ইসলামের রাজনৈতিক মতবাদ

ইসলামী রাষ্ট্রের স্বরূপ

পূর্বোল্লিখিত বৈশিষ্ট্যসমূহের ভিত্তিতে চিন্তা করলে প্রথম দৃষ্টিতেই বুঝতে পারা যাবে যে, এটা আর যাই হোক -গণতন্ত্র (Democracy) কিছুতেই নয়। কারণ যে ধরনের শাসনতন্ত্রে দেশের নাগরিকদের নিরংকুশ প্রভুত্বের অধিকার স্বীকৃত হয়, রাজনৈতিক পরিভাষায় তাকেই গণতন্ত্র বলে। সেখানে জনগণের মতেই আইন বিরচিত হয়, জনগণের মতেই আইনের রদ-বদল হয়। তারা ইচ্ছামত আইন জারী করতে পারে, আবার বিধিবদ্ধ আইনকে তারাই বাতিল করতে পারে। কিন্তু ইসলামে ইসলামী রাজনীতিতে এর বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। কাজেই উল্লেখিত অর্থে ইসলামী শাসন ব্যবস্থাকে ‘গণতন্ত্র’ বলা যেতে পারে না। (যাঁরা বলেন তাঁরা মারাত্মক ভুল করেন- অনুবাদক)

ইসলামী শাসন ব্যবস্থার অধিকতর সঠিক ও সুষ্ঠু নাম হতে পারে, ‘হুকুমাতে ইলাহীয়া’- আল্লাহর শাসন ব্যবস্থা। ইংরেজী পরিভাষায় এটাকে ‘থিওক্র্যাসী’ (Theocracy) বলা হয়ে থাকে;কিন্তু থিওক্র্যাসী বলতে ইউরোপবাসী যা বুঝে থাকে;ইসলামী থিওক্র্যাসী এটা হতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র  জিনিস। ইউরোপীয় থিওক্র্যাসীতে নির্দিষ্ট একদল ধর্মযাজক (Priest Class)আল্লাহর নামে নিজেদের মনগড়া আইন জারী করে থাকে* এবং কার্যত নিজেদেরই প্রভুত্ব সাধারণ নাগরিকদের উপর স্থাপন করে।

[* খৃষ্টান পাদ্রী ও পোপদের নিকট হযরত ঈসা (আঃ) এর কয়েকটি নৈতিক শিক্ষা ছাড়া আর কিছুইনেই। মানুষের বাস্তব ধর্ম ও সামাজিক জীবনের জন্য কোন বিধান মূলত তাদের নিকট ছিল না। এ জন্য তারা নিজেদের মর্জীমত নিজেদের লালসা ও ইচ্ছা-বাসনা অনুসারে আইন বানাতেরা এবং আল্লাহর দেয়া আইন বতে তা জারী করত।]

এই ধরনের শাসনব্যবস্থাকে ‘ইসলামী হুকুমাত’ বলার পরিবর্তে ‘শয়তানী হুকুমাত’ বলাই অধিকতর যুক্তিগত। অন্যদিকে ইসলাম যে ‘থিওক্র্যাসী’ উপস্থাপিত করে, তার পরিচালন ভার বিশেষ কোন ধর্মীয় দলের উপর ন্যস্ত হয় না, তা দেশের সাধারণ মুসলমানদের হাতেই অর্পিত হয়ে থাকে। তবে জনসাধারাণ এটাকে নিজেদের মর্জীমত না চালিয়ে –  চালায় আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহ অনুসারে। এর নামকরণের জন্যে যদি আমাকে কোন নতুন পরিভাষা রচনার অনুমতি দেয়া হয়, তাহলে আমি এই ধরনের শাসন ব্যবস্থা ও পদ্ধতিকে (Theo Democracy) বা ‘আল্লাহর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ বলে অভিহিত করব। কারণ, এতে আল্লাহর উচ্চতর ও নিরংকুশ কর্তৃত্বের (Paramountcy) অধীন মুসলমানদেরকে সীমাবদ্ধ প্রভুত্বের অধিকার (Limited Popular Sovereignty) দান করা হয়েছে। এতে শাসন বিভাগ (Executive) মুসলিম জনসাধারনের ভোটেই নির্বাচিত হবে, মুসলমানই এটাকে পদচ্যুতও করতে পারবে, এ ছাড়া শাসন শৃংখলা স্থাপনের যাবতীয় ব্যাপার এবং যেসব বিষয় সম্পর্কে আল্লাহর শরীয়ত স্পষ্ট বিধান দেয়নি মুসলমানদের সম্মিলিত মতামত (ইসলামী পরিভাষায় যাকে বলা হয়- ‘ইজমা’) অনুসারেই সেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। আল্লাহর আইনের ব্যাখ্যা, বাস্তব প্রয়োগ ও নীতি নির্ধারণও বিশেষ কোন শ্রেণী বা অংশ কিংবা গোত্রের একাধিকারভুক্ত নয়। নির্বিশেষে সাধারণ  মুসলমানদের মধ্যে যারা ইজতেহাদী প্রতিভা সম্পন্ন তারা প্রত্যেকেই আল্লাহর কিতাবের ব্যাখ্যা দান প্রসংগে কথা বলার অধিকারী। এ দিক দিয়ে বিচার করলে বলতে হবেঃ এতে গণতন্ত্রের মর্যাদা পুরোপুরিই রক্ষিত হয়েছে, কিন্তু উপরে যেমন বলেছি- আল্লাহ ও রাসূলের আইনের ব্যাপারে কোন প্রকার রদ-বদল করার বিন্দুমাত্র অধিকার কারো নেই। কোন ব্যক্তি, রাষ্ট্রপতি, আইন পরিষদ, মুজতাহিদ, আলেম বা আল্লামা, এক কথায় সমগ্র মুসলমান মিলিত হয়েও তা করতে পারে না। এই হিসেবে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা বা রাজনীতিকে ‘থিওক্র্যাসী’ বলা যেতে পারে।

একটি প্রশ্ন

ইসলামী শাসন ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের এরূপ সীমা নির্দেশ করা হয়েছে কেন, এই সীমা ও বিধি-নিষেধের স্বরুপই বা কি, পরবর্তী আলোচনা শুরু করার পূর্বে এখানেই তার উত্তর এবং সামান্য ব্যাখ্যা পেশ করা আবশ্যক মনে করি। প্রশ্নকারী বলতে পারে যে, এরূপ করে আল্লাহ তায়ালা মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিবেক এবং মনের স্বাধীনতা হরণ করে নিয়েছেন, অথচ একটু পূর্বেই একথা প্রমাণ করা হয়েছে যে, অল্লাহ মানুষকে বুদ্ধি-জ্ঞান ও চিন্তার পরিপূর্ণ আযাদী দান করেছেন। এই প্রশ্নের উত্তর এই যে, আইন রচনার অধিকার আল্লাহ তায়ালা নিরংকুশভাবে নিজের হাতে রেখেছেন, তাতে কোনরূপ সংশয় নেই;কিন্তু তা তিনি মানুষের স্বাভাবিক জন্মগত স্বাধীনতাকে হরণ করার জন্য করেননি, করেছেন মানুষের অধিকারকে সুরক্ষিত করার জন্য। মানুষের ভ্রান্ত পথ হতে ফিরিয়ে রাখা এবং নিজের পায়ে নিজে কুঠারাঘাত করা হতে বিরত রাখাই এরূপ সীমা নির্ধারণ করার মূল উদ্দেশ্য। পাশ্চাত্যের যে তথাকথিত গণতন্ত্রে সার্বজনীন প্রভুত্বের সুযোগ থাকে বলে গালভরা দাবী করা হয়, এখানে তার একটু যাচাই বা সমালোচনা করে দেখা দরকার। যেসব লোকের পারস্পারিক মিলনে রাষ্ট্ররূপ পরিগ্রহ করে, তাদের সকলেই কখনও আইন রচনা করে  না, অথবা সকলেই একত্রিত হয়ে কোন আইন রচনা করে না। বাস্তব ক্ষেত্রে কার্য পরিচালনার নিমিত্ত নির্দিষ্ট কয়েকজন লোককে প্রভুত্ব ও শাসন ক্ষমতা অর্পণ করা হয়- করতেই হয়। তারা জনগণের পক্ষ হতেই আইন রচনা করে এবং তা জারী করে থাকে। এই উদ্দেশ্যেই নির্বাচনের ব্যবস্থা এবং পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়। এই নির্বচন যুদ্ধে সেসব লোকই সাধারণত জয়লাভ করে থাকে, যারা অর্থবল, জ্ঞান, বিদ্যা, শঠতা, প্রতারণা, মিথ্যা প্রোপাগাণ্ডা প্রভৃতি হাতিয়ার ব্যবহার করে জনগণকে প্রতারিত করতে সমর্থ হয়। পরিণামে জনগণের ভোটে এরা জনগণের ‘ইলাহ’ পদে জেকে বসে। অতপর তারা জনগণের কল্যাণ সাধনের জন্য নয়- কেবল নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্যই আইন রচনা করেন এবং জনগণ প্রদত্ত শক্তি প্রয়োগ করে সেসব আইন জারী করে।বস্তুত গণতন্ত্রের এই অভিশাপ ইউরোপ, আমেরিকা, ইংল্যাণ্ড এবং গণলতন্ত্রের স্বর্গ বেল কথিত এবং পরিচিত অন্যান্য সকল দেশের উপর স্থাপিত হয়ে আছে।

