আধুনিক যুগে ইসলামী বিপ্লব

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

.দেশে দেশে জন আকাঙ্ক্ষাঃ ইসলামী বিপ্লব

আজকের বিশ্বে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, এমন একটা সময় আসছে যখন বিভিন্ন দেশ তার শিক্ষা, অর্থ, বিচার ব্যবস্থা এক কথায় জীবনের সব সমস্যার সমাধান একমাত্র ইসলামের মাধ্যমেই করতে চায়। আর এজন্যই একটি ইসলামীকরণ প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে দেশে দেশে। এর সবচাইতে বড় প্রমাণ হচ্ছে আধুনিক বিশ্বের ইসলামী আন্দোলনগুলো।

বর্তমান দুনিয়ায় সবচাইতে পরিচিত দু’টো আন্দোলনের নাম জামায়াতে ইসলামী এবং ইখওয়ানুল মুসলিমুন। এছাড়াও তুরস্কে মিল্লি সালামত পার্টি বা ন্যাশনাল সলভেশন পার্টি, ফজিলত পার্টি বর্তমানে জাস্টিস এন্ড ডেভেলপম্যান্ট পার্টি, মালয়েশিয়ায় ইসলামিক পার্টি অব মালয়েশিয়া, ইয়েমেনে আল ইসলাহ পার্টি, ওলামা ও মোহাম্মদীসহ কতিপয় ইসলামী দল এবং মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও আফ্রিকায় বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সংগঠনও ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠার লড়াই করে যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশে প্রায় ৩০ টি ছাত্র সংগঠন এবং ১২০ টির মত ছাত্র যুব সংগঠন এই প্রচেষ্টার সাথে সংশ্লিষ্ট। এশিয়া, আফ্রিকার সকল আরব দেশে ইখওয়ান বা অনুরূপ সংগঠন এবং উপমহাদেশের সকল দেশে জামায়াতে ইসলামীর তৎপরতা রয়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ইসলামী সেন্টার, মসজিদ ও ইসলাম চর্চা কেন্দ্র।

বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে ইসলামের জোয়ার কতটা প্রবাহিত হয়েছে বা কতটা গভীরভাবে বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে তা পর্যালোচনা সাপেক্ষ হলেও মুসলিম দেশগুলোতে ইসলামী আন্দোলন বা ইসলামী শক্তির উত্থানের আলামত স্পষ্ট। ব্যাপক আন্দোলন হিসেবে হোক, আংশিক দাবী-দাওয়ার ভিত্তিতে হোক, ইস্যুভিত্তিক বা আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের প্রশ্নে হোক মুসলিম দেশসমূহের সরকারগুলো আর আগের মত ইসলামের সাথে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করতে পারছে না। আমাদের জানা মতে আভ্যন্তরীণভাবে প্রতিটি মুসলিম দেশের এমন কি কতিপয় অমুসলিম দেশেও (যেখানে মুসলিম সংখ্যা উল্লেখযোগ্য) সরকারসমূহ ইসলামের অনুসারীদের পক্ষ থেকে এক ধরণের রাজনৈতিক চাপ অনুভব করছে। অবশ্য অনেক মুসলিম দেশ ইসলামী জাগরণে শংকিত এবং তারা প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। এটা অবশ্যই দুর্ভাগ্যজনক যে, অনেক মুসলিম দেশে রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার স্বীকৃত নয়। কোন কোন দেশে নির্যাতন ও নিপীড়েনের ফলে কিছু কিছু লোক বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আন্দোলন চললেও যেসব জায়গায় মুসলমানদের স্বাধীনতা ও আত্ননিয়ন্ত্রণের বিষয়টি জড়িয়ে গিয়েছে সেসব জায়গায় আন্দোলন জংগী রূপ নিয়েছে। যেমন ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, ফিলিপাইন প্রভৃতি স্থানে মুসলমানরা জংগী তৎপরতায় নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছে। এসবের সাথে সাধারণভাবে সমাজ পরিবর্তনের জন্য জামায়াতে ইসলামী ও ইখওয়ান যে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে তার তুলনা করা বা এক করে দেখার কোন সুযোগ নেই।

পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যম ইসলামের অনুসারীদের সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকাকে মৌলবাদী কর্মকাণ্ড বলে আখ্যায়িত করলেও লক্ষণীয় যে উল্লেখযোগ্য বেশ ক’টি রাষ্ট্রে ইসলাম প্রতিষ্ঠার ইতিবাচক আন্দোলন সাম্প্রতিককালে বেশ গতি লাভ করেছে এবং শক্তি সঞ্চার করেছে।

কুরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক খোলাফায়ে রাশেদার অনুকরণে একটি ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার অধীনে বসবাস করার আকাঙ্ক্ষা প্রতিটি দেশের মুসলিম জনতার প্রাণের আকাঙ্ক্ষা। বৃহত্তর মুসলিম জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে থাকে। দেশে দেশে ইসলামী বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা আজ জন আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের জনগণের দীর্ঘকালের আকাঙ্ক্ষা

বাংলাদেশ জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র। বিশ্বের মুসলিম জনসংখ্যার দশ ভাগের এক ভাগ ১৪৫ মিলিয়ন বাংলাদেশে বসবাস করে। বাংলা ভাষা বিশ্বের ৬ষ্ঠ বৃহৎ ভাষা। বাংলাদেশের শতকরা একশত ভাগ লোক একই ভাষায় কথা বলে। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতি চালু রয়েছে। বাংলাদেশের প্রকৃতিক সম্পদ আছে। উর্বর জমি ও পরিশ্রমী মানুষ আছে। দেশটি খাদ্য উৎপাদনে স্বনির্ভর, মাথাপিছু আয় বাড়ছে, গড় আয়ু বাড়ছে, শিক্ষার হার বাড়ছে, মা ও শিশুর মৃত্যু হার কমছে এবং সামগ্রিক বিবেচনায় দেশটি এগিয়ে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত আমাদের প্রিয় জন্মভূমি এই বদ্বীপ বাংলাদেশে ইসলামী শাসনের অধীনে বসবাসের আকাঙ্ক্ষা এখানকার জনগণের দীর্ঘকালের। এজন্যে তারা বার বার নেতাদের ডাকে সাড়া দিয়েছে। ত্রিশ ও চল্লিশের দশক থেকে এ যাবত প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তনে এই জন আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক যে, জনগণের মনের কোণে লালিত এ পবিত্র আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হয়নি আজও। তবে এ পথে দেশ যে খানিকটা এগিয়েছে এবং জনগণের এ আকাঙ্ক্ষা পূরণের সংগ্রাম অনেকটা সংঘবদ্ধ হতে যাচ্ছে একথা দ্বিধাহীন কণ্ঠে উচ্চারণ করা চলে।

কিন্তু ইসলামের ভিত্তিতে একটি ইসলামী বিপ্লব কি, বিপ্লব বা পরিবর্তনের যে প্রশ্নটি জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার মূল জিনিস সে বিপ্লবের অর্থ কি অথবা সে পরিবর্তন মানে কি তা আমাদের গভীরভাবে অনুধাবন করার সময় এসেছে।

. ইসলামী বিপ্লব কি?

ইসলামের সমর্থকদের দ্বারা একটি সরকার গঠিত হলেই ইসলামী বিপ্লব হয়ে যায় না। অতীতে এমন সরকার অনেক দেশে এসেছে কিন্তু ইসলাম সেখানে বাস্তবায়িত হয়নি। হাতে কুরআন আর মুখে ইসলামের শ্লোগান এমন কোন দলের সরকারও ইসলামী বিপ্লবের সরকার নাও হতে পারে। কেননা এমন সরকার অতীতেও জনগণ দেখেছে, আজও  দেখছে। ইসলামী পণ্ডিত বা আলেমদের দ্বারা গঠিত একটি সরকার ক্ষমতায় এলেই ইসলামী বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছে বলে মনে করারও কোন যুক্তিসংগত কারণ নেই।

