ইসলামী সংগঠন

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

ইসলামী নেতৃত্বের জবাবদিহি

ইসলামী নেতৃত্ব দলের সদস্যদের নিকট থেকে দুরে অবস্থান করেন না। তিনি তাদের মাঝে থাকেন এবং তাদেরই একজন হয়ে থাকেন। তিনি তাদের প্রশ্নকে ভয় করেন না। যেই কোন প্রয়োজনীয় ও শালীন প্র্রশ্নের জওয়াব দিতে সদা প্রস্তুত থাকেন। তিনি তার যাবতীয় কাজের জন্য সাধারণভাবে সদস্যদের এবং বিশেষভাবে মাজলিসে শুরার নিকট দায়ী থাকেন। ইসলামী দল, সমাজ বা রাষ্ট্রের নেতার দায়িত্ব দ্বিমুখী। একদিকে তাঁকে দায়ী থাকতে হয় নির্বাচক মন্ডলীর কাছে। অন্যদিকে তাঁকে দায়ী থাকতে হয় আল্লাহর কাছে। বস্তুত: দুনিয়ার জওয়াবদিহির চেয়ে তাঁর আখিরাতের জওয়াবদিহি ভীষণতর। এই সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল(সা) পূর্বাহ্নেই সাবধান করে বলেছেন –

كلكم راع وكلكم مسؤول عن رعيته ألإمام راع ومسئول عن رعيته.

“তোমাদের প্রত্যেকেই তত্ত্বাবধায়ক এবং তোমাদের প্রত্যেকেরই তার তত্ত্বাবধান-দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। নেতা একজন তত্ত্বাবধায়ক এবং এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।”

 – সহীহুল বুখারী, সহীহ মুসলিম

أيما والرولى من أمر المسلمين شيئا فلم ينصخ لهم ولم

یجه له کنمنحه وجهده لنفسبه کبهٔ الله علل وجهه فی النار

“যেই ব্যক্তি মুসলিমদের সামষ্টিক ব্যাপারে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, পরে তার দায়িত্ব পালনে সৎ মনোভাব প্রদর্শন করেনি এবং এই কাজে সে নিজেকে এভাবে নিয়োজিত করেনি যেভাবে সে নিজেকে নিয়োজিত করে নিজের কাজে, শেষ বিচারের দিন আল্লাহ তাকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।”

ইসলামী সংগঠনে আনুগত্য

নেতার আনুগত্য ইসলামী সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তির ওপর অবশ্যকর্তব্য। এই সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ

“মুমিনগণ, আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের মধ্য থেকে যে উলুল আমর তার আনুগত্য কর।”

-আন নিসা: ৫৯

আল্লাহ রাসূল বলেন,

من أطاعنىانى فقد أطاع الله ومن عصبانی فقذ عص اللّة ومن

يطع الأمير فقد أطاعنى ومن يغص الأمير فقد عص

“যেই ব্যক্তি আমার আনুগত্য করলো সে আল্লাহর আনুগত্য করলো। যেই ব্যক্তি আমাকে অমান্য করলো সে আল্লাহকেই অমান্য করলো। আর যেই ব্যক্তি আমীরের আনুগত্য করলো সে আমারই আনুগত্য করলো। যেই ব্যক্তি আমীরের অবাধ্য হলো সে আমারই অবাধ্য হলো।”

 – সহীহুল বুখারী

اسمعوا والطيعوا وان استعمل علیکم عبد حبشی كان راسه زبيبة

“তোমরা শ্রবণ কর ও আনুগত্য কর যদিও তোমাদের ওপর কোন হাবশী গোলামকেও কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয় এবং তার মাথা দেখতে আংগুরের মতো (ছোট) হয়।”

