মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্ সা.

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

mbmsমানবতার বন্ধু মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্ সা.
নঈম সিদ্দিকী

অনুবাদ ও সম্পাদনা
আকরাম ফারুক
আবদুস শহীদ নাসিম


স্ক্যান কপি ডাউনলোড

অধ্যায়ঃ ১

পূর্ব কথা

আগমনের উদ্দেশ্য আহ্বান এবং ঐতিহাসিক অবস্থান

‘মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্’ সা. গ্রন্থখানা মুলত এই উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী গবেষক ও চিন্তাবিদ নঈম সিদ্দীকির উর্দু ভাষায় রচিত ‘মুহসিনে ইনসানিয়াত’ এর বাংলা অনুবাদ। গ্রন্থখানা Human Benefactor শিরোনামে ইংরেজী ভাষায়ও অনূদিত হয়েছে।

এ গ্রন্থখানা চিরায়ত পন্থায় রচিত রসূলুল্লাহ্ সা. – এর কোন জীবনী গ্রন্থ নয়। এ গ্রন্থে মুলত রসূলে পাক সা. যে অনুপম সমাজ বিপ্লব সংঘঠিত করেছিলেন এবং সুনিপন কারিগরের মতো যে অনন্য সাধারন মানব দল ও মানব সমাজ নির্মাণ করেছিলেন, সেই নির্মাণ কাজেরই এক অপূর্ব বিশ্লেষণধর্মী শিক্ষনীয় চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তাই এটি একাধারে রসূলে পাকের সীরাত এবং ইসলামী সমাজ বিপ্লব সংঘটনের প্রতিবেদন। ইসলামী সমাজ গড়ার সাধ যারা পোষোণ করেন, এটি তাদের জন্যে খুবই উপকারী গ্রন্থ।

আগমনের উদ্দেশ্য আহ্বান এবং ঐতিহাসিক অবস্থান

মহানবী সা.- এর জীবন চরিত অধ্যনের আগে তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদের সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করা প্রয়োজন। যে মহান কাজটি সুসম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে বিশ্ব মানবতার এই মহোপকারী বন্ধু পৃথিবিতে আবির্ভূত হয়েছিলেন, এবং একটি চূড়ান্ত লক্ষ্যভেদী সংগ্রামের সফল সমাপ্তি সাধনের জন্যে গোটা জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন, সেই কাজটি কী ছিল, তা আমাদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। আসলে রসূলের সা. জীবনেতিহাস একটি আন্ত মানবীয় কর্মসূচী বাস্তবায়নের অক্লান্ত সংগ্রামের ইতিহাস। রসূলের জীবন কুরআনের শিক্ষা ও আদর্শের বাস্তব ও কর্মময় বিশ্লেষণ। রসূলের জীবন হজরত আদম আ. ইব্রাহিম আ. মুসা আ. ঈসা আ. ও অন্যান্য নবীগণ নিজ নিজ যুগে যে পবিত্র বাণীর মশাল জ্বালিয়েছিলেন সেই বাণীরই পরিপূরক। মহানবীর কাজের ধরন ও প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য ও তার পরিমণ্ডলের বিশালতাকে দৃষ্টিপথে না রেখে আমরা নবী জীবনকে সুসংবদ্ধ করতে পারিনা, নবী জীবনে সংঘটিত ঘটনাবলীর মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করতে পারিনা, তাঁর জীবন চরিত অধ্যয়নের প্রকৃত উদ্দেশ্য নির্ণয় করতে পারিনা এবং তাঁর জীবন চরিত থেকে যা কিছু অর্জন করা দরকার তা অর্জন করতেও পারিনা।

