মতবিরোধপূর্ণ বিষয়ে সঠিক পন্থা অবলম্বনের উপায়

৩. মতবিরোধের ইতিহাসের দ্বিতীয় যুগঃ তাবেয়ীগণের যুগ

তাবেয়ীগণের মতপার্থক্য

এভাবেই সাহাবায়ে কিরামের মাঝে মতপার্থক্যের সৃষ্টি হয়েছে। উত্তরাধিকার সুত্রে এ মতপার্থক্য তাবেয়ীদের নিকত পৌছে। প্রত্যেক তাবেয়ীর নিকট যা কিছু পৌছে তিনি সেটাকে আয়ত্ত করে নেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর যে যে হাদীস এবং যে যে সাহাবীগণের যে যে মতামত শুনেছেন, তা তাঁরা  তাঁদের স্মৃতিতে অংকিত করে নেন। সাহাবীগণের বক্তব্যে যেসব ইখতিলাফ লক্ষ্য করেছেন, নিজ নিজ জ্ঞানবুদ্ধি অনুযায়ী তাঁরা সেগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের চেষ্টা করেছেন। কখনো একটি বক্তব্যকে আরেকটি বক্তব্যের উপর অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এ ব্যাপারে কোনো কোনো বক্তব্য তাদের সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য হয়েছে। এমনকি তা যদি প্রথম শেণীর কোনো সাহাবীর বক্তব্যও হয়ে থাকে। যেমন, ‘তায়াম্মুম দ্বারা ফরয গোসলের কার্য সমাধান হয় না’- হযরত উমার (রা) এবং ইবনে মাসউদের (রা) এ মতকে তারা গ্রহন করেননি। পক্ষান্তরে এ প্রসংগে তাঁরা হযরত আম্মার (রা) এবং ইমরান ইবনে হুসাইন প্রমুখের মশহুর রেওয়ায়াত গ্রহণ করেছেন। এ পর্যায়ে এসে তাবেয়ীগণের মধ্যে ও স্বাভাবিক মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়ে যায়। দেখা দেয় ভিন্ন ভিন্ন মত। আর বিভিন শহরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় ভিন্ন ভিন্ন মতের আলিমদের নেতৃত্ব। যেমনঃ

ক) মদীনায় সায়ীদ ইবনে মুসাইয়্যেব (রহ) এবং সালিম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উমারের (রহ) মতামত গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। তাঁরা মদীনার জনগণের ইমামের মর্যাদা লাভ করেন। এ দু’জনের পর মদীনায় যুহুরী, কাযী ইয়াহিয়া ইবনে সায়ীদ এবং রাবীয়া ইবনে আবদুর রহমান অনুরুপ মর্যাদা লাভ করেন।

খ) মক্কায় আতা ইবনে আবি রিবাহ গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে তাদের ইমামের মর্যাদা লাভ করেন।

গ) কুফায় ইব্রাহীম নখয়ী এবং শা’বী এ মর্যাদা লাভ করেন।

ঘ) বসরায় এ মর্যাদা লাভ করেন হাসান বসরী।

ঙ) ইয়েমেনে লাভ করেন তাউস ইবনে কাইসান আর

চ) সিরিয়ায় মাকহুল।

অতঃপর আল্লাহ তা’আলা কিছু লোকের অন্তরে এঁদের থেকে ইলম হাসিল করার আকাঙ্কখা জাগ্রত করে দেন। এভাবে তারা এঁদের নিকট থেকে রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাদীস, সাহাবায়ে কিরামের (রা) বক্তব্য ও ফতোয়া ও এই লোকদের মতামত ও বিশ্লেষণ সংগ্রহ করেন। অতঃপর তাঁদের কাছে ফতোয়া চাইতে আসে অসংখ্য লোক। তাদের সম্মুখে আসে হাজারো মাসায়েল। উত্থাপিত হয় শত শত মামলা মুকাদ্দামা। (এ সকল বিষয়ে তাদেরকে ফতোয়া দিতে হয় এবং ব্যাক্ত করতে হয় নিজেদের মতামত।)

ফিকাহ সংকলনের সূচনাঃ

উপোরক্ত ব্যাক্তিদের মধ্যে সায়ীদ ইবনে মুসাইয়্যেব এবং ইব্রাহীম নখয়ী প্রমুখ যথানিয়মে বিভিন্ন অধ্যায় ভিত্তিক ফিকাহ সংকলন করেন। প্রত্যেক অধ্যায়ে তাঁরা কিছু মূলনীতির অনুসরন করেন। যা তাঁরা তাঁদের পুর্ববর্তীদের থেকে লাভ করেছেন।

সায়ীদ ইবনে মুসাইয়্যেব এবং তার ছাত্ররা এ মত পোষণ করতেন যে, হারামাইনের বাসিন্দারা ফিকাহর ব্যাপারে সর্বাধিক যোগ্যতার অধিকারি। তাঁদের মতামতের (মাযহাবের) ভিত্তি ছিলো হযরত উমার (রা) ও হযরত উসমানের (রা) ফতোয়া ফায়সালা সমূহ, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা), আয়িশা (রা), ও ইবনে আব্বাসের (রা) ফতোয়াসমূহ এবিং মদীনার কাযীগণের ফায়সালা ও রায়সমূহ। আল্লাহতায়ালা প্রদত্ত তাওফীক অনুযায়ী তাঁরা এসকল বিধান ও ফতোয়া সংগ্রহ করেন এবং গবেষণা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে সেগুলো পর্যালোচনা করেন। অতঃপর (ক) যে বিষয়ে মদিনার আলিওগণের ঐক্যমত পোষণ করেছেন, সেটা দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করেছেন। (খ) যে বিষয়ে তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য ছিলো সে বিষয়ে ঐ মতকে গ্রহণ করেন, যা কোনো না কোনো কারণে মজবুত এবং অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। এসব কারণ আবার বিভিন্ন প্রকার হয়ে থাকতে পারে। যেমন, আধিকাংশ আলেম কর্তৃক সে মতটি গ্রহণ করা কিংবা কিয়াসের ভিত্তি মজবুত হওয়া, বা সরাসরি কুরআন সুন্নাহ ভিত্তিতে গবেষণা করে নির্ণয় করা কোনো ফায়সালার সাথে সামঞ্জস্যশীল হওয়া অথবা অন্য কোনো কারণে। (গ) আর যে বিষয়ে তাদের কোনো ফতোয়া এরা লাভ করেননি, সে বিষয়ে তাঁদের অনুরূপ অন্যান্য বক্তব্য ও ফতোয়াসমূহের উপর গবেষণা করতেন, সেগুলোর উদ্দেশ্য, ও ইংগিত ও দাবী খুঁজে বের করতেন এবং সে অনুযায়ী কোনো সিদ্ধান্তে পৌছুতেন। এভাবে প্রতিটি অধ্যায়ে তারা অসংখ্য মাসায়েল ও বিধান রচনা করেন। ইব্রাহীম নখয়ী এবং তার ছাত্রের ধারণা ছিলো, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ এবং তার শিষ্যগণই ফিকাহশাস্ত্রে সর্বাধিক দক্ষ। যেমন, আলকামা মাসকুককে বলেছিলেঃ “সাহাবীদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের চাইতে বড় কোনো ফকীহ ছিলেন কি?” একইভাবে ইমাম আবু হানীফা (রহ) ইমাম আওযায়ীকে বলেছেনঃ “ইব্রাহীম নখয়ী সালিম ইবনে আবদুল্লাহর চাইতে বড় ফকীহ। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ তো আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ ই। তাঁর সাথে আর কার তুলনা হয়?” মূলতঃ ইব্রাহীম নখয়ী ও তার ছাত্রদের ফিকহী মসলকের ভিত্তিই ছিলো আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের মতামত ও ফতোয়া, হযরত আলী (রা) এর ফতোয়া ও ফায়সালাসমূহ, কাযী শূরাইহর ফায়সালাসমূহ এবং কুফার অন্যান্য কাযীর ফায়সালাসমূহের  উপর। ইব্রাহীম নখয়ী তাঁর সাধ্যানুযায়ী এইসব ফতোয়া, ফায়সালা  ও বিধান সংগ্রহ করেন এবং এগুলো ঠিক সেইভাবে কাজে লাগান, যেভাবে মদীনায় সায়ীদ ইবনে মুসাইয়্যেব প্রমুখ সেখানকার সাহাবী ও পরবর্তী আলিমদের বক্তব্য (আছার) ও ফতোয়াসমূহ কাজে লাগান। এগুলোর ভিত্তিতে অনুসন্ধান ও গবেষণা ভালিয়ে অসংখ্য মাসায়েল উদ্ঘাটন করেন। ফলশ্রুতিতে এখানেও ফিকাহর প্রতিটি  অধ্যায়ে মাসায়েলের স্তুপ জমা হয়ে যায়।

সায়ীদ ইবনে মুসাইয়্যেব ছিলেন মদীনার ফকীহদের মুখপাত্র। মদীনার ফকীহদের মধ্যে হযরত উমারের (রা) ফায়সালাসমূহ এবং আবু হুরায়রা (রা) বর্ণিত হাদীসসমুহ তাঁর চাইতে অধিক কারো মুখস্ত ছিলো না। আর ইব্রাহীম নখয়ী ছিলেন কুফার ফকীহদের মুখপাত্র। এঁরা দু’জন কারো সুত্র উল্লেখ না করে যখন কোনো মাসয়ালা বর্ণনা করতেন, তখন তার অর্থ এই হতো না যে, কারো সুত্র ছাড়াই স্বীয় ইজতিহাদের ভিত্তিতে মাসয়ালাটি প্রদান করেছেন। বরঞ্চ সাধারণত এসব মাসায়েক তাঁরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অতীতের কোনো ফকীহর সুত্রেই বর্ণনা করতেন। শেষ পর্যন্ত এ দুজনকে ঘিরে উভয় শহরে গড়ে উঠে বিরাট ফকীহ গোষ্ঠী। তাঁরা দুজন দুই স্থানে এই শাস্ত্রের কেন্দ্রীয় ব্যাক্তিত্বে পরিণত হন। অসংখ্য লোক তাদের কাছ থেকে লাভ করেন ফিকাহর ইলম। তাঁদের এসব ছাত্ররা ও আবার গবেষণা বিশ্লেষণের মাধ্যমে মাসয়ালা বের করেন। বের করেন মাসয়ালার শাখা প্রশাখা এবং খুঁটিনাটি অনেক বিষয়।

 ৪. মতবিরোধের ইতিহাসের তৃতীয় যুগঃ তা’বে তাবেয়ীনদের যুগ

উলামায়ে তাবেতাবেয়ীন

তাবেয়ীগের যুগ শেষ হওয়ার  পর আল্লাহ তায়ালা ইলমে দ্বীনের আরেক দল বাহক সৃষ্টি করেন। এতে করে ইলমে দ্বীন সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সা) নিম্নোক্ত প্রতিশুতি পূর্ণ হলঃ (আরবীঃ  يحمل هذا العلم من كل خلاف عدله) “ইয়াহমিলু হা-যাল ইলম মিন কুল্লি খালাফিন উদুলহু—প্রত্যেকটি ভবিষ্যত বংশধরের ন্যায়পরায়ণ লোকেরা এই ইলমের আমানত বহন করবে।”

ইলমে দ্বীনের এই বাহক দল সেই দায়িত্ব পালন করছেন। এঁরা ছিলেন তাবেয়ীনদের ছাত্র। তারা তাবেয়ীগণের নিকট থেকে তাঁদের সংগৃহীত অযু, গোসল, সালাত, হজ্জ, বিয়ে-শাদী, লেনদেন ব্যাবসা বাণিজ্য প্রভৃতি সাধারণভাবে দৈনন্দিন জীবনে ঘটমান যাবতীয় বিষয়ের শরয়ী পন্থাসমূহ সংগ্রহ করেন; রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাদীস সংগ্রহ এবং বর্ণনা করেন; বিভিন্ন শহরের কাযীদের ফায়সালা এবং মুফতীদের ফতোয়া সংগ্রহ করেন। এছাড়াও তাঁরা তাঁদের থেকে মাসায়েল জিজ্ঞাসা করেন এবং সকল বষয়ে নিজেরাও ইজতহাদ করেন।  এভাবে তাঁরা জাতিএ শ্রেষ্ট আলিমের মর্যাদা লাভ করেন। জনগণ তাঁদেরকে ইমাম হিসেবে গ্রহণ করেন। এবং শরয়ী ব্যাপারে তাঁদের বক্তব্য শুদ্ধ বলে মেনে নেন। এঁরাও আবার নিজ নিজ শিক্ষকের পন্থা অবলম্বন করেন। অতীত আলেমগণ এর বক্তব্য ও ফতোয়ার উদ্দেশ্য ও দাবী অনুধাবনের ক্ষেত্রে তারা নিষ্ঠার সাথে নিজেদের পূর্ণ প্রতভাকে কাজে লাগান। নিজেদের অগাধ প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে তাঁরাও মানুষকে ফতোয়া দান করেন। বিভিন্ন বিষয়ের ফায়সালা প্রদান করেন। হাদীস বর্ণনা করেন এবং জ্ঞান শিক্ষা দেন।

তাবেতাবেয়ী আলিমগণের চিন্তা ও কর্মপদ্ধতি

এ স্তরের আলিমগণের চিন্তাপদ্ধতি ও কর্মপদ্ধতি ছিলো খুনই সামঞ্জস্যপুর্ণ। তাঁদের চিন্তা ও কর্মের এই সামঞ্জস্যের সারসংক্ষেপ হলোঃ

১. তাঁদের দৃষ্টিতে ‘মুসনাদ হাদীস’ যেমন গ্রহণযোগ্য ছিলো, অনুরূপভাবে গ্রহণযোগ্য ছিলো ‘হাদীসে মুরসাল’।১৩

[১৩. যে হাদীসের সাথে ধারাবাহিকভাবে বর্ণনাকারীর নাম উল্লেখ করা হয়, সেটা হলো ‘হাদীসে মুসনাদ (সনদযুক্ত)’ আর সনদ উল্লেখ করা ছাড়াই কোনো তাবেয়ী বা তাবেতাবেয়ী সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে যা হাদীস বর্ণনা করেন, তাকে ‘হাদীসে মুরসাল’ বলে।]

২. তাঁরা সাহাবী এবং তাবেয়ীগণের বক্তব্যকে শরয়ী দলীল হিসেবে গ্রহণ করতেন। এ প্রসংগে তাঁদের দৃষ্টিভংগী এই ছিলো যেঃ

(ক)  শরয়ী বিষয়ে সাহাবী এবং তাবেয়ীগণ যেসব বক্তব্য দিয়েছেন সেগুলো হয়তো রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস হিসেবেই তাঁরা উল্লেখ করেছেন, তবে সংক্ষিপ্ত করে ‘মওকূফ’১৪ করেছেন।

[১৪. ‘মওকূফ’ হচ্ছে সেই হাদীস যার সুত্র (সনদ) সাহাবী পর্যন্ত পৌছেছে। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহর (সা) সুত্র উল্লেখ ছাড়াই সাহাবী যে বক্তব্য প্রদান করেছেন, সেটাই মওকূফ।]

যেমন, ইব্রাহীম নখয়ী সরাসরি এভাবে হাদীস বর্ণনা করেছেনঃ “রাসূলূল্লাহ (সা) মুহাকালা১৫ এবং মুযাবান১৬ করতে নিষেধ করেছেন।” তাঁর মুখ থেকে এ হাদীসটি শুনার পর তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, “এটি ছাড়া রাসূলুল্লাহর (সা) অন্য কোনো হাদীস কি আপনার মুখস্থ নেই?”

