আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – ষষ্ঠ খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

আশ-শায়মা‘ বিনত আল-হারিছ আস-সা‘দিয়্যা (রা)


আশ-শায়মা‘র আসল নাম হুযাফা, মতান্তরে জাযযামা। ডাকনাম আশ-শায়মা‘ ও আশ-শাম্মা‘। বানূ সা‘দের এক বেদুঈন মহিলা। তিনি তাঁর গোত্রে কেবল ডাকনামেই প্রসিদ্ধ ছিলেন।[আল-বায়হাকী, দালায়িল আন-নুবুওয়াহ্-১/১৩২] সম্ভবত তাঁর দেহে অতিরিক্ত তিল থাকার কারণে তিনি এ নামে আখ্যায়িত হন।[নিসা‘ মিন ‘আসর আনু-নুবুওয়াহ্- ৩৩৭, টীকা-২, আল-ইসাবা-৪/৩৩৫ ] উল্লখ্য যে, মহিলা সাহাবীদের মধ্যে আশ-শায়মা‘ নামে দ্বিতীয় কেউ নেই। তাঁর পিতা আল-হারিছ ইবন ‘আবদিল উযযা ইবন রিফা‘আ আস-সা‘দিয়্যা এবং মাতা মহানবীর (সা) দুধমাতা হযরত হালীমা আস-সা‘দিয়্যা (রা)। আশ-শায়মা‘র বড় পরিচয় তিনি মহানীবীর (সা) দুধ বোন। উল্লেখ্য যে, হযরত হালীমার (রা) সন্তান ‘আবদুল্লাহ, উনায়সা ও আশ-শায়মা‘- এ তিনজন হলেন রাসূলুল্লাহর (সা) দুধ-ভাই-বোন। আশ-শায়মা‘ তাঁর মা হালীমাকে শিশু মুহাম্মাদের (সা) প্রতিপালনে অনেক সাহায্য-সহযোগিতা করেন।

হযরত হালীমা (রা) শিশু মুহাম্মাদকে (সা) দুই বছর দুধ পান ও লালন-পালনের পর মক্কায় তাঁর সম্মতিতে হযরত হালীমা (রা) তাঁর দুধ-সন্তান মুহাম্মাদকে (সা) নিয়ে আবার তাঁর গোত্রে ফিরে যান। তখন তিনি হাঁটতে শিখেছেন, দুধ-ভাই-বোনদের সাথে খেলা করতে শিখেছেন। অন্যসব বেদুঈন ছেলে-মেয়েদের মত হালীমার ছেলে-মেয়েরাও তাদের জনপদের আশে-পাশের চারণভূমিতে ছাগল-ভেড়া চরাতো্ তারা তাদের দুধ-ভাই শিশু মাহাম্মাদকেও (সা) মাঝে মধ্যে সঙ্গে নিয়ে যেত। এ সময় আশ-শায়মা‘ তাঁকে দেখাশুনা করতেন। পথ দীর্ঘ হলে, রোদের তাপ বেশী হলে তাঁকে কোলে তুলে নিতেন। মাঝে মাঝে ছেড়ে নিতেন। আবার কখনো তাঁকে নিয়ে ছায়ায় বসতেন এবং দু‘হাতে তুলে নাচাতে সুর করে নীচের চরণ দু‘টি গাইতেন :[ প্রাগুক্ত, ৪/৩৩৬; আহমাদ যীনী দাহলান, আস-সীরাহ্ আন-নাবাবিয়্যাহ্-৪/৩৬৬] (আরবী****)

‘হে আমাদের পরোয়ারদিগার! আপনি আমাদের জন্য মুহাম্মাদকে

বাঁচিয়ে রাখুন, যাতে আমরা তাঁকে একজন যুবক হিসেবে দেখতে পাই।

অতঃপর আমরা তাঁকে এমন একজন সম্মানিত নেতা হিসেবে দেখতে পাই যে, তাঁর প্রতি বিদ্বেষপোষণকারী শত্রুর মাথা নত হয়ে যাবে।

