আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – প্রথম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

যায়িদ ইবন হারিসা (রা)

আবু উসামা যায়িদ নাম। হিব্‌বু রাসূলিল্লাহ (রাসূলুল্লহার প্রীতিভাজন) তাঁর উপাধি, পিতা হারিসা এবং মাতা সু’দা বিনতু সা’লাবা।

সু’দা বিনতু সা’লাবা তাঁর শিশু পুত্র যায়িদকে সঙ্গে করে পিতৃ গোত্র বনী মা’নের নিকট যাওয়ার জন্য যাত্রা করলেন। পিতৃ-গোত্রে পৌঁছার পূর্বেই একদিন রাতে বনী কায়নের লুটেরা দল তাঁদের তাঁবু আক্রমণ করে ধন সম্পদ, উট ইত্যাদি লুণ্ঠন এবং শিশুদের বন্দী করে নিয়ে যায়। এই বন্দী শিশুদের মধ্যে তাঁর পুত্র যায়িদ ইবন হারিসাও ছিলেন।

যায়িদের বয়স তখন আট বছর। লুটেরা দল তাঁকে বিক্রির উদ্দেশ্যে ‘উকাজ’ মেলায় নিয়ে যায়, হাকীম ইবন হিযাম ইবন খুয়াইলিদ নামে এক কুরাইশ নেতা চার শো’ দিরহামে তাঁকে খরীদ করেন। তাঁর সাথে আরো কিছু দাস খরীদ করে তিনি মক্কায় ফিরে আসেন।

হাকীম ইবন হিযামের প্রত্যাবর্তনের খবর শুনে তাঁর ফুফু খাদীজা বিনতু খুয়াইলিদ দেখা করতে আসেন। ফুফুকে তিনি বলেনঃ ফুফু উকাজ থেকে আমি বেশ কিছু দাস খরীদ করে এনেছি। এদের মধ্যে যেটা আপনার পসন্দ হয় বেছে নিন। আপনাকে হাদিয়া হিসাবে দান করলাম।

হযরত খাদীজা দাসগুলির চেহারা গভীরভাবে নিরীক্ষণ করার পর যায়িদ ইবন হারিসাকে চয়ন করলেন। কারণ, তিনি যায়িদের চেহারায় তীক্ষ্ণ মেধা ও বুদ্ধির ছাপ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি তাঁকে সঙ্গে করে বাড়ীতে নিয়ে এলেন।

এ ঘটনার কিছু দিন পর মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহর সাথে খাদীজা পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তিনি স্বামীকে কিছু উপহার দেওয়ার ইচ্ছা করলেন। প্রিয় ক্রীতদাস যায়িদ ইবন হাসিরা অপেক্ষা অধিকতর সুন্দর কোন জিনিস তিনি খুঁজে পেলেন না। এ ক্রীতদাসটিকেই তিনি স্বামীর হাতে তুলে দিলেন।

এ সৌভাগ্যবান বালক ক্রীতদাস মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহর তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হতে লাগলেন। তাঁর মহান সাহচর্য লাভ করে উত্তম চারিত্রিক সৌন্দর্য পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেলেন। এ দিকে তাঁর স্নেহময়ী জননী পুত্র শোকে অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর চোখের পানি কখনও শুকাতো না। রাতের ঘুম তাঁর হারাম হয়ে গিয়েছিল। তাঁর বড় দুঃখ ছিল, তাঁর ছেলেটি বেঁচে আছে না ডাকাতদের হাতে মারা পড়েছে, এ কথাটি তিনি জানতেন না। তাই তিনি খুব হতাশ হয়ে পড়তেন। তাঁর পিতা হারিসা সম্বাব্য সব স্থানে হারানো ছেলেকে খুঁজতে থাকেন। পরিচিত অপরিচিত, প্রতিটি মানুষের কাছে ছেলের সন্ধান জানতে চাইতেন। তিনি ছিলেন তৎকালীন আরবের একজন বিশিষ্ট কবি। এ সময় রচিত বহু কবিতায় তাঁর পুত্র হারানোর বেদনা মূর্ত হয়ে উঠেছে। এমনি একটি কবিতায় তিনি বলেন-

‘‘যায়িদের জন্য আমি কাঁদছি, জানিনে তার কি হয়েছে,

সে কি জীবিত?

তবে তো ফেরার আশা আছে, নাকি মারা গেছে

আল্লাহর কসম! আমি জানিনে, অথচ জিজ্ঞেস করে চলেছি।

তোমাকে অপহরণ করেছে সমতল ভূমির লোকেরা, না পার্বত্য ভূমির?

উদয়ের সময় সূর্য স্মরণ  করিয়ে দেয় তার কথা, আর যখন

অস্ত যায়, নতুন করে মনে করে দেয়।

আমি দেশ থেকে দেশান্তরে তোমার সন্ধানে

উট হাঁকিয়ে ফিরবো, কখনও আমি ক্লান্ত হবো না,

আমার বাহন উটও না। আমার জীবন থাকুক বা মৃত্যু আসুক।

প্রতিটি মানুষই তো মরণশীল- যত আশার পেছনেই দৌড়াক না কেন।’’

এই হজ্জ মৌসুমে যায়িদের গোত্রের কতিপয় লোক হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কায় এলো। কা’বার চতুর্দিকে তাওয়াফ করার সময় তারা যায়িদের মুখোমুখি হলো। তারা পরস্পর পরস্পরকে চিনতে পেরে কুশল বিনিময় করলো। লোকগুলি হজ্জ আদায়ের পর গৃহে প্রত্যাবর্তন করে যায়িদের পিতা হারিসাকে তার হারানো ছেলের সন্ধান দিল।

ছেলের সন্ধান পেয়ে হারিসা সফরের প্রস্তুতি নিলেন। কলিজার টুকরা, চোখের পুত্তলি যায়িদের মুক্তিপণের অর্থও বাহনে উঠালেন। সফরসঙ্গী হলেন হারিসার ভাই কা’ব। তাঁরা মক্কার পথে বিরামহীন চলার পর মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহর কাছে পৌঁছলেন এবং বললেনঃ

‘ওহে আবদুল মুত্তালিবের বংশধর! আপনারা আল্লাহর ঘরের প্রতিবেশী। অসহায়ের সাহায্যকারী, ক্ষুধার্তকে অন্নদানকারী ও আশ্রয়প্রার্থীকে আশ্রয় দানকারী। আপনার কাছে আমাদের যে ছেলেটি আছে তার ব্যাপারে আমরা এসেছি। তার মুক্তিপণও সঙ্গে নিয়ে এসেছি। আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন এবং আপনার ইচ্ছামত তার মুক্তিপণ নির্ধারণ করুন।’

মুহাম্মাদ সা. বললেনঃ ‘আপনারা কোন্‌ ছেলের কথা বলছেন?

– আপনার দাস যায়িদ ইবন হারিসা।

– মুক্তিপণের চেয়ে উত্তম কিছু আপনাদের জন্য নির্ধারণ করি, তা-কি আপনারা চান?

– কী তা?

– আমি তাকে আপনাদের সামনে ডাকছি। স্বেচ্ছায় সে নির্ধারণ করুক, আমার সাথে থাকবে, না আপনাদের সাথে যাবে, যদি আপনাদের সাথে যেতে চায়, মুক্তিপণ ছাড়া তাকে নিয়ে যাবেন। আর আমার সাথে থাকতে চাইলে আমার করার কিছুই নেই।

তারা সায় দিয়ে বললঃ আপনি অত্যন্ত ন্যায় বিচারের কথা বলেছেন।

মুহাম্মাদ সা. যায়িদকে ডাকলেন। জিজ্ঞেস করলেনঃ এ দু’ব্যক্তি কারা?

বললঃ ইনি আমার পিতা হারিসা ইবন শুরাহবীল। আর উনি আমার চাচা কা’ব।

বললেনঃ ‘তুমি ইচ্ছা করলে তাঁদের সাথে যেতে পার, আর ইচ্ছা করলে আমার সাথেও থেকে যেতে পার।’

কোন রকম ইতস্ততঃ না করে সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলে উঠলেনঃ ‘আমি আপনার সাথেই থাকবো।’

তাঁর পিতা বললেনঃ ‘যায়িদ, তোমার সর্বনাশ হোক! পিতা-মাতাকে ছেড়ে তুমি দাসত্ব বেছে নিলে?’

তিনি বললেনঃ ‘এ ব্যক্তির মাঝে আমি এমন কিছু দেখেছি, যাতে আমি কখনও তাকে ছেড়ে যেতে পারিনে।’

যায়িদের এ সিদ্ধান্তের পর মুহাম্মাদ সা. তাঁর হাত ধরে কা’বার কাছে নিয়ে আসেন এবং হাজরে আসওয়াদের পাশে দাঁড়িয়ে উপস্থিত কুরাইশদের লক্ষ্য করে ঘোষণা করেনঃ ‘ওহে কুরাইশ জনমণ্ডলী! তোমরা সাক্ষী থাক, আজ থেকে যায়িদ আমার ছেলে। সে হবে আমার এবং আমি হবো তার উত্তরাধিকারী।’

এ ঘোষণায় যায়িদের বাবা-চাচা খুব খুশী হলেন। তাঁরা তাঁকে মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহর নিকট রেখে প্রশান্ত চিত্তে দেশে ফিরে গেলেন। সেই দিন থেকে যায়িদ ইবন হারিসা হলেন যায়িদ ইবন মুহাম্মাদ। সবাই তাঁকে মুহাম্মাদের ছেলে হিসেবেই সম্বোধন করতো। অবশেষে আল্লাহ তা’আলা সূরা আহযাবের- ‘তাদেরকে তাদের পিতার নামেই ডাক’- এ আয়াত নাযিল করে ধর্মপুত্র গ্রহণের প্রথা বাতিল করেন। অতঃপর আবার তিনি যায়িদ ইবন হারিসা নামে পরিচিতি লাভ করেন।

যায়িদ নিজের পিতা-মাতাকে ছেড়ে মুহাম্মাদকে সা. যখন বেছে নিয়েছিলেন, তখন জানতেন না কি জিতই না তিনি জিতেছেন। স্বীয় পরিবার-পরিজন ও গোত্রকে ছেড়ে যে মনিবকে তিনি চয়ন করলেন, তিনিই যে, সাইয়্যেদুল আওয়ালীন ওয়াল আখিরীন এবং সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতি প্রেরিত আল্লাহর রাসূল, এর কোন কিছুই তিনি জানতেন না। তার মনে তখন একটি বারের জন্যও এ চিন্তা উদয় হয়নি যে, এ বিশ্বে এমন একটি রাষ্ট্র কায়েম হবে যা পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত সর্বত্র কল্যাণ ও ন্যায়বিচারে পূর্ণ হয়ে যাবে এবং তিনিই হবেন সেই কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা। না, এর কোন কিছুই তখন যায়িদের চিন্তা ও কল্পনায় আসেনি। সবই আল্লাহর অনুগ্রহ। যাকে ইচ্ছা তিনি অঢেল দান করেন।

