আমরা কি চাই কেন চাই কেন চাই কিভাবে চাই?

মানবিয় মতবাদের ব্যর্থতা

শান্তির আশায় মানুষ যে মানবিক মতবাদের দ্বারস্থ হচ্ছে মানবতার মুক্তি সাধনে তা ব্যর্থ হয়েছে চরমভাবে। বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার, না নবতর প্রযুক্তির উদ্ভাবন পৃথিবীকে এনে দিয়েছে মানুষের হাতের মুঠোয়। মানুষের নিয়ন্ত্রণ বলয় সম্প্রসারিত হচ্ছে পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে। কিন্তু শান্তির শ্বেতকবস্তুর এখনো ধরতে পারেনি মানুষ। আবিষ্কার করতে পারেনি শান্তির প্রক্রিয়া। পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ তথাকথিত স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের নামে অসাম্য উচ্ছৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের সৃষ্টি করেছে। সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী চেতনা জাতিতে জাতিতে হিংসা-বিদ্বেষ, দ্বন্দ্ব ও কলহের জন্ম দিয়েছে। সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ তথা সমাজতন্ত্র শান্তি ও সাম্যের নামে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে পাশবিক জিন্দানে বন্দী করে অবশেষে ইতিহাসের সর্বাধিক ঘৃণিত ও বিপর্যস্ত মতবাদ হিসেবে পৃথিবীর বুক থেকে চির বিদায় নিয়েছে। নয়া বিশ্বব্যবস্থা (ঘবি ডড়ৎষফ ঙৎফবৎ) নামে পুঁজিবাদ নিয়ন্ত্রিত আজকের বিশ্বে মানবাধিকারের নামে মানবতা লাঞ্ছিত হচ্ছে দেশেদেশে। পৃথিবীর বাতাস ভারী হয়ে উঠছে নির্যাতিত মানুষের করুণ আর্তনাদ আর বারুদের গন্ধে। বিশ্বের ঘোষিত মোড়লরা গণতন্ত্রের লেবাছে পৃষ্ঠপোষকতা করে যাচ্ছে মানবতার কসাইদের। বিশ্বের কোটি কোটি শিশু যখন ক্ষুধার্ত অবস্থায় বিছানায় ঘুমাতে যায়, তখন অস্ত্র প্রতিযোগিতায় ব্যয় হচ্ছে কোটি কোটি ডলার। পারমাণবিক যুদ্ধের অশানি সংকেতে আতঙ্কিত আজ বিশ্ব মানবতা। এসবই মানবিক মতবাদের ব্যর্থতার সুস্পষ্ট স্মারক।

বাংলাদেশের সমস্যা

বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় জন্মভূমি। এদেশের শতকরা ৮৯.৭ ভাগ মানুষ মুসলমান। আমাদের রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামী ইতিহাস-ঐতিহ্য। অন্যায় আর অসত্যের কাছে এদেশের মানুষ কখনো। মাথা নত করেনি। বারবার আধিপত্যবাদী শক্তি এদেশের ওপর তাদের অশুভ তাবা বিস্তারের প্রয়াস পেয়েছে। এদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বিনষ্ট করতে চেয়েছে কিন্তু এদেশের সংগ্রামী মানুষেরা বারবার এদের প্রতিহত করেন এবং আমাদের জন্য তৈরী করেন বসবাস উপযোগী চমৎকার এক আবাসস্থল।

শাহ মাখদুম, শাহ জালাল, খান জাহান আলীর মতো ধর্মীয় নেতৃত্ব এদেশে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং তাকে সুদৃঢ় করেছেন। তিতুমীর, হাজী শরীয়তউল্ল্যাহ এবং শেরে বাংলার মত রাজনৈতিক নেতৃত্ব আমাদের স্বাতন্ত্র্য চেতনা, আমাদের স্বাধীকার আন্দোলনকে করেছেন বেগবান। দুইশত বছরের বৃটিশ শাসনের নিগড়কে এদেশের জনগণ কখনোই মেনে নেয়নি। তাই বৃটিশদের আধিপত্যের শৃঙ্খল ভেঙ্গে মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি পাকিস্তান গঠনের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এখানকার জনগণ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বাংলাদেশের মানুষের ভূমিকা ছিল নিরঙ্কুশ এবং তুলনাহীন, কিন্তু পাকিস্তানের ২৪ বছরের শাসনকালেও মানুষ শান্তি ও সুখের মুখ দেখতে পায়নি। অবশেষে ৭১ সালে আবারও লক্ষ্য প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হল স্বাধীনতা।

