ইসলামের যাকাত বিধান – ১ম খন্ড

একটি ফিকহী প্রশ্ন
কিন্তু সেজন্যে কি এক সর্বপ্রথম নিজের মাল থেকে সন্ধি- সমঝোতার জরিমানা দিয়ে দিতে হবে, পরে সে যা দিয়েছে তা যাকাতের মাল থেকে তাকে দিয়ে দিতে হবে, যেন প্রকৃতপক্ষে ঋণগ্রস্ত হওয়া ব্যক্তিকে যাকাত থেকে বোঝা যায় যে, হ্যাঁ, এ শর্তটি কক্ষা করা আবশ্যক। তাহলেই যাকাত সংক্রান্ত আয়াতের আক্ষরিক মর্যাদা রক্ষিত হতে পারে।[غاية المنتهي গ্রন্থ এবং তার শরাহ্ গ্রন্থে বলা হয়েছেঃ ষষ্ঠ হচ্ছে সেই ঋণী যে পারস্পারিক বিবাদ মীমাংসা করতে ‍গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়েছে, সে ধনী হলেও, নে যদি নিজের মাল থেকে তা না দিয়ে থাকে। কেননা নিজের মাল থেকে দিয়ে থাকলে তো সে ঋণগ্রস্ত হ’ল না। যদি সে ঋণ নিয়ে তা দিয়ে থাকে তাহলে তা পূরণের জন্যে সে যাকাত থেকে নিতে পারে। কেননা ঋণ তো রয়ে গেছে- المصدر السبق ج]
কিন্তু আয়াতটির ভাবধারা এবং যাকাতের এ অংশটি রেখে বিধানদাতা যে লক্ষ্য পেতে চান, তা হচ্ছে, সালিশী কমিটিকে তা দিয়ে দিতে নিষেধ করা যাবে না, যেন সে দায়ীত্ব পালন করতে গিয়ে পাওনাদারকে তার প্রাপ্য দিয়ে দিতে পারে। অবশ্য যখন কোন কমিটির দায়িত্বে এ কাজটি হবে, সমাজ তার রায়কে গুরুত্ব দেবে। কেননা সমাজই এ কমিটি গঠন করেছে এবং তাতে রাজী হয়েছে। আর যদি কুরআনে প্রস্তাবিত রূপটা সংরক্ষণ করাই অপরিহার্য হয়, তহলে কমিটির একজন সদস্যকে তা কোন লোকের বা কোন সংস্থার কাছ থেকে করজ নিয়ে দিয়ে দেবার জন্যে দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। পরে যাকাতের এ ঋণগ্রস্তের জন্যে নির্দিষ্ট অংশই হচ্ছে ‘ সন্ধি সমঝোতর পাণ্ড’
তবে এ ব্যাপারের গুরুত্ব অস্বীকার করা উচিত নয় যে, প্রথম প্রকার সামাজের হুদয় – কন্দর থেকে যাক ফুটে ওঠেছে- যে দয়াপরবশ হয়ে মীমাংসার উদ্দেশ্যে নিজের কাছ থেকে ব্যয় করেছে, তা ফেরত পাওয়ার কোন নিশ্চয়তা ছাড়াই, নৈতিকতার মানদণ্ডে এ পথম পন্থাটি মূলত লক্ষ্যভূত। ইসলামের নির্ধারণে তা খুব বেশী গুরুত্ব পাবে। ‘ জাতীয় আধ্যাত্মিক মূল্যেমানের সাথে যাকাতের সম্পর্ক’ পর্যায়ে আমরা এ বিষয়ে স্পষ্ট ও বিস্তারিত কথা বলেছি।
অতএব এ সিদ্ধান্তের পূর্বে এমন একটা মৌলের প্রয়োজন যার উপর কিয়াস করা যেতে পারে। আর তা হচ্ছে কৃষি জমির ভাড়ায় যাকাত যখন মালিক তা হস্তগত করে ও তার মালিক হয়। পূর্বে আমরা এ বিষয়ে বলেছি এবং দলীলের ভিত্তিতে এ মতটিকে অগ্রাধিার দিয়েছি। এ মৌল ব্যতীত উপরউক্ত ‘কিয়াস’ সহীহ্ বলে মেনে নেয়া যায় না।
তৃতীয় কৃষি জমির উপর দালান-কোঠার ‘কিয়াস’ করা এ দুটির মধ্যে পার্থক্যকারীর উপস্থিতির দরুন ক্ষুণ্ন হতে পারে। তা এভাবে যে, কৃষি জমি স্থায়ী আমদানীর উৎস। তাতে কোন স্থবিরতা দেখা দেবে না। পুরাতন হয়ে যাওয়ারও কোন আশংকা নেই এবং কালের অগ্রগতিতে তা নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকেনা। কিন্তু দালান-কোঠার অবস্থা ভিন্নতর। তা কয়েক বছরের নির্দিষ্ট মেয়াদের অর্থাগমের উৎস হতে পারে। তা কমও হয়, বেশীও হয়, শেষে চূড়ান্ত সমাপ্তিও ঘটে। তাহলে আসল ও শাখার মধ্যকার এ পার্থক্যর দরুন তার উপর কিয়াস করা হবে। مقيس ومقيس عليه এ দুইয়ের মাঝে পূর্ণ-মাত্রায় সাদৃশ্য থাকা একান্তউ বাঞ্চনীয়, অন্যথায় তা হবে সাদৃশ্যহীনের উপর কিয়াস। আর তা গ্রহণযোগ্য নয়।
এই আপত্তি থেকে কথাটি জানা যায়, যা উপরিউক্ত কিয়াসকে সহীহ্ করে, তা হচ্ছে ভোগ-ব্যবহারের উপর কর ধার্য না করা সংক্রান্ত মত গ্রহণ। তারা আমদানী থেকে একটা বার্ষিক পরিমাণ কর্তন করার দাবি তুলেছে এভাবে যে, বছরের অগ্রগতিতে তার পুঞ্জীভূত হওয়া মূলধন থেকে বিনিময় নিয়ে ‍নিতে বাধ্য করে। এই মূলধনই হচ্ছে তার আমদানীর উৎস। তাহলে যন্ত্রপাতি বা জমি-আমদানরি উৎস –যদি ক্রমাগতভাবে ত্রিশ বছর পর্যন্ত উৎপাদন অব্যাহতভাবে চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, তাহলে তার মূল্য থেকে প্রতি বছর একটি অংশ জমা করে আরও যন্ত্র ও জমি ক্রয় করে আরও আমদানীর উৎস ক্রয় করা সম্ভব হয়। এতে করে আমদানী স্থিতিশীল ও অব্যাহত থাকতে পারে। এ কর্তিত অংশের করমুক্ত হওয়া বাঞ্চনীয়। তাহলে এক ব্যক্তি যখন একটা ইমারতের মালিক হয়, তখন মনে করা যাক- তার মূ্ল্য ধরা হল ত্রিশ হাজার দীনার এবং আরও ধরলাম যে, প্রতি বছর তার মূল্য ৩০ ভাগের এক ভাগ হ্রাস পেয়ে যাচ্ছে অর্থাৎ বছরের এক সহস্র দীনার। এক্ষণে তার বাৎসরিক আয় থেকে এ সহস্র দীনার বাদ দিয়ে ধরতে হবে। তাহলে বছরে যদি তার ভাড়া হয় তিন হাজার দীনার, মনে করা হবে যে, তার মাত্র দু’হাজার দীনারে ভাড়া দেয়া হয়েছে। কেবলমাত্র এ দিক দিয়েই কৃষি জমির উপর ইমারত ও কারখানার কিয়াস করা চলে। কেননা তা কালের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন অব্যহত রাখতে সক্ষম একটা উৎস। আর তা প্রতিষ্ঠান ও যন্ত্রপাতি সংরক্ষণের ব্যয়ের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয় এবং তা আমরা যে ব্যয়-ভোগের উল্লেখ করেছি, তার বিপরীত নয়।
তৃতীয় আলোচনা
ইমারত ইত্যাদির যাকাতের নিসাব
দালান-কোঠা ও শিল্প-কারখানার আমদানীর বিপুলতার সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা করে তার যাকাতের নিসাব কি হবে, তা নির্ধারণ পর্যায়ে আমাদের উপরিউক্ত মত প্রকাশকারী মনীষিগণ কোন কথা বলেন নি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, সে নিসাব কত ধরতে হবে? তার পরিমাণ কিভাবে নির্ধারিত হবে, তার নিসাব কি কৃষি ফসলের নিসাব পরিমাণে নির্ধারণ করা হবে….. যা কিনা পাঁচ ‘অসাক’। আর সে নির্ধারণে কি নগণ্য ফসল ও ফল ধরা হবে, না মধ্যম মানের, না উচ্চ-উন্নত-মানের? এই বিতর্কের সহায়ক হয়, যদি আমরা কারখানার আয়কে জমির আয়ের উপর কিয়াস করি। কিংবা তার নিসাব নির্ধারণ করা হবে নগদ মূল্য হিসেবে? যার মূল্য ৮৫ গ্রাম স্বর্ণ? এ হিসেবে যে, স্বর্ণ সর্বকালের নিসাব নির্ধারণে স্থায়ী ইউনিট। সম্ভবত এ কথাই অধিক সত্য এবং সহজ। কেননা এই পরিমাণ সম্পদ যে লোকই লাভ করে শরীয়াত তাকেই একজন ধনী লোক গণ্য করে এবং তার উপর যাকাত ধার্য করে। তার কম পরিমাণ সম্পদের মালিককে যাকাত দিতে বাধ্য করেন না। পক্ষান্তরে ইমারত বা শিল্প কারখানার মালিক সব সময়ই তার মালিকানার আয় পেতে থাকবে নগদ হিসেবে। তাই তার যাকাতের নিসাব নগদ হিসেবে নির্ধারণ করাই উত্তম।
যে মেয়েদের মধ্যে নিসাব গণ্য হবে
নিসাব গণ্য করা যখন অপরিহার্য –কেননা শরীয়াতের দৃষ্টিতে তা-ই ধনী হওয়ার নিম্নতম পরিমাণ সম্পদ – তখন জানতে হবে কোন্ মেয়াদের মধ্যে নিসাব গণ্য করা হবে? তা কি মাসিক গণ্য হবে- বারো মাসের আয় নিসাব পরিমাণ হওয়া শর্ত হবে? না বার্ষিক হিসাবে ধরা হবে- বারো মাসের আয় একত্রিত করে নিসাবের হিসাব করা হবে? এবং বছরের শেষে নিসাব পরিমাণ সম্পদ হলে তার যাকাত গ্রহণ করা যাবে? মাসিক হিসাব ধরা হলে মালিকের পক্ষে তা কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থা হয়। এতে নিম্নমানের ঘর-বাড়ির কম আয়ের লোকেরা যাকাত থেকে নিস্কৃতি পেতে পারে। কেননা তাদের মাসিক আয় কখনই নিসাব পরিমাণ হবে না, এর ফলে মালিকদের কিছু্টা সুবিধা হবে।
তবে বার্ষিক হিসাব ধরলে গরীব মিসকীন ও যাকাত পাওয়ার অধিকারী লোকদের পক্ষে সুবিধা। কেননা তাতে যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে অনেক প্রশস্ত হবে, যাকাত ফরয হওয়া মালের পরিমাণও বিপুল ও ব্যাপক। বিরাট সংখ্যক লোকের উপরই তখন যাকাত ধার্য হতে পারবে, যাকাত ফাণ্ডের আয়ের পরিমাণও অনেক বৃদ্ধি পেয়ে যাবে।
সম্ভবত এ হিসাবটাই অধিক যথার্থ ও বাঞ্ছনীয়। কেননা ব্যক্তির আয়-আমদানী রাষ্ট্রের আয়ের মতই। তার বার্ষিক হিসাব গ্রহণই প্রচলিত, মাসিক হিসাব নয়। প্রাচিনকালে ঘর-বাড়ির ভাড়াও বার্ষিক হিসাবে ধার্য হত, মাসিক নয়(মক্কা শরীফে এখনও বার্ষিক হিসাবে ধরা হয়)। এ কারণে ফিকাহবিদগণ বলেছেন যে, আয় করা মালের যাকত তা হস্তগত হওয়ার সাথে সাথে দেয়া বাঞ্ছনীয়। বাড়ির ভাড়ার টাকা বছরে নিসাব পরিমাণ হলে সঙ্গে সঙ্গেই যাকাত দিয়ে দিতে হবে।
এরূপ অবস্থায় মাসিক আয়ের হিসাব গণ্য করা হবে, যেমন করে খেজুর ও কৃষি ফসলের হয়ে থাকে। যদিও তা কয়েকবারে কাটা বা তোলা হয় এবং পরে সব একসঙ্গে মিলিয়ে হিসাব করতে হয়। ইমাম আহমদ এই মত দিয়েছেন। ‘আল-মুগনী’ গ্রন্থে লিখিত হয়েছেঃ ‘এক বছরের সব ফল বা ফসল পরস্পর একত্রিত করে হিসাব করা হবে। তার পাওয়ার সময় যতই বিভিন্ন হোক-না কেন। তাতে অবশ্য আগে-পরে হবে। এক ফল শেষ হয়ে যদি পরবর্তী ফল প্রকাশ পায় ‍ও শেষ হয়, তাহলে প্রতিবারের ফল একসঙ্গে মিলিয়ে গুনতে হবে। যেমন খেজুর যদি বছরে দুইবার ধরে তাহলে তা একত্রিত করে গুণতে হবে।
দালান-কোঠার আয়ের হিসাবও এমনি করেই হবে, যেমন কারখানার হিসাব। সাদৃশ্যপূর্ণ হিসাব সমূহ একত্রিত করে করতে হবে। কেননা কারখানার হিসাব খুবই স্পষ্ট ও পরিচ্ছন্ন। প্রতি বছর তার আয়ের পরিমাণ সন্দেহমুক্তভাবে জানা যায়। কিন্তু প্রতি মাসের নির্ভেজাল এবং কাঁটায় কাঁটায় হিসাব করা সম্ভব হয় না।
আমদানী থেকে ঋণ ও ব্যয়াদি বাদ দেয়া
এ পর্যায়ে আমরা মনে করি, যাকাত ধার্য হবে নির্ভেজাল আমদানীর উপর। অর্থাৎ মজুরী, কর ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় সম্পূর্ণরূপে বাদ দেয়ার পর যা উদ্ধৃত থাকবে, তার উপর যাকাত ধার্য হবে। অনুরূপভাবে যে সব ঋণ সত্য প্রপাণিত হবে, তাও বাদ যাবে। ব্যয় পরিমাণ বাদ য়ো হবে কৃষি ফসল ও ফলের ক্ষেত্রে। এটা ফিকাহবিদ আতার মত। তিনি বলেছেনঃ ‘তোমরা ব্যয় পরিমাণ বাদ দাও এবং অবশিষ্টের যাকাত দাও। ইবনুল আরাবীও এ মতের সমর্থন ও তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
জীবিকার জন্যে নিম্নতম পরিমাণ বাদ দেয়া
এ পর্যায়ে একটি আলোচনা থেকে যায়, যা করা হলে ইমারত ইত্যাদি যাকাত সংক্রান্ত কথাবার্তা পূর্ণত্ব পেতে পারে। তা হচ্ছে, মালিকের নিজের ও তার পরিবারবর্গের জীবন জীবিকা পর্যায়ের যাবতীয় ব্যয়ের নিম্মতম পরিমাণও বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত। কেননা তার এ ছাড়া আর কোন আয়ের উৎস নেই, যা দ্বারা সে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।
তাহলে কি যাকাত ফরয হবে নির্ভেজাল বাৎসরিক আয়ের উপর এবং তার পরিবারবর্গের জীবিকা প্রয়োজনীয় পরিমাণ বাদ না দিয়ে? ফিকাহবিদদের পরিভাষানুযায়ী- তার মৌল প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা না করে? …… না কি কোন কিছু বাদ না দিয়ে সমস্ত আয়ের উপর যাকাত ধার্য হবে?
সন্দেহ নেই, এমন লোক অবশ্যই থাকতে পার যাদের ভাড়ায় দেয়া একখানি ঘর ছাড়া জীবিকা নির্বাহের আর কোন উপায় নেই। ছোট-খাট একটা কারখানও হতে পারে, যা সে নিজেই পরিচালনা করে কিংবা তার প্রতিনিধি হিসেবে কেউ চালায়। এ ধরনের একটা ঘর বা একটা কারখানা একজন ক্ষমতাহীন বৃদ্ধ, বিধবা বা ইয়াতিম শিশুরও থাকতে পারে। তাহলে কি এ সবের সমস্ত থেকে জীবিকা নির্বাহের জন্যে কোন অংশ বাদ দেয়া হবে? …এতে তাদের জন্যে অপরিহার্য? ……তা বাদ দিয়েই অবশিষ্টের উপর যাকাত ধার্য করা উচিত নয় কি? ……..না সমস্ত আয় থেকেই যাকাত দিতে হবে?
ইসলামের সুবিচারপূর্ণ নীতি হল, জীবিকার জন্যে নিম্নতম প্রযোজনীয় পরিমাণ বাদ দিয়ে অবশিষ্টের উপর যাকাত ধার্য করা। দ্বীনের অভিজ্ঞ লোকদের দ্বরাই পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে। আর বাৎসরিক হিসেবে অবশিষ্ট সম্পদ নিসাব পরিমাণ হলে তবেই তার উপর যাকাত ধার্য করতে হবে। এটা বিশেষভাবে তাদের জন্যে, যাদের এ ছাড়া অন্য কোন উপায়ে জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করার ক্ষমতা নেই।
এ পর্যায়ে আমাদের দুটো দলীল রয়েছেঃ
প্রথমঃ মৌল প্রয়োজন পূরণের জন্যে যতটা মাল আবশ্যক, ফিকাহবিদদের দৃষ্টিতে তা না থাকার সমতুল্য। তাদেন দৃষ্টান্ত হচ্ছে, পিপাসা ‍নিবৃত্তির জন্যে প্রয়োজনীয় পরিমাণের অধিক পানি না থাকলে তায়াম্মুম করা যাবে। কেননা যা আছে, তা না থাকার শামিল।
দ্বিতীয়ঃ সেসব হাদীস, যা খেজুর আঙুরের বাগানের মালিকদের উপর চাপ হালকা ও সহজ করার উদ্দেশ্যে বর্ণিত হয়েছে। নবী করীম (স) এদের সম্পর্কে বলেছেন এক-তৃতীয়াংশ বাদ দিয়ে হিসাব করার জন্যে। আর এক-তৃতীয়াংশ বাদ না দিলে অন্তত এক- চতুর্থাংশ অবশ্যই বাদ দিতে হবে। হিসাব করার জন্যে। এই পরিমাণ বাদ দিয়ে অশিষ্টের উপর যাকাত ধার্য করাই হাদীসের দৃষ্টিতে অত্যন্ত জরুরী এবং তা যেমন ফলের ক্ষেত্রে, তেমনি আলোচ্য ক্ষেত্রেও।
নবম অধ্যায়
স্বাধীন শ্রমের উপার্জনের যাকাত
শুরু কথা
এ কালের ব্যক্তিবর্গের নিজের কাজ ও পরিশ্রমলব্ধ সম্পদই সর্বাধিক মাম্য। মানুষ কাজ করে যা উপার্জন করে, তা-ও মাল। এ ধরনের উপার্জনকারী লোকদের আয় দু’ধরেনরঃ
প্রথম ধরণ হলোঃ ব্যক্তি নিজস্বভাবে কাজ করে এবং অন্য কারোর কাছে কোনরূপ হীনত স্বীকার না করেই কিছু-না -কিছু উপার্জন করে নে কাজ হয় হাত দিয়ে করা হয়, না হয় তাতে বিবেক বুদ্ধির প্রয়োগ ঘটে। এই উভয় ধরনের কাজে আয়কে ‘শ্রমের উপার্জন’ বলা হয়। যেমন চিকিৎসক, ইঞ্জিনীয়ার, আইনজীবি, শিল্পী, কারিগর, দর্জী, কাঠ-মিস্ত্রী প্রভৃতি লোককে স্বাধীন শ্রমজীবি বলা চলে।
দ্বিতীয় ধরনঃ কাজে মানুষ অপর ব্যক্তির সাথে জড়িত হয়, সে অপর ব্যক্তি কিংবা সরকার হতে পারে, একটা কোম্পানী হতে পারে, হতে পারে একাধিক ব্যক্তি। এবং সে সংযুক্তি কতিপয় ব্যক্তির সাথে কৃত চুক্তির ভিত্তিতে হতে পারে এই মর্মে যে, সে কোন একটা কাজ সম্পন্ন করবে, সে কাজ দৈহিক শ্রমের হতে পারে। , বিবেক-বুদ্ধির হতে পারে কিংবা উভয়ের সমন্বয়ে কোন কাজের জন্যে। এরূপ অবস্থায় তার আমদানীটা মাসিক বেতন, মজুরী বা প্রতিদানমূলক।
তাহলে এই আমদানী থেকে কি যাকাত গ্রহণ করা হবে- যা নিত্য-নতুনরূপে আসে কিংবা নেয়া হবে না? আর যাকাত নেয়া হলে তার নিসাব কি ধরা হবে? ইসলামী ফিকাহ্ এই পর্যায়ে কি বলে?
