ইসলামী জাগরণের তিন পথিকৃৎ

সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (রহ)

. জন্ম বংশ পরিচয়

খৃস্টীয় ১৯০৩ সনে হিন্দুস্থানের হায়দারাবাদ রাজ্যের (বর্তমান অন্ধ্র প্রদেশ) আওরঙ্গাবাদ শহরে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আব্বার নাম সাইয়েদ আহমাদ হাসান। আম্মার নাম রুকাইয়া বেগম। সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (রহ) আল হুসাইন ইবনু আলী (রা) বংশের বিয়াল্লিশ তম পুরুষ।

. শিক্ষা জীবন

সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী তিন বছর বয়সেই বর্ণমালা শিখে ফেলেন। তাঁর আব্বাই ছিলেন তাঁর প্রধান শিক্ষক। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাঁকে বিভিন্ন বিষয় শেখানো জন্য গৃহ শিক্ষকও রাখা হয়।

এগার বছর বয়সে তিনি আওরঙ্গাবাদের মাদরাসা ফাওকানিয়াতে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হন। ঐ মাদরাসাতে ভাষার সাথে সাথে গণিত, পদার্থ বিদ্যা, রসায়ন বিদ্যা ও ইতিহাস শেখানো হতো। এই শিক্ষালয়ে পড়াশুনা কালে সাইয়েদ আবুল আ’লা প্রবন্ধ লেখা ও বক্তৃতা দানে পারদর্শিতা অর্জন করেন।

১৯১৬ সনে তিনি মাদরাসা ফাওকানিয়া থেকে ম্যাট্রিকুলেশান মানের পরীক্ষা পাশ করেন ও হায়দারাবাদ কলেজে ভর্তি হন। তাঁর আব্বা সাইয়েদ আহাদ হাসান পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে ভূপালে অবস্থান করছিলেন। সাইয়েদ আবুল আ’লা তাঁর আব্বার সেবা-যত্নের জন্য তাঁর আম্মাকে নিয়ে ভূপালে আসেন। তখন তাঁর কলেজ জীবনের মাত্র ছয়টি মাস অতিবাহিত হয়েছে। এই অল্প বয়সেই তাঁর ছাত্র জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।

এই সময় প্রখ্যাত লেখক নিয়ায ফতেহপুরীর সাথে সাইয়েদ আবুল আ’লার সাক্ষাত ও পরিচয় ঘটে। তরুণ সাইয়েদ আবুল আ’লা লেখক হওয়ার সংকল্প গ্রহণ করেন।

. কর্মজীবন শুরু

১৯১৮ সন। সাইয়েদ আবুল আ’লার বয়স তখন পনর বছর। তাঁর বড় ভাই সাইয়েদ আবুল খায়ের মাওদূদী বিজনৌর থেকে প্রকাশিত আলমাদীনা পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত হন। তরুণ আবুল আ’লাও সম্পাদকীয় স্টাফের একজন সদস্য হিসেবে আলমাদীনা পত্রিকায় যোগদান করেন। কিন্তু দুই মাসের বেশি তাঁরা সেখানে থাকতে পারেনি। তারা দিল্লী চলে আসেন।

১৯১৮ সনেই জব্বলপুরের জনৈক তাজউদ্দীন সাপ্তাহিক তাজ নামে একটি পত্রিকা বের করেন। সাইয়েদ আবুল খায়ের ও সাইয়েদ আবুল আ’লার ওপর এর সম্পাদনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। কিন্তু আর্থিক সমস্যার কারণে কয়েক মাস পরই পত্রিকাটি বন্ধ করে দিতে হয়। এই সময় তাঁরা কিছুকাল ভূপালে অবস্থান করে আবার দিল্লী আসেন। দিল্লীতে অবস্থান কালে সাইয়েদ আবুল আ’লা ইংরেজী ভাষা শেখেন। তিনি গভীর মনোযোগের সাথে ইংরেজী ভাষায় লিখিত দর্শন, ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজ-বিজ্ঞানের বই-পুস্তক পড়তে থাকেন।

. খিলাফাত আন্দোলনের তরুণ কর্মী

১৯১৪ সন থেকে ১৯১৮ সন পর্যন্ত চলে প্রথম মহাযুদ্ধ। এই যুদ্ধে জার্মেনীর পক্ষে যুদ্ধে নেমেছিলো তুর্কী তথা উসমানী খিলাফাত। যুদ্ধে জার্মেনী ও তুর্কী পরাজিত হয়। যুদ্ধের পর বৃটেন ও ফ্রান্স তুর্কী তথা উসমানী খিলাফাতের বিভিন্ন অঞ্চল নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিতে থাকে। ১৯১৯ সনে বৃটিশ শাসিত উপ-মহাদেশের মুসলিমরা উসমানী খিলাফাতের অখণ্ডতা অক্ষুণ্ন রাখার দাবিতে তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলে। এই আন্দোলনেরই নাম খিলাফাত আন্দোলন।

এই আন্দোলনের প্রধান ব্যক্তিত্ব ছিলেন মাওলানা মুহাম্মাদ আলী ও তাঁর ভাই মাওলানা শাওকাত আলী। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তরুণ ব্যারিস্টার হুসাইন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ১৯১৮ সনে গঠিত জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ খিলাফাত আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়। আরো সমর্থন জানায় অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল কংগ্রেস।

প্রবল বেগে এগুচ্ছিলো খিলাফাত আন্দোলনের জোয়ার। এই প্রেক্ষাপটে তাজউদ্দীন সাহেব ১৯২০ সনে জব্বলপুর থেকে আবার সাপ্তাহিক তাজ পত্রিকার প্রকাশনা শুরু করেন। সম্পাদক নিযুক্ত হন তরুণ সাংবাদিক সাইয়েদ আবুল আ’লা মাওদূদী। তখন তাঁর বয়স মাত্র সতর বছর।

সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী সাপ্তাহিক তাজ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে চলমান রাজনীতির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছিলেন। খিলাফাত আন্দোলনের জোয়ার তখন জব্বলপুরেও পৌঁছে। তিনি আন্দোলনের বিভিন্ন তৎপরতার সাথে জড়িত হন।

জব্বলপুরে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন জনসভায় তরুণ সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীকে বক্তৃতা দিতে হয়।

. ‘তাজমুসলিমপত্রিকার সম্পাদক

সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীর নিরলস প্রচেষ্টায় সাপ্তাহিক তাজ পত্রিকাটি দৈনিক তাজে উন্নীত হয়। কিন্তু দৈনিক তাজ বেশি দিন টিকে থাকতে পারেনি। বৃটিশ বিরোধী একটি নিবন্ধ প্রকাশ করার কারণে পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়া হয়।

ঐ বছর সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীর আব্বা সাইয়েদ আহমাদ হাসান মৃত্যুবরণ করেন।

১৯২০ সনের শেষভাগে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী দিল্লীতে চলে আসেন।

১৯২১ সনের তিনি পরিচিত হন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের মুফতী কিফায়েতুল্লাহ ও মাওলানা আহমাদ সাঈদের সাথে। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ তখন ‘মুসলিম’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশনার উদ্যোগ নেয়। সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী এই পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত হন।

দিল্লীতে অবস্থান কালে পত্রিকা সম্পাদনার ফাঁকে ফাঁকে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী প্রখ্যাত আরবী ভাষাবিদ মাওলানা আবদুস সালাম নিয়াযীর কাছে আরবী ভাষা শিখতে থাকেন। তিনি ছিলেন দারুণ পরিশ্রমী। তিনি আল কুরআনের তাফসীর, আল হাদীস, আল ফিক্‌হ ও অন্যান্য বিষয় ব্যাপকভাবে অধ্যয়ন করেন। তরুণ বয়সেই তিনি ইসলামী জীবন দর্শন ও জীবন বিধানের একজন সুপণ্ডিতরূপে গড়ে উঠেন।

১৯২৩ সনে ‘মুসলিম’ পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী ভূপাল চলে যান। কিছুকাল পর তিনি আবার দিল্লী ফিরে আসেন।

. উপমহাদেশের মুসলিমদের দুর্দিন

মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধীর অভিপ্রায়ে ১৯২০ সন থেকে চলে আসা অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল কংগ্রেস বৃটিশ বিরোধী অসহযোগ আন্দোলন বন্ধ করে দেয় ১৯২২ সনে। তবুও এগিয়ে চলছিলো খিলাফাত আন্দোলন।

কিন্তু ১৯২৪ সনে তুর্কীর সমরনায়ক মুস্‌তাফা কামাল পাশা উসমানী খিলাফাতের বিলুপ্তি ঘোষণা করেন। ফলে উপ-মহাদেশে বিপুল উদ্দীপায় পরিচালিত খিলাফাত আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়ে। দারুণভাবে হতাশ হন মুসলিম জনগণ।

খিলাফাতে রাশেদা, উমাইয়া খিলাফাত ও বানুল আব্বাস খিলাফাতের পর উসমানী খিলাফাতই ছিলো দুনিয়ার মুসলিমদের শক্তির কেন্দ্র। ইউরোপের বস্তুবাদী চিন্তাধারার অনুসারী মুস্‌তাফা কামাল পাশা খিলাফাত ব্যবস্থা বিলুপ্ত করেই ক্ষান্ত হননি, তুর্কীর ভূ-খণ্ডে ইসলামের কবর রচনা করার জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন, সবই তিনি করেন। তুর্কীকে একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও সমাজবাদের প্রচার প্রসারের পথ উন্মুক্ত করে দেন। ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা তুলে দেন। মাদরাসাগুলো বন্ধ করে দেন। পর্দা প্রথার বিলোপ সাধন করে। ইসলামী আইনের স্থলে সুইস কোড প্রবর্তন করেন। ইসলামী সংস্কৃতির বিলোপ সাধনের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালান।

এই সময় কেবল তুর্কীতেই নয় অন্যান্য মুসলিম দেশেও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও সমাজবাদে বিশ্বাসী বহুলোক গড়ে উঠে। এমনকি এই উপ-মহাদেশের মুসলিমদের অন্যতম প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও ইসলাম বিদ্বেষী লোক বের হতে থাকে। এই সময় ‘নিগার’ নামক একটি মাসিক পত্রিকা জোরেসোরে নাস্তিকতাবাদ প্রচার করতে থাকে।

মুসলিম এই দুর্দিনে ঘটে আরেক দুঃখজনক ঘটনা।

হিন্দুদের একটি সংগঠনের নাম ছিলো আর্যসমাজ। এই সংগঠনের অন্যতম নেতা ছিলেন স্বামী শ্রদ্ধানন্দ। তিনি শুদ্ধি আন্দোলন নামে একটি আন্দোলন শুরু করেন ১৯২৫ সনে। তাঁর বক্তব্য ছিলো, উপ-মহাদেশের মুসলিমদের পূর্ব-পুরুষরা হিন্দু ছিলো। মুসলিম শাসকদের চাপে পড়ে তারা হিন্দুত্ব ত্যাগ করে মুসলিম হয়। এখন মুসলিমদের উচিত হিন্দুত্বে ফিরে আসা।

এই আন্দোলন ছিলো মুসলিমদের জন্য খুবই বেদনাদায়ক। স্বামী শ্রদ্ধানন্দের প্রচারণায় উত্তেজিত হায়ে একজন মুসলিম ১৯২৬ সনে তাঁকে হত্যা করে। এতো গোটা উপ-মহাদেশে মুসলিম-বিরোধী দাংগা চরম আকার ধারণ করে। হিন্দু নেতারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে, বিষোদগার করতে থাকেন। উদারপন্থী বলে পরিচিত মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধীও তাঁদের সাথে সুর মিলান।

. ‘আল জমিয়তপত্রিকার সম্পাদক হিসেবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন

১৯২৫ সনে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ ‘আল জমিয়ত’ নামে একটি পত্রিকার প্রকাশনা শুরু করে। সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীকে এই পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত করা হয়।

১৯২৬ সনে যখন স্বামী শ্রদ্ধানন্দ নিহত হন তখনো তিনি এই পত্রিকার সম্পাদক। এক জুমাবার মাওলানা মুহাম্মাদ আলী দিল্লীর জামে মাসজিদে ভাষণ দিচ্ছিলেন। ‘আল জিহাদ’ সম্পর্কে হিন্দু নেতারা যেই বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন তার জওয়াব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি উল্লেখ করলেন তাঁর ভাষণে।

শ্রোতাদের মধ্যে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী ছিলেন। তিনি তখন ছাব্বিশ বছরের একজন যুবক। তিনি জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সদস্য ছিলেন না। কিন্তু সাংবাদিক হিসেবে তাঁর যোগ্যতার পরিচয় পেয়েই তাঁকে ‘আলজমিয়ত’ পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত করা হয়।

মাওলানা মুহাম্মাদ আলীর বক্তৃতা শুনে তিনি সংকল্প গ্রহণ করেন এই বিষয়ে লিখবেন। ‘আল জমিয়ত’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর জ্ঞানগর্ভ লেখা ‘আলজিহাদু ফিল ইসলাম’। ১৯২৬ ও ১৯২৭ সনে মোট চব্বিশটি কিস্তিতে তিনি ইসলামের ‘আলজিহাদ’ সংক্রান্ত ধারণা অত্যন্ত পরিচ্ছন্নভাবে তুলে ধরেন জনসমক্ষে। তাঁর লেখা অনেকের মুখে ভাষা ফুটিয়েছে। হিন্দু নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতির মুকাবিলা করার হাতিয়ার যুগিয়েছে অনেককে।

১৯২৮ সনে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ এক অবাক করা কাণ্ড করে বসে। উপ-মহাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে সংগঠিত করে রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টির প্রচেষ্টা না চালিয়ে জমিয়ত অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল কংগ্রেসের রাজনৈতিক স্ট্যান্ডের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করে। সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের এই ভূমিকা সঠিক বলে মেনে নিতে পারেন নি। ফলে তিনি ‘আলজমিয়ত’ পত্রিকার সম্পাদক পদে ইস্তফা দেন।