গণতান্ত্রিকদেশে জনগণের মর্জী অনুসারে আইন রচিত হয়, তবুও বাস্তব অভিজ্ঞতা হতে একথা নিসন্দেহে প্রমাণিত হয়েছে যে, জনগণ নিজেরাও সঠিকভাবে বুঝতে পারে না, কিসে তাদের স্বার্থ আর কিসে নয়? মূলত এটা মানুষের জন্মগত দুর্বলতা সন্দেহ নেই। মানুষ তার জীবনের অসংখ্য ব্যাপার প্রকৃত সত্য এবং তত্ত্বের অনেক দিক দেখতে পায় বটে;কিন্তু অনেক দিক আবার তার চেখের অন্তরালেও থেকে যায়। প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজের ভাল-মন্দ সম্পর্কে যে ফায়সালা (Judgment) করে, সাধারণত তা পক্ষপাতমূলক না হয়ে পারে না। মানুষের উপর তার হৃদয়াবেগ, উচ্ছাস ও লালসা-বাসনার প্রবল আধিপত্য বিদ্যমান। নিছক বৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিগত দিক দিয়ে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত খুব কম লোকই করতে পারে। অনেক সময় এটাও দেখা যায় যে, নিখুঁত বুদ্ধি ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে প্রামাণিত  ব্যাপারগুলোকেও মানুষ উচ্ছ্বাস-আবেগের প্রবল চাপে জলাঞ্জলী দিয়ে বসে। এটা প্রমাণের জন্য আমি অসংখ্য উদাহরণ পেশ করতে পারি; কিন্তু প্রবন্ধের কলেবর অনাবশ্যক বৃদ্ধির ভয়ে আমি শুধু একটি মাত্র উদাহরণ পেশ করতে চাই। আমেরিকায় মদ্যপান নিরোধ আইন (Prohibition Law) রচনা একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা। জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং নিছক বুদ্ধির মানদণ্ডে একথা সন্দেহাতিতরূপে প্রমাণিত হয়েছিল যে, মদ স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। মন, বুদ্ধি ও বিবেক শক্তির উপর এর মারাত্মক প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে। মানব সমাজে এটা ভাঙ্গন ও বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে। এসব তত্ত্ব ও সত্য সমর্থন করেই আমেরিকার জনমত একদা শরাব নিষিদ্ধকরণ আইন পাশ করার সিদ্ধান্ত করেছিল। অতপর জনগণের ভোটেই উক্ত আইন আবার পরিবর্তিত হয়েছিল।

এই আইন কার্যত যখন জারী করা হলো,তখন আইন প্রণয়নকারী জনগণই এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। উক্ত আইন জারী হওয়ার পর নিকৃষ্ট হতেও নিকৃষ্টতর শরাব অবৈধভাবে তৈয়ার করতে লাগল এবং জনগণ গোপনে গোপনে তা পান করতে লাগল। অবস্থা এতদূর মারাত্মক হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, অতপর সে দেশে পূর্বাপেক্ষা কয়েকগুণ বেমী মদ্যপান হতে লাগল। পাপ ও অপরাধের বন্যা অধিকতর প্রবল আকার ধারণ করল। সর্বশেষ সেই জনগণের ভোটেই আবার নিষিদ্ধ শারাবকে বৈধ বলে ঘোষণা করা হলো –হারামকে কার্যত হালাল করে দেয়া হলো। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বুদ্ধির দিক দিয়ে শরাব পান উপকারী প্রমাণিত হয়েছিল বলেই যে এর বিধি বদলিয়ে গেল, তা নয়। আসলে ব্যাপার ছিল এই যে, জনগণ অজ্ঞতা প্রসুত লোভ-লালসরর দাসানুদাসে পরিণত হয়েছিল। তাদের নফসের শয়তানকে তারা নিজেদের প্রভু ও বিধানদাতা বলে স্বীকার করেছিল। তাই জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বুদ্ধি বিবেক দ্বারা চূড়ান্তভাবে সমর্থিত শরাব নিষিদ্ধকরণ আইনকেই তারা নফসের দাসত্ব করতে গিয়ে পরিবর্তন করে নিযেছিল এধরনের উদাহরণ আরও অনেক দেয়াযেতে পারে?এসব উদাহরণ হতে পরিষ্কাররূপে প্রমাণিত হয় যে, আইন রচয়িতা (Legislator) হওয়ার যোগ্যতা মূলত মানুষের নেই। আল্লাহকে অস্বীকার করার পর অন্যান্য ইলাহদের দাসত্ব ও বন্দেগী হতে তারা যদি মুক্তি পায়তবুও নিজেদের নফসের খাহেসের দাস হতেই হবে। নিজেদের নফসের শয়তানকে তারা নিজেদের ইলাহ রূপে স্বীকার করে এর অনুসরণ অবশ্যই করবে। কাজেই তাদের স্বার্থের জন্য তাদেরই স্বাভাবিক আযাদী সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় সীমা নির্ধারণ অপরিহার্য সন্দেহ নেই।

এ জন্যই আল্লাহ তায়ালা মানুষের প্রতি প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থায় কতগুলো বিধি-বিষেধ আরোপ করেছেন। ইসলামী পরিভাষায় একে হুদুদুল্লাহ বা আল্লাহর নির্ধারিদ সীমা (DivineLimits) বলে অভিহিত করা হয়। মানব জীবনের প্রত্যেকটি দিক ও বিভাগের ভারসাম্য এবং সামগ্রিক সামঞ্জস্য রক্ষা করার জন্যই এসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটা মূলত কতগুলো মূলনীতি, নিয়ম প্রণালী, বিধি নিষেধ এবং আইন কানুনের সমষ্টি মাত্র। এগুলোর দ্বারা মানুষের স্বাধীনতার সর্বশেষ সীমা নির্ধারিত হয়েছে। মানুষকে বলা হয়েছে এ সীমার মধ্যে থেকে খুটিনাটি ও আনুষাঙ্গিক ব্যাপার সমূহের কায়দা-কানুন(Regulation) রচনা করার অধিকার তোমাদের আছে বটে; কিন্তু এর সীমালংঘন বা অতিক্রম করার অধিকার কোনই অধিকার নেই। পরন্তুএ সীমালংঘন করলেই তোমাদের শান্তি-শৃংখলা এবং ভারসাম্য চূর্ণ ও বিপর্যস্ত হবে।

 