[১৫. খোশা ছাড়ানো গমের স্থলে খোশাযুক্ত গম বিক্রি কে ‘মুহাকালা’ বলে।–অনুবাদক]

[১৬. মুযাবানা হলো নিজ ক্ষেতের ফসল আনুমানিক পরিমাণ ধরে একথা বলে বিক্রি করা যে, বেশী হলে ফেরত নেব না আর কম হলে আমি গচ্চা দিব।–অনুবাদক]

তিনি বললেন, “অবশ্যই আছে। তবে, আবদুল্লাহ (ইবনে মাসউদ) বলেছেন,  “আলাকামা বলেছেন” এভাবে বলতেই আমি বেশী ভালবাসি।”

একই ভাবে ইমাম শা’বির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তাঁকে একটি হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় এবং বলা হয়, হাদীসটির সনদ কি রাসূলুল্লাহ (সা) পর্যন্ত যায় না? তিনি বললেনঃ আমার দৃষ্টিতে সুত্র রাসূলুল্লাহ (সা) পর্যন্ত পৌছানো ঠিক না। কারণ বক্তব্যের মধ্যে যদি কিছু কম বেশী থাকে, এভাবে তা রাসূলুল্লাহর প্রতি আরোপিত হবে না। বরঞ্চ যে সাহাবীর নিকট আমি শুনেছি তাঁর প্রতি ই আরোপিত হবে।

(খ) কিংবা তাঁদের বক্তব্যগুলো হলো সেইসব শরয়ী বিধান, যা তাঁরা কুরআন সুনাহ থেকে অনুসন্ধান করে বের করা। বা নিজেরা ইজতেহাদ করে বের করেছেন। এই মনীষীদের গবেষণা ও ইজতিহাদ সম্পর্কে একথা মনে রাখা দরকার যে, তাঁরা তাঁদের পরবর্তী লোকদের তুলনায় অনেক উন্নত কর্মপন্থা এবং বিশুদ্ধতম চিন্তা ও মতামতের অধিকারী ছিলেন। তাছাড়া, পরবর্তী লোজদের তুলনায় তাঁরা রাসূলুল্লাহর (সা) অধিকতর কাছাকাছি সময়ের এবং অধিক ইলমের অধিকারী ছিলেন। সুতরাং তাঁদের বক্তব্য অনুসরনীয় এবং অনুবর্তনীয়। তবে, সে অবস্থাতে তাঁদের বক্তব্য এর উপর আমল করার ক্ষেত্রে জটিলতা ও বাধা রয়েছে, যখন কোনো বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য রাসূলুল্লাহর হাদীসে সাথে সাংঘর্ষিক বলে প্রমাণিত হয়েছে।

(৩)  তাবে’তাবেয়ী ইমামগণের কর্মনীতিতে তৃতীয় যে সামঞ্জস্যটি পাওয়া যায়, তাহলো এই যে, কোনো বিষয় যদি তাঁরা পরস্পরবিরোধী হাদীসে সন্ধান পেতেন, তবে সে বিষয়ে শরয়ী বিধান অবগত হবার জন্যে সাহাবায়ে কিরামের (রা) বক্তব্যের প্রতি প্রত্যাবর্তন করতেন, সাহাবীগণ যদি পরস্পরবিরোধী হাদীসগুলোর কোনটি মানসূখ বা তা’বীলযোগ্য বলে উল্লেখ করে থাকেন কিংবা বিলুপ্তি বা তাব্দীলের কোনো ব্যাখ্যাদান ছাড়াই তা পরিত্যাগ করার ব্যাপারে একমত হয়ে থাকেন, যার অর্থ মূলত হাদীসটিকে জয়ীফ, মানসূখ কিংবা তাবীলযোগ্য বলে ঘোষণা করা —এই সকল অবস্থাতেই তাঁরা সাহাবীগণের অনুসরণ করতেন। অর্থাৎ ঐ হাদীসটিকে তাঁরা ততটুকুও মর্যাদা ও গুরুত্ব দান করতেন। যতটুকু মর্যাদা দান করেছেন স্বয়ং সাহাবা কিরামগণ। এর উদাহরণ হচ্ছে কুকুরের ঝুটা বরতনের বিধান প্রসংগের হাদীস১৭ সম্পর্কে ইমাম মালিক (রহ) এর বক্তব্য। হাদীসটি সম্পর্কে তিনি বলেন, “এটিতো হাদীস হিসেবে বর্ণিত আছে। তবে এর হাকীকত বা তাৎপর্য আমি বুঝতে অক্ষম।”১৮

[১৭. হাদীসটি হলোঃ কোনো পাত্রে কুকুর মুখ ঢুকালে তা সাতবার ধুইয়ে নাও অতঃপর একবার মাটি দিয়ে ঘষে মেজে পরিস্কার করে নাও।–অনুবাদক]

[১৮. ইবনে হাজিব এ ঘটনা তাঁর ‘মুখতাসারুল উসূল’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।–অনুবাদক]

অর্থাৎ অতীত ফকীহগণকে (সাহাবীগণকে) আমি এর উপর আমল করতে দেখিনি।

(৪) তাঁরা যখন কোনো বিষয়ে সাহাবী এবং তাবেয়ীদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে বলে দেখতে পেতেন, তখন তাঁদের প্রত্যেক আলিমই নিজ নিজ শহরের সাহাবী ও তাবেয়ী এবং নিজ নিজ উস্তাদের মত অনুসরন করতেন। কেননা তিনি তাঁদের বক্তব্যের মজবুতি ও দুর্বলতা সম্পর্কে অধিকতর ওয়াকিফহাল ছিলেন এবং তাঁদের বক্তব্য অ রায় যেসব মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো, সেগুলোর তাৎপর্য সম্পর্কেও তিনি অধিক জ্ঞাত ছিলেন। তাছাড়া তাঁদের মর্যাদা, কামালিয়াত ও সমুদ্রসম জ্ঞানের প্রতিও ছিলেন তিনি আকৃষ্ট।(সুতরাং এমনটি করা তাঁদের প্রত্যেকের জন্যেই ছিলো এক স্বাভাবিক ব্যাপার।) এর ফলে মদীনাবাসীদের নিকট উমার, উসমান, ইবনে উমার, আয়িশা, ইবনে আব্বাস, যায়িদ ইবনে সাবিত (রা) প্রমুখ শ্রেষ্ট সাহাবী এবং তাঁদের সেরা ছাত্র সায়ীদ (রহ) ইবনে মুসাইয়্যেব (রহ) (যিনি হযরত উমারের (রা) ফায়সালা এবং আবু হুরাইরা (রা) বর্ণিত হাদীস সমূহের সর্বাধিক হাফিয ছিলেন), উরওয়া, সালিম, আতা, কাসিম, ইকরামা১৯

[১৯. ইকরামার নাম এখানে উল্লেখ হলে ও তাঁকে এই উদাহরণের অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। কারণ তিনি ছিলেন মক্কার অধীবাসী।–অনুবাদক]

উবাইদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ যুহরী, ইয়াহইয়া ইবনে সায়ীদ, যায়িদ ইবনে আসলাম, ও রবীয়া (রহ) প্রমুখের মতামত ও চিন্তাধারা অন্য সকলের তুলনায় অধিকতর গ্রহণযোগ্য ছিলো। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনার বিরাট মর্যাদা ও গুরুত্বের কথা বলে গেছেন২০ এবং মদীনা সবসময়ই ফকীহ ও আলিমদের কেন্দ্র ছিলো বলেও তারা এমনটি করে থাকতে পারেন। এ কারণেই দেখা গেছে, ইমাম মালিজ (রহ) মদিনার আলিমগণের মতামতকে আবশ্যিকভাবে গ্রহণ করতেন। ইমাম বুখারীও তাঁর গ্রন্থে একটি অধ্যায় এর নাম দিয়েছেন “মক্কা ও মদীনাবাসীদের সর্বসম্মত বিষয়কে গ্রহণ করা”।

[২০. হাদীসটি হলোঃ বিদ্বান্বেষণের জন্য লোকেরা অচিরেই মদীনার দিকে যান বাহন দৌড়াবে। আর মদীনার আলমরা হবে শ্রেষ্ঠ আলিম। —অনুবাদক]

পক্ষান্তরে কুফাবাসীদের নিকট আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) এবং তাঁর শাগরেদদের বক্তব্য হযরত আলীর (রা) রায় ও ফায়সালা,  কাযী শুরাইহ ও শা’বীর ফায়সালা এবং ইব্রাহীম নখয়ীর ফতোয়াসমূহ  অন্যদের তুলনায় অগ্রাধিকারযোগ্য ও অধিকতর অনুসরনযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে। এ কারণেই তাশরীক২১ প্রসংগে আলকামা মাসরুককে যায়িদ ইবনে সাবিতের (রা) বক্তব্যের প্রতি ঝুকতে দেখে বলেছিলেন “কোনো সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের (রা) চাইতেও অধিকতর শরীয়াহ সংক্রান্ত বুঝ-সমঝ রাখতেন কি?”

[২১. ‘তাশরীক’ মানে বর্গা চাষ বা জমির মালিক কর্তৃক ফসল ভাগাভাগি ভিত্তিতে নিজের জমি অপরকে চাষ করতে দেয়া। –অনুবাদক]

জবাবে মাসরুক বলেছিলেন, ‘রাখতেন না বটে, তবে আমি যায়িদ ইবনে সাবিতের (রা) এবং অপরাপর মদীনাবাসীকে তাশরীক করতে দেখেছি।”

মোটকথা, এভাবে এ যুগের প্রত্যেক আলিমের  নিকট তাঁর  উস্তাদ এবং নিজ শহরের শাসক, কাযী ও আলিমগণের ফায়সালা ও মতামত অগ্রাধিকারযোগ্য এবং অধিকতর অনুসরনযোগ্য ছিলো। নিজ শহরের ওলানাকে কোনো বিষয়ে একমত দেখতে পেলে সে বিষয়টিকে তো তাঁরা দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরতেন। এ ধরণের বিষয়গুলো সম্পর্কেই ইমাম মালিক বলেন, “যেসব সুন্নাতের বিষয়ে (আহলে মদীনার) কোনো মতপার্থক্য নেই, সেগুলো তো আমাদের নিকট এরূপ এরূপ।” (অর্থাৎ অবশ্য করনীয়)। কোনো বিষয়ে নিজ শহরের ফকীহগণের মধ্যে মতপার্থক্য দেখতে পেলে সে অবস্থায় তাঁরা ঐ মতটিকে গ্রহণ করতেন। আর ‘মজবুত ও অগ্রাধিকারযোগ্য’ মনে করতেন। আর ‘মজবুত ও অগ্রাধিকারযোগ্যে’ নির্ণয়ে ক্ষেত্রে তাঁরা ‘অধিকাংশের মত’ কিংবা ‘মজবুত কিয়াসের’ উপর প্রতিষ্ঠিত অথবা ‘কিতাব ও সুন্নাহর নীতিমালার সাথে অধিকতর সামঞ্জস্যশীল’ প্রভৃতি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখতেন। এ প্রসংগে ইমাম মালিকের একটি কথা উল্লেখযোগ্য। তিনি মদীনার আলিমগণের সম্পর্কে বলতেন, “তাঁদের থেকে আমি যা শুনতে পেয়েছি তা কতোইনা উত্তম।”

নিজ শহরের সাহাবী, তাবেয়ী এবং আলিমগণের বক্তব্য ও মতামত থেকে সরাসরি যদি টাঁরা কোনো মাসআলার জবাব না পেতেন, তখন তাঁরা তাঁদের বক্তব্য ও মতামতের আলোকে গবেষনা করে তাঁদের বক্তব্য ও মতামতের উদ্দেশ্য অনুশন্ধান করে সিদ্ধান্তে পৌছুতেন।

এই যুগের আলিমগণের অন্তরে ফিকাহর গ্রন্থাবলী সংকলনের অনুভূতি ইলহাম করে দেয়া হয়েছিলো। তাইতো দেখা যায়, মদীনায় ইমাম মালিক এবং মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান ইবনে আবিযিব মক্কায় ইবনে জুরাইজ এবং ইবনে উয়াইনা, কুফায় সওরী এবং বসরায় রুবাই ইবনে সুবাইহ পৃথক পৃথকভাবে ফিকাহ গ্রন্থ সংকলন করেন। সংকলনকালে এরা সকলেই সেই নীতি পদ্ধতি অনুসরন করেন যার প্রতি আমি এতক্ষণ আলোকপাত করলাম।

 

৫. প্রসিদ্ধ ফিকহী মাযহাবসমূহ

(১)  ইমাম মালিক ও মালিকী মাযহাব

খলীফা মনসুর হজ্জ উপলক্ষে মক্কায় এলে ইমাম মালিককে বললেন, “আমি আপনার গ্রন্থের কপি করিয়ে সেগুলো মুসলমানদের সকল শহরে পাঠিয়ে দিয়ে তাদেরকে এ নির্দেশ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, এখন থেকে এ কিতাবগুলোরই অনুসরন করতে হবে এবং এগুলো ত্যাগ করে অন্য কোনো মতের অনুসরণ করা যাবে না।” জবাবে ইমাম মালিক বললেন, “আমীরুল মুমিনীন, এমনটি করবে না। কারণ, বিভিন্ন লোকের নিকট বিভিন্ন মত পৌছেছে, বিভিন্ন ধরনের হাদয়স তারা শুনেছে এবং বিভিন্ন রকম বর্ণনা তাদের নিকট বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং যে লোকেরা যে ধরণের হাদীস ও মতামত শুনেছে, তারা সবাই তারই উপর আমল করে আসছে। এভাবে লোকদের মধ্যে ভিন্ন মতের অনুসারী রয়েছে লোক রয়েছে। তাই লোকদের তাদের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিন। যে শহরের লোকেরা যে মত (মসলক)-এর অনুসরণ করেছে, তাদেরই তাই অনুসরণ করতে দিন।”