হে আল্লাহ! আপনি তাঁকে চিরস্থায়ী সম্মান ও মর্যাদা দান করুন।’

কোন কোন বর্ণনায় প্রথম শ্লোতটি এভাবে এসেছে :[ নিসা’ মিন ‘আসর আন-নুবুওয়াহ্-৩৩৮] (আরবী********)

‘হে আমাদের পরোয়ারদিগার! আমার বাই মাহাম্মাদকে বাঁটিয়ে রাখুন।’

কী চমৎকার দু‘আই না ছিল যার প্রতিটি কথা। আল্লাহ পাকের দরবারে সেসব দু‘আ কবুল হয়েছিল।

শিশু মুহাম্মাদের (সা) মধ্যে যে শুভ ও কল্যাণ বিদ্যমান ছিল আশ-শায়মা’ ও তাঁর পরিবারের ছোট-বড় সকল সদস্য তা প্রত্যক্ষ করতেন। তাই তাঁর প্রতি সবার তীব্র আবেগ ও ভালোবাসা গড়ে উঠেছিল। মা হালীমা সবসময় তাঁকে এদিক ওদিক নিয়ে যেতে চাইলে মা তাকে বার বার সতর্ক করে দিতেন মুহাম্মাদ (সা) যেন দৃষ্টির আড়ালে মা যায়। এতেও তিনি নিশ্চিন্ত হতেন না। কাজের ফাঁকে ফাঁকে দৌড়ে গিয়ে দেখে আসতেন মাহাম্মাদ (সা) কোথায় এবং কি করছে।

একদিন দুপুরে প্রচণ্ড গরমে ক্লান্ত হয়ে মা হালীমা বিশ্রাম নিচ্ছেন। একটু পরেই তিনি টের পেলেন আশ-শায়মা‘ ও মুহাম্মাদ কেউ আশে-পাশে নেই। এই প্রচণ্ড রোদে তারা কোথায় গেল? তিনি শঙ্কিত হয়ে পড়লেন। খুঁজতে বের হলেন। দেখলেন বাড়ীর অদূরে আশ-শায়মা‘ মুহাম্মাদকে কোলে করে নাচাচ্ছে, আর এ গানটি গাইছে : (আরবী*****)

‘এ আমার ভাই, আমার মা তাকে প্রসব করেনি। সে আমার বাবা-চাচার বংশেরও কেউ নয়। হে আল্লাহ! তুমি তাঁকে সমৃদ্ধি দাও।’

মা হালীমা তিরস্কারের সুরে বললেন : আশ-শায়মা‘, তুমি তাঁকে নিয়ে এই রোদের মধ্যে খেলছো? আশ-শায়মা‘ বললেন : মা, আমার ভাইয়ের গায়ে রোদ লাগেনি। আমি দেখছি, মেঘ তার মাথার উপর ছায়া দান করছে। সে দাঁড়ালে মেঘ দাঁড়াচ্ছে, সে চললে মেঘও চলছে। এভাবে আমরা এখানে এসেছি। অবাক দৃষ্টিতে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন :

একথা কি ঠিক? আশ-শায়মা‘ বললেনঃ আল্লাহর কসম! সত্যি। আল্লাহর কসম! সত্যি[আস-সীরা্ আল-হালাবিয়্যাহ্-১/১৬৭, ১৬৮]

হযরত রাসূলে কারীম (সা) পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত মা হালীমার সাথে বনী সা‘দের পল্লীতে অতিবাহিত করেন। মরুভীমিতে নির্মল আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠার সাথে সাথে তাদের নির্ভেজাল বিশুদ্ধ আরবী ভাষা ও প্রকাশভঙ্গিও আয়ত্ত করেন। একথা তিনি পরবর্তী জীবনে অকপটে স্বীকার করতেন। তিনি বলতেন : আরবী********)

‘আসি তোমাদের সকলের চেয়ে বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জলভাষী, কারণ আমি কুরাইশ বংশের সন্তান এবং বানূ সা‘দে দুধ পান করে বেড়ে উঠেছি।’ তিনি প্রথম জীবনের এই পাঁচটি বছরের স্মৃতি জীবনে কোনদিন ভুলেননি। মা হালীমা, বোন আশ-শায়মা’ এবং তাঁদের পরিবারের অন্য সদস্যদের আদর-যত্ন, ও স্নেহ-বালোবাসার কথা সারা জীবন মনে রেখেছেন।

