আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – ষষ্ঠ খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

হালিমা আস-সা‘দিয়্যা (রা)


জাহিলী যুগে অভিজাত আরবদের মধ্যে এ প্রথা ও রীতি প্রচলিত ছিল যে, তাদের কোন সন্তান জন্মগ্রহণ করলে তারা ভিন্ন গোত্রের কোন ধাত্রীর হাতে তুলে দিত। তারা মনে করতো, এতে সন্তানের মধ্যে আভিজাত্য ও ভাষার বিশুদ্ধতা সৃষ্টি হয়। মক্কার অভিজাত লোকেরা তাদের শিশু সন্তানকে মরুবাসী বেদুঈনদের নিকট পাঠিয়ে দিত। সেখানে তারা বেদুঈন ধাত্রীদের নিকট দুধ পানের বয়সটি কাটাতো। তারা সন্তানদের জন্য স্বভাবগত বুদ্ধিমতী ও সুরুচির ধাত্রী নির্বাচন করতো। এ নির্বাচনের ক্ষেত্রে ধাত্রীদের উন্নত নৈতিকতা, সুঠাম দৈহিক কাঠামো, বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল ভাষা, সামাজিক সম্মান ও অবস্থানের দিকগুলো প্রাধান্য দিত। এসব গুণ যে মহিলার মধ্যে থাকতো সেই ধাত্রী পেশায় সফল হতো।

দুগ্ধবতী শিশু সন্তানের মায়েরা মরুভূমি থেকে বিভিন্ন শহর ও জনপদে আসতো দুধ পান করাবে এমন শিশুর খোঁজে। সেখান থেকে পারিশ্রমিকের শর্তে শিশু সন্তান সংগ্রহ করে আবার মরুভূমিতে ফিরে যেত। তারা দুধ পান করানোর সাথে সাথে শিশুদেরকে বেদুঈনদের খেলাধুলা, তাঁবু স্থাপনের কলাকৌশল, আদব-আখলাক ও বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জলভাষী। কারণ, আমি কুরাইশ গোত্রে জন্ম ও বানূ সা‘দে দুধ পান ও প্রতিপালিত হওয়ার কথা উল্লেখ করতেন।[সীরাতু ইবন হিশাম-১/১৬৭] তিনি সাহাবীদেরকে বলতেন : ‘আমি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জলভাষী। কারণ, আমি কুরাইশ গোত্রের সন্তান এবং বানূ সা‘দ গোত্রে দুধ পান করে বেড়ে উঠেছি।’ একবার আবূ বকর সিদ্দীক (রা) বললেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনার চেয়ে বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জলভাষী আর কাউকে দেখিনি। তিনি বললেন : এমনটি হতে আমার বাধা কোথায়? আমি কুরাইশ গোত্রের সন্তান এবং বানূ সা‘দে দুধ পান করেছি।[ইবন কাছীর, আস-সীরাহ্ আন-নাবাবিয়্যা-১/১১৫; আস-সীরাহ্ আল-হালাবিয়্যা-১/১৪৬]

আমাদের আলোচ্য হালীমা আস-সা‘দিয়্যা (রা) ছিলেন বানূ সা‘দ গোত্রের রাসূলুল্লাগর (সা) ভাগ্যবতী ধাত্রী তথা দুধ মা। তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে কবি শায়খ ইউসুফ আন-নাবহানী (রহ) বলেছেন :[আন-নাবহানীর “হুজ্জাতুল্লাহি ‘আলাল ‘আলামীন” গ্রন্থের সূত্রে “নিসা’ মিন ‘আসর আন-নুবুওয়াহ” গ্রন্থে উদ্ধৃত। পৃ.১১] (আরবী********)

‘তাঁকে দুধ পান করান পূর্ণ সৌভাগ্যের অধিকারিণী, গোত্রসমীহের মধ্যে উজ্জ্বল চিহ্ন বিশিষ্ট গোত্রের হালীমা।