মানব জাতির ত্রাণকর্তা

সমগ্র মানব জাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা সেখানে নানা রকমের সংস্কারকের সাক্ষাত পাই। দেখতে পাই অনেক মিষ্টভাষী অথবা অনলবর্ষী বক্তা, দার্শনিক ও চিন্তাবিদ, বিশাল সাম্রাজ্যের স্থপতি, রাজা মহারাজা ও সম্রাট, বিগ্বিজয়ী বীর, বড় বড় দল ও সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা, মানব সভ্যতার আলোড়ন সৃষ্টিকারী মহানায়ক, সমাজ কাঠামোতে বারবার তোলপাড় সৃষ্টিকারী দোর্দণ্ড প্রতাপশালী বিপ্লবী, সভ্যতার রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত নিত্য নতুন ধর্মমতের প্রবর্তক এবং নৈতিক সংস্কারক ও আইন প্রণেতা। কিন্তু যখন তাঁদের শিক্ষা, তাঁদের রেখে যাওয়া কীর্তি ও অবদান এবং তাঁদের চেষ্টা সাধনা ও তৎপরতার সার্বিক ফলাফলের দিকে দৃষ্টি দেই, তখন কোথাও কোন পূর্ণাংগ কল্যাণ ও সুফল দেখতে পাইনা। যেটুকু কল্যাণ ও সুফল চোখে পড়ে তা নিতান্তই আংশিক একপেশে ও ক্ষণস্থায়ী। সেই সুফলগুলো জীবনের কোন একটা অংশে দৃশ্যমান হয়, অতঃপর তার সাথে নানা ধরনের কুফলের মিশ্রণ ঘটে। নবীগণের ব্যক্তিত্ব ব্যতীত ইতিহাসে আর কোন উপকরণ ও উপাদান এমন দেখা যায় না, যা সমগ্র মানব সমাজকে ভেতর থেকে বদলে দিতে সক্ষম হয়েছে। মসজিদ থেকে বাজার পর্যন্ত, বিদ্যালয় থেকে আদালত পর্যন্ত এবং গৃহ থেকে রণাঙ্গণ পর্যন্ত সমগ্র সমাজ ও সভ্যতাকে আল্লাহর একই রং এ রঞ্জিত করা এবং সমগ্র মানব সমাজের ভিতর থেকে আমূল পরিবর্তন সাধন করাই ছিল মুহাম্মাদুর রসুল সাঃ -এর দাওয়াতের সাফল্য। আর তাঁর জীবনের আসল কৃতিত্ব এটাই। তার দাওয়াতে মানুষের মনমগজ বদলে গেল, চিন্তাধারা পাল্টে গেল, দৃষ্টিভঙগী বদলে গেল, রীতিপ্রথা ও আদত অভ্যাস পরিবর্তিত হয়ে গেল, অধিকার ও কর্তব্যের বণ্টন রীতি পাল্টে গেল, ন্যায় ও অন্যায় এবং হালাল ও হারামের মানদণ্ড বদলে গেল, নৈতিক মূল্যবোধের রূপান্তর ঘটালো, আইন ও সংবিধানের পরিবর্তন ঘটলো, যুদ্ধ ও সন্ধির নিয়ম কানুনের রদবদল হলো, বিয়েশাদী ও সমাজ পদ্ধতি পাল্টে গেল। মোটকথা সভ্যতার এক একটি অংগের ও এক একটি প্রতিষ্ঠানের আমূল পরিবর্তন সাধিত হলো। এই সর্বাত্মক পরিবর্তনের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত কোথাও কল্যাণ ও মংগল ছাড়া আর কিছু দৃষ্টিগোচর হয়না। এর কোন অংশেই অকল্যাণ নেই, কোন অংগনে দুষ্কৃতি নেই, নেই কোথাও কোন বিকৃতি। সর্বত্র কেবল কল্যাণ, চতুর্দিকে কেবল গঠনমূলক তৎপরতা এবং উন্নতি ও প্রগতি। প্রকৃত পক্ষে মহানবীর হাতে সাধিত হয়েছিল মানব জাতির সর্বাত্মক পুনরুত্থান ও পুনরুজ্জীবন। সত্য ও ন্যায়ের এক স্বর্ণোজ্বল প্রভাতের অভ্যুদয় ঘটিয়ে তিনি সভ্যতার আকাশকে করেছিলেন মেঘমুক্ত। তিনি উদ্বোধন করেছিলেন ঐতিহাসিক যুগের। বিশ্ব ইতিহাসে এটা এত বড় কীর্তি ও কৃতিত্ব, যার কোন নজীর আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।

