আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – প্রথম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

তুফাইল ইবন আমর আদদাওসী (রা)

নাম তাঁর তুফাইল। ‘যুন-নূর’ উপাধি। ‘দাওস’ গোত্রের সন্তান হওয়ার কারণে দাওসী বলা হয়। কবীলা-দাওস ইয়ামনে বসবাসকালী একটি শক্তিশালী গোত্র। তিনি ছিলেন এ গোত্রের ‘রয়িস’ বা সরদার। ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল তাঁর পেশা। এ কারণে মাঝে মধ্যে তাঁকে মক্কায় আসা-যাওয়া করতে হতো।

তুফাইল ছিলেন জাহিলী যুগের আরবের সম্ভ্রান্ত ও আত্মমর্যাদাশীল ব্যক্তিবর্গের অন্যতম। তাঁর ‍চুলো থেকে হাঁড়ি কখনো নামতো না। অতিথির জন্য তাঁর বাড়ীর দরজা থাকতো সর্বদা উন্মুক্ত।

তিনি ছিলেন তীক্ষ্ণ মেধা, প্রখর বুদ্ধিমত্তা, সহজাত কাব্য প্রতিভা ও সূক্ষ্ণ অনুভূতির অধিকারী। ভাষার মধুরতা, তিক্ততা ও ভাষার ইন্দ্রজাল সম্পর্কে তিনি ছিলেন সুবিজ্ঞ।

একবার তুফাইল ইবন ’আমর ব্যবসা উপলক্ষে তাঁর গোত্রের আবাসস্থল তিহামা অঞ্চল থেকে মক্কায় উপস্থিত হলেন। মক্কায় তখন রাসূলুল্লাহ সা. ও কুরাইশদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গেছে। দু’টি দলই নিজ নিজ মতের সমর্থক সংগ্রহে তৎপর। একদিকে রাসূল সা. আহ্‌বানে জানাচ্ছেন মানুষকে তাঁর প্রভূর দিকে। অন্যদিকে কাফিররা সব ধরণের উপায়-উপকরণ প্রয়োগ করে মানুষকে তাঁর থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। বলা চলে, তিনি সম্পূর্ণ অনভিপ্রেতভাবে এ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লেন। কারণ, তিনি তো এ উদ্দেশ্যে মক্কায় আসেননি। ইতিপূর্বে মুহাম্মাদ ও কুরাইশদের এ দ্বন্দ্বের কথা তাঁর মনে একবারও উদয় হয়নি। এ সংঘাতের সাথে তাঁর জীবনের এক অভিনব কাহিনী জড়িত আছে। তিনি বলেন, ‘আমি মক্কায় প্রবেশ করলাম। কুরাইশ নেতৃবৃন্দ আমাকে দেখেই এগিয়ে এসে সর্বোত্তম সম্ভাষণে আমাকে স্বগত জানালো। আমাকে তারা তাদের সর্বাধিক সম্মানিত বাড়ীতে আশ্রয় দিল। তারপর তাদের নেতৃবৃন্দ ও জ্ঞানী-গুণীরা আমার কাছে এসে বললোঃ ‘তুফাইল, আপনি এসেছেন আমাদের এ আবাসভূমিতে। এ লোকটি, যে নিজেকে একজন নবী বলে মনে করে, আমাদের সকল ব্যাপারে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে, আমাদের ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছে। আমাদের ভয় হচ্ছে, আপনিও তার কথায় বিভ্রান্ত না হয়ে পড়েন এবং আপনার নেতৃত্বে আপনার গোত্রেও আমাদের মত একই সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে না উঠে। সুতরাং আপনি এই লোকটির সাথে কোন রকম আলাপ-আলোচনা করবেন না, তার কোন কথায় কান দেবেন না। কারণ, তার কথা যাদুর মত কাজ করে। সে বিভেদ সৃষ্টি করে দেয় পিতা-পুত্র, ভাই-ভাই, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে।’

তুফাইল বলেন, ‘আল্লাহর কসম, তারা আমার কাছে রাসূলুল্লাহ সা. সম্পর্কে অভিনব কাহিনী ও তাঁর নানা রকম আশ্চর্য কার্যাবলী বর্ণনা করে আমাকে ও আমার গোত্রকে সতর্ক করে দিল। সুতরাং আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, তাঁর কাছে আমি ঘেঁষবোনা, তাঁর সাথে কথা বলবো না বা তাঁর কোন কথাও শুনবো না। সে সময় আমরা কা’বার তাওয়াফ করতাম এবং সেখানে রক্ষিত মূর্তিসমূহের পূজাও করতাম। যখন আমি কা’বার তাওয়াফ ও মূর্তি পূজার জন্য মসজিদের উদ্দেশ্যে বের হলাম, আমার দু’কানে ভালো করে তুলো ভরে নিলাম যাতে কোনভাবেই মুহাম্মাদের সা. কথা আমার কানে প্রবেশ করতে না পারে।

মাসজিদুল হারামে ঢুকেই আমি দেখতে পেলাম তিনি কা’বার পাশেই নামাযে দাঁড়িয়ে। তবে তাঁর সে নামায আমাদের নামাযের মত, তাঁর সে ইবাদাত আমাদের ইবাদাতের মত ছিল না। এ দৃশ্য আমাকে পুলকিত করলো, তাঁর সে ইবাদাত আমাকে আন্দোলিত করলো। আমার ইচ্ছে হলো তাঁর নিকটে যাই। অনিচ্ছাসত্ত্বেও এক পা দু’পা করে তাঁর কাছে গিয়ে পৌঁছলাম। আল্লাহর ইচ্ছে ছিল তাঁর কিছু কথা আমার কানে পৌঁছে দেয়া। তাই, কানে তুলো ভরা সত্ত্বেও তাঁর কিছু উত্তম বাণী আমি শুনতে পেলাম। মনে মনে বললামঃ ‘তুফাইল, তোর মা নিপাত যাক, তুই একজন বুদ্ধিমান কবি। ভালো-মন্দ বিচারের ক্ষমতা তোর আছে। এ লোকটির কথা শুনতে তোর বাধা কিসে? যদি সে ভালো কথা বলে, গ্রহণ করবি, আর মন্দ হলে প্রত্যাখ্যান করবি।’

তুফাইল বলেন, আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম। নামায শেষ করে রাসূলুল্লাহ সা. বাড়ীর দিকে রওয়ানা হলেন। আমিও তঁঅকে অনুসরণ করে তাঁর বাড়ীতে গিয়ে পৌঁছলাম। বললামঃ ইয়া মুহাম্মাদ, আপনার কাওমের লোকেরা আপনার সম্পর্কে এইসব কথা আমাকে বলেছে। তারা আমাকে আপনার সম্পর্কে এত ভয় দেখিয়েছে যে আপনার কোন কথা যাতে আমার কানে ঢুকতে না পারে সেজন্য আমি কানে তুলো ভরে নিয়েছি। তা সত্ত্বেও আল্লাহ তায়ালা আপনার কিছু কথা না শুনিয়ে ছাড়লেন না। যা শুনেছি, ভালোই মনে হয়েছে। আপনি আপনার ব্যাপারটি আমার কাছে একটু খুলে বলুন। তিনি তাঁর বক্তব্য সুষ্ঠুভাবে বলার পর সূরা ইখলাস ও সূরা আল-ফালাক তিলাওয়াত করে আমাকে শুনালেন। সত্যি কথা বলতে কি, এর থেকে সুন্দর কথা ও অনুপম বিষয় আর কখনো আমি শুনিনি। সেই মুহূর্তে আমার হাত তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিলাম এবং কালেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ পাঠ করে ইসলামের ঘোষণা দিলাম।

ইসলাম গ্রহণের পর মক্কার কুরাইশরা তাঁকে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করতে থাকে। তখন তিনি তাদেরকে উদ্দেশ্য করে সুন্দর একটি কবিতা রচনা করেন। কুরাইশদের নিন্দা, আল্লাহর একত্ব ও রাসূলুল্লাহর সা. প্রশংসা- এই ছিল সেই কবিতার বিষয়বস্তু। ইবন হাজার আলইসাবা গ্রন্থে গ্রন্থে তার কয়েকটি চরণ সংকলন করেছেন।

তুফাইল বলেন, তারপর আমি মক্কায় বেশ কিছুদিন অবস্থঅন করে ইসলামের বিধি-বিধান শিক্ষা করলাম, সাধ্যানুযায়ী কুরআনের কিছূ অংশও হিফজ করলাম। আমি আমার গোত্রে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