এই সময় তিনি গবেষকের মন নিয়ে ইমাম ইবনু তাইমিয়া (রহ), ইমাম হাফিয ইবনুল কাইয়্যিম (রহ) ও শাহ ওয়ালীউল্লাহর (রহ) গ্রন্থাবলী অধ্যয়ন করতে থাকেন।

. উপমহাদেশের রাজনীতিতে মুসলিম জাতীয়তাবাদী ধারা

স্যার সাইয়েদ আহমাদ খান বিশ্বাস করতেন যে ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান হাছিল না করে মুসলিমরা হিন্দুদের কিংবা ইংরেজদের সমকক্ষ হতে পারবে না।

তিনি মুসলিম তরুণদেরকে যুগপৎ ইসলামী মূল্যবোধ ও ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ করার অভিপ্রায় নিয়ে ১৮৭৫ সনে আলীগড় মোহামেডান এ্যাংলো ওরিয়েণ্টাল কলেজ স্থাপন করেন।

১৮৮৫ সনে অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল কংগ্রেস গঠিত হলে স্যার সাইয়েদ আহমাদ খান মুসলিমদেরকে সযত্নে কংগ্রেসের সংশ্রব এগিয়ে চলার পরামর্শ দেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে কংগ্রেসের দ্বারা মুসলিমদের কোন উপকার হবে না।

স্যার সাইয়েদ আহমাদ খানের এই দৃষ্টিভংগিতে অনুপ্রাণিত হয়ে কিছু সংখ্যক মুসলিম ১৯০৬ সনে ঢাকাতে একত্রিত হয়ে গড়ে তোলেন অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ।

আগা খানের নেতৃত্বে হাঁটি হাঁটি পা পা করে মুসলিম লীগ উপ-মহাদেশের রাজনীতিতে ভূমিকা রাখতে শুরু করে। মূলত বিভিন্ন স্বায়ত্বশাসিত সংস্থা ও চাকুরীতে জনসংখ্যা অনুপাতে মুসলিমদের সুযোগ প্রদানের দাবিতে মুসলিম লীগ সোচ্চার ছিলো। অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগও ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে উজ্জীবিত করার কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। মুসলিম লীগের তাত্ত্বিক ভিত্তিকে বলা যায় মুসলিম জাতীয়তাবাদ।

সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল কংগ্রেস, অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস ঘেঁষা জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের রাজনীতির সাথে কখনো জড়িত হননি।

. ইসলামী জাগরণের নাকীবতারজুমানুল কুরআন

১৯৩২ সন। আবু মুহাম্মাদ মুসলিহ হায়দারাবাদ থেকে মাসিক তারজুমানুল কুরআন নামে একটি ইসলামী পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সম্পাদক হিসেবে তিনি বেছে নেন সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীকে। এই সময় তাঁর বয়স ছিলো ঊনত্রিশ বছর।

অল্পকাল পর এই পত্রিকার মালিকানাও তাঁর হাতে তুলে দেয়া হয়।

তারজুমানুল কুরআনের প্রথম সম্পাদকীয়তে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী লিখেন, ‘‘এই পত্রিকার উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর বাণীকে বুলন্দ করা ও মানুষকে আল্লাহর পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর আহ্‌বান জানানো। বিশেষ উদ্দেশ্য হচ্ছে আল কুরআনের নিরিখে দুনিয়ায় বিস্তারশীল চিন্তা-চেতনা, সভ্যতা-সংস্কৃতির ও সমাজতত্ত্বের প্রেক্ষাপটে আল কুরআন ও আস্‌ সুন্নাহর নীতিগুলো ব্যাখ্যা করা এবং যুগের প্রেক্ষাপটে আল কুরআন ও আস্‌ সুন্নাহর বিধানগুলোর প্রয়োগ পদ্ধতি নির্দেশ করা। এই পত্রিকা মুসলিমদেরকে এক নতুন জীবনের দিকে আহ্‌বান জানাচ্ছে।’’

ইসলামী জাগরণের নাকীব হিসেবেই মাসিক তারজুমানুল কুরআনের আত্ম-প্রকাশ ঘটে।

১০. উপমহাদেশের মুসলিমদের নতুন দুর্ভোগ

১৯৩৫ সনে বৃটিশ পার্লামেন্টে গভর্ণমেন্ট অব ইন্ডিয়া এ্যাক্ট পাস হয়। এই এ্যাক্ট অনুযায়ী প্রাদেশিক স্বায়ত্ব শাসন দেবার অভিপ্রায়ে উপ-মহাদেশকে এগারোটি প্রদেশে বিভক্ত করে প্রাদেশিক পরিষদ গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়।

১৯৩৭ সনের ফেব্রুয়ারী মাসে অনুষ্ঠিত হয় প্রাদেশিক পরিষদগুলোর নির্বাচন। নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে সীমান্ত প্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, বিহার প্রদেশ, উড়িশা প্রদেশ, বোম্বাই প্রদেশ ও মাদ্রাজ প্রদেশ- এই সাতটি প্রদেশে কায়েম হয় কংগ্রেস সরকার। সিন্ধ প্রদেশ, পাঞ্জাব প্রদেশ, বাংলা প্রদেশ ও আসাম প্রদেশ এই চারটি প্রদেশে মুসলিম লীগ ও অন্যরা মিলে কায়েম করে কোয়ালিশন সরকার।

কংগ্রেস শাসিত সাতটি প্রদেশে কার্যত প্রতিষ্ঠিত হয় হিন্দুরাজ। এই প্রদেশগুলোতে জাতীয় সংগীত হিসেবে গৃহীত হয় বংকিম চন্দ্র চ্যাটার্জী রচিত হিন্দু রণ-সংগীত, ‘বন্দে মাতরম’। সরকারী ভাষা হয় হিন্দী। উর্দূ ভাষা উপেক্ষিত হয়। বিদ্যামন্দির-স্কীম ও ওয়ার্ধা স্কীম অব এডুকেশান অনুযায়ী নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয়। পাঠ্যপুস্তকে স্থান পায় হিন্দু বীরদের জীবনী। মুসলিম বীরদের নামধারী স্থানগুলোর নাম পরিবর্তন করা হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে অনুষ্ঠিত হতে থাকে স্বরস্বতী পূজা। সরকারী চাকুরীতে মুসলিমদের রিক্রুটমেন্ট প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। মুসলিমদের ওপর হামলা চলতে তাকে নানা অজুহাতে।

১৯৩৭ সনের জুলাই মাসে সাতটি প্রদেশে কংগ্রেসের শাসন কায়েম হওয়ার পর আড়াই বছর ধরে এই দুর্ভোগ সইতে হয় মুসলিমদেরকে। ১৯৩৯ সনে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হলে ইংরেজ শাসকগণ যুদ্ধে উপ-মহাদেশের লোকদের সহযোগিতা চায়। মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধী ইংরেজদের কাছে জানতে চান যে এই সহযোগিতা দেয়া হলে যুদ্ধের পর উপ-মহাদেশের স্বাধীনতা দেয়া হবে কিনা। এর কোন সন্তোষজনক জওয়াব দেয়নি বৃটিশ সরকার। ফলে মিঃ গান্ধীর নির্দেশে পদত্যাগ করে সাতটি প্রদেশের কংগ্রেস সরকার। হাঁফ ছেড়ে বাঁচে সাতটি প্রদেশের কোণঠাসা মুসলিম জনগোষ্ঠী।

১৯৩৭ সনে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী দিল্লীতে আসেন এবং এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিয়ে করেন। এই সময় তাঁর বয়স হয়েছিলো ৩৪ বছর। দিল্লীতে অবস্থানকালে তিনি লক্ষ্য করেন যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কংগ্রেস শাসিত সাতটি প্রদেশের মুসলিমদের করুণ দশা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করে তিনি দারুণভাবে ব্যথিত হন। হায়দারাবাদ ফিরে এসে তিনি মুসলিমদের নাজুক রাজনৈতিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে তারজুমানুল কুরআন পত্রিকায় নিবন্ধ ছাপতে থাকেন।

১১. জামালপুরের পথে

সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী তারজুমানুল কুরআনের সৌজন্য কপি পাঠাতেন লাহোরে ডঃ মুহাম্মাদ ইকবালের কাছে। ডঃ ইকবাল তখন বেশ বুড়ো হয়ে গিয়েছিলেন। অন্যকে দিয়ে পড়িয়ে তিনি তারজুমানুল কুরআন শুনতেন।

১৯৩৬ সনে ডঃ ইকবাল সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীকে পরামর্শ দিয়েছিলেন তাঁর কর্মস্থল হিসেবে পাঞ্জাবকে বেছে নিতে। সাইয়েদ আবুল আ’লা অপারগতা প্রকাশ করেন।

জনৈক চৌধুরী নিয়ায আলীর বিশাল ভূ-সম্পত্তি ছিলো পূর্ব পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর জিলার পাঠানকোট তহসিলের জামালপুর গ্রামে। তিনি সেই সম্পত্তি দীনী কাজের জন্য ওয়াক্‌ফ করে দিতে চান। তিনি তারজুমানুল কুরআনের মাধ্যমে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীর চিন্তাধারার সাথে পরিচিত ছিলেন। তিনি সাইয়েদ আবুল আ’লাকে তাঁর অভিপ্রায় জানিয়ে একটি চিঠি লেখেন।

আবুল আ’লা একটি ইসলামী পল্লী গড়ে তোলার পরিকল্পনা তৈরী করে পাঠান। পরিকল্পনার কপি নিয়ে চৌধুরী নিয়ায আলী ডঃ মুহাম্মাদ ইকবালের সাথে সাক্ষাত করেন। ডঃ ইকবাল এই পরিকল্পনা অনুমোদন করেন এবং এই কাজের জন্য সাইয়েদ আবুল আ’লাকে নিয়ে আসার জন্য চৌধুরী নিয়ায আলীকে পরামর্শ দেন।

চৌধুরী নিয়ায আলী সাইয়েদ আবুল আ’লাকে চিঠি লেখেন। ঐ চিঠি পেয়ে সাইয়েদ আবুল আ’লা লাহোরে এসে ডঃ মুহাম্মাদ ইকবালের সাথে সাক্ষাত করেন। ডঃ ইকবাল তাঁকে চৌধুরী সাহেবের আহ্‌বানে সাড়ে দিতে বলেন। এবার সাইয়েদ আবুল আ’লা রাজি হন।

১২. একটি লোভনীয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান

সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী হায়দারাবাদ ছেড়ে যাবেন শুনে উসমানীয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামীয়াত বিভাগের প্রধান মানাযির আহসান তাঁকে মাসিক আটশত পঞ্চাশ রুপি বেতনে ইসলামীয়াতের অধ্যাপক পদে নিযুক্তির প্রস্তাব দেন। সন্দেহ নেই, এটি ছিলো খুবই লোভনীয় প্রস্তাব। তাঁর বড়ো ভাই সাইয়েদ আবুল খায়ৈরও তাঁকে এই প্রস্তাবে সম্মত হতে বলেন। কিন্তু আল্লাহর দীনের আওয়াজ বুলন্দ করার মহান প্রেরণা তাঁকে এই লোভনীয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার হিম্মত যোগায়। তিনি তাঁর বড়ো ভাইকে বলেন,

‘‘আমি (দেশের রাজনৈতিক) দিগন্তে দুর্যোগের ঘনঘটা দেখতে পাচ্ছি। সারা দেশের ওপর দিয়ে এক ভয়ানক ঝড় বয়ে যাবে। এর পরিমাণ ১৮৫৭ সনের স্বাধীনতা যুদ্ধের পরিণামের চেয়েও গুরুতর হবে। হায়দারাবাদে অবস্থান করে আমি এই সম্পর্কে সতর্ক সংকেত দিতে পারবো না। এখানে তা বিবেচিত হবে রাষ্ট্র্রদ্রোহিতা বলে। আমাকে এমন এক জায়গায় যেতে হবে যেখান থেকে আমি স্বাধীনভাবে আমার মত প্রকাশ করতে পারবো।

কাউমের খিদমতে আমি নিজকে নিয়োজিত করতে চাই। আমি বিত্তহীন। কিন্তু আমার বিত্তহীনতা আমার সংকল্পের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। আমাকে তাড়াতাড়ি করতে হচ্ছে। আমি বিলম্ব করতে পারছি না। প্রথমে অর্থ বানানোর জন্য আমি যদি দেরি করি, সেই অর্থ বানানো যাত্রার বিড়ম্বনা সইতে আমাকে বাধা দেবে। ভাই, আমাকে আমার তাকদীরের পথে অগ্রসর হবার অনুমতি দিন। আমাকে আপনার দু’আ দিন। পথ বন্ধুর। কিন্তু যদি ইচ্ছা থাকে, আল্লাহর অনুগ্রহ যদি লাভ করি, আমি আমার মিশনে সফল হবোই। আমার কাছে বৈষয়িক সুবিধা অর্জনের চেয়ে আমার মিশনের সফলতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’’

১৩. ইসলামী পল্লী গঠন

১৯৩৮ সনের মার্চ মাস। সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী তাঁর নব পরিনীতা স্ত্রী মাহমুদাকে নিয়ে পৌঁছলেন জামালপুর।

কয়েকটি বাড়ি নিয়ে একটি গ্রাম। ঐ কয়টি বাড়ি ছাড়া আর কিছুই ছিলোনা সেখানে। শহুরে জীবনের চাকচিক্য ও সুযোগ সুবিধা এখানে অনুপস্থিত। এক মহান স্বপ্নে বিভোর সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী এলেন গাঁয়ে। তাঁর সাথে এলেন উঁচু ঘরের মেয়ে মাহমুদা। শহর ছেড়ে অজ পাড়াগাঁয়ে এসেছেন বলে তাঁর মনে কোন দুঃখ নেই। স্বামীর মিশনে নিষ্ঠাবান সহযোগী হতে পারাতেই তাঁর আনন্দ। জামালপুরের মুক্ত পরিবেশ ও নির্মল আবহাওয়া তাঁদের বেশ ভালো লাগছিলো।

