ইসলামের রাজনৈতিক মতবাদ

ইসলামের রাজনৈতিক মতবাদ

লেখকঃ সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী

অনুবাদঃ মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম


স্ক্যান কপি ডাউনলোড

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

ইসলামকে সাধারনত একটি গণতান্ত্রিক মতবাদ বলে অভিহিত করা হয়। অন্তত বিগত শতকের শেষার্ধ হতে অসংখ্যবার একথাটির পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। কিন্তু যারা একথাটি প্রচার করে বেড়ায়, তাঁদের মধ্যে হাজারে একজন লোকও দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানের অধিকারী নয় বলে আমার নিশ্চিত বিশ্বাস। এমনকি, ইসলামে কি ধরনের গনতন্ত্রের স্থান রয়েছে এবং এর স্বরূপই বা কি তা অনুধাবন করার জন্য তাঁরা বিন্দুমাত্রও চেষ্টা করেনি। এদের কিছু সংখ্যক লোক ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার বাহ্যিক রূপ ও অনুষ্ঠানসমূহ লক্ষ্য করে এর উপর গনতন্ত্রের লেবেল এঁটে দিতে ব্যার্থ প্রয়াস পেয়েছে। এ ব্যাপারে অধিকাংশ লোকের মানসিকতা হচ্ছে মারাত্নক। দুনিয়াতে যে বস্তুটিকে সাধারনভাবে প্রচলিত হতে দেখে, ইসলামেও এর অস্তিত্ব প্রমান করার জন্য এ শ্রেণীর লোকেরা উঠেপড়ে লেগে যায়। আর এ ধরনের কাজকে তাঁরা ইসলামের বিরাট খেদমত বলে মনে-প্রানে বিশ্বাস করে। সম্ভবত ইসলামকে তাঁরা একটি অসহায় ‘ইয়াতীম শিশুর’ সমপাংতেও বলে মনে করে। কারণ ইয়াতীম শিশু যেমন কোন প্রভাবশালী ব্যক্তির পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া বাঁচতে পারে না। তাঁরা মনে করে- ইসলামের অবস্থাও ঠিক অনুরূপ। কিংবা তাঁরা হয়ত মনে করে- আমরা কেবল মুসলমান হওয়ার কারনেই দুনিয়ার বুকে সম্মানিত হতে পারিনি। আমাদের জীবন ব্যবস্থা ও আদর্শ দুনিয়ার প্রচলিত সকল মত ও প্রথার মূলনীতিসমূহের অস্তিত্ব প্রমান করতে পারলেই আমরা বিশ্বের দরবারে সম্মান লাভ করতে পারব।

এরূপ মনোবৃত্তির ফল মুসলিম সমাজে অত্যন্ত মারাত্নক হয়ে দেখে দিয়েছে। দুনিয়ায় কমিউনিজমের উত্থানের সংগে সংগেই একদল মুসলমান দম্ভভরে ঘোষনা করতে লাগলঃ কমিউনিজম ইসলামেরই এক নতুন সংস্করণ ভিন্ন আর কিছুই নয়। অনুরূপভাবে যখন ডিকটেটরবাদের আওয়াজ উত্থিত হলো, তখন আবার কিছু সংখ্যক লোক ‘নেতার আনুগত্য কর’, ‘নেতার আনুগত্য কর’ বলে ধ্বনি তুলে বলতে লাগল যে, ইসলামের গোটা ব্যবস্থাই ডিকটেটরবাদের উপর স্থাপিত। মোটকথা ইসলামের রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা বর্তমান সময় (নিছক অজ্ঞতার কারনে) একটি রহস্যজনক গোলক ধাঁধায় পরিণত হয়ে রয়েছে। এটাকে অসংখ্য ও বিভিন্ন প্রকার মতবাদের খিচুড়ি বলে মনে করা হয়েছে এবং দুনিয়ার বাজারে যে জিনিসটিরই চাহিদা বেশী ইসলামে তারই অস্তিত্ব বর্তমান রয়েছে বলে প্রমান করার চেষ্টা হচ্ছে। বস্তুত বিষয়টি সম্পর্কে যথারীতি অনুশীলন ও গবেষণা করে দেখা একান্ত আবশ্যক। এর ফলে ইসলামী রাজনীতির কোন সঠিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বা সংজ্ঞা নির্ধারিত হলে এতদসম্পর্কিত যাবতীয় ভুল বোঝাবুঝি এবং বিক্ষিপ্ত চিন্তা কল্পনার দ্বার চিরতরে রূদ্ধ হয়ে যাবে। উপরন্তু ইসলাম প্রকৃতপক্ষে কোন রাজনৈতিক ও তামাদ্দুনিক ব্যবস্থা দান করতে পারে না বলে যারা নিজেদের চরম মুর্খতার পরিচয় দেয়- এ আলোচনায় কেবল তাঁদের মুখ বন্ধ হবে না, বস্তুত এতে জ্ঞানানুশীলনের ক্ষেত্রে এক নির্মল ও স্বচ্ছ আলোকচ্ছটাও ফুটে উঠবে। বর্তমান দুনিয়া এদিক দিয়ে গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত। আজ এই নিবিড় অন্ধকারে বিভ্রান্ত মানবজাতির মুক্তি ও কল্যাণের জন্য এরূপ আলো-বিকীরনের একান্ত আবশ্যকতা রয়েছে- যদিও দুনিয়াবাসীর মনে সাধারনত এই প্রয়োজনের কোন অনুভুতি পরিলক্ষিত হয় না।

ইসলামী মতবাদের ভিত্তি

সর্বপ্রথম একটি কথা সকলের মনে বদ্ধমূল করে নেয়া আবশ্যক। তা এই যে, ইসলাম কয়েকটি বিক্ষিপ্ত মতবাদ চিন্তা এবং একাধিক কর্মনীতির সমষ্টি বা সমন্বয় নয়। এতে এদিক ওদিক হতে বিভিন্ন প্রকার মতের সমাবেশ করে দেয়া হয়নি। বস্তুত ইসলাম একটি সুসংবদ্ধ ও সুষ্ঠু আদর্শ। কয়েকটি সুদৃঢ় মুলনীতির উপর এর ভিত্তি স্থাপিত। এর বড় বড় স্তম্ভ হতে শুরু করে ক্ষুদ্রতম খুঁটিনাটি পর্যন্ত প্রত্যেকটি জিনিসেরই এর মূলনীতির সাথে এক যুক্তিসংগত সম্পর্ক রয়েছে।ইসলাম মানব জীবনের সমগ্র বিভাগ ও বিভিন্ন স্তর সম্পর্কে যত নিয়ম-কানুন ও রীতিনীতি পেশ করেছে, তার প্রত্যেকটিরই মূল প্রাণবস্তু ও আভ্যন্তরীণ ভাবধারা এর প্রাথমিক নীতি হতেই গৃহীত হয়েছে। এই নীতিসমূহ হতে পরিপুর্ণরূপে একটি ইসলামী জীবন গঠিত হতে পারে- উদ্ভিদ জগতে যেমন বীজ হতে শিকড়, শিকড় হতে কান্ড, কান্ড হতে শাখা এবং শাখা হতে প্রশাখা ও পত্র-পল্লব ফুটে বের হয়ে থাকে।বৃক্ষটি ব্যপকভাবে সম্প্রসারিত হয়ে পড়লেও এর দুরবর্তী পাতাটি পর্যন্ত এর মূল শিকড়ের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত- ইসলামেরও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জিনিসগুলো ঠিক তদ্রূপ। অতএব ইসলামী জীবনের যে কোন দিক ও বিভাগকে বুঝার জন্যে এর মূল শিকড়ের দিকে লক্ষ্য করা এবং একে বুঝে নেয়া আবশ্যক। এটা ছাড়া এর প্রাণবস্তু ও মূলতত্ত্ব এবং আভ্যন্তরীণ ভাবধারা কিছুতেই হৃদয়ংগম করা যেতে পারেনা।