তাঁর কাছে খাদ্য ছিল অপর্যাপ্ত। অতঃপর তিনি শহরবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী সচ্ছল ব্যক্তিতে পরিণত হন।

তিনি একজন সৌভাগ্যবতী। ভাগ্যগুণে যিনি একজন ভাগ্যবীতে পরিণত হন।’[সীরাতু ইবন হিশাম-১/১৬০]

এই ভাগ্যবতী মহিলা হলেন হালীমা বিনত ‘আবদিল্লাহ ইবন আল-হারিছ আস-সা‘দিয়্যা (রা)। রাসূলুল্লাহর (সা) ধাত্রী মাতা। তাঁর স্বামীর নাম আল-হারিছ ইবন ‘আবদিল ‘উযযা ইবন রিফা‘আ আস-সা‘দী। তাঁর সন্তানরা হলেন : ‘আবদুল্লাহ, উনাইসা ও খুযাইমা, মতান্তরে হুযাফা। শেষোক্তজন আশ-শায়মা নামেও পরিচিত। এঁরা সবাই আল-হারিছের ঔরসজাত সন্তান এবং রাসূলুল্লাহর (সা) দুধ ভাই ও বোন। রাসূলুল্লাহ (সা) ও ‘আবদুল্লাহ একই সাথে দুধ পান করেন। উল্লেখ্য যে, এই আল-হারিছের ডাকনাম যুওয়ায়িব ও আবূ কাবশা ছিল। [প্রাগুক্ত; আনসাবুল আশরাফ -১/৯০-৯১]

হালীমা রাসূলুল্লাহর (সা) চাচাতো ভাই আবূ সুফইয়ান ‘ইবন আল-হারিছ ইবন ‘আবদিল মুত্তালিবের ধাত্রী ও দুধ মা ছিলেন। বানূ সা‘দ গোত্রের এক মহিলা রাসূলুল্লাহর (সা) চাচা হামযা ইবন ‘আবদিল মুত্তালিবের ধাত্রী ও দুধ মা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) যখন হালীমার কাছে তখন একদিন হামযার (রা) দুধ মা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) যখন হালীমার কাছে তখন একদিন হামযার (রা) দুধ মা তাঁকে নিজের বুকের দুধ পান করান। এদিকে রাসূলুল্লাহ (সা) হালীমার নিকট যাওয়ার আগে কিছু দিন আবূ লাহাবের দাসী চুওয়াইবার দুলধ পান করেছিলেন। ছুওয়াইবা কিছুদিন হামযাকেও দুধ পান করিয়েছিলেন। তাই হামযা বানূ সা‘দ ও ছুওয়াইবা দু‘দিক দিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) দুধ ভাই।[রিজানুল মুবাশশিরূন বিল জান্নাহ-১/৭, ২/১৮৯; নিসা’ মিন আসর আন-নুবুওয়াহ পৃ. ১১; সীরাতু ইবন হিশাম-১/১৬১; টীকা নং-৬]

