ইসলামের যাকাত বিধান – ২য় খন্ড

ভূমিকা
কুরআন মজীদে যাকাত প্রসঙ্গে নামায অপেক্ষাও সংক্ষিপ্ত এবং মোটামুটিভাবে আলোচিত হয়েছে। কোন সব ধন-মালে যাকাত ফরয হবে, তাতে কত পরিমাণ হলে কত পরিমাণ যাকাত ধার্য হবে, কুরআনের আয়াতসমূহে তা বলা হয়নি। এ পর্যায়ে যেসব শর্ত রয়েছে- যেমন মালিকানার একটি বছর অতিবাহিত হওয়ার, নির্দিষ্ট নিসাব পরিমাণের মালিক হওয়া এবং তার কম পরিমাণের ওপর যাকাত ধার্য না হওয়া-ইত্যাদি বিষয়েও কুরআন মজীদে কিছুই আলোচিত হয়নি।
আইন প্রনয়নমূলক ‘সুন্নাত’ এ পর্যায়ে বিরাট অবদান রেখেছে। তা যেমন রাসূলে করীম (স) এর কথার দ্বারা প্রমাণিত, তেমনি তাঁর কাজও এক্ষেত্রে অকাট্য ও স্পষ্ট। তা যাকাত পর্যায়ের অবিস্তারিত কথাকে সবিস্তারে উপস্থাপিত করেছে, যেমন সুস্পষ্ট করে দিয়েছে নামায সংক্রান্ত যাবতীয় কথা। আর অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও সুবিন্যস্ত মহান ব্যক্তিগণ নবী করীম (স) থেকে তা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বর্ণনা করেছেন। এই বর্ণনা বংশানুক্রমে যুগের পর যুগ ধরে অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা সহকারে চলে এসেছে।
এ কারণে নবী করীম (স) এর সুন্নাতের প্রতি ঈমান আনা ও রাখা একান্তই জরুরী এবং সে ঈমান অনুযায়ী সুন্নাতকে গৃহীত হতে হবে ইসলামের শিক্ষার আইন প্রণয়নের উৎস হিসেবে। বস্তুত ইসলামী আইন বিধানের জন্যে কুরআনের পরে পরে ও সঙ্গে সঙ্গে এই সুন্নাতই হচ্ছে তার উৎস, তার ব্যাখ্যাকারী, বিস্তারিত বর্ণনাকারী, প্রতিটি বিষয়কে স্বতন্ত্র মর্যাদায় অভিষিক্তকারী এবং সুনির্দিষ্টকারী। মহান আল্লাহ সত্যই বলেছেনঃ
وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ
এবং আমরা তোমার প্রতি আল-কুরআন নাযিল করেছি, যেন তুমি হে নবী লোকদের জন্যে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করে বলে দাও তা যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে। তাতেই আশা করা যায়, তারা সে বিষয়ে চিন্তা ভাবনা করবে। (সূরা নহলঃ ৪৪)
আবু দাউদ বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেনঃ হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রা) কে এক ব্যক্তি বললেন, “হে আবু নুজাইদ, আপনি কেন এমন কিছু হাদীস আমাদের নিকট বর্ণনা করেন, যার কোন ভিত্তি কুরআন মজীদে খুঁজে পাওয়া যায় না?” একথা শুনে হযরত ইবরান রাগান্বিত হলেন এবং লোকটিকে বললেন, “প্রতি চল্লিশ দিরহামে এক দিরহাম বা একটি ছাগী বাবদ এই এই এবং এতটি উটের মধ্যে দিতে হবে, এসব কথা কি তোমরা কুরআন মজীদে পেয়েছে?” বললে, না তা পাইনি।” বললেন “হ্যা “কুরআনে তা পাওনি, তাহলে এসব কথা কোথেকে জানতে পারলে? তোমরা এসব কথা জানতে পেরেছ আমাদের নিকট থেকে এবং আমরা তা জানতে পেরেছি স্বয়ং নবী করীম (স) থেকে।” বর্ণনাকারী বলছেন, এ পর্যায়ে সাহাবী আরও অনেক কয়টি জিনিসের উল্লেখ করেছেন।
কুরআনে যাকাত ব্যয়ের খাতের উল্লেখ
পূর্বে যেমন বলেছি, কুরআন মজীদে যাকাতের ব্যাপারটি সংক্ষিপ্ত ও অবিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। তবে যাকাত কোথায় এবং কার জন্যে ব্যয় করা হবে, কুরআনে তা উদ্ধৃত হয়েছে। এই ব্যাপারটি কোন প্রশাসকের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেয়া হয়নি। আর সেসব লোভী লোকদের জন্যে তা করায়ত্ত্ব করার সুযোগও রাখা হয়নি, যাদের জন্যে যাকাতে কোন অংশই নির্দিষ্ট নেই। ফলে তারা তা পাওয়ার প্রকৃত যোগ্যতাসম্পন্ন লোকদের সাথে কোনরূপ প্রতিযোগিতা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে না। স্বয়ং রাসূলে করীম (স) এ জীবদ্দশায় অনুরূপ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। তখন কতিপয় লোভী ও দুষ্ট মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তি বিশেষভাবে লালায়িত হয়ে উঠেছিলো। সাদকা ও যাকাতের মালের লোভে তাদের মুখে পানি জমেছিল। মনে করেছিল, রাসূলে করীম (স) তাদের সংগ্রহ-উৎসাহ দেখে তাদের প্রতি কৃপার দৃষ্টি নিক্ষেপ করবেন ও কিছু না কিছু দিয়ে তাদের লালসা প্রতিনিবৃত্ত করবেন। কিন্তু নবী করীম (সা) তাদের প্রতি ভ্রুক্ষেপ মাত্র করলেন না, তাদের ভাগে যাকাতের কোন অংশ দিয়ে করে দিতে প্রস্তুত হলেন না। তখন তারা রাসূলে করীম (স) এর বিরুদ্ধে কুৎসা রচাতে শুরু করে দিল। এমন কি নবীর উচ্চতর ও মহানতার মর্যাদার ওপরও কটাক্ষ করতে কুণ্ঠাবোধ করল না। এই অবস্থায় কুরআনের আয়াত নাযিল হয়ে তাদের মুনাফিকী মতোবৃত্তি উদ্ঘাটিত করে দিল। তাদের কুৎসিৎ মন-মানসিকতা লোককদের সম্মখে স্পষ্ট করে তুলে ধরল। তাদের ব্যক্তি-স্বার্থের লোলুপ জিহ্বার ফণা চুর্ণ করে দিল। সেই সাথে যাকাত ব্যয়েরে সঠিক ক্ষেত্রে ও খাতসমূহের সুস্পষ্ট উল্লেখও করা হল।
কুরআনের সে আয়াতটি এই
وَمِنْهُمْ مَنْ يَلْمِزُكَ فِي الصَّدَقَاتِ فَإِنْ أُعْطُوا مِنْهَا رَضُوا وَإِنْ لَمْ يُعْطَوْا مِنْهَا إِذَا هُمْ يَسْخَطُونَ وَلَوْ أَنَّهُمْ رَضُوا مَا آتَاهُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ سَيُؤْتِينَا اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ وَرَسُولُهُ إِنَّا إِلَى اللَّهِ رَاغِبُونَ إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ-
লোকদের মধ্যে কেউ কেউ যাকাতের ব্যাপারে- হে নবী- তোমাকে জ্বালাতন করে। তা থেকে কিছু তাদের দেয়া হলে তারা খুব খুশী ও সন্তুষ্ট হয় আর কিছু দেয়া না হলে ঠিক তখনই তারা হয় অসন্তুষ্ট। অথচ আল্লাহ এবং রাসূল তাদের যা কিছু দেন, তা পেয়েই তারা যদি সন্তুষ্ট থাকত এবং বলত, আল্লাহই আমাদের জন্যে যথেষ্ট, তিনি নিশ্চয়ই তাঁর অনুগ্রহ আমাদের দেবেন এবং তাঁর রাসূলও; আমরা নিশ্চয়ই আল্লাহর প্রতি আগ্রহশীল। আসল কথা হচ্ছে, সাদকাত- যাকাত- গরীব মিসকীন, তাঁর জন্যে নিয়োজিত কর্মচারী, যাদের হৃদয় আকৃষ্ট করতে হবে, যাদের গর্দান দাসত্ব শৃংখলে বন্দী, যারা ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে এবং নিঃস্ব পথিক- এ সবের জন্যে নির্দিষ্ট। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে ধার্য। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সুবিজ্ঞনী। (সূরা তওবাঃ ৫৮-৬০)
এ আয়াতটি নাযিল হওয়ার ফলে যাকাত সম্পদের প্রতি সর্বপ্রকার লোভ-লালসা যেমন নিঃশেষ হয়ে গেল, তেমনি তার ব্যয় ও বন্টনের ক্ষেত্র বা খাতসমূহ সুম্পষ্ট ও প্রকট হয়ে উঠল। প্রত্যেকেই জানতে পারল তাতে কার কি হক বা অধিকার রয়েছে।
আবূ দাঊদ জিয়াদ ইবনুল হারিস আস-সাদায়ীর সুত্রে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেছেনঃ আমি রাসূলে করীম (স) এর নিকট উপস্থিত হলাম এবং অতঃপর তাঁর হাতে বায়’আত করলাম। এ পর্যায়ে তিনি দীর্ঘ কাহিনী বর্ণনা করেছেন- এ সময় তাঁর নিকট এক ব্যক্তি আসল এবং বললঃ আমাকে যাকাত থেকে দান করুন। তখন রাসূলে করীম (স) তাকে বললেনঃ যাকাতের ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা কোন নবী বা অন্য কারুর কথা বলার অবকাশ রাখতে রাজী হন নি। বরং এ পর্যায়ে তিনি নিজেই চূড়ান্ত ফায়সালা দান করেছেন। আল্লাহ তা’আলা যাকাত সম্পদকে আটটি ভাগে বিভক্ত করার ব্যবস্থা দিয়েছেন। তাই তুমি যদি সেই আট ভাগের কোন ভাগে গণ্য হও, তা হলে আমি তোমাকে প্রাপ্য হক দেব। [এই হাদীসের সনদে একজন বর্ণনাকারী হচ্ছেন আবদুর রহমান ইবনে জিয়াদ ইবন আনউম আল-আফ্রিদী। অনেক হাদীসবিদ তাঁর সম্পর্কে আপত্তি তুলেছেন।]
যাকাত-ব্যয় খাত পর্যায়ে কুরআনী ঘোষণার তাৎপর্য
অর্থনীতি ও সমাজতত্ত্ববিদ মনীষিগণ বলেছেন, ধন-সম্পদের ওপর কর ধার্যকরণ ও তা আদায় বা সংগ্রহকরণের ব্যাপারটি খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। সরকার মাত্রই নানা উপায় ও পন্থার মাধ্যমে নানাবিধ কর আদায় করতে সক্ষম। অবশ্য তা অনেক ক্ষেত্রে ইনসাফ ও সুবিচারের ভিত্তিতেই হয়ে থাকে। কিন্তু সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, সংগ্রহ ও আদায় করার পর তা কোথায় ব্যয় করা হবে? এখানেই বিচারের মানদন্ড একদিকে ঝুঁকে পড়ে, মানুষের লালসা শয়তানী খেলায় মেতে উঠে। তখন ধন-মাল সেই লোক গ্রহণ করে থাকে, যে তা ন্যায়ত পাওয়ার যোগ্য বা অধিকারী নয়। আর বঞ্চিত থেকে যায় সেসব লোক, যারা তা পওয়ার প্রকৃত অধিকারী। এই কারণেই কুরআন মজীদ ও ব্যাপারটির ওপর যথাযথ গুরুত্বরোপ করেছে এবং ব্যাপাটিকে কিছু মাত্র অস্পষ্ট করে রাখেনি- যাকাত সংক্রান্ত বহু ব্যাপারই যেমন সুন্নাতের ব্যাখ্যার জন্যে ছেড়ে দিয়েছে; কিন্তু এই মূল ব্যাপারটি সে রকম রাখা হয়নি- এটা ‍কিছুমাত্র বিচিত্র নয়।
ইসলামের পূর্বকালীন বহু প্রকারের কর ধার্যকরণের অর্থনৈতিক ইতিহাস সর্বজনজ্ঞাত। বিভিন্ন গোষ্ঠী ও গোত্রের নিকট থেকে তখন নানা প্রকারের কর আদায় করা হত; করা হত কোথাও জোর-জবরদস্তি করে, কোথাও লোকদের রাজী ও সন্তুষ্ট করে। তা সঞ্চয় করা হত অহংকারী রাজা-বাদশার খাজাঞ্চিখানায়। তারা তা নিজেদের ও তাদের নিকটাত্মীয়দের খাহেশ ও খেয়াল খুশীমত ব্যয় ও ভোগ-ব্যবহার করত। তাদের বিলাসিতা ও বড়লোকী বৃদ্ধি পেত, তাদের আধিপত্য ও কর্তৃত্ব প্রকাশ পেত। আর ওদিকে গরীব-মিসকীন, দর্বল, শ্রমজীবী চাষী-মুজুররা চরমভাবে শোষিত, নির্যাতিত ও বঞ্চিত হয়ে থাকতে বাধ্য হত।
কিন্তু ইসলাম এসে সর্বপ্রথম এই অভাবগ্রস্থ জনগণের প্রতি কৃপার দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। তাদের জন্যে বিশেষভাবে যাকাত সম্পদে একটা পর্যাপ্ত পরিমাণ অংশ নির্দিষ্ট করে দিল। আর সাধারণভাবে সমগ্র জাতীয় সম্পদের আবর্তনেও অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করল। অর্থনৈতিক জগতে কর ধার্যকরণ ও সরকারী ব্যয় বন্টন ক্ষেত্রে ইসলামের এই সামষ্টিক কল্যাণমূলক পদক্ষেপ সর্বাগ্রে গৃহীত ব্যাপার। মানবতা দীর্ঘকাল পর এই বিষয়ে জানতে ও অবহিত হতে পেরেছে।
যাকাত পাওয়ার অধিকারী লোকদের পর্যায়ে কুরআনুল করীম যা কিছু বলেছে, রাসূলে করীম (স) এর ও খুলাফায়ে রাশেদুনের সুন্নাতে যা বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তার আলোকে আমরা আটটি যাকাত ব্যয় খাত সম্পর্কে পরবর্তী সাতটি পরিচ্ছেদে বিস্তারিত আলোচনা করব। অষ্টম পরিচ্ছেদে আলোচনা করা হবে যাকাত পাওয়ার অধিকারী লোকদের বিভিন্ন প্রকার সম্পর্কে। আর যাদের জন্যে যাকাত ব্যয় করা আদৌ জায়েয নয় তাদের সম্পর্কে আলোচনা করা হবে সর্বশেষে।
প্রথম পরিচ্ছেদ
ফকীর ও মিসকীন
[‘ফকীর’ একবচন, বহুবচনে কুকারা’। মিসকীন একবচন বহুবচনে মাসাকীন]
উপরে উদ্ধৃত সূরা তওবার আয়াতিটি যাকাত ব্যয়ের খাত বা ক্ষেত্রে সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। সে খাত হচ্ছে আটটি। তন্মধ্য প্রথম দুইটি খাত হচ্ছেঃ ফকীর ও মিসকীন। যাকাত সম্পদে আল্লাহ তা’আলা সর্ব প্রথমে তাদের জন্যেই অংশ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। এ থেকে সুস্পষ্ট বোঝা যায়, দারিদ্র্য ও অভাব-অনটন দূর করাই যাকাতের প্রথম লক্ষ্য। ইসলামী সমাজে দারিদ্র্য অভাব-অনটনের কোন স্থিতি থাকতে পারে না।
তার বড় প্রমাণ, এ পর্যায়ে কথা শুরু করে কুরআন মজীদ সর্বপ্রথম ফকীর ও মিসকীনদের কথাই বলেছে। আর আরবী কথন রীতি হচ্ছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কথা সর্বপ্রথম বলা। দারিদ্র দূর করা ও ফকীর-মিসকীনদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধানই যাকাত ব্যবস্থার প্রথম লক্ষ্য – যাকাতের আসল উদ্দেশ্য। সেই কারণে নবী করীম (স) ও কোন কোন হাদীসে শুধু এ কথাটিরই উল্লেখ করেছেন। তিনি হযরত মুয়ায (রা) কে যখন ইয়েমেনে পাঠাচ্ছিলেন, তখন তাঁকে বললেনঃ
(আবরী***********)
তাদের জানিয়ে দেবে যে, তাদের ওপর যাকাত ফরয করা হয়েছে, যা তাদের ধনী লোকদের নিকট থেকে নেওয়া হবে এবং তাদের গরীব লোকদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।
’ফকীর’ ও মিসকীন বলতে কাদের বোঝায়?
কুরআনের আয়াতে উদ্ধৃত ফকীর’ ও মিসকীন’ বলতে কাদের বোঝায়? এরা কি দুই ধরনের লোক না একই পর্যায়ের এবং অভিন্ন? হানাফী মতের ইমাম আবু ইউসূফ এবং মালিকী মাযহাবের ইবনুল কাসেম মত প্রকাশ করেছেন যে, ফকীর ও মিসকীন বলতে আসলে একই লোক বোঝায়। কিন্তু জমহুর ফিকাহবিদদের মতে এরা আসলেই দুই ধরনের লোক- একই প্রজাতিভুক্ত। আর সে প্রজাতি হচ্ছে অভাব-অনটন লাঞ্ছিত জনগণ। তবে শব্দ দুটির তাৎপর্য নির্ধারণে তাফসীরকার ও ফিকাহবিদগণের ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। অবশ্য একটি আয়াতে একই প্রসঙ্গে শব্দ দুটি ব্যবহৃত হয়েছে, তাৎপর্য নির্ধারণে এ বিষয়টির প্রতি অবশ্যই গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। এ ঠিক ‘ইসলাম’ ও ঈমান শব্দদ্বয়ের ব্যবহারের মত বিশেষজ্ঞগণ বলেছেন, এ দুটি শব্দ এক স্থানে ব্যবহৃত হলে তাৎপর্য ভিন্ন ভিন্ন হবে। তখন প্রতিটি শব্দের একটা বিশেষ অর্থ হবে। আর এ দুটি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ব্যবহৃত হলে অর্থ হবে অভিন্ন অর্থাৎ একটার উল্লেখ হলে অপরটির অর্থও তার মধ্যে শামিল আছে বলে মনে করতে হবে। এই দৃষ্টিতেই প্রশ্ন উঠেছে, এখানে ‘ফকীর, ও মিসকীন’ এই শব্দদ্বয়ের প্রকৃত তাৎপর্য কি?
শায়খুল মুফাসসিরীন ইমাম তাবারী লিখেছেন, ফকীর অর্থঃ
(আরবী*******************)
সেই অভাবগ্রস্থ ব্যক্তি, যে নিজেকে সর্বপ্রকারের লাঞ্ছনা থেকে রক্ষা করে চলছে, কারুর নিকটই কিছুর প্রার্থনা করে না।
আর ‘মিসকীন’ হচ্ছে লাঞ্ছনাগ্রস্ত অভাবী ব্যক্তি, যে চেয়ে ভিক্ষা করে করে বেড়ায়।
তার এই ব্যাখ্যার সমর্থনে তিনি বলেছেন, – মাসকানা- দারিদ্র্য শব্দটিই এই কথা বোঝায়, যেমন আল্লাহ তাআলা ইয়াহুদীদের প্রসঙ্গে বলেছেনঃ
(আরবী****************)
তাদের ওপর লাঞ্ছনা ও দারিদ্র্য চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। [(আরবী*********)] (সূরা বাকারাঃ ৬১)
সহীহ হাদীসে বলা হয়েছেঃ
সে মিসকীন নয়, যাকে একটি বা দুটি খেজুর দিয়ে দেয়া হয়। বরং মিসকীন সে, যে নিজেকে পবিত্র রেখে চলে।[বুখারী ও মুসলিম- বর্ণনাকারী হযরত আবু হুরায়রা (রা)]
তবে এটা মিসকীন শব্দের আভিধানিক অর্থ নয়। অথচ আভিধানিক অর্থই তাদের নিকট গ্রহণীয়। এই কথাটি এ পর্যায়ের, যেমন বলা হয়েছে, কুস্তিগিরি দ্বারা শক্তিমত্তার পরিচয় হয় না, শক্তিধর সে যে ক্রোধের সময় নিজেকে সামলাতে পারে।’
এই কারণে ইমাম খাত্তাবী বলেছেনঃ লোকেরা বাহ্যত তাকেই মিসকীন বলে মনে করে, যে ভিক্ষার জন্যে ঘরে বেড়ায়। কিন্তু নবী করীম (স) তাকে মিসকীন বলেন নি। কেননা সে তো ভিক্ষা করে প্রয়োজন পরিমাণ অনেক ক্ষেত্রে তার চাইতেও অধিক-আয় করে থাকে। তখন তার অভাব মিটে যায়। দারিদ্র্যের নাম- চিহ্ন পর্যন্ত মুছে যায়। তাবে যে ব্যক্তি দরিদ্র হয়েও ভিক্ষাবৃত্তি গ্রহণ করেনি, তাকে অভাব ও দারিদ্র্য অক্ষুন্নই থেকে যায়। কেউ তার কষ্টের কথা বুঝে না, দেয়ও না তাকে কিছু। [(আরবী*******)]
ফিকাহবিদগণও বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মনে প্রশ্ন জেগেছে, এই দুই ধরনের দরিদ্র ব্যক্তির মধ্যে অধিক দুরবস্থা কার। – ফকীরের, না মিসকীনের?
