মুক্তির পয়গাম

ইবাদত

ঈমানের আসল কথা হলো কোন প্রকার সন্দেহ ছাড়াই তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত এবং কিতাব ইত্যাদির উপর বিশ্বাস আনা। এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে জীবন গড়ে তোলার নাম ইবাদত অর্থাৎ দাসত্ব বা গোলামী করা। মানুষ ও জ্বীন জাতিকে সৃষ্টির উদ্দেশ্যই হলো তারা আল্লাহর ইবাদত করবে। তাই কোনো অবস্থাতেই মানুষ এই দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে পারে না। যেহেতু আল্লাহর গোলাম বা দাস হিসাবেই আমাদের জন্ম তাই আমাদের নিজেদের গোটা জীবনটাই তাঁর গোলামী বা দাসত্ব করে কাটিয়ে দেয়া উচিত। এর মানে এ নয় যে দুনিয়ার সব কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে কোথাও বসে আল্লাহ আল্লাহ করতে হবে। বরং ইবাদত করার আসল অর্থ হলো আমরা দুনিয়ায় যে সব কাজ করবো তা আল্লাহর আইন ও নিয়ম অনুযায়ী করবো। মানুষের জীবনের ঘুম, বিশ্রাম, পানাহার, চলাফেরা, অন্যের সাথে ব্যবহার, টাকা পয়সার লেন-দেন মোটকথা প্রত্যেকটি কাজ আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী করার নামই ইবাদত। এই ভাবে মানুষের জীবন গড়ে তোলার জন্যে প্রাথমিকভাবে কতকগুলো কাজ করতে হয়। যেমন আল্লাহ ও রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন, নামাজ পড়া, রোজা রাখা, যাকাত দেয়া এবং সামর্থ্য থাকলে হজ্ব করা। এগুলো হচ্ছে মুসলমানদের আনুষ্ঠানিক কাজ। এসব কাজ মুসলমানদের উপর ফরয বা অবশ্যকরণীয় করা হয়েছে যেনো এ সবের মাধ্যমেই তাদের পুরো জীবন আল্লাহর দাসত্বে পরিণত হতে পারে। তাই একজন লোক সারাদিন নামাজ পড়ার পরে রোজার মাসে সারা মাস উপবাস থাকার পরে আর পয়সা খরচ করে হজ্ব করার পরেও যদি তার হৃদয় মনে খোদার ভয়, প্রেম ও ভালবাসা সঠিকভাবে সৃষ্টি না হয় তবে তার নামায, রোজা ও হজ্ব পালনের উদ্দেশ্য একেবারে ব্যার্থ হয়েছে বলতে হবে। লোক দেখানো নামায, রোজা, হজ্ব ও যাকাতের কোন মূল্য নেই।