নবীদের কাজ

ইসলাম আল্লাহ্‌ তায়ালার প্রেরিত জীবন ব্যবস্থা। এটা কেবল হযরত মুহাম্মাদ (সা)- এর প্রচারিত বিধানই নয়, মোটামুটিভাবে একথা কারো অজানা নয়। বস্তুত মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম অধ্যায় হতে যত নবীই আল্লাহর তরফ হতে এসেছেন, তাঁদের সকলেই একমাত্র এ বিধানেরই প্রচার করেছেন। সকল নবীই এক আল্লাহ্‌র কর্তৃত্ব ও প্রভুত্ব স্বীকার করাতে এবং মানুষের দ্বারা তারই বন্দেগী করার উদ্দেশ্যে এসেছিলেন। এ সম্পর্কে এরূপ সংক্ষিপ্ত আলোচনার পরিবর্তে গভীরভাবে বিষয়টি সম্পর্কে গবেষণা করা আবশ্যক। আসলে এ সকল নিগূঢ় সত্য এবং গভীর তত্ত্ব পর্দার আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে।

বিশেষ তত্ত্বানুসন্ধানী দৃস্টিতে নির্ভুলভাবে আমাদের বিচার করে দেখতে হবে যে, আল্লাহর প্রভুত্ব স্বীকার করানোর উদ্দেশ্য কি? আর আল্লাহ্‌র কোন বান্দাহ (নবী) যখন ‘আল্লাহ্‌ ছাড়া তোমাদের অন্য কেহ প্রভু নেই’ বলে ঘোষণা করেছেন তখন স্থানীয় আল্লাহদ্রোহী শক্তিসমুহ জংগলের বিষাক্ত কাঁটার মত তাঁকে বিঁধতে শুরু করেছিল কেন, তা সুস্পষ্টরূপে অনুধাবন করার জন্যও গভীর ও সূক্ষ আলোচনা অপরিহার্য। সাধারনত নবীর এই প্রাথমিক ঘোষণার খুব সংকীর্ন অর্থ-ই গ্রহণ করা হয়ে থাকে। মনে করা হয় যে, মসজিদে গিয়ে ‘আল্লাহ্‌র সম্মুখে মাথা নত করে সিজদা করতে’ বলাই বুঝি নবীর এই ঘোষনার মূল লক্ষ্য; আর তারপর মানুষ সম্পুর্ন স্বাধীন, বাইরের যে কোন ব্যবস্থা ভিত্তিক গভর্ণমেন্টের আনুগত্য স্বীকার করা এবং তার বিধান পালন করে চলার ব্যাপারে এই ঘোষণা দ্বারা কোন বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়নি।

আমি জিজ্ঞেস করিঃ নবীর এই প্রাথমিক বাণীর অর্থ যদি শুধু এতটুকুই হতো, তাহলে দুনিয়ার কোন নির্বোধ ব্যক্তিও কি নিজের অনুগত ও আদেশানুবর্তী প্রজাদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় বিন্দুমাত্র হস্তক্ষেপ করত? এ কারণেই আল্লাহ সম্পর্কে আম্বিয়ায়ে কেরাম ও দুনিয়ার অন্যান্য শক্তির মধ্যে মূলত কোন বিষয়ে মতভেধ হয়েছিল এবং কোন ব্যাপারটা নিয়ে পরস্পরের মধ্যে দ্বন্দ ও সংগ্রাম চলেছিল, তা বিশেষভাবে গবেষণা করে দেখা একান্তই আবশ্যক হয়ে পড়েছে।

বস্তুত কুরআন মজীদে একাধিক স্থানে বিষয়টি পরিষ্কার করে দিয়েছে। যে সকল কাফের ও মুশরিকদের সংগে নবীদের সংগ্রাম চলেছিল, মুলত তাঁরা কেউই আল্লাহকে অস্বীকার করেনি। তাঁরা সকলেই আল্লাহ্‌র অস্তিত্ব স্বীকার করত। তাঁরা বিশ্বাস করত যে, আল্লাহ্‌ তায়ালাই আকাশ ও পৃথিবী, এই কাফের মুশরিকদেরকেও সৃষ্টি করেছেন। তাঁরই হুকুম অনুযায়ী বায়ু গতিশীল। সুর্য-চন্দ্র এবং নক্ষত্র সবকিছুই তাঁর নিয়িন্ত্রনাধীন।

(******)

“তাঁদের নিকট জিজ্ঞেস কর, পৃথিবী এবং তাতে যা কিছু আছে তা কার? বল- যদি তোমাদের জানা থাকে- তাঁরা বলবেঃ উহা আল্লাহ্‌র। ‘বল, একথা তোমরা ভেবে দেখ না কেন? তাঁদের জিজ্ঞেস কর, সাত আসমানের প্রভু এবং মহান আরশের মালিক কে? তাঁরা বলবে- আল্লাহ! তুমি বল, তাহলে তোমরা তাঁকে ভয় কর না কেন? তাঁদের জিজ্ঞেস কর, প্রত্যেকটি জিনিসের কর্তৃত্ব কার হাতে, যিনি সকলকে আশ্রয় দান করেন- যাঁর বিরুদ্ধে কেহ কাকেও আশ্রয় দান করতে পারে না, তিনি কে? বল যদি তোমরা জেনে থাকো। তাঁরা বলবে- আল্লাহ্‌। তুমি বল- তাহলে কোন ধোঁকায় তোমাদেরকে এভাবে নিক্ষেপ করা হয়েছে?”(মু’মিনুনঃ ৮৪)

(******)

