ইসলামের যাকাত বিধান – ২য় খন্ড

ভিন্ন কতের লোকদের দলিল হিসেবে উপস্থাপিত হাদীসসমীহের তাৎপর্য
এক্ষণে প্রশ্ন জাগে, সে সব হাদীসের কি ব্যাখ্যা হতে পারে, যা বাহ্যতা প্রকাশ করছে যে,ধন-মালে যাকাত ছাড়া আর কিছুই প্রাপ্য নেই নফল দান-সাদকা ছাড়া এবং যে লোক যাকাত দিয়ে দিল সে তার দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে পালন করে বসেছে?এসব হাদীসের মধ্যে যে কয়টি সহীহ প্রমাণিত হয়েছে। তা থেকে আমাদের সম্মুখে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, যাকাত হচ্ছে অবর্তনশীল দায়িত্ব এ কর্তব্য- তা সুনির্দিষ্ট ও স্থায়ী ভোবে ধন-মাল ধার্য হয়। প্রত্যক্ষ ভাবে স্থায়ী রূপ নিয়ে তা সরাসরি ধন-মালের ওপর ধার্য হয়। তা দিয়ে আল।লাহর নিয়ামত দানের শোকর আদায় করা হয়। ব্যাক্তির ওপর কর্যকর।তা দিযে আল্লাহর নিয়ামত দানের শোকর আদায় করা হয়। ব্যক্তির নিজের মন-মানসিকতা এ ধন-মালের পবিত্রতা এ পরিশুদ্ধতা অর্জন করা হয়। এটা এমন একটা হক্ যা আদায় না করে কোন উপায় নেই। কখন্ও যদি এমন হয় যে, যাকাত গ্রহণের জন্যে একজন ফকীর বা মিসকীন এ পাএয়া যাচ্ছে না, যার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা যেথে পারে কিংবা যাকাতের অংশ ব্যয় করার যদি আদৌ কোন প্রয়োজনই না থাকে, তবুই তা দিতে হবে।
১. এ অধ্যায়ের শুরীতে এ হাদীসসমূহের মর্যাদা সম্পর্কে আমরা আলোচনা করেছি।
এ পর্যায়ে নিসাব পরিমাণ সম্পদরে মালিক মুসলিম ব্যক্তির কাছে সধারণ এ স্বাভাবিক অবস্থায় যাকাত ছাড়া আর কিছুই দাবি করা যাবে না, একথা ঠিক এবং সে যখন এ যাকাত দিয়ে দিল, তখন তার ধন-মলের এপর ধার্যকৃত দায়িত্ব পালন করে বসল তার ধন-মলের ওপর থেকে অন্যায় এ পাপকে ধর করে দিল। অতঃপর সে যদি নফলস্বরূপ কিছু দান –সদকা করে তা হলে সে কথা স্বতন্ত্র, তাছাড়া তার আর কোন দায়ত্ব থাকে না হাদীসে যেমন বলা হয়েছে, এট সাধারণ এবং স্বাভাবিক অব্থার স্থায়ী ব্যবস্থা।
কিন্তু অন্যান্য যেসব হক –হকুকের কথা বলা হয়েছে, তা যাকাতের কত স্থায়ী ভাবে ধার্যকৃত কোন জিনিস নয়। তার সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট কোন পরিমাণএ নেই—যেমন যাকাতের পরিনাণ সুনির্দিষ্ট এ স্থয়ী, অপরিবর্তনীয়। এ শেয়োক্ত হক-হকুক অবস্থার এ প্রয়োজনের পার্থক্যর দরুন বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে এবং অবস্থ,যুগ-কাল ও পরিবেশ- পরিস্থিতির পরিবর্তনে তা পরিবর্তিত এ হয়।
এসব হক- হকুক সাধারণত মূলা সম্পদের ওপর ধার্য হয় না, সেই হিসেবে এ হয় না।তা হয় সামর্থ্যানুপাতে এবং কিছু লোক যখন তা্ও পালন করে –আদায় করে, তখন অন্যাদের ওপর থেকে ও সে দায়িত্ব পালিত হয়ে যায়। অনেক সময় ত নির্দিষ্ট হয় এভাবে যে, একজন এক ব্যক্তিকে খুব সাংঘাতিক দূরবস্থায় পড়ে দেখতে পেল, সে তার এ দূরস্থা দূর ররতে পারে বলে; মনে করল তখন তা রা তর জন্যে কর্তব্য অথবা কারোর প্রতিবেশী অভুক্ত কিংবা বস্ত্রীন থাকলে এবং তাকে খাদ্য ও বসত্র সে দিতে সক্ষম হলে তাএ তার করা কর্তব্য। সাধারণভাবে এসব হক-হককি আদায় করার ব্যাপারটি ব্যক্তিদের ঈমান এ দায়িত্ব জ্ঞানের ওপর নির্ভর করা হয়- কোনরূপ রাষ্ট্রীয় হস্থক্ষেপ বা প্রভাব বিস্তার ছাড়াই ব্যক্তিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা আজ্ঞাম দেয়, সেটি ই চাওয়া হয়। কিন্ত কোন মুসলিম শসক যদি মনে করে যে, এ ঈমানী ওয়াজিব কাজটিকে আইনের শক্তিতে কর্যকর করা কর্তব্য- বিশেষ করে ব্যক্তিগণেল অভাব য়খন তীব্যতর হয়ে দেখা দেয় কিংবা রাষ্ট্রের ব্যয় ভার ও দায়িত্ব –পরিধি বেঢ়ে যায়-একালে যেমন ঘটছে-এরূপ অবস্থায় রাষ্ট্রকে তাতে হস্তক্ষেপ করতে হবে। এটা তার জন্যে একটা বাধ্যবাধকতা বিশেষ।ইবনে তাইমিয়ি ধন-মালে যাকাত ছাড়া আর কিছু প্রাপ্য নেই কথাটির ব্যাখ্যায় বলেছেনঃ এর আর্থ ধন-মালে এমন কোন হক্ বাং প্রাপ্য নেই যাকাত ঃছাড়া, যা বেলমাত্র ধন-মালের দরুনই ওয়াজিব হয়ে থাকে। অন্যথায় এমন বহ দায়িত্ব এ কর্তব্যই রয়েছে, যা কেবলা ধন-মালের দররন ওয়াজিব হয় না। মেন কিটাত্মীয়,স্ত্রী, দাস এ গবাদিপশুর প্রতি কর্তব্য অবশ্য পালনীয় হয়ে পড়ে। আনেক সময় রক্ত মূল্য দেয়ার এ দায়িকত্ব আসে। রিণ শোধ করার প্রয়োজন হয়ে পড়। বুভুক্ষুকে খাবার খ্ওয়ানো, বস্ত্রহীনকে পরেধেয় দেয়া পরযে কেফায়া হিসেবে জরুরী হয়ে পড়ে।
এগুলো্ও অর্থনৈতিক দায়দায়িত্ব হলে ও তা অস্থায়ী কারণের দরুন। ধন-মাল হলা এয়াজিব হ্ওয়ার শর্ত-যেমন হজ্জ পালনে সামর্থ্য একটা শর্ত। এখানে দেহ বা স্বাস্থ্য হজ্জ ফরয হ্ওয়ার জন্যে জরুরী আর যাকাত ফরয হ্ওয়ার জন্য নিসাব পরিমাণ ধন-মাল থাকা শর্ত। তা কারণ্ও বটে। মন কি, সে স্থানে যাকাত পা্ওয়ার য়োগ্য লোক পা্ওয়া না গেল্ওে তা ফরযই থাকবে, তবে অন্যত্র নিয়ে বন্টন বরতে হবে। এটা আল্লাহর হক-আল্লাহরই নির্দেশে তা ফরয হয়েছে। [(আরবী********)]
ষষ্ঠ অধ্যায়
যাকত ও কর
কর –এর মৌল তত্ত্ব এ যাকাতের মৌল তত্ত্ব।
কর ধরার আদর্শিক ভিত্তি এবং যাকাত ধার্য করার ভিত্তি।ৎকর এর কেষত্র এবঙ যাকতের ক্ষেত্র।
কর ও যাকাতের মধ্যে ন্যায় পরতার প্রাথমিক নীতি।
কর ও যাকাতের মধ্যে ন্যায়পরতার প্রাথমিক নীতি।
কর ও যাকাতের মধ্যে আপেক্ষিকতা ও হার উচ্চাতা।
কর এর নিরাপত্তা।
যাকাতের সঙ্গে কর ধার্যকরণ কি বিধিসম্মত?
কর ধার্যকরণে যাকাত ফরয হ্ওয়ার প্রয়োজন কি ফরিয়ে যায়?
যাকাত ও কর
এ অধ্যায়ে আমরা ইসলামী মরীয়াতের বিধান করা যাকাত এবং মানুষ প্রবর্তিত কর এর মধ্য তুলনামূলক অধ্যয়ন করতে ইচ্ছা করেছি। আধনিক চিন্তাধারা ও অর্থ তুলনা করব না রোমান ও পারস্য সভ্যতার বা মধ্য যুগের অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে। কেননা সেসব যুগের প্রক্ষিতে যাকাত এ ক এর মধ্যে তুলনা করার কোন সাধ্যই আমাদের নেই। আমরা যাকাতের যুলনা করব কর-এর সাথে তার আধনিক অবস্থা ও রূপের পরিপ্রেক্ষিতে বহু বিবর্তন ও পরিবর্তনের স্তর পার হয়ে আসার পর। এখন তাতে বহু সুসমতা, সমঞ্জস্য ও সৌর্দর্য বিধানের কাজ সম্পাদিত হয়েছে। যগোন্তরের অভি।জ্ঞতা তো ওদাষ-ক্রটি জঞ্জাল অনেক কিছুই দূরীভূত করে তাকে অধিকতর পরিচ্ছন্ন করে দিয়েছে। নিয়অর বিভিন্ন অঞ্চল ও পরিবেশ পরিস্থিতি থেকে বহু বড় বড় বিদ্ধান- দুদ্ধিমান ব্যক্তিরা তার বিরাট খিদমত আজ্ঞাম দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত তা পরিপক্কতা লাভ করে নিজের শ্কত কন্ডের ওপর মাথা ও তুলে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে।
এ অধ্যায়ের বিভিন্ন পরিচ্ছেদে যাকাত ও আধনিক কর-ব্যবসহথার মধ্যে সাদৃশ্য ও অভিন্নতার দিকগেুলো তুলে ধরব, যার ফল ভয়েল।প্রকৃত নিগূড় তত্ত্ব উদঘাটিত হবে। যাকাত একাট অর্থনৈতিক ও শেষ প্রকৃতিসম্পন্ন পরয় হিসেবে প্রতিভাত হবে। জানা যাবে, তার মূল দর্শন্ও সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তার প্রকৃতি ও মৌল ভিত্তি অন্য সব খিছু থেকে সম্পূর্ণ আলাদা তার আয়েল সূত্র এবং ব্যয়ের খাতসমূহ ও তার মাত্রার পরিমাণ। অনুরূপভাবে তা স্বতন্ত্র তার সূচনা বা প্রিাথমিক পদক্ষেপ ও চূড়ান্ত লক্ষ্য সমূহ, নিরাপত্তা দানের যোগ্যতা বা ততোধিক শতাব্দী পূর্বে বিধ্বদ্ধ হয়েছে, এ যুগের অর্থনৈতিক ও কর সংক্রান্ত চিন্তা মুলনীতি ও বিধি-বিধানের দিক দিয়ে যতদূর উন্নীত হয়েছে, যাকাত তা্ও ছাড়িয়ে গেছে। যাকাতে নিহিত তৎপর্য- বিশেষত্ব লাভ করতে কর চিরদিনই অসমর্থ থাকবে। কিন্তু তা বি করে সম্ভব হল? তা্ও আলোচিত হবে।
এই অধ্যায়ে আটটি পরিচ্ছেদ সংযোজিত হচ্ছে
১. কর-এ মৌল তত্ত্ব ও যাকতের মৌল তত্ত্ব
২. কর ধার্য করণ ও যাকাত ধার্য করণেল দার্শনিক ভিত্তি কার –এর ক্ষেত্র সমর্থ্য ও যাকাতের ক্ষেত্র –সামর্থ্য
৪. কর ও যাকাতের মধ্যে সুবিচারের মৌল নীতি
৫. কর ও যাকাতের মধ্যে আরপক্ষিক ও ঊর্ধ্বতার হার
৬. কর এর নিরাপত্তা বিধান এবং যাকতের নিরাপত্তা বিধান
৭. যাকাতের পাশে কর বিধিদ্ধকরণ
৮. কর ধার্য করণ যাকাতকে অপ্রয়োজনীয় প্রমাণ করে না
প্রথম পরিচ্ছেদ
কর এর মৌল তত্ত্ব ও যাকাতের মৌল তত্ত্ব
অর্থনীতিবিদগণ জানেন, কর হচ্ছে একটা অর্থনৈতিক বাধ্যবধকতা। ধনী ব্যক্তি তা রাষ্ট্রের কাছে দিয়ে ওযতে থাকে। অবষ্য দেয়অল মত সামর্থ্য যদি তার থাকে। রাষ্ট্র সাধারণ ভাবে যেসব কল্যাণ মূলক কাজ করে তার মাধ্যমে যে সব সুযোগ সুবিধা করদাতা লাভ করে, সেদিকে তেমনটা দৃষ্টি দেয়া হয়না। অবশ্য রাষ্ট্র সরকান তার আয়ের দ্বারা একদিকে যেমন প্রশাসনিক ব্যয় ভার বহন করে তেমনি অিপরদিক দিয়ে রাষ্ট্র যেসব অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়িত করার সিদ্ধান্ত নেয় তার বাস্তবায়ন করে অপরিদিকে। [ ডঃ মুহম্মাদ ফুযাদ ইবরাহীম লিখিত আরবী গ্রন্থে(আরবী************) এর প্রথম খন্ড ২৬১ পৃষ্ঠা থেখে উদ্ধৃত। তাতে এ সংজ্ঞাটি গ্রহণ করা হয়েছে কর প্রভৃতি গগে ওঠার রূপ এবং তার লক্ষ্য সম্পর্কিত আলাচনার সার হিসেবে।]
আর যাককত শরীয়াত পারদর্শীদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী একটা সুনির্দষ্ট অধিকার যা আল্লাহ তা আলা মুসলমাদের ধন-মালে ধার্য করেছেন। তাঁর কিভাবে ঘোষিত ফকীর-মিসকীন ওঅন্যান্য পা্ওযার যোগ্য লোকদের জন্যে, আল্লাহর নিয়ামতের শোকর এবং তাঁর কৈকট্য লাভের জন্যে এবঙ মালের মালিকের মন-মানকিতার এবঙ তার ধন-মালেন পরিশুদ্ধকরণের লক্ষ্যে।
যাকাত ও কর এর পারষ্পরিক একত্বের কতিপয় দিক
উপরে যাকাত ও কর এর যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তার থেকে স্পষ্ট হয় যে, এদুটিরমেধ্যে পারস্পরিক বৈপরীত্যের কতগুগুলো দক রয়েছে এবং রয়েছৈ কর ও যাকাতের মধ্যে কতিফয় সাদৃশ্যের দিক্ও। প্রথমে সাদৃশ্য এ অভিন্নতার দিক কয়টি তুলে ধরছিঃ
ক. সাধ্যকরণ ও জোরপূর্বক আদায় করা যা না হলে সাধারণত কর আদায় হয় না এর ব্যবস্থা বা সুযোগ যাকাতে ও রয়েছে, যদি কেউ ঈমান ও ইসলামের দাবি ও তগিদে স্বতঃস্ফূর্তভাব না দেয়। যাকাত দিতে অস্বীকারকরীদের বিরুদ্ধে অসত্য শক্তি প্রয়োগ করে ও তা আদয় করার বিধান ইসলামে রয়েছে। এর চাইতে অধিক জোর –জবরদস্তির ও বাধ্যকরণের উপায় আর কিত হতে পারে? যাকাত দিতে অস্বীকারকারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে তলোয়ারের খাপ মক্ত করতে যিনি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তিনি অতি বড় শক্তির অধিকারী ছিলেন।
খ. কর এর বিশেষত্ব হল, তা সাধারণ ধান ভান্ডা কেন্দ্রীয় সরাকারের তহবিলে
অর্পণ রা হয় স্থানীয় সরকার ও বাদ যায় না। [ কর প্রসংগে এ শর্তটি আরোপ করা হয়েছে মধ্য যুগে ইউরোপে কৃষকরা জমির মালিককে কর দিত সে অবস্থা এড়াবার লক্ষ্যে।] যাকাত ও এ রকমই। কেননা যাকাত সূলত সরকারের কাছেই দেয়। তা দিতে হয় কুরআন ঘেষিত (আরবী***************) যাকাত কাজে নিয়েজিত কর্মচারীদের মাধ্যমে। এ বিষয়ে যাথাস্থানে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
গ. কর ব্যবস্থার মেীলনীতি হচ্ছে তার বিনিময়ে বিশেষ ও সুনির্দিষ্ট কিছু না পা্ওয়া।যার ওপর কর ধার্য হয়েছে সে বিশেষ সমাজ সমষ্টির অংশ হিসেবেই কর দেবে। সে উপকৃত হয় কর এর বিভিন্ন ব্যবহার ও তৎপরতার দরুন। যাকাত দানের মুকাবিলায়্ও দাতা কোন বিশেষ ফায়দা পা্ওয়অর লক্ষ্যে তা দেয় না। সে যেহেতু এমন একটি মুসলিম সমাজের অংশ যার সাহায্য সমর্থন দায়িত্ব গ্রহণ ভ্রাতৃত্বের সে লাভ করে। এ কারনে সমাজের লোকদের নিরাপত্তা দিয় দারিদ্র অক্ষমতা ওজীবনের দুর্বিপাকের বিরুদ্ধে। কেননা এ উম্মতের মাধ্যমেই তো আল্লাহর কালেমা বুলন্দ হবে, দুনিয়ার ইসলামের দা্ওয়াত সম্প্রসারিত হবে। যাকাত দানের ফলে সে নিজে কোন ফায়দা বা সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে কিনা সে প্রশ্ন কিছুতেই সমনে আসবে না।
ঘ. আধুনিক প্রবণতায় কর এ একটা সামষ্টিক অর্থনৈতিক এ রাজনৈতিক দুনির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। তা নিছক আর্থিক লক্ষ্যের অনেক ঊর্ধ্বে। যাকাতের ও একটা সুদূর প্রসারী লক্ষ্য রয়েছে যা দিগন্ত পরিব্যাপ্ত। তার শিকড় খুব বেশী গভীরে নিহিত।উপরোল্লেখিত দিকগুলোতে ওযমন তেমনি তা ছাড়া্ও শিকড় খুব বেশী গভীরে নিহিত। উপরোল্লেখিত দিকগুলোতে যেমন তেতমনি তা ছাড়া্ও আর্ও অনেক দিকে। ব্যক্তি ও সমষ্টির জীবনে তার প্রভাব্ও অন্যন্ত প্রকটি ও সক্রিয়।
যাকাত ও কর এর মধ্যে পার্থ্যকের দিকসমূহ
উপরে সাদৃশ্য ও অভিন্নতার দিকগুলো তুলো ধরা হয়েছে। এর পর অনৈক্য ও পাএথক্যের দিকগুলো তুলে ধরছি। এ পার্থক্যের দিকসমূহ অনেক। নিম্নোদ্ধৃত বিষয় অধিক গুরত্ব পূর্ণ বিধায় তা এখানে উদ্ধৃত করছি।
১. নাম ও শিরোনাম
যাকাত ও কর এ দুটির মধ্যকার পার্থক্য প্রথম দৃষ্টিতেই প্রতিভাত হয়ে পড়ে উভয়ের নাম ও শিরোনাম দর্শনে। প্রত্যেকটি নামেরই একটা তাৎপর্য আছে, একটা ইঙ্গিত ইশারা এ রয়েছে।
যাকাত শব্দটিই আভিধানিক অর্থে পবিত্রতা প্রবৃদ্ধি ও বাড়তি প্রবণতা বোঝায়। বলা হয় (আরবী**********)তার আত্মা পরিশুদ্ধ হয়েছে। (আরবী*********)কৃষি চাড়া বড় হয়েছে। (আরবী*********) স্থানটি পবিত্র হয়েছে।
ইসলামী মরীয়াত যাকাতের এ নামকরণ করেছে এ উদ্দেশ্যে যে, ফকির মিসকীনকে যে মাল দেয়া ফরয করা হয়েছে শরীয়াত সম্মত কাজে যা কিছু ব্যয় করা হয় তা সবই যেন এ নাম দ্বারা বোঝা যায় এবং নামটি শোনা মাত্রই যেন মনে একটা পবিত্রতার ভাবধারা জেগে ওঠে। কিন্তু কর রা ট্যাক্স শব্দটি এরূপ নয়।
কর বলতেই সাধারণত জরিমানা খারাজ ভূমিকর কিংবা জিযিয়া ইত্যাদি বোঝা যায় অর্থাৎ তা পওপ থেকে চাপিয়ে দেয়াএক প্রকারের বাদ্যবাধকতা বিশেষ। প্রত্যেকই বুঝে নেয় যে, এ বোঝা তাকে অনিছ্চা সত্ত্বে এ বহন করে যেতে হবে।যেমন তাদের ইয়াহুদীদের ওপর লাঞ্জ্না দারিদ্র্যতচাপিয়ে দেয়া হয়েছে-কুরআনের আয়াত। [আল বাকারা ঃ৬১ আয়াত।]
একারণে মানুষমাত্রই তাকে জরিমানা র মত চাপিয়ে দেয়া দর্বহ বোঝা মনে করে।
কিন্তু যাকাত (আরবী**********) শব্দটি এবং তার পবিত্রকরণ, প্রবৃদ্ধি সাধন এ বরকত দানের ভাবধারা মানুষের মনে এ অনুভতির সৃষ্টি করে যে, মালিক যে মাল পুঁজি করে রাখে কিংবা নিজের ভোগ ব্যবহারে লাগায় এবং তা থেকে আল্লাহর ধার্য করা হক্ আদায় কারে না, লোভ ও কার্পণ্যের মলিনতা ধুয়ে মুছে পরিচ্ছন্ন পবিত্র ও স্বচ্ছ নির্মল করতে পারে।
সেই সাথে এ মনে জাগিয়ে দেয় যে, যাকাত বাহ্যত মাল হ্রাস প্রাপ্ত হয়। কিন্তু তা তার মনে জাগে যে, এটা কেবল চর্মচোক দিয়েই দেখা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাই পবিত্র করে, প্রবৃদ্ধি প্রদান করে এ পরিমাণের বেড়ে যায়। এটা তার ধরা পড়ে যে অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখে সে দৃষ্টিতে। আল্লাহ তাআলা এ কথাই বলেছেন এ আয়াতেঃ (আরবী**********)
আল্লাহ সুদকে নিঃশেষ করেন এবঙ দান সমূহকে বাড়িয়ে দেন। [আল বাকারা ঃ২৭৬ আয়াত।]
বলেছেনঃ তোমরা যা (আল্লাহর পথে) ব্যয় কর তিনিই তার স্থলাভিষিক্ত এনে দেন। [(আরবী********)]
রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ যাকাত দেয়ার মাল কখনেই কমে যায় না। [হাদীসটি তিরমিযী উদ্ধৃত করেছেন।]
অনুরূপভাবে মনে এ ভাব্ও জাগিয়ে দেয় যে, পবিত্র, প্রবৃদ্ধি ও বরকত কেবল মালেই পায় না; বরং যাকাত দাতা ব্যাক্তি এ পায়, তার গ্রহণকারী ও সেই ভাবধারায় সিক্ত হয়।যাকাত পাএয়ার যোগ্য ও গ্রহণকারী লোকের মন যাকাতের দারুন হিংসা ও শক্রতার ভাব থেবে পবিত্র হয এবং তার জীবিকা প্রবৃদ্ধি লাভ করে। কেননা তা্ও তার পরিবারবর্গের জন্যে প্রয়োজন পরিমাণ সে পেয়েই গেছে।
আর যাকাতদাতার মন নিষ্কৃতি পায় লোভ এ কার্পণ্যের কলুষতা থেকে। ত্যাগ তিতিক্ষা দান ও ব্যয় বহন দ্বারা তার মন পবিত্র হয়ে ওঠে। এর করণে তার মনে পরিবারে ও দান-মালে বিপুলতা এসে যায়। কুরআন মজীদ একথা বোঝাবরা জন্যই বলেছেঃ
তাদের ধন-মাল থেকে যাকাত গ্রহণ কর, তুমি তাদের পবিত্র কর, পরিশুদ্ধি কর তার দ্বারা। [(আরবী*********)]
২. মৌলতত্ত্ব এ প্রয়োগের ক্ষেত্র
যাকাত এ কর এর মধ্যে পার্থক্যের দিকগুলোর মধ্যে ইল্লেখ্য হচ্ছে যাকাত হচ্ছে একটা ইবাদত যা মুসীলিম ব্যক্তির ওপর ফরয করা হয়েছে আল্লাহর শোকের আদায়স্বরূপ তাঁর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে। কিন্তু কর এরূপ নয়। তা নিছক একটা সামাজিক বাধ্যাবাধকতা,ইবাদত বা আল্লাহর নৈকট্য লাভের কোন ভাধারাই তাতে নেই। এ একটা জরুরী শর্ত। কেননা নিয়ত ছাড়া কোন ইবাদতই হয় না। আমলসমূহের মূল্যায়ন নিয়তের ভিত্তিতেই হয়- তাহীসের কথা এবং লোকদের শুধু এ আদেশই করা হয়েছে যে, তারা আল্লাহর ইবাদত করবে আনুহত্য কেবল তাঁরই জন্যে খালেছ ও একনিষ্ঠ করে। কুরআনের ঘোষণা। [(আরবী*********)]
এ কারণেই বলা হয় যে, যাকাত ইসলামী ফিকাহয় এক প্রকারের ইবাদত বিশেষরূাপে গণ্য। এ কথা কুরআন এ সুন্নাহর কথার তাৎপযের সাথে সঙ্গতিসম্পন্ন। কেননা উভয় দলিলেই যাকাতকে নামযের পাশেই উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআনের মাক্কী ও মাদনী সূরাসমূহের প্রায় বিশটি স্থানে এরূপ লক্ষ্য করা যায়। আর হাদীসের যে কত স্থানে তা রয়েছে তা মুনে শেষ করা যায় না। প্রস্ধি হাদনে জিবরীল এ তাই রয়েছে।ঃ ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি জিনিসের টওপর সংস্থাপিত এ হাদীসে এবঙ এরূপ অন্যান্য হাদসে ও তাই হয়েছে। এ দুটোই ইসলামের পাঁচটি রুকন এর মধ্যে শামিলক এবং ইসলামের চারচি মৌলিক ইবাদতের অন্যতম।
আর যাকাত যখন একটা ইবাদত, একট বিশেষ বিশেষ্তবসম্পন্ন সংস্কৃতি, ইসলামের সকিনসমূহের মধ্যে এটা দ্বীনী রুরন যা কেবল মুসলমানের ওপরই ফরয করা হয়েছে। এ জন্যে মহান শরীয়াত অসুসলিম নাগরিকদের এপর ইবাদতের প্রকৃত দ্বীনী বিশেষত্বসম্পন্ন একটা আর্থিক দায়িত্ব অমুসলমানের ওপর চাপানে হয়নি। কিন্তু কর সেরূপ নয়। তা মুসলিম আমুসলিম উভয়ের তাদের দেয়ার সামর্থ্যানুপাতে ধার্য হয়ে থাকে।
৩.নিসাব পরিনাণ নির্ধারণে
যাকাত একটা পরিমিতি সম্পন্ন এ মরীয়াত নির্ধারিত ব্যবস্থা। প্রত্যেকটি মালের
একটা নিসাব নির্দিষ্ট রয়েছে। সেই পরিমাণের কম মালেন মালিকদের তা থেকে অব্যাহতি দয়ো হয়েছে। তা থেকে দেয় পরিমাণটা এ নির্দিষ্ট রয়েছে পাঁচ ভাগের এক ভাগ থেকে শুরু কররে দশ ভাগের এক ভাগ পর্যন্ত তার অর্ধেক এ হতে পারে। দশ তাগের এক ভাগের এক দশামংশ এ একটা পরিমাণ। শরীয়াত এই যে পরিমণ নির্দিষ্ট করে দিয়েছে অকাট্য দলিলের ভিত্তিতে, তাতে এক বিন্দু পরিবর্তন করার করোর কিছুমাত্র অধিকার নেই। না তার বেশী ধার্য করা যায়, না কম। যারা যাকাতের ফরয পরিমাণ বৃদ্ধির ডাক দিয়েছে, আধনিক কালের অর্থনৈতিক এ সামষ্টিক সামাজিক মধ্যে ফেলে দিয়ৈছে।
কর এরূপ নয়। তার ক্ষেত্র, তার নিসাব পরিমাণ,তার মূল্যায়ন ও পরিমাণ নির্ধারণ প্রভৃতি সব কাজই রাষ্ট্র সরকারের চিন্ত ভাবনা ও প্রশাসকদের পরিমাণ নির্ধারণের মাধ্যমেই মম্পন্ন হয়ে থাকে। বরং রাষ্ট্র সরকারের প্রয়োজন অনুপাতে পরিমাণ নির্ধারণের ওপরই তার অস্থিতি একান্তভাবে নির্ভরশীল।
৪. স্থিতি ও স্থায়িত্বের দিক দিয়ে
এক আলোকে বলা যায়, যাকাত একটি স্থিতিশীল ও চিরন্তন ব্যবস্থা। এ পৃথিবীর বুকে যদ্দিন ইসলাম ও মুসলমান থাকবে, এ ব্যবস্থা এ ততদিন কর্যকর থাকবে।কোন অত্যাচারী প্রাশসক ও তা নাকচ করতে পারে না, সুবিচারের নাম করে এ তাতে কেউ কোন পরিবর্তন আনবার অধিকরী নয়। তা নামযের বিশেষত্বসম্পন্ন। নামায হচ্ছে দ্বীনের ভিত্তি স্তম্ভ আর যাকাত হচ্ছে ইসলামের পুলযোগসূত্র। কিন্তু কর ব্যবস্থায় এরূপ স্থিতিশীলতা ও চিরন্তন তার কো বৈশিষ্ট্য নেই। তার প্রকার, তার নিসাব এ পরিমাণ নির্ধারণে ও কোন স্থিতিশীলতা নেই। প্রত্যেকটি সরকারই তাতে হস্থক্ষেপ করতে, তার পরিনাণ যেমন ইচ্ছা নির্ধারণ করতে পারে অথবা সরকারী দায়িত্ব শীল কর্মকর্তারা তাতে যে কোন পরিবর্তন ও আনতে পারে। তাকে চালু রাখা্ও তাদেরই ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। পূর্বে এ বিষয়ে বলা হয়েছে। তা অস্থায়ী ব্যবস্থা। তা প্রয়োজনের দৃষ্টিতে ধর্য হয়, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে তাই শেষ হয়ে যায়।
৫. ব্যয়ের ক্ষেত্রে
যাকাতের ব্যয়ক্ষেত্র বিশেষভাবে নির্দিষ্ট। আল্লাহ তা আলা নিজেই তার কিভাবে তা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। রাসূলে করীম (স) তাঁর কথা দিয়ে তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন এবং কাজ দিয়ে তা বাস্তবায়িত করেছেন- এ সুস্পষ্ট সুনির্দিষ্ট ব্যয় খাত সমূহ। মুসলিম ব্যক্তির মা্ত্রই তা জানতে ও বুজতে পারে, পারে নিজস্বভাবে তার সব অথবা তার একটা বড় অংশ বিতরণ করে দিতে যখন তার প্রয়োজন দেখা দেবে। এ ব্যয়খাত সমূহ যেমন মানবিক তেমনি ইসলাম সম্মত এ। কিন্তু কর রাষ্ট্রের সাধারণ প্রয়াজনসমূহ পূরণার্থে ব্যয় করা হয়ে থাকে এবং সে খাতসমূহ সরকারই নির্ধারণ করে থাকে।
১. সূরা ত্ওবার ৬ আয়াতে তাই বলা হয়েছে।
সাধারণ ভাবে। যদি তারা ফাঁকি না্ও দেয় তবু তারা দেয় অনচ্ছা সত্ত্বে ও যেন তার কাছ থেকে জোর পূর্বক আদায় করা হচ্ছে। না দিয়ে পারলেই যেন বাঁচত এমনি ভাব। কিন্তু যাকাতের ব্যাপার ভিন্ন। মুসলমানরা যতটা যাকাত ফরয, তার চাইতে ও অনেক বেশী দিয়ে থাকে আল্লাহর সম্তষিট লাভের আশায়, তাঁর কাছ তথেকে স্ওযাব পা্ওয়ার উদ্দেশ্যে।নবী করীম (স) এ যুগে এবং তার পরে ও এ ধরওেনর ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। কর ও যাকাতের মধ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যায়ে আমরা এ বিষয়ে আলোচনা করব।
৭.লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের দিক দিয়ে
যাকাতের আধ্যত্মিক ও নৈতিক লক্ষ্য সূস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট। কর ব্যবস্থা সে পর্যন্ত পৌছার কথা চিন্তা ও করতে পারে না। আমাদের যাকাত শব্দ সংক্রান্ত আলোচনায় এসব উচ্চ মহান লক্ষ্যের দিকে উঙ্গিত করেছি। তার তৎপর্য ও ভাবধারার কথা্ও বলেছি। যাকাতের লক্ষ্য তার প্রভাব পর্যায়ে ও আমরা বিস্তারিত কথা বলে এসেছি। আখানে আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবে যাকাত দিতে বাধ্য ধন-মলে মালিকের সম্পর্কে যা কিছু বলেছেন যা কিছু বলেছেন যাকাতের লক্ষ্য নির্ধারণে তার উল্লেখৈই যথেষ্ট। আল্লাহ বলেছেঃ তাদের ধনমাল থেকে যাকাতের নি ও তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ কর তার দ্বারা এবংতাদের জন্যে পূর্ণ রহমতের দোআ কর। কেননা তোমার এ দোআ তাদের জন্যে সান্ত্বনার কারণ। এ কারণেই নব করীম (স) যাকাত দাতার জন্যে সব সময় দোআ করতেন তার মন ও ধনমালে বরকত আসার জন্যে। যাকাত বিভাগের প্রত্যেক কর্মচারীর জন্যে এ পসন্দনীয় নব করীম (স) এর অনুসরণ করতে গিয়ে অনুরূপ দোআ করবে।এমন কি কোন কোন ফিজহবিদ তটা বলেছেন যে, এ দে্া আ করা ওয়াজিব। কেননা উক্ত আয়াতে সেজন্যে স্পষ্ট নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর এরূপ নির্দেশ তো ওয়াজিব্ প্রমাণ করে।
কিন্তু ক র ব্যবস্থা এরূপ লক্ষের দিকে তাকাতে ও পারে না।অর্থনীতিবিদরা তো দীর্ঘকাল রাষ্ট্রের কোষাগারের জন্যে অর্থ সংগ্রহ করা ছাড়া কর এর আর ও কোন লক্ষ্য থাকতে পারে বরে বিশ্বাসই করতে পারে নি। তারা এটার নাম দিয়েছেন কর সংক্রান্ত প্রবনতার মত। পরে চিন্তার বিবর্তন ঘটেছে সামাজিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। লক্ষ্যহীনতার মতের পরাজয় ঘটেছে এবং কর কে একটা সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও সামাজিক লক্ষ্য অর্জনের উপায় মনে করার এবং সেই কাজে তা বিনিয়োগ করার আহবান প্রবল হয়ে ওঠেছে। যেমন ব্যয়ের জন্যে উৎসাহ দান কিংবা পূর্ণত্ব ব্যয় কম বা সঞ্চয়ের জন্য উৎসাহ দান করার উপদেশ দান অথবা সমাজের লোকদের মধ্যকার পার্থক্য দূর করণ ইত্যাদি। এটা কর এর অর্থনৈতিক লক্ষ্যের কাছাকাছি কথা। আর এটা ই প্রথম লক্ষ্য।
কিন্তু কর ধর্যকারীরা সাধারণ অর্থনীতিবিদরা এবং চিন্তাবিদগণ তাকে বস্তু বাদী লক্ষ্যের বাইরে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়নি। তার চাইতে প্রশস্ততর ও সুদূর লক্ষ্যাভিসারী
পরিমন্ডল নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি অর্থাৎ যে আধ্যাত্মিক ও নৈতিক লক্ষ্যকে সামনে রেখে যাকাত ফরয করা হয়েছে, সে লক্ষ্যে কর ব্যবস্থার পুনর্গঠন এখনো সুদূরপরাহত ব্যাপার।
৮. এ দুটির ধার্যকরণে চিন্তাগত ভিত্তির দিক দিয়ে
যাকাত ও করা এর মধ্যে অধিক স্পষ্ট ও প্রকট পার্থক্যের দিক হচ্ছে তার ভিত্তির দিক, যার ওপর নির্ভর করে এ দুটির প্রত্যেকটি ধার্য করা হয়। কর ধার্যকরণের আইনগত বা চিন্তাগত ভিত্তি নির্ধারণে যে মতভেদের সৃষ্টি হয়েছে তা চিন্ত ও মতবাদের পার্থরক্যের কারণে। পরে আমরা তার উল্লেখ করব। কিন্তু যাকাতের ভিত্তি তো সুস্পষ্ট। তার ফরযরূপে ধার্যকারী ও পরিমাণ নির্ধারণকারী হচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা। চারটি মতবাদের মাধ্যমে আমরা তা স্পষ্ট করে তুলব। কিন্ত এর মধ্যে কোন বৈপরীত্য নেই। বরং তার কোনটি অপর কোনটিকে শক্তিশালী করে তোলে। আমি অবশ্য এ বিষয়ে আলোচনা জন্যে একটা স্বতস্ত্র পরিচ্ছেদ গ্রহণের পক্ষপাতী, তাহলেই সম্যক আলোচনা কর সম্ভব হবে বলে মনে করি।
যাকাত, ইবাদত এ কর এক সাথে
এখানে আমরা বলতে পরি যে, যাকাত যেমন ইবাদত তেমনি একটি কর্ও বটে।তা কর এ হিসেবে যে, তা একটা সুপরিজ্ঞাত অর্থনৈতিক অধিকার বিশেষ। রাষ্ট্রেই তা আদায় করার অধিকারী। ইচ্ছা করে না দিলে রাষ্ট্র জোর করে তা নেবে ও তা ব্যয় করবে এমন সব লক্ষ্যে যার কল্যাণ গোট সমাজই পাবে।
তার পূর্বে তা হচ্ছে একট ইবাদত ইসলমের বিশেষত্বসম্পন্ন ব্যবস্থা। মুসলমান তা দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে এবং আদায় করলে তার মনে এ চেতনা জেগে ওঠে যে, সে ইসলামের রুকন পালন করছে। তা ঈমানের একটা অন্যতম শাখা বিশেষ। সে যাকে তা প্রদান করে, তাকে প্রদান করে আল্লাহর ইবাদতের কাজে তাকে সাহায্য করার লক্ষ্যে। এজন্যে তা প্রদান করা আল্লাহনগত্য এ কল্যাণকর কাজ সম্পাদন তা না দেয়া সুস্পষ্পটনরূপে আল্লাহর বিধান লংঘন। আর তার ফরয হ্ওয়ার কথা অস্বীকার করা সুস্পষ্ট কুফরী। তা আল্লাহর হক। তার আদায়করী তা আদয়ে বিলম্ব করলে প্রশাসক তার প্রতি উপেক্ষা দেখাল্ওে তা দেয়ার কর্তব্য থেকে নিষ্কৃতি পা্ওয়া যাবে না ক্রমাগত কয়ক বছর না দিল্ওে তা ফরয এবং অবশ্য দেয়ই থেকে যাবে।তা কর এর মত নয়।কর তো সরকার চাইলে দেযা কর্ব্য হয় আর না চাইলে তা নাকচ হয়ে যায়।
এখানে যে কথাটি উল্লেখ করা জরুরী মনে হয়, তা হচ্ছে, আমাদের আলিমগণ (রা) নিজেরা অবহিত ছিলেন লোকদের ও অবহিত করেছেন যে, যাকাত এ দুটি অর্থেরেই সমন্বয় কর হ্ওয়া ও ইবাদত হ্ওয়া ও ইবাদত হ্ওয়া। যদি ও তাঁরা স্পষ্ট ভাষায় যাকাতকে কর বলেন নি কখন্ও। কেননা এটা শেষেরদিকে পা্ওয়া পরিভাষা।তবে তারা এটাকে হক্ক বলেছেন এ অর্থে যে, তাধনীদের ধন মালে গরীব মিসকীনদের প্রাপ্য ও অবশ্য দেয় অধিকার। [দেখুনঃ (আরবী***********)] তারা অবশ্য যাকতকে সিলায়ে রেহমী র অর্থাৎ মানবতা ও ইসলামিকতসম্পন্ন ব্যবস্থা বলেছেন আর এ দিক দিয়ে তা ইবাদতের ভাবধারাসম্পন্ন।
আমরা এই যে তাৎর্পেযর কথা বললাম (আরবী***********) গ্রস্থ প্রণেতো যা বলেছেন তা থেকে উক্ত কথার যৌক্তিকতা অধিক স্পষ্ট করে বোঝায়। তাতে যাকাতের তত্ত্ব এ যৌক্তিকতা পর্যায়ে বিশেষ আলিমগণের এ উক্তি উদ্ধৃত করা হয়েছে। তারা বলেছেনঃ
আল্লাহ তা আলা ধনীদের ধন মালে যাকাত ফরয় করেছেন তাদের গরীব ভইদের প্রতি সহানিুভূতি প্রদর্শনস্বরূপ, ভাইদের প্রাপ্য অধিকার আদায় এবং প্রীতি ও ভালৈাবাসা বৃদ্ধির উদ্দেশ্য ওযাজিব কাজ করা হিসেবে। আল্লাহ তাআলা যে সাহায্য দান ও ব্যক্তিদের পারস্পারিক সহানুভূতির নিধেশ দিয়েছেন, তদনুযায়ী আমল করাই এর লক্ষ্য। তা ছাড়া এতে ধন মালের মালিকদের পরীক্ষা করা ও উদ্দেশ্য। কেননা ধন মালা হচ্ছে মালিকদের কলিজার টুকরা। দৈহিক ইবাদতের হুকুম দিয়ে যেমন দৈহিক পরীক্ষার্ও একটা ব্যবস্থা। তাতে ও ইবাদতের দিকটি লক্ষ্যণীয়। আর ইবাদতের দিকটির কারণেই তাতে নিয়তের শর্ত আরোপিত হয়েছে। তাতে কোনরূপ নাফরমানী ইত্যাদির সংযোগ হ্ওয়া নিষিদ্ধ।
তা সম্পর্ক রক্ষার একটা মাধ্যম বলে তাতে প্রতিনিধি নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। সেজন্যে বল প্রয়োগ করা ও সহহী। রাষ্ট্রপ্রধান যখন তা মালেন মালিকের কাছ থেকে জোর করে গ্রহণ করে তখন সেই মালিকের নিয়তের প্রতিনিধিত্ব করবে। মরে যা্ওয়া ব্যক্তি অসিয়ত করে না গেলে ও তার মাল থেকে তা গহণ করবে তাতে সম্পর্ক রক্ষার দিকটি প্রকট হ্ওযার দরুন তাতে ফকীর মিসকনের অধিকতর কল্যাণের দিক লক্ষ্য রাখা আবশ্যক। না বালেগের মাল থেক্ওে তা নেয়া হবে। আর যেহেতূ সত্যানুভূতি জানানোই বড় লক্ষ্য বলে আল্লাহ তা আলা তা কেবল বিপল সম্পদের ওপরই ফরয করেছেন। তাঁর নির্ধরিত নিসাবেই হচ্ছে সেই পরিমাণের সম্পদ। বর্ধনশীল মাল ছাড়া অন্য জিনিসের ওপর তা ধার্য করা হয়নি। আর তা হচ্ছে নগদ টাকা, ব্যবসায় পণ্য, গবদি পশু, জমির ফসল। শরীয়াতে প্রত্যেকটি ধরনের মালে নিসাব আলাদা আলাদাভাবে নির্ধারিত হয়েছে, যা দ্বারা সহানুভূতি জ্ঞাপন সম্ভব হয়। শ্রম ওকষ্ট স্বীকারের দিকে লক্ষ্য রেখেই ওয়াজিব পরিমাণ নির্ধরণ করা হয়েছে। তাই অ সেছ ব্যবস্থার অধীন জমির ফসলের এক দশমাংশ আর সেছ ব্যবস্থাধীন জমির ফসলে তার অর্ধেক ধার্য হয়েছে। [(আরবী***********)]
এ এক অতবি উত্তম বিশ্লেষণ। পূর্ববর্তী অধ্যায়সমূহে আমরা তা বিস্থারিত বলেছি।
দ্বিতয়ি পরিচ্ছেদ
কর ধর্যকরণ ও যাকাত ফরযকরণের দার্শনিক ভিত্তি
সম্ভবত যাকাতের নিগুঢ় তত্ত্ব স্পষ্ট করে তোলার জন্যে এ কালের অর্থনীতি বিদগণ কর ব্যবস্থ রূপায়ণ ও প্রবর্তন পর্যায়ে যা কিছু বলেছেন, তার উল্লেখ এখানে করা যথেষ্ট হবে। আইনত যে ভিত্তির ওপর নির্ভর করে তার উল্লেখ ও প্রয়োজন। এ তুলনামূরক আলোচনার ফলে যাকাতের প্রকৃতি এবং তার আল্লাহ প্রদত্ত ফরয হ্ওয়ার পবিত্র কর হ্ওয়ার গুণ ও বৈশিষ্ট্য প্রতিভাত হয়ে উঠবে। যাতাতের যে একটা বিশিষ্ট প্রকৃতি রয়েছে, একটা বিশেষ দর্শন তা্ও স্পষ্ট হবে।
কর ধার্য করণের আইনগত ভিত্তি
আলোচনাকারী ও চিন্তাবিদগণ আইনহত প্রকৃতি সম্পর্কে বিভিন্ন কথা বলেছেন। অন্য কথায়, লোকদের ওপর কর ধার্যকরণের আইনগত ভিত্তি সম্পর্কে তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্যের সৃষ্টি হয়েছে।
সমাজিক চুক্তি সংক্রান্ত মতবাদ
অষ্টাদশ শতাব্দীর দার্শনিকগণ এ মত প্রকাশ করেছেনযে কর ধার্যকরণের ব্যাপারটি সম্পূর্ণ রূপে রাষ্ট্র ও ব্যক্তির মধ্যকার চুক্তির ওপর ভিত্তিশীল। এমতের সমর্থকরা মনে করেন, রাষ্ট্র জনকল্যাণমূলক যেসব কাজ করে দেশবাসী ও রাষ্ট্রের মধ্যকার অকাট্য চু্ক্তির দরুন এবং যার ফয়দা ধনশালী লোকেরা পেয়ে থাকে, তারই বিনিময়স্বরূপ এ কর দেয়া হয়। এ মতটি জন লক রুশোর রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপিত সামাজিক চুক্তির এর সাথে সংগতিসম্পন্ন।
রাষ্ট্র ও করদাতাদের মধ্যে অকাট্য চুক্তি রূপায়ণে সামাজিক চুক্তি মতের সমর্থকরা বহু মত প্রশাশ করেছেন।
মিরাবু কলেছেনঃ কর হচ্ছে নগদ মূল্যাদান। ব্যক্তি এর মাধ্যমে সমাজ সমষ্টির সমর্থন ও প্রতিরোধ ক্রয় করে। তার অর্থ, ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যাকার অকাট্য চুক্তিটি আসলে ক্রয় বিক্রয়ের চুক্তি।
অ্যাডাম স্মিথ বলেছেন, এ চু্ক্তিটা আসলে কাজ ভাড়ায় লাগনোর চুক্তি। রাষ্ট্র দেশবাসীর কল্যাণমূলক কাজকর্ম আঞ্জাম দেয় আর দেশ বাসী এসব কাজের মজুরী হিসেবে কর দিয়ে থাকে।
মন্টস্কো ও হবস বলেছেনঃ এটা আসলে একটা বীমা চুক্তি বিশেষ। কর হচ্ছে এ বীমার কিস্তি, টাকার মালিক তার ধন মালোর অবশিষ্ট অংশের সংরক্ষণ মজুরী হিসেবে কর দিয়ে থাকে।
অবশ্য সমালোচকগণ স্পষ্ট করে বলেছেন, কর সম্পর্কে এ ধারণা মূলতই ভূল। কেননা রাষ্ট্র যেসব জনহিতকর কাজের আঞ্জাম দিয়ে থাকে এবং যার ফায়দটা করদাতা পায় এ দুটোর মধ্যে ভরসাম্যপূর্ণ বিনিময় হ্ওয়াটা সম্পর্ণ অসম্ভব্। যেহেতু দেশেরজনগণের জন্যে যে সাধারণ কল্যাণমূলক কাজ রাষ্ট্র আঞ্জাম দেয়, তাতে ভিন্নভাবে এক একজন নাগরিক কতটা কল্যাণ পেল, তার মূল্য নির্ণয় করা আদৌ সম্ভব নয়। যেমন নিরাপত্তা সংরক্ষণ,বিচার বিভাগ পরিচালন,শিক্ষা বিস্তারের ব্যবস্থা সর্বোপরি দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা। এসব কল্যাণমুলক নির্ধারণ তো আদৌ সম্ভব নয়। যদি তা সম্ভব হত তাহলে ও এ মতবাদটি অত্যাচারময় ফলাফলের পরিণতি পর্যন্ত পৌঁছে দিত।কেননা গরীব শ্রেনীর লোকেরাই রাষ্ট্রের কণ্যাণময় আনুকূল্য পা্ওয়ায় ধনীদের তুলনায় অধিক মুখাপেক্ষী। বিনিময় বা মজুরী প্রদান এমতাদর্শের সাথে সঙ্গতি রেখে রক্ষার জন্য কর এর বিরাট বোঝা বহন করা তাদের জন্যে ও কর্তব্য হয়ে পড়ে।
ওযমন বমিা মতাবাদটি দুটো দিক দিয়ে ক্রটিপূর্ণ। একটি এ মতটি রাষ্ট্রের কাজকে নিছক শান্তিরক্ষা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ করে দেয়। কিন্তু তা বস্তবতা পরিপন্হী। আর দ্বিতীয় দিক হচ্ছে বীমা চু্ক্তি বীমাকারীর স্কন্ধে সমস্ত খেসরতের বিনিয়ে বোঝা হবনের দযিত চাপিয়ে দেয়।অথচ রাষ্ট্রের যা কিছু ক্ষতি লোকসান হয় তার বিনিময় দেয়ার জন্যে ব্যক্তিগণকে বাধ্য করা হয় না।
রাষ্ট্রের প্রাধান্যের মতবাদ
উপরিউক্ত কথা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, সামাজিক চুক্তি মতবাদটি কর ধার্যকরণের ভিত্তি হতে পারে না। ও কারণেই দ্বিতীয় মতাদর্শটি আত্মপ্রকাশ করেছে তা হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রাধান।
এ মতবাদটির ভিত্তি হচ্ছে রাষ্ট্র তার দয়িত্ব পালন করে সমাজিক সামষ্টিক প্রয়োজন পূরণার্থে। তাতে বিশেষ ব্যক্তিদের কল্যাণ সাধনইতার লক্ষ্যভূত হয় না কেননা সাধারণ জনকল্যাণ বিশেষ ব্যক্তিদের ওপর অধিক প্রভাব শালী ও ব্যাপক এবং বর্তমানের জনগণ এ ভবিষ্যতের জনগণের মধ্যে জাতীয় দায়িত্ব গ্রহণ ব্যবস্তার ওপর বিজয়ী হচ্ছে সংরক্ষণ ব্যবস্থা।
এ সব দায়ত্ব পালনের জন্যে বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হয়। তাই রাষ্ট্রের এ অধিকার আছে যে, তার ছায়াতলে বসবাসকারী সমস্ত সমুষকেই এ ব্যয়বার বহনের জন্যে বাধ্য করবে। কেননা তার রয়েছে শ্রেষ্ঠত্বও প্রাধান্যের অধিকার। রাষ্ট্র এ বোঝা জনহণের মধ্যে বন্টন করে দেবে প্রত্যেকেরই পক্ষে সহজ বহনের মাত্র অনুযায়ী। তা হলেই সামষ্টিক নিরাপত্ত ব্যবস্থা কার্যার হবে, আধুনিককালের রানৈতিক সমাজ এ দায়িত্বই পালন করে থাকে। [এ আলোচনা লেখার জন্য আমরা ডাঃ মুহাম্মাদ হলমী মুরাদ লিখিত বই (আরবী***********) এর ওপর বির্ভর করেছি (আরবী***********) কর্তৃক ১৯৫৫ সনে গ্রন্হখানি প্রকাশিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আলোচনা শিরোনাম হচ্ছেঃ (আরবী***********)]
যাকাত ফরয করার ভিত্তি
যাকাত ফরয করা এবং সর্ভপ্রকারের অর্থনৈতিক অধিকার নির্ধারণ সম্পূর্ণ ভিন্নতর দৃষ্টিকোণ প্রসূত। এখানে তার বিশ্লেষণ দিচ্ছিঃ
শরীয়াত পালনে বাধ্য করার সাধারণ দৃষ্টিকোণ
প্রথম, শরীয়াত পালনে বাধ্য করার সাধারণ দৃষ্টিকোণ। এ দৃষ্টিকোণ বা মাতদশের ভিত্তি হচ্ছে নেয়ামতদাতা সৃষ্টিকর্তার অধিকার আছে তিনি তার বান্দাহগণকে নিজের ইচ্ছামত দৈহিক ও অর্থৈনৈতিক দায়িত্ব পালনে বাধ্য করবেন। তাতে তাঁর হাক আদায় হবে ও তাঁর প্রদত্ত নেয়ামতের শোকর ও আদায় করা যাবে। তাদের মধ্যে কে উত্তম মর্মঠ, তা আল্লাহ তাআলা পরীক্ষা করতে পারবেন। তাদের মনে ও মানসিকতায় এক ভাবধারা রয়েছে তার ও যাচাই চাছাই হয় যাবে। তাদের অন্তরে নিহিত গোপন কথা প্রকাশিত হয়ে পড়বে। কে সাসূল (স) এর অনূসরণ করছে, আর কে তা করছে না তা্ও দিবালোকের মত স্পষ্ট প্রতিভাত হয়ে যাবে। এতে করে আল্লাহ ভালোকে মন্দ থেকে, অনুগতকে পারী থেকে আলাদা করে নিতে পারবেন। তাদের আমলেন পূর্ণ ফল দিতে পারবেন তাতে তাদের একবিন্দু ঠকানো হবে না।
বস্তুর মাসুষকে তো উদ্দেশ্যহীন লক্ষ্যহীন করে সৃষ্টি করেন নি, বেকার ছেড়ে দেয়া হয়নি তাদের এ পৃথিবীর উম্মক্ত প্রান্তরে। আল্লহই বলেছেন; (আরবী**********)
তোমরা কি মনে করে নিয়েছ, আমরা তোমাদের নিরর্থক ও উদ্দেশ্যহীন ভাবে সৃষ্টি করেছি এবং শেষ পর্যন্ত তোমাদেরকে আমাদের নিকট ফিরে আসতে হবে না?[ (আরবী*********) ]
(আরবী*********)
মানুষ কি মনে করেছে, তাকে খুব সহজেই ছেড়ে দেয়া হবে?[ (আরবী***********) ]
না, তা কখনই হতে পারে না। আল্লাহ তো তাদের প্রতি নবী সাসূলগণকে পাঠিয়েছেন, তাঁরা সুসংবাদ দিয়েছেন, আযাবের ভয় দেখিয়েছেন। ফলে তারা আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ জানতে সক্ষম হয়েছে। তাঁর কি অধিকার বান্দাদের ওপর, বান্দাদের কর্তব্য কি তাঁর প্রতি এ সবই জানা সম্ভব হয়েছে। এক্ষণে যারা খারাপ আমল করবে, তাদরে তিনি শস্তি দেবেন এবং যারা নেক আমল করেছে তাদের তিনি উত্তম শুভ ফল দেবেন। [ (আরবী***********)] এটাই শুভনীতি।
আল্লাহ তাআলা মুসলমান মাত্রকেই নামায কড়ার নির্দেশ দিয়েছেন, এটা হচ্ছে দৈনিক পালনীয় ফরয। দিন রাতের মধ্যে পাঁচবার তা পড়তে হয তার জন্য নির্দিষ্ট সময়ে। তা যেমন অলসতা ভাংগে, তেমনি খাহেশে নফসের উত্তেজনা ও দমন করে।
উপেক্ষা ও অসতর্কতার অন্ধকার দূর করে। দুনিয়ার ঝামেলা থেকে মানুষকে মুক্ত করে। আল্লাহ তাআলা নিজেই বলেছেনঃ (আরবী***********)
নামায অবশ্য খুব বড় কঠিন কাজ তবে আল্লাহর ভয়ে ভীত লোকদের জন্যে ত নয়। [(আরবী***********)]
আল্লাহ তাআলা রোযা পালন ফরয করেছন্। এটা বার্ষিক প্রতিবর্ষে আবর্তিত হ্ওয়া ফরয। একটি পূর্ণ মাস মানুষদিনের বেলা জঠর ও যৌন কামনা লোভ চরিতার্থ করা থেকে বিরত থাকে। হাদীসে কুদসীতে বলা হয়েছেঃ বান্দা আমারই জন্যে খাবার ত্যাগ করে আমরই জন্যে পানীয় করিহার করে এবং আমারই জন্যে যৌন স্বাদ আস্বাদন ত্যাগ করে। [ইবনে খুজায়ামা হাদীসটি তাঁর সহীহ গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছন। আসলে খুবারী মুসলিম উদ্ধৃত।দেখুনঃ (আরবী***********)]
হজ্জ পালনও ফরয করেছেন। তা সারা জীবনের জন্যে একবার ফরয। মুসলমান হ্জ্জ করার জন্যে নিজের পরিবার পরিজন ও ঘরবাড়ি ও স্বদেশ ত্যাগ করে গাছপালা শস্যক্ষেত শুন্য মরু প্রন্তরের দিকে যাত্র করে আল্লাহর নিদর্শনসমূহের তাজীম করা, আল্লাহর ঘরের ত্ওয়াফ করাই রক্ষ্য। ফলে সে সদ্য জাত শিশুর মতই নিষ্পাপ হয়ে যায়।
হ্যাঁ, আল্লাহ তাআলা মুসলমানকে নামায ও রোযা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। এ দুটির প্রত্যেকটিই দৈহিক ইবাদত। ফরয করেছেন হ্জ্জ পালন, তা যেমন শারীরিক ইবাদত, তেমনি অর্থনৈতিক্ও। হুকুমদিয়েছেন যাকাত দেয়ার জন্যে। তা খালেসভাবে অরথনৈতিক ইবাদত। তাতে নিজের কলিজার টুকরা ধন মাল ব্যয় করতে হয়। তা জীবনের সার নির্যাস তাই আবার দুনয়ার ফিতনা। এসবের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা জনতে চান তাঁর প্রকৃত বান্দকে,কে তার নিজের সবকিছু আল্লাহর জন্যে ত্যাগ করতে প্রস্তুত আরকে ধন মালের বন্দেগী করে দুনয়ার বন্দেগীতে লিপ্ত। আল্লাহর সন্তষ্ট লাভের ঊর্ধ্বে দুনিয়াকে গুরূত্ব ও অগ্রাধিকার দেয়। তাই আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী***********)
যে লোক তার নফসের লোভ লারসাকে দমন করেতে পারল,প্রকৃত পক্ষে তারাই সফলকাম। [(আরবী*******)]
খলিফা বানানোর মত
দ্বিতয়ি মতাদর্শ হচ্ছে, আল্লাহর ধন মালে খলীফানিয়োগ। এ মতাদর্শের ভিত্তি হচ্ছে, পৃথিবীর যাবতীয় ধন মালের নিরংকুশ ও মৌলিক মালিক হচ্ছেন মহান বিশ্যস্রষ্টা আল্লাহ
তাআলা। মানুষ তাতে তাঁরই নিয়োজিত খলীফা বিশ্বলোকের সব কিছুই এর জমি, এর আখাশমণ্ডল সবই আল্লাহর মালিকানা। তিনিই ঘোষণা করেছেনঃ (আরবী*********)
যা কিছু আকাশ মণ্ডলে রয়েছে এবং যা কিছু পৃথিবীতে আছে তার সবই আল্লাহরই জন্যে। [(আরবী******)] (আরবী********)
যা কিছু আকাশ মণ্ডলে, যা কিছু পৃথবীতে এবং যা মাটির তলায় তা সবই আল্লাহরই জন্যে। [(আরবী******)]
এক কথায় যা কিছু আছে, ঊর্ধ্বলোকে কি নিম্নের দিকে, তা সবই খালেসভাবে আল্লাহর মালিকানা।তার কোন একবিন্দতে ও তাঁর শরীক কেউ নেই। বলেছেনঃ (আরবী***********)
বল, তোমরা ডাক সে সব লোকদের, যাদেরকে আল্লাহ ছাড়া প্রভু মালিক মনে কর, তারা আসমান জমিনের এক বিন্দু জিনিসের ও মালিক নয়, তাতে তাদের কোন অংশীদারীত্ব ও নেই এবং তাদের থেকে তার কোন পৃষ্পপোষাক্ও নেই। [(আরবী***********)]
এ মালিকত্ব এই ভিত্তিতে যে, তিনিই এ সবের সৃষ্টিকর্তা, তিনিই এসব কিছুর সংরক্ষক্ওঃ (আরবী********)
আল্লাহই সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা,তিনিই সব জিনিসের সংরক্ষক, প্রষ্ঠপোষক। [(আরবী***********) ] তিনি প্রত্যকটি জিনিসই সৃষ্টি করেছেন এবঙ তার পরিমাণ নির্দিষ্ট করেছেন। [(আরবী*********) ](আরবী*********)
তোমরা আল্লাহ ছাড়া আরা যাদের ডাক, তারা কস্মিন কালে ও একটি মাছি ও সৃষ্টি করতে পারবে না তার সকলে একত্রিত হলে ও। [(আরবী***********)]
সমস্ত ধন মালের মালিক এক আল্লাহ, তিনিই তা তাঁর বান্দাদের দান করেছেন নিয়ামত হিসেবে। তিনিই সে সবের একক ও অনন্য স্রষ্টা ও উদ্ভাবকম উৎপত্তিকারক। মানুষের কাজ হচ্ছে উৎপাদন। এ উৎপাদন তো আল্লাহর সৃষ্টি বস্তুকে কেন্দ্র করে যে বস্তুকে আল্লাহ তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন বানিয়ে দিয়েছেন। এ কারণে অর্থনীতিবিদগণ বলেছেনঃ উৎপাদন হচ্ছে বস্তুর ব্যবহারিক মূল্য সৃষ্টি, বস্তু সৃষ্টি নয়। তার অর্থ, মানুষের শ্রম বস্তুতে রূপান্তরিত করে প্রয়োজনে ব্যবহারের লক্ষ্যে, তার পরই তা ব্যবহার করা বা তা থেকে উপকৃত হ্ওয়া সম্ভাবপর। [দেখনঃডঃ রফয়াত আল মাহজুব লিখিত (আরবী***********)১ম খণ্ড ১৯১-১৯২ পৃ.]
মানুষ যা কিছুই উৎপাদন করে, তাতে মূল বস্তুর প্রকৃতি ও প্রাকিৃতিক গুণকে পরিবর্তিত করতে পারে না। বড়জোর তা তার আসল স্থান থেকে বের করে নিয়ে আসে উদ্ভাবন বা শিকারের মাধ্যমে অথবা যেখানে একটির বস্তু প্রয়োজনতিরিক্ত বিধায় তা এমন স্থানে নিয় যা্ওয়া হল যেখানে তার প্রয়োজন রয়েছে অথবা তা রংরক্ষণ করে, গুদামজাত রাখে ভবিষ্যতে উপকৃত হ্ওয়ার লক্ষ্যে অথবা তা কোন কোন অগ্রাধিকার প্রাপ্ত ব্যাপারের জন্যে সেই বিশেষ প্রয়োজন মেটানোর উদ্দেশ্যে তা রেখে দেয়া অথবা তা একটি আকৃতি ও বাহ্যিক রূপ থেকে পরিবর্তিত ক ভিন্নতর রূপদান করে তূলোধুনো করে বা বয়নে লাগিয়ে, অংকন বা পেষণ করে গুড়া বানানোর মাধ্যমে। অথবা দ্রব্য সামগ্রীকে একত্র করে একটা নতুন জিনিস তৈরী করা হল। এটা উপাদনসমুহে নিছক পরবর্তন সাধনমত্র স্থানান্তর রূপান্তরকরণ। এমন কি এমন এক নতুন সম্পদ সৃষ্টি যা পূর্বে ছিল না। যেমন কৃষি ফসল, পশু পালন। এক কথার মানুষ বাহ্যিকভাবে অপর জিনিস উৎপাদান করার ক্ষেত্রেই কাজ করে, শ্রম লাগায়। [দেখুনঃ ডঃআলী আবদুল ওয়াহিদ ওয়াফীকৃত (আরবী***********) গ্রন্থে ৭৪-৭৬পৃ. পঞ্চম সংস্করণ।]
উৎপাদনে মানুষের ভূমিকা কতটা অর্থদরশনের দিকপাল তার বর্ণনা এভাবেই দিয়েছেন। তা হেচ্ছে নিছক মুক্তকরণ, অবস্থাস্তর, রূপান্তর ও স্থানান্তর মাত্র। কিন্তু সে জিনিসের উদ্ভাবক কে? তিনি হচ্ছেনঃ (আরবী***********)
আমাদের সেই রব্ব যিনি প্রত্যেকটি জিনিসিই সৃষ্টি করেছেন এবং পরে তার ব্যবহার ওপ্রয়োগ বিধি দিয়েছেন। [(আরবী***********)] (আরবী***********)
আল্লাহ তো তিনি যিনি আকামণ্ডল ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং ঊর্ধ্বলোক থেকে পানি বর্ষিয়েছেন, তার দ্বারা বিভিন্ন ফল ফসর উৎপাদন করান তোমাদের রিষিকস্বরূপ। তিনি তোমাদের জন্যে নিয়ন্ত্রত করেছেন নৌকা জাহাজ, যেন তা নদী সমুদ্রে তাঁর নির্দেশ অনূযায়ী চলতে পারে। তিনি তোমাদের জন্যে খাল নদী ও নিয়ন্ত্রিত করেছেন, তিনি তোমাদের জন্যে সূর্য এরং চন্দ্রকে ও নিয়ন্ত্রি করেছেন আবর্তনশীল আবস্থায় রাত এরং দিনকে ও তোমাদের জন্যে নিয়কিন্ত্রত করেছেন এবং তোমাদের সেসব জিনিসই তিনি দিয়েছেন যা তোমরা চেয়েছিলে, যার প্রয়োজন তোমরা বুঝেছিল। তোমরা যদি আল্লাহর দেয়া নেয়ামতসমূহ গণনা করতে চা্ও, তাহলে তা কখনই পারবে না।
এমন কি এ পরিবর্তন ও মুক্ত করন কর্মের সহজ পন্হাগ্রহণ ও তা করার শক্তি বৃদ্ধি ও ক্ষমতা দান এবং এ পথে প্রয়োজনীয় সাহায্য সহযোগিতা পা্ওয়ার ব্যবস্থা ও সেই আল্লাহই করে দয়েছেন,যিনি আমদের রব্ব, যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন অথচ মানুষ এরং পূর্বে উল্লেখযোগ্য কিছুই না্ মানুষ যা জানতো না, তা্ও তাকে তিনিই জানিয়ে দিয়েছেন্।
এ কাথাটি স্পষ্ট করার উদ্দেশ্যে এখানে দৃষ্টান্তের অবতরণা করা হচ্ছেঃ
মানুষ যখন চাষাবাদ করে বীজ বপন করে, সে বীজে গাছ হয় ও দানার ছড়া বের হয়ে আসে অথবা বৃক্ষরোপণ করে, তাতে ফল ধরে। এক্ষণে প্রশ্ন এ ফসল ফালানোয় ও ফল দারানোয় পানি নষ্কাশন ইত্যাদিতে মানুষের শ্রম কতট লেগেছে আল্লাহর কাজের মুকাবিলায় তুলানামূলকভাবে যেখানে আল্লাহ জমিনকে বিনয়ী চাষযোগ্য বানিয়ে দিয়েছেন, বাতাসের প্রবাহ চালিয়েছেন, মেঘ নিয়ন্ত্রণ করে ঊর্ধ্বলোক থেকে বৃষ্টি বর্ষিয়েছেন অথবা জমিনে খাল ঝর্ণা প্রবাহিত করেছন, প্রয়োজন পরিমাণ রৌদ্র ও তাপ দান করিয়েয়েন, চন্দ্রের জ্যোতি প্রতিফলিত করেছেন, বাতস প্রবাহিত করেছেন, দানাকে মাঠির অভ্যন্তর থেকে খাদ্য গ্রহণে সক্ষম বানিয়েছেন বহু প্রকারের উপাদান থেকে। শেষ পর্যর্ত এক একটা গাছ গড়ে ওঠেছে শাখা প্রশাখা পত্র পল্লব ফুল ও ফল সমন্বিত।
স্পষ্ট দেখা যায়, মহান আল্লাহর অবদানের তুলনায় মানুষের কাজ ও শ্রমের যোগ তো খুব সমান্যই।
তাছাড়া মানুষ যে কাজ করে, আল্লাহ যদি তাকে বিবেক বুদ্ধি চিন্তাশাক্তি ও ব্যবস্থাপনা যোগ্যতা না দিতেন, কার্যকর করার ক্ষমাতা না দিতেন কাজ করার তাতিয়ার না দিতেন তা হলে মানুষকি করে কাজ করত কি করে উৎপাদন করত?