জিহাদ

নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত তাই অন্যান্য ধর্মের পূজা-উপাসনা ও যাত্রার মত কোন অনুষ্ঠানমাত্র নয়। এই কাজ করলেই আল্লাহ তায়ালা কারো উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান না। ইবাদতের আসল উদ্দেশ্য হলো মানুষের উপর থেকে আল্লাহ ছাড়া অন্য শক্তির প্রভুত্বকে খতম করা। আর এই উদ্দেশ্যে জান মাল ব্যয় করে সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করার নাম জিহাদ। তাই জিহাদ ইসলামের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক। মানুষের জীবনে ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রাম ও প্রচেষ্টাকে বলা হয় জিহাদ। জিহাদ কথাটার অর্থ তাই ব্যাপক। আমাদের চারিদিকে সীমাহীন অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম নির্যাতন, পাপ, কুশিক্ষা, নোংরামি ও উলঙ্গপনার মূল কারণ কি কখনো ভেবে দেখেছি? এ সবের প্রকৃত ও মূল কারণ হলো আজকের সমাজের নেতৃত্ব, কর্তৃক ও শক্তি সামর্থ্য রয়েছে অত্যাচারী দূরাচারী লোকদের হাতে। সাধারণভাবে আমরা দেখি একজন ড্রাইভারই নিজের ইচ্ছামত গাড়িকে যেদিক ইচ্ছা সেদিকে নিতে পারে। তাই সমাজের উপর নেমে আসে অশান্তি বিপর্যয়। আর তা থেকে মুক্তির একমাত্র পথই হলো এই অসৎ নেতৃত্ব থেকে সমাজকে মুক্ত করে ফেলা। ইসলাম চায় দুনিয়ার সব জায়গায় এই অসৎ নেতৃত্বকে খতম করে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করতে আর এই প্রচেষ্টার নামই জিহাদ। এই জন্যে প্রয়োজন হলে শক্তি প্রয়োগ যেমন জিহাদ তেমনি এ উদ্দেশ্যে সাহিত্য রচনার জন্যে কলম ধরাও তেমনি জিহাদ। কিন্তু একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে যাওয়া উচিত। তা হলো জিহাদের প্রথম পদক্ষেপ হলো নিজের সাথে জিহাদ। নিজের মন ও মানসিকতায় আল্লাহ ও রাসূলের শিক্ষা দীক্ষার বিরোধী কোন শিক্ষা ও ইচ্ছা থাকলে সর্বপ্রথম তার বিরুদ্ধেই জিহাদ করতে হবে। যে ব্যক্তির নিজের ভেতরের বিদ্রোহী আত্মার সাথে জিহাদ করেননি, সমাজের চার পাশের অন্যায় অসত্যর বিরুদ্ধে সে জিহাদ করতে পারে না। তাই জিহাদ বলতে যদি কেউ সাধারণত, যুদ্ধ মারামারি, কাটাকাটি বুঝে তবে ভুল হবে। জিহাদ একটি পবিত্র কাজ। মুসলমানদের পবিত্র দায়িত্ব।

মুসলামানদের দায়িত্ব

মুসলমানদের দায়িত্ব তাই নিজেদের জীবনে ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করার সাথে সাথে দুনিয়ার সবক্ষেত্রে আল্লাহর আইনকে কার্যকরী করা। মুসলিম জীবনের মিশন কি তা সুন্দরভাবে আল্লাহ বলে দিয়েছেন কুরআনের সূরা আল-হজ্বে। মুসলমানদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয়েছে- হে ঈমানদার! রুকু কর, সিজদা কর এবং ইবাদত কর তোমাদের প্রভুর আর সৎ কাজ করতে থাকো তবেই তোমরা লাভবান হবে এবং জিহাদ কর আল্লাহর পথে যেভাবে জিহাদ করা উচিৎ। তিনিই তোমাদের এই দ্বীন বা পথ পছন্দ করে দিয়েছেন এবং এ ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন কঠোরতা আরোপ করা হয়নি। এতো তোমাদের পিতা ইব্রাহিমের পথ, পূর্ব থেকেই তিনি তোমাদের নাম মুসলমান রেখেছেন এবং এই কিতাবেও (সেই নাম রাখা হয়েছে) যেন রাসূল তোমাদের প্রতি সাক্ষী হতে পারেন এবং তোমরা মানব জাতির প্রতি সাক্ষী হতে পারে। অতএব তোমরা নামাজ কায়েম কর ও যাকাত দিতে থাকো। এবং আল্লাহ কে (আল্লাহর আইনকে) শক্ত করে ধরো, তিনিই তোমাদের রক্ষকর্তা, তিনিই অতুলনীয় মুরব্বী এবং অদ্বিতীয় সাহায্যকারী। (সূরা হজ্ব : ৭৭-৭৮)