আল্লাহর সীমা নির্ধারণের উদ্দেশ্যে

উদাহরণ স্বরূপ মানুষের অর্থনৈতিক জীবনের উল্লেখ করা যেতে পারে। আল্লাহ তায়ালা মানুষের ব্যক্তিগত মালিকানার অধিকার,যাকাত আদায়ের অনিবার্যতা, সূদ-ঘুষের নিষিদ্ধকরণ এর যৌক্তিকতা প্রমাণিত করেছেন। উত্তরাধিকার নীতির প্রচলন এবং জুয়া ও প্রতারণামূলক ক্রয়-বিক্রয়ের অনিবার্যতা সুস্পষ্টরূপে অর্থোৎপাদন, সঞ্চয় ও ব্যয় করার পদ্ধতির উপর বিধি নিষেধ আরোপ করে ব্যক্তিগত অধিকারের কতগুলো সীমানা নির্দেশ করেছেন। এই নিদর্শনসমূহ যথাযথরূপে বজায় রেখে এর অভ্যন্তরে থেকে যদি মানুষ নিজেদের যাবতীয় কাজ-কর্ম সমাধাকরে, তাহলে একদিকে যেমন মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা (Personal Liberty)সংরক্ষিত থাকে, অন্যদিকে শ্রেণী সংগ্রাম (Class War) এবং এক শ্রেণীর কর্তৃত্ব ও প্রভুত্ব জনিত যুলম-নিপীড়নের মর্মান্তিক পরিস্থিতিরও উদ্ভব হতে পারে না। যালেম পুজিবাদ অথবা মজুরদের ডিকটেটরশিপ স্থাপিত হওয়ার কোন কারণ সৃষ্টি হতে পারে না।

মানুষের পারিবারিক জীবনের (Family Life)জন্য ও আল্লাহ তায়ালা কতগুলো সীমা নির্ধারিত করেছেন। পর্দা, পুরুষের কর্তৃত্ব ও তত্ত্বাবধানের অধিকার,স্বামী, স্ত্রী,সন্তান এবং পিতা-মাতার অধিকার, কর্তব্য, তালাকও খোলার নিয়ম, বহু বিবাহের শর্তাধীন অনুমতি,যেনা এবং অমূলক দোষারোপের শাস্তি প্রভৃতি পারিবারিক জীবনের উল্লেখযোগ্য বিধান। এগুলোর সাহয্যে মানুষের পারিবারিক জীবনের চতুর্দিকে সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। মানুষ যদি এ সীমার প্রতি লক্ষ্য রেখে জীবন যাপন করে এবং এর মধ্যে থেকে পারিবারিক জীবন নিয়ন্ত্রিত করে তাহলে যেমন কোন পরিবারই যুলুম-নিপীড়নের জাহান্নাম হতে পারে না, অনুরূপ ভাবে এসব ঘর হতে নারীদের শয়তানী স্বাধীনতার প্রলয়ংকারী তুফানের ও সৃষ্টি হতে পারে না। বতর্মান সময় এই সীমালংঘন করা হচ্ছে বলেই নারী স্বাধীনতার ভূ-কম্পন গোটা মানব সভ্যতাকে ধ্বংস করার কুটিল কটাক্ষ প্রদর্শন করেছে।

এরূপে সভ্যতা ও সামাজিক শৃংখলা সংরক্ষণের জন্য আল্লাহ তায়ালা কেসাসে’র আইন, চোরের জন্য হাত কাটারশাস্তি,মদ্যপান বিধি বহির্ভূত হওয়, শরীরের বিশেষ অঙ্গ আচ্ছাদিত করার বিধান প্রভৃতি কতগুলো স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় আইন প্রণয়ন করে দিয়েছেন। এগুলোর সাহায্যে মানব সমাজের ভাঙ্গন, বিপর্যয় ও আভ্যন্তরীণ অশান্তির দ্বার চিরতরে রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে।

আল্লাহর নির্ধারিত সীমাগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা পেশ করা এবং মানব জীবনের ভারসাম্য ও সামঞ্জস্য রক্ষার ব্যাপারে এর প্রত্যেকটির কার্যকারিতা ও অনিবার্যতার সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ পেশ করা এখানে আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এখানে আমি শুধু এতটুকু বলতে চাই যে, আল্লাহ তায়ালা মানুষকে উল্লেখিত রুপে একটি স্থায়ী, অটলও অপরিবর্তনীয় সংবিধান (Constitution) রচনা করে দিয়েছেন। এটা মানুষের স্বাধীনতার মূল ভাবধারা এবং বুদ্ধি বিবেক ও চিন্তার স্বাধীনতা মোটেই হরণ করে না। এটা মানুষের জীবন যাপনের জন্য একটি সরল, পরিচ্ছন্ন সুস্পষ্ট ও ঋজু রাজপথ রচনা করে দিয়েছে। এ পথ অবলম্বন করে চললে মানুষকে নিজেদের স্বাভাবিক অজ্ঞতা ও দুর্বলতার দরুন ধ্বংসের মুখে নিক্ষিপ্ত হতে হবে না, তার আভ্যন্তরীণ শক্তি, সামর্থ ও যোগ্যতা ভুল ও অন্যায় পথে প্রযুক্ত হয়ে ব্যর্থ হবে না। বস্তুত আল্লাহর নির্ধারিত এই একটানা পথে অগ্রসর হলেই মানুষের পক্ষে প্রকৃত কল্যাণ ও প্রগতি লাভ করা সম্ভব। পর্বত শৃংগের চড়াই উতরাই পথের একদিকে থাকে গভীর খাদ আর অপরদিকে উন্নত সমতল ভূমি। এ পথের শেষ প্রান্তকে নানাভাবে চিহ্নিত করা হয়। কেননা এই চিহ্ন না থাকলে পথিকের পক্ষে ভুল এবং নিমিষের সামান্য ভুলের ফলে অতল গহবরে নিপতিত হওয়ার পূর্ণ আশঙ্কা আছে। কিন্তু এরূপ সীমা নির্ধরণের দ্বারা মানুষের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে বলে মনে করার কোনই কারণ আছে কি? বস্তুত ধ্বংসের কবল হতে রক্ষা করা, পথের প্রত্যেক মোড় ও প্রত্যেক সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করাই এর উদ্দেশ্য। পথের প্রত্যেক বাঁকে এসেই তা পথের দিক নিদের্শ করে।বলে তোমার পথ এদিকে নয়, ওদিকে। এদিকে না দিয়ে ঐদিকেই তোমাকে যেতে হবে, এর ফলেই নিরাপদে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হওয়া পথিকের পক্ষে সম্ভব হতে পারে। অনুরূপভাবে আল্লাহ প্রদত্ত শাসনতন্ত্রে নির্ধারিত সীমার উদ্দেশ্যেও ঠিক তাই। চিহসমূহই মানুষের জীবন পথের সঠিক দিক নির্দেশ করে। প্রত্যেক জটিল ও বন্ধুর স্থানে পথের প্রত্যেক বাকে এবং প্রত্যেক চৌমাথায় সীমা নিদের্শ করে মানুষকে শান্তি এবং কল্যাণের দিকে পরিচালিত করে। কোন দিকে চলা উচিত, কোন দিকে নয়, তা সন্দেহাতীতরূপে বলে দেয়।

উপরে বলেছি, আল্লাহর নির্ধারিত সংবিধান অটল ও অপরিবর্তনীয়। তুরস্ক এবং ইরানের অধিবাসীদের ন্যায় এই সংবিধান সম্পূর্ণত বাতিল করা এবং এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা মানুষের ইচ্ছাধীন; কিন্তু একে  পরিবর্তন করার, এতে সামান্য রদবদল করার অধিকার কারো নেই। অন্তিম কাল পর্যন্ত এটা অটল ও অপরিবর্তনীয় সংবিধান। যখনই এবং যেখানেই ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম হবে, এটাই হবে তার মূল গঠনতন্ত্র। কুরআন এবং সুন্নাতে রাসূল দুনিয়াতে যতদিন টিকে আছে, ততদিন এই গঠনতন্ত্রের একটি ধারা ও স্থানচ্যুত বা পরিবতির্ত হতে পারেন না। মুসলমান হিসেবে জীবন যাপন করতে হলে আল্লাহর দেয়া এই সংবিধান অনুসরণ করে চলতে প্রত্যেকেই বাধ্য।