عليك السمع والطاعة فی عسرك ويسرك ومنشطك ومكرهك

“সহজ অবস্থায় ও কঠিন অবস্থায় এবং সন্তুষ্টিতে ও অসন্তুষ্টিতে তথা তোমার অধিকার নস্যাৎ হওয়ার ক্ষেত্রেও শ্রবণ করা ও আনুগত্য করা তোমার কর্তব্য।” – সহীহ মুসলীম

من کره من آمیره شیا

فلیصابر

“তোমদের কেউ যদি তার আমীরের মধ্যে কোনরূপ অপ্রীতিকর বিষয় লক্ষ করে, সে যেন ধৈর্য ধারণ করে।” -সহীহুল বুখারী, সহীহ মুসলিম

সালামাহ ইবনে ইয়াযিদ আল জুফী (রা)জিজ্ঞেস করেছিলেন,

سأل سلمة ابن يزيد الجغفى رسول اللّه صلى اللّة عليه وسلم فقال يا نبى اللّه أرأيت ان قامت علينا أمراء يسألونا حقهم ويمنعونا حقنا فما تأمرنا؟ فأعرض عنه ثم سأله فقال رسول اللّه صلى اللّة عليه وسلم اسمعوا وأطيعوا فائما تليهم ما نملو او و عليكم ما هملتم

“তোমরা হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের ওপর যখন এমন আমীর ক্ষমতায় আসীন হবে যারা তাদের অধিকার আমাদের নিকট থেকে পুরাপুরি আদায় করে নিতে চাইবে আমাদের অধিকার দেবে না তখন আমরা কি করবো? রাসূলুল্লাহ (সা) তার প্রতি (প্রশ্নকর্তার)ভ্রুক্ষেপ করলেন না। সালামাহ আবার জিজ্ঞেস করলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এবার বললেন, “ তোমারা শ্রবণ করবে ও আনুগত্য করে যাবে। কারণ তাদের বোঝা তাদের ওপর। তোমাদের বোঝা তোমাদের ওপর। ” – সহীহ মুসলীম

আনুগত্যের মূল অধিকারী হচ্ছেন আল্লাহ। আনুগত্যের দ্বিতীয় অধীকারী হচ্ছেন আল্লাহর রাসূল(সা)। আর তৃতীয় অধিকারী হচ্ছেন সংগঠনের আমীর।

আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য নি:শর্ত। অর্থাৎ কোন বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ কী তা জানার পর বিনা বাক্য ব্যয়ে তা পালন করাই মুমিনের কর্তব্য। আমিরের নির্দেশ যদি আল্লাহ ও তার রাসূল (সা) নির্দেশের সাথে সাংঘর্ষিক না হয় তাও পূর্ণ আন্তরিকতার সহকারে পালন করতে হবে। কিন্তু তার কোন নির্দেশ যদি আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশের সাথে সাংঘর্ষিক হয় তা পালন করা যাবে না। এই সম্পর্ক আল্লাহর রাসূলের শিক্ষা হলো :

آلطاعة فی المغروف

“আনুগত্য কেবল মারূফ কাজে।” – সহীহুল বুখারী

لاً طاعة لمخلوق فى معصية الخالق

“স্রষ্টার অবাধ্য হয়ে কোন সৃষ্টির আনুগত্য করা চলবে না।”

السمع والطاعة حق ما لَمْ يُؤمر بمخصية فاذا أمر بمغصية فلاً سمع ولاً طاعة

“গুনাহর নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নেতার নির্দেশ শ্রবণ ও পলন প্রত্যেকের জন্য অবশ্য কর্তব্য। গুনাহর নির্দেশ দেয়া হলে আনুগত্য পাওয়ার অধিকার তার নেই।” – সহীহুল বুখারী

على المرء المسلم السمع والطاعة فيما آحب وكره الأآن يؤمر بمغصية فاذا أمر بمغصية فلاً سمع ولاً طاعة

