আমরা সেই সে জাতি – ৩য় খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

বিশ্বের প্রথম ‘আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র’

ইয়েমেন সীমান্ত ঘেঁষে নাজরান একটা বিশাল ভূভাগ। আরবের সবচেয়ে বড় খৃস্টান কেন্দ্র হিসেবে এটা পরিচিত।

নাজরানের বিশপের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে একটা চিঠি পাঠালেন মহানবী (সা)। চিঠি পেয়ে নাজরানের গীর্জার প্রধান বিশপ কি করণীয় তা ভেবে বিচলিত হয়ে পড়লেন। অনেকের সাথে পরামর্শ করলেন। কেউ বললেন, ‘একালে একজন ভাববাদীর আগমন ঘটবে, একথা অনেক দিন থেকে শুনে আসছি। আপনিই কর্তব্য ঠিক করুন।’ তবে সকলেই এক বাক্যে বলল, এসব ধর্ম সম্পর্কিত জটিল সমস্যা, আপনাদের ন্যায় ধর্মগুরুরাই এর সমাধান করতে পারেন।’ নাজরানের একটা নিয়ম হলো, কোন গুরুতর সংকট বা ভয়ংকর কোন বিপদ উপস্থিত হলে গীর্জার উপর চট ঝুলিয়ে দিয়ে অবিরাম ঘণ্টা বাজানো হয়। বিশপ ভেবে-চিন্তে গীর্জার চট ঝুলানো ও ঘণ্টা বাজানোর নির্দেশ দিলেন। নাজরান অঞ্চলের ৭৩টি গ্রাম নিয়ে গীর্জার সম্রাজ্য। গীর্জার বিপদ-ঘণ্টা শুনে হাজার হাজার লোক ছুটে এল গীর্জায়। গীর্জার সামনে বিশাল প্রান্তর লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল। লক্ষাধিক লোক সামনে রেখে গীর্জার ব্যালকনিতে দণ্ডায়মান হলেন প্রধান বিশপ আয়হারা। অসীম সম্মানের পাত্র তিনি। নাজরানবাসীর উপর তাঁর অতুল প্রভাব। তিনি লোকদের উদ্দেশ্য করে মদীনা থেকে প্রাপ্ত মহানবীর পত্র পাঠ করে সবাইকে শুনালেন এবং করণীয় স্থির করার আহবান জানালেন। চিঠি পাঠের পর আলোচনা করে স্থির হলো, প্রধান বিশপ ও যাজক নাজরানের বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গকে নিয়ে অবিলম্বে মদীনা যাত্রা করবেন। তাঁরা সেখানে গিয়ে নবধর্মের খবর নিয়ে ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনার পর করণীয় ঠিক করবেন। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে নাজরানের ৬০ জন যাজক ও প্রধান ব্যক্তির একটা প্রতিনিধি দল মদীনা এল।

মদীনা এসে প্রথমেই তারা মসজিদে নববীতে উপাসনা করার অনুমতি চাইলেন। মহানবী (সা) অস্বাভাবিক হলেও এ অনুমতি তাদের দিলেন। নাজরান প্রতিনিধিরা নিশ্চিত ধরে নিয়েছিল এ অনুমতি তারা পাবে না। অনুমতি পাওয়ায় তারা বিস্মিত হলো। মদীনা আসার আগেই নাজরান প্রতিনিধিরা পরিকল্পনা এঁটেছিল মহানবীর সাথে ‘মোলাআনা’ করার। অর্থাৎ পরস্পর এইভাবে কসম করা যে, ‘আমি মিথ্যাবাদী হলে আমার উপর আল্লাহর লানত হোক।’ কিন্তু মহানবীর সাথে সাক্ষাত হবার পর তাঁর মুখ দেখে তাদের হৃদয় কেঁপে উঠল। তাঁরা সকলেই একমত হলো যে, তাঁর সাথে ‘মোলাআনা’ করে কাজ নেই। প্রকৃতই উনি যদি নবী হন, তাহলে আমাদের সর্বনাশ হবে। তারপর নাজরান প্রতিনিধিদল দীর্ঘ সময় ধরে রাসূলুল্লাহর সাথে ধর্মের জটিল সব প্রসংগ নিয়ে আলাপ করল। তারা বুঝে গেল, ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আলাপ করে তাঁর সাথে সুবিধা করা সম্ভব নয়। ওদিকে ‘মোলাআনা’ করার আশা তাদেরকে আগেই ত্যাগ করতে হয়েছে।

এই অবস্থায় নাজরান প্রতিনিধিদল মদীনার সাথে রাজনৈতিক সন্ধির প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তারা আন্তর্জাতিক আরব গণতন্ত্রের (International Arab Federation) মেম্বার হবার আগ্রহের কথা জানালেন এবং এই কমনওয়েলথের সদস্য হবার জন্য তাদের কি দিতে হবে তা ঠিক করে দেয়ার জন্য মহানবীকেই অনুরোধ করলেন।

এরপর মহানবী (সা) নাজরানবাসীদের উদ্দেশ্যে লিখিতভাবে নিম্নোক্ত সনদ ঘোষণা করলেন :

“তাদের (নাজরানবাসীদের) উপস্থিত, অনুপস্থিত, স্বজাতীয় ও অনুগত সকলের জন্য আল্লাহর নামে তাঁর রাসূল মুহাম্মাদের প্রতিজ্ঞা এই যে, সকল প্রকার সম্ভব চেষ্টার দ্বারা আমরা তাদের নিরাপদ রাখব। তাদের দেশ, তাদের বিষয়-সম্পত্তি ও ধন-সম্পদ এবং তাদের ধর্ম ও ধর্ম সংক্রান্ত যাবতীয় আচার-ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে ধন-সম্পদ এবং তাদের ধর্ম ও ধর্ম সংক্রান্ত যাবতীয় আচার-ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে অক্ষুন্ন অব্যাহত ও নিরাপদ থাকবে। তাদের কোন সমাজগত আচার-ব্যবহারের কোন বিষয়গত স্বত্বাধিকারের এবং কোন ধর্মগত সংস্কারের উপর কখনও কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করা হবে না। কম বেশী যা কিছু তাদের আছে, তা সম্পূর্ণরূপে তাদেরই থাকবে। মুসলমানরা তাদের নিকট থেকে অর্থবিনিময় ব্যতীত কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করা হবে না। কম বেশী যা কিছু তাদের আছে, তা সম্পূর্ণরূপে তাদেরই থাকবে। মুসলমানরা তাদের নিকট থেকে অর্থবিনিময় ব্যতীত কোন প্রকার উপকার গ্রহণ করতে পারবে না। তাদের কাছ থেকে ‘ওশর‘ (ফসলের উপর অবশ্য দেয় অংশ) গ্রহণ করা হবে না, তাদের দেশের মধ্য দিয়ে সৈন্য চালনা করা হবে না। আল্লাহর নামে তাদের আরও প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে যে, কোন ধর্মযাজককে তাঁর পদ থেকে অপসারণ করা হবে না, কোন পুরোহিতকে পদচ্যুত করা হবে না। কোন সন্ন্যাসীর সাধনায় কোনও প্রকার বিঘ্ন সৃষ্টি করা হবে না। যত দিন তারা শান্তি ও ন্যায়ের মর্যাদা রক্ষা করবে, ততদিন এই সনদের লিখিত সব শর্ত সমানভাবে বলবৎ থাকবে।“

মদীনার সনদের পর পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে জাতিগত সহাবস্থানের এ এক অনন্য দলিল। মদীনার সনদ ছিল কিছুটা স্থানীয় পর্যায়ের, কিন্তু এই ‘নাজরান সনদ’ একটা কমনওয়েলথ ব্যবস্থার অধীনে জাতিগত সহাবস্থানের আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক দলিল।

