে এ ঈমানদার লোকদের প্রতি কোনরূপ হিংসা সৃষ্টি করো না।
এসব আয়াত আমাদের শিক্ষা দিয়েছে যে, গোটা মুসলিম উম্মত অবিভাজ্য, পূর্ণাঙ্গ, তাদের স্থান ও সময়কাল যতই বিভিন্ন ও দূরবর্তী হোক না কেন, কালের অগ্রগতি যতই হোক, তারা অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ। প্রথম দিকের লোকেরা শেষের দিকে আগতদের কল্যাণের দিকে জন্য কাজ করবে, তারা বৃক্ষ রোপণ করবে, যেন পরে আসা লোকেরা তা থেকে ফল আহরণ করতে পারে। তাদের পরে যারা আসবে তারাও এ ধারাকে রক্ষা করবে। পূর্ব পুরুষেরা যা করে গেছে, পরবর্তী বংশধরেরা তা নিয়ে গৌরববোধ করবে এবং পূর্ববর্তীদের জন্যে আল্লাহ্র কাছে মাগফিরাত কামনা করবে, অভিশাপ বর্ষণ করবে না।
ইসলামের ধন ও সম্পদ-সম্পত্তি বন্টনের এ নীতি পুঁজিবাদের উপর কঠিন আঘাত হানছে। কেননা পুঁজিবাদে শুধু বর্তমানের কিছু লোকের স্বার্থ ও সুযোগ-সুবিধা বিধান করা হয়; কিন্তু পরে যারা আসছে, তাদের জন্যে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। পক্ষান্তরে কমিউনিজম বা সমাজতন্ত্রও বেশীর ভাগ লোককেই বঞ্চিত রেখে মুষ্টিমেয় ক্ষমতাসীনের একচেটিয়া ভোগ-সম্ভোগে সমগ্র জাতীয় সম্পদকে উৎর্গীকৃত করে দেয় এবং সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার পথ রুদ্ধ করে দেয়।
হযরত মুআয ইবনে জাবাল উমর ফারূক (রা)-কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন- যখন তিনি প্রথম ওসব জমি বিজয়ীদের মধ্যে বন্টন করার ইচ্ছা করেছিলেন:
আল্লাহ্র নামের শপথ, এখন তো তাই হবে, যা আপনি পছন্দগ করেন না। আজ যদি এ সব সম্পত্তি এখানকার লোকদের মধ্যে বন্টন করে দেন, তাহলে লোকদের হাতে বিরাট সম্পদ এসে যাবে, তারা তা ভোগ দখল করতে থাকবে। পরে তা এক ব্যক্তি ও এক স্ত্রী লোকের হাতে এসে যাবে। পরে বহু লোক আসবে, যারা কোন জিনিসই পাবে না। তাই এমন একটা উপায় ও পন্থা বের করুন, যা আগের ও পরের সব লোকের জন্যেই কল্যাণকর হবে।’ –পরে হযরত উমর হযরত মুআযের এ কথার উপর গুরুত্ব দেন।
যারা এ সম্পদকে গোটা উম্মতের জন্যে ওয়াক্ফ করার পথে বাধা দিয়েছিলেন, তাদের লক্ষ্য করে হযরত উমর বললেন: পরে যারা আসবে এ উম্মতের লোক, তারা কিছুই না পাক, তা-ই কি তোমরা চাও?
বস্তুত শক্তি প্রয়োগ যে সব এলাকা বা জমি দখল করা হয়েছে, তা সাধারণ মুসলিম জনগণের মধ্যে বন্টন করে দেয়া হয়েছে বলে আমরা জানি না- কেবলমাত্র ‘খায়বর’ ছাড়া। নবী করীম (স) তার অর্ধেক বন্টন করে দিয়েছিলেন, তা তাদের মালিকানায় চলে গেল, তার খারাজও তাদের দিতে হত না। এ ছাড়া হযরত উমর ও তৎপরবর্তীকালে যা-ই শক্তি প্রয়োগে দখল করা হয়েছে, -তার কোনটিই বন্টন করা হয়নি। সিরিয়া, ইরাক ও মিসর প্রভৃতি এলাকার জমি তার দৃষ্টান্ত।
খারাজী জমি ক্রয় ও বিক্রয়
ইমাম মালিক, শাফেয়ী ও আহমদ প্রমুখ অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ এ ব্যাপারে একমত যে, খারাজী জমি ক্রয় বা বিক্রয় করা জায়েয নয়। কেননা তা ওয়াক্ফ সম্পত্তি। ওৎবা ইবনে ফারকাদ খারাজী জমি ক্রয় করেছিলেন বলে উমর তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তুমি এ জমি কার কাছ থেকে কিনলে? বললন, তার মালিকদের কাছ থেকে।’ পরে মুহাজির ও আনসারগণ একত্রিত হলে তাদের লক্ষ্যকরে বললেন, ‘এরাই হজ্ঝে খারাজী জমির মালিক।’ তুমি এদের কাছ থেকে কিছু ক্রয় করেছে? বললেন ‘না’। বললেন, ‘তাহলে তুমি যার কাছ থেকে তা ক্রয় করেছ, তাকে তা ফেরত দাও এবং তোমার টাকা তুমি ফেরত নিয়ে নাও।’
কেউ কেউ বলেছেন, রাষ্ট্রপ্রধান যদি শক্তি প্রয়োগে দখল করা জমি তার মালিকদের হাতেই রেখে দেন, তাহলে উত্তরাধিকার নিয়মেতার উপর মালিকানা চলবে এবং তারা তা বিক্রয়ও করতে পারবে। দলীল হিসেবে উল্লেখ করা যায়, হযরত ইবনে মাসউদ একজন সামন্তের কাছ থেকে জমি ক্রয় করেছিলেন এই শর্তে যে, তার খারাজ সে নিজে দিয়ে দেবে।
অনেকে আবার বিক্রয় করা নাজায়েয বলেছেন, কেবল ক্রয় জায়েয বলেছেন। কেননা তাতে যিম্মিদের কাছ থেকে জমি খালাসকরে নেয়া হয়। ফলে তা যার হাতে ছিল, সে তার স্থলাভিষিক্ত হবে।
ইবনে কুদামাহ বলেছেন, ‘ক্রয় জায়েয’ বলেছি। কেননা তা ক্রয়কারীর হাতে আসবে, যা বিক্রেতার হাতে ছিল, তার বিনিময়েসে তার খারাজ আদায় করবে। এখানে ‘ক্রয়’ অর্থ, কোন কিছুর বিনিময়ে বিক্রেতা থেকে ক্রয়কারীরহাতে মালিকানা এসে যাওয়া। খারাজ দেয়া বিক্রেতার দায়িত্ব- যেমন ইবনে মাসউদ বলেছিলেন- তাহলে তা কার্যত ভাড়ায় নেয়া হবে, ক্রয় করা নয়। তখন তাতে মেয়াদের উল্লেখ হওয়া বাঞ্ছনীয়-যেমন ক্রয়ে হয়ে থাকে।
পরে বলেছেন, এ জমি যখন বিক্রয় হবে- শাসন কর্তৃপক্ষ তার বিক্রয় যথার্থ বলে ঘোষণা করবে, -তখন তা সঠিক বলে গৃহীত হবে। কেননা ব্যাপারটি বিরোধপূর্ণ ছিল। কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ফলে তা যথার্থ হয়ে গেল, যেমন সব ইজতিহাদী ব্যাপারে হয়ে থাকে। রাষ্ট্রপ্রধান যদি তার বিবেচনা মত কোন কল্যাণের জন্যে তা বিক্রয় করে, যেমন জমির কোন সংস্কারের প্রয়োজন আর তা করবে কেবল সে, যে তা ক্রয় করবে, তাহলে তা বিক্রয় করা ঠিক হবে। কেননা সেটা রাষ্ট্রপ্রধানের কাজ।
সমর্থনের মাধ্যমে খারাজ ধার্যকরণ
এই আলোচনায় খারাজী জমির প্রকৃতি ও হযরত উমর (রা)-এর সময় থেকে এ ব্যাপারে মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গী স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রমাণিতহয়েছে যে, তা গোটা মুসলিম উম্মতের সম্মিলিত সম্পত্তি। তার মালিক বলে পরিচিত লোকেরা তার শুধু দখলের মালিক, প্রকৃত মালিকানা তাদের নয়। আর তার উপর ধার্য খারাজ তার ভাড়া সমতুল্য। তা ইসলামী রাষ্ট্রকে দিতে হবে মুসলিম জনগণের সাধারণ কল্যাণে ব্যয় করার জন্যে। মূল খারাজী জমির উন্নয়ন, তার সহজ উৎপাদন, তার পানি প্রবাহের সংস্কার এবং উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে করা যাবতীয কাজ এ পর্যায়ে গণ্য।
এ সব জমির ভোগ দখলকারীরা পরে যদি ইসলাম কবুল করে কিংবা ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে তার মালিকানা হস্তান্তরিত হয়ে যায়, তাহলেও তার উপর ধার্য খারাজ বহাল থাকবে। সর্বকালের সব ফিকাহ্বিদই এ বিষয়ে সম্পূর্ণ একমত। কোন একজনের মালিকানাও তা প্রত্যাহার করতে পারে না। কেননা তা সর্বযুগের মুসলিম উম্মতের মালিকানা। কোন এক যুগের লোকেরা তার উপর এককভাবে মালিক হয়ে বসতে পারে না এবং পরবর্তী যুগের লোকদেরও যে হক তার উপর রয়েছে, তা প্রত্যাহৃত হতে পারে না।
ওশর ও খারাজ কি একসাথে ধার্য হতে পারে
একটা ফিক্হী সমস্যা দেখা দিয়েছে এ নিয়ে। এটা জানা কথা যে, কোন মুসলমান যদি কোন জমি চাষ করে, তার কর্তব্য তার ফসলের ওশর বা অর্ধ-ওশর আদায় করা। একটা সুনির্দিষ্ট যাকাত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, খারাজ দেয়া হচ্ছে, তারপরও কি ওশর দিহতে হবে, না এ দুটির একটি মাফ হয়ে যাবে?
হানাফী মত ও তার দলীল
ইমাম আবূ হানীফা ও তাঁর সঙ্গীদের মত হচ্ছে, খারাজ চাপানো থাকা অবস্থায় ওশর দেয়া ফরয নয়। কেননা তা ফরয হতে পারে কেবল খারাজী জমির উপর। লাইস ইবনে সাদ, ইবনেআবূ শায়বা, শাবী ও ইকরামারও এ মতের প্রতি সমর্থন রয়েছে। তা হচ্ছে ওশর ও খারাজ উভয়ই একটা জমির উপর একত্রে ধার্য হতে পারে না। এ মতের কতিপয় দলীল এখানে উল্লেখ করা যাচ্ছে:
প্রথমত, ইবনে মাসউদ কর্তৃক নবী করীম (স) থেকে বর্ণিত হয়েছে:
(আরবী*********)
কোন মুসলমানের এক জমির উপর ওশর-খারাজ উভয়ই একসঙ্গে ধার্য হতে পারে না।
এই দলীলটিই এ প্রসঙ্গে যথার্থ ও কাম্য।
দ্বিতীয়ত, আবূ হুরায়রার বর্ণনা, নবী করীম (স) বলেছেন, ‘ভবিষ্যত ইরাক তার দেয় দিরহাম ও ‘কফীজ’ (একশ’ চল্লিশ হাত জমি), সিরিয়া তার ‘মদী’ (সিরীয় মাপ) ও দীনার এবং মিসর তার ‘আরদব’ ও দীনার দিতে অস্বীকার করবে।তখন তোমরা ফিরে আসবে যেখান থেকে শুরু করেছিলে।’ এ কথাটি তিনি তিনবার বলেছেন। আবূ হুরায়রার গোশ্ত ও রক্ত এর সাক্ষী। (মুসলিম, আবূ দাঊদ)
হাদীসটি ভবিষ্যদ্বাণী পর্যায়ের। শেষ যামানায় ধার্য করা ফরয হক দিতে লোকেরা যে অস্বীকৃতি জানাবে, তা-ই বলা হয়েছে এ হাদীসে।তাতে প্রকারান্তরে হক-এর কথাটিও প্রমাণিত হল। এ হক হচ্ছে তার উপর ধার্য করা খারাজ। তা দিরহাম ও কফীজ হতে পারে, কিন্তু ওশর নয়। যদি ওশর ফরয হত, তাহলে এর সঙ্গে তারও উল্লেখ করা হত।
তৃতীযত, তারেক ইবনে শিহাব বলেছেন, হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব বাগদাদের এক বিশাল পরগনার সরদারদের সম্পর্কে লিখেছিলেন: ‘তোমরা তাদের জমি তাদের কাছে ফিরিয়ে দাও, তারা তার খারাজ দিতে থাকবে।’ এই চিঠিতে তিনি খারাজ গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন, ওশর গ্রহণের নয়। তা যদি ফরয হত তাহলে নিশ্চয়ই তার আদেশ দিতেন।
চতুর্থত, ওশর ও খারাজ একত্র না করার জনীতি হযরত উমরের সময় থেকেই পূর্ণমাত্রায় কার্যক হয়ে এসেছে অব্যাহত ও অক্ষুণ্ণভাবে। সাহাবিগণও তা সমর্থন করেছেন। সওয়াদ এলাকার জমির খারাজ ব্যবস্থা তার দৃষ্টান্ত। কোন ন্যায়বাদী সুবিচারক রাষ্ট্রনেতা বা কোন জালিম শাসকও সওয়ারদের জমি থেকে ওশর গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন বলে কোন প্রমাণ নেই। যদিও মুসলমানরা বিপুল পরিমাণ খারাজী জমির মালিক ছিলেন। কাজেই এর উপরই ইজমা হয়েছে। কার্যত তার বিরোধিতা কিছুতেই জায়েয হতে পারে না।
পঞ্চমত, যে অর্থে খারাজ ফরয ও ওশর ফরয সেই অর্থে। আর তা হচ্ছে জমির চাষযোগ্য ও প্রবৃদ্ধিপ্রবণ হওয়া। এজন্যে জমি যদি লবণাক্ত ও অনুর্বর নিষ্ফল হয় তাহলে তাতে খারাজ বা ওশর কোনটাই ফরয হবে না। তা থেকে বোঝা গেল যে, ফরয হওয়ার মূল কারণ হল জমির প্রবৃদ্ধি প্রবণতা। যাকে কথায় বলা হয় ‘জমির খারাজ’ –‘জমির ওশর’। এরূপ বলা তো নিশ্চয়ই কারণভিত্তিক। তাই এই দুটিই একত্রে চাপানো যেতে পারে না। যেমন কেউ যদি ব্যবসায়ের নিয়তে এক বছরের জন্যে নিসাব সংখ্যক গবাদিপশুর মালিক হয়, তাহলে তাকে নিশ্চয়ই দুটি যাকাত দিতে হবে না। কেননা একই কারণে একই মালে একই সময় দুটি যাকাত ধার্য করা নিষিদ্ধ। নবীকরীম (স)-এর হাদীসে বলা হয়েছে: (আরবী*********) যাকাতে দ্বৈততা নেই।
ষষ্ঠত, খারাজ মূলক কুফরের কারণে ধার্য হয়ে থাকে। যে জমি শক্তিবলে জয় করা হয়েছে এবং তার মালিকদেরই তাতে অবস্থিত ও ভোগদখলকারী হিসেবে থাকতে দেয়া হয়েছে, সেই জমির উপরই খারাজ ধার্য হয়। পক্ষান্তরে ওশর ধার্য হয় ইসলামের কারণে। কেননা তা ইবাদত। আল্লাহ্র শোকর আদায় মালিকের ধন ও মালের পবিত্রতা-পরিচ্ছন্তা বিধানের উদ্দেশ্যেই তা ফরয হয়। তাই এ দুটি ফরয হওয়ার মৌল কারণের দিক দিয়েই পরস্পর পরিপন্থী। অতএব এ দুটি কখনই একত্রিত হয়ে একটি জমির উপর ধার্য হতে পারে না।
জমহুর ফিকাহ্বিদদের অভিমত
মুসলিম উম্মতের জম্হুর আলিমগণ মত দিয়েছেন যে, ওশর একটা অনিবার্য ফরয। তা খারাজ ধার্য হওয়ার প্রতিবন্ধক নয়। তাঁদের দলীল এই-
প্রথম, যে সব সাধারণ স্পষ্ট অকাট্য দলীল জমির ফসলের উপর যাকাত (ওশর) ফরয করেছে, তাতে জমির বিভিন্ন প্রকারের মধ্যে কোন পার্থক্য করা হয়নি।যেমন বলা হয়েছে:
(আরবী*********)
হে ঈমানদার লোকেরা। তোমরা ব্যয় কর তোমাদের পবিত্র উপার্জন এবং তোমাদের জন্যে জমি থেকে যা উৎপাদন করে দিয়েছি তা থেকে।
বলা হয়েছে: (আরবী*********)
তাঁর হক দিয়ে দাও তা কাটাই-মাড়াইর দিন।
সহীহ্ হাদীসে বলা হয়েছে:
‘আকাশের মেঘ যাই সিক্ত করে তাতেই ওশর।’
শরীয়াতের এসব অকাট্য দলীল সাধারণ তাৎপর্যপূর্ণ। জমির সর্বপ্রকারের উৎপাদন, কাটাই-মাড়ই করা হয়েছে এবং যা-ই আকাশের পানিতে সিক্ত হয়- এই পর্যায়ের সবগুলোই এর অন্তর্বুক্ত। জমি ওশরী হোক কি খারাজ, িতার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। খারাজ ধার্য হয় জমির উপর চাষাবাদ করা হোক, আ না-ই হোক- তা মুসলমানের মালিকনা হোক কি কাফিরের। আর ওশর হচ্ছে বিশেষভাবে ফসলের উপর ধার্য- যদি তার মালিক মুসলমান হয় তবে।
দ্বিতীয়ত, ওশর খারাজ দুই স্বতন্ত্র প্রকৃতির হক। দুটি ভিন্ন ভিন্ন কারণে তা ধার্য হয়। একটি ফরয হওয়া অপরটির ধার্য হওয়ার প্রতিন্ধক নয়।
কেননা খারাজ ধার্য হওয়ার কারণ হচ্ছে ব্যবহার করা ও ফসল ফলানোর কর্তৃত্ব স্থাপিত হওয়া। আর ওশরের কারণ হচ্ছে ফসল লাভ। ওশরের সম্পর্কে সরাসরি ফসলের সাথে। আর খারাজ সম্পর্কিত যিম্মী হওয়ার সাথে। ওশর ব্যয়ের ক্ষেত্র কুরআনের ঘোষিত যাকাতের আটটি খাত। আর খারাজ ব্যয়ের ক্ষেত্র সৈন্য, কর্মচারী ও রাষ্ট্রের সাধারণ ব্যয় ও জনকল্যাণমূরক কাজ। সম্পর্ক ও ব্যয়-ক্ষেত্রের দিক দিয়ে দুটি যখন ভিন্ন ভিন্ন এবং দুটির মধ্যে যখন কোন বৈপরীত্য নেই, তখন দুটিরই একসাথে ধার্য হওয়া না-জায়েয হতে পারে না। যেমন দোকানের ভাড়া ও মালের যাকাত একই সাথে দিতে হচ্ছে।
ইহ্রাম বাধা থাকা অবস্থায় যদি কেউ অন্য লোকের মালিকানাভুক্ত শিকার হত্যা করে, তাহলে তার কাফ্ফারা দিতে হবে জন্তু হত্যার সমপরিমাণ, সেই সাথে অতিরিক্ত দিতে হবে মালিককে তার জন্তুর মূল্য বাবদ। -এ-ও তেমনি।
তৃতীয, কুরআন ও সুন্নাহের অকাট্য স্পষ্ট দলীলের ভিত্তিতে ওশর ফরয হয়েছে। এমতাবস্থায় ইজতিহাদের সাহায্যে খারাজ ধার্য করা নিষিদ্ধ হতে পারে না।
পর্যালোচনা ও অগ্রাধিকার দান
সত্যি কথা, জম্হুর ফিকাহ্বিদদের মত সুস্পষ্ট ও সহীহ দলীলের উপর ভিত্তিশীল। তার প্রমাণে কোন দুর্বলতাই নেই। হানাফী ফিকাহ্বিদগণ এ সব দলীলের মুকাবিলায় যথেষ্ট ও অকাট্যভাবে গ্রহণযোগ্য কোন দলীল উপস্থাপিত করতে পারেন নি। জমির উপর খারাজ ধার্য হওয়ার কারণে মুসলমানকে তার ফসল ফলের উপর ওশর ধার্যকরণ থেকে নিষ্কৃতি দেয়ার ব্যাপারটি বোধগম্য নয়। বস্তুত যাকাত হচ্ছে ইসলামের সুদৃঢ় ইমারত, তিনটি মৌল বিধানের অন্যতম এবং তার বড় বড় প্রতীকের একটি। ইবনুল মুবারক কুরআনের আয়াত (আরবী*********) ‘আর জমি থেকে যা তোমাদের জন্যে উৎপাদন করেছি’ পাঠ করে বললেন, ইমাম আবূ হানীফার কথা মেনে নিয়ে আমরা কি আল্লাহ্র এ নির্দেশ অমান্য করব?
হানাফী মতের পক্ষে এছাড়া আর যেসব দলীলের উল্লেখ করা হয়েছে, পেশ করা হয়েছে যে সব প্রমাণ, জম্হুর ফিকাহ্বিদগণ তা প্রত্যাক্যান করেছেন, তার দুর্বলতা দেখিয়ে দিয়েছেন বিস্তারিতভাবে। নিম্নে তা বিবৃত হল।
১. ‘ওশর ও খারাজ একসাথে ধার্য হবে না’ –এ মর্মের হাদীসটি –যেমন ইমাম নববী বলেছেন, বাতিল, এর দুর্বল হওয়া সর্বসমর্থিত। এ হাদীসিটি এককভাবে ইয়াহ্ইয়া ইবনে আম্বাসাতা, আবূ হানীফা, হাম্মাদ, ইবরাহীম নখ্য়ী, আলকামা ইবনে মাসউদ- নবী করীম(স) থেকে বর্ণনা করেছেন। বায়হাকী বলেছেন, ইয়াহ্ইয়অ ইবনে আম্বাসাতা যে দুর্বল বর্ণনাকারীর নামে বর্ণনাকরণের অভিযোগে অভিযুক্ত। ইমাম সুয়ূতী ইবনে আব্বাস ও ইবনে আদী সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন যে, তাঁরা দুজনই উপরিউক্ত কথাটিকে বাতিল ঘোষণা করে বলেছেন: ইয়াহ্ইয়া ছাড়া আর কেউ-ই তা বর্ণনা করেন নি, সে দাজ্জাল।
২. উপরে উল্লিখিত ও হযরত আবূ হুরায়রা বর্নিত হাদীসটি সম্পর্কে ইমাম নববী লিখেছেন, আগের ও পরবর্তীকালের আলিমগণের গ্রন্থাবলীতে এর দুটি প্রখ্যাত ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। একটি হচ্ছে, ওরা শীগ্রই ইসরাম কবুল করবে এবং তাদের উপর থেকে জিযিয়া প্রত্যাহার করা হবে।
আর দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি হচ্ছে, শেষ যামানার যে সব ফিতনার সৃষ্টি হবে, হাদীসটি সে সম্পর্কে ববিষ্যদ্বাণী উপস্থাপিত করেছে। ভবিষ্যতে তার ফরয অধিকারসমূহ দিতে অস্বীকার করবে। যাকাত জিযিয়া ইত্যাদি দেয়া থেকে বিরত থাকবে। তাদের ধারণা মতেই যদি হাদীসের অর্থ হত, তাহলে তো দিরহাম-দীনার –নগদ অর্থ ও ব্যবসায়ী পণ্যের যাকাতও ফরয হত না। কিন্তু সে কথা কেউ বলেন নি।
৩. বাগদাদের পরগনা সংক্রান্ত কাহিনীর তাৎপর্য হল, তাদের কাছ থেকে খারাজ নিতে হবে। কেননা তা হচ্ছে ভাড়া, তাদের ইসলাম গ্রহণের কারণের কারণে তা প্রত্যাহার করা যেতে পারে না। আর তদ্দরুন ‘ওশর’ প্রত্যাহৃত হওয়ারও কোন প্রয়োজন হয় না। খারাজের উল্লেখ করা হয়েছে এজন্যে যে, তারা ভুলবশত মনে করে নিয়েছিল, ইসলাম গ্রহণের কারণে জিযিয়ার ন্যায় খারাজও নাকচ হয়ে যাবে। কিন্তু ওশর সম্পর্কে তো সকলেরই জানা যে, প্রত্যেক স্বাধীন মুসলমানের উপর তার ফরয, এ জন্যে তার উল্লেখের প্রয়োজন ছিল না। যেমন গবাদিপশুর যাকাতের উল্লেখ করা হয়নি। নগদ সম্পদে যাকাতের কথাও এখানে বলা হয়নি।
কেউ কেউ জবাবে বলেছেন, হযরত উমরের ভাষণ সম্ভবত তাদের জন্যে যারা খারাজের ব্যাপারে দায়িত্বশীল ছিল, ওশরের উপর তাদের কোন কর্তৃত্ব ছিল না। অথবা ওশর গ্রহণের সময়ে তা ছিল না কিংবা তার জন্যে সেই জিনিস ছিল না, যাতে ওশর ফরয হয়।
৪. তাদের এই দলীল-‘সব রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রশাসকের স্থায়ী আমল ছিল। ওশর ও খারাজ একত্রিত না করার উপর এটা একটা ইজমার রূপ পরিগ্রহ করেছে’ –গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা খলীফায়ে রাশেদ, উমর ইবনে আবদুল আযীয ওশর ও খারাজ একসাথে আদায় করেছেন, এটা একটা ঐতিহাসিক সত্য।
আমর ইবনে মায়মুন থেকে বর্ণিতহ, তিনি উমর ইবনে আবদুল আযীযকে খারাজী জমির মালিক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। জবাবে তিনি বললেন, ‘জমি থেকে খারাজ গ্রহণ কর এবং ফসল থেকে ওশর গ্রহণ কর।’
শরীক বলেছেন, উমর এ কথা বলেছেন প্রশ্ন করার পর কিংবা তিনি পর্যন্ত এ কথা পৌঁছেছে। কেননা তিনি তো মাননীয় অনুসরণীয় ব্যক্তি ছিলেন।
হযরত উমর ও সাহাবিগণ খারাজের সঙ্গে ওশর গ্রহণ করেন নি, এ কথা সত্যি বটে। কিন্তু তার কারণ হচ্ছে, সেকালে খারাজী জমি ছিল কাফিরদের মালিকানাধীণ। কোন মুসলিম ব্যক্তি খারাজী জমির মালিক ছিল না; তাই ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদের কাছ থেকেও ওশর গ্রহণ করেন নি- এই দাবির সমর্থনে কোন দলীল নেই।
৫. ওশর ও খারাজ ধার্য হওয়ার কারণ একটি কথা বলা ঠিক নয়। কেননা ওশর ধার্য হয় মূল ফসলের উপর, আর খারাজ হচ্ছে জমি বাবদ দেয়- তাতে ফসল করা হোক কিংবা না-হোক। অন্য কথায়, খারাজ ধার্য হওয়ার কারণ জমি থেকে ফায়দা নেয়ার ক্ষমতা লাভ। আর ওশর ধার্য হওয়ার কারণ ফসল বর্তমান থাকা।
৬. খারাজ কুফরীর শাস্তি স্বরূপ বিধিবদ্ধ হয়েছে, একথা বলাও কিছুমাত্র যুক্তিসঙ্গত নয়। আসলে তা জমির ‘ভাড়া হিসেবেই ধার্য হয়, তার মালিক মুসলমান কি কাফির সে প্রশ্ন অবান্তর। খারাজ যদি শাস্তিই হত তাহলে তা কখনই মুসলমানদের উপর ধার্য হত না, যেমন জিযিয়া কখনই মুসলমানের উপর ধার্য হয় না। আর আধুনিককালের রাষ্ট্রসমূহ যে দেশবাসীর উপর ‘ভূমিকর’ বা ‘ভূমি মালিকানা কর’ ধার্য করে, তা কখনই শাস্তিদানের উদ্দেশ্যে হয় না। তা হয় রাষ্ট্রীয় ব্যয় বহনে তাদের আর্থিকভাবে অংশ গ্রহণের সুযোগ দানের লক্ষ্যে। কাজেই খারাজ ও ওশর-এ দুটের পথ ভিন্ন ভিন্ন ও পরস্পর বিরোধী, এ কথা বলা কোনক্রমেই যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না। খারাজ হচ্ছে জমির ভাড়া, আর ওশর হচ্ছে ফসলের যাকাত, এ দুটির মধ্যে কোনরূপ বৈপরীত্য নেই। কোনজমির ভাড়ার বিনিময়ে গ্রহণ করে তাতে চাষাবাদ করা হলে যেমন হয়।
উৎপাদন থেকে খারাজ বাদ দিয়ে অবশিষ্টের যাকাত দান
খারাজ ধার্য হলে জমির ফসলের ওশর ধার্য হওয়া যখন নিষিদ্ধ নয়, তখন খারাজকে ফসলের উপর ঋণ ধরে জমির মোট উৎপাদন থেকেতা বাদ দিতে হবে। তারপরে অবশিষ্ট পরিমাণ নিসাব মাত্রার হলে তার যাকাত দিতে হবে।
এক্ষণে খারাজী জমি কোথায়
এক্ষণে ইসলামী বিশ্বের মানচিত্রে একটা বাস্তববাদী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখতে হবে, ফিকাহ্বিদ ও ঐতিহাসিকগণ যে জমির প্রকৃতির পরিচয় দান প্রসঙ্গে বলেছৈন তা খারাজী, তা এক্ষণে কোথায় অবস্থিত। যেমন মিসর, সিরিয়া, ইরাক ইত্যাদি দেশের জমি। প্রাথমিককালের মুসলমানরা এসব এলাকা দখল করেছিলেন এবং সে সবের ভোগ দখলকারীদের হাতেই তা রেখে দিয়েছিলেন।
প্রশ্ন হল, এসব জমি কি এখনও খারাজী হয়ে আছে? যার দরুন হানাফী ও অন্যান্য ফিকাহ্বিদদের মধ্যে উপরিউক্ত ধরনের মতবিরোধ হচ্ছে? ….. অথবা সে জমি প্রকৃতি পরিবর্তন করে অন্যান্য সাধারণ জমির মতই হয়ে গেছে, ফলে তাতে ওশর ধার্য হওয়ার সুযোগ হয়েছে?