মানব জাতির ত্রাণকর্তা বিশ্বনবীর সা. আবির্ভাব ঘটেছিল এমন এক পরিস্থিতিতে, যখন সমগ্র মানবজাতি ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। কোথাও চলছিল পাশবিকতা ও হিংস্রতার যুগ। কোথাও শেরক ও পৌত্তলিকতার অভিশাপ সভ্য জীবনের সর্বনাশ সাধন করছিল। মিশর, ভারত, ব্যাবিলন, নিনোভা, গ্রিস ও চীনে সভ্যতা সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। একমাত্র রোম ও পারস্যে সভ্যতার পতাকা উড়ছিল। সেই রোমক ও ইরানী সভ্যতার বাহ্যিক জাঁকজমক চোখ ঝলসে দিত। অথচ সেসব নয়ানাভিরাম প্রাসাদের অভ্যন্তরে চলতো লোমহর্ষক যুলুম ও নির্যাতন। জীবনের ক্ষতস্থান থেকে বেরুত উৎকট দুর্গন্ধ। রাজা ও সম্রাটগণ শুধু খোদার অবতারই ছিল না, বরং তারাই খোদা হয়ে জেঁকে বসেছিল। তাদের সাথে আঁতাত করে জনগণের ওপর প্রভুত্ব চালাতো ভূমি মালিক ধর্মযাজক শ্রেণী। রোম ও ইরান উভয় সাম্রাজ্যের এই নিদারুণ শোষণ নিষ্পেষণে সাধারণ মানুষ শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মরতে বসেছিল। তারা জনগনের কাছ থেকে মোটা মোটা দাগের কর, খাজনা, ঘুষ ও নজরানা আদায় করত। উপরন্তু তাদেরকে পশুর মতো খাটনী খাটতে বাধ্য করা হতো। অথচ এদের অভাব অভিযোগ, দুঃখ কষ্ট ও বিপদ মুসিবত নিয়ে না ছিল তাদের কোন ভাবনা, না ছিল কোন সহানুভূতি, আর না ছিল এ সবের সমাধান বা প্রতিকার। এই সব কর্তৃত্বশীল শ্রেণীর ভোগ বিলাস ও প্রকৃতিপূজা তাদের নৈতিক সত্তাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিয়েছিল। রাজা বাদশাহদের ক্ষমতার পালাবদল ও উত্থান-পতন, নিত্যনতুন বিজেতাদের আবির্ভাব এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধবিগ্রহের কারণে পরিস্থিতির যে সাময়িক পরিবর্তন ঘটতো, তাতেও সাধারণ মানুষের জন্য কোন মুক্তির পথ উন্মুক্ত হতোনা। প্রত্যেক পরিবর্তনের পর সাধারন মানুষ আরো বেশী করে শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট হতো। যে শক্তিই ক্ষমতার রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হতো, সে সাধারণ মানুষকেই শোষণের হাতিয়ার বানিয়ে, তাদেরই রক্তকে পুঁজি করে এবং তাদের শ্রমকে কাজে লাগিয়ে নিজের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতো এবং বিজয় ও কর্তৃত্ব অর্জনের পর সে পূর্বসুরীদের চেয়েও বড় যুলুমবাজ ও বড় শোষকে পরিণত হতো। স্বয়ং রোম ও ইরান সাম্রাজ্য দ্বয়ের মধ্যেও ক্রমাগত সংঘাত-সংঘর্ষ লেগে থাকতো। বিভিন্ন অঞ্চল কখনো এক সাম্রাজ্যের দখলে যেত কখনো আরেক সাম্রাজ্য তাকে গ্রাস করতো। কিন্তু প্রতিবার বিজয়ী শক্তি প্রজাদের কোন না কোন গোষ্ঠীকে নিষ্ঠুরভাবে দমন করতো। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ইরানী সাম্রাজ্যভুক্ত কোন জায়গা রোম সাম্রাজ্যের পদানত হলে সেখানকার অগ্নিকুণ্ডগুলো নিভিয়ে তদস্থলে গির্জা নির্মাণ করা হতো আবার রোম সাম্রাজ্যভুক্ত কোন জায়গা ইরানীদের দখলে গেলে সেখানকার সমস্ত গির্জা পর্যবসিত হতো অগ্নিকুন্ডে। দুনিয়ার অধিকাংশ অঞ্চল থাকতো অরাজকতার কবলে। প্রতিনিত যুদ্ধবিগ্রহ, সংঘাত সংঘর্ষ ও বিদ্রোহ সংঘটিত। ধর্মীয় উপদলগুলো পরস্পরের রক্ত ঝরাতো। আর এইসব দাংগা হাংগামায় দলিত মথিত হত মানুষের মানবিক মর্যাদা। লাঞ্ছিত ও ভূলুণ্ঠিত হতো তার মানুষত্ব। অমানুষিক পরিশ্রম করেও সে জীবনের নুন্যতম প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম হতোনা। শত জুলুম নির্যাতনের মুখেও সে সামান্য প্রতিবাদ পর্যন্ত করতে পারতোনা। চরম তিক্ত অনুভূতিও তাঁকে নীরবে হজম করতে হতো। বিবেক ও মন এমন কঠিন দাসত্বের নিগড়ে আবদ্ধ থাকতো যে, টু শব্দটি করার স্বাধীনতাও তার থাকতো না। কি সাংঘাতিক লোহার খাঁচায় সে আবদ্ধ থাকতো এবং কত হতাশা ও ব্যর্থতার দীর্ঘশ্বাসে যে তার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে থাকতো, কে তার খোঁজ রাখতো। সেই লোহার খাঁচায় কুনো দিকে একটি জানালাও খোলা ছিল না এবং মানুষের সামনে ক্ষীণতম আশার আলো বয়ে আনার কোন মতবাদ বা দর্শনের একটি জোনাকীও জ্বলতনা। তার আত্মা আর্তনাদ করতো। কিন্তু কোন দিক হতে সেই আর্তনাদে কেউ সাড়া পর্যন্ত দিত না। কোন ধর্ম তাকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসতো না। কেননা নবীদের শিক্ষা বিকৃতি ও আপব্যবহারে অতল তলে তলিয়ে উধাও হয়ে গিয়েছিল। ধর্মের নামে আর যেটুকু অবশিষ্ট ছিল তাকে ধর্মীয় মহল ব্যবসায়ের পণ্যে পরিণত করেছিলো। সমকালীন যালেম ও শোষক মহলের সাথে তারা গাঁটছড়া বেঁধে নিয়েছিল। গ্রিস দর্শনের কথাই বলুন। কনফুসিয়াস ও মনুসংহিতার কথাই বলুন কিংবা বেদ বেদান্ত, বৌদ্ধ ধর্ম বা জষ্টীনান ও সোলুনের আইনের কথাই বলুন, সবই হয়ে পড়েছিল নিষ্প্রাণ ও নিষ্ক্রীয়। কুনো দিক থেকে কোন আলোক রশ্মি দৃষ্টিগোচর হচ্ছিলনা। পৃথিবীর কোথাও যখনই এমন অবস্থা হয় যে, মানুষ একটা লোহার খাঁচায় আবদ্ধ হয়ে যায় এবং কোন দিক থেকেই কোন আশার আলো পরিদৃষ্ট হয় না, তখন সমাজ ব্যবস্থায় সংকট ও অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়ে যায়। [মানবজাতির এই ঐতিহাসিক অবস্থা সম্পর্কে কুরআন অতি সংক্ষেপে পর্যালোচনা করেছে, যার তুলনা খুঁজে পাওয়া যায় না : “পৃথিবীর জলভাগে ও স্থলভাগে বিপর্যয় এসেছে শুধু মানুষের কৃতকর্মের কারণে। এভাবে আল্লাহ্ তাদেরকে তাদের কিছুটা কর্মফল ভোগ করাতে চান। হয়তো তার সৎপথে ফিরে আসবে। (রুম-৪১)] তাই যখন সারা বিশ্ব জুড়ে ইতিহাসের ভয়াবহতম বীভৎসতম অরাজকতা দেখা দিল, তখন সেই অরাজকথার ঘুটঘুটে অন্ধকারে আকস্মিকভাবে জ্বলে উঠল মানবতার শ্রেষ্ঠতম বন্ধু বিশ্বনবীর আলোর মশাল। সে মশাল সমকালীন সামাজিক বিপর্যয়ের অন্ধকারের বুক চিরে চতুর্দিক করলো উদ্ভাসিত।