আমার প্রত্যাবর্তনের খবর শুনে আমার বৃদ্ধ পিতা দৌঁড়ে এলেন। আমি বললামঃ আব্বা, আপনি আমার থেকে দূরে থাকুন। আমি আপনার কেউ নই বা আপনি আমার কেউ নন।

এ কথা শুনে তিনি বললেনঃ এ কথা কেন, বেটা? বললামঃ আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি, মুহাম্মাদের সা. দ্বীনের অনুসারী হয়েছি। বললেনঃ বেটা, তোমার দ্বীনই আমার দ্বীন। বললামঃ যান, গোসল করে পবিত্র পোশাক পরে আমার কাছে আসুন। যা আমি শিখেছি, আপনাকে শেখাবো। তিনি চলে গেলেন। গোসল করে পবিত্র পোশাক পরে আমার কাছে ফিরে এলে আমি তাঁর কাছে ইসলামের দাওয়াত পেশ করলাম। তিনি সাথে সাথে ইসলাম কবুল করলেন। তারপর এলো আমার সহধর্মিনী। তাকেও আমি দূরে সরে যেতে বললাম। ‘আপনার প্রতি আমার মা-বাবা কুরবান হোক’- এ কথা বলে সে এর কারণ জানতে চায়। আমি বললামঃ ইসলাম তোমার ও আমার মধ্যকার সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়েছে। আমি ইসলাম গ্রহণ করে দ্বীনে মুহাম্মাদীর অনুসারী হয়েছি। সে বললোঃ তাহলে আপনার দ্বীনই আমার দ্বীন। বললামঃ যুশশারা ঝর্ণার পানি দিয়ে গোসল করে পবিত্র হয়ে এসো। (যুশশারা দাওস গোত্রের দেবীমূর্তি তার পাশেই ছিল পাহাড়  থেকে প্রবাহিত একটি ঝর্ণা) সে বললোঃ আমার মা-বাবা আপনার প্রতি কুরবান হোক, ধর্ম ত্যাগের ব্যাপারে আপনি কি যুশ-শারাকে একটুও ভয় পাচ্ছেন না? বললামঃ ‘যুশ-শারা ও তুমি নিপাত যাও। যাও, সেখানে গিয়ে মানুষের ভীড় থেকে একটু দূরে থেকে গোসল করে এসো। এই বধির প্রস্তর-মূর্তি তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না, সে যিম্মাদারী আমি নিলাম। সে চলে গেল একটু পরে গোসল সেরে ফিরে এলো। আমি তার সামনে ইসলামের দাওয়াত পেশ করলাম। সে সানন্দে ইসলাম গ্রহণ করলো। তারপর আমি দাওস গোত্রের সকল মানুষের সামনে ইসলামের দাওয়াত পেশ করলাম। কিন্তু একমাত্র আবু হুরাইরা ছাড়া প্রত্যেকেই ইতস্ততঃ ভাব প্রকাশ করলো। দাওস গোত্রের মধ্যে একমাত্র তিনিই খুব তাড়াতাড়ি ইসলাম গ্রহণ করেন।

তুফাইল রা. বলেন, ‘অতঃপর আমি মক্কায় রাসূলুল্লাহর সা. খিদমতে হাজির হলাম। এবার আমার সঙ্গে আবু হুরাইরা। রাসূলুল্লাহ সা. জিজ্ঞেস করলেঃ তুফাইল, তোমার পেছনের খবর কি? বললামঃ ‘তাদের অন্তরে মরচে পড়ে গেছে, তারা মারাত্মক কুফরীতে লিপ্ত। দাওস গোত্রের ওপর পাপাচার ও নাফরমানী ভর করে বসেছে।’

আমার এ কথা শোনার পর রাসূলুল্লাহ সা. উঠে দাঁড়ালেন তারপর অজু করে নামায আদায় করলেন এবং আকাশের দিকে হাত উঠালেন। আবু হুরাইরা বলেন, আমি যখন রাসূলুল্লাহকে সা. এমনকি করতে দেখলাম, আমার ভয় হলো এই ভেবে যে, তিনি হয়তো আমার গোত্রের ওপর বদদুআ করবেন, আর তারা ধ্বংস হয়ে যাবে। মনে মনে আমি বললামঃ আল্লাহ আমার কাওমকে হিফাজত করুন। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে আমি রাসূলুল্লাহকে সা. বলতে শুনলামঃ ‘হে আল্লাহ, দাওস কবীলাকে তুমি হিদায়াত দান কর’, এভাবে তিনি তিনবার বললেন। তারপর তুফাইলের দিকে ফিরে বললেনঃ এবার তুমি তোমার কাওমের কাছে ফিরে যাও। তাদের সাথে কোমল আচরণ কর এবং তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দাও।’

রাসুল সা. যখন দাওস গোত্রের জন্য হাত উঠিয়ে দুআ করছিলেন, তুফাইল বললেনঃ ‘আমি এমনটি চাইনে।’ এ কথা শুনে রাসূল সা. বললেনঃ তোদের মধ্যে তোমার মত আরো অনেক লোক আছে।’ কথিত আছে, জুনদুব ইবন ’আমর আদ-দাওসী জাহিলী যুগেই বলতেনঃ এ সৃষ্টি জগতের একজন স্রষ্টা নিশ্চয়ই আছেন, তবে তিনি কে, তা আমরা জানিনে। রাসূলুল্লাহর সা. আবির্ভাবের খবর শুনে তিনি ৭৫ জন লোকসহ মদীনায় এসে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

তুফাইল বলেন, আমি ফিরে এসে দাওস কবীলায় ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে আত্মনিয়োগ করলাম। এ দিকে রাসূলুল্লাহ সা. মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাত করলেন। একে একে বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল। তারপর আমি রাসূলুল্লাহর সা. খিদমতে হাজির হলাম, আমার সঙ্গে তখন দাওস কবীলার আশিটি পরিবার। তারা সবাই ইসলাম গ্রহণ করেছে। আমাদের দেখে রাসূল সা. ভীষণ খুশী হলেন এবং খাইবারের গণীমতের অংশও তিনি আমাদের দিলেন। আমরা বললাম, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, এখন থেকে যত যুদ্ধে আপনি অংশ নেবেন, দক্ষিণ ভাগের দায়িত্ব থাকবে আমাদের ওপর।’ তুফাইল বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর সঙ্গে থেকে গেলাম। অবশেষে আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছায় মক্কা বিজয় হলো।

তুফাইল রা. তার গোত্রের উপাস্য যুল-কাফ্‌ফাইন মূর্তিটি ভস্মিভূত করে দেন। সাথে সাথে দাওস গোত্রের অবশিষ্ট শিরকও নিঃশেষ হয়ে যায়, তাদের সকলেই ইসলাম গ্রহণ করে। এদিকে রাসূল সা. তায়িফ অভিযানে রওয়ানা হয়েছে। তুফাইল রা. তাঁর গোত্রের আরো চারশ’ সশস্ত্র লোককে সঙ্গে নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে তায়িফে মিলিত হন। তুফাইল ছিলেন তাঁর দলটির অধিনায়ক। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার পতাকাবাহী হবে কে?’ তিনি বললেন, ‘নুমান ইবন রাবিয়া যেহেতু দীর্ঘকাল যাবত এ দায়িত্ব পালন করে আসছে, তাই এ ক্ষেত্রেও সে এ দায়িত্বটি পালন করবে।’ রাসূল সা. তাঁর এ যুক্তি পছন্দ করলেন।

এরপর থেকে রাসূলুল্লাহ সা. যতদিন জীবিত ছিলেন তুফাইল ইবন আমর তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসেবে ছিলেন। হযরত আবু বকর সিদ্দীকের খিলাফাতকালে তিনি তাঁর জীবন, তরবারি ও সন্তান-সন্ততি সবই খলীফার আনুগত্যে উৎসর্গ করেন। রিদ্দার যুদ্ধের আগুন চারদিকে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলে তিনি ভণ্ডনবী মুসাইলামা আল-কাজ্জাবের বিরুদ্ধে প্রেরিত একটি বাহিনীর অগ্রসৈনিক হিসেবে পুত্র আমরকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। তিনি যখন ইয়ামামার পথে, তখন একটি স্বপ্ন দেখলেন। সঙ্গী-সাথীদের কাছে তিনি এর ব্যাখ্যা চাইলেন। সঙ্গীরা জিজ্ঞেস করলে, ‘কি দেখেছো?’ তিনি বললেন, ‘দেখেছি, আমার মাথা ন্যাড়া করা হয়েছে, একটি পাখী আমার মুখ থেকে বের হয়ে গেল, আমার স্ত্রী আমাকে তাঁর পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে নিল, আমার পুত্র আমর আমাকে দ্রুত টেনে বের করতে চাইলো; কিন্তু তার ও আমার মধ্যে প্রাচীর খাড়া হয়ে গেল।’