এ ঘটনার মাত্র কয়েক বছর পর মুহাম্মাদ সা. নবুওয়াত লাভ করেন। যায়িদ হলেন পুরুষ দাসদের মধ্যে প্রথম বিশ্বাসী। পরবর্তীকালে তিনি হলেন রাসূলুল্লাহর সা. বিশ্বাসভাজন আমীন, তাঁর সেনাবাহিনীর কমাণ্ডার এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে মদীনার অস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক।

যায়িদ যেমন পিতা-মাতাকে ছেড়ে রাসূলকে সা. বেছে নেন, তেমনি রাসূলও সা. তাঁকে গভীরভাবে ভালোবাসলেন এবং তাঁকে আপন সন্তান ও পরিবারবর্গের মধ্যে শামিল করে নেন। যায়িদ দূরে গেলে তিনি উৎকণ্ঠিত হতেন, ফিরে এলে উৎফুল্ল হতেন এবং এত আনন্দের সাথে তাঁকে গ্রহণ করতেন যে অন্য কারো সাক্ষাতের সময় তেমন দেখা যেত না। কোন এক অভিযান শেষে হযরত যায়িদ মদীনায় ফিরে এলে রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে যেভাবে গ্রহণ করেছিলেন, তার একটি বর্ণনা দিয়েছেন হযরত আয়িশা রা.।

তিনি বলেন-

‘যায়িদ ইবন হারিসা মদীনায় ফিরে এলো। রাসূলুল্লাহ সা. তখন আমার ঘরে। সে দরজার কড়া নাড়লো। রাসূল সা. প্রায় খালি গায়ে উঠে দাঁড়ালেন। তখন তাঁর দেহে নাভী থেকে হাঁটু পর্যন্ত একপ্রস্থ কাপড় ছাড়া কিছু ছিল না। এ অবস্থায় কাপড় টানতে টানতে দরজার দিকে দৌড়ে গেলেন। তাঁর সাথে গলাগলি করলেন ও চুমু খেলেন। আল্লাহর কসম, এর আগে বা পরে আর কখনও রাসূলুল্লাহকে সা. এমন খালিগায়ে আমি দেখিনি।’

যায়িদের প্রতি রাসূলুল্লাহর সা. গভীর ভালোবাসার কথা মুসলিম জনতার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে লোকে তাকে ‘যায়িদ আল হুব্ব’ বলে সম্বোধন করতো এবং তাঁর উপাধি হয় ‘হিব্বু রাসূলিল্লাহ’ বা রাসূলুল্লাহর প্রীতিভাজন।

হযরত হামযা রা. ইসলাম গ্রহণ করলে রাসূল সা. তাঁর সাথে যায়িদের ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন। তাঁদের দু’জনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। এমন কি হামযা কখনও সফরে গেলে তাঁর দ্বীনি ভাই যায়িদকে অসী বানিয়ে যেতেন।

‘উম্মু আয়মন’ নামে রাসূলুল্লাহর সা. এক দাসী ছিলেন। একদিন তিনি সাহাবীদের বললেনঃ কেউ যদি কোন জান্নাতী মেয়েকে বিয়ে করতে চায়, সে উম্মু আয়মনকে বিয়ে করুক। হযরত যায়িদ আল্লাহর রাসূলকে সা. খুশী করার জন্য তাঁকে বিয়ে করেন। তাঁরই গর্ভে প্রখ্যাত সেনানায়ক হযরত উসামা ইবন যায়িদ মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন।

মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাতের পর তিনি হযরত কুলসুম ইবন হিদ্‌মের মেহমান হন। হযরত উসাইদ ইবন হুদাইবের রা. সাথে তাঁর ভ্রাতৃ-সম্পর্ক কায়েম হয়। এত দিন তিনি নবী পরিবারের একজন সদস্য হিসাবে একসঙ্গে থাকতেন। এখানে আসার পর তাঁকে পৃথক বাড়ী করে দেওয়া হয় এবং রাসূলুল্লাহর সা. আপন ফুফাতো বোন জয়নব বিনতু জাহাশের সাথে তার বিয়ে হয়। কিন্তু যয়নবের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় তিনি তালাক দেন। অতঃপর আল্লাহর নির্দেশে রাসূলুল্লাহ সা. যয়নবকে বিয়ে করেন।

হযরত যায়িদ ছিলেন তৎকালীন আরবের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ তীরন্দায। বদর থেকে মূতা পর্যন্ত সকল অভিযানেই অংশগ্রহণ করেছিলেন। একমাত্র ‘মাররে ইয়াসী’ অভিযানে যোগদান করতে পারেননি। এ যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে মদীনায় স্থলাভিষিক্ত করে যান।

হিজরী অষ্টম সনে একটি মারাত্মক ঘটনা ঘটে গেল। এ বছর রাসূল সা. ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত একটি পত্রসহ হারিস ইবন উমাইর আল-আযদীকে বসরার শাসকের নিকট পাঠান। হারিস জর্দানের পূর্ব সীমান্তের ‘মূতা’ নামক স্থানে পৌঁছলে গাস্‌সানী সম্রাটের একজন শাসক শুরাহ্‌বীল ইবন ‘আমর পথ রোধ করে তাঁকে বন্দী করে। তারপর তাঁকে হত্যা করে। রাসূল সা. ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেন। কারণ, এর আগে আর কোন দূত এভাবে নিহত হয়নি। রাসূল সা. মূতায় অভিযান পরিচালনার জন্য তিন হাজার সৈন্যের এক বাহিনী প্রস্তুত করলেন এবং পরিচালনার দায়িত্ব দিলেন হযরত যায়িদ ইবন হারিসার হাতে। রওয়ানার পূর্ব মুহূর্তে রাসূল সা. উপদেশ দিলেনঃ ‘যদি যায়িদ শহীদ হয়, দলটির পরবর্তী পরিচালক হবে জা’ফর ইবন আবী তালিব। জা’ফর শহীদ হলে পরিচালক হবে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা। সেও যদি শহীদ হয় তাহলে তারা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে পরিচালক নির্বাচন করে নেবে।’

যায়িদের নেতৃত্বে বাহিনীকে মদীনা থেকে যাত্রা করে জর্দানের পূর্ব সীমানারত ‘মায়ান’ নামক স্থানে পৌঁছলো। রোম সম্রাট হিরাক্‌ল গাস্‌সানীদের পক্ষে প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে এক লাখ সৈন্যের এক বিরাট বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলো। তার সাথে যোগ দিল পৌত্তলিক আরবদের আরও এক লাখ সৈন্য। এ সম্মিলিত বাহিনী মুসলিম বাহিনীর অনতি দূরে অবস্থান গ্রহণ করলো। ‘মায়ানে’ মুসলিম বাহিনী দু’রাত অবস্থান করে করণীয় বিষয় সম্পর্কে পরামর্শ করলেন। কেউ বললেন, পত্র মারফত শত্রু বাহিনীর সংখ্যা রাসূলুল্লাহ সা. কে অবহিত করে পরবর্তী নির্দেশের প্রতীক্ষায় থাকা উচিত। কেউ বললেন, আমরা সংখ্যা, শক্তি বা আধিক্যের দ্বারা লড়াই করিনা। আমরা লড়াই করি এ দ্বীনের দ্বারা। যে উদ্দেশ্যে তোমরা বের হয়েছো, সেজন্য এগিয়ে চলো। হয় কামিয়াবী না হয় শাহাদাত- এর যে কোন একটি সাফল্য তোমরা লাভ করবে।

অতঃপর এই দুই অসম বাহিনী মুখোমুখি সংঘর্ষে অবতীর্ণ হলো। দু’লাখ সৈন্যের বিরুদ্ধে মাত্র তিন হাজার সৈন্যের বীরত্ব ও সাহসিকতা দেখে রোমান বাহিনী বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। তাদের অন্তরে ভীতিরও সঞ্চার হলো।

যায়িদ ইবন হারিসা রাসূলুল্লাহর সা. পতাকা সমুন্নত রাখার জন্য যে বীরত্ব সহকারে লড়াই করেন তার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। তীর ও বর্শার অসংখ্য আঘাতে তাঁর দেহ ঝাঁঝরা হয়ে যায়। অবশেষে, তিনি রণক্ষেত্রে ঢলে পড়েন। তারপর একে একে জাফর ইবন আবী তালিব ও আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা পতাকা তুলে নেন এবং বীরত্বের সাথে শাহাদাত বরণ করেন। অতঃপর মুসলিম বাহিনীর সম্মিলিত সিদ্ধান্তে খালিদ ইবন ওয়ালিদ কমাণ্ডার নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন নও মুসলিম। তাঁর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী অনিবার্য পরাজয় ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়। এভাবে নবম হিজরীতে ৫৪ অথবা ৫৫ বছরে বয়সে হযরত যায়িদ শাহাদাত বরণ করেন।

মূতার দুঃখজনক সংবাদ রাসূলুল্লাহর সা. নিকট পৌঁছলে তিনি এতই শোকাতুর হয়ে পড়েন যে, আর কখনও তেমন শোকাভিভূত হতে দেখা যায়নি। তিনি শহীদ কমাণ্ডারদের বাড়ী গিয়ে তাদের পরিবারবর্গকে সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। যায়িদের বাড়ী পৌঁছলে তাঁর ছোট্ট মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে রাসূলকে সা. জড়িয়ে ধরে এবং রাসূল সা. উচ্চস্বরে কেঁদে ফেলেন। তাঁর এ অবস্থা দেখে সা’দ ইবন উবাদা বলে ওঠেনঃ ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, একি?

তিনি বলেনঃ ‘এ হচ্ছে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।’

রাসূল সা. বিদায় হজ্জ থেকে ফিরে যায়িদের অল্পবয়স্ক পুত্র উসামাকে পিতৃ হত্যার বদলা নেওয়ার জন্য এক বাহিনী সহকারে পাঠান। এত অল্পবয়স্ক ব্যক্তির নেতৃত্ব অনেকের পছন্দ হলো না। রাসূল সা. একথা জানতে পেরে বললেনঃ ‘তোমরা পূর্বে তার পিতার নেতৃত্বের সমালোচনা করেছিলে। এখন তার পুত্রের নেতৃত্বে সন্তুষ্ট হতে পারছো না। আল্লাহর কসম। যায়িদ নেতা হওয়ার যোগ্য ছিল এবং সে ছিল আমার সর্বাধিক প্রিয়। তারপর আমার সবচেয়ে প্রিয় তাঁর পুত্র উসামা।’ উসামা ছিলেন পিতার উপযুক্ত সন্তান। পিতৃহত্যার উপযুক্ত বদলা নিয়ে তিনি মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন।

রাসূলুল্লাহর সা. প্রতি ভক্তি, ভালোবাসা, আনুগত্য ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনই ছিল হযরত যায়িদের জীবনের একমাত্র ব্রত। তাঁর জীবনের বিভিন্ন ঘটনায় একথার প্রমাণ পাওয়া যায়। হযরত উম্মু আয়মন রা. ছিলেন বেশী বয়সের প্রায় বৃদ্ধা, বাহ্যিক রূপহীনা এক নারী। শুধু রাসূলকে সা. খুশী করার উদ্দেশ্যেই হযরত যায়িদ রা. তাঁকে বিয়ে করেন। হযরত যয়নাবের রা. সাথে তাঁর ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে তিনি নিজেই আবার যয়নাবের রা. কাছে রাসূলুল্লাহর সা. বিয়ের পয়গাম উত্থাপন করেন। শুধুমাত্র এজন্য যে, রাসূল সা. তাঁকে বিয়ে করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। এ কারণে হযরত যয়নাবের রা. প্রতি সম্মানের খাতিরে তাঁর দিকে চোখ তুলে তাকাননি। অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে শুধু প্রস্তাবটি পেশ করেছিলেন। (মুসলিম)