শেষ যামানার বহু হানাফী মতের ফিকাহ্বিদ ফতওয়া দিয়েছেন যে, মিসর ও সিরিয়ার সেসব জমি এখন আর খারাজী থাকেনি। সেসব জমির তখনকার মালিকরা সব মরে গেছে, িএক্ষণে তা বায়তুলমালের সম্পত্তি! অতএব তার উপর থেকে ‘খারাজ’ উঠে গেছে। তারপর বায়তুলমাল থেকে তা কেউ যথাযথভাবে ক্রয় করে নিলে, তবে তার মালিক হবে এবং তার উপর ‘খারাজ’ ধার্য হবে না। খারাজ ফরয হবে না তার উপর। কেননা রাষ্ট্র সরকার মুসলমানদের জন্যে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
তাই ‘খারাজ’ যখন প্রত্যাহার হল, তখন ওশর তার উপর উপবিষ্ট থাকল। কেননা মুসলমানদের মালিকানাবুক্ত সব জমির আসল অবস্থাই তাই। তা কুরআন ও ইজমা দ্বারা প্রমাণিত।
আর বাস্তব কথা হচ্ছে, এ কালের সব রাষ্ট্র সরকার সর্ব রকমের কৃষিজমির উপর একটা বিশেষ ধরনের ‘ভূীমকর’ বা খাজনা ধার্য করে থাকে। সে জমি মূলত খারাজী ছিল কি ওশরী- সেদিকে কোন দৃষ্টিপাত করা হয় না। ফলে সব জমিই সমান ও অভিন্ন পর্যায়ে এসে গেছে। এক্ষণে সংগতিপূর্ণ কাজ এই হতে পারে যে, মুসলমানের মালিকানাভুক্ত সব জমির উপরই ওশর কিংবা অর্ধ-ওশর ধার্য করতে হবে- যদি তাতে নিসাব বা তদূর্ধ্ব পরিমাণ ফসল ফলে। আর ধার্যকৃত ভূমিকর তো মালিককে দিতেইা হবে। তাই ওশর বা অর্ধ-ওশর দিতে হবে জমির উৎপাদিত ফল ও ফসল থেকে।
ওশর ও খারাজ একত্র হওয়া সম্পর্কে একালের বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গী
জমহুর ফিকাহ্বিদদের মতামত ব্যক্ত ও স্পষ্ট হওয়ার পর এ সম্পর্কে একালের ফিকাহ বা আইনবিদদের দৃষ্টিভঙ্গী বিশ্লেষণ করা আবশ্যক।
ডঃ আহ্মাদ সাবিত উয়াইজাহ্ একটি আলোচনায় বলেছেন; ‘এদিকে ইংগিত করা আমাদের কর্তব্য যে, মুসলমানরা যখন খারাজ বিধান ও ফসলের যাকাত বিধানের মধ্যে পার্থক্য করেছেন, তখনই কৃষি ফসলের আমদানী ও জমির আমদানীর পার্থক্য করেছেন। এ পার্থক্যটিকে বিংশ শতক ধরনের কর এর ভিত্তিরূপে গণ্য করা যেতে পারে। প্রায় সব দেশেই জমির মালিকের আমদানী এবং ভাড়ায় লাগালে সে বাবদ প্রাপ্ত পরিমাণের ভিত্তিতে এক প্রকারের কর ধার্য হয়ে থাকে। আর অপর একটি কর ধার্য হয় ফসল বাবদ আমদানীর উপর। জমিতে ফসল ফলালে যে ফসল জন্মে তার ভিত্তিতে এ কর ধার্য হয়, সে জমি মালিক নিজেই সেই ফসল ফলাক, কিংবা কেউ তা ভাড়ায় নিয়ে ফলাক। জম্হুর ফিকাহ্বিদগণ জমির মালিকের আমদানী কর হিসেবে খারাজকে গণ্য করেছেন। তাঁরা মনে করেছেন, কৃষি ফসল ও ফলের যাকাত (ওশরটা) কৃষি ফসলের আমদানীর উপরই ধার্য কর বিশেষ। এই ভিত্তিতে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, কোন মুসলিম যদি কোন যিম্মীদের মালিকানার জমিতে চাষাবাদ করে, তাহলে সে তার কৃষি ফসলের যাকাত নেবে, যেমন যিম্মী দেবে সেই জমির খারাজ। অনুরূপভাবে কোন মুসলমান যদি খারাজী জমির মালিকানা লাভ করে, তাহলে সে ওশর এবং খারাজ উভয় দেবে।
শায়খ মাহমাদ শালতুত তাঁর ‘বিভিন্ন মাযহাবের তুলনা’ শীর্ষক গ্রন্থে হানাফী দলীলের দুর্বলতা ও জমহুর ফিকাহ্বিদদের প্রমাণের শক্তি স্পষ্ট করে তোলার এবং তাঁদের মতকে অগ্রাধিকার দেয়ার পর লিখেছেন:
এ কথা জানতে পারলে যে, মুসলমানদের উপর ওশর একটা দ্বীনি ফরয হিসেবে ধার্য এবং খারাজ ধার্য ইজতিহাদ পদ্ধতিতে- যেমন তা মুসলিম সমষ্টির জন্যে একটা সম্পদ হয় এবং তার দ্বারা জনগণের সাধারণ প্রয়োজন পূরণ করা যায়- সত্য নীতির ধারক শাসকের পক্ষে- যদি সে কল্রাণকর মনে করে ও প্রয়োজন বোধ করে- মুসলিম জনগণের উপর, যারা রাষ্ট্র কর্তৃক সংরক্ষণ পায় ও তার শক্তি আনুকূল্যে উপকৃত হয়- তাদের উপরও এমন একটা কর ধার্য জায়েয, যদ্দ্বার সেই কল্যাণ সাধিত হতে পারবে ও প্রয়োজন পূরণ হতে পারবে। আর আল্লাহ তা’আলা তাদের উপর ‘জিযিয়া’ হিসেবে যে যাকাত ধার্য করেছেন তাদের পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধতা বিধানের উদ্দেশ্যে, তা মুসলমানদের উপর ধার্য করণে কোন প্রতিবন্ধকতা নেই। তারপর যদি খারাজও ধার্য হয়, তবে তাতে কুরআনের অকাট্য দলীলও সুস্পষ্ট সুন্নাতের ভিত্তিতে ফরয হওয়ার ব্যবস্থা তা আর বাদ দেয়া যেতে পারে না।
ষষ্ঠ অধ্যায়
মধু ও প্রাণী উৎপাদনের যাকাত
এই অধ্যায়ে চাটি আলোচনা:
প্রথম আলোচনা: মধুর যাকাত।
দ্বিতীয় আলোচনা: কত পরিমাণে যাকাত বাবদ কতটা দিতে হবে?
তৃতীয় আলোচনা: মধুর নিসাব পরিমাণ, এবং
চতুর্থ আলোচনা: রেশম ও দুগ্ধ ইত্যাদি প্রাণীজাত সম্পদের যাকাত
প্রথম আলোচনা
মধুর যাকাত
শুরু কথা
আল্লাহ তা’আলা মানুষকে যেসব উত্তম নিয়ামত দান করেছেন এবং খাদ্যপ্রঅণ, নিরাময়তা ও স্বাদ আস্বাদনের উপকরণ হিসেবে যে সব সংরক্ষিত করেছেন, মধু সে সবের মধ্যে অন্যতম। একারণে আল্লাহ্ তা’আলা নিজেই তাঁর একটি অনুগগ্রহের দান হিসেবে তার উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ করেছেন:
(আরবী*********)
লক্ষ্য কর, তোমার রব মধুমক্ষিকার প্রতি এ নির্দেশ ওহী করেছেন যে, পাহাড়-পর্বত, গাছে ও উপরে ছড়িয়ে- থাকা লতাপাতায় নিজেদের ছাতা নির্মাণ কর। পরে সর্বপ্রকারের ফলের রস চুষে লও এবং তোমাদের রব কর্তৃক নির্ধারিত পথে নিয়মানুগতভাবে চলতে থাক। এই মক্ষিকার ভিতর থেকে রঙ-বেরঙের পাণীয় নির্গত হয়, তাতে রয়েছে মানুষের জন্য নিরাময়তা। নিশ্চয়ই এ সমস্ত ব্যাপারে চিন্তাশীল লোকদের জন্যে একটা নিদর্শন নিহিত রয়েছে।
এক্ষণে প্রশ্ন হচ্ছে, এই মধুর যাকাত দিতে হবে কিনা, যেমন জমির উৎপাদিত ফসলের যাকাত দিতে হয়?
মধুর যাকাতের পক্ষে যাঁরা
ইমাম আবূ হানীফা ও তাঁর সঙ্গী-শাগরিদদের মত হচ্ছে, মধুর যাকাত দেয়া ফরয। কিন্তু মৌমাছির চাক খারাজী জমিতে গড়ে উঠলে তা ফরয নয়। কেননা খারাজী জমির তো খারাজ আদায় করা হয়। তাও আল্লাহ্র ধার্য করা হক, আর এই জমীনের উপর আল্লাহ্র দুটি হক এক সঙ্গে ও একই কারণে ধার্য হতে পারে না, তা তো স্বতঃসিদ্ধ কথা, তা ওশরী জমি হোক, আর যা-ই হোক। যেমন মৌচাক যদি পাহাড়ে হয়, তাহলেও তাই। কেননা তাতে ওশর ধার্য রয়েছে।
ইমাম আহ্মদও বলেছেন, মধুর যাকাত দিতে হবে। ইমাম আহমদের কাছে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ’ মধুর যাকাত দেয়া ফরয, এটাই আমার মত। কেননা হযরত উমর (রা) মধুর যাকাত আদায় করেছেন।’ লোকেরা হয়ত তখন ইচ্ছামূলকভাবে নফল হিসেবেই তা দিয়ে থাকবে, এই কথা বলা হলে তিনি বললেন, ‘না, তা নয়। তিনি তা রীতিমত আদায় করেছেন।’
মকহুল, জুহরী, সুলায়মান ইবনে মুসা, আওযায়ী ও ইসহাক প্রমুখ ফিকাহ্বিদও এ মতই প্রকাশ করেছেন।
এ মতের দলীল
প্রথম: মধুর উপর যাকাত ফরয হওয়ার যে মতটি উপরে উদ্ধৃত হল তার দলীল দুই ধরনের: প্রথম, সাহাবীদের মত ও কথা এবং দ্বিতীয়, যুক্তি ও বিবেচনা।
ক. সাহাবীদের মত ও কথা পর্যায়ে উল্লেখ্য, আমর ইবনে শুয়াইব তাঁর পিতা তাঁর দাদা থেকে বর্ণিত: নবী করীম (স) মধু থেকে ওশর নিয়েছেন।’ ইবনে মাজা এই বর্ণনাটি উদ্ধৃত করেছেন।
আবূ দাউদ ও নাসায়ী হাদীস গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে, বনূ মাত্য়ান-এর হিলাল নামক এক ব্যক্তি তার মধুর ওশর নিয়ে রাসূলে করীম(স)-এর কাছে উপস্থিত হল এবং ‘সালবা’ নামক উপত্যকা তাকে দেয়ার জন্যে প্রার্থনা জানাল। ফলে নবী করীম (স) সেই উপত্যকা তাকে দিয়েছিলেন। হযরত উমরের খিলাফত আমলে সুফিয়ান ইবনে ওহাব এ বিষয়ে আপত্তি করে লিখেছিলেন। জবাবে তিনি লিখেছেন: রাসূলের যুগে যে ওশর দেয়া হল, তা যদি সে রীতিমত দিতে থাকে, তাহলে ‘সালবা’ তার কাছে থাকতে দেবে। অন্যথায় তা বৃষ্টির মাছি, যার ইচ্ছা খাবে। ইবনে হাজারের মত এ বর্ণনাটি সহীহ্।
খ. সুলায়মান ইবনে মূসা বর্ণনা করেছেন, আবূ সাইয়ারাতা বললেন: ‘ইয়া রাসুল! আমার মৌমাছির চাষ আছে।’ রাসূল বললেন: ‘তার ওশর দিতে থাক।’ বললেন: ‘হে রাসুল, এ ভূমির উপর দাঁড়ানো পাহাড় আমার তত্ত্বাবধানে দিয়ে দিন।’ তখন নবী করীম (স) পাহাড়টিও তাকে মধু চাষের জন্যে দিয়েছিলেন। আহমদ ইবনে মাজা এ বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন।
গ. সাদ ইবনে আবূ যুবাব থেকে বর্ণিত, নবী করীম (স) তাঁকে তাঁর জনগণের উপর দায়িত্বশীল নিযুক্ত করেন। তিনি তাঁর লোকদের বললেন: ‘তোমরা মধুর যাকাত আদায় কর। পরে তিনি আদায়কৃত মধু হযরত উমরের কাছে নিয়ে আসেন। তিনি তা বিক্রয় করে তা মুসলমানদের যাকাত ফাণ্ডে জমা দিয়ে দিলেন। অপর বর্ণনায় বলা হয়েছে, তিনি তাঁর লোকদের বললেন, ‘যে মালের যাকাত দেয়া হয়নি, তাতে কোন কল্যাণ নেই’। তখন আমি প্রতি দশটি পাত্রের ওশর বাবদ একটি পাত্র ভর্তি মধু গ্রহণ করলাম এবং তা খলীফা হযরত উমরের কাছে নিয়ে এলাম। তিনি তা মুসলমানদের থেকে সংগৃহীত যাকাত ফাণ্ডে জমা করে নিলেন। ইবনুল আসরম বর্ণনা করেছেন, ‘হযরত উমর তাঁকে মধুর ওশর নেয়ার জন্যে আদেশ করেছেন।’
ঘ. ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত নবী করীম (স) বলেছেন, ‘মধুর যাকাত প্রতি দশটি পাত্রের একটি।’
এ সব হাদীস ও সাহাবীদের আমল সংক্রান্ত বর্ণনার কোন কোনটি সূত্রের দিক দিয়ে যয়ীফ হলেও পরস্পর সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী এবং এ থেকে এ কথাও জানা যায় যে, বিষয়টির একটি ভিত্তি ও মৌলিক গুরুত্ব অবশ্যই আছে। ইবনুল কাইয়্যেম এ সব হাদীস এবং তার উপর অন্যান্যদের সমালোচনার উল্লেখ করে বলেছেন, ইমাম আহমদ ও তাঁর জামায়াতের মত হচ্ছে, মধুর যাকাত দিতে হবে। তাঁরা মনে করেন, এসব বর্ণনা পরস্পরের দ্বারা সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এ সবের সূত্রও বিভিন্ন।
দ্বিতীয়: বিবেক-বুদ্ধি ও বিচার-বিবেচনাও এ মতের সমর্থন করে। কেননা মধু আসলে গাছ ও ফলের নির্যাস। তা যেমন মাপা যায়, তেমনি সঞ্চয় করেও রাখা যায়। অতএব তাতে যাকাত ধার্য হবে, যেমন শস্য ও খেজুরে হয়। বিশেষ করে এজন্যেও যে, তাতে মানুষের শ্রম শস্য ও ফল উৎপাদনের তুলনায় অনেক কম লাগে।
ইমাম আবূ হানীফার মতে ওশরী জমিতে মধু উৎপাদন করা হলে তাতে ওশর ধার্য হবে। তবে খারাজী জমিতে হলে তার যাকাত দিতে হবে না। কেননা মূলনীতি হচ্ছে ওশর ও খারাজ একসঙ্গে ও একটি জমির উপর ধার্য হবে না। খারাজী জমিতে যেহেতু তার প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদন ক্ষমতার জন্যে খারাজ ধার্য হয়ে থাকে, তাই এ কারণেই তার উপর অপর একটি হক ধার্য হতে পারে না। খারাজী জমিতে যেহেতু তার প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদন ক্ষমতার জন্যে খারাজ ধার্য হয়ে থাকে, তাই এ কারণেই তার উপর অপর একটি ধার্য হতে পারে না। আর ওশরী জমিতে এ পর্যায়ের কোন হক ধার্য হয় না। কাজেই যা ওশরী জমি, তাতে এ হক ধার্য হবে। কিন্তু ইমাম আহমদ এ ব্যাপারে দুই ধরনের জমির মধ্যে কোন পার্থক্য নির্ধারণ করেন নি। তাই তিনি খারাজী ও ওশরী সর্বপ্রকার জমিতেই মধুর যাকাত ফরয বলে মনে করেছেন।
এ পর্যায়ে অন্যান্য মত
ইমাম মালিক, শাফেয়ী, ইবনে আবূ লায়লা, হাসান ইবনে আবূ সালেহ ও ইবনুল মুনযির প্রমুখ মনে করেন, মধুর যাকাত দিতে হবে না। দুটি দলীল তাঁদের সমর্থনে উল্লেখ করা হয়েছে: একটি- যেমন ইবনুল মুন্যির বলেছেন, ‘মধুর ওশর ফরয হওয়ার পক্ষে প্রমানিত কোন হাদীস নেই, এ পর্যায়ে কোন ইজমাও অনুষ্ঠিত হয়নি। অতএব তাতে যাকাত হবে না।
দ্বিতীয়: মধু তরল, প্রাণী নির্যাস। ফলে তা দুগ্ধের মত। আর দুগ্ধে যে কোন ধার্য হয় না, তা সর্বসম্মত।
আবূ উবাইদের মত
ইসলামী অর্থনীতিবিদ আবূ উবাইদ উপরিউক্ত দুটি মতের মধ্যবর্তী মত গ্রহণ করেছেন। কেননা তাঁর দৃষ্টিতে এ পর্যায়ে উদ্ধৃত সমস্ত হাদীস ও সাহাবীর উক্তি পরস্পর বিরোধী।যদিও তাঁর বেশী ঝোঁক যাকাত ফরয হওয়ার দিকে।
মধুর যাকাত পর্যায়ে দুই ধরনের মতের উল্লেখ করে তিনি বলেন: আমাদের দৃষ্টিতে সমস্ত দিক বিবেচনা করে এ মতই অধিক গ্রহণযোগ্য যে, রাষ্ট্রনেতাগণ মধুর যাকাত দেয়ার জন্যে লোকদের বলবে, তাদের উৎসাহ দেবে, তা না দেয়াকে ঘৃণ্য করে তুলবে তাদের কাছে।তবে তা গোপন করে রাখা হলে তাদের উপর দোষ চাপানো যাবে না। কেননা কোন জিনিস নিঃসন্দেহে ফরয প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তা করা যায় না। যেমন জমির ও জন্তুর যাকাত পর্যায়ে করা যায়। মধুর যাকাত দিতে রাযী না হলে সেজন্যে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করা যাবে না, যেমন ফসল ও জন্তুর যাকাত না দিলেতা করা যায়। এরূপ কথা বলা হচ্ছে এ জন্যে যে, নবী করীম(স) থেকে এ পর্যায়ে কোন বলিষ্ঠ কথা সহীহ্রূপে প্রমাণিত হয়নি, যেমন অন্য দুটির যাকাত পর্যায়ে প্রমাণিত হয়েছে। তিনি যাকাত বিষয়ে যেসব ফরমান লিখে পাঠিয়েছিলেন, তাতেও এর উল্লেখ নেই। আর তা যদি সেই পর্যায়ের বিধি হত, তা হলে তার সীমাও নির্দিষ্ট হত; যেমন জমির ফসলের ক্ষেত্রে করা হয়েছে। পরবর্তী ইমামগণের মধ্য থেকেও এ পর্যায়ে কারোর কোন বলিষ্ঠ উক্তি পাওয়া যায়নি।
তবেএটা প্রমাণিত যে, মধুর উৎপাদক তার যাকাত নিয়ে আসে, তবে সরকারী বায়তুলমালে তা অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। যেমন হযরত উমর করেছেন।
পরে লিখেছেন, এ পর্যায়ে মোটামুটি কথা হচ্ছে, কেউ যদি মধুর যাকাত দিতে অস্বীকৃত হয়, তাহলে তার উপর জোর প্রয়োগ করা উচিত হবে না। কাউকে আরাযী করে আদায় করারও কোন হুকুম নেই।
মধুর যাকাত পর্যায়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মত
এই গ্রন্থকারের মতে গ্রহণযোগ্য মত হচ্ছে, মধুও এক ধরনের সম্পদ। তার জন্যে যেমন শ্রম প্রয়োজন, তেমনি তাতে আল্লাহ্র অনুগ্রহও নিহিত। তাই তা এমন সম্পদ, যার উপর যাকাত ফরয হওয়া বাঞ্ছনীয়।
আমাদের এ কথার দলীল হচ্ছে:
ক. সর্বপ্রার মাল-সম্পদে যাকাত সাধারণভাবে ফরয, তাতে কোন পার্থক্য করা হয়নি। যেমন আল্লাহ্র নির্দেশ: ‘লোকদের ধন-মালে যাকাত গ্রহন কর।’ তোমরা যা উপার্জন কর এবং আমরা জমি থেকে তোমাদের যা দান করি তা থেকে ব্যয় কর” “এবং আমরা তোমাদের যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় কর” ইত্যাদি কুরআনের আয়াত।
খ. আল্লাহ্ তা’আলা কৃষি ফসল ও ফলে যে যাকাত ফরয করেছেন তার ভিত্তিতে বিবেচনা করলেও আমাদের উক্ত কথার সমর্থন মেলে। কেননা জমির ফসল উৎপাদনে যেমন আয় হয়, মৌচাকে উৎপাদিত মধু থেকেও তেমনি আয় হয়। আর আমাদের দৃঢ় প্রত্রয় এই যে, এই দুই প্রকারের আয়ের মধ্যে কোনরূপ তারতম্য করা যায় না, যেমন সমান ধরা যায় না ও এক করা যায় না দুটি ভিন্ন ভিন্ন জিনিসকে।
গ. এ পর্যায়ে যেসব হাদীস ও সাহাবীদের উক্তি উদ্ধৃত হয়েছে বিভিন্ন সূত্রে ও বর্ণনাভঙ্গীতে, তা পরস্পর শক্তিশালী বানিয়ে দিয়েছে। এ বর্ণনা যেমন বহু তেমনি সূত্রও অসংখ্য। এ কারণে ইমাম তিরমিযী এ পর্যায়ে উদ্ধৃত সমস্ত হাদীসকে পাইকারীভাবে অ-সহীহ বলেন নি। বরং বলেছেন: ‘এ পর্যায়ে অনেকগুলো বর্ণনাই নবীকরীম(স) থেকে সহীহ্ভাবে প্রমাণিত।’ তার অর্থ, অনেকগুলো সহীহ না হলেও বেশ কিছু কথা নিশ্চয়েই সহীহ্। পরে ইমাম তিরমিযী লিখেছেন, বহু সংখ্যক ইসলাম বিশেষজ্ঞই এই অনুযায়ী আমল করেন।
ইমাম শাওকানীও এই মতই দিয়েছেন, যদিও তিনি যাকাতের ক্ষেত্র প্রশস্ত করার পক্ষপাতী নন। বলেছেন, মধুর ওশর দেয়া ফরয। তাঁর ব্যাখ্যাকার সিদ্দীক হাসান লিখেছেন, ‘ইমামের মতে এ পর্যায়ের সমস্ত দলীলই গ্রহণযোগ্য মানে উত্তীর্ণ নয়।
যাঁরা বলেছেন, মধু তরল পদার্থ ও প্রাণীনিঃসৃত বলে তা দুগ্ধের সমতুল্য, আর দুগ্ধে যাকাত ধার্য হয় না, সর্বসম্মতভাবে; তাঁদের জবাবে বলা যায়, মূলত দুগ্ধের মূল যে মুক্ত গাভী, তার যাকাত দেয়া ফরয কিন্তু মধুর যে মূল তার উপর যাকাত ফরয নেই। তাই তা দুগ্ধের মত তরল হলেও তার উপর যাকাত ফরয হবে।
দ্বিতীয় আলোচনা
মধুর যাকাতের পরিমাণ
মধুর যাকাত ফরয বলে যাঁরা মত দিয়েছেন, তাঁদের মত তার দশ ভাগের এক ভাগ ওশরদিতে হবে। পূর্বে এর দলীল উদ্ধৃত হয়েছে। যেমন, কৃষি ফসলের এক-দশমাংশ ফরয হয়ে থাকে।
তাতে যে শ্রম ও অর্থ বিনিয়েঅজিত হবে, তা কি বাদ দিয়ে হিসাব করা যাবে?