“আকাশ ও পৃথিবীকে কে সৃষ্টি করেছে? এবং সুর্যও চন্দ্রকে কে নিয়ন্ত্রিত ও নিয়মানুগত করেছে, তা তাঁদের নিকট জিজ্ঞেস করলে তাঁরা নিশ্চয়ই বলবে যে, এটা সবই আল্লাহ্‌র কীর্তি। কিন্তু তবুও তাঁরা ভ্রষ্ট হয়ে কোথায় চলে যাচ্ছে? তাঁদের নিকট যদি জিজ্ঞেস কর আকাশ হতে কে বৃষ্টিপাত করাচ্ছে এবং মৃত ধরিত্রীকে কে জীবন দান করছে? তবে তাঁরা নিশ্চয়ই বলবে যে, এটা একমাত্র আল্লাহ্‌র কাজ।” (আনকাবুতঃ ৬১-৬৩)

(******)

“তাঁদের নিকট যদি জিজ্ঞেস কর যে, তোমাদেরকে কে সৃষ্টি করেছেন? তবে তাঁরা নিশ্চয়ই বলবেঃ আল্লাহ্‌ সৃষ্টি করেছেন। এটা সত্ত্বেও তাঁরা পথ ভ্রষ্ট হয়ে কোথায় যাচ্ছে?” (যুখরুফঃ ৮৭)

অতএব একথা সুস্পষ্ট জানা যায় যে, আল্লাহ্‌র অস্তিত্ব সম্পর্কে এবং তাঁর সৃষ্টিকর্তা,আকাশ ও পৃথিবীর একচ্ছত্র মালিক হওয়ার ব্যাপারে মানব সমাজে কোন কালেই কোন মতভেদ ছিলনা। জনগন চিরদিনই একথা নিঃসংকোচে ও স্বভাবিকভাবেই স্বীকার করত। কাজেই এসব কথার পুনঃ প্রচার এবং জনগনের দ্বারা এটা স্বীকার করার জন্য নবী পাঠাবার কোন প্রয়োজনীয়তা নিঃসন্দেহে ছিল না। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে যে, দুনিয়ায় নবীদের আগমনের কি উদ্দেশ্য ছিল? এবং স্থানীয় শক্তি নিচয়ের সংগে তাঁদের কি নিয়ে সংগ্রামের সৃষ্টি হয়েছিল- এ প্রশ্ন আমাদের সম্মুখে প্রচন্ড হয়ে দেখা দেয়।

কুরআন মজীদ এর সুস্পষ্ট জবাব দিয়েছে। কুরআন বলেঃ নবীগন বলতেন যে, “যিনি তোমাদের এবং আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা, বস্তুত তোমাদের ‘রব’ ও ‘ইলাহ’ও একমাত্র তিনিই। অতএব তাঁকে ছাড়া আর কাকেও ‘রব’ এবং ‘ইলাহ’ বলে মেনো না”। মুলত একথা নিয়েই ছিল নবীদের প্রাণান্তকর সাধনা এবং প্রতিকূল শক্তির সাথে সকল প্রকার কলহ-বিবাদ। কারণ দুনিয়ার মানুষ নবীদের উল্লেখিত বাণীকে স্বীকার করার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু এই বিবাদের মুলেই বা কি নিগূঢ় কারণ নিহিত ছিল? ‘ইলাহ’ কাকে বলে? ‘রব’ দ্বারা কি বুঝান হচ্ছে? একমাত্র আল্লাহকেই ‘রব’ ও ‘ইলাহ’ স্বীকার করার জন্য নবীদের এরূপ পৌনপুনিক প্রচেষ্টার মূল কারণ কি? আর দুনিয়ার মানুষই বা একথা স্বীকার করতে কেন রাযী হয়না এবং এটা শুনেই বা তাঁরা কেন যুদ্ধংদেহী বেশ ধারন করে?

এখানে আমি এসব প্রশ্নের জবাবই পেশ করতে চেষ্টা করব।

‘ইলাহ’ শব্দের অর্থ

সকলেই জানেন, ‘ইলাহ’ শব্দের অর্থ প্রভু- উপাস্য বা মাবূদ। কিন্তু এ শব্দগুলোর সঠিক অর্থ বর্তমান যুগের মানুষ প্রায় ভুলে গিয়েছে। মা’বূদ শব্দের মূল হচ্ছে- ‘আবদ’। আবদ অর্থ বান্দা-দাস ; আর ইবাদাতের অর্থ কেবল পুজা করাই নয়,বান্দাহ এবং দাস বন্দেগী ও গোলামী করে যে ধরনের জীবন যাপন করে থাকে, মূলত সেই পুর্ন জীবনের যাবতীয় কাজ-কর্মকেই বলে হয় ইবাদাত। খেদমতের জন্য দন্ডায়মান হওয়া, সম্মান ও সম্ভ্রম প্রদর্শনের জন্য হাত বেঁধে দাঁড়ানো, নিজেকে দাস মনে করে মাথা নত করা, হুকুম মেনে চলার স্বতঃস্ফুর্ত প্রবণতা ও আবেগে উচ্ছ্বসিত হওয়া, আনুগত্য করতে গিয়ে চেষ্টা-সাধনা ও দুঃখ-কষ্ট ভোগ করা, নির্দেশানুযায়ী কাজ সমাধা করা, মনিবের আদেশ অনুসারে প্রত্যেকটি জিনিস উপস্থিত করে দেয়া তাঁর অতুলনীয় বিক্রম ও গভীর মহিমার সম্মুখে বিনয়াবনত হওয়া, তাঁর রচিত ও প্রদত্ত প্রত্যেকটি আইন মেনে চলা, প্রত্যেকটি নিষিদ্ধ বস্তুকে পরিহার ও মূলোৎপাটিত করা, তাঁর আদেশ অনুযায়ী আত্নবিসর্জন করতে প্রস্তুত হওয়া- এটাই হল ইবাদাতের প্রকৃত অর্থ। আর মানুষ এভাবে যার ইবাদাত করে, তিনিই মানুষের আসল মা’বুদ- আর তিনিই ‘ইলাহ’।

‘রব’ এর অর্থ

‘রব’ শব্দের প্রকৃত অর্থ প্রতিপালক; যেহেতু দুনিয়ায় প্রতিপালকেরই আনুগত্য ও আদেশ পালন করা হয়, অতএব ‘রব’ শব্দের অর্থ ‘মালিক’ ‘মনিব’ ও হয়ে থাকে। এ জন্যই কোন বস্তুর মালিককে আরবী পরিভাষায় ‘রাব্বুলমাল’—জিনিসের মালিক ও বাড়ির মালিককে ‘রববুদ-দার’ বলা হয়। মানুষ যাকে নিজের রিজিকদাতা ও প্রতিপালক বলে মনে করে যার নিকট হতে মান-সম্মান, উন্নতি ও শান্তি লাভ করার আকাংখা করে থাকে, মানুষ যাকে প্রভু, মনিব ও মালিকরূপে নির্দিষ্ট করে এবং বাস্তব জীবনে যার আনুগত্য ও আদেশ পালন করে চলে, বস্তুত সে-ই হচ্ছে তাঁর ‘রব’।