ইসলামী রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য

ইসলমের এই শাসন সংবিধান অনুযায়ী যে রাষ্ট্র প্রতিষ্টিত হবে আল্লাহ তায়ালা তার একটি উদ্দেশ্য ও নির্ধারিত করে দিয়েছেন। কুরআন পাকের কয়েক স্থনেই এই উদ্দেশ্যের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে:

 لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ ۖ وَأَنزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ

আমি আমার নবীদেরকে সুস্পষ্ট বিধানসহ প্রেরণ করেছি। কিতাব এবং মিযান ও তাদেরকে আমি দান করেছি। এর সাহয্যে মানুষ সুবিচার এবং ইনসাফ কায়েম করতে পারবে। আমি লৌহ ও দিয়েছি। এতে বিরাট শক্তি এবং মানবের অশেষ কল্যাণ নিহিত রয়েছে। (হাদিসঃ ২৫)

আয়াতে উল্লেখিত লৌহ অর্থ রাষ্টশক্তি বা (Coercive Power)এখানে বলা হয়েছে যে,আল্লাহ প্রদত্ত সুস্পষ্ট বিধান এবং তাঁর কিতাবে যে মীযান দান করা হয়েছে -যে সঠিক ও ভারসাম্যযুক্ত (Well Balanced) জীবন ব্যবস্থা দেয়া হয়েছে, সেই অনুসারে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং সামাজিক সুবিচার (Social Justice)কায়েম করাই আম্বিয়ায়ে কিরামের একমাত্র কাজ। অন্যত্র বলা হয়েছেঃ

 الَّذِينَ إِن مَّكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنكَرِ ۗ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ

এদেরকে আমি যদি পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা এবং রাজশক্তি দান করি, তাহলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দিবে ভাল ও কল্যাণকর কাজ করবে এবং অন্যায় ও পাপ কাজ হতে মানুষকে বিরত রাখবে। (সূরা আল হজ্জঃ ৪১)

অন্য আর এক স্থানে বলা হয়েছেঃ

 كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ ۗ

-তোমরা সবচেয়ে উত্তম জাতি, নিখিল মানুষের কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যেই তোমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নিদের্শ দিবে, অন্যায় ও পাপ কাজ হতে লোকদেরকে বিরত রাখবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখবে। (সূরা আলে ইমরান:১১০)

এ আয়াতগুলো সম্পর্কে চিন্তা করলে সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয় যে, কুরআনের পরিকল্পিত রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে নেতিবাচক (Negative) নয়, এর সম্মুখে এক যথার্থ (Positive) উদ্দেশ্যে বর্তমান রয়েছে। মানুষকে পরস্পরের যুলুম নিপীড়ন হতে মুক্তি দেয়া তাদের স্বাধীনতা সংরক্ষণ এবং দেশকে বহিরাক্রমণ হতে রক্ষা করাই এর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য নয়। আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী সামাজিক সুবিচারের সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করাও এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। আল্লাহর সুস্পষ্ট বিধান নির্ধারিত পাপের সমস্ত উৎস ও উপায় বন্ধ করা এবং পুণ্য ও কল্যাণময় সকল পথ উন্মুক্ত করাই এর উদ্দেশ্য। এ জন্য স্থান এবং পরিস্থিতি বিশেষ রাষ্ট্র শক্তির প্রয়োগ করা চলবে। প্রচার প্রপাগাণ্ডা করা হবে। সামাজিক শিক্ষা ও দীক্ষাদানের বহুবিধ উপায়ও অবলম্বিত হবে। সামাজিক প্রভাব এবং জনমতের চাপও এ জন্য প্রযুক্ত হবে।

সার্বাত্মক রাষ্ট্র

এ ধরনের রাষ্ট্র যে নিজের কর্মক্ষেত্রে ও প্রভাব পরিসরবে সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ করতে পারে না, তা বলাই বাহুল্য। মূলত এটা সর্বাত্মক রাষ্ট্রব্যবস্থা সকল মানুষকে এবং মানুষের গোটা জীবনকে এটা নিজ প্রভাবাধীন করে নেয়। সমাজ ও সংস্কৃতির প্রত্যেকটি দিক ও বিভাগকে এটা স্বীয় বিশিষ্ট নৈতিক দৃষ্টিভংগী এবং সংস্কার মূলক কর্মসূচী অনুসারে গঠন করে। এরূপ রাষ্ট্রের অধীন কোন মানুষ জীবনের কোন একটি ব্যাপারকেও ব্যক্তিগত বলে ঘোষণা করতে পারে না। এই হিসেবে ইসলামী রাষ্ট্র ফ্যাসিষ্ট অথবা কমিউনিষ্ট রাষ্ট্রের প্রায় অনুরূপ। কিন্তু সর্বাত্মক হওয়া সত্ত্বেও বতর্মান যুগের একনায়কত্ত্বমূলক(Totalitarian)ও স্বৈরাচারী(Autharitarian)রাষ্ট্রসমুহের সাথে এর কোনই সামঞ্জস্য নেই। ইসলামী রাষ্ট্রে ব্যাক্তি স্বাধীনতা কখনই হরণ করা যেতে পারে না। ডিকটেটরশীপেরও নামগন্ধ এতে নেই। এ ব্যাপারে ইসলামী রাষ্ট্রনীতিতে যে পরিপূর্ণ সুবিচার ও সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং হক ও বাতিলের মধ্যে যে সূক্ষ্ম সীমানা নির্ধারিত হয়েছে তা দেখে প্রত্যেকটি সত্যানুসন্ধিৎসু (সত্যের সন্ধানি) মন সাক্ষ্য দেবে যে, এরূপ সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা রচনা করা আল্লাহ ছাড়া আর কারো পক্ষেই সম্ভব নয়।

দলীয় এবং আদর্শ ভিত্তিক রাষ্ট্র

ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধান, এর উদ্দেশ্য এবং সংস্কার মূলক রূপ সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করলে নিসন্দেহে জানা যায় যে, এ ধরনের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা সকলের পক্ষে সম্ভব নয়। ইসলামী রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যকে যারা নিজেদের জীবনের উদ্দেশ্য রূপে গ্রহণ করেছে, যারা ইসলামী রাষ্ট্রের সংস্কারমূলক কার্যক্রমের কেবল সমর্থকই নয়-এর প্রতি কেবল  পরিপূর্ণ বিশ্বাসই স্থাপন করেনি; বরং অন্তর্নিহিত স্বতস্ফুঃর্ত ভাবধারা এবং এর দূরবর্তী খুটিনাটি বিষয় সম্পর্কে ও যারা সম্পূর্ণ রূপে অভিজ্ঞ; বস্তুত তারাই ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনা করার উপযুক্ত। ইসলাম এ ব্যাপারে ভৌগলিক বর্ণ বা ভাষাগত কোন শর্ত আরোপ করেনি-নির্বিশেষে দুনিয়ার সকল মানুষের সম্মুখেই ইসলমের সংবিবধান, লক্ষ্য এবং সংস্কার মূলক কার্যসূচী উপস্থিত করা হয়েছে। যে ব্যক্তি তা হৃদয় মন দিয়ে গ্রহণ করবে-সে যে বংশের, যে দেশের এবং যে জাতিরই লোক হোক না কেন-তার রাষ্ট্র পরিচালক দলের অর্ন্তভুক্ত হওয়ার পথে কোন বাধা থাকতে পারে না। পক্ষান্তরে যারা তা গ্রহন করবে না,রাষ্ট্র পরিচালকদের কোন কাজেই তাকে শরীক করা যেতে পারে না। ইসলামী রাষ্ট্রের সীমার মধ্যে সে জিম্মি(Subject) হয়ে বাস করতে পারে। ইসলামী রাষ্ট্রে তাদের জান মালের ও ইজ্জত আব্রুর পূর্ণরূপে রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। এছাড়াও রাষ্ট্রীয় কর্ম পরিচালনের ব্যাপারে তাদেরকে কোনই অধিকার দেয়া হয়নি। কারণ এটা একটি আদর্শবাদী রাষ্ট্র। এর পরিচালনা ও নেতৃত্বের দায়িত্ব কেবলতারাই সঠিক রূপে সম্পন্ন করতে পারে যারা সেই আদর্শে বিশ্বাসী ও তার অনুসারী। এদিক দিয়ে ইসলামী রাষ্ট্র ও কমিউনিষ্ট রাষ্ট্রের মধ্যে এক প্রকার সামঞ্জস্য রয়েছে। কিন্তু বিরোধী মতাবলম্বীদের (অ-কমিউনিষ্টদের) প্রতি কমিউনিষ্ট পরিচালিত রাষ্ট্র যেরূপ আচরণ করে থাকে তার সাথে ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমদের প্রতি প্রযোজ্য আচরণের বিন্দুমাত্র সামঞ্জস্য নেই। কমিউনিষ্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সংগে সংগেই এর নিজস্ব মতবাদ ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতিকে অ-কমিউনিষ্টদের উপর জবরদস্তিমূলক পন্থায় চাপিয়ে দেয়া হয়, তা স্বীকার না করলে জায়গা জমি কেড়ে নেয়া হয়, রক্ত পাত ও খুন-জখমেরপ্রচণ্ডতায় ধরিত্রী প্রকম্পিত হয়। লক্ষ লক্ষ মানুষকে পৃথিবীর জাহান্নাম সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত করা হয়। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র অ-মুসলিমদের প্রতি উদার মনোভাব ও সুবিচার মূলক ব্যবহার প্রদর্শন করে থাকে। এ ব্যাপারে ইনসাফ ও যুলুম এবং সততা ও মিথ্যার যে সীমা নির্ধারন করা হয়েছে, তা দেখে প্রত্যেকটি চিন্তাশীল ও সত্যাশ্রয়ী ব্যক্তি তার যথার্থতা এবং অন্তনির্হিত সৌন্দর্যও যৌক্তিকতা নিসন্দেহে স্বীকার করবে। প্রত্যেকটি লোক অনুধাবন করতে পারবে যে, মানুষকে কল্যাণ পথের সন্ধান দেয়ার জন্য আল্লাহর তরফ হতে যে সংস্কারক আবির্ভূত হন, তার আদর্শ কর্মনীতি এবং দুনিয়ার কৃত্রিম ও কপট সংস্কারকদের (?) কর্মপন্থার  মধ্যে আসমান যমীন পাথর্ক্য রয়েছে।