গঠিত হলো দারুল ইসলাম ট্রাস্ট। একদল গবেষক যোগাড়ের চেষ্টা করেন সাইয়েদ আবুল আ’লা। প্রথমে তাঁর তাকে সাড়া দেন ঝিলাম জিলার খানপুর গ্রামের প্রতিভাবান যুবক ফজলুর রহমান। ইনিই পরে নায়ীম সিদ্দিকী নামে পরিচিত হন। ছয়জন সাথী নিয়ে কাজ শুরু করেন সাইয়েদ আবুল আ’লা।

মাসজিদে নিয়মিতভাবে জামায়াতে ছালাত আদায় শুরু হয়। ইমামত করতেন সাইয়েদ আবুল আ’লা। প্রতিদিন সকালে অনুষ্ঠিত হতো দারসুল কুরআন।

সেখানে একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরী গড়ে তোলা হয়। গবেষণাধর্মী পড়াশুনা হতো সেখানে। বিকেলে তাঁরা নিকটবর্তী খালের তীড়ে বেড়াতে যেতেন।

জুমাবার নিকটবর্তী গ্রামের লোকেরাও আসতো ঐ মাসজিদে। সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী প্রাঞ্জল ভাষায় ইসলামের বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করে খুতবা দিতেন। ছালাতুল জুমুআর ইমামতও তিনি করতেন। খুতবার মাধ্যমে তিনি ঈমান, ইসলাম, ছালাত, ছাওম, যাকাত, হাজ, জিহাদ ইত্যাদি সম্পর্কে শ্রোতাদেরকে জ্ঞান-সমৃদ্ধ করে তোলেন।

১৪. রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা

হায়দারাবাদে অবস্থানকালে তিনি পত্রিকাতে প্রধানত ইসলামের মৌলিক বিষয়ে আলোচনা করতেন। জামালপুরে এসে মৌলিক বিষয়গুলোর সাথে ক্রমাগতভাবে রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনামূলক প্রবন্ধও লিখতে থাকেন।

তিনি অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল কংগ্রেসের আদর্শ জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও সেক্যুলার গণতন্ত্রের সমালোচনা করেন। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ কংগ্রেসের রাজনীতির সমর্থকে পরিণত হওয়ায় তিনি এই সংস্থারও সমালোচনা করেন। তদুপরি মুসলিম লীগের ভ্রান্তিও তিনি চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে থাকেন।

অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল কংগ্রেসের প্রধান চালিকা শক্তি ছিলেন জাওহার লাল নেহরু। তিনি মুসলিমদেরকে আলাদা জাতি গণ্য করার অর্থ দাঁড়াবে একজাতির ভেতর আরেক জাতির অস্তিত্ব মেনে নেয়।। তদুপরি তিনি ছিলেন সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী। তিনি ধর্ম-কর্মকে কুসংস্কার গণ্য করতেন। তিনি ব্যঙ্গ করে বলতেন যে ইসলামী জীবন পদ্ধতি মানে হচ্ছে বিশেষ ধরণের পাজামা পরা, দাড়ি রাখা ও বিশেষ ধরণের লোটা (বদনা) বহন করা।

জাওহার লাল নেহরু জানতেন যে মুসলিমরা তেমন সংগঠিত নয়। ‘মুসলিম গণ সংযোগ’ কার্যক্রম পরিচালনা করে তাদেরকে কংগ্রেসের ভেতরে ঢুকিয়ে নেয়া সম্ভব। সেই জন্য কংগ্রেসের অন্তর্ভুক্ত মুসলিম নামধারী ব্যক্তিদের দ্বারাই এই কার্যক্রম শুরু হয়।

বিহার প্রদেশের ডঃ সাঈদ মাহমুদ নামকাওয়াস্তে মুসলিম ছিলেন। কার্যত তিনি ছিলেন ইসলামের কট্টর দুশমন। তিনি বলতেন যে ধর্মীয় পরিচয়ে হিন্দু ও মুসলিমরা পরিচিত হওয়া উচিত নয়। দেশের নাম ‘হিন্দুস্থান’ আর দেশের সবাই ‘হিন্দী’ বলে আখ্যায়িত হওয়া উচিত। মুসলিমদেরও উচিত হিন্দী নাম গ্রহণ করা। এতে হিন্দু-মুসলিমের পার্থক্য ঘুচে যাবে।

অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল কংগ্রেস মুসলিমদেরকে বোকা বানিয়ে দলে ভেড়াবার জন্য ‘ইসলামীয়াত সেল’ গঠন করে। এর প্রধান কর্মকর্তা হন ডঃ মুহাম্মাদ আশরাফ। তিনি প্রচার করতেন যে রাজনীতিতে ধর্মকে টেনে আনা পশ্চাদপদতার লক্ষণ। একটি প্রগতিশীল ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক বিষয়ে একজন হিন্দু হিন্দু থাকবে না, একজন মুসলিম মুসলিম থাকবে না। ব্যক্তিগত জীবনে তারা যেই কোন ধর্মে বিশ্বাস রাখতে পারে, কিন্তু প্রকাশ্য জীবনে ধর্মমত নির্বিশেষে একজাতির সদস্য হিসেবে আচরণ করবে। ডঃ মুহাম্মাদ আশরাফ সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি মুসলিমদেরকে বলতে থাকেন যে দুনিয়ার পরবর্তী দ্বন্দ্ব হবে বিত্তবানদের সাথে সর্বহারাদের। আর মুসলিমরা যেহেতু অর্থনৈতিক দিক দিয়ে পিছিয়ে রয়েছেন, একটি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাঝেই নিহিত রয়েছে তাদের মুক্তি। এই সব বক্তব্যে বিভ্রান্ত হচ্ছিলো মুসলিম জনগোষ্ঠী। তখন সামগ্রিকভাবে উপ-মহাদেশের মুসলিমদের আদর্শিক অবস্থা ছিলো খুবই নাজুক। ইসলাম ও জাহিলিয়াতের পার্থক্য বুঝার যোগ্যতা ছিলো না তাদের অনেকের। ইসলামী জীবন দর্শন ও জীবন বিধান সম্পর্কে জ্ঞানের স্বল্পতা তাদেরকে সহজেই বিপথগামী করে তুলছিলো।

এই অমানিশায় ইসলামের বিভিন্ন দিক উপস্থাপন করে লিখে চলছিলেন সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী। আদর্শিক জ্ঞান বিতরণের সাথে সাথে রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনামূলক লেখাও তিনি লিখছিলেন।

সামগ্রিকভাবে মুসলিমরা কংগ্রেসে যোগদানের ব্যাপারে ছিলো দ্বিধান্বিত। সেই জন্য কংগ্রেস মুসলিমদেরকে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি বলে আখ্যায়িত করতে থাকে। এই সময় সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী লেখেন যে মুসলিমরা স্বাধীনতার বিরোধী নয়। কিন্তু তারা এমন স্বাধীনতা চায় যেখানে তারা মুসলিম হিসেবে জীবন যাপন করার ও ইসলামী নীতির ভিত্তিতে সংগঠিত রাষ্ট্র হিসেবে তাদের সমাজ পরিচালনার নিশ্চয়তা লাভ করবে।

১৫. ‘এক জাতিতত্ত্বের পক্ষে মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানীর ওকালতি

১৯৩৮ সনের প্রথম ভাগেই জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের অন্যতম শীর্ষ নেতা মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী ‘মুত্তাহিদা কাওমিয়াত’ শীর্ষক বই লিখে মুসলিমদেরকে বুঝাতে চান যে হিন্দু-মুসলিম মিলে এক জাতি হওয়াতে এবং একত্রে কাজ করাতে কোন দোষ নেই।

মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী তাঁর বইতে লেখেন,

‘‘আমরা প্রতিদিন সম্মিলিত স্বার্থের জন্য সংঘ বা সমিতি গঠন করে থাকি এবং তাতে শুধু অংশগ্রহণ করি না বরং সদস্যপদ লাভ করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টাও করে থাকি। শহর এলাকা, বিশেষ এলাকা, মিউনিসিপ্যাল বোর্ড, জিলাবোর্ড, ব্যবস্থা পরিষদ, শিক্ষা সমিতি এবং এই ধরণের শত শত সমিতি রয়েছে যা বিশেষ উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট নিয়মনীতি অনুযায়ী গঠিত। এইসব সমিতিতে অংশগ্রহণ করা এবং সেই জন্য পূর্ণভাবে কিংবা আংশিকভাবে চেষ্টা করাকে কেউ নিষিদ্ধ বলে না। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয়, এই ধরণের কোন সমিতি যদি দেশের স্বাধীনতা অর্জন ও বৃটিশ প্রভুত্বের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তাতে অংশগ্রহণ করা হারাম, ন্যায়পরায়নতার খেলাফ, ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থি ও জ্ঞান-বুদ্ধির বিপরীত হয়ে যায়।’’ [মুত্তাহিদা কাউমিয়াত, হুসাইন আহমাদ মাদানী, পৃঃ ৫২]

১৬. ‘এক জাতিতত্ত্বের অসারতা প্রমাণ

জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে মুসলিমরা যাতে চিন্তার বিভ্রান্তির শিকার না হয় সেই জন্য সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী তারজুমানুল কুরআনে এই বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা পেশ করেন ‘মাসলায়ে কাউমিয়াত’ নামে। তিনি লেখেন, ‘‘ইসলামী জাতীয়তায় মানুষে মানুষে পার্থক্য করা হয় বটে, কিন্তু জড়, বৈষয়িক ও বাহ্যিক কোন কারণে নয়। এটা করা হয় আধ্যাত্মিক নৈতিক ও মানবিকতার দিক দিয়ে। মানুষের সামনে এক স্বাভাবিক সত্য-বিধান পেশ করা হয়েছে, যার নাম ইসলাম। আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্য, হৃদয় মনের পবিত্রতা-বিশুদ্ধতা, কর্মের অনাবিলতা, সততা ও দীন অনুসরণের দিকে গোটা মানবজাতিকে আহ্‌বান জানানো হয়েছে। তারপর বলা হয়েছে, যারা এই আহ্‌বান গ্রহণ করবে তারা একজাতি হিসেবে গণ্য হবে। আর যারা তা অগ্রাহ্য করবে তারা ভিন্ন  জাতির অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ মানুষের একটি হচ্ছে ঈমান ও ইসলামের জাতি। তার ব্যক্তি সমষ্টি মিলে একটি উম্মাহ। মানুষের অন্যটি হচ্ছে কুফর ও ভ্রষ্টতার জাতি। তারা পারস্পরিক মত-বিরোধ ও বৈষম্য সত্ত্বেও একই দল।’’

‘‘এই দুইটি জাতির মধ্যে বংশ ও গোত্রের দিক দিয়ে কোন পার্থক্য নেই। পার্থক্য বিশ্বাস ও কর্মের। কাজেই একই আব্বা-আম্মার দুই সন্তান ইসলাম ও কুফরের উল্লেখিত পার্থক্যের কারণে স্বতন্ত্র দুই জাতির মধ্যে গণ্য হতে পারে এবং দুই নিঃসম্পর্ক ও অপরিচিত ব্যক্তি ইসলামে প্রবেশ করার কারণে এক জাতি অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে।’’

‘‘জন্মভূমির পার্থক্যও এই উভয় জাতির ব্যবধানের কারণ হতে পারে না। এখানে পার্থক্য করা হয় হক ও বাতিলের ভিত্তিতে। আর হক ও বাতিলের স্বদেশ বা জন্মভূমি বলে কিছু নেই। একই শহর একই মহল্লা ও একই ঘরের দুই ব্যক্তির জাতীয়তা ইসলাম ও কুফরের পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন হতে পারে। একজন নিগ্রো ইসলামের সূত্রে একজন মরক্কোবাসীর ভাই হতে পারে।’’

‘‘বর্ণের পার্থক্যও এখানে জাতীয় পার্থক্যের কারণ নয়। বাহ্যিক চেহারার রঙ ইসলামে নগন্য। এখানে একমাত্র আল্লাহর রঙেরই গুরুত্ব রয়েছে। আর এটাই হচ্ছে সবচে’ উত্তম রঙ।’’

‘‘ভাষার বৈষম্যও ইসলাম ও কুফরের পার্থক্যের কারণ নয়। ইসলামে মুখের ভাষার মূল্য নেই, মূল্য হচ্ছে হৃদয়ের ভাষাহীন কথার।’’

‘‘ইসলামী জাতীয়তা বৃত্তের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে কালেমা ‘‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’। বন্ধুতা আর শত্রুতা এই কালেমার ভিত্তিতেই হয়ে থাকে। এই স্বীকৃতি মানুষকে একীভূত করে, অস্বীকৃতি চূড়ান্ত বিচ্ছেদ ঘটায়। এই কালেমা যাকে বিচ্ছিন্ন করে তাকে রক্ত, মাটি, ভাষা, বর্ণ, শাসন ব্যবস্থা প্রভৃতি কোন সূত্র ও কোন আত্মীয়তাই যুক্ত করতে পারে না। অনুরূপভাবে এই কালেমা যাদেরকে যুক্ত করে তাদেরকে কোন কিছুই বিচ্ছিন্ন করতে পারে না।’’

‘‘উল্লেখ্য যে অমুসলিম জাতিগুলোর সাথে মুসলিম জাতির সম্পর্কের দুইটি দিক রয়েছে। প্রথমটি এই যে, মানুষ হিসেবে মুসলিম অ-মুসলিম সকলেই সমান। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে এই যে, ইসলাম ও কুফরের পার্থক্যের কারণে আমাদেরকে তাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয়া হয়েছে। প্রথম সম্পর্কের দিক দিয়ে মুসলিমরা তাদের সাথে সহানুভূতি, ঔদার্য ও সৌজন্যমূলক আচরণ করবে। কারণ মানবতার নিরিখে এইরূপ ব্যবহারই তারা পেতে পারে। এমন কি তারা যদি ইসলামের দুশমন না হয়, তাদের সাথে বন্ধুত্ব, সন্ধি ও মিলিত উদ্দেশ্যের (Common Cause) জন্য সহযোগিতাও করা যেতে পারে। কিন্তু কোন প্রকার বস্তুগত ও বৈষয়িক সম্পর্ক তাদেরকে ও আমাদেরকে মিলিত করে ‘এক জাতি’ বানিয়ে দিতে পারে না।’’