হালীমা রাসূলুল্লাহকে (সা) দুধ পান করিয়েছেন। এ কারণে তিনি ‍দুধ পানকারিণী হিসেবে আরবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধি অর্জন করেছেন। রাসূলুল্লাহকে (সা) তিনি দুধের শিশু হিসেবে যেভাবে লাভ করেন তার একটি বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন : সে ছিল অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষের বছর। আমি বানূ সা‘দের আরো দশজন মহিলার সাথে সাদা রঙ্গের একটি দুর্বল মাদি গাধার উপর সওয়ার হয়ে দুগ্ধপোষ্য শিশুর খোঁজে বের হলাম। আমাদের সাথে একটা বুড়ো মাদি উটও ছিল। আল্লাহর কসম! তার ওলান থেকে এক কাৎরা দুধও বের হচ্ছিল না। ক্ষিদের জ্বালায় আমাদের শিশুদের কান্নাকাটির কারণে আমরা রাতে মোটেও ঘুমোতে পারতাম না্ আমার বুকের ও আমাদের উটনীর দুথে আমার শিশু পুত্র ‘আবদুল্লাহর পেট ভরতো না। তবে আমরা বৃষ্টি ও সচ্ছলতার আশা করতাম। অবশেষে আমরা মক্কায় পৌঁছলাম। আমাদের প্রত্যেকের সামনে শিশু রাসূলুল্লাহকে (সা) উপস্থাপন করা হলো। তিনি ইয়াতীম শিশু- একথা শোনার পর কেউ আর তাঁকে নিতে আগ্রহ দেখালো না। কারণ, আমরা শিশুর পিতা-মাতার নিকট থেকে ভালো কিছু লাভের আশা করতাম। আমরা বলাবলি করতাম : শিশুটি ইয়াতীম। তার মা ও দাদা তেমন কী আর দিতে পারবে? এ কারণে আমরা তাকে অপসন্দ করলাম। এর মধ্যে দলের একমাত্র আমি ছাড়া আর সবাই স্তন্যপায়ী শিশু পেয়ে গেল। যখন আমরা আমাদের গোত্রে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম তখন আমি আমার স্বামীকে বললাম : আল্লাহর কসম! অন্যরা স্তন্যপায়ী শিশু নিয়ে ফিরবে আর আমি শূন্য হাতে ফিরবো, এ আমার মোটেই পসন্দ নয়। আমি এই হাশিমী ইয়াতীম শিশুটির নিকট যাব এবং তাকেই নিয়ে ফিরবো। তিনি বললেন : হাঁ, তুমি তাই কর। হতে পারে তার মধ্যে আমাদের জন্য বরকত ও সমৃদ্ধি রেখেছেন। অতঃপর তার বাড়ীতে গিয়ে নিয়ে এলাম।[আনসার আল-আশরাফ -১/৯৩-৯৪,]

অপর একটি বর্ণনায় এসেছে। হালীমা বলেন : আমি উপস্থিত হলে ‘আবদুল মুত্তালিব স্বাগতম জানিয়ে প্রশ্ন করেন : তুমি কে? বললাম : বানূ সা‘দের এক মহিলা। বললেন : তোমার নাম কি? বললাম : হলীমা।

‘আবদুল মুত্তালিব একটু হেসে বললেন : সাবাশ! সাবাশ! সৌভাগ্য ও বুদ্ধিমত্তা। এমন দু‘টি গুণ যার মধ্যে সে যেন সকল যুগের কল্যাণ ও চিরকালের সম্মান। আবদুল মুত্তালিব (সা‘দ) ও হালীমা (হুলম) শব্দ দু‘টির প্রতি ইঙ্গিত করে। একথা বলেন। তিনি হালীমাকে নবীর (সা) জননী আমিনার ঘরে নিয়ে যান। তাঁর নিকট থেকেই হালীমা শিশু মুহাম্মাদকে গ্রহণ করেন।[প্রাগুক্ত; আবন কাছীর, আস-সীরাহ্-১/১১২-১১৩; আয-যাহাবী, তারীখ আল-ইসলাম-১/৪৫, ৪৬] হালীমার ভাগ্য যে সুপসন্ন ছিল তা সূচনাতেই বিভিন্নভাবে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। যেমন কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, হালীমা যখন আবদুল মুত্তালিবের সাথে নবীর (সা) নিকট পৌঁছেন তখন আবদুল মুত্তালিব এক অদৃশ্য কণ্ঠে নিম্নের শ্লোকগুলোর আবৃত্তি শুনতেহ পান :[নিসা’ মিন ‘আসর আন-নুবুওয়াব।প.-১২] (আরবী*******************)

“নিশ্চয় আমিনার ছেলে মুহাম্মাদ পরম বিশ্বস্ত, সৃষ্টি জগতের মধ্যে সবচেয়ে ভালো এবং ভাদের মধ্যে উত্তম।

হালীমা ছাড়া তাঁকে অন্য কেউ দুধ পান করাবে না। সে পুণ্যবানদের জন্য কত না বিশ্বস্ত!