খেলাফত

অতপর আমি ইসলামী রাষ্ট্রের গঠন পদ্ধতি ও কর্মনীতির সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাদানের চেষ্টা করব। ইসলামী আদর্শ অনুযায়ী সার্বভৌম প্রভুত্বের অধিকারী ও আইন রচয়িতা একমাত্র আল্লাহ তায়ালা একথা ইতি পূর্বে বলা হয়েছে। বস্তুত এটাই হচ্ছে ইসলামী মতাদর্শের মূলনীতি। দুনিয়াতে আল্লাহ প্রদত্ত আইন ও জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে যারা সচেষ্ট হবেন,এই মূলনীতির দৃষ্টিতে তাদের মর্যাদা নির্ধারণ করতে হবে। একটু চিন্তু করলেই নিসন্দেহে বুঝতে পারা যায় যে, ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠা প্রয়াসী মানুষ। প্রকৃত সার্বভৌম প্রভু’ আল্লাহ তায়ালার প্রতিনিধিত্বের মর্যাদাই লাভ করতে পারেন, অন্য কিছুনয়।ঠিক এ জন্যই ইসলামও তাকে এই খেলফত বা প্রতিনিধিত্বের মর্যাদা দান করেছে, কুরআন মাজীদে বল হয়েছেঃ

  وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ

অর্থাৎ তোমাদের মধ্যে ঈমানদার ও তদনুযায়ী সৎকর্মশীল লোকদের নিকট আল্লাহ এই ওয়াদা করেছেন যে, তিনি তাদেরকে দুনিয়াতে ‘খলীফা’ বা প্রতিনিধি নিযুক্ত করবেন, তাদের পূর্ববর্তী লোকদের যেরূপ এই মর্যাদা দেয়া হয়েছিল। (সূরা আন নূর:৫৫)

ইসলামের রাষ্ট্র-দর্শনের উপর এ আয়াতটি সুস্পষ্টরূপে আলোক পাত করছে। এতে দুটি মূলতত্ত্বের প্রতি ইংগিত করা হয়েছে।

প্রথমতঃ ইসলম মানুষকে প্রভুত্বের (Rulership) পরিবর্তে খেলাফতের (Viceregency) অধিকার দান করেছে এবং অনুরূপ পরিভাষা ব্যবাহার করেছে। কারণ ইসলামী আদর্শে প্রভুত্ব ও আইন রচনার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্য সুরক্ষিত। অতএব ইসলামী গণতন্ত্র অনুযায়ী যারাই দুনিয়ায় শাসনকার্য চালাবেন, তারা অনিবার্যরূপে উচ্চতর প্রভুর (আল্লাহর)প্রতিনিধিই (Viceregent) হবেন, তারা মানুষের জীবন ও রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যাপারে আল্লাহর প্রদত্ত অধিকার ও ইখতিয়ার (Delegate Power) প্রয়োগ করতে পারবেন। দ্বিতীয়ত খলীফা নিযুক্ত করার প্রতিশ্রুতি সমগ্র মুমিনদের প্রতিই দেয়া হয়েছে। উক্ত আয়াতে এরূপ বলা হয়নি। এটা হতে প্রমাণিত হয় যে, মূলত প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তিই আল্লাহর প্রতিনিধি-খলীফা। আল্লাহর তরফ হতে মু‘মিনদের যে খিলাফত দান করা হয়েছে, তা সার্বজনীন খিলাফত (Popular Vice regency), কোন ব্যক্তি,পরিবার,গোত্র,কিংবা শ্রেণীবিশেষের জন্য এটা নির্দিষ্ট ও সুরক্ষিত নয়। প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তি এককভাবে আল্লাহর খলীফা। এ জন্য প্রত্যেক খলীফা ব্যক্তি গত ভাবেও আল্লাহর নিকট দায়ী।

নবী করীম (সাঃ)বলেছেন:

 كلهم راع وكلكم مسؤل عن رعيته

অর্থাৎ তোমাদের প্রত্যেক ব্যক্তিই দায়িত্বসম্পন্ন এবং তোমাদের প্রত্যেককেই আল্লাহর নিকট নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে।

আর খলীফা হওয়ার দিক দিয়ে মানুষের পরস্পরের মধ্যে তারতম্য, পার্থক্য,কোন প্রকার বড় ছোট বা উচু নীচু নেই।

ইসলামী গণতন্ত্রের স্বরূপ

ইসলামী রাজনীতিতে গণতন্ত্রের এটাই মূল ভিত্তি। সার্বজনীন খিলাফতের উল্লিখিত ধারণার বিশ্লেষণ করলে অনিবার্যরূপে নিম্নলিখিত ফল পরিলক্ষিত হবে।

একঃ ইসলামী সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তি আল্লাহর ‘খলীফা’ হবে, খিলাফতের দায়িত্ব পালনে তারা সকলেই সমানভাবে শরীক হবে, এ জন্যই উক্ত সমাজে শ্রেণীবিভেদ, জন্মগত বা সামাজিক বৈষম্য ও পার্থকের বিন্দুমাত্র অবকাশ থকতে পারে না প্রতেক ব্যক্তিই সমান মর্যাদা ও সমান সম্মানের অধিকারী। অবশ্য ব্যক্তিগত যোগ্যতা ওস্বভাব প্রকৃতির শ্রেষ্ঠত্বের ভিক্তিতে কারো বৈশিষ্ট্য প্রতিপন্ন হতে পারে হযরত নবী করীম (সাঃ) একথাই সুস্পষ্ট করে নিম্নলিখিত হাদীসেঃ

