এসো আলোর পথে

এসো আলোর পথে

ভূমিকা

পৃথিবীর কোন বস্তুই এমনিতেই সৃষ্টি হয়নি। সকল সৃষ্টির পিছনে থাকে এক একজন কারিগর। আমাদের পৃথিবী তেমনি এক বিশাল সৃষ্টিকর্ম। যা তায়ালা সৃষ্টি করেছেন। পৃথিবীর সকল উপকরণ মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত রয়েছে। আর মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে একমাত্র ইবাদত করার জন্য। তাই মানুষ যেন সঠিক পদ্ধতিতে ইবাদত করতে পারে সেজন্য তিনি পথ প্রদর্শক হিসেবে নবী রাসূল পাঠিয়েছেন। যারা নবী-রাসূলকে মেনে নিয়ে সে অনুযায়ী নিজেদের জীবন-যাপন করবে তারাই মুসলিম। শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স) এর মাধ্যমে নরুওয়াতের সে ধারা সমাপ্ত হয়েছে। আর কোন নবী-রাসূল পৃথিবীতে আসবেন না। নবী রাসূলদের অনুপস্থিতিতে তাদের রেখে যাওয়া দাওয়াতী কাজের আঞ্জাম দিবে মুসলমানরা। বাংলাদেশের প্রায় সকল লোক মুসলমান। কিন্তু ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও তার অনুসৃতি থেকে তারা অনেক দূরে সরে গেছে। বিশেষ করে তরুন সমাজ। তরুন সমাজকে ইসলামের রঙে রাঙিয়ে তুলে আগামী দিনে জাতির কান্ডারির ভূমিকায় অবতীর্ণ করার মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।

মহাবিশ্বের স্রষ্টা ও পরিচালক

অসংখ্য জিনিস আমরা নিয়মিত ব্যবহার করছি। বই, কলম, গাড়ি, কম্পিউটার, রেডিও, মাইক প্রভৃতি হাজার রকম জিনিস। এগুলো সবই নির্ধারিত নিয়মে তৈরি হয়েছে। আপনা আপনি হয়নি। কিন্তু কলকব্জা জড়ো করলেই গাড়ি হয় না, এক টুকরো প্লাষ্টিক যেমন ইচ্ছেমতো কাটলেই কলম হয় না। মানুষ উন্নত মস্তিস্কের সাহায্যে অনেক চিন্তা ভাবনার পর এসব জিনিস তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এগুলো ব্যবহারেরও নির্ধারিত নিয়ম আছে। ছোট নিবটি ভেঙে গেলেই আর সে কলম দিয়ে লেখা যায় না। গাড়ি চালানো না শিখে কেউ চালাতে শুরু করলে নির্ঘাত দুর্ঘটনায় পড়ে তাকে মরতে হবে। এ পৃথিবী আর মহা বিশ্বেও সবকিছু তেমনি সুনির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী সৃষ্টি হয়েছে, আর চলছেও নির্ধারিত নিয়ম মেনে। কেউ যদি বলে, হঠাৎ করে পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে, কোন নিয়ম ছাড়াই পাহাড় সমুদ্র বন-বনানী স্থাপিত হয়ে গেছে, তাহলে তাকে নির্বোধ, বোকা, মিথ্যাবাদী ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। তেমনি একথাও চরম মিথ্যা যে এ বিশ্বের কোন কর্তা বা পরিচালক নেই।

মূলত: এ মহাবিশ্বে সবচেয়ে বড় সত্তা হচ্ছেন মহান রাব্বুল আলামীন। তায়ালা এ বিশ্ব এবং যাবতীয় কিছু সৃষ্টি করেছেন ও পরিচালনা করছেন। এ মহাসৃষ্টির পেছনে রয়েছে তার বিরাট পরিকল্পনা। সবচেয়ে সুন্দর নিয়ম বা বৈজ্ঞানিক বিধি মেনে চলছে এ মহাজগতের প্রতিটি বস্তু। তাই বলেন, পৃথিবী ও আকাশের সবকিছুই এক মহাবিজ্ঞানী পরিকল্পনার নিদর্শন।

অর্থাৎ “নিশ্চয় আকাশ-পৃথিবীর সৃষ্টি এবং দিন রাত্রির পরিবর্তনের মাঝে চিন্তাশীল লোকদের জন্যে নিদর্শন রয়েছে যারা সব সময় কথা স্মরণ রাখে এবং আসমান-জমিনের সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে; এরপর স্বত:স্ফূর্ত-ভাবেই সাক্ষ্য দেয়, হে আমাদের প্রভু, তুমি এগুলো অনর্থক সৃষ্টি করোনি।(আলে ইমরান : ১৯০-১৯১)