ইসলাম একটি সামগ্রিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতির নাম। অর্থাৎ ইসলামী বিপ্লব একটি সামগ্রিক পরিবর্তন আনয়নকারী বিপ্লবেরই নাম। যে মানুষকে নিয়ে বা যে মানুষের কল্যাণের জন্য বিপ্লব সে মানুষের মধ্যে যদি বিপ্লব বা পরিবর্তন না আসে তাহলে ইসলামী বিপ্লব হতে পারে না। বিপ্লব বলতে অনেকে হঠাৎ বা আকস্মিক পরিবর্তনকে বুঝেন। আকস্মিক পরিবর্তন, বিদ্রোহ, গৃহযুদ্ধ, নৈরাজ্য, সংস্কার, সরকার যন্ত্রের পরিবর্তন বা শাসনতন্ত্রের পরিবর্তন এসবের কোনটাই ইসলামে বিপ্লব বলে চিহ্নিত বা আখ্যায়িত করা হয়নি। ইসলামে বিপ্লবের ধারণাটাই এসব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্ব সর্বাবস্থায় আল্লাহর এবং বান্দা সর্বাবস্থায় দায়িত্বশীল বা দায়িত্বপ্রাপ্ত। মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি বা খলিফা হিসেবে আল্লাহর দেয়া সুযোগ ও ক্ষমতার সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার করবে এবং আল্লাহর দাস হিসেবে তার নিজ দায়িত্ব পালন করবে মাত্র।

রসূল সা. যে মডেল স্থাপন করেছেন ইসলামী বিপ্লবের মডেল সেটাই। ইসলামী বিপ্লব তো বিপ্লব এ অর্থে যে, এ বিপ্লব মানুষের কাঠামোতে নয় বরং মন-মানসিকতা, চিন্তা-চেতনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, রুচি-দৃষ্টিভংগী, পছন্দ-অপছন্দ অর্থাৎ জীবনের সকল ক্ষেত্রের পরিবর্তন এনে দেয়।

ইসলামী বিপ্লবের অর্থ ইনসাফ,শান্তি, নিরাপত্তা এবং সাম্য প্রতিষ্ঠা করা। অন্য অর্থে আল্লাহার রাজত্ব কায়েম করা। ইসলামের মতে আল্লাহর দুনিয়ায় আল্লাহর রাজ কায়েম হওয়ার এ বিপ্লব এমনিতেই আসে না। অর্থাৎ ইতিহাস এবং বিপ্লব কখনো নিজে নিজেই আসে না।

আকস্মিকতা এবং শক্তি প্রয়োগকে অনেকে বিপ্লবের বৈশিষ্ট্য মনে করে। কিন্তু ইসলামের বিপ্লবের তেমন কোন ধারণা নেই।

ইসলামী বিপ্লবের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে এবং এ বিপ্লব বর্তমান ও ভবিষ্যতের সমন্বিত এক প্রগতিশীল প্রক্রিয়ার নাম। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ নিজেই বলেছেনঃ

إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ

‘‘আল্লাহ সেই জাতির অবস্থার পরিবর্তন করেন না যারা নিজেরা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করে না।’’ – (সূরা আর রা’দঃ ১১)

ব্যক্তিগতভাবে এবং সমষ্টিগতভাবে একটি জনগোষ্ঠী যদি নিজেদের অবস্থার পরিবর্তনে বদ্ধপরিকর হয় তাহলে কেবল মাত্র আল্লাহ সেই জনগোষ্ঠীর অবস্থার পরিবর্তন করেন। আসলে মানুষই হচ্ছে ইতিহাসের নির্মাতা এবং পরিবর্তনকারী। জনগনের মানসিক অবস্থা পরিবর্তনের উপরই নির্ভর করে জনগনের ভাগ্যের পরিবর্তন।