কারো উপর কারো কোন শ্রেষ্ঠত্ব বা বৈশিষ্ট্য নেই তা প্রতিপন্ন হতে পারে একমাএ দ্বীন ইসলাম সম্পর্কিত জ্ঞান,কর্ম ও তকওয়ার কম বেশির কারণে সব মানুষই আদমের সন্তান আর আদম মাটি হতে সৃষ্ট আরববাসীর অনারবের উপর কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই আনারবদেরও কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই আরববাসীদের উপর তদনুরুপ শ্বেতাংগের কৃষ্ণাংগের উপর এবং কৃষ্ণাংগেরও শ্রেতাংগের উপর কোন শ্রেষ্ঠত্ব বা বৈশিষ্ট্য নেই। …….. কারো শ্রেষ্টত্ব স্বীকার হতে পারে একমাত্র তাকওয়ার কারণে।

মক্কা বিজয়ের ফলে সমগ্র আরব দেশ ইসলামী রাষ্ট্রের অর্ন্তভুক্ত হলে পরে বিশ্বনবী (সাঃ)তার বংশ বা গোত্রের লোকদের -তদানীন্তন আরব দেশের ব্রাক্ষণদের সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ

  يا معشر قريش ان الله قد اذهب عنكم نخوة الجاهلية و

تعظمها الاباء ايها الناس كلهم من ادم وادم من تراب ـ لافخر للانسان ـ  لافضل للعربئ علئ العجمئ ولا للمجمئ علئ العربئ ان اكرمكم عند الله اتقاكم ـ

অর্থাৎ হে কুরাইশগন! আল্লাহ তোমাদের আধাঁর যুগের গৌরব, অহংকার এবং বংশীয় আভিজাত্র দূর  করে দিয়েছেন।হে মানুষ! তোমরা সকলেই আদমের সন্তান। আর আদম মাটি হতে তৈরী। বংশীয় গৌরবের কোন অবকাশ নেই। অনারবদের উপর আরবদের এবং আরবদের উপর অনারবদের কোনই শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বেশি  মুত্তাকী ব্যক্তিই তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্মানিত।

দুইঃ ইসলামী সমাজে কোন ব্যক্তি বা দলের জন্মগত সামাজিক মর্যাদা (Social Status)কিংবা পরিগৃহীত পেশার দিক দিয়ে কারো জন্য কোন যোগ্যতা প্রতিভার স্ফুরণ এবং ব্যক্তিত্বের ক্রমবিকাশ সাধনের পথে কোনরূপ বাধা সৃষ্টি করা যেতে পারে না। সমাজের অন্যান্য সকলের ন্যায় উন্নতি লাভের সবল সুযোগ সুবিধা প্রত্যেক মানুষই সমান ভাবে লাভ করতে পারবে। প্রত্যেক ব্যক্তিই স্বাভাবিক শক্তি, যোগ্যতা ও প্রতিভার বলে উন্নতি লাভের সকল দুয়ারেই সকলের জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত থাকবে। কেউ কারো অগ্রগতি ও ক্রমবিকাশের পথে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করতে পারবে না। ইসলামী আদর্শে এই অবাধ সুযোগ লাভের ব্যবস্থা পরিপূর্ণরূপে বর্তমান রয়েছে। ইসলামী সমাজে দাস ও দাস পুত্রকেও সামরিক অফিসার এবং প্রাদেশিক গভর্ণর পযর্ন্ত নিযুক্ত করা হয়েছে। আর বড় বড় অভিজাত বংশের নেতৃস্থানীয় লোকগণ তাদের নেতৃত্ব মেনে নিয়েছেন, তাদের আনুগত্য স্বীকার করেছেন। চামড়ার জুতা সেলাই করতে করতে উঠে নেতৃত্বের উচ্চতম আসনে আসীন হলো-ইসলামের ইতিহাসে এরূপ ঘটনা মোটেই বিরল নয়। অসংখ্য তাঁতী ও বস্ত্রব্যবসায়ী দেশের কাযী,মুফতী ও ফেকাহ্ শাস্ত্রের ব্যাখ্যা (ফকীহ) হওয়ার সুযোগ লাভ করেছেন। আজ তারা ইসলামের ইতিহাসে মহান ব্যক্তিদের মধ্যে পরিগণিত হচ্ছেন।

হযরত নবী করীম (সাঃ) এরশদ করেছেনঃ

  اسمعوا واطيعوا ولو استعمل عليكم عبد حبشئ

অর্থাৎ কোন হাবশী গোলামকেও যদি তোমাদের নেতা নিযুক্ত করা হয়, তবে তার ও আদেশ পালন কর ও আনুগত্য স্বীকার কর।

তিনঃ ইসলামী আাদর্শে গঠিত সমাজে কোন ব্যক্তি বা দলের (Group) পক্ষে ডিকটেটর হয়ে বসার বিন্দুমাত্র সুযোগ থাকতে পারে না। এ সমাজে প্রত্যেক ব্যক্তিই আল্লাহর খলীফা। জনগণের খেলাফত অধিকারকে হরণ করে নিরংকুশ প্রভু ও হর্তাকর্তা হয়ে বসা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। সামাজিক শাসন ও শৃংখলা স্থাপনের জন্যই ইসলামী সমাজের প্রত্যেক নাগরিক ইসলামী বিশেষের অনুযায়ী প্রত্যেক খলীফা নিজ নিজ খেলাফত অধিকার যখন ব্যক্তি বিশেষের মধ্যে শাসনকর্তা।

অতএব একদিকে সে আল্লাহর নিকট দায়ী হয়, অন্যদিকে হয় জনগণের নিকট। কারণ, তারাই নিজ নিজ খেলাফত অধিকার এর হতে অর্পণ করেছে বলেই তার পক্ষে শাসক হওয়া সম্ভব হয়েছে এমতাবস্থায় সে(নির্বাচিত) খলীফা না হয়ে পরস্বাপহরণকারীর ভূমিকাই গ্রহণ করে। কারণ, ডিকটেটর পদের সার্বজনীন খেলাফত সম্পূর্ণ রূপে নির্মূল হয়ে যায়। ইসলামী রাষ্ট্র যে একটি সর্বাত্মক রাষ্ট্র তাতে বিন্দমাত্র সন্দেহ নেই। ইসলামী জীবনের সমগ্র দিক ও বিভাগই এর প্রভাবধীন হয়ে থাকে। ইসলামী রাষ্ট্রের নায়কগণ যে আইন জারী করে,বস্তুত তাই হচ্ছে সর্বাত্মক সর্ব ব্যাপক। আর ইসলামী রাষ্ট্রের সর্বাত্মক হওয়ার এটাই মূল ভিত্তি। আল্লাহ মানব জীবনের প্রত্যেক দিক ও বিভাগের জন্য যে ব্যবস্থা দান করেছেন, তা অনিবার্যরূপে পরিপূর্ন ব্যাপকতার সাথেই কার্যকরী হবে। আল্লাহ প্রদত্ত এই বিধান পরিত্যাগ করে ইসলামী রাষ্ট্রনায়কগণ নিজেদের ইচ্ছা অনুসারে নিয়ম শৃংখলাবদ্ধ রাষ্ট্রব্যবস্থা (Regimentation) প্রণয়নের হস্তক্ষেপ করতে পারে না। তারা বিশেষ কোন কর্য বা জীবিকা গ্রহণের জন্য, বিশেষ কোন জীবিকা হতে বিরত থাকার জন্য বিশেষ কোন বিষয়ে শিক্ষা লাভ করার জন্য, বিশেষ কোন শিক্ষা লাভ না করার জন্য ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকদের বাধ্য করতে পারে না। রুশ,জার্মানী এবং ইটালীর ডিকটেটরগণ নিজেদের আমলে যেসব কর্তৃত্ব নিজ হস্তে গ্রহণ করেছে কিংবা কামাল আতাতুর্ক তুরস্কে যে ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে, ইসলামী রাষ্ট্রের আমীরকে(রাষ্ট্রপতি) অনুরূপ অধিকার ও কর্তৃত্ব দেয়নি। এ ছাড়া লক্ষণীয় বিষয় এই যে, ইসলামী সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তিই ব্যাক্তিগত ভাবে আল্লাহর নিকট দায়ী। এই ব্যক্তিগত দায়িত্ব(Personal Responsibility) পালনের কাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এ ব্যাপারে কেউ কারো অংশীদার নয়।এ জন্য আইনের সীমার মধ্যে স্বাধীনতা থাকা আবশ্যক। প্রত্যেক নগিরিক যেন নিজ ইচ্ছামত কোন পথ গ্রহণ করতে পারে এবং নিজের প্রবণতা অনুসারে উন্নতি লাভ করার জন্য নিজ শক্তি প্রয়োগ করার সুযোগ পায়। আমীর কারো জীবন পথে কোন দিক দিয়েই বিন্দুমাত্র প্রতিবন্ধকতা বা নিয়ন্ত্রণ সৃষ্টি করলে সে যালেম নামে অভিহিত হবে এবং এরূপ যুলুমের জন্য তাকে আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে। ঠিক এ জন্যই হযরত নবী(সাঃ)এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের এ ধরনের কোন নিয়ন্ত্রণের অস্তিত্ব পর্যন্ত ছিল না।