মানুষের ওপর আল্লাহর এ অশেষ দয়া ও অনুগ্রহের কথা কুরআন মজীদে বলা হয়েছে। তাদের সম্মুখে মহাসত্য উদঘাটিত করার প্রসঙ্গে বলেছেনঃ (আরবী***********)
তোমরা যে চাষাবাদ কর, সে বিষয়টি কি কখনো ভেবে দেখছ? তোমরা চাষাবাদ কর, ফসল ফলা্ও, না আমরা প্রকৃত পক্ষে চাষাবাদ করে ফসল ফলানোর কাজ টি আঞ্জাম দিই? আমরা চাইলে সমস্ত ফসলকে ভুসি ও টুকরা টুকরা বানিয়ে দিতাম, তখন তোমরা নানারূপ কথা রটাতে থাকতে যে, আমরদের ওপরই চাবুকটাপড়ল। বরং বলবে আমাদের ভাগ্যটাই খারাপ হয়ে গেছে। তোমরা কি কখন্ও চোখ মেলে তাকিয়ে দেখছ, যে পানি পান কর, তা কি তোমরাই মেঘ থেকে বর্ষিয়েছ বিংবা তার বর্ষণকারী আমরা? আমরা ইচ্ছা করলে তা লবণাক্ত বানাতে পারতাম।কিন্তু বানাই নি)তা সত্ত্বে ও তোমরা শোকর কর না কেন?[ (আরবী***********)]
অপর একটি আয়াতে বলা হয়েছেঃ (আরবী***********)
মানুষের উচিত তার খাদ্যের প্রতি দৃষ্টি পাত করা। আমরাই পানি ঢেলেছি, পরে জমিকে আমরাই দীর্ণ করেছি, তার ফলে তাতে উৎপাদন করেছি দানা, আংগুর তরিতরকারি। [(আরবী***********)]
তৃতীয় একটি আয়াতে বলা হয়েছেঃ (আরবী***********)
তাদের জন্যে একটা নিদর্শন হচ্ছে মৃত জমি, আমরাই তা পুনরুজ্জীবিত করি এবং তা থেকে বের করি দানা,তার কোনটি তারা খায়। আর পৃথিবীতে খেজুর ও
আংগুরের গন সন্নিবেশিত বাগান বানিয়েছি এবং তার বুকে খাল ঝর্ণা প্রবাহিত করেছি, যেন তারা তার ফল ও তাদের হাতের কাজের ফসল খেতে পারে, তারা কি শোকর করবে না। [(আরবী***********)]
হ্যাঁ এটাই প্রশ্ন,তারা শোকর করবে কিনা ? তারা তো এমন সব ফল পকড়া্ও খায়, ফলানোর জন্যে তারা কোন শ্রম করেন্।তা ফলেছে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর উৎপাদন ব্যবস্থার অধীনে। তিনিই মৃত জমিন পুনরুজ্জীবিত করেছেন, তা থেকে দান বের করেছেন, বাগান রছনা করেছন এবং ঝর্ণাধরা সমূহ প্রবাহিত করেছেন।
কেবল কৃষিক্ষেত্রেই আল্লাহর কুদরতী কাজ করেনি করেছে সর্বব্যাপারে সর্বক্ষেত্রে, জীবনের সব দিকে ্ও বিভাগে। তা কৃষি হোক, কি ব্যবসায় অথবা শিল্প কিংবা অন্য কিছু। দৃষ্টান্তস্বরূপ শিল্পের কথা বলা যায়। আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে কাঁচা মাল আমরা পাই, তা মানুষের উৎপাদন নয়। যেমন আল্লাহ তাআলা লৌহ বা উস্পাত বস্তু হিসেবে সৃষ্টি করে দিয়েছেন। বলেছেনঃ (আরবী***********)
এবং আমরা লৌহ নামিয়ে দিয়েছি,তাতে কঠিন শক্তি নিহিত এবং জনগণের জন্যে অশেষ কল্যাণ। [(আরবী*********)] আয়াতের (আরবী*********) শব্দের শাব্দিক বা আভিধানিক অর্থ নাযিল করেছি। তার ব্যবহারিক অর্থ আল্লাহর কোন নৈসার্গিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে লৌহ সৃষ্টি করেছেন, তাতে মানুষের কিছু করবার ছিল না ক্ষমতা্ও নেই। আল্লাহর কুদরতের সৃষ্টি করেছে, না পেট্রোল, না বিদ্যুৎ। মানুষ এগুলো আবিষ্কার করেছে মাত্র। কিন্তু বিশ্বলোক গর্ভে তা নিহিত করে রেখেছেন তো একমাত্র মহান আল্লাহই।
শিল্পোদ্ভাবনের পন্হা মানুষ আল্লাহর কাছ থেকে ইলহাম হিসেবে জানতে পেরেছে।তিনিই মানুষকে এসব কিছু শিখিয়েছেনঃ অথচ মানুষ এ সবের কিছুই জানতো না।আল্লাহ নিজেই হযরত দাঊদ সম্পর্কে বলেছেনঃ
(আরবী***********)
এবং তাকে আমরা পোশাক নির্মাণ শিল্প শিক্ষা দিলাম তোমাদের জন্যেই, যেন তোমাদেরকে তা রক্ষা করতে পারে তোমাদের অসুবিধা থেকে। তোমরা কি শোকর গুজার হবে?[ (আরবী***********)]
এ থেকে আমরা এ সিদ্ধান্তে পৌছতে পারি যে, সর্ব প্রকারের ধানমাল আল্লাহর সৃষ্ট, তিনি তা স্বীয় অনুগ্রহ ও দানস্বরূপ মানুষকে দিয়েছেন। তা আল্লাহর দেয়া রিযিক। তাই
মানুষ যখনই স্বীয় কর্ম ও শ্রমের কথা স্মরণ করবে, তার পূর্বে স্মরণ করা উচিত এ সব জিনিসের সৃষ্টি ও উদ্ভাবনে আল্লাহর কুদরতের অবাদনকে। (আরবী***********)
তোমাদের কাছে যে নিয়ামতইত রয়েছে, তা তো আল্লাহর কাছ থেকে পাওয়া। [(আরবী***********)]
এরূপ অবস্থায় আল্লাহর বান্দারা আল্লাহর কাছ থেকে বিপুল ধন সম্পদ পেয়ে তার কিছুটা অংশ সে আল্লাহরই পথে, আল্লাহর কালেমা বুলন্দ ও প্রচারের কাজে এবং তারই অপর ভাই আল্লাহর বান্দদের জন্যে ব্যয় করবে, তা আর বিচিত্র কি?
তাহলেই দাতার শোকর আদয় করা সম্ভবপর হবে।এ কারণেই আল্লাহ তাআলা তাঁ গ্রন্থে নির্দেশ দিয়েছেনঃ (আরবী***********)
তোমরা সেসব ধন মাল থেকে আল্লাহর পথে ব্যয় কর, যা আমরা রিযিক হিসেবে তোমাদের দিয়েছি। [(আরবী*********)] (আরবী********)
এবং আমরা তাদের যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে তারা আল্লাহর নিয়োজিত খলীফা ছাড়া আরা কিছুই নয় অথবা বলা যায়, এসব ধন মালের প্রবৃদ্ধি সাধন ও তা ব্যয় ব্যবহারের জন্যে নির্ভর যোগ্য দায়িত্বশীল মাত্র। আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী***********)
দা্ও তাদের আল্লাহর সেই মাল থেকে, যা তিনি তোমাদেরকে দান করেছেন। (আরবী***********)] বলেছেনঃ (আরবী*********)
আল্লাহর অনুগ্রহস্বরূপ ধন সম্পদে যারা কার্পণ্য করে, তারা যেন মনে না করে যে, তাদের জন্যে ভালো। না, বরং তা তাদের জন্যে খুব খারাপ হয়েছে, আল্লাহর স্বীয় অণূগ্রস্বরূপ দেয়া মালে কার্পণ্য করে যেন মানুষ এ সত্য সব সময়ই মনে রাখে যে, ধন মাল তার নয়, আল্লাহর এবং সে তা আল্লাহর অনুগ্রহের অবদান হিসেবেই পয়েছে।
বলেছেনঃ (আরবী***********)
এবং ব্যয় কর সে মাল থেকে যাতে আল্লাহ তোমাদেরকে খলীফা বানিয়েছেন। [(আরবী***********)] প্রমাণিত হল, মানুষ আসলে ধন মালের মালিক নয়, সে প্রকৃত মালিকের খলীফা মাত্র। প্রকৃত মালিক আল্লাহ। মানুষ তার রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহারকারী মাত্র। মানুষ আল্লাহর উকীল। [ ইবনুল কাইয়্যেম প্রশ্ন তুলেছেন, কোন লোককে আল্লাহর উকীল বলা যায় কিনা? তিনি নিজে এ প্রশ্নের জবাব দিয়েছে না সূচক। কেননা উকীল মোয়াক্কেলের স্থলাভিষিক্তি হয়ে কর্তৃত্ব করে। কিন্তু আল্লাহর কোন কর্তৃত্বসম্পন্ন নায়েব নেই। তাঁর স্থলাভিষিক্ত কেউ হতে পারে না। তিনিই বরং বান্দার স্থালাভিষিক্ত। যেমন নব করীম (স) এর একটি দোআর ভাষা হচ্ছেঃ হে আল্লাহ তুমি সফরে সঙ্গী এবং বংশ পরিবারে খলীফা। পরে বলেছেন, তবে এ কথাটি যদি এ অর্থে নেয়া হয় যে, মানুষ নির্দেশিত আল্লাহর অর্পিত জিনিসগুলোর সঙরক্ষণে তার দেখাশুনা এ লালন পারনের পন্যে, তাহলে তা যথার্থ কাথা। (আরবী***********)]
তাফসীরুল কাশশাফ লেখক আর তোমরা ব্যবয় কর সেই জিনিস থেকে যাতে তিনি তোমাদেরকে খলীফা বানিয়েছেন, আল্লাহর এ কথার তাফসীরে লিখিছেনঃ তোমাদের হাতে যে সব ধন মাল রয়েছে, তা সবই আল্লাহর সৃষ্টি, তাঁরই উদ্ভাবিত বলে তা সবই আল্লাহর। তিনিই তা তোমাদের দানকারী। তা ব্যবহার করার ও তা থেকে উপকৃত হ্ওয়ার জন্যে তিনিই তোমাদের সুযোগ দিয়েছেন অর্থাৎ তিনি সেসব ধন মালে হস্তক্ষেপ ও ব্যয় ব্যহার করার জন্যে খলীফা বানিয়েছেন তোমাদেরকে। অতএব তা প্রকৃত পক্ষে তোমরা তা থেকে আল্লাহর অধিকার আদায়ে ব্যয় কর, তা থেকে ব্যয় করার তোমাদের অধিকার রয়েছে। যেমন অপর কারোর ধনা মাল ব্যয় ব্যবহার করার সেইপেতে পারে, যাকে তা করার জন্যে অনুমতি দেয়া হবে। [ (আরবী***********)]
ধন মাল আল্লাহর মানুষতাতে নয়েব বা উকীলমাত্র একথাটুকু জেনে নেয়াই যথেষ্ট নয়। তা ব্যয় ও দান করা সহজ হ্ওয়ার জন্যে অনুমতি পেলে অপরের ধন মালে হস্থক্ষেপ করা সাধারণত সহজই হয়ে থাকে। বরং সে সাথে এ নিগূঢ় তত্ত্ব ও জানতে হবে যে, মানুষ ধন মালের প্রকৃত মালিকের ইচ্ছাকে মেনে চলতে বাধ্য্ কেননা উকীল তো তাকেই বলা হয়, যে মোয়াক্কেলের ইচ্ছায় প্রতিভূ হয়ে থাকে। তিনি যা চান, তাকে কার্যকর করা ও তার দায়িত্ব। তার মন যা বা যে রকম চাইবে, সেরকম হস্তক্ষেপ করার কোন ব্যক্তিগত বা স্বতন্ত্র অধিকার কারোরই নেই। অন্যথায় তার উকিল হ্ওয়াটাই বাতিল হয়ে যাবে। সুযোগ পেয়ে খারাপ আচরণ গ্রহণের দরুন অতঃপর সে খলীফা হ্ওয়ার যোগ্যই বিবেচিত হবেনা।
আমাদের মনীষী ও বিশেষজ্ঞগনণ ধন মালে আল্লাহর হক বা অধিকার কি, তা খুবই উন্নত ও বলিষ্ঠ ভাষায় বিবৃত করেছেন। ইমাম রাযী তাঁর তাফসীর যা লিখেছেন, তা এখানে উদ্ধৃত করছিঃ
গরীব দরিদ্র লোকেরা আল্লাহর পরিবারভুক্ত। ধনী লোকেরা হচ্ছে আল্লাহর ধন ভাণ্ডারের ধারক বা রক্ষী কেননা তাদের কাছে যেসব ধন মাল রয়েছে, তা সবই আল্লাহর ধন মাল। এরূপ অবস্থায় ধন মালের মালিক যদি তার রয়েছে, তা সবই আল্লাহর ধন-মাল। এরূপ অব্স্থায় ধন-মালের মালিক যদি তার ধন রক্ষীকে বলে যে ভাণ্ডারের ধারক বা রক্ষী কেননা তাদের কাছে যেসব ধন মাল রয়েছে, তার একটা অংশ আমার পরিবারের অভাবগস্ত লোকদের জন্যে ব্যয় কর, তবে তা বিচিত্র কিছু নয়। [(আরবী***********)]
কাযী ইবনুল আরাবী লিখেছেনঃ
আল্লাহ তা আলা তাঁর উচ্চতর বুদ্ধিসত্তা এবং মহান কর্যকর আইন বিধানের ভিত্তিতে কিছু লোককে বিশেষভাবে ধন মাল দিয়েছেন, অপর খিছু লোককে দেন নি। এ দেয়াটা হচ্ছে তাদের প্রতি আল্লাহর নেয়ামত। আর এ নেয়ামতের শোকরের পন্হা বানিয়েছেন এই যে, তার মালের একটা অংশ তাকে দেবে যার ধন মাল নেই। এটা মহান আল্লাহর প্রতিনিধিত্বস্বরূপ সেক্ষেত্রে যেখানে তিনি তাদের প্রতি অনুগ্রহ দান করেছেন। (আরবী***********)
পৃথিবীর বুকে যত প্রাণিই আছে, সকলেরই রিযিক দেয়া দায়িত্ব আল্লাহর। [(আরবী***********)]
ধনী লোক আল্লাহর খাজাঞ্চী ধন মালের আমানতদার। সে এ মাল আল্লাহরক পরিবারের জন্যে ব্যয় জন্যে দায়ী। এক্ষণে সে যদি আল্লাহর এ ধন-মাল নিজেই ভক্ষণ করতে শুরু করে, অন্য কাউকে এ নেয়ামতের শরীক না করে, তাহলে সে আল্লাহর আযাব ও শাস্তি পা্ওয়ার যোগ্য হয়ে পড়বে।
আল্লাহর কথাহিসেবে বর্ণিত একটি হাদীসে কুদসী জনগণের মধ্যে ব্যাপাক প্রচার লাভ করেছ। তা হচ্ছেঃ
মাল আমার গরীবরা সব আমার পরিবার, ধনী লোকেরা আমার উকিল ভারপ্রাপ্তপ্রতিনিধি। আমার উকলরা যদি কার্পণ্য করে আমার পরিবারবর্গের প্রয়োজন পূরণে, তাহলে আমি তাদের আমার আযাবের স্বাদ আস্বাদন করার, তাতে আমি কারোই পরোয়া করব না। [অনেক অনুসন্ধান করে ও এ কথার সত্যতার প্রমাণ আমি পাইনি। এ কথাটি কার তা ও জানা যায়নি। গ্রন্হকার]
উপরিউক্ত হাদীসটি সনদের দিক দিয়ে অপ্রমাণিত হলে ও এর তাৎপর্য মোটামুটি যথার্থ এবং সঠিক। হাদীস টি সমদের দিক দিয়ে অপ্রমণিত হলে ও এর তাৎপর্য মোটামুটি যথার্থ এবং সঠিক। হাদীসটি সর্বাসাধারণ মুসলমানের কাছে খুব বেশী পরিচিত বলে মনে
করা যায়, আল্লাহর ধন মালে মানুষের খলীফা হ্ওয়ার ধারণাটি খুব বেশী মজবুত এবং সুদৃঢ়। চিন্তার ক্ষেত্রে তা খুব বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তার গভীর শিকড় পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের সুন্নাতে।
মজারা ব্যাপার হচ্ছে, মুসলিম দেশগুলোর বহু ভিক্ষাপ্রার্থী ও দার চা্ওয়ার লোক এ মতামতটির সাথে খুব বেশী পরিচিত এবং তারা সক্ষম সমর্থ লোকদের অনুগ্রহের দৃষ্টি আকর্ষণে, তাদের কাছ থেকে মোটা রকমের দান সাদকা হাসিল করার উদ্দশ্যে খুব বেশী ব্যবহার বা উচ্চরণ করে থাকে। তাদের অনেকেরই মুখেধ্বণিত হয়ঃ ধন মাল তো আল্লাহর। ……. কথাটা তো ঠিক, কিন্তু তা ব্যবহার করা হয মন্দ উদ্দেশ্য্
হোদসে বলা হয়েছেঃ কিয়ামতের দিন ফকরিদর মুকাবিলায় ধনী লোকদের জন্যে হবে অয়ল দোযখ। সেদিন গরীব লোকেরা ফরিয়াদ করবেঃ হে আমাদের রব্ব। ধনীরা আমাদের হক না দিয়ে আমাদের ওপর জুলুম করেছে, তুমিইেএ সব হক তাদের ওপর ফরয় করে দিয়েছিলে আমাদের দেয়ার জন্যে। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ আমার মর্যাদা, আমার মহানত্বের শপথ! আজ আমি তোমাদেরকে আমার কাছে স্থান দেব এবং ্ওদেরকে দূবে সরিয়ে রাখব। [কাবারানী হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন (আরবী***********) গ্রন্থে আনাস থেকে। হাদীসটির সনদ যয়ীফ। (আরবী***********)]
ব্যক্তি ও সমষ্টির মধ্যকার দায়্ত্বি গ্রহণের মতবাদ তৃতীয় মতাদর্শ হচ্ছে ও সমষ্টির মধ্যে দায়ত্ব গ্রহণ ব্যবস্থা সংক্রান্ত মতবাদ। সমাজ দার্শনিকদের কাছে এটা সর্ববাদীসমর্থিত যে, মানুষ স্বভাবতই সামাজিক। প্রাচীন দর্শনিকরা বলেছেন, মানুস সামাজিক জীব। আর আধকিরা বলেছেন, মানুষ সমাজের মধ্যে বসবাস ছাড়া যথার্থ মানব জীবন যাপন করতে সক্ষম হতে পারে না।
একথা ও ছূড়ান্তভাবে সমর্থিত যে, ব্যক্তি সমষ্টির কাছে ঋণী তার বহু প্রকারের জ্ঞান, তত্ত্ব ও মর্যাদা বিশেষত্ব লাভের জন্যে। কেননা ব্যক্তি জীবনের সূচনা থেকেই সমাজ সমষ্টির প্রত্যক্ষ সাহয্য সহয়োগিতা ছাড়া বাঁচতে ও জীবন জাপন করতে পারে না। সমাজই হয় ব্যক্তির বীবন ও স্থিতির ধারক অতন্দ্র প্রহরী। তা না হলে মানুষতার দোলনাতেই মরে পড়ে থাকত। সমাজ সমষ্টিই ব্যক্তিকে সভ্যতার উপাদান ও নিয়ম কানুন সম্পর্কে অবহিত করে। তার আচার আচরণ মালীন ও দায়িত্বপূর্ণ বানায়, সামষ্টিক উত্তরাধিকারের মৌল নীতিসমূহ ও সমাজই তাকে জানিয়ে দেয়। ভাষা, আচার আচারণ, প্রচলন অনুসরণের প্রবণতার রীতি নীতি, বিভিন্ন সভ্যতা ও সঙস্কৃতি, ধর্মীয় বিধি বিধান ও পারস্পরিক লেন দেন, কর্যকলাপ ইত্যাদি সবই তো সমাজসমষ্টি ব্যাক্তিকে শক্ষাদান করে। বস্তুত সামজিক ও সামাষ্টিক জীবন না হলে ব্যক্তিরা বোবা পশু হয়ে যেত। বৈষয়িক বিষয়াদি সম্পর্কে সে কিছুই জানতে পারত না অথবা হত এমন শিশু যে, তার জন্যে ক্ষতিকর কি আর উপকারী কি, তা জানতেই পারত না। সমাজ সমষ্টিই তার
আচার আচরণ ভারসাম্যপূর্ণ তখন তার বিবেক বুদ্ধি থাকে সাদ দাগ চিহ্ন হীন প্রস্তর ফলকের মত। পরে সমাজ সমষ্টি সামাজিক উত্তরাধিকারের কার্যকারণ দিয়ে তাকে লালন পালন করতে তাকে। আর তা পূর্বসূরিয়া উত্তরসূরিদদের জন্যেই রেখে গেছে। ভাষা, সংস্কৃতি,আকীদা বিশ্বাস অনুসরণ, এ সবই এ পর্যয়ে পড়ে। [দেখুন ডঃ আহমাদ আলখাশশাব লিখিত প্রন্হ (আরবী***********)]
অতএব ব্যক্তি সমাজ সমষ্টির কাছে ঋণী, এতে আর কোন সন্দেহ নেই। এ কথা যেমন সত্য হয় ব্যক্তির আত্মিক,সাংস্কৃতিক ও সভ্যতা সংক্রান্ত উপার্জনের ক্ষেত্রে, তেমনি সত্য হয় তার বস্তুগত ও অর্থনৈতিকি আয় উপার্জনের ব্যাপার ও।
কাজেই ব্যক্তি যদি ও বহু স্বভাবজাত গুণ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়ে তাকে, তবু্ও এ কথায় সন্দেহ নেই যে, সে যা কিছু উপার্জন করে তা তার একক চেষ্টা সাধনার ফলেই উপার্জন করে না। তাতে শরীক রয়েছে বহ মানুষের চেষ্টা, চিন্ত ও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হাতের শক্তি, যা গুণে শেষ করা যাবে না কোনটি অংশগ্রহণ করেছে কাছে থেকে এবং কোনটি করেছে দূর থেকে, কোনটি স্বেচ্ছায় আবার কোনটি অনিচ্ছায় ও অজ্ঞাতসারে। ধন মাল তার মালিকের হাতে পৌছানের এসব হচ্ছে কার্যকারণ আর এ কার্যকারণ সমূহই তাতে পুরামাত্রায় শরীক রয়েছে।
যে কৃষক গমের ফসল কেটে ঘরে নিয়ে এলো সে কি করে তা লাভ করল, তা চিন্তা করলেই উপরের কথার যথার্থতা বোঝা যায়। ক্ষেত্রে সমাজ সমষ্টির চেষ্টার তুলনায় ব্যক্তির চেষ্টা সাধানার মুল্য কত? সমাজই খাল কেটেছে, জমিতে দখল দিয়েছে, সেচের ব্যবস্থা করেছে, চাষ যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করেছে এবং এ সময় যে খোরাক পোশাক ও বাসস্থানের প্রয়োজন হয়েছিল, তা তকেব যোগড় করে দিয়েছে। সর্বোপরি দেশে ও সমাজে শান্তি শৃংখলা ইত্যাদি সামাজিক আনুকুল্য এত বেশী পেয়েছে, যা গুণে শেষ করা যাবে না।
একজন ব্রবসায়ীর কাথা চিন্তর করা যায়। সেকি করে মুলধন সংগ্রহ করল? কি করে সে কামাই রোজগার করল? তার ওপর ও তো সমাজের বহু অনুগ্রহের অবদান রয়েছে। সে অবাদান বিরাট,অসামন্য। কে তার কাছে পণ্য বিক্রয় করে, তার কাছ থেকে কে তা ক্রয় করে? কে সেসব পণ্য তৈয়ার করে? সমাজ সমষ্টির আনূকুল্য না পেলে তার কোন কাজটা চলত?
কৃষক, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি বেতনভুক কর্মচারী, প্রত্যেক পেশা ও প্রত্যেক ধরনের মালের মালিক মস্পর্কেই এ কথা সত্য।
ও সম্পত্তি তখন সমাজ সমষ্টির চেষ্টা সাধনার ব্যাপরটি অধিক প্রকাশমান এবং বড় হয়ে ওঠে। ব্যক্তির অংশ সেখানে খুব সামন্য এবং ক্ষীণ পরিলক্ষিত হয়। কেননা ব্যক্তির কর্মক্ষমতা তো সমিাবদ্ধ। তাকে তার শক্তি সমার্থ্যের সময়ের ও প্রয়োজনের স্বাভাবিক সমিাবদ্ধতা নিয়েই থাকতে ও চলতে হয়।
বিশাল কৃষি খামার বা বিরাট শিল্প কারখানা অথবা বহু শাখা প্রশাখা সমন্বিত ব্যবসার প্রতিষ্ঠানের মালিক কতখানি চেষ্টা চালিয়ে থাকে? কাজটা যখন প্রাতিষ্ঠনিক হয়, তখন ব্যক্তির ব্যক্তিগত চেষ্টার স্থান তো খব নগণ্যই হয়ে থাক। অপরদিকে থাকে তার সাথে কাজে শরীক শত সহস্র,মানুষের চষ্টোর সংযোগ। সেজন্যে তাদের মাথার ঘাম, চোখের দৃষ্টি এবং চিরন্তন শক্তি ব্যয় হয়ে থাকে অপরিমেয়।
এ করণে এক ব্যক্তি যে ধন মাল রোজগার করে, যাকে সে নিজেরর ধান মাল বলে দাবি করে ও সেজন্যে অহম বোধ করে, তা আসলে সমাজ ও সমষ্টির সম্পদ। সমাজের সম্পদবলে ও তা গণ্য হবে, তার হিসেব সমাজের খাতায় ও লেখা হবে। তার সংরক্ষণের দায়িত্ব পালনের জন্যে সামজকেই দায়ী করা হবে।
একারণেই কুরআন মজীদে মুসলিম সমাজকে সম্বোধন করে বলা হয়েছেঃ (আরবী***********)
এবং তোমরা তোমাদের ধনমাল কম বুদ্ধির লোকদেরে দি ও না,যে ধন মালকে আল্লাহ তোমাদের জন্যে স্থিতির মাধ্যম বানিয়েছেন। [(আরবী***********)]
ফিকাহবিদগণ এ আয়াতের ভিত্তিতেই নির্বোধ ও বহুদা খরচকারী, অপচয়কারীদের ওপর তাদের ধন সম্পদ ব্যয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিধান বের করেছেন। বহ্যত সে ধন মাল তাদের কতৃত্ব ও দখলে ও থাকলে ও এর্ং তার মালিক হলে ও প্রকৃত পক্ষে তা সমষ্টির মালিকানা সম্পদ। তা বৃদ্ধি পেয়েছে, সংরক্ষিত হয়েছে সমাজের ব্যবস্থাপনায়। তা ধ্বংস প্রাপ্ত হলে তার ক্ষতিটা সমাজ সমষ্টিকেই ভোগ করতে হয়।
এ দুষ্টিকোণ দিয়ে আল্লাহ তাআলার উপরিউক্ত কথা এবং তাতে সমাজ সমষ্টিকে সম্বোধন করার তাৎপর্য খুব পরিষ্কার বুঝতে পারা যায়। তোমরা তোমাদের ধন মাল নির্বোদ মালিকানা স্বত্বের অধিকরী সম্পর্কে একটা আল্লাহর ঘোষনা পা্ওয়া যাচ্ছে। পরে ও যা আল্লাহ তাআলা তাদের জন্যে স্থিতির মাধ্যম বানিয়েছেন বলা হয়নি, বরং বলা হয়েছেঃ যাকে আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্যে স্থিতির মাধ্যম বানিয়েছেন। তার অর্থ ধন মাল যদ্ওি তাদের ও মালিকনাধীন তবু ও তা গোটা সমাজ সমষ্টির জন্যে স্থিতির মাধ্যম সামষ্টিক বীবনের মেরুদণ্ড।
কুরআন আর ও বলছেঃ (আরবী***********)
হে ঈমানদার লোকেরা। তোমরা তোমদেরধন মাল পারষ্পরিক ক্ষেত্রে বাতিল পন্হায় ভক্ষণ করো না। তবে যদি তোমাদের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবসায় হয এবং তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। আল্লাহ নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতি দয়াবান। [ (আরবী***********)]
এ আয়াত মুমিনদের পারস্পরিক ভাবে ধন মাল বাতিল পন্হায় ভক্ষণ করতে নিষেধ করছে। যেমন নিষেধ করছে পরষ্পকে হত্যা করতে। আয়াতে তোমাদের ধন মাল এবং তোমাদের নিজেদের বরঅ হয়েছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে এ চেতনা জাগিয়ে দা্ও যে, তাদের কতিপয়ের ধন মাল আসলে তাদের সমষ্টির ধন মাল। একজনের নফস সত্তাসমষ্টির আত্মসত্তার মতই।
মুসলিম উম্মত তাদের অধিকার রক্ষা, তাদের কল্যাণ তাদের নফস ও ধন মাল সব কিছুর জন্যে দায়িত্বশীল। এমতাবস্থায় কেউ যদি অন্য কারোর মালা ভক্ষণ করে, সে যেন তার নিজের ধন মাল ভক্ষণ করে অথবা ভক্ষণ করে গোটা সমাজ সমষ্টির ধন মাল। এক্ষণে কেউদ যদি তা ভাইয়ের জনের ওপর হামলা করে তাকে হত্যা করে সে যেন নিজেকেই হত্যা করল অথবা গোটা সমাজকে হত্যা করল। অন্য আয়াতে সেকথাই বলা হয়েছেঃ (আরবী***********)
যে লো কোন মানুষেকে হত্যা করল অন্য কোন ব্যক্তিকে হত্যার শাস্তির বিসেব ছাড়াই অথবা পৃথিবতে বিপর্যয় সৃষ্টি ব্রতিরেকেই সে যেন সমস্ত মানুষকে হত্যা করল। পক্ষান্তরে যে লোক একটি মানুষকে বাঁচালো সে যেন সমস্ত মানুষকেই বাঁচাল। [(আরবী***********)]
কুরআন মজীদের মর্যাদা মাহাত্ম্য এবং তার মুজিযা অসাধারণ। তার একটি কথা বা তার অংশ দ্বারা এক মহা্ ও বিরাট সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে যদ্দারা এক মহামূল্য মৌলনীতি উদ্ঘাটিত হয়।যেমন সূরা নিসার উপরিউক্ত আয়াতটি ঃতোমরা খেয়ো না তোমাদের মালকপারস্পরিকভাবে বাতিল উপায়ে। এখানে ধন মালকে সমস্ত মুসলমানের মুল করে ঘোষণা করা হয়েছে। তার যেন পরস্পর পরস্পারের মাল না খায় একথা বলা
হয়নি। এ থেকে জানিয়ে দেয়া হল যে, গোট মুসলিম সমাজ এক অবিভাজ্য ইউনিট, প্রতিটি ব্যাপারেই তারা পরস্পরের ধারক ও রক্ষক। যেন বলা হলঃ
আমাদের ধন মাল প্রকৃত পক্ষে তোমাদেরই ধন মাল।তোমাদের ধন মাল। তোমাদের প্রত্যেক ব্যক্তির ধন মাল, প্রকৃত পক্ষে তোমাদেরই ধন মাল। তোমাদের প্রত্যেক ব্যক্তির ধন মাল, প্রকৃত পক্ষে গোটা সমাজের ধনমাল।
সাইয়্যেদ রশীদ রিজা এ আয়াতের তাফাসীরে লিখেছেনঃ এ ধরনের সম্পর্ক স্থাপন ইসলামে রংশীদারিত্বের নীতি নির্ধারণ করে, যার দিকে একালের কমিউনিস্ট সমাজ তন্ত্রীরা ইংগিত করে থাকে অথচ এ ক্ষেত্রে ইসলামের যে সুবিচারমুলক নীতি রয়েছে, তা তারা জানতে ও বুঝতে পারে না। তারা যদি ইসলামে জিনেসের সন্ধান করে তাহলে তারা তা অবশ্যেই পাবে। কেননা ইসলাম তার অনুসারী প্রত্যেক ব্যক্তির ধন মালকে সম্পূর্ণরূপে গোটা উম্মতের ধন মাল বলে ঘোষণা করেছে যদি ও ব্যক্তিগত দখন ও মালিকানা পূর্ণমাত্রায় স্বীকৃত, ব্যক্তির অধিকার সংরক্ষিত। তা প্রত্যেক বিপুল মালের অধিকারীর ওপর সমষ্টির কল্যাণে সুনির্দিষ্ট অধিকার আদায়ের দায়িত্ব অর্পণ করেছে, যেমন তার ও প্রত্যেক অল্প মালের মালিকের ওপর অপর কিছু বিপগ্রস্ত জনগণের অধিকার ধার্য করা হয়েছে। এভাবে গোটা মানবজাতিকে অধিকারের দৃঢ় রজ্জুতে পরস্পরের াসাথে কঠিন ভাবে বেধে দেয়া হয়েছে। আর সর্বোপরি সমস্ত সানুষকে পরম পূণ্য ময় কাজ, সর্বোচ্চ কল্যাণ ও অনুগ্রহ স্থায়ী ও সাময়িক সাদকা ও হাদিয়া দানের জন্যে উৎসাহিত করা হয়েছে। [(আরবী***********)] উপরোদ্ধৃত সমস্ত কথার সার নির্যাস হচ্ছে, ব্যক্তির ধন মালে সমষ্টির খুব বেশী তগিদপূর্ণ অধিকার রয়েছে। তা এমন অধিকার, যা আাদায় করার পথে কারোর শরীয়াত সম্মত মালিকত্ব ও বাধা হয়ে দাড়াতে পারে না। বরং ব্যক্তির মালিকানাতেই সমষ্টির কল্যাণের জন্যে একটা বাধা হয়ে দাড়াতে পারে না। বরং ব্যক্তির মালিকানাতেই সমষ্টির কল্যাণের জন্যে একটা নির্দিষ্ট অংশ সব সময়ই ধার্য হয়ে থাকে। তার চাইতে ও বড় কথা, প্রয়োজনের সময় সামগ্রিক কল্যাণের তাগিদে সমষ্টির অধিকার অগ্রাধিাকারপ্রাপ্ত হয়ে থাকে।
রাষ্ট্রিই সমষ্টির ওপর কর্তৃত্বসমম্পন্ন প্রতভু, সমষ্টির কল্যাণের ব্যবস্থা রাষ্ট্রেই করে। প্রত্যেক মালদারের ধান মালে সেই সমষ্টির জন্যে একটা অংশ নির্দিষ্ট থাকা আবশ্যক। সে অংশ খরচ হেব এমন এমন কাজে যার প্রত্যক্ষ ফায়দা সমষ্টির কল্যাণে নিয়োজিত হবে। সমষ্টির অস্তিত্ব রক্ষা পাবে ও দায়িত্ব পালিত হবে, সর্বপ্রকারের বিদ্রোহ ও সীমালংঘন প্রতিরুদ্ধ হবে।
মুসলিম সমাজে যদি অভাবগ্রস্ত ও দারিদ্র্য পীড়িত ব্রক্তি না থাকে, তাহলে ও মুসলিম ব্যক্তিকে তার যাকাত দিতে হবে অবশ্যম্ভাবীরূপে। তখন তা গোটা ইসলামী সমাজ মুসলিম মিল্লাতের সম্পদ হবে। সে পর্যয়ের প্রয়োজনে তা ব্যয় করা হবে, আল্লাহর পথে গুণসম্পন্ন কার্যাবলীতে তা ব্যয় হবে। আর তা এমন একটা ব্যয় খাত, সাধারণভানে কার্যকর থাকবে ততিদিন, যতদিন প্রথিবীর বুকে ইসলাম থাকবে।
মুসলামদের মধ্যে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব
চতুর্থ মতাদর্শঃ ভ্রাতৃত্বের মতবাদ
ব্যক্তি ও সমষ্টির মধ্যে পরষ্পরের দয়িত্ব গ্রহণের তুলানায় ভ্রাতৃত্ব একটা গভীর তাৎপর্য ও সুদূর প্রসারী লক্ষ্যে অধিকারী। ভ্রাতৃত্ব কথাটিতে স্বার্থ ও সুবিধার পারস্পরিক বিনিময়ের স্থান নেই। গ্রহণের মুকাবিলায় দানের প্রশ্ন ও নয় এটা। এটা গভীর মানবিক আধ্যত্মিক তাৎপর্য পরিপূর্ণ। তা মৌল মানবিকতার অন্তর্নিহিত ভাবধারা থেকে উৎসারিত। ভ্রাতৃত্বের দাবি হচ্ছে, ভাই কে দা্ও তার কাছ থেকে না যেয়া হলে ও দা্ও। ভাইকে নিজের ও ওপর অগ্রাধিকার দা্ও।
ইসলামা দুই ধরনের ভ্রাতৃত্ব উপস্থাপিত করেছে অথবা বলা যায়, ইসলাম উপস্থাপিত। ভ্রাতৃত্বের দুটি পর্যায়। একটি ভ্রাতৃত্বের ভিত্তি হচ্ছে মানবিকতায় অংশীদারিত্ব। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে আকীদা বিশ্বাসে একাত্মতার ভ্রাতৃত্ব।
প্রথমটি মানষের বর্ণ, ভাষা,দেশ শ্রেণী প্রভৃতি দিক দিয়ে তারা যতই বিভিন্ন ও পরস্পর সাংঘর্ষিক হোক না কেন, সমস্ত মানুষ এক ও অভিন্ন মূলের শাখা প্রশাখা। একই পিতার সন্তান। এ দৃষ্টিতে আল্লাহ তাআলা গোটা মানব জাতিকে সম্বোধন করেছেন (আরবী***********) হে আদম সম্তান আদম বংশজাত বলে। [ এ ডাকটি কুরআনে পাঁচটি স্থানে এসেছে। ;চারটি হচ্ছে সুরা আরাফে এবং সূরা ইয়াসনে।] যেমন সম্বোধন এসেছে (আরবী***********) হে মানুষ বলে[ সূরা নিসাতে প্রথম। পরে বারে বারে ] অর্থাৎ তাদের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম রক্ত সম্পর্ক এবং ব্যাপক ভ্রাতৃত্ব রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা কুরআন মজীদে এ রক্ত সম্পর্কের মানবিকতার অধিকারের কথা উদাত্ত কন্ঠে ঘোষণা করেছেন। এটা হচ্ছে মনুষ্যত্বের মানবিকতার ভ্রাতৃত্ব। আল্লাহ তাআলা সূরা আন নিসার শুরুতেই বলেছেনঃ (আরবী***********)
হে মানুষ ! তোমরা ভয় কর তোমাদের সেই রব্বকে, যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন একই প্রাণত্তা থেকে তা থেকেই সৃষ্টি করেছেন তার জুড়ি এবং এ উভয় থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বিপুল সংখ্যক পুরুষ ও নারী। আর ও তোমরা ভয় কর আল্লাহকে, যাঁর দোহাই দিয়ে তোমরা পরস্পরের কাছে চা্ওয়ার কাজ কর এবং ভয় কর রক্ত সম্পর্ক। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর প্রহরী। [ সূরা আন নিসা শুরু।]
হে মানুষ বলে ডাক দেয়ার পর (আরবী*********) এর উল্লেখ এবং তাদের একই প্রাণীসত্তা আদম সত্তা থেকে সৃষ্টি করার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার স্পষ্ট তাৎপর্য হচ্ছে মাধারণ মানবিক নৈকট্য ও একত্মতা। ইসলামের নবী (স) এ ভ্রাততের ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করেছেন।তিনি এ ভ্রাতৃত্বকে উদ্বুদ্ধ করার জন্যেই আহবান জানিয়েছেনঃ (আরবী***********)
তোমরা সকলে আল্লাহর বন্দা ভাই হ্ও। [বুখারী মুসলিম]
শুধু তাই নয়, নবী করীম (স) এ মানবিক ভ্রাতৃত্বকে একটা অন্যতম আকীদার মধ্যে গণ্য করেছেন, যার সাক্ষ্য স্বয়ং আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন। নবী করীম (স) সমস্ত মানুষকে সেই আকীদা গ্রহণের আহবান জানিয়েছেন। তিনি প্রত্যেক নামাযের পরে এই বলে দোআ করতেনঃ
হে আমাদের আল্লাহ! আমাদের রব্ব, রব্ব সব জিনিসের মালিক সে সব জিনিসেরেই। আমি সাক্ষী তুমিই আল্লাহ একক, তোমার শরীক কেউ নেই। হে আমাদের আল্লাহ, আমাদের রব্ব সব জিনিসের, মালিক ও আমাদের রব্ব,রব্ব সব জিনিসেরই মালিক্ও আগামী সাক্ষী সমস্ত বান্দাই পরস্পর ভাই। [আহমাদ ও আবূ দাঊদ উদ্ধৃত করেছেন।]
মানুষ ও মানুষের মধ্যকার সম্পর্কে শিরোনাম ও পরিচিতি হচ্ছে ভ্রাত্রত্ব,পাস্পরের ভাই হ্ওয়া। ভ্রাতৃত্বের কতগুলো ফলশ্রুতি আছে, কতগুলো দাবি। এ ভ্রতৃত্বের অন্যতম দাবি হচ্ছে কোন মানুষই তার অন্য ভাইকে বাদ দিয়ে বঞ্চিত করে সর্বপ্রকার কল্যাণ ও নিয়ামতের নিজেকেই একমাত্র অধিকরী মানে করবে না। অন্য ভাইয়ের তুলানায় নিজেকে অগ্রাধিাকর প্রাপ্ত মনে করে নেবে না। বস্তুত যে লোক নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত, এ দুনিয়ায় তার জন্ম নেয়ারই কোন অধিকার নেই।
আরব কবি আল মুয়াররা কি সুন্দুর বলেছেনঃ
আমি যদি ও চিরন্তন তাকে একক ভাবে ভালোবাসি না।
নিশ্চয়ই আমার একার চিরশন্যতা ভালোবাসি না।
মেষ বৃষ্টি বর্ষণ করে শহর নগর গড়ল না, সে আমার ওপর বৃষ্টি বর্ষালো না, আমার জমিনের ওপর।
এই সাধারণ ভ্রাতৃত্বের ঊর্ধ্বে আর একটি ভ্রাতৃত্ব রয়েছে, যা এর চাইতে ও অধিক গভীর প্রভাব শালী, অধিক মর্মস্পর্শী। তা হচ্ছে আকীদা বিশ্বাসের একাত্নতার ভ্রাতৃত্ব।এটাকে ই ইসলামী ভ্রতৃত্ব বলা হয়। এ ইসলামী ভ্রাতৃত্ব মুমিন লোকদেরকে চিন্তা ও আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে পরস্পরের সাথে এমন ভাবে বাঁধে, যা কখনই ছিন্ন হয় না। এ
ভ্রাতৃত্ব আকীদা বিশ্বাসের একত্বের এ ভ্রাতৃত্ব অন্তর, হদয় ও চিন্তার দিক দিয়ে,অধিকতর নিকটবর্তী। পারস্পারিক সাহায্য ও ঔদার্য গ্রহণে প্রত্যেককে অধিক আগ্রহী বানায় এবং এ আগ্রহের ব্যাপারটি রক্ত বংশের ভাইয়ের প্রতি যা হয় তার চাইতে ও অধিক তীব্র, বেশী প্রভাবশালী হয়ে থাকে। একারণেই আল্লাহ তাআলা কুরআন মজীদে বলেছেনঃ (আরবী***********)
মুমিনরা পরস্পরের ভাই এ ছাড়া কিছু নয়। [ (আরবী***********) ]
এ আধ্যাত্নিক ভ্রাতৃত্ব ও এ বিশ্বাসগত সৌহার্দ্য সৌহদ্যপূর্ণ সম্পর্কের অধিকার হচ্ছে, কার্যত পরস্পরের দাযত্ব গ্রহণ এবং সামাজিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধানের ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন ঘটতে হবে। অন্যথায় সেভ্রাতৃত্ব অর্থহীন ও অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়বে।
এ ভ্রাতৃত্বের অধিকার আর ও তাগিত পূর্ণ হয়ে পড়ে যখন মুমিন গণ একই সমাজভুক্ত হয়ে বসাবাস করতে থাকে। এক্ষেত্রে একই দেশের দেশে বসবাসজনিত সম্পর্কটা সমন্বয়কারী্ ঈমানী ভ্রাতৃত্বের সাথে যুক্ত হবে। আর একথা পূর্বেই সপ্রমাণিত যে, দারুল ইসলাম ইসলাম রাজ্য তার বিশাল বিস্তৃতি সহ সমগ্র মুসলিমের এক ও অভিন্ন আবাসভূমি। ইসলামে বিশ্বাসী সব মানুষই এ দেশে সমাজভুক্ত সর্বতোভাবে অভিন্ন।
রাসূলে করীম(স) এ ভ্রাতৃত্বের অধিকারের কথা অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভাষায় বলেছেন, যা বহ কয়টি হদীসে সন্নিবেশিত রয়েছে। এখানে তার কয়েকটি হাদীস উদ্বৃত করা যাচ্ছেঃ (আরবী***********)
একজন মুমিন অপর একজন মুমিনের জন্যে ঠিক সেরূপ যেমন একটি প্রাচীরে একটি ইট অপর ইটকে শক্ত করে। [বুখারী মুসলিম, আবূ মূসা বণিত। ]
মুমিনদের পারস্পরিক বন্ধুতা দয়া সহানুভুতির দৃষ্টান্ত একটি অখণ্ড দেহের মত। দেহের একটি অংগ যদি অসুস্থ হয়, সে কারণে গোটা দেহ উত্তাপ্ও অনিদ্রায় ভোগে। [বুখারী, মুসলিক নূমান ইবনে বশীর বর্ণিত।]
মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে তার ওপর জুলুম করতে পারে না সে তাকে অসহায় করে ছেড়ে ও দিতে পারে না। [বুখার,মুসলিম আবূ দাউদ তারগীব তারহীব, ৩য় খণ্ড ৩৮৯ পৃ.হালবী প্রকাশিত।]
যে ব্যক্তি তার ভাইকে ক্ষুধার্ত বস্ত্রহীন ও রোগাক্রান্ত অবস্থায় ফেলে রাখে অথচ সে তাকে এ ক্ষুধা বস্ত্রহনিতা এ রোগ থেকে নিস্কৃতি দিতে সক্ষম,সে তাকে বাস্তবিকভাবেই অসহায় করে ছেড়ে দিল, তাকে লাঞ্চিত অপমানিত করল। নবী করীম(স) বলেছেনঃ
যে লো খেয়ে পতিৃপ্ত হয়ে রাতে ঘুমালো অথচ তার প্রতিবেশী তার পাশেই রাত কাটাল অভুক্ত অবস্থায়, এ কথাতার জানা ও ছিল সে তো আমার প্রতি ঈমানই আনেনি। [তাবারানী এ বাজ্জার আনাস থেকে হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন। এর সনদ উত্তম। তাবারানী ও আবূ ইয়ালা ও তা উদ্ধৃত করেছেন ইবনে আব্বাস থেকে। হাকেম উদ্ধৃত করেছেন আয়েশা থেকে। (আরবী***********)
এ সব হাদীসে ইসলামী সমাজের যথার্থ চিত্র অংকিত হয়েছে। এ সমাজের ব্যক্তিরা সিসা ঢেলে সুদৃঢ় বাঁধনে তৈরি করা প্রাচীনসদৃশ। একজন অপরজনকে দুর্বল করে না, শক্ত ও দৃঢ় করে। গোটা ইসলামী সমাজ একটি অখণ্ড পরিবার। এখানে প্রত্যেকটি ভাই অপর প্রত্যেকটি ভাইয়ের দাযত্বশীল হয়ে দাঁড়ায়। এ একটি অখণ্ড দেহ সত্তা যেন। তার একটি অঙ্গ ব্যক্তি অসুস্থ হলে গোটা দেহ সত্তা সমাজ সমষ্টি অসুস্থ বোধ করে।
অতএব যে মুসলিম ব্যক্তি কাজ করতে পারে না কিংবা কাজ তো করতে পারে; কিন্তু কাজ পায় না অথবা কাজ তো করে ঃ কিন্তু সে কাজ দ্বারা প্রয়োজন পরিমাণ উপার্জন করতে পারে না বা সবিই ঠিক কিন্ত এমন বিপদ ঘটেছে যা তাকে সাহায্যের মুখাপেক্ষী বানিয়েছে হয় তার ঘর জ্বলে গেছে, ধন মাল বা শস্য বন্যায় ভেসে গেছে, ফসল নষ্ঠ হয়ে গেছে, ব্যবসা অচল বা মন্দা হয়ে পড়েছে অথবা পথের মধ্যেই সে তার ঘর বাড়ি ও ধন মাল থেকে সম্পর্কহীন হয়ে পড়েছে এ সকল লোকেরই অধিকার আছে সাহায্য পা্ওয়ার। তখন তাকে সাহায্য করা তাদের ভেঙ্গে পড়া মেরুদণ্ডকে সোজা ও শক্ত করা, তাকে হাত ধরে দাঁড় করে দেয়া যেন উঠতে ও চলতে পারে জীবনের চলমন কাফেলার সাথে শরীক থেকে আল্লাহর সম্মানিত মানুষহিসেবে, গোটা সমাজ সমষ্টিরিই দায়িত্ব ও কর্তব্য। নতুবা মানুষ যখন তারই ভাই, তারই মত অপর একজন মানুষকে লাঞ্চিত করে, লাঞ্চিত হতে দেয় এবং মঙ্গল বলতে কোথা্ও কিছু থাকে না।
এ সব কিছু থেকেই আমাদের সম্মুখে যাকাত ফরয হ্ওয়ার দার্শনিক ভিত্তি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর তা যে কর ধার্য করার দার্শনিক ভিত্তির তুলনায় আনেক বেশী ব্যাপক ও গভীর এবং চিরস্থায়ী ও শাশ্বত তাতে কেন সন্দেহ থাকে না। অবশ্য সামাজিক নিরাপত্তা বিধানের ক্ষেত্রে যাকাত ও কর এর দৃষ্টি কোণ অভিন্ন হতে পারে; কিন্তু অপর তিনটি মতাদর্শের দিক দিয়ে যাকাত ফরয করার ব্যাপারটি অ্ত্যন্ত বিশিষ্টতা পূর্ণ ও
স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী, তা সর্বতোভাবে সন্দেহাতীত।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
কর ধাযের ক্ষে্ত্র বনাম যাকাত দাযের ক্ষেত্র
কর ধাযের ক্ষেত্র যা কর ধাযের সুযোগ করে দেয়, কেউ কেউ বলেন উৎস,আবার কেউ কেউ বলেছেন নিক্ষেপ স্থান।
রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিবিদগণ উল্লেখ করেছেনঃ কর সমূহের গুরুত্বপূর্ণ বিভক্তি আর ক্ষেত্রের দিক দিয়ে তা নিম্নলিখিভাবে বিভক্তঃ
১.মূলধনের ওপর কর
২. আয় ও আমদানীর ওপর কর
৩.ব্যক্তিদের ওপর মাথাপিছু কর
৪. ভোগ্য ব্যহার্য জিনিসের ওপর কর
অবশ্য ইসলামে এ শেষোক্ত ভোগ্য ব্যবহার্য জিনিসের ওপর কর ধার্য করণ যাকাত অধ্যায়ে পরিচিত নয়। কেননা প্রকৃত পক্ষে যাকাত ধনী লোকদের কাছ থেকে গ্রহণীয় কর, যা গরীব মিসকীন এবং দ্বীন ও জাতির জন্যে সাধারণ কল্যাণের নিমিক্ত তা ব্যয় হয়। আর ভোগ ব্যবহার কারী যেমন গরীব লোক হয়, তেমনি হয় ধনী লোকেরা ও।তখন এ করের যারা আশ্রয় গ্রহণ করে, তারা তা করে প্রাপ্তির বিপুলত্য ও প্রাচুযের জন্যে। কিন্তু তার ও অন্যান্য ক্ষেত্রের মধ্যে বৈপরীত্য দেখা দিলে ইসলামে অন্যান্য প্রকারের কর পরিচিত। মূলধনের ওপর যেমন আয়ের ওপর ও তেমন এবং ব্যক্তিদের ব্যাপারে ও তাই।
এ পরিচ্ছেদের আলোচনাসমূহে আমরা এ তিন ধরনের যাকাতের উল্লেখ করার ইচ্ছ রাখি। সাথে সাথে সে কয়টির ও তার মত অন্যান্য করসমূহের মধ্যে তুলনা করা হবে, কিন্তু তাতে খুব বিরক্তিকর দীর্ঘতা যেমন গ্রহণ করা হবে না, তেমনি অঙ্গহানিকর সংক্ষিপ্ততাকে ও প্রশ্রয় দেয়া হবে না।
প্রথম আলোচনা
মূলধনে যাকাত
যে সব ধন মালে যাকাত ধার্য হয় এবং ইসলাম তার যে পরিমাণ সমূহ নির্ধারণ করেছে সে বিষয়ে যে লোকই সামান্য চিন্তা করবে তার সম্মুখে একথা স্পষ্ট হয়ে ওঠবে যে, ইসলামী শরীয়াত কেবলমাত্র কর ধার্যকরণের ব্যবস্থাই গ্রহণ করে নি বিভিন্ন যুগের কোন কোন অর্থনীতি চিন্তাবিদ যেমন মনে করেছেন। বরং যাকাতের অধ্যায়ে অধ্যায়ে বিভিন্ন ধরনের কর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
যাকাত কখন্ওে ধার্য হয় মুলধনের ওপর,যেমন গৃহপালিত পশু সম্পদ স্বর্ণ ও রৌপ্য নগদ সম্পদ এবং ব্যবসায় সম্পদের ওপর ধার্য হয়ে থাকে।
কখন ও আবার তা ধার্য হয় আয় আমদানির ওপর, কিন্তু সর্ব প্রকারের আয় আমদানীর ওপর নয়ঃ বিভিন্ন ধরনের আয়ের শাখা প্রশাখার ওপর।তার প্রথম হচ্ছে,কৃষি ফসলের আমদানির ওপর তারপর খনিজ উৎপাদনের আয়ের ওপর তারপর কার্যত ভাড়ায় লাগানো নির্মিত প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর, তারপর কল কারখানা ও যন্ত্রপাতির ওপর মুনাফাদায়ক প্রত্যেক মূলধনের আয়ের ওপর অব্যবসায়ূ। তার পর শ্রম ও উপার্জনের ওপর নিয়মিত মাসিক বা সাপ্তাহিক বার্ষিক বেতন, বেতনভুকদের ও শ্রমিকদের মজুরীর ওপর।স্বাধীন পেশার লোকদের আয়ের ওপর ও তা ধর্য হয়। এ গ্রন্থের যথাস্থানে এসব খাতের কথাই সুবিন্যন্তভাবে আমরা লিপিবদ্ধ করেছি।
যাকাতে মূলধন করের বৈশিষ্ট্য আছে দোষ ক্রটি নেই
ইসলামী শরীয়াত মূলধনের পশু, ব্যবসায় পণ্য ও নগদ সম্পদের ওপর যখন যাকাত ধার্য করে তখন তা খুব অভিনব ও বিস্ময়োদ্দীপক ব্যাপার হয় না। কেননা কমিউস্টি সমাজতন্ত্রবাদী ও অপরাপর অর্থব্যবস্থাপন্হীরা তার বহু পূর্বেই মূলধনের ওপর নানা প্রকারের ধার্য করে বসেছে। আনেকে তো এতখানি বাড়াবাড়ি করেছে যে, তারা দাবি করেছে যে, এটাই হবে একমাত্র করা যার ওপর গোটা অর্থ ব্যবস্থা সীমিত থাকবে এবং মূলধন পরিব্যাপ্ত হবে অন্য কিছু ছাড়া। [আরবী************]
মূলধনের ওপর কর ধাযের বৈশিষ্ট্য তার সমর্থকদের দৃষ্টিতে
মূলধনের ওপর কর ধার্য করার সমর্থন করা তার পক্ষে বহু যুক্তি প্রমাণ উপস্থাপিত করেছে। এখানে তার কিছু অংশ পেশ করা হচ্ছেঃ
১.মূলধনের মালিকত্ব তার মালিককে বহু প্রকারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদা এবং সুযোগ সুবিধা দান করে। তন্মধ্যে উপার্জনের অবাধ সুযোগ সুবিধা সুবিধা দান করে। তন্মধ্যে উপার্জনের অবাধ সুযোগ সুবিধা অন্যদের তুলানায় সে ই অনেক বেশী পেয়ে থাকে। তাছাড়া ধন সম্পদের কারণ তাদের মানে একটা নিশ্চিন্ততা ও মানসিক স্বস্তি লাভ করে থাকে, যা মূলধনহীন লোকদের বেলা সম্পর্ণ অকল্পনীয়। এ সুফল মূলধনের আবর্তনশীল আমাদানী একটা বড় অবদান।
২. মূলধনের ওপর কর ধার্য করা হলে সকল ব্যক্তির ভিন্ন ভিন্ন ধন সম্পদকে ও পরিব্যপ্তি করে। এমন কি যে মূলধন কোন আয় না এবং পরবর্তী পর্যায়ে আয়ের ওপর কর ধার্যর ও সুযোগ করে দেয় না হয় স্বভঅবতই কোন আয় আমদানী আনে না যেমন মহামূল্যবান উপঢৌকনের বিলাস দ্রব্যাদি উৎকৃষ্ট হীরা জহরতের অলংকারাদি কিংবা তার মালিকদের কারণে যেমন নগদ নগদ ধন মাল।
৩. এ করের আ্ওতায় পড়ে ধন সম্পদের সবপ্রকারের উপাদান। যেসব ধন সম্পদ বেকার পড়ে আছে (আজকের ভাষায় কালো টাকা) তার ওপর ও এ আঘাত পড়ে এবং তার মুনাফা আনয়নকে ত্বরান্বিত করে।ফলে বারবারের কর ধার্য করণের সে মূলধনকে নিঃশেষ করে দেয় না। কিন্তু আয় আমদানীর ওপর ধার্য কর ভিন্ন রকমের। তা কেবলমাত্র মুনাফা লাভের কাজে নিয়োজিত ধন মালের ওপরই ধার্য হয়। লুকিয়ে রাখা মূলধন তার আঘাত থেকে বেমালুম রক্ষা পেয়ে যায়।
৪. মূলধনের ওপর ধার্য এ কর ধনমালের মালিকদের বেশী বেশী উৎপাদনে বিপুলভাবে উৎসাহিত করে। কেননা তাদের কর দিতে হবে এ চেতনা তাদের ওপর চাবুকের মত কাজ করে তাদের মূলধন উৎপাদন বাড়েল কি বাড়ল না অথবা উৎপাদন কম হল কি বেশী হর, কর তাদের দিতেই হবে এচেতনা।
৫. এ কর ব্যবস্থার বাস্তাবায়ন উচ্চতর হার ও সেই দুর্বহ পরিমাণ যে পর্যন্ত আমদানী কর পৌছতে পারে পশ্চাতে থেকে যে বিপল ও প্রচুর পরিমাণ আয় হয়, তার কারণে যে হ্রাস প্রাপ্তি ঘটে তাতে বিরাট অংশ গ্রহণ করে থাকে। তার ফলে অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব আমদানী কর এর অত্যধিক ঊর্ধ্বমুখিতা থেকে একটা মান পর্যন্ত কমিয়ে আনে।
৬. মূলধনের ওপর কর ধার্যকরণ তার নামটা দ্বারা যেমন বোঝা যায় মালিকানাহীন বা বিত্ত সম্পত্তিহীন শ্রেণী কে স্পর্শকরে না। কেননা এ শ্রেণীর লোকেরা শ্রমজীবীমাত্র। এ কারণে তা সংস্কারবাদী কমিউনিজম (সমাজতন্ত্র) এ দার্য কররূপে গণ্য হতে পারে। [এসব বিশেষত্ব পর্যায়ে দেখুনঃ ডঃ রশদি দকর লিখিত (আরবী*************) গ্রন্থের ২য় মুদ্রণ জামে সুরীয় প্রেস ৩৪৭ পৃ গ্রন্থের ২য় মুদ্রণ জামে সুরীয় প্রেস ৩৪৭ পৃ. এবং ডঃ সাযাদ মাহের হামজা লিখিত (আরবী*************) গ্রন্থে ১৬৬ ও তৎপরবর্তী পৃষ্ঠ।]
মূলধনের ওপর কর ধার্যকরণ সমর্থরকারীদের মতে এগুলোই হলো এ ব্যবস্থার
বিশেষত্ব এবং এসব কারণেই তারা সমর্থন করে থাকে। আর এরা সকলে হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক চিন্তা ভাবনা লোক।সূলধনের ওপর কর ধার্যকরণ বিরোধীদের বক্তব্য
উপরিউক্ত লোকদের প্রতিকুলে রয়েছে সেসব লোক, যারা মূলধনের ওপর কর ধার্যকরণের পরিপন্হী। তাদের অধিকাংশই হচ্ছে পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার সমর্থক। তারা উপরিউক্ত যুক্তিসমূহ অর্থহীন মানে করে বর্ণিত বিশেষত্বসমূহ থেকে দৃষ্টি ভিন্ন দিকে ফিরিয়ে নিতে চেষ্টা পেয়েছে। তারা বলেছেঃ
১. মূলধনের ওপর যে কোন বলেছে ধরনের কর ধার্যকরণের ফলেই প্রায়শই এবং সাধারণভাবেই সঞ্চয়ের আগ্রহ এবং উৎসাহ স্নান ও ক্ষীণ হয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, উৎপাদনের শক্তিই হ্রাসপ্রাপ্তি হবে। আর তার পরিণতি হবে খুবইভয়াবহ। কেননা জমি ও কারখানা প্রভৃতি চলমান মূলধনকে কর ধার্যকরণের ক্ষেত্র বানালে তা সঞ্চয়কারীদের উৎসাহে ভাটা লাগিয়ে দেবে এবং দৃঢ় মৌল খাতে সঞ্চয় বৃদ্ধির পরিবের্তে তা সমস্ত আয় ব্যয় করে নিঃশেষ করে দিতে আগ্রহী বানাবে।
২. কর ধার্যকরণ উপযোগী মূলধনকে কোন একটি স্থানে সীমিতকরণ খুবই কঠিন ব্যাপার হয়ে হয়ে দাঁড়াবে ্ কেননা মূলধনের সংজ্ঞা ও তার প্রকৃতি নির্ধারণে আবহমান কাল থেকেই বিভিন্ন প্রকারের মতামত চলে এসেছে। এক ব্যক্তির মালিকানাধীন সম্পদ সম্পত্তির পরিমাণ নির্ধারণ ও খুবই কঠিন ব্যাপার। অনেক সময় সে পরিমাণ নির্ধারণ বস্তবের সাথে সঙ্গতিসম্পন্ন হতে পারে খুব বেশী কষ্ট স্বীকারের পর কখন ও না ও হতে পারে, কিন্তু তা আদৌ যথেষ্ট নয়। অনেক হয়ত অসত্য নির্ভর করা ছাড়া গত্যম্ভর থাকে না, কিন্তু তা আদৌ যথেষ্ট নয়। অনেক হয়ত অসত্য হিসেবে অগ্রিম পেশকরার পন্হার আশ্রয় নিতে পারে। তা ছাড়া এমন মূলধন রয়েছে যা গোপন রাখা খুবই সহজ।
৩. মূলধনের ওপর বার্ষিক নিয়মে কর ধার্য করা হলে গোটা মূলধনই নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে অথচ তা আয়ের একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎস। অতএব আয় নয় মূলধন খুব সুস্ংদ্ধভাবে নিত্য নতুন রূপ বা আকার ধারণ করে না। বরং তা থেকে যে অংশটাই কর্তিত হবে, সেই পারিমাণ সঞ্চয় করে তা পূর্ণ করা অম্ভব হবে। আর কোন রাষ্ট্র যদি কেবল এ ধরনের কর ধার্যকরণের ওপর নিরূন্তর ভাবে নির্ভরশীল হয় তাহলে তা নিঃসন্দেহে বিশেষ ধন মাল তার নিজের দায়িত্বে নিয়ে যা্ওয়ার পূর্বাভাস হব্ আর তার পরিণতিতে করলব্ধ আয় খু্বই কম হয়ে পড়বে এবং ব্যক্তিগত উৎপাদন তৎপরতা নির্মূল হয়ে যাবে। [(আরবী*************) গ্রন্থের ১৬৮ ও তার পরবর্তী প্রষ্ঠা।]
মূলধনের ওপর কর ধার্যকরণ কালে আবশ্য গ্রহণীয় সতর্কতা
এ প্রেক্ষিতে কোন কোন অর্থনীতিবিদ মুলধনের ওপর কর ধার্যকরণকালে তার যেসব
বিশেষত্ব রয়েছে তার কোন কোনটি থেকে ফায়দা লাভের উপদেশ দিয়েছেন এবং সেজন্যে নিম্মোদ্ধৃত বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ আরোপ করতে বলেছেনঃ
১.মূলধনের একটা বিরাট অংশকে আলাদা করে তার ওপর এ কর ধার্য ন করাই উত্তম,তার হার ভরস্ম্যপূর্ণ হওয়াই উত্তম। এবং এভাবে যে, মূলধন থেকে প্রাপ্ত আমদানী থেকেই তা দিয়ে দেয়া হবে পুরামাত্রায় এবং মূলধনের ওপর হস্তক্ষেপ করা হবে না।
২. কর ব্যবস্থায় কেবলমাত্র কর ধার্য না করা কর ধাযের অন্যান্য দিকের ওপর সম্পূরক কর ধার্য করা বাঞ্চনীয়। বিশেষ করে আয়ের কর। [ডঃ রশীদ দকর রচিত(আরবী**********) গ্রন্থের ৩৫৫ পৃ, ২য় মুদ্রণ]
৩. একটা নিদিষ্ট পরিমাণের কম সম্পদের মালিককে কর অব্যাহতি দিতে হবে অথবা একটা নির্দিষ্ট পরিমাণের আয়ের কম পরিমাণের আয়শীল ব্যক্তিকে নিষ্কুতি দিতে হবে করের বোঝা থেকে।
৪. ঋণ বা বন্ধক ইত্যাদি ধরনের সম্পদের ওপর কর ধার্যকরণ থেকে দূরে থাকা কর্তব্য হব।যাকাত ফরয়করণের এই বিষয়গুলোর ওপর লক্ষ্য আরোপে ইসলামের অগ্রবর্তীতা
মূলধনের ওপর ইসলামের আররোপিত যাকাত ব্যবস্থার ওপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে আল্লাহর শোকর আমরা উপরিউক্ত বিশেষত্ব সমূহের ওপর বিশেস দুষ্টি রাখা হয়েছে বলে বুঝতে পারি। আর অর্থনীতিবিদরা যেসব দোষক্রটির সমালোচনা করেছেন, তা থেকে তাকে মুক্ত এপবিত্র পাচ্ছি এবং তাঁরা সেসব উত্তম উপদেশ দিয়েছে কেবলমাত্র প্রবৃদ্ধিশীল এমুনফাদায়ক মূলধনের ওপর। প্রবৃদ্ধিশীল বলতে সেসব মূলধনই ধরা হয়েছে যার মধ্যে প্রবৃদ্ধি লাভের বিশেষত্ব আছে তার মালিক তা বেকার ফেলে রাখলে এ তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়নি।। আর প্রবৃদ্ধির শর্ত করা হয়েছে সম্পদে যেন বাড়াতি ও বৃদ্ধি থেকে যাকাত গ্রহণ করা যায় এবং ঠিক আসলটা অক্ষত অবস্থায় থেকে যেতে পারে। আরবী ভাষায় যাকাত শব্দটির আভিধানিক অর্থই হচ্ছে প্রবৃদ্ধি। এ করণে অর্থনীতি বিদগণ এ অর্থনৈতিক কর ধার ধার্যকরণে তার প্রয়োগকরণে যে কারণ দেখিয়েছেন,তর হচ্ছে তার আ্ওতায় কেবলমাত্র ক্রমবর্ধনশীল ধন মালই আসে। [দেখুনঃ (আরবী*************)]
এপ্রেক্ষিতে ব্যবহহ মুবাহ অলংকারাদির ওপর যাকাত ধার্য না করার মত যাঁরা দিয়েছেন তাঁদের মত আমরা য়থার্থ মনে করছি। কেননা এ জিনিস তো আর প্রবৃদ্ধি লাব করছে না। কিন্তু তা যদি পুঁজি করা হয় কিংবা তাতে যদি অতিরিক্ত মাত্রায় অপচয় লক্ষ্য
করা যায়, তা স্বাভাবিক অবস্থা ও রীতিনীতি লংঘনকারী হয় তাহলে ভিন্ন কথা। পুরুষরা নিজেদের অলংকার হিসেবে যা ব্যবহার করে অথবা তৈজসপত্র উপঢৌকন, প্রতিকৃতি ইত্যাদি ব্যবহূত হলে ও অনূরূপ নীতি অবলম্বিত হবে অর্থাৎ তার সব কিছুর ওপর যাকাত ধার্য হবে। কেননা উপরিউক্ত অবস্থাসমূহে বিপুল পরিমাণ মহামূল্য মূলধন সম্পূর্ণ বেকার ও অনুৎপাদক করে ফেলে রাখা হয়, যার কোন প্রয়োজনইথাকতে পারে না।
এ কারণে ফিকাহবিদগণেএ বিষয়ে ও একমত হয়েছেন যে, বসবাসের ঘরবাড়ির ওপর দেহের পোশাক পরিচ্ছদের ওপর ঘরের আসবাব পত্রের ওপর, যানবাহন ও কোন যাকাত ধার্য হবে না। কেননা ওগুলো বর্ধনশীল নয়, এগুলো মালিকের কোন না কোন মৌলিক প্রয়োজন পূরণে ব্যাপৃত। [দেখুনঃ (আরবী*************]
অবশ্য কারোর কারোর মত বসবাসের ঘরকে কর ধার্যকরণ থেকে অব্যহতি না দেয়াই য়থার্থ নীতি হতে পারে। কোন কোন রাষ্ট্রের বিভিন্ন আয়ের ওপর তো বটেই সমস্ত অস্তাবর সম্পদ সম্পত্তি এবং মূল্য নির্ধারণ সম্ভব এমন সমস্ত জিনিস প্ত্র ও ঘরের আসবাবপত্রের ওপর ও কর ধার্য হয়ে থাকে। [ (আরবী*************)]
২. মূলত স্থিতিশীল মূলধনের ওপর ইসলামী শরীয়াত যাকাত ধার্য করেনি যেমন কল কারখানা জমি জায়গা ইত্যাদি। কর ধার্য করেছে আবর্তনশীল মুলধনের ওপর। তবে স্থিতিশীল মূলধনের আয় ও প্রবৃদ্ধি থেকে অবশ্যই যাকাত গ্রহণ করা হবে।যেমন কৃষি জমি এ বিষয়ে কুরআন হাদীসের অকাট্য দলিল বর্তমান।তার সাথে যু্ক্ত হবে সে সব নির্মিত প্রতিষ্ঠানাদি যার মুনাফা হয়। এর ফলে যাকাত সঞ্চায়কারীদের উৎসাহ বিনষ্ট করবে না তাদের আয় খরচ করে ফেলার ব্যাপাকতা সাধন করতে ও বলবে না স্থিতিশীল মুলধনে রূপান্তরিত হ্ওয়ার আশংকায়। যেমন কোন কোন কর ধার্য করেণের পরিণতিতে তা হেত দেখা যায়।
৩. সর্বপ্রকারের মূলধনে তা কম হোক কি বেশী ইসলামী শরীয়াত যাকাত ধার্য করেনি। বরং সেজন্যে একটা বিশেষ নিসাব নির্ধারণ করেছে সর্বপ্রথম। সেই নিসাবকে ধনাঢ্যতার নিন্মতম পরিমাণ গণ্য করা হয়েছে।তার কম পরিমাণ সম্পদকে যাকাত থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তাবে মালিক নিজে নফলভাবে দান সাদকা করলে ভিন্ন কথা। পূর্বে যেমন বলেছি, এ নিসাবের পরিমণ ধরা হয়েছে স্বর্ণের ৭৫ গ্রাম নগদ এ অতিবহিত হলে তবেই অনুপাতে এ পরিমাণের মালিকানার ওপর একটি বছর অতিবাহিত হলে তবেই তার ওপর যাকাত ধার্য হয়। তার পর ও শর্ত এই যে, তা তার মৌল প্রয়োজনের অতিরিক্ত হতে হবে। আর মৌল প্রয়োজন যে সময় দেশ স্থান অবস্থার পার্থক্যের দরুন বিভ্ন্নি রূপ ধারণা করতে পারে তা পূর্বে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
৪. ইসলামী মূলধন যাকাত ধার্য করে তার মূল্য বাড়িয়ে দেয়নি তা থেকে একটা বিরাটরঅংশ বিছিন্ন েকরে আলাদা ধরা হয বলে। তা একটা ভারসাম্যপূর্ণ হরে২ ১/২% হারে নগদ ও ব্যবসায় সম্পদ পরিামণ নির্ধারণে নির্ধারিত হয়েছে। গাবাদি পশুর ক্ষেত্রে প্রায় এরূপ, যেন তার প্রবৃদ্ধি উপঃপাদন আয় থেকে তা সহজেই গ্রহণ করা সম্ভব পর হয়। আর ও বিশেষ কথা হচ্ছে, এ যাকাতটি আবর্তণশীল।
সত্য কথা হচ্ছে, ইসলাম মূলধনের ওপর কর ধার্য করেছে নগদ ও ব্যবসায় সম্পদ ও পশু সম্পদে সূলধনটিকেই ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করার উদ্দেশ্য নয়, বরং তা থেকে প্রপ্ত আয়কেই সেভাবে গ্রহণ করার উদ্দেশ্য।
এখানে উল্লেখ্য, আমাদের ফিকাহবিদগণ সুস্পষ্ট ভাষায় এ কথার অকাট্যতা ঘোষণা করেছেনঃ
শায়খুল ইসলাম ইবনে কুদামাহ আলমুগনী গ্রন্থে যে সব ধন মালে যাকাত ফরয হ্ওয়ার জন্যে এক বছর কাল অতিবাহিত হ্ওয়া শর্তরূপে গণ্য হয়েছে এবং যে সব ধন মালে তা হযনি, এ দুটির মধ্যকার পার্থক্য নির্ধারণ প্রসঙ্গে বলেছেনঃ
যেসব মালে এক বছর অতিবাহিত হ্ওয়া নির্ধারিত তা হচ্ছে প্রবদ্ধি লক্ষ্য করার ক্ষেত্র । গাবদি পশু ধুগ্বদান ্ও বংশবৃদ্ধির ক্ষেত্র, ব্যবসায়ের পণ্য মুনাফা লাভের ক্ষেত্র। নগদ মুলধন ও তাই। তাতে একটি বছরের শর্ত করা হয়েছে। কেননা এ সময়টার মধ্যে প্রবৃদ্ধি লাভঃ সম্ভব যেন যাকাতটা মুনাফা থেকে আদায় করা যায়। আর তাই সহজ ও সুগম যেন সময়কালে বহুবার যাকাত ধার্য ঘটনা সংঘটিত না হতে পারে।কারণ তাতে মালিকের সব মালই নিঃশেষ হয়ে যাবে। [ (আরবী*************) এবং দেখুন ঃএ গ্রন্থের ১৬২ পৃ.]