আল্লাহ বলেছেন, মুসলমানদের কাজ হলো একমাত্র তাঁরই গোলামী করা। এজন্যে তাদের নিজেদেরকে ভালভাবে গড়তে হবে। আল্লাহ যখন ভাল কাজ করতে বলেছেন তখন এটা স্পষ্ট যে খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে একজন মুসলমানকে এ কাজ করতে হবে নিজের জন্য এবং সেই সাথে সমাজে এক বিরাট দায়িত্ব পালনের জন্য। নিজেকে প্রস্তুত করার পর মুসলমানদের আদেশ করা হয়েছে জিহাদ করার। তারা ন্যায় কাজেও আদেশ দিবে এবং সেই সাথে অন্যায় কাজে দেবে বাধা। যাতে করে আল্লাহর আহবান চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং মানুষ যুক্তি ও বিবেক খাটিয়ে ইসলামকে গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু দেখা যায় সমাজের কুসংস্কার, খারাপ নেতৃত্ব এ পথে বাধা সৃষ্টি করে, তখন শেষ ব্যবস্থা হিসেবে তরবারিও ধরতে হয়। নবী রাসূলরা এ দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা এ দায়িত্ব পালন করে তাঁদের অনুসারীদেরকে এ কাজ বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন। এখন এ দায়িত্ব তাদের অনুসারীদের। এই দায়িত্ব যারা পালন করবে দুনিয়ায় তারা পাবে সম্মান আর আখেরাতে পাবে উত্তম পুরষ্কার। কিন্তু এ দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে দুনিয়া ও আখেরাতে উভয় জায়গায় তারা হবে লাঞ্চিত। মুসলমানদের আগে এ দায়িত্ব ছিল বনি ইসরাঈলদের উপর। তারা ছিল হযরত মূসা (আ) এর উম্মাত। কিন্ত এ দায়িত্ব অবহেলা করার কারণে তারা হল দুনিয়াতে লাঞ্চিত এবং আশ্রয়হীন। তাদের লাঞ্চনার কথা খোদ কুরআনেই আছে। তারপর এ দায়িত্ব এসে পড়ে মুসলমানদের উপর। রাসূলে খোদা (সা) এর নেতৃত্ব গড়ে ওঠা এই জাতি এ দায়িত্বকে তাদের নিজেদের জীবন মৃত্যুর উদ্দেশ্য বানিয়ে নিলো। গড়ে উঠলো মুসলিম নামে এক নিঃস্বার্থ সৈনিক জাতি যাদের হাতে মানবতা পেলো মুক্তির স্বাদ, পেল সত্যের সন্ধান। রাতের অন্ধকারে তাদের মাথা নত হয় পড়তো মহান আল্লাহর দরবারে। দিনের বেলায় তাদের ঘোড়ার খুরের দাপটে কেঁপে উঠতো দুনিয়ার জাহেলিয়াত, অন্যায় ও অসত্য । প্রথম জামানার মুসলমানরা তাদের এ দায়িত্ব সম্পর্কে ছেলেন পূর্ণ সজাগ। তারা এইভাবে কাজ করেছেন এবং ঈমানের পরীক্ষায় ত্যাগ ও কোরবানী স্বীকার করেছেন। আর তাই মানবতার ইতিহাসে তাদের নাম উজ্জ্বল ও ভাস্বর হয়ে আছে।

মুসলমানদের বিপর্যয়

কিন্তু আস্তে আস্তে মুসলমানদের মধ্যে এ দায়িত্ব পালনে দেখা দিলো শিথিলতা। আরাম-আয়েশের মধ্যে ডুবে গেলো তারা। অন্যদিকে ইসলামের দিকে ডাকা তো দূরের কথা নিজেদের জীবন থেকে বিদায় নিলো ইসলামী রীতিনীতি। শুধু কথায় ইসলাম মেনে চলা হতো, কাজে নয়। এ সময় পাশ্চাত্য বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলো আধুনিক, জ্ঞান-বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কারকে কাজে লাগিয়ে শিল্পবাণিজ্যের ক্ষেত্রে এগিয়ে গেলো অনেক। ব্যবসায়ের সওদা নিয়ে তারা ছড়িয়ে পড়লো পৃথিবীর আনাচে কানাচে। যখনই মুসলিম শক্তি দুর্বল হয়ে পড়লো তখনই তারা যে আঘাত হেনেছিলো সে আঘাত সহ্য করতে পারলো না মুসলিম শাসকরা। বুদ্ধি ও শক্তির কাছে হেরে গেলো মুসলিম শাসকরা। মুসলিম জাহানে নেমে এলো পরাধীনতার অন্ধকার। মুসলমানরা শুধু শাসন ক্ষমতাই হারালো না, তাদের শিক্ষা-দীক্ষা, আচার-অনুষ্ঠান ও আদর্শের উপর আসলো বিজাতীয় আঘাত।

