মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্ সা.

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

মদিনার সামরিক কর্মকাণ্ডের ধরণ

ইসলামী রাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ডকে দুই সাম্রাজ্যের পারস্পরিক সংঘাত কিংবা দুই ধর্মীয় উপদলের সংঘর্ষ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এখানে আলেকজান্ডার ও নেপোলিয়নের মত বিশ্বজয়ের কোন পরিকল্পনা যেমন ছিলনা, তেমনি ছিলনা হল্যান্ড, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মত স্বাধীন দেশগুলোর স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিয়ে উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার কোন উচ্চাভিলাষ। এখানে একই দেশ ও একই জাতির লোকদের মধ্যে এই নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছিল যে, এক পক্ষ জাতির পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে একটা নির্দিষ্ট কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য নিঃস্বার্থভাবে মাথার ঘাম পায়ে ফেলছিল, আর অপর এক পক্ষ তাকে ব্যর্থ করে দেয়ার মতলবে তার অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করতে উঠে পড়ে লেগেছিল। ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মল, নিষ্কলংক ও ন্যায়নিষ্ঠ এই বিপ্লবের বিরুদ্ধে কোরায়েশ, ইহুদী ও বেদুঈন গোত্রগুলো নিছক নেতিবাচক অন্ধ ভাবাবেগের গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে গিয়ে জঘন্যতম অপকর্ম, অপরাধ, চক্রান্ত ও হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল। বহু বছরব্যাপী গোয়ার্তুমিপূর্ণ কর্মকাণ্ড চালানোর পর এখন পরবর্তী একটামাত্র পদক্ষেপই তাদের নেয়া বাকী ছিল, সেটা হলো প্রকাশ্য সশস্ত্র আগ্রাসন চালিয়ে ময়দানে নামা এবং সম্ভব হলে চিরতরে এই বিরোধের অবসান ঘটানো। কোরায়েশ আগে আগে এবং অন্যরা পেছনে পেছনে চললো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদেরই অস্তিত্ব খতম হয়ে গেল। এই যুদ্ধগুলোর সাথে সর্বাংশে না হলেও অনেকাংশে সেই সব সংঘর্ষের সাদৃশ্য রয়েছেন, যা রাশিয়ায় ফেব্রুয়ারী বিপ্লব থেকে শুরু করে অক্টোবর বিপ্লবের পূর্বে অথবা ফরাসী বিপ্লবের নামে রাজভক্তদের ও বিপ্লবীদের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল। অথবা আমেরিকার গৃহযুদ্ধের মতও বলা যেতে পারে। মক্কা ও মদিনার যুদ্ধগুলো মূলতঃ এক ধরণের গৃহযুদ্ধই ছিল। এই গৃহযুদ্ধের সর্বপ্রথম কারণ ছিল এই যে, একদিকে রসূল সা. পৈতৃক জাহেলী ব্যবস্থার অন্ধ অনুকরণ ত্যাগ করে আল্লাহর নির্দেশে একটা নির্ভুল কর্মপন্থা অবলম্বন করেছিলেনর। অপর দিকে কোরায়েশ তাকে তার বিবেক ও মতের স্বাধীনতা প্রয়োগ করে কাজ করতে দিতে চাইছিলনা। জাহেলিয়াতের হোতারা বলপ্রয়োগে সহিংস পন্থায় যুবকদের সচেতন বিবেকবুদ্ধিতে স্বাধীন মত ও বিশ্বাস থেকে বঞ্চিত করতে চেয়েছিল। আর এই সচেতন বিবেক নিজের স্বাভাবিক অধিকার অর্জন করতে ও অন্যদেরকে তা দিতে বদ্ধপরিকর হয়েছিল।

মদীনার প্রাথমিক ইসলামী রাষ্ট্রের দশ বছরের সামরিক তৎপরতার এই ধরণটা প্রাণক্ষয়ের পরিসংখ্যান দেখলে স্পষ্ট বুঝা যায়। এ কথা না মেনে উপায় থাকে না যে, রসূল সা. ন্যূনতম রক্তপাতের নীতি অনুসরণ করেছিলেন। নামমাত্র প্রাণক্ষয়ের মাধ্যমে তিনি দশ লক্ষ বর্গমাইল ভূখণ্ডের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে দেখান। বিপ্লবের চূড়ান্ত সাফল্যের স্তরে পৌঁছা পর্যন্ত সর্বমোট ২৫৫ জন মুসলিম শহীদ ও ৭৫৯ জন কাফের খুন হয়। (রহমাতুল্লিল আলামীনঃ কাযী সুলায়মান মানসুর পুরী, ২য় খণ্ড, পৃঃ ২৬৫) লক্ষ কোটি মানুষের কল্যাণের পথ উন্মুক্ত করার জন্য মাত্র ৭৫০ জন বিরোধীকে হত্যা করতে হয়। অপবাদ রচনাকারীদের উচিত এই পরিসংখ্যানের আলোকে নিজেদের ধ্যান-ধারণাকে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে রেখে দেখা। এই যুদ্ধগুলো যদি ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে করা হতো, তাহলে তাতে শুধু যে ইহুদী ও খৃস্টানদের মত জঘন্যতম নৃশংসতা চালানো হতো তা নয়, বরং এর চেয়ে অনেক বেশী সংখ্যক মানুষকে এক একটা যুদ্ধেই হত্যা করা হতো। রসূল সা. যদি দিগ্বিজয়ের উচ্চাভিলাষী হয়েই যুদ্ধে নামতেন, তাহলে বড় বড় সমর নায়করা যেভাবে অকাতরে রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছে, তেমনি তিনিও আরবের মরুভূমিতে রক্তের ঢল বইয়ে দিতে পারতেন। দুটো প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের সংঘর্ষ হলেও তাতে অনেক বেশী লোক ক্ষয় হতো, অনুরূপভাবে যুদ্ধবন্দীর সংখ্যা যেখানে ৬৫৬৪ ছিল, সেখানে তাদের মধ্যে থেকে মাত্র দু’জন বন্দীকে তাদের প্রমাণিত অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড দেয় হয়। সর্বমোট ৬৩৪৭ জন বন্দীকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল। ‘রহমাতুল্লিল আলামীন’ গ্রন্থের লেখক অনেক গবেষণার পর বলেছেন যে, মাত্র ২১৫ জন বন্দীর পরিণাম সুস্পষ্টভাবে জানা যায়নি। হয়তো পরবর্তীকালে জানা যাবে। খুব সম্ভবত তারা ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম সমাজে বিলীন হয়ে গেছে। মদিনায় প্রকৃত পক্ষে একটা বিকাশমান ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রকে আভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে এবং একই ভূখণ্ডের আত্মীয় অধিবাসীদের মধ্যে সংঘাত বেধে গিয়েছিল। অত্যন্ত স্বল্প পরিসর সময়ে তিন চারটে বড় বড় যুদ্ধে অতি সামান্য প্রাণক্ষয়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। আসলে এ নিষ্পত্তিটা জনমতের ব্যাপকতর গণ্ডীতেই হচ্ছিল।

ভাববার বিষয় যে, রসূল সা. এর স্থলে যদি অন্য কোন সমরনায়ক হতো, তাহলে এটা কি সম্ভব হতো, সে বদরের ময়দানে নিজ সৈনিকদেরকে নির্দেশ দিত যে, বনু হাশেমের যোদ্ধাদেরকে হত্যা করোনা, কেননা তারা স্বেচ্ছায় আসেনি, বাধ্য হয়ে এসেছে, আব্বাস বিন আব্দুল মোত্তালেবকে হত্যা করোনা, আবুল বুখতারী বিন হিশামকে হত্যা করোনা? (ভুলক্রমে আবুল বুখতারীকে হত্যা করা হয়েছিল।) এটা কি কল্পনা করা যায় যে, বদরের বন্দীদের ছটফটানিতে অস্থির হয়ে মদিনার বিজয়ী শাসকের চোখের ঘুম আসেনা এবং রাতের অন্ধকারে গিয়ে তাদের বাঁধন ঢিলা করে দেন? এটা কি হতবুদ্ধিকর ব্যাপার নয় যে, ঠিক যুদ্ধ চলার সময়ে তিনি মক্কার লোকদের আবেদনে সাড়া দিয়ে খাদ্যশস্যের অবরুদ্ধ চালান ইয়ামামা থেকে ছাড়িয়ে মক্কায় পাঠিয়ে দিলেন এবং আরো পাঁচশো স্বর্ণমুদ্রা দুর্ভিক্ষপীড়িত মক্কাবাসীকে নিজের পক্ষ থেকে পাঠালেন? উপরন্তু মক্কা বিজয়ের দিন যে ব্যক্তির বিজয়পতাকা আকাশে উড়ছিল, তিনি যদি মুহাম্মাদ সা. ছাড়া আর কেউ হতেন এবং তার লক্ষ্য ইসলামের বিজয় ছাড়া অন্য কিছু হতো, তবে কি সে পারতো ১৫/২০ বছরের পাশবিক নির্যাতনের মর্মন্তুত কালো ইতিহাসকে ভুলে গিয়ে ‘‘আজ তোমাদের ওপর কোন অভিযোগ নেই, যাও তোমরা মুক্ত-’’ এ ঘোষণা দিতে? কখখনো নয়। অন্য কেউ হলে মক্কার অলিগলি কোরায়েশদের রক্তে ভেসে যেত।

আসলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও রসূল সা. কে যুদ্ধের ময়দানে নামতে হয়েছিল। কেননা এই পথ শাহাদাতের বধ্যভূমির ওপর দিয়েই চলে গেছে। কিন্তু তিনি ভূখণ্ড জয়ের পরিবর্তে মানুষের হৃদয় জয় করতে চেয়েছিলেন। তিনি তরবারী দিয়ে মানুষের দেহকে অনুগত করার পরিবর্তে যুক্তি দিয়ে মনমগজকে ও সুন্দর স্বাভাবিক চরিত্র দিয়ে মনকে বশীভূত করতে চেয়েছিলেন। তাঁর আসল যুদ্ধ ছিল জনমতের ময়দানে। এই ময়দানে তাঁর শত্রুরা ক্রমাগত পরাভূত হয়েছিল। বস্তুত ইসলামী বিপ্লবের শত্রুদের সাথে রসূল সা. কে যে সংঘাতে লিপ্ত হতে হয়েছিল, সশস্ত্র যুদ্ধ ছিল তার একটা অতি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।

