আমরা সেই সে জাতি – ২য় খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

চলমান পেজের সূচীপত্র

মেহমানের মর্যাদা পেলো যুদ্ধবন্দীরা

বদর যুদ্ধে বিজয়ী মুসলমানদের হাতে অনেক কুরাইশ বন্দী হলো। এরা সেই তারা, যারা মহানবী(সা) এবং তাঁর অনুসারীদের উপর তের বছর ধরে অমানুষিক অত্যাচার করেছে এবং তাঁদেরকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে। সেই যুগের নীতি অনুসারে হয় তাদের সকলকে হত্যা অথবা তাদেরকে দাস বানিয়ে নেয়া যেত। কিন্তু মহানবী(সা) তাদের সাথে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী ব্যবহার করলেন।

তিনি তাদের সাথে মেহমানের মত ব্যবহার করতে নির্দেশ দিলেন। মুসলমানদের নিজেদের খাওয়ার ব্যাপারে কষ্ট হলেও বন্দীদের ভাল ও পেট পুরে খাবার দেয়া হতো। মুসলমানরা দু’চারটা খেজুর খেয়ে দিন কাটাতেন, কিন্তু বন্দীদের রুটি খাওয়ান হতো। বন্দীদের একজন পরবর্তীকালে বলেছেন, “মদিনাবাসিদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। ওরা আমাদের ঘোড়ায় চড়িয়ে নিজেরা পায়ে হেঁটে পথ চলত। তারা প্রায় না খেয়ে আমাদের খাওয়াত।”

ওয়াহাবের আমল দেখে উমার (রা) ঈর্ষান্বিত হলেন

ওয়াহাব ইবনে কাবুস (রা) একজন সাহাবী। তিনি একটি গ্রামে বাস করতেন এবং বকরি চরাতেন। একদিন তিনি নিজের ভ্রাতুষ্পুত্রের ছাগলের সাথে নিজের ছাগলগুলো বেঁধে দিয়ে ছাগলগুলো ওইখানে ফেলে মদীনা শরীফ চলে গেলেন। সেখানে নবী করীমকে(সা) সন্ধান করে জানতে পারলেন, নবী করীম(সা) উহুদের যুদ্ধে চলে গেছেন। তিনি দ্রুত গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে হাজির হলেন।

তিনি পৌছার পর একদল কাফির নবী করীমকে(সা) আক্রমণ করলো। হযরত ওয়াহাব(রা) তখন ক্ষিপ্রতার সাথে এবং অমিতবিক্রমে তরবারি চালাতে লাগলেন এবং অল্প সময়ের মধ্যে শত্রুদের হটিয়ে দিলেন। একটু পর আরেক দল নবী করিমকে(সা) আক্রমণ করল।এবারও হযরত ওয়াহাব শত্রুদের হটিয়ে দিলেন। এবার তৃতীয় দল আক্রমণ করল। নবী করীম(সা) তখন ওয়াহাবকে জান্নাতের সুসংবাদ দিলেন। বলার সাথে সাথে হযরত ওয়াহাব শত্রুদলটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কিন্তু শ্রান্তক্লান্ত বীর এবার শহীদ হয়ে গেলেন।

সা’আদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস বলেন যে, ওয়াহাব(রা) সেদিন যে বীরত্ব প্রদর্শন করেছেন, কোন যোদ্ধাকে তিনি কখনও অমন সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শন করতে দেখেননি।

ওয়াহাবের শাহাদাতের পর নবী করীম(সা) তাঁর মাথার কাছে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, আমি তোমার উপর সন্তুষ্ট, আল্লাহও তোমার উপর সন্তুষ্ট হন।

এরপর নবী করীম(সা) সাংঘাতিক ভাবে আহত হয়ে থাকলেও নিজের পবিত্র হাতে ওয়াহাবকে দাফন করলেন। হযরত উমার(রা) বলেন, কারো আমল দেখে আমি কখনও ঈর্ষান্বিত হই নি। কিন্তু ওয়াহাবের আমল দেখে আমি বাস্তবিকই ঈর্ষান্বিত হয়েচিলাম।এমন আমলনামা নিয়ে যদি আল্লাহর নিকট যেতে পারতাম।