অশ্লীল দোষ-ত্রুটি থেকে সে মুক্ত এবং যাবতীয় পাপ ও পঙ্কিলতা থেকে পরিচছন্ন।

তুমি তাকে তার নিকট ছাড়া আর কারো নিকট সম্পর্ণ করবে না। মহাপরাক্রমশালী সত্তার নিকট থেকে এ আদেশ ও সিদ্ধান্ত এসেছে।”

নবীকে (সা) গ্রহণের সাথে সাথে হালীমা ও তাঁর স্বামীর নিকট কল্যাণ ও সমৃদ্ধি নেমে এলো। হালীমা শিশু মুহাম্মাদকে (সা) কোলে নিয়ে বুকের সাথে চেপে ধরার সাথে সাথে তাঁর শুকনো বুক দুধে ভরে গেল। তিনি পেট ভরে পান করলেন। তারপর হালীমা তঁর নিজের শিশু সন্তান ‘আবদুল্লাহকে স্তন দিলেন, সেও পেট ভরে পান করলো। তারপর দু‘শিশুই ঘুমিয়ে পড়লো।

হালীমা ও তাঁর স্বামী দু‘জনই ক্ষধা ও পিপাসায় কাতর ছিলেন। যেহেতু তাঁদের মাদী উটটি ওলান ছিল শুকনো। তাঁরা খাবার বা দুধ পাবেন কোথায়? কিন্তু হঠাৎ করে তাদের অবস্থা বদলে গেল। এ সম্পর্কে হালীমা নিজেই বলেছেন : ‘আমার স্বামী আমাদের উষ্ট্রীটির কাছে গিয়ে দেখলেন তার ওলানটি দুধে পূর্ণ হয়ে আছে। তিনি দুধ দুইলেন এবং আমরা দু‘জন পেট ভরে পান করলাম, সে রাতটি আমরদের পরম সুখে কাটলো। সকালে স্বামী আমাকে বললেন : আল্লাহর কসম, হালীমা! জেনে রাখ, তুমি একটি কল্যাণময় শিশু গ্রহণ করেছো।

আমি বললাম : আল্লাহর কসম, আমি তাই আশা করি। তারপর আমরা আমদের পল্লীতে ফেরার জন্য বের হলাম। আমি শিশু মুহাম্মাদকে (সা) নিয়েআমার মাদী গাধাটির উপর উঠে বসলাম। কী আশ্চর্য! সেটি এত দ্রুত চলতে লাগলো যে আমাদের দলের অন্য কারো গাধা তার সাথে পেরে উঠছিল না। এক সময় আমার সঙ্গী-মহিলারা আমাকে বললো : ‍যুওয়ায়িবের মেয়ে! আচ্ছা বলতো, এটা কি তোমার সেই গাধী যার উপর সোয়ার হয়ে তুমি গিয়েছিলে? আমি বললাম : নিশ্চয়, এটা সেই গাধী। তারা বললো : আল্লাহর কসম, তাহলে অন্য কোন ব্যাপার আছে।[সীরাতু ইবন হিশাম-১/১৬৪; উসুদুল গাবা-৫/৪২৭; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৩/২৫৫]

কাফেলা বানূ সা‘দের পল্লীতে পৌঁছলো। সে বছর সেখানে অভাব ও দারিদ্র্যের একটা ছাপ সর্বত্র বিরাজমান ছিল্ হালীমা এই ইয়াতীম শিশুর বরকত ও কল্যাণ প্রত্যক্ষ করতে লাগলেন। সবকিছুতেই তাদের বরকত ও সমৃদ্ধি হতে লাগলো্ তাঁর ছাগল-ভেরা শুকনো চারণভূমিতে অন্যদের ছাগল-ভেড়ার সাথে চরতে যেত। যখন ফিরতো তখন তাঁর গুলোর ওলান দুধে পূর্ণ থাকতো, কিন্তু অন্যদের গুলো যেমন যেত তেমনই ফিরতো। তাই তাঁর গোত্রের লোকেরা তাদের নিজ নিজ রাখালদেরকে বলতো : তোমারেদ কী হয়েছে, আবূ যুওয়ায়িবের মেয়ের রাখাল যেখানে তাঁর ছাগল চরায় সেখানে তোমরা চরাতে পার না? কিন্তু তা করেও তারা দেখলো, তাতে কোন লাভ হয় না।