রসূল সা. এর সমর কৌশল

রসূল সা. এর সমরকৌশলের মূল কথা ছিল, শত্রুর রক্ত ঝরানোর চেয়ে তাকে অসহায় করে দেয়াকে অগ্রাধিকার দান, যতক্ষণ না সে সহযোগিতা করে অথবা প্রতিরোধ ত্যাগ করে। রসূল সা. এর পবিত্র জীবন চরিতের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণকারী উপমহাদেশের বিশিষ্ট গবেষক ডঃ হামীদুল্লাহ সিদ্দীকী রসূল সা. এর সামরিক কৌশলকে এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ

‘‘আসলে রসূলুল্লাহ সা. শত্রুকে ধ্বংস করার পরিবর্তে বাধ্য করা পসন্দ করতেন।’’ (আহদে নব্বীকে ময়দানহায়ে জং, পৃঃ ৪৪)

অন্যত্র তিনি লিখেছেনঃ

‘রসূল সা. এর রাজনীতির লক্ষ্য কোরায়েশকে ধ্বংস করা ছিল না, বরং সম্পূর্ণরূপে অক্ষত রেখে অক্ষম ও পরাভূত করা ছিল তাঁর লক্ষ্য।’ (আহদে নববী মে নিযামে হুকুমরানঃ পৃঃ ২৪৯)

রসূল সা. এর অনুসৃত কলাকৌশলগুলোর বিশদ বিবরণ দিয়ে ও ঘটনাপ্রবাহের পর্যালোচনা করে লেখক তাঁর এই অভিমতকে নিখুঁতভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এই কৌশলের আওতায় রসূল সা. নিম্নরূপ বাস্তব কর্মপন্থা অবলম্বন করেনঃ

‘‘তিনি নিজের প্রতিরক্ষা শক্তিকে সংখ্যা, সংঘবদ্ধতা, পরিশ্রম, সামরিক প্রস্তুতি ও চারিত্রিক প্রশিক্ষণের দিক দিয়ে দ্রুত বিকশিত করেছেন, অতঃপর তাকে একটা যন্ত্রের মত সদা সক্রিয় রেখেছেন এবং তা দ্বারা বিরোধীদেরকে তিনি ভীত সন্ত্রস্থ করে রেখেছেন।

মক্কাবাসীর বাণিজ্যপথকে অবরোধ (Blockade) করে তাদেরকে নিস্তেজ করে দিয়েছেন।

সমঝোতা ও চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে বিভিন্ন গোত্রকে ক্রমান্বয়ে শত্রুর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিজের সাথে নিয়ে নিয়েছেন।

সামরিক অভিযানের জন্য তিনি রকমারি কৌশল করেছেন। কখনো অবলম্বন করেছেন শত্রুকে প্রস্তুত হবার সুযোগ না দিয়ে অতর্কিত আক্রমণের পন্থা (যেমন মক্কা বিজয়)। কখনো অপ্রত্যাশিত পথ অবলম্বন করে এবং অভিযানের গন্তব্যস্থলকে গোপন রেখে বিরোধীদেরকে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলেছেন (যেমন বনুল মুস্তালিকের যুদ্ধ)। কখনো নিজের যুদ্ধের নীলনকশা আগে থেকে নিজের পক্ষে করে রেখেছেন (যেমন বদরের যুদ্ধ), আবার কখনো এমন কোন নতুন প্রতিরক্ষাকৌশল অবলম্বন করেছেন, যার পূর্বাভিজ্ঞতা শত্রুর ছিলনা (যেমন খন্দক যুদ্ধ)।

মদিনা রাষ্ট্রের গোটা দশ বছরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উল্লিখিত মৌলিক নীতির সুস্পষ্ট উদাহরণ। উপরন্তু আমরা যখন এর সাথে রসূল সা. এর সেই মহানুভব ও উদার দৃষ্টিভংগিকে যুক্ত করি, যা কোন বিজেতাসুলভ নয়, বরং মিশনারীসুলভ প্রেরণায় উজ্জীবিত ছিল, এবং যা একজন হানাদার সমরনায়কসুলভ ক্রোধ ও আক্রোশের পরিবর্তে একজন দীক্ষাগুরুসুলভ গভীর হিতকামনা ও সমবেদনার প্রতীক ছিল, তখন বিভিন্ন মহল থেকে তোলা আপত্তি ও অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ নিরর্থক মনে হয়। অথচ ওগুলোর সাফাই দিতে গিয়ে পশ্চিমানুগতরা সমগ্র ঘটনা স্রোতকেই বিকৃত করতে বসেছে। রসূল সা. এর হৃদয়ে মানবতার সংস্কার ও সংশোধনের যে মনোভাব সক্রিয় ছিল, তা ব্যক্ত করার জন্য আমরা কয়েকটা ঘটনার দিকে ইংগিত দিচ্ছি।

মক্কায় যখন যুলুম নির্যাতন চরম আকার ধারণ করলো এবং কোরায়েশদের আক্রোশ অতিমাত্রায় আগ্রাসী রূপ পরিগ্রহ করলো, তখন সেই নারকীয় সন্ত্রাস ও সহিংসতার প্রধান হোতা ছিল দু’জন- আবু জাহল ও ওমর ইবনুল খাত্তাব। এমন কট্টর দুশমনদের ব্যাপারে কোন দুনিয়াদার রাজনীতির চরম রুষ্ট মনোভাব পোষণ না করে এবং মনে মনে তার ধ্বংস কামনা না করে পারতোনা। কিন্তু হিংস্রতার আগুনে নিরন্তর দগ্ধ হয়েও রসূল সা. কাতর কণ্ঠে দোয়া করতেন, আল্লাহ যেন এই দু’জনের অন্তত কোন একজনকে ইসলাম গ্রহণের তওফীক দেন। এই দোয়া থেকে প্রমাণিত হয়, মানবতার এই সংগঠন নিজের শত্রুদের ধ্বংসের চেয়ে তাদের সংশোধনের বিষয় অগ্রাধিকার দিতেন এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের ব্যাপারে ভালো আশা পোষণ করতেন। হযরত ওমরের ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে তাঁর দোয়া সফল হয়।

দ্বিতীয় ঘটনা হলো, তায়েফের অধিবাসীদের হিতকামনার অপরাধে তাদের হাতে রসূলের লাঞ্ছিত ও আহত হওয়ার ঘটনা। কোন দুনিয়াবী রাজনীতির পতাকাবাহীর কাছ থেকে এ ক্ষেত্রে এ ছাড়া আর কিছু আশা করা যায় না যে, তার হৃদয় তাদের জন্য চিরতরে বন্ধ হয়ে যেত, এবং সম্ভব হলে সে গোটা শহরকে তৎক্ষণাত উল্টে দিত। অন্যথায় সারা জীবন তাদের ওপর রুষ্ট ও ক্ষুব্ধ থাকতো এবং ক্ষমতা হাতে পাওয়ার প্রথম সুযোগেই এমন অসভ্য শহরটাকে ধ্বংস করে দিত। তায়েফের এই নির্যাতনে রসূল সা. এর সাথী মর্মাহত হয়ে ঠিক এই ধারায়ই চিন্তা করেছিলেন এবং বলেছিলেন, এই নরপশুদের জন্য বদদোয়া করুন। এমনকি জিবরীলও তাঁর প্রচ্ছন্ন মনোভাব পরীক্ষা করার জন্য জানান যে, তাঁর ইংগিত পেলে পাহাড়ের ফেরেশতারা মক্কা ও তায়েফকে পাহাড়ের মাঝে পিষে ফেলে দিতে প্রস্তুত। কিন্তু রসূল সা. বললেন, না, ওরা অজ্ঞতার কারণে ভুল পথে চলছে। ওরা যদি ঈমান নাও আনে, তবে ওদের বংশধররা সত্যের দাওয়াত কবুল করে এক আল্লাহর অনুগত হয়ে যাবে।

তৃতীয় ঘটনা ওহুদের ময়দানের। মুসলমানদেরকে যখন কিছু ভুলত্রুটির কারণে আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কতার সংকেত স্বরূপ পরাজয় বরণ করানো হলো এবং স্বয়ং রসূল সা. গুরুতর আহত হলেন, তখন এক চরম তিক্ততার পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে দৃশ্যত সঙ্গতভাবেই মর্মাহত কোন কোন সাহাবী রসূল সা. কে অনুরোধ করলেন, আপনি মোশরেকদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে বদদোয়া করুন, তাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক। তিনি জবাব দিলেন, আমাকে অভিশাপকারী করে পাঠানো হয়নি। আমাকে পাঠানো হয়েছে বার্তাবাহক ও সুসংবাদদাতা হিসাবে। এই বলে তিনি শত্রুদের জন্য দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ! আমার জাতির লোকদেরকে সুপথ দেখাও। কেননা তারা জানেনা।’’ অর্থাৎ কোরায়েশদের কাছ থেকে আঘাতের পর আঘাত খেয়েও তার মধ্যে এমন আকাংখা জন্মেছিল যে, ওরা ধ্বংস হয়ে না যাক। বরং যুদ্ধাবস্থায়ও তিনি এই আকাংখার সোচ্চার থাকেন যে, তারা হেদায়াত লাভ করুন।

খয়বর অভিযানকালে কামুস দুর্গ জয়ের জন্য রসূল সা. হযরত আলী রা. কে বিশেষ পতাকা দিয়ে বললেনঃ

‘‘হে আলী, তোমার দ্বারা যদি একজন মানুষও হেদায়াত পায়, তবে সেটা তোমার জন্য মস্ত বড় নিয়ামত হবে।’’

অর্থাৎ শত্রুর শারীরিক ক্ষতি সাধন ও রক্তপাত করাই আসল উদ্দেশ্য নয়, বরং যত বেশী সম্ভব, মানুষের মন মগজে পরিবর্তন আসুক এবং তারা নয়া জীবন ব্যবস্থাকে গ্রহণ করুক- এটাই অগ্রগণ্য।

