আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – ষষ্ঠ খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

উম্মু হারাম বিনত মিলহান (রা)


হযরত উম্মু হারাম (রা) এর আসল নাম জানা যায় না। এ তাঁর ডাকনাম এবং এ নামেই তিনি ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। তিনি মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গাত্রের নাজ্জার শাখার কন্যা। পিতা মিলহান ইবন খালিদ। মাতার দিক দিয়ে তিনি হযরত উম্মু সুলাইমের (রা) বোন এবং রাসূলুল্লাহর (সা) খাদিম প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আনাস ইবন মালিকের খালা। আর দুধপানের দিক দিয়ে ছিলেন হযরত রাসূলে কারীমের (সা) খালা। [আস-সীরাহ্ আল-হালাবিয়্যা-৩/৭৩]

মদীনার নাজ্জার খান্দানের মিলহানের পরিবারটি ছিল একটি অতি সৌভাগ্যবান পরিবার। মদীনায় ইসলামী দা‘ওয়াতের সূচনালগ্নে এ পরিবারের সদস্যগণ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেন। আল্লাহ ও রাসূলের (সা) গভীর প্রেম ও ভালোবাসা এ পরিবারের সদস্যবর্গের অন্তরের অন্তমূলে গেঁড়ে বসে। তাদের নারী-পুরুষ সকলে জিহাদ, জ্ঞানচর্চা, ইসলামের সেবায় জীবন দান, বদান্যতা প্রভৃতি কল্যাণমূলক কাজে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। মিলহানের দুই ছেলে হারাম ও সুলাইম (রা) বদর ও উহুদ যোদ্ধা ছিলেন। উভয়ে বি‘রে মা‘উনার অন্যতম সদস্য ছিলেন এবং সেখানে শাহাদাত বরণ করেন। হারাম ইবন মিলহানের (রা) জীবনের বড় কৃতিত্ব এই যে, তিনি তার ঘাতক জব্বার ইবন সুলামীকে মুসলমান বানিয়ে যেতে সক্ষম হন। ঘটনাটি সংক্ষেপে এই রকম: জব্বার ইবন সুলামী হারাম কে লক্ষ করে তীর নিক্ষেপ করলে তার বক্ষ ভেদ করে যায় এবং তিনি জোরে (আরবী**************)

উচ্চারণ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। বাক্যটির অর্থৎ “কা‘বার প্রভুর শপথ, আমি কামিয়াব হয়েছি। অর্থা শাহাদাত লাভে কামিয়াব হয়েছি। ঘাতক জব্বার যখন (আরবী *****) শব্দের অর্থ জানলো তখন তার মধ্যে ভাবান্তর হলো। সে তওবা করে ইসলামে দাখিল হয়ে গেল। হযরত হারাম ইবন মিলহানের (রা) জীবনের সর্বশেষ উচ্চারিত বাক্যটি হযরত জাব্বার ইবন সুলামীর (রা) ইসলাম গ্রহণের কারণ হয়ে যায়। [বুখারী: বাবুর রাজী; নিসা‘মিন আসর আন-নুবুওয়াহ-৪২]

মদীনার যে সকল মহিয়সী নারী হযরত রাসূলে কারীমের (সা) সহচর্যে নিজেদের চারিত্রিক শোভা আরো উ**কর্ষমণ্ডিত করে তোলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন মিলহানের দুই কন্যা উম্মু সুলাইম ও উম্মু হারাম। কেবল ‘আত-তাহযীব‘ গ্রন্হকার উল্লেখ করেছেন যে, উম্মু হারামের (রা) প্রথম স্বামী আমর ইবন কায়স আল-আনসারী। [আত-তাহযীব-১২/৪৬]। তবে অধিকাংশ গ্রন্হে তার স্বামীর নাম প্রখ্যাত সাহাবী হযরত উবাদা ইবন আস-সামিত উল্লেখ করা হয়েছে। ইবন সা‘দের ধারণা, ‘উবাদা ইবন আস-সামিত তার প্রথম স্বামী এবং তার ‍দ্বিতীয় স্বামী আমর ইবন কায়স। [তাবাকাত-৮/২৬৮]। তবে নির্ভরযোগ্য সীরাতের গ্রন্হাবলীর মাধ্যমে জানা যায় যে, উবাদা ইবন আর-সামিত (রা) তার সর্বশেষ স্বামী। [সাহাবিয়াত-২১০]। এই উবাদা (রা) একজন প্রথমপর্বের মহান আনসারী সাহাবী, আকাবার সদস্য, নাকীব, বদর-উহুদ-খন্দকের সাহসী মুজাহিদ এবং বাই‘আতু রিদওয়ানসহ উল্লেখযোগ্য সকল ঘটনার অংশীদার। হিজরী ৩৪ সনে ফিলিস্তীনের রামলায় ইন্তিকাল করেন। [তাহযীবুল আসমা‘ ওয়াল লুগাত-১/২৫৬, ২৫৭; আল-আ‘লাম-৩/২৫৮।]

