ইসলামী নেতৃত্ব

যোগ্য সংগঠকের পরিচয়

কারো পক্ষে সংগঠন বনে যাওয়া কঠিন কিছু নয়, কিন্তু যোগ্য সংগঠক হওয়া সত্যি কঠিন। সংগঠনের কিছু রুটিন ওয়ার্ক সম্পন্ন করা খুবই সহজ, কিন্তু সংগঠনে প্রাণ-বন্যা সৃষ্টি করা মোটেই সহজ নয়।

সংগঠনের প্রাণ-বন্যা সৃষ্টি করা এবং তা অব্যাহত রাখা একজন যোগ্য সংগঠনের পক্ষেই সম্ভব। বহুমুখী কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে একজন যোগ্য সংগঠন তাঁর যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে যান। সংগঠনের সর্বত্র প্রাণচাঞ্চল্য এবং গতিশীলতা অব্যাহত রেখে সংগঠনটিতে উত্তরোত্তর অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম সংগঠকই যোগ্য সংগঠক।

একজন যোগ্য সংগঠন একজন শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি। তাঁর প্রতি কর্মী বাহিনী স্বতঃস্ফূর্তভাবে শ্রদ্ধাবনত থাকে। আর এই শ্রদ্ধা কর্মীদের মনে বিনা কারণেই উৎসারিত হয় না। সংগঠকের উন্নত মানের সততা ও যোগ্যতাই তাঁকে কর্মীদের শ্রদ্ধার পাত্রে পরিণত করে। কর্মীরা যদি সংগঠককে প্রাণভরে ভালোবাসতে পারে তাহলে তাঁর নির্দেশ পালনে তাদের মনে কোনরূপ দ্বিধা বা কুণ্ঠা থাকে না।

শ্রদ্ধাভাজন সংগঠককে কড়া নির্দেশ দিয়ে কর্মীদেরকে কাজে নামাবার প্রয়াস চালাতে হয় না। তাঁর ইঙ্গিত বা অনুরোধই কর্মীদেরকে কর্মচঞ্চল করার জন্য যথেষ্ট। একজন সংগঠক বিভিন্নমুখী যোগ্যতার বিকাশ ঘটিয়ে যোগ্য সংগঠকের স্তরে উন্নীত হন। এখানে আমরা অতি সংক্ষেপে কিছু যোগ্যতার কথা আলোচনা করবো।

. জ্ঞানের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব

একজন সংগঠককে অবশ্যই জ্ঞানী ব্যক্তি হওয়া প্রয়োজন। আদর্শ, আন্দোলন ও সংগঠন সংক্রান্ত যেই কোন প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দেবার মতো জ্ঞানের ব্যপ্তি ও গভীরতা তাঁর থাকা চাই। বিরোধী মতবাদগুলোর বক্তব্য সম্পর্কেও তাঁকে থাকতে হবে ওয়াকিফহাল। সেইগুলোর ভ্রান্তি ও পূর্ণাঙ্গতা সম্পর্কেও তাঁর অবগতি থাকা প্রয়োজন।

. উন্নত আমল

একজন আদর্শ সংগঠককে অবশ্যই আদর্শের মূর্ত প্রতীক হতে হবে। আদর্শের দৃষ্টিতে পালনীয় বিষয়গুলোর অনুশীলনের ক্ষেত্রে নিষ্ঠাই হবে তাঁর জীবনের প্রকৃত ভূষণ। তাঁর আমল হতে হবে অন্যদের জন্য অনুকরণযোগ্য।

. সুন্দর ব্যবহার

একজন যোগ্য সংগঠকের ব্যবহার অবশ্যই সুন্দর হতে হবে। তিনি কখনো রুক্ষভাষী হবেন না। তাঁর আচরণ রূঢ় হবে না। বরং তাঁর আচরণ কর্মীদেরকে চুম্বকের মতো কাছে টেনে নিয়ে আসার মতো মধুর হওয়া চাই।

. অগ্রণী ভূমিকা পালন

সংগঠনের কাজ আগ বাড়িয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে অথবা কোন সমস্যা দেখা দিলে তা সমাধানের ক্ষেত্রে সংগঠকেরেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। এইসব বিষয় নিয়ে তিনিই বেশি বেশি ভাববেন, তিনিই নতুন নতুন চিন্তা পেশ করবেন, নতুন নতুন কর্মকৌশল তিনিই উদ্ভাবন করবেন। এইভাবে চিন্তার ক্ষেত্রে তিনি নেতৃত্ব দেবেন। আবার বহির্মুখী কর্মকাণ্ডেও তিনিই ইনিশিয়েটিভ গ্রহণ করবেন। মোটকথা, চিন্তা ও কাজ উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর ভূমিকা হবে অগ্রণী ভূমিকা।

. সাহসী ভূমিকা পালন

যেই সংগঠন সমাজ বিপ্লবে বিশ্বাসী সেই সংগঠনকে প্রতিষ্ঠিত সমাজের কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী ভালো চোখে দেখবে- এটা স্বাভাবিক নয়। প্রতিষ্ঠিত সমাজ ব্যবস্থার পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে যারা যুলুম ও শোষণ চালায় তারা যে এই সংগঠনের অগ্রগতি দেখে আঁতকে ওঠে শুধু তাই নয়, বরং এই সংগঠনের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেবার জন্য নানা ধরণের সন্ত্রাসী তৎপরতা এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর সওয়ার হয়ে বহুবিধ নির্যাতন ও নিপীড়ন চালায়। ফলে সংগঠন নাজুক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। এই ভীতিপ্রদ পরিস্থিতিতে সংগঠককে শক্তভাবে সংগঠনের হাল ধরে থাকতে হয়। একজন যোগ্য সংগঠকের চেহারা ও কর্মকাণ্ডে এমন পরিস্থিতিতেও ভীতির চিহ্ন ফুটে ওঠবে না। তাঁর এই সাহসী ভূমিকাই কর্মীদেরকে সাহসী করে তুলবে এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি মুকাবিলা করে সামনে এগুবার হিম্মত যোগাবে।