তাঁরা মন্তব্য করলেন, ‘স্বপ্নটি ভালো।’ তুফাইল বলেন, ‘তবে আমি স্বপ্নের তাবীর করলাম এভাবেঃ ন্যাড়া মাথার অর্থ ঘাড় থেকে আমার মাথা বিচ্ছিন্ন হবে। মুখ থেকে পাখী বের হওয়ার অর্থ আমার রূহটি বের হয়ে যাবে। স্ত্রীর পেটের মধ্যে ঢুকে যাওয়ার অর্থ মাটি খুড়ে কবর তৈরী করে আমাকে দাফন করা হবে। আমার প্রবল বাসনা, আমি যেন শহীদের মৃত্যু বরণ করতে পারি। আর আমার পুত্র ’আমর, সেও আমার মত শাহাদাত চাইবে; কিন্তু একটু দেরীতে সে তা লাভ করবে।’ তাঁর এ ব্যাখ্যা সত্যে পরিণত হয়েছি। হিজরী ১১ সনে ইয়ামামার যুদ্ধে এই মহান সাহাবী বীরত্বের সাথে লড়াই করেন এবং যুদ্ধের ময়দানেই শাহাদাত বরণ করেন। এ যুদ্ধে তাঁর একমাত্র পুত্র ’আমরের ডান হাতে কব্‌জিটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তিনি দুর্বল হয়ে পড়েন। এভাবে তিনি যুদ্ধের ময়দানে নিজের হাতটি ও পিতাকে হারিয়ে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন।

দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমার ইবনুল খাত্তাবের রা. খিলাফাতকালে একবার ’আমর ইবন তুফাইল এলেন তাঁর কাছে। খরীফার জন্য খাবার উপস্থিত হলে তিনি তাঁর কাছে উপবিষ্ট সকলকে আহ্‌বান জানালেন খাবারের জন্য। সকলে সাড়া দিলেও ’আমর সাড়া দিলেন না। খলীফা তাঁকে বললেন, ‘তোমার কী হলো? সম্ভবতঃ হাতে জন্য লজ্জা পাচ্ছ?’ ’আমর বললেন, ‘হ্যা, তাই।’ খলীফা বললেন, ‘আল্লাহর কসম, তোমার ঐ কাটা হাতটি দিয়ে এ খাবার ঘেঁটে না দেওয়া পর্যন্ত আমি মুখে দেবনা। আল্লাহর কসম, একমাত্র তুমি ছাড়া মুসিলম উম্মাহর মধ্যে এমন আর কেউ নেই যার এক অংশ জান্নাতে। অর্থাৎ তোমার হাতটি।’ পিতার মৃত্যুর পর সব সময় তিনি শাহাদাতের স্বপ্ন দেখতেন। অবশেষে হিজরী ১৫ সনে রোমান বাহিনীর সাথে ইয়ারমুকের প্রান্তরে মুসলমানদের যে ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয় সেখানে তাঁর এ স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়। এভাবে বাপ-বেটা দু’জনেই শাহাদাতের গৌরব অর্জন করেন।

মক্কায় রাসূলুল্লাহ সা. ও মুসলমানদের ওপর যখন যুলুম-অত্যাচারের মাত্রা চরমে পৌঁছে, তখন একদিন তুফাইল প্রস্তাব দিলেন রাসূলকে সা. তাঁদের গোত্রে হিজরাত করে তাদের দুর্ভেদ্য দুর্গে আশ্রয় নেওয়ার জন্য। তিনি রাসূলুল্লাহর সা. হিফাজতের পূর্ণ যিম্মাদারীর আশ্বাসও তাঁকে দান করেন। কিন্তু এ গৌরব আল্লাহ তায়ালা মদীনার আনসারদের ভাগ্যে নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। তাই তিনি তুফাইলের আহ্‌বানে সাড়া দেননি।

ইসলাম গ্রহণের পর স্বীয় গোত্রে ইসলামী দাওয়াত ও তাবলীগে ব্যস্ত থাকায় রাসূলুল্লাহর সা. সাহচর্যে দীর্ঘদিন কাটাবার সুযোগ তিনি পাননি। তবে তাঁরই চেষ্টায় গোটা দাওস গোত্র ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

সাঈদ ইবন আমের আলজুমাহী (রা)

ঐতিহাসিকরা বলেছেনঃ সাঈদ ইবন ’আমের এমন ব্যক্তি যিনি দুনিয়ার বিনিময়ে আখিরাত খরিদ করে নেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সা. অন্য সব কিছুর ওপর প্রাধান্য দান করেন।

তাঁর পিতার নাম ’আমের এবং মাতা আরওয়া বিনতু আবী মুয়ীত। খাইবার বিজয়ের পূর্বে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।

মক্কার কুরাইশরা ধোঁকা দিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবী খুবাইব ইবন আদীকে রা. বন্দী করে মক্কায় নিয়ে আসে এবং সমবেত জনমণ্ডলীর সামনে প্রকাশ্যে জীবিত অবস্থায় অত্যন্ত নৃশংসভাবে তাঁর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে তাঁকে শুলবিদ্ধ করে। এ হৃদয় বিদারক দৃশ্য উপভোগ করার জন্য মক্কায় ঢেড়া পিটিয়ে দেওয়া হয়। এ দৃশ্য দেখার জন্য মক্কার তানয়ীম এলাকা থেকে আগত লোকদের মধ্যে সাঈদ ইবন ’আমের আল-জুমাহীও ছিলেন।

তাঁর ধমনীতে তখন যৌবনের টগবগে রক্ত। মানুষের ভীড় ঠেলে তিনিও চলেছেন সামনের দিকে। এক সময় তিনি এসে দাঁড়ালেন প্রথম সারির কুরাইশ নেতৃবৃন্দ- আবু সুফিয়ান ইবন হারব, সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যা প্রমুখের পাশাপাশি। কুরাইশদের বন্দীকে তিনি দেখলেন বেড়ী লাগানো অবস্থায়। নারী-পুরুষ, আবাল বৃদ্ধ-বণিতা তাঁকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর আংগিনার দিকে। তাঁর হত্যার মাধ্যমে বদর যুদ্ধে নিহত কুরাইশদের বদলা নেওয়াই তাদের উদ্দেশ্য। তাই তারা পৈশাচিক উল্লাসে মাতোয়ারা।

বন্দীকে সঙ্গে নিয়ে অগনিত মানুষ বধ্যভূমিতে উপস্থিত হল। দীর্ঘদেহী যুবক সাঈদ ইবন ’আমের দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলেন। নারী ও শিশুদের চীৎকার ও শোরগোলের মধ্যে তাঁর কানে ভেসে এল খুবাইবের দৃঢ় ও শান্ত কণ্ঠস্বর। বলছেঃ ‘আমাকে শূলীতে চড়াবার পূর্বে তোমরা যদি অনুমতি দাও, আমি দু’রাকা’আত  নামায আদায় করে নিতে পারি।’ তারা অনুমতি দিল।

সাঈদ ইবন ’আমের দেখলেন, তিনি কা’বার দিকে মুখ করে দু’ রাকা’আত নামায আদায় করলেন। সে নামায কতই না সুন্দর, কতই না চমৎকার! তারপর কুরাইশ নেতৃবৃন্দের দিকে ফিরে তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেনঃ ‘আল্লাহর কসম! তোমরা যদি মনে না করতে, আমি মরণ-ভয়ে নামায দীর্ঘ করছি, তাহলে আমি নামায আরও  দীর্ঘ করতাম।’

অতঃপর সাঈদ ইবন ’আমের স্বচক্ষে দেখলেন, তাঁর গোত্রের লোকেরা জীবিত অবস্থায় খুবাইবের দেহ থেকে একটার পর একটা অংগ কেটে ফেলছে। আর তাঁকে জিজ্ঞেস করছেঃ ‘তোমার স্থানে মুহাম্মাদকে আনা হোক, আর তুমি মুক্তি পেয়ে যাও, তা কি তুমি পছন্দ কর?’