হযরত যায়িদ ও তাঁর সন্তানদের প্রতি রাসূলুল্লাহর সা. সীমাহীন ভালোবাসা লক্ষ্য করে হযরত আয়িশা রা. বলতেনঃ ‘যদি যায়িদ জীবিত থাকতেন, রাসূল সা. মৃত্যুর পর হয়তো তাকেই স্থলাভিষিক্ত করে যেতেন।’

আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা)

আবদুল্লাহ নাম, আবুল আব্বাস কুনিয়াত। পিতা আব্বাস, মাতা উম্মুল ফাদল লুবাবা। কুরাইশ বংশের হাশেমী শাখার সন্তান। রাসূলুল্লাহর সা. চাচাতো ভাই এবং উম্মুল মুমিনীন হযরত মায়মুনা রা. তাঁর আপন খালা।

মহান সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রা. নানা দিক থেকেই সম্মান ও গৌরবের অধিকারী ছিলেন। রক্ত-সম্পর্কের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর সা. চাচাতো ভাই। অগাধ জ্ঞান পাণ্ডিত্যের জন্য তিনি আরব জাতি তথা উম্মাতে মুহাম্মাদীর ‘হাবর ও বাহর’ (পূণ্যবান জ্ঞানী ও সমুদ্র) উপাধি লাভ করেছিলেন। তাকওয়া ও পরহিযগারীর তিনি ছিলেন বাস্তব নমুনা। তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি দিনে রোযাদার, রাতে ইবাদাত গোযার এবং রাতের শেষে প্রহরে তাওবাহ ও ইসতিগফারকারী। আল্লাহর ভয়ে তিনি এত বেশী কাঁদতেন যে, অশ্রুধারা তাঁর গণ্ডদ্বয়ে দু’টি রেখার সৃষ্টি করেছিল।

ইনি সেই আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস যাঁকে উম্মাতে মুহাম্মাদীর রাব্বানী (আল্লাহকে জেনেছে এমন জ্ঞানী) বলা হয়েছে। আল্লাহর কিতাব পবিত্র কুরআন সম্পর্কে অধিক জ্ঞানী, তার ব্যাখ্যা ও ভাব সম্পর্কে অধিক পারদর্শী এবং তার রহস্য উপলব্ধির ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তি।

রাসূলুল্লাহর সা. মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাতের তিন বছর পূর্বে তিনি মক্কার শিয়াবে আবী তালিবে জন্মগ্রহণ করেন। কুরাইশরা তাঁর গোত্র বনু হাশিমকে বয়কট করার কারণে তারা তখন শিয়াবে আবী তালিবে জীবন যাপন করছিল। রাসূলুল্লাহ সা. ওফাতের সময় তিনি তের বছরের একজন কিশোর মাত্র। এতদসত্ত্বেও তিনি রাসূলুল্লাহর সা. এক হাজার ছ’শ’ ষাটটি বাণী বা হাদীস স্মৃতিতে সংরক্ষণ করে মুসলিম জাতির বিশেষ কল্যাণ সাধন করেন, সহীহুল বুখারী সহীহ মুসলিমে যার অনেকগুলিই বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ পিতা হযরত আব্বাস দৃশ্যতঃ মক্কা বিজয়ের অল্প কিছুদিন পূর্বে হিজরী ৮ম সনে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইবন সাদের বর্ণনা মতে উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজার পর উম্মুল ফাদলই মহিলাদের মধ্যে সর্বপ্রথম ঈমান আনেন। তাই হযরত আবদুল্লাহ জন্মের পর থেকেই তাওহীদের পরিবেশে বেড়ে ওঠেন এবং বুদ্ধি বিবেক হওয়ার পর এক মজবুত ঈমানের অধিকারী মুসলমান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

তাঁর মা প্রখ্যাত সাহাবিয়্যা উম্মুল ফাদল লুবাবা বিনতুল হারিস আল-হিলালিয়্যা আবদুল্লাহ ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তাঁকে কোলে করে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট নিয়ে যায়। রাসূল সা. নিজের পবিত্র মুখ থেকে একটু থু থু নিয়ে শিশু আবদুল্লাহর মুখে দিয়ে তাঁর তাহনীক করেন। এভাবে তার পেটে পার্থিব কোন বস্তু প্রবেশের পূর্বেই রাসূলে পাকের পবিত্র ও কল্যাণময় থু থু প্রবিষ্ট হয়। আর সেইসাথে প্রবেশ করে তাকওয়া ও হিকমাত।

তাঁর পিতা হযরত ’আব্বাস হিজরী ৮ম সনে মক্কা বিজয়ের অল্প কিছুদিন পূর্বে সপরিবারে মদীনায় হিজরাত করেন। আবদুল্লাহর বয়স তখন এগারো বছরের বেশী হবে না। কিন্তু তখনও তিনি অধিকাংশ সময় রাসূলুল্লাহর সা. সাহচর্যে কাটাতেন। একবার বাড়ী ফিরে এসে তিনি বর্ণনা করেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট এমন এক ব্যক্তিকে দেখেছি, যাকে আমি চিনিনে।’ হযরত আব্বাস একথা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট ব্যক্ত করলে রাসূল সা. আবদুল্লাহকে ডেকে নিজের কোলে বসান এবং মাথায় হাত বুলিয়ে দু’আ করেন; ‘হে আল্লাহ, তাকে বরকত দিন এবং তার থেকে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন।’

সাত বছর থেকেই তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সেবা ও খিদমতে আত্মনিয়োগ করেন। অজুর প্রয়োজন হলে তিনি পানির ব্যবস্থা করতেন, নামাযে দাঁড়ালে তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে ইকদেতা করতেন এবং সফরে রওয়ানা হলে তিনি তাঁর বাহনের পেছনে আরোহন করে তাঁর সফরসঙ্গী হতেন। এভাবে ছায়ার ন্যায় তিনি তাঁকে অনুসরণ করতেন এবং নিজের মধ্যে সর্বদা বহন করে নিয়ে বেড়াতেন একটি সজাগ অন্তঃকরণ, পরিচ্ছন্ন মস্তিষ্ক এবং আধুনিক যুগের যাবতীয় রেকর্ডিং যন্ত্রপাতি থেকে অধিক শক্তিশালী একটি স্মৃতিশক্তি।

হযরত আবদুল্লাহ যদিও স্বভাবগতভাবেই ছিলেন শান্তশিষ্ট, বুদ্ধিমান ও চালাক, তবুও তিনি জীবনের যে অধ্যায় রাসূলুল্লাহর সা. সাহচর্য লাভের সুযোগ লাভ করেন মূলতঃ সে বিষয়টি মানুষের জীবনের খেলাধূলার সময়। তিনি স্মৃতিচারণ করেছেনঃ আমি অন্য ছেলেদের সাথে গলিতে, রাস্তা-ঘাটে খেলা করতাম। একদিন পেছনের দিক থেকে রাসূলুল্লাহকে সা. আসতে দেখলাম। আমি তাড়াতাড়ি একটি বাড়ীর দরজার আড়ালে দিয়ে পালালাম। কিন্তু তিনি আমাকে ধরে ফেললেন। আমার মাথায় হাত রেখে বললেনঃ ‘যাও, মুয়াবিয়াকে ডেকে আন।’ মুয়াবিয়া ছিলেন রাসূলুল্লাহর সা. কাতিব বা সেক্রেটারী। আমি দৌড়ে তাঁর কাছে গিয়ে বললামঃ ‘চলুন, রাসূল সা. আপনাকে ডাকছেন।’

উম্মুল মু’মিনীন হযরত মায়মূনা রা. হযরত আবদুল্লাহর খালা হওয়ার কারনে অধিকাংশ সময়ে তাঁর কাছে কাটাতেন। অনেক সময় রাতে তাঁর ঘরেই শুয়ে পড়তেন। এ কারণে খুব নিকট খেলে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে রাসূলুল্লাহর সা. সাহচর্য লাভে তিনি ধন্য হয়েছেন। রাতে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে তাহাজ্জুদ নামায আদায় ও তাঁর অজুর পানি এগিয়ে দেওয়ার সুযোগও লাভ করেছেন। একবার হযরত মায়মূনার ঘরে তাহাজ্জুদ নামাযে রাসূলুল্লাহর সা. বাম দিকে দাঁড়িয়ে গেলে তিনি আবদুল্লাহর মাথা ধরে ডান দিকে দাঁড় করিয়ে দেন।

হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস নিজের ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ একদিন রাসূলুল্লাহ সা. অজু-করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। আমি দ্রুত পানির ব্যবস্থা করে দিলাম। আমার কাজে তিনি খুব খুশী হলেন। নামাযে যখন দাঁড়ালেন তখন আমাকে তাঁর পাশে দাঁড়াবার জন্য ইংগিত করলেন। কিন্তু আমি তাঁর পেছনে দাঁড়ালাম। নামায শেষ করে আমার দিকে ফিরে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আবদুল্লাহ আমার পাশে দাঁড়াতে কিসে তোমাকে বিরত রাখলো?’ বললামঃ ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ আমার দৃষ্টিতে আপনি মহা সম্মানিত এবং আপনি এতই মর্যাদাবান যে, আমি আপনার পাশাপাশি হওয়ার উপযুক্ত বলে মনে করিনি।’ সাথে সাথে তিনি আকাশের দিকে দু’হাত তুলে দু’আ করলেন, ‘আল্লাহুম্মা আতিহিল হিকমাহ্‌’- ‘আল্লাহ, আপনি তাকে হিকমাত বা বিজ্ঞান দান করুন।’ আর একবার রাতের বেলা রাসূলুল্লাহর সা. অজুর পানি এগিয়ে দিলে তিনি আবদুল্লাহর জন্য দু’আ করেন এই বলেঃ ‘আল্লাহুম্মা ফাক্‌কিহ্‌হু ফিদদীন ওয়া আল্লিমহুত তাবীল- হে আল্লাহ, তাকে দ্বীনের ফকীহ বানিয়ে দাও, তাকে তাবীল বা ব্যাখ্যা পদ্ধতি শিখাও।’

আল্লাহ পাক তাঁর প্রিয় নবীর এ দু’আ কবুল করেন এবং হাশেমী বালককে এত অধিক জ্ঞান দান করেন যে, বড় বড় জ্ঞানীদের তিনি ঈর্ষার পাত্রে পরিণত হন। তাঁর অগাঘ জ্ঞান তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার বিচিত্র ঘটনাবলী ইতিহাস ও জীবনী গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে।

রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের সময় আবদুল্লাহর বয়স মাত্র তের বছর। এর সোয়া দুই বছর পর প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর ইনতিকাল করেন। দ্বিতীয় খলীফা হযরত ’উমারের খিলাফতকালে তিনি যৌবনে পদার্পণ করেন। খলীফা ’উমার রা. তাঁকে স্বীয় সান্নিধ্যে তত্ত্বাবধানে রাখেন। তাকে গুরুত্বপূর্ণ মজলিসে বড় বড় সাহাবীদের সাথে বসার অনুমতি দিতেন। বদরী সাহাবীদের সাথেও বসার অনুমতি তাঁকে দেওয়া হয়। মুহাদ্দিস ইবন আবদিল বার বলেনঃ ‘উমার ইবন আব্বাসকে ভালোবাসতেন এবং তাঁকে সান্নিধ্য দান করতেন।

তৃতীয় খলীফা হযরত উসমানের রা. যুগে হিজরী ২৭ সনে মিসরের ওয়ালী আবদুল্লাহ ইবন আবী সারাহর নেতৃত্বে আফ্রিকায় একটি অভিযান পরিচালিত হয়। হযরত আব্দুল্লাহ মদীনা থেকে একটি বাহিনী নিয়ে এ অভিযানে অংশগ্রহণ করেন এবং মুসলিম পক্ষের দূত হিসাবে আফ্রিকার বাদশাহ জারজীরের সাথে আলোচনা করেন। বাদশাহ তাঁর প্রখর মেধা ও বুদ্ধিমত্তা দেখে মন্তব্য করেনঃ ‘আমার ধারণা, আপনি আরবদের একজন মহাজ্ঞানী ব্যক্তি।’

হিজরী ৩৫ সনে হযরত উসমান রা. বিদ্রোহীদের দ্বারা গৃহবন্দী হলে তিনি আবদুল্লাহকে স্বীয় প্রতিনিধি হিসাবে আমীরে হজ্জ নিয়োগ করে মক্কায় পাঠান। সে বছর তারই নেতৃত্বে হজ্জ অনুষ্ঠিত হয়। হজ্জ থেকে যখন মদীনায় ফিরে আসলেন, মদীনা তখন উত্তপ্ত। খলীফা উসমান রা. বিদ্রোহীদের হাতে শাহাদাত বরণ করেছেন এবং মদীনা বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে। তাঁরা খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণের জন্য হযরত আলীকে চাপ দিচ্ছে। হযরত আলী রা. আবদুল্লাহর সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। আবদুল্লাহ পরিস্থিতির বিস্তারিত বিশ্লেষণের পর দয়িত্বভার গ্রহণ না করার জন্য আলীকে রা. পরামর্শ দেন। হযরত আলী দায়িত্ব গ্রহণ করলে যেসব পরিস্থিতির উদ্ভব হবে বলে তিনি ধারণা করেন, পরবর্তীকালে তা সবই সত্যে পরিণত হয়।

উটের যুদ্ধে হযরত আবদুল্লাহ হযরত আীলর পক্ষে হিজাযী বাহিনীর পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। হযরত আলী তাঁকে বসরার ওয়ালী নিয়োগ করেন। বসরা থেকে একটি বাহিনী নিয়ে তিনি সিফফিনের যুদ্ধে আলীর রা. পক্ষে অংশগ্রহণ করেন। উল্লেখ্য যে, হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়ার রা. মধ্যে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয। সিফ্‌ফিনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হযরত আলী রা. হযরত আবদুল্লাহকে তাঁর পক্ষে সালিশ নিযুক্ত করতে চান, কিন্তু অন্যদের আপত্তির কারণে তাঁর সে চাওয়া বাস্তবায়িত হতে পারেনি।

হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়ার রা. মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের সময় আলীর রা. কিছু সঙ্গী যখন তাঁকে ছেড়ে চলে গেল, তখন আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস আলীকে বললেন, ‘আমীরুল মুমিনীন, আপনি আমাকে তাঁদের কাছে গিয়ে একটু কথা বলার অনুমতি দিন।’ তিনি বললেন, ‘আমি তাদের পক্ষ থেকে আপনার ওপর যে কোন ধরনের বাড়াবাড়ির আশংকা করছি।’ আবদুল্লাহ বললেন, ‘ইনশাআল্লাহ তেমন কিছু হবে না।’

আবদুল্লাহ তাদের কাছে গিয়ে উপলব্ধি করলেন তাদের চেয়ে এত বেশী একাগ্রচিত্তে ইবাদাতে নিমগ্ন অন্য কোন সম্প্রদায় ইতিপূর্বে আর কখনও তাঁর দৃষ্টিগোচর হয়নি। তারা বলল, ‘ইবন আব্বাস, আপনাকে খোশ আমদেদ! তবে আপনি কি জন্য এসেছেন?’ বললেন, ‘আপনাদের সাথে কিছু আলোচনার জন্য।’ তাদের কেউ কেউ বলল, ‘এর সাথে আলোচনার প্রয়োজন নেই।’ তবে কেউ কেউ বলল, ‘ঠিক আছে, বলুন, আপনার কথা আমরা শুনি।’ তিনি বলেলেন, ‘রাসূলুল্লাহর সা. চাচাতো ভাই, তাঁর জামাই এবং তাঁর ওপর প্রথম পর্যায়ে ঈমান পোষণকারী ব্যক্তি অর্থাৎ আলীর প্রতি এমন চরম মনোভাব পোষণ করছেন কেন?’ তারা বলল, ‘আমরা তাঁর তিনটি কাজের বদলা নিতে চাই।’ তিনি বরলেন, ‘সে তিনটি কাজ কি কি?’ তারা বলল,

১. সিফফিনের যুদ্ধক্ষেত্রে আবু মুসা আশয়ারী ও আমর ইবনুল আসকে শালিশ নিযুক্ত করে তিনি আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে মানুষকে বিচারক নিযুক্ত করেছেন।

২. আয়িশা ও মুয়াবিয়ার সাথে তিনি যুদ্ধ করেছেন, কিন্ত‍ু তাদের ধন-সম্পদ গণিমাত হিসাবে এবং যুদ্ধবন্দীদেরকে দাস-দাসী হিসাবেও গ্রহণ করেননি।

৩. মুসলমানরা তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে তাঁকে আমীর হিসাবে মেনে নেওয়া সত্ত্বেও তিনি ‘আমীরুল মুমিনীন’ উপাধি পরিহার করেছেন।

জবাবে ইবন আব্বাস বললেন,

‘যদি আমি আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের হাদীস থেকে এমন কিছু কথা আপনাদের সামনে পেশ করতে পারি যা আপনারা অস্বীকার করতে পারেন না, তাহলে আপনারা যে বিশ্বাসের ওপর আছেন তা থেকে কি প্রত্যাবর্তন করবেন?’ তাঁরা সম্মতিসূচক জবাব দিলে তিনি বললেন,

‘আপনাদের অভিযোগ, তিনি দ্বীনের ব্যাপারে মানুষকে বিচারক বিযুক্ত করে অপরাধ করেছেন। অথচ আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

‘‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা ইহরাম অবস্থায় শিকার করো না। তোমাদের মধ্যে কেউ যদি স্বেচ্ছায় কোন কিচু শিকার করে, তাহলে তোমাদের অন্তর্গত দুইজন সুবিচারক সে সম্পর্কে যে আদেশ করে সে অনুযায়ী অনুরূপ একটি পশু বিনিময় হিসাবে কাবায় উপস্থিত করবে।’’ (আলমায়িদাঃ ৯৫)

‘আল্লাহর নামে আমি শপথ করে বলছি, চার দিরহাম মূল্যের একটি নিহত খরগোশের ব্যাপারে বিচারক নিয়োগ করা থেকে মানুষের রক্ত ও জীবন রক্ষা এবং তাদের পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদ মীমাংসার উদ্দেশ্যে মানুষকে বিচারক নিয়োগ করা অধিক যুক্তিসংগত নয় কি?’

তারা বলল, ‘হাঁ, মানুষের রক্তের নিরাপত্তা ও তাদের পারস্পরিক বিবাদ নিষ্পত্তির জন্য বিচারক নিয়োগ অধিক সংগত।’ ইবন আব্বাস বললেন, ‘আমরা তাহলে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ।’

ইবন আব্বাস বললেন, ‘আপনারা বলছেন, আলী ‍যুদ্ধ করেছেন আয়িশা ও মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে, কিন্তু তাদের বন্দী করে দাস-দাসী বানাননি। আপনারা কি চান আপনাদের মা আয়িশাকে দাসী বানানো হোক এবং অন্যান্য দাসীদের সাথে যেমন আচরণ করা হয় তাঁর সাথেও তেমন করা হোক? উত্তরে যদি হাঁ বলেন তাহলে আপনারা কাফির হয়ে যাবেন। (কারণ শরীয়াতে দাসীর সাথে স্ত্রীর ন্যায় আচরণ বৈধ)

আর যদি বলেন, ‘আয়িশা’ আমাদের মা নন, তাহলেও আপনারা কাফির হবেন। কারণ, আল্লাহ বলছেনঃ

‘‘নবী মুমিনদের ওপর তাদের নিজেদের অপেক্ষা অধিকতর স্নেহশীল এবং তাঁর সহধর্মিনীগণ তাদের জননী।’’ (সূরা আলআহযাবঃ ৩৬)

‘এখন এ দুটি জবাবের যে কোন একটি আপনারা বেছে নিন।’ তারপর তিনি বললেন, ‘আমরা তাহলে এ ব্যাপারেও সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম?’ তারা বলল, ‘হাঁ।’

সবশেষে তিনি বললেন, ‘‘আলী ‘আমীরুল মুমিনীন’ উপাধিটি পরিহার করেছেন, আপনারা এ অভিযোগ তুলেছেন। অথচ হুদাইবিয়ার সন্ধির সময়ে রাসূলুল্লাহ সা. ও মক্কার মুশরিকদের মধ্যে যে চুক্তিটি সম্পাদিত হয়, তাতে ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.’ বাক্যটি লেখা হলে কুরাইশরা বলেছিলঃ আমরা যদি বিশ্বাসই করতাম আপনি আল্লাহর রাসূল, তাহলে আমরা আপনার কা’বা শরীফে পৌঁছার পথে প্রতিবন্ধক হতাম না বা আপনার সাথে সংঘর্ষেও লিপ্ত হতাম না। আপনি বরং এ বাক্যটির পরিবর্তে ‘মুহাম্মাদ ইবনু আবদিল্লাহ’ কথাটি লিখুন। সেদিন কিন্তু রাসূল সা. এ কথা বলতে বলতে তাদের দাবী মেনে নিয়েছিলেন- ‘আল্লাহর কসম, আমি সুনিশ্চিতভাবে বলছি, আমি আল্লাহর রাসূল- তা তোমরা আমাকে যতই অস্বীকার করনা কেন।’ আলী ঠিক একই কারণে ‘আমীরুল মুমিনীন’ লকবটি পরিহার করেছেন। কারণ, মুয়াবিয়া যদি তাঁকে ‘আমীরুল মুমিনীন’ বলে স্বীকারই করে নিতেন তাহলে তো কোন বিরোধই থাকতো না।’’ একথার পর তিনি বললেন, ‘তাহলে আমরা এ ব্যাপারেও সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম?’ তারা বলল, ‘হাঁ।’