এই কয়েকটা ঘটনা আমরা কেবল নমুনা হিসাবেই গ্রহণ করেছি, নচেত এমন প্রমাণের অভাব নেই যা রসূল সা. এর মৌলিক দৃষ্টিভংগি স্পষ্ট করে দেয়। যুদ্ধবাজ লোকেরা অত্যন্ত তাড়াহুড়ো প্রিয় ও রগচটা হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে মানবতার বন্ধু রসূল সা. কে আমরা অত্যন্ত শান্ত, দৃঢ় সংকল্প ও উচ্চাভিলাষী দেখতে পাই। তাঁর রাজনীতিতে শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে কৌশল ও কল্যাণকামিতা সক্রিয়। রাজনৈতিক কুশলতা ও বিচক্ষণতার এর চেয়ে বড় অলৌকিক প্রমাণ আর কী হতে পারে যে, তিনি মদিনায় যাওয়ার অব্যবহিত পরই বিভিন্ন পর্যায়ের লোকদের সাথে আলাপ আলোচনা চালিয়ে ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি পত্তন করে ফেললেন। কোন বৈপ্লবিক মতবাদের ওপর এক ফোঁটা রক্ত না ঝরিয়েই এভাবে একটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার দৃষ্টান্ত সম্ভবত সমগ্র মানবেতিহাসেও পাওয়া যাবে না। একমাত্র এটাই ছিল সঠিক অর্থে রক্তপাতহীন (Bloodless) বিপ্লব, যার গোঁড়ায় কোন মানুষের এক ফোঁটা রক্তও ঝরেনি এবং একটা লাশও পড়েনি। এমন হতবুদ্ধিকর ঘটনা স্বয়ং নবুওয়াতের অসাধারণ বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত করে।

এ কথাও ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, ইসলামী রাষ্ট্রের যাবতীয় সামরিক তৎপরতা কোরায়েশ ও ইহুদী গোত্রগুলোর বিরুদ্ধেই পরিচালিত হয়েছিল, যারা তাকে যুদ্ধের ময়দানে জোর করেই টেনে নিয়েছিল। কোরায়েশ ও ইহুদী ছাড়া অবশিষ্ট আরবরা সবাই নিজেদের স্বাভাবিক জীবনে কর্মব্যস্ত ছিল। সামান্য কিছু এলাকা ছাড়া সমগ্র আরবের কোথাও যুদ্ধ হয়নি। বরঞ্চ আরবের সাধারণ জনতা উভয় শক্তির উদ্দেশ্য, চরিত্র ও রাজনৈতিক শক্তি-সামর্থ নীরব দর্শক হয়ে পর্যবেক্ষণ করতো। যখন মুসলিম শক্তি সর্ব দিক দিয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে দিয়েছে, তখন বিভিন্ন অঞ্চল ও গোত্রের প্রতিনিধি দল এগিয়ে এসে এসে ইসলাম গ্রহণ করেছে। এ সত্যটাও কোন চিন্তাশীল ব্যক্তির দৃষ্টি আকর্ষণ না করে ছাড়েনি যে, সব ক’টা বড় বড় যুদ্ধ যথা বদর, ওহুদ ও খন্দক- শত্রুরা নিজেরাই হানাদার হয়ে মদিনার আশপাশে এসে করেছে। এভাবে তারাই রসূল সা. কে বাধ্য করেছে যেন শত্রুর শক্তির উৎসগুলোকে তিনি পদানত করে নেন। এ জন্য কোরায়েশ ও তাদের বশংবদদের শক্তি খর্ব করার জন্য মদিনার দিক থেকে মাত্র একবারই চূড়ান্ত অভিযান চালানো হয় এবং মক্কা বিজয়ের পর হুনায়েন ও তায়েফের যুদ্ধ প্রতিপক্ষের শক্তি সম্পূর্ণরূপে খতম করে দেয়। অপর দিকে ইহুদীদের শক্তির কেন্দ্রগুলোকেও উৎখাত করা হয় ন্যূনতম প্রাণক্ষয়ের মাধ্যমে।

একটা ব্যাপক ভুল বুঝাবুঝি

হাদীস, সীরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থাবলীতে ‘গুয্ওয়া’ ও ‘সারিয়া’ নামে সামরিক অভিযান সমূহের যে লম্বা তালিকা দেখতে পাওয়া যায়, তার কারণে অমুসলিমদের তো কথাই নেই, স্বয়ং অনেক মুসলমানও সাংঘাতিক রকমের ভুল বুঝাবুঝিতে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। অথচ ‘গুয্ওয়া’ ও ‘সারিয়া’ হাদীস ও মাগাযীর (ইসলামের সামরিক ইতিহাস) গ্রন্থাবলীর বিশেষ পরিভাষা। এই পরিভাষা দুটোর প্রত্যেকটার আলাদা আলাদা অর্থ নির্দিষ্ট রয়েছে। সামরিক প্রতিরক্ষামূলক অভিযান, টহল বা প্রহরা, বিদ্রোহী ও অপরাধীদের দমন, শিক্ষা বিস্তার ও দাওয়াত দান, কিংবা চুক্তি সম্পাদন ইত্যাকার রকমারি প্রয়োজনে যখনই কোন সেনাদল (তা সে মাত্র দু’জনেরই হোক না কেন) পাঠানো হতো তখন তাকে ‘সারিয়া’ বলা হতো। আর যে সেনাদলের সাথে রসূল সা. নিজে শরীক থাকতেন, তাকে বলা হতো ‘গুয্ওয়া’। এ ধরণের সেনাদলের কার্যত কোন সংঘর্ষে বা অন্য কোন ধরণের তৎপরতায় জড়িত হতে হোক বা নাহোক, উভয় অবস্থায় তাকে সারিয়া অথবা গুয্ওয়া বলা হতো। ছোটখাটগুলো বাদ দিলে উল্লেখযোগ্য বড় বড় সামরিক অভিযান মাত্র কয়েকটাই থাকে। যেমন বদর, ওহুদ, আহযাব বা খন্দক, খয়বর ও মক্কা (হোনায়েনসহ)। উল্লেখ্য যে, তবুক ও সন্নিহিত অঞ্চলে যে ‘জায়শে উসরাত’ (‘কষ্টকর অভিযান’) পাঠানো হয়েছিল, তার একমাত্র কারণ ছিল সিরিয়ার বিদেশী সরকারের পক্ষ থেকে আক্রমণের আশংকা এবং তার ধরণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমি এখন সংক্ষেপে এই সামরিক অভিযানগুলো নিয়ে আলোচনা করবো।

সর্বপ্রথম যে বিষয়টার ওপর দৃষ্টি পড়ে তা হলো, সংঘর্ষের সূত্রপাত কিভাবে হলো। এর জবাব দেয়ার জন্য আমি আগে উভয় পক্ষের অবস্থান ও ভূমিকা পর্যালোচনা করবো।

কোরায়েশের আগ্রাসী মানসিকতা

কোরায়েশের মানসিকতা একটা ঘটনা থেকে আপনা আপনিই চিহ্নিত হয়ে যায়। তারা যখন রসূল সা. কে সামষ্টিকভাবে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিল, তখন মক্কার নেতারা আলোচনা করার সময় নিজেদের মানসিকতা খোলাখুলিভাবেই ব্যক্ত করেছিল। একটা প্রস্তাব এসেছিল রসূল সা. কে লোহার নির্মিত কারাগারে দরজা তালাবদ্ধ করে আটকে রাখা হোক, যাতে তিনি ভেতরে ছটফট করে মরে যান। এ প্রস্তাব শুনে নাজ্দ থেকে আগত এক প্রবীণ ব্যক্তি-শায়খ নাজদী বললো, ‘‘তোমরা যদি ওকে কারাবন্দী কর, তাহলে তার দাওয়াত লোহার কারাগারের বদ্ধ দরজা ভেদ করে দূর দিগন্তে ছড়িয়ে পড়বে এবং তাঁর সাথীদের ওপর তার প্রভাব পড়বে। এমনকি এটাও বিচিত্র নয় যে, তারা তাকে বের করে নিয়ে যাবে। তারপর তারা তোমাদের চেয়ে সংখ্যায় বেশী হয়ে তোমাদের পরাজিত করবে।’’ আর একটা প্রস্তাব ছিল এই যে, ‘‘আমরা মুহাম্মাদ সা. কে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেব। তাড়িয়ে দেয়ার পর সে কোথায় যাবে, কোথায় থাকবে তা দিয়ে আমাদের কী কাজ? সে আমাদের দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলেই হলো, আমরা নিজেদের সম্পর্ক স্বাভাবিক করে নিলেই হলো এবং আমাদের পারস্পরিক প্রীতি বহাল হলেই হলো।’’ (সীরাতে ইবনে হিশাম, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৯৪) এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার জন্য শায়খ নাজদী এর যে পর্যালোচনা করলো তা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মজলিসে তা গৃহীত হয়েছিল। শায়খ নাজদী বললোঃ

‘‘না, আল্লাহর কসম, এটা তোমাদের জন্য মোটেই উপযোগী নয়। তোমরা কি তার ভাষার মিষ্টতা ও লালিত্য দেখতে পাওনা, যা দিয়ে সে জনগণের মনে নিজের প্রভাব বদ্ধমূল করে? আল্লাহর কসম, তোমরা যদি এটা কর, তাহলে তোমরা তার কবল থেকে কিছুতেই মুক্তি পাবেনা। সে আরবের যে কোন গোত্রে নিজের ঠাঁই খুঁজে নিতে পারে, তারপর নিজের কথা দিয়ে জনগণের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, লোকেরা তার অনুসারী হয়ে যেতে পারে, সেই অনুসারীদের সাথে নিয়ে সে তোমাদের ওপর চড়াও হতে পারে, তোমাদের জনপদে প্রবেশ করতে পারে এবং তোমাদের হাত থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়ে তোমাদের সাথে যেমন খুশী আচরণ করতে পারে। কাজেই অন্য কোন কৌশল অবলম্বন কর।’’ (সীরাতে ইবনে হিশাম, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৯৪)

শায়খ নাজদীর এ কথাগুলো পড়লে অনুমান করা যায়, সে কত চালাক এবং ধড়িবাজ ছিল। সে রসূল সা. এর ব্যক্তিত্বকে বুঝে নিতে মোটেই ভুল করেনি। সেই সাথে এই সমস্ত আলোচনা থেকে এটাও পরিষ্কার হয়ে যায় যে, মক্কার কর্তাব্যক্তিরা তেরো বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে রসূল সা. এর ব্যক্তিত্ব, স্বভাব, বাণী ও চরিত্র মাধুর্যকে তখন একটা স্বতন্ত্র রাজনৈতিক বিপদ ও মারাত্মক হুমকি মনে করতে শুরু করেছিল। এ সময় তাদের ঔদ্ধত্য এতদূর পৌঁছে যায় যে, মানবতার এই মুক্তিদূত পৃথিবীর কোন একটা ভূখণ্ডে গিয়েও জীবিত থাকুক এবং কোথাও গিয়ে নিজের দাওয়াতী কাজ চালাতে সক্ষম হোক-এটা বরদাশত তারা করতে প্রস্তুত ছিলনা। নচেত তারা জানতো, তারা যে অত্যাচার চালিয়েছে এবং মুসলিম যুবকদেরকে তাদের বাড়ীঘর থেকে তাড়িয়ে যে অপরাধ করেছে, তার হিসাব একদিন তাদেরকে দিতে হবে। তারপর তারা যেভাবে রসূল সা. কে হত্যা করার ব্যাপারে একমত হলো এবং তিনি প্রাণ নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ায় তাঁকে ধরার জন্য যে ছুটোছুটি করা হলো এবং বড় আকারের পুরস্কার ঘোষণা করা হলো, তা থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, সাধ্যে কুলালে তারা রসূল সা. কে এক মুহূর্তও বেঁচে থাকার সুযোগ দিতে চাইছিলনা। তাঁর অস্তিত্বই তাদের জন্য হুমকি এবং তাঁর জীবনই তাদের জন্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। কোরায়েশদের এই মনোভাব রসূল সা. তাৎক্ষণিকভাবে জানতে পারবেনা না এর কোনই কারণ ছিল না।