. সঠিক মানের কর্মী গঠন

সংগঠনের সঠিক মানের কর্মী তো তারাই যারা এর আদর্শ ও আন্দোলনকে সঠিকভাবে বুঝেছে, সংগঠনের লক্ষ্য ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে, এর কর্মসূচী ও কর্মপদ্ধতি বুঝে শুনে গ্রহণ করেছে, এর নির্বাচন পদ্ধতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ পদ্ধতি, সমালোচনা পদ্ধতি, কর্মী গঠন পদ্ধতি ইত্যাদি ভালোভাবে বুঝেছে এবং শুধু জানা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ না থেকে তারা তাদের জ্ঞান অনুযায়ী বাস্তব ময়দানে ভূমিকাও পালন করে চলছে।

এই মানে কর্মীদের গড়ে তোলার জন্য সংগঠক সাংগঠনিক প্রক্রিয়াগুলোর ওপর তো নির্ভর করবেনই, তদুপরি তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে এই বিষয়ের দিকে কর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন।

ব্যক্তিগত সাক্ষাত ও আলাপের মাধ্যমে জ্ঞানের মান ও কর্মতৎপরতার মান ভালোভাবে আঁচ করে পরামর্শ দেবেন। এইভাবে কর্মীদের সঠিক মানে উন্নীত করার নিরলস প্রচেষ্টা চালাতে হয় সংগঠককে।

. সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ

কোন সংগঠনের পরিকল্পনা তৈরী হয় সেই সংগঠনের কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য। অর্থাৎ পরিকল্পনার ভিত্তি হচ্ছে সংগঠনের স্থায়ী কর্মসূচী। বার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের দায়িত্ব সংগঠককেই পালন করতে হয়। তার পর সেটি সংশ্লিষ্ট ফোরামে পেশ করতে হয় অনুমোদনের জন্য।

পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় কর্মী সংখ্যা, কর্মীদের মান, সংগঠনের আর্থিক সংগতি, শুভাকাঙ্ক্ষীদের আর্থিক সহযোগিতার সম্ভাবনা, সংগঠনের প্রভাব বলয়, পরিবেশ-পরিস্থিতি, বৈরী শক্তিগুলোর শক্তি ও কর্মকৌশল, সামগ্রিকভাবে সমাজ পরিবেশ, সংগঠনের তৎপরতার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া, সংগঠনের কর্মধারা নির্ধারণে বর্তমান সময়ের দাবি ইত্যাদি সামনে রাখতে হয়। পরিকল্পনা প্রণয়ন কালে এই বিষয়গুলো সামনে না রাখলে পরিকল্পনা একপেশে হয়ে পড়ার আশংকা রয়েছে। আর সবগুলো দিক বিবেচনা করে পরিকল্পনা রচিত হলে তা বাস্তবধর্মী ও সময়োপযোগী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। একটি বাস্তবধর্মী ও সময়োপযোগী পরিকল্পনা প্রণয়নের যোগ্যতা একজন সংগঠনের খুবই বড়ো একটি যোগ্যতা।

. জরুরী পরিস্থিতিতে ত্বরিৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ

সংগঠনের কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় অশান্ত ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতি সংগঠনের স্বাভাবিক গতিধারা দারুণভাবে প্রভাবিত করে। আবার এমন পরিস্থিতিরও উদ্ভব হতে পারে যা সংগঠনের জন্য বিপজ্জনক। এই ধরণের পরিস্থিতি স্থায়ী কর্মসূচী বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গৃহীত পরিকল্পনা দ্বারা মুকাবিলা করা সম্ভব নাও হতে পারে। তাই এই ধরণের পরিস্থিতির উদ্ভব হলেই সংগঠনকে জরুরী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। এই ক্ষেত্রে সংগঠকের কর্তব্য হচ্ছে, উদ্ভূত পরিস্থিতির ত্বরিত মূল্যায়নের পর ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে জনশক্তিকে তা যথাশীঘ্র জানিয়ে দেয়। জরুরী পরিস্থিতিতে অবিলম্বে করণীয় নির্ধারণ করার যোগ্যতাও সংগঠকের অতি বড়ো একটি যোগ্যতা।

. পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ

কোন বিষয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে গেলে ভুল সিদ্ধান্ত হয়ে যেতে পারে। কিন্তু বেশ কিছু সংখ্যক বিজ্ঞ লোক ব্যাপক আলোচনার পর কোন সিদ্ধান্ত নিলে এতে ভুলের আশংকা কম থাকে। তাই একজন বিজ্ঞ সংগঠক কখনো একা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন না।

যতো বেশী সম্ভব লোকদের মতামত যাচাই করে তিনি করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সংগঠকের জন্য একটি রক্ষাকবচ। একজন যোগ্য সংগঠন তা কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারেন না।

