মতবিরোধপূর্ণ বিষয়ে সঠিক পন্থা অবলম্বনের উপায়

 ১. মতবিরোধমুক্ত সোনালী যুগঃ রাসুলুল্লাহর (সা) যুগ 

আমাদের একালের মতো নবী করীমের (সা) যুগে ফিকহী মাসআলা মাসায়েল নিয়ে গবেষণা করা হতোনা। তার সময় ‘ফিকাহ’ নামে আলাদা কোনো বিষয়েরও অস্তিত্ব ছিলনা। জ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে পৃথক একটি বিভাগ হিসেবে ‘ফিকাহ’ নামে কোনো বিষয়ের সংকলন সম্পাদনাও হয়নি। বর্তমানে আমাদের আমাদের ফকীহরা (ইসলামী আইন বিশারদরা)  যেভাবে দলিল-আদিল্লা ও যুক্তিপ্রমাণসহ পৃথক পৃথকভাবে প্রতিটি বিষয়ের গুরুত্ব, মর্যাদা, বিধি-বিধান, শর্ত-শারায়েত ও প্রয়োগরীতি বর্ণনা করেন, সে সময় বিধি বিধান বর্ণনার ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো পদ্ধতি চালু ছিল না। এখন যেমন কোনো একটি সমস্যা (মাসআলা) কল্পনা করে নিয়ে তার উপর গবেষণা চালানো হয়; যেসব জিনিসের সংজ্ঞা প্রদান করা যেতে পারে, সেগুলোর যুক্তি ভিত্তিক সংজ্ঞা প্রদান করা হয়; যেসব জিনিসের সীমা ও পরিধি নির্ণয় করা যেতে পারে সেগুলোর সীমা-পরিধি স্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়—এরূপ কোনো পদ্ধতি তখন ছিলনা।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তরীকা ছিলো এর চাইতে ভিন্নতর। তার তরীকা এরূপ, যেমন তিনি অযু করতেন। সাহাবায়ে কিরাম প্রত্যক্ষ করতেন, তিনি কি নিয়মে অযু করছেন। তার অযু দেখে দেখে তার তরিকায় অযু করতেন। এটি অযুর রুকন, এই অংশ অযুর নফল কিংবা এটা অযুর আদব—এভাবে বিশ্লেষণ করে করে তিনি বলতেন না। একইভাবে তিনি নামায পড়তেন। সাহাবায়ে কিরাম তার নামায পড়া দেখতেন। তার নামায পড়া দেখে দেখে তার তরীকা অনুযায়ী নামায আদায় করতেন। তিনি হজ্জ পালন করেন। লোকেরা তার হজ্জের পদ্ধতি অবলোকন করে এবং সেই অনুযায়ী নিজেরা হজ্জ পালন শুরু করে। সাধারণত এটাই ছিলো নবী করীম (সা) এর শিক্ষাদান পদ্ধতি। তিনি কখনও ব্যাখ্যা করে বলেননি যে অযুত চার ফরয, কিংবা ছয় ফরয। অযু করার সময় কখনও কোনো ব্যাক্তি যদি অযুর অংগ সমূহ পরপর ধৌত না করে তবে তার অযু হবে কি হবেনা—এমন কোনো ঘটনা আগে থেকে ধরে নিয়ে সে বিষয়ে আগাম কোনো বিধান জারি করা উচিৎ বলে তিনি কখনও মনে করতেন না। এরূপ ধরে নেয়া এবং অসংগঠিত অবস্থার বিধাবনের ক্ষেত্রে তিনি কদাচিতই কিছু বলেছেন।

অপরদিকে সাহাবায়ে কিরামের (রা) অবস্থাও এই ছিলো, এই ধরনের ব্যাপারে তারা নবী করীমকে (সা) খুব কমই প্রশ্ন করতেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথীগণের চাইতে উত্তম কোনো মানব দল কখনও দেখিনি। রাসুলে খোদার গোটা জিন্দেগীতে তারা তাকে মাত্র তেরটি প্রশ্ন করেছেন। এর সবগুলোই কুরআনে উল্ল্যেখ হয়েছে।

যেমনঃ ‘(আরবীيسئلونك عن الشهر الحرام قتال فيه :)

(ইয়াসআলুনাকা আনিশ শাহরিল হারামি কিতালুন ফীহি)’—‘হে নবী এরা তোমাকে হারাম মাসগুলোতে যুদ্ধ সংক্রান্ত বিধান জিজ্ঞেস করছে’। অথবা

‘(আরবী: يسئلونك عن المحيض)

(ইয়াসালুনাকা আনিল মাহীদ)’—হে নবী তারা তোমার নিকট হায়েয সংক্রান্ত বিষয় জানতে চাচ্ছে’—প্রভৃতি।”

অতপর হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেনঃ “সাহাবীগণ কেবল সেইসব প্রশ্নই করতেন, যা ছিলো তাদের জন্য উপকারী।”

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা) বলেনঃ “তোমরা এমন কোন বিষয়ে প্রশ্ন করোনা, যা বাস্তবে সংঘটিত হয় নি। কারণ, আমি উমর ইবনুল খাত্তাবকে (রা) এ ধরনের প্রশ্নকর্তাদের অভিসম্পাত করতে দেখেছি।”

কাসেম (রা) লোকদের সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা এমনসব বিষয়ে প্রশ্ন করছো, যেসব বিষয়ে প্রশ্ন করার জন্যে আমরা কখনো মুখ খুলিনি। তাছাড়া তোমরা এমনসব বিষয়েও খুটে খুটে প্রশ্ন করছো যা আমার জানা নেই। সেগুলো যদি আমার জানা থাকতো, তবে তা নবী করীমের (সা) ফরমান অনুযায়ী বলে দিতাম।”

[১. নবী করীম (সা) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন ঐ আলিমের মুখে আগুনের লাগাম পরানো হবে, যে কোন জ্ঞান রাখ সত্বেও প্রশ্নকর্তাকে তা বলেনি। -অনুবাদক]

উমার ইবনে ইসহাক (রহ) বলেছেনঃ “রাসূলে খোদার (সা) অর্ধেকের বেশী সাহাবীর (রা) সংগে সাক্ষাতের সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আমি তাদের চাইতে অধিক জটিলতামুক্ত এবং কঠোরতা বর্জনকারী মানব সাক্ষাত পাইনি।”

উবাদা ইবনে বসরকান্দী (রা) থেকে এই ফতোয়া চাওয়া হয়েছিলোঃ “কোনো নারী যদি এমন কোনো  স্থানে মৃত্যুবরণ করে, যেখানে তার কোনো ওলী পাওয়া যাবেনা, সে অবস্থায় তাকে গোসল দেয়ানো হবে কিভাবে?” জবাবে তিনি বলেছিলেনঃ “আমি এমন লোকদের সাক্ষাত লাভ করেছি,২  

[২. অর্থাৎ সাহাবায়ে কিরাম (রা)–অনুবাদক]

যারা তোমাদের মতো কঠোরতা এবং জটিলতা অবলম্বন করতেন না। তারা তোমাদের মতো (ধরে নেয়া বিষয়ে) প্রশ্ন করতেন না।”

[৩. এই বাণী (আছার) গুলো সবই ইমাম দারমীর গ্রন্থ থেকে সংকলিত হয়েছে। –গ্রন্থকার ]

২. মতবিরোধের ইতিহাসের সূচনাযুগঃ

সাহাবায়ে কিরামের (রা) যুগঃ

শায়খাইনদের কর্মনীতিঃ

রাসূলুল্লাহ (সা) সাধারণত সাহাবীগণের সাধারণ সভাতেই দ্বীনি কথাবার্তা বলতেন এবং শিক্ষা প্রদান করতেন। সে কারণেই দেখা যায়, শায়খাইন [হযরত আবু বকর (রা) ও হযরত উমার (রা)] তাদের খিলাফতামলে কোন বিষয়ের শরয়ী বিধান জানা না থাকলে তা অন্যান্য সাহাবীদের নিকট থেকে জিজ্ঞাসা করে জেনে নিতেন। তারা জিজ্ঞেস করতেন, তোমরা এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) কোনো বক্তব্য শুনেছ?

 আবু বকরের সম্মুখের যখন দাদীর ওয়ারিশী পাওনা সংক্রান্ত মাসয়ালা উপস্থাপিত হলো, তখন তিনি বললেন, “দাদীর অংশ পাওয়া সম্পর্কে আমি রাসূলুল্লাহর (সা) কোনো বাণী শুনিনি। তাই এ বিষয়ে আমি অন্যদের কাছে জিজ্ঞেস করে নেবো।” অতঃপর যোহরের নামাযের পর তিনি সমবেত লোকদের জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমরা কেউ দাদীর ওয়ারিশী পাওয়া সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সা) থেকে কোনো বক্তব্য শুনেছ কি?”

মুগীর ইবনে শু’বা (রা) বললেনঃ ‘হ্যাঁ, আমি শুনেছি।’ তিনি  জিজ্ঞেস করলেনঃ ‘কি শুনেছ’ মুগীরা (রা) বললেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সা) দাদীকে মাইয়্যেতের রেখে যাওয়া সম্পদের এক ষষ্ঠাংশ প্রদান করেছেন।” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “বিষয়টি তুমি ব্যাতিত আর কারো জানা আছে কি?” মুহাম্মদ ইবনে মুসলিম (রা) বললেনঃ “মুগীরা যথার্থ বলেছেন।”

তাদের বক্তব্য শুনার পর আবু বকর (রা) আবেদনকারী মহিলাকে তার মৃত নাতির রেখে যাওয়া সম্পদের এক ষষ্ঠাংশ দিয়ে দেন। এরূপ দুয়েকটি নয়, অসংখ্য ঘটনা হাদীসের গ্রন্থাবলীতে উল্ল্যেখ আছে। যেমনঃ হযরত উমারের নিকট গর্ভস্থ সন্তানের দিয়্যতের (রক্তমূল্য) বিষয়টি উত্থাপিত হলে এ বিষয়ে তার কোনো বিধান জানা না থাকায় তিনি এ প্রসংগে সাহাবায়ে কিরামের নিকট প্রশ্ন করেন। জবাবে মুগীরা ইবনে শু’বা (রা) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সা) এর রক্তমূল্য নির্ধারণ করেছেন ‘গুররাহ’।

[৪. ‘গুররা’ একজন দাস মুক্ত করা কিগবা মৃতের ওলীকে পঞ্চাশ দিনার বা পাঁচশ দিরহাম প্রদাব করা।–অনুবাদক]

তার নিকট এ বিষয়ে নবী করীমের (সা) হাদীস শুনার পর হযরত উমার (রা) সে মুতাবিক ফায়সালা প্রদান করেন। মহামারী আক্রান্ত অঞ্চলের উপর দিয়ে সফর করা যাবে কিনা এ বিষয়ে হযরত উমার (রা) আবদুর রহমান আউফের (রা) বর্ণিত হাদীসের উপর আমল করেন।

[৫. ঘটনাটি হলোঃ সিরিয়া অভিযানের সময় হযরত উমার (রা) মুসলিম বাহিনী নিয়ে যাত্রা করেন। পথিমধ্যে কোনো এক স্থানে গিয়ে জানতে পারেন সম্মুখের অঞ্চলগুলো ব্যাপক মহামারীতে (প্লেগ) আক্রান্ত। যাত্রা অব্যাহত রাখা না রাখার ব্যাপারে তিনি উপস্থিত লোকদের পরামর্শ চাইলেন। হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ  এসে বললেন, নবী করিম (সা) মহামারী আক্রান্ত অঞ্চলে যেতে নিষেধ করেছেন। এ হাদীস শুনে তিনি বাহিনীকে প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ দেন। –অনুবাদক]