হযরত উমর থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি মধুর ওশর পর্যায়ে বলেছেন যা খুব সহজে ও বিনা পরিশ্রমে পাওয়া যায়, তাতে ওশর-এক দশমাংশ দিতে হবে। আর যা লালন ও পরিচর্যার মাধ্যমে উৎপাদিত হবে, তার অর্ধ-ওশর দিতে হবে। অর্থাৎ যাকাতের পমিাণ কম হওয়ার শ্রম ও অর্থব্যয়ের একটা ভূমিকা আছে, যেমন কৃষি ফসলের ক্ষেত্রে হয়।
নাসের নামক এক আহলি বায়ত ফিকাহ্বিদ ছাড়া এ মতের বিরোধিতা আর কেউ করেন নি। তিনি বলেছেন, তাতে এক-পঞ্চমাংশ দিতে হবে, যেমন ‘ফাই’ সম্পদের হুকুম। কেননা তা মাপযোগ্য নয়, জমির পর্যায়েও নয়।
এই গ্রন্থকারের দৃষ্টিতে অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য মত হচ্ছে, যাবতীয় ব্যয় ও শ্রমের মূল্য বাদ দিয়ে অবশিষ্ট থেকে ওশর নিতে হবে, যেমন কৃষি ফসল ও ফলের ওশর সংক্রান্ত আলোচনায় আমরা সবিস্তারে বলেছি।
তৃতীয় আলোচনা
মধুর নিসাব
মধুর নিসাব কি, এ পর্যায়ে কোন কথাই নির্দিষ্ট সীমার উল্লেখ করা হয়নি। এ কারণে ফিকাহ্বিদগণ বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। ইমাম আবূ হানীফার মতে কম হোক, বেশী হোক, সর্বাবস্থায়ই ওশর দিতে হবে। কৃষি ফসল ও ফলের ক্ষেত্রে তাঁর আসল মত তাই।
ইমাম আবূ ইউসুফ বলেছেন, সাধারণ মাপযোগ্য পাঁচ অসাকের মূল্য পর্যন্ত তার পরিমাণ পৌঁছলে তাতেউ ওশর ধার্য হবে। অন্যথায় হবে না।মাপযোগ্য নয়, এমন জিনিসের ক্ষেত্রে অসাকের মূল্য ধরে হিসাব করাই তাঁর আসল নীতি। দশ ‘রতল’ হচ্ছে নিসাবের পরিমাণ, এ-ও তাঁর একটি মত। ইমাম মুহ্মাদ থেকে যত বর্ণনা এসেছে, তাতে বলা হয়েছে, পাঁচ ‘ফরক’ –এক ‘ফরক’ ছত্রিশ ‘রতল’ পাঁচ ‘মণ’- একমণে দুই ‘রতল’ পাঁচ ‘কুরব’-এর কুর্ব একশ রতল।
ইমাম আহমদ থেকে বর্নিত, মধুর নিসাব হচ্ছে দশ ‘ফরক’। আর তাঁর মতে এক ফরক্ হচ্ছে ষোল ‘রতল’। তাহলে নিসাব দাঁড়ায় একশত ষাড় বোগদাদী ‘রতল’ আর একশ’ চুয়াল্লিশ মিসরীয় ‘রতল’।
এই গ্রন্থকারের মতে পাঁচ অসাকের মূল্য হিসেবে মধুর নিসাব ধার্য হবে (অর্থাৎ ৬৫৩ কিলোগ্রাম অথচা ৫০ মিসরীয় কিলো)। শরীয়াতের বিধানদাতা কৃষি ফসল ও ফলের নিসাব নির্ধারণ করেছেন পাঁচ অসাক। মধুর নিসাবও তাই হবে এবং সেই পরিমাণ হলেতা থেকে ওশর নিতে হবে। তা হলে মধুর নিসাব হচ্ছে অসাক হিসেবে।
চতুর্থ আলোচনা
রেশম ও দুগ্ধ ইত্যাদি প্রাণীজাত সম্পদের যাকাত
মধুর যাকাত দেয়া ফরয বলে যাঁরা মত দিয়েছেন, তাঁদের মতকেই আমরা অগ্রাধিকার দিয়েছি এবং তা কুরআন-হাদীসের দলীলের সাধারণ ভাবধারার ভিত্তিতে। সেই সাথে কৃষি ফসলের উৎপাদতনের উপর ধারণাটাও সম্মুখে রয়েছে এবং সাহাবিগণের উক্তি ও কার্য বর্ণনা- যা পরস্পরকে শক্তিশালী করে। তাহলে অন্যান্য প্রাণীজাত সম্পদ সম্পর্কে শরীয়াতের বিধান কি হবে, সেটা প্রশ্ন।
একালে গবাদিপশু ছাড়া আরও বড় প্রাণীর কথা আমরা জানতে পেরেছি, যার উৎপাদন থেকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ আয় করাসম্ভব। গুটি পোকাজাত রেশমও এ পর্যায়েরই একটা মূল্যবান সম্পদ।তা দিয়ে বহু মূল্যবান রেশমীকাপড় তৈরী হয়। মুরগীর ফার্ম এ কালের ব্যবসায়ের একটা বড় সূত্র, যেখানে বিপুল পরিমাণ ডিম লাভ করা যায়। অথবা মাংশসমৃদ্ধ মুরগীর উৎপাদন হয়। নবী করীম (স) ও সাহাবিগণ এবং তাঁদের পরবর্তী যুগে এসব ক্রমবৃদ্ধিশীলসম্পদের কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। আর এ কারণে শরীযাতে এ জন্যে সরাসরিভাবে কোন হুকুমের উল্লেখও পাওয়া যায় না।
ফিকাহ্বিদগণ গবাদিপশুর দুগ্ধের উপর যাকাত ধার্য না হওয়া এবং মধুর উপর যাকাত ধার্য না হওয়ার কারণ স্বরূপ যা বলেছেন, তাতেই এই প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায়। এ দুটোই প্রাণীজাত। কিন্তু এ দুটোর মধ্যকার পার্থক্য নির্ধারণ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, দুগ্ধের আসল উৎস গবাদিপশুর উপর যাকাত ধার্য রয়েছে, সে কারণে দুগ্ধের উপর ধার্য হবে না। কিন্তু মধু সেরূপ নয়। অর্থাৎ যার মুল্য বা আসল উৎসের উপর যাকাত ধার্য নেই, তার প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদনের উপর যাকাত ধার্য হবে। গাভীর দুগ্ধ প্রভৃতি প্রাণীজাত সম্পদকে কিয়াস করতে হবে মৌমাছি জাত মধুর উপর। কেননা এ দুটোই এমন প্রাণীজাত সম্পদ, যার মূল্যের উপর যাকাত ধার্য হয়নি। কাজেই আমরা মনে করি, দুগ্ধ ও আনুসঙ্গিক দ্রব্যাদির ক্ষেত্রে মধুর ক্ষেত্রে গৃহীত নীতিই প্রযোজ্য হবে। তাই তার পরিচ্ছন্ন সম্পদের ‘ওশর গ্রহণ করতে হবে। যেসব গবাদিপশুর কেবলমাত্র দুগ্ধ উৎপাদনের জন্যে রাখা হয়, সেসব ছাড়া অন্য গবাদিপশুর সম্পদের এই কথা, যতক্ষণ পর্যন্ত সেসব পশু ব্যবসায়ী পণ্যহিসেবে গৃহীত না হচ্ছে।
এখানে যে মৌল নীতিতিট পাওয়া যাচ্ছে, তা হল, যার মূল্যের উপর যাকাত ধার্য নয়, তার উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধির উপর যাকাত ধার্য হবে, যেমন জমির উৎপাদন কৃষি ফসল, মৌমাছির উৎপাদন মধু, চতুষ্পদ জন্তুর দুগ্ধ, মুরগীর ডিম এবং গুটি পোকার উৎপাদন রেশম। শিয়া মতের ফিকাহ্বিদ ইমাম ইয়াহ্ইয়অ এই মত প্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ তাঁর মতে মধুর উপর যাকাত ধার্য হয়, রেশমের উপরও তেমনি যাকাত ধার্য হবে। কেননা এই দুটিই বৃক্ষ ও গাছ-গাছালি থেকে পাওয়া যায়। গুটি পোকার উপর যাকাত ধার্য নয়। তবে তা-ও যদি ব্যবসায় পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তার উপরও যাকাত ধার্য হবে।
তবে এমন ফিকাহ্বিদও রয়েছেন, যাঁরা উৎপাদন ও পণ্য বানানোর উদ্দেশ্যে গৃহীত পশু সম্পর্কে ভিন্ন একটি মত পোষণ করেন। তাঁরা সেগুলোকে ব্যবসায়ের পণ্য গণ্য করে প্রতি বছর তার মূল্য এবং তার উৎপাদনের মূল্য নির্ধারণ করে তার উপর যাকাত ধার্য হওয়ার কথা বলেছেন। আর মুলধন ও তার প্রবৃদ্ধি একসঙ্গে এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ যাকাত বাবদ দিতে হবে বলে মত দিয়েছেন। যায়দীয়া মতের হাদী ও মুয়াইয়্যিদ বিল্লাহ্ প্রমুখ ফিকাহ্বিদ্ থেকে উপরিউকিত্ কথা জানা গেছে।
তাই যদি কেউ ঘোড়া ক্রয় করে তার উৎপাদন বিক্রয় করার উদ্দেশ্যে বা গাভী খরিদ করে তা থেকে পাওয়া দুগ্ধ ও মাখন বিক্রয়ের লক্ষ্যে, আর গুটিপোকা ক্রয় করে ও পালন করে তদ্লব্ধ রেশম বিক্রয় করার জন্যে, তাহলে বছরের শেষে তার উৎপাদনসহ মূল্য হিসাব করে তার যাকাত দিতে হবে, ঠিক যেমন ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে করার নিয়ম রয়েছে।
তাঁদের মতে এ কথা কেবল উৎপাদনশীল পশু বা প্রাণী পর্যন্তই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে না, ব্যবসায় ছাড়া উৎপাদন ও ফসল লাভ হয় এমন সর্বপ্রকার মালই এর মধ্যে গণ্য হবে; যেমন কোন চাকা, যা ভাড়া দেয়া হয়। পরবর্তী অষ্টম অধ্যায়ে আমরা প্রাসাদ ও শিল্প-কারখানা যা উৎপাদন দেয় ও উৎপাদনের উদ্দেশ্যে গৃহীত হয়- সেসব সম্পর্কেও তা থেকে যাকাত গ্রহণ পর্যায়ে আলোচনা করব। এখানে শুধু এতটুকু বলেই ক্ষান্ত হচ্ছি যে, মধুর উপর কিয়াস করে প্রাণীজাত দ্রব্যাদির উপর যাকাত ধার্য করা একটা নির্বুল সিদ্ধান্ত, এর বিপরীত মত কিছু নেই। অতএব তাতে ব্যত্যয় হওয়া উচিত নয়।
সপ্তম অধ্যায়
খনিজ ও সামুদ্রিক সম্পদের যাকাত
এই অধ্যরয়ের আলোচনা নিম্নোক্ত বিষয় সমন্বিত:
শুরু কথা: খনি, পুঁজি, মাটির তলে সঞ্চিত সম্পদ ইত্যাদির ব্যাখ্যা। এ ছাড়া আরও সাতটি আলোচনা:
প্রথম: মাটির তলায় গচ্ছিত সম্পদ এবং সে বাবদ যা ফরয হয়,
দ্বিতীয়: খনিজ সম্পদে যে হক ধার্য হয়, সে সম্পর্কিত আলোচনা,
তৃতীয: এই ফরযের পরিমাণ,
চতুর্থ: নিসাব এবং সে নিসাব কখন গণ্র হবে,
পঞ্চম: খনিজ সম্পদের যাকাত ফরয হওয়ার জন্যে কি একটি বছর অতিক্রান্ত হওয়া জরুরী?
ষষ্ঠ: খনিজ সম্পদের যাকাত বাবদ গৃহীত সম্পদ ব্যয়ের ক্ষেত্র,
সপ্তম: সমুদ্র থেকে পাওয়া সম্পদ,
শুরু কথা
খনি পুঁজি বা সঞ্চিত ধন (Treasure) ও মাটির তলে পুঞ্জিত সম্পদ-সংক্রান্ত বর্ণনা
ইবনুল আসীর বলেছেন: খনি বলতে বোঝায় সেসব ক্ষেত্র, যেখান থেকে জমি নিঃসৃত মহামূল্য সম্পদ নিষ্কাশন করা হয়। যেমনস্বর্ণ, রৌপ্য, তাম্র প্রভৃতি।
ইবনুল হুম্মাম বলেছেন: প্রতিটি জিনিসের অবস্থিত স্থানকেই খনি বলা যায়। আল্লাহ্ তা’আলা প্রথম ভূ-সৃষ্টির দিন থেকে যেসব স্থানে মহামূল্য সম্পদরাশির স্থিতি স্থাপন করেছেন তা-ই ‘খনি’ নামে অভিহিত। ‘সঞ্চিত ধন’ (Treasrue) হচ্ছে মানুষ কর্তৃক সংগৃহীত ও সঞ্চয়কৃত সম্পদ।
ইবনে কুদামাহ্ বলেছৈন: জমির মধ্য থেকে যেসব মূল্যবান সম্পদ নির্গত হয়, তাই ‘কান্জ’ ও ‘রিকাজ’ নামে অভিহিত হয়। সমুদ্র থেকে আলাদা মানুষ কর্তৃক মাটির ভেতরে রক্ষিত সম্পদকে খনি বলা হয় না; বলা হয় পুঁজি বা সঞ্চিত ধন।
প্রথম আলোচনা
মাটির তলায় প্রোথিত সম্পদ এবং তার উপর ধার্য যাকাত
আগের কালের লোকেরা মাটির তলে যেসব মূল্যবান সম্পদ- স্বর্ণ, রৌপ্য, তাম্র, তৈজপত্র ইত্যাদি জমা করে রেখেছে এবং পরে তা উদ্ধার হয়েছে, ফিকাহ্বিদগণের মত হচ্ছে, তার এক-পঞ্চমাংশ বায়তুলমালে দেয়া ফরয। যে তা পেয়েছে তার উপর এ ফরয কার্যকর হবে। কেননা হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে, নবী করীম (স) বলেছেন: (*********) ‘মাটির তলে প্রোথিত সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ দেয়’। বহু কয়টি হাদীস গ্রন্থেই এ হাদীসটি উদ্ধৃত হয়েছে। আর মাটির তলে গচ্ছিত সম্পদকেই ইসলামী পরিভাষায় (****) বলা হয়, তাতে কোন মতপার্থক্য নেই।
অপর একটি হাদীসেবলা হয়েছে, নবী করীম(স)-কে পড়ামাত্তা বা পড়ে পাওয়া দ্রব্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, ‘যা চলাচলের রাস্তায় পাওয়অ গেছে অথবা পাওয়া গেছে জনবসতিপূর্ণ কোন গ্রাম বা বস্তিতে, এক বছর কাল পর্যন্ত তার প্রচার চালাতে হবে। এ সময়ের মধ্যে তার মালিক পাওয়া গেলে তো ভালই।নতুবা তা তোমার হবে। আর যা লোক চলাচলের পথে পাওয়া যায়নি এবং পাওয়া যায়নি কোন লোকবসতিতে, তাতে এবং মটির তলে গচ্ছিত অবস্থায় প্রাপ্ত সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ দিতে হবে।
হাদীসদ্বয় থেকে কয়েকটি কথা জানা যায়:
ক. কোন অনাবাদী জমিতে কিংবা জানা নেই এমন কোন জমিতে কিছু পাওয়া গেলে তার এক-পঞ্চমাংশ দিতে হবে। জমির উপরে পাওয়া গেলেও। আর যদি কোন মুসলিমের বা অমুসলিমের যিম্মীর মালিকানাধীন জমিতে কিছু পাওয়া যায়, তাহলে তা সেই মালিকের প্রাপ্য।
খ. অধিকাংশ বিশেষজ্ঞদের মত হচ্ছে, ‘রিকাজ’ (****) বলতে এমন সব মালই বোঝায়, যা মাটির তলায় সঞ্চিত ও প্রোথিত পাওয়া গেছে। ইমাম শাফেয়ীর মতে বিশেষভাবে স্বর্ণ ও রৌপ্য সম্পদ এ পর্যায়ে গণ্য। তবে প্রথম মতটি হাদীসের সাধারণ তাৎপর্যের সাথে সংগতিপূর্ণ।
গ. হাদীসদ্বয়ের বাহ্যিক অর্থ থেকে যেমন স্পষ্ট হয়, সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ দেয়া প্রাপকের দায়িত্ব, সে মুসলিম হোক, কি অমুসলিম যিম্মী, ছোট হোক বা বড়- সাধারণ ফিকাহ্বিদদের এটাই মত। ইমাম শাফেয়ী বলেছেন, যিম্মী হলে তার কাছ থেকে কিছুই নেয়া যাবে না। কেননা এই এক-পঞ্চমাংশ দেয়া ফরয হয় কেবল তারই উপর, যার উপর যাকাত ফরয হয়। কেননা এই এক-পঞ্চমাংশ যাকাত পর্যায়ের ফরয। প্রাপক শিশু বা নারী হলে তার এই ‘রিকাজের’ মালি কহতে পারবে না।
ইবনে কুদামাহ লিখেছেন, আমরা রাসূলেরকথা ‘রিকাজ-এর এক-পঞ্চমাংশ দেয়’-এর সাধারণ অর্থই গ্রহণ করেছি। অর্থাৎ তা যে কোন প্রাপ্ত সম্পদের ক্ষেত্রেই সাধারণভাবে প্রযোজ্য। আর অবশিষ্ট যা থাকবে তা প্রাপকের হবে; সে যা-ই হোক।
ইবনে দকীকুল-ইদ বলেছেন, যাঁরাই বলেছেন, ‘রিকাজ’ মাত্রেরই এক-পঞ্চমাংশ দেয়- তা হয় সাধারণ ও শর্তহীনভাবে কিংবা অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা-ই হাদীসের নিকটতর কথা।
ঘ.হাদীসের বাহ্যিক তাৎপর্যের দৃষ্টিতে কোন নিসাব নির্ধারিত নয়। আগের কালের মাটির তলায় প্রোথিত কম-বেশী যে-কোন পরিমাণ সম্পদই হোক, তার এক-পঞ্চমাংশ বায়তুলমালে জমাদিতে হবে। ইমাম মালিক, আবূ হানীফা, তাঁর সঙ্গদ্বয়, আহমদ, ইসহাক ও শাফেয়ীর প্রাচীন কথা থেকে উপরিউক্তি মতেরই সমর্থন মেলে। যেহেতু তা এক-পঞ্চমাংশ গ্রহণযোগ্য সম্পদ, তাই তার কোন নিসাব হতে পারে না, যেমন গনীমতেরমালের কোন নিসাব হয় না। আর যেহেতু তা কোনরূপ ব্যয় পরিম্রম ব্যতীত পাওয়া গেছে, তাই তার যাকাত ধার্যকরণে কোন কিছু বাদ দেয়ার প্রশ্ন উঠে না। খনিজ সম্পদ ও চাষের ফসলের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন রয়েছে।
ইমাম শাফেয়ীর শেষ মত হচ্ছে ‘রিকাজে’ ও নিসাব ধরতে হবে। কেননা তা একটা হক যা জমি নিঃসৃত সম্পদের উপর ধার্য হয়ে থাকে। তাই তারও নিসাব নির্ধারণ করতে হবে, যেমন খনিজ সম্পদ ও কৃষি ফসলে করা হয়।
ঙ. এই ক্ষেত্রে মালিকানার একটি বছর অতিক্রান্ত হওয়ার কোন শর্ত নেই। এক-পঞ্চমাংশ দিয়েদিতে হবে সঙ্গে সঙ্গেই।
হাফেয ইবনে হাজার বলেছেন, ইমাম শাফেয়ী নিসাবের শর্ত করেছেন বলে ইবনুল আরাবী যে উল্লেখ করেছেন, তা ঠিক নয়। কেননা তাঁর নিজের বা তাঁর সঙ্গীদের লিখিত কোন গ্রন্থ থেকেও তাপ্রমাণিত হয় না।
চ. রিকাজ থেকে গৃহীত এক-পঞ্চমাংশ কি কাজে ব্যয় করা হবে, তা হাদীসে উল্লিখিত হয়নি। এ কারণে ফিকাহ্বিদগণ এই পর্যায়ে বিভিন্ন মত দিয়েছেন। হয় তা যাকাত ব্যয়ের ক্ষেত্রসমূহে- ফকীর, মিসকীন ও অন্যান্য আটটি ক্ষেত্রে ব্যয় করা হবে কিংবা ‘ফাই’ সম্পদের ব্যয় ক্ষেত্র অর্থাৎ সাধারণ জনকল্যাণমূলক কাজকর্মে নিয়োজিত হবে এবং ফকীর-মিসকীনকে তার অংশ দেয়া হবে।
ইমাম শাফেয়ী ও আহমদ বলেছেন, যাকাতের ব্যয়ক্ষেত্রেই এরও ব্যয়ক্ষেত্র। কেননা হযরত আলী প্রোথিত সম্পদের প্রাপককে নির্দেশ দিয়েছিলেন মিসকীনদের জন্যে ব্যয় করতে। যেহেতু তা জমি থেকেই পাওয়অ গেছে, অতএব তা ফসল ও ফলের সমতুল্য।
ইমাম আবূ হানীফা, আহমদ, মালিক এবং সাধারণ ফিকাহ্বিদগণ বলেছেন, ‘ফাই’ সম্পদের ব্যয়ক্ষেত্রই তারও ব্যয়ক্ষেত্র। অর্থাৎ তা রাষ্ট্রের সাধারণ বাজেটভুক্ত হবে। কেননা শা’বী বলেছেন, এক ব্যক্তি মদীনার বাইরে মাটিতে প্রোথিত অবস্থায় এক হাজার দীনার পেয়েছিল। তা নিয়ে হযরত উমরের কাঝে উপস্থিত হলে তিনি তা থেকে এক-পঞ্চমাংশ দুইশ’ দীনার তিনি উপস্থিত মুসলমানদের মধ্যে বন্টন করেচিলেন অর্থাৎ এক ব্যক্তির প্রাপ্ত সম্পদে সকলকেই অংশীদার বানালেন। শেষে কিছু অতিরিক্ত হওয়ার দরুন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, প্রাপক ব্যক্তি কোথায় গেল? লোকটি সম্মুখে দাঁড়ালে তিনি বললেণ, ‘তুমি এ সব দীনার নিয়ে যাও, এসব তোমার।’
‘আল-মুগনী’ গ্রন্থকার লিখেছেন, তা যদি যাকাত হত, তাহলে তা যাকাত পাওয়ার অধিকারী লোকদেরই দেয়া হত, উপস্থিত সাধারণ লোকদের মধ্যে তা বন্টন করতেন না এবং অবশিষ্টটাও প্রাপককে ফেরত দিতেন না। তাঁদের কথা হচ্ছে, তা যিম্মীর উপরও ফরয, অথচ যাকাত তো যিম্মীর উপর ধার্য হয় না। আরও কারণ এই যে, তা খুমুস বা এক-পঞ্চমাংশ গ্রহণীয় সম্পদ- কাফিরের হাত থেকে পড়ে গেছে। ফলে তা গনীমতের এক-পঞ্চমাংশের মতই হয়ে গেছে।
ব্যয়ক্ষেত্র যাই হোক, এসব প্রোথিত সম্পদ পাওয়ার বিরল ঘটনা। যাকাত ফাণ্ডের জন্যে তা খুব মূল্যবান জিনিস নয়, সাধারণ রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডারও এতে ভরে না। তবে খনিজ সম্পদের ব্যাপারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিধায় পরবর্তী আলোচনা আমরা এ প্রসংগেই রাখতে চাই।
দ্বিতীয় আলোচনা
খনি ও খনিজ পদার্থের যাকাত
পূর্বের একটি অধ্যায়ে আমরা কৃষি সম্পদের উপর ধার্যা যাকাত সংক্রান্ত বিধান বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছি। তা হচ্ছে জমির উপরিভাগ থেকে পাওয়া সম্পদ। জমির অভ্যন্তর থেকে পাওয়া সম্পদের উপর ধার্য যাকাতের বিষয়টি আলোচনার অপেক্ষায় রয়ে গেছে। জমির গভীরে পাওয়া খনিজ সম্পদ আল্লাহ তা’আলা স্বীয় প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনার অধীন তা সঞ্চিত ও পুঞ্জীভূত করে রেখেছেন। তা মাটির সাথে মিলে-মিশে থাকে। তা উত্তোলন ও নিষ্কাশন করার বিভিন্ন পন্থা ও প্রক্রিয়াও তিনিই মানুষকে শিখিয়েছেন। ফলে মানুষ লাভ করছে স্বর্ণ, রৌপ্য, তাম্র, লৌহ, রাং, আরসেনিক, তৈল, লবণ ইত্যাদি। তন্মধ্যে কতগুলো হয় তরল এবং কতগুলোহয় জমাট বাঁধা। আর এসব সম্পদ যে মহামূল্যবান, মানবজীবনের জন্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ- বিশেষ করে আধুনিক যুগে, বিশ্বব্যাপী কোম্পানীসমূহ মাটির গর্ত থেকে উত্তোলিত এসব খনিজ সম্পদের বলে দুনিয়ায় অগ্রগতি লাভের প্রতিযোগিতায় মেটে উঠেছে- তা কেউ অস্বীকার করতে পারে না। উপরন্তু এসব পুঞ্জীভূত সম্পদের জন্যে দুনিয়ার রাষ্ট্রসমূহ পরস্পর কঠিন দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়, অন্তহীন যুদ্ধে জড়িত হয়, বিশেষ করে পেট্রোল এ দিক দিয়ে যে কতটা ভূমিকা পালন করে, তা কারোর অজানা নেই।
প্রশ্ন হচ্ছে, এসব কনিজ সম্পদ থেকে যা কিছু মানুষ লাভ করে, ইসলামী শরীয়াতে তার জন্যে কি বিধান রয়েছে? তাতে আল্লাহ্র হক কি ধার্য হবে, কখন তা ফলয হবে, কত পরিমাণ হলে তা ফলযহবে, এ ফরযের রূপ কি এবংতা কোথায় কিভাবে ব্যয় করা হবে?