হানাফী ফিজাহর প্রখ্যাত গ্রন্হ আল হিদায়ার গ্রন্হকার লিখেছেনঃ
মালিকানার একটি বছর পূর্ণ হ্ওয়া আবশ্যক (যাকাত ফরয হ্ওয়ার জন্য) কেননা এমন একটা সময়ের অবকাশ তাকে দিতেই যার মধ্যে তাতে প্রবৃদ্ধি বাস্তবায়িত হতে পারে। শরীয়াতে এ সময়কাল নির্ধারত হয়েছে একটি পূর্ণ বছর। কেননা এ সময়কালের মধ্যেই তা বাস্তবায়িত ওবিকাশিত হতে পারে বলে মানে করা যায়। এ সময় ভিন্ন পর্যায়ে সমন্বিত মূল্যের পার্থক্য প্রায়ই এসময়ের সধ্যে লক্ষ্য করা যায়।তাতেই হুকুম আবরর্তিত হবে।
মহামনীষী ইবনুল হতহুল কাদরী গ্রন্থে শরীয়াতে যাকাত ফরয হ্ওয়ার জন্যে একটি বছর শর্ত করার যৌক্তিকতা ও বৈজ্ঞানিকতা পর্যায়ে অতিরিক্তি ভাবে বলেছেনঃ তার নিগঢ় তাৎপর্য হল াযাকাতের বিধান করার মৌল লক্ষ্য পরীক্ষা ও যাচাই হ্ওয়া সত্ত্বে ও তার ব্যবহারিক লক্ষ্য গরীব মিসকনের সহায্য সমানুভূতি এমন ভাবে করা, যেন সেনিজে ফকরি হয়ে না যায় বরং তা করা বিপুল ধন মালের একটাকম পরিমেয় অংশ দান করার মাধ্যমে। কিন্তু যে মাল ক্রমবর্ধনশীল নয় তার ওপর যাকাত ফরয করা
হলে প্রতি বছর যাকাত দেয়ার ফলে তার উল্টো ফল দেখা দেব্।সেই সাথে তার নিজের বিশেষ ব্যয়ের ব্যাপাটি ও রয়েছে। অতেএব ব্যবসায় ক্রমবৃদ্ধি ও মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে গড়া ব্যবসায়ে এক বছরের শর্ত করা হয়েছে বান্দ থেকে অথবা বিশেষ করে তার জন্যে আল্লাহর সৃষ্টির সাথে যেন তার৫৫৬ বাস্তবে অস্তিত্ব লাভ করার সমভবপর হয়, ক্রমবৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় এবং লক্ষ্যের বিপরীত অবস্থা সৃষ্টর পথে প্রতিবন্ধকতা দাঁড় করানো সম্ভব হয়। [(আরবী*************)]
ওপরের আলোচনা থেকে আমাদের সম্মুখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, মূলত মূলধন থেকে যাকাত গ্রহণই লক্ষ্য ছিল না, যাকাত গ্রহণ করা হবে তার আয় ওপ্রবৃদ্ধি থেকে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যাকাতটা আয় ও প্রবৃদ্ধি থেকে নেয়া হবে কোন কারণে……………
এজবার ইবনে কুদামাহ লিখেছেন[(আরবী*************)]ঃপ্রকৃত প্রবৃদ্ধিকে গণ্য করা হয়নি। কেননা তাত বিভিন্ন এবং তার গণনা সম্ভব। আর ও এজন্য যে, যার বাহ্যিক দিকটা গণ্য করা হয়েছে, তা প্রকৃত অবস্থার দিকে ভ্রক্ষেপ করা হয়নি ঠিক যেমন কার্য কারণের অনুপাতে কোন বিষয়ে সিন্ধান্ত গ্রহণ। [ এ কথাটি বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে এদিকে যে, শরীয়াত তার হুকুম নির্ধরণের নির্ভর সুসংবদ্ধ বাহ্যিক গুণ পরিচিতির ওপর। ফিকাহবিদরা তার নাম দিয়েছেন কারণ্ ও নিমিত্ত (আরবী***********)হুকমটাই শরীয়াতের বিধান হ্ওয়ার আসল কারণ নয়। তার দৃষ্টান্ত যেমন ইসলাম মুসাফিরকে রমযানের রোযা ভঙ্গ করা বা রোযা না রাখার অনুমতি দিয়েছে, চার রাকআতে নামায দুই রাকাত পড়ার অনুমতি আছে। এ অনমতির যৌক্তিকতা বা কারণ কষ্ট। ব্যাপারটি যদি অনির্দিষ্ট ও অসংবদ্ধ হয় তাহলে সেদিকে ভ্রক্ষেপ করা যাবে না।শরীয়াত শুধু কষ্টের কারণটি অর্থাৎ সফরের প্রতিই লক্ষ্য রেখে এ সিদ্ধান্ত দিয়েছে।]
দ্বিতীয় আলোচনা
আয় ও উৎপন্নের ওপর যাকাত
আধনিককালো আয় ও উৎপন্ন কে রকরক ধার্য কারণের অধিক গুরুত্ব পূর্ণ ক্ষেত্র বলে মনে করা হয়। আয় আয়ের প্রাচীনতম উৎস যখন ভুমি মালিকানা তখন এ কালে আয়ের বহু নতুন ও অভিনব দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। এ দ্বারা সমূহ হচ্ছে কাজ বা শ্রম কিংবা মূলধন অথবা দুটোই এক সাথে।
শিল্প উৎপাদনের গতি যখন সম্মুখের দিকে অগ্রসর হল এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিনিময় স্রোত তীব্র হল তখন কাজ ও মূলধনের আয় আমদানী পরিমাণ ও অনেক বৃদ্ধি পেল, বিচিত্র ধরনের হয়ে দাড়াল। ব্যবসায়ী ও শৈর্পিক তৎপরতা খব লাভবান হয়ে উঠল। শেয়ার ও সার্টিফিকেটের হস্তান্তরযোগ্য মূল্যের আয়্ও বৃদ্ধি পেল। অপরদিকে পেশার মুনাফা এবং নির্দিষ্ট বেতনের লোক ও বিভিন্ন ব্যস্ততার কর্মচারীদের বিপুল সংখ্যককে দেয় মজরী এ নির্দিষ্ট বেতন ও ব্যাপক ভাব বৃদ্ধি পেয়ে গেল।
এদিক দিয়ে আধনিক রাষ্ট্রের বিশেষত্বে সৃষ্ট ব্যাপকতা ও প্রশস্ততা একদিকে এবং অপরদিকে জমির আয় বহির্ভুত বহু নতুন উৎসের আত্মপ্রকাশ দেখে রাষ্ট্র সমূহ আয় আমদানীকে রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডারের একটা আয় সূত্র ধরে নিয়ে একালে তার ওপর অব্যাহত করা ধার্য করতে শুরু করেছে। এ কারণে অনব্যাহত কর এর তুলনামূলক গুরিুত্ব অনেখানি হ্রাস পেয়েছে। এ পর্যায়ের কর হিষেবে গুল্ক কর ও ভোগ্য কর ইত্যাদি উল্লেখ্য। এ ছাড়া ও অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে আয়কর সমূহ আধুনিক পরিস্থিতি পরিবেশে সুবিচার ও ন্যায়পরতা প্রতিষ্ঠার অতীব নিকটবর্তী ব্যবস্থারূপে গণ্য।কেননা এ কর ব্যবস্থায় জমি বহির্ভূত আয়ের অীধকারী লোকদের অংশীদারিত্ব অপরিহার্য হয়ে পড়ে। সেই সাথে সাধারণের বোঝা বহনে জমির আমদানীর মালিকরা ও শরীক থাকবে। [ ডঃ সায়াদ সাহের কৃত (আরবী*************)]
আয় এর তাৎপর্য
আয় বলতে বোঝায় সেই নতুন ধন সম্পদ যা কোন স্থিতিশীল পরিজ্ঞাত উৎস থেকে নিঃসৃত বা অর্জিত ও হন্তগত হয়।
ক. তা হলে আয়ের একটা উৎসের প্রয়োজন। তা জমি, অস্থাবর ও নগদ প্রভতি ধরনের বস্তুগত হোক বিংবা অবস্তুগত যেমন শ্রম বা কর্মক্ষমতা (নগদ পারিশ্রমিক দিয়ে যা পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব)। আথবা এ দুইয়েল সমন্বয়ে গড়ে ওঠা উৎস
অতএব আয়ের উৎস হচ্ছে হয় মূলধন, অথবা কাজ বা শ্রম কিংবা এই উভয়ই এক সাথে।
আর মুলধন জমি ও অস্থাবর সম্পদ উভয়ই হতে পারে।তাই এ উভয় উৎস থেকে যা আয় হবে াত পমি সম্পদ থেকে আয় হবে যেমন, তেমনি স্থানান্তরযোগ্য সম্পদের ও আয় গণ্য হবে।
কিন্তু কাজ বা শ্রমের উৎস থেকে যে আয়টা হবে তার মালিক নিজেই ব্যবহার করবে, অন্য কারোর কাছে অর্পণের সম্পর্কের সাথে জড়িত না হয়েই এবং হাতের কাজ বা বুদ্ধি খাটানোর কাজ দ্বরা সে অগ্রসর হবে। এরূপ অবস্থায় তার এ আয়টা পেশাগত কাজের আয় সে যে পেশায় অভ্যন্ত তা দিয়েই সে তা লাব করবে। সে যদি অন্য কারোর সাথে ব্যক্তি বিনিয়োগের চুক্তিতে জড়িত হয় তাহলে তখন তার এই আয়টা মসিক নির্ধারিক বেতন বা মজুরী কিংবা ভরণ পোষণের দায়িত্ব পালনমুলক হবে।
তৃতীয় উৎসটি যখন মূলধন ও শ্রম উভয়ে মিশ্রিত হবে তখন তার আয়টা সাধারণ মুনাফা বলে পরিচিত হবে। [ ডঃ মুহাম্মাদ ফুয়াদ ইবরাহীম কৃত (আরবী*********) গ্রন্থের ১ম খণ্ড ৩২২পৃ.]
আর এ উৎসমূহ ভিন্ন ভিন্ন হলে অর্থনীতি বিদদের মতে আয়টা উৎপন্ন, সুবধা (Benefit), মজুরী ও মুনাফা এ চারটি ভিন্ন ভিন্ন নামে অভিহিত হবে।
খ. এসব উৎস সম্পর্কে মূল কথা হল, এগুলোর স্থায়িত্ব ও স্থিতি গুণে গুণান্বিত। তুলনামূলক স্থিতি স্থয়িত্বের কথাই বলা হচ্ছে। স্থিতির নিম্নতম মান হচ্ছে উৎপাদনের দিকে ফিরে যা্ওয়ার সম্ভাবনা। তবে স্থিতি ্ও স্থায়িত্বের সম্ভানার দিক দিয়ে এ উৎসমূহ পরস্পর বিভিন্ন। মূলধন এ দিকগুলোর মধ্যে কাজ বা শ্রমের তুলনায় স্থিতি লাভে অধিক বেশী ক্ষমতা শালী। [পূর্বোল্লিখিত সুত্র ]আয়ের উৎসের স্তিতির মানের এই আপেক্ষিক পার্থক্যসমূহ স্বভাবতই একই কর এর পার্থক্যপূর্ণ ক্ষেত্র রচনা করে। কাজেই আয়ের উৎসে শুধু ধন মাল হলে তাতে মুল্য বৃদ্ধি পাবে। আর তা হ্রাস প্রাপ্ত হবে যখন উৎস হবে শুধু কাজ বা শ্রম। অপরদিকে মূলধন এবং কাজ উভয়ই উৎস হলেবোঝা টা মাঝামাঝি ধরনের হবে। তবে মূলধনের প্রকার অনুপাতে কর মূল্য পার্থক্য পূর্ণ এ হতে পারে তখন কৃষি জমির আয়েল ওপর ধার্যকর এর মূল্য উচ্চতর হতে পারে প্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপ ধার্য কর এর তুলনায়। কেননা প্রতিষ্ঠান তো কিছু কালের পর ধ্বংস ও বিলীত হয়ে যেতে পার……… এমনিই চলবে। [(আরবী*************)]
ইসলামী শরযিাতে আয়ের যাকাত
ইসলাম যেমন পশু সম্পদ, ব্যবসায় ও নগদ প্রভৃতি মূলধনের ওপর যাকাত ধার্য করেছে, তেমনি যাকাত ধার্য করেছে আয় আমদানীর ওপর ও। তার উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত হচ্ছে, ইসলাম কৃষি উৎপাদনের আয়ের ্ওপর ধার্য করেছে ফল ও ফসলের যাকাত

অর্থাৎ তাতেত ওশর ও অর্ধ ওশর ধার্য হয়েছে। এ পার্থক্যটা জমি সেচের পার্থক্যের দরুন হয তা স্বাভাবিক ভাবে হয়, না হয় সেজন্যে সেচ ব্যবস্থা করতে হয় পয়সা ও শ্রম লাগিয়ে এ কারণে। ইসলাম এখানে আমদেরকে এমন একটা মৌলনীতি দিয়েছে কর সংক্রান্ত আইন প্রণয়নে যার একটা বিশেষ গুরত্ব রয়েছে। আর হচ্ছে ব্যয় করা শ্রম বা কষ্ট অনুযায়ী ধার্য দেয়কে বিভিন্ন প্রকারে বিভক্ত করা। ফলে যেখানেই কষ্টের মাত্রা কম সেখানিই করা এ হার উচ্চ হবে। পক্ষান্তরে যেখানে কষ্টের মাত্র বেশী হবে, যেখানে এ হার কম হয়ে যাবে।
এই প্রেক্ষাপটে বুঝতে হবে মাটির তলায় প্রোথিত ধন সম্পদ যা যখন পা্ওয় যাবে তার এক পঞ্চামাংশ ২০% দেয় ধার্য করার মাহত্ম্য এবং আকাশ বা খালের পানিতে সেচ করা ক্ষেত বা বাগানের ফসল ও ফলে ধার্য হয়েছে পাঁচ ভাগের এক ভাগের অর্ধেক অর্থাৎ এক দশমাংশ আর বিশেষ সেচ ব্যবস্থার সাহায্যে সেচ করা জমির ফসলে ফলে অর্ধ ওশর ৫% এবং কঠিন শ্রম ও কাজের ফলে অর্জিত যেমন ব্যবসায় করে পা্ওয়া নগদ সম্পদ একদর্মাশের এক চতুর্থাংশ অর্থাৎ ২.৫% ধার্য করা হয়েছে এ সাবের যথার্থতা ও।
এ সিদ্ধান্তে্র ভিত্তিতে কোন কোন ফিকাহবিদ এ মত গ্রহণ করেছেন যে, খনিজ সম্পদে দেয ধার্য এক পঞ্চামাংশ থেকে শুরু করে একদমাংশের এক চতুর্থাংশ পর্যন্ত বিভিন্ন হারে হতে পারে কষ্ট ও শ্রম অনুপাতে, যেমন যথাস্থানে বিস্তারিত বলা হয়েছে। [এ গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়ের সপ্তম পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।]
ইসলামে আয়ের যাকাত কয়েক প্রকারের। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে বহু সংখ্যক বিকাহ পারদর্শী ইমামের মতে মধুর যাকাত পরিমাণ ওমর এক দশমাংশ। এ মাতকেই আমরা অগ্রাধিাকর দিয়েছি।এর ওপরই আমরা জান্তব উৎপাদনকে ও কিয়াস করেছি।
খনিজ সম্পদের উৎপাদন থেখে প্রাপ্ত আয়ের যাকাত ও বিভিন্ন পরিমাণের হবে।সামুদ্রিক সম্পদের মুক্তা আম্বর ও মৎস্য ইত্যাদি থেকে ও অনুরূপ হারে যাকাত দিতে হবে।বহু প্রাচীন কালীন ফিকাহবিদ এমত দিয়েছেন।আমরা ও এ মাতকে পছন্দ করেছি এ সমর্থন ও দিয়েছি।
যেসব জমি চাষকারীকে নির্দিষ্ট নগদ অথের বিনিময়ে ভাড়া দেয়া হয় সে ভাড়া থেকে লব্ধ আয়ের যাকাত ও এই হারে দিতে হবে, মালিক দেবে ভাড়ার যাকাত আর চাষী দেবে জমি থেকে লব্ধ ফল ও ফসলের যাকাত ওশর কিংসা অর্ধ ওশর।
মালিকানা ভুক্ত দালান কোঠা গাড়ী যানবাহন এ ধানের যে সব জিনিস ভাড়া দেয়া হয় এবং যা থেকে আবর্তন শীলাভাবে মালিক ভাড়া পেতে থাকে, সে বাবদ প্রচণ্ড আয়ের যাকাত ও অনুরূপেই হবে। কোন কোন আলিম তাই বলেছেন, আমরা ও যথাস্থানে এ মতকে অগাধিকার দিয়েছি।
শ্রম বা কাজ ও সাধীন পেশা থেকে উপার্জিত আয়ের যাকাত ও এমনি হবে। মাসিক তারে প্রাপ্ত বেতন,মজুরী ও লালন পালন এবং বিভিন্ন পেশা ও কায়কারবের মালিক যা কিছু উপার্জন ও আয় করে সেই অর্জিত সম্পদ ও এ পর্যায়ে গণ্য। এ সব ক্ষেত্রে যথাযথ শর্তানুযায়ী যাকাত ধার্য হবে যেমন আমরা পূ্র্বে অগ্রাধিকার দিয়েছি ও বিশ্লেষণ করেছি।
তৃতীয় আলোচনা
ব্যক্তিদের ওপর ধার্য যাকাত
ব্যক্তিদের ওপর ধার্য কর
আমরা উল্লেখ করে এসেছি যে কর ব্যবস্থা পারদর্শিগণ ক্ষেত্রের পার্থক্য বিসেবে করকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছেনঃ মূলদনের ওপর কর আয় আমদানীর ওপর কর এবং ব্যক্তিদের ওপর কর। যাকাত হচ্ছে মূলধনের ওপর কর সে বিষয়ে এবং আয় আমদানীর ওপর কর সম্পর্কে আমরা আলোচনা করেছি। ব্যক্তিগণের ওপর কর পর্যায়ের যে যাকাত সে সম্পর্কিত আলোচনা এখন ও অবশিষ্ট বা বাকী রয়ে গেছে। ব্যক্তিগণের কর সরাসরি মালদরের ওপর বর্তে এ হিসেবে যে, সে কর ধার্য হ্ওয়ার একটা উপযুক্ত ক্ষেত্র। তাতে তার ব্যক্তিগত অবস্থা বিচার্য নয় সেধনী কি গরীর। এ কর মাথাপিছু কর নামে পরিচিত। কেননা তা মাথা পিছু হিসেবে প্রত্যেক ব্যাক্তির কাছ থেকেই গ্রহণ করা হবে অর্থাৎ কোন ব্যক্তিই তা থেকে বাদ যাবে না।
মাথা পিছু এর ধার্য করণের ওপর রাষ্ট্র নির্ভর শীল হয়ে থাকে। কেননা তা পুরুষ, মেয়েলোক ও শিশু সকলের ওপর সমানভাবে পড়ে। অথবা যাদের মধ্যে বিশেষ শর্ত বিপুলভাবে পা্ওয়া যায় সে সব লোকের ওপর ধার্য হয়। এ বিশেষ শর্ত হতে পারে রাজনৈতিক যোগ্যতার শর্ত অথবা তা সংখ্যালঘুর ওপর কিংবা আশেপাশের লোকদের ওপর ধার্য ওয়ার নির্দিষ্ট কর।
বিশেষত্র ও দোষ ক্রটি
এ কর এর বিশেষত্ব বা সুবিধা হচ্ছে করা ধার্য করার উপকরণ নির্ধারণ করায় অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে এরূপ ক্ষেত্রে বিশেষ কোন কষ্ট স্বীকার করতে হয় না। সকলকে কর ধার্যর ক্ষেত্ররূপে নির্ধারণ নিরংকুশ সাধারণ নিয়মের সাথে সঙ্গতি রক্ষা করে যাতে লব্ধ সম্পদ বিপুল হয় তার কোন প্রয়োজনদেখা দেয় না।
তবে তার ্ওপর এ কথা ধরে নিতে হবে যে, তা কর বহন ও তা আদায় করার শক্তি, সামর্থের পরিপন্হী হবে যদি সমস্ত মালদার শ্রেণীর লোকদের থেকে একটি পরিমাণ গ্রহণকরা হয়। কেননা তাদের আয় ও সম্পদ একই পরিমাণের নয়।
এ কারণে আধুনিক কালের রাষ্ট্র ব্যক্তিগণের ওপর কর ধার্যকরণ নীতি প্রত্যাহার করেছে। তার পরিবর্তে ধন মালের ওপর কর ধার্য করণের প্রতি অধিক গুরত্ব আরোপকরেছে; কিন্তু তা সত্ত্বে ও এখন পর্যন্ত কোন কোন আধুনিক রাষ্ট্র এ প্রকারের কর আরোপের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে তখন তার উদ্দেশ্য হয় সামজিক সামিষ্টিকতার চেতন তীব্র করে তোলার উদ্দেশ্যে যেন তারা সকলেই এ চেতনা লাভ করতে পারে যে, তারা সকলেই সামষ্টিক বোঝা বহনে অংশীদার রয়েছে। আরা তার পরিণতিতে রাজনৈতিক অবস্থা ও কার্যকলাপের গুরুত্ব এবং তারা বহু বিদেশে ছড়িয়ে থাকলে দেশী হ্ওয়ার চেতনা জাগানেরর লক্ষ্যে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ।
লক্ষ্যণীয়, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কয়টি অঙ্গরাজ্যের প্রায়ই মাথাপিছু কর ধার্য করা হয়ে থাকে যদি তা লব্ধ সম্পদ বিশেষ কাজে নির্দিষ্ট করা হয়।হয় তা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যব করার জন্যে অথবা সামজিক সাহা্য্য কাজের অগ্রতি সাধনের লক্ষ্যে কিংবা রাস্তা ঘাটের অবস্থা উন্নয়নের জন্যে ধার্য করা হয়।
ফ্রান্সে ও এ মাথাপিছু কর অব্যাহত নিয়মে ধার্য হয়ে তাকে। যেমন স্থানীয় কর; আর মালদার মাত্রের ওপর কর। শর্ত এরূপ থাকে যে, বছরের তিনটি দিন রা্স্তা নির্মাণ বা সমানকরণ সংরক্ষণের জন্যে প্রত্যেক ব্যক্তিকে করতে হবে। [ডঃ মুহাম্মাদ ফুয়াদ ইবরাহীম কৃত (আরবী**********) ১ম খণ্ড ৩০৫-৩০৭ পৃ. মাথাপিছু কর শীর্ষক আলোচনা।]
ফিতরার যাকতে ব্যক্তিগণের কর এর মতই সুবিধা
ইসলাম যে ফিতরার যাকাত ধার্য করেছে তার ওপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করা হলে দেখা যাবে প্রতি বছর ফরয রোযা থেকে অবসর গ্রহণ এবং ঈদের আগমন কালে একবার করে এ যাকাত দিতে হয়। এ যাকাত ব্যক্তিদের মাথাপিছু ধার্য করা একপ্রকারের কর বিশেষ। এর সুবিধা এবং বিশেষত্ব হচ্ছে তা ধার্য করা যেমন সহজ তেমিন আদায় করা ওঝঞ্ঝাটমুক্ত। আর তা সকল মুসলমান পরিব্যাপ্ত অথচ এ ধানের কর এর ব্যাপারে সাধারণত যেসব শ্রম ও অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়, এ ফিতরার যাকাতে তার আদৌ কোন আশংকা নেই। কেননা তার পরিমাণটা খুবই হাল্কা। প্রত্যেক ব্যক্তির পক্ষেই মনের খুশীতে তা দিয়ে দিয়া ও খুবই সহজ। বিশেষ করে তা একটা ফরয ইবাদতের সাথে যুক্ত বলে তা মর্যদা অনেক বেশী।তাতে একটা পবিত্রতার তাৎপর্য নিহিত। সেই সাথে আধ্যত্মিক ও নৈতিক লক্ষ্য ও তা সাথে জড়িত। তবে কেউ যদি তা আদৌ দিতে না পারে তা হলে সমস্ত সুসলমানের সর্বসম্মত মতে সে ক্ষমা ও নিষ্কৃতি পা্ওয়ার যোগ্য।
ইসলামী শরীয়াত এ যাকাত বার্ষিক হিসেবে প্রত্যেকটি মুসলিমের ওপর ধার্য করেছে পুরুষ স্ত্রী বা অর্প বয়স্ক বেশী বয়স্ক নির্বিশেষে। এর মূলে একটা বড় লক্ষ্য হচ্ছে, মুসলিম ব্যক্তি সচ্চলতা ও দারিদ্র্য উভয় অবস্থায়ই দরিদ্র জনের জন্যে অর্থ ব্যয় করতে ও ত্যাগ স্বীকারা করতে অভ্যস্ত হোক। তা হলে যেমন সুখ স্বাচ্ছন্দ্যকালে মানুষের জন্যে অর্থ ব্যয় করবে, তেমনি করবে অভাব অনটনকালে ও। প্রত্যেকে অপর সকলের ও প্রত্যেকের জন্যে চিন্তা ভাবনা করতে, অভাবগ্রস্ত ও দারিদ্র্যপীড়িত লোকদের জন্যে স্বীয় দায়িত্বের অনুভূতি রাখতে অভ্যস্ত হবে। বিশষ করে ঈদ ও ফরয রোযা পালন সমাপ্তিকালীন আনন্দ উৎসবকালে তাদে কথা বেশী করে স্মরণ করবে।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য কোন লোক নিজে ও যদি ফিতরা পা্ওয়ার যোগ্য হয়, তা ও ফিতরা দেয়ার পথে ইসলামকোন প্রতিবন্ধকতা দেখতে পায় না হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। (আরবী**********)
তোমাদের মধ্যে যারা ধনীলোক, আল্লাহ তাআলা তাদের তাযকীরা পবিত্র পরিশুদ্ধ করবেন ফিতরা দেয়ার দরুন। আর যারা দরিদ্র তারা যা দিল,
আল্লাহর তা আলা তার চাইতে ও বেশী তাদের ফিরিয়ে দেবেন। [ফিতরার যাকাত আলোচনায় এ হাদীসটি উদ্ধৃত হয়েছে।]
দুনিয়ার মুসলিম এ ফিতরা আদায় করতে খুব বেশী আগ্রহী লক্ষ্য করা যায়। রোযা পালনে বেহুদা কথা কাজ এবং গর্হিত আচার আচারণ বা ক্রটি বিচ্যুতি যা ঘটেছে, এ ফিতরা দিয়ে তার ক্ষতি পূরণ করাই সকলের লক্ষ্য। যদি ও তাদের অনেকেই তাদের ধন মালের যাকাত দিতে খুবই অমনোযোগী পাওয়া যায়(যা একন্তই অবঞ্চনীয়)।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
কর ও যাকাতের মধ্যে সুবচারের ভুমিকা
কর একটা বাধ্যতামূলক ধার্যকৃত ব্যবস্থা। যার ওপর তা ধার্য হবে সে স্বতঃস্ফুর্তভাবে তা দেতে প্রস্তুত না হলে, জোনপূর্বকই তা তার কাছে থেকে আদায় করে নেয়া হবে। এ প্রেক্ষিতে আধুনিক কালের বহু অর্থনীতিবিদ ও করবিশারদ এআহবান জানিয়েছেন যে এ কর কোনরূপ জোর জবরদস্তি রুঢ় ব্যবহার ঃছাড়াই তা আদায় করার কতগুলো নিয়ম ও কায়দা অবলম্বন করতে হবে এবং কর সংক্রান্ত আইন কানুন এমন ভাবে পুনর্গঠিত করতে হবে যেন তা ধার্যকরণ ব্যাপারটি সুবিচার নীতির সাথে পুরাপুরি সংগতিপূর্ণ হয়। যেমন, তা আদায় করার কাজটা একটা অনূকূল সময়ে সম্পন্ন করতে হবে, যাতে করে করদাতা কোন ভাবেই নির্যাতিত হবে না এসব হচ্ছে, সেই মৌলনীতি একদিক দিয়ে কর নির্ধারণে বিধায়কের কর্ত্যেরূপে নির্দিষ্ট করতে হবে কর সংক্রান্ত আিইন প্রণয়নকালে এবং অপর দিক দিয়ে অর্থনেতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করে তা দিকে দিকে এ সব মৌলনীতির প্রতি লক্ষ্য রেখে কাজ ক রতে হবে, তা যখনই কর ও তা আদায় করার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ইচ্ছা করবে।
প্রখ্যাত অর্থনৈতিক দার্শনিক আদমস্মীথ, ফাজিঞ্জস এবং সিসামুন্ডী উপস্থাপিত উপরিউক্ত মৌলনীতসমুহের তাৎপর্য অনুধাবনে যে লোকই আত্মানিয়োগ করবে, সে ই জানতে পারবে যে, তা হচ্ছে চারটিঃন্যায়পরতা দৃঢ় প্রত্যয়, আনুকূল্য এবং মধ্যম নীতি অবলম্বন। এ চারচি মৌলনীতি প্রধানত আদম স্মীথের উদ্ভাবিত বলে জানা যায়।
এ মৌল ভিত্তি, নীতি, নিয়মসমূহ হচ্ছে অর্থনীতির সংবিধান,যা পালন করা একান্তই কর্তব্য। এর কোন একটির ও বিরোধিতা অর্থনীতির সংবিধান,যা পালন করা একান্তই কর্তব্য।এর কোন একটির ও বিরোধিতা অর্থনীতিতে বাঞ্ছনীয় নয় বিশেষ করে আইন প্রণয়নকারী ব্যক্তিদের এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের পক্ষে। [ দেখুনঃডঃ মুহাম্মদ ফয়াদ ইবরাহীম কৃত গ্রন্হ (আরবী******)১ম খণ্ড, ২৬২-২৬৩ পৃ.]
সত্যি কথা হচ্ছে যাকাত ফরযকরণে ইসলাম এ মৌলনীতি সমূহের প্রতি সর্বাগ্রে ও পূর্ণমাত্রা লক্ষ্য রেখেছে। রেখেছে এমন সময়, যখন আদম স্মীথ দুনিয়ায় আত্মপ্রকাশ করেননি বরং তাঁর ও প্রায় এক হাজার বছর পূর্বে। পরবর্তী আলোচনা পর্যায়সমূহে আমরা তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা পেশ করব।
প্রথম আলোচনা
সুবিচার ও ন্যায়পরতা ক্ষেত্রে
লোকদের ওপর কর ধার্যকালে যে প্রথম মৌলনীতি অনুসরণ ও পূর্ণমাত্রায় সংক্ষরণ একান্তই অপরিহার্য, তা হচ্ছে সুবিচার ও ন্যায়পরতা। আর আদম স্মীথ[ইংরেজী অর্থনৈতিক দার্শনিক। অষ্টাদশ শতকের বড় অর্থনীতি মনীষী। তাঁর গ্রন্থের নাম(আরবী**********) জাতীয় সম্পদ। তিনি ক্লাসিক্যাল বা স্বাদীন অর্থনীতির আর্দিপিতা নামে খ্যাত।] এ মৌলনীতির ব্যাখ্যা করে বলেছেনঃ সরকারী ব্যয় বহনে রাষ্ট্রের প্রজা সাধারণের অংশীদারিত্ব একান্তই আবশ্যক। প্রত্যেককেই দিতে হবে তার শক্তিসামর্থ্যের সম্ভাব্যতা অনুপাতে অর্থাৎ রাষ্ট্রের সাহায্য সহযোগিতায় যে যতটা আয় ভোগ করে সে অনুপাতে। [দেখুনঃ ডঃ আহমাদ সাব উয়াইজাহ উপস্থাপিত(আরবী**********) শীর্ষক সেমিনার রচনা।]
উপরিইক্ত মৌলনীতি সাধারণ ভাবে ইসলামী শরীয়াতের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। আর বিশেষভাবে সঙ্গতিপূর্ণ যাকাত কর ধার্যকরণের সাথে।
কেননা ইসলামের যাবতীয় ব্যাপার সুবচার ও ন্যায়পরতা একান্তভাবে কাম্য। তা মহান আল্লাহ তা আলার অসংখ্য গুণাবলীর মধ্যকার একটি বিশেষ গুণ ও।তাঁর বহ পবিত্র নামের মধ্যকার একটি নাম ও তাই। আল্লাহর সৃষ্টি এ আসমান জমিন এ ন্যায়পরতা ওসুবচারের ওপরই প্রতিষ্ঠিত।নবী রাসূলগণ এ আদর্শসহ প্রেরিত, আসমানী গ্রন্হসমূহ এ আদর্শের বাহন বিসেবে অবতীর্ণ।কুরআন মজীদ এ কথা অতীব সুস্পষ্ট ভায়ায় ঘোষণা করেছেঃ (আরবী**********)
নিংসন্দেহে আমরা আমাদের সাসূলগণকে পাঠিয়ে অকাট্য সুস্পষ্ট যুক্তি প্রমাণ সহকারে। এবং তাঁদের সাথে নাযিল করেছি আল কিতাব ও মানদণ্ড, যেন লোকেরা সুবচার সহকারে বসবাস করতে পারে। [(আরবী**********)]
এ সুবিচারই কাম্য ওকাঙ্ক্ষিত।
ইসলামে এ সুবচার নীতির গুরুত্ব যে কতখানি তা উপরিউক্ত ঘোষণায়ই সুস্পষ্ট। এ নীতিকে যাকাতের ক্ষেত্রে সন্ধান করা হলে আমরা তা এখানে পূর্ণমাত্রায় স্পষ্টরূপে বিরাজিত দেখতে পাব। ইসলামের বহু আইন বিধানেই তা লক্ষ্যণীয়।
প্রথমঃ যাকাত ফরয হ্ওয়ায় সমতা ও সম্য
যাকাত প্রত্যেক ধনশালী মুসলিমের ওপরই পরয হিসেবে ধার্য, তার জাতিত্ব, গায়োর বর্ণ, বংশ তালিকা বা সামাজিক শ্রেণী মর্যাদা যা ই হোক না কেন। নারী পুরুষ, সাদা কালো অভিজাত উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন,দুর্বল-নিম্নবংশ,শাসক প্রজা সাধারণ, রাজা দাস ণফল ধার্মিক মানুষ আর দুনিয়াদার মানুষ যা িই হোক। এ অকাট্য শরীয়াতী ফরয পালনে সকলে সমান ভাবে বাধ্য। কিন্তু পাশ্চাত্য জগতের প্রাচীনকালীন আইন প্রণয়নে এ নিরংকুশ সমতা ও সাম্য সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। তথায় ধার্মিক ও সাদচারী লোকেরা করা অব্যাহতি পেয়ে আসছে সব সময়। কেননা যেমন বলা হয়েছে তারা তাদের রক্ত ও নামায সমূহ উপস্থিত করছে। [ডঃ সাবিত উয়াইজা রচিত ইসলাম ও কর সম্পর্কিত সেমিনার রচনা। (সে কারণে তাদের ওপর কর ধার্য করা হয় না)]
ইবনে হাজম বলেছেনঃ যাকাত ফরয় পুরুষ ও মহিলা, অপ্রাপ্ত রয়স্ক, পূর্ণ বয়স্ক, সুস্থ বিবেক বুদ্ধিসম্পন্ন ্ও পাগল নির্বিশেষে সকল মুসলিমের ওপর। আল্লাহ তা আলা বলেছেন ঃতাদের ধন মাল থেকে যাকাত গ্রহণকর, তুমি তদের পবিত্র করা ও তাদের পরিশুদ্ধ কর তদ্দারা। এনির্দেশ ছোট বড়, সুস্থ বিবেকসম্পন্ন ও পাগল সকলের প্রতিই প্রয়োজ্য। কেননা তারা সকলেই আলাহর পবিত্রকরণের মুখাপেক্ষী। পরিশুদ্ধতা লাভ তাদের সকলের জন্যেই অপরিহার্য। এরা সকলেই ঈমানদার লোক। রাসূলে করীম (স) হযরত ময়ায (রা) কে বলেছিলেনঃ তুমি তাদের জানিয়ে দা্ও যে, আল্লাহ তা আলা তাদের ওপর যাকাত ফরয করেছেন, যা তাদের ধনীদের কাছ থেকে গ্রহণ করা হবে এবং তাদের দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। এ কথা ও বির্বিশেষে সব মুসলমান ধনী লোকদের ওপর প্রযোজ্য। [(আরবী**********)]
দ্বিতীয়ঃনিসাবের কম পরিমাণ ধন মাল বাদ যাবে
যাকাত ধার্যকরণে ইসলামের সুবিচার নীতি হচ্ছে,স্বল্প পরিমাণের ধন মালকে তা থেকেঅব্যাহতি দেয়া হয়েছে। যাকাত ফরয করা হয়েছে কেবলমাত্র পূর্ণ ;নিসাব পরিমাণ ধন মালের ওপর। তার ক করণ হচ্ছে, লোকদের পক্ষে কষ্ট না হয় এমন অতিরিক্ত ধন মাল থেকে যাকাত গ্রহণ। মানব প্রকৃতির ওপর দঃসহচাপ প্রয়োগ শরীযাতের লক্ষ্য নয়্ এ কারণে আল্লাহ তা আলা তাঁর রাসূল (স) কে নির্দেশ দেয়েছেনঃ (আরবী********)
অতিরিক্ত ধন মাল (থেকে যাকাত) গ্রহণকর। [অনেক (আরবী*********) এর তাফসীর করেছেন যাকাত। কেননা তা বিপুল ধান মাল থেকে খুব সমান্য নেয়া হয়।]
এবং লোকদের নির্দেশ দাও প্রচালিত ও সর্বজন পরিচিত ভাল কাজ করার। [(আরবী********) ] আল্লাহ তা আলা আরও বলেছেনঃ(আরবী**********)
লোকেরা তোমাকে জিজ্ঞেস করে তারা কি ব্যয় করবে। হে নবী! তুমি বলঃ প্রয়োজননাতিরিক্ত পরিমাণ। [(আরবী********) ]
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে (আরবী**********) এর তাপসীর বর্ণিত হয়েছেঃ ধনাঢ্যতার অতিরিক্ত পরিমাণ।
তৃতীয়ঃ জোড়া যাকাত নিষিদ্ধ
ন্যায়পরতা ও সুবচারের নীতি বড় প্রকাশমান বস্তবায়ন হচ্ছে রাসূলে করীম(স) ঘোষিত সে বিধান, যাতে তিনি বলেছেনঃ
যাকাত ধার্যকরণে দ্বৈততা নেই। [আবূ উবাইদের উদ্ধুতি(আরবী**********)]
এ কথার অর্থ বিসেবে আবূ উবাইদ বলেছেনঃ এক বছরের দু বার যাকাত নেয়া হবে না। [(আরবী**********)] ইবনে কুদামাহ প্রমুখ এ হাদীসের ওপর ভিত্তি করে ঘোষণা করেছেনেঃ একই কারণে ও একই বছর দুই যাকাত ধার্য করা জায়েয নয়। [(আরবী**********) ] আধুনিক কালে কর ও নব্য অর্থব্যবস্থা অধ্যয়নে এ কথাটি জোড়া নিষিদ্ধ নানে পরিচিত।
নবী করীম (স) এর উপরিউক্ত আইনটির কারণে ইসলামের ফিকাবিদগণ তাঁদের দৃষ্টি যাবতীয় আইন বিধানে মৌলনীতি এ কারণ নির্ধারণে পুরোপুরি নিবদ্ধ রেখেছেন।এটা এমন একটা অগ্রবর্তিতা, যার দৃষ্টান্ত বিরল। নিম্মে কয়েকটি উল্লেখ করা যাচ্ছেঃ
ক. ইমাম আবূ হানীফা;বলেছেনেঃ ধন মালের মালিক উট, গরু বা ছাগল যার যাকাত দেয়া হয়েছে নগত সম্পদের নিসাব পরিমাণের সাথে মিলিয়ে গণনা করবে না।তার কারণ এই বলা হয়েছেঃ মিলানো হলে যাকাতে দ্বৈততা দেখা দেবে। একই বছরে একই ধন মালের মালিকের ওপর দুবার যাকাত ধার্যকরণই এবং হাদীস দ্বারা তা নিষিদ্ধ হয়েছে। [(আরবী*********) ]
খ. যে লোক তা নগদ সম্পদের যাকাত দিয়ে দিল, পরে সে তা দিয়ে একটা উট কিংবা অন্য কোন গবাদি পশু ক্রয় করল অথচ যাকাত দিয়ে দেয়া নগদ অর্থ দ্বারা যে ধরনের গবাদি পশু সে ক্রয় করল, অনুরূপ গবাদি পশু তার কাছে আগে থেকেই বর্তমান রয়েছে তখন তার সাথে এই শেষে ক্রয় করাটাকে মেলাবে না তার যাকাত আবার দেবে না যখন বছরান্তে সমস্ত গবাদি পশুর যাকাত দেয়া হবে। কেননা সেটিতো সেই
নগদ সম্পদেরা বিকল্প, যার যাকাত ইতিপূর্বেই দিয়ে দেয়া হয়েছে। অতএব সেই বছরই সেটির যাকাত পুনরায় দিতে হবে না। [ ঐ ;এবং দেখুনঃ (আরবী *******) ]
গ.ব্যবসায়ের লক্ষ্যে নিসাব সংখ্যক গবাদি পশু উট গরু ছাগল ইত্যাদি ক্রয় করা হলে ইমাম আবূ হানীফা ও সওরী ও আহমদের মতে তার ব্যবসায়ী যাকাত দিতে হবে।আর মালিক ও শাফেয়ীর নতুন মত হচ্ছে, তার যাকাত দিতে হবে গবাদি পশুর যাকাত, তার কারণ হিসেবে বলেছেন, তার গবাদি পশু গণ্য হ্ওয়াই অধিক শক্তিশালী কথা। এ মতের ইজমা অনুষ্ঠিত হয়েছে, তা প্রত্যক্ষ হ্ওয়ার বিশেষত্বের অধিকারী ও। অতএব তাই উত্তম। প্রথমোক্ত মতের লোকেরা যুক্তি দেখিয়েছেন যে, ব্যবসায়ী যাকাত দেয়া হলে মিসকীনরা বেশী পরিমাণ পেতে পারবে। কেননা তা ফরয হয় সেই মালে, যা হসেবে অনেক বেশী। [(আরবী *******)]
উপরিউক্ত দুটি মতের প্রেক্ষিতে আমার মনে হচ্ছে,তারা সকলেই একমত হয়েছেন এ কথায় যে, যাকাত কেবলমাত্র একটি দিকের বিচারেই ফরয হয়ে থাকে। হয় ব্যবসায়েল দৃষ্টিতে না হয় কাজের জন্যে ঘরে স্বাধীন মুক্ত ভাবে পালিত গবাদি পশু হ্ওয়ার কারণে। এখন আলাদা আলাদা উভয় দিকের বিবেচনা করা হলে একই নিসাবের দুটি যাকাত ধার্য হতে হয় অবশ্যম্ভাবীরূপে।কিন্তু তা জয়েয নয়। কেননা তা পূর্বোদ্ধৃত হাদীসের পরিপন্হী।
ঘ. উট ও গরু সম্পর্কে ফিকাহবিদগণ যা বলেছেন, তা্ও এ পর্যায়ে গণ্য। এ পশু চাষাবাদ, পানি উত্তোলন ও কৃষি কাজে নিযুক্ত থাকে। এ কারণে জমহুর ফিকাহবিদগণ তার ওপর যাকাত ধার্য ন হ্ওয়ায় মত প্রকাশ করেছেন। তার কারণ প্রদর্শন সম্পর্কে তাঁরা বলেছেনঃ গমে তো যাকাত ধার্য হয়। আর গম গরুথেকেই। [(আরবী *******)] আবূ উবাইদ এ অর্থটির ওপর তাগিদ জানিয়ে বলেছেনঃ গরু যখন চাষবাদের কাজ করে, পানি উত্তোলন করে বা টানে, তখন যে দানার ওপর যাকাত ধার্য হয়, তা তো সেই গরুর চাষ, পানি উত্তোলন ও মলনেরই ফসল। এখন ফসলের সাথে সাথে সাথে যুদি গরুর ওপর ও যাকাত ধার্য হয় তাহলে লোকদের ওপর দ্বিগুণ বা দ্বৈত যাকাত ধার্য করা হবে। [(আরবী *******)]
ঙ. সুবিচার নীতি প্রয়োগ ও দ্বৈত যাকাত ধার্য নাকরা মতের হানীফা বিকাহবিদগণ বলেছেনঃ খারজী জমি (যার গোটা খণ্ডের ওপর বার্ষিক সুনির্দিষ্ট কর ধার্য হয়) থেকে ওশর নেয়া হবে না। এভাবেই একই জমির ওপর ওশর ও কারাজ উভয়ই একত্রে ধার্য হওয়া থেকে রক্ষা পা্ওয়াযেতে পারে। সেমন একই মালে ব্যবসায় যাকাত ও গবাদি পশুর যাকাত একত্রিত হতে পারে না। [(আরবী *******)]
চ. উক্ত মৌলনীতির আর ও প্রয়োগ এভাবে হয়েছে যে, জমহুর ফিকাহবিদগণ শর্ত করেছেন, নিসাব পরিমাণ সম্পদ ঋণমুক্ত হলে তবেই তার ওপর বান্দ হিসেবে দাবি দা্ওয়অ চাপানো যায়।কেননা যে মাল ঋণ বাবদ দেয় তা না থাকার সমতুল্য।
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি ঋণ শোধ করে দিলে তার পর তা নিসাবের পরিমাণ সম্পদের মালিকত্ব অবশিষ্ট না থাকলে সেধনী ব্যক্তি গণ্য হবে না বরং তখন সে অভাবগ্রন্ত গণ্য হবে। এতে প্রকাশমান ও অপ্রকাশমান ধন মাল অভিন্ন হবে যেমন আগেই অগ্রাধিকার পেয়েছে।
ঋলগ্রন্ত ব্যক্তি ঋণেল কারণ যাকাত থেকে অব্যাহতি পাওয়অর কারণ প্রদর্শনস্বরূপ কোন কোন ফিকাহবিদ যা বলেছেন, তা অবশ্যই স্মরণীয়। কেই বলেছেন, ঋণদাতা তার উপর চেপে;বসে বলে ঋণগ্রস্থের মালিকত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। আবার কেউ বলেছেন, ঋণের টাকা ফেল পা্ওয়ার অধিকারী লোককে বাধ্যতামূলকভাবে যাকা দিতে হবে। এরূপ অবস্থায় ঋণগ্রস্তের উপর ও যাকাত ফরয করা হলে একই মালে দুবার যাকাত ধার্য হয়ে পড়ে। আর হাদীস তা নিষেধ করেছে।
এ থেকে বোঝা যায় যে, কোন অবস্থায়ই দ্বৈত যাকাত ধার্য হতে পারে না।
চতুর্থঃ কষ্টের পার্থক্যের দরুন যাকাত পারিমাণে পার্থক্য
ইসলামের সুবচারমূলক অবদান এ ও যে, সম্পদ উৎপাদনে মানুষের নিয়োজিত কষ্টের পরিমাণ বা মাত্রায় পার্থক্যের দরুন যাকাতের ধার্য পরিমাণেও পার্থক্য করা হয়। তবে উজ্জ্বলতম দৃষ্টিান্ত হচ্ছে,যে জমি স্বতন্ত্র সেচ ব্যবস্থা ছাড়াই ফল ও ফসল দেয়, তাতে ওশর ধার্য হয় এবং জমিতে স্বতন্ত্রভাবে অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে সেচ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয় ফসল ফলানোর জন্যে তাতে অর্ধ ওশর ধার্য হয়। যেমন এক-পঞ্চমাংশ ধার্য হয় মানুষ যে সব গচ্ছিত ও খনিজ সম্পদ লাভ করে শ্রম ছাড়াই তাতে। কেননা তাতে নিয়োজিত শ্রম ও কষ্ট সে সম্পদের তুলনায় কম যা দিয়ে তা হাসিল করা হয়।
বস্তুতঃইসলামী শরীয়াত ছাড়া এ মৌল ন্যায় পতাপূর্ণ নীতির প্রতি আর কেউই ভ্রক্ষেপ মাত্র করেনি। অথচ আমাদের জ্ঞানমতে তা অবশ্য রক্ষণীয় ও লক্ষ্যণীয় একটা গুরুর্বপূর্ণ বিষয়।
সাধারণত অর্থনীতিবিশরিদ ব্যক্তিবর্গের অবশ্য কর্তব্য সেদিকে নজর দেয়া, তা দিয়ে উপকৃত হ্ওয়া। কিন্তু তারা তা রক্ষা বা প্রয়োগ করেছেন আয়ের ওপর কর ধার্য করণে কেবল তার উৎসের প্রতি ;কিন্তু তাতে যে কষ্ট ও চেষ্টা নিয়োজিত হয়, তার প্রতি একবিন্দু গুরুত্ব দেয়া হয়নি। তার পার্থক্যকে ও যথাযথ মূল্য দেয়া হয়নি।
পঞ্চামৎকরদাতার ব্যক্তিগত অবস্থার প্রতি লক্ষ্য দান
যাকাত অন্যান্য সব দিকক দিয়ে ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্যে কাজ করেছে। ধন শালী লোকদের পরস্পরের মধ্যে সুবিচার প্রতিষ্ঠার দিক দিয়ে তার খুব বেশী গুরুত্ব রয়েছে। তম্মধ্যে একটি হচ্ছে যাকাতদাতা ব্যক্তির ব্যক্তিগত অবস্থার প্রতি যাথাযাথ লক্ষ্য রাখা। যাকাত শুধুমাত্র ধনের পরিমাণের ওপর ই দৃষ্টি কেন্দ্রীভূত রাখেনি। অর্থনীতি
বিশারদ গণ দুই প্রকারের কর এম মধ্যে পার্থক্য করেছেন। একটি হচ্ছে প্রত্যক্ষ কর, য মূলধন মালের ওপর ধার্য করা হয়।মালদারের ব্যক্তিগত অবস্থার ওপর কোন দৃষ্টিই দেয়া হয় না।তার ওপর কি বোঝা চাপানো হচ্ছে সিদিকেও লক্ষ্য রাখা হয় না। তার ঋণ বা অন্যান্য আর ও বহু প্রকারের দায়িত্ব কর্তব্য থাকলে তা্ও কোন গুরুত্ব পায় না।আর একটি হচ্ছে ব্যক্তিগত কর। তাতে নিন্মোক্ত বিষয়গুলোর ওপর নজর রাখা হয়ঃ
১. ব্যক্তির জন্যে প্রয়োজন পরিমাণকে কর থেকে অব্যাহতি দেয়া
২. আয়ের উৎসের প্রতি খেয়াল রাখা;
৩. যাবতীয় জরুরী করচ ও দায়দায়িত্ব বাদ দিয়ে তার পর খালেস আয় থেকে কর গ্রনণ;
৪. পারিবারিক দায় দায়িত্ব ও বোঝাকে রেয়াত দান ৫.ঋণসমূহকে ও রেয়াত দান।
ইসলাম যাকাত ফরযকরণের এ সব কয়টি বিষয়ের ওপর বিশেষ লক্ষ্য রেখেছে সবকিছিুর আগে। আর তার চাইতে ্ও সব কয়টি বিষয়ের ওপর বিশেষ লক্ষ্য রেখেছে সবকিছুর আগে। আর তা চাইতেও বড় কথা, ইসলাম তা করেছে তখন মানুষ প্রত্যক্ষ কর ও ব্যক্তি গত কর এর মধ্যে কোনুরূপ পার্থকের কথা আদৌ জানতো না।
ক. তন্মধ্যে একটি হচ্ছে, নিসাব পরিমাণের কম বিত্তের ওপর যাকাত ফরয করা হয়নি। তারা ভিত্তি হচ্ছে, নিসাব পরিমাণের কম বিত্তের ওপর যাকাত ফরয করা হয়নি। তার ভিত্তি হচ্ছে এ যে ইসলাম তো যাকাত ফরয করেছে কেবল ধনী লোকদের ওপর,যেন তা তাদেরই দরিদ্রদের মধ্যে বন্টন করা হয়। নিসাব হচ্ছে নিম্মতম পরিমাণ সম্পদ, শরীয়াতের দৃষ্টিতে যার ওপর যাকাত হতে পারে। যে লোকেএ নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক নয়, সে যাকাত ফরয হতে পারে এমন পরিমাণ সম্পদের মালিক নয় বলে তার ওপর তা ধার্য হবে না। সীমিত পরিমাণ সম্পদের মালিকদের ওপর কর এর বোঝঅ না চাপানোর মানবয়ি চিন্তার বহু শতাব্দী পূর্বে ইসলাম এ অবদান রেখেছে। [ এ গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়ের প্রথম পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্যঃ যে ধনের ওপর যাকাত ফরয হয় তার শর্ত;১২৬-১৬৩পৃ.]
খ. ব্যক্তির ও তার পরিবারের নিম্নতম পরিমাণক জবিকাকে অব্যাহতি দান এ পরিমাণটা নির্ধারিত হয় তার মৌল প্রয়োজণবলীর ভিত্তিতে। বিশেষজ্ঞ আলিমগণ শর্ত করেছন যে নিসাব পরিমাণ সম্পদ মালিককে মৌল প্রয়োজনের অতিরিক্ত হতে হবে। এ পর্যায়ে আমরা কুরআন সুন্নাহ ও উম্মাতের ফিকাহবিদদের উক্তি প্রভৃতি থেকে অকাট্য দলিলের ভিত্তিতে ইতিপূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। সেই সাথে চিন্ত বিবেচনা পূর্ণযুক্তি দিয়েও তার সমর্থন যুগিয়েছি। যদিও আল্লাহর এ কথাটিই আমাদের জন্যে যথেষ্টঃ
(আরবী *******)
লোকেরা হে নবী আপনাকে জিজ্ঞেস করে তারা কি ব্যয় করবে? আপনি বলে দিনঃ যা কিছু প্রয়োজনাতিরিক্ত,তা।
আয়াতের (আরবী *******) শব্দটির অর্থজমহুর আলিমগণেল তাফসীর অনুযায়ী মৌল প্রয়োজনের অতিরিক্ত। ১ রাসূলে করীম (স) বলেছেনঃ যাকাত দিতে হবে শুধু ধনাঢ্যতার প্রকাশ থেকে। এবং শুধু কর তোমার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের থেকে।
গ. ঋলগ্রস্তকে অব্যাহতি দান এ পর্যায়েরই উল্লেখ্য ব্যাপার। আর তা হবে যদি ঋলটা নিসাবের সমান হয় অথবা ঋণের দরুন নিসাব পরিমাণ সম্পদ না হয়। জমহুর আলিমগণের এটাই মত। শরীয়াতের অকাট্য দলীল তার নিয়ামলীর এবং তার সাধারণ ভাবধারা ও তারই সমর্থন করে। পূর্বে তা আমরা স্পষ্ট করে আলোচনা করেছি।২
এপর্যায়ে হানাফী আলিমগণের বক্তব্য সুবন্যস্তভাবে উল্লেখ করাই যথেষ্ট হবে মনে করি। তাঁরা বলেছেন, যার ঋণ এতটা হবে যতাটা তার ধন মাল বান্দা হিসেবে তার ওপর আরও দায় দায়িত্ব আছে তা আল্লাহর জন্যে হোক যেমন যাকাত কিংবা মানুষের জন্যে হোক যেমন ঋণ,ক্রয়ের মূল্য, হারারোর ক্ষতিপুরণ,স্ত্রীর মোহরানাপ্রভৃতি। অথচ নগদ অর্থ হোক কি অন্য কিছু তাতে কোন পার্থক্য নেই। ওপরন্তু তাৎক্ষণিক হোক বিলম্বিত মেয়াদের হোক তাহলে তার ওপর যাকাত ধার্য হবে না।
তা এ জেন্যে যে, নিসাব পরিমাণ সম্পদ তো ঋণগ্রস্তের মৌল প্রয়োজন পূরণেই নিয়োজিত অর্থাৎ তা প্রস্তুত হয়ে আছে তাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যে প্রকৃতেই হোক অথবা পরিমাণগতভাবেই হোক। কেননা সে তা তার ঋণ শোধের জন্যে তারই ওপর নির্ভর শীল। পা্ওনাদারের তাগাদার চাপেএবং পরিণতিতে কারাবরণ থেকে নিজেকে রক্ষা করার তার আর কোন উপায় নেই। অপরদিকে আল্লাহর কাছে পাকড়া ও থেকেই রেহাই পা্ওয়ারও এটাই তার এক মাত্র উপায়। কেননাপ তার এ ঋণ তার ও জান্নতের মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে রয়েছে। তাহলে এর চাইতেও বড় প্রয়োজন তার আর কি হতে পারে? এক্ষণে তা পিপাসা নিবৃত্তকারী পানি, ব্যবহার্য পোশাক ইত্যাদির মত হয়ে গেছ। আর এরূপ অবস্থায় তা না থাকার মতই। কেননা এরূপ হলে পানি থাকা সত্ত্বে তৈয়ম্মুম করা জায়েয। অত এব এ লোকের ওপর যাকাত ফরয হবে না। দানের পোশাক যদি নিসাব পরিমাণ হয় তবুও। [তৃতীয় অধ্যায়ের প্রথম পরিচ্ছেদ যাকাত ফরয হয় যে মালে, তার সাধারণ শর্ত শীর্ষক আলোচনা।]
চ. জরুরী ব্যয় ও দায় দায়িত্ব ও দিতে হবে, যেন যাকাতটা খালেস আমদনী বা সম্পদ থেকে দেয়া সম্ভব হয়, আমরা এ মতটি গ্রহণ করেছি। আতার মতও তাই।তিনি জমির ফসল বা ফল সম্পর্কে বলেছেনঃ
তোমরা খরচাদি বাদ দাও, তার পর যা থাকে তা থেকেই যাকাত দাও।
ইবনে উমর ও ইবনে আব্বাস (রা) ও খরচ বাদ দেয়ার যদি তা ঋণ করে করা হয়ে থাকে পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন্
ইমাম আহমদ থেকেও খরচটা ঋণ হয়ে থাকলে উক্তরূপ মতই বর্ণিতদ হয়েছে। যেমন বীজের মূল্য যদি বাকি থেকে থাকে বাকিতে নেয়া হয়ে থাকে ব্যাংক থেকে, তাহলে সে ঋণ পরিমাণ সম্পদ থেকে বাদ যাবে।
অনুরূপ ভাবে খারাজ বাদ দেয়ার পরেই ফসল ওফলের যাকাত বা ওশর দিতে হবে বলে তিনি মত দিয়েছেন। খারাজকে জমির ওর ঋণ ধরা হয়েছে। কৃষি ফসল ইত্যাদিকে দালান কোঠা ও শিল্প কারখানা ইত্যাদির ওপর কিয়াস করা হয়েছে।১
ব্যবসায়ে তো কার্যত খরচাদি বাদ দেয়াই হবে। কেননা যাকাত নেয়া হবে বছরের শেষে যে আসল ওমুনাফা অবশিষ্ট থাকবে, তা থেকে। যা খরচ তা তো পষিয়ে নেয়া হয়েছে অবশ্য ;যদি তা ঋণ হয়ে না থাকে,যেমন দোকান ভাড়া যা দেয়া হয়নি। তখন হিসেবে তা বাদ দিয়ে ;অবশিষ্টের যাকাত দিতে হবে।
ঙ. র্পর্ববর্তী পরিচ্ছেদ আয়ের উৎসের প্রতি লক্ষ্য রাখার কথা যা উল্লেখ করেছি, তা্ও এখানে উল্লেখ্য। অতএব যে আয়ের উৎস স্থায়ী অ আবর্তনশীল মূলধন যেমন কৃষিজমির আয় তো থেকে ওশর বা অর্ধ ওশর গ্রহণ করা হবে। আর যে আয়ের উৎস শ্রম বা কাজ যেমন মাসিক বেতন,মজুরী,স্বাধীন পেশার লোকদের আয় ইত্যাদি, তা থেকে এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ যাকাত বাবদ গ্রহণ করা হবে।
ষষ্ঠঃসঙ্গতি বিধানে সুবিচার
ইসলামের শরীয়াত সুবিচার রক্ষার ব্যাপারে তার অকাট্য দলিল সমূহ যতটা পরিব্যাপ্ত, ইসলাম সে উজ্জলতম দিকগুলোর মধ্যে সীমাদ্ধ হয়ে থাকাকেই যথেষ্ট মনে করেনি। তাৎপযের দিক দিয়ে তা আরও অনেক দূরে পৌছে গেছে। এ আইন প্রণয়নের বস্তবায়নের সাথে সুবচারের প্রতি লক্ষ্য রাখাকেও যোগ করেছে। তাকে খুবেই উত্তমভাবে বাস্তবয়িত করেছে ও কার্যকর করে তুলেছে। এ কারণে যাকাতের জন্যে কর্মচারী নিয়োগের ও বাছাইকরণের জন্যে খুব বেশী উৎসাহ দান করেছে।তাদেরকে ঈমানী শক্তির বলে বলীয়ান হ্ওয়ার ্ওনিজেদের কে তার আবরণে সুরক্ষিত করার জন্যে ও উপদেশ দিয়েছ।তাদের জানিয়েছে ও বুঝিয়েছে যে আইনের মজবুত ধারায় সুবচারের নীতি যদি স্বকিৃত থাকে, কিন্তু সে আইন যারা কার্যকর করার জন্যে দায়িত্বশীল তাদের মনে মগজে চরিত্রে যদি তা প্রকট না থাকে, তাহলে তা লক্ষ তারিয়ে ফেলবে, সাদা কাগজে লেখা থাকবে অথচ বাস্তবতাশূন্য হয়ে দাঁড়াবে।
এ পর্যায়ে ইমাম আবূ ইউসুফ খলীফা হারুন অর রশীদকে বলেছিলেনঃ হে খলীফাতুল মুসলেমীন! আপনি এমন একজন লোক নিযক্ত করার আদেশকরুন, যে হবে বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য, অতীব পবিত্র চরিত্রের অধিকারী কল্যাণ কামী, আপনার ও আপনার
১. এ পর্যায়ে কৃষি সম্পদের যাকাত শীর্ষক আলোচনা দ্রষ্টব্য। শেষ পর্যন্ত আমি অবহিত হয়েছি যে, জাফরী মাযহাবেই হচ্ছে ফিকাহবিদ আতার মত(আরবী *******) গ্রন্হদ্বয় থেকে এ কথা (আরবী *******) গ্রন্থের ২য় খণ্ড, ৮০-৮১ পৃষ্টায় উদ্ধৃত হয়েছে।
প্রজা সাধারণের পক্ষে বিপদ আশংকামুক্ত।এবং এ ব্যক্তিকে বিভিন্ন স্থানে যাকাত সংদগ্রহের দায়িত্ব দিন। তাকে এ আদেশ করুর, যেন সে বিভিন্ন স্থানে এমন সব লোক নিয়োজিত করে যারা হবে তার পসন্দনীয়, মনোনীত। তাদের ধর্মীয় আচার আচারণ, নিয়ম পদ্ধতি ও আমনতদারী সম্পর্কে জানতে চাইবে। তবেই তারা নানা স্থান থেকে যাকাত সংগ্রহ করে তার কাছে জমা করে দেবে।
আমিজানতে পেরেছি, কারাজ আদায়ে নিযক্ত ব্যক্তিরা নিজেদের পক্ষ থেকে এমন সব লোককে যাকাত আদায়ের জন্যে পাঠিয়ে থাকে, যারা জনগণের ওপর জুলুম করে, খুব রুঢ় ওঅশালীন ব্যবহার করে এবং মাল নিয়ে আসে যা হালাল নয়, যা সংকলন ও হয় না। আসলে যাকাত আদায়ের জন্যে পবিত্র চরিত্রের কল্যাণকামী লোক নিযুক্ত হ্ওয়া একান্তই বাঞ্চনীয়। [(আরবী *******)]
রাসূলে করীম (স) যাকাতের জন্যে ভারসাম্য পূর্ণ চরিত্রের ও শরীয়াতের বিধান পালন কারী নিযুক্ত করতেন। এজেন্যে তিনি বলেছেনঃ যাকাতের কাজে নিযুক্ত লোক যদি ন্যায়পরতা ও সমতার সাথে কাজ করে তবে সে আল্লাহর পথের গাজীর মর্যাদাশীল হবে। [আহমাদ আবূ দাউদ, তিরমিযী,ইবনে মাজা ও ইবনে খুজায়মা উদ্ধৃত। তিরিমিযী হাদীসটি কে হসন বলেছেন। (আরবী *******) হাদীসটিকে মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহীহ বলে অবিহিত করেছিন এবং যাহরী তা সমর্থন করেছেন।] নবী করীম (স) তাঁর একজন কর্মচারীকে বলেছিলেনঃ
আল্লাহকে ভয় কর, হে আবুল অলীদ! কিয়ামতের দিন তুমি যেন এমন উট বহন করে নিয়ে না আস, যা বিকট ধ্বনি করবে, বা এমন গরু নিয়ে না আস যা হাম্বা রব তুলবে এবং এমন ছাগী নিয়ে না আস যা চ চ করবে। [ তাবারানী (আরবী *******)গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন। এর সনদ সহীহ(আরবী *******)]
দ্বিতীয় আলোচনা
দৃঢ় প্রত্যয়
কর আরোপে সুবিচার প্রতিষ্ঠার দ্বিতীয় মৌলনীতি হচ্ছে দৃঢ় প্রত্যয়।
এখানে দৃঢ় প্রত্যয় বলতে বোঝায়, যার ওপর কর ধার্য হয়, যে সচ্ছল লোককে কর দিতে বাধ্য করা হয় তার মতে এ কর পক্ষে একটা দৃঢ় প্রত্যয় বিরাজমান থাকা একান্তই আব্শ্যক। তাতে যেন কোনরূপ অজ্ঞতার অন্ধকার বা অস্পষ্টতা থাকা উচিত নয়। তেমনি নিছক জবরদস্তিমূলক ও হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। করা দেয়ার মেয়াদ পন্হা ও সময়াদি সকলের কাছে সুস্পষ্টরূপে জানা থাকতে হবে এবং শেষ কদ্দিনে চলবে, তাও অজানা থাকলে চলবে না কর সংশ্লিষ্ট সকল লোকেরই এ বিষয়ে পূর্ণমাত্রায় অবহিত থাকতে হবে।
অর্থনীতির শুরু আদম স্মীথ এ দৃঢ় প্রত্যয়ের গুরুত্ব স্পষ্ট করে প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেনঃ ধনশালী ব্যক্ত্রি যা কিছু বাধ্যবাদকাত এবং তার ওপর যে কর্তব্য আরোপিত, সেই বিষয়ে তার মনে অকাট্য সন্দেহমুক্ত জ্ঞান থাকার গুরুত্ব বাস্তবিকই অনস্বীকার্য। কেননা যে কোন কর ব্যবস্থায় দৃঢ় প্রত্যয়ের অনুপস্থিতি করা বোঝা বন্টনের সুবিচার না হ্ওয়ার কঠিন বিপদ ডেকে আনতে পারে।
উপরস্তু কর ব্যবস্থার স্থিতির সাথে দৃঢ় প্রত্যয় খুব বেশি গভীর ভাবে সংযুক্ত ও সম্পর্কশীল, এতে দ্বিমতের অবকাশনেই। ধনশালী ব্যক্তি যদি একটা বোঝা যাবে,সে তার দায়িত্ব ও কর্তব্যের ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় পোষণ করে। এই প্রেক্ষিতে কানার প্রভৃতি ব্যাখ্যাকার এতদূর বলেছেন, প্রত্যেকটি প্রাচীন করেই খুবই উত্তম পবিত্র কর।
পারস্পরিক ব্যাপারসমূহের সম্পর্কে ও এরূপ কিয়াস করা যায়। তাতে খুব বেশী ও বারবার পরিবর্তন কর বিধানকে ভেঙ্গে চুরে দেয় এবং তা সন্দেহের পর্যায় অতিক্রম করে স্থিতি ও প্রত্যয়কে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়া পর্যন্ত পৌছে দেয়। উপরর্ন্ত কর আরোপকারীর মনোভাব সম্পর্কে জনমনে প্রবল সংশয় জেগে ওঠে। [ ড. ফুয়াদ ইবরাহীম লিখিত (আরবী *******) গ্রন্থে থেকে ২৬৭ পৃ.]