হযরত আলীর পক্ষত্যাগীদের সাথে আবদুল্লাহ ইবন আব্বাসের এ জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় তাঁরা তৃপ্ত হল এবং তাঁর বলিষ্ঠ যুক্তিকে তাঁরা অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নিল। এ সাক্ষাতকারের পর বিশ হাজার লোক আবার আলীর দলে প্রত্যাবর্তন করে এবং অবশিষ্ট চার হাজার লোক আলীর শত্রুতার হঠকারী সিদ্ধান্তে অটল থাকে।

চরমপন্থী খারেজীদের সাথে ‘নাহরাওয়ান’ নামক স্থানে হযরত আলীর রা. যে যুদ্ধ হয়। আবদুল্লাহ বসরা থেকে সাত হাজার সৈন্যসহ এ যুদ্ধে যোগদান করেন। হযরত আলী বসরার সাথে অধিকৃত সমগ্র ইরানেও আবদুল্লাহকে ওয়ালী নিয়োগ করেন। তিনি ইরানের খারেজী বিদ্রোহ নির্মূল করেন।

একটি বর্ণনা মতে, আলীর রা. খিলাফতকালেই হযরত আবদুল্লাহ বসরার গভর্নরের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করে মক্কায় চলে যান। কারণ স্বরুপ বলা হয়েছে, বসরার কাজী আবূর আসওয়াদ দুয়ালী ও তাঁর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়ায় তিনি পদত্যাগ করেন। তবে অন্য একটি বর্ণনা মতে, তিনি হযরত আলীর রা. খিলাফতের শেষ পর্যন্ত বসরার ওয়ালীর দায়িত্ব পালন করেন এবং হযরত মুয়াবিয়ার রা. খিলাফতের সূচনাতে তিনি মক্কায় চলে যান এবং নির্জনে বসবাস করতে থাকেন।

হযরত ইমাম হুসাইন রা. কুফাবাসীদের আমন্ত্রণে যখন মদীনা থেকে মক্কা হয়ে কুফায় রওয়ানা হচ্ছিলেন, হযরত আবদুল্লাহ তাঁকে কুফাবাসীদের গাদ্দারীর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। কারবালার ইমাম হুসাইনের সপরিবারে শাহাদাত বরণে হযরত আবদুল্লাহ ভীষণ আঘাত পান। মক্কায় অবস্থান করলেও হযরত আবদুল্লাহ ইবন যুবাইরের রা. হাতে বাইয়াত করতে অস্বীকৃতি জানান। তবে তাঁকে খিলাফতের হকদার বলে মনে করতেন। বুখারী শরীফের একটি হাদীসের ভিত্তিতে একথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ কারণে তাঁর মক্কায় অবস্থান কিছুটা কষ্টকর হয়ে পড়ে। তিনি তায়েফে চলে যান। শেষ জীবনে অসুস্থ হয়ে যান এবং তায়েফেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস জ্ঞানার্জনের জন্য অক্লান্ত সাধনা ও পরিশ্রম করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি সব ধরণের পথ ও পন্থা অবলম্বন করেন। রাসূলের সা. জীবদ্দশায় তিনি তাঁর অমিয় ঝর্ণাধারা থেকে দু’টি অঞ্জলি ভরে গ্রহণ করেন এবং তাঁর ওফাতের পর বিশিষ্ট সাহাবীদের নিকট থেকে জ্ঞানতৃষ্ণা মেটাতে থাকেন। জ্ঞান আহরণের ক্ষেত্রে তিনি যে কত বিনয়ী ও কষ্টসহহিষ্ণু ছিলেন তাঁর নিজের একটি বর্ণনা থেকেই তা অনুমান করা যায়। তিনি বলেনঃ

‘‘আমি যখনই অবগত হয়েছি, রাসূলুল্লাহর সা. কোন সাহাবীর নিকট তাঁর একটি হাদীস সংরক্ষিত আছে, আমি তাঁর ঘরের দরজায় উপনীত হয়েছি। মধ্যাহ্নকালীন বিশ্রামের সময় উপস্থিত হলে তাঁর দরজার সামনে চাদর বিছিয়ে শুয়ে পড়েছি। বাতাস ধূলাবালি উড়িয়ে আমার জামা-কাপড় ও শরীর হয়তো একাকার করে ফেলেছে। অথচ আমি সাক্ষাতের অনুমতি চাইলে তখনই অনুমতি দিতেন। শুধুমাত্র তাঁকে প্রশ্ন করার উদ্দেশ্যেই আমি এমনটি করেছি। তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে আমার এ দুরবস্থা দেখে বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহর সা. চাচাতো ভাই, আপনি কি উদ্দেশ্যে এসেছেন? আমাকে খবর দেননি কেন, আমি নিজেই গিয়ে দেখা করে আসতাম। বলেছি, আপনার নিকট আমারই আসা উচিত। কারণ জ্ঞান এসে গ্রহণ করার বস্তু, গিয়ে দেয়ার বস্তু নয়। তারপর তাঁকে আমি হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি।’’

জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে ইবন আব্বাস ছিলেন বিনয়ী। তিনি জ্ঞানীদের উপযুক্ত কদরও করতেন। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। একদিন কাতিবে ওহী ও বিচার, ফিকাহ, কিরায়াত ও ফারায়েজ শাস্ত্রে মদীনাবাসী পণ্ডিতদের নেতা যায়িদ বিন সাবিত রা. তাঁর বাহনের পিঠে আরোহন করবেন, এমন সময় হাশেমী যুবক আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস মনিবের সামনে দাসের দাঁড়াবার ভংগিতে তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং বাহনের লাগাম ও জিনটি ধরে তাঁকে আরোহণ করতে সাহায্য করলেন। যায়িদ রা. তাঁকে বললেন, ‘রাসূলের সা. চাচাতো ভাই, এ আপনি কি করছেন, ছেড়ে দিন।’ ইবন আব্বাস বললেন, ‘আমাদের উলামা ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে এরূপ আচরণ করার জন্যই আমরা আদিষ্ট হয়েছি।’ যায়িদ রা,. বললেন, ‘আপনার একটি হাত বাড়িয়ে দিন।’ তিনি একখানা হাত বাড়িয়ে দিলে যায়িদ রা. ঝুঁকে পড়ে তাতে চুমু খেলেন এবং বললেন, ‘আমাদের নবী-পরিবারের লোকদের সাথে এরূপ আচরণ করার জন্যও আমরা আদিষ্ট হয়েছি।’

জ্ঞান অন্বেষণে হযরত ইবন ইবন আব্বাসের অভ্যাস, একাগ্রতা কর্মপদ্ধতি দেখে সে যুগের বড় বড় জ্ঞানী ও মনীষীরা চরম বিস্ময়বোধ করেছেন। ‘মাসরুক ইবনুল আজদা’- একজন শ্রেষ্ঠ তাবেয়ী, বলেন, ‘‘আমি যখন ইবন আব্বাসকে দেখলাম, বললাম, ‘সুন্দরতম ব্যক্তি।’ যখন তিনি কথা বললেন, বললাম, ‘সর্বোত্তম প্রাঞ্জলভাষী’ এবং যখন তিনি আলোচনা করলেন, বললাম, ‘সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি।’’

জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে যখন তিনি কিছুটা আত্মতৃপ্তি অনুভব করলেন তখন মানুষকে শিক্ষাদানের ব্রত কাঁধে তুলে নিলেন। আর তখন থেকেই তাঁর বাড়িটি একটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। যে অর্থে আজ আমরা বিশ্ববিদ্যালয় শব্দটি ব্যবহার করে থাকি সে অর্থে তার বাড়ীটিকে বিশ্ববিদ্যালয় বললে অত্যুক্তি হয়না। তবে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ইবন আব্বাস বিশ্ববিদ্যালয়ে মধ্যে পার্থক্য এখানে যে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকেন বহু শিক্ষক আর সেখানে ছিলেন একজন শিক্ষক। তিনি ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু।

ইবন আব্বাসের এক সঙ্গী বর্ণনা করেন, ‘আমি ইবন আব্বাসের এমন একটি মাহফিল দেখেছি যা গোটা কুরাইশ গোত্রের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। দেখলাম তাঁর বাড়ীর সম্মুখের রাস্তাটি লোকে লোকারণ্য। আমি তাঁর কাছে উপস্থিত হয়ে বাড়ীর দরজায় মানুষের প্রচণ্ড ভীড়ের কথা জানালাম। তিনি অজুর জন্য পানি আনালেন। অজু করলেন। তারপর বসে বললেনঃ ‘তুমি বাইরে গিয়ে অপেক্ষমান লোকদের বল, যারা কুরআন ও কিরায়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে চাও, ভেতরে যাও।’ আমি বেরিয়ে গিয়ে তাদেরকে একথা বললাম। বলার পর এত বিপুল সংখ্যক লোক ভেতরে প্রবেশ করল যে, কক্ষটি এমনকি সম্পূর্ণ বাড়ীটি পূর্ণ হয়ে গেল। তারা যা কিছু জানতে চাইলো তিনি তাদেরকে অবহিত করলেন। তারপর বললেন, তোমাদের অপেক্ষমান ভাইদের জন্য পথ ছেড়ে দাও।’ তারা চলে গেল।

অতঃপর তিনি আমাকে বললেন, ‘বাইরে গিয়ে বল, যারা কুরআনের তাফসীর ও তাবীল সম্পর্কে জানতে চাও, ভেতরে যাও।’ আমি বেরিয়ে গিয়ে তাদেরকে একথা বললাম। বলার পর লোকে ঘর ভরে গেল। তাদের সব জিজ্ঞাসারই তিনি জবাব দিলেন এবং অতিরিক্ত অনেক কিছুই অবহিত করলেন। তারপর বললেন, ‘তোমাদের অপেক্ষমান ভাইদের জন্য পথ ছেড়ে দাও।’ তারা বেরিয়ে গেল।

তিনি আমাকে আবার বললেন, ‘তুমি বাইরে ‍গিয়ে যারা হালাল, হারাম ও ফিকাহ সম্পর্কে জানতে চায় তাদেরকে ভেতরে পাঠিয়ে দাও।’ আমি বেরিয়ে গিয়ে তাদেরকে পাঠালাম। তাদের সংখ্যাও এত ছিল যে ঘরটি সম্পূর্ণরূপে ভরে গেল। তাদের সকল জিজ্ঞাসার জবাব দানের পর তাদেরকে পরবর্তী লোকদের জন্য স্থান ছেড়ে দিতে বললেন। তারা চলে গেল।

তিনি আমাকে আবার পাঠালেন এবং ফারায়েজ ও তৎসংক্রান্ত মাসলা-মাসায়েল সম্পর্কে যারা জানতে চায় তাদেরকে আহ্‌বান জানালেন। এবারও ঘরটি ভরে গেল। তাদের সকল জিজ্ঞাসার সন্তোষজনক জবাব দানের পর পরবর্তী লোকদের জন্য স্থান ছেড়ে দিতে বললেন। তারা চলে গেল। তিনি আমাকে আবার পাঠালেন। বললেন, ‘যারা আরবী ভাসা, কবিতা এবং আরবদের বিস্ময়কর সাহিত্য সম্পর্কে জানতে ইচ্ছুক তাদেরকে পাঠিয়ে দাও।’ আমি তাদেরকে পাঠালাম। এবারো ঘর ভরে গেল। তিনি তাদের সব প্রশ্নের জবাব দিয়ে তুষ্ট করে বিদায় দিলেন। বর্ণনাকারী মন্তব্য করেন, ‘সমগ্র কুরাইশ গোত্রের গৌরব ও গর্বের জন্য এই একটিমাত্র সমাবেশই যথেষ্ট।’