এমন কতগুলো প্রশ্ন, যার জবাব পাওয়া এ যুগের প্রেক্ষিতে খবই জরুরী। তাহলেই প্রতিটি মুসলিম তার দেয় কর্তব্য বা হক সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে পারবে। কেননা নবরূপের এই আমদানীর পরিমাণও একালে নেহায়েত কম হয় না। বরং তার পরিমাণ খব বড়ই হয়। অতীতকালের ফিকাহবিদগণ এ ধরনের আমদানী সম্পর্কে তেমন কিছু জানতেন না।
আমরা তিনটি পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে এ প্রশ্নগুলোর জবাব উপস্থাপিত করতে চাইঃ
১. কাজের উপার্জনের বা শ্রমের ফিকহী রূপায়ণ এবং তার যাকাত সম্পর্কে প্রাচিন ও নতুন ফিকাহবিদদের মত। সেই সঙ্গে অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য মতের উল্লেখ।
২. নিসাব, তার পরিমাণ এবং হিসাবটা কিভাবে করা হবে?
৩. ফরযের পরিমাণ কত?
প্রথম আলোচনা
স্বাধীন ও পেশাভিত্তিক উপার্জনের স্বরূপ নির্ধারণ
সমসাময়িক অভিমত
আবদুর রহমান হাসান, মুহাম্মদ আবূ জুহূরা ও আবদুল ওহাব খাল্লাফ প্রমুখ একালের প্রখ্যাত ইসলামী ফিকাহবিদ ১৯৫২ সনে দামেশকে যাকাত সম্পর্কে অনুষ্ঠিত সেমিনারে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন। সে সিদ্ধান্তটির মূল কথাগুলো এখানে ‍তুলে দিচ্ছিঃ কাজ ও পেশাগত উপার্জন থেকেও যাকাত গ্রহণ করা হবে যদি তা নিসাব পারিমাণ হয়ে একটি বছর পর্যন্ত স্থায়ী থাকে। ইমাম আবূ হানীফা, আবূ ইউসুফ ও মুহাম্মাদের মত হচ্ছে, নিসাব পুরো বছর অক্ষত থাকতে হবে-কম বেশী হতে পারবে না তা নয়; শুধু শুরু ও শেষে দুদিকে নিসাব পরিমাণ বহাল থাকাই যথেষ্ট হবে এ কথা লক্ষ্য রেখে আমরা বলতে পারি, কর্মের উপার্জনের উপর প্রতি বছরই যাকাত ধার্য করা সম্ভব। এখানে সেই ‘ইল্লাত’ বা কারণ পাওয়া গেছে- যা ফিকাহবিদগণ এজন্যে নির্দিষ্ট করেছেন। এবং যেহেতু ইসলাম চায়, কোন লোকের বারো জনীহ্ মিসরীয় স্বর্ণমুদ্রা পরিমাণ সম্পদ অর্জিত হলে তাকে ধনী মনে করা হবে এবং এই পরিমাণটা যাকাত ধার্য হওয়ার জন্যে যথেষ্ট। এর ফলে ধনী যে যাকাত দোব এবং দরিদ্র যে তা গ্রহণ করেবে- উভয়ের মধ্যকার পার্থক্যটা প্রকট হয়ে উঠবে।
হানাফীরা ভুলবশতই বছরের প্রথম ও শেষে নিসাব পরিমাণ প্রাপ্তিকে যথেষ্ট ধরে নিয়েছেন – সারা বছরকাল অনুরূট টরিমাণের স্থিতিকে গুরুত্ব দেন নি। তাই স্বাধীন পেশা বৃত্তি ও কাজের উপার্জনের উপর যাকাত ধার্য করাকালে এ জিনিসটির দিকে লক্ষ্য দেয়া একান্ত আবশ্যক। তাহলে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যেকার পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠবে এবং স্বাধীন পেশাদার লোকদের মধ্যে এামন খুব কম লোকই দেখা যাবে, যাদের আমদানী প্রচুর নয়।
যাকাত পরিমাণ সম্পর্কে কথা বলার তাঁরা আবার মূল বিষয়বস্তুর দিকে ফিরে এসেছেন। তাঁরা বলেছেনঃ
স্বাধীন পেশা বৃত্তি ও কাজের উপার্জনের কোন দৃষ্টান্ত ফিকাহ্ শাস্ত্রে দেখতে পাওয়া যায় না, শুধু মজুর রাখার ব্যাপারটি ছড়া ইমাম আহমেদের মত অনুযাঢী। তিনি বলেছেনম, ‘যে লোক তার গর ভাড়ায় দিল, তার রোয়া সত্তগত করল – যা নিসাব পরিমাণ পর্যন্ত পৌঁচেছে, তার উপর যাকাত ফরয হবে, যখন সে তা ব্যবহার করতে শুরু করেছে। একটি বছর অতিক্রান্ত হওয়ার কোন শর্তই থাকবে না আর এটা প্রকৃতপক্ষে কর্মের উপাজনের সাথে পারস্পারিক সাদৃশ্যপূর্ণ। অতএব তার উপরও যাকাত ফরয হবে-যদি তার পরিমাণ নিসাব পর্যন্ত পৌছে।
প্রথমে আমরা যা নিধারন করেশেষে তা তার কাজ ও পেশাভিত্তিক উপার্জন পূর্ণত্ব পাবে। তা হলে এক বছর অতিক্রান্ত ছিল, এটা তার উপরের কথা। তা হচ্ছে, লক্ষণীয় যে, উপার্জনকারী সক্ষম ব্যক্তি নিসাব পরিমাণ উপার্জন থেকে বঞ্চিত থাকবে-তা খুব বিরল ঘটনা হবে। তার আমদানীর নিসাব পরিমাণ বছরের মাঝখানে হ্রাসপ্রাপ্ত হলেও বছরের হওয়া নিসাব পরিমাণের উপরই যাকাত ফরয হবে।
মাসিক বেতন ও মজুরীলব্দ্ধ মাল
পূর্বের এ সিদ্ধান্তের ফলশ্রুতি হিসাবে বলতে পারি, এক মাস বারো মাস পর্যন্ত প্রাপ্ত মাসিক বেতনথেকেও যাকাত গ্রহণ করতে হবে। কেননা যাকাতের জন্যে সহজ পন্থা হচেছ স্থায়ী নিসাব যা বছরের প্রথমে ও শেষে থাকে।
এই মনীষিগণ কাজ ও পেশাবৃত্তির উপার্জন এবং মাসিক বেতন হিসাবে পাওয়া আয় সম্পর্কে কথা বলেছেন, এটা খুবই বিস্ময়কর। কেননা, ফিকাহ্‌ শাস্ত্রে তার কোন দৃষ্টান্ত তাঁরা পাননি। শুধু ইমাম আহমদ থেকে ঘরের ভাড়া সম্পর্কে একটি মত বর্ণিত পাওয়া গেছে। এখানে আমরা তাকে অর্জিত সম্পদ বলব, যা মুসলিম ব্যক্তি অর্জন ও সংগ্রহ করে নতুন করে মালিকানা লাভের শরীয়ত সম্মত যে কোন উপায়ে তার মালিক হয়ে বসে। এ উপার্জনকে যথার্থ ফিকহী রূপায়নে বলা যায় অর্জিত মাল।
সাহাবী ও তৎপরবর্তীকালের লোকদের একটি জামায়াত তার যাকাত নেওয়া ফরজ বলে মত প্রকাশ করেছেন, সে জন্য একটি বছর অতিক্রান্ত হওয়ার কোন শর্ত আরোপ করেন নি। হযরত ইবনে আব্বাস, ইবনে মাসুদ, মুয়াবিয়া, সাদেক, বাকের, নাসের ও দাউদ প্রমুখ এ মত গ্রহণ করেছেন। ওমর ইবনে আব্দুল আযিয, হাসান, জুহুরী ও আওযায়ীর ও এই মত।
অর্জিত সম্পদ সম্পর্কে সুচিন্তিত মত
একালে এভাবে উপার্জিত সম্পদ সম্পর্কে শরীয়তের দৃষ্টিকোণ জানতে পারা একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। একটা সুষ্ঠ মত সম্মুখে আসা দরকার, কেননা এর উপর বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ভরশীল। বহু প্রকারের আমদানি এর অন্তর্ভূক্ত হয়ে পড়ে। স্বাধীন কাজ, পেশাবৃত্তি এবং ব্যবসা ছাড়া অন্যভাবে মূলধন ইত্যাদির আমদানি এই পর্যায়ে গণ্য।
অর্জিত মাল ‍যদি পূর্বে যাকাত দেওয়া কোন মালের প্রবৃদ্ধির ফলশ্রুতি হয়- যেমন: ব্যবসায়ের মালের মুনাফা বা ছেড়ে দিয়ে রাখা জন্তুর উৎপাদন- তাহলে তা তার মূল্যের সাথে গণ্য হবে। তার বছর ও সেই অনুযায়ী গণনা করা হবে। এর ফলে আসল ও প্রবৃদ্ধি পরস্পর সংযুক্ত হয়ে যাবে।
তাই যে লোক উম্মুক্ত ভাবে বিচরণশীল জন্তু বা ব্যবসায়ের মালের নিসাব পরিমাণের মালিক হবে, বছরের শেষে সে আসলের ও তৎলব্ধ ফায়দার যাকাত এক সঙ্গে দিয়ে দিবে। এ বিষয়ে আমাদের নতুন কিছু বলবার নেই।
এই অর্জিত মালের মুকাবিলায় আসে যদি তা যাকাত দেওয়া মালের মূল্য হয়- যার উপর এক বছর সময় অতিবাহিত হয়নি। যেমন – সে যদি তার জমির ফসল বিক্রি করে দেয় এবং তার যাকাত ও সে দিয়েছে ওশর বা অর্ধ ওশর হিসাবে, তেমনি যদি সে যদি তার জন্তুর বিক্রয় করে দেয় অথচ তার যাকাত সে পূর্বেই দিয়ে দিয়েছে, তখন সে মূল্য বাবদ যে মালটা অর্জন করল, তখন সে তার যাকাত দেবে না। কেননা, দিলে এই মালের দুইবার যাকাত দেওয়া হয়, আর তা অচল।
কারোর কাছে রক্ষিত মালের প্রবৃদ্ধি হিসাবে যা অর্জিত নয়, সে বিষয়েয় কথা বলা হছ্ছে। তা এক স্বতন্ত্র উপায়ে অর্জিত. যেমন, কোন বিশেষ কাজের মুজুরী বা মূল ধনের আয়, দান উপঢৌকন ইত্যাদি , তা তার কাছে থাকা মালের সমজাতীয় হোক, কি ভিন্ন জাতীয়।
এ মালের যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য অর্জিত হওয়ার পর থেকে কি পূর্ণ একটি বছর মালিকের মালিকানার অধীন থাকা শর্ত? কিংবা তার কাছে যে জাতীয় মাল রয়েছে সে জাতীয় মাল অর্জিত হলে সব একত্রিত করে হিসাব করা হবে? অথবা তা যখনই অর্জিত হবে ও নিসাব পরিমাণ হওয়ার শর্ত পূর্তির এবং তার ঋণমুক্তি ও মৌল প্রয়োজনের অতিরিক্ত হওয়ার কথা জানা যাবে, তখনই তার যাকাত দিয়ে দিতে হবে?
এখানে যে তিনটি সম্ভব্যতার কথা বলা হয়েছে তার প্রতিটির পক্ষে ফিকাহ্ বীদ গণ রয়েছেন। যদিও ফিকাহ্ শাস্ত্র নিয়ে মশগুল থাকা লোকদের মধ্যে প্রসিদ্ধ মত হচ্ছে, প্রত্যেক মালের যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য একটি বছর পূর্ণ হওয়া জরুরি শর্ত- সে মাল নতুন অর্জিত হোক, কি পূর্ণ থেকে বর্তমান থাকুক। এ পর্যায়ের কতিপয় হাদিসের ভিত্তিতে বলা হয়েছে যা এক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার উল্ল্যেখ সহ বর্ণিত হয়েছে। বিশেষ করে অর্জিত মাল সম্পর্কে এ কথা বলা হয়েছে।
এ কারণে এক বছর মালিকানা পূর্তির শর্ত যে সব হাদিসে এসেছে সে সব হাদিস কি মর্যাদার এবং হাদিসের ইমাম গণের কাছে তার সত্যতা যথার্থতার প্রমাণ কতটা অকাট্য, সে বিষয়ে এখানে আলোচনা করা একান্ত অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
এক বছর পূর্তি সংক্রান্ত হাদিস যয়ীফ।
চারজন সাহাবী কর্তৃক রাসূলে করীম (সা:) থেকে গণনা করা হাদিসে মালিকানার এক বছর পূর্তির শর্ত উল্লিখিত হয়েছে। তারা হচ্ছেন – হযরত আলী, ইবনে উমর, আনাস এবং হযরত আয়েশা (রা:)। কিন্তু একয়টি হাদিস যয়ীফ। দলিল হিসাবে তা মেনে নেওয়া যায় না।
হযরত আলী(রা:) বর্ণিত হাদিস
হযরত আলী (রা:) বর্ণিত হাদিস টি আবু দাউদের গ্রন্থে উদ্ধুত হয়েছে। হাদিসটি তে বলা হয়েছে : তোমার যখন দুইশত দিরহাম হবে এবং তার উপর এক বছর কাল অতিবাহিত হবে, তখন তার উপর পাঁচ দিরহাম যাকাত ফরজ হবে। আর স্বর্ণে তোমার উপর কিছুই দেয় হবে না, যতক্ষণ না তোমার ২০ দিনার সম্পদ হবে। যদি তোমার ২০ দিনার সম্পদ হয় এবং তার উপরে এক বছর পূর্ণভাবে অতিবাহিত হয় তাহলে তার অর্ধ দিনার দেয় হবে। এর বেশি হলে এভাবেই হিসেব চলবে।
বর্ণনাকারী বলেছেন, “এভাবেই হিসাব চলবে” কথাটি হযরত আলীর নিজের না তিনি তা রাসূলে করীম (সা:) থেকে বর্ণনা করেছেন, তা আমি জানিনা। আর যাকাতের মালে “এক বছর অতিবাহিত হলে ” কথাটি নেই। কেবলমাত্র জারির বলেছেন, ইবনে ওহাব রাসূলের হাদিসে বাড়িয়ে বলেছেন: যাকাতের মালে কিছুই ধার্য হবে না, যতক্ষণ না তার উপর একটি বছর অতিবাহিত হবে। আবু দাউদের উদ্ধৃতি অনুযায়ী হযরত আলী বর্ণিত হাদিসটি এই। এক্ষণে হাদিস সমালোচকদের দৃষ্টিতে এ হাদিসটির মূল্য ও মর্যাদা কি, তাই আলোচ্য।
ক. ইবনে হাজম ও আব্দুল হক বলেছেন, এ হাদিসটি জরীর, ইবনে হাজম- আবু ইসহাক, আসেম, হারিস আলী সূত্রে বর্ণনা করেছেন। আসেম ও হারিসের পরে রয়েছেন আবু ইসহাক। হারিস মিথ্যাবাদী। আর বেশ কয়েকজন বর্ণনাকারী সম্পর্কেই এই উক্তি বৈধ। হারিস সনদ দিয়েছেন , আসেম দেননি। জরীর এই দুইজনকে একত্রিত করেছেন এবং একজনের বর্ণিত হাদিসকে অন্য জনের বর্ণনার মধ্যে দাখিল করে দিয়েছেন। শু’ বা, সুফিয়ান ও মুয়াম্মার ও এ হাদিসটি আবু ইসহাক, আসেম আলী থেকে আলীর উক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এমনি প্রত্যেক ’ফিকাহ্’ বর্ণনাকারী থেকে আসেম বর্ণনা করেছেন এবং আলীর উক্তি বলে ধরেছেন। এক্ষণে জরীর যদি তা আসামের সনদ বর্ণনা করে থাকেন এবং তাই বলে থাকেন তাহলে তা আমরা গ্রহণ করব।
খ. হাফেয ইবনে হাজার ইবনে হাজমের উপরিউক্ত কথার উপর মন্তব্য প্রসঙ্গে বলেছেন, তিরমিযী এ হাদীসটিকে আবূ আওয়ানা, আবূ ইসহাক, আসেম আলী থেকে রাসুলের কথা হিসেবে নর্ণনা করেছেন।
আমি বলব, আবূ আওয়ানা বর্ণত হাদীসটিতে এক বছরের শর্তের উল্লেখ নেই। কাজেই তা দলীল হতে পারে না। তিরমিযীর বর্ণনা অনুযায়ী হাদীসটির ভাষা এরূপ- রাসূলে করীম (সা) বলেছেন আমি ক্ষমা করে দিয়েছি ঘোড়া ও ক্রীতদাসের যাকাত। অতএব তোমরা নগদ সম্পদের যাকাত নিয়ে এস প্রতি চল্লিশ দিমহামে এক দিরহাম হিসাবে। আর একশ নব্বই দিরহামে কিছুই ফরয নয়। তার পরিমাণ দু’শ পূর্ণ গলে দা ধেতে পাঁচ দিরহাম দিতে হবে।
গ. এ সব কথাই গ্রহণীয় যদি আসেমকে সিকাহ্ ধরা হয়। কিন্তু সে তো অক্ষত থাকেনি। মুন্ যেরী বলেছেন, হারিস ও আসেমের বর্ণনা দলীল হতে পারে না। সাহাবী বলেছেন, তার কাছ থেকে চারজন বর্ণনা করেছেন। ইবনে মুয়ীন ও ইবনুল মদীনী তাঁকে সিকাহ্ বলেছে। ইমাম আহমদ বলেছেন, তিনি হারিসের উপরে অবস্থিত। আর তিনি আমার কাছে গ্রহনীয়। নাসায়ী বলেছেন, তাঁর বর্ণনা গ্রহণে কোন অসুবিধা নেই। তবে ইবনে আদী বলেছেন, তিনি একাকী হযরত আলী থেকে কতিপয় হাদীস বর্ণনা করেছেন; আর তাঁর থেকেই অসুবিধাটির সূচনা হয়েছে। ইবনে হাব্বান বলেছেন, তিনি স্মরনশক্তির দিক দিয়ে খারাপ ছিলেন; বড় বেশি ভুল করতেন। তিনি তাঁর বহু কথাই হযরত আলী থেকে রাসুলের কথা হিসেবে বর্ণনা করতেন। তাই তা পরিহারযোগ্য। তবে তাঁর অবস্থা হারিস থেকে ভাল। এতে মুনযেরীর কথার সমর্থন হয়ে গেছে যে, তিনি দলীল হতে পারেন না।
ঘ. এতদসত্ত্বেও আলোচ্য হাদীসটি দোষমুক্ত। হাফিয ইবনে হাজার যেমন বলেছেন, তার কথা- যে হাদীসটি আমরা আবূ দাউদ থেকে উদ্ধৃত করলাম, তা দোষমুক্ত। পরে তার সনদের উল্লেখ করে বলেছেন, ইবনুল মুয়াফিক এর মধ্যকার প্রচ্ছন্ন দোষ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। আর তা হচ্ছে, জরীর ইবনে হাজাম আবূ ইসহাক থেকে এ হাদীসটি শুনেন নি। এটি ইবনে ওহাবের সঙ্গী হাফেযগণ বর্ণনা করেছেন। তাঁরা হলেন, সাহনুন, হারমালা, ইউনুস, বহর ইবনে নসর প্রমুখ ইবনে ওহাব থেকে জরীর ইবনে হাজম, হারিস ইবনে উমারাতা, ইবূ ইসহাক থেকে। ইনুল মুয়াক বলেছেন, এত আবূ দাউদের উস্তাদ সুলায়মানের উপরই চাপ পড়েছে। কেননা তিনি ভুল করে একটি লোককে প্রত্যাহার করেছেন। আর হাসান ইবনে উমারাতা- যিনি সনদ তেকে বাদ পড়েছেন- সর্বসম্মতিক্রমে প্রত্যাহৃত।
এ থেকে জানা গেল যে, উপরউক্ত হাদীসটি কয়েকটি দোষ রয়েছে। হারিসের দিক থেকে- কেনান সে মিথ্যাবাদী বলে অভিযুক্ত। কেবল সে একাই হাদীসটিকে রাসূলেরে কথারুপ বর্ণনা করেছেন। আসেমের দিক থেকেও দোষ দেখা দিয়েছে। কেননা তার সিকাহ হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। ইবনুল মুয়াক যে ইল্লাতের উল্লেখ করেছেন সে দিক থেকেও, ইবনে হাজারও সে ইল্লাতের কথা বলেছেন। ইমি মনে করি, যাঁরা হাদীসটিকে হাসান বলেছেন, তাঁরা যদি সেই ইল্লাতের কথা জানতে পারতেন তাহলে তাঁরা তাঁদের একথা প্রত্যাহার করতেন। কেননা সে ইল্লাতটি খুবই মারাত্মক।
ইবনে উমর (রা) বর্ণিত হাদীস
হযরত ইবনে উমর বর্ণিত হাদীসটি সম্পর্কে ইবনে হাজার বলেছেন, হাদীসটিকে দারে কুত্ নী বায়হাকী উদ্ধৃত করেছেন। তার সনদে রয়েছে ইসমাঈল ইবনে আইয়াশ। তাঁর বর্ণত হাদীস যয়ীফ। আবনে নুমাইর, মু’তামার প্রমুখও তাদের উস্তাদের কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন, উস্তাদ হচ্ছেন উবায়দুল্লাহ ইবনে উমর – রাফে থেকে বর্ণনাকারী।
আনাস (রা) বর্ণিত হাদীস
আনাস (রা) বর্ণিত হাদীসটি দারে কতুনী গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে। তাতে হাসান ইবনে সিয়াহ একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন যয়ীফ। তিনি এককভাবে সাবিত থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইবনে হাব্বান বলেছেন, এ লোকটি খব বেশী ’মুনকারে হাদীস’, তার বর্ণিত হাদীসকে দলীলরূপে গ্রহন করা যায় না- বিশেষ করে যখনসে একক বর্ণনাকারী হয়।
আয়েশা (রা) বর্ণিত হাদীস
হযরত আয়েশা (রা)বর্ণিত হাদীসটি ’ইবনে মাজা’ গ্রন্থে দারেকুতনী ও বায়হাকী উদ্ধৃত করেছেন। বর্ণনাকারী উকাইলী যয়ীফ।
ইবনুল কাইয়্যেম তাহযীবে সুনানে আবূ দাউদ গ্রন্থে বলেছে: একটি পূর্ণ বছর অতিবাতহত না হওয়া পর্যন্ত কোন মালেই যাকাত নেই হাদীসটি হযরত আয়েশা কর্তৃক বর্ণিত এবং সহীহ সনদে উদ্ধৃত। মুহাম্মদ উবনে উবায়দুল্লাহ ইবনুল মুনাদী বলেন, হযরত আয়েশা বলেছেন: আমি রাসুলে করীম (সা) কে বলতে শুনেছি; এক বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কোন মালে যাকাত ধার্য হয় না। আবুল হুসাইন ইবনে বিশরান, উসমান ইবনে সামাক- ইবনুল মুনাদী থেকে বর্ণনা করেছেন।
আমি বলব, ইবনুল কাইয়্যেম এই সনদে বর্ণিত এই হাদীসটিকে কি করে সহীহ বললেন, তা একটি বিস্ময়। বর্ণনাকারী শুজা ইবনে ওলীদের দকে ভ্রুক্ষেপ না করলেও চলে। কেনা আবূ হাতিম তার সম্পর্কে বলেছেন: সে খুব নরম – শক্ত নয় এবং তার বর্ণনাকে দলীলরুপে গ্রহন করা যায় না। তবে তার কিছু সহীহ হাদীস রয়েছে মুহাম্মদ ইবনে আমর থেকে বর্ণিত। তাহ তার শায়খ হারিসা ইবনে মুহাম্মদকে কি করে উপেক্ষা করা যায়? সে-ই-হচ্ছে হারিসা ইবনে আবূ রিজাল – উমরা থেকে বর্ণনাকারী। দারে কুতনী ও উকাইলী তার হাদীসকে পুর্বেই ’যয়ীফ’ বলে অভিহিত করেছেন। যাহাবী তার সম্পর্কিত আলোচনায় বলেছেন, আহমদ ও ইবনে মুয়ীন তাকে ’যয়ীফ’ বলেছেন। নাসায়ী বলেছেন, ’পরিত্যক্ত’। বুখারী বলেছেন, মুনকারূল হাদীস, তাকে কেউ গণ্য করে না। ইবনুল মাদীনী বলেছেন, আমাদের সঙ্গীরা তাকে সব সময়ই যয়ীফ বলে অভিহিত করেছেন। ইবনে আদী বলেছেন, সাধারণভাবেই তার বর্ণনা মুনকার – অ-গ্রহনযোগ্য। অর্থাৎ তার একক বর্ণনাকে সহীহ্ বলা হতে পারে কিভাবে?