সময় গড়িয়ে চললো, সে দিনের সেই ছোট্ট শিশু মুহাম্মাদ বড় হলেন। এক সময় নবুওয়াত লাভ করলেন। মদীনায় হিজরাত করলেন। প্রতিপক্ষের সঙ্গে যুদ্ধ ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জড়িয়ে পড়লেন। হাওয়াযিন যদ্ধে মুসলিম বাহিনী বিজয়ী হলে বানূ সা‘দের আরো অনেক নারী-পুরুষ সদস্যের সাথে আশ-শায়মা‘ও মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হন। বন্দী হওয়ার সময় তিনি মুসলিম মুজাহিদদেরকে বলেন : ‘আল্লাহর কসম! তোমরা জানতে পারবে যে, আমি তোমাদের নেতার দুধ-বোন।’ কিন্তু তারা তাঁর কথা বিশ্বাস না করে তাঁকে রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে হাজির করে। আশ-শায়মা‘ বলেন। ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনার দুধ-বোন। রাসূল (সা) বললেন : তোমার দাবীর সপক্ষে কোন প্রমাণ বা চিহ্ন উপস্থাপন করতে পারবে? বললেন : আমি একদিন আপনাকে পিঠে উঠিয়েছিলাম। আপনি আমাকে কামড় দিয়েছিলেন, এই তার দাগ।[ইবন হাযাম, জামহারাতু আনসাব আল-‘আরাব-১/২৬৫] রাসূল (সা) চিহ্নটি চিনতে পারলেন। তিনি একটি চাদর বিছিয়ে তার উপর তাঁকে বসালেন ও তাঁর কুশল জিজ্ঞেস করলেন। তারপর বললেন : তুমি ইচ্ছা করলে আদর-যত্ন ও সম্মানের সাথে আমার নিকট থেকে যেতে পার। আবার ইচ্ছা করলে তোমার গোত্রে ফিরে যেতে পার। আশ-শায়মা’ বললেন : আমি আমার গোত্রে ফিরে যেতে চাই। তারপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং রাসূলুল্লাহর (সা) রিসালাতে বিশ্বাস স্থাপনের ঘোষণা দেন। রাসূল (সা) মাকহূল[তাদের বংশধারা বিদ্যমান আছে। (আল-বিদায়া ওয়অন নিহায়া-৪/৩৬৩, আল-ইসাবা-৩/৪৩৫; আনসাব আল-আশরাফ-১/৯৩] নামের একটি দাস, একটি দাসী, বহু ছাগল-ভেড়া ও উট উপঢৌকনসহ তাঁকে তঁর গোত্রে পাঠিয়ে দেন।[উসুদুল গাবা-৫/৪৮৯; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া-৩/৩৬৩; তারীখ আত-তাবারী-২/১৭১; আনসাব আল-আশরাফ-১/৯৩; আ‘লাম আন নিসা’-২/৩১৭ আল-আ‘লাম -৩/১৮৪,] ইবনুল কালবী বলেন, আশ-শায়মা’ একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট আসেন এবং পরিচিতি হিসেবে তাঁর দেহে শিশুকালে রাসূলুল্লাহর (সা) দাঁতের চিহ্ন দেখান।[আনসাব আল-আশরাফ-১/৯৩]