এ প্রশ্নগুলোর জবাব বিভিন্ন ফিকাহ্বিদ বিভিন্নরূপে দিয়েছেন। এই বিভিন্নতার কারণ হচ্ছে এতদসংক্রান্ত দলীলসমূহের তাৎপর্যের বিভিন্নতা। এ বিষয়ে ‘কিয়াস’ করতে গিয়ে তাঁরা বিভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। যদিও কুরআনের আয়াত অনুযায়ী এ ব্যাপারে তাঁরা সকলেই একমত যে, খনি থেকে যা উত্তোলিত হবে, তার যাকাত অবশ্যই দিতে হবে। এ পর্যায়ে উল্লেখ্য আয়াত হচ্ছে:
(আরবী ***********)
হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের উপার্জিত পবিত্র জিনিসএবং আমরা যা কিছু তোমাদের জন্রে জমি থেকে বের করেদেই, তা থেকে ব্যয় কর। আর খনিজ সম্পদ যে জমি থেকে আল্লাহ্র বের করে দেয়া সম্পদ, তাতে সন্দেহ নেই।
যে খনিজ সম্পদের উপর যাকাত ধার্য হয়
কোন খনিজ সম্পদ থেকে যাকাত নিতে হবে, তা নির্ধারণে ফিকাহ্বিদদের মধ্যে মতভেদের সৃষ্টি হয়েছে। ইমাম শাফেয়ীর প্রখ্যাত মত হচ্ছে, তিনি শুধু স্বর্ণ ও রৌপ্য থেকেই যাকাত গ্রহণের পক্ষপাতী। এচাড়া অন্যান্য মূল্যবান সম্পদ- লৌহ, তামা, সীসা, ফিরোজা, হীরা, ইয়অকুত, মুজররদ, সবুজ বর্ণের জুমররদ, সুরমা প্রভৃতি- এতে যাকাত ধার্য হবে না।
ইমাম আবূ হানীফা এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয় মনে করেছেন, জমি থেকে পাওয়া সর্ব প্রকারের খনিজ সম্পদ- যা বিভিন্নভাবে ঢালাই করা যায়- তার সবটার উপর যাকাত ফরয হবে। আর তরল জমাটবাঁধা খনিজ সম্পদ- যা ঢালাই করা যায় না, তার উপর কোন কিছুই ধার্য হবে না। তারা অবশ্য স্বর্ণ ও রৌপ্যের উপর কিয়াস করেই এ কথা বলেছেন। কেননা এ দুটির উপর তো নিঃসন্দেহে ও সর্ববাদীসম্মতভাবে যাকাত ফরয হয়ে আছে অকাট্য দলীল ও ইজমার ভিত্তিতে। অতবে তাঁর মতে অন্যান্য জিনিস সম্পর্কেও- যা আগুনে উত্তপ্ত করে ঢালাই করা যায়- সেই কথাই প্রযোজ্য হবে।
হাম্বলী মাযহাবের মত হচ্ছে, যা ঢালাই করা যায় আর যা যায় না তার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। অতএব যা কিছুই মাটির নীচ থেকে উত্তোলিত হবে এবং যার কিছু না-কিচু মুল্য রয়েছেও তারই উপর যাকাত ফরয হবে। তা জমাটবাঁধা হোক- যেমন লৌহ, সসিা, তামা ইত্যাদি অথবা তরল প্রবহমান হোক- যেমন তৈল, পেট্রোল, সালফার ইত্যাদি। যায়দ ইবনে আলী, বাকের এবং সাদিক প্রমুখ শিয়ামতের ফিকাহ্বিদ এই মত দিয়েছে। তবে মুয়াইদবিল্লাহ লবণ, তৈল ইত্যাদিকে এ থেকে বাদ দিয়েছেন।
আবূ জাফল বাকেরকে যবক্ষার (Salt Peter) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, যবক্ষার কি? বলল, লবণাক্ত জমি, যার উপর পাণি জমে লবনে পরিণত হয়। তখন তিনি বললেন, ‘তা খনিজ সম্পদের মধ্যে গণ্য, অতএব তার এক-পঞ্চমাংশ দিতে হবে।’ প্রশ্নকারী আবার জিজ্ঞেস করল: ‘সালফার’ ও ন্যাপথলিও জমি থেকে পাওয়া যায়, তার কি হুকুম? বললেন, ‘এগুলো এবং এর মত অন্যান্য সব জিনিসেরই এক-পঞ্চমাংশ দিতে হবে।’
এ গ্রন্থকারের মতে হাম্বলী মাযহাবের এই মতটি অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। ‘খনিজ সম্পদ’ বলতে যা-ই বোঝায়, তাই এই অর্থের সমর্থ। কেননা জমাটবাঁধা ও তরল পদার্থ- এর মধ্যে মৌলিকতার দিক দিয়ে কোন পার্থক্য নেই। তেমনি পার্থক্য নেই যা ঢালাই করা যায় আর যা যায় না, তার মধ্যে। অনুরূপ লৌহ, সসিা এবং ন্যাপথলি ও সালফারের মধ্যেও কোন পার্থক্য গণ্য করা যায় না। এ সবগুলোই মহামূল্যবান সম্পদ এবং মানুষের জীবনের বিশেষ প্রয়োজনীয়। একালে এগুলো তো ‘কালো স্বর্ণ’ নামে অভিহিত। আমাদের ইমামগণ যদি এসব মহামূল্য খনিজ সম্পদের আধুনিক মূল্য ও গুরুত্ব দেখতে পেতেন, তার দ্বারা যে কল্যাণ এবং জাতীয় বৈভব লাভ করা যায়, তা যদি তাঁদের গোচরীভূত হত, তাহলে তাঁরা নিশ্চয়ই ইজতিহাদের মাধ্যমে ভিন্নতর সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারতেন।
‘আল-মুগনী’র গ্রন্থকার হাম্বলী মাযহাবের পক্ষে দলীল পেশ প্রসঙ্গে বলেছেন:
ক. কুরআনে উপরিউক্ত আয়াতের সাধারণ অর্থই আমাদের প্রধান দলীল।
খ. আর যেহেতু তা-ও খনিজ সম্পদ, তাই তা থেকে প্রাপ্ত সম্পদের উপর অবশ্যই যাকাত ধার্য হবে। যেমন স্বর্ণ ও রৌপ্য হয়।
গ. যেহেতু তা সম্পদ, তা লাভ হলে তার এক-পঞ্চমাংশ অবশ্যই দিতে হবে। আর তা যদি খনি থেকে পাওয়া যায়, তাহলে তার উপর স্বর্ণের মতই যাকাত ধার্য হবে।
তৃতীয় আলোচনা
খনিজ সম্পদের উপর ধার্য যাকাতের পরিমাণ: এক পঞ্চমাংশ অথবা এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ
খনিজ সম্পদের উপর কি পরিমাণ যাকাত ফরয, তানিয়ে ফিকাহ্বিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
ইমাম আবূ হানীফা, তাঁর সঙ্গিগণ, আবূ উবাইদ, যায়দ ইবনে আলী, বাকের, সাদিক এবং শিয়া যায়দীয়া ও ইমামীয়া ফিকাহ্বিদগণ মত দিয়েছেন, তাতে ফরয হচ্ছে এক-পঞ্চমাংশ।
ইমাম আহমদ ও ইসহাক বলেছেন, ফরয পরিমাণ হচ্ছে এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ, যেমন নগদ সম্পদের যাকাত। তা অকাট্য দলীল এবং ইজমা দ্বারা প্রমাণিত। ইমাম মালিক এবং শাফেয়ীও এ মত দিয়েছেন।
মালিকী মাযহাবে খনিজ সম্পদ দু’ধরনের। এক প্রকার খনিজ সম্পদ যার উৎপাদনে যথেষ্ট শ্রম বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। সে সম্পর্কে সর্বসম্মত মত হচ্ছে, তাতে যাকাত ছাড়া আর কিছুই ধার্য হবে না। অপর ধরনের কনিজ সম্পদে শ্রম প্রয়োজনীয় নয়। এ ব্যাপারে ইমাম মালিকের বিভিন্ন মত পাওয়া যায়। কখনো বলেছেন, তাতে যাকাত হবে। আবার কখনোবলেছেন- তাতে যাকাত ধার্য হবে এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ- যেমন নগদ সম্পদে হয়।
ইমাম শাফেয়ীরও এ ধরনের কথা আছে। তাঁর প্রখ্যাত মত এবং যে মতের উপর তাঁর সঙ্গীরা ফতওয়া দিয়েছেন, তা হচ্ছে, তা থেকে গ্রহণ করতে হবে এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ।
আরও একটি মত আছে, যা মালিকী মাযহাবে খুবই প্রসিদ্ধ। তা হচ্ছে, যা মাটির গর্ভ থেকে বের হবে, তা তামা ধরনের কঠিন হোক, কি তরল, তা সবই বায়তুলমালের মালিকানাভুক্ত হবে। জমির গর্ভ থেকে প্রাপ্ত পেট্রোলও রাষ্ট্রীয় মালিকানায় চলে যাবে।কেননা সর্বসাধারণ মুসলমানের কল্যাণ এতেই নিহিত যে, এই সমষ্টির মালিকানা হবে, ব্যক্তিগত নয়। এই সব মহামূল্য সম্পদ খারাজ ব্যক্তিদের হস্তগত হলে চরম অকল্যাণ ডেকে আনবে।তা নিয়ে জনগনের মধ্যে দ্বন্দ-কলহ এবং যুদ্ধ-বিগ্রহ ও রক্তপাতও হয়ে যেতে পারে।তাই তা মুসলিম নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বসম্পন্ন রাষ্ট্রীয় সরকারের ব্যবস্থাধীন থাকতে হবে এবং তার কল্যাণ সাধারণভাবে সকলের মধ্যে বিতরিত হতে হবে।
এ কথার সমর্থক হচ্ছে হাদীসের একটি বর্ণনা। হযরত আবিয়ায হাম্মাল আল মাজিলী বলেন: তিনি রাসূলে করীম(স)-এর কাঝে মাজ’রিবের কাছে অবস্থিত লবণের খনির লীজ-প্রার্থনা করলে তিনি তা তাঁকে দিলেন। আবিয়ায যখন চলে গেলেন, তখন রাসূলে করীমকে বলা হল, ‘ইয়া রাসূল! আপনি এলোকটিকে কিসের লীজ দিলেন, তা কি আপনি বুঝতে পেরেছেন? আপনি তো তাকে আটকে থাকা পানির লীজ দিয়েছেন। পরে রাসূল (স) তো ফেরত নিয়ে নেন।
এই পানি স্থিতিশীল, চলাচল করে না এবং তা বিনাশ্রমে পাওয়া যায় বলে তা লবণ-সদৃশ মনে করা হয়েছে।
আবূ উবাইদ লবণ চলাচলকরে না এবং তা বিনাশ্রমে পাওয়া যায় বলে তা লবন-সদৃশ মনে করা হয়েছে।
আবূ উবাইদ লবণ খনিজ লীজ দেয়া এবং পরে তা ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাখ্যায় বলেছেন, নবী করীম(স) তা মৃত অনাবাদী জমি হিসেবেই লীজ দিয়েছিলেন এ উদ্দেশ্যে যে, আবিয়ায তা পুনরুজ্জীবিত ও আবাদ করবেন। কিন্তু পরে তিনি যখন বুঝতে পারলেন যে, তা আটকে থাকা পানি, প্রবাহমান ঝর্ণার মত নয়, তখনতা তারকাছ থেকে ফেরত নিলেন। কেননা নবী করীমের সুন্নাত হচ্ছে, স্বাভাবিকভাবে উদ্বূত ঘাস, আগুন ও পানির ক্ষেত্রে সব মানুষই সমানভাবে শরীক হবে।তাই তা মাত্র একজনের কর্তৃত্বের ছেড়ে দিয়ে তা থেকে অন্যদের বঞ্চিত করাকে পছন্দ করতে পারেন নি।
এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ দেয়ার পক্ষের দলীল
খনিজ সম্পদের এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ দেয়ার পক্ষের দলীল হচ্ছে: নবী করীম (স) হিলাল ইবনুল হারিসকে কাবলিয়ার খনিসমূহ লীজ দিয়েছিলেন। (তা সমুদ্রোপকূলের পার্শ্বের জমি। মদীনা থেকে পাঁচদিনের পথ দূরে অবস্থিত) তা নখ্লা ও মদীনার মধ্যবর্তী করা’র পার্শ্বে অবস্থিত। এসব খনি যাকাত ছাড়া আর কিছুই নেয়া হয় না।
ইমাম শাফেয়ী এ হাদীসটি উদ্ধৃত করে লিখেছেন: হাদীসবিদগণ বর্ণনার সূত্র হিসেবে এটাকে সহীহ মনে করেন নি। যদিও তাঁরা প্রমাণ করতে চেয়েছেন; কিন্তু নবী করীম কর্তৃক লীজ দেয়অর খবর ছাড়া আর কিছু প্রমাণ করা যায় নি। আর খনিজ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ ছাড়া যাকাত দেয়ার ব্যাপারটি নবী করীম (স) থেকে আদপেই বর্ণিত নয়।
আবূ উবাইদ আরও বরেছেন: কাবলিয়অর জমি দেয়া সংক্রান্ত রাবীয়ার বর্ণনাটির কোন সনদ নেই। তা ছাড়া তাতে একথা বলা হয়নি যে, নবী করীম (স) তা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। শুধু বলেছেন: তা নবী করমি থেকে প্রমাণিত হলে একটা দলীল হত এবং তা দেয়া জায়েয হত না।
এক-পঞ্চমাংশ দেয়ার পক্ষের দলীল
ক. ইমাম আবূ হানীফঅ এবং তাঁর সমর্থকবৃন্দ তাঁদের মতের সমর্থনে রাসূলের এ কথাটির উল্লেখ করেছেন: (*******) ‘রিকাজে এক-পঞ্চমংশ ফরয।’
তাঁরা বলেছৈন, জমির উৎপাদন দুই প্রকারের। একটার নাম পুঁজিকৃত সম্পদ- ‘কনজ’। তা মানুষ কর্তৃক মাটির গর্ভে পুঁতে রাখা সম্পদ। আর দ্বিতীয়টি খনিজ সম্পদ। তা আল্লাহ্ তা’আলা পৃথিবী সৃষ্টির দিন মাটির মধ্যে সৃষ্টি করে রেখেছেন। ‘রিকাজ’ শব্দটি এই দুই প্রকারের সম্পদই বোঝায়। তবে তার প্রত্যক্ষ অর্থ খনিজ সম্পদ আর পরোক্ষ অর্থ ‘কানজ’।
কিন্তু ইমাম মালিক, শাফেয়ী ও হিজাজের সাধারণ ফিকাহ্বিদগণ বলেছেন, খনিজ সম্পদ ‘রিকাজ’ নয়, বরং প্রাচীণ যুগ থেকে মাটির গর্ভে পুঁতে রাখা সম্পদই হচ্ছে ‘রিকাজ’। যেমন হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেছেন: নবী করীম(স) বলেছেন:
(আরবী********)
বোবা জন্তু আহত করার কোন জরিমানা বা খেসারত দেয়া বাধ্যতামূলক নয়, কূপে পতিত হলে বা খনিতে মৃত্যুবরণ করলে কোন ক্ষতিপূরণ নেই।তবে রিকাজে এক-পঞ্চমাংশ দেয়া বাধ্যতামূলক।
নবী করীম (স) এ হাদীসে খনিজ সম্পদ ও রিকাজের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তাই বলতে হবে, রিকাজ খনিজ সম্পদ থেকে ভিন্ন ও স্বতন্ত্র জিনিস।
হানাফী ফিকাহ্বিদগণ বলেছেন, খনিজ সম্পদ ‘রিকাজে এক-পঞ্চমাংশ দেয়’ রাসূলের একথার অন্তর্ভুক্ত। কেননা তিনি খনিজ সম্পদের উল্লেখ করেছেন। যদি বলতেন: তাতে এক-পঞ্চমাংশ, তাহলে লোকের গচ্ছিত সম্পদ তার অন্তর্ভুক্ত ধরা যেত না- কেননা তা খনিজ সম্পদ নয়।
এ দুই পক্ষের মধ্যকার বিরোধ নির্মুল করতে পারে- এমন ভাষাভাষী কাউকে পাওয়া যায়নি। ইরাকের ফিকাহ্বিদগণ ভাষা পারদর্শী ছিলেন। মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান হাঁদের মধ্যেএকজন। আর হিজাজের ফিকাহ্বিদদের মধ্যে ভাষা বিশেষজ্ঞ ছিলেন ইমাম শাফেয়ী।
পাঠকদের কাছে বাহ্যত মনেহবে, ‘রিকাজ’ শব্দটি দুটি অর্থ দেয়। ‘কামুস’ ইত্যাদি অভিধান গ্রন্থে বলা হয়েছে:
(আরবী***********)
রিকাজ তা-ই, যা আল্লাহ্ তা’আলা সঞ্চিত করে রেখেছেন অর্থাৎ খনির মধ্যে সৃষ্টি করেছেন, আর ইসলাম-পূর্ব যুগের প্রোথিত সম্পদ এবং স্বর্ণ ও রৌপ্য খণ্ডাকারে খনিজ সম্পদ।
ইবনুল আসীর ‘নিহায়া’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘রিকাজ’ হিজাজবাসীদের মতে ইসলাম-পূর্ব যুগের লোকদের ভূগর্ভে প্রোথিত সম্পদ। আর ইরাকবাসীদের মতে খনিজ সম্পদ। দুটি অর্থই ভাষাসম্মত। কেননা দুটি মাটির তলায় স্থাপিত, প্রতিষ্ঠিত।
ইমাম আবূ হানীফা দলীল দিয়েছেন এই বলে যে, ‘রিকাজ’ অর্থ খনিজ সম্পদ। হাদীসে বলা হয়েছে, এক ব্যক্তি রাসূলে করীম(স)-এর কাছে প্রাচীন পরিত্যক্ত স্থানে প্রাপ্ত সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেণ: ‘তাতে এবং রিকাজে এক-পঞ্চমাংশ দিতে হবে।’
পরে বলেছেন, প্রথম প্রোথিত সম্পদ সম্পর্কে জবাব দিয়েছেন তারপর ভিন্নভাবে বলেছেন রিকাজের কথা। এভাবে বলায় মৌলিকতার দিক দিয়ে দুটো ভিন্ন ভিন্ন জিনিস বোঝানো হয়েছে।
তাঁর কোন কোন সঙ্গী বলেছেন, খনিজ সম্পদকে ‘রিকাজ’ নামকরণ মূল ভাষায় না গেলেও তা ভাষাগত ধারণার পথে ব্যাপকভাবে প্রচারিত। মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান শায়বান ফিকাহ্শাস্ত্রে গভীর মনীষার অধিকারী এবং সেই সাথে একজন আরব মনীষীরূপেও খ্যাত- তিনি বলেছেন: ‘স্বর্ণ ও রৌপ্য খুব বেশী পরিমাণে পাওয়া গেলে আরবরা বলে: (******) খনি কানায় কানায় ভরে গেছে।
‘আল-বাদায়েউ’ গ্রন্থ প্রণেতা বলেছেন: (*****) থেকে গৃহীত। তার অরথ ‘প্রতিষ্ঠিত করা’। আর যা কনিতে থাকেতা জমির গর্ভে প্রতিষ্ঠিত।তা জমাকৃত বা ‘কানজ’ নয়। কেননা তা জমির সাথে প্রতিবেশী হয়ে থাকার জন্য রক্ষিত হয়েছে।
খ. কনিজ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ দেয়া ফরয প্রমাণার্থে হানাফীগণ অপর একটি দলীলের অবতারণা করেছেন। তা হচ্ছে যুদ্ধে লব্ধ গনীমতের মালের উপর কিয়াস অর্থাৎ তাও এ পর্যায়েরই একটি জিনিস মনে করা।
তাঁরা বলেছেন, যেহেতু খনিজ সম্পদগুলো কাফিরদের হাতে ছিল। পরে তাদের হাত থেকে তা বিচ্যুত হয়। কিন্তু তার উপর মুসলমানদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কেননা তাঁরা এসব পাহাড়-পর্বত গৃহাস্থলের উপর প্রাধান্য অর্জনের ইচ্ছুক ছিলেন না। ফলে তা কাফিরদের মালিকানাধীনই থেকে যায়। পরে মুসলিমরা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সেগুলোর উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করে। অতএব তার এক পঞ্চমাংশ দেয়া ফরয হবে।
কিন্তু এরূপ দলীল উপস্থাপনে একটা কৃত্রিমতা আছে। যেহেতু এসব খনি কাফিরদের মালিকানায় থাকার দাবিটা অগ্রহণযোগ্য। আর তা হতে বা পরে কিভাবে? সমগ্র অঞ্চল তো ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্বুক্ত হয়ে গিয়েছিল। তখন এসব খনি ইসলাম-পূর্ব যুগের অবস্থায় পড়েছিল, তা কি করে মেনে নেয়া যায়? আর-কেইবা তা দাবি করে দৃঢ়তার সাথে বলতে পারে?
গ. ইমামীয়া মাযহাবের ফিকাহ্বিদগণ খনিজ সম্পদে এক-পঞ্চমাংশ ফরয প্রমাণের জন্যে সূরা ‘আল-আনফাল’-এর এ আয়াতটি দলীল হিসেবে পেশ করেছেন:
তোমরা জানবে, তোমরা যে জিনিসই গনীমত স্বরূপ পাও তাতে আল্লাহ্র জন্রে রাসূলের নিকটাত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন ও নিঃস্ব পথিকের জন্যে এক পঞ্চমাংশ ধার্য হবে। (৪১ আয়াত)
আয়াতটি গনীমতের মালের এক-পঞ্চমাংশনেয়া ফরয সাব্যস্ত করছে। আর অভিধানের দৃষ্টিতে ‘গনীমত’ হচ্ছে যা-ই উপরি পাওনা হিসেবে পাওয়া যাবে- তা। তাই বাহ্যত সেসব জিনিসই এর অন্তর্বুক্ত, যা জমির স্থল, জল ও অভ্যন্তর ভাগ থেকে পাওয়া যাবে।
কিন্তু এ দলীলে আপত্তি আছে। প্রথম কথা, আসরে পূর্বের বর্ণনা দৃষ্টে আয়াতটি যুদ্ধে যে গনীমতের মাল পাওয়া যায়, সে সম্পর্কেই প্রযোজ্য। দ্বিতীয়, নবী করীম (স)-এর ভাষায় প্রধানত এবং বেশীর ভাগ ‘গনীমত’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে এ অর্থেই। যেমন তাঁর কথা: (*****) ‘আমার জন্যে গনীমত হালাল করা হয়েছে।’
বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ-গবেষকগণ উল্লেখ করেছেন, ‘সাধারণ অর্থবোধক শব্দ অনেক সময় বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হয় এমন কতগুলো নিদর্শন ও ইংগিতের ভিত্তি, যা সেদিকে স্পষ্ট নির্দেশ করে। তখন তা থেকে সে অর্থই গ্রহণ করা হয়, যদিও তা ভিন্ন অরতওদিতে পারে। ইবনে দকীকুল-ইদ বলেছেন, পূর্ব প্রসংগ (Context) মোটামুটি অর্থ সম্পন্ন শব্দের নির্দিষ্ট একটা অর্থ গ্রহণের নির্দেশকরে, বহু কয়টি অর্থের মধ্যে একটিতে অগ্রাধিকার দেয়ার পথ দেখায়। পাঠকতার রুচি অনুযায়ী সেদিকে পরিচাতিল হয়।
এ প্রসঙ্গে গ্রন্থকারের দৃষ্টিতে প্রথম দলীলটিই উত্তম। অর্থাৎ ‘রিকাজ’-এর এক-পঞ্চমাংশ দেয়াসংক্রান্ত সহীহ্ হাদীসখনিজ সম্পদকেও শামিলকরে, যেমন শামিলকরে মাটির গর্ভে পুঁতে রাখা গচ্ছিত সম্পদ। ইমাম আবূ উবাইদ তাঁর কিতাবুল আমওয়াল’ গ্রন্থে এই মতটিকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
শ্রম পরিমাণ ফরয হওয়ার মত
কিছু সংখ্যক ফিকাহ্বিদ একটা স্বতন্ত্র মত প্রকাশ করেছেন। তাঁরা সে জিনিস উৎপাদনে নিয়োজিত শ্রম, অর্থ ব্যয় ও কষ্টের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। বলেছেন, নিয়োজিত শ্রম ও কর্মেরতুলনায় উৎপাদনের পরিমাণ যদি অধিক হয়, তাহলে এক-পঞ্চমাংশ দেয়া ফরয হবে। আর তার তুলনায়উৎপাদন যদি কমহয়, তাহলে দেয়া ফরয হবে এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ। ইমাম মালিক ও শাফেয়ীও এই মত দিয়েছেন।
এরূপ পার্থক্যকরণের লক্ষ্য হচ্ছে, দুই ধরনের হাদীসের মধ্যে সমন্বয় সাধন। এক ধরনের হাদীস থেকে জানা যায়, স্বর্ণ-রৌপ্যের এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশদিতে হবে। আর এ দুটি খনিজ সম্পদ, অতএব অন্যান্য খনিজ সম্পদেও অনুরূপ নিয়ম কার্যকর হবে। অপর ধরনের হাদীস হচ্ছে, খনিজ সম্পদে এক-পঞ্চমাংশ দেয়। আর তা ‘রিকাজ’ বা রিকাজের মত। অপর দিকদিয়ে তা কৃষি ফসলের উপর ধারণাযোগ্য, তাতে চেষ্টা ও কষ্টের পার্থক্যের ভিত্তিতে ফরয পরিমাণেও পার্থক্য হবে।
শাফেয়ী মাযহাবের রাফেয়ী এই কথার দলীল দান প্রসঙ্গে বলেছেন, যা কোনরূপ শ্রম ও অর্থ ব্যয় ব্যতিরেকেই পাওয়া যায়, তার এক-পঞ্চমাংশ দিতে হবে। আর যা অর্জনে কষ্ট ও অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে, তাতে এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ দিতে হবে। এতে করে সংশ্লিষ্ট সমস্ত হাদীসের মধ্যে সমন্বয় সাধিতহতে পারে। আরওএ জন্যে যে, কষ্ট কম হওয়ার ফরয পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। আর তা বেশী হলে তার পরিমাণ কম হবে। আকাশের পানিতে সিক্ত ও কৃত্রিম সেচে সিক্ত করে জমির ওশর পরিমাণে যে পার্থক্য স্বীকৃত হয়েছে, তা কি লক্ষ্য করার মত নয়?
