ইসলামের যাকাত বিধান – ২য় খন্ড

সামাজিক নিরাপত্তার এক দৃষ্টান্তহীন ব্যবস্থা
ইসলাম বিদেশী অপরিচিতির মধ্যে নিঃস্ব হয়ে পড়া মুসাফিরদের ব্যাপারে যে গুরুত্ব আরোপ করেছে তা সমাজ-ব্যবস্থার ইতিহাসে দৃষ্টান্তহীন। এ দুনিয়ার অপর কোন মতবাদ, সমাজ-ব্যবস্থা বা কোন বিধানই এরূপ কোন ব্যবস্থার দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত করতে পারেনি। আর আসলে এটা এক ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা- এ পর্যায়ের একক ও অন্যান্য ব্যবস্থা। কোন দেশে বসবাসকারী লোকদের স্থায়ী প্রয়োজন ও অভাব-অনটন দূর করার ব্যবস্থা করেই ইসলাম ক্ষান্ত হয়নি। বরং ভ্রমণ ও বিদেশ গমন ইত্যাদি ক্ষেত্রে ও কার্যকারণে মানুষ যেসব অভাব ও নিঃস্বতার সম্মুখীন হয়, তার জন্যেও সুষ্ঠু ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে ইসলামের এই অবদান সেই কালে- যখন পথে-ঘাটে শহরে-বন্দরে, হোটেল-মুসাফিরখানা, বিশ্রামাগার বা হোটেল-রেস্তোঁরা একালের মত কোথাও ছিল না।
কার্যতও আমরা দেখতে পাচ্ছি, ইবনে সায়াদ বর্ণনা করেছেন, হযরত উমর ইবনুল খাত্বা (রা) তাঁর খিলাফত আমলে একটা ঘর নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন এবং তার ওপর লিখে দিয়েছিলেন ‘দারুদ্দাকীক’-ময়দার ঘর। তার কারণ সেই ঘরে ময়দা, আটা, খেজুর, পানি ও অন্যান্য দরকারী দ্রব্য সংগ্রহ করে রেখেচিলেন। যেসব নিঃস্ব পথিক ও অতিথি তাঁর নিকট আসত সেসব দিয়ে তাদের সাহায্য করা হত। অনুরূপভাবে মক্কা ও মদীনার দীর্ঘ পথের মাঝেও হযরত উমর অনুরূপ ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। নিঃস্ব লোকেরা এখান থেকে যথেষ্ট উপকৃতহত এবং একটা স্থান থেকে পানি নিয়ে পরবর্তী স্থানে পৌঁছতে পারত। [(আরবী *********)]
পঞ্চম খলীফায়ে রাশেদ হযরত উমর ইবনে আবদুল আজীজের সময়কার ব্যবস্থা সম্পর্কে আবূ উবাইদ বর্ণনা করেছেন, তিনি ইমাম ইবনে শিহাব জুহ্রীকে যাকাত-সাদকা সংক্রান্ত রাসূলে করীমের বা খুলাফায়ে রাশেদুনের যেসব সুন্নাত বা হাদীস মুখস্ত আছে তা তাঁর জন্যে লিখে পাঠাবার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ফলে তিনি একখানি দীর্ঘ লিপি লিখে পাঁঠিয়েছিলেন। তাতে প্রত্যেকটি অংশ আলাদা আলাদা বিভক্ত করে দিয়েছিলেন। এই লিপিখানিতে ‘ইবনুস-সাবীল’ পর্যায়ে এই কথাটি উদ্ধৃত হয়েছে: ইবনুসসাবীল-এর অংশ প্রত্যেক রাস্তায় চলাচলকারী লোকদের সংখ্যানুপাতে বিভক্ত করে হবে, যে কোন নিঃস্ব পথিক- যার কোন আশ্রয় নেই, আশ্রয় দেয়ার মত কোন পরিবারও নেই- তাকে খাওয়অতে হবে যতক্ষণ না সে তেমন একটা আশ্রয়স্থল পেয়ে যায় বা তার প্রয়োজন পূর্ণ হয়। প্রত্যেকটি পরিচিত বাড়ি-ঘর নির্ভরযোগ্য লোকের হাতে ন্যস্ত করতে হবে। যেন যে কোন নিঃস্ব পথিক সেখানে উপস্থিত হতে পারবে এবং তাকে আশ্রয়ও দেবে এবং খাবার দেবে। তার সঙ্গে বাহন জন্তু থাকলে তার খাবারের ব্যবস্থাও করবে- যতক্ষণ তাদের নিকট রক্ষিত দ্রব্যাদি নিঃশেষ হয়ে না যায়। ইনশাআল্লাহ্। [(আরবী *********)]
অভাবগ্রস্ত ও বিপন্ন পথিকের জন্যে এরূপ ব্যবস্থা বিশ্বমানব কোথাও দেখেছে কি?…. ইসলামী ব্যবস্থা ছাড়া আর কোন ব্যবস্থায় এরূপ নিরাপত্তা কোথাও পাওয়া যায় কি? মুসলিম উম্মত ছাড়া দুনিয়ার অপর কোন উম্মতম এরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সমর্থ হয়েছে কি?
সফর শুরুকারী ও সফর সমাপ্তকারী
এখানে একটি বিষয় ফিকাহ্বিদদের মধ্যে মতবিরোধের কারণ ঘটিয়েছে। প্রশ্নটি হচ্ছে, যে মুসাফির পথ অতিক্রম করে গেছে লক্ষ্যহীনভাবে, তাকে ‘ইবনুস সাবীল’ বলা হবে, না সে সহ সেই মুসাফিরও তার মধ্যে শামিল হবে যে দেশে বা শহরের দিকে যাত্রা শুরু করতে চাইছে।
জমহুর ফিকাহ্বিদদের বক্তব্য
সফর সূচনাকারী ব্যক্তি ‘ইবনুস সাবীল’ পর্যায়ে গণ্য হওয়ার অধিকারী হবে না। তা এজন্যে:
(ক) কেননা ‘সাবীল’ মানে পথ। আর ‘ইবনুস-সাবীল’ হচ্ছে সেই পথিক যে পথে চলমান রয়েছে। যেমন ‘ইবনুল লাইল’ বলা হয় সে লোককে যে রাত্রিবেলা বাইরে খুব বেশি যাতায়াত করে। নিজ শহরে বা ঘরে অবস্থানকারী তো আর পথে পড়ে নেই। তাই ‘পথিক’ বলতে যা বোঝায় তা তাকে বলা যাবে না। কাজেই যে-লোক শুধু সংকল্প করেছে, কার্যত পথে এখনও নামেনি, তাকে ‘পথিক’ সংক্রান্ত গুণে গুণান্বিত বা সেই পরিচয়ের অধিকারী বলা যায় না।
(খ) ‘ইবনুস সাবীল’ বলতে ‘বিদেশী’ লোকই বোঝায়। যে লোক নিজের দেশে নিজের ঘরে রয়েছে, তাকে তা বলা চলে না। তার যত প্রয়োজন বা অভাবই দেখা দিক না কেন। [***১]
তাই জমহুর ফিকাহ্বিদদের মতে আয়অতে উল্লিখিত ‘ইবনুস-সাবীল’ বলে কেবলমাত্র ‘বিদেশী লোক’ই বোঝা যেতে পারে, অন্যকে নয়। সে লোকের নিজের দেশে সম্পদ সংগতি থাকা সত্ত্বেও তাকে যাকাতের অংশ দেয়া হবে এজন্যে যে, সে তার নিজের সম্পদ ব্যবহার করতে পারছে না, তা থেকে উপকৃত হতে পারছে না বিদেশে পড়ে আছে বলে। এক্ষণে সে নিঃস্ব ফকীরবত। আর ‘পথিক’ নিজ দেশে গরীব হলেও তাকে তা দেয়া হবে দুটি কারণে। একে তো সে দরিদ্র, দ্বিতীয় সে বিদেশে নিঃস্ব অবস্থায় রয়েছে। ‘নিস্ব পথিক’ হিসেবে তাকে দেয়া হবে তার বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছার প্রয়োজনীয় সম্বল। আর তার এই প্রয়োজনের দৃষ্টিতে তাকে খরচ বাবদ দেয়া হবে তার প্রয়োজন পরিমাণ।
‘ইবনুস-সাবীল’ পর্যায়ে ইমাম শাফেয়ীর বক্তব্য
যে অপরিচিত ব্যক্তি- পথ অতিক্রমকারী কিংবা সফর সূচনাকারী উভয়ই অর্থাৎ যে লোক সফর করার ইচ্ছা করেছে; কিন্তু সম্বল পাচ্ছে না। এই দুই ধরনের লোককেই তাদের প্রয়োজন মত দেয়া হবে- তাদের যাওয়ার জন্যে ও প্রত্যাবর্তনের জন্যে। কেননা পথে চলার সংকল্পকারী সফরের ইচ্ছা করেছে, কোন পাপ কাজের নয়। ফলে সে পথ অতিক্রমকারীর পর্যায়ভুক্ত। কেননা এই দুই লোকই সফর সম্বলের মুখাপেক্ষী, যদিও দ্বিতীয় ব্যক্তিকে ইবনুস সাবীল বলা হবে পরোক্ষ অর্থে। [দেখুন: (আরবী *********)]
এই গ্রন্থকারের বিবেচনা
প্রথমোক্ত মতটির আয়াত উদ্ধৃত ‘ইবনুস-সাবীল’-এর সাথে অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ। শরীয়াতের লক্ষ্যের দিক দিয়েও অধিক নিকটবর্তী। তার ওপর কিয়াস করা হয়েছে সফরে আগ্রহী বা সংকল্পকারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে। তাকেও যাকাতের মাল থেকে দেয়া যাবে, যদিও সে তার সফর দ্বারা বিশেষ কোন ফায়দা লাভ করার ইচ্ছা করেছে। হতে পারে সে জীবিকা অর্জনের কোন উপায় তালাশ করেছে কিংবা মনের আনন্দস্ফূর্তি লাভের উদ্দেশ্যে বিদেশে যাওয়ার সংকল্প করেছে।
তবে ইমাম শাফেয়ীর অভিমত- আমি মনে করি- গ্রহণ করা যেতে পারে তাদের ক্ষেত্রে, যারা এমন কোন সাধারণ কল্যাণের উদ্দেশ্যে সফর করে, যার কল্যাণটা দ্বীন-ইসলামকিংবা মুসলিমসমাজ পেয়ে যায়। যেমন কেউ সফর করে কোন শিক্ষা সংক্রান্ত প্রতিনিধিত্বে বা মুসলিম দেশের জন্যে প্রয়োজনীয় কোন কাজের জন্যে। এমন কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারের জন্যেও এ সফর হতে পারে যা দ্বীন-ইসলাম ও মুসলিম সমাজের জন্য উপকারী সাধারণভাবে।তবে তাতে অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত লোকদের মতামতকে গ্রাহ্য করতে হবে।
এ ধরনের সফরকারী কার্যত ‘ইবনুস-সাবীল’ না হলেও সে ‘ইবনুস সাবীল’ হবে তার সংকল্পের দৃষ্টিতে। আর যা কাছাকাছি ও নিকটবর্তী তা সেই আসলেজিনিসের মর্যাদা পেয়ে থাকে। এই লোককে কোন সাহায্যদান জাতি ও উম্মতের জন্যে সাধারণ কল্যাণে দানের সমান। ফলে তা ‘ফী-সাবীলিল্লাহ’ দেয়ার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। পারস্পরিক সম্পর্ক সংশোধন বা উন্নতকরণের উদ্দেশ্যে যারা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে তাদেরকে যাকাত দেয়ার মতই এই দান। তাই এরূপ দান শরীয়াতের অকাট্য স্পষ্ট দলিলের ভিত্তিতে সমর্থনীয় না হলেও কিয়াসের ভিত্তিতে সমর্থনীয়।
এই বক্তব্যের সমর্থনে বলা যায়, উক্ত আয়াতে ‘ইবনুস সাবীল’ বাক্যটি এসেছে ফী-সাবীলিল্লাহ-এর পর। যেন বলা হয়েছে: ‘আল্লাহ্র পথে ও পথ সন্ধানে’।
পূর্বে উল্লেখ করেছি, এই আয়াতটিতে কতিপয় ব্যয়ক্ষেত্রকে (***) অক্ষরের পর উল্লেখ করায় এ সুবিধাটাকু পাওয়া গেছে যে, এটা এমন কল্যাণকর কাজ যাতে যাকাত দেয়া যাবে, এক ব্যক্তিকে দেয়ার পূর্বে। এমন কি এদের কোন একজন যদি যাকাতের অংশ নিয়ে নেয় তবে সে তা নেবে তার পরিচিতি সহকারে শরীয়াত যে সাধারণ কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করতে চেয়েছে সেই সাধারণ কল্যাণের জন্যেই।
এই কারণে এ চারটি ক্ষেত্রে কাউকে যাকাতের সম্পদের মালিক বানিয়ে দেয়ার শর্ত করা হয়নি- দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহ্র পথে ও পথ-পুত্র’ এর ক্ষেত্রে। এটাই নির্ভুল মত। উপরিউক্ত কথার ভিত্তিতে ‘ইবনুস সাবীল, (পথ-পুত্র) সাধারণ কল্যাণের প্রতিভূ। সে নিজের প্রতিনিধিত্ব করছে না। তাই সঠিক পন্থা হচ্ছে, সে নিজ হাতে যাকাতের সেই অংশ গ্রহণ না করে তার জন্যে ব্যয়কারী কোন প্রতিষ্ঠান তা নিয়ে নেবে।
হাম্বলী মাযহাবের লোকেরা প্রথমোক্ত মতের সমর্থনকারী। তাঁরা বলেছেন, ‘ইবনুস সাবীল’ যদি তার নিজের গ্রাম বা শহরে যাওয়ার পরিবর্তে অনত্র যেতে চায়, তাহলে তাকে সেখানে যাওয়ার ও সেখান থেকে নিজের ঘরে পৌঁছার জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ সম্বল দিতে হবে, কেননা এটা বৈধ সফরের জন্যে সাহায্য, সঠিক উদ্দেশ্য লাভই এই সফরের লক্ষ্য। তবে সফরটা শরীয়াতসম্মত হতে হবে। হয় আল্লাহ্র নৈকট্য লাভমূলক হবে, যেমন হজ্জ, জিহাদ ও পিতামার সাথে সাক্ষাৎ, অথবা হবে মুবাহ সফর, যেমন জীবিকার সন্ধান, ব্যবসায়ের সুযোগ-সুবিধার অনুসন্ধান। আর সফরটা যদি প্রমোদ বিহার (Excursion- Pleasure trip) হয়, তাহলে তাতে দুটো পন্থা হতে পারে: একটি, তাকে দেয়া হবে। কেননা তার এই সফর কোন পাপ কাজের জন্যে নয়। আর দ্বিতীয় হচ্ছে, তাকে দেয়া যাবে না। কেননা তার জন্যে এই সফর কোন প্রয়োজনীয় বা আবশ্যকীয় ব্যাপর নয়। [দেখুন: (আরবী ***********)]
পথ অতিক্রমকারী মুসাফিরকে যাকাত দান- তার লক্ষ্যে উপনীত হতে পারে তার জন্যে, এটা তার উদ্দেশ্য লাভের জন্যে সাহায্য বিশেষ। তার জীবিকার সন্ধানে হলে- বরঞ্চ প্রমোদ বিহার হলেও তাকে যাকাতের অংশ দেয়াই উত্তম। কেননা ইসলাম বা মুসলিমের জন্যে কোন যথার্থ উদ্দেশ্যসফর করার মূলে যে কারণ নিহিত থাকতে পারে, এক্ষেত্রেও তা রয়েছে।
‘ইবনুস সাবীল’কে যাকাত দেয়ার শর্ত
‘ইবনুস-সাবীল’- ‘পথ-পুত্র’কে যাকাতের অংশ দেয়ার ব্যাপারে কতিপয় শর্ত আরোপ করা হয়েছে। কয়েকটি শর্ত সর্বসম্মত এবং কয়েকটি শর্তের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে।
প্রথম শর্ত, ‘পথ-পুত্র’ যে স্থানে রয়েছে, সেখানেই তাকে অভাবগ্রস্ত হতে হবে তার স্বদেশ পৌঁছার সম্বলের জন্যে। তার নিকট সেই সম্বল থেকে থাকলে তাকে যাকাতের অংশ থেকে দেয়া যাবে না। কেননা তার তো কাজ হল তার নিজের ঘরে পৌঁছা। মুজাহিদের অবস্থা ভিন্নতর। সে যাকাতের অংশ নিতে পারবে- অ-হানাফীদের মতও এই- যদিও সে তার নিজের অবস্থান স্থানে ধনশালী ব্যক্তি। কেননাতাকে তা দেয়া হবে শত্রুদের ভীত ও বিতাড়িত করার লক্ষ্যে। আর জিহাদকারীকে যাকাত দেয়যা হবে আল্লাহ্র দুশমনদের মুকাবিলায় তাকে সাহসী শক্তিমান করে তোলার উদ্দেশ্যে।
দ্বিতীয, তার সফর পাপমুক্ত হতে হবে। তার সফর যদি কোন পাপ কাজের লক্ষ্যে হয়- যেমন কাউকে হত্যা করা বা হারাম ব্যবসায়ের জন্যে প্রভৃতি- তা হলে তাকে যাকাতের অংশদেয়া যাবে না একবিন্দুও। কেননা তাকে দেয়ার অর্থ তার সেই পাপ কাজে তাকে সহায়তা করা। কিন্তু মুসলমানদের ধন-মাল দিয়ে আল্লাহ্র নাফরমানীর কাজে সহায়তা করা যেতে পারে না। তবে সে যদি খালেসভাবেতওবা করে, তবেতার অবশিষ্ট সফরের খরচ বাবদ দেয়া যাবে। তার যদি অভাববে মরে যাওয়ার আশংকা দেখা দেয় তাহলে তওবা না করলেও তাকে দেয়া যাবে। কেননা পাপ করলে সে করবে, তাকে মারার জন্যে ছেড়ে দিয়ে সমাজ তো পাপ করতে পারে না। [দেখুন: (আরবী ***********) মালিকী মতের কেউ কেউ বলেছেন, তার মৃত্যুর আশংকা হলেও তাকে দেয়া যাবে না। কেননা তার মুক্তি তার নিজের হাতেই রয়েছে, সে সহজেই তওবা করতে পারে। দেখুন : (আরবী ***********) অন্যরা বলেছেন, পাপটা কি ধরনের তা দেখতে হবে। নর হত্যার বা কারুর ইজ্জত নষ্ট করার ইচ্ছা থাকলে দেয়া যাবে না, তওবা করলে দেয়া যাবে।]
আর যে সফরে কোন গুনাহ নেই সে সফর কোন ইবাদতের জন্যেহতে পারে, হতে পারে কোন প্রয়োজনের জন্যে বা প্রমোদবিহারও হতে পারে। ইবাদতের সফর যেমন হজ্জ, জিহাদ ও কল্যাণকর ইল্ম সন্ধান এবং জায়েয যিয়ারতের সফর ইতাদি, সে সব পথিককে যাকাত দানে কোন মতভেদ নেই। কেননাইবাদতের কাজে সাহয্য তো শরীয়াতের কাম্য। বৈষয়িক প্রয়োজনের সফরও হতে পারে- যেমন ব্যবসা, জীবিকা সন্ধান প্রভৃতির উদ্দেশ্যে বিদেশ গমন। যারা বলেন যে, ‘ইবনুস সাবীল’ হচ্ছে সেইলোক, যে তার নিজের ঘর-বাড়ি ও ধন-মাল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, তাদের মতে সে পথিককে যাকাত দেয়া যাবে। কেননা এ হচ্ছে বৈধ বৈষয়িক প্রয়োজনের কাজে সাহায্য দান। সটিক লক্ষ্য অর্জনের জন্যে সাহায্য।
যে শাফেয়ী ফিকাহ্বিদ নিজ ঘর থেকে রওয়ানাকারীকেও ‘ইবনুস-সাবীল’ মনে করেন, উক্ত ব্যাপারে তাদের দুটি কথা:
একটি, দেয়া যাবে না। কেননা এ সফরে তার কোন প্রয়োজন নেই।
দ্বিতীয, দেয়া যাবে। কেননা শরীয়াত সে সফরের রুখসাত বা অনুমতি দিয়েছে তাতে ইবাদতের সফর ও মুবাহ সফরের মধ্যে কোন পার্থক্য করা হয়নি। যেমন নামায ‘কসর’ পড়া যাবে, রোযা ভাংগা যাবে উভয়বিধ সফরেই। এ অত্যন্ত সহীহ কথা।
আনন্দ ও বিনোদনের সফর পর্যায়ে খুব বেশি মতভেদের সৃষ্টি হয়েছে বিশেষ করে শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের লোকদের মধ্যে।
তাঁদের কেউ কেউ বলেছেন, দেয়া যাবে।
তাঁদের কেউ কেউ বলেছেন, দেয়া যাবে। কেননা এ সফর পাপমুক্ত। অপররা বলেছেন, দেয়া যাবে না। কেননা এ সফরের প্রকৃত কোন প্রয়োজন নেই। বরং এ এক প্রকারের বেহুদা অর্থব্যয়। [দেখুন: (আরবী ***********)]
তৃতীয়, সে যদি ঋণ বা অগ্রিম হিসেবে পাওয়ারও কোন উপায় না পায়- তাকে দেয়ার মত কোন লোকই না পাওয়া যায় সেই স্থানে, যেখানে সে রয়েছে তাহলে তাকে যাকাত থেকে দেয়া যাবে। এই কথা সে লোক সম্পর্কে যারনিজের ঘরে ধন-মাল রয়েছে, ঋণ শোধ করার সামর্থ্যও আছে।; [এই জন্য দেখুন: (আরবী ***********)]
এই শর্তটি মালিকী ও শাফেয়ী মাযহাবের কেউ কেউ আরোপ করেছেন যদিও এ মাযহাবেরই অপর লোকেরা এর বিরোধিতা করেছেন।
ইবনুল আরাবী তাঁর আহকামুল কুরআন’ গ্রন্থে এবং কুরতুবী তাঁর তাফসীরে অগ্রাধিকার দিয়েছেন এ মতকে যে, ‘ইবনুস-সাবীল’কে যাকাত থেকে দেয়া যাবে, অগ্রিম দেয়ার মত কোন লোক পাওয়া গেলেও।তাঁরা দুজনই বলেছৈন, কারোর ব্যক্তিগত অনুগ্রহের বশবর্তী হওয়ার কোন আবশ্যকতা নেই। আল্লাহ্র অনুগ্রহ নিয়ামতও তো পাওয়া গিয়েছে। [(আরবী *********)] তা-ই যথেষ্ট।
ইমাম নববী বলেছেন, ‘ইবনুস সাবীল’ যদি এমন লোক পেয়ে যায়, যে তাকে লক্ষ্যস্থলে পৌঁছার জন্যে প্রয়োজন পরিমাণ সম্পদ ঋণ বাবদ দেবে, তবু তার পক্ষে ঋণ করা জরুরী নয়। বরং তার জন্যে যাকাত ব্যয় করা সম্পূর্ণ জায়েয। [(আরবী ********)]
হানাফী আলিমগণের বক্তব্য হচ্ছে, পারলে ঋণ নেয়াই তার পক্ষে উত্তম।তবে তা করা কর্তব্য নয়। কেননা হতে পারে সে ঋণ আদায় করতে অক্ষম হয়ে পড়বে। [দেখুন: (আরবী ***********)]
ইবনুল আরাবী ও কুরতুবী যে কারণে উল্লেখ করেছেন, তার সাথে সংযোজিত এ হচ্ছে অপর একটি কারণ। এই দুই ‘ইল্লাত’ বা কারণ ইবনুস সাবীলের জন্যে ঋণ গ্রহণ করার বাধ্যতা আরোপ করতে নিষেধ করে:
প্রথম, ঋণ গ্রহণ করায় লোকদের অণুগ্রহ স্বীকার করতে হয়। কিন্তু আল্লাহ তা করার জন্যে চাপ দেন নি।
দ্বিতীয়, ঋণ ফেরত দিতে অক্ষম হওয়া সম্ভব। আর তা হলে সেটা তার পক্ষেও যেমন ক্ষতিকর, তেমনি ক্ষতিকর ঋণদাতার জন্যেও।
‘ইবনুস-সাবীল’কে কত দেয়া হবে
ক. ‘ইবনুস-সাবীল’কে খোরাক-পোশাকের ব্যয় এবং লক্ষ্যস্থল পর্যন্ত পৌঁছার জন্যে যা প্রয়োজন অথবা তার ধন-মাল পথিমধ্যে কোথাও থাকলেতা যেখানে রয়েছে, সে পর্যন্ত পৌঁছার খরচ দিতে হবে।এ ব্যবস্থা তখনকার জন্যে, যখন পথিকের সঙ্গে আদৌ কোন ধন-মাল থাকবে না। আর যদি এমন পরিমাণ মাল তার সঙ্গে থাকে যা যথেষ্ট নয়, তা হলে প্রয়োজনীয় পরিমাণ দিতে হবে।
খ. সফর দীর্ঘ পথের হলে তার জন্যে যানবাহনের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। দীর্ঘ সফরের পরিমাণ হচ্ছে যে পথে চললে নামায ‘কসর’ করা চলে তা। প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ। অথবা পথিক দুর্বল- পথ চলতে অক্ষম হলে সে দৃষ্টিতেও পথের দৈর্ঘ্য নিরূপণ করা যায়। আর পথিক যদি সক্ষম ব্যক্তি হয় এবং তার সফর নামায ‘কসর’ করার পরিমাণ দীর্ঘ পথের না হয় তাহলে যানবাহনের ব্যবস্থা করা হবে না। তবে তার সঙ্গের জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা যাবে। কিন্তু সে জিনিসপত্র যদি সে নিজেই বহন করে নিতে সক্ষমহয় তাহলেতা বহনের ব্যবস্থা করারও প্রয়োজন হবে না।
ফিকাহ্বিদগণ বলেছেন, যানবাহনের ব্যবস্থা করাবলতে বোঝায়, সম্পদ বিপুল থাকলে তা দিয়ে একটা যান ক্রয় করা। আর কম হলে ভাড়ায় নেয়া হবে। তাঁরা একথা বলেছেন এজন্যে যে, সেকালে যানবাহনরূপে সাধারণ জন্তু-জানোয়ারই ব্যবহৃত হত। এজন্যেই তা ক্রয় করতে বা ভাড়ায় নিতে বলা হয়েছে। কিন্তু আজকেরদিনে যানবাহনের অনেক বিবর্তন ও উন্নতি সাধিত হয়েছে। মোটর গাড়ি, রেল গাড়ি, জাহাজ, লঞ্চ, উড়োজাহাজ ইত্যাদি কত রকমেরই না যানবাহন একালে পাওয়া যায়! এগুলো ক্রয় করার কোন উপায় নেই, প্রয়োজনও নেই্ মোটকথা অবস্থা অনুপাতে সহজলভ্য কোন যানবাহনের ব্যবস্থা করে দিলেই হবে। যার পক্ষে রেল গাড়ি বা জাহাজ-লঞ্চ সহজ হবে, তার জন্যে উড়োজাহাজের ব্যবস্থা করা অনাবশ্যক। যেন যাকাতের মাল নির্দয়ভাবে ব্যয় করা না হয়। যা না হলে চলে না, শুধু তার ব্যবস্থাই তা দিয়ে করা যাবে।
গ. সফরের সব খরচই বহন করা যাবে। কেবল তা-ই শুধু নয়, যা সফরের দরুন অতিরিক্ত পড়ছে। এটাই সহীহ কথা।
ঘ. সফরকারী উপার্জনে সক্ষম হোক কি অক্ষম- উভয় অবস্থাতেই দেয়া যাবে।
ঙ. তার যাওয়ার ও ফিরে আসার জন্যে যে পরিমাণটা যথেষ্ট তা-ই দেয়া যাবে- যদি সে ফিরে আসার ইচ্ছা রাখে এবং সেখানে ধন-মাল কিছু পাওয়ার সুযোগ তার যদি না থেকে থাকে।
কোন কোন আলিম বলেছেন, তার সফরকালে ফিরে আসার জন্য কিছু দেয়া যাবে না, তা দেয়া যাবে যখন সে ফিরে আসবে তখন। আর কেউ কেউ বলেছেন, সে যদি যাওয়ার পরই ফিরে আসবার ইচ্ছা রাখে তাহলে ফিরে আসার জন্যেও দেয়া যাবে।আর সে যদি একটা সময় পর্যন্ত তথায় অবস্থান করার ইচ্ছা রাখে তাহলে ফিরে আসার জন্যে দেয়া যাবে না। কিন্তু প্রথমোক্ত মতটিই ঠিক।
চ. অবস্থান করার ইচ্ছা থাকলে তখন কি করা হবে এই পর্যায়ে শাফেয়ী আলিমগণ একটু বিস্তারিত করে বলেছেন। আর তা হচ্ছে, যদি চারদিনের কম সময় অবস্থান করার ইচ্ছা থাকে- যাওয়া ও আসার দিন ছাড়া তাহলে অবস্থানের ব্যয়ও বহন করা হবে। কেননা আসলেসে তখন সফরেই রয়েছে। এজন্যে সেরোযা ভাংতে পারে, নামায কসর করতে পারে, সফরের সব সুবিধাই সে ভোগ করতে পারে। কিন্তু যোদ্ধার ব্যাপার তা নয়। তার দূরদেশে অবস্থানকালীন খরচাদিও বহন করতে হবে, তা যত দীর্ঘই হোক। পার্থক্য হচ্ছে, যোদ্ধাকে তো বিজয়ের আশায় বসে থাকতে হয়। যোদ্ধা ‘গাযী’ এই নাম বা পরিচিতিটা তার অপরিবর্তিতই থাকে কোন স্থানে অবস্থান করলেও বরং তা আরও শক্ত হয়। কিন্তু সফরকারীর তা হয় না।
অন্যদের কেউ কেউ বলেছেন, ‘ইবনুস সাবীল’কেও দিতে হবে তার অবস্থানকালের জন্যেও তা যত দীর্ঘই হোক। অবশ্য সাফল্যের আশায় অবস্থান করার প্রয়োজন দেখা দিলে তবেই। [দেখুন: (আরবী ***********)]
ছ. ‘ইবনুস সাবীল’ যখন সফর থেকে ফিরে আসবে, তখন কিছু পরিমাণ সম্পদ উদ্বৃত্ত ও অবশিষ্ট থাকলে তা তার নিকট থেকে ফেরত নেয়া হবে কি হবে না এ একটা প্রশ্ন। ফিকাহ্বিদগণ এ বিষয়ে মতামত ব্যক্ত করেছেন।
এর জবাবে শাফেয়ীরা বলেছেন: হ্যাঁ, নেয়া হবে, সে নিজের ওপর কৃচ্ছতা গ্রহণ করে থাকুক কি না-ই থাকুক। অন্য মত হচ্ছে, যদি সে নিজের ওপর কৃচ্ছতা করে থাকে তবে এবং এই কারণেই যদি সম্বল উদ্বৃত্ত থেকে থাকে, তাহলে তা ফেরত নেয়া হবে না। কিন্তু যোদ্ধার জন্যে তা নয়। সে নিজের ওপর কৃচ্ছতা করে থাকলে তার নিকট থেকে ফেরত নেয়া হবে না। কেননা যোদ্ধা যা নেয়, তা বিনিময় হিসেবেই নেয়। আমরা তার মুখাপেক্ষী, সে যুদ্ধ করলেই আমরা রক্ষা পাই। আর তা সে করছে। পক্ষান্তরে ‘ইবনুস সাবীল’ নিজেই তার নিজের প্রয়োজনে সাহায্য গ্রহণ করে আর এই সাহায্য গ্রহণ করায় তার সে প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। [(আরবী ***********)] অতএব উদ্বৃত্তের ওপর তার কোন অধিকার থাকার কথা নয়।
এ যুগে ‘ইবনুস-সাবীল’ পাওয়া যায় কি
সমকালীন কোন কোন আলিম মনে করেছেন, আমাদের এ যুগে ‘ইবনুস-সাবীল’ ধরনের লোক দেখতে পাওয়া যায় না। কেননা এ কালের যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই উন্নাত, দ্রুত গতিবান এবং বিচিত্র ধরনের। মনে হচ্ছে, গোটা পৃথিবী যেন একটি শহরে পরিণত হয়েছে। তাছাড়া লোকদের উপায়-উপকরণও বিপুল, সহজলভ্য। দুনিয়ার যে কোন স্থানে বসে মানুষ স্বীয় ধন-মাল নিয়ন্ত্রিত করতে পারে ব্যাংকের মাধ্যমে, অন্যান্য উপায়ে। [দেখুন: (আরবী ***********) সূরা হাশর-এর ষষ্ঠ আয়াতের তাফসীরে এই মত লেখা হয়েছে।]
উপরিউক্ত কথা মরহুম শায়খ আহমাদ আল-মুস্তাফা আল-মারাগী তাঁর তাফসীরে উদ্বৃত্ত করেছেন। কিন্তু আমরা এই মতের বিপরীত কথা বলতে চাই। কেননা আমরা দেখতে পাচ্ছি, আমাদের এ যুগেও ‘ইবনুস্-সাবীল’ পাওয়া যায়- যে কোন শহর থেকে- যে কোন উপায়েই হোক ধন-মাল লাভ করা যেতে পারে বলে যতই দাবি করা হোক না কেন।
‘ইবনুস-সাবীল’ এর বাস্তপ রূপ
১. কোন কোন লোক ধনী গণ্য হয় বটে, কিন্তু তা সত্ত্বেও ব্যাংকের সাহায্য নেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। সে যখন বিদেশে অর্থহীন সম্বলহীন হয়ে পড়বে তখন সে কোথায় পাবে তার প্রয়োজনীয় সম্পদ? অনুরূপভাবে বিভিন্ন কার্যকরণ ও পরিস্থিতির দরুন কোন দূরবর্তী গ্রামে কিংবা ধূলি-ধূসর মরুভূমিতে যে লোক আটকে যাবে, কোন নগর কেন্দ্রে পৌঁছার সামর্থ্য লাভ করছে না, ফলেসে তার ব্যাংক থেকে ইচ্ছামত সম্পদ গ্রহণও করতে পারে না। এরূপ অবস্থায় এই লোকের পরিণতি কি হবে?