উমায়ের(রা) যুদ্ধ রেখে খেজুর খেলেন না

বদরের যুদ্ধে নবী করীম(সা) একটি তাঁবুতে কিছুক্ষণ বিশ্রাম শেষে বাইরে এসে বললেন, ‘উঠ এবং আসমান যমিনের চাইতে বড় এবং মুত্তাকীদের জন্যে তৈরি জান্নাতের দিকে অগ্রসর হও।’

হযরত উমায়ের ইবনুল হাম্মাম এই কথা শুনে বলে উঠলেন, বাঃ বাঃ।

নবী করীম(সা) বললেন, ‘তুমি তাদের একজন।’

এরপর সাহাবী উমায়ের(রা) ঝুলি থেকে খেজুর বের করে খেতে লাগলেন। কিন্তু পর মুহূর্তেই বলতে লাগলেন, ‘খেজুর খাওয়ার জন্যে অপেক্ষা! হাতে তো অনেক খেজুর রয়েছে, এতক্ষণ কে অপেক্ষা করবে?’ এই বলে উমায়ের খেজুরগুলো ফেলে দিয়ে শত্রুর মধ্যে ঢুকে পড়লেন এবং যে পর্যন্ত না শহীদ হলেন সে পর্যন্ত অনবরত অসি চালনা করলেন।

মহানবী(সা) ও মুসলিমদের প্রতি এক শহীদের বাণী

উহুদের যুদ্ধে নবী করীম(সা) হযরত সা’দ ইবনে রাবী কেমন আছেন জানতে না পেরে একজন সাহাবীকে তাঁর সন্ধানে পাঠালেন। তিনি প্রথমে শহীদদের মধ্যে তাঁকে তালাশ করলেন, না পেয়ে জীবিতদের মধ্যে ডেকে বেড়াতে লাগলেন। কিন্তু নিরাশ হয়ে বললেন, সা’দ ইবনে রাবীর সংবাদ লওয়ার জন্যে নবী করীম(সা) আমাকে পাঠিয়েছেন।

তখন এক স্থান হতে একটি অতি ক্ষীণ স্বর শোনা গেল। তিনি ঐ স্বর লক্ষ্য করে গিয়ে দেখলেন, সা’দ নিহতদের মধ্যে পড়ে আছে এবং জীবনের এক আধটি নিঃশ্বাস মাত্র তাঁর বাকি আছে।

সাহাবী নিকটে গেলে হযরত সা’দ বললেন, নবী(সা) কে সালাম জানিয়ে বলো, আল্লাহ তাআলা কোন নবীকে তাঁর উম্মতের তরফ থেকে শ্রেষ্ঠতম যে পুরস্কার দান করেছেন, আল্লাহ যেন আমার তরফ থেকে তাঁকে তার চেয়ে উত্তম পুরস্কার দান করেন। আর মুসলমানদের আমার এ বাণী পৌঁছিয়ে দিও যে, তাদের একটি প্রাণী জীবিত থাকতে যদি কাফিররা নবী করীম(সা) এর নিকটে আসতে পারে, তবে তাদের মুক্তির জন্যে আল্লাহর কাছে কোন ওযরই থাকবেনা। এ কথা বলে তিনি শহীদ হয়ে গেলেন।

সাদ জিহাদের ডাক শুনে বিয়ের কথা ভুলে গেলেন

হযরত সা’দ। কোন মেয়েই তাঁকে বিয়ে করতে রাজি হয় না। হয়ত তাঁর প্রচুর অর্থ বা দৈহিক সৌন্দর্য ছিল না। অবশেষে তিনি নবীর(সা) শরণাপন্ন হলেন। নবী(সা) তাঁর বিয়ে ঠিক করলেন। মনের আনন্দে সা’দ ছুটে গেলেন বাজারে যথাশক্তি অর্থ ব্যয়ে বিয়ের জিনিসপত্র কিনতে। বাজারে গিয়েই সা’দ শুনতে পেলেন ‘জিহাদ’, জিহাদে কে যোগ দেবে, সত্যের পথে, আল্লাহর পথে কে প্রাণ দিবে। সা’দ এই আহবান শুনলেন। বিবাহিত জীবনের সকল স্বপ্নসাধ তাঁর মুহূর্তে ভেঙে গেল। জিহাদের আহবান এসেছে- সত্যের জন্য প্রাণ দিতে ডাক এসেছে- সা’দ অধীর হয়ে উঠলেন। বিয়ের জিনিসপত্র না কিনে তিনি খরিদ করলেন একটি ঘোড়া, বর্শা ও একটি সুদীর্ঘ তরবারি। ছুটে চললেন যুদ্ধক্ষেত্রে। অসীম সাহস, উৎসাহ ও বীর্যবত্তা দেখিয়ে সা’দ যুদ্ধ করে শহীদ হলেন। যে সা’দ চেয়েছিলেন বিবাহের রাতে কনেকে যৌতুক দেবেন, আনন্দের প্রীতি উপহার দেবেন, সেই সা’দ সূর্যাস্তের পূর্বেই আল্লাহকে তাঁর জীবন উপহার দিলেন- এক অপূর্ব যৌতুক।

জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর মহানবী শত্রুদের মঙ্গল চাইলেন

উহুদের যুদ্ধক্ষেত্র। মহানবী(সা) স্বয়ং সৈনিকদের ব্যুহ সাজিয়েছেন। পাহাড়ের গলিপথে পাহারা বসিয়েছিলেন এবং যার যা দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন।

কিন্তু প্রাথমিক বিজয় মুসলিম সৈনিকদের আত্মহারা করে দিয়েছিল, দায়িত্বের কথা তারা ভুলে গিয়েছিল। পাহাড়ের গলিপথ রক্ষার দায়িত্ব যাদের উপর ছিল, তারা সরে এসেছিল সেখান থেকে। ফলে পেছন থেকে আক্রান্ত হওয়ার বিপর্যয় নেমে আসে মুসলিম বাহিনীতে।

অনেক সাহাবী শহীদ হলেন। আহত হলেন আরও অনেকে। স্বয়ং মহানবী(সা) মারাত্মক আহত হলেন। পাথরের আঘাতে তাঁর কপালে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হলো। লৌহ শিরস্ত্রাণ তাঁর ঢুকে গিয়েছিল ক্ষতে। দাঁতও তাঁর ভেঙে গিয়েছিল। তিনি অজ্ঞান হয়ে পরেছিলেন।

পাহাড়ের এক চূড়ায় সাহাবীরা তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি জ্ঞান ফিরে পেয়ে চোখ খুলে চাইলেন। রক্ত মুছে ফেললেন মুখমণ্ডল থেকে। তারপর তিনি প্রথম কথা বললেন তা ছিল এই,

“হে আল্লাহ, আমার লোকদের সত্য পথে ফিরিয়ে আনুন। তারা জানে না তারা কি করছে।”

কিন্তু উমার, আমি যে শান্তির বার্তা বাহক

হুদাইবিয়ার সন্ধির শর্তগুলো স্থির হয়েছে, কিন্তু স্বাক্ষর তখনও হয় নি। এমন সময় মক্কার একজন মুসলমান পালিয়ে হুদাইবিয়ায় মুসলমানদের কাছে পৌঁছল। নাম আবু জান্দাল। সে ইসলাম গ্রহণ করায় মক্কাবাসীরা তার উপর অমানুষিক অত্যাচার চালিয়ে আসছে। তার দেহে নির্মম আঘাতের চিহ্নগুলো জ্বলজ্বল করছে। সে মহানবী(সা) এর কাছে আশ্রয়ের আবেদন করলেন।

মহানবীর দরবারে উপস্থিত কুরাইশ  নেতা সাহল বলল, ‘সন্ধির শর্ত অনুযায়ী এই লোককে অবিলম্বে মক্কায় ফেরত পাঠাতে হবে।’ উত্তরে একজন মুসলিম বলল, ‘সন্ধি এখনও স্বাক্ষর হয়নি, সুতরাং এ লোককে ফেরত দিতে এখনই আমরা বাধ্য নই।’ সাহল বলল, ‘যদিও সন্ধি এদিক থেকে অসম্পূর্ণ তবু সন্ধির শর্ত সম্পর্কে আমরা একমত হয়ে গেছি। সুতরাং লোকটিকে অবশ্যই আমাদের হাতে ফেরত দিতে হবে।’