কেউ কেউ এ ঘটনাটি খলিফা হারুনুর রশীদের সাথে সম্পৃক্ত বলে উল্লেখ করেছেন এবং এভাবে বর্ণনা করেছেন যে, হারূনুর রশিদ ইমাম মালিকের নিকট পরামর্শ চেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনারা মুয়াত্তা খানায়ে কা’বায় উৎকীর্ণ করে দিয়ে লোকদের সকল মতপার্থক্য ত্যাগ করে এর অনুসরন করতে বাধ্য করলে কেমন হয়?” জবাবে ইমাম মালিক বললেন, “এমনটি করবেন না। রাসূলুল্লাহর (সা) এর সাহাবীদের মধ্যেই বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য ছিলো। অতপর তারা বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ার ফলে বিভিন্ন মতপার্থক্যের সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং বর্তমানে লোকদের মধ্যে যে মতপার্থক্যের সৃষ্টি হয়েছে, তা সাহাবায়ে কিরামের (রা) থেকেই চলে আসছে।” তার বক্তব্য শুনে হারুনুর রশীদ বললেন, “আবু আবদুল্লাহ! আল্লাহতায়ালা আপনাকে দ্বীন সম্পর্কে আরো অধিকতর বিজ্ঞতা দান করুক।” এ ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন ইমাম সুয়ুতী।

মদীনাবাসীরা রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে যেসব হাদীস বর্ণনা করেছেন, ইমাম মালিক ছিলেন সেসব হাদীসের শ্রেষ্ঠতম আলিম। তাঁর বর্ণিত হাদিসমূহ সনদ্গত দিক থেকে সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য। তাছারা হযরত উমারের (রা) ফায়সালাসমূহ এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার, আয়িশা সিদ্দিকা (রা) ও  তাদের ছাত্র সপ্ত ফকীহর২২ বক্তব্য ও মতামত সম্পর্কে তাঁর চাইতে বড় আলিম আর কেউ ছিলো না।

[২২. এই সাতজন ফকীহ হলেনঃ (১) সায়ীদ ইবনে মুসাইয়্যেব (২) উরোয়া ইবনে যুবায়ের (৩) কাসিম ইবনে মিহাম্মদ ইবনে আবু বকর (৪)আবু বকর ইবনে আবদুর রাহমান মাখযুমী (৫) খারিজা ইবনে যায়িদ ইবনে সাবিত (৬) উবাইদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ মাসউদী (৭) সুলাইমান ইবনে ইয়াসার হিলালী।–অনুবাদক]

এই মহান আলিম এবং তাঁর মতো অন্যান্য শ্রেষ্ঠ আলিমদের হাতেই ইলমে রাওয়ায়াত ও ইলমে ইফতা’র ভিত্তি স্থাপিত হয়। ইলম ও ইরশাদের সনদরূপে প্রতিষ্ঠিত হবার পর হাদিস বর্ণনা, ফতোয়া দান, ইজতিহাদ, ও জ্ঞান বিতরণের ক্ষেত্রে ইমাম মালিক যে বিরাট অবদান রেখেছে তা দ্বারা নবী করীমের (সা) সেই ভবিষ্যতবাণিই সত্যে পরিণত হয়েছে, যাতে তিনি বলেছিলেন, “অচিরেই লোকেরা উটে আরোহণ করে ইলম হাসিলের জন্য ছুটোছুটি করবে। কিন্তু মদীনার আলিমদের চাইতে বড় কোনো আলিম তারা পাবেনা।” ইবনে ইয়াইনা ও আবদুর রাজ্জাকের মতো সেরা চিন্তা বিদের মতে রাসূলুল্লাহ (সা) এর এই ভবিষ্যতবাণী ইমাম মালিকের মাধ্যমে সত্যে পরীণত  হয়েছে, তাঁর মৃত্যুর  পর তাঁর ছাত্ররা তাঁর বর্ণিত সকল হাদীস ও মতামত সংগ্রহ করেন। তাঁরা এগুলোর সম্পাদনা করেন এবং ব্যাখ্যা প্রদান করেন। এগুলোর মূলনীতি ও দলিল-আদিল্লা নিয়ে গবেষনা করেন এবং এর ই ভিত্তিতে তাঁরা আরো অধিক মাসালা-মাসায়েল উদ্ভাবন করেন। এসব পাথেয় সাথে নিয়ে তাঁরা মরক্কো ও পৃথিবীর অন্যান্য দিকে ছড়িয়ে পড়েন। এদের মাধ্যমে আল্লাহ তা’ইয়ালা উপকৃত করেন তাঁর অসংখ্য সৃষ্টিকে। ইমাম মালিকের মাযহাবের এই হচ্ছে মূলকথা। তুমি যদি আমার বক্তব্যের সত্যতা জানতে চাও, তবে মুআত্তায়ে মালিক পড়ে দেখো। এখানে আমরা যা কিছু বলেছি গ্রন্থটিতে তার সত্যতা খুঁজে পাবে।

(২) ইমাম আবু হানীফা ও হানাফী মাযহাব

ইমাম আবু হানীফা কঠোরভাবে ইব্রাহীম নখয়ী ও ইব্রাহীম নখয়ীর স্বখেয়ালের উলামায়ে তাবেয়ীনের মসলক অনুসরণ করেন। কদাচিতই তিঁনি তাঁদের অনুসরণ থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। এই মসলকের ভিত্তিতে পূর্ণ দক্ষতার সাথে মাসায়েল বের করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন বিরাট মর্যাদার অধিকারী। মাসায়েল তাখ্রীজের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন  অত্যন্ত বাস্তবধর্মী ও যুক্তিবাদী। তাঁর পুরো দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিলো ক্ষুদ্র ও খুঁটিনাটি বিষয়গুলোর প্রতি, তুমি যদি তাঁর সম্পর্কে আমার মন্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে চাও তবে ইমাম মুহাম্মদের ‘কিতাবুল আছার’ আবদুর রাজ্জাকের ‘জামে’ এবং আবু বকর ইবনে শাইবার ‘মুসান্নেফ’ গ্রন্থ থেকে ইব্রাহীম নখয়ীর বক্তব্যগুলো বেছে বেছে বের করে নাও। অতঃপর আবু হানীফার মাযহাবের সাথে সেগুলো মিলিয়ে দেখো। তুমি দেখতে পাবে, দুয়েকটি জায়গায় ছাড়া লোথাও তাঁর কদম ইব্রাহীম নখয়ীর ব্যাখ্যা-বিশ্লেশণ ও মসলক থেকে বিচ্যুত হয়নি। আর সেই ব্যাতিক্রম দুয়েকটি জায়গায়ও আবু হানীফা নিজের পক্ষ থেকে অভিনব কোনো পন্থা অবলম্বন করেননি। বরঞ্চ কুফারই অন্য কোন না কোনো ফকীহর অনুসরণ করেছেন।

আবু হানীফার ছাত্রদের মধ্যে সর্বাধিক মশহুর ছিকেন আবু ইউসুফ, হারুনুর রশীদের শাসনকালে ইনি প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হন। তাঁর এই পদে নিয়োগ লাভের ফলে হানাফী মাযহাব রাষ্ট্রীয় ভাবে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ইরাক, খোরাসান এবং তুরান সর্বত্রই এ মাযহাব রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর হয়।

তাঁর অপর ছাত্র মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান গ্রন্থ রচনা, সম্পাদনা ও সংকলনের দিক থেকে অন্য সকলের তুলনায় অগ্রগণ্য ছিলেন। দারস ও তাদরীসের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অনন্য। প্রথমত তিনি আবু হানীফা এবং আবু ইউসুফের নিকট থেকে ‘মুআত্তা’ শিক্ষা লাভ করেন। অতঃপর নিহেই চিন্তা গবেষণার কাজ শুরু করেন। স্বীয় উস্তাদ আবু হানীফা ও আবু ইউসুফের প্রত্যেকটি মাসআলা মুআত্তার আলোকে পর্যালোচনা করেন। আর যেগুলোতে উভয়ের মিল খুঁজে পেয়েছেন, সেগুলো তো আনন্দচিত্তেই গ্রহন করেছেন।  আর যেগুলোর ব্যাপারে উভয়ের মধ্যে মতপার্থক্য খুঁজে পেয়েছেন, সেগুলোর ব্যাপারে পুনরায় পর্যালোচনা করেছেন। তন্মধ্যে যেটিকে কোনো সাহাবী বা তাবেয়ীর মতের অনুরূপ পেয়েছেন, সেটির ব্যাপারে ও হানাফী মাযহাব কেই গ্রহন করেছেন। আর যেটিকে দুর্বল কিয়াস ও দুর্বল ইস্তেম্বাতের উপরে প্রতিষ্ঠিত পেয়েছেন এবং ফকীহদের অনুসৃত শীহ হাদীস ও অধিকাংশ আলেমের মতের বিপরীত পেয়েছেন সেটির ব্যাপারে নিজের মাযহাব ত্যাগ করে অর্থাৎ আবু হানীফার ও আবু ইউসুফের সাথে একমত না হয়ে সাহাবী কিংবা তাবেয়ীদের মধ্যে থেকে এম;ন কারো মত গ্রহন করেছেন, যার মতটি তার কাছে সর্বাধিক যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে।

আবু হানীফার এ দু’জন ছাত্র তাঁরই মতো যথাসম্ভব ইব্রাহীম নখয়ীর মাযহাবের অনুসরণ করেছেন। তবে দু’টি অবস্থায় কখনো কখনো উস্তাদের (আবু হানীফা) সাথে তাদের মতপার্থক্য হয়েছেঃ

১. কখনো এমন হতো যে, আবু হানীফা ইব্রাহীম নখয়ীর মাযহাবের ভিত্তিতে কোনো মাসয়ালা বের করেছেন, কিন্তু আবু ইউসুফ এবং মুহাম্মাদ এই তাখরীজকে গ্রহণ করেননি।

২.  কখনো এমন হতো যে, কোনো একটি মাসয়ালার ব্যাপারে ইব্রাহীম নখয়ীসহ কুফার অন্যান্য ফকীহদের মধ্যে মতপার্থক্য পাওয়া যেতো। যেখানে কোনো একটি মতকে অগ্রাধিকার দেবার প্রশ্ন দেখা দিতো। এমতাবস্থায় অনেক সময় তাঁদের মত আবু হানীফার মতের অনুরূপ হতো না।

আগেই বলেছি ইমাম মুহাম্মাদ গ্রন্থ রচনা ও সংকলনের প্রতি দৃষ্টিবান ছিলেন। তিনি এই তিন জনের২৩

[২৩. অর্থাৎ ইব্রাহীম নখয়ী, আবু হানীফা ও আবু ইউসুফ (রাহিমাহুমুল্লাহ)]

রায়সমূহ সংকলন করে ফেলেন, যার ফলে উপকৃত হতে থাকে অসংখ্য মানুষ। পরবর্তী সময়ে হানাফী আলিমগণ অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে তাঁর গ্রন্থাবলীর প্রতি দৃষ্টি প্রদান করে থাকেন। তাঁরা এগুলোর সার নির্যাস বের করেন, সম্পাদিত করেন, তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন এবং সহজে বুঝাবার উপযোগী করে তুলেন। সেগুলোর ভিত্তিতে আরো অনেক মাসায়েল ইস্তেম্বাত করেন এবং দলিল-আদিল্লা যুক্ত করে সেগুলোকে মজবুত করেন। অতঃপর তারা এসব গ্রন্থাবলী সাথে নিয়ে সমুদ্র পেরিয়ে প্রাচ্যের দিকে ছড়িয়ে পড়েন আর সেসব গ্রন্থের সকল মাসায়েল আবু হানীফার মাযহাব বলে গণ্য হতে থাকে।

এভাবে আবু ইউসুফ এবং মুহাম্মাদের মাযহাবও আবু হানিফার (রহ) মাযহাব বলেই গণ্য হতে থাকে। তিনজনকে একই মাযহাবের সাথে একাকার করে ফেলা হয়। অথচ এঁরা দুইজনে ছিলেন স্বাধীন মুজতাহিদ। আবু হানীফার সাথে মূলনীতি ও খুঁটিনাটি বিষয় তাদের মতপার্থক্য মোটেও কম ছিলো না। তাদেরকে একই মাযহাবের বলে গণ্য করার কারণ এই ছিলো যে,

১. একটি ব্যাপারে তাদের তিনজনের মাধ্যেই মিল অর্থাৎ তারা তিজনই একজনের (ইব্রাহীম নখয়ী) মাযহাবের অনুসারী।

২. দ্বিতীয়ত ‘মাসবুত’ এবং ‘জামেউল কবীর’ গ্রন্থে তাঁদের তিনজনের মাযহাবই একত্রে সংকলিত হয়েছে।

(৩)  ইমাম শাফেয়ী এবং শাফেয়ী মাযহাব

উপরোক্ত দু’টি মাযহাবের (মালিকী ও হানাফী) প্রসিধি এবং মূলনীট ও খুঁটিনাটি বিষয়সমূহ সংকলনের সূচনাকালেই শাফেয়ীর আবির্ভাব ঘটে। তিনি গভীরভাবে পূর্ববর্তীদের চিন্তা ও গবেষণা সমূহ পর্যালোচনা করতেন। তাঁদের ইস্তেম্বাত ও ইস্তেখরাজের পদ্ধতি তিনি বিশ্লেষণ করেন। এতে কিছু বিষয়ে তাঁর মনে খটকার সৃষ্টি হয়। তাঁর রচিত আমর গ্রন্থ ‘কিতাবুল উম্মে’র প্রথমদিকের এ বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন। এখানে সংক্ষেপে সেগুলো উল্লেখ করছিঃ