হালীমার এভাবে দুটি বছর কেটে গেল। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতি দিনই তিনি কল্যাণ ও সমৃদ্ধি দেখেতে পেলেন। এর ভিতর দিয়ে নবীর (সা) দুধ পানের সময় সীমা পূর্ণ হয়ে গেল।

নবী (সা) এমনভাবে বেড়ে উঠলেন যা সচরাচর অন্য শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। হালীমা মনে করলেন, এখন তাঁকে মক্কায় তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত। তিনি এই শিশুর মধ্যে যে শুভ ও কল্যাণ এ দু‘বছর প্রত্যক্ষ করেছেন তাতে স্বভাবতই তাঁকে আরো কিছু দিন নিজের কাছে রাখার ইচ্ছা করতেন। তাসত্ত্বেও তিনি তাঁকে মক্কায় নিয়ে গেলেন।

মা আমিনা তাঁর প্রিয় সন্তানকে ফিরে পেয়ে দারুণ খুশী হলেন। বিশেষতঃ যখন দেখলেন, তাঁর সান্তান এমনভাবে বেড়ে উঠেছে যেন সে চার বছরের কোন শিশু। অথচ তার বয়স এখনো দু‘বছর অতিক্রম করেনি। হালীমা শিশুকে আরো কিছু দিন পল্লীতে তাঁর নিকট রাখার জন্য মা আমিনার নিকট আবদার জানালেন। মা রাজী হলেন। হালীমা উৎফুল্ল চিত্তে শিশুকে নিয়ে পল্লীতে ফিরে এলেন। শিশুটিও পল্লী প্রকৃতিতে ফিরে আসতে পেরে দারুণ খুশী। এভাবে নবী (সা) বানূ সা‘দে দ্বিতীয় বারের জন্য ফিরে এলেন। আর এখানেই তাঁর বক্ষ বিদারণের বিস্ময়কর ঘটনটি ঘটে যখন তাঁর বয়স চার অথবা পাঁচ বছর।

ইমাম মুসলিম তাঁর নিজস্ব সনদে আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা) অন্য শিশুদের সাথে একদিন খেলছেন, এমন সময় জিবরীল (আ) তাঁর কাছে আসেন। তারপর তাঁকে ধরে মাটিতে চিৎ করে শুইয়ে দিয়ে তাঁর বুকটি ফেঁড়ে ফেলেন। তারপ তাঁর হৃৎপিণ্ডটি (কালব) বের করে তার থেকে একটি রক্তপিণ্ড পৃথক করে বলেন : এ হলো তোমার মধ্যে শয়তানের অংশ। তারপর সেটা একটি সোনার গামলায় যমযমের পানি দিয়ে ধুইয়ে যথাস্থানে স্থাপন করেন। খেলার সঙ্গীরা এ দৃশ্য দেখে দৌড়ে তার ধাত্রী মা হালীমার কাছে যেয়ে বলে : মুহাম্মাদকে হত্যা করা হয়েছে। সবাই ছুটে আসে এবং তাঁকে বিবর্ণ অবস্থায় দেখতে পায়।[সহীহ মুসলিম-১/১০১; ইবন কাছীর, আস-সীরাহ্-১/১৩; আস-সীরাহ্ আল-হাসবিয়্যাহ্-১/১৫০; আল-বায়হাকী, দালায়িল আন-নুবুওয়াহ্-১/১৩৫]

এ ঘটনার পর হালীমা শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি নবীকে (সা) তাঁর মায়ের নিকট ফিরিয়ে দেন।