মহানবী(সা) গম্ভীরভাবে বসেছিলেন, অবশেষে তিনি সাহলকে বললেন, ‘ঠিক আছে, তোমার  ইচ্ছাই পূর্ণ হবে।’

তারপর তিনি আবু জান্দালের দিকে স্নেহদৃষ্টি তুলে বললেন, ‘আবু জান্দাল, ফিরে যাও, আল্লাহর নামে ধৈর্য ধারণ কর। আল্লাহই তোমার মুক্তির ব্যবস্থা করবেন।’

ক্রন্দনরত আবু জান্দাল মুসলমানদের সামনে দিয়ে মক্কায় চলে গেল। তার কান্না অস্থির করে তুলল মুসলমানদের। উমার (রা) আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি মহানবীর(সা) সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। অদম্য আবেগে গোটা দেহ কাঁপছিল তাঁর। বললেন, ‘হে রাসুল, আপনি কি আল্লাহর সত্যিকার রাসুল নন?’

মহানবী(সা) বললেন, ‘নিশ্চয় আমি আল্লাহর রাসুল।’ উমার(রা) বললেন, ‘আমরা হকের উপর আছি, তারা নাহক পথে আছে এটা কি সত্য?’

মহানবী(সা) বললেন, ‘অবশ্যই সত্য।’ উমার(রা) বললেন, ‘তাহলে কেন আপনি অপমানকর সন্ধির অমর্যাদাকে ধরে রাখতে চাইছেন? আমার আবেদন, সন্ধির শর্ত থেকে আমাদের মুক্তি দিন। তলোয়ারই ফায়সালা করুক।’

মহানবী(সা) হেসে বললেন, কিন্তু উমার, ‘আমি যে শান্তির বার্তাবাহক। ধৈর্য ধর। তুমি যাকে অমর্যাদা বলছ, তার মধ্যেই করুণাময় আল্লাহ এক মহাপুরস্কার লুক্কায়িত রেখেছেন, যা সামনেই দেখতে পাবে’ এই বলে মহানবী(সা) সন্ধিপত্রে তাঁর সীলমোহর লাগালেন এবং তা তুলে দিলেন সাহল-এর হাতে।

একটা খেজুর মহানবীকে রাতে ঘুমাতে দিল না

মহানবী(সা) বিত্তের মধ্যে থেকেও ছিলেন নিঃস্ব। এক বিশাল সাম্রাজ্যের মালিক হয়েও তিনি ছিলেন দরিদ্র। মৃত্যুর দিন তাঁর গৃহাঙ্গন ছিল অন্ধকার, বাটিতে তেল ছিল না। ভাঁড়ারে কোন খাবার ছিল না, ঋণের দায়ে তাঁর বর্মটি ছিল বন্ধক দেয়া।

তিনি নিঃস্ব ছিলেন কারণ রাষ্ট্রের সম্পত্তি অর্থাৎ জনগণের সম্পদে তিনি হাত দিতেন না। সাদাকা জাতীয় দানকে তিনি নিজের জন্য হারাম মনে করতেন।

একদিনের ঘটনা। একদিন রাতে মহানবীকে(সা) নিদ্রাহীন দেখা গেল। তিনি অশান্ত বিছানায় গড়াগড়ি দিচ্ছিলেন। তাঁর সহধর্মিণী জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসুল, সারা রাত আপনি ঘুমোননি।”

মহানবী(সা) উত্তরে বললেন, “আমি পথে এক জায়গায় একটা খেজুর পেয়ে তুলে নিয়েছিলাম এবং খেয়ে ফেলেছিলাম এই ভেবে যে, হয়তো ওটা পচে নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু এখন আমার ভয় হচ্ছে খেজুরটা যদি সাদাকার জিনিস হয়ে থাকে?”