“প্রত্যেক মুসলিমের ওপর নেতার নির্দেশ শ্রবণ করা ও আনুগত্য করা অবশ্য কর্তব্য- চাই তা তার পছন্দ হোক বা অপছন্দ হোক, যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহর নাফরমানীর নির্দেশ না দেওয়া হয়। আল্লাহর নাফরমানীর নির্দেশ দেয়া হলে তা শ্রবণ করা ও আনুগত্য করা যাবে না।” -সহীহুল বুখারী, সহীহ মুসলীম

সংগঠনের শৃঙ্খলার উপাদান হচ্ছে আনুগত্য। যেই সংগঠনে আনুগত্য নেই সেই সংগঠনে শৃঙ্খলা নেই। আর শৃঙ্খলাই যদি না থাকে তাহলে সংগঠনে বহুলোকের ভিড় জমলেও এর কোন মূল্য হয় না।

একটি সংগঠন তখনই কোন বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে পারে যখন এর কর্মীবাহিনী নেতার নির্দেশকে সেভাবে পালন করে যেভাবে সেনাবাহিনীর জওয়ানরা তাদের কমান্ডারের নির্দেশ পালন করে থাকে।

ইসলামী সংগঠনে পদলোভীর স্থান

আল্লাহর বিচারালয়ে নেতার জবাবদিহি একজন সাধারণ মুমিনের জবাবদিহির চেয়ে কঠোরতর হবে। এই জবাবদিহি সম্পর্কে সত্যকার অর্থে কোন সচেতন ব্যক্তি নেতৃত্ব-পদ লাভের আকাংখা পোষণ করবে, এটা স্বাভাবিক নয়। যদি কোন ব্যক্তির কথা আচরণ থেকে প্রমাণিত হয় যে নেতৃত্ব পদের প্রতি তার লোভ রয়েছে তাহলে বুঝতে হবে যে সেই ব্যক্তি ব্যাধিগ্রস্থ।

একমাত্র আত্মপুজারী বা স্বার্থান্ধ ব্যক্তিই ইসলামী সংগঠনের নেতৃত্ব পদ লাভের জন্য প্রার্থী হতে পারে। এই ধরনের কোন ব্যক্তি যাতে ইসলামী সংগঠনের কোন পদ পেতে না পারে সেই ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল(সা) সদা-সতর্ক ছিলেন।

يا عبد الرحمن بن سمرة لا تسأل الامارة – فاتك ان أعطيتها عن غير مسألة أعلنت عليها، وأن أعطيتها عن مسألة وكانت اليها

রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন, “হে আবদুর রহমান ইবনু সামুরাহ, নেতৃত্ব পদ প্রার্থী হয়ো না। কারণ প্রার্থী না হয়ে নেতৃত্ব প্রদত্ত হলে তুমি এই ব্যাপারে সহযোগীতা পাবে। আর প্রার্থী পয়ে নেতৃত্ব পদ পেলে তোমার ওপরই যাবতীয় দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হবে। ” সহীহ মুসলীম

ائتا واللّه لأئولى على هذا العمل أحدًا سألة ولاً أحدًا حرص عليه

“আল্লাহর শপথ, আমরা এমন কোন লোকের ওপর এই কাজের দায়িত্ব অর্পণ করবো না যে এর জন্য প্রার্থী হয় বা অন্তরে এর আকাংখা পোষণ করে।” সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম

পদ-লোভী সাধারণত: পরোক্ষভাবে নেতৃত্ব পদে আসীন হবার চেষ্টা করে। কিন্তু এই লোভ যখন মাত্রাতিরিক্ত হয় তখন সে পরোক্ষ ভূমিকা বাদ দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে নেমে পড়ে। নিজেকে নেতা ঘোষণা করে সে লোকদেরকে তার নিকট বাইয়াত হওয়ার আহব্বান জানায়।

খুলাফায়ে রাশিদিনের পর মুসলিম উম্মাহ এই ধরণের দু:খজনক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছ। স্বঘোষিত নেতাদের হাতে পড়ে মুসলিম উম্মাহকে বহু দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।