মানবতার মহান নবী দুধ-বোন আশ-শায়মা’র প্রতিই কেবল মহানুভবতা দেখাননি, বরং তাঁর ক্ষমা ও মহানুভবতা গোটা বানূ সা‘দকে পরিবেষ্টন করে। উল্লেখ্য বানূ সা‘দ ছিল বিশাল হাওয়অযিন গোত্রের একটি শাখা গোত্র। হিজরী ৮ম সনে হুনাইন যুদ্ধে হাওয়াযিন গোত্র পরাজিত হলে তাদের ধন-সম্পদ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে মুসলমানদের হাতে আসে এবং তাদের নারী ও সন্তানদেরকে বন্দী করা হয়। তখন হাওয়াযিন গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট আসে এবং তাদের আনুগত্য ও ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেয়। এই দলে রাসূলুল্লাহর (সা) দুধ-চাচাও ছিলেন। তারা ক্ষমা ভিক্ষা চায়, বন্দীদের মুক্তি দাবী করে এবং তাদের জব্দকৃত ধন-সম্পদ ফেরত চায়। এই দলটির মুখপাত্র যুহায়র ইবন সুরাদ উঠে দাঁড়িয়ে ভাষণ দান করেন। তার কিছু অংশ নিম্নরূপঃ (আরবী****)

‘হে আল্লাহর রাসূল! এই বন্দীদের মধ্যে আপনাকে লালন-পালনকারী আপনার চাচী, ফুফু, খালা ও কোলে-পিঠে বহনকারী রক্ষণাবেক্ষণকারীও রয়েছে। আমরা আপনাকে কোলে-পিঠে করে লালন-পালন করেছি, আমাদের স্তনের দুধ পান করিয়েছি।….. আমি আপনাকে দুগ্ধপোষ্য শিশু দেখেছি। আপনার চেয়ে ভালো কোন দুগ্ধপোষ্য শিশু আমি আর দেখিনি। আমি আপনাকে দুধ পান বন্ধ করা শিশু দেখেছি। আপনার চেয়ে ভালো দুধ পান বন্ধ করা ভালো আর কাউকে দেখিনি। তারপর দেখেছি যুবক হিসেবে। আপনার চেয়ে ভালো যুবক আর দেখিনি। আপনার মধ্যে শুভ ও কল্যাণ স্বভাব পূর্ণতা লাভ করেছে। সবকিছু সত্ত্বেও আমরা হলাম আপনার মূল, শেকড় ও গোত্র। অতএব আমাদের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ করুন, আল্লাহ আপনার প্রতি অনুগ্রহ করবেন।’ তারপর তিনি নিম্নের এই চরণগুলো আবৃত্তি করেন। : (আরবী*********)

‘হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ করুন। আপনি এমন এক ব্যক্তি যাঁর নিকট আমরা আশা করি ও যার অনুগ্রহের প্রতীক্ষা করি।

আপনি সে মহিলাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন যাদের দুধ পান করেছেন। যখন তাদের বিশুদ্ধ ও স্বচ্ছ দুধে আপনার মুখ পূর্ণ হয়ে গেছে।

আপনার সেই মায়েদেরকে ক্ষমা করুন যাদের দুধ পান করেছেন। নিশ্চয় ক্ষমার গুণটা সৃষ্টিজগত তা পরিধান করে।’

হযরত রাসূলে করীম (সা) তার এই মনোমুগ্ধকর বর্ণনা ও সুমিষ্ট কবিতা শুনার পর বলেন : আমার ও বাণূ ‘আবদিল মুত্তালিবের যা কিছু আছে তা সবই তোমাদের জন্য।

কুরাইশরা বলে উঠলো : আমাদের যা কিছু আছে তা সবই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য।

ইবন কাছীর বলেন, এরপর রাসূল (সা) দুধ-পিতার গোত্রের সকলকে সম্মানের সাথে মুক্তি দেন।[আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৪/৩৬৩, ৩৬৪; তারীখ আত-তাবারী-২/১৭৩; ‘উয়ূন আল-আছার-২/২২৩; আস-সীরাহ্ আল-হালাবিয়্যা-১/১৭০]

হযরত আশ-শায়মা‘র (রা) জীবনের আর কোন কথা জানা যায় না। তিনি কখন, কোথায় ইন্তেকাল করেছেন তাও সম্পূর্ণ অজ্ঞাত থেকে গেছে। আয-যিরিকলী হি.৮/খ্রী. ৬৩০ সনের পর তার মৃত্যু হয়েছে এমন কথা বলেছেন।[আল-আ‘লাম-৩/১৮৪]

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