এই ঘটনার আরো একটু পেছনে চলে যান। আকাবার দ্বিতীয় বায়য়াতের সময় হযরত আব্বাস আনসারদের এই বলে সাবধান করে দিয়েছিলেন, ‘‘যে উদ্দেশ্যে তোমরা রসূল সা. কে দাওয়াত দিচ্ছ, সে উদ্দেশ্যে যদি সফল করতে পার, এবং তার যে বিরোধিতা করা হবে তার যদি মোকাবিলা করতে পার, তাহলে তোমরা যে কঠিন দায়িত্ব গ্রহণ করেছ সেটা গ্রহণ করা সঠিক হবে।’’ তাছাড়া ঐ বায়য়াতের ভাষায় এই উদ্বোধনী কথাগুলোও খুবই তাৎপর্যবহ ছিলঃ ‘‘তোমরা তোমাদের সন্তান ও পরিবার পরিজনকে যেভাবে রক্ষা করে থাক, সেইভাবে আমাকেও রক্ষা করবে।’’ তারপর আনসারদের জবাব লক্ষ্যণীয়ঃ ‘‘আপনি নিশ্চিত থাকুন, আমরা যুদ্ধবাজ লোক’’। অতঃপর তাদের এই প্রশ্ন তোলা যে, ‘‘আপনার কারণে আমাদের বহু চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে, এরপর এমন হবে না তো যে, আপনার জন্য আমরা এত কষ্ট ভোগ করবো, আপনি জয়ী হবেন, তারপর আমাদেরকে ছেড়েছুড়ে আপনি নিজ পরিবারে ফিরে যাবেন?’’ এবং রসূল সা. কর্তৃক ‘‘আমি তোমাদের এবং তোমরা আমার’’ বলে আশ্বাস দেয়া খুবই তাৎপর্যবহ। অতঃপর আব্বাস বিন উবাদা আনসারী কর্তৃক নিজ সাথীদেরকে এই বলে হুশিয়ার করে দেয়াও গভীর তাৎপর্যমণ্ডিতঃ ‘‘তোমরা সারা বিশ্বের সাদা কালো সকল মানুষের সাথে যুদ্ধের ঝুঁকি নিচ্ছ। সাবধান এমন যেন না হয় যে, তোমাদের অনেক সম্পদ বিনষ্ট এবং গোত্রের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ নিহত হতে দেখে তোমরা রসূলকে সা. শত্রুর হাতে সোপর্দ করে দেবে। সব কিছু এখনই ভেবে চিন্তে স্থির করে নাও।’’

এসব কথাবার্তার তাৎপর্য এই যে, কোরায়েশ যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করে রেখেছিল, তার আলোকে শুধু রসূল সা. ও হযরত আব্বাসই নন, বরং দূর দূরান্ত থেকে আগত আনসাররাও দ্ব্যর্থহীনভাবে বুঝতে পেরেছিলেন, তারা যে বায়য়াত করবেন, তা যুদ্ধ ঘোষণারই নামান্তর।

এই বায়য়াতের বৈঠকের কথাবার্তা এক শয়তান আড়ি পেতে শুনে কোরায়েশদের জানিয়ে দিল। তারপর কোরায়েশের বাঘা বাঘা নেতারা আনসারদের আবাসস্থানগুলোতে যেয়ে যেয়ে বলতে লাগলো, ‘‘শুনেছি তোমরা মুহাম্মাদের সা. সাথে সাক্ষাত করেছ এবং তাকে আমাদের এখান থেকে বের করে নিয়ে যেতে চাও। এও শুনেছি যে, তোমরা তার হাতে হাত দিয়ে আমাদের সাথে যুদ্ধ করার চুক্তি করেছ। অথচ আরবের অন্য যে কোন গোত্রের তুলনায় তোমাদের সাথে যুদ্ধ করা আমাদের কাছে ঢের বেশী অপছন্দনীয়। অর্থাৎ আনসাররা যদি রসূল সা. কে মক্কা থেকে বের করে নিয়ে যায় এবং তাকে নিজেদের কাছে নিরাপদ আশ্রয়ে রাখে, তাহলে মক্কাবাসী তাকে যুদ্ধ ঘোষণা গণ্য করবে। সেটা যদি মদিনাবাসী সত্যিই করে তবে সে ক্ষেত্রে কোরায়েশ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট। এভাবে আগাম যুদ্ধ ঘোষণা জানিয়ে দেয়া হলো। তবে কিছু লোক তো এ ঘটনা জানতোনা। যারা জানতো, তারা ব্যাপারটা চেপে রাখলো।

এরপর যখন বায়য়াতকারী আনসাররা মক্কা থেকে চলে গেল, তখন কোরায়েশরা এ বিষয়টা নিয়ে পরামর্শ করলো। শেষ পর্যন্ত স্থির হলো, ওদের পিছু ধাওয়া করা দরকার। মদিনার হজ্জ কাফেলা ভালোয় ভালোয় চলে গেল। তবে সা’দ বিন উবাদা ও মুনযির বিন আমরকে মক্কাবাসী ধরে আনলো এবং মারপিট করলো। এ ঘটনা থেকেও বুঝা যায়, রসূল সা. মক্কা থেকে অক্ষতভাবে বেরিয়ে যান- এটা তাদের কাছে কতখানি অসহনীয় ছিল এবং রসূল সা. কে নিরাপদ আশ্রয় নেয়ার অঙ্গীকারকারীদের ওপর তাদের কত ক্রোধ ছিল।

এছাড়া আবিসিনিয়ার মোহাজেরদেরকে ফিরিয়ে আনা এবং মদিনাগামী মোহাজেরদেরকে প্রথম দিকে হিজরত থেকে ঠেকানোর যে চেষ্টা কোরায়েশরা করেছিল তা থেকেও বুঝা যায়, অন্য কোন ভূখণ্ডে ইসলামী আন্দোলন শেকড় গাড়ুক, সেটাও তাদের মনোপুত ছিলনা। এ ধরণের যে কোন সম্ভাবনাকে প্রতিহত করতে তারা বদ্ধপরিকর ছিল।

এই সব ঘটনা থেকে এ কথা দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে যায় যে, হিজরতের আগেই কোরায়েশদের পক্ষ থেকে এমন যে কোন শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ দেয়া হয়েছিল, যে রসূল সা. কে নিজের কাছে আশ্রয় দেবে এবং ইসলামী আন্দোলনের ফসল তাদের ভূখণ্ডে ফেলতে দেবে। ইসলামী বিপ্লবের সংগঠকরা এত বেকুফ ছিলনা যে, তারা এই চ্যালেঞ্জকে উপেক্ষা করবে।

অবশেষে এই অলিখিত যুদ্ধের ঘোষণার খবর লিখিতভাবে একটা ষড়যন্ত্রমূলক চিঠির মাধ্যমে মক্কা থেকে মদিনায় পৌঁছে গেল। মদিনার বিশ্বাসঘাতকদের সরদার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এর হাতে পৌঁছা এই চিঠিতে মদিনার আনসার ও ইহুদী সবাইকে এই মর্মে হুমকি দেয়া হয়েছিল যে, হয় তোমরা স্বেচ্ছায় মুহাম্মাদকে সা. মদিনা থেকে বের করে দাও, নচেত আমরা মদিনা আক্রমণ করে তোমাদের হত্যা করবো এবং তোমাদের স্ত্রীদেরকে প্রমোদ সংগিনী বানাবো।

এরপর ইহুদীদের সাথে যোগসাজশ করে কোরায়েশরা সরাসরি মুসলমানদের জানালো, ‘‘তোমরা মক্কা থেকে নিরাপদে বেরিয়ে যেতে পেরে উল্লেসিত হয়োনা। আমরা মদিনায় এসে তোমাদের মজা দেখাবে।’’

এই সময়ই আবু জাহল সা’দ বিন মায়াযকে কা’বার তওয়াফ করতে বাধা দেয় এবং খোলাখুলিভাবে বলে যে, তোমরা কা’বার চত্তরে পা রাখবে এটা আমি পছন্দ করিনা।

তথাপি এ সময় মক্কা থেকে অনবরতই দুষ্কৃতি ও লুটপাট চালানোর জন্য ছোট ছোট সেনাদল বেরুতে লাগলো। রসূল সা. এ খবর জানা মাত্রই পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে টহল গ্রুপ পাঠাতে লাগলেন। একাধিকবার মদিনার এ সব টহল গ্রুপ মক্কার ঐ সব সেনাদলকে দেখতে পেয়েছে। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়েই তারা পালিয়ে গেছে।

হিজরতের ত্রয়োদশ মাসে ঘটলো এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা। কিরয বিন জাবের ফেহরী মদিনায় এসে ডাকাতি করলো এবং মদিনার চারণ ক্ষেত্র থেকে রসূল সা. এর পালিত পশু, সরকারী উট ও অন্যান্য লোকদের পশু হাঁকিয়ে নিয়ে চলে গেল। এই ঘটনার সুষ্পষ্ট লক্ষ্য ছিল এই যে, আমরা তিন শো মাইল দূর থেকে এসেও তোমাদের রাষ্ট্রের সম্পত্তি এভাবে লুটপাট করে নিয়ে যেতে পারি।’ (সীরাতে ইবনে হিশাম, ২য় খণ্ড, পৃঃ ২৩৮, আসহাহুস্ সিয়ার; পৃঃ ১২৫, রহমাতুল্লিল আলামীন, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৪০)