মুসলিম উম্মাহ যে পরবর্তী যুগগুলোতে এই ধরনের অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে (সা) এবং রাসূল(সা) তাঁর সাহাবীগণকে এই সম্পর্কে অবিহিত করেছেন। এই ধরনের পরিস্থিতির মুকাবিলা করার জন্য কী পদক্ষেপ নেয়া বাঞ্ছনীয় তাও তিনি বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেছেন।

আল্লাহ্‌র  রাসূল(সা) বলেন,

وسيكونون بغدى خلفاء فيكثرون قالوا يا رسول اللّه فما

تأمرنا ؟ قال أو فوا بيعة الأول فالأول

“অচিরেই আমর পরে বেশ কিছু সংখ্যক খালীফা হবে।” সাহাবীগণ বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, তখনকার জন্য আমাদের প্রতি আপনার কী নির্দেশ? তিনি বললেন, “যথাক্রমে একজনের পর আরেকজনের বাইয়াত পূর্ণ করবে। ” – সহীহুল বুখারী, সহীহ মুসলিম

اذا بويع لخليفتين فاقتلوا الاخر منها

 “যখন দু’জন খলীফাহর জন্য বাইয়াত গ্রহণ করা হয়, তখন যার বাইয়াত শেষে গ্রহণ করা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে লড়াই কর।” -সহীহ মুসলিম

و من بایع اماما فأعطاهٔ صفقة یده و ثمرة قلبه، فلیطغهٔ ان

استطاع فان جاء اخر ينازعه فاضربوا عنق الاخر

 “এবং কেউ যদি নেতার নিকট বাইয়াত করে, তার হাত রেখে এবং তার নিকট অন্তরের অর্ঘ নিবেদন করে তাহলে সে যেন সাধ্যমতো আনুগত্য করে। অপর কোন ব্যক্তি যদি মুকাবিলায় আত্মপ্রকাশ করে তাহলে যেন তার ঘাড় মটকে দেয়।” -সহীহ মুসলিম

আল্লাহর রাসূলের(সা) এই বাণী থেকে বুঝা গেল যে, পদলোভী ব্যক্তিকে নেতৃত্ব পদে বরণ করে নেয়া যাবে না। তেমনিভাবে ইসলামী সংগঠন বা রাষ্ট্রের জনসমর্থনপুষ্ঠ একজন আমীর বর্তমান থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় কোন ব্যক্তিকে আমীর স্বীকার করা যাবে না। স্বীকার করাতো দূরে থাক, এই ধরনের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহর রাসূল(সা)।

পদ লোভী ব্যক্তি দল বা রাষ্ট্রের নেতৃত্ব পদ লাভ করলে সে তা বিনাশই করে ছাড়ে। তদুপরি সে তার আখিরাতেও বরবাদ করে। এই সম্পর্কেই আল্লাহর রাসুল(সা)বলেছেন,

انگم سنتحر صون على الامارة فستكون ندامة يوم القيامة

“অচিরেই তোমরা নেতৃত্ব পদের অভিলাষী হয়ে পড়বে। আর কিয়ামাতের দিন এটা তোমাদের জন্য লজ্জা ও দু:খের কারণ হবে।” -(সহীহুল বুখারী)

ইসলামী সংগঠনে পরামর্শ

পরামর্শ নেয়া ও পরামর্শ দেয়া ইসলামী সংগঠনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ রব্বুল আলামীন সামষ্টিক কাজ কর্মে আসহাবে কিরামের সাথে পরামর্শ করার জন্য রাসূলকে (সা) নির্দেশ দিয়েছেন :

وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ ۖ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ

“কাজ-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ কর। কোন বিষয়ে তোমার মত সুদৃঢ় হয়ে গেলে আল্লাহর ওপর ভরসা কর।” – আলে ইমরান : ১৫৯

মুমিনদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন,

মুমিনদের বৈশিষ্ট উল্লেখ করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন,