আবু বকরকে কোনদিন ছাড়িয়ে যেতে পারবোনা

আবু বকর (রা) তাঁর অতুলনীয় বিশ্বাসপরায়ণতার জন্যে উপাধি পেয়েছিলেন ‘আস সিদ্দিক’। শুধু বিশ্বাস ও আমলেই নয়, দানশীলতার ক্ষেত্রেও তাঁর কোন তুলনা ছিল না।

উমার ইবনে খাত্তাব(রা) বলেছেন, তাবুক যুদ্ধের প্রাক্কালে মহানবী(সা) আমাদের যার যা আছে তা থেকে যুদ্ধ তহবিলে দান করার আহবান জানালেন। এ আহবান আমি নিজে নিজেকে বললাম, “আমি যদি আবু বকরকে অতিক্রম করতে পারি তাহলে আজই সেই দিন।” এই চিন্তা করে আমি আমার সম্পদের অর্ধেক মহানবীর(সা) খেদমতে হাজির করলাম। আল্লাহর রাসুল জিজ্ঞাসা করলেন, “পরিবারের জন্য তুমি কি রেখেছ ?” বললাম, “যেই পরিমাণ এনেছি সেই পরিমাণ রেখে এসেছি।” এরপর আবু বকর তাঁর দান নিয়ে হাজির হলেন। মহানবী(সা) ঠিক ঐভাবেই তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আবু বকর, পরিবারের জন্য কি অবশিষ্ট আছে?” আবু বকর জবাব দিলেন, “তাদের জন্য আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসুল রয়েছেন।” আমি আমার কানকে আগের মত করেই বললাম “কোন ব্যাপারেই আবু বকরকে কোন দিন ছাড়িয়ে যেতে পারবোনা।”

ফাতিমার আবদার, মহানবীর কম্পিত কণ্ঠস্বর

সমগ্র আরব তখন মহানবীর(সা) করতলে। প্রভূত সম্পদ তখন জমা হয়েছে মদিনার নববী রাষ্ট্রে। এমনি একদিন মহানবীর(সা) একমাত্র জীবিত সন্তান আদরের দুলালী ফাতিমা(রা) এলেন তাঁর কাছে।

মহানবী(সা) দাঁড়িয়ে দুহাত বাড়িয়ে তাঁকে স্বাগত জানালেন। সস্নেহে তাঁকে পাশে বসালেন। রুমাল দিয়ে মেয়ের মুখের ঘর্মবিন্দু মুছে দিলেন। তারপর কুশল জিজ্ঞাসা করলেন মেয়ের।

কুশল বিনিময়ের পর ফাতিমা(রা) বিষন্নভাবে বললেন, ‘আব্বাজান, অনেক লোক আমার বাড়িতে। আমরা দুজন, তিন ছেলে, চারজন ভাতিজা এবং অতিথিদের স্রোত। আমাকে একাই রান্নাবান্না করতে হয়, সবকিছু দেখাশুনা করতে হয়। আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, আমি শুনেছি, বন্দী অনেক মেয়ে এসেছে। যদি একটি মেয়ে আমাকে দেন, খুব উপকার হয়।’

মহানবী(সা) কম্পিত কণ্ঠে বললেন, ‘প্রিয় কন্যা আমার, যে সম্পদ এবং বন্দীদের তুমি দেখছ সবই মুসলিম জনসাধারণের। আমি এ সবের খাজাঞ্চি মাত্র। আমার কাজ হলো এগুলো সংরক্ষণ করা এবং যথার্থ প্রাপকদের তা দিয়ে দেয়া। তুমি সেই প্রাপকদের একজন নও। সুতরাং এখান থেকে আমি তোমাকে কিছুই দিতে পারিনা। প্রিয় কন্যা, এই দুনিয়া কঠোর সংগ্রামের ক্ষেত্র। তুমি তোমার কাজ করে যাও। যখন ক্লান্ত হবে, আল্লাহকে স্মরণ করবে এবং তাঁর সাহায্য চাইবে। তিনিই তোমাকে শক্তি যোগাবেন।’

‘আল্লাহ’ শব্দে দাসুর-এর হাত থেকে তরবারি পড়ে গেল

মহানবী(সা) একদিন একটি গাছের তলায় ঘুমিয়েছিলেন। এই সুযোগে দাসুর নামে একজন শত্রু তাঁর পাশে এসে দাঁড়াল। শোরগোল করে সে মহানবী(সা) কে ঘুম থেকে জাগাল।

মহানবীর(সা) ঘুম ভাঙলে চোখ খুলে দেখলেন, একটা উন্মুক্ত তরবারি তাঁর উপর উদ্যত। ভয়ানক শত্রু দাসুর চিৎকার করে উঠলো, ‘এখন আপনাকে কে রক্ষা করবে?’