১৭. লাহোরে আগমণ

দূরদর্শী সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী অনুভব করেন যে সামগ্রিক প্রয়োজনের বিবেচনায় দারুল ইসলাম ট্রাস্টকে দারুল ইসলাম আন্দোলন পরিণত করা প্রয়োজন। এই বিষয়ে চৌধুরী নিয়ায আলীর সাথে তাঁর মত পার্থক্য সৃষ্টি হয়। চৌধুরী নিয়ায আলীর মত ছিলো, দারুল ইসলাম ট্রাস্ট চিন্তা-গবেষণার কাজ চালাতে থাকুক, আর রাজনীতি সামলাক মুসলিম লীগ। এই মত-পার্থক্যের কারণে সাইয়েদ আবুল আ’লা জামালপুর ত্যাগ করেন।

১৯৩৮ সনের ডিসেম্বর মাসে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী লাহোর আসেন। ইসলামীয়া পার্কের একটি বাড়ি ভাড়া করে তিনি তাতে উঠেন। এই বাড়িটি তাঁর বাসস্থান ও তারজুমানুল কুরআনের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।

১৮. আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণদৃষ্টি

১৯৩৯ সনে শুরু হয় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ। এ বছর পহেলা সেপ্টেম্বর বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেন জার্মেনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার ঘোষণা দেন। তিনি দুনিয়াবাসীকে এই ধারণা দেবার চেষ্টা করেন যে ইংরেজ জাতি শান্তি-প্রিয় জাতি, তাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে এবং শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার খাতিরে ইংরেজরা যুদ্ধে নামতে বাধ্য হচ্ছে।

সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী তারজুমানুল কুরআনে নিবন্ধ লিখে ইংরেজ জাতির ভালো মানুষীর মুখোশ খুলে দেন। তিনি লেখেন যে দুনিয়ার সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর মধ্যে ইংরেজরাই সবচে’ বেশি শক্তিশালী, তারা দুনিয়ার বহু দেশে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চালিয়ে সেইগুলোকে তাদের পদানত করেছে, উপমহাদেশেও তারা প্রতারণা ও চাতুর্যের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে, প্রথম মহাযুদ্ধের সময় তারা মুসলিমদেরকে যেই সব ওয়াদা দিয়েছিলো সেইগুলো রক্ষা করেনি, তারাই মুসলিমদের মধ্যে অনৈক্যের বীজ বুনেছে, মুসলিমদেরকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামিয়েছে এবং তারাই মুসলিম ফিলিস্তিনের বুকে ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেছে। এই সব রেকর্ড নিয়ে তারা শান্তির জন্য যুদ্ধে নেমেছে এমন দাবি করা শোভা পায় না।

১৯. লাহোর ইসলামীয়া কলেজে অধ্যাপনা

১৯৩৯ সনের ৭ই সেপ্টেম্বর সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী লাহোর ইসলামীয়া কলেজে ইসলামীয়াতের অধ্যাপক নিযুক্ত হন। তবে তিনি বেতন নিতে রাজি হননি। অধ্যাপক হিসেবে তিনি ইসলামের আধ্যাত্মিক দিক বিশ্লেষণ করেই ক্ষান্ত হতেন না। তিনি সুন্দরভাবে ইসলামের রাজনীতি, অর্থনীতি, মুসলিম উম্মাহর কর্তব্য ইত্যাদি বিষয় উপস্থাপন করতেন। এতে কলেজ কর্তৃপক্ষ বিব্রত বোধ করে ও তাঁকে রাজনীতি সম্পর্কে আলোচনা পরিহার করতে বলে। সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী কর্তৃপক্ষের বেঁধে দেয়া গণ্ডির ভেতরে থেকে ইসলামকে কাটসাঁট করে আলোচনা রাখতে অস্বীকৃতি জানান।

এই মতপার্থক্যের কারণে ১৯৪০ সনের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি ইসলামীয়া কলেজে অধ্যাপনা ত্যাগ করেন।

অখণ্ড মনোযোগ সহকারে তিনি তারজুমানুল কুরআন সম্পাদনা করতে থাকেন।

২০. পাকিস্তান আন্দোলন

মিঃ মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ প্রথমে অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল কংগ্রেসের সদস্য ছিলেন। আরো পরে তিনি একই সময়ে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সদস্য রূপে কাজ করেন। পরে কংগ্রেসের মুসলিম-বিদ্বেষী মনোভংগির কারণে তিনি কংগ্রেস থেকে সরে আসেন। ১৯৩৪ সনে তিনি অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। তখন থেকে মুসলিম লীগ বেগবান হয়ে উঠে।

১৯৪০ সনের ২২, ২৩ ও ২৪শে মার্চ লাহোরের মিন্টু পার্কে অনুষ্ঠিত হয় অল ইন্ডিয়া মুসলিম  লীগের বার্ষিক সম্মেলন। এই সম্মেলনের উদ্বোধন করতে গিয়ে মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ বলেন,

‘‘এই কথা বুঝা বড়ো কঠিন যে আমাদের হিন্দু ভাইয়েরা ইসলাম ও হিন্দু ধর্মের প্রকৃত স্বরূপ কেন বুঝতে পারেন না। আসলে এই দুইটি কোন ধর্ম নয় বরং প্রকৃত পক্ষে দুইটি পৃথক ও সুস্পষ্ট সমাজ ব্যবস্থা এবং হিন্দু ও মুসলিমকে মিলিত করে একই জাতীয়তা গঠন একটা কল্পনা বিলাস মাত্র। এক জাতীয়তাবাদের ভুল ধারণাটি সীমালংঘন করে আমাদের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ হয়ে পড়েছে। যথাসময়ে আমাদের দৃষ্টিভংগির পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হলে, ভারতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়া হবে। হিন্দু ও মুসলিমদের পৃথক পৃথক ধর্মীয় দর্শন, সামাজিক রীতিনীতি ও সাহিত্য-সম্ভার রয়েছে। তারা পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় না, একত্রে পানাহার করেনা। তারা দুইটি স্বতন্ত্র সভ্যতা ও সংস্কৃতির অধিকারী যা দুইটি বিপরীত ধারণা-বিশ্বাসের ভিত্তিতে গঠিত। তাদের জীবন সম্পর্কিত দৃষ্টিভংগিও আলাদা।

এই কথাও সত্য যে হিন্দু ও মুসলিম ইতিহাসের ভিন্ন ভিন্ন উৎস থেকে প্রেরণা লাভ করে। তাদের রয়েছে পৃথক মহাকাব্য, মহাগ্রন্থ, পৃথক জাতীয় বীর এবং প্রাসংগিক উপাদান ঘটনাপঞ্জী। অধিকাংশ ক্ষেত্রে একজনের জাতীয় বীর অন্য জনের শত্রু। এই ধরণের বিপরীতমুখী দুইটি জাতিকে যাদের একটি সংখ্যাগুরু ও অপরটি সংখ্যালঘু একই রাষ্ট্রে যুক্ত করে দিলে অশান্তি বাড়তে থাকবে এবং এমন রাষ্ট্রে সরকার পরিচালনার জন্য যেই কাঠামোই তৈরী হবে তা শেষ পর্যন্ত ধ্বংস হয়ে যাবে। জাতির যেই কোন সংজ্ঞা অনুযায়ী মুসলিমরা একটি জাতি এবং অবশ্যই তাদের থাকতে হবে একটি আবাসভূমি, একটি ভূখণ্ড বা অঞ্চল ও একটি রাষ্ট্র।’’

[দ্রষ্টব্যঃ বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, আব্বাস আলী খান, পৃষ্ঠা ৪২২ ৪২৩]

পরদিন অর্থাৎ ২৩ শে মার্চ উপ-মহাদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল ও পূর্ব অঞ্চলকে নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব পাঠ করেন শেরেবাংলা এ.কে.ফজলুল হক। সম্মেলন সর্ব সম্মতিক্রমে উক্ত প্রস্তাব অনুমোদন করে। এই প্রস্তাবই ‘‘লাহোর প্রস্তাব’’ ও ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ নামে সুবিদিত।

তখন থেকে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তান নামে মুসলিমদের একটি স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চলতে থাকে। এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান শ্লোগান ছিলো- ‘‘পাকিস্তান কা মাতলাব কেয়া? লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ।’’ মুসলিম জনগোষ্ঠীকে এই ধারণাই দেয়া হচ্ছিলো যে পাকিস্তান হবে একটি ইসলামী রাষ্ট্র। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র গঠনের অপরিহার্য উপকরণ ইসলামী ব্যক্তিত্ব গঠনের কোন উদ্যোগই নিচ্ছিলেন না মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ।

এই বিষয়ে সাইয়েদ আবুল আ’লা তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। কিন্তু তাঁরা তাঁর কথায় কান দিলেন না।

২১. ইসলামী রাষ্ট্র গঠন পদ্ধতির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ

১৯৪০ সনের ১২ সেপ্টেম্বর ‘‘আনজুমানে ইসলামী তারীখ ওয়া তামাদ্দুন’’ নামক সংস্থার উদ্যোগে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্র্যাচি হলে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। উক্ত সভায় সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী একটি জ্ঞানগর্ভ ভাষন দেন। বিষয়বস্তু ছিলো ‘‘ইসলামী হুকুমাত কিস্‌ তারাহ কায়েম হোতি হায়।’’ (ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়)

সেই ভাষণের একাংশে তিনি বলেন, ‘‘এই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজন এমন সব লোকের, যাদের অন্তরে রয়েছে আল্লাহর ভয়। যারা নিজেদের দায়িত্ব পালন সম্পর্কে আল্লাহর নিকট জওয়াবদিহি করতে হবে বলে অনুভূতি রাখে যারা দুনিয়ার ওপর আখিরাতকে অগ্রাধিকার দেয়। যাদের দৃষ্টিতে নৈতিক লাভ-ক্ষতি পার্থিব লাভ-ক্ষতির চাইতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। যারা সর্বাবস্থায় সেই সব আইন-কানুন, বিধি-বিধান ও কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করে যা তাদের জন্য বিশেষভাবে তৈরী হয়েছে। যাদের চেষ্টা-সাধনার একমাত্র লক্ষ্য হবে আল্লাহর সন্তোষ অর্জন। ব্যক্তিগত ও জাতিগত স্বার্থের দাসত্ব ও কামনা-বাসনার গোলামীর জিঞ্জির থেকে যাদের গর্দান সম্পূর্ণ মুক্ত। হিংসা-বিদ্বেষ ও দৃষ্টির সংকীর্ণতা থেকে যাদের মন-মানসিকতা সম্পূর্ণ পবিত্র। ধন-সম্পদ ও ক্ষমতার নেশায় যারা উন্মাদ হবার নয়। ধন-সম্পদের লালসা আর  ক্ষমতার লিপ্সায় যারা কাতর নয়। এই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য এমন নৈতিক বলিষ্ঠতার অধিকারী একদল লোক প্রয়োজন পৃথিবীর ধনভাণ্ডার হাতে এলেও যারা নিখাদ আমানতদার প্রমাণিত হবে। ক্ষমতা হস্তগত হলে জনগণের কল্যাণ চিন্তায় যারা নিখাদ আমানতদার প্রমাণিত হবে। ক্ষমতা হস্তগত হলে জনগণের কল্যাণ চিন্তায় যারা না ঘুমিয়ে রাত কাটাবে। আর জনগণ যাতে সুতীব্র দায়িত্বানুভূতিপূর্ণ তত্ত্বাবধানে নিজেদের জান-মাল ইযযতসহ যাবতীয় বিষয়ে থাকবে নিরাপদ ও নিরুদ্বিগ্ন। ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজন এমন একদল লোকের যারা কোন দেশে বিজয়ী বেশে প্রবেশ করলে সেখানকার লোকেরা গণহত্যা, জনপদ ধ্বংসসাধন, যুলম-নির্যাতন, গুণ্ডামী, বদমায়েসী ও ব্যভিচারের ভয়ে ভীত হবে না। বরং বিজিত দেশের মানুষেরা এদের প্রতিটি সিপাহীকে পাবে তাদের জান-মাল-ইয্‌যাতের ও নারীদের সতীত্বের হিফাজতকারী রূপে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তারা এতোটা সুখ্যাতি ও মর্যাদার অধিকারী হবে যে তাদের সততা, সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, নৈতিক-চারিত্রিক উৎকর্ষ ও ওয়াদা প্রতিশ্রুতি পালনে গোটা দুনিয়া তাদের প্রতি হবে আস্থাশীল। এই ধরণের এবং কেবল এই ধরনের লোকদের দ্বারাই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে ইসলামী রাষ্ট্র।’’

[দ্রষ্টব্যঃ ইসলামী বিপ্লবের পথ, সাইয়েদ আবুল লা মওদূদী, পৃষ্ঠা১৮]