ক. তিনি দেখলেন, তাঁরা (মদীনা ও কুফার ফকীহগণ অর্থাৎ মালিকী ও হানাফীহণ) ‘মুরসাল ও মুনকাতি’ হাদীসও গ্রহণ করেছেন।২৪

[২৪. মুরসাল হচ্ছে ঐ হাদিস যা কোনো তাবেয়ী মধ্যবর্তী বর্ণনাকারী সাহাবীর নাম উল্লেখ করা ছাড়াই সরাসরি রাসুলুল্লাহর সুত্রে বর্ণনা করেছেন। আর মুনকাতি হলো সে হাদীস, যার বর্ণনাকারী দের (সনদের) ধারাবাহিকতা ভিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।–অনুবাদক]    এর ফলে তাদের মধ্যে ক্রুটি প্রবেশ করেছে। হাদীস বত্তণনার সবগুলো পন্থা কমা করলে দেখা যায় বহু মুরসাল হাদীসে কোনোভিত্তি এই। বহু মুরসাল হাদীস মুসনাদ হাদীসে সাথে সাংঘর্ষিক। এ কারণে ইমাম শাফেয়ী কতগুলো শর্ত পূর্ণ হবার পূর্ব পর্যন্ত মুরসাল হাদীস গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেন। শর্তগুলো উসূলের গ্রন্থাবলীতে উল্লেখ রয়েছে।

খ.  তিনি দেখলেন, তাঁরা ইখতিলাফপূর্ণ প্রমাণসমূহের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের জন্যে কোনো নির্দিষ্ট বিধি অনুসরণ করেননি। যা অনুসরণ করলে তাঁদের ইজতিহাদসমূহ ভ্রান্তি থেকে সুরক্ষিত (মাহফুয) হতো। সুতরাং শাফেয়ী এ বিষয়ে মূলনীতি ও বিধি বির্ধারণ করে গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর এ গ্রন্থই উসূলে ফিকাহর পয়লা গ্রন্থ।

পূর্ববর্তীদের সম্পর্কে তাঁর এই দ্বিতীয় উদাহরণ হিসেবে একটি ঘটনা উল্লেখ করে গেলোঃ একদিন ইমাম শাফেয়ী ইমাম মুহাম্মাদের কাছে এলেন। দেখলেন, তিনি বক্তব্য রাখছেন এবং বক্তব্যে এই বলে মদীনার ফকীহদের অভিযুক্ত করছেন “তারা মকদ্দমার ফায়সালার জন্যে দু’জন সাক্ষীর সাক্ষ্য জরুরী মনে করেনা, বরঞ্চ একজনের সাক্ষ্য এবং সেইসাথে বাদীর শপথের ভিত্তিতে ফায়সালা (রায়) দিয়ে দেয়। অথচ এটা আল্লাহর কিতাবের সাথে মানুষের মতের সংযোজন।”   তাঁর বক্তব্য শুনে শাফেয়ী বললেন, “খবরে ওয়াহিদ২৫ দ্বারা কিতাবুল্লাহর উপর কিছু সংযোজন করা বৈধ নয়, এটা কি আপনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত?”  তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ।”

[২৫. খবরে ওয়াহিদ হলো সে হাদীস যার বর্ণনাকারীর সংখ্যা সকল যুগেই তিনজন, দুইজন কিংবা একজন ছিলো। —অনুবাদক]

এবার শাফেয়ী বললেন, “তবে আলা লা অসীয়্যাতা লোয়ারিছিন”—সাবধান, ওয়ারিশের জন্যে অসীয়াত করা যাবে না২৬

[২৬. বুখারী, নাসায়ী, মুসনাদে আহমদ প্রভৃতি গ্রন্থে হাদীসটি উল্লেখ হয়েছে। ইমাম শাফেয়ীর বক্তব্য হলো হাদীসটি খবরে ওয়াহিদ শ্রেণীভূক্ত।—অনুবাদক]

—হাদীসটির ভিত্তিতে ওয়ারিশের জন্যে অসীয়ত করা যাবে না বলে আপনি কমন করে মত দিয়েছেন? অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেছেনঃ (

كُتِبَ عَلَيْكُمْ إِذَا حَضَرَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ إِن تَرَكَ خَيْرًا الْوَصِيَّةُ لِلْوَالِدَيْنِ وَالأقْرَبِينَ بِالْمَعْرُوفِ حَقًّا عَلَى الْمُتَّقِينَ

 কুতিবা আলাইকুম ইযা হাদারা আহাদাকুমুল মাউতু ইন তারাকা খাইরানিল অসিয়্যাতু লিল ওয়ালিদাইনি ওয়াল আকরাবীনা বিল মা’রুফ )—তোমাদের কারো মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে সে যদি ধন-সম্পদ রেখে যেতে থাকে তাহলে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী তার পিতামাতা এবং নিকটাত্নীয়দের জন্যে অসীয়াত করাকে তোমাদের উপর ফরয করে দেয়া হলো।২৭

 [২৭. দেখুন, সূরা আল বাকারা-১৮০। –অনুবাদক]

এটা কি খবরে ওয়াহিদ দ্বারা কুরআনের উপর সংযোজন নয়? এভাবে শাফেয়ী মুহাম্মাদের আরো কয়েকটি অভিযোগ উত্থাপন করলেন। এর ফলে মুহাম্মাদ চুপ হয়ে যান।

গ. তিনি দেখলেন, উলামায়ে তাবেয়ীন, যাদের উপর ফতোয়া দানের দায়িত্ব ছিলো-কোনো কোনো সহীহ হাদীস তাদের নিকট পৌছেইনি। তাই, হাদীসে রাসূলে স্পষ্ট বিধান রয়েছে, এরূপ মাসায়েলও কখনো কখনো তাদের কাছে এলে হাদীস জানা না থাকার ফলে তারা সে বিষয়ে ইজতিহাদ করেছেন, কিংবা সাধারণ ধারণামতে ফতোয়া দিয়েছেন অথবা কোনো সাহাবীর কর্মনীতিকে অবলম্বন করে সে অনুযায়ী ফতীয়া প্রদান করেছেন। অতঃপর কখনো এমন হয়েছে যে, পরবর্তীতে তৃতীয় স্তরে এসে সে সংক্রান্ত হাদীস নজরে এলো। কিন্তু তারপরও ফকীহগণ তা গ্রহণ করেননি এবং সে অনুযায়ী আমল করেননি। তাদের ধারণা ছিলোঃ এ হাদীস তো আমাদের শহরের পুর্ববর্তী আলিমগণের আমল এবং মাযহাবের বিপরীত। সুতরাং এতে কোনো না কোনো দুর্বলতা বা ক্রুটি রয়েছে, যার ফলে তা তাঁদের নিকট তা গ্রহণযোগ্য হয়নি।

আবার কখনো এমন হয়েছে যে, সে হাদীসগুলো তৃতীয় স্তরে এসে ও সকলের নজরে আসেনি। এসেছে আরো পরে যখন মুহাদ্দিসগণ পৃথিবীর দিক দিগন্তে হাদীস সংগ্রহের জন্যে ছড়িয়ে পড়েন এবং হাদীসে বিভিন্ন তরীকা ও সনদ সংগ্রহের কাজে পূর্ণ আত্মনিয়োগ করেছেন। ফলে বহু হাদীসের অবস্থা এমন হয়েছে, যেগুলোর বর্ণনাকারী সাহাবীর সংখ্যা এক বা দুইয়ের অধিক ছিলো না। তাঁদের থেকে শুনে পরবর্তীদের যারা শুনিয়েছেন তাদের সংখ্যাও এক বা দুইয়ের অধিক ছিলো না। তাঁদের থেকে শুনে পরবর্তীদের যারা শুনিয়েছেন তাদের সনহখ্যা ও এক বা দুইয়ের অধিক ছিলো না। এমনি করে পরবর্তীতেও বর্ণনাকারীদের সংখ্যা কমই থেকে যায়, এর ফলে এই দীর্ঘ সমকাল হাদীসগুলো সাধারণ ফকীহদের দৃষ্টির অগোচরেই থেকে যায়। অতঃপর হাদীসে সেইসব মহান হাফিযদের যুগে এসে সেগুলো সকলের নজরে আসে, যারা বিভিন্ন তরীকায় বিভিন্ন সূত্র ও উৎস থেকে হাদীস সংগ্রহ ও সংকলন করেন।

এই বাস্তব বিষয়গুলোর প্রেক্ষিতে ইমাম শাফেয়ীর বক্তব্য হলো, আমাদেরকে সাহাবী এবং তাবেয়ী আলিমগণের নীতি অনুসরণ করা উচিত। তাঁদের সামনে যখন কোনো মাসয়ালা আসতো, তখন প্রথমেই তাঁরা সে বিষয়র রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস অনুসন্ধান করতেন। সে সংক্রান্ত কোনো হাদীস পাওয়া না গেলে কেবল তখনই তা অন্য প্রকার দলিল ও যুক্তি গ্রহণ করেতেন। কিন্তু তারপরও তাঁরা নিজেরদের জন্যে হাদীস গ্রহণের দরজা নন্ধ করে দিতেন না। বরঞ্চ যখনই সেই সংক্রান্ত কোনো হাদীস তাঁদের অবগতিতে আসতো সাথে সাথে নিজেদের ইজতিহাদ পরিত্যাগ করে সেই হাদীসকে গ্রহণ করতেন। বাস্তব ঘটনাই যখন এই, তখন তাঁরা কোনো  হাদীসকে গ্রহণ করেননি বলেই তা দুর্বল বা ক্রুটিপূর্ণ হবার কথা স্পষ্টভাবে বলে গিয়ে থাকলে তা আলাদা কথা। এর  উদাহরন হচ্ছে হাদীসে কিল্লাতাইন।২৮ 

[২৮. কিল্লাতাইন ‘কিল্লাতুন’ এর দ্বিবচনঃ কিল্লাতুন মানে বড় মটকা যাতে পাঁচশ রতল পানি ধরে। হাদীসটি হলোঃ “ইযা কানা বালাগাল মাউ কিল্লাতাইন লাম ইয়াহমিলিল হুবূস—দুই কিল্লা পরিমাণ পানিতে নাজাসাত পড়লে তা নাপাক হয় না।“ (মুসনাদে আহমদ, আবু দাউদ, দারেমী)–অনুবাদক]

বিভিন্ন সুত্রে বর্ণিত এই হাদীসটি একটি সহীহ হাদীস। অধিকাংশ সুত্রে প্রথিম দিকের রাবীগণ হলেন। “হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ওলীদ ইবনে কাসীর, তাঁর কাছে বর্ণনা করেছেন মুহাম্মাদ ইবনে জাফর ইবনে যুবায়ের কিংবা মুহাম্মাদ ইবনে ইবাদ ইবনে জাফর, তাঁর কাছে বর্ণনা করেছেন উবাইদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ এবং তার কাছে বর্ণনা করেছেন আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা)।” পরবর্তীকালে সনদটির বিভিন্ন শাখা প্রশাখা সৃষ্টি হয়। এই দুইজন রাবীই (মুহাম্মাদ ইবনে জাফর এবং মুহাম্মাদ ইবনে ইবাদ) যদিও পুর্ণ বিশ্বস্ত কিন্তু যেহেতু তাঁরা ঐসব লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না যারা ফতোয়া দানের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। সে কারণে হাদীসটি সায়িদ অবনে মুসাইয়্যেব এবং যুহুরীর যামানায় খ্যাতি লাভ করেনি আর তা মালিকী এবং হানাফিদের দৃষ্টিতেও আসেনি। ফলে তাঁরা এর ভিত্তিতে আমল করেননি। কিন্তু শাফেয়ীর যামানায় হাদীসটি খ্যাতি লাভ করে এবং তিনি তার ভিত্তিতে আমল করেন।

এর দ্বিতীয় উদাহরণ হচ্ছে, খিয়ারে মজলিসের হাদীস।২৯

[২৯. হাদীসটি হলোঃ “ক্রয়-বিক্রয়ের অনুষ্ঠান থেকে বিচ্ছিন্ন হবার পূর্ব পর্যন্ত ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েরই ক্রয় বা বিক্রয় বাতিল করবার ইখতিয়ার থাকে।“ ইমাম মালিক মুআত্তায় হাদীসটি বর্ণনা করেছেন বটে, কিন্তু এর ভিত্তিতে আমল করেননি।—অনুবাদক]

ঘ. শাফেয়ীর যামানায় সাহাবায়ে কিরামের (রা) কওল সর্বাধিক সংগ্রথিত হয়। এসব বক্তব্য ছিলো ব্যাপক বিস্তৃত ও ইখতিলাফ পূর্ণ। তিনি এসব কওলের পর্যালোচনা বিশ্লেষণ করতেন। ফলে এর একটা বিরাট অংশ তিনি সহীহ হাদীসের বিপরীতে দেখতে পান। কারণ  এ হাদীসগুলো সকল সাহাবীর নিকট পৌছেনি। তিনি আরো দেখলেন, এরূপ অবস্থা সৃষ্টি হলে অতীতের আলিমগণ সাহাবীদের কওল ত্যাগ করে হাদীসে রুজু করতেন। সুতরাং এরূপ অবস্থায় তিনিও সাহাবীদের কওল অনুসরণ করেননি। তিনি বলতেন, সাহাবীগণও মানুষ আমরাও মানুষ।৩০

[৩০. অর্থাৎ আমাদেরই মতো তারাও বুঝের ও চিন্তার ক্ষেত্রে ক্রুটি-বিচ্যুতির উর্ধে ছিলেন না। সুতরাং নবীর বক্তব্যের মতো তাঁদের বক্তব্যও চোখ বন্ধ করে গ্রহণ করা যায় না। কুরআন সুনাহ থেকে মাসায়েল ইস্তেম্বাত করা তাঁদের জন্যে যেমন বৈধ ছিলো, আমাদের জন্যেও তেমনি বৈধ। সর্বাবস্থায় তাঁদের ইস্তেম্বাতের অনুসরণ করতে আমরা বাধ্য নই।—অনুবাদক]

ঙ. তিনি আরো দেখলেন, একদল ফকীহ ‘রায়’ এবং ‘কিয়াস’কে একাকার করে ফেলেছে। উভয়টির মধ্যে কোনো পার্থক্যই বাকী রাখছে না। অথচ শ্রীয়ত ‘রায়’কে নাজায়েজ এনং ‘কিয়াস’কে জায়েজ ও মুস্তাহসান বলে আখ্যায়িত করে। এই লোকগুলো কখনো কখনো ‘রায়কে’ ইস্তেহসান বলে থাকে। তিনি বলেন, আমি ‘রায়’ বলতে কোনো ক্রুটি কিংবা যুক্তির ধারণা বা সম্ভাবনাকে কোনো বিধানের ভিত্তি বা কারণ ধরে নেয়াকে বুঝাচ্ছি আর ‘কিয়াস’ বলতে বুঝাচ্ছি, কোনো মানসূস বিধানের কারণ খুঁজে বের করা এবং সেই কারণের ভিত্তিতে অনুরূপ অন্যান্য বিষয়েও একই বিধান স্থির করা।