এক-পঞ্চমাংশ-২-% ও এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ-২.৫%-এর মধ্যকার পার্থক্য খুব সামান্য নয়। তাই ওশর বা অর্ধ-ওশর ধার্যকরণে কোন আপত্তি থাকতে পারে না। কেননা উৎপাদনে নিয়েঅজিত শ্রম ও অর্থ ব্যয়ের মূল্যায়নের দৃষ্টিতে এই পার্থক্যটা করা হয়। আধুনিক আইন-প্রণয়নেও এটা কোন অভিনব ব্যাপার নয়। শরীয়াতের বিধানের দৃষ্টিতে এটা একটা স্পষ্ট নিয়ম। গৃহীত মালের মুনাফা তার মূল্য ও অর্জন-সহজতা বাকষ্টের দৃষ্টিতে ফরয পরিমাণে কম-বেশীর পার্থক্যকরণ একটা চিরস্বীকৃত স্বাভাবিক ব্যবস্থা।
চতুর্থ আলোচনা
খনিজ সম্পদের নিসাব- তা কখন গণনা করা হবে
খনিজ সম্পদের কি কোন নিসাব আছে
ইমাম আবূ হানীফা তাঁর সঙ্গী-সাথীগণ মত দিয়েছেন যে, খনিজ সম্পদের পরিমাণ কম হোক বেশি হোক, তার হক দিতে হবে, কোনরূপ নিসাবের হিসাব ছাড়াই। কেননা তা ‘রিকাজ’, আর এ প্রসঙ্গে হাদীস সাধারণ অর্থ ব্যক্ত করে। তার এক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার শর্ত নেই। অতএব তারকোন নিসাবও নেই, যেমন রিকাজের নিসাব নেই।
ইমাম মালিক, শাফেয়ী, আহমদ ও ইসহাক এবং তাঁদের সঙ্গীগণ বলেছেন, একটা নিসাব অবশ্যই ধরতে হবে। আর তা হচ্ছে: উৎপন্ন জিনিসের মূল্য নগদ সম্পদের নিসাব মূল্যেল সমান হলে তার উপর হক ধার্য হবে। স্বর্ণ ও রৌপ্যের নিসাব নির্ধারণ পর্যায়ে যেসব হাদীস এসেছে সে সবের সাধারণ অর্থকেই দলীল হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। যেমন: ‘পাঁচ আউকিয়ার কমে কোন যাকাত ধার্য হবে না’। ‘একশ’ নব্বইটিতে কিছুই দিতে হবে না’। আর সর্বদেশের ফিকাহ্-বিদগণের ঐকমত্য হচ্ছে, স্বর্ণের নিসাব বিশ মিশকাল।
দলীল দ্বারা প্রমাণিত, খনিজ সম্পদ সংক্রান্ত সত্য কথা হচ্ছে, নিসাব গণ্য করতে হবে, তবে একবছর অতিক্রান্ত হওয়ার শর্ত থাকবে না। আর অর্থ- যেমন রাফেয়ী বলেছেন- নিসাব গণ্য করতে হবে এজন্যে যে, প্রাপ্ত সম্পদ যেন এতটা পরিমাণের হয়, যা ধার্য হক দিতে সক্ষম হতে পারে। আর বছর অতিক্রান্ত হওয়ার শর্ত করা হয় সম্পদের প্রবৃদ্ধি ও ফলোৎপাদনের সম্ভাবনার দৃষ্টিতে। কিন্তু খনিজ সম্পদ তা স্বতঃই প্রবৃদ্ধিপ্রাপ্ত। এই কারণে কৃষি ফসলের নিসাব নির্ধারিত হয়েছে; কিন্তু তার উপর এক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার শর্ত করা হয়নি।
নিসাব নির্ধারণে সময়-মেয়াদ
নিসাব নির্ধারণের শর্ত আরোপের অর্থ এই নয় যে, একবারে যা পাওয়া যাবে, তার নিসাব হয় কিনা, তা দেখতে হবে।বরং বহু বারে যা পাওয়া যাবে তা একত্রিত করে পরিমাণ ধরতে হবে। কেননা খনিজ সম্পদ এভাবেই উদ্ধাও উ উত্তেলিত হতে পারে- হয়েথাকে। কৃষি ফসল লব্ধ সম্পদের যাকাতের হিসাবও এমনিভাবেই করা হয়।
কিন্তু কৃষি ফসল ও ফল একত্র করে হিসাব করা হয় তা একই বছর ও একই মৌসুমে লব্ধ ফল বা ফসল হিসেবে। এখানে লক্ষ্য করতে হবে; কাজ প্রাপ্তি, খনিজ সম্পদের প্রকাশ পাওয়া এবং তা আয়ত্ত করার দিকে।কাজ যদি অব্যাহতভাবে চলে, প্রাপ্তিও হতে থাকে ক্রমাগতভাবে তাহলে একত্রিকরণ সহীহ হবে। উৎপাদন তার মালিকানায় থেকে যাওয়ার শর্ত করা হয়নি। এক্ষণে যদি বিক্রয়ের মাধ্যমে যাকাত দেয়া হয় তাহলে অপর ফসলতার সাথে মেলানো ফরয হবে- যেমন হাতিয়ার বা যন্ত্রপাতি মেরামতের বা কর্মচারীর রোগ অথবা বিদেশ যাত্রার দরুন হতে পারে- তাহলে তা উৎপাদন একত্রিকরণে প্রতিবন্ধক হবে না, কিন্তু খনিজ সম্পদ পাওয়া থেকে নিরাশ হওয়ার দরুন ভিন্ন পেশা গ্রহণের কারণে যদি কাজ বন্ধ হয়ে যায় অথবা এই পর্যায়ের অন্য কোন কারণে তাহলে তার প্রভাব অবশ্যই স্বীকার্য হবে।
আর কাজ যদি অব্যাহতভাবে চলে; কিন্তু প্রাপ্তি ধারাবাহিক না হয়, -এভাবে যে, হয় খনি দীর্ঘদিন বন্ধ হয়ে গেল, পরে প্রাপ্তি শুরু হল- এরূপ অবস্থায় এই বন্ধের সময়টা অল্প হলে একত্রিত করে হিসাবকরণে কোন দোষ হবে না। আর দীর্ঘ হলে বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেছেন, একত্র করা যাবে- কেননা খনির এরূপ অবস্থা সাধারণত হয়েই থাকে। তাই তা একত্রিত করে নিসাব ধরা না হলে খনিজ সম্পদের যাকাতই হয়েই থাকে।তাই তা একত্রিত করে নিসাব ধরা না হলে খনিজ সম্পদের যাকাতই অনেক সময় আদায় করা সম্ভব হবে না।
অবশ্য অনেকে এ-ও মনে করেছন যে, তা একত্রিত করা যাবে না, যেমনকাজ বন্ধ হলে গেলে করা হয় না।তখন তাদুই স্বতন্ত্র চাষের ফসলবা দুই মৌসুমের ফল মনে করতে হবে।
এ বিষয়ে এ গ্রন্থকারের মত হচ্ছে, এসব ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের পরিমাণ নির্ধারণের উপর ছেড়ে দিতে হবে। কেননা কুরআনই আমাদের সেই নির্দেশ দিয়েছে এই বলে: ‘তোমরা না জানলে যাঁরা জানেন তাঁদের কাছে জিজ্ঞেস কর।’
পঞ্চম আলোচনা
খনিজ সম্পদে যাকাত ধার্যকরণে এক বছর কি শর্ত
জমহুর ফিকাহবিদগণের মত হচ্ছে, খনিজ সম্পদ উত্তোলনে ও অর্জন সমাপ্ত এবং তা পরিচ্ছন্নকরণ, পৃথকীকরণ হলেই তার যাকাত দেয়া ফরয হয়ে যাবে।
ইমাম মালিক বলেছেন, খনিজ সম্পদ কৃষি ফসলের মতই। কৃষি ফসলের ওশর নেয়ার মত তার যাকাতও নিতে হবে এবং যে সময় খনিজ সম্পদ সম্পূর্ণভাবে আয়ত্তে এসে যাবে, তখনই তা গ্রহণ করতে হবে। একটি বছর মালিকানায় থাকার কোন শর্ত দরকার নেই। প্রাচীন ও পরবর্তীকালের সব ফিকহাবিদই এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ একমত।
ইসহাক ও ইবনুল মুনযির আবশ্য ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। তাঁরা এক বছর আতিক্রম হওয়ার শর্ত আরোপ করেছেন। কেননা হাদীসে স্পষ্ট বলা হয়েছে একটি পূর্ণ বছর অতিক্রম না হওয়া পর্যন্ত কোন মালেরই যাকাত ফরয হবে না। যদিও এ হাদীসটি যয়ীফ এবং এটাকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ হাদীসটি আর সাধারণ অর্থ অবশিষ্ট থাকেনি। কৃষি ফসল ও ফল তা থেকে বিশেষ করে নেয়া হয়েছে তাই খনিজ সম্পদ তার সাথে যুক্ত হবে ও তার উপর কিয়াস করা হবে।
এক বছর শর্ত্ না করার ব্যাপারে ‘আল-মুগনী’ গ্রন্থ প্রণেতা বলেছেন, খনিজ সম্পদ জমি থেকে প্রাপ্ত সম্পদ। তাই কার যাকাত ফরয হওয়ার এক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার শর্ত্ করা যায় না;যেমন কৃষি ফসল ও ফলের ক্ষেত্রে করা হয় না। তাছাড়া এক বছরের শর্ত্ করা হয় এসব ছাড়া অন্যান্য ব্যাপারে প্রবৃদ্বির মা্ত্রা পূর্ণ্ত্ব লাভের জন্যে। আর খনিজ সম্পদের প্রবৃদ্ধি তো একবারেই হয়ি যায়। অতএব তাতে কৃষি ফসলের মত বছর অতিক্রান্ত হওয়ার শর্ত করা যাবে না। (আল-মুগনী, ৩য় খন্ড)
শাফেয়ী ফিকাহর গ্রন্থ ‘আল-মুহায়্ যাব’ প্রণেতা বলেছেন; খনিজ সম্পদের যাকাত তা প্রাপ্ত হওয়ার পরই ফরয হবে, তাতে ব্ছর অতিক্রান্ত হওয়ার শর্ত করা যবে না। কেননা তা করা হয় প্রবৃদ্ধির পূর্ণত্ব প্রাপ্তিন জন্য। কিন্তু খনিজ সম্পদ প্রাপ্তিতেই প্রবৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। তাই তাতে বছর অতিক্রান্তির শর্ত হতে ব্ছর পারে না।
ষষ্ঠ আলোচনা
খনিজ সম্পদের যাকাত ব্যয়ের ক্ষেত্র
খনিজ সম্পদের যাকাত কোথায় ব্যয় করা হবে
খনিজ সম্পদের উপর ধার্য ও গ্রহীত হকের স্বরূপ নির্ধা্রণে ফিকাহবিদগণ বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, তা কি ‘যাকাত’ হিসেবে গন্য হবে? এবং যাকাত ব্যয়ের কুরআন নির্ধাইরত আটটি খাতে ব্যয় করতে হবে? অথবা তা যাকাত গন্য হবে না, তা ব্যয় করা হবে গনীমত ও ‘ফাই’ লব্ধ এক পঞ্চমাংশ সম্পদের ব্যয়ক্ষেত্রে? অর্থাৎ সাধারণ রাষ্ট্রীয় কাজ-কর্মে দরিদ্র, মিসকীনদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধানে – যদি যাকাত লব্দ সম্পদ যথেষ্ট না হয়?
ইমাম শাফেয়ীর ভিন্ন ভিন্নকয়েকটি মত পাওয়া গেছে। একটি মতে শুধু যাকাত ব্যয়ের ক্ষেত্রে ব্যয় করার কথা বলা হয়েছে। অন্য মতে বলা হয়েছে, তার উপর এক পঞ্চমাংশ ধার্য্ হলে তার ব্যয়ক্ষেত্র হবে ‘ফাই’ সম্পদ ব্যয়ের ক্ষেত্র। আর যদি এক-দশমাংশের এক চতুর্থাংশ ধার্য হয়, তাহলে যাকাতের ব্যয় ক্ষেত্রেই তা ব্যয় করা হবে।
এ মতপার্থক্যের ভিত্তিতে যাঁরা একে যাকাত মনে করেন নি, তাঁরা এক-পঞ্জামাংশ দেয়া ফরয করেছেন যিম্বীর উপর- যদি সে খনিজ সম্পদ লাভ করে। কেননা যিম্বীর উপর তো যাকাত ফরয হতে পারে না। যাকাত তো ইবাদাত পর্য্য়ের কাজ; যিম্মী এ ইবাদাতের অধিকারী নয়। অনুরুপভঅবে যাঁরা এবক যাকাত গণ্য করেন নি, তাঁরা তা আদায় করণে নিয়তেরও শর্ত্ করেন নি। অপররা নিয়তের শর্ত করেছেন। কেননা তা একটি ইবাদাত। আর ইবাদতে নিয়ত জরুরী- তা ছাড়া ইবাদত হয় না।
সপ্তম আলোচনা
সমুদ্র থেকে লব্দ সম্পদ
সমুদ্র থেকে পাওয়া মণি-মুক্ত, আম্বর ইত্যাদি প্রসঙ্গে
সমুদ্র থেকে যেসব মহামুল্য সম্পদ পাওয়া যায়- যেমন মণি, মুক্তা, আম্বর…… প্রভৃতি সুগন্ধি ইত্যাদি, সে সংক্রান্ত হুকুম কি হবে, তা নিয়ে ফিকাহবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
ইমাম আবু হানিফা, তাঁর সঙ্গিগণ, হাসান ইবনুস সালেহ এবং শিয়াদের যায়দীয়া মত হচ্ছে, তাতে কিছুই ফরয হবে না।
পূর্বে ইবনে আব্বাসেরও সেই মত ছিল। বর্ণিত হয়েছে , তিনি বলেছেন, ‘আম্বর’ ‘রিকাজ’ নয়, তা এমন একটা জিনিস যা সমুদ্র উপরে উৎক্ষিপ্ত করেছে। তাতে কোন কিছু ফরয নয় অর্থা্ৎ তাতে যাকাত বা এক-পঞ্চমাংশ কিছুই ফরয হবে না।
হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত হয়েছে, আম্বর গনীমত নয়। তা যে পাবে, তারই হবে অর্থাৎ তাতে গনীমতের মত এক-পঞ্চমাংশ ফরয হবে না।
আবূ উবাইদ বলেছেন, রাসূলে কারীম (স)- এর দুজন সাহাবী মনে করেছেন যে, সমুদ্র থেকে লব্ধ সম্পদে কোন কিছুই ধার্য হবে না।
কিন্দু হযরত ইবনে আব্বাসের একটি বর্ণ্না সহীহ প্রমাণিত হয়েছে। তিনি আম্বর সম্পর্কে বলেরেছন, “তাতে যদি কিছু দেয় ধার্য্ হয়ও তবে তা হবে এক-পঞ্চমাংশ। ”
মনে হচ্ছে ইবনে আব্বাস একটা নির্দিষ্ট ঘটনার পর তাঁর শেষ মত থেকে রুজু করেছেন। ইবরাহীম ইবনে সাদ এডেনের কর্ম্কর্তা নিযুক্ত ছিলেন। তিনি হযরত ইবনে আব্বাসকে আম্বর সর্ম্পকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, তাতে যদি কিছু ধার্য্ হয়; তবে তা হবে ‘খুসুম’ বা এক পঞ্চমাংশ। সম্ভবত এডেনের মত সমুদ্রোপকুলবর্তী স্থানে এ কর্ম্কর্তাকে এ ধরণের বহু জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ফলে হযরত ইবনে আব্বাস ভিন্ন ভিন্ন ও পরস্পর বিরোধী মত প্রকাশ করেছিলেন। আর মুজতাহিদ যে অবস্থা ও কালের পরিবর্ত্নে নিজের দেয়া ফতোয়াও পরিবর্ত্ন করেন, তা তো জানা কথা। কেননা তিনি তো সঠিক কল্যান ও দিক-পার্থ্ক্যকে বিশেষ ভাবে লক্ষ্য করেই কথা বলেন।
অপর একটি বর্ণনায় ইবনে আব্বাস-উমর ইবনুল খাত্তাব সূ্ত্রে বর্ণিত এবং উদ্ধৃত হয়েছে এই ‘আম্বর’সর্ম্পকে। তাতে বলা হয়েছে, আম্বর এবং সমুদ্রগর্ভ থেকে অলংকারাদি পর্যায়ের আর যা কিছু উদ্ধার করা হয়, তাতে এক-পঞ্চমাংশ দিতে হবে। ’ ইবনে আব্বাসের আর একটি বর্ণনা, ইয়ালা ইবনে সাইনাতা হযরত উমরকে লিথলেন সমুদ্রোপকূলে পাওয়া একটি আম্বর সর্ম্পকে। হযরত উপস্থিত সাহাবীদের এ বিষয় জিজ্ঞেস করলেন; তাতে কি ফরয হবে? সাহাবীগণ তা থেকে এক-পঞ্চমাংশ গ্রহণের পরামর্শ দিলেন। হযরত উমর এ কথা লিথে পাঠালেন, তাতে এবং যে কোন দানা সমুদ্র থেকে উদ্ধার করা হবে, তাতে এক-পঞ্চমাংশ ধার্য হবে। ’ হযরত উমর থেকে এর বিপরীত একটা বর্ণ্নাও পাওয়া গেছে। তিনি নির্দেশ দিয়েছেনঃ‘সামুদ্রিক অলঙ্কারদি এবং আম্বর থেকে এক-দশমাংশ গ্রহণ কর। ’
কিন্তূ হযরত উমর থেকে বর্ণিত এসব বর্ণ্নার সনদ সহীহ হওয়ার মর্য্দা পায়নি। এ বৈপরীত্য সহকারে যদি তা সহীহ হয়ও, তবু এ কথা প্রমাণিত হয় যে এ ক্ষেত্রে ইজতিহাদের বিপুল সুযোগ রয়েছে, বিশেষ করে ফরয পরিমান নির্ধারণে। তাই প্রশ্ন দাড়িয়েছে, তাতে রিকাজের ন্যায় এক-পঞ্চমাংশ ধার্য্ হবে কিংবা কৃষি ফসলের ন্যায় এক-দশমাংশ? অথবা দিরহাম, দীনার ইত্যাদি নগদ সম্পদের ন্যায় এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ?
আম্বর ও মণি-মুক্তার উপর এক-পঞ্চমাংশ ধার্য করার কিছু কিছু বর্ণনা কয়েকজন তাবেয়ী থেকেও পাওয়া গেছে। আবূ উবাইদ তা হাসান বসরী ও ইবনে শিহাব জুহরী থেকে বর্ণনা করেছেন। আর আবদুর রাজ্জাক ও ইবনে শায়বা উমর ইবনে আবদুল আযীয থেকে বর্ণনা করেছেন যে ‘তিনি আম্বর’ থেকে এক-পঞ্চমাংশ গ্রহণ করেছেন।
ইমাম আবু ইউসুফের মতও তা-ই। ইমাম আহমদ খেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তাতে যাকাত ধার্য হবে। কেননা প্রকারান্তরে তা খনি থেকে লদ্ধ। আর সমুদ্রের গর্ত থেকে লদ্ধ জিনিসের উপরও তাই ধার্য হবে।
আবূ উবাইদ সামুদ্রিক সম্পদাদির উপর কিছুই ধার্য্ না হওয়ার মতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কেননা নবী করীম (স) এর যুগেও সমুদ্র থেকে বহু জিনিসই উত্তোলিত হত, কিন্তূ তা থেকে কোন কিছু গ্রহণ করার কোন সুন্নত আমাতদর পর্য্ন্ত পৌঁছায়নি। তাঁর পরে খুলাফায়ে রাশেদুন থেকেও সহীহভাবে বর্ণিত কিছুই পাওয়া যায়নি। তাই আমরা মনে করেছি যে, তা সম্পুর্ণ ক্ষমা করা হয়েছে, যেমন- ঘোড়া ও দাসকে যকাতমুক্ত করা হয়েছে। কিন্তূ আসলে সমুদ্র থেকে বের করা জিনিসের উপর কোন হক ধার্য হওয়া স্থলভাগের খনি থেকে বের করা জিনিসে ধার্য হকের মতই হওয়া উচিত।
অনেকে এ দুটোকে ভিন্ন ভিন্ন মনে করেন। তাঁরা বলেন, রসূল (স) এর সুন্নাতই এ দুটোর মধ্যে পার্থ্ক্য করেছে। তিনি ‘রিকাজে’ এক-পঞ্চমাংশ ধার্য করেছেন। আর সমুদ্রগর্ভ্ ধেকে পাওয়া জিনিস সম্পর্কে কিছুই বলেন নি। কিন্তু যে বিষয়ে স্পষ্ট দলীল আছে আর যে বিষয়ে কোন দলীল নেই- কিছূই বলা হয়নি-এ দুয়ের মাঝে কোন সমন্বয়কারী করণের ভিত্তিতে মিলানো ছাড়া কিয়াস আর কিছূ বলে কি?
সমুদ্র থেকে নির্গত জিনিস যখন শরীয়াতের দৃষ্টিতে গনীমতের মালসদৃশ নয়, তখন তা স্থলভাগের খনি লদ্ধ জিনিসের মত হবে। কেননা উভয়ই সম্পদ। আর সম্পদ হওয়াই উভয়ের মধ্যে সমন্বয় বিধানকারী করণ। অতএব তার উপর কিয়াস করা চলবে।
সমূদ্রলদ্ধ জিনিসের উপর কোন হক ধার্য্ হওয়াই বাঞ্ছনীয়। খনিজ সম্পদের উপর কিয়াস করেই তা করা হবে। কৃষিলদ্ধ সম্পদের উপরও কিয়াস করা যায়। এ হকটিকে আমরা যাকাত বলি, আর না বলি তাতে কিছু যায় আসে না।
তবে ধার্য হকের পরিমাণটা কি হবে? তা নির্ধারণ করতে হবে পরামর্শদানকারীদের পরামর্শের ভিতিতে- হযরত উমর তাই করেছেন। রাসুলে করীম (স) ক্ষেতের সেচকার্যে নিয়োজিত কষ্ট ও ব্যয়ের পার্থক্যের ভিতিতে ফসলের যাকাতের পরিমাণে কম-বেশী করেছেন- ওশর বা অর্ধ্ওশর ধার্য করে। এখানেও অনুরুপভাবে কষ্টের মাত্রার পার্থক্যের দৃষ্টিতে ফরয পরিমাণ কম-বেশী নির্ধারণ করতে হবে এবং তা করতে হবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী। কেননা অনেক সময় খুব অল্প কষ্টে উত্তম ও মহামূল্যবান জিনিস উদ্ধার করা যায়। তাই তাতে সেই দৃষ্টিতেই হকের পরিমাণ বেশী ধার্য্ হওয়া বাঞ্ছনীয় হবে।
ইমাম মলিক ও ইমাম শাফেয়ী থেকে খনিজ সম্পদ সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে, তাতে উপরিউক্ত কথার সমর্থ্ন পাওয়া যায়। কষ্ট ও ব্যয়ের পার্থক্যের দৃষ্টিতে ধার্য্ হকের পরিমাণও কম-বেশী হয়েই থাকে। কখনো তা এক-পঞ্চমাংশ হতে পারে, আর কখনো এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ।
আমারা মনে করি, এই পরিমাণ নির্ধারণের ব্যপারটি ইজতিহাদ ও যোগ্য অভিজ্ঞ লোকদের পরামর্শক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপর ছেড়ে দেয়া বাঞ্চনীয়। তখন ওশর বা অর্ধ্ ওশর যা-ই হোক একটা ধার্য্ করা যাবে। আবূ উবাইদ হযরত উমর থেকে অপর একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। তা হল তিনি তাতে ওশর ধার্য করেছেন। কিন্তূ এক্ষেত্রে ওশর ধার্য্ হওয়ার কারণ বা যৌক্তিকতা কি থাকতে পরে, বুঝি না। কেননা তিনি তা ‘রিকাজের’ মতো মনে করেন নি। তা করলে এক পঞ্চামাংশ ধার্য করা যেত। তাকে খনিজ সম্পদও ধরেন নি, তা ধরা হলে তা থেকে যাকাত এক-দশমাংশের এক-চর্তুথাংশ গ্রহণ করা যেত। তিনি তাতে ওশর ধার্য্ করেছেন;কিন্তু এটা ওশর ধার্যের ক্ষেত্রে নয় তা পারে শুধু তখন, যদি তাকে জমি থেকে পাওয়া ফসল ও ফল সমতুল্য মনে করা যায়। কিন্তু এরূপ মত কেউ দিয়েছেন বলে জানা যায়নি।
মাছে কি ধার্য হবে
সামুদ্রিক সম্পদাদি ও আম্বর পার্যয়ে যা কিছু বলা হয়েছে, তা নদী-সমুদ্র থেকে শিকার করা মাছের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাহলে তো একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দাঁড়িয়ে যাবে। বিরাট সম্পদ পাওয়া যাবে এই বাবদ। বিশেষ করে যখন বড় আকারের যৌথ কোম্পানীর ভিত্তিতে মৎস শিকার করার কাজ করা হবে। তাকে হক ধার্য্ হওয়া থেকে মুক্ত রাখা কিছুতেই উচিত হতে গারে না- যেমন খনি ও ক্ষেত-খামারকে রাখা হয়নি।
আবূ উবাইদ ইবনে উব্বাদ থেকে বর্ণনা করেছেন। বলেছেন, উমর ইবনে আবদুল আযীয আম্বানে নিযুক্ত তাঁর কর্মচারীকে লিখে পাঠিয়েছিলেন; ‘শিকার করা মাছের মূল পরিমাণ দুইশত দিরহাম পর্য্ন্ত না পৌঁছালে সে বাবদ কিছুই গ্রহণ করা যাবে না। নগদ সম্পদের নিসাব পরিমাণটাও এই। এই পরিমাণ হলে তা থেকে যাকাত গ্রহণ করতে হবে। ’ ইমাম আহমদও এ মত দিয়েছে বলে বর্ণনা পাওয়া গেছে। ইমামীয়া ফিকাহবিদদের মতে এক-পঞ্চমাংশ ধার্য হবে। কেননা তাঁদের মতে তা গনীমতের মালের মত।
অষ্টম অধ্যায়
দালান-কোঠা ও শিল্প কারখানা প্রভৃতিপ্রবৃদ্ধিমূলক প্রতিষ্ঠন
এই অধ্যায়ে তিনটি আলোচনাঃ
প্রথম, প্রবৃদ্ধি দান ক্ষেত্রসমূহের যাকাত
দ্বিতীয়, এসব জিনিসের যাকাত কিভাবে দেয়া যাবে?
