বাইয়াতের হাকিকাত

ইকামাতে দীন ও বাইয়াত


রাসূল (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের জীবন থেকে একথা প্রমাণিত যে, ইকামাতে দীনের কাজ সব ফরযের বড় ফরয। এ কাজের জন্যই আল্লাহ পাক রাসূল পাঠিয়েছেন বলে কয়েকটি সূরায় ঘোষণা করেছেন।

(আরবী)

‘তিনিই সে সত্তা, যিনি তাঁর রাসূলকে হেদায়াত ও আনুগত্যের একমাত্র সত্য বিধানসহ পাঠিয়েছেন, যেন রাসূল (সা.) তাকে (বিধানকে) আর সব রকমের আনুগত্যের বিধানের উপর জয়ী করেন।’ (সূরা তাওবা ৩৩, সূরা ফাত্‌হ ২৮ ও সূরা সফ ৯ আয়াত)

এ বিরাট কাজটি এমন যে নবীর পক্ষেও এ কাজ একা করা সম্ভব নয়। তাই এ কাজের জন্য একদল যোগ্য লোক তৈরি করার প্রচেষ্টা সকল নবীই করেছেন। যে নবী প্রয়োজনীয় সংখ্যক লোক পাননি তাঁর হাতে ইসলাম বিজয়ী হয়নি বা দীন কায়েম হতে পারেনি।

এ দ্বারা একথাই প্রমাণিত হয় যে, ইকামাতে দীনের জন্য মুসলিমদের জামায়াত বা সংগঠন অপরিহার্য। অর্থাৎ ইকামাতে দীনের এ বড় ফরয কাজটির জন্য জামায়াতবদ্ধ হওয়াও ফরয। এভাবেই জামায়াতবদ্ধ হওয়া দ্বিতীয় বড় ফরয। বাইয়াতই হল জামায়াতী বন্ধনের সূত্র। তাই ইকামাতে দীনের জন্য বাইয়াত ছাড়া উপায় নেই। প্রকৃত কথা এই যে, ঐ বাইয়াতই আসল ইসলামী বাইয়াত যা ইকামাতে দীনের উদ্দেশ্যে ইসলামী সংগঠনের মধ্যে চালু হয়।

মুসলমানদের যেসব সংগঠনে বাইয়াত পরিভাষাটি করা সত্ত্বেও ইকামাতে দীনের কোন কর্মসূচী ও কর্ম তৎপরতা নেই, সেখানে বাইয়াতের আসল হাকিকাত নেই। নামায, রোযা ও যিকরের মতো ইসলামে বহু পরিভাষা যেমন মুসলিমদের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও এ সবের হাকিকাত চর্চা খুব কমই হয়েছে, তেমনি বাইয়াত পরিভাষাটির অবস্থাও তাই হয়ে আছে।

প্রকৃত পক্ষে বাইয়াত পরিভাষাটির দ্বারা এমন ইসলামী সংগঠনই বুঝায় যা জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ এর উদ্দেশ্যেই গঠিত। রাসূল (সা.)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত সাহাবায়ে কেরামের জামায়াতই এর আদর্শ নমুনা। বাইয়াতই ঐ জামায়াতের প্রাণ শক্তি।

সূরা তাওবার ১১১ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা একথাই বলেছেন যে, তিনি ঐ সব মু’মিনের জান ও মালই খরিদ করেছেন ‘যারা আল্লাহর পথে লড়াই করে, দুশমনকে মারে এবং নিজেরাও নিহত হয়।’ দীনে হককে কায়েমের আন্দোলন ছাড়া বাতিলের সাথে এ লড়াই হবার কোন কারণই নেই। সুতরাং কুরআন পাকে যে বাইয়াতের কথা বলা হয়ৈছেতা জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহর উদ্দেশ্যেই। ইকামাতে দীনের আন্দোলনের জন্যই বাইয়াত দরকার। আর বাইয়াতের মাধ্যমেই জামায়াতবদ্ধ হতে হয়। জামায়াতবদ্ধ না হয়ে ইকামাতে দীনের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়।

ইকামাতে দীন এর সাথে জামায়াত ও বাইয়াতের সম্পর্ককে নামায ও ওযুর সম্পর্কের সাথে তুলনা করা যায়। আল্লাহ পাক নামাযের জন্যই ওযুকে ফরয করেছেন। নামাযই হল আসল ফরয। ঐ ফরযটি ওযু ছাড়া হয়না বলেই ওযু ফরয। তেমনিভাবে জামায়াত ও বাইয়াত ছাড়া ইকামাতে দীনের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। ইকামাতে দীনই আসল ফরয। ঐ ফরযের প্রয়োজনেই জামায়াত ফরয আর বাইয়াতের বন্ধন ছাড়া জামায়াত মজবুত হতে পারে না এবং জামায়াতের উদ্দেশ্যও পূর্ণ হতে পারে না। অর্থাৎ জামায়াতবদ্ধ হবার ফরযটি বাইয়াতের মাধ্যমেই আদায় হয়।

কেউ যদি ওযূ করে কিন্তু নামায আদায় করার প্রয়োজন মনে না করে তাহলে সে ওযুর কোন সওয়াব পাবে না। সে ওযু করছে না বলে হাত মুখ ধুয়েছে বলাই উচিত হবে। যে নামাযের ধার ধারে না সে ওযুর অঙ্গগুলো ওযুর মতো ধুয়ে নিয়েছে বলেই সে অযু করেছে বলা ঠিক হবে না। কারণ নামাযী লোকই ওযু করে থাকে এবং সে নামাযী নয় বলে ওযু করেনি মনে করতে হবে।

তেমনিভাবে ইকামাতে দীনের উদ্দেশ্য ছাড়া যে বাইয়াত তা আসল বাইয়াত নয়। ইসলামে বাইয়াতের যে হাকিকাত তা এ বাইয়াতে পাওয়া যায় না। তবুও বাইয়াত পরিভাষাটি যেভাবেই চালু থাকুক তা সমাজে বেঁচে আছে বলেই এর আসল হাকিকাত চর্চা কাজে লাগতে পারে। যদি বাইয়াত কথাটি লোকের নিকট পরিচিতই না থাকতো তাহলে এর মর্ম বুঝানো আরও কঠিন হতো। যেমন সমাজে যদি নামাযের প্রচলন না থাকতো তাহলে নামাযের হাকিকাত চর্চা করা আরও মুশকিল হতো।

আসল বাইয়াত আল্লাহর নিকট


হুদায়বিয়াতে সাহাবায়ে কেরামের নিরস্ত্র অবস্থা ও কুরাইশদের সাথে লড়াই-এর শপথ করার ঘটনাকে সূরা আল ফাত্‌হে এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে :

(আরবী)

‘হে রাসূল যারা আপনার নিকট বাইয়াত হয়েছে তারা নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট বাইয়াত হয়েছে। তাদের হাতের উপর আল্লাহর হাত রয়েছে।’ (সূরা আল ফাত্‌হ: ১০ আয়াত)

মুমিনের জান ও মাল আল্লাহর নিকট বিক্রয় করার পর তা মু’মিনের হাতেই আমানত রাখা হয়। তাই মু’মিন সে আমনত ইসলামী সংগঠনের মাধ্যমে দীনের পথে কাজে লাগায়। এভাবে কাজে লাগানোকে আল্লাহ তায়ালা কিভাবে গ্রহণ করেন তা এ আয়াতে প্রকাশ পেয়েছে।

আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যখন মু’মিন তার জীবন উৎসর্গ করার কথা সংগঠনের নেতার নিকট ঘোষণা করে তখন সে ঘোষণা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহরই নিকট করা হয়। হুদায়বিয়ার ঐ শপথ রাসূল (সা.)-এর নিকট যেভাবে করা হয়েছে তা যেন আল্লাহরই নিকট করা হলো। তাই তাঁরা যখন রাসূল (সা.)-এর হাতে হাত দিয়ে শপথ করছিলেন তখন আল্লাহর হাতেই যেন হাত দিয়ে শপথ করেছিলেন। তখন আল্লাহর হাতেই যেন হাত দিয়েছিলেন। জিহাদ ও ইকামাতে দীনের উদ্দেশ্যে বাইয়াত হলে তা আসলে আল্লাহরই নিকট হয়ে থাকে।

জামায়াতে ইসলামীর রুকনগণ শপথ গ্রহণের সময় যেসব কথা উচ্চারণ করেন তাতে নিম্নলিখিত আয়াতটিও রয়েছে :

(আরবী)

‘আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য।’ (সূরা আল আনআম ১৬২)

এ আয়াতের মাধ্যমে যে বাইয়াত নেয়া হয় তা আসলে আল্লাহ পাকের নিকটই বাইয়াত করা হয়।

জামায়াতী জিন্দেগীর গুরুত্ব


মানুষ সামাজিক জীব। ইসলাম মানুষেরই জন্য। তাই ইসলঅম স্বাভাবিকভাবেই এমন বিধান দিয়েছে যা মানব সমাজের সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

ব্যক্তির সমষ্টিই সমাজ। তাই ব্যক্তিকে সমাজ জীবনের উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য ইসলাম এতো বিস্তারিত বিধি-বিধান দিয়েছে।

ব্যক্তি জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায় পর্যন্ত একটি ভারসাম্যপূর্ণ পূর্ণাঙ্গ বিধানই মানব জাতির কল্যাণের জন্য অপরিহার্য। এ জাতীয় বিধান একমাত্র আল্লাহই দিতে সক্ষম। তাই ইসলামই একমাত্র বিশ্বজনীন বিধান।

ঐ পূর্নাঙ্গ বিধানকে মানব সমাজে চালু করার দায়িত্ব দিয়েই রাসূল (সা.)-কে পাঠানো হয়েছে। সমাজ গঠনের কাজ সামাজিক প্রচেষ্টা ছাড়া কিছুতেই সম্ভব নয়। ইসলামকে বিজয়ী করার জন্য রাসূলের চেয়ে বেশী যোগ্য কেই হতে পারে না। কিন্তু সব রাসূলের জীবনে ইসলাম বিজয়ী হয়নি। কারণ ইসলামকে বিজয়ী করার যোগ্য একদল (জামায়াত) লোক যোগাড় না হলে যোগ্যতম রাসূলের পক্ষেও এ কাজ সমাধা করা সম্ভব নয়।

এ কারণেই প্রত্যেক রাসূল সকল মানুষকে দীনের দাওয়াত দেয়ার পর যারা সাড়া দিয়েছৈন তাদেরকে …(আরবী)… (আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর) বলে সাংগঠনিক দাওয়াতও দিয়েছেন। এ দ্বারা এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, রাসূলের প্রতি ঈমান আনা যেমন ফরয ঈমানদারদের জামায়াতবদ্ধ হওয়াও তেমনি ফরয।

রাসূল (সা.) জামায়াতী জিন্দেগীর উপর গুরুত্ব আরোপ করতে গিয়ে বলেছেন:

…(আরবী)…

১. ‘আমি তোমাদেরকে এমন পাঁচটি কথার হুকুম দিচ্ছি যা আল্লাহ আমাকে হুকুম করেছেন – সংগঠনবদ্ধ হওয়া, নেতার কথা শুনা, আনুগত্য করা, হিজরত করা ও আল্লাহর পথে জিহাদ করা।’ (মুসনাদে আহমাদ, তিরমিযি)

…(আরবী)…

২. ‘যখন তিন জন লোক সফরে যাও তখন তোমাদের একজনকে আমীর বানাও।’ (আবূ দাউদ)

…(আরবী)…

৩. ‘যে ব্যক্তি জামায়াত পরিত্যাগ করল সে ইসলামের শিকল তার গলা থেকে ছুঁড়ে ফেলল।’ (মুসনাদে আহমাদ ও তিরমিযি)

মুসলিম জীবনে জামায়াতের এ বিরাট গুরুত্বের দরুনই ফরয নামায জামায়াতে আদায় করার জন্য এত তাকীদ হাদীসে রয়েছে। যারা নামাযের জামায়াতে আসেনা রাসূল (সা.) তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়ার ইচ্ছা পর্যন্ত প্রকাশ করেছেন।

কুরআন, হাদীস ও সাহাবায়ে কেরামের জীবন একথাই প্রমাণ করে যে, জামায়াতবদ্ধ জীবন যাপন করা ফরয।

ইকামাতে দীন ও জামায়াতী জিন্দেগী


ইকামাতে দীনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই রাসূল (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে জামায়াতবদ্ধ করেছৈন। দীনকে বিজয়ী করার দায়িত্ব যদি ফরয হয়ে থাকে তাহলে জামায়াতবদ্ধ হওয়াও ফরয হওয়া স্বাভাবিক। আর জামায়াতবদ্ধ হবার বন্ধনসূত্রই হল বাইয়াত। বাইয়াতের মাধ্যমেই জামায়াতের বন্ধন মজবুত হয়।

জামায়াতে ইসলামীর রুকন হিসেবে যে শপথ গ্রহণ করতে হয় তা প্রকৃতপক্ষে ঐ বাইয়াতের বাস্তব রূপ। শুধু শপথ বা হলফ শব্দ দ্বারা ঐ দীনী গুরুত্ব বুঝায় না যা বাইয়াত শব্দ দ্বারা বুঝায়। তাই রুকনিয়াতের শপথকে বাইয়াতের মর্যাদা সম্পন্ন মনে করা উচিত। এ ছাড়া জামায়াতের আনুগত্যের সঠিক শরয়ী চেতনা জাগ্রত হতে পারে না।

প্রত্যেক সংগঠনেই শপথের রীতি চালু রয়েছে। জামায়াতের রুকনদের শপথ গতানুগতিক ধরনের নয়। এ শপথের ভাষা থেকে বুঝা যে, বাইয়াতের শরয়ী প্রয়োজন এতে সঠিকভাবেই পূরণ হয়।

বাইয়াত ও ইসলামী রাষ্ট্র


কেউ কেউ মনে করেন যে, ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাথেই বাইয়াতের অস্তিত্ব নির্ভরশীল। তাদের মতে রাষ্ট্র ব্যবস্থা না থাকলে বাইয়াতেরও প্রয়োজন নেই। একথার যুক্তি বোধগম্য নয়। ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা অপনিতেই চালু হয় না। জামায়াতবদ্ধ প্রচেষ্টার ফলেই ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্ম। আর জামায়াতী জিন্দেগীর সাথেই বাইয়াতের সম্পর্ক। বাইয়াতের মজবুত সূত্রে আবদ্ধ জামায়াতের মাধ্যমেই ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম হওয়া সম্ভব। সুতরাং বাইয়াতের ফসলই ইসলামী রাষ্ট্র। ইসলামী রাষ্ট্র বাইয়াত ব্যবস্থা ছাড়া কায়েমই হতে পারে না।

মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম হবার পূর্বে রাসূল (সা.) এর মাক্কী জীবনে কি সাহাবায়ে কেরাম বাইয়াত হননি? রাসূল (সা.)-এর নিকট বাইয়াত হবার জন্য কি ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়েছিল?

যুক্তির বিচারেও একথা না মেনে উপায় নেই যে, জামায়াত ও বাইয়াতই আগে এবং ইসলামী রাষ্ট্র পরে।

কে কোন জামায়াতে বাইয়াত হবেন?


আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত কথাটির অস্তিত্ব থাকলেও এর সাংগঠনিক কোন রূপ এই। চার মাযহাবের অনুসারী ও আহলে হাদীস হিসেবে পরিচিত সকল মুসলিমই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অন্তর্ভুক্ত। তাদেরকে সংক্ষেপে সুন্নী বলা হয়। আহলে সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত কোন মাযহাবই শিয়া মতাবলম্বীগণকে তাদের মধ্যে গণ্য করেন না। অর্থাৎ শিয়াগন সুন্নী হিসেবে গণ্য নন।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত বলতে তাদেরকে বুঝায় যারা রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের জামায়াতের অনুসারী। আল্লাহ পাক তাঁর রাসূলকে একমাত্র উৎকৃষ্ট আদর্শ (উসওয়াতুন হাসানা) ঘোষণা করেছেন এবং রাসূল (সা.) তাঁর সাহাবাগণকে তাঁর আদর্শের সত্যিকার অনুসারী বলে সার্টিফিকেট দিয়েছেন। অর্থাৎ আল্লাহর রাসূলই একমাত্র উসওয়াতুন হাসানা বটে, ইত্তেবায়ে রাসূলের (রাসূলের আনুগত্য) ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামই উসওয়াতুন হাসানা।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অন্তর্ভুক্ত দুনিয়ার সকল মুসলমান সাংগঠনিক আকারে কোন জামায়াত নয়। জামায়াতের আসল পরিচয়ই হল ইমারত। আমীর ছাড়া কোন জামায়াত হতে পারে না। দুনিয়ার সকল সুন্নী কোন এক ইমারতের অধীন নয়। এমনকি একই দেশের সকল সুন্নীগণও এক আমীরের বাইয়াত হন না।

সুতরাং এটাই স্বাভাবিক যে সুন্নীদের মধ্যে যারা ইকামাতে দীনের উদ্দেশ্যে কোন সংগঠন (জামায়াত) কায়েম করেন তাদের মধ্য থেকে ঐ জামায়াতের একজন আমীর নির্বাচিত হবেন। ঐ জামায়াতের আর সব সদস্য ঐ নির্বাচিত আমীরের মাধ্যমেই বাইয়াত হবেন। এ আমীর শুধু এ জামায়াতের অন্তর্ভুক্ত লোকদেরই আমীর। যারা এ জামায়াতে যোগদান করবে না তারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অন্তর্ভুক্ত হলেও এ জামায়াতের আমীরের নিকট তাদের বাইয়াত হওয়া জরুরী নয়।

এ কারণেই জামায়াতে ইসলামীর আমীর দেশের সকল সুন্নী মুসলিমানের আমীর নন। যারা জামায়াতে ইসলামীর সদস্য (রুকন) হন শুধু তারাই এই আমীরের মাধ্যমে জামায়াতের নিকট বাইয়াত হন। এমন কি জামায়াতে ইসলামীর নিষ্ঠাবান কর্মী হলেও সদস্য বা রুকন না হওয়া পর্যন্ত কেউ বাইয়াতের মধ্যে শামিল বলে গণ্য হয় না। এমন অনেক যোগ্য কর্মী আছেন রুকনদের চেয়েও বেশী কাজ করেন। কিন্তু তারা নিজের জান ও মাল ইকামাতে দীনের জন্য উৎসর্গ করার শপথ নিতে রাযী না হলে তাদেরকে রুকন হিসেবে গণ্য করা হয় না। এ শপথকেই ইসলামী পরিভাষায় বাইয়াত বলা হয়।

বাইয়াত কি প্রত্যাহার করা যায়?


আসল বাইয়াত তো আল্লাহ তায়ালার নিকটই করা হয়। এ বাইয়াত ঈমানেরই দাবী। এ বাইয়াত প্রত্যাহার করা মানে ঈমান ত্যাগ করা। বেহেশতে যাবার নিয়ত থাকলে এ বাইয়াত প্রত্যাহার করার কথা চিন্তা করাও অসম্ভব।

কিন্তু ঐ বাইয়াতের দাবী পূরণের জন্য ইকামাতে দীনের উদ্দেশ্যে গঠিত কোন জামায়াতের নিকট যে বাইয়াত হতে হয় তা দীনের স্বার্থে অবশ্যই প্রত্যাহার করা যেতে পারে। কোন জামায়াতের নিকট বাইয়াত হবার পর যদি এর চাইতেও উন্নতমানের দীনী জামায়াতের সন্ধান পাওয়া যায় তাহলে নিম্নমানের জামায়াতের নিকট থেকে বাইয়াত প্রত্যাহার করে ঐ উন্নতমানের জামায়াতের নিকট বাইয়াত হওয়াই উচিত। এ অবস্থায় বাইয়াত প্রত্যাহার করা মোটেই দোষণীয় নয়। কারণ উৎকৃষ্টতর জামায়াতের নিকট বাইয়াত হওয়ার উদ্দেশ্যে প্রত্যাহার করা আসলে প্রত্যাহার নয়, বাইয়াতের স্থান বদল মাত্র।

কিন্তু নিজের কোন দুর্বলতার দরুন বা ইসলামী আন্দোলনের পথে চলা কঠিন মনে করে যদি কেউ বাইয়াত প্রত্যাহার করে বা জামায়াত পরিত্যাগ করে তাহলে সে ঈমানের চরম দুর্বলতার পরিচয়ই দেয়। এ বিষয়ে হাদীসে কঠোর সতর্কবানী উচ্চারণ করা হয়েছে –

…(আরবী)…

‘জামায়াতের সাথে আল্লাহর রহমত থাকে। যে বিচ্ছিন্ন হয় সে দোযখেই নিক্ষিপ্ত হয়।’ (তিরমিযি)

…(আরবী)…

‘যে ব্যক্তি বাইয়াতের বন্ধন ছাড়াই মারা গেলো সে জাহিলিয়াতের মৃত্যুবরণ করল।’ (মুসলিম)

…(আরবী)…

‘যে ব্যক্তি আনুগত্য পরিত্যাগ করল এবং জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মারা গেল সে জাহিলিয়াতের মৃত্যুবরণ করল।’ (মুসলিম)

জামায়াতে ইসলামী ও বাইয়াত


জামায়াতে ইসলামী আমীর ও রুকনদের মধ্যে বাইয়াতের এ সম্পর্কের ব্যাপারে যাতে আনুগত্যের সীমা সামান্যও লঙ্ঘন না হয় সে উদ্দেশ্যে একটি গঠনতন্ত্র দ্বারা গোটা সংগঠন পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। আমীর রুকনদের ভোটে নির্বাচিত মজলিসে শূরার নিকট জওয়াবদিহী করতে হয়। কুরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিতে আমীরের কোন ভুল হলে সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেবার জন্য গঠনতন্ত্রে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। এমনকি আমীরের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশ করার জন্যও গঠনতান্ত্রিক পদ্ধতি আছে।

পীর-মুরীদীর মধ্যে বাইয়াত-এর পরিভাষাটি সীমাবদ্ধ অর্থে ব্যবহার করা হয়। জামায়াতের মধ্যে রুকনিয়াতের শপথের ক্ষেত্রে তা অনেক ব্যপক অর্থে প্রচলিত। জামায়াতের রুকন হওয়ার মানে আল্লাহর দীনের জন্য জান ও মাল আল্লাহর নামে ও তাঁরই সন্তুষ্টির আশায় সম্পুর্ণ উৎসর্গ করার শপথ নেয়া। বাইয়াতের যে অর্থ সাহাবায়ে কেরামের যুগে ছিল জামায়াতের রুকনিয়াত দ্বারা সে অর্থই বুঝায়। জামায়াতের গঠনতন্ত্রে বাইয়াত পরিভাষাটি ব্যবহার করা না হলেও এর চেতনা ও তাৎপর্য অবশ্যই রুকনিয়াতের শপথের মধ্যে রয়েছে।

আল্লাহর দীন কায়েমের মহান সংকল্প নিয়ে নিজের জান ও মাল, সময় ও শ্রম এবং দৈহিক ও মানসিক যাবতীয় যোগ্যতা কুরবানী দেবার যে শপথ নিয়ে জামায়াতের রুকনিয়াত কবুল করতে হয় তা যে কুরআন ও হাদীসের পরিভাষায় বাইয়াতেরই অনুরূপ সে উপলব্ধি ও চেতনা সৃষ্টিই এ পুস্তিকার মূল উদ্দেশ্য। আল্লাহ পাক বাইয়াতের এ চেতনা দ্বারা সকল রুকনকে উদ্বুদ্ধকরণ ও কর্মতৎপর রাখুন – আমীন।

১৯৪১ সালে মাওলানা মওদূদী (র.)-এর উদ্যোগে লাহোরে সর্ব প্রথম যখন জামায়াতে ইসলামী গঠিত হয় তখন জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যগণ যে শপথ গ্রহণ করেছিলেন তার বিবরণ নিম্নরূপ:

“সর্ব সম্মতভাবে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী সাহেবকে আমীর নির্বাচিত করা হয়। বাইয়াতের প্রচলিত রীতি অবলম্বন করা হয়নি। বরং গোটা জামায়াত একসাথে এ শপথ নিয়েছে যে, উপরোক্ত ব্যাখ্যা অনুযায়ী সবাই আমীরের আনুগত্য করবেন এবং তাঁর হুকুম মেনে চলবেন। এই বাইয়াতে আ’ম (সামষ্টিক বাইয়াত) আদায়ের পর আবার ঐ (কান্নাকাটির) অবস্থায়ই সৃষ্টি হল যা পূর্বে ঈমান তাজা করার সময় হয়েছিল।

জামায়াতের কার্য-বিবরণী প্রথম খণ্ডের এ বিবরণ থেকে একথা অত্যন্ত স্পষ্ট হয়েছে যে, জামায়াতের সূচনা থেকেই বাইয়াতের চেতনা সবার মধ্যে জাগরূক ছিল। আমীরে জামায়াতের আনুগত্যের যে শপথ তারা নিলেন তা যে ইসলামী পরিভাষায় বাইয়াতই ছিল সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। সুতরাং জামায়াতের রুকনগণ যে শপথ নেন তা অবশ্যই বাইয়াত হিসেবে গণ্য।

জামায়াতের কর্মী ও সহযোগী সদস্যদের বাইয়াত


যারা জামায়াতে রুকনিয়াতের শপথ নেননি, কিন্তু কর্মী ও সহযোগী সদস্য হিসেবে ইসলামী আন্দোলনে শরীক আছেন তারা রুকনদের মতো পূর্নাঙ্গ বাইয়াত না করলেও ইকামাতে দীনের উদ্দেশ্যে আংশিক বাইয়াত করেন। যারা সহযোগী সদস্য হন তারা জামায়াতের সাথে সহযোগিতার শপথ গ্রহণ করেন এবং যারা কর্মী তারা রুকন হওযার পথে এগিয়ে যাবার শপথই করেন। রুকনদের বাইয়াত হলো …(আরবী)… এর (দৃঢ় সংকল্পের) বাইয়াত। যারা কর্মী তারা এর প্রস্তুতি গ্রহণেরই বাইয়াত নেন। আর যারা সহযোগী তারা সহায়তা করার জন্য বাইয়াত হন।

কিন্তু ঈমানের দাবী হলো পূর্নাঙ্গ বাইয়াত। ঈমানের এ দাবী পূরণের জন্য প্রত্যেক ঈমানদারেরই আকাঙ্খা, আগ্রহ ও সংকল্প থাকা উচিত। কারণ ঈমানের আসল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের কামিয়াবী। এ মহান উদ্দেশ্য হাসিল করতে হলে পূর্ণাঙ্গ বাইয়াতের পথেই এগিয়ে যেতে হবে। আল্লাহ পাক আমাদেরকে আখিরাতের সাফল্য লাভ করার লক্ষ্যে পরিপূর্ণভাবে বাইয়াত হয়ে শরয়ী দাবী পূরণ করার তাওফীক দান করুন – আমীন।

— সমাপ্ত —

About শহীদ অধ্যাপক গোলাম আযম