এমন ভীড়ের কারণেই ইবন আব্বাস পরবর্তীকালে একেকটি বিষয়ের জন্য সপ্তাহের একটি দিন নির্ধারণ করেছিলেন। ফিকাহ্‌, মাগাযী, কবিতা, প্রাচীন আরবের ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন দিতে তিনি আলোচনা করতেন। তাঁর এসব আলোচনার মজলিসে যত বড় জ্ঞানীই উপস্থিত হতেন না কেন, তিনি পরিতৃপ্ত হয়ে ফিরতেন।

হযরত ইবন আব্বাস তাঁর অপরিসীম জ্ঞান ও চিন্তাশক্তির কল্যাণে অল্পবয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও খিলাফতে রাশেদার মজলিসে শূরার সদস্য হওয়ার গৌরব লাভ করেছিলেন। হযরত উমার রা. কোন কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হলে প্রবীণ ও বিদ্বান সাহাবীদের আহ্‌বান জানাতেন। সেই সাথে আবদুল্লাহ ইবন আব্বাসকেও ডেকে পাঠাতেন। তিনি উপস্থিত হলে হযরত উমার তাঁর যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করে বলতেন, ‘আমরা এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছি, তুমি ও তোমার মত আর যারা আছ সমাধান বের কর।’

একবার প্রবীণ ও বয়োজ্যেষ্ঠ সাহাবীদের মজলিসে হযরত উমার অন্যদের তুলনায় আবদুল্লাহ ইবন আব্বাসকে একটু বেশী গুরুত্ব ও প্রাধান্য দিলেন। তখন আবদুল্লাহ একজন যুবক। এ ব্যাপারে তিনি প্রবীণ সাহাবীদের সমালোচনার সম্মুখীন হন। কেউ কেউ বলেন, ‘আমাদেরও তো তার বয়সী ছেলে ও নাতিরা রয়েছে, আমরাও তো তাদেরকে নিয়ে আসতে পারি।’ হযরত উমার তখন কুরআনের একটি আয়াতের ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করে আবদুল্লাহকে পরীক্ষা করেন। সে পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হন। তখন উমার বলে, ‘আবদুল্লাহ তো বুদ্ধদের মত যুবক। তার আছে একটি জিজ্ঞাসু যবান ও সচেতন অন্তঃকরণ।’

হিশাম ইবন উরওয়া তাঁর পিতা উরওয়াহকে ইবন আব্বাসের জ্ঞানের গভীরতা ও তাঁর মর্যাদা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘ইবন আব্বাসের তুল্য জ্ঞানী লোক আমার নযরে পড়েনি।’

আমর ইবন হাবশী বলেন, ‘আমি ইবন উমারকে একটি আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেনঃ তুমি ইবন আব্বাসের কাছে যাও এবং তাকেও জিজ্ঞেস কর। কারণ মুহাম্মাদের সা. ওপর যা কিছু অবতীর্ণ হয়েছে সে সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের যাঁরা অবশিষ্ট আছেন তাঁদের মধ্যে তিনিই অধিক জ্ঞানী।’’

তাফসীর শাস্ত্র ও অন্যান্য ইসলামী বিষয়সমূহে তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্যের মূলে ছিল প্রথমত তাঁর রাসূলে করীমের সা. সান্নিধ্য লাভ ও সেবার সুযোগ। দ্বিতীয়ত তাঁর জন্য রাসূলুল্লাহর সা. দু’আ। তৃতীয়তঃ জ্ঞান অর্জনের প্রতি তাঁর অপরিসীম আগ্রহ এবং অক্লান্ত চেষ্টা সাধনা।

যায়িদ ইবন সাবিত মারা গেলে হযরত আবু হুরাইরা মন্তব্য করেছিলেন ‘এই উম্মাতের বিজ্ঞ আলিম মৃত্যুবরণ করলেন এবং আশা করি আল্লাহতা’আলা আবদুল্লাহ ইবন আব্বাসকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করবেন।’

হযরত ইবন আব্বাস বিশিষ্ট ছাত্র ও ব্যক্তিদের শিক্ষাদানের সাথে সাথে সাধারণ লোকদের সম্পর্কেও সচেতন ছিলেন। মাঝে মাঝে বিশেষ মাহফিলের মাধ্যমে তিনি জনসাধারণকে ওয়াজ-নসিহত করতেন।

নিজে না করে অন্যকে করতে বলেন, ইবন আব্বাস এ ধরণের লোক ছিলেন না। তিনি ছিলেন দিনে রোযাদার ও রাতে ইবাদাত গোযার। আবদুল্লাহ ইবন মুলাইকা বলেন ‘‘একবার আমি ইবন আব্বাসের সাথে মক্কা থেকে মদীনা পর্যন্ত সফর করলাম। বিশ্রামের জন্য যখনই কোথাও তাঁবু গেড়েছি, রাতের একটি বিশেষ অংশ তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাটিয়ে দিতেন। অথচ অন্য সফরসঙ্গীরা তখন ক্লান্তি ও শ্রান্তিতে গভীর ঘুমে অচেতন। একদিন রাত্রে একাগ্রচিত্তে তাঁকে আমি পাঠ করতে শুনলামঃ

وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ۖ ذَٰلِكَ مَا كُنتَ مِنْهُ تَحِيدُ

‘এবং মৃত্যুর বিকার সত্যভাবেই সমুপস্থিত। এ হচ্ছে তা-ই যা থেকে তুমি পালিয়ে বেড়াতে।’ (ক্বাফঃ ১৯)

বারবার তিনি এ আয়াতটি আওড়াচ্ছেন আর কাঁদছেন। সুবহে সাদিক পর্যন্ত তিনি এভাবে কাটিয়ে দিলেন।’’

৬৮ হিজরী মুতাবিক ৬৮৬/৮৮ খ্রীস্টাব্দে তায়েফ নগরে তিনি ইনতিকাল করেন। ওফাতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল একাত্তর বছর। মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যা তাঁর জানাযার ইমামতি করেন। তায়েফ নগরে ‘মসজিদে ইবন আব্বাস’ নামক বিশাল মসজিদটি আজও  তাঁর স্মৃতি বহন করে চলেছে। এ মসজিদেরই পেছনের দিকে এক পাশে এ মহান সাহাবীর কবর। তাঁকে কবরে সমাহিত করার পর কুরআনের এ আয়াতটি পঠিত হয়েছিলঃ

يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ – ارْجِعِي إِلَىٰ رَبِّكِ رَاضِيَةً مَّرْضِيَّةً – فَادْخُلِي فِي عِبَادِي – وَادْخُلِي جَنَّتِي –

‘হে পরিতুষ্ট আত্মা! তুমি প্রসন্ন ও সন্তুষ্ট অবস্থায় তোমার প্রতিপালকের দিকে প্রত্যাবর্তন কর। অতঃপর আমার বান্দাগণের মধ্যে প্রবিষ্ট হও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ কর।’ (আলফজরঃ ২৭৩০)

আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা)

রাসূলুল্লাহ সা. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. সম্পর্কে বলেছেনঃ ‘যে ব্যক্তি বিশুদ্ধভাবে কুরআন পাঠ করে আনন্দ পেতে চায়, যেমন তা অবতীর্ণ হয়েছে- সে যেন ইবন উম্মু আবদের পাঠের অনুসরণে কুরআন পাঠ করে।’

এটা সেই সময়ের কথা যখন তিনি একজন কিশোর মাত্র, তখনও যৌবনে পদার্পণ করেননি। কুরাইশ গোত্রের এক সর্দার ’উকবা ইবন আবু মু’ইতের একপাল ছাগল নিয়ে তিনি মক্কার গিরিপথগুলোতে চরিয়ে বেড়াতেন। লোকের তাঁকে ‘ইবন উম্মু আবদ’ বলে ডাকতো। তবে তাঁর নাম আবদুল্লাহ, পিতার নাম মাসউদ, কুনিয়াত আবু আবদির রহমান এবং মাতার নাম উম্মু আবদ।

তাঁর গোত্রে যে একজন নবীর আবির্ভাব ‍ঘটেছে, সে সম্পর্কে নানা খবর এ কিশোর ছেলে সবসময় শুনতেন। তবে অল্প বয়স এবং বেশীরভাগ সময় মক্কার সমাজ জীবন থেকে দূরে অবস্থানের কারণে সে সম্পর্কে তিনি গুরুত্ব দিতেন না। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন সকালে উঠে ’উকবার ছাগলের পাল নিয়ে বের হয়ে যেতেন আর সন্ধ্যায় ফিরতেন।

একদিন এ কিশোর ছেলেটি দেখতে পেলেন, দু’জন বয়স্ক লোক, যাদের চেহারায় আত্মমর্যাদার ছাপ বিরাজমান, দূর থেকে তাঁর দিকেই এগিয়ে আসছেন। তাঁরা ছিলেন এত পরিশ্রান্ত ও পিপাসার্ত যে, তাঁদের ঠোঁট ও গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। নিকটে এসে লোক দু’টি সালাম জানিয়ে বললেন, ‘বৎস! এ ছাগলগুলি থেকে কিছু দুধ দুইয়ে আমাদেরকে দাও। আমরা পান করে পিপাসা নিবৃত্ত করি এবং আমাদের শুকনা গলা একটু ভিজিয়ে নেই।’

ছেলেটি বললঃ ‘এ আমার দ্বারা সম্ভব নয়। ছাগলগুলি তো আমার নয। আমি এগুলির রাখাল ও আমানতদার মাত্র।’ লোক দু’টি তার কথায় অসন্তুষ্ট হলেন না, বরং তাদের মুখ মণ্ডলে এক উৎফুল্লতার ছাপ ফুটে উঠলো। তাদের একজন আবার বললেনঃ ‘তাহলে এমন একটি ছাগী আমাকে দাও যা এখনও পাঠার সংস্পর্শে আসেনি।’ ছেলেটি নিকটেই দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছোট্ট ছাগীর দিকে ইশারা করে দেখিয়ে দিলেন। লোকটি এগিয়ে গিয়ে ছাগীটি ধরে ফেলেন এবং ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রহীম’ বলে হাত দিয়ে ধরে তার ওলান মলতে লাগলেন। অবাক বিস্ময়ে ছেলেটি এ দৃশ্য দেখে মনে মনে বললেনঃ ‘কখনও পাঠার সংস্পর্শে আসেনি এমন ছোট ছাগী কি দুধ দেয়? কিন্তু কি আশ্চর্য! কিছুক্ষনের মধ্যেই ছাগীর ওলানটি ফুলে ওঠে এবং প্রচুর পরিমাণ দুধ বের হতে থাকে। দ্বিতীয় লোকটি গর্তবিশিষ্ট পাথর উঠিয়ে নিয়ে বাঁটের নীচে ধরে তাতে দুধ ভর্তি করেন। তারপর তাঁরা উভয়ে পান করেন এবং ছেলেটিকেও তাদের সাথে পান করালেন। ইবন মাসউদ বলেনঃ আমি যা দেখছিলাম তা সবই আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। আমরা সবাই যখন পরিতৃপ্ত হলাম তখন সেই পূণ্যবান লোকটি ছাগীর ওলানটি লক্ষ্য করে বললেনঃ ‘চুপসে যাও।’ আর অমনি সেটি পূর্বের ন্যায় চুপসে গেল। তারপর আমি সেই পূণ্যবান লেকটিকে অনুরোধ করলামঃ ‘আপনি যে কথাগুলি উচ্চারণ করলেন, তা আমাকে শিখিয়ে দিন।’ বললেন, ‘তুমি তো শিক্ষাপ্রাপ্ত বালক।’