শাফেয়ী ও হাম্বলী মতে ফকীর এর অবস্থাই অধিক খারাপ। মালিকীদের নিকট ব্যাপারটি উল্টো- হানাফীরাও এই মত গ্রহণ করেছেন বলে সকলে জানেন। উভয় পক্ষের নিকট অভিধান ও শরীয়াত- দুই দিক দিয়েই দলীল রয়েছে।
শব্দ দিয়ে তাৎপর্য নির্ধারণে উপরিউক্ত মতদ্বৈততার ব্যাপারটি যত গুরুত্বপূর্ণই হোক, তারা নিজেরাই চূড়ান্ত করে বলেছেন যে, এর কোন দীর্ঘসূত্রিতা নেই, আর এর তত্ত্বানুসন্ধানের পরিণতিতে যাকাতের ব্যাপারে আপরণযোগ্য কোন ফলই পাওয়া যাবে না। [প্রাচ্যবিদ শাখত ‘ইসলামী বিশ্বকোষ’ এ ফকীহ ও মিসকীন শব্দদ্বয় প্রসঙ্গে আলোচনাকালে দুঃখজনক ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। বলেছেন, ফুকারা ও মাসাকীন শব্দদ্বয়ের মধ্যে যে পার্থক্য করা হয় তা খুবই অবিচারমূলক। ফিকাহর আলিমগণ সর্বাবস্থায়ই সংজ্ঞার এমন ব্যাখ্যা দিতে অভ্যস্ত হয়েছেন, যেন তারা নিজেরাই দুইটি শ্রেণীর মধ্যে কোন একটির মধ্যে প্রধান হিসেবে গণ্য হতে পারেন। (১০ম খণ্ড, ৩৬০ পৃ.) কিন্তু আলিম চরিত্রসম্পন্ন কোন ব্যক্তির নিকট থেকেই এরূপ দুর্বলতা প্রকাশিত হওয়া নিতান্তই অবাঞ্ছিত। হানাফী মাযহাবের সরখসী বা মালিকী মাযহাবের ইবনুল আরাবী, শাফেয়ী মাযহাবের নব্বী, হাম্বলী মাযহাবের ইবনে কুদামাহ, জাহিরী মতের ইবনে হাজম প্রমুখ ইসলামী মাযহাব সমূহের ফিকাহবিদগণ। দারিদ্র্য বা অনটনগ্রস্ত হওয়ার ভান করে যাকাতের অংশ গ্রহণের লোভ করেবেন- এমন কথা চিন্তাই করা যায় না। সংজ্ঞাসমূহের মনগড়া ব্যাখ্যা দিয়ে কোন বৈষয়িক স্বর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করবেন, তাও নিতান্তই অকল্পনীয়। কেননা এসব ফিকাহবিদ দানকারী ধনী ও আত্মসম্মান রক্ষাকারী দারিদ্র ব্যক্তিদের মধ্য থেকে ছিলেন। তাঁদের জীবনচরিত সম্পর্কে অবহিত সকল লোকের নিকটই তা স্পষ্ট। আর যে অবিচারমূলক পার্থক্য সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে, তাতে একই প্রসঙ্গে ব্যবহৃত এসব শব্দের মধ্যে সূক্ষ্মতর পার্থক্যের কথা চিন্তা করা যায় না। আসলে এটা প্রথমে আভিধানিক ব্যাপার। ফিকাহ পর্যায়ের বিতর্ক তো পারে। এজন্যেই আভিধানিক ও তাফসীরবিদগণ এ বিষয়ে তেমনই অনুসন্ধিৎসা চালিয়েছেন, যেমন চালিয়েছেন ফিকাহবিদগণ। আর একথা তো অকাট্য যে, এই মতপার্থক্যের কোন প্রভাবই যাকাতের ক্ষেত্রে প্রতিফলিত নয়।]
হানাফী মতে ফকীর ও মিসকীন
এখানে যে কথা উল্লেখ্য তা হচ্ছে, হানাফীদের মতে যে লোক শরীয়তভিত্তিক যাকাতের নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক নয়, সেই ফকীর অথবা যে লোক মালিক হবে ঘরের দ্রব্যসামগ্রী, সাজ –সরঞ্জাম, কাপড়-চোপড়, বই-কিতাব ইত্যাদি জরুরী প্রয়োজনে ব্যবহার্য এবং মৌল প্রয়োজন পরিপূরণে আবশ্যকীয় দ্রব্যাদির, যার মূল্য নিসাব পরিমাণ কিংবা তার অধিক হবে।
আর তাঁদের মতে মিসকীন হচ্ছে সে যার কিছুই নেই। সাধারণভাবে এটাই প্রসিদ্ধ কথা।
তবে হানাফী আলিমগণেল মধ্যে নিসাব বলতে কি বোঝায় তা নির্ধারণে মতপার্থক্য রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে দুশ দিরহামের নিসাব ধরা হবে কিংবা যে কোন মালের প্রচলিত নিসাব ধরে হিসাব করলেই চলবে? [(আরবী ************* দ্রষ্টব্য)]
অতএব তাঁদের মতে দারিদ্র্য বা অভাবের দিক দিয়ে যাকাত পাওয়ার অধিকারী লোক হচ্ছে এরাঃ
১. নিঃস্ব – যার কিছুই নেই, সে মিসকীন।
২. যার ঘর, দ্রব্য ও ঘরের কিছু না কিছু সামগ্রী রয়েছে, যা দিয়ে উপকৃত হওয়া যায় বটে কিন্তু তা দারিদ্র্য মোচন যথেষ্ট হয় না- তার মূল্য যাই হোক না কেন।
৩. নগদ সম্পদের নির্ধারিত নিসাব পরিমান অপেক্ষা কম সম্পদের যে মালিক দুশ দিরহাম নগদ সম্পদের কম পরিমাণের মালিক।
৪. নগদ সম্পদ ছাড়া অন্যান্য সম্পদের নিসাব পরিমাণের কম সম্পদের যে মালিক- যেমন চারটি উটের মালিক কিংবা উনচল্লিশটি ছাগলের মালিকও ফকীর গণ্য হতে পারে। তবে শর্ত এই যে, তার মূল্য যেমন দুশ দিরহাম পর্যন্ত না পৌছায়।
আরও একটি ব্যাপারে মতদ্বৈততা রয়েছে। তা হচ্ছে, নগদ সম্পদ ছাড়া অন্যান্য সম্পদের নিসাব – যেমন পাঁচটি উট বা চল্লিশটি ছাগলের মূল্য যদি নগদ সম্পদের নিসাব পরিমাণ না হয়, তাহলে এরূপ অবস্থায় কারো মতে তার পক্ষে যাকাত গ্রহণ করা জায়েয এবং তাকে নিকেজেও যাকাত আদায় করতে হবে। আর অপররা বলেছেন, সে তো ধনী ব্যক্তি, তাকে যাকাত দেয়া যেতে পারে না। [(আরবী*************)]
কি পরিমাণের ধনাট্যতা যাকাত গ্রহণের প্রতিবন্ধক তা স্পষ্ট করার জন্যে আমরা শীঘ্রিই বিস্তারিত আলোচনায় প্রবৃত্ত হচ্ছি।
অপর তিনজন ইমাম ফকীর ও মিসকীন সম্পর্কে যে মত দিয়েছেন, তাতে বলা হয়েছে, ইমাম আবূ হানীফা ছাড়া অপর তিনজন প্রধান ইমামের দৃষ্টিতে নিসাব পরিমাণ সম্প-সম্পত্তির মালিকানা না থাকার ওপর দারিদ্র্য ও মিসকীনী নির্ভরশীল নয়। বরং প্রয়োজন পরিমাণ সম্পদ না থাকাই দারিদ্র্য প্রমাণ করে।
অতএব ফকীর সে, যার কোন মাল-সম্পদ নেই, নেই তার উপযোগী হালাল উপার্জন, যদ্দ্বারা তার প্রয়োজন পূরণ হতে পারে, যার খাওয়া-পরা ও থাকার স্থান বা ঘর এবং অন্যান্য জরুরী জিনিসপত্র নেই। না তার নিজের জন্যে, না তার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের জন্যে। খুব অপচয়ের প্রশ্ন নয়, নিম্নতম প্রয়োজনের কথাই বলা হচ্ছে। যেমন যার দৈনিক প্রয়োজন দশ টাকা, অথচ সে পাচ্ছে চার বা তিন কিংবা দুটাকা মাত্র সে তো নিঃসন্দেহে ফকীর।
আর মিসকীন হচ্ছে সে, যার এমন পরিমাণ সম্পদ বা হালাল উপার্জন সম্পূর্ণ মাত্রায় আছে যাদ্দ্বারা তার ওপর নির্ভরশীল লোকদের প্রয়োজন পূরণ হতে পারে বটে, কিন্তু তার হচ্ছে না। যেমন যার প্রয়োজন দশ টাকার সে পাচ্ছে সাত বা আট টাকা- যদিও সে নিসাব পরিমাণ কিংবা একটা মোটা সম্পদের মালিক হয়ে আছে।
কোন কোন ফিকাহবিদ বলেছেন, অর্ধেক বা তদূর্ধ্ব পরিমাণ দ্বারা যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ হতে পারে। এরূপ অবস্থায় এই যথেষ্ট পরিমাণের অর্ধেক বা তার চাইতে বেশির মালিক হলেও সে মিসকীন। আর ফকীর হচ্ছে, তার অর্ধেকেরও কম পরিমাণ সম্পদের মালিক।
এই সংজ্ঞার সারনির্যাস হচ্ছে, দারিদ্য ও মিসকীনীর নামে যাকাত পাওয়ার অধিকারী হচ্ছে নিম্নেদ্ধৃত তিন পর্যায়ের যে কোন এক পার্যায়ের লোকঃ
প্রথমঃ যার কোন সম্পদ নেই, নেই আসলেই কোন উপার্জন।
দ্বিতীয়ঃ যার কিছু মাল বা উপার্জন আছে বটে; কিন্তু তা তার ও তার পরিবারের লোকদের প্রয়োজন পূরণের জন্যে যথেষ্ট নয়।
তৃতীয়ঃ যার মাল-সম্পদ আছে বা অর্ধেক কিংবা ততোধিক প্রয়োজন পূরণের পরিমাণ উপার্জন আছে, যাদ্দ্বারা তার ও তার ওপর নির্ভরশীল লোকদের প্রয়োজনের অর্ধেক পূরর্ণ হয়; তার প্রয়োজন পূরা মাত্রায় পুরণ হয়না।
ফকীর বা মিসকীনের জন্যে ’যথেষ্ট পরিমাণ’ বলতে মালিকী ও হাম্বলী মতে একটি বছরের জন্যে যথেষ্ট হওয়া বোঝায়। আর শাফেয়ী মতে তার সম্মানের লোকদের জীবনের বেশির ভাগ সময়ের জন্যে যথেষ্ট বোঝায়। যদি সাধারণ বয়সের গড় ষাট বছর হয় এবং সে হয় ত্রিশ বছর বয়সের লোক, আর তার নিকট বিশ বছর বয়স পর্যন্ত প্রয়োজন পূরণ হওয়ার মত সম্পদ থাকে, তাহালে অবশিষ্ট দশ বছরের প্রয়োজন পূরণের জন্যে সে যাকাত গ্রহণের অধিকারী হবে।
শামসুদ্দীন রমলী বলেছেন, সংজ্ঞার এই বিশ্লেষণে অধিক সংখ্যক ধনী লোকেরই যাকাত গ্রহণের সুযোগ ঘটবে, এমন কথা বলা যায় না। কেননা আমরা তার জাবাবে বলব, যার এমন মাল আছে যে, তার মুনাফাই তার জন্যে যথেষ্ট হবে; কিংবা এমন পরিমাণ জমি আছে যার উৎপাদন তার জন্যে যথেষ্ট হবে, সেই ধনী ব্যক্তি। অধিকাংশ ধনী ব্যক্তিই এরূপ। [(আরবী***********)] তাই এই ধনী ব্যক্তিরা কখনই যাকাত পেতে পারে না।
কোন ফকীর বা মিসকীন ব্যক্তির উপযুক্ত একখানা ঘর থাকলেই তার দারিদ্র্য ও মিসকীনী থেকে মুক্তি ঘটেছে বলে মনে করা যুক্তিযুক্ত নয়। কেননা এ ঘর তার জন্যে প্রয়োজনীয়, তা বিক্রয় করে দিয়ে প্রয়োজনের জন্যে ব্যয় করতে তাকে বাধ্য করা যায় না। আর যার এমন পরিমাণ জমি রয়েছে যে, তার ফসল তার প্রয়োজন পূরণ করে না, সে নিশ্চয়ই ফকীর ও মিসকীন। তবে সে জমি যদি খুব উত্তম হয়, যা বিক্রয় করে দিলে তার জন্যে যথেষ্ট পরিমাণ ফসল ক্রয় করা সম্ভবপর হয়, তাহলে তা বিক্রয় করে দেয়াই তার কর্তব্য-বাহ্যত তা-ই মনে হয়।
ঘরের মতই তার মালিকানার কাপড়-চোপড়ও , বছরের বিশেষ বিশেষ সময়ে শোভা বর্ধনের জন্যে তার ব্যবহার প্রয়োজনীয় হলেও। এই কাপড়ের মালিকানা থাকলেই সে দরিদ্র্য থাকবে না, ধনী গণ্য হবে, এমন কথা নয়।
নারীর জন্যে উপযুক্ত অলংকারাদির কথাও তাই। স্বাভাবতই সৌর্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যেই তার প্রয়োজন। তা থাকলেই তার দরিদ্র ও মিসকীন থেকে মুক্তি ঘটেছে, তা বলা যেতে পারে না।
জ্ঞান-বিজ্ঞানের বই-কিতাব, যা খুবই প্রয়োজনীয়, বিরল বা দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থাদি- বছরের মাত্র একবারই তার প্রয়োজন দেখা দিলেও তা শরীয়ত সম্পর্কিত ফিকাহ, তাফসীর- হাদীসের গ্রন্থাদিই হোক, কিংবা অভিধান বা সাহিত্যের ন্যায় সাহায্যকারী গ্রন্থাদিই হোক। অথচ বৈষয়িক উপকারী গ্রন্থাদি- যেমন চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কিয় বই, এ সবের দরুনও কারুর দারিদ্র বা মিসকীনী ঘুচে যায় না।
পেশা সংক্রান্ত যন্ত্রাপাতি, শিল্পের পাত্রাদি- যা শিল্পোৎপাদন কর্মে বিশেষভাবে প্রয়োজনীয় , তাও এ পর্যায়েই গণ্য।
যেসব ধন-মাল ব্যবহার অনুপযোগী, দূরবর্তী কোন স্থানে অবস্থিত বলে অথবা নিকটে উপস্থিত মাল হওয়া সত্ত্বেও কোন প্রতিবন্ধক থাকার কারণে তা থেকে উপকৃত হওয়া যায় না। যেমন কোন স্বৈরতান্ত্রিক সরকার তা আটক করেছে বা তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, কিংবা তাকেই বন্দী করে রেখেছে।
দীর্ঘ মেয়াদী ঋণ থাকলেও অনুরূপ অবস্থাই হয়। কেননা যদ্দিন মেয়াদ শেষ না হচ্ছে, তার দারিদ্র্য দূর হচ্ছে না।
ফকীর-মিসকীনের অংশ থেকে কোন ধনীকেই কিছু দেয়া যেতে পারে না
দারিদ্র্য ও মিসকীনী পর্যায়ে ফিকাহবিদদের দৃষ্টিবঙ্গি স্পষ্ট করে তোলবার জন্যে এবং যাকাত পাওয়ার যোগ্য দুই প্রকারের লোকদের পরিচিতি পূর্ণাঙ্গ করার উদ্দেশ্য এর বিপরীত অর্থবোধক শব্দটির ওপরও দৃষ্টিপাত করা আবশ্যক। কেননা এর বিপরীত গুণের লোক তো আর যাকাত পাওয়ার অধিকারী হতে পারে না। তাই ফকিরী ও মিসকীনী এই দুইয়ের বিপরীতে গুণসম্পন্ন শব্দ ধনীর ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে।
ফিকাহবিদগণ এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ একমত যে, ফকীর ও মিসকীনের প্রাপ্য যাকাতের অংশ কোন ধনী লোককেই দেয়া যেতে পারে না। কেননা যাকাতকে আল্লাহ তাআলা ফকীর ও মিসকীনদের জন্যেই চিরতরে নির্দিষ্ট করে নিয়েছেন। ধনী লোক যাকাত পাওয়ার যোগ্য লোকদের মধ্যে গণ্য নয়। নবী করীম (স) তো স্পষ্ট ভাষায় বলেছেনঃ
(আরবী*********************)
তা ধনীদের নিকট থেকে গ্রহণ করা হবে, তাদের মধ্যকার গরীব লোকদের মধ্যে তা বন্টন করার উদ্দেশ্য।
তিনি আরও বলেছেনঃ যাকাত ধনী লোকের জন্যে হালাল নয়।’ (আবুদাউদ, তিরমিযী)
কেননা ধনী লোকেরাই যাকাত নিয়ে নিলে তা পাওয়ার প্রকৃত অধিকারী লোকেরা তা থেকে বঞ্চিত থেকে যাবে। তাহলে তা ফরয করার আসল উদ্দেশ্য গরীব লোকদের দারিদ্র্য মোচন-মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়ে পড়বে। ইবনে কুদামা তাই বলেছেনঃ [(আরবী ********)]
কিন্তু ধনী কে ধনীর সংজ্ঞা কি?