তিনি আরো বলেন,

‘‘বর্তমানে মুসলিম নামে যেই জাতিটি এই দেশে বাস করছে তাতে ভালো-মন্দ সকল প্রকার লোকই রয়েছে। চরিত্রের দিক থেকে কাফিরদের মধ্যে যতো প্রকার লোক পাওয়া যায় ততো প্রকার লোক এই জাতির মধ্যেও বর্তমান। কোন কাফির জাতি আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ার জন্য যতো লোক যোগাড় করতে পারবে সম্ভবত এই জাতিও ততো লোক একত্রিত করতে পারবে। সুদ, ঘুষ, চুরি, ডাকাতি, যিনা, মিথ্যাচার ও ধোঁকাবাজিসহ যাবতীয় নৈতিক অপরাধের কাজে এই জাতিটি কাফিরদের চেয়ে মোটেই কম পারদর্শী নয়। পেট ভর্তি ও অর্থ উপার্জনের জন্য কাফিররা যতো পথ অবলম্বন করে এই জাতির লোকেরাও ঠিক ততো পথই অবলম্বন করে। নিজ মুয়াক্কেলকে জিতানোর জন্য একজন মুসলিম আইনজীবী প্রকৃত সত্যকে চাপা দেবার সময় ঠিক ততোতাই আল্লাহর ভয়হীন হয়ে থাকে যতোটা হয়ে থাকে একজন অ-মুসলিম আইনজীবী। একজন মুসলিম ধন-সম্পদের প্রাচুর্য দ্বারা ও একজন মুসলিম শাসক ক্ষমতার দাপটে ঠিক সেই সব কাজই করে যা করে অ-মুসলিম ধনী ব্যক্তি ও শাসকেরা। যেই জাতি নৈতিক দিক দিয়ে এতোটা অধপতিত, তার সকল জগাখিচুড়ি চরিত্রের লোকদেরকে সংগঠিত করে দিলে, কিংবা রাজনৈতিক ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে তাদেরকে শৃগালের চাতুর্য শিখিয়ে দিলে অথবা সামরিক ট্রেনিং দিয়ে তাদেরকে হিংস্র করে তুললে জংগলের কর্তৃত্ব লাভ হয়তো সহজ হবে, কিন্তু আমি বুঝি না তাদের দ্বারা আল্লাহর কালেমাকে বিজয়ী করার কাজ কিভাবে হওয়া সম্ভব।’’

[দ্রষ্টব্যঃ ইসলামী বিপ্লবের পথ, সাইয়েদ আবুল লা মওদূদী, পৃষ্ঠা২৩]

আরো এগিয়ে তিনি বলেন,

‘‘এছাড়া আল্লাহর দীনকে বিজয়ী করার আন্দোলনের জন্য প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব যারা সেই সব নীতি থেকে এক ইঞ্চিও বিচ্যুত হবে না যেইগুলোর প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামের আবির্ভাব। এই আদর্শিক দৃঢ়তার ফলে সকল মুসলিমকে যদি না খেয়েও মরতে হয় এমন কি তাদেরকে যদি হত্যাও করা হয়, তবুও তাদের নেতৃবৃন্দ বিন্দুমাত্র বিচ্যুতি বরদাশত করতে প্রস্তুত হবে না। যেই নেতৃত্ব কেবল জাতির স্বার্থ দেখে, আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে জাতির স্বার্থে যেই কোন কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করে এবং যাদের অন্তর আল্লাহর ভয়শূণ্য, তারা যে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার মহান কাজের একেবারেই অযোগ্য, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।’’

[দ্রষ্টব্যঃ ইসলামী বিপ্লবের পথ, সাইয়েদ আবুল লা মওদূদী, পৃষ্ঠা২৪]

‘‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতা তো সেইসব লোকের হাতেই আসবে যাদেরকে ভোটাররা সমর্থন করবে। ভোটারদের মধ্যে যদি ইসলামী চিন্তা ও মানসিকতা সৃষ্টি না হয়, খাঁটি ইসলামী নৈতিক চরিত্র গঠনের আগ্রহই যদি তাদের না থাকে এবং ইসলামের সেই নিরপেক্ষ ইনসাফ ও অলংঘনীয় নীতিগুলো যদি তারা মেনে চলতে প্রস্তুত না হয় যেইগুলোর ভিত্তিতে ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালিত হবে তবে তাদের ভোট দ্বারা কখনো খাঁটি মুসলিম নির্বাচিত হয়ে পার্লামেন্টে আসতে পারবে না। এই অবস্থায় কেবল ঐসব লোকই নেতৃত্ব হাসিল করবে যারা আদমশুমারী অনুযায়ী তো মুসলিম, কিন্তু দৃষ্টিভংগি কর্মনীতি ও কর্মপদ্ধতির দিক থেকে তাদের গায়ে ইসলামের বাতাসও লাগেনি। স্বাধীন মুসলিম দেশে এই ধরণের লোকদের হাতে নেতৃত্ব আসার অর্থ হচ্ছে আমরা ঠিক সেই জায়গাতেই অবস্থান করবো, যেখানে অবস্থান করছিলো অ-মুসলিম সরকার। বরং এই ধরণের মুসলিম সরকার আমাদেরকে তার চাইতেও নিকৃষ্ট অবস্থায় নিয়ে যাবে।’’

[দ্রষ্টব্যঃ ইসলামী বিপ্লবের পথ, সাইয়েদ আবুল লা মওদূদী, পৃষ্ঠা২৬,২৭]

সেই ভাষণের একাংশে তিনি বলেন,

‘‘অলৌকিকভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটে না। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য এমন একটি আন্দোলন উত্থিত হওয়া অপরিহার্য যার বুনিয়াদ নির্মিত হবে সেই জীবন দর্শন, সেই জীবনোদ্দেশ্য, সেই নৈতিক মানদণ্ড ও সেই চারিত্রিক আদর্শের ওপর যা হবে ইসলামের প্রাণশক্তির সাথে সম্পূর্ণভাবে সামঞ্জস্যশীল। কেবল সেই সব লোকই এই আন্দোলনের নেতা ও কর্মী হবার যোগ্য যারা এই বিশেষ ছাঁচে ঢেলে নিজেদেরকে গড়ে তুলতে প্রস্তুত হবেন এবং সেই সাথে সমাজে অনুরূপ মন-মানসিকতা ও নৈতিক প্রাণশক্তির প্রসারের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন।’’

[দ্রষ্টব্যঃ ইসলামী বিপ্লবের পথ, সাইয়েদ আবুল লা মওদূদী, পৃষ্ঠা১৯]

২২. জাহিলিয়াতের স্বরূপ উদ্ঘাটন

১৯৪১ সনের ২৩শে ফেব্রুয়ারী পেশাওয়ার ইসলামীয়া কলেজের ‘‘মাজলিস-ই-ইসলামীয়াত’’ কর্তৃক আয়োজিত একটি আলোচনা সভায় সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন।

এই ভাষণে তিনি জাহিলিয়াতের বিভিন্নরূপ অত্যন্ত পরিচ্ছন্নভাবে শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরেন। জাহিলিয়াত ব্যক্তি, মানুষ ও সমাজকে কিভাবে বিনষ্ট করে তা তিনি তুলে ধরেন তাঁর আলোচনায়। এরি পাশাপাশি ইসলামের জীবনদর্শন ও তার কল্যাণময়তা অত্যন্ত সুন্দরভাবে তিনি উপস্থাপন করেন। নিম্নে আমরা তাঁর ভাষণের সারকথাগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

নাস্তিকতাবাদ

জাহিলিয়াতের একটি রূপ হচ্ছে নাস্তিকতাবাদ। এই মতবাদ এই ধারণা ব্যক্ত করে যে বিশ্বজাহান আপনা-আপনি তৈরী হয়েছে, আপনা-আপনি শেষ হয়ে যাবে। এর কোন মালিক নেই। থাকলেও মানব জীবনের সাথে তাঁর কোন সম্পর্ক নেই। মানুষও এক প্রকার জন্তু। অন্যসব কিছুর মতো পৃথিবীতে ঘটনাক্রমে মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে। মানুষ এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকে ও বিচরণ করে। তার মাঝে নানা ধরণের কামনা, বাসন ও লালসা রয়েছে। এইগুলো চরিতার্থ করার জন্য তার মাঝে নিহিত শক্তিগুলো তাকে উত্তেজনা দেয়। তার রয়েছে অংগ-প্রত্যংগ, বিভিন্ন অস্ত্র ও সরঞ্জাম। এইগুলোর সাহায্যে সে তার কামনা-বাসনা-লালসা চরিতার্থ করতে পারে। পৃথিবীর বিস্তৃত অংগনে সে বহুবিধ উপকরণ-উপাদান দেখতে পায়। তার অংগ-প্রত্যংগ দ্বারা এইগুলো ব্যবহার করে সে তার আকাংখা পূরণ করতে পারে। চারদিকে ছড়িয়ে থাকা অফুরন্ত সামগ্রী সে ভোগ-ব্যবহার করবে পৃথিবীতে এটাই তার কাজ। এমন কোন শক্তিঘর ও কর্তৃত্বশীল সত্তা নেই যার কাছে মানুষ জওয়াবদিহি করতে বাধ্য। মানুষ স্বাধীন। কারো কাছে তার দায়বদ্ধতা নেই। পথ-নির্দেশ লাভের কোন উৎস কোথাও নেই। নিজের জন্য প্রয়োজনীয় আইন তৈরী করা, নিজের শক্তিগুলোর ব্যবহার ক্ষেত্র বাছাই করা, পৃথিবীর জীবকুল ও বস্তু-সম্ভারের সাথে তার সম্পর্ক ও কর্মনীতি নির্ধারণ করা তারই কাজ। এই সব বিষয়ে কোন পথ নির্দেশ পেতে হলে জন্তু-জানোয়ারের জীবনে, পাথর ও পাহাড়ের ইতিকথায় ও মানুষের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ওপরই নির্ভর করতে হবে। নিজেদের মধ্য থেকে উদ্ভূত ও সমাজে মানুষের ওপর প্রভাবশীল রাষ্ট্র-শক্তির কাছে তাকে জওয়াবদিহি করতে হবে, অন্য আর কারো কাছে নয়। পৃথিবীর জীবনই মানুষের একমাত্র জীবন। তার কাজের ফলাফল এই জীবনেই সীমাবদ্ধ। এই জীবনে প্রকাশিত ফলের ভিত্তিতে নির্ণয় করতে হবে কোন নীতি শুদ্ধ কিংবা অশুদ্ধ, ভুল কিংবা নির্ভুল, উপকারী কিংবা অনুপকারী, গ্রহণযোগ্য কিংবা বর্জনযোগ্য।

এই মতবাদ অনুসরণের ফলে মানুষ স্বেচ্ছাচারী ও দায়িত্বহীন কর্মপন্থা গ্রহণ করে। সে নিজেকে নিজের দেহ ও দৈহিক শক্তিগুলোর মালিক মনে করে। নিজের ইচ্ছা মতোই এইগুলো ব্যবহার করে। পৃথিবীর যেই বস্তু তার করায়ত্ত হয় কিংবা যেই ব্যক্তির ওপর কর্তৃত্ব স্থাপিত হয় সে ঐ বস্তু বা ব্যক্তির প্রতি মালিকের আচরণই প্রদর্শন করে। প্রাকৃতিক আইন ও সমাজবদ্ধ জীবন ধারার দাবি ছাড়া আর কোন শক্তিই তার স্বাধীন অধিকার ও ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করতে পারে না। তার মনে কোন নৈতিক অনুভূতি থাকে না যা তার বল্‌গাহীন জীবন ধারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ফলে সে অত্যাচারী, বিশ্বাসঘাতক, দুর্নীতিপরায়ণ, দুষ্কর্মশীল ও ধ্বংসসাধনকারী হয়ে থাকে। সে স্বার্থপর ও সুবিধাবাদী হয়ে থাকে। প্রবৃত্তির কামনা বাসনা পূর্ণ করা ছাড়া তার জীবনের আর কোন উদ্দেশ্য থাকে না। যেই সব জিনিস তার জীবনের জন্য এই উদ্দেশ্য পূরণের সহায়ক, তার দৃষ্টিতে তা-ই মূল্যবান ও গ্রহণযোগ্য।

এই মনোভংগি সম্পন্ন লোকদের সমন্বয়ে গঠিত সমাজের রাজনীতি মানব প্রভুত্বের ওপর স্থাপিত হয়। তা এক ব্যক্তি, এক পরিবার, বিশেষ শ্রেণী কিংবা জনগণের প্রভুত্বও হতে পারে। সকল অবস্থাতেই আইন প্রণেতা হয় মানুষ। সবচে’ বেশি ধূর্ত, শঠ, কপট, প্রতারক, মিথ্যাবাদী, শক্তিশালী ও পাপিষ্ঠ লোকই রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও আধিপত্য লাভ করতে পারে। তাদের বিধান-গ্রন্থে শক্তির নামই সত্য। আর দুর্বলতা গণ্য হয় বাতিল বলে। এই সমাজে শিল্প-সাহিত্যে নগ্নতা ও পশুত্বের ভাবধারা ক্রমণ প্রবল হতে থাকে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কখনো সামন্তবাদ কখনো পুঁজিবাদ আবার কখনো সর্বহারাদের একনায়কত্ব কায়েম হয়। এই সমাজে সুবিচারপূর্ণ অর্থ-ব্যবস্থা গড়ে তোলা আদৌ সম্ভব নয়। এই সমাজের প্রতিটি মানুষই তো মনে করে যে, পৃথিবী একটি লুণ্ঠনের ক্ষেত্র। কাজেই যে যেইভাবে পারে সম্পদ কুক্ষিগত করে। এই সমাজের শিক্ষা ব্যবস্থাও এই বস্তুবাদী দৃষ্টিভংগির ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখাকে এমনভাবে ব্যবহার করা হয় যাতে মানুষের মন-মগজে উপরোল্লেখিত চিন্তাধারা বদ্ধমূল হয়ে যায়।