আল্লাহর নিয়ামত (ইসলাম) যখন সম্পূর্ণ হলো

বিদায় হজ্বের দীর্ঘ অভিভাষণ মহানবী (সা) শেষ করলেন এই কথা বলে “যারা উপস্থিত আছে, তারা অনুপস্থিতদেরকে আমার এ সকল ‘পয়গাম’ পৌঁছে দেবে। হয়তো উপস্থিতদের কতক লোক অপেক্ষা অনুপস্থিতদের কতক লোক এর দ্বারা অধিকতর উপকৃত হবে।”

আল্লাহর বাণী, সত্যের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার মহামিশন যেন তিনি শেষ করলেন। তাঁর মুখমণ্ডল বেহেশতী পুণ্য প্রভায় দীপ্ত হয়ে উঠেছে। তাঁর কণ্ঠস্বর সত্যের তেজে ক্রমশঃই দৃপ্ততর হয়ে উঠছে। তাঁর চোখ দু’টিতে পরম প্রভুর জন্য ভক্তি গদগদ অসীম আকুলতা। মুখ উপরে তুলে তিনি চাইলেন উর্ধাকাশে এবং উচ্চকণ্ঠে বলতে লাগলেন, ‘হে আল্লাহ, আমি কি তোমার বাণী পৌঁছে দিয়েছি, আমি কি নিজের কর্তব্য সম্পাদন করেছি?’

আরাফাতের গোটা প্রান্তর থেকে লাখ কণ্ঠে ধ্বনি উঠল, ‘নিশ্চয় ইয়া রাসূলাল্লাহ।’

মহানবী (সা) তখন আরও আবেগ-ভরা কণ্ঠে পরম প্রভুর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘হে আমার আল্লাহ, আপনি শ্রবণ করুন, আপনি সাক্ষী থাকুন, এরা স্বীকার করছে, আমি আমার কর্তব্য পালন করেছি।”

মহানবী (সা) এরপর দৃষ্টি ফিরিয়ে চাইলেন আরাফাতের লাখ জনতার দিকে। বললেন, “হে লোক সকল, আমার সম্পর্কে তোমাদের প্রশ্ন করা হবে। তোমরা সে প্রশ্নের কি জবাব দেবে জানতে চাই।”

আরাফাতের পর্বত ও প্রান্তর জুড়ে ধ্বনিত হলো লাখো কণ্ঠের আবেগ-মথিত উত্তর, “আমরা সাক্ষ্য দেব, আপনি আমাদের পরম প্রভু আল্লাহর বাণী আমাদের পৌঁছে দিয়েছেন, আপনি আপনার কর্তব্য সম্পূর্ণ পালন করেছেন।”

মহানবী (সা) তখন অপূর্ব এক ভাবে বিভোর। তিনি আকাশের দিকে অঙ্গুলি তুলে উচ্চ কণ্ঠে বলতে লাগলেন, ‘প্রভু হে সাক্ষী থাকুন, হে আমার আল্লাহ সাক্ষী খাকুন।’ শেষ হয়েছে আরাফাতের বিদায় হজ্বের ভাষণ।

শেষ হলো উপস্থিত লাখো জনতার সাথে তাঁর শেষ কথা। পরম প্রভুকেও সাক্ষী রাখলেন তিনি তার মিশনের সম্পূর্ণতা বিষয়ে।

বাকী ছিল পরম প্রভু আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের তরফ থেকে পরম একটি সুসংবাদের।

দয়াময় আল্লাহ কি পারেন তার প্রিয়তম বান্দাহ ও প্রিয়তম রাসূলকে তাঁর পরম সন্তুষ্টির কথা না জানিয়ে?

আরাফাতের ভাষণ শেষ হবার পরপরই মহানবীর প্রতি অবতীর্ণ হলো মর্তের বান্দাদের জন্য মহিমাময় প্রভুর পরম সন্তোষের বাণী আল-কুরআনের এই আয়াত :

“তোমাদের মঙ্গল হেতু তোমাদের দ্বীনকে আজ পূর্ণ, পরিণত করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামতকে সুসম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীনরূপে মনোনীত করে দিলাম।”

মহানবীর চির বিদায়ের প্রস্তুতি

একাদশ হিজরী সাল।

বিদায় হজ্ব শেষে মহানবী (সা) মদীনায় ফিরেছেন। ফিরবার পর পৃথিবীর সমস্ত কাজ-কাম সমাধা করার জন্যে মহানবী ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। যেন তিনি কোন মহাযাত্রার আয়োজন শুরু করে দিয়েছেন।

হজ্ব থেকে প্রত্যাবর্তনের পথেই তাঁর প্রিয় সাহাবীদের কবরগাহ্ জান্নাতুল বাকিতে রাতের একটা দীর্ঘ সময় তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন। তিনি তাঁর সাহাবীদের জন্যে দোয়া করেছেন এবং তাঁদের কাছে বিদায় নিয়েছেন।

জান্নাতুল বাকি থেকে ফিরে আসার পর সফর মাসের শেষার্ধের প্রথমভাগে মহানবীর মধ্যে পীড়ার সূত্রপাত ঘটলো।

বিখ্যাত সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলছেন, ইন্তিকালের একমাস আগেই হযরত তাঁর মৃত্যু সংবাদ সকলকে জানিয়েছিলেন।

মহানবীর (সা) অসুস্থ হয়ে পড়ার পর যেন সেই চির বিদায়ের মহাসময়টাই ঘনিয়ে এলো।

এ সময় একদিন মহানবী (সা) আয়েশা সিদ্দিকা (রা)-এর বাড়ীতে সবাইকে ডাকলেন।

সকলে উপস্থিত হলে মহানবী (সা) বললেন,

“হে লোক সকল, তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ্ তোমাদের উপর রহম করুন। তাঁর সাহায্য ও শক্তিবলে তোমরা জীবনের কর্মসময়ে জয়যুক্ত ও কল্যাণমণ্ডিত হও। তিনি তোমাদের মহত্ত্ব দান করুন, সৎপথ প্রদর্শন করুন এবং সততা অর্জনের শক্তি দান করুন। তাঁর আশ্রয়ে তোমরা নিরাপদ থাক। আমি তোমাদেরকে আল্লাহর নামে ধর্মভীরু হবার অছিয়ত করছি। তোমাদেরকে আমি তাঁরই মঙ্গল-হাতে সমর্পণ করে যাচ্ছি। আমি তোমাদেরকে আল্লাহর ন্যায়দণ্ড সম্বন্ধে বিশেষরূপে সতর্ক করে বলছি যে, সাবধান, কোন দেশের কোন জাতির উপর অন্যায় আচরণ করো না, এতে তোমরা তাঁর (আল্লাহর) বিদ্রোহী বলে গণ্য হবে। আল্লাহ আমাকে ও তোমাদেরকে বলছেন, “পরকালের পরম শান্তির নিবাস আমি সে সকল লোকদের জন্য (নির্ধারিত) করব যারা পৃথিবীতে আত্মম্ভরিতা করতে ও বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে চায় না। সংযমশীল লোকেরাই পরিণামে কল্যাণ লাভ করে থাকে।” তোমরা ভবিষ্যতে যেসব বিজয় লাভ করবে তা আমি দেখতে পাচ্ছি। তোমরা আমার পর মুশরিক হয়ে যাবে, সে আশংকাও আমার নেই। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে, আমার পর তোমরা ধন-সম্পদের মায়ামোহে মুগ্ধ না হয়ে পড়, এ নিয়ে তোমরা পরস্পর রক্তপাত ঘটাতে প্রবৃত্ত না হও এবং সে অপকর্মের অবশ্যম্ভাবী প্রতিফলস্বরূপ পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ন্যায় তোমরা বিধ্বস্ত হয়ে না যাও।