ধনীর যাকাত গ্রহণ নিষিদ্ধ
যে ধনাঢ্যতা যাকাত গ্রহণ করার প্রতিবন্ধক, তার সংজ্ঞা কি, সে বিষয়ে ফিকাহবিদদের বিভিন্ন কথা উদ্ধৃত হয়েছে।
আমরা বলেছি, ধনাঢ্যতা যাকাত গ্রহণের প্রতিবন্ধক, কেননা ধনাঢ্যতাই যাকাত ফরয হওয়ার কারণ। এ বিষয়ে ফিকাহবিদগণ মোটামুটি অভিন্ন মত পোষণ করেন। আর তা হচ্ছে, সর্বজনবিদিত ক্রমবৃদ্ধিশীল ধন-মালের নিসাব পরিমাণের মালিকানা- কয়েকটি বিশেষ শর্তের ভিত্তিতে। অথচ এই ফিকাহবিদগণই যাকাত গ্রহণে প্রতিবন্ধক পরিমাণ ধনাঢ্যতার সংজ্ঞায় বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। এখানে আমরা সেই বিভিন্ন মত উল্লেখ করছিঃ
ইমাম সওরী প্রমুখের অভিমত
সুফিয়ান সওরী, ইবনুল মুবারক ও ইসহাক ইবনে রাহুয়াই বলেছেন, যে ধনাঢ্যতা থাকলে যাকাত – সাদকা গ্রহণ করতে বাধা দেয়- নিষেধ করে, তা হচ্ছে পঞ্চাশ দিরহাম বা এই মূল্যের সমান পরিমাণ স্বর্ণের মালিকানা অর্থাৎ নগদ সম্পদের নিসাবের এক চতুর্থাংশের অর্ধেক। [(আরবী**************)]
দলীল হিসেবে তাঁরা হযরত ইবনে মাসউদ (রা) বর্ণিত একটি হাদীস উদ্ধত করেছেন। রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ
(আরবী******************)
যে ব্যক্তি তার যথেষ্ট সম্পদ থাকা সত্ত্বেও ভিক্ষা করবে, কিয়ামতের দিন তার মুখাবয়বে আচড়ানো ক্ষতচিহ্ন থাকবে।
একথা শুনে বলা হল, ইয়া রাসূল! ধনাঢ্যতা বলতে কি বোঝায়? বললেনঃ পঞ্চাশ দিরহাম নগদ সম্পদ কিংবা এই মূল্যের স্বর্ণের মালিকত্ব থাকা। [(আরবী****************)]
ইমাম আহমাদ থেকেও এই মতের বর্ণনা উদ্ধুত হয়েছে। অবশ্য নগদ সম্পদের মালিকানা ও অনগদ সম্পদের মালিকানার মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে। যে লোক অ-নগদ সম্পদের একট পরিমাণের মালিক হবে, যা তার জন্যে যথেষ্ট নয়, সে ধনী বলে অভিহিত হতে পারে না- তার মূল্য যত বেশিই হোক না কেন। আর যে লোক পঞ্চাশ দিরহাম নগদ সম্পদ বা এই পরিমাণ মূল্যের স্বর্ণের মালিক হবে, সে ধনী বিবেচিত হবে। কেননা নগদ সম্পদ ব্যয়ের জন্যে প্রস্তুত সামগ্রী। উপরে উদ্ধৃত হযরত ইবনে মাসউদ বর্ণিত হাদীসেও এ কথারই সমর্থন পাওয়া যায়।
কিন্তু হাদীসের মূল্যায়ন ও যাচাই পরখকারীরা উক্ত হাদীসটিকে দুর্বল বলে অভিহিত করেছেন। এ দর্বলতার কারণও নির্দেশ করেছেন।
হাদীসটিকে সহীহ মেনে নিয়েও অনেক মনীষী তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন এই বলে যে, রাসূলে করীম (স) এ কথাটি ঠিক সেই জাতির লোকদের জন্যে বলেছেন, যারা পঞ্চাশ দিরহামের মূলধন নিয়ে ব্যবসা করত এবং তা তাদের জন্যে যথেষ্ট হতো। [(আরবী**********)]
অন্যরা বলেছেন, নবী করীম (স) উক্ত কথা বলেছিলেন তখন, যখন এই পঞ্চাশ দিরহাম সাধারণভাবেই যথেষ্ট হয়ে যেত। [(আরবী**************)]
অনেকে ব্যাখ্যা করেছেন, কথাটি আসলে ভিক্ষাবৃত্তি সংক্রান্ত; কাজেই যে লোক পঞ্চাশ দিরহামের মালিক হবে, ভিক্ষা চাওয়া তার জন্যে হারাম হবে; কিন্তু গ্রহণ করা হারাম হবে না। [(আরবী****************)]
ইমাম খাত্তাবী বলেছেন, হাদীসবিদগণ মত প্রকাশ করেছেন, হাদীসে একথা বলা হয়নি যে, যে লোক পঞ্চাশ দিরহামের মালিক হবে, তার জন্যে যাকাত সাদকা হালাল নয়। তার পক্ষে ভিক্ষা চাওয়া অপসন্দনীয়, এ কথাই শুধু বলা হয়েছে। কেননা ভিক্ষা চাওয়াটা নিতান্ত প্রয়োজনেই হয়ে থাকে, কিন্তু যে লোক উপস্থিত প্রয়োজন মেটানোর পরিমাণ সম্পদের মালিক, তার ভিক্ষা চাওয়ার কোন প্রয়োজন হতে পারে না। [(আরবী*****************)]
হানাফী মাযহাবের মত
হানাফী আলিমগণ মনে করেন, যে ধনাঢ্যতা যাকাত-সাদকা গ্রহণের প্রতিবন্ধক, তা নিম্নোক্ত যে কোন একটি মাত্রার হবেঃ
প্রথম, যে কোন মালের যাকাতের নিসাব পরিমানের মালিকত্ব। যেমন মুক্তভাবে পালিত পাঁচটি উট অথবা দুশ দিরহাম নগদ; কিংবা দীনার নগদ (এক্ষণে তার মূল্য ৮৫ গ্রাম স্বর্ণ মনে করা হয়েছে)। কেননা শরীয়াত মানুষকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। এক প্রকার হচ্ছে ধনী লোক, যাদের নিকট থেকে যাকাত গ্রহণ করা হবে আর অন্য প্রকার হচ্ছে গরীব, মিসকীন- তাদের মধ্যে যাকাত বন্টন করা হবে। আর একজন লোক একই সময় ধনী ও গরীব উভয়ই হতে পারে না। যেমন, কারুর নিকট নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে সেই সম্পদের ওপর যাকাত ধার্য হবে। কিন্তু তার যদি বিপুল সংখ্যক সন্তান-সন্ততি থাকে, যাদের জন্যে বহু পরিমাণ ব্যয় করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে, তাহলে সে যাকাত দিতে পারে না আর যাকাত গ্রহণও তার জন্যে জায়েয হয় না।
অপর কোন কোন হানাফী আলিমের মত হচ্ছে, যে কোন মালের নিসাব পরিমাণ থাকাটাই গণনাযোগ্য সেই একই জাতীয় মাল দ্বারা নিসাব পূর্ণ হোক আর নাই হোক।
তাই যে লোক চল্লিশটি ছাগীর মালিক ছাগীর নিসাবও তাই- তার মূল্য যদি দুশ দিরহাম সমান না হয়, তাহলে উপরিউক্ত মত অনুযায়ী সে গরীব ব্যক্তি। এমতাবস্থায় তাকে যাকাত দিতেও হবে এবং সে যাকাত গ্রহণও করতে পারবে।
এই মতের সমর্থনে কেউ কেউ দলীল হিসেবে একটি হাদীসের উল্লেখ করেছেন। হাদীসটি এইঃ
কোন ব্যক্তির যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদ থাকা সত্ত্বেও সে যদি ভিক্ষা চায়, তাহলে সে (কুরআনে অপসন্দনীয় বলে ঘোষিত ভাবে) লোকদের পাকড়াও করে ভিক্ষা চাইল।
লোকেরা জিজ্ঞাসা করলঃ ‘যথেষ্ট পরিমাণ’ বলতে কি বোঝায়? বললেনঃ দুশ দিরহাম নগদ।
কিন্তু হাদীসটি যয়ীফ। তাসত্ত্বেও তা ভিক্ষা নিষেধকারী দলীল হিসেবে গণ্য হতে পারে। তা সে সব হানাফী ফিকাহবিদদের বিরুদ্ধে পেশ হতে পারে না, যারা মনে করেন যে, যার নিকট দুশ দিরহাম রয়েছে, অথচ তা তার জন্যে যথেষ্ট হয় না, তার পক্ষে যাকাত গ্রহণ করা সম্পূর্ণ জায়েয। কেননা যে ধনাঢ্যতা ভিক্ষা চাওয়াকে হারাম করে, তা যাকাত গ্রহণকে হারাম করে না।
এই উভয় মতের কোন একটির ওপর নির্ভরতা গ্রহণের ক্ষেত্রে হানাফী আলিমগণের মধ্যে পারস্পরিক মতবিরোধ রয়েছে। এই মতবিরোধের কথা তাদেরে লিখিত গ্রন্থাবলীতে বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে।
দ্বিতীয়, যেসব মালে যাকাত ফরয হয় না সেসব মালের মালিকানা যদি প্রয়োজনের অতিরিক্ত পরিমাণের হয় এবং তার মূল্য দুশ দিরহামের বেশি হয়- যেমন কাপড়, বিছানা, তৈজসপত্র, বই-কিতাব, ঘড়-বাড়ি, দোকান ঘর, চতুষ্পদ জন্তু ইত্যাদি- প্রয়োজনের অতিরিক্ত যদি থাকে, অথচ এর সবগুলোই ব্যয়-ব্যবহারের জন্যে, বিক্রয় করে ব্যবসা করার জন্যে নয়। সেগুলো যদি দুশ দিরহাম মূল্যের হয়, তা হলে তার পক্ষে যাকাত গ্রহণ হারাম হয়ে যাবে। কারুর দুইখানি ঘর থাকারেও একখানি ঘর দ্বারাই তার প্রয়োজন পূর্ণ হলে-যা বিক্রয় করা নগদ সম্পদের নিসাব পরিমাণ মূল্য পাওয়ার আশা হবে, তার জন্যেও যাকাত গ্রহণ জায়েয হবে না। অনুরূপভাবে কারুর নিকট উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বই-কিতাব বা কাজের পাত্র-ভান্ডার তৈজসপত্র থাকলে- যার মুল্য নিসাব পরিমাণ হবে অথচ সেগুলো তার জন্যে প্রয়োজনীয় নয়, কেননা সে নিজে কোন লেখাপড়ার ব্যক্তি নয়, নয় সে সেই কাজের যোগ্য যার পত্রগুলো রয়েছে- তা হলেও তার যাকাত গ্রহণ জায়েয হবে না।
ইমাম আল-কাসানী বলেছেনঃ
ইমাম করখী ‘প্রয়োজন পরিমাণ পর্যায়ে’ বলেছেনঃ যারা একখানি ঘর আছে, আছে ঘরের দ্রব্য-সামগ্রী-সরঞ্জাম, আছে একজন খাদেম, বিছানা পাত্র, পরিধানের কাপড়, শিক্ষিত হলে বই-পত্র, তার এই অতিরিক্ত পরিমাণের মুল্য যদি এমন পরিমাণ হয় যার দরুন তার মালিকের পক্ষে যাকাত গ্রহণ করা হারাম হয়ে যায়, তাহলে তাকেও যাকাতের অংশ দেয়ায় কোন দোষ নেই। কেননা হাসান বসরী থেকে বর্ণিত হয়েছে, সাহাবিগণ এমন ব্যক্তিকেও যাকাত দিতেন যে ঘোড়া, হাতিয়ার, খাদেম ও ঘর ইত্যাদি দশ হাজার দিরহাম মূল্যের সম্পত্তির মালিক ছিল। কেননা এই জিনিসগুলো তো মৌল প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত-এগুলো মানুষের জন্যে একান্ত আবশ্যক। তাই এগুলোর থাকা না থাকা সমান। [(আরবী**************)]
’আল-ফাতওয়া’ কিতাবে উদ্ধৃত হয়েছে, যার দোকান ও শস্যাদি রাখার ঘর আছে, কিন্তু সে শস্য তার ও তার পরিবারবর্গের প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট হয় না, সে ফকীর, দরিদ্র ব্যক্তি। তার পক্ষে যাকাত গ্রহণ সম্পূর্ণ জায়েয। ইমাম মুহাম্মাদ এই মত দিয়েছেন। কিন্তু ইমাম আবূ ইউসূফের মতে এই ব্যক্তির পক্ষে যাকাত হালাল নয়। অনুরূপভাবে কারুর যদি ফলের বাগান থাকে এবং তার ফসল তার প্রয়োজন পূরণের জন্যে যথেষ্ট না হয়, তাহলে……..।
যদি কারুর নিকট এমন পরিমাণের খাদ্য মজুদ থাকে যার মূল্য দুশ দিরহাম, তা যদি তার এক মাসের প্রয়োজন পূরণের জন্যে যথেষ্ট হয়, তাহলে তার পক্ষে যাকাত গ্রহণ জায়েয হবে। যদি এক বছরের জন্যে যথেষ্ট হয়, তাহলে বলা হয়েছে হালাল হবে না। আবার কেউ কেউ বলেছেন, হালাল হবে। কেননা প্রয়োজন পরিমাণ পাওয়ার তার অধিকার আছে। তাই মনে করতে হবে যে, তার কিছুই নেই। খোদ নবী করীম (স) তাঁর পরিবারবর্গের জন্যে এক বছর কালের জন্যে প্রয়োজনীয় খাদ্য জমা করে রেখেছিলাম।
যদি করুর শীতকালীন কাপড় থাকে, যা গ্রীষ্মকালে প্রয়োজনীয় নয়, (এবং তার মূল্য নিসাব পরিমাণও হয় তাহলেও) তার পক্ষেও যাকাত গ্রহণ করা হালাল।
’তাতারখানীয়া’ ফতোয়ার কিতাব লিখিত রয়েছে, কারুর বসবাসের একখানা ঘর থাকলে আর তা সবাইর বসবাসের জন্যে যথেষ্ট না হলে তার পক্ষেও যাকাত গ্রহণ করা জায়েয।
তাতে আরও উদ্ধত হয়েছে, ইমাম মুহাম্মাদকে জিজ্ঞেস করা হয়, একজনের জমি আছে, সে তা চাষাবাদ করে, কিংবা দোকান রয়েছে, যা দ্বারা সে মুনাফা পায়, অথবা তিন হাজার মূল্যের একখানা ঘর রয়েছে; কিন্তু তার নিজের ও তার পরিবারবর্গের খরচপত্রের জন্যে যথেষ্ট পরিমাণ আয় না থাকে, তাহলে তার পক্ষে যাকাত গ্রহণ করা জায়েয কিনা? জবাবে বললেনঃ হ্যাঁ জায়েয, তার মূল্য কায়েক হাজার হলেও। এই মতের ওপরই ফতোয়া দেয়া হয়েছে। কিন্তু ইমাম ইউসূফ ও মুহাম্মাদের মতে হালাল নয়।
ফিকাহবিদ ইবনে আবেদীনের নিকট জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, যে মেয়েটিকে দান-জিহাজ সহকারে তার স্বামীর বাড়িতে পাঠানো হয়েছে, সে কি ধনবতী গণ্য হবে? জবাবে বলেছিলেন, বাহ্যত দেখা যায়, ঘরের দ্রব্য-সরঞ্জাম, পরনের কাপড়-চোপড় ও ব্যবহার্য ভাণ্ড বা তৈজসপত্রাদি মৌল প্রয়োজনীয় জিনিসের মধ্যে গণ্য, একান্তই অপরিহার্য। তাই তার অতিরিক্ত অলংকারাদি, তৈজসপত্র ও সৌন্দর্য বৃদ্ধিকারী সামগ্রীসমূহ যদি নিসাব পরিমাণ হয়, তাহলে তার মালিক ধনী গণ্য হবে।
তিনি আরও বলেছেন, ‘তাতারখানীয়া’ গ্রন্থের ফিতর সাদকা অধ্যায় লিখিত রয়েছেঃ যে মেয়েলোকটির হীরা-জহরত রয়েছে, যা সে ঈদ ও অন্যান্য উৎসবাদিতে পরিধান করে, স্বামীর জন্যে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে সেগুলো ব্যবসায়ের জন্যে নয়, তার ওপর ফিতরা সাদকা দেয়া ওয়াজিব কিনা, হামান ইবনে আলীকে জিজ্ঞাস করা হলে জবাবে তিনি বলেছিলেনঃ হ্যাঁ ঐসব জিনিস নিসাব পরিমাণের হলে তা ওয়াজিব হবে। আর উমর-আল-হাফেযকে ও বিষয়ে জিজ্ঞাস করা হলে তিনি বললেন, তার ওপর তেমন কিছুই ওয়াজিব হবে না। ইবনে আবেদীন বলেছেন, এই আলোচনার সারকথা হচ্ছে অলংকারাদি আসল ও মৌল প্রয়োজনের মধ্যে গণ্য অ-নগদ সম্পদ। [(আবরী*************)] (প্রকৃত ব্যাপারে তো আল্লাহই ভালো জানেন)
ইমাম মালিক, শাফেয়ী ও আহমাদের মত
যে-সম্পদ দ্বারা প্রয়োজন পূরণ হয়, তা-ই ধনাঢ্যতা। একজন লোক যখন পরমুখাপেক্ষী নয়, তখন যাকাত গ্রহণ তার জন্যে হারাম, কোন জিনিসের মালিকানা না থাকলেও। আর অভাবগ্রস্ত ও পরমুখাপেক্ষী হলেই তার জন্যে যাকাত গ্রহণ হালাল- সে নিসবা পরিমাণ বা বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেও। ইমাম মালিক, শাফেয়ী ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বর্ণনানুযায়ী ইমাম আহমাদের এই অভিমত। ইমাম খাত্তাবী বলেছেনঃ ইমাম মালিক ও ইমাম শাফয়ীর মত হচ্ছে, ধনাঢ্যতার কোন সীমা বা সংজ্ঞা সুপরিচিত নয়। ব্যক্তির সচ্ছলতা ও অর্থশক্তির প্রেক্ষিতেই তা নির্ধারণ করতে হবে। ব্যক্তির নিকট যা আছে, তা তার জন্যে যথেষ্ট হলে তার পক্ষে যাকাত গ্রহণ জায়েয হবে না। অভাবগ্রস্ত হলে তা জায়েয হবে। [(আরবী*************)]
ইমাম শাফিয়ী বলেছেন, ব্যক্তি কখনও দিরহামের মালিক হয়ে ধনী গণ্য হয়-উপার্জন চালু থাকলে। আর কোন ব্যক্তির হাজার টাকার মালিকানা থাকলেও তার অক্ষমতা ও বিপুল সংখ্যক সন্তানাদি থাকার কারণে সে ধনী গণ্য হবে না।
শরীয়াত তার দলীলাদি দ্বারা এই মতকেই সমর্থন করে। শরীয়াতের মৌল ভাবধারাই তাই। অভিধান ও তার প্রয়োগ থেকেও তারই সমর্থন পাওয়া যায়।
নিম্নোদ্ধৃত কথাগুলো থেকেও এ মতের যথার্থতা প্রমাণিত হয়ঃ
ক. হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে, নবী করীম (স) কুবাইচা ইবনুল মাখারিকের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেনঃ তিনজনের যে কোন একজনের পক্ষে ভিক্ষা করা জায়েযঃ যে ব্যক্তি অভুক্ত রয়েছে, সে যতক্ষণ পর্যন্ত জীবনে বেঁচে থাকার সম্বল না পাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত ভিক্ষা চাইতে পারে।
খ. দরিদ্র্য হচ্ছে অভাবগ্রস্ততার অপর নাম। আর ধনাঢ্যতার বিপরীত। কাজেই যে লো অভাবগ্রস্ত, সেই দরিদ্র এবং কুরআনী আয়াতের আওতায় পড়ে প্রত্যক্ষভাবে অর্থাৎ সে যাকাত গ্রহণ করতে পারবে। আর যে লোক পরমুখাপেক্ষিতমুক্ত, সে যাকাত হারাম হওয়ার সাধারণ ঘোষণার মধ্যে পড়বে অর্থাৎ যাকাত গ্রহণ তার জন্যে হারাম। অভাবগ্রন্ততাই যে দারিদ্র্য, তার দলীল হচ্ছে আল্লাহর ঘোষণাঃ
(আরবী***************)
হে মানুষ! তোমরা সকলেই আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী।
এ কথার ভিত্তিতে দুটি বিষয়ে কথা বলা হচ্ছেঃ
প্রথম, যে ব্যক্তির যথেষ্ট পরিমাণ ধন মাল আছে তা যাকাত দেয়া মাল হোক কিংবা অন্য ধরনের; অথবা তার উপার্জিত কর্মের বিনিময়ে বা মজুরী হিসেবে পাওয়া জমি হোক কিংবা অন্য কিছু তার পক্ষে যাকাত গ্রহণ জায়েয নয়। ধন-মালের যথেষ্ট হওয়ার ব্যাপারটি বিবেচ্য হবে তার নিজের, তার ওপর নির্ভরশীল তার সন্তানাদি ও অন্যান্যদের প্রেক্ষিতে। কেননা এদের সকলেরই প্রয়োজন পুরণ করা আল্লাহ প্রদত্ত বিধানের লক্ষ্য। তাই এক ব্যক্তির জন্যে যা প্রয়োজন বিবেচিত হবে তা ই বিবেচিত হবে অন্যদের জন্যেও। সাধারণ শ্রমজীবী ও বেতভুক্ত লোকেরও এই শ্রেণীর মধ্যে গণ্য এবং তাদের নিত্য সব উপার্জনের কারণে ধনী বলে বিবেচিত। তার ধন ও পুঞ্জীভুত সম্পদের দরুন নয়। অতএব যারা নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হওয়ার দরুন গরীব ও দারিদ্র বিবেচিত হবে, তারা সবাই যাকাত পাওয়ার যোগ্য হবে…….. কিন্তু এ কথা গ্রহনযোগ্য।
দ্বিতীয়, যে লোক যাকাত দেয়া মালের নিসাব পরিমাণের বা তার অধিকের মালিক হবে, যা তার নিজের ও তার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের জন্যে যথেষ্ট নয়, তার পক্ষে যাকাত গ্রহণ বৈধ। কেননা সে ধনী নয়। কাজেই যার হাজার দীনার বা ততোধিক মূল্যের পণ্যদ্রব্য রয়েছে, কিন্তু তা থেকে লব্ধ মুনাফা তার প্রয়োজনের জন্যে যথেষ্ট হয় না বাজারের মন্দা অবস্থার কারণে, কিংবা তার অধিক সংখ্যক সন্তান-সন্ততি থাকার কারণে তার পক্ষে যাকাত গ্রহণ সম্পূর্ণ জায়েয।
যার পাঁচ ‘অসাক’ পরিমাণ কৃষি ফসল রয়েছে; কিন্তু তা সত্ত্বেও তা তার জন্যে যথেষ্ট হয় না, তার পক্ষেও যাকাত নেয়া জায়েয। অবশ্য এই অবস্থা তার ওপর যাকাত ফরয হওয়ার প্রতিবন্ধক হবে না। কেননা যে ধনাঢ্যতা যাকাত ফরয হওয়ার কারণ হয় তা হচ্ছ শর্তাধীন নিসাবের মালিকানা। যাকাত গ্রহণের প্রতিবন্ধক ধনাঢ্যতা হচ্ছে তা, যদ্বারা প্রয়োজন যথেষ্ট মাত্রায় পূরণ হবে। এ দুটির মধ্যে কোন বাধ্যবাধকতা নেই। [আরবী*************)]
মাইনূনী বলেছেন, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলকে লক্ষ্য করে বলেছিলামঃ এক ব্যক্তির উট ও ছাগল রয়েছে, যার ওপর যাকাত ফরয হয়, অথচ তা সত্ত্বেও সে ফকীর-দরিদ্র। তার চল্লিশটি ছাগী থাকতে পারে, কাছে কৃষিজমি; কিন্তু তা তার জন্যে যথেষ্ট হয় না, এই ব্যক্তিকে কি যাকাত দেয়া যাবে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ অবশ্যই। হযরত উমরের উক্তি হচ্ছেঃ ‘এদের দাও, তাদের এত এত উট থাকলেও’। [(আরবী**************)]
ইবনে আহমাদ বলেছেন, কারুর ভূ-সম্পদ বা জমি থাকলে-যার ফসল হয় দশ হাজার বা ততোধিক, কিন্তু তা-ও তার জন্যে যথেষ্ট হয় না, সে যাকাত নেবে। [(আরবী************)]
তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলে, এক ব্যক্তির মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা ফসল রয়েছে, কিন্তু তা কাটার সরঞ্জাম নেই, সে কি যাকাত নেবে? বললেনঃ হ্যাঁ।
যার মুখস্থকরণ ও অধ্যয়নের জন্যে জরুরী বই-পত্র রয়েছে অথবা ব্যবহারে বা ভাড়া দেয়ার অলংকারাদি রয়েছে যা জরুরী, তার এই থাকাটা যাকাত গ্রহণের প্রতিবন্ধক নয়।
উপার্জনক্ষম দরিদ্র
যাকাত পাওয়ার অধিকার হওয়ার ভিত্তি হচ্ছে অভাব-ব্যক্তির অভাব তার নিজের ও তার ওপর নির্ভরশীল লোকদের প্রয়োজন যথেষ্ট মাত্রায় পূরণের। এক্ষণে কোন নিষ্কর্মা অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিকে- যে সমাজের ওপর বোঝা, সাহায্য ও দান নিয়ে বেঁচে থাকছে- যাকাত দেয়া জায়েয হবে কিনা? অথচ সে লোকটি শক্ত-সুঠাম দেহসম্পন্ন, উপার্জন করতে সক্ষম এবং শ্রমোপার্জনের মাধ্যমে যেস নিজেকে পরমুখাপেক্ষীহীন ও দারিদ্রমুক্ত বানাতে পারে, তা সত্ত্বেও তাকে যাকাত দেয়া যাবে কিনা?