এ শব্দ দু’টির অর্থের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করুন এবং গভীরভাবে ভেবে দেখুন যে, মানুষের ‘ইলাহ’ ও ‘রব’ হওয়ার বলিষ্ঠ দাবী নিয়ে কে এসে দাঁড়ায়? কোন্‌ শক্তি বলে থাকে যে, তোমরা আমার বন্দেগী ও ইবাদাত কর? গাছ, পাথর, নদী, সমুদ্র, জন্তু-জানোয়ার, চন্দ্র-সুর্য ও নক্ষত্র প্রভৃতি কোন একটি প্রাকৃতিক বস্তুও আজ পর্যন্ত মানুষের কাছে এরূপ দাবী উপস্থাপন করেছে? এগুলোর কোন একটির মধ্যেও কি এরূপ দাবী করার বিন্দুমাত্র সামর্থ আছে?

প্রত্যেক মানুষই বুঝতে পারেন যে, এদের কোনটিই এরূপ দাবী মানুষের কাছে করতে পারে না। বস্তুত কেবল মানুষই মানুষের উপর নিজের প্রভুত্ব কায়েম করার জন্য এরূপ দাবী করে থাকে- আর মানুষই তা করতে পারে। প্রভুত্বের লালসা একমাত্র মানুষের মন ও মস্তিষ্কে স্থান করতে পারে। মানুষেরই সীমালঙ্ঘনকারী প্রভুত্ব লোভ কিংবা উদগ্র শোষনাভিলাষ তাঁকে ভয়ানকভাবে উত্তেজিত ও অনুপ্রানিত করে এবং অন্য মানুষের ‘খোদা’ হবার জন্য মানুষকে নিজের দাসত্বের শৃংখলে বন্দি করার জন্যে, নিজের পদতলে অন্য মানুষের মস্তক অবনত করার জন্য, তাঁদের উপর নিজের হুকুম ও আইন চালাবার জন্য, নিজের লোভ-লালসা চরিতার্থ করার জন্য ও মানুষকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার জন্যই মানুষ এরূপ ক্ষমতার নেশায় মেতে ওঠে। মানুষের ‘খোদা’ হবার মত প্রলোভনের বস্তু মানুষ আজ পর্যন্ত অপর একটিও আবিষ্কার করতে পারেনি। যার কিছুটা শক্তি-সামর্থ বা ধন-সম্পদ কিংবা কূটবুদ্ধি ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব অথবা এ ধরনের অন্য কোন জোর রয়েছে, সে-ই নিজের স্বাভাবিক ও সংগত সীমা লঙ্ঘন করে সম্মুখে অগ্রসর হবার জন্য, প্রভাবশালী হবার জন্য এবং তাঁর পরিবেশের দুর্বল, দরিদ্র, বুদ্ধিহীন বা (কোন দিক দিয়ে) নীচ ব্যক্তিদের উপর নিজের প্রভুত্ব কায়েম করার জন্য প্রান দিয়ে চেষ্টা করে।

এ ধরনের প্রভুত্বলোভী ও ক্ষমতাবলাসী লোক দুনিয়ার সাধারনত দু’ প্রকার পাওয়া যায়। এ দু’ প্রকার লোকেরা দু’টি ভিন্ন পথ ধরে নিজ নিজ লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হয়ে থাকে।

প্রথম প্রকার মানুষ অত্যন্ত দুঃসাহসী হয়ে থাকে। কিংবা তাঁদের নিকট খোদায়ীর দাপট প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় সাজ-সরঞ্জাম বর্তমান থাকে। এ শ্রেনীর লোক সরাসরিভাবে ও স্পষ্ট ভাষায় নিজেদের খোদায়ী দাবী পেশ করে থাকে। মিসরের ফেরাউন এ শ্রেনীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। সে নিজের বাদশাহী ও সৈন্য-সামন্তের বলে মত্ত হয়ে বলেছিল (****) ‘আমিই তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ রব’ (****) ‘আমি ছাড়াও তোমাদের অন্য কোন প্রভু আছে বলে আমার জানা নেই’। হযরত মুসা (আ) যখন তাঁর সম্মুখে বনী ইসরাঈলদের আযাদীর দাবী পেশ করলেন এবং তাঁকে বলেন যে, তুমি নিজেও ইলাহুল আলামীন- এর (সারে জাহানের রব এর) বন্দেগী কবুল কর, তখন ফেরাউন বলেছিলঃ

(******)

“তুমি যদি আমাকে ছাড়া অন্য কাকেও ‘ইলাহ’ রূপে স্বীকার করে লও তাহলে তোমাকে আমি গ্রেফতার করে কারারুদ্ধ করে দিব”।

যে বাদশাহর সাথে আল্লাহ্‌র সম্পর্কে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর তর্ক হয়েছিল, তারও অনুরূপ দাবী ছিল। কুরআন শরীফে যে ভঙ্গীতে ঘটনাটির উল্লেখ করা হয়েছে তা বিশেষ ভাবে প্রণিধানযোগ্যঃ

(******)

“যে ব্যক্তি ইব্‌রাহিমের সাথে তর্ক করেছিল, তাঁর কথা ভেবে দেখ। উভয়ের মধ্যে তর্ক হয়েছিল এ নিয়ে যে, ইব্‌রাহিমের ‘রব’ কে? এই তর্ক হয়েছিল কেন? এ জন্য যে, আল্লাহ্‌ তাঁকে কোন দেশের রাজত্ব দান করেছিলেন। ইব্‌রাহীম যখন বলেছিলেন যে, জীবন ও মৃত্যু যার হাতে তিনিই আমার রব। তখন উত্তরেসেই ব্যক্তি বলেছিল, জীবন ও মৃত্যু তো আমার হাতে। ইব্‌রাহীম বললেনঃ (আমার) আল্লাহ্‌ পুর্বদিক হতে সুর্য উদিত করেন, ক্ষমতা থাকলে তুমিই এটাকে পশ্চিম দিক হতে উদিত কর। একথা শুনে সেই কাফের ব্যক্তি হতবাক ও নিরুত্তর হয়ে গেল”। (সূরা আল বাকারা-২৫৮)

