ইসলামের যাকাত বিধান – ২য় খন্ড

ষষ্ঠ আলোচনা
যাকাত ব্যয়ে ভুল-ভ্রান্তি
যাকাতদাতা যাকাত ব্যয়ে ভুল করলে কি করা হবে
যাকাতদাতা যদি ভুল করে এমন ক্ষেত্রে যাকাত ব্যয় করে বসে যা প্রকৃতপক্ষে যাকাত ব্যয়ের ক্ষেত্র নয়, তা করেছে নিজের অজ্ঞতার কারণে, পরে তার নিজের কাছেই ভুলটা স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়েছে, এরূপ অবস্থায় তার যাকাত কি দেয়া হল এবং ফরযের দায়িত্ব থেকে সে মুক্ত হল। কিংবা এই যাকাত তার ওপর ঋণ হয়ে থাকবে স্থায়ীভাবে যতক্ষণ না সে তা তার সঠিক ক্ষেত্রে ব্যয় করছে?
এই বিষয়ে ফিকাহবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি বিভিন্ন।
আবূ হানীফা, মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান ও আবূ উবাইদা বলেছেন, সে যা দিয়েছে, তা-ই তার জন্যে যথেষ্ট। তার যাকাত আদায় হয়ে গেছে, মনে করতে হবে, পুনরায় যাকাত দেয়ার জন্যে তার নিকট দাবি করা যাবে না।
মায়ান ইবনে ইয়াযীদ বলেছেনঃ আমার পিতা সাদকা দেয়ার জন্যে দীনারসমূহ বের করে এনেছিলেন। পরে তা মসজিদে এক ব্যক্তির কাছে রেখে দিলেন। পরে আমি এসে তাঁর নিকট থেকে তা ফিরিয়ে নিয়ে যাই। তখন পিতা বললেনঃ আল্লাহর কসম, আমি তোমাকে দিতে চাই নি। পরে আমি বিষয়টি নিয়ে রাসূলে করীমের দরবারে মামলা দায়ের করি। তখন তিনি বলেনঃ হে ইয়াযীদ, তুমি যা নিয়ত করেছে, তা তুমি পেয়ে যাবে। আর হে মায়ান, তুমি যা নিয়েছ তা তোমার জন্যে। হাদীসটি আহমাদ ও বুখারী কর্তৃক বর্ণিত।
হাদীসে সাদকার কথা বলা হয়েছে, তা সম্ভবত নফল হবে। তবে (ماশব্দ) তুমি যা নিয়ত করেছ বা ক্যের ‘মা’ শব্দটি সাধারণত্বের তাৎপর্য বহন করে।
এঁদের দলিল হিসেবে হযরত আবূ হুরায়রা বর্ণিত হাদীসটিও উল্লেখ্য। নবী করীম (সা) বলেছেনঃ এক ব্যক্তি [ লোকটি ছিল ইসরাঈলী বংশের।] বললেঃ আমি অদ্য রাতের বেলা অবশ্যই সাদকা দেব। পরে সে সাদকা নিয়ে এল এবং একজন চোরের হাতে রেখে দিল। (সে যে চোর তা তার জানা ছিল না)। পরে তারা বলতে শুরু করল, রাতের বেলা সাদকা করতে গিয়ে একজন চোরের হাতে দিয়ে দিল। সে লোক বললেঃ হে আল্লাহ! তোমার প্রশংসা [ সেই অবস্থার দরুন আল্লাহর প্রশংসা করল নতুবা কোন খারাপ কাজের দরুন তো আর আল্লাহর হামদ করা হয় না।] আমি নিশ্চয়ই সাদকা দেব। পরে সে সাদকা নিয়ে বের হয়ে তা এক জ্বেনাকারের হাতে রেখে দিল। সকাল বেলা লোকেরা বলাবলি শুরু করে দিলঃ রাতের বেলা লোকটি একজন জ্বেনাকারের হাতে সাদকা দিয়েছে! লোকটি বললেঃ হে আল্লাহ! তোমার প্রশংসা, আমি আবার সাদকা করব। পরে সে সাদকা নিয়ে বের হয়ে ধনী ব্যক্তির হাতে দিল। সকালবেলা আবার লোকেরা বলতে শুরু করলেঃ রাতের বেলা একজন ধনীকে সাদকা দিয়েছে। পরে সে বললেঃ হে আল্লাহ্! তোমার প্রশংসা, জ্বেনাকার, চোর ও ধনীর ব্যাপারে। পরে সে স্বপ্নে দেখল, তাকে বলা হচ্ছে, তোমার সাদকা চোরের হাতে পড়েছে সম্ভবত সে চৌর্যবৃত্তি থেকে মুক্তি পাবে, জ্বেনাকার সম্ভবত তার দরুন জ্বেনা থেকে বিরত থাকবে। আর ধনী ব্যক্তি সম্ভবত সাদকা পেয়ে চেতনা লাভ করবে এবং আল্লাহ তাকে যে ধন-সম্পদ দিয়েছেন, তা আল্লাহর পথে ব্যয় করতে শুরু করে দেবে। [ আহমাদ, বুখারী, মুসলিম। ]
এক ব্যক্তি রাসূলে করীমের কাছে যাকাত চেয়েছিল। তিনি তাকে বলেছিলেনঃ তুমি যদি সেই বিভক্তি খাতসমূহের কোন একটিতে গণ্য হও, তাহলে নিশ্চয়ই আমি তোমার পাওনা দিয়ে দেব।’ এবং দুই শক্ত সমর্থ ব্যক্তিকে তিনি বরে দিয়েও ছিলেন, ‘তোমরা চাইলে আমি তা থেকে তোমাদের দেব; কিন্তু জেনে রাখো, কোন ধনী এবং শক্তিমান উপার্জনক্ষম ব্যক্তির জন্যে কোন অংশ এতে নেই।’ যদি ধনাঢ্যতার আসল রূপটা ধরতেই হত, তাহলে এই লোক দুটির মৌখিন কথাকেই তিনি যথেষ্ট মনে করতেন না। ‘আল-মুগিনী’ গ্রন্থেও এরূপ বলা হয়েছে। [(আরবি***************)]
এই সহজ নীতির ধারক লোকদের প্রতিকূলে এক জনসমষ্টি এ ব্যাপারে খুব বেশি কঠোরতা অবলম্বনের পক্ষপাতী। তাদের মত হচ্ছে, যে লোক যাকাত পাওয়ার অধিকারী নয়, তাকে তা দেয়া হলে তার যাকাত আদায় হল না। যখন তার ভুল ধরা পড়বে, তখন তাকে দ্বিতীয়বার যোগ্য অধিকারীকে তা দিতে হবে। কেননা সে ফরয পাওনাটা এমন ব্যক্তিকে দিয়েছে যে তা পেতে পারে না। অতএব মনে করতে হবে, সে ফরয আদায় করেনি। তার দায়িত্ব পালিত হয়নি। লোকদের পাওয়া ঋণের মতই তা অ-দেয়া থেকে গেছে ও তার নিকট পাওনা রয়ে গেছে।
শাফেয়ী মাযহাবও অনুরূপ কঠোরতাপ্রবণ। ‘রওজাতুন নাজীর’ প্রভৃতি গ্রন্থে তার উল্লেখ রয়েছে। [(আরবি***************)]
ইমাম আহমাদের মাযহাব হচ্ছে-কাউকে ফকীর মনে করে তাকে যাকাত দেয়ার পর যদি প্রকাশ হয়ে পড়ে যে, সে ধনী লোক, তাহলে এ ব্যাপারে দুটি বর্ণনা পাওয়া গেছে। একটি বর্ণনা মতে, তার যাকাত আদায় হয়ে গেছে। আর অপর বর্ণনাটির দৃষ্টিতে তা অ-দেয়া রয়ে গেছে।
আর যদি জানা যায় যে, গ্রহণকারী দাস বা কাফির কিংবা হাশিমী বংশের অথবা দাতার নিকটাত্মীয় কেউ-যাকে যাকাত দেয়া জায়েয নেই, তাহলে এ দেয়াটা গণ্য হবে না। এ হচ্ছে একটি বর্ণনা। এর কারণ বলা হয়েছে, অন্যদের ছাড়া ধনী ও গরীবকে আলাদা করে চিনতে পারা খুবই দুষ্কর ব্যাপার। যেমন আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবি***************)
তাদের অবস্থা প্রকাশ না করা ও ভিক্ষা না চাওয়ার দরুন জাহেল লোক তাদেরকে ধনশালী মনে করে। [(আরবি***************)]
এই দুই প্রান্তিক মতের লোকদের মধ্যবর্তী বহু ফিকাহবিদ রয়েছেন, যারা উভয় অবস্থার মধ্যে পার্থক্য করেছেন, একটিকে অপরটি থেকে আলাদা করে দেখেছেন। ফলে তাঁরা কোন কোনটিকে জায়েয বলেছেন- আদায় হয়ে গেছে বলে ফতোয়া দিয়েছেন, আর কোন কোন অবস্থার দেয়াকে অগ্রাহ্য করেছেন।
হানাফীদের মতেঃ
যে লোক বহু চিন্তা-ভাবনা ও কষ্ট করে বিচার-বিবেচনার পর যাকাত পাওয়ার যোগ্য লোক মনে করে যাকাত দিয়েছে; কিন্তু তার পরও প্রকাশিত হয়েছে যে, সে লোকটি ধনী কিংবা যিম্মী অথবা জানা গেছে যে, গ্রহীতা তার পিতা, পুত্র, স্ত্রী বা হাশেমী বংশের কেউ, তা হলে তার যাকাত সঠিকভাবে দেয়া হয়েছে, তাকে তা পুনরায় দিতে হবে না। কেননা তার সাধ্যমত সে করেছে।
তেব যদি প্রকাশিত হয় যে, যাকাত গ্রহীতা কাফির, মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত-যদিও সে এখন আশ্রয়প্রার্থী, তা হলে আবূ হানীফার মতে এই দেয়া যথার্থ ও যথেষ্ট হবে, পুনরায় দিতে হবে না। কেননা এখানেও যতটা সতর্কতা অবলম্বন সম্ভব ছিল, তা সে করেছে। অপর একটি বর্ণনায় অবশ্য বলা হয়েছে, তা আদায় হয়নি মনে করতে হবে। আবূ ইউসুফেরও এই কথা। কেননা যুদ্ধলিপ্ত হওয়ার পরিচিতিটা শরীয়াত অনুযায়ী শুভ নয়। এ কারণে নফল সাদকাও তাকে দেয়া জায়েয হতে পারে না। তাই ফরয আদায় করেও আল্লাহর নৈকট্য লাভ হল না। অতএব পুনরায় তা দিতে হবে।
কোনরূপ সন্দেহ ও অনুসন্ধিৎসা ছাড়াই কাউকে যাকাত দেয়া হলে তা যাকাত-ব্যয়ের যথার্থ ক্ষেত্র কিনা সে বিষয়ে মনে কোন প্রশ্নই যদি না জেগে থাকে-পরে তার ভুল প্রকাশিত হয়ে পড়ল, জানা গেল যে, যাকাত ব্যয়ের সঠিক ক্ষেত্র নয়-তা হলে তা আদায় হয়নি, পুনরায় তাকে তা দিতে হবে। কেননা সে তার সাধ্যমত চেষ্টা করেনি। আর যদি তার ভুল প্রকাশিত না হয় ও ধরা না পড়ে, তবে তা জায়েয ধরে নিতে হবে।
আর যদি সঠিক ক্ষেত্র বের করার জন্যে চেষ্টা চালিয়ে থাকে, যাকাত দিল এমন ব্যক্তিকে যে তার যথার্থ ক্ষেত্র নয় বলে ধারণা হওয়া সত্ত্বেও কিংবা সন্দেহ করল, কিন্তু যথার্থ ক্ষেত্র জানতে চেষ্টা করেনি, তা হলে আদায় হবে না- যতক্ষণ না তা সঠিক ক্ষেত্ররূপে প্রকাশিত হয়। পরে যদি তার যথার্থতা প্রকাশিত হয়, তাহলে সহীহ্ কথা- তা জায়েয হল।
ফিকাহবিদগণ বলেছেন, যাকে দেয়া হল, সে যদি ফকীরদের কাতারে দাঁড়িয়ে তাদের মতই কাজ করে, অথবা তাদের মতই তার বেশ-বাস থাকে, কিংবা সে চাইল, তাই দিয়ে দিল- এ সব কার্যকারণ সঠিক জ্ঞান লাভের চেষ্টার পর্যায়ে গণ্য, এরূপ অবস্থায় পরে যদি তার ধনী হওয়ার কথা প্রকাশিতও হয়, তবু পুনরায় দিতে হবে না।
ভুলবশত গ্রহণ করা হলে তা কি তার নিকট থেকে ফেরত দেয়া হবে? যুদ্ধে লিপ্ত ব্যক্তির নিকট থেকে ফেরত নিতে হবে না। হাশিমী হলে সে পর্যায়ে দুটি বর্ণনা। নিজের ধনী সন্তান হলে ফেরত নিতে হবে। তা কি তার জন্যে শুভ হবে?…… এ বিষয়ে মতভেদ আছে। আর যদি শুভ না হয়, তাহলে- বলা হয়েছে- সে দান করে দেবে, অন্যরা বলেছেন, দাতার কাছে প্রত্যর্পিত করতে হবে। [(আরবি***************)]
মালিকী মতে
সঠিক ক্ষেত্র জানতে চেষ্টা করেও যদি প্রকৃত অনুপযুক্ত লোককে যাকাত দিয়ে থাকে- যেমন সে ধনী, কাফির ইত্যাদি- যদিও ধরণা ছিল যে, সে পাওয়ার যোগ্য, তখন তা ফেরত নেয়া সম্ভব হলে তা ফিরিয়ে নিতে হবে – যদি তা অবশিষ্ট থেকে থাকে। অন্যথায় তার পরিবর্তনে অন্য কিছু নিতে হবে-যদি তা শেষ হয়ে গিয়ে থাকে। যেমন যদি খেয়ে ফেলে থাকে। বিক্রয় করে দিয়ে থাকে কিংবা কাউকে দান করে থাকে- এরূপ অবস্থায় গ্রহীতা তাকে ধোঁকায় ফেলে থাকুক, কি না-ই থাকুক।
যদি নৈসর্গিক কারণে তানষ্ট হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে তা বিবেচনা সাপেক্ষ গ্রহীতা যদি দাতাকে ধোঁকা দিয়ে থাকে-সে ধনী হওয়া সত্ত্বেও দারিদ্র্য প্রকাশ করে প্রতারিত করে থাকে অথবা কাফির হওয়া সত্ত্বেও মুসলমান হওয়ার কথা প্রকাশ করে থাকে, তা হলে তার বিনিময়টা তার কাছ থেকে ফেরত নেয়া ওয়াজিব। আর যদি ধোঁকা দিয়ে না থাকে; তা হলে গ্রহীতাকে কিছু ফেরত দিতে হবে না। দাতাকেই বরং দ্বিতীয়বার নিজ থেকে যাকাত দিতে হবে। কেননা প্রথমবারের দেয়াটা যথার্থ হয়নি। যেহেতু তা পাওয়ার যোগ্য লোক- মুসলিম দরিদ্র- তার সম্মুখে আসেনি, এ ধরনের লোক যাকাত পায়নি।
এসব কথা ব্যক্তিগতভাবে যাকাত দেয়া অবস্থার জন্যে প্রযোজ্য। কিন্তু যদি রাষ্ট্রপ্রধান বা তাঁর প্রতিনিধি সঠিক ক্ষেত্র বের করতে চেষ্টা করার পর যাকাত দিয়ে থাকেন- কিন্তু পরে জানা গেল যে, গ্রহীতা তা পাওয়ার অনুপযুক্ত তাহলে তা আদায় হয়ে গেছে, রাষ্ট্রপ্রধানকে তা জরিমানাস্বরূপ পুনরায় ফকীরকে দিতে হবে না। কেননা সে তো মুসলমানদের কল্যাণেব জন্যে চেষ্টা করেছে। আর তাই এই চেষ্টার পুনরাবৃত্তি সম্ভব নয়। এ কারণে কেউ কেউ বলেছেন যে, তাঁর এই দেয়াটা যথার্থ হবে যদি তা ফিরিয়ে দেয়া সম্ভবও হয়, তবুও। এর ওপরও এ বলে আপত্তি তোলা হয়েছে যে, মাযহাবপন্থীদের কথা থেকে বোঝা যায় যে, প্রশাসক যাকে দিয়েছে তার হাত থেকে তা কেড়ে নিতে হবে- যদি গ্রহীতা তা পাওয়ার অধিকারী না হয়- যদি তা সম্ভবপর হয়। এ কথাটি পরিষ্কার। কেননা যাকাত তো আর ধনী লোকদের হতে দেয়া যায় না এবং তাদের হাত থেকে তা কেড়েও নেয়া যায় না?
এরূপ অবস্থায় রাষ্ট্র প্রধান হচ্ছেন অছি; বিচারপতির অগ্রবর্তী। এ দুজনের ক্ষেত্রে তা যথার্থ হবে বলে ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন- যদি তা ফেরৎ নেয়া দুষ্কর হয় কোনরূপ প্রতারিত না হলেও। আর যদি ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব হয়, তাহলে তা ওয়াজিব হবে-এটা সর্বসম্মত মত। [(আরবি***************)]
যায়দীয়া ফিকাহবিদদের মতে
যে লোক যাকাত দেবে এমন লোককে, যে তা পাওয়ার যোগ্য নয় সর্বসম্মতভাবে-কিংবা তার মাযহাব অনুযায়ী যাকে দেয়া যায় এমন লোককে ছাড়া দেয়া হলে তা পুনর্বার দিতে হবে। প্রথম বারের দেয়াকে যাকাত মনে করা যাবে না। সর্বসম্মতভাবে যাকাত পাওয়ার অযোগ্য লোক হচ্ছে কাফির- কাফির ব্যক্তির পিতামাতা ও সন্তান এবং ধনী-যার ধনাঢ্যতা সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত। এরূপ লোককে যাকাত দেয়া হলে তা পুনরায় দিতে হবে, তাদেরকে দেয়া হারাম তা জেনে-শুনে দিক, কি না জেনে শুনে, কিংবা এই ধারণার বশবর্তী হয়ে যে, কাফির মুসলিম এবং সন্তান ও পিতামাতা কেউ অপরিচিত নয়। আর ধনী গরীবও চেনা যায় না কিংবা এরূপ কোন ধারণা ছাড়াই। সর্বাবস্থায়ই তা পুনরায় দিতে হবে।
যেসব লোকের যাকাত পাওয়ার অধিকারে মতবৈষম্য রয়েছে- যেমন এমন নিকটাত্মীয় যার ব্যয়ভার বহন তার জন্যে জরুরী, আর ধনী-যার ধনাঢ্যতায় মতপার্থক্য রয়েছে-এদের কাউকে যাকাত দেয়া হলে অথচ তার মাযহাবী মত হচ্ছে যে, তাকে দেয়া জায়েয নয়, দিল এই কথা জেনে-শুনে যে, তার সাথে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে, অথচ তার মাযহাব অনুযায়ী কথা নিষিদ্ধ-তা পুনরায়য় দেয়া একান্তই আবশ্যক। এই কথা সর্বসম্মত।
তাদেরকে যাকত দেয়া হারাম, কিংবা তার মাযাহাব না জেনেও অথবা ওরা অপরিচিত লোক এই ধারণা নিয়ে কিংবা ধনী ব্যক্তিকে দরিদ্র মনে করেই যদি দিয়ে থাকে, তাহলে তা পুনরায় দিতে হবে না। কেননা মত বিরোধীয় বিষয়াদি সম্পর্কে অজ্ঞ লোক তো ভুলো মনের মতই অক্ষম অথবা ইজতিহাদকারী ভুল করলেও যেমন হয়, এ-ও তেমনি। [(আরবি***************)]
এসব বিভিন্ন অবস্থাকে বিচার-বিবেচনা করে আমি মনে করি, যে লোক সত্য জানতে প্রাণপণ চেষ্টা করেও ভুল করেছে ও তার যাকাত যথার্থ স্থানে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে, সে তো মাযূররূপে গণ্য। কাজেই তার এ ভুলের জন্যে তাকে ক্ষতিপূরণ বাবদ কিছু করতে বাধ্য করা যায় না। কেননা সে তো তার সাধ্যমত চেষ্টা চালিয়েছে। হানাফীদেরও এই মত। তার দলিল হচ্ছেঃ (আরবি***************)
আল্লাহ তো মানুষকে দায়িত্ব দেন তার সাধ্যে যতটা কুলোয় ততটাই, তার বেশি নয়।
আর আল্লাহ কারুরই শুভকর্ম ফল বিনষ্ট করেন না। যেমন কোন ব্যক্তি যদি তার যাকাত কোন চোরের, ব্যভিচারীর বা ধনী ব্যক্তির হাতে পৌঁছায় তাহলে যেমন হয়, এ-ও ঠিক তেমনি।
হ্যাঁ, সত্য জানার চেষ্টার ত্রুটি করে থাকলে, বে-পরোয়াভাবে যাকাত বন্টন বা ব্যয় করে থাকলে যদি প্রকাশিত হয় যে, সে ভুল করে বসেছে, যথার্থ ক্ষেত্রে যাকাত পৌঁছাতে পারেনি, তাহলে তাকে তার এই ভুলের দণ্ড-যা তার নিজের ত্রুটির দরুন দেখা দিতে পেরেছে- ভোগ করতে প্রস্তুত থাকতে হবে। তাই তাকে পুনরায় যাকাত দিতে হবে যেন যথার্থ স্থানে তা পৌঁছানো সম্ভবপর হয়। কেননা আসলে তা- ফকীর, মিসকীন ও অন্যান্য পাওনাদার লোকদের হক, তাদেরকেই তা না দেয়া পর্যন্ত তাদের দায়িত্ব পালন সম্পূর্ণ হতে পারে না অথবা দিতে হবে তাদের প্রতিনিধি রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে – তাদের সাধ্যে যেটা কুলোয়।
আর এই উভয় অবস্থাতেই যে লোক তা গ্রহণ করেছে ও জানতে পেরেছে যে, তা যাকাত- সে তা পাওয়ার যোগ্য নয়, তার কর্তব্য হচ্ছে, তা ফিরিয়ে দেয়া অথবা তা ধ্বংস হয়ে গিয়ে থাকলে তার বদল বা বিকল্প ফেরত দেবে। অন্য লোকের অধিকার সে কিছুতেই ভক্ষণ করতে পারে না। তা খেলে তার পেট আগুন খেয়ে ফেলবে। এটা তখনকার জন্যে যখন তাগিদ করা হবে বা তার বেশির ভাগ ধারণা হবে যে, সে তা পাওয়ার অধিকারী নয়। অন্যথায় তা তারই হয়ে যাবে। যেমন সে তা গ্রহণ করল; কিন্তু তা যে যাকাত তা সে জানতে পারল না, তা তার হতে বিনষ্ট হয়ে গেল- তখনও এই হুকুম। হাদীসে উদ্ধৃত রাসূলের উক্তি ‘হে মায়ান, তুমি যা নিচ্ছ তা তোমার’ এ কথাটি বলার তাৎপর্য হচ্ছে, যে সম্ভবত তা পাওয়ার যোগ্য ছিল, যদিও তার পিতা তা পসন্দ করেন নি। রাষ্ট্রপ্রধান যদি যাকাত ব্যয়ের ক্ষেত্র সম্পর্কে ভুর করেন, তাহলে তাঁকে তার ক্ষতিপূরণ করতে হবে না। কেননা তিনি তো মুসলিম জনকল্যাণের জন্যে বিশ্বস্ত দায়িত্বশীল, যদি এই ধরনের অনুপযুক্ত লোক তা নেয় এবং তার হতে তা মওজুদ থাকে, তাহলে তা ফেরত দেয়া কর্তব্য- যেমন মালিকী আলিমরা বলেছেন।
দ্বিতীয় অধ্যায়
যাকাত আদায় করার পন্থা
যাকাতের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক
যাকাতের ক্ষেত্রে নিয়তের স্থান
যাকাত বাবদ মূল্য প্রদান
সংগৃহীত যাকাত ভিন্ন জায়গায় স্থানান্তর
যাকাত দেয়া তরান্বিতকরণ ও বিলম্বিতকরণ
যাকাত আদায় সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়
ভূমিকা
পূর্ববর্তী অধ্যায়সমূহের আলোচনা থেকে আমরা জানতে পেরেছি যাকাত ফরয হওয়ার কথা, কার ওপর তা ফরয, কোন সব মাল-সম্পদে তা ফরয, তার প্রত্যেকটিতে কত পরিমাণ ফরয-এর সবই জানতে পারা গেছে। অনুরূপভাবে এও জানতে পেরেছি, কার জন্যে যাকাত ব্যয় করতে হবে, পাওয়ার যোগ্য লোক কত প্রকারের এবং কোন্ কোন্ প্রকারের লোকদেরকে যাকাত দেয়া জায়েয নয়- এ সব বিষয়েই বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
এক্ষণে যাকাত আদায় করার যথার্থ পন্থা কি, সেই বিষয়ে জানা বাকী রয়েছে। যার ওপর যাকাত ফরয, সে নিজেই কি পাওয়ার যোগ্য লোকদের মধ্যে তা বন্টন করার দায়িত্বশীল কিংবা সে দায়িত্ব সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের? আর এটা সর্বপ্রকারের মালের যাকাতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, না কোন কোন ধনমালের ক্ষেত্রে এবং কোন কোন ধন-মালের ক্ষেত্রে নয়? উপরন্তু রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যাকাত আদায়ের ব্যবস্থা যদি না থাকে কিংবা রাষ্ট্রচালক যদি জালিম অথবা কাফির হয়, তাহলে তখণ কি করা যাবে?
যাকাত আদায়ে নিয়তের কি শর্ত আছে? যাকাতদাতার নিয়ত ছাড়াই সরকার যদি জোর করে নিয়ে নেয়, তাহলে তখন কি হবে? রাষ্ট্র-সরকারের পক্ষে কিংবা দাতার পক্ষে এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে- এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাকাত স্থানান্তরিত করা কি জায়েয? এ ব্যাপারে সীমা কি এবং কোথায়?
যাকাত জিনিসের বদলে তার মূল্য দেয়া কি জায়েয কিংবা ঠিক যেটা দেয়া ফরয, সেই আসল জিনিসটাই দিয়ে দিতে হবে-দেয়া কি ওয়াজিব- যাকাত ফরয হওয়ার পর তা আদায় তরতে বিলম্ব করা কি জায়েয? যদি বিলম্বিত করা হয়, তাহলে কি হুকুম? বিলম্ব করলে কি যাকাত ফরয পরিত্যক্ত হবে? আর খুব তাড়াতাড়ি দেয়ার বা হুকুম কি? যাকাত গোপন করা কি জায়েয? যে তা গোপন করল, তার কি শাস্তি হবে? যাকাত আদায় করার দায়িত্ব এড়ানোর পরিণাম কি? তা প্রত্যাহার করানোর উদ্দেশ্যে কোন কৌশল অবলম্বন করলে কি হবে?…… এগুলো এবং আরও অনেক প্রশ্ন যাকাত আদায় ও বন্টন পর্যায়ের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হওয়া আবশ্যক।
আমরা এ পর্যায়ে এসব ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট আরও বহু প্রশ্ন নিয়ে পরবর্তী পরিচ্ছেদসমূহে সবিস্তারে আলোচনা করব। এই উদ্দেশ্যেই এ অধ্যায়ের অবতারণা।
প্রথম পরিচ্ছেদ
যাকাতের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক
যাকাতের ব্যাপারে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও জবাবদিহি
পূর্বে যেমন সবিস্তারে বলা হয়েছে, যাকাত একটা প্রমাণিত ও সুনির্দিষ্ট অধিকার বিশেষ- তা আল্লাহ কর্তৃক ফরয করা হয়েছে। কিন্তু মূলত তা এমন অধিকারের জিনিস নয় যা ব্যক্তিদের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে বলে মনে করতে হবে। অতঃপর যে লোক আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালীন মুক্তি চায়, সে তা দেবে; আর যার পরকালের প্রতি প্রত্যয় দুর্বল, আল্লাহর ভয়ের মাত্রা ক্ষীণ- অন্তরে আল্লাহর মহব্বতের তুলনায় ধন-মালের মহব্বত প্রবল, সে তা দেবে না। এরূপ মনে করা ঠিক নয়।
না, যাকাত কোন ব্যক্তিগত অনুগ্রহ বা দয়ার ব্যাপার নয়। তা একটা সামষ্টিক ঘংগঠনের সাথে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট। রাষ্ট্র-সরকারই এই সংগঠন ও তৎসংশ্লিষ্ট ব্যাপারাদি আঞ্জাম দেয়ার জন্যে দায়িত্বশীল। তা একটা সুগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে পালনীয়। সরকারই এ অনন্য দায়িত্ব পালনের জন্যে একান্তভাবে দায়ী। যার ওপর যাকাত ফরয তার কাছ থেকে সরকারই তা আদায় ও সংগ্রহ করবে এবং যাদের তা প্রাপ্য, তাদের মধ্যে তা সুষ্ঠু বন্টনের দায়িত্বও সরকারের ওপরই অর্পিত।
কুরআনের দলিল
এই কথার সবচাইতে বড় দলিল হচ্ছে, যাকাত আদায়-সংগ্রহ ও বন্টনের ব্যাপারে যারাই দায়িত্বশীল, আল্লাহ্ তা’আলা নিজেই তাদের উল্লেখ করেছেন এবং তাদের নাম দিয়েছেনঃ (আরবি***************) –’এই কাজের কর্মচারী লোকগণ’। আর মূল যাকাতেই এদের জন্যে একটা অংশও নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন তাদের মজুরী বা পারিশ্রমিক হিসেবে। অন্য কোন ফাণ্ড বা দুয়ার থেকে তাদের বেতন গ্রহণের জন্যে তাদেরকে বাধ্য করেন নি। ফলে তাদের জীবিকার পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে, তারা যাতে করে সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হয়, তার নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আল্লাহ্ নিজেই বলেছেনঃ (আরবি***************)
যাকাত কেবলমাত্র গরীব ও মিসকীন, সে কাজে নিযুক্ত কর্মচারী, যাদের হৃদয় সন্তুষ্ট রাখতে হচ্ছে, ক্রীতদাসের ঋণগ্রস্তদের, আল্লাহর পথে এবং নিঃস্ব পথিকের ব্যাপারে ব্যয়িত হওয়ার জন্যে নির্দিষ্ট। এটা আল্লাহর কাছ থেকে আরোপিত ফরয। আর আল্লাহর সর্বজ্ঞ, মহাবিজ্ঞানী। [(আরবি***************)]
কুরআন মজীদে এই সুস্পষ্ট-অকাট্য ঘোষণা দেয়ার পর কারুর পক্ষে এ থেকে রুখসত বা নিষ্কৃতি পাওয়ার কিংবা অন্য কোন রকম ব্যাখ্যা করার অথবা ভিন্ন কোন ধারণা পোষণ করার একবিন্দু অবকাশ থাকতে পারে না। বিশেষ করে যখন বলা হয়েছেঃ এটা আল্লাহর কাছ থেকে ধার্যকৃত ফরয’ এবং তার বন্টন ক্ষেত্র হিসেবে এ থাতগুলোর উল্লেখ করা হয়েছে এবং তা সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ কর্তৃক ধার্যকৃত ফরযকে কে অকেজো করে দিতে পারে, কার সে অধিকার আছে?