ইবন ইসহাক বলেন, শিশু মুহাম্মাদকে তহাঁর মায়ের নিকট ফিরিয়ে দেওয়ার কারণ হিসেবে কোন কোন আলিম আমাকে একথা বলেছেন যে, দুধ ছাড়ার বয় হওয়ার পর দ্বিতীয় বার যখন হালীমা (রা) মুহাম্মাদকে নিয়ে যান তখন হাবশার কিছু খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী লোক তাঁকে দেখে তাঁর পরিচয় জানতে চায় এবং তাঁকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। তারপর তারা তাঁকে তাদের দেশে, তাদের রাজার নিকট নিয়ে যেতে চায়। তারা বলে, এই শিশু ভবিষ্যতে বড় কিছু করবে। আমরা তাঁর মধ্যে সেসবের লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি। হালীমা ভয় পেলে, তারা হয়তো তাঁকে চুরি করে নিয়ে যেতে পারে। তাই তিনি তাঁর মায়ের নিকট ফিরিয়ে দেন[সীরাতু ইবন হিশাম-১/১৬৭,] ছয় বছর বয়স পর্যন্ত তিনি মায়ের স্নেহে লালিত-পালিত হন। তারপর মা ইনতিকাল করেন।

একটি বর্ণনা এ রকম এসেছে যে, হালীমা যখন শিশু মুহাম্মাদতে (সা) শেষ বারের মত তাঁর মায়ের নিকট নিয়ে আসছিলেন তখন মক্কার উঁচু ভূমিতে পৌঁছার পর তাঁকে হারিয়ে ফেলেন। পরে ওয়ারাকা ইবন নাওফাল ও কুরাইশ গোত্রের অন্য এক ব্যক্তি তাঁকে পান। তাঁরা দু‘জন তাঁকে নিয়ে ‘আবদুল মুত্তালিবের নিকট এসে বলেন : এই আপনার ছেলে। আমরা তাকে মক্কার উঁচু ভূমিতে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করতে দেখলাম। আমরা তার পরিচয় জিজ্ঞেস করলে সে বলে : আমি মুহাম্মাদ ইবন ‘আবদিল্লাহ ইবন ‘আবদিল মুত্তালিব। তাই আপনার কাছে নিয়ে এসেছি।[ইবন কাছীর, আস-সীরাহ-১/১৫,] তারপর আবদুল মুত্তালিব তাঁকে কাঁধে তুলে একটি কবিতা আবুত্তি করতে করতে কা‘বা তাওয়াফ করেন। কাবিতাটির একটি শ্লোক নিম্নরূপ :[ সীরাতু ইবন হিশাম-১/১৬৭] (আরবী********)

‘যারা পায়ের নলা ও পাতার সাহয্যে চলে, এমন প্রত্যেকের থেকে আমি তার জন্য মানুষের স্রষ্টা আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করি।’

নবীকে (সা) তাঁর নিকট ফিরিয়ে দিয়ে হালীমা তাঁর জনপদে ফিরে গেলেন। বহু বছর চলে গেল। এ দিকে নবী (সা) যুবক হলেন, বিয়ে করলেন। কিন্তু মা হালীমার স্মৃতি কোন দিন ভোলেননি। তাঁর স্নেহ-মমতার কথা, লালন-পালনের কথা প্রায়ই তিনি স্ত্রী খাদীজার (রা) কাছে বলতেন। খাদীজার (রা) মনেও হালীমাকে একটু দেখার ইচ্ছা জাগতো। একবার এক অভাবের বঝর তিনি আসলেন। রাসূল (সা) তাঁকে সসম্মানে বাড়ীতে রাখলেন ও সমাদার করলেন। হালীমা অনাবৃষ্টির কথা বললেন, জীব-জন্তু মারা যাবার কথা শোনালেন এবং তীব্র অভাবের বর্ণনা দিলেন। রাসূল (সা) তাঁকে সাহায্যের ব্যাপারে খাদীজার (রা) সাথে কথা বললেন। খাদীজা (রা) অত্যন্ত সম্মানের সাথে তাঁকে চল্লিশটি ছাগল এবং পানি বহন ও এদিক ওদিক যাওয়ার জন্য একটি উট দান করেন। এ যাত্রায় হালীমা তাঁর পরিবারের লোকদের জন্য অনেক উপহার-উপঢৌকন নিয়ে যান।[আনসাবুল আশরাফ-১/৯৫; নিসা’ মুবাশশারাত বিল জান্নাহ্-১/৩২]