এ ধরনের লোক অবশ্যই ‘ইবনুস-সাবীল’ রূপে গণ্য হবে। কেননা সে ধনী হওয়া সত্ত্বেও তার ধন-মাল থেকে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অতএব সে সাহায্য পাওয়ার যোগ্য হয়েছে। উপরিউক্ত অবস্থা বিরল হলেও তা কখনও কখনও সংঘটিত হয়ে থাকে, হতে পারে।
পালিয়ে যাওয়া ও আশ্রয় গ্রহণকারী লোক
২. এমন বহু লোকই আছে যারা স্বদেশ ত্যাগ করে চলে যেতে বাধ্য হয় অবস্থার কারণে এবং তারা তাদের ধন-মালও মালিকানা সম্পদ-সম্পত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তা হয় বিদেশী দখলদার যোদ্ধা বাহিনীর অত্যাচার-নিপীড়নের দরুন অথবা বিদেশী স্বৈরাচারী আল্লাহ্ বিরোধী লোকদের চাপে। তারা কাফির প্রশাসক হতে পারে বা প্রায় কাফিরদের ন্যায় আচরণ গ্রহণকারীও হতে পারে। এ ধরনের লোকেরাই দেশের ভালো ও কল্যাণকামী লোকদের ওপর অমানুষিক অত্যাচার চালিয়ে থাকে। তাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কৃত করে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করে তাদের নিজেদের ধন-মাল ভোগ-ব্যবহারের সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার থেকে। তাদের অপরাধ এ ছাড়া আর কিছুই হয় না যে, তারা বলে: ‘আমাদের রব্ব একমাত্র আল্লাহ। তাকে ছাড়া আর কাউকেই আমরা মানি না।; এরূপ অবস্থায় বহু লোক নিজেদের দ্বীন-ঈমান লয়ে দেশ ত্যাগ করে ভিন্ন দেশে চলে যেতে বাধ্য হয়। তাদের ধন-বাড়িতে রক্ষিত ধন-মাল থেকেও তারা হয়ে পড়ে বঞ্চিত। তার নিজ দেশের ব্যাংকে তার নামে তার নিয়ন্ত্রণে বহু ধন-মাল থাকলেও বা অনুরূপ কোন অবস্থা হলেও- তার নিজের কোন কাজের আসে না তা। বহু নিপীড়িত-বিতাড়িত-বহিষ্কৃত ও বিদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী রাজনীতিক বা সাধারণ নাগরিক এ কালে অনেক দেশেই দেখা যায়।
ফিকাহ্র পরিভাষায় তাদের কি বলা হবে?
তাদের নিজেদের দেশে তাদের ধন-মাল রয়েছে একথা সত্য। কিন্তু তার ওপর এক্ষণে তাদের কোন কর্তৃত্ব নেই। তা পাওয়ারও কোন উপায় নেই। এরূপ অবস্থায় তারা আসলে ধনী হলেও কার্যত নিতান্তই দরিদ্র, সর্বহারা। আর এরূপ অবস্থা যাদেরই হবে, তারাই ‘ইবনুস্ সাবীল’ –এর মর্যাদা ও অধিকার পাবে।
নিজ ঘরে থেকেও নিজের মালের ওপর কর্তৃত্ব নেই যার
৩. হানাফী ফিকাহ্বিদের কেউ কেউ এমন প্রত্যেককে ‘ইবনুস-সাবীল’ গণ্য করেছেন, যে তার নিজের ধন-মাল থেকে অনুপস্থিত, তা ব্যবহারে অক্ষম যদিও সে নিজের ঘরে উপস্থিত। সে ব্যক্তির প্রয়োজন বা অভাবগ্রস্ততাই তার যাকাত প্রাপ্তির যোগ্য হওয়ার কারণ। এ কারণটি এখানে পুরোপুরি উপস্থিত। কেননা এখন সে কার্যত ফকীর, দরিদ্র, বাহ্যত সে যতই ধনীই হোক। [দেখুন : (আরবী ***********)]
তাঁরা বলেছেন: কোন ব্যবসায়ী ব্যক্তির যদি লোকদের নিকট টাকা পাওনা থাকে কিন্তু তা সে আদায় করতে পারছে না, কিছুই ফেরত পাচ্ছে না- তার পক্ষে যাকাত গ্রহণ করা জায়েয। কেননা সে কার্যত ফকীর-ইবনুস সাবীল-এর মতই। [(আরবী ***********)]
কল্যাণমূলক কাজে বিদেশ গমনকারী
৪. যে লোক বিদেশ গমনে ইচ্ছা করেছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় সফর সম্বল যোগাড় করতে পারছে না, শাফেয়ী মাযহাব তাকেও ইবনুস সাবীল গণ্য করেছে। এই মত যদি আমরাও গ্রহণ করি এবং এই সফর ইসলামে গণ্য কোন কল্যাণকর কাজের জন্যে অথবা মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনে হতে হবে বলে আমরা যে শর্ত আরোপ করেছি, তা এখানে আছে বলে যদি আমরা মনে করি, তা হলে আমাদের এই যুগেও এ পর্যায়ের বহু অবস্থা ও রূপ এবং বহু ব্যক্তিকে দেখতে পাব। তারা প্রতিভাবান ছাত্র হতে পারে, দক্ষ শিল্পপতি হতে পারে, সূক্ষ্ম শিল্পী বা কারিগত হতে পারে এবং এ পর্যায়ের এমন সব লোকও হতে পারে, যারা বিদেশে প্রতিনিধিত্বের জন্যে প্রেরিত হয়ে থাকে। প্রেরিত হয়ে থাকে কল্যাণকর জ্ঞানে বিশেষত্ব অর্জনের উদ্দেশ্যে, ফরপ্রসূ কর্মে উচ্চতর প্রশিক্ষণ লাভের লক্ষ্যে। এসবের সুফলটা দ্বীন ও জাতি- উভয়ই পেয়ে থাকে শেষ পর্যন্ত।
আশ্রয় বঞ্চিত লোকেরা
৫. হাম্বলী মাযহাবের কোন কোন আলিম ইবনুস-সাবীল-এর অপর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাতে বহু লোকই এর অন্তর্ভুক্ত গণ্য হতে পারে আমাদের এ কালেও। উল্লেখ করেছেন, সেইসব লোকও ‘ইবনুস-সাবীল’ যারা লোকদের পথে ঘাটে জড়িয়ে ধরে ও পাকড়াও করে ভিক্ষা চায়। [(আরবী ***********)]
লজ্জা ও দুঃখে কপাল ঘুচিয়ে যায় যখন আমরা প্রায়শই দেখতে পাই যে, বহু দেশ ও শহর-নগরের অধিবাসী মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও বহু সহস্র লোক সাধারণ আশ্রয় ও বসবাস্থল থেকেও বঞ্চিত হয়ে আছে। তারা নিরুপায় হয়ে পথের পার্শ্বে কিংবা গাছতলায় কোন-না-কোন রকমের একটা আশ্রয় বানিয়ে নিয়েছে। সর্বত্র মাটি ছড়িয়ে আছে, তার ওপরই শয্যা রচনা করেছে। বাতাসকেই তারা গাত্রাবরণ বানিয়েছে। এরা নিঃসন্দেহে ‘পথের সন্তা’ –‘ইবনুস-সাবীল’। কেননা পথই তাদের মা-বাপ।
এটা বস্তুতই সমাজ-সমষ্টির কলংক। কাজেই কুরআন তাদের প্রতি গুরুত্ব আরোপ কর থাকলে তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। কুরআন তাদেরকে একটা বিশেষ গুণেও ভূষিত করে থাকতে পারে এবং তা ‘ফকীর’ মিসকীন’ ইত্যাদি থেকে ভিন্নতর। ইসলামের প্রধান ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ‘কর’ যাকাতে তাদের জন্যে একটা অংশও নির্দিষ্ট করে দিয়ে থাকতে পারে, তা কিছুমাত্র অস্বাভাবিক নয়।
এসব লোককে ‘ইবনুস-সাবীল’ ধরে নিয়ে যাকাতের অংশ দেয়া হলে তা কিছুমাত্র অশোভন কাজ হবে না। তাদের ‘ফকীরও’ মনে করা যায়। প্রথমোক্ত পরিচিতির ভিত্তিতে তাদেরকে ‘পথ-সন্তান’ হওয়ার অবস্থা থেকে মুক্তকরণের উদ্দেশ্যে তাদের উপযোগী ‘বাসস্থান’ বানিয়ে দেয়া একান্তই আবশ্যকীয় মনে হয়। আর দ্বিতীয় পরিচিতির ভিত্তিতে তাদের যাবতীয় প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা করা- তাদের জীবিকার নির্ভরযোগ্য সংস্থান করে দেয়াও আবশ্যক মনে হয়। তাতে করে তারা কোনরূপ অপচয়, বাহুল্য ব্যয় ও কৃচ্ছতা ব্যতিরেকেই মানবীয় প্রয়োজন তৃপ্তিদায়ক মাত্রায় পূরণ করতে সক্ষম হবে।
পড়ে পাওয়া মানুষি
৬. সাইয়্যেদ রশীদ রিজা তাঁর তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘কুড়িয়ে পাওয়া (Founding) শিশু’ও সম্ভবত ‘ইবনুস-সাবীল’-এর মধ্যে গণ্য হতে পারে। তিনি এ-ও উল্লেখ করেছেন যে, সমকালীন বহু প্রতিভাবান ব্যক্তি তাঁদের লিখিত গ্রন্থে এটাও একটি যথার্থ তাৎপর্য বলে ঘোষণা করেছেন।
শায়খ রশীদ যদিও খুব দৃঢ়তার সাথে না হলেও তার উক্ত কথাটিকে সমর্থন যুগিয়েছেন এই বলে যে, ‘কুড়িয়ে পাওয়া’ বালক বা শিশুও এর মধ্যে গণ্য হতে পারে, যা অপর কোন শব্দে শামিল হয় না। আর কুরআন যেহেতু ইয়াতীম-এর ওপর খুব বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছে এবং তার প্রতি ভালো দয়ার্দ্র ব্যবহার করার উপদেশ দিয়েছে উচ্চমানের বুদ্ধিমত্তা ও যৌক্তিকতা সহকারে। এ কারণে যে ইয়াতীম কোন আত্মর্যাদাসম্পন্ন শক্তিশালী সাহায্যকারী পিতা পায় না বলেই নিরুপায় হয়ে পড়ে তার চরিত্র গঠন হয় খুবই ত্রুটিপূর্ণভাবে। বিবেক-বুদ্ধির ওপর আবরণ সৃষ্টিকারী মূর্খতা তাকে সর্বাত্মকভাবে গ্রাস করে বসে। মন-মানসিকতার বিকৃতির দরুন নৈতিক চরিত্রেরও চরম বিপর্য ঘটে। আর এই মূর্খতা ও নৈতিক বিকৃতির দরুন সমাজের ও জাতির কুলাংগার সন্তান হয়ে দাঁড়ায় তারা। তারা এক সঙ্গে বাস করেও তাদের জন্যে তারা বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে। ইয়াহীমেরই যখন এরূপ পরিণতি, তখন কুড়িয়ে পাওয়া সন্তান তো সমাজের স্নেহ-যত্ন-আশ্রয় ও লালন-পালন বেশি মাত্রায় অধিকারী। উপরে এই যৌক্তিকতা ও ফিকহী দৃষ্টিকোণের কথাই বলা হয়েছে।
বলেছেন, প্রায় সব তাফসীরকারই এই কুড়িয়ে পাওয়া সন্তানের উল্লেখ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। হয়ত এজন্যে যে, তাঁদের সময়ে কুড়িয়ে-পাওয়া সন্তানদের সংখ্যা খুবই বিরল ছিল। আর শেষেরদিকের তাফসীর লেখকগন তো কেবল পূর্ববর্তী লেখকদের রচনাবলীর অনুলিপিই তৈরী করেছেন মাত্র। [(আরবী ***********)]
তাছাড়া ‘কুড়িয়ে পাওয়া সন্তান’ ‘ইবনুস-সাবীল’ পর্যায়ে গণ্য না হলেও তারা সাধারণ পকীর-মিসকীনের মধ্যে তো অনিবার্যভাবেই গণ্য হবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কেননা ‘ফকীর’ হচ্ছে ‘অভাবগ্রস্ত’ –ঠেকে যাওয়া লোক। তা অল্প বয়সেরহোক কি বেশি বয়সের। তার পক্ষে যাকাতের অংশ পাওয়া তো সবদিক দিয়েই নিশ্চিত।
অষ্টম পরিচ্ছেদ
যাকাত পাওয়ার যোগ্য লোকদের সম্পর্কে পর্যালোচনা
যাকাত পাওয়ার যোগ্য লোকদের সম্পর্কে ফিকাহ্বিদদের সামগ্রিক পর্যালোচনা
আল্লাহ্ তা’আলা যাকাতরে ব্যয়খাতসমূহের উল্লেখ করেছেন তাঁর কিতাব কুরআন মজীদে। এই খাতসমূহকে আটটি ভাগে বিভক্ত করেছেন। এই ভাগসমূহের বিস্তারিত ব্যাখ্যা আমরা করেছি, প্রত্যেক বিষয়ে সুস্পষ্ট বর্ণনা আমরা উপরে উদ্ধৃত করেছি। তা সত্ত্বেও একটি বিষয় এখানে অবশিষ্ট থেকে গেছে, যার বিশ্লেষণ আমরা এ পর্যায়ে করতে চাচ্ছি। তা হচ্ছে- যাকাত বন্টনকারী ব্যক্তি নিজে হোক কি সরকার বা বায়তুলমাল সংরক্ষক, সে কি এই আট প্রকারের লোকদের মধ্যে যাকাত বন্টন করবে এবংতাদের মধ্যে পরিমাণ সমান করে দেবে?
কোন কোন ফিকাহ্বিদ তা-ই মনে করেছেন। তন্মধ্যে ইমাম শাফেয়ীও রয়েছেন। তিনি তাঁর কিতাব ‘আল-উম্ম’-এর বহু কয়টি অধ্যায়ে এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
ইমাম নববী তা*র (****) গ্রন্থে লিখেছেন- ইমাম শাফেয়ী ও তাঁর সঙ্গীদের কথা হচ্ছে, ‘মূল মালিকই যদি যাকাত বন্টনকারী হয় কিংবা তার প্রতিনিধি, তাহলে যাকাত সংস্থায় কর্মচারীদের জন্যে (***) নির্দিষ্ট অংশ বন্টন থেকে বাদ যাবে, যে অংশটি অপর সাতটি অংশের সাথে মিলিত হয়ে বন্টিত হবে- যদি সেগুলো পাওয়া যায়। অন্যথায় যে কয়টি খাতে লোক পাওয়া যাবে, সে সব খাতেই তা বন্টন করা হবে। কোন একটি খাতে লোক পাওয়া সত্ত্বেও তাতে যাকাত অংশ না দেয়া জায়েয নয়। বাদ দেয়া হলে সে অংশের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে অর্থাৎ আমাদের মত হচ্ছে, সব কয়টি খাতেই যাকাত ব্যয় করা। ইকরাম, উমর ইবনে আবদুল আজীজ, জুহ্রী ও দাউদ জাহিরী এই মত পোষণ করেন। [(আরবী **********)]
ইমাম আহমাদ থেকেও বর্ণনা পাওয়া গেছে শাফেয়ী মাযহাবের সমর্থনে। তিনি তো সব কয়টি খাতেই ব্যয় করা, এগুলোর মধ্যে সমতা বিধান এবং প্রতিটি খাতে তিন বা ততোধিককে দেয়া ওয়াজিব বলে মনে করেন। কেননা এই ‘তিন’ হচ্ছে জামায়াত হওয়ার কম-সে কম সংখ্যা। তবে (***) এর কথা স্বতন্ত্র। সে যা গ্রহণ করে তা তার পারিশ্রমিকস্বরূপ। তাই একজন হলেও চলবে ও দিতে হবে আর ব্যক্তি মালিক নিজেই যাকাত বন্টন করলে ‘কর্মচারীর’ খাত বাদ দিতে হবে। হাম্বলী মাযহাবের আবূ বকরও এ মত দিয়েছেন। [(আরবী **********)]
মালিকী মাযহাবের আলিম ‘আচবাগ্’ সকল খাতে সাধারণ বন্টনের ব্যাপারে ইমাম শাফেয়ীর মতকে খুবই পসন্দ করেছেন। যেন তাদের সকলেরই অধিকারের কথা ভুলে যাওয়া বা উপেক্ষা করা না হয়। তাছাড়া তাতে করে বিভিন্ন প্রকারের কল্যাণ সাধিত হওয়াও সম্ভবপর।তাতে দারিদ্র্য বিদূরণ, যুদ্ধ পরিচালন ও ঋণ শোধ প্রভৃতি সব কাজ একই সাথে সম্পন্ন হতে পারে। এই সকলের দো’আও সেই জিনিসকেই বাধ্যতামূলক করে দেয়। [‘চাভীতা’র টীকায় একথা উদ্ধৃত করেছেন, ১ম খণ্ড, ৩৩৪ পৃ., খরশী থেকে উদ্ধৃত।]
ইব্নুল আরাবী বলেছেন, ফিকাহ্বিদগণ একমত হয়ে বলেছেন- যাকাত সংস্থার কর্মচারীদেরকে সবকিছু দেয়া যাবে না। [(আরবী **********)] কেননা তাতে শরীয়াতের যাকাত বন্টন নীতির লক্ষ্য বিনষ্ট হওয়ার আশংকা রয়েছে। সে লক্ষ্য হচ্ছে- মুসলমানদের দারিদ্র্য নিরসন, ইসলামে বিশ্বাসীদের রিক্ততা বিদূরণ- যেমন ইমাম তাবারী বলেছেন।
ইমাম শাফেয়ীর সঙ্গিগণ দলিল হিসেবে নির্ভর করেছেন এই কথার ওপর যে আল্লাহ্ তা’আলা সাদকা যাকাতকে ‘মালিক করে দেয়া’ বোঝায় যে (***) ‘লাম’ তা সহ উল্লেখ করে (****) যাকাত পাওয়ার অধিকারী লোকদের উল্রেখ করেছেন। তাতে শরীক হিসেবে মালিকানা লাভ সম্ভব হতে পারছে। ফলে তা হচ্ছে প্রাপক লোকদের বিবরণ। এটা হল, ঠিক যেমন সুনির্দিষ্ট লোকদের জন্যে অথবা কোন এক প্রকারের লোকদের জন্যে অসিয়ত করা। কাজেই তাদের সকলকেই তাতে শরীক করা ওয়াজিব হয়ে পড়ল।
হাদীসের দলিল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে আবূ দাউদ-এ জিয়াদ ইবনুল হারিস আস সাদায়ী’ থেকে বর্ণিত হাদীসটি। তিনি বলেছেন: আমি নবী করীমের নিকট উপস্থিত হলাম এবং তাঁর নিকট ‘বায়’আত’ করলাম। এই সময় তার নিকট আর এক ব্যক্তি উপস্থিত হল। বলল: আমাকে যাকাতের অংশ দিন। নবী করীম (স) তাকে বললেন: ‘আল্লাহ্ তা’আলা কোন নবীর বা অপর কারোর হুকুমের যাকাতের বিধানও বিভক্তি করেন নি। তিনি নিজেই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত ফয়সালা করে দিয়েছেন এবং তাকে আটটি অংশে বিভক্ত করেছেন। এখন তুমি যদি সেই বিভক্তির কোন একটিতে গণ্র হও, তাহলে আমি তোমার হক দিয়ে দেব।’
ইমাম শাফেয়ী এ ব্যাপারে ইমাম মালিক ও ইমাম আবূ হানীফার এবং তাঁর সঙ্গীদের বিরোধিতা করেছেন। এরা যাকাত বন্টনে সব কয়টি খাতকে শরীক করাওয়াজিব মনে করেন নি।
তাঁরা বলেছেন- আয়াতের যে (***)‘লাম’ এর কথা বলা হয়েছে তা ‘মালিক বানিয়ে দেয়া’ অর্থ বোঝায় না। তা ‘জন্যে’ বোঝাবার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন বলা হয়, ‘এই লাগামটি জন্তুর জন্যে’, ‘দুয়ার ঘরের জন্যে।’
তাঁরা দলিলস্বরূপ এ আয়াতটির উল্লেখ করেছেন:
(আরবী **********)
তোমরা যদি দান-সাদকা প্রকাশ্যভাবে দাও, তা-ও উত্তম, আর যদি তা গোপন কর এবং তা ‘ফকীরদের’ই উল্লেখ করা হয়েছে সাদকার ব্যয়খাত হিসেবে। আর কুরআনে সাদকা যখনই নিঃশর্ত উল্লিখিত হবে, বোঝা যাবে যে, তা ফরয সাদকা অর্থাৎ যাকাত। নবী করীম (স) বলেছেন: (আরবী **********)
আমি সাদকা-যাকাত তোমাদের ধনীদের নিকট থেকে গ্রহণকরব ও তোমাদের গরীবদের মধ্যে তা ফিরিয়ে দেব, এজন্যে আমি আদিষ্ট হয়েছি।
যাকাত ব্যয়খাতের আটটির মধ্যে শুধু একটি খাতের উল্লেখ করার দলিল ও কুরআন হাদীস উভয় থেকেই এখানে উদ্ধৃত হল। [(আরবী **********)]
আবূ উবাদ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেছেন:
(আরবী **********)
তুমি যখন খাতসমূহের মধ্য থেকে কোন একটি খাতে যাকাত ব্যয় করলে তখন তা-ই তোমার জন্যে যথেষ্ট হল। কেননা মহান আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, ‘সাদকা’ ফকীর ও মিসকীনদের জন্যে’…. অমুক অমুকও পাবে। যেন এই খাতসমূহ ছাড়া অন্যকোথাও তা নিয়োগকৃত না হয়….।
হুযায়ফা থেকেও অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে।
ইবনে শিহাব থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন: (আরবী **********)
তোমাদের মধ্যে যাকাতের ব্যাপারে অধিক সৌভাগ্যবান সে, যে হবে তাদের মধ্যে সংখ্যার দিক দিয়ে অনেক বেশি এবং অনশনের দিক দিয়ে অনেক বেশি কষ্টকারী তাদের মধ্যে।
অর্থাৎ যাদের সংখ্যা বেশি এবং যারা ক্ষুধার অধিক মাত্রায় কাতর, তারা যাকাত পাওয়ারও বেশি অধিকারী।
ইবরাহীম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: (আরবী **********)
লোকেরা কেবল দারিদ্র্য ও অনশন সম্পর্কেই জিজ্ঞাসা করত (যে, তা নিরসনের উপায় কি?)।
সুফিয়ান ও ইরাকবাসী আবূ হানীফা এবং তাঁর সঙ্গিগণ বলেছেন: (আরবী **********)
যাকাত আটটি খাতের কোন একটিতে ব্যয় হলেই তা যথেষ্ট হবে।
ইবরাহীম নখয়ী বলেছেন: যাকাত সম্পদ বিপুল হলে তা সব কয়টি খাতে বন্টন কর। আর কম বা স্বল্প হলে তা একটি খাতেই ব্যয় কর। আতা থেকেও অনুরপ বর্ণিত হয়েছে। [আবূ উবাদ তাঁর (****) গ্রন্থে এ সব কথা উদ্ধৃত করছেন, ৫৭৬-৫৭৮।]
আবূ সওর বলেছেন, যাকাতদাতা নিজেই তা বন্টন করলে একটি মাত্র খাতে ব্যয় করা তার পক্ষে জায়েয। আর সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান বন্টন করলে সব কয়টি খাতেই তা করবে।
ইমাম মালিক বলেছৈন, সাদকা-যাকাত-বন্টনের ব্যাপারে আমাদের মতে কাজটি রাষ্ট্রপ্রধানের ইজতিহাদ ছাড়া আর কোনভাবে সম্পন্ন করা যাবে না। যে খাতের প্রয়োজন তীব্র ও পাওয়ার যোগ্য লোকদের সংখ্যা বেশি হবে, সে খাতটিতে রাষ্ট্রপ্রধান প্রয়োজন পরিমাণ অধিক ব্যয় করবে। এক বা দুই বৎসর কিংবা কয়েক বৎসর পর তা অন্য খাতে স্থানান্তরিত করা যাবে। কাজেই অভাবগ্রস্ত ও অধিক সংখ্যাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে তা যতটা এবং যেভাবেই হোক।
আমার পসন্দনীয় আলিমগণকে আমি এই মতেরই ধারক পেয়েছি। [(আরবী **********)]
উপরিউক্ত মতসমূহের মধ্যে নখ্য়ী, আবূ সওর ও মালিক প্রমুখের কথাই অধিক যুক্তি সঙ্গত মনে হয়- আমি যা মনে করি- তা পরস্পর সম্পূরক।
(******) গ্রন্থকারের গবেষনা
(*****) গ্রন্থকার এ ব্যাপারটির পর্যায়ে ব্যাপক গবেষণা ও অনুসন্ধান চালিয়েছেন। বলেছেন, আল্লাহ তা’আলা সাদকা-যাকাতকে আটটি খাতের জন্য বিশেষভাবে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। এর বাইরে অপর কোন খাতে তা ব্যয় করার কোন সুযোগ রাখেন নি। কিন্তু এই বিশেষভাবে নির্দিষ্টকরণ থেকে একথা জরুরী হয়ে পড়ে যে, সেই খাতসমূহে একেবারে সমান পরিমাণে বন্টন করতে হবে। আর কম বেশি যা-ই সংগৃহীত হবে, তা-ই তাদের মধ্যে বন্টন করতে হবে এমন কথাও নয়। তার অর্থ হচ্ছে, সাদকা-যাকাত জাতীয় সম্পদ এই আট জাতীয প্রাপকদের মধ্যে বন্টনীয়। যার ওপর যাকাত-সাদকা জাতীয় কিছু দেয়া ফরয হবে, সে যদি তা এই আট জাতীয় খাতে ব্যয় করে দিল, তাহলে সে এ বিসয়ে আল্লাহ্র নির্দেশ পালন করল এবং আল্লাহ্র আরোপ করা ফরয আদায় হয়ে গেল। যদি বলা হয় মালিক যদি যাকাত ফরয হওয়ার পরিমাণ সম্পদ লাভ করল তার পক্ষে আট প্রকারের ব্যয় খাতগুলির বর্তমান থাকা সত্ত্বেও সেই সব কয়টিতেই তা ভাগ করা- কষ্ট ও অসুবিধা ছাড়াও-প্রাচীন ও শেষদিকের মুসলমানদের কাজের পরিপন্থী পদক্ষেপ হবে। অনেক সময় যাকাত বাবদ স্বল্প পরিমাণ সম্পদ জমা হয়, তা যদি সবকয়টি খাতেই বন্টন করা হয়, তা হলে প্রতিটি খাতই লব্ধ অংশ থেকে উপকৃত হতে পাল- তা একটি প্রকার হলেও, বেশি সংখ্যক হওয়া তো দূরের কথা।
জিয়াদ ইবনুল হারিস বর্ণিত হাদীসে নবী করীম (স) বলেছেন: আল্লাহ নবী বা অন্য কারুর হুকুমে যাকাত বন্টনের ব্যবস্থা করেন নি। তিনি নিজেই ফায়সালা করে দিয়েছেন ও আটটি ভাগে বিভক্ত করেছেন- এ হাদীসটি দলিল হিসেবে গণ্য ধরে নিয়েও (হাদীসটির সনদ সম্পর্কে আপত্তি উঠেছে) বলা যায় তার অর্থ হচ্ছে, যাকাত সম্পদ বিবক্তি তার খাত বিভক্তি অনুযায়ী হবে। আয়াতটিতে যেমন করে খাত কয়টির উল্লেখ হয়েছে- নবী করীম (স) যা বলতে চেয়েছেন, মূল যাকাত বন্টনই যদি লক্ষ্য হয়ে থাকে, তা হলে তার অ্থ, প্রতিটি অংশ তার জন্যে নির্দিষ্ট খাত ছাড়া অন্য খাতে ব্যয় জায়েয হবে না। যে খাতটির অস্তিত্ব নেই, সেই খাতের জন্যে নির্দিষ্ট অংশটি অপর খাতে ব্যয় করা কখনই জায়েয হবে না। তা মুসলিম উম্মতের ইজমার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
উপরন্তু তা মেনে নিলে তা হবে সমষ্টিগত যাকাত সম্পদ হিসেবে যা রাষ্ট্রপ্রধান অর্থাৎ বায়তুলমালে-সংগৃহীত হবে। ব্যক্তি বিশেষ বা প্রত্যকটি ব্যক্তি হিসেবে নয়। তাহলে সমান বন্টন ওয়াজিব হওয়ার মত কোন কথাই অবশিষ্ট থাকল না। বরং কোন কোন পাওয়ার যোগ্য লোককে কোন কোন যাকাত এবং অপর লোকদের অপর কোন যাকাত দেয়া সম্পূর্ণ জায়েয।
হ্যাঁ রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার যদি কোন বিশেষ ভূ-খণ্ডের সমস্ত প্রকারেরযাকাত সংগ্রহ করে এবং আটটি খাতের সব কয়টি উপস্থিত হয়ে যায়, তাহলে প্রতিটি খাতেরই তার অংশের দাবি করার অধিকার রয়েছে আল্লাহ্র বিভক্তি অনুযায়ী পাওয়ার। কিন্তু তা তাদের মধ্যে সমান পরিমাণে বন্টন করা এবং দান করার ক্ষেত্রে সবাইকে শামিল করা জরুরী কর্তব্য নয়। কতিপূ খাতকে অপর খাতের তুলনায় অধিক পরিমাণে দেয়ার তার অধিকার রয়েছে। এমনকি কাউকে দেবে কাউকে নয়, যদি তা-ই ইসলাম ও মুসলিমের জন্যে কল্যাণ বিবেচিত হয়- তাহলে তা করারও অধিকার আছে। যেমন তার নিকট যাকাত সংগৃহীত হল এই সময়ই জিহাদ সংঘটিত হল এবং কাফির ও বিদ্রোহীদের হামলা থেকে ইসলামের ঘর প্রতিরক্ষার দাবি উপস্থিত হল, তাহলে তখন মুজাহিদদের জন্যে নির্দিষ্ট খাতসমূহকে অগ্রাধিকার দেয়া ও তাতেই সব ব্যয় করা সম্পূর্ণ জায়েয হবে। তাতে যাকাতলব্ধ সব সম্পদ ব্যয় হয়ে গেলেও আপত্তি করা চলবে না। অনুরূপভাবে মুজাহিদ ছাড়া অন্যান্য খাতে ব্যয় করার অধিক তাকীদ দেখা দিলে তা করা খুবই সংগত হবে। [(আরবী **********)]
আবূ উবাইদের অগ্রাধিকার দান
ইমাম আবূ উবাইদ উপরিউক্ত মতটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ইমাম আবূ জুহরা যাকাতরে পর্যায় ও স্থান সম্পর্কে হযরত উমর ইবনে আবদুল আজীজকে যা লিখেছিলেন তার উল্রেখ করেছেন, যেমন হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে। বলেছৈন, এখানে আটটি অংশ রয়েছে। একটি ফকীরদের জন্যে আর একটি মিসকীনদের জন্যে… এভাবে আটটি অংশ। পরে ফকীর থেকে ইবনুস সাবীল পর্যন্ত প্রতিটি খাতে যা ব্যয় হবে তা আলাদা আলাদা করে দেখিয়েছন। আটটি খাতের প্রতিটিতে একটি অংশ কিভাবে বন্টন করা হবে তাও দেখিয়েছেন। অতঃপর আবূ উবাইদ বলেছেন, এগুলো হচ্ছে যাকাত ব্যয় করার ক্ষেত্র, যখন তাকে অংশে অংশে বিভক্ত করা হবে। আর এ-ই হচ্ছে পদ্ধতি যে তা করতে সক্ষম ও সামর্থ্যবান হবে তার জন্যে। কিন্তু আমি মনে করি, রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার ছাড়া এরূপ করা আর কারুর জন্যেই ফরয নয়। তার ফাণ্ডে যদি মুসলমানদের দেয়া যাকাতের পরিমাণ বিপুল হয় তখন সব কয়টি খাতের প্রাপ্য দিয়ে দেয়া আবশ্যক হবে। তখন তা বন্টন করার ব্যাপারে সাহায্যকারী বহু সংখ্যক হস্ত কাজ করবে। কিন্তু যার নিকট তার বিশেষ করে নিজের ধন-মালের জন্যে নিয়েঅজিত লোক ছাড়া আর কেউ থাকে না, সে যদি কোন কোন খাতে তা দেয় অপর কোন কোন খাত বাদ দিয়ে, তাহলে তা তার জন্যে যথেষ্ট এবং জায়েয হবে। যেসব আলিমের নাম উপরে উদ্ধৃত করা হয়েছে তাঁদের এটাই মত।
এক্ষেত্রে মূল ভিত্তি হচ্ছে নবী করীম (স) থেকে বর্ণিত হাদীস। তিনি যাকাত প্রসঙ্গে বলেছেন:
(আরবী **********)
তা নেয়া হবে তাদের ধনীদের থেকে। পরে তা ফিরিয়ে বন্টন করা হবে তাদেরই গরীবদের মধ্যে।
এখানে তো একটি মাত্র খাতের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পরে তাঁর নিকট ধন-মাল আসল। তখন তিনি তা ফকীরদের ছাড়া দ্বিতীয় খাতে নিয়োগ করেছেন। তারা হচ্ছে ‘আল-মুয়াল্লাফাতুলকুলবুহুম’ আল আকরা ইবনে হাবে, উয়াইনা ইবনে হাসান, আলা ও জায়দ ইবনুল খায়ল প্রমুখ ব্যক্তিরা ছিল এই খাতের প্রাপক। তাদের মধ্যে সেই রৌপ্য বন্টন করে দিলেন যা হযরত আলী নবী করীম (স)-এর নিকট ইয়ামেনবাসীদের ধন-মাল থেকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তা সেই লোকদের নিকট থেকেই গ্রহণ করা হয়েছিল,যাদের ধন-মাল থেকে তখন যাকাত নেয়া হত।
পরে তার নিকট আরও মাল আস। তখন তিনি তা তৃতীয় খাতে নিয়োগ করলেন, তা হচ্ছে ‘আল-গারেমূন’ –ঋণগ্রস্ত লোক।
কুবাইচা ইবনুল মাখারিক যে দুর্বহ বোঝা নিয়েচিলেন, তাতে তাঁকে বলেছিলেন, ‘তুমি অপেক্ষাকর, আমাদের নিকট যাকাতের মাল আসুক’। অতঃপর হয় আমরা সে বোঝা বহনে তোমাদের সহায়তা করব, না হয় বোঝাটি তোমার ওপর থেকে আমরা তুলে নিয়ে যাব। এ কথাটিও এই পর্যায়েরই। এতে নবী করীম (স) বিশেষ একটি খাতকে অপরাপর খাত অপেক্ষা অধিক ভাগ্যবান বানিয়ে দিয়েচিলেন এবংতাতেই যাকাত সম্পদ ব্যয় করেছিলেন।