১০. পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কর্মী পরিচালনা

সংগঠক কেবল পরিকল্পনা গ্রহণ করেই ক্ষান্ত হবেন না। তিনি গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য গোটা কর্মী বাহিনীকে কাজে লাগাবেন। এই জন্য তিনি পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত কাজগুলোর গুরুত্ব সম্পর্কে কর্মীদেরকে ওয়াকিফহাল করে তুলবেন, প্রত্যেকের করণীয় বিষয়গুলো চিহ্নিত করে দেবেন এবং তা আঞ্জাব দেয়ার জন্য তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করবেন। কর্মীদেরকে ভালোভাবে পরিকল্পনা বুঝিয়ে দেয়া এবং পরিকল্পনা কার্যকর করার জন্য তাদেরকে পাগলপারা করে তুলতে পারা সংগঠকের একটি বড়ো কৃতিত্ব।

১১. সঠিক ব্যক্তিদের বাছাই করে দায়িত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ

সংগঠন পরিচালনার ক্ষেত্রে অনেক ধরণের কাজ রয়েছে। সেইগুলো এক ব্যক্তির পক্ষে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। তাই সংগঠককে একটি টিম গড়ে তুলতে হয়। বিভিন্ন ব্যক্তির ওপর অর্পণ করতে হয় বিভিন্ন বিভাগের কাজ। বিভিন্ন কাজের জন্য লোক বাছাই করার ক্ষেত্রে সংগঠককে খুব সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। সঠিক মিজাজ ও সঠিক মানের লোক বাছাই না হলে ম্যাল এডজাস্টমেন্ট সমস্যা দেখা দিতে বাধ্য। অথচ কাউকে কোন পদে নিযুক্ত করা যতো সহজ, পদচ্যুত করা ততোখানি সহজ নয়। অপসারণকে সহজে মেনে নেয়ার মতো বাহাদুর ব্যক্তি কমই দেখা যায়। ফলে জটিলতার সৃষ্টি হয়। তাই নিযুক্তির আগেই সংগঠককে বারবার ভাবতে হবে, ব্যক্তি চয়নের যথার্থতা সম্পর্কে নিঃসংশয় হতে হবে। ভেবে চিন্তে, জেনে শুনে এবং ভবিষ্যত সম্ভাবনার দিকে লক্ষ্য রেখে লোক নিয়োগ করা একজন বিচক্ষণ সংগঠকের একটি বিশেষ যোগ্যতা।

১২. সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ

সংগঠনের সুগঠিত কার্যক্রম ক্রমশঃ শিকড় পর্যায়ে (গ্রাসরুট লেভেল) নিয়ে যাবার অবিরাম প্রচেষ্টা চালাবেন সংগঠক। অধস্তন স্তরে নেতৃত্ব দেবার যোগ্যতা সম্পন্ন লোক হলেই তিনি সেই স্তরে সংগঠন সম্প্রসারিত করে নেবেন। এইভাবে একটি নেটওয়ার্ক নিম্নতম পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারিত হবে। সঠিকমান সংরক্ষণ করে ন্যূনতম সময়ের মধ্যে শিকড় পর্যায়ে সংগঠনের বিস্তৃতি ঘটানো যোগ্য সংগঠকের অন্যতম প্রধান কৃতিত্ব।

১৩. কাজের তত্ত্বাবধান

কাজের পরিকল্পনা তৈরী করে তা কর্মীদেরকে বুঝিয়ে দেয়ার পর একজন যোগ্য সংগঠন নির্লিপ্ত হয়ে বসে থাকবেন না। তিনি নানাভাবে জনশক্তির কর্মতৎপরতার প্রতি লক্ষ্য রাখবেন। বিশেষভাবে দায়িত্বপূর্ণ পদে নিয়োজিত ব্যক্তিদের কাজের খোঁজ খবর নেবেন। কাজের ত্রুটি পরিলক্ষিত হলে সেইদিকে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবেন। এইভাবে কাজের তত্ত্বাবধান করাকে একজন যোগ্য সংগঠক তাঁর নিত্যকর্মের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করবেন।

১৪. প্রেরণাদায়ক বক্তৃতাভাষণ

একজন যোগ্য সংগঠককে অবশ্যই সুবক্তা হতে হবে। বক্তৃতা-ভাষণের মাধ্যমেই তিনি আদর্শের বিভিন্ন দিক, আন্দোলনের গুরুত্ব এবং সংগঠনের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য জনসমষ্টির সামনে তুলে ধরবেন। তাঁর বক্তৃতার ভাষা হতে হবে সহজবোধ্য। এতে থাকতে হবে বলিষ্ঠতা এবং কর্মীদের উদ্দীপিত করার ক্ষমতা। আকর্ষণীয় ও প্রেরণাদায়ক বক্তৃতা দানের যোগ্যতাও একটি বড়ো রকমের যোগ্যতা।

১৫. স্থানকালপাত্র বিবেচনা করে বক্তব্য পেশ

একজন যোগ্য সংগঠক বক্তব্য পেশ করার আগে ভালোভাবে ভেবে দেখবেন যে যেইস্থানে তিনি কথা বলছেন সেইস্থানে কোন্‌ কথাগুলোর ওপর গুরুত্ব দেয়া উচিত, তিনি যেই কথাগুলো বলছেন সেইগুলো সময়োপযোগী কিনা এবং তিনি যাদেরকে সম্বোধন করে কথা বলছেন তাদের সমঝ শক্তি, ধারণ শক্তি কতখানি। শোতাদের বয়স, শিক্ষার মান, সাংগঠনিক জীবনের বয়স ইত্যাদি বিষয়ের দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। একজন বিচক্ষণ সংগঠক কখনো স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা না করে বক্তব্য রাখেন না।