তোমরা আমার অনুপস্থিত সাহাবীদের আমার সালাম পৌঁছে দেবে। আর আজ থেকে কিয়মত পর্যন্ত যারা আমার প্রচারিত দ্বীনের অনুসরণ করবে, তোমাদের মাধ্যমে তাদের প্রতিও আমার সালাম অনন্ত-অফুরন্ত দোয়া।”

মহানবীর এক গল্পে আবু বকর (রা) কাঁদলেন

মহানবীর (সা) চির বিদায়ের পাঁচ দিন আগের কথা।

সেদিন মহানবীর (সা) পীড়ার তীব্রতা খুবই বৃদ্ধি পেল। রোগ-যন্ত্রণায় তিনি অস্থির।

কিন্তু এর মধ্যেও তিনি তাঁর শেষ কথাগুলো মানুষকে জানাবার জন্য ব্যস্ত। তিনি সেখানে উপস্থিত মুসলিম নর-নারীদের উদ্দেশ্য করে বললেন,

“তোমাদের আগের জাতিগুলো তাদের পরলোকগত নবী ও বুজুর্গদের কবরগুলোকে উপাসনালয়ে পরিণত করেছে। সাবধান! তোমরা যেন এই মহাপাপে নিজেদের লিপ্ত করো না। খৃস্টান ও ইহুদীরা এই পাপে অভিশপ্ত হয়েছে। দেখ, আমি নিষেধ করছি আমি আমার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। আমি তোমাদেরকে সুস্পষ্টভাবে নিষেধ করে যাচ্ছি, সাবধান আমার কবরকে সিজদাগাহ বানাবে না। আমার এই চরম অনুরোধ অমান্য করলে তজ্জন্য তোমরাই আল্লাহর নিকট দায়ী হবে। হে আল্লাহ, আমার কবরকে ‘পূজাস্থলে’ পরিণত করতে দিও না।”

আর একদিনের কথ।

অসুস্থ মহানবী (সা) মসজিদের মিম্বরে আরোহণ করলেন। সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, “আল্লাহ তাঁর একজন দাসকে দুনিয়ার সমস্ত সম্পদ দান করলেন। কিন্তু সে দাস তা গ্রহণ না করে আল্লাহকে গ্রহণ করলো।”

এই কথা শ্রবণ করে আবুবকর (রা) কাঁদতে শুরু করলেন।

আবুবকর (রা-এর কান্না দেখে অনেকে বলাবলি করতে লাগল, বৃদ্ধের হঠাৎ আজ কি হলো! আল্লাহর নবী একজন লোকের গল্প বলছেন, আর উনি কেঁদে আকুল হচ্ছেন!

এ যে ছিল মহানবীর আশু বিদায়ের ইঙ্গিত, তা অনেকেই বুঝতে পারেননি।

‘এই শেষ ভ্রাতৃবর্গ, এই শেষ’

সেদিন মহানবী (সা)-এর পীড়ার ১১তম দিন।

অসুস্থতা সত্ত্বেও এতদিন মহানবী (সা) মসজিদে নববীর নামাযের জামায়াতে নিজেই ইমামতি করে এসেছিলেন। আজকেও তিনি উঠেছেন নামাযের জন্যে। ওজু করতে লাগলেন।

মাথা ঘুরতে লাগল তাঁর।

পরপর তিনবার চেষ্টা করেও তিনি পারলেন না ওজু করতে।

ক’দিন ধরে তাঁর ব্যাধির তীব্রতা ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠেছিল। খাইবারের সেই ইহুদীনির খাওয়ানো বিষের জ্বালাও মারাত্মক হয়ে উঠেছিল। আজ অবশেষে তিনি পারছেন না সাহাবীদের সাথে নামাযে শরিক হতে।

জামায়াতে উপস্থিত সাহাবীদের তিনি বলে পাঠালেন, ‘আবু বকরকে নামাযে ইমামতি করতে বলো।’

আবু বকরকে নবীর স্থানে ইমামতিতে দাঁড়াতে দেখে সাহাবীরা ধৈর্য আর রাখতে পারলেন না। কান্নায় আকুল হলেন সবাই।

এর মধ্যেই ধৈর্যের মহাপ্রতীক আবু বকর (রা) নামাযের ইমামতি শুরু করে দিলেন। এ সময় মহানবী (সা) একটু আরামবোধ করলেন্

সঙ্গে সঙ্গেই তিনি দু’জন আত্মীয়ের কাঁধে ভর দিয়ে মসজিদে এলেন।

আবু বকররের ইমামতিতে তখন নামায চলছিল।

মহানবী (সা)-কে জায়গা ছেড়ে দেবার জন্যে সরে দাঁড়াচ্ছিলেন আবু বকর (রা)। মহানবী (সা) তাঁকে নিষেধ করলেন এবং মহানবী (সা) আবু বকরের পাশে বসে নামায পড়লেন।

নামাযের পর মহানবী (সা) ফিরে বসে সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘হে মুসলিমগণ, আমি তোমাদেরকে আল্লাহর হাতে সমর্পণ করে যাচ্ছি। তাঁর আশ্রয় ও তাঁর সাহায্যের কাছে তোমাদের সঁপে দিচ্ছি। আল্লাহই তোমাদের রক্ষা করবেন। তোমরা নিষ্ঠা, ভক্তি ও সততার সাথে তাঁর আদেশ পালন করতে থেকো। তাহলে তিনি তোমাদের রক্ষা করবেন। এই শেষ ভ্রাতৃবর্গ, এই শেষ।”

বেদনা-বিধুর সেই সোমবার

সেদিন সোমবার।

চরম বেদনা-বিধুর এক সোমবার।

চির বিদায়ের দিন মহানবীর।

তখন সুবহে সাদিক।

মসজিদে নববীতে ফজরের জামায়াতে সমবেত হয়েছেন সাহাবীরা।

নামায তখন আরম্ভ হয়েছে।

এ সময় মহানবীর হৃদয় ব্যাকুল হয়ে উঠল তাঁর পরেও আল্লাহর বান্দারা কিভাবে মহাপ্রভুর উপাসনায় লিপ্ত থাকে তা দেখার জন্য।

তিনি তাঁর কামরার পর্দা তুলে দিতে বললেন। পর্দা উঠে যেতেই মসজিদে নববীতে সাহাবীদের নামাযের জামায়াত দৃশ্যমান হয়ে উঠল।

এই নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখে সেই অন্তিম সময়েও মহানবীর মুখ-মণ্ডলের রোগ-ক্লিষ্টতা যেন দূর হয়ে গেল। আনন্দ-উৎসাহে দীপ্ত হয়ে উঠল তাঁর বদনমণ্ডল। ঠোঁটে দেখা দিল তাঁর হাসির রেখা।

সাহাবীদের দিকে চেয়ে শেষবার যেন হাসলেন মহানবী (সা)।

সেই শেষ দিনের স্নেহের দুলালী ফাতিমা (রা)।

যন্ত্রণাকাতর পিতার দিকে চেয়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘হায়, আমার পিতা না জানি কত কষ্ট পাচ্ছেন।’ স্নেহের দুলালী কন্যা ফাতিমার এই বিলাপ শুনে মহানবী বললেন, ‘ফাতিমা, আর অল্প সময় তোমার পিতার কষ্ট, আজকের পর আর কষ্ট নেই।’

মহানবীর পাশে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা)। যন্ত্রণা-পীড়িত মহানবীর একটা অভিপ্রায় তিনি বুঝলেন। উম্মুল মুমিনীন একটা মেছওয়াক চিবিয়ে মহানবীর হাতে দিলেন। তা নিয়ে মহানবী (সা) ধীরে দাঁতে বুলালেন। নিকটে পানির একটা পাত্র ছিল। পাত্র থেকে হাতে করে পানি নিয়ে মুখে দিতে দিতে তিনি বললেন, “মৃত্যুর অনেক কষ্ট। লা’ ইলাহা ইল্লাল্লাহ। হে আল্লাহ আমাকে মৃত্যু যন্ত্রণা সহ্য করার শক্তি দান কর।”

