ইসলামের যাকাত বিধান – ২য় খন্ড

পার্থক্য সমস্যা
সাময়িস বা আবর্তনশীল সহায্য দিয়ে কেবল দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাই যাকাতের একমাত্র ও চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। মালিকানা নীতির ব্যাক্তি ও প্রশস্তি বিধান, সম্পদের মালিক ধনী লোকদের সংখ্যা বৃদ্ধি, ধনী লোকদের প্রতি মুখাপেক্ষী দরিদ্র জনগণের মধ্যে এমন বিপুল সংখ্যক লোক গড়ে তোলা-যারা সারা জীবনের জন্যে যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হবে- ইত্যাদিও যাকাতের লক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত।
তা এভাবে যে, যাকাতের লক্ষ্য হচ্ছে দরিদ্র ব্যক্তিকে ধনী ও সচ্ছল বানানো-যাকাত বাবদ লব্ধ যতটা সংকুলান হয় এবং তাকে অভাবের পরিমান্ডল থেকে বহিষ্কৃত করে স্থায়ী সচ্ছলতার দিকে নিয়ে যাওয়া। আর তা হবে প্রত্যেক অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিকে তার প্রয়োজনীয় ও যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক বানানোর দ্বারা। যেমন ব্যবসায়ী ব্যবসায় এবং তৎসংশ্লিষ্ট দ্রব্যাদির মালিক হয়। কৃষক একখন্ড ভূমি ও তৎসংশ্লিষ্ট অন্যান্য জিনিসের মালিক হয়। কোন পেশার লোক মালিক হয় তার পেশার কাজের জন্য প্রয়োজনীয় হাতিয়ার ও যন্ত্রপাতি-অনুরূপ অন্যান্য জিনিসের। যাকাতের ব্যয়খাত সংক্রান্ত আলোজনায় আমরা এ পর্যায়ে স্পষ্ট কথা বলে এসেছি। [‘ফকীর-মিসকীনকে কত দেয়া হবে, চতুর্থ অধ্যায় প্রথম পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।] এভাবেই যাকাত তার বিরাট লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করে। আর তা হচ্ছে নিঃস্ব লোকদের সংখ্যা কমানো এবং মালিক শ্রেণীর লোকদের সংখ্যা বৃদ্ধিকরণ।
সমাজ ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে এটাই হচ্ছে ইসলামের অন্যতম ও বড় লক্ষ্য- যে জনগণ এ পৃথিবীতে আল্লাহ্র সৃষ্ট যাবতীয় কল্যাণ ও সুখশান্তিমূলক দ্রব্যাদি ও উপায়-উপকরণ সমানভাবে অংশ গ্রহণের সুযোগ পারে; সেগুলো কেবলমাত্র ধনী শ্রেণীর লোকদের মধ্যেই সীমিতভাবে আবর্তিত হতে থাকবে না- যার ফলে অন্যান্য লোক সে সব থেকে বঞ্চিত হতে পারে। বরং তা নির্বিশেষে সকলের মধ্যেই আবর্তিত হতে থাকবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেনঃ
(আরবী************)
তিনি সেই সওা যিনি তোমাদের সমস্ত লোকের জন্যে পৃথিবীর সব কিছু সৃষ্টি করেছেন। [(আরবী************)]
আয়াতের (আরবী************) ‘সমস্ত লোক’ শব্দটি পৃথিবীর সব কিছুর তাগিদস্বরূপ বলা হয়েছে মনে করা সহীহ। তাতে যাদের সম্বোধন করা হয়েছে সে সমস্ত মানুষ বোঝাবার ওপর গুরুত্বারোপও বোঝাতে পারে। আর এক সাথে উভয় অর্থ বোঝাতে চাইলেও কোন প্রতিবন্ধকতা নেই। এ পেক্ষিতে অর্থ হবেঃ পৃথিবীর বুকে যা কিছু আছে তা সবই সৃষ্ট হয়েছে সমস্ত মানুষের জন্যে, অল্প সংখ্যক লোকেরা অন্যদের বঞ্চিত করে তা নিরংকশভাবে আয়ওাধীন করে নেবে এজন্যে নয়।
এ পরিপ্রেক্ষিতেই ইসলাম সুবিচারপূর্ণ বণ্টনের নীতি গ্রহণ করেছে। সমষ্টির ধন-মালে মালিকত্ব অভিন্ন হবে। ইসলাম এক্ষেত্রে ভারসাম্য কার্যকর করার জন্যে যাকাত, ফাই প্রভৃতি ব্যবস্থা অবলম্বন করেছে। তাতে মানুষ পরস্পরের সমান মনে এসে যায়। ‘ফাই’ বণ্টন সংক্রন্ত আয়াতে কুরআন মজীদে তা স্পষ্ট ভাষায় বলে দেয়া হয়েছে। বলেছেনঃ
(আরবী************)
আল্লাহ তাঁর রাসূলকে নগরবাসীদের কাছ থেকে যা কিছুই দিয়েছেন, তা আল্লাহ্র জন্যে এবং রাসূলের নিকটাত্মীয়দের, ইয়াতীম, মিসকীন ও নিঃস্ব পথিকের জন্যে-যেন তা কেবল তোমাদের মধ্যকার ধনী লোকদের মধ্যেই আবর্তিত হতে না থাকে। [(আরবী************)]
ইসলাম জীবিকা ও রুটি রুজির দিক দিয়ে বিভিন্ন মানুষের মধ্যে পার্থক্য স্বীকার করেছে। কেননা তা যে জন্মগত কর্মক্ষমত্, শক্তি-সামর্থ্য, প্রতিভা ও বুদ্ধিসওার দিক দিয়ে বিভিন্ন মানুষের মধ্যে নিহিত পার্থক্যের ফলশ্রুতি, তাতে কোনই সন্দেহ নেই। সে সাথে একথাও স্বীকার্য যে, এ পার্থক্য কমবেশী হওয়ার অর্থ এ নয় যে, ইসলাম ধনীদের ধন বৃদ্ধির কাজ করবে এবং দরিদ্রদের তিল তিল করে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার জন্যে ছেড়ে দেবে, যার ফলে উভয় শ্রেণীর মধ্যে পার্থক্যটা অধিকতর বৃদ্ধি পেয়ে যাবে, ধনীরা সমাজে এমন শ্রেণী হয়ে দাঁড়াবে যার জন্যে লিখে দেয়া হবে যে; তারা গজদন্ডের উচ্চ শিখরে বসবাস করবে, সর্বপ্রকারের যে ধনসম্পদ ও নিয়ামরেত উওরাধিকারী কেবল তারা হবে আর দরিদ্র লোকেরা এমন একটা শ্রেণী হয়ে বসবে, পর্ণকুটিরে থেকে নিঃস্বতা ও বঞ্চনার আঘাতে মৃত্যুবরণ করাই হবে যাদের একমাত্র ভাগ্যলিপি।……না, ইসলাম এরূপ অবস্থায় পক্ষপাতী নয়।
বরঞ্চ ইসলাম আইন বিধান রচনা ও বাস্তব সংগঠন গড়ে তোলার মাধ্যমে এজন্যে কাজ শূরু করেছে। তার উপদেশ, উৎসাহ দান ও পরিণতি সম্পর্কে সাবধানকরণকেও এজন্যে কাজে লাগিয়েছে। সমাজের এ উভয় শ্রেণীর লোকদের মধ্যকার পার্থক্য দূরত্ব হ্রাস করাই ইসলামের লক্ষ্য। এজন্যে ধনীদের অত্যাচারে-উৎপীড়ন ও শোষণের সীমা নির্ধারণ এবং দরিদ্রদেরকে সমান মানে উচ্চে উওোলনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
এ পর্যয়ে ইসলাম গৃহীত উপায় ও পন্থাসমূহ সম্পর্কে আমি খুব বেশী কিছু বলতে চাই না। সে সবের মধ্যে যাকাত যে একটা স্পষ্ট ও প্রধান উপায়, সে পর্যায়ে আমি পরে বিস্তারিত কথা বলব। কেননা তাতো ধনীদের কাছ থেকে নেয়া হয় এবং দরিদ্রের দেয়া হয়।
আমরা যখন সুষ্ঠু সহীহ্ ইসলামী সমাজের চিন্তা করি, দেখতে পাই তার ব্যক্তিগণ নিখুঁতভাবে কাজ করেছে ইসলামের আহ্বানের সাড়া দিয়ে। জমিনের পরতে পরতে গমন করছে, তার অভ্যন্তরে নিহিত কন্দর থেকে রিযিকের সন্ধান করছে, তা বের করে নিয়ে আসছে বাইরের জগতে। চতুর্দিকে কৃষি কাজ ও শিল্পোৎপাদন ছড়িয়ে বাড়িয়ে দিচ্ছে, ব্যবসায়ী হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে এক দিগন্ত থেকে অন্য দিগন্তে। বহু ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা কর্মতৎপর হয়ে রয়েছে। নানা পেশায় মানুষ ব্যতিব্যস্ত, সর্বশক্তি নিয়োগ দিয়েছেন, সর্বশক্তি দিয়ে তার কল্যাণ গ্রহণ করছে। এ ধরনের একটি সমাজের চিত্র যখন আমাদের সম্মুখে ভেসে ওঠে তখন দেখতে পাই অসংখ্য মানুষ এমন সক্ষম, যাদের ওপর যাকাত ফরয হতে পারে তাদের ধন-সম্পদে, তাদের আয়ে উৎপন্ন।
হারটা নিশ্চয়ই খুব বড় হবে এবং এ শ্রেণীর লোকদের সংখ্যা অনেক বেশী হবে।
তথায় এমন লোকও বিরল হবে না, যারা অক্ষমতার দরুন কাজ থেকে দূরে বসে থাকবে অথবা পরিবারের লোকসংখ্যা বিপুল ও আয়ের মাত্রা কম হওয়ার দরুন খুবই অসচ্ছলতার মধ্যে দিনাতিপাত করবে।
কিন্তু তাদের সংখ্যা খুব বেশী হবে না। যতই হোক, সংখ্যাটা অবশ্যই সীমিত হবে।
তার ফলে এখানে যাকাত বাবদ লব্ধ সম্পদের তুলনায় প্রাপকদের প্রাপ্তি পরিমাণ বিপুল হবে। তখন কম আয়ের বা আয়হীন লোকদের মালিক বানানোর জন্যে বিপুল সম্পদ দেয়া সম্ভব হবে। ফলে জাতির ‘আছে’ ও ‘নেই’ লোকদের মধ্যকার পারস্পরিক পার্থক্য দূরত্ব অনেকখানি হ্রাস করা খুবই সহজ হয়ে দেখা দেবে।
কষ্টদায়ক দারিদ্র্যের সাত্রা বেশী হওয়া-একদিকে বিপুল ধনসম্পদের মালিক এবং অপরদিকে দিনের খোরাক বঞ্চিত লোকদের অবস্থিতিই- একটা সমাজের জন্যে খুব বড় বিপদ। এ বিপদটা সমাজ-সংস্থাটিকেই বিপর্যস্ত করে তার অস্থিমজ্জা জরাজীর্ণ করে দেয়- তার চেতনা হোক আর না-ই হোক। কিছু লোক পেটের ওপর হাত রেখে অতিভোজজনিত বদহজমের অভিযোগ করে আর তাদেরই পার্শ্বে থাকে এমন লোক, যারা পেটের ওপর হাত রেখে ক্ষুধার আগুন দমনে প্রয়াসী। কিছু লোক আকাশচুম্বী প্রাসাদের মালিক-বাসকারী লোকের অভাব বা স্বল্পতা আর কাছেই জরাজীর্ণ পর্ণকুটির-পা বিছিয়ে শোয়ারও সংকুলান হয় না, বাপ-মা, স্ত্রী-পুত্র নিয়ে মাথা গুঁজে থাকতেও পারে না! এ এক অমানুষিক দৃশ্য!
কিন্তু যাকাত মানুষে মানুষে এ বীভৎস ও কুৎসিত পার্থক্য দূরীভূত করে দেবে। অন্তর এ দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকেরা যে প্রয়োজন পরিমাণ ও খাদ্য পোশাক বাসস্থান পাচ্ছে না, এরূপ লোক কোথাও পাওয়া যাবে না। অধিকন্তু যাকাত এ শ্রেণীর লোকদের অর্থনৈতিকভাবে ঊর্ধ্বে তুলে নেয়ার-এবং ধনী লোকদের পর্যায়ে গন্য হওয়ার সুযোগদানের অনূকুল কাজ করবে।
ভিক্ষাবৃওি সমস্যা
ইসলাম ভিক্ষাবৃওির বিরুদ্ধে লড়াই করেঃ বাস্তবভাবে ইসলাম মুসলামানের মনে লোকদের কাছে ভিক্ষার হাত দরাজ করার প্রতি তীব্র ঘৃণার সৃষ্টি করে। সেজন্যে তার ব্যক্তিত্ব ও আত্মসম্মানবোধ জাগাবার জন্যে প্রশিক্ষাণ দেয়। সর্বপ্রকারের নীচতা ও হীনতার ঊর্ধ্বে উঠবার প্রেরণা যোগায়। ইসলামের নবী রাসূলে করীম (স) সহাবীদের কাছ থেকে যেসব বিষয়ে ‘বায়’আত’ গ্রহণ করতেন, তার শুরুতেই এ বিষয়ের অঙ্গীকারের উল্লেখ করতেন। তাকে ‘বায়‘আতের’ অন্যতম ‘রোকন’ হিসেবে বিশেষভাবে স্মরণ করিয়ে দিতেন। আবূ মুসলিম আল খাওলানী থেকে বর্ণিত- তিনি বলেছেন, আমার বিশ্বস্ত বন্ধু আউফ ইবনে মালিক আমার কাছে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি এক হিসেবে আমার বন্ধু। অন্য হিসেবে তিনি আমার দৃষ্টিতে বিশ্বস্ত আমানতদার। বলেছেঃ ‘আমরা সাত বা আট কিংবা নয়জন লোক রাসূলে করীম (স) এর কাছে বসা ছিলাম। তখন তিনি বলেলনঃ তোমরা কি রাসূলে করীম (স) এর হাতে ‘বায়‘আত’ করবে না। আমরা নও মুসলিম হিসেবে বায়‘আত করেছি বেশী দিন হয়নি- বললামঃ আমরা তা আপনার কাছে বায়‘আত করেছি।………. পরপর তিনবার হললেন…. তা সও্বেও আমরা হাত প্রসারিত করেছিলাম, তারপর বায়‘আতও করলাম। একজন বললেনঃ হে রাসূল! আমরা তো আপনার কাছে ইতিপূর্বে ‘বায়‘আত’ করেছি। এখন আবার কিসের ওপর ‘বায়‘আত’ করব। তিনি বললেনঃ বায়আত করবে একথার ওপর যে, তোমরা আল্লাহ্র বন্দেগী করবে, তাঁর সাথে একবিন্দু শিরক করবে না, পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়বে, তোমরা শুনবে ও আনুগত্য করবে। পরে খুব আস্তে করে বললেনঃ ‘তোমরা লোকদের কাছে কিছু চাইলে না।
হাদীসটির বর্ণনাকারী বলেছেন, সেই লোকদের কেউ কেউ তার চাবুক ফেলে দিচ্ছিল-অতঃপর কেউই তাকে কিছু দেয়ার জন্যে কারো কাছেই এবং কখনই সওয়াল করবে না। [হাদীসটি মুসলিম, আবূ দাউদ, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ উদ্ধৃত করেছেন যেমন (আরবী************)] গ্রন্থে ২য় খন্ড (আরবী************) এ বলা হয়েছে।]
নবীর কাছে বায়‘আতকারী লোকেরা এমনিভাবে বায়‘আতের আক্ষরিকভাবে অনুসরণ ও বাস্তবায়ন করেছেন। অতঃপর বাস্তবিকই তাঁরা কারোর কাছেই কিছু চাননি-অর্থ পর্যায়ের কোন জিনিস কিংবা কোনরূপ কষ্টের কাজ-কেন ক্ষেত্রেই নয়। এজন্যে আল্লাহ সাহাবীদের প্রতি সন্তষ্ট ছিলেন। বস্তুত তারা দুনিয়াকে জয় করেছিলেন নিজেদের নফসকে জয় করার পর। (যারা নিজের ওপর কর্তৃত্ব করতে পারে, তারাই পারে অন্য মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করতে।) তাঁরা নিজেদেরকে সীরাতুল মোস্তাকীমে চালিয়েছিলেন বলেই দুনিয়াকে সীরাতুল মুস্তকীম দেখাতে সক্ষম হয়েছিলেন।
রাসূল করীম (স) এর মুক্ত গোলাম সওবান (রা) থেকে বর্ণিত, বলেছেন রাসূলে করীম (স) ইরশাদ করেছেনঃ ‘যে লোক আমাকে নিশ্চয়তা দিতে পারবে যে, সে লোকদের কাছে কিছুই চাইবে না, আমি তাকে জান্নাতের নিশ্চয়তা দিতে পারি।’ সওবান বললেনঃ ‘আমি হে রাসূল! বললেনঃ হ্যাঁ, লোকদের কাছে কিছুই চাইবে না এবং অতঃপর তিনি বাস্তবিকই কারো কাছে কিছুই চাইতেন না। [হাদীসটি আবূ দাউদ বর্ণনা করেছে-পূর্বে সূত্র। বায়হাকী উদ্ধৃত করেছেন (আরবী************) ৪র্থ খন্ড ১৯৭ পৃ.]
নবী করীম (স) সাহাবীদের কাছে গ্রহণকারী হাতকে ‘নীচের হাত’ বলে চিহ্নিত করেছেন। আর আত্মসংসম রক্ষাকারী বা দাতা হাতকে ‘উপরের হাত’ বলে দেছিয়েছেন। তিনি তাদের শিক্ষা দিয়েছেন, তাঁরা যেন (ভিক্ষা) চাওয়া থেকে আত্মরক্ষা করায় নিজেদের রাজী করেন, তাহলে আল্লাহও তাদের মর্যাদা রক্ষা করবেন। তাঁরা যেন অন্য লোকের প্রতি মুখাপেক্ষী না হন, তাহলে আল্লাহ তাদের মুখাপেক্ষীহীন বানাবেন। হযরত আবূ সায়ীদ খদরী (রা) থেকে বর্ণিত, আনসারদে কতিপয় লোক রাসূরে করীম (স) এর কাছে কিছু প্রার্থনা করলে তিনি তাদের তা দিলেন। পরে আবার চাইলে তখনও দিলেন। শেষে রাসূলের কাছে যা ছিল তা তখন নিঃশেষে ফুরিয়ে গেল, বললেন, আমার কাছে কোন মাল থাকলে আমি তা তোমাদের না দিয়ে পূজি করে রাখতাম না। আর যে লোক চাওয়া থেকে বিরত থাকবে আল্লাহও তাকে পরমুকাপেক্ষিতা থেকে রক্ষা করবেন। যে ধৈর্য ধারণ করবে, আল্লাহ তাকে ধৈর্যশীল বানাবেন। আর ধৈর্য থেকে অধিক প্রশস্ত জিনিস কেউ কাউকে দিতে পারে না। [ইবন মাজা ছাড়া অন্যান্য সকলে হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন। দেখুনঃ (আরবী************) এবং তার পরে।]
কাজেই আসল ভিওি
রসূল (স) সাহাবিগণকে ইসলামের মূলনীতিসমূহের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দুটি মৌল নীতি শিখিয়েছেন।
প্রথম মৌলনীতিঃ কর্মই উপর্জনের ভিওি। মুসলিম মাত্রেরই কর্তব্য পৃথিবীর-জমির- পরতে পরতে গমন করা এবং আল্লাহ্র অনুগ্রহ সন্ধান করা। আর কাজ- যদিও কেউ কেউ তাকে উপেক্ষার দৃষ্টিতে দেখে- লোকদের কাছে চাওয়া থেকে বিরত থাকা অপেক্ষাও অনেজ উওম। লোকদের কাছে চাওয়ার মুখের পানি ফেলানোর তুলনায়ও তা ভাল। কেউ যদি পিঠের ওপর রশি রেখে এ বোঝা কাঠ নিয়ে আসে তা বিক্রয় করে, তাহলে আল্লাহ্ তার মুখ রক্ষা করবেন। তা অনেক ভালো লোকদের কাছে চওয়া থেকে-তারা দিল কি দিল না, তা তো অনিশ্চিত। [বাখারী জুবাইর থেকে উদ্ধৃত করেছেন (আরবী************) এর শুরুতে।]
লোকদের কাছে চওয়া হারাম
আর দ্বিতীয় মৌলনীতি হচ্ছে, মূলত লোকদের কাছে চাওয়া এবং তাদের জড়িয়ে ধরে দিতে বাধ্য করা হারাম। কেননা তাতে একটি মানুষকে স্বীয় মান-মর্যাদা ক্ষুন্ন করে চমভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করা হয়। অতএব কোন মুসলমানেরই চাওয়ার পথ ধরা উচিত নয়। তবে বাস্তবিকই কোন কঠিন প্রয়োজন-অভাব, দারিদ্র্য- যদি তাকে চাইতে বাধ্যই করে, তাহলে স্বতন্ত্র কথা। যদি কেউ অন্য লোকের কাছে চায় অথচ তার জন্যে যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদ তার কাছে রয়েছে, তা হলে তার এ ‘চাওয়া’টা কিয়ামতের দিন তার মুখমন্ডলে ‘জখম’ হয়ে দেখা দেবে।
এ মর্মে বহু সংখ্যক হাদীস রয়েছে, যাতে লোকদের কাছে ‘চাওয়া’ সম্পর্কে হুঁশিয়ারী করে দেয়া হয়েছে, এমন সব ভয়াবহ পরিণতির কথা বলা হয়েছে, যা শুনলে অন্তর কেঁপে ওঠে।
অন্মধ্য থেকে বুখারী মুসলিম নাসায়ী কর্তৃক হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে রাসূল (স)- এর কথা হিসেবে উদ্ধৃত হয়েছেঃ
লোকদের কাছে চেয়ে বেড়ানো তোমাদের মধ্য থেকে কারোর অভ্যাস হায়ে দাঁড়িয়ে থাকলে সে যখন আল্লাহ্র সাক্ষাতে উপস্থিত হবে, তখন তার মুখে গোশতের এক টুকরাও থাকবে না।
‘সুনান’ প্রণেতাগণ উদ্ধৃত করেছেনঃ ‘যে অন্যদের কাছে চাইল অথচ তার যথেষ্ট পরিমাণ ধনাঢ্যতা আছে, কিয়ামতের দিন সে ক্ষতবিক্ষত মুখমন্ডল নিয়ে আসবে। বলা হলঃ হে রাসূল! ধনাঢ্যতা হয় কিসে? বললেনঃ পঞ্চাশ দিরহাম অথবা সেই পরিমাণ স্বর্ণমূল্য।’ [চারখানি হাদীস গ্রন্থে উদ্ধৃত।]
অর্থাৎ লোকদের কাছে ‘চাওয়া’ কাজটির পরিণতি ব্যক্তির মনুষ্যত্ব ও মর্যাদা প্রকাশকারী মুখমন্ডলে প্রকাশিত হবে।
আর একটি হাদীসঃ ‘যে চাইল’ অথচ তার কাছে যথেষ্ট আছে, সে আগুনের মাত্রা বৃদ্ধি করতে চাইছে অথবা জাহান্নামের অগ্নিস্ফুলিংগ বেশী করতে চেয়েছে।’ সাহাবিগণ বললেনঃ হে রাসূল! ‘যথেষ্ট পরিমাণটা কি? বললেনঃ যে পরিমাণে তার সকাল-সন্ধ্যা চলে যায়। [আবূ দাউদে উদ্ধৃত।]
অপর হাদীসঃ যে চাইল, অথচ তার কাছে এক আউকিয়া রয়েছে, সে তো লোকদের জড়িয়ে ধরার অপরাধ করল। [আবূ দউদনাসায়ী উদ্ধৃত।] ‘আউকিয়া’- চল্লিশ দিরহাম।
উপরের হাদীসের অর্থ কি এই যে, যার কাছে একদিনের সকাল-সন্ধ্যার খোরাক আছে? অথবা তার তাৎপর্য এই যে, সে প্রতি দিনের প্রয়োজনীয় খাদ্য উপার্জন করে, ফলে সে সব সময়ই সকাল-সন্ধ্যার খোরাক পায়?
সম্ভবত এ শেষোক্ত তাৎপর্যটিই অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য, এটাই অধিক সমীচীন। অতএব যে লোক এভাবে নিত্য নতুন রিযিক পাচ্ছে, তার এ পাওয়াই চাওয়ার লাঞ্ছনা থেকে বিরত থাকার জন্রে যথেষ্ট।
যে ধনাঢ্যতা ভিক্ষা হারাম করে
উপরিউক্ত হাদীসসমূহে ভিক্ষা চাওয়া হারাম হয় যে পরিমাণ ধনাঢ্যতায়, তাতে বিভিন্ন পরিমাণের উল্লেখ করা হয়েছে- তার কারণ কি? শাহ্ অলী উল্লাহ্ দিহলভী তাঁর অন্যান্য গ্রন্থ ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা’য় উক্ত প্রশ্নের যে উওর দিয়েছেন, তা খুবই উওম। তিনি বলেছেনঃ
আমাদের মতে এসব হাদীস পরস্পর বিরোধী নয়। কেননা মানুষ বিভিন্ন স্থানে বাস করে। প্রত্যেকেরই একটা উপার্জন আছে, তা থেকে দিকে যাওয়া সম্ভব নয়। অতএব যে লোক কোন পেশার মাধ্যমে উপার্জনকারী হবে, সে সেই পেশার জন্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি-হাতিয়ার না পাওয়া পর্যন্ত অক্ষম। যে চাষী তার চাষের প্রয়োজনীয় হাল-গরু না পাওয়া পর্যন্ত, যে ব্যবসায়ী সে পণ্যদ্রব্য না পাওয়া পর্যন্ত এবং যে লোক জিহাদে যোগদান করে সকাল-সন্ধ্যায় পাওয়া গনিমতের মাল দিয়ে রিযিকের ব্যবস্থা করে-যেমন রাসূলে করীম (স)-এর সাহাবিগণ ছিলেন-এ সকলের জন্যে নির্ধারিত পরিমাণ হচ্ছে এক ‘আউকিয়া’ অথবা পঞ্চাশ ‘দিরহাম’।
আর যে লোক উপার্জন করে হাটে-বাজারে বোঝা বহন করে; কিংবা কাঠ সংগ্রহ ও বিক্রয় করে এবং অনুরূপ অন্যান্য উপার্জনকারী, তাদের বেলায় নির্ধারিত পরিমাণ তা- যা সকাল-সন্ধ্যা খাবার জোটাতে পারে। [২য় খন্ড, ৪৯ পৃঃ (আরবী**************) হানাফী আল্লামা আবূ জাফর তাহাভী [(আরবী**************)] গ্রন্থে বলেছেন, নবী করীম (স) প্রথম দিক দিয়ে ভিক্ষা চাওয়া হারাম হয় যে পরিমাণ খাদ্য থাকলে- তা নির্ধারণে খুব কড়াকড়ি করেছেন। পরে ক্রমশ সে কঠোরতাকে হালকা করেছেন। শেষে বলেছেন পাচঁ ‘আউকিয়া’ আর তা রৌপ্যে যাকাত ফরয হওয়ার পরিমাণ। কিন্তু এ কথার কোন দলিল নেই। তাই শাহ্ দিহলভীর ব্যাখ্যা অধিক গ্রহণীয়। আল্লামা তাহভী পাঁচ ‘আউকিয়া’র যে হাদীসের কথা বলেছেন, সে হাদীসের শুদ্ধতা প্রমাণিত হয়নি।]
বিবেচনাসম্মত কথা হচ্ছে, যে পরিমাণ ধনাঢ্যতা ভিক্ষা চাওয়া হারাম করে, তা যাকাত গ্রহণ হারাম করে যে পরিমাণ ধনাঢ্যতা, তা থেকে অনেক কম। কেননা শরীয়াতের বিধানদাতা ভিক্ষাবৃওির ওপর কঠোরতা গ্রহণ করেছেন। সে ব্যাপারে হুঁশিয়ারী উচ্চারণে খুব গুরুত্ব দিয়েছে। অতএব নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া কোন মুসলিমের জন্যেই ভিক্ষাবৃওি জায়েয নয়। আর ভিক্ষা করার সময়টিতেও প্রয়োজন পরিমাণ যার আছে, তার তো ভিক্ষা করার প্রয়োজন থাকতে পারে না- খাওাবী তাই বলেছেন।
ইসলাম তার প্রতি ঈমানদার লোকদের জন্যে এ প্রশিক্ষণেরই ব্যবস্থা করেছে। আর তাদের জন্যে ওসবই হচ্ছে মূল্যবান উপদেশ, নসীহত।
কিন্তু কেবল নীতিগত উপদেশ ও নৈতিক আবেদন এবং মনস্তাও্বিক প্রশিক্ষণ কখনই যথেষ্ট হতে পারে না, যদি সাথে ভিক্ষুক লোকদের জন্যে-যারা সমুপস্থিত প্রয়োজনেই, শক্তিশালী বাধ্যবাধকতায়ই ভিক্ষাবৃওি করে-বাস্তব ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হবে। এজন্যেই বলা হয়েছে, ‘জবরের আওয়াজ বিবেকের ধনীর চাইতে অনেক শক্তিশালী।’
কর্মক্ষম লোকদের কর্মসংস্থানই ভিক্ষাবৃওি রোধের বাস্ত উপায়
ভিক্ষাবৃওি রোধের বাস্তব কর্মপন্থা দুটি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়। প্রথম, প্রত্যেক কর্মক্ষম বেকার লোকের জন্যে উপযুক্ত কাজের ব্যবস্থা করা। এটা ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার নাগরিকদের প্রতি। যে দায়িত্বশীল, সে তা জনগণের জন্যে দায়ী (Responsible)। দেশবাসীর মধ্যে কর্মক্ষম বেকার লোকদের সম্মুখে তার হাত কচলাতে থাকা কোনক্রমেই উচিত নয়। তেমনি তাদের প্রতি স্থায়ভাবে যাকাত-সাদ্কা’র সাহায্য দানে হাত প্রসারিত করতে থাকাও জায়েয নয়-পরিমাণ কম কি বেশী। যাকাতের ব্যয়খাত পর্যায়ে আমরা রাসূলে করীম (স)- এর হাদীস উল্লেখ করে এসছিঃ ‘যাকাত ধনীর জন্যে বা সুস্থদেহ শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তির জন্যে হালাল নয়। সুস্থদেহ শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিকে যে বস্তুগত সাহায্যেই দেয়া হবে, তা এক দিক দিয়ে বেকারত্বে উৎসাহিত করা ছাড়া আর কিছুই নয়। আর অপর দিক দিয়ে তা দুর্বল অক্ষম অপূর্ণাঙ্গ দেহ লোকদের অধিকারে বেশী লোকের ভিড় সৃষ্টি মাত্র।’
ওসব ভিক্ষা-চাওয়া লোকদের একজনের প্রতি রাসূলে করীম (স) যে নীতি গ্রহণ করেছিলেন, তা-ই হচ্ছে বাঞ্ছনীয় ও কর্তব্য পদক্ষেপ।
আনাস ইবনে মালিক (রা) [হাদীসটি আবূ দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী ও ইবনে মাজা উদ্ধৃত করেছেন। তিরমিযী বলেছেনঃ এ হাদীসটি ‘হাসান’- কেবল আখ্জার ইবনে আজলাম সূত্রেই আমরা তা জানি। তার সম্পর্কে ইয়াহ্ইয়া ইবনে মুয়ীনি বলেছেনঃ[(আরবী**************) আবূ হাতেম আর রাজী বলেছেনঃ তাঁর বর্ণিত হাদীস লেখা হত। দেখুনঃ [(আরবী**************)] থেকে বর্ণিত, একজন আনসার বংশীয় লোক রাসূলে করীম (স)-এর কাছে উপস্থিত হয়ে ভিক্ষা চাইলে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা ঘরে কি কিছুই নেই’? সে বলল, হ্যাঁ, আছে। উটের পিঠে পরাবার বা ঘরে গরম কাপড়ের নিচে বিছানোর একটা কাপড়- তার একটা অংশ পরিধান করি, আর অপর অংশ বিছাই, আর একটি পাত্র। তাতে পানি পান করি।’ তখন নবী করীম (স) বললেন, জিনিস দুটি আমার কাছে নিয়ে এসো।’ সে তা তাঁর কাছে নিয়ে এল। রাসূলে করীম (স) তা হাতে নিয়ে বললেন, এই দুটি কে কিনবে? এক ব্যক্তি বলল, আমি নেব এক দিরহাম মূল্যে।’ তিতিন বললেন, ‘তার বেশী দিতে কেউ প্রস্তুত আছে?’………দুবার……….. তিনবার। তখন অপর একটন বলল, ‘আমি এ দুটি জিনিস দুই দিরহাসে কিনব।’ তখন নবী করীম (স) জিনিস দুটি সে লোকটিকে দিলেন ও দুটি দিরহাম গ্রহণ করলেন। দিরহাম দুটি তিনি আনসারীকে দিয়ে বললেন, ‘একটি দিরহাম দিয়ে খাদ্য ক্রয় করে তোমার পরিবারের কাছে পৌঁছাও। আর অপর দিরহামটি দিয়ে একটি কুঠার কিনে আমার কাছে নিয়ে এসো।’ পরে রাসূলে করীম (স) নিজ হাতে তাতে হাতল লাগিয়ে দিলেন। তাকে বললেন, ‘যাও’ কাঠ সংগ্রহ কর এবং বিক্রয় কর এবং আমি যেন তোমাকে পনের দিন পর্যন্ত না দেখি।’ অতঃপর লোকটি চলে গেল। সে কাঠ নিয়ে এসে বিক্রয় করতে লাগল। পরে যখন সে ফিরে এলো, এ সময়ে সে দশ দিরহাম উপার্জন করেছে। তার কিছু দিয়ে সে কাপড় ক্রয় করল এবং কিছু দিয়ে সে খাদ্য ক্রয় করল। এ সময় রাসূলে করীম (স) বললেন, ‘কিয়ামতের দিন তোমার মুখমন্ডলে ভিক্ষার কালো চিহ্ন পড়ুক, তার চাইতে এটা অনেক ভালো। কেননা ভিক্ষা চাওয়া তিনজন লোক ছাড়া শোভা পায় না। কঠিন দারিদ্র্যে পাড়িত ব্যক্তি [কঠিন দারিদ্র্য বলতে- মূলে ব্যবহৃত শব্দের দৃষ্টিতে- বোঝানো হয়েছে এমন দারিদ্র্য যা ব্যক্তিকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় অর্থাৎ তার কাছে এমন জিনিসও থাকে না যা দিয়ে সে মাটি থেকে সরে থাকতে পারে।] অথবা ন্যক্কারজনক বিরাক্তকর ঋণে জর্জরিত ব্যক্তি অথবা এমন দিয়েত দিতে বাধ্য ব্যক্তি, যা দিলে সে এত দরিদ্র হয়ে পড়বে যে, তার জন্যে ভিক্ষা চাওয়া হালাল হয়ে যাবে।
এ সুস্পষ্ট হাদীসে আমরা দেখতে পাচ্ছি, নবী করীম (স) প্রার্থী আনসারীকে যাকাত গ্রহণ করতে দিননি। কেননা সে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। আর তার জন্যে তা জায়েয নেই। জায়েয হতে পারে কেবল তখন, যখন তার সম্মুখে চলার পথ সম্পূর্ণরূপে সংকীর্ণ হয়ে পড়ে, কোন পন্থা গ্রহণও অসম্ভব হয়ে পড়ে অথচ রাষ্ট্র সরকারের দয়িত্ব হচ্ছে তার জন্যে হালাল উপার্জনের সুযোগ করে দেয়া এবং তার সম্মুখে কর্মের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়া।
এ হদীসটি থেকে ইসলামের এমন কতগুলো অগ্রবর্তী পদক্ষেপের কথা জানা যায়, ইসলামের আত্মপ্রকাশের পর দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী কাল অতিবাহিত হওয়ার পরই মানবতা এ সব বিষয়ে অবিহিত হতে পেরেছে।
নবী করীম (স) অভাবগ্রস্ত ভিক্ষাপ্রার্থী ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে কিছু বস্তুগত সাহায্য দিয়েই তার সমস্যার সমাধান করতে চান নি- যেমন অনেকে তাই চিন্তা করেছে। নিছক উপদেশ-ওয়ায বলেও ভিক্ষাবৃওির বিরুদ্ধে ঘৃণা জগিয়ে দিয়েও তিনি দায়িত্ব পালন করেননি-যেমন অনেকে সাধারণত করে থাকে। তিনি স্বহস্তে সমস্যাটির বাস্তব সমাধান দেয়ার এবং এক সফল পন্থায় তার দারিদ্র্য দূর করার চেষ্টা করেছেন।
তাকে শিক্ষাদান করেছেন যে, তার মধ্যে যাত শক্তি ও কর্মক্ষমতা রয়েছে, তাকে অবশ্যই কাজে লাগাতে হবে- সে শক্তি যত ক্ষুদ্রই হোক, যত উপায় ও পন্থা পয়োগ করা সম্ভব, তাও অবলম্বন করতে হবে-তা যতই দুর্বল কিন্তু তবুও ভিক্ষা করবে না- যদি তার কাছে এমন জিনিস থাকে যা ব্যবহার করলে প্রয়োজন পরিমাণ উপার্জন করা সম্ভব হতে পারে, তাহলে তা অবশ্যই ব্যবহার করবে।
তাকে এও শিক্ষা দিলেন যে, যে কাজই হালাল রিযিক এনে দেয় তা-ই ভাল ও অদ্রজনোচিত কাজ, যদিও তা কাঠ যোগাড় ও বোঝা বহন করে নিয়ে এসে বিক্রয় করার কাজই হোক-না-কেন। তা হলেই আল্লাহ তার মুখমন্ডলকে ভিক্ষার লাঞ্ছনা থেকে রক্ষা করবেন।
রাসূল (স) তাকে এমন কর্মের পথ দেখালেন, যা তার ব্যক্তিত্ব, শক্তি- সামর্থ্য, পরিবেশের পরিপ্রেক্ষিতে সবদিক দিয়েই তার উপযোগী। তার জন্যে কাজের একটা হাতিয়ারও যোগাড় করে দিলেন। সেটি নিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার পথ দেখালেন; তাকে দিশেহারা করে ছেড়ে দিলেন না- না খেয়ে তিল-তিল করে মরে যাওয়ার জন্যে। তাকে পনের দিনের একটা মেয়াদও নির্দিষ্ট করে দিলেন; এ কাজ তার জন্যে শোভন কিনা এ মেয়াদের শেষে তা তিনি জানতে পারবেন বলে। এই মেয়াদের মধ্যে যদি সে কাঙ্খিত দায়িত্ব পালনে সক্ষম প্রমাণিত হয় তা হলে তাকে এ কাজে বহাল রাখবেন। অন্যথায় তার জন্যে অন্য কোন উপাযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন, এটাই ছিল তাঁর পরিকল্পনা।
লোকটির সমস্যার বাস্তব সমাধান পেশ করার পরই তিনি সেই নীতিগত সংক্ষিপ্ত উপদেশ তার সম্মুখে পেশ করলেন, যাতে ভিক্ষাবৃওি সম্পর্কে উচ্চমানের সতর্কতা ও ভয় প্রদর্শন রয়েছে। সেই সীমার কথাও বলে দিলেন, যার মধ্যে বিচরণ চায়েয। আমরা মুসলিমদের জন্যে নবী প্রদর্শিত এ নির্ভুল পন্থা অবলম্বন ও অনুসরণ করা একান্তই কর্তব্য। মুখের কথা ও ওয়ায-নসীহতের সাহায্য ভিক্ষাবৃওির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পূর্বেই আমাদের উচিত সমস্যাসমূহের বাস্তব সমাধান পেশ করা- প্রত্যেক বেকার ব্যক্তির জন্যে কাজের সংস্থান করা। [এ গ্রন্থকার প্রণীত (আরবী*************) থেকে উদ্ধৃত।]
এ প্রেক্ষিতে যাকাতের ভূমিকা কত বড় গুরুত্বপূর্ণ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যাকাত সম্পদ থেকে কর্মক্ষম বেকার লোকদের জন্যে যে ধরনের হাতিয়ার, যন্ত্রপাতির প্রয়োজন তা কিনে দেয়া কিংবা ব্যবসায়ের জন্যে মূলধন সংগৃহীত যাকাত সম্পদ থেকে দেয়া সম্ভব হলে তাই দেয়া। যাকাত ব্যয়ের খাতসমূহের বিশ্লেষণে আমরা তা বিস্তারিত বলে এসেছি। এ থেকে সেবামূলক কাজের প্রশিক্ষণও দেয়া যেতে পারে, যাকে কেউ পেশা বা উপার্জন-উপায়রূপে গ্রহণ করবে এবং তা থেকেই সে জীবিকার সংস্থান করবে। যৌথ প্রকল্প প্রতিষ্ঠা, শিল্প কারখানা স্থাপন ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, কৃষি ফার্ম কায়েম করা ইত্যাদি ধরনের বহু কাজের ব্যবস্থাই তা থেকে করা যেতে পারে। বেকার কর্মক্ষম লোকেরা সেখানে কাজ করবে, উপার্জন করবে এবং শরীকানায় বা সমগ্রটার কিংবা তার কোন অংশের তারা মালিক হয়ে বসবে।
অক্ষম লোকদের জীবিকার নিরাপওা
দ্বিতীয়-অর্থাৎ ভিক্ষাবৃওি ও লোকদের কাছে চেয়ে বেড়ানো সমস্যার বাস্তব কর্মের মাধ্যমে সমাধান করার উপায়সমূহের মধ্যে ইসলামের দৃষ্টিতে দ্বিতীয় পন্থা হচ্ছে, উপার্জনে অক্ষম প্রত্যেক ব্যক্তের জন্যে উপযুক্ত ও যথেষ্ট মাত্রার রিযিকের নিরাপওা দান। তার অক্ষমতা দুটি কারণে হতে পারেঃ
ক. দৈহিক দুর্বলতা ও শক্তিহীনতার দরুন তা হতে পারে। অল্প বয়স্কতাও তার ও উপার্জনের মাঝখানে প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়াঁতে পারে, আশ্রয়দাতা বা অভিভাবক না থাকা যেমন ইয়াতীমদের বেলায় হয় কিংবা কোন কোন ইন্দ্রিয় শক্তির বা কোন অংগের অক্ষমতার দরুনও তা হতে পারে। হতে পারে দীর্ঘ মেয়াদী ও অক্ষমকারী রোগের দরুন….. ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলো দৈহিক কারণ, যে কেউই এ অক্ষমতার মধ্যে পড়ে যেতে পারে এবং তার ওপর বিজয়ী হওয়া কিংবা তাকে দমিত করার কোন উপায়ই হয়ত সে পেতে পারে না। এরূপ ব্যক্তিকে যাকাত থেকে এমন পরিমাণ দিতে হবে, যা তার জন্যে যথেষ্ট হবে, তাকে সচ্ছল বানিয়ে দেবে, তার দুর্বলতা দূর করার ও তার অক্ষমতার প্রতি দয়াপরবশ হয়ে তা করতে হবে-যেন সে সমাজের ওপর একটা বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়। যদিও আমাদের এ আধুনিক যুগে বিজ্ঞানের সাহায্য আংশিক অক্ষমতাসম্পন্ন লোকদের অবস্থার পরিবর্তন করে জীবনযাত্রা সহজ করে তোলা সম্ভবপর-যেমন অন্ধ, বধির ইত্যাদি। তাদেরকে নানা শিল্প ও পেশা শেখানো যেতে পারে- যা তাদের উপযোগী হবে, তাদের অবস্থার সাথে সংগতিসম্পন্ন হবে এবং ভিক্ষার লাঞ্ছনা থেকে তাদের রক্ষা করবে, সম্মানজনক জীবিকার সংস্থান করবে। তাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণদানে যাকাতের মাল ব্যয় করায় কোনই অসুবিধা থাকতে পারে না।
খ. উপার্জনে অক্ষমতার দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, কর্মক্ষম হওয়া সও্বেও হালাল কাজ বা উপার্জন পন্থা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া। কাজ চাইলেও পাওয়া না যাওয়ার মত অবস্থা হওয়া, কাজের জন্যে বহু চেষ্টা করেও ব্যর্থ হওয়া। রাষ্ট্রকর্তার পক্ষ থেকে এ……..এ লোকদের জন্যে উপার্জনের সুবিধা দান সও্বেও তা না পাওয়া- দৈহিকভাবে অক্ষম লোকদের মতই এদের অবস্থা মনে করতে হবে, যদিও তারা শক্তি-সামর্থ্য ও যোগ্যতার অধিকারী। এজন্যে যে, কেবল দৈহিক তদ্দারা উপার্জন করা না যাবে।
ইমাম আহ্মাদ প্রমুখ সে দুই ব্যক্তির কিস্সা বর্ণনা করেছেন, যারা রাসূলে করীম (স)- এর কাছে উপস্থিত হয়ে যাকাতের অংশ চেয়েছিল। নবী (স) তাদের দুজনের আপাদমস্তক দেখে নিলেন; দেখলেন, দুজনই খুব স্বাস্থ্যবান শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি। পরে তাদের বললেনঃ ‘তোমরা চাইলে আমি তোমাদের দেব; কিন্তু জেনে রাখ, যাকাতে ধনী ও উপার্জনশীল শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তির কোন প্রাপ্য নেই। অতএব শক্তিসম্পন্ন উপার্জনকারী ব্যক্তির যাকাত পাওয়ার কোন অধিকার নেই।
উপারিউক্ত বর্ণনায় আমাদের সম্মুখেই বহু লোকেরই বিভ্রান্তিমূলক চিন্তার ভিওিহীনতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যাদের ধারণা হচ্ছে, যাকাত বুঝি প্রার্থীমাত্রকেই দেয়া যেতে পারে- যে ই তা পেতে চাইবে, তাকেই বুঝি তা দিতে হবে! না, তা নয়। অনেকে এও মনে করেন যে, যাকাত বুঝি বিপুল সংখ্যক প্রার্থী ও ভিক্ষুককে সাহায্য করে। না, বরং আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ইসলাম যেভাবে যাকাতের বিধান বিধিবদ্ধ করেছে তা যদি বাস্তবিকই অনুধাবন করা হয়- ইসলামের বিধান অনুযায়ী সংগ্রহ করা হয় এবং ইসলাম যেভাবে বণ্টন করার বিধান দিয়েছে সেই অনুযায়ী অংশ ভাগ করে ও সেভাবে ভাগ করে দেয়া হয়, তাহলে অকারণ ভিক্ষাকারী ও কৃত্রিমভাবে ভিক্ষুক সাজার পধ চিরতরে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করা খুবই সম্ভবপর হবে।
পারস্পরিক শত্রুতা ও সম্পর্ক বিনষ্টির সমস্যা
সৌভ্রাতৃত্ব মৌল ইসলামী লক্ষ্য
ইসলামের মৌল লক্ষ্য হচ্ছে সমস্ত মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সৌভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক গড়ে তোলা-কিশেষভাবে ইসলামী সমাজের লোকদের পরস্পরের মধ্যে। এরূপ ভ্রাতৃত্ব- যার মধ্যে প্রীতি ও ভালোবাসার গভীরতা রয়েছে এবং তার ফলশ্রুতিতে পারস্পরিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক নিরাপওা ব্যবস্থা কার্যকর হলেই প্রকৃত শান্তি ও নির্বিঘ্নতা স্থাপিত হতে পারে। তখন এ শান্তিই হবে সমাজ-সমষ্টির বিশেষত্ব। তখন লোকেরা ছোট ছোট ব্যাপারে বড় বড় ঝগড়া-বিবাদ অনুষ্ঠিত হতে এবং বিলাসপূর্ণ জীবনের স্বার্থে স্থায়ী দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ হওয়ার মত অবস্থা চলতে দেখতে পারে না।
কিন্তু এরূপ একটি সামাজিক অবস্থা কেবলমাত্র তখনই পাওয়া যেতে পারে, যদি লোকদের অন্তরে আল্লাহ্র প্রতি এর পরকালের প্রতি প্রকৃত ও গভীর ঈমান গড়ে ওঠে ও স্থায়ী হয়ে থাকে। বিরাট লক্ষ্যকে সামনে রেখেই মানুষ বাঁচে এবং প্রয়োজন হলে তারই জন্য মৃত্যুও বরণ করে। সে লক্ষ্য হচ্ছে মহাসত্যের ও মহাকল্যাণের সাহায্য কাজ। এরূপ লক্ষ্য গ্রহণ করা হলেই মুমিন ব্যক্তির পক্ষে সামান্য নগণ্য সামগ্রী বা ব্যাপারাদি উপেক্ষা করা সম্ভবপর। তখন তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হবে ঊর্ধ্ব দিগন্তে, পথিমধ্যে বৈষয়িক স্বার্থের জন্য লড়াই করতে প্রবৃও হবে না তারা। কেননা তা খুবই সামান্য মূল্যের জিনিস আর পরকাল হচ্ছে সর্বোওম এবং চিরস্থায়ী।
ইসলামী ভ্রাতৃত্বের দৃষ্টান্তমূলক সমাজ
পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব-ভালোবাসাসস্পন্ন লোকদের সমাজের একটা দৃষ্টান্ত রূপ আমরা দেখতে পেয়েছি প্রথম ইসলামী সমাজে। রাসূল করীম (স) এর নেতৃত্বে মদীনা শহরকে কেন্দ্র করে এই সমাজটি গড়ে উঠেছিল। যদিও তথায় পারস্পরিক বিরোধিতা ও শত্রুতার অনেক দিক ছিল। তা সও্বেও এই প্রোজ্বল ভ্রাতৃত্বের পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভবপর হয়েছিল। এ সমাজ প্রাথমিকভাবে গড়ে উঠেছিল মুহাজির ও আনসারদের সমন্বয়ে। মহাজিররা ছিলেন বহিরাগত ও নগরবাসীদের ওপর অনুপ্রবেশকারী। তাঁরা আদনানী আরব ছিলেন। আর আনসাররা ছিলেন নগরের আদিম অধিবাসী। তাঁরা আরবা আরবের লোক ছিলেন অর্থাৎ কাহতানী। এ কাহ্তানী ও আদনানী আরবদের প্রত্যেকের মধ্যে ছিল প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও পারস্পরিক গৌরব-অহংকার প্রকাশের রীতি। এমন কি, এ আনসারার দুটো বড় বংশধারায় দানা বাঁধছিলেন-দীর্ঘদিন পর্যন্ত তাদের পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ এবং রক্তপাতও চলছিল, উওরাধিকারসূত্রে তা অব্যাহতভাবে শত্রুতা নিয়ে আসছিল। তারা ছিল ‘আওস’ বা ‘খাজরাজ’ নামে পরিচিত। তা সও্বেও এ লোকদের মধ্যে তুমি দেখতে পাচ্ছ বিলাল হাবসীকে, সালমান ফারসীকে এবং সুহাইব রুমীকে। সেখানে এ দুর্ধর্ষ মরুচারীদের উপরে দেখবে আবূ যারকে এবং সভ্যতার আলোকপ্রাপ্ত ও নিয়ামতের ক্রোড়ে লালিত মুচয়িচ্ ইবনে উমাইর (রা) কে।
এসব সও্বেও ঈমানের ভিওিতে এমন অনন্য ভ্রাতৃত্ব গড়ে উঠেছিল যা দুনিয়ার চক্ষু কোনদিনই দেখতে পায়নি। আমরা তথায় এমন এক সমাজ সংস্থা দেখতে পাচ্ছি, যেথায় ব্যক্তি তার দ্বীনী ভাইয়ের জন্যে তাই পসন্দ করছে, যা পসন্দ করছে সে নিজের জন্যে, তা-ই অপসন্দ করছে, যা সে অপসন্দ করছে নিজের জন্যে। তারা প্রত্যেকেই মনে করছে যে, এরূপ না হলে তার ঈমানই পূর্ণ ও যথার্থ হবে না। উপরন্ত আমরা সেখানে এও দেখতে পাই যে, এক ভাই অপর ভাইকে নিজের ওপর অগ্রাধিকার দিচ্ছে। নিজে দুঃসহ ক্ষুধায় কাতর হওয়া সও্বেও তার ক্ষুধার্ত ভাইকে খাবার দিচ্ছে, নিজে পিপাসায় প্রাণান্তকর অবস্থার মধ্যে পড়েও তার পিপাসার্ত ভাইকে অগ্রে পানি পান করার সুযোগ করে দিচ্ছে। এহেন উন্নত মনের সমাজ সংস্থার আরেকটি চিত্র কুরআন মজীদ আমাদের সম্মুখে তুলে ধরেছে নিম্মোক্ত আয়াতেঃ
(আরবী*************)
(‘ফাই’ লব্ধ মাল) সেসব মুহাজির ফকীরদের জন্যে, যারা নিজেদের ঘর-বাড়ি ও বিও-সম্পওি থেকে বহিষ্কৃত বিতাড়িত হয়েছে। এ লোকেরা আল্লাহ্র সন্তুষ্টি ও অনুগ্রহ পেতে চাচ্ছে। এরা আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলের সাহায্য সমর্থনে সদা সক্রিয় থাকে। এরাই সত্যপন্থী লোক। (তা সেই লোকদের জন্যেও) যারা এ মুহাজিরদের আগমনের পূর্বেই ঈমান গ্রহণ করে হিজরত কেন্দ্রে অবস্থান গ্রহণ করেছিল। এরা এসেছে। আর যা কিছুই তাদের দেয়া হয়, তারা নিজেদের হৃদয়ে তার কোন প্রয়োজনই অনুভব করে না এবং তারা নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে- নিজেরা যতই অভাবগ্রস্ত হোক না-কেন। প্রকৃত কথা হচ্ছে, যারা নিজেদের মনের সংকীর্ণতা থেকে রক্ষা পেয়ে গেছে, তারাই সফলকাম। [(আরবী*************)]
ইসলাম বাস্তবভিওিক আইন তৈরী করে
ইসলাম এ ধরনেরই একটি সমাজকে আদর্শ ও দৃষ্টান্তস্বরূপ সম্মুখে রেখেছে। সেদিকেই জনগণের মন আকৃষ্ট ও উদ্বুদ্ধ করতে সচেষ্ট। সেদিকেই চক্ষু নিবদ্ধ রেখেছে ইসলামে বিশ্বাসী লোকেরাও এবং বাস্তবভাবে এরূপ একটি আদর্শ সমাজ গঠন ও কায়েমের লক্ষ্যে দুনিয়ার নিষ্ঠাবান লোকেরা নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে।
বস্তুত ইসলাম বাস্তবাবদী দ্বীন। ইসলাম উচ্চতর আকাশ-মর্গের জন্যে আইন তৈরী করে না- ভুলে যায় না নিম্মে ধরনীতল। ইসলাম বিরল সংঘটিত অবস্থার প্রেক্ষিতে আইন তৈরী করে না-স্বাভাবিক ও প্রায়ই সংঘটিতব্য অবস্থাকে উপেক্ষা করে। ইসলাম মানুষকে ফেরেশতা মনে করে না, মনে করে সেই মানুষ, যারা পৃথিবীর উপরে বিচরণ বেড়ায় না। ইসলাম মানুষ সম্পর্কে এ ধারণা দিয়েছে যে, কুপ্রবৃওি তাদের তাড়ানা করে, তাদের মধ্যে নিহিত ‘নফসে আম্মারা’ তাকে খারাপ কাজের প্ররোচনাও দেয়। মানুষ শয়তান ও জ্বিন-শয়তান তাদের মনে ‘ওয়াস্ওয়াসার’ সৃষ্টি করে। পরস্পরের মনে গোপনভাবে বিভ্রন্তিকর কথাবার্তা চাকচিক্যময় ও লোভনীয় করে জাগ্রত করে দেয়। বৈষয়িক জীবনের স্বার্থ লোভ তাদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে। ফালে ফেত্না-ফাসাদ, অত্যাচার-নিপীড়নের ঝঞ্ঝা-বাত্যা ছুটতে শুরু করে। এ কারণেই মানুষ পারস্পরিক ঝগড়া বা বিপদে নিমজ্জিত হয়, দ্বন্ধে লিপ্ত এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধও শুরু করে দেয়। তখন মানুষের ধন-মাল যেমন লুন্ঠিত হয়, তেমনি ইযযত-আবরুও হয় পদদলিত।
যুদ্ধ-বিগ্রহ মানব সমাজের আদিম ক্রিয়া
পারস্পরিক যুদ্ধ-বিগ্রহের এ ব্যাপারটি সেদিন থেকেই সূচিত, যেদিন প্রথম এ বিশাল পৃথিবীতে পিতামাতা ও সন্তানসমন্বিত একটি পরিবার বাস করতে শুরু করেছে। হযরত আদম ও হাওয়া এবং তাঁদের পুত্র ও কণ্যাগণের সমন্বয়েই এ পরিবারটি গঠিত হয়েছিল। তখনও ভাই ভাইয়ের ওপর সীমালংঘন করেছে, শত্রুতা সীমালংঘনমূলক ভূমিকায় পড়ে তাকে হত্যা করেছে। এ কারণেই ফেরেশতাগণ এ নব্য সৃষ্টি সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করত, যাকে আল্লাহ্ পৃথিবীতে তাঁর খলীফা বানিয়েছিলেন। তখন খিলাফতের মর্যাদা অনুধাবন করতে না পেরে ফেরেশতাগণ বলেছিলেনঃ
(আরবী*************)
হে আল্লাহ! তুমি কি পৃথিবীতে এমন সৃষ্টি নিয়ে আসবে, যা তথায় বিপর্যয় সৃষ্টি করবে ও রক্তপাত করবে? আমরাই তো তোমার প্রশংসায় তাসবীহ পাঠ করছি এবং তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। [(আরবী*************)]
হযরত আদমের দুই পুত্রের কিস্সা কুরআন মজীদ বিবৃত করেছে। মানুষ যদি প্রবৃওির তাড়ানায় চলতে শুরু করে এবং ঈমানের তাগিদ উপেক্ষা করে চলে, তাহেলে কি অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে, তা আমরা সেই কিস্সার প্রত্যক্ষ করতে পারি। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেছেনঃ
(আরবী*************)
তাদের সম্মুখে আদমের দুই সন্তানের কিস্সা সত্যতা সহকারে বর্ণনা কর। যখন দুজনই কুরবানী করেছিল, তখন তাদের একজনের কুরবানী গৃহীত হয় এবং অপরজনের পক্ষ থেকে তা গৃহীত হয় না। তখন সে বললঃ আমি নিশ্চয়িই তোকে হত্যঅ করব। সে বললঃ আল্লাহ্ তো কেবল মওাকী লোকদের কাছ থেকেই কবুল করেন। তুমি যদি আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে আমার প্রতি তোমার হস্ত প্রসারিত কর, আমি তোমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে আমার হাত তোমার দিকে প্রসারিত করব না। আামি তো সারা জাহানের রব্ব্ আল্লাহ্কে ভয় করি। আমি তো চাই, তুমি আমার গুনাহ্ এবং তোমার গুনাহ্ উভয়ই নিয়ে যাও। তাহলে তুমি একজন জাহান্নমী হবে। আর জালিম লোকদের এটাই কর্মফল। অতঃপর তার নফ্স তাকে তার ভাইকে হত্যা করার জন্যে প্রবুদ্ধ করে, পরে সে তাকে হত্যা করে ফেলে। এতে করে সে ভয়ানক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেল। পরে আল্লাহ্ একটি কাক পাঠালেন, কাকটি মাটি খুঁড়ছিল-যেন সে তার ভাইয়ের লাশ সমাধিস্থ করার পন্থা শেখাতে পারে। তখন সে বললঃ হায়! আমি এ কাকটির মত হতেও অক্ষম হয়ে পড়লাম আমার ভাইয়ের লাশ দাফনের পদ্ধতি জানতে পারিনি।……. এভাবে সে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে গেলে। [(আরবী*************)]
এ ছিল মানব জীবনের সূচনাকাল। মানুষ তখন পর্যন্ত লাশ দাফনের প্রক্রিয়াও জানতো না। ইতিপিূর্বে কোন লাশ দাফন হতেও দেখেনি।……একজন মানুষ তার ভাই মানুষকে হত্যা করে বসল……..সে ছিল তার আপন ভাই।
ঝগড়া-বিবাদ ও দ্বন্দ্ব-সংগ্রামে ইসলামের ভূমিকা
এ প্রাচীনতম অথচা একালের এ মানবীয় সমস্যার সমাধানের জন্যে বাস্তবপন্থী আদর্শ স্থানীয় জীবন-বিধানি ইসলাম কি কার্যকর পন্থা গ্রহণ করেছে?