তাঁর দেহ থেকে রক্তের ধারা প্রবাহিত হচ্ছে, আর তিনি বলছেনঃ

‘আল্লাহর কসম, আমি আমার পরিবার ও সন্তান-সন্ততির মধ্যে নিরাপদে অবস্থান করি, আর বিনিময়ে মুহাম্মাদের সা. গায়ে একটি কাঁটার আঁচড় লাগুক তাও আমার মনঃপুত নয়।’ একথা শুনে চতুর্দিক থেকে লোকেরা হাত ওপরে উঠিয়ে চীৎকার করে বলতে লাগলঃ ‘হত্যা কর, ওকে হত্যা করা।’

অতঃপর সাঈদ ইবন ’আমর দেখলেন, শূলীকাষ্ঠের ওপর দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি বলছেনঃ

‘আল্লাহুম্মা আহসিহিম আদাদা-ওয়াকতুলহুম বাদাদা ওয়ালা তুগাদির মিনহুম আহাদা-ইয়া আল্লাহ, তাদের সংখ্যা তুমি গুণে রাখ, তাদেরকে তুমি এক এক করে হত্যা কর এবং কাউকে তুমি ছেড়ে দিও না।’ এই ছিল তাঁর অন্তিম দু’আ। তারপর তরবারি ও বর্শার অসংখ্য আঘাতে তাঁর দেহ জর্জরিত করা হয়।

কিছুদিনের মধ্যে কুরাইশরা বড় বড় ঘটনাবলীতে লিপ্ত হয়ে খুবাইব ও তাঁর শূলীর কথা ভুলে গেল। কিন্তু যুবক সাঈদ ইবন ’আমের আল জুমাহীর অন্তর থেকে খুবাইবের স্মৃতি এক মুহূর্তের জন্য দূরীভূত হলনা। ঘুমালে স্বপ্নের মধ্যে, জেগে থাকলে কল্পনায় তিনি খুবাইবকে দেখতেন। তিনি যেন দেখতে পেতেন, খুবাইব শূলীকাষ্ঠের সামনে অত্যন্ত ধীর-স্থির ও প্রশান্তভাবে দু’রাকাআত নামায আদায় করছেন। কুরাইশদের ওপর অন্তিম বদ-দু’আর বিনীত সুরও যেন তিনি দু’কান দিয়ে শুনতে পেতেন। তাঁর ভয় হত এখনই হয়ত তাঁর ওপর বজ্রপাত হবে অথবা আকাশ থেকে প্রস্তর বর্ষিত হবে।

তাছাড়া খুবাইবের নিকট থেকে তিনি এমন কিছু শিক্ষালাভ করেন, এর পূর্বে যা তিনি জানতেন না। যেমনঃ বিশ্বাস এবং বিশ্বাসের পথে আমরণ জিহাদই হচ্ছে প্রকৃত জীবন। মজবুত ঈমান অনেক অভিনব ও অলৌকিক বিষয় সৃষ্টি করতে পারে। তাছাড়া একজন মানুষ যাঁকে তাঁর সঙ্গীরা এত গভীরভাবে মুহাব্বাত করতে পারে, তিনি আল্লাহ প্রেরিত নবী ছাড়া আর কিছু নন।

সেই সময় থেকে আল্লাহ তা’আলা সাঈদ ইবন আমেরের অন্তরকে ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। একদিন তিনি জনমণ্ডলীর সামনে উঠে দাঁড়িয়ে কুরাইশদের দেব-দেবী ও মূর্তির সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিন্নকরে ইসলাম গ্রহণের প্রকাশ্য ঘোষণা দেন। খাইবার যুদ্ধের পূর্বে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।

সাঈদ ইবন আমের হিজরাত করে মদীনায় এলেন এবং সর্বক্ষণ রাসূলুল্লাহর সা. সাহচর্য অবলম্বন করেন। তিনি খাইবারসহ পরবর্তী সব যুদ্ধেই অংশগ্রহণ করেন।

রাসূলুল্লাহর সা. তিরোধানের পর তাঁর দা’খলীফা আবু বকর রা. ও উমারের রা. খিলাফতকালে সাঈদ ইবন ’আমের উন্মুক্ত তরবারি হাতে তাঁদের নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করেন। হযরত উমারের রা. খিলাফতকালে সেনাপতি আবু উবাইদা রা. ইয়ারমুক যুদ্ধের জন্য অতিরিক্ত সৈন্য সাহায্য তলব করেন। খলীফা মদীনা থেকে সাঈদের নেতৃত্বে এক বাহিনী পাঠিয়ে দেন। ইয়ারমুকে সাঈদ রা. উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। দুনিয়ার বিনিময়ে আখিরাতকে ক্রয় ক’রে এবং আল্লাহর রিজামন্দীকে অন্তর ও দেহের সকল কামনা বাসনার ওপর প্রাধান্য দান ক’রে এবং আল্লাহর রিজামন্দীকে অন্তর ও দেহের সকল কামনা বাসনার ওপর প্রাধান্য দান ক’রে মুসলিমদের জন্য তিনি এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। রাসূলুল্লাহর সা. প্রথম দু’খলিফা সাঈদ ইবন ’আমেরের সততা আল্লাহ-ভীতি সম্পর্কে অবগত ছিলেন। এ কারণে সব সময় তাঁরা তাঁর উপদেশ গ্রহণ করতেন।

খলীফা হযরত ’উমারের রা. খিলাফতকালের প্রথম পর্ব তখন চলছে। একদিন সাঈদ ইবন আমের খলীফাকে বললেনঃ

‘‘ওহে উমার, আমি আপনাকে মানুষের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ দান করছি। তবে আল্লাহর ব্যাপারে মানুষকে ভয় করবেন না। আপনার কথা আপনার কাজের পরিপন্থী যেন না হয়। কারণ, কর্মদ্বারা সত্যায়িত কথাই সর্বোৎকৃষ্ট কথা।

ওহে উমার, দূর ও নিকটেই যে মুসলিম উম্মার শাসক আল্লাহ আপনাকে বানিয়েছেন, তাদের ব্যাপারে সর্বদা আপনি সজাগ থাকবেন। আপনার নিজের ও পরিবার বর্গের জন্য যা আপনি পছন্দ করবেন তাদের জন্যও তা আপনি পছন্দ করবেন। আপনার নিজের ও পরিবার বর্গের জন্য যা অপছন্দ করবেন তাদের জন্যও তা অপছন্দ করবেন। সত্যে উপনীত হওযার জন্য সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করবেন। আল্লাহর নির্দেশের ব্যাপারে কোন নিন্দুকের নিন্দার ভয় আপনি করবেন না।’’

উমার জিজ্ঞেস করলেন,

‘সাঈদ, এ কাজ করতে সক্ষম কে?’

তিনি বললেনঃ ‘আপনার মত ব্যক্তি। আল্লাহ যাঁকে উম্মাতে মুহাম্মাদীর কর্তৃত্ব দান করেছেন এবং আল্লাহ ও আপনার মাঝে অন্য কোন প্রতিবন্ধক নেই।’

তখনই তিনি সাঈদের নিকট আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, আমার ওপর এ বিপদ চাপাবেন না, আমাকে এ দুনিয়ার দিকে টেনে আনবেন না।’

উমার রেগে গিয়ে বললেন,

‘আপনাদের ধ্বংস হোক! খিলাফতের এ দায়িত্ব আমার কাঁধে চাপিয়ে এখন আমার থেকে দূরে থাকতে চান? আল্লাহর কসম! আমি আপনাকে ছাড়বো না।’ একথা বলে তিনি সাঈদকে হিমসের ওয়ালী নিযুক্ত করেন। তারপর জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার ভাতা নির্ধারণ করে দেব কি?’ সাঈদ বললেন, ‘আমীরুল মু’মিনীন, আমি তা দিয়ে কি করব? বাইতুল মাল থেকে যে ভাতা আমি লাভ করে থাকি তাইতো আমার প্রয়োজনের তুলনায় বেশী হয়ে যায়।’ সাঈদ হিমসে চলে গেলেন।

কিছুদিন পর আমীরুল মু’মিনীন উমারের কতিপয় বিশ্বস্ত লোক হিমস থেকে মদীনা এল। উমার তাদেরকে বললেনঃ

‘তোমাদের গরীব মিসকিনদের একটা তালিকা তোমরা আমাকে দাও। আমি তাদের কিছু সাহায্য করব। তারা একটি তালিকা প্রস্তুত করে ’উমারকে দিল। তাতে অন্যান্যের সঙ্গে সাঈদ ইবন আমেরর নামটিও ছিল। খলীফা জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ সাঈদ ইবন আমের কে?’ তারা বলল, ‘আমারের আমীর।’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের আমীরও কি এতো গরীব?’