সুতরাং ইসলামী বিপ্লব হচ্ছে একটি ব্যাপক, বাস্তব ভিত্তিক, নিরবচ্ছিন্ন, গতিশীল, গভীর বিপ্লব। সেই সাথে এ বিপ্লব হবে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, শোষণ-নিপীড়ন ও আধিপত্যবাদবিরোধী, একনায়কত্ব ও স্বৈরাচার বিরোধী। এ হবে এমন এক সার্বজনীন বিপ্লব যাতে থাকবে আধ্যাত্মিকতা, ইসলামের সঠিক মেজাজ ও প্রকৃতির প্রতিফলন। বিপ্লবের নেতৃত্ব, আবেদন, পথ এবং পন্থা হবে সম্পূর্ণরূপে ইসলামী এবং আল্লাহর রংয়ের পরিপূর্ণ সৌন্দর্যের বিকাশ ঘটবে এ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে।

ইসলামের জন্য সংগ্রাম, প্রচেষ্টা, প্রয়াস, সাধনা, খেদমত সবকিছুই ইসলামী আন্দোলন বলে বিবেচিত হলেও বিপ্লব হচ্ছে একটি সামগ্রিক এবং ব্যাপক পরিবর্তনের নাম।

সত্যিকার ইসলামী বিপ্লব তাই যা আদর্শিক, রাজনৈতিক এবং কর্মসূচীগত-ভাবে পূর্ণতা লাভ করে। ইসলাম বাস্তবায়নের অর্থই হলো জনগনের সার্বিক জীবনযাত্রার পরিবর্তন আনয়ন। ইসলামী আন্দোলন যেমন শুধু মুসলমানদের জন্য নয় তেমনি ইসলামী বিপ্লবও হচ্ছে গোটা মানবতার বিপ্লব।

. ইসলামী বিপ্লবের প্রকৃতি বৈশিষ্ট্য

ইসলামী বিপ্লবের যে সংজ্ঞা নির্ণয়ের চেষ্টা উপরে করা হয়েছে সেটিই সত্যিকার অর্থে বিপ্লব। আর এ বিপ্লব অর্জনের পথ ও পন্থা কি হতে পারে এ বিষয়টি বিশেষভাবে আলোকপাত করার দাবী রাখে।

অলৌকিক বা আকস্মিকভাবে দুর্ঘটনার মত কি কোন বিপ্লব আসতে পারে? পৃথিবীর ইতিহাস একথাই প্রমাণ করে যে, কোন দেশে বা সমাজে তেমন একটি বিপ্লব হঠাৎ করে সম্পন্ন হতে পারে না। ইসলামের ইতিাহাসের বিপ্লবের আলোচনায় প্রথমে না গিয়েও দেখা যায় যে, ফরাসী বিপ্লব, রুশ বিপ্লব বা চীনের বিপ্লব হঠাৎ করে আসেনি। ওসব বিপ্লবের পটভূমিকা রচনার পিছনেও আছে বিশাল এবং দীর্ঘ ইতিহাস। সুতরাং প্রয়োজনীয় উপায় উপকরণের সংযোগ না হওয়া পর্যন্ত আকস্মিক কোন বিপ্লবের প্রত্যাশা অর্থহীন। সম্প্রতি ইরানে যে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে বাইরের জগতের কাছে এটাকে আকস্মিক ঘটনা বলে মনে হলেও ইরানী জনগনের কাছে যে এটি দীর্ঘ সংগ্রামের পথ ছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। এ বিপ্লবকে যারা সামান্যও জানার চেষ্টা করেছেন তাদের স্বীকার করতেই হবে যে, অনেক চড়াই-উৎরাই অতিক্রম করেই সম্পন্ন হয়েছে এ বিপ্লব। ইরানে যা হয়েছে ওভাবেই আরেকটি দেশে ঘটবে বিপ্লব এ ধারণা করার কোন কারণ নেই। বিষয়টির গভীরে না গিয়ে এমন আশাবাদ কেউ করতে পারেন। কিন্তু সেই আশাবাদ শেষ পর্যন্ত যে আশাবাদই থেকে যাবে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। প্রত্যেকটি দেশের আর্থসামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই নির্ধারণ করবে কোন দেশে কিভাবে বিপ্লব আসতে পারে।