মানবীয় প্রকৃতির দিক দিয়ে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, ঝগড়া-বিবাদ ও যুদ্ধ-বিগ্রহ যখন এমনই যে, তা থেকে মানুষের নিষ্কৃতি নেই, তখন তার বিপদটা ঘনীভূত হয়ে আসবাব, তার স্ফুলিংগ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার এবং দিনের পর দিন তার খারাপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে দেয়ার জন্যে উন্মুক্ত করে ছেড়ে দেয়ার কোনই অর্থ হয় না। তাই যখনই কোন ঝগড়ার সৃষ্টি হবে, দ্বন্দ্ব তীব্র হয়ে উঠবে যখনেই সে আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠবে, তখন কি তাকে সমাজ সভ্যতা সংস্কৃতি সব কিছুই জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেবার জন্যে সুযোগ করে দেয়া হবে?….. না, ইসলামের তা নীতি নয়। অবিলম্বে সমাজ-সমষ্টির তাকে হস্তক্ষেপ করা একান্ত আবশ্যক। সমস্ত শক্তি নিয়োগ করে যত শীঘ্র সম্ভব এ আগুন নিভিয়ে ফেলতে চেষ্টা করা সমাজের একটা বড় দায়িত্ব। আর সেজন্যে সমাজের পক্ষ থেকে কিছু সংখ্যক লোককে এ কাজের জন্যে দায়িত্বশীল বানিয়ে দেয়া হবে এবং সেজন্যে সম্ভাব্য প্রয়োজনীয় সর্বপ্রকার প্রস্তুতি ও শক্তি-সামর্থ সহাকারে তাদেরকে এ কাজে অগ্রসর হতে হবে।
যে কোন আগুন জ্বলবে-জ্বালাবে একটি ঘর কিংবা বেশী, তা নির্বাপনের ব্যবস্থা করা এবং এদিকে দিয়ে জনগণকে নিরাপওা দন সমাজ-সমষ্টিরেই দায়িত্ব। অনুরূপভাবে যে বিবাদ-বিসম্ভাদের প্রক্রিয়া গোটা সমাজকে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে ভয় হবে, তা মিটাবার ও নির্মূল করার দায়িত্বও তাকেই বহন করতে হবে।
মীমাংসার জন্যে হস্তক্ষেপ করা সমষ্টির দায়িত্ব
পারস্পরিক বিবাদ-বিসংবাদ এক ভিন্ন ধরনের আগুন। এ আগুন কেবল ঘর বাড়ি পাথরই ধ্বংস করে না, কেবল বাঁশ, গাছ ও দ্রব্যসম্ভারই ভস্ম করে না, সমাজের লোকদের হৃদয়, মন ও আত্মকে খেয়ে ফেলে, ভালোবাসা, প্রেমপ্রীতির ভাবধারা হৃদয় মনকে নির্মূল করে দেয়। এই বিপদটি মানুষের ঈমান ও নৈতিকতাকেও ধ্বংস করে। কাজেই সমাজ-সমষ্টি এ আগুন নির্বাপনের জন্যে এবং তা থেকে জনগণকে নিরাপওা দান কারা জন্যে দায়ী। রাসূলে করীম (স) এরূপ ঘটনার খারাপ প্রতিক্রিয়ার কথা বলেছেন এভাবে ‘পারস্পরিক সম্পর্কের বিপর্যয়-তা-ই নির্মূলকারী? [তিরমিযী এই বাড়তি কথাটুকু উদ্ধৃত করেছেন বটে। কিন্তু কোন সনদের উল্লেখ করেননি।] তাঁর এ কথাটিও বর্ণিত হয়েছেঃ আমি বলি না তা চুল নির্মূলকারী এবং বলছি তা দ্বীন-তথা দ্বীনদারীকেই নির্মূল করে দেয়।’ [আবূ দাউদ ও তিরমিযী উদ্ধৃত।]
সমাজের লোকদের পরস্পরে যে ভাঙন-ফাটল-বিবাদই দেখা দিক, তা নির্মূল করার জন্যে হস্তক্ষেপ করা সমাজ সমষ্টিরই কর্তব্য। এমন কি, তা যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও দেখা দেয়, তবু সে ব্যাপারে সমাজ নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে না। তবে একথা স্বতন্ত্র যে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার বিবাদ মীমাংসার জন্যে এবং তার আগুন নির্বাপনের জন্যে তাদের নিকটাত্মীয়দেরই দায়িত্ব নিতে হবে সর্বপ্রথম।– যেন ছেঁড়াজীর্ণ কাপড়ে তালি লাগানোর প্রশ্ন দেখা না দেয়। এ পর্যায়ে আল্লাহ্ বলেছেনঃ
(আরবী*************)
যদি তোমরা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোন ফাটল ধরার আশংকা বোধ কর, তাহলে তোমরা স্বামীর পক্ষ থেকে একজন মীমাংসাকারী এবং স্ত্রীর পক্ষ থেকে আর একজন মীমাংসাকারী নিযুক্ত কর। তারা দুজন মীমাংসা আসতে চাইলে আল্লাহ্ তার তওফীক দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ ও সর্ববিষয়ে অবহিত। (সূরা-নিসাঃ ৪৩)
আয়াতটি স্পষ্ট বলে দিয়েছেন যে, মীমাংসাকারীদ্বয় স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই পরিবারস্থ লোক হতে হবে। কিন্তু এ মীমাংসাকারী প্রেরণ এবং ‘পারিবারিক মজলিশ’ সংগঠনের দায়িত্ব সমাজের ওপর অর্পিত। ‘নিযুক্ত কর’- বা ‘পাঠাও’ বলে ইসলামী রাষ্ট্রের যাবতীয় সমস্যার সমাধানে নিযুক্ত দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গকেই নির্দেশ করা হয়েছে। এ ধরনের লোক পাওয়া না গেলে গোটা সমাজই সেজন্যে দায়ত্বশীল হবে-নিরাপওাদান মূলক দায়িত্ব।
একটি পরিবারে সৃষ্ট ক্ষুদ্র দ্বন্দ্ব মেটাবার জন্যে সমাজ-সমষ্টিই যখন দায়িত্বশীল, তখন দুটো ভিন্ন ভিন্ন পরিবার, গোত্র বা দেশ কিংবা জাতির মধ্যে সৃষ্ট অতিশয় বড় আকারের বিবাদ-বিসম্বাদ মীমাংসা করার দায়িত্বও সমাজ-সমষ্টির ওপরিই অর্পিত হবে স্বাভাবিকাভাবেই। এ দায়িত্ব নিঃসন্দেহে অনেক বড়, নিঃসন্দেহে অধিকতর বাধ্যতামূলক এবং জটিল।
এ প্রেক্ষেতেই কুরআন মজীদ দুই পক্ষের মধ্যকার দ্বন্দ্ব মীমাংসা করার জন্যে-বিবাদ থামাবার জন্যে-সমাজকেই দায়িত্বশীল বানিয়েছে, সেজন্যে যদি অস্ত্রধারণও করতে হয়, তবু এ দায়িত্ব সমাজকেই পালন করতে হবে।
কুরআনের ঘোষণাঃ
(আরবী**************)
মুমিনদের দুটো দল যদি পারস্পরিক যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তাহলে তোমরা তাদের মীমাংসা করে দাও। পরে যদি এক পক্ষ অপর পক্ষের ওপর সীমা লংঘন করে তাহলে সেই সীমা লংঘনকারী পক্ষের বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ কর-যেন শেষ পর্যন্ত আল্লাহ্র নির্দেশের প্রতি ফিরে আসে। যদি ফিরে আসে, তাহলে সে পক্ষদ্বয়ের মধ্যে ন্যায়পরতা সহকারে মীমাংসা করে দাও এবং সুবিচার কর। আল্লাহ্ সুবিচারকারীদের ভালোবাসেন। নিঃসন্দেহে মুমিনরা ভাই-ভাই। অতএব তোমাদের ভাইদের পরস্পরে মীমাংসা কর। আর আল্লাহ্কে ভয় কর, সম্ভবত তোমাদের প্রতি রহমত করা হবে। [(আরবী************)]
কুরআন মজীদ বহুতর স্থানে লোকদের পরস্পরের মধ্যে মীমাংসা করার জন্যে উপদেশ দিয়েছে, উৎসাহ প্রদান করেছে। একটি আয়াতে বলেছেঃ
(আরবী************)
তোমরা আল্লাহ্কে ভয় কর এবং তোমাদের পরস্পরে মীমাংসা কর। আর আল্লহ্ ও তাঁর রাসূলকে মানো-যদি তোমরা মুমিন হও। [(আরবী************)]
অন্য আয়াতঃ
(আরবী************)
লোকদের বহু কানপরামর্শেই কোন কল্যাণ নেই। তবে যে লোক দান কার বা কোন ভালো কাজ অথবা লোকদের মধ্যে মীমাংসার্থে যে পরামর্শ করা হয়, তা স্বতন্ত্র। আর যে লোক এ কাজ করবে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি পাওয়ার উদ্দেশ্যে, আমরা নিশ্চয়ই তাকে বিরাট শুভ কর্মফল দেব। [(আরবী************)]
রাসূলে করীম (স)- এর বহু সংখ্যক হাদীসও বর্ণিত হয়েছে, যা এ কাজটির ওপর খুবই গুরুত্ব আরোপ করে এবং মীমাংসা কাজের উৎসাহ দেয় ঠিক উক্তরূপ শক্তিশালী ও প্রভাব বিস্তারকারী পদ্ধতিতে। একটি হাদীসঃ
আমি কি নামায, রোযা ও দান-সাদ্কার তুলনায়ও অধিক মর্যাদা সম্পন্ন উওম কাজের কথা তোমাদের বলব?……….তা হচ্ছে পারস্পরিক মীমাংসা করা। কেননা পারস্পরিক বিবাদই হচ্ছে নির্মূলকারী। [আবূ দাউদ (আরবী************) এ উদ্ধৃত, তিরমিযী উদ্ধৃত (আরবী************) বলেছেনঃ হাদীসটি সহীহ।]
মীমাংসাকারী কমিটি
সমাজকে কেবলমাত্র পুরুষ লোকদেরকে বিবাদাগ্নি নির্বাপনের কাজে নিযুক্ত করতে বলা হয়েছে। সেই সাথে গাড়ি ও পানি ‘শোষ পাইপ’ ইত্যাদি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও সঙ্গে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। অনরূপভাবে মানুষের পরস্পরের মধ্যে মীমাংসা কার্য সম্পাদানের জন্যে বিশেষভাবে পুরুষদেরকে নিযুক্ত করাই বাঞ্ছনীয়। সেই সাথে এ মীমাংসা কার্যে অংশ প্রহণের জন্যে নানা কমিটি গঠন করতে হবে প্রতিটি দিকে ও গ্রামে। যে কোন বিবাদের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা সেসব কমিটিকে দিতে হবে। সেই কমিটিগুলোর জন্যে সকল উপায় প্রয়োগ কাজ করার সুযোগও থাকতে হবে।
অর্থনৈতিক দায়-দায়িত্ব
অস্বীকার করার উপায় নেই, লোকদের পারস্পরিক বিবাদ নিরসন ও মীমাংসা বাস্তবায়নে একটা দায়দায়িত্ব থাকে এবং বিশেষভাবে তা হচ্ছে অর্থনৈতিক দায়দায়িত্ব। কেননা এ বিবাদের কারণ ‘দিয়েত’ বা ‘রক্তমূল্য’ হতে পারে অথবা দুই পক্ষের মধ্যে এক পক্ষের বা উভয় পক্ষের ওপর ধার্য জরিমানাও হতে পারে এবং হতে পারে, সে জরিমানা দিতে এক সক্ষম হচ্ছে না কিংবা তা দেয়ার যৌক্তিকতা সে স্বীকার করে না; কিন্তু অপর পক্ষ তা ছেড়ে দিতে মোটেই রাজী নয়। আর শক্তি প্রয়োগ করা হলে মীমাংসার পথই বন্ধ হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা হয়। আর আঘাত ভুলানো ও জখম শুকানোর লক্ষ্যে তা করা সমীচীনও মনে হয় না। তা হলে তখন কি করা যাবে? পারস্পরিক মীমাংসা সৃষ্টির কি উপায় হতে পারে তখন? এ অর্থনৈতিক দায়দায়িত্বটা কার মাথায় চাপানো চায়?
সমাধান অতীব সহজ এবং এ সহজলভ্য সমাধান আমাদেরকে যাকাতই দিচ্ছে। যাকাতের অন্যতম ব্যয়খাত হচ্ছে ‘আল-গারেমীন’- ঋণগ্রস্ত লোকগণ। ‘যাকাত ব্যয়ের খাত’ আলোচনায় আমরা বলে এসেছি এ ঋণগ্রস্ত লোকদের মধ্যে সে সব বড় বড় হৃদয়ওয়ালা লোকও গণ্য-ইসলামী সমাজ যাদের পরিচিতি উপস্থাপিত করেছে। অগ্রসর হত এবং মীমাংসা বাস্তবায়িত করার জন্যে ‘দিয়েত’ বা জরিমানাটা নিজের মাল থেকে দিয়ে দিতে বাধ্য হত-বিবাদের আগুন নিভানোর এবং শান্তি ও স্বস্তি কায়েমের উদ্দেশ্যে। এসব লোককে সাহায্য দেয়ার জন্যে যাকাতের এ খাতটি নির্ধারিত হয়েছে। এটা ইসলামের এক অন্যন্য অবদান।
কুবাইচাতা ইবনুল মাখারিক আল-হিলালী (রা) যিনি এমনি এক মীমাংসার কাজে গিয়ে একটা বড় বোঝা মাথায় তুলে নিয়েছিলেন-পরে তিনি রাসূলে করীম (স)- এর কাছে উপস্থিত হয়ে এ ব্যাপারে সাহায্যের প্রার্থনা করেছিলেন। এ সংক্রান্ত হাদীসে বলা হয়েছে, তিনি এ ব্যাপারে সাহায্য প্রার্থনা করতে কোন দ্বিধাবোধ করেন নি। নবী করীম (স) তখন তাঁকে বলেছিলেনঃ অপেক্ষা কর, যাকাতের মাল আসুক, তখন তা থেকে আমরা তোমাকে দিতে বলব। পরে তিনি তাকে বললেনঃ যে ব্যক্তিই এরূপ কোন ঋণের বোঝা নিজের মাথায় গ্রহণ করবে, তার পক্ষে ‘চাওয়া’ হালাল। যেন সে তা পায় এবং পরে সে সতর্ক হয়। (আহমাদ ও মুসলিম এ হাদীস উদ্ধৃত করেছেন।)
ইসলামের অবদানের একটা উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে-ফিকাহ্বিদগণ দৃঢ়তার সাথে বলেছেন-পারস্পরিক বিবাদ মীমাংসা করতে গিয়ে যে লোক ঋণগ্রস্ত হবে, যাকাত থেকে তাকে দিতে হবে-যদিও সেই মীমাংসার ব্যাপারটি ইহুয়াদী-খৃষ্টান যিম্মীদের মধ্যকারই হোক-না-কেন। [(আরবী************)]
কেননা ইসলামী সমাজ-পরিধির মধ্যে যারা বাসন করে, তাদের সকলের মধ্যে শান্তি ও চুক্তি-সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত করাই ইসলামের লক্ষ্যসমূহের মধ্যে অতীব মৌলিক লক্ষ্য।
একটি ফিকহী প্রশ্ন
কিন্তু সেজন্যে কি এক ব্যক্তিকে সর্বপ্রথম নিজের মাল থেকে সন্ধি-সমঝোতার জরিমানা দিয়ে দিতে হবে, পরে সে যা দিয়েছে তা যাকাতের মাল থেকে তাকে দিয়ে দিতে হবে, যেন প্রকৃতপক্ষে ঋণগ্রস্ত হওয়া ব্যক্তিকে যাকাত থেকে দেয়ার কাজটি হয়? জবাবে বলা যায়-সাধারণভাবে ফিকাহ্বিদদের বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, হ্যাঁ, এ শর্তটি রক্ষা করা আবশ্যক। তাহলেই যাকাত সংক্রন্ত আয়াতের আক্ষরিক মর্যাদা রক্ষিত হতে পারে। [(আরবী************) গ্রন্থ এবং তার শরাহ গ্রন্থে বলঅ হয়েছেঃ ষষ্ঠ হচ্ছে ঋণী যে পারস্পরিক বিবাদ মীমাংসা করতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়েছে, সে ধনী হলেও, সে যদি নিজের মাল থেকে তা না দিয়ে থাকে। কেননা নিজের মাল থেকে দিয়ে থাকলে তো সে ঋণগ্রস্ত হল না। যদি সে ঋণ নিয়ে তা দিয়ে থাক, তাহলে তা পূরণের জন্যে সে যাকাত থেকে নিতে পারে। কেননা ঋণ তো রয়ে গেছে। (আরবী************)]
কিন্তু আয়াতটির ভাবধারা এবং যাকাতের এ অংশটি রেখে বিধানদাতা যে লক্ষ্য পেতে চান, তা হচ্ছে, সালিশী কমিটিকে তা দিয়ে দিতে নিষেধ করা যাবে না, যেন সে তার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পাওনাদারকে তার প্রাপ্য দিয়ে দিতে পারে। অবশ্য যখন কোন কমিটির দায়িত্বে এ কাজটি হবে, সমাজ তার রায়কে গুরুত্ব দেবে। কেননা সমাজই এ কমিটি গঠন করেছে এবং তাতে রাজী হয়েছে। আর যদি কুরআন প্রস্তাবিত রূপটা সংরক্ষণ করাই অপরিহার্য হয়, তাহলে কমিটির একজন সদস্যকে তা কোন লোকের বা কোন সংস্থার কাছ থেকে করজ নিয়ে দিয়ে দেবার জন্যে দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। পরে যাকাতের এ ঋণগ্রস্তের জন্যে নির্দিষ্ট অংশ থেকে তাকে তা দিয়ে দেয়া যাবে। ঋণগ্রস্তদের জন্যে নির্দিষ্ট অংশই হচ্ছে ‘সন্ধি-সমঝোতার ফাগু’।
তবে এ ব্যাপারের গুরুত্ব অস্বীকার করা উচিত নয় যে, প্রথম প্রকার-সমাজের হৃদয়-কন্দর থেকে যা ফুটে ওঠেছে-যে দয়াপরবাশ হয়ে মীমাংসার উদ্দেশ্যে নিজের কাছ থেকে ব্যয় করেছে, তা ফেরত পাওয়ার কোন নিশ্চয়তা ছাড়াই, নৈতিকতার মানদন্ডে েএ প্রথম পন্থাটি মূলত লক্ষ্যভূত। ইসলামের নির্ধারণে তা খুব বেশী গুরুত্ব পারে। ‘জাতীয় আধ্যাত্মিক মূল্যমানের সাথে যাকাতের সম্পর্ক’ পার্যায়ে আমরা এ বিষয়ে স্পষ্ট ও বিস্তারিত কথা বলেছি।
কঠিন দুঃখপূর্ণ ঘটনার সমস্যা
প্রাচুর্য ও বিপদমুক্ততা
ইসলামের কাম্য হচ্ছে সমাজের প্রত্যেকটি ব্যক্তি জীবন সামগ্রীর প্রাচুর্য ও ভয়-ভীতিমুক্ত পরিবেশে বসবাস করুক, যেন সে আল্লাহ্র ইবাদত পালন করতে পরে-ঐকান্তিক আল্লাহ্র ভয়, নতি স্বীকার ও আত্মোৎসর্গের ভাবধারা সহকারে। এ কারণে আল্লাহ্ তা‘আলা কুরাইশদের কাছে তাঁর ইবাদতের দাবি করেছেন এ দুটো নিয়ামতের বিনিময়েঃ প্রাচুর্য ও ভয়হীনতা। আল্লাহ্ বলেছেনঃ
(আরবী************)
যেহেতু কুরাইশরা অভ্যস্ত হয়েছে অর্থাৎ শীতকাল ও গ্রীষ্মকালে বিদেশ যাত্রায় অভ্যস্ত। কাজেই তাদের কর্তব্য হচ্ছে এ ঘরের আল্লাহ্র ইবাদত করা, যিনি তাদের ক্ষুধা থেকে রক্ষা করে খাবার দিয়েছেন এবং ভয়-ভীতি থেকে দূরে রেখে নিরাপওা দান করেছেন।
বস্তুত একটি স্থান বা দেশের পক্ষে সবচাইতে দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, উক্ত দুটো-খাবার ও নিরাপওার-নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হওয়া। অন্য আয়াতে আল্লাহ্ তা‘আলা তাই বলেছেন, ‘আল্লাহ্র একটি নগরকে দৃষ্টান্ত স্বরূপ উপস্থাপিত করেছেন, যা নিরাপওাপূর্ণ, নিশ্চিত ছিল, সেখানকার প্রয়োজনীয় রিযিক সর্বদিক দিয়ে প্রচুর পরিমাণে আসত। পরে নগর (বাসী) আল্লাহ্র নিয়ামতসমূহের প্রতি কুফরী করে। তার ফলে আল্লাহ্র তাকে ক্ষুধার ভয়ের পোশাক পরিয়ে দিলেন-যা তারা করত তার কুফল হিসেবে।
এ কারণেই আমরা লক্ষ্য করছি ইসলামী বিধান তার অধীন বসবাসকারী প্রত্যেকটি-মুসলিম বা অমুসলিম-মানুষের জন্যে সমহারে ও মানে উপযোগী জীবিকার ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে, তাতে সে খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান পারে- যেমন পারে চিকিৎসা ও শিক্ষা অতীব সহজ ও আয়াসহীনভাবে।
যাকাতের বিধান প্রণয়নে তা বেকার কার্যক্ষম লোকদের জন্যে কাজের ব্যবস্থা এবং অভাবগ্রস্ত ব্যক্তির জন্যে যথেষ্ট পরিামাণে দ্রব্য দেয়ার ব্যবস্থা করে দারিদ্র্য সমস্যার সমাধান কিভাবে করতে চেয়েছে, তা আমরা লক্ষ্য করেছি। এ প্রাচুর্যের ব্যবস্থা হবে তার জন্যে ও তার পরিবারের জন্যে-একটি মতে এক বছরকালের জন্যে আর অপর মতে তার সমগ্র জীবনের জন্যে প্রাচুর্যের ব্যবস্থা করাই লক্ষ্য। যার কাছে যাথেষ্ট মাত্রার কম অংশ রয়েছে, তাকে তা পূর্ণ করে দেয়া হবে তার জীবিকার মান উন্নত করার লক্ষ্যে।
কালের ঘাত-প্রতিঘাত
কিন্তু দেখা গেছে, মানুষ প্রয়োজন পরিমাণ বরং বিপুল প্রশস্ততা সহাকরে জীবিকার পাচ্ছে, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই কালের বিষদাঁত তাকে দংশন করে বসল। আকস্মিকভাবে তার ওপর আঘাতের ওপর আঘাত হানল। ধনী ছিল, হঠাৎ তাকে নিতান্ত নিঃস্ব দরিদ্র বানিয়ে ফেলল। সম্মনিতাকে করে দিল লাঞ্ছিত অবমানিত-পরম শান্তি-স্বস্তি ও নরাপওার পর চরমভাবে বিপর্যস্ত করে দিল এবং চূর্ণ করে দিল তাকে এ আকস্মিক বিপদ ও দুঃখপূর্ণ ঘটনার আঘাত যা থেকে তার রক্ষা পাওয়ার বা তা প্রতিরোধ করার কোন উপায়ই থাকে না।
একজন ব্যবসায়ী মহাস্বাচ্ছন্দ্য জীবন যাপন করছিল, তার পণ্য বহনকারী নৌকা বা জাহাজ হঠাৎ নদী-সমুদ্রে নিমজ্জিত হল কিংবা জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে গেল আর তাতে নিয়োজিত ছিল তার সমস্ত মূলধন।
কৃষক, বাগান মালিক-আসমানী মুসীবতে তার ফসল বা গাছপালা সব ধ্বংস হয়ে যাওয়ার দরুন সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়ল, চাষীর সোনার ফসল খেয়ে ফেলল কীট-পতঙ্গ –পোকা। সে ফসল সে ঘরে আনতে পারল না-তুলা, গম, ধান যে ফসলই হোক অথবা চাষের গরু মরে গেল, সেই দুঃখে মালিকই মরণাপন্ন হয়ে পড়ল।
আকস্মিক দুর্ঘটনা উওরকালে বীমা ব্যবস্থার সূচনা করেছে
এ ধরনের বহু প্রকারের আকস্মিক দুর্ঘটনা-দুঃখজনক ঘটনাবলী দীর্ঘদিন ধরে বহু সভ্যতা ধ্বংস করেছে এবং সচ্ছলতার সোনালী পরিবেশে বসবাসকারী বহু মানুষকে চরম দারিদ্র্যের নিম্নতম পংকে ডুবিয়ে দিয়েছে। লোকেরা তাদের ব্যবসার শিল্প-কারখানা ও মূলধনের ব্যাপারে- এবং তাদের অন্তর্ধানের পর তাদের বংশধরদের ব্যাপারে কোনরূপ নিরাপওার সন্ধান পাচ্ছিল না। তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। তখন তারা কালের আঘাত ও সময়ের ভ্রুকুট থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় সন্ধানে আত্মনিমগ্ন হল। এর ফলেই বীমা ব্যবস্থার উদ্ভব হল। বিগত শতাব্দীতেই পাশ্চাত্য এ ব্যবস্থার প্রবর্তন করে। তার রূপ ও সংগঠন বিভিন্ন, ক্ষেত্র নানাবিধ।
ইসলামী বীমা ব্যবস্থা
শতাব্দীকাল পূর্বে পশ্চিমা সমাজ যে বীমাব্যবস্থার সাথে পরিচিত হয়েছে তারও বহু পূর্বে ইসলামী সমাজব্যবস্থা একটা বিশেষ পন্থায় ব্যক্তিগণের জন্য নিরাপওার ব্যবস্থা উপস্থাপিত করেছে। মুসলমানদের জন্যে বায়তুলমালই ছিল এ ব্যবস্থা। তা একটা বিরাট সামগ্রিক নিরাপওা ব্যবস্থা। কালের আঘাতে জর্জরিত প্রত্যেকটি ব্যক্তি এ ব্যবস্থার আশ্রয় পেতে পারে, তা হলে সে পাবে সাহায্য এবং আশ্রয়।
এরূপ বিপন্ন ব্যক্তিকে লোকদের অনুগ্রহের দানের ওপর নির্ভরশীল থাকার জন্যে ছেড়ে দেয়া হবে না। লেকাদের পক্ষ থেকে দুটো কল্যাণ সে পেতে পারে-যদি সে তা নিষেধ না করে। তার ব্যাপারে আগ্রহ পোষণ করা হবে। কল্যাণমূলক ভাবধারা প্রবৃদ্ধি এবং লোকদের মধ্যে পারস্পরিক দয়ামূলক আচরণ। নবী করীম (স)-এর কাছে এক ব্যক্তি তার ওপর আগত বিপদের অভিযোগ করল। তখন তিনি তাঁর সাহাবীদের বললেনঃ তোমরা সকলে লোকটাকে দান-সাদকা দাও। অতঃপর লোকেরা তাই করল। [পূর্বে এ ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে এক স্থনে। আহমাদ এটি উদ্ধৃত করেছেন, ৩য় খন্ড, ৩৬পৃ. মুসলিম (আরবী************) আবূ দাউদ-নাসায়ী (আরবী***********) তিরমিযী (আরবী*********)ইবনে মাজাহ (আরবী***********)]
ঋণগ্রস্তদের অংশে আকস্মিক দুর্ঘটনার সাহায্য
ইসলাম বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে কেবলমাত্র নেক লোকদের স্বেচ্ছেমূলক দানের ওপর নির্ভরশীল করে ছেড়ে দেয়নি। বায়তুলমালে তার জন্যে একটা অংশ রয়েছে-যাকাতের মালে তো বটেই। এজন্যে রাষ্ট্রপ্রধান বা দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছে দাবি করা যাবে। তাতে কোন ভয় বা লজ্জার কারণ নেই। কেননা সে একজন মুসলিম নাগরিক-মুসলমানদরে বায়তুলমাল থেকে সে তার অধিকার চেয়ে-আদায় করে নেবে।
পূর্বে উল্লিখিত কুবাইচাতা উবনুল মাখারিক সংক্রান্ত হাদীসে বলা হয়েছে, নবী করীম (স) বলেছেনঃ ভিক্ষা চাওয়া তিনজন লোক ছাড়া আর কারোর জন্যে জায়েয নয়। তার মধ্যে রয়েছে সেই ব্যক্তি, যে আকস্মিকভাবে বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে এবং তার যথাসর্বস্ব নিঃশেষ হয়ে গেছে। তার জন্যে ভিক্ষা চাওয়া সম্পূর্ণ জায়েয-যেন সে বেঁচে ও সক্রিয় থাকার মত জীবিকা পায়।
‘আল-গারেমীন’- এর ব্যাখায়-যাকাত ব্যয়ের খাত সংক্রন্ত আয়াতে প্রাচীন কালের দাফসীরকারেরা বলেছেনঃ যার ঘর পুড়ে গেছে, কিংবা বন্যায় ধন-মাল ভাসিয়ে নিয়েছে, ফলে সে পরিবারবর্গকে নিয়ে কঠিন বিপদে পড়েছে, সে লোকও এ পর্যায়ে গণ্য। [আলগারেমী, যাকাত ব্যয়ের খাত সংক্রন্ত আলোচনা দেখুন]
আকস্মিক বিপদগ্রস্তকে কত দেয়া হবে
কুবাইচাতা সংক্রন্ত রাসূলে করীম (স)-এর হাদীসে আমরা দেখেছি, তার হক্ চাওয়ার অধিকার আছে এবং সেজন্যে দায়ীত্বশীলদের কাছে সে চাইতে পারে-যেন জীবনে বেঁচে থাকার জন্যে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সাহায্য পেতে পারে। ‘জীবনে বেঁচে থাকার পরিমাণ’ বলতে বোঝায় প্রত্যেক ব্যক্তির অর্থনৈতিক মান ও সমাজকেন্দ্রিক পরিবেশ উপযোগী পরিমাণ পাওয়া। অতএব যার ঘর পুড়ে গেছে তার জন্যে উপযুক্ত এবং তার ও তার পরিবারবর্গের সংকুলান হয় এমন প্রশস্ত একটা ঘর-তার অবস্থার সাথে সংগতিসম্পন্ন আসবাবাপত্রসহ। যে ব্যবসায়ী ব্যবসায় ক্ষেত্রে বিপদে পড়েছে, তার উপযোগী বেঁচে থাকা ব্যবস্থা হচ্ছে, তার ব্যবসায়ের চাকাটাকে আবার আবর্তিত করে দেয়া। পূর্বের ন্যায় প্রশস্ততা ও সম্পদশীলতা না হলেও কোন দোষ নেই। এভাবে প্রত্যেক ব্যক্তিই তার সাথে সংগতিসম্পন্ন ব্যবস্থা পাবে।
কোন কোন ফিকাহবিদ মনে করেন, তাকে তার পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে যাওয়ার মত ব্যবস্থা করে দিতে হবে। [গাজালী একথা উল্লেখ করেছেন তাঁর (আবরী************) গ্রন্থে। ‘ফকীর ও মিসকীন’ শীর্ষক যাকাত ব্যয় খাত পর্যায়ে আমরা একথা উদ্ধৃত করেছি।] কিন্তু আমি মনে করি এ মত বা অন্য মত গ্রহণ করা নির্ভর করে যাকাত-ফান্ডের সামর্থ্যের ওপর। তা বেশী হলে একরূপ আর কম হলে অন্য রূপ, সেই সাথে অন্যান্য ব্যয়-খাতগুলোর চাহিদার তীব্রতা বা দুর্বলতার প্রতিও লক্ষ্য রাখতে হবে।
চাষের জমির বিপদ
চাষের জমির যে সব মালিক কষ্ট করে-শ্রম করে চাষকার্য করে কোন বিপদে পড়েছে, তারা যাকাতের অংশ পেয়ে উপকৃত হওয়ায়-অন্যদের তুলনায় বেশী অধিকারী। তাদের প্রয়োজনও অনেক তীব্র। প্রাচীনকালে গ্রামবাসীরা এ সব অবস্থায় পারস্পরিকভাবে সাহায্য-সহযোগিতার ব্যবস্থা করে নিত। কারোর ওপর তেমন বিপদ এলে তারা পারস্পরিকভাবে সাহায্য সংগ্রহ ও একত্রিত করত। তারা বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির দুঃখ দূর করা ও পিঠ শক্ত করার উদ্দেশ্যে এ সাহায্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে দিয়ে দিতে।
পরবর্তীকালে লোকদের মন থেকে কল্যাণমূলক ভাবধারা যখন কর্পূরের মত উবে যায় কিছু সংখ্যক বাদে-মিসকীন চাষী এমন অবস্থায় সম্মুখীন হয় যে, তার চাষের গরু মরে গেলে কপালে হাত চাপড়িয়ে দুঃখ করত, যেন সেটি তার পরিবারেরই একজন। তার স্ত্রী ও পুত্র-কন্যারা সেজন্যে কান্নাকাটি করত, যেন অতি প্রিয়জন মরে গেছে। মা কিংবা বাপ। লোকেরা জানতে পারত যে, অমুক ব্যক্তির কোমর ভেঙে গেছে। এমনিভাবে যার ফসল আসমানী বিপদে নষ্ট হয়ে যেত কিংবা তার চাইতেও কঠিন-আগুনে ঘরবাড়ি জ্বলে যেত, তার জীবিকা ও সঞ্চয় নিঃশেষ হয়ে যেত। এ সব বিপদগ্রস্ত লোকই যাকাতের এ ‘আল-গারেমুন’ খাত থেকে এবং ফকীর-মিসকীনের জন্যে নির্দিষ্ট খাত থেকে সাহায্য লাভ করতে পারত, যেন লেকটি আকস্মিক বিপদের আঘাতে একেবারে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে না যায়। তার হাত ধারে তুলে দেয়া হত যেন সে চলমান জীবনের কাফেলায় শরীক থেকে সক্ষমতায় চলতে পারে, তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে না পড়ে, কেননা তা হলে সেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া লেকাদের সঙ্গে থেকে চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে।
কুমারিত্বের সমস্যা
ইসলামে বৈরাগ্যবাদ নেই
ইসলাম মানব প্রকৃতিতে নিহিত যৌন প্রবৃওির লাগাম ছেড়ে দেয়ার পক্ষপাতী নয়। তাহলে তা যথেচ্ছভাবে বিচরণ শুরু করে দেবে। কোন বাঁধান-কোন নিয়ন্ত্রণই তা মানবে না তখন। এ কারণে ইসলাম জ্বিনা-ব্যভিচারকে সম্পূর্ণরূপে হারাম করে দিয়েছে। যেসব কাজ বা অবস্থা মানুষকে সেদিকে অগ্রসব করে এবং তার মধ্যে নিক্ষেপ করে, সেগুলোকেও হারাম কারা হয়েছে। কিন্তু তার সাথে চরম শত্রুতামূলক আচরণ গ্রহণ করা- তাকে সম্পূর্ণ দমন করতে চেষ্টা করা-সমূলে বিনষ্ট করার পন্থা অবলম্বন করাকেও ইসলাম আদৌ সমর্থন করেনি। এজন্যে ইসলাম বিয়ে কারার পন্থা উদঘাটন করেছে, সেজন্যে আহ্বান জানিয়েছে ও উৎসাহ দিয়েছে এবং স্ত্রী বা স্বামী বিবর্জিত জীবন যাপন ও ‘খাসি’ করে পৌরুষকে চিরতরে খতম করাকে হারাম ঘোষণা করেছে। অতএব কোন মুসলিম ব্যক্তির উচিত নয় শক্তি-সামর্থ্য থাকা সও্বেও বিয়ে কার থেকে বিরত থাকা। আল্লাহ্র জন্যে একান্ত হয়ে যাওয়ার কিংবা ইবাদত, বৈরাগ্যবাদ এবং দুনিয়া ত্যাগ করার দোহাই দিয়ে অবিবাহিত হয়ে থাকা কোনক্রমেই বাঞ্ছনীয় হতে পারে না।
নবী করীম (স) তাঁর কোন কোন সাহাবীর মধ্যে এরূপ মনোভাব গ্রহণের ইচ্ছা বা সংকল্পের কথা জানতে পেরে উদাও কণ্ঠে ঘোষণা করলেনঃ ‘এটা ইসলামের জীবন পদ্ধতি থেকে বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতি, নবী (স)-এর সুন্ন তারে পরিপন্থী।’ তিনি তাঁদের এও বললেনঃ
আমি তোমাদের মধ্যে আল্লাহ্ সম্পর্কে বেশী জানা লোক এবং তোমাদের তুলনায় তাঁর কাছে বেশী ভীত। কিন্তু তা সও্বেও আমি রাত্রি জাগরণ করে ইবাদত করি-ঘুমাইও। আমি নফল রোযা রাখি আবার ভাংগিও। আমি বিয়ে এবং স্ত্রী সঙ্গমও করি। অতএব আমার এ সুন্নাত যে রিহার করে চলবে, সে আমার মধ্যে গণ্য হবে না। [ও]
হযরত সায়দ ইবনে আবূ ওয়াক্কাস (রা) বলেছেনঃ ‘রাসূলে করীম (স) উসমান ইবনে সজ্উনের (রা) স্ত্রীহীনতা ও আল্লাহ্র ইবাদতে গ্রহণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছিলেন। তিনি তাঁকে অনুমতি দিলে আমরা সকলেই ‘খাসি’ হয়ে যেতাম’। [বুখারীতে এসব হাদীস উদ্ধৃত।] তিনি যুব সমাজকে সাধারণভাবে সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ হে যুব সমাজ! তোমাদের মধ্যে যে-ই যৌন মিলনে সক্ষম, তার বিয়ে করা কর্তব্য। কেননা তা দৃষ্টিকে নত রাখে এবং যৌন শক্তিকে সংরক্ষিত করে। [বুখারীতে এ সব হাদীস উদ্ধৃত।]
এ প্রক্ষিতে কোন কোন বিশেষজ্ঞ বলেছেনঃ বিয়ে করা মুসলিম মাত্রের জন্যেই ফরয। যতক্ষণ সে কাজে সক্ষম থাকবে, তা ত্যাগ করা তার হালাল নয়।
‘রিযিক’ বা জীবিকা কম বা সংকীর্ণ হয়ে পড়ার ভয়েও কোন মুসলিমের উচিত নয় বিয়ে থেকে রিত থাকা। তার কাঁধে পরিবারের ভরণ-পোষণ যোগানোর দায়িত্বের দুর্বহ বোঝা চাপবে, এ ভয়েও বিরত থাকা উচিত নয়। তার তো কর্তব্য মুকাবিলা করা। চেষ্টা করা, আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও সে সাহায্য পাওয়ার জন্যে অপেক্ষা করা যার ওয়াদা তিনি করেছেন বিবাহিত লোকদের দেবেন বলে এবং বিবাহ করার মাধ্যমে যারা নিজেদের নৈতিক পবিত্রতা ও চারিত্রিক নিষ্কলুষতা রক্ষা করতে চেয়েছে। আল্লাহ্ তা‘আলা ইরশাদ করেছেনঃ
(আবরী************)
এবং বিবাহ দাও তোমাদের বয়স্ক সন্তান ও নেককার দাসদের ও দাসীদেরকে-তারা দারিদ্র হলে আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহের তাদের সচ্ছল বানিয়ে দেবেন। [(আবরী************)]
রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ তিনজন লোকের সাহায্য করা আল্লাহ্র দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত, নৈতিক পবিত্রতা রক্ষার ইচ্ছায় বিবাহিত, দাসমুক্তির চুক্তিকারী-যে তা আদায় করতে ইচ্ছুক- যে দাস একটা পরিমাণের মালের বিনিময়ে নিজেকে মুক্ত করতে চায় এবং সে শর্তের চুক্তিপত্র করে আর আল্লাহ্র পথের যোদ্ধা। [আহমাদ, নাসায়ী, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ্ ও হাকেম-আবূ হুরায়রা থেকে সহীহ্ সনদে। যেমনঃ (আবরী************)- এ বলা হয়েছে।]
আল্লাহ্র অনুগ্রহ এবং তাঁর সে সাহায্য-যার ওয়াদা তিনি করেছেন বিয়ে করেন নিজেকে পবিত্র রাখতে ইচ্ছুক মুমিন ব্যক্তিকে তার মধ্যে এ ব্যাপারটিও গণ্য যে, মুসলিম সমাজ সরকার বা যাকাত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অভাবগ্রস্ত হলে মোহরানা ও বিয়ের ব্যয় বহনে তার প্রতি সাহায্যের হস্ত প্রসারিত করব। যেন সে দৃষ্টি নীচু রাখা ও যৌন-অংগের পবিত্রতা রক্ষা করার জ্যে ঘেষিত ইসলামের আহ্বানে পুরামাত্রা সাড়া দিতে পারে; একটি মুসলিম পরিবার গঠন এবং আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর বান্দাদেরকে যে স্পষ্ট উজ্জ্বল আয়াত সম্পর্কে অবহিত করেছেন তা অনুধাবন করা তার পক্ষে যেন সম্ভব হয়। আল্লাহ্র বাণীঃ
(আবরী************)
আল্লাহ্র একটি নিদর্শন হচ্ছে, তিনি তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকে তোমাদের জন্যে জুড়ি সৃষ্টি করেছেন, যেন তার কাছে শান্তি লাভ করা এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যে বন্ধুত্ব দয়া-মায়া উদ্রেক করেছেন। নিঃসন্দেহে এ ব্যবস্থায় বহু নিদর্শন নিহিত রয়েছে চিন্তাশীল লোকদের জন্যে। [(আবরী************)]
উপরিউক্ত কথা আমি নিজ থেকে নতুন করে কিংবা নিজের মতে ইজতিহাদ করে বলিনি। আমার একথা পূর্বেও বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের ইমাম ও নেতৃবৃন্দ কয়েক যুগ ধরে বিয়েকেই ‘পূর্ণ মাত্রার প্রাপ্তি’ বা ‘যথেষ্ট মাত্রা’ নির্দিষ্ট করে ধরেছেন। তাঁরা বলেছেনঃ গরীব ব্যক্তির যথেষ্ট মাত্রার প্রাপ্তি হচ্ছে এমন পরিমাণ পাওয়া যদ্দারা যে বিয়ে করতে পারবে-যদি তার স্ত্রী (বা স্বামী) না থাকে এবং বিয়ে করার প্রয়োজন বোধ করে। যাকাতের ব্যয়খাত পর্যায়ের আলোচনায় যথাস্থানে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছি। [দেখুনঃ ‘বিয়ে যথেষ্ট মাত্রার প্রাপ্তি’ বিষয়।]
পালিয়ে যাওয়ার সমস্যা
কুরআন মজীদ নিঃস্ব পথিকের সমস্যাটির ওপর মক্কী ও মাদানী উভয় পর্যায়ের আয়াতসমূহের কত বেশী গুরুত্ব আরোপ করেছে, ‘যাকাতা ব্যয়ের অধ্যায়ে আমরা তা বিস্তারিতভাবে আলোচনা ও বিশ্লেষণ করেছি। কুরআনের অধিকাংশ স্থানেই নিঃস্ব পথিকের প্রতি দয়া প্রদর্শন এবং তাকে তার অধিকার দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ যাকাতের মালে তার জন্যে একটা অংশও নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
এটা এজন্যে যে, ইসলাম প্রতিটি মানুষের জন্যে একটি বাসস্থান বা ঘর থাকা একান্তই প্রয়োজন বলেণ মনে করে কেউ ‘পথের সন্তান’ হোক তা তার কাম্য নয় পসন্দও নয়। এ প্রেক্ষিতেই ইসলামী শরীয়াত প্রতিটি মানুষের জন্যে তার উপযোগী একটি ঘর থাকা সনির্দিষ্টভাবে বাধ্যতামূলক করেছে-যেখানে সে এবং তার পরিবারবর্গ একটি ঘর থাকা সুনির্দিষ্টভাবে বাধ্যতামূলক করেছে-যেখানে সে এবং তার পরিবারবর্গ আশ্রয় নেবে। এটাকে মৌল প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হয়েছে, মানুষের জীবনে বেঁচে থাকা ও স্থিতি গ্রহণের জন্যে এ ঘরের অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য।
যতটুকু প্রাচুর্য বা ‘যথেষ্ট মাত্রার সম্পদ’ না থাকলে মানুষ ফকীর বা মিসকীন গণ্য হয়, তার তাৎপর্য বিশ্লেষণে ইমাম নববী বলেছেনঃ এ পর্যায়ে গণ্য হচ্ছেঃ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান-অন্যান্য একান্ত প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি-কোন রূপ অপচয় বা কার্পণ্র করা ছাড়াই তার জন্যে শোভন হয় এমন। তা এক ব্যক্তির জন্যে এবং তার ব্যয় বহনের ওপর নির্ভরশীল যারা তাদের সকলের জন্যে। [জীবন-উপযোগী মান দ্রষ্টব্য।]
ইবনে হাজম মৌলিক দ্রব্যাদি-ইসলামী সমাজ বিধানে যা প্রতিটি মানুষের জন্য প্রচুর মাত্রার হওয়া আবশ্যক-বর্ণনায় বলেছেনঃ
প্রত্যেক দেশ (বা স্থানের) ধনী লেকাদের কর্তব্য হচ্ছে সেখানকার গরীব লোকদের দায়িত্বশীল হয়ে দাঁড়ানো। রাষ্ট্র সরকার তাদের সেজন্যে বাধ্য করবে। যদি যাকাত ও ফাই সম্পদ দ্বারা সমস্ত মুসলমানের প্রয়োজন পূরণ না হয়, তাহলে অপরিহার্যভাবে প্রয়োজনীয় খাদ্য, শীত-গ্রীষ্ম উপযোগী পোশাক এবং সূর্যের তাপ, বৃষ্টি ও পথিকদের দৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার মত একটা ঘরের ব্যবস্থা অবশ্যই করতে হবে। [(আবরী************)]
যাকাতের ব্যয়খাত পর্যায়ে ‘ইবনুস্ সাবীল’ আলোচনায় আমরা বলে এসেছি যে, একালের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কেউ কেউ ‘ইবনুস্ সাবীল’ বলতে ‘পথে হারানো অবস্থায় পাওয়া লোক’ বোঝানো হয়েছে বলে মনে করেছেন। আমার মতে তা খুব বিচিত্র বা অসম্ভব নয়। কেননা উক্ত রূপ ব্যক্তির জন্যে পথই হচ্ছে তার পরিজন, তার মা, তার বাপ। ‘পথ হারিয়ে যাওয়া অবস্থায় পাওয়া’ মানুষ অন্য অন্য মানুষের কৃত অপরাধের ফলশ্রুতি। কিন্তু তারা সে অপরাধের বোঝা বহন করে না। আল্লাহ্ বলেছেনঃ
(আবরী************)
প্রত্যেক ব্যক্তির উপার্জন তারই জন্যে। কোন বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করে না। [(আরবী************)]
অতএব এ ‘পথে পড়ে পাওয়া লোকদের’ জন্যে যাকাত সম্পদের একটা অংশ নির্দিষ্ট হওয়া আবশ্যক, যদ্দারা তাদের প্রয়োজন পূরণ করা হবে। তাদের উওম প্রশিক্ষণ তা ব্যয় করা হবে এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের উপযোগী করে তাদের তৈরী করা হবে।
যারা ‘ইবনুস-সাবীল’-এর মধ্যে এ ‘পথে পড়ে পাওয়া লোকদের’ গণ্য করেন না, তারা তাদেরকে নিশ্চয়ই ‘ফকীর’ মিসকীন’দের মধ্যে গণ্য করেন আর তাও যে যাকাত ব্যয়ের খাত তাতে কোন মতপার্থক্য নেই।
একটি জরুরী সতর্কবাণী
এ অধ্যায়ের উপসংহারে এ বিষয়ে সতর্ক করে দেয়া আবশ্যক বলে মনে হয় যে, যাকাত পূর্ণঙ্গ ইসলামী বিধানের অংশ। আল্লাহ্র তা‘আলা এ বিধান দিয়েছেন দুনিয়ার মানুষকে হোদায়েত দান এবং তাদের জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে। সমাজের সর্ব প্রকারের সমস্যার সমাধান কেবলমাত্র যাকাত দ্বারাই করা যাবে বলে মনে করা ঠিক নয়। এ পর্যায়ে কিছু কথা আমরা ইতিপূর্বে বলেছি। বিশেষ করে যে সমাজের জীবনের সমগ্র দিক ও বিভাগ থেকে ইসলাম এবং তার শরীয়াতকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে, যেখানকার আচার-আচরণ ও নীতি নির্ধারণ ইসলামী নৈতিকতাকে বাধ্যতামূলকাভাবে মেনে চলা হয় না-ইসলামী-নীতি অনুসরণ করা হয় না, তথায় একা যাকাত কি করতে পারে?