বস্তুতঃ এ দৃঢ় প্রত্যয়ের যাবতীয় নিয়ম কানুন যাকাত ফরযকরণে পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়িত। আল্লাহ তাআলা তা তাঁর কিতাবে সুস্পষ্ট ঘোষণার মাধ্যমে ফরয
করেছেন। তার রাসূলে করীম(স) এ জবানীতে তার পরিমাণ সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তা ব্যাখ্যা ্ও বিস্তারিত বিশ্লেষণে ইমাম সাহেবগণ বিরাট মহামূল্য ফিকহী জ্ঞানের সমাহার রেখে গেছেন। তােই প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য হচ্ছে তৎসংক্রান্ত যাবতীয় হুকুম আহকাম ও স্থিতিশীল ফরয, তাতে খুব বেশী পরিবর্তন পরিবর্ধনের অবকাশ নেই। এ কালের অন্যান্য সমাজের বিবিধ কর এর সততা নিত্য পরিবর্তনশীল নয়। যাকাতের কোন কোন আইনে যে ফিকাহবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, রাষ্ট্র যখন যাকাত সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করবে, তখন তন্মাধ্যে যে কোন একটি মতকে অগ্রাধিকার দিতে পারে।
তৃতীয় আলোচনা
আনুকূল্য রক্ষায়
আদম স্মীথ কর ব্যবস্থার সুবিচার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে তৃতীয় যে মৌলনীতি উপস্থাপিত করেছেন, তা হচ্ছে আস্থার সাথে আনুকূল্য রক্ষা।
এ মৌলনীতির সারনির্যাস হচ্ছে, কর নির্ধারণ বা আরোপে ধন শালী ব্যক্তির দিকটির প্রতি লক্ষ্য রাখা এবং তর প্রতি নম্রতা ও সহানুভুতি প্রদর্শন যেন সে স্বীয় মনের ঐকান্তিক সন্তুষ্টি ও স্বতঃস্ফূর্ততা সহকা কর আদায় করে দিতে প্রস্তুত হয়। এ ব্যাপারে তার যেন কোনরূপ অভিযোগ না থাকে। অথবা কোন রূঢ়তা ও কষ্টদানের শিকারে পরিণত না হয়।
ইসলামী আইন প্রণয়ন ও তা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে যা আমরা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি ও স্পষ্ট করে তুলেছি কোন দৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তি লক্ষ্য করবেন যে, ইসলাম এ দিকটির ওপর খুব বেশী গুরুত্ব আরোপ করেছে। নিম্নে আমরা তা বিভিন্ন দিক তুলে ধরছি, তা থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠবেঃ
প্রথমত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা) থেকে ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন যে, নবী করীম (স) বলেছেন, মুসলমানদের যাকাত তাদের পানির স্থানসমূহেই আদায় করা হবে। আহমদ ও আবূ দাউদ উদ্ধৃত অপর বর্ণনায় কথাটি এইঃ টানাটানি নেই, পার্শ্বে রেখে দেয়া নেই,তাদের যাকাত তাদের স্থান ছাড়া অন্য কোন খানে নেয়া হবে না। [ইমাম শাওকানী লিখেছেনঃ আবূ দাউদ মুনযেরী ও হাফেস তালখীচ গ্রন্থে এ হাদীসটি সম্পর্কে কিছুই বলেননি। এর সনদে মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক রয়েছেন, তিনি(আরবী *******) করে হাদীস নর্ণনা করেছেন।এ অধ্যায়ের ইমরান ইবনে হুসাইন থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন আহমদ আবূ দাউদ নাসয়ী, তিরমিযী ইবনে হাব্বান আবদুর রাজ্জাক। নাসয়ী তাঁর থেকে অপর এক সূত্রে হাদীসটি এনেছেন। (আরবী *******) তাবারানী(আরবী *******) গ্রন্থে হযরত আব্বাস থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেনঃ মরুবাসীদের যাকাত তাদের পানির কাছে এবং তাদের আঙিনায় লওয়া হবে। তার সনদ উত্তম। যেমন (আরবী *******)এ রয়েছে।]
হাদীসে টানাটানি নেই বলে বোঝানো হয়েছে যে, গবাদি পশুর যাকাত সেগুলোর অবস্থান স্থান থেকেই নেয়া হবে। তা যাকাত গ্রহণকারী কর্মচারী পর্যন্ত টেটে নেয়া যাবে না। খাত্তাব্ উল্লেখ করেছেনঃ পার্শ্বে রেখে দেয়া নেই বলে বোঝানো হয়েছে যে, ধন মালের মালিকদেরকে তাদের অবস্থান স্থাল থেকে সরিয়ে দিয়ে যাকাতের হিসাব করা বা যাকাতের মাল ল্ওয়অ হবে না।এ ও হতে পারে যে তাদের কে পশুর অবস্থান স্থল থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া;চলবে না, যার ফলে যাকাত আদায় করীকে তাদের পিছনে
পিছনে দৌড়াতে ও তাদের খোঁজার শ্রম করতে হতে পারে। সোজা কথা, যাকাত আদায় যেমন আদায়কারীর সুবিধা আসুবিধা দেখতে হবে, তেমনি দেখতে হবে যাকাদাতার সুবিধা আসুবিধা। [(আরবী**********)]
কেউ কেউ পার্শ্বে রেখে দেয়া নেই এর ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে যে, যাকাত গ্রহণকারী ব্যব্তি থাকবে যাকাতদাতাদের থেকে অনেক অনেক দুরে আর তখন তাদেরকে যাকাত গ্রহণকারীর কাছে ডেকে ডুবে হাজির করা হবে হাদসে এ কাজ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। [(আরবী**********)]
শা্ওকানী লিখেছেনঃ হাদীসটি থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, যাকাত গ্রহণকারী যে যাকাত নিয়ে যেতে এসেছে, সে যাকাতদাতাদের পানির স্থানে সেখানে তারা অবস্থান করে উপস্থিত হয়ে যাকাত নেবে। কেননা যাকাতদাতাদের পক্ষে সেটাই সুবধাজনক। [(আরবী**********)]
দ্বিীতীয়ঃ মধ্যমমানের জিনিস গ্রহণ ও উত্তম বাছাই করা মাল না নেয়ার নির্দেশ।
হযরত মায়াযকে ইয়মেন প্রেরণকালে রাসূলে করীম (স) কর্তৃক প্রদত্ত ভাষণে এ কথটি ও ছিলঃ তুমি নিজেকে বাছাই করা উত্তম মালসমূহ থেকে দূরে রাখব। কেননা যাকাতদাতা লোকেরা সাধারণত এই বাছাই করা উত্তম মালসমূহ খুশীর সাথে দিতে প্রস্তুত হয় না।
উত্তম উষ্ট্রী গ্রহণকারী জনৈক যাকাত কর্মচারীর প্রতি নবী করীম (স) অস্বীকৃতি ও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করতে হয়েছিল যে, আসলে সেটি দুটি উঠেল বদলে গ্রহণ করা হয়েছে উটের বিরাট পালের মধ্য থেকে। অবশ্য যাকাতদাতা মুসলিমকেও বেছে বুড়ো অক্ষম ও রোগাক্রন্ত উট যাকাত বাবদ দিতে নিষেধ করা হয়েছে, বলেছেনঃ হ্যাঁ, তোমাদের ধন মালের মধ্যে মধ্যম মানের জিনিস যাকাত বাবদ দেবে। কেননা আল্লাহ তাআলা বাছাই করা উত্তম মালই দিতে বলেননি যেমন, তেমনি খারাপ নিকৃষ্ট মাল দবোর আদেশ ও দেন নি। [ প্রথম খণ্ডের আলোচনা দ্রষ্টব্য]
তৃতীয়ঃ কৃষি ফসল ও ফল ফাঁকড় পরিমাণ আন্দাজকরণের কম সে কম পরিমাণ ধরার নির্দেশ। আবূ দাঊদ তিরমিযী ও নাসায়ী উদ্ধৃত রাসূলে করীম (স) এর হাদীস ইতি পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছেঃ তোমরা যখন আন্দাজ করে পরিমাণ ধরবে তখন ধার্য পরিমাণ থেকে এক-তৃতীয়াংশ বাদ দিয়ে নেবে। যদি এক তৃতীয়াংশ বাদ দেয়া সমীচীন মনে না করা তা হলে অন্তত এক চতুর্থাংশ অবশ্যই বাদ দেবে। রাসূল (স) এর কথা আন্দাজকররে বোঝা হালকাকরণ নীতি গ্রহণ করা। কেননা ধন মালের অনেক পরিমাণ গাছ থেকেই খেয়ে ফেলঅ হয়, ঝড়ে পড়ে যায় ও পোকায় কেয়ে ফেলে। [ কৃষি ফসল ও ফলের যাকাত পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য]
ইমাম খাত্তাবী লিখেছেন ঃ রাসুলের এক তৃতীয়াংশ বাদ এক চতুর্থাংশ বা দা্ও কথাটির ব্যাখ্যা কোন কোন আলিম বলেছেনঃ মালের যে অংশ বাদ দেয়া হবে, তা যাকাত দাতার সুবিধা বিধানস্বরূপ। কেননা যদি পুরোমত্রার প্রাপ্যটা পরোপুরি নিয়ে নেয়া তাহলে তাতে তাদের ক্ষতি সাধিত হবে অথচ ফল ফসলের অনেক জিনিস পড়ে যায়, পাখী খেয়ে ফেলে, লোকেরা খাবার জন্যে পেড়ে নিয়ে যায়। এরূপ অবস্থায় পরিমাণ আন্দাজের সময় এক চতুর্থাংশ বাদ দিয়ে ধরলে তাতে যাকাতদাতাদের পক্ষে খুবই প্রশস্ত ও সুবিধা হয়। হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) এরূপ আন্দাজ ধারারই নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ফিকাহবিদদের মধ্যে অনেকে এ মতও দিয়েছেন যে, সমস্ত খেজুর সম্পদই ধরতে হবে, কিছুই বাদ দেয়া চলবে না বরং কিছু পরিমাণ খেজুর আলাদা করে তাদের নেয়া হবে, যার পরিমাণ অনুমানের সাহয্যে জানা গেছে। [(আরবী**********)]
চতুর্থঃ যাকাত দেয়ার নির্দিষ্ট তারিখ ছাড়িয়ে তার পরে বিলম্ব করে তা দেয়া জায়েয আছে। অবশ্য তা পারা যাবে মালের মালিকের খুব বেশী প্রয়োজন দেখা দিলে। যেমন হযরত উমর (রা) দুর্ভিক্ষের বছর তাই করেছিলেন।
এসবই করদাতাদের প্রতি আনুকূল্য দানের অন্তর্ভক্ত নীতি।

চতুর্থ আলোচনা
মধ্যম নীতি অনুসরণে
কর ব্যবস্থায় পযোজ্য প্রখ্যাত সুবিচার নীতির এটা চতুর্থ নিয়ম।
অর্থনতিবিদরা কর আদায়ের বাধ্যকতায় মধ্যম নীতি অবলম্বনের প্রয়োজন মনে করেছেন। সর্বপ্রকারের বাড়াবাড়ি পরিহার করার গুরুত্ব ও তাঁরা স্বীকার করেছেন।
কর সংগ্রহের বাধ্যবাধকতা পর্যায়ে এখানে মনে করা হয়েছেঃ রাষ্ট্র বেতনভুক্ত কর্মচারীদের মজুরীদানে এবং অর্থ বিভাগের জন্য পরিহার্য প্রয়োজনীয় গরুত্বপূর্ণ কার্যাবলী ও ভাণ্ডবাটি যা খরিদ করা হয় তাতে যা কিছু ব্যয় করে তা। এসব অর্থ ব্যয় অর্থনৈতিক কেন্দ্রস্থলে তা বহন করে নিয়ে যা্ওয়ার কষ্ট ইত্যাদিত যা ব্যয় করা হয়, তাও এর মধ্যে শামিল। তা হয় তাদের দেয় পৌছানোর লক্ষ্যে হোক অথবা তাদের বক্তব্য শোনা ও হিসেব নিয়ে তাদের সাথে বোঝাপড়া করা ইত্যাদির জন্য হোক অথবা তাদের জুলুম পীড়ন দূর করা বা প্রতিষ্ঠনগত সিদ্ধান্তে দোয় ধরার জন্যই হোক। এ ধানের বহু কারণেই তাদের স্থানান্তরিত হওয়ার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে এবং সেজন্যে তাদের একটা মূল্যবান সময়ও অতিবাহিত হতে পারে। প্রয়োজন হতে পারে কোন কোন ব্যয়বার বহনে কষ্ট স্বীকার করার।
এতে কোন ভয়ের কারণ নেই যে, সাধারণ মালদার লোকেরা তাদের ওপর ধার্য কর যাথারীতি আদায় করে দেবে। যেন রাষ্ট্র সরকার তৎলব্ধ সম্পদ দ্বারা সে সাধারণ ব্যায়াদি সম্পন্ন করতে পারে, যার কিছুটা ফায়দা শেষ পর্যন্ত তাদের দিকেই ফিরে আসবে। মালদার ব্যক্তি যুদ অনুভব করে যে, তার নিকট থেকে যে মাল নেয়া হচ্ছে, তা উক্ত লক্ষ্য বাস্তবায়নের কোন বিশেষ ভুমিকা পালন করবে না বরং তার একটা বিরাট অংশ বিনকষ্ট হয়ে যাবে, তখন তা অর্থ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনগণের ভাণ্ডারের দিকে যাওয়ার পথে থাকবে, তখন সে তা আদায় করবে নিতান্ত অীনচ্ছা ও বিরক্তি সহকারে। নাফরমানির পতাকা বহন করতে সে কখনই কুন্ঠিত হবে না এবং ভবিষ্যতে ও সে কর দেয়ার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতেই চেষ্টা করবে প্রাণপণে[দেখুনঃ (আরবী**********)]
কর ব্যবস্থা সম্পর্কে অর্থনীতি বিদরা এসব যা কিছুর উল্লেখ করেছেনে, ইসলামে এ দিকটি স্মপর্কে আমরা যখন বিবেচনা করি, তখন আমরা সাধারণভাবেই দেখতে পাই যে, তা সর্বক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা ও মধ্যম নীতি অবলম্বনের নির্দেশ দেয় এবং সীমালংঘন ও কার্পণ্য সংকীর্ণতা প্রদর্শন করতে স্পষ্ট ভাষায় নিষেধ করছে। ব্যক্তির
বিশেষ ধান মালের ক্ষেত্রে যখন এরূপ গুরুত্ব আরোপ, যখন সাধারণ ধন মালের বিশেষ করে যাকাত সম্পদে অধিক বেশী গরুত্ব আরোপিত হবে, সে তো স্বাভাবিক কথা।
নবী করীম (স) যাকাত সংগ্রহে ও যাকাত আদায়কারী কর্মচারীদের ব্যাপার কত তীব্র কঠোরতা ও অনমীয় নীতি অবলম্বন করেছেন এবং যারা লোকদের কাছ থেকে হাদীয়া তোহফা গ্রহণ করে তা নিজের মাল মনে করেছে তাদের প্রতি যে কি সাংঘাতিক ভাবে ক্রুদ্ধ ও রাগান্বিত হয়েছেন, তা কারুরেই অজানা নেই!
যাকাত স্থানান্তরকরণ শীর্ষক আলোচনায় আমরা দেখেছি, কর্মচারীরা কিভাবে মফস্বলে চলে গেছে, যাকাতের মাল সংগ্রহ করেছে এবং ঠিক হাতে কেবল তাদের নিয়ে যাওয়া চাবক ও ক ম্বল সঙ্গে নিয়ে ফিবে এসেছে। তার রাষ্টের ওপর শুধু ততটুকুর বোঝাই চাপিয়েছে, যতটুকু তারা মজুরী হিসেবে গ্রহণ করেছে। তা ই তাদের জন্যে যথেষ্ট ছিল হত, কোনরূপ অবমূল্যায়ণ বা বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘন ছাড়াই। ইমাম শাফেয়ী শর্ত আরোপ করেছেন তার সমর্থকরাও যে, যাকাত সংস্থার কর্মচারীদের আট ভাগের এক ভাগের অধিক দেয়া যাবে না। কেননা কুরআন মজীদই তাদের জন্যে এ অষ্টমাংশ নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। অতেএব তারা তার চাইত েবেশী পাবে না। এ কথাটি ইমাম শাফেয়ী বলেছেন এজন্য যে, তাঁর মাযহাবে কুরআনে উল্লেখিত আটটি খাতের মধ্যে লব্ধ যাকাত সম্পদ সমান হারে বন্টন করা অপরিহার্য।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
কর ও যাকাতের মধ্যে স্থিতি ও ঊর্ধ্বগামিতা
স্থিতিশীল কর ও ঊর্ধ্বগামী কর
স্থিতি শীল কর বলতে বোঝায় সেই কর, যার মূল্য স্থিতিশীল থাকে তার অধীন বস্তুর যতই পরিবর্তন হোক না কেন। যেমন আয়ের ওপর বা কোন সম্পদের ওপর কর ধার্য হল, তার মূল্য হচ্ছে ১০%। এ মূল্যটা সকল প্রকারের আয় ও সম্পদের প্রযোজ্য হবে তা বড় হোক কি ছোট।
আর ঊর্ধ্বগামী বা বাড়তি প্রবণতসম্পন্ন কর হচ্ছে তাই, যার মূল্য বৃদ্ধি পায় তার অধীন বস্তুর পরিমাণ বৃদ্ধির সাথে সাথে। যেমন আয়ের ওপর কর ধার্য হল প্রথম একশত জনীহ (মিশরীয় মুদ্রা) এর ১০% দুই শতের ওপর ১২% তিন শতের ওপর ১৫% ইত্যাদি। [(আরবী**********)]
ন্যায়পরতা আছে, তা বর্ণনায় বহু যুক্তি প্রমাণেরও অবতারণা করেছেন তাঁরা যদিও পাপত্তি উত্থানকারীদের কোন অপত্তির প্রতিই তাঁরা ভ্রক্ষেপ করেননি; তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি যুক্তি এইঃ
১. একজন সম্পদশালী ব্যক্তি ক্রমবৃদ্ধিশীল ফসল আইনের অনুগত। সে যখনই ধন লাভ করল, তার সম্পদ বৃদ্ধি ও প্রবৃদ্ধি অনুপাতে তা ক্ষমতাও বৃদ্ধি পেল। বরং এ সামর্থটা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে বহু কয়টি পরপর হারের চাইতওে অনেক বেশী। এ ধনবান ব্যক্তি উর্ধ্বগামী কর দেয়ার জন্যে কিছুমাত্র কম প্রস্তুত হবে না। কেননা কর এর বোঝা ঝামেলা বহনের শক্তি তার অনেক বৃদ্ধি পেয়ে গেছ।
২. সম্পদ ও আয়ে লক্ষ্যণীয় পার্থক্য দূর করার একটা খুব সার্থক ও নিকট বর্তী উপায় হচ্ছে ঊর্ধ্বগামী হারের কর। অতএব যেখানে পরিস্থিতির সুস্থতা বিধানের উদ্দেশ্যে ঊর্ধ্বগামী হারের কর ধার্য করে তা করা একান্তই কর্তব্য। এর দ্বারাই এ দূরিতক্রম্য পার্থক্য সীমিত করা এবং ধনী ও গরীবদের মধ্যকার ব্যবধান ও দূরত্ব কম সে কম করা সম্ভব হবে।
আমাদের পূর্ববর্তী অধ্যয়নে আমাদের সম্মুখে এ কথা স্পষ্ট প্রতিভাত হয়ে গেছে, যাকাত কোন ঊর্ধ্বগামী কর চিন্তার ফসল নয়। ফলে যাকাতের মূল্য বা হার মাত্র
বৃদ্ধি শীল নয়। অন্য কথায় যাকাতের ফরয পরিমাণের হার তখনই বৃদ্ধি প্রাপ্ত হবে যখন ধন সম্পদের আ আয়েল পরিমাণ যার ওপর যাকাত ধার্য হয় বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে।বস্তুর এ এক স্থিতিশীল ও স্থায়ীভাবে ফরযকৃত যাকাত। কেননা যাকাতে দেয় পরিমাণটা স্থায়ী ও স্থিতিশীল। উপাদান উপকরণের পরিমাণ বাড়তির দিকে বা কমতির দিকে যতই পরিবর্তিত হোক না কেন।
অতএব যে লোক বিশটি স্বর্ণ দনিারের মালেক, সে তার দশভাগের এক ভাগের এক চতর্থাংশ দেবে। অনুরূপভাবে যে লোক বিশ হাজার স্বর্ণ দীনারের মালিক হবে, সেও ঠিক সেই এক দশমাংশের এক চতর্থাংশ যাকাত বাবদ প্রদান করবে।
যার জমি পাঁচ অসক পরিমাণ শস্য উৎপান্ন করল অথবা যার খেজুর বাগানে পাঁচ অসাক খেজুরের ফসল ফলল, সে উভয় অবস্থায়ই এক দশমাংশ বা তার অর্ধেক যাকাত বাবদ দেবে। তেমনি যার হাজার অসাক বা ততোধিক পরিামাণের ফসল লাভ হল, সেও সেই হারেই দেবে।
প্রথম প্রথম দৃষ্টিতে অনেকের মনে হতে পারে যে, বিভিন্ন প্রকারের গবাদি পশুতে যাকাত বুঝি বিপরীতভাবে ঊর্ধ্বমুখিতা প্রবণ,ছাগলের যাকাতেও বুঝি তাই। যেনম সহীহ হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছেঃ প্রতি চল্লিশটি ছাগীতে একটি ছাগী একশ বিশটি পর্যন্ত এ হার। তার পরে সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে দুশটি পর্যন্ত দুটি চাগী। আরও অধিক হলে তিনশ পর্যন্ত তিনটি ছাগ।অতঃপর প্রতি একশতে একটি।
এ থেকে এ কালের কোন কোন আলোচনাকারী চিন্তাবিদ মনে করেছেন যে, পশুর ক্ষেত্রে যাকাত বিপরীত দিকসম্পন্ন ঊর্ধ্বগামী এবং তার পশু সম্পদ বৃদ্ধির ব্যাপারে উৎসাহদানস্বরূপ বিশেষ করে আরব উপদ্বীপে। অবশ্য এরূপ ব্যাখার একটি তাৎপর্য রয়েছে। তবে গভীল সূক্ষ্ম অধ্যয়নকারী স্পষ্ট দেকতে পারেন যে, এ সিদ্ধান্তটা অগ্র্হণযোগ্য। আর এক দশামাংশের এক চতুর্থাংশ হার যা ইসলাম সাধারণভাবে গ্রহণ করে থাকে নগদ ও ব্যবসায়ী মূলধনের যাকাত ঠিক সেই হারই পশুর যাকাতেও গ্রহণীয়। এটা স্বভাবিকতার দিক দিয়ে নৈকট্য বিধানমূলক ব্যব্স্থা গরু ও উটেরবেলা এ কথা স্টষ্ট। এজন্যে হাদীসমূহে প্রতি ত্রিশটি গরুর জন্যে একটি করে এক বছর বয়স্ক পুরুষ বা সস্ত্রী বাছুর এবং প্রতি চল্লিশটিতে একটি করে মুসান্না যেমন উট বিপুল সংখ্যক হলে প্রতি চল্লিশটিতে একটি দুই বছরে উপনীত বাচ্চা, প্রতি পঞ্চাশটিতে একটি করে চার বছরে উপনীত বাচ্চা। অতএব ত্রিশটি গরুতে একটি এক বছঃর বয়স্ক বাছুর ও চল্লিশটিতে একটি করে মুসান্নাহ আর চল্লিশটিতে চিনতে লবুন, পঞ্চাশটি উটে হুক বা যখন লক্ষ্য করা যাবে যে, এ সংখ্যার মধ্যে ছোট আছে, মধ্যম আছে, বড় আছে। এ সবই আমাদের কে নৈকট্য বিধানকারী একটি হার দেয়। আর তা হলে এক দশমাংশের এক চতুর্থাংশ।
আর ছাগলের পুরুষ স্ত্রী যা ই হোক প্রথন চল্লিশটি বাবদ একটি ছাগী দিতে হবে। কেননা শর্ত এই করা হয়েছে যে, নিসাবটা এমন পরিমাণের হতে হবে যেন তার মালিক বড় ধনী বলে পরিচিত হতে পারে। যথাস্থানে আমরা এ কথাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছি এবং বলেছি যে, চল্লিশটি বা পাঁচটি এর কম সংখ্যকের মালিক ধনী বিবেচিত হয় না, যার ওপর যাকাত ফরয হতে পারে।
তার অর্থ প্রথম চল্লিশটিতে দেয় ফরযের পরিমাণ একদশমাংশের এক চতুর্থাংশ। অন্যান্য ক্ষেত্রে ও সেই ব্যবস্থা।ছাগলের মালিকানা পরিমাণ বিপুল হলে দেয় ফরযের পরিমাণ কম হওয়অর তত্ত্ব আগেই বলেছি যে, এ ধারনের ক্ষেত্রে অল্প বয়স্ক ছাগল বিপুল সংখ্যক হতে পারে। কেননা ছাগীরা বছরের একাধিকবার বাচ্চা প্রসব করে, আর একবারে একাধিক সংখ্যক বাচ্চ জন্ম দেয়। তার এ সব বাচ্চই তো হিসেবে ধরতে হয়। হযরত উমর (রা) থেকে সেই বর্ণরা পাওয়া গেছে, তিনি তাঁর কর্মচারীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তারা যেন ছাগলের বাচ্চা গুলোর হিসেবে গণ্য করে, রাখাল যদি কোনটিকে হাতে করে বহন করে নিয়ে আসে তুবও।
পশুর যাকাতে গ্রহীত হার হচ্ছে এক দশমাংশের এক চতুর্থাংশ। তার একটি প্রমাণ হচ্ছে, ইবরাহীম নখয়ী ও আবূ হানীফা থেকে ঘোড়ার যাকাত পর্যায়ে বর্ণিত হয়েছে, তার মূল্য ধরা হবে এবং তার মূল্যের এক দশরাংশের এক চতুর্থাংশ যাকাত বাবদ দিতে হবে।
যাকাত ঊর্ধ্বমুখী নীতিতে গ্রহণ করা হয় না কেন
প্রশ্ন হচ্ছে, যাকাত একটা স্থায়ী ও স্থিতি শীল হারের কর হল কেন? ঊর্ধ্বমুখী কর হল ন কেন? এ প্রশ্নের জবাব হচ্ছে, এ যুগে এ ধরনের কর ধার্যকরণের একটা প্রবণতার সৃষ্টি হয়েছে। বহু লোকই এর সমর্থনে ঘোষনা দিয়েছে যে, এর ফলে পার্থক্য দূরীভুত হবে এবং সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষিত হবে।
আমি মনে করি উর্ধ্বমুখী চিন্ত প্রসূত নীতিতে যাকাত ধার্য না হওয়ার কতগুলো কারণ রয়েছে তার মধ্যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণসমূহের উল্লেখ করা যাচ্ছেঃ
প্রথমঃ যাকাত স্বপ্রকৃতিতে একটা দ্বীনী ফরয এবং তা স্থায়ী যদ্দিন মানুষ এ পৃথিবতে আছে, তদ্দিন। ততদিন ইসলাম্ও টিকে থাকবে, টিকে থাকবে েইসলাম উপস্থাপিত এ যাকাত ব্যবস্থা। ক্ষেত্র, অবস্থা ও প্রয়োজনের পরিবর্তনের কারণে তা কখনই পরিবর্তিত হবে না। তা চিরদিনই ফরয থাকবে এবং সেজন্যে বান্দা হওয়ার কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবেও। প্রত্যেক ধনশালী মুসলিম ব্যক্তিই প্রত্যেক যুগে প্রত্যেক অবস্থায় ও পরিবেশেই তা দিতে প্রস্তুত থাকবে।
কিন্তু ঊর্ধ্বমুকীতাপ্রবণ কর এরূপ নয়। রাষ্ট্র বিশেষ ক্ষেত্রে এবং বিশেষ দেশে বিশেষ অবস্থায় বিশেষ সমষ্টিক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য বস্তবায়নের উদ্দেশ্য তা ধার্য করে থাকে। এ কারণে তা হার কখনের ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে যেমন, তেমনি হতে পারে নিম্নমুখীপ্রবণও। আর প্রয়োজন না থাকলে তা কখনও সম্পূর্ণ প্রত্যাহুত ও হতে পারে। ইসলামী শরীয়াত প্রয়োজন দেখা দিলে তার যোগ্য লোকদের ওপর কর ধার্য করতে রাষ্ট্র প্রধানকে নিষেধ করে না। এ প্রয়োজন দেখা দিতে পারে অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেলে, জনগণের মধ্যে অর্থনৈতিক পার্থক্য অনেক বেশি িএবং বিশাল হয়ে গেল কিংবা বার্ষিক বাজেটের বিরাটত্ব রক্ষ্রর আবশ্যকত দেখা দিলে। এরূপ অবস্থায় যাকাত ছাড়াও ঊর্ধ্বমুখী বা অ ঊর্ধ্বমুখী করা ধার্য করা যেতৈ পারে য জুলুম কেও প্রতিরোধ করবে, সুবচার প্রতিষ্ঠত করবে এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজন ও ফূর্ণ করবে। তবে তার শর্ত হচ্ছে, তা প্রয়োজন পরিমাণ অনুযায়ী হতে হবে তার অধিক নয় এবং বিবেচক ও উজদেষ্ট পরিষদ তার প্রয়োজন কনে করবে। শুদু তাই নয়, তা হবে, আল্লাহর নযিল করা কিতাব ও মানদণ্ডের সাথে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ যাক তিনি রাসূলগণের মাধ্যেমেনযিাল করেঃছেন জনগণের সাধ্য ইসাফ ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য।
দ্বিতীয়ঃ যাকতের ব্য ক্ষেত্র এবং অন্যান্য যে সাব দিকে তা ব্যয় বরা হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখে বলা যায়, জনগণের মধ্যকার অর্থনৈতিক পার্থক্য বিদূরণ দুর্বল শ্রেণীর লোকদের্ উচ্চমানে উন্নীত করণে যাকাত ঊর্ধ্বমুখী রক এর লক্ষ্য বাস্তবায়িত করে থাকে। কেননা যাকাত থেকে উপকৃত হয়ে বেশীর ভাগ য়েসব লোক যাদের কোনরূপ আয় নেই, যারা সীমিত আয়ের লোক যেমন ফকীর, মিসকীন, ক্রীতাদস, ঋণগ্রস্ত, নিঃস্ব পথিক। কর যখন বেশীর ভাগ ধনী লোকদের কাছ থেকেই গ্রহণ করা হবে প্রকারান্তরে অপ্রতাক্ষ হলেও না জনকল্যাণ মূলক কাজে ব্যয় করে তাদের দিকেই তা ফিরিয়ে দেয়ার জন্য, তখন সরকারই তা তাদের প্রতি আদায় করে তাদের দিকেই তা ফিরিয়ে দেয়ার জন্য, তখন সরকার কৃষিজমির মালিকের কাছ থেকে করা নিচ্ছে, সে তা তাদের দিকিই ফিরিয়ে দিচ্ছে পানি সেছের ব্যবস্থা ও কটিনাশক ছিটিয়ে িইত্যাাদিভাবে যদ্দারা জমি আপদমুক্ত হতে পারে। অনেক সময় প্রাপ্ত কর এর চাইতে ও অনেক বেশীই ফেরত দেয়। কিন্তু যাকাত তো এমন কর, যা ধনী লোকদের নিকট থেকে থেকে গৃহীত হয় দরিদ্র ও অভাগ্রস্ত লোকদের কাছে তাফিরিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে এবং দ্বীন ইসলামের ও ইসলামী রাষ্ট্রের কোন কোন সাধারণ জনকল্যাণমূলক কাজ আঞ্জাম দেয়ার জন্যে।
এক্ষণে যাকাত নেয়া দরিদ্র জনগণের জীবন মান উন্নত করার উদ্দেশ্যে। যাকাত বিশেষ ভুমিকা পালন করে পারস্পরিক অর্থনৈতিক দূরত্ব কম করা ও এক ধরনের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠর জন্যে। আর তার ফসল ঊর্ধ্বমুখী লক্ষ্য অর্জিত হয়, যদিও তার শিরোনামও আনষ্ঠানিক বা সরমারী পরিচিত তা হয় না।
তৃতীয়ঃ ঊর্ধ্বমুখী কর এর পক্ষে যারা বড় বড় কথা বলেন ভারসাম্য রক্ষ, পারস্পরিক মালিকানা পরিমাণ কাছাকাছি নিয়ে আসা এবং আয়ের পূনর্বন্টন ইত্যাদি,এ লক্ষ্যের বেশীর ভাগ অর্জনে ইসলাম ভিন্নতর ও বিশেষ ধরনের পন্হা উদ্ভাবন ও অবলম্বর করেছে। ইসলাম সেজন্যে মীরাস বন্টন ও অসীয়তকরণের পন্হা গ্রহণে করেছে। হারাম উপায়ে অর্জিত সম্পদের প্রতিরোধ করা, সুদ ও সম্পদ মওজুদকরণের হারাম করা ইত্যাদি ব্যবস্থার সাহায্য নেয়া হয় যাকাত ফরয করা ছাড়াও। এর প্রত্যেকটিই মালিকত্বকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয়ার পক্ষে সার্থকভাবে কাজ করে, সম্পদর মালিকত্ব সমান মানে আসে, লোকদের মধ্যে ইনসাফ ্ও সুবিচার কায়েম করে।
চতুর্থঃ ঊর্ধ্বমুখিতারা চিন্তর ওপরও বহু আপত্তি রয়েছে। অধিক সংখ্যক লেখকও অর্থনৈতিক চিন্তাবিদ তা উত্থাপিত করেছেন। তন্মধ্যে প্রকট ধরনের কতিপয় আপত্তি এখানে উল্লেখ করা যাচ্ছেঃ
১. ঊর্ধ্বমুখিতার হার নির্ধারণ সম্পন্ন হয় জবরদস্তিমূলকভাবে তা কোন সস্থ কর্মোপযোগী ভিত্তির ্ওপর স্থাপিত নয়। তার পরিণতি সংঘটিত হয় অত্যন্ত রূঢ়তায় যার নিয়ন্ত্রক যেমন কিছু নিই, তিমনি নেই কোন বাধা সন্ধন। ঊর্ধ্বমুখী সংক্রান্ত মতবাদের মধ্যে উজ্জ্বলতম দিক হচ্ছে ত্যাগ স্বীকারের সমতা বিধান।তা কোন স্থিতিশীল ও স্থায়ী প্রতিষ্ঠিত নিয়ম কানুন ভিত্তিক নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, ১বা২ কিংবা ততোধিক হারে মূল্য বৃদ্ধির ফলে কি এ সাম্য ও সমতা অর্জিত হবে? ঊর্ধ্বমুখিতা কি আয়ের বৃদ্ধিহারের সাথে পা মিলিয়ে চলবে, না তার তুলনায় মন্হর গতি হবে? করা দিতে বাধ্য লোকেরা কি বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত হবে? কিংবা আয় বণ্টিত হবে নানা খণ্ডের ও অংশেঃ?……….এগুলো বাস্তব অসুবিধা, ঊর্ধ্বমুখী ব্যবস্থার এসব পরিপন্হী এবং তাতে নির্যাতন ও অবিচারের ক্ষেত্রটিকে প্রশস্ত করে দেবে। [ডঃ রশীদ দকর রচিত(আরবী**********)]
২. ক্রমাগত ও অব্যাহত ঊর্ধ্বমুখিতা হিসেবেরে দিক দিয়ে একটি বাস্তব অসম্ভবতা পর্যন্ত পৌছে যায়। তা এভাবে যে ঊর্ধ্বমুখী কর ১% হারের আয় কখনই ১০০০ লীরা পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে, তখন ১২৯% হারে হয়ে যাবে, যখন আয় ১,০০০,০০০ মিলিয়ন লীরা পর্যন্ত উঠে যাবে, তখন তার মূল ও আসল আয়টাওা অতিক্রম করে চলে যাবে এ কর এবং কার্যত ও বাস্তবভাবে তা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। [(আরবী**********)]]
৩.কর ব্যবস্থা ঊর্ধ্বমুখী পদ্ধতি ধনী শ্রেণীকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসের পরিণতি পর্যন্ত পৌছে দেয় বিশেষ করে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রসমূহ যেখানে শ্রেণী সংগ্রাম পারস্পরিক সাংঘর্ষিক হয়ে থাকে এবং এলোমেলোভাবে স্তূপীকৃত মূল ধনসমূহ গলিয়ে প্রবাহিত করে দেবে। [(আরবী**********)]]
৪.ঊর্ধ্বমুখী কর ধার্যকরণ ব্যবস্থা স্বভাবতই সে পরিমাণ সম্পদ আলাদা করে কেটে নেয়া, যা ধনশালী ব্যক্তি পুঁজিকরণ ও উৎপাদনে পুনর্নিয়োগের জন্যে নির্দিষ্ট করে রাখে। তা ভোগব্যবহার করা হলে তাহ্রাসপ্রাপ্ত হয় না। জনগণের সঞ্চয় ও উৎপাদনে পুনর্নিয়োগের উৎসাহে ভাটা পড়ে। এসবেরই পণিতিতে উৎপাদন তৎপরতা এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে যে, তার পরিমাণ করোর নিকট অস্পষ্ট থাকার কথা নয়।
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
কর এর নিশ্চয়তা যাকাতের নিশ্চয়তা
কর ফাঁকি দেয়া
কর মানুষের অতীব প্রিয় জিনিসের ওপর ধার্য করা হয়ে থাকে, তা এমন ধন মাল, যার ভালোভাসা মানুষের কাছে খুবই চাখচিক্যপূর্ণ বানিয়ে দেয়া হয়েছে। এ কারণে বহু মানুষই নানাভাবে নানা উপায়ে ও কৌশলেক কর ফাঁকি দতে চেষ্টা করে। এমনকি স্বাভাবিকভাবেও যারা পারস্পরিক লেন দেন আমানত রক্ষার শুভ গুণে অলংকৃত, তারা পর্যন্ত সরকারের সাথে লেন দেনে এ সত্তার অস্তিত্ব অননুভূতভাবে স্বীকৃতব্য।
কর ফাঁকি দেয়ার কারণ
কর ফাঁকি দেয়ার কারণসমূহের অধিকাংশেই মনস্তাত্ত্বিক। যেমন মালের মালিকের মনে ধন মালের মায়া।সকলেই চায় তার ধনমাল তার হাতেই থাকুক অথবা হয়ত মানে করে যে, কর ধার্য করাই অন্যায় অবিচারমূলক কিংবা সে হয়ত মনে করে, কর দেয়ার বিনিময়ে রাষ্ট্রীয় কর্মতৎপরতার যে ফায়দা সে পাবে তা খুবই সামন্য। কেউ কেউ এমন দারণা পোষণ করতে পারে যে, প্রদত্ত কর সাধারণ জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হবে না অথবা এমন ধারণ হতে পারে যে রাষ্ট তাকে যা দেয়,তার চাইতে বেশী তার কাছে দাবি করা হচ্ছে। কেউ আবার।অন্য লোকদের করা ফাঁকি দিতে দেখে সে ও কর না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, যেন করা না দে্য়ার ব্যাপারে তাদের মধ্যে পুর্ণ সাম্য ও সমতা বজায় থাকে। এরূপ অবস্থা ও লক্ষ্য করা যায় যে, একটা সুনির্দিষ্ট কর ফাঁকি দেয় শুধু এজন্যে যেন অপর একটি জুলুমমূলকভাবে দেয়া কর এর ক্ষতি পূরণ হয়ে যায়। এ ধানের বহু কারণই হতে পারে।
কর ফাঁকি দেয়ার ধরন ও পদ্ধতি
কর যদি ভারী ও দুর্বহ হয় তাহলে কর ফাঁকি দেয়ার ক্ষেত্র অনেক প্রশস্ত হয়ে পড়ে? কর কে সুবচারপূর্ণ মনে না করা এদিকের কারণ। আর আপরদিকের কারণ হচ্ছে, করলব্ধ সম্পদ উত্তমভাবে ব্যয় হওয়ার ব্যাপারো করদাতার মনে আস্থাও নিশ্চিন্ততা না থাকা। কর ফাঁকি দেয়ার পন্হা ও পদ্ধতি অনেক বিভিন্ন। কর দাতা ব্যক্তি অনেক সময় কর সংক্রান্ত ইনে যেসব ফাকি রয়েছে, তারই আশ্রয় নিয়ে থাকে। এটাকে বিধিবদ্ধভাবে কর এড়ানো কলা চলে অর্থাৎ এ ফাঁকের ফলে লোকটি আনের প্যাঁচে পড়ে না।অনেক সময় আগাম অসত্য হিসেব দিয়েও কর এড়িয়ে যাওয়া হয়। তাতে ভুল বিবৃতি দেয়া থাকে, যেন তার ওপর ভিত্তি করে কর এর পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। এ আগাম স্বীকৃতি দেয়া থেকে বিরত থেকে ও অনেক সময় কর এড়ানো হয় এ আশায় যে, কর ধার্যকারী প্রতিষ্ঠনের লোকেরা তার প্রতি ভ্রক্ষেপও করবে না, তার ওপর কর ধার্যই হবে না অথবা তার ওপর যে পরিমাণ ধার্য হওয়া উচিত, তার চাইতে কম ধার্য করা হবে। অনেক সময় যন্ত্রপাতির ক্ষয় তার মূল্যের; চাইতে ও বেশী হয়ে যায় এবং অনেক সময় কর ধার্য করার ক্ষেত্র বিষয়ে গোপিন করেও কর এড়ানো হয়ে থাকে।
কর ফাঁকি দেয়ার ক্ষতি
কর ফাঁকি দেয়ার কারণ বা পন্হা পদ্ধতি যা ই হোক বহু কয়টি কারণে তার পণিীত অত্যস্ত মারাত্মক হয়ে থাকেঃ
ক. তা রাজ ভান্ডারকে ক্ষতি গ্রস্ত করে। কেননা কর বাবদ আয় কম হয়ে পড়ে।
খ. অন্যান্য মালদার লোকদের ও তা ক্ষতি করে যার ফাঁকি দিতে পারে না কিংবা ফাঁকি দিতে প্রস্তুত হয় না। ফলে তারা এককভাবে কর এর বোঝা ঝামেলা বহন করতে বাধ্য হয় অথচ অন্য কিছু লোক কর এড়াতে সক্ষম হয়। তার ফলে দেশের সকলের ওপর অর্থনৈতিক বোঝা বহনের দায়িত্ব বন্টনে সুবিচার প্রতিষ্ঠা সম্পূর্ণ ব্যাহত হয়।
গ. অনেক সময় তদ্দরুণ বর্তমান কর এর মূল্য বৃদ্ধির কারণ ঘটায়, অথবা নতুন করে কর ধার্যকরণের প্রয়োজন সৃষ্টি করে যে কর ফাঁকি দেয়ার দারুন সৃষ্ট ক্ষতি পূরণ হয়।
ঘ. একট চরিত্রবান পরিশুদ্ধ সমাজের পক্ষেও তা ক্ষতিকর।কেননা জাতীয় ধন ভাণ্ডার শূন্য বা অপূর্ণ থাকে বলে বহু জনকল্যাণমূলক প্রকল্প প্রত্যাহর করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
ঙ. এ সবের পরে সবচেয়ে মারত্মক হচ্ছে নৈতিক চরিত্রের ক্ষতি। কেননা ফাঁকি দান তৎপরতা মান সমসিকতার চরমতম বিপর্যয় সুষ্টি করে। বিশ্বস্ততা ও আমানতদারী থাকে না, এক অভিন্ন উম্মতের ব্যক্তিগণের পারস্পরিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে।
ফাঁকি প্রতিরোধ ও কর দেয়া নিশ্চিত করণ
উপরিউক্ত করণে আধুনিক অর্থনৈতিক আেইন প্রণয়ন করীর কর ফাঁকি প্রথা রোধ কল্পে কতিপয় নিরাপত্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তন্মাধ্যে কয়েকটির উল্লেখ কর যাচ্ছেঃ
১. অর্থবিভাগের ব্যক্তিদের কে ধনীদের গোপনকৃত সম্পদ এবং তাদের প্রতিষ্ঠনিক দলিল দস্তাবেজ সম্পর্কে পূর্ণমাত্রায় অবহিতকরণ।
২. প্রত্যেক অবস্থাপন্ন ব্যক্তিকে তার সেসব ধন মাল সম্পর্কে অগ্রিম জনান দিতে বাধ্য করা সে সব ধন মালের ্ওপর কর ধার্য হতে পারে। প্রকৃত পক্ষে সেসব ধনমালের বর্তমান থাকে জরুরী শর্ত বটে। কোন রাষ্ট্রের আইনে হলফ করে স্বীয় স্বীক্রতির সমর্থন জানানোরও বিধান রাখা হয়েছে। যদি সে হলফ অসত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে তাকে মিথ্যা হলফ করারা বিশেষ দণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
৩. মিথ্যা স্বীকৃতিদাতা সম্পর্কে নির্ভূল সংবাদদানকারীকে পুস্কৃত করণ।
৪. কর কে তার উৎসে আটকে দেয়া। যেমন বেতন ভুক্ত কর্মচারীদের বেতনের ওপর ধার্য কর প্রাপকদের হাতে সে বেতন পৌছার পূর্বেই কর্তন করে রাখা।
৫. কর ফাঁকিদাতাদের ওপর জরিমানা ও শাস্তি বিধান করা।
৬. ঋণগ্রস্তদের ধন মালে কর ধার্য করে জাতীয় ধন ভাণ্ডারের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, তা অপরাপর প্রাপকের পূর্বে আদায় করার ব্যবস্থা করা। [এ আলোচনার জন্যে আমরা ডঃআবদুল হাকীমরিফায়ী ও ডঃ হুসাইন খাল্লাফ লিখিত (আরবী*********) নহদাতুল মিসরীয়া কর্তক প্রকাশিত গ্রন্থের সাহায্য নিয়েছি।]
এসব সত্ত্বেও অর্থ বিভাগের লোকেরা অনেক সময় কর ফাঁকি দানের প্রতিরোধে সম্পূর্ণ অক্ষমতার কথা ঘোষণা করে থাকে। বিশেষ করে যখন সুনির্দিষ্ট ধন মাল সবটাই অথবা অংশিক গোপন করা সম্ভব হয়। এরূপ অবস্থায় এ রোগের চিকিৎসার জন্যে আেইন প্রয়োগের পূর্বে মান মানসিকতার পরিবর্তন অপরিহার্য
ইসলামী শরীয়াতে যাকাতের নিশ্চয়তা
কর ধার্যকরণের পরিণতি যখন এরূপ শরীয়াত পালনে বাধ্য বহু লোক যখন যথেষ্ট রাজনৈতিক পরিপক্কতা পায়নি এবং সাধারণ কল্যাণমূলক কাজের যথাযথ মূল্য ও মর্যাদাও জানতে পারেনি ও প্রেক্ষিতে যাকাত ধার্যকরণের অবস্থাটা কর ধার্যকরণের অবস্থা থেকে বহুদিক দিয়েই সম্পূর্ণ ভিন্নতার ও স্বতন্ত্র। মানুষ যে দৃষ্টিতে কর কে দেখে, সেই দৃষ্টিতে যাকাতকে কেউ দেখে না।
দ্বীনী ও নৈতিক নিশ্চয়তা
মুসলিম ব্যক্তিমাত্রই অনুভব করে যে, যাকাত তার ও তার সরকার বা আদায়করী প্রতিষ্ঠানের মধ্যবর্তী সম্পর্কেই ব্যাপার নয়। বরং সবকিছুর পূর্বে তা তার ও তার আল্লাহর মধ্যকার সম্পর্কের ব্যাপার। আর বস্তুত তাই ইবাদতের প্রকৃত তাৎপর্য, যে সম্পর্কে আমরা ইতপূর্বে ইতপূর্বে একাধিক স্থানে বিস্থারিত কথা বলেছি।
আমাদের ফিকাহবিদগণ এ তাৎপযের ব্যাখ্যা দিয়েছেন সুস্পষ্ট ও বলিষ্ঠ ভায়ায়। কাযী আবূ বকর ইবনুল আরাবী আল মালিকী লিখেছেনঃ প্রকৃত পাওনাদার তো স্বয়ং আল্লাহ তাআলা। কিন্তু তিনি তাঁর এ পাওনার অধিকারটা তাদের জন্য তাদের জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, যাদের রিযিকের দায়ত্ব তিনি নিজে গ্রহণ করেছেন এই বলেঃ(আরবী**********)
পৃথিবীতে যে কোন প্রাণীই রয়েছে, তার ই রিযিকের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহর ওপর বর্তেছে। [(আরবী*********]
আলিমকুল শিরোমনি উপাধি প্রাপ্ত হানাফী ফিকাহবিদ আল কাসানী লিখেছেনঃ যাকাতের মূল কথা হচ্ছে ধন মালের নিসাব পরিমাণ থেকে একটা অংশ আল্লাহর জন্যে বের করে দেয়া এবং তা তারই উদ্দেশ্যে সমর্পিত করা। আর তাতে মালিকের হাত তার ওপর থেকে তুলে নিয়ে কোন ফকীরকে তা মালিক বানেয়ে, তা হন্তান্তর করা আথবা আল্লাহর প্রতিনিধিত্বকারী হস্তে সোপর্দ করা ফকীরকে মালিক বানানো ও তার কাছে সমর্পণ করার লক্ষ্যে। তার দলিল হচ্ছে আল্লাহর বাণীঃ (আরবী**********)
এ লোকেরা কি জানে না যে, আল্লাহ নিজেই ত্ওবা কবুল করে থাকেন তাঁর বান্দগণের পক্ষ থেকে এবং সাদকা দান গ্রহণ করেন। [(আরবী**********)]
নবী করীম (স) বলেছেনঃ দান আল্লাহর হাতে পড়ে ফকীরের হাতে পড়ার আগেই। [ ইবনে জরীর এ হাদীসটি তাঁর তাফসীরে উদ্ধৃত করেছেন েইবনে মাসউদের উক্তি হিসেবে বিভিন্ন কাছাকাছি ভাষা ও শব্দে যেমন ১৭১৬৩-১৭১৬৬ নম্বর আসার, তাফসীরে তাবারী ১৪ খণ্ড ৪৫৯-৪৬১ পৃ. (আরবী*********) হযরত আয়েশা থেকে রাসূল (স) এর উক্তি হিসেবেঃ এক ব্যক্তি তার পবিত্র উপার্জন থেকে একটা দান করে। আর আল্লাহ তো পবিত্র জিনিসি ছাড়া গ্রহণই করেণই না।তখন আল্লাহ মহান তা নিজ হাতে কবুল করে থাকেন। পরে সে তা দেখতে পায় তার পুরুষ অশ্ব শাবক বা তার ভৃত্যকে বা তার প্রাচীন। হাদীসটি েউদ্ধৃত করেছেন বাহার, বর্ণনাকারী সকলে সিকাহ। (আরবী**********) গ্রন্থেও তা উদ্ধুত হয়েছে।]
আর যেহেতু যাকাত একটি ইবাদত আর ইবাদত হচ্ছে একান্তভাবে আল্লাহর জন্যেই যবাতীয় কাজ সম্পন্ন করা। [(আরবী**********)] এ কারণে তা এড়াতে খুব কম লোকই চাইতে পারে।
যাকাত দিতে বাধা ব্যক্তি তার ওপর কোনরূপ জুলুম করা হচ্ছে এমন কথা আনুভর করে না। মনে করে না যে, যাকাত দিতে বাধ্য করে তার ওপর কোন রূপ অবিচার করা হয়েছে। কেননা এ বিধান প্রবর্তনকারী কোন মানুষ তো নয় যে, সে পক্ষপাতিত্ব করবে বা অবিচার করবে। তিনি সুবিচারপূর্ণ বিধান প্রবর্তক, যিনি বান্দারেদর ওপর জুলুম করেন না। কেননা তিনিই তো রব্বুল ইবাদ সমস্ত মানুষের ও রব্ব।
আর যাকাত যখন ব্যক্তি ও তার আল্লাহর মধ্যকার সম্পর্কের মাধ্যম সর্বোচ্চ পর্যায়ে, তখন সে লোক কি করে যাকাত দিতে পারে তাঁর বিধান অমান্য করে, যাঁর কাছে কোন কিছুই গোপন থাকতে পারে না, যিনি গোপন প্রকাশ্য সব কিছুই জানেন, সে লোক এও জানে যে আল্লাহ তার হিসেব নেবেন পুংখানুপুংখভাবে সেইদিন, যেদিন মানুষ রাব্বুল আলামনের সমীপে দাড়িয়ে যাবে?
সহীহ ইসলামী প্রশিক্ষণ মুসলিম ব্যক্তির মনে মগজে যে ইসলামী চরিত্রের বীজ
বপন করে, তাই হচ্ছে রীতিমত যাকাত আদায় হওয়ার অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য সূত্র।
মুসীলিম ব্যক্তির লালন প্রশিক্ষণ হয় দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তির ভাবধারায় এবং পরকালীন কল্যাণের প্রতি আগ্রহ উৎসাহ সৃষ্টির মাধ্যমে। আল্লাহর কাছে যা আছে তা পাওয়াই হয় তাঁর বড় কামনা ও বাসনা। এজন্যে আল্লাহর পথে ব্যয় করতে আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসাকেও সবকিছুর ওপর অগ্রাধিকার দিতে সে সব সময়ই প্রস্তুত থাকে। কোন সময় যদি এমন হয় যে, দুনিয়া ও তাতে কল্যাণ, সম্পর্ক স্বাদ আনন্দ স্ফূর্তি মানুষের লোভনীয়, আকর্য়ণীয় সমস্ত কিছু একদিকে আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলর ভালোবাসা এবং তার পথে জিহাদ অপরদিকে দুটির একটি মাত্র গ্রহণ করা যাবে তাহলে মুমিন বান্দ আল্লাহর রাসূল এবং পরকালের দিকটি গ্রহণ করতে কখনই কণ্ঠিত হবে না ইতস্তত করবে না।
কুরআনের বিপ্লবী সুস্পষ্টরূপে ও চূড়ান্তভাবে সম্পর্ক ছিন্নকারী ঘোষণা এই প্রেক্ষিতে অনুধাবনীয়। তাতে আল্লাহর তাআলা মুমিনদের সম্বোধন করে বলেছেনঃ (আরবী**********)
বল. তোমাদের বাপ দাদা তোমাদের ভাই বেরাদর, তোমাদের স্বামী স্ত্রী, তোমদের বংশ গোত্র, ধন মাল যা তোমরা সংগ্রহ সঞ্চয় করেছ ও ব্যবসায় যার মন্দ ভাবকে তোমরা সব সময় ভয়,ঘর বাড়ী যা তোমরা পসন্দ কর যদি অধিক প্রিয় হয় তোমদের কাছে আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং তাঁর পথে জিহাদের তুলনায় তাহলে তোমরা অপেক্ষা কর যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর চূড়ান্ত ফায়সালা নিয়ে আসেন। আর আল্লাহ ফাসিক লোকদেরে হেদায়েত দান করেন না। [(আরবী**********)]
এ প্রশিক্ষণ মুসলিম ব্যক্তিকে এই চেতনায় সমৃদ্ধ করেছে যে, তার কাছে যে ধন মাল রয়েছে তা আমানতদার মাত্র্। সে এক্ষণে প্রশ্ন করছে, সে কি ব্যয় করবে? তার কাছে রক্ষিত ধন মাল নিয়ে সে কি করবে? কোন কাজে লাগাবে?