হযরত রাসূলে কারীম (সা) মদীনার কেন্দ্রস্থল থেকে দুই মাইল (মু‘জামুল বুলদান-৪/৩০২) দূরে তাকওয়া ও খোদাভীত্তির উপর ভিত্তি করে যে মসজিদটি নির্মাণ করেন সেটি হলো- মাসজিদুল কুবা। এ মসজিদ সম্পর্কে নাযিল হয়েছে এ আয়াত:[সূরা আত-তওবা-১০৮; আস-সীরাত আল-হালাবিয়্যাহ্ -৩/৭৩] (আরবী***********) ‘যে মসজিদের ভিত্তি প্রথম দিন হতেই স্থাপিত হয়েছে তাকওয়ার উপর, তাই তোমার সালাতের জন্য অধিক যোগ্য‘

ইসলামের ইতিহাসে এ মসজিদের গুরুত্ব অপরিসীম। হযরত ইবন উমার (রা) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা) বাহনে চড়ে অথবা পায়ে হেঁটে এ মসজিদে আসতেন এবং এখানে দুই রাকা‘য়াত নামায আদায় করতেন। [সহীহ মুসলিম-৪/১২৭] কুবার এই পবিত্র মসজিদের পাশে ছিল উম্মু হারামের পরিবারের বসবাস। রাসূল (সা) হযরত হারামকে (রা) যথেষ্ট মর্যাদা ও গুরুত্ব দিতেন। মাঝে মাঝে তার গৃহে যেতেন এবং দুপুরে বিশ্রামও নিতেন। [উসুদুল গাবা-৫/৫৭৪; আল-ইসতী‘আব-৪/৪২৪; আয-যাহাবী: তারীখ-৩/৩১৭; আল-ইসাবা-৪/৪৪১]। মাঝে মাঝে নামাযও আদায় করতেন। হযরত আনাস (রা) বলেন: একদিন নবী (সা) আমাদের নিকট আসলেন। তখন বাড়ীতে কেবল আমি, আমার মা (উম্মু সুলাইম) ও আমার খালা উম্মু হারাম ছিলেন। তিনি আমাদের লক্ষ করে বললেন: তোমরা এসো, আমি তোমাদের নিয়ে নামায আদায় করি। তখন কোন নামাযের ওয়াক্ত ছিল না। তিনি আমাদের নিয়ে নামায আদায় করলেন এবং আমাদের পরিবারের সকলের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের সকল কল্যান কমনা করে দু‘আ করলেন। (সহীহ মুসলিম-২/১২৮)। একবার রাসূল (সা) উম্মু হারামের (রা) গৃহে এলে তিনি খাবার তৈরী করে তাকে খাওয়ান। আহার শেষে একটু বিশ্রাম নিতে থাকেন, আর উম্মু হারাম (রা) রাসূলের (সা) মাথার চুল বিলি দিয়ে উকুন দেখতে শুরু করেন। এমতাবস্থায় রাসূলের (সা) একটু হালকা ঘুমের ভাব এসে যায়। একটু পরে জেগে উঠে মৃদু হেসে উম্মু হারামকে (রা) শাহাদাতের সুসংবাদ দান করেন। আর সেদিন থেকেই তাকে “আল-শাহীদা“ (মহিলা শহীদ) বলা হতে থাকে। রাসূল (সা) শাহাদাতের সুসংবাদ অপর যে মহিলাকে দান করেন তিনি হলেন উম্মু ওয়ারাকা আল-আনসারিয়্যা (রা)। উল্লেখ্য যে, রাসূলুল্লাহর (সা) দাদা আব্দুল মুত্তালিবের মা ছিলেন বানূ নাজ্জারের কন্যা। তাই উম্মু হারাম (রা) রাসুলুল্লাহর (সা) খালা সম্পর্কীয়া হওয়ার করাণে মাহরামা ছিলেন। আর তাই তিনি রাসূলের (সা) মাথা স্পর্শ করে উকুন খুঁটতে পেরেছেন। [নিসা‘মিন ‘আসর আন-নুবুওয়াহ-৪৪]