ইসলাম পূর্ণঙ্গ ও পরস্পর অবিচ্ছিন্ন শরীয়াত। তার কিছু অংশ গ্রহণ এবং অপর কিছু অংশ বাদ দিয়ে চলা কোনক্রমেই সমীচীন হতে পারে না। ঠিক তেমনি জীবনের কোথাও ইসলাম ছাড়া অন্য কোন বিধান ‘আমদানী’ করাও সম্পূর্ণ অবাঞ্ছনীয়। ইসলামের কোন একটা অংশ-যেমন যাকাত- দিয়ে গায়র ইসলামী বিধানের সাথে জোড়াতালি দিলে যেমন অশোভন হবে, তেমনি হবে সম্পূর্ণ নিষ্ফল। এরূপ জোড়াতালি দেয়া নীতি সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য।
ইয়াহুদীরা এ নীতি গ্রহণ করেছিল বলে আল্লাহ্ তাদের তীব্র সমালোনা করেছেন। তাদের প্রশ্ন করেছেনঃ
(আরবী************)
তোমরা কি আল্লাহ্র কিতাবের কিছু অংশ বিশ্বাস কর আর কিছু অংশ অবিশ্বাস করা? [(আরবী************)]
রাসূলে করীম (স) এবং তার পর প্রত্যেক শাসককে যারাই আল্লাহ্র বিধানের কিছু অংশ বাদ দিয়েছে-আল্লাহ্ তা‘আলা সাবধান করে দিয়েছেন এই বলেঃ
(আরবী************)
আল্লাহ্র নাযিল –করা বিধান অনুযায়ী লোকদের ওপর প্রশাসন চালাও, তাদের কেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না, তাদের ব্যাপারে সাবধান থাকবে-তোমার প্রতি আল্লাহ্র নাযিল করা বিধানের কিছু অংশ থেকে তারা তোমাকে বিরত রাখতে পারে। [(আরবী************)]
আসলে যাবতীয় সমস্যার সমাধান হচ্ছে ইসলামকে গ্রহণ-পূর্ণঙ্গ ইসলামের বাস্তবায়ন। [দেখুন মৎ প্রণীত গ্রন্থঃ (আরবী************)]
চতুর্থ অধ্যায়
ফিতরের যাকাত
• তার অর্থ, তার বিধান, তার যৌক্তিকতা-বৈশিষ্ট্য।
• কার ওপর তা ওয়াজিব? কাদের পক্ষ থেকে দেয়া ওয়াজিব?
• দেয় পরিমাণ, কিসে তা ওয়াজিব হয়?
• ওয়াজিব হওয়ার সময় এবং দিয়ে দেয়ার সময়।
• ফিতরের যাকাত কার জন্যে ব্যয় করা হবে?
এ অধ্যায়ের পাঁচটি পরিচ্ছেদ
প্রথমঃ ‘ফিতরের যাকাত-এর তাৎপর্য, তার বিধান বর্ণনা এবং তার বিধিবদ্ধ হওয়ার যৌক্তিকতা।
দ্বিতীয়ঃ কার ওপর তা ওয়াজিব? এবং কাদের পক্ষ থেকে দেয়া ওয়াজিব?
তৃতীয়ঃ ওয়াজিবের পরিমাণ, কোন জিনিসে তা হবে? মূল্য দিয়ে আদায় করার হুকুম কি?
চতুর্থঃ ওয়াজিব হওয়ার সময়-দেয়ার সময়।
পঞ্চমঃ ফিতরের যাকাত কার জন্যে ব্যয় করা হবে?
প্রথম পরিচ্ছেদ
ফিতরের যাকাত-এর অর্থ, তার হুকুম ও যৌক্তিকতা
ফিতরের যাকাত- এর অর্থ
‘যাকাতুল ফিতর’- ‘ফিতরের যাকাত’ বলতে সেই যাকাত বোঝায়, যা রমযানের রোযা শেষ করার কারণে ধার্য হয়। তাকে ‘সাদকায়ে ফিতর’- ও বলা হয়। আমরা বলেছি, (আরবী************) শব্দটি শরীয়াতের ব্যবহারে ‘ফরয যাকাত’ বোঝায়। কুরআন ও সুন্নাতে এর বহুল ব্যবহার লক্ষণীয়। একে ‘যাকাতুল ফিত্রাতও নাম দেয়া হয়েছে; তা যেন প্রকৃতি বা স্বভাবসম্মত- সৃষ্টিত্বের সাথে সম্পর্কিত। মানব প্রকৃতির ওপর তা ওয়াজিব করা হয়েছে আত্মর ‘তাজকীয়’ এবং তার কার্যবলী পরিচ্ছন্ন-নির্ভুল-নিষ্কলুষ করার লক্ষ্যে। এখানে উৎসকে ‘ফিত্রাত’ বলা হয়-অর্থাৎ ‘জন্ম দানকারী’। তা আরবী নয়, বাইরে থেকে এসে আরবী হয়ে যাওয়া শব্দও নয়। এটা হচ্ছে ফিকাহবিদদের পরিভাষা। [ইবনে আবেদীন তাঁর টীকায় বলেছেনঃ (আরবী************) গ্রন্থে বলা হয়েছে, (আরবী************) শব্দটি ফিকাহবিদ প্রমুখের কালামে ‘জন্ম স্থান’ অর্থে ব্যবহৃত। কেউ কেউ এটিকে ‘সাধারণের কথা’ বলে অভিহিত করেছেন অর্থাৎ ‘ফিত্রাত’ অর্থ সাদ্কা- আভিধানিক ব্যবহার। কেননা অভিদানে এইরূপ অর্থ লেখা হয়নি। ‘আল-কামুস’-এ বলা হয়েছে, ‘আলফিত্রাতু’ অর্থ ‘সাদাকাতুল ফিতর’- রোযা না রাখার সাদকা। আর একটি অর্থঃ ‘সৃষ্টিতত্ব (আরবী************) কোন কোন বিশেষজ্ঞ প্রথমটি অসহীহ্ বলে আপওি করেছেন। কেননা এর উৎস শরীযাতদাতা ছাড়া কেউ জানে না। ‘আল-কামুস’-এর ভ্রান্তির মধ্যে গণ্য-যা বেশীর ভাগই হয় শরীয়াতী তও্বকে আভিধানিক তও্বের সাথে সংমিশ্রিত করার কারণে। (আরবী************) গ্রন্থে লেখা হয়েছেঃ ‘ফিত্রাত’ শব্দটি এই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে ইমাম শাফেয়ীর রচনায় আর তা অভিধানের দৃষ্টিতে সহীহ্ যদিও আমার কাছে রক্ষিত মৌল গ্রন্থাবলীতে তা পাওয়া যায়নি। নববী রচনায় বলা হয়েছে, ‘ফিত্রাত’ জন্ম স্থান বোঝায়, সম্ভবত তা সেই ‘ফিত্রাত’ থেকে গৃহীত, যার অর্থ ‘সৃষ্টি কার্য’। আবূ মুহাম্মাদ আল-আরহরী বলেছেন, তার অর্থ, ‘যাকাতুল খিলাকাত-‘সৃষ্টির যাকাত’ অন্য কথায় তা ‘দেহের যাকাত’। (আরবী************) গ্রন্থে বলা হয়েছেঃ আল ফিত্রাত’ অর্থ ‘মূল’। ফিত্রাত যাকাত ওয়াজিব অর্থ দেহের যাকাত। ‘দেহ’ শব্দটি উহ্য করে “ফিতরাত” শব্দটিকে তদস্থানে বসানো হয়েছে। এতেই অর্থ বোঝা যায় বলে এরূপ ব্যবহার যথেষ্ট মনে করা হয়েছে। আল-কাহাস্তানীও এ কথা বলেছেন। এজন্যে কারো কারো কথাঃ মাথার সাদকা, দেহের যাকাত। সারকথা, ‘আল-ফিতরাতু’ শব্দের আভিধানিক অর্থ নিঃসন্দেহে ‘সৃষ্টিতত্ব’। তা এ ক্ষেত্রে ব্যবহার তার উৎস বোঝাবার জন্যে। কোন উহ্য না ধরে তা ব্যবহার করা হলে তা জন্মস্থানের শরীয়াতসম্মত পরিভাষা গণ্য হবে। আর উহ্য ধরা হলে তার আভিধানিক অর্থ গণ্য হবে। সম্ভবত (আরবী************) গ্রন্থকার এ কথাই বলতে চেয়েছেন। দেখুনঃ (আরবী************)]
‘সাদকায়ে ফিতর’ হিজরতের দ্বিতীয় বছর ধার্য করা হয়েছে। আর এ বছরই ফরয হয়েছে রমযান মাসের রোযা। [(আরবী************)] ‘ফিত্রা’ ওয়াজিব হয়েছে রোযাদারের বেহুদা ও অশ্লীল কথা-কাজ থেকে তাকে পবিত্রকরণের লক্ষ্যে। সেই মিসকীনদের জন্যেও খাদ্য ব্যবস্থা গ্রহণ, অভাবের লাঞ্ছনা থেকে-ঈদের দিনে ভিক্ষাবৃওি থেকে তাদের বাঁচানো এর সুফল।
এ যাকাতটি অন্য সব যাকতা থেকে স্বতন্ত্র এক প্রকারের কর। কেননা এটা ব্যক্তিদের ওপর ধার্য হয়। আর অন্যগুলো ধার্য হয় ধন-মালের ওপর। এ কারণে অপরাপর যাকাতে যা কিছু শর্ত, এখানে সেগুলো গণ্য করা হয়নি। নিসাব পরিমাণের মালিকানা থাকা শর্ত নয়-যার বিস্তারিত বিবরণ যথাস্থানে দেয়া হয়েছে। পরেও এর ওপর আলোকপাত করা হবে। ফিকাহবিদগণ এ যাকতের নাম দিয়েছেন, ‘মাথার যাকাত’ ‘ঘাড়ের যাকাত’ ‘শরীরের যাকাত’ ইত্যাদি। আর শরীর বলেতে ব্যক্তি বোঝায়-প্রাণ বা আত্ম নয়।
ফিতরের যাকাতও ওয়াজিব
বহু কয়জন হাদীস গ্রন্থ সংকলক আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) সূত্রে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন যে, রাসূলে করীম (স) রমযানের ফিতরের যাকাত ধার্য করেছেন এক ছা’খেজুর অথবা এক ছা’ গম প্রত্যেক স্বাধীন বা ক্রীতদাস ব্যক্তির ওপর-পুরুষ কিংবা মেয়েলোক-মুসলিমদের মধ্যে থেকে। [(আরবী************) গ্রন্থে উদ্ধৃত নাইলুল আওতার, ৪র্থ খন্ড, ১৭৯ পৃষ্ঠা উসমানীর ছাপা।]
পূর্বের ও পরবর্তী জমহুর আলিমগণ বলেছেনঃ হাদীসের শব্দ (আরবী************) অর্থ বাধ্যতামূলক করেছেন, ওয়াজিব করে দিয়েছেন। অতএব ফিতরের যাকাত-তাঁদের মতে ওয়াজিব বা ফরয। কেননা তাও আল্লাহ্র সাধারণ অর্থবোধক আদেশ (আরবী************) ‘এবং যাকাত দাও’-এর আওতাভুক্ত। রাসূলে করীম (স)-একে ‘যাকাত’ বলেছেন। কেননা তা আল্লাহ্র আদেশের আওতাভুক্ত। আর রাসূলে করীম (স)-এর কথা (আরবী************) বেশীর ভাগ এ অর্থেই ব্যবহৃত হয়।
একটা তাগিদের দিক হল (আরবী************) অর্থ ‘ওয়াজিব কারেছেন’- বাধ্যতামূলক করেছেন। এ শব্দটির পরই****** (ওপর) ব্যবহৃত হয়েছে। তাও ‘ওয়াজিব’ই বোঝায়। কেননা হাদীসে প্রত্যেক স্বাধীন ও ক্রীতদাসের ওপর বলা হয়েছে। সহীহ বর্ণনাসমূহে তাই উদ্ধৃত হয়েছে ****** ‘আদেশ করেছেন; আর বাহ্যত ******* ‘ওয়াজিব’ বোঝায়। [(আরবী************)]
আবুল আলীয়া, আতা ও ইবনে সিরীন স্পষ্ট ভাষায় বলেছেনঃ তা ফরয-যেমন বুখারী প্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে। তা ***** হিসেবে উদ্ধৃত হয়েছে। হাফেয ইবনে হাজার ‘ফতহুলবারী’ গ্রন্থে বলেছেনঃ আবদুর রাজ্জাক হাদীসটিকে ইবনে জুরাইজ থেকে-আতা থেকে- এ সূত্রে ‘মুওাছিল’ রূপে উদ্ধৃত করেছেন। ইবনে আবূ শায়বা আছেমুল আহওয়াল থেকে-অন্যান্যদের থেকে- এ সূত্রে ‘মুওাছিল’ রূপে উদ্ধৃত করেছেন। বুখারী শুধু এদের উল্লেখ করেই ক্ষান্ত হয়েছে। কেননা তারা ফিতরা ফরয বলেছেন নতুবা ইবনুল-মুনযির প্রমুখ বলেছেন যে, এর ওপর ‘ইজমা’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।] আর তাই মালিক, শাফেয়ী আহমাদের মত।
হানাফীদের মতে তা ওয়াজিব, ফরয নয়। এটা ফরয ও ওয়াজিবের মধ্যকার পার্থক্যের নিয়মের ওপর ভিওিশীল। তাঁদের মতে ফরয হচ্ছে শুধু তা যা অকাট্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত। আর ওয়াজিব হচ্ছে তা, যা ***** অপ্রত্যয়মূলক দলিল দ্বারা প্রমাণিত। এ পার্থক্যটার ফলশ্রুতি হচ্ছে, ফরয অমান্যকারী কাফির হবে; কিন্তু ওয়াজিব অমান্যকারী কাফির হবে না। এ কারণে তাঁরা ওয়াজিবকে বলেন, ‘বাস্তব কর্মীয় ফরয’ (আরবী************) আর তার মুকাবিলায় রয়েছে ‘আকীদাগতভাবে ফরয। কিন্তু অপর তিনজন ইমামের মতে ফরয এ থেকে ভিন্ন। তা দুভাগের সমন্বয়ঃ যা অকাট্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত, আর যা ***** দলিল দ্বারা প্রমাণিত। এ থেকে আমরা জানতে পারিঃ হানাফীরা হুকুমের ক্ষেত্রে অপর তিনটি মাযহাবের বিরোধী নন। [মুহাক্কিক ইবনুল হুম্মাম বলেছেনঃ তাৎপর্যের দিক দিয়ে এ দুই অর্থের মাঝে কোন পার্থক্য নেই-মতবিরোধ নেই। কেননা তাঁরা যাকে ফরয বলেনতা এ রকম নয় যে, তা অস্বীকার করলে কাফির হতে হবে। তা ওয়াজিব অর্থে যাকে আমরা ওয়াজিব বলি। সারকথা হচ্ছে, তাঁদের পরিভাষায় যা ফরয, তা আমাদের বচনে ওয়াজিব। তার দুটি অংশের একটিতে আমরা প্রয়োগ করেছি। হানাফীরা ফিতরাকে ওয়াজিব বলেন-ফরয নয় এজন্যে যে, তার ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারেই কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে সেসব হাদীস ৈএ পর্যায়ে উদ্ধৃত হয়েছে তা অকাট্যভাবে প্রমাণিত নয়। তার তাৎপর্যও নয় অকাট্য। দেখুনঃ (আরবী************)] আসলে এটা পরিভাষাগত মতপার্থক্য। আর পরিভাষায় কোন দোষ নিহিত নেই।
মালিকী মতে লোকেরা ‘আশহুর’ থেকে উদ্ধৃত করেছেন তা সুন্নাতে মুয়াক্কিদাহ। [ইবনে হাজম ‘আল-মুহাল্লা’ গ্রন্থে (৬ষ্ঠ খন্ড- ১১৮ পৃ.) মালিক থেকে বর্ণনা করেছেনঃ ফিতরের যাকাত ফরয নয়। শায়খ শাকের তার ওপর টীকায় লিখেছেন যে, এটা ইবনে হাজমের বোঝার ভুল কিংবা যে তার থেকে বর্ণনা করেছেন, তার ভুল। ইমামা মালিক ******** গ্রন্থে বলেছেনঃ যাকাত ওয়াজিব হয় মরুবাসীদের ওপর, যেমন ওয়াজিব হয় নগরবাসীদের ওপর। আর তা এজন্যে যে, ‘রাসূলে করীম (স) রমযানের ফিতরা লোকদের ওপর ফরয করেছেন’।….. ইবনে রুশদ তাঁর (আরবী************) গন্থে (১ম খন্ড ২৬৯ পৃষ্ঠা) মাযহাবের শেষে দিকের কোন কোন আলিম থেকে এ কথা উদ্ধৃত করেছেন- নির্দিষ্ট করেননি।] আর জাহিরী মরেত কারো কারো কথাও এই। শাফেয়ী মতের ইবনুল-লুবান এ মত দিয়েছেন। তারা ****** শব্দটির যা হাদীসে ব্যবহৃত হয়েছে-‘ নির্ধারণ করেছেন’ এ অর্থ মনে করেছেন। পূর্বে আমরা যা উল্লেখ করেছি, তা তাদের জবাব।
ইবনে দকীকুল ঈদ বলেছেনঃ অভিধানে ****** অর্থ ****** ‘পরিমাণ ঠিক করা।’ কিন্তু শরীয়াতী বচনে তার অর্থ ‘ওয়াজিব’ করা। অতএব এ অর্থে গ্রহণ করাই বাঞ্ছনীয়।
ইবনুল হুম্মাম বলেছেনঃ শরীয়াতদাতার কালামে ব্যবহৃত শব্দকে তার শরীয়াতী প্রকৃত তাৎপর্যে গ্রহণ করা একটা স্থির সিদ্ধান্ত-যতক্ষণ অন্য কোন অর্থ গ্রহণে বাধ্যকারী কিছু না আসে। আর শরীয়াতী তও্ব নিছক একটা নির্ধারণই নয়-বিশেষ করে বুখারী ও মুসলিম গ্রন্থদ্বয়ে ব্যবহৃত শব্দে। নবী করীম (স) ফিতরের যাকাত দেয়ার আদেশ ****** করেছেন। আর ****** শব্দের অর্থ ******* ‘আদেশ করেছেন।’
তাকে যাকাত বলায় তার ‘ওয়াজিব’ (ফরয) হওয়াটারই সমর্থন মেলে। তাই তা সাধারণ যাকাতের অন্তর্ভুক্ত-যার আদেশ করেছেন আল্লাহ্ তা‘আলা এবং তা দিতে অস্বীকারকারীদের কঠিন আযাব দেয়ার ওয়াদা করেছেন।
এ প্রেক্ষিতে ইমাম নববী ইবনুল লুবানের মত উদ্ধৃত করেছেন যে, তা সুন্নাত। পরে বলেছেন, এটা বিরল, অগ্রহণীয়। বরং সুস্পষ্ট গলদ।
ইসহাক ইবনে রাহ্আই বলেছেন, ফিতরের যাকাতকে ওয়াজিব মনে করা ‘ইজমা’ সমর্থিত। বরং ইবনুল মুন্যির বলেছেনঃ তার ওয়াজিব হওয়ার ওপর ‘ইজমা’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ইসহাকের এ কথাটি দুর্বোধ্য। কেননা তাতে ত্রুটিপূর্ণ অপর্যাপ্ত মতপার্থক্য রয়েছে যেমন পূর্বে উল্লেখ করেছি। আরও এজন্যে যে, ইবরাহীম ইবনে উলিয়া ও আবূ বকর আল-আসম বলেছেন, যাকাত ফরয হওয়ার দরুন তার ওয়াজিব হওয়াটা নাকচ হয়ে গেছে।
তাঁদের উভয়ের দলিল হচ্ছে কাইস ইবনে সায়াদ ইবনে উবাদ থেকে আহমাদ ও নাসায়ী উদ্ধৃত বর্ণনা তাঁকে সাদকায়ে ফিতর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তখন তিনি বলেছেনঃ
রাসূলে করীম (স) যাকাত সংক্রান্ত আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্বে ‘সাদকায়ে ফিতর দেয়ার জন্যে আদেশ করেছিলেন। পরে যখন যাকাতের আয়াত নাযিল হয়, অতঃপর তিনি আমাদের আদেশও করেন নি, নিষেধও করেন নি অথচ আমরা দিয়ে যাচ্ছিলাম।
এ বর্ণনার সনদে আপওি আছে। কেননা তার একজন বর্ণনাকরী অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি। হাফেজ ইবনে হাজার যেমন বলেছেন। [সয়ূতী নাসায়ীর শরাহ গ্রন্থে এটারই অনুসরণ করেছেন। আর শাওকানী তাঁর ‘নাইলুল আওতার’ গ্রন্থে (৪র্থ খন্ড-১৮০ পৃ.) উসমানিয়া ছাপা) কিন্তু শায়খ আহমাদ শায়েক ইবনে হাজার তার মতের লোকদের কথায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন-হাদীসটি উদ্ধৃত করার পর যেমন নাসায়ী উদ্ধৃত করেছেন (৫ম খন্ড, ৪৯ পৃ.) দু’টি সনদ সূত্রে। সনদ দুটি সম্পর্কে বলেছেনঃ ‘দুটি সহীহ সনদ; ফিকাহ বর্ণনাকারীরাই তা বর্ণনা করেছেন। তাতে অজ্ঞাত পরিচয় কেউ নেই আদৌ। (আরবী************)] তা সহীহ হবে ধরে নিলে তাতে এমন দলিল নেই যা তার মনসূখ হওয়া প্রমাণ করতে পারে। কেননা রাসূলে করীম (স) প্রথমবার আদেশ দেয়াকে যথেষ্ট মনে করেছেন, আবার আদেশ দেয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। কেননা একটি ফরযের আদেশ নাযিল হলে অপর ফরযটি নাকচ হওয়া বাধ্যতামূলক করে না। [(আরবী************)] আল্লাহ্ ও রাসূলে (স)-এর আদেশের মৌল কথা হচ্ছে, তা সব সময় সুদৃঢ় ও স্থায়ী থাকে। আর শুধু সম্ভাব্যতার দ্বারা ‘মনসূখ’ হওয়া প্রমাণিত হয় না।
এ কারণে মুসলমানদের কাছে চূড়ান্তভাবে স্থিত যে,ফিতরের যাকাত ওয়াজিব। কেউ বিরূপ মত পোষণ করলে সেজন্যে কারোর কোন পারোয়া নেই। কেননা তা তার পূর্বে ও পরে অনুষ্ঠিত ইজমা’র বিরোধী। [দেখুনঃ (আরবী************)]
প্রাচ্যবিদ শাখ্ত এ পর্যায়ে যা কিছু উল্লেখ করেছেন, তাতে বহু এলামেলো কথা বলেছে। [শাখত (আরবী************) বলেছেন, ফিতরার যাকাত ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে ফিকাহবিদগণ বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, শেষ পর্যন্ত যে মতটি প্রাধান্য পেয়েছে তা ফিতরের যাকাতকে ওয়াজিব বলেছে। আর মালিকীদের মতে তা সুন্নত ছাড়া আর কিছু নয়।
এ কথায় বহু ভূল রয়েছে। আমরা দেখেছি, ফিকাহবিদগণ ফিতরার ওয়াজিব হওয়ার মতে সকলেই ঐক্যবদ্ধ। ইবনুল মুনযির তাঁর ওপর ইজমা হওয়ার কথা বলেছেন। বিভিন্ন যুগে দুই জন বা তিনজন যদি ভিন্ন মত পোষণ করে থাকেন, তা হলে তাদের এ বিরূপ মত ধর্তব্য নয়। তবে মালিকীদের মতে তা ওয়াজিব ছাড়া আর কিছুই নয়। এ মাযহাবের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থাবলীতে তাই বলা হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপঃ
(আরবী************)
দ্রষ্টব্যৗ ‘আশহুব যা উল্লেখ করেছেন, তা এ মযাহাবে নির্ভরযোগ্য নয়। শাখত-এর দলিল ***** গ্রন্থে উদ্ধৃত ইবনে আবূ জায়দের কথায় বিভ্রান্ত হয়েছে। তাতে লেখা আছেঃ ‘ফিতরের যাকাত সুন্নাত, ওয়াজিব, রাসূলে করীম (স) তা ছোট বড় সকলের ওপর ফরয করেছেন। তিনি যদিও শুধু ‘সুন্নাত’ বলেই ক্ষান্ত হন নি। বরং বলেছেন, ওয়াজিব, রাসূলে করীম (স) তা নির্ধারিত করেছেন। এজন্যে ব্যাখ্যাকারীরা বলেছেনঃ প্রসিদ্ধ মত হচ্ছে, তা সুন্নাত নির্ধারিত। দেখুনঃ (আরবী************) মালিক আল-মুয়াওা গ্রন্থে স্পষ্ট করে লিখেছেন, তা ওয়াজিব এবং হাদীসের দলিল দ্বারা তা প্রমাণিত করেছেন-যেমন পূর্বে বলেছি। এ ক্ষণে প্রমাণীত হল যে, ফিতরার ওয়াজিব হওয়াটা কেবল ‘রায়’ দ্বারা ঠিক করা হয়নি। যেমন শাখত মনে করেছেন। বরং তা রাসূলে করীম (স)-এর সময় থেকেই সমাজে চালু হয়েছে।]
ফিতরের যাকাত বিধিবদ্ধ হওয়ার যৌক্তিকতা
এ যাকাত (ফিতরা) ওয়াজিব হওয়ার যৌক্তিকতা পর্যায়ে হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছেঃ
(আরবী************)
রাসূলে করীম (স) ফিতরের যাকাত নির্ধারিত করেছেন রোযাদারকে বেহুদা অশ্লীল কথা ও কাজ থেকে পবিত্র রাখা এবং মিসকীনদের জন্যে খাবারের ব্যবস্থাস্বরূপ। [হাদীসটি আবূ দাউদ কর্তৃক (আরবী************) অধ্যায়ে উদ্ধৃত করেছেন। এবং তিনি মুনযেরী এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করেননি। তার হাদীসে বর্ণিত যৌক্তিকতা দুটি ব্যাপারের সমন্বয়। অর্থ, দুজনই হাদীসটিকে ‘হাসান’ মনে করেন-যেমন বলা হয়েছে। হাকেমও উদ্ধৃত করেছেন। (১ম খন্ড-৪০৯ পৃ.) এবং বলেছেন, হাদীসটি সহীহ বুখারীর শর্তে। যাহবী তা সমর্থন করেছেন। ইবনে মাজাহও উদ্ধৃত করেছেন ‘যাকাতুল ফিতর’ অধ্যায়। দারে কুতনী (২১৯ পৃ.) বলেছেনঃ এ হাদীসের বর্ণনাকারীদের মধ্যে কেউ ‘দোষী’ বা ‘আহত’ নয়। বায়হাকী ১৬৩ পৃষ্ঠার। দেখুনঃ মিরকাত-৪র্থ খন্ড, ১৭৩ পৃ. (আরবী************) ২য় খন্ড, ৪১১ পৃ.। আর হাদীসটির শেষ অংশ হচ্ছেঃ (আরবী************) যে তা নামাযের পূর্বে আদায় করবে, তার যাকাত গৃহীত, (আরবী************) আর যে তা নামাযের পরে দেবে, তা একটি সাধারণ দান হবে। হাদীসের ****** শব্দটি অর্থহীন-ফায়দাহীন কাজ বোঝায়-যার কোন তাৎপর্য থাকে না অথবা ‘বাতিন’ও হতে পারে। আর ******** মূলত যৌন মিলন ও স্বমী-স্ত্রীর মধ্যকার কাজ বোঝায়। পরে তা সকল অশ্লীল বীভৎস কাজ বোঝাচ্ছে সাধারণ অর্থে।]
হাদীসে বর্ণিত যৌক্তিকতা দুটি ব্যাপারের সমম্বয়।
প্রথম ব্যাপার রমযান মাসের রোযাদারদের সাথে সাথে সম্পৃক্ত। তাদের রোযা কোন বেহুদা কথা ও অশ্লীল কাজের দোষযুক্ত হয়ে যেতে পারে এ আংশকা আর পূর্ণঙ্গ রোযা তো তাই যা মুখ ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পালন করে-যেমন রোযা থাকে পেট ও যৌন অঙ্গ। কাজের রোযাদারকে তার মুখ, তার কান, তর চক্ষুদ্বয়, তার হাত কিংবা তার পা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (স) কর্তৃক নিষিদ্ধ কথা কাজ দ্বারা কলুষিত হলে তা ক্ষমা করা হবে না। আর রোযাদার সাধারণতই এ সব থেকে রক্ষা পেতে পারে না- বিজয়ী মানবীয় দুর্বলতার দরুন। এ কারণে রোযা শেষ হওয়ার পর এ যাকাতের ব্যবস্থা করা হয়েছে-ঠিক ‘গোসল’ বা ‘হাম্মামের’ মত-মন দুষিত হলে তার ক্ষতি থেকে পবিত্র হওয়ার লক্ষ্যে অথবা রোযা দোষযুক্ত হলে তার ত্রুটির ক্ষতি পূরণের জন্যে এ ব্যবস্থা। ‘কেননা ভাল ও উওম কার্যাবলী খারাপকে ধুয়ে মুছে দেয়’- এতো জানা কথা।
যেমন শরীয়াতের বিধানদাতা পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামাযের সাথে নিয়মিত সুন্নাত নামায চালূ করেছেন। কেননা ফরয নামাযে কোন ত্রুটি বা কোন কোন নিয়ম পালনে অসবিধা হতে পারে। কোন কোন ইমাম এ ব্যবস্থাকে ‘সহু সিজদা’র সাথে তুলনা করেছেন। অকী, ইবনুল জাররাহ বলেছেন, ‘রমযান মাসের জন্যে ফিতরের যাকাত নামাযের ‘সহু সিজদা’র সমতুল্য। তা রোযার ত্রুটি-বিচ্যুতির ক্ষতি পূরণ করে দেয়, যেমন সহু সিজদা নামাযের ত্রুটির ক্ষতিপূরণ করে। [(আরবী************)]
আর দ্বিতীয় ব্যাপার সমাজ-সমষ্টির সাথে সম্পৃক্ত, তার সর্বত্র-বিশেষ করে মিসকীন ও অভাবগ্রস্ত লোকদের মধ্যে ভালোবাসা, প্রীতি ও আনন্দ বিস্তৃত করা একটা বড় লক্ষ্য।
কেননা ঈদ তো সাধারণভাবে আনন্দ স্ফূর্তর দিন। কাজের সে দিন সমাজের সমস্ত লোক যাতে করে এ আনন্দ স্ফূর্তিতে যোগদান করতে পারে তার ব্যবস্থা করা একান্ত বাঞ্ছনীয়। কিন্তু মিসকীনরা কখ্খনই আনন্দ লাভ করতে পারে না যদি কেবল ধনী সচ্ছল লোকেরাই চর্ব্য-চোষ্য লেজ্য-পেয় ভোগ করে, আর তারা এ মহা ঈদের দিনে খাবারও না পায়।
এ কারণে শরীয়াতরে যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ এ দিনে এমন ব্যবস্থা গ্রহণের অপরিহার্যতা মনে করেছে, যার ফলে অভাবগ্রস্তরা অভাব ও ভিক্ষার লাঞ্ছনা থেকে মুক্ত থাকতে পারবে। সেই সাথে তার মনে এ চেতনাও জাগবে যে, সমাজ তাকে ভুলে যায়নি, তার প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করেনি। বিশেষ করে এ জাতীয় আনন্দ ও উৎসবের দিনে। এ কারণে হাদীসে বলা হয়েছেঃ
(আরবী************)
তোমরা এ দিনে তাদের সচ্ছল করে দাও। [‘নাইলুল আওতার’ গ্রন্থে বলা হয়েছেঃ হাদীসটি বায়হাকী ও দারেকুতনী কর্তৃক ইবনে উমর থেকে উদ্ধৃত হয়েছে। বায়হাকীর বর্ণনায় রয়েছে (আরবী************) এ দিনে দ্বারা দ্বারে ভিক্ষা করে বেড়ানো থেকে তাদের বাচাও। ইবনে সায়দ ‘তাবাকাত’ গ্রন্থে আয়েশা ও আবূ সায়ীদ থেকে উদ্ধৃত করেছেন ৪র্থ খন্ড, ১৮৬ পৃ. (আরবী************) দেখুনঃ (আরবী************)]
শরীয়াতের বিধানদাতার সম্মুখে ওয়াজিব পরিমাণটা হ্রাস করাও লক্ষ্য হিসেবে ছিল-যেমন পরে বলা হবে এবং লোকদের নিজেদের খাদ্য থেকে যাতে সহজেই দিয়ে দিতে পারে তা ব্যবস্থা করাও বাঞ্ছনীয় ছিল যেন সম্ভাব্যভাবে জাতির বৃহওর জনগোষ্ঠী এ মহাউৎসবে যোগদান করতে পারে। এ মহান উপলক্ষেই শরীয়াতে তাৎক্ষণিক অবদান হিসেবে এ ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
যাকাতুল ফিতর কার ওপর ওয়াজিব এবং কাদের পক্ষ থেকে দেয়া ওয়াজিব
ফিতরের যাকাত কার ওপর ওয়াজিব
উপরে বহু কয়জন হাদীস গ্রন্থকার উদ্ধৃত ও হযরত ইবনে উমর (রা) বর্ণিত হাদীসটির ভাষা হচ্ছেঃ
(আরবী************)
রাসূলে করীম (স) রমযানের ফিতরের যাকাত ধার্য করেছেন প্রত্যেক স্বধীন মুক্ত ও ক্রীতদাস-পুরুষ বা স্ত্রী মুসলমানের ওপর।
বুখারী তারই থেকে যে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, তাতে বলা হয়েছেঃ
রাসূলে করীম (স০ ফিতরের যাকাত বাবদ এক ছা’ খেজুর বা এক ছা’ গম ধার্য করেছেন দাস মুক্ত স্বাধীন পুরুষ-স্ত্রী এবং ছোট ও বয়স্ক মুসলমানদের ওপর।
আবূ হুরায়রা (রা) থেকে ফিত্রের যাকাত পর্যায়ে বলা হয়েছেঃ প্রত্যেক মুক্ত ও দাস পুরুষ ও নারী, ছোট ও বয়স্ক, ধনী ও গরীবের ওপর। [হাদীসটি আহ্মদ‘বুখারী’ মুসলিম ও নাসায়ী উদ্ধৃত করেছেন। তা কিতাবুয্ যাকাতের১৮৬ নম্বর হাদীস- ফত্হুর রাব্বানী ৯ম খন্ড, ১৩৯ পৃ.]