মানুষ ও বিশ্বজগৎ

তাহলে প্রশ্ন জাগে কেন এ মহাবিশ্ব আর পৃথিবীর এতসব নিয়ামত সৃষ্টি করে রেখেছেন? এই উত্তর পেতে হলে আমাদের আরেকটু এগুতে হবে। মূলত: এ বিশ্বজগতের সবকিছু মানুষের কল্যাণার্থে সৃষ্টি করা হয়েছে। তায়ালা পৃথিবীতে মানুষের বসবাসের সকল প্রকার প্রয়োজনীয় উপকরণ সৃষ্টি করার পরই মানুষকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। সৃষ্টির সকল আদি থেকে সৃষ্টি নির্ধারিত নিয়মেই পরিচালিত হয়ে আসছে। যেমন আমরা সূর্যকে দেখি প্রতিদিনই সে পূর্বদিকে উদিত হয়ে পশ্চিমে অস্ত যায়। ছক বাঁধা এ নিয়মের বাইরে যাওয়ার কোন শক্তি তার নেই। কিন্তু মানুষ অন্য সবার মতো ধরাবাধা নিয়মে চলতে বাধ্য নয়।

বস্তুত: মহান আল্লাহ সব কিছুকে মানুষের জন্যে তার নিদর্শন বানিয়েছেন। যেমন একটু আগে কালামে পাকের উদ্ধৃতি দেয়া হল। ক্ষুদ্রতম থেকে বৃহত্তম সব সৃষ্টিই র ইবাদত করছে বা তার বিধান মেনে চলছে। এজন্যে তাদের মধ্যে পূর্ণ শান্তি অনাদিকাল থেকে বিরাজমান। এতে মানুষের জন্যে বড় শিক্ষা রয়েছে। তা হচ্ছে মানুষেরও উচিত আল¬াহর বিধান মত চলা। অন্যদিকে এ সৃষ্টিসমূহ মানুষের উপকারের জন্যই মওজুদ রয়েছে, মানুষ তার যাবতীয় প্রয়োজন এগুলো দিয়েই পূরণ করে। বলেন-

“এ পৃথিবীর সবকিছুই তোমাদের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে (আল কুরআন)

মানুষের দায়িত্ব

তাহলে বুঝা গেল, দুনিয়ার সব কিছুকেই দয়াময় আল্লাহ্ মানুষের খেদমতে নিয়োজিত রেখেছেন। অথচ বিভিন্ন সময় দেখা গেছে মানুষ দুনিয়া বা এর বিভিন্ন বস্তুর গোলামী করেছে, কখনও সূর্যের, কখনও চন্দ্রের, কখনও প্রতিমার। আরো আশ্চর্যের ব্যাপার! দুনিয়ার সব মানুষ সৃষ্টি- এক জাতের সৃষ্টি। তাই তারা সবাই সমান। জন্মগত মর্যাদায় কেউ কারো বড় ছোট নয়। অথচ মানুষের মাঝে কিছু লোক বিভিন্ন সময় অন্য মানুষকে গোলাম বানিয়েছে, তাদের শাসক বা মনিব হয়েছে। এটা মানবতার জন্যে জঘন্য অপমান। অতীতে ফেরাউন নমরুদরাই এটা করেনি, আজকের যুগেও তাদের উত্তরসূরী রয়েছে। এরা নিজেদের মনগড়া মতবাদ বা শাসন সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। আর মানুষ তাদের স্রষ্টা ও তাঁর বিধানকে না জানার কারণে তাদের আনুগত্য করে চলেছে।

অথচ বলেন মানুষ দুনিয়াতে আমার প্রতিনিধি। মানব সৃষ্টির সময় তিনি ফেরেশতাদের বলেছিলেন:

“আমি দুনিয়াতে আমার প্রতিনিধি নিয়োগ করতে চাই।” তাই মানুষ ফেরেশতার চাইতেও বড়। তারা প্রতিনিধি। দুনিয়াতে তাদের কাজ হলÑ তারা কেবল দেয়া বিধান অনুযায়ী চলবে আর দুনিয়াকে সেভাবে চালাবে। এটা বুঝতে না পারার কারণেই মানুষ বিভিন্ন বস্তুর বা অপর কোন মানুষের গোলামী করে থাকে।

মানুষের প্রকৃত পরিচয়

সে আধা অধীন আর আধা স্বাধীন, যেমন, আল্ল¬াহ তাকে মুখ দিয়েছেন কথা বলার জন্যে। সে কান দিয়ে বলার কাজ সম্পন্ন করতে পারে না।

তাই এখানে সে খোদার অধীন, কিন্তু মুখ দিয়ে সে সত্য বলবে, না মিথ্যে বলবে সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা তাকে দিয়েছেন।

এজন্য দেখা যায় নেহাত খারাপ লোকরাও নিজেদের জনদরদী পরিচয় দিতে ভালোবাসে। এ অনুভূতি আসে মানুষের বিবেক থেকে। বিবেক হলো ভালো ও মন্দ পার্থক্য করার ক্ষমতা।

শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)