চিন্তা করার বিষয় এই যে, সেই লোকটি নিরুত্তর হল কেন? সে তো আল্লাহকে অস্বীকার করেনি। নিখিল সৃষ্টি জগতের প্রভু আল্লাহ্‌ সুর্যের উদয়-অস্ত একমাত্র তাঁরই বিধান মত হয়ে থাকে, একথা সে পুরোপুরিই স্বীকার করত ও মানত। বিশ্বভুবনের মালিক কে, এই প্রশ্ন নিয়ে এখানে কোন তর্ক ছিল না- মতভেদও কিছু ছিল না, তা নিয়ে। সে ব্যক্তি কখনো আল্লাহ্‌ হবার দাবী করেনি, সে কেবল তাঁর দেশবাসীর ‘রব’ হবার দাবী করেছিল মাত্র। আর এ দাবী করারও মূ্ল কারণ শুধু এই যে, তাঁর হাতে ছিল রাজশক্তি ও শাসন ক্ষমতা। জনগনের জান-মালের উপর তাঁর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা স্থাপিত ছিল। সে নিজে ইচ্ছামত কাউকেও ফাঁসি দিতে পারত। সে নিজের মুখের কথাকেই ‘দেশের আইন’ মনে করত। সমগ্র প্রজা সাধারনের উপর তাঁর মুখের আদেশ আইন হিসেবে চালু হয় বলে তাঁর মনে ছিল অহংকার। এজন্যই হযরত ইব্‌রাহীম (আ)- কেও বলেছিল, ‘আমাকে মানো, আমার বন্দেগী ও ইবাদত কর’। কিন্তু হযরত ইব্‌রাহীম (আ) যখন স্পষ্ট ভাষায় বললেন যে, ‘আমি একমাত্র তাঁরই ইবাদত ও বন্দেগী করব, একমাত্র তাকেই রব বলে মানব, যিনি সারা পৃথিবী ও আকাশ জগতের ‘রব’, চন্দ্র, সূ্র্য্য সবকিছুই যার ইবাদত করে। তখন ইহা শুনে সে লোকটি স্তম্ভিত হয়ে গেল। কারণ, এই লোকটিকে কি করে বশ করা যাবে, তা-ই হল ভাবনা ও উদ্বেগের বিষয়।

ফেরাউন ও নমরুদ যে খোদাই ও প্রভুত্বের দাবী করেছিল, ইহা কেবল এই দু’ ব্যক্তি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নয়। দুনিয়ার প্রত্যেক স্থানেই প্রত্যেক শাসকেরই এরূপ দাবী ছিল এবং এখনো রয়েছে। প্রাচীন ইরানের বাদশাকে ‘খোদা’ বলা হত এবং তাঁর সম্মুখে আনুষ্ঠানিকভাবে দাসত্ব ও বন্দেগী পালন করা হত। অথচ প্রকৃত পক্ষে কোন ইরানবাসী তাঁকে আল্লহা মনে করত না, আর সে নিজেও তা কখনোও দাবী করত না। ভারত বর্ষেরও কয়েকটি শাসক পরিবারও নিজেদেরকে দেবতাদের বংশধর বলে মনে করত। সূর্য্য বংশ ও চন্দ্র বংশ ইতিহাসের পৃষ্ঠায় আজও উল্লেখিত রয়েছে। রাজাকে এখানে অন্নদাতা- ‘রাযেক’ বলা হত। এমনকি তাঁর সম্মুখে মস্তক নত করে সিজদা পর্যন্ত করা হত। অথচ ‘পরমেশ্বর’ হওয়ার দাবী কোন রাজা-ই করত না। আর প্রজারাও তাঁকে ‘পরমেশ্বর’ মনে করত না। দুনিয়ার অন্যান্য দেশের অবস্থাও অনুরূপ ছিল এবং আজও তা আছে। কোন কোন দশের শাসকদের সম্পর্কে ‘ইলাহ’ ও ‘রব’ এর সামর্থবোধক শব্দ সাধারণভাবে প্রয়োগ করা হয়। এরূপও অনেক দেশ আছে যেখানে এ ধরনের শব্দের ব্যবহার না করলেও অনুরূপ অর্থবোধক শব্দ নিশ্চয়ই ব্যাবহৃত হয়ে থাকে। খোদায়ী প্রভূত্বের এরূপ দাবীর জন্য প্রকাশ্যভাবে ‘ইলাহ’ বা ‘রব’ হওয়ার দবী করা অপরিহার্য নয়- মুখে একাথা বলারও খুব প্রয়োজন নেই যে, আমি ‘ইলাহ’ বা ‘রব’। বরং ফেরাউন ও নমরূদ মানুষের উপর যেরূপ প্রভূত্ব ও শাসন, শক্তি ও ক্ষমতা, প্রভাব ও আধিপত্য ইত্যাদি কায়েম করেছিল,যারা আজো অনুরূপ কাজ করে, প্রকাশ্যে না হলেও মূলত তারাই ‘ইলাহ’ ও ‘রব’ হওয়ার দাবী করে থাকে। পক্ষান্তরে যারাই তাদেরকে ঐ ধরনের ক্ষমতা ও প্রভূত্বের অধিকারী বলে স্বীকার করে, মূলত তাঁরা তাঁদের ‘ইলাহ’ ও ‘রব’ হওয়ার কথাই স্বীকার করে। মুখে ঐ শব্দ ব্যবহার না করলেও কোন ক্ষতি হয় না।

মোটকথা, যারা সোজাসুজি ভাবে ইলাহ ও রব হওয়ার দবী উত্থাপন করে, তাঁরা একধরনের মানুষ, আর যাদের কাছে তদনুরূপ শক্তি-সামর্থ এবং অনুরূপ দাবী স্বীকার করার প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ বর্তমান নেই, বরং যারা ধোঁকা, প্রতারনা, কূটবুদ্ধি এবং কৌশল ইত্যাদির হাতিয়ার যথেষ্ট প্রয়োগ করতে ও জনসধারনের মন-মস্তিষ্ক আয়ত্তাধীন করতে সমর্থ, তাঁরা আর এক ধরনের মানুষ। সেষোক্ত ধরনের লোক নিজেদের উপায়-উপকরণ যা কিছু আছে, তাঁর দ্বারা কোন দেবতা, মৃত আত্মা, কোন ভূত, কবর, গ্রহ কিংবা বৃক্ষকে ‘ইলাহ’ এর মর্যাদা দান করে এবং মানুষকে বলেঃ এটা তোমাদের ক্ষতি বা কল্যাণ করতে সমর্থ, এটা তোমাদের প্রয়োজন পূর্ণ করতে পারে, এটা তোমাদের রক্ষক ও সাহায্যকারী, এটাকে খুশি না করলে এটা তোমাদের দুর্ভিক্ষ, রোগ, শোক, দুঃখ ও বিপদ-আপদে নিমজ্জিত করে দেবে। আর এটাকে খুশি করে তোমাদের প্রয়োজন পূর্ন করার প্রার্থনা করলে এটা তোমাদের সাহায্য করবে। কিন্তু এদেরকে খুশি করার এবং তোমাদের দুরবস্থা ও দুর্গতি দূরিভূত করার দিকে এদের দৃষ্টি আকৃষ্ট করা- এদেরকে সন্তুষ্ট করার কার্যকরী পন্থা আমরা জানি। এদের নিকট পর্যন্ত পৌঁছবার অবলম্বন আমরাই হতে পারি। আমাদের নেতৃত্ব মেনে লও, আমাদের খুশি এবং তোমাদের জান-মাল আব্রু সব কিছুরই উপর আমাদের নিরংকুশ কর্তৃত্ব স্বীকার করে লও- ফলে অসংখ্য নির্বোধ মানুষ প্রতারনার এই দুশ্ছেদ্য জালে জড়িত হয়ে পরে এবং এই ধরনের মিথ্যা খোদার আশ্রয়ে ঐসব পুরোহিত পূজারী ও যাজকদের একচেটিয়া প্রভূত্ব ও খোদায়ী স্থাপিত হয়।