ইসলামের সাথে আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের পরিচিতির এটাই হলো প্রথম কাহিনী। এ মহাপূণ্যবান ব্যক্তিটি আর কেউ নন, তিনি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আর তাঁর সঙ্গীটি ছিলেন হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা.। কুরাইশদের অত্যাচার উৎপীড়ন থেকে বাঁচার জন্য এ সময় তাঁরা মক্কার নির্জন গিরিপথ সমূহে আশ্রয় নিয়েছিলেন। রাসূল সা. ও তাঁর সঙ্গীকে যেমন ছেলেটির ভালো লেগেছিল তেমনি তাঁদের কাছেও ছেলেটির আচরণ, আমানতদারী ও বিচক্ষণতা খুব চমৎকার মনে হয়েছিল। তাঁরা ছেলেটির মধ্যে কল্যাণ ও মংগলের শুভলক্ষণ প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

এ ঘটনার অল্প কিছুদিন পর আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নিজেকে রাসূলুল্লাহর সা. একজন খাদিম হিসাবে উৎসর্গ করেন। রাসূল সা.ও তাকে খাদিম হিসাবে নিয়োগ করেন। সেইদিন থেকে এ সৌভাগ্যবান বালক ছাগলের রাখালী থেকে সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠতম মানুষের খাদিমে পরিণত হন।

আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ ছায়ার মত নিজের মনিবকে অনুসরণ করেন। সফরে বা ইকামতে, গৃহের অভ্যন্তরে বা বাইরে সব সময় তিনি তাঁর সাথে সাথে থাকতেন। রাসূল সা. ঘুমালে তাঁকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিতেন, গোসলের সময় পর্দা করতেন, বাইরে যাবার সময় জুতো পয়ে দিতেন, ঘরে প্রবেশের সময় জুতো খুলে দিতেন এবং তাঁর লাঠি ও মিসওয়াক বহন করতেন। তিনি যখন হুজরায় অবস্থান করতেন তখনও তাঁর কাছে যাতায়াত করতেন। রাসূল সা. তাঁকে যখনই ইচ্ছা তাঁর কামরায় প্রবেশ এবং কোন প্রকার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও সংকোচ না করে তাঁর সকল বিষয় অবগত হওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। এ কারণে তাকে ‘সাহিবুস সির’ বা রাসূলুল্লাহর সা. সকল গোপন বিষয়ের অধিকারী বলা হয।

আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ নবী-গৃহে প্রতিপালিত হন, তাঁকে অনুসরণ করেন এবং তাঁরই মত আচার-আচরণ, ও চরিত্র-বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হন। এ কারণে তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘হিদায়াত প্রাপ্তি, আচার-আচরণ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে তিনিই হচ্ছেন রাসূলুল্লাহর সা. নিকট উত্তম ব্যক্তি।’

ইবনে মাসউদ খোদ রাসূলাল্লাহর সা. শিক্ষালয়ে শিক্ষালাভ করেন। তাই সাহাবীদের মধ্যে যারা কুরআনের সবচেয়ে ভালো পাঠক, তার ভাব ও অর্থের সবচেয়ে বেশীল সমঝদার এবং আল্লাহর আইন ও বিধি-বিধানের সবচেয়ে বেশী অভিজ্ঞ, তিনি ছিলেন তাঁদেরই একজন।

একবার হযরত উমার রা. আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে বললোঃ ‘আমীরুল মুমিনীন! আমি কুফা থেকে এসেছি। সেখানে আমি দেখে এসছি, এক ব্যক্তি নিজের স্মৃতি থেকেই মানুষকে কুরআন শিখাচ্ছেন।’ একথা শুনে তিনি এত রাগান্বিত হলেন যে, সচরাচর তাঁকে তেমন রাগ করতে দেখা যায় না। তিনি উটের হাওদার অভ্যন্তরে রাগে ফুলতে থাকেন। তারপর প্রশ্ন করেন- তোমার ধ্বংস হোক! কে সে লোকটি?’

– ‘আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ।’

জ্বলন্ত আগুনে পানি ঢেলে দিলে যে অবস্থা হয়, ইবন মাসউদের নাম শুনে তাঁরও সে অবস্থা হলো। তাঁর রাগ পড়ে গেল। তিনি স্বাভাবিক অবস্তা ফিরে পেলেন। তারপর বললেনঃ তোমার ধ্বংস হোক! আল্লাহর কসম, এ কাজের জন্য তাঁর চেয়ে অধিক যোগ্য কোন ব্যক্তি বেঁচে আছে কিনা আমি জানিনা। এ ব্যাপারে তোমাকে আমি একটি ঘটনা বলছি।’ উমার রা. বলতে লাগলেন- ‘‘একদিন রাতের বেলা রাসূল সা. আবু বকরের সাথে কথাবার্তা বলছিলেন। তাঁরা মুসলমানদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছিলেন। আমিও তাঁদের সাথে ছিলাম। কিছু সময় পর রাসূল সা. বের হলেন, আমরাও তাঁর সাথে বেরুলাম। বেরিয়েই আমরা দেখতে পেলাম, এক ব্যক্তি মসজিদে নামাযে দাঁড়িয়ে; কিন্তু আমরা তাঁকে চিনতে পারলাম না। রাসূল সা. দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাঁর কুরআন তিলাওয়াত শুনলেন। তারপর আমাদের দিকে ফিরে বললেনঃ ‘যে ব্যক্তি বিশুদ্ধভাবে কুরআন পাঠ করে আনন্দ পেতে চায়, যেমন তা অবতীর্ণ হয়েছে, সে যেন ইবন উম্মু আবদের পাঠের অনুরূপ কুরআন পাঠ করে।’ এরপর আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ বসে দু’আ শুরু করলেন রাসূল সা. আস্তে আস্তে তাঁকে লক্ষ্য করে বলতে লাগলেনঃ ‘চাও, দেওয়া হবে, চাও, দেওয়া হবে।’

উমার রা. বলেন, আমি মনে মনে বললাম, আল্লাহর কসম, আমি আগামীকাল প্রত্যুষেই আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের নিকট গিয়ে তাঁর দু’আ সম্পর্কে রাসূলের সা. মন্তব্যের সুসংবাদটি তাঁকে দিব। সকাল সকাল আমি তার কাছে গেলাম। গিয়ে দেখি আবু বকর সিদ্দীক রা. আমার আগেই তাঁর কাছে পৌঁছে গেছেন এবং তাঁকে সুসংবাদটি দিয়ে ফেলেছেন। সত্যিই যখনই কোন সৎকাজে আবু বকরের সাথে আমি প্রতিযোগিতা করেছি তখন তিনিই প্রতিটি ক্ষেত্রে বিজয়ী হয়েছেন।

আল্লাহর কিতাব কুরআনের জ্ঞানে তিনি কতখানি পারদর্শী ছিলেন সে সম্পর্কে তাঁর নিজের একটি মন্তব্য এক্ষেত্রে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, ‘‘যিনি ‍ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই সেই আল্লাহর কসম! আল্লাহর কিতাবের এমন কোন একটি আয়াত নাযিল হয়নি যে সম্পর্কে আমি জানিনা যে, তা কোথায় নাযিল হয়েছে এবং কি সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে আমার থেকে অধিক পারদর্শী কোন ব্যক্তির কথা আমি যদি জানতে পারি এবং তাঁর কাছে পৌঁছা সম্ভব হয়, তাহলে আমি তাঁর কাছে উপস্থিত হই।’

নিজের সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ যে কথাটি বলেছেন তাতে অতিরঞ্জন নেই। এ সম্পর্কে একটি ঘটনা পাঠকদের কাছে তুলে ধরা সমীচীন বলে মনে করি। একবার হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব রা. কোন এক সফরে রাত্রিবেলা একটি অপরিচিত কাফিলার সাক্ষাত লাভ করেন। রাতের ঘোর অন্ধকারে কাফিলার কোন লোকজনকে দেখা যাচ্ছিল না। ঘটনাক্রমে সেই কাফিলায় আবদুল্লাহ ইবন মাসউদও ছিলেন; কিন্তু উমার রা. তা জানতেন না। উমার রা. একজন লোককে তাদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করতে বললেন, কাফিলা কোথা থেকে আসছে? অন্য কাফিলা থেকে আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ জবাব দিলেন-

– ‘আমীক উপত্যকা থেকে।’

– ‘কোথায় যাচ্ছে?’

– ‘ইলাল বাইতিল আতীক- বাইতুল আতীকে (অর্থাৎ কাবা শরীফে)।’ জবাব শুনে উমার রা. বললেনঃ ‘নিশ্চয় তাদেরমধ্যে কোন আলিম ব্যক্তি আছেন।’ তিনি আবার জিজ্ঞেস করতে বললেন, ‘কুরআনের শ্রেষ্ঠতম আয়াত কোনটি?’

– ‘আল্লাহু লাইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম, লা তাখুজুহু সিনাতুন ওয়ালা নাওম- সেই চিরন্তন চিরঞ্জীব সত্তা আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। তন্দ্রাও তাকে স্পর্শ করেনা এবং নিদ্রাও তাঁকে পায়না।’

– ‘সর্বাধিক ন্যায়-নীতির ভাব প্রকাশক আয়াত কোনটি?’

– ইন্নাল্লাহা ইয়া’মুরু বিল আদলি ওয়াল ইহসানি ওয়া ইতায়িজিল কুরবা- আল্লাহ ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা, পরোপকার এবং নিকটতম আত্মীয়-স্বজনদেরকে দান করার নির্দেশ দিচ্ছেন। আবার প্রশ্ন হলোঃ

– ‘সর্বাধিক ব্যাপক অর্থবোধক আয়াত কোনটি?’

– ‘ফামাই ইয়া’মাল মিসকালা জাররাতিন খাইরাই য়ারাহ, ওয়ামাই ইয়া’মাল মিসকালা জার্‌রাতিন শাররাই য়ারাহ’- ‘যে ব্যক্তি এক বিন্দু পরিমাণ সৎকজ করবে সে তার বিনিময় লাভ করবে, তেমনিভাবে যে ব্যক্তি এক বিন্দু পরিমাণ অসৎকাজ করবে তার বিনিময়ও সে লাভ করবে।’

– ‘সর্বাধিক ভীতিপ্রদ আয়াত কোনটি?’