অংশীবাদ

জাহিলিয়াতের আরেকটি রূপ অংশীবাদ বা শিরক। এই মতবাদ এই ধারণা ব্যক্ত করে যে বিশ্ব জাহান বহু সংখ্যক দেব-দেবী দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্ব-জাহানের বিভিন্ন শক্তি বিভিন্ন দেব-দেবীর হাতে নিবদ্ধ। কোন কোন মুশরিক জাতি তাদের উপাস্যদেরকে এমনভাবে সাজিয়ে নেয় যে, একজন প্রধান দেবতা আছে, আর এই প্রধান দেবতা বহু অ-প্রধান দেবতা দ্বারা পরিবেষ্টিত। অ-প্রধান দেবতাদেরকে সন্তুষ্ট করেই প্রধান দেবতাকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব। এই মতবাদের অনুসারীরা বিশিষ্ট জীবিত ব্যক্তি, বিশিষ্ট মৃত ব্যক্তি, পাহাড়-পর্বত, গাছপালা, নদী-নালা, সাগর-মহাসাগর, আগুন, গ্রহ, নক্ষত্র প্রভৃতিকে উপাস্য বানিয়ে নেয়। যুগে যুগে আবির্ভূত নবী-রাসূলদের শিক্ষার প্রভাবে মানুষ এক আল্লাহর স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু কালক্রমে মানুষ ঐ নেক বান্দাদের প্রতি এমন আচরণ শুরু করে যার ফলে তাঁরা মুশরিক ব্যক্তিদের অ-প্রধান দেবতার মর্যাদা পেতে থাকেন।

এই মতবাদের অনুসারী মানুষের জীবন অবাস্তব আন্দাজ অনুমানের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। তারা বহু কিছুকে অলৌকিক শক্তি সম্পন্ন মনে করে ও মানুষের ভাগ্যের ওপর ভালো কিংবা মন্দ প্রভাব ফেলতে সক্ষম মনে করে। মুশরিকী কু-সংস্কারে আচ্ছন্ন ব্যক্তিদেরকে ধূর্ত কিছু লোক প্রতারণার জালে আবদ্ধ করে অর্থ লুণ্ঠনের ব্যবস্থা করে। কেউ নিজেই রাজা বাদশাহ হয়ে বসে, কেউ বা সূর্য, চন্দ্র বা কোন কল্পিত দেবতার সাথে বংশ-সম্পর্ক দেখিয়ে লোকদের মনে এই ধারণা সৃষ্টি করে যে এরাও দেবতা, আর লোকেরা তাদের দাস। কেউ বা পুরোহিত সেজে বসে ও দাবি করে যে যাদের হাতে উপকার অপকারের চাবিকাঠি তাদের সাথে এদের নিকট-সম্পর্ক বিদ্যমান। এইসব কাল্পনিক দেবতাদের কাছ থেকে মানুষ অনুসরণযোগ্য কোন জীবন ব্যবস্থা লাভ করতে পারে না। মানুষ এই কাল্পনিক দেবতাদের অনুগ্রহ ও সাহায্য লাভের আশায় তাদের পূজা-অর্চনায় নিয়োজিত থাকে। কিন্তু জীবনের বৃহৎ ও বিশাল অংগনে বাস্তব কাজ-কর্মের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় আইন-কানুন তৈরী করার মানুষের নিজেদেরই হাতে থাকে। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিল্প-সাহিত্য, শিক্ষা-নীতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে এই মতবাদের অনুসারীদের আচরণ নাস্তিকতাবাদের অনুসারীদের আচরণের অনুরূপই হয়ে থাকে।

সর্বেশ্বরবাদ

জাহিলিয়াতের আরো একটি রূপ হচ্ছে  সর্বেশ্বরবাদ। এই মতবাদ এই ধারণা ব্যক্ত করে যে মানুষ ও বিশ্ব জাহানের সব কিছুই অ-প্রকৃত। এইগুলোর আদৌ কোন স্বতন্ত্র সত্তা নেই। একই সত্তা এই বিশ্ব জাহানকে আত্মপ্রকাশের মাধ্যম বানিয়েছে এবং সেই সত্তাই সব কিচুতেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশমান।

এই মতবাদের ফলে মানুষের মনে সৃষ্টি হয় সংশয়বাদ। নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কেই সে সন্দেহের গোলক ধাঁধায় পড়ে যায়। সে নিজেকে এমন পুতুল মনে করে যাকে অন্য কেউ আড়ালে বসে নাচাচ্ছে। চিন্তার এমন আবর্তে পতিত মানুষ জীবনের কোন উদ্দেশ্যেই খুঁজে পায় না। সে মনে করে যে তার কিছুই করার নেই। সার্বিক সত্তা যেই দিকে যাচ্ছে সেও সেই দিকেই যাচ্ছে।

এই মতবাদের বিশ্বাসীদেরকে প্রবৃত্তির দাসত্ব করতেই দেখা যায়। প্রবৃত্তি তাদেরকে যেই দিকে চালিত করে তারা সেই দিকেই ছুটে চলে।

বৈরাগ্যবাদ

জাহিলিয়াতের ভিন্ন একটি রূপ হচ্ছে রাহবানিয়াত বা বৈরাগ্যবাদ।

এই মতবাদ এই ধারণা ব্যক্ত করে যে মানুষের জন্য এই পৃথিবী হচ্ছে একটি শাস্তি ভোগের স্থান। এখানে মানুষের অবস্থান দণ্ড প্রাপ্ত কয়েদীর মতো। কামনা-বাসনা, আমোদ-আহলাদ, দৈহিক আরাম ও দেহের দাবি হচ্ছে এই কারাগারের বেড়ি ও শিকল। মানুষ এই পৃথিবীর বস্তুগুলোর সাথে যতো বেশি জড়িত হবে ততো বেশি আবর্জনা দ্বারা পরিবেষ্টিত হবে। মানুষের মুক্তির পথ যাবতীয় আমোদ-আহলাদ থেকে মুক্ত হওয়া, কামনা-বাসনা দমন করা ও দেহের চাহিদাগুলো তপস্যা-সাধনার মাধ্যমে পীড়ন করা। এই পীড়নের ফলে আত্মা পবিত্র হয়।

বৈরাগ্যবাদে বিশ্বাসী ব্যক্তিরা দুনিয়ার ঝামেলা থেকে দূরে সরে থেকে অসৎ ব্যক্তিদের জন্য পথ উন্মুক্ত করে দেয়। বৈরাগ্যবাদী সৎ লোকেরা তপস্যা-সাধনায় আত্মনিয়োগ করে, আর অসৎ লোকের দুনিয়ার কর্তৃত্ব হাতে নিয়ে ফিতনা ফাসাদের বিস্তৃতি ঘটায়। বৈরাগ্যবাদের প্রভাবে মানুষ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। সমাজনীতি, রাজনীতি ইত্যাদি নিয়ে তারা মাথা ঘামায় না। আর সেই জন্যই অসৎ শাসকদেরকে জোরে সোরে বৈরাগ্যবাদী জীবন দর্শনের পৃষ্ঠপোষকতা করতে দেখা যায়। প্রকৃতপক্ষে এই মতবাদ জনগণকে যালিম ব্যক্তিদের প্রতি বিনয়াবনত ও পোষমানা বানাবার জন্য যাদুর মতো কাজ করে। কখনো কখনো দেখা যায়। দুনিয়া ত্যাগের আবরণে বৈরাগ্যবাদীরা দারুণ দুনিয়া পূজারী হয়ে উঠে।

ইসলাম

পরিশেষে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী ইসলামের জীবন দর্শন ও তার অনুসৃতির সুফলের ওপর আলোকপাত করেন।

ইসলাম এই ধারণা ব্যক্ত করে যে বিশ্বজাহান এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর সাম্রাজ্য। তিনি এটি সৃষ্টি করেছেন। তিনিই এটি পরিচালনা করছেন। সমস্ত ক্ষমতা তাঁর হাতে কেন্দ্রীভূত। মানুষ এই সম্রাটের প্রজা। এই সাম্রাজ্যের অংশ হওয়ার কারণে সাম্রাজ্যের অন্যান্য অংশ যেইভাবে সম্রাটের আনুগত্য করে চলছে মানুষের কর্তব্য সেইভাবে তাঁর আনুগত্য করে চলা। মানুষ নিজের জন্য জীবন বিধান তৈরী করার ও নিজের কর্তব্য নিজের স্থির করার অধিকার রাখে না। তার কাজ হচ্ছে ‘‘আল মালিকুল মুলকের’’ নির্দেশ পালন করা।

দুনিয়ার জীবন মানুষের পরীক্ষাগার। সম্রাট নিজে প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে। কারণ, আল্লাহ মানুষকে যেই জ্ঞান বুদ্ধি ও স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দান করেছেন এবং অগণিত সৃষ্টির ওপর কর্তৃত্ব করার ইখতিয়ার দিয়েছেন, এর মাধ্যমে তিনি মানুষকে পরীক্ষা করছেন।

পৃথিবীর জীবন পরীক্ষাগার। তাই এখানে হিসাব নেই, শস্তি নেই, পুরস্কার নেই। হিসাব, শাস্তি কিংবা পুরস্কারের জন্য যেই সময়টি নির্দিষ্ট তার নাম ‘আখিরাত’।

যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ মানুষের মনোমাঝে এই চিন্তা-চেতনারই বিকাশ ঘটাতে চেয়েছেন।

কোন একটি ভূ-খণ্ডের মানুষ যখন এই মতবাদ গ্রহণ করে তখনই তার প্রতিফলন ঘটে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক, লেনদেন, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি তথা জীবনের সকল দিক ও বিভাগে। পবিত্রতা, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্য, জীবন যাপন পদ্ধতি, সামাজিক রীতিনীতি, ব্যক্তিগত চরিত্র, জীবিকা উপার্জন, অর্থব্যয়, অর্থ বণ্টন, দাম্পত্য জীবন, পারিবারিক জীবন, বৈঠকী নিয়ম-কানুন, সরকার গঠন, বিচার, অপরাধ দমন, কর ধার্য, জনকল্যাণমূলক কাজ, শিল্প-বাণিজ্য, শিক্ষাব্যবস্থা, সেনাবাহিনী গঠন, যুদ্ধ পরিচালনা, সন্ধি স্থাপন- সব কিছুতেই বিকশিত হয় এই দৃষ্টিভংগি।

এই মতবাদ মানুষের জীবনকে দায়িত্ব-জ্ঞান-সম্পন্ন ও সুশৃঙ্খল করে তোলে। এই মতবাদের বিশ্বাসী মানুষ মনে করে যে তার দেহ, তার সকল শক্তি সামর্থ ও চারদিকে ছড়িয়ে থাকা সম্পদ সম্ভারের মালিক সে নয়। এই সব কিছুর মালিক আল্লাহ। এইগুলো মালিকের পক্ষ থেকে তার নিকট আমানত হিসেবে রাখা হয়েছ। এই আমানতের হিসাব একদিন তাকে অবশ্যই আল্লাহর নিকট দিতে হবে। এই ধারণা মানুষকে বলগাহীন জীবন যাপন করতে দেয় না। তাঁকে প্রবৃত্তির দাস হতে দেয় না। সে অত্যাচারী ও বিশ্বাসঘাতক হতে পারে না। সে হয় একজন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি।

এই মতবাদ মানুষকে সংগ্রামী ও অবিশ্রান্ত চেষ্টানুবর্তী করে তোলে। তাকে স্বার্থপরতা, আত্মপূজা ও জাতি পূজার পংকিলতা থেকে পবিত্র করে। তাকে সততা, সত্যনিষ্ঠা, উন্নত নৈতিক আদর্শের পথে সংশ্লিষ্ট রাখে। এই মতবাদ অনুযায়ী সকল মানুষ আল্লাহর প্রজা। সকলের মর্যাদা, অধিকার ও সুযোগ সুবিধা লাভের সম্ভাবনা সমান। কোন ব্যক্তি, পরিবার, শ্রেণী বা জাতির অন্যান্য মানুষের উপর কোন আভিজাত্য নেই, শ্রেষ্ঠত্ব নেই। এইভাবে এই মতবাদ মানব প্রভুত্বের ধারণার মূলোচ্ছেদ করে। এই মতবাদ আঞ্চলিক ও বর্ণভিত্তিক বৈষম্য বিদ্বেষেরও মূলোৎপাটন করে। এই মতবাদের দৃষ্টিতে পৃথিবীর মালিক আল্লাহ। সকল মানুষ আদমের সন্তান। সকলেই একমাত্র আল্লাহর বান্দা। এই মতবাদের দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠত্বের মাপিকাঠি আল্লাহভীতি, সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও সত্যের জন্য সংগ্রামশীলতা। এই মতবাদের দৃষ্টিতে যারা মানব রচিত বিধান প্রত্যাখ্যান করে একমাত্র আল্লাহ প্রদত্ত বিধানের আনুগত্য করে তারা সকলে মিলে, একটি দল আর যারা তা করে না তারা ভিন্ন দল। পার্থক্যের এই একটিমাত্র ভিত্তি ছাড়া আর সব ভিত্তিই পরিত্যাজ্য।

এই মতবাদের ভিত্তিতে যেই রাষ্ট্র গড়ে উঠে সেই রাষ্ট্রের বুনিয়াদ হয় আল্লাহর সার্বভৌমত্ব। এই রাষ্ট্রে আল্লাহর শাসন কায়েম হয়, আল্লাহর আইন চালু হয়। এই রাষ্ট্রে মানুষ আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি রূপে কাজ করে। এই রাষ্ট্রের গোটা ব্যবস্থাই ইবাদাত ও তাকওয়ার পবিত্র ভাবধারায় পরিপূর্ণ হয়। শাসক ও শাসিত উভয়েই সমানভাবে অনুভব করে যে তারা আল্লাহর হুকুমাতের অধীনে জীবন যাপন করছে এবং তাদের গোপন ও প্রকাশ্য সব কিছু আল্লাহর সাথেই সম্পর্কিত। এই রাষ্ট্রের কর দাতা মনে করে যে সে আল্লাহকেই কর দিচ্ছে। করগ্রহিতা মনে করে যে সে আমানতদার মাত্র। একজন সিপাই থেকে শুরু করে বিচারপতি কিংবা শাসক পর্যন্ত সকলেই ঠিক সেই মনোভাব নিয়ে কর্তব্য পালন করে যেই মনোভাব নিয়ে তারা ছালাত আদায় করে থাকে। এই উভয় প্রকার কাজকেই তারা ইবাদাত মনে করে। এই রাষ্ট্রে গণ-প্রতিনিধি নির্বাচনের সময় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তাদের তাকওয়া, আমানতদারী, সততা, সত্যবাদিতা ও অন্যান্য মহৎ গুণ সন্ধান করা হয়। ফলে উন্নত নৈতিক চরিত্র সম্পন্ন ব্যক্তিরাই নেতৃত্ব লাভ করেন ও দায়িত্বপূর্ণ পদে অভিষিক্ত হন।