উপমহাদেশে ইসলাম

আমাদের এই উপমহাদেশে ইসলামের ঝান্ডা নিয়ে বিজয়ীর বেশে আসলেন যুবক বীর সেনানী মোহাম্মদ বিন কাসেম। কিন্তু তারও আগে ইসলমের সুমহান আদর্শের পরিচয় পেয়েছিল এ দেশের মানুষ। ইসলামের আহবান নিয়ে এসেছিলেন ইসলাম ধর্ম প্রচারক দরবেশগণ। অল্প কিছু দিনের মধ্যে দিল্লীর শাসন ক্ষমতায় বসলো মুসলিম শাসকরা। আর ধীরে ধীরে এদেশে মুসলামানের সংখ্যা বাড়তে লাগলো। ইতিহাস সাক্ষী এদেশের মুসলিম শাসকরা অন্য ধর্মের লোকদেরকে ক্ষমতার জোরে মুসলমান বানাননি। বরং এ দেশের লোক মুসলমান হয়েছিল ইসলামের সুমহান আদর্শে মুগ্ধ হয়েই। মুসলিম শাসকরা সবাই যে ভাল ছিলেন তা নয়। ধীরে ধীরে তারা আরাম-আয়েশের দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন। দেশের কল্যাণ, দশের কল্যাণের কথা ভুলে গেলেন। ফলে শাসন ক্ষমতা দিন দিন দুর্বল হয়ে যেতে লাগলো। মুসলমানদের পূর্বে উপমহাদেশের শাসন ক্ষমতা ছিল অন্য ধর্মাবলম্বীদের হাতে। তারা ছিল মুসলমানদের উপর চটা। ইংরেজ বেনীয়রা তাদের সহায়তায় এদেশের শাসন ক্ষমতায় এলো। এবার শুরু হলো এদেশের মুসলমানদের পরাধীন জিন্দেগী। মুসলমানরা অবশ্য পরাধীনতা সহ্য করেননি। ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মুখর হলেন  মহীশূরের হায়দার আলী ও টিপু সুলতান। ১৮৫৭ সালে জেগে ওঠলো স্বাধীন চেতা মুসলমানরা। ইংরেজদের বিরুদ্ধে শুরু হলো ভারতের সর্বত্র মুসলমানদের এক ব্যাপক সংগ্রাম। এ সংগ্রামে নেতৃত্ব দিলেন দিল্লীর সম্রাট বাহাদুর শাহের যোগ্য সেনাপতি জেনারেল বখত খান, বাংলার মুসলমানরা যখনই সুযোগ পেয়েছে তখনই ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছে। তাদের হারানো স্বাধীনতাকে ফিরে পাওয়ার জন্য করেছে আপ্রাণ চেষ্টা। এ দেশে ইংরেজদের প্রধান শত্রু ছিল তাই মুসলমানরা। মুসলমানদেরকে তারা সব রকমের অধিকার থেকে বঞ্চিত করলো। আর অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা যারা মুসলমানদের উপর ছিল হাড়ে চটা তারা এগিয়ে আসলো ইংরেজদের খয়ের খাঁ হয়ে। মুসলমানদের অবস্থা হলো আরো কাহিল। কিন্তু শিকল দিয়ে মানুষ কোন দিন অন্য মানুষকে শতাব্দীর পর শতাব্দী বেঁধে রাখতে পারে না। আর সেই শিকল ভাঙ্গার ইতিহাস সবারই জানা।