কুরআন মজদেই বলা হয়েছে মুমিন লোকেরা রাসুলে করীম (স) কে দুই দুইবার জিজ্ঞেস করেছে, তারা কি ব্যয় করবে? কুরআন একবার তার জবাব দিয়েছে খরচের জিনিস সম্পর্কে বলে আ দ্বিতীয়বার তার ব্যয়ের খাত বলে দিয়ে। (আরবী**********)
লোকেরা তোমার কাছে জানতে চায়, তারা কি ব্যয় করবে? বলঃ যা কিছু প্রঃয়োজনতিরিক্ত [(আরবী*******)] (আরবী*********)
লোকেরা জানতে চায়, তারা কিসে ব্যয় করবে? বলঃ যে ধন মাল তোমরা ব্যয় করবে তা পিতামাতা নিকটত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন ও নিঃস্ব পথিকের জন্যে।আর তোমরা যে ভাল কাজই করবে আল্লাহ সে বিষয়ে পরামাত্রায় অবহিত। [(আরবী**********)]
হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে আনাস ইবনে মালিক বর্ণিত, তিনি বলেছেনঃ বনূ তামীম গোত্রের এক ব্যাক্তি রাসূলে করীম (স) এর কাছে এসে বললেঃ হে রাসূল আমার বিপুল ধন সম্পদ রয়েছে।সেই সাথে আছে অনেক পরিজন, ধন মাল ও উপস্থিত লোকজন।এখন আমরকে জানান, আমি কি করব? বিভাবে তা ব্যয় করব? তখন রাসুলে করীম (স) বললেন ঃ তোমার ধন মালের যাকাত দিয়ে দেবে। তা তোমাকে পবিত্র করবে। তোমার নিকটাত্মীয়দের সাথে ছেলায়ে রেহমী রক্ষা করবে এবং মিসকীন, প্রতিবেশী ও ভিক্ষাপ্রার্থীর যে হক আছে তা অবশ্যই জানবে। লোকটি বললঃ হে রাসূল! আমার জন্যে ব্যাপারটি কম করে দিন। তখন রাসূলে করীম (স) বললেনঃ নিকটাত্মীয়কে তার হক দাও মিসকীন নিংস্ব পথিককেও। আর বেহুদা খরচ করো না। লোকটি বললঃ হে রাসূল ! আমি যদি আপনার প্রতিনিধির কাছে যাকাত আদায় করে দিই, তাহলে কি আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কাছে দায়িত্বমক্ত হতে পারব? রাসূলে করীম (স) বললেনঃ হ্যাঁ তুমি তা আমার প্রতিনিধির হাতে দিয়ে দিলে তার দায়ত দায়িত্ব থেকে তুমি মুক্ত হয়ে যাবে। এ ব্যাপারে কোন গুনাহ হলে তা হবে তার যে তা পরিবর্তন করবে। [ হায়সামী বলেছেনঃ (আরবী*****) ৩য় খণ্ডের ৬৩ পৃষ্ঠায়ঃ হাদীসটি আহমাদ এবং তাবরানী (আরবী*****)গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেঃন। এর বর্ণনাকারী সকলেই সহীহ সিকাহ।]
ব্যাপারটি কেবল বিপুল ধন সম্পদের মালিকদের পর্যন্তই ঠেকে থাকেনি। বহু সংখ্যক অল্প ধন মালের মালিকও রাসূলের করীম (স) এর কাছে এসে তা নিয়ে কি করা যাবে? বলে প্রশ্ন করেছে।
আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেছেনঃ এক ব্যক্তি বললঃ হে রাসূল! আমার কাছে একটি স্বর্ণ মুদ্রা আছে। আমি তা কি করব? বললেনঃ তুমি সেটি তোমার নিজের জন্যে ব্যয় কর। বললেঃ আমার কাছে আরও একটি আছে এখন ? বললেন তা ব্যয় কর
তোমার সন্তানের জন্য। বলল, আমার কাছে আরও একটি রয়েছে? বললেন, সেটি ব্যয় কর তোমার খাদেমের জন্যে। বললাঃ আমার কাছে আরও একটি আছে, বললেনঃ তখন তুমি বিবেছন করে যা করার করবে। [হাদীসটি আবূ দউদ নাসায়ী ও হাকেম উদ্ধত করেছেন এবং মুসীলিমের শর্তনুযায়ী সহীহ বলে মত দিয়েছেন। যাহবী তা সমর্থন করেছেন। (আরবী**********)১মখণ্ডের ৪১৫ পৃষ্ঠায় বর্ণনা আছ্]
শুধু তাই নয়, যার কাছে ধন মাল জমেছে, এমন ব্যক্তি ও সব কিছু সঙ্গে নিয়ে রাসূলে করীম (স) এর কাছে এলে তা উপযুক্ত ব্যয় ক্ষেত্রে তা ব্যয় করার উদ্দেশ্যে, যদিও তা তার নিজের জন্যেই প্রয়োজন। তখন নবী করীম (স) তাকে এ ধরনের কাজ থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে তাকে ধমক দিয়েছেন। হযরত জাবির (রা) ব লেছেন ঃ আমরা রাসূলে করীম (স) এর কাছে উপস্থিহ ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি একটি ডিমের মত স্বর্ণপিণ্ড নিয়ে তাঁর কাছে উপস্থিত হল। বললঃ হে রাসূলঃ আমি এইটা খনি; থেকে পেয়েছি। আপনি এটি গ্রহণ করুন। এটি আমি দান করলাম। অবশ্য এটি ছাড়া আমার আর কিছু নেই। নব করীম (স) তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। পরে লোকটি তাঁর দক্ষিণ পাশ দিয়ে তাঁর সম্মুখে এলো ও পূর্বরূপ কথা বলল। তখনও তিনিও তিনি তার কথার দিকে ভ্রক্ষেপ করলেন না। পরে আবার বাম দিক থেকে তাঁর সম্মুখেএসে সেই কথা বললে। তখনও তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন। পরে পিছন থেকে বলল। তখন নবী করীম (স) পিণ্ডটি তার হাত থেকে নিয়ে লোক টিকে লক্ষ্য করে আহত করত। পরে তিনি বললেনঃ তোমাদের এক একজন তার সব মালিকানা সম্পদ নিয়ে আসে, বলে এটা দান। পরে সেই লোকদের ধর পাকড় করতে থাকে ভিক্ষা পাওয়ার জন্যে। আসলে উত্তম দান তো তা যা ধনাঢ্যতার প্রকাশ থেকে দেয়া হয়। [২আহমাদ ও তাবারানী (আরবী**********) গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন বর্ণনাকারী সকলে সিকাহ। যেমন (আরবী********) এতে উ্দ্ধৃত করেছেন (আরবী**********) হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। যহব তা সমর্থন করেছেন। (আরবী**********)]
বস্তুত এ হচ্ছে সহীহ সঠিক সত্য ঈমানের লক্ষণ আর তা ইসলামী প্রশিক্ষণেরই ফসল। তা মুসলিমকে এমন বানিয়েছে যে, সে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই দায়িত্বশীলের কাছে উপস্থিত হয়েত দাবি জানিয়েছে, তা মালের যাকাত যার কেউ দাবি জানায়নি গ্রহণ
করা ও নিয়ে নেয়া হোক। কিছু সংখ্যক সিরিয়াবাসী নিজেদের িইচ্ছায় হযরত উমরের কাছে উপস্থিত হয়ে দাবি জানাচ্ছো, তাদের কাছ থেকে ঘোড়ার যাকাত নিয়ে নেয়া হোক। তারা বলেঃ আমরা বহু ধন মাল পেয়েছি ঘোড়া ও ক্রীতাদাস থেকে। আমরা পসন্দ করি, তাতে যাকাত ধার্য হোক ও তা আমাদের জন্যে পবিত্রতার মাধ্যম হোক। [আহমাদ ও তাবারানী ২আহমাদ ও তাবারানী (আরবী**********) গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন বর্ণনাকারী সকলে সিকাহ। যেমন (আরবী********) এতে উ্দ্ধৃত করেছেন (আরবী**********) হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। যহব তা সমর্থন করেছেন। (আরবী**********) গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন বর্ণনাকারী সকলে সিকাহ। যেমন ২আহমাদ ও তাবারানী (আরবী**********) গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন বর্ণনাকারী সকলে সিকাহ। যেমন (আরবী********) এতে উ্দ্ধৃত করেছেন (আরবী**********) হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। যহব তা সমর্থন করেছেন। (আরবী**********)এতে উদ্ধৃত করেছেন ২আহমাদ ও তাবারানী (আরবী**********) গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন বর্ণনাকারী সকলে সিকাহ। যেমন (আরবী********) এতে উ্দ্ধৃত করেছেন (আরবী**********) হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। যহব তা সমর্থন করেছেন। (আরবী**********) হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। যাহবী তহা সমর্থন করেছেন। [আহমাদ ও তাবারানী (আরবী**********) গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন বর্ণনাকারী সকলে সিকাহ। যেমন (আরবী********) এতে উ্দ্ধৃত করেছেন (আরবী**********) হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। যহব তা সমর্থন করেছেন। (আরবী**********)]
একজন এল মধুর যাকাত সঙ্গে নিয়ে। সে বললে যে মালের যাকাত দেয়া হয়নি, তাতে কোন কল্যাণ নেই। [বাজ্জার ও তাবারানী (আরবী**********) গ্রন্থে উদ্ধৃত বলেছেন। মুনীর ইবনে আবদুল্লাহ এর একজন বর্ণনাকারী যয়ীফ। যেমন (আরবী**********) তে বলা হয়েছে।]
ইবনে মাসউদ আর একজনক লোক। তিনি তাঁর কৃষি কসলের ওশর কিংবা অর্ধ ওশর দিয়েই ক্ষান্ত হননি। তিনি ফল ভাগ করেন। এক ভাগ পরিবাবর্গের জন্যে জমা রাখেন। এক ভাগ জমির বীজ হিসেবে ফিরিয়ে দেন। আ অপর একভাগ দান করে দেন। [তাবরানী উদ্ধৃত করেছেন (আরবী********) গ্রন্থে, মাসরুক থেকে। এর বর্ণনাকারী যেমন(আরবী********) গ্রন্থে (আরবী********) উল্লিখিত হয়েছে।]
মুসলিম ব্যক্তি বিশ্বাস করেন, তিনি যাকাত দিয়েই নিজেকে এবং তাঁর ধন-মাল পবিত্র করে নিতে পারেন। এ যাকাতই হচ্ছে তা ধন-মাল ও তার প্রবৃদ্ধির রক্ষা দুর্গ, বাহ্যত, তাতে পরিমাণ হ্রাস যতই সূচিত হোক না কেন। এ পর্যায়েই কুরবান মাজীদ বলেছে (আরবী********)
তোমরা যে যাকাত দিচ্ছ আল্লাহর সন্তষ্টি লাভের লক্ষ্যে, জেনে রাখ, এরাই সম্পদ বৃদ্ধিকারী(আরবী********)
শয়তান তোমদেরকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং নিজেই কাজের আদেশ করে অথচ আল্লাহ তোমদেরকে ওয়াদা দেন তাঁর কাছ থেকে ক্ষমা ও অনুগ্রহ পাওয়ার। (আরবী********)
তোমরা যা ব্যয় কর, তার পরিপূরক তিনিই এনে দেন এবং তিনি উত্তম রিযিক দানকারী।
আসল ব্যাপার হচ্ছে,বহু মুসলিমেই এমন আছে, যাদের কাছে যা চাওয়া হয়, মনের খুশীতে তাঁরা চাইতেও অনেক বেশী দিতে থাকেন। এতেই তাদের চক্ষুর শীতলতা।
এ পর্যায়ে রাসূলে করীম (স) এর যুগের দুটি বাস্তব দৃষ্টান্ত এখানে তুলে ধরা যথেষ্ট হবে বলে মনে করি। তা থেকে ঈমান ও আকীদাহ প্রসীত দ্বীনী নিশ্চয়তার প্রমাণ পা্ওয়া যাবে অবিলম্বে ফরয যাকাত আদায় করার ব্যাপারে। বরং যা ফরয, তার চাইতে ও বেশী দিয়ে দেয়ার উজ্জ্বলতাম নিদর্শন।
আবূ দউদ তাঁর সনদে সুয়াইদ ইবনে গাফালাহ থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেনঃ আমি ভ্রমণ করেছি (অথবা বলেছেন, তিনি ভমণ করেছেন< তিনি আমাকে জানিয়েছেন), নবী করীম (স) নিয়োজিত একজন যাকাত আদায়কারীর সঙ্গী হয়ে। নবী করমি(স) এর সময়ই দেখলামঃ তুমি দুগ্ধদানকারী জন্তু) গ্রহণ করবে না, দুই বিছিন্ন কে একত্রিত করবে না এবং একত্রিতকে বিচ্ছিন্ন করবে না।আর সে পানির কাছে উপস্থিত হত, যখন
ছাগলগুলো তথায় উপস্থিত করা হত। বলতঃ তোমরা তোমাদের মালের যাকাত দিয়ে দাও। তখন একজন লোক তার ঝুটি ধারী উষ্ট্রীকে দেবার সংকল্প করল। বললেন, আমি বললামঃ সে আবূ সালেহদ, ঝুটিধারী কি? বললেনঃ বড় ঝুটিধারী উষ্ট্রী। বললেনঃ পরে সে লোক তো গ্রহণ করতেহ অস্বীকার করল। পরে তার চাইতে নিম্ন মানের একটাকে লাগাম বেঁধে দিল। সে সেটি গ্রহণ করল বললঃ আমি এটি গ্রহণ করছি। আমি ভয় করছি, রাসূলে বাছাই করা উট ইচ্ছা করে নিয়েছ। [ মুনযেরী বলেছেন, নাসয়ী ও ইবনে মাজাহ এটি উদ্ধৃত করেছেন। এর সনদে হিলাল ইবনে হুবাব রয়েছেন, একাধিক বিশেষজ্ঞ তাকে সিকাহ বলেছেন। তবে কেউ কেউ তা সম্পর্কে আপত্তিও তুলেছেন। (আরবী***) দারে কুতনী ও বায়হাকীও উদ্ধৃত করেছেন, যেমন (আরবী*******) ত বলা হয়েছে।]
উবাইদ ইবনে কায়াব (রা) থেকে বর্ণিত, বলেছেনঃ রাসূলে করমি (স) আ মাকে যাকাত আদয়কারী বনিয়ে পাঠালেন। আমি এক ব্যক্তির কাছে পৌঁছলাম। আমার সম্মুখে তার সব মাল যখন একত্রিত করা হল তখন তাতে একটি দুই বছরে উপনীত উষ্ট্রী শাবক ছাড়া আরো কিছুই গ্রহণীয় পেলাম না তখন আমি তাকে বললামঃ তুমি এ শাবকটি দিয়ে দাও, এটিই তোমার যাকাত। লোকটি বললঃ এটি? এটির তো দুধও নেই পিঠও নেই। কিন্ত অপর একটি যৌবন বয়সের বিরাট চর্বিদার উট আছে। বললঃ আপনি বরং সেটি নিন। আমি বললামঃ আমি সেটি নেব না, যতক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণ করার জন্যে আমি আদিষ্ট হচ্ছি। নবী করীম (স) তোমার কাছেই রয়েছেন। তুমি ইচ্ছা করলে এটি রাসূলে করীম (স) এর কাছে নিয়ে যাও এবং আমাকে যেমন দেখিয়েছ ও নিতে বলছ তেমনি তাঁকে ও দেখাও এবং নিতে বল। তিনি যদি এটি তোমার কাছ থেকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত হন, তাহলে আমি তা নিয়েক যাব। অতঃপর লোকটি আমার সাথে; চলল। যে উচটি আমাকে দেখিয়েছিল সেটিও সঙ্গে নিয়ে রওয়অন হল। শেষ পর্যন্ত আমরা রাসূলে করীম (স) এর কাছে উপস্থিত হলাম। লোকটি বললঃ হে রাসূল (স)!আমার কাছে আপনার প্রেরিত লোক আমার মালের যাকাত নেবার জন্যে এসেছিল। এস দাঁড়ায়নি কখনই। আমি তার সম্মুখে আমার সব মাল উপস্থিত করেছিলাম। লোকটি মনে করল সে মালে আমার আছে একটি দুই বছরে উপনীত শাবকমাত্র ফরয। কিন্তু সেটির যেমন দুধ নেই, তেমনি িপঠ্ও নেই। তার সম্মুখে আমি একটি বিরাঠ যুবক বয়সের চর্বিদার উট পেশ করলাম ও উদ্দশ্যে যে, সে সেটি গ্রহণ করবে। কিন্তু সে অস্বীকার করল ও আমাকে ফিরিয়ে দিল। সেই কথিত উটটি এখানে আপনার সম্মখে রয়েছে। আমি ওটিকে আপনার কাছে নিয়ে এসেছি, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি গ্রহণ করুণ। তখন নবী করীম (স) তাকে বললেনঃ এটিই তোমার দেয়। তুমি যদি অতি উত্তম জিনিস নফল হিসেবে দান কর, তাহলে আল্লাহই তোমাকে সেজন্যে পুরস্কৃত করবেন। আমি ওটিক তোমার পক্ষ থেকে গ্রহণ করলাম। বললঃ ঠিক আছে, ওটি
আপনার সম্মখেই রয়েছে হে রাসূল। আমি দেবার জন্যেই নিয়ে এসেছি, আপনি ওটি গ্রহণ করুন। পরে রাসূলে করীম (স) সেটি নিয়ে নেয়ারজন্যে আদেশ করলেন। এবং তার জন্যে তার জন্যে, তার ধন-মালের বরকতের জন্যে দোআ করলেণ। [ হাদীসটি আহমদ আবূ দাউদ ও হাকেম উদ্ধৃত করেছেন। হাকেম হাদীসটিকে মুসলিমের শর্তে সহীহ বলেছেন। যাহবী তা সমর্থন করেছেন (আরবী********) হাদীসটির সমদে মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক রয়েছেন। তাঁর বর্ণত তাদীসকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করণে ইমাম গণেল মধ্যে মত পার্থক্যের সৃষ্টি হয়েছে যখন তা (আরবী********) করে বর্ণনা করা হয়। কিন্তু এখানে স্পষ্ট ভাষায় (আরবী********) বলে বর্ণনা করেছেন। (আরবী********) নববী (আরবী******) গ্রন্থে (আরবী********) লিখেচেনঃ আহমাদ ও বাড়াতি বলেছেন ঃ বর্ণনাকারী উবাউদ ইবনে কায়ব থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি হচ্ছেন উমারাতা ইবনে আমর ইবনে হাজম। মুয়াবিয়ার খিলাফতকালে তাঁকে যাকাত সংগ্রহের দায়িত্বশীল বানানো হয়েছিল। তখন সে ব্যক্তির কাছ থেকে এক হাজার পাঁচশত উষ্টে্র যাকাত বাবদ ত্রিশটি উষ্ট্য গ্রহণ করা হয়েছিল। আল্লাহ ধান-মালে বরকতের জন্যে তাঁর রাসূলের দোআ কবূল করেছিলেন।]
আহমাদ হাদীসের বর্ণনা এনেছেন এভাবেঃ লোকটি বললঃ আমি আল্লাহকে এমন জন্তু করয দেব না, যার দুধ নেই পিঠও নেই। [ হাদীসটি আহমদ আবূ দাউদ ও হাকেম উদ্ধৃত করেছেন। হাকেম হাদীসটিকে মুসলিমের শর্তে সহীহ বলেছেন,। যাহবী তা সমর্থন করেছেন(আরবী********) হাদীসটির সমদে মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক রয়েছেন। তাঁর বর্ণত তাদীসকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করণে ইমাম গণেল মধ্যে মত পার্থক্যের সৃষ্টি হয়েছে যখন তা (আরবী********) করে বর্ণনা করা হয়।কিন্তু এখানে স্পষ্ট ভাষায় (আরবী********) বলে বর্ণনা করেছেন। (আরবী********) নববী (আরবী********) গ্রন্থে (আরবী********) লিখেচেনঃ আহমাদ ও বাড়াতি বলেছেন ঃ বর্ণনাকারী উবাউদ ইবনে কায়ব থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি হচ্ছেন উমারাতা ইবনে আমর ইবনে হাজম। মুয়াবিয়ার খিলাফতকালে তাঁকে যাকাত সংগ্রহের দায়িত্বশীল বানানো হয়েছিল। তখন সে ব্যক্তির কাছ থেকে এক হাজার পাঁচশত উষ্টে্র যাকাত বাবদ ত্রিশটি উষ্ট্য গ্রহণ করা হয়েছিল। আল্লাহ ধান-মালে বরকতের জন্যে তাঁর রাসূলের দোআ কবূল করেছিলেন।]
সে লোক বিশ্বাস করত যে, তার ও আল্লাহর মধ্যকার সম্পর্ক সর্বাগ্রে। সে আল্লাহকে সে উট করয দিতে লজ্জাবোধ করছিল, যার দ্বারা কোন ফায়দা পাওয়া যাবে না। সেটির পিঠনেই বলে পষ্ঠে সওয়ার চলবে না, ওলান নেই বলে দুধও দোহানো যাবে না।
বস্তুত ওদ্বীনী নিশ্চয়তাই হচ্ছে যাকাত ফাঁকি দেয়া থেকে বাঁচাতে নির্ভরযোগ্য রক্ষাকবচ অথচ পাশ্চাত্য দেশসমূহে এ ফাঁকিই হচ্ছে এখান কার একমাত্র গৌরবের বিষয়। ফ্রান্সের মঁসিয়ে ফাসান উরিতন ১৯৩৬ সনে ঘোষণা করেছিলেন, যদি ফাঁকি না চলত, তাহলে কর এর হার অনেক হ্রাস পেত। মঁসি সিরী বলেছিলেন, ফাঁকি দানের দিকে ইঙ্গিত করে ইল্লেখ করেছিলেনঃ যারা কর ফাঁকি দেয় তারা এমন সব উপানের আশ্রয় নেয় যার কতকটা আইনসম্মত আর অপরা কতকটা আইন বিরোধী। তিনি মনে করেন, এ সব উপায় ইনের মৌল ইঙ্গিত করেছেনঃ অর্থনৈতিক ফাঁকিরোধ করার বস্তুব পন্হা উদ্ঘাটনে অর্থমন্ত্রী সক্ষম হলে বাজেটের অক্ষমতা অনেকখানি দূর করা সম্ভব পর হত। [(আরবী********)]
আইনগত ও সংগঠনিক নিশ্চয়তা
এসব দ্বীনী ও নৈতিক নিশ্চয়তার প্রধানত নির্ভর হচ্ছে মানুষের মন মানসিকতা ও ঈমানের ওপর। ইসলামী শরীয়াত এসব ছাড়াও অন্যান্য আইন গত ও সাংগঠনিক নিশ্চয়তার বিধান করেছে। ইসলামী রাষ্ট্র যাকাতের নিশ্চয়তার জন্যে তাও কাজে
লাগায়। বিশেষ করে কিছু লোকের ঈমান যদি দুর্বল হয়ে পড়ে তাহলে এ উপায়েও নিশ্চয়তার বিধান করতে হবে। তন্মাধ্যে উল্লেখ্যঃ
যাকাত সংগ্রহকারীদের সহযোগিতা করা ও কোন জিনিস গোপন না করার নির্দেশ
এপর্যায়ে বহু সংখ্যক হাদীস এসেছে, যার কোন কোনটি আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি। এ পর্যায়েরই একটি হাদীস হচ্ছে রাসূলে করীম (স) বলেছেন, তোমাদের কছে এমন সব অশ্বারোহিরা আসবে, যাদের ওপর তোমরা অসন্তুষ্ট ওক্রুদ্ধ থাকবে। তারা যখনই তোমাদের কাছে আসবে তাদের প্রতি শুভাগমন জানাবে এবং তারা যে উদ্দেশ্য আসবে তার ও তাদের মধ্যে প্রতিবন্ধক দূর করে দেবে। তারা যডিদ সুবিচার করে তবে তাদের নিজেদের জন্যেই কল্যাণ হবে। আ তারা জুলুম করলে তার খারাপ পরিণতি তাদেরই ভোগ করতে হবে। তোমাদের যাকাত পূর্ণ মাত্রার দিয়ে দিলে তাদের সন্তুষ্টি ঘটবে, তখন তারা অবশ্যই তোমাদের কল্যাণের জন্যে দোআ করবে। [আবূ দাউদ তাঁর সুনান গ্রন্থে হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেনঃ (আরবী********) হাদীসটির সনদে আবুল গবন তিনি হচ্ছেন সাবিত ইবনে কাইস আল মাদনী আল গিফারী স্মরণ শক্তির দিক দিয়ে সমালোচিত বর্ণনাকারী। তা সত্ত্বে ও ইমাম আহমাদ তাঁকে সিকাহ বলেছেন। (আরবী********)
জারীর ইবনে আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণত, তিনি বলেছেনঃ আরব বেদুঈনদের কিছু লোক রাসূলে করীম (স) এর কাছে উপস্থিত হয়ে বললঃ যাকাত আদায়কারী সংগ্রহকারী লোকেরা আমাদের কাছে আসে তার আমদের ওপর জুলুম করে। নবী করীম (স) বললেনঃ তোমরা তোমাদের কাছে আগত যাকাত আদায়কারী লোকদের সন্তুষ্ট করে দাও। তারা বললঃ তারা আমাদের ওপর জুলুম করলেও কি আমার তাই করব? রাসূলে করীম (স) বললেন ঃ হ্যাঁ তোমরা যাকাত আদয়কারী লোকদের সন্তষ্ট করে দাও জরীর বললেনঃ রাসূলে করীম (স) এর এ কথা শোনার পার যে যাকাত আদায়করীই আমাদের কাছে এসেছে, সেই আমাদের প্রতি সন্তষ্ট হয়ে গেছে। [হাদীসটি আবূ দাউদ উদ্ধৃত করেছেন, উপরে সে আর্ণনারই তরজমা দেয়া হয়েছে। মুসলিম ও নাসায়ী হাদীস উদ্ধৃত করেছেন। (আরবী********)]
বুশাইর ইবনে খাচাচিয়া থেকে বর্ণিতঃ আমরা বললাম, হে রাসূল! যাকাত আদায়কারীদের কিছু লোক আমাদের ওপর অনেক বাড়াবাড়ি করে। তারা যে পরিমাণ বাড়াবাড়ি করে সেই প রিমাণ ধন-মাল কি আমরা তাদের থেকে গোপন করব? বললেন, না। [ হাদীস উদ্ধৃত আবূ দাউদ উদ্ধৃত করেছেন, তিনি বা আল মুনযেরীএ সম্পর্কে কোন মন্তব্য করেননি। আবদুর কাজ্জাকও হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন। তাঁর সনদে দাইসম সদসী রয়েছেন। ইবনে হাব্বাস তাঁকে সিকাহ বর্ণনাকারীদের মধ্যে গণ্যা করেছেন। (আরবী********) গ্রন্থে বলেছেনঃ তিনি গ্রহণযোগ্য। (আরবী********)]
এ সব কয়টি হাদীস স্পষ্ট ভাষায় বলছে যে, কতিপয় সরকারী কর্মচারীর যাকাত আদায়ে কঠোরতা কিংবা আংশিক জোর জুলুম তাদের দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করা থেকে বিরত থাকাকে কিছুমাত্র সমর্থনযোগ্য বানায় না। তাদের থেকে মাল গোপন করা বৈধ হয় না। কেননা তা রাষ্ট্রের অর্থ ভাণ্ডারকে শূন্যতার মধ্যে ঠেলে দেবে। তার বাজেট ভারসাম্য হারিয়ে ফেলকে। কি শে তরে এহন্যে যে, কিছু লোক তাদের মতের মূল্যায়নের খুব বেশী বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘনমূলক কাজ করে থাকে।অপর লোকের মূল্যায়নের প্রতি তারা ভ্রাক্ষেপমাত্র করে না।
এ সবক কথাই প্রযোজ্য, আনুসরণীয় যুদ তা সুস্পষ্ট জুলুমের রূপ পগ্রিহ না করে, যার কোন ব্যাখ্যা দেয়া যায় না বা জুলুম হওয়অর ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ থাকে না। যদি তাই হয়ে পড়ে, তাহলে অতিরিক্ত পরিমাণ আদায় না করারও জুলুম সহ্য না করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে ব্যক্তির। হযরত আনাসের যাকাত পরিমাণ পর্যায়ে ইর্ণত হাদীসে তাই বলা হয়েছে। তাহলঃ যে লোক মুসলমানদের কাছে তা চাইবে যথাযথভাবে তাকে যেন তা অবশ্যই দেয়া হয়। আর যে তার অতিরিক্ত চাইবে, তা সে দেবে না। এটা এজন্যে যে নবী করীম (স) তো প্রত্যেকটির ফরয পরিমাণ সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। সকল মুসলমানিইতা জানেন। তা সত্ত্বে ও যদি কেউ তা লঙ্ঘন করে তাহলে তা গ্রাহ্য করা চলবে না।
যাকাত এড়ানোর কৌশল অবলম্বন নিষিদ্ধ
যাকাত এড়ানোর লক্ষ্যে যে কোন প্রকারের কৌশল অবলম্বন ইসলামে সম্পূর্ণ হারার করে দেয়া হয়েছে বাহ্যত সে কৌশলঅবলম্বন যতই শরীয়াত সম্মত ও জায়েয মানে করা হোক না কেন। একটি প্রচলিত কৌশল এ রকম হতে পারে যে, একটি বছর পূর্ণ হওয়ার প্রক্কালে মালিক তার যাবতহীয় ধন সম্পদ তার স্ত্রীকে হেবা করে দিল- যেন বছরটা অতিক্রান্ত হয়ে যায়। পরে স্ত্রী আবার তাকেই সব হেবা করে দিল এবং সে তা সব তার কাছ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে নিল। এ ধরনের পন্হা অবলম্বনকে পাশ্চাত্যে আইনসম্মত পন্হায় কর ফাঁকি বলে অভিহিত করা হয়। আর কোন কোন ফিকাহবিদ একে শরীয়াতমসম্মত হীলা গ্রহণ নামে অভিহিত করেছেন। এটা যে হারাম তার অকাট্য দলিল হচ্ছে, এ সহীহ হাদীসঃ
সমস্ত আমলের মূল্যায়ন হবে নিয়ত আনুযায়ী। প্রত্যকেই তাই পাবে যা পাওয়ার সে নিয়ত করেছে।
ইমাম বুখারী এ সব হীলা অবলম্বনকে বাতিল পন্হা বলে অভিহিত করেছেন এবং তার দলিল হিসেবে যাকাত ফরয করণ পর্যায়ে হযরত আনাস (রা) বর্ণিত হাদীস উদ্ধৃত করেছেনঃ একত্রিতকে ভিন্ন বিছিন্ন করা যাবে না এবং বিচ্ছিন্ন কে একত্রিত করা যাবে না যাকাত ফরয হওয়ার ভয়ে। [ ইবনুল কাইয়্যেম এ হাদীসটি (আরবী*********) গ্রন্থে (আরবী*********)উদ্ধৃত করেছেন। এ গ্রন্থে এবং (আরবী*********) গ্রন্থে আবনুল জাওযীর হীলা মতের অকাট্য দলিল প্রমাণ দ্বারা প্রতিবাদ শীর্ষক আলোচনা করেছেন। [
ইমাম মালিক বলেছেন ঃ তার অর্থ তিন ব্যক্তির প্রত্যেকরেই মালিকানায় চল্লিশটি করে ছাগল থাকবে। ফলে তর ওপর যাকাত ফরয হবে, কিন্ত তার সবগুলো একত্রিত করা হলে সে সবের ওপর মাত্র একটি ছাগী ফরয হেব অথবা দুই শরীকের প্রত্যেকেরই একশ একটি করে ছাগল আছে, তাতে তাদের উভওয়র ওপর তিনটি ছাগী ধার্য হবে। কিন্তু হিসেবের সময় তা বিভক্ত করে গণনা করা হলে উভয়ের প্রত্যেকের ওপর মাত্রি একটি করে ছাগী ফরয হবে। [ (আরবী*********) কিতাবুযযাকাত(আরবী*********)]
ইমাম আবূ ইউসূফের কথা পূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি। তাহলঃ আল্লাহও পরকালের প্রতি ঈমানদার কোন ব্যক্তির পক্ষে যাকাত না দেয়া যাকাত দিতে অস্বীকার করা আদৌ জায়েয বা হালাল নয়। তা নিজেহর মালিকানা থেকে বের করে কোন সামষ্টিক মালকানায় দিয়ে দেয়া যেন তা ভিন্ন ভিন্ন হিসেবে করা হয় এবং যাকাত ফরয হতে না পারে তা করাও জায়েয নয়। যেমন উট গরু ছাগলের এমন সংখ্যার মালিক প্রত্যেক হবে, যার ফলে যাকাত ফরয হতে পরবে না কোনভাবে ও কোন কারণ সৃষ্টি করে যাকাত বাতিল করার জন্যে হীলা করা যাবে না। [(আরবী*********)]
ইমাম আবূ ইউসূফ লিখিত কিতাবুল খারাজ থেকে কৌশল অবলম্বন করা জায়েয, উক্ত উদ্ধৃতি তার তীব্র প্রতিবাদ করে। এ কাজটা সম্পূর্ণ হারাম, এ ব্যাপারে উক্ত বক্তব্য পূর্ণভাবে সুস্পষ্ট। কিন্তু সম্ভবত আইনের ভিত্তিতে এ কাজকে বাতিল প্রমাণ করা সম্ভব পা হবে না। কেননা বিচারক তো বহ্যিক অবস্থানুযায়িই বিচার করবে। কারোর নিয়ত বা গোপন তত্ত্বকথার দিকে কোন কৌতুহল দেখাবে না, তা বের করারও চেষ্ট করবে না। অতএব সে ব্যাপাটি সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করা ছাড়া গত্যন্ত নেই। হাম্বলী ও মালিক মাযাহাবের ফিকাহবিদগণ এ ধরনের হীলা কৌশল ও তার প্রভাব প্রতিক্রিয়া আইনের বলে বন্ধ করার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। হাম্বলী ফিকাহর কিতাবে লিখিত রয়েছে, যাকাত এড়ানোর উদ্দেশ্যে যে লোক বেশী বেশী জমি ক্রয় করবে, তার মূল্যের ওপর যাকাত ধার্য করতে হবে, তার উদ্দেশ্যটা বানচাল করার লক্ষে। যেমন বিক্রয় বা অন্য কিছুর সাহয্যে যাকাত এড়ানো। [(আরবী*********)] আর মালিকী মাযহাবের কিতাবেও আনুরূপ কাথাই লিখিত রয়েছে। পঞ্চম অধ্যায়ের যষ্ঠ পরিচ্ছেদে এসব কথা আমরা আলোচনা করে এসেছি।
যাকাত দিতে অস্বীকারকারীর অপরাধ ও আর্থিক দণ্ড
যাকাত দিতে অস্বীকারকারী কিংবা যাকাত আদায় থেকে বিরত থাকা লোককে আর্থিক শাস্তি দেয়ার কথা হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে। আহমাদ, আবূ দাউদ ও নাসায়ী উদ্ধৃত
করেছেনঃ প্রতি গৃহপালিত উটের প্রতি চল্লিশটিতে একটি করে দুই বছরের উপনীত উষ্ট্রী শাবক দতি হবে। হিসেবে কোন একটি উট আলাদা করা যাবে না। আর যদি কেউ তা দেয় শুভ ফল পা্ওয়ার আশায়, সে শুভ ফল সে পাবে। আর যে তা দেয়া থেকে বিরত থাকবে, আমি তার কাছে থেকে তা অবশ্যআ আদায় করে নেব এবং তার উটের অর্ধেক আমাদের মহান আল্লাহর ধার্য করা অধিকারসমূহের মধ্যে থেকে একটি অধিকার হিসেবে। মুহাম্মাদের বংশের লোকদের জন্যে তার এক বিন্দু হালাল নয়।শুনতাকাল আখবার গ্রন্থে বরঅ হয়েছে, এ হাদীসটি যাকাত দিতে অস্বীকারকারীর কাছ থেকে তা নিয়ে নেওয়ার ও যথাস্থানে তা পৌছাবার অকাট্য দলিল। [(আরবী*********)]
দিতে অস্বীকৃত উটের অর্ধেক নেয়া, অন্য কথায় যে মালের যাকাত দিতে অস্বীকার করা হয়েছে তার অএধক বাজেয়াপ্ত করা এক ধরনের আর্থিক দণ্ডেকরণ। এটা তাদের কৃতপাপের শাস্তি প্রদানের জন্যে রাষ্ট্র প্রধানের একটা অবলম্বন। রাষ্ট্রপ্রধান এ দ্বারাই সে সব লোককে উচিত শিক্ষা দিতে পারেন যারা যাকাত দিতে অস্বীকার করে কিংবা ফাঁকি দিতে চেষ্টা করে। এটাকে তাজীরী শাস্তি বলা হয়, যা সুনির্দিষ্ট নয়। বরং দায়িত্বশীল ও উপদেষ্টা পরিষদের লোকেরা ইসলামী সমাজে থেকে তার পরিমাণ নির্দিষ্ট করবে। তার অর্থ, এ একটা অবাধ্যতামূলক শাস্তি, সাধারণভাবে প্রচলিত ও নয়। বরং এ শাস্তি যেমন দেয়া যায়, তেমনি নাও দেয়া যেতে পারে।
কোন কোন ইমান এ মত গ্রহণ করেছেন যে, মাল নিয়ে শাস্তি দেয়া জায়েয বা শুভ কাজ নয়। প্রথমদিকে এ নিয়ম চালু করা হয়েছিল, পরে তা বাতিল হয়ে গেছে। আসলে এটা মালিকত্বের মর্যাদা ও সম্ব্রম রক্ষার জন্যে কজঠোরতা মাত্র। একটি হাদীসের ওপর র্ভিরতার ও আছে, যাতে বলা হয়েছেঃ আল্লাহ তাআলা তোমাদের ওপর হারাম করেছেন তোমাদের রক্ত এবং তোমাদের ধন মাল পারস্পরিক। [(আরবী*********)] যেহেতু সাহাবায়ে কিরাম (রা) যাকাত দিতে অস্বীকারকারী লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। তাদের কাছ থেকে প্রাপ্যের অতিরিক্ত নেননি কেউ কেউ হাদীসের সনদে দোষ ধরেছেন অথবা তার সনদে ধরবার মত কোন ক্রটি নেই।কেউ কেউ হাদীসটিকে মনসুখও বলেছেন; কিন্তু তারও কোন দলিল নেই। বহু দলিলেই আর্থিকভাবে শাস্তি দানের কথার প্রমাণ রয়েছে। [ ইবনুল কাইয়্যেম (আরবী***********) গ্রন্থে নবী করীম (স) এর খলীফাগণের ১৫ টি বিচারের উল্লেখ করেছেন। তাতে আর্থিক জরিমানার শাস্তি দেয়া হয়েছে ২৮৭ পৃ. (আরবী***********) এবং এ কিতাবের ৭৭৯-৭৮২ পৃ,দ্রষ্টব্য।]
যাকাত দিতে অস্বীকারকারীদের কেবল জরিমানা দণ্ডে দণ্ডিত করেই ক্ষান্ত হওয়া হয়নি, অস্ত্র চালানো হয়েছে এবং যুদ্ধের অিগ্নি প্রজ্বলিত করা হয়েছ। আল্লাহর এবং প্রার্থী ও বঞ্চিতের হক আদায়ের পথে বাধাদানকরীদের দমন করাই ছিল তার লক্ষ। হযরত আবূ বকর এবং তাঁর সঙ্গের সাহবীবৃন্দ (রা) ও যাকাত অস্বীকারকারীদের
বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন এবং বলেছেন ঃ আল্লাহর কসম ওরা যদি রাসূলের সময়ে দেয়া একটি রশি দিতেও অস্বীকার করে তাহলে আমি তাদের বিরুদ্ধে সে জন্যে যুদ্ধ করব। [ প্রথম অধ্যায়ের যাকাত দিতে অস্বীকারকারীদের বিরুদ্বে যুদ্ধ করা আলোচনা দ্রষ্টব্য।]
ইবনে হাজম বলেছেনঃ যাকাত দিতে অস্বীকারকারীর জন্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হচ্ছে তার কাছ থেকে তা অবশ্যিই নিতে হবে। সে তা পছন্দ করুক আর না ই করুক। কেননা যে লোক তা অস্বীকার কের, সে তা যুদ্ধ ঘোষণাকারী। আর সে যদি মিথ্যা বলে, তাহলে সে মর্তদা দ্বীন ত্যাগকারী। আর যদি সে মাল গোপন করে সরাসরি ভাবে দিতে অস্বীকার নাও করে, তাহলেও সে একটা বড় পাপ করে সে জন্যে তাকে শিক্ষা দিতে হবে, প্রয়োজন হলে মারতে হবে, যেন সে দিয়ে দেয় অথবা মার খেতে খেতে মরে যায় আল্লাহর হক না দেয়ার অপরাধে নিহত হয়ে আল্লাহর কাছে অভিশপ্ত হবে সে। রাসূলে করীম(স) বলেছেনঃ তোমাদের যে লোক কোন পাপ কাজ হতে দেখবে, সে যেন তা শিক্তি বলে বদলে দেয় যদি তা সামর্থ্য থাকে। আর যাকাত ন দেয়া সে একটি বড় অপরাধ, এ অপরাধ যে করবে, যার সামর্থ্য আছে সে তা শক্তি বলে বদলে দেবে, আদায় করে নেবে। এটাই স্বাভাবিক। যেমন পূর্বে বলেছি। আর তওফীক দান তো আল্লাহর হাতে।২যাকাত আদায়ের পন্হা অধ্যায়ের আমরা বলে এসেছি যাকাত একটি প্রমাণিত অধিকার। অগ্রবর্তিতা বা বছর অতিক্রান্ত হওয়ার দরুন তা প্রত্যাহুত হতে পারে না। যার ওপর তা ফরয হয়েছে, তার মৃত্যু হলেও নয়। মৃতের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে তা ঋণ হিসেবে গণ্য হবে এবং অপরাপর ঋণের আগেই তা আদায় করে নেয়া হবে। কেননা না দেয়া যাকাতে দুটি ব্যাপার জড়িত হয়ে পড়েছে। একে তো তা আল্লাহর হক, দ্বিতীয়ত, তা আল্লাহর ফরীর মিসকীন অভাগ্রস্ত বান্দাদের হক।
সপ্তম পরিচ্ছেদ
যাকাতের পরও কি কর ধার্য হবে
ইসলাম মুসলমানেদের ধন-মালে একটা সুস্পষ্ট সুপরিজ্ঞাত হক হিসেবে ধার্য করেছে যাকাত। তা একটা কর বিশেষ, মুসলিম সরকার তা সংগ্রহ ও ব্যয় উভয় কাজের জন্যেই দায়িত্বশীল। এক্ষণে প্রশ্ন হচ্ছে, ধনী লোকদের ওপর যাকাতের পাশাপাশি জাতীয় সাধারণ কল্যাণমূলক কাজের জন্যে অন্যান্য করও কি ধার্য করা যাবে যা রাষ্ট্রের সাধারণ ব্যয় প্রয়োজন পূরণে বিনিয়োগ করা হবে কিংবা যাকাতই হচ্ছে একক ও অনন্য অর্থনৈতিক দায় দায়িত্ব যে, এ ছাড়া আর কিছুই মুলমানদের কাছ থেকে গ্রহণ করা যাবে না?
ইসলামী মরীয়াতের বিধান সম্পর্কে চিন্তা করলেই ব্যাপারটি সম্পষ্ট হয়ে ওঠে পূর্ণমাত্রায়। আমরা তিনটি আলোচনা পর্যায়ে এ বিষয়ে কথা বলতে চাইঃ
প্রথম আলোচনাঃ কর কার্যকরণ জায়েয হওয়ার দলিল; দ্বিতীয় আলোচনা ঃ কর ধার্যকরণ অবশ্য লক্ষ্যণীয় শর্তাবলী
তৃতীয় আলোচনাঃ কর ধার্য করার বিরোধদের সংশয় এবং তার জবাব; পর্যায়ক্রমে আমরা এ তিনটি বষয়ের ব্ক্তব্য পেশ করছি।
প্রথম আলোচনা
যাকাতের পাশাপাশি কর ধার্যকরণ জায়েয হওয়ার দলিল
ন্যায়পরতাভিত্তিক কর ধার্যকরণ বৈধ হওয়ার দলিলসমূহ আমরা নিম্মোক্তভাবে সুস্পষ্ট করে তলিতে চাচ্ছিঃ
প্রথম ঃ সামষ্টিক দায়িত্ব গ্রহণ কর্তব্য
ধম-মালে যাকাত ছাড়াও কোন অধিকার আছে কি অধ্যায়ের আলোচনা আমরা যে সব দলিল প্রমাণ উপস্থাপিত করেছি, তার পুনরাবুত্ত নিষ্প্রয়োজন। শুধু একুকু কথা বলাই যথেষ্ট যে, মুসলমান জনগণের প্রয়োজন দেখা দিলে যাকাতের পরও কর ধার্য করা জায়েয, এক বিষয়ে ফিকাহবিদগণ সম্পূর্ণ একমত।কেননা সামষ্টিক প্রয়োজন কখনই অপর্ণ রাখা যেতে পারে না। তাতে যত ধন-মালই লগুক না কেন। এমন কি, যাঁরা বলেন ধন-মালে যাকাত ছাড়া আর কিছুই প্রাপ্য নেই তাঁরা পর্যন্ত স্বীকরা করেছেন যে, প্রয়োজন দেখা দিলে যাকাতের বাইরেও অর্থ আদায় করা যাবে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধান ও ভ্রাতৃত্ব সংক্রান্ত মতাদর্শের ব্যবস্থায় আমরা যা বলে এসেছি তাও এ মতকেই বলিষ্ঠ করে। কেননা তাই হচ্ছে যাকাত ফরয় হওয়ার আদর্শিক ভিত্তি। ধন-মালে যাকতের পরও কোন হক ধার্য় হওয়ার জন্যে তাই ভিত্তি হিসেবে গণ্য হতে পারে
দ্বিতীয়ঃ যাকাত ব্যয় ক্ষেত্র সুনির্দিষ্ট, রাষ্ট্রের আর্থিক দায়িত্ব বহু
একথাও আমরা জানি যে, যাকাত সামষ্টিক , নৈতিক দ্বীনী ও রাজনৈতিক লক্ষ্য ও বটে। প্যর্বে যেমন বলে এসেছি। আর যাকাতের লক্ষ্য নিছক অর্থনৈতিকই নয় অর্থাৎ শুধু ধন-মাল সংগ্রহ করা রাষ্ট্রের সুবিধা মত ব্যয় করার উদ্দেশ্যে তাও নয়। যদিও কারো কারো মতে তার সাবলিল্লাহ খাতটি সর্বপ্রকারের অল্লাহনুহত্য ও জনকল্যাণ মূলক কাজে পরিব্যাপ্ত বটে। কিন্তু তা আয়াত ও হাদীসের বক্তব্যের পরিপন্হী, জমহুর ফিকাহবিদগণও সে মত গ্রহণ করেননি।
তাই বলতে হচ্ছে, যাকাত ব্যায়ের খাত আটটি ভাগে বিভক্ত।কুরআন মজীদই তা দৃঢ়ভাবে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। তাতে এক সাথে দুটি দিক সমন্বিত। মুসলমানদের মধ্যকার অভাবগ্রস্ত ও দারিদ্র্য পীড়িত ফকীর, মিসকীন, ক্রীতদাস, নিজেদের দরুন ঋণগ্রন্ত ও নিঃস্ব পথিক লোকেরা একদিকে। আর অপরদিক মুসলামানরা যাদের মুখাপেক্ষী আল্লাহর পথে মুজাহিদ, মুয়াল্লাফাত কুলুবুহু,
যাকাত সংস্থার নিয়োজিত কর্মচারী এবং সামষ্টিক কল্যাণে ঋণগ্রস্ত লোকজন।
এ কারণে যাকাতের জন্যো স্বতন্ত্র ও বিশেষ বায়তুলমাল গঠন করা হয়েছিল, তার বাজেট সম্পূর্ণ আলাদা। যাকাতের মাল রাষ্ট্রের অন্যান্য আয়ের ধন মালের সাথে মিশ্রিত করা ফিকাহবিদ মতে জায়েয নয়। কেননা যাকাত তো শরীয়াত কর্তৃক সৃনির্দিষ্ট খাতেই শুধু ব্যয় করা যাবে, অন্য কোন খঅতে নয়। আর সামষ্টিক দায়িত্ব গ্রহণ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে তার প্রথম দায়িত্বের কাজ।
এ কারণে ইমাম আবূ ইউসূফ বলেছেন, খারাজের মাল যাকাতের মালের সাথে মিশ্রিত কর জায়েয নয়। কেননা খারাজ হচ্ছে মুসলিম জনগণের সামষ্টিক সম্পদ আর যাকাত হচ্ছে আল্লাহ কর্তৃক সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিগণের জন্যে ব্যয় করার সস্পদ। [(আরবী***********)]
এ জন্যে তাঁরা আরও বলেছেন, পুল বা রাস্তা নির্মাণে যাকাত সম্পদ ব্যয় করা যাবে না। খাটা, মসজিদ, মুসাফিরখানা, মাদ্রাসা, পানি পানের জন্যে ঝর্ণধারা প্রবাহিতকরণ প্রভৃতি কাজেও ব্যয় করা হবে না। [(আরবী***********)]
অথচ এ কাজগুলো ইসলামী রাষ্ট্রই শুধু নয়, সকল রাষ্ট্রের জন্যেই একান্তভাবে জরুরী। তাহলে এসব কাজে অর্থ ব্যয় করা যাবে কোত্থেকে, যখন এ সব কল্যাণমূক কাজেও যাকাত ব্যয় জায়েয হচ্ছে না?
জবাব এই যে, আগের কালে এসব জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা যুদ্ধমান শক্রর কাছ থেকে মুসলমানদের অর্জিত গনীমতের মালের এক পঞ্চমাংশ বাবদ প্রাপ্ত সম্পদ থেকে অথবা যদ্ধ ও রক্তপাত ছাড়াই মুশরিকদের ধন-মালথেকে ফাই বাবদ যা কিছু আল্লাহ তাআলা দিয়ে দিতেন তা থেকে। প্রথম যুগের ইসলাম বিজয়কালে এ দুটো আয় উৎস বা আয় সূত্র জাতীয় ধনভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে দিত। ফলে তখন যাকাত ছাড়া ভিন্নতর কর লোকদের ওপর ধার্য করার কোন প্রয়োজনই দেখা দিত না। তাছাড়া একথাও স্মরণীয় যে, তখন কার সময়ে রাষ্ট্রের দায়-দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল অনেক সীমিত। কিন্তু আমদের এ যুগে উপরিউক্ত সূত্রদ্বয় সম্পূর্ণকূরপ নিঃশেষ ও বন্ধ হয়ে গেছে। এক্ষণে জাতীয় কল্যাণমূলক কাজের জন্যে অন্য কোন ছাড়া এজন্যে আর কোন উপায়ই থাকতে পারে না।তাই সার্বিক কল্যাণমূলক কাজ বস্তবায়নের জন্যে প্রয়োজন পরিমাণ কর অবশ্যই ধার্যকরতে হবে, যা ব্যতীত কর্তব্য পূর্ণভাবে পালিত হয়ে না,তা দেয়া ওয়াজিব এ মৌলনীতি আনুযায়ীই এ কর ধার্য করা হবে।
শাফেয়ী ফিকাহবিদদের এ মত আমরা পূর্বেই জানতে পেরেছি যে, রিযিকপ্রাপ্ত যোদ্ধা ফাই সম্পদে যাদের জন্যে নির্দিষ্ট অংশ রয়েছে কিংবা শৃংখলাবদ্ধ সৈন্যবাহিনীর যেসব লোক জাতীয় ধনভাণ্ডার থেকে মাসিক বেতন পায় তাদের জন্যে যাকাত সম্পদ থেকে এক পয়সাও ব্যয় করা যাবে না। তবে সাবীলিল্লাহ খাতের সম্পদ পাবে নফল হিসেবে জিহাদে যোগদানকারী মুজহিদরা। কিন্তু এই শাফেয়ী ফিকাহবিদরাই এ-
আলোচনাও তুলেছেন যে, জাতীয় ধনভাণ্ডার নিয়মিত ও বেতন ভূক সেনাবহিনীর জন্যে ব্যয় করার যখন কিছুই থাকবে না অথচ কাফির শক্রদের উসকানী প্রতিরোধের জন্যে লোক তৈরী রাখা মুসলমানদের জন্যে প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে,তখন মুসলমানদের এ প্রয়োজন পূরণে দাড়িয়ে যাওয়া লোকদের ভরণ-পোষণ ইত্যাদির ব্যয়েোকত্থেকে চালানো হবে?
নববী প্রমখ শাফেয়ী ইমানগণ অগ্রাধিকার নীতির আলোকে বলেছেন, এ রূপ অবস্থায় মুসলমান ধনী ব্যক্তিদের কর্তব্য হচ্ছে যাকাতের মালের বাইরের সম্পদ দিয়ে তাদের সাহায্য করা। [ দেখুন (আরবী***********)] তৃতীয়ঃ শরীয়অতের সর্বাত্মক নিয়ম
যা ব্যতীত ওয়াজিব কাজ সম্পন্ন হয় না, তা ওয়াজিব এ মূলনীতির ওপরই গোটা ব্যাপার একান্তভাবে নির্ভরশীল নয়। এ পর্যায়ে রয়েছে একটা সর্বাত্মক মৌলনীতি শরীয়াতের সাধারণ নিয়ম। শরীয়াতের অকাট্য সম্পষ্ট দলিলসমূহের আলোজে ইসলামের বিশেষজ্ঞা মণীষিগণ তার ভিত্তি রচনা করেছেন। সেজন্যে খুঁটিনাটি হুকুম আহকামও নিঙড়ানো হয়েছে। ্তার পরিনতিতে আইন প্রণয়নের একটা মৌলনীতি গড়ে উঠেছে,যার ওপর ভিত্তি করা চলে, তার ভিত্তিতে কর্মনীতি নির্ধারণ সম্ভব। আইন প্রণয়ন কিংবা ফতোয়া দান অথবা বিচার কালে তা থেকে হেদায়েত পাওয়া যেতে পারে। প্র পর্যায়ের মৌলনীতি হচ্ছেঃ জনকল্যাণের দাবি পূরণ বিপর্যয়েোধ কল্যাণ প্রতিষ্ঠার ওপরে অগ্রাধিকার পাবে। দুটি কল্যাণেল মধ্যে সাধারণ বা নিম্মমানেরট বিনষ্ট করা উচ্চমানেরটা লাভের উদ্দেশ্যে, সাধারণ ক্ষতি প্রতিরোধের জন্যে বিশেষ ক্ষতি গ্রাহ্য হবে। [এ মৌলনীতির জন্যে দেখুনঃ (আরবী***********) এবং (আরবী***********)]
শরীয়াতের এ মৌলনীতি কার্যকর করা হলে শুধু কর ধার্যকরণই বৈধ প্র মাণিত হবে না, জাতীয় ও রাষ্ট্রী কল্যাণ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তা ধার্যকরণ ও গ্রহণ অকাট্য ও অপরিহার্যও প্রমণিত হবে। কেননা জাতীয় বিপর্যয় ক্ষতি ও বিপদ প্রতিরোধ এ ছাড়া সম্ভব নয়। তবে অন্যান্য সূত্রের যেমন পেট্রোল বা অন্য কিছুর আয় যদি সেজন্যে যথেষ্ট হয়, তবে সে স্বতন্ত্র কথা। কিন্তু তাও যদি কিছু না থাকে এবং এরূপ অবস্থায় আধুনিক ইসলামী রাষ্ট্রকে কর ধার্য করার অধিকার দেয়া না হয়, তাহলে কিছুদিন চলার পর সে রাষ্ট্রটি যে ধড়াষ করে ভুমিসাৎ হবে, চতুর্দিক থেকে তার অক্ষমতা প্রকট হয়ে সম্পূর্ণ অচলাবস্থা দেখা দেবে এবং সর্বোপরি সামরিক অভ্যুত্থানের বিপদ ঘণীভূত হবে, তাতে আর কোনই সন্দেহ থাকতে পারে না।
এ কারণে; বিভিন্ন যুগের আমিলগণ ফতোয়া দিয়েছেন যে, বায়তুলমালকে শক্তিশালী
করার উদ্দেশ্যে মুসলিম প্রশাসক যে করই ধার্য করবে, তা যতারীতি দেয়া একান্তই কর্তব্য। অন্যতায় বিপদ প্রতিরোধ ও প্রযোজন পূরণ অসম্ভব থেকে যাবে।
শাফেয়ী মতের ইমাম গাযযালী সাধারণ কল্যাণে অতিরিক্ত ধন-মাল নেয়ার বিপক্ষে। কিন্তু তিনিও লিখেছেনঃ হাত যখন ধান মাল শূন্য হয়ে পড়বে, সাধারণ কল্যাণের ধন-মাল ততটা অবশিষ্ট থাকবে না যদ্দারা সাময়িক ব্যয়ভার বহন করা চলে এবং এ সময় ইসলামী রাজ্যে শক্রর ঢুকে পড়ার আশংকা দেখা দিলে কিংবা দুষ্কৃতকারীদের পক্ষ থেকে ধন মাল ধনী লোকদের কাছ থেকে নিয়ে নেয়া রাষ্ট্রপ্রধানের জন্যে জায়েয হবে। কেননা আমরা জানি দুই দুষ্কৃতি বা ক্ষতি এক সাথে দেখা দিলে ও সাংঘষিক হলে দুটির মধ্যে কঠিনতর ও অধিক বড় দৃষ্কৃতি দমন করাই শরীয়াতের লক্ষ্য। কেননা এরূপ অবস্থায় প্রত্যেক ধনী ব্যক্তি যা কিছু দেবে তা জানমালের ওপর ঘুনিয়ে আসা বিপদের তুলনায় খুবই সামান্য। ইসলারেম দেশে যদি শক্তিশালী প্রশাসক না থাকে, যে সামষ্টিক প্রশাসন ব্যবস্থা সুষ্ঠুরূপে পরিচালিত করবে ও দুষ্কৃতির মূল উৎপঠিত করবে, (তাহলে তো বিপদটা অত্যস্ত কঠিন হয়ে পড়বে) [(আরবী***********)]
মালিকী মতের ইমাম শাতেবী লিখেছেনঃ আমরা যদি এমন রাষ্ট্রপ্রধান দাঁড় করাই, যার আনুগত্য করা হবে, সে যদি বিপ্লব দমনের জন্যে বিপুল সংখক সেনাবহিনী সংগ্রহ করা এবং বিপুল বিস্তীর্ণ রাষ্ট্রের সঙরক্ষণের জন্যে অভাগ্রস্ত হয়ে পড়ে- বায়তুলমাল শূন্য হয়ে যায় এবং সৈন্যদের জন্যে যথেষ্ট পরিমাণ ধন-মালের প্রয়োজন হয়ে পড়ে, তাহলে ন্যায়পন্হী রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে যথেষ্ট হয় এমন পরিমাণ ধন মাল ধনী লোকদের ওপর ধার্য করা জায়েয হবে এবং যতদিন ন বায়তুলমাল ধন-মালে সমৃদ্ধ হচ্ছে, তা নিতে পারবে। উত্তরকালে তা ফসল ও ফল ইত্যাদির ওপর ধার্য করা তার জন্যে জায়েয হবে।
তবে এ কথা প্রাথমিক ইসলামী যুগের লোকদের থেকে আমরা জানতে পারিনি। কেননা সে যুগে বায়তুলমাল স্বতঃই সমৃদ্ধ ছিল, যা আমাদের যুগে নেই। এক্ষণে রাষ্ট্রপ্রধান যদি নএ নীতি গ্রহন না করেন তাহলে তার জাঁকজমক ও দাপট প্রতাপ সবই নিঃশেষ হয়ে যাবে এবংত আমাদের দেশ কুফরী শক্তির অভ্যুত্থানের শিকারে পরিণত হবে। তা প্রতিরোধ করতে সক্ষম হতে রাষ্ট্রের প্রধানের শক্তি ও দাপট। এমাতাবস্থায় ও যারাধার্য কর ফাঁকি ;দেয় যার ফলে রাষ্ট্রের শক্তি ও দাপট লোপ পেয়ে যেতে পারে তাদের এমন ক্ষতি সাধিত হবে যার তুলনায় ধান মাল দেয়ার ক্ষতিকে তারাই নগণ্য মনে করবে। তার পরিমাণ সামান্য হলে তো বটেই। এ বিরাট ক্ষতির মুকাবিলায় সামন্য মাল গ্রহণজনিত ক্ষতি যখন খুবই নগণ্য হবে, তখন প্রথমটিকে দ্বিতীয়টির ওপর অগ্রাধিকার দানের প্রয়োজনীয়তায় কারোরই একবিন্দু সন্দেহ থাকবে না। [(আরবী***********)]
বস্তুত গাযাযালী ও শাতেবী উভয়ের বক্তব্য হল,উপরিউক্ত অবস্থায় ধনী লোকদের ওপর কর বা মাসিক দেয় ধঅর্য করা সম্পূর্ণ জায়েয। এ ঘোষণাটি একটি মৌলনীতির ওপরভিত্তিশীল। আর তা হচ্ছেঃ সাধারণ বা নগণ্য ক্ষতি সহ্য করে কঠিন ও মারাত্মক ক্ষতি প্রতিরোধ করা।
চতুর্থ ঃ মাল দিয়ে জিহাদ এবং বড় পরিমাণ ব্যয়ের দাবি ইসলাম মুসলমানদের জন্যে ধন-মাল জান প্রাণ দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করাকে ফরয করেছে। আল্লাহর নির্দেশঃ(আরবী***********)
তোমরা সকলে বের হয়ে পড় হালকাভাবে,কি ভারীভাবে এবং তোমাদের জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ কর। (আরবী***********)
মুমিন কেবলমাত্র তারাই, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে, অতঃপর কোনরূপ সন্দেহে পড়েনি এবং তাদের জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, তারাই সত্যবাদী। (আরবী***********)
তোমরা আল্লাহর ও রাসূলের প্রতি ঈমান আর এবং আল্লাহর পথে জিহাদ কর তোমাদের ধন-মাল ও জান প্রাণ দিয়ে। (আরবী***********)
এবং তোমরা ব্যয় কর আল্লাহর পথে এবং তোমরা নিজেরাই নিজেদের হাতে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে না। আর অতীব উত্তম নীতি অবলম্বন কর। কেননা আল্লাহ এ অতীব উত্তম নীতি অবলম্বনকারীদের ভালোবাসেন। [(আরবী***********]
সন্দেহ নেই মাল দ্বারা জিহাদ করার এ আদেশ পালন করা ফরয এবং তা যাকতের বাইরে আর একটি কর্তব্য। মুসলিম সমাজের মধ্যে অর্থ দ্বারা জিহাদ করার বোঝা বহনের সামার্থ্য কে কতটা রাখবে কে কতটা অংশ বহনের দায়িত্ব নেবে, তা নির্ধারণ করা রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব এবং অধিকারের ব্যাপারে। ইবনে তাইমিয়া উপরিউ্ক্ত কথাটি (আরবী***********)গ্রন্হকার থেকে উদ্ধৃত করেছেন- পরে এ বিষয়ে বলা হবে।
আমাদের এ যুগের সশস্ত্র সেনাবহিনী গঠন ও তাদের ব্যয়ভার বহনের জন্যে বিরাট ও ভয়াবহ পারিমাণের অর্থ সম্পদের প্রয়োজন, তা সত্ত্বেও শক্তি সঞ্চয় শুধু মাত্র অস্ত্র ও সৈন্য সংগ্রহের ওপর র্ভিরশীল নয়। সেই সাথে বৈজ্ঞানিক শৈল্পিক ও অর্থনৈতিক প্র ভৃতি জীবনের বহুবিধ দিকে ও বিভাগে শক্তি, প্রাধান্য ও আধিত্য লাভও একান্ত অপরিহার্য। আর এসবই ব্যাপক অর্থ সম্ভার ও সমৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু তা অর্থ দ্বারা জিহাদ হিসেবে ব্যাপক কর ধার্যকরণের মাধ্যমে বিপুল অর্থ সম্পদ সংগ্রহ ভিন্ন উপায়ন্তর থাকে না। ব্যক্তি এ কর দিয়েই সমষ্টিকে সমৃদ্ধি ও শক্তিশালী করতে পারে। পারে রাষ্ট্রকে প্রকৃত সহায়তা দিতে। তার ফলে সে নিজেও শক্তিশালী হয়ে উঠবে, তার দ্বীন, রক্ত, ধন-মাল ও ইজ্জত সংরক্ষিত হবে।
পঞ্চমঃ জনসম্পদে লাভবান হ্ওয়া
কর প্রভৃতি বাবদ যে সম্পদ সংগৃহীত হবে, তা ব্যয় করা হবে সামষ্টিক কল্যাণকর কার্যবলীতে। তার ফায়দাটা সমাজের সমস্ত ব্যক্তিদের কাছেই প্রত্যবর্তিত হয়ে আসবে। এ পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য,পানি সরবরাহ ও সেচ ব্যবস্থা ইত্যাদি এ সবই এমন সামষ্টিক কল্যাণমূলক কাজ, যদ্দারা সমষ্টিগত ঘোটা মুসলিম জনতাই ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়। থেকে বা দূর থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে।
রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও তার প্রভাব প্রতিপত্তি থেকে ব্যক্তি বিশেষ ভাবে উপকৃত হয় এবং তারই কর্তৃত্ব ও ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এবং তার অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক শান্তি –শৃংখলা নিরাপত্তা প্রভৃতি সামষ্টিক কল্যাণকর কাজের সুফল ভোগ করে। অতএব ব্যক্তির কর্তব্য ধন মাল দিয়ে রাষ্ট্রকে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করে তোলা ও রাখা- যে তা তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারে।
ব্যক্তি যেমন সমষ্টি থেকে উপকৃত ও সমৃদ্ধ হয় এবং বিভিন্ন আশা –আকাংখা প্রতিফলিত হয রাষ্ট্রে, তা মুকাবিলায় প্রতিদানস্বরূপ কর ও অন্যান্য সর্বপ্রকার সাহায্য সহযোগিতা দিয়ে এই মৌলনীতি বাস্তবায়ন করা একান্ত কর্তব্য, যা ফিকাহবিদগণ পরিভাষা হিসেবে বলেছেন। (আরবী***********)
দ্বিতীয় আলোচনা
কর ধার্যকরণে অবশ্য পালনীয় শর্তাবলী
কিন্তু যে ধরনের কর ধার্য করার আনুমতি্ ইসলামী শরীয়াত দিয়েছে, যে ধরনের কর এর প্রতি ইসলাম সন্তুষ্ট তাতে নিরম্মোদ্ধৃত শর্তাবলী অবশ্যই রক্ষিত হতে হবেঃ
প্রথমত শর্তঃ অর্থের প্রকৃত প্রয়োজন অন্য কোন আয়সূত্র না থাকা। প্রথম শর্ত হচ্ছে, রাষ্ট্রের প্রকৃত পক্ষেই অর্থের প্রয়োজন হবে, যা পূরণের জন্যে অপর কোন আয়ের সূত্র ও নেই যদ্দারা সরকার তার লক্ষ্য বাস্তবায়িত করতে পারে। লোকদের ওপর অতিরিক্ত করভার চাপিয়ে কষ্ট না দিয়েও জনকল্যাণমূলক কার্যাবলী সম্পন্ন করা তার পক্ষে সম্ভব(অর্থাৎ এরূপ যদি না হয়) কেবলমাত্র তখনই অতিরিক্ত কর ধার্য করাকে ইসলাম সমর্থন করে।
তা এ কারণে যে, ধন-মালের ক্ষেত্রে মূল কথা হচ্ছে, তা নেয়া হারাম। লোকদের ওপর অর্থনৈতিক কি অ-অর্থনীতিক অতিরিক্ত অনাহুত চাপ দেয়া থেকে নিষ্কৃতি দান কাজেই কারো মালিকানার মর্যাদা অকারণ বিনষ্ট করা,তার মালিকানা থেকে ধন-মাল নিয়ে নেয়া এবং তার ওপর অর্থনৈতিকবোঝা চাপিয়ে দেয়া কোনক্রমেই জায়েয হতে পারে না তবে যদি অব্শ্য বাধ্যকারী কোন প্রয়োজন তীব্র হয়ে আছে বটে, কিন্তু তা পরিপূরণের জন্যে স্বয়ং সরকারের হাতেই ধান মাল রয়েছে, আয়ের সূত্র বা আমদানী এমন আছে যদ্ধারা তার প্রয়োজন পূরণ হতে পারে এবং লোকদের কর ধার্য করার বাস্তবিকই অপেক্ষা না থাকে, তাহলে এরূপ অবস্থায় কর ধার্য করা বৈধ হবে না।
মুসলিম মনীষী ও ফতোয়াদানকারী বিশেষজ্ঞগণ এ শর্তটি রক্ষার ্ওপর খুব বেশী গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তাঁরা এ জন্যে শেষ পর্যন্ত যাওয়ার কথা ও বলেছেন। কেউ কেউ শর্ত করেছেন, বায়তলমাল সম্পূর্ণপূপে শূন্য হয়ে যেতে হবে, তখনই কর ধার্য করা যুক্তিসঙ্গত হতে পারে। তাঁদের এরূপ মত হওয়ার কারণ সাধারণত শাসক-প্রশাসকগণ প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে অর্থ সংগ্রহে মত্ত হয়ে থাকে। জনগণকে এমন সব অর্থনৈতিক চাপে জর্জরিত করে তোলে, যা বহন করার সাধ্য-সামর্থ্য তাদের প্রকৃত পক্ষেই থাকে না। এটা অত্যন্ত জুলুমমূলক আচরণ সন্দেহ নেই।
সত্যি কথা, ইসলামের ইতিহাস এ পর্যায়ে আমাদের সম্মুখে উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্তাবলী উপস্থাপিত করেছে। আমাদের আলিমগণ সব সময়ই জাতীয় কল্যাণের চিন্ত করেছেন, তাদের অন্যায় ও বাড়াবাড়িমূলক নীতি আনুসরণ করতে তাঁরা সব সময়ই অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
মিসর অধিপতি কতজ (আরবী***********)যখন তদানীন্তন হলব ও সিরিয়া অধিপতি মালিক নাসেরের দাবিতে সাড়া দিয়ে তাতারদের বিরীদ্ধে লড়াই করার লক্ষ্যে যুদ্ধ প্রস্তুতি নিতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি িএ ব্যাপারে পরামর্শ দেয়ার জন্যে বিচারপতি, আইন বিদ ও নগর প্রধানদের একত্রিত করেছিলেন। তিনি ছেয়েছিলেন তাতারদের মুকাবিলার যুদ্ধ করতে এবং এজন্যে প্রয়োজনীয় ধনসম্পদও লোকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করার ইচ্ছ করেছিলেন।এ উদ্দেশ্যে তিনি উপরিউক্ত লোকদেরকে পর্ত –দুর্গে একত্রিত করেছিলেন।তখন সেখানে শায়খ ইজ্জুদ্দীন ইবনে আবদুস সালাম,কাযী বদরুদ্দীন বাসৃয়ঞ্জারী মিসর অঞ্চরের প্রধান বিচার প্রমুখ বহু আলিম ও প্রখ্যাত ব্যক্তি উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁরা বিষয়টি সম্পর্কে ব্যাপক পর্যালোচনা করলেন, ইবনে আবদুস সালামের মতে সকলেই একত্রিত ও একমত হলেন। তিনি বাগশাহ কতজ কে বলেছিলেন তার সারনির্যাস হচ্ছে, শক্র বাহিনী যখন মুসলমানদের ওপর চড়াও হয়ে এসেছেঠ, তখন সকলেরই কর্তব্য হয়ে পড়েছে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা,তাতে সন্দেহ নেই এবং এ জিহেদের প্রয়োজন অর্থ সম্পদও আপনি জনগণের কাছ থেকে গৃহণ করতে পানের, তাপূর্ণভঅবে জায়েযও বটে। তাবে সেজন্যে শর্ত হচ্ছে, বায়তুলমালে যদি কিছুই অবশিষ্ট না থেকে থাকে, তবেই জনগণের কাছ থাকে অর্থ সাহয়্য নেয়ার প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।এ জন্যে প্রেয়োজন হলে আপনি স্বর্ণখচিত পরিচ্ছদাদি এবং মহামূল্য দ্রব্য সামগ্রী বিক্রয় করে দিতে পানের। [মূলের শব্দ হেচ্ছে (আরবী*********) এক বচনে (আরবী*********)তা স্বর্ণখচিত এক প্রকার মূল্যবান পরিচ্ছদ, যা বাদশাহ বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষ্যে রাপন্যেবর্গের মধ্যে বিতরণ করেন।] প্রত্যেকটি সৈনিক স্বীয় যানবাহন ও অস্ত্রশস্ত্রেই ব্যবহার করবে। তাদের জীবনমাণ জনসধারণের সাথে সমান ও পার্থক্যশুন্য হতে হবে। সৈনিকদের হাতে ধন-মাল ও মুল্যবান জাঁকজমকপর্ণ সমঞ্জামাদি বর্তমান থাকা অবস্থায় জনসাধারণের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ কিছুতেই জায়েয হতে পারে না। এ কথার পাই বৈঠক শেষ হয়ে যায়। [ দেখুনঃ (আরবী*********)]
অসমসাহসী ইমাম নববী ঠিক আনুরূপ কথাই বলেছিলেন জাহের বেবিরসের সম্মুখে। উত্তরকালে জাহের যখন সিরিয়ায় তাতার শক্তির মুকাবিলায় যদ্ধ করতে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, কিন্তু বায়তুলমাল ছিল সম্পূর্ণ শূন্য ; সৈন্য সজ্জিতকরণ এবং যোদ্ধদের জন্যে ব্যয় করার মত অর্থ সম্পদ কিছুই ছিলনা। তাখন তিনি জনগণের ওপর কর ধার্য করা সম্পর্কে সিরীয় আলিমগণের কাছে ফতোয়া চাইলেন। কেননা বাদশাহকে সাহায্য করা শক্রদের বিরূদ্ধে সৈন্যদের যুদ্ধ করার এবং তাতে প্রয়োজনীয় অর্থ-সম্পদ সংগ্রহের এছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। তাই আলিমগণ প্রেয়োজনীয় অর্থ সম্পদ সংগ্রহের এছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। তাই আলিমগণ প্রয়োজন পূরণ ও কল্যাণমূলক কার্যাবলী সম্পাদনের প্রেক্ষিতে তা জায়েয বলে ফতোয়া দিয়েছিলেন। এ মর্মে ফতোয়া লিখেও দিয়েছিলেন। এ সময় ইমাম নববী উপস্থিত ছিলেন। বাদশাহ
যখন আলিমগনকে জিজ্ঞেস করলেন, ফতোয়ায় স্বাক্ষর করতে কেউ বাকী রয়ে গেছেন কি না? তাঁরা বললেন ঃ হ্যাঁ শায়খ মুহীউদ্দীন আন –নববী এখনও রয়ে গেছেন। পরে তাঁকে ডেকে উপস্থিত করা হয এবং তাঁকে বলা হয়ঃ আপনিও অন্যান্য আলিম ফিকাহবিদদের সাথে স্বাক্ষর দিন। শায়খ নববী স্বাক্ষর দিতে অস্বীকৃতি জানালেন। বাদশাহ তার কারণ জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন, আমি জানি আপনি আমীর বন্দকদারের ক্রীতদাস ছিলেন। আপনার ধন-মাল কিছুই ছিল না। পরে আল্লাহ আপনার ওপর অনেক আনুগ্রহ করেছেন, তিনি আপনাকে বাদশাহ বানিয়েছেন। আমি শুনেছি আপনার মালিমায় িএক সহস্র ক্রীতদাস রয়েছে, তাদের প্রত্যেকেরই স্বর্ণখচিত পরিচ্ছদ রয়েছে। আপনার কাছে আরও দুই শত ক্রীতদাসী রয়েছে, তাদের রয়েছে মহামূল্য স্বর্ণলংকার। আপনি যদি এ সবকিছু বিক্রয় করে দেন এবং আপনার ক্রীতাদাসরা স্বর্ণখচিত পোশাকের পরিবর্তে মোটা পশমের পোশাক ধারণ করে- ক্রীতাদাসীরা শুধু কাপড় পরে, অলংকারহীনা থাকে, তাহলেই আমি প্রজা সাধারণের কাছ থেকে কর ধরে অর্থ প্রহণের সমর্থনে দেয়া ফতোয়ায় স্বাক্ষর দিতে পারি।