[দ্রষ্টব্যঃ ইসলাম জাহিলিয়াত, সাইয়েদ আবুল লা মওদূদী]

২৩. জামায়াতে ইসলামী গঠন

সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী একটি সত্যনিষ্ঠ সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করেন। মাসিক তারজুমানুল কুরআনের মাধ্যমে তিনি এই মর্মে একটি আবেদন পেশ করেন। যাঁরা মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনুকরণে একটি সংগঠন গড়ে তুলতে আগ্রহী তিনি তাঁদেরকে ইসলামীয়া পার্কে অবস্থিত ‘‘তারজুমানুল কুরআনের’’ অফিসে সমবেত হওয়ার আহ্‌বান জানান।

১৯৪১ সনের ছাব্বিশে অগাস্ট পঁচাত্তর জন ব্যক্তি সমন্বয়ে গঠিত হয় জামায়াতে ইসলামী। সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী নব গঠিত সংগঠনের একটি খসড়া সংবিধান পেশ করেন। সম্মেলন উক্ত সংবিধান অনুমোদন করে। অতপর সেই সংবিধান অনুযায়ী আমীর নির্বাচনের পদক্ষেপ নেয়া হয়। সর্বসম্মতিক্রমে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী জামায়াতে ইসলামী আমীর নির্বাচিত হন্।

এই সম্মেলনের এক পর্যায়ে তিনি যেই বক্তব্য রাখে তা ছিলো অসাধারণ। বক্তব্যের একাংশে তিনি বলেন,

‘‘জামায়াতে ইসলামীতে যাঁরা যোগদান করবেন তাঁদেরকে এই কথা ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে যে জামায়াতে ইসলামীর সামনে যেই কাজ রয়েছে তা কোন সাধারণ কাজ নয়। দুনিয়ার গোটা ব্যবস্থা তাঁদেরকে পাল্টে দিতে হবে। দুনিয়ার নীতি নৈতিকতা, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, সভ্যতা-সংস্কৃতি প্রতিটি কিছু পরিবর্তন করে দিতে হবে। দুনিয়ায় আল্লাহ-দ্রোহিতার ওপর যেই ব্যবস্থা কায়েম রয়েছে তা বদলিয়ে আল্লাহ আনুগত্যের ওপর কায়েম করতে হবে। সকল শাইতানী শক্তির বিরুদ্ধে তাঁদের সংগ্রাম। …..প্রতিটি পদক্ষেপের পূর্বে তাঁদেরকে ভালোভাব বুঝে নিতে হবে তাঁরা কোন কঠিন পথে পা বাড়াচ্ছেন।’’

উল্লেখ্য যে তখন গোটা উপ-মহাদেশের জনসংখ্যা ছিলো প্রায় চল্লিশ কোটি। ত্রিশ কোটি ছিলো অ-মুসলিম। মুসলিমদের সংখ্যা ছিলো দশ কোটি। এদের বিরাট অংশ ছিলো নামকাওয়াস্তে মুসলিম। সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীর আহ্‌বানে সাড়া দিয়ে সংগঠিত হয়েছিলেন মাত্র পঁচাত্তর জন লোক। তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা দিলেন, ‘‘দুনিয়ার গোটা ব্যবস্থা তাঁদেরকে পাল্টে দিতে হবে।’’

স্থূল দৃষ্টিসম্পন্ন লোকদের কেউ কেউ হয়তো তাঁকে বদ্ধ পাগলই মনে করেছিলেন। কিন্তু সূক্ষ্ণদর্শী ও দূরদর্শী সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী ভালো করেই জানতেন যে সকল বিপ্লবের গোড়াতে প্রথমে তো থাকে একজন মাত্র মানুষ। আর সেই মানুষটিকে কেন্দ্র করেই কালক্রমে গড়ে উঠে বিশাল কাফিলা।

২৪. জামালপুরে কেন্দ্রীয় অফিস স্থানান্তর

সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী শহরের কোলাহলমুক্ত এমন একটি স্থানে জামায়াতে ইসলামীর অফিস স্থানান্তরের কথা ভাবছিলেন যেখানে শান্ত মনে গবেষণা কাজ করা যায় এবং ইসলামের আলোকে একটি জনপদও গড়ে তোলা যায় যা অন্য সব জনপদের জন্য হবে একটি মডেল। এই খবর জানতে পেরে ‍চৌধুরী নিয়ায আলী জামালপুরের দারুল ইসলাম ট্রাস্টেই জামায়াতে ইসলামী অফিস স্থানান্তরের প্রস্তাব দেন। বিষয়টি জামায়াতে ইসলামীর মাজলিসে শূরায় আলোচিত হয় এবং চৌধুরী সাহেবের প্রস্তাব সাদরে গৃহীত হয়।

১৯৪২ সনের জুন মাস জামালপুরে জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় অফিস স্থানান্তরিত হয়। প্রায় চার বছর পর সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী আবার জামালপুর আসেন। এই সময় জামায়াতে ইসলামী দাওয়াত পৌঁছানো, শাখা বাড়ানো ও জনশক্তির মান বাড়ানোর জন্য ব্যাপক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছিলো। বিভিন্ন স্থানে আঞ্চলিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে থাকে। সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী এইসব সম্মেলনে জ্ঞানগর্ভ ভাষণ দিয়ে জনশক্তিকে দিক-নির্দেশনা দিতে থাকেন।

২৫. প্রথম কেন্দ্রীয় সম্মেলন

১৯৪৫ সনের ১৯, ২০ ও ২১শে এপ্রিল জামালপুরের দারুল ইসলামে জামায়াতে ইসলামীর প্রথম কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। গোটা উপ-মহাদেশ থেকে আগত আট শতাধিক ডেলিগেট উপস্থিত ছিলেন এই সম্মেলনে।

সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী ‘‘ইসলামী দাওয়াত ও কর্মনীতির’’ ওপর আলোকপাত করেন। ভাষণের একাংশে তিনি বলেন,

– ‘‘আমরা সাধারণত সকল মানুষকে বিশেষ করে মুসলিমদেরকে আল্লাহর দাসত্ব গ্রহণ করার আহ্‌বান জানাই।’’

– ‘‘যারা ইসলাম গ্রহণ করার কিংবা ইসলাম মেনে চলার কথা বলেন আমরা তাঁদের সকলকে বৈসাদৃশ্য দূর করে ইসলামের পূর্ণ অনুসারী হবার আহ্‌বান জানাই।’’

– ‘‘আমরা তাঁদেরকে আল্লাহদ্রোহী নেতৃত্বের অবসান ঘটিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব আল্লাহভীরু লোকদের হাতে সুপর্দ করার আহ্‌বান জানাই।’’

[দ্রষ্টব্যঃ ইসলামী দাওয়াত কর্মনীতি, সাইয়েদ আবুল লা মওদূদী, পৃষ্ঠা]

কর্মনীতি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন,

যাঁরা আমাদের দাওয়াত কবুল করেন আমরা তাঁদেরকে কার্যত আল্লাহর প্রতি আনুগত্যশীল জীবন গড়ে তুলতে এবং এই কাজে নিষ্ঠা ও একাগ্রতার প্রমাণ পেশ করতে বলি।

ঈমানের বিপরীত সকল কাজ থেকে তাঁদের জীবনকে পবিত্র করতে বলি। এখান থেকেই তাঁদের চারিত্রিক বিশুদ্ধির কাজ এবং এর যাচাই শুরু হয়ে যায়। যাঁরা উচ্চ লক্ষ্য সামনে রেখে উচ্চ শিক্ষা লাভ করেছেন তাঁদেরকে নিজেদের রচিত স্বপ্ন প্রাসাদ নিজের হাতেই ধূলিসাৎ করে দিতে হয় এবং এমন এক জীবন ক্ষেত্রে নামতে হয় যাতে সম্মান, পদমর্যাদা, আর্থিক স্বাচ্ছন্দের সম্ভাবনা কেবল নিজেদের জীবনেই নয় পরবর্তী কয়েক পুরুষ পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয় না। আর যাঁদের আর্থিক সচ্ছলতা, লুণ্ঠিত সম্পদ, অংশীদারদের অপহৃত অংশ ও উত্তরাধিকারীদের হক নষ্ট করা সম্পত্তির ওপর স্থাপিত, এই আন্দোলনের যোগদানের ফলে সেই সব ত্যাগ করে তাঁদেরকে সর্বহারা সাজতে হয়। কারণ তাঁরা যেই আল্লাহকে নিজেদের মালিক ও মনিব হিসেবে মেনে নিয়েছেন তিনি কারো সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করা পছন্দ করেন না। ….কার্যত এই আদর্শ গ্রহণ করলে প্রত্যেক ব্যক্তির আপনজন তাঁর দুশমন হয়ে পড়ে। তাঁর আব্বা-আম্মা, ভাই-বন্ধু, স্ত্রী-সন্তান ও অন্যান্য নিকটাত্মীয়রাই সর্বপ্রথম তাঁর ঈমানের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। এই আদর্শ গ্রহণ করার সংগে সংগে বহু লোকের শান্তিপূর্ণ ও স্নেহময় নীড় বোলতার বাসায় পরিণত হয়। প্রকৃতপক্ষে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের এটিই সর্ব প্রথম ট্রেনিং সেন্টার। ….এই প্রাথমিক পরীক্ষায় যাঁরা ব্যর্থ হন আন্দোলন ও সংগঠন থেকে তাঁরা আপনা আপনি ঝরে পড়েন। যাঁরা এতে সাফল্য অর্জন করেন তাঁরা নিজেদের নিষ্ঠা, একাগ্রতা, ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, দৃঢ় সংকল্প, সত্যপ্রীতি ও মজবুত স্বভাব-প্রকৃতির অস্তিত্ব প্রমাণ করেন যা আল্লাহর পথে প্রাথমিক পদক্ষেপ ও পরীক্ষার প্রথম অধ্যায় অতিক্রম করার জন্য একান্ত অপরিহার্য।

[দ্রষ্টব্যঃ ইসলামী দাওয়াত কর্মনীতি, সাইয়েদ আবুল লা মওদূদী, পৃষ্ঠা২১,২২]

‘‘দ্বিতীয়ত জামায়াতে ইসলামী সদস্যদের ওপর আদর্শ প্রচারের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। যেই সত্যের আলো তারা লাভ করেছেন তা তাঁদের সন্নিকটবর্তী সকল মানুষের মধ্যে বিকীর্ণ করা তাঁদের অন্যতম প্রধান কর্তব্য। ….এখানে আবার নতুন পরীক্ষা শুরু হয়। এই প্রচারমূলক কাজের চাপে প্রচারকের নিজের জীবনই সয়ংশোধিত হতে থাকে। কারণ এই কাজ শুরু করলে অসংখ্য দূরবীণ ও সার্চ লাইট তাঁর জীবন ও চরিত্রের দিকে উত্তোলিত হয়। ফলে প্রচারকের জীবন ঈমান বিরোধী সামান্য কিছু থাকলেও এই বিনা পয়সার সংশোধন প্রচেষ্টার মাধ্যমে তাঁর নিজের নিকট তা স্পষ্ট হয়ে উঠে ও অনবরত চাবুক লাগিয়ে তাঁর জীবনকে নির্মল করে তোলে।

প্রচারক যদি আসলেই ঐকান্তিক নিষ্ঠার সাথে ঈমান এনে থাকে, তাহলে এই সমালোচনায় মোটেই ক্ষিপ্ত হবেন না ও গোঁজামিল দিয়ে নিজের ভুল গোপন করার চেষ্টা করবেন না। বরং লোকদের এই সমালোচনার আলোকে নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে চেষ্টিত হবেন।’’

[দ্রষ্টব্যঃ ইসলামী দাওয়াত কর্মনীতি, সাইয়েদ আবুল লা মওদূদী, পৃষ্ঠা২২,২৩]

‘‘আদর্শ প্রচারের ক্ষেত্রে আমরা কর্মীদেরকে আল কুরআনে উপস্থাপিত কর্মনীতিই শিক্ষা দিতে চেষ্টা করেছি। অর্থাৎ যুক্তি, জ্ঞান-বুদ্ধি ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে লোকদেরকে আল্লাহর পথে আহ্‌বান জানানো। ক্রমধারা অনুসরণ করে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে লোকদেরকে দীন ইসলামের বুনিয়াদী নীতিগুলো ভিত্তি করে জীবন গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করা। কাউকে সাধ্যাতীত খোরাক দান, মৌলিক বিষয়ের পূর্বে খুঁটিনাটি বিষয় পেশ করা, মৌলিক ত্রুটি দূর করার পরিবর্তে বাহ্যিক ত্রুটি দুর করার চেষ্টা করে সময় নষ্ট করার মতো অবৈজ্ঞানিক কাজ করতে কর্মীদেরকে নিষেধ করা হয়। বিভ্রান্ত লোকদের প্রতি ঘৃণা ও অবজ্ঞা মিশ্রিত আচরণ না করে সুদক্ষ ডাক্তারের মতো সহানুভূতি ও কল্যাণ কামনাসহ তাদের প্রকৃত রোগের চিকিৎসা করার চেষ্টা চালানোই আমাদের কাজ। ভর্ৎসনা ও পাথর নিক্ষেপের উত্তরে কল্যাণকর কাজ করতে শেখা, যুল্‌ম নির্যাতনের মুখে ছবর অবলম্বন করা, যারা অজ্ঞতাবশতঃ কুতর্ক করে তাদের সাথে বিবাদে লিপ্ত না হওয়া, নিরর্থক কথাবার্তাকে মহান ব্যক্তির মতো উপেক্ষা করা আমাদের কর্মীদের বৈশিষ্ট্য। সত্য থেকে যারা দূরেই থাকতে চায় তাদের পেছনে লেগে থাকার চেয়ে সত্যসন্ধানী ব্যক্তিদের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়া কর্তব্য।’’