১৯৪৭ সালে সৃষ্টি হলো পাকিস্তান। এই দেশের মুসলমানরা চেয়েছিলো একটা ইসলামী সমাজ কায়েম করবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য উপমহাদেশের মুসলমানদের! পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতায় যারা এলো তারা মুসলমানদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে দিলো না। তারা মুখে মুখে শুধু ইসলামের কথা বললেও ইসলামকে প্রতিষ্ঠার কোন বাস্তব প্রচেষ্টাই চালালো না। ইসলামী আদর্শ ও ন্যায়নীতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার ফলে দেখা দিলো চরম বিপর্যয়। দেশের এক অংশের লোকের ওপর চললো জুলুম ও বেইনসাফী। বাঙালী মুসলমানরা যে আশায় পাকিস্তান চেয়েছিল তা তো তারা পেলোই না, বরং তারা হলো বহুমুখী জুলুমের শিকার। তাই বাঙালী মুসলমানরা শুরু করলো স্বাধীনতার সংগ্রাম। ১৯৭১ সালে অনেক ত্যাগ তিতিক্ষা আর সংগ্রামের ফলে সৃষ্টি হলো স্বাধীন বাংলাদেশ। বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ। সারা বিশ্বের মুসলমানদের আশা-আকাঙ্ক্ষার সাথে আজ বাংলাদেশের মানুষ জড়িত। আজ সারা দুনিয়ায় প্রায় ১২০ কোটি মুসলমান। অনেকগুলো দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা মুসলমানদের হাতে। তবুও দুনিয়ার দরবারে মুসলিম আজো চরমভাবে লাঞ্চিত।

সারা বিশ্বের নিপীড়িত মানবতার মুক্তি সনদ আল কুরআন যাদের ঘরে, সেই জাতিকে আজ বিশ্বের মানুষের দুয়ারে দুয়ারে হাত পেতে বেড়াতে হচ্ছে। বাংলাদেশের মুসলমান হিসেবে আমাদের উপর যে দায়িত্ব তা আমরা ভুলে যেতে পারি না। আজ সারা বিশ্বের অবহেলিত লাঞ্চিত মানবতার মুক্তি একমাত্র ইসলামের পথেই। তাই ইসলামের অনুসারী হয়ে আমরা বসে থাকতে পারি না। আজকের দুনিয়া দ্রুত পরিবর্তনের পথে। দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে ধ্বংসের পথে। মুসলিম হিসেবে তাই আমাদের দায়িত্ব পালনের পথে আমাদেকেও দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসতে হবে। যতই কঠিন হোক না কেন, এটা আমাদের দায়িত্ব। ধ্বংসের পথ থেকে মানবতাকে মুক্ত করার দায়িত্ব এ যুগের মুসলমানদের। সারা বিশ্বের মানুষের দিকে তাকিয়ে ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসতে হবে মুসলমানদেরকে। কাজে লাগাতে হবে মুসলিম জাহানে আল্লাহ যে অসীম সম্পদ দিয়েছেন তা সব। এগিয়ে আসতে হবে মুসলিম যুবক, তরুণ, বৃদ্ধ সবাইকে।

একাজের জন্যে প্রথমেই মুসলিম মিল্লাতকে করতে হবে, পুনর্গঠিত, ঐক্যবদ্ধ। বহুদিনের জড়তার ঘোর কাটিয়ে এ জাতির মধ্যে আনতে হবে প্রাণ উদ্দীপনা। মানবতার মুক্তি সৈনিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে জাতিকে এক সুষ্ঠু পরিকল্পনার আলোকে মুসলিম যুবকদেরকে। যাতে তারা এ দায়িত্ব সহজেই বহন করতে পারে।