ইমাম আত-তিরমিযী হযরত আনাস ইবন মালেকের বর্ণনা সংকলন করেছেন। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা) উম্মু হারামের গৃহে আসতেন এবং তিনি রাসূলকে (সা) আহার করাতেন। উম্মু হারাম ছিলেন ‘উবাদা ইবন আস-সামিতের স্ত্রী। একদিন রাসূল (সা) আসলেন। তাকে আহার করালেন। তারপর রাসূলের (সা) মাথার চুল বিলি দিয়ে উকুন দেখতে শুরু করলেন। রাসূল (সা) ঘুমিয়ে গেলেন। একটু পরে জাগলেন এবং মৃদু হাসলেন। উম্মু হারাম জিজ্ঞেস করলেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ! হাসলেন কেন? বললেন: ঘুমের মধ্যে আমাকে দেখানো হলো, আমার উম্মতের কিছু লোক জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর উদ্দেশ্যে সাগর পাড়ি দেওয়ার জন্য জলযানে আরোহী হয়েছে। উম্মু হারাম আরজ করলেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ! আল্লাহ যেন আমাকেও তাদের অন্তর্ভূক্ত করেন সে জন্য আল্লাহর নিকট দু‘য়া করুন।

এরপর রাসূল (সা) মাথা রেখে আবার ঘুমিয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর মৃদু হাসতে হাসতে জেগে উঠলেন। উম্মু হারাম আবার প্রশ্ন করলেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ! হাসছেন কেন? জবাবে রাসূল (সা) পূর্বের কথাটি বললেন। উম্মু হারামও আগের মত আরজ করলেন। এবার রাসূল (সা) বললেন: (আরবী**********) তুমি প্রথম দলের অন্তর্ভূক্ত।

সময় গড়িয়ে চললো। রাসূলুল্লাহ (সা) ইনতেকাল করলেন। প্রথম ও দ্বিতীয় খলীফা আবূ বকর ও উমার (রা) একে একে দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন। ইসলামী খিলাফতের সীমা সরহদের দারুণ বিস্তার ঘটলো। তৃতীয় খলীফা হযরত উসমান (রা) খিলাফতের মসনদে আসীন। সিরিয়ার আমীর হযরত মু‘আবিয়া ইবন আবী সুফইয়ান (রা)  খলীফার নিকট সাগর দ্বীপ কুবরুস (সাইপ্রাস) অভিযানের অনুমতি চাইলেন। উল্লেখ্য যে, এ সময় কুবরুস ছিল বাইজান্টাইন রোমান শাসিত একটি দ্বীপ। ইতিপূর্বে মুসলমানদের যেমন কোন নৌ-বাহিনী ছিল না তেমনি ছিল না জলপথে অভিযানের কোন অভিজ্ঞতা। তাই আমীর মু‘আবিয়ার (রা) আবেদনের প্রেক্ষিতে হযরত উসমান (রা) মজলিসে শূরার বৈঠক আহ্বান করলেন। দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনার পর নৌ-বাহিনী গঠন ও জলপথে কুবরুস অভিযানের সিদ্ধান্ত হয়। এটাই ছিল মুসলমানদের নৌপথে প্রথম অভিযান। তাই দারুণ কতর্কতা অবলম্বন করা হয়।

মজলিসে শূরার সিদ্ধান্ত মুতাবিক হযরত উসমান (রা) হিজরী ২৭ সনে সাগর পাড়ি দিয়ে কুবরুস অভিযানের নির্দেশ দেন। হযরত ম‘আবিয়া (রা) একটি নৌ-বাহিনী গঠন করেন। এই নৌবাহিনীতে হযরত আবূ যার আল-গিফারী (রা), আবুদ দারদা (রা), উবাদা ইবন আস-সামিত (রা) প্রমুখের মত বহু উচু স্তরের সাহাবীকে অন্তর্ভূক্ত করেন।