এ পর্যায়ে শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের বিশেষজ্ঞগণ মত প্রকাশ করে বলেছেন, যাকাত ফকীর ও মিসকীনের প্রাপ্য, তার কোন অংশ কোন ধনী ব্যক্তিকে দেয়া জায়েয নয়। অনুরূপভাবে যে উপর্জনের মাধ্যমে তার নিজের ও পরিবারবর্গের প্রয়োজন যথেষ্ট মাত্রায় পূরণ করতে সক্ষম তাকেও তার অংশ দেয়া যেতে পারে না। আমার বিবেচনায় এ মতই অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। [(আরবী***********)]
শরীয়াতের অকাট্য দলিল ও নিয়মাদিও এই মতকেই শক্তিশালী করে। যদিও কোন কোন হানাফী আলিম উপার্জনশীল দরিদ্র ব্যক্তিকেও যাকাত দেয়া জায়েয মনে করেন, অবশ্য তার নিজের উচিত নয় তা গ্রহণ করা। কেননা গ্রহণ জায়েয হলেও তা গ্রহণ করতেই হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। যেমন কোন ধনী ব্যক্তিকে দরিদ্র মনে করে যাকাত দেয়া হলে তা গ্রহণ না করাই তার উচিত। তাই দেয়া জায়েয হলেও গ্রহণ করা হারাম। আর জমহুর হানাফী ফিকাহবিদগণ বলেছেন, গ্রহণ করাও হারাম নয়। তবে গ্রহণ না করা অধিক উত্তম সেই ব্যক্তির পক্ষে, যার পক্ষে জীবনযাত্রা মোটামুটিভাবে নির্বাহ করা সম্ভব। [আরবী******)]
কোন কোন মালিকী মাযহাবপন্থী ফিকহবিদ মত দিয়েছেন যে, উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে যাকাত দেয়া জায়েয নয়। [(আরবী************)]
উপরিউক্ত মতটি শরীয়তের দলিল ও নিয়মাদিও সমর্থন করে। এই কথা বলছি এজন্য যে, ইসলাম প্রত্যেক শক্তিমান ব্যক্তির জন্যে কাজ করে উপার্জন করা ফরয করে দিয়েছে। সেই সাথে তার জন্য তার কাজ করে উপার্জন করা সহজ করে দেয়া কর্তব্য বলে ঘোষণা করেছে। ফলে সে স্বীয় শ্রম ও কাজের বিনিময়ে উপার্জন দ্বারা যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ করতে সক্ষম হবে। সহীহ হাদীসে বলা হয়েছেঃ
(আরবী*******************)
স্বীয় উপার্জনে খাওয়া অপেক্ষা অধিক উত্তম খাদ্য কেউ কখনও খায়নি।
কেউ যখন যথেষ্ট উপার্জনের কাজ পায়, তার পক্ষে সে কাজ অগ্রাহ্য করা- দান সাদকা গ্রহণ বা মানুষের নিকট ভিক্ষা চাওয়ার আশায়-কিছুতেই জায়েয হতে পারে না।
এ কারণেই আমরা দেখছি, নবী করীম (স) সুস্পষ্ট ভাষায় বলছেনঃ
(আরবী**************)
ধনী ব্যক্তির জন্যে যাকাত-সাদকা জায়েয নয়, সুস্থ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্পন্ন শক্তিশালী ব্যক্তির জন্যেও নয়।
তাহাবী জুহাইরুল আমেরী থেকে বর্ণনা উদ্ধত করেছেন, তিনি আবদুল্লাহ ইবনে আমরুবনিল-আ’সকে যাকাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ তা কোন ধরণের মাল? বললেনঃ পংশু, আহত, অন্ধ, দুর্বল, বিপদগ্রস্ত ও উপার্জনে অক্ষম ব্যক্তিদের প্রাপ্য মাল। পরে বললেন, এই কাজের কর্মচারী ও মুজাহিদদেরও তাতে অংশ বা অধিকার রয়েছে। আবদুল্লাহ বলেছেন, মুজাহিদ লোকদের জন্যে জিহাদের প্রয়োজন ও সে কাজে সাহায্যকারী সম্পদ যাকাত থেকে গ্রহণ করা সম্পূর্ণ করে দেয়া হয়েছে। আর কর্মচারীরা তাদের কাজের পরিমাণ অনুযায়ী নিতে পারবে। অতঃপর বলেছেন, ধনী ও শক্তিমান ব্যক্তিদের জন্যে যাকাত গ্রহণ জায়েয নয়। [(আরবী***********)]
আবদুল্লাহ ইবনে আমরের এই কথাটি বহু সংখ্যক সাহাবী স্বয়ং নবী করীম (স) থেকে শুনে বর্ণনা করেছেন।
তাবে দৈহিক শক্তি ও উপার্জনে শরীরিক যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কার্যত যদি যথেষ্ট পরিমাণে উপার্জন করতে সক্ষম না হয়, তাহলে তার কোন মূল্য বা গুরুত্ব নেই। কেননা উপার্জনহীন শক্তি-সামর্থ্য ক্ষুধার্তের অন্ন ও বস্ত্রহীনের বস্ত্রের ব্যবস্থা করতে পারে না। ইমাম নববী বলেছেন, উপার্জনকারীকে কাজে নিয়োগ করার কেউ না থাকলে (অন্য কথায় বেকার ব্যক্তির পক্ষে) যাকাত গ্রহণ করা জায়েয। কেননা সে তো কার্যত অক্ষম। [(আরবী*************)]
উপরিউক্ত হাদীসে শুধু সুস্থ পূর্ণাঙ্গ দেহ বলেই শেষ করা হয়েছে। কিন্তু অপর একটি হাদীসে নিশ্চিত করে বলা হয়েছে, ক্ষমতা থাকলেই হবে না, উপার্জন করতে হবে, তবেই তার জন্যে যাকাত গ্রহণ না-জায়েয হবে।
আবদুল্লাহ ইবনে আদী বলেছেন, তাঁকে সংবাদ দেয়া হয়েছে, দুজন লোক নবী করীম (স) এর নিকট উপস্থিত হয়ে যাকাতের অংশ প্রার্থনা করল। নবী করীম (স) তাদের দুজনের ওপর তীক্ষ্ম দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। দেখতে পেলেন, দুজন লোকই সুস্থ শক্তিমান। তখন তিনি বললেনঃ “তোমরা চাইলে আমি যাকাতের মাল তোমাদের দেব। কিন্তু জেনে রাখবে, ধনী ব্যক্তির জন্যে তাতে কোন অংশ নেই। অংশ নেই শক্তিমান উপার্জনশীলের জন্যেও। [الحمد , ابو لؤد , نسائى আহমাদ বলেছেন, হাদীসটি উত্তম। নববী বলেছেন, হাদীসটি সহীহ। আবূ দাউদ ও মুনযেরী কিছুই বলেননি।]
নবী করীম (স) এ দুজন লোকের আসল অবস্থা জানতেন না বিধায় উক্তরূপ কথা বলে তাদেরকে যাকাত গ্রহণ করা না করার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। কেননা তারা বাহ্যত শক্তিমান হলেও বাস্তবভাবে বেকার ও অ-উপার্জনকারী হতে পারে। অথবা উপার্জন করেও যথেষ্ট পরিমাণে থেকে বঞ্চিত থেকে যেতে পারে। আর তা হলে তাদের জন্যে যাকাত গ্রহণ না-জায়েয হবে না।
এই প্রেক্ষিতে হাদীসে বিশেষজ্ঞগণ বলেছেন, রাষ্ট্রকর্তা বা যাকাতদাতার উচিত, যাকে যাকাতের মাল দেয়া হচ্ছে, তার প্রকৃত অবস্থা না-জানার দরুন তাকে উক্তরূপ নসীহত করা। একথা স্পষ্ট করে বলা দরকার যে, যাকাতের মাল ধনী লোকের প্রাপ্য নয়, উপার্জনক্ষম ব্যক্তির জন্যেও নয়। তা-ই হচ্ছে রাসূলে করীম (স) এর আদর্শ। [(আরবী***************)]
উপার্জনের অর্থ হচ্ছে প্রয়োজন পরিমাণ উপার্জন। তা না করতে পারলে যাকাত গ্রহণ জায়েয হবে। আসলে উপার্জনের অক্ষমতাই সেজন্যে শর্ত নয়। কেবল অক্ষম, রোগাক্রান্ত লোকদের মধ্যেই যাকাত সম্পদ বিতরণ করতে হবে, এমনও কোন কথা নেই।
ইমাম নববীর কথানুযায়ী উপার্জন এমন হতে হবে, যা তার অবস্থা ও মর্যাদার উপযোগী। তা না হলে তাকে উপার্জনহীনই মনে করতে হবে। [১১১১১]
তবে সে হাদীসে সুস্থ শক্তিমান ব্যক্তির ওপর যাকাত হারাম বলা হয়েছে, তা শক্তিসম্পন্ন অথচ সর্বক্ষণ বেকার ব্যক্তির ক্ষেত্রে সাধারণ অর্থেই গ্রহণ করতে হবে।
সারকথা হচ্ছে, যে উপার্জনক্ষম ব্যক্তির ওপর যাকাত গ্রহণ হারাম, তাতে নিম্নোদ্ধৃত শর্তাবলী পুরামাত্রায় বর্তমান থাকতে হবেঃ
১. উপার্জন করার মত কাজ পাওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
২. এই কাজ শরীয়তসম্মত ও হালাল হতে হবে। কেননা শরীয়াতে হালাল নয় এমন থাকলেও তা না থাকার মতই মনে করতে হবে।
৩. সাধ্য ও শক্তির অতিরিক্ত কোন কাজের বোঝা গ্রহণ করতে হবে না। কেননা সাধারণ সাধ্যায়ত্ত কাজই মানুষ করতে পারে। (সাধ্যাতীত কাজের ব্যবস্থা থাকলে তাতে বেকারত্ব ঘুচে না।)
৪. কাজটি এতটা পরিমাণ হতে হবে, যাদ্বারা তার নিজের ও তার ওপর নির্ভরশীল পরিবারপর্গের প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট হবে।
তার অর্থ হচ্ছে, উপার্জনক্ষম প্রত্যেক ব্যক্তির প্রতিই শরীয়াতের আশা এই যে, তার নিজের প্রয়োজন সে নিজে পূরণ করবে। সেই সাথে সাধারণভাবে সমাজ ও বিশেষভাবে রাষ্ট্রনায়ক এই কাজে তার সহযোগিতা করবে। এটা তার অধিকার এবং সমাজ ও রাষ্ট্রনায়কের তা কর্তব্য। তাই যে লোক এরূপ উপার্জনে অক্ষম হবে- ব্যক্তিগত দুর্বলতার কারণে, যেমন বালকত্ব, বার্ধক্য, রোগ ও পঙ্গুত্ব ইত্যাদি অথবা কর্মক্ষম হয়েও তার উপযোগী কোন হালাল উপার্জন পাওয়া থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে কিংবা উপার্জনের ক্ষেত্রে ও সুযোগ পেয়েও তার নিজের ও পরিবারবর্গের জন্যে প্রয়োজনীয় ও যথেষ্ট পরিমাণের উপার্জন করতে পারছে না, এরূপ অবস্থায় তার পক্ষে যাকাত গ্রহণ সম্পূর্ণ জায়েয। তা গ্রহণ করলে তাতে তার কোন দোষ হবে না আল্লাহ দ্বীনের বিচারে।
বস্তুত এই হচ্ছে ইসলামের মহান শিক্ষা। এতে যেমন ইনসাফ ও সুবিচারের দিকটি প্রকট, তেমনি দয়া অনুগ্রহের ভাবধারাও পূর্ণরূপে কার্যকর। একালে যে স্লোগান উঠেছেঃ ’ যে কাজ করবে না সে খাবেও না’- তা সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক কথা যেমন, তেমনি নৈতিকতা পরিপন্থী এবং অমানবিকও। বস্তুত পাখি ও জন্তু জগতে এমন অনেকই রয়েছে যেখানে শক্তিমান দুর্বলকে বহন করে, কর্মক্ষম অক্ষমকে সাহায্য করে। মানুষ কি এসব ইতর প্রাণীর অপেক্ষাও নিকৃষ্টতর?
ইবাদতে লিপ্ত ব্যক্তি যাকাত পাবে না
ইসলামের ফিকাহবিদগণ সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, কোন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি যদি কামাই-রোজগার ছেড়ে দিয়ে নামায-রোযা ইত্যাদি নফল ইবাদতে মশগুল হয়ে যায়, তা হলে তাকে যাকাত দেয়া যেতে পারে না, তার পক্ষে তা গ্রহণ করাও জায়েয নয়। কেননা তার ইবাদতের কল্যাণই তাকে সংকুচিত করে ফেলেছে। কাজ ও শ্রমে সে অংশ গ্রহণ করেনি। [(আরবী********)] অথচ শ্রম করার ও জমির পরতে পরতে রিজিকের সন্ধান করার জন্যে তাকে সুস্পষ্ট ভাষায় আদেশ দেয়া হয়েছে। উপরন্তু ইসলামে এ ধরনের কোন রাহবানিয়াতের একবিন্দু স্থান নেই। বরং এরূপ অবস্থায় হালাল উপার্জনে নিয়োজিত হওয়া এই সব ইবাদতের তুলনায় অনেক উত্তম কাজ, অবশ্য নিয়ত যদি যথার্থ হয় এবং উপার্জনের ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লংঘন না করে।
ইলম শেখার কাজে একনিষ্ঠ ব্যক্তি যাকাত পাবে
তবে কেউ যদি কল্যাণকর ইলম শেখার-বিদ্যার্জনের কাজে একনিষ্ঠভাবে নিয়োজিত হয়, তাহলে তার প্রয়োজন পূরণের জন্যে তাকে যাকাত দেয়া যাবে। তাকে ইলমের প্রয়োজনীয় কিতাব খরিদ করে দেয়া যেতে পারে যাকাতের টাকা দিয়ে। কেননা তার তার দ্বীন ও দুনিয়ার জন্যে সত্যিই কল্যাণকর।
ইলম শিক্ষার্থীকে যাকাত দেয়া যায় এ কারণেও যে, সে ফরযে কেফায়া আদায়ের কাজে আত্মনিয়োগ করে আছে। এই ইলম শেখার কল্যাণটা তার নিজের মধ্যেই সীমিত হয়ে থাকবে না। তা গোটা জাতির জন্যেই কল্যাণবহ। তাই তাকে যাকাতের টাকা দিয়ে সাহায্য করা বাঞ্ছনীয়। আসলে যাকাত ব্যয় করা যায় মুসলিম অভাবগ্রস্ত ব্যক্তির জন্যে। এমন কাজেও ব্যয় করা যায় যা মুসলিম উম্মতের জন্যে জরুরী।
কেউ কেউ শর্ত করেছেন যে, তাকে উত্তমতায় শ্রেষ্ঠ হতে হবে এবং তার দ্বারা মুসলিম জনগণকে উপকৃত হতে হবে। নতুবা সে যাকাত পাওয়ার অধিকারী বিবেচিত হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সে উপার্জনক্ষম থাকবে।[ঐ এবং (আবরী**********)] এ কথাটি যুক্তিসম্মত। আধুনিক রাষ্ট্রসমূহ এই নীতি অনুযায়ী কাজ করে এবং সমাজের উত্তম ও অগ্রসরমান লোকদের জন্যেই অর্থ ব্যয় করে থাকে। তাদের জন্যে বিশেষ অধ্যয়নের ব্যবস্থা করে কিংবা উচ্চতর শিক্ষা-প্রশিক্ষণের জন্যে তাদের অভ্যন্তরীণ বা বৈদেশিক প্রতিনিধিত্বে শরীক করে।
প্রচ্ছন্ন আত্মসম্মান রক্ষাকারী দরিদ্ররা সাহায্য পাওয়ার অধিকারী
ইসলামে সমান শিক্ষার ভুল প্রয়োগের কারণে সাধারণত লোকেরা ধারণা করে যে, যাকাত পাওয়ার অধিকারী সেসব গরীব মিসকীন, যারা কোন উপার্জনের কাজ করে না বা করবে না কিংবা যারা লোকরদের নিকট প্রার্থনা করা, ভিক্ষা চাওয়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে, যারা নিজেদের দারিদ্র ও দুঃখ-দুর্দশার কথা প্রচার করে ও দেখিয়ে বেড়ায়। পথে ঘাটে-হাটে, বাজারে, মসজিদের দুয়ারে লোকদের সম্মুখে প্রার্থনার হস্ত প্রসারিত করে। সম্ভবত মিসকীনের এই চিত্র ও ছবিই দীর্ঘকাল ধরে লোকদের মন-মানসে ভাসমান হয়ে আছে। এমন কি স্বয়ং নবী করীম (স) এর জীবদ্দশায়ও এরূপ প্রকৃত মিসকীন ও সমাজ সমষ্টির সাহায্য পাওয়ার যোগ্য লোক কে সে বিষয়ে বলে দেয়ার প্রয়োজন বোধ করেছেন। বলেছেঃ
(আরবী******************)
প্রকৃত মিসকীন সে নয় যাকে তুমি একটা বা দুটো খেজুর দিয়ে অথবা এক মুঠি বা দুমুঠি খাবার দিয়ে বিদায় কর। বরং প্রকৃত মিসকীন সে যে দরিদ্র হয়েও প্রার্থনা থেকে বিরত থেকে আত্মমর্যাদা বজায় রাখে। তোমরা ইচ্ছা করলে পড়তে পার, কুরআনের আয়াতঃ যারা লোকদের জড়িয়ে ধরে ভিক্ষা চায় না…….[(আরবী*************)]
অর্থাৎ যারা কাঁদ কাঁদ হয়ে ভিক্ষা চায় না, ভিক্ষা দিতে লোকদের বাধ্য করে না, লোকদের কষ্ট দেয় না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা চুড়ান্তবাবে ঠেকে না যায়। যে লোক নিজের প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও ভিক্ষা চায়, সে তাই করে। এই পরিচিতি বর্ণনা করা হয়েছে সে ফকীর-মুহাজির লোকদের, যারা নিজেদের যথাসর্বস্ব ছেড়ে-ছুড়ে দিয়ে আল্লাহ ও রাসূলের দিকে চলে গেছে। এখন তাদের ধন-মাল বলতে কিছু নেই, নেই উপার্জন করে নিজেদের প্রয়োজন পূরণের কোন উপায়। [(আরবী*******)] আল্লা এদের সম্পর্কেই বলেছেনঃ
(আরবী*******************)
দান-সাদকা যাকাত সে সব ফকীরদের জন্যে, যারা আল্লাহর পথে পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েছে, পৃথিবীতে কামাই-রোজকার করে বেড়ানোর সামর্থ্যবান নয়, মুর্খ লোকেরা তাদের ধনী মনে করে, তারা ভিক্ষা থেকে বিরত থাকে আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্যে, অথচ তুমি তাদের বাহ্যিক অবস্থা দেখেই চিনতে পার, তারা লোকদের নিকট কাঁদ কাঁদ হয়ে জাড়িয়ে ধরে ভিক্ষা চায় না।
বস্তুত এসব লোকই সাহায্য পাওয়ার তুলনামূলকভাবে অধিক উপযুক্ত অধিকারী। নবী করীম (স) পূর্বোক্ত হাদীসে এ কথাই বলেছেন।
(আরবী*************************)
লোকদের নিকট ঘুরে ঘুরে যে-লোক ভিক্ষা চায়-যাকে তুমি এক বা দুমুঠি খাবার বা একটি বা দুটো খেজুর দিয়ে বিদায় কর- সে প্রকৃত মিসকীন নয়। বরং প্রকৃত মিসকীন সে, যে স্বাচ্ছন্দ্য অর্জনের উপায় পায় না, লোকেরাও তাদের দারিদ্র বুঝতে পারে না বলে তাদের দেয়ও না কিছুই্ আর তারা লোকদের নিকট ভিক্ষা চাইতেও দাঁড়ায় না। (বুখারী, মুসলিম)
এই মিসকীনই সাহায্য পাওয়ার উপযুক্ত অধিকারী। যদিও লোকেরা এই মিসকীন সম্পর্কে উদাসীনই থাকে। বুঝতে পারে না যে, এই লোককে সাহায্য দেয়া উচিত। এজন্য নবী করীম (স) এই লোকের প্রতিই জনগণের দৃষ্টি আকৃষ্ট করেছেন। বিবেক-বুদ্ধি নিয়োগ করতেও বলেছেন তাদের জনেই। তাহলেই বহু প্রচ্ছন্ন দরিদ্র ও আত্মসম্মান রক্ষাকারীি পরিবার প্রয়োজনীয় সাহায্য পেয়ে অভাবমুক্ত হতে পারে। এদের অনেক লোকই অবস্থার দুর্বিপাকে পড়ে গেছে বা অক্ষমতা তাদের দরিদ্র বানিয়েছে। অথবা সন্তান-সন্তাতির আধিক্যের কারণে তাদের সম্পদ কম পড়ে যাচ্ছে। হয়ত উপার্জন করে এত সামান্য যে , তা তাদের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে না।
ইমাম হাসানুল বাসরীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলে, এক ব্যক্তির ঘর-বাড়ি আছে, আছে সেবক-খাদেম, সে কি যাকাত গ্রহণ করতে পারে? জবাবে তিনি বলেছিলেন, হ্যাঁ সে যদি অভাব বোধ করে তাহলে নিতে পারে, কোন দোষ নেই তাতে। [(আরবী*****)] পূর্বে উল্লেখ করেছি, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান ফতোয়া দিয়েছিলেন, এক ব্যক্তির চাষের জমি রয়েছে, অথবা আছে দোকান ব্যবসা করার; কিংবা তার আয় তিন হাজার টাকা; কিন্তু তা তার নিজের ও পরিবারবর্গের প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট নয়, তার পক্ষে যাকাত গ্রহণ করা জায়েয। যদিও তার আয় কয়েক হাজার পর্যন্ত পৌছায়। এই মতের উপরই ফতোয়া দেয়া হয়েছে। ইবনে আবেদীন এই কথা উল্লেখ করেছেন। [(আরবী**************)] ইমাম আহমাদের অনুরূপ একটি ফতোয়ার কথা উল্লেখ করেছি এর পূর্বে। তার মর্ম এই যে, যে-ব্যক্তির ফসল ফলানের জমি আছে, যার আয় দশ হাজার দিরহাম বা তার কম-বেশী পরিমাণ হবে, কিন্তু তা তার জন্যে যথেষ্ট হয় না, সেও যাকাত গ্রহণ করতে পারবে। [(আরবী**************)]
শাফেয়ী মাযহাবের লোকদের মত হচ্ছে, কারুর জমি থাকলে ও তার আয় তার প্রয়োজন পরিমাণের তুলনায় কম হলে সে ফকীর বা মিসকীন গণ্য হবে। তাকে যাকাত দিয়ে তার প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব। তাকে তার জমি বিক্রয় করে দিতে বাধ্য করা যাবে না।
মালিকী মাযহাবের লোকদের মত হচ্ছে, যে লোক নিসাব পরিমাণ বা তার বেশি সম্পদের মালিক, তার খাদেম এবং ঘর-বাড়ি আছে; কিন্তু প্রয়োজন পূরণ হয় না, তাকেও যাকাত দেয়া জায়েয। [(আরবী**************)]
তার অর্থ, যার কিছুই নেই, যে কোন কিছুরই মালিক নয় এমন নিঃস্ব ফকীরকেই যাকাত দেয়া লক্ষ্য নয়। বরং প্রয়োজন পূরণের কতকাংশ যার আছে, তার পূর্ণমাত্রায় প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা করে দেয়াও লক্ষ্য। কেননা সে তার যথেষ্ট মাত্রায় সম্পদের অধিকারী নয়।
ফকীর ও মিসকীনকে কি পরিমাণ যাকাত দেয়া যাবে?