কিশোরদের দায়িত্ব

একটা সমাজকে গঠন করতে হলে সে সমাজের সকলেই এগিয়ে আসতে হয়। এগিয়ে আসতে হয় কিশোরদেরকেও। আজকের কিশোররাই আগামী দিনের জাতির ভবিষ্যৎ। তাই আমরা দেখি হযরত মুহাম্মদ (সা) যখন মক্কার অন্ধকার সমাজে আলোর মশাল জ্বালাতে অগ্রসর হলেন তখন তার সাথে কচি কিশোর সাহাবীরাও এগিয়ে এলেন। এ সময় হযরত আলী (রা) ছিলেন কিশোর বয়সের। হযরত সবেমাত্র নবুয়ত পেয়েছেন। তিনি তার সমাজের বড় বড় নেতাদেরকে ডাকলেন। সবাইকে বললেন তার সাথী হতে। সকলেই ভয় পেলো। কেননা সত্যের পথে চলতে যে হিম্মতের দরকার তাতো আর সকলের মধ্যে থাকে না। কিন্তু কিশোর বালক হযরত আলী (রা) তখন ঘোষণা করলেন-হতে পারি আমি বয়সে সকলের চেয়ে কনিষ্ঠ, আমার গলার আওয়াজ অনেক ক্ষীণ, আমার পা দুটো কচি, এই কঠিন সংগ্রামের পথে চলার যোগ্য নয়, তবুও আমি এই পথ গ্রহণ করলাম। আমি প্রস্তুত এ জন্য জিহাদ করতে। এমনি বহু সংগ্রামী কিশোর সাহাবী রাসূলের সাথে জিহাদে শরীক হয়েছিলেন।

ইসলামের বিজয় ইতিহাসেও অনেক বীর কিশোরের কথা আজো সোনার অক্ষরে লেখা আছে তাই যারা কিশোর সাহাবী রাসূলের সাথে জিহাদে শরীক হয়েছিলেন। ইসলামের বিজয় ইতিহাসেও অনেক বীর কিশোরের কথা আজো সোনার অক্ষরে লেখা আছে তাই যারা কিশোর তরুণ তাদের এই মহান সংগ্রামের পথে এগিয়ে আসা দরকার। দুঃস্থ মানবতার দুয়ারে সত্যের পয়গাম পৌঁছাতে মানুষকে ন্যায়ের পথে এগিয়ে নিতে, সারা বিশ্বকে ইসলামের আলোকে আলোকিত করতে, মুসলিম কিশোরদেরকেও আজ এগিয়ে আসতে হবে। বিংশ শতাব্দীর সব সমস্যার সুষ্ঠ এবং সুন্দর সমাধান ইসলামের পথে রয়েছে। সে ইসলামকে এই দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব মুসলমানদের। কিন্তু সেই মুসলমানদের বর্তমান অবস্থা কি তা একবার ভেবে দেখা দরকার। মুসলমানদের নিজেদের দুর্বলতার কারণে তাদের উপর নেমে এসেছিল পরাধীনতার অন্ধকার। বিজয়ী পাশ্চাত্য শক্তিগুলো মুসলমানদের ওপর শুধূ শাসন চালায়নি, তারা তাদের শিক্ষা-দীক্ষা, রীতি-নীতির মূলে আঘাত হেনেছিল।