আল্লাহ তা‘লা যখন মুহাম্মাদকে (সা) মানবজাতির জন্য নবী ও রাসূল হিসেবে নির্বাচন করে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানানোর নির্দেশ দিলেন তখন হালীমা গ্রহণ করেন।[আস-সারাহ আল-হালাবিয়্যা-১/৩২] যে, তিনি, তছার স্বামী ও সন্তানগণ- ‘আবদুল্লাহ, আশ-শায়মা’ ও উনাইসা- সবাই ইসলাম গ্রহণ করেন। “আস-সীরাহ্ আল-হালাবিয়্যা” –র লেখক বলেন : তাঁর ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে বেশীর ভাগ আলিমের কোন সন্দেহ নেই। ইবন হিব্বান একটি সহীহ হাদীছ বর্ণনা করেছেন যা দ্বারা তাঁর ইসলাম গ্রহণ প্রমাণিত হয়। হাফিজ মুগলাতায়-এর হালীমার ইসলাম গ্রহণ বিষয়ে একখানি গ্রন্থ আছে যার শিরোনাম হলো :“আত-তুহফাতুল জাসীমাহ্ ফী ইসলামি হালীমা।[নিসা মিন ’আসর আন-নুবুওয়াহ্, পৃ.১৫,]

নবী (সা) ছিলেন কোমল মনের দয়াপ্রবণ মানুষ। নিজের আশে পাশের লোকদেরকে শুধু নয়, বরং নিকট ও দূরের সবাইকে ভালোবাসতেন এবং হাদিয়া-তোহফা পাঠাতেন। আর এর থেকে তাঁর দুধ মা হালীমা বাদ পড়তে পারেন না। নবী (সা) সারা জীবন হালীমার স্নেহ-মমতার কথা মনে রেখেছেন। নবীরন (সা) অন্তরের গভীর ছিল মা হালীমার স্থান। তাই চল্লিশ বছরের বেশী বয়সেও তাঁকে “মা মা” বলে ডাকতে শোনা যায়, নিজের গায়ের চাদরটি খুলে বিছিয়ে তাঁর বসার স্থান করে দিতে দেখা যায়। শুধু তাই নয়, তাঁর ভালো-মন্দ ও অভাব-অভিযোগের কথাও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শুনতে দেখা যায়। আরো দেখা যায় মায়ের একান্ত অনুগত সন্তানের মত হৃষ্টচিত্তে হাসি মুখে তাঁর সাথে কথা বলতে।[আল-ইসাবা-৪/২৭৪,]

কাজী ‘আয়্যাজ “আশ-শিফা” গ্রন্থে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট হালীমা ও তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের স্থান বর্ণনা প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, আবুত তুফায়ল বলেছেন : আমি আমার কিশোর বয়সে নবী (সা) “জি‘রানা[“জি‘রানা” তায়িফ ও মক্কার পথে, তবে মক্কার নিকটবর্তী স্থানের না। (তাহযূবুল আসমা‘ ওয়াল লুগাত-৩/৫৯)] নামক স্থানে একদিন গোশত বণ্টন করতে দেখেছি। সে সময় এক বেদুইন মহিলা আসলেন এবং বনীর (সা) একেবারে কাছে চলে গেলেন। নবী (সা) নিজের চাদরটি বিছিয়ে তাঁকে বসতে দিলেন। মহিলাটি বসলেন। আমি লোকদের কাছে প্রশ্ন করলাম : এই মহিলা কে? লোকেরা বললো : ইনি রাসূলুল্লাহর (সা) মা, তাঁকে দুধ পান করিয়েছেন।[আলাম আন-নিসা’ -১/২৯০]

‘উমার ইবন আস-সায়িব বর্ণনা করেছেন। একদিন রাসূলুল্লাহ (সা) বসে আছেন। এমন সময় দাঁর দুধ-পিতা আসলেন। তিনি নিজের এক খণ্ড কাপড়ের এক পাশ বিছিয়ে দিলেন এবং তিনি তার উপর বসলেন। একটু পরে রাসূলুল্লাহর (সা) দুধ ভাই আবদুল্লা্হ ইবন আল-হারিছ আসলেন। রাসূল (সা) উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে সামনে বসালেন।[তাবাকাত-১/১১৪; আল-ইসী‘আব-৪/২৬২; আশ-শিফা-১/২৬০; উসুদুল গাবা-৫/৪২৮]

বালযুরী বর্ণনা করেছেন। রাসূল (সা) দুধ বোন আশ-শায়মা‘ তাঁর মা হালীমার সাথে তাঁকে কোলে নিতেন এবং তাঁর সাথে খেলতেন। এই আশ-শায়মা‘ হুনায়ন যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হন। তাঁর সাথে কঠোর আচরণ করা হয়, তখন তিনি বলেন : ওহে জনগণ! আপনার জেনে রাখুন, আমি আপনাদের নবীর বোন। তাঁকে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট আনা হলে তিনি বললেন : আমি আপনার বোন। আমি আপনাকে আমার মায়ের সাথে কোলেন নিতাম, আপনি আমাকে কামড়ে দিতেন। রাসূল (সা) তাঁকে চিনতে পারেন এবং নিজের চাদর বিছিয়ে তাঁকে বসতে দেন। তাঁকে েএকটি দাস ও কেটি দাসীসহ অনেক উপহার-উপঢৌকন দিয়ে মুক্তি দেন।[আনসাবুল আশরাফ-১/৯৩,]

হযরত হালীমার (রা) মৃত্যু সম্পর্কে শায়খ আহমাদ যীনী দাহলাম বলেছেন, তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন, হিজরাত করেন, মদীনায় মারা যান এবং বাকী গোরস্তানে দাফন করা হয়। তাঁর কবরটি সেখানে প্রস্ধি।[নিসা‘ মিন ‘আসর আন-নুবুওয়াহ্, পৃ.১৭,] তবে বালাযুরীর একটি বর্ণনায় বুঝা যায় তিনি মদীনায় হিজরাত করেননি এবং মক্কা বিজয়ের পূর্বে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। বর্ণনাটি এ রকম : মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহর (সা) যখন “আবতাহ” উপত্যকায় অবস্থান করছেন তখন তাঁর নিকট হালীমার বোন তাঁর স্বামীর বোনকে সংগে নিয়ে আসেন। তিনি রাসূলকে (সা) এক পাত্র পনীর ও একপাত্র ঘি উপহার দেন। রাসূল (সা) তাঁর নিকট হালীমার অবস্থা জানতে চান। তিনি তাঁর মৃত্যুর খবর দেন। তখন রাসূলের (সা) দু‘চোখ পানিতে ভিজে যায়। তারপর রাসূল (সা) তাঁদের অবস্থা জানতে চান। তাঁরা অভাব ও দারিদ্রের কথা জানান। রাসূল (সা) তাঁকে পরিধেয় বস্ত্র, একটি ভারবহিী পশু ও দু‘শো দিরহাম দানের নির্দেশ দেন। যাবার বেলায় তিনি নবীকে (সা) লক্ষ্য করে বলে যান : আপনি ছোট ও বড় উভয় অবস্থায় চমৎকার দায়িত্বশীল।[আনসাবুল আশরাফ, পৃ.৯১; দালায়িল আন-নুবুওয়অহ্১/১৩৩,] তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর থেকে ‘আবদুল্লাহ ইবন জা‘ফার (রা) বর্ণনা করেছেন।[আল-ইসী‘আব-৪/২৬২]

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