মোটকথা, রাষ্ট্রপ্রধান-সরকার-সব কয়টি খাতে যাকাত বন্টনের ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীনতার অধিকারী- কোন কোন খাত বাদ দিয়ে অপর কোন কোন খাতে সে তা ব্যয় করতে পারে। তখন তা ইজতিহাদ পন্থায় সমাধা করা হবে এবং সত্যকে পরিহার করার প্রবণতাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হবে। রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার ছাড়া অন্যদের জন্যেও এরূপ অবাধ অধিকার রয়েছে (ইনশা আল্লাহ্)। [(আরবী **********)]
রশীদ রিজা’র অগ্রাধিকার দান
আল্লামা রশীদ রিজা ‘আল-মানার’ তাফসীর গ্রন্থে লিখেছেন: পূর্বকালের আলিম ও বিভিন্ন দেশের ইমামগণের মধ্যে বিষয়টি নিযে যে মতপার্থক্যের সৃষ্টি হয়েছে, তা প্রমাণ করে যে, এ ব্যাপারে পূর্ব থেকে কোন সুস্পষ্ট নীতি পাওয়া যায়নি যার ওপর নবী করীম (স) থেকে এ পর্যন্ত এ বিসয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকবে।
খুলাফায়ে রাশেদুন-এর সময় থেকেও এ পর্যায়ে কোন ঐকমত্য ভিত্তিক নীতি পাওয়া যায়নি। মনে হচ্ছে, তাঁরা ব্যাপারটি কল্যাণময়তার দৃষ্টিতে বিবেচনা করতেন এবং তদনুযায়ী অগ্রাধিকার দিযে কাজ করতেন- যা রাষ্ট্রনায়কগণ পাওয়ার অধিকারেরদৃষ্টিতে ও যাকাত সম্পদের পরিমাণ সল্পতাও বিপুলতা এবং বায়তুলমালে তা সংগৃহীত হওয়ার প্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন।
কল্যাণকরতা বিবেচনায় সব কয়জন ইমামের মধ্যে ইমাম মালিক ও ইবরাহীম নখ্য়ী’র কথা অধিক গ্রহণযোগ্য। আর ইমাম আবূ হানীফার মত সাধারণ কল্যাণ ও অকাট্য দলির উভয় দিকের বিচারেই গ্রহণযোগ্যতা থেকে অনেক দূরে। [পূর্বে উল্রেখ করেছি, আবূ উবাইদ ইবনে আব্বাস ও হুযাইফা থেকেএরূপ কথার বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। একটি মাত্র খাতে সব যাকাত সম্পদ ব্যয় জায়েয হওয়ার সম্পর্কিত মতটি প্রয়োজনও বন্টন ক্ষেত্রের কল্যাণের বিরোধী নয়- যদি তা-ই মুসলিম মানসিকতার সাথে সঙ্গতিসম্পন্ন হয়।] তবে সংগৃহীত সম্পদ খুব বেশি মাত্রায় কম হলে অন্যকথা। তখন একজনকে দেয়া হলে সে তা দিয়ে উপকৃত হবে। আর তা যদি অন্যান্য কয়েকটি খাতেও ব্যয় করা হয় কিংবা একই খাতের বহু ব্যক্তির মধ্যে বন্টন করা হয়- যেমন ‘ফুকারা’ খাত- তা হলে তা কারোর জন্যেই যথেষ্ট হবে না।
তবে একই খাতের পাওয়ার যোগ্য লোকদের মধ্য থেকে মাত্র একজনকে বিপুল সম্পদ দেয়া জায়েয হওয়ার বাস্তবিকই কোন কারণ বা যৌক্তিকতা নেই, তা নিঃসন্দেহ। আল্লাহ তা’আলা প্রতিটি খাতকে বহু বচনে উল্লেখ করেছেন। আবূ হানীফা বা অন্য কেউ ইলম ও চিন্তা-ভাবনার দিক দিয়ে একথা বলতে পারেন না যে, একটি খাতের একজন লোককে দিয়ে দিলেই আল্লাহ্র আদেশ পালন এবং কুরআনের বিধান অনুযায়ী কাজ হয়ে যাবে। দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মজলিশে শূরা প্রতিটি যুগে ও দেশে কার পরে কার অগ্রাধিকার তা নির্ধারণ করবে এটাই বাঞ্ছনীয়। সমস্ত যাকাত সম্পদও যখন যথেষ্ট হবে না তখন রাজা-বাদশাহ্ প্রশাসক সকলকেই ইচ্ছামত বন্টন বা ব্যয় করা থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। আর প্রয়োজন বা অভাবের যেমন শ্রেণী বা মাত্রা পার্থক্য রয়েছে, তেমনি কোন কোন স্থানে ও সময়ে কোন কোন খাত কার্যত দেখা যায় না, অপর কয়েকটি খাত পাওয়া যায়- এটাও স্বাভাবিক। [(আরবী **********)]
খাতসমূহে যাকাত বন্টনের সারকথা
উপরিউদ্ধৃত বহু মত, গবেষণা-বিশ্লেষণ ও অগ্রাধিকার সংক্রান্ত যাবতীয় কথার সারনির্যাস আমরা এখানে তুলে ধরছি:
১. যাকাত সম্পদের পরিমাণ বিপুল ও বেশি হলে সব কয়টি খাতে তা বন্টন করা বাঞ্ছনীয়- যদি সব কয়টি খাতই পাওয়া যায়, সে সবের প্রয়োজন সমান মাত্রায় হোক বা পার্থক্যপূর্ণ হোক। তার কোন একটা খাতের প্রয়োজন থাকা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা হওয়া সত্ত্বেও তাতে কিছুই ব্যয় না করা- খাতটিকে বঞ্চিত করা জায়েয নয়। এই কথাটি সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রপ্রধান বা শরীযাতসম্মত কর্তৃপক্ষের জন্যে, যা যাকাত সংগ্রহ ও প্রাপকদের মধ্যে বন্টনের কাজ করবে।
২. আটটির সব কয়টি খাতের বর্তমান থাকা অবস্থায় সব খাতেই যখন যাকাত বন্টন করা হবে, তখন প্রতিটি খাতে ব্যয়ের পরিমাণ সর্বতোভাবে সমান করা ওয়াজিব বা ফরয নয়। বরং তা হতে হবে প্রয়োজন ও সংখ্যা মাত্রা অনুপাতে। কেননা কোন এলাকায় হয়ত এক হাজার জন ফকীর রয়েছে; ‘কিন্তু গারেমুন’ বা ‘ইবনুস-সাবীল’ খাতে দশ জনের বেশি পাওয়া যায় না- এমনটা হতে পারে। এরূপ অবস্থায় দশজনকে যা দেয়া হবে, তা-ই এক হাজার জনকে কিভাবে দেয়া যেতে পারে? এ কথাটি ইমাম মালিক এবং তাঁর পূর্বের ইমাম জুহ্রীর মাযহাবের সাথে অধিক সাযূজ্যপূর্ণ দেখতে পাচ্ছি। তারা যে খাতের লোকদের সংখ্যা বেশি প্রয়োজন তীব্র, সেই খাতিটকে বড় অংশ দিয়ে অগ্রাধিকার দিতেন। [দরদী তা*র (******) গ্রন্থে বলেছৈন: অধিক অভাবগ্রস্তকে অন্যদের ওপর অগ্রাধিকার দিতে হবে, হয় বিশেষভাবেই তাদের দিতে হবে, নয় অধিক পরিমাণে দিতে হবে- আস্থানুযায়ী যেটা সমীচীন বোধ হবে। কেননা অভাব মোচনই লক্ষ্য। (১ম খণ্ড, ২৩৪ পৃ.)] কিন্তু তা ইমাম শাফেয়ীর মতের খেলাফ।
৩. বিশেষভাবে কয়েকটি খাতে সমগ্র যাকাত সম্পদ ব্যয় করা জায়েয, যদি শরীয়াতসম্মত কল্যাণ দৃষ্টি এই বিশেষ নীতি গ্রহণ করার প্রয়োজন প্রকাশ করে। ঠিক যেমন আটটি খাতের মধ্য থেকে মাত্র একটি খাতে ব্যয় করা কালে তার সমস্ত ব্যক্তিগণের মধ্যে দেয় পরিমাণ সর্বতোভাবে সমান করা জরুরী নয়। বরং তাদের প্রয়োজন অনুপাতে কম বেশি করা জায়েয। কেননা প্রয়েঅজনের মাত্রা বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে অনেক সময় তারতম্যপূর্ণ হতে পারে।
জরুরী কথা হচ্ছে, পরিমাণে কম-বেশি করা যাবে যদি তার কারণ থাকে, যদি তা করা কল্যাণকর হয়। ইচ্ছামত ও খাহেশ অনুপাতে তা করা যাবে না এবং তা করা যাবে অপরাপর খাত বা ব্যক্তিদের প্রতি কোনরূপ বিদ্বেষ পোষণ ব্যতিরেকে। [এই পর্যায়ে উত্তম কথা পড়েছি (আরবী **********) গ্রন্থে, তাতে বলা হয়েছে: রাষ্ট্রপ্রধান (সরকার) কম বেশি করার এই কাজ করতে পারবে কেবল মাত্র তখন, যখন অপরাপর খাতের প্রতি কোনরূপ অবিচার করার মনোভাব না থাকে। যদি তা থাকে, তবে তা করা যাবে না। কেননা তা হচ্ছে সত্য বিরোধী ঝোঁক ও প্রবণতা, অবিচার। এই অবিচার এরূপ, যেমন একজন ঋণগ্রস্তকে তার ঋণ পূরণের অধিক পরিমাণ দেয়া হল আর অপর ঋণ গ্রস্তকে তার ঋণ পমিাণ থেকেও অনেক কম দেয়া হল। অথবা একজন ইবনুস সাবীলকে তার বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছার পরিমাণ দেয়া হল আর অপর জনকে তার কম দেয়া হল। অথবা একজন ফকীরকে দেয়া হবে যা তার ও তার পরিবারবর্গের জন্যে যথেষ্ট। আর অপর জনকে তার তুলনায় অনেক কম। অথচ তার যুক্তিসঙ্গত কোন কারণ নেই। এই পার্থক্যকারী যেন কারুর মন সন্তুষ্টকরণের কাজ করল। অবশ্য রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার কোন কোন ব্যক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে তাকে পরিমাণবেশি দিতে পারে অন্যদের তুলনায় বহু কয়টি কারণে যেমন, যাকাত পাওয়ার অধিকারের কারণ। যেমনহয়তো কোন দরিদ্র্য ব্যক্তি মুজাহিদ। যাকাত সংস্থার কর্মচারী ও ঋণগ্রস্ত হবে। এরূপ ব্যক্তিকে বহু কয়টি কারণ একত্রিত হওয়ার দরুন অন্যদের তুলনায় বেশি দেয়া যেতে পারে।]
৪. যেসব খাতে যাকাত ব্যয় করা হবে তন্মধ্যে ফকীর ও মিসকীনই হতে হবে প্রথম পর্যায়ে গণ্য ও অগ্রাধিকার প্রাপ্ত। কেননা তাদের সচ্ছল বানানো ও যথেষ্ট মাত্রায় প্রয়োজন পূরণই হচ্ছে যাকাতের প্রথম লক্ষ্য। এমনকি রাসূলে করীম(স) হযরত মুয়ায (রা) বর্ণিত হাদীসে কেবল মাত্র এই একটি খাতেরই উল্লেখ করেছেন: ‘তাদের ধনীদের নিকট থেকে যাকাত নেয়া হবে এবং তাদের গরীব লোকদের মধ্যেই তা বন্টন করা হবে’ এই বাণীতে। এটা এজন্যে যে, এই খাটির গুরুত্ব অন্য কয়টির তুলনায় অধিক।
তাই সরকারের পক্ষে সেনা সংগ্রহে যাকাত সম্পদ ব্যয় করার উদ্দেশ্যে তা গ্রহণ করা জায়েয হবে না, যদি দরিদ্র মিসকীন প্রভৃতি দুর্বললোকদের খাতসমূহ বঞ্চিত করে তাদেরকে ক্ষুধা, বস্ত্রহীনতা ও বিলুপিড্তর হাতে ছেড়ে দেয়া হয় এবং হিংসা, পরশ্রীকাতরতা ও বিদ্বেষ তাদের জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভস্ম করতে থাকে।
এ সবই যতক্ষণ পর্যন্ত বিশেষ ও সাময়িক ক্ষেত্র হয়ে না দাঁড়াবে, ততক্ষণ তার চিকিৎসাকে দারিদ্র্য ও মিসকীন রোগের চিকিৎসার ওপর অগ্রবর্তিতা দেয়া যাবে।
৫. যাকাত সংস্থা কর্মচারীদের জন্যে ‘কর’ হিসেবে ও বন্টনস্বরূপ সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণে ইমাম শাফেয়ীর মতটি গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। তিনি পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন লব্দ যাকাত সম্পদের এক-অষ্টমাংশ পরিমাণ। তাই তার বেশি হওয়া জায়েয নয়। কেননা আরোপেত অধিকাংশ ‘কর’ ব্যবস্থা সম্পর্কে দোষারোপ করা হয় এই বলে যে, তার একটা বিরাট পরিমাণই ব্যয় হয়ে যায় প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কাজকর্মে। ফলে মূল ভাণ্ডারে অর্জিত সম্পদের খুব সামান্য অংশই সঞ্চিত থাকে। অর্জন ও সংগ্রহ ব্যয় বাবদ বহু অপচয়ের দরুন লব্ধ পরিমাণ সম্পদের অধিকাংশ হ্রাসপ্রাপ্ত হয়ে যায়। তাতে বড় বড় পদ সৃষ্টি করা হয় ও তার বাহাদুরী ও মর্যাদা রক্ষার্থে, অফিস সংক্রান্ত কায়দা-কানুন ও বাহ্যিক প্রকাশ ও দেখানো যে জটিলতা সৃষ্টির প্রবণতার কারণে বিপুল ব্যয় অপরিহার্য হয়ে দেখা দেয়। তাতে বহু জাঁকজমক দেখানো হয় ও বহু সম্পদ নিয়োজিত হয়, আসলে তা পাওনাদারদের প্রাপ্ত অংশ থেকেই নেয়া হয় নতুবা পাওয়অর যোগ্য লোকদের অংশের পরমাণ আরও অনেক বড় হতে পারে।’
৬. যাকাত বাবদ সংগৃহীত সম্পদের পরিমাণ স্বল্প হলে- যেমন খুব বড় সম্পদশালী নয় এমন এক ব্যক্তির দেয়া যাকাত- কেবল একটি খাতেই তা নিয়োগ করা যাবে। নখ্য়ী ও আবূ সওর তা-ই বলেছৈন। বরং তা এক ব্যক্তিকেই দিতে হবে, যেমন ইমাম আূ হানীফা বলেছেন। কেননা এই সামান্য পরিমাণ সম্পদ বহু কয়টি খাতে কিংবা একই খাতের বহু লোকের মধ্যে বন্টন করা হলে যাকাত থেকে যে ফায়দাটা পাওয়ার আশা, তা-ই ব্যাহত হয়ে পড়বে। পূর্বে ‘ফকীর’ ও মিসকীন’ খাতে যাকাত দিয়ে সচ্ছল করে দেয়া পর্যায়ে ইমাম শাফেয়ীর অগ্রাধিকার দানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিপুল সংখ্যাক ব্যক্তির মধ্যে প্রত্যেককে একটি-দুটি করে ‘দিরহাম’ বন্টনের তুলনায় তা অনেক উত্তম। কেননা এই শোষোক্ত পন্থা গ্রহণ করা হলে কারুরই কোন উপকার হবে না, কারুর জন্য যথেষ্টও হবে না।
এই ব্যবস্থা তখনকার জন্যে যখন উপস্থিতির সংখ্যা কম হলেও খুব বেশি সাহায্যের প্রয়োজনসম্পন্ন লোক খুব বেশি হবে না। তা যদি হয়, তাহলেতা তখন সেই অনুপাতে বন্টন করাই অধিক উত্তম হবে।
নবম পরিচ্ছেদ
যেসব খাতে যাকাত ব্যয় করা হবে না
‘যাকাত’ একটি বিশেষ ধরনও ভাবধারাসম্পন্ন ‘কর’ বিশেষ। তা ব্যক্তি ও সমষ্টির এবং মানব-বিশ্বের জীবন ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যসমূহ সম্মুখে রেখে তার বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে বিধিবদ্ধ করা হয়েছে।
তাই কোন ব্যক্তিরই তা পাওয়ার যোগ্য অধিকারী না হয়ে তা থেকে একবিন্দু গ্রহণ করার অধিকার থাকতে পারে না। ধন-মালের মালিক বা সরকার কর্তার পক্ষেও নিজ ইচ্ছেমত ও উপযুক্ত খাত তালাশ না করে তার ব্যয় করাররও কোন অধিকার স্বীকৃত নয়।
এই কারণে ফিকাহ্বিদগণ শর্ত করেছেন যে, যাকাত গ্রহণকারী ব্যক্তি সে সব পর্যায়ের লোক হতে পারবে না, যাদের জন্যে যাকাত হারাম হওয়ার অকাট্য দলিল প্রমাণ উপস্থিত হয়েছে এবং যাকাত ব্যয়ের জন্যে তাদেরকে সহীহ ও উপযুক্ত খাতরূপে গণ্য করেনি।
যাদের জন্যে যাকাত গ্রহণ হারাম ঘোষিত হয়েছে, তারা মোটামুটি এই:
১. ধনী সচ্ছল লোকেরা
২. শক্তিসম্পন্ন উপার্জনকারী লোক
৩. নাস্তিক, আল্লাহ-দ্রোহী, ইসলামের সাথে শত্রুতাকারী, বিরোধিতাকারী, প্রতিবন্ধকতাকারী লোক। সর্বসম্মতভাবে এই লোকেরা যাকাত পেতে পারে না। আর জমহুর ফিকাহ্বিদদের মতে যিম্মিরাও যাকাত পাবে না।
৪. যাকাতদাতার সন্তানেরা, তার পিতামাতা এবং তার স্ত্রী (তার নিকট থেকে যাকাত নিদে পারবে না- অনুবাদক)। এ ছাড়া অন্যান্য নিকটাত্মীয় পাবে যদিও এই ব্যাপারে বিভিন্ন মত রয়েছে এবং তা বিস্তারিত আলোচনা সাপেক্ষ।
৫. নবী করীম (স)-এর ঘর-পরিবার বংশধর। বনু হাশেম গোত্রের লোকমাত্রই। অথবা বনু হাশেম ও বনু মুত্তালিব। এ বিষয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। পরবর্তী আলোচনায় আমরা এ পর্যায়ে বিস্তারিত কথা বলব।
প্রথম আলোচনা
‘ফকীর ও মিসকীন’ পর্যায়ের আলোচনায় আমরা উল্লেখ করে এসেছি যে, ‘ফকীর ও মিসকীন’ খাতের জন্যে নির্দিষ্ট অংশের যাকাত কোন ধনী ব্যক্তিকে দেয়া যাবে না। এ বিষয়ে ইসলামের সকল ফিকাহ্বিদই সম্পূর্ণরূপে একমত। কেননা নবী করীম (স) বলেছেন: ধনীর পক্ষেযাকাত গ্রহণ হালাল নয়। [হাদীসদ্বয়ের উৎসের উল্লেখও তথায় করা হয়েছে।] তিনি হযরত মুয়ায (রা)-কে বলেছিলেন: ‘যাকাত ধনীদের নিকট থেকে নেয়া হবে ও তাদের সমাজের গরীব লোকদের মধ্যে বন্টন করা হবে’। [হাদীসদ্বয়ের উৎসের উল্লেখও তথায় করা হয়েছে।]
তাঁরা বলেছেন: যাকাত ধনী লোকদের দেয়া হলে তা ফরয করার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।কেননা সে উদ্দেশ্য হচ্ছে, তা দিয়ে গরীব লোকদের ধনী বানানো। কিন্তু ধনীদের তা দিলে এই উদ্দেশ্যটা পূরণ হতে পারে না।
এ পর্যায়ে ফিকাহ্বিদগণের পূর্ণ ঐকমত্য থাকা সত্ত্বেও ‘ধনী’ কাকে বলে- কোন ধনীকে যাকাত দেযা নিষেধ এবং তা গ্রহণ করা কোন ‘ধনী’র পক্ষে হারাম তা নির্ধারণে তাঁরা বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। আর এ পর্যায়ের যাবতীয় কথাবার্তাও আমরা ‘ফকীর-মিসকীন’ খাতের বিশদ আলোচনায় উল্লেখ করেছি। তা আবার দেখে নেয়া যেতে পারে।
অন্যান্য খাতসমূহ সম্পর্কেও ফিকাহ্বিদদের বিভিন্ন মত রয়েছে। ইমাম আবূ হানীফা বলেছেন: ধনীকে যাকাত দেয়া যাবে না, যদিও সে ‘ফী-সাবীলিল্লাহ’ হয় কিংবা হয় ঋণগ্রস্ত পারস্পরিক বিবাদ মীমাংস করা দরুন। হযরত মুয়ায ও অপর হাদীসটি অনুযায়ী আমল করার জন্যে এই মত গ্রহণ করা হয়েছে।
তারা যাকাত সংস্থার কর্মচারী ছাড়া উক্ত নিষেধ থেকে আর কাউকে বাদ দেন নি। কেননা কর্মচারী যা নেবে তা তার কাজের পারিশ্রমিক স্বরূপ। ‘মুয়াল্লাফঅতুল কুলুবুহম’কেও বাদ দেয়া হয়েছে উক্ত নিষেধের আওতা থেকে।কিন্তু তাঁরা যেমন বলেছৈন, ইসলামের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার লাভের দরুন এই খাতটিই বাতিল হয়ে গেছে। [দেখুন: (আরবী *********)]
অন্যান্য ইমাম মত দিয়েছেন: যাকাত কেবল ‘ফকীর’ দরিদ্রদের মধ্যে বন্টন করাকে একমাত্র খাত হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে হযরত মুয়ায সংক্রান্ত হাদীসের ভিত্তিতে। কেননা যাকাত ফরয করার লক্ষ্যই হল ‘গরীব জনগণকে সচ্ছল বানানো’।
যাকাত যদি ‘ফকীর’ ও ‘মিসকীন’ ছাড়া অন্য কাউকে না দেয়া যায় তাহলে সূরা তওবার আয়াতে এ দুটো খাতের উল্লেখের পর আরও ছয়টি খাতের উল্লেখ করার কোন অর্থ হয় না।
যাকাত কর্মচারী ও ‘ইবনুস-সাবীল’ নিজ দেশে ধনী হলেও এই নিষেধাজ্ঞা থেকে তাদেরকে মুক্ত মনে করা হয়েছে, তেমনি যোদ্ধাকে- যার জন্যে সরকারীভাবে কোন বেতন ধার্য করা হয়নি এবং পারস্পরিক বিবাদ মীমাংসার্থে ঋণগ্রস্ত হওয়া ব্যক্তিকেও তোমরা উক্ত নিষেধাজ্ঝা থেকে বাদ দিতে পার।
সত্যি কথা হচ্ছে, যাকাত ব্যয়ের খাত সংক্রান্ত আয়াতে পাওয়ার যোগ্য লোকদের দুটি গোষ্ঠীকে একত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম গোষ্ঠী: যেসব মুসলমান অভাবগ্রস্ত, আর তারা হচ্ছে:
ফকীর, মিসকীন, ক্রীতদাসনিজেদের কাজের দরুন ঋণগ্রস্ত হওয়া ব্যক্তি ও ইবনুস-সাবীল। এদেরকে যাকাত দেয়া হবে তাদের অভাব ও মুখাপেক্ষীতার কারণে। তা পেয়েই তারা তাদের উপস্থিত প্রয়োজন মেটাতে পারে। আর দ্বিতীয় প্রকারের লোক তারা, যাদের প্রতি মুসলমানরা মুখাপেক্ষী।তারা হচ্ছে, যাকাত সংস্থার কর্মচারী, মুয়াল্লাফাতুল কুলুবুহুম, অন্যলোকদের কল্যাণার্থে ঋণগ্রস্ত হওয়া ব্যীক্ত এবং ফী-সাবীলিল্লাহ্ অর্থাৎ জিহাদে নিযুক্ত ব্যক্তিরা। এই লোকদেরকে যাকাত দেয়া যাবে, তারা দরিদ্র হোক, কি ধনী।
এ পর্যায়ে নবী করীম(স)-এর হাদীস বিস্তারিত ও আলাদা আলাদা করে কথা বলেছে: ‘ধনীর জন্যে যাকাত জায়েয নয় পাঁচ জন লোক ছাড়া-আল্লাহ্র পথে যোদ্ধা, কিংবা যাকাতের কর্মচারী, কিংবা ঋণগ্রস্ত ব্যীক্ত; অথবা এমন ব্যক্তির জন্যেও যে তা নিজের সম্পদ দ্বারা ক্রয় করেছে অথবা সেই ব্যক্তির জন্যও জায়েয, যার পা্রতিবেশী মিসকীন লোক। ‘সে মিসকীনকে সাদকাস্বরূপ দিল, মিসকীন তাকেহাদিয়াবা উপঢৌকন স্বরূপ দিল’। ইমাম নববী বলেছেন: এই হাদীসটি ‘হাসান’ বা সহীহ্। আবূ দাঊদ দুটো সূত্রে হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন। একটি সূত্র ‘মুরসাল’। আর অপরটি ধারাবাহিক। [(*****) গ্রন্থে (৬খণ্ড, ২০৬ পৃ.) লিখেছেন: উভয় সূত্রের হাদীসটির সনদ নির্ভরযোগ্য। বায়হাকী হাদীসটির সবগুলো সূত্রকে একত্রিত করেছেন। তাতে বলা হয়েছে, মালিক ও ইবনে উযাইনা দুজনই হাদীসটিকে ‘মুরসাল’ বলেছেন। আর মা’মর ও সওরী ধারাবাহিক সূত্র সমন্বিত বলেছেন। এরা দুজনই নির্ভরযোগ্য হাফেযে হাদীস পর্যায়ে গণ্য আর যে হাদীস ‘মুরসাল’ ও ‘মুত্তাসিল’ উভয় ধরনের বর্ণিত, সহীহ মতে তাকে ‘মুত্তাসিল’-ধারাবাহিক সনদসম্পন্ন মনে করতে হবে।]
ছোট বয়সের ধনী পুত্র পিতাকেও ধনী করে দেয়
‘ধনী’র পক্ষে দারিদ্র্য অভাব-অনটনের কারণ যাকাত গ্রহণে হালাল নয়, কেননা মানুষ কখনও নিজেই ধনীথাকে, আবার কখনও অপর ব্যক্তির ধনী হওয়ার কারণে ধনী হয়ে যায়।
ছোট বয়সের সন্তানকে ধনীই মনে করতে হবে, যদি তার পিতা ধনী হয়। এক্ষেত্রে পুরুষ ও মেয়ের মধ্যে কোনই পার্থক্য নেই। তবে বড় বয়সের লোক যদি দরিদ্র হয় তাহলে ভিন্ন কথা। কেননা তার পিতার সচ্ছলতা তাকে ধনী বানিয়ে দেবে না- যদি তার যাবতীয় ব্যয়ভার তাকেই বহন করতে হয়। যেমন দরিদ্র মেয়ে, যার স্বামী নেই ও দরিদ্র পুত্র-উপার্জনে অক্ষম। [দেখুন: (আরবী *********)]
দরিদ্র মেয়েলোক স্বামীর ধনাঢ্যতার দরুন ধনী গণ্য হতে পারে। কেননা জানা মতে ও শরীয়াতের দৃষ্টিতে সে তো তার সাথেতই সম্পৃক্ত। তার হিসাব-নিকাশ স্বামীর ওপর অর্পিত। স্বামীর দেযা যথেষ্ট মাত্রার খরচ ব্যবস্থা তার জন্যে রয়েছে। কাজেই তাকে যাকাত দেয়া জায়েয হবে না। কেননা কার্যত তো তা ধনী স্বামীকেই দেয়া হবে, যা জায়েয নয়।
ইমাম আবূ হানীফার দেয়া বাহ্যিক মতে ধনী ব্যক্তির স্ত্রীকে যাকাত দেয়া জায়েয করে, স্বামী তার জন্যে যাবতীয ব্যয়ের ব্যবস্থা করে দিয়ে থাক আর না-ই থাক। ইমাম আবূ ইউসুফের মত হচ্ছে, তা জায়েয নয়। কেননা তার স্বামী ধনী ব্যক্তি, স্ত্রী যাবতীয় ব্যয়ভার যথেষ্ট মাত্রায় বহন তার করত্ব্য।তার মোটমুটি অবস্থা সচ্ছলতাপূর্ণ হোক কিংবা দারিদ্র্যের চাপে সংকীর্ণতাপূর্ণ। সেই স্ত্রীকে যাকাত দেয়া কার্যত ধনী অল্প বয়সী সন্তানকে দেয়ার মতই। [ঐ, (আরবী *********)এবং ] আর হানাফী আলিমগণ ধনী লোকের স্ত্রী ও তার সন্তানের মধ্যে পার্থক্য করেছেন এজন্যেযে, স্ত্রীর যাবতীয ব্যয়ভার স্বামী কর্তৃক বহন তো স্ত্রীর ‘পারিশ্রমিক’ স্বরূপ। ছোট বয়সের সন্তানের ব্যয়ভার বহন করা ওয়অজিব হওয়া তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। কেননা সন্তান তো ধনী ব্যক্তির অংশ-ঔরসজাত। তার ব্যয়ভার বহন নিজের ব্যয়ভার বহনের মতই। কাজেই তাকে যাকাত দেয়া আসলে ধনী ব্যীক্তকে যাকাত দেযঅর মতই ব্যাপর। [(আরবী *********)]
শাফেয়ী মাযহাবের কোন কোন আলিম ধনী ব্যক্তির দরিদ্র স্ত্রীকে এবং তার দরিদ্র সন্তানকে যাকাত দেয়া জায়েয বলেছেন, স্বামী ও পিতার যাবতীয় ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও। অন্যরা এর বিরোধিতা করেছেন। এ পর্যায়ে বহু কয়টি মত রয়েছে। [(আরবী *********)]
তন্মধ্যে একটি মত হচ্ছে, সন্তান বা স্ত্রী কিংবা অন্য নিকটাত্মীয়- যার যার ব্যয়ভার বহন কোন ধনী ব্যক্তির দায়িত্ববুক্ত হবে,তার জন্যে যাকাত হারাম। কেননা তার প্রয়েঅজন পূরণের দায়িত্ব তো গৃহীত হয়েছে। আর এটাই তার জন্যে যথেষ্ট। [(আরবী *********)]
মালিকী আলিমদের কথা হচ্ছে, যে ফকীর ব্যক্তির খরচ বহনের দায়িত্ব কোন ধনী ব্যক্তির ওপর অর্পিত, তার জন্যে যাকাত হারাম- কার্যত সে ব্যয়ভার বহন না করা হলেও। কেননা সে তা গ্রহণ করতে সক্ষম বিচার বিভাগের রায় বা আনুকূল্য নিয়ে। কিন্তু সেই ধনী ব্যক্তির ওপর দাবির মামলা যদি দায়ের না হতে পারে কিংবা তার ওপর রায় কার্যকর করা যদি কঠিন বা অসম্ভব হয়, তাহলে অবশ্য ভিন্ন কথা হবে। [দেখুন: (আরবী *********)]
আমি পূর্বে যা বলেছি, আমার মতে সেটাই অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। তা হচ্ছে, ছোট বয়সের সন্তান ও স্ত্রী পিতা ও স্বামীর ধনাঢ্যতার দরুন ‘ধনী’ গণ্য হবে। কেননা সন্তান পিতার সাথে ও স্ত্রী স্বামীর সাথে এতই একাত্ম যে, তা কোনক্রমেই বিচ্ছিন্ন করা যায় না। এই দুজনের ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব পালন ওয়াজিব করে দেয়া হয়েছে কুরআন ও সুন্নাহ উভয় দলিলেই। এরা দুজনই এমন যে, তাদের প্রয়েঅজন যথেষ্ট মাত্রায় পূরণের দায়িত্ব স্থায়ী বাধ্যতামূরক ও অপরিহার্যভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। অতএব এ দুজনকে যাকাত দেয়া জায়েয নয় এবং দুজনের পক্ষে তা গ্রহণ করাও হালাল নয়। তবে অন্যান্যসব নিকটাত্মীয়ের ব্যাপরটা এরূপ নয়। সরকারই তাদের জন্যে যাকাত বা অন্যান্য সরকারী আয়ের ফাণ্ড থেকে যাবতীয় ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব পালন করবে এবং তাদেরকে তাদের নিকটাত্মীয়ের ব্যয়ভার বহন থেকে মুক্ত করে দেবে। মুসলিম ব্যক্তিদের পক্ষে তাদের যাকাত থেকেও এমন পরিমাণ দেয়া জায়েয হবে যদ্দ্বারা প্রাপ্ত সম্পদ দ্বারা অপূরণ থাকা প্রয়োজনগুলো পূরণের ব্যবস্থা করবে। অথবা সে ব্যয়ভার বহন থেকে সম্পূর্ণ মাত্রায় মুখাপেক্ষীহীন বানিয়ে দেবে। এ কথা সত্য তাঁদের মত অনুযায়ীও যাঁরা বলেন যে, ফকীর ও মিসকীনকে সারা জীবনের জন্যে যথেষ্ট পরিমাণ দিতে হবে। [পূর্ববর্তী অধ্যায়ের আলোচনা: ‘ফকীর-মিসকীনকে কত পরিমাণ যাকাত দেয়া হবে’ দ্রষ্টব্য।]
দ্বিতীয় আলোচনা
উপার্জনশীল শক্তিসম্পন্ন লোক
হাদীসসমূহে ধনী লোকদের জন্যে যাকাত হারাম হওয়ার কথা যেমন বলা হয়েছে, তেমনি বলা হয়েছে শক্তিমান ভারসাম্যপূর্ণ দেহাঙ্গের অধিকারী ব্যক্তির ওপর যাকাত হারাম হওয়ার কথা। কেননা তার দেহ সর্বপ্রকার পঙ্গুত্ব ও অক্ষমতামুক্ত। এই শক্তিমান ব্যক্তির ওপর যাকাত হারাম করা হয়েছে এজন্যে যে, এই ব্যক্তি কাজ করবে, নিজের প্রয়োজন নিজেই যথেষ্ট মাত্রায় পূরণ করবে, বেকার নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকবে না ও দান-সাদকা পাওয়ার ওপরও নির্ভরশীল হবে না, এটাই তো কাম্য। তবে লোকটি যদি স্বাস্থ্যসম্পন্ন হয়, কিন্তু উপার্জনের সুযোগ বা কাজ না পায়, তাহলেসে ‘মা’যু’র বটে; যাকাতহ দিয়ে তার সাহায্য করাই বাঞ্ছনীয়- এটা তার অধিকারও, যতক্ষণ পর্যন্ত সে উপযুক্ত কোন কাজ না পাবে। অপর একটি হাদীসে বলা হয়েছে:
(আরবী *********)
ধনী ও শক্তিমান উপার্জনশীল ব্যক্তির জন্যে যাকাতের কোন অংশ থাকতে পারে না।
‘ফকীর’ ‘মিসকীন’ পর্যায়ের আলোচনায় এই কথাটি বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে।