মালের মালিকানার একটি পূর্ণ বছর অতিক্রান্ত হওয়া সম্পর্কিত হাদীসগুলোর মোটামটি এ-ই হল অবস্থা। সে মাল মদ্য অর্জিত হোক কি অন্য কিছু, সেদিক থেকে নজর ফেরালেও তা গ্রহণযোগ্য নয়।
অর্জিত মাল সম্পর্কিত হাদীস
বিশেষ করে অর্জিত মাল পর্যায়ে তিরমিযী একটি হাদীস উদ্ধৃত করেছেন আবদুর রহমান ইবনে যায়দ ইবনে আসলাম- যায়দ ইবনে উমর মূত্রে। রাসূলে করীম (সা) বলেছেনঃ যে লোক কোন মাল অর্জন করল তার উপর যাকাত ধার্য হবে না যতক্ষণ মালিকরে কাছে তার পূর্ণ একটি বছর অতিবাহিত না হবে। আইযূব-নাঢফ-ইবনে উমর সুত্রেও এই হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। বিন্তু তা রাসূলে করীমের কথা হিসেবে বর্ণিত হয়নি।
তিরমিযী বলেছেন, এ হাদীসটি আবদুর রহমান ইবনে যায়দ ইবনে আসলাম বর্ণিত হাদীসের তুলনায় অধিক সহীহ্। আইয়ূব ও উবায়দুল্লাহ ইবনে উমর ইত্যাদি নাফে ইবনে উমর তেকে তাঁর কথা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আর আবদুর রহমান ইবনে যায়দ ইবনে আসলাম হাদীসে যয়ীফ ব্যক্তি। আহমদ ইবনে হাম্বল ও আলী ইবনে মাদানী প্রমুখও তাকে যয়ীফ বলে ছেন। বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি খুব বেশী ভুল করেছেন।
আবদুর রহমান ইবনে যায়দ বর্ণিত হাদীসটি দারে কুতনী ও বায়হাকীও বর্ণনা করেছেন। বায়হাকী ও ইবনুল জাওযী প্রমুখ তাকে ’মওকুফ’ বলেছেন। দারে কুতনী বলেছেন, হাদীসটি যয়ীফ। মালিক তাকে মওকুফ হিসেবে সহীহ্ বলেছেন। বায়হাকী তা আবূ বকর, আলী ও আয়েশা থেকে মুওকুফ সহাবীর উক্তিরুপে- সহীহ্ বলেছেন।
এই বিশ্লেষণ থেকে স্পস্ট হয় যে, মালের এটি বছর অতিবাহিত হওয়ার শর্ত নবী করীম (সা) – এর কথা সত্য হওয়ার প্রমাণ কোন হাদীসের অংশ নয়। বিশেষ করে অর্জিত মাল সম্পর্কে। হাফেয বায়হাকীও তাই বলেছেন।
এ পর্যয়ে রাসুলে করীম (সা) থেকে কোন কিছু সহীহ্ রুপে প্রমাণিত হয়ে থাকলে তা সদ্য অর্জিত মাল সম্পর্কে প্রযোজ্য। তাহলে দলীলসমূহের মধ্যে সমন্বয় সাধিত হয়। এখানে এক বছর অতীত হওয়ার ব্যাপারে একটা সর্বসম্মত কথা রয়েছে। তা হচ্ছে, যে মালের যাকাত একবার দেয়া হয়েছে, তার উপর অতঃপর এক বছর অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত আর কোন যাকাত ধার্য হবে না। কেননা যাকাত বার্ষিক হিসাবে ধার্য হবে না’- এই কথা এ অধ্যায়ের এক বছরের শর্ত পর্যয়ে আমরা বিস্তারিত বলে এসেছি। অর্জত মালের এক বছর অতিবাহিত হওয়া বিষয়ে বর্ণিত হাদীসসমূহের যয়ীফ হওয়া বিষয়ে সাহাবীগণের মতপার্থক্য বিশেষভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে।
অর্জিত মাল সম্পর্কে সাহাবী, তাবেয়ীন ও পরবর্তী লোকদের মতপার্থক্য
মালের এক বছর অতিবাহিত হওয়ার শর্ত পর্যয়ে কোন সহীহ্ হাদীস বা অকাট্য দলীল যখন পাওয়া গেল না, তখন এ উপর ইজমা অনুষ্ঠিত হওয়ারও কোন প্রশ্ন উঠে না। না কথার ইজমা, না চুপ থাকার ইজমা। কেননা সাহাবী ও তাবেয়ীন অর্জিত মালের ব্যাপারে বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। তাঁদের কউ কউ একটি বছর অতিবাহিত হওয়ার শর্ত করেছেন, কেউ কেউ তা করেন নি। যখনই কোন মাল অর্জিত হবে, তখনই তার যাকাত ফরয হওয়ার কথা বলেছেন অনেকেই।
আর্ এদের মধ্যেই যখন কোন বিষয়ে মতবিরোধ সংঘটিত হয়, তখন কোন একটা মতকে অপর মতের তুলনায় উত্তম বলা চলে না। তখন অন্যান্য দলীলের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়- ইসলামের সাধারণ নিয়ম এটাই। কুরআন মজীদ আল্লাহ্ নিজেই বলেছেনঃ (আরবী ********)
তোমরা যখন কোন বিষয়ে মতপার্থক্যের মধ্যে পড়ে যাবে, তখন নেই বিষয়টি আল্লাহ্ এবং রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও।
কাসেম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবূ বকর থেকে সহীহ্ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত আবূ বকর কোন মালের এক বছরকাল অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তার যাকাত গ্রহণ করতেন না।
উমরাতা বনিতে আবদুর রহমান কর্তৃক উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে, তিনি বলেছেনঃ এক বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তার যাকাত দেয়া যাবে না। — অর্থাৎ অর্জিত মালের যাকাত।
আলী ইবনে আবূ তালিব (রা) বলেছেনঃ যে কোন মাল অর্জন করল, সে তার যাকাত দেবে না, যতক্ষণ না তার একটি বছর অহিবাহিত হয়। ইবনে উমর থেকেও অনুরুপ বর্ণনা এসেছে।
সাহাবীগণের এসব উক্তি থেকে প্রমাণিত হয় যে, মালিকদের মালিকানাধীন এক বছর অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত কোন মালেরই যাকাত দেয়া ফযে হবে না। ’সদ্য অর্জিত মাল’ হলেও নয়। কিন্তু অপর কয়েকজন সাহাবী এই মতের বিপরীত মত প্রকাশ করেছেন। তাঁরা অর্জিত মালের মালিকানার এক বছর অতিবাহিত হওয়ার শর্ত করেন নি।
ইবনে হাজম বলেছেন, ইবনে আবূ শায়বা ও মালিক ‘মুয়াত্তা’ গ্রণ্থে বর্ণনা করেছেন- ইবনে আব্বাস (রা) থেকে সহীহ্ সুত্রে প্রমাণিত হয়েছে যে, ‘সর্ব প্রকার মালের যাকাত তখনই ফরয হয় যখন মুসলিম ব্যক্তি তার মালিক হয়’।
এই বর্ণনা এক বছর কাল অতীত হওয়ার অপেক্ষা না করে অর্জিত মালের যাকাত সাথে সাথেই দিয়ে দেয়ার কথা বলছে। ইবনে মাসউদ ও মু’আবিয়া প্রমূখ সাহাবী এবং উমর ইবনে আবদুল আযীয, হাসান বসরী ও জুহরী প্রমুখ তাবেয়ী থেকেও এ কথাই প্রচারিত হয়েছে।
অর্জিত মাল পর্যায়ে সাহাবী ও তাবেয়ীর মত
অর্জিত মালের মালিক সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস থেকে আবূ উবইদ বর্ণনা কলেছেনঃ সে যেদিন তা অর্জন করল, সেদিনই তার যাকাত দিয়ে দেবে। ইবনে আবূ শায়বাও তাই বর্ণনা করেছেন। ইবনে আব্বাস থেকে এ বর্ণনা সহীহ্। ইবনে হাজমেরও তাই মত। তার অর্থ, নগদ অর্জিত মালের যাকাত ফরয হওয়ার শর্ত নেই- ইবনে আব্বাসের উক্তি থেকে লোকেরা তাই বুঝেছেন। যদিও আবূ উবাইদ নিজেই এর বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেছেন, লোকেরা ইবনে আব্বাসের উরিউক্ত উক্তির ব্যাখ্যা করেছেন এই বলে যে, তিনি স্বর্ণ ও রৌপ্যের কথা বলতে চেয়েছেন। আবূ উবাইদ বলেন, সম্ভবত তিনি জমি থেকে পাওয়া ফসলের যাকাত দেয়া সম্পর্কে এ কথা বলেছেন। কেননা মদিনাবাসিরা জমিকে ’মাল’ বলত্ ইবনে আব্বাস তা মনে করে থাকলে তাঁর এই হাদীসের কি অর্থ হতে পারে তা আমি বুঝি না।
সন্দেহ নেই, আবূ উবাইদ অর্থনীতির বিষয়ে একজন সুদক্ষ ইমাম। যাকাতের বিষয়ে তিনি খুব বেশী ইজতিহাদ করেছেন ও উত্তম মতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাঁর অনেক কথা আমরাও গ্রহণ করেছি। কিন্তু এক্ষেত্রে তাঁর মত দর্বল বলে মনে হয়। ‍কেননা জাতির মনীষীবৃন্দের কথা থেকে যা সহজে বোঝা যায়, তিনি তার বিপরীত মত দিয়েছেন। আবূ উবাইদের পুর্বের মনীষীগণ যা বুঝেছেন সেই মতেরও বিরোধিতা তিনি করেছেন। কেননা তিনি যা বলেছেন তা সত্য হলে বলতে হবে, ইবনে আব্বানের কথায় এমন কিছু নতুনত্ব নেই, যার দরুন তিনি বিশেষত্বের দাবি করতে পারেন এবং তা বর্ণনার যোগ্য হতে পারে।
সর্বোপরি, কথার বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ বঞ্ছনীয়, তার কোন রকম ব্যাখ্যায় যাওয়া উচিত নয়। তবে বাহ্যিক অ্থ গ্রহণে কোন প্রতিবন্ধক থাকলে ভিন্ন কথা। কিন্তু এখানে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণে তেমন কোন প্রতিবন্ধক আছে কি? ……….. না, তা নেই।
প্রথমতঃ ইবনে আবাবস উম্মতের সর্বিক মতের বিপরীত কিছু বলেন নি। ইবনে মাসউদ এবং মু’আবিয়া প্রমুখ সাহাবীও সেই কথাই বলেছেন। পরবর্তীকালে উমর ইবনে আবদুল আযীয, হাসান ও জুহরী প্রমুখ সেই মতই দিয়েরেছন।
দ্বিতীয়তঃ যে সব ব্যাপারে অকাট্য কোন দলীল নেই, সে বিষয়ে মত প্রকাশ করতে মুজতাহিদ সাহাবীর পক্ষে ( কোন মত না দিয়ে) অন্য আলিমের অপেক্ষায় বসে থাকা জরুরী নয়। এমন নয় যে, অন্যরা কি বলেন তা জেনে নেয়ার পরই তিনি তাঁর রায় ও ইজতেহাদের কথা প্রকাশ করবেন। মতের সমর্থন পাওয়া গেলে বলবেন, নতুবা চুপ থাকবেন এমন কথাও হতে পারে না। কেননা প্রত্যেক ‍মুজতাহিদই ইজতিহাদী বিষয়ে স্বীয় মত স্বাধিনভাবে প্রকাশ করার দায়িত্ব তাঁর নেই।
তৃতীয়ত, কোন সাহাবী এককভাবে কোন মত প্রকাশ করলে তা কিছুমাত্র দূষণীয় নয়, আর আমাদের ফিকহী ওতিহ্যে তা অভিনবও কিছু নয়। হযরত ইবনে আব্বাস ‘মুতয়া’ সম্পর্কে একক মত পোষণ করেন, যা কোন সাহাবীই সমর্থন করেনে নি। পালিত গাধার গোশত খাওয়া সম্পর্কেও তিনি একক মত রাখেন। তাঁর এই মত অন্য সাহাবীর মতের অনুকূল নয় বলে তা প্রত্যাহারযোগ্য নয়।
আবু উবাইদ তাঁর ব্যাখ্যার উপর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নন। তিনি বলেছেন, এই ব্যাখ্যা যদি যথার্থ না হয়, তা হলে আমি জানি না তাঁর কথার অর্থ কি?
