মযবুত ঈমান

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

মযবুত ঈমান

অধ্যাপক গোলাম আযম


স্ক্যান কপি ডাউনলোড

বইটির পটভূমি

ইসলামী আন্দোলনের  ও সংগঠনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে আমি তীব্রভাবে উপলব্ধি করেছি যে, ইসলামকে সঠিকভাবে বুঝা সত্ত্বেও ইসলামের দাবি পূরণে অনেকেই ব্যৰ্থ হয়। ধীরে সুস্থে বিবেক-বুদ্ধি যথাযথভাবে প্রয়োগ করে ইসলামী আন্দোলনে অগ্রসর হবার পর কেউ কেউ আবার পিছিয়ে যায়। জামায়াতে ইসলামীর রুকন হিসেবে বেশ কিছুদিন সক্রিয় ভূমিকা পালনের পরও একসময় নিক্রিয় হয়ে পড়ে। ছাত্রজীবনে নেতৃস্থানীয় দায়িত্ব পালন করেও কর্মজীবনে আর এগুতে চায় না। ‘বিস্ময় ও বেদনার সাথে আমি এ সব লক্ষ্য করে দীর্ঘদিন কারণ তালাশ করে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, ঈমানের দুর্বলতাই এর জন্য দায়ী। ঈমানের দাবি কী, কোন পথে ঈমানে দুর্বলতা আসে এবং মজবুত ঈমানের কী কী শর্ত রয়েছে এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। গত কয়েক বছরে ইসলামী আন্দোলনে সক্রিয় পুরুষ, মহিলা, ছাত্র ও ছাত্রীদের আরও সুস্পষ্ট হয়েছে। বিষয়টি এখন পরিপূর্ণ রূপ লাভ করেছে। তাই এ বিষয়টিকে পুস্তিকাকারে পরিবেশন করার প্রয়োজন বোধ করছি। দুর্বল শরীর নিয়ে যেমন কোন কাজ করার ক্ষমতা থাকে না, দুর্বল ঈমান নিয়েও ঈমানের কোন দাবি পূরণ করা সম্ভব হয় না। তাই যারা ঈমানের দাবিদার তাদের এ বিষয়ে বিশেষভাবে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। এ প্রয়োজন পূরণে সহযোগিতা করাই এ লেখার উদ্দেশ্য। এ বড় আশা নিয়ে আমি লিখছি যে, যারা একবার ইসলামী আন্দোলনের শরীক হয় তারা যদি ঈমান সম্পর্কে এ সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করে তাহলে কেউ আল্লাহর রহমতে ঈমানের দাবি পূরণ করতে ব্যর্থ হবে না। মানুষে মানুষে যোগ্যতার পার্থক্য আছে এবং থাকবে। ঈমানের দিক দিয়ে দুর্বল না হলে প্রত্যেকেই তার যোগ্যতা অনুযায়ী ভূমিকা রাখতে সক্ষম। আল্লাহ তাআলা আমার এ আশা পূরণ করুন।

গোলাম আযম

জুন, ২০০২

মজবুত ঈমান

এ বিষয়টি ছয়টি পয়েন্টে বিভক্ত করে আলোচনা করতে চাই।

১. ঈমান মানে কী? বিশ্বাস বলতে কী বুঝায়? বিশ্বাসের সংজ্ঞা কী? কর্মের সাথে বিশ্বাসের সম্পর্ক কী? বিশ্বাস কত রকম হতে পারে?

২. মানব জীবনে বিশ্বাসের প্রয়োজনীয়তা কী?

৩. ইসলামে ঈমান সম্পর্কিত বিষয় (ঈমানিয়াত) কী কী? কেউ ইসলাম গ্রহন করে মুসলিম হতে চাইলে তাকে কী কীবিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে?

৪. আল্লাহর উপর ঈমান আনলে আল্লাহর সাথে কেমন সম্পর্ক কায়েম হয়?

৫. ঈমান কী কারণে দুর্বল হয়? কোন পথে ঈমানে দুর্বলতা আসে?

৬. মযবুত ঈমানের শর্ত কী কী? কোন কোন শর্ত পূরণ হলে ঈমান মযবুত হয়?

১. ঈমান মানে কী?

ঈমানী আরবী শব্দ। এর সহজ অর্থ হলো বিশ্বাস। বিশ্বাস বলতে কী বুঝায়? এটা অত্যন্ত গুরত্বপুর্ণ বিষয়।

একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বুঝতে সুবিধা হবে। ধরুন এক পরিচিতি লোক এসে আমাকে বললেন, ভাই, আমাকে এক হাজার টাকা ধার দিন। আমি এক মাস পরই ফেরত দিয়ে যাব।

এক মাস পর টকাটা ফেরত দেবে কি না সে বিষয়ে আমার সরাসরি জানা নেই। আমি তাকে কী বলবো? তাকে তো আর একথা বলা যায় না যে, এক মাস পর ফেরত দেন কি না আগে দেখে নিই। তাহলে তাকে কী বলব? আমার কাছে লোকটি ধার চেয়েছে, হয় তাকে ধার দেব, আর না হয় ধার দিতে অস্বীকার করব। ধার দেব কি দেব না এ বিষয়ে কিভাবে আমি সিদ্ধান্ত নেব? টাকা সত্যি ফেরত দেবে কি না সে বিষয়ে ডাইরেক্ট নলেজ বা প্রত্যক্ষ জ্ঞান তো নেই। তাই বাধ্য হয়ে আমাকে পরোক্ষ জ্ঞানের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমি তাকে যতটুকু জানি তাতে আামার মনে এ বিশ্বাস হয় কি না যে, লোকটি ওয়াদা পালন করবে। যদি তার উপর আমার বিশ্বাস হয় যে, এ লোক টাকা ফেরত দেবে তাহলে আমি তাকে ধার দেব। মোট কথা, ধার দেওয়ার এই সিদ্ধান্তটার ভিত্তিই হলো বিশ্বাস। যদি তার অতীত আচরণ থেকে তার উপর আমার এ বিশ্বাস না হয় যে, টাকাটা ফেরত দেবে, তাহলে আমি ধার দেব না। আমি যে তাকে অবিশ্বাস করলাম, তাও পরোক্ষ জ্ঞানের মাধ্যমে। তাকে ধার দিতে অস্বীকার করলে সে নিশ্চয়ই বলবে, আমাকে বিশ্বাস করেন না? আমি যে তাকে অবিশ্বাস করলাম, এটাও কিন্তু বিশ্বাস। অর্থাৎ আমার বিশ্বাস যে, সে টাকা ফেরত দেবে না। তাকে আমি টাকা দিলামই না। কী করে জানলাম যে, সে টাকা ফেরত দেবে না? পরোক্ষ জ্ঞানের মাধ্যমেই আমি এ বিশ্বাসে পৌছেছি।

তাহলে বিশ্বাসের সংজ্ঞা কী দাঁড়াল? যে বিষয়ে সরাসরি জ্ঞান নেই, অথচ সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হচেছ ; তখন পরোক্ষ জ্ঞানের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া উপায় নেই; এভাবে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় তারই নাম বিশ্বাস।

একটি বড় উদাহরণ

মৃত্যুর পর আবার জীবিত হতে হবে কি না এ বিষয়ে সরাসরি জ্ঞান নেই। কিন্তু এ বিষয়ে নির্লিপ্ত থাকারও উপায় নেই। যদি মৃত্যুর পর আরও একটি জীবন থাকে তাহলে আমাকে সে হিসাব মনে রেখেই দুনিয়ায় চলতে হবে। যদি না থাকে তাহলে বেপরোয়া চলা সহজ মনে হতে পারে। তাই এ বিষয়ে চুপ থাকার উপায় নেই। হয় আছে মনে করতে হবে আর না হয় নেই বলে ধারণা করতে হবে এবং স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হবে।

এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত কিভাবে নেব? কেউ ঐপারে থেকে ফিরে আসে না। এপার থেকে উঁকি মেরে দেখাও সম্ভব নয়। পরকাল একেবারেই অদৃশ্য। পবিত্র কুরআনে অনেক সূরায় শুধু আখিরাতকে বিশ্বাস করার জন্য যুক্তি পেশ করা হয়েছে। এসব জ্ঞানের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে জানা যায় যে,  পরকাল অবশ্যই আছে।

পরকাল সম্পর্কে সরাসরি জ্ঞান নেই, অথচ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত পৌঁছাতেই  হবে। বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়। তাই ঐ সিদ্ধন্ত পরোক্ষ জ্ঞানের মাধ্যমেই সম্ভব। এভাবেই অদৃশ্য বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এ সিদ্ধন্তটাই বিশ্বাস।

বিশ্বাসের তিন অবস্থা

যে দুটো উদাহরণ পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে এর ভিক্তিতে বিশ্বাসের তিনটি অবস্থা হলোঃ

১. ইতিবাচক বিশ্বাস

ক. আমার বিশ্বাস হয় যে,  লোকটিকে ধার দিলে টাকা ফেরত পাওয়া যাবে।

খ. আমার বিশ্বাস হয় যে,  মৃত্যুর পর আবার জীবিত হতে হবে।

২. নেতিবাচক বিশ্বাস

ক.আমার বিশ্বাস যে, লোকটি ধার নিলে টাকা ফেরত দেবে না।

খ. আমার বিশ্বাস যে, মৃত্যর পর আর কোনো জীবন নেই।

৩. সন্দেহ

ক. লোকটি টাকা ফেরত দিতেও পারে নাও দিতে পারে।

খ. মৃত্যুর পর আবার জীবিত হতেও পারে নাও হতে পারে।

সন্দেহ মানে কোনো রকম বিশ্বাস এখনো জন্মেনি। ইতিবাচক বা নেতিবাচক কোনো বিশ্বাস না হওয়াই সন্দেহ।

বিশ্বাস ও কর্মের সম্পর্ক

বিশ্বাসের সাথে কর্মের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। যে ধরনের বিশ্বাস হয় সে অনুযায়ীই কর্ম হয়ে থাকে। বিশ্বাসের বিপরীত কর্ম হয় না। বিশ্বাস তিন রকম হলেও কর্ম তিন রকম হয় না। ইতিবাচক বিশ্বাসের কর্ম এক রকম। আর নেতিবাচক বিশ্বাস ও সন্দেহের ভিত্তিতে কর্ম একই রকম হয়। যেমনঃ যদি আমার বিশ্বাস হয় যে লোকটি টাকা ফেরত দেবে তাহলে আমি তাকে টাকা ধার দেব।

যদি বিশ্বাস হয় যে ফেরত দেবে না তাহলে আমি তাকে ধার দেব না। সন্দেহ হলেও ধার দেব না।

যে রকম বিশ্বস হয় সে অনুযায়ীই কর্ম হয়। কর্মের পেছনে অবশ্যই বিশ্বাস রয়েছে। বিশ্বাস ছাড়া কর্ম হতে পারে না। বিশ্বাসের বিপীতও কর্ম হয় না। বিশ্বাস ও কর্ম একেবারেই ঘনিষ্ঠ।

২.মানব জীবনে বিশ্বাসের প্রয়োজনীয়তা কী?

সরাসরি জ্ঞানের উৎস হলো পাঁচটি ইন্দ্রিয়। এ দ্বারা অতি সামান্য জ্ঞানই হাসিল করা যায়। শুধু এটুকু জ্ঞানের দ্বারা মানুষের জীবন চলে না। সামান্য কিছু ক্ষেত্র ছাড়া মানুষকে বিশ্বাসের উপর নির্ভর করেই চলতে হয়।

১. শৈশবে মা বলে দিয়েছেন যে, অমুক আমার বাবা। বিশ্বাস করেছি। এ বিষয়ে সরাসরি জ্ঞানের কোনো সুযোগ নেই।

২. বাংলা ভাষা শিখার জন্য অ,আ, ক, খ, তে বিশ্বাস করেই এ ভাষা শিখতে হয়েছে।

৩. অসুখ হলে ডাক্তারের উপর বিশ্বাস না করলে চিকিৎসা পাওয়া অসম্ভব।

৪. ফসল হবে এ কথা বিশ্বাস না হলে কৃষক চাষাবাদই করতে পারবে না।

৫. বিচারকের মনে সাক্ষী প্রমাণ নিয়ে আসামি দোষি বলে বিশ্বাস সৃষ্টি হলেই শাস্তি দেয়, বিশ্বাস না হলে বা সন্দেহে হলে শাস্তি দেয় না।

৬. যে কোন সময় মৃত্যু আসতে পারে। তবু মানুষ আরও বেঁচে  থাকবে বিশ্বাস করে বলেই জীবন সচল আছে।

৭. মানুষে মানুষে সম্পর্ক বিশ্বাসের উপরই কায়েম থাকে। স্বামীস্ত্রীর সম্পর্ক, ভাই –ভাইয়ে সম্পর্ক, বন্ধুত্বের সম্পর্ক, ব্যবসায়-বাণিজ্যের সম্পর্ক সবই বিশ্বাসনির্ভর।

হিসাব করলে দেখা যাবে যে, বিশ্বাস ছাড়া একদিনও মানুষ চলতে পারে না। বিশ্বাসই গোটা জীবনকে ঘিরে রেখেছে।

না দেখে বিশ্বাস করি না

আজব মগজের এমন কিছু লোক আছে, যারা বহু বিষয়েই বাধ্য হয়ে বিশ্বাস করে, কিন্তু আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বসের বেলায় বলে, ‘না দেখে বিশ্বাস করি না’।

মযবুত ঈমান সম্পর্কে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সমাবেশ আলোচনাকালে ‘না দেখে বিশ্বাস করি না’ কথাটার অসারতা প্রমাণ করার জন্য একটা সহজ উদাহরণ দিয়ে থাকি। আমার হাতের মুঠোয় এক গুচ্ছ চাবি রেখে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে বলি, ‘আমি দাবি করে বলছি যে, আমার হাতে এক গুচ্ছ চাবি আছে, তোমরা কি এ কথা বিশ্বাস কর’? ছেলেরা বলে, হ্যাঁ; বিশ্বাস করি। আবার জিজ্ঞেস করি, কেন বিশ্বাস কর? জবাবে বলে, আমরা বিশ্বাস করি যে, আপনি মিথ্যা বলেন না। তাই আপনি যখন বলছেন, চাবি আছে তখন আমরা এ কথা বিশ্বাস করি।

মুষ্টি খুলে চাবিটি দেখিয়ে আবার জিজ্ঞেস করি, এটা চাবি তা বিশ্বাস কর? তখন কেউ কেউ বলে ফেলে, হ্যাঁ; বিশ্বাস করি। আমি বলি, যখন চাবিটি অদৃশ্য ছিল তখনই বিশ্বাসের প্রয়োজন ছিল। চাবিটি দেখার পর বিশ্বাসের আর প্রয়োজন রইল না। যারা দেখার পরও বিশ্বাস করি বলেছ তারা বিশ্বাসের বাজে খরচ করেছ। দেখলে আর বিশ্বাসের দরকার হয় না। না দেখলেই বিশ্বাসের প্রয়োজন হয়। তাই ‘না দেখে বিশ্বাস করি না’  কথাটি একেবারেই হাস্যকর ও অযৌক্তিক। বোকাদের পক্ষেই এমন কথা বলা সম্ভব। কোনো নাস্তিকও তার মাকে এ কথা বলতে পারবে না, মা ছোট সময় না বুঝে তোমার কথা মেনে নিয়ে বিশ্বাস করেছি যে, অমুক আমার বাবা, এখন আমি না দেখে কোনো কিছু বিশ্বাস করি না। তাই আমাকে দেখাও কেমন করে ঐ লোক আমার বাবা। এ কথা না দেখেও বিশ্বাস করে। শুধু আল্লাহর বেলায় না দেখে সে বিশ্বাস করে না।

বাস্তব জীবনে বিশ্বাস ছাড়া মানুষ একদিনও চলতে পারে না। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ে ও তাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য বিশ্বাসের আশ্রয় নিতে হয়। এ অবস্থায় আল্লাহ, ওহী, রাসূল, আখিরাত ইত্যাদি বিরাট বিরাট বিষয়ে বিশ্বাসের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার না করা বুদ্ধিমানের লক্ষণ নয়।

জ্ঞান চর্চা বিশ্বাস দিয়েই শুরু হয়

সকল জ্ঞান একমাত্র আল্লাহরই নিকট রয়েছে। প্রত্যেক বিষয়ে জ্ঞানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শুধু আল্লাহই জানেন।  তিনিই শুরু, তিনিই শেষ। যে কোনো জ্ঞান চর্চা করতে হলে প্রথমেই কতক বিষয়কে বিশ্বাস করতে হয়। A,B,C,D বা ক,খ,গ, যেভাবে লেখা আছে এগুলোকে বিনা যুক্তিতে মেনে নিয়েই ভাষা শেখা শুরু করতে হয়। কেই যদি তর্ক করে যে, এভাবে কেন, অন্যভাবে লিখলে দোষ কী? তাহলে তার ভাষা শেখা শুরু করাই সম্ভব হবে না।

জ্যামিতি পড়তে হলে প্রথমেই কতক Axiom বা স্বতঃসিদ্ধ বিষয়ে বিশ্বাস করতে হয় । যেমন বিশ্বাস করতে হয় যে, বিন্দুর (Pount) দৈর্ঘ্য, প্ৰস্থ, উচ্চতা কোনটাই নেই, তবু বিন্দুর অস্তিত্ব আছে। যদিও পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র অনুযায়ী এটা একেবারেই অযৌক্তিক। তথাপি এটা বিশ্বাস না করলে জ্যামিতি শেখা শুরুই করা যায় না।

বিজ্ঞান চর্চা প্ৰথমে হাইপথেসিস (কল্পনা, অনুমান) দিয়েই শুরু হয়। মাধ্যাকর্ষণ শক্তির আবিষ্কারক নিউটন সম্পর্কে জানা যায় যে, ফলের বাগানে বসা অবস্থায় তাঁর সামনে গাছ থেকে একটা আপেল নিচে পড়লো। এর আগেতো বহুবার তিনি আপেল পড়তে দেখেছেন; কিন্তু সেদিন তাঁর মনে প্রশ্ন জাগলো যে, উপরেও শূন্য নিচেও শূন্য। তাহলে ফলটি উপরের দিকে না যেয়ে নিচের দিকে নামল কেন? তাঁর মনে এ দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাল যে, পৃথিবীর মধ্যে এমন কোন শক্তি আছে যা বস্তুকে আকর্ষণ করে। এভাবে বিশ্বাসের ভিত্তিতে বৈজ্ঞানিক গবেষণার সূচনা হয়।

জ্ঞানের ময়দানে কোন বিষয়েই জ্ঞানের শুরু বা শেষ মানুষের আয়ত্তে নেই। প্ৰথমে বিশ্বাস দিয়ে জ্ঞান চর্চা শুরু হয় এবং একটি পৰ্যায় পর্যন্ত যেয়ে চর্চা থেমে যায়। জ্ঞানের শেষ পর্যন্ত পৌছার সাধ্য মানুষের নেই।

৩. ইসলামে ঈমান সম্পর্কিত বিষয় কী কী?

ইসলাম গ্রহণ করতে হলে বা মুসলিম হতে হলে ৭টি বিসয়ের উপর ঈমান আনতে হবে। ইসলমে ঈমান বলতে এ সাতটি বিষয়ের ইপর দৃঢ় বিশ্বাসকে বুঝায় ॥

এগুলোকে ঈমানে মুফসসাল তথা বিস্তারিত ঈমান বলা হয়। আরবীতে এগুলোকে শিখতে হয়।

امَنْتُ بِاللهِ وَمَلئِكَتِه وَكُتُبِه وَرَسُوْلِه وَالْيَوْمِ الْاخِرِ وَالْقَدْرِ خَيْرِه وَشَرِّه مِنَ اللهِ تَعَالى وَالْبَعْثِ بَعْدَالْمَوْتِ

 অর্থাৎ আমি ঈমান আনলাম আল্লাহ, তার ফেরশতাগণ, তার কিতাবসমূহ, তার রাসূলগণ, শেষ দিন (পরকাল), তাকদীরের ভালো ও মন্দ আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয় এবং মৃত্যুর পর পনরুজ্জীবন এর প্রতি।

ঈমানের প্রধান বিসয় তিনটি তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাত। ঐ৭টি বিষয় এ তিনটিরই অর্ন্তভূক্ত। তাওহিদের মধ্যে শামিল রয়েছে তিনটি-  আল্লাহ, ফেরেশতাগণও তাকদীর।রিসালতের মধ্যে দুটি কিতাবসমূহ ও রাসূলগণ। আর আখিরাতের মধ্যে দুটি-  শেষ দিন ও মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবন।

তাওহীদের মধ্যে আল্লাহর সাথে ফেরেশতাকে এ জন্যই শামিল করা হয়েছে যে, ফেরেশতাদের সম্পর্কে মানুষের ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। তাদেরকে আল্লাহর কন্যা বলে বিশ্বাস করা হত। আল্লাহ জানিয়ে দিলেন যে, ফেরেশতারা আল্লাহর দাসও কর্মচারী মাত্র। তারা আল্লাহর কোনো ক্ষমতায় সামান্যতম শরীকও নয়। তাদের সম্পর্কে এ ধারণা থাকলে আল্লাহর সাথে কোনো দিক দিয়েই তাদেরকে শরীক করার আশঙ্কা থাকে না।

তাকদীর মানে সর্ববিষয়ে চূড়ান্ত ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর হাতে। যে বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত তিনি করেন, সেটাই তাকদীর। মানুষের জীবনে ভালো ও মন্দ যাই ঘটে তা আল্লাহর সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই ঘটে থাকে। সেখানে অনথ্য কোন শক্তির হাত নেই। আল্লাহর এই একচ্ছত্র আধিপত্য ও কর্তৃত্ব তাওহূদেরই অর্ন্তভূক্ত।

৪.আল্লাহর সাথে সম্পর্কের বাস্তব রূপ কী?

আল্লাহর উপর ঈমান আনলে আল্লাহর সাথে বান্দাহর বিশেষ সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। আল্লাহ তায়াল এ সম্পর্ককে সূরা নাস এ তিনভাবে প্রকাশ করেছেনে।

১. رَبِّ النَّاس মানুষের রব বা প্রতিপালক। যাবতীয় প্রয়োজন পূরণকারী রক্ষণাবেক্ষণকারী ইত্যাদি। আর মানুষ তার দয়ার ভিখারি তার একান্ত অনুগৃহীত ও প্রতিপালিত।

২. مَلِكِ النَّاسِ   মানুষের বাদশাহ। তিনি রাজা আর মানুষ তার প্রজা। কোনো অবস্থায়ই কারো পক্ষে তার রাজত্বের বাইরে যাওয়ার উপায় নেই। তার রাজ্যের নিয়ম কানুন ও বিধি বিধান মানুষ আবদ্ধ। ভালো বা মন্দ কিছু করার ইচ্ছা ও চেষ্টার ইখতিয়ারটুকু শুধু মানুষকে দেওয়া হয়েছে। কিন্ত কোন কাজ সমাধা করার কোনো ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। কর্ম সমাধা করা আল্লাহর উপর সম্পূর্ণ নিভরশীল। শুধু ইচ্ছা ও চেষ্টা করা হলেই মানুষ কর্মের পুরস্কার বা শাস্তি পাবে। কর্ম সম্পন্ন না হলেও এর বদলা পাবে। ইচ্ছা ও চেষ্টার সামান্য ইখতিয়ারটুকু ছাড়া আল্লাহ তার প্রজাকে ক্ষমতাই দেননি।

৩. إِلَٰهِ النَّاسِ  আল্লহই মানুষের একমাত্র ইলাহ মাবুদ হুকুমদাতা প্রভু ও মুনিব। তার হুকুমের বিরোধী কোনো হুকুম মানার অধিকার মানুষের নেই।

রাসূল (সাঃ) বলেনঃ

স্রষ্টাকে অমান্য করে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য চলে না।

এসব সম্পর্কের স্বাভাবিক দাবি

যে আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর উপর ঈমান আনে তার ঈমানের দাবি সে পূরণ করতে সক্ষম হয়।

১. সে আল্লাহর একমাত্র রব হিসেবে মেনে নেয়। যা কিছু সে দুনিয়ায় ভোগ করে এর জন্য সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর প্রতিই জ্ঞাপন করে। তার দেহে যত নিয়ামত আছে তার অন্তরে যত সুকামনা আসে তার মনে যত সুচিন্তা আসে নেক কাজের যত ইচ্ছা মনে জাগে সৎকাজের জন্য চেষ্টা করার যতটুকু তাওফীক হয় আল্লাহর সৃষ্টি জগতের যা কিছু ব্যবহার করা ও ভোগ করার সুযোগ সে পায় এ সকল বিষয়েই সে একমাত্র আল্লাহর নিকট শুকরিয়া জানায়। একমাত্র তারই প্রতি কৃতজ্ঞতায় মাথা নত করে এবং মনে তারই অনুগ্রহের তৃপ্তি বোধ করে। প্রতিটি আপদ বিপদকে তার পক্ষ থেকে মনে করে। সে আল্লাহকেই একমাত্র রিযকদাতা ও প্রয়োজন পূরণকারী মনে করে। কঠিন মুসীবতেও সে পেরেশান হয় না। কোনো অবস্থায়ই তার রব থেকে নিরাশ হয় না। সব কিছুর মধ্যে আল্লাহ তার জন্য মঙ্গল ও কল্যাণ রেখেছেন বলে বিশ্বাস করে। একমাত্র তারই উপর নির্ভর করে মনে সান্তনা বোধ করে।

২. সে আল্লাহকে একমাত্র বাদশাহ মনে করে এবং আর কোনো শক্তির পরওয়া সে করে না। কোনো বড় শক্তিই তার নিকট বড় নয়। যিনি সকল বাদশাহর বাদশাহ সে নিজেকে তারই স্নেহভাজন প্রজা মনে করে। কারো দাপটে সে ভীত হয় না। আল্লাহ ছাড়া আর কোনো শক্তিকে ভয় করার সামান্য প্রয়োজনও সে বোধ করে না। কেউ তার কোনো ক্ষতি করতে পারে বলে সে মনে করে না। সে পরম সাহসী ও চরম নির্ভীক। দুনিয়া ও আখিরাতে সে আল্লাহকেই একমাত্র ওলী বা স্নেহপরায়ণ অভিভাবক মনে করে। সর্বাবাস্থায় সে অন্তরে প্রাশান্তি বোধ করে। কোনো অবস্থায়ই বিচলিত হওয়া প্রয়োজন মনে করে না। নিজেকে সে আল্লাহর সৈনিক মনে করে এবং তার বাদশাহর রাজত্ব কায়েম করা ও কায়েম রাখা সবচেয়ে বড় কর্তব্য মনে করে। আল্লাহর অপছন্দনীয় সবকিছু উৎখাত করার জযবা রাখে। সে আল্লাহ তাআলাকেই আর সব কিছু থেকে ভালোবাসে তার সন্তুষ্টি লাভের চেয়ে বড় কোনো আকাঙক্ষা তার থাকে না। মালিকের সন্তষ্টির জন্য জান কুরবান করার মধ্যেই সে গৌরব বোধ করে। শয়তানের রাজত্ব উৎখাত করে আল্লাহর রাজত্ব কায়েমের লক্ষ্যে জান ও মাল কুরবান করার জন্য সর্বাত্মাক চেষ্টা করাই জান্নাত লাভের সোপান মনে করে।

৩. আল্লহই একমাত্র ইলাহ বলে বিশ্বাস করে। তার হুকুমের বিরোধী কারো হুকুম পালান করতে সে এক বিন্দু প্রস্তুত নয়। তার আদেশ পালন করা ও তার নিষেধ থেকে নিজেকে বিরত রাখাই তার দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবন ও আখিরাতের চিরস্থায়ী জীবনের সাফল্যের একমাত্র উপায় বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। এটাই আল্লাহর নৈকট্য লাভের একমাত্র পথ বলে সে মনে করে। দুনিয়ার শাস্তি ও আখিরাতের মুক্তির জন্য আর কোন বিকল্প উপায় আছে বলে সে বিশ্বাস করে না।

৫. কীভাবে ঈমানে দুর্বলতা দেখা দেয়?

আল্লাহ তায়ালার প্রতি সত্যিকার ঈমান থাকলে তার সাথে যে সব সর্ম্পক গড়ে উঠে এ সম্পর্কের দাবি পূরণ করাই মুমিনের জন্য স্বাভাবিক। কিন্তু ঈমানের দাবিদার হওয়া সত্তেবও ঈমানের দাবি পূরণে সেই ব্যর্থ হয় যার ঈমান দুর্বল। তাই প্রত্যেক মুমিনেরই এ বিষয়ে সঠিক ধারণা থাকা প্রয়োজন যে কোন পথে ঈমনে দুবর্লতা আসে। যখনই ঈমানে দুবলতা দেখা দেবে তখনই আল্লাহর সাথে সর্ম্পক ছিন্ন হয়ে যাবে। এটা বিরাট কথা। এ বিষয়ে চরম সতর্কতা প্রয়োজন।

আল্লাহ তাআলা দুনিয়ায় বহু কিছুর সাথে আমাদের ভালোবাসার সর্ম্পক গড়েছেন। সেসব সর্ম্পক ত্যাগ করার অনুমতিও তিনি দেননি। বরং এসব সর্ম্পককে তিনি সজ্জা  বলে ঘোষণা করেছেনেঃ

زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالْأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ۗ ذَٰلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَاللَّهُ عِندَهُ حُسْنُ الْمَآبِ

মানুষের জন্য তাদের পছন্দসই জিনিস নারী সন্তান সোনা রুপার স্তপ বাছাই করা ঘোড়া পালিত পশু ও চাষের জমি খুবই কামনার বিষয় বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব দুনিয়ার কদিনের জীবিকা মাত্র। আসলে যা ভালো আশ্রয় তা তো আল্লাহর কাছেই আছে। (সূরা আলে ইমারান :১৪)

এসব ভালোবাসার বিষয় দ্বারা মানুষের জীবনকে সাজিয়ে দেওয়া  হয়েছে বলে আল্লাহর স্বয়ং ঘোষণা করলেন। এসব ভালোবাসার সজ্জাকে ত্যাগ করে বৈরাগী বা সন্ন্যাসী হয়ে গেলে আল্লাহর নিকট অপরাধী সাব্যস্ত হবে। দুনিয়ায় যেসব জিনিসের সাথে আল্লাহ নিজে এ ভালোবাসার সম্পর্ক সৃষ্টি করেছেন, এসব ভালোবাসার পরিমাণও তিনি ঠিক করে দিয়েছেন। ঐ পরিমাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসলেই ঈমান দুর্বল হয়। আল্লাহ বলেন,

قُلْ إِن كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُم مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّىٰ يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ ۗ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ

(হে রাসূল! আপনি তাদেরকে) বলুন, তোমাদের পিতামাতা, সন্তানাদি,ভাই বোন, স্ত্রীগণ আত্মীয়Ñস্বজন, ঐ মাল যা তোমরা অজর্ন করেছ, তোমাদের ঐ কারবার তোমরা যার মন্দার ভয় কর এবং তোমাদের ঐ বাড়ি যা তোমরা পছন্দ কর (এসব) যদি তোমাদের নিকট আল্লাহ, তার রাসূল ও তার পথে জিহাদের চেয়ে বেশি প্রিয় হয়, তাহলে আল্লাহর ফায়সালা (মৃত্যু) আসা পযর্ন্ত অপেক্ষা কর। আল্লাহ ফাসিকদেরকে হেদায়াত করেন না।(সূরা তাওবা:২৪)

এ আয়াতে অতি স্পষ্ট ভাষায় দুনিয়ার ভালোবাসার জিনিসগুলোকে কী পরিমাণ ভালোবাসা যাবে তা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আল্লাহ, রাসূল ও আল্লাহর পথে জিহাদের চেয়ে বেশি ভালোবাসলেই ঈমান দুর্বল বলে প্রমাণিত হবে। যখন ঐ আটটি জিনিসের ভালোবাসা এ তিনটির চেয়ে বেশি হবে তখনি ঈমানের বিপদ। আল্লাহ, রাসূল, জিহাদের ভালোবাসার সাথে ঐ ৮টি জিনিসের ভালোবাসার যখনি টক্কর হবে, তখন তিনটির ভালোবাসা নিষিদ্ধ নয়; বরং কর্তব্য। কিন্তু ঈমান নিরাপদ থাকবে। ঐ আটটির ভালোবাসা নিষিদ্ধ নয়; বরং কর্তব্য। কিন্তু তিনটির চেয়ে ঐ ৮টির ভালোবাসা বেশি হলেই প্রমাণিত হবে যে, ঈমান দুর্বল।

একটি চমৎকার উদাহরণ এ কথাটিকে সুন্দর ভাবে স্পষ্ট করে দেয়। পানির অপর নাম জীবন। পানি ছাড়া জীবন বাঁচে না বলেই এ কথাটি বলা হয়। কিন্তু মানুষ কি পানিতে ডুবে মরে না? তাহলে পানিকে জীবন বলা যায় কী করে? আসল কথা হলো, এক বিশেষ পরিমাণ পানি অবশ্যই জীবন। এ পরিমাণের বেশি হলে পানিই মরণ। তেমনিভাবে আল্লাহ, রাসূল ও জিাহাদের প্রতি ভালোবাসার চেয়ে ঐ আটটি জিনিসের ভালোবাসা কম হলে এটাই ঈমানের জীবন। আর ৩টি থেকে ৮টির বালোবাসা বেশি হলেই ঈমানের মরণ।

আল্লাহ, রাসূল ও ইসলামী আন্দোলনের প্রতি দায়িত্ব পালনের পথে যখন ঐ আটটি ভালোবাসার বস্তু প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়, তখন ঐ দায়িত্ব পালনে বাধার সৃষ্টি হয়। এ বাধা দূর করতে পারলে, অর্থাৎ তিনটির ভালোবাসার খাতিরে যদি আটটির ভালোবাসা কুরবানী দেওয়া যায়, তাহলে প্রমাণিত হবে যে, ঈমান দুর্বল নয়। ঈমান দুর্বল হলে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। কারণ তখন আর ঈমানের দাবি পূরণ করার শক্তি থাকে না।

সম্পদ ও সন্তানকে আল্লাহ্‌ সজ্জা ও বলেছে , ফিতনাও বলেছেন-

الْمَالُ وَالْبَنُونَ زِينَةُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَالْبَاقِيَاتُ الصَّالِحَاتُ خَيْرٌ عِندَ رَبِّكَ ثَوَابًا وَخَيْرٌ أَمَلًا

সম্পদ ও সন্তানাদি দুনিয়ার জীবনের সজ্জা।(সূরা কাহফ:৪৬)

إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ

নিশ্চয়ই তোমাদের মাল ও সন্তান ফিতনা’ (সূরা তাগাবুন:১৫)

ঐ আটটি ও তিনটির ভালোবাসায় যদি ভারসাম্য রক্ষা কর হয় তাহলে সম্পদ ও সন্তান জীবনের সজ্জা। আর যদি আটটির ভালোবাসা বেশি হয় তাহলে সম্পদ ও সন্তান ফিতনা। ইসলামী পরিভাষায়, আল্লাহর হুকুম পালনে বাধাকেই ফিতনা বলা হয়। এর শাব্দিক অর্থ  পরীক্ষা, বিপদ, গোলাযোগ, আকর্ষণ, বিশৃঙ্খলা, ইত্যাদি।

সূরা মুনাফিকূনের দ্বিতীয় রুকুর প্রথম আয়াতে আল্লাহ বলেনঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ ۚ وَمَن يَفْعَلْ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ

হে ঐসব লোক যারা ঈমান এনেছে শোন! তোমাদের মাল ও আওলাদ (সম্পদও সন্তান) যেন তোমাদরেকে আল্লাহর কথা ভুলিয়ে না দেয়। এসবের ভালোবাসায় এমন মগ্ন হয়ে যেয়ো না, যার কারণে ঈমানের দাবি পূরণে অবহেলা হয়ে যায়।

About শহীদ অধ্যাপক গোলাম আযম