এ আবূ হুরায়রা (রা)-এর কালাম। কিন্তু এরূপ কথা কেউ নিজের ইচ্ছামত বলতে পারে না। তাই তা অবশ্যই রাসূলে করীম (স)-এর কাছ থেকে শোনা কথা হবে।
এ সব হাদীস প্রমাণ করেছে যে, এ যাকাতটা মুসলমানদের ব্যক্তি ও মাথাপিছু সাধারণভাবে ফরয ধার্য করা। স্বাধীন, মুক্ত ও ক্রীতদাস বা পুরুষ-স্ত্রী কিংবা ছোট ও বয়স্ক, ধনী ও গরীব এবং সভ্যতার আলোক প্রাপ্ত ও মরুবাসী-এদের মধ্যে এদিক দিয়ে কোনই পার্থক্য নেই। জুহরী, রাবীয়াতা ও লাইস বলেছেনঃ ফিত্রের যাকাত কেবল সভ্যতালোকিত নগরবাসীর ওপর বিশেষভাবে ধার্যকৃত, মরুবাসীদের ওপর তা ওয়াজিব নয়। আর উপরিউদ্ধৃত হাদীসসমূহ বাহ্যত এ কথার প্রতিবাদ করে। অতএব সঠিক ও যথার্থ কথা তাই যা জমহুর ফিকাহবিদগণ বলেছেন। [(আরবী************)]
ইবনে হাজম এ কথাটি আতা থেকে বর্ণনা করেছেন এবং এই বলে তার প্রতিবাদ করেছেন যে, রাসূলে করীম (স) এ ব্যাপারে বদ্দু ও এ রাবীকে অন্য থেকে আলাদা করেন নি-(বিশেষভাবে কারোর ওপর নয়, সব মুসলিমের ওপরই তা ধার্য হয়েছে।) অতএব এ ব্যাপারে মুসলমানদের মধ্য থেকে কাউকে আলাদা করা- এ দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি দেয়া জায়েয নয়। [(আরবী************)]
স্ত্রী ও শিশুর ওপরও কি ওয়াজিব
হাদীসের ‘পুরুষ বা স্ত্রী’ কথাটি আবূ হানীফার মাযাহাব সমর্থন করে অর্থাৎ তা নারীর ওপরও ওয়াজিব-তার স্বামী থাক আর না থাক। স্ত্রীর ওপর নিজস্বভাবেই তা ওয়াজিব এবং তার নিজের মাল থেকে আদায় করা কর্তব্য। জাহিরী ফিকাহর মাযাহাব এই। [(আরবী************) কিতাবুয যাকাতের ১৮৭ নম্বরের হাদীস।]
অন্য তিনজন ইমাম এবং লাইস ও ইসহাকের মতে স্বামীরই কর্তব্য তার স্ত্রীর ফিত্রের যাকাত আদায় করে দেয়া। কেননা তার যাবতীয় ব্যয়ভার তাকেই বহন করতে হয় এবং এটিও তার মধ্যে গণ্য। হাফেয ইবনে হাজার বলেছেন, এ কথাটিতে আপওি আছে। কেননা তারা বলেছেনঃ ‘স্বামী যদি দরিদ্র হয় এবং স্ত্রী হয় ক্রতদাসী, তা হলে তার ফিত্রা আদায় করা মনিবের কর্তব্য হবে। সাধারণ ব্যয়ভারের কথা স্বতন্ত্র। তাহলে দুটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আর তাঁরা সকলে এ ব্যাপারে একমত যে, মুসলিম ব্যক্তি তার কাফির স্ত্রীর পক্ষ থেকে ফিত্রা দেবে না অথচ তার সাধারণ ব্যয়ভার তাকেই বহন করতে হবে। শাফেয়ী মুহাম্মাদ ইবনে আলী আল-বাকের সুত্রে বর্ণিত ‘মুরসাল’ হাদীসকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তা হচ্ছেঃ ‘তোমরা সাদকায়ে ফিতর সেই সকলের পক্ষ থেকে দাও, যাদের যাবতীয় খরচ তোমরা বহন করা। [বায়হাকী হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন এ সূত্রেই- ৯ম খন্ড, ১৪০ পৃষ্ঠার সনদে ‘আলী’কে অতিরিক্ত উল্লেখ করেছেন। হাদীসটি ******* ইবনে হাজম বলেছেন, এখানে একটা পরম বিস্ময়ের ব্যাপার রয়েছে। আর তা হচ্ছে ইমাম শাফেয়ী হাদীসটিকে ******* বলেন নি। পরে এখানে বলতে শুরু করেছে যে, তা’ মুরসাল’- ইবনে আবূ ইয়াহইয়ার বর্ণনা থেকে। (আরবী************) বায়হাকী ইবনে উমরের হাদীস হিসেবে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেনঃ (আরবী************) এর সনদ অশক্তিশালী, যেমন বলেছেন (৪র্থ খন্ড ১৬১ পৃ.।) দারে কুতনীও বর্ণনা করেছেন। (আরবী************) যার ওপর তোমার ব্যয়ভার বহন চালু হয়েছে, তার পক্ষ থেকে খাইয়ে দাও। এর বর্ণনাকারী আবদুল আ’লা অশক্তিশালী- যেমন বায়হাকী বলেছেন। কিন্তু তার পূর্ববর্তী বর্ণনার সাহায্যে তা শক্তিশালী হয়ে যায়। ******* গ্রন্থে বলা হয়েছেঃ এটা ******* (২য় খন্ড ১৯৯ পৃ.) দেখুনঃ (আরবী************)]
কিন্তু এ ধরনের বর্ণনা ‘যয়ীফ’ বলে তাকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করা যায় না, অথচ শাফেয়ী এবং তার সমমতের ফিকাহবিদগণ ব্যক্তির কর্মচারী এবং তার কাফির দাসের পক্ষ থেকেও ফিত্রা দেয়া বাধ্যতামূলক বলে মত প্রকাশ করেছেন। ইবনুত্তার কুমানীও এ কথা বলেছেন। [আরবী************] কেননা মালিক তো দুই জনেরই যাবতীয় খরচ বহন করে থাকে।
অনুরূপভাবে ইমামীয়া বলেছেন, ফিতরের যাকাত নিজের এবং যার যার খরচ বহন করা হয় তাদের সকলের পক্ষ থেকে দিতে হবে। [আরবী************]
লাইস বলেছেন, যে কর্মচারীর মজুরী সুনির্দিষ্ট নয় সে কর্মচারীর পক্ষ থেকে মালিক ফিত্রা দেবে। আর তার মজুরী সুনির্দিষ্ট হলে তার ফিত্রা তার আদায় করা জরুরী নয়। [আরবী************]
আর জায়দীয়া মতের লোকেরা শুধু যার খরচ বহন করা হয় নিকটাত্মীয় বা স্ত্রী অথবা দাস হওয়ার কারণে, কেবল তার ফিত্রা দেয়া বর্তব্য বলে শেষ করেছেন। [আরবী************]
আর ‘ছোট বয়স্ক’ কথাটি প্রমাণ করে যে, ছোট বয়সের নাবালেগ কোন শিশুও যদি ধন-মালের মালিক হয়, তা হলে তার ওপরও তা ওয়াজিব। তার অভিভাবকিই তার পক্ষ থেকে তা দিয়ে দেবে। আর তার ধন-মাল না থাকলে তার ফিত্রাটা দেয়া ওয়াজিব হবে যে তার খরচাদি বহন করে তার ওপর। এটা জমহুরের মাযহাব।
মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান বলেছেনঃ তা দেয়া ওয়াজিব শুধু তার পিতার ওপর, তার বাপ না থাকলে তার ওপর কিছুই ওয়াজিব নয়। [আরবী************ দেখুনঃ]
সায়ীদ ইবনুল মুসাইয়্যের ও হাসান বসরীর মত হচ্ছেঃ ফিতরের যাকাত ওয়াজিব শুধু তার ওপর যে রোযা থাকে। কেননা রোযাকে পবিত্রকরণের লক্ষ্যেই তা ওয়াজিব করা হয়েছে। আর অল্প বয়স্ক নাবালেগ এ পবিত্র করণের মুখাপেক্ষী নয়। কেননা তার কোন গুনাহ হয় না।
তার দলিল হচ্ছে ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণিত হাদীস। তিনি বলেছেনঃ ‘রাসূলে করীম (স) ফিতরের যাকাত ধার্য করেছেন রোযাদারকে বেহুদা ও লজ্জাষ্কার কাজকর্ম থেকে পবিত্রকরণের লক্ষ্যে।’
এর জবাবে বলা হয়েছে, হাদীসে ‘পবিত্রকরণ’ কথাটি সধারণভাবে ও বেশী ভাল লোকের প্রতি লক্ষ্য রেখে বলা হয়েছে। [পূর্বোল্লিখিত উৎসসমূহ।] যেমন কোন হাদীসে ফিত্রা ওয়াজিব করার ভিন্নতর হেকমতের উল্লেখ করা হয়েছে। যেমনঃ ‘মিসকীনদের খাবারের ব্যবস্থাস্বরূপ’। আর যেমন অপর এক হাদীসে বলা হয়েছেঃ ‘এ দিনে তাদের সচ্ছল বানিয়ে দাও।’
এ ফিত্রা যখন এক হিসেবে পবিত্রকরণের লক্ষ্যে ধার্যকৃত, তখন অন্য হিসেবে তা গরীবদের খাদ্য ও তাদের সচ্ছল বানানোর পন্থা। আর এ লক্ষ্যটা অল্প বয়স্কের ক্ষেত্রেও পুরোপরি প্রযোজ্য-যেমন বড়দের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
গর্ভস্থ সন্তানের ফিত্রাও কি ওয়াজিব
জমহুর ফিকাহ্বিদদের মতে গর্ভস্থ সন্তানের পক্ষ থেকে ফিত্রা দেয়া ওয়াজিব নয়।
ইবনে হাজম বলেছেন, গর্ভস্থ সন্তান যদি তার মায়ের গর্ভে একশ বিশ দিন-চার মাস কাল-পূর্ণঙ্গ লাভ করে থাকে ফিতরের রাতের ফজর হওয়ার পূর্বে, তা হলে তার পক্ষ থেকেও সাদকায়ে ফিতর আদায় করা ওয়াজিব হবে। কেননা সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে যে, এ সময়ে ভ্রূণের দেহে প্রাণের সঞ্চার হয়ে থাকে।
ইবনে হাজম দলিলস্বরূপ উল্লেখ করেছেন, নবী করীম (স) ছোট বয়সের ও বড় বয়সের সকলের ওপরেই সাদকায়ে ফিতর ওয়াজিব করেছেন। আর গর্ভস্থ সন্তানকে ‘ছোট বয়সের’ বলা চলে। আর ‘ছোট বয়স’-এর শিশুর ওপর যে হুকুম প্রযোজ্য তার ওপরও তাই প্রযোজ্য।
হযরত উসমান ইবনে আফফাত থেকে ইবনে হাজম বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, তিনি ছোট বড় ও গর্ভস্থ (সন্তানের) সন্তানেরও সাদকায়ে আদায় করেতেন।
আবূ কালাবা থেক বির্ণিত, তিনি ছোট ও বড় এমনকি মায়ের গর্ভে অবস্থিত সন্তানের পক্ষ থেকেও সাদকায়ে ফিতর দেয়া খুব পসন্দ করতেন। ইবনে হাজম বলেছেন, আবূ কালাবা সাহাবাদের দেখতে পেয়েছেন, তাঁদের সঙ্গও পেয়েছেন এবং তাঁদের থেকে হাদীসও বর্ণনা করেছেন (তাবেয়ী)। সুলায়মান ইবনে ইয়াসারকে গর্ভস্থ সন্তান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল-তারও ফিত্র দেয়া হবে কি? বললেনঃ হ্যাঁ। বলেছেন, এ ব্যাপারে সাহবীদের কেউ হযরত উসমানের বিরোধিতা করেছেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়নি। [আরবী************]
সত্যি কথা হচ্ছে, ইবনে হাজম যা-ই বলুন, গর্ভস্থ সন্তানের ফিত্রা দেয়া ওয়াজিব হওয়ার প্রমাণকারী কোন দলিল নেই। আর হাদীসের শব্দ ‘ছোট’ বলতে গর্ভস্থ সন্তানও বোঝায়-এ বলা খুব গোঁড়ামি ও জোরপূর্বক বলা ছাড়া আর কিছু নয়। হযরত ওসমান ও অন্যদের সম্পর্কে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে, তাতেও বড় জোর ‘মুস্তাহাব’ প্রমাণিত হতে পারে মাত্র। আর নফল ইবাদতের কোন সীমা শেষ নেই, যেই তা করবে সেই বিপুল সওয়াব পারে, সন্দেহ নেই।
ইমাম শাওকানী উল্লেখ করেছেন, ইবনুল মুনযির গর্ভস্থ সন্তানের পক্ষ থেকে ফিত্রা দেয়া ওয়াজিব নয় বলে ‘ইজমা’ হওয়ার কথা উদ্ধৃত করেছেন। ইমাম আহমাদ তাকে মুস্তাহাব মনে করতেন। ওয়াজিব নয়। [আরবী************]
সাদকায়ে ফিতর ওয়াজিব হওয়ার জন্য ‘নিসাব’ কি শর্ত
ইবনে উমর বর্ণিত উপরিউদ্ধৃত হাদীসে ‘মুক্ত ও গোলাম’ কথাটি ধনী ও নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক নয় এমন ফকীরকেও শামিল করে। আবূ হুরায়রা (রা) তাঁর বর্ণিত হাদীসে স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন, ‘ধনী ও গরীব’ উভয়ের ওপর ওয়াজিব। জমহুর এবং তিনজন ইমাম এ মত দিয়েছেন। তাঁর সকলেই ফিত্রা ওয়াজিব হওয়ার জন্যে শুধু ইসলামের বিশ্বাসী এবং ফিত্রা পরিমাণটা, তার সেই দিনের খোরাকের অতিরিক্ত হওয়ার শর্ত করেছেন মাত্র। এ খোরাকে তার নিজের এবং সে সব লোকের খোরাকী দেয়া তার দায়িত্ব তাদের খোরাকও শামিল করতে হবে। আর সে দিন অর্থ রাতসহ দিন। আর অতিরিক্তি শর্ত হচ্ছে তার বাসস্থান, ঘরের জিনিসপত্র ও মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের অতিরিক্ত।
শাওকানী বলেছেনঃ এটাই ঠিক। কেননা এ পর্যায়ের দলিলসমূহ নিঃশর্ত। গরীব ধনীর কোন বিশেষত্ব নেই। যে পরিমাণের মালিক হলে ফিত্রা দিতে হবে তা নির্ধারণে ইজতিহাদ করার কোন সুযোগ নেই। বিশেষ করে যে ‘কারণে’ ফিত্রা বিধিবদ্ধ হয়েছে, তা গরীব ধনী সকলের সধ্যেই বর্তমান থাকে। আর তা হচ্ছে বেহুদা ও অশ্লীল কথা ও কাজ থেকে পবিত্রকরণ। আর এক দিন ও রাত্রির খাবারে মালিক হওয়াটা তো জরুরী শর্ত। কেননা ঈদের দিনে যারা গরীব তাদের সচ্ছল বানানোই হল ফিত্রা বিধান করার লক্ষ্য। এখন সেদিনের খোরাক থাকার শর্ত না পাওয়া গেলে সে তো বরং সে লোকদের মদ্যে গণ্য হবে যাদের সেদিন সচ্ছল বানানোর জন্যে আদেশ করা হয়েছে। এ আদেশ যাদের প্রতি করা হয়েছে তাদের মধ্যে সে গণ্য বা শামিল হবে না। [আরবী************]
আবূ হানীফা ও তাঁর মাযহাবের লোকেরা উপরিউক্ত মতের বিরোধিতা করেছেন। তাঁরা বলেছেন, সাদকায়ে ফিত্র ওয়াজিব শুধু তার ওপর, যে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক। তাঁদের দলিল বুখারী [বুখারী তাঁর গ্রন্থের (আরবী************) তে **** হিসেবে উদ্ধৃত করেছেন। আর তার ******* সহীহ ধরে নিতে হবে, জমহুরের তাই মত। ইবনে হাজম এর বিপরীত মত পোষণ করেন।] ও নাসায়ী বর্ণিত হাদীসেঃ ‘যাকাত শুধু ধনীদের দেয়-ধনের প্রকাশ।’ আর ‘ধনী’ সে যে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক। যে ফকীর তার কোন ধন নেই। অতএব তার ওপর ওয়াজিব নয়। তার ওপর তা দেয়া ফরয নয়। তাঁর মালের যাকাত ফরয হওয়ার ওপর কিয়াস করেছেন।
অন্যান্যরা এর জবাবে বলেছেন-যেমন শাওকানী উল্লেখ করেছেন, তাঁরা যে হাদীসের উল্লেখ করেছেন তা দিয়ে উদ্দেশ্য হাসিল হয় না, আসলে আবূ দাউদ [শাওকানী কেবল আবূ দাউদের নাম করেই ক্ষান্ত রয়েছেন অথচ বুখারী (আরবী************)-এ নাসায়ী (আরবী************) এবং আহমাদ তাঁর মুসনাদে (২য় খন্ড, ৩৪৫-৩৭৮ পৃ.)ও মুসলিম যাকাত অধ্যায়ে উদ্ধৃত করেছেন। মুসলিম-এর ভাষা এইঃ (আরবী************)] এ হাদীসটি এ ভাষায় উদ্ধৃত করেছেনঃ
(আরবী************)
যা ধনের বাহ্যিক দিক থেকে দেয়া হয় তাই উওম যাকাত।
এ হাদীসটি আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক। সে হাদীসটি আবূ দাউদ ও হাকেম কর্তৃক মরফু- রাসূলের কথা হিসেবে উদ্ধৃত। তা হচ্ছেঃ (আরবী************)
আর তাবরানী কর্তৃক আবূ ইমামা থেকে বর্ণিত মরফূ হাদীস হচ্ছেঃ
(আরবী************
‘নিহায়া’ গ্রন্থে এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে এমন পরিমাণ যা স্বল্প মালের অবস্থা ধারণ করে।
এবং আবূ হুরায়রার হাদীস নাসায়ী, ইবনে খুজায়মা ও ইবনে হাব্বানের গ্রন্থে উদ্ধৃত। শব্দ ইবনে হাব্বানের গ্রন্থে ব্যবহৃত। হাকেম হাদীসটি সহীহ বলেছেন মুসলিমের শর্তের ভিওিতে। নবী করীম (স) বলেছেনঃ
একটি দিরহাম এক লক্ষ দিরহামকে ছাড়িয়ে গেছে। এক ব্যক্তি বললঃ তা কি করে হল হে রাসূল? তিনি বললেনঃ এক ব্যক্তির বিপুল ধনসম্পদ ছিল। সে তার মাল সম্পদ থেকে এক লক্ষ দিরহাম নিয়ে দান করেছিল। আর এক ব্যক্তির ছিল মাত্র দুটি দিরহাম। সে তার একটি নিয়ে দান করে দিল। এ লোকটি তার মোট সম্পদের অর্ধেক দিয়ে দিল………..
তবে মালের যাকাতের ওপর কিয়াস করে যে দলিল দেয়া হয়েছে, তা সহীহ নয়-যেমন শাওকানী বলেছেন। কেননা এটা অসম কিয়াস। কিয়াসের জন্যে যে ভিওির সাদৃশ্যের প্রয়োজন, তা এখানে নেই। যেহেতু ফিত্রা ওয়াজিব হওয়াটা দেহ সংশ্লিষ্ট, আর অন্যান্য যাকাত ওয়াজিব হওয়াটা ধনমালের সাথে সংশ্লিষ্ট। অতএব এ দুটি ভিন্ন ভিন্ন জিনিস। [দেখুনঃ (আরবী************)]
এ ছাড়া অন্যরা যে বলেছেন, নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকানা হলেই ধনী গণ্য হয় আর ফকীরের ধনসম্পদ নেই, অতএব তার ওপর ফিত্রাও ওয়াজিব নয়-এ মতটির প্রতিবাদে সেসব সহীহ হাদীসের সাধারণ তাৎপর্যের কথা বলা হয়েছে, যা ধনী-গরীব সব মুসলমানের ওপর ফিতর ওয়াজিব হওয়া পর্যায়ে উদ্ধৃত হয়েছে। আবূ হুরায়রা (রা) তাঁর হাদীসে ‘ধনী’ বা ‘গরীব’ শব্দদ্বয় দ্বারা এ কথা স্পষ্ট করে তুলেছেন। আহমাদ ও আবূ দাউদ সালাবাতা ইবনে আবূ সগূর তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ তোমরা ফিতরের সাদকা বাবদ দাও এক ছা’ গম (মূল শব্দ ***** বা ***** অর্থ একই) ছোট বা বড়, মুক্ত বা গোলাম, ধনী বা গরীব পুরুষ বা স্ত্রী-প্রতিটি মানুষের পক্ষ থেকে। তারপর তোমাদের ধনী লোকেরা তো যাকাতও দেবে। আর গরীব লোকেরা যা দেবে তার চাইতে অনেক বেশী আল্লাহ তাদের ফিরিয়ে দেবেন। আবূ দাউদের অপর একটি বর্ণনায় রয়েছেঃ প্রত্যেক দুজনের পক্ষ থেকে ছা’ গম দাও।
ইবনে কুদামাহ যেমন বলেছেন, এ সাদকাটা মালের হক কিন্তু মাল বেশী হলেই তার পরিমাণ বেশী হয় না। অতএব তাতে নিসাব পরিমাণ মালের মালিক হওয়া শর্ত হতে পারে না-যেমন কাফফারার ক্ষেত্রে তা শর্ত নয়। তার থেকে নিতেও কোন বাধা নেই, দিতেও বাধা নেই। যেমন যার কৃষি ফসলে ওশর ওয়াজিব-পরে সে তার ও তার পরিবারবর্গের প্রয়োজন পূরণে অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারে। (তাই সে যেমন দেবে, তেমনি পারেও অন্য কথায়, তার কাছে থেকে যেমন নেয়া হবে, তেমনি তাকে দেয়াও হবে।’-অনুবাদক)
আর ‘ধরনের প্রকাশ থেকেই যাকাত দিতে হয়’ হাদীসটি মালের সাদকা-মালের যকাতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর এ ফিতরের যাকাতটি বিশেষভাবে দেহ ও মনের তরফ থেকে দিতে হয়। [দেখুনঃ (আরবী************)]
আমি মনে করি, ফিতরের যাকাত প্রত্যেক ধনী-গরীব মুসলিমরে ওপর ধার্য করার মূলে শরীয়াতের বিধানদাতার একটা নৈতিক প্রশিক্ষণমূলক লক্ষ্য নিহিত রয়েছে। আর তা হচ্ছে, মুসলমানকে সচ্ছলতার অবস্থার মত দারিদ্র্যাবস্থাতেও আল্লাহ্র জন্যে অর্থ ব্যয়ে অভ্যস্ত করে তোলা। তাতে দারিদ্র্যের কঠিন অবস্থায়ও ত্যাগ স্বীকারের অভ্যাস হবে সচ্ছল অবস্থার মতই। আর কুরআন মজীদ মুওাকী লোকদের পরিচিতি প্রসঙ্গে বলেছেঃ
(আরবী************)
তারা অর্থব্যয় করে সচ্ছল অবস্থায় এবং কষ্ট-দরিদ্র্যের অবস্থায়। [(আরবী************)]
এ থেকে মুসলিমরা এ শিক্ষা লাভ করে যে, সে ধন-দৌলতের দিক দিয়ে দরিদ্র এবং চরম দুরবস্থার সম্মুখনি হলেও তার হাতটাও ‘উঁচু হাত’ হতে পারে এবং সেও অন্যকে দান করা-অন্যের জন্যে ব্যয় করার স্বাধ আস্বাদম করতে পারে-যদিও তা বছরের মাত্র একবার, একটি দিনের জন্যে। এ কারণে জমহুর ফিকাহবিদগণ এ সাদকা ওয়াজিব হওয়ার জন্যে নিসাব পরিমাণের মালিক হওয়ার শর্ত না করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
অনুরূপভাবে স্ত্রীর নিজের মাল থাকলে তা থেকে এ সাদকা দেয়া ওয়াজিব-আবূ হানীফা প্রমুখেল এ মতটিকেও অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। কেননা তার ফলে একজন মুসলিম মহিলা তার সমান কর্তব্যের অনুভূতি লাভ করতে পারবে। তাকে তার নিজের মাল থেকে ব্যয় করতে অভ্যস্ত করাও হবে, কেবল স্বামীর ওপর নির্ভরশীল হওয়া থেকেও- অন্তত এ ক্ষেত্রে তাকে বাঁচানো যাবে। তা সত্ত্বেও স্বামী যদি সদিচ্ছা পরবশ হয়ে স্ত্রীরটাও দিয়ে দেয় তাহলে তা অবশ্যই আদায় হবে।
দরিদ্রের ওপর ফিতরা ওয়াজিব হওয়ার শর্ত
দরিদ্র বা ফকীর ব্যক্তির ওপর ফিতরা ওয়াজিব হওয়ার জন্যে জমহুর ফিকাহবিদগণ এ শর্ত আরোপ করেছেন যে, এ ফিতরার পরিমাণটা তার ও তার ওপর নির্ভরশীল লোকদের ঈদের দিন ও রাত্রির প্রয়োজনীয় খাবারের অতিরিক্ত হতে হবে। তার বাসস্থান, দ্রব্যসামগ্রী ও তার মৌলিক প্রয়োজনেরও বাড়তি হতে হবে। তাই যার একটা ঘর আছে, যা তার নিজের বসবাসের জন্যে দরকার অথবা তার নিজের ব্যয় পূরণের জন্যে তার ভাড়াটা তার প্রয়োজন অথবা একটা কাপড় যা তার নিজের বা তার ওপর নির্ভরশীলদের জন্যে আবশ্যক কিংবা কোন জন্তু যা তার চলাচল ও তার মৌল প্রয়োজন পূরণে তার নিজের দরকার অথবা গৃহপালিত গবাদিপশু যার প্রবৃদ্ধি তার প্রয়োজন অথবা এমন পণ্য যা থেকে ফিতরা দিলে তার মুনাফাটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এরূপ ফকিরের ওপর ফিতরা ওয়াজিব হবে না। কেননা তার যা আছে তা সবই তার মৌলিক প্রয়োজন পূরণের জন্যে জরুরী। অতএব তা বিক্রয় করতে তাকে বাধ্য করা যাবে না, তার নিজের বন্দোবস্তের মতই। আর যার অনেক বই পত্র রয়েছে যা পড়া তার দরকার বা তা থেকে কিছু মুখস্থ করা তার প্রয়োজন, ফিতরা দেয়ার জন্যে তাকে তা বিক্রয় করতেবলা যাবে না। এ ছাড়া তার মৌল প্রয়োজনের অথিরিক্ত যা থাকবে যা বিক্রয় করে ফিতরা দেয়ার জন্যে ব্যয় করা সম্ভব হবে, তা দিয়ে ফিতরা দেয়া ওয়াজিব হবে। কেননা তার আসল প্রয়োজন পূণকে কোনরূপ ক্ষতিগ্রস্ত না করেই তা দেয়া সম্ভব। এটা ঠিক সে রকম যে, কারো কাছে তার নিজের খাদ্যের অতিরিক্ত থাকলে সে তা দেবে। [(আরবী***************)]
দীর্ঘমেয়াদী ঋণ ফিতরা দেয়ার প্রতিবন্ধক নয়
যে লোকের কাছে সাদকায়ে ফিতরা দেয়ার মত সম্পদ আছে, কিন্তু তার ওপর এতটা পরিমাণ ঋণের বোঝাও রয়েছে, তারও কর্তব্য হবে ফিতরা দেয়া। তবে ঋণ শোধের খুব বেশী তাকীদ ও চাপ থাকলে ভিন্ন কথা হবে। তখন তার ঋণ শোধ করাই উচিত হবে, ফিতরা দিতে হবে না।
ইবনে কুদামাহ বলেছেন, ঋণ ফিতরা দেয়ার প্রতিবন্ধক নয়, যদিও তা প্রতিবন্ধক মালের যাকাত দেয়ার, কেননা ফিতরার ওয়াজিব হওয়াটা খুব বেশী তাগিদপূর্ণ। তার বড় প্রমাণ তা গরীব মানুষের ওপরও ওয়াজিব এবং দিতে পারে এমন প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির ওপরই তা ধার্য। এমন কি যার যাবতীয় ব্যয়ভার অন্য কেউ বহন করে তার পক্ষ থেকেও তা দেয়া ওয়াজিব। কোন বিশেষ পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া শর্তও নয় এখানে। অতএব তা সাধারণ ব্যয়ের মধ্যে গণ্য। আরও এজন্যে যে, মালের যাকাত ফরয হয় মালিকানার কারণে। ঋণ তো এই মালিকানাকে প্রভাবিত করে ফিতরা ওয়াজিব হয় ব্যক্তির দেহের ওপর, ঋণ তার ওপর কোন প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। তবে ঋণের দাবি যদি খুব তীব্র ও তাৎক্ষণিক হয়, তা হলে ফিতরা প্রত্যাহৃত হবে। কেননা ঋণ ফেরত চাইলে তা আদয় করো ওয়াজিব হয়ে পড়ে। আর তা বিশেষ এক নির্দিষ্ট ব্যক্তির পাওনা, কারোর অসচ্ছলতা বা দারিদ্র্য তা প্রত্যাহৃত হয় না। আর তা কার্যকারণের দিক দিয়ে অগ্রবর্তী, ওয়াজিব হওয়ার দিক দিয়েও তার গুরুত্ব সর্বাধিক। তা দিতে বিলম্ব করলে গুনাহগার হতে হবে। অতএব তা ফিতরা ছাড়া আর সবকিছুই প্রত্যাহার করে- যদি তার তাগাদা করা নাও হয়। কেননা ঋণের তাগাদা আদায়ের বাধ্যবাধকতা আরোপ করে এবং বিলম্ব করা হারাম হয়ে যায়। [(আরবী***************)]
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
ওয়াজিব ফিতরার পরিমাণ এবং কি থেকে দিতে হবে
হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেনঃ রমযানের ফিতরের যাকাত হিসেবে রাসূলে করীম (স) এক ছা’ খেজুর অথবা এক ছা’ গম ধার্য করেছেন। হাদীসটি বহু কয়খানি গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে।
আবূ সায়ীদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেনঃ আমরা রাসূলে করীম (স) এর জীবদ্দশায় ফিতরের যাকাত বাবদ এক ছা’ খাদ্য অথবা এক ছা’ খেজুর কিংবা এক ছা’ কিশমিশ অথবা এক ছা’ পনির দিতাম। আমরা এভাবেই দিয়ে আসছিলাম। শেষে একবার মুয়াবীয়া মদীনায় আগমন করেন এবং বলেনঃ আমি দেখেছি, সিরিয়ার লোকেরা দুই মদ্দকে এক ছা’ খেজুর দ্বারা বদল করে। পরে লোকেরা তাই গ্রহণ করল। হাদীসটি কয়েকজন গ্রন্থ প্রণেতা উদ্ধৃত করেছেন। বুখারী ছাড়া অন্যরা একটু বাড়তি বর্ণনা দিয়েছে। তা হচ্ছে আবূ সায়ীদ বলেছেনঃ অতপর আমি সব সময় সেই পূর্বের মতই দিয়ে যাচ্ছিলাম।
উপরিউক্ত হাদীসদ্বয় প্রমাণ করছে যে, ফিতরের যাকাত বাবদ সর্বপ্রকার জিনিস থেকে এক ছা’ পরিমাণ দেয়।
শাহ দিহলভী লিখেছেন- এক ছা’ পরিমাণ নির্ধারণ করার কারণ হচ্ছে, এ পরিমাণ খাদ্য ঘরের লোকদের পরিতৃপ্তি দিতে পারে। এতে এত খাদ্য থাকে যা যথেষ্ট এবং গরীবরা সে পরিমাণ খাদ্যে অভ্যস্ত। আর দাতাদের পক্ষেও এ পরিমাণ খাদ্য দান করলে সাধারণত করোর কোন ক্ষতি হয় না। [(আরবী***************)]
গম ও কিশমিশ ছাড়া অন্য জিনিসের বেলায় এক ছা’ পরিমাণ দেয়া ইজমার ভিত্তিতে ওয়াজিব। আর তিনজন ইমামের মতেও সে অন্য জিনিসের ক্ষেত্রে এক ছা’ পরিমাণ ওয়াজিব। আবূ সায়ীদ খুদরী, আবূল আলীয়া, আবূশ শা’মা, হাসানুল বসরী, জাবির ইবনে জায়দ, ইসহাক, আল-হাদী, আল-কাসেম, আন-নাসের ও আল-সুয়াইয়্যাদ বিল্লাহ প্রমুখেরও এ মত- শাওকানী এ কথাই লিখেছেন। [(আরবী***************) এ গ্রন্থে লিখিত হয়েছেঃ আলী ইবনে আব্বাস ও শাবী থেকে বিভিন্ন কথার বর্ণনা পাওয়া গেছে। কোনটিতে এক ছা’ আবার কোনটিতে অর্ধ ছা’। ইবনে হাজম আবূ সায়ীদ থেকে এমন বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, যা এক ছা’ ওয়াজিব হওয়ার সুপরিচিত মতের বিপরীত। এটা খুবই বিস্ময়কর। (আরবী**********)]
অর্ধ ছা’ গম দেয়ার কথা যাঁরা বলেছেন, তাঁদের মত
আবূ হানীফা এবং তার সঙ্গীরা বলেছেনঃ অর্থ ছা’ পরিমাণ গম যথেষ্ট। তবে কিশমিশ তাঁর থেকে বিভিন্ন মতের বর্ণনা এসেছে। [আবূ ইউসূফ ও মুহাম্মাদ কিশমিশকে খেজুরের মতই মনে করেছেন। এটা ইমাম আবূ হানীফা থেকেও বর্ণিত। কোন কোন হানাফী আলিম এ বর্ণনাকে সহীহ বলেছেন। ইবনুল হুম্মাম ফাতহুল কাদীর গ্রন্থে দলিলের দিক দিয়ে উক্ত মতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আর সররুল মুখতার গ্রন্থে বহু কয়জনকে বক্তব্য উদ্ধৃত রয়েছে যে, এ মতের ওপর ফতোয়া হয়েছে। (আরবী*********)] এটা জায়দ ইবনে আলী ও ইমাম ইয়াহইয়ার মাযহাব- যেমন শাওকানী বলেছেন।[(আরবী***************)] ইবনে হাজম বলেছেন, উমর ইবনে আবদুল আজিজ, তায়ূস, মুজাহিদ, সায়ীদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, ওরওয়া ইবনুজ জুবাইর, আবূ সালামাতা ইবনে আবদুর রহমান ইবনে আউফ, সায়ীদ ইবনে জুবাইর প্রমুখ থেকেও সহীহ বর্ণনা পাওয়া গেছে এ মতের সমর্থনে। আওজায়ী, লাইস ও সূফিয়ান সাওরীর কথাও তাই। যেমন ইবনে হাযম বহু সংখ্যক সাহাবী থেকে উপরিউক্ত মতের সমর্থনে বহু কয়টি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। তাঁদের মধ্যে আবূ বকর, উমর, উসমান, আলী, আয়েশা, আসমা বিনতে আবূ বকর, আবূ হুরায়রা, জারির ইবনে আবদুল্লাহ, ইবনে মাসউদ, ইবনে আব্বাস, ইবনুজ জুবাইর, আবূ সায়ীদ খুদরী প্রমুখ উল্লেখ্য। তবে আবূ বকর ইবনে আব্বাস ও ইবনে মাসউদ ছাড়া আর সকল থেকেই উক্ত মত সহীহ প্রমাণিত হয়েছে। [(আরবী*******) এবং দেখুন (আরবী*********)]
এক ছা’ পরিমাণ ওয়াজিব যাঁরা বলেছেন, তাঁদের দলিল
জমহুর ফিকাহবিদদের দলিল হচ্ছে আবূ সায়ীদ বর্ণিত হাদীস। তার কথায় এক ছা’ খাদ্য কিংবা এক ছা’ খেজুর কিংবা এক ছা’ গম অথবা এক ছা’ কিশমিশি বা এক ছা’ পনির।
নববী বলেছেন, দুটি দিক দিয়ে তা প্রমাণ করেঃ একটি হিজাজবাসীদের পরিভাষায় খাদ্য বলতে বিশেষভাবে গম বোঝায়। তার সঙ্গে রয়েছে অন্যান্য উল্লিখিত জিনিস।
এবং দ্বিতীয় হচ্ছে, হাদীসে বিভিন্ন জিনিসের উল্লেখ রয়েছে। সেগুলোর মুল্য বিভিন্ন অথচ প্রত্যেক প্রকারের খাদ্য থেকে এক ছা’ পরিমাণ ধার্য করা হয়েছে। তাতে বোঝা দেল ছা’ ই আসলে গণ্য, মূল্যের প্রতি কোন নজর নেই। [(আরবী***********)] বলেছেন, তাঁদের কাছে কোন প্রমাণ নেই শুধু হযরত মুয়াবিয়ার হাদীস ছাড়। আর কায়েকটি হাদীসও অবশ্য রয়েছে, কিন্তু হাদীস পারদর্শীরা সেগুলোরক যয়ীফ বলেছেন। এ গুলোর দুর্বল হওয়াটা প্রকট ও অকাট্য। [(আরবী***************)]
জমহুর ফিকাহবিদগণ হযরত মুয়াবিয়া হাদীসের জবাব দিয়েছেন। বলেছেন, তা একজন সাহাবীর উক্তিমাত্র আবূ সায়ীদ ও অন্যান্য যে সব সাহাবী (রা) রাসূলে করীম (স) সংস্পর্শ তাঁর চাইতে বেশী দিন পেয়েছেন, তাঁরা তাঁর এ কথার বিরোধিতা করেছেন। তাঁরা রাসূলে করীম (স) সম্পর্কে জানেনও বেশী। আর একটি নীতি হচ্ছে, সাহাবিগণের মত বিভিন্ন হলে তাঁরা কেউ অন্যদের তুলনায় উত্তম বিবেচিত হবেন না। এমতাবস্থায় অন্য দলিল সন্ধান করা আবশ্যক। তাঁরা বলেছেন” বহু হাদীস ও কিয়াস অন্যান্য জিনিসের মতো গমেরও এক ছা’ হওয়ার শর্তকরণে ঐক্যবদ্ধ, অতএব তার ওপর নির্ভর করতে হবে। মুয়াবিয়া (রা) তো স্পষ্ট করে বলেছেন যে, তিনি যা বলেছেন, তা তাঁর একটা মত- একটা বিবেচনা মাত্র। তিনি তা নবী করীম (স) এর কাছ থেকে শ্রবণ করেছেন, এমন কথা তিনি বলেন নি। তাঁর উক্ত মজলিসে বহু লোক উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও একজনও যদি জানতেন যে, মুয়াবিয়ার কথা রাসূলে (স) এর সুন্নাতের সাথে সামঞ্জস্যশীল, তাহলে তিনি তার উল্লেখ করতেন। অন্যান্য সব ব্যাপারেও তেমনটাই হয়েছে। [(আরবী**************)]
রায় এবং ইজতিহাদ উভয়ই শরীয়াতসম্মত। মুয়াবিয়া ও অন্যান্য সাহাবী (রা) এর অনুসৃত নিয়মাবলী থেকে তা প্রমাণিত হয়, কিন্তু যে বিষয়ে অকাট্য সম্পদ দলিল পাওয়া যাবে সেখানে তা অগ্রহণীয়। [(আরবী**************)]
অর্থ ছা’ যথেষ্ট বলার সমর্থনে আবূ হানীফার দলিল
ইমাম আবূ হানীফা ও তাঁর মতের লোকদের দলিল হচ্ছেঃ
প্রথম আবদুল্লাহ ইবনে সালাবাতা অথবা সালাবাতা ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে সূয়াইর বর্ণিত ও আবূ দাউদ উদ্ধৃত হাদীস। তার কথাঃ রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ ফিতরের সাদকা হচ্ছে এক ছা’ গম (বা আরবী*******) প্রত্যেক দুইজনের পক্ষ থেকে। [আবূ দাউদ হাদীসের ভাষা ও সূত্র দেখা যেতে পারে। (আরবী********) এবং (আরবী*******) এ প্রসঙ্গে ইবনে হাজমের বক্তব্যঃ (আরবী**************)]
আর হাকেম ইবনে আব্বাস (রা) থেকে রাসূলে করীম (স) একথা উদ্ধৃত করেছেনঃ
(আরবী****************)
সাদকায়ে ফিতরের পরিমাণ হচ্ছে দুই মদ্দ গম।
আর আমরা জানি দুই মদ্দ অর্থ অর্ধ ছা’। অনুরূপভাবে তিরমিযী আমর ইবনে শূয়াইব তার পিতা তার দাদা সূত্রে রাসূলের কথা হিসেবে এবং আবূ দাউদ ও নাসায়ী হাসান থেকে মুরসাল হিসেবে হাদীস উদ্ধৃত করেছেনঃ রাসূলে করীম (স) এ সাদকা নির্ধারণ করেছে, এক ছা’ খেজুর কিংবা গম অথবা অর্ধ ছা’ গম (আরবী**********)। [দেখুন (আরবী**************)]
এভাবে আরও বহু কয়টি হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে, যার সমষ্টি প্রমাণ করে যে, এক ছা’ পরিমাণটাই বিশেষভাবে নির্দিষ্ট। শাওকানী তাই বলেছেন এ কথা মনে নিয়ে যে, যে খাদ্য কথাটি সহীহ বর্ণানায় উদ্ধৃত হয়েছে তার মধ্যে بر (গম) ও শামিল। [(আরবী************)]
দ্বিতীয়, বহু সংখ্যক সাহাবী থেকে সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ তাঁরা অর্ধ ছা’ গম দিতে দেখেছেন। সুফিয়ান সওরী তাঁর জামে গ্রন্থে হযরত আলী (রা) এর কথা হিসেবে উদ্ধৃত করেছেনঃ অর্ধ ছা’ গম। চারজন খলীফা থেকেও অনুরূপ বর্ণনা এসেছে। [(আরবী************)]
এসব সাহাবীর উক্তির ওপর আল-মুনযেরী নির্ভর করে বলেছেনঃ গম সম্পর্কে কোন কথা নবী করীম (স) থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণিত হয়েছে বলে আমরা জানি না। [হাকেম এক ছা’ গম পর্যায়ে যে সব হাদীস উদ্ধৃত (১ম খণ্ড ৪১০-৪১১পৃ.) করেছেন, যার সব কয়টিকে সহীহ বলেছেন- যাহবী তন্মধ্যে দুটিকে স্বীকার করে নিয়েছেন – তা পানি ঘোলা করেছ। এ দুটির একটি সায়ীদ জুমহী ইবনে উমর সুত্রে বর্ণিতা। কিন্তু বায়হাকী বলেছেনঃ এতে গম এর উল্লেখ সুরক্ষিতভাবে হয়নি। (৪র্থ খণ্ড-১৬৬ পৃ.) অতএব তা দলিল হতে পারে না। আর দ্বিতীয় হাদীসটিকে হাকেমের মতই ইবনে খুজায়মাও তাঁর সহীহ গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন ইবনে ইসহাক, আবদুল্লাহ ইবনে উসমান ইবনে হুকাইম, ইয়াজ ইবনে আবদুল্লাহ সুত্রে। আবূ সায়ীদ বলেছেনঃ লোকেরা তাঁর কাছে রমযানের সাদকার উল্লেখ করলে তিনি বলেলেনঃ আমি তো তাই দেই যা রাসূলে করীম (স) এর যগে দিতাম- এক ছা’ খেজুর কিংবা এক ছা’ গম বা এক ছা’ আটা অথবা এক ছা’ পনির। তখন একজন লোক বললোঃ দুই মদ্দ গম? বললেনঃ না ওটা তো মুয়াবিয়ার মূল্যায়ন। আমি তা গ্রহণ করি না। তদনুযায়ী আমলও করি না। কিন্তু ইবনে খুজায়মা বলেছেনঃ আবূ সায়ীদের কথায় গম বা আটার উল্লেখ ভুলবশত হয়েছে। কেননা আবূ সায়ীদ যদি বলেই থাকতেন যে, তাঁর কথাঃ একজন লোক বলল, থেকে বুঝা যায় যে, কাহিনীর শুরুতে গমের উল্লেখ সুরক্ষিত নয়। ভুলটা কার আমি জানিনা। তাঁরা রসূল (স) এর যগে এক ছা’ গম দিতেন, তাহলে লোকটি তাঁকে নিশ্চয়ই জিজ্ঞেস করত নাঃ দুই মদ্দ গম? আবূ দাউদ ইবনে ইসহাকের এ বর্ণনাটির দিকে ইঙ্গিত করেছেন এবং বলেছেন, তাতে গমের উল্লেখ সুরক্ষিত হয়। ফতহুল বারী থেকে উদ্ধৃত ২য় খণ্ড ৩৭৩ পৃ. ইবনে হাজম এ হাদীসটি তাঁর المحلى গ্রন্থে (৬ষ্ঠ খণ্ড- ১৩০) উদ্ধৃত করেছেন ইবনে ইসহাকের সূত্রে। কিন্তু তাতে এক ছা’ গমের উল্লেখ নেই। সে দলিলের ভিত্তিতে বলেছেন যে, আবূ সায়ীদ গম দিতে মোটামুটি নিষেধ করেন। কিন্তু আল্লামা শায়খ আহমাদ শাকের দারে কুতনী উদ্ধৃত (২২২) বর্ণনা এনে তার বিরোধিতা করেছেন। হাকিম আল-মুস্তাদারক (১ম খণ্ড ৪১১ পৃ.) গ্রন্থে যে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, সেটিকে আমরা এখানে উদ্ধৃত করেছি। তাতে এটুকু কথা অতিরিক্ত রয়েছেঃ অথবা এক ছা’ গম। বলেছেনঃ এটা বর্ণনাকারীদের পার্থক্য। কেউ একটার উল্লেখ করেন অথবা অন্যটার উল্লেখ করেন। আসলে সবেই সহীহ। সিকাহ বর্ণনাকারী কিছু বাড়তি বললে তা গ্রহণীয়। উক্ত শায়খ ইবনে খুজায়মা ও আবূ দাউদের ও বাড়তি অংশ সম্পর্কে যে কথা বলেছেন, তা জানতে পরেননি। ফতহুল বারী তা উদ্ধৃত করেছে। হ্যাঁ সিকাহ বর্ণনাকারীর বাড়তি কথা গ্রহণীয় হয় যদি তাঁর চাইতেও অধিক সিকাহ বর্ণনাকারী তার বিরোধিতা না করেন অথবা অথবা কালামে এমন কিছু না থাকে যা তার ভ্রান্তি বোঝায়। আবূ সায়ীদ প্রমুখ থেকে বহু সংখ্যক হাদীস এসেছে, যা প্রমাণ করে যে, সেকাল গম তাঁদের খাদ্য ছিল না। তার কিছু কিছু পরে উল্লেখ করব। তবে যে ইবনে ইসহাক থেকে বর্ণনা এসেছে তিনি সমালোচকদের দৃষ্টিতে تدليس করেন বলে খ্যাত – যদি হাদীস স্পষ্ট ভাষায় না বলেন। এখানে عن-عن ধারায় বর্ণনা এসেছে, মুস্তাদরাক গ্রন্থে তাই আছে। এ সবকিছু প্রমাণ করে যে,হাদীসকে সহীহ বলেছেন এবং যাহরী তা মেনে নিয়েছে, তা আসলে ভ্রান্তি।