হানাফী আলিমগণ এই মতের বিরোধিতা করেছেন। তাঁরা বলেছৈন: নিসাব-পরিমাণ কম সম্পদের মালিককে- সে সুস্বাস্থ্যবান উপার্জনশীলহলেও- যাকাত দেয়া জায়েয হবে। কেননা সে তো ‘ফকীর’। আর ‘ফকীর’ হল যাকাতরে একটা নির্দিষ্ট ব্যয়ক্ষেত্র। তা ছাড়া প্রকৃত প্রয়োজনটা তার দ্বারা পূরণ হতে পারছে না। তাই তার দলিলের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে যে, নিসাব-পরিমাণ সম্পদের অনুপস্থিতিই যাকাত পাওয়ার অধিকার সৃষ্টি করে। ইবনুল হুম্মাম বলেছেন: ‘অনেকের মতেই উপার্জনশীল লোকদের পক্ষেযাকাত নেয়া জায়েয নয়।’ দলিলটা হচ্ছে উপরে উদ্বৃত সেই হাদীস। নবীকরীম(স) বলেছৈন, ‘ধনী ও সুস্থ দেহধারী ব্যক্তির জন্যে যাকাত হালাল নয়। আর যে দুজন লোক তার নিকট যাকাত চেয়েছিল, তিনি তাদেরকে মোটা সোটা স্বাস্থ্যবান ব্যক্তি দেখতে পেয়ে বলেছিলেন, ‘আসলে তো তোমাদের দুজনের কোন অধিকার নেই যাকাত পাওয়ার। তা সত্ত্বেও তোমরা চাইলে আমি তোমাদের দেব।’ এর জবাবস্বরূপ বলেছেন, দ্বিতীয় হাদীসটি প্রমাণ করছে: এর তাৎপর্য হচ্ছে, তাদরে দুজনের চাওয়াটাই হারাম। কেননা নবী করীম (স) বলেছিলেন:
‘তোমরা দুজনে চাইলে আমি তোমাদের দেব।’ গ্রহণ করা হারাম হলে এরূপ বলতেন না। [ দেখুন (আরবী *********)]
পূর্বেও এ হাদীসটি উদ্ধৃত এবং আলোচিত হয়েছে।তাতে আছে, ‘তোমরা দুজনে চাইলে আমি তোমাদের দুজনকে দেব’ আর ‘এতে ধনী ও শক্তিমান উপার্জনশীল ব্যক্তির জন্যে কোন অংশ নেই’। তাদেরকে একথা বলেছিলেন এজন্যে যে, তাদের প্রকৃত অবস্থা তাঁর জানা ছিল না। আর সব স্বাস্থ্যবান ব্যক্তিই তো আর উপার্জনশীল হয় না, যা তার জন্যে যথেষ্ট হতে পারে। এ কারণে তাদের দিয়েছেন বটে; কিন্তু সেই সাথে তাদের নসীহতও করেছেন, নির্ভুল পথও দেখিয়েছেন এই বলে যে, ধনী ও উপার্জনশীল ব্যক্তির জন্যে যাকাতে কোন অংশ নেই।
এটা ইমাম আবূ উবাইদের পসন্দ করা মত। কেননা নবীকরীম(স) ধনাঢ্যতা ও উপার্জন ক্ষমতার ভিত্তিস্বরূপ ঘোষণা করেছেন, যদিও সব শক্তিমান ব্যক্তিই ধনশালী হয় না। এক্ষণে তারা দুজনেই সমান। তবে এই শক্তিমান ব্যক্তি যদি পেশা গ্রহণ সত্ত্বেও- রিযিক সন্ধান করেও তা পায় না বলে- রিযিক থেকে বঞ্চিত বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে থাকে, সে তার পরিবারবর্গের জন্যে উপার্জনে প্রাণপণে চেষ্টা করে যাচ্ছে। তা সত্ত্বেও চাহিদা তাকে অক্ষম করে রেখেছে। অবস্থা যদি এরূপ হয়, তাহলে তখন মুসলিম জনগণের ধন-মালে তার হক ও হিস্সা রয়েছে। কেননা আল্লাহ বলেছেন:
(আরবী *********)
তাদের ধন-মালে তাদের জন্যে অংশ রয়েছে।
হযরত ইবনে আব্বাস থেকে এই আয়াত পর্যায়ে বর্ণিত হয়েছে: (***) হচ্ছে, যারা উপার্জনের পেশা গ্রহণকারী লোক হওয়া সত্ত্বেও প্রয়োজন পরিমাণ উপর্জন করতে পাছে না। [(আরবী *********)]
তৃতীয় আলোচনা
অমুসলিমকে যাকাত দেয়া যায় কি
নাস্তিক, দ্বীন-ত্যাগকারী ও ইসলামের সাথে যুদ্ধকারীকে যাকাত দেয়া যাবে না
মুসলিম উম্মত এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ একমত যে, কাফির, মুসলিমদের সাথে যুধ্যমান লোকদের যাকাতের একবিন্দও দেয়া যাবে না। [এই ইজমা’র কথা (****) গ্রন্থের ২য় খণ্ডের ১৮৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে।]
এই ইজমা (ঐকমত্যের) প্রমাণ ও ভিত্তি হচ্ছে আল্লাহ্র কথা:
(আরবী *********)
তোমাদেরকে সে সব লোকের সাথে যারা তোমাদের সাথে দ্বীনের ব্যাপারে যুদ্ধ করেছে, তোমাদেরকে তোমাদের ঘর-বাড়ি থেকে বহিষ্কার করেছে এবং তোমাদেরকে বহিষ্কৃত করার ব্যাপারে খুব বেশি বাড়াবাড়ি করেছে, তাদের সাথে বন্ধুত্ব করা থেকে নিষেধ করা হচ্ছে। যারাই তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, তারাই জালিম।
আরও এজন্য যে, তারা ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। ওরা প্রকৃত সত্যের দুশমন, সত্যের ধারকদের শত্রু। তাদের প্রতি যে সাহায্যই করা হবে, তা-ই খঞ্জর হয়ে দ্বীনকে ক্ষত-বিক্ষত করবে। তার দ্বারা মুসলমানদের হত্যা করবে। আর নিজেকে হত্যা করা ও তাদের পবিত্র স্থানসমূহের ওপর সীমালংঘনমূলক কার্যকলাপ করার জন্য কাউকে নিজেদের ধন-মাল দেয়া, না ধর্মের কথা হতে পারে, না এটা বিবেকসম্মত হতে পারে।
মুলহিদ-নাস্তিকের ব্যাপারটাও তদ্রূপ। সে তো আল্লাহ্কেই অস্বীকার করে। নবুয়ত ও পরকালকে করে সম্পূর্ণ অবিশ্বাস। দ্বীনের বিরুদ্ধে লড়াই করা তো তার স্বাভাবিক প্রবণতা হবে। অতএব এই দ্বীনের ধন-মাল থেকে কিছুতেই দেয়া যেতে পারে না।
অনুরূপভাবে ইসলাম থেকে মুর্তাদ- দ্বীন ত্যাগকারী হয়ে বের হয়ে যাওয়া ব্যক্তিকেও যাকাত দেয়া যেতে পারে না। কেননা সে তো ইসলামের মধ্যে ছিল, পরে সে বের হয়ে গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এই ব্যক্তি বেঁচে থাকারই অধিকারী নয়। সে দ্বীন ত্যাগ করে মহাঅপরাধ করেছে। মুসলিম সমাজকেও সে প্রত্যাখ্যান করেছে। এজন্যেই নবী করীম(স) বলেছেন: (আরবী *********)
যে লোক দ্বীন ত্যাগ করেছে তাকে তোমরা হত্যা কর।
যিম্মীদের যাকাত দেয়া
ইসলামী রাষ্ট্রের অনুগত অমুসলিম নাগরিকদের মধ্যে যারা আহ্লি কিতাব আর যারা অনুরূপ কোন ধর্মে বিশ্বাসী-অনুসারী- যারা মুসলিম সমাজের মধ্যে বসবাস করছে, যারা মুসলমানদের দায়িত্বাধীন হয়ে গেছে, মুসলমানদের রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকার করেছে, ইসলামের দেশীয় আইন বিধান (Law of the land) তাদের ওপর জারি করার অণুমতি দিয়েছে ও এই সূত্রের দারুল-ইসলামের অধীনতা অর্জন করেছে অথবা অনুরূপ ‘নাগিরকত্ব’ (Citizenship) লাভ করেছে, তাদের জন্যে যাকাত সাদকা ব্যয় করার ব্যাপারে বহু মতবিরোধ রয়েছে, তা বহু দীর্ঘ আলোচনা সাপেক্ষ। এখানে তা তুলে ধরছি।
‘নফল সাদকা’ দান
মুসলমানদের নফল দান-খয়রাত অমুসলিমদের দেয়ায় কোনই নিষেধ নেই, দোষ নেই। এটা মানবতা ও মানবিকতার দৃষ্টিতেও যুক্তিসঙ্গত। মুসলমানদের সাথে তাদের যে চুক্তি রয়েছে, তার মর্যাদাটাও এতে রক্ষা পেতে পারে। ইসলামের প্রতি তাদের অবিশ্বাস-অস্বীকৃতি (***) তাদের প্রতি মুসলমানদের সদ্ব্যবহার ও দয়া-সহানুভূতি প্রদর্শন কিছুমাত্র প্রতিবন্ধক হতে পারে না। তবে তা ততদিন পর্যন্ত, যতদিন তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুধ্যমান হবে না। আল্লাহ্ নিজেই বলেছেন:
(আরবী *********)
আল্লাহ্ তোমাদিগকে সেই লোকদের ব্যাপারে নিষেধ করেছেন না যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেনি, তোমাদের ঘন-বাড়ি থেকে তোমাদের বহিষ্কৃত করেনি- এ দিক দিয়ে যে, তোমরা তাদের প্রতি ভাল কল্যাণমূলক আচরণ করবে ও তাদের প্রতি সুবিচার করবে। আল্লাহ্ নিশ্চয়ই সুবিচারকারীদের ভালবাসেন। [(আরবী *********)]
মুসলমানরা যখন তাদের মুশরিক নিকটাত্মীয়দের প্রতি ভাল ও শুভ আচরণ গ্রহণ করার ব্যপাপারে কুণ্ঠা বোধ করেছিলেন, তখন এই কুণ্ঠা রদ করার উদ্দেশ্যেই উক্ত আয়াতটি নাযিল হয়েছিল। এর পূর্বে হযরত ইবনে আব্বাসের বর্ণনাটি প্রনিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন: মুসলমানরা তাদের বংশের ও আত্মীয় মুশরিক লোকদেরকে দান-সাদকা দেয়াটা অপসন্দ করেছিলেন। এ বিষয়ে তাঁরা রাসূলে করীম(স)-কে প্রশ্নও করেছিলেন। তিনি তাঁদের অনুমতি দিয়েছিলেন এবং নিম্নোক্ত আয়াতটি তখন নাযিল হয়েছিল। [(আরবী *********)]
(আরবী *********)
হে নবী! তাদের হেদায়েত করে দেয়ার দায়িত্ব তোমার নয়, আসলে হেদায়েত আল্লাহ্ই করেন যাকে চান। আর তোমরা যে মাল ব্যয় কর, তা তোমাদের নিজেদের জন্যে আর তোমরা যা কিছু খরচ কর তা কর আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে। এভাবে তোমরা যা ব্যয় করবে, আল্লাহ্ তা তোমাদের প্রতিই পুরোপুরি ফিরিয়ে দেবেন। আর তোমাদের প্রতি কোন অবিচার করা হবে না। [(আরবী *********)]
‘তোমরা যা কিছু ব্যয় কর, তা কর কেবলমাত্র আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে’- এই আয়অতাংশের তাৎপর্যস্বরূপ ইবনে কাসীর লিখেছেন: ‘সাদকা দানকারী যদি আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে দান করে তা হলে তাতেই তার শুভ ফল আল্লাহ্ দেবেন; কিনতউ তা কে পেল, সে নেককার পরহেজগার ব্যক্তি, না পাপী, সে তা পাওয়ার যোগ্য কি অযোগ্য- এ ব্যাপারে তার ওপর কোন দায়িত্ব নেই। সে তার নিয়ত অনুযায়ীই সওয়াব পেয়ে যাবে। আয়াতের অপর অংশ তার দলিল, যাতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা যে মালই খরচ কর, তা তোমাদের প্রতি পূর্ণ করে ফিরিয়ে দেয়া হবে এবং তোমাদের প্রতি অবিচার করা হবে না।’ [(আরবী *********)]
তার বান্দাদের মধ্যে যারা নেককার, ভালো আচরণকারী, তিনি তাদের প্রশংসা করেছেন এই বলে:
(আরবী *********)
তারা তার-ই ভালবাসাস্বরূপ মিসকীন, ইয়াতীম ও বন্দীদের খাবার খাওয়ায়। [(আরবী *********)]
এই সময়কার বন্দী ছিল মুশরিক লোকেরা। হাসান প্রমুখ থেকে তা-ই বর্ণিত হয়েছে। [দেখুন: (আরবী *********)]
‘সাদকায়ে ফিতর’ থেকে দেয়া
নফল সাদকার মতই-কাচাকাছির-ই ‘সাদকায়ে ফিত্র’ কাফ্ফারা দেয়া ও মানত পুরা করা ইত্যাদি। ইমাম আবূ হানীফা, মুহাম্মাদ ও আর কয়েকজন ফিকাহ্বিদ উক্ত দানসমূহ ‘যিম্মী’দের দেয়ার অনুমতি দিয়েছেন। কেননা দলিল এই সাধারণ অনুমতির ধারক। যেমন আল্লাহ্ সাদকাত পর্যায়ে বলেছেন:
(আরবী *********)
তোমরা যদি সাদকা প্রকাশ্রভাবে দাও, তা-ও উত্তম। আর যদি তা গোপন কর এবং তা দাও ‘ফকীর’দের তাহলে তাও তোমাদের জন্য কল্যঅণকর।তা তোমাদের থেকে তোমাদের খারাপগুলো দূর করে দেবে। [(আরবী ***********)]
এ আয়াতে ‘ফকীর’ দরিদ্র্যদের মধ্যেকোন তারতম্য করা হয়নি। আর কাফ্ফারা’ পর্যায়ে আল্লাহ্ বলেছৈন:
(আরবী *********)
তাহলে তার কাফ্ফারা হবে দশজন মিসকীন খাওয়ানো- তোমরা তোমাদরে পরিবারবর্গের যে মধ্যম মানের খাবার দাও সেই রূপ খাবার। [(আরবী ***********)]
(আরবী *********) তারপরে যারা সমর্থ হবে না, তার জন্যে ষাটজন মিসকীন খাওয়ানোই হল কাফ্ফারা। [(আরবী ***********)]
এ সব আয়াতে মিসকীনের মধ্যে কোন পার্থক্য বা তারতম্য করা হয়নি। বিশেষ করে এজন্যে যে, এ কাজটি হল তাদের প্রতি কল্যাণ পৌঁছানো। আর এ কাজ থেকে আমাদের নিষেধ করা হয়নি।
তা সত্ত্বেও তাঁরা বলেছৈন, এ সব জিনিস মুসলিম সমাজের ফকীর মিসকীনদের দেয়া অতীব উত্তম কাজ, কোন সন্দেহ নেই। কেননা মুসলিমকে সাহায্য করা হবে আল্লাহ্র বন্দেগীর কাজে।
ইমাম আবূ হানীফা শর্ত করেছেন, সে অমুসলিম যেন মুসলমানদের দুশমন ও তাদের বিরুদ্ধে যুধ্যমান না হয়। কেননা সেরূপ ব্যক্তিকে সাহায্য দিলে তা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে তাদেরকে সাহায্য করা হবে। আর তা কখনই জায়েয হতে পারে না। [দেখুন: (আরবী ********)]
আবূ উবাইদ ও ইবনে আবূ শায়বা কোন কোন তাবেয়ী থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন: তাঁরা পাদ্রী-পুরোহিতদের সাদকায়ে ফিতরের অংশদিতেন। [দেখুন: (আরবী ***********) যে ইজমা’র কথা বলা হয়েছে, আসলে তা মুয়াল্লাফাতু কুলুবুহুম সম্পর্কে।]
জম্হুর ফিকাহ্বিদদের দৃষ্টিতে মালের যাকাত অমুসলিমকে দেয়া জায়েয নয়
কিন্তু মালের যাকাত- ওশর ও অর্ধ-ওশর দেয়ার ব্যাপারে আলিমসমাজের সংখ্যাগরিষ্ট দল এই মত দিয়েছেন: কোন অমুসিলমকে তা দেয়া জায়েয নয়। এমন কি, ইবনুল মুনযির বলেছৈন, এই মতের ওপর উম্মতের ‘ইজমা’ অনুষ্ঠিত হয়েছে যে, যিম্মীকে যাকাত দিলে তা আদায় হবে না। তবে সাদ্কায়ে ফিত্র-এর ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। [দেখুন: (আরবী ***********)যে ইজমা’র কথা বলা হয়েছে, আসলেতা মুয়াল্লাফাতুল কুলুবুহুম সম্পর্কে।]
জমহুর ফিকাহ্বিদগণ এ পর্যায়ে যে দলিল পেশ করেছেন, তার মধ্যে অধিক শক্তিশালী দলির হচ্ছে হযরত মুয়ায বর্ণিত হাদীস:
(আরবী ***********)
আল্লাহ তা’আলা তাদের ধন-মালে তাদের ওপর যাকাত ফরয করেছেন তা তাদের ধনীদের নিকট থেকে নেয়া হবে এবং তাদেরই গরীবদের মধ্যে বন্টন করা হবে।
এ হাদীসে যাদের- অর্থাৎ যে সমাজেরই ধনী লোকদের নিকট থেকে যাকাত নেয়া হবে, তাদেরই- অর্থাৎ সেই সমাজেরই গরীবদের মধ্যে তা বন্টন করতে হবে বলে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর তারা (যাকাতদাতাগণ) হচ্ছে সব মুসলিম। অতএব তাদের ছাড়া অমুসলিম গরীবদের যাকাত দেয়া জায়েয হতে পারে না।
‘ইজমা’ হওয়ার দাবির পর্যালোচনা
কিন্তু ইবনুল মুনযির যে ইজমার দাবি করেছেন, তা এখানে অগ্রহণযোগ্য। অন্যরা ইবনে সিরীন ও জুহ্রী থেকে বর্ণনা করেছেন, তাঁরা দুজন কাফিরদের যাকাত দেয়া জায়েয বলেছৈন। [(আরবী ***********)]
সারাখসী ‘আল-মাবসূত’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, আবূ হানীফার সঙ্গী ইমাম জুফর যিম্মীকে যাকাত দেয়া জায়েয বলেছৈন। সারাখসী বলেছৈন, এটা কিয়াস মাত্র। কেননা ফকীর-অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিকে আল্লাহ্র নৈকট্য ও গনিষ্ঠতা লাভের পথে ধনী বানিয়ে দেয়াই লক্ষ্য। আর তা এখানে অীর্জত হয়েছে। কিন্তু মুয়ায বর্ণিত হাদীসের দলির দ্বারা জুফার-এর কথা প্রতিবাদ করেছন। [দেখুন: (আরবী ***********)]
ইবনে আবূ শায়বা হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন, তাকে সাদকা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তা কাকে দেয়া হবে। তিনি বললেন:
তোমাদের মিল্লাতের মধ্রকার মুসলিম ও যিম্মিগণকে দেবে। আরও বলেছেন, নবী করীম (স) যিম্মীদের মধ্যে সাদকা ও লব্ধ এক-পঞ্চমাংশ বন্টন করে দিতেন। [(আরবী ***********)]
বাহ্যত প্রশ্নটি থেকে বোঝা যায় যে, তা ছিল ফরয সাদকা অর্থাৎ যাকাত সম্পর্কে। অবশ্য সেই সাথে নফল সাদকার বিষয়েও হতে পারে। এতদসত্ত্বেও নবী করীম (স)-এর নিকট জমা করা হত ও তা থেকে যোগ্য লোকদের মধ্যে বন্টন করা হত যেসব সাদ্কাত তা প্রধানত যাকাত সম্পদই।কিন্তু এ হাদীসটি মুরসাল।
ইবনে আবূ শায়বা তার সনদে হযরত উমর থেকে যাকাতের আয়অত [সূরা তওবা- ৬০ আয়াত] সম্পর্কে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, এরা হচ্ছে সমকালীন আহলি কিতাব। [(আরবী ***********)]
উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলীর মধ্যে একটা ঘটনা ইমাম ইউসুফ উদ্ধৃত করেছেন। হযরত উমর (রা) একজন বৃদ্ধ ইয়াহুদীর জন্যে মুসলমানদের বায়তুলমাল থেকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সাহায্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। তাঁর দলিল ছিল কুরআনের আয়অত:
(আরবী ***********) এই মিসকীনরা আহলি কিতাব থেকে। [দেখুন: (আরবী ***********) বালাযুরী ইতিহাস গ্রন্থে এই বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন (১৭৭পৃ.)। উমর ইবনুল খাত্তাব দামেশকের আল-জাবীরা নামক স্থানে খৃস্টান কুষ্ঠ রোগগ্রস্ত লোকদের নিকট উপস্থিত হলেন। তিনি তাদের জন্যে সাদকাত ও খাদ্য যোগাড় করে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। এই সাদকাত বলতে বাহ্যত যাকাতই মনে করা যায়। কেননা তা-ই কেবল রাষ্ট্র ব্যবস্থার অধীন হয়। তা হলেই তা থেকে খাদ্য ব্যবস্থা করা চলে।]
‘রওজুননজীর’ গ্রন্থ [দ্বিতীয় খণ্ড, ৪২৫ পৃ.] প্রণেতা ইবনে আবূ শায়বার হযরত উমর সম্পর্কিত বর্ণনা উদ্ধৃত করার পর লিখেছেন: ‘এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, হযরত উমর (রা) আহলি কিতাব লোকদেরকে যাকাত দেয়া জায়েয মনে করতেন।’ ‘আল-মানার’ তাফসীর লেখক জায়দীরা থেকে অনুরূপ উদ্ধৃত করেছেন। এবং (****)[(আরবী ***********)] গ্রন্থে জুহরী ও ইবনে সিরীন থেকে এই বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে। বলেছৈন: আয়াতে ‘আল-ফুকারা’ শব্দটি সাধারণ অর্থবোধক ও নির্বিশেষ এটাই তাদের দলিল।
তাবারী [(আরবী ***********)] ইকরামা থেকে উক্ত আয়াত পর্যায়ে এই মত উদ্ধৃত করেছেন মুসলিম ফকীরদেরকে এই মিসকীন মনে করো না। এরা হচ্ছে আহলি কিতাবের মিসকীন। [আবূ জুহ্রা, আবদুর রহমান হাসান ও খাল্লাফ এই তাফসীর পর্যায়ে মত প্রকাশ করেছেন: তিনি বলেন যে, উক্ত আয়াতে মিসকীন বলতে আহলি কিতাবের মিসকীন বোঝানো হয়েছে, তিনি দুটি কায়দা করে দিচ্ছেন। একটি হচ্ছে, ফকীর ও মিসকীন দুটি পরস্পর পার্থক্যপূর্ণ জনগোষ্ঠী। আয়াতের একটির উল্লেখ করা হলে অপরটির উল্লেখ আপনা আপনি হয়ে যেত না আর দ্বিতীয় হচ্ছে, যিম্মীদের মধ্যে যারা মিসকীন তাদেরকে যাকাত দেয়া জায়েয হয়ে যায় এই শর্তে যে, তারা নিঃশর্তে উপার্জনে অক্ষম হলে তা পাবে। কেননা সক্ষম যিম্মীদের নিকটথেকে তো জিযিয়া আদায় করা হবে। আর তাদের নিকট থেকে জিযিয়া নেয়া হবে আর যাকাতও তাদের দেয়া হবে, এটা বোধগম্য নয়। দেখুন: (আরবী ***********)]
এই পর্যায়ে কেউ কেউ যিম্মীকে যাকাত দেয়ার ব্যাপারে এই শর্ত আরোপ করেছেন যে, যাকাতদাতা যদি যাকাত গ্রহণকারী মুসলমান না পায়, তবেই তা জায়েয হবে। আল জাস্সাস উবায়দুল্লাহ্ ইবনুল হাসান থেকে তা-ই বর্ণনা করেছেন। [(আরবী ***********)] আবাদীয়া গোষ্ঠীর কোন কোন লোকেরও এই কথা। [(আরবী ***********)]
তুলনা ও অগ্রাধিকার দান
আমরা বলব, জমহুর ফিকাহ্বিদগণ তাদের মতের সমর্থনে যে অধিক শক্তিশালী দলিলের উল্লেখ করেছেন, তা হচ্ছে হযরত মুয়াযের হাদীস। হাদীসটি যে সহীহ্, সে বিষয়ে সকলেই সম্পূর্ণ একমত। কিন্তু যে কথা প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে হাদীসটির উল্লেখ করেছেন, তা অকাট্য নয়। হাদীসটি এই সম্ভাবনা তুলে ধরে যে, প্রতিটি অঞ্চলের ধনী লোকদের থেকে যাকাত গ্রহণ করা হবে এবং তা তাদেরই ফকীর লোকদের মধ্যে বন্টন করা হবে। এরা সকলে অঞ্চল স্বাদেশিকতা ও প্রতিবেশীরবিচারে সেই ধনী লোকদেরই দরিদ্র জনগণ গণ্য হবে। এখান থেকেই তাঁরা এ হাদীসকে দলিলরূপে পেশ করেছেন এ কথা প্রমাণের জন্যে যে, এক শহর বা ঞ্চলের যাকাত সেখান থেকে অন্য শহর বা অঞ্চলে তুলে নেয়া জায়েয নয়।
সাদকায়ে ফিতর ও অনুরূপ অন্যান্য সাদকা ব্যয় করা জায়েয হওয়ার পক্ষে হানাফী আলিমগণ যেসব দলিলের উল্লেখ করেছেন তন্মধ্যে সেই সব আয়াতের নিঃশর্ত তাৎপর্যও রয়েছে, যাতে ফকীর লোকদের মধ্যে কোনরূপ পার্থক্যের সৃষ্টি করা হয়নি। সে দৃষ্টিতে সব মিসকীনই সম্পূর্ণ সমান ও অভিন্ন। হযরত উমর, জুহ্রী, ইবনে সিরীন, ইকরামা, জাবির ইবনে জায়দ ও জুফার থেকে যা বর্ণিত হয়েছে, উক্ত দলিল তারও সাক্ষী। সূরা আল-মুমতাহিনা’র আয়াত বলছে:
‘যেসব লোক তোমাদের বিরুদ্ধে দ্বীনের ব্যাপারে যুদ্ধ করেনি এবংতোমাদেরকে তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বহিষ্কৃতও করেনি, তাদের সাথে তোমরা ভাল ব্যবহার করবে, আল্লাহ্ তোমাদেরকে তা থেকে নিষেধ করছেন না।’ তাঁরা বলেছেন: ‘এই আয়াতটির বাহ্যিক অর্থ যিম্মীদের প্রতি যাকাত ব্যয় করার জায়েয হওয়ার দাবি করে। কেননা যাকাত দেয়াটা তাদের প্রতি একটা ভালো ব্যবহারই বটে, যদিও মুয়াযের হাদীসথেকে তা প্রমাণিত হয় না। [ দেখুন: (আরবী ***********)]
অথচ আমাদের নিকট এ কথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, মুয়ায বর্ণিত হাদীসটি অপর দলিলের নিঃশর্ততা ও সাধারণত্বের পরিপন্থী নয়। আর হযরত উমর (****) আয়াতের তাৎপর্যে মনে করেছেন যে, এর মধ্যে মুসলিম অমুসলিম উভয়ই সমানভাবে শামিল রয়েছে।
দলিলসমূহের পারস্পরিক তুলনা থেকে আমার মনে হচ্ছে, যাকাতের ব্যাপরে আসল কথা হল, তা প্রথমত কেবল মুসলিম ফকীর-মিসকীনকেই দিতে হবে। কেননা তা বিশেষভাবে মুসলিম ধনী লোকদের ওপরই ধার্য করা ফরয বিশেষ। কিন্তু যাকাত সম্পদে প্রশস্ততা ও বিপুলতা থাকলে এবং মুসলিম ফকীরদের কোন ক্ষতি না হলে যিম্মী ফকীরকে দিতে নিষেধ বা বাধা কিছু নেই। এ ব্যাপারে আয়অতটির সাধারণ ও নিঃশর্ত তাৎপর্যই আমাদের জন্যে যথেষ্ট দলিল। হযরত উমরের আমল(বাস্তব কাজ) কম দলিল নয়। এ ছাড়া রয়েছে ফিকাহ্বিদদের রায় ও অভিমত। বস্তুত এই ধরনের একটা উচ্চতর বদানস্যতা ও মহানুভবতা ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্মই উপস্থাপিত বা প্রবর্তিত করতে পারেনি।
উপরিউক্তি কথা এখানকার জন্যে, যখন দেয়া হবে দরিদ্র্য ও অভাব বা প্রয়োজনের নামে। কিন্তু যদি মনস্তুস্টি সাধানকল্পে (***) তার নিকট ইসলামকে প্রিয় করে তোলার উদ্দেশ্যে দেয়া হয়, দেয়া হয় তার সাহায্য করে মুসলমানদের সাথে ও তাদের রাষ্ট্রের সাথে মনের আকর্ষণ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে, তাহলে আল্লাহ্র কিতাব ও তাঁর রাসূলের সনতের অকাট্য দলিল দ্বারা আগেই আমরা তা জায়েয হওয়ার মতকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছি, আর এই অংশটি যে, চিরদিন থাকবে, সে কথাও বলেছি। যদিও আমরা বলে যে, ‘মনস্তুষ্টিকরণ’ ও ‘মুয়াল্লাফাতু কুলবুহুম’ খাতে যাকাত ব্যয় করার কাজটি আসলে ইসলামী সরকারের করণীয় নয়, ব্যক্তিমনের নয়। অবশ্য ইসলামী সংস্থাসমূহ এই রাষ্ট্র সরকারের বিকল্প হতে পারে।
এখানে একটি বিষয়ে সতর্ক করে দেয়া আবশ্যক। তা হচ্ছে, যারা বলেছেন, যিম্মীদের যাকাতরে সম্পদ দেয়া যাবে না, তার অর্থ এই নয় যে, তাদেরকে অনশন ও বস্ত্রহীনতার মধ্যে রেখে তিল তিল করে মরতে দেয়া হবে। কখখনই নয়। তাদেরকে বায়তুলমালের অপরাপর আয়- যেমন ‘ফাই’, গনীমতের এক-পঞ্চমাংশ, খনিজ সম্পদ ও খারাজ প্রভৃতি- থেকে অবশ্যই সাহায্য করা হবে। আবূ উবাইদ তাঁর (***) গ্রন্থে উমর ইবনে আবদুল আজিজের তাঁর বাওরা’র ওপর নিযুক্ত প্রশাসককে লিখিত ফরমানের উল্লেখ করেছেন। তাতে রয়েছে: ‘তোমার নিজের দিক থেকে যিম্মীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ কর; যাদের বয়স বেশি হয়ে গেছে, শক্তিহীন বা দুর্বল হয়ে পড়েছে, তাদের কামাই-রোজগার সংকীর্ণ হয়ে গেছে। এরূপ লোকদের জন্যে মুসলমানদের বায়তুলমাল থেকে প্রয়োজনীয় পমিাণ সাহায্য চালু কর। [(আরবী ***********)] সত্য কথা এই যে, তিনি যিম্মীদেরকে সাহায্য চাওয়া অপেক্ষায় রাখাও পসন্দ করেন নি। বরং খলীফাতুল মুসলমীন নিজেই আঞ্চলিক প্রশাসককে তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও তাদের দাবি-দাওয়া জানবার জন্যে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন বায়তুলমাল থেকে প্রয়োজনীয় সাহায্য দান করা যায়। আর এটাই হচ্ছে ইসলামের সুবিচার।
ফাসিক ব্যক্তিকে কি যাকাত দেয়া যাবে
ফাসিক সম্পর্কে ফিকাহবিদগণ মত দিয়েছেন, তারা যতক্ষণ পর্যন্ত আসল ইসলামের ওপর অবিচল থাকবে, যতক্ষণ তার অবস্থার সংশোধনের জন্যে চেষ্টা চলতে থাকবে, ততক্ষণ তাদেরকে যাকাত দেয়া যাবে। তার মনুষ্যত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শনই এর লক্ষ্য। আর যেহেতু এরূপ ব্যক্তির নিকট থেকে যাকাত গ্রহণ করা হবে, তাই তাদের দেয়াও যাবে। ফলে ‘ধনী লোকদের নিকট থেকে তা নেয়া হবে ও তাদেরই গরীব লোকদের মধ্য তা বন্টন করা হবে’- হাদীসে এই সাধারণ তাৎপর্যপূর্ণ ঘোষণার অন্তর্ভুক্ত হয়ে আছে। [ দেখুনঃ (আরবি ****************)] তবে তা অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে। কেননা আল্লাহর মাল দিয়ে তো আর আল্লাহর নাফরমানীর কাজে সহায়তা-সহযোগিতা করা যায় না। সাধারণ ধারণাই এ ব্যাপারে যথেষ্ট মনে করতে হবে। এ কারণে মালিকী মাযহাবের কোন কোন আলিম বলেছেন, পাপী গুনাহগার লোকদের যাকাত দেয়া যাবে না যদি মনে করা হয় যে, তারা তা এ সব পাপ কাজে ব্যয় করবে। অন্যথায় তাদের তা দেয়া জায়েয হবে। [ দেখুনঃ (আরবি ****************) এই মত জাফরী মাযহাবের সাথে সংগতিসম্পন্ন। যেমন ইমাম জাফরের ফিকাহতে উদ্ধৃত হয়েছে ২য় খণ্ড, ৯৩ পৃ. এবং আবাজীয়া ফিকাহায়ও তাই রয়েছে, (আরবি ****************)]
জায়দীয়াদের মতে ফাসিক ধনী ব্যক্তির ন্যায়, তার জন্যে যাকাত জায়েয নয়, তাকে দিলে যাকাত আদায় হবে না। হ্যাঁ, তবে সে যদি যাকাত সংস্থার কর্মচারী হয় কিংবা ‘মুয়াল্লাফাতু কুলুবুহুম’-এর কেউ হয়, তাহলে ভিন্ন কথা। [ (আরবি ****************)]
আমার মতে অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য মত হচ্ছে, ফাসিক ব্যক্তি যদি তার ফিসক-ফুজুরী দ্বারা মুসলমানদের চ্যালেঞ্জ না করে তাহলে তাকে যাকাত দেয়ায় কোন দোষ নেই। যদিও নেককার ও দৃঢ় আদর্শবাদী চরিত্রবান লোকই হচ্ছে যাকাত পাওয়ার ইজমাসম্মত উপযুক্ত ও উত্তম লোক। কিন্তু যে ফাজের-গুনাহগার ব্যক্তি ধৃষ্টতা দেখায় তার সর্ববিধ পাপ কাজ নিয়ে অহমিকা বোধ করে-নির্ভীকভাবে ফাসিকী কাজ করতে থাকে, তাহলে তার অহংকারী মনোভাব নির্মূল না হওয়া ও তওবা না করা পর্যন্ত তাকে যাকাতের টাকা বা সম্পদ দেয়া যেতে পারে না। কেননা ঈমানের শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য রজ্জু হচ্ছে আল্লাহর জন্য ভালোবাসা আল্লাহরই জন্যে অসন্তোষ। [ একটি হাদীসের তরজমা. যা ইমাম আহমাদ. ইবনে আবূ শায়বা ও বায়হাকী তার শুয়ূবুক ঈমানে উদ্ধৃত করেছেন। সয়ুতী হাদীসটি সহীহ বলে ইঙ্গিত করেছেন তার (আরবি ****************) গ্রন্থে।]
আল কুরআনে বলা হয়েছেঃ (আরবি ****************) আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন মহিলাগণ পরস্পরের বন্ধু-পৃষ্ঠপোষক। তারা ভাল ও সৎকাজের আদেশ করে এবং অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে নিষেধ করে। [(আরবি ****************)]
এই আয়াতের ঐকান্তিক দাবি হচ্ছে, মুসলিম সমাজ কোন ফাসিক ব্যক্তির দিকে সাহায্যের হস্ত প্রসারিত করবে না- এরূপ অবস্থায় যে, সে তার নাফরমানীর কাজে গভীরভাবে মগ্ন রয়েছে এবং তার গুনাহের দ্বারা সে পরস্পরের প্রতি লানত করছে, তার সাধারণ চেতনাকে চ্যালেঞ্জ করছে। তাই বলে এটা গুনাহগার ও ফাসিক লোকদের প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন, এমন কথা বলার কোন যুক্তি নেই। মুসলিম সমাজের মধ্য থেকেও তাদের ক্ষুধা-কাতর হয়ে ধ্বংস হয়ে যেতে দেয়া হবে, এমন অপবাদেরও যৌক্তিকতা স্বীকার করা যায় না। ইসলাম তো আসলেই বিশাল উদারতা, দয়া-সহানুভূতি এবং ক্ষমা-সহিঞ্চুতা নিয়ে এসেছে।
ক্ষমা-সহিঞ্চুতা ব্যক্তিগত দোষ ও অন্যায়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। কিন্তু যে লোক গোটা সমাজকেই কলুষিত ও পাপপ্রবণ বানিয়ে দিচ্ছে, দ্বীন ও দ্বীনদার লোকের লাঞ্ছিত করছে, তাকে ক্ষমা করার কোন প্রশ্নই উঠতে পারে না। তাকে ক্ষমা করার ক্ষমতাও নেই কারোর। যে লোক নিজের প্রতি দয়া প্রদর্শন করে, সেই অন্যের নিকট থেকে দয়া পাওয়ার অধিকারী হতে পারে। তবে তওবা করলে ভিন্ন কথা। আর তা না করে যদি ক্রমাগতভাবে পাপ করতেই থাকে, শয়তানের আনুগত্য করায় সে পৌনপৌনিকতা বজায় রেখে চলে- গুমরাহীর পথে চলতেই থাকে, সমাজ ও তার মূল্যমান, তার আদর্শের প্রতি বৃদ্ধাংগুষ্ঠি দেখাতেই থাকে, তাহরে সে না খেয়ে মরলেও কোন দোষ নেই। এমন ব্যক্তির কোন মর্যাদাই স্বীকার করা যেতে পারে না। আর যে লোক নিজেই নিজেকে অপমানিত করে সে অন্য লোকের নিকট সম্মান পাওয়ার অধিকারী নয়। যে নিজেকে দয়া করে না, সে দয়া পেতেও পারে না।
যে লোক নামায-রোযা পালন, মদ্যপান-জুয়া খেলার ওপর না খেয়ে মরাকে অগ্রাধিকার দেয় সে সমাজের নিকট কোনরূপ সাহায্য-সহানুভূতি পাওয়ার অধিকারী নয়। অন্তত এরূপ যার স্বভাব চরিত্র ও ইচ্ছা-বাসনা, তার পক্ষে সমাজের দয়া-সহানুভূতি পাওয়া সম্ভব নয়।
কিন্তু এই ধৃষ্টতাকারী ফাসিক ব্যক্তির যদি তার ওপর নির্ভরশীল কোন পরিবার থাকে, তাহলে সেই পরিবারের লোকদেরকে যাকাতের মাল দেয়া আবশ্যক। সেই ব্যক্তির দোষে তার পরিবারকে কষ্ট দেয়া যায় না। আল্লাহ তাই বলেছেনঃ (আরবি ****************) প্রত্যেকটি ব্যক্তির ওপর তার নিজের উপার্জনই চাপবে। কোন বোঝা বহনকারীই অপরের বোঝা বহন করবে না। [(আরবি ****************)]
বিদ’আত পন্থী কিংবা বেনামাযী ব্যক্তিকে যাকাত দেয়া যাবে কিনা, ইমাম ইবনে তাইমিয়াকে এই প্রশ্ন করা হলে তিনি জবাবে বললেনঃ
যাকাতদাতা ব্যক্তির উচিত দ্বীনদার শরীয়াত অনুসরণকারী মুসলমানদের মধ্য থেকেই ফকীর, মিসকীন, গারেমীন প্রভৃতি যাকাত পাওয়ার যোগ্য লোক সন্ধান করা। যে লোক প্রকাশ্যভাবে বিদ্’আত করছে; কিংবা পাপ কাজ করে যাচ্ছে, সে তো পরিত্যক্ত হয়ে শাস্তি পাওয়ার যোগ্য; তাকে তওবা করতেও বলা যেতে পারে।…. তাহলে এরূপ ব্যক্তিকে কি করে সাহায্য করা যায়? [(আরবি ****************)]
নামায তরককারী সম্পর্কে বলেছেন
‘যে লোক নামায পড়ছে না, তাকে নামায পড়তে বলতে হবে। সে যদি বলে যে, হ্যাঁ, আমি নামায পড়ি, তাহলে তাকে দেয়া যাবে। অন্যথায় দেয়া যাবে না। [(আরবি ****************)]। অর্থাৎ সে যদি তওবা করার কথা প্রকাশ করে এবং নমায পড়বে এই মর্মে ওয়াদা করে তাকে এ ব্যাপারে সত্যবাদী মনে করে যাকাত দেয়া যাবে।
(আরবি ****************) গ্রন্থে শায়খুল-ইসলাম লিখেছেনঃ ‘যে লোক যাকাত পেয়ে তদ্দ্বারা আল্লাহর আনুগত্যের কাজে সাহায্য পেতে চাইবে না, তেমন লোককে যাকাত দেয়া যায় না। কেননা আল্লাহ যাকাত ফরয করেছেন তার ইবাদত-আনুগত্যের কাজে তদ্দ্বারা সহায়তা গ্রহণকল্পে-যে সব মুমিন ব্যক্তি তার মুখাপেক্ষী হবে। যেমন ফকীর, ঋণগ্রস্ত কিংবা যে লোক মুসলমানদের কাজে সহযোগিতা করে-যেমন যাকাত সংস্থার কর্মচারী ও আল্লাহর পথে জিহাদকারী ব্যক্তি। তাই অভাবগ্রস্ত লোকদের মধ্যে যারা নামায পড়ে না, সে যতক্ষণ তওবা না করবে এবং নামায রীতিমত পড়তে শুরু না করবে, ততক্ষণ তাকে যাতাক আদৌ দেয়া যাবে না। [(আরবি ****************)]
সাইয়্যেদ রশীদ রিজা’র বক্তব্য
এ পর্যায়ে ইসলামী সমাজ সংস্কারক সাইয়্যেদ রশীদ রিজার একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য তুলে দিয়ে এই প্রসঙ্গটি আমরা শেষ করতে চাই। তিনি তাঁর তাফসীরে লিখেছেনঃ
অভিজ্ঞতা থেকে জানা গেছে, ইংরেজ ফ্রাংগ্রীরা যে সব দেশের ইসলামী ভিত্তিকে নষ্ট করে দিয়েছে, শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিকৃত-বিভ্রান্ত করেছে, সে সব দেশে নাস্তিকতা ও আল্লাহদ্রোহিতা মারাত্মক রকম বৃদ্ধি পেয়ে গেছে। আর দ্বীন-ইসলামের ফায়সালাও জানা গেছে যে, ইসলাম ত্যগকারী ব্যাক্তি আসল কাফির অপেক্ষাও অনেক বেশি ক্ষতিকর। তাই এরূপ ব্যক্তিকে যাকাত বা সাদকায়ে ফিতর-এর কিছুই দেয়া যেতে পারে না। তবে প্রকৃত কাফির যদি অ-যুধ্যমান হয়, তাহলে তাকে নফল সাদকার টাকা বা সম্পদ দেয়া জায়েয হতে পারে; কিন্তু ফরয যাকাত দেয়া যাবে না। (জমহুর ফিকাহবিদদের মত-ই তিনি সমর্থন করে গেছেন।)
এই সব দেশে মুজাহিদ – নাস্তিক অ-ধার্মিক লোক বহু রকমের। তাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রকাশ্যভাবে আল্লাহকে অস্বীকার করে- হয় বলে, আল্লাহ নিষ্কর্মা হয়ে গেছেন; কেউ কেউ সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করছে অথবা ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে শিরক করছে। অন্যরা কেউ কেউ ‘অহী’ অস্বীকার করছে, নবুয়ত-রিসালাতের সত্যতা মানছে না বা নবীর প্রতি গালাগাল করছে কিংবা কুরআনকে যা তা বলছে অথবা পুনরুত্থান ও বিচার দিনকে অমান্য করছে। এদের কেউ কেউ আবার ইসলামকে শুধু রাজনৈতিক জাতীয়তা হিসেবে মানছে, কিন্তু তারা মদ্যপান, জ্বেনা-ব্যভিচার, নামায তরক করা প্রভৃতি ইসলামের ‘রুকন’ সমূহকে অস্বীকার করছে, নামায পড়ছে না, যাকাত দিচ্ছে না, রোযা পালন করছে না, সামর্থ থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর ঘরে হজ্জ করতে রাজী হচ্ছে না। এ সব লোকের ভৌগোলিক বা বংশীয় ইসলাম গণনার যোগ্য নয়। তাই উল্লিখিত কোন ব্যক্তিকেই যাকাত দেয়া জায়েয হতে পারে না। বরং যাকাতদাতার কর্তব্য হচ্ছে, ইসলামের সহীহ্ আকীদায় অবিচল লোক তালাশ করে বের করে তাদের যাকাত দেবে। দ্বীনের অকাট্য আদেশ-নিষেধের প্রতি যাদের দৃঢ় প্রত্যয় রয়েছে, এমন লোক বের করবে। এসব লোক একবিন্দু গুনাহও করবে না এমন শর্ত কখনই করা যেতে পারে না। কেননা মুসলিম ব্যক্তি কখনও কখনও গুনাহ করে; কিন্তু সেই সাথে সে তওবাও করে। আর আহলি সুন্নাহর মৌল নীতি হচ্ছে, কাবাকে কেবলা মানে, এমন কোন লোককে কোন গুনাহের দরুন তারা কাফির বলবে না। কার্যত বিদ’আতে নিমজ্জেত বা শরীয়াতের দলিলে ব্যাখ্যাগত ভিত্তির ওপর বিদ’আতী আকীদা সম্পন্ন লোকও কাফির হয়ে যায় বলে তারা মনে করেন না। বস্তুত আল্লাহর আদেশ-নিষেধ বিশ্বাসকারী মুসলমান যদি গুনাহ করে এবং ফরয তরক করা ও নির্লজ্জ কাজ-কর্ম করা যারা হালাল মনে করে, এই দুই শ্রেণীর লোকদের মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। এই ব্যক্তি এসব কাজ আল্লাহ কর্তৃক অর্পিত দায়িত্বের এক বিন্দু চেতনা ছাড়াই পৌনপুনিকতা সহকারে করে। সে আল্লাহর নাফরমানী করেছে, এই খেয়ালও হয় না তার। তার উচিত আল্লাহর নিকট তওবা করা, তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা।
যে মুসলিমের ইসলামে সংশয় রয়েছে, তাকেও যাকাত দেয়া সমীচীন নয়। যেসব লোককে রমযান মাসে দিনের বেলা কফিখানা, হোটেলে-রেস্তোরা ও খেল-তামাশার লীলাকেন্দ্র ধূম্র উদগীরণ করতে বা মদ্যপানে মত্ত হয়ে থাকতে অথবা চর্ব-চোষ্য-লেহ্য-পেয়-র স্বাদ আস্বাদনে ব্যতিব্যস্ত দেখা যায়- এমনকি জুম’আর দিনের নামাযের সময়ও- তারা উক্তরূপ কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকে না তাদের সম্পর্কে কি বলা যাবে, আমি জানি না। অনেক সময় আবার এ সব বিভ্রান্ত লোকেরা কোন-না-কোন জুম’আর মসজিদে উপস্থিতও হয়ে থাকে। এই লোকদেরকে কি গুনাহগার মুসলিম’ বলা যাবে কিংবা বলা যাবে সব সীমালংঘনকারী নাস্তিক? তাদের সম্পর্কে যে ধারণাই পোষণ করা হোক, যাকাতের কোন মাল যে এদেরকে দেয়া যেতে পারে না, তা নিঃসন্দেহে। তাই যাদের দ্বীন ঈমান ও সচ্চরিত্রতা সম্পর্কে নির্ভর করা যাবে সেই লোকের সন্ধান করতে হবে যাকাত দেবার জন্যে। তবে ফাসিক ব্যক্তিকে দিলে তার সংশোধন হবে এমন ধারণা হলে তাকে মুয়াল্লাফাতু কুলুবুহুম’ –এর মধ্যে গণ্য করে দেয়া যাবে।
ইসলামের পরস্পর বিরোধী গোষ্ঠিসমূহকে যাকাত দান
ইসলামে পরস্পর বিরোধী যতগুলো ফির্কা বা জনগোষ্ঠী রয়েছে আহলি সুন্নাত তাদের ‍‘বিদআতপন্থী’ বা ‘স্বেচ্ছাচারবাদী’ (আরবি***************) নামে অভিহিত করেছে।
‘বিদআত’ দুই ধরনের। একটা হল মানুষকে কাফির বানিয়ে দেয় এমন বিদ’আত (আরবি***************) এ বিদ’আত তার অনুসারীকে ঈমান থেকে বের করে কুফরির মধ্যে নিয়ে যায়। এই পর্যয়েও বিভিন্ন গোষ্ঠী বিভিন্ন মানের হয়ে থাকে। কিছু হয় সীমালংঘনকারী, কিছু মধ্যমপন্থী।
আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে মানুষকে ‘ফাসিক বানিয়ে দেয় এমন বিদ’আত’ (আরবি***************)। তা তার অনুসারীকে কাফির বানায় না বটে; কিন্তু ফাসিক’ অবশ্যই বানিয়ে দেয়। আর এই ‘ফিসক’টা প্রধানত চিন্তা ও আকীদা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে কাজ করে। একে ব্যাখ্যাগত ফিসক-ও বলা চলে তবে বাস্তব কাজ ও আচার-আচরণে ফিসক (সীমালংঘন প্রবণতা) থাকে না।
এ সব পরস্পর বিরোধী ফির্কা বা জনগোষ্ঠীসমূহের মধ্যে যেসব ফকীর ও যাকাত পাওয়ার যোগ্য লোক আছে তাদেরকে যাকাত দেয়া সম্পর্কে কি হুকুম সেটাই প্রশ্ন।
সত্যি কথা হচ্ছে, আহলি সুন্নাহ’ গোটা মুসলিম উম্মতের মধ্যে উদারতা ও বদান্যতা প্রদর্শনে অগ্রসর অতি বড় একটি জনগোষ্ঠী। যে বিদ’আত মানুষকে কাফির বানায় ও ইসলাম থেকে বের করে নিয়ে যায়, [ দৃষ্টান্তস্বরূপ দেখুনঃ(আরবি***************)] তাদের ছাড়া অন্য সব বিদ’আত পন্থীদেরই- আহলি কেবলা মুসলিম মাত্রকেই যাকাত দেয়ার পক্ষপাতী, যদি তারা কল্যাণ ও স্থিতিশীলতাসম্পন্ন হয়। আর এতেও সন্দেহ নেই যে, আহলি সুন্নাহ লোকেরা বিদ’আত মুক্ত ও রাসূলের সুন্নাতের অনুসারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে যাকাত দেয়াকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যদিও তারা তাদের সাথে সম্পর্কশীল। তাহলে অন্যদের ব্যাপারে কি করতে হতে পারে?
আসলে এ পর্যায়ে কথা হচ্ছে, দেয়া জায়েয- দিলে যাকাত আদায় হবে, কিংবা হবে না, এই বিষয়েই যা মতপার্থক্য।
জা’ফরী ইমামীয়া শিয়াদের মত হচ্ছে এই শর্তে যে, যাকাতদাতা ইসনা আসরিয়া শিয়া সতের লোক হবে- ইমামের কথাঃ সাদকা ও যাকাত কেবল তোমার সঙ্গী-সাথীদেরই দাও।’ মুয়াল্লাফাতু কুলুবুহুম’ ছাড়া আর কাউকে এই শর্ত থেকে নিষ্কৃতি দেয়নি। কেননা এ কথা ধরে নেয়া হয়েছে যে, এরা কাফির বা মুনাফিক হবে। যাকে যাকাত দেয়া হবে সাধারণ কল্যাণময় কাজের জন্যে- তার দারিদ্র্য দূর করার বা তার বিশেষ ধরনের প্রয়োজন পূরণের জন্যে নয়, তা-ও উক্ত শর্ত থেকে মুক্ত।
ইমাম জাফর-এর ফিকাহতে শায়খ মুগনীয়া এই শর্তটিকে বিশেষ করে শুধু যাকাতের ব্যাপারে প্রয়োগ করার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। আর মুস্তাহাব দান-সাদকা যে কোন অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেয়া জায়েয বলে মত প্রকাশ করেছেন। [(আরবি***************)]
একথা বলেছেন এতদসত্ত্বেও যে, শায়খ এক্ষেত্রে মাযহাবী ইমাম (র)-এর প্রদত্ত মতের ওপর নির্ভর করেছেন ও আস্থা স্থাপন করেছেন। সে মতটি হচ্ছে, সাদকা ও যাকাত কোন কিছুই না দেয়া। এখানে ‘সাদকা’ অর্থ ফরয দান বলা ঠিক নয়। অন্যথায় তার পর যাকাত বলা পুনরুক্তির দোষে দূষিত হয়ে পড়ে।
মূল দলিরে- যদি বর্ণনাটি সহীহ্ সাব্যস্ত হয়- মূল বক্তব্যের এমন সাধারণ অর্থ করা যেতে পারে যা সব মুসলিমকেই শালিম করে।
আহলি বায়াতের কোন কোন আলিমের এমন মত জানা গেছে, যা উপরিউক্ত সাধারণ ও ব্যাপক তাৎপর্যকে সমর্থন করে।
‘বুহরানী’ তাঁর (আরবি***************) গ্রন্থে আবূ জাফর আল-বাকের (র) থেকে এ কথা উদ্ধৃত হয়েছেঃ একজন লোক তার নিকট উপস্থিত হয়ে তাকে বলরেনঃ আল্লাহ আপনাকে রহমত করুন’ আমার নিকট থেকে এই পাঁচ শত দিরহাম গ্রহণ করুন, পরে তা যথাস্থানে ব্যয় বা বন্টন করুন। আসলে এটা আমার মালের যাকাত। এ কথা শুনে ইমাম বললেনঃ না, ওটা বরং তুমিই নাও। এবং ওটা তোমার প্রতিবেশী ইয়াতীম ও মিসকীন এবং তোমার মুসলিম ভাইদের মধ্যে বন্টন করে দাও।[(আরবি***************)]
ইমামুস-সাদেকের পিতা থেকে এ দলিলটি বর্ণিত। সওয়ালকারীকে তিনি কোন শর্ত বলে দেন নি। শুধু দুটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। তা হচ্ছে, প্রয়োজন ও অভাব এবং দ্বিতীয় ইসলাম বা মুসলিম হওয়া। অতএব ইসলামী ভ্রাতৃত্ব সব হিসেবের ঊর্ধ্বের জিনিস। মুমিনরা সকলেই পরিস্পরের ভাই, এ কথা সর্বজনস্বীকৃত।
আবাজীয়া গোষ্ঠীর লোকদের মধ্যে সেই মাযহাব অনুসারী ছাড়া অন্য মুসলমানকে যাকাত দেয়া জায়েয হওয়া পর্যায়ে মতবিরোধ রয়েছে।
তাদের কেউ কেউ বলেছেন, যদি জানা যায় যে, সে দরিদ্র ব্যক্তি; কিন্তু সে পক্ষের কি বিপক্ষের, সমর্থক কি বিরোধী- তা জানা না যায় তাহলে তাকে যাকাত দেয়া যাবে। কেউ কেউ আবার বিরোধীকেও দেয়া জায়েয বলে মত দিয়েছেন। বলা হয়েছে, এমন লোক আমাদের চোখের সম্মুখে থাকলে তাকে দেয়া জায়েয। আবার কেউ বলেছেন, দাতার নিকটে থাকলে তাকে যাকাত দেয়া হবে। (আরবি***************) গ্রন্থে বলেছেন, সহীহ্ এবং সত্য কথা হচ্ছে, দেয়া যাবে না, দেয়া যাবে শুধু সমমাযহাব লোকদের। যদি সে রকম লোক না পাওয়া যায়, তা হলে এই দিক দিয়ে পরিচিতি ব্যক্তিকে দেয়া হবে। আর তাও পাওয়া না গেলে দেয়া হবে তা থেকে সম্পর্কহীন ব্যক্তিকে নতুবা এমন বিরোধীকে যে তার নিজের মাযহাবী মতের অনুগত। তবে অগ্রাধিকার দেয়া হবে সেই ব্যক্তিকে যে আমাদের গালাগাল করে না, আর তার পরে সেই ব্যক্তিকে যে কম গালাগাল করে আর তার পরে খুব বেশি গালাগালকারীকে। আর তাও না হলে খৃষ্টানকে দেয়া হবে নতুবা ‘সাবুনী’ বা সাবেয়ীকে। আর তাও না হলে ইয়াহুদীকে। আর তারপর অগ্নিপূজককে নতুবা মূর্তিপূজারীকে। এসব কথা সম্ভব না হওয়ার ওপর ভিত্তিশীল। আকস্মিক মৃত্যুর ভয় দেখানো হয়েছে এবং পাঠাবার কোন পথ না পাওয়ার ওপর নির্ভর করা হয়েছে। [(আরবি***************)]
লক্ষণীয়, এই শেষোক্ত শর্তগুলো লোকদের পক্ষে মাযহাবপন্থীদের গোষ্ঠী থেকে বের হয়ে যাওয়াকে কঠিন করে দেয়া হয়েছে।
আর জায়দীয়া গোষ্ঠীর মত (আরবি***************) গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছেঃ
জায়দ ইবনে আলী (রা) এ প্রসঙ্গে বলেছেনঃ তোমার মালের যাকাত কাদরীয়া পন্থীদের দেবে না [ কদরীয়া’ বলতে প্রাচীন কালের সে সব লোককে বোঝানো হয়, যারা বলত, প্রতিটি ব্যাপারই সূচনা। অর্থাৎ তার পূর্বে আল্লাহ জানতেন না। এভাবে ঘটনাবলী সম্পর্কে আল্লাহ জানতে পারেন তা সংঘটিত হওয়ার পর। এ মত সর্বপ্রথম প্রকাশ করেছে ‘আল জুহানী’। সহীহ মুসলিমে তাই বলা হয়েছে। মু’তাজিলাদের বোঝাবার জন্যেও এই শব্দ ব্যবহৃত হত। তবে এখানে প্রথম ব্যবহারটিই লক্ষ্য। ইমাম জায়দ একজন তাবেয়ী। মনে করা হচ্ছে যে তিনি তাবেয়ীদের দেখতে পেয়েছেন।] মুর্জিয়াকেও নয় [ ‘মুর্জিয়া, বলতে বোঝায় সে লোক, যে ফাসিক লোকদের ওপর অভিশাপ বর্ষণে বাড়াবাড়ি ত্যাগ করেছে। পূর্বকালের একটি জামা’আতের এটাই মত। সেই ব্যক্তিকেও বলা হয়, যে বিশ্বাস করে আমল ছাড়াও ঈমান হতে পারে। ঈমান থাকা অবস্থায় গুনাহ কোন ক্ষতি করে না, যেমন কুফরী অবস্থায় আল্লাহর ইবাদত কোন ফায়দা দেয় না। শব্দটি (আরবি***************) থেকে, অর্থ বিলম্বিতকরণ। উক্ত মতের লোক যেহেতু আমলকে ঈমান থেকে দূরে নিয়ে গেছে, সেই কারণে তাকে মুর্জিয়া বলা হয়। ইমাম জায়েদের মতের দৃষ্টিতে শেষোক্ত ব্যবহারটাই সমীচীন।] হারুরীয়াকেও নয় [ ‘হারুরা’ একটা স্থানে নাম। সেই সম্পর্কের দিক দিয়ে ‘হারুরীয়া’ বলা হয়েছে। স্থানটি কুফাতে অবস্থিত। প্রাথমিক খাওয়ারিজ লোকেরা এখানে একত্রিত হয়েছিল। পরে প্রত্যেক খারিজী মতের লোককে হারুরীয়া বলতে শুরু করা হয়েছে। এদেরকে (আরবি***************) ও বলা হয়। এরা হযরত আলী ও হযরত ওসমানকে কাফির মনে করে।] রাসূলের আহলি বায়ত লোকদের বিরুদ্ধে যারা ‍যুদ্ধ করেছে তাদেরকেও নয়। [ তাদের সাথে যারা সশস্ত্র যুদ্ধ করেছে, বিদ্রোহ করেছে, সীমালংঘন করেছে, রক্তপাত করা হালাল মনে করেছে, এ কথা সাধারণভাবে তাদেরকে এবং অন্যদেরকেও বোঝায়। কিন্তু তাদের ব্যাপারে খুব বেশি করে যেসব ইজতিহাদী মাসলায় তাদের ইজমা হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি তাতে এবং দ্বীনের যেসব মৌল বিষয়ে উভয় পক্ষ থেকে প্রবল সংশয়ের অবকাশ রয়েছে, তাতে বিরোধিতা খুব বেশী ক্ষতিকর বা নিন্দনীয় নয়। দেখুনঃ(আরবি***************)]
‘রওজুন নজীর’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, উক্ত ইমাম (আ)-এর কথা ফাসিককে যাকাত দেয়া জায়েয নেই’ ব্যাখ্য সাপেক্ষ। হাদী, কাসেম ও নাসের এরূপ বলেছেন।
তাদের দলিলহল (আরবি***************) বলে সম্বোধন করা হয়েছে মুমিন লোকদের প্রতি এজন্য যে, যাকাতের টাকা দিয়ে যেন আল্লাহর নাফরমানীমূলক কোন কাজের সহায়তা করা না হয়।
বলেছেনঃ প্রাচীন লোকদের একটি জামায়াত তা জয়েয বলে মত দিয়েছেন।
‘মুসান্নাফ ইবনে আবূ শায়েবা’ গ্রন্থে ফুজাইলের সনদে বলা হয়েছেঃ আমি ইবরাহীম নখয়ীকে (আরবি***************) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বললেনঃ ওরা সে লোক যারা নিজেদের অভাব ছাড়া কখনও ভিক্ষা চাইত না।
মুয়াইয়্যিদ বিল্লাহ ইমাম ইয়াহইয়া, হানাফী শাফেয়ী মাযহাবের লোকেরা তাই বলেছেন। কেননা (আরবি***************) শব্দটি সাধারণ অর্থবোধক। আরও এজন্যে যে, ধনীদের নিকট থেকে নিয়ে তাদেরই ফকীর গরীবদের মধ্যে বন্টন করা হয়।’ (হাদীস)
ইমাম শাফেয়ীর দুটো কথার একটি ইমাম ইয়াহইয়া গ্রহণ করেছেন। তা হচ্ছেঃ ফাসিকের ফিসক যদি মুসলমানদের জন্যে ক্ষতিকর হয় তাহলে তাকে যাকাত থেকে দেয়া যাবে না। যেমন বিদ্রোহী ও যুদ্ধ লিপ্তকে দেয়া হয় না, এদেরকেও যাকাত দেয়া যাবে না। কেননা তাতে রাষ্ট্রপ্রধানের কথর অপমান হয়। আর তারও মুসলিম জনগণের দায়িত্ব পালন এই দুটোর মধ্যেই ব্যাপারটি আবর্তিত হয়। [(আরবি***************)] যা কিছুমাত্র বাঞ্ছনীয় নয়।
চতুর্থ আলোচানা
স্বামী, পিতামাতা ও নিকটাত্মীয়কে কি যাকাত দেয়া যাবে
নিকটবর্তী ব্যক্তি যদি ঘনিষ্ঠতার দিক দিয়ে দূরবর্তী হয়, তাহলে যাকাতদাতা ধনশালী ব্যক্তির পক্ষে সেই লোকের ব্যয়ভার বহন বাধ্যতামূলক হয় না। কাজেই তার এই নিকটবর্তী ব্যক্তির যাকাত তাকে দিতে কোন দোষ নেই। নিকটবর্তী ব্যক্তি নিজেই দিক কিংবা অন্য যাকাতদাতা দিক, তা সমান কথা কিংবা তা দেবে সরকার বা তার প্রতিনিধি অর্থাৎ যাকাত বিতরণ প্রতিষ্ঠান তা দেবে। আর ফরীর-মিসকীনদের জন্যে নির্দিষ্ট অংশ থেকে দেয়া হোক, কি অন্য কোন খাত থেকে, তাতেও কোন পার্থক্য থাকে না।
কিন্তু যে নিকটবর্তী ব্যক্তি ঘনিষ্ঠতম নৈকট্য সম্পর্কশীল; যেমন পিতা-মাতা, সন্তান, ভাই-বোন ও চাচা-চাচী- এদেরকে যাকাত দেয়া জায়েয হওয়া পর্যায়ে বিশদ আলোচনার প্রয়োজন।
সেই নিকটবর্তী ব্যক্তি যদি যাকাত পাওয়ার যোগ্য হয়- হয় এজন্যে যে, সে যাকাত সংস্থার কর্মচারী, ক্রীতদাস বা ঋণগ্রস্ত অথবা আল্লাহর পথেরে মুজাহিদ, তাহলে সেই যাকাতদাতা নিকটবর্তী ব্যক্তির পক্ষে তাকে যাকাত দেয়ায় কোন দোষ হতে পারে না। কেননা লোকটি যাকাত পাওয়ার যোগ্য এমন গুণগত কারণে, যাতে এই নৈকট্যের কোন প্রভাব খাটতে পারে না। আর এই নিকটবর্তী ব্যক্তিরও নৈকট্যের নাম করে ঋণগ্রস্তের ঋণ শোধ করা বা আল্লাহর পথের মুজাহিদদের খরচ বহন করার অনুরূপ কিছু করারও প্রয়োজন হয় না, তাও ওয়াজিব নয়।
অনুরূপভাবে নিঃস্ব পথিককেও সফর খরচ দান করা সম্পূর্ণরূপে জায়েয হবে।
তবে ‘মুয়াল্লাফাতু কুলুবুহুম’ খাতে কাউকে ব্যক্তিগতভাবে সাহায্য বা যাকাতের টাকা দেয়া উচিত নয়। এটা রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার প্রতিনিধিরই করণীয়। পূর্বে এ কথা বলে আসা হয়েছে।
আর ঘনিষ্ঠ নৈকট্যসম্পন্ন নিকটবর্তী ব্যক্তি যদি “ফকীর’ বা মিসকীন’ হয়ে থাকে, তাহলে কি এই ফকীর ও মিসকীনের যাকাতে-অংশ তাকে দেয়া যাবে?….. এর জবাব দেয়ার জন্যে সর্বপ্রথম দাতা লোকটিকে তা জানা আবশ্যক।
যাকাত বিতরণকারী ব্যক্তি যদি রাষ্ট্র প্রধান বা তার প্রতিনিধি হয় কিংবা এ কালের পরিভাষায় সরকারই যাকাত সংগ্রহ বন্টনের দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে সে প্রয়োজন, অভাব ও পাওয়ার যোগ্যতার দৃষ্টিতে যাকে দেয়ার প্রয়োজন মনে করবে, তাকে দেবে, সে যদি যাকাতদাতার সন্তান বা তার পিতা বা স্বামীও হয়, তবুও। [ দেখুনঃ (আরবি***************)] তার কারণ হচ্ছে, যাকাতদাতা তো মুসলমানদের দায়িত্বশীল ব্যক্তির নিকট যাকাত পৌঁছিয়ে দিয়েছে। সে যথাস্থানেই জমা করে দিয়েছে, তাতে তার ফরয পালনের দায়িত্ব থেকে মুক্তি সংঘটিত হয়েছে। এক্ষণে তার বন্টনের ব্যাপারটি সরকারের ওপর ন্যস্ত। কেননা যাকাতের মাল বায়তুলমালে জমা হয়ে যাওয়ার পর তার পূর্ব-মালিক দাতার সাথে তার কোন সম্পর্কই অবশিষ্ট থাকে না। এক্ষণে তা আল্লাহর মাল কিংবা মুসলিম জনগণের সম্পদ।
সেই নিকটবর্তী ব্যক্তি যদি ‘ফকীর’ কিংবা মিসকীন’ হয় আর যে লোক তাকে যাকাত দেবে, সে নিজেই হয় তার নিকটবর্তী ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, তাহলে এই নৈকট্য ও ঘনিষ্ঠতার মান এবং কোন্ লোক তার নিকটবর্তী, সেটা সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এই ফকীর যদি যাকাতদাতার পিতা হয়, মা হয়, হয় পুত্র বা কন্যা, এরা সেই ধরনের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় যাদের যাবতীয় ব্যয়ভার বহনের জন্যে ধনী ব্যক্তিকে বাধ্য করা যাবে, তাহলে এদের কাউকেই সেই ধনী ব্যক্তির যাকাত দেয়া চলবে না।
ইবনুল মুনযির বলেছেন, ইসলামের বিশেষজ্ঞগণ এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ একমত হয়েছেন যে, যাকাতদাতা তার যাকাত তার আপন পিতামাতাকে দিতে পারবে না, দেয়া জায়েয হবে না, কেননা অবস্থা তো এই যাকাতদাতা নিজেই এদের যাবতীয় ব্যয়ভার বহনে স্বাভাবিকভাবেই বাধ্য এবং দায়ী। এমতাবস্থায় এদেরকে তার যাকাত দেয়া হলে তাদের খরচ বহনের দায়িত্ব পালন থেকে তাদের মুখাপেক্ষিতা দূর করা হবে বটে কিন্তু সেই লোক তার স্বাভাবিক দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। ফলে যাকাতের প্রত্যক্ষ ফায়দাটা সে নিজেই পেয়ে যাবে। তখন মনে হবে, সে নিজেই যেন নিজেকে যাকাত দিয়েছে অথচ তা জায়েয নয়- যেমন যাকাত দ্বারা সে নিজের ঋণ পূরণ করতে পারে না। [ দেখুনঃ(আরবি***************) ]
আরও এজন্যে যে, সন্তানের ধন-মাল তো পিতামাতার ধন-মাল। এই কারণে মুসনাদ ও সুনান হাদীস সংকলন গ্রন্থে একাধিক সূত্রে রাসূলে করীম (সা) থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে। তিনি বলেছেনঃ (আরবি***************)
তুমি ও তোমার ধন-মাল তোমার পিতার জন্যে। [ তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৩য় খণ্ড, ৩০৫পৃ.। ইমাম আহমাদ হাদীসটি তিনটি সূত্রে বর্ণনা করেছেন। আমর ইবনে শুয়াইব তাঁর পিতা তাঁর দাদা থেকে। শায়খ শাকের হাদীসটিকে সহীহ্ বলেছেন। দেখুন, ১৬৭৮, এবং ৬৯০২, ৭০০১-১খণ্ড ও ১২ খণ্ড। ইবনে মাজাহ গ্রন্থে হযরত জাবির থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে, এই সূত্রের বর্ণনাকারী ব্যক্তিগণ সিকাহ। তাবারানী বর্ণনা করেছেন সামুরাতা ও ইবনে মাসউদ থেকে যয়ীফ সূত্রে (আরবি***************) দেখুন।]
যেমন করে কুরআন পুত্রদের ঘরকে পিতার ঘর বলে ঘোষণা দিয়েছে। যখন বলেছেঃ (আরবি***************)
এবং তোমাদের ওপর কোন দোষ বর্তাবে না যদি তোমরা আহার কর তোমাদের ঘর-বাড়ি থেকে……। [(আরবি***************)]
অর্থাৎ তোমাদের পুত্রদের ঘর থেকে। [(আরবি***************) ]
আয়াতটিতে সংশ্লিষ্ট নিকটাত্মীয়দের প্রকৃত রূপটা তুলে ধরা হয়নি। ব্যক্তির নিজের ঘরে খাবার গ্রহণে এমন কোন দোষের প্রশ্ন নেই, যা দূর করার জন্যে কুরআনী আয়াত নাযিল করতে হবে। তাই আয়াতে বলা ‘তোমাদের ঘর’ বলে বুঝিয়েছে ‘তোমাদের পুত্রদের ঘর’।
নবী করীম (সা) বলেছেনঃ(আরবি***************)
ব্যক্তির নিজের উপার্জন থেকে আহার গ্রহণ খুব বেশি উত্তম এবং ব্যক্তির সন্তান তার নিজেরই উপার্জন বিশেষ। [হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন তিরমিযী, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ হযরত আয়েশা (রা) থেকে এমন সনদে যাকে তিরমিযী উত্তম বলেছেন। আবূ হাতিমও হাদীসটিকে সহীহ বরেছেনঃ (আরবি***************) এ তা উদ্ধৃত হয়েছে। আহমাদ অনুরূপ বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন সহীহ্ সনদে। তা ৬৬৭৮ ও ৭০০১ নম্বর হাদীসের অংশ বিশেষ।]
এ পর্যায়েই হানাফী মাযহাবের আলিমগণ বলেছেনঃ সম্পদের উপকারিতা পিতামাতা ও সন্তানদের মধ্যে সম্মিলিত ও সুসংবদ্ধ। তাই ফকীর পিতামাতাকে মালিক বানিয়ে দেয়ায় সর্বতোভাবে যাকাত আদায় হবে না। বরং তা নিজের জন্যে ব্যয় হয়ে দাঁড়াবে এক হিসেবে। তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক খুব শক্তিসম্পন্ন থাকায় তাদের পরস্পরের জন্যে সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। [ দেখুনঃ (আরবি***************)] তার মূলেও এই কারণই নিহিত।
অনুরূপভাবে সন্তানদেরকে যাকাত দেয়াও জায়েয নয়। কেননা তারা হল যাকাতদাতার অংশ। তাদের যাকাত দেয়া নিজেকে দেয়ার সমান। বুখারী ও আহমাদ মায়ান ইবনে ইয়াজীদ থেকে যে হাদীস বর্ণনা করেছেন তা এ পর্যায়ে প্রতিবন্ধক হতে পারে না। তা হলঃ
‘আমার পিতা মসজিদের এক ব্যক্তির নিকট বহু দীনার স্বর্ণমুদ্রা বের করলেন তা দান করার উদ্দেশ্যে। আমিও তথায় উপস্থিত থেকে তা নিলাম। পরে পিতা বললেনঃ আল্লাহর নামের শপথ আমি তোমাকে তো দিতে চাইনি, তুমি নিলে কেন? পরে আমি রাসূলের নিকট উপস্থিত হয়ে এ বিষয়ে তাঁর সাথে আলোচনা করলাম। তখন নবী করীম (সা) বললেনঃ হে-ইয়াজীদ! তুমি তোমার নিয়ত অনুযায়ী সওয়াব পাবে। আর যে মায়ান, তুমি যা নিয়েছ, তা তোমার জন্যই থাকবে।’
বাহ্যতই বোঝা যায়, এই সাদকাটা ছিল নফল সাদকা। শওকানী তাই বলেছেন- ওটা ফরয যাকাতের ব্যাপারে নয়। [দেখুন(আরবি***************)] তা যদি হত তাহলে পিতার দেয়া যাকাত তার পুত্র নিতে পারত না, নিলে তা জায়েয হত না।
এই ব্যাপারের বিরুদ্ধে এসেছে মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান এবং শিয়া মতের আবদুল আব্বাস থেকে পাওয়া একটি বর্ণনা। তাতে বলা হয়েছে, বাবা মাকে যাকাত দিলে তা আদায় হয়ে যাবে। শেষের দিকের জায়দীয় ফিকাহবিদদের একটি গোষ্ঠীও উক্ত মতের সমর্থন করেছে, মূল, শাখা প্রশাখা বংশের লোক এবং রক্ত সম্পর্কের অপরাপর সকল পর্যায়ের লোকদের মধ্যে যাকাত ব্যয় করাকে তারা জায়েয ঘোষণা করেছেন। তাঁরা দলিল হিসেবে বলেছেন- আসল কথা হল, যাকাত সংক্রান্ত কথাগুলো সম্পূর্ণ সাধারণ অর্থবোধক, সব শ্রেণীর লোকই তার মধ্যে শামিল ও গণ্য হতে পারে। তাতে এমন কোন বিশেষত্ব বিধায়ক কথা নেই যা সহীহ্ হতে পারে ও কাউকে কাউকে তা পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারে। [(আরবি***************)] ইমাম মালিক থেকেও অনুরূপ বর্ণনা পাওয়া গেছে। বলেছেনঃ পুত্রদের পুত্রদের মধ্যে এবং ঊর্ধ্বে দাদা ও দাদীর জন্যে যাকাত বন্টন বৈধ। [(আরবি***************)] সম্ভবত ইবনুল মুনযির ও বহরুয যাকাত’ গ্রন্থে প্রণেতাদ্বয়ের নিকট উক্ত বর্ণনা সমূহ সহীহ্ বলে গৃহীত হয়নি। এরাঁ দুজন বর্ণনা করেছেনঃ ব্যক্তির বংশমূল পিতা, মা, দাদা ও দাদী এবং নিজের বংশের শাখা প্রশাখা- সন্তান ও সন্তানের সন্তানদের মধ্যে যাকাত ব্যয় নাজায়েয হওয়ার ওপর ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা ঘোষিত হয়েছে। [দেখুনঃ(আরবি***************)]
ইবনুল মুনযির প্রমুখ যে দলিলটির উল্লেখ করেছেন, তা-ই হচ্ছে এই ঐকমত্যের সনদ। আর তা হচ্ছেঃ এদেরকে যাকাত দিলে তা তাদেরকে তার খরচ বহন থেকে নিষ্কৃতি দান করবে, এই দায়িত্ব তার ওপর থেকে সরিয়ে দেবে। তার ফায়দাটা তার নিজের প্রতিই প্রত্যাবর্তিত হবে। মনে হবে, যকাতটা নিজেকেই দেয়া হয়েছে। আর তাতে যাকাত আদায় হয় না।
ইবনুল সুনযির এ কথার ওপর ঐক্যমত্যের কথা বলেছেন যে, পিতামাতাকে যাকাত দেয়া জায়েয নয়। কেননা অবস্থা এরূপ যে, যাকাতদাতাকে তাদের যাবতীয় ব্যয়ভার বহনের জন্যে বাধ্য করা হবে। এই অবস্থাটা যদি বাস্তবায়িত না থাকে- সন্তান যদি অর্থনৈতিক সংকীর্ণতার মধ্যে পড়ে দরিদ্র না হয়, বরং সে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়ে পড়ার দরুন যাকাত দেয়া তার জন্যে কর্তব্য হয়ে পড়ে, এরূপ অবস্থায় ইমাম নববী বলেছেন, সন্তান বা পিতামাতা যদি ফকীর বা মিসকীন হয়, কোন কোন অবস্থায় পিতামাতার খরচ বহন সন্তানের জন্যে ওয়াজিব না হয়, তাহলে তার পিতা-মাতা ও সন্তানের জন্যে ফকীর ও মিসকীনের জন্যে নির্দিষ্ট অংশ থেকে যাকাত দেয়া জায়েয হবে। কেননা এরূপ অবস্থায় সে নিঃসম্পর্ক ও দায়িত্বমুক্ত ব্যক্তি। [(আরবি***************)]
ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেনঃ পিতামাতা ও তদূর্ধ্ব আত্মীয়কে যাকাত দেয়া জয়েয- নিচের দিকে সন্তানকে দেয়াও জায়েয- যদি তারা ‘ফকীর’ হয় এবং সে তাদের খরচ বহনে অক্ষম হয়ে পড়ে। এই কথার সমর্থনে যাকাত ব্যয়ের মৌল কারণ-দারিদ্র্য ও অভাবের দাবিকে তুলে ধরা হয়েছে। এ দাবি পূরণের পথে কোন শরীয়াতসম্মত প্রতিবন্ধক পাওয়া যায়নি। ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, ইমাম আহমাদের দুটো কথার একটি হচ্ছে এই- মা যদি দরিদ্রা হয় এবং তার ছোট ছোট অক্ষম সন্তান থাকে যাদের ধন-মাল রয়েছে, যাকাত তাদের জন্যে ব্যয় করা হলে তাদের ক্ষতি সাধন করা হবে, তাহলে তাদের যাকাত থেকে মাকে অংশ দেয়া যাবে। [(আরবি***************)]
স্ত্রীকে যাকাত দেয়া জায়েয নয়
উপরে পিতামাতা ও সন্তানদের বিষয়ে যা বলা হয়েছে, স্ত্রী সম্পর্কেও সেই কথাই বলা চলে। এজন্যে ইবনুল মুনযির বলেছেনঃ বিশেষজ্ঞগণ একমত হয়ে বলেছেন, কোন ব্যক্তিই তার যাকাত তার স্ত্রীকে দেবে না। কেননা স্ত্রীর যাবতীয় ব্যয়ভার তো যাকাতদাতাকেই বহন করতে হবে। আর তা করা হলে স্ত্রীর পক্ষে যাকাতের মুখাপেক্ষী থাকার কারণ অবশিষ্ট থাকবে না। অতএব স্ত্রীকে যাকাত দেয়া জায়েয হতে পারে না। স্ত্রীর ভরণ-পোষণ ব্যয় বাবদ তা দেয়া হলেও তা জায়েয হবে না। তাতে যাকাত আদায় হবে না।
তাছাড়া স্ত্রী তার স্বামীর সাথে এমন অভিন্নভাবে সম্পৃক্ত যে, স্ত্রী না যেন সে নিজে কিংবা তার অংশ। যেমন আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবি***************)
তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে এ-ও একটি যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য থেকেই জুড়ি সৃষ্টি করে দিয়েছেন। [(আরবি***************)]
(স্বামী স্ত্রীর জন্যে জুড়ি, স্ত্রী স্বামীর জন্যে)
তার স্বামীর ঘর তার নিজেরই ঘর। যেমন আল্লাহ বলেছেনঃ(আরবি***************)
এবং তাদেরকে তাদের ঘর থেকে বহিষ্কৃত করো না। [(আরবি***************) তাদের ঘর অর্থ – তাদের স্বীয় ঘর।]
এই ঘর বৈবাহিক সম্পর্কের ঘর স্বভাবতই স্বমীর মালিকানা সম্পদ।
অন্যেরা বলেছেনঃ [(আরবি***************)] স্বামী তার যাকাত স্ত্রীর জন্যে ব্যয় কররে তা গণ্য হবে না- তাতে যাকাত আদায় হবে না। কেননা এরূপ অবস্থায় ডান হাতে দিয়ে বাম হাতে নিয়ে দেয়া ছাড়া প্রকৃতপক্ষে আর কিছুই হয় না।
স্ত্রী কি তার দরিদ্র স্বামীকে যাকাত দিতে পারে
মিসকীন ও দরিদ্র স্বামীকে স্ত্রীর নিজের সম্পদের যাকাত দেয়ার ব্যাপারে ইমাম আবূ হানীফা ও অন্য কয়েকজন ফিকাহবিদ মত দিয়েছেন যে, তা জায়েয নয়, কেননা স্বামী তার স্ত্রী থেকে ভিন্নতর ও বিছিন্ন কেউ নয়। যেমন ভিন্নতর ও বিছিন্ন কেউ নয় স্ত্রী স্বামী থেকে। আর এই উভয় ক্ষেত্রেই স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে এবং স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে যাকাত দান নিষিদ্ধ।
কিন্তু স্বামীর দেয়াটাকে স্ত্রীর দেয়ার ওপর কিয়াস করা সহীহ হতে পারে না। বিবেক-বুদ্ধি ও বিচার – বিবেচনা উভয় দিক দিয়েই তা যেমন অযৌক্তিক, তেমনি হাদীস ও সাহাবীদের বক্তব্যের দিক দিয়েও।
বিবেক-বুদ্ধি ও বিবেচনার দিক দিয়ে ইমাম আবূ উবাইদ যেমন বলেছেন- স্বামী তার স্ত্রীর ব্যয়ভার বহন করতে বাধ্য- স্ত্রী যদি সচ্ছল অবস্থার হয়, তবুও। আর স্ত্রীকে বাধ্য করা যায় না স্বামীর ব্যয়ভার বহন করতে সে যদি খুব কষ্টের মধ্যেও থাকে। তা হলে এ দুটোর মধ্যকার পার্থক্যের তুলনার কোনটি অতিশয় বড় কঠিন পার্থক্যের ব্যাপার হবে, তা আমাদের অবশ্যই খতিয়ে দেখতে হবে।
ইবনে কুদামা জায়েয হওয়ার পন্থা বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে লিখেছেনঃ কেননা স্বামীর ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব স্ত্রীর ওপর বর্তায় না। কাজেই স্বামীকে স্ত্রীর যাকাত দেয়া নিষিদ্ধ হতে পারে না, যেমন নিষিদ্ধ নয় ভিন্নতর ও নিঃসম্পর্ক কোন পুরুষকে দেয়া। কিন্তু স্ত্রীকে যাকাত দেয়ার ব্যাপারটি সম্পূর্ণ আলাদা। কেননা তার ব্যয়ভার বহন করা স্বামীর কর্তব্য। আর মৌলিকতার দিক দিয়ে যাকাত দেয়াটা জায়েয, কেননা যাকাত পাওয়ার চিহ্নিত নামগুলো যেহেতু সাধারণ প্রয়োগযোগ্য, নিষেধ করার কোন অকাট্য দলিল নেই। এর ওপর কোন ইজমাও অনুষ্ঠিত হয়নি। আর যার ব্যাপারে নিষেধ প্রমাণিত, তার ওপর এই ব্যাপারটি কিয়াস করা সহীহ্ হতে পারে না। কেননা এ দুটোর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। অতএব দেয়া জায়েয হওয়াটা প্রমাণিত অবস্থায় বর্তমান থেকে গেল। [(আরবি***************) ]
বর্ণিত দলিলাদির দিক দিয়ে উল্লেখ্য হচ্ছে ইমাম আহমাদ, বুখারী ও মুসলিমের আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের স্ত্রী জয়নব থেকে বর্ণিত হাদীস। তিনি বললেনঃ
রাসূলে করীম (সা) ইরশাদ করেছেনঃ ‘হে মহিলা সমাজ! তোমরা দান-সদকা কর, তোমাদের অলংকারাদি থেকে হলেও।’ তিনি বললেনঃ অতঃপর আমি ফিরে এসে আবদুল্লাহকে বললামঃ ‘তুমি তো খুব সংকীর্ণ হাতের (দারিদ্র্যপীড়িত) লোক। আর রাসূলে করীম (সা) আমাকে দান-সাদকা করার নির্দেশ দিয়েছেন। এখন তুমি তাঁর নিকট গিয়ে জানতে টেষ্টা কর (তোমাকে দিলে যাকাত আদায় হবে কিনা? যদি আমার যাকাত দেয়া হয়ে যায় তোমাকে দিলে তাহলে তোমাকেই দেব।) অন্যথায় আমি তা অন্য লোকদের দিয়ে দেব, বললেন। আবদুল্লাহ বললেনঃ তুমিও চল। বললেন, অতঃপর আমিও গেলাম। তখন তথায় দেখলাম রাসূলের ঘরের দ্বারদেশে একজন আনসার বংশীয় মহিলাও দাঁড়িয়ে আছে। তার প্রয়োজনও ঠিক আমারই মত। তখন নবী করীম (সা)-এর স্বাস্থ্যগত অবস্থা ভালো ছিল না বলে হযরত বিলাল (রা) আমাদের সম্মুখে উপস্থিত হলেন। আমরা তাঁকে বললামঃ তুমি রাসূলের নিকট গিয়ে খবর দাও, দুইজন মহিলা দরজায় দাঁড়িয়ে আপনার নিকট জানতে চাচ্ছে, তাদের স্বামীদেরকে এবং তাদের ক্রোড়ে লালিত ইয়াতীম সন্তানদেরকে যাকাত দিলে তা তাদের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে কি না?…….. কিন্তু আমরা কারা, তা তাঁকে বলো না।…… পরে বিলাল ঘরে প্রবেশ করে রসূলের নিকট উক্ত বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেন। রাসূলে করীম (সা) জিজ্ঞেস করলেন, কে কে এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করছে? তিনি বললেনঃ আনসার বংশের মহিলা একজন আর অপরজন জয়নব। রসূলে করীম (সা) জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ জয়নব? বললেন, আবদুল্লাহর স্ত্রী। তখন নবী করীম (সা) বললেনঃ এই দুজনের জন্যে দুটো করে শুভ কর্মফল। একটি হচ্ছে নৈকট্য রক্ষার শুভ কর্মফল আর অপরটি হচ্ছে দানের।’ হাদীসটি আহমাদ ও বুখারী, মুসলিম কর্তৃক উদ্ধৃত। বুখারী উদ্ধৃত ভাষায় প্রশ্নটি ছিলঃ আমরা স্বামীর জন্যে এবং আমার ক্রোড়ে লালিত ইয়াতীমদের জন্যে ব্যয় করলে আমার যাকাত আদায় হয়ে যাবে কি? [দেখুনঃ (আরবি***************)]
ইমাম শাওকানী বলেছেন, এই হাদীসটিকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করে বলা হয়েছে, স্ত্রী তার স্বামীকে যাকাত দিলে তার থেকে তা আদায় হয়ে যাবে- তার জন্যে এই দেয়া সম্পূর্ণ জায়েয। সওরী, শাফেয়ী, আবূ হানীফার দুই সঙ্গী এবং মালিক ও আহমাদ থেকে পাওয়া দুটো বর্ণনার একটি উক্ত মতের সমর্থন রয়েছে। হাদী, নাসের, মুয়াইয়্যিদ বিল্লাহও এই মত দিয়েছেন। দলিল হিসেবে তা সম্পূর্ণতা পায় যদি ধরে দেয়া হয় যে, এখানে ফরয সাদকা বা যাকাতের কথা বলা হয়েছে। মাজেরী এ কথা দৃঢ়তা সহকারে বলেছেন। মহিলা দুইজনের প্রশ্নঃ ‘আমার দিক থেকে আদায় হবে কি?’ থেকেও উক্ত কথার সমর্থন মেলে। অন্যরা এ হাদীসটি থেকে বুঝেছেন যে, এটা নফল দান-সাদকার কথা, সেই প্রসঙ্গেই প্রশ্ন, ফরয যাকাত সম্পর্কে নয়। রাসূলের কথা, তোমাদের অলংকারাদি থেকে হলেও’ তার প্রামাণ। ‘আমাদের দিক থেকে আদায় হবে কি’ প্রশ্নের ব্যাখ্যা এরা করেছেন এই অর্থেঃ ‘এ দান আমাদের জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবে কি’ অর্থাৎ মহিলাটি ভয় করেছিলেন, তার স্বামীকে দানটা দিয়ে দিলে সওয়াব লাভ করার লক্ষ্য হাসিল হবে কি, আযাব থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে কি?…… সেজন্যেই এই প্রশ্ন করেছিলেন।
শাওকানী এ বিষয়ে লিখেছেন, বাহ্যত স্ত্রীর যাকাত স্বামীকে দেয়া জায়েয হতে পারে বলে মনে হয়। প্রথমত এজন্যে যে, তার নিষেধকারী কিছু নেই। যে বলেছে যে, জায়েয নেই, তার প্রমাণ তাকেই ‍দিতে হবে। দ্বিতীয়ত প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে নবী করীম (স) কোন বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করেন নি বলে ব্যাপারটি সাধারণ ও সার্বজনীন পর্যায়ে পড়ে গেছে। সাদকাটা নফল না ফরয ওয়াজিব, তা যখন তিনি জিজ্ঞেস করেন নি, তখন মনে হচ্ছে, তিনি বলেছিলেনঃ হ্যাঁ, স্বামীকে দিলে তোমার তরফ থেকে আদায় হয়ে যাবে- তা ফরয সাদকা হোক, কি নফল। [দেখুন (আরবি***************)]
অন্যান্য নিকটাত্মীয়দের যাকাত দানঃ নিষেধকারী ও অনুমতিদানকারী
ভাই, বোন, চাচা, ফুফা-ফুফী ও খালা-খালু প্রভৃতি নিকটাত্মীয়কে যাকাত দেয়া যাবে কিনা সে পর্যায়ে ফিকাহবিদগণ বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। কেউ বলেছেন, জায়েয হবে। অন্যরা বলেছেন, তা না, হবে না। এভাবে বহু বিরাট মতবিরোধ। এদের মধ্যে কেউ উক্ত আত্মীয়দের সকলকেই দেয়া জায়েয বলেছেন। আর অন্যরা এদের সকলকেই দিতে নিষেধ করেছেন। কিছু ফিকাহবিদ কোন কোন নিকটাত্মীয়কে দিতে পারা যায় বলেছেন, অন্যদের দিতে নিষেধ করে মত দিয়েছেন।
যাঁরা নিষেধ করেছেন, তাঁরাও নিষেধের ভিত্তি নির্ধারণে বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ নিকটাত্মীয়কে পরিবারের সাথে বাস্তবভাবে যুক্ত দেখতে পেয়েছেন। তাই যতক্ষণ তারা পরিবারবরর্গের সাথে মিলে-মিশে থাকবে, ততদিন সে তার স্ত্রী ও সন্তানদের পর্যায়ভুক্ত হবে। এরূপ অবস্থায় তাকে যাকাত দেয়া জায়েয হবে না।
এদের কেউ কেউ এমন, যাঁরা মনে করেন যে, প্রশাসক স্ত্রীর ব্যয়ভার বহনের জন্যে তাকে বাধ্য করতে পারে। তাই যতক্ষণ এরূপ কোন আদালতি নির্দেশ জারি না হচ্ছে যা তার নিকটবর্তী ব্যক্তির খরচ বহনে তাকে বাধ্য করবে, ততক্ষণ তার যাকাত তাকে দেয়া জায়েয হবে।
এদের কেউ কেউ মনে করেছেন, শরীয়াত অনুযায়ীই তার খরচ বহন বাধ্যতামূলক, তাই তাদেরকে যাকাত দেয়া জায়েয হবে না। কেননা শরীয়াতই তাদের খরচ বহনের জন্যে যাকাতদাতাকে বাধ্য করছে। আর যার খরচ বহন শরীয়াত অনুযায়ী বাধ্যতামূলক নয়, তাকে দেয়া যেতে পারে। এই মতের লোকেরা যে নিকটবর্তী ব্যক্তির খরচাদি বহন বাধ্যতামূলক তাকে যাকাত দেয়া জায়েয হবে কিনা, সে বিষয়ে বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন।
আবূ উবাইদা তার সনদে ইবরাহীম ইবনে আবূ হাফসা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেনঃ আমি মায়ীদ ইবনে জুবাইরকে জিজ্ঞেস করেছিলামঃ আমি আমার খালাকে যাকাত দেব কি না? জবাবে বললেন, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই দেবে, যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি তার জন্যে দ্বার রুদ্ধ করে না দেবে [দেখুনঃ (আরবি***************)] অর্থাৎ যতক্ষণ পর্যন্ত তাকে তার নিজের পরিবার ও সন্তানাদির সাথে মিলিয়ে একাকার করে না নিচ্ছে, ততক্ষণ তা জায়েয।
হাসান থেকে বর্ণনা করা হয়েছে, তিনি বলেছেনঃ যাকাতদাতা ব্যক্তি তার যাকাত তার নিকটাত্মীয় লোকদের দেবে যতক্ষণ পর্যন্ত সেন তার পরিবারবর্গের মধ্যে গণ্য না হচ্ছে। [(আরবি***************)] আতা বলেছেন, ব্যক্তির নিকটাত্মীয় যদি তার পরিবারবর্গের অন্তর্ভুক্ত না হয় যার ব্যয়ভার সে বহন করছে, তাহলে সে বা তারা অন্যদের তুলনায় তার যাকাত পাওয়ার অধিক বেশি অধিকার সম্পন্ন- যদি তারা ফকীর হয়। [(আরবি***************)]
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা এসেছে, তিনি বলেছেনঃ তোমার ভরণ-পোষণের আওতাভুক্ত কোন লোককে যাকাত না দিলে তোমার কোন দোষ নেই। [(আরবি***************)]
কোন কোন বিশেষজ্ঞের এটাই মত। তাঁরা দেখেছেন, নিকটাত্মীয়কে পরিবারবর্গের মধ্যে শামিল করা হয়েছে কি হয়নি। যদি হয়ে থাকে, তাহলে তাকে যাকাত দেয়া জায়েয নয় বলে মত দিয়েছেন। কিন্তু শরীয়াত অনুযায়ী তার খরচ বহন বাধ্যতামূলক কিনা সেদিকে বা অন্য দিকে তারা নজর দেন নি।
আবূ উবাইদা আবদুল্লাহ ইবনে দাউদ থেকে অপর একটি মত উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেছেনঃ নিকটাত্মীয়দের যাকাত দেয়া অপসন্দনীয় হবে যদি সরকার যাকাতদাতাকে তাদের খরচ বহনের জন্যে বাধ্য করে। যতক্ষণ বাধ্য করা হবে না, ততক্ষণ তাদের যাকাত দেয়ায় কোন দোষ নেই। [(আরবি***************)]
আবূ উবাদইদা নিজে বলেছেনঃ উক্ত মতটি আবদুর রহমান ও ইবনে দাঊদের ব্যাখ্যার ফলশ্রুতি। এ দুটো স্বতন্ত্র অভিমত, যারা তা চাইবে- অনুসরণ করবে। [(আরবি***************)]
এই সব মত ও রায়ের মধ্যে প্রসিদ্ধ মতটি হচ্ছে তার, যিনি যাকাত দেয়া নিষেধের ভিত্তি বানিয়েছেন শরীয়াত অনুযায়ী খরচ বহনের বাধ্যতাকে, তাই শরীয়াত অনুযায়ী যে নিকটাত্মীয়ের খরচ বহন ওয়জিব, তাকে যাকাত দেয়া জায়েয নয়। তাঁরা এর দুটো কারণ বলেছেন। একটি এই যে, সে ধনী বলে তার কিছু ফায়দা দাতার ভাগেই আসে এবং খরচ বহনের দায়িত্ব বাতিল হয়ে যায়। [দেখুনঃ (আরবি***************)]
এটাই হচ্ছে ইমাম মালিক ও শাফেয়ীর মত। ইমাম আহমাদ থেকেও একটি বর্ণনা এই মর্মে এসেছে। জায়দ ইবনে আলী, আল-হাদী কাসেম, নাসের ও মুয়াইয়্যিদ বিল্লাহর অভিমতও এই। কোন্ নিকটাত্মীয়ের ব্যয়ভার বহন বাধ্যতামূলক, তা নির্ধারণে তাদের বিভিন্ন মত রয়েছে।
জায়েদ ইবনে আলী ও আহমাদ ইবনে হাম্বল থেকে বর্ণিত, যে লোক যার উত্তরাধিকারী তার খরচ বহন তারই ওপর বর্তায়।
ইমাম জায়েদ আরো বলেছেনঃ রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার কর্তৃক যাকে খরচ বহনের দায়িত্ব অর্পণ করা হবে তাকে যাকাত দেয়া যাবে না। প্রশ্ন হয়েছেঃ বলেছেনঃ রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার কার খারচাদি বহনের কথা বলবেন? জবাবে বলেছেনঃ তার সব কয়জন উত্তরাধিকারীর খরচাদি। [(আরবি***************)]
ইমাম শাফেয়ী ব্যক্তির মূলের দিকের- তা যত উচ্চেই উঠুক এবং শিকড়ের দিক- তা যত নিচেই হোক- আত্মীয়দের খরচ বহন ওয়াজিব মনে করেন।
খরচাদি ওয়াজিবকরণে অধিক সংকীর্ণ মত হচ্ছে ইমাম মালিকের। তাঁর মতে তার ঔরসজাত পুরুষ সন্তানের জন্যে তার মূলের দিকে পিতার খরচ জরুরী- ওয়াজিব যতক্ষণ তারা পূর্ণ বয়ষ্ক হয়ে উঠতে না পারছে। [শায়খ আলীশ মালিকীকে একজন পূর্ণ বয়ষ্ক ও উপার্জনক্ষম শিক্ষার্থী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তার বাবাকে যাকাত দিলে তা আদায় হয়ে যাবে কি? জবাবে বলেছিলেন, হ্যা জায়েয। কেননা তার পূর্ণ বয়ষ্ক ও উপার্জনক্ষম হওয়ার দরুন সে দায়িত্ব শেষ হয়ে গেছে। আর বিদ্যার্জনে মশগুল থাকার কারণে সে যাকাত পেতে পারে। (আরবি***************)] আর এমন মেয়েদেরও, যতক্ষণ তাদের বিয়ে না হচ্ছে। তাদের স্বামীরাও এদের মধ্যে গণ্য। তবে সন্তানের সন্তানের কথা ভিন্নতর। তাদের খরচ বহনদাতার কর্তব্যভুক্ত নয়। যেমন নাতিদের কর্তব্য নয় দাদার খরচ বহন। সন্তানের তার দরিদ্র- ফকীর পিতামাতার খরচ বাধ্যতামূলক, যেমন স্বামীর জন্যে তার স্ত্রীর ও তার স্ত্রীর ও তার একজন সেবকের খরচ বহন করা বাধ্যতামূলক। ভাইবোন ও অপর নিকটাত্মীয় ও মুহররম ব্যক্তি সম্পর্কিত আত্মীয়ের। [(আরবি***************)] খরচ বহন কারুর জন্যে বাধ্যতামূলক নয়। [ঐ. পৃ. ২৫৪।] এক্ষণে সেই লোকের পিতা-মাতা ও সন্তান এই নিকটাত্মীয় ব্যতীত অন্যান্য নিকটাত্মীয়ের যাকাত জায়েয- যেমন ইমাম মালিকের মত।
নিকটাত্মীয়দের যাকাত দেয়া জায়েয বলেছেন যাঁরা
অন্যান্য আলিম নিকটাত্মীয়দের যাকাত দেয়া জায়েয বলেছেন পিতা-মাতা ও সন্তানদের ছাড়া। তাদের কেউ কেউ ভিত্তি করেছেন এই কথার ওপর যে, নিকটাত্মীয়ের যাবতীয় ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব পালন শুধু একটা সদাচরণ ও আত্মীয়তা রক্ষার মহান ব্রত মাত্র। এটা কারুর ওপর চাপিয়ে দেয়া যায় না, কাউকে তা করার জন্যে বাধ্য করা যায় না, মজবুর করা যায় না অথচ তাদেরই অনেকেই মনে করেছে, এটা একান্তই পালনীয় ওয়াজিব। এতদসত্ত্বেও তারা নিকটাহত্মীয়কে যাকাত দেয়ায় কোন প্রতিবন্ধকতা আছে বলে মনে করেন না। ইমাম আবূ হানীফা, তার সঙ্গিগণ এবং ইমাম ইয়াহইয়া এই মত প্রকাশ করেছেন। ইমাম আহমাদ থেকে বাহ্যিক বর্ণনাও এরূপ। ইবনে কুদামাহ বলেছেন, এই বর্ণনাটি বহুসংখ্যক মুহাদ্দিস কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে। বলেছেন, ইসহাক ইবনে ইবরাহীম ও ইসহাক ইবনে মনসুরের বর্ণনায় এই কথা রয়েছেঃ
তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন ভাই, বোন ও খালাকে যাকাত দেয়া যাবে? জবাবে বললেনঃ পিতামাতা ও সন্তানাদি ছাড়া আর সব নিকটাত্মীয়কেই দেয়া যাবে। এটাই অধিকাংশ আলিমের মত। আবূ উবাইদ বলেছেন, আমারও সেই কথা। কেননা নবী করীম (সা) বলেছেনঃ (আরবি***************) দান মিসকীনকে দিলে হয় দান আর রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়কে দিলে তা যেমন দান, তেমনি তা আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাও। [আবূ দাঊদ ছাড়া অপর পাঁচখানি হাদীস গ্রন্থে উদ্ধৃত।]
এখানে নফল বা ফরয-কোন কিছুরই শর্ত করা হয়নি। উত্তরাধিকারী ও অপরদের মধ্যেও কোন পার্থক্য রাখা হয়নি। কেননা এরা বংশের মূল কাঠামোর সাথে সম্পর্কিত নয়। ফলে অনাত্মীয় লোকদের মত হয়ে গেছে। [(আরবি***************)]
ইবনে আবূ শায়বা ও আবূ উবাইদা একদল সাহাবী ও তাবেয়ীন থেকে এই বর্ণনাটি উদ্ধৃত করেছেন। ইবনে আব্বাসের বর্ণনায় তিনি বলেছেনঃ নিকটাত্মীয়রা অভাবগ্রস্ত হলে তাকে যাকাত দেবে।’
ইবরাহীম থেকে বর্ণিত, ইবনে মাসউদের স্ত্রী তার অলংকারের যাকাত সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- তিনি অলংকারের যাকাত দিতে হয় বলে মনে করতেন- আমার ক্রোড়ে আমার ভাইয়ের ইয়াতীমরা লালিত, আমার যাকাত তাদের দেব? তিনি বলেছিলেনঃ হ্যাঁ।
সায়ীদ ইবনুল মুসাইয়্যিব বলেছেনঃ আমার ইয়াতীম ও আমার নিকটাত্মীয়রাই আমার যাকাত পাওয়ার সবচাইতে বেশি অধিকারী।
হাসানকে জিজ্ঞাসা করেছিলঃ আমার ভাইকে আমার যাকাত দেব? বললেনঃ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই, ভালোবেসে দেবে।
ইবরাহীমকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ একজন মেয়েলোকের সম্পদ আছে। সে তার যাকাত তার বোনকে দেবে কি? বললেনঃ হ্যাঁ।
দহহাক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেনঃ তোমার নিকটাত্মীয়রা গরীব হয়ে থাকলে অন্যদের অপেক্ষা তারাই তোমার যাকাত পাওয়ার বেশি অধিকারী।
মুজাহিদ থেকে কর্ণিত, বলেছেনঃ গ্রহণ করা হবে না এরূপ অবস্থায় যে, তার রক্ত সম্পর্ক তার মুখাপেক্ষী। [এসব উক্তি ‘মুসান্নাফ ইবনে আবূ শায়বা’ গ্রন্থের ৪র্থ খণ্ডের ৪৭-৪৮ পৃষ্ঠায় (আরবি***************) গন্থের ৫৮১-৫৮২ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।]
তুলনা ও অগ্রাধিকার দান
উপরে যে বিভিন্ন মত ও উক্তি উদ্ধৃত হয়েছে আমি তার মধ্যে অগ্রাধিকার দিচ্ছি সাহাবী, তাবেয়ীন ও তৎপরবর্তীকালের অধিক সংখ্যক আলিম সে মত দিয়েছেন, সেটিকে। আর তা হচ্ছে, পিতামাতা ও সন্তান ছাড়া অন্যান্য সব নিকটাত্মীয়কেই যাকাত দেয়া জায়েয হবে। ইমাম আবূ উবাইদাও তাঁর (আরবি***************) গ্রন্থে এই মতকেই তারজীহ্ দিয়েছেন।
এ ব্যাপারে আমাদের দলিল হচ্ছেঃ
প্রথমত যে সব শরীয়াতী দলিল যাকাতকে সাধারণভাবে ফকীর মিসকীনদের জন্যে নির্দিষ্ট করেছে, তাতে নিকটাত্মীয় ও অনাত্মীয়ের মধ্যে কোন তারতম্য করা হয়নি। যেমন যাকাতের মূল আয়াতঃ ‘সাদকাত কেবলমাত্র ফকীর ও মিসকীনের জন্যে’। হাদীসেও বলা হয়েছেঃ তাঁদের ধনীদের নিকট থেকে তা দেয়া হবে এবং তাদেরই ফকীরদের মধ্যে তা বণ্টন করা হবে।’
এই সাধারণ তাৎপর্যসম্পন্ন ঘোষণাবলী সব নিকটাত্মীয়কেও শামিল করে। তাদেরকে এই সাধারণ অধিকারের বাইরে নিয়ে যাওয়ার মত কোন তারতম্যধর্মী দলিল একটিও নেই। তবে স্ত্রী, পিতামাতা ও সন্তানদের কথা স্বতন্ত্র। এদেরকে এই সাধারণ অধিকার থেকে বাইরে গণ্য করে ইজমা। ইবনুল মুনযির, আবূ উবাইদ ও ‘বাহারিযুখনার’ গ্রন্থ প্রণেতাগণ এই ইজমার কথা উল্লেখ করেছেন নিজ নিজ গ্রন্থে।
এ ছাড়া আরও দলিল-প্রমাণ রয়েছে। যথাস্থানে আমরা সে সবের উল্লেখ করেছি।
দ্বিতীয়ঃ যেসব দলিলে বিশেষভাবে নিকটাত্মীয়দের প্রতি সাদকা দানের উৎসাহ দেয়া হয়েছে- যেমন রাসূলে করীম (সা)-এর কথা মিসকীনকে সাদকা দিলে তা একটা সাদকাই হয়। আর রক্ত সম্পর্কশীল আত্মীয়কে দিলে তা সাদকা ও আত্মীয়তা রক্ষা উভয়ই হয়। [হাদীসটি আহমাদ, নাসায়ী, তিরমিযী, ইবনে হাব্বান, হাকেম, দারে কুতনী উদ্ধৃত করেছেন। তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। (আরবি***************)]
‘সাদকা’ যাকাত বোঝায়- যেমন পূর্বে বলা হয়েছে। নবী করীম (সা)-এর আর একটি বাণীঃ (আরবি***************)
নিকটাত্মীয়কে দান করার উত্তম দিক হচ্ছে তোমার শত্রুতা গোপনকারী। [হাদীসটি আহমাদ ও তাবারানী কর্তৃক আবূ আইউব থেকে এবং এ দুজনই হাকীম ইবনে হেজাম থেকে বর্ণিত হয়েছে। (আরবি***************) এ-ও তা উদ্ধৃত হয়েছে। বলেছেনঃ এর সনদ হাসান। অনুরূপভাবে তাবারানী উদ্ধৃত করেছেন (আরবি***************) গ্রন্থে উম্মে কুলসুম বিনতে আকাবা থেকে। এর বর্ণনাকারিগণ নির্ভরযোগ্য। (আরবি***************)]
অনুরূপভাবে তাবারানী ও বাজ্জার আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণনা করেছেন ( পূর্বে উদ্ধৃত হাদীসটির অংশ- যা বুখারী, মুসলিম ও আহমাদ উদ্ধৃত করেছেনঃ) তার স্ত্রী বিলালকে বললেনঃ দুই মুহাজির মহিলার পক্ষ থেকে রাসূলে করীমকে সালাম বল। কিন্তু আমাদের পরিচিতি প্রকাশ করো না। তাকে বলঃ তার স্বামী নিঃস্ব এবং তার ক্রোড়ে পালিত তার ভাইয়ের ঐরসজাত সন্তান ইয়াতীমদের জন্যে তার যাকাত ব্যয় করলে সে কি শুভ ফল পাবে? অতঃপর বিলাল নবী করীমের নিকট উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞাসা করায় তিনি বলরেনঃ হ্যা, তার জন্যে দ্বিগুণ শুভ ফল। একটা হল নিকটাত্মীয়তার আর একটা দানের সওয়াব। [হাদীসটি তাবারানী (আরবি***************) গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন, বাজ্জারও অনুরূপ বর্ণনা তুলেছেন। একজন বর্ণনাকারী হাজ্জাজ ইবনে নছর, ইবনে হাব্বান প্রমুখ তাকে সিকাহ’ বলেছেন: কিন্তু তার সম্পর্কে আপত্তি আছে। বাজ্জারের বর্ণনাকারিগণ সহীহ্। দেখুনঃ (আরবি***************) সহীহ্ ইবনে হাব্বানেও উদ্ধৃত হয়েছে। দেখুনঃ (আরবি***************) ] আমরা বলেছি, কোনরূপ বিস্তারিত কথা জিজ্ঞাসা না করাটা এই সম্ভাব্যতা আনে যে, কথার তাৎপর্য হচ্ছে সাধারণ নির্বিশেষ। ইলমে উসূলের বিশেষজ্ঞগণ এই তত্ত্ব উপস্থাপিত করেছেন।
তাঁদের কথা- ‘নিকটাত্মীয়দের দিলে তার ফায়দাটা তার নিজেরই হয়, এবং তার নিজের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব ছুটে যায়, এ কথাটি স্ত্রী, সন্তান ও পিতামাতার ক্ষেত্রে খুবই সত্য ও প্রযোজ্য। কেননা তাদের ফায়দা মিরিত অবিভাজ্য। তারা সকলেই তার মালে সমানভাবে শরীক। এদের ব্যয়ভার বহন তার জন্যে ওয়াজিব এবং তা কুরআন ও সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত।
অন্যান্য নিকটাত্মীয়ের ব্যাপারে- আমি যা মনে করি, তাদের ব্যয়ভার বহন নিকটাত্মীয়ের জন্যে বাধ্যতামূলক হয় যদি তথায় মুসলমানদের ধন-মালে তাদের জন্যে যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদ না থাকে। আর যাকাত, ফাই, এক-পঞ্চমাংশও বায়তুলমালের অন্যান্য আয় উৎস। এগুলোর দ্বারা ব্যবস্থা করা না হলে তখন সচ্ছল অবস্থার নিকটাত্মীয়কে ক্ষুধা-বস্ত্রহীনতার মধ্যে পড়ে মরে যেতে দিতে পারে না। অনুরূপভাবে সরকার যদি যাকাত সংগ্রহকারী ও দরিদ্র জনগণের জীবিকার নিরাপত্তা দানকারী না হয়, তখন ধনী নিকটাত্মীয়ের কর্তব্য হয় তার নিকটাত্মীয় দরিদ্র ব্যক্তির ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালন করা। অভাব-অনটনে জর্জরিত হয়ে মরতে দিতে পারে না সে। এই নিরাপত্তা দান সম্পূর্ণ মাত্রায় কার্যকর হোক, কি আংশিক, তার জন্যে যাকাত দ্বারা এই ব্যবস্থা গ্রহণ করায় কোন দোষ নেই।
কেননা নিকটাত্মীয়ের নিরাপত্তা দান, তার প্রয়োজন পূরণ ও তার দুঃখ বিদূরণই ওয়াজিব। এটা আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার্থে এবং তার অধিকার আদায়স্বরূপ। আর এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করার জন্যে যাকাতকে একটা আয়রূপে গণ্য করার পথে প্রতিবন্ধক কোন দলিল পাওয়া যায়নি। সরকার যদি এই যাকাত সংগ্রহ করত তাহলে এই সব দরিদ্র ব্যক্তির ব্যয়ভার যাকাতের আয় থেকেই বহন করা সম্ভব হত। তাই এরূপ অবস্থায় যখন এরূপ সরকার নেই- একজন মুসলিম ব্যক্তি রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতিনিধি হিসেবে তার নিকটাত্মীয়দের জন্যে এই নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে- করবে সেই যাকাত দিয়েই, যা দিয়ে রাষ্ট্রেরই কর্তব্য ছিল তা সংগ্রহ ও বন্টন করে এই ব্যবস্থা কার্যকর করা।
তবে এমন আলিমও রয়েছেন, যারা নিকটাত্মীয়ের ব্যয়ভার পালনের বাধ্যবাধকতা এবং তাকে যাকাত দেয়ার মধ্যে কোন বৈপরীত্য আছে বলে মনে করেন না। তাঁরা বলেছেন, নিকটাত্মীয়দের ব্যয়ভার বহন করা বিশেষ কয়েকটি শর্তের ভিত্তিতে ওয়াজিব। তা সত্ত্বেও তাদেরকে যাকাত দেয়া তাঁরা জায়েয বলেছেন।
এটা ইমাম আবূ হানীফা ও তাঁর সঙ্গিগণের অভিমত। তাঁরা চিন্তা করেছেন, ব্যয়ভার বহন বাধ্যতামূলক হলেও তা যাকাত দেবার প্রতিবন্ধক নয়। যাকাত দেবার প্রতিবন্ধক হচ্ছে দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে ফায়দার মালিকানার ক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব। এরূপ অবস্থায় ‘মালিক বানিয়ে দেয়া’ তাদের মতে যাকাতের যে-রুকন, এই অবস্থাটা দাতা ও তার সন্তান পিতামাতার মধ্যে সংঘটিত হয়, তা ছাড়া অন্য কোনখানে তা ঘটে না। এই কারণেই তাদের পরস্পরের পক্ষে পরস্পরে সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় না। কিন্তু অন্য নিকটাত্মীয়দের বেলায় তা নয়। তাদেরকে যাকাত দিলে সেখানে ‘তামলীক’ হতে পারে। কেননা সেক্ষেত্রে যাকাতের ফায়দাটা পারস্পরিক শরীকানায় থাকে না, সেটা ছিন্ন হয়ে যায়। আর এ কারণে তাদের পারস্পরিক সাক্ষ্যদানও বৈধ বলে স্বীকৃত হয়। [ দেখুন (আরবি***************)]
‘রওজুন্ নজীর’ গ্রন্থ প্রণেতা শেষ দিকের জায়দীয়া ফিকার ফিকাহবিদ। তিনি বলেছেনঃ ‘আলিমগণ যে কারণ দেখিয়েছেন যে, নিকটাত্মীয়কে যাকাত দিরে তাতে ভবিষ্যতের যে ব্যয়ভার বহন তর দায়িত্ব, তা প্রত্যাহৃত হয়ে যায়। তাই নিকটাত্মীয়দের সাদকা দানের ব্যাপারে হাদীসসমূহে যে উৎসাহ দান করা হয়েছে তার সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার দরুন তা গহণ যোগ্য নয়। কেননা বাধা হচ্ছে, বলা যাবে যে, নিকটাত্মীয়ের খরচ বহনও ওয়াজিব- তাকে যাকাত দিলে তা বিন্দুমাত্র নষ্ট হয়ে যায় না। কেননা নিকটাত্মীয় কর্তৃক নিকটাত্মীয়ের খরচ বহনের ব্যাপারটি কখনও কখনও ওয়াজিব হয়, স্থায়ীভাবে তো নয়। [(আরবি***************)]
ইমাম শাওকানী বলেছেন, আসল কথা হচ্ছে, কোনই প্রতিবন্ধকতা নেই। যে লোক মনে করেন, নিকটাত্মীয়তা কিংবা ব্যয়ভার বহন ওয়াজিব হওয়া দুটিই প্রতিবন্ধক, তার স্বপক্ষে দলিল পেশ করা তারই কর্তব্য। কিন্তু আসলে তেমন কোন দলিল-ই নেই। [(আরবি***************)]
পঞ্চম আলোচনা
মুহাম্মদ (স)-এর বংশ পরিবার
যেসব হাদীস মুহাম্মদ (স)-এর বংশ-পরিবারের জন্যে যাকাত হারাম বলে
আহমাদ ও মুসলিম মুত্তালিব ইবনে রবীয়াতা ইবনুল হারিস ইবনে আবদুল মুত্তালিব থেকে বর্ণনা করেছেনঃ তিনি এবং ইবনে আব্বাস পুত্র ফযল একসাথে রাসূল করীমের নিকট উপস্থিত হলেন। পরে আমাদের একজন কথা বলতে গিয়ে বললেনঃ ‘হে রাসূল! আমরা আপনার নিকট এসেছি এই উদ্দেশ্যে যে, আপনি আমাদেরকে এ সব যাকাত-সাদকাতের ব্যাপারে দায়িত্বশীল নিযুক্ত করবেন। তাহলে তা থেকে অন্যরা যেমন ফায়দা পাচ্ছে, আমরাও তেমনি তার ফায়দা পেতে পারব। লোকেরা যেমন আপনার নিকট যাকাতের মাল পৌঁছিয়ে দেয়, আমরাও তেমনি পৌঁছিয়ে দেব। তখন নবী করীম (সা) বললেনঃ(আরবি***************)
সাদকা-যাকাত মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের বংশ পরিবারের লোকদের জন্যে বাঞ্ছনীয় নয়। কেননা তা লোকদের ময়লা আবর্জনা ছাড়া আর কিছুই নয়।
অপর বর্ণনার ভাষা হচ্ছেঃ (আরবি***************) মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের বংশ-পরিবারের লোকদের জন্যে যাকাত হালাল নয়।
‘মুন্তাকা’ গ্রন্থে এই হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে। [(আরবি***************)]
আবূ দাঊদ ও তিরমিযী আবূ রাফে থেকে বর্ণনা করেছেন (তিরমিযী হাদীসটিকে বলেছেন সহীহ্) বলেছেন রাসূলে করীম (সা) বনু মাখজুম গোত্রের এক ব্যক্তিকে সাদকা-যাকাত সংগ্রহের কাজে নিযুক্ত করেছেলেন। পরে সেই ব্যক্তি আবূ রাফেকে বললেঃ তুমি আমাকে অনুসরণ কর, তাহলে তুমিও তা থেকে পাবে। আমি বললামঃ আমি নিজেই রাসূলের নিকট প্রার্থনা করব, তাই করলামও। তখন তিনি আমাকে বললেনঃ (আরবি***************)
জনগণের মুক্ত দাস তদের নিজেদের মধ্যেই গণ্য হয়। আর আমরা আহলি বাইতের লোক। আমাদের জন্যে সাদকা-যাকাত হালাল হয় না। [দেখুনঃ (আরবি***************)]
আবূ রাফে রাসূলে করীমের মুক্ত দাস ছিলেন।
ইমাম বুখারী (আরবি***************) অধ্যায়ে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত হাদীস উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেছেনঃ হযরত আলীর পুত্র হাসান যাকাতের খেজুর থেকে একটি খেজুর ধরে মুখে পুরেছিলেন ( তিনি বালক বা শিশু ছিলেন) তখন নবী করীম (সা) বললেনঃ এ্যা, এ্যা, কি করছ?……… যেন তিনি তা ফেলে দেন। পরে বললেনঃ (আরবি***************)
তুমি কি বুঝতে পারনি, আমরা তো যাকাত খাই না?
হাদীসটি মুসলিমও উদ্ধত করেছেন। হাফেয ইবনে হাজার বলেছেন, মুসলিমের বর্ণনার ভাষা এইঃ (আরবি***************) আমাদের জন্যে যাকাত হালাল নয়।
অপর বর্ণনা মা’মার থেকে। তাঁর ভাষাঃ (আরবি***************)
সাদকা-যাকাত মুহাম্মাদের বংশধরদের জন্যে জায়েয নয়।
ইমাম আহমাদ, তাহাভী হাসান ইবনে আলীর নিজের বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেছেনঃ (আরবি***************)
আমি নবী করীম (সা) এর সঙ্গে ছিলাম। তখন যাকাতের খেজুরের দুটি বোঝা চলে এলো। আমি তার একটি ধরলাম ও সেটি মুখে নিক্ষেপ করলাম। নবী করীম (সা) তখনই সেটিকে মুখের পানিসহ ধরে ফেললেন। অতঃপর বললেনঃ মুহাম্মাদের বংশের লোকদের জন্যে যাকাত হালাল নয়।
এই হাদীসটির সনদ খুব মজবুত। [(আরবি***************)]
এ পর্যায়ে উল্লিখিত সমস্ত হাদীসই অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, নবী করীম (সা) এবং তার বংশের লোকদের জন্যে যাকত হালাল নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আলে মুহাম্মাদ’ – মুহাম্মাদের বংশের লোক’ কারা?…. কোন ধরনের সাদকা তাঁদের জন্যে হালাল নয়?
এ ক্ষেত্রে খুব বেশি মতবিরোধ দেখা যায়। আমরা তা এখানে উল্লেখ করছি। শেষে আমাদের অভিমতও প্রকাশ করব, কেন মতটিকে আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি তাও বলব।
‘আলে মুহাম্মাদ (স)’ কারা
হাফেয ইবনুল হাজার ‘ফতহুল বারী’ গ্রন্থে এবং শাওকানী ‘নাইলুল আওতার’ গ্রন্থে ’আলে’ বলতে কি বোঝায় তার বিস্তারিত ব্যাখায় ফিকাহবিদদের মতপার্থক্যের উল্লেখ করেছেন।
ইমাম শাফেয়ী ও বিপুল সংখ্যক আলিম বলেছেন, তারা হচ্ছে বনু হাশিম ও বনু-মুত্তালিব। ইমাম শাফেয়ীর এই মতের দলিল হচ্ছে, নবী করীম (সা) বনু মুত্তালিবকে বনু হাশিমের সাথে শরীক বানিয়েছেন নিকটাত্মীয়দের জন্যে নির্দিষ্ট অংশে। তাদের ছাড়া কুরাইশ বংশের অন্য কাউকে কিছু দেন নি। যে সাদকা দাতাদের প্রতি হারাম ঘোষণা করেছেন, তার বিকল্প ব্যবস্থা এই দানটা। বুখারী জুবাইর ইবনে মুতয়িম বর্ণিত হাদীসে এই কথাই দেখিয়েছেন। হাদীসটির বক্তব্য হচ্ছেঃ
আমি ও উসমান ইবনে আফফান নবী করীম (সা)-এর নিকট গেলাম। এবং বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল। আপনি বনু-মুত্তালিবকে তো খায়বরের এক-পঞ্চমাংশ দিয়েছেন, কিন্তু আমাদের বাদ দিয়েছেন। অথচ আমরা ও তারা একই মর্যাদার লোক। তখন রাসূলে করীম (সা) বলরেনঃ (আরবি***************)
বনু মুত্তালিব ও বনু হাশিম তো এক ও অভিন্ন জিনিস।
এ কথার জবাব দেয়া হয়েছে এই বলে, তিনি তাদের তা দিয়েছেন তাদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে, যাকাতের বিকল্প হিসেবে নয়। আবূ হানীফা, মালিক ও সাদুইয়া বলেছেন, শুধু বনু হাশিমরাই হচ্ছে আলে মুহাম্মাদ। আহমাদ থেকে বনু মুত্তালিব সম্পর্কে দুটি বর্ণনা এসেছে। আর অন্যদের থেকে এসেছে, তারা হচ্ছে, বনু গালেব ইবনে ফহর। ‘ফতহুল বারী’ গ্রন্থে এরূপ বলা হয়েছে।
‘বনু হাশিম’ বরতে বোঝায়, আলী, আকীল, জাফর, আব্বাস ও আল-হারাম-এর বংশধররা। তার মধ্যে আবূ লাহাবের বংশধররা গণ্য নয়। কেননা এই বংশের লোকই রাসূলের জীবদ্দশায় ইসলাম কবুল করে নি। এই কথার প্রতিবাদ করে (আরবি***************) গ্রন্থে বলা হয়েছেঃ উৎবা ও মা’কাব নামে আবূ লাহাবের দুই পুত্র মক্কা বিজয়ের বৎসর ইসলাম কবুল করেছিল। নবী করীম (সা) তাদের ইসলাম কবুলের দরুন খুব আনন্দিত হয়েছেলেন। তাদের জন্যে তিনি দো’আও করেছিরেন। এরাই দুইজন রাসূলে করীম (সা) এর সঙ্গে হুনাইন ও তায়েফ যুদ্ধে শরীকও হয়েছিল। বংশাবিজ্ঞ লোকদের মতে এই দুজনের অনুসরণকারীও ছিল বহু লোক।
ইবনে কুদামাহ্ লিখেছেন, বনু হাশিমের জন্যে ফরয যাকাত হালাল নয়, এ বিষয়ে কোন মতিবিরোধের কথা আমরা জানি না। আহলি বাইতের আবূ তালিবও তাই বলেছেন। ‘বাহরি যুখখার’ গ্রন্থে তার সূত্রে এ কথা উদ্ধৃত হয়েছে। ইবনে বাসলান এই পর্যায়ে ইজমা হওয়ারও উল্লেখ করেছেন। তাবারী ইমাম আবূ হানীফার এই মত উদ্ধৃত করেছেন যে, বনু হাশিমের জন্যে সাদকা গ্রহণ জায়েয। তার এই মতটিও উদ্ধৃত হয়েছে যে, তারা রাসূলের নিকটাত্মীয়দের জন্যে নির্দিষ্ট অংশ থেকে বঞ্চিত হলে যাকাত গ্রহণ তাদের পক্ষে জায়েয হবে। তাহাভী এই কথা বলেছেন।
কোন মালিকী আলিম আবহরী সূত্রে এই কথা উদ্ধৃত করেছেন। ‘ফতহুল বারী’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, কোন কোন শাফেয়ীরও এই মত।
ইমাম আবূ ইউসুফ থেকেও এই কথা উদ্ধৃত হয়েছঃ যাকাত তাদের মধ্যে পারস্পরিকভাবে গ্রহণ করা জায়েয, অন্য লোকদের নিকট থেকে জায়েয নয়। ‘বাহর’ গ্রন্থে জায়দ ইবনে আলী, মুর্তাজা, আবুল আব্বাস ও ইমামীয় সূত্রেও এ কথাই বলা হয়েছে। আর ‘শিফা’ গ্রন্থে আল-হাদী ও আল-কাসেম আল-ইয়ামীর সূত্রেও এ মতই বর্ণিত হয়েছে।
ইবনুল হাজার বললেন, এ পর্যায়ে মালিকী মাযহাবের পক্ষে চারটি প্রসিদ্ধ বক্তব্য রয়েছেঃ জায়েয, নিষিদ্ধ, নফল দান জায়েয, ফরয নয় আর তার বিপরীত।
শাওকানী লিখেছেন, যে সব হাদীস সাধারণভাবে হারাম হওয়ার কথা বলে, তা সকলের জন্যেই প্রবর্তিত। বলা হয়েছে এই হাদীসসমূহ তাৎপর্যতভাবে ‘মুতাওয়াতির’। খোদ আল্লাহর কালামও তাই বলেঃ
(আরবি***************)
বল এই কাজের বিনিময়ে আমি তোমাদের নিকট কোন পারিশ্রমিক চাই না- শুধু নৈকট্যে ভালোবাসা চাই।
বলেছেনঃ (আরবি***************) বল, এই কাজের জন্যে আমি তোমাদের নিকট কোন পারিশ্রমিকই চাই না।
এই পারিশ্রমিক বা যাকাত যদি তার আলে’র জন্যে হালাল করে দিতেন, তাহলে তারা সেজন্যে সম্ভবত দোষ ধরত। আল্লাহর এ কথাটিও পঠনীয়ঃ (আরবি***************)
তুমি তাদের নিকট থেকে যাকাত গ্রহণ কর, তুমি তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে তার দ্বারা।
নবী করীম (সা) এর কথাটিও প্রমাণিত হয়েছেঃ (আরবি***************) যাকাত জনগণের ময়লা। [ ইবনুল হাজার বলেছেনঃ এ দলিল থেকে নফল সাদকা জায়েয প্রমাণিত হতে পারে, ফরয যাকাত নয়। অধিকাংশ হানাফী আলিমেরও এই মত। শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের লোকদের নিকটও তাই,। তার বিপরীতটা-ফরয যাকাত জায়েয, নফল দান জায়েয নয়। বলেছেন, ফরয দান গ্রহণ করায় কোন লাঞ্ছনা নেই, নফল দানের কথা আলাদা। বনু হাশিম ও অন্যদের মধ্যে এই তারতম্য করার কারণ হচ্ছে নীচের হাত উপরের হাতের ওপর তোলাই হল নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ। কিন্তু উপরের হাতও যদি সেরূপ হয়, তাহলে দোষ নেই। (আরবি***************)] মুসলিমের বর্ণনা।
যারা বলেছেন, হাশিমীরা হাশিমীদের নিকট থেকে গ্রহণ করতে পারে- তা হালাল, তারা দলিল হিসেবে পেশ করেছেন হযরত আব্বাস বর্ণিত হাদীস। এ হাদীসটি মুহাদ্দিস হাকেম ‘উলুমুল হাদীস’ –এর ৩৭তম অধ্যায়ে এমন সনদের সূত্রে উদ্ধৃত করেছেন যার সব কয়জন লোকই বনু হাশিম থেকে। তা হচ্ছে, হযরত আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব বলেছেনঃ ‘আমি বললাম, হে রাসূলুল্লাহ! আপনি তো আমাদের পরস্পর থেকে তা গ্রহণ করা হালাল হবে কি না? বললেন হ্যাঁ। কিন্তু এই হাদীসের কতিপয় বর্ণনাকারীর ওপর ‘তুহমাত’ (দোষ) আরোপিত হয়েছে।
ইমাম ইবনে হাজার ও ইমাম শাওকানী যা উদ্ধৃত করেছেন, তা ছাড়াও এখানে আমরা চারটি মাযহাবের গ্রন্থাবলী যা যা বলা হয়েছে, তা উদ্ধৃত করছি। এতে করে আলোচনাটি পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করবে।
হানাফী ফিকাহর (আরবি***************) গ্রন্থে বলেছেনঃ
ইমাম আবূ হানীফা থেকে বর্ণিতঃ তাদেরকে নফল ও ফরয যাকাত দিতে কোন দোষ নেই। ইমাম মুহাম্মাদের (আরবি***************) –এ বলা হয়েছেঃ
ইমাম আবূ হানীফা থেকে এপর্যায়ে দুটি বর্ণনা এসেছে। ইমাম মুহাম্মাদ বলেছেনঃ আমরা জায়েয হওয়ার বর্ণনাটি গ্রহণ করছি কেননা তা তাদের জন্যে হারাম ছিল বিশেষভাবে স্বয়ং রাসূলে করীমের জামানায়। (আরবি***************) গ্রন্থে বলা হয়েছেঃ ইমাম আবূ হানীফা থেকে হাশিমীকে যাকাত দেয়া অনুরূপভাবে জায়েয বলে বর্ণনা এসেছে।
তাঁর থেকে এসেছেঃ আমাদের এই যুগে তা নিঃশর্তভাবে জায়েয। তাহাভী বলেছেনঃ আমরা এই মতটিই গ্রহণ করছি। কাহাস্তানী প্রমুখও এই কথাটিকেই বহাল রেখেছেন। [দেখুনঃ (আরবি***************)]
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া অগ্রাধিকার দিয়ে বলেছেন, বনু হাশিমের জন্যে হাশিমীদের যাকাত গ্রহণ করা জায়েয। [(আরবি***************)] জাফরীয়া’র মতও তাই। [(আরবি***************) এই গ্রন্থে রয়েছেঃ মুস্তাহাব যাকাত সব মানুষ থেকেই গ্রহণ তাদের জন্যে জায়েয ব্যবসায়ের যাকাতের ন্যায়। তাছাড়া যব, গম, খেজুর, কিশমিশ ও অন্যান্য কৃষি ফসলেরও।]
এক্ষেত্রে সবচাইতে কঠিন ও কঠোর মাযহাব হচ্ছে জায়দীয়া মাযাহাব। তাতে হাশেমীদের হাশেমী থেকে যাকাত গ্রহণও জায়েয মনে করা হয়নি। তাদের নিকট এটার ওপরই নির্ভরতা। তারা যাকাত গ্রহণের চাইতে লাশ খাওয়া ভাল বলেছেন। বলেছেনঃ লাশ ভক্ষণ যদি তাকে ক্ষতি করে, তা হলে ঋণ হিসেবে যাকাত নিতে পারে।
এ গ্রন্থে লিখিত রয়েছেঃ মুস্তাহাব যাকাত সব মানুষ থেকেই গ্রহণ তাদের জন্যে জায়েয- ব্যবসায়ের যাকাতের ন্যায়। তাছাড়া যব, গম, খেজুর, কিসমিস ও অন্যান্য কৃষি ফসলেরও।
তা যখনই সম্ভব হবে ফিরিয়ে দেবে। এ সব কথা সেই কঠিন ঠেকায় পড়া ব্যক্তি সম্পর্কে, যার ক্ষুধায় বা পিপাসায় কিংবা নগ্নতা প্রভৃতির দরুন ধ্বংস ও মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে পড়েছে। [(আরবি***************)]
হাশিমীর গনীমত ও ফাই সম্পদের অংশ না পেলে
এখানে একটি গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে। আর তা হচ্ছে, বায়তুলমালে যখন গনীমত দও ফাইর সম্পদ থাকবে না কিংবা এমন ব্যক্তি তার কর্তা হয়ে বসল যে, তাদেরকে সে কিছুই দিচ্ছে না, তখন বনু হাশিমের অবস্থা কি হবে? মালিকী মাযহাবের কেউ কেউ বলেছেন, বায়তুলমাল থেকে তাদের যা প্রাপ্য তা যদি তাদেরকে দেয়া না হয় আর সে কারণে তারা কষ্টের দারিদ্র্যের সম্মুখীন হয়ে পড়ে, তাহলে তখন তাদেরকে যাকাত থেকে দিতে হবে। এরূপ অবস্থায় তাদেরকে দেয়া অন্যদেরকে দেয়ার তুলনায় অনেক উত্তম।
তবে তাঁদের কেউ কেউ এই শর্ত করেছেন যে, এই দানটা জায়েয হবে কেবল কঠিন প্রয়োজন দেখা দিলে, এরূপ অবস্থায় অন্যান্য হারাম জিনিসও যেমন হালাল হয়ে যায়, এও তেমনি। এরূপ অবস্থায় লাশ ভক্ষণ করাও মুবাহ হয়ে যায়। তার অর্থ, তা আসলে হারাম প্রয়োজন বশত হালাল হয়ে গেছে। (হালাল হয়ে গেছে ঠিক নয়, শুধু খাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে শর্ত সাপেক্ষে)।
অন্যরা বলেছেনঃ এই শেষের যুগে এসে দৃঢ় প্রত্যয় দুর্বল হয়ে পড়েছে। কাজেই তাদেরকে যাকাত দেয়া যিম্মী ও কাফির-ফাজিরদের যাকাত দেয়ার তুলনায় অনেক সহজ। [(আরবি***************)]