বস্তুবাদীদের বা সমাজতান্ত্রিকদের ধারণায় যে বিপ্লব ইসলাম তাও অনুমোদন করে না। এদের মতে সমাজের পরিবর্তনের জন্য ব্যক্তি কোন কার্যকরী শক্তি নয়। প্রাকৃতিক আইন এবং নিয়ম দ্বারাই সমাজ বিকশিত হয়, পরিবর্তিত হয়। অবৈধ বা যে কোন পন্থায় ক্ষমতা দখলকে এরা বিপ্লব বলে।

আবার অনেকে মনে করেন, জননন্দিত কোন বীর পুরুষ বা ব্যক্তিত্ব হচ্ছে পরিবর্তন বা বিপ্লবের চালিকাশক্তি। এদের মতে আইন কাঠামো বা বিধিব্যবস্থা হচ্ছে শক্তিশালী বা ক্যারিসম্যাটিক ব্যক্তিত্বের হাতের যন্ত্র মাত্র। তারা যেভাবে চান পরিবর্তন ঠিক সেভাবেই আসে। সাধারণ মানুষের কোন অবদান বিপ্লবে নেই। তাদের কাছে মূল উপাদান হচ্ছে অসাধারণ ক্ষমতাবান ব্যক্তিত্ব। বলা হয়ে থাকে ‘বীরভোগ্যা বসুন্ধরা’। বীরের বীরত্ব মানুষকে অভিভূত করে। কিন্তু বীরপুরুষের উপস্থিতিই বিপ্লবের কারণ হতে পারে না।

অনেকে এটাও মনে করেন যে, আহলে রায় জনগোষ্ঠী বিপ্লবের প্রধান উপকরণ এবং তারাই সামাজিক পরিবর্তনের জন্য দায়ী। গণতন্ত্রের মতে সর্বোত্তম সরকার ব্যবস্থা তাই যাতে জনগণের অংশীদারিত্ব থাকে। প্রাচীনকাল থেকে অদ্যাবধি গণতন্ত্রও একথা বলে যে, সাধারণ জনতাই পরিবর্তন বা বিপ্লবের একমাত্র সিদ্ধান্তকারী শক্তি।

. বিপ্লব এনেছে জনতা

অলৌকিক কিংবা আকস্মিকভাবে ক্ষমতার পরিবর্তন হতে পারে। এটি অসম্ভব কিছু নয়। তবে তাকে বিপ্লব বলা যাবে না। সেটা ক্ষমতার হাত বদল মাত্র। মার্কসবাদ বা সমাজতন্ত্র ‘সর্বহারাদের বিপ্লবের’ যে ধারণা দেয় ইসলামের নিকট তাও গ্রহণযোগ্য নয়। শক্তিমান সিংহ পুরুষ ডাক দিবেন আর বিপ্লব সংঘটিত হয়ে যাবে ইসলামে এমন ধারণার অবকাশ নেই। আল্লাহর নবী রসূলদের চাইতে আর কেউ তো সিংহ পুরুষ বা শক্তিমান বা ক্যারিসম্যাটিক হতে পারেন না।

কিন্তু নবী রাসূলগণ কি ডাক দিয়েই বিপ্লব সম্পাদিত করেছিলেন? মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাইতে শক্তিমান পুরুষ বা আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব দুনিয়াতে আর কে হতে পারেন? মক্কাবাসীকে ডাক দেয়ার সাথে সাথেই কি বিপ্লব এসেছে? তাঁকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। সে পথ ছিল সংগ্রামের পথ। যে মানুষের জন্য বিপ্লব চাই সে মানুষের মধ্যে পরিবর্তন আনার জন্যে সংগ্রাম করেছেন তিনি। যে রাসূল সা. বিশ্বের ইতিহাসের সেরা বিপ্লবী সে রাসূলের ভূমিকা ছিল একজন বাণীবাহকের, পথ প্রদর্শকের বা সতর্ককারীর। রাসূল সা.-এর নেতৃত্বে বিপ্লব এনেছে সেই জনতা যে জনতার কল্যাণের জন্যই এসেছিলেন রাসূল সা.। ইসলামে নবীর দায়িত্ব হচ্ছে জনগণকে পথ প্রদর্শন ও সত্যের সন্ধান দেয়। সেই সাথে জনগণকে ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত ও সংগঠিত করা, সংঘবদ্ধ শক্তিতে পরিণত করা। সত্যকে জনগণ গ্রহণ করবে কি বর্জন করবে এটি তাদেরই সিদ্ধান্ত। সুতরাং দৈবাৎক্রমে কোন কিছু সংঘটিত হওয়ার প্রশ্নই আসে না। যা কিছু ঘটবে তা মানুষের সুনির্দিষ্ট চিন্তা-ভাবনা এবং কার্যক্রমেরই ফলশ্রুতি।