চারঃ ইসলামী সমাজের নারী পুরুষ -প্রত্যেক বয়স্ক ও সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন মুসলামানই ভোট দেয়ার অধিকার পাবে। কারণ, এরা প্রত্যেকেই আল্লাহ প্রদত্ত খেলাফতের অধিকারী। এই খেলাফতের প্রয়োগের ব্যাপারে, আল্লাহ তায়ালা বিদ্যা শিক্ষা বা ধন সম্পত্তির কোন নিদির্ষ্ট মানের শর্ত আরোপ করেন নি। ঈমান এবং তদনুযায়ী সৎকর্মশীলতাই ভোটাধিকারের মাপকাঠি, অতএব ভোটদানের ব্যাপারে সকল মুসলমান সমান মর্যাদার অধিকারী।

ব্যক্তিতন্ত্র ও সমষ্টিতন্ত্রের মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপন

ইসলাম একদিকে পরিপূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে, অন্যদিকে যে ব্যক্তিতন্ত্র (Individualism) সমাজ জীবনের প্রতিবন্ধক তারও মূলোচ্ছেদ করেছে। ইসলমে ব্যক্তি ও সমাজের পারস্পারিক সম্পর্কিত সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে স্থাপিত করা হয়েছে।এতে কমিউনিজম ও ফ্যাসীবাদের ন্যায় ব্যক্তির স্বাতন্ত্র সমাজ গর্ভে বিলীন করে দেয়া হয়নি; পক্ষান্তরে পাশ্চাত্যের বলগাহারা গণতন্ত্রের ন্যায় ব্যক্তিকে তার সীমালংঘন করে সমাজ স্বার্থে আঘাত হানার ও অবকাশ দেয়া হয়নি। বস্তুত ইসলামের সমষ্টিগত জীবনের উদ্দেশ্যে যা তাই হচ্ছে ব্যক্তি জীবনের লক্ষ্য। আর তা হতে আল্লাহর আইনের প্রতিষ্ঠা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ। উপরন্তু ইসলমে ব্যক্তির অধিকারসমূহ যথাযথভাবে সুরক্ষিত করার পর সমষ্টির জন্য বিশেষ কর্তব্য তার উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে ব্যষ্টিবাদ ও সমষ্টিবাদের মধ্যে পরিপূর্ণ সামঞ্জস্য স্থাপিত হয়েছে। এতে ব্যক্তি তার প্রাকৃতিক শক্তিসমূহের উৎকর্য সাধনের পূর্ণ সুযোগ লাভ করতে পারে এবং সেই সংগে নিজের উৎকর্ষলব্ধ শক্তিসমূহের দ্বারা সমষ্টিরও বৃহত্তর কল্যাণ ও মঙ্গল সাধনের ব্যাপারে সাহায্যকারী হতে পারে।

মূলত বিষয়টি বিস্তারিত আলাচনা সাপেক্ষ; কিন্তু এখানে তার অবকাশ নেই। ইসলামী গণতন্ত্রের পূর্বোক্ত বিশ্লেষণ হতে পাঠকদের মনে যে ভুল ধারণার সৃষ্টি হতে পারে, তার পথ বন্ধ করাইএ সংক্ষিপ্ত ও প্রাসংগিক আলোচনার একমাত্র কারণ।

ইসলামী রাষ্ট্রের সংগঠন

সার্বজনীন খিলাফতের যে ব্যাখ্যা আমি করেছি, তদৃষ্টে ইসলামী রাষ্ট্রের ইমাম বা রাষ্ট্রপতির মর্যাদা কি হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। স্বতন্ত্রভাবে প্রত্যেক মুসলমান আল্লাহ প্রদত্ত যে খিলাফত লাভ করেছে, এর প্রয়োগ ক্ষমতা সে নিজ সমাজ হতে এক উত্তম ব্যক্তিকে নির্বাচিত করে স্বেচ্ছায় তার নিকট আমানত রাখে মাত্র। বস্তুত ইসলামী সমাজে খলীফার এতদপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কোন মর্যাদা বা অধিকার নেই। তাকে যে খলীফা নামে অভিহিত করা হয় তার অর্থ এই নয় যে, তিনি একাই আল্লাহর খলীফ। বরং সর্বসাধারণ মুসলমানের স্বতন্ত্র খিলাফত তাতে সমন্বিত ও কেন্দ্রীভূত হয়েছে বলেই তাকে খলীফা বলা হয় মাত্র। উপসংহারে ইসলামের রাষ্ট্রীয় আদর্শের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতে চাই। আশা করি এ আলোচনার ফলে ইসলামী রাষ্ট্র সম্পর্কে পাঠকদের মনে সুস্পষ্ট ধারণার সৃষ্টি হবে।

একঃ ইসলামী রাষ্ট্রের রষ্ট্রপতি নির্বাচন হবেঃ

  إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ ۚ

অর্থাৎ তোমাদের মধ্যে সর্বপেক্ষা আল্লাহভীরু ব্যক্তিই তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী সম্মানার্হ (সূরা হুজুরাতঃ ১৩)

এ মূলনীতি অনুযায়ী। অন্য কথায়, যারা নৈতিক চরিত্র ইত্যাদির উপর মুসলিম জনগণের পূর্ণ আস্থা থাকবে, রাষ্ট্রপতি পদের জন্য কেবল তাকেই নির্বাচিত করা হবে এবং নির্বাচিত হওয়ার পর ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার পরিপূর্ণ কর্তৃত্ব ও অধিকার তারই হবে। তার উপর নিসংকোচে আস্থা স্থাপন করতে হবে, ভরসা করতে হবে।

তিনি যতদিন পর্যন্ত আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য স্বীকার করে তাদের প্রদত্ত শিক্ষা অনুসরণ করে চলবেন, ততদিন তার আনুগত্য স্বীকার করা প্রত্যেকটি নাগরিকের পক্ষে অবশ্য কর্তব্য।

দুইঃ আমীর (রাষ্ট্রপতি) সমালোচনার উর্ধে নয়। প্রত্যেক মুসলমানই তার সমালোচনা করতে পারবে। কেবল তার সামাজিক কাজকর্ম সম্বন্ধেই সমালোচনা করা যাবে তা নয়’ তার ব্যাক্তিগত (Private) জীবন সম্পর্কেও সমালোচনা করার অধিকার প্রত্যেকের রয়েছে। (প্রয়োজন হলে) আমীরকে পদচ্যুত ও করা যাবে। আইনের চোখে তার মর্যাদা সাধারণ নাগরিকদের সমান হবে, তার বিরুদ্ধে আদালতে মকদ্দমা দায়ের করা যেতে পারে এবং আদলতে তিনি কোন বৈষম্যমূলক মার্যাদা পাবার অধিকার হবেন না।

তিনঃ আমীর পরামর্শ করে কাজ করতে বাধ্য থাকবেন।সে জন্য একটি মজলিশে শুরা বা পার্লামেন্ট গঠন করতে হবে।মজলিশে শুরার প্রতি জনগণের অবিচল আস্থা থাকা বাঞ্চনীয়। এজন্য শুরার সদস্যগণকে মুসলিম নাগরিকদের ভোটে নির্বাচিত করা শরীয়াতের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ নয়, যদিও খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে জনগণের ভোটে শুরার সদস্যনির্বাচনের কোন উদাহরণ পাওয়া যায় না।