ফকীর ও মিসকীনকে কতটা পরিমাণ যাকাত দেয়া যাবে, সে বিষয়ে ফিকাহবিদদের বিভিন্ন মত রয়েছে। এ মতপার্থক্যকে আমরা নিম্নলিখিতভাবে দুটি ভাগে ভাগ করে বলতে পারিঃ
প্রথম, তাদের দেয়া হবে প্রচলিত নিয়মে এতটা পরিমাণ, যাদ্বারা তাদের প্রয়োজন যথেষ্ট মাত্রায় পূর্ণ হয়-বিশেষ কোন পরিমাণ নির্ধারণ করা ছাড়াই।
দ্বিতীয়, তাদের দেয়া যাবে নির্দিষ্ট পরিমাণের মাল, যা তাদের অনেকের নিকট সামান্য আবার অনেকের নিকট অধিক বিবেচিত হবে।
আমরা প্রথমটি নিয়ে প্রথমেই আলোচনা করব। কেননা ইসলাম-কুরআন ও সুন্নাতের দৃষ্টিতে যাকাতের লক্ষ্য পর্যায়ে তা-ই অতীব নিকটবর্তী মত। এই দিকটিতেও দুটো মত রয়েছেঃ
১. একটি মত, আয়ুষ্কাল পর্যন্তকার জন্যে যথেষ্ট পরিমাণ দেয়া,
২. আর একটি মত, এক বছরের জন্যে যথেষ্ট পরিমাণ দেয়া।
প্রথমত জীবনকালের প্রয়োজন পরিমাণ দান
এমত অনুযায়ী ফকীরকে এতটা পরিমাণ দিতে হবে, যাদ্বারা তার দারিদ্রর মূলোৎপাটন হয়ে যায়। তার অভাব-অনটন দুর হওয়ার কারণ ঘটে এবং স্থায়ীভাবে যথেষ্ট মাত্রায় তার প্রয়োজন পূরণ হতে পারে। আর দ্বিতীয়বার যেন তার যাকাত গ্রহণের মুখাপেক্ষিতা না থাকে।
ইমাম নববী বলেছেন, ফকীর-মিসকীনদের দেয় পরিমাণ পর্যায়ে ইরাকী ও বিপুল সংখ্যক খোরাসানী ফিকাহবিদগণ বলেছেন, তাদের এমন পরিমাণ দিতে হবে যা তাদেরকে দারিদ্র থেকে মুক্ত করে স্বাচ্ছন্দ্য ও ধনাঢ্যতার দিকে নিয়ে যেতে পারে অর্থাৎ যা তাদেরকে স্থায়ীভাবে সচ্ছলতা দান করবে। ইমাম শাফেয়ী নিজেও এই মত দিয়েছেন। কুবাইচা ইবনুল মাখারকি আল হিলালী বর্ণিত একটি হাদীস দলিল হিসেবে তাঁরা উল্লেখ করেছেন। হাদীসটি হচ্ছে, নবী করীম (স) বলেছেনঃ তিনজনের যে কোন একজনের পক্ষে ভিক্ষা চাওয়া জায়েয। একজন, যার ওপর এমন বোঝা চেপেছে যে, তার জন্যে ভিক্ষা করা জায়েয হয়ে গেছে যতক্ষণ পর্যন্ত সে সেই পরিমাণ না পাচ্ছে। তা পেয়ে গেলে সে তা থেকে বিরত থাকবে। দ্বিতীয়, এক ব্যক্তি বড় দুরবস্থার সম্মুখীন হয়ে পড়েছে, বিপদে পড়ে গেছে, তার সব ধন-মাল নিঃশেষ হয়েগেছে। তার পক্ষে ভিক্ষা চাওয়া জায়েয যতক্ষণ পর্যন্ত সে জীবনযাত্রার স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ মাত্রার মালিক না হচ্ছে। আর তৃতীয় ব্যক্তি সে, যে অনশনের সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। এমন কি তার সমাজের জনগণের মধ্য থেকে অন্তত তিন ব্যক্তি বলতে শুরু করেছে যে, অমুক ব্যক্তি অনশনে দিন কাটাচ্ছে। এই ব্যক্তির পক্ষেও ভিক্ষা চাওয়া জায়েয, যতক্ষণ না সে তার যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদ লাভ করছে। এই তিনজন ব্যতীত অপর লোকদের পক্ষে ভিক্ষা চাওয়া- হে কুবাইচা- একান্তই ঘুষ ছাড়া আর কিছুই নয়। এরূপ ভিক্ষা করলে তা ঘুষ হবে। (মুসলিম)
অর্থাৎ প্রয়োজন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ভিক্ষা চাওয়ার অনুমতি নবী করীম (স) দিয়েছেন।
যদি সে উপার্জনের কোন পেশা ধরতে পারে, তবে প্রয়োজনীয় দ্রব্য-সামগ্রী বা হাতিয়ার-যন্ত্রপাতি তাকে ক্রয় করে দিতে হবে, তার মূল্য বেশি হোক বা কম, যেন তৎলব্ধ মুনাফা এমন পরিমাণ হয় যা তার প্রয়োজন যথাসম্ভব পূরণ করে দেবে। তাবে পেশা, দেশ, শহর-স্থান, সময়-কাল ও ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে পার্থক্য হতে পারে।
আমাদের সঙ্গীদের অনেকেই বলেছেন, যে লোক সবজি বিক্রয় করতে পারে, তাকে পাঁচ বা দশ দিরহাম দেয়া যেতে পারে। যার পেশা হীরা-জহরত ও স্বর্ণ-রৌপ্য বিক্রয়, তাকে দশ হাজার দিরহাম পর্যন্ত দেয়া যেতে পারে, যদি তার কম পরিমাণ দ্বারা প্রয়োজন পরিমাণ আয় করা না যায়। আর যে ব্যবসায়ী, রুটি প্রস্তুতকারী, আতর প্রস্তুতকারী বা মুদ্রা বিনিময়কারী, তাকে সেই অনুপাতে যাকাতের অর্থ দেয়া যেতে পারে। যে দরজী কাজে পটু, কাঠ মিন্ত্রী, কসাই বা যৌগিক পদার্থ সৃষ্টিকারী হবে, কোন শিল্পকর্মে পারদর্শী হবে, তাকে এতটা পরিমাণ দিতে হবে যাদ্বারা সে তার কাজের জন্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি খরিদ করতে পারবে।
যদি সে কৃষ্টিজীবী হয়, তাহলে তাকে জমির ব্যবস্থা করে দিতে হবে এমন পরিমাণ, যেখানে ফসল ফলিয়ে সে চিরজীবন স্বাচ্ছন্দ্য সহকারে কাটাতে সক্ষম হবে।
যদি এই ধরনের পেশা গ্রহণে সক্ষম না হয়, কোন শিল্প দক্ষতারও অধিকারী না হয়, ব্যবসা ইত্যাদি কোন উপার্জনযোগ্য মাধ্যম অবলম্বন করে জীবিকা নির্বাহ করতে সক্ষম না হয়, তাহলে তাকে তার বসবাসের স্থানের উপযোগী জীবনযাত্রা নির্বাহের আয়ুষ্কালীন ব্যবস্থা করে দিতে হবে।
শামসুদ্দিন রমলী নববী লিখিত ‘আল-মিনহাজ্জ’ গ্রন্থের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে লিখেছেন, ফকীর ও মিসকীন উপরিউক্ত ধরনের কোন উপার্জন পন্থা, কোন পেশা বা ব্যবসায় অবলম্বন করতে যদি সক্ষম না হয়, তাহলে তার সারাজীবন কাটাবার জন্যে প্রয়োজন পরিমাণ সম্পদ তাকে দিতে হবে। কেননা উদ্দেশ্য হল লোকটিকে মুখাপেক্ষিতা থেকে বিকুক্ত করা। আর তা করা না হলে এই মুখাপেক্ষিতা থেকে তার মুক্তি সারাজীবনে সম্ভব হবে না। আর বয়স যদি বেশি হয়ে যায়, তাহলে এক এক বছরের জন্যে প্রয়োজনীয় পরিমাণ দিতে হবে।
যে লোক উপার্জন করতে সক্ষম নয়, তাকে যাকাত দিতে বলার অর্থ এই নয় যে, তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নির্বাহের জন্যে নগদ অর্থ তাকে দিতে হবে এবং তার অর্থ তাকে এমন জিনিস ক্রয় করে দিতে হবে, যার আয় থেকে তার প্রয়োজন পূরণ হবে এবং ভবিষ্যতে সে যাকাত গ্রহণ থেকে বেচেঁ যেতে পারবে। তাহলে সে সেই জিনিসের মালিক হতে পারবে ও উত্তরাধিকারসূত্রে তা বন্টিতও হতে পারবে তার বংশধরদের মধ্যে।
জরকাশী যেমন আলোচনা করেছেন, সরকারী ব্যবস্থাধীনেই সেই জিনিস ক্রয় হওয়া উচিত অথবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই বাধ্য করা দরকার সেই জিনিস ক্রয় করার জন্য এবং তা কোন অবস্থায়ই হস্তান্তর না করার জন্যে।
এই মালিকানা যদি তার জীবনব্যাপী প্রয়োজনের জন্যে যথেষ্ট না হয় তাহলে যাকাতের অর্থ দ্বারাই তা পূর্ণ করে দিতে হবে। তখন সে দরিদ্র ও মিসকীন কিনা তা শর্ত করার আবশ্যকতা নেই।
মা-অর্দী বলেছেন, যদি তার নব্বই থাকে, আর একশ না হলে তার প্রয়োজন পূর্ণ না হয়, তাহলে এই দশ তাকে দিয়ে দিতে হবে। আর কোন উপার্জন ব্যতিরেকেই এই নব্বই যদি তার জন্যে যথেষ্ট হয় তাহলে হয়ত তার সমগ্র জীবনব্যাপী প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট হবে না।
এই সব কথাই বলা হচ্ছে সে লোক সম্পর্কে, যে ভাল উপার্জন করছে না। যে-লোক উপযুক্ত কোন পেশা গ্রহণ করতে পারবে, যা তার জন্যে যথেষ্ট হবে, তাহলে তাহলে তাকে তার পেশার জন্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয়ের মূল্য দেয়া যেতে পারে তা যাত বেশিই হোক না কেন। তাই যে লোক ভাল ব্যবসা করতে পারে, তাকে যথেষ্ট পরিমাণে মুলধন দেয়া যেতে পারে, যেন ব্যবসায়ের মুনাফা দ্বারা সে তার প্রয়োজন যথেষ্টভাবে পূরণ করতে সক্ষম হয়। আর এই মূলধন দেয়ার ব্যাপরটি ব্যক্তি ও স্থানের তারতম্যের দরুন কমবেশিও হতে পারে।
যদি সে বেশির ভাগ উত্তম পেশা গ্রহণে সক্ষম হয় আর সবটাই তার জন্যে যথেষ্ট হয়, তাহলে তাকে মূল্য বা মুলধন যতটা কম দিলে চলে, তা-ই দিতে হবে। যদি তাকে কতকাংশ দিলে যথেষ্ট হয়, তাহলে তা-ই তাকে দেয়া যাবে। তার একাংশ যদি একজনের জন্যে যথেষ্ট না হয়, তাহলে সেই একজনের দিতে হবে এবং তার বেশি বেশি জমি ক্রয় করে দেয়া যাবে, যার আয় তার অসম্পূর্ণ প্রয়োজন যথেষ্টভাবে পূর্ণ করবে। [আরবী***************)]
ইমাম শাফেয়ী তাঁর الام গ্রন্থে এই কথাগুলো লিখেছেন। তাই তাঁর অধিকাংশ সঙ্গী-সাথীও এই মতকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এর ওপর ভিত্তি করে তার অনেক শাখা-প্রশাখা বের করেছেন। আর এ পর্যায়ে তিনটি বিস্তরিত সূক্ষ্ম আলোচনার অবতারণা করেছেন, যা আমরা এখানে উদ্ধৃত করলাম।
ইমাম আহমাদের মতও ইমাম শাফেয়ীর প্রায় অনুরূপ। তিনি দরিদ্র ফকীর ব্যক্তির পক্ষে তার চিরজীবনের প্রয়োজন পরিমাণ সম্পদ গ্রহণ জায়েয বলে মত প্রকাশ করেছেন। আর তা নেয়া যেতে পারে ব্যবসায় মূলধন বা কোন শিল্প সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি হিসেবে। হাম্বলী মতের কোন কোন ফিকাহবিদও এই মত গ্রহণ করেছেন এবং তদনুযায়ী কাজ করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। [(আরবী*************)]
ইমাম খাত্তাবী উপরে উদ্ধৃত কুবাইচা বর্ণিত হাদীসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, সাদকা বা যাকাত দানের চূড়ান্ত প্রান্তিক পরিমাণ হচ্ছে প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট পরিমাণ, যাদ্বারা জীবনের প্রয়োজন যথেষ্টভাবে পূরণ হবে, জীবিকা সমস্যার সমাধান হবে এবং দারিদ্র প্রেক্ষিতে । তাতে কোন সীমা নির্দিষ্ট নেই। প্রত্যেক ব্যক্তির অবস্থার তারতম্যের বিচারেরই তা নির্ধারণ করতে হবে। [(আরবী*************)]
যখন দিবেই, তখন সচ্ছল করে দাও
উপরিউক্ত মতটি হযরত উমর ফারূক (রা) থেকে বর্ণিত মতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। হযরত উমর ফারূকের রাজনীতি এই খাতেই প্রাবহিত দেখতে পাচ্ছি এবং এ নীতি অতীব যুক্তিসঙ্গত, নিখুঁত ও সুষ্ঠু সন্দেহ নেই। হযরত উমর ফারূকেরই অপর একটি উক্তি হচ্ছেঃ
(আরবী***************)
যখন দিবেই, তখন ধনী বানিয়ে দাও-সচ্ছল বানিয়ে দাও। [(আরবী**************)]
হযরত উমর (রা) যাকাত সম্পদ দিয়ে দরিদ্র ব্যক্তিকে বাস্তবিকই ধনী ও সচ্ছল বানিয়ে দিতেন। সামান্য খাদ্যের ব্যবস্থা করে দিয়ে কিংবা কয়েকটি দিরহাম দিয়ে তা ক্ষুধা বা উপস্থিত প্রয়োজন পূরণ করে দিয়েই ক্ষান্ত হতেন না।
তখনকার সময়ের ঘটনা, এক ব্যক্তি তার নিকট এসে তার অর্থনৈতিক দুরবস্থার বর্ণনা দিয়ে সাহায্য প্রার্থনা করে বসলো। তিনি তাকে তিনটি উট দিয়ে দিলেন। এটা ছিল তাকে দরিদ্র্য থেকে বাঁচানোর জন্যে। তিনি যাকাত বণ্টনকারী কর্মচারীদের নির্দেশ দিলেন, যাকাত পাওয়ার যোগ্য লোকদের মধ্যে বারবার তা বণ্টন কর- তাতে এক একজন একশটি করে উট পেয়ে গেলেও ক্ষতি নেই। [(আরবী*****************)]
দরিদ্রদের ব্যাপারে তার নীতি ঘোষণা করলেন উদাত্ত কণ্ঠেঃ
(আরবী********************)
আমি তাদের বারবার যাকাত দেব, তাদের একজন একশটি করে উট পেয়ে গেলেও।
তাবেয়ী ফিকাহবিদ আতা বলেছেন, ‘কোন মুসলিম ঘরের লোকদের মধ্যে যাকাত বণ্টন করলে পূর্ণমাত্রায় দাও। তা-ই আমার নিকট পসন্দ।’
এই মত অনুযায়ী ইসলামী রাষ্ট্র যাকাত-সম্পদ দ্বারা বড় বড় কল-কারখানা, খামার ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে, যার মালিক হবে কেবলমাত্র গরীব লোকেরা-তার সবটার অথবা তার কিছু অংশের। যেন তার এই সবের মালিক হলেও তা বিক্রয় করার বা মালিকানা হস্তান্তর করার কোন অধিকার তাদের থাকবে না। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান ‘প্রায় ওয়াকফ’ সম্পত্তিতে পরিণত হয়ে স্থায়ী হয়ে থাকবে।
দ্বিতীয় মতঃ এক বছরের জন্যে যথেষ্ট পরিমাণ দিতে হবে
এখানে দ্বিতীয় একটি মত রয়েছে। মালিকী, হাম্বলী ও অন্যান্য মতের সাধারণ ফিকাহবিদগণ এ মতটি উপস্থাপিত করেছেন। এ মতের বক্তব্য হল, ফকীর ও মিসকীনকে যাকাত সম্পদ থেকে এতটা পরিমাণ দিতে হবে, যা তার ও তার উপর নির্ভরশীলদের এক বছরের জন্যে প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট হবে। এ মতের লোকেরা সারা জীবনের জন্যে যথেষ্ট-এমন পরিমাণ দেয়ার প্রয়োজন মতে করেন নি। অনুরূপভাবে এক বছরের জন্যে প্রয়োজন পরিমাণের কম দেয়ারও যৌক্তিকতা তারা স্বীকার করেন নি।
তাঁরা এক বছর সময়ের জন্যে দেয়ার পক্ষপাতী এজন্যে যে, সাধারণত প্রত্যেক ব্যক্তি তার সমাজ তথা রাষ্ট্রের নিকট থেকে এই মেয়াদকালে জৈবিক নিরাপত্তা লাভের অধিকারী। রাসূলে করীম (স) এর অনুসৃত নীতিতেও এর সমর্থন ও দৃষ্টান্ত রয়েছে। একথা সহীহ সুত্রে জানা গেছে যে, তিনি তার পরিবারবর্গের জন্যে এক বছর কালের খোরাক মজুত করে রাখতেন। [বুখারী , মুসলিম]
উপরন্তু যাকাতের মাল তো সাধারত বার্ষিক হিসেবে সংগ্রহ করা হয়। কাজেই তা থেকে কাউকে সারা জীবনের রসদ যোগাবার কোন কারণ থাকতে পারে না। প্রতি বছরই যাকাত সম্পদ সংগৃহীত হবে এবং তা পাওয়ার যোগ্য লোকদের মধ্যে বার্ষিক হিসেবে বণ্টন করা হবে, এটাই যুক্তিযুক্ত কথা। [মালিকী মাযহাবের কেউ কেউ বলেছেন, যাকাত বার্ষিক হিসেবে বণ্টন করা না হলে এক সঙ্গে এক বছরের প্রয়োজনের অধিকও দেয়া যেতে পারে।]
এ মতের লোকেরা একথাও মনে করেন যে, এক বছরের জন্যে এতটা যথেষ্ট, তার কোন পরিমাণ-সীমা নির্দিষ্ট নয়। বরং যথাসম্ভব পাওয়ার যোগ্য লোকদের এক বৎসরের সচ্ছলতা বিদানকারী মান অনুযায়ীই বণ্টন করতে চেষ্টা করা উচিত।
যদি কোন ফকীর বা মিসকীনের এক বৎসরের প্রয়োজন যথেষ্টভাবে পূরণ হতে নিসাব পরিমাণেরও বেশির প্রয়োজন হয়, তাহলে তাকে তা-ই দিতে হবে। তাতে যদি সে ধনী হয়ে যায়, তবু কোন দোষ নেই। কেননা দেয়ার সময় তো সে ফকীর বা মিসকীনই ছিল এবং যাকাত পাওয়ার যোগ্য ছিল।
বিয়ে করিয়ে দেয়াও পূর্ণমাত্রার যথেষ্ট পরিমাণের অন্তর্ভুক্ত
যথেষ্ট পরিমাণে দিতে হবে’ এই নীতির আলোকে আমি আরও একটি কথা এখানে বলতে চাই। তা হচ্ছে, ফকীর বা মিসকীনের জন্যে যথেষ্ট পরিমাণের পূর্ণ মাত্রার বাস্তবায়ন ও সম্পূর্ণতা দান। ইসলামী ফিকাহ তাই মনে করে। এই প্রেক্ষিতে ইসলামের আলিমগণের একথা বিবেচনা করা বাঞ্ছনীয় যে, শুধু পান-আহার পোশাকই কেবল মানুষের মৌল প্রয়োজন নয়। মানুষের স্বভাবজাত প্রয়োজন ও তাগীদ আরও রয়েছে। যা না হলে মানুষের জীবন পূর্ণত্ব পেতে পারে না। সে প্রয়োজনের চরিতার্থতা একান্তই আবশ্যক। আর তা হচ্ছে প্রজাতি ও সংরক্ষণ ও যৌন প্রবণতার চরিতার্থতা বিধান। আল্লাহ তায়ালা পৃথিবী আবাদকরণ ও মানব বংশ সংরক্ষণে আল্লাহর ইচ্ছা বাস্তবায়নে এ বিষয়টিকে চাবুকের মত বানিয়ে দিয়েছেন, মানুষ এর দ্বারাই চালিত হয় সেই লক্ষ্যের পানে। ইসলাম এই স্বভাবজাত ভাবধারার প্রতি কোন রূপ উপেক্ষা প্রদর্শন করে নি; বরং এই জিনিসকে সুসংগঠিত করেছে এবং আল্লাহর বিধানের ভিত্তিতে তার সীমা ও নিয়ম-কুনুন নির্ধারণ করেছে।
অপরদিকে ইসলাম অবিবাহিত জীবন যাপন, নারীবিহীন অবস্থায় জীবন কাটানো বা পুরুষত্ব হনন-হরণের কাজকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। মানুষের যৌন ও প্রজনন শক্তি দমনের কোন চেষ্টা ভাবধারাকেই আদৌ সমর্থন দেয়নি এবং প্রত্যেক দৈহিক সামর্থ্যসম্পন্ন পুরুষকে বিয়ে করার নির্দেশ দিয়েছে। আদেশ হচ্ছেঃ
(আরবী**********************)
’তোমাদের যে কেউ সামর্থ্যবান হবে, সেই যেন বিয়ে করে। কেননা এই বিয়েই তার দৃষ্টিকে নত রাখবে এবং তার যৌন অঙ্গের সংরক্ষন করবে অতীব উত্তমভাবে। [(আরবী*****************)]
অতএব সমাজের বিবাহেচ্ছুক (বিবাহক্ষম) নর-নারী মহরানা ইত্যাদি দিতে বিবাহিত না হলেও বিয়ের প্রয়োজন হয়ে থাকলে তার বিয়ের ব্যবস্থা করে দেয়া ও তাকে যথেষ্ট পরিমাণে যাকাত দেয়ার অন্তর্ভুক্ত কাজ। [(আরবী**************)]
শুধু তা-ই নয়, তারা এতদূর বলেছেন যে, যদি কারুর একজন স্ত্রী যথেষ্ট না হয়, তাহলে দুইজন স্ত্রী যোগাড় করে দিতে হবে। কেননা যথেষ্ট পরিমাণে, দেয়ার মধ্যে এটিও গণ্য। [(আরবী***************)]
খলীফায়ে রাশেদ উমর ইবনে আবদুল আজীজ লোকদের মধ্যে ঘোষণা করতেনঃ ‘কোথায় মিসকীনরা, কোথায় ঋণগ্রস্ত লোকেরা, কোথায় বিবাহেচ্ছু লোকগেণ……..।’ তার এই ডাকের উদ্দেশ্য ছিল এ পর্যায়ের সকল লোকের প্রয়োজন বায়তুলমাল থেকে পূরণ করার ব্যবস্থা করা।
এ পর্যায়ের আসল ভিত্তি হচ্ছে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত একটি হাদীস। এক ব্যক্তি রাসূলে করীম (স) এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, আমি আনসার বংশের একটি মেয়ে বিয়ে করেছি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কত মহরানা নির্দিষ্ট করলে?” বললে “চার আউকিয়া (৪*৪০=১৬০ দিরহাম)।” নবী করীম (স) বললেন, “মাত্র চার আউকিয়া? মনে হচ্ছে, তোমরা এই পাহাড়টি ফেলানের জন্যে রৌপ্য খোদাই করছ। এখন তো আমাদের নিকট কিছু নেই। কিন্তু খুব শীগগীরই আমরা তোমাকে এমন প্রতিনিধিত্বে পাঠাব, যাতে তুমি অনেক কিছুই পেয়ে যাবে।” [(আরবী********************)]
হাদীসটি থেকে জানা গেল, এই অবস্থায় নবী করীম (স) এর বিরাট দানের কথা লোকদের ভালভাবে জানা ছিল। এ করণেই তিনি বলেছিলেনঃ এখন তো আমার নিকট দেবার মত কিছু নেই, তবে তোমার জন্যে অন্য ব্যবস্থা করা হবে, যা থেকে তুমি প্রচুর পেয়ে যাবে।
ইলমের বই-পত্র দানও ‘যথেষ্ট দানের অন্তর্ভুক্ত
ইসলাম মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির বিকাশ দানকারী দ্বীন। তা মানুষকে ইলম শেখার আহবান জানিয়েছে, বিদ্বান লোকদের সম্মান ও মর্যাদা অনেক উঁচু করে তুলেছে, বরঞ্চ ইলমকে ঈমানের কুঞ্চিকা এবং কর্মের প্রেরণাদায়ক বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অন্ধ অনুসরণকারীর ঈমান ও অজ্ঞ-মুর্খের ইবাদতের কোন মূল্য ইসলাম গণ্য করা হয়নি। কুরআন সুস্পষ্ট ভাষায় প্রশ্ন তুরেছেঃ
’যারা জানে, আর যারা জানে না, তারা উভয় কি সমান হতে পারে।?[(আরবী*******************)]
বিজ্ঞ ও মূর্খ এবং ইলম ও মূর্খতার মধ্যকার পার্থক্য স্পষ্ট করে দেয়ার উদ্দেশ্যে বলা হয়েছেঃ
অন্ধ ও দৃষ্টিমান পুঞ্জীভূত অন্ধকার ও আলো কখনই অভিন্ন হতে পারে না। [(আরবী****************)]
রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ
ইলম সন্ধান-অর্জন মুসলিম মাত্রের জন্যেই ফরয। [(আরবী*******************)]
এখানে যে ইলম এর কথা বলা হয়েছে তা প্রচলিত ধরনের দ্বীনি ইলমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং সকল প্রকার কল্যাণকর ইলমই এর অন্তর্ভুক্ত। মুসলিম সমাজ তার এই জীবনে যত কিছু জ্ঞানের মুখাপেক্ষী তা সবই শিখতে হবে। তাতে স্বাস্থ্য রক্ষা, অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন ও সমাজ সভ্যতা পরিচালনা ও সংগঠন সংক্রান্ত সব ইলম শামিল রয়েছে। শত্রুদের প্রতিরোধ করার জন্যে সামরিক বিদ্যাও এর বাইরে নয়। এর সবই ফরযে কিফায়া। বিশেষজ্ঞ আলেমগণ এই মত দিয়েছেন।
এ করণে ইসলামের ফিকহবিদগণ যাকাত বণ্টনের বিধানে ঘোষণা করেছেন, ইলম অর্জনে একটিষ্টভাবে নিয়োজিত ব্যক্তবর্গকে তার অংশ দিতে হবে-দেয়া যাবে। অথচ ইবাদতের কাজে একন্তভাবে আত্মনিয়োগকারীর জন্যে আর ইলম শিক্ষার্থীর কাজ তার নিজের জন্যে যেমন, তেমনি সমগ্র মানবতার কল্যাণেও। [(আরবী**************)]
ইসলাম এ কথা বলেই ক্ষান্ত হয়নি। ফিকহবিদগণ এও বলেছেন যে, ফকীর-মিসকীন ব্যক্তির ইলম অর্জনে প্রয়োজনীয় কিতাবাদি খরিদ করার উদ্দেশ্য যাকাত গ্রহণ করতে পারে, যদি তা দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণের জন্যে অপরিহার্য হয়ে পড়ে। [আরবী***********)]
হানাফী ফিকাহবিদদের মতে যাকাতের মাল এক শহর থেকে অন্য শহরে নির্দ্বিধায় স্থানান্তরিত করা জায়েয, যদিও এটা নিয়মের পরিপন্থী-যদি তা ইলম শিক্ষার্থীকে সাহায্য করার উদ্দেশ্য হয়। [(আরবী***************)]
কোন মতটি গ্রহণ করা উত্তম?