. জনতাই ইতিহাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করে

ইসলামের মতে সামাজিক পরিবের্তনের জন্য ব্যক্তিত্ব, অলৌকিকতা বা বিধি বিধান মৌলিক উপাদান নয়। পরিবর্তনের মৌলিক উপাদান হচ্ছে মানুষ এবং মানুষ। জনগণ বা মানুষই হচ্ছে ইসলামের দৃষ্টিতে সামাজিক পরিবর্তনের মৌলিক এবং কার্যকর উপাদান। সমাজ, জাতি, রাষ্ট্র তথা বিশ্বের সবকিছুর দায় দায়িত্বের বোঝা ইসলাম চাপিয়ে দিয়েছে মানুষের উপর। মানুষ বা জনগণ হচ্ছে সমাজের পরিবর্তন বা উত্থান পতন ও অগ্রগতির মূল উপাদান। জনগণের অর্থ হলো সমগ্র জনতা। এ জনতাই ইতিহাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করে। ইসলাম জনগণকেই বিপ্লবের মূল চাবিকাঠি বা প্রধান শক্তি মনে করে। ইসলাম সমগ্র মানব মণ্ডলীকে তার পরিণতির জন্য যেমন দায়ী করেছে তেমনি যে মানুষ নিয়ে সমাজ গঠিত সে ব্যক্তি মানুষকেও দায়ী করে এবং ব্যক্তি মানুষটিকেই জবাবদিহির সম্মুখীন হতে হবে।

যারা ইসলামী বিপ্লবের প্রত্যাশী এ বিষয়ে তাদের সুস্পষ্ট হতে হবে যে, প্রকৃতিগতভাবেই এ বিপ্লবের ভিত্তি হবে ইসলামী আদর্শ। সুতরাং ইসলামী বিপ্লবের বিশেষ পরিচিতি, বৈশিষ্ট্য অবশ্যই বস্তুবাদী বিপ্লব, মুক্তি বা স্বাধীনতার বিপ্লব থেকে সম্পূর্ণরূপে ভিন্নতর হতে বাধ্য। এর অর্থ অবশ্যই এটা নয় যে, ইসলামী বিপ্লব, স্বাধীনতা, মুক্তি বা জনসাধারণের কল্যাণের প্রশ্নে নীরব বা এসব বিষয় বিবেচনা করে না। পক্ষান্তরে এর সবকিছুই ইসলামী বিপ্লবে সমন্বিত বা সন্নিবেশিত। যেহেতু ইসলাম একটি সামগ্রিক এবং পরিপূর্ণ, বিশ্বজনীন বিপ্লবী আদর্শ তাই মানবতার মুক্তি, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, মানব কল্যাণ, সাম্য, ইনসাফ আরো তাৎপর্যপূর্ণ ও ব্যঞ্জনাময় অর্থই ইসলামী বিপ্লবের মধ্যে বর্তমান। ইসলাম যেহেতু কতিপয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় তাই ইসলামী বিপ্লব হচ্ছে সার্বজনীন এক বিশিষ্ট চিন্তাধারার জীবন প্রবাহ, বিশ্বদৃষ্টি, সামগ্রিক মানবতা এবং মানবীয় তৎপরতার প্রতিফলন।

. ইসলামী বিপ্লবের দুটো প্রধান বৈশিষ্ট্য

উপরের আলোচনা থেকে আমরা নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তে আসতে পারিঃ-