যে সূরাতে যাকাত ব্যায়ের উপরিউক্ত ক্ষেত্রসমূহের উল্লেখ করা হয়েছে, ঠিক সেই সূরাটিতেই আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেনঃ (আরবি***************)
তুমি তাদের ধন-মাল থেকে যাকাত গ্রহণ কর, তুমি তাদের পবিত্র কর, এবং তদ্দারা তাদের পরিশুদ্ধ কর এবং তাদের জন্যে পূর্ণ দো’আ কর। তোমার পূর্ণ দো’আ নিঃসন্দেহে তাদের জন্যে সান্ত্বনার কারণ। [(আরবি***************)]
আগের কালের ও একালের জমহুর মুসলমান মত প্রকাশ করেছেন যে, আলোচ্য আয়াতে ‘সাদকা (আরবি***************) অর্থ যাকাত।’ প্রথম অধ্যায়ে আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে এসেছি।
উপরিউক্ত কথার সমর্থনে একটা বাস্তব ও ঐতিহাসিক দলিল হচ্ছে, হযরত আবূ বরক (রা) এর খিলাফত আমলের ‘যাকাত দিতে অস্বীকারকারী’ লোকেরা এই আয়াতটিকেই ভিত্তি করেছিল। বাহ্যত উক্ত আয়াতটি বোঝায় যে, যাকাত গ্রহণের দায়িত্ব শুধুমাত্র নবী করীম (সা)এর। তিনিই তার বিনিময়ে তাদের জন্যে দো’আ করবেন। একজন সাহাবীও এই দাবি করেনি যে, এই আয়াতটি ফরয যাকাত ভিন্ন অন্য কোন বিষয়ে কথা বলছে। তাঁদের পরে ইসলামের মহান ইমামগণ সেই লোকদের উত্থাপিত সন্দেহের প্রতিবাদ ও অপনোদন করেছেন। তাঁরা সকলেই যা বলেছেন, তা হচ্ছে, ‘তাদের ধন-মাল থেকে যাকাত নাও’ বলে যে নির্দেশটি দেয়া হয়েছে, তা যেমন নবী করীম (সা) এর প্রতি ছিল, তেমনি ছিল তাঁর পরবর্তী মুসলিম মিল্লাতের দায়িত্বশীল প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যেও।…….. এ বিষয়েও আমরা প্রয়োজনীয় কথা বলে এসেছি।
হাদীস
আল্লাহর কিতাবে উদ্ধৃত দলিল সম্পর্কিত কথা উপরে বলা হয়েছে। এক্ষণে এ বিষয়ে নবীর সুন্নাত উপস্থাপিত করা হচ্ছে।
বুখারী, মুসলিম ও অন্য গ্রন্থাবলীতে উদ্ধৃত হযরত ইবনে আব্বাস বর্ণিত হাদীস হচ্ছেঃ নবী করীম (সা) যখন হযরত মুয়ায (রা) কে ইয়েমেন পাঠিয়েছিলেন, তখন তিনি তাঁকে বলেছিলেনঃ
তাদের তুমি জানিয়ে দেবে, আল্লাহ তা’আলা তাদের ধন-মালে যাকাত ফরয করে দিয়েছেন, যা তাদের ধনী লোকদের কাছ থেকে গ্রহণ করা হবে, পরে তাবন্টন করা হবে তাদের দরিদ্র লোকদের মধ্যে। তারা যদি তোমার এ কথা মেনে নেয়, তাহলে তুমি তাদের বাছাই করা উত্তম মালসমূহ থেকে দূরে থাকবে। আর নিপীড়িতের ফরিয়াদকে তুমি খুবই ভয় করবে। কেননা তার ও আল্লাহর মধ্যে কোন প্রতিবন্ধক নেই। (ইবনে আব্বাস থেকে অনেকেই হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন)।
এ হাদীসটিতে আমরা লক্ষ্য করছি, নবী করীম (সা) সেই ফরয যাকাত সম্পর্কেই বলেছেনঃ তাদের ধনী লোকদের থেকে তা নেয়া হবে এবং তাদেরই দরিদ্রদের মধ্যে তা বন্টন করা হবে। হাদীসটি স্পস্ট ভাষায় ঘোষণা করছে, কোন গ্রহণকারী আদায়কারী তিদের নিকট থেকে তা গ্রহণ ও আদায় করবে এবং বন্টনকারী তা বন্টনও করবে। যার ওপর তা ফরয, তার ইচ্ছার ওপর তা ছেড়ে দেয়ার কোন প্রশ্নই ওঠেনা।
শায়খুল ইসলাম হাফেয ইবনুল হাজার বলেছেনঃ উক্ত হাদীস এ কথার দলিল যে, রাষ্ট্রপ্রধান (সরকারই) যাকাত সংগ্রহ ও ব্যয় বন্টনের জন্যে দায়িত্বশীল, হয় সে নিজে এ কাজ করবে, নয়তো করবে তার প্রতিনিধি। আর যে লোক তা দিতে অস্বীকার করবে, তার কাছ থেকে তা বল প্রয়োগের মাধ্যমে নেয়া হবে। [(আরবি***************)]
শাওকানী তাঁর ‘নাইলুল আওতার’ গ্রন্থে এ সব হাদীসই উদ্ধৃত করেছেন। [(আরবি***************)] যাকাতের কাজে নিযুক্ত এইসব কর্মচারীদের কথা বিশ্লেষণ পর্যায়ে বিপুল সংখ্যাক হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে। তখন তাদেরকে (আরবি***************) অথবা (আরবি***************) ‘চেষ্টাকারী লোকগণ’ বা ‘সাদকা আদায়কারী লোকগণ’ নামে অভিহিত করা হত। পূর্ব অধ্যায়ে আমরা ‘যাকাত কার্যে নিযুক্ত কর্মচারী’ খাত সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু কথা বলেছি। যাকাত দেয়া যাদের ফরয তাদের এই যাকাত সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছূ কথা বলেছি। যাকাত দেয়া যাদের ফরয তাদের এই যাকাত সংগ্রহকারীদের প্রতি কি কর্তব্য, বহু সংখ্যক হাদীসে বিশদভাবে বলা হয়েছে। আমরা শিগগিরই এ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো বলব।
নবী ও খুলাফায়ে রাশেদুনের বাস্তব সুন্নাত
উপরে রাসূলে করীম (সা)এর কথার সুন্নাত উদ্ধৃত হয়েছে। তাঁর বাস্তব কর্মের সুন্নাত সেই কথাকে অধিকতর বলিষ্ঠ করে তোলে। রাসূলের এবং তারপর খুলাফায়ে রাশেদুনের সময়ে যেদ কর্মধারা প্রবহমান ছিল, তার ঐতিহাসিক ঘটনাবলীও সেই কথারই সত্যতা ও বাস্তবতা প্রমাণ করে।
হাফেয ইবনুল হাজার (আরবি***************) গ্রন্থে ইমাম রাফেয়ী উদ্ধৃত এ হাদীসটির উল্লেখ করেছেনঃ নবী করীম (সা) এবং তারপর খলীফগণ যাকত গ্রহণের উদ্দেশ্যে চেষ্টাকারী লোক (আরবি***************) পাঠাতেন। এ হাদীসটি মশহুর। বুখারী ও মুসলিমে আবূ হুরায়রা (রা) থেকে উদ্ধৃত হয়েছেঃ ‘হযরত উমর যাকাতের জন্যে লোক পাঠালেন। ঐ দুটি গ্রন্থ আবূ হুমাইদ থেকে উদ্ধৃত হয়েছেঃ ‘আজাদ’ বংশের ইবনুল লাতবীয়’ নামক এক ব্যক্তিকে এই কাজে কর্মচারী নিযুক্ত করেছেলেন।’ গ্রন্থদ্বয়ে হযরত উমর থেকে উদ্ধৃত হয়েছে, তিনি ইবনে সাদীকে কাজে নিযুক্ত করেছিলেন। আবূ দাঊদ থেকে বর্ণিত হয়েছে নবী করীম (সা) আবূ মাসউদকে একজন যাকাত সংগ্রহকারীরূপে ‍নিযুক্ত করে পাঠিয়েছিলেন।
মুসনাদে আহমদ গ্রন্থে রয়েছে; তিনি আবূ জহম ইবনে হুযায়ফাকে যাকাত ‍আদায়কারী করে পাঠিয়েছিলেন। তাতে আছেঃ তিনি উকবা ইবনে আমেরকে যাকাত আদায়কারীরূপে পাঠালেন। তাতে কুররা ইবনে দমূচ বর্ণিত হাদীসে রয়েছেঃ ‘দহহাক ইবনে কায়সকে যাকাত আদায়কারী করে পাঠালেন।’ ‘মুস্তাদরাক’ গ্রন্থে রয়েছেঃ তিনি কায়স ইবনে সায়াদকে যাকাত সংগ্রহকারীরূপে পাঠালেন। তাতে উবাদাহ ইবনে সামেত বর্ণিত হাদীস হচ্ছে, নবী করীম (সা) তাকে যাকাতদাতাদের কাছে পাঠালেন। অলীদ ইবনে উকবাকে বনুল মুস্তালিকের কাছে যাকাত আদায়কারী করে পাঠালেন।
বায়হাকী শাফেয়ী থেকে বর্ণনা করেছেনঃ হযরত আবূ বকর ও উমর (রা) দুজনই যাকাত আদায়ের জন্যে লোক পাঠাতেন। শাফেয়ী ইবরাহীম ইবনে মায়াদ থেকে জুহরী থেকে সূত্রে উক্ত হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন। তাতে অতিরিক্ত রয়েছেঃ ‘এবং তা আদায় করাকে কোন বছরই বিলম্বিত করতেন না।’ প্রাচীন বর্ণনায় রয়েছেঃ উমর থেকে বর্ণিত, তিনি এই কাজ ‘রিমাদাহ’র বৎসর বিলম্বিত করেছিলেন। পরে যাকাত সংগ্রহকারী পাঠালেন। সে দুই দুই বছরের যাকাত নিয়ে এল।
তাবকাতে ইবনে সাযাদ-এ উল্লিখিত হয়েছেঃ নবী করীম (সা) নবম সনের মুহররম চাঁদে (মাসে) আরবদের কাছে যাকাত আদায়কারী প্রেরণ করেছিলেন। এ কথাটি আল-ওয়াকিদী রচিত ‘কিতাবুল মাগাজী’তে বিস্তারিতভাবে এসেছে। [(আরবি***************)]
ইবনে সায়াদ সে সব গোত্রের ও তাদের প্রতি প্রেরিত যাকাত আদায়কারীর নামও উল্লেখ করেছেন। উয়াইনা ইবনে হুনাইনকে পাঠিয়েছিলেন বনূ তামীম গোত্রের প্রতি তাদের যাকাত আদায়ের জন্যে।
বুয়াইদা ইবনুল হাবীবকে আসলাম ও গাইফার প্রতি তাদের যাকাত আদায়ে জন্যে পাঠিয়েছিলেন। তাকে বলা হত কায়াস ইবনে মালিক।
উবাদাহ ইবনে বাশার আল-আশহালকে মুলাইম ও মুলাইম ও মুজাইনা গোত্রের কাছে প্রেরণ করেছিলেন। রাফে ইবনে মাকীসকে জুহাইনা গোত্রের কাছে পাঠিয়েছিলেন। আমার ইবনুল আসকে পাঠিয়েছিলেন ফাজারাহ গোত্রের কাছে। দহহাক ইবনে সুফিয়ানুল কাইলানীকে বনু কিলাবের কাছে পাঠিয়েছিলেন। বুসর ইবনে সুফিয়ানুল কায়াবীকে বনু কায়াবের নিকট পাঠিয়েছিলেন। ইবনুল লাতামিয়া আল আজদীকে বনু যুবইয়ানের নিকট পাঠিয়েছিলেন। সায়াদ হুযাইমের কাছে তাদের যাকাতের জন্যেও এক ব্যক্তিকে পাঠিয়েছিলেন।
ইবনে সায়াদ বলেছেন, রাসূলে করীম (সা) তাঁর প্রেরিতব্য যাকাত আদায়কারীদের ক্ষমাশীলতা অবলম্বনের জন্যে এবং লোকদের উত্তম ও বাছাই করা ধন-মাল বেছে বেছে নেয়া পরিহার করার জন্যে নির্দেশ দিতেন। [(আরবি***************)]
ইবনে ইসহাক অপরাপর জনগোষ্ঠীর উল্লেখ করেছেন, যাদেরকে নবী করীম (সা) বিভিন্ন গোত্র ও আরব উপদ্বীপের অন্যান্য এলাকার প্রতি প্রেরণ করেছিলেন।
মুহাজির ইবনে আবূ উমাইয়্যাতাকে ছানয়ায় পাঠিয়েছিলেন। পরে তার কাছে আসওয়াদ আল-আনাসী বের হয়ে এসেছিল, সে সেখানেই অবস্থান করছিল। জিয়াদ ইবনে লবীদকে হাজরা মওতে পাঠিয়েছিলেন। আদী ইবনে হাতেমকে তাই ও বনু আসাদ গোত্রের প্রতি পাঠিয়েছিলেন। মালিক ইবনে নুযাইরাতাকে বনু হিঞ্জালার যাকাতের জন্যে পাঠিয়েছিলেন। মলিক ইবনে নুযাইরাতাকে বনু হিঞ্জালার যাকাতের জন্যে পাঠিয়েছিলেন। বনু মায়াতের যাকাত আদায়ের দায়িত্ব দুই ব্যক্তির মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিলেন। জবরকান ইবনে বদরকে একদিকে এবং কাইস ইবনে আবেমকে অপরদিকে পাঠিয়েছিলেন।
‘আলা’ ইবনুল হাজরামীকে বাহরাইনে পাঠিয়েছিলেন। হযরত আলীকে পাঠিয়েছিলেন নাজরানের দিকে তাদের যাকাত সংগ্রহ করার উদ্দেশ্য এবং এজন্য যে, তারা তাদের জিযিয়া তাঁর নিকট পেশ করবে। [(আরবি***************)]
আল-কাত্তানী রচিত (আরবি***************) গ্রন্থে ইবনে হাজমের (আরবি***************) থেকে, ইবনে ইসহাক ও আল-কালায়ী রচিত ‘সীরাত’ থেকে ইবেন হাজার রচিত ‘আল-ইসাবাহ’ থেকে সেসব সাহাবীদের নাম উদ্ধৃত করা হয়েছে যাঁদেরকে নবী করীম (সা) যাকাত বিভাগের দায়িত্বে বা সে বিষয়ে লেখাপড়া করার জন্যে বিভিন্ন দায়িত্বে ‍নিযুক্ত করেছিলেন। বলেছেনঃ
ইবনে হাজম তাঁর (আরবি***************) নামক গ্রন্থে বলেছেনঃ যাকাতের হিসাব লেখার জন্যে রাসূলে করীম (সা)-এর নিযুক্ত ব্যক্তি ছিলেন জুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা), তাঁর অনুপস্থিতি কিংবা অক্ষমতার ফলে জুহাম ইবনুস সালাত ও হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামোন এই লেখার কাজ সমাধান করতেন। [(আরবি***************)] আরও বলেছেনঃ [(আরবি***************)] গ্রন্থে আল-আরকাম ইবনে আবুল আরকমের আজ-জুহরীর জীবন বৃত্তান্ত লেখা হয়েছে। তাতে উল্লেখ করা হয়েছেঃ তাবারানী উল্লেখ করেছেনঃ নবী করীম (সা) তাঁকে (আরকাম) যাকাত সংগ্রহের কাজে কর্মচারী নিযুক্ত করেছিলেন। তাতে কাফীয়া ইবনে সাবা আল-আসাদীর বৃত্তান্তও উদ্ধৃত হয়েছে। ওয়াকিদী থেকে উদ্ধৃত হয়েছেঃ নবী মুস্তফা (সা) তাঁকে তাঁর গোত্রের লোকজনের যাকাতের ব্যাপারে কর্মচারী নিযুক্ত করেছিলেন। হুযায়ফাতা ইবনুল ইয়ামান প্রসঙ্গেও লেখা হয়েছে, ইবনে সায়াদ থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে, নবী করীম (সা) তাঁকে ‘আজদ’ গোত্রের যাকাত সংগ্রহের কাজে নিযুক্ত করেছিলেন। ‘আল-ইসাবা’ গ্রন্থে কাহাল ইবনে মালেক ‘আল-হাযালী’র বৃত্তান্ত লেখা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, নবী মুস্তফা (সা) তাঁকে হুযাইলের যাকাত সংগ্রহের কাজে কর্মচারী নিযুক্ত করেছিলেন। তাতে খালিদ ইবনুল বারচায়ার কথাও উদ্ধৃত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, আবূ দাঊদ ও নাসায়ী মা’মার জুহরী থেকে- আয়েশা (রা) থেকে সূত্রে উদ্ধৃত করেছেনঃ নবী করীম (সা) আবূ জহম ইবনে হুযাইফা (রা)-কে যাকাত আদায়কারী নিযুক্ত করেছিলেন। খালেদ ইবনে সায়ীদ ইবনুল আঁচ আল-উমাভীর বৃত্তান্তে বলা হয়েছে যে, নবী মুস্তাফা (সা) তাঁকে মুযহিজ-এর যাকাত সংগ্রহে নিযুক্ত করেছিলেন। হুযাইমাতা ইবনে আসেম আর-আকলীর জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইবনে কানে’ সাইফ ইবনে উমর- থেকে মায়সের ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আদাস থেকে-এই সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, আদাস ও খুজাইমা নবী করীম (সা)-এর কাছে প্রতিনিধি হয়ে এলেন। পরে তিনি খুজাইমাকে আহলাফ গোত্রের প্রশাসক নিযুক্ত করলেন এবং তাঁকে লিখলেনঃ ‘আল্লাহর নামে যিনি দয়াবান ও করুণানিধান’ আল্লাহ রাসূল মুহাম্মাদ থেকে খুজামা ইবনে আসেমের নামেঃ আমি তোমাকে তোমার লোকজনের ওপর যাকাত সংগ্রহকরূপে ‍নিযুক্ত করলাম। সেই লোকেরা যেন আহত না হয়, তাদের ওপর যেন জুলুম করা না হয়। এ কথাটি রাশাতী উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেনঃ আবূ উমর তা উপেক্ষা করল। সাহম ইবনে মিনজাব তাইমীর জীবন বৃত্তান্তে তাবারী থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে, তিনি নবী করীম (সা)-এর নিয়োজিত বনু তমীমের যাকাত সংগ্রহ কাজে কর্মচারী ছিলেন। নবী করীম (সা)-এর ইন্তেকালের পর পর্যন্ত তিনি এ কাজে নিযুক্ত ছিলেন। ইকরামা ইবনে আবু জেহলের জীবন বৃত্তান্তে তাবারী থেকে উদ্ধৃত করেছেনঃ নবী করীম (সা) তাঁকে হাওয়াজিনের যাকাত সংগ্রহ কাজে নিযুক্ত করেছিলেন তাঁর ওফাতের বছর। মালিক ইবনে নুযাইরাতার জীবনীতে উল্লেখ করেছেনঃ তিনি বেশ কয়জন রাজা-বাদশাহর সহযাত্রী ছিলেন। নবী করীম (সা) তাঁকে তাঁর জনগণের যাকাত সংগ্রহ কাজে কর্মচারী ‍নিযুক্ত করেছিলেন মুনয়িম ইবনে নুযাইরাতা তামীমীর জীবন কাহিনীতে বলেছেনঃ নবী করীম (সা) তাঁকে বনু তমীমের যাকাত সংগ্রহের জন্যে প্রেরণ করেছিলেন। মুরদাম ইবনে মালেক আল-গনভীর জীবন বৃত্তান্তে বলা হয়েছে, নবী করীম (সা) তাঁকে তাঁর লোকজনের যাকাত সংগ্রহ কজে ক্ষমতাশালী করে নিযুক্ত করেছিলেন।
এভাবেই নবী করীম (সা) প্রায় গোটা উপদ্বীপ পরিব্যপ্ত করে ফেলেছিলেন। [দেখুনঃ (আরবি***************) আমরা (আরবি***************) নামক দেমাশক থেকে প্রকাশিত পত্রিকাটি থেকে- যা নবী জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী (আরবি***************) নামের সমষ্টির মধ্যে স্পষ্ট করে তুলেছে, তা থেকেই এই কথা উদ্ধৃত করেছি, তা যদিও পূর্ণাঙ্গ নয়। তবে ইবনে ইসহাক উদ্ধৃত কাহিনী তার সাথে মেশালে তা সম্পূর্ণ হয়। তবে ম্যাপটিতে গোত্রসমূহের অবস্থান দেখানোর কারণে উদ্দেশ্যপূর্ণ হয়ে যায়।] সর্বত্র তিনি যাকাত আদায়কারী ও সে জন্যে চেষ্টাকারী কর্মচারীদেরকে নিযুক্ত করেছিলেন, যেন যাকাত ফরয হওয়া লোকেরা তা যথাযথভাবে আদায় করার সুবিধা পায়।
নবী করীম (সা) এ কাজে নিযুক্ত লোকদেরকে ধন-মালের মালিকদের সাথে ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী কিরূপ আচরণ করতে হবে সেই সংক্রান্ত মূল্যবান উপদেশে সুসমৃদ্ধ ও শক্তিমান করে দিতেন। তাদের সাথে দয়ার্দ্র ও সহজাতমূলক আচরণ গ্রহণ করার-সেই সাথে আল্লাহর হক আদায়ের ব্যাপারে কোনরূপ উপেক্ষা-অপমানের আবেশ না আসতে পারে সে বিষয়ে যত্মবান হওয়ার উপদেশ দিতেন।
অনুরূপভাবে কোনরূপ অধিকার ছাড়া জনগণের একবিন্দু মাল গ্রহণ সম্পর্কে তীব্র ভাষায় ও কঠিনভাবে হুঁশিয়ার করে দিতেন। তাঁদের কারোর কারোর কাছ থেকে যাকাত সংগ্রহের হিসেবও গ্রহণ করা হত, যেমন পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, ইবনুল লাতবীয়া যখন কর্মক্ষেত্র থেকে ফিরে এলেন তাঁর নিকট থেকে সংগৃহীত যাকাতের হিসাব নেয়া হয়েছিল।
ইবনুল কাইয়্যেম লিখেছেন, দায়িত্বশীল কর্মচারীদের নিকট থেকে হিসাব গ্রহণ এবং তাদের কার্যকলাপের যে বিচার বিশ্লেষণ করা হত তার প্রমাণ এতেই রয়েছে। তাতে কারুর কোন বিশ্বাসভঙ্গের ত্রুটি ধরা পড়লে তাকে বরখাস্ত করা হত এবং অপেক্ষাকৃত বিশ্বস্ত লোক নিযুক্ত করা হত, [(আরবি***************)] এতেও কোনই সন্দেহ নেই।
এসব কিছুই আমাদের সম্মুখে অকাট্যভাবে প্রতিভাত করে তুলে যে, নবী করীম (সা)-এর যুগ হতেই যাকাত সংক্রান্ত গোটা ব্যাপারটি সরকারীভাবে পালনীয় কাজরূপে গণ্য হয়ে এসেছে। এটা একান্তভাবে সরকারী কাজরূপে গণ্য। এই কারণে নবী করীম (সা) ইসলাম গ্রহণকারী প্রত্যেকটি জনগোষ্ঠী ও গোত্রের জন্যে একজন করে যাকাত আদায়কারী নিযুক্ত করার ইচ্ছা করেছিলেন। সে সেখানকার ধনী লোকদের নিকট থেকে যাকাত আদায় করবে তা পাওয়ার যোগ্য লোকদের মধ্যে তা বন্টন করবে। তাঁর পরবর্তী খলীফাগণও এই ব্যবস্থাই চালু রেখেছিলেন।
এই কারণে আরিমগণ বলেছেন, যাকাত আদায়ের জন্যে কর্মচারী নিয়োগ ও প্রেরণ করা রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব। কেননা নবী করীম (সা) ও তৎপরবর্তী খলীফাগণ তাই করেছেন। তাঁরা যাকাত আদায়কারী লোক সর্বত্র পাঠাতেন। আরও এজন্যে যে, লোকদের ধন-মাল থাকলেও তা থেকে তাদের কি দিতে হবে, তা সাধারণত তারা জানে না। অনেকে কার্পণ্যও করে। অতএব আদায়কারী পাঠানো একান্তই কর্তব্য। [(আরবি***************)]
বিভিন্ন গোত্রের ধনশালী ব্যক্তিদেরও কর্তব্য হচ্ছে যাকাত আদায়ে নিযুক্ত লোকদের সাথে এই কাজ সুষ্ঠুরূপে আঞ্জাম দেয়ার ব্যাপরে পূর্ণ সহযোগিতা করা, তাদের ওপর যা যা ধার্য হবে তা নিজ থেকেই আদায় করে দেয়া এবং বিন্দুমাত্রও গোপন না করা, তাদের ধন-মালের কোন অংশ বাদ দিয়ে হিসাব না করাও কর্তব্য। রাসূলে করীম (সা) নিজেই এবং তাঁর সাহাবিগণ এরূপই আদেশ করেছেন।
জবীর ইবনে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেনঃ আরব বেদুইনদের কিছু লোক রাসূলে করীম (সা)-এর কাছে উপস্থিত হয়ে বললেঃ যাকাত আদায়কারী কিছু লোক আমাদের কাছে আসে, তারা আমাদের ওপর জুলুম করে। তখন নবী করীম (সা) বললেনঃ তোমরা তাদেরকে রাজী-সন্তুষ্ট রাখতে চেষ্টা করবে। [ হাদীসটি মুসলিম তাঁর সহীহ্ গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন।]
জাবির ইবনে আতীক (রা) থেকে বর্ণিত , রাসূলের করীম (সা) বলেছেনঃ খুব শীঘ্র তোমাদের কাছে এমন অশ্বারোহী লোক আসবে, যারা তোমাদেরকে ক্রুদ্ধ করতে চাইবে। কাজেই তারা যখন তোমাদের কাছে আসবে তখন তেমরা তাদেরকে স্বাগতম জানাবে, তাদের পথ ছেড়ে দেবে, তারা যা চাইবে তা তাদের নিতে দেবে। এতে তারা যদি সুবিচার করে, তা হলে তাতে তাদেরই কল্যাণ হবে। আর জুলুম করলে তার অকল্যাণ তাদেরই ভোগ করতে হবে। মনে রাখবে, তোমাদের সম্পূর্ণ যাকাত দিয়ে দেয়াই তাদেরকে সন্তুষ্টকরণের উপায় এবং তাদের উচিত তোমাদের জন্যে দোআ করা। [ হাদীসটি আবূ দাউদ কর্তৃক বর্ণিত। নাইলুল আওতার’ গ্রন্থে তাই বলা হয়েছে (৪র্থ খণ্ড ১৫৫ পৃঃ-উসমানীয়া ছাপা) মুনাভী ‘ফায়খ’ গ্রন্থে লিখেছেনঃ সন্দেহ নেই, নবী করীম (সা) কখনই কোন জালিম লোককে কর্মচারীরূপে নিযুক্ত করেন নি। বরং তাঁর নিযুক্ত যাকাত আদায়কারীরা চূড়ান্ত মাত্রার ইনসাফপন্থী ছিলেন। তার হবেই বা না কেন? হযরত আলী, হযরত উমর ও মুয়ায (রা) প্রমুখই ছিলেন তাঁর নিযুক্ত লোক। রাসূল (সা) কোন জালিম লোক নিয়োগ করেছিলেন, তা বলা থেকেও পানা চাই। উক্ত কথার তাৎপর্য হচ্ছে শীঘ্র তোমাদের কাছে আমার কর্মচারীরা যাকাত চাইতে আসবে। কিন্তু সাধারণত মানব-মন ধন-মালের প্রেমে মশগুল থাকে। তাই তখন তোমরা ক্রুদ্ধ বা অসন্তুষ্ট হতে পার এবং তোমরা তাদেরকে জালেম ভাবতে পার। আসলে তারা তা নয়। রাসূলের কথাঃ ‘তারা জুলুম করলে’ উক্ত ধারণার প্রেক্ষিতেই বলা। ‘যদি’ শব্দই এই কথা প্রমাণ করে অর্থাৎ ধরে নেয়া হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে তা হয়নি। মাযহারী বলেছেনঃ কথাটি সকল কালব্যাপী। তাই এর অর্থ তারা যেভাবেই যাকাত নিক না কেন, তোমরা বাধা দিও না। তারা তোমাদের প্রতি জুলুম করলেও না। যেহেতু তাদের বিরোধিতা করার অর্থ রাষ্ট্র-সরকারের বিরোধিতা। কেননা তারা সরকার কর্তৃক নিয়োজিত। আর সরকারের বিরোধিতা চরম অশান্তির সৃষ্টি করে। আদায়কারীদের জুলুমের বিরোধিতা করতে গিয়ে মাল গোপন করা জায়েয বলার প্রতিবাদ করে বলেছেন, তা কোন অবস্থায়ই জায়েয নয়। একটি হাদীসে লোকদের প্রশ্ন উদ্ধৃত হয়েছেঃ আদায়কারীরা বাড়াবাড়ি করলে আমরা কি মাল গোপন করব? জাবাবে রাসূল বলেছিলেনঃ না। তবে রাসূলের নিযুক্ত কর্মচারী ছাড়া অন্যদের নিযুক্ত কর আদায়কারীদের মধ্যে যারা জালিম, তাদের অসন্তুষ্ট করা ওয়াজিব। তারা যে জুলুম করে তার সহায়তা করে তাদেকে সন্তুষ্ট করা সম্পূর্ণ হারাম।(আরবি***************)
আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলে করীম (সা) কে বললেঃ আমি যদি আপনার প্রেরিত ব্যক্তির কাছে যাকাত শোধ করে দিই, তাতে কি আমি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের কাছে থেকে দায়িত্বমুক্ত হয়ে যাবো? বলরেনঃ হ্যাঁ, আমার প্রেরিত ব্যক্তির কাছে তুমি যদি যাকাত দিয়ে দাও, তাহলে তুমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কাছে দায়িত্বমুক্ত হবে। আর তুমি তার সওয়াব পবে। যদি কেউ তা বিকৃত করে, তাহলে তার গুনাহ তারই ওপর পড়বে। [(আরবি***************) গ্রন্থে মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায় বলা হয়েছে, ‘নাইলুল আওতার’ পূর্বোদ্ধৃতি।]
সাহাবিগণের ফতোয়া
সহল তাঁর পিতা আবূ সালেহ্ থেকে বর্ণনা করে বলেছেনঃ আমার কাছে ব্যয়যোগ্য সম্পদ সঞ্চিত হয়েছিল, তাঁর মধ্যে যাকাতও ছিল (অর্থাৎ যাকাতের নিসাব পরিমাণ সম্পদ আমি সায়াদ ইবনে আবূ ওয়াক্কাস, ইবনে উমর, আবূ হুরায়রা ও আবূ সায়ীদুল খুদরী (রা) কে জিজ্ঞাসা করলামঃ আমি নিজেই তা বণ্টন করে দেব, না সরকারের কাছে জমা করে দেব? তারা সকলেই আমাকে তা সরকারের কাছে জমা করে দেবার নির্দেশ দিলেন। এ বিষয়ে তাঁরা কেউই আমার নিকট ভিন্ন মত প্রকাশ করেন নি। অপর একটি বর্ণনায় বলা হয়েছেঃ আমি তাদেরকে বললামঃ আপনারা কি মনে করেন, এই সরকার যাকাত সেভাবেই ব্যয় করবেন যেমন আপনারা উচিত বলে মনে করেন? (বলা বাহুল্য, এটা উমাইয়া শাসন আমলের ঘটনা)…. আর তা সত্ত্বেও আমি আমার যাকাত তার কাছেই জমা করে দেব? তাঁরা সকলেই বললেনঃ হ্যাঁ, তাই দাও। ইমাম সায়ীদ ইবনে মনসূর তাঁর মুসনাদ’ গ্রন্থে উপরিউক্ত বর্ণনাটি উদ্ধৃত করেছেন। [নববী তাঁর (আরবি***************) গ্রন্থে এরূপই লিখেছেন।]
হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ আল্লাহ যাকে তোমাদের সামষ্টিক ব্যাপারের দায়িত্বশীল বানিয়েছেন, তোমরা তোমাদের যাকাত তাকেই-তার কাছেই জমা করে দাও। সে ভালো কাজ করলে তার শুভ ফল সে পাবে। আর গুনাহ করলে তার শাস্তিও সেই ভোগ করবে।
জিয়াদের ‍মুক্ত গোলাম কাজায়া থেকে বর্ণিত, ইবনে উমর বলেছেন, ‘তোমরা তাদের (সরকারী কর্মকর্তাদের) কাছেই যাকাত জমা করে দাও, তা দিয়ে তারা মদ্য পান করলেও।’ ইমাম নববী বলেছেনঃ বায়হাকী উক্ত হাদীস দুটি সহীহ্ কিংবা হাসান সনদে উদ্ধৃত করেছেন। [এসব হাদীস ও সাহাবীদের উক্তি ইমাম নববী তাঁর (আরবি***************) গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন। ৬ষ্ঠ খণ্ড, ১৬২-১৬৪ পৃ.]