শাফেয়ী ফকীহদের এই কর্মপন্থাকে সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করেন, তিনি বলেন, “যে ব্যাক্তি ইস্তেহসান বা রায়ের ভিত্তিতে কাজ করে, সে মূলত নিজেই শরীয়ত প্রণেতা হতে চায়।” তাঁর এ বক্তব্যটি ইবনে হাজিব ‘মুখতাসারুল উসূল’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

এর উদাহরণ হচ্ছে ইয়াতীমের বুঝ-জ্ঞান হবার মাসয়ালা। আসলে ইয়াতীমদের বুঝ-জ্ঞান হওয়াটা এমন একটা গোপন বিষয় যার সময়-রেখা সকলের জন্যে সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। কিন্তু কোনো কোনো ফকীহ ভাবলেন, মানুষের তো পঁচিশ বছরের মধ্যে অবশ্যি বুঝ-জ্ঞান হয়ে যায়।  সুতরাং তাঁরা পঁচিশ বছরের এ ধারণা বা সম্ভাবনাকে “বুঝ-জ্ঞান’ হওয়ার বিকল্প হিসেবে ধরে নেন। এই ধারনা তাদের কাছে বিধানে পরিণত হয়েচ যায় যে, ইয়াতীমের বয়স পঁচিশ হলে তার মাল অবশ্যি তার কাছে ফেরত দিতে হবে। তাদের মতে এটা হচ্ছে ‘ইস্তেহসান’। অথচ এ মাসয়ালায় কিয়াস হচ্ছে ইয়াতীমের মাল অতোক্ষণ পর্যন্ত তার হাতে ফেরত দেয়া যাবে না যতোক্ষণ না সে পুরোপুরি বুঝ-জ্ঞান প্রাপ্ত হয়।

মোট কথা, সাফেয়ী তাঁর পুর্ববর্তীদের মদ্যে যখন এই বিষয় গুলো দেখতে পেলেন, তখন তিনি ইলমে ফিকাহর প্রতি সম্পূর্ণ নতুনভাবে দৃষ্টি আরোপ করলেন। এবং উসূলে ফিকাহর ভিত্তি স্থাপন করেন। অতঃপর সেই উসূলের ভিত্তিতে ফিকাহর বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় ইস্তেম্বাত করেন, গ্রন্থাবলী রচনা করেন এবং মুসলিম উম্মাহকে উপকৃত করেন। সমকালীন ফকীহরা তার চারপাশে একত্রিত হয়ে যান। তাঁরা তাঁর চিন্তাধারা ও গ্রন্থাবলী অধ্যায়নে মনোনিবেশ করেন, সেগুলোর সার নির্যাস বের করেন, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেন, সেগুলো থেকে দলিল আদিল্লা গ্রহণ করেন এবং সেগুলোকে সামনে রেখে নতুন নতুন মাসায়েল ইস্তেম্বাত করেন। অতঃপর এসব জিনিস সাথে নিয়ে তাঁরা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েন। এভাবেই ফিকাহর আরেকটি স্কুল আরেকটি মাযহাব প্রতিষ্ঠা ও খ্যাতি লাভ করে, যা শাফেয়ীর মাযহাব নামে পরিচিত।৩১

[৩১. গ্রন্থকার এখানে হাম্বলী মাযহাবকে পৃথক মাযহাব হিসেবে উল্লেখ করেননি। সম্মুখে একস্থানে তিনি এর কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। —অনুবাদক]

 ৬. আহলে হাদীস

হাদীসে অনুসৃতি

জেনে রাখো, সায়ীদ ইবনে মুসাইয়্যেব, ইব্রাহীম নখয়ী এবং যুহরীর যামানায়, এরপর মালিক ও সুফিয়ান সওরীর যামানায়, এমনকি তাঁদের পরেও একদল আলিম সবসময় এমন ছিলেন, যাঁরা শরয়ী বিষয়ে চিন্তা গবেষণা করার ক্ষেত্রে ব্যাক্তিগত রায় প্রয়োগ করাকে কঠোরভাবে অপছন্দ করতেন। তাঁরা সাধারণত ফতোয়া প্রদান করতে এবং মাসয়ালা ইস্তিম্বাত করতে ভয় পেতেন। যেক্ষেত্রে ফতোয়া দান বা ইস্তেম্বাত ছাড়া বিকল্প ছিলো না কেবলমাত্র সেক্ষেত্রেই তারা ফতোয়া দিতেন এবং ইস্তিম্বাত করতেন। রাসূলুল্লাহর (রা) হাদীসের প্রতিই তাঁদের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিলো। কোনো বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হলে সে সংক্রান্ত হাদীস বর্ণনা করে দেয়াকেই তাঁরা শ্রেষ্ঠ পন্থা মনে করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদকে কোনো মাসয়ালা জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলতেন, ‘আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক হারামকৃত কোনো জিনিসকে তোমার জন্যে হালাল করাকে এবং আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক হালালকৃত কোনো জিনিসকে তোমার জন্যে হারাম করাকে আমি সাংঘাতিক অপছন্দ করি।‘৩২

[৩২. মানে কোনো জিনিস বৈধ কি অবৈধ কুরআন-হাদীসী মাধমে তা যতোক্ষণ না জানা যাবে, ততোক্ষণ কেবল নিজ রায়ের ভিত্তিতে সেটাকে বৈধ বা অবৈধ বলা যেতে পারেনা। কারণ এতে করে হারাককে হালাল এবং হালালকে হারাম বলে ফেলার আশংকা থেকে যায়। —অনুবাদক]

মুওয়াজ ইবনে জাবাল বলেছেন, “বিপদ আসার আগে বিপদের জন্যে ব্যাস্ত হয়ে পড়ো না।৩৩ কারণ প্রত্যেক যুগেই এমন মুসলিম মওজুদ থাকবে, যারা সমকালীন মাসায়েলের সঠিক জবাব দিতে সক্ষম হবে।”

[৩৩. অর্থাৎ সমস্যা সৃষ্টি হবার আগের সে সম্পর্কে মাসয়ালা জিজ্ঞেস করোনা। —অনুবাদক]

হযরত উমার (রা), হযরত আলী (রা), ইবনে আব্বাস (রা), এবং ইবনে মাসউদ ও একইভাবে সমস্যা সৃষ্টি হবার পূর্বেই সে সম্পর্কে ফতোয়া চাওয়াকে মাকরুহ মনে করতেন।

ইবুনে উমার (রা) জাবির ইবনে ইয়াযিদকে বলেছিলেন, “তুমি বসরার ফকীহদের অন্যতম। সাবধান, যখনই কোনো ফতোয়া দেবে, তা দেবে স্পষ্টভাষী কুরআন কিংবা প্রতিষ্ঠিত সুন্নাত দ্বারা। এর খেলাফ করলে তুমি নিজেও ধ্বংস হবে, অন্যদেরকেও ধ্বংস করবে।”

আবু নদর বলেছেনঃ হযরত আবু সালামা যখন বসরায় তাশরীফ এনেছিলেন, তখন আমি এবং হাসান বসরী তাঁর সম্মুখে হাজির হই। তিনি হাসান বসরীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আপনিই কি হাসান বসরী? বসরায় আপনার সাক্ষাত পাবার জন্যে আমি সবচাইতে উদগ্রীব ছিলাম। এর কারণ হলো, আমি শুনতে পেয়েছি, আপনি নাকি স্বীয় ‘রায়’ দ্বারা ফতোয়া দিয়ে থাকেন। এমনটি করবেন না। ফতোয়া কেবল রাসূলুল্লাহর (সা)  সুন্নাহ কিংবা আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব দ্বারা দেবেন।”

ইবনুল মুনকাদির  বলেছেন, “আলিম ব্যাক্তি আল্লাহ এবং তাঁর বান্দাদের মাঝখানে অবস্থান করে। সুতরাং এ নাজুক অবস্থা থকে নিরাপদে বেরুবার পথ অন্বেষণ করা তার উচিত।”

শা’বীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, “আপনাদের কাছে লোকেরা ফতোয়া চাইলে আপনারা কি করতেন?” জবাবে তিনি বলেন, “খুবই বিজ্ঞতাপূর্ণ প্রশ্ন! আমাদের কারো নিকট ফতোয়া চাওয়া হলে সাথীদের কাউকে বলতামঃ ফতোয়াটা দিয়ে দিন। তিনি আবার দায়িত্বটা অপর কারো কাছে হস্তান্তর করতেন। এভাবে দায়িত্ব পরিবর্তন হতে হতে পুনরায় সেই প্রথম ব্যাক্তির ঘাড়েই এসে দায়িত্ব চাপতো।” ইমাম শা’বীর আরেকটি কথা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিই বলেছেন, “ফতোয়াদানকারী রাসূলুল্লাহর (সা) পক্ষ থেকে তোমাকে যা কিছু শুনাবে তা-ই গ্রহণ করবে কিন্তু স্বীয় রায় দ্বারা যদি কিছু বলে, তবে তা শুনবে না পায়খানায় নিক্ষেপ করবে।”৩৪

[৩৪. এইসব ঘটনা দারেমীর সুত্রে উদ্ধৃত হলো। —অনুবাদক]

হাদীস সংকলনের যুগ

এইসব কারণ ও অবস্থার প্রেক্ষিতে ইসলামী সাম্রাজ্যে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস এবং সাহাবায়ে কিরামের (রা) আছার সংগ্রহ ও সংকলনের কাজ ব্যাপকতা লাভ করে। এমনকি হাদীস বর্ণনাকারীদের মধ্যে সম্ভবত এমন লোক খুব কমই ছিলেন, যার নিকট কমপক্ষে হাদীসের একটি সংকলন, পুস্তিকা কিংবা গ্রন্থ ছিলনা। এ যুগের সেরা মুহাদ্দীসগণ হিজাজ, সিরিয়া, মিসর, ইয়েমেন, খোরাসান প্রভৃতি দেশ সগর করেন। তাঁরা তৎকালীন গোটা মুসলিম বিস্বের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে লোকদের কাছ থেকে তাদের সংগৃহীত হাদীসের কিতাব, সংকলন ও পুস্তিকাসমূহ সংগ্রহ করেন। তাঁরা এর কষ্ট সাধ্য কাজ এতোটা নিখুঁতভাবে করেছেন যে গরীব হাদীস৩৫ এবং দুর্বল আছারসমূহ পর্যন্ত খুঁজে বের করেছেন।

[৩৫. গরীব হাদীস হচ্ছে সেইসব হাদীস, যা কেবল মাত্র একজন মাত্র রাবী বর্ণনা করেছেন।  —অনুবাদক]

এমনি করে এই লোকদের প্রচেষ্ঠায় হাদীস ও আছারের এতোটা বিরাট ভান্ডার সংগৃহীত হয়ে যায়, যতোটা ইতিপূর্বের সকল যুগ মিলিয়েও সম্ভব হয়নি। এভাবে একত্রে সকল বিষয়ের হাদীস ও আছার জানা এই সময়ের লোকদের জন্যে যতোটা সহজ হয়ে যায়, তা তাদের পূর্বেকার লোকদের জন্যে ততোটা সহজ ছিলনা। এদের কাছে এককটি হাদীস বিভিন্ন সুত্রে (সনদ) এসে পৌছেছে। এমনকি কোনো কোনো হাদীসের সনদ সংখ্যা একশতের বেশী, এমন হাদীসও পাওয়া গেছে। একেকটি হাদীস বহু সনদের মাধ্যেমে পাওয়া যাবার ফলে অনেক উপকার হয়েছে।

যেমনঃ

১. কোনো সনদে একটি হাদীসে কিছু অংশ ছার পড়ে গিয়ে থাকলে অন্য সনদে তা বর্ণিত হয়ে প্রকাশ হয়েছে।

২.  গরীব ও মশহুর৩৬ হাদীস চিহ্নিত করা সহজ হয়েছে।

[৩৬. মশহুর হাদীস সেই সকল হাদীসকে বলা হয়, যে হাদীস সাহাবী এবং তাবেয়ীদের যুগে খুব বেশী প্রচার লাভ না করলেও পরবর্তীকালে কোনো বিশেষ কারণে প্রসিদ্ধি  লাভ করে। —অনুবাদক]

৩. এর ফলে এ সময়কার আলিমদের জন্যে হাদীসে ‘শাহিদ’ এবং ‘মুতাবি’৩৭ সম্পর্কে চিন্তা গবেষণা করা সম্ভব হয়েছে।

[৩৭. ‘শাহিদ’ মানে সাক্ষী বা সমর্থক। ঐ হাদীসগুলো একটি আরেকটির শাহিদ যেগুলোর বিষয়বস্তু একতিই কিন্তু বিভিন্ন রাবী বিভিন্ন সাহাবী থেকে বর্ণনা করেছেন।

‘মুতাবি’ মানে অধীন বা অনুসারী। ঐ হাদীসগুলো একটি আরেকটির ‘মুতাবি’ যেগুলোর বিষয়বস্তু এক এবং একজন মাত্র সাহাবী থেকে বিভিন্ন রাবী সুত্র এ বর্ণিত হয়ে এসেছে। —অনুবাদক]

৪. এর ফলে এ সময়কার আলিমদের নিকট এমনসব সহীহ হাদীস প্রকাশিত হয়ে পড়ে, যেগুলো তাঁদের পূর্বেকার ফতোয়া দানকারীদের জানাই ছিলো না। ইমাম শাফেয়ী ইমাম আহমদকে বলেছিলেনঃ আপনারা সহীহ হাদীস সম্পর্কে আমাদের অধিকতর জ্ঞান রাখেন। আপনার জানা যে কোনো সহীহ হাদীস সম্পর্কে আমাকে অবগত করবেন, চাই সে হাদীস কুফার লোকদের বর্ণিত হোক কিংবা বসরার লোকদের বর্ণিত হোক কিংবা হোক সিরিয়ার লোকদের বর্ণিত।৩৮

[৩৮. ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন ইবনুল হুমাম। —অনুবাদক]

অনেকগুলো হাদীস যে কিছুলোক জানতেন আবার কিছুলোক জানতেন না, তার কয়েকটি কারন ছিলো। সেগুলো হলোঃ

১. অনেক হাদীস এমন ছিলো, যেগুলোর বর্ণনাকারীরা কেবল কোনো একটি বিশেষ স্থানের অধিবাসী ছিলেন। যেমন, সেসব হাদীস যেগুলো শুধু সিরিয়া কিংবা ইরাকের লোকেরা বর্ণনা করেছে।

২. অনেকগুলো হাদীস এমন ছিলো যেগুলো কোনো বিশেষ খানদানের লোকদের হাতে আবদ্ধ ছিলো। যেমন, ‘নুসাখায়ে বুরাইদা’ নামক হাদীস সমষ্টি। আ হাদীসগুলো বরীদ আবু বারদা থেকে এবং আবু বারদা আবু মুসা আশয়ারী (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। এর দ্বিতীয় উদাহরণ হচ্ছে ‘নুসখায়ে আমর ইবনে শুয়াইব’। এ নুসখার হাদীসগুলোর বর্ণনাকারী শুধুমাত্র আমর ইবনে শুয়াইব। তিনি  তার পিতা থেকে এবং তাঁর পিতা তাঁর দাদার কাছ থেকে শুনে হাদীসগুলো বর্ণনা করেছেন।

৩. এমন কিছু হাদীস ছিলো, যেগুলোর বর্ণনাকারী সাহাবী ছিলেন অখ্যাত অপরিচিত। এরূপ লোকদের হাদীস ও কম জানা ছিলো এবং বর্ণনাও করেছেন কম। তাই স্বাভাবিকভাবে তাঁদের থেকে খুব কম লোকই হাদীস বর্ণনা করেছেন।

এই ধরণের হাদীসগুলো সাধারণ ফতোয়া দানকারী লোকদের নিকট ছিলো অজ্ঞাত। পক্ষন্তরে এ যুগের আলিমদের নিকত গোটা হাদীসে ভান্ডার তো পৌছেছেই, সেই সাথে প্রতিটি জনপদের বসবাসকারী সাহাবী এবং তাবেয়ী ফকীহদের আছার পর্যন্ত তাদের নিকট পৌছে যায়। অথচ এ যুগের পূর্বেকার যেকোনো ব্যাক্তি কেবলমাত্র সেইসব হাদীসই সংগ্রহ করতে সক্ষম ছিলো, যেগুলো শুধুমাত্র তার শহরের লোকদের এবং তাঁর উস্তাদদের মাধ্যমে তাঁর নিকট পৌছেছে। এর পূর্বে রাবীদের নাম এবং তাঁদের আদালতগত৩৯ মর্যাদা নির্ণয় রাবীর অবস্থা ও পরিবেশের ভিত্তিতে সাধারন মানবিক দৃষ্টিতে।

[৩৯. ‘আদালত’ হাদীসের একট পরিভাষা। এর অর্থ জলো হাদীস বর্ণনাকারীর সুস্থ বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন বালিগ মুসলমান হওয়া, ফিসক ও লজ্জাহীনতার ক্রুটি থেকে মুক্ত হওয়া এবং বিশ্বস্ততার ব্যাপারে কোনো প্রকার সনশয় সৃষ্ট হতে পারে এরূপ কার্যকলাপ থেকে মুক্ত থাকা। —অনুবাদক]

কিন্তু এ যুগে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও গবেষণা পর্যালোচনার মাধ্যমে এটাকে একটা পৃথক ‘বিষয়’ হিসেবে প্রতিষ্টিত করা হয়েছে। পুংখানুপুংখ যাচাই বাছাইর মাধ্যমে প্রত্যেক রাবীর ভাল মন্দ সকল  দিক নির্ণয় করা হয়েছে। এবং এ বিষয়ে বলিষ্ঠ গ্রন্থাবলী রচনা করা হয়েছে। এই বিচার বিশ্লেষন ও গ্রন্থরচনার ফলে হাদীসসমূহের মুত্তাসিল এবং মুনকাতি হবার বিষয় পরিস্কার হয়ে যায়। এখন তাদের কাছে এটা সুস্পষ্ট যে, কোনটা হাদীসে মুত্তাসিল আর কোনটা হাদীসে মুনকাতি।৪০

[৪০. যে হাদীসের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতা সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ন রয়েছে এবং যে কোনো পর্যায়ে কোনো বর্ণনাকারী উহ্য থাকেনি, এরূপ হাদিসকে মুত্তাসিল হাদীস বলে। আর যে হাদীসে বর্ণনাকারীদের নামের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন থাকেনি, এবং মাঝখান থেকে কোনো রাবী উহ্য থেকে গেছে বা বাদ পড়ে গেছে, তাকে মুনকাতি হাদীস বলে।  —অনুবাদক]

সুফিয়ান সওরী, ওকী এবং তাদের সমপর্যায়ের লোকেরা তো চূড়ান্ত পর্যায়ের ইজতিহাদ করেছিলেন, কিন্তু তারপরও এক হাজার মুত্তাসিল মারফু হাদীস সংগ্রহ করতে সক্ষম হননি। মক্কাবাসীদের উদ্দেশ্যে আবু দাউদ সিজিস্তানীর লেখা চিঠি থেকে এ তথ্য জানা যায়। অথচ এই স্তরের লোকদের বর্ণিত হাদীসসংখ্যা চল্লিশ হাজার বা তার কাছাকাছি। (অবশ্য এই সংখ্যা এর চাইতেও অনেক গুণ বেশী। কিন্তু বাকীগুলো তাঁরা হাদীস যাচাইয়ের কষ্টি পাথরে নিরীক্ষণ করে পরিত্যাজ্য ও অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করেন।) ইমাম বুখারী থেকে তো একথা বিশুদ্ধভাবেই বর্ণিত হয়েছে যে, ছয় লাখ হাদীস পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই বাছাই করে তিনি ‘সহীহ বুখারী’ সংকলন করেছেন। আবু দাউদ-সিজিস্তানী থেকে বর্ণিত হয়েছে, পাচঁ লক্ষ হাদীস যাচাউ বাছাই করে তিনি ‘সুনানে আবু দাউদ’ সংকলন করেছেন। আহমদ এবনে হাম্বল তো তাঁর ‘মুসনাদ’ কে এমন এক মান্দন্ড হিসেবে সংকলন করেছেন, যার ভিত্তিতে হাদীসের বিশুদ্ধতা যাচাই করা যেতে পারে। যদিও তাঁর সংকলিত হাদীসগুলো একটি সুত্রে বর্ণিত হয়েছে, তবু তাঁর গ্রন্থে বর্তমান থাকে, তবে বলা যায়, হাদীসটির ভিত্তি রয়েছে আর যদি তাঁর গ্রন্থে হাদীসটি নাথাকে তবে বলা যেতে পারে হাদীসটির কোনো ভিত্তি নেই।

হাদীস বিশারদগণের ফিকাহর প্রতি মনোযোগ

এ সময় আরো যারা হাদীস শাস্ত্রে যারা অবদান রাখেন, তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ পর্যায়ের ছিলেনঃ আবদুর রাহমান ইবনে মাহদী, ইয়াহিয়া ইবনে সায়ীদ কাতান, ইয়াযীদ ইবনে হারূন, আবদুর রাযযাক, আবু বকর ইবনে আবী শাইবা,  মুসাদ্দাদ, হান্নাদ, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক ইবনে রাহুইয়া, ফদল ইবনে দুকাইন, আলী ইবনে আলমাদানী এবং তাঁদের সমপর্যায়ের আরো কতিপয় মুহাদ্দিস। এটা হাদীস বিশারদহণের সেই তবকা যা ছিলো সকল তবকার চাইতে সেরা। গবেষণ পর্যালোচনা ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মাধ্যমে হাদীসশাস্ত্রকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করার পর এ শাস্ত্রে মুহাক্কিকগণ কিকাহর প্রতি মনোনিবেশ করেন।  তাঁদের পূর্বেকার ফিকাহর ইমামদের কোনো একজনের তাকলীদ করার ব্যাপারে একমত হওয়া তাদের জন্যে সম্ভব হয়নি। কারণ, তাঁরা দেখলেন, প্রত্যেকটি মাযহাবের এমন অনেক মতামত রয়েছে যা বহুসংখ্যক হাদীস এবং আছারের৪১ সাথে সাংঘর্ষিক।

[৪১. সাহাবায়ে কিরামের কথা, কাজ, সমর্থন ও মতামতকে ‘আছার’ বলা হয়। –অনুবাদক]

তাই তারা কিছু মূলনীতি প্রণয়ন করেন এবং তার ভিত্তিতে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস এবং সাহাবী, তাবেয়ী ও মুজতাহিদ্গণের আছার পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে সঠিক বিধান অবগত হয়ে তার উপর আমল করেন। তাঁদের প্রণীত মূলনীতিগুলো সংক্ষেপে আমি তোমার সম্মুখে পেশ করছি।

 

নতুন উসূলে ফিকাহ

তাদের মূলনীতি ছিলো এই যেঃ

১.  কোনো বিষয়ে কুরআনে স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া গেলে, সে বিষয়ে অন্য কিছুর প্রতি প্রত্যাবর্তন করা বৈধ নয়।

২. কোনো বিষয়ে যদি কুরআনের বক্তব্যের একাধিক অর্থ গ্রহণের অবকাশ থাকে, তবে সুপ্রতিষ্ঠিত সুন্নাতে রাসূল দ্বারা সে বিষয়ের ফায়সালা গ্রহণ করতে হবে।

৩. যে মাসয়ালায় কুরআন থেকে কোনো ফায়সালা পাওয়া যায় না, সেক্ষেত্রে তাঁরা হাদীসে  রাসূলকে আঁকড়ে ধরেছেন। সে হাদীস সকল ফকীহর নিকট গ্রহণযোগ্য ছিলো কি  ছিলনা সেদিকে তাঁরা নজর দেননি। কিংবা হাদীসটি কোনো বিশেষ শহর বা খান্দানের সুত্রেই বর্ণিত হয়ে আসুকনা কেন, তাতেও তাঁরা কোনো প্রকার দোষ মনে করেননি, তাও তাঁরা দেখেননি। মোটকথা কোনো হাদীস পাওয়া গেলে তার সম্মুখে তারা কোনো ইজতিহাদকে গুরুত্ব দিতেন না।

৪. কোনো মাসয়ালা সম্পর্কে চূড়ান্ত পর্যায়ের অন্বেষণের পরও যদি কোনো হাদীস না পেতেন, তবে সেক্ষেত্রে তাঁরা বিরাট সংখ্যক সাহাবী ও তাবেয়ীর মতামতের অনুসরণ করতেন। তবে এ ক্ষেত্রে তাঁরা পূর্ববর্তী ফকীহদের নীতি অনুসরণ করতেন না। এরূপ অবস্থায় ফকীহগণের অনুসৃত নীতি ছিলো এই যে, তাঁরা সকল সাহাবী ও তাবেয়ীর মতামতের প্রতি লক্ষ্য না করে শুধুমাত্র বিশেষ সংখ্যক বা বিশেষ শহরের আলিমগণের মতামত অনুসরণ করতেন। এঁরা নিজেদেরকে অনুরূপ কোনো বনফহনে আবদ্ধ করেননি। বরঞ্চ এঁদের নিয়ম এই ছিলো যে, কোনো মাসয়ালার ক্ষেত্রে খুলাফায়ে রাশেদীন এবং মশহুর ফকীহগণকে একমত দেখতে পেলে তাঁরা নির্দ্বিধায় তা অনুসরণীয় মনে করতেন। কিন্তু যদি তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য পেতেন, সেক্ষেত্রে তাঁরা ঐ ব্যাক্তির রায়কে অগ্রাধিকার দিতেন যিনি তাঁদের মধ্যে ইলম, খোদাভীতি ও স্মরণশক্তির দিক থেকে অগ্রগণ্য ছিলেন। অথবা ঐ মতটি গ্রহণ করতেন যেটি সাধারন ভাবে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছিল। তাছাড়া কোনো মাসয়ালার ক্ষেত্রে যদি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ দুটি মত পেতেন, তবে সেটিকে তাঁরা “দুই মতওয়ালা মাসয়ালা” বলতেন।৪২

[৪২. এক্ষেত্রে দুটি মতই তাদের কাছে সমানভাবে অনুসরণযোগ্য ছিলো।  —অনুবাদক]

৫. চতুর্থ পন্থায়ও যদি কোনো মাসয়ালার সমাধান পেতে ব্যার্থ হতেন, তখন তাঁরা আয়াতে কুরআন ও সহীহ হাদীসে সাধারণ অর্থ, ভাভত ইংগিত ও উপযোগিতার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতেন। এবং এ সংক্রান্ত পূর্ব দৃষ্টান্ত অন্বেষণ করতেন আর দৃষ্টান্তকে অবশ্যি মাসয়ালাটির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হতো। এভাবেই উপনীত হতেম তাঁরা কোনো একটি সমাধানে। এক্ষেত্রে ও তাঁরা  কোনো একটি ধরাবাধা নিয়মের ইধীন ছিলেন না। বরঞ্চ সেই সমাধানটিই তাঁরা গ্রহণ করতেন, যেটির প্রতি তাদের জ্ঞানবুদ্ধি আস্থাশীল হতো এবং মনে হতো আশ্বস্ত। ব্যাপারটি ঠিক তেমন, যেমন কোনো হাদীসকে ‘মুতাওয়াতির’ বলে নির্ণয় করাটা হাদীসটির রাবি সংখ্যাটা এবং রাবীদের আদালতের ধরনের উপর নির্ভর করতোনা। বরঞ্চ লোকদের মনের নিষ্ঠগত ইয়াকীন সেদিকে সায় দিতো তার ভিত্তিতে হাদীসটির বিশুদ্ধতা ও অশুদ্ধতা নির্ণয় করা হতো। সাহাবীদের অবস্থা বর্ণনা প্রসঙ্গে আমরা বিষয়টি উল্লেখ করে এসেছি।

উসুলগুলোর উৎস

হাদীস বিশারদ্গণের এই উসূলগুলোর উৎস ছিলো তাঁদের পূর্ববর্তীগণের কার্যক্রম ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ। এ সম্পর্কে মাইমুন ইবনে মিহরান বলেনঃ