ইসলামী ফিকাহর উপরিউক্ত দুটি মতের বিস্তারিত আলোচনার পর প্রশ্ন হচ্ছে, কোন মতটি অনুসরণ করা উত্তম?…… একটি মত অনুযায়ী ফকীর-মিসকীনকে একবারে সারা জীবনের প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। আর অপর মতটি হচ্ছে, মাত্র একটি পূর্ণ বছরের জন্যে সেই ব্যবস্থা যথেষ্ট পরিমাণে করে দিতে হবে। এ উভয় মতের স্বপক্ষে কারণ ও দলীলও ইতিপূর্বে পেশ করা হয়েছে।…… বিশেষ করে, ইসলামী রাষ্ট্র যখন যাকাত বণ্টনের দায়িত্ব পালন করবে, তখন এ দুটি মতের কোনটি অনুসরণ করবে সে প্রশ্নটি তীব্র হয়ে দেখা দিয়েছে।
এ পর্যায়ে এই গ্রন্থকারের মত হচ্ছে, প্রতিটি মতই যুক্তিযুক্ত, অতএব এক এক অবস্থায় এক একটি মত অনুযায়ী কাজ করা যেতে পারে।
তার কারণ হচ্ছে ফকীর ও মিসকীন দুই প্রকারেরঃ এক প্রকারের ফকীর-মিসকীন শ্রম ও উপার্জন করতে পারে, যা তার প্রয়োজন পূরণেও যথেষ্ট হতে পারে- যেমন শিল্পকর্মে অভিজ্ঞ, ব্যবসায়ী ও কৃষিজীবি। তার হয়ত শিল্পকর্মের জন্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বা মূলধন অথবা জমি কিংবা বীজ বা কৃষি যন্ত্রপাতির অভাব পড়েছে। এরূপ অবস্থায় তাথে যাকাত ফাণ্ড থেকে এমন পরিমাণ সাহায্য দেয়া উচিত, যা পেয়ে সে তার জীবনব্যাপী প্রয়োজন যথেষ্ট মাত্রায় পূরণের ব্যবস্থা করে নিতে পারে, দ্বিতীয়বার সে কখনও যাকাতের মুখাপেক্ষী হবে না। কেননা তার পেশার জন্যে উৎপাদন করবে, মুনাফা করবে, ফসল ফলাবে। তাই সে আর কখনও যাকাতের মুখাপেক্ষী থাকবে না।
আর দ্বিতীয় প্রকারের ফকীর-মিসকীন উপার্জনে অক্ষম। যেমন পঙ্গু অন্ধ, থুরথুরে বুড়ো এবং বিধবা, ইয়াতীম, বালক শিশু। এ ধরনের ফকীরকে তো এক বছর কালের প্রয়োজন অনুপাতে যাকাতের অংশ দেয়া উচিত। তাদের দিতে হবে বার্ষিক হিসেবে নিয়মিতভাবে। এক বছরের জন্যে সে নিয়ে যাবে এবং বছরান্তর পুনরায় পাওয়ার জন্যে আসবে। বরং সারা বছরেরটা এক সাথে দিলে সে অপব্যয় করে বসবে-অপ্রয়োজনীয় কাজে খরচ করবে এই ভয় থাকলে তাকে মাসিক হিসেবে দেয়া উচিত। এ কালে এই নীতিই অনুসরণীয়। কর্মচারীদের যেমন মাসিক বেতন হিসেবে দেয়া হয়, এই আর্থিক সাহায্যও মাসিক হিসেবে দিতে হবে।
এই মতের সমর্থন আমি হাম্বলী মতে লিখিত কোন কোন কিতাবেও পেয়েছি।
‘গায়াতুল মুনতাহা’ নামক গ্রন্থ ও তার শরাহ কিতাব এ পর্যায়ে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের মতের উল্লেখ রয়েছে। এক ব্যক্তির চাষের জমি আছে, বাগান আছে। তাতে দশ হাজার বা তার অধিক উপার্জন হয় বটে, কিন্তু তা তার জন্যে যথেষ্ট নয় না। ইমাম আহমাদের মতে এ ব্যক্তি যাকাত গ্রহণ করে তার প্রয়োজন যথেষ্ট মাত্রায় পূরণ করতে পারবে। এরূপ অবস্থায় পেশাদারকে তার পেশার যন্ত্রপাতি দেয়া যাবে- তা যত বেশিই হোক, ব্যবসায়ীকে যথেষ্ট মাত্রায় মূলধন দেয়া যাবে। এতদ্ব্যতীত অন্যান্য ফকীর-মিসকীনকে তাদের ও তাদের বংশাবলীর প্রয়োজন পরিমাণ দেয়া যাবে। প্রতি বছর বার্ষিক হিসেবে তারা যাকাত পাবে। আমার অবলম্বিত মতের অতীব নিকটবর্তী এ মত, যদিও সারাজীবনের জন্যে যথেষ্ট পরিমাণের কথা স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ নেই। কিন্তু মূলধন ও যন্ত্রপতির মূল্য দেয়ার তাৎপর্য তো তাই।
ফকীরকে দেয় পরিমাণ পর্যায়ে অন্যান্য মত
দ্বিতীয় দৃষ্টিকোণ হচ্ছে, ফিকাহবিদগণ ফকীর ও মিসকীনকে নি পরিমাণ দেয়া হবে-কম ও বেশী এর মধ্যবর্তী একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ ওয়াজিব বলে মনে করেছেন।
ইমাম আবূ হানীফা ও তার সঙ্গী সাথিগণ মত প্রকাশ করেছেন যে, একজনকে দেয় এই পরিমাণটা দশ দিরহাম-নগদ সম্পদের নিসাব-এর অধিক হওয়া উচিত নয়। কারুর স্ত্রী ও সন্তানাদি থাকলে তাদের প্রত্যেকের জন্যেই এই নিসাব পরিমাণ গ্রহণ করা জায়েয হবে।
অপর কোন কোন ফিকাহবিদ এর চাইতে কম পরিমাণের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁর পঞ্চাশ দিরহামের অধিক দেয়া জায়েয মনে করেন না। আবার একদিন ও একরাতের খাওয়ার প্রয়োজনের অতিরিক্ত দেয়া পসন্দ করেন নি অনেকে।
তবে ইবনে হাজম প্রমুখ জাহিরী মতের ফিকাহবিদ এসব মত প্রত্যাখ্যান করে বলেছেনঃ যাকাত থেকে কমও দেয়া যেতে পারে, বেশিও দেয়া যেতে পারে, তার কো সীমা নির্দিষ্ট নেই। কেননা এই ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহ কো সীমা বা পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেয়নি।[(আরবী***************)]
ইমাম গাজালীর মত
ইমাম গাজালী তাঁর প্রখ্যাত ইহয়াউল উলুম গ্রন্থে ফকীর ও মিসকীনকে এক বছরের জন্যে যথেষ্ট, পরিমাণ যাকাত দেয়ার মতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কেননা এই পরিমাণটা তাদের প্রয়োজন পূণের নিকটবর্তী বলে মনে করা যায়। রাসূলে করীম (স) এর তাঁর পরিবারবর্গের জন্যে এক বছরের খোরপোষ সংগ্রহ করে রাখার কাজটি এ পর্যায়ে সুন্নাতরূপে গণ্য।
তিনি আরও লিখেছেন, যাকাত ও সাদকা থেকে গ্রহণীয় পরিমাণ পর্যায়ে আলিমগণের বিভিন্ন মত রয়েছে।
দেয় পরিমাণ কম করার ক্ষেত্রে একদিন এক রাতের খোরাক পরিমাণ হচ্ছে সর্বনিম্ন মান। এ পরিমাণের দলীল হিসেবে ইবনুল হানজালা বর্ণিত হাদীসটির উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (স) ধনাঢ্য থাকা অবস্থায় ভিক্ষা করা হলে তিনি বলেছিলেনঃ (আরবী***************) তার দুপুর ও রাত্রিকালীন খাবার থাকা। [আবূ দাউদ ও ইবনে হাব্বান]
অন্যরা বলেছেন, ধনাঢ্যতার, পরিমাণ পর্যন্ত গ্রহণ করতে পারে। আর ধনাঢ্যতার সীমা হচ্ছে যাকাতের নিসাব পরিমাণ সম্পদ। কেননা আল্লাহ তাআলা যাকাত ফরয করেছেন কেবলমাত্র ধনী লোকদের উরপ। তাই আলিমগণ বলেছেন, একজন ফকীর বা মিসকীন তার নিজের ও তার পরিবারের প্রত্যেকের জন্যে যাকাত ফরয হওয়া পরিমাণ সম্পদ গ্রহণ করতে পারে।
অপরাপর লোকদের বক্তব্য হচ্ছে, পঞ্চাশ দিরহাম কিংবা এই মূল্য পরিমাণ স্বর্ণের মালিকানা ধনাঢ্যতার সীমা। ইবনে মাসউদ (রা) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (স) বলেছেন, যার যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদ থাকা সত্ত্বেও ভিক্ষা চাইবে, কিয়ামতের দিন তার মুখমন্ডল ক্ষতবিক্ষত হবে। পরে জিজ্ঞাসা করা হল, তার যথেষ্ট পরিমাণ বলতে কি বোঝায়? বললেন পঞ্চাশ দিরহাম অথবা তার মূল্যের স্বর্ণ।’ এ বর্ণনাটির বর্ণনাকারী খুব শক্তিশালী নয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। [(আরবী***********)]
কিছু লোক বলেছেন, চল্লিশ দিরহাম। আতা ইবনে ইয়ামার এ কথাটির বর্ণনা করেছেন।
অনেকে এই পরিমাণটিকে অধিক প্রশস্ত করে বলেছেন, যাকাত থেকে এমন পরিমাণ গ্রহণ করবে যাদ্দারা সে জমি ক্রয় করতে পারবে, যেন সে তার আয় দ্বারা সারা জীবন ধনী হয়ে থাকতে পারে অথবা এমন পরিমাণ পণ্য ক্রয়ের ব্যবস্থা করতে পারবে। কেননা ধনাঢ্যতা বলতে তো তাই বোঝায়। এ পর্যায়ে হযরত উমরের কথা- যখন দেবে তো ধনী বানিয়েই দাও’ পূর্বেই উদ্ধুত হয়েছে।
এমনকি , কেউ কেউ এতদূর উদারতা পোষণ করেন যে, কেউ যদি গরীব হয়ে যায়, তাহলে সে এতটা গ্রহণ করতে পারবে যাদ্বারা সে তার পূর্বানুরূপ আর্থিক অবস্থা পুনরায় লাভ করতে সক্ষম হবে। তার পরিমাণ দম হাজার হলেও ক্ষতি নেই। তবে স্বাভাবিকতার সীমা লংঘিত না হয়, সেদিকে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে।
হযরত আবূ তালহা (রা) যখন তাঁর বাগানের কাজে এতই মশগুল হয়ে পড়লেন যে, নামায পর্যন্ত চলে গেল, তখন তিনি বললেনঃ ‘আমি এই বাগান সাদকা করে দিলাম।’ নবী করীম (স) তাকে উপদেশ দিলেনঃ ‘তুমি বাগানটি তোমার নিকটাত্মিয় কোন লোককে দিয়ে দাও। তোমার জন্যে তাই ভাল হবে।’ তাই তিনি তা দিয়ে দিলেন হাসসান ও আবূ কাতাদাহকে। পরে দেখা গেল, বাগানটিতে এতই খেজুর ধরেছে যা দুজন লোকের জন্যে অনেকটা বেশি এবং তা তাদের ধনী বানিয়ে দিল। হযরত উমর (রা) একজন বেদুঈনকে একটি উট দান করলেন, তার বাচ্চাটিও তার সঙ্গে ছিল।
এ পর্যায়ে এরূপ বর্ণনাই উদ্ধুত হয়েছে। আর কম করে একদিনের খোরাক দেয়া বা আউকিয়া দেয়ার কথাও বলা হয়েছে, ভিক্ষা করা ও দ্বারে দ্বারে ঘরে বেড়ানোকে ঘৃণা করা হয়েছে বলে। কেননা এটা বাস্তবিকই অত্যন্ত ঘৃণ্য কাজ। এ পর্যায়ে আরেকটি প্রস্তাবনা রয়েছে। তা হচ্ছে একটি জমি ক্রয় করে দেয়া। সম্ভবত তার দ্বারা সে ধনী ও সচ্ছল হয়ে যেতে পারবে। এটাও অবশ্য অপব্যয় ও বাড়াবাড়ি মনে হয়। অধিক ভারসাম্যপূর্ণ কাজ হচ্ছে, এক বছরের জন্যে যথেষ্ট পরিমাণ দিয়ে দেয়া, এক অধিক হলে বিপদের আশংকা। আর কম হলে সংকীর্ণতা আরোপিত হয়। [এই হাদীসটি সম্পর্কে বলেছেন, সুনান গ্রন্থাবলীতে এই হাদীসটি উদ্ধৃত হয়েছে। তিরমিযী এটিকে হাসান বলেছেন। আর নাসায়ীও বলেছেন দুর্বল।]
ইমাম গাজ্জালী যাকাত গ্রহণের নিয়ম-কানুন বর্ণনা প্রসঙ্গে এসব কথা বলেছেন। প্রসঙ্গত দারিদ্র্য ও মিসকীনীর নামে যা কিছু গ্রহণ করা হয় সেই পর্যায়ে বিবেচনা করা হয় বা ওয়াজিব মনে হয়, তারও তিনি উল্লেক করেছেন।
ইহইয়াউ উলুম’ নামের এই কিতাবখানি তাসাউফপন্থী ও পরহেযগার লোকদের জন্যে লিখিত। তাতে যাকাত গ্রহণে বিশেষ সংকীর্ণতার পন্থাই নির্ধারিত হবে, এটাই ধারণা করা যায়। কিন্তু আমরা দেখছি, আবূ হামেদ আল-গাজালী এ পর্যায়ে ভারসাম্যপূর্ণ নীতিই উপস্থাপিত করেছেন; বরং বলা যায়, অধিক প্রশস্ততার কথাই সংকীর্ণকারীদের তুলনায় ও মতের বিশ্বাসীদের তিনি অধিক নিকটবর্তী বলে মনে করেছেন। আর তা সবই হযরত উমর ও আবূ তালহা থেকে বর্ণিত দলীলের ভিত্তিতে বলা হয়েছে। নবী করীম (স) এর নির্দেশ অনুযায়ী প্রাচীরবেষ্টিত বাগান নিয়ে যা করা হয়েছে, তাও সমানে রয়েছে।
দানে প্রশস্ততার মতকে অগ্রাধিকার দান
ইসলামী অর্থব্যবস্থা পর্যায়ে অকাট্য দলীল পারদর্শী ফিকাহবিদ ইমাম আবূ উবাইদ মুজতাহিদ ছিলেন। তিনি দান করার ব্যাপারে কোন রূপ রক্ষণশীলতা ও সীমা নির্ধারণ ব্যতিরেকেই প্রশস্ততার মতটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি আবূ তালহা আবূ কাতাদাহ ও হাসসানকে প্রাচীর বেষ্টিত বাগানটি দিয়ে দেয়ার কথারও উল্লেখ করেছেন। পরে বলেছেন, প্রাচীরবেষ্টিত বাগানটি তো খেজুর, গাছপালা ও কৃষি ফসল সমন্বিত ছিল। তাহলে তার কম সে কম মূল্য কত হওয়া উচিত?