মুগীরা ইবনে শ’বা থেকে বর্ণিত, তিনি তাঁর এক মুক্ত গোলামকে-সে তায়েফে তার ধন-মালের ব্যবস্থাপক ছিল-জিজ্ঞেস করলেনঃ আমার ধন-মালের যাকাত দেয়ার ব্যাপারে তুমি কি কর? বললেনঃ তার কিছু অংশ আমি নিজেই বন্টন করে দিই। আর কিছু অংশ সরকারের নিকট জমা করে দিই।
বললেনঃ তোমার নিজের কি করার আছে এ ব্যাপারে? (তাঁর নিজের বন্টন করা অপসন্দ করলেন) বললেঃ ওরা তো যাকাত নিয়ে তা দিয়ে জমি ক্রয় করে ও ধুমধাম করে বিয়েশাদী করে। বললেনঃ তাদেরকেই তুমি দেবে। কেননা রাসূলে করীম (সা) তাদের কাছেই জমা করে দেয়ার জন্যে আমাদেরকে আদেশ করেছেন। বায়হাকী ‘সুনামুল কুবরা’ গ্রন্থে এই বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন।
এসব হাদীস রাসূলে করীম (সা) থেকে বর্ণিত, সুস্পষ্ট অর্থ জ্ঞাপক। উক্ত ফতোয়াসমূহও সাহাবিগণের আর অকাট্য। তা আমাদের মনে এই অনুভূতি বরং দৃঢ় প্রত্যয় সৃষ্টি করে যে, মূলত ইসলামী শরীয়াতের বিধান হচ্ছে, মুসলিম সরকারই যাকাত সংক্রান্ত যাবতীয় ব্যাপারের দায়িত্বশীল। তাই তা সংগ্রহ করবে ধনমালী লোকদের কাছ থেকে এবং পাওয়ার যোগ্য লোকদের মধ্যে বণ্টনও করবে। আর জাতির জনগণের কর্তব্য হচ্ছে এই কাজের দায়িত্বশীল লোকদের সাথে এ ব্যাপারে পূর্ণ সহযোগিতা করা। এই সংস্থাকে স্বীকৃতিদান, ইসলামের সাহায্যে অগ্রসর হওয়া এবং মুসলমানদের বায়তুলমালকে শক্তিশালী করা।
এই ব্যবস্থার তত্ত্ব ও বৈশিষ্ট্
কউ বলতে পারেন, ধর্মের কাজ হচ্ছে লোকদের মনকে জাগ্রত করা, অন্তরে চেতনা সৃষ্টি করা এবং জনগণের সম্মুখে উন্নত মহান আদর্শসমূহ প্রকট করে তুলে ধরা। এই লক্ষ্যে কাজ করা যে, জনগণ নিজেরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে আল্লাহর কাছে সন্তুষ্টি ও শুভ ফললাভের জন্যে আগ্রহাম্বিত হবে। তাঁর শাস্তির চাবুকের ভয়ে তারা পরিচালিত হবে। সরকারী লোকদেরই এ কাজ করতে দেয়া উচিত যে, তারাই তা নির্দিষ্ট করবে, সুসংগঠিত করবে, দাবি করবে, অন্যথায় শাস্তি দেবে। এসবই রাষ্ট্র সরকারের দায়িত্ব। ধর্মের এই পথ প্রদর্শনের কোন প্রয়োজন করে না।
এর জবাবে বলা হচ্ছে, হ্যাঁ, উক্ত কথা দুনিয়ার অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কে যথার্থ, সন্দেহ নেই। কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে এ কথা কোনক্রমেই যথার্থ নয়। কেননা ইসলাম যেমন একটা বিশ্বাসের ব্যাপার তেমনি তা একটা পূর্ণাঙ্গ সমাজ বিধানও। তাতে যেমন উন্নত নৈতিকতার শিক্ষা রয়েছে, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্র-সরকার গঠন ও পরিচালনের আইন-বিধানও রয়েছে। কুরআন গ্রন্থও সার্বভৌম।
ইসলাম মানুষের জীবনকে বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন করেনি যে, তার একটি অংশে ধর্ম কর্ম হবে আর অপর অংশ দুনিয়ার জন্যে পরিচালিত হবে সম্পূর্ণ ভিন্নতরভাবে। মানব জীবনকে এরূপ খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত করা যায় না। তার একটি অংশ কাইজার-বাদশাহ-কে আর একটি অংশ আল্লাহকে দেয়া যায় না। বস্তুত গোটা জীবন একটি অবিভাজ্য সমগ্র। মানুষ সামগ্রিকভাবেই মানুষ। গোটা বিশ্বলোক এক অবিভাজ্য সমষ্টি- কেবলমাত্র মহাশক্তিমান আল্লাহর বিধানে নিয়ন্ত্রিত।
ইসলাম এমনি এক সর্বাত্মক জীবন বিধান হয়েই এসেছে। মানুষের সামগ্রিক জীবনে পথ-প্রদর্শন ও বিধান প্রদানই তার কাজ। এজন্যে তার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে ব্যক্তির স্বাধীনতা, ব্যক্তির মর্যাদা- সমষ্টির কল্যাণ ও উন্নয়ন। গোটা জাতি ও সরকারসমূহকে সত্য ও কল্যাণের দিকে পরিচালিত করাই ইসলামের লক্ষ্য। সমগ্র মানবতাকে আল্লাহর দিকে পরিচালিত করাই ইসলামের অবদান। মানুষ কেবল এক আল্লাহ্র বন্দেগী করবে, তাতে একবিন্দু শিরক করবে না এবং পরস্পর পরস্পরকেও- আল্লাহ্কে বা দিয়ে- রব্ব প্রভু-মানব বানাবে না- এই হচ্ছে ইসলামের দাওয়াত।
এই প্রেক্ষিতেই ‘ইসলামের যাকাত বিধান’ বিচার্য। তা কখনই ব্যক্তিগত ব্রাপারে নয়। ইসলামীসরকারকেই এ পর্যায়ের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাই ইসলাম তা সংগ্রহ ও পাওয়ার যোগ্য লোকদের মধ্যে তা বন্টনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব সরকারের ওপরই ন্যস্ত করেছে। ব্যক্তিদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ব্যাপার করে রাখা হয়নি তা। আর এসব কারণে যাকাতকে কোনরূপ উপেক্ষা করা ইসলামী শরীযাতের পক্ষে শোভন হতে পারে না। আরও কতিপয় কারণে উল্লেখ এখানে করা যাচ্ছে:
প্রথম, অনেক ব্যক্তিরই মন-মানসিকতা মৃতপ্রায় হয়ে থাকে, তাতে রোগের সৃষ্টি হতে পারে, অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারে তা। এ সব লোকযদি গরীব লোকদের অধিকার আদায়ে অবজ্ঞা প্রদর্শন করে, তা হলে তাদের কোন নিরাপত্তাই থাকে না।
দ্বিতীয়, গরীব মানুষ তার অধিকার সরকারের কাছ থেকেই পেতে পারে, ধনী ব্যক্তির কাছ থেকে নয়। তাতে তার নিজের মর্যাদা রক্ষা পায়, তার মুখ লাঞ্ছনার হাত থেকে বেঁচে যায়, প্রার্থনার কালিমা লেপন থেকে মুক্ত থাকতে পারে। ব্যক্তির অনুগ্রহ ও তৎজনিত পীড়ন তার ব্যক্তি সত্তাকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়- এই অবস্থা থেকেও নিষ্কৃতি সম্ভব।
তৃতীয় এই ব্যাপারটি ব্যক্তিদের হাতে ছেড়ে দিলে তার বন্টন অর্থহীন হয়ে পড়বে।ধনী ব্যক্তি নিজ ইচ্ছামত মাত্র একজন গরীবকেহয়তো সব যাকাত সম্পদ দিয়ে দেবে, এটা অসম্ভব কিছু নয়। তা হলে অন্যরা তা থেকে বঞ্চিত থেকে যাবে, কেউ তা বুঝতেও পারবে না- অথচ তারা অধিকতর তীব্রদারিদ্র্য-পীড়িত লোক হতে পারে।
চতুর্থ,যাকাত কেবলমাত্র ফকীর-মিসকীন-নিঃস্ব পথিক প্রভৃতি ব্যক্তিদের মধ্যে বন্টনীয় ব্যাপার নয়। মুসলমানদের সাধারণ জনকল্যাণমূলক কাজেও যাকাত বিনিয়োগ করতে হবে। কিন্তু তা ব্যক্তিদের সাধ্যায়ত্ব নয়। তা মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালক-পরামর্শ পরিষদ সদস্যদের করণীয়। যেমন ‘মুয়াল্লাফঅতু কুলূবুহুম’দের জন্যে ব্যয় করা, আল্লাহ্র পথে জিহাদের প্রস্তুতি গ্রহণ এবং সারা জাহানে ইসলামের দাওয়াত প্রচারের জন্যে লোক গঠন ও প্রেরণ করা প্রভৃতি কাজও যাকাত সম্পদ দ্বারাই আঞ্জাম দিতে হবে।
পঞ্চম, ইসলাম যেমন দ্বীন, তেমন রাষ্ট্র-রাষ্ট্রব্যবস্থাও। কুরআন পঠনীয়, সার্বভৌমত্ব প্রশাসনীয়। আর এই সার্বভৌমত্ব এই রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্যে ধন-মালের প্রয়েঅজন, যা দিয়ে রাষ্ট্র চলবে। তবে তার পরিকল্পনাসমূহ বাস্তাবয়িত হবে। আর সেজন্যে আয়ের সূত্র ও উপায় প্রয়োজন। আর ইসলামে যাকাত হচ্ছে বায়তুলমালের গুরুত্ব ও স্থায়ী আয়ের একটা উৎস।[(আরবী *********)]
যাকাত সম্পদের ঘর
এই আলোচনা থেকেই আমরা জানতে পারি যে, ইসলামী জীবন-বিধানের দৃষ্টিতে যাকাতের একটা বিশেষ বাজেট পরিকল্পনা থাকতে হবে। তা স্বতঃপ্রতিষ্ঠিত সঞ্চয়। তা থেকে বিশেষভাবে নির্দিষ্ট খাতসমূহে খরচ করা হবে। এই খাতসমূহ যেমন পুরামাত্রায় মানবিক, তেমন খালেসভাবে ইসলামী। রাষ্ট্রের বিরাট সাধারণ বাজেটের সাথে মিলে একাকার হতে পারবে না। কেননা সরকারী সাধারণ বাজেট তো বহু বিচিত্র ধরনের পরিকল্পনা সমন্বিত হয়ে থাকে এবং খরচও করা হয় বহু ধরনের খাতে।
যাকাতের খাত বর্ণনাকারী সূতরা তওবার আয়াতটি এই লক্ষ্যের দিকে ইঙ্গিত করেছে। তাতেই বলা হয়েছে যে, যাকাত সংগ্রহ ও বন্টনের কাজে নিযুক্ত কর্মচারীরা তাদের মাসিক বেতন-ভাতা এই যাকাত ফাণ্ড থেকেই গ্রহণ করবে। তার অর্থ, এর জন্যে একটা স্বতন্ত্র বাজেট প্রয়োজন। তাতে যাকাত প্রতিষ্ঠানের জন্যে ব্যয় করার ব্যবস্থা থাকবে। যাকাত ব্যয়ের খাতসমূহের বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে আমরা একথা বিশেষভাবে বলে এসেছি। শুরু থেকেই মুসলিমগণ এ কথাই চিন্তা করে এসেছেন। এই উদ্দেশ্যে তাঁরা যাকাতের জন্যে একটা স্বয়ংক্রিয় বায়তুলমাল রচনা করেছিলেন। কেননা ইসলামী রাষ্ট্রের বায়তুলমালসমূহকে তাঁহা চারটি ভাগে বিভক্ত করেছেন। হানাফী ফিকাহ্বিদগণ তাঁদের গ্রন্থাবলীতে তার আলাদা আলাদা ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
প্রথম, বিশেষভাবে যাকাতের জন্যে বায়তুলমাল। তাতে গৃহপালিত গবাদি পশুর যাকাতের জন্যে ব্যবস্থা থাকবে। জমির ওশর এবং মুসলিম ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে গৃহীত শুল্ক হিসেবে যা গ্রহণ করা হবে, তা-ও তাতে থাকবে।
দ্বিতীয়, বিশেষভাবে জিযিয়া ও খারাজ বাবদ লব্ধ সম্পদের জন্যে একটা বায়তুলমাল।
তৃতীয়, ছাগল ও রিকাজের জন্যে একটা বিশেষ বায়তুলমাল। রিকাজ সম্পর্কে কেউ কেউ মত দিয়েছেন যে, তা যাকাতের মধ্যে গণ্য হবে না। যাকাত ব্যয়ের খাতসমূহেও তা ব্যয় হবে না, উক্ত কথা তাদের দৃষ্টিতেই বলা হয়েছে।
চতুর্থ, মালিকবিহীন ধনসম্পদের জন্য একটা বিশেষ বায়তুলমাল। যেসব ধন-সম্পদের মালিক পাওয়া যায় না- যেমন যে-সব ধন-মালের উত্তরাধিকারী কেউ নেই, কিংবা উত্তরাধিকারী থাকা সত্ত্বেও তা গ্রহণ করতে কেউ আসে না- যেমন স্বামী বা স্ত্রী এই দুজনের একজন, নিহত ব্যক্তি রক্তমূল্য হিসেবে পাওয়া সম্পদ বা দিয়েত- যার অলী কেউ নেই, আর পড়ে পাওয়া সম্পদ, যার মালিকের খোঁজ পাওয়া যায় না। [দেখুন: (আরবী *********)]
প্রকাশমান ধন-মাল ও প্রচ্ছন্ন ধন-মাল এবং তার যাকাত যে পাবে
যে-সব ধন-মালে যাকাত ধার্য হয়, ফিকাহ্বিদগণ তাকে তুই ভাগে বিভক্ত করেছেন: একটা প্রকাশমান আর দ্বিতীয়টি অপ্রকাশিত, প্রচ্ছন্ন। প্রকাশমান ধন-মাল হচ্ছে তা, যা মালিক নয় এমন ব্যক্তির পক্ষেও চিহ্নিত ও আয়ত্ত করা সম্ভব। কৃষিলব্ধ ফসল দানা ও ফল এবং উট, গরু ও ছাগল প্রভৃতি পশু সম্পদ এর মধ্যে গণ্য।
আর অপ্রকাশিত ধন-সম্পদ হচ্ছে, নগদ টাকা বা এই পর্যায়ে আর যা পড়ে আছে এবং ব্যবসায় পণ্য। ফিত্রার যাকাত সম্পর্কে ফিকাহ্বিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ তাকে প্রকাশমান মালের মধ্যে গণ্য করেছেন আর অন্যরা তাকে গোপন বা প্রচ্ছন্ন মাল ধরেচেন।
প্রথম প্রকার- প্রকাশমান ধন-মাল সম্পর্কে ফিকাহ্বিদগণ এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ একমত হয়েছেন যে, তার যাকাত সংগ্রহ পাওয়ার যোগ্য লোকদের মধ্যে তা বন্টন করার দায়িত্ব মুসলমানদের রাষ্ট্রপ্রধানের তথা সরকারের। ব্যক্তির করণীয় ব্যাপার নয়, ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত দায়িত্বে তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও তাদের পরিমাণ নির্ধারণের ওপর এই কাজ ছেড়ে দেয়া হয়নি। হাদীসের বর্ণনাসমূহ ‘মুতাওয়াতির’ সূত্রে পাওয়া গেছে, নবী করীম(স) এ পর্যায়ের মালের ফরয যাকাত সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তাঁর নিয়েঅজিত ব্যীক্তবর্গ কর্মচারী প্রেরণ করতেন। তা রাষ্ট্রের কাছে অর্পণ করার জন্যে মুসলমানদের বাধ্য করতেন। আর কেউ তা দিতে অস্বীকৃতহলে এই লোকেরা তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করত। [(আরবী *********)] যেসব আরব গোত্র নবী করীম (স)-এর সময়ে যাকাত দিত হযরত আবূ বকর (রা)-এর খিলাফতের সূচনাকালে তা দিতে তারা অস্বীকার করলে এই কারণেই তিনি বলেছিলেন:
(আরবী *********)
আল্লাহ্র কসম! ওরা রাসূলেল জামানায় দিত এমন একটি রশিও যদি দিতে অস্বীকার করে, তাহলে আমি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করব কেবল এই কারণে।
এই ঘোষণাটি প্রকাশমান ধন-মালের যাকতা সম্পর্কেই ছিল। আরও বিশেষ করে তা ছিল গবাদি পশুর যাকাত সম্পর্কে।
আর দ্বিতীয় প্রকারের- অপ্রকাশমান, প্রচ্ছন্ন ধন-মাল, নগদ টাকা ও ব্যবসায় পণ্যের যাকাত সম্পর্কেও ফিকাহ্বিদগণ একমত হয়েছেন যে, রাষ্ট্রপ্রধান সরকারই তা আদায় করার জন্যে দায়িত্বশীল। তার হাতেও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই তা পাওয়ার যোগ্য লোকদের মধ্যে বণ্টিত হতে হবে। কিন্তু তা করা কি তার পক্ষে ফরয বা ওয়অজিব? তা তার বা তার নিযুক্ত লোকদের কাছে অর্পণ করার জন্যে জনগণকে বাধ্য করা যাবে? সেজন্যে কি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যাবে- যেমন হযরত আবূ বকর (রা) করেছেন?
এই বিষয়ে ফিকাহ্বিদগণের বিভিন্ন মত রয়েছে। যাকাত সংক্রান্ত দায়িত্ব পালনের বিষয়ে বিভিন্ন মাযহাবের বক্তব্য আমরা এখানে তুলে ধরছি।
হানাফীদের রায়
হানাফীদের মতে প্রকাশমান ধন-মালের যাকাত সংক্রান্ত দায়িত্ব রাষ্ট্রপ্রধান অর্থাৎ সরকারের ওপর অর্পিত। ধন-মালের মালিকদের দায়িত্ব ছেড়ে দেয়া হয়নি। কেননা আল্লাহ্ বলেছেন:
(আরবী *********) তুমি গ্রহণ কর তাদের ধন-মাল থেকে যাকাত।
আরও এজন্যে যে, হযরত আবূ বকর (রা) মুসলমানদের খলীফা হিসেবেই জনগণের নিকট যাকাত দেয়ার দাবি করেছিলেন এবং দিতে অস্বীকৃত হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। উপরন্তু যে জিনিস হস্তগত করা কর্তৃত্বের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের দায়িত্ব, তা তার মালিককে বা পাওয়ার যোগ্য লোককে দেয়া জায়েয হতে পারে না। যেমন ইয়াতীমের ওলীলর ব্যাপর। [দেখুন: (আরবী *********)]
তবে প্রচ্ছন্ন ধন-মালের যাকাত দিয়ে দেয়া ধনের মালিকদের দায়িত্বে অর্পণকরা হয়েছে। আসলে সে দায়িত্বও রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারেরই ছিল। পরে তা হযরত উসমানের খিলাফত আমল থেকে জনগণের দায়িত্বে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। কেননা তাই তখন সুবিধাজনক ছিল এবং তাতেই জনগণের কল্যাণ মনে করা হয়েছে বলে সাহাবিগণ তা সমর্থন করেছেন। (পরে এ বিষয়ে আলোচনা করা হবে) ফলে ধন-মালের মালিকরাই তখন রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের প্রতিনিধি হয়ে এই কাজ করেছে। কিন্তু তাই বলে তাও সরকারের কাছে দেয়া ও সরকারের পক্ষথেকে তার দাবি করার অধিকার বাতিল হয়ে যায়নি। এই কারণেই ফিকাহ্বিদগণ বলেছেন: ‘সরকার যদি জানতে পারে যে, কোন স্থানে লোকেরা তাদের প্রচ্ছন্ন ধন-মালের যাকাত দিচ্ছে না, তাহলে তারই দায়িত্ব তার দাবি করা ও আদায় করা। অন্যথায় তা নয়। কেননা তা করা হলে ইজ্মার বিরোধিতা করা হবে। [(আরবী *********)]
ব্যবসায়পণ্য স্বস্থানে প্রচ্ছন্ন ধন-মালের মধ্যে গণ্য। কিন্তু তা যদি এক স্থান থেকে অন্যত্র স্থানান্তরিত হয় এবং ব্যবসায়ী তার শুল্ক আদায় করে, তাহলে তখন তা প্রকাশমান ধন-মালের মধ্যে গণ্য হবে। তারও যাকাত সরকারের কাছেই দিতে হবে। শুল্ক আদায়কারী তো পথে ঘাটে সরকার কর্তৃক নিয়োজিত। ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্য নিয়ে যখন এক স্থান থেকে অনত্র চলে যায়, তখন শুল্ক অফিসার তাদের কাছ থেকে শুল্ক আদায় করে। এজন্যে ফিকাহ্বিদগণ বলেছেন: শুল্ক আদায়কারীদের সম্পর্কে অনেক মন্দ কথা বলা হয়েছে, তার কারণ, তারা লোকদের ওপর জুলুম করে শুল্ক আদায় করে থাকে। [ঐ: ৪১-৪২ পৃ.]
মালিকী মাযহাবের বক্তব্য
মালিকী মাযহাবের ফিকাহ্বিদগণ বলেছেন, সুবিচারক ও ন্যায়নীতিবান রাষ্ট্রপ্রধান তথা সরকারের কাছেই যাকাত জমা করে দেয়া ওয়াজিব যার আদায়করণ ও বন্টনে ন্যায় নীতিবাদী হওয়া সুপরিচিত। কিন্তু সে যদি অন্যান্য ক্ষেত্রে জুলুমকারী-পীড়নকারী হয, তার জুলুমও পীড়ন গবাদিপশু, কৃষি ফসল কিংবা নগদ সম্পদ- যে ক্ষেত্রেই হোক, সেযদি সুবিচার করতে চায়াও এবং তা তার কাছে দিয়ে দেয়ার দাবি করে, তবুও তাকে দেয়া যাবে না।
উক্তরূপ রাষ্ট্রপ্রধান সরকারের নিকট যাকাত দেয়া কি ওয়অজিব, না শুধু জায়েয?
দরদীর তাঁর (***) গ্রন্থের শরাহ্ গ্রন্থে বলেছেন, তা ওয়াজিব। কিন্তু দাসূকী তাঁর টীকায় বলেছেন, তা মাক্রূহ। ‘তাওজীহ্’ প্রভৃতি গ্রন্থেও তাই বলা হয়েছে।
বস্তুত যাকাত গ্রহণ ও ব্যয়-বন্টন এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ন্যায়নীতি অবলম্বনকারী রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের কাছে যাকাত জমা দেয়া ওয়াজিব। [(আরবী *********)]
কুরতুবী বলেছেন, রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার যদি যাকাত গ্রহণ ও বন্টনে ন্যায়নীতির অনুারী হয়, তাহলে নগদ বা অন্যান্য সস্পদের মালিকের পক্ষে নিজস্বভাবে তা বন্টন বা ব্যয় করর কোন অধিকার নেই। বলা হয়েছে: নগদ সম্পদের যাকাত দেয়ার দায়িত্ব তার মালিকদের ওপরই অর্পিত। ইবনুল মাজেশূন বলেছেন, তা হতে পারে যদি যাকাত শুধু ফকীল-মিসকীনের জন্যেই ব্যয় করা হয়। কিন্তু যদি এ দুটি ছাড়া অপরাপর খাতে ব্যয় করার প্রয়োজন দেখা দেয়, তাহলে তা বন্টন করার কাজ কেবলমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান- সরকারেরই করণীয় হবে। [(আরবী *********)]
শাফেয়ী মাযহাবের মত
শাফেয়ী মতাবলম্বীদের মতে কেবল প্রচ্ছন্ন ধন-মালের মালিকই নিজস্বভাবে ব্যয়-বন্টন করতে পারে। স্বর্ণ, রৌপ্য, ব্যবসায় পণ্য ও ফিতরের যাকাত প্রভৃতিই এ পর্যায়ে গণ্য। (ফিত্রা সম্পর্কে অপর একটা মত হচ্ছে, তা প্রকাশমান সম্পদ।)
প্রকাশমান ধন-সম্পদ, কৃষি ফসল, খনিজ সম্পদ প্রভৃতির যাকাত মালিকের নিজের বন্টন করার ব্যাপারে দুটি মত রয়েছে। তন্মধ্যে অধিক পরিচিত- যা নতুনও- মত হচ্ছে, তা জায়েয। আর প্রাচীন মত হচ্ছে, তা জায়েয নয়। বরং রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার ন্যায়নীতির অনুসারী হলে তা তার কাছে জমা করে দেয়া ওয়াজিব। কিন্তু যদি অন্যায়কারী হয়, তাহলে তাতে দুটি মত। একটি মতে তা জায়েয; কিন্তু ওয়াজিব নয়। আর বিশুদ্ধতম মত হচ্ছে তার কাছেই জমা করে দেয়া ওয়াজিব তার হুকুমের কার্যকরতা ও তার সাথে অসহযোগিতা না করার লক্ষ্যে।
ফিকাহ্বিদগণ বলেছেন: রাষ্ট্রপ্রধান-সরকার যদি প্রকাশমান ধন-মালের যাকাত দাবি করে, তাহলে কোনরূপ বিরুদ্ধ মনোভাব ছাড়াই তা তার কাছে জমা করে দেয়া ওয়অজিব। তাহলেই তার আনুগত্য সম্পন্ন হতে পারে। আর লোকেরা যদি তা না দেয় তাহলে রাষ্ট্রপ্রধান সরকার তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, যদি তারা নিজেরাই তা বের করে বন্টন করতে প্রস্তুত হয়, তবুও। আর রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার যদি তা না চায়, কোন আদায়কারীও যদি না নাসে, মালের মালিক যাকাত দেয়া বিলম্বিত করতে যতদিন পর্যন্ত আদায়কারী আগমনের আশা থাকবে। শেষ পর্যন্ত যদি আদায়কারীর আগমন সম্পর্কে নিরাশহয়ে যায়, তাহলে তখন সে তা নিজেই বন্টন করে দেবে।
কিন্তু প্রচ্ছন্ন ধন-মালের যাকাত-সম্পর্কে মা-অর্দীর বক্তব্য মতে-রাষ্ট্রপ্রধান বা আদায়কারীদের সঠিককিচু জানা থাকে না, ধন-মালের মালিকরাই সে বিষয়ে অবহিত। তাই তারা নিজেরাই যদি স্বতস্ফূর্তভাবে তা বন্টন করে দেয়, তাহলে তা মেনে নেয়া যাবে। রাষ্ট্রপ্রধান-সরকার- যদি কারো সম্পর্কে জানতে পারে যে, সেনিজে থেকে যাকাত দিচ্ছে না, তাহলে রাষ্ট্রপ্রধান-সরকার- কি তাকে বলবে: হয় তুমি নিজেই দিয়ে দাও অথবা আমার কাছে অর্পণ কর, আমি তা বন্টন করি? এই বিষয়ে দুটি কথা রয়েছে, মানত ও কাফ্ফারার ক্ষেত্রে তা কার্যকর।
ইমাম নববী বলেছেন: সর্বাধিক সহীহ্ কথা, রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের উক্ত রূপ কথা বলা ওয়াজিব, অবাঞ্ছিত কিছু ঘটার আশংকা দূর করার উদ্দেশ্যে। [(আরবী *********)]
হাম্বলী মাযহাবের বক্তব্য
হাম্বলী মাযহাবের অভিমত হল, রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের কাছে যাকাত জমা দেয়া ওয়াজিব নয়। তবেতার অধিকার আছে তা নেয়ার বা গ্রহণ করার। ‘আল-মুগ্নী’ গ্রন্থে যেমন বলা হয়েছে- তা রাষ্ট্রপ্রধান তথা সরকারের কাছে সমর্পণ করা জায়েয, এই ব্যাপারে মাযহাবটি কোন মত পোষণ করে না। সে রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার ন্যয়বাদী হোক, কি অন্যায়বাদী এবং তা প্রকাশমান ধন-মাল হোক, কি প্রচ্ছন্ন, তাতে কোন পার্থক্যনেই। তা অর্পণ করেই যাকাতদাতা দায়িত্বমুক্ত হয়ে যাবে, তা তার হাতে জমা হওয়ার পর বিনষ্ট হয়ে যাক, কি না হোক, তার জন্যে নির্দিষ্ট খাতসমূহে তা ব্যয় করা হোক, কি নাই হোক, তাতেও কোন পার্থক্য হবে না। কেননা সাহাবীদের কাছ থেকে এরূপ কথাই পাওয়া গেছে। আর যেহেতু রাষ্ট্রপ্রধান-সরকার-জনগণের প্রতিনিধি শরীয়াত অনুযায়ী, কাজেই তাকে দেয়া হলেই ব্যক্তি দায়িত্বমুক্ত হয়ে যাবে। যেমন ইয়াতীমেরই গ্রহণ করা হয়ে যায়, আর মালের মালিক নিজেই যদি তা ভাগ-বন্টন করে দেয়, তা হলেও মাযহাব সে ব্যাপারে কোন ভিন্নমত পোষণ করে না।
মাযহাবে ভিন্নমত এদিক দিয়ে অর্থাৎ উত্তম ও অধিক পসন্দনীয় নীতি হচ্ছে, মালিক নিজেই তা বিলি-বন্টন করবে যদি রাষ্ট্রপ্রধান বাসরকার তা তার নিকট জমা দিতে না বলে; কিংবা উত্তম ও পসন্দনীয় নীতি এই যে, ন্যায়বাদী রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে তা দিয়ে দেবে, যেন সে তা যথাস্থানে ব্যয় করার দায়িত্ব পালন করে।
ইবনে কুদামাহ ‘আল-মুগ্নী’ গ্রন্থে লিখেছেন:
‘প্রত্যেকটি মানুষের পক্ষে তার যাকাত ব্যক্তিগতভাবে নিজের হাতে বিলি-বন্টন করাই মুস্তাহাব-পসন্দনীয়। তবেই তা পাওয়ার যোগ্য লোকেরা পেল বলে তার প্রত্যয় অর্জিত হতে পারে। তা প্রকাশমান মালেরই যাকাত হোক, কি অপ্রকাশমান মালের। ইমাম আহ্মাদ বলেছেন: আমি খুশি হই যদি সম্পদের মালিক নিজেই তা বন্টন করে। আর সরকারী ব্যবস্থাপনার কাছে দিলেও তা জায়েয হবে।’
হাসান, মকহুল, সায়ীদুবনি জুবাইর এবং মাইমুন ইবনে মাহ্রান বলেছেন: ধন-মালের মালিক নিজেই নিজের যাকাত যথাস্থানে ব্যয় করবে। সওরী বলেছেন: সরকারী যাকাত সংগ্রহকারীরা যদি তা যথাস্থানে ব্যয়-বিনিয়েঅগ না করে, তাহলে তুমি কিরা-কসমকর, মিথ্যা বল, তবু তাদেরকে কিছুই দিও না। বলেছেন: না, তাদেরকে কিছু দেবে না।
আতা বলেছৈন: ‘হ্যাঁ, তারা যদি তা যথাস্থানে ব্যয় বিনিয়োগ করে, তবে তাদেরকেই যাকাত দিয়ে দাও।’ এ কথার তাৎপর্য হচ্ছে, তারা সেরূপ না হলে তাদের হাতে যাকাত দেয়া যাবে না।
শবীও আবূ জাফর বলেছেন: তুমি যদি দেখ যে, সরকারী দায়িত্বশীল লোকেরা যাকাতের ব্যাপারে ন্যায়নীতি অনুসরণ করছে না, তা হলে স্থানীয় অভাবগ্রস্ত লোকদের মধ্যে তুমি নিজেই বন্টন করে দাও।
(লক্ষণীয়, এ সমস্ত কথাই অন্যায় নীতির অনুসারী যাকাত কর্মচারীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে। তা ‘আল-মুগ্নী’ যা বলেছেন তার সমর্থন করছে না।) বলেছেন: আহমাদ থেকে বর্ণিত, তিনি মত দিয়েছেন, ‘জমি ফসলের যাকাত সরকারের নিকট প্রদান আমি পসন্দ করি। কিনতউ অন্যান্য ধন-মালের যাকাত যেমন গবাদিপশু- তা নিজেই গরীব-মিসকীনদের মধ্যে বিতরণ করলে কোন দোষ হবে না।
এর বাহ্যিক অর্থ হল, তিনি বিশেষভাবে ‘ওশর’ রাষ্ট্রকর্তার হাতে পৌঁছে দেয়া পছন্দ করেন। কেননা ‘ওশর’ সম্পর্কে লোকদের মত হচ্ছে তা জমির খাজনা। অতএব তা খারাজ সমতুল্য। রাষ্ট্রকর্তারাই তার বিলি-ব্যবস্থার অধিকারী। কিন্তু অন্যান্য যাকাতের অবস্থা এরূপ নয়।
বলেছেন: ‘আল-জামে’ গ্রন্থে আমি দেখেছি, তাতে বলা হয়েছে, সাদ্কায়ে ফিতর সরকারী তহবিলে দেয়াই আমি পছন্দ করি।
পরে আবূ আবদুল্লাহ্- অর্থাৎ ইমাম আহমাদ বলেছেন, হযরত উমর (রা)-কে লোকেরা বলল, ওরা এই যাকাত নিয়ে তা দিয়ে কুকুরের গলায় ফিতা বাঁধে এবং তা দিয়ে ওরা মদ্যপান করে! তবুও কি ওদের দেব? বললেন: হ্যাঁ, ওদের কাছেই দেবে।
ইবনে আবূ মূসাও আবুল খাত্তাব বলেছেন, ‘ন্যায়বাদী রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের তহবিলে যাকাত দিয়ে দেয়া উত্তম।’ ইমাম শাফেয়ীর সঙ্গীদেরও এই মত।
অতঃপর ইবনে কুদামাহ সর্বপ্রকারের মালের যাকাতই রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের তহবিলে দেয়া ওয়াজিব বলে যাঁরা মত দিয়েছেন, তাঁদের বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। যাঁরা শুধু প্রকাশমান মালের যাকাতের কথা বলেছেন- ইমাম মালিক, আবূ হানীফা ও আবূ উবাইদ প্রমুখের কথারও উল্লেখ করেছেন। তাঁদের দলিল হচ্ছে পূর্বে উল্লিখিত আয়াত ‘নাও তাদের ধন-মাল থেকে…. এবং এরই জন্যে হযরত আবূ বকর ও সাহাবিগণ (রা) রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ পর্যন্ত করেছেন….।
এদের কথা রদ্দ্ করেছেন এই বলে: ‘যাকাত নিজেরহাতে দেয়া জায়েয হওয়া পর্যায়ে আমাদের দলির হচ্ছে, তা হল হক্- যার যা পাওনা, তাকেই তা দিয়ে দেয়া হয়। এটা তার বৈধ কাজ। এ করা হলে যাকাত আদায় হয়ে গেল। যেমন ঋণটা মূল ঋণদাতাকেই দেয়া হল। প্রচ্ছন্ন ধন-মালের যাকাতের ব্যাপারটিও তাই। যেহেতু দুই ধরনের যাকাতের এও একটা। ফলে অন্য প্রকারের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হল। উক্ত আয়াত প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রপ্রধান- সরকারের অধিকার রয়েছে তা গ্রহণ করার। এতে কোন মতদ্বৈততা নেই। হযরত আবূ বকর (রা) এজন্যেই তার দাবি করেছিলেন যে লোকেরা তা পাওয়ার অধিকারী লোকদেরকে দিচ্ছিল না, তারা নিজেরাও যদি তা পাওয়ার অধিকার লোকদেরকে দিয়ে দিত, তাহলে তিনিন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতেন না। কেননা ব্যক্তিগতভাবেতিলে তাতে যাকাত আদায় হয় কিনা, তা নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। সে কারণেই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা যায় না। রাষ্ট্রপ্রধান-সরকার ধনমালের মালিকদের কাছে যাকাত দাবি করে পাওয়ার অধিকারী লোকদের প্রতিনিধি হিসেবে অর্পিত- দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে। তাই তারা নিজেরাই যদি উপযুক্ত লোকদের মধ্যে বন্টন করে দেয়, তবে তা অবশ্যই জায়েয হবে। কেননা তারা বয়স্ক সমঝদার লোক। অল্প বয়স্ক পিতৃহীন ছেলেমেয়ে- ইয়াতীমে- কথা আলাদা।
নিজ হাতে যাকাত বিতরণের একটা বিশেষত্ব রয়েছে। তাতে ‘হক্টা তার পাওয়ার যোগ্য লোকদের কাছে সরাসরিভাবে পৌঁছে যায়। তাতে কর্মচারীদের মজুরী বেঁচে যায় যেমন, তেমনি লোকদের দারিদ্য-পীড়ন থেকে সরাসরিভাবে মুক্ত করা সম্ভব হয়। তা দিয়ে তাদেরকে সচ্ছল বানিয়ে দেয়া যায়। নিকটবর্তী ও রক্ত সম্পর্কসম্পন্ন অভাবগ্রস্তদের যাকাত দেয়া উত্তম, তাও এভাবেই রক্ষা পায়। আত্মীয়তারক্ষা করার এ একটা উপায়। অতএব তা উত্তম। যেমন তা গ্রহণকারী সরকারী লোক যদি ন্যায়বাদী না হলে ব্যক্তিগতভাবে দিয়ে দেয়া উততম, এও ঠিক তেমিন।
ইবনে কুদামাহ বলেছেন যদি প্রশ্ন তোলা হয় যে, তাহলে আসলে কথা হচ্ছে ন্যায়বাদী রাষ্ট্রনায়ক- তথা সরকারকে কেন্দ্র করেই। এরূপ অবস্থায় খিয়ানত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
আমরা বলব, রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার নিজ থেকেই তো আর যাকাত নেয়ার অধিকারী হয় না, নিজেই তা গ্রহণ বা বন্টন করে না। সব কাজই এই উদ্দেশ্যে নিয়োজিত কর্মচারীদের ওপর ন্যস্ত করতে হয়। কিন্তু তারা সকলেই তো আর খিয়ানতের ঊর্ধ্বে হয় না, তা থাকে নিরাপত্তাও পাওয়া যায় না। তা ছাড়া অনেক সময় আসলে পাওয়ার যোগ্য লোকেরা তা পায় না। সম্পদ-মালিক নিজেই তার পরিবারের প্রতিবেশী রোকজনের কাছ থেকে এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে অব্যহতি হতে পারে। আর তারাই এ নৈকট্যের সম্পর্কের কারণে তা পাওয়ার অন্যদের অপেক্ষা অনেক বেশি অধিকারী। [দেখুন: (আরবী ********)]
জায়দীয়া ফিকাহ্বিদদের মত
জায়দীয়া ফিকাহ্বিদদের মত হচ্ছে, যাকাতের ব্যাপারে পূর্ণ কর্তৃত্ব রাষ্ট্রপ্রধানের, তা প্রকাশমান ধন-মাল হোক, কি প্রচ্ছন্ন ধন-মাল। ন্যায়বাদী রাষ্ট্রপ্রধান থাকা অবস্থায় ধন-মালের মালিকের কোন কর্তৃত্ব থাকে না। প্রকাশমান ধন-মাল বলতে তারা বুঝেন গবাদি পশু, ফল এবং অনুরূপ ফিত্রা, খারাজ ও খুমুস প্রভৃতি সম্পদ। আর প্রচ্ছন্ন ধনমাল বলতে তাঁরা বুঝেন নগদ সম্পদ- স্বর্ণ রৌপ্যের মুদ্রা বা এ ধরনের আর যা কিছু- যেমন কারখানা ও ব্যবসায় পণ্য। এটা হবে, যদি তাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