ফল কথা, ইমাম ইবনুল মুনযির নবী করীম (স) থেকে গম সম্পর্কিত কথা নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া যায়নি বলে যে দৃঢ়তা প্রকাশ করেছেন, তা যথার্থ, তাতে আপত্তির কিছু নেই। হাফেজ বায়হাকীরও তাঁর সুনান গ্রন্থে (৪র্থ খণ্ড ১৭০ পৃ.) তাই বলেছেন। এক ছা’ গম পর্যায়ে হাদীস রাসূলে করীম (স) থেকে এসেছে। আর অর্ধ ছা’ পর্যায়ের হাদীস বটে; কিন্তু তা কোনটিই সহীহ নয়। তার কারণ خلافيات এ বলা হয়েছে। আবূ সায়ীদ খুদরীর হাদীস এবং ইবনে উমর থেকে প্রমাণিত হাদীসে আমাদের দেখানো হয়েছে যে, এক ছা’ গম দুই মদ্দে অর্ধ ছা’- বিনিময় হওয়ার ঘটনা রাসূলে করীম (স) এর পরে সংঘটিত।] আর তখনকার সময়ে মদীনায় গম ছিল অত্যন্ত সহজলভ্য (قمح অপেক্ষা)। সাহাবীদের সময় যখন তা বিপুল হয়, তখন তাঁরা দেখলেন যে, অর্ধ ছা’ بر (ময়দা) এক ছা’ شعير (উন্নতমানের গম) সমান হয়। আর তাঁরাই তখন নেতৃবৃন্দ। অতএব তাঁদের কথা বাদ দেয়া যেতে পারে কেবল তখণ যখন তাঁদেরই মত লোকদের কথা গ্রহণ করা হবে। পরে ইবনুল মুনযির হযরত উসমান, আলী, আবূ হুরায়রা, জাবির, ইবনে আব্বাস, ইবনুজজুবাইর – তাঁর মা আসমা বিনতে আবূ বকর (রা) থেকে সহীহ সনদে উদ্ধৃত করেছেন – যেমন ইবনে হাজার লিখেছেনঃ “তাঁরা মনে করেন, ফিতরের যাকাত হচ্ছে অর্থ ছা’ قمح (গম)। এ কথার পরিণতিই হচ্ছে ইমাম আবূ হানীফার মত।
কিন্তু আবূ সায়ীদ (রা) বর্ণিত হাদীস প্রমাণ করেযে, তিনি সেই কথা সমর্থন করেন নি। ইবনে উমর (রা) ও তাই। অতএব এক্ষেত্রে কোন ইজমা হয় নি বলেই মনে করতে হবে যদিও তাহাভী ভিন্ন মত পোষণ করেন। [(আরবী************)]
হানাফী মতের লোকেরা বলেছেন, আবূ সায়ীদ খুদরী বর্ণিত হাদীসে ওয়াজিব হওয়ার কোন দলিল নেই। সেটা এ কাজের বর্ণনামাত্র। অতএব তা জায়েযমাত্র। আমরাও তাই বলি। তাহলে ওয়াজিব পরিমাণ হল অর্থ ছা’। আর বেশী দিলে তা হবে নফল দান। [(আরবী************)]
আবূ সায়ীদ বর্ণিত হাদীসে طعام বা খাদ্য বলতে حنطه বা গমই বোঝায় বলে বলা হয়েছে, তা সমর্থনযোগ্য নয়। ইবনুল মুনযির বলেছেনঃ আমাদের কেউ কেউ ধারণা করেছেন- আবূ সায়ীদ বর্ণিত হাদীসে ساعامن طعام এক ছা’ পরিমাণ খাদ্য তাঁদের পক্ষের দলিল, যারা এক ছা পরিমাণ গম ফিতরা দেয়ার মত পোষণ করেন। কিন্তু এটা ভুল। কেননা আবূ সায়ীদ সংক্ষেপে খাদ্য এর উল্লেখ করেছেন। পরে তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন।…… পরে হাফস ইবনে মাইমারাতা সূত্রে বুখারী প্রমুখ উদ্ধৃত হাদীস তুলেছেন এই মর্মে যে, আবূ সায়ীদ বলেছেনঃ আমরা রাসূলে করীম (সা) এর সময়ে ঈদের দিনে এক ছা পরিমাণ খাদ্য ফিতরা বাবদ প্রদান করতাম। আবূ সায়ীদই বলেছেনঃ তখন আমাদের খাদ্য ছিল গম, কিশমিশ পনির ও খেজুর। পূর্ব কথার একটা ব্যাখ্যা। তাহাভী প্রমুখ অন্য সূত্রে অনুরূপ বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। তাতে এ কথাটুকুও রয়েছেঃ আমরা তা ছাড়া আর কিছু দিতাম না। [(আরবী************)]
বরং ইবনে খুজায়মা তাঁর সহীহ গ্রন্থে ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেছেনঃ রাসূলে করীম (স) এর সময়ে খেজুর, কিশমিশ ও গম ছাড়া আর কিছু দিয়ে সাদকায়ে ফিতর আদায় করা হতো না। حنطه তখন প্রচলিত ছিল না। মুসলিম শরীফে অপর এক সূত্রে আবূ সায়ীদ থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে। তিনি বলেছেনঃ আমরা তিন প্রকারের জিনিস দিয়ে ফিতরা দিতাম- একছা খেজুর অথবা এক ছা’ পনির, অথবা এক ছা’ গম। এ বর্ণনাটিতে কিশমিশ সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি- অপর তিনটির তুলনায় তার প্রচলন কম বলে। ইবনুল হাজার বলেছেনঃ এসব কয়টি সূত্রই প্রমাণ করে যে, আবূ সায়ীদের বর্ণনায় যে, খাদ্যের উল্লেখ হয়েছে, তা حنطه ছাড়া অন্য কিছু। হতে পারে তা ذره হবে। কেননা তা হিজাজবাসীদের কাছে এখন পর্যন্ত পরিচিত এবং তা তাদের প্রধান খাদ্য। জাওজাকী ইবনে আজলান-ইয়াজ সূত্রে আবূ সায়ীদের হাদীসেই এ অংশটুকু বর্ণিত আছেঃ এক ছা খেজুর এক ছা রুটি অথবা ذره। [দেখুন- (আরবী*************)]
পর্যালোচনা ও অগ্রাধিকার দান
উপরিউদ্ধৃত সমস্ত হাদীস একত্রিত করলে সুস্পষ্ট হয়ে উঠে যে, গম قمح তাদের খুব সাধারণ খাদ্যের মধ্যে শামিল ছিল না রাসূলে করীমের সময়ে। আর নবী করীম (স) ও তার এক ছা ধার্য করেন নি, যেমন গম ও খেজুর এবং কিশমিশ ও পনির থেকে ধার্য করেছেন। বুখারী ও মুসলিম গ্রন্থদ্বয়ে আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) থেকে যে বর্ণনাটি উদ্ধুত হয়েছে, তা উপরিউক্ত কথাকে বলিষ্ঠ করে। তিনি বলেছেনঃ রাসূলে করীম (স) ফিতরের যাকাত বাবদ দেবার আদেশ করেছেন এক ছা’ খেজুর বা এক ছা গম। বলেছেন, পরে লোকেরা তার বদলে দুই মদ্দ (গম) দিতে শুরু করে। অপর বর্ণনায় রয়েছেঃ পরে লোকেরা তার বদলে অর্থ ছা’ ময়দা দিতে শুরু করল। [(আরবী*************)]
ইবনুল কাইয়্যেম বলেছেনঃ এটা সুপরিচিত ও জ্ঞাত যে, উমর ইবনুল খাত্তাব এক ছা’ এর পরিবর্তে অর্থ ছা’ মায়দার প্রচলন করলেন। আবূ দাউদ এ কথাটি উদ্ধৃত করেছেন। [ইবনে হাজার বলেছেনঃ ইবনে উমর লোকেরা বলে মুয়াবিয়া ও তাঁর অনুসারীদের বুঝিয়েছেন। নাফে’ থেকে বর্ণিত আইউবের হাদীসে একথা স্পষ্ট ভাষায় উদ্ধৃত হয়েছে। হুমাইদী তাঁর মুসনাদে সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা সুত্রে উদ্ধৃত করেছেন। তাতে বলেছেনঃ ইবনে উমর বলেছেন, পরে মুয়াবিয়ার সময়ে লোকেরা এক ছা’ গমের বদলে অর্ধ ছা’ ময়দা দিতে শুরু করল। ইবনে খুজায়মা তাঁর সহীহ গ্রন্থে এরূপ উদ্ধৃত করেছেন। অপর এক সূত্রে- তা সূফিয়ান এবং নির্ভরযোগ্য। তা আবূ সায়ীদের কথার সমর্থন এবং তার চাইতেও সুস্পষ্ট। ইবনুল কাইয়্যেম আবূ দাউদের যে বর্ণনার দিকে ইঙ্গিত করেছেন, ইবনে হাজার তার উল্লেখ করেছেন। তা হচ্ছে মুসলিম (আরবী*********) বর্ণনাকরীর বিভ্রান্তী হওয়ার কথা বলেছেন। তিনি তার রদ্দ করেছেন স্পষ্টভাবে দেখুন (আরবী*************)] বুখারী মুসলিমে উদ্ধৃত, মুয়াবিয়াই তা চালু করেছেন। তাতে নবী করীম (স) থেকে বহু মুরসাল আসার উপস্থাপিত হয়েছে যা সনদযুক্ত এবং পরস্পর দ্বারা শক্তিশালী। [(আরবী*************)]
ইবনুল কাইয়্যেম ইবনে আবূ চায়াইর প্রমুখের হাদীস উল্লেখ করেছেন এবং হাসান বসরীর হাদীসও। বলেছেনঃ ইবনে আব্বাস বসরার মসজিদের মিম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে রমজানের শেষে ভাষণ দিলেন। বললেন, তোমরা তোমাদের রোযার সাদকা প্রদান কর। কিন্তু লোকেরা তা জানতে (বা বুঝাতে পারল না)। পরে বললেনঃ এখানে মদীনার কোন লোক আছে কি? তোমরা ওঠ, তোমাদের ভাইদের কাছে চলে যাও এবং তাদের শিক্ষা দান কর। কেননা তারা জানেনা। রাসূলে করীম (স) এ ফিতরা সাদকা বাবদ এক ছা’ খেজুর বা গম অথবা অর্থ ছা’ (আরবী********) ধার্য করেছেন প্রত্যেক মুক্ত বা দাস, পুরুষ বা মহিলা, ছোট বা বড় সকলের ওপরে…….. পরে হযরত আলী যখন এলেন এবং তিনি জিনিসপত্রের সস্তা মূল্য দেখলেন। তখন বললেনঃ আল্লাহ তোমাদের প্রতি প্রশস্ততা এনে দিয়েছেন। এখন তোমরা যদি তার জন্যে প্রত্যেক জিনিসের এক ছা’ পরিমাণ চালু করতে (তাহলে কতোই না ভালো হত)- আবু দাউদ বর্ণনাটি উদ্ধৃত করেছেন। উপরে তাঁরই বক্তব্য। নাসাইও উদ্ধৃত করেছেন।[নাসায়ী বলেছেনঃ হাসান ইবনে আব্বাস থেকে শুনতে পাননি। অনুরূপ বলেছেন আহমাদ ইবনুল মদীনী প্রমুখ ইমামগণ। এ দৃষ্টিতে হাদীসটি (আরবী******) তাঁরা এরূপ বলেছেন, এজন্যে ইবনে আব্বাস হযরত আলীর সময়ে বাসরায় অবস্থান করতেন। আর হাসান আলী ও উসমান উভয় আমলে মদীনায় রয়েছেন। শায়খ আহমাদ শাকের এ কথার সমালোচনা করে বলেছেনঃ এসব বিভ্রান্তি ছাড়া কিছুই নয়। কেননা হাসান ইবনে আব্বাসের সময় অবশ্যই বেঁচে ছিলেন। তিনি মদীনায় ছিলেন সে দিনগুলোতে যখন ইবনে আব্বাস বসরাতে শাসনকর্তা ছিলেন। কাজেই এ সময়ের পূর্বে ও পরে তাঁর নিকট হাদীস শোনা হাসানের পক্ষে অসম্ভব কিছু ছিল না। হাদীসে পারদর্শীগণ শুধু সমসাময়িকতার ভিত্তিকেও যথেষ্ট মনে করেছেন। পরে তার কাছ থেকে হাদীস শোনা এবং তাঁর সাথে সাক্ষাত নিশ্চিত প্রমাণ করে আহমাদ কর্তৃক তাঁর মুসনাদে সহীহ সনদে উদ্ধৃত হাদীস (৩১২৬)। তা ইবনে সিরীন থেকে বর্ণিতঃ একটি জানাজা হাসান ও ইবনে আব্বাসের সম্মখ দিয়ে চলে গেল। তা দেখে হাসান দাঁড়িয়ে গেল, কিন্তু ইবনে আব্বাস দাঁড়ালেন না। তখন হাসান ইবনে আব্বাসকে বললেনঃ রাসূলে করীম (স) তো জানাযা দেখলে দাঁড়াতেন? ইবনে আব্বাস বললেনঃ হ্যাঁ দাঁড়িয়েছেন, বসেও রয়েছেন? সাক্ষাত এবং শ্রবন প্রমাণকারী এ চাইতে বড় দলিল আর কি হতে পারে….. (আরবী*************) দেখুনঃ আমি বলব, শুধু এক সময়ের লোক হলেই বসরার মিম্বরে দেয়া একটা ভাষণ শোণবার জন্যে যথেষ্ট প্রমাণ নয়। এটা এমন সময়ের ব্যাপার, যখন হাসান নিশ্চই বসরাতে ছিলেন না। তা হলে তিনি সাক্ষাতে শুনতে পাওয়া কোন লোকরে মাধ্যমে উদ্ধৃত করেছেন। হাদীসের ক্ষেত্রে সমসাময়িকতা যথেষ্ট হয় যদি তাতে কোন স্থান বা সময়ের বিশেষভাবে উল্লেখ না থাকে। অবশ্য এটা বলা যেতে পারে যে, এ ধরনের ভাষণ অবশ্যই বসরাবাসীদের কাছে সুপরিচিত ছিল। হাসানের তা ইবনে আব্বাস থেকে সরাসরি শোনা জরুরী ছিল না। মুয়ায থেকে তায়ুমের বর্ণনা প্রসঙ্গে হাদীসবিদগণ এ কথাই বলেছেন। কেননা তায়ুম মুয়ায সম্পর্কিত যাবতীয় বিষয়ে অবহিত, তবে সাক্ষাত হয়নি। ইবনে আব্বাসের এ ভাষনে এক ছা’ খাদ্য উদ্ধুত ছিল। দেখুনঃ (আরবী*************)] তাতে আছেঃ অতপর আলী (রা) বলেছেনঃ আল্লাহই যখন তোমাদের জন্যে প্রশস্ততা এনে দিয়েছেন, তখন তোমরা উদরতার সঙ্গে দিতে তাক- ময়দা ইত্যাদি থেকে এক ছা’ পরিমাণ দাও।
ইবনুল কাইয়্যেম বলেছেনঃ আমাদের শায়খ ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রা) এ মতটিকেই শক্তিশালী মনে করতেন। বলতেনঃ আহ্মদ কাফ্ফারা পর্যায়ে যা বলেছেন, এটা তার ওপর কিয়াস। তিনি বলেছেনঃ সাদকায়ে ফিতর বাবদ যে পরিমাণ ময়দা ওয়াজিব, তা অন্য ক্ষেত্রে ওয়াজিব পরিমাণে অর্ধেক। [(আরবী**************)]
উপরে উল্লিখিত সব কথা থেকে আমাদের সম্মুখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, যেসব হাদীসে অর্ধ ছা’ গমের কথা এসেছে, তা প্রত্যাখ্যাণ করার মত যয়ীফ নয়। বিশেষ করে ইবনে আব্বাস থেকে হাসানের বর্ণনা যখন সহীহ প্রমাণিত। কিন্তু তা সাহাবীদের মধ্যে এতটা খ্যাত ও সহীহ ছিল না যে, খেজুর, গম, পনির, ও কিশমিশের এক ছা’ পরিমাণের মত অকট্যভাবে প্রমাণিত বলে মনে করা যেতে পারে।
তা যদি সহীহ হতো, তা তাহলে ইবনে উমর, আবূ সায়ীদ, মুয়াবিয়া এবং যেসব সাহাবী ও তাবেয়ী তাঁর কথা শুনেছেন, তাদের মত লোকদের কাছে তা গোপন থাকতে পারত না।
মুয়াবিয়ার কাজ তো স্পষ্ট। তিনি এক ছা’ পরিমাণ খেজুরের বিকল্প ঠিক করেছেন অর্ধ ছা’ গম قمح। এটা বিনিময়ে ও মূল্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে। এ কারণে আবূ সায়ীদ বলেছেন, এটা মুয়াবিয়ার মূল্য নির্ধারণ- আমি গ্রহনও করি না, তদানুযায়ী আমলও করি না।’ [ইবনে খুজায়মা ও হাকেম নিজ নিজ গ্রন্থে হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন। ইবনে ইসহাকের সূত্রে ফতহুল বারী, গ্রন্থে তাই বলা হয়েছে (২য় খণ্ড- ৩৭৩ পৃ.) এবং দেখুন আল-মুস্তাদরাক- (১ম খণ্ড ط سلفيه- ৪১১ পৃ; আল মুহাল্লা ৬ষ্ঠ খণ্ড, ১৩০ পৃ, نصب الريه ২য় খণ্ড, ৪ ৭-৪১৮ পৃ;]
অন্য সাহাবীগণও তাঁদের সময়ে গমের প্রাচুর্য দেখা দিলে এরূপই করতেন। তাঁরা মনে করেছেন, অর্ধ ছা’ قمح এক ছা’ গমের স্থলাভিসিক্ত হতে পারে। ইবনুল মুনযির যেমন বলেছেন।
এসব বর্ণনার ওপরে ভিত্তি করে চিন্তা করলে মন আশ্বস্ত হয় এ কথায় যে, খেজুর, গম, কিশমিশি, পনির- এ চার প্রকারের খাদ্যবস্তুর ক্ষেত্রে এক ছা’ পরিমাণটা অকাট্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত; কিন্তু সেই রকম দলীল দ্বারা এক ছা’ পরিমাণ قمح প্রমানিত হয়নি। এটা সত্যানুসন্ধানের ফলশ্রুতি। যেমন অর্ধ ছা’ সংক্রান্ত হাদীসমূহ সহীহ হওয়ার মানে পর্যন্ত পৌছায়নি। যে লোক অর্ধ ছা’ পরিমাণ ঠিক করেছেন- যেমন মুয়াবিয়া ও তাঁর সমর্থক সাহাবীগণ- এক ছা’ গম বা খেজুরের বিকল্প, তা তিনি করেছেন ইজতিহাদের সাহায্য। এ ইজতিহাদের ভিত্তি হচ্ছে এই যে, قمح ছাড়া অন্যান্য সবজিনিসের মূল্য সমান। قمح তখন খুব বেশী মূল্যে পাওয়া যেত। কিন্তু তাঁদের কথানুযায়ী প্রত্যেক যুগের ও প্রত্যেক জায়গার সাধারণ মূল্যকেই গণ্য করতে হবে। কিন্তু তাতে অবস্থা বিভিন্ন হয়ে যাবে, তা নিয়ন্ত্রিত ও সুবিন্যস্ত করা যাবে না। অনেক সময় কয়েক ছা’ قمح দেয়ার প্রয়োজনও হতে পারে। [(আরবী**************)]
পাকিস্তান সফরকালে সেখানকার কোন কোন আলিম আমাকে বলেছেন, তাদের দেশে قمح এর মূল্য খেজুরের তুলনায় অনেক কম। তাহলে সেখানে খেজুরে যা ওয়াজিব পরিমাণ তার অর্ধেক দিয়ে ওয়াজিব কি করে আদায় করা যেতে পারে? কিশমিশের অবস্থাও অনরূপ। এ কালে বহু দেশেই قمح ও খেজুরের তুলনায় তার মূল্য অনেক গুণ বেশী।
এ প্রেক্ষিত সমস্যার সমাধান কেবল তখনই হতে পারে, যদি এক ছা’ পরিমাণকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
এই যা বললাম, সাহাবায়ে কিরাম (রা) মূল্যের প্রতি নজর দিতেন মূল্যের হিসাবটাই গণ্য করতেন, তা প্রমাণ হচ্ছে, হযরত আলী (রা) যখন বাসরাতে সস্তা মূল্য দেখতে পেলেন সব জিনিসের, তখন তিনি লোকদের বললেনঃ তোমরা গম ও অন্যান্য জিনিসের এক ছা’ পরিমাণই দিতে থাক। অতএব বোঝা গেল, হযরত আলী (রা) এ ব্যাপারে মূল্যের ওপর দৃষ্টি রেখেছিলেন। হাফেয ইবনে হাজার এ কথাই বলেছেন। [(আরবী**************)]
এ পরিপ্রেক্ষিত অবশ্যই বাঞ্ছনীয় হচ্ছে, ব্যক্তির অথবা দেশের সাধারণ বা প্রধান খাদ্যের এক ছা’ পরিমাণকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা। পরে এ বিষয়ে আলোচনা করা হবে। যদি قمح গম প্রধান খাদ্য হয়, এবং তা দিয়ে ফিতরা দেয়ার ইচ্ছা করা হয়, তাহলে তার অর্ধ ছা’ পরিমাণ দেয়া জায়েয হবে- যদি তার মূল্য স্থানীয় লোকদের প্রধান খাদ্যের এক ছা’ পরিমাণের মূল্যের সমান হয়। قمح গমের মূল্য প্রদানের ব্যাপারে সাহাবীদের যে ইজতিহাদের কথা পূর্বে বলা হয়েছে এটা তারই ভিত্তিতে হবে।
তবে সর্বাবস্থায় এক ছা’ পরিমাণ দেয়াটাই সর্বাধিক সতর্কতামূলক নীতি। তাহলে মত বিরোধ থেকে বাচা যাবে এবং নিঃসন্দেহে প্রমাণিত দলিল মেনে চলা যাবে। এর ফলে মুসলিম ব্যক্তি সংশয় পূর্ণ ব্যাপার থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে সে কাজ করতে সক্ষম হবে, যাতে কোন রূপ সংশয় নেই। আর যাকে আল্লাহ প্রশস্ততা দান করেছেন, তার কর্তব্য সে প্রশস্ততা অনুযায়ী কাজ করা- যেমন হযরত আলী (রা) বলেছেন।
এক ছা’ পরিমাণের বেশী দেয়া কি জায়েয
আমার জন্যে এটা বিস্ময়কর যে, মালিকী মাযহাবের কোন কোন গ্রন্থে আমি এ কথা লিখিত দেখতে পাচ্ছি যে, ফিতরা দানকারীর জন্যে মুস্তাহাব নীতি হচ্ছে এক ছা’ পরিমাণের বেশী না দেয়া। বরং তার অধিক দেয়া মুকরূহ বলা হয়েছে। কেননা তাঁরা বলেছেন, শরীয়াত তো এ পরিমাণটাই সীমিত করে নির্ধারিত করে নিয়েছে। অতএব তার বেশী দেয়াটা যেমন বিদয়াত হবে, তেমনি মাকরূহ। যেমন তেত্রিশ বারের বেশী বার তাসবীহ- সুবহানাল্লাহ- পড়া। মাকরূহ ও বিদয়াত হবে যদি জেনে শুনে তা করা হয়। ভুলবশত করা হলে তা বিদয়াত বা মাকরূহ হবে না। [(আরবী*************)]
আমি মনে করি, এ দৃষ্টান্ত বা নজীর দেখানো সমর্থনযোগ্য নয়। কেননা যাকাত বা সাদকা তো নামাযের ন্যায় নিছক ইবাদত পর্যায়ের কাজ নয়। আর যিকির- তাসবীহ ইত্যাদিতে ওয়াজিব পরিমাণের অধিক করায় কোন দোষ হওয়ার কথা নয়- বরং তা খুবই উত্তম ও পছন্দনীয়। যেমন কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ
(আরবী**************)
যে লোক নফলস্বরূপ কোন কাজ করবে, তা তার জন্যে ভালো হবে। [(আরবী*************)]
রোযার ফিতরার ব্যাপারে এ আয়াত খুবই প্রযোজ্য। কেননা তা হচ্ছে মিসকীনের খাদ্য।
ইমাম আহমদ ও আবূ দাউদ উবাই ইবনে কায়াব (রা) থেকে উদ্ধৃত করেছেন, এক ব্যক্তির মালের যাকাতস্বরূপ একটা এক বছরে উপনীতা উষ্ট্রী ফরয হয়েছিল। কিন্তু সে তা যাকাত সংগ্রহকারীকে দিতে রাযী হল না। কেননা তা এখনো দুধওয়ালী হয়নি এবং বোঝা বহন ও সওয়ারী বহনেরও যোগ্য হয়নি। তখন তার পরিবর্তে মাটির টিবির মত উঁচু একটা উষ্ট্রী ছাড়া আর কিছু দিতে রাযী হল না। উবাইও রাযী হলেন না তা গ্রহণ করার জন্যে। কননা তা ফরয পরিমাণের অনেক বেশী অতিরিক্ত। তারা দুজনই নবী করীম (স) এ কাজে বিচার চাইলেন। তিনি তাকে বললেনঃ তোমার ওপর ফরয তো ঐটা। এক্ষণে তুমি যদি নফলস্বরূফ তা বেশি দিতে চাও তাহল আল্লাহ তোমাকে এর শুভ ফল দান করবেন। আমরা তোমার কাছ থেকে তা গ্রহণ করে নিলাম। পরে তিনি সেটি নিয়ে নেয়ার আদেশ দিলেন এবং তার মালে বরকত হওয়ার জন্যে তিনি দো’আ করলেন। [আহমদ, আবূ দাউদ ও হাকেম এ বর্ণনাটি নিজ নিজ গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন, এটাকে সহীহ বলেছেন। যাহবী তা সমর্থন করেছেন। নবম অধ্যায়ে ৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদে এর সম্পূর্ণ বর্ণনা উল্লেখ করা হবে।]
ওয়াজিব পরিমাণের বেশিও যে গ্রহন করা যেতে পারে, উপরিউক্ত বর্ণনা তার অকট্য দলিল। তাতে বেশি সওয়াব পাওয়ারও ওয়াদা রয়েছে, তাতে কোন অসন্তুষ্টিরও লক্ষণ নেই। হযরত আলী (রা) বলেছেনঃ আল্লাহই যখন তোমাদের প্রতি প্রশস্ততা দেন তখন তোমরাও তদানুযায়ী দান কর প্রশস্ততা সহকারে।
তবে বেশি দান করে নফল ইবাদত করা যদি বিদয়াত প্রমিণিত হয়, তাহলে তো সম্পুর্ণ হারাম হতো শুধু মাকরূহ নয়। কেননা বিদায়াতমাত্রই গুমরাহী।
হ্যাঁ, শুধু বাড়াবাড়ি, দেখানোপানা ও সূক্ষ্মতা অবলম্বনসরূপ- দানে উদারতা ও নফলস্বরূপ নয়- এক ছা’ পরিমাণের বেশি যে দেবে তাকে বলা যেতে পারে সে বিদায়াত করেছে আর সহীহ হাদীসে বলা হয়েছেঃ বাড়াবাড়িকারীরা ধ্বংস হোক। [আহমাদ, মুসলিম]
এক ছা’ এর পরিমাণ
পূর্বে আমরা বিশ্লেষণ করে দেখিয়াছি, এক ছা’ ওজনে মিশরীয় মাপের হয় অর্থাৎ এক পাত্র এ এক-তৃতীয়াংশ। শরহিদ দারদীর গ্রন্থেও তাই বলা হয়েছে। আর তা ২১৭৬ গ্রামের ওজনের সমান। (সেটা قمح এর ওজন হিসেবে)।
এক ছা’ قمح এর ওজন যদি তাই হয় তাহলে ফিকাহবিদগণ বলেছেন, ওটা ছাড়া অপরাপর প্রকারের জিনিস তার তুলনায় হালকা হবে। তার এ পরিমাণ মাল দেয়া হলে তা এক ছা’র বেশী হয়ে যাবে।
সেখানে যদি লোকদের ওজন করে বিক্রি করার অন্য কোন প্রকারের জিনিস থাকে যা قمح এর তুলনায় ভারী যেমন চাউল, তাহলে উল্লিখিত ওজনের পার্থক্যের তুলনাস্বরূপ বেশি পরিমাণ ওয়াজিব ধারা হবে।
এ প্রেক্ষিতেই কোন কোন আলিম পাল্লায় ওজনের পরিবর্তে পাত্র দিয়ে পরিমাণ করার ওপর বেশি নির্ভর করা যুক্তিযুক্ত মনে করেন, কেননা শস্য দানার মধ্যে হালকা- ভারী উভয় ধরনেরই রয়েছে।
ইমাম নববী الروضه গ্রন্থে লিখিছেনঃ
ছা কে উতন দ্বারা চিহ্নিত করা কঠিন। কেননা রাসূলের জামানায় যে ছা’ দ্বারা মেপে দেয়া হতো তা একটা পরিচিত পরিমাপ মাত্র। কিন্তু যে জিনিস দেয়া হয় তা বিভিন্ন হওয়ার কারেণ তার পরিমাণটাও বিভিন্ন হয়ে যায়। যেমন জনার বা ভূট্টা (maize) ও চনা প্রভৃতি। এ পর্যায়ে দীর্ঘ কথা বলার প্রয়োজন রয়েছে। যিনি সেই বিস্তারিত ও গবেষণাপূর্ণ কথা জানতে চান, তিনি (আরবী*******) পাঠ করবেন। তার সংক্ষিপ্ত কথা আমাদের মতের ইমাম আবুল ফারজ দারেমী যা বলেছেন, তাই ঠিক কথা। তা হচ্ছে, এ পর্যায়ে পাত্র দ্বারা পরিমাপের ওপর নির্ভর করতে হবে- পাল্লায় ওজনের ওপর নয় এবং রাসূলে করীম (স) এর সময়ে যে মুয়ায়ার معاير ছা’ দিয়ে পরিমাপ করে দেয়া হতো সেই রকম ছা’ দিয়ে পরিমাপ করেই দেয়া উচিত। এরূপ ছা’ বর্তমানেও আছে। তা যে পাবে না তার উচিত এমন একটা পাত্র দিয়ে পরিমাপ করা যে সম্পর্কে এ নিশ্চিয়তাবোধ হবে যে, তা সে ছা’র চাইতে কম বা ছোট হবে না। এ প্রেক্ষিতে পরিমাণ নির্ধারণ হবে রতল এবং এক-তৃতীয়াংশ প্রায়। (সম্ভবত সঠিক কথা হচ্ছে, কাছাকাছি বা নিকটবর্তী) কিছু সংখ্যক আলিম বলেছেন, এক ছার পরিমাণ হচ্ছে মধ্যম ধরনের দুই সমান হস্তের কোষ ভর্তি চারবারে যা হয় তাই। সঠিক কথা তো আল্লাহই ভালো জানেন। [(আরবী************)]
ইমাম নববীর এ কথা আমাদের এ যুগে মেনে নেয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। কেননা এখানকার সময়ে দুনিয়ার সর্বত্রই সব জিনিসই প্রায় পাল্লায় ওজন করা হয়।
ইবনে হাজাম বলেছেনঃ আমি মদীনাবাসীদের মধ্যে দুইজন লোককেও এই ব্যাপারে মতপার্থক্য করতে দেখিনি যে, নবী করীম (স) যে মদ্দ দ্বারা পরিমাণ করে সাদকাসমূহ দিতেন তা এক রতল ও অর্থরতলের অধিক ছিল না যেমন, তেমনি এক রতল ও এক-চতুর্থাংশ রতলেরও কম নয়। অনেকে বলেছেন, তা এক ও এক-তৃতীয়াংশ রতল ছিল।
বলেছেন, এটা বিশেষ কোন পার্থক্যের বিষয় নয়। তবে তা গম, খেজুর ও شعير এর পাত্র মাপের গাম্ভীর্য অনুপাতে। [আরবী**************)]
আল-মুগনী গ্রন্থে ইমাম আহমাদ থেকে উদ্ধৃত হয়েছে, ইবনে আবূ যিবের ছা’ পাঁচ রতল ও এক-তৃতীয়াংশ মাপের ছিল। আবূ দাউদ বলেছেন, সেটাই হচ্ছে রাসূলে করীম (স) ব্যবহৃত ছা’ মাপ। বলেছেন, যে লোক ভারী খাদ্য সাদকায়ে ফিতর বাবদ দেবে, তার উক্ত মাপের ওপর সতর্কতাস্বরূপ কিছুটা বেশী দেয়া উচিত। [(আরবী****************)]
হানাফীদের কাছে এক ছা’ হয় আট ’রতলে’ কৃষি ফসলের যাকাত পর্যায়ে আমরা তার উল্লেখ করে এসেছি। তার জমহুর ফিকাহবিদদের পরিমাণ এক ছা’ ও অর্থ ছা’ এর সমান হয়। তার অর্থেক ২/৩ এক ছা’ এর দুই তৃতীয়াংশ অন্যদের কাছে এক ছা’। এই অর্ধ ছা’- এর পরিমাণ কোন কোন হানাফী শায়খ করেছেন একপাত্র এ তার ষষ্ঠ ভাগ- মিশরীয় নিয়মে। আর কেউ কেউ তার পরিমাণ করেছেন একপাত্র ও এক তৃতীয়াংশ।[(আরবী***************)]
এ দৃষ্টিতে উভয়ের কাছে قمح গম এর ওয়াজিব পরিমাণ এক ও অভিন্ন হয়ে যায় পরিণামে এত সব মতপার্থক্য সত্ত্বেও। তবে قمح ছাড়া অন্য কোন শস্য ফিতরা হিসেবে দিতে গেলে সেক্ষেত্রে পার্থক্যটা প্রকট হয়ে উঠে। সেখানে হানাফীরা যে মাপের কথা বলেন, অন্যরা তাকে যয়ীফ বলেন। এরূপ এর বিপরীতটাও।
আর যার কাছে পরিমাণের পাত্র বা ওজন করার দাড়ি পাল্লা নেই, তার উচিত চার মদ্দ- পরিমাণ দেয়া। ফিকাহবিদদের মতে এক মদ্দ (Bushel) হচ্ছে মধ্যম আকার-আকৃতির এক ব্যক্তির দুই হাতের ভরা কোষ। আর এভাবে চার হাত কোষ পরিমাণ এক ছা’র সমান হবে। কেউ তার অধিক পরিমাণ দিলে তা তার নফল দান এবং তার জন্যে কল্যাণকর হবে।
যেসব জিনিস ফিতরা বাবদ দেয়া হয়
ফিতরার যাকাত প্রদান পর্যায়ে যত হাদীস এসেছে, তা বিভিন্ন প্রকারের নির্দিষ্ট খাদ্যদ্রব্যকে চিহ্নিত করেছে। সেগুলো হচ্ছেঃ খেজুর, গম, বার্লি, কিশমিশ ও পনির। (পনির হচ্ছে পানি নিষ্কাষিত শুষ্ক দুধ-যার মাখন বের করা হয়নি) কোন কোন বর্ণনায় অতিরিক্ত হিসেবে قمح এর উল্লেখ রয়েছে। আবার কোন কোনটিতে যব বা দানারও উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ জিনিসগুলোর কোন একটা দেয়া কি নির্দিষ্ট এবং ইবাদত পর্যায়ের? এই অর্থে যে, এগুলোর বাইরে অন্যান্য খাদ্যশস্যের কোন একটি দেয়া মুসলমানের জন্যে জায়েযই হবে না?
মালিকী ও শাফেয়ী মাযহাবের আলিমগণ এ প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, এ সব জিনিস দেয়াই ইবাদত পর্যায়ে নির্দিষ্টভাবে লক্ষীভুত নয়। এগুলোর কোনটি ছাড়া দেয়াই যাবে না, দিলে ইবাদত হবে না, এমন নয়। বরং মুসলমানের কর্তব্য হচ্ছে, দেশের সাধারণ খাদ্য থেকে তার ফিতরা আদায় করা। আর অন্য এক মতে ব্যক্তির সাধারণ খাদ্য ব্যক্তি বেশির ভাগ যে খাদ্য খায়, তা থেকেই দেয়া।
এর ওপর দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, সারা বছরের মধ্যে বেশীর ভাগ সময় যে খাদ্য খাওয়া হয় তাই লক্ষ্য, না বিশেষভাবে রমযান মাসে যা বেশির ভাগ সময়ে খায় অথবা ফিতরা দেবার দিনে বেশীর ভাগ যা খায় কিংবা ওয়াজিব হওয়ার দিন যা বেশির ভাগ খাবার হয়, তাই দেয়া লক্ষ্য?
মালিকী মাযহাবের লোকেরা এস সম্ভাবনার কথাই বলেছেন, তাঁদের কেউ কেউ অবশ্য ফিতরা দেবার দিনের কথা বলেছেন। কিন্তু অন্যরা রমযান মাসের বেশীর ভাগ খাদ্যকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। [(আবরী**********)]
শাফেয়ীদের সম্পর্কে ইমাম গাযযালী الوسيط গ্রন্থে লিখেছেনঃ ফিতরা ওয়াজিব হওয়ার সময়ে সারা বছরের নয়-দেশের লোকদের বেশীল ভাগ খাদ্য যা হবে, তাই দিতে হবে। আর (আরবী*********) গ্রন্থে লিখেছেন, ঈদুল ফিতরের দিনে দেশের বেশীর ভাগ লোকের যে খাদ্য থাকে, তাই দিতে হবে। [(আরবী**************)]
মালিকী মাযহাবের লোকেরা শর্ত করেছেন যে, সাধারণ ও বেশীর ভাগ খাদ্যশস্য হতে হবে সীমিতভাবে এ নয় প্রকারের খাদ্যের মধ্যে বার্লি, খেজুর, কিশমিশ, গম, যাররা, ছোলমুক্ত যব, চাল, বাজরা ও পনির। যখন এই নয়টি বা এর কোন কোনটি পাওয়া যাবে আর খাদ্য হিসেবে তা সমানভাবে গৃহীত হবে, তখন এর মধ্যে যে কোন একটি থেকে ফিতরা দেয়ার ইখতিয়ার থাকবে- ব্যক্তি যে যেটা ইচ্ছা দিতে পারবে। আর এর মধ্যে কোন একটি প্রাধান্য পেলে তা থেকেই দিতে হবে। যেমন কোন একটি এককভাবে প্রাধান্য পেয়ে থাকলে, তাই দিতে হবে। যদি তার পাওয়া যায় বা তার কোন একটি পাওয়া যায়- কিন্তু তা ছাড়া অন্যটাই যদি বেশী খাওয়া হয়, তাহলে সেটি দেয়াই নির্দিষ্ট উত্তমকে গ্রহণ করার দিক দিয়ে।
আমি কিন্তু খুঁটিনাটি ও দূরবর্তী শাখা-প্রশাখা পর্যায়ের কথাবর্তার সমর্থনে নির্ভরযোগ্য কোন দলিল পাইনি। এ কারণে উক্ত মাযহাবের কোন কোন সত্যসন্ধানী ব্যক্তি বলেছেন, এ নয়টি ছাড়া অন্য জিনিস যখন খাদ্য হিসেবে গ্রহীত হবে, তখন সেই খাদ্য হিসেবে গৃহীত দ্রব্যই ফিতরা বাবদ দিতে হবে। সেই নয়টির সব বা তার কোন একটি পাওয়া গেলেও।
এ কারণে ফিকাহবিদদের মতে গোশত, দুগ্ধ ও এ ধরনের জিনিস খাদ্য হয়ে থাকলে তা দেয়াও ওয়াজিব হবে। তখন তা ওজন করে দিতে হবে। তবে ছাতু দেয়ার ব্যাপারে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
মালিকী মতের লোকেরা এ পর্যায়ে একটি বিষয় উপস্থাপিত করেছেন। তাহলে, ব্যক্তি যদি নিম্নমানের খাবার গ্রহণ করে তার অক্ষমতার দরুন, তাহলে সেই খাদ্য থেকে ফিতরা দেয়া জায়েয হবে। এতে কোন দ্বিমত নেই। আর যদি সে কার্পণ্য ও অর্থ লোভের দরুন এরূপ করে, তাহলে তা সর্বসম্মতভাবে না জায়েয হবে। যদি তার হজম শক্তির কারণে অথবা তার অভ্যাসের দরুন এরূপ হয়, যেমন মরুবাসী শহরে গিয়েও নিম্নমানের গম شعير খায়, অথচ শহরবাসীরা قمح উচ্চমানের গম। এরূপ অবস্থায় মতভেদ রয়েছে। তাতে নির্ভযোগ্য কথা হল তার নিজের খাদ্য –যা ই হোক তা দিয়ে ফিতরা আদায় করা জায়েয হবে। [(আরবী***********)]
শাফেয়ীদের মতে যেসব শস্যদানা ও ফলে ‘ওশর’ ধার্য হয়- যা কেবল ঠেকায় পড়ে নয়, ইচ্ছামূলকভাবে ও সাধারণ অবস্থায় খাদ্য হিসেবে গৃহীত হয়ে থাকে, তাই ফিতরা হিসেবে দেয়ার যোগ্য। ইমাম শাফেয়ী থেকে তাঁর একটি প্রাচীন কথা এই বর্ণিত হয়েছেঃ
ছোলামুক্ত ভুট্টা, পিঁয়াজ ফিতরা হিসেবে দেয়া জায়েয হবে না। তবে প্রসিদ্ধ মত প্রথমটি।
পনির সম্পর্কে তারা স্থির নিশ্চিত নন। নববী বলেছেন, ফিতরা হিসেবে তাদেয়া জায়েয হওয়া সম্পর্কে নিঃসন্দেহে হওয়া বাঞ্ছনীয়। কেননা সে বিষয়ে যে হাদীস এসেছে তা সহীহ এবং তার প্রতিবাদী কিছু নেই।
সহীহতম কথা হচ্ছে, দুগ্ধ ও পনির একই অর্থের। কিন্তু ফিকাহবিদগণ বলেছেন, পনির থেকে মাখন টেনে নেয়া হয়েছে, তা দেয়া জায়েয হবে না, যেমন জায়েয হবে না লবণাক্ত পনির দেয়া যা বেশী লবনের দরুন খারাপ হয়ে গেছে। ঘুণে ধরা ও দোষযুক্ত শস্যদানাও দেয়া যাবে না।
যে সব দ্রব্য ফিতরা বাবদ দেয়া জায়েয, তা ওয়াজিব হওয়ার তিনটি দিক রয়েছে। জমহুরের মতে তার মধ্যে সহীহতম কথা হচ্ছে, দেশের সাধারণ ও বেশীর ভাগ খাদ্য যা দ্বিতীয় ব্যক্তির নিজের খাদ্য। আর তৃতীয় দিক হচ্ছে, উক্ত জিনিসগুলোর মধ্য থেকে যে কোন একটিকে বাছাই করে নেবে।
ফিকাহবিদগণ বলেছেন, ব্যক্তির খাদ্য কিংবা দেশের খাদ্য বাদ্যতামুলকভাবে চিহ্নিত হলে কেউ যদি তার চেয়ে নিম্নমানের খাদ্য দেয় তা হলে তা জায়েয হবে না। তবে উচ্চমানের দিলে তা সর্বসম্মতভাবে জায়েয হবে।
আর যদি ব্যক্তির নিজের খাদ্য গণ্য করি, আর দেখি যে, তার তো بر (উন্নতমানের গম) খাওয়া উচিত; কিন্তু সে কার্পণ্যের কারণে নিম্নমানের গম খায়, তাহলে তার সেই উন্নতমারের গমই দেয়া উচিত। আর অবস্থার কারণে যদি নিম্নমানের গমই তার জন্যে শোভন হয়ে থাকে, কিন্তু সে বিলাসিতাসরূপ উন্নতমানের গম খেতে অভ্যস্ত হয়ে থাকে, তাহলে সহীহ মত হচ্ছে, নিম্নমানেরটা দেয়াই তার জন্যে যথেষ্ট হবে। আর দ্বিতীয় মতে উন্নত মানেরটাই নির্দিষ্ট করতে হবে। [(আরবী***********)]
যদি দেশের বেশীর ভাগ লোকের খাদ্য বাধ্যতামুলক করে দিই আর সেখানকার লোকেরা বহু প্রকারের খাদ্য গ্রহণ করতে অভ্যস্ত হয়ে থাকে যে, তার মধ্যে কোন একটাকে প্রধান খাদ্য রূপে চিহ্নিত করা সম্ভব না হয়, তাহলে সেখানকার লোকেরা যেটা ইচ্ছা দিতে পাবে। তবে যেটা উন্নতমানের সেটা দেয়াই উত্তম। [ঐ (আরবী****************)]
ইমাম আহমাদের মাযহাব হচ্ছে, যে পাঁচ প্রকারের খাদ্যের নাম হাদীসে সুস্পষ্ট ভাষায় উদ্ধৃত হয়েছে, তা পাওয়া সম্ভব হলে তা বাদ দিয়ে অন্য কিছু দেয়া আদৌ জায়েয নয়। যেটি দেবে সেটি দেশের লোকদের খাদ্য হোক আর নাই হোক। [(আরবী*************)]
ইমাম আবূ হানীফা ও আহমাদের মতে সূক্ষ্ম আটা ও ছাতু দেয়াও জায়েয। কেননা তাও খাওয়া হয়। তা পেলে গরীব মিসকীনরা উপকৃত হতে পারে। আটা পেষা চাক্কির মজুরী হিসেবেও তা দেয়া যেতে পারে।[ঐ ৩য় খণ্ড, ৬২ পৃ.]