তারা বললঃ ‘হ্যাঁ। আল্লাহর কসম। একাধারে কয়েকদিন যাবত তাঁর বাড়ীতে উনুনে হাড়ি চড়ে না।

একথা শুনে খলীফা ’উমার এত কাঁদলেন যে, চোখের পানিতে তাঁর দাড়ি ভিজে গেল। তারপর এক হাজার দিনার একটি থলিতে ভরে বললেন, ‘আমার পক্ষ থেকে তাঁকে সালাম জানিয়ে বলবে; আপনার ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণের জন্য আমীরুল মু’মিনীন এ অর্থ পাঠিয়েছেন।’

দিনার ভর্তি থলি নিয়ে তারা সাঈদের নিকট উপস্থিত হল। থলির মুখ খুলেই তিনি দেখতে পেলেন তাতে দিনার। অমনি ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ বলতে বলতে থলিটি এমনভাবে দূরে সরিয়ে দিলেন যেন তাঁর ওপর বড় ধরণের কোন বিপদ আপতিত হয়েছে। তাঁর স্ত্রী ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন।

‘সাঈদ, কি হয়েছে আপনার? আমীরুল মু’মিনীন কি ইন্তিকাল করেছেন?’

তিনি বললেন, ‘না। বরং তার থেকেও বড় কিছু।’

‘মুসলিমদের ওপর কি কোন বিপদ আপতিত হয়েছে?’

তিনি বললেন, ‘না। তাঁর থেকেও বড় কিছু।’

স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, ‘সেই বড় জিনিস কি?’

তিনি বললেন, ‘আমার পরকালের সর্বনাশের জন্য দুনিয়া আমার কাছে ঢুকে পড়েছে। আমার ঘরে বিপদ এসে পড়েছে।’

স্ত্রী বললেন, ‘বিপদ দূর করে দিন।’ তখনও তিনি দিনারের ব্যাপারটি জানতেন না।

সাঈদ বললেন, ‘এ ব্যাপারে তুমি আমাকে সাহায্য করবে?’

স্ত্রী জবাব দিলেন, ‘নিশ্চয়ই।’

তারপর দিনারগুলি কয়েকটি থলিতে ভরে তিনি গরীব মুসলিমদের মধ্যে বিলিয়ে দিলেন।

কিছুদিন পর হযরত উমার ইবনুল খাত্তার রা. স্বচক্ষে সিরিয়ার অবস্থা দেখার জন্য হিমসে এলেন। সেকালে হিমসকে বলা হত ‘কুয়াইফা’। কারণ কুফাবাসীদের মত হিমসবাসীরাও তাদের শাসকদের বিরুদ্ধে সব সময় অতিরিক্ত অভিযোগ উত্থাপন করতো। তাই বলা হত হিমসও যেন ছোট-খাট একটি কুফা। যাই হোক, খলীফার আগমনের পর হিমসবাসীর তাঁকে সালাম জানাতে এলে তিনি জি্জ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের আমীরকে কেমন পেলে?’

তারা আমীরের (সাঈদ) চারটি কাজের কথা উল্লেখ করে তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করল। গুরুত্বের দিক দিয়ে সে চারটি কাজের প্রত্যেকটি সমান।

’উমার বলেন, ‘আমি হিমসবাসী ও তাদের আমীরকে একসাথে উপস্থিত হতে বললাম। আল্লাহর কাছে আমি দু’আ করলাম,তাঁর সম্পর্কে আমার ধারণা যেন হতাশাব্যঞ্জক না হয়। কারণ তাঁর প্রতি ছিল আমার দারুণ বিশ্বাস।’

হিমসবাসী ও তাদের আমীর আমার নিকট এলে আমি জিজ্ঞেস করলাম,

‘তোমাদের আমীরের বিরুদ্ধে তোমাদের অভিযোগ কি?’

তারা বলল, ‘বেশ খানিক বেলা না হওয়া পর্যন্ত তিনি আমাদেরকে দেখা দেন না।’

উমার জিজ্ঞেস করলেন, ‘সাঈদ, এ অভিযোগ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি?’

তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

‘‘আল্লাহর কসম! বিষয়টি কারও কাছে প্রকাশ করা আমার পছন্দনীয় নয়। তবে না বললেই নয়, তাই বলছি। আমার পরিবারের জন্য কোন চাকর-বাকর নেই। সকালে বাড়ীর সব কাজই আমাকে নিজ হাতে করতে হয়। আটা মাখা ও রুটি তৈরীর কাজও আমি করে থাকি। তারপর হাত মুখ ধুয়ে মানুষকে সাক্ষাৎ দিই। তখন খানিকটা বেলা হয়ে যায়।’’

উমার জিজ্ঞেস করলেন,

‘তোমাদের আরও অভিযোগ আছে কি?’

তারা বলল,

‘তিনি রাতের বেলা কাউকে সাক্ষাৎ দান করেন না।

’উমার জিজ্ঞেস করলেন,

‘সাঈদ, এ ব্যাপারে তোমার বক্তব্য কি?’

তিনি বললেন,

‘আল্লাহর কসম! এ বিষয়টিও প্রকাশ করা আমার মনঃপূত নয়। তবুও বলছি, আমি দিন মানুষের জন্য ও রাত আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করেছি।’

’উমার জিজ্ঞেস করলেন,

‘তোমাদের আর কি অভিযোগ?’

তারা বলল,

‘মাসে একটে দিন তিনি কাকেও সাক্ষাৎ দান করেন না।’

উমার জিজ্ঞেস করলেন, ‘সাঈদ বিষয়টি কি?’

তিনি বললেন, ‘‘আমীরুল মুমিনীন, আমার কোন খাদেম নেই। পরনের এ কাপড় ছাড়া অন্য কোন কাপড়ও আমার নেই। মাসে একবার আমি নিজ হাতে তা পরিষ্কার করি এবং শুকানো পর্যন্ত অপেক্ষা করি। এজন্য দিনের প্রথম ভাগে লোকদের সাক্ষাৎ দিতে পারিনা। তবে শেষ ভাগে সাক্ষাৎ দিই।’

উমার আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘তাঁর বিরুদ্ধে আর কোন অভিযোগ আছে?’

তারা বলল,

‘মজলিসে মানুষের সাথে কথা বলতে বলতে মাঝে মাঝে হঠাৎ সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন।’

উমার জিজ্ঞেস করলেন, ‘ব্যাপার কি সাঈদ?’

তিনি বললেন,

‘‘আমি মুশরিক অবস্থায় খুবাইব ইবন আদীকে শূলীতে চড়ানোর দৃশ্য দেখেছিলাম। আমি আরও দেখেছিলাম কুরাইশরা তাঁর অংগ-প্রত্যংগ এক এক করে কেটে ফেলছে। সে সময় কুরাইশরা তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল,

‘তোমার স্থানে মুহাম্মাদকে সা. আনা হোক তা কি তুমি পছন্দ কর?’

উত্তরে তিনি বলেছিলেনঃ ‘আল্লাহ কসম, আমি আমার পরিবার বর্গ ও সন্তান সন্ততির মাঝে নিরাপদে ফিরে যাই, আর এর বিনিময়ে মুহাম্মাদের সা. গায়ে কাঁটার একটি আঁচড়ও লাগুক তাও আমার মনঃপূত নয়। আল্লাহর কসম! যখনই আমার সে দিনটির স্মৃতি মনে পড়ে এবং কেন আমি সেদিন তাঁকে সাহায্য করিনি- এ অনুভূতি আমার মধ্যে জেগে ওঠে, তখন আমি চেতনা হারিয়ে ফেলি। আমার মনে হয়, আল্লাহ আমার এ অপরাধ ক্ষমা করবেন না।’

উমার তখন বললেন, সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি আমার ধারণাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেননি। তারপর তিনি সাঈদের প্রয়োজন মিটানোর জন্য এক লাখ দিনার পাঠালেন। তাঁর সহধর্মিনী দিনারগুলি দেখে বলে উঠলেনঃ

‘সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদেরকে আপনার সেবা গ্রহণ থেকে মুক্তি দিয়েছেন। যান, আমাদের জন্য খাদ্য-খাবার কিনে আনুন এবং একটি চাকর রাখুন।’

একথা শুনে তিনি স্ত্রীকে বললেনঃ

‘এর থেকে উত্তম কিছু লাভ কর তাকি তমি চাওনা? স্ত্রী বললেন, ‘সেই উত্তম বস্তু কী?’’