তাদের দলিল উপরিউক্ত আয়াত: ‘গ্রহণ কর তাদের ধন-মাল থেকে…’ এবং হাদীস: ‘তাদের ধনী লোকদের নিকট থেকে যাকাত গ্রহণ করা হবে এবং … ‘ প্রভৃতি। নবীকরীম (স)-এর নিজের পক্ষ থেকে যাকাত সংগ্রহকারী প্রেরণ, খলীফাগণের তাই করা… এসবই। এটা কাফ্ফারা, মানব, ক্ষতিপূরণ ইত্যাদির মত নয়। কেননা এসবের ওপর রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের কোন কর্তৃত্ব নেই। এগুলো ব্যক্তিগণের ব্যক্তিগত পর্যায়ের করণীয় কাজ। তবে লোকেরা নিজেরা যদি তা দেয়া থেকে বিরত থাকে, তাহলে রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার তা দিতে তাদেরকে বাধ্য করবে।
পার্থক্য এ কারণে যে, যাকাত প্রভৃতি ফরয হয়েছে আল্লাহ্ নিজেই তা ফরয করেছেন বলে। কিন্তু কাফ্ফারা ইত্যাদি তো ব্যক্তির নিজস্ব কারণে ওয়াজিব হয়ে থাকে।
যখন প্রমাণিত হল যে, যাকাত ব্যাপারটি সার্বিকভাবে রাষ্ট্রপ্রধান বাসরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট, তখন যে লোক তার যাকাত সরকারী তহবিল ভিন্ন অন্যভাবে দেবে- সরকারের কাঝে জমা দেয়ার তাগিদ থাকা সত্ত্বেও এ দেয়াটা তার যথেষ্ট হবে না, তা পুনর্বার দেয়া একান্তই আবশ্যকীয় হবে। যদি মূর্খতাবশত অন্যভাবে যাকাত আদায় করে থাকে সে মূর্খতা হতে পারে সরকারের কাছে জমা দেয়ার প্রয়োজনীয়তা অথবা তার পক্ষ থেকে দাবির কথা না জানার কারণে। কিন্তু কর্তব্য সম্পর্কে মূর্খতা তা পালন করার অক্ষমতার ওযর হতে পারে না।
কেউ কেউ আপত্তি তুলেছেন, সর্বসম্মত কর্তব্যের বিষয়ে অজ্ঞতা কোন ওযর হতে পারে না, তা মেনে নিলাম; কিন্তু সে বিষয়ে ভিন্ন মত রয়েছে তাতে অজ্ঞতা ইজতিহাদ সমতুল্য, তার একটা কারণ রয়েছে। তাই সর্বপ্রকারের ধন-মালের যাকাত পর্যায়ে কর্তৃত্ব কেবলমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের হওয়াটা সর্বসম্মত কথা নয়, -তাতে বিভিন্ন মত রয়েছে, তাই মূল হুকুম অজানা থাকার কারণে তার ব্যক্তিগতভাবে আদায় করাটাই যথেষ্ট হওয়া বাঞ্ছনীয়।
এর জবাবে বলা যায়, উক্ত মতবৈষম্য তো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের পক্ষ থেকে দাবি না করার দরুন অন্যত্র আদায় করার ক্ষেত্রে মাত্র। কিন্তু সেই দাবি যদি করা হয়, তাহলে তা যে তারই নিকট অর্পণ করতে হবে ও যাকাতের ওপর রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের কর্তৃত্বই মেনে নিতে হবে, তাতে কোন মতবৈষম্য নেই, তা সর্বসম্মত। [(আরবী ********)]
আর যদি কোন সময় রাষ্ট্রপ্রধান বা ইমাম মুসলিম না থাকে কিংবা তা সত্ত্বেও ধন-মালের মালিক তার কর্তৃত্ব না রাখে, তাহলে তখন পূর্ণবয়স্ক সম্পদ মালিক নিজেই পাওয়ার যোগ্য লোকদের মধ্যে বন্টন করবে। আর সম্পদ মালিক যদি পূর্ণবয়স্ক ও সুস্থ বিবেক-বুদ্ধির অধিকারী না হয়, -যেমন বালক, পাগল ও এ ধরনের অন্য কিছু- যেমন বেঁহুশ, নিখোঁজ, তাহলে তার অভিভাবক-অলী-তারই নিয়তে বন্টন করে দেবে। [(আরবী ********)]
আবাজীয়াদের মত
আজাবাজীয়া ফিকাহ্ মতে, প্রকাশমান রাষ্ট্রপ্রধান বা ইমাম (সরকা) থাকলে যাকাতের সমস্ত ব্যাপার তারই কাছে সমর্পিত হবে। কোন ধনী ব্যক্তিই নিজস্বভাবে যাকাত বন্টন করবে না। যদি তা করে, তাহলে আদায় হবে না, পুনরায় আদায় করতে হবে যথানিয়মে। হ্যাঁ, তবে রাষ্ট্রপ্রধান বা ইমাম বা সরকার তা করার নির্দেশ বা অনুমতি দিলে তবে আদায় হয়ে যাবে। রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতিনিধি ও কর্মচারী পর্যায়েও এই কথা।
রাষ্ট্রপ্রধানের- সরকারের অনুমতি ছাড়াই তা দিলে তাদের একটি মতে তা পালন হয়ে গেল এবং তার কাজ জায়েয বলে ঘোষিত হবে। আর অপর একটি মতে তা মোটামুটি নিঃশর্তভাবে আদায় হয়ে যাবে বটে; তবে রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার যদি তা চায়, তাহলে তখন তা তাকে আবার দিতে হবে। আদায় করেছে তা জানার পরও যদি দাবি করে তাহলেও।
এই শোষোক্ত কথার দলিলস্বরূপ বলা হয়েছে যে, ইবনে মাসউদ (রা) তাঁর স্ত্রীর নিকট যাকাত দাবি করলেন। এক্ষণে কথা হচ্ছে, রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের অনুমতি ব্যতীত দিয়ে থাকলে তা আজার দেয়া জায়েয না হলে তিনি তা চাইতেন না।
কিন্তু ইবনে মাসউদ (রা)-এর বেগম বললেন: না, তা দেব না, যতক্ষণ না এ বিষয়ে রাসূলে করীমের কাছে জিজ্ঞেস করছি, এই অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন এই ভয়ে যে, স্ত্রীর পক্ষেতার স্বামী ও সন্তানদের তার নিজের যাকাত দিয়ে দেয়া হয়ত জায়েয হবে না।
যারা যাকাত রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারী তহবিলে দেয়া ওয়াজিব বলেছৈন, তাঁদের দলির হচ্ছে, হযরত আবূ বকরের এই কথা: ‘ওরা যদি আমাকে যাকাতের এমন একটা রশি দিতেও অস্বীকার করে যা তারা রাসূলে করীম(স)-কে দিতহ, তাহলে আমি সেজন্যে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করব।’ তার অর্থ এই যে, লোকেরা রাষ্ট্রপ্রধান তথা সরকারী তহবিলে যাকাত দিতে অস্বীকার করলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা শুধু মুবাহ্ নয়, একটা অবশ্যকর্তব্য ফরয বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। তাহলে এ মধ্যে সেই অবস্থাও শামিল হয়ে গেল যে, যদি তারা তা দিতে অস্বীকার করে এই কাণে যে, তারা তা ইতিপূর্বে তা পাওয়ার যোগ্য লোকদের দিয়ে ফেলেছে, অথবা তারা তা তাদের মধ্যে নিজেরাই বণ্টন করে দেবে বলে ইচ্ছা করেছে অথবা তাদের তা আদপেই না দিতে চাওয়া- দিতে অস্বীকার করার কারণেও তা হতে পারে। ঠিক এ ব্যাপারেই ইতিপূর্বে ঘটনা সংঘটিত হয়ে গেছে, যখন তারা বলেছিল, ‘আমাদের ধন-মালে আমরা কোন অংশীদার বানাতে রাজী নই’ এবং অতঃপর তারা মুর্তাদ হয়ে গেল। অতএব শব্দের সাধারণ তাৎপর্যকেই ধরতে হবে, তার কারণে বিশেষত্বকে নয়। আর এখানে সাধারণভাবেইযাকাত দিতে অস্বীকৃত হওয়ার দরুন যুদ্ধ করাকে সম্পর্কিত করা হয়েছে প্রকাশ্য শব্দ যোজনার মাধ্যমেই। [(আরবী *********)]
শবী, বাকের, আবূ রুজাইন ও আওযায়ীর মত
শবী, মুহাম্মাদ ইবনে আলী বাকের, আবূ রুজাইন ও আওযায়ী প্রমুখ ফিকাহ্বিশারদ মত দিয়েছেন যে, যাকাত অবশ্যই রাষ্ট্রপ্রধান সরকারকে (তার তহবিলে) জমা দিতে হবে। কেননা যাকাতের ব্যয় খাতসমূহ সম্পর্কে সে-ই অধিক মাত্রায় অবহিত। আর তা একবার তার কাছে দিয়ে দিলে প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য উভয় মালেই তা আদায় হয়ে যাবে, দাতা দায়িত্বমুক্ত হবে। আর ফকীরকে দিয়ে দিলে তা বাতেনীভাবে দায়িত্বমুক্ত করবে না। কেননা আশংকা রয়েছে, সে হয়ত পাওয়ার যোগ্য নাও হতে পারে। আরও এই জন্যে যে, সে দিয়েছে বটে; কিন্তু এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে, অবশ্য তুহ্মতটা অপসৃত হবে। ইবনে উমর (রা) তাঁর যাকাত দিয়ে দিতেন ইবনে জুবাইরের পক্ষ থেকে যে কোন আদায়কারী তাঁর নিকট আসত, তাকেই অথবা নজদাতুল হারুরীকে। ‘সুহাইল থেকে- আবূ সালেহ থেকে, সূত্রে বর্ণিত বলেছেন: আমি সায়াদ ইবনে আবূ ওয়াক্কাবের কাছে উপস্থিত হলে বললাম: আমার মাল রয়েছে, আমি তার যাকাত দিতে চাই আর এরা সব হচ্ছে পাওয়ার যোগ্যযা মনে হচ্ছে, এখন আপনার কি আদেশ আমার প্রতি? বললেন, ‘তুমি তাদেরকেই দিয়ে দাও।; পরে আমি ইবনে উমরের কাছে এলাম, তিনিও তাই বললেন। তারপর এলাম আবূ হুরায়রার কাছে, তিনিও তাই বললেন। পরে আবূ সায়ীদের নিকট এলে তিনিও বললেন। হযরত আয়েশা (রা) সম্পর্কেও অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে। [দেখুন: (আরবী *********)]
তুলনা ও অগ্রাধিকার দান
ফিকাহ্বিদদের মাযহাব ও মতামত- উক্তিসমূহ উদ্ধৃত করার পর আমি যা মনে করি- উত্তম বলে ধারণা করি, তাকে অগ্রাধিকার দেয়ার পূর্বে আমি এদিকে ইঙ্গিত করতে ইচ্ছা করেছি যে, সমস্ত মাযহাবের ফিকাহ্বিদগণ বিস্তারিত ও খুঁটিনাটি ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে শত মতবৈষম্য থাকা সত্ত্বেও দুটি মৌলিক ব্যাপারে সম্পূর্ণ একমত।
প্রথমত, রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের জনগণের কাছে যাকাতের দাবি করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। মাল –সম্পদ যে ধরনের ও যে প্রকৃতি বা রূপেরই হোক-না-কেন। প্রকাশমান মাল হোক, কি অপ্রকাশমান এবং বিশেষ করে যখন নগরবাসীদের এই অবস্থা জানা যাবে যে, তারা যাকাত দেয়ার ব্যাপারে খুবই উপেক্ষা প্রদর্শন করছে। আল্লাহ এরূপ করারই নির্দেশ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে হানাফী আলিমগণ খুব তাগিত করেছেন।
এই কারণে কোন কোন ফিকাহ্বিদ বলেছেন, রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার যদি যাকাতরে জন্যে দাবি না করে, তাহলে সেই অবস্থায়ও যাকাতের ব্যাপারটি তারই ওপর সমর্পিত কিনা, এ নিয়ে মতভেদ আছে। কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার যদি তা সরকারী তহবিলে দেয়ার জন্যে দাবি করে, তাহলে তখন এ ব্যাপারটির কর্তৃত্ব সর্বসম্মতভাবেই সরকারের হবে, তাতে কোন মতভেদ নেই। [দেখুন: (আরবী *********)]
এমনকি আমরা যদি বলি যে, মতবৈষম্য রয়েছে; কিনতউ তার দাবি ও বাধ্যতামূলককরণে সে মতভেদ নিঃশেষ হয়ে যায়। কেননা কোন ইজতিহাদী বিষয়ে ইমাম বা সরকারের কোন হুকুম হয়ে গেলে ও তার কর্তৃক পরিস্থিতি বিশ্লেষিত হলে সব মতভেদই দূর হয়ে যায় যেমন কাযীর বিচার হয়ে গেলে তাই হয় চূড়ান্ত। [দেখুন: (আরবী *********)]
দ্বিতীয়ত, এই ব্যাপারটি নিরংকুশ ব্যাপার, এতে কোন সন্দেহ নেই, কোন মতভেদও নেই, যে ইমাম- রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার যদি যাকাতের ব্যাপারটি উপেক্ষা করে চরে এবং তা জমা দেয়ার জন্যে নির্দেশ বা দাবি পেশ কনা করে, তাহলে ধন-মালের মালিকদের যাকাত আদায়ের দায়িত্ব প্রত্যাহার হয় না বরং তা তাদের মাথার ওপর থেকেই যায়। আ তা কোন অবস্থায়ই তাদের জন্যে শুভ হয় না। তখন তাদের নিজেদেরই পাওয়ার যোগ্য লোকদের মধ্যে বিতরণ করে দেয়া একান্তভাবেই ওয়াজিব হয়ে পড়ে। কেননা যাকাত ইবাদত, দ্বীনী-দায়িত্ব ও ফরয। তা অবশ্যম্বাবীরূপে পালনীয়। এমন কি কোন প্রশাসক যদি এ কথা বলার দুঃসাহস করে: আমিতোমাদেরকে যাকাত আদায়ের দায়িত্ব মাফ করে দিলাম কিংবা তা তোমাদের ওপর থেকে প্রত্যাহার করলাম- সর্বপ্রকারের ধন-মালেরই- তা হলেও তার এ কথা বাতিল গণ্য হবে, তার এ কথা অর্থহীন গণ্যহবে। তখন প্রত্যেকটি মুসলিম- যার ওপর যাকাত ফলয- তা পাওয়ার যোগ্য লোকদের মধ্যে নিজস্বভাবে বিতরণের জন্যে দায়িত্বশীল হবে।
এ দুটি সত্য যখন সর্বসম্মতভাবে প্রমাণিত হল, তখন এখানে একটি ব্যাপার অবশিষ্ট থেকে যায়। তা হচ্ছে সেই বিষয়, যাতে তাঁরা বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। যে বিষয়টি হচ্ছে প্রাক্তন ও অপ্রকাশমান ধন-সম্পদ। এ পর্যায়ে প্রশ্ন হচ্ছে, এই ধন-মালের যাকাতের ব্যাপারটি কি রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের ওপর অর্পিত, না ব্যক্তিগণের ওপর?
আমি মনে করি, শরীয়াতের দলিল প্রমাণসমূহ- যা যাকাতকে রাষ্ট্রপ্রধান বা ইসলামী হুকুমতের কর্তৃত্বাধীন বানিয়ে দেয়- প্রকাশমান ধন-মাল ও অপ্রকাশমান ধন-মালের যাকাত সংক্রান্ত দায়িত্ব পালনে ব্রতী হওয়া, তা সংগ্রহ করা এবং বিতরণ ও বণ্টন করা। এ দায়িত্বের ব্যাপারে সেটাই হচ্ছে আসল কর্তব্য। নিম্নোদ্ধৃত আলোচনায় তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
ক. ইমাম রাযী তাঁর তাফসীর গ্রন্থ (****) আয়াতটির ব্রাখ্যায় লিখেছেন: ‘এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, এই যাকাতসমূহ গ্রহণ করা ও বন্টন করা রাষ্ট্রপ্রধান ও তার নিযুক্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্বের ব্যাপারে। তার প্রমাণ হচ্ছে, আল্লাহ তা’আলা নিজেই যাকাত সংক্রান্ত কর্মচারীদের জন্যে যাকাতের একটি অংশ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। আর তাই প্রমাণ করে যে, যাকাত আদায়ের জন্য কর্মচারী নিযুক্ত করা আবশ্যক। আর রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার কর্তৃক যে কর্মচারী যাকাত গ্রহণের জন্যে নিযুক্ত হবে, সেই হবে এ বিভাগের কর্মচারী। অতএব এ দলিলই অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রপ্রধান যাকাত গ্রহণ করবে। আল্লাহ্র নিম্নোদ্ধৃত আয়াতটিও একথা অকাট্যভাবে প্রমাণ করে: (আরবী *********)
তাদের ধন-মাল থেকে তুমি যাকাত গ্রহণ কর।’ [রাসূলে করীম (স)-কে এই নির্দেশ এবংতিনি রাষ্ট্রপ্রধান]
অতএব প্রচ্ছন্ন ধন-মালের মালিক নিজেই তার যাকাত বন্টন করবে, এ কথা জানা যায় অপর একটি দলিল দ্বারা। আল্লাহ্র এ কথাটিও ধরা যেতে পারে তা প্রমাণ করার জন্যে:
(আরবী *********) তাদের ধন-মালে প্রার্থনাকারী ও বঞ্চিত লোকের হক্- অধিকার রয়েছে।
এই অধিকারটি যখন প্রার্থনাকারী ও বঞ্চিত লোকের অধিকার, তখন প্রথম এবং সরাসরি তাদেরকেই তা দেয়া ওয়অজিব হয়ে পড়ে। [(আরবী *********)]
তবে কথা হচ্ছে, ইমাম রাযী এই যে আয়াতটির উল্লেখ করেছেন, তা দলিল হিসেবে ধরা ঠিক হয় না। কেননা প্রার্থ ও বঞ্চিতদের হক্ পাওনা রয়েছে প্রকাশমান ধনমালেও, তা নিঃসন্দেহ। তা সত্ত্বেও আরও অনেক দলিল রয়েছে যা প্রমাণ করে যে, যাকাত সংক্রান্ত দায়িত্ব রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের ব্যক্তিদের নয়। এ কথাটি স্বতঃই সুস্পষ্ট।
খ. প্রখ্যাত হানাফী বিশেষজ্ঞ কামালুদ্দীন হুম্মাম বলেছেন, আল্লাহ্র কথা: ‘তাদের ধন-মাল থেকে যাকাত গ্রহণ কর’- এর বাহ্যিক অর্থ হচ্ছে, যাকাত গ্রহণের সম্যক ও নিরংকুশ দায়িত্ব রাষ্ট্রপ্রধানের। তা প্রকাশমান ধন-মাল হোক, কি প্রচ্ছন্ন ধন-মাল। রাসূল করীম(স) এবং তাঁর পরবর্তী খলীফা দুজনও এই নীতিরই বাস্তব অনুসারী ছিলেন। হযরত উসমান (রা) যখন খলীফা হলেন, লোকদের অবস্থার পরিবর্তন প্রকাশ হয়ে পড়ল, তখন যাকাত আদায় কাজে নিয়েঅজিত ব্যক্তিবর্গ লোকদের প্রচ্ছন্ন ও গোপন ধন-মালের আতি-পাতি সন্ধান করা অপসন্দ করল। ফলেসরকারের প্রতিনিধি হিসেবে পাওয়ার যোগ্য লোকদের সরাসরিভাবে যাকাত দিয়ে দেয়ার দায়িত্ব মালিকদের ওপরই ন্যস্ত করা হল। এ ব্যাপারে সাহাবিগণ কোনরূপ মতপার্থক্য প্রকাশ করেন নি। কিন্তু তার দরুন রাষ্ট্রপ্রধানের যাকাত চাওয়া ও সংগ্রহ করার মৌলিক দায়িত্ব কখনই বাতিল হয়ে যায় না বা যায়নি। এ কারণে রাষ্ট্রপ্রধান যদি কখনও জানতে পারে যে, কোন অঞ্চলের লোকেরা তাদের যাকাত দিচ্ছে না, তা হলে রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার তাদের নিকট যাকাত চাইবে ও নেবে। [(আরবী *********)]
গ. নবী করীম (স) সর্বপ্রকারের-প্রকাশমান ও অপ্রকাশমান- ধন-মালেরই যাকাত গ্রহণ করতেন। তার বড় প্রমাণ হচ্ছে আবূ উবাইদ, তিরমিযি ও দারে কুতনী বর্ণিত হাদীস: নবী করীম (স) হযরত উমরকে যাকাত সংগ্রহকারীরূপে নিযুক্ত করেছিলেন। পরে তিনি হযরত আব্বাসের নিকট তার মালের যাকাত চাইতে আসলেন। তখন তিনি বললেন: আমি তো রাসূলের নিকট দুই বছরের যাকাত এক সঙ্গে পূর্বেই পৌঁছিয়ে দিয়েছি। তখন হযরত উমর বিষয়টি রাসূল (স)-এর কাছে পেশ করলেন। তখন তিনি বললেন: আমার চাচা ঠিক এবং সত্য কথাই বলেছেন। আমরা তাঁর কাছ থেকে দুই বছরের যাকাত একসঙ্গে আগেই নিয়েছি। [(*******) হাদীসটি বহু কয়টি সূত্র থেকেই বর্ণিত হয়েছে, তা যয়ীফ হলেও পরস্পর পরস্পরকে শক্তিশালী করে দেয়। দেখুন: (আরবী *********) ফিকাহ্বিদগণ এই হাদীসের বলে বলেছেন যে, যাকাত অগ্রিমও নেয়া যেতে পারে।]
একথা সর্বজনবিদিত যে, হযরত আব্বাস একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। তাঁর কোন কৃষি সম্পদ ছিল না, পালিত পশুও ছিল না।
ঘ. অনুরূপ আরও একটি হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে। নবী করীম (স) যাকাত সংগ্রহকারী লোকদের পাঠিয়েছিলেন। তখন কতিপয় বিরুদ্ধবাদী প্রচারণা চালাতে লাগল: ইবনে জামীল, খালিদ ইবনে অলীদ ও আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব যাকাত দিতে অস্বীকার করেছে। তখন নবী করীম (স) দাঁড়িয়ে ভাষণ দিলেন। দেখা গেল দুজন সম্পর্কে মিথ্যা বলা হয়েছে, তাঁরা হলেন- আব্বাস ও খালিদ (রা)। ইবনে জামীল সম্পর্কে সত্য বলা হয়েছিল, বলেছিল, ওরা খালিদের ওপর জুলুম করেছে। খালিদ তাঁর বর্ম বন্ধকক রেখেছেন এবং তা আল্লাহ্র পথে নিয়োগ করেছেন। আর রাসূলে করীম(স)-এর চাচা হযরত আব্বাসের ওপর যাকাত ধার্য হয়েছে, তাঁর কাছে আরও অবশিষ্ট রয়েছে। অপর একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে তা তাঁর ওপর এবং অনুরূপ আরও তাঁর সাথে। [(আরবী *********) আহ্মাদ, বুখারী, মুসলিম, নাইলুল আওতার ৪/১৪৯]
ঙ. আবূ দাউদ প্রমুখ কর্তৃক হযরত আলী বর্ণিত হাদীসও তার সমর্থন করে। তাতে বলা হয়েছে, নবী করীম(স) বলেছেন: তোমরা দশভাগের একভাগের এক-চতুর্থাংশদাও অর্থাৎ প্রতি চল্লিশদিরহামে এক দিরহাম…শেষ পর্যন্ত [দেখুন: (আরবী *********) ‘তাহযীবুন সুনানে আবূ দাউদ’ গ্রন্থে ইবনুল কাইয়্যেম যে টীকা লিখেছেন, তা-ও মুলসহ।] রাসূলের কথা: ‘দাও’ প্রমাণ করেছে যে, নবী করীম (স) নগদ অর্থের যাকাত দিতে বলেছেন এবং এ-ও প্রমাণিত হয় যে, রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারী তহবিলেই দিতে হবে।
চ. বহু কয়টি বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে এই মর্মে যে, হযরত আবূ বকর, উমর, উসমান, ইবনে মাসউদ, মুয়াবীয়া, উমর ইবনে আবদুল আজীজ প্রমুখ রাষ্ট্রপ্রধান নিজ নিজ শাসন আমলে সরকারী দান থেকে যাকাত নিতেন। এ দান হচ্ছে সৈন্যদের ও অনুরূপ অন্যান্যসরকারী কর্মচারীদের যাদের নির্দিষ্ট বেতন সরকারী ভাণ্ডার থেকে দেয়া হত, তা এবং দেবার সময়ই তার যাকাত নিয়ে নেয়া হ। হযরত আবূববকর (রা) লোকদের যখন কোন দান দিতেন, তখন তাকে প্রশ্ন করতেন: তোমার ধন-মাল কিছু আছে? যদি বলত ‘হ্যাঁ’, তাহলে এ দান থেকে তার যাকাত হিসেব মত নিয়ে নিতেন, আর ‘না’ বললেসবটাই তাকে দিয়ে দিতেন।
ইবনে মাসউদ (রা) তাঁর দানসমূহ থেকে যাকাত নিয়ে নিতেন। তার হিসেব ছিল, প্রতি হাজারে পঁচিশ। কেননা তাঁর মত ছিল যে, অর্জিত সম্পদের ওপর যাকাত ফরয হওয়ার জন্যে একটি পূর্ণ বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত পূর্বে এ পর্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে।
হযরত উমর (রা) যখন ‘দান’ দেবার জন্যে বের করতেন তখন ব্যবসায়ীদের মাল একত্রিত করতেন। তার মধ্যে কোনটা নগদ কোনটা বাকী, তার হিসেবে করতেন। তার পরে উপস্থিত প্রত্যেকটি থেকে যাকাত নিয়ে নিতেন। [(আরবী *********)]
কুদামা থেকে বর্ণিত, বলেছেন: আমি যখন হযরত উসমান (রা)-এর কাছে উপস্থিত হয়ে আমাদে দেয়া দান গ্রহণ করতাম, তখন তিনি আমাজে জিজ্ঞেস করতেন: তোমার কাছে কি এমন ধন-মালআছে যার যাকাত দেয়া ফরয? আমি বলতাম: হ্যাঁ। তাহলে আমাদে দেয়া ‘দান’ থেকে আমার সেই মালের যাকাত নিয়ে নিতেন। আর যদি বলতাম ‘না’, তাহলে তিনি আমার জন্যে দেয় ‘দান’ সম্পূর্ণ আমাকে দিয়ে দিতেন। [(আরবী *********)]
ছ. হযরত ইবনে উমর ও অন্যান্য সাহাবী (রা) থেকে শাসকগণ জুলুম করলেও যাকাত তাদের কাছে দেয়াই ওয়াজিব- এ পর্যায়ে যেসব ফতোয়া বর্ণিত হয়েছে,তাতে প্রকাশমান ধন-মাল ও অপ্রকাশমান ধন-মালের মধ্যে কোন পার্থক্য করা হয়নি।
আবূ উবাইদের মত ও তার পর্যালোচনা
কোন কোন আলিম দুই প্রকারের মালের মধ্যে পার্থক্যকারী দলিলের উল্লেখ করেছেন। আর তা হচ্ছে বাস্তব সুন্নাত। কেননা আমাদের পর্যন্ত ‘মুতাওয়াতির’ বা ‘মশহুর’ কোন বর্ণনা এমন পৌঁছায়নি, যা এ কথা প্রমাণ করে যে, রাসূলে করীম (স) তাঁর কর্মচারীদের এ উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছেন যে, তারা এসব ধন-মাল থেকে বায়তুলমালের অংশ নিয়ে নেবে- তা নগদ হোক, কি ব্রবসায় পণ্য এবং তা রাসূলের কাছে পাঠিয়ে দিত, অথবা রাসূলের সমর্পিত দায়িত্ব হিসেবে তা পাওয়ার যোগ্য লোকদের মধ্যেবন্টন করে দেবে- যেমন করেছে অন্যান্য প্রকাশমান ধন-মালের ক্ষেত্রে।
এ কারণে কতিপয় ইমাম এই মাযহাব গ্রহণ করেছেন যে, এই প্রচ্ছন্ন ধন-মালের যাকাত সরকারী তহবিলে দেয়া বা তা নিজস্বভাবে বন্টন করা জায়েয- এই শর্তে যে, আল্লাহকে ভয় করবে ও তা যথাস্থানে রাখবে। তদ্দ্বারা কারুর পাক্ষপাতিত্ব করবে না। এ দুটির মধ্যে যে কোন একটি কাজ ধনের মালিক যদি করে, তাহলেই সে তার ওপর ধার্যকৃত ফরয আদায় করল বলে স্বীকৃতি পেল।
আবূ উবাইদ বলেছেন, স্বর্ণ-রৌপ্য ও ব্যবসায় পণ্য ইত্যাদি নির্বাক সম্পদে ইরাক ও হিজাজবাসী সুন্নাত ও ইলমের অধিকারী লোকদের মত হচ্ছে এই এবং তা-ই আমাদের মতে গ্রহণীয়। কেননা মুসলমানগণ এর জন্যে আমানতদার বানানো হয়েছে, যেমন তাদেরকে আমানতদার বানানো হয়েছে নামাযের।
গবাদিপশু, দানা, ফল ইত্যাদির যাকাত আদায় ও বণ্টন ক রেন প্রশাসকগণ। এসবের মালিকের কোন অধিকার নেই, ক্ষমতাও নেই তাদের থেকে গোপন করার বা লুকিয়ে রাখার। সে নিজেই যদি তা বণ্টন করে ও যথাস্থানে রাখে, তাহলে তার যাকাত আদায় হবে না। তাকে সে যাকাত পুনরায় তাদের কাছে আদায় করতে হবে। হাদীস ও সাহাবিগণের কথা এ দুয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
তোমরা কি লক্ষ্য কর না, হযরত আবূ বকর (রা) মুহাজির ও আনসার লোকদের মধ্যে যারা গবাদিপশুর যাকাত দিতে অস্বীকার করে মুর্তাদ হয়ে গিয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঘোষণা করেছিলেন?…. কিন্তু স্বর্ণ ও রৌপ্যের যাকাতের জন্যে তা করেন নি? [(আরবী **********)]
এরপর আবূ উবাইদ সমগ্র ‘আ-সা-র’ (সাহাবিগণের উক্তির) উল্লেখ করে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, ব্যক্তিগণই তাদের প্রচ্ছন্ন ধন-মালের যাকাত দেয়া পূর্ণ কর্তৃত্বের অধিকারী।
আবূ উবাইদের উল্লেখ করা- ব্যক্তির গোপন ধন-মালের যাকাত নিজস্বভাবে বন্টন ও তা সরকারী তহবিলে না দেয়া জায়েয প্রমাণকারী ও সব ‘আ-সা-র’ সম্পর্কে যাঁরাই একটু চিন্তা-ভাবনা করবেন, তাঁরাই দেখতে পাবেন, বস্তুতই তাকে আসল থেকে বাদ দেয়া (Exemted) হয়েছে। যে বিষয়ে ফতোয়া দেয়া হয়েছে তার প্রতি তা অর্পণ করায় তারা রাসূলে করীম (স) ও খুলাফায়ে রাশেদুনের সুন্নাতের বিপরীত কিছু দেখতে রাজনৈতিক ফেত্নার অন্ধকার ছেয়ে যাওয়ার পর, ইবনে সাবা ও অনুরূপ লোকদের ইয়াহুদী ষড়যন্ত্র যখন থেকে কাজ করতে শুরু করেছে- হযরত উসমান (রা)-এর হত্যার ঘটনার সময় পর্যন্ত।
আবূ উবাইদ তাঁর সনদে ইবনে সিরীন থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন [***১]: যাকাত তো দেয়া হত (কিংবা বলেছেন: তোলা হত) নবী করীম (স) কিংবাতাঁর নির্দেশিত ব্যক্তির কাছে, হযরত আবূ বকর (রা) কিংবাতাঁর ভারপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাছে, তাঁর পরে হযরত উমর কিংবা তাঁর নিযুক্ত ব্যক্তির কাছে এবং তাঁর পরে হযরত উসমান (রা) কিংসা তাঁর ভারপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাছে কিন্তু হযরত উসমান (রা) যখন শহীদ হলেন, তখনলোকদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখাদেয়। তখন কেউ কেউ তা সরকারী তহবিলেদিয়েদিত, আবার অনেকে নিজেরাই বণ্টন করে দিত। যাঁরা সরকারী তহবিলে দিতেন, হযরত ইবনে উমর (রা) ছিলেন তাঁদের অন্যতম।
হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে এ কথাই প্রসিদ্ধ। তিনি বলেছেন, ‘ওরা যতক্ষণ পর্যন্ত নামায আদায়কারীথাকবে, ততক্ষণ তোমরাওদের কাছেই যাকাত দিতে থাক।’ তাঁর থেকে পাওয়া কোন কোন বর্ণনায় আমার এ শর্তটির উল্লেখ নেই। বরং তাঁর কাছে যেলোকই ফতোয়া চেয়েছে, তাকেই তিনি বলেছেন: ‘যাকাত শাসক-প্রশাসকদের কাছেই দাও, তারা তা দিয়ে কুকুরের মাংসতাদের ধ্বংস স্থলে বণ্টন করলেও।’ অপর একজনকে বরেছিলেন: ‘হ্যাঁ’ তা ওদেরই দিয়ে দাও, তা দিয়ে তারা কাপড় ও সুগন্ধি কিনলেও।’
কিন্তু কোন কোন বর্ণনা এই ধারণা দেয় যে, তিনি তাঁর একথা পরে প্রত্যাহার করেছেন। বলেছেন: (আরবী **********)
তা তার যথাস্থানেই রাখ (অর্থাৎ নিজেই বণ্টন কর।) [(আরবী **********)]
তাঁর এক বন্ধু তাঁর এ কথার প্রতিবাদ করে বললেন: ‘তুমি যাকাত সম্পর্কে কি মনে কর, কেননা এই লোকেরা তো তা নিয়ে যথাস্থানে নিয়োগ করে না? তখন হযরত ইবনে উমর (রা) বললেন: ‘তা ওদেরই দিয়ে দাও।’ এক ব্যক্তি বলে, ‘ওরা যদি নামাযও ঠিক সময়ে না পড়ে তবুও কি তুমি ওদের সঙ্গেই নামায পড়বে?’ বললেন, ‘না।’ বললেন, ‘তাহলে নামায কি যাকাতের মতই নয়?’ বললেন: ‘ওরা আমাদের ওপর গোলক ধাঁধার সৃষ্টি করেছে, আল্লাহ্ই ওদের ওপর গোলক ধাঁধার সৃষ্টি করবেন।’ [(আরবী **********)]
এ কাহিনী এক ব্যক্তির দৃষ্টিকোণমেনে নেয়ার কথা প্রমাণ করে। ইবরাহীম নখ্য়ী ও হাসান বসরী থেকেও অনুরূপ কথা পাওয়া গেছে।তাঁরা দুজনই বলেছেন: ‘যাকাত তার যথাস্থানে দিয়ে দাও এবং শাসক প্রশাসকদের থেকে তা গোপন করে যাও।’ [(আরবী **********)]
মাইমুন ইবনে মাহ্রান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: তা ছিদ্রের মধ্যে রেখে দাও। পরে তা তোমাদের চেনা-জানা লোকদের মধ্যে বন্টন করে দাও এবং প্রত্যেকটি মাস আসার আগেই তা তোমরা বণ্টন করে দিতে থাকবে। [(আরবী **********)]
আবূ ইয়াহ্ইয়া আল-কিনদী থেকে বর্ণিত, বলেছেন: আমি সায়ীদ ইবনেস জুবাইরকে যাকাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। বললেন: ‘তা দায়িত্বশীল সরকারীলোকদের নিকট দিয়েদাও। পরে সায়ীদ যখন চলতে লাগলেন, আমি তার পিছনে পিছনে গেলাম।এক সময় বললাম: আপনি আমাকে দায়িত্বশীল সরকারী লোকদের হাতে যাকাত দিয়েদিতে বললেন। কিন্তু তারা তো তা দিয়ে এই… এই কাজ করে…. এই ধরনে কাজে তারা তা ব্যয় করে? তখন বললেন: তা বণ্টন করে দাও তাদের মধ্যে যাদের দেয়ার জন্যে আল্লাহ্ তোমাকে নির্দেশ দিয়েছেন। তুমি তো লোকদের সম্মুখে আমাকে প্রশ্ন করেছ, তাই তখন তোমাকে আসল কথা বলতে পারিনি। [(আরবী **********)]
এসব ‘আ-সা-র- সাহাবিগণের মত এবং এ সব ফতোয়ার ওপর নির্ভর করেই আবূ উবাইদ উপরিউক্তি কথা বলেছৈন। উমাইয়া শাসনের কোন কোন প্রশাসকের আচার-আচরণে ইসলামী মন-মানসিকতার ওপর যে আঘাত লেগেছে ও তাতে যে ক্রোধের সঞ্চার হয়েছে, তাতে তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। খুলাফায়ে রাশেদূনের সময়ে জনগণ যে পরিবেশ ও আচার-আচরণ দেখেছিল, এ সময় তা থেকে অনেকটা বিচ্যুতি তাদের চোখে প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছিল।
তা ছাড়া দুই ধরনের ধন-মালের মধ্যে পারথক্যকরণ যখন নবীর সুন্নাত অনুযায়ীই সহীহ্ প্রমানিত হল- নবী করীম (স) নিজেই গোপন বা প্রচ্ছন্ন ধন-মালের যাকাত গ্রহণের উদ্দেশ্যে তাঁর নিয়োগকৃত যাকাত আদায়কারী পাঠাতেন না- তা দুটি কারণে ছিল:
১. লোকেরা নিজেরাই স্বতঃসক্ফূর্তভাবে এ মালের যাকাত রাসূলে করীম (স)-এর কাছে দিয়ে দিত ঈমানের তাকীদ ও আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্যে ফরয আদায়করার ঐকান্তিক উৎসাহের কারণে।
২. যেহেতু এ পর্যায়ের মালের হিসেব-নিকাশ আয়ত্ত করা তার মালিকদের ছাড়া অন্যদের পক্ষে অসম্ভব, এ কারণে তার যাকাত দেয়া ও তা বণ্টন করার কাজটি তাদের মন ও ঈমানের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে যাকে ইসলাম সঞ্জীবিত করে তুলেছে ঈমানী শক্তির সাহায্যে।
প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-এর সময় সেরূপ কাজই হয়েছে। হযরত উমর ফারুক (রা)-এর খিলাফত আমলের ইসলামী খিলাফতের সীমান্ত অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়ে পড়ে। আর সেই কারণে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সে জন্য ‘দোয়ান’ স্থাপন করা হয়। আর সেই সাথে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়। এমন কি ইসলামী সমাজের প্রতিটি সন্তানের জন্য মাসিক বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়। শেষ পর্যন্ত মুসলমানদের সাথে যিম্মীদের সামাজিক নিরাপত্তারও ব্যবস্থা নেয়া হয। আর এ ধরনের একটি সমাজ ব্যবস্থার পক্ষে বিরাট ধনাগার ও বিপুল আয়ের উৎসের প্রয়োজন দেখা দেবে, তাতে আর সন্দেহ কি?