দিনের তখন তৃতীয় প্রহর শেষ হতে যাচ্ছে। মহানবী (সা) বার বার অচেতন হয়ে পড়ছেন। প্রতিবার চেতনা ফিরে আসার পরই তিনি বলছেন, “হে আল্লাহ, হে আমার পরম বন্ধু, হে আমার পরম সুহৃদ তোমার সঙ্গে তোমার সন্নিধানে।”

মহানবীর পরম স্নেহভাজন হযরত আলী (রা)-এর কোলে তখন মহানবীর মাথা। চোখ মেললেন মহানবী (সা) এবং আলীর দিকে তাকালেন। বললেন, “সাবধান, দাস-দাসীদের প্রতি নির্মম হয়ো না।’

মহানবীর চির বিদায়ের অন্তিম মুহূর্ত।

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা) মহানবীর মাথা কোলে নিয়ে বসে আছেন। তখন শেষবারের মত মহানবী (সা) চোখ খুললেন। উচ্চকণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘নামাজ, নামাজ সাবধান! দাস-দাসীদের প্রতি সাবধান!’ এবং মহানবীর কণ্ঠে উচ্চারিত হলো, ‘হে আল্লাহ, হে আমার পরম সুহৃদ!’

এটাই ছিল রাহমাতুললিল আলামিনের শেষ নিঃশ্বাসের শেষ কথা।

মহাপ্রভুর উদ্দেশ্যে চির বিদায় ঘটল জগতের শেষ নবী, আশরাফুল আম্বিয়া, রাহমাতুললিল আলামিন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের। ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

নতুন ইকরামা

ইকরামা বিন আবু জাহল পালাচ্ছে।

মহানবীর মক্কা বিজয়ের পর স্বাভাবিকভাবেই সে মনে করল তার আর রক্ষা নেই।

মহানবী (সা) ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে তার অপরাধ সীমাহীন।

মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে মহানবী (সা) মক্কাবাসীরা অস্ত্র হাতে না নিলে তাদের জন্যে শান্তি ও নিরাপত্তা ঘোষণা করেছিলেন। এ সময় ইকরামা মুসলিম বাহিনীকে আক্রমণ করে। দু’জন মুসলিম শহীদ হওয়া ছাড়াও আরও কয়েক ডজন লোক আহত হয় তার কারণে।

এছাড়া বদর, উহুদ, খন্দক ও মুসলমানদের আশ্রিত বানু খোজায়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে সে চরম বৈরিতা ও নৃশংসতা প্রদর্শন করেছে।

সুতরাং পালাচ্ছে সে।

জিদ্দার উপকূল থেকে নৌকা নিয়ে সে পালাচ্ছে আরব ভূমি থেকেই।

কিন্তু পার হতে পারল না সে লোহিত সাগর। প্রবল বাতাস তার নৌকা আবার ফিরিয়ে আনল জিদ্দা উপকূলে। শত চেষ্টা করেও সে রোধ করতে পারল না নৌকার পেছন গতি।

কূলের কাছাকাছি এসে দেখল তীর থেকে তার স্ত্রী উম্মে হাকিম তাকে কাপড় উড়িয়ে ডাকছে।

ইকরামা তীরে নামলে তার স্ত্রী তাকে বলল, ‘আমি সেই মহানুভবের কাছ থেকে এসেছি যিনি সকল মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম ও সবচেয়ে বেশী আত্মীয়তার বন্ধন মজবুতকারী। আমি তার নিকট থেকে তোমার নিরাপত্তা লাভ করেছি। তুমি রাসূলুল্লাহর কাছে চলো।’

ইকরামা তার স্ত্রীর সাথে হাজির হলো মহানবী (সা)-এর দরবাবে।

আমৃত্যু বৈরী সেই আবু জাহেলের পুত্র ইমরামা। এই ইকরামাও বৈরিতার কোন কিছুই বাদ রাখেনি।

সেই ইকরামা সমীপবর্তী হলেন মহানবীর। বেশ দূরে থাকতেই ইকরামাকে চিনতে পারলেন মহানবী (সা)। উৎসাহ আগ্রহে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ছেন তিনি।

দ্বিধা, সংকোচ, ভয় সব মিলিয়ে পদক্ষেপগুলো জড়িয়ে পড়ছে ইকরামার। এগুতে যেন কষ্ট হচ্ছে তার। উঠে দাঁড়িয়ে মহানবী (সা) দু’হাত বাড়িয়ে ছুটলেন ইকরামার দিকে। দ্রুততার কারণে তাঁর গায়ের চাদর খসে পড়ে গেল গা থেকে।

মহানবী (সা) জড়িয়ে ধরলেন ইকরামাকে। বললেন, ‘খোশ আমদেদ, বিদেশী সওয়ার।’

ইকরামা তার স্ত্রীর দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘সে জানতে পেরেছে, আপনি আমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন।’

‘সে সত্য বলেছে।’ বললেন মহানবী (সা)। আনন্দে উজ্জল হয়ে উঠল ইকরামার মুখ। লজ্জা-বেদনায় নুয়ে গেল ইকরামার মাথা। ভেজাকণ্ঠে বললেন, “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ এক। তাঁর কোন অংশীদার নেই এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, অবশ্যই আপনি তাঁর বান্দাহ ও রাসূল। হে আল্লাহর রাসূল, এর আগে আমি ইসলাম-দুশমনির বহু প্রমাণ দিয়েছি। এখন আমার আশা, আজ পর্যন্ত আমি আপনার সাথে যে শত্রুতা করেছি, যত যুদ্ধে আপনার বিরুদ্ধে লড়েছি, হক পথে যত বাধা আরোপ করেছি, সেসব ক্ষমা করে দিন। আমার জন্য আল্লাহর কাছে মাগফিরাত কামনা করুন।“

আল্লাহর রাসূল দু’হাত তুললেন। ক্ষমা প্রর্থনা করলেন তিনি আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের কাছে ইকরামার জন্যে।

আনন্দাশ্রুতে ভরে গেল ইকরামার দু’চোখ।

আরজ করলেন তিনি মহানবীকে, ‘হে আল্লাহর রাসূল, এখন কিছু আপনি আমাকে শিখিয়ে দিন যা আমি সবসময় আমল করতে পারি।

রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “খালিস অন্তরে (কথা ও কাজে) আল্লাহর ওয়াহদানিয়াত বা একত্ব এবং আমার রিসালাতের সাক্ষ্য দিতে ও আল্লাহর পথে জিহাদ করতে থাকো।”

ইকরামা আবেগ-কম্পিত কণ্ঠে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আল্লাহর কসম, আমি আজ পর্যন্ত যত সম্পদ দাওয়াতে হকের বাধা দানে ব্যয় করেছি, তার চেয়ে দ্বিগুণ এখন আমি আল্লাহর পথে ব্যয় করবো। যত লড়াই আমি হকের বিরুদ্ধে লড়েছি, এখন আল্লাহ্‌র পথে তার দিগুণ জিহাদ করবো। আল্লাহর রাসূল (সা) আবার দোয়া করলেন ইকরামার জন্যে।

ইকরামা যখন মহানবীর কাছ থেকে ফিরছিলেন, তখন তার দু’গণ্ড বেয়ে নামছিল আবিরাম অশ্রুধারা। কি এক স্বর্গীয় নূরের আলোতে তাঁর মুখমণ্ডল দীপ্ত হয়ে উঠেছে। ইকরামার হলো নতুন জন্ম-নতুন এক ইকরামা তিনি।