রসূল সা. স্বয়ং একটা ক্ষুদ্র সেনাদল নিয়ে ডাকাতদের পিছু ধাওয়া করলেন এবং যায়েদ বিন হারিসাকে মদিনার অস্থায়ী শাসক নিযুক্ত করে গেলেন। (বদরের নিকটবর্তী) ওয়াদিয়ে সাফওয়ান পর্যন্ত গিয়েও তাদেরকে ধরতে পারলেন না। এ ঘটনা শত্রুর এমন একটা ধৃষ্টতা ছিল, যাকে কোন ক্রমেই বরদাশত করা যায় না। যে সরকারের কর্মকর্তাদের মধ্যে কিছুমাত্র বীরত্ব ও সাহসিকতা আছে এবং যাদের মধ্যে নিজেদের স্বাধীনতা ও নিজেদের জন্মভূমির প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসা আছে, তারা এ ধরণের স্পর্ধাকে সহ্য করতে পারেনা। এটা ডাকাতি হলেও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা ছিল আক্রমণের সমার্থক। এবার মদিনার সামনে প্রতিভাত হলো একটা অনিবার্য যুদ্ধের যুগ এবং একটা রক্তঝরা ভবিষ্যত।

মদিনার ওপর মক্কার আক্রমণ দ্বিতীয় হিজরী পর্যন্ত বিলম্বিত হওয়ার পেছনে কোন গুরুতর কারণ ছিল। কোন বাধার সম্মুখীন না হয়ে থাকলে কোরায়েশরা এরও আগে হামলা চালাতো এবং মদিনার নয়া ইসলামী রাষ্ট্রকে প্রতিরক্ষার প্রস্তুতির সময় দিত না। মক্কা ও মদিনার মাঝখানে ছিল বনু কিনানা গোত্রের এলাকা। এদের সাথে কোরায়েশদের বহু পুরনো শত্রুতা ছিল। বনু কিনানা প্রথমত তাদের এলাকা দিয়ে কোরায়েশকে যেতেই দেবেনা বলে আশংকা ছিল। আর যেতে দিলেও দ্বিতীয় আশংকা ছিল, বনু কিনানা মক্কাকে অরক্ষিত দেখে আক্রমণ করে বসতে পারে। অন্তত পক্ষে, কোন নাযুক মুহূর্তে তারা মক্কার সাথে মদিনায় হামলারত কোরায়েশী বাহিনীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে- এ আশংকা বিদ্যমান ছিল। সুরাকা ইবনে মালেক মাদলাজী কিনানী এই মধ্যবর্তী এলাকার সরদার ছিল। সে যখন জানতে পারলো, কোরায়েশ এসব আশংকার কারণে মদিনায় হামলা করতে পারছে না, তখন মেস উপযাচক হয়ে মক্কা যেয়ে কোরায়েশদের সহযোগিতার আশ্বাস দিল। এই গাটছড়ার পরিণামেই বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, কোরায়েশ মুসলমানদের পক্ষ থেকে কোন হামলার অপেক্ষায়ও ছিল না, সামরিক আগ্রাসন চালাতে কোন ফাঁকফোকরেরও সন্দানে ছিল না। তাদের মধ্যে আগ্রাসনের মনোভাব ও সংকল্প পুরো মাত্রায় সক্রিয় ছিল। (বহমাতুল্লিল আলামীন)

মদিনার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

এবার আসুন দ্বিতীয় পক্ষের অবস্থা পর্যালোচনা করে দেখা যাক।

যখন আমরা রসূল সা. ও তাঁর বিপ্লবী সংগঠনের অবস্থা যাচাই করি, তখন প্রত্যেক দিক দিয়ে এই মর্মেই সাক্ষ্যপ্রমাণ পাই যে, তাঁদের কাছে সবচেয়ে অনাকাংখিত বিষয় ছিল যুদ্ধ। একে তো তারা ছিল অচেনা জায়গায় আগত চালচুলোহীন ও সহায়সম্বলহীন একটা দল, তদুপরি এই দলের অর্ধেক লোকই অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বিধ্বস্ত হয়ে নিজেদের পুনর্বাসনের জন্য নিজেরাই সচেষ্ট ছিল। উপরন্তু ইসলামী বিপ্লবের সংগঠকদের সামনে একই সাথে হাজির হয়েছিল একটা নতুন পরিবেশকে ইসলামী বিপ্লবের উপযোগী করে গড়ে তোলা, বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন প্রতিষ্ঠা করা, তাদের নৈতিক ও মানসিক প্রশিক্ষণ দান এবং সর্বোপরি একটা নতুন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে তার সকল বিভাগের প্রশাসনকে গড়ে তোলার কর্মসূচী। এগুলোর মধ্যে প্রতিটা কর্মসূচী দীর্ঘ সময়ব্যাপী অখণ্ড মনোযোগ ও শ্রম দাবী করে। এমন কঠিন সমস্যাবলীতে পরিবেষ্টিত একটা ক্ষুদ্র দল কখনো যুদ্ধ চাইতে পারে না। কিন্তু অন্য দিকে তাদের ছিল একটা বিরাট আন্ত মানবিক মিশন। সারা দুনিয়ার মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা ছিল তাদের পবিত্র লক্ষ্য। জীবনের বৃহত্তম সত্য- অর্থাৎ এক আল্লাহর প্রভুত্ব ও সার্বভৌমত্বের মশাল জ্বেলে গোটা সভ্যতাকে উদ্ভাসিত করে দেয়ার জন্য তারা নিজেদের জীবনের সকল সুখ শান্তি কুরবানী করে দিয়েছিলেন। ধৈর্য ও অন্যকে অগ্রাধিকার দানের ঝুঁকিপূর্ণ ও কষ্টকর গুণগুলো অর্জন করে তারা সামনে এগুচ্ছিলেন। ইসলামের মহাসত্যই ছিল তাদের জীবনের একমাত্র পুঁজি। তারা সংখ্যায় ছিল নিতান্তই কম এবং মদিনার রাষ্ট্রটাও ছিল একেবারেই নবীণ। এই পুঁজিটুকুর সাথেই জড়িত ছিলেন তাদের সমগ্র ভবিষ্যত। তারা এ রাষ্ট্রটাকে সংরক্ষণের জন্য যে স্বাভাবিক আগ্রহ লালন করতেন, তা ছিল আকাশে চিল উড়তে দেখে মুরগী কর্তৃক সব কিছু ভুলে নিজ বাচ্চাদেরকে পালক ও পাখনা দিয়ে ঢাকার ব্যাকুলতা ও উদগ্র বাসনার মতই। তারা তাদের শুকিয়ে যাওয়া জীর্নশীর্ণ দেহ নিয়েও পাহাড়ের সাথে টক্কর দিতে প্রস্তুত ছিলেন। সকল স্বাদ, আনন্দ ও স্বার্থ ভুলে গিয়ে এমন প্রতিটা শক্তির ডানা ভেঙ্গে দিতে তারা প্রবল আবেগ ও উদ্যম পোষণ করতেন, যে শক্তি তাদের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে বাঁকা চোখে দেখে থাকে। তারা মদিনার প্রাণোচ্ছল বাতাসে ও বাগানে এবং ভ্রাতৃত্বের অনুপম পরিবেশে এসেও কখনো এক মুহুর্তের জন্য মক্কার সেই দুঃখবেদনাকে ভুলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে উদাসীনভাবে ঘুমাননি। তাদের দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্যও মক্কার রাঘব বোয়ালদের তরবারীর ওপর থেকে সরেনি, যার কোন নিশ্চয়তা ছিল না যে কখন তারা তাদের অতর্কিত আক্রমণের শিকার হয়। প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণে না রসূল সা. কোন উদাসীনতা দেখিয়েছেন, আর না তাঁর সাথীরা দায়িত্ব পালনে কসুর করেছেন। তারা কোন যোগী বা সন্যাসী ছিলেন না, বরং অত্যন্ত বিচক্ষণ ও কর্মঠ লোক ছিলেন এবং একটা নতুন পৃথিবী গড়ে তুলতে চাইছিলেন। এমন ইতিহাস সৃষ্টিকারী লোকদের মধ্যে বিরোধীদের শক্তির জবাব পাল্টা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দেয়ার প্রয়োজনীয় মেধা ও বুদ্ধির অভাব ছিল না।

রসূল সা. এর প্রতিরক্ষা কৌশল

আসুন এবার দেখা যাক, রসূল সা. কী কী প্রতিরক্ষা কৌশল অবলম্বন করেছিলেন।

মদিনায় রসূল সা. এর সাথে আগত মোহাজেরগণ শুধু নিজেদের জন্য শান্তি ও নিরাপত্তার স্থান খুঁজবেন এমন লোক ছিলেন না। তাদের মাতৃভূমি ত্যাগ করে আসার উদ্দেশ্যও কোন অর্থনৈতিক উচ্চাভিলাষ পূরণ ছিল না। বরঞ্চ তারা এসেছিলেন একটা উচ্চতর ও মহত্ত্বর লক্ষ্যে। সেই লক্ষ্যকে ভুলে গিয়ে তারা নিজেদের আখের গোছানো ও অর্থনৈতিক উচ্চাভিলাষ পূরণের কাজে নিয়োজিত হননি। রসূল সা. সৃশৃংখল পন্থায় তাদের পুনর্বাসিত করেছিলেন এবং আনসারদের সাথে তাদের সামাজিক অর্থনৈতিক ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর তাদেরকে মসজিদ ভিত্তিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের মাধ্যমে সাংগঠনিক শৃংখলার আওতায় নিয়ে আসেন। এবাদত, ওয়ায, কোরআন শিক্ষা ও অন্যান্য পন্থায় তাদের মানসিক, বাস্তব ও নৈতিক প্রশিক্ষণের কাজ তাৎক্ষণিকভাবে শুরু করে দেন এবং অত্যন্ত দ্রুততা ও ক্ষীপ্রতার সাথে এ কাজের বিস্তার ও বিকাশ ঘটান। সেই সাথে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের মাধ্যমে তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করেন। এভাবে সেই সহায়সম্বলহীন মোহাজেররা আনসারদের সাথে মিলিত হয়ে এক দুর্জয় শক্তিতে পরিণত হন এবং এই শক্তি ক্রমশ দৃঢ়তর হতে থাকে। অন্য কথায় বলা যায়, মানবীয় শক্তিতে অগ্রাধিকার দিয়ে তাকে প্রস্তুত করা হয়েছে।