তাই আমরা যখন দেখি, হযরত উমর (রা) প্রকাশমান ও প্রচ্ছন্ন উভয় ধরনের ধন-মালের যাকাত সংগ্রহের জন্যে যদি তাঁর কর্মচারীদের দায়িত্ব দিয়ে থাকেন, তাহলে তাতে বিস্ময়ের কিছু থাকতে পারে না। প্রচ্ছন্ন ধন-মালের যাকাত তার মালিকদের নিজেদের হাতে বন্টন করার স্বাধীনতা তখন দেয়া হয়নি। আর এ সবই করা হয়েছে ‘সামাজিক নিরাপত্তা’ ব্যবস্থার বাজেট পূরণের উদ্দেশ্যে, মুসলমানদের বায়তুলমালকে অধিকতর শক্তিশালী করে তোলার লক্ষ্যে।
এই উদ্দেশ্যে হযরত উমর (রা) ‘কর আদায়কারী (****) নামের একদল পরিচিত লোকদের ‘সিস্টেম’ গড়ে তুলেছিলেন। এদেরকে (****) বল াহত এজন্যে যে, তাহা যুধ্যমান দেশের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে শুল্ক আদায় করত, সে শুল্ক হত ১০%, যেমন তারা মুসলমানদের কাছ থেকে তা আদায় করে নিত। আর যিম্মী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে গ্রহণ করত, ‘অর্ধ-ওশর’। এটা হত হযরত উমর তাদের সাথে শর্তসন্ধি করতেন সেই শর্তানুযায়ী। মুসলিম ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিত এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ পরিমাণ (আর এটা হচ্ছে ব্যবসায়ের যাকাতের ধার্য পরিমাণ)। হযরত উমর (রা) এ পর্যায়ে যে মহান শিক্ষা ও আদর্শ সংস্থাপন করেছেন তারই অনুরূপ। [দেখুন: (আরবী **********)] তাদের এ গ্রহণটা ‘ওশর’, ‘অর্ধ ওশর’ ও ‘ওশরের এক চতুর্থাংশ’-এ হারে আবর্তিত হত।
আলিমগণ হযরত উমর ফারূক (রা)-এর এই আমল বা কাজকে প্রচ্ছন্ন ধন-মালের মালিকদের প্রতি সহানুভূতিমূলক আচরণ বলে মনে করেছেন।
কেননা তাঁরা ইসলামী খিলাফত কেন্দ্র থেকে বহু দূরবর্তী স্থানসমূহে বিস্তীর্ণ হয়েছিল। তাদের ধন-মালের যাকাত খিলাফতকেন্দ্রে বহন করে নিয়ে আসা ছিল খুবই দুষ্কর কাজ। এজন্যে তা একত্রিত করার উদ্দেশ্যে (****) নিয়োগ করা হয়েছিল।
তার অর্থ এই যে, রাষ্ট্রপ্রধান ও তাঁর প্রতিনিধি-অর্থাৎ সরকারী ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রকাশমান ও প্রচ্ছন্ন উভয় ধরনের ধন-মালের যাকাত আদায় করার রীতি স্থায়ীভাবে চলেছৈ। যদিও হযরত উমর (রা) কর্তৃক গৃহীত কর্মপন্থা নবী করীম (স) ও হযরত আবূ বকর (রা)-এর কর্মপন্থা থেকে খনিটকা ভিন্নতর ছিল প্রচ্ছন্ন ধন-মালের ক্ষেত্রে, তাও ইসলামী রাজ্যের অধিকতর সম্প্রসারিত হয়ে পড়ার কারণে।
পরে হযরত ওসমান ইবনে আফ্ফান (রা)-এর খিলাফত আমলে ‘ফাই’, গনীমত, খা্রাজ, জিযিয়া, শুল্ক কর ও যাকাত সাদ্কা প্রভৃতি খাতে বায়তুলমালের আয় বিরাট হয়ে পড়ে। আল্লাহ্ তখন মুসলমানদের জন্যে যেমন বিজয়ের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন, তেমনি ধন-সম্পদ অফুরন্ত প্রস্রবণের মত প্রবাহিত হয়ে পড়েছিল। তখন হযরত উসমান (রা) শুধু প্রকাশমান ধন-মালের যাকাত সরকারীভাবে আদায় ও সংগ্রহ করাকেই যথেষ্ট মনে করেছিলেন। আর প্রচ্ছন্ন ধন-মালের যাকাত তার মালিকদের কাছেই সোপর্দ করা হয়েছিল যে, তারা নিজেরাই তা আদায় করে দেবে তাদের দায়িত্ব ও লোকদের কাছে জবাবদিহির দৃষ্টিতে। এ ব্যাপারে তাদের দ্বীন ও ঈমানের প্রেক্ষিতে তাদের ওপর পূর্ণ নির্ভরতা গ্রহণ করা হয়েছিল। সন্ধুন-খোঁজ-খবর ও সংগ্রহ করার কষ্ট তাদের থেকে দূর করা, সংগ্রহ ও বণ্টনের ব্যয়ভার বিরাট হয়ে পড়ার দরুন তা হ্রাস করার উপায় উদ্ভাবনের উদ্দেশ্যেই তিনি এ পন্থা ধরেছিলেন। এটা ছিল তাঁর নিজের ইজতিহাদযদিও উত্তরকালে এপন্থার পরিণতিতে প্রচ্ছন্ন ধন-মালের যাকাত আদায়ের দিক দিয়ে জনগণের মধ্যে চরম উপেক্ষার ভাব জেগে উঠেছিল। আর তারও কারণ ছিল তাদের দ্বীনী জ্ঞান-গভীরতা হারিয়ে ফেলেছিল এবং ঈমানের জোরও অনেকটা হ্রাস পেয়ে গিয়েছিল।
কোন কোন ফিকাহ্বিদ এ ব্যাপারটির ব্যাখ্যা দিয়েছেন এই বলে যে, আমীরুল মুমিনীন হযরত ওসমান (রা) প্রচ্ছন্ন ধন-মালের মালিকদেরকেই তাঁর পক্ষ থেকে তাদের সে ধরনের ধন-মালের যাকাত দিয়ে দেয়ার দায়িত্ব দিয়ে দিয়েছিলেন। আল-কাসানী তাঁর (****) গ্রন্থে এ পর্যায়ে বলেছেন:
রাসূলে করীম (স) এবং হযরত আবূ বকর (রা) ও উমর ফারুক (রা) যাকাত গ্রহণ করতেন, হযরত ওসমান (রা)-এর সময় পর্ন্ত তাই চলছিল। কিন্তু তাঁর সময়ে ধন-মালের পরিমাণ যখন বিপুল হয়ে দাঁড়ায়, তখন যাকাত আদায় ও বন্টনে ভার মালিকদের ওপর ন্যস্ত করাতেই কল্যাণ নিহিত বলে মনে করলেন সাহাবিগণের ইজমার ভিত্তিতে। তখন ধন মালের মালিকরা রাষ্ট্রপ্রধানের ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি হয়ে দাঁড়াল। ‘তোমরা কি দেখছ না’, তিনি বলেছেন, ‘যার ওপর ঋণ রয়েছে, তা যেন সে আদায় দিয়ে দেয়।’ আর তার মালের যে যাকাত অবশিষ্ট রয়েছে, তার যেন সে নিজেই দিয়ে দেয়।’ যাকাত দিয়ে দেয়ার জন্যে এটা ছিল তার দায়িত্ব অর্পণের ঘোষণা। কাজেই তাতে রাষ্ট্রপ্রধানের অধিকার বাতিল হয়ে যায়নি। এজন্যে আমাদের লোকদের বক্তব্য হচ্ছে রাষ্ট্রপ্রধান যখন কোন অঞ্চলের লোকদের যাকাত না দেয়ার খবর জানবে তখন তিনি তার দাবি করবেন [(আরবী **********)] ও তার কাছে দিতে বলবেন।
এ সব থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এ পর্যায়ে সাধারণ মূলনীতি হচ্ছে, প্রকাশমান ও অপ্রকাশমান উভয় ধরনের ধন-মালের যাকাত রাষ্ট্রপ্রধান সরকারই সংগ্রহ করবেন। কিন্তু হযরত ওসমানের খিলাফতকালে প্রচ্ছন্ন মালের যাকাত সংগ্রহ করা সরকারের পক্ষে কঠিন ও দুরূহ হয়ে পড়ে। তখন বায়তুলমালের সম্পদরাজিও স্তুপীকৃত হয়ে পড়ে। তাই তখন তিনি তার যাকাত আদায়ের ব্যাপারটি প্রতিনিধিত্ব হিসেবে তার মালিকদে ওপরই ন্যস্ত করেছেন। তবে তারা যদি প্রতিনিধিত্বের এ দায়িত্ব পালনের কোনরূপ ত্রুটি প্রদর্শন করে এবং তাদের ধনমালে আল্লাহ্র যে হক রয়েছে তা আদায় করতে প্রস্তুত না হয়, তাহলে রাষ্ট্রপ্রধানই তা সংগ্রহ করার দায়িত্ব ফিরিয়ে নেবেন- যেমন আসলেই দায়িত্বটা তাঁর ছিল।
এই যুগে যাকাত আদায়ের দায়িত্ব কার ওপর
আমাদের একালের মুরব্বী চিন্তাবিদ আবদুল ওহ্হাফ খাল্লাফ, আবদুর রহমান হাসান (রা) ও মুহাম্মদ আবূ জুহ্রা (আল্লাহ্ তাঁদের প্রতি অসীম রহমত বর্ষণ করুন) এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছেন। দামেশকে ১৯৫২ সকনে ‘যাকাত’ পর্যায়ে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রদত্ত ভাষণে তাঁরা এ বিষয়ে নিজেদের মতামত উপস্থাপিত করেছেন। ‘জামায়ায়ে আরাবীয়া’ এ সেমিনারের আয়োজন করেছিল। তাঁরা বলেছেন:
‘এক্ষণে একথা নিশ্চিত হচ্ছে যে, প্রকাশমান ও অপ্রকাশমান ধন-মালের যাকাত সংগ্রহ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রকর্তাই পালন করবেন। তার দুটি কারণ হচ্ছে:
প্রথমটি, এ কালের সাধারণভাবে জনগণ তাদের প্রকাশমান ও অপ্রকাশমান উভয় ধরনের ধন-মালেরই শাসক-প্রশাসকদের অর্পিত প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রয়েছে, আর ফিকাহ্বিদগণও একথা চূড়ান্তভাবে বলে দিয়েছেন যে, রাষ্ট্রকর্তা যদি জনগণ যাকাত দিচ্ছে না বলে জানতে পারে, তাহলে সে তা বল প্রয়োগের মাধ্যমে অবশ্যই আদায় করবে।… এক্ষেত্রে প্রকাশমান ও অপ্রকাশমান ধন-মালের মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য করা চলবে না এই কারণে যে, তাদের প্রতিনিধিত্ব খতম হয়ে গেছে। তাই সেই মূলের দিকে ফিরে যাওয়া- রাষ্ট্রকর্তারই যাকাত আদায় করা একান্ত কর্তব্য। ফিকাহ্বিদগণ যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, সেই অনুযায়ীই এখন কাজ করতে হবে।
দ্বিতীয়টি হচ্ছে, এ কালের ধন-মাল সবই প্রকাশমান হয়ে পড়েছে প্রায়। ব্যবসায়ী অস্থাবর সম্পদ-সম্পত্তি সবই প্রতি বছরের আয় হিসেবে পরিমাপ করা হয়। ব্যবসায়ী তা ছোট কি বড় প্রত্যেকের জন্যেই একটা ‘রেকর্ড’ স্টক রেজিস্টা থাকে যার মধ্যে সব মালের গণনা রক্ষা করা হয়, তার ভিত্তিতে সহজেই লাভ-লোকসানের হিসেব করা হয়। তাই যে সব উপায়ে মুনাফা নির্ধারণ করা হয়, সরকারী কর ধার্য করা হয়, মূলধনের ওপর ফরয যাকাত ধার্য করা তার ওপর খুব সহজেই হতে পারে। এই ফরয যাকাত হচ্ছে, মহান আল্লাহ্র হক, প্রার্থনাকারী ও বঞ্চিত লেঅকদেরও হক। আর নগত টাকা-পয়সা তো বিভিন্ন খাতে ও অনুরূপ কাজে নিয়োজিত থাকে। উপরিউক্ত পন্থায় তার হিসেবটাও সহজেই জানা যেতে পারে। তবে তারা তাদের নগদ সম্পদ মাটির তলায় পুতে রাখে, তারা আসলে খুব বেশি সচ্ছলতার অধিকারী নয়। এ কালে এ ধরনের লোকদের সংখ্যাও দিন দিন কমে যাচ্ছে। অতএব তাদের যাকাতের ব্যাপারে তাদের দ্বীনদারীর ওপর নির্ভর করা যেতে পারে অনায়াসেই।
খলীফা হযরত উসমান (রা) প্রবর্তিত নীতি অনুসরণ পর্যায়ে ফিকাহ্বিদগণ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, তা করতে হবে প্রচ্ছন্ন ধন-মালের প্রকাশিত হয়ে পড়া অবস্থায়। তখন তার যাকাতও রাষ্ট্রকর্তার কর্মচারীরা নিয়ে নেবে। এ কারণে হযরত উসমান (রা)-এর অনুসৃত নীতি কার্যকর থাকা অবস্থায়ও (****) দের কাজ যথাযথভাবে চলছিল। কেননা তারা নগদ সম্পদ ও ব্যবসায় পণ্য এক স্থান থেকে অন্যত্র স্থানান্তরিত হওয়াকালে তার যাকাত গ্রহণ করত। এরূপ অবস্থায় তা আর প্রচ্ছন্ন মাল বলে গণ্য হত না, প্রকাশ্যমান মালরূপে গণ্য হত। তারা এই স্থানান্তর কালেই যাকাত নিয়ে নিত। তবে মালের মালিক যদি প্রমাণ দিতে পারত যে, সে এ সব মালের যাকাত গরীবদের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছে অথবা এ বছরই তা অপর কোন কর আদায়কারীকে দিয়ে দিয়েছে, তাহলে তারা তা থেকে রক্ষা পেতে পারত। [(আরবী **********)]
এ সব কথা পূর্ণাঙ্গভাবে সুস্পষ্ট। দলিলের বলিষ্ঠতা স্বীকার্য। এ জন্যে তার ওপর কোন টীকা-টীপ্পনীর প্রয়োজন করে না।
এ দৃষ্টিতেই বলা হচ্ছে যে, প্রত্যকটি ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকারের কর্তব্য এমন একটা ‘প্রতিষ্ঠান’ বা সংস্থা বিশেষভাবে গড়ে তোলা, যা যাকাত সংগ্রহ ও বণ্টন সংক্রান্ত যাবতীয় দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে। তা গ্রহণ করবে যেমনভাবে গ্রহণ করতে আল্লাহ তা’আলা আদেশ করেছেন এবং তা ব্যয় ও বণ্টনও করবে যেমনভাবে আল্লাহ্ তা করার নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা ইতিপূর্বে (****) খাতটির ব্যাখ্যা ‘যাকাত ব্যয়ের খাতসমূহ’ অধ্যায়ে বিস্তারিতভাবে দিয়ে এসেছি।
কিন্তু আমি মনে করি, ফরয যাকাতের একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ এক-চতুর্থাংশ বা এক-তৃতীয়াংশ- ধন-মালের মালিকদের নিজেদের হাতে বিতরণের উদ্দেশ্যে ছেড়ে দেয়া উচিত। তারা তাদের আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে প্রচ্ছন্ন দারিদ্র্য ও ঠেকায় পড়া লোকদের মধ্যে তাদের নিজস্ব পরিস্থিতির ভিত্তিতে ব্যয় ও বণ্টন করবে। এটা রাসূলের করীম (স)-এর অনুসৃত নীতির ওপর কিয়াস করে বলা হচ্ছে। তিনি যাকাত পরিমাণ অনুমানকারীদের এ অধিকার দিতেন যে, তারা ধনের মালিকদের জন্যে এক-তৃতীযাংশ বা এক-চতুর্থাংশ পরিমাণ রেখে দিত, তারা নিজেরা দুই রকম ব্যাখ্যার যে কোন একটা অনুসারে সে যাকাত ব্যয় ও বন্টন করত। ফলে উভয় প্রন্থার মধ্যে যা কিছু কল্যাণবহ, এতে করে আমরা তা গ্রহণকরতে সক্ষম হব। তাতে দুই মংগলের একত্রিকরণ ও সমন্বয় সাধন করা হবে এবং হাম্বলী ফিকাহ্বিদরা যে মালিকের নিজের যাকাত নিজের হাতেই বণ্টন করা মুস্তাহাব বলেছেন, সে হিসেবটাও রক্ষা পাবে।
এ সব কথাই বলা হচ্ছে ইসলামী হুকুমাত বর্তমান থাকার কথা মনে করে। কেননা এ ধরনের হুকুমতই ইসলামকে বাধ্যতামূলক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে কাজ করতে পারে। ইসলামই হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনার সংবিধান। তার যাবতীয় সাংস্কৃতির, সামষ্টিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কার্যকলাপ পরিচালনার জন্যে ইসলামই একমাত্র পদ্ধতি। যদিও কোন কোন খুঁটিনাটি ব্যাপারে শরীয়াতের হুকুম পরস্পর বিপরীত হয়ে পড়তে পারে। সে বিষয়ে আমরা পরে বিস্তারিত বলতে চাই।
কিন্তু যে রাষ্ট্র সরকার ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে, প্রশাসনও বিচারের সংবিধান হিসেবে তাকে মেনে নেয়নি- আল্লাহ্র নাযিল করা বিধানকে বাদ দিয়েই প্রশাসন চালিয়ে যায়- যেমন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দেশের রাষ্ট্রসমূহ মানব্ রচিত বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে- এ ধরনের রাষ্ট্রের যাকাত সংগ্রহ করার কোন অধিকার থাকতে পারে না। যদি তা করতে সচেষ্ট হয় তা হলে সে রাষ্ট্র আল্লাহ্র গজবের উপযুক্ত হবে। আল্লাহ্র জিজ্ঞাসা: আল্লাহ্র কিতাবের কতকাংশ বিশ্বাস কর আর কতকাংশ অবিশ্বাস কর’-এই জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হতে হবে। কেননা ‘তোমাদের মধ্যে থেকে যারাই এই নীতি অনুযায়ী কাজ করবে তাদের শাস্তি এ ছাড়া আর কিছুই নয় যে, বৈষয়িক জীবনে তাদের হবে চরম লাঞ্ছনা এবং কিয়ামতের দিন তারা নিক্ষিপ্ত হবে কঠিনতর আযাবে। আল্লাহ্ তোমাদের আমল-কার্যকলা- সম্পর্কে মোটেই অনবহিত নন’। [আল-বাকরা: ৮৫ আয়াত।]
যাকাত গোপনকারী, দিতে অস্বীকারকারী বা দেয়ার মিথ্যা দাবীদারী সম্পর্কে বিভিন্ন মাযহাবের অভিমত
যাকাত পর্যায়ে রাষ্ট্রের একটা বড় দায়িত্ব হচ্ছে যাকাত দিতে অস্বীকারকারীদের কঠোর শাস্তি দান, তাদের কাছ থেকে বল প্রয়োগের মাধ্যমে তা আদায় করে নেয়া- যদি ইচ্ছা করে ও স্বতস্ফূর্তভাবে না দেয়। ইসলামী মাযহাবসমূহের ফিকাহ্বিদগণ এ কথা চূড়ান্ত করে বলেছৈন। তাঁদের কেউ কেউ এ কথাটি আলাদা করে বলেছেন যে, যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হওয়া মিছামিছি দাবি করে কিংবা তার ওপর যাকাত ধার্য না হওয়ার মিথ্যা কথা বলেও এই ধরনের মিথ্যার আশ্রয় নেয়, তাহলে তাকে সুকঠিন শাস্তি দিতে হবে।
হানাফী ফিকাহ্বিদদের মত
হানাফী ফিকাহ্বিদগণ বলেছৈন, যাকাত আদায়কারী লোক যার কাছে গিয়ে তার যাকাত দাবি করবে, তখন যদি সে বলে যে, তার মালিকানায় একটি বছর এখনও পূর্ণ হয়নি; কিংবা যদি বলে, আমার ধন পরিমাণ ঋণ রয়েছে, কিংবা নিসাব পরিমাণের কম সম্পদ আছে, তা হলে তাকে আল্লাহ্র নামে কসম করে বলতে হবে। সে ‘কসম’ করলে তাকে সত্যবাদী মনে করে নিতে হবে। অপর বর্ণনায় শর্ত করা হয়েছে এই বলে যে, অপর একজন ‘কর’ গ্রহণকারীকে দেয়ার মুক্তিপত্র বার করতে হবে। ফিকাহ্বিদগণ এই বর্ণনাটি রদ্দ করেছেন এই বলে যে, একটি রেখা অপর রেখার সাধে সাদৃশ্যসম্পন্ন হয়ে থাকে। [আমাদের এ কালে প্রমাণিত হয়েছে যে, লেখা বা রেখাসমূহ বাহ্যত পরস্পর সদৃশ হলেও বাস্তবিকভাবে তা পরস্পর বিভিন্ন হয়ে থাকে। প্রত্যেক ব্যক্তির লেখায় একটি নিজস্ব স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য থাকে, যা অন্য লেখা থেকে ভিন্নতর হয়। এ কারণে প্রতীক ও প্রমাণসমূহ লেখা চেনার বিশেষ গুণসম্পন্ন লোকেরা চিনতে পারে। শরীয়াতের বিধান ধারণার প্রাধান্যের ওপর ভিত্তিশীল। আমাদের এ কালের লেখা ও রেখার ওপর এক অপরিহার্য নির্ভরতা এসে গেছে। যেমন রাষ্ট্রসমূহ তাদের বেতনভুক্ত লোকরেদ বেতন দেয় নির্ভরযোগ্য স্বাক্ষর নিয়ে আর জালকারীদের কঠোর শাস্তি হয়ে থাকে।] অনেক সময় তা জাল হয়ে থাকে। অসতর্কতার দরুন নিষ্কৃতি পায় না। গ্রহণের পর তা নষ্ট করে ফেলা হয়। তখন তার ওপর ভিত্তি করে কোন বিচার হতে পারে না। এ কারণে তা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে কিরা-কসমও করাতে হবে।
আর কিরা-কসমের পর যদি তার মিথ্যাবাদিতা প্রকাশ হয়ে পড়ে- কয়েক বছর পর হলেও তার কাছ থেকে যাকাত আদায় করতে হবে। কেননা নেয়ার অধিকার প্রমাণিত, তা মিথ্যা-কিরা-কসম দ্বারা বাতিল হতে পারে না।
‘কর’ আদায়কারী কারুর কাছে যাকাত দাবি করলে সে যদি বলে: আমি নিজে স্থানীয় গরীবদের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছি এবং কিরা করে, সেজন্যে তাহলে তাকে সত্যবাদী মানতে হবে। কিন্তু গবাদি পশুর যাকাতের ক্ষেত্রে তা গ্রহণীয় হবে না। কেননা তার যাকাত গ্রহণের অধিকার সরকারের। অন্য কেউ নিয়ে তা বাতিলকরতে পারে না। তেমিন প্রচ্ছন্ন ধন-মাল যদি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়, তা হইলেই তা প্রকাশমান হয়ে গেল। তখন সরকার বা সরকারের প্রতিনিধি তা গ্রহণ করবে। [লক্ষ্য করা যাচ্ছে অধিকাংশ হানাফী মতের লোক ওশর-এর ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছেন। মনে হচ্ছে তা যেন যাকাত ছাড়া অন্য কিছু। কেননা তা নিছক ইবাদত নয়। তাতে জমির খাজনার দিকটিও রয়েছে। তাতে এক বছর সময় অতিবাহিত হওয়ার শর্ত নয়। এটা সর্বসম্মত মত। আবূ হানীফার মতে তার কোন নিসাব নেই। পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকেওতা নিয়ে নেয়া হবে, মালিক মৃত্যুর পূর্বে অসিয়াত না করে গেলেও্ ঋণ থাকা অবস্থায়ও তা আদায় করা হবে। ‘অল্প বয়সের, পাগলের এবং ওয়াক্ফ সম্পত্তি থেকেও নেয়া হবে। এজন্যে ফিকাহ্বিদগণ বলেছৈন, ওশরকে যাকাত বলাটা পরোক্ষভাবে। অন্যরা বলেছৈন, তা যাকাত কেবলমাত্র ইমাম আবূ ইউসুফ ও মুহাম্মদের কথা মত। মুহাক্কিক ইবনুল হুম্মাম বলেছেন, তা যাকাত, সন্দেহ নেই।কৃষি ফসলের যাকাত পর্যায়ে আমরা এসব উল্লেখ করেছি। সঠিক কথা যা, তা আমরা কয়েকবার দাগিত করে বলেছি। তা হচ্ছে, যাকাত নিছক ইবাদত মাত্র নয়। এ কারণে, তাতে প্রনিধিত্ব চলে এবং জোর পূর্বকও নেয়া হয়। বালক ও পাগলের মালেও তা ধার্য হয়। এটাই উত্তম কথা।]
অনুরূপ অবস্থা হচ্ছে জমির উৎপাদন, কৃষিফসল, ফল। এগুলো প্রকাশমান মালের মধ্যে গণ্য। [(আরবী **********)]
রাষ্ট্রপ্রধান এ কারণে বল প্রয়োগ করে লোকদের কাছ থেকে যাকাত গ্রহণের অধিকারী। জমির মালিকের ওপর থেকে ফরয প্রত্যাহৃত হবে যদি সে নিজেই তা আদায় করে দিয়ে থাকে। তবে ফিকাহ্বিদের বক্তব্য হচ্ছে, সে যে নিজ হস্তে তা বন্টন করেছে তাতে সে ইবাদতের সওয়াব পাবে। আর রাষ্ট্রপ্রধান যদি তা গ্রহণ করে থাকেন, তবে তা মালি আল্লাহ্র সন্তুষ্টিতে নিয়োজিত হওয়ার সওয়াব পাবে। [(আরবী **********)]
মালিকী মাযহাবের মত
যে লোক যাকাত দিতে অস্বীকার করবে, তার কাছ থেকে তা জোরপূর্বক নিয়ে নেয়া হবে। যদি তার প্রকাশমান ধন-মাল থেকে থাকে, যদি তার প্রকাশমান মাল না থাকে- আর আছে বলে সে জনগণের মধ্যে পরিচিত হয়ে থাকে, তাহলে তাকে বন্দূ করে তার সে মাল বের করতে হবে। পরেযদি তার কিছু অংশও প্রকাশিত হয় এবং অপরাপর মাল লুকিয়ে রাখার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়, তাহলে ইমাম মালিকের বক্তব্য হল- তাকে সত্যবাদী ধরা হবে, তাকে কিরা কসম করতে বাধ্য করা হবে না এই কারণে যে, সে গোপন করেনি, যদিও সে অভিযুক্ত হয়েছে। যেলোকদেরকে কিরা-কসম করতে বাধ্য করে সে ভুল করে।
আর যদি তার কাছ থেকে যাকাত গ্রহণ যুদ্ধ না করা পর্যন্ত সম্ভব নয়, তাহলে রাষ্ট্রপ্রধান তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবেন। কিন্তু তাকে হত্যা করা লক্ষ্য হবে না। যদি সে কাউকে হত্যা করে বসে, তাহলে অবশ্য তাকে এজন্যে হত্যা করা হবে। আর এ সময় কেউ তাকে হত্যা করলে সে রক্তপাত বেহুদা হবে। [(আরবী **********)]
শাফেয়ী মাযহাবের মত
(****) গ্রন্থ প্রণেতা বলেছেন, শাফেয়ী মাযহাবের মত হচ্ছে, যার ওপর যাকাত ফরয হয়েছে, সে যদি তা দিতে অস্বীকার কর, তাহলে দেখতে হবে:
সে যদি যাকাত ফরয হওয়াটাকেই অস্বীকার করে তাহলে মনে করতে হবে, সে কাফির হয়ে গেছে এবং এই কুফরির অপরাধের শাস্তিস্বরূপ তাকে হত্যা করা হবে, যেমন মুর্তাদ ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। কেননা এটা সকলেরই জানা কথা যে, যাকাত ফরয হওয়াটা আল্লাহ্র দ্বীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই যে লোক তা অস্বীকার করবে, সে আল্লাহ্কে অস্বীকার করল, অস্বীকার করলতাঁর রাসূলকে। অতএব সে কাফির হয়ে গেল।
আর যদি নিছক কার্পণ্যেল কারণে যাকাত না দেয়, তাহলে তার কাছ থেকেতানেয়া হবে এবং এই না দেয়ার জন্যে তাকে শাস্তি দিতে হবে।
ইমাম শাফেয়ী পূর্বে বলেছিলেন: সে লোকের কাছ থেকে যাকাত তো নেয়া হবেই, সেই সাথে তার ধন-মালের অর্ধেকও নেয়া হবে। কেননা বহজ ইবনে হুকাইম তাঁর পিতা- তাঁর দাদা-রাসূলে করীম থেকে বর্ণনা বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম (স) বলেছেন: (আরবী **********)