ইবনে মাসউদ
আবূ উবাইদ হুরায়রা ইবনে ইয়ারিম থেকে বর্ণনা করেছে, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) আমাদের ছোট জন্তুর মলত্যাগের স্থানে জায়গা দান করতেনম পরে তা থেকে যাকাত গ্রহণ করতেন।
আবূ উবাইদ এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, দানের পূর্বে যে যাকাত ফযে হয়েছিল, তিনি তা পনিয়েছেন, দানের পর ভবিষ্যতে যে যাকাত ধার্য হতে পারে না তা নয়।
আবূ উবাইদের এই ব্যাখ্যাও যথার্থ ও মনঃপূত নয়। বাহ্যত যা মনে হয়, এই ব্যখ্যায় তার বিপরীত কথা বলা হয়েছে। ইবনে মাসউদ থেকে অপর সূত্রে প্রাপ্ত সহীহ বর্ণনারও বিরোধিতা হয়েছে। দান থেকে যাকাত গ্রহণ বলতে তিনি কি বোঝাতে চেয়েছেন তাঁর বক্তব্যকে সঠিকরুপে প্রকাশ করেছে। হুরায়রা বর্ণনা করেছেন, ইবনে মাসউদ তাঁর দানসমুহের যাকাত দিতেন- প্রতি হাজারে পঁচিশ। ইবনে আবূ শায়বা ও তাবরানীও অনুরুপ বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। এই হুরায়রাই প্রথমোক্ত বর্ণনার বর্ণনাকারী। এই চূড়ান্ত কথা এ কালের কর-পারদর্শীদের কথা ’উৎসের উপর প্রতিবন্ধক’-এর সাথে তুলনীয়। দানের পূর্বে অন্যান্য মালের উপর যে যাকাত ফরয হয়েছিল তা গ্রহণ করার কথা এখানে নয়। ইবনে মাসউদ যদি অন্য মালের উপর ধার্য যাকাত দান থেকে রেখে দিতেন, তাহলে প্রতি হাজারে পঁচিশ নিশ্চয়ই ফরয ধার্য হত না, তার কমও হতে পারত, বেশীও হতে পারত। সম্ভবত আবূ উবাইদ এই শেষোক্ত বর্ণনাটি জানতে পারেন নি। সেই কারণেই তিনি এরুপ ব্যাখ্যাদানের কষ্ট স্বীকার করেছেন।
মু’আবিয়া
ইমাম মালিক তাঁর ’মুয়াত্তা’ গ্রন্থে ইবনে শিহাব থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। বলেছেন, মু’আবিয়া ইবনে আবূ সুফিয়ানই প্রথম ব্যক্তি, যিনি দান থেকে যাকাত গ্রহণ করেছেন। সম্ভবত তার অর্থ, খলীফাদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই কাজ করেছেন। তাঁর পূর্বে ইবনে মাসউদ তা গ্রহণ করেছেন: অথচ এই বর্ণনাকারী ইবনে মাসউদের কথা জানতেন না। কেননা তিনি ছিলেন কূফায়, আর ইবনে শিহাব অবস্থান করতেন মদীনায়।
সন্দেহ নেই, মুআবিয়া রাষ্ট্রের কর্তা হিসেবে দানসমূহ থেকে যাকাত রেখে দিতেন। তিনি তো খলীফা ও রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন। আর মুআবিয়ার শাসনামলে বিপুল সংখ্যক সাহাবী জীবিত ছিলেন। মু’আবিয়া ‍যদি শরীয়তের বিপরীত কোন কাজ করতেন কিংবা গণনাযোগ্য ইজমা লংঘন করতেন তাহলে তাঁরা নিশ্চয়ই চুপ থাকতেন না। এছাড়া অনেক ব্যাপারেই তাঁরা প্রতিবাদের আওয়াজ তুলেছেন। যখন তিনি ফিতরায় পাকাত বাবদ এক ছা’ অন্য জিনিসের বদলে অর্ধ ছা’ গম গ্রহণ করেছিলেন, তখন তার তীব্র প্রতিবাদ উঠেছিল। যেমন আবূ সায়ীদ খুদরী বর্ণিত হাদীস থেকে জানা যায়। কেননা রাসূলে করীম (সা) ধেতে প্রমাণিত কোন সুন্নাতের বিরোধিতা করার সাধ্য কারোরই ছিল না।
উমর ইবনে আবদুল আযীয
মুআবিয়ার পর প্রথম হিজরী শতকের মুজাদ্দিদ উমর ইবনে আবদুল আযীযের খিলাফত আমলে তিনি দানসমূহ, উপঢৌক, পুরস্কার ও জুলুমের প্রতিকার বাবদ দেয় ক্ষতিপূরণ ইত্যাদি থেকে যাকাত গ্রহণ করতেন।
আবূ উবাইদ উল্লেখ করেছেন, তিনি যখন কোন লোককে তার কাজের মজুরী দিতেন, তখন তিনি তার যাকাত রেখে দিতেন। কোন জুলুমের প্রতিকার বাবদ অর্থ দিলে, তা থেকেও তার যাকাত নিয়ে নিতেন। তাঁর সঙ্গীদের কোন পুস্কার দিলেও তা থেকে তার যাকাত উসূল করে রাখতেন। কেননা যে লোক এগুলো পেত, তা তার একটি নতুন উপার্জন হত।
ইবনে আবূ শায়বা বর্ণনা করেছেনম উমর ইবনে আবদুল আযযি দান ও পুরস্কারের যাকাত দিতেন। হযরতউমরের নীতিও ছিল তাই। একালের সরকারগুলোও এই পর্যায়ের অর্জনের উপর কর ধার্য করে থাকে।
অন্যান্য তাবেয়ী ফিকাহবীদ
জুহরী থেকে বর্ণিত, অর্জিত মাল হস্তগত হওয়ার সময়ই তার যাকাত দিতে হবে। হাসান ও মবহুলও তাই বলেছেন বলে ইবনে হাজম উল্লেখ কলেছেন। আওযায়ীও তা সমর্থন করেছেন। শুধু তাই নয়, আহমদ ইবনে হাম্বল থেকেও এই মত বর্ণিত হয়েছে। পূর্ববর্তী অধ্যায়ে আমরা উল্লেখ করেছিঃ যে লোক তার ঘর ভাড়ায় দিয়েছে এবং তার কেরায়া হাতে পেয়েছে সে যেন তার যাকাত তখনই দিয়ে দেয়।
ইমাম বাকের, সাদেক, নাসের ও দাউদের মত
নাসের, সাদেক, বাকের প্রমূখ নবী বংশের ফিকাহবিদগণও এই মত প্রকাশ করেছেন। দাউদও বলেছেনঃ যে লোক নিসাব পরিমাণ মাল অর্জন করল, তার কর্তব্য তাৎক্ষনিকভাবে তার যাকাত আদায় করে দেয়া।
এই সকল দলীল হচ্ছে, যাকাত ফরযকারী দলীলসমূহের সাধারণ তাৎপর্য। যেমন নবী করীম (সা) এর কথাঃ নগদ (রৌপ্য) সম্পদের এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ দেয়।
এই আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, অর্জিত সম্পদে একটি বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয়। তা হচ্ছে দুইবার যাকাত দেয়ার সময়ের। আর তা একবছর পূর্তির পর। নবী করীম (সা) এবং তাঁর নিয়োজিত যাকাত আদায়কারীরা বছর শেষ হওয়ার পর তা গ্রহণ করতেন। কিন্তু উপার্জিত মাল সম্পর্কে তাতে কিছু বলা হয়নি, যা বছরের প্রথমেই পাওয়া যাচ্ছে।
অর্জিত মাল সম্পর্কে চার মাযহাবের মতপার্থক্য
অর্জিত মাল পর্যায়ে চার মাযহাবের মত এক নয়। পারস্পারিক পার্থক্যটা গভীর। ইবনে হাজম তাঁর ’আল-মুহাল্লা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেনঃ ইমাম আবূ হানীফ বলেছেন, অর্জিত মালের মালিকের হাতে একটি বছর অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তার যাকাত দেবে না। তবে তার কাছে অনুরুপ জাতীয় মাল থাকলে বছর শুরু হতেই যাকাত দেয়া কর্তব্য হবে- আবশ্য যদি নিসাব পূর্ণ হয়। কেননা সে যদি তার পরের বছর পূর্ণ হওয়ার এক ঘন্টা পূর্বেও অর্জন করে তার নিজস্ব মালের অনুরুপ জাতীয় মাল, -তার পরিমাণ কম হোক, কি বেশী- তহলে সেই আসল মালের সঙ্গে তা একত্রিত করে যাকাত দেবে। তার কাছে স্বর্ণ-রৌপ্য, গবাদিপশু ও ওদের বাচ্চা-যাই হোক।
ইমাম মালিক বলেছেন, অর্জিত মাল এক বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বে তার যাকাত দেবে না। তার কাছে যাকাত ফরয হওয়া জাতীয় মাল থাক আর না থাক। তবে গবাদিপশুর কথা আলাদা। কেননা কেউ যদি এই জাতীয় কিছু পায়- এগুলোর বাচ্চা ছাড়া, তাহলে তার কাছে অবস্থিত গবাদিপশুর যদি নিসাব থাকে, তবে বছরান্তে সমস্ত মালের যাকাত একসাথে দেবে। আর নিসাব পরিমাণের কম হলে তাতে যাকাত হবে না। গবাদিপশুর বাচ্চা পাওয়া গেলে মার বছর পূর্তির সময় সবগুলোর যাকাত এক সাথে দেবে।
ইমাম শাফেয়ী বলেছেন, অর্জিত মালের যাকাত দেবে একটি বছর পূর্ণ হওয়ার পর। যদি এই মালের অর্জনকারীর কাছে সেই জাতীয় মালের নিসাব বর্তমান থাকে। গবাদিপশুর বাচ্চাদের তাদের মায়েদের সঙ্গে ধরা হবে না, যদি মায়েদের সংখ্যা নিসাব পরিমাণ হয়। অন্যথায় ধরা হবে।
ইবনে হাজম খুব তীব্র ও অপছন্দনীয় ভাষায় এই কথার সমালোচনা করেছেন। বলেচেন, এসব কথাই বাতিল। বড় কথা, এগুলো অভিন্ন নয়, নিছক দাবি ও পরস্পর বিরোধি উক্তি মাত্র। এর কোন একটি কথার সত্যতার পক্ষে কোন দলীলই নেই- না কুরআন থেকে; না হাদীস থেকে কিছু পেশ করা সম্ভব হয়েছে-কোন দোষমুক্ত বর্ণনাও তুলে ধরা যায়ন। কোন ইজমা বা কিয়াসেরও উল্লেখ করা হয় নি।
ইবনে হাজম এসব গ্রহণযোগ্য বণ্টনের বিকল্প হিসাবে বলেছেনঃ সর্বপ্রকার মালেরই এক বছর অতিবাহিত হওয়ার শর্ত- তা অর্জিত হোক বা অনর্জিত। এমনকি গবাদিপশুর বাচ্চা পর্যন্ত। কিন্তু এ বলায় তিনি তাঁর সাথী দাউদ জাহিরীরও বিরোধিতা করেছেন। কেননা তিনি তো এসব বণ্টন নীতি থেকে বের হয়ে সর্বপ্রকার অর্জিত মালে যাকাত ধরেছেন বছর অতীত হওয়ার শর্ত ছাড়াই।
অর্জিত মাল হস্তগত করার সাথে সারেথ যাকাত দিতে হবে
পূর্বোক্ত মতসমূহের ও এসবের পক্ষের দলীলাদির তুলনামুলক আলোচনার পর- বিভিন্ন প্রকারের মালের যাকাত সম্পর্কিত বিধি-বিধান পর্যায়ে পওয়া দলীলসমূহ সামনে রেখে- যাকাতের বিধান নির্দিষ্ট করার যৌক্তিকতা ও লক্ষ্যকে বিবেচনা করে বলতে হচ্ছে, মাসিক নিয়মিত বেতন কর্মচারীর মজুরী, চিকিৎসাক, ইঞ্জিনিয়ার ও উকিল প্রভূতি স্বাধিন শ্রমজীবীদের অর্জিত সম্পদের উপর যাকাত ফরয হওয়ার জন্যে একটি বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয়; বরং মাল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্ঘেই যাকাত দিয়ে দিতে হবে। গাড়ি, নৌকা, লঞ্চ, জাহাজ, প্রেস, হোটেল ও খেলা-আমাশার(Amusments.) ঘর-বাড়ি ইত্যাদি অ-ব্যবসায়ী ক্ষেত্রে ‍নিয়োজিত মূলধনের যাকাতও এমনিভাবে আদায় করতে হবে।
এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাদের মত সুস্পষ্ট করে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে আমরা নিম্নলিখিত কথাগুলো পেশ করছি, তা থেকে আমাদের মতের সমর্থক দলীলসমূহের প্রেক্ষিতে অধিকতর স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
১. সর্ব প্রকারের মালে, এমনকি অর্জিত মালেও, যাকাত ফরয হওয়ার জন্যে একটি বছর অতিবাহিত হওয়ার শর্ত কোন সহীহ দ্বারা প্রমাণিত নয়। উম্মতের জন্যে সম্বলিত দলীলসমূহ এ মতকে বলিষ্ঠ করেছে। হাদীসবিদগণ এ কথা স্পষ্ট করে বলেছেন এবং কোন কোন সাহাবীর কথায়ও তা সহীহ প্রমাণিত হয়েছে।
২. সাহাবী ও তাবেয়ীন অর্জিত মাল সম্পর্কে বিভিন্ন মত দিয়েছিন। কেউ কেউ এক বছর অতিবাহিত হওয়ার শর্ত করেছেন, কেউবা করেন নি। তাঁরা পাওয়ার সাথেসাথেই তার যাকাত দিয়ে দেয়ার কথা বলেছেন। তাঁদের এই মতপার্থক্যের কারণে কারোর মত অন্যদের মত থেকে উত্তম বলা যায় না। তাই ইসলামের সাধারণ মৌলনীতির প্রতি লক্ষে রেখে অন্য দলীলের ভিত্তিতে বিষয়টি সম্পর্কে মীমাংসা গ্রহণ করতে হবে। যেমন আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, ’তোমরা কোন বিষয়ে মতদ্বৈততায় পড়ে গেলে বিষয়টিকে আল্রাহ্ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও। ’
৩. অর্জিত মাল পর্যায়ে কোন নস বা অকাট্য দলীল কিংবা কোন ইজমা বর্তমান না থাকার কারণেই চারটি মাযহাবের মধ্যে চরম মতপার্থক্যের সৃষ্টি হয়েছে; যার দরুন ইমাম ইবনে হাজম ও কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন যে, তাদের ওসব কথা ভিত্তিহীন, মৌখিক দাবি এবং পরস্পর বিরোধী বিপর্যস্ত বণ্টন মাত্র। তার কোন একটি মতের সমর্থনে কোন দলীল নেই- না ‍কুরআন থেকে, না হাদীস বা সন্নাতে থেকে, এমনকি একটা দর্বল দোষযুক্ত বর্ণনাও নেই, কোন ইজমা নেই, কিয়াসও নেই, উল্লেখযোগ্য কোন রায়ও তার পক্ষে পাওয়া যায় না।
এ ক্ষেত্রে মাযহাবগুলোর মধ্যে যে মতপার্থক্য হয়েছে, বিভিন্ন উক্তি করা হয়েছে, তা প্রতিটি মাযহাবের অভ্রন্তরীণ ব্যাপার। প্রতিটিরই সহীহ হওয়ার ও অগ্রাধিকার পাওয়ার অধিকার বয়েছে- আমি নিপে চিন্তা করে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি। এর উপর ভিত্তিশীল বহু মাসয়ালা ও শাখা-প্রশাখা পর্যায়ের মতও পাওয়া গেছে, যা অর্জিত মালের সাথে সম্পর্ক যুক্ত; তারই বিভিন্ন প্রকার, বিভিন্ন রকম। তার কাছে যা আছে তা অর্জিত মালের সাথে একত্রিত করে হিসাব করা হবে, তা একত্রিত না করে কিংবা কতক একত্রিত করা হবে, কতক নয়, – নিসাব গণনায় মিলানো হবে, না বছর গণনায়, দ না এ দুটোতেই- এ পর্যায়ের সব মাসয়ালা। গবাদিপশুর যাকাতে এসব বিষয়ের আলোচনা তোলা হবে, তোলা হবে নগদ সম্পদের যাকাতেও, ব্যবসায় পণ্যের যাকাতে ও এসব অন্যান্য শাখা- প্রশাখায়। আমি মনে করি, যে মহান সহজ শরীয়াত জনগণের জন্যে অবতীর্ণ হয়েছে, তা এসব কঠিন ও দুরুহ খুঁটিনাটি বিষয়ের অবতারণা করবে এাটি সর্বসাধারণের উপর ধার্য ফরযের ব্যাপারে, তা কল্পনা্ও করা যায় না।
৪. অর্জিত মালে যাঁরা এক বছর অতিবাহিত হওয়ার শর্ত আরোপ করেন নি, সাধারণ দলীলের দৃষ্টিতে তাঁদের মত অধিক গ্রহণীয়- তাঁদের তুলনায়, যাঁরা এক বছরের শর্ত আরোপ করেছন। কেননা কুরআন ও সুন্নাতে এ পর্যায়ের সব দলীলই সর্বপ্রকার শর্তমুক্ত। যেমন, তোমাদের মালের এক দশমাংশের এক চতুর্থাংশ দাও। নগদ সম্পদে এক-দশমাংশের এক চতুর্থাংশ দিতে হবে। যেমন আল্লাহ তা’আলা সাধারণভাবে ও কোনরুপ শর্ত ছাড়াই বলেছেনঃ হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা তোমাদের পবিত্র উপার্জন থেকে ব্যয় কর(যাকাত দাও)।
তোমাদের উপার্জন একটি সাধারণ কথা, সর্বপ্রকার উপার্জনই তার মধ্যে পড়ে, তা ব্যবসায়ে পাওয়া হোক, মাসিক বেতস হিসেবে পাওয়া হোক কিংবা হোক মজুরী হিসেবে। ফিকাহবিদগণ এ কথাকে দলীল বানিয়েছেন ব্যবসায়ের যাকাতের উপর। তা হলো শ্রম, পেশা ও কাজের ফলে উপার্জিত সম্পদের উপর তা প্রয়োগ করা হলে কেন তা গ্রহণীয় হবে না? আর ব্যবসাযের যাকাতে ফিকাহবিদগণ যখন এক বছরের শর্ত আরোপ করেছেন, তখনই তাই বর্তমানের আসল ও তা অর্জিত মুনাফার মধ্যে পার্থক্য স্থাপন করে। কেননা প্রতিদিন পাওয়া যায়, কখনো ঘণ্টায় ঘণ্টায়। কিন্তু মাসিক নির্দিষ্ট বেতন তা নয়। তা আসে পরিমিত ও স্বতন্ত্রভাবে।
৫. অর্জিত মালের যাকাতের এক বছরের শর্ত না করা যখন সাধারণ দলীল-ভিত্তিক কথা, তখন সহীহ্ কিয়াস এ সত্যও উদঘাটিত করে যে, নগদ সম্পদ যখনই পাওয়া যাবে, তখনই তার যাকাত দিতে হবে। যেমন ফসল ও ফলে ঠিক কাটার সময়ই যাকাত ফরয হয়ে যায়। আমরা যখন ফল ও ফসলের ওশর বা অর্ধ ওশর- ভাড়ায় লওয়া জমির হলেও গ্রহণ করি তা কাটার সাথে সাথে, তখন মাসিক বেতন বা ডাক্তার উকিলের আয় থেকে এক দশমাংশেরেএক চতুর্থাংশ সাথে সাথে গ্রহণ করব না কেন? অথচ আল্লাহ তা’আলা মুসলিম ব্যক্তির উপার্জন ও জমি থেকে পাওয়া ফসল থেকে ব্যয় করার কথা একই সাথে- দুটিকে পাশাপাশি রেখে বলেছেন। এ দুটির মধ্যে আমরা পার্থক্য করতে পারি কোন অধিকারে, যখন আল্লাহ্ নিজেই এ দুটি একসাথে উল্লেখ করেছেন? এ দুটিই তো আল্লাহর দেয়া রিযিক?
এ কথা সত্য যে, ফসল উৎপাদনে ও ফল বের করণে আল্লাহর নিয়ামত অধিকতর স্পষ্ট ও প্রকট। তার শোকরও অধিক কর্তব্য। কিন্তু তার দরুন এই প্রকারের আয়েংর মালের মধ্যে একটি থেকে সাথে সাথে যাকাত গ্রহণ ও অপরটিকে এক বছরের জন্যে মাফ রে দেয়ার কি যুক্তি থাকতে পারে? শরীয়াত নিজেই যতটুকু পার্থক্য করেছে- জমির উৎপাদনে ওশর বা অর্ধ- ওশর ধার্য করেছে, আর উপার্জিত নগদ সম্পদে এ-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ ধার্য করেছে- এতটুকু পার্থক্যই কি যথেষ্ট নয়?