আবূ তালহা দানের খ্যাতি লুকাতে পারবেন না বলে ভয় পেয়েছিলেন। এ কারণে তিনি তা মাত্র দুজনকে দিয়েছিলেন। তৃতীয় কাউকে তাতে শরীক করেন নি।
আবু উবাইদ বলেছেন, এটাই হচ্ছে প্রকৃত দান বা সাদকা। যদিও তা নফল। তাহলে ফরয দানের পন্থা এর চাইতে ভিন্নতর কিছু হতে পারে না। কেননা যে ফরয যাকাত ধনীদের ধনে কেবল ফকীর-মিসকীনদের জন্যে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে তার বেশি পরিমাণ গ্রহণ করা যদি হারাম গণ্য হয়, তাহলে নফল দানে-যা ওয়াজিব বা ফরয না অধিক পরিমাণ গ্রহণ অধিক সংকীর্ণ ও হারাম হবে নিশ্চিতভাবেই। আর তা যদি হলাল নয় আর নফল দানের দানকারী যদি হয় অনুগ্রহকারী কল্যাণকারী, তাহলে ফরয দানে সে অবশ্যই অধিক উদার ও বেশি বেশি দানকারী হবে। [(আরবী*************)]
পরে আবূ উবাইদ হযরত উমর ও আতা প্রমুখ থেকে কয়েকটি হাদীস উদ্ধৃত করেছেন। তারপর লিখেছেন, এসব নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে, যে অভাবগ্রস্তকেই যাকাত থেকে কিছু দেয়া হবে, তার জন্যে মুসলিমদের প্রতি এমন কোন পরিমাণ বা সীমা নির্দিষ্ট নেই যে, তা লংঘন করা অন্যায় হয়ে যাবে- অবশ্য দানকারী যদি কৃপণ না হয়; বরং ভালবাসা ও বদান্যতা সম্পন্ন হয়, তবেই এ কাজটি হবে। যেমন কেউ কোন নেককার মুসলিম পরিবারবর্গকে দারিদ্র্য ও অভাব নিপীড়িত দেখতে পেল, সে নিজে বিপুল ধন-সম্পদের অধিকারী। ঐ লোকদের কোন ঘর-বাড়ি নেই যেখানে তারা আশ্রয় নিতে পারে এবং নিজেদের একাকীত্ব ও গোপনতা রক্ষা করতে পরে। তখন সেই ধনী লোকটি তাদের জন্যে তার যাকাতের মাল থেকে একটি বাড়ি ক্রয় করে দিল। সেখানে তারা বসবাস করবে-শীতের আক্রমণ ও গ্রীষ্মের তাপ থেকে তারা আত্মরক্ষা করতে পারবে অথবা তাদের দেখা গেল উলঙ্গ-পরিধানে কাপড় নেই। তখন তাদের জন্যে পরিধেয় কাপড় কিনে দিল, যা দিয়ে তারা তাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে নামায পড়বে এবং শীত-গ্রীষ্মের কষ্ট থেকেও রক্ষা পাবে অথবা দেখল, একজন ক্রীতদাস খারাপ মনিবের হাতে মর্মান্তিকভাবে নির্যাতিত হচ্ছে। তাকে সেই মনিবের তাহ থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্য খরিদ করে মুক্ত করে দিল। কিংবা কোন দূরদেশের পথিক নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। বাড়ি-ঘরের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন। তখন টাকা খরচ করে তাকে ও তার সঙ্গী তার পরিবারবর্গকে তার দেশে পাঠিয়ে দেয়া হল। এসব এবং এ পর্যায়ের কোন কাজই বিপুল পরিমাণে অর্থ ব্যয় ব্যতিরেকে সুসম্পন্ন হতে পারে না। আর যে এ কাজ করবে, সে তার নফল দান দিয়েও এ কাজ করতে রাজী হল না। তখন সে তার মালের যাকাত দিয়ে এ ধরনের বড় বড় কাজ করল। তাহলে তাতে কি তা ফরয যাকাত আদায় হয়ে যাবে?….. হ্যাঁ নিশ্চয়ই যাকাত আদায় হবে। আর সেই সাথে সে বড় দয়াবান বলেও স্বীকৃত হবে।
উপযুক্ত মানের জীবিকা ব্যবস্থা
এই আলোচনা থেকে একথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, যাকাত দেয়ার লক্ষ্য ফকীর-মিসকীনকে একটি বা দুটি দিরহাম দিয়ে নয়। আসলে লক্ষ্য হচ্ছে উপযুক্ত মানের জীবিকার ব্যবস্থা করে দেয়া। লক্ষ্য রাখতে হবে, সে একজন মানুষ। আল্লাহ তাকে সম্মানার্হ ও মর্যাদাবান বানিয়েছেন, পৃথিবীর বুকে তাকে আল্লাহ তাঁর খলীফা বানিয়েছেন। ওপরন্তু অনুগ্রহ ও সুবিচারের প্রবর্তন দ্বীন ইসলামে সে বিশ্বাসী-একজন মুসলিম। সে সেই উম্মতের একজন, যাকে বিশ্বমানবতার কল্যাণের জন্যে তৈরী করা হয়েছে।
এই মান অনুপাতে কম-সে-কম যে ব্যবস্থা হওয়া আবশ্যক, তা হচ্ছে, ফকীর-মিসকীন ব্যক্তি ও তার পরিবারবর্গের জন্যে খাদ্য, সুপানীয়, শীত-গ্রীষ্মের পোশাক এবং উপযুক্ত সুবিধাজনক একটি বাসস্থান। ইবনে হাজম তার আল-মুহাল্লা গ্রন্থে এ বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন। আমরাও অষ্টম অধ্যায়ে তার উল্লেখ করব। ইমাম নববী তাঁর المجموع ও الروضه গ্রন্থে এর উল্লেখ করেছেন। এভাবে বহু সংখ্যক আলিমই এ বিষয়টির উপস্থাপন করেছেন।
ইমাম নববী অভাবগ্রস্ত ব্যক্তির জন্যে যাকাত ফান্ড থেকে যথেষ্ট পরিমাণে দেয়ার কথা বলে তা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
আমাদের সাথীরা বলেছেন, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যেই খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের- এবং সেই সাথে আরও যা একন্ত দরকার তার ব্যবস্থা তার উপযুক্ত করে করা আবশ্যক। অবশ্য কোনরূপ অপচয় বা বেহুদা খরচ না হয়, সেই সঙ্গে কার্পণ্যও দেখানো না হয়, সেই দিকে নজর রাখতে হবে। এই ব্যবস্থা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে যেমন হতে হবে, তার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের জন্যেও। [(আরবী***********)]
অবশ্য একালের লোকদের প্রত্যেকের জন্যে শিক্ষার ব্যবস্থা হওয়াও একান্তই প্রয়োজন। যে শিক্ষায় দ্বীনের হুকুম-আহকাম শেখা হবে, সেই শিক্ষা ও সংস্কৃতির কথা বলা হচ্ছে। মূর্খতার অন্ধকার থেকে বাঁচা, ভদ্র শলীন জীবন যাপনের পদ্ধতি জানা, বৈষয়িক দায়িত্ব পালনে যোগ্য করে তোলার জন্যে এই শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
মুসলিম ব্যক্তির মৌল প্রয়োজন পর্যায়ের আলোচনা আমরা এ বিষয় বিস্তারিত আলোচনা করেছি। শিক্ষার প্রয়োজন মূর্খতা দূর করার জন্যে। কেননা মূর্খতা জ্ঞান ও সংস্কৃতি উভয় দিক দিয়েই মৃত্যুর সমান। মূর্খ ব্যক্তি তাৎপর্যগতভাবে মৃত।
এ যুগে প্রত্যেকের জন্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা হওয়াও আবশ্যক। কোন ব্যক্তি বা তার পরিবারবর্গের কারুর রোগ হলে তাকে সুস্থ করে তোলার ব্যবস্থা করা দরকার। রোগকে উন্মক্ত করে ব্যক্তিকে স্বাস্থীহীন করে রাখার সুযোগ দেয়া যায় না। অন্যথায় প্রাণী হত্যার অপরাধ হবে, ব্যক্তিকে নিক্ষেপ করা হবে ধ্বংসের মুখে। হাদীসে বলা হয়েছেঃ
(আরবী****************)
হে আল্লাহর বন্দারা! তোমরা রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা কর। কেননা আল্লাহ এমন কোন রোগেরই সৃষ্টি করেন নি, যার জন্যে কোন ঔষধের ব্যবস্থা করেন নি। [(আরবী**********)]
আল্লহা তাআলা নিজেই বলেছেনঃ
তোমরা নিজেদের ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না। [(আরবী**********)]
(আরবী****************)
তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি অনেক দয়াবান। (সূরা আন-নিসাঃ ২৯)
সহীহ হাদীসে বলা হয়েছেঃ
(আরবী***************)
মুসলামন মুসলমানের ভাই। সে তার ওপর জুলুম করতে পারে না, তাকে অসহায় করে ছেড়েও দিতে পারে না।
কাজেই কোন মুসলিম ব্যক্তি বা সমাজ-সমষ্টি যদি অপর কোন ব্যক্তিকে অসহায় করে ছেড়ে দেয়, রোগ তাকে ধ্বংস করতে থাকে এবং তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা না হয়, তাহলে তাকে অসহায় করে ফেলে দেয়া হবে, তাকে লজ্জিত ও লঞ্ছিত করা হবে, তাতে কোন ই সন্দেহ নেই।
আসলে লক্ষণীয় বিষয় হল ব্যক্তির জন্যে সাধারণ জীবনমান স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় করে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কেননা তা সময় ও অবস্থার পার্থক্যের কারণে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে অনিবার্যভাবে। প্রত্যেক জাতির আর্থিক অবস্থা ও আয়ের তারতম্যের কারণেও এ পার্থক্য অবস্বীকার্য হয়ে পড়ে।
অনেক জিনিস এমনও আছে যা এক যুগে বা এক অবস্থায় পূর্ণাঙ্গ বিবেচিত হয়। এক সময় একটা জিনিস অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়ে, কিন্তু অপর এক যুগে ও অবস্থায় তা সেরূপ বিবেচিত হয় না।
স্থায়ী ও সূংসবদ্ধ সাহায্য ব্যবস্থা
যে ফকীর বা মিসকীন কোন ভাল পেশা অবলম্বনে সমর্শ নয়, এমন কোন শ্রমেও করতে পারে না যা তার পরিবারবর্গের জন্যে উপযুক্ত ও যথেষ্ট পরিমাণে জীবনযাত্রার ব্যবস্থা করতে পারবে, যাকাত বণ্টনের ভিত্তি হিসেবে তার জন্যে একটি পূর্ণ বছর ব্যাপী যথেষ্ট পরিমাণে দানের ব্যবস্থা করতে হবে। এই হচ্ছে যাকাতের লক্ষ্য। এ ব্যবস্থা এক মাস বা দুই মাসের জন্যে চলবে না। বরং এ ধরনের যাকাত পাওয়ার যোগ্য লোকদের জন্যে একটা স্থায়ী ও সুসংগঠিত ব্যবস্থা হওয়া বাঞ্ছনীয়। এর ফলেই দারিদ্র সচ্ছলতায় রূপান্তরিত হতে পারে এক ব্যক্তি বা একটি পরিবারের জীবনে। তার দূর্বলতা ও অক্ষমতা দূর হয়ে শক্তি ও সামর্থ্য এবং মর্যাদা লাভ সম্ভবপর হতে পারে। বেকারত্ব দূর হয়ে কর্মব্যবস্ততা সূষ্ঠু উপার্জনের তৎপরতা শুরু হতে পারে। এ পর্যায়ে ইমাম আবূ উবাইদ যে বর্ণানার অবতারণা করেছেন তা এখানে বিবেচনা করতে পারি।
একদা হযরত উমর (রা) মধ্যাহ্নকালে একটি গাছের ছায়ায় শায়িত ছিলেন। এ সময় একজন বেদুঈণ মহিলা এসে উপস্থিত হল। লোকেরা তা লক্ষ্য করছিল। মহিলটি বলল, ”আমি একজন মিসকীন মেয়েলোক আর আমার ছেলেপেলেও রয়েছে। আমীরুল মু’মিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাকে যাকাত সংগ্রহ ও বিতরণকারী নিযুক্ত করে পাঠিয়েছেন। কিন্তু তিনি আমাকে কিছই দেন নি। এরূপ অবস্থায় সম্ভবত আপনি আমার জন্যে তার কাছে সুপারিশ করতে পারেন”
এ কথা শুনে হযরত উমর (রা) মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাকে ডেকে পাঠালেন।
মহিলাটি বললেঃ আমার জন্যে সাফল্যজনক ব্যবস্থা এই হতে পারে যে, আপনিই আমাকে নিয়ে তার কাছে উপস্থিত হবেন। তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, তাই করা হবে, ইনশাআল্লাহ।
পরে মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা উপস্থিত হয়ে সালাম দিয়ে বললেনঃ আমি হাযির, নির্দেশ করুন হে আমীরুল মু’মিনীন! একথা শুনে মহিলাটি ভয়ানক লজ্জা পেল। হযরত উমর (রা) বললেনঃ আল্লাহর নামে শপথ! আমি তো তোমাদের কল্যাণ চাইতে ত্রুটি করি না। কিন্তু আল্লাহ যখন তোমাকে এ মেয়েলোকটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন , তখন তুমি কি জবাব দেবে?……. এই কথা শুনে মুহাম্মাদের দুই চোখ দিয়ে অশ্রুধারা প্রবাহিত হতে লাগল। পরে হযরত উমর বললেনঃ আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতি তার নবী করীম (স) কে পাঠিয়েছেন। আমরা তাঁকে সত্য নবীরূপে মেনে নিয়েছি আর অনুসরণ করেছি। তিনি আল্লাহর নির্দেশ ও বিধান অনুযায়ী কাজ করে গেছেন। তিনি সাদকা-যাকাত মিসকীনদের জন্যে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। পরে হযরত আবূ বকর (রা) খলীফা হল। তিনি রাসূলের সুন্নাত অনুযায়ী আমল করে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। তারপর আমাকে খলীফা বানানো হয়েছে। আমি তো তোমাদের মধ্য থেকে উত্তম লোকদেরই নানা কাজে নিযুক্ত করেছি। আমি যদি তোমাকে পাঠাই, তাহলে এক বছরের যাকাত পরিমাণ এই মহিলাকে দেবে। আর আমি জানি না, সম্ভবত আগামী বছর আমি তোমাকে পুনরায় পাঠাব কি না। পরে মেয়েলোকটির জন্যে কিছু ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিলেন। ফলে তাকে এক উট বোঝাই ময়দা জায়তুন দেয়া হল। তাকে বললেনঃ এখনকার মত তুমি এসব নিয়ে যাও।
পরে খায়বরে তুমি আমার সাথে সাক্ষাৎ করবে। আমি খায়বর যাওয়ার ইচ্ছা করেছি। পরে মহিলাটি খায়বরে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করলে তিনি মহিলাটিকে দুটি উট দিয়ে দিলেন। বললেন, এই উট দুটো নিয়ে যাও। সম্ভবত মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামার আগমন পর্যন্ত এ দিয়ে তোমার চলে যাবে। আমি তাকে নির্দেশ দিয়েছি, তোমাকে বিগত এক বছর কালের জন্যে ও আগামী বছরের জন্যে হক দিয়ে দিতে।[(আরবী************)]
এই কাহিনী এবং এ কথোপথন থেকে কি প্রমাণিত হয়? এ ঘটনার বিবরণ থেকে অনেক মূল্যবান মৌল নীতি জানা যায়।
১. ইসলামী রাজ্যের অধিবাসী প্রতিটি নাগরিকের প্রতি শাসক ও প্রশাসকের কঠিন দায়িত্ব ও জবাবদিহি রয়েছে। এ বিষয়ে ইসলামী রাষ্ট্রর সর্বোচ্চ শাসক খলীফাতুল মুসলিমীন প্রচন্ড ভাবে সচেতন ছিলেন।
২. ইসলামী রাজ্যের নাগরিকগণ তাদের উপযুক্ত জীবিকা পাওয়ার অধিকার রাখে এবং সে বিষয়ে তারা পূর্ণমাত্রায় সচেতন। রাষ্ট্রেই এ অধিকার আদায়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
৩. ইসলামী সমাজে জীবিকার নিরাপত্তা বিধানে যাকাত হচ্ছে প্রাথমিক পর্যায়ের দান বা আর্থিক সাহায্য।
৪. এই সাহায্য ছিল সুসংগঠিত এবং স্থায়ী। যদি কেউ তার অংশ না পায়, তাহলে সেজন্যে ফরিয়াদ করতে পারে, তার প্রতিকার চাইতে পারে, এই অধিকার প্রতিটি যাকাত পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিরই রয়েছে।
৫. হযরত উমরের রাষ্ট্রনীতি ছিল রাশেদা- সত্য ও সৎপথ অনুসরণকারী। তা এতটা পরিমাণ দেয়ার পক্ষপাতী ছিল যা প্রাপকদের জন্যে যথেষ্ট হয়, তাদের পরমুখাপেক্ষিতামুক্ত ও ধনী বানিয়ে দেয়। তিনি মহিলাটিকে ময়দা ও জয়তুন বোঝাই উট দিয়ে দিলেন। পরে তার সঙ্গে আরও দুটো উট মিলিয়ে দিলেন। আর এই গোটা দানকে তিনি সাময়িক দান হিসেবে গণ্য করেছিলেন, যতক্ষণ না মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা এসে তাকে বিগত বছর ও আগামী বছরের জন্যে এক সাথে দিচ্ছে।
এসবের শেষে একথাও প্রমাণিত হয় যে, হযরত উমর (রা) এ কাজ সর্বপ্রথম করেন নি। এক্ষেত্রেও তিনি নবী করীম (স) ও প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর (রা) এর অনুসারী ছিলেন।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
যাকাত কার্যে নিয়োজিত কর্মচারী
যাকাতের অর্থনৈতিক ও প্রতিষ্ঠানগত ব্যবস্থাপনা
কুরআনে নির্দিষ্ট যাকাত ব্যয়ের খাতসমূহের মধ্যে তৃতীয় হচ্ছে এজন্যে নিয়োজিত কর্মচারী। এর পূর্বে ফকীর ও মিসকীনের কথা বলা হয়েছে। যাকাতে নিয়োজিত কর্মচারী, বলতে বোঝায় যাকাত আদায়, সংরক্ষাণ ও ব্যয়-বণ্টন সংক্রান্ত যাবতীয় কাজের জন্যে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা। এর মধ্যে যাকাত আদায়কারী, সংরক্ষণকারী, পাহারাদার, লেখক, হিসাব রক্ষক এবং তার বণ্টনকারী সব লোকই গণ্য। এসব লোকের পারিশ্রমিক যাকাত সম্পদ থেকে দেয়ার ব্যবস্থা স্বয়ং আল্লাহ তাআলাই করে দিয়েছেন,- যেন তারা মালের মালিকদের নিকট থেকে যাকাত ছাড়া আর কিছুই গ্রহণ না করে, তার প্রয়োজনও তারা বোধ না করে। উপরন্তু এই ব্যবস্থা দ্বারা এ কথাও প্রমাণিত হয় যে, যাকাত একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যবস্থা ও সংস্থা। এর নিজের আয় দ্বারাই তাকে চলতে হবে। অপর কোন আয়ের উৎসের ওপর নির্ভরশীল হবে না। এই সংস্থার সঙ্গে জড়িত সকলের প্রয়োজন এখান থেকেই পূরণ করতে হবে।
কুরআন মজীদে যাকাত ব্যয়ের অন্যতম খাতরূপেই তাদের উল্লেখ করা হয়েছে এবং তা একটি অকাট্য দলীল। যাকাত পাওয়ার যোগ্য আট প্রকারের মধ্যে এরাও এক প্রকারের প্রাপক। এদের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে ফকীর ও মিসকীনের পর। কেননা এরাই প্রথম প্রাপক ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত লোক। এই সব কিছু প্রমাণ করে যে, যাকাত-ব্যবস্থা ইসলামে ব্যক্তির ওপর অর্পিত কাজ নয়। বরঞ্চ এটা আসলে রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অন্তর্ভূক্ত। রাষ্ট্রই এর যাবতীয় ব্যবস্থাপনা, গঠন ও পরিচালনা করবে। যাকাত আদায়কারী, খাজাঞ্চী, লেখক ও হিসাবরক্ষক সব কিছু নিযুক্ত করা ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বস্তুত যাকাতের একটা আয় রয়েছে, আছে একটা বিশেষ বাজেট বা আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা। যারা এখানে কাজ করবে, তাদের মাসিক বেতন এখান থেকেই দেয়া হবে। [যাকাতের সাথে সরকারের সম্পর্ক’ অধ্যায় দ্রষ্টব্য]
যাকাত আদায়কারী প্রেরণ সরকারের দায়িত্ব
এ পর্যায়ে ফিকাহবিদগণ ঘোষণা করেছেন, যাকাত গ্রহণের জন্যে লোক পাঠানোর কাজটি রাষ্ট্রপ্রধানকে বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে করতে হবে। নবী করীম (স) এবং তাঁর পরে খুলাফায়ে রাশেদুন যে তাই করেছেন, একথা সর্বজনবিদিত। বুখারী ও মুসলিমে উদ্ধৃত হযরত আবূ হুরায়রা (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, নবী করীম (স) হযরত উমর (রা) কে যাকাত আদায়ের কাজে নিযুক্ত করে পাঠিয়েছিলেন। হযরত সহল ইবনে সায়াদ (রা) থেকেও বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছেঃ নবী করীম (স) ইবনে লাতবিয়াকে যাকাত আদায়ের কাজে নিযুক্ত করেছিলেন। এ পর্যায়ে হাদীসের সংখ্যা বিপুল। এই ব্যবস্থা করা হয়েছে এ কারণে যে, লোকেরা ধন-মালের মালিক হয়ে বসে; কিন্তু সেজন্যে তাদের ওপর কি কর্তব্য দাঁড়িয়েছে তা তারা জানে না, বুঝে না। অনেকে আবার বুঝেও কর্পণ্য করে। এজন্যেই যাকাত আদায়কারী পাঠনো একান্তই জরুরী হয়ে পড়েছে। [(আরবী*******)]
রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা তাঁর দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কৃষি ফসল ও ফল-মূলের যাকাত আদায় করার জন্যে লোক প্রেরণ করবে। এসবের যাকাত বছর হিসেবে আদায় করা হয় না, হয় ফসল হিসেবে; যখনই তা দেয়া ফরয হয়, তখন। কাজেই ফসল ও ফল কাটা ও মাড়াইর সময়ই তা যাকাত গ্রহণের জন্যে লোক যেতে হবে। এ ছাড়া গৃহপালিত গবাদি পশুর যাকাতে বছরের হিসাব গণ্য হবে। সেজন্যে বছরের একটি মাস নির্দিষ্ট করে নেয়ার প্রয়োজন। আদায়কারী বছরান্তর নির্দিষ্ট মাস বা সময়ে সেজন্যে উপস্থিত হবে। সেজন্যে মুহাররম মাসটি নির্দিষ্ট হওয়া ভাল; শীতকাল হোক কি গ্রীষ্মকাল। কেননা শরীয়াতী হিসেবে এটিই হচ্ছে বছরের প্রথম মাস।