এই আঘাতে মুসলমানদের অনেকের মধ্যে বিশেষ করে আধুনিক শিক্ষিতদের মধ্যে দেখা দিলো চিন্তাধারার পরিবর্তন। তারা প্রকৃত ইসলামী শিক্ষা পেলো না। ইসলাম বা ধর্ম সম্পর্কে যা কিছু শিখলো তা হলো পাশ্চাত্যের শাসকদের শেখানো বুলি। তাদের কাছে ইসলাম ধর্ম অন্যান্য ধর্মের মত একটা ধর্ম । এ  যুগে ইসলাম চলতে পারে না। ইসলাম এ যুগে সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে না। আসলে ইসলাম সম্পর্কে ভ্রান্ত এবং অসম্পূর্ণ জ্ঞানই এ ধারণার জন্য দায়ী। তাই মুসলিম মিল্লাতকে পুনর্গঠিত করতে হলে দরকার ইসলামী শিক্ষার ব্যাপক প্রসার। অনেকে মনে করে ইসলামের সাথে আধুনিকতার কিংবা বিজ্ঞানের মিল নেই। আসলে ইসলামে আধুনিকতার কিংবা বিজ্ঞানের ন্যায় নব আবিষ্কারের বিরোধী নয়। ইসলামের বিরোধ পাশ্চাত্যের মতবাদের সাথে, চিন্তধারার সাথে। তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে দুনিয়ার মানুষের জন্যে চলার পথ দিতে চায়। আর ইসলাম আল্লাহর দেখানো পথে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা এবং তার প্রয়োগের মাধ্যমে মানবতার মুক্তি আনতে চায়। ন্যায়-নীতি বাদ দিয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষতায় কি লাভ? নিজের ক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠার জন্যে, মানুষকে মারার জন্য বুদ্ধি খাটিয়ে আনবিক বোমার মত ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্র তৈরি কি আধুনিকতা? ইসলাম এই হিংসা, ঘৃণা ও স্বার্থপরতা মাখা আধুনিকতা চায় না। সেই সকল সেকেলেপনা এবং পুরাতন কুসংস্কারের পূজারীও নয়। বহুদিনের জড়তার ফলে ইসলামের নামে যে সমস্ত কুসংস্কার চলছে তার অবসান চাই। আর এসব কিছুর জন্যে প্রয়োজন প্রকৃত ইসলামী শিক্ষার ব্যাপক প্রসার।

মুসলিম কিশোরদেরকে ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। যাতে করে একজন ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার সাথে সাথে তারা মুসলিম ডাক্তার কিংবা মুসলিম ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। তবেই না সমাজ তাদের দ্বারা উপকৃত হবে। মুসলিম যুবকদের উপর আরও একটি বিরাট দায়িত্ব রয়েছে। পৃথিবীর মানুষ ইসলামকে চায়। তারা চায় ইসলামকে যুক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে যাচাই করে নিতে। আর যেহেতু ইসলাম এখন পৃথিবীর কোথাও প্রতিষ্ঠিত নেই, তাই মানুষ ইসলামকে জানবে বুঝবে যেভাবে তা পেশ করা হবে সেই ভাবেই। বর্তমান যুগের যাবতীয় সমস্যার ইসলাম কি সমাধান দেয় তা তাদের কাছে পরিষ্কার করতে হবে। পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান, সভ্যতার সাংস্কৃতির সুষ্ঠু পর্যালোচনা করে দেখিয়ে দিতে হবে এর দোষ ত্রুটি,সত্য, মিথ্যা, গ্রহণীয় ও বর্জনীয় কি আছে। আর এর জন্যে প্রয়োজন ইসলামী সাহিত্যের আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের গভীর অধ্যয়ন এবং কুরআন, হাদীস ও ইসলামী সাহিত্যের ওপর ব্যাপক গবেষণা। এই বিরাট দায়িত্বের জন্যে এখন থেকে মুসলিম কিশোরদের তৈরি হতে হবে।

জাতির পুনর্গঠনের এ কাজ সহজ নয়। এ সমাজের মধ্যে এমন অনেকে আছেন যারা নিজেদেরকে গড়ে তুলতে এবং অন্যদেরকে গড়ার কাজে আগ্রহী। এই সব সত্যপ্রিয় কিশোরদেরকে একত্রে অগ্রসর হতে হবে।