এদের মধ্যে আর একদল লোক আছে, যারা নান প্রকার যাদুমন্ত্র, ফাল ও গণনা, তাবিয-তুমার ও মন্ত্র ইত্যাদির সাহায্য গ্রহণ করে। আর কিছু লোক এমনও রয়েছে, যারা নিজেরা একদিকে আল্লাহ্‌র বন্দেগী স্বীকার করে এবং অপরদিকে মানব সাধারনকে নিজেদের দাস বানাবার চেষ্টা করে। তাঁরা জনগণকে বলে যে, তোমরা সরাসরিভাবে নৈকট্য লাভ করতে পারো না, তাঁর নৈকট্য লাভ করার জন্য আমরাই একমাত্র বাহন বা মাধ্যম। ইবাদাতের যাবতীয় অনুষ্ঠান আমাদের মাধ্যমেই পালিত হতে পারে। কাজেই জন্ম হতে মৃত্যু পর্যন্ত যাবতীয় ধর্মসংক্রান্ত অনুষ্ঠান আমাদের হাতে- আমাদের সাহায্যেই পালিত হবে। আর একদল লোক আল্লাহ্‌র কিতাব একচ্ছত্রভাবে দখল করে বসে, জনসাধারণকে এর জ্ঞান হতে একেবারেই বঞ্চিত করে রাখে, আর নিজেরা নিজেদেরকে ‘আল্লাহ্‌র ভাষ্যকার’ মনে করে হালাল- হারাম সংক্রান্ত নির্দেশ দিতে শুরু করে। তাঁদের মুখের কথাই ‘দেশের আইন’ হয়ে থাকে এবং তাঁরা মানুষকে আল্লাহ্‌র পরিবর্তে নিজেদের আদেশানুবর্তী করে নেয়। প্রাচীনকাল হতে বিভিন্ন নামে ও বিভিন্ন রূপে যেসব পৌরহিত্যবাদ, ব্রাক্ষ্ম্যন্যবাদ ও পোপতন্ত্র চলে এসেছে এবং দুনিয়ার বিভিন্ন এলাকায় এখনো বর্তমান রয়েছে, এটাই সে সবের মূল তত্ব। এরই দৌলতে বিভিন্ন পরিবার, বংশ, গোত্র বা শ্রেনী জনগনের উপর নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের কলংক ছাপ স্থাপন করেছে।

বিপর্যয়ের মূল কারণ

এ দৃষ্টিতে চিন্তা করলে নিঃসন্দেহে জানা যায় যে, মানুষের উপর মানুষের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভুত্বই হচ্ছে দুনিয়ার সর্বকালের, সর্বজাতির ও সকল দেশের সকল প্রকার অশান্তি ও বিপর্যয়ের মূল কারণ। এটাই সমস্ত ভাঙ্গন ও বিপর্যয়ের প্রধান উৎস। এটা হতে আজও অসংখ্য বিষাক্ত ধারা জন্মলাভ করে দিক-দিগন্তে প্রবাহিত হচ্ছে। আল্লাহ্‌ তো স্বতঃই সকল মানুষের প্রকৃতির অন্তর্নিহিত রহস্য ও ভাবধারা পুর্ব হতেই যথাযথরূপে জানেন। আর হাজার হাজার বছরের অভিজ্ঞতা হতে আমরাও নিঃসন্দেহে জানতে পেরেছি যে, মানুষ অন্য একজনকে- সে যে-ই হোক না কেন- ‘ইলাহ’ ও ‘রব’ স্বীকার না করে কিছুতেই থাকতে পারে না। বস্তুত কাউকেও ‘রব’ ‘ইলাহ’ স্বীকার না করে মানুষের জীবন চলতেই পারে না। কেউ যদি আল্লাহকে ‘ইলাহ’ ও ‘রব’ বলে স্বীকার না-ও করে তবুও কাউকেও ‘ইলাহ’ ও ‘রব’ বলে স্বীকার না করে মানুষের নিস্তার নেই। অধিকন্তু, এক আল্লাহকে ‘রব’ ও ‘ইলাহ’ বলে স্বীকার না করলে তখন অসংখ্য ‘রব’ তাঁর উপর চেপে বসতে পারে; বস্তুত এক আল্লাহকে ‘ইলাহ’ ও ‘রব’ স্বীকার না করার এটাই অনিবার্য পরিনাম।