তৃতীয়, তাতে নিসাবের হিসাব কিভাবে নির্ধারিত হবে?
প্রথম আলোচনা
প্রবৃদ্ধি দান-ক্ষেত্রসমূহের যাকাত
অর্ধ- সম্পদ প্রবৃদ্ধির কাজে ব্যবহৃত জিনিস-পত্রঃ এ সব জিনিসের উপর স্বতঃই যাকাত ধার্য হয় না, এগুলো বিক্রয় করে মুনাফা অর্জ্ন করার জন্যও রাখা হয় না। এগুলো গ্রহণ করা হয় প্রবৃদ্ধি লাভের উদ্দেশ্যে এবং এসবের মালিকের তা থেকে ফায়দা লাভ করে, তা ভাড়ায় লাগিয়ে তার মাধ্যমে উপার্জ্নও করে। অথবা তার উৎপাদন বিক্রয় করার মাধ্যমে আয় করে।
যেমন ঘর-বাড়ী ও জন্তূ-জানোয়ার, যা নির্দিষ্ট মজুরীর বিনিময়ে ভাড়ায় লাগানো হয়- ভাড়ায় লাগানো অলংকারাদিও এ পর্যয়ে গণ্য। একালে দালান-কোঠা ও পরিবহন উপকরণ ইত্যাদিও ভাড়ায় লাগিয়ে অর্থোপার্জন করা হয়।
এমন সব জিনিসও আছে যা কোন-না কোন উৎপাদন দেয় এবং সেই উৎপাদন বিক্রয় করে অর্থ্ লাভ করা হয়। যেমন গরু-ছাগল, যা মাঠে ছেড়ে দিয়ে পালা হয় না। তার দুগ্ধ বা পশম বা গোশত-চর্বি বিক্রয় করা হয়। একালে এ পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ্ জিনিস হচ্ছে শিল্প-কারখানা-যন্ত্রপাতি, যা উৎপাদন দেয় এবং সে উৎপন্ন দ্রব্যাদি বাজারে বিক্রয় করা হয়।
ষষ্ঠ অধ্যায়ে আমরা বলে এসেছি যে, প্রাণী উৎপাদনকে মধুর উপর কিয়াস করতে হবে এবং তার সম্পুর্ণভাবে উৎপন্ন (Finished) থেকে ওশর নিতে হবে। কেননা তা প্রাণীজাত, আর এ প্রাণীর উপর কোন যাকাত ধার্য্ হয় না।
এ কারণে আমি এক্ষেত্রে মনে করি, উপরে অর্থোপার্জনের মাধ্যমে পর্যায়ের যেসব জিনিসের উল্লেখ করা হয়েছে, তাকে যাকাত থেকে মুক্ত রাখাতে হবে। যদিও কোন কোন ফিকাহবিদ তা যাকাত ধার্য হওয়ার জিনিসের মধ্যে গণ্য করেছেন।
যেসব মাল সরাসরি ব্যবসায়ের জন্যে গ্রহণ করা হয় এবং যেসব মাল অর্থাগমের মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করা হয়- এ দুপর্যা্য়ের জিনিসের মধ্যে পার্থক্য আছে। প্রথম পর্যায়ের জিনিস থেকে তা হস্তান্তরিত করার মাধ্যমে মুনাফা লাভ হয়। কিন্তূ যে জিনিস প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তা স্ব-স্থানে থেকেই যায়, তার ফায়দাটুকুই শুরুই গ্রহণ করা হয়।
এসব উৎপাদন-মাধ্যম সংক্রান্ত জিনিসমূহ সম্পর্কে শরীয়াতের হুকুম জানতে চেষ্টা করা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। বিশেষ করে বর্ত্মান যুগে। কেননা এ যুগে প্রবৃদ্ধিসম্পন্ন মাল বহু প্রকারের হয়ে গেছে। কেবল জন্তু ও নগদ সম্পদের উপরই কোন নির্ভরতা নেই। ব্যবসায়-পণ্য ও কৃষি জমিই একালের একমাত্র মুনাফা লাভের মাধ্যম নয়।
ভাড়ায় লাগানো ও অর্থাগমের জন্যে নির্মিত দালান-কোঠাও একালের প্রবৃদ্ধি সম্পন্ন সম্পদরূপে গণ্য। শিল্প-কারখানাও, যা উৎপাদনের জন্যে নিয়োজিত-গাড়ী ও উড়োজাহাজ, নৌকা-জাহাজ-লঞ্চ ইত্যাদি যাত্রী পরিবহন পণ্যদ্রব্য ও অন্যান্য সামগ্রী স্থানান্তরিতকরণে ব্যাপক ও বিপুলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এগুলোতে নিয়োজিত মূলধন হয় স্থিতিশীল, নয় প্রায় স্থিতিশীল। অন্য কথায়, অর্থাগম ও প্রবৃদ্ধি সাধনে নিয়োজিত মূলধন-যা হস্তান্তরিত হয় না, বরং মালিকদের বিপুল অর্থ আমদানীর সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। এসব জিনিস যাকাত পর্যায়ে শরীয়াত এবং ফিকাহবিদগণ কি বলেন?
যাকাত ধার্যকরণে সংকীর্ণতাবাদীদের বক্তব্য
১. যে সব জিনিসের যাকাত ধার্য হতে পারে, নবী করীম (স) তা সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট ও চিহ্নিত করে গেছেন। কিন্তূ ভাড়ায় লাগানো জমি, জন্তূ ও যন্ত্রপাতি প্রভৃতিকে তার মধ্যে গণ্য করেন নি। আসলে মানুষকে সর্বপ্রকার বাধ্যবাধকতা ও কর্তব্য-দায়িত্ব থেকে মুক্ত রাখাই ইসলামের লক্ষ্য। এ মৌলনীতি থেকে বাইরে যাওয়া যেতে পারে কেবলমাত্র অকাট্য দলীল ও বিধানের ভিত্তিতে, যা মহান আল্লাহ ও রাসূলের কাছ থেকে এসেছে বলে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তূ আলোচ্য বিষয়ে তেমন কিছুই পাওয়া যায়নি।
২. ইসলামের ফিকাহবিদগণও এসব জিনিসের উপর যাকাত ফরয হওয়ার পক্ষে কোন কথাই বলেন নি। যদি বলতেন, তাহলে নিশ্চয়ই তা কারোরই অজানা থাকতে পারত না।
৩. বরং তাঁরা এর বিপক্ষে দলীল উপস্থাপিত করেছেন। বলেছেন, বসবাসের ঘরে, বিভিন্ন পেশাদারদের পেশা সংক্রান্ত কাজের জন্যে প্রয়োজনীয় হাতিয়ার ও যন্তপাতি যানবহনরূপে ব্যবহৃত জন্তু জানোয়ার এবং ঘরের আসবাবপত্রের উপর কোন যাকাত ধার্য হবে না।
তাহলে এ ব্যাপারে তাঁদের মতে শরীয়াতের সিদ্ধান্ত এই দাঁড়ায় যে, শিল্পকারখানার কোন যাকাত দিতে হবে না, তার উৎপাদন যত বড় ও বিরাটই হোক-না-কেন। এসব দালান-কোঠারও যাকাত দিতে হবে না; তা যত উঁচু বুনিয়াদেই প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন। গাড়ী, উড়োজাহাজ ও নৌকা জলযানের বা ব্যবসায়ী জাহাজের আমদানী যত বেশীই হোক, তার কোন যাকাত দিতে হবে না।
হ্যাঁ, তবে তা থেকে যা আমদানী হয়, তা হস্তগত হওয়ার পর যদি একটি বছর অতিক্রান্ত হয়, তাহলে তার উপর নগদ সম্পদ হিসেবে যাকাত ধার্য হবে। আর এক বছরকাল পর্যন্ত যদি নিসাব পরিমাণ না থাকে কিংবা নিসাব পূর্ণই না হয়, তাহলে তাতে কিছুই ধার্য হবে না।
যাকাত ধার্যর ক্ষেত্রে সংকীর্ণ করে রাখা একটা প্রাচিন মত। আগের কালের লোকেরা এই মত উপস্থাপিত করেছেন। জাহিরী মতের ফকীহ্ ইবনে হাজম এই মতের একজন বড় সংরক্ষক ও প্রবক্তা। শেষের দিকে ইমাম শা ওকানী ও নওয়াব সিদ্দিক হাসান এই মতের পিছনে সমর্থন যুগিয়েছেন। তাঁরা এতদুর যে, ব্যবসায়ের পণ্যেও যাকাত ধার্য হবে না, ফল- ফাঁকর ও শাক সবজিতেও যাকাত নেই।
প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদনের উপায় উপকরণের যাকাত ধার্যকণের প্রতিবাদ করে সবচেয়ে বলিষ্ঠ ও স্পষ্ট কথা বলেছেন। ‘রুদিতু নাদিয়াত’ গ্রন্থগার বলেছেন, সর্বসম্মতভাবে যেসব জিনিসের উপর যাকাত ধার্য হয়, তাছাড়া অন্যান্য জিনিসের উপর যাকাত ধার্যকরণ – ইসলামের প্রাথমিক স্তরে কখনই শানা যায়নি। অথচ সেই যুগটাই ইসলামের সোনালী যুগ এবং সর্বোত্তম সময়। কুরআন ও সুন্নাহ্ থেকে তার পক্ষে কোন দলীল পেশ করা তো সুদূরপরাহত ব্যাপার।
যাকাত ধার্যকরণে উদার দৃষ্টিসম্পন্ন লোকদের বক্তব্য
যাঁরা যাকাত ধার্যকরণে উদার দৃষ্টিসম্পন্ন, তাঁরা বলেন যে, জিনিসগুলোর উপরও যাকাত ধার্য হবে। মালিকী ও হাম্বলী মাযহাবেরও কোন কোন আলিমের এরূপ মত রয়েছে- যদিও তাঁরা খুব পরিচিত নন। আল্লামা আবূ জুহরা, খাল্লাফ ও আবদুর রহমান হাসান প্রমুখ একালের মনীষিগণও তাই মনে করেন। এ গ্রন্থকারও এ মতে বিশ্বাসী এবং সে বিশ্বাস নিম্নলিখিত যুক্তিসমূহের উপর ভিত্তিশীলঃ
১. আল্লাহ্ তা’য়ালা সর্ব প্রকারের মাল সম্পদের উপরই একটা সুপরিজ্ঞাত হক ফরয করেছেন, তা যাকাত হোক বা সাদকা। কুরআনের ঘোষণাঃ ‘লোকদের ধন-মালে সুপরিজ্ঞাত হক রয়েছে’। কুআনের নির্দেশঃ ‘তাদের ধন মাল থেকে সাদকা-যাকাত গ্রহণ কর’। রাসূলে করীম(স) বলেছেনঃ ‘তোমরা তোমাদের ধন মালের যাকাত দাও’। এসব আয়াত ও হাদীসে বিভিন্ন মালের মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য করা হয়নি।
ব্যবসায়- পণ্যে যাকাত হয় না বলে জাহিরী ফিকাহবিদগণ যে মত দিয়েছেন, ইবনুল আরাবী তা রদ্ করেছেন। কেননা সেরূপ কোন সহীহ হাদীস পাওয়া যায়নি। বরং আল্লাহর নির্দেশঃ ‘তাদের ধন-মাল থেকে যাকাত নাও’ সর্বপ্রকারের মালই বুঝিয়েছেন- যদিও সে মাল বিভিন্ন প্রকারের, নামও সে সবের এক নয়। এর মধ্যে থেকে কোন প্রকারের মালকে যদি যাকাতদানের বাধ্যকাধকতা থেকে মুক্ত করতে হয়, হবে তা নিশ্চয়ই অকাট্য দলীলের ভিত্তিতে করতে হবে।
২. মালমাত্রের উপরই যাকাত ফরয হওয়ার কারনটা অতীব যুক্তিসংগত এবং বোধগম্য। আর তা হচ্ছে প্রবৃদ্ধি আইনের কারণ বিশ্লেষণকারী ফিকাহবিদগণও এ কথা বলেছেন। তাঁরা কিয়াসকে পুরাপুরি কাজে লাগিয়েছেন। আর তাঁরা জাতির সমস্ত ফিকাহবিদ্ সমন্বিত পক্ষান্তরে মুষ্টিমেয় জাহিরী মুতাযিলা ও শিয়া ফিকাহবিদরাই শুধু ‍ভিন্ন মত পোষণ করেন। আর এ কারণেই তাঁরা বসবাসের ঘর, ব্যবহার্য কাপড়- পোশাক, হীরা-জহরতের অলংকার, পেশার কাজের যন্ত্রপাতি, ‘জিহাদের ঘোড়ার উপর ইজমা’ করেছেন যাকাত ফরয না হওয়ার। কাজেই উট, গরু ও স্ত্রীলোকদের সাধারণ ব্যবহার্য অলংকারাদির উপর থেকে যাকাত প্রত্যাহার করার কথাটিও নির্ভুল, সহীহ। যেসব মাল স্বভাবতই প্রবৃদ্ধিপ্রবণ নয় বা মানুষের কাজের ফল প্রবৃদ্ধি পায় না, তা-ও এ পর্যায়ে গণ্য।
প্রবৃদ্ধিই যখন যাকাত ফরয হওয়ার কারণ, তখন এতদসংক্রান্ত হুকুম আবর্তিত হবে- কারণ পাওয়া যাওয়া না যাওয়ার মধ্যে, তাই যে মালই প্রবৃদ্ধিপ্রবণ তাতে যাকাত ফরয হবে, নতুবা নয়।
৩. যাকাতের বিধান প্রণয়নে নিহিত লক্ষ্য ও যৌক্তিকত হেচ্ছে মালের মালিকদের মন পবিত্র ও পরিচ্ছন্নকরণ এবং অভাবগ্রস্ত লোকদের প্রতি সহানুভূতি কার্যকরকরণ, আর দ্বীন-ইসলামের সমর্থন সংরক্ষণে আর্থিক সাহায্যদানের ব্যবস্থাকরণ। ইসলামের দাওয়াত প্রচার ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগও তার অন্তর্ভুক্ত। যাকাত ফরয করা মালিকদের নিজেদের নিজেদের কল্যাণে অধিকতর কার্যকর। তারা যাকাত দিয়ে পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধি অর্জন করতে পারে, গরীব-মিসকীনদের সাহায্য করাও এর দ্বারা সম্ভব।
জমির উৎপাদনে ওশর ধার্যকারণের বিবেক-বুদ্ধিসম্মত যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করেছেন ইমাম কাসানী। বলেছেনঃ “গরীবদের মধ্যে ওশর বণ্টনে নিয়ামতের শোকর আদায় নিহিত রয়েছে। যারা অক্ষম, তাদের শক্তিশালী করাও সম্ভব, তাদের নেজেদের ফরয আদায়ে সক্ষম করে তোলাও এভাবেই সম্ভব হতে পারে। গুনাহ ও কার্পন্য থেকে মন ও মানসিকতাকে পবিত্র-পরিশুদ্ধিকরণের এ একটা অধিক কার্যকর উপায়্ আর এর প্রত্রেওকটি কাজই অবশ্য করণীয় , বিবেক-বুদ্ধির দৃষ্টিতে যেমন, শরীয়াতের দৃষ্টিতেও তেমনি। তাহলে নিয়ামতের শোকর, অক্ষমের সাহায্যকরণ মন-মানসিকতা পবিত্র-পরিশুদ্ধিকরণ কি বিবেক ও শরীয়াতের দৃষ্টিতে কেবলমাত্র ফসল ও ফলের মালিকদের জন্যেই প্রয়োজন? আর কারখানা, দালান-কোঠা, নৌকা, লঞ্চ, জাহাজ, উড়োজাহাজের মালিকদের জন্যে তার কোন প্রয়োজনই নেই? …… অথচ তারা এসবের মাধ্যমে জমি, ফসল ও ফলের মালিকদের তুলনায় অনেক-অনেক গুণ বেশী পরিমাণ আয় করে থাকে! আর তাদের কষ্ট বলতেও তেমন কিছু স্বীকার করতে হয় না?
যাকাত ধার্য করার ক্ষেত্রে সংকীর্ণকারীদের মতের প্রতিবাদ
নবী করীম (স) যেসব মাল থেকে যাকাত গ্রহণ করেছেন, কেবল তা থেকেই যাকাত গ্রহণ করা যাবে, তার বাইরে অপর কোন জিনিস থেকে যাকাত নেয়া চলবে না- এ কথার জবাবে আমরা বলতে চাইঃ
কোন বিশেষ মাল থেকে নবী করীম(সা) যাকাত গ্রহণ করেছেন, এর কোন দলীল কর্তমান না থাকাটা এটা প্রমাণ করে না যে, সে মালে যাকাত ফরয নয়। কেননা এ তো জানা কথা যে, নবী করীম(স) সেসব প্রবৃদ্ধিসম্পন্ন মাল থেকে যাকাত গ্রহণ করেছেন, যা তাঁর সময়ে আরব সমাজে প্রচলিত ছিল। যেমন উট, গরু, ছাগল ইত্যাদি জন্তু এবং গম, যব, খেজুর, কিশমিশ ইত্যাদি কৃষি ফল ও ফসল আর নগদ রৌপ্য মুদ্রা। কিন্তু তা সত্ত্বেও মুসলিমগণ অন্যান্য এমন বহু জিনিস থেকেই যাকাত গ্রহণ করেছেন, যে বিষয়ে কোন দলীল আসেনি এবং তা করা হয়েছে ওসব মালের উপর কিয়াস করে, যেসব থেকে নবী করীম(সা) যাকাত গ্রহণ করেছেন; অথবা দলীলের সাধারণ তাৎপর্যকে ভিত্তি করে এবং যাকাত ফরয করার মূলে নিহিতকরণের সামঞ্জস্য বিধানস্বরুপ।
ক. ইমাম শাফেয়ী স্বর্ণের যাকাত পর্যায়ে এ কারণই লিখেছেনঃ নবী করীম(সা) নগদ রৌপ্য মুদ্রার উপর যাকাত ধার্য করেছেন। পরে মুসলিমরা স্বর্ণ থেকেও যাকাত গ্রহণ করেছেন, হয় এমন হাদীসের উপর ভিত্তি করে, যা আমাদের কাছে পৌঁছেনি অথবা এ কথা ‘কিয়াস’ করে যে, স্বর্ণ হচ্ছে সঞ্চয়কারীদের জন্যে নগদ সম্পদ। ক্রয়-বিক্রয়ে তা মূল্য হিসেবে আদান প্রদান করার নিয়মও চালু রয়েঢরছ। ইসলামের পূর্বেও তা এরূপ ছিল এবং ইসলামের যুগেও তা চলমান ছিল।
ইমাম শাফেয়ীর ‘এমন কোন হাদীসের বর্তমান থাকার সম্ভাব্যতা বোধ – যা তাঁর কাছে পৌছেনি’ কথাটির সম্ভাবনা খবই ‍দুর্বল। কেননা এরূপ কোন হাদীস আদৌ থেকে থাকলে তা লোকেরা নিশ্চয়ই পরস্পরের কাছে বর্ণনা করতেন, তার কঠিন প্রয়োজনও দেখা দিয়েছিল। অতএব কিয়াস করাই উত্তম পন্থা। ফিকাহবিদ কাযী আবূ বকর ইবনুল আরাবীও এ কথা দৃঢ়তার সাথে বলেছেন। নবী করীম(সা) রৌপ্য, তার নিসাব ও যাকাতের পরিমাণ স্পষ্ট করে বলেছেন; কিন্তু স্বর্ণের কথা উল্লেখ করেন নি, তার কারণ ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন যে, তখনকার লোকদের ব্যবসা বিশেষ করে রৌপ্যকেন্দ্রিক ছিল- অন্ততঃ বেশীর ভাগ। তাই এ বেশীর ভাগ ব্যবহৃত জিনিসেরই উল্লেখ করা হয়েছে, যেন অবশিষ্ঠ জিনিসগুলোও বোঝা যায়। কেননা তাঁরা সকলেই অধিক বোধসম্পন্ন লোক ছিলেন। পরে হেমইয়ারীরা এসে যখন ছোট-বড় প্রতিটি বিষয়ের দলীল চাইতে শুরু করল, তখন আল্লাহ তাদের সম্মুখে হিদায়েতের দ্বার রুদ্ধ করে দিলেন এবং যারা পূর্বের লোকদের আচরিত নীতি অনুসরণ করে হিদায়াত লাভ করেছিল, তাদের সমষ্টি থেকে বাইরে চলে গেল। এ কথাটি হয়েছে তাদের সম্পর্কে, যারা কিয়াস মেনে নিতে ও ‘কারণের প্রতি লক্ষ্য করতে অস্বীকার করেছেন’।
খ. অনুরূপভাবে ব্যবসায়ের পণ্যের উপর যাকাত ফরয হওয়ার পক্ষে কোন অকাট্য দলীল না থাকা সত্ত্বেও ইবনুল মুনযির বলেছেন, তা ফরয হওয়ার উপর ইমাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং কেবল জাহিরী মাযহাবের লোকেরা ছাড়া আর কেউেই এর বিরোধিতা করেন নি।
গ. হযরত উমর ঘোড়ার যাকাত গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছিলেন তা-ও এ পর্যায়েরই একটি কাজ। কেননা তিনি জানতে পেরেছিলেন যে, এক-একটা ঘোড়ার মূল্য বিপুল পরিমাণ থাকে। ইমাম আবূ হানীফা সে মতই গ্রহণ করেছেন-যদি তা প্রবৃদ্ধি বংশ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে পালন করা হয়।
ঘ. ইমাম আহমদ মধুর উপর পাকাত হওয়ার পক্ষপাতী। কেননা এ বিষয়ে যেমন সাহাবীর উক্তি উদ্ধৃত হয়েছে, তেমনি কৃষি ফসল ও ফলের যাকাতের উপর কিয়াস করলেও তাই করতে হয়। তিনি সর্বপ্রকার খনিজ সম্পদেও যাকাত ফরয মনে করেন স্বর্ণ ও রৌপ্যের উপর কিয়াস করে। তাছাড়া এ পর্যায়ের আয়াত ‘যা কিছু আমরা তোমাদের জন্যে বের করেছি জমি থেকে’-খুবই ব্যাপক ও সাধারণ তাৎপর্যসম্পন্ন।
ঙ. ইমাম জুহরী, হাসান ও আবূ ইউসুফ রিকাজ ও খনিজ সম্পদের উপর কিয়াস করেই বলেছেন, সমুদ্র থেকে পাওয়া মণি-মুক্তা ও আম্বরের উপর যাকাত ধার্য হবে।
চ. মাযহাবগুলো বহু প্রকারের হুকুম-বিধানে যাকাত পর্যায়ে কিয়াসকে গুরুত্ব দিয়েছেন। যেমন শাফেয়ীরা লোকদের বেশীর ভাগ খাধ্যের উপর কিয়াস করেছেন ফিতরার যাকাত সম্পর্কে উদ্ধৃত হাদীসের উপর। যেমস খেজুর, কিশমিশ, যব বা গম্। উল্লিখিত চারটি খাদ্যদ্রব্যের উপর কিয়াস করা চলে, কেননা এগুলো কৃষি ফসল বিধায় এ সম্পর্কে শরীয়াতেরন দলীল উদ্ধৃত হয়েছে।
ছ. সর্বকালের ও সব দেশের ফিকাহবিদগণ থেকে এ কথার সমর্থনে কোন উক্তি বর্ণিত হয়নি’ এই দাবিও ঠিক নয়। কেননা তাঁদের যুগে হয়ত এসব প্রবৃ্দ্ধি-সম্পন্ন মাল সাধারণভাবে ততটা প্রচার ও প্রচলন লাভ করেনি। ফলে ফিকাহবিদকে ইজতিহাদ করে মাসলা বের করতে হচ্ছে। এসবের কোন কোনটি তা সেকালে ছিলই না। এসবই প্রায় একালের নবোদ্ভূত। তা সত্ত্বেও এ সব জিনিসের উপর বা তার ফল ও ফসলের উপর যাকাত ধার্য হওয়ার পক্ষে ফিকাহবিদদের উক্তি পাওয়া গেছে। আমরা তার উল্লেখ পরে করছি।
জ. যন্ত্রপাতি ও হাতিয়ার ইত্যাদিকে যাকাতমুক্তকরণ সংক্রান্ত ফিকাহবিদদের ঘোষণা খু্বই ‍যুক্তিসঙ্গত ও যথার্থ। কিন্তু ফিকাহবিদগণ এসব জিনিসকে যে যাকাত ক্ষেত্রের বাইরে ধরেছেন, আমরা তা থেকে স্বতন্ত্র মত পোষণ করি। কেননা বসতি ঘর ও অর্থাগমের জন্যে নির্মিত দালান-কোঠা এক জিনিস নয়, পেশার কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও হাতিয়ার ইত্যাদি থেকে ভিন্ন হচ্ছে সে সব জিনিস, যা কাজে ব্যবহৃত হয়ে মুনাফা আমদানী করে দেয়। এগুলো আবিস্কৃত হয়ে দুনিয়ায় মানূষের জীবনকে রীতিমত বদলে দিয়েছে। এ কারণে ঐতিহাসিকগণ এগুলোর উদ্ভাবনকে ‘শিল্প বিপ্লব’ নামে অভিহিত করেছেন। সাধারণ চলাচলের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত জন্তু ‍নিশ্চয়ই গাড়ি, বাস, উড়োজাহাজ ও সমুদ্রে চলমান বড় বড় জাহাজের মত নয়। ঘরের সাধারণ ব্যবহার্য সরঞ্জামাদী সেসব বিছানা-ফরাশ থেকে স্বতন্ত্র, যা ভাড়ায় লাগানো হয় এবং তার বিনিময়ে বিপুল অর্থাগম হয়। তাহলে আমাদের বিশেসজ্ঞগণ যখন বলেন যে, তাঁরা যেসব জিনিসের উল্লেখ করেছেন, তার উপর যাকাত ধার্য হবে না, তখন তাঁরা কোন ভুল করেন না। বরং তারা খুব মূক্ষ্মভাবে বিচার-বিবেচনা করে যাকাত ফরয হওয়ার জন্যে শর্ত নির্ধারণ করেছেন। তা হচ্ছে এই যে, তা প্রবৃদ্ধিসম্পন্ন হবে এবং মৌল প্রয়োজনের অতিরিক্ত হবে। এ কারণে ‘হিদায়া’ গ্রন্থকার এ সব জিনিসের উপর যাকাত ধার্য না হওয়ার কারণ দর্শাতে ‍গিয়ে বলেছেনঃ ‘কেননা এগুলো মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের কাজে নিয়োজিত – এগুলো প্রবৃদ্ধিসম্পন্ন নয়’।
‘এনায়া’ গ্রন্থকার আর ও স্পষ্ট করে বলেছেনঃ মৌল প্রয়োজন পূরণে নিয়োজিত থাকা এবয় প্রবৃদ্ধিসম্পন্ন না হওয়া- এ দুটির প্রতিটিই যাকাত ফরয হওয়ার প্রতিবন্ধক অথচ এ দুটিই এখানে একত্রিত হয়েছে। প্রথমত এ জন্যে যে, তা স্বর্ণ ও রৌপ্যের ন্যায় ন্বভাবতই প্রবৃদ্ধিপ্রবণ নয়। এগুলো বিক্রয় করে ব্যবসাও করা হয় না। কিন্তু অন্যান্য সব জিনিসে এ দুটির কোনটিই উপস্থিত নেই।
এ কারণে সব ফিকাহবিদ একমত হয়ে বলেছেন যে, মালিক নিজের বসবাসের জন্যে যে ঘর ব্যবহার করে, তার উপর যাকাত ধার্য হবে না, এ তো ন্যায়বিচারের কথা। ইসলাম এই ন্যায়বিচার নিয়েই দুনিয়ায় অবতীর্ণ হয়েছে। একালের বহু সরকারই জমি জায়গার উপর এক ধরনের কর ধার্য করে, এমনকি বসবাসের স্থানের উপরও তা যত ছোটই হোক না কেন (কিন্তু ইসলামে তা নেই)।
এ কারণেই আমাদের ইসলামী ফিকাহবিদগণ ঘর-বাড়ি, কাপড়-পোশাক, পেশার কাজে নিয়োজিত যন্ত্রপাতি প্রভৃতির উপর যাকাত ধার্য না করার পক্ষপাতী। কেননা তার বিপরীত অর্থে যা প্রবৃদ্ধির জন্যে গ্রীহীত এবং মৌল প্রয়োজন পূরণে ব্যবহৃত নয়, তার উপর যাকাত ধার্য হওয়া বাঞ্ছনীয়।
দ্বিতীয় আলোচনা
দালান-কোঠা ও শিল্প-কারখানার যাকাত কিভাবে দিতে হবে
ইসলাম যে সব প্রবৃদ্ধিসম্পন্ন ধন-মালের উপর যাকাত ফরয করেছে, তা দু’ধরনেরঃ
প্রথমঃ যেসব ধন-মাল, যার মূল বা আসল এবং প্রবৃদ্ধি উভয় থেকে বছরান্তে একসঙ্গে যাকাত গ্রহণ করা হয় অর্থাৎ মূলধন থেকেও এবং তা থেকে পাওয়া মুনাফা থেকেও। যেমন গবাদিপশু ও ব্যবসায় পণ্যের যাকাত। তা করা হয় এজন্যে যে, এখানে মূল এবং তদলব্ধ ফসল সম্পূর্ণ একাকার। এসব ক্ষেত্রে যাকাতের পরিমাণ হয় এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ।
দ্বিতীয়ঃ সেসব ধন-মাল, যার মুনাফা ও আয় থেকেই শুধু যাকাত গ্রহণ করা হয়, মুনাফা বা আয় লাভ হওয়ার সাথে সাথে, এক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার অপেক্ষা না করেই। সেখানে মূলধন স্থিতিশীল হোক- যেমন কৃষি জমি কিংবা অস্থিতিশীল – যেমন, মধুর চাক। এখানে যাকাতের পরিমাণ হচ্ছে ওশর কিংবা অর্ধ-ওশর- ১০%অথবা ২০%।
তা হলে আধুনিককালে নবোদ্ভূত এসব প্রবৃদ্ধিসম্পন্ন ধন-মালের যাকাত গ্রহণের ব্যাপারটি কোন্ ভিত্তিতে মীমাংসা করা হবে? কি হিসাবে যাকাত গ্রহণ করা হবে তা থেকে? …… যাকাত কি কেবল মূলধন ও অবশিষ্ট ফসল থেকেই নেয়া হবে, যেমন হয় ব্যবসা সম্পদে? না তার আয় বা ফসল থেকেই শুধু তা গ্রহণ কারা হবে, – যেমন হয় শস্য, ফল ও মধুতে?