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সকল দিকে শুরু করে এক ধূসর যাত্রা। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির পাশাপাশি দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অসাম্য, নির্বিচারে নির্যাতন তথা এক ব্যাপক অরাজকতা জাতিকে ধ্বংশের মুখে ঠেলে দেয়। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ধর্মহীন এক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য ষড়যন্ত্র করা হয়। ইসলাম ও ইসলামী প্রতিষ্ঠানসমূহকে বিতর্কিত করার এক সর্বনাশী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এদেশের মাটি ও মানুষের শিকড়লব্ধ সংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে বিজাতীয় মঙ্গল-সংস্কৃতির চর্চাকে আমদানি করা হয়। এভাবে জাতিকে পরিচয়ের সংকটে নিপতিত করা হয়। সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ, একদলীয় শাসন কায়েমের মাধ্যমে রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বিশেষ মহলের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন আমাদের জাতীয় রাজনৈতিক জীবনকে চরম সংকটপূর্ণ করে তোলে। অর্থনৈতিক অঙ্গনেও “উলট-পালট করে দে মা লুটে পুটে খাই” দর্শন আসন গেড়ে বসে। একদিকে বিপুল জনসংখ্যা চরম দারিদ্র সীমার নীচে অবস্থান করে মানববেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়। অপরদিকে মুষ্টিমেয় সুবিধাবাদী গোষ্ঠী আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়ে যায়। সিংহভাগ সম্পদ জমা হয় নতুন বাঙ্গালী দাউদ ইস্পাহানীদের হাতে।

পরিণতিতে ১৯৭৫ সালে আবার জাতীয় রাজনীতির পট পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু জনগণের উপর জগদ্দল পাথরের মত যে স্বৈরতন্ত্র পাকাপোক্ত আসন নেয় তা থেকে আজও পরিত্রাণ পায়নি জাতি। ক্ষমতায় গিয়ে ক্ষমতাসীনদের ভাগ্য পরিবর্তিত হলেও সাধারণ জনতার ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটেনি আজও। মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলার জন্য এদেশের মানুষ অতীতের মত ৯০ এ আন্দোলন করে ৯১-এর গণতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। ৯৬ সালে এসে তারাও স্বৈরাচারের পথ অনুসরণ করে। ফলে আরেকটি আন্দোলনে রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছিল এদেশের মানুষ। কিন্তু যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবন এই পুরনো প্রবাদকে সত্যায়িত করে তারাও শুরু করে জনগণের উপর অত্যাচার, নির্যাতন। তারা ক্ষমতায় এসেই সন্ত্রাস ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তারা দেশটাকে একটি তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করার অপচেষ্টা চালায় কিন্তু ২০০১ সালে জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেন এবং আবার নতুন সরকার ক্ষমতায় আসেন। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে দেশকে পুণর্গঠনের দিকে মনোনিবেশ করেন কিন্তু বাকশালীদের আক্রমণাত্মক, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে সরকারের অনেক কাজই পুরোপুরি সফলতার মুখ দেখতে ব্যর্থ হয়। বিরোধীদল সংসদে না গিয়ে রাজপথ কাঁপতে থাকে এবং লাগাতার হরতাল দিয়ে দেশকে একটি অরাজক পরিস্থিতির দিকে ধাবিত করে। ২৮ আগস্ট সৃষ্টি করে এরা নিরীহ মানুষকে রাস্তার উপর বর্বরোচিতভাবে হত্যা করে। আবার ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এল। এই অনির্বাচিত সরকার অকেগুলো ভাল কাজ হাতে নিলেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে তাদের অনেক কাজই ব্যহত হয়। তারা মাইনাস টু ফর্মুলার নামে দেশকে রাজনৈতিক শূন্য করার চেষ্টা করে। অবশেষে তারা নির্বাচন দিতে বাধ্য হয় ২৯ তারিখের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে তারা একটি দলকে ক্ষমতায় বসায় যারা নির্বাচিত হয়েই দেশজুড়ে আবার লুটতরাজ শুরু করে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্রাবাস বাস ষ্ট্যান্ড, মার্কেট এমনকি তারা ক্লাবও দখল করে নেয়। এদেশের মানুষ যাকেই বিশ্বাস করেছে কেউই তাদের বিশ্বাসের মূল্য দেয়নি। তাই তারা পরিবর্তন চেয়েছে। কিন্তু এত পরিবর্তনের পরও আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণ কি মিলেছে? আমরা ৪৭ সালে বিট্রিশদের থেকে স্বাধীনতা অর্জন করি আবার ৭১ সালে পুনরায় স্বাধীন হই। দু’ দুবার স্বাধীনতা অর্জন করে আজও কেন নিজেদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব হুমকির সম্মুখীন? আমরা কী চেয়েছিলাম? কেন আমাদের চাওয়া পাওয়ার এই পার্থক্য?

About শিবির অনলাইন লাইব্রেরী