আর যে লোক তা (যাকাত) দিতে অস্বীকার করবে, আমরা অবশ্যই তার কাছ থেকে তা নেব, সেইসাথে নেবতার মালের অর্ধেক। আল্লাহ্র চূড়ান্ত সিদ্ধান্তসমূহের মধ্যে এ একটি। আর আলে মুহাম্মাদের জন্যেতা কোন অংশ নেই। [হাদীসটি আহ্মাদ, আবূ দাউদ ও নাসায়ী কর্তৃক উদ্ধৃত। প্রথম অধ্যায়ে এ বিষয়ে বক্তব্য পেশ করা হয়েছে। হাকেমও হাদীসটি তার আল-মুস্তাদরাক’ গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন(১ম খণ্ড, ৩৯৮ পৃ.)। তার সনদ সহীহ বলা হয়েছে এবং যাহবীও তা সমর্থন করেছেন। ইয়াহ্ইয়া ইবনে সরীন বলেছেন: হাদীসটির সনদ সহীহ্ যদি তা বহজ ছাড়া হয়। বহজ সিকাহ্ বর্ণনাকারী ইমাম আহ্মাদককে এই হাদীসটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: আমি তাঁর অবস্থা জানি না। তাঁর সনদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে বললেন: (****) খুবই উত্তম সনদ। আবূ হাতিম বলেছেন, বিশ্বস্ততায় মশ্হুর নয় এবংবলেছেন, বর্ণনাকারী ইবনুত তালা মজহুল। অজ্ঞাত পরিচিত ব্যক্তি।যদিও ইমামগণের এক জামায়াত তাঁকে সিকাহ্ বলেছেন। ইবনে আদী বলেছেন, তাঁর বর্ণিত কোন হাদীস আমি ‘মুনকার’ ‘অগ্রহণযোগ্য’ পাইনি। যাহ্বী বলেছেন, কোন আলিমতাঁকে কখনই পরিত্যাগ করেন নি। তবে তাঁর বর্ণিত হাদীসকে কেউ দলিল হিসেবে গ্রহণ করেনি। তাঁর সমালোচনা করে বলা হয়েছে, তিনি শতরঞ্জ খেলতেন। ইবনুল কাতান বলেছেন, এটা তার জন্য ক্ষতিকরকিছু নয়। কেননা সকলের জানা ফিকাহ্ মস্লা হল, তা মুস্তাহাব। ইমাম বুখারী বলেছেন, তাঁর ব্যাপারে লোকেরা বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। ইবনে কাসীর বলেছেন, অধিকাংশ ফিকাহ্বিদ তাকে দলিল হিসেবে নেন না। হাকেম বলেছেন, তার বর্ণিত হাদীস সহীহ্। তাঁর অনেক কয়টি হাদীসকে ইমাম তিরমিযী ‘হাসান’ অভিহিত করেছেন। ইমাম আহমদ ও ইসহাক তাঁকে সিকাহ বলেছেন, তাঁর বর্ণিত হাদীস দলিল হিসেবেও নিয়েছেন। ইমাম বুখারী সহীহ্ বুখারী গ্রন্থের বাইরে তাঁকে গ্রহণ করেছেন। তাঁর ওপর টীকা লিখেছেন। আবূ দাউদ থেকে বর্ণিত, তিনি তাঁর মতে দলিল। দেখুন: (আরবী **********)]
প্রথম কথাটাই ঠিক। যাকাত দিতে কার্পণ্যকারী ব্যীক্ত যদি বাধা দেয়, তাহলে রাষ্ট্রপ্রধান তার সাথে যুদ্ধ করবে। কেননা আবূ বকর সিদ্দীক (রা) যাকাত দিতে অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। [দেখুন: (আরবী **********)]
যাকাত দিতে অস্বীকারকারীকে শিক্ষাদান ও জোরপূর্বক গ্রহণের ঐকমত্য
প্রথম সিদ্ধান্তটি- যে লোক যাকাত ফরয হওয়াকে অস্বীকার করে তা দিতে প্রস্তুত হবে না তার কাফির হয়ে যাওয়ার কথা এবং তাকে মুর্দাত হিসেবে হত্যা করার ঘোষণা সর্বসম্মত। তবে শর্ত এইযে, সে লোক এমন হবে না, যার কোন ‘ওজর’ থাকতে পারে। যেমন নও-মুসলিম হওয়া কিংবা মুসলমানদের বসতি থেকে দূরে জন্মগ্রহণ করা ও লালিত পালিত হওয়া। প্রথম অধ্যায়ে এসব কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অনুরূপভাবে দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটি- যার ওপর যাকাত ফরয হয়েছে কিন্তু সে তা কার্পণ্যের কারণে দিতে অস্বীকার করছে, তার কাছ থেকে জোরপূর্বক নেয়া হবে এবং তাকে শাস্তিও দেয়া হবে। সেই সাথে তাকে বন্দী করে উপযুক্ত শিক্ষাও দিতে হবে। [দেখুন: (আরবী **********)]
যাকাত দিতে অস্বীকারকারীকে তার অর্ধেক মাল নিয়ে শাস্তি দান ও বিভিন্ন মত
যাকাত দিতে অস্বীকারকারীর অর্ধেক মাল নিয়ে তাকে শাস্তিদান অন্য কথায় তার অর্ধেক মাল বাজেয়াপ্ত করা- তাকে ইসলামী নীতি শিক্ষাদান ও তার মত অন্যান্য লোককে সচেতন করার উদ্দেশ্যে যেমন বহজ ইবনে হুকাইম বর্ণিত পূর্বোদ্ধৃত হাদীসেবলা হয়েছে- এ পর্যায়ে ফিকাহ্বিদদের বিভিন্ন মত রয়েছে। ইমাম শাফেয়ী প্রথম দিকে এ কথাই বলেছিলেন। ইমাম ইসহাকও তাই। আহ্মাদ ও আওযায়ী এই স্পষ্টভাষী হাদীসটিকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। হাম্বলী মাযহাবের কেউ কেউ উক্ত মতটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। যেমন পরে বলা হচ্ছে।
শাফেয়ীর পরবর্তী নতুন মত হচ্ছে, তার কাছ থেকে যাকাত পরিমাণ মালই গ্রহণ করা হবে। জম্হুর ফিকাহ্বিদদেরও তাই মত।
ক. এজন্যে যে, হাদীসে বলা হয়েছে: ব্যক্তির ধন-মালে যাকাত ছাড়া আর কারুর কোন অধিকার নেই। [পরে হাদীসটির সূত্র উল্লেখ করা হবে।]
খ. এবং যেহেতু তা একটি ইবাদত, তা পালন করতে কেউ অস্বীকার করলে তার অর্ধেক মাল নিয়ে নেয়া ওয়াজিব হতে পারে না। যেমন অন্যান্য ইবাদতের ক্ষেত্রে করা হয়।
গ. এবং যেহেতু হযরত আবূ বকর (রা) ও সাহাবীদের সময়ে যাকাত দিতে অস্বীকারকারী লোক ছিল বিপুল সংখ্যক, কিন্তু তাদের কাছ থেকে অধিক মাল নেয়ার কথা কেউ বর্ণনা করেনি, নেয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়নি। [(আরবী **********)]
বহজ বর্ণিত হাদীসটি বায়হাকী শাফেয়ী থেকে উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেছেন, হাদীস পারদর্শিগণ এমন কোন হাদীস প্রমাণ করেন নি, যার বলে যাকাতও গ্রহণ করা হবে আর সেই সাথে তার উটেরও অর্ধেক (তার এই যাকাত না দেয়ার জরিমানাস্বরূপ) নেয়া হবে। যদি তেমন কিছু প্রমাণিত হত, তাহলে আমরা নিশ্চয়ই তামেনে নিতাম। [***৩]
বায়হাকী শাফেয়ীর উক্ত কথাকে সমর্থন করেছেন এই বলে যে, বুখারী ও মুসলিম এ ধরনের কোন হাদীস নিয়ে আসেন নি। [(আরবী **********)] তাঁর বর্ণিত হাদীসকে যয়ীফ প্রমাণ করার জন্যে এতটুকু কথাই যথেষ্ট নয়। কেননা এমন বহু সংখ্যক সহীহ্ হাদীসইরয়েছে যা বুখারী ও মুসলিম উদ্ধৃত করেন নি অথচ তার অধিকাংশ বায়হাকী ও অন্যান্যইমাম দলিল হিসেবে নিয়েছেন।
তার পরেও ‘বায়হাকী’ বলেছেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগে চোরকে দ্বিগুণ জরিমানা দিতে হ।ত পরে তা বাতিল হয়ে যায়। ইমাম শাফেয়ী উক্ত নিয়ম মনসূখ হওয়ার ব্যাপারে বরা ইবনে আজেব বর্ণিত হাদীসকে দলিল হিসেবে নিয়েছেন। হাদীসটিতে তার উটটি যে বিপর্যয় করেছিল তার উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু সে কিস্সায় নবী করীম (স) থেকে এ কথা বর্ণিত হয়নি যে, তিনি তার জরিমানা দ্বিগুণ করে দিয়েছিলেন, বরং তাতে শুধু ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্যেতিনি যে হুকুম দিয়েছিলেন তারই উল্লেখ হয়েছে। তাই এ ব্যাপারটিও অনুরূপ হওয়ার সম্ভাবনা। [(আরবী **********)]
মা-অর্দী বলেছৈন, ‘ধন-মালের যাকাত ভিন্ন অন্য কোন হক নেই’ রাসূলে করীম (স)-এর এ কথাটিতে এমন কিছু ভাব রয়েছে, যা হাদীসটিকেক যাকাত ফরয হওয়ার বাহ্যিক অর্থ থেকে তম্বীহ্ ও ভয় প্রদর্শনের দিকে ফিরিয়ে নেয়। যেমন বলেছেন, ‘যে লোক তার ক্রীতদাস হত্যা করবে, আমরাও তাকে হত্যা করব’। [পাঁচখানি গ্রন্থে হাদীসটি উদ্ধৃত হয়েছে। তিরমিযী বলেছৈন, (*****) তার সনদে দুর্বলতা আছে। কেননা তা হাসানের বর্ণনা সামুরা এর বাহ্যিক অর্থকে কতিপয় আলিম গ্রহণকরেছেন। (আরবী **********)] যদিও সে তার দাস হত্যার কারণে নিহত হবে না। [(আরবী **********)]
ইমাম নববী (****) গ্রন্থে লিখেছেন: সুনানে আবূ দাউদ প্রভৃতি গ্রন্থে যে হাদীসটি উদ্ধৃত হয়েছে ‘তার অর্ধেক মাল নেয়া’ সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ী যে হাদীসটিকে ‘যয়ীফ’ বলেছেন এবং হাদীস পারদর্শীদের থেকেই এ কথা বর্ণনা করেছেন যে, তাঁরাও হাদীসটিকে ‘সপ্রমাণিত’ মনে করেন না।
এ জবাবটাই পসন্দনীয়, গ্রহণীয়। কিন্তু আমাদের সাথীদের মধ্যে যাঁরা এই জওয়াব দিয়েছেন যে, ও হাদীসটি মনসূখ হয়ে গেছে, তা কিন্তু যয়ীফ কথা। কেননা কোন দলিল ছাড়া মন্সূখ প্রমাণ করা যায় না। কিন্তু তা করার এখন আর কোন উপায় নেই। [(আরবী **********)]
তিনি (****) গ্রন্থেও এরূপ বলেছেন। যেসব সাহেবান বহজ বর্ণিত হাদীসটিকে মন্সূখ বলে জবাব দিয়েছেন, বলেছেনতা ছিল তখন, যখন মাল দ্বারা শাস্তি দেয়া হত। বলেছেন, এ জবাবটা দুটি কারণ দুর্বল। একটি হচ্ছে, ইসলামের প্রথম যুগে মালের জরিমানা করে শাস্তি দেয়া হত এই বলে যে, তারা দাবি করেছে, তা প্রমাণিত কথা নয়, লোকরেদ কাছে পরিচিতও নয়।
আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, মনসূখ হওয়ার কথা গ্রহণ করা যেতে পারে যদি তার তারিখ জানা যায়। কিন্তু তা এখানে জানা যায়নি।
তাই সহীহ্ জবাব হচ্ছে, মূল হাদীসটিই ‘যয়ীফ’। তাই অগ্রহণীয়। [(আরবী **********)]
পর্যালোচনা ও অগ্রাধিকার দান
আমরা যা মনে করি, বহজ ইবনে হুকাইম বর্নিত হাদীসটিতে এমন কোন ত্রুটি নেই যা গণ্য করা যেতে পারে।তা- যেমন পূর্বে বলেছি [ঐপ্রথম খণ্ড, ৭৭ পৃ.]- রাষ্ট্রপ্রধানের মত নির্ধারণের ফলে যে তা’জীরী শাস্তি দেয়া সাব্যস্ত হবে, তাই দিতে হবে। তা সেই পর্যায়ে গণ্য যা আমরা বারবার উল্লেখ করেছি অর্থাৎ সে সব হাদীসের মধ্যে একটি যা রাসূলে করীম(স) সমাজ নেতা ও রাষ্ট্রকর্তা হিসেবে বলেছেন। কিরাফী ও শাহ্ দিহলভী প্রমুখও এরূপই বলেছেন। [দেখুন: ঐ ২৩০ পৃ. ২৩৩ পৃ.]
এ হাদীসটি সেই পর্যায়ের যা আধুনিক কালের আইন রচনায় রয়েছে ধার্যকৃত কর দিতে অস্বীকারকারীলোকদের ভীত-সন্ত্রস্ত করার উদ্দেশ্য।
যাঁরা বহজ বর্ণিত হাদীসটি রদ্দ করেন, তাঁরা নিম্নোক্ত তিনটির যে কোন একটির ওপর নির্ভর করেছেন:
২. তাঁদের কেউ কেউ নির্ভর করেছেন হাদীসসমূহের পারস্পরিক বৈপরীত্যের ওপর।কেননা যাকাত চাড়া ধন-মালের অন্যকোন হক নেই, এ হাদীসটি সহীহ্ ও প্রমাণিত। এ পর্যায়ে মরফু হাদীসও বর্ণিত হয়েছে। [দেখুন: (আরবী **********)]
২. তাঁদের কেউ কেউ নির্ভর করেছেন এ কথার ওপর যে, তা মাল জরিমানার মাধ্যমেএক প্রকারের শাস্তি দান। তাইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল, পরে মনসুখ হয়ে গেছে।
৩. অপর কিছু লোকনির্ভর করেছেন একথার ওপর যে, হাদীসটি ‘যয়ীফ’-তার বর্ণনাকারী বহজ-এর দুর্বলতার কারণে। এই ভিত্তিতে নববী অবিচার করেছেন।
প্রথম কথা, একটা স্বতন্ত্র অধ্যায়ে আমরা বলব, ধন-মালের যাকাত ছাড়াও হক্ ধার্য হয়। এ পর্যায়ে কুরআনের আয়াতও রয়েছে। অনেক কয়টি সহীহ্ হাদীসও উদ্ধৃত ও বর্ণিত হয়েছে। অতএব বহজ বর্ণিত হাদীসও অন্য হাদীসের মধ্যে কোন বৈপরীত্য নেই।
আর দ্বিতীয় কথা, মালের জরিমানা করে শাস্তিদানের নীতি-সহীহ্ কথা এই- মনসূখ হয়নি। গবেষক ইবনুল কাইয়্যেমতাঁর (*****) গ্রন্থে রাসূলে করীম (স) এবং তাঁর খুলাফায়ে রাশেদুনের পনেটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন। তার প্রত্যেকটি থেকে মালের জরিমানা দ্বারা শাস্তি দেয়ার কথা প্রমাণিত। [দেখুন: (আরবী **********)]
হাদীসটিকে ‘যয়ীফ’ মনে করার ব্যাপারে আমার বক্তব্য হচ্ছে- বাহ্যত মনে হচ্ছে, তা সনদের দিক দিয়ে ‘যয়ীফ’ নয়। বরং তা হাদীস মওজু হওয়ার কারণ সমূহের মধ্যে একটি কারণ। তা পূর্ববর্তী দুটি ব্যাপারের ওপর ভিত্তিশীল। এ কারণে তাঁরা বা তাঁদের কেউ কেউ বহজকে এই হাদীসের দরুন ‘যয়ীফ’ বলেছেন।কিন্তু বহজ-এর কারণে হাদীসটি ‘যয়ীফ’ বলা হয়নি। তা-ই সম্ভব। ইবনে আব্বাস বলেছৈন: এ হাদীসটি না হলে বহজকে আমি ‘সিকাহ’ বর্ণনাকারীদের মধ্যে গণ্য করতাম।
ইবনুল কাইয়্যেম (*******) গ্রন্থে বহজ সম্পর্কে ইমামগণের বক্তব্য উল্লেখ করার এবং আহমাদ, ইসহাক ও ইবনুল মাদীনী যে তাকে সহীহ্ বলেছেন, তার উল্লেখের পর লিখেছেন: ‘এ হাদীসটি যে লোক রদ্দ করেছেন, তার কাছে কোন দলিল নেই।’ হাদীসটি মনসূখ হওয়ার দাবিও বাতিল। কেননা সে দাবির স্বপক্ষেও নেই কোন প্রমাণ। অথচ মাল নিয়ে শাস্তি দেয়ার শরীয়াতসম্মত প্রমাণের অনেক হাদীস রাসূলে করীম (স) থেকে বর্ণিত হয়েছে। কোন দলিলের ভিত্তিতে সেগুলোর মনসূখ হওয়া প্রমাণিত নয় বরং রাসূলেকরীম (স)-এর পরবর্তীকালে তাঁর খলীফাগণ তদানুযায়ী আমল করেছেন। বরা ইবনে আজেবের উটের ঘটনা প্রসঙ্গে বর্ণিত হাদীসের সাথে তার বৈপরীত্যটাও চরম মাত্রার দুর্বল কথা। কেননা শাস্তি দেয়া ন্যায়সংগত হতে পারে যদি শাস্তি প্রাপ্ত ব্যক্তি কোন কর্তব্য কাজ করতে অস্বীকৃত হয় কিংবা কোন নিষিদ্ধ কাজ করে বসে। কিন্তু যা তার নিজের ইচ্ছা ও কাজ ছাড়াই ঘটে গেছে, তার ওপর কোনরূপ শাস্তি চাপানোর যৌক্তিকতা কেউ মেনে নেবে না। যাঁরা মনে করেন যে, ও কথাটি শুধু ভীত করার জন্যে বলা, আসলে তা নয়, তাদের এ ধারণা চরম মাত্রার বিপর্যয় সৃষ্টিকারী। নবী করীম (স)-এর কালাম এরূপ অবাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। ইবনে হাব্বানের কথা ‘এ হাদীসটি না থাকলে বহজকে আমি সিকাহ্ বর্ণনাকারীদের মধ্যে করে নিতাম’ যারপর নাই অগ্রহণযোগ্য কথা। কেননা তার ‘যয়ীফ’ হওয়ার কারণ কেবলমাত্র এই একটি হাদীস ছাড়া যদি আর কিছুই না থেকে থাকে, অথচ তাঁকে যয়ীফ বলা হয়েছে কেবলমাত্র এই হাদীসটির কারণে, তাহলে এ তো ‘আবর্তনশীল’ এবংতা বাতিল। অথচ তাঁর বর্ণনায় এমন কিছু নেই যা তাঁর যয়ীফ হওয়ার কারণ ঘটাতে পারে। কেননা ফিকাহ্ বর্ণনাকারীগণ এ পর্যায়ে তার বিপরীত কিছুই পেশ করেন নি। [(আরবী **********)]
আশ্চর্যের কথা, ফিকাহ্ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য গ্রন্থাদির লেখকগণ- যেমন শীরাজী ‘আল-মুহায্যার-এর লেখক, মা’আর্দী ‘আল-আহ্কামুস্ সুলতানিয়ার গ্রন্থকার এবং আল-মুগনীর’ লেখথক কিংবা কমপক্ষে তার সহীহ্ হওয়াটায় বিভিন্ন মত থাকার দরুন- এমন এক হাদীসের বলে, যার কোন মূল্যই নেই ইল্মী দিক দিয়ে। সে হাদীসটি হচ্ছে- ধন-মালের যাকাত ভিন্ন অন্য কোন দাবি নেই।
এ কারণে হাদীসসমূহের গুরুত্ব, মর্যাদা ও মূল্যবান- সেসবের মূল উৎস এবং সূত্রের দিক দিয়ে সঠিকভাবে জেনে নেয়া একান্তই আবশ্যক। ‘অবহিত ব্যক্তির ন্যায় তোমাকে আর কেউ অবহিত করতে পারবে না।’ [সূরা ফাতির ১৪ আয়াত]
হাম্বলী মায্হাবের মত
হাম্বলী মাযহাবের মত ঠিক শাফেয়ী মাযহাবের মতই। যাকাত দিতে অস্বীকারকারীদের অমান্যতা, বিদ্রোহ ও মিথ্যা বলার কারণে মুর্তাদ হয়ে যাওয়ার বর্ণনা দেয়ার পর ইবনে কুদাহাম্ লিখেছেন: ‘যাকাত ফরয হওয়া বিশ্বাস করা সত্ত্বেও যদি তা দিতে অস্বীকার করে, তখন রাষ্ট্রপ্রধান যদি তার নিকট থেকে যাকাত নিয়ে নিতে পারেন, তবে তাই নেবেন এবং তাকে শাস্তি দেবেন। অধিক সংখ্যক আলিমের কথা হচ্ছে, তার অতিরিক্ত কিছু নেবেন না।… অনুরূপভাবে যদি গোপন করেও মিথ্যা বলে, যার ফলে রাষ্ট্রপ্রধান, তার যাকাত গ্রহণ করতে না পারেন- পরে তা যদি প্রকাশিত হয়ে পড়ে, তাহলে ইসহাক ইবনে রাহ্ওয়াই ও আবূবকর আবদুল আজীয বলেছেন, তার যাকাতও নেবে, সেই সাথে তার মোট মালের অর্ধেকও নেবে। যেমন বহজ ইবনে হুকাইম বর্ণনা করেছেন।
সেই অস্বীকারকারী ব্যক্তি যদি রাষ্ট্রপ্রধানের যাকাত গ্রহণে বাধাদান করে, তাহলে তিনি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবেন। কেননা সাহাবায়ে কিরাম (রা) যাকাতের প্রতিবন্ধকতাকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। সে যুদ্ধে যদি রাষ্ট্রপ্রধান জয়লাভ করেন, তার সব ধন-মালও দখলে আসে, তাহলে তা থেকে যাকাত নেবেন; তখনও তার অতিরিক্ত কিছু নেবেন না। তার সন্তানদের গোলাম বানানো যাবে না। কেননা এই সন্তানরা কোন অপরাধ করেনি। আর যাকাত দিতে অস্বীকারকারীকে যখনই গোলাম বাননো হয় না, তখন তার সন্তানদের তো কোন কথাই উঠতে পারে না। আর যুদ্ধে যদি জয় হয় কিন্তু ধন-মাল না পাওয়া যায়, তাহলে তা দেবার জন্যে তাকে বলতে হবে এবং তওবা করতে বলতে হবে তিনবার। যদি সে তওবা করে এবং যাকাতও দিয়ে দেয়, তো ভাল কথা, নতুবা তাকে হত্যা করা হবে। তবে তাকে কাফির বলা যাবে না।
অবশ্য ইমাম আহমাদের একটি মত বর্ণিত হয়েছে। তা হচ্ছে- যাকাত না দেয়ার দরুন সে যখন যুদ্ধই করতে নেমেছে, তখন সে কাফির না হয়ে যায় না। মাইমুনী ইমাম আহমাদের এক কথা বর্ণনা করেছেন যে, লোকেরা যখন যাকাত দিতে অস্বীকৃত হবে- যেমন লোকেরা হযরত আবূ বকর (রা)-কে দিতে অস্বীকার করেছিল এবং তারা সেজন্যে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল, তাহলে তাদের উত্তরাধিকারী কেউ হবে না, তাদের জানাযার নামাযও পড়া হবে না। আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ বলেছেন: যাকাত তরককারী মুসলিম নয়।
তার কাণ, যেমন বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবূ বকর (রা) যখন যাকাত দিতে অস্বীকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন, যুদ্ধ তাদের কামড়ে ধরল, তখন তারা বলেছিল: হ্যাঁ আমরা যাকাত দেব। তখন হযরত আবূ বকর (রা) বলেছিলেন: আমি তা গ্রহণ করব না যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা এ সাক্ষ্য না দেবে যে, আমাদের পক্ষের নিহত ব্যক্তিরা জান্নাতবাসী হবে এবং তোমাদরে পক্ষের নিহতরা হবে জাহান্নামবাসী। কোন সাহাবী এ কথার প্রতিবাদ করেছেন, এমন কথা কেউ বর্ণনা করেনি। তাহলে প্রমাণিত হল যে, তারা কাফির হয়ে গিয়েছিল।
প্রথম বিবেচ্য, হযরত উমর (রা) ও অন্যান্য সাহাবী শুরুতে যখন যুদ্ধ যোগদান করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, যদি তাঁরা মনে করতেন যে, ওসব লোক কাফির হয়ে গেছে, তাহলে তাঁরা নিশ্চয়ই যুদ্ধ করতে ইতস্তত করতেন না। পরে তাঁরা যুদ্ধে একমত হলেন বটে; কিন্তু তাদের কাফির হওয়ার ব্যাপারটি মৌলিকভাবে ‘না’র ওপর থেকে গেল। আরও এজন্যে যে, যাকাত হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ দ্বীনের একটি শাখা। তা শুধু তরক করলেই একজন লোক কাফির হয়ে যায় না, যেমন হজ্জ। আর যাকাত তরক করলে যদি কাফির না হয়, তাহলে তার জন্যে যুদ্ধ করলেই কাফির হয়ে যাবে না। যেমন বিদ্রোহীরা। হযরত আবূ বকর (রা) যাদেরকে উক্ত কথা বলেছিলেন, হতে পারে তারা যাকাতকে ফরয মানতেই অস্বীকার করেছিল। এ ব্যাপারটি তো একটা নির্দিষ্ট অবস্থায় সংঘটিত হয়েছিল। তাই হযরত আবূ বকর (রা) ঠিক কোন্ সব লোককে সম্বোধন করে উক্ত কথাটি বলেছিলেন, তা আজ প্রকট ও প্রমাণ করা সম্ভব নয়। হতে পারে তারা মুর্তাদ হয়ে যাওয়া লোক ছিল্ হতে পারে তারা যাকাত ফরয হওয়াকেই অস্বীকার করেছিল। আরও অনেক কিছু হতে পারে। তাই বিভিন্ন মতদ্বৈততার ক্ষেত্রে কোন একটা চূড়ান্ত কথা বলা চলে না। হয়ত হযরত আবূ বকর (রা) একথা বলেছিলেন এজন্যে যে, তারা কবীরা গুনাহ্ করেছে এবং তওবা না করেই মৃত্যুবরণ করেছে। এজন্যে তাদের জাহান্নামী হওয়ার কথা বলেছেন প্রকাশ্যভাবে, যেমন প্রকাশ্যভাবে মুজাহিদ শহীদদের জান্নাতবাসী হওয়ার কথা বলেছিলেন। আর সব ব্যাপারে চূড়ান্ত ফয়সালা তো আল্লাহ্র ওপর ন্যস্ত। তারা চিরকাল জাহান্নামে থাকবে, এমন কথাও বলেন নি। কেউ জাহান্নামী হবে একথা বললে তার চিরকাল জাহান্নামে থাকার কথা বলা হয় না। পরন্তু নবী করীম (স) সংবাদ দিয়েছেন যে, তাঁর উম্মতের মধ্য থেকে বহু লোক চিরকাল জাহান্নামে থাকবে। পরে আল্লাহ্ তা’আলা তারেকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে নিয়ে যাবেন। [দেখুন: (আরবী **********)]
‘যায়দীয়া’ মতের লোকদের বক্তব্য
‘জায়দীয়া’ মতের কিতাব (****) এবং তাঁর শরাহ গ্রন্থে বলা হয়েছে: ধন-মালের মালিক যদি দাবি করে যে, তার ওপর যাকাত ফরয নয়, সে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক নয়, তাহলে তার কথা গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা তাঁর প্রতিনিধির কর্তব্য হল, তার কথার সত্যতায় কোনরূপ সন্দেহের উদ্রেক হলে সে ব্যক্তিকে কিরা-কসম করতে বাধ্য করবে। আর তা করা হবে যদি তার বিশ্বস্ততা প্রকাশমান ও সর্বজনবিদিত না হয়। কিন্তু সে লোক যদি প্রকাশমানভাবে বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি হয়, তাহলে তাকে কিরা-কসম করতে বাধ্য করা হবে না। [(আরবী **********)]
কিন্তু ধন-মালের মালিক যদি অঙ্গীকার করে যে, তার ওপর যাকাত ফরয আর সেই সাথে এও দাবি করে যে, সে তা রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষথেকে দাবি করার পূর্বেই পাওয়ার যোগ্য লোকদের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছে- এ কথার সত্যতা প্রমাণকারী যদি কেউ না থাকে, তাহলে বন্টন করার দাবিকারীকে তার প্রমাণ পেশ করতে হবে। কেননা আসল কথা হল যাকাত আদায় করে না দেযা এবং বণ্টনটা ঘটেছে রাষ্ট্র প্রধানের দাবি করার পূর্বে। সে যদি যাকাত ওয়াজিব হওয়া ও বন্টন করা ইত্যাদি সব কিছু প্রমাণ পেশ করে তো ভালো কথা নতুবা তার নিকট থেকে যাকাত আদায়কারী তা আদায় করে নেবে। তখন তার বণ্টন করার দাবি মেনে নেয়া যাবে না, সেযদি প্রকাশমান-বিশ্বাসযোগ্য হয়, তবুও। [(আরবী **********)]
অত্যাচারী শাসকের কাছে যাকাত দেয়া
অত্যাচারী শাসকের কাছে যাকাত দেয়া পর্যায়ে আলিমগণ যা কিছু বলেছেন এবং এ ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে যে মতভেদ রয়েছে, তার সম্পূরক ও চূড়ান্ত কথা হচ্ছে তিনটি:
১. নিঃশর্তভাবে তা জায়েয। ২. নিঃশর্তভাবে তা নিষিদ্ধ এবং ৩. পার্থক্যকরণ।
যাঁরা জায়েয বলেছেন, তাঁদের বক্তব্য
অত্যাচারী শাসকের কাছে যাকাত দেয়া জায়েয বলেছেন যাঁরা, তাঁদের দলিল হচ্ছে সে সব হাদীস, যাতে এ বিসয়ে স্পষ্ট কথা উদ্বৃত হয়েছে। (****) গ্রন্থে তন্মধ্য থেকে অনেকগুলো হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে। [দেখুন: (আরবী **********) এবং দেখুন: ]
ক. হযরত আনাস থেকে বর্ণিত, দুই ব্যক্তি বলল: হে রাসূল (স) আমি যদি আপনার প্রেরিত ব্যক্তির কাছে যাকাত আদায় করে দিই, তাহলে কি আমি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের কাছে দায়িত্বমুক্ত হতে পারলাম? বলেন: হ্যাঁ, তুমি যদি তা আমার প্রেরিত ব্যক্তির কাছে দিয়ে দাও, তাহলে তুমি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের কাছে সম্পূর্ণ দায়িত্বমুক্ত হলে। তখন তুমি তোমার শুভ কর্মফল পাবে। যে তার ব্যয়ক্ষেত্র বদলে দেবে, গুনাহ তারই হবে। [আহমাদ বর্ণনা করেছেন, যেমন নাইলূল আওতার’ ৪র্থ খণ্ড ১৫৫ পৃ. রয়েছে।]
খ. ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, রাসূলে করমি (স) বলেছেন: আমার পরে নিশ্চয়ই এমন সব নিদর্শনাদি ও ব্যাপারসমূহ সংঘটিত হবে, যা তোমরা খারাপ মনে করবে। সাহাবিগণ বললেন: হে আল্লাহ্র রাসূল, সেই অবস্থার জন্যে আমাদেরকে কি নির্দেশ দেন? বললেন: তোমাদের ওপর ধার্য কর্তব্য ও হক তোমরা আদায় করতে থাকবে আর তোমাদের যা পাওনা ও অধিকার, তা আল্লাহ্র নিকট চাইবে। [বুখারী ও মুসলিম। ঐ]
গ. ওয়েল ইবনে হুজর থেকে বর্ণিত, আমি রাসূলে করীম (স)-কে বলতে শুনেছি, এক ব্যক্তি তাঁর কাছে প্রশষ্ন করছিল- আপনি কি মনে করেন, আমাদের ওপর যদি এমন সব কর্তৃত্বসম্পন্ন লোক প্রতিষ্ঠিত হয় যারা আমাদের হক আমাদেরকে দিতে অস্বীকার করে আর তাদের হক্ তারা আমাদের কাছে চায়, তাহলে তখন আমরা কি করব? বললেন: তোমরা তা শোন এবং মান্য কর। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, তাদের ওপর তা ধার্য হবেই যা তারা নিজেদের ওপর চাপিয়ে নিয়েছে এবং তোমাদের ওপর তাই ধার্য যা তোমরা চাপিয়ে নিয়েছ নিজেদের ওপর। [মুসলিম, তিরমিযী তিনি এ হাদীসকে সহীহ্ বলেছেন, ঐ]
এ সব হাদীসের খুব গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য রয়েছে। আর তা হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্র সব সময়ই এমন ধন-মালের মুখাপেক্ষী, যার দ্বারা তা সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা কায়েম করবে এবং সাধারণ কল্যাণমূরক কাজ আঞ্জাম দেবে, যার ফলে ইসলামের কালেমা বুলন্দ হবে। কিন্তু জনগণ যদি তাদের হস্তে প্রয়োজনীয় ধন-মাল দেয়া থেকে বিরত রাখে- কোন কোন প্রশাসকের জুলুম নিপীড়নের কারণে, তাহলে রাষ্ট্রের আর্থিক ভারসাম্য বিনষ্ট হবে। উম্মতের রজ্জু ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়বে। অপেক্ষামান শত্রুরা তাদের ব্যাপারে অনেক লোভ-লালসা করবে। অতএব সে রাষ্ট্রের আনুগত্য করা- যাকাত ইত্যাদি যা কিছু দেয় তা যথারীতি আদায় করা একান্তই কর্তব্য। ইসলামী শরীয়াত জুলূম প্রতিরোধ করার যত পথ দেখিয়েছে তা অবলম্বনের পথে এ নির্দেশ কোন বাধা নয়।
তাই মুসলিম ব্যক্তিবর্গের কাছে যে সব আর্থিক অধিকার পাওনা রয়েছে তা দিয়ে দেয়া তাদের কর্তব্য। সেই সাথে দায়িত্বশীল জাতীয় কর্মকর্তাদের কল্রাণ কামনামূরক উপদেশ- নসিহত করাও বাঞ্ছনীয়। কেননা দ্বীন ইসলামের দিক দিয়ে তা ওয়াজিব এবং তা পালন করা উচিত। কুরআনী ঘোষণানুযায়ী পারস্পরিক সত্য, ন্যায় ও ধৈর্য ধারণের উপদেশ দান এবং ন্যায়ের নির্দেশ ও অন্যায়ের প্রতিরোধ নাগরিক হিসেবে একটা অতি বড় কর্তব্য।
মুসলিম সমাজের অধিকার এবং কর্তব্য ও দায়িত্ব অবিসংবাদিত, অবিস্মরণীয়। আর তা হচ্ছে শাসক-প্রশাসকদের মধ্যে স্পষ্ট ও প্রকাশ্য কুফরী দেখতে পেলে এবং কুরআনী দলিলের ভিত্তিতে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হলে তাদের আনুগত্য করা একটা অতি বড় দায়িত্ব।
অনুরূপভাবে মুসলিম ব্যক্তির অধিকার এবং কর্তব্য হচ্ছে, যে কোন স্পষ্ট গুনাহের কাজ দেখতে পারে, তার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করবে। যেমন হাদীসে বলা হয়েছে:
(আরবী **********)
শোনা এবং আনুগত্য করা প্রত্যক মুসলিমব্যক্তির অধিকার এবং কর্তব্য-পসন্দ ও অপসন্দ সর্বপ্রকারের কাজে, যতক্ষণ পর্যন্ত কোন গুনাহের কাজে আদিষ্ট না হবে। যদি কোন পাপ বা নাফরমানীর কাজের আদেশ হবে, তখন তা শোনাও যাবে না, আনুগত্যও করা যাবে না। [বেশ কয়জন মুহাদ্দিস হাদীসটি নিজ নিজ গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন ইবনে উমর থেকে, যেমন (*****) গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে।]
যাঁরা নিষেধ করেছেন তাঁদের অভিমত এবং দলিল
অত্যাচারী শাসকের কাছে যাকাত দিতে যাঁরা নিঃশর্তভাবে নিষেধ করেছেন, তাঁদের এই মতটি ইমাম শাফেয়ীর দুটি কথা একটি। আল-মাহদী তা (****) গ্রন্থে আহ্লি বয়েত থেকে উদ্ধৃত করেছেন। তাহলে জালিম প্রশাসকদের কাছে যাকাত দেযঅ জাযেয নয়, তাতে ফরয আদায় হবে না। তাদের দলির হচ্ছে আল্লাহ্ তা’আলার এই বাণী:
(আরবী **********)
আমার কোন দায়িত্ব-কর্তৃত্ব অত্যাচারী লোকেরা পেতে পারে না।
ইমাম শাওকানী এ আয়াতকে দলিল বানানোর প্রতিবাদ করেছেন। তিনি বলেছেন: এই বিতর্কিত বিষয়ে এরূপ একটি সাধারণ অর্থবোধক আয়াতকে দলিলরূপে পেশ করা যথার্য বলে নিলেও দেখা যায়, আয়াতটির সাধারণ অর্থবোধকতা এই অধ্যায়ে উদ্ধৃত হাদীসসমূহ দ্বারা সীমিত ও নির্ধারিত হয়ে গেছে। [***১]
যাঁরা পার্থক্যকরণের মত দিয়েছেন
শাফেয়ী, মালিকী ও হাম্বলী মাযহাবের কোন কোন আলিম এই মত পোষণ করেছেন যে, মালের মালিকের পক্ষে সরকার নিযুক্ত যাকাত আদায়কারী ও প্রতিনিধির কাছে যাকাত অর্পণ করা জায়েয- তারা ফাসিক হলেও যদি তারা তা যথাস্থানে স্থাপন করে এবং আল্লাহ্র বিধান মত ব্যয় করে। আর তারা যদি তা যথাস্থানে স্থাপন না করে ও তা পাওয়ার যোগ্য লোকদের মধ্যে বন্টন না করে, তাহলে তাদের কাছে যাকাত অর্পণ করা সম্পূর্ণ হারাম। তখন তা গোপন করা ও লুকিয়ে ফেলা ওয়াজিব। [***২] এবং ‘আল-মাঅর্দী শাফেয়ী মতের আরিম হয়েও এ ধরনের শাসক-প্রশাসক সম্পর্কে বলেছেন: তারা যখন মালের মালিকদের কাছ থেকে জোর ও জবরদস্তি করে যাকাত গ্রহণ করবে, তাদের মালে আল্লাহ্র যে হক ধার্য হয়েছে তা আদায় হবে না। তখন তা নিজস্বভাবে পাওয়ার যোগ্য লোকদের মধ্যে পুনরায় বণ্টন করা তাদের কর্তব্য হবে। [(আরবী **********)]
মালিকী মাযহাবের লোকদের মতে: দরদীর (আরবী **********) [ঐ. *********)] গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন: যাকাত ব্যয়ে অত্রাচারী বলে পরিচিত ও খ্যাত ব্রক্তিকে যে লোক যাকাত দেবে সে যদি কার্যতও জুলুম ও অবিচারমূরক কাজ করে, তাহলে সে যাকাত আদায় হবে না। তাকে দিতে অস্বীকার করা এবং সম্ভব হলে তা নিয়ে পালিয়ে যাওয়া কর্তব্য আর যদি কার্যত, অবিচার না করে, পাওয়ার যোগ্য লোকদেরমধ্যেই তা করে, তাহলে তা আদায় হবে।
আর সে যদি যাকাত গ্রহণ ও ব্যয়ে সুবিচার ও ন্যায়পরতা করে, যদি সে অত্যাচারী হয় অন্যান্য ক্ষেত্রে ও ব্যাপারে, তাহলে দরদীর বলেছেন- তার কাছে দেয়াই করত্ব্য। দসূকী তাঁর টীকায় লিখেছেন, তা ঠিক নয়, বরং তা তখনও তা মাকরূহ হবে। [(আরবী **********)]
শাযখ জরুখ তাঁর (আরবী **********) গ্রন্থে লিখেছেন:
‘সুবিচারক ও ন্যায়বাদী রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে যাকাত ইচ্ছামূলকভাবে দেয়া যাবে, তাতে কোনরূপ মতভেদ নেই। আর অীবচারক ও অন্যায়বাদী রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে যাকাত দেয়া যাবে না। তবে সে যদি দাবি করে এবং তার কাছ থেকে তা গোপন করা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে তাকে দিতে হবে। যার পক্ষে তা না দিয়েই নিজস্বভাবে বণ্টন করা সম্ভব হবে, তার পক্ষে তাকে দেয়ায়যাকাত আদায় হবে না। ইবনুল কাসেম ও ইবনে নাফে বর্ণনা করেছেন, যে যদি তাকে সেজন্য কিরা-কসম করতে বলে, তাহলে তাকে দিয়ে দেয়া যথেষ্ট হবে। তবে তখন আবার দেয়া মুস্তাহাব। ইবনে আবদুল হাকাম মদীনার শাসনকর্তাকে যাকাত দিয়েছিলেন। ইবনে রুশদ বলেছেন: যে লোক যাকাতের ব্যাপারে ন্যায়পরায়ণ নয় এবং তা তার উপযুক্ত স্থানে সংস্থাপন করে না, তাকে যাকাত দেয়া যথেষ্ট হওয়া পর্যায়ে বিভিন্ন মত রয়েছে (****) আচবাগ, ইবনে আহব এবং ইয়াহ্ইয়ার শ্রবণ মতে কাসেমের দুটি কথার একটি হচ্ছে- তা যথেষ্ট হবে। আর শ্রবণে ইবনুল কাসেমের দ্বিতীয় কথা হচ্ছে তা যথেষ্ট হবে না। মশহুর কথা হচ্ছে, তা যথেষ্ট হবে যদি সেজন্য জোরজবরদস্তি করে। আল্লাহই জালিমের বড় হিসেব গ্রহণকারী। কিন্তু তা জায়েয হবে না যতক্ষণ তাকে যাকাত বলে নামকরণ ও চিহ্নিত করণ না করা হবে এবং তা যথানিয়মে গ্রহণ না করা হবে। [(আরবী **********)]
অর্থাৎ ট্যাক্স বা ‘কর’ বা অনুরূপ কোন নামে যাকাত গ্রহণ করা হলে সব মাযহাবের মতেই তা আদায় হবে না।
হানাফীদের মত
আল্লাহদ্রোহী ও অত্যাচারী শাসকগণ যদি প্রকাশমান ধন-মালে যাকাত বা খারাজ নিয়ে নেয় এবং তা যথাস্থানে ব্যয় করে, তাহলে ধন-মালিকদের পক্ষে পুনরায় যাকাত দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই। পক্ষান্তরে তারা যদি তা যথাস্থানে ব্যয় না করে আর তা স্থাপন করে তার জন্যে শরীয়াতসম্মত স্থানে, তাহলে বান্দাহ এবং আল্লাহ্ পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষার্থে পুনরায় যাকাত দেয়া তাদের জন্যে কর্তব্য হবে। তবে খারাজ আবার দিতে হবে না। কেননা তার ব্যয়ক্ষেত্র তারাই। তা যুদ্ধের পাওনা, তারাই তো যুধ্যমান শত্রুর বিরুদ্ধে মুকাবিলা করে থাকে।
অবশ্য অপ্রকশমান ধন-মালের ক্ষেত্রে এ পর্যায়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। কেউ কেউ ফতোয়া দিয়েছেন, তা আদায় হয়নি। কেননা যাকাত গ্রহণ করার জালিম শাসকের কোন অধিকার নেই। এই কারণে তার কাছে যাকাত অর্পণ করা জায়েয নয়। কেননা তা গ্রহণ করার যার বৈধ অধিকারই নেই তার কাছে তা দেয়া হলে আদায় হতে পারে না।
‘আল-মবসূত’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, জালিম লোকের হাতে যাকাত অর্পণ করে যদি তাদের প্রতি সাদ্কা করার নিয়ত করে, তাহলে তা সহীহ্ হওয়াই অধিক যথার্থ কথা। কেননা তাদের ওপর যে দায়-দায়িত্ব রয়েছে, সে হিসেবে তারাই ফকীর পর্যায়ে গণ্য। [(আরবী **********) সত্য কথা হচ্ছে, ঐ লোকদের ওপর জনগণের যে সব অধিকার রয়েছে ও ধন-মাল ধার্য হয়েছে, সে হিসেবে তারাই ঋণগ্রস্ত ও ঋণী বলে গণ্য হবে। আর ‘আল-গারেমুন’ খাত পর্যায়ে আমরা বলে এসেছি যে, তার এ ঋণটা বেহুদা ব্যয় বা পাপ কাজে ব্যয়ের দরুন হবে না, তবেই সে ঋণগ্রস্ত বলে যাকাত পাওয়ার অধিকারী হবে। কিন্তু এখানে সে শর্ত পাওয়া যায়নি।]
হাম্বলীদের মত
হাম্বলী ফিকাহ্বিদদের মতে- ইবনে কুদামাহ্ তাঁর (****) গ্রন্থে লিখেছেন:
‘খাওয়ারিজ ও বিদ্রোহীরা যদি যাকাত নিয়ে নেয়, তাহলে দাতার যাকাত আদায় হবে। অনুরূপভাবে শাসকমণ্ডলীর কেউ যদি ধন-মালের মালিকের কাছ থেকে যাকাত নিয়ে নেয়, তবে তাতেও ফরয আদায় হয়ে যাবে, গ্রহণকারী তা নিয়ে ন্যায়পরতা রক্ষা করল কি অবিচার করল এবং তা জোরপূর্বক নিল কিংবা ইচ্ছা করেই তা তাকে দিল, তাতে কোন পার্থক্য হবে না।
ইব্রাহীম নখ্য়ী বলেছৈন: ওশর বা কর আদায়কারীরা তোমাদের কাছ থেকে যা আদায় করে নেয়,তাতে তোমরা দায়িত্বমুক্ত হবে। সাল্মমাতা ইবনে আক্ওয়া থেকে বর্ণিত, তিনি তাঁর যাকাত নজ্দা খারেজীকে দিয়েছিলেন।’
ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তাঁকে ইবনুয যুবাইর ও নজ্দার নিয়োজিত যাকাত আদায়কারীদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। জবাবে তিনি বলেছিলেন: এদের যা কাছেই তোমাদের যাকাত দিয়ে দাও না কেন, তোমার দায়িত্ব পালন হয়ে গেল।
কিয়াসের পক্ষপাতী ফিকাহ্বিদ্দের মতও অনুরূপ, যে সব স্থানে তাদের শাসন চলে সব স্থানে তা-ই কার্যকর। তাঁরা বলেছেন, যখন খাওয়ারিজদের কাছে যাবে, তখন তাদেরকে শুল্ক দিলে যাকাত আদায় হবে না।
যেসব খাওয়ারিজ যাকাত আদায় করে, তাদের সম্পর্কে আবূ উবাইদ বলেছৈন, তারা যাদের নিকট থেকে যাকাত নিল তাদেরকে তা পুনরায় দিতে হবে। কেননা ওরা তো মুসলমানদের জননেতা ও দায়িত্বশীল শাসক নয়। ফলে তারা ডাকাত সমতুল্য।
ইবনে কুদামাহ বলেছেন, আমাদের জন্যে সাহাবীদের কথাই দলিল, তাঁদের সময়ে তাঁদের মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল বলে বলে আমরা জানি না। অতএব ইজমা হয়েছিল, ধরে নিতে পরি। কেননা তা কর্তৃত্বসম্পন্ন লোকের কাছেই দেয়া বিদ্রোহীদের নিকট দেয়ার মতই। [(আরবী **********)]
(আরবী **********) গ্রন্থেও অনুরূপভাবে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রনায়কের কাছে যাকাত দেয়া জায়েয হওয়ার ব্যাপারে মাযহাবের মধ্যে কোন মতপার্থক্য নেই। সে সুবিচারক হোক, কি অত্যাচারী। আর ধন-মাল প্রকাশমান হোক, কি প্রচ্ছন্ন। এ পর্যায়ে সাহাবিগণ থেকে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে, তা-ই তাদের দলিল। আহমাদ বলেছেন, তাঁরা শাসকদের কাছে যাকাত দিত। রাসূলের সাহাবীগণই তাদেরকে তা দিয়ে দিতে বলতেন এবং তারা তা কোথায় ব্যয় করে তাও তাঁরা জানতেন। এরূপ অবস্থায় আমার কি বলবার থাকতে পারে? [(আরবী **********)]
তুলনা ও অগ্রাধিকার দান
এ সব বিষয়ে আমি যা মনে করি, তা হচ্ছে, জালিম শাসকরা যা নেয়, তা যদি যাকাতরে নামে নেয়, তাহলে তাদের হস্তে যাকাত অর্পণ করা অন্যায় হবে না এবং কোন অবস্থাতেই মুসলমানকে পুনর্বার যাকাত দিতে বাধ্য করা যাবে না। হ্যাঁ, তারা যদি যাকাতের নামে না নেন, তাহলে তা দিয়ে যাকাত আদায় করা হল, মনে করা যাবে না। মালিকী মাযহাবের আলিমগণ এবং অন্যরা তাই বলেছৈন। ‘যাকাত ও কর’ এ পর্যায়ে আমরা আরও আলোচনা পেশ করবো।
জালিমের হাতে যাকাত দেয়া হবে কিনা, এই প্রশ্নে আমি তা দেয়াই ভালো মনে করি- যদি তারা তা পাওয়ার যোগ্য লোকদের মধ্যে বন্টন করে এবং শরীয়াতে তার জন্যে নির্দিষ্ট খাতসমূহে তা ব্যয় করে, অন্যান্য কোন কোন ক্ষেত্রে তারা জুলুম করলেও।
যদি তা যথাস্থানে স্থাপন না করে, তাহলে তাদের হাতে যাকাত দেয়া যাবে না। কিন্তু যদি দাবি করে, তাহলে তো না দিয়ে উপায় থাকবে না। তখন আমল করতে হবে সে সব হাদীস অনুযায়ী যা আমরা পূর্বে উল্লেখ করে এসেছি। শাসক ও রাজন্যবর্গ জুলুম করলেও তাদের হাতে যাকাত সঁপে দেয়া সংক্রান্ত সাহাবাগণের বারবার দেয়া ফতোয়া অনুযায়ীও আমল হবে।
শাসকের মুসলিম হওয়া শর্ত
যে কথাই কোনই সন্দেহ নেই তা হচ্ছে সাহাবিগণ যেসব শাসক-প্রশাসকের হাতে যাকাত সঁপে দেয়ার ফতোয়া দিয়েছেন, তাঁরা মুসলমান- ইসরামের প্রতি ঈমানদার ও ইসলাম অনুসারী লোক ছিলেন। তাঁরা ইসলামীশাসন প্রতিষ্ঠার জন্যে জিহাদ করেছেন এবং তাতেই তাঁরা সন্তুস্ট ছিলেন না। ইসরামেরই নামে তাঁরা বহু যুদ্ধে জয়লাভ করেছেন, ইসলামেরই ঝাণ্ডা তাঁরা বুলন্দ করেছেন, যদিও পরবর্তীকালে কোন কোন হুকুম আহকামের বরখেলাফ কাজ করেছেন দুনিয়ার প্রতি গুরুত্বারোপ ও লালসার দাসত্ব করতে গিয়ে।
এই শ্রেণীর লোকদের নিকট যাকাত দেয়া যেতে পারে, আদায় করা যেতে পারে এবং সর্বপ্রকারের অর্থীনৈতিক অধিকার। সহীহ হাদীসসমূহ তা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে এবং জমহুর ফিকাহ্বিদগণ এ সব হাদীসকেই দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
আমাদের এ কালের শাসক-প্রশাসকদের মধ্যে এই ধরনের লোক খুব বেশি নেই। অধিকাংশই তো ইসলামের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে।তাকে পিছনের দিকে ফেলে রেখেছে, কুরআন মজীদকে তারা ত্যাগ করেছে। শুধু তা-ই নয়, তাদের অনেকে ইসলাম, মুসলমান ও ইসলামের দাওয়াত বিস্তারকারীদের ওপর খড়গহস্ত হয়ে পড়েছে। এ লোকদের তো সাহায্য সহযোগিতা করা যেতে পারে না, যাকাতরে মাল এদের হাতে সঁপে দিয়ে। কেননা তা দিয়ে তারা তাদের কুফরী ও নাস্তিকতা প্রচার করবে এবং দুনিয়ার চরম বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। তাই শাসক-প্রশাসকের মুসলিম ও ইসলাম পালনকারীহওয়া একটি অনিবার্য শর্ত তাদের হাতে যাকাত দেয়া জায়েয হওয়ার জন্যে।
জমহুর ফিকাহ্বিদগণ সম্পূর্ণ একমত হয়ে বলেছেন, কোন কাজে সফরকারী ইবনুস সাবীল হলেও তাকে যাকাতরে মাল দেয়া যেতে পারে না, যতক্ষণ সে তওবা না করবে। পাপ কাজের দরুন ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি সম্পর্কেও এই কথা। কেননা আল্লাহ্র মাল দিয়ে আল্লাহ্র নাফরমানীর কাজে সাহায্য ও সহযোগিতা করা যেতে পারে না।
যে শাসক আল্লাহ্র মাল দিয়ে আল্লাহ্র পথেই বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়- সে পথ রুদ্ধ করে দেয়, আল্লাহ্র শরীয়াতকে অচল করে রাখে এবং আল্লাহ্র বিধানের দিকে আহ্বানকারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে মর্মান্তিকভাবে উৎপীড়ন দিয়ে জর্জরিত করে, তাদের হাতে যাকাত সঁপে দেয়ার কোন প্রশ্নই ওঠতে পারে না।
সমাজ সংস্কারক আল্লামা সাইয়্যেদ রশীদ রিজা (র) তাঁর তাফসীর ‘আল-মানার’ এ পর্যায়ে যা লিখেছেন, তা আমাকে চরমভাবে সন্তুষ্ট ও উদ্বুদ্ধ করেছে। তিনি লিখেছেন: ‘দারুল ইসলামে মুসলমানদের নেতা- যার হাতে যাকাত দিয়ে দেয়া যায়, সেই আসলে যাকাত সংগ্রহ ও তা পাওয়ার যোগ্য লোকদের মধ্যে বণ্টন করার অধিকারী। তার কাছে যাকাত দিতে অস্বীকারকারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা তার একান্ত কর্তব্য- ওয়াজিব।
কিন্তু এ যুগে বহু মুসলিম দেশেই ইসলামী হুকুম কায়েম নেই, যা ইসলামী দাওয়াতের দায়িত্ব পালন, ইসলামের ওপর আক্রমণ প্রতিরোধ এবং ফরযে আইন বা ফরযে কিফায়া পর্যায়ে জিহাদ করবে, আল্লাহ্র হদ্দসমূহ কায়েম করবে, ফরয যাকাত গ্রহণ করবে- যেমন তা ফরয করা হয়েছে এবং আল্লাহ্র নির্দিষ্ট ব্যয় খাতসমূহে তা ব্যয় করবে। বরং অধিকাংশ মুসলিম দেশই ফ্রান্সী শাসনের অধীন হয়ে পড়েছে। বহু দেশের শাসকগণ মুর্তাদ হয়ে গেছে, নাস্তিকতায় বিশ্বাস হয়ে গেছে। [আজকের মুসলিম দেশসমূহের অধিকাংশই এ ধরনের অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছে। ফ্রান্সী শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পর ধর্ম ও আদর্শহীন শাসকদের অধীন হয়ে পড়েছে।]
ফ্রান্সী রাষ্ট্রসমূহের অধীন ভৌগলিক নামের মুসলমানদের বহু নেতাকেই ফ্রান্সীরা ইসলামের নামে গোলাম বানাবার কাজে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। তাদের দ্বারাই ইসলামের খতম করানো হচ্ছে।
মুসলমানদের জন্যে কল্যাণময় কাজ ও যাকাত সাদকাত ওয়াক্ফ প্রভৃতি ধর্মীয় গুণ পরিচিতসম্পন্ন ধন-মালের ওপরও তারা হস্তক্ষেপ করতে শুরু করেছে এই মুসলিম নামধারী নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে। তাই এ ধরনের সরকারের হাতে যাকাতের একবিনদুও সোপর্দ করা কোনক্রমেই জায়েয হতে পারে না। তাদের উপাধি ও সরকারী পদ যা-ই হোক না কেন।
অন্যান্য যে সব ইসলামী হুকুমাতের নেতা, কর্তা ও প্রধানরা দ্বীন ইসলাম পালন করে চলে এবং সেখানকার ‘বায়তুলমালের ওপর বিদেশীদের কোন কর্তৃত্ব আধিপত্য নেই, সেসবের কাজে প্রকাশমান ধন-মালের যাকাত সঁপে দেয়া অবশ্য কর্তব্য। প্রচ্ছন্ন ধন-মাল-স্বর্ণ-রৌপ্য, নগদ সম্পদ ইত্যাদির যাকাতও তাদেরই দিতে হবে- যদি তারা তা দেবার জন্যে দাবি করে, যদিও তারা কোন কোন ক্ষেত্রে ও আইন বিধান জুলুমকারী হয়ে থাকে তবুও। যেমন ফিকাহ্বিদগণ বলেছৈন, তাদের হাতে যে লোক নিজের যাকাত সঁপে দেবে, তারা তা যথাস্থানে কুরআনী আয়াত দ্বারা নির্দিষ্ট খাতসমূহের ইনসাফ সহকারে ব্যয় না করলেও তা দিতে বাধ্য হবে।
বিশেষজ্ঞগণ এ বিষয়ে চূড়ান্ত কথা বলেছৈন, যেমন (****) প্রভৃতি কিতাবেবলা হয়েছে- রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রশাসক যদি জুলুমকারী হন, যাকাত তার শরীয়াতী বিধান অনুযায়ী নির্দিষ্ট খাতসমূহে ব্যয় না করে তাহলে উত্তম নীতি হচ্ছে,নিজ হস্তে পাওয়ার যোগ্য লোকদের মধ্যে ফরয যাকাত বন্টন করে দেযঅ- যদি রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা তাঁর কর্মচারীরা তা দেবার দাবি পেশ না করেন, তবে। [(আরবী **********)]
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
যাকাতের নিয়তের স্থান
যাকাত এক হিসেবে ইবাদত, আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের বড় মাধ্যম। কেননা তা ইসলামের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য, প্রতীক এবং ঈমানের তৃতীয় ভিত্তি। কুরআন মজীদ এবং রাসূলের সুন্নতের অসংখ্য স্থানে তা নামাযের সাথে মিলিত ও যুক্তভাবে উল্লিখিত। কিনতউ তা সত্ত্বেও তা একটি বিশেষ ধরনের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ও স্বতন্ত্র ইবাদত।
অপরদিক দিয়ে তা একটা নির্দিষ্ট কর, ধনীদের ধন-মালে ফকীর ও আল্লাহ্র কিতাবে উল্লিখিত সমস্ত পাওয়ার যোগ্য লোকদের জন্যে সুনির্দিষ্ট হক। তা এমন একটা কর, যা সংগ্রহ করা ও ব্যয় করার মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্য রাষ্ট্রের। যাদের ওপর তা ধার্য হয়, তারা স্বতস্ফূর্তভাবে তা না দিলে শক্তি প্রয়োগ করে তা আদায় করবে রাষ্ট্রশক্তি। এই অধিকার তাকে দেয়া হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তা একটা বিশেষ ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কর।
অর্থাৎ যাকাত এদিক দিয়ে ইবাদতের তাৎপর্যবহ কর এবং এমনএকটা কর যা ইবাদতের রূপ ও প্রকৃতির ধারক।
যাকাত এই দুই ভাবধারা সম্বলিত বলে তার প্রতি ফিকাহ্বিদদের দৃষ্টিবঙ্গিতে বেশ পার্থক্য পারিলক্ষিত হচ্ছে। তাঁদের কেউ কেউ যাকাতের প্রথম উল্লিখিত বিশেষত্বের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছেন এবং অপর কেউ কেউ এই দ্বিতীয় উক্ত বিশেষত্বকে অধিক মাত্রায় গুরুত্ব দিয়েছেন। কোন কোন আহকামের ক্ষেত্রে কতক ফিকাহ্বিদ দু’টি তাৎপর্যের একটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং অপর আহকামে হয়ত দ্বিতীয় তাৎপর্যটির ওপর লক্ষ্য আরোপ করেছেন তুলনামূলকভাবে বেশি।
এরূপ মতভেদের চেহারা দেখা যায় বালক, পাগল ও এ পর্যায়ের অন্যদের ধন-মালের যাকাত ফরয হওয়ার পর্যায়ে। যেমন ‘নিয়ত’ –ও যাকাতে তার স্থান বিষয়ে তা স্পষ্ট হয়ে দেখা দিয়েছে।
যাকাতের নিয়তের শর্তকরণ
যাকাত দেবার জন্যে নিয়তের কোন শর্ত আছে কি নেই?