আরবের নিকটতম অঞ্চল রাসুল সাঃ এর প্রাথমিক কর্মক্ষেত্র। সেখানে যে কি সাংঘাতিক অবস্থা বিরাজ করছিল টা ভাবলেও গা শিউরে উঠে। আদ ও সামুদ আমলে কিংবা সাবা ও ইয়েমেনের সাম্রাজ্যবাদী প্রভাবের আওতায় এক সময় খানিকটা সভ্যতার আলোকচ্ছটা যদি বা দেখা দিয়েছিল, কিন্তু তাও নিবে গিয়েছিলো বহুকাল আগে। আববের বাদবাকী অঞ্চলগুলো তখনো প্রাগ-সভ্যতার প্রগার অন্ধকারে ডুবেছিল। সভ্যতার সূর্য তখনো ওঠেনি এবং মানবজাতী আদিম জাহেলিয়াতের ঘুম থেকে তখনো জেগে ওঠেনি। চার দিকে বিরাজ করছিল প্রবল উত্তেজনা। মানুষে মানুষে সংঘাত সংঘর্ষ, যুদ্ধ ও লুটপাটের তাণ্ডব চলছিল। মদ, ব্যভিচার ও জুয়ার সমন্বয়ে জাহেলি সংস্কৃতি তুংগে উঠেছিল। কুরাইশরা শেরক ও পৌত্তলিকতাযুক্ত ধর্ম নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছিল পবিত্র কা’বার মোতাওয়াল্লিগিরীর রমরমা ব্যবসায়। ইহুদিরাও পাল্লা দিয়ে বিকৃত ধর্ম ব্যবসায়ের দোকান খুলে রেখেছিল। বাদবাকি আরবরা ডুবেছিল চিন্তার নৈরাজ্যে। মক্কা ও তায়েফের মহাজনরা সুদী ব্যবসার জাল পেতে রেখেছিল। দাস ব্যবসার অভিশপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো মহা ধুমধামের সাথে চলছিল। মোটকথা, মানুষ প্রবৃত্তির গোলামীর সর্বনিম্ন স্তরে নেমে গিয়ে হিংস্র হায়েনা ও চতুষ্পদ জন্তুর মত জীবন যাপন করছিল। [কুরআনের সূরা ফুরকানে বলা হয়েছেঃ তারা যেন পশুর মত, বরং পশুর চেয়েও বিপথগামী।”(আয়াত-৪২)] শক্তিমানরা দুর্বলদেরকে ছাগল ও ভেড়ার পালের মত নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাতো। দুর্বলেরা শক্তিমানদের পদতলে লুটিয়ে থাকতো।