. ইসলামী বিপ্লবের প্রথম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে চিন্তা ও মনোজগতে বিপ্লব এবং পরিবর্তন আনয়ন।

. দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো এ বিপ্লব হবে জনগনের বিপ্লব এবং জনজীবনে আনবে বিপ্লব বা পরিবর্তন। অর্থাৎ ইসলামের মতে জনগণের মানসিক পরিবর্তন এবং জনগণের পরিবর্তনই ইসলামী বিপ্লবের মূল জিনিস।

সেই মূল উপাদানটি কি যা একটি সমাজকে অকস্মাৎ পরিবর্তন করে দেয়। সম্পূর্ণরূপে তার বৈশিষ্ট্য, লক্ষ্য এবং অবয়ব বা কাঠামো একেবারেই বদলে দেয়? ইতিহাসের এই চালিকাশক্তিটি কি? যে জনগণের মধ্যে বা যে জনগণের কল্যাণের জন্য বিপ্লব সাধন প্রয়োজন আসলে সেই জনগণই ইতিহাসের ঐ চালিকাশক্তি। জনগণকে সম্পৃক্ত না করে কোন বিপ্লব আসতে পারে না। নবী রাসূল আম্বিয়া কেরামগণের আ. আবির্ভাবের পর এমনিতেই কোন পরিবর্তন বা বিপ্লব আসেনি। জনগণ যতক্ষণ ঐ বিপ্লবে শামিল না হয়েছে ততক্ষণ পর্যন্ত ঐ সমাজে কোন বিপ্লব আসেনি।

. ইসলামী বিপ্লবের ভিত্তি

তৌহিদঃ ক্ষমতা, কর্তৃত্ব এবং সার্বভৌমত্ব আল্লাহর। মানুষের উপর মানুষের কোন ধরণের প্রভূত্ব ও আধিপত্য চলতে পারে না। মানুষ স্বাধীন একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোন শক্তির অধীন নয়। ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের সর্বময় অধিকারী আল্লাহ, মানুষ নয়।

রেসালাতঃ মুসলমানরা ব্যক্তিগতভাবে এবং সামষ্টিকভাবে আল্লাহর কাছে দায়িত্বশীল। দ্বীন ইসলাম একমাত্র অবতীর্ণ বিধান এবং নবীদের ওহী বা প্রত্যাদেশ দিয়ে পাঠানো হয়েছে এই দায়িত্ব দিয়ে। রিসালাতের মাধ্যমেই পরিপূর্ণ জীবন বিধান ইসলামের চিরন্তন বাণী সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করে পূর্ণতা বিধান করা হয়েছে।

ন্যায়বিচারঃ মুসলিম ব্যক্তি ও সমষ্টিকে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে এবং বিশ্বজগত, মানবতা, প্রকৃতি এবং এর সম্পদের প্রতি ন্যায় বিচারের সাথে আচরণ করতে হবে।

খিলাফতঃ মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি এবং সৃষ্টি জগতের সেরা। সকল মানুষকে আল্লহ সম অধিকার দিয়ে সৃষ্টি করেছেন অর্থাৎ মানুষ মাত্রই আল্লাহর নিকট সমান। আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে মানুষ দুনিয়ায় আল্লাহর আইনের শাসন কায়েম করবে। মুসলমানদের ইসলাম এ শিক্ষাই দেয় যে তারা মানবতাকে খেলাফতের দায়িত্বের পথে পরিচালিত করবে।

ইসলামী বিপ্লব তার নিজস্ব গতিধারায় চলবে। কোথাও এর ব্যর্থতা ইসলামের সামগ্রিক ব্যর্থতা বলে চিহ্নিত হতে পারে না। কেননা এটা হচ্ছে মুসলিমদের আদি কাল থেকে শুরু হওয়া সব আন্দোলন ও সংগ্রামের একটি সামগ্রিক অব্যাহত প্রক্রিয়া। বর্তমান শতাব্দীতেও সেই প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে এবং নতুন গতি লাভ করেছে। বর্তমান বিশ্বে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত এটি অব্যাহত থাকবে।