যে বোঝা যায়, নবী করীম (স) যেসব জিনিসের উল্লেখ করেছেন, তাই নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। কেননা তখনকার সময়ে সেগুলোই ছিল আরব পরিবেশের সাধারণ খাদ্য। এখন যদি কোন দেশের লোক কেবল চাল খেয়েই জীবন ধারণে অভ্যস্ত হয়ে থাকে- যেমন জাপান-এশিয়া এলাকার লোকদের অবস্থা। তাদের প্রকৃতি তাদের সেই খাদ্য থেকেই গড়ে উঠেছে, অতএব তা থেকেই তাদের ফিতরা দেয়া হবে। আর কোন দেশের লোকেরা যদি اذرة খাদ্যে জীবন ধারণ করতে থাকে-যেমন মিশরীয় রীফ তাদের উচিত হচ্ছে সেই খাদ্য থেকেই ফিতরা দেয়া; অতএব আমার দৃষ্টিতে এ মতটাই অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য যে, প্রত্যেক ব্যক্তিই তার দেশের জনগনের সাধারণ খাদ্য দিয়েই তার ফিতরা আদায় করবে অথবা তার নিজের সাধারণ খাদ্য যদি দেশের সাধারণ খাদ্য থেকে উন্নতমানের হয়, তাহলে তা থেকেই ফিতরা দেবে।
ইবনে হাজমের মতে খেজুর ও গম বা বর্লি ছাড়া অন্য কোন জিনিস আদৌ জায়েয হবে না। কিশমিশ, قمح মিহি আটা, পনির ইত্যাদি কোন কিছুই নয়। এ কথার দলিল দিতে গিয়ে তিনি দীর্ঘ আলোচনার অবতারণা করেছেন এবং এর বিপরীত মতের সব হাদীসই তিনি রদ্দ করেছেন। তার মতের বিরোধী লোকদের তিনি তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেছেন। এটাই তাঁর চিরাচরিত অভ্যাসও বটে। [(আরবী****************)]
তিনি যেসব হাদীস দলিল হিসেবে উদ্ধৃত করেছেন, তার মধ্যে ইবনে মুজলিজ থেকে। তাঁর সনদে বর্ণিত একটি হয়; তিনি বলেছেনঃ আমি ইবনে উমর (রা) কে বললাম, আল্লাহ তো অনেক প্রশস্ত করে দিয়েছেন ব্যাপারটি। بر (উন্নত মানের গম) কি খেজুরের তুলনায় উত্তম সাদকায়ে ফিতর দেয়ার জন্যে? তিনি তাঁকে বললেনঃ আমাদের সঙ্গীরা একটা পন্থা অনুসরণ করেছেন, আমিও সেই পন্থা অনুসরণ করা পছন্দ করি। [(আরবী***************)]
একজন সাহাবীর এ উক্তিটিকে দলিল হিসেবে উপস্থাপিত করে ইবনে হাজম খুব বাড়াবাড়ি করেছেন বলতে হবে। এমন কি তিনি এটাকে সাহাবীদের ইজমারূপেও গণ্য করেছেন অথচ তার বিপরীত মতের সমর্থনে সাহাবিগণের বিপুল সংখ্যক উক্তি বা মন্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে। ইবনে হাজমের উক্ত মতের ওপর আল্লামা শায়খ আহমদ শাকের যে টিকা লিখেছেন আল-মুহাল্লা’ গ্রন্থের ওপর, এখানে তার উল্লেখ করাই আমাদের জন্যে যথেষ্ট হবে। তিনি লিখেছেনঃ
ফিতরার যাকাত পর্যায়ে যত হাদীসই উদ্ধৃত হয়েছে, সেগুলোর সূত্র সম্পর্কে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে চিন্তা করলেই তার তাৎপর্য বোঝা যাবে যে, সাহাবীগণ (স) এর এসব উক্তিতে শব্দের বিভিন্নতা রয়েছে। একথাও জানা যাবে যে, ইবনে হাজম যে কেবলমাত্র খেজুর ও বার্লি ছাড়া অন্য কিছু ফিতরা বাবদ দেয়া আদৌ সমর্থন করেছেন না তাঁর সপক্ষে সত্যই কোন দলিল নেই। হযরত মুয়াবিয়া সাহাবীগণের উপস্থিতিতে এক ছা’ পরিমাণ বার্লি ইত্যাদির বদলে সিরীয় গমের দুই মদ্দ পরিমাণ দেয়া উত্তম বলে মনে করলেন অথচ তাঁদের কেউই এ বার্লির পরিবর্তে উন্নত মানের গম দেয়ার কথায় আপত্তি জানালেন না। হযরত আবূ সায়ীদ শুধু পরিমাণটার ওপর আপত্তি করেছিলেন ও উন্নতমানের গম ও এক ছা’ পরিমাণ দেয়াটাকেই সমর্থন করেছেন। ইবনে উমর (রা) নিজে তো বিশেষভাবে সেই জিনিস দিয়েই ফিতরা আদায় করতেন যা দিয়ে তিনি আদায় করেছিলেন রাসূলে করীম (স) এ সময়ে। সেই জিনিস ছাড়া অন্য কিছু দিতে তিনি এখনও আপত্তি করেন নি। তিনি যদি লোকদেরই আমল বাতিল মনে করতেন তারা তো সাহাবী ও তাবেয়ীনই ছিলেন তাহলে তিনি নিশ্চয়ই কঠোরভাবে প্রতিবাদ জানাতেন ও নিষেধ করতেন। তিনি তো এ ধরনের বহু ব্যাপরেই তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ করেছেন কেবল বিধান প্রণয়নের লক্ষ্যেই নয়, রাসূলের সুন্নাত অনুসরণের তীব্র আগ্রহে। যেমন তিনি সে সব স্থানে যেতে ও অবস্থান করেছিলেন সেসব স্থানে স্বয়ং রাসূলে করীম (স) গেছেন ও অবস্থান করেছেন অথচ কোন একজন মুসলমানও তা ওয়াজিব বলে মনে করেন নি। ফিতরা ওয়াজিব করা হয়েছে ঈদের দিনে গরীব জনগণের বাড়ী বাড়ী ভিক্ষা করে বেড়ানো থেকে বিরত রাখার লক্ষ্যে যেহেতু এ দিনে ধনী লোকরা নিজেদের ধনমাল ও পরিবার-পরিজন নিয়ে খুবই আনন্দ স্ফূর্তিতে মশগুলে থাকে। এরূপ অবস্থায় প্রত্যেক ব্যক্তিরই নিজস্বভাবে চিন্তা ভাবনা করা আবশ্যক যে, সে কি কোন গরীব ব্যক্তিকে এক ছা; পরিমাণে খেজুর বা এক ছা; পরিমাণ বার্লি দিয়ে ভিক্ষা থেকে বিরত রাখতে পারে?….. এ দিনে….. এদেশে? গরীব ব্যক্তি ও দুটি নিয়ে কি করতে পারে?……. পারে শুধু এই যে, সে দুটি কম মূল্যে কে ক্রয় করবে তাই তালাশ করে বেড়াবে, যেন সে তার ও তার সন্তানের জন্যে খাদ্য ক্রয় করতে পারে। [(আরবী*************)]
মূল্য প্রদান
তিনজন ইমাম ফিতরার যাকাত ও অন্যান্য সব যাকাতেই মূল জিনিসের মূল্য দেয়া জায়েয মনে করেন নি।
ইমাম আহমাদকে সাদকায়ে ফিতর বাবদ পয়সা প্রদান করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেলেনঃ আমি ভয় করছি যে, তাতে আদায় হবে না। তাছাড়া তা রাসূল (স) এ সুন্নাতের পরিপন্থীও।
তাঁকে বলা হল, লোকেরা বলে, উমর ইবনে আবদুল আজিজ মূল্য গ্রহণ করতেন।
বললেনঃ এ লোকেরা তো দেখছি রাসূল (স) এর কথাকে বাদ দিয়ে অমুক-অমুকের কথাকে দলিল হিসেবে নিচ্ছে। ইবনে উমর বলেছেনঃ রাসূলে করীম (স) ফরয (ধার্য করেছেন……..হাদীস) আর আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেনঃ তোমরা অনুগত্য কর আল্লাহর এবং মেনে চল রাসূলকে। [(আরবী*************)]
এর অর্থ, তিনি দ্রব্যের মূল্য প্রদানকে রাসূলের বিরোধিতা মনে করতেন। ইমাম মালিক ও শাফেয়ীর কথাও তাই। [(আরবী*************)]
ইবনে হাজমও এরূপ কথাই বলেছেনঃ মূলত দ্রব্যের মূল্য প্রদানে ফিতরা আদায় হবে না। কেননা তা রাসূলে করীম (স) এর ধার্য করা জিনিস ছাড়া অন্য কিছু। তবে জনগণের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে মূল্য দেয়া জায়েয হবে কেবলমাত্র পারস্পরিক সম্মতি সন্তুষ্টির ভিত্তিতে। আর যাকাতের ফিতরার নির্দিষ্ট কোন মালি নেই বলে তার অনুমতি বা সম্মতি পাওয়ারও প্রশ্ন ওঠে না। [(আরবী*************)]
সওরী, আবূ হানীফা ও তাঁর সঙ্গিগণ বলেছেনঃ মূল্য প্রদান জায়েয। উমর ইবনে আবদুল আজিজ ও হানানুল বসরী থেকে এ কথা বর্ণিত হয়েছে। [(আরবী*************) গ্রন্থে লিখিত রয়েছে, উমর ইবনে আবদুল আজিজ থেকে তা সহীহ সূ্ত্রে বর্ণিত হয়েছে।]
বাসরায় অবস্থানরত (গভর্ণর) আদীর প্রতি লেখা উমর ইবনে আবদুল আজিজের চিঠি পড়তে আমি শুনেছিঃ দিওয়ানভুক্ত প্রতিটি ব্যক্তি থেকে তাদের দানসমূহ থেকে অর্ধ দিরহাম গ্রহণ করা হবে। [(আরবী*************)]
হাসানুল বসরী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেনঃ ইবনে আবূ শাইবা আউন থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, সাদকায়ে ফিতর আদায়ে পয়সা (নগদ মূল্য) দেয়ার কোন দোষ নেই। [(আরবী*************)]
আবূ ইসহাক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমি লোকদের (সম্ভবত সাহাবীদের) এ অবস্থায় পেয়েছি যে, তাঁরা রমযানের সাদকা খাদ্যের মূল্য প্রদান করে আদায় করতেন। [(আরবী*************)]
আতা থেকে বর্ণিত, তিনি সাদকায়ে ফিতর বাবদ একটি রৌপ্য মুদ্রা দিতেন। [(আরবী*************)]
ক. নবী করীম (স) এর কথাঃ এ দিন মিসকীনদের সচ্ছল বানিয়ে দাও থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, মূল্য দিলেও তাদের সচ্ছ্বল বানাবার উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয় যেমন খাদ্যবস্তু দিলে তা হয়। আর অনেক সময় মূল্য দেয়াটা উত্তমও হয়। কেননা ফিতরা বাবদ পাওয়া বিপুল খাদ্য সম্ভার ফকীর মিসকীনের কাছে জমা হলে তা বিক্রয় করার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে অথচ নগদ পয়সা পেলে সে তার দ্বারা প্রয়োজন মত খাদ্যবস্তু ও অন্য দ্রব্য ক্রয় করতে পারে।
খ. ইবনে মুনযিরের কথা ইতিপূর্বে উদ্ধৃত হয়েছে মূল্য দেয়া জায়েয হওয়ার পক্ষে। খোদা সাহাবিগণই অর্ধ ছা’ উন্নত মানের গম দেয়া জায়েয বলে মত দিয়েছেন। কেননা তাঁরা তাকে এক ছা’ পরিমাণ খেজুর বা বার্লির মূল্য হিসেবে বিকল্প মনে করেছেন। এ কারণেই মুয়াবিয়া (রা) বলেছেনঃ আমি মনে করি, সিরীয় গমের দুই মদ্দ পরিমাণ এক ছা’ খেজুরের বদল হতে পারে।
গ. আমাদের এ যুগের দৃষ্টিকোন দিয়ে বিচার করলেও এটাই সহজ মনে হবে। বিশেষ করে শিল্পোন্নত দেশ ও এলাকাসমূহে তো নগদ পয়সাই হয় বিনিময়ের একমাত্র মাধ্যম। অনেক দেশ অনেক শহর এবং অনেক সময়ই তা গরীব লোকদের জন্যে খুবই সুবিধাজনক হয়।
আমার যা মনে হয়, নবী করীম (স) ফিতরার যাকাত দেয়ার জন্যে খাদ্যবস্তু দেয়া নির্ধারিত করেছেন দুটি কারণেঃ প্রথম সেই সময়কার আরবে নগদ অর্থ ছিল বিরল। ফলে খাদ্যবস্তু দেয়াটাই ছিল লোকদের পক্ষে সহজ। আর দ্বিতীয়, নগদ মূল্যের ক্রয়ক্ষমতা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন হয়ে থাকে। কিন্তু এক ছা পরিমাণ খাদ্য সেরূপ নয়। তা মানবীয় প্রয়োজন খুব সীমিতভাবে পূরণ করতে পারে মাত্র। সেকালে খাদ্যসষ্য দেয়া যেমন দাতার পক্ষে সহজতর ছিল, গ্রহণকারীর পক্ষেও তা ছিল অধিক উপকারী (একালে নগদ মূল্য দেয়াটা ঠিক তেমনি।) আল্লাহই সঠিক কথা ভালো জানেন।
যাকাত আলোচনায় যাকাত আদায়ের পন্থা পর্যায়ে প্রদান। সম্পর্কে আমি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করছি। তা আবার দেখে নেয়া যেতে পারে।
মূল্য প্রদান সম্পর্কিত বিষয়াদি
নগদ মূল্য প্রদানের সাথে কতগুলো বিষয় জড়িত। হানাফী আলিমগণ তার উল্লেখ করেছেন।
প্রথম, মূল্য প্রদান অর্থ গম অথবা বার্লি কিংবা খেজুরের মূল্যদান। এ তিনটির যেকোন একটির মূল্য দেয়া যেতে পারে ইমাম আবূ হানীফা ও আবূ ইউসুফের মত অনুযায়ী আর ইমাম মুহাম্মাদ বলেছেনঃ কেবলমাত্র গমের মূল্যই দেয়া যাবে। [(আরবী **********)]
আমার বিবেচনায় হচ্ছে, দেশের সাধারণ খাদ্যশস্যের এক ছা’ পরিমাণের মূল্যদান। শস্যটা মধ্যম মানের হওয়া উচিত। আর উত্তম মানের কলে তা আরও উত্তম।
দ্বিতীয়, হাদীসে যে সব জিনিসের উল্লেখ হয়েছে, মূল্য হিসেবে তার মধ্যে পারস্পরিক বিনিময় করে ফিতরা দেয়া জায়েয হবে না যেমন গমের মূল্য হিসেবে গম দেয়া জায়েয নয়,- এভাবে যে, মধ্যম মানের এক ছা’ পরিমাণের মূল্য বাবদ অর্ধ ছা’ উত্তমমানের গম দেয়া যাবেনা। তেমনি মূল্য হিসেবে গমের পরিবর্তে খেজুর বা বার্লি দেয়াও জায়েয হবে না বরং মূল জিনিসটির মূল্যটা দিতে হবে। অবশিষ্ট দ্রব্যাদি। সম্পর্কেও এরই ভিত্তিতে ধারণা করতে হবে। কেননা মূল্য গণ্য হবে যেসব জিনিসের উল্লেখ হাদীস হয়নি, তার দ্বারা। [(আরবী*****************)]
তৃতীয়, হানাফীদের মধ্যে – মূল্য প্রদান না হাদীস উল্লিখিত দ্রব্য দিয়ে ফিতরা আদায় করা- এ দুটোর মধ্যে কোনটি উত্তম তা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
তাদের কেউ বলেছেন, গম দেয়া সর্বাবস্থায় উত্তম। তা কঠিন কষ্টের সময় হোক কিংবা অন্য কিছু। কেননা তাতে সুন্নাতের সাথে সাদৃশ্য ও সমতা রক্ষা করা হবে।
অন্যদের কথা হচ্ছে, সময়টা যদি খুব কষ্টের ও খাদ্যভাবের হয়, তাহলে তখন মূল খাদ্যটা দেয়াই উত্তম। আর প্রশস্ততা ও সচ্ছলতাকালে মূল্য দেয়া উত্তম। কেননা তা গরীব মানুষের প্রয়োজন পূরণে অধিক সক্ষম।
এ থেকে আমাদের সম্মুখ সুস্পষ্ট হয়ে উঠে যে, উত্তম সাব্যস্ত করার ভিত্তি হচ্ছে গরীব ব্যক্তির পক্ষে কেনটা দিলে অধিক সুবিধাজনক হয়, সেই জিনিসটি দেয়া। যদি খাদ্যশস্য দিলে মূল্যের তুলনায় তার পক্ষে অধিক ভাল হয়, তাহলে সেটি দেয়া উত্তম। যেমন দুর্ভিক্ষ ও কষ্টের সময় তা ভাল। আর নগদ পায়সা পেলে তার যদি বেশী সুবিধা হয়, তাহলে তাই দেয়া উত্তম।
হিসেবে গরীব ব্যক্তির একার সুবিধাটা না দেখে গোটা পরিবারের সুবিধাটার বেশী গুরুত্ব পাওয়া উচিত। কেননা দেখা গেছে, অনেক পারিবরিক দায়িত্ব সম্পন্ন দরিদ্র ব্যক্তি নগদ পায়সা নিয়ে তা নিজের বাজে অভ্যাস ব্যয় করে ফেলে অথচ তখন তার স্ত্রী ও সন্তান-সন্তুতি হয়ত িএকবেলা খাবার বঞ্চিত হয়ে রয়েছে। এরূপ অবস্থায় খাদ্যশস্য দেয়াই অধিক ভালো।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
ফিতরা কখন ওয়াজিব হয় এবং তা কখন প্রদান করতে হবে
ফিতরা কখণ ওয়াজিব হয়
মুসলমানগণ এ ব্যাপার সম্পূর্ণ একমত যে, রমযানের রোযা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই ফিতরা ওয়াজিব হয়ে পড়ে। ইবনে উমর (রা) এর পূর্বোল্লিখত হাদীস রমযানে ফিতরার যাকাত রাসূলে করীম (স) ফরয (ধার্য) করেছেন। এটাই তার বড় দলিল।…… ওয়াজিব হওয়ার সঠিক সময় নির্ধারণে ফিকাহবিদদের মত বিভিন্ন প্রকারের। ইমাম শাফেয়ী, আহমাদ, ইসহাক, সওরী এবং একটি বর্ণনায় ইমাম মালিকের মত হচ্ছে, রমযানের শেষ দিনের সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে ফিতরা ওয়াজিব হয়। কেননা তা রোযাদারের পবিত্রতা বিধানের উদ্দেশ্যে ওয়াজিব করা হয়েছে। সূর্যাস্তের সাথে সাথে রোযাও শেষ হয়ে যায়। অতএব তখনই তা ওয়াজিব হয়ে যায়।
আবূ হানীফা এবং তাঁর সঙ্গীরা, লাইস, আবূ সওর এবং মালিকের দুটো বর্ণনার একটির বক্তব্য হচ্ছে, ঈদের দিনের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ফিতরা ওয়াজিব হয়। কেননা তা এমন নৈকট্য মাধ্যম ঈদের দিনের সাথে সংশ্লিষ্ট। কাজেই তা ঈদের দিনের আগে হতে পারে না- যেমন কুরবানী ঈদুল আযহার দিনেই করতে হয়। [(আরবী*************)]
আসলে ব্যাপারটি সহজবোধ্য। পার্থক্যের ফলশ্রুতি প্রকাশিত হয় রোযার শেষ দিনের সূর্যাস্তের পর এবং ঈদের দিনের সূর্য উদয় হওয়ার পূর্বে জন্মগ্রহণকারী শিশুর ব্যাপারে, – তার ওপর ফিতরা ওয়াজিব হবে কি-না এ নিয়ে। অনুরূপভাবে ’শরীয়াত পালনে বাধ্য المكلف ব্যক্তি যদি উক্ত সময় মৃত্যুবরণ করে তবে তার ব্যাপারেও। [(আরবী*************)]
কখন প্রদান করা হবে
বুখারী ও মুসলিম ইবনে উমর (রা) থেকে উদ্ধৃত করেছেনঃ
(আরবী*****************)
রাসূলে করীম (স) লোকদের নামাযের জন্যে রওয়ানা হওয়ার পূর্বেই ফিতরা দিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন।
এখানে নামায অর্থ ইদের নামায
ইকরামা থেকে বর্ণিত বলেছেনঃ প্রত্যেক ব্যক্তি তার ফিতরা তার নামাযের আগেই পেশ করবে। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ
(আরবী*************)
প্রকৃত সাফল্য লাভ করল সে, যে পরিশুদ্ধতা গ্রহণ করল এবং তার আল্লাহর নাম স্মরণ করল- অতপর নামায পরল।[(আরবী*************)]
ইবনে খুজায়মা কাশরী ইবনে আবদুল্লাহ- তার পিতা থেকে- তাঁর দাদা থেকে- এ সূত্রে বর্ণনা উদ্ধত করেছেন। রাসূলে করীম (স) কে এ আয়াতটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। জবাবে তিনি বলেছিলেনঃ আয়াতটি ফিতরার যাকাত পর্যায়ে অবতীর্ণ হয়েছে। [(আরবী*************)]
কিন্তু হাদীসটি সনদের দিক দিয়ে দুর্বল। কেননা, কাসীর, নামের বর্ণনাকারী হাদীসের ইমামগণের বিচারে খুব বেশী যয়ীফ, ব্যক্তি বলে চিহ্নিত।[বরং আবূ দাউদ ও শাফেয়ী বলেছেন, এ লোকটি মিথ্যুক গোষ্ঠীর একজন সদস্য। ইবনে হাব্বান বলেছেন, এ লোকটি খুব বেশী মুনকারুল হাদীস। সে তার পিতা তার দাদা সূত্রে মওজু হাদীস বর্ণনাকরে। কিতাবসমূহে তার উল্লেখ কেবল বিস্ময়বোধ হিসেবেই হতে পারে। তবে তিরমিযী তার হাদীস সহীহ বলেন। যাহবী উল্লেখ করেছেন, আলিমগণ তিরমিযীর এ সাক্ষ্যর ওপর নির্ভর করে তার হাদীস গ্রহণ করবেন না। দেখুন (আরবী*************)] মুলত আয়াতটি মক্কায় অবতীর্ণ সূরার। আর ফিতরার যাকাত শরীয়াতবদ্ধ হয়েছে মদীনায় রমযানের রোযা ফরয হওয়া ও দুই ঈদের শরীয়াতবদ্ধ হওয়ার পর। ফিতরার যাকাত সম্পর্কে নাযিল হয়েছে, রাসূলে করীম (স) এর এ কথাটির ব্যাখ্যা এই হতে পারে যে, আয়াতটি ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গী থেকে ফিতরার যাকাত বোঝায়।’ ফিতরার যাকাতের কারণে পারিভাষিক তাৎপর্যের দিক দিয়ে তা নাযিল হয়নি।
বুখারী ও মুসলিম আবূ সায়ীদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেনঃ ‘আমরা রাসূলে করীম (স) এর সময়ে ঈদুল ফিতরের দিনে এক ছা’ পরিমাণ খাদ্য প্রদান করতাম।’ বাহ্যত মনে হয়, সারাটি দিন ধরে এ ফিতরা দেয়া হত। কিন্তু ব্যাখ্যাকারগণ দিনের প্রথমাংশেই দেয়ার কথা বলেছেন। আর এ সময়টি হচ্ছে ফযরের নামায ও ঈদের নামাযের মধ্যবর্তী সময়। ফতহুল বারী গ্রন্থে তাই লেখা হয়েছে।
শাফেয়ী (র) মনে করেছেন, নামাযের পূর্বে দেয়া শর্ত মুস্তাহাবস্বরূপ আরোপ করা হয়েছে। কেননা নবী করীম (স) এর কথাঃ ‘তোমরা এদিনে মিসকীনদের সচ্ছল বানিয়ে দাও’ এর এদিন বলতে সারাটি ঈদের দিনে বোঝায়।[(আরবী*************)]
জমহুর ফিকাহবিদগণ মনে করেন, নামাযের পর পর্যন্ত বিলম্বিত করা মাকরূহ। কেননা ফিতরা দানের প্রথম লক্ষ্য হচ্ছে, এ দিনে লোকদের নিকট চাওয়া- ভিক্ষা করা থেকে ফকীর মিসকীনকে বিরত রাখার এবং তাদের সচ্ছল করে দেয়া। কাজেই তা দেয়া বিলম্বিত হলে দিনের একটি অংশ এ সচ্ছলকরণ কার্যসূচী, অবাস্তবায়িত থেকে যাবে।[(আরবী*************)]
ইবনে হাজম মনে করেন, সূর্যের তাপ বৃদ্ধি পাওয়া ও ঈদের নামাযের সময় উপস্থিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফিতরা দানের সময়টাও শেষ হয়ে যায়। অতএব বিলম্ব করাটা তাঁর হতে হারাম।
বলেছেন, ফিতরা দেয়ার সময় শেষ হওয়ার পূর্বে যে তা দেবে না, তা তার যিম্মায় ও তার মালের ওপর ধার্য হয়েই থাকবে। এটা তার একটা ঋণ বিশেষ। লোকদের জন্যে স্বীকৃত একটা অধিকার, তার মাল থেকে তা দিয়ে দেয়া তার জন্যে ওয়াজিব। তার মালের মধ্যে তা আটকে রাখা হারাম। অতএব তা আদায় করা তার জন্যে একটা চিরন্তন কর্তব্য হয়ে থাকবে। দিয়ে দিলে মিসকীনদের হক আদায় হয়ে যাবে বটে; তবে তার জন্যে নির্দিষ্ট সময়ে না দেয়া- সময় নষ্ট করার দরুন আল্লাহর হকটা অবশিষ্ট থেকে যাবে। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া ও লজ্জিত অনুতপ্ত হওয়া ছাড়া এ ক্ষতির পূরণ করা তার পক্ষে কখনই সম্ভবপর হবে না। [(আরবী*************)]
শাওকানীর ঝোঁক হচ্ছে এদিকে যে, ঈদের নামাযের পূর্বেই ফিতরা দিয়ে দেয়া ওয়াজিব- হযরত ইবনে আব্বাসের হাদীসের কারণে। তা হলঃ যে তা নামাযের পূর্বে দিয়ে দেবে, তা গৃহীত যাকাত হবে আর যে তা নামাযের পর দেবে, তখন তা হবে একটা সাধারণ দান পর্যায়ের।’
সাধারণ দান পর্যায়ের কথাটির অর্থ, সে প্রদানের ফলে ফিতরার যাকাত দানের যে সওয়াব সেই বিশেষ সওয়াব সে পাবে না তার আসল নৈকট্যমূলক গুণসহকারে যা পেতে যথাসময়ে প্রদান করলে।
আর ঈদের দিন গত হয়ে যাওয়ার পর তা দিলে কি হবে?…… এ পর্যায়ের ইবনে রাসলান বলেছেন, তা সর্বসম্মতভাবে হারাম। কেননা তা যখন ওয়াজিব যাকাত, তখন তা তার জন্যে নির্দিষ্ট সময় ছাড়িয়ে দিলে গুনাহ ওয়াজিব হয়ে পড়ে- যেমন সময় ছাড়িয়ে নামায পড়া হলে হয়। [(আরবী*************)]
আল-মুগনী গ্রন্থে বলা হয়েছে, ঈদের দিন ছাড়িয়ে ফিতরা দিলে গুনাহগার হবে এবং তার কাযা করা বাধ্যতমূলক হবে। [(আরবী*************)] ইবনে সীরীন ও নখয়ী ঈদের অতিবাহিত করার পরও তা দেয়ার রোখসত আছে বলে মত দিয়েছেন, এটা বর্ণনা করা হয়েছে। ইবনুল মুনযির আহমাদ থেকেও এ কথা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু সুন্নাত অনুসরণ করা যে উত্তম, তাতে সন্দেহ নেই। [দরদীর (আরবী********) গ্রন্থে এ কথাই বলেছেন। সময়মত না দিলে ফিতরা দেয়ার দায়িত্ব বাতিল হয়ে যায় না। তা তার যিম্মায় থেকে যায়- ১ম খণ্ড, ৫০৮ পৃ.] আর তা করতে হলে নামাযের আগেই দিতে হবে।
কিন্তু তা অগ্রিম দেয়া- ঈদের দিনেরও পূর্বে দেয়া সম্পর্কে হাজম নিষেধবাণী উচ্চারণ করেছেন এবং ঈদের দিনের সূর্যোদয়ের এক দিন বা তার কম সময়ও আগাম আদায় করা সমীচীন মনে করেন নি। বলেছেন, তার জন্যে নির্দিষ্ট সময়ের অল্পক্ষনে পূর্বে দেয়াও মুলত জায়েয নয় বলে মত প্রকাশ করেছেন। [(আরবী*************) ইবনে হাজমের এ মত ইমামীয়া ফিকাহরও মত। ইমাম জাফরের ফিকাহ্ কিতাবে (২য় খণ্ড, ১০৬ পৃ.) তাই লেখঅ রয়েছে। তিনিও শওয়ালের চাঁদের পূর্বে দেয়া জায়েয মনে করেন নি।]
এ কথাটির ভিত্তি হচ্ছে, ফিতরা অগ্রিম দেয়াকে তিনি আদৌ জায়েয মনে করেন নি। এ মত সাহাবীগণের মতের বিপরীত। তাঁরা আগাম দেয়া জায়েয হওয়ার যে মত দিয়েছেন তা সহীহ সূত্রে প্রমাণিত।
বুখারী ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেছেন- সাহাবিগণ ঈদুল ফিতরের এক বা দুই দিন পূর্বেই যাকাতুল ফিতর দিয়ে দিতেন। আর তাঁরাই হচ্ছেন মুসলমানদের জন্যে শরীয়াত পালনের ক্ষেত্রে আদর্শ, অনুসরণীয় পথ প্রদর্শনকারী। আহমাদও এ মত দিয়েছেন। বলেছেন, উক্ত সময়ের বেশী সময় পূর্বে ফিতরা প্রদান জায়েয নয় অর্থাৎ একদিন বা দুইদিন পূর্বে।
মালিকীরাও এ মতের ধারক। তাঁদের কেউ কেউ অবশ্য তিন দিন আগে দেয়াও জায়েয বলেছেন। [(আরবী***********)]
হাম্বলী মাযহাবের কেউ কেউ বলেছেন, অর্ধমাসকাল পূর্বে দেয়াও জায়েয। আর শাফেয়ী বলেছেন, রমযান মাসের শুরু থেকেই দিতে শুরু করা জায়েয। কেননা ফিতরা ব্যবস্থার কারণই হল রোযা রাখা ও রাখা শেষ করা। এই দুটি কারণের একটি পাওয়া গেলেই তা অগ্রিম দেয়া জায়েয হবে- যেমন নিসাব পরিমাণ মালের মালিক হওয়ার পর অগ্রিম যাকাত দেয়া জায়েয। [(আরবী*************)]
ইমাম আবূ হানাফী বলেছেন, বছরের শুরু থেকেই অগ্রিম দেয়া জায়েয। কেননা এটাও যাকাত পর্যায়ের। অতএব তা মালের যাকাত সদৃশ।
আর যায়দীয়া ফিকাহ্র মতে মালের যাকাতের মত দুই বছর পূর্বেও অগ্রিম দেয়া হলে তা জায়েয হবে। [(আরবী********)
মালিক ও আহমদের মত অধিক সতর্কতাপূর্ণ এবং হাসিলের খুব নিকটবর্তী। সে লক্ষ্যটি হচ্ছে, মূলত ঈদের দিনে গরীবদের সচ্ছলকরণ।
একমাস পরও তা দেয়া জায়েয হওয়াটা জনগণের জন্যে অবশ্য খুবই সহজসাধ্য ও সুবিধাজনক। বিশেষ করে রাষ্ট্রই যদি ফিতরা সংগ্রহ কাজের দায়িত্ব পালন করে, তাহলে। কেননা তা সংগ্রহ করা ও পাওয়ার যোগ্য লোকদের মধ্যে বণ্টন করার সংগঠন গড়ে তুলতে যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন। তা এমনও হতে পারে যে, ঈদের দিনের সূর্যোদয় হল, ঠিক তখনই গরীব লোকদের কাছে তাদের প্রাপ্যটা পৌছে গেল। তাতে তারা ঈদের আনন্দ ও সুখ অনুভব বা উপভোগ করতে পারবে- ঠিক অন্যান্য সমস্ত লোকের মত।
কোন ইসলামী সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান যাকাতুল ফিতরা আদায় ও বণ্টনের দায়িত্ব পালন করতে গেলে তার জন্যেও একথাই অনুসরণীয়।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
ফিতরা কাদের দেয়া হবে
ফিতরা মুসলমান গরীবকে দিতে হবে
ইবনে রুশদ লিখেছেনঃ ফিতরা কাকে দেয়া হবে, এ প্রশ্নের জবাব হচ্ছে- ফিকাহবিদগণ এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ একমত যে, ফিতরা কেবলমাত্র মুসলিম ফকীর মিসকীনকেই দেয়া হবে। কেননা নবী করীম (স) ইরশাদ করেছেন, ……… তাদের সচ্ছল বানিয়ে দাও।
যিম্মী মিসকীনদের ব্যাপারে মতানৈক্য
বলেছেন, যিম্মী (অমুসলিম) ফকীর মিসকীনদের দেয়া জায়েয কিনা। এ বিষয়ে ফিকাহবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কিন্তু জমহুর ফিকাহবিদদের মত হচ্ছে, তা তাদের জন্যে জায়েয নয়। ইমাম আবূ হানীফা বলেছেনঃ হ্যাঁ, তাদের জন্যেও তা জায়েয।
এ মতপার্থক্যের কারণ হচ্ছে এ প্রশ্নে যে, তা দেয়া জায়েয হওয়ার ভিত্তি কি শুধু দারিদ্র্য? না দারিদ্র্য ও মুসলিম হওয়া- উভয়ই ভিত্তি। তাঁরা বলেছেন, যিম্মিদের জন্যে তা জায়েয নয়। পক্ষান্তরে যারা দারিদ্রকেই একমাত্র ভিত্তি মনে করেছেন, তাঁরা তাদেরকেও ফিতরা দেয়া জায়েয বলেছেন। কিছু লোক আবার শর্ত আরোপ করেছেন যে, তা কেবল সে সব যিম্মির জন্যে জায়েয, যারা রাহেব পাদ্রী পর্যায়ের লোক। [(আরবী*************)]
ইবনে আবু শাইবা আবূ মাইসারা থেকে বর্ণনা করেছন, তিনি রাহেবদেরকে ফিতরা বা সাদকা দিতেন। [(আরবী********)]
আমর ইবনে মাইমুন, আমর ইবনে শারাহবীল ও মুররাতুল হাযাদানী থেকে বর্ণিত, তাঁরা রাহেবদেরকে ফিতরা দিতেন। [(আরবী*************)]
আসলে এ হচ্ছে মানবীয় বদান্যতা, ইসলামের ক্ষমাশীল ভাবধারার প্রকাশ। শুধু বিরোধিতাই কারোর প্রতি সদাচরণ গ্রহণ করতে নিষেধ করে না- যদি সে মুসলমানদের সাথে শত্রুতা ও যুদ্ধ না করে। তাই ইসলামী পরিবেশে বসবাসকারী সব মানুষকেই ঈদের নির্মল আনন্দে পুরোপুরি অংশীদার করা অবশ্যই কর্তব্য হবে, তারা কারোর বিবেচনায় কাফির হলেও। তবে সে জন্যে শর্ত হচ্ছে প্রথমে মুসলিম ফকীর-মিসকীনদের সচ্ছল বানাতে হবে। তারপর উদ্ধৃত্ত থাকলে যিম্মীকে তা দেয়া যাবে।
যাকাত ব্যয়ের ক্ষেত্র’ পর্যায়ে আমরা এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করে এসেছি।
ফিতরাও কি যাকাতের আটটি খাতে বণ্টনীয়
ফিতরা কেবলমাত্র ফকীর ও মিসকীনকেই দিতে হনে, না যাকাতের নির্দিষ্ট আটটি ব্যয় খাতে তা বণ্টন করে খরচ করতে হবে?….. এ একটি প্রশ্ন।
শাফেয়ী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত হচ্ছে, মালের যাকাত যে আটটি খাতে ব্যয় করা নিয়ম, ফিতরাও সে খাতসমূহেই ব্যয় করা ওয়াজিব। এ আটটি খাতের উল্লেখ (আরবী*************) সুচক আয়াতে করা হয়েছে। এ আটটি খাতে তা সমানভাবে বণ্টন করতে হবে।[(আরবী*************)] ইবনে হাজমের মতও তাই। ফিতরার যাকাতদাতা নিজেই যদি তা বণ্টন করে, তাহলে যাকাত সংস্থায় নিয়োজিত কর্মচারী ও ময়াল্লাফাতু কুলুবুহম খাতে কিছুই ব্যয় করতে হবে না। কেননা এ দুটো খাতে যাকাত ব্যয় করা তো রাষ্ট্র প্রধানের কাজ, অন্য কারোর নয়। [(আরবী*************)]
ইবনুল কাইয়্যেম এ মতের বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেছেন, সাদকায়ে ফিতর কেবলমাত্র এবং বিশেষভাবে মিসকীনদের মধ্যে বণ্টন করাই ছিল রাসূলে করীম (স) এর নীতি। এটা তিনি আটটি খাতে মুঠি-মুঠি করে কখনই বণ্টন করেননি। সেরূপ করা কোন নির্দেশও তিনি দেননি। সাহাবীদের মধ্যে কেউ এরূপ বণ্টন করেননি। তাবেয়ীরাও কেউ না। বরং আমাদের দুটো কথার একটা হচ্ছে, ফিতরা কেবলমাত্র মিসকীন ছাড়া অন্য কাউকে দেয়াই জায়েয নয়।
এ মতটি আটখাতের বণ্টন করার মতের তুলনায় অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। [(আরবী*************)]
মালিকীদের মতে, ফিতরা ফকীর মিসকীনদের দেয়া হবে, এ কাজে নিযুক্ত কোন কর্মচারী বা কারোর দিন সন্তুষ্টকরণের জন্যে কাউকে কিছু দেয়া যাবেনা। দাস মুক্তির কাজেও তা ব্যয় করা যাবে না। ঋণগ্রস্ত মুজাহিদ, নিঃস্ব পথিককে তার বাড়িতে পৌছানো ইত্যাদি কোন খাতেই তা ব্যয়িত হবে না; বরং দেয়াই হবে দারিদ্র্যগুণ থাকলে। কোন স্থানে দরিদ্র লোক পাওয়া না গেলে নিকটবর্তী যেখানে গরীব লোক রয়েছে, সেখানে পাঠিয়ে দেয়া হবে। পাঠানোর খরচ কিন্তু ফিতরা দাতার নিজ থেকে বহন করতে হবে- ফিতরা থেকে নয়। তা ফিতরা থেকে দেয়া হলে এক ছা’ পরিমাণে ঘাটতি পড়বে। [(আরবী*************)]
এ আলোচনা থেকে স্পষ্ট হল যে, এখানে তিনটি মত রয়েছেঃ
১. আটটি খাতে ফিতরা বণ্টন ওয়াজিব হওয়ার মত কিংবা তাদের মধ্যে যে যে খাতে লোক পাওয়া যাবে তাকে সমান পরিমাণে দিতে হবে। এটা শাফেয়ীদের প্রসিদ্ধ মত।
২. আটটি খাতে ফিতরা বণ্টন করা জায়েয হওয়ার মত। আর কেবল মাত্র দরিদ্রজনকে বিশেষভাবে দেয়ার মত। এটা জমহুর ফকাহবিদদের মত। কেননা সেটা সেই সাদকা যা কুরআনের কথাঃ ‘সাদকাত কেবল মাত্র ফকীর-মিসকীনদের জন্যে…….. সাধারণত এর অন্তর্ভুক্ত।
৩. কেবলমাত্র এবং বিশেষভাবে ফকীরদের দেয়া ওয়াজিব হওয়ার মত। এটা মালিকী মাযহাবের মত- যেমন পূর্বে বলেছি। ইমাম আহমাদের দুটো মতের একটা এই। ইবনুল কাইয়্যেম এ মতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাঁর উস্তাদ ইবনে তাইমিয়াও।
আল-হাদী, আল-কাসেম এবং আবূ তালেবও এ মতই গ্রহণ করেছেনঃ ফিতরা কেবলমাত্র ফকীর-মিসকীনদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে- অন্য কোন লোকের মধ্যে নয়। যাকাতের আটটি খাতের কোন একটিতেও নয়। কেননা হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছেঃ ফিতরা মিসকীনদের খাদ্য।’ আর হাদীসঃ এ দিনে তাদের সচ্ছল বানিয়ে দাও। [(আরবী*************)]
এ কথার গাম্ভীর্য গুরুত্ব অনস্বীকার্য। তা ফিতরার যাকাতের প্রকৃতির সাথে সঙ্গতিসম্পন্নও বটে। তার মৌল লক্ষ্যও তাই। কিন্তু তা সত্ত্বেও দ্বারা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয়ার এবং প্রয়োজনকালে ও অন্যান্য খাতে তার কল্যাণকর অবদান হতে দেয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা উচিত নয় বলে আমি মনে করি।
তাঁরা যেসব হাদীসের উল্লেখ করেছেন, তা থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, বিশেষভাবে সেই দিনের জন্যে ফকীর-মিসকীনদের সচ্ছল বানিয়ে দেয়াই ফিতরার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। অতএব তাদের পাওয়া গেলে অন্যদের ওপর তাদেরকেই অগ্রাধিকার দেয়া কর্তব্য। কিন্তু তা প্রয়োজন ও কল্যাণের দৃষ্টিতে অন্যান্য ব্যয় খাতেও তা ব্যয় করতে নিষেধ করে না। যেমন নবী করীম (স) মালের যাকাত পর্যায়ে উল্লেখ করেছেনঃ তা সমাজের ধনীলোকদের কাছ থেকে গ্রহণ করা হবে এবং সেই সমাজেরই দরিদ্র লোকদের মধ্যে তা বণ্টন করেদেয়া হবে। কিন্তু এ ঘোষণা কুরআনের যাকাত সংক্রান্ত আয়াতে যে সব খাতের উল্লেখ রয়েছে, তাতে তা ব্যয় করতে নিষেধ করছে না।
এ আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে উঠে যে, আমাদের বিবেচনায় উত্তম মত হচ্ছে, ফকীর মিসকীনকে অন্যদের ওপর অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবে বিশেষ প্রয়োজন ইসলামী কল্যাণ বিবেচনায় অন্য কিছু গ্রহণীয় বিবেচিত হলে ভিন্ন কথা।
অধিকাংশ ফিকাহবিদের দৃষ্টিতে সহীহ মত হচ্ছে- একজন ব্যক্তির জন্যে করণীয় হল সে তার ফিতরা একজন বা বহু কয়েকজন মিসকীনকে দেবে। অনুরূপভাবে একটি সমাজ সংস্থার পক্ষে তাদের ফিতরা একজন মিসকীনকে দেয়াও জায়েয হবে। কেননা দলিল এর মধ্যে কোন পার্থক্য করা হয়নি। [(আরবী*************)]
কেউ কেউ একজনের ফিতরা অনেক কয়েকজনকে দেয়া অপসন্দ করেছে। কেননা
তাতে হাদীসে দরিদ্র ব্যক্তিদের যে সচ্ছল করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হতে পারে না। অনুরূপভাবে বহু লোকেরা ফিতরা একজন লোককে দিলে তারই মত বা তার চাইতেও অধিক বেশী অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিদের বর্তমান থাকা সত্ত্বেও তাকে অন্যদের ওপর অধিক গুরুত্ব দেয়া হয় অথচ এরূপ অধিক গুরুত্ব দানের কোন যৌক্তিকথাই থাকতে পারে না।
ফিতরা যাকে দেয়া যাবে না
সাদকায়ে ফিতরা যতক্ষণ পর্যন্ত যাকাত থাকবে, ততক্ষণ তা মালের যাকাত যাদের দেয়া জায়েয নয়, তাদেরকে দেয়া জায়েয হবে না। ইসলামের দুশমন কাফির বা মুর্তাদ অথবা যে লোক তার ফিসক ফুজুরী দ্বারা মুসলমানদের চ্যালেঞ্জ করে, যে লোক স্বীয় মাল বা উপার্জনের দরুন ধনী অথবা উপার্জনে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও শ্রম করে না বলে বেকার, তাছাড়া পিতামাতা, সন্তান-স্ত্রী, এদেরকে ফিতরা দেয়া যাবে না। কেননা মুসলমান যদি এ লোকদের ফিতরা দেয়, তাহলে কার্যত তা নিজেকেই দেয়া হবে। – এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা যাকাত ব্যয়ের খাত’ পর্যায়ে আমরা করে এসেছি।
স্থানীয় দরিদ্র ব্যক্তি বেশী অধিকারী
মালের যাকাত স্থানান্তর করা সম্পর্কে আমরা যা বলে এসেছি, এখানেও তাই বলব। তা হচ্ছে, যে স্থানের লোকদের ওপর ফিতরা ওয়াজিব- যেখানে ফিতরাদাতা বসবাস করে, তাদের ফিতরা সেখানকার দরিদ্র ব্যক্তিদের মধ্যেই বিতরণ করতে হবে। তার কারণসমূহও সেখানেই উল্লেখ করে এসেছি। আরও এজন্যে যে, ফিতরার যাকাত বিশেষভাবে দ্রুত সাহায্য দানের ব্যবস্থা-একটা বিশেষ সময়ের জন্যে। আর সময়টা হচ্ছে রমযানের ঈদ, কাজেই পাড়া-প্রতিবেশীরা স্থানীয় লোকেরাই তা পাওয়ার অধিক অধিকারী। তবে তাদের মধ্যে কেউ দরিদ্র না থাকলে ভিন্ন কথা। তখন তা নিকটবর্তী স্থানে পাঠিয়ে দিতে হবে। মালিকীদের এ মত আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি। আল-বহর, গ্রন্থে লিখিত আছেঃ কোন মহত্তর উদ্দেশ্য ছাড়া স্থানীয় দরিদ্র লোকদের পরিবর্তে অন্যদের মধ্যে ফিতরা বণ্টন করা মাকরূহ। [(আরবী*************)]
পঞ্চম অধ্যায়
যাকাত ছাড়া ধন-মালে কোন অধিকার কি স্বীকৃতব্য
ধম-মালে যাকাত ছাড়া আরও কোন অধিকার স্বীকৃত না হওয়ার মত।
যারা বলেন যে, ধন-মালে যাকাত ছাড়াও অধিকার আছে তাঁদের মত।
বিরোধের বিষয় নির্ধারণ এবং অগ্রাধিকার দান।
ধনমালে যাকাত ছাড়াও কোন অধিকার আছে কি
কোন কোন বিষয়ে বহু মতের বিশেষ একটি মত ব্যাপক খ্যাতি ও বিপুল প্রসিদ্ধি লাভ করে- এটা প্রায়ই লক্ষ্য করা যায়। এমন কি অনেকে শেষ পর্যন্ত এ ধারণা পোষণ করতে থাকে, যে, এ পর্যায়ে এটাই একক ও অনুরূপ মত। এ ছাড়া ভিন্ন কোন মতই নেই। তার পক্ষের যুক্তি-প্রমাণ যতই দুর্বল হোক এবং বলার মত কথা কিছু নাই থাকে, যে দিকে তখন কিছুমাত্র ভ্রূক্ষেপ করা হয় না। এ পর্যায়ের একটি মত উল্লেখ্য। মতটি ফিকাহবিদদের মধ্যের শেষের দিকের লোকদের কাছে খুবই ব্যাপকভাবে প্রচারিত। আর তা হচ্ছে, ধন-মালে যাকাত ছাড়া আর কিছুই পাওয়ার নেই। কেউ তার যাকাত হিসেবে করে দিয়ে দিলে সে সর্বপ্রকার অর্থনৈতিক দায়-দায়িত্ব থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হয়ে গেল। তার কাছে আর কিছু দাবি করা যেতে পারে না। এমন কি দ্বীনী ইলমের চর্চাকারী বহু লোকের কাছেও এ ব্যাপারটি যেন সর্ববাদীসম্মত চূড়ান্তভাবে স্বীকৃত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ অধ্যায়টি তিনটি পরিচ্ছেদ বিভক্তঃ
প্রথমত ধন-মালে যাকাত ছাড়াও কোন প্রাপ্য আছে- একথা যাঁরা স্বীকার করেন না, তাঁদের মতের ব্যাখ্যা।
দ্বিতীয়ত, যাঁরা বলেন-ধন-মালে যাকাত ছাড়াও অধিকার আছে, তাদের মতের বিশ্লেষণ।
এবং তৃতীয়ত, দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধীয় স্থান উন্মুক্তকরণ এবং যেটি অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য, সেটিকে অগ্রাধিকার দান।
প্রথম পরিচ্ছেদ
ধন-মালে যাকাত ছাড়া আরও কিছু অধিকার থাকার বিরোধী মত
বহু সংখ্যক ফিকাহবিদ এ মত গ্রহণ করেছেন যে, ধন-মালের ওপর একমাত্র অধিকার হচ্ছে যাকাত। যে লোক যাকাত দিয়ে দিল, সে তার ধন-মালকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে নিল। তার দায়িত্ব পালিত হল এবং সে দায়িত্বমুক্ত হয়ে গেল। অতঃপর তার কাছে আর কিছুই চাওয়া বা দাবী করার সুযোগ থাকতে পারে না। তবে সে নিজে নফল দান-সদকা করে আল্লাহর কাছে অধিক সওয়াব পাওয়ার ও সওয়াবের বিপুলতা লাভের আশায়, তা হলে সেটা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র কথা। শেষের দিকে ফিকাহবিদদের কাছে এ মতটাই অধিকতর খ্যাতি ও প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এমন কি তাঁরা মনে করে নিয়েছেন যে, এ ব্যাপারে ভিন্ন কোন মতই নেই।
এ মতের সমর্থনে উপস্থাপিত হদীসসমূ
(১) এ মতের ধারকগণ হযরত তালহা (রা) থেকে বর্ণিত ও বুখারী মুসলিম প্রমুখের গ্রন্থাবলীতে উদ্ধৃত হাদীসটির ওপরই একান্তভাবে নির্ভর করেছেন। তা হচ্ছে, নযদের অধিবাসী েএক ব্যক্তি রাসূলে করীম (স) এ খেদমতে উপস্থিত হল। তার মাতার চুল বিদ্ধস্ত, এলোমেলো, তার আওয়াজের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছিল কিন্তু কি বলছিল, তা ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না। লোকটি শেষ পর্যন্ত রাসূল (স) এ নিকটবর্তী হয়ে গেল এবং সে ইসলাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছিল। তখন রাসূল (স) বলেছেনঃ রাত দিনের মধ্যে পাঁচ ওয়াক্ত নামায। বললঃ এছাড়াও কি আমার কিছু করণীয় আছে? বললেনঃ না, তবে তুমি যদি নফল পড় তাহলে সে কথা আলাদা। রাসূলে করীম (স) বললেন, আর রমযান মাসের রোযা। বলল, তা ছাড়াও কি রোযা রাখতে হবে আমাকে? বললেন, না, তবে তুমি যদি নফল রোযা থাক, তাহলে সে স্বতন্ত্র কথা। অতপর তিনি যাকাতের উল্লেখ করলেন। লোকটি বললঃ যাকাত ছাড়াও কিছু দেয় আছে? বললেনঃ না, তবে তুমি যদি নফল দান কর, সে আলাদা কথা। তখন লোকটি পিছনে সরে আসতে আসতে বলতে লাগলঃ আমি এর অতিরিক্তও কিছু করব না আর এর চাইতে কমও করব না। তখন নবী করীম (স) বললেনঃ লোকটি যা বলছে তা সত্য হলে সে নিশ্চয়ই সফল হবে অথবা বললেনঃ লোকটি যা বলছে তা সত্য প্রমাণ করলে জান্নাতে প্রবেশ করবে। [হাদীসটি তিরমিযী ছাড়া অন্য ছয়খানি গ্রন্থে উদ্ধৃত। (আরবী************) গ্রন্থে তাই বলা হয়েছে।]
(২) অনুরূপ আর একটি হাদীস হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত ও বুখারী শরীফে উদ্ধত। এক বেদুঈন নবী করীম (স) এর কাছে উপস্থিত হল। সে বললঃ আমাকে এমন একটা কাজের ধারা বলে দিন, যা করল আমি জান্নাতে দাখিল হতে পারব। তখন নবী করীম (স) বললেনঃ আল্লাহর বন্দেগী কর, তাঁর সাথে কোন কিছুই শরীক বানাবে না, ফরয নামায পড়বে, নির্দিষ্ট ধার্যকৃত যাকাত আদায় করবে এবং রমযান মাসের রোযা থাকবে। লোকটি বললঃ যার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম করে বলছি, এর অধিক কিছু আমি করব না। লোকটি যখন চলে গেল, তখন রাসূলে করীম (স) বললেনঃ সে কেউ একজন জান্নাতী লোক দেখতে চায় সে যেন এ লোকটিকে দেখে। [তিরমিযী (আরবী************) উদ্ধৃত (আরবী************) তিনি বলেছেন’ হাদীসটি (আরবী************) হাকিমও উদ্ধৃত করেছেন এবং বলেছেন (আরবী************) যাহবী এ কথার যথার্থতা মেনে নিয়েছেন – ১ম খণ্ড ৩৯০ পৃ. কিন্তু ইবনে হাজার (আরবী************) গ্রন্থের ১৭৭ পৃষ্ঠায় লিখেছেনঃ এর সনদ যয়ীফ।]
(৩) তাদের আর একটি দলিল হচ্ছে আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত তিরমিযী উদ্ধৃত হাদীসটি। নবী করীম (স) বলেছেন, তুমি যখণ তোমার মালের যাকাত দিয়ে দিলে, তখন বুঝবে তোমার ওপর যা দেয় বর্তিয়েছে তা তুমি দিয়ে ফেলেছ। [ইবনে খুজায়মা ও হাকেম উদ্ধত করেছেন, ১ম খণ্ড- ৩৯০ পৃ. বলেছেন, মুসলিমের শর্তে হাদীসটি সহীহ। যাহবী এ কথা সমর্থন করেছেন। ইবনে হাজার ফতহুল বারী গ্রন্থের (৩য় খণ্ড, ১৭৫ পৃ.) বলেছেনঃ আবূ জুমরা ও বায়হাকী প্রমুখ হাদীসটির موقوف হওয়া- কোন সাহাবীর উক্তি হওয়াটাকে অধিক ঠিক মনে করেছেন। বাজ্জারও সে মত দিয়েছেন। দুনিয়ার নিকৃষ্টতম মাল- তা থেকে বরকত ধ্বংসকারী এবং পরকালে আযাবের ব্যবস্থাকারী হচ্ছে তা-ই যা আল্লাহর অধিকার বিনষ্টকারীর জন্যে প্রস্তুত হয়ে রয়েছে।] আর যে লোক তার মালের ওপর ধার্য অধিকার আদায় করল, তার ওপর সে ব্যাপারে কোন হক ধার্য নেই মনে করতে হবে এবং বাধ্যতামূলকভাবে আরও কিছু দেয়ার জন্যে তার কাছে দাবি করা যাবে না।
(৪) হাকিম হযরত জাবির থেকে রাসূলের কথা হিসেবে যা উদ্ধত করেছেন, তাও এ পর্যায়ের আর একটি দলিল। তা হচ্ছেঃ তুমি যখন তোমার মালের যাকাত আদায় করে দিলে, তখন তুমি তার খারাপ অংশটা তা থেকে দূর করে দিলে।
বস্তুত মালের ওপর যে সব হক-হক্ক ধার্য হয়, তা সব আদায় করে দিয়ে দিলে দুনিয়া ও আখেরাতে মালের খারাপ অংশটা মানুষটি থেকে দূরে সরে যায়।
(৫) হাকিম উম্মে সালমা থেকে যা উদ্ধৃত করেছেন, তাও একটি দলিল। উম্মে সালমা স্বর্ণালংকার পরতেন। তিনি এ বিষয়ে রাসূলে করীম (স) এর কাছে জিজ্ঞেস করলেনঃ এতে কি তা নিষিদ্ধ পুঁজিকরণ হয়? নবী করীম বললেনঃ তুমি যদি ওর যাকাত দিয়ে দাও তাহলে তা নিষিদ্ধ পুঁজিকরণ হবে না তাতে। [হাকিম লিখেছেনঃ (১ম খণ্ড, ৩৯০ পৃ.) হাদীসটি বুখারীর শর্তের ভিত্তিতে সহীহ। যাবরী তা সমর্থন করেছেন। হাদীসটির সনদে আপত্তি আছে। তৃতীয় অধ্যায়ের আলোচনায় অলংকারের যাকাত পর্যায়ে এ বিষয়ে কথা বলে এসেছি, তা দ্রষ্টব্য।]
তার অন্যান্য বর্ণনায় এ কথা রয়েছেঃ যে মালের পরিমাণ যাকাত হওয়ার যোগ্য হবে তার যাকাত দিয়ে দেয়া হলে তা নিষিদ্ধ পুঁজি হবে না। [হাদীসটি আবূ দাউদ কর্তৃক উদ্ধত।]
এ কথায় একথা প্রমাণিত হয় যে, মাল-সম্পদ পুঁজিকরণের ওপর আযাবের যে সব ধমক এসেছে, তা যাকাত আদায়কারীর পক্ষে প্রযোজ্য নয়। যাকাত ছাড়া মালে অন্য কোন ফরযও যদি থাকত, তাহলে তা আযাবের ধমক থেকে সে নিষ্কৃতি পেত না।
এ মতের কোন কোন লোক উপরিউক্ত আলোচনার পর অতিরিক্ত কথাও বলেছেন। তাঁরা নবী করীম (স) থেকে একটা সুস্পষ্ট ঘোষণকারী হাদীসও উদ্ধৃত করেছেন। বলেছেনঃ ধন-মালের ওপর যাকাত ছাড়া আর কোন হক নেই। [হাদীসটি ইবনে মাযাহ কর্তৃক উদ্ধত। কিন্তু নববী তাঁর (আরবী************) গ্রন্থে লিখেছেনঃ হাদীসটি খুবই যয়ীফ অপরিচিত (৫ম খণ্ড ৩৩২ পৃ.)। পূর্বে বায়হাকী এ হাদীসটি সম্পর্কে বলেছেনঃ আমাদের লোকেরা এ হাদীসটি (আরবী************) এর মধ্যে বর্ণনা করেন। আমি ওর কোন সনদ মুখস্থ করিনি (আরবী************) হাফেয আল এর ওপর আপত্তি তুলেছেন ইবনে মাযাহর বর্ণনা দিয়ে যে, তাঁর সুনানে ও ভাষায়ই উদ্ধৃত হয়েছে। তার পুত্র হাফেয আবূ জুরয়া উল্লেখ করেছেনঃ হাদীসটি তাঁর মতে ইবনে মাযাহয় এ ভাষায় রয়েছেঃ ধন-মালের যাকাত ছাড়া আর কোন হক নেই। (আরবী************) তার অর্থ ’নেই’ কথাটি হাদীসে লেখকের পক্ষ থেকে বাড়িয়ে লেখা হয়েছে। পরে এই ভুলটা ব্যাপক প্রচার লাভ করে। আল্লামা শায়খ আহমদ শাকের (র) (আরবী************) গ্রন্থেল তাফসীরে তাবারীর (৩য় খণ্ড, ৩৪৩-৩৪৪ পৃ. আল –মায়ারিফ) লিখেছেনঃ ইবনে মায়াহর গ্রন্থে এ ভুলটি সংঘটিত হওয়ার প্রমাণসমূহ এইঃ
(ক) তাবায়ী উক্ত হাদীসটি (২৫২৭ নম্বর) মূল ইয়াহইয়া ইবনে আদমের র্সূত্রে- যে সূত্রে ইবনে মাজাহ হাদীসটি নিয়েছেন উদ্ধুত করেছেন। সেখানে হাদীসটির ভাষা হচ্ছেঃ ধন-মালের যাকাত ছাড়াও হক রয়েছে।
খ. ইবনে কাসীর তাঁর তাফসীর হাদীসটি তিরমিযী ও ইবনে মাজা উভয় থেকে নিয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন। তাতে এ দুটির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। নাবলিসী তাঁর (আরবী************) ১১৬৯৯ গ্রন্থে তাই করেছেন। একই হাদীস হিসেবে উভয়ের প্রতি নিসবাত করেছেন।
গ. বায়হাকীর কথা- যেমন পূর্বে উদ্ধৃত হয়েছে- আমি এর সনদ মুখস্থ করিনি- ইবনে মাজাতে যদি এ ভাষায়ই উদ্ধৃত যাকাত তাহলে তিনি নিশ্চয়ই এরূপ বলতেন না। নববীর কথা- পরিচিত নয়- এ পর্যায়েরই আবূ জুররা যা বলেছেন, শায়খ শাকের সেদিকে উঙ্গিত করেন নি। সম্ভবত তিনি তা জানতেই পারেন নি।
হাদীসটিতে ওলট পালট (আরবী************) হয়েছে, বলার পরিবর্তে উপরিউক্ত বিশ্লেষণই অধিক যথার্থ ও সঠিক। কেননা দেখা যায় হাদীসটি একই সূত্রে দুই রকম পরস্পর বিপরীত ভাষায় উদ্ধৃত হয়েছে। এটাই প্রচারিত।]
এ সমস্ত হাদীসের বাহ্যিক অর্থ এ গ্রহণ করা হয় যে, ধন-মালের ওপর যাকাত ছাড়া। আর কোন হক ধার্য নেই। আর প্রথমোক্ত হাদীস দুটো সহীহ হাদীসসমূহের অন্যতম। আর যথার্থতার ওপর কোন দোষারোপ নেই।
তৃতীয় হদীসটির সনদ যয়ীফ বলা হয়েছে। আর চতুর্থ হাদীসটি সাহাবীর ওপর (আরবী************) কোন সাহাবীর উক্তি হওয়াটাই ঠিক। আর পঞ্চম হাদীসটির সনদে আপত্তি আছে।
তবে যে হাদীসটি ধন-মালে যাকাত ছাড়া কোন হক্ক নেই’ বলছে, সেটি যারপরনাই রকমের যয়ীফ, প্রত্যাখ্যাত নিঃসন্দেহ। বরং তা ভুল এবং বিকৃত, পরিবর্তিত। সহীহ হাদীস দুটিই তার প্রতিবন্ধক।
বিপরীতধর্মী দলিলসমূহ সম্পর্কে তাদের বক্তব্য
যে সব হাদীস ধন-মালের ওপর যাকাত ছাড়াও হক আছে বলে প্রমাণ করছে, উক্ত মতের লোকেরা তার ব্যাখ্যা করেছেন। বলেছেন যে, এগুলোতে মুস্তাহাব হিসেবে যাকাত বহির্ভুত দানের কথা বলা হয়েছে, তা ওয়াজিব নয় এবং বাদ্যতামূলক নয়।
অথবা তাঁরা বলেছেন, হ্যাঁ, যাকাত ফরয হওয়ার পূর্বে যে হক ছিল, যাকাত ফরয হওয়া পর বাতিল ও মনসূখ হয়ে গেছে পূর্বে যত অধিকার ছিল তা সবই। ঠিক যেমন আল্লাহর কথাঃ (আরবী************)
’এবং দাও তার হক তা কর্তনের দিন।’
অথবা তাঁরা তার কোন-না-কোন ব্যাখ্যা করেছেন এই বলে যে, তা ওয়াজিব হবে নিতান্ত প্রয়োজন কালে। লোকেরা الماعون সম্পর্কে বলেছেন। কেউ কেউ الماعون এর তাফসীর করেছেন যাকাত। কোন কোন সাহাবী থেকে তা বর্ণিত। কিন্তু তাতে যাকাতের পরও কোন হক ধার্য হতে পারে, তার প্রমাণ নেই।
তিরমিযী ফাতিমা বিনতে কাইস থেকে রাসূলে করীম (স) এর কথা হিসেবে যে হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন তা হচ্ছেঃ
ধন-মালে যাকাত ছাড়াও অধিকার আছে। [এ হাদীসটি সম্পর্কে তিরমিযী বলেছেনঃ এটির সনদ ওরূপ নয়। আবূ মামুন আল-আওয়ার হাদীসটিকে যয়ীফ করেছে। তাবায়ীর এ হাদীসটি এনেছেন (৩য় খণ্ড, ১৭৬-১৭৭ পৃ.) ২৫২৭ ও ২৫৩০ উভয় হাদীসে। দারেমী (১ম খণ্ড, ৩৮৫ পৃ.) ইবনে মাজা ১৭৮৬ ইয়াহিইয়া ইবনে আদম সূত্রে। আর বায়হাকী (আরবী************) (৪র্থ খণ্ড, ৮৪ পৃ.)]