মাজুসীদের (যরোষ্ট্রীয় ধর্মাবলম্বী) ব্যাপারেও তিনি হযরত আবদুর রাহমান ইবনে আউফ (রা) এর বর্ণিত হাদীস অনুযায়ী ফায়সালা করেন।

[৬. হযরত উমার (রা) তার খিলাফত আমলে মাজুসীদের থেকে জিযিয়া আদায় করছিলেন না। অতপর আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা) বললেনঃ নবী করীম (স) হিজরের মাজুসীদের নিকট থেকে জিযিয়া আদায় করতেন। এ হাদীস শুনার পর তিনি তাদের উপর জিযিয়া ধার্য করে দিলেন।–অনুবাদক]

আবদুল্লাহ ইবনে মাসুদ (রা) মা’কাল ইবনে ইয়াসার (রা) বর্ণিত হাদীস স্বীয় রায়ের সম্পুর্ণ সমার্থক পেয়ে সীমাহীন খুশী হন।

[৭. এ রায় ছিলো এমন একজনের ব্যাপারে যার স্বামী এমন অবস্থায় মারা গিয়েছেন যে, এখনো তিনি স্ত্রী্র সান্নিধ্যে আসেননি এবং তার মোহরও ধার্য করেননি।–অনুবাদক]

হযরত আবু মুসা আশয়ারী কোনো প্রয়োজনে উমার ফারুকের কাছে আসেন।দরজায় তিনবার আওয়াজ দেবার পরও কোনো জবাব না পেয়ে তিনি প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। অতঃপর উমার (রা) দরজা খুলে দূর থেকে তাকে ডেকে আনেন এবং ফিরে যাবার কারণ জিজ্ঞাসা করেন। তিনি বললেন, নবী করীম (সা) বলেছেনঃ “তিনবার আওয়াজ দেওয়ার পরও অনুমতি পাওয়া না গেলে দরজা থেকে ফিরে যাবে।” উমার (রা) বললেনঃ তোমার বর্ণনার সপক্ষে আরেকজন সাক্ষী লাগবে। অতঃপর আবু সায়ীদ খুদরী (রা) আবু মুসার (রা) বর্ণিত হাদীসের সত্যতা স্বীকার করলে হযরত উমার (রা) তা গ্রহণ করেন।

 

মতপার্থক্যের ভিত্তি, সূচনা ও কারণ

মোটকথা, নবী করীম (সা) সাধারণত মাসায়েল এবং আহকামে শরীয়াহ সাহবায়ে কিরামের আ’ম ইজতেমায় ইরশাদ করতেন। একেকজন সাহাবী নবী করীম (সা) কে যে তরীকায় ইবাদাত করতে দেখেছেন এবং তার থেকে যেভাবে ফতোয়া ও ফায়সালা শুনেছেন, তিনি তা আয়ত্ত করে নেন এবং সেভাবে আমল করতে থাকেন। অতঃপর তিনি নবী করীম (সা) এর এসব বক্তব্য ও আমলকে অবলম্বন করে পরিবেশ পরিস্থিতি ও অবস্থার বিচারে সেগুলোর উদ্দ্যেশ্য ও গুরুত্ব নির্ণয় করতেন। এ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে তাদের প্রত্যেকের মধ্যেই কাজ করত ঐকান্তিক নিষ্ঠা। এভাবে তারা কোনো হুকুমকে নির্ণয় করেন ‘মুবাহ’। কোনটিকে ‘মুস্তাহাব’ ও কোনটিকে ‘মানসূখ’। এ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে দার্শনিক দলিল প্রমাণ নয়, বরঞ্চ তাদের মনের প্রশান্তি ও প্রসন্নতাই ভূমিকা পালন করে। যেমন,  তোমরা সরল সোজা গ্রাম্য লোকদের অবস্থা দেখতে পাচ্ছ। তারা অতি সহজেই পরস্পরের কথা বুঝে ফেলে। তারা একজন অপরজনের  কথার মধ্যকার ইশারা-ইংগিত, উপমা উদাহরণ এবং ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দ্বারা তার বক্তব্য বিষয়কে নির্দ্বিধায় বুঝে নিতে পারে।

রাসূলে খোদার (সা) যুগ পর্যন্ত এভাবেই লোকেরা আমল করতো। অতঃপর সাহাবায়ে কিরামের (রা) বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন। তারা যে যেখানে গেছেন, তিনিই সেখানকার জনগণের নেতৃত্ব লাভ করেন। এ সময় জীবনের বিভিন্ন বিভাগে নতুন নতুন ঘটনা তাদের সামনে আসতে থাকে। এসব বিষয়ে লোকেরা তাদের কাছে ফতোয়া ও ফায়সালা চান। প্রত্যেক সাহাবী তার নিকট রক্ষিত প্রমাণিত জ্ঞান (কুরআন-সুন্নাহ) দ্বারা কিংবা প্রমাণিত জ্ঞানের আলোকে জবাবা প্রদান করতেন। কোনো বিষয়ে যদি এভাবে সমাধান পাওয়া না যেতো তবে তারা সে বিষয়ে ইজতেহাদ করতেন এবং যে কারণ ও উদ্দেশ্যের ভিত্তির উপর রাসূলে খোদা (সা) শরয়ী বিধান প্রদান করেছেন, তা জানার  চেষ্টা করতেন। অতঃপর যে কারণ উদ্দেশ্যের সাথে মাসয়ালার সাথে সামঞ্জস্য দেখতে পেতেন, সেখানে তারা অনুরূপ বিধান প্রয়োগ করতেন। এই প্রয়োগের ক্ষেত্রে তারা রাসূলে খোদার বিধান প্রয়োগ নীতি ও উদ্দেশ্যের পূর্ণ অনুবর্তন করতেন।

এ ব্যাপারে তারা পূর্ণ তাকওয়া ও ঈমানদারীর সাথে নিজেদের যোগ্যতাকে কাজে লাগাতেন। এখান থেকেই শুরু হয় তাদের মধ্যে মতপার্থক্যের। আর এর কারণ প্রতিষ্ঠিত ছিলো কয়েকটি মৌলিক ভিত্তির উপরঃ

প্রথম পার্থক্যঃ রাসূলের হাদীস জানা না থাকার পার্থক্য

যেসব কারণের উপর ভিত্তি করে সাহাবায়ে কিরামের মতামতের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছিলো, তার পয়লাটি হচ্ছে এই যে, কোনো একটি প্রশ্ন বা সমস্যার সমাধান সম্পর্কে একজনের হয়তো রাসূলুল্লাহর বক্তব্য জানা ছিলো, পক্ষান্তরে অন্য এক সাহাবীর হয়তো সে বিষয়ে নবী করীম (স) এর বক্তব্য জানা ছিলো না যার ফলে সে বিষয়ে তিনি বাধ্য হয়ে ইজতিহাদ করেন। এরূপ ইজতিহাদের কয়েকটি অবস্থা হতো। যেমনঃ

এক. কখনো এরূপ ইজতিহাদ রাসূল (সা) এর অনুরুপ হয়ে যেতো। ইমাম নাসায়ী (রা) প্রমুখ থেকে বর্ণিত একটি হাদীস হচ্ছে এর উদাহরণ। উক্ত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের (রা) নিকট এমন একজন মহিলার প্রসংগে জিজ্ঞাসা করা হয়, যার স্বামী তার মহরানা নির্ধারণ এবং সান্নিধ্য গমনের পূর্বেই মৃত্যু বরণ করেছে? তিনি জবাব দিলেন, এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) কোনো ফায়সালা আমার জানা নেই। কিন্তু এ বিষয়ে যে কোনো একটি ফায়াসালা দেওয়ার জন্য লোকেরা তাকে পীড়াপীড়ি করতে থাকে। তখন তিনি বিষয়টির উপর ইজতিহাদ করে এই ফায়সালা প্রদান করেনঃ মহিলাটিকে এমন পরিমাণ মোহরানা দিতে হবে, যা তার সমমর্যাদার মহিলারা পেয়ে থাকে। এর চাইতে কম ও না এর চাইতে বেশী ও না। তাছাড়া মহিলাটিকে ইদ্দত পূর্ণ করতে হবে এবং সে তার স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে উত্তরাধিকার লাভ করবে। এ ফায়সালা শুনার সাথে সাথে হযরত মা’কাল ইবনে ইয়াসার (রা) দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের কাবিলার জৈনক মহিলার ব্যাপারে ঠিক অনুরূপ  ফায়সালা করেছিলেন।” তার সাক্ষ্য শুনে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ এতো খুশি হন, যতটা ইসলাম কবুল করার পর থেকে ঐ সময় পর্যন্ত আর হননি।

দুই. কখনো এমন হতো যে, কোনো একটি মাসয়ালা সম্পর্কে দু’জন সাহাবী পরস্পর আলোচনা করতেন। এ আলোচনার মাধ্যমে রাসূলের (সা) কোনো হাদীস তাদের সামনে এসে যেতো এবং হাদীসটির বিশুদ্ধতা সম্পর্কে তাদের মধ্যে প্রবল আস্থা জন্ম নিতো। এমতাবস্থায় মুজতাহিদ তার ইজতিহাদ পরিত্যাগ করে হাদীসটি গ্রহণ করতেন। উদাহরণস্বরূপ সেই হাদীসটির কথা উল্লেখ করা যাক, যেটি হাদীসের ইমামগণ হযরত আবু হুরাইরা (রা) সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। তা হলো এই যে, হযরত আবু হুরাইরা (রা) এর ধারণা ছিলোঃ “যার উপর গোসল ফরয হলো (জুনুবী), সে যদি সূর্যোদয়ের পূর্বে গোসল না করে, তাহলে তার রোযা হবে না।” কিন্তু নবী করীমের (সা) পবিত্র স্ত্রীগণের কেউ কেউ যখন নবী করীম (সা) এর এই ধারণার বিপরীত ছিলো বলে বর্ণনা করলেন, তিখিন হযরত আবু জুরাইরা তার ধারণা থেকে প্রত্যাবর্তন করলেন।

তিন. আবার কখনো এমন হতো যে, ইজতিহাদকারী সাহাবীর নিকট রাসূলুল্লাহর (সা) এর হাদীসটি পৌছেছে বটে, কিন্তু তা  বিশ্বাসযোগ্য পন্থায় পৌছায়নি। এমতাবস্থায় মুহতাহিদ বর্ণনাটি পরিত্যাগ করতেন এবং নিজের ইজতেহাদের উপর আমল করতেন। এ উদাহরণ পাওয়া যায় ফাতেমা বিনতে কায়েস (রা) এর একটি হাদীস থেকে যা ছয়টি সহীহ গ্রন্থেই (সিহাহ সিত্তাহ) বর্ণিত হয়েছে। হাদীসটি হলোঃ “ফাতেমা বিনতে কায়েস (রা) হযরত ইমারের  (রা) সম্মুখে বললেনঃ রাসূলুল্লাহ (সা) জীবিত থাকতে আমাকে তিন তালাক দেয়া হয়েছিলো কিন্তু তিনি আমাকে ইদ্দতকালীন খোরপোষ দেয়ার নির্দেশ দেননি এবং তালাক দেয়া স্বামীর বাড়িতেও থাকতে দেননি।” হযরত উমার (রা) ফাতিমা (রা) এর এ বক্তব্য গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। তিনি বলেনঃ “আমরা একজন নারীর কথায় আল্লাহর কিতাব পরিত্যাগ করতে পারি না।

[৮. এখানে কুরআনের কয়েকটি আয়াতাংশকে ইংগিত করা হয়েছে। সূরা তালাকে বলা হয়েছেঃ “আরবীঃولا تخرجهن من بيوتهن (ওয়ালা তুখরিজুহুন্না মিন বুয়ুতিহিন্না) “অর্থাৎ, ইদ্দতকালে তোমরা তাদের বাসগৃহ থেকে বের করে দিও না।” এবং “اسكنهن من حيث سكنتم من وجدكم” (আসকিনহুন্না মিন হাইছু সাকানতুম মিন উজদিকুম) “তাদের ইদ্দতকালে তাদের সেই বাসগৃহে থাকতে দাও তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী তোমরা নিজেরা যে বাসগৃহে থাকো।” এ আয়াতগুলো থেকে জানা গেলো যে, ইদ্দতকালে নারীদেরকে ঘর থেকে বের করে দেয়া যাবে না। বরঞ্চ তালাকপ্রাপ্তাকে এ সময়ের জন্যে নিজের ঘরে থাকতে দেয়া স্বামীর দায়ীত্ব। তাছাড়া কুরআনে আরো বলা হয়েছেঃ  “انفقوا عليهن” (আনফিকু আলাইহিন্না) “তাদের ব্যায়ভার বহন করো।” এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, ইদ্দতকালে তালাকপ্রাপ্তার ব্যায়ভার ও বহন করতে হবে। আয়াতাংশগুলো অর্থ প্রকাশের দিক থেকে পরিস্কার, দ্ব্যর্থহীন, ও সাধারণ অর্থবোধক। এখানে নির্দিষ্ট করে কেবল ‘তালাকে রিজয়ী’ (ফেরতযোগ্য তালাক) দেয়া নারীর কথা বলা হয়নি। তাই এ আয়াতগুলোর হুকুম সব ধরনের তালাক দেয়া নারির উপরই প্রযোজ্য হবে। এই সাধারণ হুকুমটির প্রেক্ষিতেই হযরত উমার (রা) ফাতিমা বিনতে কায়েসের (রা) বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ তার বর্ণনাটি কুরআনের আয়াতের স্পষ্ট বিরোধী।

হযরত উমার (রা) এর এই কর্মপন্থা থেকে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি লাভ করি। ফাতিমা (রা) ছিলেন একজন সাহাবী। উদুকে হাদীস অনুযায়ী ‘আসসাহবাতু কুল্লুহুম উদূল’  আর ফাতিমা ও সাহাবীদের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন। কিন্তু তা সত্বেও তার বর্ণনা কুরআনের স্পষ্ট অর্থের সাথে সাংঘর্ষিক হউয়ায় তিনি তা গ্রহন করেননি। এতে বুঝা গেলো, হাদীস বিচারে কেবল সনদই বিবেচ্য নয়, বরঞ্চ বক্তব্য বিষয়ও (মতন) খতিয়ে দেখতে হবে। সোনালী সূত্রের মধ্যেও ভ্রান্তির সম্ভাবনা থাকতে পারে। সুত্রের (সনদ) বিশুদ্ধতা সর্বাবস্থায় হাদীসের বিশুদ্ধতার জন্যে যথেষ্ট নয়। কারণ ফাতিমা বিনতে কায়েসের (রা) বর্ণনার মধ্যে তো সুত্রগত দুর্ববলতার কোনো অবকাশ ছিল না। (সঃ ইসলহী)]

 তাছাড়া তার বক্তব্য সঠিক কি ভুল তাও নিশ্চিত বলা যায় না। তিন তালাকপ্রাপ্তা মহিলাকে অবশ্যি খোরপোষ এবং বাসস্থান দিতে হবে।” তাছাড়া “আমাকে রাসূল (সা) খোরপোষ এবং বাসস্থানের ব্যাবস্থা করে দেননি” ফাতিমা বিনতে কায়েসের (রা) একথাশুনতে পেয়ে হযরত আয়িশা (রা) বলে উঠলেনঃ “ফাতিমার কি হলো? সেকি আল্লাহকে ভয় করে না?”

দ্বিতীয় আরেকটি উদাহরণ দিচ্ছি। আ উদাহনরণটি বর্ণনা বুখারী এবং মুসলিমে উল্লেখিত হয়েছেঃ  “হযরত উমার (রা) মনে করতেন, জুনুবী (যার উপর গোসল ফরয হয়েছে) যদি গোসলের পানি না-ও পায়, তবু তায়াম্মুম দ্বারা সে পবিত্রতা অর্জন করতে না। ”

 অতঃপর হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসার (রা) তাকে নিজের ঘটনা শুনালেন। তিনি বলেন, “একবার রাসূলুল্লাহ (সা) এর সফরসংগী ছিলাম। আমার গোসলের জরুরত হলো। কিন্তু পানি পাওয়া গেল না। তার তায়াম্মুমের উদ্দেশ্যে ধুলায় গড়াগড়ি করে নিলাম। পরে ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (সা) কে জানালাম। তিনি বললেন, তোমার এতটুকুই করা যথেষ্ট ছিলো, (একথা বলতে বলতে) তিনি নিজের দু’হাত যমীনের মারলেন এবং সেখান থেকে উঠিয়ে স্বীয় মুখমন্ডল ও হস্তদ্বয় মাসেহ করে দেখালেন।” হযরত উমারের (রা) দৃষ্টিতে আম্মারের এ বর্ণনায় কোনো দুর্বলতা ছিলো। ফলে তিনি তার এই বক্তব্য গ্রহণ করলেন না। তার দৃষ্টিতে বর্ণনাটি প্রামাণ্য দলিল ছিলো না। অবশ্য পরবর্তীতে হাদীসটি মশহুর হয়ে যায় এবং দুর্বল হবার ধারণা চাপা পড়ে যায়। ফলে লোকেরা তার উপর আমল করতে থাকে।

চার. কখনো এমন হতো যে, মুজতাহিদ সাহাবীর নিকট সংশ্লিষ্ট বিষয়ের হাদীসই পৌছেনি। যেমন সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছেঃ  আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা) মহিলাদেরকে গোসলের সময় মাথার চুল খুলে নিতে হুকুম করতেন। হযরত আয়িশা (রা) ব্যাপারটি হানতে পেরে বিস্মিত হয়ে বললেন, “ইবনে উমারের কি হলো, কেনো তিনি মহিলাদেরকে চুল খোলার নির্দেশ দেন? এমন হলে তো তাদেরকে মাথার চুল কামিয়ে ফেলতে বললেই হয়। অথচ আমি এবং রাসূলুল্লাহ (সা) এক পাত্রে গোসল করতাম। আমি কহুলতাম না শুধুমাত্র মাথায় তিনবার পানি ঢালতাম।”

এ ব্যাপারে দ্বিতীয় উদাহরণটি পাওয়া যায় ইমাম যুহুরী বর্ণিত একটি ঘটনায়। তাহলোঃ  “হিন্দ রাদিয়াল্লাহু আনহার একথা জানা ছিলো না যে, কোও নারীর যদি দশদিনের বেশী ঋতুস্রাব হতে থাকে, তাহলে তাকে দশম দিনের পর থেকে নামাজ পড়তে হবে। এ কারণে তিনি সেসময় নামায পড়তেন না। আর নামাজ পড়তে না পারার কারণে তিনি শুধু কান্নাকাটি করতেন।”

দ্বিতীয় কারণঃ  রাসূলের কজের ধরণ নির্ণয়ের পার্থক্য

সাহাবায়ে কিরামের (রা) মধ্যে মতপার্থক্য সৃষ্টি হবার দ্বিতীয় কারণটি ছিলো এই যে, তারা নবী করীম (সা) একটি কাজ করতে দেখেছে। (কিন্তু মানবিক চিন্তার প্রকৃতিগত তারতম্যের কারণে কাজটির ধরন ও গুরুত্ব অনুধাবনের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে পার্থক্য হয়ে যায়।)। ফলে কেউ রাসূলের (সা) উক্ত কাজটিকে মনে করেছেন ইবাদাত আর কেউ মনে করেছেন মুবাহ। এ ব্যাপারে দু’টি উদাহরণ পেশ করা যেতে পারে। প্রথম উদাহরণটি হচ্ছে ‘তাসবীহের’। মানে হজ্ব সফরের উদ্দেশ্যে রাসূল (সা) এর আবতাহ উপত্যকায় অবতরণের ঘটনা। আসহাবে উসূল ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। আবু হুরায়রা (রা) এবং আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা) এর দ্ররুষ্টিতে এই অবতরণের কাজটি ইবাদতের অন্তর্ভূক্ত ছিলো। তারা এটাকে হজ্জের সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত মনে করত। কিন্তু হযরত আয়িশা (রা) এবং আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) এর মতে, তিনি সেখানে ঘটনাক্রমে অবতরন করেছিলেন। সুতরাং সেটা হজ্জের সুন্নাতের অন্তর্ভূক্ত নয়।

এ ব্যাপারে দ্বিতীয় উদাহরনটি হচ্ছে এই যে, “সাধারণ মুসলমানদের মতে, খানায়ে কা’বার তাওয়াফের সময় ‘রমল’ করা সুন্নাত। কিন্তু আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) এর মতে রাসূলুল্লাহ (সা) যে রমিল করেছিলেন, তা ছিলো একটি আকস্মিক ঘটনা। তিনি তা করেছিলেন মক্কার মুশরিকদের একটি র্ভৎসনার জবাবে তিনি সাময়িকভাবে এ কাজটি করেছিলেন। তারা বলতঃ ‘মদীনার সুতাররা মুসলমানদেরকে বিচূর্ণ ও ক্লান্ত করে রেখেছে।’ এ র্ভৎসনার জবাব তিনি মুসলমানদের নিতান্তই সাময়িকভাবে “রমল” করার হুকুম দিয়েছেন। এটি হজ্জের স্থায়ী কোনো সুন্নাত নয়।”

তৃতীয় কারণঃ  ধারণাগত বিশ্লেষণের পার্থক্য

সাহাবায়ে কিরামের (রা) মধ্যে মতপার্থক্যের সৃষ্টি হবার তৃতীয় কারণটি হলো, রাসুলুল্লাহর (সা) কাজস্মূহের কথা বর্ণনার ক্ষেত্রে তাঁদের ধারণাগত বিশ্লেষণ। যেমন, রাসূলুল্লাহ (সা) হজ্জ সম্পাদন করেছেন আর সাহাবায়ে কিরাম (রা) তা প্রত্যক্ষ করেছেন। পরে তারা লোকদের কাছে রাসূলুল্লাহর (সা) সেই হজ্জের ধরণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, তিনি ‘হজ্জে তামাত্তু’ করেছেন। কেউ বলেছেন, তিনি ‘হজ্জে কিরান’ করেছেন। আবার কারো কারো মতে সেটা ছিলো ‘হজ্জে ইফরাদ’।

[৯. ‘তামাত্তু’ সে ধরণের হজ্জকে বলা হয়ম যাতে হজ্জের মাসগুলোতে মক্কা গিয়ে উমরা আদায় রবং মাথা মুনফ করে ইহরাম খুলে ফেলা হয়। অতঃপর জিলহজ মাসের আট তারিখে আবার নতুন করে ইহরাম বেঁধে হজ্জ আদায় করা হয়। ‘কেরান’ সেই হজ্জকে বলা হয়, যাতে উমরা এবং হজ্জ উভয়টার জন্যে একত্রে ইহরাম বাঁধা হয় এবং উভয়টা সমাপ্ত করার পর ইহরাম খোলা হয়। আর উমরা বিহীন হজ্জকে ইফরাদ বলা হয়।–অনুবাদক]

এর দ্বিতীয় উদাহরণটি হচ্ছে আবু দাউদে সংকলিত হযরত সায়ীদ ইবনে যুবায়ের (রা) বর্ণিত একটি হাদীস। তিনি বলেনঃ “আমি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসকে বললাম, হে আব্বাস! হজ্জের ইহরাম বাঁধার পর রাসূলুল্লাহ (সা) যে তালবিয়া১০

[১০. হজ্জের তালবিয়া হচ্ছে, (لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لاَ شَرِيْكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لاَ شَرِيْكَ لَكَ) “লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। লাব্বাইকালা-শারিকালাকা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়াননি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক লা-শারিকালা।”]

পাঠ করেছিলেন, সে বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) সাহাবীগণের মধ্যে মতপার্থক্য দেখে আমার কাছে বিস্ময় লাগছে।” আমার বক্তব্য শুনে ইবনে আব্বাস বললেনঃ

“এ বিষয়ে প্রকৃত ঘটনা আমার সবার চাইতে বেশী জানা আছে, আসলে রাসুলুল্লাহ (সা) একটিই মাত্র হজ্জ করেছিলেন, আর এই জন্যেই সে হজ্জের বিস্তারিত বিবরণের ব্যাপারে লোকদের মধ্যে মতপার্থক্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনা হছে এই  যে, রাসূলুল্লাহ (সা) হজ্জের উদ্দেশুএ মদীনা ত্যাগ করেন। অতঃপর তিনি মসজিদে যুলহুলাইফাইয় দু’রাকাত নামাজ আদায় করেন। তারপর সেখানেই হজ্জের তালবিয়া পাঠ করেন। সেখানে তার আশে পাশে যারা ছিলেন, তারা তার এই তালবিয়া পাঠ শুনেন এবং মনে রাখেন। অতঃপর তিনি উটে আরোহণ করেন, ইট তাকে নিয়ে যাত্রা শুরু করলে তিনি পুনরায় তালবিয়া পাঠ করেন। এ সময় আবার অপর কিছু লোক তা শুনতে পায়, ব্যাপার হলো সফর ব্যপদেশে সাহাবীগণের পৃথক পৃথক দল একের পর এক রাসূলুল্লাহর (সা) এর খিদমতে আত্মনিয়োগ করে তার পাশে থাকতেন। সে কারণে উট তাকে নিয়ে যাত্রা শুরু করার সময় তার পাশে যারা ছিলেন, তারা তখনকার তালবিয়া শুনতে পান এবং তারা মনে করে বসেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) কেবল তখনই তালবিয়া পাঠ করেছেন যখন যুলহুলাইফার মসজিদ থেকে উটে করে যাত্রা শুরু করেন। অতঃপর তিনি সম্মুখে অগ্রসর হয়ে বায়দাউপত্যকা অতিক্রমকালে এর উপরে উঠলে পুনরায় তালবিয়া পাঠ করেন। এ সময় আরেকদল লোজ তার তালবিয়া শুনতে পায়। এরা মনে কর বসে রাসূলুল্লাহ (সা) শুধু বায়দা উপত্যকা অতিক্রমকালে তালবিয়া পাঠ করেছেন অথচ, খোদার কসম,  জায়নামাজে বসে ও তিনি হজ্জের নিয়ত করেছিলেন। অতঃপর উট তাকে বিয়ে যাত্রা শুরু করার পর ও তালবিয়া পাঠ করেছেন এবং বায়দা অতিক্রমকালেও তালবিয়া পাঠ করেছেন।”

চতুর্থ কারণঃ  ভুলে যাবার কারণে মতপার্থক্য

সাহাবায়ে কিরামের (রা) এর মধ্যে মতপার্থক্যের কারন হচ্ছে ভুলচুক (যা মানুষের জন্যে অস্বাভাবিক কিছু নয়।)

এর উদাহরণ হচ্ছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা) সম্পর্কিত একটি বর্ণনা। তিনি (ইবনে উমার) বলতেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সা) একটি উমরা করেছেন রজব মাসে।” তার এ বক্তব্য অবগত হলে আয়িশা বললেনঃ “ইবনে উমার ব্যাপারটা ভূলে গেছেন।১১

[১১. জামউল ফাউয়ায়িদ ১ম খন্ড পৃঃ ৩৪৫-৩৪৬; বর্ণনাঃ উমার রবং ইবনে উমার (রা) –অনুবাদক]

পঞ্চম কারণঃ  রাসূলুল্লাহ্র (সা) বক্তব্যের সঠিক উদ্দেশ্য আয়ত্ত করা না করার পার্থক্য

সাহাবায়ে কিরামের (রা) মধ্যে মতপার্থক্য সৃষ্টি হওয়ায় পঞ্চম কারণ হচ্ছে এই যে, কখনো কখনো রাসূলুল্লাহর (সা) বক্তব্যের যথার্থ ও পূর্ণ উদ্দেশ্যে সকলে সমানভাবে আয়ত্ত করে রাখতেন না। এর উদাহরণ হচ্ছে, রাসূলুল্লাহর (সা) সুত্রে হযরত ইবনে উমার (রা) বর্ণিত একটি হাদীস। তিনি বলেনঃ

“রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ মৃত ব্যাক্তির পরিবার পরিজন কান্নাকাটি করলে  মৃত ব্যাক্তিটিকে আযাব দেয়া হয়।” এ বক্তব্য শুনে হযরত আয়িশা (রা) বললেনঃ এটা ইবনে উমারের ধারণা প্রসূত কথা। রাসূলুল্লাহর বক্তব্যের উদ্দেশ্যে এবং স্থানকাল পাত্র তিই আয়ত্ত রাখেননি। প্রকৃত ঘটনা হছে এই যে, রাসূলুল্লাহ (সা) এক ইয়াহুদী মহিলার কবরের পাশ দিয়ে যাবার কালে দেখলেন, তার আপনজনেরা তার জন্য মাতম করছে। তিনি বললেনঃ “এরা এখানে তার জন্যে কান্নাকাটি করছে অথচ তার কবরের আযাব হচ্ছে।”১২

[১২. এ ঘটনা মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে। –অনুবাদক]

এখানে হযরত উমার (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) বক্তব্যের যথার্থ উদ্দেশ্য আয়ত্ত করতে পারেননি। তিনি মনে করেছেন, কান্নাকাটির কারণে মাইয়্যেতের আযাব হয়েছে এবং ব্যাপারটা সাধারণভাবে সকল মাইয়্যেতের জন্যই প্রযোজ্য। অথচ রাসূলুল্লাহ (সা) বক্তব্য ছিলো কেবল উক্ত মাইয়্যেতের জন্যে নির্দিষ্ট (খাস) এবং বক্তব্যে তিনি কান্নাকাটিকে আযাবের কারোন হিসেবে উল্লেখ করেননি।

৬ষ্ট কারণঃ  বিধানের কারণ নির্ণয়গত কারণ

সাহাবায়ে কিরামের (রা) মধ্যে যেসব কারণে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েক্সহে তন্মধ্যে আরেকটি হচ্ছে এই যে, কোনো বিধান স্থির করার পিছনে কি কারন ছিলো তা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে তাঁদের মতামত এর ভিন্নতা। যেমন, কফিন অতিক্রমকালে দাঁড়ানো। এ ব্যাপারে কোনো কোনো সাহাবী বলেছেনঃ ফেরেশতাদের সম্মানার্থে দাঁড়ানো হয়, কেননা প্রত্যেক কফিনের সাথেই ফেরেশতারা শামিল হয়। এ মতানুযায়ী মৃতব্যাক্তি মুমিন হোক কিংবা কাফির সর্বাবস্থায় ই দাড়াতে হবে। আবার কেউ কেউ বলেছেনঃ মৃত্যু ভীতির কারণে দাঁড়ানো হয়। এ মতানুযায়ীও যে কোনো ধরণের লোকের কফিনের জন্য দাড়াতে হবে। আবার কেউ কেউ বলেছেন, একবার রাসূল (সা) এর নিকট দিয়ে এক ইয়াহুদীর কফিন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।  তার মাথা উপর দিয়ে ইয়াহুদীর লাশ অতিক্রম করা তিনি পছন্দ করলেন না। তার তিনি দাড়ালেন। এটা যদি সঠিক কারণ হয়ে থাকে, হবে দাড়ানোটা শুধু কাফিরের কফিনের জন্যে নির্দিষ্ট।

৭ম কারণঃ  সামঞ্জস্যবিধানগত পার্থক্য

কোনো বিধানের বৈপরিত্য নিরসনকল্পে সামনহস্য বিধান করতে গিয়ে সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। যেমন, রাসূলুল্লাহ (সা) খাইবার যুদ্ধের সময় ‘মুতআ’ বিয়ের অনুমতি দিয়েছিলেন। যদ্ধের পর আবার তা নিষেধ করে দেন। অতঃপর ‘আওতাস’ যুদ্ধের সময় পুনরায় মুতআর অনুমতু প্রদান করেন। এবারও যুদ্ধের পর অনুমতি প্রত্যাহার করে নেন।

এখন এ বিষয়ে হযরত আব্বাসের (রা) মত হলো, প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে ‘মুতআর’ অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন শেষ হবার সাথে সাথে অনুমতি প্রত্যাহার করা হয়েছে। সুতরাং অনুমতি প্রয়োজনের সাথে সম্পর্কিত। এ জন্যে এ অনুমতি স্থায়ী। (অর্থাৎ প্রয়োজন দেখা দিলে মুতআ বিয়ে করা যাবে। আর প্রয়োজন দূরীভুত হলে তা নিষিদ্ধ।) কিতু সাধারণ সাহাবীগণের মত এর বিপরীত। তাদের মত হলো, মুতআ বিয়ের ইনুমিতিটা ছিলো মুবাহ পর্যায়ের। নিষেধাজ্ঞা সে অনুমতিকে স্থায়ীভাবে রদ (মানসুখ) করে দিয়েছে।

এ ব্যাপারে দ্বিতীয় উদাহরণ হচ্ছে এই যে, রাসূলুল্লাহ (সা) কিবলামুখী হয়ে ইস্তেঞ্জা করতে নিষেধ করেছেন। এ ব্যাপারে কিছু সাহাবীদের মত হলো, এ নিষেধাজ্ঞা সাধারণ এবং রদযোগ্য নয়। কিন্তু ওফাতের এক বছর হযরত জাবির (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) কে কিবলামুখী হয়ে পেশাব করতে দেখেছেন। তাই তার ধারণা জন্মেছে যে, রাসুলুল্লাহ (সা) এর এই কাজ সংক্রান্ত তাঁর পূর্ববর্তী নিষেধাজ্ঞাকে রদ করে দিয়েছে। এমিনিভাবে হযরত ইবনে উমার (রা) রাসূলুল্লাহকে (সা) কিবলার দিকে পিছু দিয়ে এবং সিরিয়ার দিকে মুখ করে ইস্তেঞ্জা করতে দেখেছেন। এর ভিত্তিতে তিনি তাদের মতকে রদ করে দিয়েছেন যারা বলেন, কিবলার দিকে পিছু দিয়ে ইস্তেঞ্জা করে নিষেধ। অতঃপর কিছু লোক এই উভয় মতের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের চেষ্টা করেছেন। ইমাম শা’বী (রা) প্রমুখ মত দিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিষেদাজ্ঞা ছিলো খোলা উন্মুক্ত জায়গার বেলায়। কেউ যদি পায়খানা বা টয়লেটে বসে ইস্তেঞ্জা করে, তখন কিবলার দিকে মুখ কিরে বা পিছু দিয়ে বসলে কোনো অসুবিধা নাই। কিন্তু কেউ কেউ আবার ভিন্ন মত ব্যাক্ত করেছেন। তারা বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) নিষেধাজ্ঞা স্থায়ী এবং সাধারণ। তবে হযরত জাবির (রা) এবং ইবনে উমার (রা) যা দেখেছেন, সেটা করা নবী হিসেবে বিশেষভাবে কেবলমাত্র তার জন্য বৈধ ছিলো। সুতরাং তার সে কাজ এ সংক্রান্ত তার নিষেধাজ্ঞাকে রদ করে না। তাক্সহাড়া কোনো বিশেষ স্থানে কিবলামুখী বা কিবলাকে পিছু দিয়ে ইস্তেঞ্জা করাও বৈধ বলে প্রমাণ করেনা।

 

About শাহ্‌ ওয়ালি উল্লাহ্‌ মুহাদ্দিসে দেহলভী র.