জাহের তাঁর একতা শুনে ক্রুদ্ধ হনে এবং তাঁকে নিদের্শ দেনঃ এ দামেশক শহন থেকে তুমি এখনই বের হয়ে যাও। ইমাম নববী বললেনঃ আপনার নির্দেশ অবশ্য পালনীয়া এই বলে তিনি তার নাওয়া গ্রামের চলে গেলেন।
তখন ফিকাহবিদগণ বাদশাহকে বললেনঃ এ লোকটি দেশের বড় আলিম ও শ্রেষ্ট লোকদের একজন। সকলেই তাকে মানে। তাঁকে দামেশকে ফিরিয়ে আনুন। তখন জাহের তাকে ফিরে ফিরে আসার আনুমতি দেন। কিন্তু শায়খ ফিরে আসতে অস্বীকার করেন এবং বলেনঃ জাহের ওখানে থাকা অবস্থায় আমি কিছুতেই সেখানে যাব না। প্রায় একমাসকাল পর জাহের মৃত্যুমুখে পতিত হন। [. আল উস্তায মুহাম্মাদ আল-গাযালী লিখিত (আরবী*********) গ্রন্থের ২২২-২২৩ পৃষ্ঠা থেকে, পঞ্চশ ছাপা।]
ইমাম নববী সলতান জাহের বেবিরসকে উপদেশ দিয়ে একটি চিঠি লিখেছিলেন। তাতে নিনি শরীয়াতের বিধান ব্যাখ্যাকরেছিলেন। লিখেছিলেন;
বায়তুলামলে কিছু বর্তমান থাকা অবস্থায়- নগদ সম্পদ হোক,সামগ্রী হোক, জমি হোক বিক্রয়যোগ্য সরঞ্জাম বা অন্য কিছু প্রজা সাধারণের কাছ থেকে আর কিছু গ্রহণ করা হালাল নয়। বাদশাহর দেশের আল্লাহ তা সাহয্যকারীদের সম্মনিত করুন সব মুসলিম আলিমেই এ মতে সম্পূর্ণ এক ও অভিন্ন। বায়তুলমাল তো এখন আল্লাহ শোকর খুবই সমৃদ্ধ ভরপুর। আল্লাহ তার প্রতিষ্ঠা, সমৃদ্ধি,প্রশস্ততা এবং খায়র ও বরকত আরও বাড়িয়ে দিন। [ হাফেয সালাভী লিভিত ইমাম নববীর জীবনী। (আরবী*********)]
দ্বিতীয় শর্তঃকর এর বোঝা ইনসাফ সহকারে বন্টন
অতিরিক্ত ধন-মাল অর্থ সংগ্রহের প্রয়োজন যখন সন্পষ্ট ভাবে প্রমাণিত হেবে এবং করধার্য করা ছাড়া ও প্রয়োজন পূরণের আর কোন সূত্র বা উপায় থাকবে না, তখন কর ধার্য করা শুধু জায়েযিই নয়. ফরযও। তবে শর্ত এই যে, লোকদের ওপর কর এর বোঝা সুবিচার ও ন্যায়পরতার ভিত্তিতে বন্টন করতে হবে নে এক শ্রেণীর লোক অপর শ্রেণীর লোকদেরই দ্বিগুণ তিনগুণ বেশী চাপের নীচে পড়তে না হয়- তা দাবি কারী কোন প্রয়োজন ছাড়াই।
সুবিচার বা ন্যায়পরতা বলতে আমরা সমান –পরিমাণ মনে করছি না। কেননা দুই পার্থক্যপর্ণ ব্যক্তির মধ্যে সমতা করতে যাওয়া জুলুম ছাড়া কিছু নয়। তাই সকলের কাছ থেকে গ্রহণীর একই হারের হওয়া উচিত নয়্ বরং অর্থনৈতিক সামাজিকতার দিক দিয়ে ও হার বিভিন্ন হওয়া উচিত। ফলে কারো কাছ বেশী আর কারো কাছ থেকে তুলনামূলক ভাবে কম নেয়া বঞ্ছনীয়।
আবূ উবাইদ তার সনদে হযরত ইবনে উম র (রা) থেকে বর্ণিত হাদীস উপরিউক্ত কথার সমর্থন করে। বর্ণনাটি এই ঃহযরত উমর (রা) নবত গোষ্ঠীর লোকদের কাছ থেকে জয়তুন ও গম বাবদ অর্ধ ওশর গ্রহণ করতেন- যেন মদীনার দিকে পরিবেশন বেশী বেশী হযেএবং কুতনীয় থেকে ওশর গ্রহণ করতেন। [(আরবী********)]
নবত বলতে একদল ব্যবসায়ী বোঝায়,যারা যুধ্যমান লোকদেরদ মধ্য থেকে ইসলামী রাজ্যে এসে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। তারা বিভিন্ন পণ্য –দ্রব্য ও খাদ্য মদীনার আমদানী করত। হযরত উমর (রা) নিয়ম করেছিলেন যেমন আনাস ইবনে মালিক তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন, যুধ্যমান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এক-দমাংশ শল্ক গ্রহণ করতেন আর যিম্মী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে শুল্ক নিতেন অর্ধ-ওশর। আর মুসলমান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিতেন এক-দশাংশের এক –চতুর্থাংশ। [(আরবী********)]
এটা হতো একদেশ থেকে দেশান্তরে পণ্যদ্রব্য নিয়ে যাওয়া বা আনার সময়ে। সীমান্তে শুল্ক আদায়ে দায়িত্বশীলরূপে নিয়োজিত লোকেরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এ কর গ্রহণ করত।তারা এক বছর কাল ব্যবসা করার সুযোগ পেত। এটা আধুনিককালের শল্ক কর এর মত ব্যবস্থা। বিদেশী আশ্রয় গ্রহণকারী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এক-দশমাংশ শুল্ক গ্রহণ করা হতো সমান সমান নীতি গ্রহণ আনুযায়ী।কেননা বিদেশী যুধ্যমানরা মুসীলিম ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এই এক এক-দশমাংশই গ্রহণ করত হযরত আবূ মূসা হযরত উমর ফারুক (রা)কে তা-ই লিখে জানিয়েছিলেন। [(আরবী********)] তিনি যিম্মী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্ধ –ওশর গ্রহণ করতেন, কেননা তাদের সাথে এ শর্তে সন্ধি হয়েছিল এবং তাতেই তারা রাজী ছিল। [(আরবী********)] তবে তাদের কাছ থেকে তা গ্রহণ করা
হতো কেবলমাত্র একদেশ থেকে দেশান্তরে নিয়ে যাওয়অর সময়। মুসলমানদের অবস্থা ছিল ভিন্নতর, তারা নিজ দেশে ব্যবসা চালালেও তাদের ব্যবসার যাকাত দিতে হতো্ যেমন যিম্মীদের কৃষি ফসল,ফল গবাদি পশু ও অন্যান্য এমন সব মালের মুসলমানদের কাছ থেকে যার ওপর যাকাত নেয়া হয়- কোন অংশ দাবি করা হতো না। তবে এ ব্যবস্থও খৃস্টান বনূ তগলব গোত্র ছাড়া অন্যদের ক্ষেত্রে কার্যকর ছিল। কেননা এ খৃস্টান গোত্রটি হযরত উমরের সাথে বিশেষ শর্তে সন্ধি করেছিল বলে তারা স্বতন্ত্র ও বিশেষ আচারণ পেত। [ এ জন্যেক দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম আলোচনা দ্রষ্টব্য] মুসলিম ব্যবসায়ূ সম্পদের যাকাত।উদ্দেশ্য হচ্ছে, উপরিউক্ত নবত গোত্রের লোকদের কাছ থেকে এক –দশমাংশ নেয়াই ছিল নিয়ম-যেমন সায়েব ইবনে ইয়াজীদ বলেছেনঃ আমি হযরত উমরের যুগে মধীনার বাজারে কর্মকর্তানিযুক্ত ছিলাম। তখন আমি নবত গোত্রের লোকদের কাছ থেকে ওশর গ্রহণ করতাম। [ (আরবী********)]
কিন্তু হযরত উমর (রা) কর এর মূল্য হ্রাস করার ইচ্ছা করলেন এবং অর্থনৈতিক বিচার বিবেচনায় তা ১০% থেকে৫% পর্যন্ত নামিয়ে দিলেন। এটা ছিল তদানীন্তন ইসলামী রাজ্যের রাজধানী মদীনা নগরের জন্যে প্রয়োজনয় খাদ্য ইত্যাদি অন্যান্য পণ্যের তুলনায় বেশী বেশী আমদানী কাজে তাদের উৎসাহিত করার লক্ষ্যে গৃহতি সিদ্ধান্ত। তখনকার সময়ে সদীনায় জয়তুন ও গম আমদানী করার বিশেষ প্রয়োজন ছিল কলাইর ডাল,গোশত খণ্ড ইত্যাদির তুলনায়। একালের প্রায় সব রাষ্ট্রেই শল্ক নীতি এমনিভাবেই গড়ে তুলে থাকে। তাই কোন কোন ক্ষেত্রে শুল্কের হারকম করে কখনও উঁচুও করে দেয়। সুনির্দিষ্ট আমদানীকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যেই তা করা হয়, দেশী শিল্পজাত পণ্যকে সংরক্ষণ দেয়া অথবা পূর্ণ পরিপক্ক শিল্প-পণ্যের আমদানী হ্রাস করার সিদ্ধান্তের ফলেই তা করা হয়। এভাবে আর অনেক উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
আবূ উবাইদ ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেনঃ হযরত উমর নবত লোকদের থেকে জয়তুন ও গম বাবদ অর্ধ –ওশর গ্রহণ করেতেন –যেন মদীমায় আমদানী বেশী হয় এবং কুতনিয়ার কাছ থেকে নিতেন ওশর। [ (আরবী********)]
হযরত উমরের এ নীতি আমদেরকে শল্ক কর এর হার বাড়ানো বা কমানের একটা দলিল বা পথপ্রদর্শন দিচ্ছে। রাষ্ট্র পরিচলকের বিবেচনা মত জাতীয় কল্যাণ চিন্তার ভিত্তি তেই তা করাপ যাবে।
পূর্বে আমরা বলে এসেছি, সমাজ জীবনে ও অর্থনীতিতে ইসলামের লক্ষ্য হচ্ছে, জাতীয় সম্পদ তার মধ্য থেকে মুষ্টিময় লোকদের হস্তে পুঞ্জীভূত হয়ে যাবে না, অন্যদের তো কোন প্রশ্নই উঠতে পারে না। এ কারণে ইসলাম অধিকাংশ সক্ষম লোকদের মধ্যে জাতীয় সম্পদ বিতরণের নীতি আনুযায়ী কাজ করে, লোকদের পরস্পরের বড় বড় ফাঁক
ও পার্থক্য দূর করা এবং জনগণেকে আর্থিক অবস্থায় দিক দিয়ে পরস্পরের সমান ও নিকটতর মানে নিয়ে আসা তারই দায়িত্ব। এ কারণে আল্লাহ তাআলা ফাই সম্পদ বণ্টনের এ মৌল নীতি ঘোষণা করেছেনঃ (আরবী********)
যেন ধন সম্পদ কেবল তোমাদের মধ্যকার ধনী লোকদের মধ্যেই আবর্তিত হতে না থাকে। [(আরবী*******)]
তাই উর্ধ্বমুখী কর ছাড়া অন্য কোন উপায় যখন থাকবে না তখন পরিণতি এই দেখা দেবেঃ ধন-সম্পদ কেবলমাত্র ধনী লোকদের মধ্যেই আবর্তিত হচ্ছে না। ধনী একটা মানে নেমে আসবে এবং দরিদ্ররা একটি মানে উন্নীত হবে, উভয়ই পরষ্পরের কাছাকাছি এসে যাব্ ইসলাম এই নীতিকেই সমর্থন করে, এ নীতিরই আনুকুল্য করতে প্রস্তুত।
তা করা হবে ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন-জীবিকা, পরিবাররের দায়-দায়িত্ব এবং ঋণসমূহ ফেরত দান ইত্যাদি যথাযথভাবে পালনের সুযোগ দেয়ার। এছাড়াও পূর্বে যে সব কথার উল্লেখ করেছি, তার প্রতি লক্ষ্য রেখে।
তৃতীয় শর্তঃ জাতীয় কল্যাণে ব্যয় করতে হবে, পাপ ও নির্লজ্জতার কাজে নয়
কর ইনসাফ সহকারে গ্রহণ করাই যথেষ্ট নয়, তার বোঝাসহ লোকের ওপর ইনসাফ সহকারে করাই একমাত্র দায়িত্ব নয়। সে বাবদ লব্ধ সম্পদ জাতীয় সাধারণ কল্যাণমূলক কার্যবলীতে ব্যয় ও নিয়োগ করতে হবে। শাষক প্রশাসকদের অভিলাষ–লালসা ও ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের কাজে ব্যয় করা চলবে না।তাদের পরিবারের সুখ সুবধা-বিলসিতা পূরণের জন্যেও নয়। তাদের আনুসারী দলীয় লোক এবং সহযাত্রী সাথীদের আনন্দস্ফূর্তি বিধানের জন্যেও নয়।
এ কুরআন মজীদ যাকাত ব্যয়ের খাত সম্পষ্ট ও অকাট্যভাবে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। তাতে কোনরূপ দলীয় রাজনীতির খেলা বার একবিন্দু অবকাশ রাখা হয়নি। পাওয়ার যোগ্য লোক ছাড়া অন্যদের জন্যে তার এক ক্রান্তিও ব্যয় করা চলবে না। খুলাফায়ে রাশেদুণ এবং তাঁদের সাথে সাথে সাহাবায়ে কিরাম ও জনগণের ধন-সম্পদগ তার জন্যে শরীয়াত নির্ধারিত খাতে ব্যয় করার ওপর খুব বেশী কঠোরতা অবলম্বন করেছেন। খিলাফতে রাশেদা ও অত্যাচারী রাজা বাদশাহর মধ্যে এটা ই তো পার্থক্য। প্রথমোক্তরা দেশ শাসন করেন আল্লাহর দেয়া বিধানের ভিত্তিতে আর শেষোক্তরা দুনিয়ার প্রচলন বা নিজেদের ইচ্ছা কামনা আনুযায়ী।
ইবনে দুনিয়ার (আরবী********) গ্রন্থে সালমান থেকে বর্ণনা করেছেন। হযরত উমর (রা)
তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি বাদশাহ না খলীফা? সালমান তাঁকে বললেন, আপনি যদি মুসলমানের জমি থেকে একটি বা কম কিংবা বেশী দিরহাম কর গ্রহণ করেন, অতঃপর তা তার উপযুক্ত ক্ষেত্র ছাড়া অন্যত্র ব্যয় বা বিনিয়োগ করেন, তাহলে আপনি বাদশাহ খলীফা নন। এ কথা শুনে হযরত উমর কেঁদে ফেললেন। [(আরবী********)]
সুফিয়ান ইবনে আবুল আওজা থেকে বর্ণিত, হযরত উমর ইবনুল কাত্তাব বলেছেনঃ আল্লাহর কসম আমি জানি না আমি খলীফা না বাদশাহ। আমি যদি বাদশাহ হই, তাহলে এটা একটা ভয়ানক ব্যাপার। একজন বললঃ খলীফা ন্যায়সঙ্গতভাবেই গ্রহণ করে এবং ব্যয় রেক শুধু উপযুক্ত স্থানে। আল্লাহর শোকর,আপনি তো তোই করেন। আর বাদশাহ তো সীমালঙ্ঘন করে। সে নিজ ইচ্ছামত গ্রহণ করে ও ইচ্ছামতোই ব্যয় করে। হযরত উমর এ কথা শুনে চুপ হয়ে গেলেন। [(আরবী********)]
তাবারী বর্ণনা করেছেন, হযরত উমারের সাথে এক ব্যক্তির নিকটাত্মীয়তা ছিল। সে তাঁর কাছে কিছু চাইল। হযরত উমর তাকে ধমক দিয়ে বের করে দিলেন। এ নিয়ে কথা হয়। পরে একজন বললেন ঃ হে আমীরুলমুনিনীন !অমুক ব্যক্তি আপনার কাছে কিছু চেয়েছিল। কিন্তু আপ নর তাকে তা না দিয়ে বের করে দিয়েছেন? তখন তিনি বললেনঃ হ্যাঁ লোকটি আমার কাছে আল্লাহর –(সামষ্টির, রাষ্ট্রের) মাল চেয়েছিল। আমি যদি তাকে তা দিতাম,তাহলে আল্লাহর কাছে আমার ওজর পেশ করার কিছুই থাকত না। আমি বিশ্বাসভঙ্গকারী বাদশাহ হিসেবেই তাঁর সাথে সাক্ষাত করতে বাধ্য হতাম। [(আরবী********)]
চতুর্থ শর্তঃ উপদেষ্টা পরিষদ ও জনমতের সামঞ্জস্য রক্ষা
রাষ্ট্রপ্রধান প্রধান তাঁর প্রতিনিধি ও বিভিন্ন আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের মতকে অগ্রাহ্য করে তার প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে কেবলমাত্র নিজের মতের ভিত্তিতে কর ধার্য করবেন, তা আদৌ জায়েয নয়। তার পরিমাণও একক মতের জোরে করতে পারেবেন না। জনগণের ওপর কোনরূপ কর ধার্য করতে হলে উপদেষ্টা পরিষদের লোকজন এবং গণপ্রতিনিধিদের সাথে মতের সামঞ্জস্য বিধান করেই তা করতে হবে। আমরা বলেছি, ব্যক্তিগণের ধন-মালের ব্যাপারে মৌলিক কথা হল তা গ্রহণ করা হারাম।এটা ব্যক্তি মালিকানার মর্যাদা রক্ষার ব্যবস্থা। আর জনগণের ওপর কোনরূপ দায়িত্ব না চাপানো সর্বপ্রকারে বোঝা থেকে দখল থেকে ছিু মাল নিয়ে নিতে বাধ্য করবে, তাদের ওপর খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। তখন আনুরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিমিত্ত মতামত দানের জন্যে দায়িত্বশীল ও কর্মকর্তাদের রায়ের মধ্যে পূর্ণ সমঞ্জস্য সৃষ্টি করেই পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে্
তারাই পূর্বোদ্ধৃত শর্তসমূহের প্রতি নজর রেখে কাজ আঞ্জাম দিতে পারে। তারা ধার্য করার প্রয়োজনের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করবে। অন্যান্য আয়ের সূত্রে এ প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট কিনা, তাও তারাই আনুধাবন করতে পারবে এবং জনগণের মধ্যে করের বোঝা সুবচারপূর্ণ নীতিতে বন্টন করতে সক্ষম সংগঠন কায়েম করাও তাদের পক্ষেই সম্ভব হবে।তারাই সংবাদদাতা বাঅবস্থা সস্পর্কে অবিহিত ও বিশেষত্বসম্পন্ন লোকদের সাহায্য ও নিতে পারবে। উপরস্ত যে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এ ধার্যকৃত কর বাবদ লব্ধ সম্প সংগ্রহ করা হয়েছে- যে জনকল্যাণমূলক, উৎখেদমতের কাজ করার ইচ্ছা, সেই কাজেই তা ব্যয় হচ্ছে কিনা তার প্রতি লক্ষ্য রাখাও তাদেরই দায়িত্ব।
পরামর্শ করা কুরআন সন্নাহর প্রমাণে ফরয
পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথাটি যা আমরা বলেছি, তা আমাদের নিজস্ব কথা নয়। কুরআন ও সুন্নাহ থেকে তাই প্রমাণিত হয়।
কুরআনের আয়াতে তো পরামর্শ গ্রহণকে ইসলামী সমাজ গঠনের একটা মৌল ও ভিত্তিগত উপরকণ হিসেবে উপস্থাপিত করেছে। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেনঃ(আরবী******)
আর যারা তাদের আল্লাহর আহ্বানে সাড়া দিয়েছে, নামায কায়েম করেছে এবং যাদের জাতীয় ব্যাপারাদি পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয় এবং আমরা যা রিযিক বাবদ তা থেকে ব্যয় করে…..। [(আরবী********)]
আয়াতটিতে পারস্পরিক পরামর্শেকে আল্লাহর আহবানে সাড়া দেয়ার, নামায কায়েম করা এবং আল্লাহর দেয় রিযিক থেকে ব্যয় করার সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এটা মাক্কী যুগের কথা। এ যুগে ইসলামের মৌল নীতিসমূহই প্রতিষ্ঠত হচ্ছিল। সাধারণ স্বাভাবিক পদ্ধতি হিসেবে গুণ ও প্রশংসাকীর্তন স্বরূপ সে বিষয়ে বলা হয়েছে। কুরআনে কখনও মন্দ বলা ও তিরস্কারস্বরূপও এ পর্যায়ের কথা বলা হয়।
পরে মদীনর যুগে নাযিল হয়েছে আল্লাহ তাআলার এ নির্দেশ (আরবী******)
এবং তুমি তাদের সাথে পরামর্শ করা জাতীয় সামষ্টিক ব্যাপারাদিতে। পরে তুমি যখন সংকল্প করে ফেললে,তখন আল্লাহর ওপরই ভরসা কর। [(আরবী********)]
মাদানী যুগটি হচ্ছে ইসলামী সমাজের জন্যে আইন প্রণয়ন ও সংগঠন গড়ে তোলা পর্যায়। এখানে আয়াতটিতে নি্র্দেশের ভঙ্গি গ্রহণ করেছে। আর সাধারণ স্বাভাবিক রীতি হচ্ছে হয় আদেশ হবে, না হয় নিষেধ হবে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে,উক্ত আয়াতটি ওহোদ যুদ্ধের পর অবতীর্ণ হয়েছে। এ যু্দ্ধের সূচনাতেই রামূলে করীম (স) সাহাবাদের সাথে একত্রিত হয়ে পরামর্শ করেছিলেন এ বিয়য়ে যে, শহরের মধ্যে অবস্থান গ্রহণ করা হবে, না অগ্রসর হয়ে শক্রদের মুকাবিলা করা হবে? সাধারণভাবে সাহবিগণ শহর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষেই মত দিয়েছিলেন। ফলে তিনি বের হয়েছিলেন কিন্ত এটা তার একার মতের ভিত্তিতে ছিল না।যদিও পরিণামে সত্তরজন সাহাব আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গ করিছিলেন। এরূপ পরিণতি সত্ত্বে ও উক্ত আয়াতটি নাযিল হয়ে পরামর্শ করারই তাগিদ করেছে। স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে সেজন্যে এবং তাদের পরামর্শ কর বলে অর্থাৎ তোমাকে এ পরামর্শ করা নীতি অব্যাহতভাবে চালিয়ে যেতে হবে। পরামর্শের পরিণতি যতিই মর্মান্তিক হোক তা পরিহার করা চলবে না। কেননা একথা স্বতঃসিদ্ধ যে, যে পরামর্শ করেছি সে কখনও লজ্জিত হয়নি।
সুন্নাত বা হাদীস ও এব্যাপারে স্পষ্টভাষী। নবী করীম (স) যাবতীয় জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে সাহবিগণের াসাথে পরামর্শ করতেন বিশেষ করে সে ব্যাপারে, যে বিষয়ে আল্লাহ কোন নির্দেশ বা সিদ্ধন্ত নিয়ে অহীনাযিল হয়নি।বদর যুদ্ধে ঈর পর্বত পর্যন্ত যাওয়ার ব্যাপপরেও তিনি পরমর্শ করেছিলেন। কেবল মহাজির সাহাবীদের পরমর্শকেই তিনি যথেষ্ট মনে করেননি। আনাসার সাহাবিগণের মতের সাথে সঙ্গতি হওয়ার ফলেই তিনি স্বস্তি পেয়েছিলেন। মনযিল কোথায় হবে তা নিয়ে ও পরার্শ করেছেন। হুবার ইবনুল মুনযিরের পরামর্শের ভিত্তিতে সে মনযিল ঠিক করা হয়। ওহোদের দিন- যেমন বলেছি শহরের বাইরে যাওয়াটা পরামর্শের ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত আনুযায়ী হয়েছিল। খন্দকের দিন আহজাবের সাথে এক বছরের জন্যে মদীনার ফলের এক তৃতীয়াংশ নেয়ার ভিত্তিতে সন্ধি করার ব্যাপারেও পরামর্শ করেছেন। কিন্তু সাযাদ ইবনে উবাদা ও সায়াদ ইবনে মুয়ায তা মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলেন। ফলে তাপরিত্যক্ত হয়। হুদায়বিয়ার দিনও পরামর্শ করেছিলেন মুশরিকদের সমআনদের প্রতি দৃষ্টি দেয়ার ব্যাপারে বি করা যাবে, তা নিয়ে। তখন হযরত সিদ্দীক (রা) বললেনঃ আমরা কারো সাথে যদ্ধ করতে আসিনি। আমরা এসেছি উমরা করার নিয়তে। তিনি একথা দিয়েই জবাব দিয়েছিলেন হযরত আয়েশা(রা) এর প্রতি মিথ্যা আরোপের ঘটনায়ও নবী করীম (স) প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেনঃ হে মুসলিম জনগণ, যি লোকরা আমার পরিবারেরে ওপর দোষারোপ করেছে,[ (আরবী******) অর্থ তুহমাত –দোষ আরোপ করেছে। কেই যখন কেউ যখন কাউকে খার।] খারাপ কথা চালিয়ে দিয়েছে, তাদের ব্যাপারে করণীয় সম্পর্কে তোমরা আমাকে পরাপমর্শ দাও। হযরত আলী ও উসমান (রা) এর কাছে হযরত আয়েশা (রা) এর সাথে বিচ্ছেদ ঘটানের ব্যাপারেও পরামর্শ চেয়েছিলেন। [(আরবী******)]
ইবনে কাসীর এ সব পরামর্শ সংক্রান্ত ঘটনাবলীর উল্লেখ করে বলেছেনঃ নবী করীম (স) যুদ্ধ ইত্যাদি ব্যাপারে পরামর্শ করতেন। এ প্রেক্ষিততে ফিকাহবিদগণ এ ব্যাপোরে মতভেদে পড়েছেন যে, পরামর্শ গ্রহণ তাঁর জন্যে ফরয ছিল কিংবা লোকদের মন রক্ষার্থে তা করা মুস্তাহাব ছিল। ফিকাহবিদদের কথা এ দুভাগে বিভক্ত।
রাসূলে করীম (স) মাসুম ও অহীর মাধ্যমে সাহায্যপ্রাপ্ত ছিলেন। তাঁর অন্য পরামর্শের ব্যাপার কি ছিল, তা নিয়ে মতভেদ জায়েয হলেও তাঁর পরবর্তী খলীফা ও ইমাম রাষ্ট্রপ্রধান গণের ব্যাপারে এ নিয়ে কোন কোনরূপ মতভেদ করা আদৌ সঙ্গত নয়। কেননা আয়াতটি এ বিষয়ে সম্পষ্ট। এ সুস্পষ্ট আদেশ ফরয প্রমাণ করে। নবী করীম (স) নিজে সর্বপ্রকারের জাতীয় গুরুত্বপুর্ণ ব্যাপারে পরামর্শ কার্যকর করার জন্যে উৎসাহিত করেছেন। তাতেও তা ওয়াজিব বা ফরয প্রমাণিত হয়। বিশেষ করে মুসলিম উম্মাতের দীর্ঘ ইতিহাসের অভিজ্ঞতা স্বৈরতন্ত্রীদের আচরণের প্রক্ষিতে স্বৈরতন্ত্রের যে অভিশাপ ও দুঃখ বিপর্যয়ে মুসলিম জনগণ বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত হয়েছে, সে দৃষ্টিতেও কুরআনের আয়াতের নির্দেশ আমাদের জন্যে অবশ্য পালনীয় বানিয়ে দেয়।
পরামর্শ কি জ্ঞানদানকারী না বাধ্যতামূলক
এখানে একটি প্রশ্ন থেকে যায়। তা হচ্ছে এ পরামর্শ কি রাষ্ট্রপ্রধানের জন্যে বাধ্যতামূলক।
এর জবাব হচ্ছে, হ্যাঁ তাতে কোন সন্দেহ নেই।
তার দলিল হচ্ছে, বনী করীম (সা) নিজে পরামর্শ গ্রহণেল পরা নিজের মত পরিহার করে অধিকাংশ সাহাবীর পরামর্শ আনুযায়ী কাজ করতেন। পূর্বে বহু কয়েকটি স্থানে আমরা তার উল্লেখ করেছি।
ইবণে কাসীর উল্লেখ করেছেন, ইবনে মারদুইয়া হযরত আলী ইবনে আবূ তালিব (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেনঃ তিনি বলেছেনঃ তুমি যখন দৃঢ় সংকল্প করলে তখন আল্লাহর ওপর ভরসা কর।
এ আয়াতে যে (আরবী********) বা দৃড় সংকল্প এর কথা বলঅ হয়েছে, তার তাৎপর্য সম্পর্কে রাসূরে করীম (সা) বলেছিলেনঃ মত দিতে পারে এমন লোকদের সাথে পরামর্শ করা এবং পরে তাদের পরামর্শ মেনে নেয়াই হচ্ছে তার তাৎপর্য। [ (আরবী********)]
পরামর্শের ফল যদি বাধ্যতামূলক না হয়, তাহলে তার কোন গুরুত্ব বা মূল্যই থাকে না।দুনিয়ার স্বৈরতন্ত্রীরা এ পরামর্শকে একটা হাস্যকর বস্তুতে পরিণত করেছে। তারা তা নিয়ে লোকদের সামনে হাস্যরস ও তামাসা করে। তারাও পরামর্শ করে বটে, কিন্তু কাজ করে নিজেদের ইচ্ছেমত অথবা পরমর্শ করে কিন্তু বিরোধিতা করে যেমন তারা মেয়েদের ব্যাপারে ধারণা পোষণ করে। [কতক লোকের মুখে একটি খুব শোনা যায়ঃ মেরেদের সাথে পরমর্শ কর; কিন্তু করে তার বিপরীত।তারা মনে করে এটা বুঝি রাসুলের হাদীস। কিন্তু তা যে সত্য নয়, তাপ্রমাণের জন্যে দলিল হিসেবে আল্লাহর একথাটিই যথেষ্ট যা তিনি বলেছেন পিতা মাতা সম্পর্কে দুগ্ধপোষ্য সন্তান প্রসঙ্গেঃ তাদের দু জনের পারস্পরিক পরামর্শ ও সন্তুষ্টির ভিত্তিতে যদি দুধ ছাড়াতে ইচ্ছা করে, তাহলে তাদের কোন দোষ হবে না (আল-বাকারা; ২৩৩ আয়াত)। সত্তরী প্রমুখ বলেছেনঃ তাদের একজনের পক্ষে অপরাজনের সাথে পরামর্শ না করে স্বৈরাচার চালায়, তবে তা জায়েয হবে না।ইবনে কাসীর, ১ ম খণ্ড, ৫৮৪পৃ.)]
তাছাড়া জাতির দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের এরূপ শর্ত করার অধিকার আছে যে, রাষ্ট্র প্রধান তাদের সাথে প্রতিটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে বাধ্যতামূলকভাবে পরামর্শ করবে। কর ধার্য করা এ পর্যায়েরেই একট কাজ এবং এ শর্তের ওপর বয়আত পূর্ণত্ব পাবে, তখন তা ভঙ্গ করা তার পক্ষে জায়েয হবে না, সম্ভব হবে না। হাদীসে বলা হয়েছেঃ (আরবী********) মুসলমানরা তাদের শর্তের ওপর থাকবে। [ হাদীসটি আবূ দাউদ উদ্ধৃত করেছেন (আরবী********) তে। ইবনে মাজাহ (আরবী********) এ এবং হাকেম আবূ হুরায়রা থেকে। বুখারী ও মুসলিমের উদ্ধৃত করেছেন কাসীর ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আউফ আল-মুজানী তাঁর পিতা থেকে তাঁর দাদা থেকে –এ সূত্রে। তিনি বলেছেন, হাদীসটি সহীহ। তার ভাষা এইঃ (আরবী********) মুসলমানরা তাদের শর্তের ওপর স্থির থাকবে। তবে কোন শর্ত হালালকে হারাম করে যা হারামকে হালাল করে (তবে তাক্ষা করা যাবে না।) এর আপত্তি তলেছেন যে, বর্ণনারাকারী কাসীর খুব বেশী যয়ীফ।ইবনে হাজার তার ওশর পেশ করেছেনঃ বলেছেন সম্ভবত তিনি হাদীসটি বহু সূত্রে বর্ণিত হওয়াকে গণ্য করেছেন। তা তাবারানী বর্ণনা করেছেন রাফে ইবনে খাদীজ থেকে। তার সনদ উত্তম –যেমন আল-মুভীক আত তাইমীর গস্থে বলা হয়েছে ২য় খণ্ড, ৪৫৭ পৃ.) শাওকানী তাঁর বহুকয়টি বর্ণনা উদ্ধৃত করার পর লিখেছেনঃ একথা স্পষ্ট যে, এ হাদীসমূহ ও সূত্রসমূহ পরস্পরের সাক্ষ্য দিচ্ছে। তাই এর কম যে কম অবস্থা হচ্ছে এই যে, যে মূল দেখুন (আরবী********)] ওয়াদা পূরণ করা সুনশ্চিতভাবে ওয়াজিব। এখন আমরা পরামর্শ ওয়াজিব না মুস্তাহাব তা বাধ্যতামূলক না জ্ঞান দানকরী-এ কথা িবলা পার্থক্যহীন।এ হাদীস এবং উপরিউক্ত কোন সব বিষয়ে পরমর্শ করতে হবে, তা চিহ্নিত করে দেননি। শুধু একটা ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ (আরবী********) এর উল্লেখ হয়েছে। এ শব্দটি শামিল করে সর্বপ্রকারের সাধারণ ব্যাপার যা জনসাধারণের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং তাদের কল্যাণ ও অবস্থার সাথে সম্পুক্ত ও তার ওপর প্রভাব শালী যেমন যুদ্ধ ও বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে চুক্তি এবং এ পর্যায়ের অন্যান্য যাবতীয় ব্যাপার।সন্দেহ নেই, কর ধার্য করা জাতির জনগণের ওপর একটা অতীব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। জাতীয় জীবনে তা প্রভাব সুদুর প্রসারী। এ কারণে সকল আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের মতের সাথে সঙ্গতি স্থাপন করে জনগণের ওপর কোন প্রকারেরই কর ধার্য করে না।
তৃতীয় আলোচনা
কর ধার্যর বিরোধীদের সংশয়
বেশ কিচু লোক মনে করেন, যাকাত ধার্য হওয়ার দরুন আর কোন কর ধার্যর আদৌ প্রয়োজন নেই। অতঃপর অন্য কোন কর ধার্য করা জায়েযও নয়। তাদের এ কথার সমর্থনে ও প্রমাণের জন্যে যে সব সন্দেহ সংশয় প্রকাশ করেছেন, তার কতিপয়ের সংক্ষিপ্ত উল্লেখ এখানে করা যাচ্ছে।
প্রথম সংশয়ঃ ধন –মালেন যাকাত ছাড়া আর কিছু প্রাপ্য নেই
ফিকাহবিদদের ব্যাপারে একথা সর্বজনবিদিত যে, তাঁরা এ মত পোষণ করেন যে, ধন- মালে যাকাত ছাড়া আর কিছু প্রাপ্য নেই এবং ধন-মালের ওপর হক বা প্রাপ্য হিসেবে চিরকাল এ যাকাতই শুধু ধার্য হতে পারবে। এছাড়া আর কিছু্ ধার্য করা যাবে না। অতএব কর বা অন্য কিছুর নানে জনগণের ধনমাল থেকে কিছুই নেয়া জায়েয হবে না।
দ্বিতীয় সংশয়ঃ ব্যক্তিগত মালিকানার মর্যাদা রক্ষা
ইসলাম ব্যক্তিগত মালিকানাকে যথার্থ মর্যাদা দিয়েছে। প্রত্যেক ব্যক্তিকেই তার ধন-মালের ওপর অন্য সকলের তুলানায় অধিকারী বানিয়ে দিয়েছে। ধন-মাল পারস্পরিক নেয়া হারাম করে দিয়েছে, যেমন হারাম করেছে কক্ত ও মান-সম্মান। এমন কি হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে, যে লোক তার ধন-মাল রক্ষা করতে গিয়ে নিহতত হবে, সে শহীদ গণ্য হবে। [ বহু কয়কজন মুহদ্দিস হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন।] অতএব কোন ব্যক্তির স্বতঃস্ফূর্ত অনুমতি বা সন্তুষ্টি ব্যতিরেকে কারো ধন-মাল নেয়া হালাল নয়।
কর সম্পর্কে তার সমর্থকরা তার দোষমুক্ত হওয়া ও তার ব্যাখ্যায় যত কিছুই বলুক না কেন, তা ধন-মালের একটি অংশ তার মালিকদের হাত থেকে জোরপুর্বক ও তাদের মনে আঘাত দিয়ে নিয়ে নেয়া ছাড়া আর তা কিছুই নয়।
তৃতীয় সংশয়ঃ কর ও শুল্ক ধার্যকরণের বিরুদ্ধে বর্ণিত হাদীস
নব করীম (স) এর বহিু সংখ্যক হাদীসে শুল্ক ইত্যাদি ধার্য করণ ও তা আদায়ে নিযুক্ত লোকদের মন্দ বলা হয়েছে এবং তার জাহান্নামে যাওয়ার ও জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়ার হুমকি দেয়া হয়েছে।
আবূ খায়ের (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেনঃ মুসলিমা ইবনে মুখাল্লাদ মিসরে নিযুক্ত আমীর (শাসনকর্তা) ছিলেন। তিনি রুয়াইফা ইবনে সাবেত (রা) এর কাছে দাবি করলেন যে, তাঁকে দশমাংশ কর আদায়ের দায়িত্বশীল নিযুক্ত করা হোক। তখন তিনি বললেনঃ আমি শুনেছি, রাসূল করীম (স) বলছিলেনঃ কর আদায়কারী জাহান্নামী। [আহমাদ উদ্ধৃত করেছেন ইবনে লাহিয়ার বর্ণনা থেকে। তাবারনীও অনুরূপ উদ্ধৃত করেছেন। তিনি অতিরিক্ত শব্দ ব্যবহার করেছেন। (আরবী********)]
উকবা ইবনে আমের থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূল করীম (স) কে বলতে শুনেছেনঃ কর আদায়কারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। [আবূ দাউদ ও ইবনে খুজায়মা তাঁর সহীস গ্রন্থে এবং হাকেম হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন। তাঁরা সকলেই মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকের বর্ণনা দয়েছেন। হাকেম বলেছেনঃ হাদীসটি মুসলিমের শর্তে সহীহ।মুনযেরী বলেছেনঃ এ কথাই বলেছেন আর মুসলিম মুহাম্মাদ েইবনে ইসহাক থেকে (আরবী********)এর উদ্ধৃত করেছেন (আরবী********)]
এ হাদীসটি এবং তার পূর্বে উদ্ধৃত হাদীসটি সম্পর্কে যদিও কথা উঠেছে, তবু এ দুটির সমর্থন করছে মুসলিমের গ্রন্থে উদ্ধৃত হাদীসটি। সেটি গামেদীয়া মহিলার প্রসঙ্গে বর্ণিত। মেয়েলোকটি জ্বেনার ফলে গর্ভবতী হয়েছিল। নবী করীম(স) তার ওপর শরীয়াতের দণ্ড কার্যকর করেছিলেন। কেননা সে নিজেই তা স্বীকার করেছিল। এ দন্ড কার্যকর করা হয়েছিল সম্তান প্রসব ও তার দুধ ছাড়ানোর পর। এ হাদীসটিতে যদি এ রূপ তওবা করত, তাহলে তাকে ও মাফ করা হত।
এ তাদীসটি প্রমাণ করছে যে, কর আদায়কারীর গুনাহ বিবাহিতা হয়ে জ্বেনা দরুন গর্ভবতী হলে যে গুনাহ হয়, সে রকম কঠিন গুনাহ। আর এটা কর আদায় প্রসঙ্গে অত্যস্ত কঠিন আযারেব ধমক।
(আরবী********) অতিরিক্ত কর আদায়কারীদের তিরস্কার করে বলা হদীসসমূহ সহীহ বা হাসান নানে অভিহিত হতে না পারলেও তা পরস্পরকে শক্তিশালী করছে।
তাবরানী (আরবী********) গ্রন্থে উসমান ইবনে আবুল আচ থেকে নবী করীম (স) থেকে এ সনদে যে হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন, তাও এ পর্যাযে গণ্য। তাতে বলা হয়েছেঃ আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টির কাছে আসেন। অতঃপর ক্ষমা করেন, যে তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। কিন্তু যে লোক তার যৌন স্থানের সীমা লঙ্ঘন করেছে এবং যে অতিরিক্ত কর আদায়কারী এ দুজন ছাড়া। [ হাদীসটি (আরবী********) গ্রন্থের ৩য় খণ্ডের ৮৮ পৃষ্ঠায়ক উদ্ধৃত হয়েছে এমন ভাষায় যা (আরবী********) এবং আহমাদ থেকেও আলাদা। আহমাদেরক বর্ণনাকারীরা সহীহ তবে তাদের মধ্যে রয়েছে আলী ইবনে যায়দ। তার ব্যাপারে আপত্তি থাকলেও তাকে সিকাহ বলাক হয়েছে-]
ইবনুল আসীর (আরবী********) গ্রন্থে বলেছেনঃ হাদীসের শব্দ (আরবী********) একটা কর বিশেষ, যা কর আদায়কারীক গ্রহণ করে থাকে। আর (আরবী********) বলতেও তাই বোঝায়। [(আরবী********)]
বগাভী বলেছেনঃ কর আদায়কারী বলতে এ সব হাদীসে সে লোক বুঝিয়েছে, যে লোক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে যখন তারা এক স্থান থেকে অন্যত্র যায়-এক–দশমাংশের নামে এ (আরবী********) আদায় করে। [ (আরবী********)]আল মুনযেরী বলেছেনঃ এক্ষণে বা একালে (আরবী********) গ্রহণ করে ওশর এর নামে। এছাড়া নাম ছাড়াও বাহু কর গ্রহণ করা হয়ে থাকে। এভাবে যা যা গ্রহণক করা হয়, তা সবই হারাম। এবং ঘুষ বিশেষ। এসব নিয়ে তারা আসলে পেটের মধ্যে আগুন ভরছেঠ। তাদের পক্ষের সব দলিল প্রমাণ তাদের আল্লাহর কাছে গ্রহনযোগ্য এবং তাদের ওপর ক্রোধ এবং তাদের জন্যে রয়েছে কঠিন আযাব্[৩ ঐ ৫৬৭ পৃ.]
কর আদায়কারী সম্পর্কে আল মুনভী লিখেছেনঃ তারাই হচ্ছে ওশর –এক-দশমাংশ কর আদায়কারী। এরা লোকদের থেকে তা (জোরপূর্বক ওঅন্যায়ভাবে) গ্রহণ করে থাকে। তাইয়্যেবীর কথা উদ্ধৃত করেছেনঃঅতিরিক্ত ও অন্যায়ভাবে নেয়া কর বড় বড় ধ্বংস কারী গুনাহের মধ্যে একটা। যাহবী এ কাজকে কবীরা গুনাহ বলেছেন। [যাহবীর (আরবী********) গ্রন্থের ১১৯ পৃষ্ঠার তাই উল্লেখ করা হয়েছে। (আরবী********) কিন্তু যাহবী (আরবী********) কি তা কোন সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা লেখননি। বরং বলেছেনঃ অতিরিক্ত কর আদায়কারী জালিম লোকদের বড় বড় সহায়কদের মধ্যে গণ্য। আসলেক সে নিজেই বড় জালিম। কেননা সে এমন জিনিস আদায় করে নেয়, যা পাওয়ার অধিকারীক সে নয় এবং তা দেয় এমন লোককে, যে তা পেতে পারে না্। (১১৯ পৃ.) ইবনে হাজার আল –হায়সামীক এ কথা গুলোকে ধমক ও ভয় প্রদর্শন পর্য়ায়ে গণ্য করেছেন।] পরে বলেছেন এরূপ কর আদায় ডাকাতির মত কাজ। আদায়কারী;চোরের চাইতেও নিকৃষ্ট ও দৃষ্কৃতকারী। সে যদি লোকদের ওপর অবিচার করে ও নিত্য নতুন কর তাদের ওপর ধার্য করে তাহলে সে বড় জালিম। যে লোক ধার্যকৃত কর-এর অর্ধেক গ্রহণ করে প্রজাগণের সাথে দয়অর আচারণ করে তার অপেক্ষাও সে অধিক জুলুম কারী। আর অন্যায়ভাবে কর আদায়কারী তার লেখক, হিসাবরক্ষক এবং পুলিশ বা সৈন্যদের মধ্য থেকে যে তা গ্রহণ করে, যে তার মুরব্বীগিরি করে ও পার্শ্বের সমর্থক হয়, মূলক গুনাহে এরা সকলেই শরীক, এরা সবাই ঘুষখোর। [(আরবী********)]
উপরোদ্ধৃত হাদীসসমূহের সাথে যুক্ত হচ্ছে সে সব হাদীসও যাতে মুসলমানদের কাছ থেকে (আরবী*******) অন্যায়ভাবে এক-দশমাংশ গ্রহণ পর্যায়ে উদ্ধৃত হয়েছে। যেমন সায়ীদ ইবনে যায়েদের বর্ণনা। তিনি বলেছেনঃ আমি রাসূল করীম (স) কে বলতে শুনেছিঃ
হে আরব জনগণক, তোমরা মহান আল্লাহর প্রশংসা ও শোকর আদায় কর, যিনি তোমাদের (আরবী********) থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছেন। [(আরবী********) এর ২য় খণ্ড, ৮৭ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছেঃ হাদীসটি আহমাদ,আবূ ইয়ালা ও বাজ্জার উদ্ধৃত করেছেন। তাতে একজন বর্ণনাকারীর নাম বলা হয়নি। তা ছাড়া অবশিষ্ট সকলেই সিকাহ। ]
আর এক ব্যক্তি রাসূলে করীম (স) থেকে বর্ণনা করেছেনঃ (আরবী********) অতিরিক্ত করভার ধার্য হেব ইয়াহুদ খৃস্টানদের ওপর। মুসলমানদের ওপর (আরবী********) ধার্য হতে পাবে না অন্য এক সূত্রের বর্ণনার ভাষা ইসলামী সামাজের লোকদের উপরে (আরবী********) ধার্য হতে পারে না। [ হাদীসটি আহমাদ ( ৩য় খণ্ড, ৪৭৪ পৃ.) আতা ইবনুস সায়ের থেকে বকর ইবনে ওয়ায়েল গোত্রের এক ব্যক্তি থেকে-তার খালু থেকে এ সূত্র উদ্ধৃত করেছেন। বলেছেন, আমি বললামঃ হে রাসূল! আমি কি আমার লোকজনের ওপর অতিরিক্ত কর ধার্য করব? তিনি বললেনঃ অতিরিক্ত কর ধার্যকরণ…..।উক্ত আতা হরব ইবনে ইবায়দুযল্লাহ আসসাকাফী থেকে তার খালু থেকে এ সূত্রেও উদ্ধৃত হয়েছে। আর আতা হরব ইবনে হিলাল আস-সাকাফী আবূ উমাইয়্যাতা থেকে –(অনুরূপ) বনূ তগলবের এক ব্যক্তি তিনি নবী করীম(স) কে বলতে গুনেছেনঃ মুসলমানদের ওপর (আরবী********) নেই …… আবূ দাউদ তাঁর সুন্নান গ্রন্থে হরব ইবনে উবায়দুল্লাহ ইবনে উমাইর তার না মায়েরবাপ থেকে, তার বাবা থেকে যিনি রাসূল থেকে বর্ণনা করেছেন- এ সূত্রে হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন। দেখুনঃ (আরবী********)
আবাদুল হক বলেছেনঃ এ হাদীসটি সনদ সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। তা এমন সূত্রে আমার কাছে আসেনি যাকে দলিল বানানো যেতে পারে। ইনবুল কাতান বলেছেনঃ এ হরব সম্পর্কে ইবনে মুয়ূনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তিনি বলেছেনঃ প্রখ্যাত, সর্বপরিচিত। কিন্তু তাকে প্রমাণিত করার জন্যে এইটুকু কথা যথেষ্ট নয়।কত প্রখ্যাত ব্যক্তিই আছেন, যার বর্ণনা গ্রহণ করা হয় না। তবে তার নানা তার মায়ের পিতা –আদৌ পরিচিত নয়। তাহলে তার পিতা সম্পর্কে বলা যায়? আল মুসাভী লিখেছেনঃ হাদীসটি ইমাম বুখারী তাঁর তারীখুল কবীর গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন। তাতে বর্ণনাকারীদের ওলট-পালট অবস্থা রয়েছে। বলেছেনঃ এর সমর্থক নেই।তিরমিযী হাদীসটি যাকাত গ্রসঙ্গে। (আরবী********) এ উদ্ধৃত করেছেন সনদ ছাড়া, আহমাদ তাঁর মুসনাদে উক্ত ব্যক্তি থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। করেছেন। অন্যান্য সব বর্ণনাকারী সিকাহ। বিস্ময়েল কথা, আর মুসাভীক এটি (আরবী********) এ উদ্ধৃত করেছেন। (আরবী********)]
এ হাদীস টি শরাহ আল-মুসাভী (আরবী********) গ্রন্থে লিখিছেনঃ (আরবী********) (শুল্ক) তো কেবল ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের ওপর ধার্য হতে পারে তারা যখন সন্ধি সংঘটিত হওয়ার সময় সিদ্ধান্ত করবে কিংবা আমাদের দেশে ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে প্রবেশ করবে, তখন এ দশমাংশ তারা দেবে। এটা তাদের জন্যে বাধ্যতামূকলক। কিন্ত মুসলমানদের ওপর (আরবী********) ধার্য করা যাবে না–যাকাত কর ব্যতীত । মুসলমানদের কাছ থেকে কর গ্রহণ হারাম হওয়ার এটাই মূল ভিত্তি[(আরবী********)]
এগুলোই সংশয়ের কারণ। এজন্যেইতারা যাকাতের পাশাপাশি কর ধার্য করা জায়েয মনে করেন না।
এ পর্যায়ে আমরা বিস্তারিত ও সুস্পষ্ট আলোচনা করছি। এক্ষণে আমরা এর জবাব দেব।
প্রথম সংশয়ের জবাব
প্রথম সংশয়টি সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য এই যে, পূর্বের অধ্যায়ে আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে এ মতটি প্রত্যাখ্যান করেছি। এ জন্যে আমরা অকাট্য দলিলসমূহ পেশ করেছি। আমরা প্রমাণ করেছি ধন-মালে যাকাত ছাড়া হক প্রাপ্য আছে। এ কথাটি প্রকৃতপক্ষেই সর্বসম্মত।
দ্বিতীয সংশয়ের জবাব
ইসলাম ব্যক্তি মালিকানার মর্যাদা স্বীকার করেছে। তাতে তার ওপর অন্যান্য হক ধার্য হওয়া নিষিদ্ধ হয়ে যায়নি। দরিদ্র অক্ষম লোকদের হক রয়েছে মালদার লোকদের ধন-মালে তাদের ভ্রাতৃত্বের এবং দ্বীনী ও মানবিক সম্পর্কের দিক দিয়েও। তাদের যারা উপার্জনে অক্ষম বা যারা উপার্জন করে অভাব থেকে মুক্ত হয় না, যাদের কোন আয় নেই, এসব লোকের যে হক আছে, তা আমরা ইতিপূর্বে অকাট্যভাবে প্রমাণ করে এসেছি।
বস্তুত ব্যক্তির ধন-মালে সমষ্টির অধিকার আছে- অবশ্য স্বীকৃতব্য।কেননা ব্যক্তি সমষ্টির সহায়তা ছাড়া তা উপার্জন করতে পারেনি। এ সমষ্টিই তার সাথে সহযোগিতা করেছে কাছে থেকে কিংবা দূরে থেকে ইচ্ছা করে কিংবা কোনরূপ ইচ্ছা ছাড়াই। ধনীর সম্পদ এমনিভাবেই পুঞ্জীভূত হয়ে উঠেছে। সমষ্টি ছাড়া ব্যক্তির জীবন ও জীবিকা কখনই পূর্ণত্ব পায়নি। সামাজিক মানুষের অবস্থাই তাই। আর মানুষ যে সামাজিক জীব, তা তো জানা কথাই। সব সমাজ বিজ্ঞানীই তা বলেছেন।
এসবের উপরে পূর্বে ধন-মালে আল্লাহ্র হক স্বীকৃতব্য। তিনিই তার স্রষ্ট, দাতা-উদ্ঘাতা। তার পথ সুগমকারী। সকল ধন-মাল প্রকৃতপক্ষেই তাঁরই।মানুষ তো তার আমানতদার, তাঁর প্রতিনিধি। আর আমানতদার বা প্রতিনিধি বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কখনই সে জিনিসের নিরংকুশ কর্তা হয়না, যার দায়িত্ব বা আমানত তার কাছে অর্পণ করা হয়েছে। বরং সে তো আসলে মালিকের দাবি বা নির্দেশ অনুযায়ী ব্যয় করতে বাধ্য, তার পরিমাণ কম হোক, কি বেশী।
ইসলামী রাষ্ট্রেএমন অভাবগ্রস্ত লোক যদি থাকে, যাকাতও যাদের সচ্ছল করতে পারেনি; সামাজিক কল্যাণের দাবি প্রচণ্ড হয়ে দেখা দিলে অথবা সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে রাষ্ট্রকে বিপদমুক্ত করার লক্ষ্যে অধিক অর্থের প্রয়োজন হলে কিংবা আল্লাহ্র দ্বীনের দাওয়াত ব্রঅপকভাবে প্রচারের জন্যে বেশি টাকার দরকার হলে, ইসরাম এ দৃঢ় ও বাধ্যতামূলক ঘোষণা দিয়েছে যে, ধনী লোকদের কাছ থেকে এতটা পরিমাণ অর্থ নিতে হবে, যা এসব কাজের জন্যে একান্তই অপরিহার্য বিবেচিত হবে। কেননা উপরিউক্তি কাজগুলো বাস্তাবায়িত করা মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের জন্যই একান্ত জরুরী। কিন্তু এসব কাজ সমাধা করা বিপুল অর্থ সম্পদ ছাড়া সম্ভবপর নয়। আর সে অর্থ কর ধার্য করা ছাড়া কোথাও থেকে পাওয়ার উপায় নেই। পরন্তু প্রকৃত করত্ব্য পালন যে জিনিস ছাড়া সম্ভব নয়, সে জিনিস ওয়াজিব-অবশ্য দেয় হয়ে দাঁড়ায়।
তৃতীয সংশয়ের জবাব: শুল্ক কর শরীয়াতসম্মত কর নয়
(****) শুল্ক বা নগর শুল্ক ইত্যাদির দোষ বর্ণনায় যে সব হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে, তার অধিকাংশই সহীহ প্রমাণিত হয়নি। পূর্বে আমরা তা দেখেছি। যা-ও বা সহীহ প্রমাণিত হয়েছে, তা কর ধার্যকরণের প্রতিবন্ধক নয়। কেননা (***) বলতে অভিধান ও শরীয়াতের দিক দিয়ে একটা সুনির্দিষ্ট অর্থ মনে করা যায় না।
‘লিসানুল আরব’ অভিধান গ্রন্থে (****) এর পরিচিত স্বরূপ লিখিত হয়েছে: সে সব অর্থ যা জাহিলিয়াতের যুগে হাট-বাজারে পণ্য বিক্রয়কারীর কাছ থেকে গ্রহণ করা হতো। তাতেই লিখিত আছে: (***) তা যা কর আদায়কারীরা গ্রহণ করে।ইবনুল এরাবীবলেছেন: (***)হচ্ছে সে অর্থ, যা যাকাত সংগ্রহকারী কাজ সম্পন্ন করার পর গ্রহণ করে। এরপর এ হাদীসটির উল্লেখ করা হয়েছে: (***) গ্রহণকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। তাতে এ-ও রয়েছে: (***) সে কর বা ট্যাক্স, যা ট্যাক্স আদায়কারী নিয়ে থাকে। তার মূল হল জোরপূর্বক সংগ্রহ করা। তাতে আরও বলা হয়েছে: (****) অর্থ (***) আর (***) হচ্ছে বিক্রয় মূল্য খাটো বা ক্ষতিগ্রস্ত করা (***)-এ ধরনেরই কথা। [(আরবী **********)]
বায়হাকী বলেছৈন: (***) মানে ক্ষতি বা হ্রাস করা। কর্মচারী যদি যাকাত প্রাপকদের কম করে, তাহলে সে (****) নামে অভিহিত হবে। [(আরবী **********)]
এই প্রেক্ষিতে যাকাত আদায়ে নিযুক্ত বেতনভুক্ত কর্মচারীকে (***) বলা চলে- যে তার কাজে জুলুম করে এবং মালদার লোকদের ওপর খুব বেশী বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘন করে, তাদের কাছ থেকে তা নেয়, যা তার পাওনা নয় অথবা আল্লাহ্র মালে ধোঁকাবাজি করে, এমন মাল সংগ্রহ ও সঞ্চয় করে, যা তার নয় যা গরীব-মিসকীন ও পাওয়ার যোগ্য অন্যান্য লোকদের প্রাপ্য। (***)-এর ব্যাখ্যায় কোন কোন বর্ণনাকারী থেকে যা বর্ণিত হয়েছে (***) সে, যে যাকাত গ্রহণ করে বিনা অধিকারে- এ কথাও তা সমর্থন করে। [দেখুন: (আরবী **********)] যেমন আবূ দাউদ তাঁর গ্রন্থের (আরবী **********) এর একটি হাদীস উদ্ধৃত করেছে।
যে সব হাদীসে যাকাতের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘনকারী কর্মচারীদের সম্পর্কে কঠোর হুকমকির বাণী উচ্চারিত হয়েছে, তাও উপরিউক্ত কথার সমর্থনে স্মরণীয়। আমরা যাকাত ব্যয়ের খাত- যাকাত কর্মচারীদের পর্যায়ের আলোচনায় এ সম্পর্কে অনেক কথাই বলে এসেছি। এ কারণে হযরত সায়াদ ইবনে উবায়দা, আবূ মাসউদ, উবাদাতা, ইবনুসসামেত প্রমুখ সাহাবী (রা) নবী করীম (স) এর কাছে যাকাত আদায়ের দায়িত্বশীল কর্মচারী হওয়া থেকে অব্যাহতি প্রার্থনা করেছিলেন। কেননা এ কাজে যে সব কঠোর বাণী উচ্চারিত হয়েছে, তা তাঁরা শুনতে পেয়েছিলেন। ফলে তাদের জাহান্নামী হতে হবে, এ ভয়ে খুব বেশী ভীত হয়ে পড়েছিলেন। রাসূলে করীম (স) তাঁদের মনোবাসনা পূর্ণ করেছিলেন এবং অব্যাহতি দিয়েছিলেন।
(****) শব্দের আরও একটি ব্যবহার রয়েছে, সম্ভবত তা অধিক প্রকাশমান। তার অর্থ সে সব অত্যাচারমূরক কর, যা ইসলামের অভ্যুদয় কালে সমগ্র পৃথিবীতে ব্যাপকভাবে জারী ছিল। তখন তা নিতান্ত অন্যায়ভাবে কোনরূপ অধিকার ছাড়াই নেয়া হতো এবং তা ব্যয়ও দেয়া হতো না। এ সব কর বাবদ সঞ্চিত সম্পদ জনগণের কল্যাণে আদৌ ব্যয় বা প্রয়োগ-নিয়োগও করা হতো না। ব্যয় করা হতো রাজা-বাদশাহ্, প্রশাসক ও রাজন্যবর্গের কল্যাণে, তাদের অনুসারী সমর্থকরাও তার অংশ পেত। দেশবাসীর কাছ থেকে তা তাদের দেয়ার সাধ্য ও ক্ষমতা অনুপাতে নেয়া হতো না। ইচ্ছামত বহু ধনী লোককেই তা থেকে অব্যাহতি দেয়া হতো। আর নিতান্ত শত্রুতাবশত গরীব লোকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক আদায় করে নেয়া হতো। বহু আলিমই (****)-এর এ ব্যাখ্যাই দিয়েছেন।
হানাফী মাযহাবের কিতাব (****) গ্রন্থে বলা হয়েছে: ‘কর’ আদায়কারীদের খারাপ পরিণতি যা কিছু বলা হয়েছে, তার প্রয়োগ হবে সেই লোকের ওপর, যে জুলুম করে লোকদের ধন-মাল নিয়ে নেয়। আজকের দিনের জালিমরা তাই করছে। [(আরবী **********)]
‘দুররুল মুখতার’ প্রভৃতি গ্রন্থে বলা হয়েছে। [(আরবী **********)]
এ সব ধরনের ‘কর’ ‘আল-মাক্স’ নামে অভিহিত হওয়াই উত্তম। কেননা এ (***) সম্পর্কেই কঠিন আযাবের ধমক এসেছে। (***) অতিরিক্ত কর আদায়কারীদের তিরস্কার পর্যায়ে যা বলা হয়েছে, তা ঠিক সেই কর সংগ্রহকারীদের সম্পর্কে, যারা জুলুম করে নেয় বলে তাদের জন্যে আযাবের চাবুক তৈরী হয়ে আছে। কেননা তারা জনগণের ওপর এমন আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দেয় যা বহন করার সাধ্য তাদের নেই। জালিম লোকেরা তাই করে এবং সংগৃহীত সম্পদ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয় এবং চেষ্টাকারী ও মজলুম জনতার নামে উড়ানো হয়।
ইমাম যাহবী কবীরা গুনাহ সম্পর্কে যা বলেছেন, উপরিউক্ত কথাতার সঙ্গতিপূর্ণ। তিনি বলেছেন, অত্যাচারী কর আদায়কারী জালিমদের বড় সাহায্যকারী, বরং তারা নিজেরাই জালিম। কেননা তারা এমন সব ধন-মাল নেয়, যা নেয়ার কোন অধিকার তাদের নেই এবং তা দেয় এমন লোককে, যার তা পাওয়ার কোন অধিকার নেই। [(আরবী **********)]
তবে আমাদের পূর্বোদ্ধৃত শর্তের ভিত্তিতে যে সব কর ধার্য হবে জাতীয় বাজেটের ব্যয়-প্রয়োজন পূরণ এবং উৎপাদন ও জনসেবামূলক কার্যাবলীতে দেশের অভাব মোচনের লক্ষ্যে, যা সামরিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভৃতি ক্ষেত্রের জাতীয় কল্যাণসমূহ কাজে ব্যয় করা হবে, প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে জাতীয় অগ্রগতি সাধন, মূর্খকে জ্ঞান শিক্ষাদান, বেকারের কর্মসংস্থান, ক্ষুধার্তের ক্ষুণ্ণিবৃত্তি, ভীত-সন্ত্রস্তকে নিরাপত্তা দান, রোগীর চিকিৎসা, প্রসূতির তত্ত্বাবধানের জন্যে যেসব কর ধার্য করা হবে- ইসলামের জ্ঞানসম্পন্ন প্রত্যেক ব্যক্তিই স্বীকা করবে যে, এ কর সম্পূর্ণ জায়েয। শুধু জায়েয নয়, তাওয়াজিব- দেয়া একান্ত কর্তব্য। ইসলামী সরকারের তা ধার্য করার অধিকার আছে, তেমনি তা কল্যাণ ও প্রয়োজনানুরূপ গ্রহণ করারও অধিকার আছে।
মুসলমানদের (****) মুক্তি সংক্রান্ত হাদীসের তাৎপর্য
যে হাদীসটিতে (******) অর্থাৎ নানাবিধ করের বোঝা থেকে মুসলমানদের নিষ্কৃতি দানের কথা বলা হয়েছে, একে তো সে হাদীসটি সহীহ নয় এবং তাদের বক্তব্যে তা খুব স্পষ্টও নয়। তার অনেক কয়টি সহীহ অর্থ হতে পারে এবং তা অতি সহজেই গ্রহণ করা যেতে পারে কোনরূপ কৃত্রিমতা বা অবিচার ছাড়াই।
আবূ উবাইদের ব্যাখ্যা
কর আদায়কারী (****) সম্পর্কে আযাবের হুমকির উল্লেখসহ যে সব হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে, সাহাবীদের কথায় তার যে সমর্থন পাওয়ার যায় তা সবই উল্লেখ করার পর ইমাম আবূ উবাইদ বলেছেন: ‘আমরা এই যে সব হাদীসের উল্লেখ করলাম, যাতে কর আদায়কারীর উল্লেখ রয়েছে, যাতে কর আদায় করাকে অপসন্দ করার কথা বলা হয়েছে ও কঠোরতা প্রকাশ করা হয়েছে আসলে এগুলোর মূল রয়েছে জাহিলিয়াতের যুগ। তখনকার আরব-অনারব রাজা-বাদশা সকলেই এ ধরনের কর আদায় করত। তাদের নিয়মছিল তারা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তাদের ধন-মালের এক-দশমাংশ নিত, যখন তারা তাদের দেশে ব্যবসা করার জন্যে আসত। নবী করীম (স)-এর লিখিত প্রেরিত পত্রাদি থেকেও আমরা এরই প্রমাণ পাই। এ সব চিঠি তিনি বিভিন্ন এলাকা ও দেশের লোকজনের প্রতি পাঠিয়েছিলেন। তাতে তিনি লিখেছিলেন: তাদেরকে একত্রিত করা হবে না, তাদের কাছ থেকে এক-দশমাংশ নেয়া হবে না- এ থেকে আমরা জানতে পারি যে, এটা জাহিলিয়াতের জামনার রীতি ছিল। এ পর্যায়ে অবশ্য বহু সংখ্যক হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে। পরবর্তীকালে আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর রাসূল ও ইসলামের সাহায্যে তা বাতিল করিয়ে দিয়েছেন এবং যাকাত ফরয করেছেন এক-দশমাংশের এক চতুর্থাংশ ধার্য করে। প্রতি দুইশত দিরহামে পাঁচ দিরহাম। যে লোক তাদেরকাছ থেকে এ ফরয বাবদ ধার্য অংশ নেবে, সে হাদীসে কথিত কর আদায়কারী গণ্য হবে না। কেননা সে এক-দশমাংশ নিচ্ছে না। সে যা গ্রহণ করেছে, তা এক-চতুর্থাংশ। হাদীসে এই ব্যাখ্যাই দেয়া হয়েছে এই বলে যে, মুসলমানদের ওপর (****) নেই। (***) হবে ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের ওপর। যে হাদীস মরফু উদ্ধৃত হয়েছে, তাতেও এ কথাই বলা হয়েছে। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, (****) বলা হয়েছে তাকে, ‘যে লোকদের কাছ থেকেসাদকা গ্রহণ করে কোনরূপ অধিকার ছাড়াই। ইবনে উমর বর্ণিত হাদীসটির ব্যাখ্যাও তাই। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: আপনি কি জানেন হযরত উমর মুসলমানদের কাছ থেকে ‘এক-দশমাংশ’ গ্রহণকরী ছিলেন? বললেন: না, আমি তা জানি না। জিয়াদ ইবনে হুদাইর বর্ণিত হাদীসও অনুরূপ। তিনি বলেছেন: আমরা মুসলমান ও চুক্তিবদ্ধ লোকদের কাছ থেকে এক-দশমাংশ নিতাম না। একথা বলে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন: আমরা মুসলমানদের কাছ থেকে এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ নিতাম। আর যিম্মীদের কাছ থেকে অর্ধ-ওশর।
এ প্রেক্ষিতে মুসলমানদের ওপর থেকে (***) তুলে নেয়ার অর্থ দাঁড়ায়- তাদের ওপর অবশ্য যে দেয় হিসেবে ধার্যের পরিমাণ হ্রাস করা হয়েছে সেইহার থেকে, যা জাহিলিয়াতের যুগের আরব-অনারব রাজা-বাদশাহরা আদায়করত এবং এক্ষণে তার পরিমাণ এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ ধার্য হয়েছে, ইসলাম ব্যবসাপণ্যে যাকাত হিসেবে এ পরিাণটা ধার্য করেছে। হাদীসে এ ইয়াহুদী ও খৃস্টান বলতে সেকালের বিশেষ করে যুদ্ধরত লোকদেরকেই বুঝিয়েছে। যেমন আবূ উবাইদ আবদুর রহমকান ইবনে মাকাল থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেছেন: আমি জিয়াদ ইবনে হুদাইরকে জিজ্ঞেস করলাম: আপনার এক-দশমাংশ নিতের কাদের কাছ থেকে? বললেন: আমরা মুসলমান কিংবা চুক্তিবদ্ধ লোকদের কাছ থেকে এক-দশমাংশ নিতাম না। বললাম: তাহলেকাদের কাছ থেকে নিতেন? বললেন: অমুসলিম যুদ্ধরত (জাতির যে সব লোক দারুল ইসলামে ব্যবসা করে সেই) ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে- যেমন করে তারা আমাদের কাছ থেকেনিত, যখন আমরা তাদের দেশে যেতাম। [(আরবী **********)]
এটা বিজাতীয় লোকদের প্রতি গৃহীত আচরণ পর্যায়ের ব্যাপারে অর্থাৎ লোকদের সাথে সেরূপ আচরণ গ্রহণ, যেমন ভাইদের রাষ্ট্রসমূহ মুসলমানদের প্রতি আচরণ করত। এ এমন একটা মৌল নীতি, যা আজ পর্যন্ত অনুসরণ করা হচ্ছে।
তবে ইয়াহুদী-খৃস্টানদের মধ্যে যারা যিম্মী হয়েছিল, তাদের কাছ থেকেও এক-দশমাংশ নেয়া হত না, যেমন নেয়া হত যুদ্ধরত জাতির লোকদের কাছ থেকে। তার এক-চতুর্থাংশও নেয়া হত না, যেমন তা নেয়া হত মুসলমানদের কাজ থেকে। তাদের কাছ থেকে নেয়া হত অর্ধ-ওশর। আবূ উবায়েদের কাছে এটা দুর্বোধ্য হয়ে পড়েছে। প্রথমত তিনি এর তাৎপর্য বুঝতে পারেন নি। পরে আমি গভীরভাবে হযরত উমর সংক্রান্ত হাদীসটি বুঝতে চেষ্টা করি। আমি দেখতে পাই, তিনিতাদের সাথে এইশর্তে একটা চুক্তি করেছিলেন। এটা মাথাপিছু জিযিয়া ও জমির খারাজ দেয়ার বাইরের ব্যাপার। এমনিভাবে হাদীসটি চলেছে।পরে বলেছেন: আমি দেখলাম, তাদের ব্যবসায়ীদের কাছ তেকে গ্রহণটাই ছিল সন্ধির মূল কথা। এক্ষণে তা তাদের ওপর মুসলমানদের প্রাপ্ত অধিকার। [(আরবী **********)]
সম্ভবত এ বৃদ্ধিকরণ যা তাদের ব্যবসায়ীরা বহন করত,-এটা ছাড়া তাদের গবাদি পশু ও সঞ্চিত নগদ সম্পদ থেকে কিছু কিছুই নেয়া হত না বলেই হয়েছিল অথচ মুসলমানদের এ সম্পদেরও যাকাত দিতে হয়। [দেখুন: (আরবী **********)]
তিরমিযীর ব্যাখ্যা
হাদীসে (***) উল্লেখিত হয়েছে, তার আরও একটি ব্যাখ্যা রয়েছে। তা হল, এটা জিযিয়া। আবূ দাউদ কর্তৃক উদ্ধৃত কোন কোন বর্ণনায় সে কথা এসেছে এভাবে: মুসলমানদের ওপর খারাজ নেই। কেননা জিযিয়াকেও ‘মাথা পিছু খারাজ’ বলা হত তখনকার সময়ে।
ইমাম তিরমিযী তাঁর ‘সুনান’ গ্রন্থে লিখেছেন: নবী করীম(স) এর কথা: ‘মুসলমানদের ওপর (***) নেই’ তার অর্থ ‘মাথা পিচু জিযিয়া’। এ ব্যাখ্যাটা মুল হাদীসেই রয়েছে। তিনি বলেছৈন: (****) কেবলমাত্র ইয়াহুদী খৃস্টানদের ওপর, মুসলমানদের ওপর (***) নেই। [(আরবী **********)]
এ দলিলের ভিত্তিতে বলা হয়েছে যে, যিম্মী যদি ইসলাম কবুলকরে তাহলেতার ওপর থেকে জিযিয়া প্রত্যাহৃত হবে।
আল-মুনতাভীর অভিমত ও তার পর্যালোচনা
আশ্চর্যের বিষয়,আল্লামা আল-মুনাভীর তাঁর (***) গ্রন্থে হাদীসটিকে মুসলমানের কাছ থেকে ‘কর গ্রহণ হারাম হওয়ার মূলভিত্তি’ ঘোষণা করার পর লিখেছেন: সম্ভবত এ হাদীসটি হযরত উমর পাননি। তাই তিনি (***) গ্রহণ করেছেন। মুকারেজী প্রমুখ বলেছেন: হযরত উমর জানতে পারলেন যে, যে মুসলমান ব্যবসায়ীরা ভারত আগমন করে, তাদের কাছ থেকে এক-দশমাংশ নেয়া হয়। তখন তিনি বসরার শাসনকর্তা হযরত আবূ মূসা আল-আশআরীকে লিখছেন: তোমার এলাকায় যে মুসলিম ব্যবসায়ী আসে তাদের কাছ থেকে প্রতি দু’শ দিরহামে পাঁচ দিরহাম এবং চুক্তিবদ্ধ যিম্মী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতি বিশ দিরহামে এক দিরহাম গ্রহণ কর। পরে উমর ইবনে আবদুল আজীজ তা লোকদের ওপর থেকে প্রত্যাহার করে নেন। [(আরবী **********)]
এ বর্ণনা থেকে জানা গেল, তিনি জানতে পেরেছেন, হযরত উমর তাঁর একজন প্রাদেশিক গভর্ণরকে লিখেচিলেন: লোকদের ওপর থেকে (***) প্রত্যাহার করা হোক। আর অপর একজনের কাছে লিখেচিলেন, ‘সওয়ার হয়ে (****) ‘ট্যাক্স ঘরের’ দিকে যাও এবং সেটিকে ধুলিসাৎ করে দাও।’ [(আরবী **********)]