এ কাজ তখন সম্ভব যখন ইসলামের আহবান বলিষ্ঠভাবে চারিদিকে প্রচারিত হবে। রাসূলে খোদা (সা) সামাজের লোকদের তিরষ্কার, অপবাদ, লাঞ্চনা উপেক্ষা করে ইসলামের আহ্বানকে তাদের সামনে তুলে ধরেছিলেন। ফলে তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছিলো সে যুগের সত্যপ্রিয় মানুষরা। তেমনি ভাবে ইসলামের বিপ্লবী আহ্বানকে যদি সত্যিকারভাবে সমাজে প্রচার করা হয় তবে এই বিংশ শতাব্দীর ঘুনে ধরা সমাজ থেকেও বেরিয়ে আসবে সত্যের মশাল নিয়ে হযরত আলী (রা) এর মত অনেক তাজা তরুণ প্রাণ হযরত আবু বকর (রা), হযরত ওসমান (রা) এর মতে অনেক দানশীল ব্যক্তি এবং হযরত ওমর (রা) এর মত সিংহদিল পুরুষ। খালেদ, মূসা তারিকের মত মুসলিম তরুণরাও জেগে উঠবে সত্যের মশাল নিয়ে।

আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স) তাঁর সারা জিন্দেগীতে অশেষ কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে নিজেদের জীবনে ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। তাঁর চলা ফেরা, চাল-চলন, স্বভাব চরিত্র ছিল ইসলামের জীবন্ত প্রতীক। তাঁকে দেখেই মানুষ বুঝলো ইসলামের পথ কত মহান, ইসলাম কত সুন্দর। আসলে এটাই নিয়ম। সাধারণ মানুষ একটা আদর্শকে তখনই গ্রহণ করে যখন সে বাস্তবে দেখতে পায় সে আদর্শের মহত্ব। বিংশ শতাব্দীর মানুষ ইসলাম গ্রহণ করবে যখন মসুলমানেরা তাদের জীবনে ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করে দেখিয়ে দিবে যে ইসলাম মানুষকে কত উদার করে, কত মহৎ করে।

ধূসর মরুর কঠোর হৃদয়ের বেদুঈনরা যদি ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হতে পারে তবে আজকের বিংশ শতাব্দীর জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎকর্ষ মানুষ কেন ইসলামের দিকে আসবে না? আমরা যদি আমাদের নিজেদের জীবনে ইসলামী রীতি-নীতি মেনে চলি, ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে তুলতে পারি এক সুন্দর সুখী সমাজ, তবে দলে দলে মানুষের এই মহান মুক্তির পথে এগিয়ে আসবে। তাই মুসলিম তরুণদেকে আজ নিজেদের জীবনকে ইসলামের রঙে রাঙিয়ে তুলতে হবে। তাদেরকে ইসলামের উজ্জ্বল প্রতীক হতে হবে। তাদের দেখেই মানুষ ইসলামের দিকে আসবে, তাদের কথা শুনে নয়। আর এ জন্যে প্রয়োজন অনেক বেশী করে ইসলামী জ্ঞানের চর্চা, ইসলামী চরিত্র গঠন।

মুসলিম তরুণদের কাছে তাই উদাত্ত আহবান- এসো মানবতার মুক্তির পয়গাম চারিদিকে ছড়িয়ে দেই, এসো গড়ে তুলি সত্যের ঝান্ডাবাহী একদল সৈনিক- যারা মানুষের ওপর মানুষের প্রভুত্বকে খতম করে দিয়ে গড়ে তুলবে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এক সুন্দর সমাজ। যেখানে মানবতা পাবে মুক্তি,বিরাজ করবে শান্তি, ন্যায়নীতি, সততা ও ভ্রাতৃত্ব।

এই উদ্দেশ্যে আমাদের চলতে হবে সুশৃংখল ও সুসংগঠিতভাবে, তৈরি করতে হবে নিজেদের মধ্যে সীসাঢালা প্রাচীরের মত মজবুত সম্পর্ক। রাসূলের (সা) দেখানো পথ ধরে আমাদের অগ্রসর হতে হবে। জেনে নিতে হবে সেই আলোকিত পথের ঠিকানা।

— সমাপ্ত —

About ইবনে মাসুম