তিনি বললেন, ‘আমরা এ দিনারগুলি আল্লাহকে করজে হাসানা দিয়ে দিই। তিনি আমাদের উত্তম বিনিময় দান করবেন, আমরা তো সেই বিনিময়ের সর্বাধিক মুখাপেক্ষী।’

স্ত্রী বললেন, ‘হাঁ, তা দিন। আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করুন।’

সেই মজলিসে বসে তিনি দিনারগুলি কয়েকটি থলিতে ভরলেন। তারপর পরিবারের প্রত্যেকে সদস্যের হাতে একটি করে থলি দিয়ে তিনি বললেনঃ অমুক বিধবা, অমুক ইয়াতিম, অমুক গোত্রের মিসকীন এবং অমুক গোত্রের অভাবগ্রস্তদের মধ্যে বিলি করে এস।

নিজের প্রয়োজন সত্ত্বেও অন্যকে যাঁরা প্রাধান্য দেয়, সাঈদ সেই মহান ব্যক্তিদের একজন।

হিমসের ওয়ালী থাকা অবস্থায় খলীফা হযরত ’উমার রা. তাঁকে একবার মদীনায় ডেকে পাঠান। তিনি মদীনায় এলেন। হাতে তাঁর একটি লাঠি এবং খাওয়ার জন্য একটি মাত্র পিয়ালা। খলীফা জিজ্ঞেস কেরলেন, তোমার সাজ-সরঞ্জামত এতটুকুই? জবাব দিলেন এর চেয়ে বেশী জিনিসের প্রয়োজন কি জন্য? পিয়ালায় খাই এবং লাঠিতে সাজ-সরঞ্জাম ঝুলিয়ে নিই।

ইবন সা’দের মতে, হিমসের ওয়ালী থাকা অবস্থায় হিজরী ২০ সনে তিনি ইনতিকাল করেন। আবু উবাইদার মতে তাঁর মৃত্যু সব হিজরী ২১।

সুরাকা ইবন মালিক (রা)

কুরাইশদের মাঝে যখন এ কথাটি ছড়িয়ে পড়লো যে, মুহাম্মাদ সা. মক্কায় নেই তখন একদিকে যেমন কুরাইশ নেতৃবৃন্দ খবরটি বিশ্বাসই করত পারছিলনা, অন্য দিকে মক্কায় একটি ভীতির ভাবও ছড়িয়ে পড়ে। সাথে সাথে তারা বনু হাশিমের প্রতিটি বাড়ীতে তল্লাশী শুরু করে দেয়। মুহাম্মাদের সা. ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বাড়ী-ঘর তল্লশী করতে করতে তারা আবু বকরের বাড়ীতে উপস্থিত হয়। তাদের সাড়া পেয়ে আবু বকরের মেয়ে আসমা বেরিয়ে আসেন। কুরাইশ নেতা আবু জাহল তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমার আব্বা কোথায়?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘তিনি এখন কোথায় তাতো আমি জানিনা।’

নরাধম আবু জাহল আসমার গালে সজোরে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিলে তাঁর কানের দুলটি ছিট্‌কে পড়ে এবং তিনিও মাটিতে  লুটিয়ে পড়েন।

কুরাইশদের যখন স্থির বিশ্বাস হলো যে, মুহাম্মাদ সা. সত্যি সত্যি মক্কা থেকে চলে গেছেন, তখন তাদের অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়। তারা একদল পদচিহ্ন বিশারদকে পদচিহ্ন অনুসরণ করে তাঁদের খুঁজে বের করার জন্য লাগিয়ে দেয়। পদচিহ্ন বিশারদরা ‘সাওর’ পর্বতের গুহার কাছে এসে কুরাইশদের বললেো আল্লাহর কসম, তোমাদের  সাথী মুহাম্মাদ সা. এ গুহা ছেড়ে এখনও কোথাও যায়নি।’ আসলে তাদের এ অনুমান সঠিক ছিল। মুহাম্মাদ সা. ও তাঁর সাথী আবু বকর তখনও সেই গুহার মধ্যে। আর কুরাইশরা তাঁদের মাথার ওপরে। এমন কি হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. গুহার ওপরের দিকে তাদের মাথার ওপর বিচরণকারী কুরাইশদের পা-ও দেখতে পাচ্ছিলেন। তাঁর চোখ দু’টি পানিতে ঝাপসা হয়ে গেল। ভালোবাসা, দরদ ও ভর্ৎসনা মিশ্রিত দৃষ্টিতে রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর দিকে তাকালেন। ফিস ফিস করে আবু বকর বললেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, আল্লাহর কসম, আমার নিজের জানের ভয়ে নয়, আপনার প্রতি তাদের কোন দুর্ব্যবহার আমাকে দেখতে হয়, এ ভয়ে আমি কাঁদছি”। তাঁকে আশ্বস্ত করে রাসূল সা. বললেন, ‘আবু বকর, দুশ্চিন্তা করোনা, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।’

আল্লাহ তায়ালা আবু বকরের অন্তরে প্রশান্তি দান করলেন। তবে তিনি বার বার মাথার ওপর চলাচলরত কুরাইশদের পায়ের দিকে তাকাতে লাগলেন। এক সময় তিনি রাসূলকে সা. বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, তাদের কেউ তার দু’পায়ের পাতার দিতে তাকালেই আমাদের দেখে ফেলবে।’ জবাবে রাসূল সা. বললেন, ‘তুমি কি মনে করেছো আমরা মাত্র দু’জন? তৃতীয় একজন, আল্লাহও আমাদের সাথে আছেন।’

সেই মুহূর্তে তাঁরা দু’জন কুরাইশদের এক যুবককে বলতে শুনলেন, ‘তোমরা সবাই গুহার দিকে এসো, আমরা একটু ভেতরটা দেখবো।’ উমাইয়্যা ইবন খালফ তাকে একটু বিদ্রুপ করে বললো, ‘গুহার মুখে এই মাকড়সা ও তার বাসা দেখতে পাওনা? এগুলি মুহাম্মাদের জন্মেরও আগে থেকে এখানে আছে।’ তবে আবু জাহল বললো, লাত ও উজ্জার শপথ, আমার মনে হচ্ছে তারা আমাদের ধারে কাছে কোথাও আছে। আমাদের কথা তারা শুনছে এবং আমাদের কার্যকলাপও তারা দেখছে। কিন্তু তার ইন্দ্রজালেও আমাদের দৃষ্টিশক্তি আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। তাই আমরা তাদের দেখতে পাচ্ছি না।’

যা হোক, কুরাইশরা মুহাম্মাদকে সা. খুঁজে বের করার ব্যাপারে একেবারে হাত গুটিয়ে নিলনা এবং তাঁর পিছু ধারওয়া করার সিদ্ধান্তেও তাদের কোন নড়চড় হলো না। মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী স্থানে বসবাসরত গোত্রগুলিতে তারা ঘোষণা করে দিল, কোন ব্যক্তি মুহাম্মাদকে জীবিত বা মৃত যে কোন অবস্থায় ধরে দিতে পারলে তাকে একশ’টি উন্নত জাতের উট পুরস্কার দেয়া হবে।

সুরাকা ইবন মালিক আল-মাদলাজী তখন মক্কার অনতিদূরে ‘কুদাইদ’ নামক স্থানে তার গোত্রের একটি আড্ডায় অবস্থান করছিল। এমন সময় কুরাইশদের একজন দূত সেখানে উপস্থিত হয়ে মুহাম্মাদকে সা. জীবিত বা মৃত অবস্থায় ধরে দেয়ার ব্যাপারে কুরাইশদের ঘোষিত পুরস্কারের কথা প্রচার করলো।

একশ’ উটের কথা শুনে সুরাকার মধ্যে লালসার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। কিন্তু অন্যের মধ্যেও এ লালসা সঞ্চার হতে পারে এ ভয়ে সে কোন কথা না বলে নিজেকে সামলে নিল।

সুরাকা আড্ডা থেকে ওঠার আগেই সেখানে তার গোত্রের অন্য একটি লোক এসে বললো, ‘আল্লাহর শপথ, আমার পাশ দিয়ে এখনও তিন জন লোক চলে গেল, আমার ধারণা তারা মুহাম্মাদ, আবু বকর ও তাদের গাইডই হবে।’