চারঃ শুরার ফায়সালা সাধারণত সংখ্যাধিক্যকে সত্যের মাপকাঠি বলে স্বীকার করে না।

 قُل لَّا يَسْتَوِي الْخَبِيثُ وَالطَّيِّبُ وَلَوْ أَعْجَبَكَ كَثْرَةُ الْخَبِيثِ ۚ

অর্থাৎ পংকিল-কদর্য ও পবিত্র এ দুটি জিনিস কখনো সমান হতে পারে না পংকিলের সংখ্যাধিক্য তোমাকে স্তস্তিত করে দিলেও নয়। (সূরা আল মায়েদাঃ ১০০)

এক ব্যক্তির রায় গোটা মজলিশে শুরার মিলিত মতের বিপরীত হওয়ায়ও তা সত্য এবং সঠিক হতে পারে, ইসলামে তার পূর্ণ অবকাশ রয়েছে। অতএব এক ব্যক্তির রায় যদি সত্য হয়,তবে একাট বিরাট দল তার সমর্থক নয় বলেই তার রায় বর্জিত হবে ইসলাম একথা কিছুতেই স্বীকার করে না।অতএব আমির মজলিশের সংখ্যাধিক্যের না সংখ্যালঘুর রায় সমর্থন করবেন, তা পুরো পুরি তারই ইচ্ছাধীন। এমন কি ইসলমী রাষ্ট্রের আমীর গোটা মজলিশের মিলিত রায় অস্বীকার করে নিজের মতের ভিত্তিতে কোন ফায়সালা গ্রহণ করার পূর্ণ অীধকারী হবেন। কিন্তু এসব ব্যাপারেই আমীর তার বিশাল ক্ষমতা ও ইখতিয়ারকে কিভাবে প্রয়োগ করছেন তাকওয়া ও আল্লাহভীতি সহকারে, না খামখেয়ালী ও স্বেচ্ছাচারিতার বশবর্তী হয়ে রাষ্ট্রর জনসাধারণ তা সতর্ক দৃষ্টিতে লক্ষ্য করবে।শেষোক্ত অবস্থা পরিলক্ষিত হলে জনগণের অভিমত ক্রমে এমন আমীরের পদচ্যূত হওয়ার পথে কোনই বাধা থাকতে পারে না।

পাঁচঃ  এমারত (রাষ্ট্রপতিত্ত্ব) কিংবা মজলিশে শুরার সদস্য পদ অথবা অন্য কোন দায়িত্বপূর্ণ  পদে এমন ব্যক্তিকে নির্বাচিত বা নিযুক্ত করা যেতে পারে না, যে ব্যক্তি এর প্রার্থী কিংবা তা লাভ করার জন্য কোন না কোন প্রকার চেষ্টা করবে। ইসলামে পদপ্রার্থী হওয়ার প্রথা(Candidature) মোটেই সমর্থনযোগ্য নয়। এমন কি নিজের জন্য নির্বচন প্রোপাগান্ডার অভিযান চালাবারও কোন অবকাশ ইসলামী হুকুমাতে নেই। প্রাথীকে কোন পদ দেয়া হবে না। নবী করীম (সাঃ) এর এটা সুস্পষ্ট নির্দেশ। একটি নির্দিষ্ট পদের জন্য একাধিক ব্যক্তি প্রার্থী হয়ে দাঁড়াবে, এক অন্যের বিরুদ্ধে কাদা ছোঁড়াছুড়ি করবে, পোস্টার,  হ্যান্ডবিল সভা সম্মেলন এবং সংবাদপত্র ও যাবতীয় প্রচারণার হাতিয়ার ব্যবহার করে সাধারণ ভোটারকে প্রতারিত ও বিভ্রান্ত করবে, মিঠাই শিরণী পোলাও কোর্মা বিতরণ করা হবে, মোটেরে চড়ে ভোটদাতাদের বাড়ী বাড়ী ছুটোছুটি করবে এসব কদর্য কার্যক্রম ইসলাম কখনই বরদাশত করতে পারে না। কারণ এর ফলে কেবল তারাই নির্বাচিত হওয়া তো দূরের কথা আদালতে এদেরকে অভিযুক্ত করা হবে।

ছয়ঃ ইসলামী রাষ্ট্রের মজলিশে শুরার পার্টি প্রথার অবকাশ নেই। শুরার অভ্যন্তরে প্রত্যক সদস্যই স্বতস্ত্রভাবে থাকবে এবং সত্যের স্বপক্ষে ভোট দেবে অভিমত প্রকাশ করবে। কোন সদস্য সকল সময় এবং সকল অবস্থায় নির্দিষ্ট কোন দলের সমর্থন করবে তারা ন্যায় করুক, কি অন্যায় করুক, তার কোন বিচার করবে না ইসলামী হুকুমাতে এরূপ কার্যকলাপের অবকাশ নেই। বস্তুত ইসলামী আদর্শ এর সম্পূর্ণ বিপরীত। যারা সত্যের অনুসারী বলে বিবেচিত হবে, তাকেই সমর্থন করতে হবে। ফলে আজ যাকে সত্যাশ্রয়ী মনে বিরোধী মনে হলে তার বিরুদ্ধোচরণ করা হবে। এটাই হচ্ছে ইসলামী আদর্শের কর্মনীতি ও ভাবধারা।

সাতঃ ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিচার বিভাগাকে শাসন বিভাগের প্রভাব হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করার নিদের্শ রয়েছে। আল্লাহর আইনকে তার বান্দাহদের উপর জারী করাই হচ্ছে বিচারকের কাজ। তিনি আদলতের আসনে আমীর বা খলীফার প্রতিনিধি হয়ে বসবেন না, বস্তুত তিনি আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবেই তথায় আসীন হবেন।অতএব আদালতের সীমার মধ্য স্বয়ং খলীফার পদমর্যাদারও কোন গুরুত্ব থাকবে না। ইসলামী রাষ্ট্রের অধীন কোন ব্যক্তিই স্বীয় ব্যক্তিগত,বংশীয় বা সরকারী পদমর্যাদার দরুন বিচারকের সম্মুখে উপস্থিত হওয়া হতে অব্যহতি পেতে পারে না। মজুর, কৃষক, দরিদ্র প্রভৃতি সাধারণ নাগরিক রাষ্ট্রের যে কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদলতে মকদ্দমা দায়ের করতে পারে।এমন কি স্বয়ং খলীফার বিরুদ্ধেও এ মোকদ্দমা পেশ হতে পারে এবং ফরিয়াদীর স্বত্ব প্রমাণিত হলে আল্লাহর আইন খলীফার প্রতি প্রযোজ্য হবে। বিচারক এ কাজ সাধারণ নাগরিককের উপর যেমন আল্লাহর আইন জারী করে থাকেন, অনুরূপভাবে খলীফার উপরও তা জারী করার তার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।

অনুরূপ স্বয়ং খলীফারও কারো বিরূদ্ধে নিজের কোন অভিযোগ থাকলে তিনি স্বয়ং শাসনকর্তা সুলভ ক্ষমতার বলে কোন কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারবেন না। নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় তিনিও একজন সাধারণ নাগরিকের ন্যায় আদালতের দুয়ারে উপস্থিত হতে বাধ্য হবেন।

ইসলামী রাষ্ট্রের বিস্তারিত ও পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেশ করা এই ক্ষুদ্র পুস্তকে সম্ভব নয়। ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্নিহিত ভাবধারা এবং এর কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান লাভ করার জন্য হযরত নবী করীম (সা)- এর জীবনী এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলের ইতিহাস পেশ করা অব্যশক। কিন্তু এই প্রবন্ধে তার অবকাশ নেই। তবুও এখানে যতটুকু বলা হয়েছে তা হতে ইসলামী হুকুমাত সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা করা সম্ভব হবে বলে আমার বিশ্বাস।

— সমাপ্ত —

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.