“আবু বকরের (রা) সামনে কোনো বিবাদের মীমাংসার জন্যে মুকদ্দমা পেশ করা হতে তিনি আল্লাহর কিতাবের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতেন। তাতে যদি বিষয়টি সংক্রান্ত বিধান পেয়ে যেতেন, তাই দিয়েই ফায়সালা করতেন। কিতাবুল্লায় সে সংক্রান্ত কোনো বিধান না পাওয়া গেলে সে সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাত বা হাদীস নিজের জানা না থাকলে বেরিয়ে পড়তেন। এবং মুসলমানদের মধ্যে কারো জানা আছে কিনা জিজ্ঞাসা করতেন। বলতেনঃ আমার কাছে এরূপ এরূপ একটি মুকদ্দমা দায়ের করা হয়েছে, অনুরূপ বিষয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) কোনো ফায়সালা তোমাদের জানা আছে? এমতাবস্থায় সাধারণত তাঁর সামনে একদল লোক জমা হয়ে যেতো। তাঁদের প্রত্যেকেই অনুরূপ বিষয়ে রাসূলুল্লাহর ফায়সালার ঘটনা তাঁকে শুনাতেন। তখন আবু বকর বলতেনঃ ‘শোকর সেই আল্লাহর, যিনি আমাদের মধ্যে এমনসব লোক সৃষ্টি করেছেন, যাঁরা আমাদের জন্যে  আমাদের নবীর বানী সংরক্ষণ করে রেখেছেন।’ সম্ভাব্য সকল প্রচেষ্টার পরও সে বিষয়ে রাসূলুল্লাহর কোনো সুন্নাত৪৩ উদ্ধার করতে না পারলে সাহাবীদের মধ্যকার সর্বোত্তম ও শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী লোকদের ইজতেমা করতেন এবং সে বিষয়ে তাঁদের কাছে পরামর্শ চাইতেন। অতঃপর কোনো একটি রায়ের উপর তাঁদের মতৈক্য হলে তিনি সেই অনুযায়ী ফায়সালা করে দিতেন।”

[৪৩. এ গ্রন্থে ‘সুন্নাত’ শব্দটি ‘হাদীসে রাসূল’ ও সুন্নাতে রাসূল’ উভয় অর্থে ব্যাবহৃত হয়েছে। অনুবাদক]

একইভাবে হযরত উমার (রা) সম্পর্কে শুরাইহ কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি শুরাইহকে ফরমান পাঠিয়েছিলেনঃ  “আপনার কাছে যদি এমন কোনো বিষয় উপস্থাপিত হয় যার বিধান আল্লাহর কিতাবে মুজুদ রয়েছে তবে সে অনুযায়ী ফায়সালা করবেন। মানুষের মতামত যেনো আপনাকে আল্লাহর কিতাব থেকে অনুদিকে ফেরাতে না পারে। এমন কোনো মুকদ্দমা যদি আপনার সামনে পেশ করা হয়, যার কোনো বিধান আল্লাহর কিতাবে নেই তবে সে বিষয়ে সুন্নাতে রাসূল এর প্রতি দৃষ্টি আরোপ করুন এবং সে অনুযায়ী ফায়সালা করুন। এমন কোনো বিষয় যদি আপনার সামনে উপস্থাপিত হয়ে যার কোনো বিধান কিতাবুল্লাহতেও নেই এবং রাসূলুল্লাহর সুন্নাহ  ও নিরব, তবে সে বিষয়ে লোকদের সাধারণ ও সর্বসম্মত মত কি তা দেখুন এবং সে অনুযায়ী ফায়সালা করুন। আর আপনার নিকট যদি এমন কোনো মুকদ্দমা থাকে যে সম্পর্কে কিতাবুল্লাহ এবং সুন্নাতে রাসূলে তো কোনো বিধান নেই-ই এমনকি আপনার পূর্ববর্তীদের ও কেউই সে সম্পর্কে কোনো মতামত দিয়ে যাননি, তবে সে সম্পর্কে আপনি দুটি পন্থার যে কোনোটি অবলম্বন করতে পারেন।  (এক) নিজের রায় দ্বারা ইজতিহাদ করে সাথে সাথে কোনো ফায়সালা প্রদান করতে পারেন। কিংবা (দুই) ইজতিহাদী রায় কর্যকর করার বিষয়টি বিলম্ব করতে পারেন এবং বিষয়টি নিয়ে আরো অধিকতর চিন্তা ভাবনা করতে পারেন। আর শেষোক্ত জিনিসটি (বিলম্ব) করা আমি আপনার জন্য উত্তম মনে করি।”

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেনঃ

“আমাদের জীবনে এমন একটি সময়৪৪ অতিবাহিত হয়েছে, যখন আমরা কোনো ফায়সালা প্রদান করতাম না এবং তার উপযুক্ত ও আমরা ছিলাম না। কিন্তু আল্লাহ তায়্যালার ইচ্ছা অনুযায়ী সেই স্থানে উপনীত হয়েছি। যা তোমরা দেখতে পাচ্ছ।

[৪৪. অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সা) এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের যামানা।  —অনুবাদক]

শোনো আজকের পর যার সামনেই কোনো মুকদ্দমা উপস্থিত হয় সে যেনো অবশ্যি আল্লাহর কিতাবের ভিত্তিতে ফায়সালা করে। এমন কোনো বিষয় যদি তার সামনে পেশ হয় যে সম্পর্কে আল্লাহর কিতাবে কোনো বিধান নেই, তপবে সে যেনো রাসূলুল্লাহর সুন্নাহর প্রতি দৃষ্টি দেয়। এবং সে যেনো সে অনুযায়ী ফায়সালা প্রদান করে। কিন্তু যখন এমন কোনো বিষয় তার সামনে উপস্থিত হবে যে সম্পর্কে কোনো বিধান কুরআন এবং হাদীসে উভয়টি থেকেই পাওয়া না যাবে তখন যেনো সে উক্ত বিষয় এ সালিহ লোকদের ফায়সালার ভিত্তিতে ফায়সালা করে। এক্ষেত্রে সে যেনো এমনটি না বলে যে, আমি ভয় পাচ্ছি কিংবা আমার মত এটা। কেননা হারাম সুস্পষ্ট এবং হালালও সুস্পষ্ট। আর এ দুটির মাঝখানে এমন কিছু জিনিস আছে, যেগুলোর হারাম হওয়াটা স্পষ্ট নয় এবং এবং হালাল হওয়াটাও স্পষ্ট নয়। সুতরাং অষ্পষ্ট জিনিসগুলোর ব্যাপারে এই নীতি অবলম্বন করো যে, তোমার মনে যে জিনিস সম্পর্কে খটকা লাগে তা ত্যাগ করো আর যে সম্পর্কে মন নিশ্চিন্ত হয়, তা গ্রহণ করো।”

ইবনে আব্বাস (রা) থেকে যখন কোনো মাসয়ালা জিজ্ঞেস করা হতো, তিনি কুরআনের বিধান মুতাবিক তার জবাব দিতেন। জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের জবাবা আল্লাহর কিতাবে পাওয়া না গেলে রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাহ মুতাবিক তার জবাব দিতেন। কিতাবুল্লাহ এবং সুন্নাতে রাসূল কোনোটিতেই পাওয়া না গেলে । তবে আবুবকর এবং উমারের (রা) এর ফায়সালার ভিত্তিতে জবাব দিতেন। কিন্তু যখন তাঁদের থেকেও অনুরূপ কোনো ফায়সালার দৃষ্টান্ত পাওয়া না যেতো, তখন ইজতিহাদ করে নিজ রায়ের ভিত্তিতে ফায়সালা দিতেন।

এই ইবনে আব্বাসই (রা) এক ভাষণে লোকদের সতর্ক করতে গিয়ে বলেছিলেনঃ “তোমরা যে বলো, ‘রাসূলুল্লাহ একথা বলেছেন আর অমুক একথা বলেছেন’ —এ ব্যাপারে তোমাদের কি এই ভয় নেই যে, তোমাদেরকে কঠিন আযাব গ্রাস করবে কিংবা জনীন তলিয়ে নিবে!”

কাতাদাহ (রা) থেকে বর্ণিত আছেঃ ইবনে সীরীন কোনো এক ব্যাক্তিকে রাসূলুল্লাহর (সা) একটি হাদিস শুনালে সে বললোঃ “এই মাসয়ালাটি সম্পর্কে অমুক ব্যাক্তি এরূপ বলেছে।” ইবনে সীরীন জবাব দিলেন “আমি তোমাকে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস শুনালাম, আর তুমি বলছো, অমুক ব্যাক্তি এরূপ বলেছে?”

 আওযায়ী থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ উমার ইবনে আবদুল আযীয লিখিত ফরমার জারি করেন যে, “কিতাবুল্লাহর হুকুমের সামনে কোনো ব্যাক্তির রায়ের বিন্দুমাত্র মূল্য নেই। আয়িম্মায়ে মুজতাহিদীনের রায় কেবলমাত্র ঐসব ক্ষেত্রেই বিবেচ্য হবে, যেসব ক্ষেত্রে আল্লাহর কিতাব এবং সুন্নাতে রাসূলের বিধান অনুপস্থিত। যেক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা) কোনো সুন্নাহ রয়ে গেছে, সেক্ষেত্রে কোনো রায় প্রদানের অধিকার কারো নেই।”

আ’মাশ বলেনঃ ইব্রাহীম নখয়ী একিক মুক্তাদীকে ইমামের বাম পাশে দাঁড়াতে বলতেন। আমি তাঁকে সামী যাইয়াতের সুত্রে ইবনে আব্বাস বর্ণিত এই হাদীসটি শুনালাম, “ রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে (ইবনে আব্বাসকে) ডান পাশে দাঁড় করিয়েছিলেন।৪৫ হাদীসটি শুনার সাথে সাথে ইব্রাহীম নখয়ী তা গ্রহণ করেন এবং নিজের ধারণা পরিবর্তন করেন।

[৪৫.  একবার তাহাজ্জুদ নামাযে ইবনে আব্বাস (রা) রাসূলুল্লাহর বাম পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর পিছে অকতিদা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে ধরে এনে ডান পাশে দাঁড় করিয়ে দেন। —অনুবাদক]

শা’বী থেকে জনৈক ব্যাক্তি তাঁর কাছে কোনো একটি বিষয়ে জানতে আসে, তিনি বলে দিলেন, এ ব্যাপারে ইবনে মাসউদ এরূপ বলেছেন। লোকটি বললো “বিষয়টি সম্পর্কে আপনার রায় কি?” তিনি বলেনঃ “হে লোকেরা, এই লোকটির কথা তোমাদের বিস্মিত করছেনা! আমি তাকে ইবনে মাসউদের সুত্রে জবাব দিয়ে দিয়েছি, অথচ সে আমার নিজের রায় জানতে চাচ্ছে!  আমি তাকে যে জবাব দিয়েছি, জবাব দেবার রি তরীকারি মামার কাছে সর্বোত্তম। আল্লাহর কসম, তোমাকে আমি যার সুত্রে জবাব দিয়েছি, তার পরিবর্তে আমার নিজের রায়া প্রদানকরার চাইতে কোনো গাণ গাওয়াকে৪৬ আমি অধিক পছন্দ করি।”৪৭

[৪৬. ‘গাণ গাওয়া বলতে, মুখ থেকে কোনো গুণাহর উপযুক্ত কথা বেরিয়ে পড়া। —অনুবাদক]

[৪৭. উপরোল্লেখিত সবগুলা ঘটনা ও বক্তব্য দারেমীর সুত্রে উদ্ধৃত হলো। —গ্রন্থকার]

তিরমিযী আবু সায়িবের সুত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ আমরা ওকীর নিকট বসা ছিলাম। রায় দ্বারাকার্য সম্পাদনের পক্ষপাতী এক ব্যাক্তিকে তিনি বলচিলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সা) কুরবানীর উটের কূঁজে আঘাত করে রক্ত প্রবাহিত করে দিয়েছিলেন। অথচ আবু হানীফা এটাকে বলেছেন, নাক কান কর্তিত করা!” লোকটি বললঃ “এর কারণ ইব্রাহীম নখয়ী এটাকে নাক কান কর্তিত করা বলেছেন।” তার এ বক্তব্য শুনে অকী ভীষণভাবে রাগান্বিত হন এবং বলেনঃ “আমি তোমাকে রাসূলুল্লাহ (সা) এরূপ বলেছেন! অথচ তুমি বলছো ইব্রাহীম ঐরূপ বলেছে! তোমাকে কয়েদখানায় আবদ্ধ করা উচিত এবং ততোক্ষণ পর্যন্থ সেখান থেকে মুক্ত করা উচিত নয় যতোক্ষণ না তুমি তোমার এরূপ চিন্তা ও বক্তব্য থেকে প্রত্যাবর্তন করো।”

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আতা, মুজাহিদ এবং মালিক ইবনে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম বলতেন, “রাসূলুল্লাহ (সা) ব্যাতীত এমন কোনো মানুষ নেই যার কথার কিছু অংশ গ্রহণযোগ্য এবং কিছু অংশ বর্জনযোগ্য হয় না।”

ফিকাহর এই পদ্ধতির সাফল্য

মোটকথা হাদীসে আলিমগণ মাসয়ালা ইস্তিম্বাত করার জন্যে যখন উসূলে ফিকাহকে এই নতুন বুনিয়াদের ভিত্তিতে সাজালেন, তখন আর তাঁদের পূর্ববর্তীদের আলোচিত কিংবা তাদের নিজেদের সময়ে সংঘটিত এমন কোন মাসয়ালা অবশিষ্ট থাকলো না যেটি সম্পর্কে কোনো না কোনো মারফু মুত্তাসুল বা মুরসাল কিংবা মুকূফ অথচ সহীহ, হাসান এবং নির্ভরযোগ্য হাদীস পাওয়া যায়নি। কদাচিৎ কোনো ক্ষেত্রে অনুরূপ কোনো হাদীস পাওয়া না গেলেও অন্তত শায়খাইন৪৮ ও অন্যান্য খলীফার আছার, বিভিন্ন শহরে কাযীদের রায় অথবা ফকীহগণের কোনো ফতোয়া অবশ্যি পেয়েছেন কিংবা নসসে সরীহর উমুম, ইংগিত ও উপযোগিতার ভিত্তিতে সরাসরি ইস্তিম্বাত করে নিয়েছেন। এভাবেই সত্যিকার সুন্নাতে রাসূলের রাজপথ অনুসরণের কাজ আল্লাহতায়ালা তাঁদের জন্যে সহজ করে দেন। এই আলিমগণের মধ্যে পূর্ণত্বের দিক থেকে শ্রেষ্ঠত্ব হাদীসের জ্ঞানের শীর্ষে অবস্থান করছিলেন আহমদ ইবনে হাম্বল এবং ইসহাক ইবনে রাহুইয়া।