– ‘লাইসা বআমানিয়্যিকুম ওয়ালা আমানিয়্যি আহলিল কিতাবি মান ই’মাল সুআন ইউজযা বিহি ওয়ালা ইয়াজিদ লাহু মিন দুনিল্লাহ ওয়ালিয়্যান ওয়ালা নাসীরান’- ‘না তোমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী, আর না আহলি কিতাবদের কামনা-বাসনা অনুযায়ী সবকিছু হবে। যে ব্যক্তি খারাপ কাজ করবে তাঁকে তাঁর প্রতিফল ভোগ করতে হবে। আর আল্লাহ ছাড়া তার জেন্য আর কোন অভিভাবকও পাবেনা এবং কোন সাহায্যকারীও না।’

‘সর্বঅধিক আশার সঞ্চারকারী আয়াত কোনটি?’

– ‘কুল ইয়া ’ইবাদিল্লাজীনা আসরাফু ’আলা আনফুসিহিম লা-তাকনাতু মির রাহমাতিল্লাহু ইন্নাল্লাহা ইয়াগফিরজ্জুনুবা জামীয়া। ইন্নাহু হুয়াল গাফুরুর রাহীম’- ‘হে নবী আপনি বলুন। হে আমার বান্দারা, যারা নিজের ওপর বাড়াবাড়ি করছো, আল্লাহর হমত ও করুণা থেকে নিরাশ হয়োনা। নিশ্চয় আল্লাহ সব পাপই ক্ষমা করে দেবেন। তিনিই তো গাফুরুর রাহীম।’

– ‘আচ্ছা আপনাদের মাঝে কি আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ আছে?’

– হ্যাঁ।’

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ কেবল একজন ভালো ক্বারী, আলিম, আবিদ ও যাহিদিই ছিলেন না, সেইভাবে তিনি ছিলেন একজন কর্মঠ ও বিচক্ষণ ব্যক্তি এবং কঠিন বিপদ মুহূর্তে অগ্রগামী একজন মুজাহিদ। তাঁর জন্য এ গৌরবটুকুই যথেষ্ট যে, রাসূলুল্লাহর সা. পর তিনিই ভূ-পৃষ্ঠের প্রথম মুসলিম যিনি প্রকাশ্যে কুরাইশদের মাঝে কুরআন পাঠ করেছিলেন।

রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবীরা একদিন মক্কায় একত্রিত হলেন। তাঁরা তখন সংখ্যায় অল্প ও দুর্বল। নিজেদের মধ্যে তাঁরা বলাবলি করলেন, ‘আল্লাহর শপথ, প্রকাশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করে কুরাইশদেরকে কখনও শুনানো হয়নি। তাদেরকে কুরআন শোনাতে পারে এমন কে আছে?’

আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ বললেনঃ ‘আমিই তাদেরকে শোনাবো।’ অন্যরা বললেন, ‘তোমার ব্যাপারে আমাদের ভয় হচ্ছে। আমরা এমন এক ব্যক্তিকে চাই, যার লোকজন আছে, কুরাইশরা তার ওপর কোনরূপ অত্যাচার করতে চাইলে তারা তখন বাধা দিতে পারবে।’ ইবনে মাসউদ বললেন, ‘আমাকে অনুমতি দিন। আল্লাহ আমাকে হিফাজত করবেন।’ একথা বলে তিনি মসজিদের দিকে রওয়ানা হলেন এবং মধ্যাহ্নের কিছু আগে মাকামে ইবরাহীমে এসে পৌছলেন। তিনি মাকামে ইবরাহীমের নিকট দাঁড়িয়ে জোরে জোরে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করলেনঃ ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রহীম। আররাহমানু আল্লামাল কুরআন, খালাকাল ইনসানা আল্লামাহুল বায়ান……।’

তিনি তিলাওয়াতে করে যেতে লাগলেন। কুরাইশরা শুনে ক্ষণিকের জন্য চিন্তা করলো। তারপর একে অপরকে প্রশ্ন করলো, ‘ইবন উম্মু আবদ কি বলে? তার সর্বনাশ হোক! মুহাম্মাদ যা বলে তাই তো সে পাঠ করছে।’ তারা সবাই উঠে তাঁর দিকে ধেয়ে গেল এবং তাঁর মুখে নির্দয়ভাবে মারতে লাগলো। এ অবস্থায় আল্লাহ যতটুকু চাইলেন ততটুকু তিনি তিলাওয়াত করলেন। তারপর রক্তাক্ত দেহে সঙ্গীদের কাছে ফিরে এলেন। তাঁরা বললেন, ‘আমরা এরই আশংকা করছিলাম।’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আল্লাহর শত্রুরা এখন আমার কাছে অতি তুচ্ছ যা আগে ছিলনা। আপনারা চাইলে আগামী কালও আমি এমনটি করতে পারি।’ তাঁরা বললেন, ‘না, যথেষ্ট হয়েছে। তাদের অপছন্দনীয় কথা তুমি তাদেরকে শুনিয়ে দিয়েছ।’ হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ ইসলাম গ্রহণ করার পর কুরাইশদের অত্যাচারের শিকারে পরিণত হন। বাধ্য হয়ে দুইবার হাবশায় হিজরাত করেন।অবশেষে মাদীনায় চিরদিনের জন্য হিজরাত করে চলে যান। মদীনায় প্রখ্যাত আনসারী সাহাবী হযরত মুয়াজ ইবন জাবালের অতিথি হন। রাসূলুল্লাহ সা. মদীনায় আসার পর তাঁদের দু’জনের মধ্যে দ্বীনি ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে দেন এবং তাঁর বসবাসের জন্য মসজিদে নববীর পাশে একখণ্ড ভূমি দান করেন

রাসূলুল্লাহর সা. সাথে সকল গুরুত্বপূর্ণ ‍যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন। বদর যুদ্ধে দু’জন আনসারী যুবক ইসলামের কট্টর দুশমন আবু জাহলকে হত্যা করে ময়দানে ফেলে আসে। যুদ্ধশেষে রাসূল সা. বললেনঃ ‘কেউ যেয়ে আবু জাহলের অবস্থা একটু দেখে আস তো।’ আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ দৌড়ে চলে গেলেন। আবু জাহলের প্রাণস্পন্দন তখনও থেমে যায়নি। আবদুল্লাহ তার দাড়ি সজোরে মুট করে ধরে বললেনঃ ‘বল, তুই আবু জাহল কিনা।’

উহুদ, খন্দক, হুদাইবিয়া, খাইবারসহ মক্কা বিজয়েও তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সাথী ছিলেন। হুনাইন যুদ্ধে কাফিরদের অতর্কিত আক্রমণে দশ হাজারের মুসলিম বাহিনী বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। মাত্র আশিজন যোদ্ধা নিজেদের জীবনকে বাজি রেখে রাসূলুল্লাহর সা. চতুষ্পার্শে অটল থাকেন। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ সেই আশিজনের একজন। এ যুদ্ধে রাসূল সা. মুশরিক বাহিনীকে লক্ষ্য করে যে এক মুঠো ধূলো নিক্ষেপ করেছিলেন, রাসূলুল্লাহর সা. হাতে তা তুলে দিয়েছিলেন আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ।

রাসূলুল্লাহ সা. ওফাতের পর দীর্ঘদিন যাবত সকল কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকেন। তবে হযরত উমারের রা. খিলাফতকালে হিজরী ১৫ সনে তিনি আর বসে থাকতে পারলেন না। জিহাদের ডাকে সাড়া দিয়ে ইয়ারমুক যুদ্ধে বেরিয়ে পড়েন এবং বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন।

হিজরী ২০ সনের খলীফা উমার রা. তাঁকে কুফার কাজী নিয়োগ করেন। কাজীর দায়িত্ব ছাড়াও বায়তুল মাল, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এবং কুফার ওয়ালীর উযীরের দায়িত্বও তাঁর ওপর ন্যস্ত করা হয়।

পুরো দশ বছর অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এতগুলি দায়িত্ব তিনি পালন করেন। এ দীর্ঘ সময়ে খলীফা উমারের রা. শাহাদাত বরণ, হযরত উসমানের খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণসহ কুফার ওয়ালীর রদবদল হয়েছে, কিন্তু আবদুল্লাহ বিন মাসউদ স্বীয় পদে বহাল থাকেন। খলীফা উসমানের খিলাফতের শেষ পর্বে আবদুল্লাহকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তিনি সঙ্গীসাথী ও পরিবার পরিচনসহ কুফা থেকে হিজাযের দিকে যাত্রা করেন। পথে মরুভূমিতে ‘রাবজা’ নামক স্থানে পৌঁছে জানতে পারেন প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু যার গিফার রা. সেখানে অন্তিম শয্যায়। তাঁর পৌঁছার অল্পক্ষণ পরেই আবু যার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, আবদুল্লাহ বিন মাসউদ তাঁর জানাযার নামসাযে ইমামতি করেন এবং কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করেন। সেখান থেকে তিনি মক্কা চলে যান এবং উমরা আদায় করে মদীনায় পৌঁছেন। বাকী জীবন মদীনায় চুপচাপ কাটিয়ে দেন।

হিজরী ৩২ সনে আবদুল্লাহর বয়স যখন ষাট বছরের ওপরে, হঠাৎ একদিন এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে বলতে লাগলো, ‘আল্লাহ আমাকে আপনার জানাযা থেকে বঞ্চিত না করুন। গতরাতে আমি স্বপ্নে দেখেছি, রাসূল সা. একটি মিম্বরের ওপর আর আপনি তাঁর সামনে। তিনি আপনাকে বলছেন, ‘ইবন মাসউদ, আমার পরে তোমাকে ভীষণ কষ্ট দেওয়া হয়েছে। এস, আমার কাছে চলে এস। এ স্বপ্ন সত্যে পরিণত হল। এ অল্প কিছুদিন পরেই তিনি রোগে আক্রান্ত হন এবং সেই রোগেই মারা যান।

হযরত উসমানের রা. খিলাফতকালে পর্যন্ত তিনি জীবিত ছিলেন। তিনি যখন অন্তিম রোগ শয্যায়, তখন উসমান রা. একদিন তাঁকে দেখতে গেলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ

– ‘আপনার অভিযোগ কিসের বিরুদ্ধে?’

– ‘আমার পাপের বিরুদ্ধে।’

– ‘আপনার চাওয়ার কিছু আছে কি?’

– ‘আমার রবের রহমত বা করুণা।’

– ‘বহু বছর যাবত আপনার ভাতা নিচ্ছেন না, তাকি আবার দেয়ার নির্দেশ দেব?’

– ‘আমার কোন প্রয়োজন নেই।’

– ‘আপনার মৃত্যুর পর আপনার কন্যাদের প্রয়োজনে আসবে।’

– ‘আপনি কি আমার কন্যাদের দারিদ্রের ব্যাপারে ভীত হচ্ছেন? আমি তো তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছি, তারা যেন প্রত্যেক রাতে সূরা ওয়াকিয়া পাঠ করে। কারণ আমি রাসূকে সা. বলতে শুনেছিঃ ‘যে ব্যক্তি প্রত্যেক রাতে সূরা আল-ওয়াকিয়া পাঠ করবে, কখনও দারিদ্র তাকে স্পর্শ করবে না।’

দিনশেষে রাত্রি নেমে এলো, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ তাঁর রফীকে ’আলা- শ্রেষ্ঠতম বন্ধুর সাথে মিলিত হলেন। খলীফা উসমান তাঁর জানাযার নামায পড়ান এবং হযরত উসমান ইবন মাজউনের রা. পাশেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