সাধারণ ফিকাহ্বিদদের মত হচ্ছে, যাকাত আদায়ের নিয়তের শর্ত রয়েছে। কেননা তা একটি ইবাদত বিশেষ এবং কোন ইবাদতই নিয়ত ছাড়া আদায় হয় না। আল্লাহ তা’আলা বলেছেন:
(আরবী **********)
লোকদের শুধু এই নির্দেশই দেয়া হয়েছে যে, তারা আল্লাহ্র ইবাদত করবে, আনুগত্যকে একান্তভাবে তাঁরই জন্যে একনিষ্ট করে সবদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে এবং নামায কায়েম করবে ও যাকাত দেবে।
রাসূলে করীম (স) বলেছেন: ‘কাজসমূহ নিয়ত ভিত্তিক’। যদি নিয়ত না করে- ভুল ভ্রান্তির কারণে হলেও- কোন ইবাদত হবে না। কেননা ভুল-ভ্রান্তির কারণে নিয়ত না করা পমাণ করে যে, লোকটি মাল দিয়েছে বটে; কিন্তু ইবাদত পালনের ও আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের কোন নিয়ত করেনি।ত খন তা মৃতের কাজ হয়ে দাঁড়ায় কিংবা তা যেন একটা প্রাণহীন প্রতিকৃতিমাত্র। নিয়ত ওয়অজিব। হয় তাকে নিজেকেই তা করতে হবে, নতুবা করেতে হবে ধন-মালের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিকে। যেমন বালক, পাগল বা নির্বোধ ব্রীক্ত- যার মাল ব্যয়ের ক্ষমতা নেই তার প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তি নিয়ত করবে, তার বা সে যার প্রতিনিধিত্ব করছে তার ধন-মালে যা ফরয ধার্য হয়েছেতা-ই সে আদায় করছে। [***১]
বালকের বা পাগলের প্রতিনিধি (অভিভাবক) যদি সে দুজনের মালের যাকাত দেয় কোনরূপ নিয়ত ছাড়াই তাহলে তা যথাস্থানে পৌঁছবে না। তাকে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। [***২]
ইমাম আওজায়ীর মত এবং তার পর্যালোচনা
যাকাতের জন্যে নিয়তের শর্ত করার পর্যায়ে জমহুর ফিকাহ্বিদদের মতের বিরোধিতা করেছেন ইমাম আওজায়ী। বলেছৈন: তার জন্যে কোন নিয়তের প্রয়োজন নেই। কেননা তা ঋণ সমতুল্য। অন্যান্য ঋণ আদায়করণে যেমন নিয়তের প্রয়োজন হয় না, এই ঋণটি আদায়করণেও অনুরফভাবে কোন নিয়তের আবশ্যকতা নেই। নিয়ত ছাড়াই ইয়াতীম বালকের মালের যাকাত তার অভিভাবক দিবে এবং দিতে অস্বীকারকারীর কাছ থেকে শাসক তা জোরপূর্বক নিয়ে নেবে। [(আরবী **********)]
এ কথার প্রতিবাদ করেছেন ফিকাহ্বিদগণ এবং রাসূল (স)-এর উপরিউক্ত প্রখ্যাত হাদীসটি তার দলিলরূপে পেশ করেছেন: ‘আমলসমূহ নিয়ত অনুযায়ী মূল্য পায়।’ যাকাত আদায় করা একটা ‘আমল’। তা একটা ইবাদতও যা বারবার ফরযরূপে ধার্য হয়। তা যেমন ফরয হয়, তেমনি নফলও হয়। অতএব তা নামাযের মতই নিয়তের মুখাপেক্ষী। ঋণ প্রত্যর্পণ থেকে তা ভিন্ন প্রকৃতির। কেননা ঋণ প্রত্যর্পণ কোন ইবাদত নয়। তা পাওনাদার প্রত্যাহার করলেই প্রত্যাহৃত হয়ে যায়। কিন্তু যাকাত সেরূপ নয় তা যার ওপর ফরযরূপে ধার্য হয়, তার ওপর থেকে তা কেউ পত্যাহার করতে পারে না। কেননা ফকীর-দরিদ্র্যের জন্যে যে মাল ব্যয় করা হয়, তা কয়েক ধরনের হতে পারে। তা যাকাত হতে পারে, মানবত হতে পারে, কাফফারা ও নফল দানও হতে পারে। তাই ঠিক কোন ধরনের মাল তাদের দেয়া হচ্ছে তার নিয়ত করে তাতে পার্থক্য সৃষ্টি করতে হবে।
বালকের অভিভাবক ও প্রশাসক এই দুইজনও নিয়ত করবে প্রয়োজন দেখা দিলে।
কোন কোন মালিকী মতের আলিমও আওজায়ীর অনুরূপ মত পোষণ করেন। তা হচ্ছে, যাকাত নিয়তের মুখাপেক্ষী নয়। এ মতটি মালিকী মাযহাবের একটি বিরল মত। তাই গ্রহণ করে বলা হয়েছে, ফকীহগণ যাকাতরে মালের অংশীদার। এক অংশীদার অপর অংশীদারের হাত থেকে তার অংশটা নিয়ে নেবে, এতে নিয়তের কোন প্রয়োজন পড়ে না। গ্রহণকারীরও কোন নিয়তের প্রয়োজন হবে না, দাতারও নয়। উক্ত মাযহাবের লোকদের একটা কথা হচ্ছে: ‘যাকাত আদায় করতে অসম্মত ব্যক্তির কাছ থেকে তা জোরপূর্বক নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে দেয়া এবং তার ওপর জোর প্রয়োগ করে নিয়ে নেয়ার মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য রয়েছে।
তবে মালিকী মতের নির্ভরযোগ্য কথা হচ্ছে: ‘যাকাত আদায় হওয়ার নিয়তের শর্ত রয়েছে।’
দিতে অসম্মত ব্যক্তির কাছ থেকে জোরপূর্বক যাকাত গ্রহণ পর্যায়ে ইবনুল আরাবীর মত- যা পরে বলা হবে যাকাত আদায় হবে বটে, কিন্তু তার থেকে সওয়াব লাভ হবে না। [(আরবী **********)]
যাকাত পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তি যদি ধনীর ধন-মাল থেকে যাকাত পরিমাণ মাল চুরি করে নিয়ে যায়, তাতে কিন্তু যাকাত আদায় হবে না। কেননা এখানে যাকাত দেয়ার নিয়তের কোন অস্তিত্ব নেই। [(আরবী **********)]
যাকাতের নিয়ত অর্থ কি
‘নিয়ত’ বলতে বোঝায়- দাতা তার মনে এই বিশ্বাস স্থাপন করবে যে, এটা তার নিজেরধন-মালের যাকাত, অথচা যার পক্ষ থেকে সেদিচ্ছে তার ধন-মালের যাকাত, এই অভিভাবত্ব হয় বালক বা পাগলের ক্ষেত্রে। নিয়তের স্ফূরণক্ষেত্র হচ্ছে হৃদয়- সর্বপ্রকারের বিশ্বাস, ধারণা ও অনুভূতির উৎসই হচ্ছে এই হৃদয়। [দেখুন: (আরবী **********) শাফেয়ী মতের বক্তব্য হল, মুখের উচ্চারণ অন্তরে স্থলাভিষিক্ত হবে। যেমন (আরবী **********) তে বলা হয়েছে। (****) গ্রন্থে তা দাউদের মত বলা হয়েছে, তার কোন যৌক্তিকতা নেই. (আরবী **********)] হুকুম সংক্রান্ত নিয়তই যথেষ্ট, যেমন কোন কোন মালিকী ফিকাহ্বিদ স্পষ্ট করে বলেছেন। যখন একজন তার টাকা-পয়সা গণনা করল এবং তার ওপর যা ফরয রূপে ধার্য, সে তা বের করে দিল এবং এটা লক্ষ্য করল না যে, সে যা বের করল তার যাকাত। কিনতউ তাকে প্রশ্ন করা হলে সে নিশ্চয় বলবে। তা হলেই তার যাকাত হয়ে যাবে। [(আরবী **********)]
একটা দৃষ্টান্ত দেয়া যাক। যদি কারোর এ অভ্যাস থাকে যে, সে জায়দ নামের এক ব্যক্তিকে প্রতি বছর কিছু টাকা দিয়ে থাকে। যখন সে তাকে দিল, দেয়ার পর সে নিয়ত করল যে, সে যাকাত দিয়েছে এবং জায়দ যাকাত পাওয়ার যোগ্য, তাহলে তার যাকাত আদায় হবে না কেননা এখানে প্রকৃত বা হুকুম পর্যায়ের কোন নিয়ত পাওয়া যায়নি। [(আরবী **********)]
বস্তুত এ নিয়তই হচ্ছে ইবাদত ও আল্লাহ্র নৈকট্য প্রভৃতি পর্যায়ের কাজসমূহের মধ্যে পার্থক্যকারী। আর জমহুর ফিকাহ্বিদগণ যাকাতে এই নিয়তের শর্ত আরোপ করেছেন। আল্লাহ্র কাছে তা নিয়ত ছাড়া গৃহীত হবে না। এ থেকেই যাকাতের ইবাদতের দিকটি আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রশাসকের যাকাত গ্রহণ অবস্থায় নিয়ত
প্রশাসক যখন যাকাত গ্রহণ করবে- সম্পদের তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেবে কিংবা দিতে অসম্মত হওয়ার কাণে তার কাছ থেকে জোরপূর্বক নেবে- এ উভয় অবস্থায় নিয়তের ব্যাপারটি কিরূপ হবে? প্রশাসকের নিয়তই সম্পদের মালিকের নিয়তের স্থলাভিষিক্ত হবে, কি হবে না? সর্বাবস্থায়ই কি যাকাত আদায় হয়ে যাবে, না কোন কোন অবস্থায় আদায় হবে? আর যখন আদায় হবে, তখন কি শুধু বাহ্যিকভাবে আদায় হল, না বাহ্যিক ও প্রকৃত উভয়রূপেই তা আদায় হয়ে যাবে?
অধিকাংশ ফিকাহ্বিদদের মত হচ্ছে, ইচ্ছামূলক ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেয়া কালে প্রশাসকের নিয়ত সম্পদের মালিকের নিয়তের স্থলাভিষিক্ত হবে না- মতার নিয়তই যথেষ্ট হবে না। ইমাম শাফেয়ীর মতে সে নিয়ত যথেস্ট হওয়ার পক্ষে। এমনকি প্রশাসক যদি কোন নিয়ত নাও করে, তবুও। (***) গ্রন্থে লিখিত ভাষ্যের এটাই বাহ্যিক কথা। আর অপর মতটি হচ্ছে- না, সে নিয়ত যথেষ্ট হবে না। কেননা প্রশাসক হচ্ছে গরীব-মিসকীনের প্রতিনিধি। সম্পদের মালিক যদি মিসকীনকে যাকাত দেয় কোনরূপ নিয়ত ছাড়াই, তা হলে তা গৃহীত হবে না। তাদের প্রতিনিধির অবস্থাও অনুরূপ। [নববী (****) গ্রন্থে লিখেছেন: এ দ্বিতীয় মতটি কাযী আবূ তাইয়্যেবের নিকট গ্রহণীয়, সহীহতম এবং তাহজীব ও ‘আল-মুহাজ্জাব’ গ্রন্থ প্রণেতাদ্বয় ও শেষকালের জমহুর ফিকাহ্বিদের কাছে। তাঁরা শাফেয়ীর কথা: দিতে অসম্মত ব্যক্তির জন্যে প্রযোজ্য মনে করেছেন। যা গ্রহণ করা হয়েছে, তা কবুল হবে নিয়ত না হলেও। কিন্তু (****) গ্রন্থে লিখেছেন: তা কবুল হবে ইচ্ছা করে দিক বা অনিচ্ছাসহ। (আরবী **********)]
নববী বলেছেন:
‘যাকাত দিতে অস্বীকারকারীরকাছ থেকে জোরপূর্বক গ্রহণকালেযদি সে তার নিয়ত করে, তাহলে বাহ্যিক ও প্রকৃত উভয়দিক দিয়েই তার দায়িত্ব পালিত হল। রাষ্ট্রপ্রধানের নিয়ত করার কোন প্রয়েঅজন পড়বে না। নতুবা রাষ্ট্রপ্রধান নিয়ত করলেও বাহ্যত যথেষ্ট হবে। দ্বিতীযবার তার কাছে দাবি করা যাবে না। আসলেও- প্রকৃতপক্ষেও কি তা আদায় হয়ে গেল? এর দুটি জবাব আছে। সহীহ্তম জবাব হল হ্যাঁ, যথেস্ট হবে। যেমন বালকের অভিভাবক নিয়ত করলে হয়ে যাবে- তার নিয়ত তার নিয়তের স্থলাভিষিক্ত হবে। আর রাষ্ট্রপ্রধান নিয়ত না করলে প্রকৃতপক্ষে ফরয আদায় হবে না কস্মিনকালেও। সহীহতম কথাই বাহ্যত তা হবে না। মাযহাব হচ্ছে, রাষ্ট্রপ্রধানের ওপর নিয়ত করা ফরয, তার এই নিয়ত সম্পদের মালিকের নিয়তের স্থলাভিষিক্ত হবে। অপর একটি মতে বলা হয়েছে, ফরয নয়, যেন সম্পদের মালিক একটি ইবাদতের কাজকে এত সহজ মনে করে না বসে। [(আরবী **********)]
ইবনে কুদামাহ্ তাঁর আল-মুগ্নী গ্রন্থে লিখেছেন:
‘রাষ্ট্রপ্রধান যদি জোরপূর্বক যাকাত নিয়ে নেন, তাহলে নিয়ত না হলেও চলবে। কেননা মালিকের পক্ষে নিয়ত করা দুষ্কর হওয়া তা আর তার ওপর ওয়াজিব থাকল না- এটা ইমাম শাফেয়ীর মত। কেননা রাষ্ট্রপ্রধানের গ্রহণটা দুই অংশীদারের মধ্যে সম্পদ বন্টন করার পর্যায়ে গণ্য। তাই নিয়তের অপেক্ষায় থাকা হবে না। আরও এজন্যে যে, রাষ্ট্রপ্রধানের অধিকার রয়েছে তা গ্রহণ করার। এজন্যে তিনি দিতে অসম্মত ব্যক্তির কাছ থেকে নিয়ে নিতে পারেন। যদি তাতে যাকাত আদায় না হয়ে যেত, তাহলে তিনি নিতেন না, হাম্বলী মতের আবূ খাত্তাব ইবনে আকীল এ মত গ্রহণ করেছেন যে, ব্যপারটি বান্দাহ ও আল্লাহ্ তা’আলার পারস্পরিক- তাতে মালের মালিকের নিয়ত ছাড়া যাকাত আদায় হতে পারে না। কেননা রাষ্ট্রপ্রধান হয় সেই মালিকের প্রতিনিধি নতুবা প্রতিনিধি গরীব লোকদের অথবা এক সাথে দুই জনেরই। যারই প্রতিনিধি হোক, তার নিয়ত কখনই মালের মালিকের নিয়তের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না। আও এ কারণে যে, যাকাত হচ্ছে একটা ইবাদত। আর ইবাদত মাত্রেই নিয়ত অপরিহার্য। তাই যার ওপর সে ইবাদত ফরয, তার নিজের নিয়ত ভিন্ন তা আদায় হতে পারবে না- যদি সে নিয়ত করার যোগ্য ব্যক্তি হয়ে থাকে। যেমন নামায। যাকাত আদায় হবে না, তা সত্ত্বেও তার কাছ থেকে তা নেয়া হবে শরীয়াতের বাহ্যিক দিকটা রক্ষার উদ্দেশ্যে। যেমন নামায পড়তে জোরপূর্বক হলেও বাধ্য করা হবে- অন্তত বাহ্যিক রূপটা বজায় থাক এ উদ্দেশ্যে। এখন নামাযী যদি নিয়ত ছাড়াই নামায পড়ে, তাহলে আল্লাহ্র কাছে তা গ্রাহ্য হবে না।
ইবনে আকীল বলেছেন, ফিকাহ্বিদদের কথা যথেস্ট হবে বা আদায় হয়ে যাবে।’ অর্থাৎ বাহ্যত, তার অর্থ: তা দ্বিতীয়বার দিতে বলা হবে না- বলা যাবে না। যেমন আমরা ইসলামের এই নিয়মের কথা বলেছি যে, মুর্তাদ হয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে ঈমানের শাহাদত দিতে বলা হবে। যদি সে ঈমানের সাক্ষ্য দেয়, তাহলে বাহ্যত তার মুসলিম হওয়ার কথা স্বীকার করে নেয়া হবে। কিন্তু সে যা উচ্চারণ করছে, তার সত্যতার প্রতি যদি সে বিশ্বাসী না হয়। তাহলে আসলে ও প্রকৃতপক্ষে তার ইসলাম গ্রহণীয় হবে না অর্থাৎ আল্লাহর কাছে তাও গ্রহ্য হবে না। [(আরবী**********)]
মালিকী মতের কার্য ইবনুল আরাবীও এ কথা বলেছেনঃ ‘যাকাত জোর পূর্বক নেয়া হলে আদায় হবে বটে; কিন্তু তাতে কোন সওয়াব হবে না। [(আরবী*******) গ্রন্থে বলা হয়েছেঃ দিতে অসম্মত ব্যক্তির কাছ থেকে যাকাত নিতে হলে রাষ্ট্রপ্রধানের নিয়তই যথেষ্ট হবে- এটা সহীহ মত।]
দলিরসমূহের ভিত্তিতে এ মতটি বের করা যাকাতের প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যথার্থতা ও সঠিকতার অতি নিকটবর্তী। তাই রাষ্ট্রকর্তার যাকাত গ্রহণ মালের মালিকের নিয়ত ছাড়াই নিছক আইনের দিক দিয়ে ফরয আদায়ের জন্যে যথেষ্ট হবে- এ অর্থে যে, তাকে পুনরায় তা দিতে বলা হবে না।
কিন্তু তাতে আল্লাহর নিকট সওয়াব পাওয়ার দিক দিয়ে একান্তই জরুরী হচ্ছে মালের মালিক নিয়ত করতে সমর্থ হলে তাকে অবশ্যই স্পষ্টরূপে নিয়ত করতে হবে। কেননা নিয়ত ছাড়া যে ‘আমল’ তা প্রাণহীন দেহাবয়ব মাত্র। (‘নিয়তই হচ্ছে আমলের রূপকার’ কথাটির যথার্থতা স্বীকার্য।)
হানাফী মতে ফতোয়া দেয়া হয়েছে এ কথার ওপর যে, যার ওপর যাকাতর ফরয, সরকারী আদায়কারী যদি তার কাছ তা জোরপূর্বক নিয়ে নেয়, তাহলে তার ফরয আদায় হল- প্রকাশমান মালে ধার্য ফরয তার ওপর অনাদায় থেকে যাবে না। কেননা তার তো তা নেয়ার কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা বা অধিকার রয়েছ। কিন্তু অপ্রকাশমান মালের ক্ষেত্রে এই ফরয অবশিষ্ট থাকে যাবে। (আরবী********)
যাকাতে নিয়তের সময়
যাকাতের জন্যে যখন নিয়ত শর্ত, কখন প্রশ্ন হচ্ছে এ নিয়ত কখন করতে হবে?
হানাফীদের বলিষ্ঠ কথা হচ্ছে, নিয়তটা দেয়ার সাথে সময়ের দিক দিয়ে নিকটবর্তী ও ঘনিষ্ঠতম হতে হবে। আর ‘আদায়’ বা ‘দেয়ার ’ অর্থ হচ্ছে, ফকীরকে যা রাষ্ট্রপ্রধানের কছে দিয়ে দেয়া- হস্তান্তর করা। রাষ্ট্রপ্রধান ‘ফকীরদের প্রতিনিধি। সময়ের ঘনিষ্ঠতার শর্ত করা হয়েছে এজন্যে যে, নিয়তটাই তো আসল। অপরাপর ইবাদতের অনুষ্ঠানেও এই কথা।
যাকাত আদায়ের জন্যে মোটামুটি নিকটবর্তীতা বা ঘনিষ্ঠতা হওয়াই যথেষ্ট। যেমন , নিয়ত ছাড়াই দিয়ে দিল, পরে নিয়ত করল, পরে প্রতিনিধি দিল নিয়ত ছাড়াই অথবা কোন যিম্মীর হাতে দিল ফকীরদের দেবার জন্যে, তাহলে তা জায়েয হবে। কেননা মূলত আদেশদাতার নিয়তটাই গণ্য।
যাকাত আদায়ের জন্যে মোটামুটি নিকটবর্তীতা বা ঘনিষ্ঠতা হওয়াই যথেষ্ট। যেমন, নিয়ম ছাড়াই দিয়ে দিল, পরে নিয়ত করল যখন যাকাতের মালটা ফকীরের হাতে রয়েছে অথবা প্রতিনিধিকে দেয়ার সময় নিয়ত করল, পরে প্রতিনিধি দিল নিয়ত ছাড়াই। অথবা কোন যিম্মীর হাতে দিল ফকীরদের দেবার জন্যে, তাহলে তা জায়েয হবে। কেননা মূলত আদেশদাতার নিয়তটাই গণ্য।
যেমন সমস্ত মাল থেকে যাকাতের ফরয পরিমাণ আলাদা করার সাথে নিয়তের ঘনিষ্ঠতা বা নিকটবর্তীতা হলেও যথেষ্ট হবে, যদিও তা আসলের বিপরীত। কেননা পাওয়ার যোগ্য লোকদের দিয়ে দেয়া বিচ্ছিন্নভাবে হয়। এজন্যে প্রত্যেকবার দেয়ার সময় নিয়তকে উপস্থিত রাখা দুরূহ ব্যাপার। তাই মূল আলাদা করা কালীন নিয়তই যথেষ্ট হবে- অসুবাধাটা দূর করার জন্যেই এ ব্যবস্থা। কিন্তু কেবল আলাদা করার দ্বারাই দায়িত্ব মুক্ত হয়ে যাবে না। দায়িত্বমুক্ত হবে ফকীরদের হাতে পৌঁছানোর পর।
কেউ যদি তার সমস্ত ধন-মাল দান করে দেয়, তাহলে তার ওপর যাকাত ফরয থকাবে না। যদি সে কার্যত নিয়ত যাকাতরেই করল অথবা আসলে কোন নিয়তই করল না। কেননা ফরযটা ধার্য এক অংশের ওপর। অথচ সে সমস্তটাই আল্লাহর ওয়াস্তে দান করে দিয়েছে। নিয়তটা শর্ত ছিল প্রতিবন্ধক দূর করার উদ্দেশ্যে। সে যখন সবটাই দিয়ে ফেলল, তখন প্রতিবন্ধক বলতে কিছুই থাকল না। [আরবী*********]
মালিকী ফিকাহ মতে যাকাতের মাল আলাদা করা কালে এবং পাওয়ার যোগ্য লোকদেরকে দিয়ে দেয়ার সময়ই নিয়ত করা কর্তব্য। তা কোন সময় হলেও তা যথেষ্ট হবে। কিন্তু আলাদাকরণ বা দিয়ে দেয়া কোন সময়ই যদি নিয়ত করা না হয়- নিয়ত করল পরে কিংবা এ উভয় সময়েরই পূর্বে, তাহলে তা গ্রহণীয় হবে না। [আরবী*********]
শাফেয়ী ফিকাহর দুটি বক্তব্য যাকাত বিতরণের পূর্বে নিয়ত করা পর্যায়ে। সহীহতম কথা হচ্ছে, যেমন নববী বলেছেন- আদায় হবে, যথেষ্ট হবে। কেননা দুটি কাজকে এক সঙ্গে করা ওয়াজিব করা হলে খুবই কষ্টকর হত। আরও এজন্যে যে, আসলে উদ্দেশ্য তো ফকীরের দারিদ্র্য দুর করা। এ কারনে মালের মালিক তার প্রতিনিধির কাছে হস্তান্তর করা কালে নিয়ত করলেই যথেষ্ট হবে। আর দ্বিতীয় বক্তব্য, মিসকীনদের মধ্যে যাকাত বন্টনকালে প্রতিনিধির নিয়ত করা জরুরী শর্ত। তাঁরা বলেছেনঃ কেউ যদি প্রতিনিধি নিযুক্ত করে এবং নিয়ত করার দায়িত্বও তারই ওপর অর্পণ করে, তাহলে তাও জায়েয হবে। [আরবী ********]
হাম্বলী মাযহাবের লোকদের মত- ‘আল-মুগনী’ গ্রন্থে লিখিত হয়েছেঃ যাকাত আদায় কারা সামান্য পূর্বে নিয়ত করা হলে তাও চলবে, যেমন সমস্ত প্রকারের ইবাদতে হয়ে থাকে। আর যেহেতু এ ইবাদতটিাকে প্রতিনিধিত্ব বলে, তাই যাকাত বের করার সাথে নিয়তের ঘনিষ্ঠতা ও নিকটবর্তিতা তার মাল নিয়ে প্রলুব্ধকরণ পর্যন্ত পৌঁছে দেবে।
সময়ের নিকটবর্তীতা ঘটানোর ক্ষেত্রে এ সহজতা মেনে নেয়া সত্ত্বেও অপর দিকটিতে খুব বেশি কঠোরতা আরোপ করেছেন। তাই ‘আল-মুগনী’ গ্রন্থে বলা হয়েছেঃ যাকাত কেউ তার প্রতিনিধির কাছে দিয়ে দিলে এবং প্রতিনিধি ছাড়াই সে নিজে নিয়ত করলে জায়েয হবে, যদি তার নিয়ত দেয়ার বহু পূর্বে না হয়ে থাকে। খুব দীর্ঘ সময় পূ্েব হরে জায়েয হবে না। তাবে প্রতিনিধির কাছে দেয়ার সময় নিয়ত করলে ভিন্ন কথা। কখন প্রতিনিধি পাওয়ার যোগ্য লোকদের কাছে দেয়ার সময় নিয়ত করবে।
কেউ যদি তার সমস্ত মাল ইচ্ছা করে দান করে দেয় এবং এর দ্বারা যাকাত আদায় করার নিয়ত না করে তাহলে যাকাত আদায় হবে না। কেননা সে তো ফরয আদায় করার নিয়ত করেনি। যেমন কেউ যদি একশ’ রাকায়াত নাময পড়ে, কিন্তু তাতে ফরয আদায়ের নিয়ত না করে, তাহলে ফরয নাময আদায় হবে না। শাফিয়ীও এ কথা বলেছেন। [আরবী **********]
এ সমস্ত অবস্থায় আমি পসন্দ করি, সহজতা বিধান এবং আদায় হয়ে যাওয়ার কথা, কবুল হওয়ার কথা। আর মুসলমানের যাকাত বের করার সাধারণ নিয়ত থাকাটাই যথেষ্ট।
যাকাতের মূল্য প্রদান
মূল্য প্রদানে ফিকাহবিদদের বিভিন্ন মত
কারোর ছাগপালের মধ্যে একটি ছাগী যদি যাকাত বাবদ দেয়, সাবস্ত্য হয় কিংবা কারোর উটের পাল থেকে একটি উষ্টী অথবা এ ‘আরদব’ গম, ফলের এক কান্তার যাকাত বাবদ দেয়া হয়, তাহলে একথা কি চূড়ান্ত যে, তাকে মূল এ জিনিসগুলোই দিয়ে দিতে হবে। কিংবা মূল এ জিনিসগুলো দেয়া ও তার নগদ মূল্যটা দেয়ার মধ্যে তাকে কোন স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে? … এবং মূল্য দিয়ে দিলেও তা যথেষ্ট হবে ও তার যাকাত যথার্থভাবে আদায় হয়ে যাবে?
ফিকাহবিদগণ এ ব্যাপারে বিভিন্ন কথা বলেছিন। কেউ কেউ তা নিষেধ করেছেন, কেউ কেউ বলেছেন, কোনরূপ দ্বিধা-কুণ্ঠা ছাড়াই তা জায়েয হবে। আবার কারোর কারোর মতে তা জায়েয হলেও মাকরুহ। অন্যান্য কিছু লোকের মত হচ্ছে, তা কোন কোন অবস্থায় জায়েয আবার কোন কোন অবস্থাতে জায়েয হবে না।
মূল্য দেয়া নিষিদ্ধাকরণে সবচাইতে বেশি কঠোরতা অবলম্বনকারী হচ্ছেন শাফেয়ী ও জহিরী মতের ফিকাহবিদগণ। হানাফীরা বিপরীত মতের ধারক। তাঁরা বলেছেন যে, সর্বাবস্থাতেই যাকাত জিনিসের মূল্য দেয়া জায়েয। মালিকী ও হাম্বালী মতের বহু কয়টি বর্ণনা ও কথা রয়েছে।
(আরবী **********) গন্থে বলা হয়েছে, যাকাত জিনিসের মূল্য প্রদান যথেষ্ট হবে না।
ইবনুল জায়েব ও ইবনে বশীরও এ কথাই গ্রহণ করেছেন। (আরবী*******) গ্রন্থে এর ওপর আপত্তি পেশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, (আরবী********) গ্রন্থে এর বিপরীত কথা বলা হয়েছে। তার প্রসিদ্ধ কথা হচ্ছে, মূল্য দেয়া যেতে পারে বটে- দেয়া হারাম নয়, তবে মাকরূহ। [(আবরী***********) গ্রন্থে বলা হয়েছে, যে জিনিস যাকাত বাবদ দেয়, সে বাবদ কোন অস্থায়ী বা খাদ্য ধরনের জিনিস দেয়া যাবে না। কারোর নিজের দেয় যাকাত জিনিস খরিদ করা মাকরূহ। তাকে যাকাত ক্রয়ের মধ্যে গণ্য করা হয়েছে এবং তা মাকরূহ। ইবনে আবদুস সালামও একথা বলেছেন। ‘বাজী’ বলেছেনঃ (আরবী *******) ও অন্যান্য গন্থের বাহ্যিকভাবে বক্তব্য হচ্ছে, এ কাজটি যাকাত ক্রয় পর্যায়ের। আর এ সম্পর্কে প্রসিদ্ধ কথা হচ্ছে, তা মাকরূহ- হরাম নয়। মালিকী মাযহাবের কেউ কেউ বলেছেন, ফিকাহবিদদের প্রকাশ্য কথা হচ্ছে, ‘তাওজীহ’ ও ইবনে আবদুস সালাম যা বলেছেন, তাই অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। ইবনে রুশদও এ কথাই গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেছেন, সকল মতের মধ্যে ‘জায়েয’ হওয়ার মতটাই অধিক ভাল। ইবনে ইউনুসও এ কথাকে যথার্থ বলেছেন। যাকাতের মূল্য দেয়া পর্যয়ে অনেক বিস্তারিত ও পার্থাক্যমূলক কথা রয়েছে। কোন কোন মালিকী মতের ফিকাহবিদ তা এককভাবে বলেছেন। দরদীরও তার উল্লেখ করেছেন। তা হচ্ছে, কৃষি ফসল বা পশুর যাকাত জিনিসের মূল্য দেয়া জায়েয মাকরুহসহ, কিন্তু এ দুটোর পরিবর্তে কোন অস্থায়ী জিনিস দেয়া কিংবা আসলের স্থালে অন্য কৃষি ফসল বা পশু দিয়ে দেয়া জায়েয হবে না। দেখুনঃ (আরবী************)
ইবনে নাজী রচিত [আরবী ************] (আরবী **************) গন্থে আশহুব ও ইবনুল কাশেমের এ মত উদ্ধৃত হয়েছে যে, মূল্য প্রদান মোটামুটি জায়েয। কেউ কেউ বিপরীত কথাও বলেছেন।
(আরবী *********) গন্থে বলা হয়েছে, যাকাত আদায়কারী যাকাতের মূল্য গ্রহণে কাউকে বাধ্য করলে তার যাকাত আদায় হয়ে গেছে আশা করা যায়, বড় বড় ফিকাহবিদগ বলেছেনঃ তা এজন্যে যে, সে প্রশাসক এবং প্রশাসকের হুকুম সকল বিরোধ দূর করে। [ দেখুন আরবী **********]
হাম্বলদের মত বলে ‘আল-মুগনী’ গন্থে বলা হয়েছেঃ ইমাম আহমদের বাহ্যিক মত হচ্ছে, কোন যাকাতের জিনিসেরই মূল্য দেয়া গ্রহণযোগ্য হবে না। ফিতারায় যাকাতও নয়। মালের যাকাতও নয়। কেননা তা সুন্নাতের পরিপন্থী।
ইমাম আহমাদ থেকে বর্ণিত একটি কথা হচ্ছে, ফিতরার যাকাত ছাড়া অন্য সর্বক্ষেত্রে মূল্য প্রদান জায়েয। আবূ দাউদ বলেছেন, ইমাম আহমাদকে প্রশ্ন করা হয়েছেল, এক ব্যক্তি তার বাগানের ফল বিক্রয় করে দিয়েছে, সে কি করে যাকাত কেবে? বললেন, যার কাছে বিক্রয় করা হয়েছে, তার ওপর ধার্য করা হবে। বলা হল তাহলে কি খেজুর দেবে, না তার মূল্য? বললেন, সে ইচ্ছা কররে ফলও দিতে পারে, ইচ্ছা করলে তার মূল্যও দিতে পারে। মূল্য দেয়া জায়েয হওয়ার এটা একটি দলিল। [আরবী***********]
ফিতরার যাকাত পর্যায়ে খুব কঠোরতা দেখিয়েছেন। বলেছেন, তার মূল্য দেয়া জায়েয হবে না। যারা উমর ইবনে আবদুল আজীজের কাজকে দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ জানিয়েছেন। [আরবী***********] এ বিষয়ে আমরা চতুর্থ অধ্যায় আলোচনা করব।

About শিবির অনলাইন লাইব্রেরী