এহেন পরিস্তিতিতে মুহাম্মদ সাঃ আমূল ও সর্বাত্মক পরিবর্তনের আহ্বান নিয়ে একাকী ময়দানে নামলেন। এমন হতাশা ব্যঞ্জক পরিবেশে আর কেউ হলে হয়তো লোকালয় ছেড়ে পালিয়ে যেত। অতীতে অনাচারকে ঘৃণা করার মত সৎ ও সংবেদনশীল লোক যে পৃথিবীতে পাওয়া যায়নি তা নয়। বিপুল সংখ্যায় পাওয়া গেছে। কিন্তু অনাচারের মোকাবেলা করা ও প্রতিকার করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তারা নিজ নিজ জীবনের নিরাপত্তার জন্য সমাজ ও লোকালয় ছেড়ে বনে জংগলে ও পর্বতগুহায় আশ্রয় নিত এবং যোগী সন্যাসী হয়ে যেত। কিন্তু রসূল সাঃ বিপন্ন মানবতাকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে নিজের জীবন বাঁচানোর চিন্তা করেননি। বরং অন্যায় ও দুষ্কৃতির সাথে লড়াই করে সমগ্র মানব জাতির জন্য মুক্তির পথ খুলে দিয়েছিলেন। সভ্যতার নৌকার হাল ধরে তাকে সঠিক গন্তব্যের পথে চালিত করেছিলেন। রোম ও ইরানের দুই যুদ্ধমান পরাশক্তি তৎকালে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছিল, তা ভাংগার জন্য তিনি তৃতীয় শক্তিরূপে আবির্ভূত হলেন। ধীরে ধীরে এই তৃতীয় শক্তি যখন নিজ পায়ের ওপর দাঁড়ালো, তখন তা রোম ও ইরান উভয় শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করলো। উভয়ের পরাক্রমশালী নেতৃত্বকে ক্ষমতাচুত্য করলো এবং জনগণকে বিভীষিকাময় সভ্যতার খাঁচা থেকে মুক্ত করে স্বাধীন পরিবেশে বিচরণের সুযোগ করে দিল [এ সম্পর্কে কয়েকটি হাদীস উল্লেখের দাবী রাখে: “আমাকে আদম সন্তানদের রকমারি যুগের মধ্য থেকে শ্রেষ্ঠ যুগে পাঠানো হয়েছে,” (বুখারী) “আল্লাহ ইসমাঈলের বংশধরের মধ্য থেকে কিনানাকে, কিনানার বংশধরের মধ্য থেকে কুরাইশকে, কুরাইশের মধ্য থেকে বনু হাশেমকে এবং বনু হাশেম থেকে আমাকে মনোনীত করেছেন” (মুসলিম) “আল্লাহ যখন জগত সৃষ্টি করেন তখন আমাকে শ্রেষ্ঠ শ্রেণীর, অতঃপর গোত্রের অতঃপর শ্রেষ্ঠ পরিবারের অন্তর্ভূক্ত করেন। তাই আমি ব্যক্তি হিসাবেও শ্রেষ্ঠ এবং পরিবার হিসাবেও শ্রেষ্ঠ”। (তিরমিযী)]। আদম সন্তানদের সামনে একটি মুক্তির পথ উন্মুক্ত হলো এবং ডাকাতদের দ্বারা পরিবেষ্টিত মানুষের কাফেলাটি উন্নতি ও সমৃদ্ধির মঞ্জিলের দিকে রওয়ানা হয়ে গেল।

মোটকথা রসূল সাঃ সমগ্র জগতবাসীর জন্য মুক্তিদূত ও ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন।