৬. অর্জিত মালের ফরয হওয়ার জন্যে একটি বছর অতিবাহিত হওয়ার শর্ত করার অর্থ, বড় বড় বেতনভুক্ত ও স্বাধীন শ্রমজীবীদের তাদের আয়ের উপর যাকাত ধার্যকরণ থেকে নিস্কৃতি দেন। কেননা তারা হয় এমন ব্যক্তি হবে, যে যা কিছু আয় করে তা বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুনঃ বিনিয়োগ করবে, না হয় এমন ব্যক্তি হবে, যে যা কিছু অর্জন করে তা বিপুল ও বেহুদাভাবে ব্যয় করে নিজেদের আরাম-আয়েশের মাত্রা অনেক গুণ বৃদ্ধি করবে – ডানে ও বাঁয়ে যদৃচ্ছভাবে টাকা ওড়াবে। তার উপর একটি বছর অতিবাহিত হতে দেবে না। আর তার অর্থ যাকাতের চাপ কেবলমাত্র মধ্যম নীতির ও বুঝে-শুনে ব্যয় বিনিয়োগকারীদের উপর বর্তাবে। তারাই তাদের উপার্জন থেকে সঞ্চয় করবে ও একটি বছর পর্যন্ত তা ধারণ করে থাকবে। ইসলামী শরীয়াতে সুবিচারক তা বেহুদা ব্যয়কারীদের অবাধ সুযোগ দেবে ও মধ্যম নীতি অনুসারীদের উপরই কেবল যাকাত দেয়ার দায়িত্ব চাপাবে, তা কিছুতেই কল্পনা করা যায় না।
৭. অর্জিত মাল সম্পদে একটি বছর অতীত হওয়ার শর্ত নির্ধারণ করা একটি সুস্পষ্ট স্ববিরোধের সৃষ্টি করে, যাতে যাকাত ফরযকরণে ইসলামের সুবিচার নীতি ও যৌক্তিকতা অস্বীকৃত হয়ে পড়ে। কেননা যে কৃষক চাষ করে, ভাড়ায় জমি নিয়ে ফসল ফলায়, তার কাছ থেকে তো যাকাত – ওশর বা অর্ধ ওশর – নেয়া হবে নিসাব পরিমাণ হলেই, শুধু ফসল কাটারই অপেক্ষা থাকবে, কিন্তু জমির মালিক, যে জমি ভাড়ায় দিয়ে একঘণ্টা সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ নগদ সম্পদ হস্তগত করে, তার কাছ থেকে কিছুই নেয়া হবে না- কেননা তার উপর একটি বছর অতিবাহিত হওয়ার শর্ত করা হয়েছে। যা খুব কমই ঘটে থাকে। চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, আইনজীবী ও যানবাহনের মালিক, হোটের পরিচালক- এরা যাকাত দেয়া থেকে একটি বছর পর্যন্ত রেহাই পেয়ে যাবে, তা হতে পারে না। এরুপ অবস্থার সৃষ্টি হয় শুধু কিছু সংখ্যক ফিকাহবিদের মত রক্ষা করার জন্যে, কিছু সংখ্যক আলিমের ইজতিহাদের মর্যাদা রক্ষার জন্যে। অথচ তাদের কথা গ্রহণ করা যেমন, তেমনি আগ্রাহ্যও করা হতে পারে। তাঁরা যদি আধুনিক যুগকে দেখতেহ পেতেন, তাহলে নিজেরাই তাঁদের এই অসঙ্গতিপূর্ণ ইজতিহাদ বদলে দিতেন, ইমামগণের ন্যায়ানুগত্য থেকে তা আমরা বুঝতে পারি।
৮. অর্জিত মাল-সম্পদের যাকাত অর্জিত হওয়ার সাথে সাথেই তা দিয়ে দিতে হবে। মাসিক নিয়মের বেতন, মজুরী এবং ব্যবসা ছাড়া অন্যান্য মূলধন থেকে প্রাপ্ত সম্পদও এর মধ্যে পড়বে। আর স্বাধীন পেশাধারীদের আয়টা গরীব-মিসকীন- যারা যাকাত পায়- তাদের জন্যে অধিক কল্যাণকর। এর ফলে বায়তুলমালে খুব বেশী পরিমাণ আয় জমা হতে পারে। অথচ সরকারের পক্ষে তা লাভ করতে কোন কষ্ট বা অসুবিধা হয়না। প্রাপক ব্যক্তিরও কোন কষ্ট হয় না সাথে সাথে যাকাত দিয়ে দিতে। মাসিক বেতনধারী সরকারী ও ফাউন্ডেশনসমূহের কর্মচারীরও এ অন্তর্ভুক্ত। এ কালের কর- পারদর্শীরা তার নাম দিয়েছে ’উৎসের উপর প্রতিবন্ধকত সৃষ্টি। ’ যেমন ইবনে মাসউদ, মু’আবিয়া ‍ও উমর ইবনে আবদুল আযীয প্রমুখ দান করার সময়ই সেই দান থেকে প্রাপ্য যাকাতটা নিয়ে নিতেন, এও ঠিক তেমনি।
ইবনে আবূ শায়বা হুরায়রা থেকে ঘোষনা করেছেনঃ ইবনে মাসউদ তাঁর দানসমূহের যাকাত নিতেন প্রতি হাজারে পঁচিশ হিসাবে। আউন ও মুহাম্মদ থেকে বর্ণিত, তাঁরা বলেছেনঃ আমি দেখেছি, শাসক – রাষ্ট্রপ্রধানগণ যখন কোন দান করতেন তখন তা থেকেই তার যাকাত নিয়ে নিতেন।
উমর ইবনে আবদুল আযীয প্রদত্ত দান ও পুরস্কারের যাকাত সাথে সাথে নিয়ে নিতেন।
ইমাম মালেক ইবনে শিহাব থেকে বর্ণনা করেছেন, দানসমূয়হ থেকে সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি যাকাত দিয়েছিলেন, তিনি হলেন, মু’আবিয়া বিন আবূ সুফিয়ান। একথা বলার উদ্দেশ্য সম্ভবত এই যে, খলীফাগণের মধ্যে এই ব্যাপারে তিনিই সর্বপ্রথম ব্যক্তি। কেননা তাঁর পূর্বে হযরত আবুদল্লাহ ইবনে মাসউদ এ কাজ করেছেন; কিন্তু তিনি খলীফা ছিলেন না।
৯. অর্জিত সম্পদে যাকাত ফরযকরণে ইসলামের গভীর পরোপকার ইচ্ছা, সহানুভূতি ও দানশীলতার ভাবধারার প্রতি গুরুত্ব আরোপিত হয়েছে, মুসলিমের মন-মানসে এ ভাবধারা ব্যাপকভাবে জেগে ওঠে। প্রত্যেক সামষ্টিক ভাব ধারায় উদ্ধুদ্ধ হয়, ব্যক্তি হয় সমষ্টির জন্যে ত্যাগ স্বীকারকারী, সমাজের বোঝা বহনে হয় অংশীদার্। এ একটা স্থায়ী গুণ-মর্যাদা বিশেষ। ব্যক্তিত্বের মৌল উপাদানসমূহের মধ্যে এ একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আল্লাহ্ তা’আলা মুত্তাকী লোকদের গুণ-পরিচিতি বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেনঃ
ومما رزقنا هم ينفقون
আমরা তাদের যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে।
বলেছেনঃ
ياايها الذين امنوا مما رزقناكم-
হে ঈমানদার লোকেরা! আমরা তোমাদের যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে তোমরা ব্যয় কর—(যাকাত দাও)।
এই কারণে নবী করীম (সা) প্রত্যেক মুসলিমের তার মাল – উপার্জন, কাজ-শ্রম ও অন্যান্য উপায়ে প্রাপ্ত সম্পদ থেকে যাকাত দেয়া কর্তব্য বলে ঘোষণা করেছেন।
বুখারী আবূ মুসা আল আশ’আরীর বর্ণন উদ্ধৃত করেছেন। নবী করীম (সা) বলেছেনঃ علي كل مسلم صدقة ‘প্রত্যেক মুসলিমকেই যাকাত দিতে হবে’। লোকেরা জিজ্ঞেস করলেন; হে আল্লাহর রাসূল! যার কিছুই নেই সে কোথাথেক যাকাত দেবে? বললেনঃ
ليحمل بيده فيسه ويتصدق-
সে নিজ হাতে কাজ করবে, শ্রম করবে, তার আয়ে নিজেকে উপকৃত করবে এবং অন্যদের দান করবে।
সাহাবীরা বললেন, শ্রম ও কাজ করেও যদি কিছু না পায়? বললেনঃ
يعين ذالحاجة الملهوف
সে ঠেকায় পড়া কষ্ট ও দুঃখে পাওয়া মানুষের সাহায্য করবে। সাহাবীরা আবার প্রশ্ন করলেনঃ তাও যদি না পারে- সে সামর্থও যদি না থাকে? রাসূল বললেনঃ
فليعمل بالمروف وليمسك عن الشرفانها له صدقة
তাহলে সে নিজে নেক আমল করবে, অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকবে। আর এটাই হবে তার বড় দান।
ওসব নিত্য নব আমদানীকে ফরয যাকাত থেকে নিস্কৃতি দেয়া ও একটি বছর অতিবাহিত হওয়ার অপেক্ষায় থাকা এমন অবস্থার সৃষ্টি করবে যে, বহু লোক বিপুল উপার্জন করবে, ব্যয় বরবে না, তাদের প্রতি সহানুভূতিও জানাবে না- যারা আল্লাহর এই নিয়মিত থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছে এবং অনুরুপ উপার্জনে সক্ষম নয়।
১০. অর্জিত মাল-সম্পদের যাকাত দিতে একটি বছর অপেক্ষা করার শর্ত না থাবলে যাকাতের সম্পদ নিয়ন্ত্রন ও সুশৃঙ্খল বণ্টন খুব সুন্দরভাবে সম্পন্ন হতে পারে। যাদের যাকাত দিতে হবে, এটা তাদের পক্ষে খুব ভাল ব্যবস্থা। আর যাকাত সংগ্রহের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের পক্ষেও এটা খুব সহজসাধ্য কাজ হয়। কেননা যে-ই তা পাবে, কম বা বেশী, মাসিক বেতন হিসেবে, ক্ষতিপূরণ হিসেবে বা জমির আয় হিসেবে- যে প্রকারেই হোক-না-কেন- তাকে প্রতি বছর একটি তারিখ নির্দিষ্ট করে রাখতে হবে। যখনই বছরান্তে সেই নির্দিষ্ট তারিখটি উপস্থিত হবে, তখনই তাকে যাকাত দিয়ে দিতে হবে। তার অর্থ এই হবে যে, প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তিকে এক বছর দশ – পনেরোটি তারিখ নির্দিষ্ট করে রাখতে হবে যখন অর্জিত মালের বছর পূর্তির পর যাকাত দিতে হবে। বস্তুত এ একটা কঠিন কাজ। যাকাত আদায়কারী সরকারের পক্ষেও তা খবই কষ্টকর ও দুঃসাধ্য হবে। কেননা প্রতিটি ব্যক্তির এরূপ অসংখ্য নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক রাখা সম্ভব হবে না, ফলে যাকাত সংগ্রহ করাটাই স্থগিত রাখা ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না।
এ কালের বিশেষজ্ঞদের অভিমত
এ পর্যায়ে খু্বই ইনসাফের কথা হবে যদি আমরা এখানে একালের প্রখ্যাত চিন্তাবিদ শায়খ মুহাম্মদ আল- গাযালী তাঁর الاسلام والاوضاع الاقتصاديه- নামের গ্রন্থে যা লিখেছেন তার উল্লেখ করি। তিনি লিখেছেন, ইসলামে যাকাত ফরয করার মৌল নীতি হচ্ছে, হয় শুধু মূলধন গণ্য করা হবে- কম হোক বেশী হোক; কিংবা নিজ অবস্থায়ই দাঁড়িয়ে থাকা। যতক্ষণ পর্যন্ত একটি বছর তার উপর দিয়ে অতিবাহিত না হচ্ছে, ততক্ষণে তার উপর যাকাত ফরয হবে না। এ হচ্ছে ব্যবসা পণ্যের ও নগদ সম্পদের যাকাত দেয়ার নিয়ম। তাতে এক দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ দেয়া ফরয। অথবা আয়ের পরিমাণটা গণ্য করা হবে মূলধনের প্রতি নজর না দিয়ে। যেমন কৃষি ফসল ও ফল। তাতে ওশর বা অর্ধ ওশর ধার্য হয়। অতঃপর বলেছেনঃ এ থেকে আমরা এই নির্যাস লাভ করতে পারি যে, যার কোন আমদানী আছে; যা যাকাত ফরয হয় এমন কৃষকের আমদানীর চেয়ে কম হয় না, সে সমমানের যাকাত দেবে। মূলধনের পরিমাণের কোন গুরুত্ব নেই, তার শর্তও কিছু নেই।
অতএব চিকিৎসক, আইনজীবী, প্রকৌশলী, শিল্পী, কারিগর ও বিভিন্ন ধরনের পেশাদার, বেতনভুক্ত ও তাদের মত আর যাদের উপর যাকাত ফরয হয়, তাদের যাকাত ডিদতে হবে তাদের বড় বড় আমদানী থেকে! এ কথার দুটি দলীল আমার কাছে রয়েছে।
প্রথমঃ কুরআন মজীদের যাকাত সংক্রান্ত সমস্ত নির্দেশের সাধারণ প্রযোজ্য আয়াতঃ হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা যে পবিত্র উপার্জন কর, তা থেকে ব্যয় কর (যাকাত দাও)। উল্লিখিত গোষ্ঠীসমূহের উপার্জন নিশ্চয়ই পবিত্র। আতএব তা থেকে ব্যয় করা, যাকাত দেয়া অবশ্যক কর্তব্য। এরূপ ব্যয় করেই এরসব লোক তাদের মধ্যে গণ্য হতে পারে, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেছেনঃ
الذين يؤمنون بالغيب ويقيمون الصلوة ومم رزقنا هم ينفقون
যারা গায়বের প্রতি ঈমান রাখে, নামায কায়েম করে এবং আমরা তাদের যা রিযিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।
দ্বিতীয় দলীলঃ যে কৃষক পাঁচ কাঠা পডিরমাণ জমিরও মালিক নয়, সে ‍যদি ইজারা নিয়ে জমি চাষ করে, তাহলে তার উপরও যাকাত(ওশর) ধার্য হবে না, যে ডাক্তার রোগী দেখে একদিনে একজন কৃষকের সারাবছরের খাটুনীর বিনিময়ে পাওয়া সম্পদেরও অনেক বেশী আয় করে, তার উপর যাকাত ধার্য হবে না, ইসলামের ন্যায়বাদী বিধান সম্পর্কে তা কল্পনাও করা যায় না।
কাজেই এ সবের উপরও যাকাত ধার্য হওয়া একান্তই আবশ্যুকি। সমান ও সাধারণ কারণ যতক্ষণ থাকবে-যার ভিত্তিতে শরীয়াত হুকুম সাব্যস্থ হয়, ততক্ষণ এই ধারণাকে অগ্রাহ্য করা এবং এর ফলশ্রুতিকে স্বীকার না করা খুবই মারাত্মক ভুল।
যদি বলা হয়, কি করে অর্জিত সম্পদের উপর যাকাত ধার্য করা হবে এবং কোন হারে ধার্য করা হবে, তাহলে তার সহজ জবাব হচ্ছে, শরীয়ত ফল-ফসলের যাকাত ওশর বা অর্ধ ওশর ধার্য করেছে। জমির ফসলের কৃষকের উৎপাদনের পরিমাণের ভিত্তিতে যাকাত ধার্য হবে। অতএব প্রত্যেক কর্মীর উৎপাদন হিসাবে সর্বপ্রকারের আমদানীর উপর যাকাত ধার্য হবে।
এ কথার বিস্তারিত বিবরণ খঁটিনাটি মাসয়ালার সিদ্ধান্ত উল্লেখ করা যেতে পারে এবং মূল্য নির্ধারণ করাও সম্ভব। কিন্তু তা উপরিউক্ত মৌলনীতি স্বকার কবে নেয়ার পর। অবশ্যক তা এক ব্যক্তির একক চিন্তার উপর ভিত্তি করলে হবে না; সে জন্যে আলিমগণের সহযোগিতাপূর্ণ সমবেত প্রচেষ্টা (ইজতিহাদ) একান্ত আবশ্যক।
বস্তুত এ এক উত্তম কথা, ইসলামের মৌল ও ভিত্তিগত নীতি-আদর্শের গভীর উপলব্ধি নিঃসৃত। আর যে যুক্তি দুটির উল্লেখ হয়েছে, তা ও নিখুঁত।
তবে এখানে যে পদ্ধতি অনূসৃত হয়েছে, তা চিন্তাবিদ আল গাযালীর প্রদর্শিত। তাতে ইজমার বিরোধিতা করা হয়নি। এ মত সাহাবী, তাবেয়ী ও পরবর্তী ফিকাহবিদদেরও অবলম্বিত।
এই মতে চারটি প্রখ্যাত মাযহাবেরই রায়ের পরিপন্থী পথ অবলম্বিত হয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এ মত আল্লাহ ও রাসূলের কাছ থেকে পাওয়া এবং মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ফিকাহবিদদের উপস্থাপিত কোন দলীলের পরিপন্থী নয়। তাঁরা তো অন্ধভাবে তাঁদের অনুসরণ করতে বলেন নি, তাঁদের ইজতিহাদের বিপরীত মত পোষণ করা যে হারাম, তাও তাঁরা বলেন নি। বরঞ্চ তাঁরা অন্ধভাবে নির্বিচারে তাঁদের কথা মেনে নিতে স্পষ্ট ভাষায় নিষেধ করেছেন। এ কথা কারোরই অজানা নেই।
দ্বিতীয় আলোচনা
কাজ ও স্বাধীন পেশার বিনিময়ে পাওয়া সম্পদের নিসাব
এ কথা সর্বজনবিদিত যে, ইসলাম সকল মালের উপর যাকাত ধার্য করেনি; পরিমাণ তার কম হোক কি বেশী। যে মালের পরিমাণ সর্বপ্রকার ঝণ ও মৌল প্রয়োজন বাদ দিয়ে নিসাব মাত্রা পর্যন্ত পৌছবে কেবল তারই উপর যাকাত ফরয করা হয়েছে। নিসাবের এই শর্ত করা হয়েছে এ উদ্দেশ্যে, তার ধনাঢ্যতা যেন প্রকট হয় যার উপর যাকাত ফরয হয়ে থাকে। কেননা যাকাত তো কেবল ধনীদের কাছে থেকেই গ্রহণ করা হয়, আর প্রয়োজনাতিরিক্ততা’ও যেন স্পষ্ট হয়। কেননা ত-ই হচ্ছে যাকাত ধার্য হওয়ার ক্ষেত্র। কুরআন মজীদে বলাক হয়েছেঃ
ويساءلونك ماذا ينفقيون- قل العفو-
হে নবী! লোকেরা তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে, তারা কি পরিমাণ ব্যয় করবে। তুমি বলে দাও যা মৌল প্রয়োজনের অতিরিক্ত।
নবী করীম (সা) বলেছেনঃ
لا صدقة الا عن ظهر غناي
যাকাত শুধু ধনাঢ্যতার উপরই ধার্য হয়।
যে সব মালের উপর যাকাত ধার্য হয় সেই প্রসঙ্গের আলোচনায় আমরা এ পর্যায়ে বিস্তারিত কথা বলে এসেছি। আর যাকাত যখন নিসাব ছাড়া ফরয হয় না, তখন নিসাবের পরিমাণ কি, তা নির্ধারিতব্য।
চিন্তাবিদ আল-গাযালী তাঁর পূর্বোদ্ধৃত কথায় কৃষিফসল ও ফলের নিসাব অনুযায়ী এই জিনিসেরও নিসাব নির্ধারণের প্রতি ঝোঁক প্রকাশ করেছেন। কৃষকের যতটা আমদানীতে যাকাত দিতেহ হয়, তার চাইতে কম আমদানী না হলে এ পেশাদারদের থেকে যাকাত নেয়া হবে। ফিকাহর ভাষায় তার অর্থ দ্বাড়ায়, যার আমদানী পরিমাণ পাঁচ অসাকের মূল্যের সমান (মিসরীয় ৫০কিলো) অথবা ৬৫৩ কিলোগ্রাম ওজন সমান জমির ফসল-গম ইত্যাদি হলে তার কাছ থেকে যাকাত নেয়া হবে। এই মতের একটি গুরুত্ব এবং ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু অনেক সময় কৃষি ফসলের নিসাবের পরিমাণ কম করার দিকে শরীয়াতের একটা বিশেষ উদ্দেশ্য লক্ষ্য করা যায়। কেননা মানুষের জীবন-জীবিকার মৌল উপাদান হচ্ছে এই কৃসি ফসল।
তার চাইতেও উত্তম কথা, এখানে নগদ সম্পদের নিসাবকে মান হিসেবে গণ্য করতে হবে। আর তার মূল্যমান হচ্ছে ৮৫ গ্রাম স্বর্ণ। এ পরিমাণটা বিশ মিশকাল সমান, যা হাদীসে –সাহাবীদের উক্তিতে-উদ্ধৃত হয়েছে।
যেমন লোকেরা তাদের মাসিক বেতন ও অন্যান্য আমদানী নগদ টাকায় গ্রহণ করে থাকে, এ ও ঠিক তেমনি। কাজেই এই নগদ সম্পদের নিসাব ঠিক করাই উত্তম।
এই প্রসঙ্গের অবশিষ্ট কথা
স্বাধীন পেশাদার লোকদের আমদানী সুনিয়মিত ও সুসংগঠিতভাবে হয় না। প্রতিদিনও হতে পারে- যেমন ডাক্তার চিকিৎসকের আয় কখনও সখনও হতে পারে – যেমন আইন ব্যবসায়ী, উকিল, দর্জী ইত্যাদি। কোন কর্মী তাদের মজুরী সাপ্তাহিক নিয়মে পায় বা দুই সপ্তাহের এক সাথে পায়। অধিকাংশ বেতনভুক কর্মচারী মাসিক বেতন পেয়ে থাকে। …এ সব অবস্থায় তাদের নিসাব ধরা হবে কোন হিসেবে?