১০. বিপ্লব রপ্তানি করা যায় না

বিপ্লব রপ্তানির সমাজতান্ত্রিক বা পাশ্চাত্য কোন ধারণা ইসলাম সমর্থন করে না। বরং ইসলাম তার নিজস্ব শক্তিগুণেই কোন একটি জনপদে বিপ্লব করতে সক্ষম। কোথাও বিপ্লব রপ্তানির ধারণা মেনে নিলে প্রশ্ন আসে যে দেশ থেকে বিপ্লব রপ্তানি করা হবে সে দেশের বিপ্লবটি কোথা থেকে রপ্তানি করা হলো। সে বিপ্লব যদি রপ্তানি করা বিপ্লব না হয়ে থাকে এবং সেখানকার জনগণ যদি বিপ্লব সংঘটিত করে থাকেন তাহলে অন্য কোন দেশেও বিপ্লবের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অবলম্বন করে বিপ্লব আসতে পারে। ইসলামী বিপ্লব যেহেতু শোষণ ও নির্যাতন বিরোধী সেহেতু মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে গোটা জনশক্তির উপরই এ বিপ্লবের সুপ্রভাব পরিদৃষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। অর্থাৎ সার্বজনীনতার প্রতিশ্রুতি রয়েছে ইসলামী বিপ্লবে।

১১. ইসলামী বিপ্লব সার্বজনীন

ইসলাম যেহেতু পরিপূর্ণভাবে সুশোভিত এক আদর্শের নাম সেহেতু ইসলামী বিপ্লব কোন ধরণের বর্ণবাদ, গোষ্ঠীবাদ, গোত্রবাদ, জাতীয়তাবাদ, শ্রেণীসংঘাত, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, বস্তুবাদ কোন কিছুকেই স্থান দিতে পারে না বা প্রশ্রয় দিতে পারে না। এমনকি ইসলামী বিপ্লব ইসলামের সার্বজনীন রূপের বাইরে বিশেষ কোন প্রবণতাকেও প্রশ্রয় দিতে পারে না।

ইসলামী বিপ্লব মানে সমগ্র উম্মাহর বিপ্লব। এটি বিশেষ কোন দেশ, কাল ও পাত্রের বিপ্লব নয়। কিংবা কোন একটি বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থের সাথেও সংশ্লিষ্ট নয়। ইসলামী আন্দোলন যেমন ‘জাতি পূজারি বা দেশ পূজারি’ হতে পারে না তেমনি ইসলামী বিপ্লবও কোন বিশেষ দেশ বা জাতীয় সীমার গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ হতে পারে না।

বিদেশ নির্ভর কোন ধ্যান ধারণা দিয়ে ইসলামী বিপ্লব হয় না। জনগণের মধ্য থেকেই বিপ্লবী শক্তির উত্থান হতে হবে। মহা বিপ্লবে মহানায়ক হযরত মুহাম্মদ সা.-এর বিপ্লবী কাফেলায় জনগণ শরীক হয়েছিল এবং বিপ্লব জনগণের আকাঙ্ক্ষার সাথে ছিলো সংগতিপূর্ণ। পক্ষান্তরে রাশিয়ার ১৯১৭ সালের বিপ্লব বা চীনের ১৯৪৯ সালের বিপ্লবের আদর্শ তথাকথিত মার্ক্সবাদ রাশিয়া বা চীনের জনগণের আদর্শ ছিল না। কিংবা তাদের আকাঙ্ক্ষার বস্তুও ছিলো না। ফলে বিপ্লবের নামে রাশিয়া এবং চীনে যে ঐতিহাসিক গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। ইসলামী বিপ্লব নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষের বিপ্লব ছিল বলেই চিহ্নিত একটি মহল অর্থাৎ প্রতিক্রিয়াশীল ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ছাড়া সাধারণভাবে জনগণ ইসলামী বিপ্লবকে জানায় প্রাণঢালা অভিনন্দন। খোলাফায়ে রাশেদীনের যামানায় এ অবস্থা অব্যাহত ছিল।

 

About শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান