ইসলামী সংগঠন

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

ইসলামী সংগঠন কর্মী গঠন

কর্মী গঠন কষ্টসাধ্য, কিন্তু অসাধ্য নয়। ধৈর্য সহকারে চেষ্টা চালাতে থাকলে ইসলামের সঠিক রূপ উপলব্ধিকারী একজন ব্যক্তিকে করমীরূপে গড়ে তোলা যায়। এই ধরনের একজন ব্যক্তি কর্মী বা হওয়ার পেছনে অবশ্যই কোন কর্মী বানাবার জন্য বিচক্ষণতা সহকারে অগ্রসর হবেন।

(১) সহচর্য দান

যাকে কর্মী বানাবার জন্য সিলেক্ট করা হবে সে তো এই সমাজেরই মানুষ। সমাজের বহু নারী ও পুরুষের সাথে তার মেলামেশা। তাদের কথাবার্তা, ধ্যান-ধারণা ও আচরণ দ্বারা সে নিশ্চয় প্রভাবিত। ইসলামের পথের আহবান শুনেই সে এক লাফে চলে আসতে পারে না। সে একজন সামাজিক জীব। তার মন উন্মুক্ত করার জন্য, মনের ভার লাঘব করার জন্য এবং ভাব-বিনিময় করার জন্য ওই লোকগুলো তার প্রয়োজন। ওসব লোকের বেষ্টনী থেকে মুক্ত করতে হলে তাকে সাহচর্য দান করতে হবে। তার আপঞ্জনে পরিণত হতে হবে। তার বন্ধু মহলের বিকল্প একটি মহল তাকে দিতে হবে। এই পর্যায়ে দু’ধরনের কাজ করতে হবে।

(ক) অন্তর্দ্বন্দ্ব নিরসন

কিছু বই পুস্তক পড়ে অথবা কিছুকাল যাবত যুক্তিপূর্ণ আলাপ-আলোচনা শুনে সে ইসলামের দিকে ঝুঁকেছে। কিন্তু আগেকার ধ্যান-ধারণাগুলো মাঝে মাঝে তাঁর মনোজগতে উদিত হচ্ছে। সেগুলোর চাকচিক্য মাঝে মাঝে তাঁর মনে একটা দোলা দিয়ে যায়। কোন আদর্শটি শ্রেষ্ঠতম এটা সে এখনো ভালোভাবে বুখে ওথাতে পারেনি। এই বিষয়ে তাঁর মনে এখনো দৃঢ় প্রত্যয় সৃষ্টি হয়নি। তদুপরি এই পথে চলতে গেলে সে ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার আশংকা দেখছে। বেশ কিছুকাল ধরেই তাঁর মনে এই দ্বন্দ্বে থাকা স্বাভাবিক। মনের এই অবস্থাটা সত্যিই নাজুক। এই সময়টি একজন মানুষের জীবনের অন্যতম জটিল বিষয়। এই সময় ইসলামী সংগঠনের কর্মী তাঁর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে আল ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাগুলো তার সামনে স্পষ্টতর করে তুলতে থাকবে। লাভ-ক্ষতির সঠিক তাৎপর্য তাকে বুঝাবে। দুনিয়ার লাভের চেয়ে আখিরাতের লাভ যে অনেক বেশি বড়ো ও মূল্যবান তা তাকে বুঝাতে হবে। আশা করা যায় এক পর্যায়ে এসে সেই ব্যক্তির অন্তর্দ্বন্দ্ব দূর হবে। ইসলামের প্রতি তার মনে দৃঢ় প্রত্যয় সৃষ্টি হবে।

(খ) মানসিক দৃঢ়তা অর্জনে সহযোগিতা দান

এবার সেই ব্যক্তি নিজেকে ইসলামের অনুসারী বলে পরিচয় দিতে শুরু করবে। কিন্তু এই সময় তাকে অনেক হোঁচট খেতে হবে। তার পরিবার-পরিজন এবং পূর্বতন বন্ধুমহল তার জীবন দুর্বিসহ করে তুলবে। তাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করবে। তার সমালোচনা করবে। ইসলামের পথে অগ্রসর না হবার জন্য তাকে চাও দেবে। বিভিন্ন ব্যাপারে তার সাথে অসহযোগিতা করবে।

এই সময় তার পাশে থেকে মুমিনের চলার পথে স্বাভাবিকভাবে যেসব বাধা আসে সেগুলো সম্পর্কে তাকে ওয়াকিফহাল করে তুলতে হবে। এসব বাধার মুকাবিলা করার জন্য তাকে সাহস যোগাতে হবে। এসব আসহাবে রাসূল এবং পরবর্তী যুগের ইসলামের মুজাহিদদের পরীক্ষার ঘটনাসমূহ তার সামনে তুলে ধরতে হবে এবং পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার লক্ষ্যে মনোবল অটুট রাখার জন্য তাকে উৎসাহ দিতে হবে।

(২) সাংগঠনিক পরিবেশে আনয়ন

এই ধরনের বাধার মুকাবিলা করে যে সমনে অগ্রসর হয় তার পিছুটান দেবার আশংকা কম এবার তাকে সাংগঠনিক পরিবেশের সাথে পরিচিত করে তুলতে হবে। তাকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হাজির করতে হবে। সাংগঠনিক পরিবেশের পবিত্রতা ও চমৎকারিত্ব দেখে সে প্রীত হবে এবং নিজেকে আরো দৃঢ় করে নিতে পারবে।

(৩) ছোট খাটো দায়িত্ব অর্পণ

সাংগঠনিক পরিবেশে নিয়মিত আসা-যাওয়ার ভেতরে তার আন্তরিকতা পরিস্ফুট হয়ে ওঠবে। এবার তাকে ছোটোখাটো কাজ সম্পন্ন করার দায়িত্ব দিতে হবে। নিশ্চয়ই সে এগুলো সম্পন্ন করতে থাকবে। এভাবে কাজের প্রতি তার মনে সৃষ্ট হবে অনুরাগ। আবার কাজের অভিজ্ঞতাও সে অর্জন করবে এভাবেই।

(৪) অর্থ দানে উদ্বুদ্ধকরণ

এবার তাকে আল্লাহর পথে অর্থ দানের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ইনফাক ফী সাবীলিল্লাহর তাৎপর্য ও গুরুত্ব তাকে বুঝাতে হবে। আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এতো আগ্রসর হবার পর সে নিশ্চয়ই অকাতরে অর্থ দান করবে সংগঠনের বাইতুলমালে।

(৫) প্রাথমিক প্রশিক্ষণ প্রদান

অগ্রসরমান ব্যক্তির জন্য চাই প্রশিক্ষণ। ইসলামের প্রত্যয়বাদ, ইসলামী জীবন বিধান এবং অন্যান্য মতবাদের তুলনামুলক জ্ঞান দিয়ে তাকে সমৃদ্ধ করে তুলতে হবে। এজন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কাযর্ক্রমে তাকে যোগদানের সুযোগ দিতে হবে।

 

(৬) আহবান জ্ঞাপনের দায়িত্ব অর্পণ

এই পর্যায়ে উপনীত হবার পর তাকে আহবান জ্ঞাপনের গুরুত্ব বুঝিয়ে এই কাযে আত্মনিয়োগ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে। আল্লাহর দিকে আহবান জ্ঞাপনের পদ্ধতি সম্পর্কেও তাকে করতে হবে ওয়াকিফহাল।

(৭) কাজের রিপোর্ট গ্রহণ

সপ্তাহে একবার খবর নিতে হবে তার কাজের। জেনে নিতে হবে কারা তার টার্গেট। কি ধরনের বই তাদেরকে দেয়া হচ্ছে এবং কি ধরনের আলাপ হচ্ছে তাদের সাথে। তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শও দিতে থাকতে হবে। যদি দেখা যায় এই ব্যক্তি ধারাবাহিকভাবে আহবান জ্ঞাপন এবং সংগঠনের অর্পিত বিভিন্ন কাজ সঠিকভাবে পালন করেছে তাহলে সে ইসলামী সংগঠনের একজন কর্মী হলো।

কর্মী গঠনের কাজ যত ব্যাপক হবে, ইসলামী বিপ্লব সাধনের সময়ও ততই ত্বরান্বিত হবে। আর নতুন কর্মী গঠনের এই কঠিন দায়িত্ব পালন করতে হবে হবে পুরোনো কর্মীদেরকেই।

ইসলামী সংগঠনে কর্মীর মানোন্নয়ন

ইসলামী সংগঠনের কর্মতৎপরতা অংশগ্রহণ করে কর্মীগণ অব্যাহতভাবে জ্ঞানগত ও সাংগঠনিক প্রশিক্ষণ লাভ করে থাকে। স্বাভাবিক প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়ার বাহিরেও কর্মীদের মানোন্নয়ের জন্য বিশেষ বিশেষ কার্যক্রমের অবলম্বন করা প্রয়োজন। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। নিম্নে অত্যন্ত ফলপ্রসূ কয়েকটি কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করছি।

(১) সাপ্তাহিক সভা

কর্মীর মানোন্নয়ের জন্য নিয়মিত সাপ্তাহিক সভা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাপ্তাহিক সভায় নিয়মিত যোগদানের মাধ্যমে কর্মীদের মাঝে সময়ানুবর্তিতা এবং সাংগঠনিক আনুগত্যের অভ্যাস গড়ে ওঠে। তদুপরি সাপ্তাহিক সভার আলোচনা কর্মীদের জ্ঞান বৃদ্ধির সহায়ক। সাপ্তাহিক সভার কার্যক্রম সাধারণত নিম্নরূপ হতে পারেঃ

(ক) পরিচালক কর্তৃক সভার উদ্ধোধন

(খ) দারসে কুরাআন বা দারসে হাদীস

(গ) কর্মীদের কাজের রিপোর্ট গ্রহণ

(ঘ) অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ

(ঙ) পরবর্তী সভার কার্যসূচি প্রণয়ন

(চ) পরিচালকের বক্তব্য ও সভার সমাপ্তি ঘোষণা

 

(২) সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ শিবির

জ্ঞানের ব্যাপকতা বৃদ্ধির জন্য বেশী সংখ্যক কর্মীকে নিয়ে বেশী সংখ্যক সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ শিবির অত্যন্ত জরুরী। সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ শিবিরের কার্যক্রম নিম্নরূপ হতে পারেঃ

(ক) উদ্বোধন

(খ) দারসে কুরাআন

(গ) এক বা একাধিক প্রধান বক্তৃতা

(ঘ) বক্তৃতা ভিত্তিক আলোচনা

(ঙ) পরিচালকের বক্তব্য ও সমাপ্তি ঘোষণা

(৩) পাঠ চক্র

আদর্শিক জ্ঞান বৃদ্ধি, আন্দোলন ও সংগঠন সম্পর্কে ধারণা দান, সাংগঠনিক পারদর্শিতা সৃষ্টি, সমাজ-সচেতনতা সৃষ্টি এবং ইসলামী আন্দোলনের করম-কৌশল সম্পর্কে ধারণা দানের জন্য পাঠচক্র অনন্য ভূমিকা পালন করে থাকে। সমমানের অনুর্ধ দশজন কর্মীকে নিয়ে পাঠচক্র গঠিত হয়। শুরুতেই পাঠচক্রের জন্য পূর্ণাঙ্গ কোর্স তৈরি করে নিতে হয়। পাঠচক্রের কমপক্ষে দশটি সেসন বা অধিবেশন হওয়া দরকার। দু’অধিবেশনের মাঝে এক মাসের বেশি ব্যবধান হওয়া উচিত নয়। পাঠ চক্রের অধিবেশনের কার্যক্রম নিম্নরূপ হতে পারেঃ

(ক) পরিচালক কর্তৃক অধিবেশনের উদ্বোধন

(খ) পাঠ চক্রের প্রত্যেক সদস্যের আলোচনা পেশ

(গ) প্রশ্নোত্তর

(ঘ) পরিচালক কর্তৃক সকলের আলোচনা পর্যালোচনা

(ঙ) আলোচ্য বিষয়ের উপর পরিচালকের সমাপনী বক্তব্য

(৪) দীর্ঘ প্রশিক্ষণ শিবির

ইসলামী জীবনাদর্শ, ইসলাম বিরোধী মতবাদ, ইসলামী আন্দোলন, ইসলামী সংগঠন, ইসলামী আন্দোলনের কর্মকৌশল, কর্মীদের আকাংখিত মান ইত্যাদি সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান ও স্পষ্টতর ধারণা দানের উদ্দেশ্যে বেশি সংখ্যক কর্মী নিয়ে তিন, পাঁচ বা সাতদিনের দীর্ঘ প্রশিক্ষণ শিবির অনুষ্ঠান খুবই প্রয়োজনীয়। এই ধরনের শিবিরের কর্মসূচি নিম্নরূপ হতে পারে।

(ক) উদ্বোধন (প্রথম দিন)

(খ) দারসে কুরাআন

(গ) দারসে হাদীস

(ঘ) দুই বা ততোধিক প্রধান বক্তৃতা

(ঙ) বক্তৃতা ভিত্তিক আলোচনা

(চ) শিক্ষার্থীদের বক্তৃতা

(ছ) সাধারণ প্রশ্নোত্তর

(জ) হাতে কলমে শিক্ষা (সহীহ করে আল কুরাআন পঠন, হিসাব রক্ষণ, নথি-পত্র সংরক্ষণ ইত্যাদি)

(ঝ) সমাপ্তি ভাষণ (শেষ দিন)

(৫) বক্তৃতা অনুশীলন চক্র

বক্তৃতা ভাষণের মাধ্যমেই অগণিত মানব গোষ্ঠীকে ইসলামী আদর্শ, আন্দোলন ও সংগঠন বুঝাতে হবে। সংগঠন যেই হারে সুবক্তা তৈরি করে কাজের ময়দানে পেশ করতে পারবে কাজের ব্যাপ্তি সেই হারেই বাড়বে।

কর্মীদের বক্তা বানানোর জন্য বক্তৃতা অনুশীলন চক্র একটি ফলপ্রসূ প্রক্রিয়া। কয়েকজন কর্মীকে নিয়ে গঠিত হবে একটি বক্তৃতা অনুশীলন চক্র। এর পরিচালনায় থাকবেন একজন দক্ষ পরিচালক। চক্রের জন্য তিনি সময়সূচী নির্ধারণ করবেন। বক্তৃতা অনুশীলন কার্যক্রম নিম্নরূপ হতে পারেঃ

(ক) পরিচালক কর্তৃক উদ্বোধন

(খ) চক্রের অন্তর্ভুক্ত কর্মীদের বক্তৃতা

(গ) পরিচালক কর্তৃক বক্তার সম্বোধন পদ্ধতি, বক্তব্য বিষয়ে জ্ঞানের বোধগম্যভাবে বক্তব্য উপস্থাপনে ব্যর্থতা-সাফলতা, বক্তব্য উত্থাপনে ধীরতা-দ্রুততা, অঙ্গভঙ্গি এবং বক্তৃতার আঙ্গিক (প্রারম্ভ, মধ্যভাগ ও সমাপ্তি) ভালভাবে পর্যবেক্ষণ ও নোট করণ

(ঘ) পর্যবেক্ষণ ও নোটের ভিত্তিতে পরিচালক কর্তৃক বক্তৃতা পর্যালোচনা।

(ঙ) সমাপ্তি ঘোষণা

(৬) ব্যক্তিগত আলাপ, জিজ্ঞাসা এবং পরামর্শ দান

একজন কর্মীর মান মূল্যায়নের জন্য তার সাথে আলাপ খুবই জরুরী। আলাপকালে বিভিন্ন প্রশ্নের মাধমে তার জ্ঞান, অনুশীলন এবং সাংগঠনিক মান সম্পর্কে সঠিক ধারণা নিয়ে তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দরকার। নিসন্দেহে ব্যক্তি গঠনে এটি একটি উত্তম প্রক্রিয়া।

ইসলামী সংগঠনের সংহতি

একটা ইসলামী সংগঠনের সূচনা করা খুব কঠিন কাজ নয়। কিন্তু একে সঠিক মিজাজে পরিচালনা করা এবং এর সংহতি সংরক্ষণ করা বড়োই কঠিন। কখনো কখনো দেখা যায় সংগঠনের সাথে জড়িত কিছু লোক ব্যতিক্রমধর্মী ভূমিকা পালন করছে।

প্রথমে এদেরকে সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ আনুগত্যের পরিবর্তে আংশিক আনুগত্য করতে দেখা যায়। কিছুকাল পর এরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। আরো কিছুকাল পর দেখা যায় এরা গীবাতের মতো জঘন্য পাপে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। তাদের এই ভূমিকা সংগঠনের সংহতির পক্ষে ক্ষতিকর।

যারা এই ধরনের ভূমিকা পালন করে তাদের মন-মানসিকতা বিশ্লেষণ করলে অনেকগুলো কারণ চিহ্নিত করা সম্ভব। প্রধানতঃ নিম্নোক্ত কারণগুলো তাদের অবাঞ্চিত আচরণের জন্য দায়ী।

(১) ইসলামী আন্দোলনের প্রকৃত লক্ষ্য সম্পর্কে অস্পষ্টতা

ইসলামী আন্দোলনের একজন কর্মী কেবল আল্লাহর সন্তোষ অর্জনকেই তার জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য বানিয়ে নেয়ার কথা। রিদওয়ানুল্লাহ বা আল্লাহর সন্তোষ অর্জনের লক্ষ্যে পরিচালিত হবে তার চিন্তাধারা ও কর্মপ্রবাহ। এই মৌল লক্ষ্য যদি ভালোভাবে মন-মগজে স্থান না পায় তাহলে নিশ্চয়ই অন্য কোন লক্ষ্য সেই স্থান দখল করে নেয়। আর দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানেও সেই লক্ষ্য অর্জিত না হতে দেখলে সে অস্থির হয়ে ওঠে নিতান্ত স্বাভাবিকভাবেই। এই মানসিকতা অস্থিরতা থেকে জন্ম নেয়া অসন্তোষ যা ক্রমশঃ তার চিন্তাধারা ও কর্মধারাকে প্রভাবিত করে।

(২) ইসলামী সংগঠনের বৈশিষ্টগুলো সম্পর্কে অপূর্ণাংগ ধারণা

ইসলামী সংগঠন আর অন্যান্য সংগঠনগুলোর মাঝে আকাশ-পাতালের পার্থক্য রয়েছে। ইসলামী সংগঠনের নিজস্ব কতগুলো বৈশিষ্ট রয়েছে। এর নেতৃত্ব কাঠামো, নির্বাচন পদ্ধতি, আনুগত্য নীতি, পরামর্শ পদ্ধতি, ইহতিসাব পদ্ধতি প্রভৃতি সম্পর্কে কর্মীর সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। তা না হলে কর্মী সমাজ অংগনে যেসব সংগঠন দেখে থাকে অথবা সে যেই সংগঠন থেকে এসেছে সেটির বৈশিষ্টের আলোকে এই সংগঠনকেও বিচার করতে চাইবে। এতে করে যারা এই সংগঠনের বৈশিষ্টগুলো ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে তাদের চিন্তা আর এই কর্মীর চিন্তার মধ্যে বেশ দূরত্ব সৃষ্টি হয়। চিন্তার এই দূরত্ব সংগঠনের সংহতির পক্ষে ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়।

(৩) ইসলামী আন্দোলনের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে সংশয়

ইসলামী আন্দোলনের একটি বিশেষ কর্মপদ্ধতি রয়েছে। জোর করে মানুষের ঘাড়ে সওয়াব হওয়া এই আন্দোলনের কর্মপদ্ধতি নয়। এই আন্দোলন সমাজ পরিবর্তনের আগে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে পরিবর্তন আনতে চায়। আবার ব্যক্তির চিন্তাজগতে পরিবর্তন না এনে তার ব্যক্তিগত জীবনে কোন ফলপ্রসূ পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তাই ইসলামী আন্দোলনের মৌলিক কাজই হচ্ছে মানুষের চিন্তাধারা থেকে জাহেলী ধ্যান ধারণাগুলোর মূলোৎপাটন করে সেখানে ইসলামী ধ্যান ধারণা রোপণ করা। ব্যক্তির চিন্তাক্ষেত্রে ইসলামী ধ্যান ধারণার চারা যতোই বড়ো হতে থাকে তার কর্মপ্রবাহেও পরিবর্তন সূচিত হয় আনুপাতিক হারে। এভাবে গড়ে ওঠা মানুষগুলোর নিরালস প্রচেষ্টার ফলে সমাজে ইসলামী জীবন বিধান প্রচলনের চাহিদা সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ ইসলামী আন্দোলনের গণভিত্তি রচিত হয়। তখন একটি প্রবল আন্দোলন সৃষ্টি করে ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করা যায়।