أَمْرُهُمْ شُورَىٰ بَيْنَهُمْ

তাদের সামষ্টিক কাজ-কর্মে পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়। ” -আশ শুরা : ৩৮

যেই বিষয়ে একাধিক ব্যক্তির সুবিধা-অসুবিধা রয়েছে সেই বিষয়ে কোন একজনের এককভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এক ধরণের বাড়াবাড়ি। কোন বিষয়ে যতো মানুষের স্বার্থ জড়িত আছে ততো মানুষের সাথে পরামর্শ করাই বাঞ্ছনীয়। সংশ্লিষ্ট লোকের সংখ্যা যদি খুব বেশি হয় তাহলে তদের প্রতিনিধি স্থানীয় ব্যক্তিদের পরামর্শ গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। কোন মানুষ সামষ্টিক ব্যাপারগুলোতে স্বেচ্ছাচারিতা চালানোর চেষ্টা হয়তো এই জন্য করে যে, সে নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য অন্যের অধিকার হরন করতে চায় অথবা সে নিজেকে বড় এবং অন্যকে ছোট মনে করে। এই দু’ধরণের মনোভাবই খারাপ। মুমিন চরিত্রে এই ধরনের মনোভাব যেন প্রবেশ করতে না পারে তারই জন্য ইসলাম পারস্পরিক জীবনের অপরিহার্য শর্ত বানিয়ে দিয়েছে। যেসব বিষয় অপরের স্বার্থ ও অধিকারের সাথে জড়িত সেগুলোর ফয়সালা করা অতি বড় দায়িত্ব। আখিরাতে জবাবদিহির অনুভূতি যার আছে তিনি এমন বিষয়গুলোতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অথবা তদের প্রতিনিধিদের সাথে পরামর্শ করার চেষ্টা অবশ্যই করবেন যাতে সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকালে অসতর্কভাবে কোন ত্রুটি ঘটলেও কোন এক ব্যক্তির উপর তার দায় দায়িত্ব না পড়ে।

মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে লোকেরা পূর্ণ স্বাধীন হতে হবে। মানুষের মুখ বন্ধ করে তাদের হত-পা বেঁধে তাদেরকে অন্ধকারে রেখে সামষ্টিক ব্যাপারসমূহ পরিচালনা করা বড়ো রকমের যুলম।

ঐকমতের ভিত্তিতে যেই পরামর্শ দেয়া হয় অথবা যা অধিকাংশ ব্যক্তির মত হয় তা মেনে নেয়াই বাঞ্ছনীয়। কেননা কোন ব্যক্তি যদি সকলের মত পাওয়ার পর স্বেচ্ছাচারিতা অবলম্বন করে তাহলে পরামর্শ করার নীতি কার্যত: অর্থহীন হয়ে পড়ে। কেবল পরামর্শ নিলেই হয় না। পরামর্শের পর সর্বসম্মতভাবে অথবা অধিকাংশের মতের ভিত্তিতে যেই সিদ্ধান্ত হবে সেই অনুযায়ী ব্যাপারসমূহ সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন।

আরো একটি মৌলিক কথা মনে রাখা দরকার। মুসলিমদের ব্যাপারসমুহ নিষ্পন্ন করার ক্ষেত্রে মাজলিসে শুরা নিরংকুশ ক্ষমতার অধিকারী নয়। পরামর্শ দীন ইসলামের নির্দিষ্ট সীমার মধ্যেই হতে হবে। মুসলীমগণ শারীয়াহের ব্যাপারে পরামর্শ করবে কোন বিধানের সঠিক তাৎপর্য বুঝার জন্য এবং তা কার্যকর করার লক্ষে সর্বোত্তম পন্থা নির্ধারণ করার জন্য। যেসব বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল(সা) চূড়ান্ত ফয়সালা দিয়েছেন সেসব বিষয়ে মাজলিসে শূরা স্বাধীনভাবে কোন নতুন ফয়সালা গ্রহণের উদ্যোগ নিতে পারে না।