যেদিন রাসূল (সা) উম্মু হারামকে নৌ-যুদ্ধে অংশ গ্রহণের ভবিষ্যদ্বাণী করেন এবং যেদিন তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) মুখে একথা শোনেন: (আরবি***********) “আমার উম্মতের প্রথম একটি বাহিনী সাগর পথে যদ্ধ করবে, তারা নিজেদের জন্য জান্নাত ওয়াজিব করে নিবে। উম্মু হারাম, তুমিও তাদের মধ্যে থাকবে। [বুখারী : আল জিহাদ; হিলয়াতুল আওলিয়া ওয়া তাবাকাত আল-মাশাহীর ওয়াল আল-আ‘লাম-২/৬১; তারিখু ‍দিমাশক- ৪৮৬ [তারাজিম আন-নিসা]

সেদিন থেকে হযরত উম্মু হারাম (রা) এমন একটি নৌ-অভিযানের প্রতিক্ষায় ছিলেন। দীর্ঘদিন সে সুযোগ এসে গেল। তিনি স্বামী উবাদা ইবন আস-সামিতের (রা) সংগে জিহাদে বেরিয়ে পড়লেন। তরঙ্গ-বিক্ষুদ্ধ সাগর পাড়ি দিয়ে মুসলিম বাহিনী কুবরুস অবতরণ করে এবং রোমান বাহিনী কে তাড়িয়ে দিয়ে সেখানে ইসলামী পতাকা উড্ডিন করেন। মূলত যুদ্ধ ছাড়াই কেবল সন্ধির মা্ধ্যমে কুবরুস বিজিত হয়।

কুবরুস বিজয় শেষে বাহিনী যখন মূল ভূমিতে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন একদিন উম্মু হারাম (রা) একটি বাহন পশুর পিঠে চড়তে গিয়ে পড়ে যান। ভীষণ আঘাত পান এবং সেই আঘাতে সেখানে ইন্তেকাল করেন। সাগর দ্বীপ কুবরুসের মাটিতেই তাকে দাফন করা হয়। [ সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং- ১৬৪৫; দালায়িল আন-নুবুওয়াহ-২/৭১২; নাসাবু কুরায়শ-১২৪-১২৫]

হিশাম ইবন আল-গায বলেন: উম্মু হারাম বিনতে মিলহানের কবর কুবরুসে। স্থানীয় জনসাধারণ বলে থাকে : এ হচ্ছে একজন স**কর্মশীল মহিলার কবর। [তারিখু দিমাশক-৪৯৬ (তারাজিম আন-নিসা)] তিনি আরো বলেছেন : আমি হিজরী ৯১ সনে বাকাকীস সাগর উপকূলে তার কবর দেখেছি এবং তার পাশে দাড়িঁয়েছি। আজো সেখানে বিভিন্ন মহাদেশের অসংখ্য মানুষের ভীড় জমে। [নিসা‘মিন আসর আন-নুবুওয়াহ-৪৭]

হযরত উম্মু হারাম (রা) ইসলামের ইতিহাসে প্রথম মহিলা নৌ-যোদ্ধা। তিনি প্রথম মহিলা সাহাবী নৌ-সেনা যিনি যুদ্ধের উদ্দেশ্যে শ্বেতসাগর পাড়ি দিয়েছেন।

হাদীস বর্ণনা

হযরত উম্মু হারাম (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস বর্ণনা করেছেন। তার থেকে মোট পাঁচটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সে সব হাদীস উচু স্তরের অনেক সাহাবী ও তাবি‘ঈ বর্ণনা করেছেন। যেমন : আনাস ইবন মালিক (রা), আমর ইবন আসওয়াদ (রা), উবাদা ইবন আস-সামিত (রা), আতা ইবন ইয়াসার, ইয়ালা ইবন শাদ্দাদ ইবন আওস (রা) প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ।

তিনি তিন ছেলে- কায়েস, আব্দল্লাহ ও মুহাম্মদকে রেখে যান। প্রথম দুইজন প্রথম স্বামীর এবং শেষের জন উবাদা ইবন আস-সামিতের (রা)। [তাবাকাত-৮/৩১৮; আল-ইসাবা-৪/৪৪২]

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