হানাফীদের কারুর কারুর বক্তব্য আমরা একটু পূর্বেই উদ্ধৃত করেছি। শাফেয়ী মাযহাবের আবূ সায়ীদ আল-ইস্তুখরী বলেছেনঃ তারা যদি ‘খুমুস’ থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে তাদের যাকাত দেয়া জায়েয। কেননা তাদের জন্যে যাকাত হারাম করা হয়েছে এই কারণে যে, গনীমতের এক-পঞ্চমাংশের এক-পঞ্চমাংশে তাদের প্রাপ্য নির্দিষ্ট হয়েছিল। অতএব এই প্রাপ্য যখন তারা পাবে না, তখন যাকাত দেয়া ওয়াজিব।
নববী রাফেয়ী থেকে উল্লেখ করেছেনঃ গাযালীর সঙ্গী মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াহইয়া উক্ত মতের সমর্থনে ফতোয়া দিতেন। [(আরবি***************)]
ইবনে তাইমিয়া ও হাম্বলী মাযহাবের কাযী ইয়াকুব অগ্রাধিকার দিয়ে বলেছেন, তারা যদি গনীমত ও ফাই সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে জনগণের যাকাত থেকে তারা অংশ গ্রহণ করতে পারে-তা জায়েয। কেননা এক্ষণে তারা বড় অভাব ও প্রয়োজনের মধ্যে রয়েছে। [(আরবি***************)]
ইমামীয়া জাফরীয়া’র মাযহাব-ও তাই। [(আরবি***************)]
বনু হাশিমকে যাকাত দেয়ার পক্ষে জমহুর ফিকাহবিদগণ কোন মত দেন নি। (এককভাবে তারা কিংবা মুত্তালিবসহ- এ পর্যায়ের মতভেদ পূর্বে উদ্ধৃত হয়েছে) তারা যদি এক- পঞ্চমাংশ পাওয়া থেকে বঞ্চিতও হয় তবুও। কেননা যাকাত তাদের জন্যে হারাম করা হয়েছে রাসূলে করীমের সাথে তাদের সম্পর্কের মর্যাদার কারণে, তাই ‘খুমুস’ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হলে এই মর্যাদাটা তো শেষ হয়ে যায় না। [(আরবি***************)]
পর্যালোচনা ও অগ্রাধিকার দান
আমি যা মনে করি, আমাদের এ কালে নবী করীম (সা)-এর নিকটাত্মীয়দের যাকাত দেয়ার কথাটিই অধিক যুক্তিসংগত ও শক্তিশালী। কেননা এ কালের তারা গনীমত ও ফাই সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ পাচ্ছে না। নবী করীম (সা)-এর জীবদ্দশায় তাদের প্রতি সাদকা-যাকাত হারামকরণের বিনিময়ে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে আল্লাহ তা’আলার তরফ থেকে এই গনীমত ও ‘ফাই’ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
আর নিকটাত্মীয় হিসেবে যে অংশটি নির্দিষ্ট হয়েছিল, তার উল্লেখ এই আয়াতটিতে রয়েছেঃ (আরবি***************)
তোমরা জেনে রেখো, যে জিনিসই তোমারা গনীমতরূপে পাবে, তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহর জন্যে এবং রাসূলের জন্যে, নিকটাত্মীয়দের জন্যে, ইয়াতীম, মিসকীন ও নিঃস্ব পথিকের জন্যে। [(আরবি***************)]
অপর আয়াতঃ (আরবি***************)
আল্লাহ্ তাঁর রাসূলকে নগর-গ্রামবাসীদের কাছ থেকে ‘ফাই’ হিসেবে যা-ই দিবেন, তা আল্লাহর জন্যে, রাসূলের জন্যে, নিকটাত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন ও নিঃস্ব পথিকের জন্যে যেন ধন-সম্পদ কেবলমাত্র তোমাদের ধনী লোকদের মধ্যেই আবর্তনশীল হয়ে না থাকে। [(আরবি***************)]
বনু হাশিমের জন্যে যাকাত হারাম করা হয়েছিল তাদের মর্যাদা রক্ষার্থে। এ কথাটি খুব শক্তিশালী নয়। বরং উত্তম কথা হল, তা ছিল রাসূলের তরফ থেকে তাদের সংরক্ষণ এবং সাহায্যদান স্বরূপ। ফলে এই প্রাপ্তিতে তাদের মুসলিম ও কফির উভয় শ্রেণীর লোকই অংশীদার হয়েছিল।
বনু মুত্তালিবকে বনু হাশিমের সাথে সংযুক্ত করার উদ্দেশ্যে কোন কোন শাফেয়ী উক্তরূপ কথা বলেছেন। তাঁরা যুক্তিস্বরূপ বলেছেন, এরা সকলেই রাসূলে করীমের সঙ্গে বহু দুঃখ-কষ্ট নির্যাতন ও ক্ষুধা-যন্ত্রণা ভোগ করেছেন। এরা তার সঙ্গী হয়ে আবূ তালিব গুহায় প্রবেশ ও অবস্থান করেছেন এবং কুরাইশের ক্রোধ ও বয়কটের যন্ত্রণা তিলে তিলে সহ্য করেছেন। পরে যদি কোন-না-কোন কারণে নিকটাত্মীয়ের জন্যে নির্দিষ্ট এই অংশটি প্রত্যাহার করা হয়, বায়তুলমাল শূন্য হওয়া অথবা শাসকদের স্বৈর নীতি অনুসরণের কারণে তা দেয়া বন্ধ হয়ে যায়, তখন তাদেরকে যাকাত থেকে বঞ্চিত করা কিছুতেই উচিত হতে পারে না নতুবা সন্দেহটা তাহাদের জন্যে খুব মারাত্মক হয়ে দেখা দেবে।
রাসূলে করীম (সা)-এর দুনিয়া ছেড়ে চলে যাওয়ার পর নিকটাত্মীয়ের জন্যে নির্দিষ্ট এই অংশটি বাতিল হয়ে গেছে বলে যখন বিপুল সংখ্যক আলিম ও বিশেষজ্ঞ অভিমত ব্যক্ত করেছেন এবং পরবর্তী খলীফার নিকটাত্মীয়ের জন্যে তা পুনঃনির্ধারিত হয়ে গেছে অথবা তা জিহাদের প্রস্তুতি ও অস্ত্রশস্ত্র ক্রয়ে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত হয়েছে, [ আবূ উবাইদাও কিতাবুল খারাজে আবূ ইউসূফ এবং ইবনে জরীর সূরা আনফাল-এর উপরিউক্ত (গনীমত সংক্রান্ত) আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে হাসান ইবনে মুহাম্মাদ হানাফীয়া থেকে বর্ণিত একটি হাদীস উদ্ধৃত করেছেন। তাতে বর্ণিত হয়েছে, তাঁকে রাসূলের ও নিকটাত্মীয়ের অংশ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। জবাবে তিনি বলেছিলেন, রাসূলের ইন্তেকালের পর লোকেরা এ দুটি অংশ সম্পর্কে নানা মতবিরোধের মধ্যে পড়ে যায়। কারুর মত এই হয় যে, নৈকট্যের জন্যে নির্দিষ্ট অংশ ছিল রাসূলের নিকটাত্মীয়ের জন্যে। অপর লোকেরা বলেলেন, তা এখন মুসলমানদের খলীফার নিকটাত্মীয়রা পাবে। অপর লোকেরা বললে, নবী করীমের জন্যে নির্দিষ্ট অংশ তাঁর পরবর্তী খলীফা পাবে। পরে সকলের মতের সমন্বয় করা হয় এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যে, এই দুটি অংশ আল্লাহর পথে জিহাদের প্রস্তুতিতে ব্যয় করা হবে।
পরে হযরত আবূ বকর ও হযরত উমরের খিলাফত আমলে এই ব্যবস্থাই কার্যকর হয়। দেখুনঃ (আরবি***************) আরও দেখুনঃ (আরবি***************)- পরে পযরত আলী (রা) যখন খলীফা হলেন, তখনও এই নীতি কার্যকর থাকে (আরবি***************) ] তখন তার বিকল্প যাকাত তাদের জন্যে জায়েয হওয়া একান্তই বাঞ্ছনীয়।
উপরিউক্ত মতটি আরও শক্তিশালী হয় এই কথায় যে, জমহুর আলিম যেসব হাদীসের ভিত্তিতে বনু হাশিমের ওপর কিয়ামত পর্যন্ত সময়ের জন্যে যাকাত হারাম হওয়ার মত দিয়েছেন, কেউ কেউ বনু মুত্তালিবকেও তাদের সাথে যুক্ত করেছেন, সেই সব হাদীস আসলে উক্তরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পক্ষে সুস্পষ্ট রায় দেয় না।
সত্যি কথা হচ্ছে, যে লোকই সর্বপ্রকার দিদ্বেষ-আত্মপক্ষ, অন্ধ অনুসরণ, প্রশাসকদের খ্যাতি ও মতদাতাদের দাপট প্রভৃতি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে অনাবিল বিচার-বুদ্ধি দিয়ে সে সব বিষয় বিবেচনা করবেন, তাঁরই সম্মুখে উক্ত মতের বিপরীত কথাই সুস্পষ্টরূপে প্রতিবাদ হয়ে উঠবে, তা হচ্ছেঃ
ক. মুত্তালিব ইবনে রবীয়াতা বর্ণিত হাদীসের বক্তব্য হচ্ছে বনু হাশিমের দুইজন যুবক রাসূলে করীম (সা)-এর নিকট যাকাত-সাদকাত সংগ্রহের দায়িত্বে নিযুক্তির প্রার্থনা করে, যেন অন্য লোক যে ফায়দা পাচ্ছে, তারাও তা পেতে পারে। নবী করীম (সা) তাদের জন্যে এই পথ বন্ধ করে দেয়ার ইচ্ছ করলেন এবং তার ঘর ও নিকটবর্তী বংশের লোকদের পক্ষ থেকে ত্যাগ ও কুরবানীর অনুসরণযোগ্য আদর্শ কায়েম করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। গনীমতের মাল ও অনুরূপ ফায়দা পাওয়া থেকেও তাদেরকে দূরে রাখলেন। মক্কা বিজয়ের দিন তারা রাসূলের নিকট কাবার খেদমত ও পানি পান করানোর সেবার সুযোগ লাভ করতে চাইলেন। তখন তিনি তাদেরকে এই কাজের সুযোগ দিলেন। কেননা এ কাজে ঝুঁকি ও কষ্ট রয়েছে। তখন তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ (আরবি***************)
তোমাদের পক্ষে উত্তম হচ্ছে তা যা তোমরা দেবে, তা নয় যা তোমরা পাবে। [(আরবি***************)]
বুখারী উদ্ধৃত হাদীসের ভাষা হচ্ছে, ‘যাকাত আলে-মুহাম্মাদের জন্যে বাঞ্ছনীয় নয়’। এ থেকে বড়জোর মকরুহ তানজীহী বোঝায়্ মনে হয় যে কাজে হালাল নয় এমন জিনিস গ্রহণের আশংকা থাকে, তার নিকটে যাওয়া থেকে। তিনি তাদের মনে ঘৃণা বা এড়ানোর ভাব জাগাতে চেয়েছিলেন। ‘ইবনুল লাতবিয়’ তাই মনে করেছেন। আর এ কারণেই উবাদাতা ইবনুচ্ছামেত প্রমুখ সাহাবী সাদকাত-যাকাত সংগ্রহের কর্তৃত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। কেননা তাতে জায়েয নয় এমন অনেক কাজ হওয়ার আশংকা ছিল।
এই কর্তৃত্বপূর্ণ দায়িত্বটি কঠোরতার ওপর ভিত্তিশীল। কেননা তা জনগণের ধন-সম্পদের সাথে সংশ্লিষ্ট। আর তা গোটা মুসলিম সমষ্টির সম্পদ। মুসলমান অভাবগ্রস্ত লোকদের – কিংবা মুসলমানদের যে জিনিসেরই প্রয়োজন, তা পাওয়ার অধিকারে সম্পদ। তাই ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী পাওয়ার অধিকারসম্পন্ন লোকদের থেকে অতিরিক্ত যা-ই গ্রহণ করবে, তাতেই ফকীর ও অভাবগ্রস্ত লোকদের খালেছ অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করা হবে এবং সমষ্টির সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করা হবে।
এই হাদীস থাকা সত্ত্বেও অনুসৃত মাযহাবগুলোর বিপুল সংখ্যক আলিম বনু হাশিমের লোকদের জন্যে এই বিভাগের কর্মকর্তা হওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। ‘যাকাত সংস্থার কর্মচারী’ পর্যায়ের আলোচনায় আমরা এসব কথা বিশদভাবে বলে এসেছি। আবূ রাফে বর্ণিত হাদীসটিও এই তাৎপর্যকেই শক্তিশালী করে। তা স্পষ্ট করে বলে দেয় যে, রাসূলের ঘরের লোকদেরকে যাকাত-সাদকা সংক্রান্ত কাজকর্ম থেকে দূরে সরিয়ে রাখার মূল কারণ তাদের বংশীয় মর্যাদা রক্ষা নয়, বরং তাদের ওপর যে মিথ্যা সন্দেহ ও অভিযোগ হতে পারে, তা থেকে রক্ষা করাই ছিল আসল লক্ষ্য। ফলে মিথ্যা দোষারোপকারীদের মুখ যেমন বন্ধ থাকবে, তেমনি একটা উত্তম অনুসরণীয় আদর্শও সংস্থাপিত হবে। রাসূলের বংশ ও তাঁদের মুক্ত করা লোকদের এই প্রশিক্ষণও হবে যে, তারা কষ্ট ও ঝুঁকি বরদাশত করতে মন-মানসিকতার দিক দিয়ে প্রস্তুত হবে। গনীমতের মালের প্রতিও তাঁদের লোভ হবে না। কেবল মর্যাদা রক্ষাই যদি এই নিষেধের কারণ হত, তাহলে তাঁদের লোভ হবে না। কেবল মর্যাদা রক্ষাই যদি এই নিষেধের কারণ হত, তাহলে তাঁদের মুক্ত করা গোলামদের নিশ্চয়ই তাদের সাথে যুক্ত করা হত না।
খ. হাসান ইবনে আলীর বর্ণনা, রাসূলের কথাঃ ‘তুমি বোঝ না, আমরা যাকাত-সাদকা খাই না’ – এবং মুসলিমের বর্ণনাঃ ‘আমাদের জন্যে সাদকা যাকাত হালালা নয়,’ এসব থেকে আমার মনে হচ্ছে নবী করীম (সা) রাষ্ট ও সমাজপ্রধান হিসেবেই এসব কথা বলেছিলেন। কেননা তাঁর কর্তৃত্বে যাকাত-সাদকাত সংগৃহীত ও একত্রিত হলেই তো হালাল হয়ে যায় না। তা তো মুসলিম সমষ্টির মালিকানা সম্পদ। হযরত উমর (রা) যাকাতের দুগ্ধ পান করেছিলেন ভুলবশত, সঙ্গে সঙ্গেই তা থু থু করে ফেলে দিয়েছিলেন’- বর্ণনাটিও ঠিক এ পর্যায়ে গণ্য। [(আরবি***************)]
(আরবি***************) গ্রন্থে ঠিক এই জন্যেই বলা হয়েছেঃ ‘রাষ্ট্রপ্রধানের জন্যে হালাল নয়, যেমন রাসূলও রাষ্ট্রপ্রধানই। হযরত উমর যাকাতের দুগ্ধ এ জন্যেই পরিহার করেছিরেন। [(আরবি***************)]
গ. উক্ত হাদীসসমূহ যেসব কার্যকারণ ও সম্ভাবনা উপস্থাপিত করেছে, তা থেকে আমরা যখন দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলাম ও নিছক শব্দ সমূহের বিবেচনায় আত্মনিয়োগ করলাম, তখন বিবেচ্য হলঃ ‘আলে মুহাম্মাদ’ বাক্যটি কি বোঝায়? তা কি নিশ্চিতভাবে শুধু বনু হাশিমের লোকদের কিংবা তাদের সাথে বনু মুত্তালিবও বোঝায় কিয়ামত পর্যন্ত?
এরূপ অর্থ হওয়ার কোন অকাট্য ও নিরংকৃশ প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং ‘আলে-মুহাম্মাদ’ ঠিক ‘আলে ইবরাহীম’ ‘আলে ইমরান’ –এর মতই তাৎপর্যের ধারক। যেমন কুরআনের আয়াতে উদ্ধৃত হয়েছেঃ (আরবি***************)
নিশ্চয়ই আল্লাহ্ আদম, নূহ, আলে ইবরাহীম ও আলে ইমরানকে সারা জাহানের ওপর মনোনীত করেছেন।
এ আয়াতের ‘আলে-ইমরান’ বলতে মরিয়াম ও তাঁর পুত্র ঈসা (আ)-কে বোঝায়। আর আলে-ইবরাহীম’ বলতে ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব ত তাঁদের বংশধরদের বোঝায়। কিন্তু তাঁদের কিয়ামত পর্যন্ত বংশধরদের বোঝায় না। ইবরাহীম ও ইসহাক প্রসঙ্গে আল্লাহ নিজেই বলেছেনঃ (আরবি***************)
এখন এ দুজনের বংশধরদের মধ্য থেকে কেউ মুহসিন, সদাচারী আর কেউ নিজের আত্মার ওপর সুস্পষ্ট জুলুমকারী। [(আরবি***************)]
বিশ্ব বিধ্বংসী ইয়াহুদীরা তো হযরত ইবরাহীমেরই বংশোদ্ভূত লোক; আল্লাহর এ কথাটিও এ অর্থেইঃ (আরবি***************) পরে তাকে ফিরাউনের লোকেরা তুলে নিল। [(আরবি***************)]
এবং (আরবি***************) এবং ডুবিয়ে দিলাম ফিরাউনের লোকজনকে। [(আরবি***************)]
(আরবি***************) এবং ফিরাউনের লোকজনের ওপর নিকৃষ্ট ধরনের আযাব ভেঙ্গে পড়ল। [(আরবি***************)]
এক্ষণে প্রশ্ন হচ্ছে, ‘আলে-ফিরাউন’ বলে কেবল ফিরাউনকেই বুঝাতে হবে, না তার ঘরের লোকজনসহ সবাইকে এবং তাদের সাথে ঘনিষ্ঠতর সম্পর্কশীল লোকদেরও বুঝতে হবে?….. নিশ্চয়ই তা-ই হবে তার তাৎপর্য। তাই এখানেও – ‘আলে-মুহাম্মাদ’ বলে- কেবলমাত্র তার ঘরের লোক, তাঁর স্ত্রীগণ, সন্তানাদি, বংশধর এবং তাঁর ঘনিষ্ঠতম ব্যক্তিবর্গই বুঝতে হবে। আর এ কথাও বিশেষভাবে যথার্থ ও প্রয়োগযোগ্য কেবলমাত্র তাঁর (সা) জীবনে বেঁচে থাকা অবস্থার ক্ষেত্রে। ইমাম আবূ হানীফারও এই কথাই তাঁর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তাঁর সাথী মুহাম্মাদ ইবনুল হাসানও এই মতই গ্রহণ করেছেন। (আরবি***************) গ্রন্থ প্রণেতা বলেছেন, ইমাম মালিকের অনেক কয়টি মতের মধ্যে এ মতটি অন্যতম। আর তার কারণ দেখিয়েছেন এই বলে যে, মিথ্যা সন্দেহ ও দোষারোপ থেকে তাদের বাঁচাবার উদ্দেশ্যেই তা তাদের জন্যে হারাম ঘোষণা করা হয়েছিল। আর তা রাসূলের জীবনের অবসানের সাথে সাথেই নিঃশেষ হয়ে গেছে। [(আরবি***************)]
ইমাম শাওকানী ‘বল, আমি এই কাজের জন্যে তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না’ কুরআনী ভাষায় রাসূলের এ কথার ভিত্তিতে বলেছিলেন, তিনি যদি তাদের জন্যে যাকাত হালাল করে দিতেন, তাহলে এ জন্যে তাদেরকে অভিযুক্ত হতে হত। এই কথাটি বাতিল হয়ে যায়। কেননা এ সবই ছিল রাসূলে করীম (সা)-এর জীবদ্দশার ব্যাপার। কিন্তু তাঁর ইন্তেকালের পর তারা সকলে অন্যান্য মুসলমানের সমান মর্যাদার হয়ে গেছে। অতঃপর তাদের জন্যে কোন বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রশ্ন ওঠে না এবং এই ঘোষণা যথাযথভাবে কার্যকর হবেঃ ‘যাকাত গ্রহণ করা হবে সমাজের ধনী লোকদের থেকে এবং বণ্টন করা হবে তাদেরই দরিদ্রদের মধ্যে।’
আমরা এই কথা বলেছি দুটি কারণেঃ
প্রথমঃ ইসলামী শরীয়াত যাবতীয় বিধি-বিধানে নবী করীম (সা) এর নিকটাত্মীয়দের সাধারণ জনগণ থেকে ভিন্ন করে দেখেনি। বরং তিনি তো ঘোষণাই করেছেন যে, জনগণ চিরুনীর দাঁত বা কাঁটাগুলোর মতই সমান ও সর্বতোভাবে অভিন্ন। অধিকার ও দায়িত্ব কর্তব্যের ক্ষেত্রেও এই অভিন্নতা পুরোপুরি রক্ষিত হয়েছে, ঝুঁকি ও শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে কোনরূপ বৈষম্য পার্থক্যকে স্থান দেয়া হয়নি। নবী করীম (সা) উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছেনঃ ‘আল্লাহর কসম, মুহাম্মাদ-তনয়া ফাতেমাও যদি চুরি করে, তাহলেও আমি তার হাত কেটে দেব।’ [ বুখারী, মুসলিম] তিনি আরও বলেছেনঃ (আরবি***************)
যার নিজের আমল ও চরিত্র মন্থর, তার বংশ তাকে দ্রুতগতিশীল বানাতে পারে না। [বুখারী, মুসলিম]
দ্বিতীয়ঃ আর এ কারণটাই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। তা হচ্ছে ইসলামের যাকাত একটা বাধ্যতামূলকভাবে ধর্যকৃত ফরয। তা সর্বজনবিদিত হক ও অধিকার-একটা সুনির্দিষ্ট ‘কর’ বিশেষ। রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারই তা আদায় করার ও পাওয়ার যোগ্য লোকদের মধ্যে বন্টন করার জন্যে দায়িত্বশীল। তাই তাতে কারুর ওপর কারুর ব্যক্তিগত অনুগ্রহ বর্ষণের কোন অবকাশ থাকে না। যে লোক তা থেকে নেবে, তা নেবে তার পাওয়ার অধিকারের ভিত্তিতে। অতএব তাতে কোন দোষের স্থান নেই।
বিস্ময়ের ব্যাপার, কোন কোন ফিকাহবিদ-এবং অধিকাংশই হাশিমী বংশের লোকদের জন্যে ফরয – যাকাত হারাম মনে করেছেন বটে; কিন্তু নফল দান-সাদকা গ্রহণকে সম্পূর্ণ মুবাহ্ মনে করেছেন। অথচ ব্যক্তিগত অনুগ্রহ দেখাবার সুযোগ এই ক্ষেত্রেই অধিক।
আলে-মুহাম্মাদের ওপর যাকাত কিয়িামত পর্যন্ত হারাম করে দেয়ার কথা যদি সহীহ্-ই হত, তাহলে হারাম হত নফল দান গ্রহণ। ইবনুল হাজার কোন কোন ফিকাহবিদের এরূপ উক্তি উদ্ধৃত করেছেন। তাঁরা এই বলে দলিল দিয়েছেন যে, যা ফরয, তা গ্রহণে কোন লাঞ্ছনার অবকাশ থাকতে পারে না। নিন্তু নফল দান-সাদকার অবস্থা এরূপ নয়।
পূর্বের আলোচনা থেকে এ কথাটিও স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, এ বিষয়ে কখনই কোন ইজমা অনুষ্ঠিত হয়নি। তাই যারা তাদের জন্যে যাকাত হালাল বলে মত দিয়েছেন, তাঁরা ঐকমত্যের ইজমার প্রাচীর দীর্ণ ও চূর্ণ করেছেন বলে তাদের ওপর দোষারোপ করা যায় না।
কেননা আমরা দেখেছি, ইমাম আবূ হানীফা জায়েয পওয়ার কথা বলেছেন, তাঁর সাথী ইমাম মুহাম্মাদ এই মতই অবলম্বন করেছিলেন, কোন কোন শাফেয়ী আলিমের মতও তাই এবং মালিকী মাযহাবের কারো কারো কাছে এটাই গ্রহণীয়।
তবে কোন কোন বর্ণনায় এমন তাৎপর্য রযেছে যা নিঃশর্ত জায়েয হওয়ার মতের সমর্থক। তার একটির কথা ‘বাহরি যুখখার’ গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে। তা এইঃ নবী করীম (সা) বনু মুত্তালিবের বিধবাদের জন্যে দান করেছিলেন। উক্ত গ্রন্থ প্রণেতার মতে তা ছিল নফল সাদকা। [(আরবি***************)]
যেমন আবূ দাঊদ তাঁর ‘সুনান’ গ্রন্থে ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেছেনঃ আমার পিতা আমাকে নবী করীম (সা) –এর কাছে একটি উটের ব্যাপারে পাঠিয়েছিলেন, যা তিনি তাঁকে যাকাত থেকে দিয়েছিলেন। অপর বর্ণনায় বলা হয়েছেঃ সেটি বদলানোর জন্যে এলেন। [আবূ দাঊদ (আরবি***************) আধ্যায়ে হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন। মুনষেরী এই বিষয় নীরব রয়েছে। নাসায়ীও হাদীসটি তুলেছেন। দেখুনঃ (আরবি***************)]
ইমাম নববী দুই দিক দিয়ে এ হাদীসের জবাব দিয়েছেনঃ
একটি, বনু হাশিমের প্রতি প্রথম দিক দিয়ে যাকাত হারাম ছিল, পরে তা মনসূখ হয়ে গেছে, যেমন বলা হয়েছে।
দ্বিতীয়, হযরত আব্বাস (রা) থেকে গরীর লোকদের জন্যে একটি উট ধার নিয়েছিলেন। পরে সেটি তিনি যাকাতের উট থেকে ফেরত দিলেন। অপর একটি বর্ণনায়ও এমন কথা এসেছে যা এই কথা বোঝায়। খাত্তাবীও এ কথার দ্বারাই জবাব ‍দিয়েছেন। প্রকৃত ব্যাপার আল্লাহই ভালো জানেন। [(আরবি***************)]
সন্দেহ নেই, হাদীসের বাহ্যিক তাৎপর্যই গ্রহণ করতে হবে- কোনরূপ ব্যাখ্যা অবলম্বন না করেই কিংবা মনসূখ কথা না বলেই।
আমার মনে হচ্ছে, ইমাম বুখারীর নিকট এ পর্যায়ে সহীহ্ সনদের কোন হাদীম প্রতিভাত হয়নি, যা স্পষ্টভাবে কিছু বোঝায়। এ কারণেই তিনি এরূপ শিরোনাম দিয়ে একটি হাদীস উদ্ধৃত করেছেনঃ (আরবি***************)
নবী করীম (সা) ও তাঁর বংশের লোকদের যাকাত দেয়া পর্যায়ে যা বলা হয়, তার অধ্যায়……..
‘যা বলা হয়’….. কথাটি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, যে হাদীস নিয়ে আসা হচ্ছে তা যয়ীফ এবং তাতে সংশয় রয়েছে।’
এ হচ্ছে পূর্ব কথার উদ্ধৃতির দিক দিয়ে কথা। কিন্তু ইসলামী বিধান রচনার অন্তর্নিহিত যৌক্তিকতা বিবেচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে, বাহ্যত তা নবী করীম (সা) ও তাঁর বংশধরদের জন্যে তাঁর জীবনকালে হারাম করারই সিদ্ধান্ত দেয়। কেননা নবী করীম (সা) নিজেই নিজেকে ও তাঁর বংশের লোকদেরকে যাকাত-সাদকা গ্রহণ থেকে দূরে সরিয়ে পবিত্র রাখতে চেয়েছিলেন, যেন পবিত্রতা ও স্বার্থহীনতার একটা উচ্চতর দৃষ্টান্ত মুসলিম জনগণের জন্যে সংস্থাপন করা যায়। যেন দেয়ার জন্যে তাঁদের মনে লোভ দেখা না দেয়। তাহলে নবী করীম (সা) যে উচ্চতর আদর্শবাদিতার কথা ঘোষণা করেছিলেন, বাস্তবে তার সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্য রক্ষা পায়। তিনি ঘোষণা করেছিলেনঃ (আরবি***************)
উপরের হাত নীচের হাতের চেয়ে অনেক ভালো। [(আরবি***************)]
এজন্যে যে, কোনরূপ বস্তুগত বিনিময় বা মুনাফা ছাড়া সম্পদ দানের মধ্যে গ্রহীতার প্রতি দাতার একটা ব্যক্তিগত অনুগহ বর্ষণের ভাব বিদ্যমান থাকে। কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার যদি ধনীদের কাছ থেকে যাকাত-সাদকাত গ্রহণ করে ও দরিদ্রের মধ্যে বণ্টন করে জনগণের প্রতিনিধি ও দায়িত্বশীল হিসেবে তা হলে তাতে ব্যক্তিগত অনুগ্রহের ভাব প্রকাশের কোন অবকাশ থাকে না। রাষ্ট্রপ্রধান নিজে ব্যক্তিগতভাবে মুমিনদের কাছে থেকে যাকাত-সাদকাত গ্রহণ করে নিজের ঘাড়ে এই অনুগ্রহ দেখানোর ঝুঁকি গ্রহণ করবেন এবং তাঁর ঘরের লোকজনের ওপরও এই মর্যাদা চাপিয়ে দেবেন তা কোনক্রমেই বাঞ্ছনীয় নয়।
এরূপ ব্যবস্থার মধ্যে একটা নিগূঢ় তত্ত্ব নিহিত রয়েছে। আল্লামা শাহ দেহলভী এই বিষয়ে অবহিত করেছেন। বলেছেনঃ রাষ্ট্রপ্রধান নিজে ব্যক্তিগতভাবে যদি যাকাত-সাদতাত গ্রহণ করে এবং তাঁর বিশেষ লোকদের জন্যে তা গ্রহণ করাকে জায়েয করে দেন- সে যেরূপ ফায়দা তা থেকে পায় সেরূপ ফায়দা যদি পায় তারাও, তাহলে তাঁকে কেন্দ্র করে একটা সন্দেহ সংশয়ের ধূম্র কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠবে এবং লোকেরা তাঁর সম্পর্কে এমন সব কথা বলবে যা তাঁর ক্ষেত্রে সত্য নয়। এ কারণে এসব ছিদ্রপথকে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয়া হয়েছে যে, যাকাত দানের ফায়দাটা তাদের দিকেই ফিরে আসছে। কেননা যাকাত সম্পর্কে চূড়ান্ত কথা হচ্ছেঃ তা দেয়া হবে সমাজের ধনী লোকদের কাছ থেকে এবং সেই সমাজেরই দরিদ্র জনগণের মধ্যে তা বন্টন করা হবে। এটা তাদের সকলের প্রতি আল্লাহর একটা অনুগ্রহ বিশেষ। মূল ফায়দাটা তাদের নিকটই ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে, তাদেরকে কল্যাণের নিকটবর্তী করে দেয়া হয়েছে, পাপ ও অন্যায়ের সংস্পর্শ থেকে তাদের রক্ষা করা হয়েছে, [(আরবি***************)] তবে আলে-মুহাম্মাদের জন্যে যাকাতকে কিয়ামত পর্যন্ত সময়ের জন্যে হারাম করে দেয়ার কোন যৌক্তিকতা বা বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নিহিত আছে বলে মনে হচ্ছে না।
বিস্ময়কর ব্যাপার হল, যারা বনূ হাশিম ও বনূ মুত্তালিবের জন্যে যাকাত হারাম করেছেন, তা গ্রহণ তাদের জন্য জায়েয নয় বলেছেন, তারা যদি বায়তুলমালের এক- পঞ্চমাংশের এক-পঞ্চমাংশ গ্রহণের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতেন, তাহলে এই পঞ্চমাংশও নির্মূল হয়ে যেত। এ কালে যেমনটা ঘটছে, বিশেষ করে প্রশাসকদের স্বৈরতন্ত্রের কারণে। অতীত কালেও তা-ই দেখা গেছে, প্রশ্ন হচ্ছে, দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত লোকদের যদি যাকাত দেয়া না হয়- এরূপ প্রয়োজনের অবস্থায়ও, তাহলে নবীর ঘরের লোকদেরকে অনশনে মরে যাওয়ার জন্যে ছেড়ে দিলেই তাঁদের প্রতি সম্মান দেখানো হবে? যাকাতের মানে তাঁদের অধিকার থাকা সত্ত্বেও তাঁদের তা না দিয়ে কষ্ট দেয়ার কি অর্থ থাকতে পারে; এ বাস্তবিকই বোধগম্য নয়।
এই কারণে চারটি মাযহাবের আলিমসমষ্টি ও অন্যরা ফতোয়া দিয়েছেন যে, ‘আলে-মুহাম্মাদ’ লোকদের যদি বায়তুলমাল থেকে এক-পঞ্চমাংশ না দেয়া হয়, তাহলে যাকাত গ্রহণ করা তাঁদের পক্ষে সম্পূর্ণ জায়েয। কেননা তাঁদের প্রয়োজন রয়েছে, তারা অভাবগ্রস্ত এবং সে অভাব অবশ্যই পূরণ হতে হবে। [দেখুনঃ(আরবি***************)] বরং মলিকী মাযহাবের কতিপয় আরিম মত দিয়েছেন যে, এরূপ অবস্থায় তাদেরকে যাকাত দান অন্যদেরকে দেয়ার তুলনায় অনেক উত্তম। আর এটাই হচ্ছে সহীহ্ কথা (আরবি***************)

About শিবির অনলাইন লাইব্রেরী