সত্যি কথা এই যে, আল-মুনাভীর উপরিউক্ত বক্তব্য সম্পর্কে গভীর সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে বিন্তা-ভাবনা, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও সত্যানুসন্ধানের বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে।
ক. তিনি (***) সংক্রান্ত হাদীসকে সহীহ বা হাসান বলেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা সহীহ নয় হাসানও নয়। তিনি নিজেই তা (****) গ্রন্থে বিশ্লেষণ করেছেন।
খ. তিনি ধরে নিয়েছেন যে, তাঁর দৃষ্টিতে যে হাদীসটি সহীহ ও সপ্রমাণিত, হযরত উমর তার বিপরীত কাজ করেছেন এবং তাঁর সময়ে কোন সাহাবীই তাঁকে এ বিষয়ে অবহিত করেন নি। যদিও তখন বিপুল সংখ্যক সাহাবী বর্তমান ছিলেন এবং দ্বীনী ব্যাপারে তাঁরা খুবই সচেতন দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন ছিলেন। রাষ্ট্রীয় ব্যাপারাদির সাথেও তারা গভীর ও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। তা ছিল বিপুল জনগণের সাথে কোনক্রমেই গোপন থাকতে পারে না।
গ. হযরত উমর (রা) যা করেছেন, সাহাবিগণও যার প্রতিবাদ করেন নি- বহাল রেখেছেন, লেখক তাকে একটা অন্যায়-বরং কবীরা গুনাহ গণ্য করেছেন। কেননা তিনি (***) নিয়েছেন, যা নিলে সে লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এ কথাটি বিরোধী হয়ে পড়ে খুলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাতের অনুসরণ করার যে নির্দেশ আমাদেরকে দেয়া হয়েছে তার। কেননা হযরত উমর (রা) সর্বসম্মতভাবেই তাঁদেরই একজন।
ঘ. তাঁর বক্তব্যের তাৎপর্য হচ্ছে, উমর ইবনে আবদুল আজীজ হযরত উমর ফারুক প্রবর্তিত একটি জুলুমের ব্যবস্থা লোকদের ওপর থেকে প্রত্যাহার করেছেন অথচ ঐতিহাসিক সত্য প্রমাণ করে যে, উমর ইবনে আবদুল আজীজ হযরত উমরের সুন্নাত পুনরুজ্জীবিত করার দায়িত্ব পালন করেছেন। এ কারণে তাঁর সংশয়ের সৃষ্টি হযেছে। উমর ইবনে আবদুল আজীজ তো বনু উমাইয়া প্রবর্তিত জুলুম ও শোষনমূলক ব্যবস্থাবলীল মূলোৎপাটন করেছেন। তারা তাঁরই বংশের লোক ছিল। কেননা তাঁর কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ওদের তুলনায় অধিক প্রিয় ছিলেন।
এ আলোচনা থেকে আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, উমর ইবনে আবদুল আজীজ যা উৎখাত করেছেন, তা হচ্ছে অবিচার, জুলুম, মানুষকে কষ্টদান, শরীয়াত অর্পিত দায়িত্ব ও অধিকার লঙ্ঘন এবং যে সব শর্ত ও সীমা স্বীকার করে নেয়া হতো তা রক্ষা না করা। কার কাছ থেকে কি নেয়া হবে, কি কাজে নেয়া হবে, কখন নেয়া হবে কি ভাবে নেয়া হবে- এ বিষয়ে পূর্বে কিছুই ঠিক-ঠিকানা ছিল না। ফলে জনগণ খুব খারাপভাবে কর আদায় করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, কর আদায়কারীদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ফরিয়াদ করে। পঞ্চম খলীফায়ে রাশেদ এগুলো শক্ত হস্তে দূর করেছিলেন।
ইবনে হাজম উদ্ধৃত একটি কাহিনী- যার উল্লেখ আমরা ইতিপূর্বে একবার করেছি- উপরিউক্তি কথার সত্যতা প্রমাণ করে। জুরাইক [(****) পেশ (**) জবর- আবঊ উবাইদ (***) গ্রন্থের ১৬৬১ পৃষ্ঠায় এ পাঠই গ্রহণ করছেন। কেনা মির ও সিরিয়াবাসীরা এভাবেই বলে, তারাই এ বিষয়ে ভাল জানে। বুখারী, যাহবী প্রমুখ প্রথমে (***) লিখেছেন।] ইবনে হায়ান আদ-দেমাশকী মিসরের প্রবেশ পথে দায়িত্বশীল কর্মচারী ছিলেন। তিনি বলেন: উমর ইবনে আবদুর আজীজ আমাকে লিখেছেন: নজর দাও তোমার কাছে যে মুসলমানই যাবে, তাদের প্রকাশমান ধন-মাল যা তারা ব্যবসায়ে আনা-নেয়া করে, তার প্রতি চল্লিশ দীনারের এক দীনার গ্রহণ করবে। তার কম হলে অনুরূপ হিসেবে হার নিতে হবে। [দেখুন: (আরবী **********)]
এখানে আমার মনে হচ্ছে, ‘মুসলমানদের ওপর (***) নেই’ এ হাদীসটি সনদের দিক দিয়ে একথা পম্রাণ করে না যে, মুসলমানদের কাছ থেকে সুবিচারপূর্ণকর গ্রহণও হারাম- মুসলিম রাষ্ট্রের প্রয়োজন দেখা দিলেও। তা প্রমাণের দি দিয়েও যথার্থ নয়। এবং তাৎপর্যের দিক দিয়েও তা প্রমাণ করে না।
চার মাযহাবের ফিকাহ্বিদগণ সুবিচারপূর্ণ কর জায়েয মনে করেন
পূর্ববর্তী আলোচনায় সব শোবাহ সন্দেহ দূর হয়ে গেছে বলে মনে করি। সুবিচারপূর্ণ কর ধার্যের বিরোধীরা এ সব শোবাহ ও সন্দেহেরই আশ্রয় নিত। এ পরিচ্ছেদে আমরা যা বিশ্লেষণ করেছি তার তাগিদ অনুযায়ী এ কথা বলা প্রয়োজন যে, ইসলামী ফিকাহ্ যাকাত ছাড়াও- যাকাতের বাইরেও কর ধার্যকরণের সাথে যথার্থভাবে পরিচিত অর্থাৎ সুবিচারমূলক কর ধার্যের বৈধতা চার অনুসৃত মাযহাবের ফিকাহি্বিদগণ স্বীকার করেছেন। অবিচারমূলক কর সম্পর্কেও তাঁরা অবহিত। সে বিষয়ে তাঁরা বিভিন্ন হুকুম-আহকাম প্রণয়ন ও সংকলন করেছেন। কিন্তু তাঁরা এটি ওটির ওপর (***) ‘কর’ নাম আরোপ করেননি। মালিকী ফিকাহ্র কেউ কেউ তার নাম দিয়েছেন (***) অথবা (***) ‘আল-খারাজ’
হানাফীদের কেউ কেউ তার নাম দিয়েছেন (****) এক বচনে (***) ব্যক্তি শাসকেরদিক থেকে যে প্রতিনিধিত্ব করে- সত্যভাবে কিংবা বাতিল ভাবে, তারই নাম হচ্ছে: (****)
হাম্বলী মাযহাবের কেউ কেউ তার নাম দিয়েছেন (*****) ‘রাষ্ট্র অর্পিত দায়িত্ব’ অর্থাৎ সে সব অর্থনৈতিক দায়িত্ব, যা রাষ্ট্র বাধ্যতামূলক জনগণের ওপর কিংবা এক শ্রেণীর লোকের ওপর জারী করে দেয়।
হানাফী ফিকাহ্তে
হানাফী ফিকাহতে তাদের প্রাচীন ও শেষের দিকের ফিকাহ্বিদগণ এ সুবিচারমূলক কর ধার্য করা এবং তার শরীয়াতসম্মত হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন, দেখতেই পাই। আল্লামা ইবনে আবেদীন উল্লেখ করেছেন: ‘নাওয়ায়েরব’ সত্যভিত্তিকও হয়েথাকে। যেমন, সংযুক্ত খালের ভাড়া লওয়া, মহল্লার পাহারাদারের মজুরী- মিসর দেশে তার নাম ‘আল-খফীর’, রাষ্ট্রপতিকে ‘অযায়েফ’ দেয়া, যেন সে সেনাবাহিনীকে সুসজ্জিত করতে পারে, বন্দীদের মুক্তিপণ দেয়া যদি তার প্রয়োজন দেখা দেয়, বায়তুলমালে কিছুই যদি না থাকে, তাহলে তা জনগণের কাছ থেকেই পেতে হবে। (*******) অর্থ তাদের ওপর আবর্তিত ভাবে ফরয করে দেয়া হবে।
কোন কোন ‘নাওয়ায়েব’ অকারণ ও অন্যায়ভাবেও হয়ে থাকে। ইবনে আবেদীন বলেন: যেমন আমাদের একালের বিভিন্ন নামে ও খাতে কর আদায় করা। [(আরবী **********)]
হানাফী কিতাব ‘আল-ফন্নিয়া’য় বলা হয়েছে:
আবূ জাফর আল-বালখী বলেছেন: রাষ্ট্র জনগণের ওপর তাদের কল্যাণার্থে যা কিছু ধার্য করে [(****) শব্দটি (***) থেকে এবং তা থেকেই (****) নিষ্কৃত কর ধার্য করা।], তা দ্বীনী কর্তব্য হয়ে পড়ে এবং সত্যভিত্তিক অধিকার বলে বিবেচিত হবে- যেমন খারাজ। আমাদের মাশায়েখগণ বলেছেন: রাষ্ট্রপ্রধান জনগণের ওপর যা কিছু ধার্য করবে, তা তাদের কল্যাণের জন্য হয়েছে মনে করতে হবে। তার জবাবও অনুরূপ হওয়া বাঞ্ছনীয়। এমন কি রাস্তাঘাটে চোর-ডাকাতের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্যে নিযুক্ত পাহারাদারদের মজুরী, রাস্তাঘাট নির্মাণ, পথসমূহের দ্বারা নির্মাণ এ কথা শুধু জানতে হবে, প্রচার করা চলবে না, ফেতনার ভয় আছে। সামষ্টিক কল্যাণের কাজ। পরে লিখেছেন: এই আলোকে বলা যায়, খাওয়ারিজমে জীহুন বারবজ নদী সংস্কারের জন্যে জনগণের কাছ থেকে যা কিছু নেয়া হয়, তা সাধারণের কল্যঅণের জন্যে অবশ্য দেয়। তা দিতে অস্বীকার করা জায়েয নয়। এটা জুলূম নয়। কিনতউ জানা যায়, এ জবাব তদানুযায়ী আমল করার উদ্দেশ্যে,রাষ্ট্র ও এ কাজে নিয়েঅজিত তার কর্মচারীদের সম্পর্কে মানুষকে মুখকে বিরত রাখার জন্যে- ব্যাপক প্রচারের জন্যে নয় যেন প্রকৃত প্রয়োজন পরিমাণের চাইতে বেশী নেবার দুঃসাহস না দেখায় অর্থাৎ উক্ত ফতোয়াটি ব্যাপকভাবে প্রচার করা এবং জনগণকে সাধারণভাবে জানানোই উদ্দেশ্য নয়।
ইবনে আবেদীন তাঁর (***) টীকায় উপরিউক্ত কথা উদ্ধৃত করেছেন। পরে বলেছেন, উক্ত কথাটিকে এ শর্তের মধ্যে রাখা আবশ্যক যে, তা ধার্য করা যাবে এবং দেয়া ওয়াজিব হবে যদি বায়তুলমালে তার জন্যে প্রয়েঅজন পরিমাণ সম্পদ মওজুদ না থাকে। [(আরবী **********)]
উপরে যে প্রমাণটা উদ্ধৃত হল, তা আমাদের বক্তব্যের সুস্পষ্ট প্রমাণ। উপরিউক্ত ফিকাহ্বিদগণ এইটুকু বলাই যথেষ্ট মনে করেছেন যে, রাষ্ট্র জনগণের কল্যাণে যা কিছু কর ধার্য করে তা দ্বীনী ওয়াজিব, ন্যায্য অধিকার হিসেবেই তা প্রাপ্য। এতদসত্ত্বেও তাঁরা উক্ত কথার সাথে সংশ্লিষ্ট করেছেন তাদের এ কথা: এ ব্যাপারটি বুঝতে হবে, ব্যাপক প্রচার করা যাবে না। কেননা ফেতনা ফাসাদের ভয় আছে। তার অর্থ-তাঁরা মনে করেন, উক্ত ফতোয়াটি ফিকাহ্বিদ এবং তাঁদের ছাত্রদের বিশেষ পরিমণ্ডলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। শাসক এবং তাদের সাঙ্গ-পাঙ্গ সমর্থক-সাহায্যকারীদের মধ্যেতা প্রকার করা যাবে না। কেননা তারা প্রকৃত প্রাপ্য পরিমাণের ওপর অধিক চাপিয়ে দেয়ার দুঃসাহস করতে পারে। তাতে জনগণ অর্থনৈতিক চাপে কষ্ট পাবে- কারণ বা অকারণে।
অবশিষ্ট তিন মাযহাবের ফিকাহ্তে
মালিকী মাযহাবের শায়খ আল-মালিক বলেছেন: মুসলিম জনগণের ওপর ‘খারাজ’ ধার্যকরণ সাধারণ জনকল্যঅণমূরক পদক্ষেপের মধ্যে গণ্য। তা জায়েয হওয়ার ব্যাপারে আমাদের কোনই সন্দেহ নেই। আমাদের এ কালে অধিক প্রয়োজন দরুন আন্দালুসীয় দেশে তা ধার্য করার কল্যাণ প্রকাশিত হয়েছে। শত্রুরা মুসলমানদের কাছথেকেতা এক্ষণে আন্দালুসিয়ায় নিঃসন্দেহে জায়েয। যে পরিমাণ প্রয়েঅজন, তার ওপর নজর রাখতে হবে, তা রাষ্ট্র প্রধানের ওপর সমর্পিত। [(আরবী **********)]
পূর্বে আমরা দুজন ইমামের (আল-গাযযালী ও শাতেবীর) মত উদ্ধৃত করেছি।তাঁরা দুজনই এ খারাজ ধার্য করা জায়েয বলেছেন- যদি বায়তুলমাল শূন্য হয় এবং রাষ্ট্রপ্রধান তার প্রয়োজন মনে করে।
সরকার কর্তৃক চাপানো দায়িত্ব এবং যুক্তভাবে করা জুলুম পর্যায়ে ইমাম ইবনে তাইমিয়ার কালাম একটু পরই উদ্ধৃত করা হবে। তিনি রাষ্ট্র যা গ্রহণ করে তার অনেকটা মাল দ্বারা জিহাদ হিসেবে জায়েয মনে করেছেন। তা ধনীদের ওপর দেয় কর্তব্য হবে। যেমন (***) গ্রন্থকারের উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে। [(****) কাশফুজুনুন ২-১২১৩ তে যেমন উদ্ধৃত হয়েছে। (আরবী **********)]
শেষ পর্যন্ত চারটি মাযহাবের প্রত্যেকটি মাযহাবের আলিম ও সম্মানিত ইমামগণ সুবিচারপূর্ণ কর ধার্য করাকে জায়েয বলে ফতোয়া দিয়েছেন যদিও তাঁদের কেউ সরকারী কর্মচারীদের বাড়াবাড়ি করার ও জনগণের ওপর জুলুম করার ভয়ে এ ফতোয়াকে ব্যাপক প্রচার সংরক্ষিত রাখার পক্ষপাতী।
অত্যাচারমূলক কর পর্যায়ের ফিকহী খুঁটিনাটি
রাষ্ট্র সরকার জুলুমমূলক ও অন্যায়ভাবে যে সব কর ধার্য করে, তা ‘নাওয়ায়েব’ কিংবা সরকার চাপানো দায়িত্ব বা ‘অযায়েফ’ বলে পরিচিত।
এ জুলুমমূলক কর সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে, তার বহু খুঁটিনাটিও প্রকাশিত হয়েছে। তন্মধ্য থেকে কয়েকটির উল্লেখ এখানে করা যাচ্ছে:
ক. এ ধরনের কর দ্বারা দায়িত্ব গ্রহণের কাজ করা যেতে পারে যদিও তা না হক ভাবে ধার্য হয়েছে অর্থাৎ কোন লোক যদি কর বাবদ প্রাপ্ত সম্পদ দ্বারা অন্য কারোর ভরণপোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করে, সে তা ফিরিয়ে দিতে পারে। কেননা জালিমতা তার কাছ থেকে নিয়েছে। এ অর্থে নয় যে, জালিম দায়িত্ব গ্রহণকারীর কাছ থেকে তা দাবি করে নেয়ার অধিকার রাখে- তা প্রমাণিত হচ্ছে না। [(আরবী **********)]
খ. যে লোক কর- এর বোঝা বণ্টন করে দেয়ার ব্যবস্থা করবে, তাকে সেজন্যে সওয়াব দেয়া হবে, যদি মূলত তা গ্রহণ বাতিল ও জুলুম হয়, তবুও। তাঁরা বলেছেন: ফিকাহ্ ভাষায় (***) অর্থ পারস্পরিক সুবিচারমূলক আচরণ অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর তার সাধ্য অনুপাতে আর্ধিক বোঝা চাপানো। কেননা কর পরিমাণ নির্ধারণের দায়িত্ব যদি জালিমেরহাতে ছেড়ে দেয়া হয় তাহলে অনেক সময় তাদের কেউ কেউ জনগণের ওপর তাদের সাধ্যের অধিক বোঝা চাপিয়ে দিতে পারে। তখন জুলুমের ওপর জুলুম করা হবে। এমতাবস্থায় যদি কোন ওয়াকিফহাল ব্যক্তি কর-বোঝা সুবিচারের সাথে বণ্টন করার দায়িত্ব নেয়, তাহলে জুলূমের মাত্রা কম হবে বলে আশা করা যায়। এ কারণে তাকে সওয়াব দেয়া হবে বলে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। [(আরবী **********)]
গ. এসব ‘নওয়ায়েব’ ও কর আদায় ইত্যাদি যা অন্যায়ভাবে চাপানো হয়, তার প্রতিরোধ করা- কোনরূপ কৌশল বা সুপারিশ কিংবা এ ধরনের অন্য কিছুর সাহায্যে তা এড়িয়ে যাওয়া জায়েয হবে- যদি তার ভাগের করটা অবশিষ্টদের ওপর চাপানো না হয়। যদি অবশিষ্টদের তার বোঝা বহন করতে হয়, তাহলে তা এড়ানো উচিত হবে না।
কেউ কেউ একটা সমস্যা হিসেবে বলেছেন, এভাবে ধার্য করা কর দেযা হলে তাতে বরং জালিমের জুলুম কাজে সাহায্য করা হবে। তাই যার পক্ষে জুলুমকে নিজের থেকে প্রতিরোধ করা সম্ভব, তা করাই তার পক্ষে মঙ্গলজনক হওয়া উচিত।
অন্যরা এ সমস্যার সমাধান দিয়েছেন এই বলে যে, তাঁর নিজের থেকে এ জুলুম প্রতিরোধের ফলে সমাজের দুর্বল ও অক্ষম লোকদের ওপর নানাবিধ জুলূম নির্যাতন চালানোর আশংকা দেখাদিতে পারে, যা থেকে নিজেদের রক্ষা করার কোন কৌশল উপায় বা সুপারিশ অর্জন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। [(আরবী **********)] একথাটি খুবই যথার্থ।
এ অত্যাচারমূলক কর-বোঝা বহন করার ব্যাপারে ধনী লোকদের মধ্যে সমতা ও সাম্য প্রতিষ্ঠা ওয়াজিব হওয়ার বিষয়ে ইমাম ইবনে তাইমিয়া অতীব উত্তম কালাম পেশ করেছেন। তিনি ‘সামষ্টিক ও সম্মিলিত জুলুমমূলকত কর’ –যা একটা গ্রাম বা শহরের শরীক সব মানুষের কাছ থেকেই দাবি করা হবে- সে বিষয়ে তিনি লিখেছেন:
‘যখন তাদেরসকলের কাছ থেকে কোন জিনিস দাবি করা- নিতে চাওয়া হবে, যা তাদের ধন-মাল থেকে মাথাপিছু গ্রহণ করা হবে- যেমন সরকারী আর্থিক চাপ, যা তাদের সকলের ওপর চাপানো হবে- হয় তাদের মাথা গুণতি হিসেবে অথবা তাদের যানবাহনের সংখ্যানুপাতে কিংবা তাদের গাছের সংখ্যা হিসেবে বা তাদের ধন-মালের পরিমাণ হিসেবে- যেমন তাদের অধিকাংশ থেকে শরীয়াতের ফরয যাকাত নেয়া হয়, শরীয়াতী ওয়াজিব খারাজ নেয়া হয় কিংবা শরীয়াতী জিনিসের বাইরে সরকারের চাপানো অর্থ নেয়া হয়- যেমন খাদ্য-পোশাক-যানবাহন ফল-ফাকড়া ইত্যাদি ক্রয়কারী ও বিক্রেতার ওপর ধার্য করা হয়- যদিও বলা হয়েছে যে, এটা তাদের মাল দ্বারা জিহাদ করা স্বরূপ ধার্য করা হয়েছে- জিহাদের এসব জিনিসযদি প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে- যেমন (****)-এর লেখক উল্লেখ করেছেন, তাতে যে জুলুম প্রবেশ করেছে, যার কোন যৌক্তিকতাই আলিমগণের কাছে স্বীকৃত নয় এবং যেমন সম্রাটের আগমন বা তার সন্তান হওয়া প্রভৃতি সাময়িক কাজ উপলক্ষে যা সংগ্রহ করা হয়- হয় তাদের ওপর একটা পণ্য নিক্ষেপ করা হবে তার মূল্যের চাইতেও বেশী দামে- তার নাম রাখা হয়েছে (***) এবং যেমন একটি কাফেলার লোকদের মাথা পিচু পিছু দাবি করা হবে অথবা তাদের জন্তুর সংখ্যা বা ধন-মালের পরিমাণ অনুযায়ী অথবা তাদের সকলেরই কাছ থেকে চাওয়া হবে-
…. এসব নিপীড়ত লোকেরা যারা এসব খাতে মাল দিতে বাধ্য হয়, তাদের কাছ থেকে যা চাওয়া হবে তাতে সুবিচারকে অপরিহার্য করে নেয়া। এ ব্যাপারে তাদের পারস্পরিকভাবে একের অপরের ওপর জুলুম করা উচিত নয়। বরং তাদের উচিত কাছ থেকে অন্যায়ভাবে যা নেয়া হচ্ছে তাতে বাধ্যতামূলকভাবে সুবিচর প্রতিষ্ঠা করা।যেমন উচিত ন্যায়সঙ্গতভাবে যা নেয়া হচ্ছে তাতে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা। কেননা এই যা কিছু সরকারী অর্থনৈতিক দাবি তাদের কাছ থেকে আদায় করে নেয়া হচ্ছে তাদের লোকসংখ্যা ও তাদের ধন-মালের দরুন, তাদের তুলনায় ভিন্নতর। তার অবস্থা বিভিন্ন হয় গ্রহণের দিক দিয়ে। কখনও গ্রহণকারী ন্যায়সঙ্গতভাবে নেয় আর কখনও তা বাতিলভাবে গ্রহণ করে। কিন্তু যাদের কাছে তা দাবি করা হয়েছে, এসব সরকারের অর্পিটত দেয় তাদের কাছ থেকে গ্রহণ করা হবেচ তাদের লোকসংখ্যা ও ধন-মালের কাণে। অতএব তাদের পরস্পরের উচিত নয় পরস্পরের ওপর জুলুম করা। বরং সর্বাবস্থায় পরস্পরের ওপর সুবিচার করাই প্রত্যেকের কর্তব্য। জুলুম কোন অবস্থায়ই বিধিসম্মত হতে পারে না।
অতএব উপরিউক্তি শরীক লোকদের এ অধিকার নেই যে, অন্যরা যেভাবে নিপীড়িত ও অত্রাচারিত হয়েছে, তারাও তা-ই হবে। বরং হয় সে তার অংশের দেয় দেবে- তাহলে সে সুবিচারকারী বিবেচিত হবে অথবা তার অংশের চাইতে অতিরিক্ত দেবে- তাহলে সে তার শরীক লোকদের সাহায্য করতে পারবে তাদের কাছ থেকে যা নেয়া হয়েছে, তাতে এবং সে অতীব ন্যায়কারী গণ্য হবে। তার পক্ষেসেই মালে তার জন্যে নির্দিষ্ট অংশ দিতে অস্বীকার করা ঠিক হবে না, যা অন্য সমস্ত শরীক থেকে নিয়ে নেয়া হবে। তাহলে তাদের ওপর দ্বিগুণ জুলুম করা হবে। কেননা ধার্য মাল তো নেয়া হবেই অনিবার্যভাবে। তাই কেউ যদি স্বীয় মর্যাদাবা ঘুষ বা এ ধরনের অন্য কিছুর সুযোগ তাদেয়া থেকে বিরত থাকে, তাহলে তার জন্যে নির্দিষ্ট অংশের মাল যার কাছ থেকে নেয়াহবে, সেতার ওপর জুলুমকারী হবে। তার ওপর থকে জুলুম প্রতিরোধ করার ফলে অন্য ব্যক্তির ওপর জুলুমকরা হবে অনিবার্যভাবেযদি অন্যদের ওপর জুলুম না হয়, তাহলে তা হবে তার জন্যে নির্দিষ্ট অংশ দেয়া থেকে বিরত থাকার মত। তাহলে তা তার কাছ থেকে যেমন নেয়া হবে না তেমনি নেয়া হবে না অন্যদের কাছ থেকেও। তাহলে এটা জায়েয হবে।
এমতাবস্থায় সমস্ত শরীকেরই ধার্য মাল দিয়ে দেয়া ওয়াজিব হবে। প্রত্যেকেই তার সে অংশ দেবে যার সে প্রতিনিধিত্ব করে- যখন না- দেয়া অংশ শরীকদের মধ্যে ন্যয়বিচারের ভিত্তিতে বন্টন করে দেয়া হবে। আর যে লোক অনেক্যর অংশ তার পক্ষ থেকে দিয়ে দেবে কোনরূপ জোর-জবরদস্তি ছাড়াই, তা তার কাছ থেকে ফেরত নেয়া তার অধিকার আছে। তার পক্ষথেকে সে যে দিয়ে দিল, এ কারণেই সে অতব নেক আমলকারী গণ্য হবে। তখন সে যে দিয়েছে, তা তাকে ফিরিয়ে দেয়া উচিত হবে।ঠিক যেমন কর্জে হাসানা দাতা। আর যে লোক অনুপস্থিত থাকল, দিল না, ফলে উপস্থিত লোকেরাই তা দিয়ে দিল, তারা যে পরিমাণ দিয়েছে সে পরিমাণ তাদেরকে তার দেয়া কর্তব্য হবে। আর যে লোক তার পক্ষ থেকে আদায়কারীর কাছ থেকে নিয়ে নিল এবং আদায়কারীকে দিয়ে দিল, তার তা গ্রহণ করা জায়েয হবে- যার জন্যে আদায় করা বাধ্যতামূলক সে প্রথম জালিম হোক, কি অন্য কেউ। এ কারণে সে যা অন্যের পক্ষ থেকে দিয়ে দিয়েছে, তার দাবি করার তার অধিকার আছে। যেমন ঋণ ফেরত দেয়ার জন্যে নির্দেশ দেয়া হয় আর তার মালের বিকল্প গ্রহণে গ্রহণকারীর জন্যে কোন সন্দেহের কারণ নেই।
অষ্টম পরিচ্ছেদ
যাকাতরে পর কর ধার্যের প্রয়োজন হবে না
একটি প্রশ্ন, যার জবাব চাওয়া হচ্ছে-
বহু মুসলমানের চিন্তায় ঘুরপাক খাচ্ছে, তাদের কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এ প্রশ্নের জবাব একান্তই জরুরী হয়ে পড়েছে। সে জবাব না দিয়ে নিস্তার নেই্ প্রশ্নটি সংক্ষেপে এই যে, ধন-মালের মালিকরা সরকারী ভাণ্ডারে আপেক্ষিক ও ঊর্ধ্বমুখী উভয় প্রকারের কর এত পরিমাণের দিয়ে থাকে, যা অনেক সময় শরীয়াতের ফলয করা যাকাতের পরিমাণ অপেক্ষা অনেক গুণ বেশী হয়ে থাকে। এভাবে বিপুল ধন-মাল সরকারের ভাণ্ডারে চলে যায়, যা বাজেটে বর্ণিত খাতসমূহে ব্যয়িত হয়। আর বাজেটের কোন কোন ব্যয়খাত যাকাতেরই ব্যয় খাতরূপে গণ্য হয়েথাকে, তাতে সন্দেহ নেই। যেমন অক্ষম লোকদের সাহায্য, বেকর লোকদের কর্মসংস্থান বাস্তুহারা, বাসমান ও পড়ে পাওয়া লোকদের আশ্রয়দান ইত্যাদি সরকারী জনকল্যাণ বিভাগের কাজ বলে গণ্য হয়। দরিদ্রদের জন্যে বিনামূল্যে শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থাও এ পর্যায়ের কাজ। মুসলমানরা এসব কাজের জন্যে সরকারকে যে কর দেয়, তার পরও কি যাকাত দেয়ার প্রয়োজন থাকে? সরকার কি দরিদ্রদের প্রয়োজন পূরণ এবং যাকাতরে খাতসমূহে সাধারণভাবে ব্যয় করার জন্যে দায়ী হবে অথবা এসব বিপুল পরিমাণের হওয়া সত্ত্বেও এবং তা দেয়ার পরও যাকাত থেকে নিষ্কৃতি নেই যাকাত তবুও দিতে হবে? মুসলমানরা যাকাতের নামে তার বিশেষ খাতে এবং বিশেষ পরিমাণেই তা আদায় করতে বাধ্য থাকবে?
এ প্রশ্নের যথার্থ জবাব দেয়ার জন্যে একথা উল্লেখ করা একান্ত আবশ্যক যে, ‘যাকাত’ যাকাত হয়েছে তিনটি কারণে:
১. সে বিশেষ পরিমাণ, যা শরীয়াত নির্দিষ্ট করেছে- এক-দশমাংশ থেকে অর্ধ-ওশর ও এক-দশমাংশের এক-চতুর্থাংশ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে।
২. বিশেষ নিয়ত- আল্লাহ্র নৈকট্য অর্জনের ইচ্ছা ও সংকল্প এবং আল্লাহ্র ফরয করা যাকাত- যে বিষয়ে তিনি তাঁর বান্দাদেরকে আদেশ দিয়েছেন, সে আদেশ পালন করা।
৩. বিশেষ ব্যয় খাত- তা আট প্রকারের, কুরআনুল করীমই তা নির্দিষ্ট করে দিয়েছে।
সাধারণভাবে সরকার কর্তৃক ধার্যকৃত কর দ্বারা কি এ তিনটি কারণ বাস্তাবয়িত হয়?
প্রথমে পরমাণের কথাই বলা যাক। একথা প্রমাণিত যে, কর কোন শরীয়াত নির্ধারিত পরিমাণের বাধ্যবাধকতা স্বীকার করে না। অনেক সময় তা অনেক বেশী নিয়ে নেয়। কখনও আবার তার চাইতে কম। কখনও এমন পরিমাণ মাল থেকে কিছুই গ্রহণ করা হয় না, যাকাত ফরয হওয়ার শর্তসমূহ যাতে পূর্ণমাত্রায় বর্তমান। যেমনকৃষি ফসল ও ফল ফাঁকড়া। কখনও এমন পরিমাণ মাল থেকেও কর নেয়া হয়, যা যাকাত ফরয হওয়ার জন্যে শরীয়াতসম্মত ও উপযুক্ত পরিমাণ নয়। কেননা তাতে যাকাত ফরয হওয়ার শর্তাবলী পূর্ণ হয়নি।
এ পর্যায়ে বলা হয়ে থাকে, বিশেষভাবে কথা হচ্ছে নগদ সম্পদ থেকে যা কিছু নেয়া হয় সে বিষয়ে। তা এক-চতুর্থাংশ ফরযেরও বেশী। বেশী হলে তো কোন ক্ষতি হওয়ার কথা নয়। আর যদি ধরে নিই তা তার চাইতে কম, তাহলে অবশিষ্ট পরিমাণ ব্যয় করা মুসলমানের কর্তব্য।
আর নিয়ত কি বাস্তাবায়িত হবে শুধু এভাবে যে, করদাতা মনে করবে যে, এটা কর নয়- যাকাত?
একথার ওপর প্রশ্ন তোলা হয় যে, এরূপ স্থানে ইবাদতের নিয়ত করা খালের ও একনিষ্ঠ হতে পারে না অথচ যাকাত একটা ইবাদত বিশেষ। তাই তার জন্যে খালের নিয়তের শর্ত করা হয়েছে। কুরআনে তাই বলা হয়েছে:
(আরবী **********)
তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে শুধু এই যে, তারা আল্লাহ্র ইবাদত করবে খালেস মনোভাব এবং অন্য সব দিক থেকে মনকে ফিরিয়ে আল্লাহ্রই জন্যে আনুগত্য সুনির্দিষ্ট করে।
উপরিউক্তি প্রশ্নের জবাবে বলা হয়, নিয়তে গণনার বিষয় হচ্ছে, ফরয আদায়ের উদ্দেশ্যে মাল বের করে দিয়ে দেয়া।এখানে তা অর্জিত। প্রত্যেক ব্যক্তি তো তা-ই কপারে, যার সে নিয়ত করবে।
আর ব্যয়েল খাত পর্যায়ে বক্তব্য হচ্ছে, মুসলমান তার যাকাত পাওয়ার যোগ্য আটটি খাতের যে কোন একটিতে ব্রয় করবে প্রত্যক্ষভাবে অথবা যাকাত আদায়ে নিযুক্ত কর্মচারীকে দিয়ে দেবে- এটাই ফরয। এ কর্মচারী সে, যাকে রাষ্ট্রপ্রধান যাকাত গ্রহণ ও তার জন্যে নির্দিষ্ট খাতসমূহে তা ব্যয় করার দায়িত্বে নিযুক্ত করেছে। ফলে রাষ্ট্রপ্রধান হবেন পাওয়ার যোগ্য লোকদের উকীল। সে ধনী লোকদের কাছ থেকে তা গ্রহণ করে তাদের মধ্যে বণ্টন করবে- করার ব্যবস্থা কার্যকর করবে।
তার অর্থ, রাষ্ট্রপ্রধান ও তাঁর প্রতিনিধি যাকাত যথানিয়মে ও তার নামেই গ্রহণকরবে, যেন তা শরীয়াত নির্ধারিত বিশেষ খাতসমূহে ব্যয় করা যায়। তা যথানিয়মে ও তাঁর নামেই যাকাত গ্রহণের শর্ত করেছে এজন্যে যে, যাকাত হচ্ছে ইসলামের বড় বড় নিদর্শেনের মধ্যে একটি। আর নিদর্শনাদিকে অবশ্যই তার নাম-পরিচিতিসহ চালু, কার্যকর ও জীবন্ত থাকতে হবে। অন্যথায় নিদর্শন হওয়ার তাৎপর্যন্ত বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
এ কারণে- পূর্বে যেমন বলেছি- মালিকী মাযহাবের ফিকাহ্বিদগণ দৃঢ় মত প্রকাশ করেছেন যে, অত্যাচারী শাসকগণ যা কিছুই গ্রহণ করে, তাতেই যাকাত আদায় হয়ে যাবে- যদি তা যাকাতের নামে গ্রহণ করা হয়। তাঁদের ছাড়া অন্যান্য ফিকাহ্বিদের কথা থেকেও তা-ই বোঝা যায়- যদিও অনেকে স্পষ্ট তা বলেন নি।
এ কথার তাৎপর্য হচ্ছে, সরকারসমূহ প্রাচীন (***) অন্যায়ভাবে ধার্যকৃত কর হিসেবে যা কিছুই নেয়, আর আধুনিক সরকারসমূহ কর বা ট্যাক্স নামে যা গ্রহণ করে, তা যাকাতের স্থলাভিষিক্ত- যাকাতের বিকল্প হতে পারে না। তা যাকাতের হিসেবেও গণ্য হবে না। কেননা তা যাকাতের নামে গ্রহণ করা হয়নি, গ্রহণ করা হয় অন্য নামে, অন্যখাত হিসেবে। তা নিশ্চয়ই ইসলামেরপাঁচটি স্তম্ভের- যা আল্লাহ তা’আলা ঘোষণা করেছেন- একটি নিদর্শন হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে না। আর তা ব্যয়ও করা হয় এমন সব খাতে, যার সব কয়টাই কুরআন সুন্নাহ নির্ধারিত ও শরীয়াতসম্মত ব্যয় খাত নয়।
প্রথমোক্ত সওয়াবের জবাবে এ বক্তব্যই আমার। কিন্তু এ জবাবের ওপর আবার কতগুলো প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। দ্বীনদার মুসলমান এককভাবেই বহু বিচিত্র ধরনের অর্থনৈতিক দায-দায়িত্বের সম্মুখীন হয়ে থাকে। সেও সরকার নির্ধারিত কর দেয় যেমন অন্যরা তা দিয়ে থাকে। পরে আরও ধার্য হয়, তাও সে দেয়- একাই এবং তা হচ্ছে তার মালের যাকাত। এ ব্যাপারটা তার পক্ষে খুবই দুঃসহ, কঠিন ও কষ্টদায়ক সন্দেহ নেই, অথচ ইসলামী শরীয়াত গনহণের ওপর থেকে সর্বপ্রকার অসুবিধা ও কষ্টদায়ক ব্যবস্থা দূরীভূত করার জন্যে প্রবর্তিত হয়েছে। মানুষের জীবনে সহজতা বিদান ও ক্ষতি কষ্ট প্রতিরোধই তার লক্ষ্য।
এই অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালনের কষ্ট বহু মুসলমানকে বারবার এ কথা উত্থাপিত করতে বাধ্য করে যে, কর বাবদ দেয়া অর্থকেই ফরয যাকাতরে খাতে গণ্যকরা হোক।…. তা হবে না কেন?
মুসলিম জীবনের বাস্তব বৈপরীত্য
মুসলিম জীবনে বাস্তব বৈপরীত্য না থাকলে এরূপ কথা বলা হত না, একথা জোর করেই বলা চলে। কেননা তারা একটি জাতি হিসেবে চিরকালই ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করতে ও তা পালন করে চলতে প্রস্তুত ছিল। তারা চিরদিনই এ বিশ্বাসের ধারক ছিল যে, যাকাত ফরয এবং ইবাদত। বরং বহু মুসলিম রাষ্ট্রেরই রাষ্ট্রীয় দ্বীন ছিল এ ইসলাম। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইসলামী বিধান সেখানে কার্যকর ও অর্থবহ নয়। সে সব অঞ্চলে ইসলামী আইন প্রণয়ন একটা অপরিচিত ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। তারা জনগণের জীবন থেকে তা আজ বহিষ্কৃত, পরিত্যক্ত, অবশ্য বর্তমান যুগের পূর্বে এরূপ বৈপরীত্য তাদের জীবনে কখনই ছিল না।
যাকাত সম্পর্কে পর্যালোচনা করলেই আমরা দেখতে পাই, তা সর্বকালে প্রায়সব দেশে ও সমাজেই একটি মহান পবিত্র ও বাধ্রতামূলক ফরয হিসেবে গণ্য হয়ে এসেছে। বহু ধন-মাল থেকে সরকার-প্রশাসক তা সংগ্রহ ও আদায় করে নিয়েছে। মুসলিম জনগণ যাকাত ধার্য হতে পারে- এমন সব ধন-মাল থেকেই তা বাধ্যতামূলকভাবে ও নিয়মিত আদায় করে দিয়েছে। সেইসাথে একথাও অবশ্য সত্য যে, কোন কোন দেশ ও সমাজ এ ব্যাপারে আদর্শচ্যুত হয়েছে, তা সংগ্রহ বা ব্যয় অথবা উভয় ক্ষেত্রেই চরম দুর্নীতি ও অত্রাচারের আশ্রয় নিয়েছে। অনেক মুসলিম ব্যক্তি এমন দেখা গেছে, যাদের ধন-মালের মায়া ও প্রেম ফরয যাকাত আদায় করতে বাধা দিয়েছে। আল্লাহ্র দেয়া অনুগ্রহের প্রতি তারা কার্পণ্য করেছে। যাকাত দেয়া থেকে বিরত রয়েছে, দিতে অস্বীকার করেছে অথবা তা দিতে চরম গাফিলতি প্রদর্শন করেছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও কোন মুসলিমরাজ্য ফরয যাকাতের গোটা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে অকেজো অচল করে রেখেছে- ইসলাম একটা মনঃপূত দ্বনি হওয়ার মর্যাদা মুসলিম জনগণেরকাছে হারিয়ে ফেলেছে এবং প্রকাশ্যভাবে যাকাত পরিহার বা অস্বীকার করেছে, এমনটা বড় একটা দেখা যায়নি।
এই বৈপরীত্য সৃষ্টিতে সাম্রাজ্রবাদের প্রভাব
কিন্তু আমাদের এ যুগে অবস্থার আমুল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। বহু ইসরামী দেশেই যাকাত সরকারীভাবে প্রতিষ্ঠানের মাধ্রমে আদায় করা হচ্ছে না। এ অবস্থা ইচ্ছা করে সৃষ্টি করা হয়নি। পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্রবাদী ব্যবস্থার অধীন হয়ে পড়েছে সমগ্র মুসরিম জাহান। তারই পরিণতিতে এরূপ অবস্থা দেখা দিয়েছে। পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের অধীনতা ও তার বস্তুবাদী প্রভাব-প্রতিপত্তি তাৎপর্যগতভাবেই ইসলাম জগতের জনজীবনকে পাশ্চাত্য নাস্তিক্যবাদী ভিত্তিতে গড়ে তুলেছে। বহু সংখ্যক মুসলমানই ইসলামী পুনর্জাগরণে ও পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সংশয়বাদী হয়ে পড়েছে। বহু লোকের জীবনে ইসলামের আকীদা-বিশ্বাস ও ফরযসমূহ দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করেছে, পরিত্যক্ত হয়েছে। এমন কি, শেষ পর্যন্ত মুসলিম দেশ থেকে সাম্রাজ্যবাদ বিদায় নিয়ে চলে যাওয়অর পরও তার কুপ্রভাব থেকে দেশ ও দেশবাসী মুক্ত হতে পারেনি। তার কারণষ, সাম্রাজ্যবাদের শুধুদ সেনাবাহিনীই হয়ত দেশ ত্যাগ করে চলে গেছে; কিন্তু তার চিন্তা, মনস্বতাত্বিক ও বাস্তব কার্যের মধ্যে বিরোধী ভাবধারা প্রবলভাবে এখনও বিরাজ করছে। কেননা সাম্রাজ্রবাদী শক্তি রেখে গেছে গভীর ব্যাপক সাংস্কৃতিক, শিক্ষা বিষয়ক, আইনগত ও প্রশাসনিক, নৈতিক ও আচার-আচরণমূলক কুপ্রভাব- যা ইসলামের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
ইসলামের ফৌজদারী আইন সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে রাখা হয়েছিল। ফলে লাম্পট্য, জ্বেনসা-ব্যভিচার, মদ্যপান ও সর্বপ্রকারের ফিসকে-ফুজুরী মুসলিম সমাজেই ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়ে পড়েছিল।
ইসরামের তমদ্দুনিক আইন-বিধান সম্পূর্ণরূপে পরিত্যক্ত হয়েছিল। ফলে সুদ, ঘুষ এখনও ব্যাপকভাবে চালু হয়ে রয়েছে। ইহুদী সংশয়বাদীরা মুসলিম মানসে জাগিয়ে দিয়েছে ইসলামের প্রতি সংশয়, অবিশ্বাস। মুসলিম উম্মতের লোকেরাই আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।
অনুরূপভাবে ইসলামের সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও সম্পূর্ণরূপে রহিত হয়ে গেছে। ফলে ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ যাকাত-ব্যবস্থা-অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তাদের ওপর চেপে বসেছে বিচিত্র ধরনের তমদ্দুনিক কর ব্যবস্থা। এমন কি যাকাত আইনের খসড়া কোন কোন যুগে পার্লামেন্টে উপস্থাপিত করা হলে নামধারী মুসলমানরাই তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে। তারাই তার প্রতিবাদ করেছে। কেননা তাতে করে ধর্মনিরপেক্ষবাদের পরিবর্তে ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র চালানোর প্রচেষ্টা সফল হয়ে যাবার উপক্রম হচ্ছিল। আর তা আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক হচ্ছিল্ কেননা এরা ছিল ইউরোপীয় সভ্যতার অন্ধ অনুসারী। আর তথায় বহুদিন পূর্বেই রাষ্ট্র থেকে ধর্ম বহিষ্কৃত এবং রাষ্ট্র ধর্মচ্যুত হয়ে গিয়েছে।
আজ একথা সত্য যে, সাম্রাজ্যবাদী সামরিক শক্তি আরবও মুসলিম জাহান থেকে বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু পশ্চাতে রেখে গেছে তাদের অসংখ্য একনিষ্ঠ শিষ্য শাগরিদ। তাদেরকে তারা নিজেদের মতই গড়ে তুলেছিল, তাদের চোখের সামনে তাদের বিশেষ ও যত্ন লালনে তাদেরকে তাদের প্রতিনিধিত্বের গুণে গুণান্বিত করে গড়েছিল। তাদের নাস্তিক্যবাদী দর্শন, সংস্কৃতি ও চিন্তা-বিশ্বাসের খাঁটি দুগ্ধ তাদের সেবন করিয়েছিল। তাদের পরিত্যক্ত আসনে তাদের বসিয়ে দিয়ে তাদের পন্থা ও পদ্ধতিতে কাজ চ ালিয়ে যাওয়ায় অভ্যস্ত করে- তারা চলে গেছে। আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষতা ইসলাম ও তার মূল্যমানকে সম্পূর্ণ অকেজো, পশ্চাদপদ ও প্রতিক্রিয়াশীল বলে গণ্য করে। পক্ষান্তরে যা কিছুই পশ্চিম দেশসমূহ থেকে আসে- সে সব দেশে ও সমাজে সম্পূর্ণ পুরাতন ও পরিত্যক্ত হওয়ার পরই আসুক না-কেন- তা-ই আধুনিকতা, অগ্রবর্তিতা, সভ্যতা ও ক্রমোন্নতি বলে বিবেচিত হয় ও সাদরে সযত্নে অক্ষরে অক্ষরে অনুসৃত হয়।
ফল দাঁড়িয়েছে যে, যাকাত সম্পূর্ণরূপে পরিত্যক্ত হয়েছে। আমাদের আর্থিক ও সামষ্টিক আইন প্রণয়নে ও পরিকল্পনা রচনায় তার কোন স্থান- কোন ভূমিকাই স্বীকৃত হচ্ছে না। আর কোন কোন মুসলিম ব্যক্তির এবং কোন কোন দ্বীনী প্রতিষ্ঠানের অবিরাম চেষ্টা কার্যকর না থাকলে মুসলিম জীবন থেকে তা সম্পূর্ণরূপে যে বিলীন, নিঃশেষ ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত, তাতে কোনই সন্দেহ নেই।
যাকাতের ব্যাপারে ইসলামী সরকারের দায়িত্ব
সত্যি কথা- যাতে কোন সংশয় নেই, মতপার্থক্র নেই- হচ্ছে, যাকাত একটি ইসলামীফরয, দ্বীন-ইসলমে তার স্থান অতিশয় পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিম মানসে তার গুরুত্ব তীব্রভাবে স্বীকৃত। তাদের জীবনে ইতিহাসে তার প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক এবং সুদূরপ্রসারী। অন্যান্য ধার্যকৃত কর-এর পাশাপাশি যাকাতও স্থায়ী হয়ে থাকবে তার স্ব-নামে, স্ব-পরিচিতিতে, স্ব-পরিমাণ ও স্ব-ব্যয় খাতসমূহ সহকারে। তা কখনই পরিত্যক্ত হতে পারে না। সরকারের অন্যান্য সাধারণ ব্যয়ভার বহনের জন্রে যে কর ধার্য করে- ব্যাপক ও বিচিত্র ব্যয়ের বাজেট অনুযায়ী প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে, তা থেকেও অব্যাহতি পাওয়া যাবে না।
এ যুগের ইসলামী বিধানভিত্তিক প্রত্যেকটি সরকারকে যাকাতরে ব্যাপারে বিশেষ দায়িত্বশীল ও কর্মতৎপর হতে হবে। সর্বত্র এমন একটা প্রতিষ্ঠান, কল্যাণ ব্যবস্থা যা ফাউন্ডেশন গড়ে তোলা আবশ্যক- তার নাম যা-ই দেয়াহোক- যা আল্লাহ্র বিধান হিসেবেই যাকাত সংগ্রহ করা এবং আল্লাহ্র শরীয়াত নির্দেশিত পথে ও পন্থায় তা ব্যয় ও বন্টন করার দায়িত্ব পালনকরবে। এ বাবদ সংগৃহীত সম্পদ স্বতন্ত্র মর্যাদায় রাখতে হবে। অন্যান্য খাতের জন্যে সংগৃহীত অর্থ বা সম্পদের সাথে তা জড়িত বা মিশ্রিত হতে পারবে না। সাধারণ বাজেটে শামিলহয়ে গিয়ে তার স্বাতন্ত্র্য বিনষ্ট হতেও দেয়া যাবে না।
সর্বশেষ কথা, শরীয়াতের ফিকাহ্বিদ ও অর্থনীতিবিদ, সাংগঠনিক পারদর্শিতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটা সূক্ষ্ম কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এই ব্যক্তিরা বিভিন্ন ধরনের কর ও ফরয যাকাতের মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারণ করবে। তারা উভয়ের সংমিশ্রমণ ও অরাজকতা প্রতিরোধ করবে। অবস্থা যেন এমন না হতে পারে যে, দ্বীনদার মুসলমান তো এককভাবে যাকাতের বোঝা বহন করতে বাধ্য হবে, আর দ্বীনী দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত নয় এমন মুসলমানরা যাকাত আদায়ের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পেয়ে যাবে।
ইসলামের দিকে অগ্রগতি গ্রহণকারী রাষ্ট্রমাত্রের জন্যেই এটা একান্ত পালনীয় ফরয। গোটা মুসলিম জাতিরও তা-ই করতব্য- তা পালন করতে হবে তার প্রতিনিধি সভা ও সংসদের মাধ্যমে যাকাত আদায়কারী বণ্টনকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে।
এটা কেবল যাকাতের বেলায়ই কর্তব্য নয়। আল্লাহ তা’আলার নির্দেশ অনুযায়ী ইসলামী শরীয়াতের প্রতিটি বিধান বাস্তবায়িত করার জন্যেই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রত্যেকটি মুসলিম রাষ্ট্রেরই কর্তব্য।
সরকার যাকাত না নিলে ব্যক্তির দায়িত্ব কি
সরকার যদি যাকাত সংগ্রহ ও বণ্টনের দায়িত্ব পালন না করে- অন্য কথায়, সরকার যদি ইসলামী জীবন বিধান অনুসরণ করে না চলে যাকাত আদায ও বণ্টনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা কার্যকর না করে, সরকার যদি ধর্মনিরপেক্ষবাদী ও ইসলামী শরীয়অতকে পৃষ্ঠপ্রদর্শনকারী হয়, যাকাতকে তার হিসেবের খাতা থেকে সম্পূর্ণ বর্জন ও বহিষ্কার করে দেয় এবং নিজ ইচ্ছেমত কর ধার্যকরণের ওপরই একান্তভাবে নির্ভরশীল হয়, তবে তার দ্বারাই যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করে ও রাষ্ট্রের কল্যাণমুখী কার্যাদি সম্পন্ন করে- যেমন আধুনিককালের রাষ্ট্রগুলো করছে, তা হলে এখানে এ প্রশ্নটি তীব্র হয়ে দেখা দেয় যে, মুসলিম ব্যক্তিকে যেখানে বহু প্রকারের কর দিতে হচ্ছে, তা সত্ত্বেও তাকে যাকাত দিয়ে যেতে হবে কিংবা এ সব কর দেযার মাধ্যমে যাকাত আদায় করা হয়ে যাবে ও আলাদাভাবে যাকাত দেয়ার দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে?…. তাহলেই না মুসলিম ব্যক্তি একই মাল থেকে দুই ধরনের অধিকার দেয়ার দয়িত্ব ও ঝামেলা থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারে।
কর দিয়েই যাকাতের দায়িত্ব থেকে মুক্তির ফতোয়া
এখানে একটি ফতোয়ার উল্লেখ করা যেতে পারে। কোন কোন যুগে কোন কোন ফিকাহ্বিদদের দেয়া ফতোয়ার সাথে তার মিল রয়েছে। আর তা হচ্ছে, হ্যাঁ, কর দিয়েই যাকাত দেয়ার দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে-
এ পর্যায়ে উল্লেখ্য মত হচ্ছে ইমাম নববীর। তিনি লিখেছেন: শাফেয়ী ফিকাহ্বিদগণ এ বিষয়ে একমত যে, জুলূমস্বরূপ যে খারাজ গৃহীত হয়, তা ওশর-এর বিকল্প ও স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না। শাসক যদি তা ওশর-এর বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে তাতে ফরয ওশরথেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার ব্যাপারে বিভিন্ন মত রয়েছে। সহীহ কথা হচ্ছে, তাতে ফরয খারাজ আদায়ের দায়িত্বথেকে মুক্তি হবে। কিন্তু তাতে যদি ওশর পরিমাণের কম দেয়া হয়, তাহলে অবশিষ্ট্যটা দিতে হবে।[(আরবী **********)]
কথাটি বোঝা গেল এভাবে যে, ওশরী জমি থেকে- যার ওপর ওশর ফরয যাকাতরূপে ধার্য হয়েছে- যদি খারাজ নেয়া হয় ফরয ওশরের বিকল্প হিসেবে, তাহলে যে সব মালে যাকাত ফরয হয়, তা থেকে কর গ্রহণের মতই অবস্থাটা দাঁড়াবে এ হিসেবে যে, তা যাকাতের বিকল্প, যাকাত দেয়ার প্রয়োজন পূরণকারী। আর যে খারাজ বা করই সাধারণ জনকল্যাণে ব্যয়িত হবে, তা সবই সমাজ সমষ্টির জন্যে।
কিন্তু এরূপ ধারণার ওপর প্রশ্ন জাগে যে, সরকার প্রজা-সাধারণের কাছ থেকে যে করাদি গ্রহণ করে, তা যাকাতের বিকল্প কিছুতেই গণ্য হতে পারে না। এজন্যেই তো তা মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের কাছ থেকেই গৃহীতহয়ে থাকে এবংতা ব্যয় হয় এমন সাধারণ খাতসমূহে, যার অনেকটা যাকাতরে খাত নয় নিশ্চিতভাবেই।
হাম্বলী মাযহাবের কিতাবসমূহে ইমাম আহমদ থেকে যে কথাটির উল্লেখ হয়েছে, তা প্রায় এরকমই। তা হচ্ছে, তাঁর কাছে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, যে চুক্তিবদ্ধ জমি থেকে সরকার অর্ধেক ফসল নিয়ে নেয়, তার সম্পর্কে কি হুকুম? তিনি জবাবে বলেছিলেন, ‘সরকারের এরূপ নেয়ার অধিকার নেই, এটা জুলুম।’ তাঁকে বলা হল, ‘জমির মালিকের হাতে যে ফসল অবশিস্ট থাকে, তার যাকাত সে দেবে?’ বললেন, ‘সরকার ‘যা নিচ্ছে তা-ই যাকাতরে বিকল্প গণ্য হবে অর্থাৎ মালিক যদি তার নিয়ত করে।’ [(আরবী **********)]
এ পর্যায়ে ইবনে তাইমিয়ার বক্তব্য আরও সুস্পষ্ট। তিনি বলেছেন: রাষ্ট্রপ্রধান যা কর-এর নামে নিচ্ছে, তা-ই যাকাতের নিয়তে দিলে তা আদায় হয়ে যাবে। যাকাতের দায়িত্ব চলে যাবে, যদিও ঠিক যাকাত হিসেবে নেয়া হয় না। [ইমামম আহমাদ এ কথাটি মুহাম্মাদ আল মনসূর রচিত (আরবী **********) গ্রন্থের ১মখণ্ড, ১৫৪ পৃষ্ঠা থেকে উদ্ধৃত করেছেন (আরবী **********)]
এ কথাটির সাথে স্মরণীয়, ইমাম তাঁর ফতোয়ায় স্পষ্ট করে লিখেছেন, তা উপরোদ্ধৃত কথার সাথে সাংঘর্ষিক। ফতোয়ায় লিখেছেন: রাষ্ট্রের শাসক-প্রশাসকরা যাকাতের নাম না নিয়ে যা কিছু নিচ্ছে, তা যাকাত হিসেবে গণ্য হবে না। [(আরবী **********)]
এক্ষণে বিবেচ্য ও যাচাই করার যোগ্য- এ দুটি উদ্ধৃতির মধ্যে কোন্টি অধিক সহীহ এবং প্রমাণিত। যদি দুটিই সহীহ প্রমাণিত হয়, তাহলে প্রশ্ন কোন্টি তাঁর শেষ পর্যায়ের কথা?
ব্যাপার যা-ই হোক এ একটা বিশেষ ফতোয়া। বহু ফিকাহ্বিদ নিজ নিজ সময়ে লোকদের তদানুযায়ী ফতোয়া দিতে বাধ্য হয়েছেন,- যেন মুসলমানদের কষ্ট দূর হয়ে যায়। তাদের ওপর এমন দায়িত্ব চাপানো না হয়, যা তাদের পৃষ্ঠকে ন্যুব্জ করে দেবে। আল্লাহ তো তাদের প্রতি সহজ করেই বিধান করতে চেয়েছেন, কঠোরতা ও কষ্ট আরোপ করতে চান নি। এ ফতোয়া সম্পর্কে এটা লক্ষ্যণীয় যে, তার ভিত্তি রাখা হয়েছে এমন সব কর ও (***) –এর ওপর যা শাসক জুলুম করেও না-হকভাবে নিয়েথাকে। এ কারণে ফতোয়াদাতা তা দেয়ার সময় যাকাত দিচ্ছে বলে মনে করলেযাকাত হয়ে যাবে বলে ফতোয়া দিয়েছেন। এরূপ নিয়ত করা জরুরী বলেছেন। মনেকরেছেন, এতে করে তাদের ওপর বোঝা হালকা হবে, তারা রাগ হতে পারে এবং মুসলমানদের ওপর থেকে জুলুম প্রতিরোধ করা হবে।
কিন্তু আমাদের এখানকার আলোচ্য বিষয়ে ধরে নিচ্ছি, আমরা কথা বলছি সুবিচারমূলক কর সম্পর্কে, যা একালে একান্তই জরুরী হয়ে পড়েছে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ভার বহনের জন্যে।
শরীয়তে অনুসৃত মাযহাবগুলো সম্পর্কে ইতিপূর্বে আমরা যা বলেছি তা থেকে বোঝা যায় যে, সব কর, যা লোকদের ওপর চাপানো হয় ‘নাওয়ায়েব’ (***) নামে; কি খারাজ বা সরকার আরোপিত কর প্রভৃতির নামে তা বাধ্যতামূলক ব্যাপর, তা এমন একটা ঋণ যা ফেরত পাওয়ার অধিকারী- ফরয যাকাতের পাশাপাশি। অতৈএব তা যাকাতের বিকল্প নয়, তা যাকাতের বাধ্যবাধকতা বিলুপ্ত করে না, তা যাকাতের বদলে আরোপিত বলে গণ্য নয়।
অধিকাংশ আলিমকর বা (***)-কে যাকাত পর্যায়ে মনে করেন না
জনমহুর আলিমগণ (***)-কে কখনই এবং কোন অবস্থায়ই যাকাত পর্যায়েরজিনিস বলে মনে করেন না। মুসলমানদের মধ্য থেকে যে লোক এ (**) ধার্য করে কিংবা তা জায়েয বলে ফতোয়া দেয়, তার ওপর তাঁরা কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেছেন। যেমন আল্লামা ইবনে হাজার আল হায়সামী শাফেয়ী কৃত (***) গ্রন্থে রয়েছে। তিনি বলেছেন:
ইবনে হাজার হায়সামীর বক্তব্য
‘জেনে রাখ, কোন কোন ফাসিক ব্যবসায়ী মনে করে যে, তাদের কাছ থেকে শুল্ক ইত্যাদি কর বাবদ যা কিছু নেয়া হয়, তাতেই যাকাত আদায় হয়ে যাবে- যদি তার নিয়ত করা হয়, -এ ধারণাটা সম্পূর্ণ বাতিল। শাফেয়ী মাযহাবে এর কোন সনদ নেই। কেননা রাষ্ট্রপ্রধান শুল্ক আদায়কারীদেরকে যাদের ওপর যাকাত ফরয কেবল তাদের কাছ থেকেই যাকাত গ্রহণের কাজে নিযুক্ত করেনি। তাদেরকে নিযুক্ত করা হয়েছে (***) গ্রহেণর জন্যে, তা যে মালেরই তারা পাক-পরিমাণ কম হোক কি বেশী- তাতে যাকাত ফরয হোক, আ না-ই হোক। ধারণা করা হয়েছে যে, তাদেরকে তা গ্রহণের জন্যে নিযুক্ত করা হয়েছে মুসলমানদের কল্যাণে নিয়োজিত সেনাবাহিনীর ওপর ব্যয় করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু আলোচ্য বিষয়ে এ ধারণা প্রয়োজ্য নয়। কেননা আমরা যদি ধরে নিই যে, তা তার শর্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত অর্থাৎ বায়তুলমালে কিছুই থাকবে না যখন, রাষ্ট্রপ্রধান ধনীদের কাছ থেকে মাল নিতে বাধ্য হবে, এ অবস্থাও তা ফরয যাকাত প্রত্যাহকারী নয়। কেননাতা যাকাতের নামে গ্রহণ করা হয়নি।
কোন কোন ব্যবসায়ী আমাকে বলেছে, কর আদায়কারীকে মাল দেয়ার সময় যদি নিয়ত করে যে, তাযাকাত বাবদ দিচ্ছে, তা হলে (***) আদায়কারীকে যাকাতরে মালিক বানিয়ে দেয়া হবে। তা সেঅন্যকে দিয়ে সেই জিনিসকেও বিনষ্ট করবে। এ কথাটিও আলোচ্য বিষয়ে কোন ফায়দা দিচ্ছে না। কেননা কর আদায়কারী এবং তাদের সাঙ্গ-পাঙ্গদের মধ্যে যাকাত পাওয়ার যোগ্য লোক পাওয়অর তো কোন প্রশ্ন উঠতে পারে না। কেননা তাদের সবাইর শিল্প কারখানা গড়া বিপুল উপার্জন করার ক্ষমতা রয়েছে। তাদের শক্তি আছে, জোর প্রয়োগ করতে পারে, তারা যদি হালাল উপার্জনে তাদের শ্রম নিয়োগ করে, তাহলে তারা এ নির্লজ্জ বীভৎস কুশ্রী কাজ তেকে বেঁচে যেতেপারে। এরূপ যাদের অবস্থা, তাদেরকে কি করে যাকাত দেয়া যেতে পারে- তারা তা নিতেই বা পারে কিভাবে? কিন্তু ব্যবসায়ীদের ধন-মালের প্রেম তাদেরকে অন্ধ বানিয়ে দিয়েছে। প্রকৃত সত্য তারা দেখতে পায় না শুনতে পায় না তারা সে সব কথা, যা তাদের দ্বীনের দিক দিয়ে তাদেরকে কল্যঅণ দিতে পারে- শয়তানের ফেরেবে পড়ে ভুলে গেছে তারা। শয়তান তাদের প্ররোচিত করেছে এই বলে যে, এই মাল তাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক ও জুলুমমূলকভাবে নেয়া হচ্ছে। এরূপ অবস্থায় তারা যাকাত দেবে কিভাবে? আল্লাহ যে তাদের ওপর যাকাত ফরয করেছেন, তা তারা হয়ত টেরই পায়নি। তাই তারা খুব সহজ ও বৈধভাবে না দিয়ে দিলে তারা এ দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারে না। আর তারা যে নির্যাতিত হয়েছে, সে জন্যে তাদের নামে অনেক নেকী লিখিত হওয়ার এবং তাদের মর্যাদা উচ্চ হওয়াই যথেষ্ট হবে।
আলিমগণ এসব কর আদায়কারীদের চোর ডাকাত বলে- বরং তার চাইতেও খারাপভাবে অভিহিত করেছেন: কোন ডাকাত যদি তোমার মাল নেয়, আর তুমি নিয়ত করে যে, যাকাত দিলাম, তা হলে তাতে আদৌ কোন ফায়দা হবে কি? এটা যখন তোমাকে কোন ফায়দা দেবে না, কোন জিনিস তোমার বাড়িয়েও দেবে না, তখন সে বিষয়ে সাবধান হয়ে যাওয়াই ভাল।
যেসব মুর্খ লোক মনে করে যে, জোরপূর্বক কর আদায়কারীদেরকে টাকা দিয়ে যাকাত দেয়ার নিয়ত করা হলে তা যাকাত বাবদই গৃহীত হবে, আলিমগণ তীব্র ভাষায় তাদের মন্দ বলেছেন। এ কথাটির প্রতিবাদে এবং তাদের নির্বুদ্ধিতা প্রমাণে তাঁরা দীর্ঘ আলোচনাও করেছেন। বাস্তবিকই উক্তরূপ মতের লোক নিশ্চয়ই মূর্খ, তাদের কথা না বলাই মঙ্গল। তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করার প্রয়োজন নেই। অতএব চিন্তা-বিবেচনা কর, আল্লাহ তোমাকে সমৃদ্ধ করবেন। [(আরবী **********)]
ইবনে আবেদীনের বক্তব্য
হানাফী ফিকাহ্বিদ ইবনে আবেদীন তাঁর (****)-এর ওপর লিখিত হাশিয়ায় ইবনে হাজারের কিছু কথা উদ্ধৃত করেছেন। তারপর তিনি বলেছেন: ‘তবে জুলুমমূলক কর গ্রহণকারী রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে এমন জিনিস দিয়ে যা সে তাকেই দেয় এবং নিজের আমলনামায় জুলুমও আল্লাহ বিরোধিতা লিখিয়ে নেয়। ব্যবসায়ী তার বা অপর কোন অনুরূপ কর গ্রহণকারীর কাছে যাতায়াত করে, একই বছরের বহু কয়বার তা গ্রহণকরে, যদিও তার ওপর যাকাত ফরয হয়নি। এ থেকে এ-ও জানা গেল যে, তা হানাফীদের কাছে যাকাত বলে গণ্য হবে না। কেননা সে তো সেই দশমাংশ গ্রহণকারী নয়, যাকে রাষ্ট্র-প্রধান পথের ওপর কর্মে নিযুক্ত করেছেন যাকাত গ্রহণের উদ্দেশ্যে।…. বাজ্জাবিয়া উদ্ধৃত করছেন: (***)কে যাকাতরূপে নিয়ত করা হলে- স ত্যি কথা এই যে, তাতে যাকাত দেয়া হবে না। ইমাম সরখসীও তাই বলেছেন।
ইবনে আবেদীন সহীহভাবে এ কথাটির দিকে ইশারা করেছেন যে, (***) দেয়ার সময় তা (***) আদায়কারীকে দান বলে নিয়ত করলেতা জায়েয হবে। কেননা সে তো ফকীর এজন্যে যে, তার ওপর অনেক দায়-দায়িত্ব রয়েছে।’ [(আরবী **********)]
শায়খ আলী শের ফতোয়া
শায়খ আলী শের মালিকী মাযহাব অনুযায়ী দেয়া ফতোয়ায় লিখিত হয়েছে যে লোক গবাদিপশুর নিসাব সংখ্যক মালিক, সে তার বিষয়ে ফতোয়া চেয়েছিলেন। প্রশাসক তার ওপর প্রতি বছর একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে নগদ টাকা ধার্য করে দিয়েছিল। তা সে নিয়ে নিত যাকাতের নাম না করেই। এরূপ অবস্থায় কি তা যাকাত বলে নিয়ত করা শোভন ও সমচিীন হবে? এবং যাকাত আদায় হয়ে যাবে, কি যাবে না? শায়খ জবাবে বলেছেন: না, তাতে তার যাকাতের নিয়ত করার অনুমতি দেযা যেতে পারে না। আর তার নিয়ত করলেও তাতে যাকাত আদায় হয়ে যাবে না- নাচেরুল্লাকানী ও আল-হাত্তাব এরূপই ফতোয়া দিয়েছেন। [(আরবী **********)]
সাইয়্যেদ রশীদ রিজার ফতোয়া
তদানীন্তন ভারতীয় কোন মুসরমান ভরতে ইংরেজ শাসকরা জমিবাবদ যা আদায করে- তার ফসলের অর্ধেক বা এক-চতুর্থাংশ- তা শরীয়াত অনুযায়ী ফরযস্বরূপ দেয় বলে গণ্য করা যাবে কিনা, এ বিসয়ে মিসরীয় মনীষী সাইয়্যেদ রশীদ রিজাকে প্রশ্ন করেছিলেন। স্মরণীয় যে, শরীয়াত মত তো দেয়া হচ্ছে ওশর কিংবা অর্ধ-ওশর।
সাইয়্যেদ রিজা তাঁর জবাব আল-মানার[(আরবী **********)] পত্রিকায় নিম্নোক্তভাবে প্রকাশ করেছিলেন:
‘জমির ফসলের ওশর বা অর্ধ-ওশর – যা ফরয হয়, তা যাকাত পর্যায়ের মাল। তা কুরআন ঘোষিত আটটি খাতে বা যে কয়টি পাওয়া যায়, তাতে ব্যয় করা ফলয। দারুল ইসলামে কোনসরকারী কর্মচারী তা গ্রহণকরে থাকলে তাতে জমির মালিক তা থেকে দায়িত্বমুক্ত হবে। তখন রাষ্ট্র প্রধানের বা তার কর্মচারীর দায়িত্ব হবে তা পাওয়ার যোগ্র লোকদের মধ্যে ব্যয় বা বণ্টন করা। আর সরকারী কর্মচারী যদি তা গ্রহণ না করে, তাহলে মালিকের করত্ব্য হবে আল্লাহ্র বিধান মুতাবিক তা যথাস্থানে স্থাপন করা। আর খৃস্টান শাসক বা অন্য কেউ বিজিত জমি থেকে যা নেয়, তা কররূপ গণ্যহবে, তা দিলে যাকাত আদায় হয়ে যাবে না- যাকাত দেযার দায়িত্ব পালিত হবে না। অতএব মুসলিম ব্যক্তির কর্তব্র হচ্ছে, অবশিষ্ট ফসল থেকে তার শর্তানুযায়ী যাকাত আদায় করে দেয়া। [(আরবী **********)]
এ ফতোয়ার সাক্ষী হচ্ছে শায়খের কথা- যদিও তা অমুসলিম শাসকের গ্রহণের ব্যাপারে বলা হয়েছিল। কথাটি হচ্ছে খৃস্টান ও অন্যান্যরা যা নেয়, তা কররূপে গণ্য হবে, তাতে যাকাত আদায় হয়ে যাবে না। এ কথার তাৎপর্য হচ্ছে, যা কর পর্যায়ের, তা কখনই যাকাত গণ্য হবে না।
শায়খ শাল্তুতের ফতোয়া
প্রাক্তন শায়খুল-আজহার শায়খ শালতুতকে অন্যায়ভাবে ধার্য করা কর বাবদ দেয়া সম্পদকে যাকাত গণ্যকরা যায় কিনা, এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি এ প্রশ্নের খুব সুন্দর জবাব দিয়েছিলেন। আল্লাত তাঁকে রহমত দান করুন- তিনি যাকাতরে নিগুঢ় সত্যতা পূর্ণাঙ্গভাবে বর্ণনা করার পর বলেছেন, যাকাত কোন প্রকার কর পর্যায়ের নয়, তা সব কিছুর পূর্বে একটা আর্থিক ইবাদত বিশেষ।তবে এটা সত্য যে, কোন কোন দিক দিয়ে তার ও কর-এর মধ্যে কতকটা সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়, কিন্তু তা অনেকগুলো দিক দিয়েই সম্পূর্ণ ভিন্ন ও স্বতন্ত্র। প্রথম আইনগত উৎসেরদিক দিয়েই তা ভিন্ন জিনিস। ফরয হওয়ার ভিত্তির দিক দিয়েও তা স্বতন্ত্র ব্যবস্থা। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের দিক দিয়েও উভয়ের মধ্যে কোন মিল নেই। হার ও পরিমাণের ক্ষেত্রেও পূর্ণ বৈসাদৃশ্য বিদ্যমান। ব্যয়ের ক্ষেত্রেও উভয়ের আলাদা আলাদা। … এ অধ্যায়ে প্রথম পরিচ্ছেদে যেমন আমরা বর্ণনা করেছি।
পরে বলেছেন, যাকাত যখন স্বয়ং আল্লাহ প্রবর্তিত একটা ঈমানী ফরয বিশেষ, তার প্রয়োজনদেখা দিক আর না-ই দিক, তা আদায়করা ফরয। এরূপ অবস্থায় তা ফকীর মিসকীনদের জন্যে একটা স্থায়ী আয়ের উৎস সমতুল্য। কোন জাতি বা উম্মত কখনই ফকীর-মিসকীন শূন্য হয় না। পক্ষান্তরে কর হচ্ছে প্রয়োজন অনুযায়ী শাসক কর্তৃক প্রবরিত্ত। তাই একথা স্পষ্ট যে, দু’য়ের একটা অপরটার জন্যে যথেষ্ট নয়। আইনগত উৎসেরদকি দিয়েও এ দুটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও ভিন্নতর হক। আর লক্ষ্য পরিমাণ, স্থিতিশীলতা ও স্থায়িত্বের দিক দিয়েও দুটি এক নয়।
এ কারণে কর দেয়া তো বাধ্যতামূলক কর্তব্য। তা এমন একটা ঋণ পর্যায়ের যা নিয়ে ধন-মাল মশগুল হয়। যা অবশিষ্ট তা যদি যাকাতের নিসাব পরিমাণ হয় এবং তাতে যাকাতের শর্তাদি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়- তা হচ্ছে মৌল প্রয়োজন পূরণথেকে অবসর পাওয়া এবং তার ওপর যদি একটা বৎসর অতিবাহিত হয়, তাহলে তার যাকাত দেয়া একটা দ্বীনী ফরয হয়ে দাঁড়ায়।
জনগণের ওপর যে কর ধার্য হয়, তাতে মানুষ নিজেদেরকে নিষ্পেষিত ও অত্যাচারিত মনে করে। কেননা তৎলব্ধ সম্পদ ফকীর মিসকীনরা আল্লাহ্র ধার্য করা থেকে বঞ্চিত থাকার কারণ লাভ করে না। তার পথ হচ্ছে সরকারের অর্থনৈতিক দাবি, যা তার বিশেষ ব্যয়ক্ষেত্রে ব্যয়িত হবে। তার হিসেব-নিকেশ ও তার সংগ্রহ ও ব্যয়ের পথে চলবে।
আর সরকার কর্তৃক তার সাধারণ কার্যক্রমের হিসেব গ্রহণের ব্যাপরটি সম্পর্কে ইসলামের মৌল নীতিসমূহ সাক্ষ্য দেয়। তাতে সাধারণ সামষ্টিক কল্যাণ সাধিত হয়। দ্বীন-ইসলাম তাকে প্রথম স্থানে বসিয়েছে। [(আরবী **********)]
শায়খ আবূ জুহ্রার অভিমত
শায়খ আবূ জুহরা তাঁর (আরবী **********) গ্রন্থে আলোচ্য বিষয়টি- যাকাতের সাথে কর-এর সম্পর্ক-শামিল করেছেন। তিনি লিখেছেন:
কোন কোন আলোচনাকারী এ চিন্তাটি তুলে ধরেছেন: যাকাত কি ওসর কর-এর সাথে চিরকালই ফরয হয়ে থাকবে?