ভাড়া দেয়া ঘর-বাড়ি ইত্যাদি মুনাফা লাভের উপায় থেকে যডাকাত গ্রহণের ব্যাপারে দুটি প্রাচিন মত
ফিকাহর সাথে সম্পর্ক রাখেন কিন্তু তার গভীরে পৌঁছান না, এমন বহু লোকই মনে করেন যে, যেসব ঘর-বাড়ি লোকদের কাছে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে ভাড়া দেয়া হয়, যা প্রতি বছর বা প্রতিমাসে নতুন করে আয় এনে দেয়, তার যাকাত দেয়া সম্পর্কে কোন ফিকাহবিদই দৃঢ়তার সাথে কিছুই বলেন নি। কেননা এভাবে ঘর-বাড়ি ভাড়ায় লাগারোর কোন নিয়ম তখনকার সময় সাধারণভাবে প্রচলিত ছিল না। তাই এ বিষয় একালে লোকদের একটা চূড়ান্ত কথা জানার প্রয়োজন রয়েছে।
এই কারণ প্রদর্শন যুক্তিসংগত। কিন্তু তা সত্ত্বেও ফিকাহবিদদের মধ্যে এমন কিছু লোক রয়েছেন যাঁরা এসব মালের যাকাত দেয়ার কথা বলেছেন। যদিও এ ব্রাপারে তাঁদের দৃষ্টিকোণ ও আচরণ অভিন্ন নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, তাকে ব্যবসায়ে বিনিয়োজিত মূলধনের মত মনে করা হবে এবং প্রতি বছর তার মূল্যায়ন করে তার এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ(২.৫%) যাকাত বাবদ গ্রহণ করা হবে, না তার মূল্য কি হয় তা না দেখে শধু তার আয় ও আমদানী থেকেই যাকাত গ্রহণ করা হবে- যখন তার পরিমাণ নিসাবক পর্যন্ত পৌছবে?
প্রথম দৃষ্টিকোণঃ মূল্যায়ন করে ব্যবসায়ী যাকাত গ্রহণ
এ মত অনুযায়ী অর্থাগমকারী দালান-কোঠা, উড়োজাহাজ এবং পণ্যবাহী নৌকা-জাহাজ-নঞ্চের মালিকদের অবস্থা হচ্ছে ব্যবসা পণ্যের মালিকদের মত। প্রতি বছর দালানের মূল্য থেকে ঐ পরিমাণ বাদ দেয়া হয় তেমনি তা থেকে ২.৫% বাদ দিয়ে- হিসাব করতে হবে।
আহলে সুন্নত ও শিয়া মতের বহু ফিকাহবিদ এ মত পোষণ করেন।
হাম্বলী ফকীহ্ ইবনে আকীলের মত
আহলে সুন্নাতের হাম্বলী ফিকাহবিগ আবুল ওফা ইবনে আকীল উপরিউক্ত মত প্রকাশ করেছেন। তিনি একজন প্রতিভা সম্পন্ন শক্তিশালী চিন্তাবিদ এবং মাসলা বের করতে সম্ষম ফিকাহবিদ্। ইবনুল কাইয়্যেম তাঁর এ মতটি তাঁর ‘بدا ئع الفوائع’ গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন। তিনি ইমাম আহমদ থেকে পাওয়া বর্ণনার ভিত্তিতে ভাড়ায় দেয়া অলঙ্কারর উপর কিয়াস করেই একথা কলেছেন। তাঁর মত হচ্ছে ভাড়ায় লাগানোর জন্যে প্রস্তুত জমি এবং অনুরূপভাবে ব্যবসায়ের জন্যে প্রস্তুত বা ভাড়ায় লাগানো পণ্যেরও যাকাত দিতে হবে।
এ কথা অলংকারের উপর কিয়াস করে বলা হয়েছে। কেননা অলংকার সম্পর্কে আসল কথা হচ্ছে, তার যাকাত দিতে হবে না। কিন্তু তা ভাড়ায় লাগানোর জন্যে তৈরী করা বা রাখা হলে তার উপর যাকাত ধার্য হবে। এ থেকে জানা গেল যে, ‘ভাড়ায় লাগানো’ যাকাত ফরয হওয়ার একটা কারণ। তাই যেসব জিনিসের উপর মৌলিকভাবে যাকাত ফরয নয়; কিন্তু তা যদি ভাড়ায় লাগানো হয়, তাহলে সেই আসল জিনিসের উপর যাকাত ফরয হবে(কেননা তখন তা অর্থাগমের একটা উপায়ে পরিণত হয়ে যায়)।
আরও স্পষ্ট কথা- স্বর্ণ ও রৌপ্য দুটো মৌলিক জিনিস, তার আসলের উপরই যাকাত ফরয। পরে পরিধান, সৌন্দর্য ও ফায়দা লাভের জন্যে কারুকার্য গ্রহণের দরুন তার যাকাত ধার্য হওয়াটা প্রত্যাহুত না হয়ে বরং তার উপর যাকাত ধার্য হবে। তাই যে সব জমি, তৈজসপত্র ও জন্তু-যার আসলের উপর যাকাত হয় না, সে সবের উপর যাকাত ফরয হবে। আমরা বলব, ইমাম আহমদ বলেছেনঃ স্বর্ণ রৌপ্য হালাল অলংকাররূপে ব্যবহৃত হতে শুরু করলে তার উপর যাকাত ধার্য হবে না, তবে ভাড়ায় লাগানোর জন্যে তৈরী করা বা রাখা হলে তা ফরয হবে, -এই মতটি অত্যন্ত শক্তিশালী। তা একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলনীতির উপর ভিত্তিশীল এবং তা হচ্ছে, অপ্রবৃদ্ধিসম্পন্ন বা মৌল প্রয়োজন পূরণে নিয়োজিত মালের উপর যাকাত ধার্য হবে না্, যাকাত ফরয হবে প্রবৃদ্ধিসম্পন্ন মালের উপর, যা মালিককে আয় এবং উপার এনে দেয়।
সৌন্দর্যর জন্যে ব্যবহ্রত জায়েয অলংকার এবং পোশাক অপ্রবৃদ্ধিসম্পন্ন মাল, এসব কেবল মালিকের প্রয়োজন পূরণে নিয়োজিত। কিন্তু তা যখন ভাড়ায় লাগানোর জন্যে প্রস্তুত রাখা হবে তখন তা প্রবৃদ্ধি অর্জনের পরিমণ্ডলে পৌছে যায় এবং যাকাত ধার্য হওয়ার ক্ষেত্র হিসেবেও তা উপযুক্ত হয়ে দাঁড়ায়। ইবনে রুশদের উল্লেখ অনুযায়ী ইমাম মালিকের মতও তাই।
আমরা যদি এই নীতিটি জমি, সরঞ্জামাদি, গাড়ি, নৌকা, জাহাজ নঞ্চ, উড়োজাহাজ ও শিল্পোৎপাদনের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও হাতয়ার উপকরণের উপর প্রয়োগ করি, তাহলে এই সিদ্ধান্তটি স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, তা ব্যক্তিগত ব্যবহারে নিয়োজিত থাকলে তার উপর যাকাত ধার্য হবে না। কিন্তু যখনই তা ভাড়ায় লাগানো হবে এবং তা মুনাফা ও প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যম হবে, তখন তার উপর যাকাত ধার্য হবে। আর এরূপ অবস্থায় তার যাকাত হবে ব্যবসাপণ্যের যাকাতের মত- নির্দিষ্ট নিসাব ও নির্দিষ্ট যাকাত পরিমাণ নিসাব অনুযায়ী।
তার অর্থ, এই দালান-কোঠার বা অটোমোবাইল, উড়োজাহাজ, হোটেল কিংবা বিয়ে-শাদীতে ভাড়ায় দেয়া তাঁবু, কাপড়-পোশাক ইত্যাদি বা পণ্যদ্রব্য- যা ভাড়ায় দেয়া হয় ও ভাড়ায় দেয়া লাগানোর জন্যে প্রস্তুত করা হয়- তা ব্যক্তি মালিকানায় হোক বা গেড়াষ্ঠীগত কোম্পানীর মালিকানায় হোক- এগুলোর মূল্য নির্ধারণ করে অবশিষ্ট নগদ মূলধন ও ফেরত পাওয়া সম্ভব পরিমাণ তার সাথে যোগ করে- যেমন মূলধনের ব্যবসায়ীরা করে থাকে- তার শতকরা ২.৫% ভাগ যাকাত বাবদ দিতে হবে।
এগুলোকে স্থিতিশীল মূলধন বলা যায় না। কেননা তার উপর যাকাত ফরয হয় না, যেমন দোকানের পাত্র- ভাণ্ডার-মরঞ্জামাদীর যাকাত দিকে হয় না। যেহেতু এই স্থিতিশীল দ্রব্যাদি আসলেই প্রবৃদ্ধিশীল মূলধন যা মুনাফা ও উপার্জন টেনে আনে। যা জমি এবং সে সব স্থান, যেখানে কারখানা ও শিল্পোৎপাদনের প্রতিষ্ঠান দাঁড় করা হয়। কেন উপার্জনের লক্ষ্যে নিয়োজিত নয়, কেবল তা-ই যাকাত মুক্ত গণ্য হতে পারে। যেমন না এগুলো সেই লক্ষ্যেই নির্মিত। কিন্তু জমি, দালান-কোঠা, হোটেল, সিনেমা ঘর প্রভৃতি নির্মিতিই হয় আয়-আমদানী বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে।
আমদানী বৃদ্ধির জন্যে নির্মিত ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে ‘হাদুইয়ার’ মত
যায়দীয়া শিয়া মতের হাদুইয়া প্রমূখ ফিকাহবিদ মত প্রকাশ করেছেন যে, অর্থাগম ও প্রবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নির্মিত সমস্ত জিনিসের উপর যাকাত ধার্য হবে। কেননা এগুলো মালিককে বিপুল আয়ের সুযোগ করে দেয়। আর আল্লাহর নির্দেশ ‘ওদের ধন-মাল থেকে যাকাত গ্রহণ কর’ খুবই নির্বিশেষ। আরও এজন্য যে, তা প্রবৃদ্ধি লাভে ব্যবহ্রত হওয়ার উদ্দেশ্যেই নির্মিত। ফলে তা বব্যবসা সম্পদের মত হয়ে গেল। অতএব তার যাকাত দিতে হবে যদি তার মূল্য নিসাব পরিমাণ পর্যন্ত ইযায়।
অতএব যে অলংকার, ঘর, জন্তু-যান ইত্যাদি ভাড়ায় দেয়া হবে, তার নগদ মূল্য যদি নিসাব পরিমাণ পর্যন্ত পৌছে যায় ও বছারের শুরু ও শেষের দিকে তাই থাকে, তাহলে তার উপর ব্যবসায়- যাকাতের ন্যায় যাকাত ফরয হবে।
কেউ যদি একটা ঘোড়া ক্রয় করে এ উদ্দেশ্য নিয়ে যে, তার ফল বা উপাদন(বাচ্চা) যখন তা বিক্রয় করা হবে, তাহলে তার মূ্ল্য ও তার বাচ্চার মূল্যের উপর যাকাত ধার্য হবে। কেননা তা ঠিক ব্যবসায়ের জন্যে খরিদ করা হয়েছে ও বাচ্চা তারই লাভ হয়েছে।
মুয়াইয়্যিদ বিল্লাহ্ বলেনঃ ’রেশম পোকা যদি এ উদ্দেশ্যে ক্রয় করা হয় যে, তার উৎপাদন বিক্রয় করা হবে, তাহলেও অনুরূপভাবে তার যাকাত দিতে হবে।
হুকাইনী বলেছেন, যদি কউ কোন বৃক্ষ ক্রয় করে তার ফল উদ্দেশ্যে কিংবা কেউ গাভী বা ছাগল ক্রয় করে তা থেকে পাওয়া পশম, দুগ্ধ ও মাখন বিক্রয় করার উদ্দেশ্যে, তাহলে তারও যাকাত দিতে হবে। ‍
এ মতের দলীল হিসেবে দুটি বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছেঃ
১. সাধারণভাবে সব মালের উপর যাকাত ধার্যকরণই হল যাকাত ফরযের আয়াতের আসল দৃষ্টিকোণ। তাতে মালের বিভিন্নতার মধ্যে কোন রূপ পার্থক্য নির্দেশ করা হয়নি।
২. অর্থাগমের মাল সম্পর্কে কিয়াস করা হয়েছে ব্যবসায়ের মালের উপর। এই দুই প্রকারের মাল দ্বারা প্রবৃদ্ধি অর্জনই আসল লক্ষ্য।
ভিন্ন মতের উত্থাপিত আপত্তি
বিভিন্ন ফিকাহবিদ উপরিউক্ত মতের উপর আপত্তি তুলেছেন। তাঁরা যাকাত ধার্য হওয়ার ক্ষেত্র সংকীর্ণ রাখার পক্ষপাতী। ইমাম শাওকানী ও তাঁর ব্যাখ্যাতা নওয়াব সিদ্দিক হাসান খান এ পর্যায়ে উল্লেখ্য।
যাঁরা বলেন, শাক-সবজি ও ব্যবসায়ের পণ্যে যাকাত নেই, শাওকানী ও সিদ্দিক হাসান এ মত পোষণ করেন-তাঁরা বলতে পারেন যে, ঘর-বাড়ি ও জন্তু যান যা তার মালিক ভাড়ায় দেয়—তাতেও যাকাত নেই।
এ পর্যায়ে যে দলীল উল্লেখ করা হয়েছে, তার উপর দুাটি সংশয় আরোপিত হয়; একটির সম্পর্ক বর্ণিত হাদীসের সাথে। আর দ্বিতীয়টির সম্পর্ক যুক্তি ও বিবেচনার সাথে।
১. হাদীস হচ্ছে, মুসলিমের গোলাম ও তার ঘোড়ার উপর যাকাত নেই। এখানে যাকাত না হওয়ার কথাটি সাধারণভাবে বলা হয়েছে। ব্যবসসায়ে মুনাফা অর্জন বা কেরায়ায় লাগানো ঘোড়া বা গোলামও তার অন্তর্ভুক্ত মনে হয়।
২. দ্বিতীয় সংশয়টি হচ্ছে, এসব মাল তো সর্বসম্মতভাবে সেই পর্যায়ের, যার উপর যাকাত ধার্য হয় না। তার উপর কি করে যাকাত ফরয করা যেতে পারে? যেমন ঘর-বাড়ি, জমি-জায়গা, যানবাহনরূপে ব্যবহৃত জন্তু ইত্যাদি। তার মূলটা ব্যবসায়ে বিক্রয় করা হয় না, শুধু ভাড়ায় লাগানো হয়। আর শুধু এ কারণে যাকাত ধার্য করার কথা ইসলামের প্রাথমিক যুগে কখনই শোনা যায়নি। সে পর্যায়ে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে কোন দলীলের উল্লেখ তো সুদূরপ্ররাহত।
তখনকার লোকেরা ভাড়ায় গ্রহণ করত, ভাড়ায় লাগাতোও এবং তাদের গর-বাড়ির স্থানের ও যানবাহনরূপে ব্যবহৃত জন্তুর ভড়াও তারা আদায় করত। কিন্তু তাদের কারোর মনেই বছরান্তে তার ঘরের-জমির ও জন্তুর এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ, যাকাত বাবদ দেয়ার কথা জাগেনি। তারা এ পীড়াদায়ক কষ্ট থেকে মুক্ত থাকা অবস্থা নিয়েই জীবন কাটিয়ে গেছে। তৃতীয় হিজরী শতকের শেষকালে কিছু লোক এ যাকাতের কথা কোনরূপ দলীল ছাড়াই বলতে শুরু করেছেন। তাঁদের একমাত্র দলীল ব্যবসায় পণ্যের উপর কিয়াস।
তা সত্ত্বেও এ ‘কিয়াস’টাই কয়েকটি কারনে বিপর্যস্ত; একটি কারণ, আসল ও তার ফল বা শাখার মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। আর মুনাফার ফায়দা নিশ্চয়ই আসলের ফায়দার সমান নয়।
এ সংশয়ের সারকথা হচ্ছে, মানুষসর্বপ্রকারের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত, মানুষের আসল ‘পজিশন’ তাই। আর এসব আমাদানীকারক প্রতিষ্ঠানের উপর যাকাত ফরয হওয়ার কোন প্রত্যক্ষ দলীলও পাওয়া যায়নি। প্রাথমিক কালের কোন একজন লোকও এসবের উপর যাকাত ফরয হওয়ার কথা বলেন নি; কোন আয়াত বা হাদীসের অকাট্য দলীল পাওয়া তো দূরের কথা।
ব্যবসায়ের মালের উপর কিয়াস করে তার যাকাত দেয়া যদি যুক্তিসংগত ধরেও নেয়া যায়, তবু এ ‘কিয়াস’ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পার্থক্যকারী থাকার কারণে। আর তা হচ্ছে, ব্যবসায়ের মাল এবং তার পণ্যদ্রব্যের ‘আসল ও মূলটাই হস্তান্তরিত হয়। কিন্তু এ জিনিসগুলো সেরূপ নয়। এগুলো মালিকের কাছেই থেকে যায়, তার ফায়দাটুকুই শুধু কাজে নেয়া হয়, তার বেশী নয়।
পর্যালোচনা ও অগ্রাধিকার দান
‘মুসলিমের গোলাম বা তা অশ্বের উপর যাকাত নেই’- এ হাদীসটির তাৎপর্য হচ্ছে, এ দুটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করে বলে তার উর যাকাত ধার্য না হওয়ার কথা বলা হয়েছে। গোলাম মনিবের থিদমত করে, আর অশ্বের পৃষ্ঠে সে নিজে সওয়ার হয়, যুদ্ধে গম করে। এ কারণে ফিকাহবিদগণ ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই এ গোলাম ও অশ্বের উপর যাকাত ধার্য না করার পক্ষে মত দিয়ে এসেছেন। তবে তা ব্যবসায়ের জন্যে হলে তা থেকে যাকাত নেয়ার ব্যবস্থা কার্যকর করা হত। ইবনুল মুনযির এর উপর ইজমা হওয়ার দাবি করেছেন। এ হাদীসের বাহ্যিক অর্থও তা-ই; যা তাঁরা বুঝেছেন ও তার উপর ফতোয়াও দিয়েছেন।
এসব জিনিসের যাকাত ধার্য করণ সংক্রান্ত কোন কথা প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের থেকে বর্ণিত না হওয়ার কারণ হচ্ছে, তখন এগুলো ভাড়ায় লাগানো ও তা থেকে অর্থাগম করার কোন রেওয়াজ ছিল না। আর প্রত্যেক যুগের সমস্যা সে যুগের অবস্থার প্রেক্ষিতেই অনুধাবনীয় হয়ে থাকে এবং অনুপাতেই তার সমাধান বের করতে হবে। বর্ণনাকারিগণও ঠিক তা-ই বর্ণনা করেন পরবর্তী লোকদের কাছে। এসব অর্থাগমকারী দ্রব্যাদি নিয়ে সেকালে কোন সমস্যাই দেখা দেয়নি। কথা হচ্ছে, হাদী’র মত ইজমা’র পরিপন্থী নয়। কেননা সাহাবী ও তাবেঈনগণ হয় এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছেন এবং তাতে বিভিন্ন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। তাহলে তা একটা বিরোধীয় বিষয়। অথবা তাঁরা এ বিষয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধান চালিয়ে ঐকমত্যে উপনীত হয়েছেন। কিন্তু কেউ তা পরবর্তী লোকদের কাছে বর্ণনা করেন নি। কিংবা তাঁরা এ বিষয়ে আদৌ চিন্তা- বিবেচনাও করেন নি। অবস্থা যা-ই হোক, নির্ভুল চিন্তা- বিবেচনার ভিত্তিতে এ বিষয়ে শরীয়াতের সিদ্ধান্ত জানতে চেষ্টা(ইস্তেম্বাত) করা নিশ্চয়ই কোন দূষণীয় কাজ নয়।
এসব অর্থাগমকারী প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসায়ের পণ্যের উপর ‘কিয়াস’ করার একটা যৌক্তিকতা বিবেচিত হতে পারে প্রথম দৃষ্টিকোণ থেকে। কেননা সব পণ্যদ্রব্য ও অর্থাগমের জিনিসপত্র মূলধন বিশেষ, প্রবৃদ্ধিসম্পন্ন এবং ফল উৎপাদনকারী। আর উভয়ের মালিক ব্যবসায়ী; সে তার মূলধনের ফল পায়, মুনাফা অর্জন করে। আর ব্যবসা পণ্যের মালিক নে আসল জিনিসটি তার মালিকানা থেকে বের করে হস্তান্তরিত করেই উপকার লাভ করে। পক্ষান্তরে দালান-ইমারত ও কারখানা শুধু মুনাফা দিয়েই মালিককে ধন্য করে, মূল জিনিসটা তার হাতেই থেকে যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও এটা এমন পার্থক্য নয়, যার দরুন এর একটির উপর যাকাত ফরয মনে করা হবে ও অপরটিকে নিস্কৃতি দেয়া হবে।
বরঞ্চ বলতে হবে, আসল জিনিস মালিকানায় অবশিষ্ট রেখে তার আয়-অর্থগম থেকে উপকৃত হওয়া অধিক পরিমাণ মুনাফা লাভের কারণ হয়। ক্ষয়-ক্ষতি থেকেও মুক্ত থাকে অন্য-ব্যবসায়ীর তুলনায় অনেক বেশী।
এ হল প্রথমবারের কথা। কিন্তু গভীর ও সূক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বিবেচনা করা হলে দুই ধরনের জিনিসের ও তাদের মালিকদের মধ্যে আরও পার্থক্য স্পষ্ট ও প্রকট হয়ে উঠবে। এখানে কয়েকটি দিক তুলে ধরা হচ্ছেঃ
প্রথমঃ ব্যবসা পণ্যের অধিক সত্য ও যথার্থ সংজ্ঞা হচ্ছে, সে সব জিনিস যা মুনাফা লাভের আশায় প্রস্তুত করা হবে, তা-ই পণ্য বলে বিবেচত হবে। সামুরাতা বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, ’নবী করীম(সা) সে সব জিনিস থেকে যাকাত বের করার নির্দেশ দিতেন, যা লোকেরা বিক্রয়ার্থে প্রস্তুত করতেন।
ব্যবসায়ের যাকাত পর্যায়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
আর এসব ইমারত ও কারখানা এবং অনুরূপ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান কিন্তু বিক্রয় করার উদ্দেশ্য প্রস্তুত করা হয় না। বরং মালিকরা তা প্রস্তুত করে অর্ধাগমের উদ্দেশ্যে। এই কথাটির প্রয়োগ হয় ব্যবসায়ের উপর; সেসব শরীকদারের উপরও, যারা বড় বড় ইমারত ক্রয় করে বা নির্মাণ করে সেটি বিক্রয় করে মুনাফা পাওয়ার উদ্দেশ্যে। অতএব এই কাজ যে ঠিক ব্যবসা এবং এই ইমারতও ব্যবসায়ের পণ্য, তাতে কোন মতবিরোধ থাকতে পারে না।
দ্বিতীয়ঃ যেসব মালিক তাদের মূলধন অর্থাগমের কাজে নিয়োজিত করে, তার প্রবৃদ্ধি কামনা করে, তাদের যদি ব্যবসায়ী মনে করা হয়- যদিও তাদের মূলধন আবর্তিত হয় না এবং তা বিক্রয় করার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করাও হয় না – তাহলে যেসব জমি ফসল দেয় এবং যেসব গাছ ফল দেয়, সেসবের মালিকও ব্যবসায়ী গণ্য হবে এবং প্রতিবছর তাদের এই জমি ও গাছের বা বাগানের মূল্যায়ন করে তার ২.৫% হারে যাকাত দিতে হবে।
তৃতীয়ঃ এ সব অর্থাগমের প্রতিষ্ঠান অনেক সময় কোন না কোন কারণে অকেজো হয়ে যায়, তার অর্থাগম স্তব্ধ হয়ে যায়। দালানের মালিক ভাড়াটে পায় না, কারখানার মালিক জরুরী সামগ্রী পায় না বা কাজের লোক পায় না, কিংবা মুনাফাদানকারী বাজার পায় না। তখন ওসবের যাকাত কে দেবে? আর কেমন করেই বা দেয়া হবে?