১৬. সাংগঠনিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা সংরক্ষণ

প্রত্যেকটি সংগঠনেরই নিজস্ব কিছু আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম থাকে। সংগঠনের স্বকীয়তা সংরক্ষণের প্রয়োজনেই এইসব কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখা প্রয়োজন। যেমন ব্যক্তিগত রিপোর্ট রাখা, সাংগঠনিক মিটিং করা এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচী অনুষ্ঠান। আবার প্রত্যেকটি সংগঠনেরই নিজস্ব কর্মনীতি, কর্মসূচী, কর্মপদ্ধতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ পদ্ধতি ইত্যাদি থাকে। সংগঠনের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের তাকিদেই এইগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা প্রয়োজন। এই বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পর্কে সবসময় সজাগ থাকা সংগঠকের কাজ। নতুনভাবে যারা সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে তাদের সামনেও এই বৈশিষ্ট্যগুলোর গুরুত্ব সঠিকভাবে তুলে ধরা এবং তাদেরকে এইগুলোর নিশানবরদাররূপে গড়ে তোলা সংগঠকের অন্যতম কর্তব্য।

১৭. আর্থিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন

একটি সংগঠনের থাকে নানামুখী কাজ। এইসব কাজ সুসম্পন্ন করতে হলে অনেক অর্থের প্রয়োজন। সংগঠনের জনশক্তিকে অধিক পরিমাণে আর্থিক কুরবানী করতে উদ্বুদ্ধ করবেন সংগঠক। শুধু সংগঠনের কর্মীদের অর্থদানের ওপর নির্ভর না করে শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে বিভিন্ন কাজের প্রকল্প পেশ করে তাদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের ব্যাপারে বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সংগঠকেরই কাজ। সমাজের সম্পদশালী ব্যক্তিদের সাথে সংগঠকের ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন। সংগঠনের আর্থিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে একজন আদর্শ সংগঠক ব্যক্তিগতভাবেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকেন।

১৮. শৃঙ্খলা সংরক্ষণ

শক্তিশালী সংগঠন মানেই সুশৃঙ্খল সংগঠন। আর শৃঙ্খলার মূল উৎপাদন হচ্ছে আনুগত্য। আনুগত্য সম্পর্কে আল-কুরআন এবং আল-হাদীস যেইসব পথ নির্দেশ পেশ করেছে সেইগুলো সম্পর্কে কর্মী বাহিনীকে ওয়াকিফহাল করে তোলা এবং এই বিষয়ে কর্মীদেরকে সদাজাগ্রত রাখা সংগঠকেরই কাজ।

আনুগত্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্যই সংগঠনে থাকে গঠনতন্ত্র বা সংবিধান। গঠনতন্ত্র সঠিকভাবে মেনে চলার ক্ষেত্রে কোন কর্মীর শৈথিল্য প্রকাশ পেলে অবিলম্বে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে এবং তাকে সংশোধনের প্রচেষ্টা চালাতে হবে। পর্যাপ্ত প্রচেষ্টার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সংশোধিত না হলে তার বিরুদ্ধে সাংবিধানিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হবে।

গঠনতন্ত্রের আনুগত্য করে না এমন ব্যক্তির প্রতি নমনীয় আচরণ করা হলে আনুগত্যহীনতাকেই উৎসাহিত করা হবে। এতে করে আনুগত্যহীনতার ব্যাধি সংক্রমিত হয়ে ব্যাপক আকার ধারণ করার আশংকা রয়েছে। তাতে সংগঠনের শৃঙ্খলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে বাধ্য। তাই সংশোধনের চূড়ান্ত প্রচেষ্টা চালানোর পর সংগঠনের স্বার্থেই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে একজন যোগ্য সংগঠক কুণ্ঠিত হবেন না।

১৯. কর্মীদের বিভিন্নমুখী প্রতিভা বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ

সংগঠনের কর্মীরা এক ধরণের কাঁচামাল। এদের মাঝে সুপ্ত থাকে অনেক সম্ভাবনা। কর্মীদেরকে ভালো সংগঠক, ভালো লেখক, ভালো বক্তা, ভালো সমাজকর্মী এবং ভালো জননেতারূপে গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। তাছাড়া বিভিন্ন টেকনিকেল প্রশিক্ষণও যেমন, কম্পিউটার পরিচালনা, মোটর ড্রাইভিং ইত্যাদি তাদেরকে দেবার সুযোগ করে দেয়া প্রয়োজন। আধুনিক সমাজের এই ধরণের টেকনিকেল প্রশিক্ষণ কর্মীদেরকে ব্যাপকতর দক্ষতার অধিকারী করে তোলে। কর্মীদের নানামুখী প্রতিভা বিকাশের কর্মকৌশল উদ্ভাবন করা সংগঠকেরই কাজ।

২০. সুদূর প্রসারী চিন্তা নিয়ে প্রতিভাবান কর্মীদের ব্যবহার

প্রতিভাবান কর্মীরা সংগঠনের নিকট আল্লাহর এক অতি মূল্যবান আমানাত। এদের সঠিক ব্যবহার আমানাতদারীরই দাবি। এদের সঠিক ব্যবহার না হওয়া আমানতদারীর খেলাফ কাজ।