আমাদের সম্মুখে দুটি সম্ভাব্য পন্থা বা দিক রয়েছেঃ প্রথম, প্রত্যেক সম্পূর্ণ পাওনা আমদানী বা অর্জিত সম্পদের নিসাব আলাদা-আলাদাভাবে নিসাব করতে হবে। যার যার আমদানী নিসাব পরিমাণ হবে- উচ্চমানের চাকরীজীবীদের উচ্চতর বেতন, বড় বড় ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তি, তা কর্মচারীদের জন্যেও হতে পারে-স্বাধীন পেশাদারদের এক একদফার আমদানীর পরিমাণ খুব বিপুল হয়, তা থেকে যাকাত নিতে হবে। যা নিসাব পরিমাণ নয়, তা থেকে যাকাত নেয়া হবে না।
এই পন্থার একটা যৌক্তিকতা আছে। এর ফলে ছোট ছোট বেতনভুকের যাকাত থেকে নিস্কৃতি পাবে। কেবল বড় বড় চাকুরেদের উপর যাকাত ধার্য হবে। সামাজিক সুবিচারপূর্ণ ধন-বণ্টনের দৃষ্টিতে এই পন্থা উত্তম।
সাহাবী ও ফিকাহবিদদের উক্তি এই পন্থায় সমর্থনে রয়েছে। তাঁরা বলেছেন, অর্জিত সম্পদ নিসাব পরিমাণ হলে সাথে সাথে যাকাত দিয়ে ‍দিতে হবে। এই পন্থা সম্ভাবনার দ্বারও খুলে দেয় যে, বছর শেষ হলে নিসাব পরিমাণ থাকলে তার উপর যাকাত ফরয থাকবে।
কিন্তু প্রতিবারের আমদানীকে যাদি নিসাব পরিমাণ ধনতে চাই, তাহলে অধিকাংশ স্বাধীন পেশাদারই যাকাত দেয়া থেকে মাফ পেয়ে যাবে। কেননা তাদের অল্প পরিমাণ আমদানী খুব কাছাকাছি দফায় হয় বটে; কিন্তু তার খুব কমেই নিসাব পারমাণ হয়ে থাকে। নিকটবর্তী সময়ে এই সমস্ত দফায় পাওয়া সম্পদ একত্র করে গণনা করা হলে তার সমষ্টি হয়ত নিসাব পরিমাণ হতে পারে। অধিকাংশ বেতনভুক কর্মচারীর অবস্থাও তাই।
এখানেই দ্বিতীয় সম্ভাব্যতা প্রকাশিত হয়। তা হচ্ছে, নিকটবর্তী সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে অর্জিত বা আয় করা সম্পদ একত্র করে গণনা করা।
খনি থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে পাওয়া সম্পদের নিসাব নির্ধারণে ফিকাহবিদগণ এই নীতি অবলম্বনের কথাই বলেছেন। কেননা তাতে অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতায় বারে বারে উত্তোলিত সম্পদকে একত্রিত করে গণনা করা হলেই নিসাব পূর্ণত্ব পায়।
এক বছর সময়ের মধ্যে বারে বারে পাওয়া কৃষি ফসল ও ফলের নিসাব নির্ধারণে সব একত্রিত করে হিসাব করা পর্যায়ে ফিকাহবিদগণ একমত হতে পারেন নি। হম্বলীদের বক্তব্য হল, এক বছরে পাওয়া কৃষি ফসল বা ফলের নিসাব মাত্রা পূর্তির জন্যে বিভিন্ন প্রজাতীয় ফল-ফসল একত্র করে গণনা করতে হবে, তা বিভিন্ন স্থান থেকে উৎপন্ন হলে ক্ষতি নেই। একই বছরে গাছে দুবার ফসল ধরলে তা একত্রিত করে নিসাব গণনা করত হবে। কেননা তা এক বছরের ফল ও ফসল।
এই ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি, শরীয়াতের দৃষ্টিতে একটা বছর একটা সময়- ইউনিট। আধুনিক কর পদ্ধতিতেও তা-ই স্বকৃত। যাকাতের বছর গণনায়ও এই নিয়ম চলবে।
অনেক ক্ষেত্রে সরকার কর্মচারীদের বেতন বার্ষিক হিসাব ধার্য করে, যদিও তা দেয় মাসিক হিসেবে। কেননা কর্মচারীদের প্রয়োজন এ হিসেবেই দেখা দেয়। তদনুযায়ী কর্মচারীদের নির্ভেজাল আয় এবং স্বাধীন পেশাদারদের আয় থেকে পূর্ণ বছরে একবার –যদি তা নিসাব পরিমাণ হয় যাকাত গ্রহণ করা হবে।
কোন কোন ফিকাহবিদ অর্জিত সম্পদের যাকাত দেয়া ও তার পদ্ধতি পর্যায়ে যা বলেছেন, তার উল্লেখ উপরউক্ত কথাকে বলিষ্ঠ ও স্পষ্ট করে তুলবে।
অর্জিত সম্পদের যাকাত দেয়ার নিয়মঃ
আগের কালের যেসব মনীষী অর্জিত সম্পদের যাকাত দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন, যাকাত দানের নিয়ম ও পদ্ধতি পর্যায়ে তাঁদের কাছ তেকে দুটো কথা বর্ণিত হয়েছে।
প্রথম নীতিঃ জুহরী বলেছেন, একজন লোক যখন কোন সম্পদ অর্জন করল, তার নির্দিষ্ট যাকাত দেয়ার মাসের আগমনের পূর্বেই যদি সে তা ব্যয় করতে ইচ্ছা করে, তাহলে তাকে তার যাকাত প্রথমেই দিয়ে দিতে হবে। তারপর সে তা ব্যয় করতে পারেব। আর সে যদি তার এ সম্পদ ব্যয় করতে না চায়, তাহলে অন্যান্য মালের সাথে একত্র করে নির্দিষ্ট মাসেই সে যাকাত দেবে।
ইমাম আওযায়ী প্রায় এ রকমের কথাই বলেছেন। তাহলে, যে লোক তার দাস বা ঘর বিক্রয় করল, সে মূল্য হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার যাকাত দিয়ে দেবে। তবে তার যাকাত দেয়ার জন্যে কোন নির্দিষ্ট মাস থেকে থাকলে সে মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করে তার অন্যান্য মালের সাথে একসাথে যাকাত দেবে।
তার অর্থ, যার পূর্বে থেকেই যাকাত দেয়ার মাল রয়েছে ও তার একটি বছর প্রচলিত নিয়মে অতিবাহিত হয়ে গেছে, সে তার অর্জিত সম্পদের যাকাত দান সে মাস পর্যন্ত বিলাম্বিত করতে পারবে। তদনুযায়ী সব মালেস যাকাত একসঙ্গে দেবে। অন্যথায় বছর পূর্তির পূর্বেই তা ব্যয় করে ফেলার আশঙ্কা থাকলে অনতিবিলম্বে তার যাকাত দিয়ে দেবে।
দ্বিতীয় নীতীঃ মকহুল বলেছেন, কারোর, যাকাত দেয়ার নির্দিষ্ট মাস থাকলে- মাঝখানে যদি সে কোন মাল পেয়ে যায় ও তা ব্যয় করে ফেলে, তহলে যা ব্যয় করে ফেলেছে, তার যাকাত তাকে দিতে হবে না। যদি কোন নির্দিষ্ট মাস না থেকে থাকে, আর সে কোন সম্পদ পেয়ে যায়, তাহলে সে তখনই তার যাকাত দিয়ে দেবে।
কিন্তু এ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট মাসে যাকাত দেয়ার মত মাল যার আছে, সে এমন একটা সুযোগ পেয়ে যায়, যা যার সে রকম কোন মাল নেই সে পায় না। কেননা প্রথম ব্যক্তির পক্ষে অর্জিত সম্পদ যাকাত না দিয়েই ব্যয় করে ফেলা জায়েয হয়ে পড়ে। সে নির্দিষ্ট মাসে শুধু অবশিষ্ট পরিমাণেই যাকাত দিতে বাধ্য হবে। কিন্তু যার অন্য মাল নেই, সে তো সাথে সাথেই যাকাত দিয়ে দেবে। ফল দাঁড়ালো এই যে, অন্য মাল যার আছে সে সুবিদা পেয়ে গেল, কিন্তু যার এই অর্জিত মাল ছাড়া আর কোন মাল নেই, তার উপরে অধিক চাপ পড়ল।
আমার চোখে অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য মত হল, যে অর্জিত মাল নিসাব পরিমাণ হবে, তার যাকাত তাৎক্ষনিকভাবে নিয়ে নেয়া হবে- যেমন জুহরী ও আওযায়ী বলেছেন। হস্তগত হওয়ার সাথে সাথেই যাকাত দিয়ে দেয়া হবে। (যার অন্য কোন মাল নেই তার সম্পর্কে এই কথা), অথবা অন্যান্য মালের সাথে মিলিয়ে যাকাত দেয়ার জন্যে নির্দিষ্ট বছরপূর্তির জন্যে বিলম্ব করা হবে-যদি খরচ করে ফেলার আশংকা না থাকে তবে। অন্যথায় সঙ্গে সঙ্গেই যাকাত দেয়ার দায়িত্ব তার উপর অর্পিত থাকবেই। নিসাব পরিমাণের কম হলেও তা থেকে যাকাত নিতে হবে- যেমন মকহুল বলেছেন। সেই নির্দিষ্ট মাস পর্যন্ত যা অবশিষ্ট থাকবে, একসঙ্গে তার যাকাতও দিয়ে দেবে। আর তার নিজের ও তার পরিবারবর্গের প্রয়োজনে যা ব্যয় হয়ে যাবে, তার যাকাত দেয়া ফরয হবে না। অর্জিত মাল নিসাব পরিমাণের কম হলে তা পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কোন যাকাত দিতে হবে না।
এই নীতির লক্ষ্য হচ্ছে, ছোটখাটো বেতনধারী লোকদের- যাদের প্রাপ্তি নিসাব পরিমাণ হয় না- তাদের যাকাতের দায়িত্ব হালকা করা। অনুরূপভাবে অল্প পরিমাণের কয়েক দফায় যে আমদানী স্বাধীন পেশাদারদের হয়, তারাও নিস্কিৃতি পেয়ে যায়। কেননা তাদের কোন দফার আমদানীই নিসাব পরিমাণ হয় না।
নির্ভেজাল আমদানী ও মাসিক বেতনের যাকাত
মাসিক বেতন ও মজুরীর যাকাত দেয়ার মতটি যখন আমরা গ্রহণ করেছি, তখন আমরা এই মতকেই অগ্রাধিকার দেব যে, যাকাত কেবল নির্ভেজাল সম্পদ থেকে নিতে হবে। অর্থাৎ তা থেকে প্রমাণিত ঋণ বাদ দিতে হবে। আর তার ও পরিবারবর্গের নিম্মতম মাত্রার জীবন-জীবিকা মানুষের জন্যে একান্তই অপরিহার্য। তা হচ্ছে, মৌল প্রয়োজন। আর যাকাত ফরয হয় মৌল প্রয়োজন পূরণ করার পর অতিরিক্ত সম্পদের উপর।
এসব বাদ দিয়ে বছরের বেতন প্রাপ্তি ও আমদানী থেকে যাকাত নেয়া হবে। যদি তার পরিমাণ নগদ সম্পদের নিসাব সমান হয়। আর যে বেতন ও মজুরী বার্ষিক হিসাবেও নিসাব (সব বাদ সাদ দেয়ার পর) পরিমাণ হয় না, তা থেকে কোন যাকাত গ্রহণ করা হবে না।
মনে রাখা আবশ্যক, মুসলিম ব্যক্তি যখন তার কাজ বা পেশার মাধ্যেমে উপার্জন করা সম্পদের যাকাত দেবে- সর্বপ্রকার অর্জিত সম্পদ থেকে, সে তার যাকাত দেবে অর্জিত হওয়ার সময়ে। পরে তা বছর সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার পূর্বে তাকে আবার কোন যাকাত এ বাবদ দিতে হবে না। কেননা একই বছরে দুবার যাকাত ফরয হয় না। এ কারনে আমরা বলে এসেছি যে, সে তার অর্জিত সম্পদের যাকাত অন্যান্য মালের সাথে বছরপূর্তির পর দিতে পারে- যদি বছরপূর্তির পূর্বেই তা খরচ হয়ে যাওয়ার ভয় না থাকে।
একটি দৃষ্টান্ত দেয়া যেতে পারে। একজন লোক তার মালের যাকাত প্রতি বছর মুহাররম মাসে দিয়ে দেয়। সে যদি কোন অতিরিক্ত সম্পদ অর্জন করে- যেমন বেতন পেল সফর বা রবিউলআউয়াল কিংবা তার পরের কোন মাসে এং প্রাপ্তির সাথে সাথেই তার যাকাতও দিয়ে দিল, বছরপূর্তির পর সে তার অন্যান্য মালের যাকাত দেয়ার সময় এ মালের যাকাত আবার দেবে না। এ মালের বা তার অবশিষ্টের যাকাত সে দেবে পরবর্তী বছর শেষ হয়ে যাওয়ার পর। তাহলে একই বছরে দুবার যাকাত দেয়ার বোঋা তার উপর চাপবে না। কেননা আল্লাহর শরীয়াত মানুষকে স্বাচ্ছন্দ দেয়, কষ্ট নয়।
তৃতীয় আলোচনা
কর্মে উপার্জিত সম্পদের যাকাত পরিমাণ
বিভিন্ন ধরনের আয়-আমদানী থেকে যে যাকাত নেয়া হবে, তার হার কি হবে? চিন্তাবিদ আল-গাযালী তা নির্ধারণের জন্য ইসলামী চিন্তাবিদদের পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজন বোধ করে তাঁদের আহবান জানিয়েছেন। আমরা এ পর্যায়ের কথাবার্তার তুলনামূলক আলোচনা-পর্যালোচনা করে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি, এখানে তা সুবিন্যস্তভাবে পেশ করছি।
কেবলমাত্র মূলধনের ফলশ্রুতিতে পাওয়া আমদানী হবে অথবা মূলধন ও কর্ম- এই উভয়ের মিলিত আয় হবে। যেমন শিল্প-কারখানা, দালান-কোঠা, ছাপাখনা, হোটেল, গাঢ়ি, বিমান ইত্যাদি আমদানী তার যাবতীয় খরচ, ঋণ ও মৌল প্রয়োজন বাদ দেয়ার পর নির্ভেজাল সম্পদ থেকে এক-দশমাংশ যাকাত বাবদ নেয়া হবে। কৃষি জমির আয়ের উপর কিয়াস করে এ মত দেয়া হয়েছে, যা কোনরূপ সেচ পরিশ্রম বা ব্যয় ব্যতিরেকেই সিক্ত হয়।
দালান-কোঠাও শিল্-কারখানার আমদানীর যাকাত পর্যায়ে শায়খ আবূ জুহরা ও তাঁর সমমনাদের অভিমত ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। সমস্ত খরচ ও কষ্ট, শ্রমমূল্য বাদ দিয়ে নির্ভেজাল আমদানীর পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হলে- যেমন শিল্প-কোম্পানীসমূহের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে-তাহলে নির্ভেজাল আয় থেকে ওশর পরিমাণ যাকাত গ্রহণ করা হবে। আর তা সম্ভব না হলে আমদানী থেকে অর্ধ-ওশর পরিমাণ যাকাত নেয়া হবে- এই বণ্টন নীতি গৃহীত হয়েছে।
মূলধন বলতে আমরা এখানে ব্যবসায়ে বিনিয়োগকৃত নয় এমন মূলধন বুঝিয়েছি। আর ব্যবসায়ে আবর্তনশীল মূলধন ও তার মুনাফা থেকে এক সাথে এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ পরিমাণ নেয়া হবে।
কেবলমাত্র কাজের ফলে লব্ধ আয় –যেমন বেতনধারীদের বেতন ও স্বাধীন পেশাদারদের কাজের আমাদানী- থেকে নেয়া হবে শুধু ওশরের এক-চতুর্থাংশ পরিমাণ। কেননা নগদ সম্পদে সাধারণভাবেই এই পরিমাণ ফরয করেছে কুরআন-হাদীসের দলীল। তা সদ্য অর্জিত সম্পদ হোক, কি তার উপর এক বছর অতিবাহিত হয়ে থাকে। তাতে চেষ্টা ও কষ্টের গুরুত্ব স্বীকারে ইসলামের যে মৌল নীতি রয়েছে, তার সাথে সংগতি রক্ষা করা হয়েছে। কননা এই ক্ষেত্রে যাকাত পরিমাণ খুব হালকা হয়। ইবনে মাসউদ ও মুআবিয়া সৈন্যদের জন্যে দেয়া দান ইত্যাদির সাথে এই হার নির্ধারণে যে নীতি অবলম্বন করেছেন, তার সাথে সামঞ্জস্য স্থাপন করা হয়েছে। এঁদের পরে উমর ইবনে আবদুল আযিযও এই নীতিই অনুসরণ করেছেন। কাজেই এসব দানের ক্ষেত্রে অবলম্বিত নীতির উপর কিয়াস করা কৃষি জমির আমদানীর উপর কিয়াস করা অপেক্ষা অনেক ভাল। তার উপর কিয়াস করা যেতে পারে দালান-কোঠা ও শিল্প-কারখানার আমদানী। এসব ক্ষেত্রে মূলধন অক্ষুন্ন থেকেই আমদানী দিয়ে থাকে।
তার অর্থ কাজের আমদানীর ব্যাপারে খালেস মূলধনের বা মূলধন ও কাজ মিশ্রিত আমদানীর ব্যাপার অপেক্ষা অনেক হালকা ও সহজ। একালেও তার উপর কর ধার্য করা হয়ে থাকে। আয়কর ধার্যকরণেউপার্জনশক্তির তারতম্যের প্রতি গুরুত্ব সহকারে লক্ষ্য রাখতে হবে। আর মূলত আমদানীর উৎস তিনটি অবস্থার যে-কোন একটির মধ্যে পড়তে পারে। মূলধন কাজ বা শ্রম এবং মূলধন ও শ্রম একত্রে। কেননা ‘কর’ জগতে এটা সুনির্দিষ্ট যে, অস্থাবর আমদানীর উপর বা জমির আমদানীর উপর কর পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে কাজে উপার্জনের উপর ধার্য করের চাইতে অধিক। কেননা মূলধন স্থায়ীভাবে আমদানী দিতে থাকে আর কর্মশক্তি খুব সামান্যই অবশিষ্ট থাকে। তাঁরা আরও বলেছেন, আমদানীর উৎসের আমদানী মালিকদের তুলনায় অধিক কর বোঝা বহনে মক্ষম। ধন-বণ্টনে সুবিচারনীতির কার্যকরতা এতেই নিহিত।
কমিউনিস্টরা তো দাবি তুলেছে যে, কর্মের আমদানীকে সর্ব প্রকারের কর থেকে মুক্ত রাখতে হবে। কিন্তু যাকাতের ইসলামী দৃষ্টিকোণ হচ্ছে তা আল্লাহর ‍নিয়ামতের শোকরস্বরূপ দিতে হবে। তার মধ্যেই নফসের তাযকিয়া করতে হবে, ধন-মাল পবিত্র-পরিশুদ্ধিকরণ করতে হবে। আল্লাহর হক আদায় করারও পন্থা এটাই। সমাজ-সমষ্টির অধিকার এই পথেই আদায় করা সম্ভব। সমাজের দর্বল শ্রেণীর লোকদের সাহায্য করার এ এক কার্যকর ব্যবস্থা। এই মত ও দৃষ্টিকোণ কর্ম ও শ্রমের উপার্জনের উপরও যাকাত ধার্য করে; তার পরিমাণ যতই বিভিন্ন হোক-না-কেন।
দশম অধ্যায়
শেয়ার ও বণ্ডের যাকাত
আধুনিক অর্থনীতিতে এক নতুন ধরনের মূলধনের পরিচয় ঘটেছে। বিশ্বে বিপ্লব ও ব্যবসায়ের নিত নতুন রূপ এই অভিনব মূলধনের উদ্গাতা। তা হচ্ছে শেয়ার ও বণ্ডের সার্টিফিকেট যা নগদ মূলধন সমতুল্য। বিশ্বের বাজারে ব্যবসায়ী লেন-দেনে তা বিশেষ গুরুত্ববহরূপে গণ্য। তা ’কাগজী মুদ্রার বিনিময়’ নামে পরিচিত। এই সব কাগজ বা শেয়ার ও বণ্ডকে অর্থনীতিবিদগণ ‘অস্থাবর সম্পত্তি’ গণ্য করেন এবং তার নিত্য নতুন আমদানীর উপর কর ধার্য করা হয়। তার নাম করা হয় অস্থাবর সম্পত্তির আয়ের কর। অনেক মূল শেয়ারের উপর কর ধার্য করে একে মূলধনের উপর ধার্য কর মনে করে।
শেয়ার ও বণ্ডের মধ্যে পার্থক্য
’শেয়ার’ হচ্ছে বড় বড় কোম্পানীর বিরাট মূলধনের অংশের উপর মালিকানা অধিকার। প্রতিটি শেয়ার মূলধনের অংশ হিসেবে সমমান ও মূল্যের হয়ে থাকে।
আর বণ্ড হচ্ছে ব্যাংক, কোম্পানী বা সরকার প্রদত্ত লিখিত প্রতিশ্রুতি বিশেষ, যার মালিক নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ নগদ সম্পদ পাওয়ার অধিকারী হয়।
এই শেয়ার ও বণ্ড এর মধ্যে পার্থক্যের আরও বহু দিক রেয়েছে। শেয়ার ব্যাংক বা কোম্পানীর মূলধনের অংশের বিকল্প। আর বণ্ড কোম্পানী বা ব্যাংকের লাভ অর্জনের পরিমাণের উপর। আর লোকসান হলে তারও অংশ তার ভাগে পড়ে। কিন্তু বণ্ড বা সার্টিাফকেট সেই ঋণ থেকে নির্দিষ্ট সীমিত পরিমাণ মুনাফা এনে দেয়, যা তার বিকল্প। এই মুনাফা কমও হতে পারে, বেশীও হতে পারে।
বণ্ডের ধারক ঋণদাতারূপে গণ্য। যে কোম্পানী বা ব্যাংক কিংবা সরকারকে লিখিত পরিনাণ ঋণ দিয়েছে বলে প্রমাণিত হবে। কিন্তু শেয়ার মালিক তার শেয়ার মূল্য অনুপাতে কোম্পানী বা ব্যাংকের অংশের মালিক হবে।
বণ্ডের একটা সীমীত সময় রয়েছে তার যথার্থতা স্বকৃতির জন্যে। কিন্তু শেয়ার কোম্পানীর চূড়ান্ত অবসানের পূর্বে মূল্যহীন হয় না।
শেয়ার ও বণ্ডের একটা নামগত মূল্য রয়েছে। তা ইস্যু করার সময় যে মূল্য ধরে দেয়া হয়, তা-ই তার মূল্য। আর একটা আছে বাজার মুল্য- যা বাজার দর অনুযায়ী নির্ধারিত হয় এবং উঠানামা করে। এর দুটিই পারস্পরিক লেনদেনে ব্যবহ্‌ত ও গৃহীত হয় ঠিক পণ্যদ্রব্যের মতই। বহু লোক তার ভিত্তিতে ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবসা করে থাকে তার মাধ্যেমে মুনাফা লাভের আশায়। চাহিদা ও যোগানের বাড়তি অনুসারে উপরিউক্ত বাজারে পণ্য মূল্য প্রভাবিত হয়, যেমন প্রভাবিত হয় দেশের রাজনৈতিক অবস্থার দ্বারা। তার অর্থ-কেন্দ্র ও কোম্পানীর সাফল্যও তার উপর প্রভাব বিস্তার করে। তাতে শেয়ারের প্রকৃত মুনাফা পরিমাণ এবং বণ্ডের প্রকৃত মুনাফায় যথেষ্ট পার্থক্যের সৃষ্টি হয়। বিশ্ব শান্তি বা যুদ্ধের প্রভাবও তার উপর যথেষ্ট প্রতিফলিত হয়।
উপরিউক্ত বর্ণনা থেকে একথা স্পষ্ট হয়েছে যে, শেয়ার ইস্যু করা তার মালিকত্ব ও ক্রয়-বিক্রয় এবং তার ভিত্তিতে পারস্পরিক লেনদেন সম্পূর্ণ হালাল, তা করতে কোন দোষ নেই যতক্ষণ কোম্পানীর আসল কাজ কোন হারাম পেশার ভিত্তিতে না চলবে। যেমন মদ্যোৎপাদনের কারখানা, মদ্য বিক্রয়ের ব্যবসায় কিংবা সূদের ভিত্তিতে ঋণদান ও ঋণ গ্রহণ হতে না থাকবে।
কিন্তু বণ্ডের অবস্থা শেয়ার থেকে ভিন্নতর। যার গোটা কারবারই সূদ-ভিত্তিক। অনেক সময় অবশ্য বণ্ড মূলধন সমতুল্য হয় তার মালিকের কাছে ঠিক শেয়ারের মতই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে , এ দু’প্রকারের মূলধনের যাকাত কিভাবে দেয়া হবে?