আনুসঙ্গিকভাবে এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানানো খুবই জরুরী। সেটা হলো, মক্কার মত মদিনাও প্রতিরক্ষার দিক দিয়ে অত্যন্ত উপযোগী স্থান ছিল। উপরন্তু মদিনার ভৌগলিক অবস্থানও এত চমৎকার ছিল যে, তা সিরীয় ও ইরাকের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর একেবারেই সামনে অবস্থিত ছিল। আরবের শ্রেষ্ঠতম বাণিজ্যিক সড়কের পাশেই এবং সমুদ্র থেকে মাত্র ৭০/৭৫ মাইল দূরে অবস্থিত ছিল। এ শহর প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষার এক মজবুত দুর্গ স্বরূপ ছিল। একটুখানি সচেতনতা, অধিবাসীদের সংঘবদ্ধতা ও প্রতিরক্ষার যুতসই কৌশল তাকে আরো শক্তিশালী বানাতে পারতো। মদিনা শহরটা প্রায় দশ মাইল লম্বা ও দশ মাইল চওড়া ময়দানে বিস্তৃত ছিল এবং খানিক দূরে দূরে বিভিন্ন গোত্রের ছোট ছোট বস্তি ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। এ এলাকাকে ‘মদিনার উদর’ এবং ‘হারাম’ বা নিষিদ্ধ এলাকা বলা হতো। এই অসমান মাঠের মাঝখানে ‘সালা’ নামক পাহাড় এবং আরো কয়েকটা ছোট ছোট পাহাড় রয়েছে। ঈর ও সূর পর্বত দ্বয় একে ঘিরে রেখেছে। গোত্রীয় বস্তিগুলোতে আজাম ও আতাম নামক মজবুত প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যুহ রয়েছে। এ ধরণের ব্যুহ এক সময় একশো পর্যন্ত ছিল।

মদিনার যে অংশটি ‘মদিনাতুন্নবী’ নামে পরিচিত ছিল, তা অবস্থিত ছিল মদিনার মধ্যখানে। এই অংশে মসজিদে নববী, নবী পরিবারের বাসস্থান এবং রাজধানী অবস্থিত। এর দক্ষিণে ছিল নিবীড় বাগান, দক্ষিণ-পূর্ব দিকে কোবা পল্লী ও আওয়ালী পল্লী ও তৎসহ বাগবাগিচা। পূর্ব দিকে কোবা থেকে ওহুদ পর্যন্ত পূর্ব পশ্চিমে বিস্তৃত ছিল ইহুদী মহল্লাগুলো। দক্ষিণ পশ্চিম দিকেও বহু সংখ্যক জনবসতি ও বাগবাগিচা ছিল। মদিনার প্রাচীন প্রাচীরের বাবুশ্শামী নামক দরজার কাছেই অবস্থান করতো বনু সায়েদা গোত্র (যাদের চাদঘেরা চত্তরে প্রথম খলিফার নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছিল।) তারও সামনে ‘সালা’ পাহাড়ের ওপর বাস করতো বনু হারাম গোত্র। উত্তর পশ্চিমে ‘ওয়াদী আল-আকীকে’র কিনারে বীরে রোমা পর্যন্ত বহু সংখ্যক বাগান ছিল, দক্ষিণে উঁচু উঁচু পাহাড় ছিল এবং বহু উচ্চ ভূমি ও সমতল ভূমির মধ্য দিয়ে দুর্গম পথ চলে গিয়েছিল। মদিনার পূর্বে ও দক্ষিণে পাথুরে মাঠ ছিল। সে মাঠ না ছিল সামরিক শিবির স্থাপনের উপযোগী, আর না ছিল রণাঙ্গন হবার যোগ্য। কেবল উত্তর দিকে দিয়ে শহরের রাস্তা সামরিক দিক দিয়ে উন্মুক্ত ছিল। তাই বদর ও ওহুদের যুদ্ধ করার জন্য কোরায়েশরা ঐ দিকটাই পছন্দ করলো। কিন্তু মক্কার সৈন্যদের উত্তর দিক দিয়ে যেয়ে হামলা করা সামরিক দিক দিয়ে জটিল ব্যাপার ছিল এবং মদিনার জন্য ছিল উপকারী।

কিন্তু মদিনার অবস্থান ও তার পরিবেশগত উপযোগিতা কাজে লাগাতে হলে তার সমগ্র জনশক্তিকে একটা শৃংখলার মধ্যে আনা অপরিহার্য ছিল। এ উদ্দেশ্যে রসূল সা. এর দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃতিত্ব ছিল এই যে, চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে ইহুদী, আওস, খাজরাজ ও অন্যান্য গোত্রকে তাদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ভেদাভেদ সত্ত্বেও একটা শৃংখলার আওতায় এনে ফেললেন। একেবারেই অজানা ও অচেনা পরিবেশে গিয়ে পরস্পর বিরোধী মানুষদের কয়েক মাসের মধ্যে একই রাজনৈতিক এককে তথা রাষ্ট্রের নাগরিকে পরিণত করে ফেলা তাঁর রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও দক্ষতার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। তাঁর কুশলতার আরো বড় সাক্ষর এই যে, এই রাজনৈতিক এককের বা রাষ্ট্রের লিখিত সংবিধানে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বিচার, আইন রচনা, যুদ্ধ পরিচালনা ও সমালোচনার যাবতীয় ক্ষমতা রসূল সা. এর হাতে অর্পণ করা হয়েছিল এবং আল্লাহর সার্বভৌমত্বের মৌল চেতনা তাতে প্রতিফলিত হয়েছিল। এই রাজনৈতিক দলীলে অংশ গ্রহণকারী সকলকে এই মর্মে অংগীকার করানো হয় যে, আরব গোত্র সমূহের সাথে যে সব মোশরেক ও ইহুদী যোগদান করবে, তারা মুসলমানদের অনুসারী এবং যুদ্ধের সময় তাদের সহযোগী হবে। তারা মক্কার কোরায়েশদের জীবন ও ধনসম্পদের রক্ষকও হবেনা, এবং মুসলমানরা যখন কোরায়েশদের ওপর আক্রমণ চালাবে, তখন মুসলমানদেরকে বাধাও দেবেনা। এতে এ কথাও স্বীকার করিয়ে নেয়া হয় যে, যুদ্ধ ও সন্ধির ব্যাপারটা হবে সামষ্টিক। যে কোন যুদ্ধ সবার জন্য যুদ্ধ হবে, এবং সামরিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়া সবার জন্য অপরিহার্য ও বাধ্যতামূলক। তবে প্রত্যেক মিত্র নিজ নিজ অংশের যুদ্ধের ব্যয় নিজেই নির্বাহ করবে। ইহুদীদের সাথে এ বিষয়টা দ্ব্যর্থহীনভাবে স্থির হলো যে, মুসলমানরা যাদের সাথে আপোষ ও সন্ধি করবে, ইহুদীরাও তাদের সাথে আপোষ ও সন্ধি করবে। মদিনার রক্ষনাবেক্ষণে তারা সমানভাবে অংশ গ্রহণ করবে। মুসলমানদের ওপর কেউ আক্রমণ চালালে ইহুদীরা মুসলমানদের সাহায্য করবে। এর জবাবে ইহুদীদের ওপর কেউ যদি আক্রমণ চালায়, তাহরে মুসলমানরা তাদেরকে সাহায্য করবে। (আহদে নববী মেঁ নিযামে হুকুমরানীঃ ড. হামীদুল্লাহ সিদ্দীকী)

মদিনার সাংবিধানিক দলীলের এতদসংক্রান্ত ধারাগুলো থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রসূল সা. কোরায়েশদের পক্ষ থেকে সামরিক আগ্রাসনের সুস্পষ্ট আশংকা অনুভব করছিলেন এবং তার মোকাবিলা করার জন্য রাজনৈতিকভাবে যথাযথ আগাম প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করছিলেন।

মদিনাকে হারাম তথা নিরাপদ শহর বা City of peace ঘোষণা করা ছিল একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এ সিদ্ধান্তটাও ঐ সাংবিধানিক দলীলে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। ধর্মীয় দিক দিয়ে এর তাৎপর্য ছিল এই যে, সমগ্র পরিবেশটা পবিত্র এবং এই পরিবেশকে সম্মান দেখানে তার অধিবাসীদের অপরিহার্য কর্তব্য। এর রাজনৈতিক তাৎপর্য এই ছিল যে, কোরায়েশরা যেমন একটা নিরাপদ শহরে সংরক্ষিত ছিল, তেমনি রসূল সা. মদিনা রাষ্ট্রের নাগরিকদেরকেও একটা নিরাপদ বাসস্থান দিলেন। তাই এ দিক দিয়ে মক্কা ও মদিনার অবস্থা ছিল সমান সমান। এতে মক্কাবাসীদের বিরুদ্ধে এই মর্মে প্রচ্ছন্ন চ্যালেঞ্জ দেয়া হয়েছিল যে, তোমরা যদি মদিনার পবিত্রতা লংঘন করে তার অধিবাসীদের ওপর বাড়াবাড়ি কর, তাহলে তোমরাও মক্কার নিরাপত্তা ও পবিত্রতার বেষ্টনীর মধ্যে অক্ষত থাকতে পারবে না।

মদিনার নিরাপত্তা বেষ্টনী ইসলামী সরকারের সদর দফতর বা রাজধানীর সীমানাও চিহ্নিত করে দিয়েছিল। ঐ সীমানাকে স্থায়ীভাবে নির্ধারণ করার কাজে রসূল সা. বিশেষভাবে মনোযোগ দেন। তিনি হযরত কা’ব ইবনে মালেককে আদেশ দেন, মদিনার চতুসীমায় উঁচু উঁচু মিনার নির্মাণ করাও। এই আদেশ অনুসারে তিনি যাতুল জায়েশের (যা নাকি বায়দার মাঝখানে অবস্থিত হুফায়রা পাহাড়ের সাথে অবস্থিত। এটা মক্কা মদিনার রাস্তায় বিদ্যমান) এর টিলার ওপর, হুশাইরিব (যাতুল জায়েশের সাথে যুক্ত) আর মাখীযের পাহাড়ের ওপর (সিরিয়ার পথে) হুফাইয়াতে (মদিনার উত্তর দিকের জংগলে) এবং যুল উশাইর নামক স্থানে (হুফাইয়ার কিনারে অবস্থিত) আর তীম পাহাড়ে (মদিনার পূর্ব দিকে) জায়গায় জায়গায় প্রতীকী স্তম্ভ নির্মাণ করেন, যার ধ্বংসাবশেষ এখনো বিদ্যমান। এই চিহ্নিত বেষ্টনী প্রায় এক মনযিল লম্বা ও এক মনযিল চওড়া। (আহদে নববীকে ময়দানহায়ে জং- ড. হামীদুল্লাহ সিদ্দীকী, পৃঃ ১১-১২)