সংগঠক ভালোভাবে কর্মীদের স্টাডি করবেন। কারা ময়দানের কাজে বেশি উপযুক্ত হবে তা বুঝে তাদেরকে চিহ্নিত করবেন। একটি আদর্শবাদী রাষ্ট্র গঠন ও পরিচালনার জন্য উন্নত মানের রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, প্রশাসক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, আইনবিদ, সাহিত্যিক, কূটনীতিবিদ, বিজ্ঞানী ইত্যাদি প্রয়োজন। একজন সংগঠককে বুঝতে হবে তাঁর কর্মী বাহিনীর প্রতিভাবান ব্যক্তিদের কে কোন্‌ ময়দানের জন্য বেশি উপযুক্ত। যারা যেই ময়দানের উপযুক্ত তাদেরকে সেই ময়দানে বিশেষজ্ঞ হবার সুযোগ দেয়া প্রয়োজন। একজন বিজ্ঞ সংগঠকই কেবল এই লক্ষ্যে সঠিক ভূমিকা পালন করতে পারেন।

২১. কর্মতৎপরতা লক্ষ্য করে দ্রুত অগ্রসরমান কর্মীদের বাছাইকরণ

আপন দায়িত্ববোধে উজ্জীবিত হয়ে পরিকল্পনার আলোকে ময়দানে কাজ করতে থাকলেও কর্মীদের সকলের কাজের মান এক হয় না। দেখা যাবে কোন কোন কর্মী যেনযেতনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করছে। আবার কোন কোন কর্মী কাজ করছে খুবই সুন্দরভাবে।

সুন্দরভাবে যারা কাজ করছে তাদের মাঝেও দু’ধরণের কর্মী দেখা যায়। এদের একাংশ কাজটা তো সুন্দরভাবে করছে, তবে সময় নিচ্ছে বেশী। অপরাংশ কাজটা সুন্দরভাবে করতে গিয়েও বেশি সময় নিচ্ছে না। বুঝতে হবে, এরা অধিকতর যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তি। এদের দ্বারা বেশি পরিমাণে কাজ করিয়ে নেয়া সম্ভব।

কর্মতৎপরতা লক্ষ্য করলে আরো দেখা যাবে যে কর্মীদের অনেকেই ভালো কর্মী বটে, তবে নেতৃত্ব দানের যোগ্যতা তাদের নেই। আবার অনেকের এমন আছে যারা নিজেও ভালোভাবে কাজ সম্পাদন করে, তদুপরি অন্যকে দিয়েও কাজ করিয়ে নেয়ার যোগ্যতা রাখে। বুঝতে হবে, নেতৃত্ব দানের যোগ্যতা এদের মাঝে রয়েছে।

যোগ্য সংগঠকের কাজ হচ্ছে কর্মীদের মধ্য থেকে যাদের সমঝ শক্তি ও কর্মশক্তি বেশি তাদেরকে আলাদা তালিকাভুক্ত করে নেয়া।

২২. বাছাই করা কর্মীদের ব্যাপকতর প্রশিক্ষণ

সম্ভাবনাময় কর্মীদের তালিকা তৈরী করাই যথেষ্ট নয়। এদের জন্য ব্যাপকতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। আদর্শ, আন্দোলন ও সংগঠনের খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কেও তাদেরকে ওয়াকিফহাল করে তুলতে হবে। আদর্শ, আন্দোলন ও সংগঠনের সঠিক প্রতিনিধিত্ব করার যেগ্যতা তাদের মাঝে বিকশিত করতে হবে। এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি আঞ্জাম দিতে পারেন একজন দূর দৃষ্টি সম্পন্ন সংগঠক।

২৩. পারস্পরিক সুসম্পর্ক সৃষ্টি

কর্মীদের মাঝে পারস্পরিক সুসম্পর্ক গড়ে না উঠলে কোন সংগঠনকে শক্তিধর সংগঠন বলা চলে না। ইসলামী সংগঠনের কর্মীদেরকে সিসাঢালা প্রাচীরের মতো মজবুত হতে হবে, এটাই আল্লাহর দাবি। এর অর্থ হচ্ছে, এই সংগঠনের কর্মীগণ একে অপরের প্রতি গভীর মমত্তবোধ অনুভব করবে, একে অপরের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিপক্ষের মুকাবিলা করবে।

এই ধরণের সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য কর্মীদের মাঝে এক বিশেষ ধরণের দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ হওয়া প্রয়োজন। একে অপরের ছোটখাটো ত্রুটি বিচ্যুতি ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখা, একে অপরের দোষের চেয়ে গুণের দিকে বেশি তাকানো, কোন অবস্থাতেই একে অপরের প্রতি রুষ্ট না হওয়া এবং একে অপরের গীবাত না করা- পারস্পরিক সুসম্পর্ক গড়ে তোলার বুনিয়াদ। এই বুনিয়াদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করতে হয় সংগঠককেই।

২৪. নিষ্ক্রিয়তার প্রতিকার

কোন কারণে মনে খটকা সৃষ্টি হওয়া, কারো আচরণে রুষ্ট হওয়া, কোন প্রপাগাণ্ডায় প্রভাবিত হওয়া, পরিস্থিতির ভয়াবহতায় ভীত হওয়া, কোন অবাঞ্ছিত ঘটনায় ব্যথিত হওয়া, নিজের জীবনে কোন অপরাধ ঘটে যাওয়া, ব্যক্তিগত জীবনে কোন বড়ো রকমের সমস্যা সৃষ্টি হওয়া- এই ধরণের কোন কারণে একজন কর্মী নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারে। সংগঠক কোন কর্মীর এমন অবস্থার কথা জানতে পেলেই শিগগির তার সাথে দেখা ও আলাপ করে আসল কারণটি চিহ্নিত করবেন এবং আল-কুরআন ও আল-হাদীসের আলোকে বক্তব্য রেখে তাকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাবেন।