ইকরামার ওয়াদা পালন

ইসলাম গ্রহণের সময় ইকরামা বিন আবু জাহল বলেছিলেন, ইসলামের বিরুদ্ধে তিনি যত যুদ্ধ করেছেন, যত অর্থ খরচ করেছেন, তার দ্বিগুন তিনি খরচ করবেন ইসলামের জন্যে।

আমৃত্যু কথাটা মনে রেখেছেন ইকরামা বিন আবু জাহল।

হযরত আবু বকর (রা)-এর খিলাফতকালে ভণ্ড নবীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ব্যস্ত ছিলেন ইকরামা। এ জন্যে গঠিত ১১টি বাহিনীর একটির সেনাপতি ছিলেন তিনি। ইয়ামামা থেকে জর্ডান, জর্ডান থেকে ইয়েমেন- এই বিস্তৃত অঞ্চলে তিনি যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁর বাহিনীর গোটা খরচ তিনি নিজের অর্থ থেকে ব্যয় করেছেন, বায়তুল মাল থেকে তিনি এক পয়সাও নেননি। ভণ্ড নবীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষে আমর ইবনুল আসের নেতুত্বাধীন সিরিয়াগামী বাহিনীতে শামিল হলেন ইকরামা (রা) একজন সেনাধ্যক্ষ হিসেবে।

সিরিয়াগামী বাহিনী সমবেত হয়েছে মদীনার উপকণ্ঠে।

এ বাহিনীর পরিদর্শনে বেরিয়েছেন আমীরুল মুমিনীন হযরত আবু বকর (রা)।

এক তাঁবু তাঁর দৃষ্টিগোচর হলো যার চারদিকে ঘোড়া আর ঘোড়ার মিছিল। আর দেখলেন, বর্শা, তরবারী এবং অন্যান্য যুদ্ধ সরঞ্জামের বিশাল স্তূপ সেখানে।

হযরত আবু বকর এলেন সে তাঁবুর কাছে। উঁকি দিলেন ভেতরে। দেখতে পেলেন ইকরামা (রা)-কে।

তিনি জানতে পারলেন, এসব ঘোড়া ও সরঞ্জাম ইকরামা নিজ অর্থে কিনেছেন যুদ্ধের জন্যে।

হযরত আবু বকর (রা) ইকরামাকে সালাম করলেন এবং বললেন, “ইকরামা তুমি এই যুদ্ধাস্ত্র ও সরঞ্জামাদি ক্রয়ের জন্যে বিপুল অর্থ খরচ করেছো। আমি চাই, এর একটা অংশ বায়তুল মাল থেকে তুমি নাও।”

ইকরামা (রা) আরজ করলেন, “হে খলিফাতুর রাসূল, আমার নিকট এখনও দু’হাজার দিনার নগদ রয়েছে। আমার সম্পদ আমি আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফ করে দিয়েছি। বায়তুল মালের উপর বোঝা আরোপ করা থেকে আমাকে মাফ করুন।”

হযরত আবু বকর (র) আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। দু’হাত তুলে তিনি দোয়া করলেন ইকরামার জন্যে।

‘আজ আল্লাহর জন্যে জীবন বিলিয়ে দেবোনা?’

আজনাদাইনের যুদ্ধ শেষ।

দামেশক বিজয় সম্পূর্ণ হয়েছে।

মুসলিম বাহিনী জর্দানের ফাহলে।

ছোট মুসলিম বাহিনী ৮০ হাজার রোমক সৈন্যের মুখোমুখি।

সম্মুখ সমরে ভীত রোমক বাহিনী বীরত্বের বদলে বেছে নিল ষড়যন্ত্রের পথ।

এক অন্ধকার রাত।

রোমক বাহিনী এসে আপতিত হলো মুসলিম বাহিনীর উপর।

ভীষণ যুদ্ধ শুরু হলো।

যুদ্ধ চলল সে রাত এবং পরের গোটা দিন। এক ইকরামা ইবনে আবু জাহেল যেন দশ ইকরামায় পরিণত হয়েছেন। যেদিকে তিনি ছুটছেন, লাশের সারি পড়ে যাচ্ছে। যুদ্ধের স্রোত তাকে মূল বাহিনী থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। সামনে তাঁর বিরাট এক শত্রু ব্যুহ।

ঢুকে পড়লেন তিনি সে শত্রু ব্যুহে।

তাঁর লক্ষ্য শত্রু নিধন। নিজের প্রতি কোন খেয়াল তাঁর নেই। আঘাতে আঘতে ক্ষত-বিক্ষত হতে লাগল তাঁর দেহ। সাথীরা চিৎকার করে বলল, “ ইকরামা আল্লাহকে ভয় কর। এভাবে নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে নিপতিত করা না। আবেগকে বুদ্ধির উপর বিজয়ী হতে দিও না।”

ইকরামা তার তরবারী না থামিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন, “হে লোকেরা, আমি লাত-উজ্জার খাতিরে জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতাম। আজ আল্লাহ ও রাসূলের (সা) জন্যে জীবন বিলিয়ে দেব না? আল্লাহর কসম, তা কখনো হবে না।”

রোমক সৈন্যেরা তখন পিছু হটতে শুরু করেছে। যুদ্ধে তাদের শোচনীয় পরাজয় ঘটল। মাত্র কতিপয় সৈন্য ছাড়া গোটা রোমক বাহিনী নিশ্চি‎হ্ন হয়েছিল ঐ যুদ্ধে। শহীদ হতে চাইলেও এ যুদ্ধেও ইকরামা গাজী হয়ে ফিরলেন।

শাহাদাতের বাইয়াত

ইয়ারমুকের ভয়াবহ রণক্ষেত্র।

রোমক সম্রাটের ২ লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী অতুল সমর-সম্ভার নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে সমবেত।

তাদের মুকাবিলায় দাঁড়িয়েছে খালিদ বি ওয়ালিদের নেতৃত্বে ৪০ হাজার সৈন্যের মুসলিম বাহিনী।

দুই পক্ষ থেকেই শুরু হয়েছে মরণপণ যুদ্ধ। যুদ্ধের এক পর্যায়ে বিশাল রোমক বাহিনীর চাপে মুসলিম বাহিনীর ব্যুহগুলো ভেঙে পড়ার উপক্রম হলো।

খোদ সেনাপতির তাঁবু বিপন্ন হয়ে উঠল।

ইকরামা বিন আবু জাহলের হৃদয়ের সব আবেগ যেন উথলে উঠল। নিজের ঘোড়া হাঁকিয়ে অগ্রসর হলেন সামনে এবং উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন, “হে রোমকরা, আমি কোন এক সময় স্বয়ং রাসূলের (সা) বিরুদ্ধে (কুফরী অবস্থায়) লড়াই করেছি। আজ কি তোমাদের মুকাবিলায় আমার কদম পিছু হটতে পারে? আল্লাহর কসম, এমনটি কখনও হবে না।”

বলে তিনি পেছনে তাকিয়ে তাঁর বাহিনীর উদ্দেশ্যে বললেন, “এসো, কে আমার হাতে মৃত্যুর বাইয়াত করবে?”

চারজন অগ্রসর হলো তাঁর দিকে তাঁরা ইকরামার হাতে হাত রেখে শাহাদাতের বাইয়াত গ্রহণ করল। এই চারজনের মধ্যে দু’জন ছিল ইকরামার দুই ছেলে। তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল খালিদ ইবনে ওয়ালিদের তাঁবু লক্ষ্য করে এগিয়ে আসা রোমক সৈন্যদের উপর। শুরু হলো তাদের মরণপণ লড়াই।

এক এক করে তারা শহীদ হলেন অথবা শুরুতর আহত হয়ে লড়াই করতে অক্ষম হয়ে পড়লেন। গুরুতর আহত ছিলেন ইকরামার দুই পুত্র। ছুটে এলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ। নিহতের স্তূফে পাওয়া গেল হযরত ইকরামার (রা) লাশ। তাঁর নিঃশ্বাস তখনও ছিল। হযরত খালিদ তাঁর মাথা কোলে তুলে নিলেন্ তাঁর মুখে ফোটা ফোটা পনি দিতে দিতে বললেন, “আল্লাহর কসম, ইবনে হানতামার (হযরত উমর ফারুকের) ধারণা সঠিক প্রমাণিত হয়নি। তাঁর ধারণা ছিল যে, বনি মাখজুমীরা শাহাদাত লাভ করতে চায় না।”

একটি বক্তৃতা ও কাব্য প্রতিযোগিতা

মক্কা বিজয় ও হুনাইন যুদ্ধের পর আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মদীনায় প্রতিনিধিদল আসার হিড়িক পড়ে গেল। কেউ এল ইসলাম গ্রহণের জন্যে, কেউ এল মহানবীর সাথে দেখা করে সব বিষয় অবহিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেবার লক্ষ্যে। আরবের একটি বড় ও প্রভাবশালী গোত্র বনু তামিম। সে গোত্র থেকে প্রায় ৮০ জনের একটি প্রতিনিধিদল এল মদীনায়।

বনু তামিমের যেমন অর্থ-বিত্ত আছে, তেমনি ভাষা ও কবিত্বের প্রতিভা নিয়ে তারা দারুণ অহংকারী। এ ব্যাপারে গোটা আরবের কাউকেই তারা পাত্তা দেয় না। তারা মনে করে ভাষা ও কবিত্বের প্রতিযোগিতায় তাদের কোন প্রতিদ্বন্দী নেই।

মহানবীর (সা) সাথে আলোচনায় বসার পর তারা মহানবীর (সা) কাছে প্রস্তাব করল, আপনাদের সাথে প্রথমে আমাদের কীর্তিগাথা নিয়ে কাব্য প্রতিযোগিতা হবে। যদি তাতে আপনারা জিতে যান, তাহলে ইসলাম নিয়ে কথা বলব। উত্তরে মহানবী (সা) বললেন, গর্ব-আহংকার প্রদর্শন এবং কবিতাবাজির জন্যে আমি প্রেরিত হইনি। তবে তোমরা যদি পীড়াপীড়ি কর, তাহলে শুন, এক্ষেত্রেও আমরা দুর্বল ও অসমর্থ নই।

শুরু হলো বক্তৃতা ও কাব্য প্রতিযোগিতা। বনু তামিমের পক্ষ থেকে দাঁড়ালেন তাদের শ্রেষ্ঠ ভাষাশিল্পী ও বাগ্মী আতারফ বিন হাজির। তিনি তার স্বগোত্রের মান-মর্যাদা, ক্ষমতা-প্রভাব, বংশ-গৌরব, বিত্ত-বৈভব, বীরত্ব ও মেহমানদারী নিয়ে অলঙ্কৃত ভাষায় ওজস্বী বক্তৃতা দিয়ে বিজয়ের গর্ব নিয়ে বসে পড়লেন। তিনি বসলে মহানবী (সা) তাঁর সাহাবী সাবিত বিন কায়েসকে আতারফের জবাব দিতে নির্দেশ দিলেন। সাবিত বিন কায়েস দাঁড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা কীর্তন, রিসালাত ও দাওয়াতে হকের বর্ণনা, আল-কুরআনের অবতীর্ণ হওয়া এবং মুহাজির ও আনসারদের চরিত্র ও কাজে এমন অলংকারপূর্ণ ভাষায় বাগ্মিতার সাথে বর্ণনা করলেন যে, গোটা মজলিস মন্ত্রমুগ্ধের মত নিশ্চুপ হয়ে গেল।

বক্তৃতা প্রতিযোগিতার পর শুরু হলো কাব্য প্রতিযোগিতা।

বনু তামিমের পক্ষ থেকে দাঁড়ালেন তাদের শ্রেষ্ঠ কবি যবরকান বিন বদর। তিনি তাঁর গোত্রের আকাশস্পর্শী প্রশংসা-সম্বলিত কবিতা পাঠ করলেন।

যবরকান বসলে মহানবী (সা) সাহাবী কবি হাসসান বিন সাবিতকে জবাব দেয়ার জন্যে উঠে দাঁড়াতে বললেন। হাসসান বিন সাবিত উঠে দাঁড়িয়ে আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং দাওয়াতে হক-এর উপর এমন ছন্দোবদ্ধ এবং মাধুর্যপূর্ণ ও প্রভাবশালী কবিতা পাঠ করলেন যে, যবরকানের কবিতা ম্লান হয়ে গেল।

শেষ হলো প্রতিযোগিতা।

গোটা মজলিস তখন নীরব-নিস্তব্ধ।

উঠে দাঁড়াল বনু তামিম-এর একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। উচ্চকণ্ঠে বললেন তিনি, “পিতার কসম! মুহাম্মাদের (সা) খতিব আমাদের খতিব থেকে আফজাল এবং তাঁর কবি আমাদের কবি থেকে উত্তম। তাঁদের কণ্ঠস্বর আমাদের কণ্ঠস্বর থেকে চিত্তাকর্ষক ও মিষ্টি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ ইবাদাতের যোগ্য নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।”

এই ব্যক্তি কিরাসুল আকরা তামিমী। তিনি বনু তামিম-এর নেতা। কিরাসুল আকরা থাকতেই বনু তামিম প্রতিনিধি দলের সকল সদস্য একবাক্যে বলে উঠলেন, “আপনি সত্য বলেছেন, আপনি সত্য কথা বলেছেন।”

অতঃপর বনু তামিমের সকলে মহানবীর হাতে হাত রেখে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হলেন।

হযরত উমর (রা)-এর কঠোর সিদ্ধান্ত

হযরত আবু বকর (রা)-এর খিলাফতকাল। দুই সাহাবী আকরা বিন হারিস এবং আইনিয়া বিন হাসান আবু বকরের দরবারে হাজির হলেন।

মহানবী (সা) তালিফে কুলূব হিসেবে যাদের সাহায্য করতেন, আকরা তাদের একজন। তারা খলিফা আবু বকরের কাছে ‘জায়গীর‘-এর আবেদন জানালেন। আবু বকরের দরবারে তখন উমর ফারুক (রা) হাজির ছিলেন। তিনি আকরা (রা)-কে উদ্দেশ্য করে বললেন, “রাসূলুল্লাহ (সা) তোমাকে তালিফে কুলূব করতেন। এখন তোমার পরিশ্রম করা উচিত।” আবু বকর (রা) রাসূল (সা)-এর আমলের সকল দান ও উপঢৌকন বহাল রাখেন এবং আকরা ও আইনিয়া হাসানের আবেদন অনুসারে তাদের জমি বরাদ্দের লিখিত নির্দেশ দিলেন।

এর অনেক পরের ঘটনা।

তখন উমর ফারুক (রা)-এর শাসনকাল।

আকরা (রা) এবং আইনিয়া হাসান এলেন তাঁর কাছে এবং আবেদন করলেন আবু বকর (রা) কর্তৃক নির্দেশ বহাল রাখার জন্যে।

উমর (রা) তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করলেন এবং বললেন, “আল্লাহ ইসলামের বিজয় দিয়েছেন এবং তোমাদের থেকে মুখাপেক্ষীহীন করেছেন। এখন তোমরা (জায়গীর ও উপঢৌকন ছাড়া) ইসলামের উপর মজবুতভাবে দাঁড়িয়ে যাও। নচেৎ আমাদের ও তোমাদের মধ্যে তরবারিই ফায়সালা করবে।”