আবির্ভাবের স্থান কাল মানবীয় উপাদান

মানবজাতিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য মহান আল্লাহ একদিকে যেমন রসূল সা. এর শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিত্বকে বাছাই করলেন, অপরদিকে তেমনি সেকালের নিকৃষ্টতম পরিস্থিতির বিরাজ করা সত্ত্বেও রাসুল সাঃ এর জন্য উৎকৃষ্টতম সময়, দাওয়াতের জন্য সবচেয়ে উপযোগী স্থান এবং প্রথম সম্বোধন করার জন্য সর্বোত্তম জাতিকেও নির্বাচিত করলেন।

সামগ্রিকভাবে দেখতে গেলে সময়টাকে এই হিসাবে সবচেয়ে উপযোগী মনে করা যায় যে, তখন গোত্রীয় সমাজ ব্যবস্থার সময় শেষ হয়ে আন্তর্জাতিকতার যুগ আসন্ন হয়ে উঠেছিলো। ইতিহাস অল্প কয়েকটা বাঁক ঘুরতেই বিজ্ঞানের যুগে পদার্পন করতে যাচ্ছিল। রসূল সাঃ এর আবির্ভাবের যুগটি ছিল আসলে উল্লিখিত দুটো যুগের মাঝে সীমানা চিহ্নিতকারী। ভবিষ্যতের ব্যপকতর ও উজ্জ্বলতর যুগের উদ্ধোধন করার জন্য পূর্ববর্তী নবীদের দাওয়াতকে পূনর্ব্যক্ত করা, তার প্রাণশক্তিকে তুলে ধরা, আল্লাহর আনুগত্য ভিত্তিক সভ্যতার ভিত্তি মজবুতভাবে স্থাপন করা এবং ইসলামের সাম্য ও ন্যায় বিচার ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থাকে পূর্ণাংগভাবে উপস্থাপন করা জরুরী হয়ে পড়েছিল, যাতে করে রসূল সাঃ -এর এই কীর্তির আলোক রশ্মিতে পরবর্তী যুগগুলি আলোকিত হয়ে যেতে পারে। এই যুগটা এ হিসাবেও সবচাইতে উপযোগী ছিল যে, মানুষের সামনে আর কোন আশা ভরসার স্থল অবশিষ্ট ছিল না, তাই তাদের পক্ষে ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হওয়া সহজতর ছিল।

দাওাতের স্থানের দিকে যদি দৃষ্টি দেই, তবে দেখতে পাই আরব একটা উষর মরুময় দেশ হওয়া সত্ত্বেও তৎকালীন সভ্য দুনিয়ার কেন্দ্রীয় স্থানে অবস্থিত ছিল। প্রাচ্য, পাশ্চাত্য ও উত্তর দিক থেকে আগত সকল বাণিজ্যিক পথগুলো আরব ভুখন্ডের সাথে এসে মিলিত হয়েছিল। বিভিন্ন দেশের মাঝে যতটা বহির্বাণিজ্য চলতো, তা আরব ব্যবসায়ীদের মাধ্যমেই চলতো। আম্মান ও ইয়েমেন, সানা ও মক্কা, জেদ্দা ও ইয়াম্বু, এবং মদিনা ও দুমাতুল জান্দালের মাঝে বাণিজ্যিক কাফেলার আনাগোনা ছিল। এসব কাফেলা আরব নেতৃবৃন্দ তথা কুরাইশদের অনুমতি ও গুরুত্বপূর্ণ গোত্রগুলোর ছাড়পত্র ছাড়া নিরাপদে চলাচলই করতে পারতোনা। এভাবে আরব ভূখণ্ড, বিশেষত মক্কা, তায়েফ, মদিনা ইয়াম্বু ও দুমাতুল জান্দালের যোগাযোগ ভারত, চীন, ইরান, ইরাক, মিশর, রোম ও ইথিওপিয়ার সকল অঞ্চলের সাথে ছিল। এখানে কোন সামষ্টিক দাওয়াত ও প্রচারের কেন্দ্র অন্য যে কোন অঞ্চলের চেয়ে বেশী সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হতো। তা ছাড়া আরব বিশ্বে মক্কা ও মদিনার গুরুত্ব ছিল সর্বোচ্চ। ধর্মীয়, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে তাদের নেতৃত্ব ও কর্তিত্ব ছিল অপ্রতিরোধ্য।

আরব জাতীর সভ্যতা ও সংস্কৃতির দিক দিয়ে অনগ্রসরতা, উচ্ছৃংখলতা ও নৈরাজ্য এবং অর্থনৈতিক দুরাবস্থার দরুণ যদিও কয়েকটা সম্যসার সৃষ্টি হয়েছিলো, কিন্তু এর একটা মস্ত বড় উপকারিতাও ছিল। সেটি হলো, আরব দেশ বহিরাগত আধিপত্য থেকেও অনেকাংশে মুক্ত ছিল। তাছাড়া আভ্যন্তরীণ পর্যায়েও এমন ক্ষমতা কারো ছিল না যে, সারা দেশের উপর নিয়মতান্তিক রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে পারে এবং তারপর ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, আইন ও শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে সমাজকে একটা বিশেষ কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে পারে। এমন ক্ষমতাবান কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী থাকলে সে ইসলামী আন্দোলনকে খতম করে দিতে পারতো, যেমন অতীতের বিভিন্ন জালেম বাদশা নবীদের দাওয়াতকে পূর্ণতার পর্যায়ে পৌঁছার আগে থামিয়ে দিত। কুরাইশদের যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল এবং তারা সর্বশক্তি নিয়ে বাধা দিয়েছেও বটে। তবে কুরাইশদের সমগ্র আরবের ওপর কোন নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ছিলনা। তাদের ধর্মীয় ও বাণিজ্যিক প্রভাব যতই গভীর হক না কেন তারা কখনো একটা সুসংগঠিত সরকারের বিকল্প হওয়ার মত ছিলনা।

ধর্মীয় দিক থেকে দেখলে দেখা যায়, এ ভূখণ্ডের চারদিকে পূর্ববর্তী নবীদের দাওয়াতের স্মৃতি ছিল অম্লান। সেকালের জাতীগুলোর যে পরিণতি হয়েছিলো, তার আলামতগুলিও সবার চোখের সামনে বিরাজ করতো। উত্তরে ছিল হজরত ইব্রাহিমের জন্মস্থান উর। তারই কাছে ছিল হজরত নুহ, হজরত লূত ও হজরত সালেহ আ. –এর অঞ্চল। বনী ইসরাঈলের উত্থান পতন ও ঈসা (আ)-এর দাওায়াতের স্থান ফিলিস্তীন এবং জেরুজালেমও পার্শ্বেই অবস্থিত ছিল। দক্ষিণে ছিল আ’দ ও সামুদের বাসস্থান এবং মারেব বাঁধের এলাকা ও সাবার রাজ্য। সাগরের ওপারে রয়েছে মিশর। সেখানে ইব্রাহিব ও ইসমাঈল তাওহীদের কেন্দ্রকে শক্তিশালী করেন ও সুসংহত করেন। সেখানে তাঁরা ইবাদত ও আনুগত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। আল্লাহর আনুগত্য, তাওহীদ ও মানবতার সংস্কার ও বিকাশের জন্যে এর চেয়ে উত্তম এলাকা আর কোনটা হতে পারতো? এখানে ইসলামের দাওয়াতের আওয়ায তুললে সহজেই মানুষের মনে সাবেক নবীগণের রেখে যাওয়া নিদর্শনাবলী পুনরুজ্জীবিত হয়ে দেখা দেবার মতো অবস্থা বিরাজ করছিল।

মানবীয় উপাদানও আরবে যা ছিল, তা ছিল সর্বোত্তম।এ উপাদানটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট ছিল এই যে, এর ক্ষমতা ও যোগ্যতার উৎস তখনো পর্যন্ত অব্যবহৃত ও সুরক্ষিত ছিল। রোম ও ইরানের পাশবিক সভ্যতা যেসব ধ্বংসাত্মক রোগের জন্ম দিয়েছিলো, আরবরা তা থেকে তখনো মুক্ত ছিল। তাদের মধ্যে হিংস্র জীবন যাপন পদ্ধতি জনিত দোষত্রুটি বিদ্যমান থাকলেও তার ভালো গুনাবলীও নেহাত কম ছিল না। বেদুইন হওয়ার কারণে তাদের মেজাজে ছিল স্বভাবসুলভ সরলতা। কৃত্রিমতা থেকে তারা ছিল সম্পূর্ণ মুক্ত। প্রাকৃতিক নিদর্শবলী  কে তাদের খুব নিকট থেকে দেখার সুযোগ ছিল। তাই বিশ্ব চরাচরে মহাসত্যের নিদর্শনাবলী উপলব্ধি করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল। গরম আবহাওয়া, মরুঝড়ের ঝাপটা, রাত দিনের কষ্টকর সফর, ক্ষুধা ও পিপাসার অভিজ্ঞতা এবং প্রতিদিনকার হত্যা ও লুটতরাজের কারণে তাদের মধ্যে দুর্ধর্ষতা ও দুঃসাহসিকতার জন্ম হতো এবং তা বীরত্বের প্রেরণা উজ্জীবিত করার কাজে সহায়ক হতো। একটা দুনিয়া জোড়া আন্দোলন পরিচালনার কাজে যে ধরনের একদল সাহসী বীরের প্রয়োজন ছিল, তারা ঠিক তেমনি ছিল। তাদের মধ্যে দানশীলতা বিদ্যমান ছিল। এত বড় কাজ করার জন্য কৃপন ধরনের মানুষ মানানসই হতোনা। আরবদের স্মরণশক্তি ছিল অসাধারণ। নিজেদের বংশ পরম্পরাতো বটেই এমনকি তাঁরা তাদের ঘোড়ার বংশ পরম্পরাও মুখস্ত রাখতো। একটি জীবন ব্যবস্থার নীতিমালাকে গ্রহণ করা এবং তা অন্যদের কাছে পৌঁছানোর জন্য এ ধরনের লোকেরাই সর্বোত্তম কর্মী হতে সক্ষম ছিল। তাদের মধ্যে আত্মসম্ভ্রমবোধ পুরোমাত্রায় বিদ্যমান ছিল। এজন্য আত্মমর্যাদা রক্ষার কাজটি সমাধান করা তাদেরই আয়ত্বাধীন ছিল। তাদের ভাষাও ছিল একটা উচ্চমানের, বিশাল ও বিকাশমান ভাষা। সে ভাষার লালিত্য ও অলংকার অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছিল। তাই জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারের কাজে তারা সহজেই সামনে অগ্রসর হতে পারতো। অন্যদেরকে একটা বিপ্লবী বক্তব্য দ্বারা অনুপ্রাণিত করতেও তারা অধিকতর সফলকাম হতো।