ইসলামী আন্দোলনের এই স্বাভাবিক কর্মপদ্ধতির সাথে ভালোভাবে পরিচিতি না থাকলে একজন কর্মী ডানে বাঁয়ে কর্মরত বিভিন্ন আন্দোলনের কর্মপদ্ধতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে। তখন তার নিকট ইসলামী সংগঠনের অনুসৃত কর্মকৌশল অপ্রতুল মনে হয়। আন্দোলনের কর্মপদ্ধতির নির্ভুলতা সম্পর্কে তার মনে সংশয় সৃষ্টি হয়। এমতাবস্থায় সংগঠনের অনুসৃত ধারার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়ানো তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে।

(৪) বিপদ মুসিবাত সম্পর্কে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গির  অভাব

ইসলামদ্রোহীদের ওপর বিপদ মুসিবাত আসে আযাবরূপে। আর মুমিনদের উপর তা আসে পরীক্ষারূপে।

চলার পথের বিভিন্ন মোড়ে ইসলামী সংগঠনকে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় অনেকগুলো বিকল্প সামনে থাকে। যেই বিকল্পটি সর্বোত্তম বলে বিবেচিত হয় সেটিই হয় সংগঠনের সিদ্ধান্ত। সংগঠন জেনে বুঝে কোনদিন কোন কম উত্তম বিকল্পকে সিদ্ধান্তের ভিত্তি বানায় না। কিন্তু সব সময় সর্বোত্তম বিকল্প বেছে নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে থাকলেই সংগঠনের ওপর কোন বিপদ মুসিবাত আসবে না এমন ধারণা করা মস্ত বড়ো ভুল।

বিপদ মুসবাত আল্লাহর সিদ্ধান্তক্রমে আসে। তাঁর অনুমোদন ছাড়া কোন ব্যক্তি, দল বা জাতির ওপর বিপদ মুসিবাত আসতে পারে না। বিপদ মুসিবাত চাপাবার আগেই তিনি সেই ব্যক্তি, দল বা জাতির সাথে পরামর্শ করে তা থেকে ইসলামী সংগঠনের ওপর যখন কোন বিপদ মুসিবাত আসে তাকে আযাব মনে না করে পরীক্ষা মনে করা প্রত্যেক কর্মীর কর্তব্য।

বিপদ মুসিবাত সম্পর্কে এই দৃষ্টিভঙ্গির অনুপস্থিতি কর্মীকে বিভ্রান্তির শিকারে পরিণত করে। চিন্তার বিভ্রান্তি কর্মীকে সংগঠনের স্রোতধারা থেকে ক্রমশঃ দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়।

(৫) অগ্রাধিকার নির্ধারণে অক্ষমতা

ইসলামী সংগঠন নানামুখী কাজ করে থাকে। আবার কর্মীদেরও এক একজনের এক এক ধরনের কাজের প্রতি বেশী আগ্রহ থাকে। কিন্তু যার যেই কাজের প্রতি বেহী ঝোঁক সে যদি মনে করে যে এই কাজটিকেই সংগঠন অগ্রাধিকার দেয়া উচিত তাহলে সমস্যার উদ্ভব না হয়ে পারে না। সাহিত্যামোদী কর্মী সাহিত্যচর্চাকে, শিল্পীনুরাগী কর্মী শিল্প চর্চাকে, ক্রিড়ানুরাগী কর্মী ক্রিড়াকে, রাজনীতি প্রিয় কর্মী রাজনীতি চর্চাকে অগ্রাধিকার দেবার চাপ দিতে থাকলে সংগঠনের সমস্যার সম্মুখীন হতে বাধ্য। প্রত্যেকেই স্ব স্ব ক্ষেত্রের কাজের গুরুত্ব সংগঠনের সামনে তুলে ধরবে। এটা অন্যায় নয় বরং এটাই হওয়া উচিত। তবে সবকিছু বিচার বিশ্লেষণ করে সনহহঠন যেই কাজগুলোকে অগ্রাধিকার দেয় প্রত্যেক কর্মী সেগুলোকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। নিজস্ব পছন্দনীয় ক্ষেত্রে সংগঠনের নীতি নির্ধারকদের দৃষ্টিতে অগ্রাধিকার না পাওয়ায় খুঁতখুঁত করা ঠিক নয়। মনে এই ধরনের খুঁতখুঁতি থাকলে সমাগ্রিক কাজের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়া সম্ভব হয় না।

(৬) মানসিক ভারসাম্যহীনতা

মানসিক ভাসাম্যহীনতা কর্মীকে সংগঠনের স্বাভাবিক প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ভারসাম্যহীনতার অনেকগুলো লক্ষণ আছে। এখানে কয়েকটি প্রধান লক্ষণ উল্লেখ করা হলোঃ

(ক) ত্বরা প্রবণতা

অতি শিগগিরি কাজের ফল পাওয়ার আকাংখা কর্মীর মনে দারুন অস্থিরতা সৃষ্টি করে। যেই কোন পদ্ধতি অবলম্বন করে ফল পাওয়ার জন্য কর্মী উদগ্রীব হয়েওঠে।

(খ) অতি আশা

ভালভাবে পরিচিত না হওয়া পর্যন্ত কর্মী নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সম্পর্কে তাঁর মনের কোঠায় নিজেই একটি ভাবমূর্তি রচনা করে নেয়। মনে মনে সে তাদেরকে অতি মানবের স্থান দেয়। পরিচিত হবার পর সে দেখতে পায় তারা অতি মানবও নয়, অসাধারণ মানুষও নয়। তখন সে হতাশ হয়। কল্পিত মানুষটিকে পরিত্যাগ করে বাস্তব মানুষটিকে গ্রহণ করলে সমস্যা হয় না। সমস্যা সৃষ্টি হয়ত তখন যখন বাস্তব মানুষটিকে পরিত্যাগ করে কল্পিত মানুষটিকে গ্রহণ করা হয়।

(গ) চরম পন্থার প্রতি ঝোঁক

চরম মনোভাবাপন্ন কর্মী কোন সমকর্মীর সামান্য ভুল-ভ্রান্তিকেও বরদাশত করতে প্রস্তুত নয়। যেই কোন ভুল-ভ্রান্তির সে কঠোর প্রতিবিধানের পক্ষপাতী। তদুপরি বিরোধীদের মুকাবিলায় হিকমাত পূর্ণ কোন কর্মপদ্ধতি তার ভালো লাগে না। গরম ও চরম ধরনের কোন কিছু না হলে তাঁর পছন্দই হয় না।

(ঘ) অহংকার

অহংকারী ব্যক্তি আত্মপূজারী হয়ে তাকে। সে অন্যদেরকে হেয় জ্ঞান করে। নিজের চিন্তাশক্তি ও যোগ্যতা নিয়ে তার বড়ো গর্ব। অন্যদের সাথে খাপ খাওয়ানো তার প্রায়ই হয়ে ওঠে না।

(ঙ) অভিমান

কিছু সংখ্যক কর্মী আছে যারা সামান্যতেই অভিমান করে বসে। সহকর্মী বা নেতার উক্তি বা ব্যবহারে তারা অভিমান করে কাজ কর্ম ছেড়ে দেয়।

এই হচ্ছে মানসিক ভারসাম্যহীনতার কিছু লক্ষণ। মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি সামষ্টিক কর্মকান্ডের ডিফেকটিভ কল-কব্জার ভূমিকা পালন করে থাকে।

(৭) মুখোশ-পরা দুশমনদের ভূমিকা

সংগঠনের ক্ষতি সাধনের উদ্দেশ্যে কিছু সংখ্যক দুশমন সংগঠনের সাথে জড়িত হতে পারে। এই ধরনের লোকেরা সংগঠনের ভেতরে অহেতুক নানা ধরনের প্রশ্ন ছড়িয়ে দেয়, ভিত্তিহীন কথা প্রচার করে ও সংগঠনের অনুসৃত পলিসি সমূহের সমালোচনা করতে থাকে। তারা সংগঠনের নেতাদের সম্পর্কে কর্মীদের মনে অশ্রদ্ধা ও অনাস্থার ভাব সৃষ্টির জোর প্রচেষ্টা চালাতে থাকে।

প্রধানতঃ এই সাতটি কারণে সংগঠনের সংহতি হুমকির সম্মুখীন হয়। সংহতি বিনাশনে এগুলো রোগ জীবাণুর মতো কাজ করে। এসব জীবাণু যাতে সংগঠন দেহে প্রবেশ করতে না পারে অথবা প্রবেশ করলেও গোড়াতেই যারা চিকিৎসা করা যায় সেই দিকে সংগঠন পরিচালকদের বিশেষ দৃষ্টি থাকা প্রয়োজন।

About এ. কে. এম. নাজির আহমদ