মহানবী(সা) ধীর শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘আল্লাহ।’

শত্রু দাসুর মহানবীর(সা) এই শান্ত গম্ভীর কণ্ঠের আল্লাহ শব্দে কেঁপে উঠল। তার কম্পমান হাত থেকে খসে পড়ল তরবারি।

মহানবী(সা) তার তরবারি তুলে নিয়ে বললেন, ‘এখন তোমাকে কে রক্ষা করবে, দাসুর? সে উত্তর দিল ‘কেউ নেই রক্ষা করার।’

মহানবী(সা) বললেন, ‘না, তোমাকেও আল্লাহই রক্ষা করবেন।’ এই বলে মহানবী(সা) তাঁকে তার তরবারি ফেরত দিলেন এবং চলে যেতে বললেন।

বিস্মিত দাসুর তরবারি হাতে চলে যেতে গিয়েও পারল না। ফিরে এসে মহানবীর হাতে হাত রেখে পাঠ করলঃ ‘লা- ইলাহ ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।’

একজন শরীফযাদা এবং একজন ভিক্ষুক

একদিন কয়েকজন সাহাবী নবী করীম(সা) এর নিকট বসা ছিলেন, ঐ সময় একজন লোক তাঁদের সামনে দিয়ে চলে গেল। নবী করীম(সা) সাহাবীদের জিজ্ঞেস করলেন, ঐ লোকটি সম্পর্কে তোমরা কি জান?

তাঁরা বললেন, তিনি শরীফযাদা, ভাল ঘরে বিয়ে করতে চাইলে সবাই সাদরে গ্রহণ করবে। কথা বলতে থাকলে সবাই মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনবে এবং কারো জন্য সুপারিশ করলে কথা রাখবে।

তাঁদের কথা শুনে নবী করীম(সা) চুপ করে রইলেন।

একটু পরে আরেক ব্যক্তি সেখান দিয়ে চলে গেল। নবী করীম(সা) সাহাবীদের জিজ্ঞেস করলেন, এ লোকটি সম্বন্ধে তোমাদের অভিমত কি?

তাঁরা বললেন, সে একজন ভিক্ষুক, তাকে কেউ ভিক্ষা দেয় না, তার কথাও কেউ শুনে না, কারও জন্য সুপারিশ করতে গেলে তার কথা কেউ আমলে নেয় না।

শুনে নবী করীম(সা) বললেন, প্রথম লোকটির মত যদি দুনিয়ার সব লোক হয়ে যায়, তথাপি সকলে মিলে দ্বিতীয় লোকটির সমান হবে না।

নিতান্ত দরিদ্র ও তুচ্ছ ব্যক্তিও যদি সৎ পথে বিচরণ করে, সৎকার্য করে জীবন কাটায়, তবে আল্লাহর নিকটে সে বেআমল শরীফ লোক থেকে অনেক শ্রেষ্ঠ এবং সম্মানিত।

মদিনা হিংস্র জন্তুর শিকারে পরিণত হয় হোক

মহানবীর(সা) মৃত্যুর পর আবু বকর(রা) খলীফা নির্বাচিত হলেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে মহানবী(সা) সিরিয়ায় একটি অভিযান প্রেরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় সেই মুহূর্তে তা স্থগিত হয়ে যায়। কিন্তু আবু বকর(রা) খলিফা হয়েই সেই অভিযান প্রেরণের উদ্যোগ নিলেন। মুসলিম নেতৃবিন্দের অনেকেই এর সাথে দ্বিমত পোষণ করলেন এই বলে যে, মদীনা অরক্ষিত হয়ে পড়লে মহানবীর(সা) মৃত্যুর সুযোগ নিয়ে গোলযোগকারী যারা মাথা তুলতে চাচ্ছে, তারা সুযোগ পেয়ে যেতে পারে।

জবাবে খলিফা আবু বকর(রা) বললেন, মহানবীর(সা) কোন সিদ্ধান্তকে আমি অমান্য করতে পারবো না। মদীনা হিংস্র বন্য জন্তুর শিকারে পরিণত হয় হোক, কিন্তু সেনাবাহিনীকে তাদের মৃত মহান নেতার ইচ্ছা পূরণ করতেই হবে।