নবীদের সর্বশেষ ও শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন হযরত মুহাম্মাদ (সা)। তাঁর ওপর নাজিল হয়েছে আল কুরআন। এতে সর্বকালের সর্বযুগের মানুষের জন্যে তাঁর পছন্দনীয় পথ কি, তা বলে দিয়েছেন। রাসূল (সা)আল্লাহর দ্বীন ইসলামকে পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন। এ জীবনব্যবস্থা সব মানুষের জন্যে খোদা মনোনীত একমাত্র জীবন ব্যবস্থা। তাই আল কুরআনের সর্বশেষ নাজিল হওয়া আয়াতে আল্লাহ বলে দিয়েছেন।

“… আজ আমি তোমাদের জন্যে আমার জীবন ব্যবস্থাকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, আমার নিয়ামতকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের জন্যেই ইসলামকে একমাত্র জীবন-বিধান হিসেবে নির্ধারিত করলাম। (সূরা আল মায়েদা: ৩)

মানুষের আসল পরিণাম

যারা দুনিয়াতে আল্লাহ প্রদত্ত বিধান এবং রাসূল (সা) প্রদর্শিত পথ অনুযায়ী চলবে আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়ায় সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তা দেয়ার ওয়াদা করেছেন। যেমন খোলাফায়ে রাশেদীন এবং যুগে যুগে ন্যায়পরায়ণ খোদাভীরু শাসকের অধীনে মানুষ ইনসাফ, সুবিচার পেয়েছিল: শোষণ, নির্যাতন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল। কিন্তু এ থেকেও আল্লাহ বড় সফলতা দিবেন আখিরাতে। আখিরাত হচ্ছে মৃত্যুর পরবর্তীকাল। কিয়ামাতের পর আল্লাহ পৃথিবীর সব মানুষকে পুনরুজ্জীবিত করবেন ও একত্রিত করবেন। সেদিন মানুষের যাবতীয় কাজের হিসেব নেয়া হবে। দুনিয়ায় যারা হুকুম মেনেছে, নবীর পথে চলেছে, তাদেরকে চিরকালের জন্যে জান্নাত (চিরন্তন সুখের স্থান) দেয়া হবে। আর যারা কর্মের স্বাধীনতার সুযোগে উচ্ছৃংখলতা ও খোদাদ্রোহীতার পথ অবলম্বন করছে, তাদেরকে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। তাদের পরিণাম হবে জাহান্নাম।

বোকা, অহংকারী, স্বল্পজ্ঞানী আর পন্ডিত নামধারী কিছু গোঁড়া ব্যক্তি আখিরাতকে অস্বীকার করতে চায়। শয়তান এসব পন্ডিতদের মতই ছিল। সে জ্ঞানের অহংকারে ডুবে গিয়েছিল। তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ কেউ হতে পারে তা সে মানতে চাইল না। ফলে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা তার কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হল। আখিরাতের প্রতি অবিশ্বাসী পন্ডিতরাও জ্ঞানের অহংকারে ডুবে থাকে। তাদের ধারণার বাইরে যে আরো কিছু থাকতে পারে তা তারা বিশ্বাস করতে চায় না। অথচ একটু খোলা মনে চারিদিকে তাকালে, চিন্তা করলে বুঝতে পারা যায়- শুকিয়ে যাওয়া মাটিতে বৃষ্টি হবার পরই ঘাস গজায় কেন? কিভাবে শীতের জীর্ণতার পরেই আসে বসন্তের সজীবতা। দিনের পরেই বা রাত্রি কিভাবে নেমে আসে? আল্লাহর দেয়া নিয়ম অনুযায়ী প্রকৃতিতে যখন এ বিপরীত অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে তখন সেই আল্লাহ মৃত মানব সমষ্টিকে আবার সহজেই জীবন দিতে পারবেন না কেন?

দুনিয়া হলো পরীক্ষার স্থান। আখিরাত ফল লাভের স্থান। কাউকে কোন মর্যাদা আর পদ দেয়া হলে সে তার উপযুক্ত কি না তা যাচাই করে দেখা দরকার। আর যাচাই করে তার যথাযোগ্য পুরস্কার বা শাস্তি দেয়া দরকার। তেমনি দুনিয়ায় মানুষের মর্যাদা- সব জীবের ওপর শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা। আর পদ বা দায়িত্ব- খিলাফত বা আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব। সে এ মর্যাদা বা দায়িত্বের কতটুকু উপযুক্ত তা যাঁচাই করার স্থান হলো এই দুনিয়া। তাই সে আল্লাহ এবং রাসূলের (সা) পথে চলে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিতে পারে। আর যাচাই হলে যথাযোগ্য পুরস্কার বা শাস্তি। পুরস্কার বা শাস্তি দেয়ার স্থান আখিরাত। আখিরাতের সফলতাই মানুষের আসল সফলতা।

 

About বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির