মযবুত ঈমান

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

৬. মযবুত ঈমানের শর্ত কী কী?

মযবুত ঈমানের প্রধান শর্ত দুটোঃ

১. র্শিকমুক্ত ঈমান বা নির্ভেজাল তাওহীদ।

২. ঈমানের দাবিদারকে তাগূতের কাফির হতে হবে।

সুতরাং মযবুত ঈমানের অধিকারীকে তাওহীদ, শিরক  তাগূত সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পেতে হবে।

তাওহীদ ও শিরক

তাওহীদের সম্পূর্ণ বিপরীত পরিভাষা হলো শিরক  । তাওহীদ শব্দের অর্থ হলো অদ্বিতীয়তাবাদ।সাধারণ এর অর্থ করা হয় একাত্ববাদ। এ অর্থটি ত্রুটিপূর্ণ। আরবী ওয়াহিদ শব্দের অর্থ এক, আর আহাদ অর্থ অদ্বিতীয়।

قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ  বল যে, আল্লাহ অদ্বিতীয়। একের পর দুই, তিন ইত্যাদি সংখ্যা রয়েছে। তাই একাত্ববাদ বললে মূল মর্মটি বুঝায় না।অদ্বিতীয় মানে, যার কোনো সমকক্ষ নেই, এমনকি যার সাথে তুলনা করার মতোও কেউ নেই।

তাওহীদ সম্পর্কে সঠিক ধারণা পেতে হলে র্শিক সম্বন্ধে সুস্পষ্ট জ্ঞান থাকতে হবে। কারণ তাওহীদ মানেই র্শিক না থাকা। তাওহীদের সবচেয়ে স্পষ্টও সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞাই হলো র্শিকমুক্ত ঈমান। যেমন আলোর সহজ সংজ্ঞা হলো অন্ধকার না থাকা। তাই শিরক সম্পর্ক বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন।

যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে তারা কাফির। যারা শিরক করে তারা আল্লাহকো অস্বীকার করে না। তারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে বটে কিন্তু আল্লাহর সাথে অন্যান্য সত্তা বা শক্তিকে বিভিন্ন ভাবে শরীক করে। তাদেরকে মুশরিক বলা হয়।

শিরক শব্দটির অর্থ হলো শরীক করা। আল্লাহর সাথে কী কী ভাবে শরীক করা হয় তা বুঝতে পারলে শিরক সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে এবং শিরক থেকে বেচে থাকাও সহজ হবে।

মাওলানা মওদূদী (র) তার বিখ্যাত তাফসীর তাফহীমুল কুরআনে সূরা আনআমের ১২৮নং টীকায় শিরক সম্পর্কে যে আলোচনা করেছেনে এর সমামানের কোন আলোচনা আমি পাইনি। কুরআন মাজীদে শত শত আয়তে শিরকের কথা আছে এবং ঐসব জায়গায়ই টীকাও আছে। আমার জানা মতে সূরা আনআমের ১২৮নং টীকাতে শিরকের পূর্ণঙ্গ ব্যাখা পাওয়া যায়। অন্যান্য শত শত টীকায় কোথাও ১০% কোথাও ৫০% ব্যাখ্যা আছে।১২৮নং টাকাটি ভালোভাবে হজম করতে পারলে অন্যান্য টীকা পড়ার দরকারই হবে না। আমি সে ব্যাখাটিই এখানে পেশ করছি।

শিরক চার প্রকার

যারা আল্লাহর সাথে অন্য সত্তাকে শরীক করে তারা এ কাজটি চারভাবে করে থাকে।

১. আল্লাহর সত্তার (Person) সাথে শরীক করে।

যেমন কাউকে আল্লাহর পুত্র, কন্যা বা স্ত্রী সাব্যস্ত করে। কুরআনে আছে ঃ

وَقَالَتِ الْيَهُودُ عُزَيْرٌ ابْنُ اللَّهِ وَقَالَتِ النَّصَارَى الْمَسِيحُ ابْنُ اللَّهِ

ইহুদীরা হযরত ওযায়িরকে আল্লাহর পুত্র বলে। আর খ্রিষ্টানরা মাসীহ (আ) কে আল্লাহর পুত্র বলে। (সূরা তাওবাঃ ৩০)

খ্রিষ্টানরা হযরত ঈসা (আ) এর মা হযরত মারইয়াম (আ) কে আল্লাহর স্ত্রী মনে করে।

ফেরেশতাগণকে আল্লাহর কন্যা মনে করা হত বলে কুরআনে বহু জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে। দেব দেবীদেরকেও আল্লাহর বংশ বলে বিশ্বাস করা হয়। কতক স্বৈরশাসক নিজেদেকে স্রষ্টার বংশধর বলে দাবি করেছে। এভাবেই আল্লাহর যাতের সাথে অন্য সত্তাকে শরীক করা হয়।

২. আল্লাহর গুণাবলির সাথে শরীক করা।

যেসব গুণ একান্তেই আল্লাহর সেসব গুণ কারো মধ্যে আছে বলে বিশ্বাস করা শিরক। যেমন গায়েবী ইলম বা অদৃশ্য স¤পর্কে জ্ঞান। কারো সম্পর্কে এমন ধারণা করা যে তিনি সবকিছু জানেন দেখেন বা শুনেন এবং সব দোষ ত্র“টি থেকে মুক্ত।

৩.  আল্লাহর ক্ষমতায় অন্য কোনো সত্তাকে শরীক করা। যেসব ক্ষমতা শুধু আল্লাহর সেসব ক্ষমতা আর কারো মধ্যে আছে বলে বিশ্বাস করা শিরক। যেমন

ক. আইন দেওয়া ক্ষমতা হালাল ও হারাম বা জায়েয ও না জায়েয এর সীমা নির্ধারণ করা। মানবজীবনের জন্য বিধি বিধান রচনা করা একমাত্র আল্লাহর ইখতিয়ার। আল্লাহর দেওয়া আইন রচনার ক্ষমতা আছে কিন্তু মৌলিক আইন রচনার অধিকার আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই।

খ.অলৌকিকভাবে কারো উপকার বা ক্ষতি করা প্রয়োজন পূরণ করা, হেফাযত করা রক্ষণাবেক্ষণ করা দোআ শোনা ও কবুল করা ভাগ্য গড়া ও ভাঙা ইত্যাদি আল্লাহ ছাড়া আর কারো পক্ষে করার ক্ষমতা আছে মনে করা।

গ. সন্তান দান করা রোগ দেওয়া ও আরোগ্য করা রিযক দান আপদ বিপদ দেওয়া ও দূর করা ইত্যাদি শুধু আল্লাহর একক ক্ষমতা। এতে কেউ শরীক নেই।

৪.  আল্লাহর অধিকারে আর কাউকে শরীক করা।

যেমন রুকু ও সিজদা করা হাত বেধে নত হয়ে ভক্তি শ্রদ্ধা দেখানো পশু কুরবানী করা বিপদ আপদে কাতরভাবে দোআ করা দয়া ও অনুগ্রহ পাওয়ার আশায় কোনো কিছু দান করা ইত্যাদি একমাত্র আল্লাহর প্রাপ্য বা হক।

প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে কারো অসন্তুষ্টির ভয় করা প্রয়োজন পূরণের ও বিপদ দূর করার জন্য দোআ করা নিঃশর্ত আনুগত্য করা সত্য ও অসত্যের মাপকাঠি গণ্য করা ইত্যাদি শুধু আল্লাহর হক। এসব হকের কোনোটি পাওয়ার যোগ্যতা অন্য কোনো সত্তার আছে বলে মনে করা শিরক। কুরআন মাজীদে বারবার ঘোষণা করা হয়েছে যে আল্লাহ তায়ালা শিরকের গুনাহ মাফ করবেন না। উপর্যুক্ত ৪ প্রকার শিরকের ১নং শিরক মুসলমারদের মধ্যে নেই। কিন্তু বাকি সব রকমের শিরকই মুসলমানদের মধ্যেও ব্যাপকভাবে পাওয়া যায়। এর প্রধান কারণ হলো শিরক সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকা।

প্রচলিত শিরকের উদাহরণ

১. আমাদের দেশে মানুষের মনগড়া আইন চালু আছে। আল্লাহর আইন কায়েমের চেষ্টা না করলে বুঝা গেল যে মানুষের তৈরি চালু আইনকে মন থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। এসব আইন বৈধ মনে করা যে শিরক তা অনেকেই বুঝে না। যারা এসব অবৈধ আইন উৎখাত করে আল্লাহর আইন চালু করার চেষ্টা করে তারা শিরক থেকে বেচে গেল।

২. রিযকের মালিক একমাত্র আল্লাহ। যে পেশাই গ্রহণ করা হোক ঐ পেশা রাযযাক নয়। ঐ পেশা নষ্ট হলেও আল্লাহ অন্য উপায়ে রিযক দিতে সক্ষম।

কোন স্কুল, কলেজ বা মাদরাসার শিক্ষক ইসলামী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। ঐ সব প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে রিযক বন্ধ করার ভয় দেখিয়ে দীনের কাজ থেকে বিরত রাখতে পারে। যদি কেউ চাকরি চলে যাবার ভয়ে ইকামাতে দীনের কাজ বন্ধ করে দেয় তাহলে বুঝা গেল যে সে আল্লাহকে একমাত্র রাযযাক মনে করে না। সে চাকরিকেও রিযকদাতা হিসেবে আল্লাহর সাথে শরীক মনে করে। এভাবেই শিরক ঈমানকে দুর্বল করে। ঈমান শিরকমুক্ত না হলে মযবুত হতে পারে না। যে চাকরি বাচানোর জন্য আল্লাহর পথে জিহাদ করা বন্ধ করল আল্লাহর সাথে তার ঈমানের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল।

কয়েক বছর আগে খুলনা থেকে এক যুবক আলেম আমার সাথে দেখা করলেন। বললেন আমি খুলনায় এক মসজিদের ইমাম ছিলাম। আমি প্রকাশ্যে জামায়াতে ইসলামীর কর্মী হিসেবে দয়িত্ব পালন করছিলাম। মসজিদ কমিটিতে চরমোনাইর পীরের মুরীদদের সংখ্যই বেশি। তারা আমাকে জানালেন যে জামায়াতে ইসলামী ত্যাগ না করলে আমাকে ইমামতী ত্যাগ করতে হবে। আমি চাকরি ছেড়ে চলে এসেছি। কারণ আমি বুঝে শুনে জামায়াতে কাজ করছিলাম।

যদি তিনি চাকরিতে বহাল থাকার জন্য জামায়াত ত্যাগ করতেন তাহলে এটা শিরক হতো এবং আল্লাহর সাথে তার ঈমানের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যেত। তিনি শিরক থেকে মুক্ত ছিলেন বলেই সাহস করে চাকরি ছেড়ে দিলেন।

এর বিপরীত উদাহরণই বেশি পাওয়া যায়। কুমিল্লা জেলার এক দাখিল মাদরাসার দু জন তরুণ শিক্ষক আমার সাথে দেখা করতে এলো। পরিচয় দিতে গিয়ে বলল আমরা দুজনই ছাত্রজীবনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথী ছিলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা যেখানে শিক্ষকতা করছ ওখানে জামায়াতে ইসলামীর সংগঠন নেই? জওয়াবে বলল, অবশ্যই আছে। বললাম, তাহলে জামায়াতের সাথে কী সম্পর্ক তা তো বললে না। বলল, মাদ্রাসার সুপার এত জামায়াতবিরোধী যে, আমরা জামায়াত করছি জানলে মাদ্রাসা থেকে বের করে দেবে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা কি আল্লাহকে রায্যাক মনে কর না? বিস্মিত হয়ে এ কথা কেন বললাম তা জানতে চাইলে। বললাম, তোমরা ঐ মাদ্রসাকেও চাকরী বাচানোর জন্য দীনের দায়িত্ব অবহেলা করছে। এতে ঈমানের দুর্বলতাই প্রকাশ পেল। এতে আল্লাহর সাথে ঈমানী সম্পর্কটাই ছিন্ন হয়ে গেল কি না তোমরা ভেবে দেখ।

৩. আমাদের ধেশে অনেক লোক আজমীরে হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতি (রা:) এবং বাগদাদে হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রা:) এর মাযারে গিয়ে তাদের নিকট সন্তানের জন্য, বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য, রোগ দূর করে দেওয়ার জন্য এবং আরও বিভিন্ন রকম মকসূদ হাসিলের উদ্দেশ্যে দোয়া করে। এসব দোয়া শুধু আল্লাহরই দরবারেই করা প্রয়োজন। বুজুর্গদের মাযারে গিয়ে দোয়া করা সুস্পষ্ট র্শিক। ওখানে গিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করাও সঠিক নয়। আল্লাহর কাছে চাওয়ার জন্য সেখানে যাওয়া অর্থহীন।

মাযার ও কবরের সাথে সম্পর্তিত বহু রকমের র্শিক ব্যাপকভাবে জনগণের মধ্যে চালু রয়েছে।

তাগূতের অর্থ

তাগূত শব্দের অর্থ সীমালঙ্ঘনকারী। আল্লাহ তায়ালা আয়াতুল কুরসীতে তার সার্বভৌম গুণাবলি উল্লেখ করে তারপর বলেনঃ فَمَن يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِن بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَىٰ لَا انفِصَامَ لَهَا ۗ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ

অতএব যে কেউ তাগূতকে অস্বীকার করে আল্লাহর উপর ঈমান এনেছে, সে এমন মযবুত রশি ধরেছে যা কখনও ছিড়বে না। আল্লাহ সব কিছু শুনেন ও জানেন। (সূরা বাকারাঃ ২৫৬)

আল্লহ তায়ালা গুণাবলি উল্লেখ করে এ আয়াতে যা বলা হয়েছে তা খুবই তাৎপর্যপূণ। বলা হয়েছে কেউ যদি উপর্যুক্ত গুণাবলিসম্পন্ন আল্লাহর প্রতি ঈমান আনতে চায় তাহলে প্রথমে তাকে তাগূতের কাফির হতে হবে। তাগূতের কাফির না হয়ে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলে তাগূতের চাপে ও দাপটে সে ঈমানের দাবি পূরণ করতে ব্যর্থ হবে। আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলে আল্লাহর সাথে যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয় তাগূতের চাপে ঐ সম্পর্ক বহাল থাকে না। তাগূতকে মানতে অস্বীকার করলে অর্থাৎ তাগূতের চাপকে অগ্রাহ্য করার হিম্মত করলে আল্লাহতর সাথে ঈমানের সম্পর্ক এমন মযবূত হয় যে তা আর ছিন্ন হয় না। আয়াতে ঈমানের এ সম্পর্কটিকে রশি বা রজ্জুর সাথে তুলনা করা হয়েছে।

এ কারণেই মযবুত ঈমানের শর্ত হিসেবে তাগূতকে অস্বীকার করতে হবে বা তাগূতের কাফির হতে হবে। তাই তাগূত সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন বা তাগূতকে ঠিকমত চিনে নেওয়া দরকার।

তাগূত সম্পকর্কে তাফহীমুল কুরআনের টীকা পড়েও মনে তৃপ্তি বোধ না করায় সরাসরি মাওলানা মওদূদীকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি যা বললেন তা নিম্নরুপ ঃ

আল্লাহতাআলা তার হুকুম মেনে চলার জন্য যেমন বাধ্য করেননি অমান্য করতেও বাধ্য করেননি। মানা ও না মানার ইখতিয়ার মানুষকে দিয়েছেন। আল্লাহর নাফরমানীর দুটো সীমা রয়েছে। প্রাথমিক সীমা হলো ফিসক আর চূড়ান্ত ও শেষ সীমা হচ্ছে কুফর। যে আল্লাহর হুকুম স্বীকার করে বটে কিন্তু পালন করে না সে ফাসিক। আর যে হুকুম কে স্বীকার করে না সে কাফির। যে নাফারমানীর এ দুটো সীমা লঙ্ঘন করে সেই তাগূত।

ব্যক্তিগত ভাবে কেউ ফাসিক বা কেউ কাফির হতে পারে। এটা যার যার ইখতিয়ার বা স্বাধীন ইচ্ছা। আল্লাহর নাফারমানীর এ দুটো সীমা রয়েছে। যে এ সীমাও লঙ্ঘন করে সে হলো তাগূত। এ দুটো সীমা লঙ্ঘন করার মানে কী? কেমন করে এ সীমা লঙ্ঘন করা হয়? এটা বুঝলেই তাগূতকে চেনা সহজ হবে।

যে নিজে ফাসিক এবং অন্য মানুষকেও ফাসিক বানানোর চেষ্টা করে সেই তাগূত। সে নাফরমানীর প্রাথমিক সীমা লঙ্ঘন করলো। যে নিজে কাফির এবং অন্যকেও কাফির বানানোর চেষ্টা করে সেই তাগূত। যে আল্লাহর নাফরমানীর শেষ সীমাও লঙ্ঘন করলো।

এখানে একটি কথা বিশেষভাবে বোঝার আছে। আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক মানুষকে নিজস্ব সত্তা দিয়ে আলাদাভোবে পয়দা করেন। যে দুনিয়ায় আসার সময় যেমন একা আসে, যাওয়ার সময়ও একাই যায়। আখিরাতে তাকে তার কৃতকর্মের ফল আলাদাভাবেই দেওয়া হবে।

তার শাস্তি সে একাই ভোগ করবে। পুরস্কারও যে একাই পাবে। তার কর্মের জন্য সেই দায়ী হবে। তাই তাকে আল্লাহর হুকুম অমান্য করার ইখতিয়ার এককভাবেই দেওয়া হয়েছে। অন্য মানুষকে আল্লাহর নাফরমান এবং বানানোর কোন ইখতিয়ার কাউকে দেওয়া হয়নি। যারা নিজে নাফরমানীর সীমা লঙ্ঘন করেÑ এরাই তাগূত।

তাগূতের পরিচয়

তাগূতকে মানতে অস্বীকার করতে হলে কে কে তাগূত তা জানতের হবে। কুরআনে তালাশ করলে ৫ প্রকার তাগূত পাওয়া যায়।

১.নাফস ও হাওয়া নাফস মানে প্রবৃত্তি, আর হাওয়া মানে কুপ্রবৃত্তি। দেহের যাবতীয় দাবিকে একসাথে নাফস বলা হয়। যে দাবি মন্দ তাকেই হওয়া বলে।

দেহের ভালো ও মন্দের কোনো ধারণা নেই। এ ধারণা আছে বিবেকের।রূহের সিদ্ধান্তই বিবেক। নাফস বা দেহের দাবি মন্দ বলেই ধরে নিতে হবে। বিবেক যাচাই করে বলে দেয় কোন দাবিটা ভালো বা মন্দ। সূরা ইউসূফের ৫৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ   নিশ্চয়ই নাফস মন্দেরই হুকুম দেয়। আল্লাহর নাফরমানীয় জন্য তাগিদ দেয় বলেই নাফস তাগূত।

যদি কেউ সত্যিই আল্লাহর অনুগত বান্দাহ হতে চায়, তাহলে তাকে অবশ্যই নাফসের কাফির হতে হবে। কেউ যদি উন্নত চরিত্রের অধিকারী হতে চায় তাহলে প্রথমেই তাকে দৃঢ় সিদ্ধান্ত দিতে হবে, আমি নাফসের কথা মেনে চলব না-না-না। অর্থাৎ আমি বিবেকের বিরুদ্ধে চলব না-না-না।

এ সিদ্ধান্ত না নিলে যে আল্লাহর প্রতি আনা সত্তেও নাফসের গোলামউ থেকে যাবে। সে আল্লাহকে ইলাহ বা হুকুমকর্তা স্বীকার করা সত্তেও নাফস বা হাওয়াকে ইলাহ হিসেবেই মেনে চলবে।

সূরা ফুরকানের ৪৩ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন,   أَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَٰهَهُ هَوَاهُ

সুরা জাছিয়ার ২৩নং আয়াতে আছে,  أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَٰهَهُ هَوَاهُ   অর্থ: তুমি কি তাকে দেখেছ, যে তার কুপ্রবৃত্তিকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করেছে? কুরআনের অনুবাদে অনেকেই তাগূত অর্থ লিখেছেন শয়তান। শয়তান আল্লাহর নাফরমানী করার জন্য উসকে দেয় বলে শয়তান অবশ্যই তাগূত। কিন্তু তাগূত অর্থ শয়তান নয়। যারা তাগূতের অর্থ শয়তান লিখেছেন, তারা তাগূতের সঠিক পরিচয় জানেন না। আমি শয়তানকে পৃথকভাবে তাগূত গণ্য করি না। কারণ শয়তান মানুষের নাফসকে বিভ্রান্ত করেই নাফরমানীর জন্য ওয়সওয়াসা দেয়। তাই প্রথম নম্বর তাগূতের মধ্যেই শয়তান অন্তর্ভূক্ত। সে হিসেবে নাফস ও শয়তানকে একই সাথে তালিাকর ১নম্বরে রাখা যায়।

২.শরীআতবিরোধী প্রচলিত কুপ্রথা ও সামাজিক কুসংস্কার ও তাগূত। (Customs and traditions)

সূরা বাকারায় আল্লাহ বলেন:  وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا ۗ

যখন তাদেরকে বলা হলো যে, আল্লাহ যা (ওহীযোগে) নাযিল করেছেন তা মেনে চল, তখন তারা বলল, আমাদের বাপ দাদাকে যা মেনে চলতে দেখেছি,আমরা তাই মেনে চলব।(সূরা বাকারা : ১৭০)

সমাজে বহু কুপ্রথা প্রচলিত আছে যা শরীআত বিরোধী।ধর্মের নামেও বহু শরীআতবিরোধী প্রথা চালু আছে। বিয়ে শাদিতে তো কুপ্রথার ব্যাপক প্রচলন আছে। কুপ্রথাগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী। এসবকে অমান্য করতে গেলে বিরাট বাধার সম্মুখীন হতে হয়। কুপ্রথাগুলো আইনের চেয়েও বেশি শক্তিশালী। আইন চালু করতে হলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার (Law Enforcement Agency) প্রয়োজন হয়। কুপ্রথা নিজেন শক্তি বলেই চালু থাকে। আইন করেও তা দুর করা সহজ নয়। এ কারণেই সামাজিক কুসংস্কারগুলোও তাগূত। এসবকে মানতে অস্বীকার না করলে ঈমারের দাবি পূরণ করা যায় না। এগুলো আল্লাহর হুকুমের বিরোধী। এসব কে মেনে চললে আল্লাহকে অমান্য করা হয়।

৪. শাসন শক্তিও তাগূত। শাসন শক্তি বললে শুধু গভর্নমেন্টই বোঝায় না। স্বামী স্ত্রী সংসারে স্বামীও শাসন শক্তি। পরিবারে পিতা শাসক শক্তি। কোন প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও শাসন শক্তি। কিছু লোকের উপর কতৃত্ব করার সুযোগ যার আছে সেই শাসক শক্তি। একটি দেশে সরকার হলো সবচেয়ে শক্তিশালী শাসক শক্তি। কুরআনে ফিরাউন ও নমরুদকে শাসক শক্তি হিসেবেই তগিূত বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা মূসা (আ) কে ফিরাউনের নিকট যাওয়ার আদেশ যে ভাষায় দিলেন সেখানেও ফিরাউনকে সীমালঙ্ঘনকারী বলেই উল্লেখ করেছেন।

اذْهَبْ إِلَىٰ فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَىٰ

হে মূসা ফিরাউনের নিকট যাও। নিশ্চয়ই সে সীমালঙ্ঘন করেছে। সূরা ত্বাহা ঃ২৪

শাসক শক্তি প্রয়োগ করে অধীনস্থদের উপর আল্লাহর আইনের বিরোধী নিয়ম কানুন চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তারা আল্লাহর নাফারমানী করায় বাধ্য করতে পারে।তাই এসব তাগূত। আল্লাহর প্রতি ঈমানের দাবি হলো আল্লাহর নফারমানী করতে অস্বীকার করা। তা না করলে ঈমানে দুর্বলতাই প্রকাশ পায়।

৫. রিযক বন্ধ করার ভয় দেখানোর শক্তি ও তাগূত। এ তাগূতটি শাসন শক্তিরই অন্তর্ভুত।চাকরি থেকে সরিয়ে দিয়ে রিযক বন্ধ করার ক্ষমতা যাদের আছে তারা শাসক শক্তি বটে। তবু এটা পৃথকভাবে গণ্য করার যোগ্য তাগূত। শাসন শক্তি প্রয়োগ করে অন্যায়ভাবে বিভিন্ন ধরনের শাস্তি দিতে পারে ও বিভিন্নভাবে ক্ষতি করতে পারে। কিন্তু চাকরি থেকে বরখাস্ত করার শাস্তিটি চরম যুলম বলেই রিযক বন্ধ করার ভয় দেখানোর শক্তিকে শাসন শক্তি থেকে আলাদাভাবে গণ্য করা হলো। এ শক্তি প্রয়োগ করে  অধীনস্থদেরকে আল্লাহর নফারমানী করতে বাধ্য করা যায় বলেই এটা ও তাগূত।

৬. অন্ধভাবে মেনে চলার দাবিদার শক্তিও তাগূত। সমাজে এমন কতক লোক আছে যারা তাদেরকে অন্ধভাবে মেনে চলার জন্য নৈতিক প্রভাব প্রয়োগ করতে সক্ষম। তাদের দাবি হলো বিনা যুক্তিতে তাদের কথা মেনে চলতে হবে। বিনা প্রশ্নে তাদের আনুগত্য করতে হবে।বিনা বাক্য ব্যয়ে তাদের হুকুম পালনের অধিকার তারা দাবি করে।

অথচ আল্লাহ ও রাসূল (সা) ছাড়া এ দাবি আর কারো অধিকার নেই। যেহেতু আল্লাহ নির্ভুল এবং রাসূল (স) আল্লাহর ওহী দ্বারা পরিচালিত বলে তিনিও নির্ভুল সেহেতু এ দু সত্তাকে বিনা দ্বিধায় শর্তহীন ভাবে মেনে চলতে হবে।

এছাড়া আর কারো এ জাতীয় আনুগত্যের দাবিদার হওয়ার অধিকার নেই। তাই যারা এ দাবি করে তারাও তাগূত। সুরা তওবার ৩১নং আয়াতে আল্লাহ বলেন,   اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ

তারা তাদের ওলামা ও পীরদেরকে আল্লাহর বদলে তাদের রব হিসেবে গ্রহন করেছে।

হদীসে এর অর্থ বলা হয়েছে যে তাদেরকে অন্ধভাবে মেনে নিয়েছে। তারা হালাল ও হারামের ব্যাপারে যে ফায়সালাই দেয় তা অন্ধভাবে স্বীকার করে নেয়। অন্ধভাবে মেনে নেওয়ার দাবিদার শক্তি ধর্মীয় ক্ষেত্রে যেমন আছে, রাজনৈতিক ময়দানেও রয়েছে। দলের সিদ্ধান্ত, নেতা বা নেত্রীর সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক মনে হলেও অন্ধভাবে তা মানতে হয়, না মানলে দল থেকে তাড়িয়ে দিতে পারে, এ ভয়ে মেনে নিতে বাধ্য হয়। তাই এ জাতীয় শক্তিও তাগূত। তাদের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের কারণে দীনের পথে বাধার সৃষ্টি হতে পারে। যেমন একপীর সাহেব মুরীদদেরকে বললেন যে, তোমরা মওলানা মওদূদীর বই পড়বে না। পীরের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের কারণে যারা বই পড়লো না, তারা ইকামাতে দীনের পথ চিনতে ব্যর্থ হলো। আমার কয়েকজন তাবলীগী ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে মাওলানা মওদূদূীর বই পড়তে দিয়েছিলাম। এক সপ্তাহ পর আরও বই নিয়ে গেলাম। আগের দেওয়া বই ফেরত চাইলাম। বই ফেরত দিলেন এবং আর কোনো বই নিতেই রাজি হলেন না।জিজ্ঞেস করলাম, বই কি পড়েছিলেন? জওয়াবে বললেন, এসব বই পড়তে মুরুব্বীরা মানা করেছেন। আমি বললাম, মুরুব্বীদেরকে জিজ্ঞেস করলেন কেন? এর জওয়াবে যা বললেন তাতে বুঝলাম যে, এসব বই পড়েই আমি গুমরাহ হয়েছি বলে তাদেরকে পড়তে নিষেধ করেছেন। আমি বললাম, যদি কোনো বই পড়লেই ঈমান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে তাহলে এমন দুর্বল ঈমান কী করে রক্ষা করবেন?

আমার খুব আফসোস হলো। যাদেরকে বই পড়তে দিয়েছিলাম তারা তাবলীগ জামায়াতেআমার সহকর্মী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তাদের একজন আমার হতেই রিক্রুট হয়েছেন। তারা তাগূতের খপ্পরে পড়ে ইকামাতে দীনের পথ চেনার সুযোগ না পাওয়ায় তাদের জন্য বেদনা বোধ করেছি। এ দীর্ঘ আলোচনায় পাঁচ রকমের তাগূত সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেল। মযবুত ঈমানের জন্য তাগূতকে অস্বীকার করা এ কারণেই অত্যন্ত জরুরি। সুরা নাহলের ৩৬ নং এ আয়াতটিতে আল্লাহ বলেন, আমি প্রত্যেক উম্মতের নিকট (এ নির্দেশ দিয়ে) রাসূল পাঠিয়েছি যে, তোমরা (একমাত্র) আল্লাহর দাসত্ব কর এবং তাগূত থেকে দুরে থাক।

নমরূদ ও ফিরাউন খোদায়ী দাবি করেছিল বলে বল হয়। কিন্তু তারা আসমান যমীন সৃষ্টি করার দাবি করেনি। তারা মানুষকে তাদের হুকুমের দাস বানিয়ে রেখেছিল। মানুষকে আল্লাহর দাস হতে বাধা দিয়ে নিজেদের দাস হতে বাধ্য করেছিল। এ অর্থেই তাদের সম্পর্কে বলা হয় যে, তারা খোদায়ী দাবি করেছিল। তারা আধুনিক যুগের পরিভাষায় ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী ছিল মাত্র। তাগূতের কাজই হলো, আল্লাহর দাসত্ব থেকে ফিরিয়ে রেখে তার দাসত্ব করতে বাধ্য করা। তাই যারা আল্লাহর দাসত্ব করতে আগ্রহী তাদেরকে সচেতন ভাবে সবরকম তাগূতী শক্তিকে পরিহার করে তাদের থেকে বেচে থাকতে হবে।

কালেমায়ে তাইয়েবা তাগূত বিরোধী

কালোমায়ে তাইয়েবা لَا اِلَهَ اِلاَّ اللهُ    এর মূল কথা হলো, আল্লাহই একমাত্র ইলাহ, আর কোন ইলাহ নেই।এ বক্তব্য প্রকাশ করার জন্য واحد اِلَهَ الله বললেই তো চলতো। তা না করে لَا   দিয়ে কেন শুরু করা হলো? لَا মানে নেই। নেই দিয়ে কেন শুরু করা হলো? মানব সমাজে বহু হুকুমকর্তা রয়েছে। মানবমনের উপর এরা রাজত্ব করে। মানব এদের হুকুম মেনে চলে; হয় বাধ্য হয়ে, না হয় লোভে পড়ে। এসব হুকুমকর্তা (ইলাহ) হলো আসলে তাগূত। তাই যারাই কালেমায় তাইয়েবা কবুল করতে চায়। তাদেরকে মহান আল্লাহর উপর ঈমান আনার আগেই তাগূতকে অস্বীকার করতে হবে। এতে প্রমাণিত হলো যে, সূরা বাকারার ২৫৬ নং আয়াতে যে ফরমে فَمَن يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِن بِاللَّهِ    বলা হয়েছে সে ফরমেই প্রথমে অস্বীকার দ্বারা শুরু করা হয়েছে। ঐ আয়াতে আল্লাহর প্রতি ঈমার আনার আগেই তাগূতের কুফরী করতে বলা হয়েছে।আল্লাহ দ্বারা তাগূতকে অস্বীকার করার ঘোষণা দেওয়ার পরে   اِلاَّ اللهُ   বলে আল্লাহর প্রতি ঈমানের ঘোষণা দেওয়া হয়। এটা বড়ই তাৎপর্যপূর্ণ। যারা তাগূতের পরিচয় জানে, তারা

লা ইলাহা’ দ্বারা কাদেরকে অস্বীকার করা হচ্ছে তা বুঝতেই পারে না। তারা না বুঝে তোতাপাখির মত কালেমা উচ্চারণ করে থাকে এবং তাগূদের দাসত্ব করতে থাকে।

একটি সহজ উদাহরণ

জমিতে ধানের বজি বপন করতে হলে প্রথমেই জমিকে আগাছামুক্ত করতে হবে।আগাছা দূর না করে ধান ফেললে ফসল তো দূরের কথ,বীজ ধানও ফিরে পাওয়া যাবে না।কৃষি জমি যেমন খালি থাকে না মানুষের মনের জমিও খালি থাকে না। ঐ রকম তাগূত মানবমন দখল করে থাকে। মনে ঈমানের বীজ ফেলতে হলে মন থেকে সব তাগূত কে তাড়াতে হবে। তা না হলে মনের যমীন ঈমানের বীজ বপনের জায়গাই হবে না।

তাগূতের সারকথা

আল্লাহ তআলা মানুষ ও জিনকে আল্লাহর দাসত্ব করার জন্য পয়দা করেছেন। আল্লাহ সূরা আয যারিয়াতের ৫৬নং আয়াতে ঘোষনা করেন,   وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

‘আমি জিন ও ইনসানকে আমার দাসত্ব করা ছাড়া আর কোন উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিনি। ‘

এ কথার একটি মর্ম হলো,  আল্লাহ শুধু তারই দাসত্ব করার জন্য তাদের কে সৃষ্টি করেছেন আর কারো দাসত্ব করার জন্য নয়। তাই যারা আল্লাহর দাসত্বের বদলে কোনো সৃষ্টি দাসত্ব করে তারা নিজেদেরকেই হেয় করে এবং মানুষ হিসেবে মার্যাদা হারায় তারা পশুর পর্যায়ে গণ্য হয়।

ঐ কথাটির অপর মর্ম হলো,  যারা আল্লাহর দাসত্ব করার সীমাবদ্ধ না থেকে প্রভুত্ব করার অপচেষ্টা চালায় তারাই তাগূতে পরিণত হয়। তারা আল্লাহর বান্দাদেরকে তাদের বান্দাহ বানায়। শাসন শক্তি রিযক বন্ধ করে দেওয়ার ভয় দেখানোর শক্তি ও অন্ধ আনুগত্যের দাবিদার শক্তি হিসেবে তারা আল্লাহর বন্দাহদের উপর প্রভুত্ব কায়েম করে চরম সীমালঙ্ঘনকারীতে পরিণত হয়।

এসব শক্তি আল্লাহর দাসত্ব করা থেকে মানুষকে ফিরিয়ে রাখে এবং তাদের দাসত্ব করতে বাধ্য করে। তাই আল্লাহর দাসত্ব করতে হলে এসব শক্তি কে মানতে অস্বীকার করার সাহস থাকতে হবে। এ সাহস যাদের নেই তারা আল্লাহর প্রতি ঈমানের দাবিদার হলেও পদে পদে তাগূতের নিকট পরাজিত হতে থাকবে।

সূরা আনকবূতের প্রথম আয়াতেই আল্লাহ তাআলা বলেন – أَحَسِبَ النَّاسُ أَن يُتْرَكُوا أَن يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ

‘মানুষ কি মনে করে যে, আল্লাহর প্রতি ঈমন এনেছি বললেই তাদেরকে বিনা পরীক্ষায় ছেড়ে দেওয়া হবে?

ঈমানের পরীক্ষা আসে তাগূতের মাধ্যমে। তাগূতকে অমান্য করার সিদ্ধন্ত না থাকলে পরীক্ষায় অবশ্যই ফেল করবে।

মযবুত ঈমানের সুফল

আগেই বলা হয়েছে যে,  আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, আল্লাহকে র্‌  বাদশাহ ও ইলাহ হিসেবে মেনে চলার সিদ্ধান্তই ঈমান। এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জীবনযাপন করতে হলে ঈমানের দাবি পূরণ করতে হবে। ঈমানের দাবি পূরণ করতে হলে ঈমানকে দুবর্ল হতে দেওয়া চলবে না। ঈমানকে শুধু দুর্বলমুক্ত রাখাই যথেষ্ট নয়, ঈমানকে অত্যন্ত মযবুত করার জন্য ঐ দুটো শর্ত পূরণ করতে হবে।

যে মযবুত ঈমানের অধিকারী সে

১. দীনের ব্যাপারে কোনো সন্দেহ বা দ্বিধায় ভোগে না। সব অবস্থায় মনে প্রশান্তি ভোগ করে এবং তৃপ্তি বোধ করে। এ প্রশান্তি ও তৃপ্তি এমন বেহেশতী নিয়ামত, যার কোনো তুলনা নেই।

২. আখিরাতের চিরস্থায়ী জীবনের সাফল্যের তীব্র কামনা এমন ভাবে অন্তর দখল করে রাখে যে, দুনিয়ার কোনো বড় স্বার্থের লোভেও বিভ্রান্ত হয় না।

৩. আল্লাহ সবসময় সাথে আছেন এ চেতনার ফলে দুঃখ কষ্ট, আপদ বিপদ ও রোগ শোকে বিচলিত ও পেরেশান হয় না এবং তাওয়াক্কুল আলল্লাহ ও সবরের নিয়ামত লাভ করে।

৪. একমাত্র আল্লাহর ভয় ছাড়া মৃত্যুভয়সহ সকল ভয় থেকে মুক্ত থাকে। মৃত্যুকে আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়ার মহাসুযোগ মনে করে এবং শহীদী মৃত্যুই কামনা করে।

৫. দুনিয়ার যেসব জিনিসের ভালোবাসার দায়িত্ব আল্লাহ দিয়েছেন এসবের আকর্ষণ সত্ত্বেও আল্লাহ রাসুল (সা) ও জিহাদী ফী সাবীলিল্লহকে প্রাধান্য দেওয়ার যোগ্যতা হাসিল করে।

৬. সকল প্রকার শিরক থেকে ঈমানকে মুক্ত রেখে তাওহীদের দাবি পূরণ করতে সক্ষম হয়।

৭. সকল প্রকার তাগূতকে অস্বীকার করার হিম্মত রাখে এবং ঈমানের দাবি পূরণ করে তৃপ্তিবোধ করে।

সহীহ ইলম

ইলম মানে কী?

ইলম শব্দের আভিধানিক অর্থ জ্ঞান। কুরআনে ও হাদীসে কোনো কোনো স্থানে এ সাধারন অর্থে শব্দটি  ব্যবহার করা হলেও ইসলামী পরিভাষায় ইলম মানে ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান। রাসূল (সা) বলেছেন, ইলম তালাশ করা ফরয। যদি এখানে সব জ্ঞানই ফরয বুঝায় তাহলে নবীর পক্ষেও এ ফরয পালন করা সম্ভব নয়।

ইলম মানে জানার বিষয়। কোন প্রাণীই ইলম ছাড়া বাচতে পারে না। পশু পক্ষী এবং কীট পতঙ্গের ও জ্ঞানের প্রয়োজন রয়েছে। পাখিকে উড়তে জানতে হবে। হাঁসকে সাঁতার জানতে হবে। মৌমাছির ফুল থেকে মধূ সংগ্রহ করার জ্ঞান দরকার। প্রতিটি জীবকেই বেঁচে থাকার জন্য খেতে হয়। সবার খাদ্য এক রকম নয়। কার খাদ্য কোনটা তা জানতেই হবে।

প্রত্যেক প্রাণীই নিজস্ব বাসস্থান প্রয়োজন। পাখি গাছে বাসা বানাতে জানে। শেয়াল মাটিতে গর্ত করে থাকার ব্যবস্থা করে। এ ব্যবস্থা করতে না জানলে তা করতে পারতো না।

জ্ঞান কোথা থেকে পাওয়া যায়?

যিনি সক প্রাণী সৃষ্টি করেছেন তিনি জ্ঞানের একমাত্র উৎস। মানুষ ছাড়া আর কোন প্রাণীর কোন আনুষ্ঠানিক শিক্ষার দরকার হয় না। তাদের জ্ঞান অর্জনের জন্য স্কুল কলেজের প্রয়োজন হয় না। আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিগতভাবেই তাদেরকে যার যার প্রয়োজনীয় জ্ঞান দান করেন। মৌমাছিকে মৌচাকের কতো চমৎকার শিল্প রচনার শিক্ষা তিনিই দিয়েছেন বলে কুরআনে উল্লেখ করেছেন এবং তা ওহীর মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন।

আল্লাহর কাছ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানকেই ওহী বলা হয়। ওহীর শাব্দিক অর্থ হলো ইশারা, ইঙ্গিত, গোপনে দেওয়া ইত্যাদি। যার কাছে ওহী আসে সে তার চেষ্টা ছাড়াই তা পায়। স্রষ্টা গোপনে তাকে তা দেন। হাঁসের বাচ্চাকে তিনি গোপনেই সাঁতার শিক্ষা দেন। সে বিনা চেষ্টাই এ শিক্ষা পেয়ে যায়।

মানুষের কেন আনুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন হয়?

মানুষ আর সব প্রণীর মতো নয়। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টির সেরা (আশরাফুল মাখলুকাত) হওয়ার মর্যাদা দান করেছেন। সকল প্রাণীই দেহসর্বস্থ, কিন্তু মানুষ দেহসর্বস্থ নয়। মানুষের দেহটি আসল মানুষ নয়। মানুষের দেহটি পশুই বটে। আসল মানুষটি কুরআনের ভাষায় ‘রূহ’। মানুষের দেহটি বস্তু দিয়ে তৈরি। মানুষ যা কিছু খায় ও পান করে তাতে যেসব বস্তু উপাদান রয়েছে সেসব উপাদান দিয়ে মানুষের দেহ তৈরি হয়েছে। তাই ঐসব খাদ্য ও পানীয় মানব দেহে ফিট হয়। অন্য কোনো উপাদান দেহ গ্রহণ করবে না। বিষ খেলে দেহের মৃত্যু হবেই।

‘রূহ’ কোন বস্তু সত্তা নয়। আমরা বিবেক বলতে যা বুঝি সেটা ‘রূহ’। এটা নৈতিক সত্তা। ভালো ও মন্দের চেতনাই হলো রূহ। এটাই আসল মানুষ। গোটা সৃষ্টিজগৎ মানুষের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে বলে কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে। সব সৃষ্টিকে কাজে লাগানোর উপযোগী হিসেবেই দেহটি দান করা হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা সকল সৃষ্টির জন্যই প্রতিটি সৃষ্টির উপযোগী বিধান তৈরি করে তা নিজেই তাদের উপর চালু করে দিয়েছেন। মানুষের দেহের জন্যও তিনি বিধান তৈরি করে , নিজেই জারী করেছেন। এসব বিধান নবীর মাধ্যমে পাঠানো হয়নি। নবীর মাধ্যমে যেসব বিধান পাঠানো হয়েছে তা আল্লাহ্‌ নিজে জারী করেননা । নিজেই জারী করার সিদ্ধান্ত থাকলে নবীর মাধ্যমে পাঠাতেন না। নবীর নিকত ওহির মাধ্যমে প্রেরিত বিধান আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে চালু করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে নবীর উপর ও নবীর উপর যারা ইমান আনে তাদের উপর। বিধানটি অবশ্যই আল্লাহর। তার পক্ষ থেকে তার প্রতিনিধি (খলীফা) হিসেবে ঐ বিধান জারী করার দায়িত্বটিই খিলাফতের দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে করতে হলে মানুষকে তার ইচ্ছাশক্তি ও চেষ্টা সাধনা প্রয়োগ করতে হবে। এ কাজ সচেতনভাবে করা ছাড়া উপায় নেই। অন্যান্য প্রণী বিনা পরিকল্পনায় চেতনাহীণ ও গতানুগতিক ধারায় জীবন যাপন করে। আল্লাহ তায়ালা নিজেই তাদেরকে এভাবে পরিচালনা করেন। এর কোন চেতনা তাদের নেই।

মানুষকে সচেতনভাবে ও ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করে সুপরিকল্পিতভাবে তার দেহসত্তাকে পরিচালনা করা এবং সৃষ্টিজগতকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর দেওয়া বিধানকে বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েচে। এ দায়িত্বই আল্লাহর খিলাফতের দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে চেষ্টা করে অর্জন করতে হবে। তাই দুনিয়ায় মানুষের নৈতিক গুনাবলি অর্জনের জন্য সচেতনভাবে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হয়। অন্যান্য পশুর প্রয়োজনীয় গুনাবলী যেমন তাদের মধ্যে আপনা আপনিই সৃষ্টি হয়, মানুষের বেলায় তা হতে পারে না।

জ্ঞানই শক্তি

  এ কথাটি স্কুল জীবনেই পাঠ্য বইতে পড়েছি। কিন্তু এর মর্ম তখনো ভালোভাবে বুঝিনি। জ্ঞানের বলেই মানুষ শক্তিমান বিশালকায় প্রাণী এমনকি হিংস্র পশুকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। জ্ঞানের শক্তিতেই মানুষও মানুষের উপর কর্তৃত্ব করে। রাসূল (সাঃ) এর নেতৃত্বে দায়িত্ব পালন করে এবং যতদিন ইসলামী শিক্ষার সাথে সাথে অন্যান্য শিক্ষায়ও তাদের প্রাধান্য ছিল ততদিনই তারা মানব জাতির নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হয়েছেন। মুসলিম জাতি ইসলামী আদর্শের দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়া সত্বেও জ্ঞান বিজ্ঞানে তাদের প্রাধান্যর কারণেই কয়েক’শ বছর বিশ্বে কর্তৃত্বের আসন দখলে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু যখন মুসলিম জাতি রাষ্ট্রক্ষমতাকে ভোগের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করল এবং জ্ঞান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে তাদের শাগরিদারই পাশ্চাত্য মুসলিমদের থেকেও অগ্রসর হয়ে গেল তখন তারা জ্ঞানের প্রাধান্য বলেই মুসলিম দেশগুলো দখল করে নিলো। আজও বিশ্বে তাদের নের্তৃত্ব এ জ্ঞান শক্তির দরুনই অব্যাহত রয়েছে।

ওহীর জ্ঞানের শক্তি

সকল শক্তির উৎস আল্লাহ তায়ালা। তাই ওহীর জ্ঞানের শক্তিকে তিনি অন্যান্য জ্ঞানের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। সাহাবায়ে কেরামের যুগে ওহীর জ্ঞানকে বাস্তব প্রয়োগ করার ফলে সে যুগের অন্যান্য জ্ঞানে উউনত রোম সম্রাজ্য ও পারস্য সম্রাজ্য মুসলিম জাতির নেতৃত্ব নিতে বাধ্য হয়। মুসলিম জাতি পার্থিব যাবতীয় জ্ঞানের শক্তি আহরণ করে মানব জাতির নের্র্তৃত্বের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়।আজ ও আবার মুসলিম জাতি ওহির জ্ঞানকে মানব সমাজে বিজয়ী করার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারলে অতীতের মতোই রাষ্ট্র শক্তির অধিকারী হয়ে মানব জাতির নের্তৃত্বের মর্যাদা পুনরুদ্ধার এগিয়ে যেতে পারে।ইসলামী আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি নামক পুস্তকে মাওলানা মওদূদী বলিষ্ঠ যুক্তি ও বাস্তব উদাহরণ দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে ইসলামী নৈতিকতা ও মৌলিক মানবীয় গুণের সমন্বয় হলে শুধু মানবীয় গুণের অধিকারীরা তাদের যাবতীয় জ্ঞান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সত্ত্বেও মুসলিমদের নিকট পরাজিত হতে বাধ্য।

ওহীর জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব আল্লাহ অবশ্যই বহাল রাখেন। কিন্তু ওহীর জ্ঞানকে বিজয়ী করার দায়িত্বে অবহেলা করে মুসলিম জাতি শুধু পার্থিব অন্যান্য জ্ঞানে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে ব্যর্থ হবে। কারন এ বিষয়ে আল্লাহর সাহায্য থেকে তারা বঞ্চিত থাকবে। দায়িত্বে অবহেলার অপরাধে দোষী সাব্যস্থ হওয়ার কারণেই তারা নেতৃত্বের অযোগ্য বলে গণ্য।

জ্ঞানের উৎস কী কী?

জ্ঞানের উৎস চারটি। যথা

১. ইন্দ্রিয়ঃ চক্ষু কর্ণ নাসিকা জিহ্বা ও ত্বকের সাহায্যে মানুষ জন্মের পর থেকেই জ্ঞান আহরণ করতে থাকে। এ জ্ঞান সরাসরি প্রত্যক্ষ পদ্ধতি তে অর্জিত হয়। এসব হাতিয়ার ও জানার বিষয়ের মাঝখানে আর কোনো মাধ্যম নেই। এ চারটি যন্ত্রের এক একটি দ্বারা বিশেষ ধরনের বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা যায়। এক যন্ত্র দিয়ে অপর যন্ত্রের উপযোগী বিষয় জানা যায় না। গন্ধের জ্ঞান শুধু নাক দিয়েই হাসিল করা যায়। অন্য চারটি যন্ত্রের সাহায্য তা জানার উপায় নেই। ইংরেজিতে এ সবকে ++++++ বলা হয়।

২. বুদ্ধিঃ আরবীতে আকল। মানুষ বুদ্ধির মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি পরিমাণে জ্ঞান আহরণ করে থাকে। জ্ঞানের রাজ্যে বিচরণের জন্য বুদ্ধি ই সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। ইন্দ্রিয় দ্বারা যতটুকু জানা যায় এরপর বুদ্ধিই মানুষকে জ্ঞানের ময়দানে আরও এগিয়ে দেয়।

চোখ দিয়ে কোথাও ধোয়া দেখা গেল। বুদ্ধি বলে উঠলো আগুন লেগেছে। চোখ কিন্তু আগুন তখনো দেখেনি । বুদ্ধি জানে যে আগুন লাগলেই ধোয়া হয়। কার্যকারণের যুক্তি বুঝবার ও বিশ্লেষণ করার শক্তিকেই বুদ্ধি বলে। এ শক্তি বলেই মানুষ জ্ঞানের মহাসমুদ্র থেকে জ্ঞান ভান্ডার আহরণ করে। গবেষণা ও জ্ঞান সাধনার প্রধান হাতিয়ার বুদ্ধি। এ শক্তি বলেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে মানুষ দ্রুত এগিয়ে চলছে। সৃষ্টিজগৎ কে জানা এবং তাকে লাগাবার যোগ্যতা অর্জন করা বুদ্ধির সাহায্যেই সম্ভব হয়।

৩. ইলহামঃ এটা বুদ্ধির ঊর্ধ্বের এক বিশেষ উৎস। যারা যে বিষয়েই চিন্তা ভাবনা গবেষণা ও সাধনায় গভীরভাবে আত্মনিয়োগ করেন, কখনো কখনো হঠাৎ কোনো জ্ঞান তাদের বুদ্ধির নিকট এসে ধরা দেয়। হয়তো দীর্ঘদিন বুদ্ধির প্রয়োগ করেও কোনো তত্ত্ব আয়ত্ত করতে সক্ষম হচ্ছিলেন না হঠাৎ ঐ তত্ত্বটি তার জ্ঞানে এসে গেল। এ ধরনের জ্ঞানকেই ইলহামী জ্ঞান বলাহয়। এর বাংলা পরিভাষা প্রজ্ঞা হতে পারে। ইংরেজিতে +++অর্থ অভিধানে যা পাওয়া যায় তা হলো ===অর্থাৎ যুক্তি ছাড়াই হাঠাৎ মনে কোনো ধারণা সুষ্টি হওয়া। আরবীতে ইলহাম শব্দটি আরও স্পষ্ট। বুদ্ধি শক্তি প্রয়োগ করেও যে তত্ত্বটির নাগাল পাওয়া গেল না হঠাৎ তা বুদ্ধির আওতায় এসে গেল। তাই আমরা জ্ঞানের এ উৎসটিকে ইলহাম বলেই উল্লেখ করা যাথর্থ মনে করি। বাংলায় এর অনুবাদের প্রয়োজন নেই।