চিন্তা করে দেখুন, সোভিয়েত রাশিয়ার কম্যুনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক ব্যুরোর (political bureau) সদস্যগণ সমগ্র রুশবাসীদের ‘রব’ও ‘ইলাহ’ নয় কি? আর পার্টির প্রধান বর্তমানে তাঁর স্থলাভিষিক্ত এ একাধিক ‘রব’ ও ‘ইলাহ’র শ্রেষ্ঠতম ও উচ্চতম ‘রব’ ও ‘ইলাহ’ নয়? বস্তুত রুশবাসীদের এক ‘পরমেশ্বর’ ও সর্বশ্রেষ্ট খোদার (পার্টি প্রধান) ছবি সসম্মানে রক্ষিত হয়নি এমন একটি গ্রাম ও কৃষি ফার্মও সেখানে খুঁজে পাওয়া যাবে না। দ্বিতীয়মহাযুদ্ধের সূচনায় পোল্যান্ডের যে অংশ অধিকার করেছিল, অনেকেই তা হয়তো জানে না তথায় স্ট্যালিনের প্রতিকৃতি হাজার হাজার সংখ্যায় আমদানী করা হয়েছিল, কিন্তু কেন? বস্তুত এর মূলে একটি বিরাট উদ্দেশ্য নিহিত ছিল। এরূপ প্রতিকৃতি দ্বারা জনগন যদি প্রভাবান্বিত হয়, তবে উত্তরকালে তথায় বলশেভিক ধর্মের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা সহজ হয়ে পড়ে। এ প্রসংগে আমি একটি কথা জিজ্ঞেস করতে চাইঃ এ একটি মানুষের প্রতি এতবেশী (অস্বাভাবিক ও অতি মানবিক) গুরুত্ব আরোপ করা হয় কিসের জন্য? বিশেষ কোন ব্যক্তি যদি গোটা জাতির (community) প্রতিনিধিও হয়ে থাকে তবুও কোটি কোটি মানুষের মন, মস্তিষ্ক ও আত্নার উপর সেই এক ব্যক্তির নিরংকুশ প্রভাব ও প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত করা হবে কেন- কোন কারনে? তার ব্যক্তিত্বের প্রতিপত্তি ও পরাক্রম তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ন দেশের জনসাধারনের স্নায়ু-মন্ডলী ও রক্ত-বিন্দুতে কেন প্রবাহিত করা হবে? বস্তুত এরূপেই দুনিয়াতে ব্যক্তিতন্ত্র কায়েম হয়ে থাকে- এই উপায়েই মানুষ মানুষের ‘প্রভু’ ও ‘খোদা’ হয়ে বসে।প্রত্যেক যুগে ও প্রত্যেক দেশে এ পন্থায়ই ফেরাউন ও নমরূদ এবং জার ও কাইজার তন্ত্রের ভিত্তি স্থাপিত হয়ে থাকে।

বিগত যুদ্ধের সময় ইতালীর অবস্থাও ছিল অনুরূপ। ‘ফ্যাসিস্ট গ্র্যান্ড কাউন্সিল’ সে দেশের অসংখ্য ‘ইলাহ’র মিলিত রূপ এবং মুসোলিনী ছিলেন সেখানকার সর্বশ্রেষ্ট ‘রব’ ও ‘ইলাহ’। জার্মানীর নাৎসি দলের নেতৃবৃন্দ ছিল অসংখ্য ‘ইলাহ’র সমষ্টি, আর হিটলার ছিল তাদের সর্বশ্রেষ্ট ‘ইলাহ’। গণতান্ত্রিক দেশ হওয়া সত্ত্বেও বৃটেন ‘ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের’ ডিরেকটরগন এবং তথাকার কয়েকজন উঁচু দরের লর্ড হচ্ছেন সমগ্র দেশের খোদা। আমেরিকার ‘ওয়ালস্ট্রিট’-এর মুস্টিমেয় পুঁজিপতি সমগ্র দেশের ‘ইলাহ’ ও ‘রব’ হয়ে বসে আছে।

মোটকথা যেদিকেই দৃষ্টি নিক্ষেপ করবেন, দেখতে পারবেন, কোথাও এক জাতি অন্য জাতির ‘ইলাহ’ হয়ে বসে আছে, কোথাও এক শ্রেণী অন্য শ্রেণীর ‘ইলাহ’ আর কোথাও এক দল অন্য সমস্ত দলের ‘ইলাহ’ ও ‘রব’-এর ভুমিকা দখল করে আছে। কোথাও কোন ডিকটেটর (****) “আমি ছাড়া তোমাদের আর কেউ ‘ইলাহ’ আছে বলে আমি জানিনা” বলে নিরংকুশ কর্তৃত্বের দাবি পেশ করছে। বস্তুত মানুষ দুনিয়ায় কোন স্থানেই কোন না কোন ‘ইলাহ’ ছাড়া বেঁচে থাকতে পারছে না।

কিন্তু মানুষের উপর মানুষের প্রভুত্ব (খোদায়ী) স্থাপিত হওয়ার পরিণাম যে কতখানি মারাত্নক হয়ে থাকে তাও ভেবে দেখা আবশ্যক। একজন হীন, নীচ, মুর্খ ব্যক্তিকে কোন এলাকার পুলিশ কমিশনারের মর্যাদা ও ইখতিয়ার দান করলে, কিংবা একজন অজ্ঞ ও সংকীর্ণমনা ব্যক্তিকে কোন দেশের প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসিয়ে দিলে এর যে বাস্তব ফল হয়ে থাকে, এই ক্ষেত্রেও ঠিক অনুরুপ পরিনাম হতে বাধ্য। প্রথমত খোদায়ী ও প্রভুত্বের নেশাটাই হচ্ছে অত্যন্ত মারাত্নক। এ মদ সেবনের পর কোন মানুষই প্রকৃতিস্থ থাকতে পারে না।আর যদি কেউ সুস্থ প্রকৃতির থাকেও,তবুও ‘খোদায়ীর’ কর্তব্য ও দায়ীত্ব যথারীতি পালন করার জন্য যে জ্ঞান, যে নিঃস্বার্থতা, নিষ্কলুষতা এবং সর্বোপরি যে নিরপেক্ষতা অপরিহার্য, মানুষ তা কোথায় পাবে? এ জন্যেই, যেখানে সেখানে মানুষের উপর মানুষের প্রভুত্ব ‘খোদায়ী’ স্থাপিত হয়েছে, তথায় যুলুম- অত্যাচার, শোষন-পীড়ন, অশান্তি-উচ্ছৃংখলা, অবিচার-অসাম্য, ক্ষমতার অপব্যবহার কোন না কোনভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে- এর ব্যতিক্রম কোথাও নেই। মানুষের প্রভুত্বের অধীন সমাজে মানুষের আত্না তার স্বাভাবিক স্বাধীনতা হতে নির্মমভাবে বঞ্চিত হয়ে থাকে। মানুষের মন ও মস্তিষ্কের উপর, তার জন্মগত শক্তি, সামর্থ ও যোগ্যতা প্রতিভার উপর কঠিন বাঁধন স্থাপিত হয়, মানব ব্যক্তিত্বের উন্নতি ও ক্রমবিকাশের পথে জগদ্দল পাথর এসে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) যে কত বড় সত্য কথা বলেছিলেন তা অতি সহজেই বুঝা যায়ঃ

(******)

মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন-“ আমি মানুষকে সুস্থ ও সঠিক প্রকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছিলাম। কিন্তু পরে শয়তান তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। প্রকৃতির সরল ও সঠিক পথ হতে তাদেরকে বিচ্যুত ও ভ্রষ্ট করে দিল। আর আমি তাদের জন্য যা হালাল করেছিলাম, এই শয়তান সেসব জিনিসকেই তাদের পক্ষে হারাম কারে দিল, তা হতে তাদেরকে বঞ্চিত করল”।