তিরমিযী এই হাদীসটিকে যয়ীফ বলেছেন। কেননা এটি আর হামজী মাইসুন আল-আওযার আল-কাসসাবে সূত্রে বর্ণিত। [ইবনে হাজার (আরবী************) গ্রন্থে এবং বুখারী (আরবী************) তে। আর ইবনে আবূ হাতিম (আরবী************)] আর হাদীসবিদদের নজরে লোকটি খুব বেশী যয়ীফ। ফলে তার বর্ণনা দলিল হতে পারে না।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
ধন-মালের যাকাত ছাড়া অধিকার আছে-এই কথায় বিশ্বাসীদের মত
সাহাবী ও তায়েয়ীনের সময় থেকেই কিছু লোক এ মত পোষণ করে আসছেন যে, লোকদের ধন-মালে যাকাত ছাড়াও অধিকার রয়েছে। হযরত উমর, আলী, আবূযর আয়েশা, ইবনে উমর, আবূ হুরায়রা, হাসান ইবনে আলী এবং ফাতিমা বিনতে কাইম প্রমুখ সাহাবী (রা) এ মত পোষণ করতেন।
আর শবী, মুজাহিদ, তায়ূস, আতা প্রমুখ তাবেয়ীরও এ ব্যাপারে এ মতই ছিল।
তাঁদের দলিল
তাঁরা দলিল হিসেবে প্রথমত পেশ করেছেন আল্লাহ তাআলার এ আয়াতঃ
(আরবী************)
পূর্ব ও পশ্চিম দিকে তোমরা মুখ করে থাকবে এটাই কোন পূণ্যময় কাজ নয়। প্রকৃত পূণ্যময় কাজ সে করেছে, যে ঈমান এসেছে আল্লাহর প্রতি, পরকালের প্রতি, ফেরেশতার প্রতি, কিতাবের প্রতি, নবীগণের প্রতি, এবং দিয়েছে মাল তাঁরই ভালোবাসায় নিকটাত্মীয়, ইয়াতিম, মিসকীন, নিঃস্ব পথিক, প্রার্থী ভিক্ষুক ও দাসদের জন্যে আর কায়েম করেছে নামায, দিয়েছে যাকাত এবং নিজেদের ওয়াদা পূরণকারী হয়েছে যখন তারা ওয়াদা করেছে আর ধৈর্যধারণকারী হয়েছে স্বাচ্ছন্দ্যকালে ও অভাব অনটনের সময়ে এবং ঠিক স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে। এ লোকেরাই সত্যতা প্রমাণকারী এবং এরাই মুত্তাকী।
তিরমিযী প্রমুখ বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (স) নিজে এ আয়াত কয়টি পাঠ করে উল্লিখিত বিধানের দলিল পেশ করেছেন। ফাতিমা বিনেত কাইস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমি অথবা কেউ রাসূল করীম (স) কে যাকাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেনঃ (আরবী************)
নিশ্চয়ই ধন-মালের যাকাত ছাড়াও হক রয়েছে।
পরে সূরা আল-বাকারার উপরিউক্ত আয়াতসমূহ পাঠ করেছেন।
এ হাদীসে যদি কোন দুর্বলতা থেকে থাকে- যেমন তিরমিযী বলেছেন – তাহলেও উপরিউক্ত আয়াতটি তাকে শক্তিশালী করে তুলছে। দাবিটাকে অনস্বীকার্য বানাচ্ছে। এ আয়াতই এককভাবে চূড়ান্ত পর্যায়ের দলিল। কেননা আয়াতে পরম পূণ্যময় কাজের (আরবী************) শাখা ও উপকরণ বানানো হয়েছে তার ভালোবাসায় নিকটাত্মীয় ইয়াতীম মিসকীন নিঃস্ব পথিক ইত্যাদিকে অর্থদানের কাজকে।’ এরই ওপর ভিত্তি করে বলা হয়েছে নামায কায়েম করা ও যাকাত প্রদান করার কথা। বলার ভঙ্গীরই দুটো আলাদা জিনিসরূপে দাঁড় করে দিচ্ছে। ফলে প্রমাণিত হল, প্রথমে মাল দান ও পরে যাকাত দান- এক নয় ভিন্ন ভিন্ন কাজ। কুরতুবী উক্ত হাদীসের ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে বললেণঃ হাদীসটিতে আপত্তি থাকলেও তার বক্তব্য যে সহীহ তামূল আয়াতে বলা এবং নামায কায়েম করা ও যাকাত প্রদান কথাটিই প্রমাণ করছে। এখানে নামাযের সাথে সাথে যাকাতের কথা বলা হয়েছে। এটা প্রমাণ করছেঃ
(আরবী************)
আল্লাহর ভালোবাসায় মাল দান ও ফরয যাকাত এ দুটো জিনিস। অন্যথায় একই কথার পুনরাবৃত্তি হয়।
(আর কুরআনে তা শোভণ বা সম্ভব নয়) [তাবারী লিখেছেন, কেউ যদি প্রশ্ন করে যে, ধন-মালের যাকাত ছাড়াও ফরয হিসেবে দান করার কোন বাধ্যবাধকতা আছে কি? বলা হয়েছে, এ ব্যাপারে ব্যাখ্যাকারগণ বিভিন্ন কথা বলেছেন। কেউ কেউ বলেছেঃ ধন-মালের যাকাত ছাড়াও এমন সব অধিকার আছে যা দেয়া ওয়াজিব। তাঁরা উপরিউক্ত আয়াতকে দলিল রূপে পেশ করেছেন। আল্লাহই যখন বললেনঃ (আরবী************) এবং অন্যান্য যার যার নাম তিনি উল্লেখ করেছেন এ সাথে তার পরে বলেছেনঃ নামায কয়েম করে ও যাকাত দিয়েছে। এ থেকে আমরা জানতে পারলাম যে, মুমিনদের পরিচিতিস্বরূপ নিকটাত্মীয় ও অন্যান্যদের যে মালদানের কথা বলা হয়েছে, তা সেই যাকাত নয় যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে শেষে। কেননা এ যদি একই মাল হতো তাহলে এভাবে দুবার বলার কোন অর্থ হতো না। তারা এও বলেছেনঃ আল্লাহর অর্থহীন কোন কথা বলবেন, এটা যখন জায়েয নয়। তখণ আমরা জানতে পারলাম যে, প্রথম মাল দানের কথাটি যাকাত থেকে ভিন্নতরও স্বতন্ত্র একটা জিনিস। আর তারপরে যে যাকাতের কথা হয়েছে তা ভিন্ন জিনিস।
তাঁরা এও বলেছেনঃ পরন্তু আমরা যা বলেছি, ব্যাখ্যাকারগণ তার সত্যতা স্বীকার করেছেন। অন্যরা বলেছেনঃ প্রথমে যে মালের কথা বলা হয়েছে তা যাকাত।….. ইমাম তাবারীর উক্ত কথা থেকে বোঝা যায় যে, তিনি প্রথম কথটি সমর্থনের প্রবণতা রাখেন। দেখুনঃ (আরবী*************)]
প্রথমে যে দান করার- দেয়ার কথা- বলা হয়েছে তা নিতান্ত নফল দান, আত্মীয়তা রক্ষা করার দান, ওয়াজিব নয়, এরূপ কথা বলা যেতে পারে না। কেননা আয়াতটি হচ্ছে বাহ্যিক প্রকাশ ও সূরত ধারণকারী ইয়াহুদীদের নীতির প্রতিবাদ এবং প্রকৃত সত্য পরম পূণ্য কাজ ও সত্য দ্বীন বর্ণনা। এরূপ ক্ষেত্রে কেবল মৌলিক বিষয়েরই অবতারণা করা শোভন, সম্পূরক বিষয়াদি বলার ক্ষেত্র এটা নয়। কেবল ফরয কাজের কথাই বলতে হয়, নফল, ওয়াজিব ও মুস্তাহাব বিষয়ের কথা নয়। প্রকৃত بر পরম পুণ্যময় কাজেরও ব্যাখ্যাস্বরূপ। আয়াতটিতে যে সব বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে, তা হচ্ছেঃ আল্লাহ ও পরকালে, ফেরেশতা, কিতাব ও নবীগণের প্রতি ঈমান এবং নামায কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, ওয়াদা পুরণ করা, সুখ-দুঃখে ও শক্তি-সামর্থ্যকালে ধৈর্য ধারণ- এ সবগুলোই মৌলিক উপাদান পর্যায়ের। এগুলো ছাড়া আকিদা বা ইবাদত অথবা নৈতিক চরিত্র- কোন একটি দিক দিয়েও ‘পরম পুণ্যময় কাজ البر বাস্তবায়িত হতে পারে না। তাহলে শুধু নিকটাত্মীয়দের ধন-মাল দেয়া আল্লাহর ভালোবাসায়ই একটি একক নফল বা মুস্তাহাব কাজ গণ্য হবে- গোটা আয়াতটির মধ্যে?…….. এটা মেনে নেয়া যায় না।
আবূ উবাইদ উল্লেখ করেছেন, তাবেয়ীনের মধ্যে কোন কোন লোক- যেমন দহহাক- মনে করে যে, এ আয়াতটি মনসুখ হয়ে গেছে। যাকাত কুরআনে উল্লিখিত সব ‘সাদকা’কেই প্রত্যাহার করিয়ে দিয়েছে। [(আরবী*************)] কিন্তু এ ধরনের কথা বলা অত্যন্ত দুঃসাহসিকতার দাবি। কোন দলিল বা প্রায় দলিলও এ কথার সমর্থন দেবে না। কেবল মৌলিক দাবির জোরেই তো আল-কুরআন মনসূখ করা যায় না; দহহাকের কথাই যদি সহীহ হত তাহলে আয়াতের (আরবী*************) কথাটাই মনসুখকারী হত (আরবী*************) এ কথার। তাতে আয়াতের একটা অংশ অপর অংশের মনসূখ হওয়ার হুকুমদাতা মনে করা হত। কিন্তু এসম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
তাছাড়া আয়াতটিতে একটি আছে সংবাদ আর আছে বির ও তাকওয়াধারী লোকদের গুণ পরিচিত। সংবাদ কখনও মনসুখ হতে পারে না। মনসুখ হলে তা সংবাদদাতাকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করবে। আল্লাহ তাঁর ঊর্ধ্বে মহান পবিত্র এই দোষারোপ থেকে।
আবূ উবাইদ এ আয়াত প্রসঙ্গে ইবনে আব্বাস (রা) এর এ কথাটি উদ্ধৃত করেছেনঃ উক্ত আয়াত মদীনায় নাযিল হয়েছিল যখন ইসলামের ফরযসমূহ নাযিল হয়েছিল, দণ্ড বিধান কার্যকর হয়েছিল এবং লোকদেরকে তদানুযায়ী আমল করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।[(আরবী*************)]
দ্বিতীয় দলিলঃ কাটাকালে ফসলের হক
তাদের আর একটি দলিল হচ্ছে সূরা আনআমের একটি আয়াত। আল্লাহ তাআলা বাগ-বাগিচা, খেজুর বাগান, কৃষি ফসল, জয়তুন ও আনার- পরস্পর সদৃশ ও অসদৃশ- সৃষ্টি করে তাঁর বান্দাদের প্রতি যে অসীম-অশেষ অনুগ্রহ প্রদর্শন করেছেন, সেই কথার উল্লেখ করার পর বলেছেঃ (আরবী*************)
তোমরা খাও তার ফল, যখন তা ধারণ করবে এবং দাও তার হক কাটার দিন এবং সীমা লঙ্ঘন করো না। কেননা আল্লাহ সীমা লঙ্ঘনকারীদের পসন্দ করেন না।
তাঁদের বক্তব্য হচ্ছে, এ আয়াতে যে হক দিতে হয়েছে তা যাকাত থেকে স্বতন্ত্র ও ভিন্নতর। এ কথাটি কয়েকটি দিক দিয়েই সুস্পষ্ট ও প্রকটঃ
১. এ আয়াতটি মক্কী, মদীনায় ওশর ফরয হওয়ার পূর্বেই নাজিল হয়েছে। তার মক্কী হওয়ার প্রমাণ এই যে, গোটা সূরাই মক্কায় এক সাথে নাযিল হয়েছিল। এ পর্যায়ে বহু কয়টি প্রসিদ্ধ বর্ণনাও উদ্ধৃত হয়েছে। (পূর্বে সে কথা আমরা বলে এসছি) কেবলমাত্র এই আয়াতটি মাদানী এ কথা বলা দলিলহীন দাবিমাত্র।
২. আয়াতটির দাবি হচ্ছে, ফল ও ফসলের হক দাও তা কাটার দিন। কিন্তু তা ওশর যাকাতের বেলায় হয় না। ওশর তো ফল পরিচ্ছন্ন ও ঝারা-পোছার পর। অন্যকথা প্রকৃত প্রাপ্তি পরিমাণ নির্ভুলভাবে জানা যাবে না। তার পরই ওশর দিতে হয়- অথবা অর্ধ ওশরে।
৩. আয়াতে আল্লাহর কথাঃ এবং সীমালঙ্ঘন করোনা, কেননা আল্লাহ সীমা লঙ্ঘনকারীকে পসন্দ করেন না, যাকাতে তো কোন সীমালঙ্ঘন নেই। কেননা তা তো শরীয়াতদাতা কর্তৃক পরিমাণ নির্দিষ্ট, সুপরিচিত। তার একবিন্দু কম করা বেশী করার কোন অধিকার নেই করোর। [দেখুনঃ (আরবী*************)]
যিনি বলেন, উক্ত আয়াত যে হক টি দিতে বলা হয়েছে, তা প্রথমে ওয়াজিব ছিল, পরে তা মনসুখ হয়ে গেছে। তার প্রতিবাদ করে এ লোকেরা বলেছেন, মনসুখ হওয়াটা শুধু সম্ভাব্যতা ও মৌখিক দাবির ভিত্তিতে প্রমাণিত হয় না। ইবনে হাজম বলেছেনঃ যে লোক দাবি করে যে, তার মনসুখ হয়ে গেছে, তার এ কথা সত্য হতে পারে কেবলমাত্র এমন এক অকট্য দলিলের ভিত্তিতে, যার রাসূল করীম (স) এর কাছে থেকে পাওয়া গেছে। অন্যথায় যে কোন ব্যক্তি যে কোন আয়াত সম্পর্কে এরূপ দাবি করে বসতে পারে, যে কোন হাদীসকে মনসুখ বলে তা মানতে অস্বীকার করতে পারে। কোন কিছুর মনসুখ হওয়ার দাবি সেই দলিলের মধ্যমে আল্লাহর দেয়া আদেশ মানার বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার করা শামিল। এটা কোন সহীহ সনদে প্রমাণিত অকট্য দলিল ছাড়া জায়েয হতে পারে না। [(আরবী*************)]
ইবনে হাজম বলেছেন, যদি বলা হয় যে, উক্ত আয়াতে কোন কাজটি ফরয করা হয়েছে? আমরা বলব ফরয করা হয়েছে এমন একটি হক দেয়া যা যাকাত ছাড়া অন্য কিছু। আর তা হচ্ছে এ যে, ফসল কাটাইকারী ফসল কাটার সময় যা মন চায় তাই দান করবে। এটা জরুরী কিন্তু পরিমাণে নির্দিষ্ট নয়। এটা আয়াতের বাহ্যিক তাৎপর্য। আগেরকালের বেশ কিছু মনীষী এ কথাই বলেছেন।[(আরবী*************)]
এ কারণে ইবনে উমর (রা) থেকে এ হক حق এর ব্যাখ্যায় বর্ণিত হয়েছেঃ তখনকার লোকেরা এমন পরিমাণ দিত যা যাকাত ওশর থেকে আলাদা।
আতা বলেছেনঃ সেই সময় উপস্থিত গরীব-মিসকীনদের যা সম্ভব হয়দেবে। কিন্তু তা ওশর গণ্য হবে না।
মুজাহিদ বলেছেনঃ মিসকীন লোকেরা উপস্থিত হলে তা থেকে (যা সম্ভব) তাদের প্রতি নিক্ষেপ করে দেবে। তিনি আরও বলেছেনঃ ফসল ফেলার সময় একমুঠি দেবে, কাটার সময় এক মুঠি দেবে এবং কাটাইকালে যা পড়ে থাকবে তা কুড়িয়ে নেবার তাদের সুযোগ দেবে।
ইবরাহীম নখয়ী বলেছেনঃ পার্সেল পাঠাবার মত দেবে। [(আরবী*************)] আবূল আলীয়া, সায়ীদ ইবনে জুবাইর, আলী ইবনে হুসাইন, রুবাই, ইবনে আনাস প্রমুখও উপরিউক্ত ধরনের কথা বলেছেন। [(আরবী*************)]
ইবনে কাসীর বলেছেন, আল্লাহ তাআলা তিরস্কার করেছেন সেই লোকদের যারা ফসল কাটে কিন্তু তা থেকে সাদকা করে না। যেমন সূরা ن এ বাগান মাকিলদের সম্পর্কে বলা হয়েছে। [দেখুনঃ (আরবী*************)]
এ আয়াতে হক বলতে কি বোঝানো হয়েছে তা নির্ধারণে এবং যাকাতের দ্বারা তার মনসুখ হয়ে যাওেয়ার ব্যাপারটিকে অগ্রাধিকার দান পর্যায়ে যে মত পার্থক্য রয়েছে, তা ইতিপূর্বে সবিস্তার উল্লেখ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মনসূখ হওয়ার তাৎপর্য হচ্ছে এবং ইবনে উমর (রা) এ ন্যায় একজন মহাসম্মানিত সাহাবী এবং আতা মুজাহিদ ও নখয়ী প্রমুখ তাবেয়ী ফিকাহ বিশারদগনের এক বিরাট জামায়াত এ আয়াত থেকে যে তাৎপর্য গ্রহণ করেছেন, তা হচ্ছেঃ ধন-মালে যাকাত ছাড়াও অধিকার আছে।
তৃতীয় দলিলঃ গবাদি পশুর ও ঘোড়ার হক
তাঁদের তৃতীয় দলিল হচ্ছে সে সব সহীহ হাদীস যাতে উট ও ঘোড়ার বিশেষ অধিকারের কথা বলা হয়েছে। তন্মধ্যে একটি হাদীস হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত ও বুখারী কর্তৃক উদ্ধৃত। তা হচ্ছে, নবী করীম (স) বলেছেনঃ (কিয়ামতের দিন) উট তা মালিকের কাছে আসবে তা সুস্থ সবল দেহ নিয়ে। দেখা যাবে যে, তার ব্যাপারে হক ধার্য ছিল, তা আদায় করা হয়নি। তখণ সে তার ক্ষুর দিয়ে সেই মালিককে দলন করবে। এ ছাড়া ছাগল আসবে তা সুস্থ সবল দেহ নিয়ে। সহসা দেখা যাবে, তার ব্যাপারে যে হক ধার্য ছিল তা দেয়া হয়নি। তখণ সে তার ক্ষুর দিয়ে তাকে দলন করবে ও শিং দিয়ে তাকে গুতোবে। বললেনঃ তার হক ছিল, দুধ দোহানের সময়ে উপস্থিত মিসকীনদেরকে তার অংশ দান। [বুখারী (আরবী***************) দেখুন ফতহুল বারী ৩য় খণ্ড ১৭২-১৭৩ পৃ.] তার অধিকার এই যে, তার দোহন করা হবে পানির উপর’ কথাটি উট ও ছাগল উভয়কে শামিল করে। মুসলিম ও আবূ দাউদের বর্ণনায় তা উটের উল্লেখের পর স্পষ্ট ভাষায় উদ্ধৃত হয়েছেঃ বর্ণনাটি এইঃ উটের মালিকই তার হক দেবে না…….আর তার হক হচ্ছে তার পানির কাছে আসার নির্দিষ্ট দিনে দোহন করা। [বুখারী কিতাবুল যাকাত(আরবী***************) অধ্যায় দেখুনঃ ফতহুল বারী ৩য়খণ্ড ১৭২-১৭৩ পৃ.]
এই শেষের ব্যক্যটি আবূ হুরায়রার শামিল করা অংশ নয়, যেমন কেউ কেউ ধারণা করেছে। আসলে তা রাসূলে করীম (স) এর হাদীসেরই অংশ। বুখারী একটি বর্ণনা থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, এ বাক্যটি স্বয়ং রাসূলে করীম (স) এর উক্তির মধ্যে শামিল রয়েছে। যেমনঃ বুখারী (আরবী***************) এর (আরবী***************) হযরত আবূ হুরায়রা (রা) এর সনদে নবী করীম (স) থেকেই বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেনঃ
উটের অধিকার হচ্ছে, তা দোহন করতে হবে পানির স্থানে। [(আরবী***************)] নাসায়ী জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ উট, গরু ও ছাগলের যে মালিক তার হক দেয় না, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন একটি সমতল রুক্ষ স্থানে দাড় করিয়ে দেবেন। দুই ভাগ বিভক্ত ক্ষুরধারীরা তাকে পদদলিত করেব এবং শিংধারী জন্তুরা তাকে শিং দিয়ে গুতোবে। সেদিন কোন জন্তুই শিংহীন হবে না, কোনটি শিং ভাঙ্গাও হবে না। আমরা বললামঃ ইয়া রাসূলল্লাহ! ওদের হক কি? বললেনঃ তার বদলকে যে চাইবে তাকে ধারস্বরূপ দেয়া তার বালতিটা ধার দেয়া এবং আল্লাহর পথে তার ওপর বোঝা চাপানো।……….. [(আরবী***************) দেখুনঃ (আরবী***************)]
মুসলিম শরীফেও হযরত জাবির থেকেই অনুরূপ হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে।
তাঁরই থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, রাসূলে করীম (স) কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ উটের হক কি? বললেনঃ তার গলায় নহর করা, তার বলদকে ধার দেয়া এবং তা দোহানো পানি খাওয়ার দিন।[(আরবী***************) গ্রন্থে বলা হয়েছে (৩য় খণ্ড, ১০৭ পৃ.) তাবরানী এ হাদীসটি الاوسط গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন। তার বর্ণনাকারীরা সহীহ সিকাহ তাবরানী শায়খ ছাড়া ইবনে আবূ হাতিম তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন কিন্তু তাকে কেউই যয়ীফ বলেনি।]
শরীদ থেকে বর্ণিত, বলেছেন, এক ব্যক্তি নবী করীম (স) এর কাছে উপস্থিত হয়ে উট সংক্রান্ত কেন বিষয়ে জিজ্ঞেস করল। তখন নবী করীম (স) বললেনঃ তার গলায় নহর করা (ছুরি মেরে জবাই করা) তার মধ্যে যেটা উত্তম স্বাস্থ্যবান সেটিতে চড়- বোঝা চাপাও এবং তা যবেহ কর তার পানি খাওয়ার দিন। [তাবরানী হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন (আরবী********) গ্রন্থে, সনদ উত্তম। (আরবী***************)]
এসব কয়টি বর্ণনাই স্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে, এই কথাটি স্বয়ং রাসূলে করীম (স) এর। অন্য কারোর কোন কথা তাতে যুক্তি হয়নি। হাফেয ইরাকী একে আবূ হুরায়রা (রা) এ উক্তি বলে যে মত প্রকাশ করেছেন, এতে তার সুস্পষ্ট প্রতিবাদও রয়েছে।
বালতি ধার দেয়ার অর্থ, কারো যদি বালতি না থাকে এবং কুপ থেকে পানি তোলার জন্য বালতি ধার চায়, তাহলে তা দিতে হবে। আর আল্লাহর পথে তার ওপর বোঝা চাপানের অর্থ, সে সব মুজাহিদের জিহাদে যাওয়ার সওয়ারী নেই, তাদের বহন করে নিয়ে যাওয়ার জন্যে দেয়া।
এ সব হাদীস মুল উদ্দেশ্য প্রমাণ করছে যথার্থভাবে। যেসব অধিকারের কথা বলা হয়েছে, তা পালন না করলে সেজন্যে কঠোর আযাবের ধমকও আছে তাতে। এ থেকে প্রমাণিত হল, এ সব হক আদায় করা ওয়াজিব। আর এ সব হক যাকাত ছাড়া ভিন্নতর জিনিস।
এ কারণে, ইবনে হাজম বলেছেন, [(আরবী***************)] প্রত্যেক উট-গরু-ছাগলের মালিকের কর্তব্য হচ্ছে, তা দোহাবে তার পানির স্থানে উপস্থিত হওয়ার দিন এবং তার দুধ থেকে যা তার মন চাইবে সাদকা করে দেবে।
ইবনে হাজম বুখারী উদ্ধৃত ও আবূ হুরায়রা বর্ণিত হাদীসটি দলিল হিসেবে পেশ করেছেন। পরে বলেছেন, যে লোক বলবে, ধন-মালে যাকাত ছাড়া আর কোন হক নেই, সে বাতিল কথা বলবে। তার কথার সত্যতা প্রমাণের কোনই দলিল নেই, কুরআন হাদীসের কোন সহীহ দলিল বা কোন ইজমাও তার পক্ষে উল্লেখ করার মত নেই। আর রাসূলে করীম (স) ধন-মালে বাধ্যতামূলক করেছেন তা ওয়াজিব। বালতি ধার বাবদ দেয়া এবং বলদকে অন্য লোকের প্রয়োজনীয় কাজে দেয়া এ দুটিই আল্লাহর কথা (আরবী***************) অর্থাৎ পরকালে অবিশ্বাসী সে সব ব্যক্তি যারা নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি পারস্পরিক দেয়া নেয়া বন্ধ করে [(আরবী***************)] এর অন্তর্ভুক্ত।
উট ও ছাগলের হক পর্যায়ে যেমন হাদীসমূহ সহীহ প্রমাণিত হয়েছে, অনুরূপভাবে ঘোড়ার হক পর্যায়েও সহীহ হাদীসসমূহ উদ্ধত হয়েছে। বুখারী আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন; রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ ঘোড়া তার মালিকের জন্যে শুভ পূণ্যফল, তার মালিকের আবরণ এবং অপর ব্যক্তির ওপর তা পাপ, যার জন্যে তা শুভ পূণ্যফল, সে সেই ব্যক্তি যে তা আল্লাহর পথে, অর্থাৎ জিহাদের কাছে নিযুক্ত করল। শেষ পর্যন্ত বললেনঃ এবং সেই ব্যক্তি যে তা নিযুক্ত করল সম্পদস্বরূপ, আত্মমর্যাদা রক্ষার্থে, পরে তার গলায় দিকে ও পিঠের দিকে আল্লাহর যে হক ধার্য রয়েছে তা সে ভুলে যায়নি। তার জন্যে তা আবরণ। আর যে লোক তার গৌরব প্রকাশের কাজে নিযুক্ত করবে, লোকদের বাহাদুরী দেখানোর উদ্দেশ্য ব্যবহার করবে মুসলিমদের বিরোধিতায়, তার ওপর তা পাপের বোঝাস্বরূপ।[বুখারী হাদীসটি তার সহীহ গ্রন্থর (আরবী***************) এর (আরবী***************) উদ্ধৃত করেছেন। দেখুনঃ (আরবী***************)]
চতুর্থ দলিলঃ অতিথির অধিকার
সেই ফিকাহবিদগণ চতুর্থ পর্যায়ে দলিলস্বরূপ পেশ করেছেন সে সব হাদীস, যাতে মেহমানের হক- যার কাছে মেহমান আসে- তার ওপর ওয়াজিব হওয়া পর্যায়ে উদ্ধৃত হয়েছে। আবূ শুরাইহ খুয়াইলদ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলে করীম (স) বলেছেন, যে লোক আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমানদার সে যেন তার মেহমানের সম্মান করে। এ সম্মান পাওয়া তার বৈধ অধিকার একদিন ও এক রাত। আর মেহমানদারীতে শেষ ‍মুদ্দাত তিন দিন। তার পরও যা হবে, তা হবে তার সাদকা। [হাদীসটি উদ্ধতৃ করেছেন মালিক, বুখারী, মুসলিম, আবূ দাউদ, তিরমিযী ও ইবনে মাজা (আরবী***************)]
মেহমানকে সম্মান দেখাবার এ আদেশ ওয়াজিব প্রমাণ করে। কেননা ঈমানকে তার সাথে সম্পর্কশীল বা নির্ভরশীল বানানো হয়েছে। আরও দলিল, এই যে, তিনদিনের পর এ পর্যায়ের যা হবে, তা হবে সাদকা বলা হয়েছে (যা নফল)।
রাসূলে করীম (স) আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা) কে যা বলেছিলেন তাও উক্ত কথার সমর্থন করে। তা হচ্ছে- নিশ্চয়ই তোমার দেহের হক রয়েছে তোমার ওপর [বুখারী ও মুসলিম প্রণীত।] এবং তোমার সাথে সাক্ষাতকারীরাও তোমার মেহমান। আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত হাদীসেও তা সমর্থন করে। নবী করীম (স) বলেছেনঃ যে মেহমানই কোন লোকের কাছে আসবে, সে মেহমান যদি বঞ্চিত হয়, তাহলে তার অধিকার আছে তার এক বেলার খোরাক সে গ্রহণ করবে, তাতে তার কোন দোষ হবে না।[আহমাদ উব্ধৃত করেছেন, তাঁর বর্ণনাকারীর সকলেই সিকাহ। হাকেম উদ্ধৃত করেছেন এবং বলেছেনঃ হাদীসটি সহীহ সনদসম্পন্ন। (আরবী********)]
মিকদাম ইবনে সা’দী করচ আল কিন্দী বর্ণনা করেছেন, রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ যে ব্যক্তিই কোন লোকের কাছে মেহমান হলো- পরে সে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হল, এ ব্যক্তির সাহায্য করা প্রত্যেক মুসলিমেরই দায়িত্ব। শেষ পর্যন্ত সে তার রাতের খাবার পরিমাণ তার ‍কৃষি ফসল ও মাল থেকে নিতে পারবে। [আবূ দাউদ ও হাকেম উদ্ধৃত করেছেন। বলেছেনঃ হাদীসটি সনদ সহীহ।] তার মাধ্যমেই নবী করীম (স) থেকে বর্ণিত মেহমানের এক রাত প্রত্যেক মুসলমানের হক। তাই যে লোক তার আঙ্গিনায় সকাল বেলা পৌছল, তখন সে তার ওপর ঋণ- হাদীস। [আবূ দাউদ ও ইবনে মাজাহ উদ্ধৃত করেছেন। দেখুনঃ (আরবী***************)]
ইবনে হাজম মুসলিমের সূত্রে উকবা ইবনে আমের (রা) থেকে বর্ণনা করেছেনঃ আমরা বললামঃ হে রাসূল! আপনি আমাদের বিভিন্ন স্থানে পাঠান। তখন আমরা বিভিন্ন লোকদের কাছে অবস্থান করি, কিন্তু তারা আমাদের মেহমানদারী করে না। এমতবস্থায় আমরা কি করব, আপনি আমাদের কি উপদেশ দেন? রাসূলে করীম (স) তখন বললেন, তোমরা যদি কোন লোকের গ্রামে বা শহরে গিয়ে উপস্থিত হও এবং তারা যদি তোমদের জন্যে সেই সব ব্যবস্থাই গ্রহণ করে যা মেহমানের জণ্যে করা বাঞ্ছনীয় তাহলে তা গ্রহণ কর। আর যদি তারা তা গ্রহণ না করে তাহলে তাদের কাছ থেকে মেহমানের হক নিয়ে নাও- যা তাদের পক্ষে সম্ভব হতে পারে।
বুখারীর সূত্রে আবদুর রহমান ইবনে আবূ বকর পর্যন্তকার সনদে বলা হয়েছে, সুফফার লোকেরা খুবই দরিদ্র ছিলেন নবী করীম (স) বলেছেন, যার কাছে দুজনের খাদ্য আছে সে যেন তৃতীয় একজন সঙ্গে নিয়ে যায়। আর যার কাছে পাঁচ জনের খাবার আছে সে যেন ষষ্ঠ জনেকে সাথে নিয়ে যায় অথবা যেমন তিনি বলেছেন, একদা হযরত আবূ বকর (রা) তিনজনকে সাথে করে নিয়ে গেলেন। আর রাসূলে করীম (স) দশজনকে সঙ্গে নিয়ে নিজের ঘরে গেলেন।
এসব হাদীসের সমষ্টি সুস্পষ্টরূপে প্রমাণ করে যে, সমাগত মেহমানের একটা হক আছে খুবই তাকীদ পূর্ণ তার সে মুসলিম ভাইয়েরা ধন-মালে, যার কাছে সে মেহমান হয়েছে। এমন কি গোটা সমাজের ওপর তার সাহায্য-সহযোগিতা করা কর্তব্য যেন সে তাগিদ পূর্ণ হকটা সে পেয়ে যেতে পারে। সেই সাথে একথাও স্পষ্ট যে, এ হক যাকাতের বাইরে- যাকাত ছাড়া অন্য হক। কেননা যাকাত একটা বিশেষ সময় ধার্য হয় ও ফরয হয়-বছর পূর্তির ফসল কাটা ইত্যাদির সময়ে অথচ মেহমান তো যে কোন সময়ে এসে যেতে পারে। এ জন্যে ইবনে মাজাহ বলেছেনঃ মেহামানদারী তো ফরয শহর-নগরবাসী-মরুবাসী-ফিকহবিদ ও মূর্খ সকলেরই ওপর- এক দিন একরাত পুণ্যময় আচরণ ও উপঢৌকন হিসেবে। পরে তিন দিন মেহমানদারী হিসেবে। এর অধিক নয়। তার পরও যদি কেউ থাকে তাহলে তখন আতিথ্য রক্ষা করা জরুরী বা বাধ্যতামূলক বলা যায় না। তবে সে নিজেই মেহমানদারী উত্তমভাবে দীর্ঘায়িত করতে চায়, তাহলে তা ভালই। কিন্তু ওয়াজিব মেহমানদারী যদি করতে অস্বীকার করে, তাহলে তা জোর করে বা যেমন করেই সম্ভব গ্রহণ করার তার অধিকার আছে। তাতে তার পক্ষেই রায়ও দেয়া হবে। [(আরবী*********)]
ইমাম শাওকানী লিখেছেনঃ
মেহমানের অধিকার পর্যায়ে আলিমগণ বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। তা ওয়াজিব কিংবা মুস্তাহাব।
জমহুর ফিকাহবিদগণ বলেছেনঃ মেহমানদারী করা ভাল নৈতিকতার শুভ আচরণের অন্তর্ভুক্ত কাজ। দ্বীন দারীর সৌন্দর্যও তাই। তা ওয়াজিব বা বাধ্যতামুলক নয়। লাইস ইবনে সায়াদ ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, এক রাতের জন্যে মেহমানদারী ওয়াজিব।
জমহুর ফিকাহবিদদের দলিল হচ্ছে সেই হাদীস যা বুখারী মুসলিমে উদ্ধৃত। তা হচ্ছেঃ যে লোক আল্লাহর ও পরকালে বিশ্বাসী, সে যেন তার মেহমাকে যথোপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করে। লোকেরা জিজ্ঞেস করলেনঃ যথোপযুক্ত’ বলতে কি বোঝায় হে রাসূল? বললেনঃ এক দিন ও রাত। আর মেহমানদারী তিনদিন পর্যন্ত চলতে পারে। এর বেশী হলে তা হবে সাদকা-সাধারণ দান বিশেষ। (আল-হাদীস)
হাদীসের শব্দ جائزته বলতে বোঝায়, মেহমানদারী একটা মুস্তাহাব কাজ কেননা তা হচ্ছে একটা দান, আত্মীয়তা রক্ষা- যা মূলত মুস্তাহাব। এ শব্দটি ওয়াজিব বোঝাবার জন্যে খুব কমই ব্যবহৃত হয়। উক্ত হাদীসটির তাৎপর্য হচ্ছে, মেহমানকে আদর যত্ন করতে হবে প্রথম দিন ও রাত। আর তাকে উপহার উপঢৌকন সাধ্যমত দান করা অতীব উন্নতমানের দানশীলতা, বদান্যতা ও অনুগ্রহ স্নেহ বাৎসল্যের ব্যাপার। [(আরবী***************)] তারা সে সব হাদীসকেও দালিল হিসেবে নিয়েছেন, যে সব হাদীস থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, কোন মুসলিম ব্যক্তির ধন-মাল তাঁর সন্তুষ্টি ছাড়া গ্রহণ করা সম্পূর্ণ হারাম। সে সব হাদীসকেও তাঁরা পেশ করেছেন, যা প্রমাণ করে যে, ধন-মালে যাকাত ভিন্ন আর কিছু প্রাপ্য নেই।
মেহমানের অধিকার পর্যায়ে যে সব হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে, সে সব বিষয়ে তাঁদের ভিন্ন মত রয়েছে।
খাত্তাবী বলেছেন, আসলে তা রাসূলে করীম (স) এর জীবদ্দশায় বাধ্যতামূলক ছিল। কেননা তখন বায়তুলমাল ছিল না। কিন্তু আজকের দিনে তাদের রিযিক যোগানের দায়িত্ব বায়তুলমালের ওপর অর্পিত। মুসলমানদের ধানমালে তাদের অধিকার নেই।
অনেকই মনে করেছেন, এসব হাদীস ইসলামের প্রাথমিক যুগে কার্যকর ছিল। তখন পারস্পরিক সহানুভুতি ও সহমর্মিতা ছিল ওয়াজিব। পরে ইসলাম যখন সর্বত্র প্রচারিত হয়ে গেল, তখন তা বাতিল হয়ে গেছে।[(আরবী***************)]
শাওকানী বলেছেনঃ সত্যি কথা হচ্ছে, মেহমানদারী কয়েকটি কারণে ওয়াজিবঃ
প্রথমঃ যে লোক মেহমানদারী করল না, তার শাস্তিস্বরূপ তার মাল গ্রহণ জায়েয। ওয়াজিব নয়- এমন কাজে এরুপ শাস্তির বিধান হয়নি।
দ্বিতীয়ঃ মেহমানদারীকে আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান শাখা বানিয়ে ব্যাপারটিকে চূড়ান্ত মাত্রায় তাগিদপূর্ণ করে দেয়া হয়েছে। তা থেকে বোঝা যায় যে, যে লোক তা করল না সে আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমানদার নয় বলে মনে হয়। আর একথা তো জানাই আছে যে, ঈমানের শাখা-প্রশাখারূপে চিহ্নিত কার্যাবলীও আদেশকৃত। তা ছাড়া তাকে সম্মান প্রদর্শনের সাথে যুক্ত করে দয়া হয়েছে। তা সাধারণ মেহমানদারীরও উর্ধ্বের এক বিশেষ কাজ। তা থেকে বোঝা যায় যে, তা অবশ্যই বাধ্যতামূলক হবে।
তৃতীয়ঃ রাসূলের কথাঃ তার অতিরিক্ত সাধারণ সাদকা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, পূর্ববর্তী কথা সাধারণ সাদকার পর্যায়ের নয়, বরং তা শরীয়াতের দৃষ্টিতে ওয়াজিব।
চতুর্থঃ তাঁর কথা (আরবী***************) মেহমানের রাত ওয়াজিব অধিকার। এ থেকেও নিঃসন্দেহে ওয়াজিব প্রমাণিত হয়। এর অপর কোন ব্যাখ্যা পেশ করা হয়নি।
পঞ্চমঃ রাসূলে করীম (স) এর কথাঃ কেননা তার সাহায্য করা প্রত্যেক মুসলমানেরই দায়িত্ব’ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, তার সাহায্য করা ওয়াজিব। আর এ কথাই মেহামানদারী ওয়াজিব হওয়ার ফলশ্রুতি।
বলেছেনঃ এ কথা যখন অকাট্যভাবে স্পষ্ট হল, তখন জমহুর ফিকাহবিদদের মাযহাবের দুর্বলতা প্রকট হয়ে উঠল। আর মেহমানদারী সংক্রান্ত হাদীসমূহ বিশেষত্ব প্রমাণকারী সন্তুষ্টি ছাড়া-ধন মাল নেয়া হারাম হওয়া সংক্রান্ত হাদীসসমূহের তুলনায়। আর মালে যাকাত ছাড়া আর কোন অধিকার নেই’ এ হাদীসের তুলনায়ও।
মেহমানদারী সংক্রান্ত হাদীসসমূহকে শুধু জান বাঁচানো পরিমাণের মধ্যে সীমিত মনে করা অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার।
কেননা তা প্রমাণকারী কোন দলিলই পাওয়া যায়নি। আর তা প্রয়োজনও কিছু নেই।
কেবল গ্রাম-মরুবাসীদের জন্যে তা খাস করা এবং শহর-নগরবাসীদের তা থেকে নিষ্কৃতি প্রদানের ব্যাপারটিও অনুরূপ। [(আরবী***************)]
পঞ্চম দলিলঃ নিত্য ব্যবহার্য জিনিসের হক
পঞ্চম পর্যায়ে তাঁর দলিলরূপে উপস্থাপিত করেছেন কুরআন মজীদের সে আয়াতটি, যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় সাধারণ দ্রব্যাদি পরস্পরের মধ্যে আদান-প্রদান করতে অসম্মত লোকদের প্রতি আযাবের হুমকি ধ্বনিত হয়েছে। আল্লাহ বলেছেনঃ
(আরবী***************)
’সে সব নামাযীদের জন্যে দুঃখ- আযাব, যারা নিজেদের নামাযের ব্যাপারে উপেক্ষা-আলস্য প্রদর্শন করে, তারা সে লোকই যারা লোক দেখানো কাজ করে ও তা নিত্যপ্রয়োজনীয় সাধারণ দ্রব্যাদিও পারস্পরিক আদান-প্রদান করে না। [(আরবী********)]
আবূ দাউদ কিতাবুল যাকাতের (আরবী***************) অধ্যায়ে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) এর বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেনঃ রাসূলে করীম (স) এ জামানায় মা-য়ূন বলতে আমরা বুঝতাম পানি তেলার বালতি ও তৈজসপত্র ধার দেয়া। [আবু দাউদ ও মুনযেরী হাদীসটি সম্পর্কে কোন মন্তব্য করেননি। (আরবী************) বায়হাকীও তা উদ্ধৃত করেছেন।]
তার অর্থ, সামাজিক জীবনে মানুষ পরস্পরের কাছে যেসব ছোট- খাটো জিনিসের জন্যে মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে, তা ধার বাবদ দেয়া ওয়াজিব। সে সব জিনিস দিতে যে লোক অস্বীকার করে সে নিন্দিত ও আযাব পাওয়ার যোগ্য সে লোকের মতই যে নামাযের প্রতি উপক্ষা প্রদর্শন করে ও লোক দেখানো নামায পড়ে। আর কেবলমাত্র কোন ওয়াজিব কাজ তরক করলেই যে আযাব বা তিরস্কার পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হতে পারে, একথা সকলেরই জানা।
এসব জিনিস ধার বাবদ দেয়া ওয়াজিব প্রমাণিত হচ্ছে, অথচ তা যাকাতের বাইরের কাজ, তখন একথা অকাট্যভাবে প্রামাণিত হল যে, নিশ্চয়ই ধন-মালের যাকাত ছাড়াও হক বা অধিকার আছে।
ইবনে হাজম তাঁর সনদে ইবনে মাসউদ (রা) থেকেও বর্ণনা করেছেনঃ الماعون হচ্ছে সে সব জিনিস যা সামাজিক মানুষ পারস্পরিকভাবে ধার, বাবদ দেয়া নেয়া করে থাকে সাধারণভাবে। তা হচ্ছে কোদাল, ভাণ্ড-পাত্র-তৈজসপত্র ও এ ধরনের অন্যান্য জিনিস। [ইবনে হাজম এ কথার উল্লেখ করেছেন (আরবী***************) গ্রন্থেল ইবনে আবূ শায়বার সত্রে।] আয়াতে উদ্ধৃত الماعون এর তাফসীরে ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তা হচ্ছে ঘরের জিনিসপত্র। তার থেকে এও বর্ণিতঃ ধার দেয়া-নেয়া। [ঐ- বায়হাকীঃ ৪র্থ খণ্ড, ১৮৩-১৮৪ পৃ.] আলী ইবনে আবূ তালিব থেকেও অনুরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়। [(আরবী***************)] উম্মে আতীয়া বর্ণিতঃ তা হচ্ছে কাজ ও ব্যবসায়, যা লোকেরা পারস্পরিকভাবে নেয়া দেয়া করে।[(আরবী***************)]
ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিতঃ তা হচ্ছে সেই মাল, যার হক দিতে অস্বীকার করা হয়। ইবনে হাজম বলেছেনঃ আমরা যা বলে এসেছি তা এ কথার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। তা ইকরামা ও ইবরাহীম প্রমুখেরও মত। কোন সাহাবী থেকেই তার বিপরীত কথা আমরা জানতে পাইনি। [(আরবী***************)]
ইবনে হাজম যেমন বলেছেন, এ সব কিছুই আভিধানিক প্রমাণ। الماعون এর তাফসীরে তাঁদের সকলের মতই সম্পূর্ণরূপে অভিন্ন-যেমন পূর্বে বলেছি।
ইবনে হাজম বলেছেন, যদি বলা হয়, হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তা যাকাত, তা হলে আমরা বলল, হ্যাঁ তবে তা ধার বাবদ দেয়া নয় এমন কথা বলেনিনি। তাছাড়া তাঁর থেকেই বর্ণনা পাওয়া গেছে যে, তা ধার বাবদ দেয়া-নেয়া। অতএব তাঁর দুটি কথার মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে হবে।[(আরবী***************)]
আবূ দাউদে ইবনে মাসউদ বর্ণিত হাদীসটি কার্যত মরফু রাসূলের কথা হিসেবে গণ্য মুহাদ্দিসীনের কাছে। কেনান তাতে রাসূলের সময়ে الماعون এর তাফসীরের কথাই উদ্ধৃত হয়েছে। যদি তখণ এতে কোন ভুল করা হয়, তাহলে অহী, তা নিশ্চয়ই সংশোধন করে দিত। কেননা আল্লাহর কিতাব অনুধাবনে ভুল অংসংশোধিত থাকতে পারত না।
ষষ্ঠ দলিলঃ মুসলিম সমাজে পারস্পারিক দায়িত্ব গ্রহণ কর্তব্য
ষষ্ঠ পর্যায়ে তাঁরা দলিল হিসেবে এনেছেন সে সব অকট্য প্রমাণ, যা মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগীতা, একের অপরের দায়িত্ব গ্রহণ ও দয়া অনুগ্রহকে ওয়াজিব প্রমাণ করে এবং মিসকীনকে খাবার দেয়া ও দিতে উৎসাহিত করা ফরয করে। আর এ কাজকে ভ্রাতৃত্বের ফলশ্রুতি- ঈমান ও ইসলামের স্বাভাবিক দাবি গণ্য করে।
তন্মধ্যে একটি হচ্ছে আল্লাহর কথাঃ (আরবী***************)
তোমরা পরস্পরের সাথে সহযোগীতা কর পরম পূণ্যময় আল্লাহ ভীতির কাজে এবং কোনরূপ সহযোগিতা করো না গুনাহ ও আল্লাহদ্রোহিতার কাজে। [(আরবী***************)]
আল্লাহ তা’আলা মুমিনদের গুণ পরিচিতি প্রসঙ্গে বলেছেনঃ (আরবী***************)
তারা পরস্পরের প্রতি অত্যন্ত দয়াশীল ও অনুগ্রহসম্পন্ন। [(আরবী***************)]
সেই ঘাঁটির কথাও বলা হয়েছে, যা আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়ার উদ্দেশ্য অতিক্রম করা প্রত্যেকটা মানুষেরই কর্তব্য যেন তারা ডানপন্থী গণ্য হতে পারে। বলেছেনঃ (আরবী***************)
কিন্তু সে ‍দুর্গম বন্ধুর ঘাটি পথ অতিক্রম করার সহসা করেনি। তুমি কি জানো সেই দুর্গম ঘাঁটির পথ কি?…… কোন গলা দাসত্ব শৃংখল থেকে মুক্ত করা কিংবা উপবাসের দিনে কোন নিকটবর্তী ইয়াতীম বা ধুলি-মলিন মিসকীনকে খাবার খাওয়ানো। সেই সঙ্গে শামিল হওয়া সেই লেকদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে, যারা পরস্পরকে ধৈর্য ধারণ ও (সৃষ্টিকুলের প্রতি) দয়া প্রদর্শনের উপদেশ দেয়।……. সেই লোকই দক্ষিণপন্থী।[(আরবী***************)]
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেনঃ (আরবী***************)
এবং দাও নিকটাত্মীয়কে তার হক এবং মিসকীন ও ইবনে সাবীলকে। [(আরবী***************)]
আল্লাহ সুবহানাহু আরও বলেছেনঃ (আরবী***************)
এবং পিতামাতার সাথে সদাচরণ, নিকটাত্মীয় ইয়াতীম, মিসকীন, আত্মীয় প্রতিবেশী, পার্শ্বে থাকা প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সঙ্গী, নিঃস্ব পথিক, এবং দক্ষিণ হস্ত যাদের মালিক হয়েছে (ক্রীতদাস) এর সাথে।[(আরবী***************)]