উমর (রা)-এর এই সিদ্ধান্ত কঠোর হলেও তার মধ্যে কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়াই হলো না। আকরা (রা) হাসিমুখে ও আন্তরিকতার সাথে এই সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন। অতঃপর জিহাদের ময়দান হলো আকরা (রা)-এর স্থান। যুদ্ধরত অবস্থায়ই তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

উপযুক্ত খাজনা আদায়কারী

তখন নবম হিজরী সাল।

মহানবী বিভিন্ন অঞ্চলে যাকাত ও খারাজ আদায়কারী নিয়োগ করছেন। যারা গোত্রে গোত্রে ঘুরে যাকাত ও খারাজ আদায় করে মহানবীর বাইতুলমালে জমা দেবেন।

যাকাত ও খারাজ আদায়কারী নিয়োগের লক্ষ্যে মহানবী (সা) ডেকে পাঠালেন খাজরাজ গোত্রের বনু সালেমের নব্য যুবক উবাদাহ বিন সামিতকে। দীর্ঘদেহী ও দোহার গড়নের উবাদাহ হাজির হলেন মহানবীর দরবারে। মহানবী (সা) তাঁকে পদ ও দায়িত্বের কথা বুঝিয়ে বললেন, “নিজের দায়িত্ব পালন-কালে আল্লাহকে ভয় করবে। কিয়ামতের দিন কোন চতুষ্পদ জন্তুও যেন তোমার বিরুদ্ধে কোন ফরিয়াদ নিয়ে না আসে।”

শুনে হযরত উবাদাহ (রা) বিন সামিত কেঁদে ফেললেন। বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার পিতা-মাতা আপনার উপর কুরবান হোন। আল্লাহর কসম, দু’জন মানুষের শাসক বা রাজস্ব আদায়কারী হওয়ারও ইচ্ছা আমার নেই।” কেউ কোন পদ চাইলে রাসূলুল্লাহ সেই পদ তাকে দিতেন না। উবাদাহর কথায় তিনি খুশী হলেন। এই পদের জন্যে তাকেই উপযুক্ত মনে করলেন।

কবিতার বিনিময়ে আল কুরআন

আবু আকিল লবিদ (রা) বিন রাবিয়াহ আমেরী আরবের জাহেলী যুগের একজন শ্রেষ্ঠ কবি। সেই যুগেও সবচেয়ে সম্মানিত কা’বাঘরে যে সাত কবির কবিতা টাঙ্গিয়ে রাখা হতো, তাদের একজন কবি লাবিদ। কবি লাবিদের কয়েকটি কবিতা মহানবী (সা) খুবই পছন্দ করতেন। সেগুলোর মধ্যে জাহেলী যুগের লিখা হলেও একটা পংক্তি ছিল তাঁর খুবই পছন্দ। যার অনুবাদ-“সতর্ক থেকো, আল্লাহ ছাড়া সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে।” স্বয়ং মহানবীর উক্তি : কবিদের কবিতার মধ্যে লাবিদের এই কবিতা খুবই ভালো। সেই কবি লাবিদ বদলে গেল ইসলাম গ্রহণের পর। ৯ম হিজরী সালে ১১৩ বছর বয়সে মদীনায় এসে মহানবীর কাছে ইসলাম গ্রহণ করেন তিনি।

ইসলাম গ্রহণের পর আরও ৩২ বছর জীবিত ছিলেন কবি লাবিদ। এই দীর্ঘ সময়ে একটি অথবা দু’টি কবিতা লিখেন তিনি।

তখন খলিফা উমর ফারুকের খিলাফতের সময়।

খলিফা একদিন কবি লাবিদকে জিজ্ঞাসা করে পাঠালেন, ‘ইসলামী যুগে তিনি কোন্ কবিতা রচনা করেছেন।’

কবি লাবিদ উত্তরে তাঁকে জানালেন, ‘কবিতার বিনিময়ে আল্লাহ তাঁকে সূরা বাকারাহ এবং সূরা আলে-ইমরান প্রদান করেছেন।’

অর্থাৎ অপরূপ আল-কুরআন পাবার পর তিনি আর কবিতা রচনার প্রয়োজন অনুভর করেননি।

আকাবার প্রথম বাইয়াত

ইসলাম-পূর্ব জাহেলী যুগ।

মদীনার ছয় যুবক হজ্বে এসেছেন। তখন মদীনার নাম ছিল ইয়াসরিব।

সে যুগেও হজ্ব হতো, কিন্তু জাহেলী রীতি অনুসারে।

মক্কার আকাবা নামক স্থানে তাঁবু গাড়লেন মদীনার সেই যুবকরা।

এই ছয়জন যুবক একদিন গম্ভীর আলোচনায় মশগুল, একজন অতিথি এলেন তাঁবুর দরজায়।

শ্রদ্ধা জাগানো সুন্দর সৌম্য-দর্শন এক অতিথি।

অতিথি সালাম দিলেন যুবকদের উদ্দেশ্যে। তারপর বললেন, ‘আপনারা কি আমার কথা শুনবেন?’

মিষ্টি কণ্ঠস্বর অতিথির।

যুবকরা সমস্বরে বলে উঠলো, ‘অবশ্যই অবশ্যই।’

অতিথি ব্যক্তিটি ছিলেন মহানবী (সা)।

তিনি তখন ছয় যুবককে মানুষের জন্যে রাব্বুল আলামিনের খোশখবর শোনালেন, তাওহীদের দাওয়াত গ্রহণের উৎসাহ দিলেন এবং বললেন, ‘আমি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহর বান্দাদের পথ প্রদর্শনে নিয়োজিত রয়েছি।’ ছয়জন যুবকই মহানবীর কথা গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। আল্লাহর রাসূলের কথা শেষ হতেই তাঁরা বললেন, ‘আল্লাহর যে কালাম আপনার উপর অবতীর্ণ হয়েছে, তা থেকে আমাদের কিছু শোনান।’

মহানবীর পবিত্র কণ্ঠে সূরা ইবরাহিম পাঠ হতে লাগলো। কয়েকটি আয়াত পাঠ হতেই চমৎকৃত হয়ে গেলেন ছয় যুবক। তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলেন, “আল্লাহর কসম, এতো সেই নবী যাঁর উল্লেখ সবসময় আমাদের শহরের ইহুদীদের মুখে শোনা যায়। ইসলাম গ্রহণে ইহুদীদের আগে তাদেরই অগ্রসর হওয়া উচিত।”

অতঃপর তারা উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে মহানবী (সা)-কে আরজ করলো, ‘হে মুহাম্মাদ (সা), আমরা আপনার দাওয়াত মনে-প্রাণে গ্রহণ করছি এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ এক আপনি তাঁর রাসূল।’

এই ঘোষণা দেয়ার পর ছয়জনের মধ্য থেকে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও সুদর্শন যুবক আবু উসামা আসয়াদ বিন যুরারাহ মহানবীর দিকে অগ্রসর হয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আপনার হাত সম্প্রসারিত করুন। আমি এই হাতে ইসলামের বাইয়াত করছি।’

মহানবী (সা) সানন্দে তাঁর হাত এগিয়ে দিলেন।

প্রথম বাইয়াত করলেন আসয়াদ বিন যুরারাহ। তারপর তাঁর সাথী পাঁচজন যুবক।

তাঁরা হলেন মদীনার প্রথম মুসলমান।

এইভাবেই এই উদ্যমী যুবকদের মাধ্যমে ইসলামের আলো প্রথম প্রবেশ করে ইয়াসরিব বা মদীনায়।