উপরে বলেছি, মানুষের সমগ্র দুঃখ-মুসিবত, সমস্ত ভাঙ্গন-বিপর্যয়, সমস্ত অশান্তি ও বঞ্চনার এটাই হচ্ছে একমাত্র মূল কারন। মানবতার মুক্তি ও প্রগতির পথে এটাই হচ্ছে প্রধানতম ও প্রকৃত বাধা। মানুষের নৈতিক চরিত্র ও আত্নাকে মানুষের বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক শক্তি নিচয়কে মানুষের সমাজ ও তামাদ্দুনকে মানুষের রাজনীতি ও অর্থনীতিকে এক কথায় গোটা মানবতাকে এই মারাত্নক ব্যাধিই কঠিন মৃত্যুর গহবরে ঠেলে দিয়েছে। প্রাচীনকাল হতে এই ‘ঘুন’ই মানবতাকে অন্তসারশূন্য করে দিয়েছে- আজ পর্যন্ত এটাই তাকে দুর্বল ও শক্তিহীন করে দিয়েছে। কিন্তু এ রোগের চিকিৎসা কিসে হতে পারে? ইসলামের দৃষ্টিতে এ রোগের একমাত্র প্রতিরোধ এই যে, দুনিয়ার সমস্ত ইলাহ ও সমগ্র ‘রব’ কে মানুষ স্পষ্ট ভাষায় ও উদাত্ত কন্ঠে অস্বীকার করবে। বস্তুত মানবতার উক্ত মারাত্নক রোগের অন্য কোন চিকিৎসাই নেই। এ ছাড়া মানুষের মুক্তির আর কোন পথ নেই- থাকতে পারে না। কারন, নাস্তিক হয়েও মানুষ অসংখ্য ‘ইলাহ’ ও ‘রব’ হতে নিষ্কৃতি পেতে পারে না, দুনিয়ার বিভিন্ন নাস্তিক জাতি বা দলের ইতিহাস হতেই একথা সন্দেহাতীত রূপে প্রমাণিত হয়েছে।

আম্বিয়ায়ে কেরামের আসল কাজ

বস্তুত আম্বিয়ায়ে কেরাম এই বুনিয়াদী সংস্কার সাধনের জন্যই দুনিয়াতে আবির্ভুত হইয়ে থাকেন, মানবতার এই মৌলিক চিকিৎসাই তারা করেছেন। মানুষের উপর হতে মানুষের প্রভূত্বকে নির্মুল করার জন্যই তার এসেছিলেন। মানুষের জুলুম-পীড়ন হতে, মিথ্যা ও কৃত্রিম ‘খোদার’ দাসত্ব জাল হতে এবং শোষন ও কুশাসন হতে মুক্তি দানের জন্য তাঁরা আবির্ভুত হয়েছিল। মানবতার সীমালংঘনকারী মানুষকে সীমার মধ্যে সংঘবদ্ধ করা মানবতার সীমা হতে বিচ্যুত মানুষকে হস্ত ধারন করে এর সীমায় উন্নীত করা এবং নিখিল মানবতাকে এক সুবিচারপূর্ন জীবন ব্যবস্থার অনুসারী ও অনুগামী করে দেয়াই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। তাদের প্রতিষ্ঠিত সমাজ ও জীবন ব্যবস্থায় মানুষ মানুষের প্রভু (খোদা) হবে না, -মানুষ মানুষের দাস হবেনা। সকল মানুষ হবে একমাত্র আল্লাহ তায়ালার দাসানুদাস। প্রথম দিন হতে শেষ পর্যন্ত সকল নবীরই এই পয়গাম ছিল মানবতার প্রতিঃ

(******)

“হে মানুষ! আল্লাহর দাসত্ব স্বীকার কর, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কেউ ‘ইলাহ’ নেই।” (সূরা হুদঃ ৮৪)

হযরত নূহ, হযরত হুদ, হযরত সালেহ, হযরত শোয়াইব- সকলেই এ একই কথা বলেছিলেন। সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)-ও একথাই ঘোষনা করেছেনঃ

(******)

“আমি তোমাদের সতর্ক ও সাবধান করতে এসেছি মাত্র। আল্লাহ ছাড়া তোমাদের ‘ইলাহ’ কেউ নেই, তিনি এক-অদ্বিতীয়, তিনি সর্বজয়ী, তিনি আকাশ, পৃথিবী এবং এর মধ্যস্থ সমস্ত কিছুরই রব”। (সূরা সোয়াদঃ ৬৫-৬৬)

(******)

“আল্লাহই তোমাদের রব, সন্দেহ নেই, তিনি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, চন্দ্র-সুর্য ও নক্ষত্র সবকিছুই তার নিয়ন্ত্রণাধীন। সাবধান! সৃষ্টিও তার- প্রভুত্বও তারই হবে”। (সূরা আরাফঃ ৫৪)

(*****)

-“তিনিই আল্লাহ্‌- তিনিই তোমাদের রব। তিনি ছাড়া আর কেউ (রব) নেই, তিনি সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা।” (সূরা আল আনয়ামঃ ১০২)

(*****)

– “তাদেরকে সবকিছু ছেড়ে- সকল দিক হতে মুখ ফিরিয়ে একমাত্র আল্লাহ্‌র দাসত্ব স্বীকার করা এবং তাঁরই আনুগত্য করে চলার আদেশ করা হয়েছে মাত্র।” (সূরা আল বাইয়্যেনাঃ ৫)

(*****)

-“আস, এমন একটি কথা গ্রহণ করি, যা তোমাদের ও আমাদের মধ্যে একেবারে সমান। তাহলে এই যে, আল্লাহ্‌ ছাড়া আমরা আর কারো বন্দেগী করব না, কর্তৃত্বের ব্যাপারে অন্য কাকেও শরীক বা অংশীদার বলে স্বীকার করব না। এবং আমাদের পরস্পরের মধ্যেও কেউ কাকেও ‘রব’ হিসেবে মানব না- এক আল্লাহ্‌ ছাড়া।” (সূরা আলে ইমরানঃ ৬৪)

বস্তুত এই ঘোষনাই মানুষের আত্না, বুদ্ধি- চিন্তা, বিবেক- মানসিক ও বৈষয়িক শক্তিনিচয়কে যুগান্তকালের গোলামীর বন্ধন হতে মুক্ত করেছে; যেসব দুর্বহ বোঝার দুরন্ত চাপে তাদের স্কন্ধচূর্ণ ও নত হচ্ছিল, যার তলে পড়ে তারা নিষ্পিষ্ট হচ্ছিল তা দূর করে দিয়েছে। বিশ্বমানবতার জন্য এটা ছিল প্রকৃত স্বাধীনতার ইশতেহার। হযরত মুহাম্মদ (সা) -এর এই অতুলনীয় কীর্তির কথা কুরআন মাজীদেও বর্নীত হয়েছেঃ

(*****)

-“নবী মানুষের উপরস্থ সকল বোঝা দূর করে দেন এবং তাঁর সকল প্রকার বাঁধনকে ছিন্ন করেন।”

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.