[দ্রষ্টব্যঃ ইসলামী দাওয়াত কর্মনীতি, সাইয়েদ আবুল লা মওদূদী, পৃষ্ঠা২৪]

‘‘সকল কাজ একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে করা এবং প্রতিদান একমাত্র আল্লাহর কাছে পাওয়ার আশা করা আমাদের কর্মীদের কর্তব্য। তাঁদের মনে এই ধারণা জাগ্রত থাকা দরকার যে আল্লাহ তাঁদের সকল কাজ দেখছেন এবং তিনি তাঁদের কাজের মূল্য অবশ্যই দেবেন। দুনিয়ার মানুষ এর মূল্য বুঝুক আর না বুঝুক, মানুষ কোন সুফল দিক আর না দিক তাতে কিছু যায় আসে না। আর এমন কর্মনীতিতে অসাধারণ ধৈর্য সহিষ্ণুতা ও অবিশ্রান্ত চেষ্টা সাধনার প্রয়োজন।

[দ্রষ্টব্যঃ ইসলামী দাওয়াত কর্মনীতি, সাইয়েদ আবুল লা মওদূদী, পৃষ্ঠা২৫]

‘‘অনেক লোকের মধ্যে একটি তীব্র গতিশীল কর্মনীতি গ্রহণ করে অবিলম্বে বিরাট কিছু করে দেখাবার আকাঙ্ক্ষা দেখা যায়। প্রকৃত পক্ষে এটি চিন্তাহীন কর্মের প্রাচীন রোগ ছাড়া আর কিছুই নয়।’’

[দ্রষ্টব্যঃ ইসলামী দাওয়াত কর্মনীতি, সাইয়েদ আবুল লা মওদূদী, পৃষ্ঠা৩৬]

‘‘আমাদের কর্মনীতি যে অত্যন্ত ধৈর্য সাপেক্ষ, মন্থর এবং অচিরেই তাতে কোন অনুভবযোগ্য ফল লাভের আশা করা যায় না বরং তাতে দীর্ঘকাল পর্যন্ত অবিশ্রান্ত ভাবে সাধনা করে যেতে হয় এতে একটুও সন্দেহ নেই।’’

[দ্রষ্টব্যঃ ইসলামী দাওয়াত কর্মনীতি, সাইয়েদ আবুল লা মওদূদী, পৃষ্ঠা৩৭]

২১ এপ্রিল সমাপ্ত হয় জামায়াতে ইসলামীর এই কেন্দ্রীয় সম্মেলন। সমাপ্তি ভাষণে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী নেতৃত্বের গুরুত্ব, মৌলিক মানবীয় গুণ ও ইসলামী নৈতিকতা সম্পর্কে বিশেষভাবে আলোচনা করেন। ভাষণের একাংশে তিনি বলেন, ‘‘একটি গাড়ি সেই দিকেই ছুটে চলে যেই দিকে ড্রাইভার এটিকে চালিয়ে নেয়। গাড়ির আরোহীরা ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক সেই দিকেই ভ্রমণ করতে বাধ্য হয়। অনুরূপভাবে মানব সমাজের গাড়িও সেই দিকেই চলতে থাকে যেই দিকে সমাজের নেতারা ও কর্তৃত্বশীল লোকেরা তাকে নিয়ে যায়।’’

‘‘পৃথিবীর যাবতীয় উপায় উপকরণ যাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে, ক্ষমতা-ইখতিয়ারের চাবি-কাঠি যাদের হাতে থাকে, জনগণের জীবনধারা যাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে, চিন্তাধারা, মতবাদ ও আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য অপরিহার্য উপায়-উপাদান যাদের হাতে থাকে, ব্যক্তিগত স্বভাব-চরিত্র পুনর্গঠন এবং সমষ্টিগত নীতি ব্যবস্থার বাস্তবায়ন ও নৈতিক মূল্যবোধ নির্ধারণের ক্ষমতা যাদের থাকে, তাদের অধীনে জীবন যাপনকারী মানুষেরা সমষ্টিগতভাবে তাদের বিপরীত দিকে কিছুতেই চলতে পারে না। এই নেতৃবৃন্দ ও কর্তৃত্বশীল লোকেরা যদি আল্লাহর প্রতি আনুগত্যশীল, সৎ ও সত্যাশ্রয়ী হয় তাহলে সেই সমাজের লোকদের জীবনের সব কিছুই আল্লাহ ভীতি ও সার্বিক কল্যাণের উপর গড়ে উঠে। অসৎ ও পাপী লোকেরাও সেই সমাজে সৎ ও পূণ্যবান হতে বাধ্য হয়। সৎ ব্যবস্থা ও কল্যাণকর রীতিনীতি ও আচার অনুষ্ঠান বিকশিত হয়। পাপ অন্যায় নিঃশেষ হয়ে না গেলেও অন্তত বিকশিত হতে পারে না। পক্ষান্তরে নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যদি আল্লাহদ্রোহী, ফাসিক, পাপী লোকদের হাতে থাকে, তাহলে গোটা ব্যবস্থা আল্লাহদ্রোহিতা, যুল্‌ম নির্যাতন, অন্যায়-অনাচার, ও অসচ্চরিত্রতার পথে চলতে থাকে। চিন্তাধারা জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতি, সভ্যতা-সংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠান, পারস্পরিক সম্পর্ক, আইন-বিচার তথা সব কিছুই বিপর্যস্ত হয়। পাপ ও অন্যায় ফুলে-ফুলে সুশোভিত হয়। সত্য, ন্যায় ও কল্যাণ বিদায় নেয়। আল্লাহর এই যমীন যুল্‌ম-নির্যাতন ও শোষণের সয়লাব স্রোতে কানায় কানায় ভরে উঠে। এমন পরিবেশে অন্যায়ের পথে চলা হয় সহজ, সত্য ও ন্যায়ের পথে শুধু চলা নয় দাঁড়িয়ে থাকাও হয় অত্যন্ত কঠিন।’’

এই ভাষণের আরেক অংশে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী মৌলিক মানবীয় গুণ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন,

‘‘ঈমানদান, কাফির, নেক্কার, বদকার, কুসংস্কারাচ্ছন্ন কিংবা বিপর্যয় সৃষ্টিকারী যে যাই হোক না কেন তার মধ্যে যদি ইচ্ছাশক্তি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ শক্তি, প্রবল বাসনা, উচ্চ আশা, নির্ভীকতা, বীরত্ব, দৃঢ়তা, ত্যাগ-তিতিক্ষা, সহিষ্ণুতা, সহনশীলতা, পরিশ্রমপ্রিয়তা, লক্ষ্য অর্জনের জন্য সব কিছু কুরবানী করার মনোভংগি, সতর্কতা, দূরদৃষ্টি, অন্তর্দৃষ্টি, বিচার ক্ষমতা, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও তদনুযায়ী কর্মনীতি নির্ধারণের যোগ্যতা, আবেগ-বাসনা-উত্তেজনার সংযমশক্তি এবং অপরাপর মানুষকে প্রভাবিত, আকৃষ্ট ও কাজে নিয়োজিত করার বিচক্ষণতা পুরোমাত্রায় থাকে, তবে এই দুনিয়ায় তার সফলতা সুনিশ্চিত।’’

‘‘সেই সংগে এমন কিছু গুণও তার থাকা চাই যেইগুলো মানব সমাজে তার সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করে। আত্মসম্মান বোধ, বদান্যতা, দয়া-অনুগ্রহ, সহানুভূতি, ঔদার্য, প্রশস্ত চিত্ততা, নিরপেক্ষতা, দৃষ্টির উদারতা, সত্যবাদিতা, বিশ্বাসপরায়ণতা, ন্যায় নিষ্ঠা, ওয়াদা পূরণ, সভ্যতা-ভব্যতা-প্রভৃতি এইগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।’’

‘‘কোন মানবগোষ্ঠীর অধিকাংশের মধ্যে যদি উল্লেখিত গুণগুলোর সমাবেশ ঘটে, তাহলে বলতে হবে যে মানবতার আসল মূলধনই তাদের অর্জিত হয়েছে এবং এর ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী সমাজ সংস্থা গড়ে তোলা সহজ সাধ্য হবে। তবে এই মূলধনের সামাজিক রূপ লাভের জন্য আরো কিছু নৈতিক গুণের সম্মিলন প্রয়োজন। ‍উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, সমাজের সকল লোক কিংবা অধিকাংশ লোক একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে চূড়ান্ত লক্ষ্যরূপে গ্রহণ করবে। সেই লক্ষ্যকে তারা তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির চেয়েও বেশি ভালোবাসবে, তাদের মাঝে পারস্পরিক সৌহার্দ থাকবে ও মিলেমিশে কাজ করার মনোভংগি থাকবে, উদ্দেশ্য হাছিলের জন্য সংঘবদ্ধভাবে প্রচেষ্টা চালাতে যতোখানি আত্মত্যাগ অপরিহার্য তা করতে তারা প্রস্তুত থাকবে, ভালো ও মন্দ নেতার মধ্যে পার্থক্য করার মতো বুদ্ধিমত্তা থাকবে……..নেতার নির্দেশ পালনে অভ্যস্ত হতে হবে…. গোটা জাতির চেতনা এতোখানি তীব্র থাকতে হবে যে কল্যাণকর বিষয়ের বিপরীত ক্ষতিকর কোন কিছুকে বরদাশত করবে না।’’

আরো সামনে এগিয়ে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী ইসলামী নৈতিকতার ওপর আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, ‘‘ইসলাম মৌলিক মানবীয় গুণকে নির্ভুল কেন্দ্রের সাথে যুক্ত করে দেয়। মৌলিক মানবীয় গুণ প্রথম অবস্থায় ‍নিরপেক্ষ একটি শক্তিরূপেই থাকে। এই অবস্থায় তা ভালোও হতে পারে, মন্দও হতে পারে, কল্যাণের হাতিয়ার হতে পারে, অকল্যাণের হাতিয়ারও হতে পারে। যেমন একটি শাণিত তলোয়ার। ডাকাতের হাতে পড়লে তা যুল্‌ম-পীড়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়। আল্লাহর পথের মুজাহিদদের হাতে পড়লে তা কল্যাণকর হাতিয়ারে পরিণত হয়।’’

‘‘ইসলাম মানুষের গোটা জীবন ও তার অন্তর্নিহিত শক্তিগুলোকে এভাবেই নিয়ন্ত্রিত ও সংশোধিত করে। এই সংশোধনের ফলে মৌলিক মানবীয় গুণগুলো সঠিক পথে পরিচালিত হয় ও ব্যক্তি স্বার্থ, বংশ, পরিবার কিংবা জাতির শ্রেষ্ঠত্ব বিধানের জন্য ব্যয়িত না হয়ে সত্যের বিজয় নিশ্চিত করার জন্য সংগতভাবে ব্যয় হতে থাকে।’’

‘‘পৃথিবীর বুকে ইসলামী নৈতিকতা ও মৌলিক মানবীয় গুণ সমৃদ্ধ এবং জাগতিক উপায় উপকরণ সঠিকভাবে ব্যবহারকারী একটি সুসংগঠিত দল বর্তমান না থাকলে আল্লাহ দুনিয়ার নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের চাবিকাঠি এমন একটি দলের হাতে ন্যস্ত করেন যেই দলটি অন্তত মৌলিক মানবীয় গুণে ভূষিত ও জাগতিক উপায়-উপকরণ ব্যবহার করার দিক দিয়ে অন্য দলগুলোর তুলনায় অধিক অগ্রসর। ……কিন্তু দুনিয়ায় যদি এমন একটি সুসংগঠিত দল সত্যিই বর্তমান থাকে যেটি ইসলামী নৈতিকতা ও মৌলিক মানবীয় গুণে অন্যান্য সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর এবং জাগতিক উপায়-উপকরণ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অন্যদের চেয়ে পশ্চাৎপদ নয়, তাহলে দুনিয়ার নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের চাবিকাঠি অন্য দলের হাতে অর্পিত হওয়া একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার।’’

‘‘এই কথাও স্মরণ রাখতে হবে যে ঐরূপ একটি দলের উপস্থিতিই নেতৃত্ব ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটার জন্য যথেষ্ট নয়। ব্যাপার এমন নয় যে এই দিকে এই রূপ একটি দল অস্তিত্ব লাভ করবে, আর ঐদিকে আসমান থেকে একদল ফেরেশতা নেমে কাফির ও ফাসিকদেরকে নেতৃত্বের আসন থেকে হটিয়ে এদেরকে সেই আসনে বসিয়ে দেবে। এইরূপ অস্বাভাবিক নিয়মে মানব সমাজে কখনোই কোন পরিবর্তন ঘটে না। নেতৃত্ব ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হলে জীবনের সকল ক্ষেত্রে, প্রত্যেক কদমে কাফির ও ফাসিক শক্তির সাথে মুকাবিলা করতে হবে এবং সত্য প্রতিষ্ঠার বন্ধুর পথে সকল প্রকার কুরবানী দিয়ে সত্য প্রীতির ঐকান্তিকতা ও অপ্রতিভ যোগ্যতারও প্রমাণ পেশ করতে হবে।’’

অতপর সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী ইসলামী নৈতিকতার চারটি পর্যায় ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ‘‘আল কুরআন ও আল হাদীসের শিক্ষা অনুযায়ী এর চারটি পর্যায় রয়েছে। প্রথম ঈমান, দ্বিতীয় ইসলাম, তৃতীয় তাকওয়া ও চতুর্থ ইহসান। এই চারটি পর্যায়ের পরবর্তীটি পূর্ববর্তীটির থেকে উদ্ভূত ও এরই ওপর প্রতিষ্ঠিত।’’

About এ. কে. এম. নাজির আহমদ