আল কুরআনের যাদু-স্পর্শ

মদীনায় ইসলামের আলো প্রবেশের পর মহানবীর পক্ষ থেকে সেখানে মুসআব ইবনে উমায়েরকে পাঠানো হলো ইসলামের শিক্ষক হিসেবে। মুসআব শিক্ষাদান ও ইসলামের দাওয়াতের কাজে নিজকে উৎসর্গ করলেন। একদিন তিনি মদীনার বনি জাফর ও বনি আশহাল-এর পল্লীতে গেলেন। তার সাথে ছিলেন বিখ্যাত খাজরাজ গোত্রের বনু নাজ্জারের বিখ্যাত ব্যক্তি আসয়াদ ইবনে যুরারাহ।

তারা দু’জন বনু জাফরের একটা কূপের উপর গিয়ে বসলেন।

বনু আশহালের সরদার সা’আদ বিন মায়াজকে কেউ গিয়ে কথাটা লাগিয়ে দিলো যে, মুসলমানরা মহল্লায় এসে মানুষকে প্ররোচিত করছে।

কথাটা শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন তিনি। অস্ত্র-সজ্জিত হয়ে যাত্রা করলেন সেই কূপের দিকে।

পথিমধ্যে তিনি খবর পেলেন, মুসআবের সাথে তার খালাতো ভাই আসয়াদ ইবনে যরারাহ রয়েছেন। থমকে গেলেন তিনি। তাঁর চাচাতো ভাই উসায়েদ বিন হুজায়েরকে বললেন, আসয়াদ না থাকলে আমিই যেতাম। তুমি গিয়ে ওদের বলে এসো, মানুষকে নষ্ট করার জন্যে ওরা আমাদের মহল্লায় যেন আর না আসে। উসায়েদ দুরন্ত এক সাহসী যুবক।

ভয়াবহ এক বর্শা নিয়ে ছুটলেন বনু জাফরের সেই কূপের উদ্দেশ্যে।

উসায়েদকে এইভাবে আসতে দেখে আসয়াদ ইবনে যারারাহ মুসআবকে বললেন, ‘এই উসায়েদ আওস গোত্রের দুই প্রধানের একজন। তার কাছে আপনাকে উপযুক্ত দাওয়াত পৌঁছাতে হবে।’

‘তাকে একটু বসতে দাও, আমি কথা বলবো।’ বললেন মুসআব।

উসায়েদ এসেই ক্রুদ্ধ কণ্ঠে মুসআবকে বলতে শুরু করলো, ‘তুমি এসেছো দুর্বল লোকদের বোকা বানাবার জন্যে। জীবনের মায়া থাকলে এখনি চলে যাও। আর এদিকে আসবে না।’ মুসআব উসায়েদের কর্কশ ও দ্রুতকণ্ঠের জবাবে নরম ও মমতাভরা কণ্ঠে বললেন, ‘প্রিয় ভাই, আমার কথা শুনুন। পছন্দ হলে গ্রহণ করবেন, না হয় বর্জন করবেন।’

মুসআবের নরম ও মমতাভরা কণ্ঠে উসায়েদের রাগ অকেনখানি পড়ে গেলো। বললো, ‘তুমি যুক্তির কথা বলেছো। কি বলতে চাও বলো।’

মুসআব অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী কণ্ঠে ইসলামের মূল শিক্ষা তুলে ধরলেন এবং পাঠ করলেন আল-কুরআনের কিছু আয়াত।

উসায়েদের রাগ তখন পড়ে গেছে।

শান্ত হয়েছে সে।

মুসআব থামতেই উসায়েদের মুগ্ধ কণ্ঠ বলে উঠলো, “এসব কতই না ভালো জীবনের কথা। কতই না সুন্দর কালাম ওগুলো। তোমাদের ধর্মে প্রবেশের জন্যে কি করতে হয়?”

মুসআব ও আসয়াদ খুশী হয়ে তাকে জানালেন ইসলাম গ্রহণের জন্যে কি করতে হয়।

গোসল করে পবিত্র কাপড় পরে কালেমা পড়ে ইসলাম গ্রহণ করলো উসায়েদ।

ফিরে যাবার সময় উসায়েদ মুসআবকে বললেন, আমি গিয়ে কৌশলে সা’আদ বিন মায়াজকে পাঠাচ্ছি।

উসায়েদকে পাঠিয়ে তার ফেরার জন্য অপেক্ষা করছিলেন সা’দ বিন মায়াজ। উসায়েদ ফিরলে তার মুখের দিকে তাকিয়ে সা’আদ বললেন, ‘তোমাকে অন্য রকমের দেখাচ্ছে। বল কি করে এলে?’

উসায়েদ বললেন, তাদের কথা শুনলাম, ভয়ের কিছুই পেলাম না।

বলে একটু থেমে আবার শুরু করলেন, ‘একটা কথা শুনে এলাম, বনি হারেছার লোকেরা নাকি আসায়াদ ইবনে যারারাকে হত্যা করার জন্যে বের হয়েছে। আপনার খালাত ভাইকে হত্যা করে আপনার বেইজ্জতি করাই তাদের লক্ষ্য।’ শুনে সা’আদ রেগে আগুন হয়ে গেল। বর্শা হাতে ছুটলেন বনি জাফরের সেই কূপের দিকে।

কূপের নিকটবর্তী হয়ে আসয়াদ বিন যরারাহ মুসআবকে জানালেন, ‘যিনি আসছেন সেই সা’আদ বিন মায়াজ তার গোত্রের শীর্ষ ব্যক্তি। তিনি ইসলামে দাখিল হলে গোটা গোত্র তাকে অনুসরণ করবে।’ সা’আদ ইবনে মায়াজ কূপের ধারে এলেন। কবি হারেছার কাউকে কোথাও দেখলেন না। আর নিশ্চিন্তে বসে থাকতে দেখলেন আসয়াদকে। উসায়েদের কথাকে এখন তাঁর এক চাল বলে মনে হলো। ক্রুদ্ধ হলেন তিনি। বললেন তিনি আসয়াদকে, “আবু উসামা, আল্লাহর কসম, তোমার মাঝে আমার আত্মীয়ের সম্পর্ক না থাকলে তুমি কিছুতেই আমার মহল্লায় খারাপ কথা ছড়াবার সাহস পেতে না।”

আসয়াদ (রা) সা’আদ বিন মায়াজের মত ক্রুদ্ধ হলেন না। মিষ্টি হাসলেন শুধু। কোন কথা বললেন না। কথা বললেন মুসআব। মধুর কণ্ঠে সা’আদকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘প্রিয় ভাই, আপনি আমাদের কথা একটু শুনুন। আপনার খারাপ মনে হবে এমন কথা বলবো না। পছন্দ না হলে আমরা চলে যাব।’ সা’আদ বিন মায়াজ বললেন, ‘বড় কায়দা করে কথাগুলো বললে।’

বলে সা’আদ বর্শা মাটিতে গেড়ে বসে পড়লেন। বুঝা গেল শুনতে চান তিনি। মুসআব হৃদয়গ্রাহী ভাষায় ইসলামের শিক্ষা ও সৌন্দর্যের বর্ণনা দিলেন এবং সূরা যুখরুফ বা হামিম থেকে কিছু আয়াত পড়ে শোনালেন।

পবিত্র কুরআনের পাঠ শুরু হতেই সা’আদ এর কঠিন মুখ সহজ হয়ে এল, ভরে গেল হাসি-খুশীতে।

মুসআব কুরআন তেলাওয়াত শেষ করতেই উসায়েদ যা বলেছিল, সা’আদও তাই বললেন। জানতে চাইলেন ইসলাম গ্রহণের নিয়ম-কানুন।

ঠিক উসায়েদের মতই সা’আদ ইবনে মায়াজ গোসল করে পবিত্র কাপড় পরে কালেমা পাঠ করে ইসলামে দাখিল হয়ে গেলেন।

সা’আদ বিন মায়াজ ইসলাম গ্রহণের সাথে গোটা বনু আশহাল গোত্র ইসলাম গ্রহণ করল।