ইতিপূর্বে আমরা এমন বহু সংখ্যক আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়েছি, যা মিসকীনকে খাবার দেয়া ও সেজন্যে উৎসাহদান ঈমানের নিদর্শন হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং তা না করাকে কুফর ও পরকাল অবিশ্বাসের লক্ষণ বলে নির্দিষ্ট করেছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ আল্লাহর এ কথাটিঃ (আরবী**********)
তুমি কি দেখেছ সেই লোককে, যে পরকালকে অবিশ্বাস করে? সে তো সেই, যে ইয়াতীমকে গলা ধাক্কা দেয় এবং মিসকীনকে খাবার দিবার জন্যে উৎসাহ দেয়না। [(আরবী***********)]
অপরাধী লোকদের জাহান্নামী হওয়ার কারণ বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছেঃ (আরবী************)
তারা বলবে, আমরা নামাযীদের মধ্যে ছিলাম না, আমরা মিসকীনকে খা্ওয়াতাম না। [(আরবী*********)]
যে লোক বাম হাতে আমলনামা পাওয়ার দরুন জাহান্নামে যা্ওয়ার ও আযাব পা্ওয়ার উপযুক্ত সাব্যস্ত হয়েছে, তাদের সম্পকে বলা হয়েছেঃ (আরবী***********)
সে মহান আল্লাহর প্রতি ঈমানদার ছিল না এবং সিমকীনকে খাবার দেবার জন্যে উৎসাহ্ও দিত না। [বুখারী ও মুসলিম]
রাসূলে করীম (স) ইসলামী সমাজের প্রকৃত ও যথার্থ রুপ এবং একে অপরের দয়িত্ব গ্রহণ পারস্পরিক সম্পকের্র ঘনিষ্ঠ এবং সংহতির চূড়ান্ত মান তুলে ধরেছেন তাঁর হাদীসসমূহের মাধ্যমে। বলেছেনঃ (আরবী***********) মুমিন মুমিনের জন্যে প্রাচীরের ইটের মত- একজন অপরজনকে শক্তিশালী করে। [বুখারী ও মুসলিম]
তার অর্থ মুসলমানদের সমাজ স্বতন্ত্র বিচ্ছিন্ন- নিঃসম্পর্ক ইটের মত নয়। অন্য কথায়, মুসলিম জাতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে পড়ে থাকা লোকদের সমষ্ট নয়। সেখানে কেউ অন্য একজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাস করে না। বরং (আরবী***********)
মুসলমানদের পাস্পরিক বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, স্নে-বাৎসল্য ও পারস্পরিক দয়া-সহানুভূতির দৃষ্টান্ত যেমন একটা ভিন্ন্ দেহ। তার কোন অঙ্গ অসুস্থ হয়ে পড়লে সমগ্র দেহে সেই কারনে জ্বর ও অনীদ্রায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে।
একটি দেহের অঙ্গ-প্রতঙ্গের পাস্পরিক সম্পর্ক ও সংহতির তুলনায় অধিক কোন শক্তিশালী সংহতি সম্পর্ক হতে পারে কি? এগুলো পূর্ণ সহযোগিতা ও একত্মাতার মাধ্যমের পরস্পরের সাথে সহযোগিতা করে কাজ করছে, একটি অপরটির কাছ থেকে শক্তি পাচ্ছে, উপকৃত হচ্ছে। তার একটিতে যন্ত্রণার উদ্ধেক হলে গোটা দেহ সত্তাই তদ্দরুন যন্ত্রণাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। নবী করীম (সা) বলেছেনঃ
যে লোক খেয়ে পরিতৃপ্ত হয়ে ঘুমায় আর তার প্রতিবেশী তার পাশে থাকলেও অভুক্ত অবস্তায় রাত কাটায় সে মুমিন নয়। [(আরবী*************)]
হযরত আলী ইবনে আবূ তালিব (রা) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (স) বলেছেনঃ
আল্লাহ তা আলা মুসলিম ধনী লোকদের ধন- সম্পদে অতটা পরিমাণই র্ধায্য করেছেন, যতটা তাদের গরীব লোকদের জন্যে সংকুলান হয়। দরিদ্ররা ক্ষুধার্ত ও বস্ত্রহীন হয়ে যে কষ্ট পায় তা কেবলমাত্র তাদের ধনী লোকদের কৃতকর্মের দরুন। সাবধন হ্ও, আলাহ তাদের কঠিনভাবে হিসেব নেবেন এবং তাদের উৎপীড়ক আযাবে নিমজ্জিত করবেন। [আল-মনযেরী (আরবী***********) গ্রন্থে লিখেছেন, হাদীসটি তাবরানী (আরবী***********) গ্রন্থে উদ্বৃত করেছেন এবং বলেছেন। মুনযেরী বলেছেনঃ সাবিত ইবনে মুহাম্মদ জাহেদ এককভাবে হাদীসটি বর্ণনা করেছন। এর অন্যান্য বর্ণনাকরীদের্ কো্ন ক্রটি নেই। হাদীসটি হযরত আলীর কথা হিসাবে্ও বণির্ত হয়েছে এবং তা-ই সম্ভব (আরবী********) ইবনে হাজম হাদীসটি মএকুফ হিসেবে (আরবী***********) গ্রন্থে উদ্বত করেছেন (আরবী***********) সায়ীদ ইবনে মনসুরের সূত্রে।]
ইবনে হাজম এ মতটির পক্ষাবলম্বন করেছেন
এ মাযহাবের পক্ষ সমর্থন করেছেন এবং কুরআন-হাদীস-সাহাবী-তাবেয়ীনের মত ইত্যাদি অসংখ্য দলিল দিয়ে এ মতটিকে অধিকতর শক্তিশালী করে তুলেছেন, আমরা এমন কাউকে পাইনি। কেবলমাত্র ইবনে হাজম এর ব্যতিক্রম। তি্নি তাঁর (আরবী) গ্রন্থে লিখেছেনঃ [(আরবী***********)তিনি যে সব হাদীস উদ্বৃত করেছেন, আমরা ত সনদ ছাড়াই সংখক্ষেপে উদ্বৃত করেছে।]
প্রত্যেক দেশ-স্থানের ধনী লোকদের ওপর ফরয করা হয়েছে যে, তার সেখানকার গরীব জনগণের পৃষ্ঠপোষক হয়ে দাঁড়াবে। সরকার তাদের এজন্যে বাধ্য করবে।যাকাত যদি তারে জন্যে যথেষ্ট না হয় এবং মুসলমানদের ফাই সম্পদ যদি প্রয়োজন পূরণে অসমর্থ হয়, তাহলে তাদের জন্যে অপরিহায যে খাদ্য তারা খায়, শীত ও গ্রীষ্মের যে পোশাক তারা পরে, যে ঘর তাদেরকে বৃষ্টি, শীত. সূযর্তাপ ও পথিকদের দৃষ্টি থেকে রক্ষা করতে পারে, তাই দিয়ে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে।
কুরআনী দলিল
এ কথার কুরআনী দলিল হলঃ (আরবী***********)
এবং দাও নিকটাত্মীয়কে –মিসকীন ও নিঃস্ব পথিককে –তার হক। [(আরবী***********)]
আল্লাহর বাণীঃ (আরবী***********)
এবং পিতামাতার সাথে অতীব ভালো ব্যবহার এবং নিকটাত্মীয়, ইয়াতীম,মিসকীন, নিকটাত্মীয় প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী প্রতিবেশী, সঙ্গী প্রতিবেশী, নিঃস্ব পথিক এবং ক্রীতদাসেরও।
আল্লাহ তাআলা মিসকীন ও নিঃস্ব পথিকের হক নিকটাত্মীয়ের হকের সাথে সমান মানের গুরুত্বপূর্ণ বানিয়ে দিয়েছেন এবং পিতামাতার প্রতি অতীব উত্তম ব্যবহার- নিকটাত্মীয়, মিসকীন, প্রতিবেশী ও ক্রীতদাসদের সাথে ভালে আচরণ গ্রহণ একান্ত কর্তব্য বলে ঘোষণা করেছেন। এ ভালো আচরণ বলতে সে সবই বোঝায়, যা পূর্বে বলেছি এবং তা না করা নিঃসন্দেহে খুবই খারাপ কাজ।
আল্লাহ তা’আলা বলেছেনঃ
(আরবী***********) তোমাদেরকে কোন জিনিস জাহান্নামে পৌছিয়ে দিল? তারা বলবেঃ আমরা নামাযী ছিলাম না এবং আমরা মিসকীনকে খাবার খা্ওয়াতাম না। [ (আরবী***********)]
এআয়াতে আল্লাহ তা’আলা নামায হ্ওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে মিসকীনকে খাবার খা্ওয়ানোর কথা বলেছেন।
হাদীসের দলিল
রাসূলে করীম (স) থেকে চূড়ান্ত মাত্রার বহু সুত্রে হাদীস বর্ণিত হয়েছে; তিনি বলেছেনঃ যে লোক লোকদেরপ্রতি দয়া করে না, আল্লাহ্ও তার ওপর দয়া রহম করেন না। [ হাদীসটি আহমদ, বুখারী, মসলিম ও তিরমিযী জরীর ইবনে আবদুল্লাহ থেকে এবং আহমাদ ও তিরমিযী আবূ সায়ীদ থেকে উদ্বৃত করেছেন। বিভিন্ন শব্দে এ হাদীস সহীহ প্রমাণিত। এর সূত্র্ও অনেক, তা মুতা্ওয়াতির র্মযাদা পযর্ন্ত পৌছে গেছে। (আরবী***********)] আর যে লোক প্রয়োজনাতিরিক্ত ধন-মালের মালিক এবং সে তার এক মুসলমান ভাইকে ক্ষুধার্ত বস্ত্রহীন ধ্বংসমুখী দেখতে পেল; কিন্তু তাত্ত্বে ও সে তার সাহায্য এগিয়ে এল না, সিঃন্দেহে বলা যায়, আল্লাহ তার প্রতি রহম করবেন না।
আবদুর রহমান ইবনে আবূ বকর সিদ্দীক (রা) থেকে বর্ণিত, ছুফফা বাসীরা ছিল খুবই দরিদ্র লোক। রাসূল করীম (স) ঘোষণাদিয়ে দিয়েছেলেন, যার কাছে দুইজনের খাবার আছে সে য়যন তৃতীয় একজন নিয়ে যায়. আর যার কছে চারজনের খাবার আছে সে যেন পঞ্চাম কিংবা ষষ্ঠ জনকে নিয়ে যায়। [ হাদীসটি আহমাদ উদ্বৃত করেছেন ১ম খন্ড-১৯৭,১৯৮,১৯৯ পৃষ্ঠায় এবং বুখারী তা উদ্বৃত করেছেন বিতাবুল মা্ওয়াকীত ও কিতাবুল মানাকিব তার প্রন্হের এ দুই অধ্যায়ে।]
ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, রাসূলেক করীম (সা) বলেছেনঃ মুসলমান মুসলমানের ভাই,
সে তার ওপর জুলুম করে না, তাকে ধ্বংস হ্ওয়ার জন্যে ছে্ড়ে ও দেয় না। [ হাদীসটি আহমাদ তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে ২য় খন্ডের ১৯ পৃষ্ঠায় এবং ৪র্থ খন্ডের ১০৪ পৃষ্ঠায়, বুখারী তাঁর সহীহ গ্রন্থের আল-মাজালিস ও ইকরাহ অধ্যায়ে, মুসলিম আল-বির-এ, আবূ দাউদ আল-আদব-এ এবং তিরমিযী সিফাতুলকিয়ামাহ অধ্যায়ে ইবনে উমর থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন।] যে লোক তাকে না খেয়ে বা বস্ত্রহীন হয়ে মরে যা্ওয়ার জন্যে অসহায় করে ছেড়ে দিল- তাকে খাবার ও পরার বস্ত্র দিতে সক্ষম হ্ওয়া সত্ত্বে ও, সে তাকে চরম ভাবে লজ্জিত করল।
আবূ সায়ীদ খুদরী থেকে বর্ণিত, রাসুলে করীম (সা) বলেছেনঃ যার কাছে দুপুরবেলার খাবার আছে সে যেন তাতে সে ব্যক্তিকে শরীক করে যার দুপুর বেলার খাবার নেই। আর যার কাছে অতিরিক্ত পাথেয় রয়েছে, সে যেন তা পাথেয়হীন ব্যক্তিকে দিয়ে দেয়। বলেছেনঃ অতঃপর রাসূলে করীম (স) কয়েক প্রকারের নিজেদের কারোর কোন হক নেই। [ মুসলিম আন-নিকাহ ওআল-লুকতাহ অধ্যায়ে, আবূ দাউদ কিতাবুযযাকাত –এ এবং আহমাদ তাঁর মুসনাদের ৩ য় খণ্ডের ৩৪ পৃষ্ঠায় উদ্ধৃত করেছেন।]
তার অর্থ এটা সাহাবাগণ (রা) এর ইজমা। আবূ সায়ীদ এ সংবাদ জানিয়েছেন। আর প্রত্যেকটি সংবাদেই আমরা তাই বলি।
আবূ মূসা (রা) এর সূত্রে নবী করীম (স) এর কথা এসেছে। তিনি বলেছেনঃ তোমরা সকলে বুভুক্ষুকে খাবার দা্ও এবং বন্দীকে মুক্ত কর। [বুখারী ও হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন। তাতে অতিরিক্ত কথা বুভুক্ষুকে খাবার দা্ও-এর পর রয়েছেঃ রোগীকে দেখতে যা্ও।] বলেছেনঃ এ র্পযায়ে কুরআন্ও সহীহ হাদীস অসংখ্য রয়েছে।
সাহাবিগণের উক্তি
হযরত উমর (রা) বলেছেনঃ আমি যদি আমার কোন কাজে অগ্রসর হই তাহলে কখনই ছপছনে হাটব না। আমি নিশ্চয়ই ধনী লোকদের উদ্বৃত্ত ধন-মাল নিয়ে তা গরীব মুহাজিরদের মধ্যে বন্টন করে দেব। [ ইবনে হাজম এ উক্তির সনদ সম্পর্কে বলেছেনঃ এ উক্তির সনদ চূড়ান্তভাবে সহীহ ও গাম্ভীর্যপূর্ণ।]
এবং হযরত আলী ইবনে আবূ তালিব (রা) বলেছেনঃ আল্লাহ তাআলা ধনী লোকদের ধন-মালে সে পরিমাণ
ফরয করে দিয়েছেন, যা তাদের গরীব লোকদের জন্যে যথেষ্ট হয়।এক্ষণে এ দরিদ্র লোকরা যদি অভুক্ত থাকে কিংবা বস্ত্রহীন নগ্ন হয়ে থাকে এবং এভাবে কষ্ট পায়, তাহলে তা শুধু ধনী লোকদের সেই পরিমাণ সম্পদ তাদের কে না দেয়ার কারনেমাত্র। আল্লাহ তাআলার সিদ্ধান্ত রয়েছে, কিয়ামতের দিন তিনি তাদের কাছে কৈফিয়ত চাইবেন, হিসেব নেবেন এবং সেজন্যে তিনি তাদের আযাব দেবেন।
ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেনঃ ধন-মালের যাকাত ছাড়া্ও প্রাপ্য রয়েছে।
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা), হাসান ইবনে আলী ও ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তাঁরা সকলে বলেছেনঃতাদের সকলেই তার জন্যে যে তাদের কাছে জিজ্ঞেস করবে। তুমি যদি জিজ্ঞাসিত হ্ও কোন বেদনাদায়ক রক্তে কিংবা কোন লজ্জাকর জরিমানার অথবা কষ্টদায়ক দারিদ্যের ব্যাপারে, তা হলে বুঝবে, তোমার প্রাপ্রটা ওয়াজিব হয়ে গেছে।
আবূ উবায়দাতা উবনূল জা্ররাহ ও তিনশ জন সাহাবী (রা) থেকে সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, একবার বিদেশ সফরে তাদের পাথেয় নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। তখন আবূ উবায়দাহ তাদের সকলের পাথেয় দুটি পাত্রে একত্র করে তাদের সকলকে সমান মানে ও পরিমাণে খাবার দিতে শুরু করেছিলেন। এ থেকে প্রমাণিত হলো যে, এটা সাহাবায়ে কিরামের (রা) সামষ্টিক ইজমা, এর বিপরীত মতের কেউ নেই।
শবী, মুজাহিদ, তায়ূস ও অন্যান্যদের থেকে সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তাঁর সকলেই বলেছেনঃ ধন-মালে যাকাত ছাড়া্ও প্রাপ্য রয়েছে।
ভিন্ন মতের লোকদের ইবনে হাজমের সমালোচনা
আবূ মুহাম্মাদ বলেছেন, উপরিউক্ত মতের বিপরীত মতের কোন লোক আছো বলে আমরা জানি না। তবে দহহাক ইবণে মুজাহিম ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি বলেছেনঃ ধন-মালে অন্য যত প্রাপ্যই (হক্) ছিল, যাকাত তা সবই মনসুখ করে দিয়েছে। কিন্তু দহাকের বর্ণনাই সহীহ নয় যখন, তখন তাঁর মত কি করে গ্রহণ করা যেতে পারে?[ আমি যদ্দূর জানি, দহতাককে কেউ যরূফ বলেনি, একমাত্র ইয়াহইয়া ইবনে মুয়ীন ছাড়া। আহমাদ তাকে সিকাহ বলেছেন, ইবনে মুয়ীন, আবূজ্জরয়া, আল-আজালী, ওদারে কুতনী্ও তাঁকে সিকাহ বলেছেন, ইবনে হাব্বান তাঁকে সিকাহ বর্ণনাকারীদের মধ্যে গণ্য করেছেন। ইবনে হাজার (আরবী***********)গ্রন্থে বলেছেনঃ সত্যবাদী বটে, তবে খুব বেশী মুরসাল হাদীসের বর্ণনাকারী অর্থাৎ সাহাবীর নাম উল্লেখ না করেই রাসূলের কথা বর্ণনা করেছেন।
(আরবী***********)তা ছাড়া কোন বর্ণনা যয়ীফ প্রমাণিত হলেই অভিমতের ও যয়ীফ প্রমাণিত হয়ে যায় না। ইবনে হজম তিই দাবি করেছেন। হাদীসবিশারদগন ইবনে আবূ লাইলাকে যয়ীফ বলেছেন; অথচ ফিকাহ শস্ত্রে তিনি ইমাম রুপে মান্য।]
অথচ আশ্চযের্র বিয়য়, এটাকে যে লোক দলিল হিসেবে পেশ করেছেন, তিনিই এর প্রথম নম্বরের বিরোধী। তিনি ধন-মালে যাকাত ছাড়া্ও প্রাপ্য আছে বলে মনে করেন সে প্রাপ্য যেমন, অভাবগ্রস্ত পিতামাতার খরছ বহন,স্ত্রীর, ক্রীতদাস-দাসীর, গবাদি পশুর জন্যে ব্যয় করা, ……….ণ ও জখম করার প্রতি মূল্য দান ইত্যাদি। দেখা গেল, এদের মধ্যে পারস্পর বৈপরীত্য রয়েছে।
তাঁর বলেন, যার পিপাসা লেগেছে এবং আংশকা দেখা দিয়েছে যে, সে এখনই পানি পান না করলে তার মৃত্য অনিবায,তাহলে তার যেখান থেকেই সে পারে পানি পান করার তার অধিকার রয়েছে। এমন কি সেজন্যে যুদ্ধ করতে হলে ও তা সে করবে।
অর্থাৎ পিপাসার দরুন মৃত্যু ঘনিয়ে এলে যে তাকে পানি দেবে না, তার বিরুদ্ধে
লড়াই করা যদি জয়েয হয়েত থাকে, তাহলেযে খাদ্য বস্ত্র না হলে তা নিবৃত্তকারী জিনিস- যারা দিতে চাচ্ছে না, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা তার পক্ষে জায়েয় হবে না নে যার তা নেই ?…….. এ দুটি অবস্থার মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়?………. এটা ইজমা, কুরআন, সুন্নাত ও কিয়াসের ও পরিপন্হী।
আবূ মুহাম্মাদ বলেছেনঃ ক্ষুধায় মৃত্যুমুখে পৌছে যা্ওয়া মুসলমানের পক্ষে তার সঙ্গী মুসলমান বা বিম্মীর কাছে অতিরিক্ত খাদ্য পা্ওয়া সত্ত্বে ও মৃত লাশ কিংবা শূকরের গোশত ভক্ষণ করে প্রাণ বাঁচানো জায়েয হতে পারে না। কেননা খা্দ্য যার কাছে আছে তার ওপর ফরয হচ্ছে সে বুভুক্ষুকে খাবার দেবে। কিন্তু ব্যাপার যদি উপরিউক্ত রুপ হয়, তাহলে ক্ষুধায় প্রাণ ওষ্ঠাগত ব্যক্তির মৃত লাশ বা শূকরের গোশত খা্ওয়া কিছুতেই জায়েয হতে পারে না। ত্ওফীক দেয়ার মালিক আল্লাহ। এ ব্যাপারে তার যুদ্ধ করার ও অধিকার আছে। তাতে যদি য়ে নিহত হয়, তাহলে হত্যাকারীর কিসাস করতে হবে আর দিতে অস্বীকারকারী নিহত হলে সে আল্লহ্ র অভিসম্পাতে পড়বে। কেননা সে একটা হক্ দিতে অস্বীকার করেছে, সে বিদ্রোহী দলে গণ্য।
আল্লাহ বলেছেনঃ
(আরবী***********)তাদের দুই পক্ষের এক পক্ষ যদি অপর পক্ষের ওপর সীমালঙ্ঘনেমূলক কাজ করে, তাহলে তোমরা সে পক্ষের বিরদ্ধে লড়াই কর, যে পক্ষ সীমালঙ্ঘন করেছে-যদ্দিন না সে পক্ষ আল্লাহ্ র মীমাংসার দিকে ফিরে আসে। [ (আরবী***********)]
অধিকার দিতে অস্বীকারকারী তার সে ভাইয়ের ওপর সীমালঙ্ঘনকারী, যার হক্ তার ওপর ধায হয়ে আছে। এ কারণেই হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) যাকাত দিতে অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। [(আরবী***********)শায়খ আহমাদ শাকের ইবনে হামের এমতের ওপর দীর্ঘ টীকা লিখেছেন। খু্বিই মূল্যবান সে টীকা।তা এখানে উল্লেখ করা উত্তম হবে। তাতে যেমন শিক্ষা আছে, তেমনি উপদেশ নসীহত্ও। তিনি বলেছেন-এ কথা ও ইসলামী শরীয়াতের অনুরুপ কথার ভিত্তিতে গ্রন্হকার মনে করেন; ইসলামী আইন প্রণয়ন খুবই উচ্চতর মানে যুক্তিবত্তা ও ন্যায় পরায়ণতার ভিত্তিতে বাস্তবয়িত হয়েছে। আমাদের ভাই মানব রচিত আইন পেয়ে খুবই মুগ্ধ ও গৌরবন্বিত মনে করেন- যাদের মন- মগজ তাতেই ডুবে আছে, তারা যদি ইসলামী আইন সম্পর্কে অবহিত হত ও তার মূলে নিহিত গভীর সূক্ষ্ম তত্ত্ব ও সৌন্দয অনুধাবন করতে সক্ষম হত. তাহলে কতই না ভালো হত! তাহলে তারা বুঝতে পারত যে, ইসলামী শরীয়াত পৃতথবীর বুকে সবচাইতে উন্নত এ উত্তম আইন বিধান। তাতে হৃদয়্ও মগজ পূর্ণ মাত্রায় পরি তৃপ্তি লাভ করতে পারে। তা প্রত্যক যুগে ও প্রত্যেক দেশেই বাস্তবায়িত হতে ও কল্যাণ দান করতে সক্ষম। কেননা আসলে তা অহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ। মুসলমানগণ যদি দ্বীন-ইসলামরে আইন বিধানের গভীর সূক্ষ্ম তাৎপয বুঝতে পারত ও নির্মল উৎস- সুমিষ্ট-সুস্বাদু পানীয় –কুরআন ও সুন্নাহ থেকে তা করতে ]
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
মুক্তকরণ ও অগ্রধিকার দান
দুই পক্ষের মধ্যকার দ্বন্দের ক্ষেত্র উদ্ঘাটন
দুই পক্ষের বক্তব্য এবং তাদের প্রত্যকের মতের সমর্থনে উপস্থাপিত দলিল প্রমাণ পেশ ও পেশ ও পর্যাচলোনার পর আমার মনে হচ্ছে, তাদের দুই দলের মধ্যকার বিরোধ-বিভক্তি অতটা বিশাল নয়, যতটা আমরা মনে করি। সন্দেহ নেই, তাদের মধ্যে ঐক্যের ক্ষেত্র্ও বহু রয়েছে। তাতে উভয়ের কেউই পরস্পরের সাথে বিরোধ ও মতপার্থক্য করে না।
ক. পিতামাতা অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়লে এবং তাদের সন্তান সচ্ছল থাকলে তাদের খরচ বহন সন্তানের কর্তব্য এবং তাদের অধিকার সর্বজনস্বীকৃত। এ ব্যাপারে কো দ্বন্দ্ব বা মত পার্থক্য নেই।
খ. নিকটবর্তীর হক্ ও অনুরুপভাবে মতপার্থক্য মুক্ত-সূচনা হিসেবে। অবশ্য কৈট্যের মাত্রায় বাধ্যতা সৃষ্টিকারী মাত্রায় সচ্ছল ও অসচ্ছল লোকদের পার্থক্যের দরুন তাদের মত্ও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে গেছে।
গ. খাদ্যাভাবে আক্রান্ত বা বস্ত্রহীনদের নগ্নতা অথবা আশ্রয় বঞ্চিত ব্যক্তির অধিকার আছে খাবার পা্ওয়ার, এ ব্যাপার্ওে কোন মতপার্থক্য নেই। আল-জাসসাস আহকামুল কুরআন গ্রন্থে লিখেছেনঃ আসলে পরয হচ্ছে যাকাত দেয়া। তবে সেখানে এমন কিছু ঘটনা সংঘটিত হয় যা পারস্পরিক সহানুভতি ও দান-প্রদান ওয়াজিব করে দেয়। যেমন
সচেষ্ট হত, আদেশসমূহ যথাযথ পালন করত, তাদের হৃদয়ের মনিকোঠায় তা লালন-পালন করত, যাবতীয় কাযার্বলীতে তা অসুসরণ করে চলত এসং তাদের সমাষ্টিক জীবন-পরিবেশে তা বাস্তায়িত করত, তাহলে তারাই হত দুনিয়ার সেরা জাতি! প্রশ্ন হচ্ছে, দুনিয়ায় যত ব্বংসাত্মক ও বিপযর্য়কারী বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে-সর্বাত্মক বিধ্বংসী ঘটনা বলী সংঘটিত হয়েছে তা প্রায় সবই কি গরীবদের ওপর ধনীকুলের জুলুম-জীড়ন-বঞ্চনার ফলে হয়নি? এক শ্রেণীর লোক দুনিয়ার ধন-সম্পদ করায়ত্ত করে সুখ, মাধুয লুঠছে আর তারই পাশে তাই ভাই উলংগ থকছে ও না খেয়ে ধুকে ধুকে মরছে।এর দৃষ্টন্ত তো ভুরি ভুরি দেয়া যায়। এমতাবস্থায় ধনী লোকরা যুদ অবস্থার নাজুকতা অনুধাবন করত তাহলে তারা নিঃসন্দেহে জানতে ও বুঝতে পারত যে, গরীব জনগণের কল্যাণ সাধনিই হতে পারে তাদের জানমালেন প্রথম রক্ষা কবচ। আল্লাহ তাদের জন্যে যা কিছু দেয়া ফরয করেছেন তাদের ওপর, ত যদি তার যতারীতি আদায় করতে থাকে তাহলেই তারা রক্ষা পেতে পারে।অতএব তাদের একথা বোঝা উচিত, জানা উচিত দুনিয়ায় আবর্তন বির্তনের কথা এবং আগে থেকেই সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেদায়েত দিন!…………. এ একটি সত্যের আ্ওয়াজ, শায়খ আ্ওয়াজ তুলেছেন। অন্যান্য বহু মানব দরদীরা যেমন আহমানকাল ধরেই এ আ্ওয়াজ দিচ্ছেন। কিন্তু তা শোনা হয়নি। তাই পরণাম যা হবার তাই হয়েছে।
বুভক্ষু- চূড়ান্ত মাত্রার এবং বস্ত্রহনি- চূড়ান্ত মাত্রার অথবা এমন মৃত ব্যক্তি, যার কাফণ–দাফনের কেউ নেই। [(আরবী******)]
এরূপ ঠেকায় পড়া ব্যক্তির দৃষ্টান্ত বালতি, কোদাল ও তৈজষপত্র ইত্যাদি ধার বাবদ ল্ওয়ার জন্যে যে ঠেকায় পড়ে সে এ জিনিস গুলো (আরবী******)পযার্য় ভুক্ত। কেননা মুসলিম ব্যাক্তির ক্ষতি ঠেকা দূর করা সর্বসম্মতভাবে ফরয।
ঘ. মুসলিম সমাজ সমষ্টিকে সাধারণভাবে ঘনীভূত হয়ে আসা সর্বান্মক বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করা-শত্রুর আক্রমণের আশংকা, কাফিরদের হাত থেকে মুসলিম বন্দীদের উদ্ধারনরণ, মহামারী ও দুর্ভিক্ষ ইত্যাদির প্রতিরোধ প্রভৃতি এ বিপদের পযার্য়ে পড়ে। এ সব অবস্থায় ব্যক্তি অধিকারের ওপর সমষ্টির অধিকর সর্বাগ্রগণ্য, এতে কোন সন্দেহ থাকতে পারে না। আর এসব কঠিন অবস্থার মধ্যে পারস্পরিক অংশ ভাগাভাগি করে নেয়াই যে ওয়াজিব, ত সমন্ত মুসলিম আলিমগণের কাছে সর্সম্মত।
আল-মিনহাজ –এর প্রতিরোধ-যেমন বস্ত্রহীনকে বস্ত্রদান, বুভুক্ষুকে খাদান ইত্যাদি। যদি যাকাত ও বায়তুলমালের সম্পদ তা প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়, তাহলে সক্ষম- লোকদের জন্যে ফরযে কেফায়া। আ সক্ষম সমর্থ লোক বলতে বোঝায় সে সব লোককে, যাদের কাছে এক বছরকালের জন্যে তাদের ও তাদের ওপর নির্ভরশীলদের জন্যে যথেষ্ট পরিমাণের অধিক সম্পদ স্ওজুদ আছে। আর উল্লিখিত ক্ষতি প্রতিরোধ বলতে কি বোঝায়? তা কি শুধু প্রাণটা বাঁচানের পরিমাণ খাদ্য দান, ন সর্ববিচারে যথেষ্ট পরিমাণ দিতে হবে?….. এর জবাবে দুটি কথা বলা হয়েছে। তন্মধ্যে সহীহতম কথা হচ্ছে এ শোয়োক্তিটি। কাপড় দান এমনপিরিমাণ হতে হবে যা শীত –গ্রীষ্মজনিত অবস্থায় প্রয়োজনীয় মানে গোটা দেহ আবৃত করতে সক্ষম হয়। আর খাদ্য ও ব্স্ত্র বলতে যা বোঝায় তাই দিতে হবে। চিকিৎসকের ভিজিট, ঔষধের মূল্য, কাজে সাহায্যকারী একজন খাদেম ইত্যাদি ও তার অন্তর্ভুক্তি হবে। একথা সকলের কাছে স্পষ্ট। [ (আরবী***********)]
পূর্বে যাকাত ব্যয়ের ক্ষেত্র পযার্য়ে সাবলিল্লাহর অংশ সম্পর্কে ইমাম নববী ও শাফেয়ী মায়হাবের অন্যান্য আলিমের মতের উল্লেখ আমরা করেছি। তা হচ্ছে সুশৃংখল সেনাবাহিনীর বেতন দান যদি বায়তুলমাল থেকে সম্ভবপর না হয়, তাহলে তা দেয়া সমাজের ধনী লোকদের দয়িত্ব হবে। তা যাকাতের বাইরে থেকে দিতে হবে।
মালিকী ফিকাহবিদ কাযী আবূ বকর ইবনুল আরাবী তাঁর (আরবী***********)গ্রন্থে লিখেছনঃ ধন-মালে যাকাত ভিন্ন আর কিছু পা্ওনা নেই। কিন্তু যাকাত দিয়ে পর যদি কোন প্রয়োজন দেখা দেয়, তাহলে সেজন্যে অর্থদান করা ধনী লোকদের কর্তব্য হবে, এতে সমস্ত আলিম একমত।
ইমাম মালিক বলেছেনঃ সমন্ত মুসলমারেন ওপর কর্তব্য, ওয়াজিব হচ্ছে কাফিরদের হস্তে তাদের লোক বন্দী হলে তা মুক্ত করা। তাতে তাদের সমস্ত ধন-মাল ও তা করতে হবে।
অনুরূপভাবে প্রশাসক যদি যাকাত সংগ্রহ করার পর তা পা্ওয়ার যোগ্য লোকদের মধ্যে বণ্টন না করে, তখন ও কি গরীরদের সচ্ছল বানানো কর্তব্য হবে ধনী লোকদের?………… খুবই বিবেচ্য বিষয়। আমার মতে, হ্যাঁ, তা তাদের ওপর ওয়াজিব হবে। [ (আরবী *********)]
কুরতুবী তাঁর তাফসীরে এ বিষয়টির ওপর খুব বেশী গুরুত্ব আরোফ করেছেন। লিখেছেনঃ মুসলিম জনসমষ্টির ওপর কোন বিপদ বা অভাব দেখা দিলে – যাকাত দিয়ে দেয়ার পর- সেজন্যে অর্থ ব্যয় করা ধনী লোকদের জন্যে ওয়াজিব।ইমাম মালিক (র) ও এ কথা উদ্ধৃত করেছেনঃ লোকদের ওপর ওয়াজিব তাদের বন্দীদের ফেদিয়া দিয়ে মুক্ত করা। তাতে তাদের সব মাল ঃশেষ হয়ে গেলে ও। তারপরে বলেছেনঃ এটা ইজমা ও বটে! তাতে আমাদের মতই শক্তি পায়। [(আরবী *********)] মালিকী পন্হী শাতেব তাঁর অনন্য গ্রন্হ (আরবী *********) এ লিখেছেনঃ বায়তুল মাল যখন শূন্য হয়ে বাবে, তখন যদি সেনাবাহিনীর জন্যে আর ও ধন-মালের প্রয়োজন দেখা দেয়, তাহলে সুবিচারক রাষ্ট্র- নায়কের অধিার আছে, সে ধনী লোকদের মাসিক বায়তুলমালে নতুন করে সম্পদ আসা পযর্ন্ত চলতে থাকবে। [(আরবী……….)]
এসব অকাট্য স্পষ্ট মত হচ্ছে সে ফিকাহবিদদের, যাঁরা ধন-মালের ওপর যাকাত-বহির্ভূত কোন হক্ ধায হতে পারে বলে মনে করেন না। এ থেকে একথাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, যাঁরা এ মত পোষণ করেন, তাঁরা আসলে অত্যাচারমূলক কর ধাযকরণেরই বিরোধিতা করেছেন। কেননা শাসক প্রশাসকরা সাধারণত এরূপ করই ধায করে থাকে তাদের নিজেদের এবং তাদের অনুসারীদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের বিপুলতা ও বিশালতা বিধানের উদ্দেশ্যে। কিন্তু তার ফলে গোটা জাতির জীবন কঠিনভাবে সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। যদি ও এরূপ কর ধাযর্করণের ফলে বিশেষ কোন প্রয়োজন পূরণ হয় না, সর্বসাধারণের কল্যাণের জন্যে ও তা প্রয়োজনীয় হয় না। সম্ভবত এ আলিমগণ ভয় পেয়েছেন এই ভে যে, যাকাতের বাইরে ও প্রাপ্য বা দেয় আছে, এ মত দিলে অত্যাচারী শাসকরা অনধিকারভাবে কর ধায র্ধায করা ও অত্যাচার মূলক অর্থ আদায়ে তাদের এমকে একটা মাধ্যম বনিয়ে নেবে। এ করণে তার তাদের এ জলুম মূলক কাযের্র পথ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে বলে দিয়েছেন যে, না যাকাতের বাইরে কিছুই নেয়ার বা পা্ওযার কোন অধিকর নেই। [ নবম অধ্যায়ে-যাকাত ও কর শীর্ষক সপ্ত পরিচেছদে বিস্তারিত আলোচনা দেয়া হয়েছে।]
কিন্তু এখানে এমন কয়েকটি ক্ষেত্র রয়েছে, যেখানে উভয় পক্ষ প্রকৃত মতদ্বৈততার মধ্যে পড়ে গেছে। কয়েকটি ক্ষেত্রের ও নাম উল্লেখ করা যাচ্ছেঃ
ক. কাটা কালে কৃষি ফসল ও কলের ওপর হক;
খ মেহমানে অধিকার;
গ. সধারণ ব্যাবর্হায ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের (আরবী*****) হক।
দ্বিতীয় কতের লোকদের দৃষ্টিতে উপরিউক্ত সব গুলোই ধন-মালে ওয়াজিব হক। তা আদায় করতে ক্রটি করা হলে মুসলাম গুনাহগার হবে এবং সেজন্যে আল্লহর কাছে কঠিন আযাব পা্ওয়ার যোগ্র বিবেচিত হবে।
পক্ষান্তরে প্রথম মতের লোকদের দৃষ্টিতে ওগুলো মুস্তাহাব হক্।করলে আল্লাহর কাছে স্ওয়অব পা্ওয়া যাবে আর না কররৈ কোন গুনাহ হবে না যতক্ষন পযর্ন্ত তার বাস্তবিক প্রয়োজন দেখা নো দেবে। তা দেখা দিলে তো তা ওয়াজিব হয়ে পড়বে।
জাসসাস বালতি তৈজসপত্র, ভাণ্ড- বাটি,কোদাল ইত্যাদি ধার বাবদ দেয়া পযার্য়ে এ কথাই বলেছেন। [ (আরবী***********)]এসব জিনিষ ধার বাবদ দেয় প্রয়োজনকালে তো ওয়াজিব।দিতে অস্বীকার করলে সে ঘৃণা ও তিরস্কারের যোগ্য হবে। প্রয়োজন ব্যতিরেকে তা দিতে অস্বীকার করা হলে নিশ্ছয়ই তা অপরাধ এবং মুসলিম সমাজের রীতিনতি চরিত্রের বিরোধিতা হবে অথচ নবী করীম(স) বলেছেনঃ আমি তো উত্তম ও মহান চরিত্রাবলীকে পূর্ণত্ব দানের উদ্দেশ্য প্রেরিত হয়েছি। [বুখারী এ হাদীসটি (আরবী***********)এ উদ্ধৃত করেছেন এবং ইবনে সায়াদ (আরবী*********)গ্রন্থে হাকেম (আরবী***********)গ্রন্থে, বায়হাকী (আরবী*********)এ আবূহুরায়রা থেকে বর্ণিত। হাদীসটির সনদ সহীহ ব্যাখ্যা (আরবী*********)]
ঙ. এ পযর্ন্ত আংশিক অধিকার পযার্য়ে যা কিছুই বলেছি, তা ধনীদের ধন-সম্পদে গরীব লোকদের অধিকর সম্পর্কে বলেছি। দ্বিতীয় মাযহাব পন্হীদের দৃষ্টিতে্ এ অধিকার গুলো ওয়াজিব। প্রত্যেক দেশ-শহর স্থানের ধনীলোকদের খাদ্য, পানীয়, বস্ত্র ও বাসস্থান ইত্যাদি যথেষ্ট পরিমাণে দিয়ে গরীবদের পর্শ্বে দাঁড়াবে। এ ছাড়া্ও আর ও যা যা প্রয়োজন তা্ও এর মধ্যে গণ্য। এজন্যে প্রশাসন ধনীদেরকে বাধ্য করবে, যদি যাকাত বায়তুলমালের অন্যান্য আয় তেকে তা পূরণ না হয়।
পযার্লোচনা ও অগ্রাধিকার দান
এ অধিকার সমূহ যথেষ্ট বিরোধী- বিশেষ করে এ শেষোক্তটি।এ জন্যে সম্মুখে অগ্রসর হ্ওয়ার পূর্বে এখানে কিছুটা স্থিতি গ্রহণ করা আবশ্যক।
১. কাটাইর সময় ফসল ও ফলের হক্ পযার্য়ে ফসল ও ফলের যাকাত শীর্ষক আলোচনায় এমতকেই অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছি যে, এ হকের অর্থ হচ্ছে ওশর ও অর্ধ ওশর। পূর্বের কিছু লোক এমতই দিয়েছেন, তাতে আয়াতটির মক্কী হ্ওয়ার পথে
কোন প্রতিবন্ধকতা নেই। মক্কী যুগে আল্লাহ তা আলা উক্ত হক্ আদায় সংক্ষিপ্ত ও মোটামুটি নির্দেশ দিয়েছেন। পর মদীনায় এসে রাসূলে করীম (স) এর জবানীতে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করিয়েছেন। ফলে তা এমন সংক্ষিপ্ত ও মোটামুটি কথা যার বিস্তারিত আল্লাহই বলে দিয়েছেন। আগের কালের কেউ কেউ যে মনসূখের কথা তুলেছেন, এটা তার ও ব্যাখ্যা।
২. মেহমানের হক্ পযার্য়ের হাদীসসমূহ থেকে একথা সুস্পষ্ট যে, তার অর্থ, এমন বিদেশী লোক, যে কোন দূরবর্তী স্থান থেকে এখানে এসেছে। সে তখন ঃনিঃস্ব পথিক (ইবনুস সাবীল) পযার্য়ে গণ্য। এ কারণে ইবনে আব্বাস ও তাবেয়ীদের একটি দল বলেছেনঃ ইবনুস সাবীল বলতে মেহমান বুঝিয়েছে। [দেখনঃ (আরবী*********)] হাদীসসমূহ স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে যে. মেহমানের আসলে তার মেহমানদারী পা্ওয়ার অধিকার আছে। আর এটা নিঃসন্দেহ যে, এ ব্যবস্থা যাকাতের বাইরে এবং অতিরিক্ত।
৩. (আরবী********) সাধারণ ব্যবহায জরুরী জিনিসপত্রের অধিকার বা তার ওপর জনগণের হক সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তার যৌক্তিকতা এই যে, যদি তা ওয়াজিব না তহ, তাহলো তা তরক করার দরুন আযাবের ভয় প্রদর্শন করা হত না. কুরআনে জাহান্নামের হুমকি দেয়া হত না। যাঁরা এ (আরবী********) এর অর্থ যাকাত করেছেন, তাঁরা্ও একথা বলেন নি যে, ঘরের সাধারণ জিনিসপত্র, যা লোকরা পারস্পরিক ধার ও দেয়া-নেয়া করে। এ থেকে তা বোঝা যায় না।
৪. ধনী লোকদের ধন-মালে ফকীর-মিসকীনের যে হক্ আছে এবং তাদের প্রতি দয়া-অনগ্রহের ব্যবহার করাকে আল্লাহ তা আলা যে ওয়াজিব করেছেন, তাদের খা্ওয়া-পরা ইত্যাদি প্রয়োজন সমূহ পূরণের যে তাগিদ আছে ত এতই স্পষ্ট ও প্রকট যে. তা একটা দটো আয়াতে কিংবা একটা বা দুটো হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলিষ্ঠ করে তোলার কোন প্রয়োজনই নেই। তবে আলিমগণ (আরবী**********) আয়াতটি এবং ধন-মালে যাকত ছাড়া্ও হক্ আছে-এ হাদীস উল্লেখ করার পদক্ষেপ নিয়েছেন, তা শুধু প্রথম ভি্ত্তি স্থাপন ও স্বরূপ নির্ধারণের উদ্দেশ্যে মাত্র্। আর তা হচ্ছে ধন-মালে যাকাত ছাড়া্ও হক্ আছে। কিন্তু মূল বিষয়টি সম্পর্কে দলিল- প্রমাণসমূহ নবীন ঊষার রক্তিম আলোকছটার ছাইতে এ অধিক স্পষ্ট এ প্রকট। কেননা ইসলামী ব্যবস্থার প্রকৃতি কুরআনের মাক্কী ও মাদানী আয়াত সমূহের আলোরক যে ভাবে গড়ে উঠেছে এবং রাসূলে করীম (স) এ সহীহ হাসান হাদীসসমূহ যেভাবে তার লালন করেছে, তাতে সমাজে পারস্পরিক দায়িত্ব গ্রহণ ও নিরাপত্তা বিধান অবশ্য কর্তব্য হয়ে গেছে। পারস্পরিক সহানুভূতি ও সহৃদয়তা- ওয়াজিব, রক্ষা করা একান্তই কর্তব্য। তার এ সমজে শক্তিমান দুর্ধর্ষ দুর্বল হতে বাধ্য। প্রতিবেশীদের পারস্পরিক অনগ্রহের আদান-প্রদান অনিবায। যে লোক ইসলামের এসব মহান উচ্চশিক্ষার এ আদর্শ অগ্রাহ্য করবে, তার
জন্যে ইসলামে ও কিছু নেই, রাসূল (স) এর কাছে ও কিছু নেই। সে আল্লাহ থেকে নিঃসম্পর্ক আল্লাহ ও নিঃসম্পর্ক তর সাথে।
বনু তামীম গোত্রের এক ব্যক্তি রাসূলে করীম (স) এর কাছে উপস্থিত হয়ে বললঃ ইয়া সাসূলুল্লাহ, আমি বিপুল ধন-সম্পদের মালিক। আমার পরিবারবর্গ ও আছে, আমার কছে উপস্থিত এ হয় অনেক লোক। এখন বলুন, আমি আমার ধন-সম্পদ কিভাবে ব্যয় করব? আমাকে জানিয়ে দিন, আমি কেমন করন? তিনি বললেনঃ তোমার মালেন যাকাত দিয়ে দেবে। কেননা তা পবিত্রকারী তোমাকে পবিত্র করবে। তোমার নিকটাত্মীয়দের সাথে ছেলায়ে মেহমী কর,ভিক্ষা প্রার্থীর, প্রতিবেশীর ও মিসকীনের হক্ আছে জানবে। [ আহমদ আনাস থেকে হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন। এর বর্ণনাকরী সকলেই সিকাহ সহীহ। (আরবী*******) আবূ উমাইদ ও ইবনুল মুনযির ও তা উদ্ধৃত করেছেন। (আরবী********)]
এ বাণীতে ভিক্ষাপ্রার্থী, প্রতিবেশ ও মিসকীনের হক্ আছে বলে ঘোষণা করা হয়েছে এবং ত যাকাতের পরের কথা। যাকাতের পর নিকটাত্মীয়দের হকের কথা বলা হয়েছে। এ কথাটি ঠিক কুরআরে আয়াতের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণঃ এবং দা্ও নিকটাত্মীয়কে তা হক্ এবং মিসকীন ও নিঃস্ব পথিকের। অন্য হাদীসের সাথে্ও তার পূর্ণ সঙ্গতি বিদ্যমান- ভিক্ষাপ্রার্থীর অধিকার আছে- অবশ্যই স্বীক্রতব্য, সে অশ্বারোহী হলে এলে ও। [হাদীসটি আহমদ মুসনাদুল হুসাইন ইবনে আলীতে উদ্ধৃত করেছেন। আবূ দাউদ কিতাবুযযাকাত –এ (আরবী******) হাফেয ইরাকী বলেছেন, এ সনদ খবই উত্তম। বর্ণনাকারীরা এ সিকাহ (আরবী*******) এ শায়খ আহমদ শাকের তাঁর মুসনাদের ওপর লিখিত টীকায় হদীসটিকে সহীহ বলেছেন। (আরবী********)]
রাসূল ররীম (স) বলেছেনঃ যে লোক মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহ ও তার প্রতি রহম করেন না। [ বখারী, মুসলিম এ তিরমিযী জরীর ইবনে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। পূর্বে ও হাদীস উদ্ধত হয়েছে এ গ্রন্থে।]
রাসূলে করীম(স) বলেছেনঃ তোমরা কখ্খনই ঈমানদার হতে পারবে না, যদি ন তোমরা পরস্পর দয়া ও অনুগ্রহ কর। সাহাবায়ে কিরাম বললেনঃ হে রাসূল আমরা প্রত্যেকেই দয়া সম্পন্ন। বললেনঃ তোমাদের পারস্পরিক দয়া-অনুগ্রহের কথাই বলছিলাম। [তাবারানী হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন আবূমূসা থেকে। সহীহ হাদীসের বর্ণনাকরীরাই এ বর্ণনাকারী।
মনযেরী তাই বলেছেন (আরবী***********)৩য় খন্ড (আরবী***********)–তে।]
এধরনের আর ও অনেক হাদীস।
উপরিউক্ত আয়াত ও হাদীসসমূহ যে পারস্পরিক দয়া-অনুগ্রহ, সহযোহিতা, দায়িত্ব গ্রহণ ও সমর্মিতার নির্দেশ দেয়, তা বাস্তবায়িত হতে পারে কেবল তখন, যখন এ সমাজের সমান মানের অনুকূল অর্থ ব্যবস্থায় প্রত্যেকটি ব্যক্তিই তার ও তার পরিবারবর্গে
খাদ্য, পানীয, পরিধেয়, বাসস্থান, শিক্ষা ও অন্যান্য যাবতীয় মৌলিক প্রয়োজনীতা জিনিস পায়- তার কেন একটি থেকে ও বঞ্চিত না হয়।
রাষ্ট্রের যাকাত সম্পদ ও বায়তুলমালের আয় যদি এরূপ সমানের অর্থ ব্যবস্থা কার্যকর করার জন্যে যথেষ্ট হয়, তাহলে তো ভালই। তখন মুমিন লোকেরা গরীব-মিসকীনের অপরাপর অধিকার আদায়ের জন্যে চেষ্টিত হবে। কিন্তু যাকাত সম্পদ ও ন্যায্য আয় যদি দারিদ্র মোচনে যথেষ্ট মাত্রায় সক্ষম না হয়, গরীব লোকদের সচ্ছল বানাতে না পারে, তা হলে সক্ষম ধনী লোকদের দায়িত্ব হচ্ছে এ গরীবদের প্রয়োজন যথেষ্ট মাত্রায় পূরনণর জন্য তারা ছেষ্চানুবর্তী হবে। প্রত্যেকই তার নিকটাত্মীয়তার মীমার মধ্যে কাজ করবে, ছেলাযয় রেহমী রক্ষা করবে। তাদের কিছু লোক যখন এ কর্তব্য পালন করে তাদের ঈমান রক্ষায় উঠে পরড় লাগবে, যার ফলে অভাবগ্রস্ত লোকেরা তাদের প্রয়োজন পূরণ করতে সক্ষম হবে, তখন অন্যরা ও গুনাহ থেকে রক্ষা পাবে। অন্যথায় রাষ্ট্রশাসকের দয়িত্ব হবে ইসলামের নামে এ কাজে হস্তক্ষেপ করা এবং অক্ষম গরীব লোকদের প্রয়োজন পূরণের ব্যবহস্থাস্বরূপ ধনী লোকদের ওপর মাসিক হারে সাহায্য ধার্য করে দেয়া।
দুনিয়ার বহ লোকই যখন এই অগ্রবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তখন্ও ইউরোপ এ ব্যবস্থ সম্পর্কে অনবহিত ছিল। ইউরোপ এ সেদিন মাত্র এ ধরনের কল্যাণকর ব্যবস্থা সম্পর্ক অবিহিত হতে পেরেছে অথচ ইসলামের কুরআন ও সুন্নাহ এ ব্যবস্থা সেদিন থেকেই কর্যকর ভাবে চালু করেছে, যেদিন ইসলামের সূর্য দিহন্ত উদ্ভাসিত করেছিল, রাসূলো করীম (স) এর সাহাবী এবং তাবেয়ীগণ কোনপূপ অস্পষ্টতা ও দারণাহীনতা ছাড়াই এক কাজকে চালু করে দিয়েছিলেন।

About শিবির অনলাইন লাইব্রেরী