এটা অবশ্যই সত্য যে যারা জ্ঞান সাধনায় লিপ্ত ইলহামী জ্ঞান তাদেরই আয়ত্তে আসে যদিও ঐ জ্ঞানটি সাধনার সরাসরি ফসল নয়।

এ জাতীয় জ্ঞানের কয়েকটি উদাহরণ

ক. ইমাম আবূ হানীফা (র) কুরআন ও হাদীস গবেষণ করে বাস্তব জীবনে পালন করার উদ্দেশ্য ইজতিহাদ করে মাসআলা মাসায়েল বের করেছেন। কোনো সময় এমন ঘটনা ঘটেছে যে দীর্ঘ সময় চিন্তা গবেষণা করেও যে মাসআলাটির মীমাংসা করতে পারেননি তা এক সময় হঠাৎ তার মনে ধরা দিল। সকল মুজাতাহিদের জীবনেই হয়তো এমন ঘটনা ঘটে।

খ. আধুনিক বিজ্ঞানের জনক হিসেবে গণ্য মহাবিজ্ঞানী নিউটনের জীবনের একটা ছোট্র ঘটনা উল্লেখ করছি। তিনি আপেলের বাগানে বসে আছেন। তার সামনেই গাছ থেকে একটা আপেল মাটিতে খসে পড়লো। জীবনে বহুবার ই এমন দৃশ্য তিনি দেখেছেন। কিন্তু হঠাৎ সেদিন তার মনে এ প্রশ্ন বিরাট হয়ে দেখা দিল যে আপেলটি উপরে বা ডানে বায়ে না যেয়ে সোজা মাটির দিকে কেন আসল? চারদিকেই তো শূন্যতা বিরাজ করছে। কোনো দিকে না যেয়ে শুধু নিচের দিকে কেন এলো? তার মনে দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টি হলো যে নিশ্চয়ই এমন কোনো শক্তি রয়েছে যা আপেলটিকে মাটির দিকে টেনে এনেছে। এই হাইপথেসিস এর উপর চালিয়ে শেষ পযর্ন্ত তিনি বিখ্যাত মতবাদ মাধ্যাকর্ষণ শক্তি আবিষ্কার করেন।

গ. গ্রীক বিজ্ঞানী আকিমেডিসের ঘটনা। বিজ্ঞানের একটি সূত্র তালাশ করে না পেয়ে তিনি রীতিমতো বিষণ্ণ ও বিমর্ষ অবস্থায় পানির টবে গোসল করছিলেন। যারা পানি ভর্তি টবে গোসল করে তারা উলঙ্গ অবস্থায়ই পানিতে নাক জাগিয়ে শুয়ে থাকে। তিনিও ঐ অবস্থায়ই ছিলেন। হঠাৎ ঐ সূত্রটি তার জ্ঞানে এসে ধরা দিল। সাফল্যের আনন্দে তিনি টব থেকে নেমে ইউরেকা ইউরেকা (পেয়েছে, পেয়েছি) বলে চিৎকার করে উঠলেন। বস্ত্রহীন অবস্থায়ই তিনি বাথরুম থেকে বের হয়ে গেলেন। খুশির আতিশয্যে গায়ে জামা পরার হুশ ও রইল না।

৪. ওহীঃ জ্ঞানের এ মহা উৎসটি কোনো মানুষের আয়ত্তে নেই। আল্লহ তাআলা যাকে নবী রাসূল নিয়োগ করেন তার নিকটই তিনি বিশেষ পদ্ধতিতে ওহীর জ্ঞান পরিবেশন করেন। এজ্ঞান নবী রাসূলের চেষ্টা সাধনার ফসল নয়। সরাসরি তা আল্লাহর পক্ষ থেকে তারা লাভ করেন।

হদীস থেকে জানা যায় যে কিভাবে রাসূল (সা) এর নিকট ওহীর জ্ঞান পৌছতো। কয়েক পদ্ধতি তে ওহী লাভ করতেন।

ক. স্বপ্নযোগে ঘুমন্ত অবস্থায় তিনি জ্ঞান লাভ করতেন।

খ. কোনো কোনো সময় ঘণ্টার আওয়াজ শুনতে পেতেন। তখন তিনি স্থির হয়ে থাকতেন এবং ওহী লাভ করতেন। এ পদ্ধতিটি তার জন্য বেশ কষ্টকর হতো। তিনি প্রচন্ড চাপ বোধ করতেন। শীতের সময়ও তার চেহারা মুবারক থেকে ঘামের ফোটা টপকে পড়তো। উটের পিঠে বসা থাকলে চাপের কারণে উট মাটিতে বসে পড়তে বাধ্য হতো।

গ. কখনো কখনো হযরত জিবরাঈল (আ) মানুষের আকারে এসে রাসূল (সা) কে তিলাওয়াত করে শুনিয়ে দিতেন।

ঘ. রাসূল (সা) এর মনে ওহীর জ্ঞান ঢেলে দেওয়া হতো।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় পদ্ধতিতে প্রাপ্ত জ্ঞনই ভাষাসহ নাযিল হতো এবং তা কুরআনের অংশ হিসেবে গণ্য হতো। এ প্রকারের ওহীকে ওহী মাতলূ বলা হয় যা তিলাওয়াত করা হয়।

প্রথম ও চতুর্থ পদ্ধতিতে যে ওহী আসতো তাতে রাসূল (সা) এর মনে আল্লাহর পক্ষ থেকে ভাবের আকারে জ্ঞান দেওয়া হতো। কুরআনের আয়াতের মতো ভাষায় নাযিল হতো না। রাসূল (সা) আল্লাহর দেওয়া ঐ সব ভাবকে নিজের ভাষায় প্রকাশ করতেন। এসব জ্ঞানই হাদীস হিসেবে পরিচিত। এ ওহী হলো গাইরি মাতলূ যা কুরআনের মতো তিলাওয়াত করার জন্য নয়।

ওহীর জ্ঞান অত্যন্ত ব্যাপক। কুরআনের বাইরে ওহীর জ্ঞানের বিরাটা ভাণ্ডার রয়েছে। রাসূল (সাঃ) যা বলেছেন যা করেছেন ও সাহাবায়ে কেরামের যেসব কথা ও কাজকে আপত্তিজনক বলে উল্লেখ করেননি তা সবই ওহীর জ্ঞানের মধ্যে শামিল।

কুরআনে যা আছে এর ভাব ও ভাষা সম্পূর্ণ আল্লাহর। তাই কোনো কিছু মানতে অস্বীকার করলে কাফির হয়ে যায়।আর বাকি ওহীর কোনো কথা যুক্তির ভিক্তিতে গ্রহন করতে অস্বীকার করলে কাফির বলে গণ্য করা হয় না। রাসূল (সা) এর কথা কাজ ও অনুমোদনকে হাদীস বলা হয়। হাদীস থেকে মুহাদ্দিসগণ ও ফকীহগণ যা সুন্নাহ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন তা কুরআনেরই বাস্তব ব্যাখা।কুরআন ও সুন্নাহ মিলেই ইসলাম। যারা সুন্নহ কে অস্বীকার করে তারা মুসলিম হিসেবে গণ্য নয়।

About শহীদ অধ্যাপক গোলাম আযম