বিভিন্ন কোম্পানী শেয়ারের যাকাত দেয়ার পদ্ধতি
এ পর্যায়ে খুব কম লেখা হয়েছে। সমকালীন মনীষিগণ শেয়ার ও বণ্ডের যাকাত দেয়া সম্পর্কে যা কিছু লিখেছেন, তাতে ‍দুটি দিক স্পষ্টঃ
প্রথম দিকঃ কোম্পানীর স্বরূপ অনুযায়ী শেয়ারের মূল্যায়ন
এ সব শেয়ার ও বণ্ডে প্রথম বিবেচনা করতে হবে তা ইস্যুকারী কোম্পানীর স্বরূপ অনুযায়ী। সে কোম্পানী কি শিল্প প্রতিষ্ঠান, না ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা উভয় ‍দিকের সমন্বিত রূপ।
শেয়ারের স্বরূপ নির্ধারণ নির্ভর করে কোম্পানীর স্বরূপ নির্ধারনের উপর যে কোম্পানীর মূলধনের একটা অংশের তা বিকল্প। আর তারই ভিত্তিতে তার যাকাত দেয়া বা না দেয়া সম্পর্কে মত ব্যক্ত করা চলে।
শায়খ আবদুর রহমান ঈসা তাঁর ‘মুআমালাতুল হাদীসাতু ওহাকামু মাহা’ নামক গ্রন্থে লিখেছেনঃ
কোম্পানীসমূহের বহু সংখ্যক শেয়ার মালিকই তাদের শেয়ারের যাকাত দেয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে কিছুই জানে না। অনেকে মনে করে , তার যাকাত দেয়া ফরয নয়। কিন্তু এই ধারণা ভ্রান্ত। অনেকের ধারণা কোম্পানীর সব শেয়ারেরই যাকাত ফরয়। কিন্তু এ কথাও ঠিক না। শেয়ার ইস্যুকারী কোম্পানীর স্বরূপ নির্ধারণের মাধ্যমেই এ সব শেয়ার সম্পর্কে কথা বলা যাবে। কোম্পানী যদি নিছক শিল্প সংক্রান্ত হয়- যা কার্যত কোন ব্যবসা করে না; যেমন রং-এর কোম্পানী, শীততাপ নিয়ন্ত্রণের কোম্পানী, হোটেল কোম্পানী, প্রচার কোম্পানী, অটোমোবাইল কোম্পানী, স্থল ও সামুদ্রিক পরিবহন কোম্পানী, ট্রাম কোম্পানী, বিমান কোম্পানী ইত্যাদি- এ সব শেয়ারের মূল যন্ত্রপাতি, প্রতিষ্ঠান পরিচালন ও আনুসংগিক কার্য পরিচালনায় নিয়োজিত এসব কোম্পানী যা মুনাফা অর্জন করে তা শেয়ার হোল্ডারদের মূল সম্পদের সাথে যখন মিলিত হয় তখন সমগ্র সম্পদেরই যাকাত দেবে, একটি বছর অতিবাহিত হওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পদ যদি নিসাব পরিমাণ হয়।
আর কোম্পানী – যদি নিছক ব্যবসায়ী হয়-পণ্য ক্রয় ও বিক্রয় করে, এসব পণ্যের উৎপাদনে মূলধন বিনিয়োগ করে না, যেমন বৈদেশীক বাণিজ্য কোম্পনী, আমদানীকারক কোম্পানী অথবা যদি শিল্প ও ব্যবসায়ী কোম্পানী হয়- যা কাঁচামাল উদ্ভাবন করে বা ক্রয় করে পরে তার উপর আবর্তনী কার্যক্রম পরিচালিত করে ও তাতে ব্যবসা করে- যেমন পেট্রোল কোম্পানী, পশম কোম্পানী, রেশম বা ‍তুলা উৎপাদন কোম্পানী, লৌহ ও চর্বি কোম্পানী, রাসায়নিক কোম্পানী ইত্যাদি-এসব কোম্পানীর শেয়ারের যাকাত দিতে হবে। তাহলে কোম্পানীর শেয়ারসমূহের উপর যাকাত ফরয হওয়ার ভিত্তি হচ্ছে, কোম্পানীর নিজেরই ব্যবসায়ী কার্যক্রমে জড়িত হওয়া-তার সাথে শিল্পোৎপাদন হোক কি না হোক। আর শেয়ারগুলোর মূল্যায়ন করা হবে তার সাম্প্রতিক মূল্য। সেই সাথে প্রতিষ্ঠান, যন্ত্রপাতি ও কোম্পানীর মালিকানাধীন পাত্রসমূহের মূল্য ধরতে হবে। কেননা এগুলো মূলধনের এক-চতুর্থাংশ কিংবা তার কম অথবা বেশীরই প্রতীক। এগুলোর মূল্য তা থেকে বাদ যাবে। আর অবশিষ্টের যাকাত দিতে হবে। কোম্পানীর বাৎসরিক বাজেট থেকেই –যা প্রতি বছর তৈরি ও প্রকাশিত হয়। কেননা এই সবের মূ্ল্য নির্ধারণ করা সম্ভব।
শেয়ারের যাকাত পর্যায়ে উপরে যা লিখিত হয়েছে, তা এই প্রসদ্ধ মতের উপর স্থাপিত যে, শিল্প-কারখানা, ব্যবসায়ী দালান-কোঠা ও তাতে বিনিয়োগকৃত মূলধনসমূহের যা ব্যবসার কাজে নিয়োজিত নয়-সব কিছুতেই যাকাত হয় না। যেমন হোটেল, গাড়ি, ট্রাম, বিমান প্রভৃতি; মূলধন ও মুনাফাতেই ব্যবসায়ের পূর্ণত্ব নয়। না উৎপাদন ও আমদানীতে, যেমন কৃষি জমির উৎপাদন(তবে তা থেকে কিছু অবশিষ্ট থাকলে ও তার উপর একটি বছর অতিবাহিত হলে ভিন্ন কথা)। এই ভিত্তিতে শিল্প-কোম্পানী(যা কার্যত ব্যবসায়ের কাজে জড়িত নয়) ও অন্যান্য কোম্পনীর মধ্যে পার্থক্য করা হয় ও প্রথমটির শেয়ারের উপর যাকাত ধার্য করা হয় না। শেষোক্তটির শেয়ারের উপর ধার্য করা হয়। যদি দুজন লোক এমন হয় য়ে, তাদের প্রত্যেকেই এক হাজার দীনারের মালিক, তাদের একজন তার হাজার দীনার দিয়ে আমদানী-রফতানী কোম্পানীর দইশ’টি শেয়ার খরিদ করল; তার অপরজন তার টাকা দিয়ে বই বা ছাপার কোম্পানীর দুইশ শেয়ার ক্রয় করল। প্রথম ব্যক্তিকে তার দুইশ শেয়ারের যাকাত দিতে হবে এবং প্রতি বছরের শেষে যে মুনাফা অর্জিত হবে তারও। অবশ্য প্রাতিষ্ঠানিক ও সরঞ্জামাদি ক্রয়ে নিয়োজিত। তার মুনাফা ও যাকাত হবে না। তবে বছরের শেষ পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকলে ও সে মাল ও অন্য মার মিলিয়ে নিসাব পরিমাণ হলে তার যাকাত দিতে হবে। আর যদি বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তা ব্যয় হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলেও যাকাত হবে না।
এভাবে এটা সম্ভব যে, এই ব্যক্তির সমস্ত বছরগুলোই এমনভাবে অতিবাহিত হয়ে যাবে যে, তার উপর যাকাত ফরয হবে না- না তার শেয়ারের উপর, না মুনাফার উপর। কিন্তু প্রথমোক্ত ব্যক্তির অবস্থা তা নয়। তার উপর প্রতি বছর বাধ্যতামূলকভাবে যাকাত ফরয হতে থাকবে- তার শেয়ারেরও এবং তার মুনাফারও। কিন্তু এটা এমন একটা ব্যাপার যা ইসলামী শরীয়াতের সুবিচার নীতি কখনই সমর্থন করতে পারে না। কেননা দুটির সমান অবস্থার জিনিসের মধ্যে পার্থক্য করা কোনক্রমেই ন্যায় বিচারের কাজ হতে পারে না।
অষ্টম অধ্যায় দালান-কোঠা ও শিল্পকারখানা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের যাকাত পর্যায়ের আলোচনায় আমরা বলে এসেছি যে, তাতে তিনটি প্রসিদ্ধ অন্ধ অনুসরণমূলক মতের বৈপরীত্য রয়েছেঃ
১. একটি মত তা কি ব্যবসায়ের পূর্ণত্বের মাল গণ্য করে প্রতি বছর তার মূল্য নির্ধারণের কথা বলে এবং তার এক –দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ যাকাত বাবদ দিতে বলে।
২. আর একটি মত তার উৎপাদন ও মুনাফাকে সদ্য অর্জিত মাল গণ্য করে তা থেকে নগদ সম্পদের সমান যাকাত গ্রহণ করতে বলে।
৩. তৃতীয় মত তাকে কৃষি জমির উপর কিয়াস করে এবং তাতে এক –দশমাংশ বা তার অর্থেক যাকাত বাবদ ধার্য করে-তার নির্ভেজাল ফসল ও মুনাফা থেকে। সেখানে এই শেষোক্ত মতটিকেই আমরা অগ্রাধিকার দিয়েছি।
আর এখানে আমরা মনে করি, শৈল্পিক বা আধা – শৈল্পিক কোম্পানী এবং ব্যবসায়ী ও আধা ব্যবসায়ী কোম্পানীর মধ্যে পার্থক্য করা – এমনভাবে যে, প্রথমটিকে যাকাত থেকে অব্যহতি দেয়া হয় এবং দ্বিতীয়টিতে যাকাত ধার্য করা হয়-এমন একটা পার্থক্যমূলক নীতি যা কুরআন, সুন্নাহ্, ইজমা, কিয়াস কোন কিছুই সমর্থন করতে পারে না।
ব্যবসায়ী কোম্পানীর শেয়ার হলে তার যাকাত নেয়া এবং শিল্প-কোম্পানীর শেয়ার হলে তা প্রত্যাহার করার মূলে কোন যৌক্তিকতাই থাকতে পারে না। এই উভয় ক্ষেত্রেই শেয়ারগুলো তো মূলধন, যা প্রবৃদ্ধি পায়, মুনাফা আনে-বাৎসডিরক এবং নিত্য নতুন বরং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে মুনাফা প্রথমটির তুলনায় অনেক বেশীই হয়ে থাকে-হতে পারে।
আমরা যদি এই দৃষ্টিকোণ গ্রহণ করতে চাই- ব্যবসায়ী কোম্পানীর স্বরূপ অনুযায়ী শেয়ারসমূহের প্রতি নজর দিয়ে, যা তার মূলধনের অংশ- তাহলে এাখানে আমর বলব যে, কোম্পানীসমূহের স্বরূপ যা-ই হোক- তা ব্যক্তিবর্গের কার্যক্রমের মতই। কেননা তারা তারই মালিক, যার মালিক হয় এইসব শিল্প বা কোম্পানী সমূহ। অতএব শৈল্পিক কোম্পানী বা আধা-শৈল্পিক কোম্পানী- যা তার মূলধনের বেশীর ভাগ প্রাতিষ্ঠানিক যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি ক্রয়ে বিনিয়োগ করে থাকে- যেমন ছাপাখানা, শিল্পকারখানা, হোটেল, পরিবহন গাড়ি ইত্যাদি- এ সব কোম্পানীর শেয়ার থেকে- বরং তার নির্ভেজাল আয় ‍ও মুনাফা থেকে ওশর পরিমাণে যাকাত নেয়া হবে না। যেমন উৎপাদন মূলক প্রতিষ্ঠানের যাকাতের ক্ষেত্রে আমরা অগ্রাধিকার দিয়েছি এবং শিল্প-কারখানা, হোটেল ইত্যাদির ক্ষেত্রে আমরা করে থাকি- যদি তা ব্যক্তির মালিকানাধীন হয়।
‍পক্ষান্তরে ব্যবসায়ী কোম্পানীসমূহের মূলধনের বড় অংশ অস্থাবর জিনিসপত্রে নিয়োগ করে, যা দিয়ে তা ব্যবসা করে, তার মূল অবশিষ্ট থাকে না। এ সব কোম্পানীর শেয়ারগুলোর বাজার দর অনুযায়ী যাকাত নেয়া হবে। সেই সাথে মিলাতে হবে তার ‍মুনাফা। তার যাকাতের পরিমাণ হবে শতকরা ২.৫% শেয়ারগুলোর স্থায়ী মূল্য ও সরঞ্জামাদীর মূল্য বাবদ দিয়ে। ব্যবসা পণ্য সম্পর্কে যেমন পূর্বে বলে এসেছি-গতিশীল ও আবর্তনশীল মূলধনের যাকাত দিতে হবে। ব্যবসায়ী কোম্পানীসমূহেজর ব্যাপার এমনিই হয়ে থাকে, যা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করে যখন তা ব্যক্তিদের মালিকানাভুক্ত হয়। এর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।
বণ্ডের যাকাত
বণ্ডের যাকাত পর্যায়ে বলা হয়েছেঃ বণ্ড ব্যাংক বা কোম্পানী কিংবা সরকারের ঋণগ্রস্ততার চেক্। তার ধারক নির্দিষ্ট সীমিত মুনাফা পাওয়ার অধিকারী হয়। এই বণ্ডের মালিক একটা দীর্ঘ মেয়াদী ঋণের মালিক। কিন্তু মেয়াদ শেষে তা তাৎক্ষণিক হয়ে যায়। অতএব তার উপর যাকাত ফরয হবে সেই সময়- যদি তার মালিকত্বে এক বছর বা ততোধিক সময় অতিবাহিত হয়ে থাকে। ইমাম মালিক ও আবূ ইউসুফ এই মত দিয়েছেন।
আর তার নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ না হলে তার যাকাত দেয়া ফরয হবে না। কেননা তা মেয়াদী ঋণ। তার মালিকত্বে এক বছরকাল অতিবাহিত না হলেও তাই। কেননা তাতে যাকাত ফরয হওয়ার জন্যে একটি বছর অতিক্রান্ত হওয়া শর্ত।
পূর্বে বলেছি, ফেরত পাওয়ার আশায় ঋণ সম্পর্কে সহীহ কথা হচ্ছে, প্রত বছরই তার যাকাত দেয়া ফরয হবে। জমহুর ফিকাহবিদগণেরও এই মত। কেননা এই ধরনের ঋণ হাতে মজুদ সম্পদের মত।
বিশেষভাবে বণ্ডের ক্ষেত্রে এই কথাই যথার্থভাবে গ্রহণীয়। কেননা এই ঋণের একটা বিশেষত্ব আছে, ফিকাহবিদগণ যে ঋণের সাথেঞ পরিচিতক এই ঋণ তা থেকে ভিন্নতর। কেননা তা প্রবৃদ্ধি সম্পদ, তা ঋণদাতার জন্য মুনাফা অর্জন করতে থাকে, যদিও তা নিষিদ্ধ। কিন্তু এই নিষিদ্ধের জন্য বণ্ড যাকাত দেয়ার বিশেষ মর্যাদা বা সুবিধা লাভ করতে পারে না। এ কারণে ফিকাহবিদগণ হারাম অলংকারের যাকাত ফরয হওয়া সম্পর্কে সম্পূর্ণ একমত হয়েছে- যদিও তা মুবাহ্। অবশ্য অলংকারের ক্ষেত্রে তাঁদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।
দ্বিতীয় দৃষ্টিকোণঃ শেয়ারগুলোকে ব্যবসা পণ্য হিসেবে গণ্য করা
দ্বিতীয় দৃষ্টিকোণ প্রথকোল্লিখিত দৃষ্টিাকোণের বিপরীত। তাতে শেয়ারগুলো সম্পর্কে কোম্পানীর স্বরূপের বিচার-বিবেচনা করা হয় না। ফলে এক ধরনের কোম্পানীর শেয়ার ও অন্য ধরনের কোম্পানীর মধ্যে পার্থক্য করা হয় না। বরং এ সবগুলোর প্রতি এক অভিন্ন দৃষ্টি নিক্ষেপ করা হয় এবং কোম্পানীর স্বরূপের প্রতি নজর না দিয়ে সকল পর্যায়ে একই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
চিন্তাবিদ আবূ জুহরা, আব্দুর রহমান, হাসান ও খাল্লাফ মনে করেন শেয়ার ও বণ্ড মাল বিশেষ, যা ব্যবসা করার জন্যে গৃহীত হয়েছে। কেননা এগুলোর ধারক তো তা নিয়ে ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবসা চালায় এবং তা থেকে অন্যান্য ব্যবসায়ীদের মতই উপার্জন করে। তার প্রকৃত মূল্য বাজারে নির্ধারিত হয়, যা তার লিখিত মূল্যের তুলনায় ক্রয়-বিক্রয় বিভিন্ন মূল্যের হয়ে থাকে। এই দিক দিয়ে ত ব্যবসায়ের পণ্য বিশেষ। অতএব তা ব্যবসার পণ্যের মতহই বিবেচিত হওয়া উচিত।
তার অর্থ, প্রতি বছরের শেষে তা থেকে শতকরা ২.৫% হারে যাকাত দিতে হবে। বাজার মূল্য নির্ধারণ অনুযায়ী শেয়ারসমূহের মূল্য থেকেই তা দেয়া হবে। সেই সাথে যুক্ত হবে তার মুনাফা। তবে শর্ত এই যে, মূ্ল্য ও মুনাফা মিলিত হয়ে নিসাব পরিমাণ হতে হবে। অথবা নিসাব পরিমাণ পূর্ণ হবে তার কাছে রক্ষিত মাল মিলিয়ে। মৌল প্রয়োজন পূরণের ব্যয় তো বাদ যাবেই। অন্যথায়, নিম্নতম জীবিকা পরিমাণ, এই দৃষ্টিতে যে, শেয়ারের মালিকের তা ছাড়া জীবিকা নির্বাহের অন্য কোন সূত্র নেই। যেমন বিধবা ইয়াতীম- যাদের কোন জীবিকা উপায় নেই। অবশিষ্ট মুনাফা ও মূলধনের যাকাত একসাথে দেবে। সম্ভবত প্রথম দৃষ্টিকোণের তুলনায় এই দৃষ্টিকোণটি ব্যক্তিবর্গের বিবেচনায় অধিক গ্রহণীয়। তদনুযায়ী ফতওয়া দেয়াও বাঞ্ছনীয়। তাতে প্রত্যেক শেয়ার মালিক তার শেয়ার পরিমাণ দ্বারাই বিবেচিত হবে। প্রতিবছরই তার মুনাফা পরিমাণও জানতে পারবে এবং তদ্দরুন সহজেই সে তার যাকাত দিতে সক্ষম হবে। প্রথম দৃষ্টিকোণে বিভিন্ন কোম্পানীর শেয়ারের মধ্য পার্থক্য করা হয় এবং এক ধরনের শেয়ারের যাকাত নেয়ার কথা বলা হয়, অন্য ধরনের নয়। কোন-কোনটিতে মূল শেয়ারেইযাকাত নেয়া হয় তার মূল্য হিসাবে এবং সেই সাথে তার মুনাফা যুক্ত করে। এটা বড় দুরূহ ব্যাপার। এই কারণে আমরা বলব, এই দ্বিতীয় দৃষ্টিকোণ গ্রহণ করা দাতাদের পক্ষে উত্তম; হিসাব করাও সহজ। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র যদি কোম্পানীগুলোর যাকাত দিতে ইচ্ছা করে, তাহলে অবশ্য প্রথম দৃষ্টিকোণই অধিক ভাল ও অগ্রাধিকার পাওয়া যোগ্য।
কোম্পানীর আয় ও শেয়ারের যাকাত কি একসাথে নেয়া হবে
এই শেয়ারগুলোকে যদি ব্যবসায়ী মূলধন গণ্য করা হয় এবং তা থেকে ব্যবসায়ী যাকাত গ্রহণ করা হয়, তাহলে এসব শেয়ারের ভিত্তিতে যেসব কোম্পানী গড়ে উঠে তার আয় থেকেও কি যাকাত গ্রহণ করা হবে?