আরবরা ছিল সংকল্পে দৃঢ় ও অনমনীয়। এমনকি অন্যায় পথে চললেও তারা মনের পরিপূর্ণ স্বাচ্ছন্দ্য ও বিবেকের অটুট প্রত্যয় নিয়েই চলতো। সব রকমের বাধা ও বিরোধিতা মোকাবিলা করে তারা অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেত। তবে তাদেরকে ন্যায় ও সত্যের পথে পরিচালিত করা হলে সে ক্ষেত্রেও তারা হতো অবিচল ও নির্ভীক। এ ধরণের আরো অনেক বৈশিষ্ট্য তাদের ছিল। যার ভিত্তিতে স্বীকার না করেই পারা যায়না যে, রাসূল সা. নিজে ব্যক্তিগতভাবে যেমন লক্ষ্য অর্জনের ব্যাপারে শ্রেষ্ঠতম নেতা ও আহ্বায়ক ছিলেন, তেমনি সর্বোত্তম মানের জনশক্তিও তাকে সরবরাহ করা হয়েছিল।

শুধু তাই নয়, এই মানব সম্পদ সকল দিক দিয়ে উন্নতি ও অগ্রগতি অর্জনে ব্যাকুল ছিল। জাহেলী আরব সমাজের মেধাবী ও চিন্তাশীল লোকদের মধ্যে ধর্মীয় দিক দিয়েও অস্থিরতা ও অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠেছিল। বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিবর্গ মহাসত্যের সন্ধান ও বিশ্ব বিধাতার নির্দেশনা লাভের জন্য ব্যাগ্র ও উদগ্রীব হয়ে পড়েছিল। রাজনৈতিক দিক দিয়েও তাদের মধ্যে নবচেতনার উন্মেষ ঘটেছিল। মক্কা ও মদীনার মত শহরগুলোতে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো গড়ে উঠেছিল। কোন না কোন পর্যায়ের গণতান্ত্রিক চরিত্র সম্পন্ন একটা নগররাষ্ট্রের খানিকটা অগোছালো রূপরেখা তৈরী হচ্ছিল। তাছাড়া আরবের অর্থনৈতিক উপায় উপকরণের স্বল্পতার দরুণ জনসংখ্যা মরু এলাকার বাইরে সম্প্রসারিত হতে বাধ্য হচ্ছিল। চলমান সভ্যতায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হলে এবং নেতৃত্ব নিস্ক্রীয় হয়ে পড়লে নতুন কোন যাযাবর গোষ্ঠীকে সভ্যতার চালকের মসনতে বসানো আল্লাহর স্বতসিদ্ধ চিরাচরিত নীতি। এই নীতি অনুসারেই আল্লাহ ফেরাউনী শক্তির পতন ঘটিয়ে তার স্থলে বনী ইসরাঈলকে ক্ষমতাসীন করেছিলেন।

এসব দিক বিবেচনা করলে আরবরাই ছিল তৎকালীন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ জনশক্তি। মানব সমাজে একটা মৌলিক ও সর্বাত্মক বিপ্লব সংঘটিত করার জন্যে এই জনশক্তিই সবচেয়ে উপযোগী।

About নঈম সিদ্দিকী