ইসলামী সংগঠনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ

মাজলিসে শুরা বা পরামর্শ সভার সদস্যগণ মুক্ত মন নিয়ে সভায় সমবেত হবেন। তাঁরা পূর্ব প্রতিষ্ঠিত কোন ধারণা নিয়ে সভায় আসবেন না।

পরামর্শ দাতাগণ নিজেদের ঈমান, ইলম ও নিরপেক্ষ চিন্তা-ভাবনা অনুযায়ী মত ব্যক্ত করবেন। কোন লোভে পড়ে, কোন ভয়ে ভীত হয়ে অথবা কোন্দলে পড়ে নিজের প্রকৃত মনোভাবের বিপরীত মত ব্যক্ত করবেন না।

একে অপরের বক্তব্য মনোযোগ সহকারে শুনবেন এবং বক্তব্যের সঠিক অর্থ বুঝবার চেষ্টা করবেন।

প্রত্যেক সদস্য নিজের অভিমত নি:সংকোচে ব্যক্ত করবেন।

প্রত্যেক সদস্যই অধিকার উত্তম অভিমতের মুকাবিলায় নিজের অভিমত কুরবানী করতে প্রস্তুত থাকবেন।

প্রত্যেকেই একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের দিকে এগুবার চেষ্টা চালাবেন।

কখনো যদি এমনটি হয়ে যায় যে, মাজলিসে শুরা সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারছেনা, তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অভিমতকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বুনিয়াদ বানাতে হবে।

সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের মতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে যারা দ্বিমত পোষণ করবেন তারাও মাজলিসে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করবেন এবং কোনভাবেই তাঁদের দ্বি-মত পোষণের কথা মাজলিসের বাইরের কাউকে জানাবেন না।

ভিন্নমত পোষণকারীগণ আমীরের মাধ্যমে পরবর্তী সভায় সিদ্ধান্ত পুর্নবিবেচনা করার জন্য মাজলিসে শুরার অধিকাংশ সদস্য সিদ্ধান্ত বহাল রাখার পক্ষে মত ব্যক্ত করলে ভিন্ন মত পোষণকারীগণকে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কাজেই মন দিতে হবে।

সিদ্ধান্ত গ্রহণের আলোচনা এমন পর্যায়েও পৌছাতে পারে যখন আমীর কিছুতেই মাজলিসে শুরার অধিকাংশ সদস্যের মতের সাথে একমত হতে পারেন না। এমতাবস্থায় সিদ্ধান্ত মুলতবী রেখে আমীর বিষয়টি সদস্য মন্ডলীর নিকট পেশ করবেন।

সদস্য মন্ডলী উভয় মত বিবেচনা করে যেটাকে অধিকতর উত্তম ও কল্যাণকর বলে রায় দেবেন আমীর এবং মাজলিসে শূরার সদস্যগণ বিনা দ্বিধায় তা মেনে নেবেন।

ইসলামী সংগঠনে ইহতিসাব

এই যুগে কোন নবী নেই। নবীর গড়া কোন মানুষও নেই।

আমরা যারা সাধারণ মানুষ তাদেরকেই আজ ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালাতে হচ্ছে ঈমানের দাবী পূরণের জন্য। কিন্তু আমাদের জীবনে আছে ভুলভ্রান্তি। কোন মুমিন সারা জীবন ভুল-ভ্রান্তি আবর্জনায় গড়াগড়ি দিতে থাকুক, এটা আল্লাহ চান না। তাই তিনি মুমিনদেরকে তাদের চিন্ত-ভাবনা, কথাবার্তা, লেন দেন ও যাবতীয় কাজ কর্মের তাযকিয়া কাজে মনোযোগী হতে উৎসাহিত করেছেন।