কিন্তু চলমান ব্যবসায়ী পণ্যের মালিক তো তা বিক্রয় করে তার মূল্য থেকে যাকাত আদায় করতে পারে। প্রয়োজন হলে তার মূল্যের উপর থেকে যাকাত প্রত্যাহার করাও সম্ভব। বাড়ির বা কারখানার মালিকের যদি অন্র কোন মাল বা নগদ সম্পদ না থাকে, তাহলে তা বা তার কোন অংশ বিক্রয় না করে দিলে সে যাকাত দিতে সক্ষমই হতে পারে না। কিন্তু তা যে কত কঠিন ব্যাপার, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অথচ আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের জন্যে কঠিন নয়। সহজতর ব্যবস্থাই চান।
এ থেকে যে জিনিসের মূল ফায়দা দেয় এবং যে জিনিসের ফল বা ফসল থেকে ফয়দা পাওয়া যায়-প্রথমটির দৃষ্টান্ত ব্যবসা পণ্যদ্রব্য আর দ্বিতীয়টির দৃষ্টান্ত জমি জায়গা- এ দুইয়ের মধ্যকার পার্থক্যের মূল্য স্পষ্ট হয় ওঠে।
চতুর্থঃ বাস্তব পরিণতির দিক দিয়ে উক্ত মতের অবস্থা আরও মর্মান্তিক হয়। কেননা ইমারত বা কারখানাইত্যাদি প্রতি বছরই মূল্যায়ন ও যাকত পরিমান নির্ধারণের মখাপেক্ষী হবে। বছর অতিবাহিত হওয়ার পর তাঁর মূল্য কি দাঁড়ালো, তা জানবার জণ্যে এটা অপরিহার্য হয়ে পড়বে। কেননা কালের পরিক্রমায় তার যোগ্যতার ঘাটতি অনিবার্য আর তার মূল্য হ্রাস প্রাপ্ত হবে। যেমন অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক বহু কারণেই দ্রব্যমূল্য পরিবর্তিত হয়ে থাকে। মূল্যায়নে তার প্রভাবও হয় অত্যন্ত প্রকট। আর প্রতি বছর অন্তর এই জিনিসগুলোর সঠিক মূল্য নির্ধারণ অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।
এ কারনে আমরা মনে করি, ইমারত ও কারখানার আমদানীর উপর যাকাত ধার্যড হওয়া বাঞ্চনীয়। অন্য ‍দুটি মত এই দৃষ্টিকোণ গড়ে উঠেছে যদিও আমদানী থেকে কি হারে যাকাত নেয়া হবে তার নির্ধারণে সে মত দুটি পরস্পর বিপরীত। ‘ওশর’ হবে, না অর্ধ-ওশর এ নিয়ে এ পার্থক্য- যেমন জমির ফসল ও ফলের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে; অথবা নেয়া হবে এক দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ- যেমন ব্যবসায়ের যাকাত নেয়া হয়?
দ্বিতীয় দৃষ্টিকোণঃ আমদানী হাতে আসার পর নগদ সম্পদের মতই তার যাকাত দিতে হবে
ফিকাহর গ্রন্থাদিতে দ্বিতীয় যে মতটি পাওয়া যায়, তা এসব আমদানীকারী প্রতিষ্ঠানের উপর ভিন্নতর দৃষ্টি দেয়। তা হচ্ছে, প্রতি বছর তার মূল্য থেকে যাকাত নেয়া হবে না, বরং তার আয় ও আমদানী থেকেই যাকাত নেয়া হবে।
ইমাম আহমদের মত
ইমাম আহমদের এ মত বর্ণিত হয়েছে; যে ব্যক্তি তার ঘর ভাড়ায় দিল ও তার ভড়া নিয়ে নিল, সে তার যাকাত দেবে যখন তা থেকে সে ফায়দা পাবে।
মালিকী মতের কথা
মালিকী মাযহাবের কিতাবে বলা হয়েছে, যে সব জিনিসের ফল বা আমদানী পাওয়ার জন্যে নির্মিত হবে যেমন ঘর-বাড়ি ভাড়ায় দেয়ার জন্যে নির্মাণ করা হল, ছাগল রাখা হল পশম পাওয়ার উদ্দেশ্যে, বাগান বানানো হল ফল পাওয়ার জন্যে, এ সবের যাকাতের ব্যাপারে মতপার্থক্য রয়েছে। এ মতপার্থক্য দুটির ক্ষেত্রেঃ
প্রথমঃ সে আসল জিনিসটি বিক্রয় হলে তার মূল্যে।
দ্বিতীয়ঃ তার ফলে, যখন তা ব্যবহার করা হবে।
প্রথম ক্ষেত্রে প্রসিসদ্ধ কথা হচ্ছে, তার এক বছর পূর্বেকার মূল্য ধরবে, যেমন ব্যক্তিগত মালামাল বিক্রয় করা হলে তাই করা হয়।
আর দ্বিতীয় কথা, তাকে মজুদকারী ব্যবসায়ীর পণ্য কনে করতে হবে। মালিকী মাযহাবে সে বিক্রয়ের সিদ্ধান্ত সর্বজনবিদিত। অর্থাৎ তাৎক্ষণিকভাবে যাক বিক্রয় করা হবে, তার যাকাত দিতে হবে যদি সে পণ্য তার হাতে এক বছর বা ততোধিক কাল আটক হয়ে থেকে থাকে।
আলোচ্য সব জিনিসে আমদানী ও ফায়দার ক্ষেত্রে এ দুটো কথা কর্যকর হয়।
আমার মতে, দ্বিতীয় কথাটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এসব আমদানী দানকারী জিনিসের আমদানীর মত যখনই হস্তগত হবে, তখনই তার যাকাত দিতে হবে।
সাহাবী, তাবেয়ীন ও তৎপরবর্তী লোকদের মত
যারাই ফায়দা দানকারী মালের মালিকানা লাভের সময় যাকাত দিয়ে দেয়ার কথা বলেন এবং একটি বছর অতিবাহিত হওয়ার শর্ত আরোপ করেন, তাঁরাই বলেন যে, আমদানী দানকারী ইমারত, দালান-কোঠার আয়, কারখানার উৎপাদন এবং গাড়ি, উড়োজাহাজ, সাজ-সরঞ্জাম ও বিছানা-পত্রাদির ভড়া পাওয়া মাত্র যাকাত দিয়ে দিতে হবে।
ফায়দা দানকারী মাল সম্পর্কে আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে আলোচনা করব। ইবনে আব্বাস, ইবনে মাসউদ, মুআবিয়া, নাসের, বাকের, ও দাউদের এই মত। উমর ইবনে আবদুল আযীয, হাসান বসরী, জুহরী, মকহুল ও আওযায়ীও এ মতই প্রকাশ করেছেন। এঁদের সকলেরই দলীল হচ্ছে, যাকাত আদায় সংক্রান্ত হাদীসের সাধারণ ও নির্বিশেষ ঘোষণাঃ নগদ সম্পদের যাকাত এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ।
কেউ কেউ ভড়ায় দেয়ার জন্যে প্রস্তুত মাল আমদানীর জন্যে বানানো মালকে বিক্রয়ার্থে প্রস্তুত মালের উপর ‘কিয়াস’ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, ‘এ এক শক্তিশালী কিয়াস’। কেননা মুনাফা বিক্রি করা মূল জিনিস বিক্রয় করার সমান। কেউ যখন কোন জিনিস ভাড়া দেয়, তখন সে যেন তা বিক্রয় করে দেয়। তবে কিয়াসের দাবি হচ্ছে, ভাড়ার আমদানীকেই নিসাব ধরতে হবে। যদি তার বার্ষিক আয় দু’শ দিরহাম হয়, তাহলে তার এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ দিতে হবে। আর এর কম হলে কিছুই দিতে হবে না।
প্রথম মতটি কার্যকর হলে আসল মূলধন থেকেই যাকাত গ্রহণ করা হবে। কেননা মত অনুযায়ী যাকাত তো আয় ও আমদানী থেকে নেয়ার কথা ২.৫% হারে। তার জন্যে একটি বছর অতিক্রান্ত হওয়ার কোন শর্তই নেই।
এ কালের আলিমদের মতঃ আয়ের যাকাত শস্য ও ফলের যাকাতের মত
আধুনিককালে এ বিয়য়ে অপর একটি মত উপস্থাপিত হয়েছে। এসব জিনিসের আয়ের যাকাত গ্রহণে তা উপরিউক্ত দ্বিতীয় মতের সাথে সংগতিসম্পন্ন। কিন্তু গ্রহণীয় পরিমাণের ব্যাপারে তা বিপরীত। কেননা এ মতে ফরয পরিমাণ হচ্ছে ওশর কিংবা অর্ধ-ওশর। কৃষি জমির ফসলে ধার্যকৃত ফরয পরিমাণকে সম্মুখে রেখে তা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রথমোক্ত মতে এসব জিনিসকে ব্যবসা পণ্যের উপর কিয়াস করা হয়েছে, এ মতটি একে কিয়াস করেছে কৃষি জমির উপর। আর আয়-আমদানীকে কৃষি ফসল ও ফল সমতুল্য মনে করা হয়েছে। কেননা যে মালিক তার চাষকৃত জমির ফসল পায়, আর অপর যে মালিক তার কারখানা, দালান-কোঠা ইত্যাদির আয় লাভ করে- এ দুই মালিকের মধ্যে কৌলিক কোন পার্থক্য নেই।
ইমারত, দালান-কোঠা ও শিল্প-কারখানাকে কৃষি জমি মনে করার এ মতটি একালের ফিকাহবিদগণ উপস্থাপিত করেছেন। তাঁরা ফিকাহবিদগণ উপস্থাপিত করেছেন। আবূ জুহরা, আবদুল ওহাব খাল্লাফ ও আবদুর রহমান হাসান প্রমুখ অর্থনীতিবিদ ১৯৫২ সালে দামেশকে অনুষ্ঠিত যাকাত সংক্রান্ত এক নেমিনারে এ মত প্রকাশ করেছেন।
তাঁরা ফিকাহবিদদের উদ্ধৃত দিয়ে ধন মালকে তিন পর্যায়ে বিভক্ত করেছেনঃ
১. যে সব মাল ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণ করার জন্যে সংগ্রহ করা হয়, যেমন বসবাসের ঘর, মালিকের খাদ্য ও প্রয়োজন পূরণের জন্যে সংগৃহীত ও সঞ্চীত খাদ্য ইত্যাদি। এসব সম্পদ বা দ্রব্যসামগ্রীর উপর যাকাত ধার্য হয় না।
২. মুনাফা অর্জনের আশায় ব্যবহারের জন্যে যেসব মালমাত্রা সংগ্রহ করা হয়, অথরা যেসব মালের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তা দিয়ে অর্থাগম করা যায় কিন্তু ভান্ডারে বা গুদামে তা বন্ধ করে বাখা হয়। সব ফিকাহবিদের সর্বসম্মত মতে এসবের উপর যাকাত ফরয হবে। রাসূলে করীম(স) এ ধরনের মালের উপর যাকাত ধার্য ও গ্রহণ করেছেন। তা হচ্ছে সেই আসল মাল, যার উপর অন্য মাল কিয়াস করা চলে।
৩. যে সব মাল প্রবৃদ্ধি লাভ ও ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণের মধ্যে আবর্তিত হয়, যেমন অলংকার, জন্তু-জানোয়ার- যা নিজের কাজের জন্যে এবং সময় সময় প্রবৃদ্ধি লাভের জন্যে রাখা হয় – এ সবের উপর যাকাত ফরয হওয়া না হওয়া নিয়ে ফিকাহবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। পরে তাঁরা বলেছেন, এ বিভক্তিকে এ কালে প্রয়োগ করা হলে আমরা নিশ্চিতরূপে এমন সব মালকে- যা একালেকার্যত প্রবৃদ্ধিপ্রবণ যাকাতের মালে মধ্যে গণ্য করে বসর, যা ফিকাহ রচনাকালে প্রবৃদ্ধি ও আয় – আমদানীর কাজে ব্যবহৃত হওয়ার ব্যাপারটি প্রচলিত ছিল না। তাঁরা এ পর্যায়ের দু ধরনের মালের উল্লেখ করেছেনঃ
প্রথম, শিল্পের পাত্র-ভান্ডার-হাতিয়ার, কল-কবজা ইত্যাদি, যা আয় বা লাভের জন্যে মূলধনরূপে গন্য হয়। আসলে তা আয় লাভের মাধ্যম। যেমন বড় কারখানার মালিক কারখানা পরিচালনার জন্যে কর্মচারী নিয়োগ করা হবে। আয় বৃদ্ধির জন্যে নিয়োজিত তার মূলধন হিসেবে যেসব শৈল্পিক পাত্রাদি ব্যবহৃত হয়; এ হিসেবে তা প্রবৃদ্ধিশীল বলে গণ্য হবে। কেননা তার আয় এসব যন্ত্র পাতি ও পত্রাদি থেকেই আসে। তাই লৌহকার নিজ হাতে যেসব হাতিয়ার দিয়ে কাজ করে তা গণ্য হবে না, কাঠমিস্ত্রি যেসব হাতিয়ার দিয়ে নিজ হাতে কাজ করে, তাও গণ্য হবে না। এজন্যে তাঁরা বলেছেন, প্রবৃদ্ধি সম্পন্ন মাল গণ্য করা হলে এ সব হাতিয়ারের উপর যাকাত ধার্য হতে পারে। ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণ পর্যায়ে তা গণ্য হয়।
ফিকাহবিদগণ তাঁদের সময়ে এসব শৈল্পিক যন্ত্র ও পাত্রাদির উপর যাকাত ফরয হয় বলে মনে করেন নি এ জন্যে যে, সেগুলো ছিল প্রাথমিক পর্যায়ের হাতিয়ার, তা তার শৈল্পিকতার জন্যে মৌল প্রয়োজনে সীমালংঘন করে না। কাজেই তা উৎপাদন দানকারী ও প্রবৃদ্ধিসম্পন্ন মালরূপে গণ্য হবে না। তাতে উৎপাদন হয় কর্মীর নিজের পরিশ্রমের জন্যে।
কিন্তু এক্ষণে অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। কেননা এক্ষণে শিল্প- কারখানা তার শৈল্পিক পাত্র-হাতিয়ার আদি তারই প্রবৃদ্ধিসম্পন্ন মূলধনরূপে গণ্য। এ কারণে আমরা বলব, যেসব শৈল্পিক হাতিয়ার পাত্রের মালিক বা শিল্পপতি নিজে তা দিয়ে কাজ করে- যেমন নাপিতের নিজের হাতে কাজ করার অস্ত্র বা যন্ত্রপাতি, সেগুলোর উপর যাকাত ধার্য হবে না। কেননা সেগুলো মৌল প্রয়োজন পূরণকারী জিনিসরূপে গণ্য। কিন্তু শিল্প- কারখানার উপর যাকাত ধার্য হবে। তাতে ফিকাহবিদদের কথার বৈপরীত্য হবে এমন কথা বলা যাবে না। কেননা তাঁরা এ বিষয়ে কোন মতই দেন নি, তার কারণ, তাঁরা এগুলো আদৌ দেখেন নি। যদি তাঁরা এগুলো দেখতে পেতেন, তাহলে তাঁরাও এসব ব্যাপারে ঠিক সে সিদ্ধান্তই পৌছতেন, যে সিদ্ধান্তে আমরা উপনীত হয়েছি। কেননা আমরা তো আসলে তাদের কাছ থেকে পাওয়া কথার উপর ভিত্তি করেই কথা বলছি।
দ্বিতীয়ঃ আয়-লাভের উদ্দেশ্যে নির্মিত দালান-কোঠা-যা ব্যক্তিগত বসবাসের জন্যে নির্মিত নয়। আমরা তাকে প্রবৃদ্ধিসম্পন্ন মাল মনে করি। সেগুলোকে মৌল প্রয়োজন পূরণকারী মাল মনে করি না। এ কারণে ঘর-বাড়ি আমরা দুই ভাগে বিভক্ত করিঃ এক- যা মালিকের বসবাসের জন্যে নির্মিত ও নিয়োজিত। এ পর্যায়ের ঘর-বাড়ির কোন যাকাত দিতে হবে না।
দুই- যা অর্থাগমের কাজে লাগানোর জন্যে নির্মিত। তার উপর যাকাত ফরয হবে বলে আমরা মনে করি। এ মতহ গ্রহণে আমরা ফিকাহবিদদের বিরোধিতা করছি না; যদিও তাঁরা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, ঘর-বাড়ির উপর যাকাত হয় না। কেননা তাঁদের কালের ঘর-বাড়ি কখনও অর্থাগমের উদ্দেশ্যে নির্মিত ও ‍নিয়োজিত হত না … হলেও তা ছিল খুবই সামান্য নগণ্য। তখন ঘর-বাড়ি নির্মিত হত ব্যক্তির প্রয়োজন পূরণার্থে।
মীমাংসাকারী কমিটি
সমাজকে কেবলমাত্র পুরুষ লোকদেরকে বিবাদাগ্নি নির্বাপনের কজে নিযুক্ত করতে বলা হয়েছে। সেই সাথে গাড়ি ও পানি ‘শোষ পাইপ’ ইত্যাদি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও সঙ্গে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। অনুরূপভাবে মানূষের পরস্পরের মধ্যে মীমাংসা কার্য সম্পাদনের জন্যে নানা কমিটি গঠন করতে হবে প্রতিটি দিকে ও গ্রামে। যে কোন বিবাদের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা সেসব কমিটিকে দিতে হবে। সেই কমিটিগুলোর জন্যে সকল উপায় প্রয়োগে কাজ করার সুযোগও থাকতে হবে।
অর্থনৈতিক দায়-দায়িত্ব
অস্বীকার করার উপায় নেই, লোকদের পারস্পরিক বিবাদ নিরস ও মীমাংসা বাস্তবায়নে একটা দায়দায়িত্ব থাকে এবং বিশেষভাবে তা হচ্ছে অর্থনৈতিক দায়দায়িত্ব। কেননা এ বিবাদের কারণ ‘দিয়েত’ বা ‘রক্তমূল্য’ হতে পারে অথবা দুই পক্ষের মধ্যে এক পক্ষের বা উভয় পক্ষের ওপর ধার্য জরিমানাও হতে পারে, সে জরিমানা দিতে এক পক্ষ সক্ষম হচ্ছে না কিংবা তা দেয়ার যৌক্তিকতা সে স্বীকার করে না; কিন্তু অপর পক্ষ তা ছেড়ে দিতে মোটেই রাজী নয়। আর শক্তি প্রয়োগ করা হলে মীমাংসা সৃষ্টির কি উপায় হতে পারে তখন? এ অর্থনৈতিক দায়দায়িত্বটা কার মাথায় চাপানো যায়?
সমাধান অতীব সহজ এবং এ সহজলভ্য সমাধান আমাদেরকে যাকাতই দিচ্ছে। যাকাতের অন্যতম ব্যয়খাত হচ্ছে ‘আল গারেমীন’- ঋণগ্রস্ত লোকগণ। ‘যাকাত ব্যয়ের খাত’ আলোচনায় আমরা বলে এসেছি এ ঋণগ্রস্ত লোকদের মধ্যে সে সব বড় বড় হুদয়ওয়ালা লোকও গণ্য- ইসলামী সমাজ যাদের পরিচিতি উপস্থাপিত করেছে। তাদের এক একজন দুটো পরিবার বা দুটো গোত্রের মধ্যকার বিবাদ মীমাংসার জন্যে অগ্রসর হত এবং মীমাংসা বাস্তবায়ীত করার জন্যে ‘দিয়েত’ বা জরিমানাটা নিজের মাল থেকে দিয়ে দিতে বাধ্য হত- বিবাদের আগুন নিভানোর এবং শান্তি ও স্বস্তি কায়েমের উদ্দেশ্যে। এসব লোককে সাহায্য দেয়ার জন্যে যাকাতের এ খাতটি নির্ধারিত হয়েছে। এটা ইসলামের এক অন্যন্য অবদান।
কুবাইচাতা ইবনুল মাথারিক আল-হিলালী(রা) যিনি এমনি এক মীমাংসার কাজে গিয়ে একটা বড় বোঝা মাথায় তুলে নিয়েছিলেন- পরে তিনি রাসূলে করীম (স) এর কাছে উপস্থিত হয়ে এ ব্যাপারে সাহায্য প্রার্থনা করতে কোন দ্বিধাবোধ করেন নি। নবী করীম (স) তখন তাঁকে বলেছিলেনঃ অপেক্ষা কর যাকাতের মাল আসুক , তখন তা থেকে আমরা তোমাকে দিতে বলব। পরে তিনি তাকে বললেনঃ যে ব্যক্তিই এরূপ কোন ঋণের কোঝা নিজের মাথায গ্রহণ করবে, তার পক্ষে ‘চাওয়া’ হালাল। যেন সে তা পায় এবং পরে সে সতর্ক হয়। (আহমাদ ও মুসলিম এ হাদীস উদ্ধৃত করেছেন)।
ইসলামের অবদানের একটা উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে- ফিকাহবিদগণ দৃঢ়তার সাথে বলেছেন- পারস্পারিক বিবাদ মীমাংসা করতে গিয়ে যে লোক ঋণগ্রস্ত হবে, যাকাত থেকে তাকে দিতে হবে- যদিও সেই মীমাংসার ব্যাপারটি ইহুয়াদী খৃষ্টান যিম্মীদের মধ্যকারই হোক-না-কেন। [مطانب اولي النهي ج2ض143]
কেননা ইসলামী সমাজ পরিধির মধ্যে যারা বাস করে, তাদের সকলের মধ্যে শান্তি ও চুক্তি- সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত করাই ইসলারে লক্ষ্যসমূহের মধ্যে অতীব মৌলিক লক্ষ্য।

About শিবির অনলাইন লাইব্রেরী