তার জবাবে তিনি বলেছেন: আমরা বলব, এ সব কর এখানকার সময় পর্যন্ত সামষ্টিক দায়িত্ব গ্রহণের জন্যে কোন মূল্যবান পরিমাণ আলাদা করে বিশেষভাবে নির্দিষ্ট করে দেয়নি অথচ যাকাতের আসল লক্ষ্য হচ্ছে সামষ্টিক অভাব মেটানো। তা সব কিছুর পূর্বেই কাম্য। কোন কোন কর অবশ্র অপ্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দেয়; কিন্তু কর যে স্থায়ীভাবেই থাবে, তা থেকে নিষ্কৃতি নেই। এ –ও সন্দেহাতীত কথা। কেননা আজ পর্যন্ত তা ফকীর মিসকীনের প্রয়োজন পূরণ করতে পারেনি অথচ তা পূরণ হওয়া আবশ্যক। [(আরবী **********)]
শায়খ আবূ জুহরা এ জবাবে কিছুটা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। কেননা তাঁর কথা থেকে বোঝা যাচ্ছে, তিনি হয়ত মনে করেন, কর যদি তার একটা বিশেষ মূল্যবান অংশ সামষ্টিক দায়িত্ব গ্রহণের জন্যে নির্দিষ্ট করে দেয় এবং ফকীর-মিসকীনের প্রয়োজন মিটে যায়, তা হলে আর যাকাত দেয়া প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকবে না।
অথচ প্রকৃত কথা হচ্ছে, যাকাতকে কোন কিচুই প্রত্যাহার করাতে পারে না। কোন জিনিসই তার বিকল্প হতে- তার প্রয়োজন খতম করতে পারে না। তা মহান আল্লাহ্র ধার্য করা বিশেষ ফরয। বান্দারা তা বাতিলও করতে পারে না, তাকে অচলকরেও রাখতে পারে না। যাকাত তার নামে তার নিয়ম-কানুন সহকারে, তার পরিমাণ ও শর্ত অনুযায়ী আদায় হতে হবে এবং আল্লাহ্র নির্দিষ্ট করা খাতসমূহেরই তা ব্যয় হতে হবে, যা তাঁর কিতাবে স্পষ্ট ভাষায় বলে দেযা হয়েছে।
আমরা যদি এমন একটা দেশ বা স্থানের কথা মনে করি যার ধন- ঐশ্বর্যের বিপুলতা ও উৎপাদনের আধিক্যের কারণে গরীব জনগণও সচ্ছল হয়ে গেছে- অন্যান্য কারণেও তা হতে পারে- তাহলেও সেখানে ধনী মুসলমানদের কাছ থেকে ‘আল্লাহ্র পথে, আল্লাহ্র বাণী প্রচার এবং তাঁর দ্বীনের প্রতি লোকদের মন আকৃষ্ট করার কাজে ব্যয় করার লক্ষ্যে অবশ্যই যাকাত আদায় করতে হবে। কোন অবস্থায়ই তা প্রত্যাহৃত হবে না।
তার একটা পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টান্ত হচ্ছে, কোন সরকার যদি করলব্ধ সম্পদ থেকে একটা বিরাট পরিমাণ সামষ্টিক দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট করে দেয়, তাহলেও সেখানে যাকাত কিছুমাত্র অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে না। কেননা তা একটা ইবাদত সুনির্দিষ্ট নিদর্শন বিশেষ।
অতএব যাকাত চিরকালই কার্যকর থাকবে, থাকবে যদ্দিন ও পৃথিবীতে কুরআন মজীদ থাকবে- কুরআন মুসলমান মাত্রকেই সম্বোধন করে বলতে থাকবে:
(আরবী **********) তোমরা নামায কায়েম কর, যাকাত দাও।
সম্ভবত শায়খ আবূ জুহ্রা খুব তাড়াহুড়া করে প্রশ্নের জবাব লিখেছেন। তিনি তাঁর উক্ত কথার গভীর তত্ত্ব ও তাৎপর্যের দিকে লক্ষ্য দিতে পারেন নি।
সার কথা
শায়খ শালতুত এবং তাঁর পূর্ববর্তী আলিমগণের ফতোয়া: ‘কর যাকাতের বিকল্প হতে পারে না’ –ফতোয়াদাতা ও ফতোয়াপ্রার্থী সকলেরই জন্যেই সান্ত্বনাদায়ক। কেননা তাতে সহীহ শরীয়াতের দৃষ্টিভঙ্গী পুরোপুরি বাস্তবায়িত। তা সর্বাবস্থায়ই মুসলিম ব্যক্তির দ্বীনদারীর পক্ষে সর্বাধিক নিরাপদ মত। সেই সাথে এই ফরযটি স্থায়িত্বেরও নিয়ামক। মুসলমানদের পারস্পরিক মধুর সম্পর্ক রক্ষার জন্যে তা অধিক কার্যকর। কর-এর নামে এ ফরযের কথা কখনই ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। হাওয়া তা উড়িয়ে নিতে পারে না।
অবশ্য একথা সত্য যে, মুসলমানদের এতে খুব বেশী কষ্ট এবং অসুবিধা ভোগ করতে হয়। অন্যরা যে অর্থনৈতিক বোঝা বহন করে না, মুসলমানকে তা বহন করতে হয়। কিন্তু সেটা তো ঈমানের দাবি। ইসলাম অর্পিত দায়িত্ব। বিশেষ করে ফেতনা-ফাসাদের দিকগুলোতে, যখন অত্যন্ত ধৈর্যশীল ব্যক্তিও দিশা হারিয়ে ফেলে। এ সময় দ্বীনী ব্যবস্থা ধারণকারী ব্যক্তির অবস্থা হয়- সে যেন জ্বলন্ত অঙ্গার মুঠোর মধ্যে চেপে ধরেছে। সর্বাবস্থায় মুসলিম ব্যক্তির অবস্থা হয়- সে যেন জ্বলন্ত অঙ্গার মুঠোর মধ্যে চেপে ধরেছে। সর্বাবস্থায় মুসলিম ব্যক্তির কর্তব্য হচ্ছে বিপর্যস্ত অবস্থাকে সুস্থ ও সঠিক করার জন্যে অবিশ্রান্ত কাজ করতে থাকা, জিহাদ করতে থাকা। বেঁকে যাওয়া সমাজ ব্যবস্থাকে সঠিক করে গড়ে তোলা- ইসলামী কর্মপন্থার দিকে সবকিছুকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা, ইসলামী ব্যবস্থা- ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠিত করা।
তা করা সম্ভব না হলে মুসলিম ব্যক্তি সব সময়ই অর্থনৈতিক মনস্তাত্বিক ও সামষ্টিক নির্যাতনে নিষ্পেষিত হতে থাকবে। কেননা এখন সে এমন একটা সামাজিক পরিবেশে বসবাস করছে, যেখানে সে সহযোগিতার পরিবর্তে প্রতিবাদে বিরোধিতার ও আঘাতের সম্মুখীন হচ্ছে। তার হাত ধরে এগিয়ে নেয়ার পরিবর্তে তার পথ রোধ করে দাঁড়াচ্ছে। এটা একটা সাধারণ ও ব্যাপক মুসিবত- জীবনের সর্বক্ষেত্রে। অথচ ইসলামের দাবি হচ্ছে তার বিশ্বাসীরা সর্বাবস্থায় শরীয়াত পালন করে চলবে, কেবল যাকাতের ব্যাপারেই নয়, সকল ক্ষেত্রে।
মুসলমান যখন দেখবে যে, রাষ্ট্র গরীব-মিসকীনের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং তার চারপাশে যাকাত পাওয়ার যোগ্য কোন অভাবগ্রস্ত মুসলমান বর্তমান নেই, -আমেরিকার মুসলমানদের এ পর্যায়ে গণ্য করা যায়- তবুও সে যেন মনে না করে যে, যাকাত তার প্রয়োজন ও গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে। কেননা যাকাতের আরও তো বহু কয়টি ব্যয়খাত রয়েছে- ই এরপূর্বে বিশ্লেষিত হয়েছে- যেমন ইসলামের দাওয়াত প্রচার ইসলামের দিকে- ইসলাম গ্রহণ করার জন্যে দাওয়াত দেয়া, লোকদের মন ইসলামের দিকে আাকৃষ্ট করা ও রাখা, ইসলামী দাওয়াত প্রচারক সংগঠন এবং ইসলামী কেন্দ্র কায়েম ও পরিচালনা করা। আল্লাহ্র কালেমা সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে বাস্তব ও সুসংগঠিত জিহাদের সূচনা করা। এগুলো কুর্বান ঘোষিত ‘আল-মুয়াল্লাফাতু কুলুবুহুম’ পর্যায়ের ফী সাবিলিল্লাহ পর্যায়ের কাজ। এসব কাজও যদি কোন দেশে করা সম্ভবপর না হয়, তাহলেযাকাত নিকটবর্তী কোন দেশে- যেখানে তার নির্দিষ্ট ক্ষেত্রসমূহে ব্যয় করা সম্ভব- পাঠিয়ে দিতে হবে।
ইবনে তাইমিয়া তাঁর পূর্বে নব্বী এবং এ দু’জনের পূর্বে ইমাম আহমদ থেকে বর্ণিত যে সব কথা ইতিপূর্বে উদ্ধৃত হয়েছে, তার সাথে আমাদের বাস্তবতার কোন সম্পর্ক নেই, তা আমাদের কালের ব্যাপারেও নয়। তা এমন সময়ের কথা, যখন ফরয যাকাত পূর্ণ মর্যাদা সহকারে কার্যকর ছিল। যখন দারুল ইসলামে রাষ্ট্রই যাকাত সংগ্রহ করার দায়িত্ব পালন করত এবং জাতির জনগণ সাধারণভাবেই তাদিয়ে দিত। তারা যদি আমাদরে একালে হতেন, তাহলেতাঁরা অন্য রকম ফতোয়া দিতেন। কেননা এমন অবস্থা ও কালের আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছে। তখন তাঁরা জমতহুর ফিকাহ্বিদদের সাথেই একাত্মতা প্রকাশ করতেন।
আমাদের ব্যক্তিগণের কাছ থেকে নানা নামে যা কিছু নেয়া হয়, তাকে যদি আমরা যাকাত গণ্য করে অনুমতি দিই তাহলে তো এ দ্বীনী ফরযটির চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দেয়া হবে। আর তাহলে ব্যক্তি জীবনে যাও বা ইসলামের নামচিহ্ন আছে, তাও নিঃশেষ হয়ে যাবে- সরকারী পর্যায়ে ইসলামী জীবন যেমন করে বিলীন হয়ে গেছে। কিন্তু মুসলিম জাহানের কোন কালের কোন স্থানের কোন আলিমই তার সাথে ইকমত হতে পারে না। (আরবী **********)
উপসংহার
ইসলামের যাকাত এক অভিনব অনন্য ব্যবস্থা
যকাতা সংক্রন্ত এ বিশাল বিস্তারিত আলোচনা থেকে এর বিভিন্ন অধ্যায় ও পরিচ্ছেদে লেখা কথাগুলো থেকে আমাদের সম্মুখে একথা স্পষ্ট হয়ে গেছে বলে মনে করি যে, ইসলাম মদীনা শরীফ পর্যায়ে যে যাকাত ফরয করেছে এবং তার সীমা, পরিমাণ ও বিধি-বিধান বর্ণনা করেছে, তা বিশ্বমানবতার ইতিহাস এক অভিনব ও অনন্য ব্যবস্থা। কোন আসমানী বিধানেই ইহিপূর্বে অনুরূপ কোন ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি, কোন মানব রচিত মতবাদ বা জীবন বিধানেও তার কোন দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে না।
যাকাত একটা অর্থনৈতিক বিধান যেমন, তেমনি সামজিক, সামষ্টিক, রাজনৈতিক, নৈতিক ও দ্বীনী ব্যবস্থা- এক সাথে এ সবই।
যাকাত একটা আর্থিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা
কেননা তা একটা সুনির্দিষ্ট আর্থিক কর বিশেষ। কখনও তা মাথাপিছু ধর্য হয়-যেমন ফিতরার যাকাত, কখনও ধন-মালের ওপর আরোপিত হয়, মওজুদ মাল ও আমদানীও ওপর। সাধারণ যাকাত ব্যবস্থার এটা নিয়ম। ইসলামে বায়তুলমালের আয়ের উৎস হিসেবে তা একটা চিরন্তন অর্থনৈতিক উৎস। ব্যক্তিদেরকে অভাব-দারিদ্র্য থেকে মক্তকরণ এবঙ তাদের অর্থনৈতিক প্রয়োজন পরিপূরণের জণ্রে ব্যয়িত হয়। উপরন্তু তা পুজিকরণ এবং ধন-মালের স্বাভাবিক আবর্তন ও উৎপাদনে বিনিয়োগ বন্ধকরণের বিরুদ্ধে এক কার্যকর আঘাত বিশেষ।
তা একটা সামাজিক ব্যবস্থাও। কেননা তা সমাজের লোকদেরকে তাদের প্রকৃত ও সম্ভাব্য অক্ষমতার বিরুদ্ধে নিরাপওা দানের কাজ করে। আকস্মিক বিপদ ও দুর্দশার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা খুবিই কার্যকর। তা লোকদের মধ্যে একটা মানবিক নিরাপওা গড়ে তোলে, যেখানে ‘আছে’র দলের লোকেরা ‘নেই’ দলের লোকদেরকে সাহায্য করে। শক্তিশালী দর্বলের হাত ধরে ওপরে তোলে। মিসকীন, নিঃস্ব পথিক নিরাপওা লাভ করে। ধনী ও গরীবের মধ্রকার পার্থক্য-দূরত্ব হ্রাস করে। সক্ষম ও অক্ষমদের মধ্যকার পারস্পরিক হিংসা ও বিদ্বেষ এবং পরশ্রীকাতরতার অগ্নি নির্বাপিত করে। লোকদের মধ্যে যারা পারস্পরিক বিবাদ মীমাংসার কাজ করে এবং তা করতে গিয়ে অনেক আর্থিক ঝুঁকিতে পড়ে যায়, যাকাত ব্যবস্থা তাদের সাহায্য করে এবং তারা সাধারণ কল্যাণের পথে যে ঋণ মাথায় চাপিয়ে নেয়, তা শোধ করে দেয়ার ব্যবস্থা করে। অনুরূপভাবে বহু প্রকারের সামাজিক সমস্যার সমাধান করে দেয়, তার অতি উচ্চ কল্যাণকর লক্ষ্য বাস্তবায়নে, তার সম্মুখবর্তী পবিত্র উদ্দেশ্যাবলী পরিপূর্ণ কার্যকরভাবে অংশ গ্রহণ করে।
তা একটা রাজনৈতিক ব্যবস্থা
কেননা যাকাতের ব্যাপারে মূল কথা হচ্ছে, রাষ্ট্রই তা সংগ্রহ ও তার খাতসমূহে বণ্টনের জন্যে দায়িত্বশীল। তাতে তাকে সুবিচার ও ন্যায়পরতার নীতি কড়াকড়িভাবে অনুসরণ করতে হয়। প্রয়োজনসমূহের পরিমাণ নির্ধারণ ও বেশী গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারকে অগ্রাধিকার দান তার দায়িত্বের অনর্ভুক্ত। আর তা করতে হবে এটা নির্ভরযোগ্য বিশ্বস্ত ও শক্তিশালী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে, যা হবে-কুরআনের ভাষায় সংরক্ষক, অভিজ্ঞ, অবহিত। এ ধরনের কর্মচারীও তাতে নিযুক্ত করে নিতে হবে। সরকারের নিজস্ব দায়িত্বে কয়েকটি ক্ষেত্রে যাকাত ব্যয়ের ব্যবস্থা করতে হবে, যেমন ‘মুয়াল্লাফাতু কুলুবুহুম’ এবং ‘ফী সাবীলিল্লাহ’।
তা একটা নৈতিক ব্যবস্থাও
কেননা তার লক্ষ্য হচ্ছে ধনী লোকদের মন-মানসকে ধ্বংসকারী লোভ-কার্পণ্য এবং কলূষিত আত্মম্ভবরিতার ময়লা ও আবর্জনা থেকে পবিত্র করা এবং বদান্যতা-দানশীলতা ও কল্যাণ-প্রেমে তাদের হৃদলকে পরিশুদ্ধতায় ভরপুর করে দেয়া। অন্য লোকদের দুঃখ-দুর্দশায় সাহানুভূতি ও দয়ামায়া সহাকরে তাদে সাথে একত্ম করে তোলা। বঞ্চিতদের অন্তরে যে হিংসার আগুন জ্বলে ওঠে তা নির্বাপনে বিরাট কাজ করে এবং অন্য লোকদেরকে আল্লাহ তা‘আলা যে জীবনের মহামূল্য সামগ্রী ও সুখ সম্পদ ভরে দিয়েছেন, তা দেখে তাদের চোখ টাটায়-যাকাত তা শীতল করে দেয়। লোকদের পরস্পরের মধ্যে ভালবাসা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করে।
সর্বোপরি তা একটা দ্বীনী ব্যবস্থা
কেননা যাকাত প্রদান করা ঈমানের দিক দিয়ে সাহায্যকারী কর্মসমূহের অন্যতম। ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুকন। অতীব কার্যকর একটি ইবাদত, যা আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের জন্যে খুবই শাণিত। কেননা অভাবগ্রস্ত লোককে তা দেয়ার প্রথম লক্ষ্য হচ্ছে দ্বীনের প্রতি তার ঈমানকে সুদৃঢ় ও স্থায়ী করা, আল্লাহ্র আনুগত্য ও ইবাদতকরণে, তাঁর নির্দেশাবলী কার্যকরেকরণে তার সাহায্য ও সহযোগিতা করা। কেননা যে দ্বীন এ মহান ব্যবস্থা উপস্থাপিত করেছে, সে দ্বীনই তৎসংক্রান্ত যাবতীয় আইন-বিধান, পরিমাণ ও তার ব্যয়ের ক্ষেত্রসমূহ সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট ও প্রতিভাত করে দিয়েছে। তার একটা অংশ অভাবগ্রস্ত লোকদের অভাব-দারিদ্র্য মোচনে ব্যবস্থার করার জন্যে নির্দিষ্ট করেছে। করার কাজে ব্যয় করার জন্যে। তার দ্বীনের কালেমা সর্বত্র প্রচার করা এবং পৃথিবীর বুকে দ্বীনের দাওয়াত ও বিধানকে প্রতিষ্ঠিত করার কাজে নিয়োগ করার জন্যে-যেন কোথাও আল্লাহহীন ব্যবস্থা ও আল্লাহ্র শক্তির আনুগত্য ও অধীনতা অবশিষ্ট না থাকে এবং সমগ্র পৃথিবীর বুকে একমাত্র আল্লাহ্র দ্বীন পুরামাত্রায় কার্যকর ও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
বস্তুত এ-ই হচ্ছে যাকাত। ইসলামও এ যাকাতকেই জারী ও কার্যকর করেছে শরীয়াতসম্মতভাবে-যদিও আজকের এ শেষ যুগের মুসলমানরা তার এ নিগূঢ় তও্ব ও তাৎপর্যের কথা বেমালুম ভুলে গেছে। তা রীতিমত আদায় করা ছেড়ে দিয়েছে, বহুলোক অবশ্য এ পর্যায়ে এখনও গণ্য নয়; কিন্তু তুলনামূলকভাবে তাদের সংখ্যা বেশী নয়।
এ যাকাতই এককভাবে প্রমাণ করেছে যে, এ দ্বীণ ও এ শরীয়াত বিশ্বস্রষ্টা মহান আল্লাহ্র কাছ থেকেই অবতীর্ণ। উম্মী মুহাম্মাদ (স)-এর কোন সাধ্যই ছিল না নিজস্বভাবে এ একক-অনন্য সুবিচারমূলক জীবন বিধান দুনিয়ায় পেশ করা ও বিশ্বমানবকে তা গ্রহণের জন্যে পথ দেখানো। এ দ্বীন তাঁর ব্যক্তিগত চিন্তার ফসল নয়, তাঁর জ্ঞন-তথ্য সমৃদ্ধ বা নিঃসৃত নয়-যদি না আল্লাহ তাঁকে বিশেষভাবে অহীযোগে এ ক্ষতমা ও সুযোগ দিতেন, তাহলে এটা সম্পূর্ণ অসম্ভব ছিল তাঁর পক্ষে। আল্লাহই তাঁর প্রতি আয়াত নাযিল করেছেন, লোকদের জন্যে হোদায়েতের বিধান দিয়েছেন, হেদায়েত ও সত্য-মিথ্যা পার্থক্যকারী অকাট্য নিদর্শনাদিও দিয়েছে। তিনি যা জানতেন না, আল্লাহ্ই তাঁকে জানিয়ে দিয়েছেন। তাঁর প্রতি ছিল আল্লাহ্র অফুরন্ত রহমত ও অতুলনীয় অনুগ্রহ।
যাকাতের পক্ষে ভিন্নমতের লোকদের সাক্ষ্য
যাকাতের এ তুলনাহীন ব্যবস্থার মাহাত্ম্য এবং মহও্ব বহু মুসলমানই হয়ত বুঝে উঠতে পারছে না। বরং যাকতকে বিকৃত করেছে এবং ইসলামে বিশ্বাসী বলে দাবি করা সও্বেও যাকাতকে তারা নানাভাবে গালমন্দ করেছে। তারা কিন্তু মুসলমানী নাম যথারীতি বহন করে চলেছে অথচ পাশ্চাত্য লেখকদের মধ্যেও এমন লোক প্রচুর রয়েছে যারা যাকাত ব্যবস্থার উচ্চ প্রশংসা করেছেন। শুধু তা-ই নয়, মানুষের কল্যাণের জন্যে এরূপ একটা মহান ব্যবস্থা কার্যকরকরণে সারা দুনিয়ার আধুনিক জীবন ব্যবস্থার সর্বাগ্রে ইসলামই যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, সে কথাও তাঁরা অকপটে স্বীকার করেছেন।
অরনোল্ড তাঁর ‘ইসলামী দাওয়াত’ নামের গ্রন্থে ইসলামের প্রধান নিদর্শনাদি সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে ইসলামী হজ্জ এবং তার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে, তার মহান লক্ষ্য সম্পন্ন ব্যবস্থা হওয়া সম্পর্কে বলিষ্ঠ কণ্ঠে উল্লেখ করেছেন। পরে যাকাত সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে বলেছেনঃ
হজ্জ ব্যবস্থা পাশাপাশি আমরা আর একটা ফরয কাজ হিসেবে পাচ্ছি যাকাত প্রদান ব্যবস্থা। মুসলমানরা আল্লাহ্র এ কথাটি স্মরণ করেঃ ‘মুমিনরা সব ভাই ভাই? এটি একটা দ্বীনী দৃষ্টিভঙ্গী, অতি ইজ্জ্বলরূপে তা বাস্তবায়িত হয় উক্ত ব্যবস্থার মাধ্যমে। তা খুব বিস্মিয়করভাবে হালকা বৃষ্টিবর্ষণ করে ইসলামী সমাজের মধ্যে।
সমাজে সাদরে গৃহীত হয় এবং অন্যান্য মুসলিমদের সাথে সমান মর্যাদায় সে উপযুক্ত স্থান লাভ করে। [আরবী**********]
লিউড্রোশ বলেনঃ যে দুটো কঠিন সামাজিক সমস্যা গোটা বিশ্বকে জর্জরিত করে তুলেছে, তার সমাধান আমি ইসলামে পেয়েছি। প্রথম-আল্লাহ্র ঘোষণা ‘সব মুমিন ভাই ভাই।’ সামাজিকভাবে মৌল বিধানের সংক্ষিপ্ত ঘোষণা এটা। আর দ্বিতীয়-প্রত্যেক মালদারের ওপরই যাকাত ফরয করা। এমনি পরীবদেরকে তাদের প্রাপ্য জোরপূর্বক নিয়ে নেয়ার সুযোগ দান- যদি ধনীরা তা দিতে ইচ্ছুক না হয়, দিতে অস্বীকার করে। এটাই প্রকৃত সাম্য প্রতিষ্ঠার পন্থা।
অপর একজন বিজাতীয় ব্যক্তি কর্তৃক লিখিত গ্রন্থে যাকাত সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, উস্তাদ কুরদে আলী তা আমাদের জন্যে উদ্ধৃত করেছেন। তা হচ্ছেঃ
এ ‘কর’টি একটা দ্বীনী ফরয কাজ। সকলের পক্ষেই তা দেয়া বাধ্যতামূলক। তা দ্বীনী ফরয হওয়া ছাড়াও যাকাত একটা সামষ্টিক বিধান-সর্বসাধারণ ও নির্বিশেষ। এমন একটা উৎস, মুহাম্মাদী বিধান অনুসারী রাষ্ট্রের মাধ্যমে একটা সম্পদ সংগ্রহ করে এবং তদ্দারা গরীব, মিসকীনকে সাহায্য করে তাদের সচ্ছল বানায়। আর এটা করা হয় একটা সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ভিওিতে, স্বৈরতান্ত্রিক বল প্রয়োগের মাধ্যমে নয়-নয় কেন অস্থায়ী উড়ন্ত পন্থার মাধ্যমে।[আবরী***********]
‘এ অভিনব ব্যবস্থা প্রবর্তনে ইসলামই প্রথম অবদানস রেখেছে। মানব ইতিহাসে সাধঅরণভাবেই তার ভিওি ইসলাম কর্তৃকই সর্বপ্রথম সংস্থাপিত হয়েছে। অতএব যাকাত কর, মালিক-ব্যবসায়ী ধনী শ্রেণী লোকদের তা দিতে বাধ্য করা হত, যেন সরকার বা রাষ্ট্র গরীব অক্ষম লোকদের জন্যে ব্যয় করতে পারে। এ ব্যবস্থা সেই প্রাচীরকে ধূলিস্মাৎ ও চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিয়েছে, যা একই রাষ্ট্রের বিভিন্ন শ্রেণীল লোকদের মধ্যে বিরাট পার্থক্যের সৃষ্টি করত। আর এর দ্বারা সামাজিক সুবিচারের পরিমন্ডলের গোটা উম্মতকে ঐক্যবদ্ধ্য করেছে। এ কারণে ইসলামী ব্যবস্থা প্রমাণ করেছে যে, তা কোন বিদ্বেষ হিংসার প্রতিক্রিয়ার ভিওিতে গঠিত হয়নি। [ঐ ৭৬-৭৭ পৃ.]
প্রখ্যাত ফরাসী প্রাচ্যবিদ মাসিনিউন-এর উক্তি উদ্ধৃত করেছেনঃ
দ্বীন ইসলামের জন্যে যথেষ্ট ব্যবস্থা তা-ই, যা সাম্যের চিন্তাকে বাস্তবায়িত করার জন্যে খুব বেশী কঠোরতা অবলম্বন করা হয়। আর তা করা হয় যাকাত ফরয করার সাহায্যে,- যা প্রত্যেক ব্যক্তি বায়তুলমালে জমা করে। তা সুদী ব্যবস্থা ও অপ্রত্যক্ষ করসমূহ-যা জরুরূ ও প্রাথমিক প্রয়োজনের ভিওিতে ধার্য করা হয়-কে উৎপাটিত করে। সাময়িকভাবে ব্যক্তিগত মালিকানা ও ব্যবসায়ী মূলধনকে ঠেকিয়ে দেয় আর এর সাহায্যে ইসলাম দ্বিতীয়বার পুঁজিবাদী বুর্জোয়া ব্যবস্থা ও বলশোভিক কমিউনিস্ট ব্যবস্থার মাঝাখানে একটা সম্মানজনক স্থান দখল করে নেয়।[আবরী***********]
ইটালী লেখিকা ডঃ ফাগ্লীরী তাঁর গ্রন্থে যা লিখেছেন, তা আরবী ভাষায় অনুদিত হয়েছে (আবরী***********) নামে। তাতে বলা হয়েছেঃ
‘আমি মোটামুটি সব ধর্মে আরোপিত নৈতিক মহান সামজিক গুরুত্ব-যা সাদকা দান দেয়ার ব্যবস্থা পেশ করেছে-স্বীকার করি এবং আমি তার ভাল দিককে দয়া-অনুগ্রহের বাস্তব ব্যাখ্যা বলে গণ্য করি। কিন্তু ইসলাম সাদকাকে বাধ্যতামূলককরণে একক আদর্শ মর্যাদা ভোগ করেছে-মসীহর শিক্ষাকে। দুনিয়ার ব্যাপারস্বরূপ এবং এখান থেকেই তা বাস্তবায়িত করার দরুন। তাই প্রত্যেকটি মুসলমান তার সম্পদের একটা অংশ ফকির পথিক মিসকীনের কল্যাণের জন্যে বিশেষভাবে নির্দিষ্ট করে দিতে বাধ্য। আর এ দ্বীনী ফরয পালন করানোর মাধ্যমে মুমিন ব্যক্তির মানবিকতার গভীর অনুভূতির যাচাই করা হয়। তার অন্তর ও আত্ম লোভ-কর্পণ্য থেকে পবিত্র হয় এবং মহান আল্লাহ্র কাছ থেকে শুভ কর্মফল লাভে আশা-আকাঙ্ক্ষার সফলতা পায়। [আবরী***********]
মুসলিম সমাজ সংস্কারকদের কথা
উপরে প্রাচ্যবিদ পাশ্চাত্য মনীষীদের যাকাতের সৌন্দর্য মাহাত্ম্য সংক্রান্ত ইনসাফপূর্ণ কথাসমূহ উদ্ধৃত করেছি। এখন আমরা কাতিপয় মুসলিম সামজ সংস্কারকে কথা উল্লেখ করাব। তাঁরা যাকাত সম্পর্কে এ সব উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন কথা বলেছেন। সম্ভবত এসব কথা থেকে অনেকে হেদায়েত এবং নসীহত লাভ করতে পারবেন।
ইসলামের মর্যদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্যে যাকাত আদায় বাধ্যতামূলক করাই যথেষ্ট
সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ রশীদ রিজা (র) তাঁর তাফসীরে লিখেছেনঃ
‘যাকাত দেয়া ফরয করার দরুন দ্বীন ইসলাম অন্যান্য সব ধর্ম ও মতের ওপর বিশিষ্ট মর্যাদার অধিকারী হয়েছে। সারা দুনিয়ার সুধী ও সমজ বিজ্ঞানীরা একথা স্বীকার করেছেন। মুসলমানরা যদি তাদে দ্বীনের এ রুকনটা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে, তা হলে আল্লাহ তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছেন এবং রিযিকে বিপুল প্রশস্ততা দিয়েছেন-এ সও্বেও যে গরীব লোক পাওয়া যাচ্ছে, তা আদৌ দেখা যেত না। পাওয়া যেত না ভয়াবহ ঋণের ভারে ন্যুজ কোন লোক। কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোকই এ ফরযটি পালন করা ত্যাগ করেছে। এর দরুন তারা তাদের দ্বীন ও জাতির কাছে মহা অপরাধ করছে। আর এর কারণে তারা তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কল্যাণের দিক দিয়ে দুনিয়ার জাতিসমূহের তুলনায় অত্যন্ত খারাপ এবং নিকৃষ্ট হয়ে আছে। তারা তাদের রাজত্ব হারিয়েছে, ইজ্জত খুইয়েছে, মর্যাদা হারা হয়েছে। ফলে অপরাপর জাতির ওপর তারা তখন বোঝা হয়ে দাড়িয়েছে। এমন কি তাদের সন্তানদের শিক্ষা-প্রশিক্ষণে পর্যন্ত এ অবস্থা বিরাজ করছে। তারা তাদেকে খৃষ্টধর্ম প্রচারকদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে ভর্তি করে দেয় অথবা নাস্তিকদের শিক্ষাকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। ফলে তাদের দ্বীনী বিপর্যন্ত হয় দুনিয়াও তাদে বিনষ্ট হয়। তাদের জতীয় ও মিল্লাতী সম্পর্ক ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। তারা বিজাতীয়দের কাছে নিকৃষ্টহীন দাস প্রমাণিত হয়। তাদের যখন বলা হয়ঃ তোমরা ওসব পাদ্রী মিশনারী এবং নাস্তিক কমিউনিষ্টদের মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোল না কেন? তখন তারা বলেঃ সেজন্যে যে অর্থের প্রয়োজন তা আমাদের নেই। কিন্তু একথা সত্য নয়। আসলে তাদের বিবেক-বুদ্ধি বলতে কিছু নেই। উচ্চতর সাহস-হিম্মত নেই। আত্মমর্যাদাবোধও তারা হারিয়েছে। ফলে তারা সে কাজ করতে সক্ষম হচ্ছে না।
তারা অন্যান্য জাতির লোকদের দেখে, তারা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান কল্যাণকর সংস্থা-সমিতি ও রাজনীতি গড়ে তুলছে, যা করতে তাদের ধর্ম তাদের বাধ্য করছে না। তাদের বিবেক-বুদ্ধি, জাতিত্ববো্ধ ও আত্মচেতনাই তাদের এজন্যে উদ্বুদ্ধ করেছে। তারা এসব দেখেও লজ্জাবোধ করছে না। তারা ওসব জাতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতেই ভালবাসে। এরা এদের দ্বীন পরিহার করেছে, ফলে তারা দুনিয়াও হারিয়েছে। তারা আল্লাহ্কে ভুলে গেছে, ফলে ভুলে গেছে তারা নিজেদেরকেও। এরাই হচ্ছে নীতি সীমালংঘকারী লোক।
অতএব মুসলিম সমাজ সংস্কারকদের কর্তব্য হচ্ছে তাদের দ্বীনদারী ও মর্যাদাবোধের যতটুকু এখনও অবশিষ্ট আছে, তার থেকেই সংশোধনী প্রচেষ্টার সূচনা করা। এজন্যে যাকাত সংগ্রহ করার এবং সর্বাগ্রে এ সংস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট লোকদের অবস্থার সংশোধন এবং তাদের সর্বপ্রকার কল্যাণ সাধনে সর্বপ্রথম ব্যয় করা কর্তব্য, অন্যদের ব্যাপারে পরে দেখা যাবে। এরূপ একটা সংস্থা গড়ে তোলা ও তার কাজ চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে গুরুত্ব সহকারে লক্ষ্য রাখতে হবে যে, যাকাত, ‘মুয়াল্লাফাতুল কুলুবুহুম’ খাতের একটা বিশেষ ব্যয় ক্ষেত্রে হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ কবলিত জাতিসমূহকে দাসত্বের শৃংখলমুক্ত করা যদি ব্যক্তিদের মুক্ত করার জন্যে ব্যয় করার সুযোগ না থাকে। আর ‘সাবীলিল্লাহ’ অংশের সঙগ্রাম পরিচালনা করা। এই জিহাদের চাইতেও অধিক গুরুত্বপূর্ণ-কুফরী শক্তির অত্যাচার জুলুম ও নিষ্পেষণ থেকে মুসলমানদের রক্ষা করার জন্যে। যখনী ও বক্তৃতা-ভাষণের সমুচিত জবাব দান ইসলামের প্রতিরক্ষা তার আর একটি ব্যয় ক্ষেত্রে।– যখন তরবারি ও অস্ত্রশস্ত্রের সাহায্যে প্রতিরক্ষার কাজ চালানোর কঠিন বা অসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছে।
জেনে রাখ, সমস্ত মুসলমানদের কিংবা তাদের অধিকাংশের যাকাত দান এবং তা একটা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যয় করাই ইসলামের মর্যাদা ফিরিয়ে আনার জন্যে যথেষ্ট। বরং অন্যরা দারুল ইসলাম থেকে যা কিছু হরণ করে নিয়ে গেছে তা ফিরিয়ে আনা এবং কাফিরদের দাসত্ব থেকে মুসলমানদের মুক্তিদানের জন্যে এটা একান্তই অপরিহার্য। বস্তুত ধনী লোকদের প্রয়োজনাতিরিক্ত সম্পদ থেকে শুধু ওশর বা ওশরের এক-চতুর্থাংশ দেয়াই যাকাত নয়।
আমরা লক্ষ্য করছি, মুসলমানদের বিশ্বের সেরা জাতি হওয়ার মর্যাদা শেষ হয়ে যাওয়ার পর এক্ষণে যেসব জাতি মুসলমানদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছে, তারা তাদের জাতি ও মিল্লাতের জন্যে অনেক বেশী ব্যয় ও ত্যাগ তিতিক্ষা স্বীকার করছে অথচ তা তাদের ওপর তাদের আল্লাহ্র তরফ থেকে ফরয করা হয়নি। [(আরবী*************)]
যাকাত উম্মতের কাছ থেকে ও তাদের প্রতি
মরহুম শায়খ মাহমুদ শালতুত-জামে আজহারের প্রাক্তন শায়খ হযরত মুয়ায বর্ণিত হাদীসের ওপর টীকা লিখেছেন, যে হাদীস নবী করীম (স) তাঁকে বলেছেনঃ
লোকদের জানিয়ে দেবে যে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের ধন-মালে তাদের ওপর যাকাত ফরয করে দিয়েছেন, যা তাদের ধনী লোকদের কাছ থেকে নিয়ে তাদেরই দরিদ্রদের ওপর ব্যয় করা হবে।
এ হাদীসের টীকায় তিনি লিখেছেনঃ
নবী করীম (স)-এর এ মহান শিক্ষা আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে যে, ইসলামের দৃষ্টিতে যাকাত উম্মতের ধনী লোকদের কাছ টাকা নিয়ে গরীবদের প্রতিনিধিত্বস্বরূপ সে জাতির জন্যেই ব্যয় করা ছাড়া আর কিছুই নয়। অন্য কথায় উম্মতের ধন-মাল তাদেরই কিছু লোকদের কাছ থেকে নিয়ে তাদেরই অন্যদের জন্যে ব্যয় করা। প্রথম হাত দাতার, আল্লাহ্ তাকে ধন-মালের সংরক্ষণ, তার প্রবৃদ্ধি সাধন এবং তা দিয়ে কাজ করার জন্যে খলীফা বানিয়েছেন। এটা ধনী লোকদের হাত। আর অন্য হাতটি হচ্ছে শ্রমজীবী কর্মীদের হাত। তাদের শ্রম ও কাজ তাদের প্রয়োজন পূরণের জন্যে যথেষ্ট পরিমাণ আয় করতে পারছে না কিংবা কাজ করতেই অক্ষম হয়ে পড়েছে এবং তার রিযিক ধনীদের ধন-মালে রেখে দেয়া হয়েছে। এটা হচ্ছে ফকীর-মিসকীনদের হাত।[(আরবী*************)]
মুসলিম সমাজে যাকাতের ভূমিকা
ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা সাইয়্যেদ আবুল আ’লা আল-মওদূদী যাকাতের দায়িত্ব ও ইসলামী অর্থ ব্যবস্থায় তার স্থান ও ভূমিকা পর্যায়ে তাঁর (আরবী*************) নামের গন্থে [(আরবী*************)] লিখেছেনঃ পূর্বে যেমন বলেছি, প্রকৃতপক্ষে ইসলাম চায় সমাজের কোন স্থানেও যেন ধনসম্পদ পুঞ্জীভূত হয়ে না ওঠে। যারা ধন-সম্পদের উওম অংশ পাওয়া কিংবা তাদের প্রয়োজনাতিরিক্ত যথেষ্ট পরিমাণে লাভ করার দরুন সম্পদের অধিকারী হয়েছে, তারা যেন তা জমা করে না রাখে, তা ব্যয় করা বন্ধ করে না দেয়। বরং তাদের কর্তব্য হচ্ছে তা ব্যয় করা এমনভাবে ও পথে, যার ফলে যারা সমাজের সম্পদ থেকে তার আবর্তন ধারা তাদের জন্যে যথেষ্ট পরিমাণে লাভ করার সৌভাগ্য অর্জন করেনি তাদের তা পাওয়া সম্ভবপর হয়।
এ উদ্দেশ্যে ইসলাম একদিকে তার উচ্চতর নৈতিক শিক্ষা ও প্রভাবশালী আগ্রহ সৃষ্টি ও ভয় প্রদর্শনের সাহায্যে জনগণের মধ্যে বাদান্যতা, দানশীলতা ও প্রকৃত সামাজিক সহযোগিতার ভাবধারা জাগিয়ে দিতে চায় যেন মানুষ তাদের প্রকৃতিগত প্রবণতার দরুন ধনসম্পদি একত্রিত ও পূঁজিকরণ থেকে বিরত থাকে এবং নিজেদের থেকেই তা ব্যয় করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। আর অপরদিকে এমন আইনও রচনা করেছে যা লোকদের ধন-মাল থেকে একটা নির্দিষ্ট ও জানা পরিমাণ নিয়ে নেয়া বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে সমষ্টির কল্যাণ ও সৌভাগ্য গড়ে তোলার জন্যে। এ জানা পরিমাণটা লোকদের কাছ থেকে নেয়া, এটাই যাকাত। আর ইসলামী অর্থ ব্যবস্থায় এ যাকাতের যে কি বিরাট ভূমিকা রয়েছে, তা কারো কাছে অস্পষ্ট থাকা উচিত নয়। তা নামযের পর ইসলামের অধিক গুরুত্বপূর্ণ রুকন। এমন কি, কুরআন স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছে যে, যে লোক ধন-মল পুঁজি করবে, সে তার যাকাত না দেয়া পর্যন্ত তার জন্যে তা হালাল হবে না। বলেছেঃ তাদের ধন-মাল থেকে যাকাত নাও, তুমি তার দ্বারা তাদের পবিত্র করবে ও পরিশুদ্ধ করবে। [(আরবী*************)]
‘যাকাত’ শব্দটিই বোঝায় যে, মানুষ যে ধন-সম্পদ সংগ্রহ ও সঞ্চয় করে তাতে অপবিত্রতা ও ময়লা-আবর্জনা রয়েছে, তা থেক আড়াই পার্সেন্ট সম্পদ প্রতি বছর আল্লাহ্র পথে ব্যয় না করা পর্যন্ত তা কখনই পরিত্র হবে না। আল্লাহ্ নিজে তো মহাসম্পদশালী, তোমাদের ধন-মাল তাঁর কাচে পৌঁছায় না, তার কোন প্রয়োজনও নেই। তাই ‘সাবীলিল্লাহ’ হচ্ছে ফকীর-মিসকীনদের সচ্ছল-স্বাচ্ছন্দ্য বানানোর জন্যে চেষ্টা করা, এমন সব কল্যাণকর কাজের উৎকর্ষ সাধন, যার ফায়দাটা জাতির সর্বশ্রেণীর লোকেরােই পাবে্ এ কারণে বলেছেঃ ‘যাকাত কেবলমাত্র ফকীর, মিসকীন, তার জন্যে নিয়োজিত কর্মচারী, মুয়াল্লাফাতু কুলুবুহুম, ক্রীতদাস, ঋণগ্রস্তদের জন্যে এবং আল্লাহ্র পথে ও নিস্বঃ পথিকের জন্যে। [(আরবী*************)]
সামাজিক সামষ্টিক সহযোগিতা গড়ে তোলার জন্যে এটাই হচ্ছে মুসলিমদের সংস্থা। সামাজিকভাবে নিরাপওা ব্যবস্থা কার্যকর করার জন্যে এটাই তাদের ঐক্যবদ্ধতা। আর এটাই তাদেরন সতর্কতামূলক ধন-মাল।
এ ধন-সম্পদই সমাজের বেকার লোকদের জন্যে নিরাপওার ব্যবস্থাপক, তাদের ইয়াতীম, বিধাবা, অক্ষম ও রোগাক্রান্ত লোকদের সাহায্য করার জন্যে একটা বড় মাধ্যম। তাদের প্রতি সহানুভূতি জানানোর ও তাদের অবস্থার উন্নয়নের এটা একটা বড় উপায়। সর্বোপরি তা প্রত্যেক মুসলিমের ভবিষ্যৎ চিন্তা থেকে মুক্তির একমাত্র অবলম্বন। অতএব স্বভাবসম্মত ইসলামী নীতি হচ্ছেঃ তুমি যদি আজ ধনী ব্যক্তি হও, তা হলে অন্যকে সাহায্য কর। তাহলে কাল তুমি যখন দরিদ্র হয়ে পড়বে তখন সেই ‘অন্য লোক’ তোমাকে সাহায্য করবে। তাহলে ভবিষ্যতে তুমি যখন দরিদ্র হয়ে পড়বে, চরম, দুর্গতির মধ্যে পড়ে যাবে এ আশংকায় আজ তোমাকে অস্থির হওয়ার কোন কারণ থাকবে না কিংবা তুমি যখন মরে যাবে-পরকালের মহাযাত্রায় রওয়ানা হয়ে যাবে, তখন তোমার স্ত্রী-পুত্র-পরিজনের কি অবস্থা হবে অথবা তোমার ওপর যখন কঠিন বিপদ আপতিত হবে বা তুমি রোগাক্রান্ত হয়ে পড়বে-তোমার যথাসর্বস্ব জ্বলে পড়ে গেল, কি বন্যায় ভেসে গেল, তখন তুমি কিভাবে মুক্তি পাবে। তুমি যখন বিদেশ সফরে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়বে, তখন তুমি কি করবে, যাকাত তোমাকে এ সব বিপদাশংকা থেকে মুক্তি দিচ্ছে। যাকাত ব্যবস্থা যথাযথভাবে চালূ থাকলে কা্উকেই এরূপ চিন্তায় কাতর হতে হবে না। চিরদিনের তরে তা থেকে মুক্তি ও নিষ্কৃত পেয়ে যাবে।
তোমার দায়িত্ব শুধু সঞ্চিত সম্পদের শতকরা আড়াই হারে নিরাপওার জন্যে আল্লাহ্র প্রতিষ্ঠানে জম করে দেয়া। তাতেই তুমি সর্বপ্রকারের বিপদ-আপদ- যা তোমার ওপর আসতে পারে-থেকে তুমি মুক্তি পেয়ে যাবে। আজ তোমার সম্পদের যে অংশটি তোমার প্রয়োজনীয় নয় তা দিয়ে দাও তাদের, যারা তার মুখাপেক্ষী। তারা তা ব্যয় করবে, নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করবে। পরে তোমার কাছে এ সম্পদই ফিরে আসবে সম্পূর্ণ মাত্রায়। বরং তার তুলনায় অধিক পরিমাণে-যদি তুমি বা তোমার সন্তানরা দরিদ্র হয়ে পড়ে।
এ ব্যবস্থাপনায়ও পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার মৌলনীতি এবং ইসলামী অর্থব্যবস্থার মৌলনীতির মধ্যকার পার্থব্য ও বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পুঁজিবাদের দাবি হছ্ছে, ব্যক্তির সম্পদ পুঁজি করবে, তা সুদে বিনিয়োগ করবে, যেন তা শোষণ করে সমাজের অন্যদের হাতে সমস্ত সম্পদ তার পকেটে নিয়ে আসতে পারে। কিন্তু এ তৎপরতা ইসলামের প্রকৃতির সাথে সঙ্গতিসম্পন্ন নয়। ইসলাম তো নির্দেশ দেয়, কোন ঝিলে সম্পদ পুঞ্জিত হলে তা থেকে খাল কেটে তার ‘পানি’ চারপাশের মৃত ক্ষেত-খামারে প্রবাহিত করতে হবে, যেন তাতে জীবনের পুনরুদগম হয়। পুঁজিবাদে সম্পদের আবর্তন বন্ধ, স্তব্ধ। কিন্তু ইসলামী অর্থব্যবস্থায় তা উন্মুক্ত। পুঁজিবাদের বদ্ধকূপ থেকে পানি নিতে হলে তোমার কাছে পূর্বে থেকেই পানির ‘স্টক’ মওজুদ থাকা আবশ্যক। অন্যথায় তুমি কিছুই পেতে পারবে না-কোন অবস্থাতেই; একটা ফোটাও নয়। কিন্তু ইসলামের পানি ভান্ডারে মৌল নীতি হচ্ছে, যার কাছে প্রয়োজনাতিরিক্ত, ‘পানি’ রয়েছে সে যেন তা এ ভান্ডারে ঢেলে দেয়,. তখন যার যার প্রয়োজন সেসে এ ভান্ডার থেকে নিজ নিজ প্রয়োজন মত পানি পেয়ে যাবে-নিতে পারবে। অতএব বাহ্যতঃ এ দুটি ব্যবস্থাই পরস্পর ভিন্ন ভিন্ন, পরিপন্থী। এ দুটির মূল ও প্রকৃতি কোন দিক দিয়েই পরস্পরের সাথে একবিন্দু সঙ্গতিসম্পন্ন নয়। এ দুটি ব্যবস্থাকে একত্রিত বা সমন্বিত করতে চেষ্টা করা প্রকৃতপক্ষে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী ব্যবস্থাকে একত্রিত করতে চাওয়ার চেষ্টা মাত্র। সুস্থ বিবেক-বুদ্ধির লোকই তা সম্ভব বলে মনে করতে পারে না।
ইসলামে যাকাতের উজ্জ্বলতম দিক
মহান ইসলামী চিন্তাবিদ সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী তাঁর (আরবী***************) গ্রন্থে ইসলামী যাকাতের উজ্জ্বলতম দিকসমূহ সম্পর্কে লিখেছেনঃ যাকাতের উজ্জ্বলতম ও গভীরতম প্রভাবের দিক- যা এ ফরয কাজটির সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত, তা হচ্ছে ঈমান ও চেতনার দিক। তা সে প্রাণশক্তি যা সরকার ধার্যকৃত কর থেকে তাকে স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী বানায়। তার অপর গুরুত্বপূর্ণ ও গভীর স্পষ্ট দিকের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেনঃ [(আরবী***************)]
যাকাতের দ্বিতীয় উজ্জ্বলতম দিক-যার দরুন যাকাত সেসব কর ইত্যাদি থেকে স্বাতন্ত্র্য ও বিশিষ্টতা পায়, যা রাজা-বাদশাহর ‍যুগে, ব্যক্তিগত শাসনের যুগে বা আধুনিক গণতাস্ত্রিক ও জাতীয় সরকারের আমলে ধার্য হয়। সুচনা, চূড়ান্ত পরিণতি ও ফলশ্রুতি সর্বক্ষেত্রেই পরস্পর ভিন্ন ভিন্ন হয়ে দেখা দেয়, তা হচ্ছে যাকাত শরীয়াত প্রবর্তিত ব্যবস্থা। রাসূল করীম (স) তাঁর বিজ্ঞতাপূর্ণ মুজযিার ভাষায় সুক্ষ্ম নবুয়ত বিশ্লেষণ যাঁকে জামেউল কারাম’ গণ্য করা হয়- বলেছেন’ তা গ্রহণ করা হবে তাদের ধনী লোকদের কাছ থেকে এবং তা ফিরিয়ে দেয়া হবে তাদেরই গরীব লোকদের ওপর। শরীয়াত প্রবর্তিত যাকাতের মুল তত্ত্বই হচ্ছে তাই। এ ব্যবস্থা চিরদিনই চলবে- যদ্দিন না আল্লাহ পৃথিবী ও পৃথিবীর উপরস্থ সবকিছুর উত্তারাধিকারী হচ্ছেন। তা সে সব ধনী লোকের কাছ থেকে আদায় করা হবে, যাদের ওপর তা ফরয হওয়ার শর্তসমূহ পুরামাত্রায় পাওয়া যাবে, শরীয়াত নির্দিষ্ট নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে এবং তা ব্যয় করা হবে আল্লাহর নির্ধারিত ব্যয়খাতসমুহে- যা কুরআন শরীফে ঘোষিত হয়েছে। যা কোন মানবীয় বিধান রচয়িতা বা আইন প্রণয়নকারীর রায় বা অভিমতের ওপর নির্ভরশীল হয়নি, কোন মানবীয় প্রশাসন বা আলিম যা প্রবর্তিত করেন নি। কুরআনে উদ্ধৃত আল্লাহর ঘোষণা হচ্ছেঃ
(আরবী***************)
যাকাত কেবলমাত্র ফকীর মিসকীনদের জন্যে…..
শরীয়াত ও নবী করীম (স) এর হাদীসসমূহ অগ্রাধিকার দিয়েছে এ যাকাত স্থানীয় গরীব-মিসকীনের মধ্যে বিতরণ, করাকে, যেখানে থেকে তা সংগৃহীত হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে যাকাত ব্যবস্থা এমনিভাবে কার্যকর ছিল। সে সব শাসন প্রশাসনেও যা খুব বেশী সূক্ষ্ম বা কঠিন ছিল না, পুরাপুরিভাবে শরীয়াতী বিধান বাস্তবায়নের দায়িত্বশীল বা আমানতদারও ছিল না, শাসন-আইন ও রাজনীতির দিক দিয়ে উচ্চতর ইসলামী আদর্শ হিসেবেও তা গন্য ছিল না। এ ধরনের রাষ্ট্রের ফকীর-মিসকীনরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়নি। আল্লাহ নির্ধারিত দণ্ডবিধানসমূহ ও পুরাপুরিভাবে অকেজো করে রাখা হয়নি সেখানে।[বিচারপতি ইমাম আবূ ইউসূফ লিখিত (আরবী***************) তার ভূমিকা বিশেষভাবে আব্বসী শাসনে খারাজ, যাকাত ও সাদকাত সম্পর্কে যতটা গুরুত্ব সহকরের আদয় ও বন্টনের ব্যবস্থা করা হত, তা উপরিউক্ত, কথার স্পষ্ট উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এ কিতাবখানি আমিরুল মুমিনীন হারুন রশীদের প্রস্তাবক্রমে লিখিত হয়েছিল।] যদিও বহু স্বার্থান্বেষী ঐতিহাসিক এবং প্রাচ্যবিদ পর্যালোচক এসব শাসন ব্যবস্থার নিন্দাবাদে খুব বেশী বাড়াবাড়ি করেছেন। তখনকার সময়ে ইসলামের সুমহান শিক্ষা ও আদর্শ থেকে যে বহু বিচ্যুতি ঘটেছিল তারও তাঁরা উল্লেখ করেছেন। বরং ইসলামের বিরুদ্ধে স্পষ্ট বিদ্রোহের কথা উল্লেখ করতেও কসুর করা হয়নি- যেমন তাঁরা সাধারণত করেই থাকেন।
যে সব কর, ট্যাক্স বা কাস্টম ডিউটি- যা আজকের সরকার ধার্য করে থাকে, তা তার বিপরীত। তা যাকাতের সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা। এ কর যাকাতের বিপরীতমুখী, বিদ্বেষাত্মক- তার তুলনায় ক্ষুদ্র পরিসরও হয় এবং হয় তার চাইতে অনেক বিরাট। তা যেমন গরীব মানুষের কাছ থেকে নেয়া হয়, তেমনি মধ্যবিত্তদের কাছ থেকেও নেয়া হয় এবং ধনী সেরা শ্রেণী ও শক্তিশালী লোকদের কাছে তা ফিরিয়ে দেয়া হয়। তা সংগ্রহ করা হয় চাষী-কৃষক শ্রমিক-শিল্পিদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপর্জন করা সম্পদ। যে সব ব্যবসায়ী দিন-রাত তাদের ব্যবসায় কেন্দ্রে দোকানে ব্যতিব্যস্ত থেকে অর্থোপার্জন করে, তারাও এ থেকে নিস্কৃতি পায় না। এসব অর্থ খুবই উদার হস্তে ব্যয় করা হয়, অত্যন্ত নির্মমভাবে অত্যন্ত বেশী নির্লজ্জভাবে। প্রজাতন্ত্রের প্রধানরা দেশ-বিদেশে বিলাসভ্রমণে গিয়ে সে টাকার অপরচয় করেন। এক হাজার এর রাতের স্বাপ্নিক রূপকথার সাথে তুল্য বড় বড় দাওয়াত জিয়াফতে তা উড়ানো হয়। আর কখনও কখনও যে জাতীয় উৎসবাদি উনুষ্ঠিত হয়, তাতে ও তার আলোকসজ্জা-জাঁকজমকে ক্ষয় করা হয়। বিভিন্ন দেশে যেসব রাষ্ট্রদূত প্রেরণ করা হয় এবং তার যে দুতাবাস খোলা হয় সেখানে মদের বন্যা প্রবাহিত হয়, নারী পুরুষের যৌ নৃত্যের ঝড় ছোটে, তাতে ভেসে যায় তার বিরাট অংশ। সরকারী পর্যায়ে ঝগড়া-বিবাদে জাতীয় আয় নিঃশেষ হয়ে যায়। তার রক্ত শুষে নেয়, জাতির ব্যক্তি ও তার শক্তির মধ্যে এ দ্বন্দ্ব আবর্তিত হতে থাকে, বিদেশী পত্র-পত্রিকায় কৃত্রিম প্রচার-প্রোপাগান্ডায় সাংবাদিক ওকালতিতে উচ্চাঙ্গের প্রচারকদের- যারা সংবাদ রচনায় নির্দোষ ব্যক্তিদের দোষী সাব্যস্ত করেন, পক্ষের-বিপক্ষের লোকদের মধ্যে ব্যাখ্যাদানে, সংবাদপত্র যা সেনাবাহিনীর অপেক্ষাও অনেক শক্তিশালী ও উপকারী বলে বিবেচিত। পরিচালনায়, অস্ত্র শস্ত্র উদ্ভাবন-নির্মাণে জনগণের রক্ত পানি করে উপর্জন করা টাকা ব্যয় হয়ে যায়। প্রত্যেকটি জাতীয় গণতান্ত্রিক বা কমিউনিস্ট সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই জাতিরি রক্ত শোষণ করে, ব্লটিং কাগজ যেমন শুয়ে নেয কালি এবং জাতিটিকে ঝগড়া বিবাদ ও রাজনৈকিক ঘুষ-রিষওয়াতের মধ্যে নিক্ষেপ করে, সাংবাদিক মিথ্যা প্রবঞ্চনায় পড়ে, অপরাধী ও নিরাপরাধ বিরুদ্ধবাদীদের মুকাবিলাকরণে পড়ে গোটা জাতি ছটফট করতে থাকে।
এসব কর আজকের সরকারসমূহ যার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে- সম্পর্কে অধিক সূক্ষ্ম লেখনী চিত্রাংকন এবং পরিচিতি অধিক সত্য প্রকাশক কথা এটাই হতে পারেঃ (আরবী****************)
গরীব লোকদের কাছ থেকে তা নেয়া হয় এবং তূলে দেয়া হয় তাদেরই ধনী লোকদের হাতে।
এ কারণে আল্লাহ তাআলা ইসলামী যাকাত ফরযরূপে ধার্য করেছেন তাঁর সচ্ছল বান্দাদের ওপর গোটা জাতির প্রতি অনুগ্রহ ও বাৎসল্যস্বরূপ। তা নবুয়তের নিয়ামতের ফসলও বটে, যে নিয়ামতের ওপরে আর কোন নিয়ামত হতে পারে না। এ যাকাতকে যদি প্রয়োজন হয় কর বলার তাহলে তা পরিমাণের দিক দিয়ে সর্বপ্রকারের কর এর তুলনায় অত্যন্ত স্বল্প পরিমাণ, অতি সামান্য কষ্টের ব্যাপার। কিন্তু বরকত ও প্রতিফলের দিক দিয়ে অতীব বিরাট। ফয়দা অনেক ব্যাপক। কেননা তা নেয়া হয় তাদের ধনী লোকদের কাছ থেকে এবং ফিরিয়ে দেয়া হয় তাদেরই গরীবদের হাতে।
শেষ কথা
আমি এ বিরাট পাঠ উপঢৌকনস্বরূপ উপস্থাপিত করছি দুনিয়ার চিন্তাবিদ এবং অর্থনৈতিক ও কর বিশারদ ব্যক্তিদের সমীপে। তাঁরা এ থেকে জানতে পারবেন, কর ও আধুনিক আর্থিক সংস্থা ও সংগঠন গড়ে তুলেছে সর্বাগ্রে। তাতে রয়েছে অতীব উত্তম সব মৌল নীতি। তার আইন বিধানসমূহ পুরাপুরিভাবে ভারসাম্যপূর্ণ। তার লক্ষ্য অতুলনীয় তার নিশ্চয়তা পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করে, বাস্তাবভাবে যে পরিস্থিতির মধ্যে তারা জীবন যাপন করছে, তারও যেন যাচাই কর দেখে। তার পরে যেন সে জাতির আকীদা-বিশ্বাসগুলো পর্যবেক্ষণ করে, যাদের জন্যে তারা আেইন বিধান রচনা করছে। তারপরে তারা যেন তাদের প্রবর্তিত করসমূহের অগ্রভাগে রাখে এ মহান পবিত্র কর-যাকাত। অতপর উর্ধ্বমুখী ও স্থিতিশীল করসমূহের তুলনামূলকভাবে যাচাই করে দেখে।
আমি এ বিরাট অধ্যয়ন উপঢৌকন দিচ্চি সামষ্টিক গ্রহণকারী ব্যক্তিদের, যেন তারা দৃঢ় প্রত্যয় সহকারে জানতে পারেন যে, এ ফরযটা মানুষের ইতিহাসের সমাজের অভাবগ্রস্থ লোকদের জন্যে সর্বপ্রথম সাহায্য ব্যবস্থা, যা সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। না, বরং তাদের জন্যে নির্দিষ্ট করা সর্বজনপরিজ্ঞাত অধিকার- মহান আল্লাহর ধার্যকৃত ফরয এটাই প্রথম। সরকারী ব্যবস্থাপনার অধীনে দুর্বল অক্ষম অভাবগ্রস্থ লোকদের সাহায্যের ইতিহাস যেমন বলা হয়েছে- সপ্তদশ শতকের পূর্বে শুরু হয়নি- অনুরূপভাবে সামষ্টিক দায়িত্ব গ্রহণ ব্যবস্থা পাশ্চাত্য প্রবর্তীত নয়, আধুনিক যুগের উদ্ভাবনও নয় তা। আসলে তা একটা ইসলামী ব্যবস্থা। ইসলামের তা ‍মুসলিম ও অমুসলিম সকলেরই জন্যে কার্যকর করেছে।
আমি এ বিরাট বিশাল আলোচনা পেশ করছি একালের বিদগ্ধ ও সংস্কৃতিবান লোকদের সম্মুখে, যাঁরা সুনাম ও সুখ্যাতির অধিকারী হয়েছেন আরব দেশ ও প্রাচ্যের অন্যান্য দেশসমূহে কিংবা যারা ইউরোপীয়, আমেরিকান বা রাশীয়, চীনা বিবেক-বুদ্ধির অধিকার ও পরিচিতির দিক দিয়ে ইসলাম ধর্মের ধারক রয়েছেন। আসলে তারা ইসলাম সম্পর্কে পুরোপুরি অজ্ঞ। তাঁদের কাছে এ তত্ত্বও অগুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ পেশ করছি এ উদ্দেশ্যে, যেন তারা নিঃসন্দেহে জানতে পারেন যে, ইসলামী কোন সন্ন্যাসীর মত বা পাদ্রীর গীর্জার ধর্ম নয়। তা দ্বীন এবং রাষ্ট্র উভয়ই। আকিদা-বিশ্বাস এবং জীবন বিধান- এক সাথে ও অবিচ্ছিন্নভাবে। তা যেমন ইলম- জ্ঞান ও বিদ্যা তেমনি বাস্তব কর্মের বিধানও। তা ইহকাল ও পরকালব্যাপী প্রভাবসম্পন্ন জীবন বিধান। তাতে যেমন স্বাধীনতা স্বীকৃত, তেমনি সুবিচার ও ন্যায়পরতাও কার্যকর তাতে একদিকে অধিকার স্বীকৃত , সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব ও কর্তব্যও ঘোষিত। আর তার উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত হচ্ছে এ যাকাত ব্যবস্থা।
আমি এ গ্রন্থটি উপহার দিচ্ছি দুনিয়ার মুসলিম জাতি সমূহকে- তাদের সমসাময়িক রাষ্ট্র সরকারসমূহে যেন তাঁরা ইসলামী শরীয়াতের ও তার বিবিধ ব্যবস্থার প্রতি নিজেদের কর্তব্য পুনঃনির্ধারণ করতে পারেন। যাকাত তার মধ্যে প্রধান। এ ব্যবস্থা পূর্ণ মাত্রায় কার্যকর হলে তাদের জীবনে বৈপরীত্য ভয়াবহ ও প্রকট হয়ে রয়েছে তা দূরে হয়ে যাবে। তাদের শাসন সংবিধান ও আইন-কানুনের ক্ষেত্র হতে আইনের সাম্রাজ্যবাদ ও বৈদেশিক দাসত্ব দূরীভুত হবে- যেমন তদের ওপর থেকে রাজনৈতিক ও সামরিক সম্রাজ্যবাদ তিরোহিত হয়েছে এবং তথায় ইসলাম পূর্ণমাত্রায় প্রতিষ্ঠিত হবে প্রতিষ্ঠিত হবে তার দ্বীন, তর আইন-কানুন এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনারসমূহ।
সর্বশেষ আমি এ গ্রন্থখানি উপহার দিচ্ছি ইসলামী ব্যবহারিক আইন-বিধান-ফিকাহ শাস্ত্রে ও ইসলামী সংস্কৃতিতে আত্মনিয়োগকারী লোকদের- যাঁরা ইসলামী ব্যবস্থা বাস্তবায়নে সচেষ্ট। সম্ভবত তাঁরা কুরআন ও সুন্নাতের আলোকে তৈরী এ ফিকহী অধ্যয়নে এমন জিনিস পাবেন যা তাদের ঈমানকে শক্তিও সমৃদ্ধি দান করবে, এ বিশ্বাস তাদের মনে জন্মাবে যে, কালের বিবর্তনের মুকাবিলা করতে দ্বীন-ইসলাম পুরোপুরি সক্ষম, নতুন করে কালের নেতৃত্ব দানও সম্ভব তার পক্ষে। জীবনের গতিকে সত্য, কল্যাণ ও সুবিচারের দিকে ফিরিয়ে নেয়ার যোগ্যতা ও ক্ষমতা পুরোপুরি রয়েছে তর সবুজ শ্যামল সতেজ শরীয়াতের বিধান। তা সর্বকালের ও সকল স্থানের মানুষের জীবনের সমস্যার সমাধান করতে পূর্ণমাত্রায় উপযুক্ততার অধিকারী। (আরবী*************)
—————

About শিবির অনলাইন লাইব্রেরী