সুরাকা বললো, ‘না, তা না। তারা হচ্ছে অমুক গোত্রের লোক। তাদের উট হারিয়ে গেছে তাই তারা তালাশ করছে।’ ‘তা হতে পারে’- এ কথা বলে লোকটি চুপ করে গেল।

আড্ডা থেকে সঙ্গে সঙ্গে উঠে গেলে অন্যদের মনে সন্দেহ হতে পারে, এ কারণে সে আরও কিছুক্ষণ সেখানে বসে থাকলো। আড্ডায় উপস্থিত লোকেরা অন্য প্রসঙ্গে আলোচনায় লিপ্ত হলে এক সুযোগে সে চুপে চুপে বেরিয়ে গেল। আড্ডা থেকে বেরিয়েই সে বাড়ীর দিকে গেলো। বাড়ীতে পৌঁছেই দাসীকে বললো, ‘তুমি চুপে চুপে মানুষে না দেখে এমনভাবে আমার ঘোড়াটি অমুক উপত্যকায় বেঁধে রাখবে।’ আর দাসকে বললেো ‘তুমি এ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বাড়ীর পিছন দিক থেকে এমনভঅবে বেরিয়ে যাবে যেন কেউ না দেখে এবং ঘোড়ার আশে পাশে কোন একস্থানে রেখে দেবে।’

সুরাকা বর্ম পরে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হলো এবং ‍মুহাম্মাদকে পাকড়াও করার জন্য দ্রুত ঘোড়া হাঁকালো, যাতে মুহাম্মাদকে সা. ধরে দিয়ে অন্য কেউ এ পুরস্কার ছিনিয়ে নিতে না পারে। সে ছিল তার গোত্রের দক্ষ ঘোড় সওয়ারদের অন্যতম। সে ছিল দীর্ঘদেহী, বিশাল বপুধারী, পদচিহ্ন বিশারদ ও বিপদে দারুণ ধৈর্যশীল। সর্বোপরি সে ছিল একজন বুদ্ধিমান কবি। তার ঘোড়াটি ছিল উন্নত জাতের।

সুরাকা সামনে এগিয়ে চললো। কিছুদূর যাওয়ার পর ঘোড়াটি হোঁচট খেলো এবং সে পিঠ থেকে দূরে ছিট্‌কে পড়লো। এটাকে সে অশুভ লক্ষণ মনে করে বলে উঠলো, ‘একি? ওরে ঘোড়া, তুই নিপাত যা।’ এই বলে সে আবার ঘোড়ার পিঠে উঠলো। কিছু দূর যেতে না যেতেই ঘোড়াটি আবার হোঁচট খেলো। এবার তার অশুভ লক্ষণের ধারণা আরও বেড়ে গেল। সে ফিরে যাওয়ার চিন্তা করলো; কিন্তু এক শ’ উটের লোভ তাকে এ চিন্তা থেকে বিরত রাখলো।

দ্বিতীয়বার ঘোড়াটি যেখানে হোঁচট খেয়েছিল সেখান থেকে সামান্য দূরে সে দেখতে পেল মুহাম্মাদ সা. তাঁর দু’সঙ্গীকে, সঙ্গে সঙ্গে সে তার হাত ধনুকের দিকে বাড়ালো; কিন্তু সে হাতটি যেন একেবারে অসাড় হয়ে গেল। সে দেখতে পেল তার ঘোড়ার পা যেন শুকনো মাটিতে দেবে যাচ্ছে এবং সামনে থেকে প্রচণ্ড ধোঁয়া উঠে ঘোড়া ও তার চোখ আচ্ছন্ন করে ফেলছে। সে দ্রুত ঘোড়াটি হাঁকানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু ঘোড়াটি এমন স্থির হয়ে গেল, যেন তার পা লোহার পেরেক দিয়ে মাটিতে গেঁথে দেয়া হয়েছে।

অতঃপর সুরাকা রাসূল সা. ও তাঁর সঙ্গীদ্বয়ের দিকে ফিরে অত্যন্ত বিনীত কণ্ঠে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বললো, ‘ওহে’ তোমরা তোমাদের প্রভুর দরবারে আমার ঘোড়ার পা মুক্ত হওয়ার জন্য দুআ করো। আমি তোমাদের কোন অকল্যাণ করবো না।’ রাসূল সা. দুআ করলেন। তার ঘোড়া মুক্ত হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তার লালসাও আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। সে তার ঘোড়াটি আবার রাসূলের সা. দিকে হাঁকালো। এবার পূর্বের চেয়েও মারাত্মকভাবে তার ঘোড়ার পা মাটিতে আটকে গেল। এবারও সে রাসূলের সা. সাহায্য কামনা করে বললেো ‘আমার এ খাদ্য সামগ্রী, আসবাবপত্র ও অস্ত্রশস্ত্র তোমরা নিয়ে নাও। আমি আল্লাহর নামে অঙ্গীকার করছি, মুক্তি পেলে আমি আমার পেছনে ধাবমান লোকদের তোমাদের থেকে অন্য দিকে হটিয়ে দেব।’

তাঁরা বললেন, ‘তোমার খাদ্য সামগ্রী ও আসবাবপত্রের প্রয়োজন আমাদের নেই। তবে তুমি লোকদের আমাদের থেকে দূরে হটিয়ে দেবে।’ অতঃপর রাসূল সা. তার জন্য দুআ করলেন। তার ঘোড়াটি মুক্ত হয়ে গেল। সে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে রাসূল সা. ও তাঁর সঙ্গীদ্বয়কে ডেকে বললো, ‘তোমরা একটু থাম, তোমাদের সাথে আমি কিছু কথা বলতে চাই। আল্লাহর কসম, তোমাদের কোন অকল্যাণ আমি করবো না।’

রাসূল সা. ও আবু বকর উভয়ে বলে উঠলেন, ‘তুমি আমাদের কাছে কী চাও?’ সে বললো, ‘আল্লাহ কসম, হে মুহাম্মাদ, আমি নিশ্চিতভাবে জানি শিগগিরই তোমার দ্বীন বিজয়ী হবে। আমার সাথে তুমি ওয়াদা কর, আমি যখন তোমার সাম্রাজ্যে যাব, তুমি আমাকে সম্মান দেবে। আর এ কথাটি একটু লিখে দাও।’

রাসূল সা. আবু বকরকে লিখতে বললেন। তিনি একখন্ড হাড়ের ওপর কথাগুলি লিখে তার হাতে দিলেন সুরাকা ফিরে যাবার উপক্রম করছে, এমন সময় রাসূল সা. তাকে বললেন, ‘সুরাকা, তুমি যখন কিসরার রাজকীয় পোশাক পরবে তখন কেমনে হবে?’

বিস্ময়ের সাথে সুরাকা বললো, ‘কিসরা ইবন হুরমুয?’ রাসূল সা. বললেন, হ্যাঁ, কিসরা ইবন হুরমুয।’

সুরাকা পেছন ফিরে চলে গেল। ফেরার পথে সে দেখতে পেল লোকেরা তখনও রাসূলকে সা. সন্ধান করে ফিরছে। সে তাদেরকে বললো, ‘তোমরা ফিরে যাও।’ আমি এ অঞ্চলে বহুদূর পর্যন্ত তাকে খুঁজেছি। আর তোমরা তো জান পদ-চিহ্ন অনুসরণের ক্ষেত্রে আমার যোগ্যতা কতখানি। তার এ কথায় লোকেরা ফিরে গেল।

মুহাম্মাদ সা. ও তাঁর সঙ্গীদ্বয়ের খবর সে সম্পূর্ণরূপে চেপে গেল। যখন তার স্থির বিশ্বাস হলো এত দিনে তাঁরা মদীনায় পৌছে কুরাইশদের শত্রুতা থেকে নিরাপত্তা লাভ করেছেন, তখন সে তার ঘটনাটি প্রচার করলো। রাসূলুল্লাহর সা. সঙ্গে সুরাকার ভূমিকা ও আচরণের খবর যখন আবু জাহলের কানে গেল সে তার ভীরুতা ও সুযোগের সদ্ব্যবহার না করার জন্য ভীষণ তিরস্কার করলো। উত্তরে সে তার স্বরচিত দু’টি শ্লোক আবৃত্তি করলোঃ

‘আল্লাহর শপথ, তুমি যদি দেখতে আবু হিকাম,

আমার ঘোড়ার ব্যাপারটি, যখন তার পা ডুবে যাচ্ছিল, তুমি জানতে

এবং তোমার কোন সংশয় থাকতো না, মুহাম্মাদ প্রকৃত রাসূল-

সুতরাং কে তাঁকে প্রতিরোধ করে?’