মদিনার অভ্যন্তরীণ শৃংখলা বহাল করার পর রসূল সা. অবিলম্বে পার্শ্ববর্তী গোত্রগুলোর দিকে মনোযোগ দিলেন। মদিনার দক্ষিণ পশ্চিম এলাকা এবং লোহিত সাগরের তীরবর্তী অঞ্চলে তিনি একাধিকবার সফর করেন। সর্বপ্রথম তিনি ভ্রমণ করেন দুয়ান নামক স্থানে। এটা মক্কার পথে আবওয়া থেকে সাত মাইল দূরে অবস্থিত। সেখানে তিনি বনী হামযার সাথে মৈত্রী স্থাপন করেন। অনুরূপভাবে ইয়ামবুর আশপাশে বসবাসকারী গোত্রগুলোর সাথেও দ্রুত চুক্তি সম্পাদন করেন। এই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক এলাকায় তিনি প্রথম হিজরীতে জুহায়না গোত্রের সাথে, দ্বিতীয় হিজরীর শুরুর দিকে বনু যামরা, বনু যুরয়া, বনু রাবয়া এবং দ্বিতীয় হিজরীর শেষের দিকে বনু মাদলাজের সহযোগিতাও পেয়ে গেলেন। কোন কোন গোত্রের সাথে তো যৌথ প্রতিরক্ষার চুক্তিও সম্পাদিত হলো যে, তারা আক্রান্ত হলেও মুসলমানরাও তাদেরকে এবং মুসলমানরা আক্রান্ত হলে তারাও মুসলমানদেরকে সাহায্য করবে। কোন কোন চুক্তিতে শুধু এতটুকু বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয় যে, রসূল সা. এর শত্রুদের সাথে বন্ধুত্ব রাখা চলবে না। কোন কোনটায় শুধু নিরপেক্ষতার স্বীকৃতি আদায় করা হয় যে, ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে যদি কোন শত্রুর লড়াই চলে, তবে চুক্তিবদ্ধ গোত্র নিরপেক্ষ থাকবে। এর অর্থ দাঁড়ালো এই যে, রসূল সা. এর রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় যথেষ্ট নমনীয়তা ছিল। (আহদে নববীকে ময়দান হায়ে জং)

এই মৈত্রীর পরিবেশ এই সব গোত্রের ভেতরে ইসলামের প্রসারের পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল, এবং এর কারণে এসব গোত্রে যে ইসলামী আন্দোলনের প্রচুর সমর্থক ও কর্মী গড়ে উঠেছিল, তা আর ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না।

পরবর্তীকালে রসূল সা. এর রাজনীতির এই কৌশল একটা স্বতন্ত্র নীতিতে পরিণত হয় এবং তিনি এ উদ্দেশ্যে প্রত্যেক এলাকায় সফর করেন। সামরিক অভিযানের জন্যই হোক কিংবা টহলের উদ্দেশ্যেই হোক, যখনই তিনি মদিনা থেকে বেরুতেন, মৈত্রীর সম্পর্ক সম্প্রসারণ সব সময়ই তার উদ্দেশ্যের অন্তর্ভুক্ত থাকতো। এখানে আমি বিশদ বিবরণ দিচ্ছি না। এর সুযোগ পরবর্তীতে আসবে। তবে সংক্ষেপে এতটুকু বলবো যে, শত্রুকে দুর্বল করা, ইসলামী আন্দোলনকে সামনে এগিয়ে নেয়া, নিজস্ব প্রতিরক্ষা নীতিকে সবল করা এবং রাষ্ট্র সীমা সম্প্রসারণের একটা অত্যন্ত প্রাভাবশালী পন্থা ছিল এই মৈত্রী সম্পর্ক স্থাপন।

এই সব কৌশলের পাশাপাশি ইসলামী বিপ্লবের আহ্বায়ক রসূল সা. ও তাঁর সাথীরা এই বাস্তবতাকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, একটা ঝ্ঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সাগরের মাঝখানে কোন রকমে মাথা গুজে থাকার জন্য যে ক্ষুদ্র দ্বীপটা তারা পেয়েছিন, তার অস্তিত্ব সর্বদাই হুমকির সম্মুখীন। তাই হয় ঝড়ের গতি উল্টে দিয়ে সমুদ্রকে বসে আনতে হবে, নচেত এই দ্বীপও একটা বুদবুদের মত চিরতরে সমুদ্রে হারিয়ে যাবে। তাঁরা অত্যন্ত ক্ষীপ্রতার সাথে নিজেদেরকে একটা সামরিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে নিলেন। তারা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ইসলামী আন্দোলনের নিত্য নতুন দাবীগুলোকে এত নিখুঁতভাবে উপলব্ধি করতেন যে, নতুন ধাপগুলোতে যাওয়ার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে নিজেদের মধ্যে যোগ্যতার সৃষ্টি করে নিতেন। মদিনায় যখন জেহাদের ডাক এল, তখন তারা এক সেকেন্ডের জন্যও নিজেদের সাবেক অবস্থা থেকে নতুন ভূমিকায় স্থানান্তরিত হতে দ্বিধা সংকোচ বোধ করেননি। তাদের মধ্যকার কেউ কখনো এ কথা ভাবেনি যে, আমরা তো দাওয়াতদানকারী ও বক্তা, যুদ্ধবিগ্রহের সাথে আমাদের কিসের সম্পর্ক? ওটাতো দুনিয়াবী রাজনীতিবিদ ও রাজ্যজয়ীদের কারবার। আমাদের ন্যায় সংস্কারকদের এসব শোভা পায় নাকি? রাজনীতি ও শাসন, কিংবা যুদ্ধবিগ্রহ তো ধর্মপ্রাচারকদের কাজ হতে পারে না!

প্রচারকদের কাজ তো পড়ে থেকে মার খেতে থাকা এবং সর্বোচ্চ পরিমাণ ধৈর্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। মদিনার ইসলামী দল যদি এ রকম চিন্তা করতো, তাহলে ইসলামী আন্দোলন ওখানেই খতম হয়ে যেত। তাকে খতম করার জন্য বাইরের কোন শক্তির প্রয়োজন হতোনা।

এই মুষ্টিমেয় সংখ্যক সাহাবী নিজেদের দ্বীন প্রচারেও দক্ষ ছিলেন, আবার এই দ্বীনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায়ও সর্বোত্তম আত্মনিবেদিত সিপাহী ছিলেন। তাঁরা নিজেদেরকে সুসংগঠিত সৈনিকে রূপান্তরিত করার জন্য তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যে মদিনা একটা নিরপদ শহর, একটা বিদ্যালয় এবং ইসলামী সভ্যতা চর্চার কেন্দ্রভূমি ছিল, সেই মদিনা একটা মজবুত সামরিক ঘাঁটিতে ও পরিণত হলো।

আল্লাহর পক্ষ থেকে রসূল সা. এর ওপর একজন সেনাপতির দায়িত্ব এসে পড়লো। এ দায়িত্ব তিনি এত সুষ্ঠুভাবে পালন করেন যে, কেবল এই বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করলেই অসংখ্য বড় বড় বই লেখা হয়ে যাবে।

টহল দানের ব্যবস্থা ও তার উদ্দেশ্য

মদিনা রাষ্ট্রের মহান রাষ্ট্রপ্রধান হিজরতের মাত্র চার ছ’মাস পরই আশপাশের এলাকায় টহল দানের জন্য সেনাদল পাঠানো শুরু করেন। বদর যুদ্ধের পূর্বে নিম্নোক্ত সেনাদলগুলো পাঠানো হয়ঃ

১. সেনাপতি হামযা ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের নেতৃত্বে ৩০ জন সৈনিকের একটা দল সাইফুল বাহর নামক স্থান অভিমুখে পাঠানো হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা। আবু জাহল তিনশো লোক নিয়ে মদিনা থেকে বেরিয়েছিল। কিন্তু মুসলমানদের চৌকিরত দেখে ফিরে গেল। (এ ছিল রমযান, হিজরী-১)

২. আবু উবাইদা বিন হারিসের নেতৃত্বে ৬০ সদস্যের সেনাদল মক্কাবাসীর সামরিক অবস্থা জানার জন্য পাঠানো হয়। শত্রুর ২০০ লোককে ইকরামা অথবা আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে ছানিয়াতুল মাররা নামক জায়গায় পাওয়া যায়। এই সেনাদল টহল দিয়ে নিরাপদে ফিরে আসে। (এটা ছিল শাওয়াল, হিজরী-১)

৩. সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাসের নেতৃত্বের ৮০ সদস্যের একটা সেনাদল টহল দানের জন্য জাহফা পর্যন্ত পাঠানো হয়। তারা কোন আক্রমণ ছাড়াই ফিরে আসে। (জিলকদ, হিজরী-১)

৪. রসূল সা. স্বয়ং ৭০ ব্যক্তিকে নিয়ে আবওয়া অঞ্চলে গমন করেন। কোরায়েশদের বাণিজ্য পথ আবওয়ার ভেতর দিয়েই যায়। রসূল সা. আমর বিন ফাহ্শী যামরীর সাথে চুক্তি সম্পাদন করে কোন সংঘর্ষ ছাড়াই ফিরে আসেন। (সফর, হিজরী-২)

৫. রসূল সা. স্বয়ং ২০০ সৈনিককে নিয়ে বুয়াতের দিকে (ইয়াম্বুর নিকট রাজভী পাহাড়ের এলাকা) যান। পথিমধ্যে উমাইয়া বিন খালফের নেতৃত্বে একশো ব্যক্তির এক কোরায়েশী কাফেলার সাক্ষাত পান। তবে কোন চ্যালেঞ্জ করা হয়নি। (এটা ছিল রবিউল আওয়াল, হিজরী-২)

৬. কিরয বিন জাবের আল ফেহরী মদিনার পশু ডাকাতি করে নিয়ে গেলে রসূল সা. ৭০ জন সৈন্য নিয়ে ধাওয়া করেন। কিরয প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যায়। তবে এই ধাওয়া করা থেকে প্রমাণিত হয় যে, মদিনা এক সদাজাগ্রত ও সদা তৎপর শক্তি। (রবিউল আউয়াল, হিজরী-২)

৭. রসূল সা. ১৫০ ব্যক্তির এক বাহিনী নিয়ে যুল উশাইর (মক্কা ও মদিনার মাঝখানে ইয়াম্বুর নিকট) চলে যান এবং সেখানে বনু মাদলাজ ও বনু যামরার সাথে চুক্তি সম্পাদন করেন। (জমাদিউস সানী, হিজরী-২)।

৮. আব্দুল্লাহ বিন জাহসের নেতৃত্বে ১২৫ ব্যক্তির এক সেনাদল নাখলার দিকে টহল দিতে পাঠানো হয়। এই বাহিনী কোরায়েশের এক বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। (রজব, হিজরী-২)