২৫. স্থবিরতার প্রতিরোধ

সংগঠনের কোন স্তরে স্থবিরতা আসতে পারে নানা কারণে।

সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ গ্রহণে সংগঠকের অপরাগতা, কর্মী সভাগুলোতে প্রাণবন্ত ও জ্ঞানগর্ভ আলোচনা পরিবেশিত না হওয়া, দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের রূঢ় আচরণ, দুশমনদের পরিচালিত উৎপীড়নে ধৈর্যচ্যুতি- এই ধরণের নানা কারণে একই সময় বেশি সংখ্যক কর্মী কর্মোদ্যম হারিয়ে ফেললে সংগঠন বা সংগঠনের অংশ বিশেষ স্থবিরতার শিকার হয়। এতে করে সংগঠন বেঁচে থাকলেও অগ্রগতি থেমে যায়।

সংগঠনে এমন কোন অবস্থার সূত্রপাত হচ্ছে কিনা যার অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে স্থবিরতা, সেই সম্পর্কে সংগঠককে সদা সচেতন থাকতে হবে। এই ধরণের কোন কিছুর লক্ষণ প্রকাশ পেলেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হবে। সংগঠনের যাবতীয় অনুষ্ঠান এবং বক্তব্য যাতে আকর্ষণীয় হয় তা নিশ্চিত করা যোগ্য সংগঠকেরই কাজ।

২৬. বিভিন্ন কাজের ভারসাম্য সংরক্ষণ

সংগঠনের আদর্শিক কনসেপ্টগুলো সাধারণের কাছে ছড়িয়ে দেবার কাজ, সংগঠনের বিস্তৃতি ঘটানোর কাজ, জনশক্তির মানোন্নয়নের কাজ, সমাজ সেবা ও সংস্কারমূলক কাজ, সংগঠনের গণ ভিত্তি রচনার কাজ, জনগণের নেতৃত্ব দানের কাজ- এই ধরণের বহুমুখী কাজ একটি সংগঠনকে আঞ্জাম দিতে হয়। এই কাজগুলো সম্পন্ন করার জন্য পুরো জনশক্তিকে মাঠে ময়দানে নিয়োজিত করতে হয়। সংগঠক লক্ষ্য রাখবেন যাতে এক প্রকারের কাজের আধিক্য অপরাপর কাজগুলোকে গুরুত্বহীন না করে ফেলে। কোন এক সময় কোন এক ধরণের কাজ বেশি গুরুত্ব পেয়ে যাওয়াতে অপর কোন একটি কাজ ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে গেছে দেখলে পরবর্তী সময়ে সেই কাজটির ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সামগ্রিকভাবে কাজের ভারসাম্য রক্ষা করা একজন সুযোগ্য সংগঠকের পক্ষেই সম্ভব।

২৭. আমানাত সংরক্ষণ

একটি সংগঠনের থাকে তহবিল। থাকে অনেক আসবাব-পত্র, অফিস ভবন ইত্যাদি। এইগুলো সংগঠনের পক্ষ থেকে সংগঠকের কাছে গচ্ছিত থাকে। এইগুলো সংগঠনের পক্ষ থেকে সংগঠকের কাছে গচ্ছিত থাকে। এইগুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষন এবং সঠিক ব্যয়-ব্যবহারেরই নাম আমানাতদারী। সংগঠক কোন অবস্থাতেই সংগঠনের অর্থ ও সম্পদ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে খরচ করে ফেলবেন না। সংগঠনের অর্থ বা সম্পদ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যয়-ব্যবহার করলে একজন সংগঠক কিছুতেই কর্মীদের শ্রদ্ধাভাজন থাকতে পারেন না। একজন যোগ্য সংগঠক আমানাত সংরক্ষণে অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ভূমিকা পালন করে থাকেন।

২৮. সঠিকভাবে রেকর্ড পত্র সংরক্ষণ

একটি সংগঠনের অনেক জরুরী কাগজপত্র, ফাইল ও রেজিষ্টার থাকে। এইগুলোকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা খুবই জরুরী। প্রত্যেকটি বিষয় সংক্রান্ত স্বতন্ত্র ফাইল, প্রত্যেকটি ফাইলে নির্দিষ্ট নাম্বার এবং ফাইলগুলোর একটি ইনডেক্‌স থাকা প্রয়োজন।

ফাইলগুলো নির্দিষ্ট এবং নিরাপদ স্থানে সংরক্ষিত হওয়া প্রয়োজন যাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ছাড়া অন্য কেউ এইগুলো নাড়াচাড়া না করতে পারে। খেয়াল রাখতে হবে যাতে প্রতিটি কাগজ সঠিক ফাইলে যায়, অন্য ফাইলে নয়।

এইভাবে ফাইল মেনটেইন করা হলে কাগজপত্র সঠিকভাবে হিফাযত হয়। আর প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র বিনা মেহনতে এবং সময় খরচ না করে বের করা সম্ভব হয়। সুবিন্যস্তভাবে রেকর্ডপত্র সংরক্ষণ করাটাও একজন সুযোগ্য সংগঠকের অন্যতম বিশেষ গুণ।