[৪৮.  অর্থাৎ আবু বকর ও উমর রাদিয়াল্লাহূ আনহুমা। —অনুবাদক]

ফিকাহর এই তরীকা অনুশীলনের জন্যে প্রয়োজন বিরাট জ্ঞান ভান্ডারের। এ পন্থায় শরয়ী বিধান সম্পর্কে রায় কায়েম করার জন্যে ব্যাক্তির ভান্ডারে হাদীস ও আছারের বিরাট সঞ্চয় বর্তমান থাকা আবশ্যক। আহমদ ইবনে হাম্বলকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল “এক লাখ হাদীস জানা থাকা মুফতী হবার জন্যে যথেষ্ট নয় কি?” তিনি বলেন ‘নয়’। অতঃপর প্রশ্নকর্তা হাদীসের সংলহ্যা বাড়াতে থাকে আর তিনি ‘নয়’ বলতে থাকেন। অবশেষে প্রশ্নকর্তা বললেন “পাঁচ লাখ হাদীস জানা থাকলে?” এবার তিনি বললেন “হ্যাঁ, আশা করা যেতে পারে।”৪৯ এখানে ইমাম আহমদ উপরোল্লেখিত মুলনীতির ভিত্তিতে ফতোয়া দান বুঝিয়েছেন।

[৪৯. ঘটনাটি ‘গায়াতুল মুনতাহা’ গ্রন্থ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। —গ্রন্থকার]

অতঃপর আল্লাহ তায়ালা আরেকদল লোক সৃষ্টি করলেন। এরা দেখলেন, তাঁদের পূর্ববর্তী মনীষীগণ হাদীস সংগ্রহ, সংকলন ও (উপরোল্লেখিত মূলনীতির ভিত্তিতে) উসুলে ফিকাহর বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব  পালন করে তাঁদেরকে সৌভাগ্যের অধিকারী করে গেছেন। সুতরাং এরা হাদীস শাস্তের অন্যান্য দিকের প্রতি মনোনিবেশ করেন। যেমন, তাঁরা সেসব সহীহ হাদীসকে পৃথক করেন, যেগুলো সহীহ হবার ব্যাপারে ইয়াযীদ ইবনে হারূন, ইয়াহিয়া ইবনে সায়ীদুল কাতান, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক ইবনে রাহুইয়া এবং তাঁদের সমপর্যায়ের সেরা হাদীস বিশারদ্গণ একমত পোষণ করেছেন। তাঁরা ঐসব ফিকহী হাদীসকে বেছে বেছে প্ররতজক করেন, যেগুলোর ভিত্তিতে বিভিন্ন শহরের ফকীহ ও আলিমগণ নিজ নিজ মাযহাব প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁরা ঐসব শায৫০ ও গরীব হাদীসের উপর অনুসন্ধান কাজ চালিয়ে সেগুলোর মর্যাদা ও হুকুম বর্ণনা করেন, অতীতের আলিমগণ যেগুলো উপেক্ষা করে এসেছেন।

[৫০. ‘শায’ হচ্ছে ঐসব হাদীস যার বর্ণনাকারী বিশ্বস্ত বটে, কিন্তু হাদীসটি তার চাইতে অধিকতর বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীর হাদীসের বিপরীত। —অনুবাদক]

এর প্রত্যেকটি হাদীসের সনদ্গত ও বিধানগত মর্যাদা বর্ণনা করেন। তাঁরা সেইসব সনদও অনুসন্ধান করে বের করেন,  তাঁদের পূর্বের হাদীস সংগ্রহকারীগণ যেসব সনদের মাধ্যমে হাদীস সংগ্রহ করতে পারেননি অথচ সেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেমন সনদ্গুলো উদ্ধার করার ফলে দেখা গেলো, কোনোটি মুত্তাসিল, কোনোটি উঁচুস্তরের রাবী কর্তৃক বর্ণিত, কোনোটি ফকীহ থেকে গকীহ কর্তৃক বর্ণিত এবং কোনোটি হাফিযে হাদীস রাবী থেকে হাফীযে হাদীস রাবী কর্তৃক বর্ণিত। এভাবে সেগুলো থেকে অনেক তত্ব ও তথ্য উদঘটিত হয়।

হাদীসের এই মহান খাদিমদের শীর্ষস্থানীয় ছিলেন বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, আবদ ইবনে হুমাইদ, দারেমী, ইবনু মাজাহ, আবু ইয়ালী, তিরমিযী, নাসায়ী, দারুজুতনী, হাকিম, বায়হাকী, খতীব, দায়লামী, ইবমে আবদুল বার এবং এঁদের সমপর্যায়ের অন্যান্য মুহাদ্দীসগণ।

এই মনীষীগণের মধ্যে আবার আমার মতে জ্ঞান, গ্রন্থরচনা এবং খ্যাতির দিক থেকে শীর্ষচূড়ায় অবস্থানকারী ছিলেন চারজন। চারজনই প্রায় সম-সাময়ীক কালের লোক ছিলেন। তাঁরা হলেনঃ

একঃ   আবু আবদুল্লাহ আর বুখারীঃ   এ চারজনের প্রথম ব্যাক্তি হলেন আবু আবদুল্লাহ আল বুখারী। তাঁর দৃষ্টি ভংগি ছিলো এই যে, মুত্তাসিল, মশহুর ও সহীহ হাদীসসমূহকে অন্য ধরনের হাদীসসমূহ থেকে ছেঁটে বেছে পৃথক করতে হবে এবং এগুলোরই উপর ফিকাহ, সীরাত, এবং তাফসীরের ভিত্তি স্থাপন করে মাসায়েল ইস্তিম্বার করতে হবে। এই দৃষ্টিভংগিতেই তিনি সংকলন করেন তাঁর চির অম্লান গ্রন্থ ‘জামিউস সহীহ’ (আল বুখারী)। এ গ্রন্থে তাঁর পূর্ব নির্ধারিত শর্ত সমূহ তিনি পুরোপুরি রক্ষা করেন।

শুনেছি জনৈক বুযুর্গ স্বপ্নে দেখেন, রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে বলছেন, “তোমার কি হলো যে, তুমি আমার কিতাব পরিত্যাগ করে মুহাম্মাদ ইবনে ইদরীসের৫১ ফিকাহর প্রতি মনোনিবেশ করেছো?” বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার কিতাব কোনটি?” রাসুলুল্লাহ জবাব দিলেন, “সহীহ আল বুখারী।”

[৫১. অর্থাৎ ইমাম শাফেয়ী (র)।  –অনুবাদক]

আল্লাহর কসম, এই গ্রন্থ খ্যাতি এবং গ্রহণযোগ্যতার এমন শীর্ষ চূড়ায় পৌছেছে যার চাইতে অধিক আশা করা যায় না।

দুই. মুসলিম নিশাপুরীঃ    এঁদের মধ্যে দ্বিতীয় ব্যাক্তি হলেন, মুসলিম নিশাপুরী। তাঁর আকাঙ্ক্ষা ছিলো এই যে, যেসব মুত্তাসিল মারফু হাদীসে বিশুদ্ধতা সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণের ঐক্যমত রয়েছে এবং যেগুলো দ্বারা সুন্নাতে রাসূলকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা সহজ  হবে সেই সব হাদীসকে নির্বাচিত করে আলাদা করতে হবে। এই হাদীসগুলোকে তিনি এমন এক পদ্ধতিতে সংকলন করার সিদ্ধান্ত নেন। যার ফলে সেগুলো মস্তিষ্কে ধারণের উপযোগী হবে এবং সেগুলো থেকে মাসায়েল ইস্তিম্বাত সহজ হবে।

অতঃপর তিনি তার এই আকাঙ্ক্ষা ও সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে অতি উত্তম তারতীবের সাথে একটি গ্রন্থ সংকলন করেন। অর্থাৎ প্রত্যেকটি হাদীসের সবগুলো সনদ এক স্থানে একত্র করেন, যাতে করে একই হাদীসে মতনের৫২ বিভিন্নতা পরিস্কার হয়ে যায় এবং একই মুলসূত্র থেক সনদের বিভিন্ন শাখা প্রশাখা কিভাবে ছড়িয়ে পড়েছে তাও জানা যায়।

[৫২. প্রত্যেক হাদীসে দুইটি অংশ থাকে। একটি হলো বর্ণনাকারীদের নামের ধারানাহিক তালিকা অপরটি হলো মূল বক্তব্য বা হাদীস অংশ। হাদীসে পরিভাষায় প্রথম অংশকে ‘সনদ’ এবং শেষাংশকে ‘মতন’ বলে।]

বাহ্যিকভাবে যেসব হাদীসের মধ্যে পারস্পরিক বৈপরিত্য ছিলো, তিনি সেগুলোর মধ্যেও সামঞ্জস্য বিধান করেন। এভাবে তিনি তাঁর এই মহান প্রচেষ্টার মাধ্যমে (অর্থাৎ সহীহ মুসলিম সংকলনের মাধ্যমে) একজন আরবী জানা ব্যাক্তির জন্যে সুন্নাতে রাসূলের রাজপথ ত্যাগ করে অন্য কোনো দিকে ধাবিত হবার পক্ষে কোনো ওজর বাকী রাখেননি।

তিন. আবু দাউদ সিজিস্তানীঃ    এই চার মনীষীর তৃতীয় ব্যাক্তি হলেন, আবু দাউদ সিজিস্তানী। তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো সেই হাদীসগুলোকে বাছাই করে পৃথক করা, যেগুলোকে ফকীহগণ দলিল হিসেবে গ্রহণ করেন এবং তাঁদের মধ্যেই অধিক খ্যাতি লাভ করেছে আর সেসব হাদীস, বিভিন্ন শহরের আলিমগণ যেগুলোর উপর আহকামের বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই মহান উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তিনি সংকলন করেন তাঁর অমর গ্রন্থ ‘সুনানে আবু দাউদ’। এ গ্রন্থে সহীহ এবং হাসান হাদীসের সাথে এমনসব দুর্বল হাদীসও তিনি সংকলন করে নেন, যেগুলো দুর্বল হওয়া সত্বেও আমলের উপযোগী। আবু দাউদ নিজেই বলেছেন, “আমার গ্রন্থে আমি এমন কোনো হাদীস সংকলন করিনি, যেটি সকল মুহাদ্দিসের দৃষ্টিতে পরিত্যাজ্য। “আমার গ্রন্থে সংকলিত জয়ীফ হাদীসে জয়ীফ হবার ব্যাখ্যাও প্রদান করেছি। কোনো হাদীসে কোনো সূক্ষ্ম  ক্রুটি থেকে থাকলে তাও এমনভাবে বয়ান করে দিয়েছি যে কোনো হাদীস বিশারদের পক্ষে তা বুঝতে কিছুমাত্র কষ্টও হবে না।” তার গ্রন্থের আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, প্রত্যেকটি হাদীস বর্ণনার পূর্বে এমন একটি ফিকহী বিধানকে সেটির শিরোনাম ধার্য করেছেন, যা অনশ্যি কোনো ফকীহ ইস্তিম্বাত করেছেন কিংবা কারো না কারো মাযহাবে পরিণত হয়েছে। এ কারণে আল গাযালী প্রমুখের মতে, ‘মুজতাহিদের জন্যে সুনানে আবু দাউদ যথেষ্ট।‘

চার. আবু ঈসা তিরমিযীঃ    এ মনীষীদের চতুর্থ ব্যাক্তি হলেন আবু ঈসা তিরমিযী। বুঝা যাচ্ছে তিনি একদিকে রেওয়ায়াতের পদ্ধতিগত দিক থেকে শায়খাইনকে৫৩ অনুসরণ করেছেন।

[৫৩. হাদীস শাস্ত্রে ‘শায়খাইন’ বলতে ইমাম বুখারী আর ইমাম মুসলিমকে বুঝায়। –অনুবাদক]

অপরদিকে, ফকীহ ও আলিমদের মত ও মাযহাব বর্ণনার ক্ষেত্রে আবু দাউদের পন্থা অনুসরণ করেছেন।  তাই তাঁর গ্রন্থে সাহাবী, তাবেয়ী এবং ফকীহদের মাযহাবও বর্ণনা করে দিয়েছেন। এভাবে তিনি এমন এক মৌলিক ও পূর্ণাংগ গ্রন্থ রচনা করেন, যাতেঃ

ক.  সংক্ষিপ্ত আকারে অতিশয় বিজ্ঞতার সাথে একেকটি হাদীসর সবগুলো সনদ উল্লেখ করা হয়েছে তবে একটির পূর্ণ বিবরন দেয়া হয়েছে আর বাকীগুলোর প্রতি ইংগিত করা হয়েছে।

খ.  প্রত্যেকটি হাদীসের অবস্থা সম্পর্কে মন্তব্য করা হয়েছে। সেটা কি সহীহ, হাসান, জয়ীফ আকি মুনকার তা বয়লে দেয়া হয়েছে। জয়ীফ রেওয়ায়েতসমূহের জয়ীফ হবার কারণ স্পষ্টভাবে বলে দেয়া হয়েছে, যাতে করে এ বিষয়ে অনুসন্ধিৎসু ব্যাক্তিরা অন্তরদৃষ্টি লাভ করতে পারেন এবং নির্ভরযোগ্য ও অনির্ভরযোগ্য হাদীসের মধ্যে পার্থক্য করতে সক্ষম হন।

গ.   প্রতিটি হাদীস সম্পর্কে বলে দেয়া হয়েছে, সেটি ‘মশহুর’ নাকি ‘গরীব’।

ঘ. সাহাবী এবং ফকীহগণের মাযহাব উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রসংগে প্রয়োজনানুসারে কারো নাম আবার কারো কুনিয়াহ উল্লেখ করা হয়েছে।

মোটকথা, জ্ঞান অন্বেষণকারীর জন্যে এ গ্রন্থে আর কোনো পর্দা রেখে দেয়া হয়নি এ কারণেই বলা হয় “গ্রন্থটি মুজতাহিদের জন্যে যথেষ্ট আর মুকাল্লিদের জন্যে পর্যাপ্ত।”

About শাহ্‌ ওয়ালি উল্লাহ্‌ মুহাদ্দিসে দেহলভী র.