ইবন হাজার আল ইসাবা গ্রন্থে শ্লোক দু’টি উল্লেখ করেছেনর।

সময় দ্রুত বয়ে চললো। একদিন যে মুহাম্মাদ সা. মক্কা থেকে রাতের অন্ধকারে গোপনে সরে গিয়েছিলেন, আবার তিনি বিজয়ীর বেশে হাজার হাজার সশস্ত্র সঙ্গীসহ প্রবেশ করলেন সেই মক্কা নগরীতে। অত্যাচারী ও অহংকারী কুরাইশ নেতৃবৃন্দ, যাদের দৌরাত্মে সর্বদা প্রকম্পিত থাকতো মক্কা, ভীত-বিহ্বল চিত্তে হাজির হলো মুহাম্মাদের সা. নিকট করুণা ভিক্ষার জন্য।

মহানুভব নবী সা. তাদের বললেন, ‘যাও তোমরা সবাই মুক্ত স্বাধীন।’

সুরাকা ইবনমালিক চললো রাসূলুল্লাহর সা. কাছে তার ইসলামের ঘোষনা দানের জন্য। সে সঙ্গে নিল দশ বছর পূর্বে প্রদত্ত রাসূলুল্লাহর সা সেই অঙ্গীকার পত্রটি। পরবর্তীকালে সুরাকা বর্ণনা করেছেনঃ

‘আমি জি’রারা (মক্কার নিকটবর্তী একটি স্থান) থেকে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট আসলাম। আনসারদের একদল সৈনিকের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়লে তারা আমাকে তীরের বাট দিয়ে পিটাতে শুরু করে এবং বলতে থাকে, ‘দূর হও, দূর হও, কি চাও?’ তবুও আমি তাদের সারির মধ্যে ঢুকে পড়লাম এবং রাসূলুল্লাহর সা. কাছাকছি গেলাম। তিনি তখন তার উটনীর ওপর সওয়ার। আমি সেই অঙ্গীকার পত্রটিসহ হাত উঁচু করে বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি সুরাকা ইবন মালিক। আর এই হলো আপনার অঙ্গীকার পত্র।’

রাসূল সা. বললেন, ‘সুরাকা, আমার কাছে এসো, আজ  প্রতিশ্রুতি পালন ও সদ্ব্যবহারের দিন।’

আমি রাসূলুল্লাহর সা. কাছাকছি গিয়ে তাঁর সামনে ইসলামের ঘোষনা দিলাম। এভাবে আমি তাঁর কল্যাণ ও বরকত লাভে ধন্য হলাম।’

রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতে হযরত সুরাকা রা. ব্যথিত ও শোকাভিভূত হন। একশটি উটের লোভে যেদিন রাসূলুল্লাহকে সা. হত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সে দিনটির কথা ঘুরে ফিরে তাঁর স্মৃতিতে ভেসে উঠতে থাকে। এখন পৃথিবীর সকল উটও রাসূলুল্লাহর সা. একটি নখাগ্রেরও সমান নয়। তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সেই প্রশ্নটি বার বার আওড়াতেন, ‘সুরাকা, যেদিন তুমি কিসরার পোশাক পরবে, কেমন হবে?’ কিসরার পোশাক যে সত্যি তিনি পরবেন সে ব্যাপারে তাঁর বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিলনা।

সময় বয়ে চললো। ইসলামী খিলাফাতের দায়িত্ব হযরত উমার ফারুকের রা. হাতে ন্যস্ত হলো। তাঁর গৌরবমসয় যুগে মুসলিম সেনাবাহিনী ঝড়ের গতিতে পারস্য সাম্রাজ্যে প্রবেশ করলো। তাঁর পারস্যের দুর্গসমূহ তছনছ করে দিয়ে তাদের বাহিনীকে পরাজিত করে পারস্য-সিংহাসন দখল করলো।

হযরত উমারের রা. খিলাফাতকালের শেষ দিকে পারস্য জয়ের সুসংবাদ নিয়ে সেনাপতি সা’দ বিন আবী ওয়াক্কাসের দূত পৌঁছলেন মদীনায়। তিনি সঙ্গে নিয়ে এলেন পারস্যের গনীমাতের এক পঞ্চমাংশ। গনীমাতের ধন-দৌলত উমারের সামনে স্তূপীকৃত করা হলে তিনি বিস্ময়ের সাথে সেদিকে তাকিয়ে থাকলেন। তার মধ্যে ছিল কিসরার মণি-মুক্তা খচিত মুকুট, সোনার জরি দেয়া কাপড়, মুক্তার হার এবং তার এমন চমৎকার দু’টি জামা যা ইতিপূর্বে আর কখনও হযরত উমার দেখেননি। তাছাড়া আর ছিল বহু অমূল্য জিনিস। হযরত উমার হাতের লাঠিটি দিয়ে এই মূল্যবান ধন-রত্ন উল্টাতে লাগলেন। তারপর চারপাশে উপস্থিত লোকদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যারা এসব জিনিস থেকে হাত গুটিয়ে নিয়ে জমা দিয়েছে, নিশ্চয় তারা অত্যন্ত বিশ্বাসভঅজন।

হযরত আলী রা., তিনি তখন সেখানেই উপস্থিত ছিলেন, বলেন, আমীরুল মু’মিনীন, আপনি বিশ্বাস ভঙ্গ করেননি, আপনার প্রজারাও ভঙ্গ করেনি। আপনি যদি অন্যায়ভাবে খেতেন, তাহলে তারা খেত।

অতঃপর হযরত উমার রা. সুরাকা ইবন মালিককে ডেকে নিজ হাতে তাঁকে কিসরার জামা, পাজামা, জুতো ও অন্যান্য পোশাক পরালেন। তাঁর কাঁধে ঝুলালেন কিসরার তরবারি, কোমরে বাঁধলেন বেল্ট, মাথায় রাখলেন মুকুট এবং তাঁর হাতে পরালেন বালা। কতই না চমৎকার!

হযরত উমার রা. সুরাকাকে পরাচ্ছেন কিসরার পোশাক, আর এ দিকে মুসলমানদের মুহূর্মুহু তাকবীর ধ্বনিতে মদীনার আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে উঠছে।

কিসরার পোশক পরা শেষ হলে সুরাকার দিকে ফিরে হযরত উমার রা. বললেন, ‘সাবাশ, সাবাশ, মুদলাজ গোত্রের ক্ষুদে এক বেদুঈনের মাথায় শোবা পাচ্ছে শাহানশাহ কিসরার মুকুট এবং হাত বালা।’ তারপর তিন আসমানের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহ, এ সম্পদ তুমি রাসূলুল্লাহকে সা. দাওনি, অথচ তিনি ছিলেন তোমার কাছে আমার থেকে অধিক প্রিয় সম্মানিত। তুমি দাওনি এ সম্পদ আবু বকরকেও। তিনিও ছিলেন তোমার নিকট আমার থেকেও অধিকতর প্রিয় মর্যাদাবান। আর তা দান করেছো আমাকে পরীক্ষার জন্য। আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই।’ অতঃপর তিনি সূরা মুমিনূনের নিম্নোক্ত আয়াত দু’টি পাঠ করলেন, ‘তারা কি মনে করে, আমি তাদেরকে সাহায্য স্বরূপ যে ধনৈশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি দান করি তা দ্বারা তাদের সকল প্রকার মঙ্গল ত্বরান্বিত করছি? না, তারা বুঝে না।’ (সূরা মুমিনূনঃ ৫৫৫৬)

সকল সম্পদ মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন না করা পর্যন্ত তিনি সে মজলিস ত্যাগ করলেন না।

হযরত সুরাকা ইবন মালিকের এ কাহিনী ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন। ইমাম আহমদও আল-বারা ইবন আযিব ও আবু বকর সিদ্দীকের সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

আবু আমর বলেন, সুরাকা ইবন মালিক খলীফা ’উসমানের খিলাফতকালে ২৪ হিজরীতে ইনতিকাল করেন। কেউ কেউ বলেছেন, হযরত উসমানের পরে তিনি ইনতিকাল করেন।

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