যাকাত আদায়কারী কর্মচারীদের কর্তব্য
যাকাত সংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত কর্মচারীদের বহু প্রকারের দায়িত্ব ও বিভিন্ন রকমের কাজ রয়েছে। তা সবই যাকাত সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্ট। কোন লোকের ওপর এবং কোন মালে যাকাত ধার্য হবে, যাকাতের পরিমাণ কত হবে, যাকাত কে কে পেতে পারে, তাদের সংখ্যা কত, তাদের প্রয়োজনের চূড়ান্ত মাত্রা বা পরিমাণ কত- কত পেলে তাদের জন্যে যথেষ্ট হয়, প্রয়োজন মেটে, এসব নির্ধারণ তাদেরই বড় কাজ।
যাকাতের জন্যে দুটো প্রতিষ্ঠান
আমাদের এ যুগে যাকাতের সম্পূর্ণ ব্যাপারটি সুষ্ঠুভাবে আঞ্জাম দেয়ার জন্যে দুটো শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেতে পারে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অধীন বহু কয়টি শাখা সংস্থাও গড়ে উঠতে পারেঃ
প্রথমঃ যাকাত আদায় বা সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান।
দ্বিতীয়ঃ যাকাত বণ্টনকারী প্রতিষ্ঠান।
১. যাকাত সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান ও তার বিশেষত্বসমূহ
যাকাত সংগ্রহ করার কাজে নিয়োজিত দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কাজ আসলে কর, সংগ্রহ পর্যায়ের কাজ। এ পর্যায়ে যে দায়িত্ব যে দায়িত্ব পালন করতে হয় ও তার ওপর যে গুরুত্ব আরোপ করতে হয়, তাকে আমরা বলতে পারি কর আদায়ের দায়িত্ব। তাদের বড় কাজ হল, যাদের ওপর ফরয যাকাত ধার্য হতে পারে, তাদের তালিকা তৈরী করা, তাদের ধন-মালের প্রকার এবং কত পরিমাণ যাকাত ফরয হয় তা নির্ধারণ করা, নিকটে গিয়ে তা পর্যবেক্ষণ করা, মালিকদের নিকট থেকে তা সংগ্রহ করা, অতঃপর তার পূর্ণমাত্রায় সংরক্ষণ করা- যাকাতা ব্যয় ও বণ্টকারী প্রতিষ্ঠানের নিকট সমর্পণ করা পর্যন্ত। ধরে নেয়া যায়, এজন্যে বিভিন্ন স্থানে, শহরে নগরে, অঞ্চলে বহু সংখ্যক শাখা-প্রশাখা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।
তবে এই প্রতিষ্ঠানটির বিশেষত্ব আধুনিক কালের কর আদায়ের প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কর্মক্ষেত্রের প্রেক্ষিতে অধিকতর প্রশস্ত ও বিশাল। কেননা কর আদায়কারী প্রতিষ্ঠান সাধারণত নগদ অর্থ গ্রহণ করে থাকে, কোথাও তা স্বর্ণ রৌপ্যরূপের হতে পারে। কিন্তু যাকাত সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানকে নগদ অর্থ-স্বর্ণ-রৌপ্য ছাড়াও বহু প্রকারের ফল ও ফসল গ্রহন ও সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করতে হয়। বহু গবাদি পশুও থাকে যাকাত বাবদ গৃহীত সম্পদের মধ্যে। যদিও এসব ক্ষেত্রেই নগদ মূল্য গ্রহণেরও অবকাশ রয়েছে। ইমাম আবূ হানীফা ও তার সঙ্গী-সাথিগণ এরূপ মত প্রকাশ করেছেন। পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা তার বিস্তারিত আলোচনা করব।
যাকাত বাবদ সংগৃহীতব্য ধন-মালের বিভিন্ন প্রকারের দৃষ্টিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গঠন করা যেতে পারে। এক-একটি প্রতিষ্ঠান এক-এক ধরনের মাল গ্রহণ করবে এবং সেই সংক্রান্ত যাবতীয় দায়িত্ব পালন করবে। এই প্রতিষ্ঠানসমূহ নিম্নরূপ হতে পারেঃ
ক. রিকাজ, খনিজ সম্পদ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান। এগুলোর মধ্যে এক-পঞ্চমাংশ দেয়।
খ. শস্য ও ফল-মূল গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান। এগুলোতে এক-দশমাংশ বা তার অর্ধেক গ্রহণীয় ১০% বা ৫%।
গ. গবাদি-পশুর যাকাত গ্রহণকারী পতিষ্ঠান। উট, গরু-মহিষ ও ছাগল ইত্যাদি এই পর্যায়ের পশু। এর একটা বিশেষ ধরনের হিসাব রয়েছে।
ঘ. নগদ সম্পদ ও ব্যবসা পণ্যের যাকাত গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান। এ ক্ষেত্রে এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ শতকরা আড়াই-আদায় করতে হবে।
২. যাকাত বণ্টনকারী প্রতিষ্ঠান ও তার বিশেষত্ব
এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সামাজিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধান’ পর্যায়ের। একালের পরিভাষায় তাই বলতে হয়, যাকাত পাওয়ার যোগ্য লোকদের চিনবার ও জানবার নির্ভূল ও উত্তম পন্থা উদ্ভাবন ও তগিত অনুভব করা, তাদের প্রয়োজনের প্রমাণ নির্ধারণ, কত পরিমাণ দিলে কার জন্যে যথেষ্ট হতে পারে-তার সব প্রয়োজন যথাযথভাবে পূরণের ব্যবস্থা হতে পারবে তা জানতে হবে। এজন্যে একটা সুস্থ ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে, যা তাদের সংখ্যা, পাত্রত্ব ও সামাজিকতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
ইমাম নববী বলেছেন, রাষ্ট্রপ্রধান, যাকাত সংগ্রহকারী এবং যাকাত বণ্টনের দায়িত্বশীলদের কর্তব্য হচ্ছে, পাওয়ার যোগ্য লোকদের তালিকা সংরক্ষণ, তাদের সংখ্যাটা জানা, তাদের প্রয়োজনের পরিমাণ সম্পর্কে অবহিত হওয়া, যেন সংগৃহীত সব যাকাত সুষ্ঠুরূপে বণ্টন করে স্বস্তি লাভ করা যায়, পাওনাদারদের পাওনা দিয়ে দেয়া যায় িএবং তাদের নিকট পড়ে থেকে যাকাত সম্পদ যেন বিনষ্ট বা ধ্বংসপ্রাপ্ত না হয়। [(আরবী*************)]
এ থেকে এ কথাও বোঝা যায় যে, ইসলামের বিশেষজ্ঞ মণীষিগণ যাকাত বণ্টন ব্যবস্থা সুসংগঠিত ও সুসংবদ্ধ করার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করেছেন, সেজন্যে চিন্ত-ভাবনাও করেছেন ব্যাপকভাবে। পাওয়ার যোগ্য লোকদের প্রতি চূড়ান্তভাবে লক্ষ্য নিবদ্ধ রেখেছেন যেন তাদের প্রাপ্য অল্প সময়ের মধ্যে তাদের হাতে পৌছে যায়। তাদের চাওয়া বা দাবি করার যেন অপেক্ষা না থাকে। এই প্রতিষ্ঠানটিরও বহু কয়টি শাখা-সংস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। প্রতিটি জেলা, মহকুমা বা থানা, ইউনিয়ন হিসেবে আমরা এই প্রতিষ্ঠানের কাজকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করতে পারি।
ক. অক্ষমতার কারণে কাজ ও উপার্জন থেকে বঞ্চিত ফকীর-মিসকীনের সংস্থা। থুরথুরে বড়ো, বিধবা, ইয়াতীম, কাজের ব্যাপদেশে বিপদের সম্মুখীন হওয়ায় অক্ষম হয়ে পড়েছে, স্থয়ী রোগের দরুন অক্ষমতা দেখা দিয়েছে, যারা সাময়িকভাবে বেকার, কাজ থেকে অবসরপ্রাপ্ত, আকষ্মিক দুর্ঘটনায় সর্বস্বান্ত হয়ে যাওয়া লোক, বিবেকবুদ্ধির দুর্বলতা অক্ষমতা দেখা দেয়ার দুরণ কাজের অনুপযুক্ত হয়ে পড়া লোক, বোকা নির্বোধ ধরনের লোক প্রভৃতি ও পর্যায়ে গণ্য হবে। তাবে তারা যে ধনী ও সচ্ছল নয় উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যা পূর্ব অর্জিত সম্পদের দরুন, এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে।
খ. যথেষ্ট পরিমাণের কম আয়ের অধিকারী লোক। এরা উপার্জন করে বটে, কিন্তু তাদের উপার্জন তাদের প্রয়োজনের তুলনায় কম, তাদের জন্যে যথেষ্ট নয়-হয় মজুরী পরিমাণ কম হওয়ার দরুন কিংবা তাদের ওপর নির্ভরশীল লোকদের বিপুল সংখ্যক হওয়ার কারণে অথবা দ্রব্যমূল্যের আকাশ-ছোঁয়া অবস্থা হওয়ার কারণে। কোন কোন ফিকাহবিদ এই লোকদেরই মিসকীন নামে চিহ্নিত করেছেন।
গ. ঋণ ভারাক্রান্ত লোকদের সংস্থা। দুর্বৈব-দুর্দশাগ্রস্ত লোকও এর মধ্যে গণ্য হবে। পারস্পারিক সম্পর্কোন্নয়ন ও বিবাদ মীমাংসাকরণের কাজের দরুন যারা ঋণগ্রস্ত হয়েছে, এ ধরনের অন্যান্য কল্যাণমূলক ও সামাজিক সামষ্টিক কাজে জড়িত হওয়ার দরুন যারা ঋণী হয়ে পড়েছে তারা সকলেই এ সংস্থার অধীন গণ্য হবে।
ঘ. মুহাজির, স্বদেশ তড়িত ও রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণকারী লোক, যারা কুফর ও অশান্তিপূর্ণ দেশ ত্যাগ করে এসে আশ্রয় গ্রহণ করেছে, ইসলামের খেদমতে বিদেশে প্রেরিত ছাত্র বা লোক প্রভৃতি এই সংস্থাভুক্ত হবে। শেষোক্তরা ফী-সাবীলিল্লাহ পর্যায়ে গণ্য বলে তাদের জন্যে যাকাত ব্যয় করা যাবে। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা পরে করা হবে।
ঙ. কাফিরী দেশে ইসলাম প্রচার সংস্থা। বিশ্বব্যাপী ইসলামী দাওয়াত প্রচারের কাজ, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা, ইসলামী দেশকে কাফিরদের কর্তৃত্ব ও আদিপত্য থেকে মুক্তকরণ, কাফিরী শাসনের অবসান করে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি কাজ এই সংস্থার অধীনে চলবে। এটাও ফী-সাবীলিল্লাহ’ পর্যায়ে গণ্য। এ বিষয়েও পরে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
এই বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কোনটিতে কত ব্যয় করা হবে, তাও নির্ধারণ করতে হবে। এজন্যে যাকাতের একটা পূর্ণাঙ্গ বাজেট তৈরী করা আবশ্যক হবে। রাষ্ট্রকর্তার ইজতিহাদ এক্ষেত্রে কাজ করবে পরামর্শদাতা বা উপদেষ্টা পরিষদের অধীন। এজন্যে পরিসংখ্যান বিভাগ চাল্য করতে হবে। অবশ্য যেখানে থেকে যাকাত সংগ্রহ করা হয়েছে সেই স্থানের কল্যাণের দিকে অধিক লক্ষ্য রাখতে হবে ইসলামের সামগ্রিক কল্যাণ দৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে। একটা বিশ্বব্যাপী ইসলামী দাওয়াতের ব্যবস্থা করার ওপরও লক্ষ্য রাখতে হবে। সারা দুনিয়ার মুসলমানের কল্যাণও এই কল্যাণদৃষ্টির অন্তর্ভূক্ত থাকবে। তারা দুনিয়ার জাতিসমূহের মধ্যে একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্যর অধিকারী উম্মত একথা বিস্মৃত হওয়া চলবে না।
যাকাত পাওয়ার যোগ্যতা নির্ণয়ের ওপর গুরুত্ব
যাকাতের মাল যার যার জন্যে ও যে যে ক্ষেত্রে ব্যয় করা হবে, সে সে ব্যক্তি ও সংস্থার যাকাত পাওয়ার যোগ্যতা ও অধিকার নির্ণয় করা এই বিভাগের একটা বড় কাজ। এ পর্যায়ে বহু নিয়ম-কানুন রয়েছে, ফিকাহবিদগণ নবী করীম (স) এর হাদীস থেকে তা ইস্তেম্বাত করে প্রকাশ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য থেকে আমরা এখানে কতিপয় শর্ত ও নিয়ম কানুনের উল্লেখ করছিঃ
ক. ফকীর মিসকীনের অংশ পাওয়ার জন্যে সর্বপ্রথম শর্ত এই যে, তার নিজের কোন মাল বা উপার্জন এমন থাকবে না যাদ্বারা তার ও তার পরিবারবর্গের প্রয়োজন যথেষ্ট মাত্রায় পূরণ হতে পারে। উপার্জনে একেবারেই ও আসলেই অক্ষম হওয়া শর্ত নয়। যেসব উপার্জনক্ষম লোক কাজ পাচ্ছে না, বেকারত্ব ভুগছে, তাদের জন্যও যাকাতের মাল সম্পূর্ণ হালাল। এরূপ অবস্থায় সেও অক্ষম বিবেচিত হবে। আর যে লোক উপার্জন করে, কিন্তু সে উপার্জন প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়, সে তার প্রয়োজন যথেষ্ট মাত্রায় পূরণের জন্য যাকাত গ্রহণ করতে পারবে।
খ. ব্যক্তির অবস্থা ও সামাজিক বা বংশীয় মর্যাদার সাথে সংগতি সম্পন্ন পরিমাণ উপার্জনই গণ্য হবে। যার উপার্জন এরূপ নয়, কিছুই নেইর মধ্যে গণ্য হবে। আলিম, কবি, সাহিত্যিক, লেখক প্রভৃতি যারা দৈহিক পরিশ্রমে অভ্যস্ত নয়, তারা ফকীর-মিসকীনের অংশ থেকে গ্রহণ করতে পারে, যদ্দিন না তারা উপযোগী কোন উপার্জন উপায় পাচ্ছে।
গ. উপার্জনক্ষম হওয়া সত্ত্বেও ইলম অর্জনে ব্যস্ত হওয়ার দারুন প্রয়োজন পূরণ করতে পারছে না, কেননা আত্মনিয়োগ করলে তার ইলম হাসিল করা হয় না, তার জন্যেও যাকাত হালাল হবে। যেলোক প্রকৃতই ইলম অর্জনে নিয়োজিত, তার জন্যেই এ কথা প্রযোজ্য। কেননা তার অর্জিত ইলম দ্বারা গোটা মুসলিম সমাজ উপকৃত হবে বলে আশা করা যায়। কিন্তু যেলোক প্রকৃতই ইলম হাসিল করছে না, করার যোগ্যতা নেই, অথচ উপার্জন করার ক্ষমতা আছে, তার পক্ষে যাকাত গ্রহণ হালাল নয়, যদিও যে কোন মাদ্রাসায় শিক্ষর্থী হিসেবে অবস্থান করছে।
ঘ. যার কোন চাষযোগ্য জমি থাকবে, কিন্তু তার আমদানী যথেষ্ট পরিমাণ হয় না, সে ফকীর বা মিসকীন গণ্য হবে এবং যাকাত থেকে তার প্রয়োজন যথেষ্ট মাত্রায় পূরণ করে দেয়া যাবে। তাকে সেই জমি বিক্রয় করে দিতে বাধ্যকরা যাবে না- শিক্ষার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিকেও বাধ্য করা যাবে না তার বই পুস্তক বিক্রয় করে দিতে। কেননা বই-পুস্তক তো তোর জন্যে অপরিহার্য অন্য লোকের তুলনায়।
চ. কোন ব্যক্তির যাকাতের মাল চিহ্নিত হওয়ার পর সে যদি দাবি করে যে সে ফকীর হয়ে গেছে, তাহলে তার দারিদ্র্য প্রমাণ না করা পর্যন্ত সে মাল তার কাছে থেকে গ্রহণ করা যাবেনা। কেননা ধনাঢ্যতা প্রমাণিত হওয়ার পর তার দারিদ্র্য প্রমাণ না করা পর্যন্ত তার দাবি মেনে নেয়া যায় না। যেমন কারুর যাকাতের মাল চিহ্নিত হওয়ার পর কারুর দেয় ঋণ তার ওপর সাব্যস্ত হলে, এক্ষণে যেস স্বীয় অভাব ও আর্থিক সংকটের কথা পেশ করল, তখনও তাই করতে হবে।
ছ. যার মাল চিহ্নিত করা হয়নি, সে যদি স্বীয় দারিদ্র্য ও অনটনের কথা প্রকাশ করে, তাহলে তার কথা মেনে নিতে হবে। এতে কোন মতদ্বৈততা নেই। কেননা দারিদ্র্য একটা প্রচ্ছন্ন ব্যাপার। কোন দলীল দিয়ে তা প্রমাণ করা সহজ নয়।
জ. কেউ দাবি করলে যে, তার কোন উপার্জন নেই- সে বেকার, তার বাহ্যিক অবস্থা দেখে যদি তাই মনে হয়- যেমন থুরথুরে বুড়ো কিংবা স্বাস্থ্যহীন কর্মক্ষমতাহীন যুবক তা হলে কোনরূপ কিড়া কসম ছাড়াই তার দাবি মেনে নিতে হবে। কেননা বাহ্যত এবং কার্যত তার কোন উপার্জন নেই।
শক্তিশালী যুবকও যদি স্বীয় দারিদ্র্যর কথা বলে, তাহলে তার কথাও গ্রহণ করা হবে; কিন্তু তাকে কিড়া-কসম করতে বলতে হবে কিনা, এ পর্যায়ে দুটো কথা রয়েছেঃ
শাফেয়ী এবং এ মতের অন্যান্য লোকদের কথা হচ্ছে, কিড়া করতে বলা যাবে না। ইমাম আহমাদ, আবূ দাউদ ও নাসায়ী বর্ণনা করেছেন, দুই ব্যক্তি এসে রাসূলে করীম (স) এর কাছে যাকাত চাইল। নবী করীম (স) চোখ তুলে তাদের দেখলেন ও চোখ নিচু করে নিলেন। তিনি দেখলেন, দুজনই বেশ স্বস্থ্যবান। তখন বললেনঃ তোমরা চাইলে আমি দেব। তবে কথা হচ্ছে, কোন ধনী সচ্ছল ব্যক্তির জন্যে এটা প্রাপ্য নয়, শক্তিসম্পন্ন উপার্জনক্ষমের জন্যেও নয়।
এ হাদীস অনুযায়ী নবী করীম (স) এর সুন্নাত অনুসরণার্থে যাকাত বণ্টনকারীর কর্তব্য প্রত্যেক শক্তিসম্পন্ন দরিদ্র ব্যক্তিকে যাকাতের অংশ দেয়ার সময় এরূপ নসীহত করা। এটা মূর্খকে শিক্ষাদান এবং অসতর্ককে সতর্ককরণ।
ঝ. ফকীর বা মিসকীন যদি দাবি করে যে, তার সন্তানাদি রয়েছে এবং তাদের সকলের জন্যে প্রয়োজনীয় পরিমাণ দরকার, তাহলে দলীল-প্রমাণ ছাড়া তার সন্তানাদির কথা মেনে নেয়া যাবে না। কেননা সাধারণত সন্তানাদি না থাকার কথা আর থাকলে তা প্রমাণ করাও কঠিন নয়।
ঞ. কেউ নিজেকে ঋণগ্রস্ত হওয়ার দাবি করলে প্রমাণ ছাড়া তা মেনে নেয়া যাবে না।
ট. এসব ক্ষেত্রে বিচারকের দালীল শ্রবণ করা এবং দাবি দায়ের করা অস্বীকার করা ও সাক্ষ্য জানানোই যথেষ্ট নয়। বরং দুজন ন্যয়বাদী সত্যবাদী চরিত্রবান বিশ্বস্ত ব্যক্তির সাক্ষ্যদান অবশ্যক। সাক্ষীদ্বয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দাবির সত্যতার পক্ষে বা বিপক্ষে সাক্ষ্য দান করবে। জনশ্রুতি বা জনগণের মধ্যে ব্যাপক-বিস্তৃতি দলীল প্রমাণের স্থলাভিষিক্ত। কেননা যতটা জানা দরকার, তা এভাবে হয়ে যায়। স্পষ্ট ধারণা করতেও কোন অসুবিধা হয় না। এমন কি কেউ কেউ এদ্দুর বলেছেন, একজন লোকও যদি প্রকৃত অবস্থা জানাতে পারে, তাবে তাই যথেষ্ট হবে। [এই সমস্ত আলোচনা ইমাম নববী রচিত (আরবী*****) থেকে গৃহীত।]
ভিক্ষা চাওয়া কার জন্যে জায়েয, সে বিষয়ে বিভিন্ন হাদীসে বলা হয়েছে। একটি হাদীসের কথাঃ ‘যে ব্যক্তি অনশন জর্জরিত।’ তার আশপাশের জানে-শুনে- এমন অন্তত তিনজন লোক বলবেঃ হ্যাঁ লোকটি সত্যই অনশনে রয়েছে। এরূপ ব্যক্তির পক্ষে ভিক্ষঅ করা জায়েয। ইমাম খাত্তাবী বলেছেনঃ এ হাদীসটির প্রয়োগ হবে সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রে, যার মালিকানা প্রমাণিত এবং বাহ্যিক সচ্ছলতা সুপরিচিত, সে যদি দাবি করে যে, তার ধন-মাল ধ্বংস হয়ে গেছে চোর-ডাকাতের লুণ্ঠনে, অথবা আমানতদারের বিশ্বাসঘাতকতার দরুন অথবা এ ধরনের এমন কোন ঘটনার ফলে যার পর্যবেক্ষনীয় কোন চিহ্ন থাকে না; কিন্তু তা সত্ত্বেও এ দাবির সভ্যতা সম্পর্কে যদি সন্দেহের সৃষ্টি হয়, তা হলে তার অবস্থা সুস্পষ্ট হওয়া ও তার সত্যতা প্রমাণিত হওয়ার পূর্বে তাকে যাকাত থেকে কিছুই দেয়া যাবে না। সেজন্যে প্রয়োজন হলে তার সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ লোকদের নিকট জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। ঠিক এ কথাই হাদীসের শেষে বল হয়েছে এই ভাষায়ঃ যতক্ষণ না তার আশপাশের জানে-শুনে এমন অন্তত তিনজন লোক তার দুরবস্থা সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে……। জানাশোনা লোক হওয়ার শর্ত হয়েছে এজন্যে যে, যারা জানে না, বুঝে না তাদের কথার কোন মূল্য নেই। ব্যাপারসমূহের অন্তর্নিহিত প্রকৃত অবস্থা অনুধাবন তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। এ ব্যাপারটি সাক্ষ্য দানের ব্যাপার নয়, প্রমাণ করা ও পরিচিতি লাভের ব্যাপার। তাই তার প্রতিবেশী বা স্বজাতীয় স্ব-সমাজী জানে-শুনে এমন তিনজন লোক তার অবস্থা সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে। বলবে যে, তার দাবি সত্য, তাহলে তাকে যাকাত দেয়া যাবে। [(আরবী**********)]

About শিবির অনলাইন লাইব্রেরী