২৯. সঠিকভাবে হিসাব সংরক্ষণ

সংগঠনের প্রয়োজনে সংগঠকই প্রধানতঃ অর্থ ব্যয় করে থাকনে। ক্যাশিয়ার বা বাইতুলমাল বিভাগের সচিব তহবিল সংরক্ষণ করে। সে নিজের সিদ্ধান্তে তহবিলের অর্থ ব্যয় করার অধিকারী নয়। অর্থ ব্যয়ের নির্দেশ আসবে সংগঠকের কাছ থেকে। সেই নির্দেশ লিখিতভাবে আসাই উত্তম। সেই নির্দেশ মুতাবিক ক্যশিয়ার তার কাস্টোডি থেকে অর্থ হস্তান্তর করবে লিখিত ভাউচারের বিনিময়ে। সংগঠনের তহবিলে কোন অর্থ আসবে না রসিদে এন্ট্রি না হয়ে। তেমনি ভাউচার ছাড়া কোন অর্থ ব্যয় হবে না। ক্যাশিয়ার অর্থ ব্যয়ের একটি টালি সংরক্ষণ করবে। আর একাউনট্যান্ট ক্যাশ বই, লেজার বই এবং ষ্টেটমেন্ট অব একাউন্টস ক্রমাগতভাবে লিখে যেতে থাকবে আধুনিক হিসাব রক্ষণ পদ্ধতির চাহিদা পূরণ করে। একই ব্যক্তি অর্থ আদায় করা, অর্থ ব্যয় করা এবং আয় ব্যয়ের হিসাব রাখা মোটেই বিজ্ঞানসম্মত নয়। এতে হিসাব সংরক্ষণে গোলমাল দেখা দিতে বাধ্য।

একজন বিজ্ঞ সংগঠক কিছুতেই এই গোলমালে পড়ে নিজের ইমেজ বিনষ্ট করতে তৈরী হতে পারেন না। তাই তাঁকে দেখা যাবে এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন।

৩০. বৈরী শক্তিগুলোর মুকাবিলার জন্য বিজ্ঞানসম্মত পন্থা উদ্ভাবন

বৈরী সংগঠনগুলো ইসলামী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের চরিত্র হনন এবং সংগঠন সম্পর্কে জনমনে বিভ্রান্তির ধুম্রজাল সৃষ্টি করার লক্ষ্যে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে থাকে।

এই প্রচার যে মিথ্যাশ্রয়ী তা সঠিকভাবে জনগণকে জানিয়ে দেয়ার পন্থা উদ্ভাবন করতে হবে সংগঠককে। ইতিহাস সাক্ষী, বৈরী শক্তিগুলো যখন দেখে যে তাদের মিথ্যা প্রচারণাও শেষ রক্ষা করতে পারছে না তখন তারা ইসলামী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং কর্মীদের ওপর দৈহিক হামলা চালাতে শুরু করে।

এমতাবস্থায় সঠিক কর্ম কৌশল উদ্ভাবন করা সংগঠকেরই দায়িত্ব।

বৃহত্তর জনগোষ্ঠী সাধারণতঃ যুলম বিরোধী। সেই কারণে মাযলুমের প্রতি তাঁরা থাকে সহানুভূতিশীল। যালিমদেরকে চিহ্নিত করে তাদের ঘৃণ্য তৎপরতা উন্মুক্ত করে পেশ করতে হবে জনগণের কাছে। যালিমদের যুলমের কাহিনী বা বিবরণ সঠিকভাবে জনগণের কাছে পৌঁছাতে পারলে বিবেকবান জনগণ তাদের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হবে। এইভাবে যালিমগণ হবে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন। মনে রাখা দরকার যে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন যালিমদের সন্ত্রাসী তৎপরতা বেশিদূর অগ্রসর হতে পারে না। জনগণের প্রবল প্রতিরোধের মুখে শেষাবধি তা ভণ্ডুল হয়ে যায়।

কি কি পন্থায় যালিমদেরকে এক্সপোজ করে জনগণের সহানুভূতি ও সহযোগিতা অর্জন করা যায় তা নির্ণয় করে যথার্থ পদক্ষেপ গ্রহণ করা একজন যোগ্য সংগঠকের কাজ।

৩১. গণভিত্তি রচনা

যেহেতু এই যুগে দুনিয়ায় সামগ্রিকভাবে ইসলাম বিরোধী চিন্তাধারাই প্রায় সর্বত্র সুপ্রতিষ্ঠিত, সেহেতু দুনিয়ার কোন অঞ্চলে ইসলামী বিপ্লব ঘটাতে হলে, সেই ভূ-খণ্ডের জনগণের নীরব সমর্থন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন তাদের সক্রিয় সমর্থনের।

কোন ভূ-খণ্ডের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী তখনই ইসলামী সংগঠনের সক্রিয় সমর্থকে পরিণত হতে পারে যখন তারা উপলব্ধি করবে যে এই সংগঠন যা বলছে তা তাদের মনেরই কথা, এই সংগঠন যা করতে চায় তা করা গেলে তাদেরই কল্যাণ হবে এবং এই সংগঠনের দেখানো পথই সমস্যা সমাধানের একমাত্র নির্ভুল পথ।