এই সমস্ত সেনা অভিযান সংঘর্ষের উদ্দেশ্যে পাঠানো হতোনা। বরং নাখলায় তাৎক্ষণিক পরিস্থিতির প্রভাবে মদিনার স্থিরীকৃত নীতির বিরুদ্ধে যে সংঘর্ষ ঘটে, তাতে রসূল সা. অসন্তোষ প্রকাশ করেন, বন্দীদেরকে মুক্তি দেন এবং নিহত ব্যক্তির জন্য রক্তপণ দেন। এ সব অভিযানের আরো বড় বড় কিছু উদ্দেশ্য ছিল। যেমনঃ

মদিনা রাষ্ট্রের সীমান্ত প্রহরা, শত্রুর গতিবিধি তদারক করা, কোরায়েশ ও অন্যান্য গোত্রকে জানিয়ে দেয়া যে, মদিনায় এখন যথারীতি সরকার প্রতিষ্ঠিত এবং মদিনাই তার রাজধানী। মুসলিম বিপ্লবী দলের স্বেচ্ছাসেবকগণের আশপাশের এলাকা, জনপদ সমূহ ও তার ভেতরকার অবস্থা, রাস্তাঘাট ও জলাশয় সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়া। সেনাপতিত্ব করা, সেনাপতি থাকা অবস্থায় দায়িত্ব পালন করা, পারস্পরিক দায়িত্ব বণ্টন, সময় ভাগ করা, কৌশল উদ্ভাবন করা। দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ইত্যাদির প্রশিক্ষণ। কেননা এ ছাড়া কোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চলতে পারেনা। তাছাড়া কোরায়েশদের এটা জানিয়ে দেয়াও উদ্দেশ্য ছিল যে, এখন তাদের অর্থনীতি মদিনার নিয়ন্ত্রণে এসে গেছে। মুসলমানরা যখন ইচ্ছা, তাদের বাণিজ্যিক পথ অবরোধ করে তাদের কাফেলার চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে। উল্লেখ্য, রসূল সা. বাল্যকালে বসরা ও মদিনায় এবং যৌবনে পুনরায় সিরিয়া সফর করেছিলেন। এই সময় তিনি মদিনার ভৌগলিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব বুঝে নিয়েছিলেন এবং কোরায়েশদের বাণিজ্যিক পথ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হয়েছিলেন। এই পূর্বার্জিত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ভীতি প্রদর্শন ও চাপ দেয়ার নীতি উদ্ভাবনে তিনি কোন জটিলতার সম্মুখীন হননি। অপরদিকে রসূল সা. কোরায়েশদের একজন হওয়ায়, বিশেষত ব্যবসায়ী হওয়ায় কোরায়েশদের উপার্জনের সবচেয়ে বড় উপায় তাঁর জানা ছিল। তায়েফ, ইয়ামান ও নাজরানের বাণিজ্যের কথা বাদ দিলেও কেবল সিরিয়া ও ইরাকের ব্যবসায় থেকে কোরায়েশদের প্রতি বছর আড়াই লাখ আশরাফী উপার্জিত হতো। (তাফহীমুল কুরআন)

এই সেনাদলগুলোকে যে প্রশিক্ষণমূলক পরিকল্পনার অধীনে পাঠানো হতো, তাতে সৈনিকদের যুদ্ধ পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেয়ার চেষ্টা করা হতো, যাতে তারা একটা কেন্দ্রীয় কমান্ডের অধীনে যন্ত্রের মত সচল ও সক্রিয় হতে পারে, তাদের কাতারবন্দীর ট্রেনিং হয়, পতাকা ও সামরিক প্রতীক সমূহের ব্যবহার শেখে, কঠিন পরিস্থিতিতেও নামায রোযা ও শরীয়তের অন্যান্য বিধান মেনে চলার যোগ্যতা সৃষ্টি হয়। এই সাথে তিনি খবর সংগ্রহের এক জোরদার ব্যবস্থারও প্রচলন করেন। এর কারণে তিনি মক্কা ও আশেপাশের গোত্রগুলো ও সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতির খোঁজখবর রাখতে পারতেন। এই সাথে তিনি রাজধানী ও সরকারের কেন্দ্রীয় দফতরের হেফাজত ও প্রহরার ব্যবস্থাও করেন।

এই ছিল দো’তরফা পরিস্থিতি, যার কারণে কোরায়েশরা বদরের যুদ্ধ সংঘটিত করার সিদ্ধান্ত নেয়।

দুটো বাস্তব কারণ

একটা যুদ্ধের জন্য পরিস্থিতি যে পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল, তাতে সন্দেহের কোনই অবকাশ নেই। কিরয বিন জাবের ফেহরীর ডাকাতি মদিনার জন্যে নিঃসন্দেহে একটা যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ ছিল। কেননা কোন জ্যান্ত জাগ্রত সরকার নিজ সীমানার অভ্যন্তরে বহিরাগতদের এমন অপরাধজনক অনুপ্রবেশকে আক্রমণ ছাড়া অন্য কোন অর্থে গ্রহণ করতে পারেনা। ওপর দিকে নাখলার ঘটনা ঘটে গেল। ঐ ঘটনা যদিও সীমান্ত সংঘর্ষের মতই ছিল, যা সরকার ও সেনাপতিদের অনুমতি ছাড়াই দু’দেশের সৈনিকদের মধ্যে সংঘটিত হয়ে থাকে। কিন্তু এ ঘটনার জন্য মক্কাবাসী অপপ্রচার চালানোর সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে গেল। তারা ব্যাপক হৈ চৈ করলো যে, দেখলে তো, নতুন ধর্মের ধ্বজাধারীরা নিষিদ্ধ মাসের পবিত্রতাও পদদলিত করে ফেললো! এদিকে রসূল সা. ঐ ঘটনায় আটক বন্দীদের ছেড়ে দিলেন, নিহত ব্যক্তির রক্তপণ পরিশোধ করলেন এবং নিজেকে ইসলামী রাষ্ট্রের সরকার প্রধান হিসেবে ঐ ঘটনার দায়দায়িত্ব থেকে মুক্ত করলেন। কিন্তু সাথে সাথে কুরআন মক্কাবাসীর প্রচারণাকে এই বলে খণ্ডন করলো যে, নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ বিগ্রহ ভালো নয় ঠিকই, কিন্তু তোমরা যে মানুষকে আল্লাহর দ্বীন গ্রহণে বাধা দিয়ে চলেছ, তাদেরকে হারাম শরীফ থেকে বের করে দিয়েছ, এবং মানবতার সংস্কার কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছ, সেটা যুদ্ধ ও হত্যাকাণ্ডের চেয়েও খারাপ কাজ। তোমাদের এই অপকর্মের মূলোৎপাটনের জন্য যদি মুসলমানরা অস্ত্র ধারণ করে, তবে সেটা হবে তাদের একটা কল্যাণমূলক কাজ। নাখলার ঘটনার একটা ভালো দিক ছিল এইযে, কোরায়েশরা সম্বিত ফিরে পেয়েছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল, যাদেরকে তারা সর্বহারা করে তাড়িয়ে দিয়েছিল, এবং যাদেরকে তারা ভাবতো বিড়ালের মুখের সহজ গ্রাস, তারা ঢিলটির জবাব পাটকেলটি দিয়ে দিতে সক্ষম। তবুও মক্কার প্রচারবিদরা ক্রোধের আগুন জ্বালাতে নাখলার ঘটনার থেকে জ্বালানী সংগ্রহ করলো।

কোরায়েশদের তিনটে প্রয়োজন

মদিনার উপর আক্রমণ চালাতে কোরায়েশদের সামনে তিনটে বড় বড় সমস্যা ছিল। এক, বনু কিনানার সহযোগিতা পাওয়া। দুই, যুদ্ধ করার জন্য লড়াকু যোদ্ধা সরবরাহ। তিন, যুদ্ধের ব্যয় নির্বাহ। প্রথম সমস্যাটার সমাধান কিভাবে হলো, তা ইতিপূর্বেই উল্লেখ করেছি। দ্বিতীয় সমস্যাটার সমাধান হলো এভাবে যে, আহাবশীদের সাথে কোরায়েশদের চুক্তি সম্পাদিত হলো। মক্কার কাছেই হুবশী নামক একটা পাহাড় রয়েছে। ঐ পাহাড়ের কাছে বসবাসকারী বনু নযীর, বনু মালেক ও মুতাইয়িরীন প্রমুখ গোত্র পরস্পরে মৈত্রী সম্পর্ক স্থাপন করে। তাদেরকে আহাবীশ নামে আখ্যায়িত করা হয়। মক্কার অধিবাসীদের তুলনায় আহাবীশদের যোদ্ধাসুলভ যোগ্যতা অনেক বেশি ছিল। তারা শুধু মৈত্রীর ভিত্তিতে নয়, বরং ভাড়াটে সৈনিক হিসেবেও কাজ করতো। অবশ্য তাড়াহুড়োর কারণে বদর যুদ্ধে তাদেরকে সাথে নেয়া সম্ভব হয়নি। বদরযুদ্ধের ফলাফল দেখে কোরায়েশ নেতাদের এই ভুলের জন্য অনুতপ্ত হতে হয়েছিল। ওদিকে (বারো শাখা বিশিষ্ট) ইহুদী গোত্র বনুল মুসতালিকের সাথে কোরায়েশদের সমঝোতা হয়ে গিয়েছিল। (রহমাতুল্লিল আলামীন)

তৃতীয় সমস্যার সমধান করা হলো এভাবে যে, কোরায়েশদের যে বাণিজ্যিক কাফেলা বাণিজ্যোপলক্ষে সিরিয়া যাচ্ছিল, তাকে মক্কাবাসী বিপুল পরিমাণ পুঁজি সরবরাহ করলো। এমনকি গৃহবধূরা পর্্যন্ত নিজ নিজ অলংকারাদি ও অন্যান্য সঞ্চয় এনে দিল। আবু সুফিয়ানের সাক্ষ্য এইযে, মক্কায় এমন কোন নারী বা পুরুষ ছিল না যে এই কাজে অংশ গ্রহণ করেনি। (সীরাতুন্নবী, শিবলী, ১ম খণ্ড, পৃ ২৯২) উদ্দেশ্য ছিল সর্বাধিক পুঁজি বিনিয়োগ করে সর্বোচ্চ পরিমাণ মুনাফা লাভ করা এবং এই উপার্জন দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে মদিনার ইসলামী রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে দেয়া।

 

About নঈম সিদ্দিকী