আবূ জুহরা ও তাঁর সঙ্গিগণ এ মত দিয়েছেন যে, শেয়ার ও বণ্ড- যে তা নিয়ে ব্যবসা করে- তার থেকে যে যাকাত গ্রহণ করা হবে, তা হবে মূল কোম্পানী থেকে গৃহীত যাকাত থেকে স্বতন্ত্র ও ভিন্নতর। কেননা যেসব কোম্পানী থেকে যাকাত নেয়া হবে, তা হবে এই হিসাবে যে, কোম্পানীর মাল প্রবৃদ্ধিসম্পন্ন, শিল্পোৎপাদনশীল ইত্যাদির কারণে। কিন্তু যে লোক কেবল শেয়ার নিয়ে ব্যবসা করে তার কাছে তা ব্যবসায়ের পণ্য হিসেবে প্রবৃদ্ধিসম্পন্ন মাল।
নিষিদ্ধ দ্বৈততা
উপরিউক্ত মতের ভিত্তিতে বলতে চাই, ধরুন- এক ব্যক্তির কোন শৈল্পিক কোম্পানীর শেয়ার রয়েছে, যার মূল্য এক হাজার দীনার। বছরের শেষে তা নির্ভেজাল মুনাফা অর্জন করল দুইশত দীনার। তার এই সমস্ত -১২০০ দীনার শতকরা ২.৫% হিসাবে মোট ৩০ দীনার যাকাত বাবদ দেয়া কর্তব্য হবে।
কোম্পানীর নির্ভেজাল মুনাফা থেকে যদি ওশর পরিমাণে যাকাত নেয়া হয়-এই মতের লোকেরা যেমন বলেন- তাহলে এই এক হাজার দীনার ও তার অর্জিত মুনাফার যাকাত দইবারে নেয়া হবে। তাতে একবার শেয়ার মালিককে ব্যবসায়ী গণ্য করা হবে। এবং তার শেয়ার ও মুনাফা সব কিছু থেকে এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ নেয়া হবে। পরে আবার নেয়া হবে উৎপাদক হিসেবে। তাহলে শেয়ারের মুনাফা থেকে- অন্য কথায় কোম্পানীর আয় থেকে ওশর নেয়া হয়। বস্তুত এ-ই হচ্ছে দ্বৈততা, যা শরীয়াতে নিষিদ্ধ।
দুই যাকাতের পরিবর্তে কোন একটি যাকাত গ্রহণ করাই বাঞ্ছনীয়। হয় যাকাত নেয়া হবে শেয়ার মূল্য থেকে তার মুনাফা সহ এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ পরিমাণে অথবা যাকাত নিতে হবে কোম্পানীর নির্ভেজাল আয় থেকে ওশর পরিমাণে।
সাদৃশ্যসম্পন্ন অবস্থাসমূহ- যা ফিকাহবিদগণ নিষেধ করেছেন
এখানে এমন কতগুলো অবস্থার উল্লেখ অবান্তর হবে না, যা পরস্পর সাদৃশ্য সম্পন্ন কিংবা আমাদের উপস্থাপিত এই অবস্থার নিকটবর্তী। ফিকাহবিদগণ যাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তার ফলে আলোচ্য বিষয়ে আমাদের কথায় যৌক্তিকতা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
গবাদিপশুর ব্যবসা ও তার যাকাত দেয়ার নিয়ম
’গবাদিপশু সম্পদের যাকাত’ অধ্যায়ে আমরা বলে এসেছি যে, গবাদিপশুর সংখ্যা নিসাব পরিমাণ হলে তার যাকাত দেয়া ফরয। এই কথা ইজমা দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু কেউ যদি গবাদিপশু ব্যবসার জন্যে ক্রয় করে তাহলে শরীয়তের হুকুম কি হবে? যেসব পশু বছরের অধিকাংশ সময় মুফত ঘাস খাওয়ায়ে পালা হয় এবং তার একটি বছর পূর্ণ হয়ে যায়। তাতে ছেড়ে দিয়ে উন্মু্ক্তভাবে পালা ও ব্যবসা করা উভয় নিয়তই বর্তমান। তাহলে তখন কি পালিত পশুর যাকাত দিতে হবে, না ব্যবসা পণ্যের যাকাত দিতে হবে?
এ পর্যায়ে ইবনে কুদামাহ ফিকাহবিদদের বিভিন্ন মতের উল্লেখ করেছেন। ইমাম মালিক ও শাফেয়ী (নতুন মতে) বলেছেন, তার পশু পালনের যাকাত দিতে হবে। কেননা এই পশুগুলোর পালনের দিকটি অধিক বলিষ্ঠ-এই মতে ইজমা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অতএব তাই উত্তম।
ইমাম আবূ হানীফা, সওরী ও আহমদ বলেছেন, তার যাকাত হবে ব্যবসা যাকাত। কেননা তা দিলে যাকাত প্রাপক গরীব-মিসকীনরা ভাগে বেশী পাবে। আর যাকাত ফরয হয় নিসাবের অতিরিক্ত সম্পদে, কিন্তু পশুর যাকাত তা নয়। শরীয়াতে নির্দিষ্ট নিসাবসমূহের মধ্যবর্তী পরিমাণ থেকে যাকাত প্রত্যাহার করা হয়েছে। ৪০ ও ১২০ টি ছাগলের মাঝের যে কোন সংখ্যার যাকাত দিতে হয় না। ২৫-৩৬ টি উটের মাঝের কোন যাকাত হয় না। তই যদি পশুর যাকাত দেয়া হয়, তাহলে গরীব লোকেরা সেই পশুগুলোর যাকাত থেকে বঞ্চিত থাকতে বাধ্য হয়, যা দু্ই নিসাব পরিমাণর মধ্যবর্তী। কেননা তার যাকাত মাফ করে দেয়া হয়েছে অথচ ব্যবসার বিচারে যাকাত দেয়া হলে-তা ও করা যায়- ফরয সঠিকরূপে আদায় হয়ে যায়। পালিত পশুর সংখ্যা নিসাব মাত্রার না হলে ব্যবসায় যাকাতের নিসাব পর্যন্ত অবশ্যই পৌছবে। ব্যবসার যাকাত পরিমাণে বেশী হবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
আর ব্যবসা যাকাতের নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই যদি পশু যাকাতের সময় এনে যায়- যেমন কউ ৪০ টি ছাগলের মালিক হল, তার মূল্য ব্যবসা নিসাবের কম, পরে বেশ মোটাসোটা হয়ে উঠল বা মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে গেল, তখন তার মূল্য অর্ধ বছরে ব্যবসা নিসাব পর্যন্ত পৌছে গেল, এরূপ অবস্থায় –কোন কোন আলিমের মতে – ব্যবসা যাকাতের বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত তার যাকাত ফরয হওয়া বিলম্বিত হবে। কেননা গরীবদের জন্যে তাই অধিক লাভজনক।
ইবনে কুদামাহ বলেছেন, পশুর যাকাত তার বছর শেষ হওয়াকালে ফরয হবার সম্ভাবনা আছে। কেননা কোনরূপ প্রতিবন্ধক ছাড়াই তার দাবি বর্তমান। তাই ব্যবসার বছর পূর্ণ হয়ে গেলে নিসাবের অধিক সম্পদের যাকাত দেয়া ফরয হবে। কেননা এটা ব্যবসার মাল এবং তার উপর একটি বছর অতিবাহিত হয়েছে এবং তাই নিসাব।
দুটি পূর্ণ হলেও দুই যাকাত ধার্য হওয়া সম্ভবপর নয়। কেননা তাতে একই বছরে ও একই কারণে দুবার যাকাত দেয়ার অবস্থা দেখা দেয়। নবী করীম (সা) এর উক্তির কারণে তা জায়েয হবে না।
আর যদি পশুর নিসাব পূর্ণ হয়; কিন্তু ব্যবসার নিসাব পূর্ণ না হয়- যেমন ৪০টি ছাগী, তার একটি বছর পূর্ণ হল; কিন্তু তার মুল্য ব্যবসার নিসাব মাত্রায় হল না তা হলে তাতে কোন প্রতিবন্ধক নেই বলে তার উপর পশুর হিসাবের যাকাত ফরয হবে।
ইবনে কুদামাহ্ আরও বলেছেন, কেউ যদি একটি জমি বা বাগান ব্যবসার জন্যে ক্রয় করে, পরে জমি চাষ করালে, ফল বা ফসল পাওয়া যায়, আর উভয় বছরই একসঙ্গে সম্পূর্ণ হয়- বছর পূর্ণ হওয়াকালে ফল বা ফসল পাকে, আর জমির মূল্য ফসলের মূল্য ব্যবসার নিসাবের অনুরূপ হয়, তাহলে সে ফল ও ফসলের যাকাত বাবদ ওশখর দেবে। আর মূল জমি বা বাগানের যাকাত দেবে ব্যবসার যাকাত হিসেবে। আবূ হানীফা ও আবূ সওর এই মত দিয়েছেন।
হাম্বলী মতের লোকদের কথা হল, জমি ও ফসল উভয়েরই যাকাত দেবে এর মূল্য হিসেবে। কেননা আসলে তা তো ব্যবসায়ের মাল। অতএব তাতে ব্যবসার যাকাত ধার্য হবে।
প্রথম কথার পক্ষের দলীল হচ্ছে, ওশর যাকাত গরীবদের জন্যে অধিক পরিমাণে পাওয়ার ব্যবস্থা করে এক-দশমাংশ। এক দশমাংশের এক-চতুর্থাংশের তুলনায় বেশী। তাই যা গরীবদের অধিক পরিমাণে দেয়, তাকেই অগ্রসর ধরতে হবে। আর এক-দশমাংশের অধিক পাওয়ার কারণ এখানে বর্তমান। অতএব তা-ই ফরয হবে। তবে ব্যবসার জন্যে ক্রীত পশুর ব্যাপারটি ভিন্নতর। কেননা পশুর হিসাবে যে যাকাত তা ব্যবসার যাকাতের তুলনায় কম। ইবনে কুদামাহ্ প্রদত্ত এই যুক্তি খুব অকাট্য নয়। কেননা যাতে গরীবদের অংশ বেশী হবে তাকেই অগ্রবর্তি মনে করা অগ্রাহ্য হবে যদি তাতে মালিকদের উপর জুলুম হয়। শরীয়াত তো উভয় পক্ষের প্রতি সমান ইনসাফের দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে।
এই পদ্ধতি প্রবর্তিত ইনসাফের কথা হল, মূল থেকে নয়, আয় ও আমদানী থেকে যাকাত নেয়া হলে ওশর ধার্য হয়। যেমন ফল ফসলের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে মূল ও তার প্রবৃদ্ধি থেকে যাকাত নেয়া হলে এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ ধার্য করা হয়। ব্যবসায়ে যেমন মূলধন ও মুনাফা উভয় থেকে যাকাত নেয়া হয়। কিন্তু এ দুটি ব্যাপার একত্রিকরণের পক্ষে কোন হুকুম নেই। তাই দুটি যাকাতের একটিকে অন্যটির উপর বিজয়ী ধরতে হবে।
এক্ষেত্রে দুটি কারণ একত্রিত হয়েছে, ব্যবসা ও চাষাবাদ- এমন কথা বলাও অযৌক্তিক। কেননা দুটির একটি কারণ মূলত লক্ষ্যভুক্ত, আর দ্বিতীয়টি তার ফলশ্রুতি। অতএব তা পিছনে থাকবে। তাই যে লোক কৃষি জমির ব্যবসা করে-কোন ও বেচে সেখানে চাষাবাদ আসল লক্ষ্য নয়; তা আনুসাংগিক মাত্র। সেখানে ব্যবসায়ের লক্ষটা প্রবল ও বিজয়ী ধরতে হবে।
এ কারণে হাম্বলী মাযহাবের লোকেরা বলেছেনঃ যে লোক ব্যবসার জন্যে নির্দিষ্ট ও ক্রীত পশুর নিসাব সংখ্যার মালিক হল, তার উপর শুধু ব্যবসার যাকাত ধার্য হবে। কেননা ব্যবসার লক্ষ পশুর যাকাত হিসাবকে দূরীভূত করেছে। আর যে লোক ব্যবসার জন্যে ক্রীত জমির মালিক হল, তাতে সে চাষাবাদ করে বীজ বপন করল, তাকে ব্যবসার যাকাত দিতে হবে অথবা কেউ ব্যবসার খেজুর বাগানের মালিক হল, তাতে ফল ধরল সে ও শুধুই ব্যবসার যাকাত দেবে। যদি ব্যবসার বছর পূর্তির পূর্বেই ফসল ও ফলের যাকাতের হিসাব অগ্রবর্তী হয় তবুও। কেননা ফল ও ফসল তা থেকে পাওয়া সম্পদের অংশ-বিশেষ। তাই মালের সাথেই তা গণ্য হবে। তবে যদি সেই পশু জমিসহ ফসল ও ফলসহ বাগানের মূল্য নিসাব পরিমাণ না হয়- বিশ মিশকাল স্বর্ণ মূল্যের ও দুইশ’ রৌপ্য মুদ্রার কর তাহরে তার অব্যবসায়ী যাকাত দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে পশুর হিসাবে যাকাত দেবে। আর ফল ও ফসলে যা ফরয হবে তা-ও। কেননা যাকাত তো সম্পূর্ণভাবে নাকচ করা যায় না।
ইবনে হাজম হাসান ইবনে হাই থেকে উদ্ধৃত করেছেন, যা ব্যবসার জন্যে চাষাবাদ করা হয়েছে- তার যাকাতও হবে ব্যবসা যাকাত, অন্য কিছু নয়।
কাসানী বলেছেন, যে লোক ব্যবসার লক্ষ্যে ওশরী জমি ক্রয় করবে কিংবা খারাজী জমি ক্রয় করবে ওই ব্যবসার উদ্দেশ্যে, তাতে হয় ওশর ধার্য হবে, না হয় হবে খারাজ। কোন একটিতেও ব্যবসার যাকাত ধার্য হবে না- এ হচ্ছে হানাফীদের মত।
ইমাম মুহাম্মাদ থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন, এরূপ ক্ষেত্রে ওশর ও যাকাত-ব্যবসা-যাকাত অথরা খারাজ ও যাকাত উভয়ই ধার্য হবে। এই বর্ণনাটির তাৎপর্য হল, জমির উপর ফরয হবে ব্যবসার যাকাত, আর ওশর হবে কৃষি ফসলের উপর। এ দুটি ভিন্ন ভিন্ন মাল। কাজেই একটি মালের উপর দুটি হক্ ধার্য হয়েছে, এমন কথা বলা যাবে না।
হানাফী মতের প্রসিদ্ধ বর্ণনার তাৎপর্য হচ্ছে, প্রত্যেকটির উপর যাকাত ফরয হওয়ার কারণ এক, আর তা হল জমি। আর আল্লাহর হক্ ধার্য হয় প্রবৃদ্ধি সম্পন্ন মালে। একটি নামের কারণে দুটি হক তাতে ফরয হয়নি। যেমন গবাদিপশুর যাকাত হয় ব্যবসার যাকাতের সঙ্গে একসাথে।
আমার বক্তব্য হচ্ছে, একটি যাকাত অপর যাকাতটির উপর প্রাধান্য পাবে। এভাবে যে, একটি যাকাত ধার্য হয়ে অপরটি ধার্য হওয়ার পর প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে। হানাফীদের এটি হল প্রসিদ্ধ মত। কিন্তু কোন্ যাকাতটি প্রাধান্য ও পগ্রাধিকার পাবে? ….. আমার কথা, যাকাতদাতার ইচ্ছার উপর তা ছেড়ে দিতে হবে, অথবা বাষ্ট্রকর্তা তার ফয়সালা করবে। কেননা উভয় যাকাতের পেছনেই যুক্তি রয়েছে।
এখানে আমি যা বলতে চাই, তা হচ্ছে, মুসলিম ফিকাহবিদদের অধিকাংশই বরং সকলেই একই মালে একই কারণে একাধিকবার যাকাত ধার্য হওয়া না জায়েয মনে করেন। যদিও কোন কোন অবস্থায় কোন ফিকাহবিদ পরস্পরের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেছেন। আর তা করেছেন, তাঁদের দৃষ্টিতে দুই কারণে যাকাত ধার্য হয়েছে বলে। ইমাম মুহাম্মাদের বর্ণনায় যেমন বলা হয়েছেঃ
ইসলামী শরীয়াতে বহু বর্ষ পূর্বেই এ পর্যায়ে বিধান রচিত হয়েছে; তা ইসলামী চিন্তা ও কর ধার্যকরণ জগতে ’দ্বৈত কর ধার্যকরণ নিষিদ্ধ’ নামে পরিচিত হয়ে আছে।

About শিবির অনলাইন লাইব্রেরী