এই উপলব্ধির পরও জনগণ সক্রিয় সহযোগিতা প্রদানের জন্য এগিয়ে আসবে না, এটা স্বাভাবিক নয়। নিজেদের মঙ্গলের পথ নির্ভুলভাবে চিনতে পারার পরও তারা এই পথের পথিকদেরকে আপন ভাববে না বা তাদের সাথে একাত্ম হবে না, এটা হতে পারে না। এমতাবস্থায় তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই এই সংগঠনের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়াবে।

এমন একটি অবস্থা সৃষ্টির নামই গণ ভিত্তি রচনা। কিভাবে এই অবস্থা সৃষ্টি করা যায় তা নির্ণয় ও কার্যকর করা যোগ্য সংগঠকেরই কাজ।

৩২. অধঃস্তন ব্যক্তি অধঃস্তন সংগঠন থেকে কাজের রিপোর্ট আদায়

অধঃস্তন ব্যক্তি ও অধঃস্তন সংগঠনের ওপর অর্পিত স্থায়ী বা কোন সাময়িক কাজের রিপোর্ট আদায় করবেন সংগঠক। তাঁকে লক্ষ্য রাখতে হবে যে নির্দিষ্ট সময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সংগঠনের কাজের রিপোর্ট তাঁর হাতে এলো কিনা। যদি কোথাও থেকে সঠিক সময়ে রিপোর্ট এসে পৌঁছে না থাকে তাহলে সংগে সংগে রিমাইন্ডার দিতে হবে। প্রথম রিমাইন্ডারের পর পর রিপোর্ট না এলে আবারো রিমাইন্ডার দিতে হবে। অর্থাৎ রিপোর্ট তাঁকে আদায় করতেই হবে।

৩৩. রিপোর্টের আলোকে কাজের পর্যালোচনা

অধঃস্তন সংগঠন থেকে রিপোর্ট আদায় তখনই অর্থবহ হতে পারে যখন সংগঠক আদায়কৃত রিপোর্ট পড়বেন, কাজের অগ্রগতি বা অধোগতি নির্ণয় করবেন এবং সেই মুতাবিক অধঃস্তন সংগঠনকে লিখিত পর্যালেচনা ও পরামর্শ পাঠাবোন।

নিয়মিতভাবে কাজের এরূপ মূল্যায়ন হতে থাকলে অধঃস্তন সংগঠন উপকৃত হয় এবং সহজেই পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়। অর্থাৎ এইভাবে রিপোর্ট পর্যালোচনার মাধ্যমে সংগঠক অধঃস্তন ব্যক্তি বা সংগঠনের কাজ উন্নততর করার ক্ষেত্রে বিশেষ সহযোগিতা প্রদান করতে পারেন।

৩৪. কুণ্ঠাহীন জবাবদিহি

জবাবদিহি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। যিনি কোন দায়িত্বপূর্ণ কাজ আঞ্জাম দেয়ার জন্য নিযুক্ত হন, তাঁকে নিয়োগকারী ব্যক্তিদের নিকট জবাবদিহি করতে হয়। দুনিয়ার সর্বত্রই এই নিয়ম প্রচলিত রয়েছে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষকে এই পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে কতিপয় কর্তব্য পালনের জন্য প্রেরণ করেছেন। এই কর্তব্য পালন সম্পর্কে তিনি এক নির্দিষ্ট দিনে সকল মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন বলেও জানিয়েছেন। অর্থাৎ সেইদিন প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কৃত কর্মের জন্য আল্লাহর সম্মুখে জবাবদিহি করতে হবে।

কোন সংগঠনের সংগঠক নিরংকুশ স্বাধীন কোন ব্যক্তিত্ব নন। যারা তাঁকে নির্বাচিত বা নিযুক্ত করেছে তিনি তাদের প্রশ্নের জবাব দান এবং তাঁর দায়িত্ব পালন ও অর্থ-সম্পদ ব্যয়-ব্যবহার সম্পর্কে তাঁদের নিকট জবাবদিহি করতে বাধ্য। একজন আদর্শ সংগঠক কুণ্ঠাহীনতাকেই এই জবাবদিহির জন্য প্রস্তুত থাকেন।

আন্দোলনকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যান সংগঠক। কিন্তু কোন সংগঠকই অমর নন। তদুপরি জীবদ্দশাতেও একজন সংগঠকের স্থানান্তরিত হওয়ার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। তাঁর স্থানান্তরিত হওয়া অথবা ইনতিকালের পর যদি শূণ্য স্থান পূর্ণ করার মতো যোগ্য ব্যক্তি পাওয়া না যায় তা সংগঠনের জন্য মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনে। সংগঠন যাতে এই ধরণের ক্ষতির সম্মুখীন না হয় তার জন্য সংগঠককে পূর্বাহ্নেই পরিকল্পিতভঅবে বিকল্প নেতৃত্বের একটি গ্রুপ তৈরী করতে হয়। এই ক্ষেত্রে বিশ্ব নবী মুহাম্মাদ সা. তো অনন্য উদাহরণ স্থাপন করে গেছেন। তিনি নেতৃত্ব দেবার মতো যোগ্য বেশ কয়েকজন ব্যক্তি গড়ে তুলেছিলেন যাঁরা তাঁর ইনতিকালের পর একের পর এক সফলভাবে মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব প্রদান করেছেন।

নিঃসন্দেহে যোগ্য উত্তরসূরী সৃষ্টি একজন সংগঠকের অতি বড়ো একটি কৃতিত্ব।

 

About এ. কে. এম. নাজির আহমদ