হযরত আবু বকরের(রা) প্রেরিত এই অভিযান ছিল সিরিয়া, পারস্য ও উত্তর আফ্রিকায় ইসলামের বিজয় অভিযানের মিছিলে প্রথম গৌরবোজ্জ্বল অভিযাত্রা।

অভিযাত্রা সফল হয়েছিল। দেড়মাস পর সেনাপতি উসামা বিজয়ীর বেশে মদীনায় ফিরে এসেছিলেন।

মহানবী(সা) কবি আব্বাসের জিহ্বা কাটার হুকুম দিলেন

হুনাইনের যুদ্ধে মুসলমানরা পরাজিত হবার মুখেও আল্লাহর মেহেরবানীতে বিজয় লাভ করল। প্রচুর গনীমতের মাল পাওয়া গেল যুদ্ধ থেকে। নিয়ম অনুযায়ী তিনি চার-পঞ্চমাংশ মুজাহিদদের মাঝে বিতরন করলেন। অবশিষ্ট এক-পঞ্চমাংশ প্রয়োজন অনুসারে বিতরণ করলেন।

আব্বাস নামে একজন দুর্বল চরিত্রের নও মুসলিম কবিও তার অংশ মহানবীর (সা) কাছ থেকে পেলেন। কিন্তু তার অংশে তিনি সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। তিনি কবিতার মাধ্যমে তার অসন্তুষ্টির প্রকাশ করলেন যাতে মহানবী(সা) সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য ছিল। মহানবী(সা) তা শুনে হাসলেন এবং বললেন, “ওকে নিয়ে যাও এবং জিহবা কেটে দাও।”

আলী(রা) ভয়ে কম্পমান কবিকে মাঠে নিয়ে গেলেন যেখানে বিজিত ভেড়া ছাগল ছিল। আলি (রা) কবিকে বললেন, “ভেড়া ছাগলের পাল থেকে যত ইচ্ছা নাও।”

কবি আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন, “মহানবী (সা) কি এভাবেই আমার জিহবা কাটতে বললেন? আমি আল্লাহর নামে শপথ করছি, আমি কিছুই নেব না। এরপর কবি আব্বাস মহানবী (সা) এর প্রশস্তিমূলক ছাড়া কোন কবিতাই আর লিখেননি।”

রাসুলুল্লাহ(সা) কদাচিৎ দুবেলা পেট ভরে আহার করতে পেরেছেন

রাসুলুল্লাহ(সা) ইন্তিকালের পর একদিন এক ভিখারিনী তার দুই সন্তানসহ হযরত আয়িশার(রা) নিকট এসে কিছু খাবার প্রার্থনা করলো। এ সময় হযরত আয়িশার(রা) নিকট মাত্র তিনটি খেজুর ছিল। তিনি এই ভিখারিনী এবং দুই সন্তানকে তিনটি খেজুর প্রদান করলেন। মহিলা দুটি খেজুর তার দুই সন্তানকে দিল এবং নিজের জন্য অপরটি রেখে দিল। শিশুদ্বয় দুটি খেজুর খাওয়ার পর তাদের মায়ের দিকে তাকাল। মা তাদের চাহনির অর্থ বুঝতে পারলো। নিজের জন্য রাখা অপর খেজুরটি অতঃপর দু’ভাগ করে দুই সন্তানকে দিল।নিজের জন্য কিছুই রইলো না। মাতৃস্নেহের এই দৃশ্য আয়িশা সিদ্দিকার(রা) হৃদয় স্পর্শ করলো। তিনি কেঁদে ফেললেন।

একদিন আয়িশা সিদ্দিকা(রা) খেতে বসে কেঁদে ফেললেন। তখন রাসুলুল্লাহ(সা) অবশ্য জীবিত নেই। তিনি বললেন, ‘আমি যখন ভরা পেটে খাই, তখন অশ্রু সংবরণ করতে পারি না।’ পার্শে দন্ডায়মান এক মহিলা এর কারণ কি জিজ্ঞাসা করলেন। জবাবে আয়িশা(রা) বললেন, ‘রাসুলুল্লাহর(সা) কথা আমার মনে পড়ে। রাসুলুল্লাহ(সা) জীবিতাবস্থায় কদাচিৎ দু’বেলা পেট ভোরে আহার করতে পেরেছেন।’