মুমিনগণ যাতে একে অপরের ভুলভ্রান্তি দেখিয়ে দেয় তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে আল্লাহর রাসূল(সা) বলেন,

“মুমিন মুমিনের আয়না।” -সুনানু আবী দাউদ

আয়না যেভাবে একজন ব্যক্তিকে তার সাজগোছে কোথায় কোন ত্রুটি আছে তা দেখিয়ে দেয়, একজন মুমিনও সেভাবে আরেকজন মুমিনের জীবনে কোথায় কী ত্রুটি আছে তা দেখিয়ে দেবে।

সাধারণত: অবচেতনভাবেই মানুষ ভুল করে। কেউ যদি এই ব্যাপারে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে তবেই সে সচেতন হয়ে তার জীবন থেকে ভুল-ভ্রান্তি দূর করার পদক্ষেপ নিতে পারে। একে অপরের ভুল ভ্রান্তি দেখিয়ে দেয়ার এই প্রক্রিয়ারই নাম ইহতিসাব।

ভুল দেখিয়ে দেয়ার একটা বিজ্ঞান সম্মত পদ্ধতি আছে। সেই পদ্ধতি অনুসরণ করা খুবই জরুরী। তা না হলে হিতে বিপরীত হবার সমূহ আশংকা। ইহতিসাব ব্যক্তিগতভাবে করাই বাঞ্ছনীয়। ব্যক্তিগতভাবে ভুলভ্রান্তি দেখিয়ে দেয়া সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যদি নিজেকে শুধরাতে উদ্যোগী না হয় তাহলে সামষ্টিক ফোরামে আনা যাবে।

ইহতিসাবের আগে ব্যক্তির মানসিক অবস্থা জেনে নেয়া বাঞ্ছনীয়। কঠিন সমস্যা-পীড়িত মানুষ কোন প্রকারের সমালোচনা বরদাশত করতে পারে না অথবা যথার্ত মেজাজে সমালোচনা গ্রহণ করতে পারে না। সেই জন্য ব্যক্তির মানসিক অবস্থা যাচাই করে নেয়া দরকার। ইহতিসাবের ভাষা হবে মোলায়েম। ভাষায় কোন তেজ থাকবে না। ক্ষোভের অভিব্যক্তি ঘটবে না।

ইহতিসাব যে করবে তার চেহারা ও ভাব-সাবে রাগ ও ক্ষোভ প্রকাশ পাবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যেন বুঝতে সক্ষম হয় যে তার ত্রুটি দেখিয়ে দেয়ার লক্ষ্য, তাকে হেয় প্রতিপন্ন করা নয় বরং তার জীবনকে সুন্দর করা।

ইহতিসাব মাথা পেতে নেয়া নিশ্চয়ই বাহাদুরি কাজ। কোন কাপুরুষের পক্ষে ইহতিসাবের মুকাবিলায় মানসিক ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভবপর নয়। কিন্তু ইসলামী সংগঠনের কর্মীগণ এই ধরনের কাপুরুষতার শিকারে পরিণত হবেন, এটা কাম্য নয়। তাই ইসলামী সংগঠনের প্রতিটি কর্মীকে ইহতিসাবের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। ইহতিসাবের কল্যাণকারিতা থেকে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করতে হবে এবং সত্যকে অকাতরে মেনে নেয়ার মনোবৃত্তি রাখতে হবে।

ইহাতিসাবের কল্যাণকারিতা সম্পর্কে যেই ব্যক্তি সচেতন সেই ব্যক্তিই ইহতিসাবকে খোশ আমদেদ জানাতে পারে। এমন ব্যক্তির কাছে থেকে ইহতিসাবের যে জবাব আসবে তা সংগঠনের সুস্থতা অক্ষুন্ন রাখবে এবং সংগঠনের কর্মীগণ আয়নার ভূমিকা পালন করার হিম্মত রাখতে পারবে।

About এ. কে. এম. নাজির আহমদ